দোহায় মকবুল ফিদা হুসেনকে নিবেদিত বিশ্বের প্রথম জাদুঘর উদ্বোধন

কাতারের রাজধানী দোহার উপকণ্ঠে যুক্ত হয়েছে একটি নতুন ধূসর-নীল স্থাপনা। সূর্যালোকে যার টালি ঝিলমিল করে ওঠে, দেয়ালে জ্যামিতিক ছায়া ফেলে। ভবনটি যেন সামনে ঝুঁকে গল্প বলার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। এটাই ‘লওহ ওয়া কলম’, ভারতীয় শিল্পের কিংবদন্তি মকবুল ফিদা হুসেনকে নিবেদিত বিশ্বের প্রথম জাদুঘর। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

কাতার ফাউন্ডেশনের এডুকেশন সিটির বিস্তৃত ক্যাম্পাসে অবস্থিত জাদুঘরটি গত সপ্তাহে উদ্বোধন করা হয়েছে। এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে ১৫০-এরও বেশি কাজ, চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, ট্যাপেস্ট্রি, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্রসহ নানা কর্ম। যা হুসেনের বৈচিত্র্যময় ও দীর্ঘ শিল্প–যাত্রার অনন্য মানচিত্র তৈরি করেছে। কিউরেটর নুফ মোহাম্মদ জানিয়েছেন, হুসেন চাইতেন তার জাদুঘর যেন বাড়ির মতোই ঘনিষ্ঠ অনুভূতি দেয়।

বিশ্বভ্রমণকারী বোহেমিয়ান শিল্পী হিসেবে পরিচিত হুসেনের ঘোড়ার চিত্র আজও সমকালীন শিল্পের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন কাজ। কিউবিস্ট ঘরানার প্রভাব, ভারতীয় ঐতিহ্য ও পুরাণ- সবকিছু মিশিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব উজ্জ্বল, সাহসী শৈলী।

তবে তার শিল্প-জীবনে ছিল নানা বিতর্ক। নগ্ন হিন্দু দেবীচিত্রের কারণে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন তিনি। এজন্য তাকে স্বেচ্ছানির্বাসনে যেতে হয়েছে। পরে কাতার তাকে নাগরিকত্ব দেয় এবং এখানেই তিনি কাটান নিজের শেষ সৃজনশীল বছরগুলো। কাতার-ভিত্তিক শিল্পী ইউসুফ আহমদ স্মরণ করেন, আরব সংস্কৃতি তাকে গভীরভাবে মোহিত করেছিল। এখানেই তিনি তার জীবনের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী কাজগুলি সম্পন্ন করেন মকবুল ফিদা হুসেন। তার উচ্চাভিলাষী কাজগুলোর অন্যতম ‘সিরু ফি আল-আর্দ’- গতি, শব্দ ও যান্ত্রিক কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে সভ্যতার গল্প বলার একটি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্ট। যা হুসেনের শেষ বছরগুলোর প্রধান কর্মযজ্ঞ ছিল।

জাদুঘর-ভবনের অনুপ্রেরণা ২০০৮ সালের একটি স্কেচ- দুইটি ভাস্কর্য-ঘর এবং এক নলাকার টাওয়ার। স্থপতি মার্তান্ড খোশলা বলেন, একটি স্কেচ মানে উদ্দেশ্য, বাস্তব পরিমাপ নয়। সেই উদ্দেশ্যকে কার্যকর জাদুঘরে রূপ দেওয়া ছিল চ্যালেঞ্জ। ফলাফল একটি গোলকধাঁধার মতো। যার বিন্যাস দর্শককে হুসেনের তুলির আঁচড়ের মতোই প্রতিটি রেখা, আলো-ছায়া অনুসন্ধানের আমন্ত্রণ জানায়।

প্রতিটি গ্যালারি শুরু হয় হুসেনের একটি উক্তি দিয়ে। দীর্ঘ করিডোর ধরে দেখা যায় তার আঁকা ছবি, ভাস্কর্য, ব্যক্তিগত জিনিস। এমনকি তার পুরোনো ভারতীয় পাসপোর্টও। কেন্দ্রস্থলে স্থান পেয়েছে তার প্রিয় ঘোড়ার ছবি। জাদুঘর দল হুসেনের চালক, সহকর্মী ও বন্ধুসহ নানা ব্যক্তির কাছ থেকে মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করেছে, যাতে তার ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত দিকও উঠে আসে। শিল্পী ইউসুফ আহমদ বলেন, মানুষ তাকে বিতর্কিত, খালি-পায়ে ঘুরে বেড়ানো এক অদ্ভুত শিল্পী হিসেবে মনে রাখে, কিন্তু তার গভীরে ছিলেন এক গল্প-কথকের প্রতিভা।

২০০৮ সালে কাতারের শেখা মোজা বিন্ত নাসেরের অনুরোধে হুসেন আরব সভ্যতা নিয়ে বিশাল কর্মপরিকল্পনা হাতে নেন। দোহায় স্টুডিও থেকে তিনি আঁকেন ইসলামের ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও মরুভূমির পথিকদের- ভারতীয় শিল্পশৈলীর গতিময় রেখা। যার মধ্যে ‘দ্য ব্যাটল অব বদর’ অন্যতম। ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার শক্তিশালী মেলবন্ধন। তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন ৯৯টি কাজের। তবে জীবদ্দশায় সম্পন্ন করেন মাত্র ৩৫টি। এগুলো পর্যায়ক্রমে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থপতি খোশলা বলেন, হুসেন ছিলেন একাধিক পরিচয়ের শিল্পী। ভারত, আরব অঞ্চল, ইতিহাস, ধর্ম, আধুনিকতা- সব মিলেই তৈরি হয়েছিল তার অনন্য জগৎ। জাদুঘরটি সেই বহুত্বকে নতুন আলোয় তুলে ধরে ধরেছে। এম এফ হুসেন শুধুই ভারতীয় শিল্পীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক বহুজাগতিক, বহুভাষী, বহুসাংস্কৃতিক শিল্প-বিশ্বের অংশ। তাই দোহায় হুসেনের স্মরণে নির্মিত এই জাদুঘর একদিকে শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যদিকে তার উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে পুনঃপাঠের একটি প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ।

mzamin