Sunday, November 23, 2025

এ ভূমিকম্প হুঁশিয়ারি সংকেত, বড় বিপদ তো সামনে by আনিসুল হক

আগারগাঁও সিসমিক সেন্টার থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে মাধবদীতে ছিল ২১ নভেম্বর ২০২৫-এর ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। মাইলে হিসাব করলে দাঁড়াবে ৮ মাইল।

রিখটার স্কেলে ৫.৭ বলছে বাংলাদেশের আবহাওয়া অফিসের সিসমিক অবজারভেটরি ও রিসার্চ সেন্টার। আর যুক্তরাষ্ট্র বলছে রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.৫।

একটা ধাক্কা দিয়ে, একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ভূমিকম্প আমাদের সতর্ক করে দিল। ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। শত শত আহত প্রধানত পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে, কেউ–বা ভবন থেকে লাফিয়ে নামতে গিয়ে।

অনেক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে, বেশ কিছু ভবন হেলে পড়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন জ্বলেছে, মাঠের মাটি দুভাগ হয়ে গেছে, ঘরের জিনিসপত্র তাক থেকে পড়ে গেছে।

আরেকটু বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে কী হবে?

বাংলাদেশের সেরা কাঠামো-প্রকৌশলী শামীমুজ্জামান বসুনিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫। তিনি বলেছিলেন: ‘ভূমিকম্প হলে আমাদের যা হবে…যারা বেঁচে যাবে, তারাও থাকতে পারবে না।

এখানে বীভৎস অবস্থা হবে। আগুন, পানি এবং পয়ঃপ্রণালির যে সিস্টেম আমাদের, এগুলোর যে অবস্থা, এগুলোকে সরাতেও পারবা না। এগুলোর গন্ধে কেউ থাকতে পারবে না।

আগুন তো আছেই। প্লাস এগুলোর যে অবস্থা, তুমি ক্লিয়ারই করতে পারবা না।
ভূমিকম্প এক্সপার্ট যেটা বলে, আমিও বিএসএর আর্থকোয়েক সোসাইটির মেম্বার, সেখানে ওরা দেখেছে যে ভূমিকম্প কত বছর পরপর একটা রিপিটেশন হয়।

যে ফল্টগুলো আছে, সেগুলো মুভ করছে। প্রতিটি আলাদা মুভ করে। কোনোটা একই ডিরেকশনে মুভ করে, কোনোটা উল্টো দিকে করছে।

এটার মধ্যে দুই জয়েন্টগুলো, যেগুলো আছে, এটাই হচ্ছে সবচেয়ে ডিফিকাল্ট জায়গা। ডাউকি ফল্ট আমাদের সিলেটের ওপর দিয়ে আছে, এটাও একটা।

ভূমিকম্প ডেইলি হচ্ছে। ভূমিকম্পের ইতিহাস দেখলে মনে হয় যে ডেইলি ২ মাত্রা বা ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে। এগুলো আমরা ধরি না।

ফলে একটা ভূমিকম্প যদি হয়, আমি জানি না কী হবে। এখানে বড় বড় এক্সপার্ট, ওনারা যারা পড়াশোনা করেন, তাঁরা বলেন, দেড় লাখ বিল্ডিং এখানে ভালনারেবল।

আমি বলব, ‘একসেপ্ট ফিউ বিল্ডিংস অল বিল্ডিংস আর ভালনারেবল। ইদানীং আমাদের ডিজাইনাররা ভেরি স্ট্রং ডিজাইন করছে। এগুলো ছাড়া অল বিল্ডিংস আর ভালনারেবল।’

অর্থাৎ তিনি বলছেন, ‘অল্প কিছু ভবন ছাড়া বাংলাদেশের সব স্থাপনাই ভূমিকম্পের সামনে ভঙ্গুর অবস্থায় আছে।’

২.

৫.৭ থেকে যদি ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, মহাপ্রলয় হবে ঢাকায়। এবং দেশের অনেক জায়গায়।

ভূমিকম্পে ভবন ধসে তো মানুষ মারা যাবেই, প্রধান বিপদ আসবে আগুন থেকে। সারা শহরের এখানে ওখানে আগুন জ্বলে উঠবে।

এখন মনে করুন, ২০ অক্টোবর ২০২৫ ঢাকার বিমানবন্দরের কার্গো গুদামে আগুন লেগেছিল। এই আগুন নেভাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেও আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছে।

অথচ এই ধরনের কেপিআই এলাকায় আগুন লাগলে অ্যালার্ম বেজে ওঠার কথা স্বয়ংক্রিয়ভাবে, সিসিটিভিতে ধোঁয়া দেখে শুরুতেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানির ধারা বর্ষিত হওয়ার কথা এবং ঘটনাস্থলেই ফায়ার ব্রিগেড থাকার কথা।

সেই সংরক্ষিত এলাকার আগুন আমরা সামলাতে পারি না। এখন কল্পনা করুন, সারা শহরে ৫০০টা ভবন ভেঙে গেছে, রাস্তাঘাটে বিদ্যুতের খুঁটি ভাঙা ইট কংক্রিট পড়ে রাস্তাকে অচল করে রেখেছে, এর মধ্যে ২৫টা জায়গায় একসঙ্গে আগুন জ্বলে উঠেছে, তখন কী হবে?

৩.

২০২৩ সালের ৭ এপ্রিল বঙ্গবাজারের আগুনের পর একটা লেখা লিখেছিলাম। সেটা এখন আবার তুলে ধরি—

সিদ্দিকবাজারে একটা ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে, সম্ভবত গ্যাস থেকে। ৭ মার্চ ২০২৩। সে সময়ও আমরা বুঝতে পারি, দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি, সরঞ্জাম, রসদ, যন্ত্রপাতি কত অপর্যাপ্ত।

মাত্র একটা ভবনে দুর্ঘটনা ঘটলে তা থেকে উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে আমরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। একই অসহায়ত্ব আমরা বোধ করেছিলাম কিছুদিন আগে, যখন সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় একটা ভবনে বিস্ফোরণ ঘটে।

এ থেকে যে দুশ্চিন্তা মনে হানা দেয়, তা হলো, একটা জায়গায় আগুন লাগলে, একটা ভবনে বিস্ফোরণ হলে আমরা সামলাতে পারি না।

উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে বুঝতে পারি, আমাদের সীমাবদ্ধতা কত সীমাহীন। সে ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগ, আল্লাহ না করুন, যদি এ ঢাকা শহরে কখনো আঘাত হানে, আমরা কী করব?

আমরা জানি, বাংলাদেশ ভূমিকম্পের শঙ্কার মুখে আছে। গত ৪ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত ইফতেখার মাহমুদের প্রতিবেদন, ‘দেশের ১৩টি এলাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ভূগর্ভস্থ ফাটল বা চ্যুতি থাকার কারণে ওই কম্পন হতে পারে। সবচেয়ে তীব্র ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা ও সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকা।

‘সব এলাকাই ঢাকা থেকে কমপক্ষে ১০০ কিলোমিটার দূরে; কিন্তু সেখানে সাত থেকে আট মাত্রার ভূমিকম্প হলে তা ঢাকায় বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।’

আমরা যে একটা বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে আছি, দেশি-বিদেশি একাধিক গবেষণায় তা উঠে এসেছে।

বলা হচ্ছে, বড় ভূমিকম্প হলে ঢাকার বহু ভবন শুধু বিধ্বস্ত হবে, তা-ই নয়, আসল ক্ষতিটা হবে আগুন থেকে।

আমাদের ভবনে ভবনে গ্যাসের লাইন, মুহূর্তে পুরো শহর জ্বলে উঠবে। এখন হরর মুভির মতো দৃশ্য কল্পনা করুন।

একটা রানা প্লাজা ধসের সময় আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেও কত সামান্যই করতে পেরেছিলাম, একটা সিদ্দিকবাজারের সময় আমরা কতটা অসহায় বোধ করেছিলাম, এক বঙ্গবাজারের আগুন নেভাতে আমাদের কতটা বেগ পেতে হয়েছিল।

এখন যদি একসঙ্গে ১ হাজার রানা প্লাজা ভেঙে পড়ে, একসঙ্গে যদি ১০০ বঙ্গবাজার জ্বলে ওঠে, একসঙ্গে যদি ৫০০ সিদ্দিকবাজার বিস্ফোরিত হয়, এ শহরের হবেটা কী!

আপনারা ভাবছেন, আমি কেন বলছি যে এতগুলো ভবন একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি আসলে কমিয়ে বলছি।

বিবিসি বাংলার ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩-এর খবরটা পড়ুন—‘২০০৯ সালে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার যৌথ জরিপে বলা হয়, ঢাকায় সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হলে, শহরের ৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়বে এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তৈরি হবে সাত কোটি টন কনক্রিটের স্তূপ।...এ ছাড়া উদ্ধারকাজের সহায়তার জন্য ২০১৯ সালে ২২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে আরও যন্ত্রপাতি বাংলাদেশ হাতে পাবে। অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ এবং দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম শক্তিশালী করতে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান বলেন, ‘ভূমিকম্প মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি খুবই অপ্রতুল।’

এখন বুঝুন, বাস্তবতাটা! এক সিদ্দিকবাজার, এক সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকা, এক বঙ্গবাজারের বিপর্যয় আমরা সামলাতে পারি না।

বঙ্গবাজারে আগুন নেভানোর কাজে ফায়ার সার্ভিসের লোকদের জন্য প্রধান বাধা হয়ে উঠেছিল মানুষের ভিড়। মানুষের ভিড়ে গাড়িগুলো চলতে পারছিল না, কর্মীরা কাজ করতে পারছিলেন না।

কোথায় আমাদের ২২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি! ২০১৭ সালের চ্যানেল আই অনলাইন খবর থেকে জানা যায়, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ‘ভূমিকম্প আমি প্রস্তুত’ শিরোনামে প্রচারণার লোগো উন্মোচন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল।

সে সময় ৬০ কোটি টাকার তাঁবু, ২৫০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনাসহ ভূমিকম্প মোকাবিলায় সরকারের কিছু উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়।

তাঁবুগুলো কই? তা দিয়ে কী হচ্ছে?

আমরা আমাদের শহরটিকে পরিকল্পনার মধ্যে আনব না, আমরা আমাদের জলাশয়গুলো ভরাট করব, ডিএপি মানব না, ভবন বানানোর সময় মাটি নিরীক্ষা করব না, ভূমিকম্প ও দুর্যোগসহনীয় ভবন বানাব না, জরুরি নির্গমন পথ রাখব না, অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলার পথ রাখব না, গলিগুলো বানিয়ে রাখব অপ্রবেশ্য, আগুন নেভানোর যন্ত্র রাখব না, নিরাপত্তা নির্দেশিকা মানব না; আমাদের রাস্তায় একটাও ফায়ার হাইড্রেন্ট থাকবে না, আমরা ফায়ার ড্রিল করব না, আমরা ঘনবসতির এলাকায় বিস্ফোরক রাখব, রাসায়নিক রাখব; আমাদের মার্কেটগুলোকে আমরা একেকটা বিপজ্জনক ফাঁদ বানিয়ে রাখব; আমরা কোনো নিয়মকানুন মানব না; আমাদের কারখানাগুলো কেউ পরিদর্শন করবেন না, ভবনগুলো কেউ নজরদারিতে রাখবেন না এবং আশা করব, দুর্যোগ এলে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা আমাদের রক্ষা করবেন এবং ভবন ভেঙে গেলে আমরা ৬০ কোটি টাকার তাঁবুতে থাকব!

আসলে আমরা একটা সার্বিক নিয়মহীনতার মধ্যে পড়ে গেছি। আমাদের অর্থগৃধ্নুতা সব নিয়মকানুন তছনছ করে ফেলেছে। লোভের লেলিহান শিখাই পুড়িয়ে ফেলছে সব প্রতিষ্ঠান, নিয়ম, নির্দেশিকা, ম্যানুয়াল, প্রটোকল, আইনকানুন, সুশাসন বলতে যা বোঝায়, তা থেকে আমরা সহস্র যোজন দূরে।

একটা করে দুর্ঘটনা ঘটবে, তারপর আমরা বলব, এই ভবনের অনুমতি ছিল না, এই বাসের ফিটনেস ছিল না, এই এলাকায় রাসায়নিক রাখার কথা নয়, এই বাজার আগেই বিপজ্জনক বলে ঘোষিত ছিল। এখন যেমন আমরা বলছি, ঢাকায় পুকুর, হ্রদ, জলাশয়গুলো গেল কোথায়?

আমরা একটা মহাবিপর্যয়ের লাল সংকেতের মুখে আছি। এখন প্রকৃত আশাবাদীর পক্ষে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই নেই।

অরুন্ধতী রায় ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ শেষ করেছেন এভাবে, ‘একটা গুবরে পোকা চিৎ হয়ে আকাশের দিকে পা উঁচু করে আছে। আকাশটা যদি ভেঙে পড়ে, সে পাগুলো দিয়ে ঠেকাবে।’

বনানীর আগুনের সময় একটা ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল। দমকলের ফুটো পাইপ পলিথিনে পেঁচিয়ে হাত দিয়ে রক্ষার চেষ্টা করছে একটি শিশু।

পরে শিশুটিকে পুরস্কার দেওয়া হয়। এবারও এমন একটি ছবি দেখলাম। জানি না ছবিটা কার তোলা, এবারের নাকি আগেরবারের।

এই গুবরে পোকাটা আকাশের ভেঙে পড়া ঠেকাতে পারবে না। তবু সে চেষ্টা করছে। বঙ্গবাজারে লুটপাট করা, দমকল অফিসে হামলা করা, রাস্তায় ভিড় করে বাধা তৈরি করা জনতার বিপরীতে এই শিশুই আমাদের আশা জোগায়।

যে যেখানে আছি, সেখান থেকেই নৈরাজ্যের স্রোতের বিপরীতে নিয়মকানুন, আইনের শাসন, সুশাসন, নিরাপত্তা বিধান ও পদক্ষেপ নেওয়ার কাজটা আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে। যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবু আমাদের চেষ্টা ছাড়া যাবে না।

* আনিসুল হক, প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও সাহিত্যিক

ভূমিকম্পের কারণে বাইরে বেরিয়ে উঁচু ভবনের দিকে তাকিয়ে আছে উৎসুক জনতা। রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকা।
ভূমিকম্পের কারণে বাইরে বেরিয়ে উঁচু ভবনের দিকে তাকিয়ে আছে উৎসুক জনতা। রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকা। ছবি: দীপু মালাকার

ইসরায়েলের স্বার্থে আইএসের জন্য ট্রাম্প দরজা খুলে দিচ্ছেন by আলি রিজক

লেবাননবিষয়ক ওয়াশিংটনের কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যেন নতুন একটি নীতিগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের (জো বাইডেন) একজন উপদেষ্টা আমোস হকস্টাইন হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণে ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত জোর দেওয়ার নীতিকে পরোক্ষভাবে সমালোচনা করেছেন।

হকস্টাইন বলেন, ‘আমরা বাস্তবতা বুঝে এগোই। শুধু হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে জোর দিলে হবে না। দ্বিমুখী পথেই এগোতে হবে—অর্থনীতি গড়ে তুলে বিনিয়োগ আনা এবং লেবানিজ সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করা।’

বাইডেন প্রশাসনের এই সাবেক কূটনীতিক সতর্ক করেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের জন্য লেবানন সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে লেবাননের পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় সহায়তার আহ্বান জানান।

ওই কূটনীতিকের এই বক্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক লেবাননকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ আখ্যা দেন। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থ হওয়া দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের তিনি ‘ডাইনোসর’ মনে করেন।

পক্ষপাতহীন অবস্থান থেকেই হকস্টাইনের এই মন্তব্য এসেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য হকস্টাইন ছিলেন বাইডেন প্রশাসনের লেবানন-সম্পর্কিত মুখ্য ব্যক্তি। তাঁর মধ্যস্থতায় লেবানন-ইসরায়েলের সামুদ্রিক সীমান্ত নির্ধারণে ঐতিহাসিক চুক্তি হয়, হিজবুল্লাহও যা সমর্থন করেছিল।

হকস্টাইনের মন্তব্য ইঙ্গিত করে যে দ্রুত হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণে ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়াবাড়ি আসলে লেবাননকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দেশটি হয়তো ‘দুর্বল রাষ্ট্র’। কিন্তু বর্তমান পদ্ধতি সবকিছু অরাজকতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি

এদিকে হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে লেবানন-ইসরায়েল আলোচনার প্রতি কঠোর আপত্তি জানিয়েছে। তবে গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন যখন বলেন, সংঘাত বন্ধের একমাত্র পথ হলো আলোচনায় বসা। তাঁর পরিপ্রেক্ষিতে হিজবুল্লাহর বিবৃতি পুরোপুরি আলোচনার অস্বীকৃতি নয়।

এক কর্মকর্তা পরে গবেষক ও সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা ‘রাজনৈতিক’ আলোচনার কথা বলেছিলেন, অর্থাৎ ‘অরাজনৈতিক’ আলোচনার পথ খোলা থাকতে পারে। তিনি এটিও বলেন, যেকোনো আলোচনার একটি স্পষ্ট চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হিজবুল্লাহ তাদের বিবৃতিতে ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি ধারার উল্লেখ করে, যা লেবাননের যেকোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকতে বলে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হামলার অভিযোগের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এটি দেওয়া হয়েছে।
এই অবস্থান টেলিভিশন ভাষণে দলটির নেতা শেখ নাঈম কাসেমও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে গেলে হিজবুল্লাহ বাধ্য হবে প্রতিক্রিয়া জানাতে, তবে তারা নিজেরা হামলা শুরু করতে চায় না।

হিজবুল্লাহর এই ব্যবহারিক অবস্থান বিবেচনায় ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত হবে হকস্টাইনের পরামর্শ গ্রহণ করে নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতে আরও নমনীয় হওয়া এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলকে লেবাননে চলমান হামলা বন্ধে চাপ দেওয়া।

এতে যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একধরনের স্থায়ী ‘শীতল শান্তি’ প্রতিষ্ঠা হতে পারে, যা লেবানন-ইসরায়েলের দীর্ঘ সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসনের আঞ্চলিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। এই সাফল্যের গুরুত্ব হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনের আরেক বড় লক্ষ্য, যা সৌদি আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সমতুল্য হবে, যদিও সৌদি ও ইসরায়েলের মধ্যে কখনো যুদ্ধ হয়নি।

এ ধরনের ‘শীতল শান্তি’ বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থেও যুক্তরাষ্ট্রকে সুবিধা দেবে। ওয়াশিংটন বৈরুতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মার্কিন দূতাবাস কমপ্লেক্স নির্মাণ করছে (বাগদাদের পর)। ফলে লেবানন ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হবে, দেশটির স্থিতিশীলতা তাই যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি স্বার্থের বিষয়।

আইএসের জন্য দরজা খুলে দেওয়া

এর বিপরীতে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণে অতিরিক্ত চাপাচাপিতে লেবাননকে যদি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক পরিকল্পনাকে দুর্বল করবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেই অন্ধকার রেকর্ডে আরেকটি সংযোজন হবে, যেখানে তারা ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা অন্যত্র ব্যর্থ রাষ্ট্র তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

এর ফলে ট্রাম্পের উত্তরাধিকারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে, বিশেষত আইএস হুমকির ক্ষেত্রে। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ব্যর্থ রাষ্ট্রে ভালোভাবে টিকে থাকে এবং লেভান্ত অঞ্চলে তাদের আগ্রহ বিশেষভাবে গভীর, যা ইরাক ও সিরিয়ায় তাদের পুনরুত্থানের চেষ্টায় প্রমাণিত। লেবাননে বিশৃঙ্খলা আইএসের জন্য সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করবে।

এই বাস্তবায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লেবানন বিষয়ে ইসরায়েলের এজেন্ডা থেকে দূরত্ব বজায় রাখা যুক্তিযুক্ত। হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণের ওপর একমাত্র জোর দেওয়া ইসরায়েলের জন্য কাঙ্ক্ষিত। কারণ, এতে তাদের ভূখণ্ড বিস্তারের নীতির পথ সুগম হয়। কিন্তু এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে নয়, ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্যই নয়।

* আলি রিজক, বৈরুতভিত্তিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট ও দ্য আমেরিকান কনজারভেটিভসহ বিভিন্ন মাধ্যমে লেখেন।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া
- ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্স

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরাইলি হামলা, নিহত কমপক্ষে ২৪

যুদ্ধবিরতির চুক্তি হলেও তা প্রতিনিয়ত লঙ্ঘন করে যাচ্ছে ইসরাইল। হামাসের সঙ্গে হওয়া ওই চুক্তি ভঙ্গ করে গাজায় ফের বিমান হামলা চালিয়েছে তেল আবিবের বাহিনী। এতে কমপক্ষে ২৪ জন নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুও রয়েছে। এছাড়া ওই হামলায় নতুন করে আহত হয়েছেন মোট ৮৭ জন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।

প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, শনিবার প্রথম হামলাটি হয় উত্তর গাজা সিটির একটি গাড়িতে। এরপর মধ্যাঞ্চলের দেইর আল-বালাহ ও নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরেও হামলা হয়। গাজা সিটির রিমাল এলাকায় ড্রোন হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আল-শিফা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামি মোহান্না। এছাড়া দেইর আল-বালাহতে একটি বাড়িতে ইসরাইলি হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন।

গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় জানিয়েছে, গত ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইল অন্তত ৪৯৭ বার তা লঙ্ঘন করেছে। এসব হামলায় ৩৪২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই শিশু, নারী ও বয়স্ক।

mzamin

ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধের পর কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করবেন টেলর গ্রিন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধের পর কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করবেন রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেলর গ্রিন। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের এই রিপাবলিকান এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি জানুয়ারিতে কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করবেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের কয়েক দিনের মধ্যেই এই অপ্রত্যাশিত ঘোষণা দিলেন তিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ‘মাগা সুপারস্টার’ বা মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন সুপারস্টার হিসেবে পরিচিত গ্রিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় জানান, তিনি ৫ জানুয়ারি কংগ্রেস ছাড়বেন। তিনি লিখেছেন, আমি সামনে একটি নতুন পথের দিকে তাকিয়ে আছি। গ্রিন মূলধারার আলোচনায় আসেন নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রতি সমর্থন এবং ট্রাম্পের প্রতি অটল আনুগত্যের কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর তা ভেঙে পড়ে। তাদের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে থাকা প্রয়াত অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সব নথি প্রকাশের বিষয়ে।

কংগ্রেস ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া ভিডিও বার্তায় গ্রিন নিজের সাফল্যগুলোর তালিকা দেন এবং ট্রাম্পকে সমালোচনা করেন। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে, তিনি গ্রিনকে হারাতে পরের বছরের নির্বাচনে একজন রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে সমর্থন করবেন। গ্রিন বলেন, আমার নিজের প্রতি যথেষ্ট সম্মান আছে। পরিবারকে আমি খুব ভালোবাসি। আমি চাই না আমার রাজ্যের মানুষ এমন একটি আক্রমণাত্মক ও বিভাজন সৃষ্টিকারী প্রাইমারি নির্বাচন সহ্য করুক, যা ঘটত সেই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে, যার জন্য আমরা লড়েছি।

কংগ্রেস থেকে বিদায় নেয়ার ঘোষণা দিলেও, মার্কিন গণমাধ্যমের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে গ্রিন জর্জিয়ার গভর্নর অথবা সিনেট আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী। এই সম্ভাবনা নিয়ে প্রেসিডেন্টও প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন। তিনি ট্রুথ সোশালে তাদের বিরোধের সময় লিখেছিলেন, তিনি গ্রিনকে আগেই বলেছিলেন দুর্বল জনমত জরিপের কারণে এই দুই পদেই তার না থাকা উচিত। দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্প ও গ্রিন ছিলেন মিত্র। গ্রিন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডার অন্যতম প্রবল সমর্থক। কিন্তু গ্রিন যখন এপস্টেইন সম্পর্কিত সব নথি প্রকাশের পিটিশনের পক্ষে থাকা রিপাবলিকানদের একজন হয়ে ওঠেন, তখন থেকেই তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। ট্রাম্প প্রথমে এই আইনটির বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু পরে অবস্থান বদলে রিপাবলিকানদের সমর্থনের আহ্বান জানান। কারণ গ্রিন ও আরও বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান ডেমোক্রেটদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আইনটি পাস করাতে প্রস্তুত ছিলেন। গ্রিন দীর্ঘদিন ধরে এপস্টেইন সম্পর্কিত নথি প্রকাশের দাবিতে সোচ্চার। একসময় এটি ট্রাম্প ও তার মাগা সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল। কিন্তু এখন তা বিভাজন সৃষ্টি করেছে।

গত কয়েক মাস ধরে গ্রিন বিভিন্ন টেলিভিশন টকশোতে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতৃত্বকে সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে যথেষ্ট কাজ করছেন না এবং তার শুল্কনীতি ভুল। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন- ট্রাম্প কি এখনও আমেরিকা ফার্স্ট নীতি অনুসরণ করছেন, নাকি বিদেশনীতি নিয়ে বেশি ব্যস্ত? তবে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল- এপস্টেইন নথি প্রকাশে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের অস্বীকৃতি; যার জন্য কংগ্রেসের কোনো আইন প্রয়োজন ছিল না। প্রেসিডেন্ট চাইলে যেকোনো সময় তা প্রকাশের নির্দেশ দিতে পারতেন। ট্রাম্প একাধিক সামাজিক মাধ্যম পোস্টে তাকে বিশ্বাসঘাতক এবং উন্মাদ বলে আক্রমণ করেন। তিনি বলেন গ্রিনকে পরাজিত করতে তিনি একজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে সমর্থন দেবেন। অবশেষে এপস্টেইন নথি প্রকাশে বিচার বিভাগকে বাধ্য করার আইনটি মঙ্গলবার কংগ্রেসে পাস হয় এবং বুধবার ট্রাম্প সেটিতে স্বাক্ষর করেন।

mzamin

ছোট গল্প- হায়েনা by নিজাম কুতুবী

একবার একটি হায়েনার ইচ্ছে হয়েছিল মানুষের সঙ্গে বসবাস করতে। হায়েনাটি মানুষের মত করে মানুষের রূপে মানুষের শহরে বসবাস পাততে চেয়েছিল। হায়েনাটি সেই উদ্দেশ্যে পাতাল পুরি থেকে হাজার মাইল পথ-ঘাট-নদী মাঠ পেরিয়ে হাজির হলো একটি মানুষের শহরে।

এই শহরে এসে সে দেখতে পেলো, কিছু মানুষ একজন মানুষের পদার্পনের অপেক্ষা করছে। লোকটির আগমনের বার্তায় ফুলের পাঁপড়ি ছিটাচ্ছে তার পদপ্রান্তে। ঠিক এমুহুর্তে হাজির হলো একটি লাল মোটর কার। চারদিক থেকে চারজন ছুটে এসে দরজা খুলে দিল। লাল মোট গাড়ি থেকে বের হলো লাল পোশাকে আচ্ছাদিত একটা লাল মানুষ। হায়েনাটির মনে হলো, মানুষটির পরনে কোন কাপড় নেই। তার কোন হৃদয়ও নেই। হয়ত মানুষটি কোন দিন সূর্যের আলো দেখেনি। জোøারাতও তার নজর কাড়েনি। চাঁদের আলোয় ভেজেনি তার শরীর। মানুষটি হেঁটে হেঁটে একটি বিরাট অট্টালিকায় প্রবেশ করলো যা আকাশ ছুঁয়েছে। মানুষটা একটা উঁচু আসনে বসলো যা মানুষের হাড় আর খুলি দিয়ে তৈরী।

আরো একটু পরে হায়েনাটি একটা রোমহর্ষক দৃশ্য দেখল। অট্টালিকার ভেতর একটা খুঁটিতে একজন মানুষ বাঁধা আর পাশেই রাম-দা হাতে দাঁড়িয়ে আছে আর একটা মানুষ। মানুষটা রাম-দার এক কোঁপে বাঁধা লোকটার একটা হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো তার আর্তচিৎকারে। কাটা হাতের দিকে তাকিয়ে লাল মানুষটা তা কামড়াতে শুরু করল। হায়েনাটি ভয়ার্ত চোখে দৃশ্যটি দেখে নিজের মনে বলে উঠল, “আমার অনেকদিন মাংস খাওয়া হয়নি, আর এখানে মানুষ মানুষের মাংস খাচ্ছে...।”

হায়েনাটি অস্থির হয়ে ছুঁটতে লাগল। ছুঁটতে ছুঁটতে থমকে দাঁড়ালো মাঝপথে-কতগুলো মানুষ একজন লম্বা চুলের মানুষকে রাস্তা দিয়ে টেনে হিচঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। লম্বা চুলের মানুষটার বসন আলগা হয়ে পড়েছে। কালো পিচের রাস্তায় বয়ে গেছে রক্তের চোপ। লম্বা চুলের মানুষটার আর্তনাদ ঢেকে গেলো মানুষগুলোর আদিম উল্লাসে। হায়েনাটির প্রাণ হাঁসহাঁস করতে লাগল। সে প্রাণপণে ছুঁটতে লাগল। তার চোখে বিস্ময় ও প্রশ্নের চিহ্ন। শহরের শেষ প্রান্তে এসে হায়েনাটি নিজের দাঁত দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। এবং একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আমার স্বজাতি অনেক উত্তম ছিল। এসব দানব মানুষদের র্কীতিকলাপ দেখে বেঁচে থাকতে লজ্জা হচ্ছে...। তাই কবর খুঁড়ছি।”

ট্রাম্প কি ফ্যাসিস্ট? জবাবে যা বলেছেন মামদানি

নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এক চমকপ্রদ সুরে কথা বলেন। মামদানি অতীতে নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে উল্লেখ করেন। সে প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, মামদানি চাইলে এখনো তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলতে পারেন, এতে তার আপত্তি নেই। সিএনএন জানিয়েছে, একজন রিপোর্টার মামদানিকে জিজ্ঞেস করেন তিনি কি এখনো সেই মন্তব্যে অবিচল আছেন? মামদানি উত্তর দিতে শুরু করেন, আমি এ বিষয়ে বলেছি...। কিন্তু ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামিয়ে দেন। ট্রাম্প বলেন, ঠিক আছে, আপনি শুধু ‘হ্যাঁ’ বলতে পারেন। ব্যাখ্যা করার চেয়ে এটা সহজ। আমার কিছু মনে হবে না।

এই মন্তব্যটি দ্রুত ভাইরাল হয় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সিএনএন’কে জানান, নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে তার ওভাল অফিসের বৈঠক ছিল দারুণ ও খুবই ফলপ্রসূ। মামদানিকে ট্রাম্প বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানান এবং বলেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে আবাসন উন্নয়ন ও খাদ্যদাম বৃদ্ধির বিষয়ে। ট্রাম্প বলেন, আমাদের একটি দারুণ, খুব ভালো, খুব ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। একটি সাধারণ বিষয় হলো আমরা দু’জনেই চাই এই শহর, যাকে আমরা ভালোবাসি, সেই শহর ভালোভাবে এগিয়ে যাক। আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি এবং আমরা অনেক বিষয়ে একমত হয়েছি, যেমন আবাসন নির্মাণ, খাদ্যের দাম। তেলের দাম অনেক নিচে নেমে আসছে।

ট্রাম্প মামদানিকে শুভকামনাও জানান এবং ইঙ্গিত দেন যে তিনি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অনেককে অবাক করতে পারেন। ট্রাম্প বলেন, আমার মনে হয়, আপনারা একজন দারুণ মেয়র পেতে যাচ্ছেন। তিনি যত ভালো করবেন, আমি তত খুশি হব। দলের পার্থক্য এখানে কোনো বিষয় নয়। তিনি কিছু রক্ষণশীল মানুষকে এবং কিছু উদারপন্থীকেও চমকে দেবেন বলে আমার মনে হয়। প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়ে মামদানি ট্রাম্পের বক্তব্যকে সমর্থন করেন এবং বলেন যে, বৈঠকটি খুবই ফলপ্রসূ হয়েছে এবং নিউইয়র্কবাসীর জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলাই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মামদানি বলেন, আমি বৈঠকটির প্রশংসা করি। এটি ছিল একটি ফলপ্রসূ আলোচনা, যেমন প্রেসিডেন্ট বলেছেন নিউইয়র্ক সিটির প্রতি আমাদের যৌথ ভালোবাসা ও সম্মান থেকেই কথাবার্তা শুরু হয়েছিল। তিনি আরও জানান, তারা ভাড়াবৃদ্ধি, বাজারদর, ইউটিলিটি বিলসহ সেই সব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন, যেগুলো শহরের মানুষকে বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।

মামদানি বলেন, আমরা ভাড়া, বাজার, ইউটিলিটিস- সবকিছু নিয়ে কথা বলেছি। কীভাবে মানুষ শহর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে সেটাও আলোচনা করেছি। প্রেসিডেন্টের সময় দেয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমরা একসঙ্গে কাজ করে নিউইয়র্কবাসীর জন্য সাশ্রয়ী জীবন নিশ্চিত করতে চাই।

mzamin

কুশনার যেভাবে জলদস্যুতার যুগ ফিরিয়ে এনেছেন by সাহার হুনেইদি

১৭ শতকের ক্ল্যাসিক জলদস্যু কেবল সমুদ্রদস্যু ছিল না; তারা ছিল এমন এক ‘হাইব্রিড’ চরিত্র, যারা রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ও অনিয়ন্ত্রিত লুণ্ঠনের মধ্যকার ধূসর অঞ্চলে কাজ করত। তারা শক্তিশালী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে ‘লেটার অব মার্ক’ নামে একটি সরকারি অনুমতিপত্র সংগ্রহ করত, যা তাদের লুণ্ঠনকে বৈধতা দিত।

এই অনুমতিপত্র তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের জাহাজ আক্রমণ ও দখল করার ক্ষমতা দিত—এভাবে বৈধ ও অবৈধ জলদস্যুতার মধ্যে একটি সীমানা তৈরি হতো। এর পেছনে আর্থিক প্রণোদনাও ছিল : দখলকৃত সম্পদের বড় অংশ তারা নিজেরা রাখত আর একটি অংশ যেত সরকারের কোষাগারে।

এই রাষ্ট্রীয় অনুমোদিত লুণ্ঠনের প্রথা ১৮৫৬ সালে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু আজ, সেটি আবার ফিরে এসেছে—এবার করপোরেট স্যুট পরে, জ্যারেড কুশনারদের রূপে।

যেভাবে প্রাচীন জলদস্যুরা কোনো দেশের পতাকার আড়ালে লুণ্ঠন চালাত, কুশনার ও তাঁর সমসাময়িকেরা ‘কূটনীতি’ ও ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন’-এর পতাকার আড়ালে একই কাজ করছেন। মধ্যপ্রাচ্য ও ফিলিস্তিন বিষয়ে সক্রিয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা কুশনার নব্য ঔপনিবেশিক কূটনীতির মঞ্চে প্রবেশ করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কুশনার ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ঘোষিত কুখ্যাত ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ তত্ত্বাবধান করেছেন। এরপর আসে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ (সেপ্টেম্বর ২০২০), যা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মৌলিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে চলে।

ট্রাম্প শাসনামলের শুরুর দিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুশনার বলেছিলেন, ‘আমি তিন বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে পড়াশোনা করছি; ২৫টি বই পড়েছি, অঞ্চলের প্রত্যেক নেতার সঙ্গে কথা বলেছি।’

২০২১ সালের ১৪ মার্চ ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি আরব-ইসরায়েল দ্বন্দ্বকে ‘রিয়েল এস্টেট বিরোধ’ বলে অভিহিত করেন, যা তাঁর অগভীর বোঝাপড়ারই প্রমাণ। তিনি লেখেন, ‘আরব নেতারা ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টি মেনে নেননি এবং ৭০ বছর ধরে তাকে ঘৃণা করে নিজেদের ঘরোয়া ব্যর্থতা ঢাকতে ব্যবহার করেছেন।’

আরব অঞ্চলের ইতিহাস বা রাজনীতি সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা না থাকা সত্ত্বেও কুশনার নিখাদ স্বজনপ্রীতির জোরে নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। এই পারিবারিক প্রভাবই তাঁকে কূটনীতির নামে ‘চুক্তিবাজি’ চালানোর সুযোগ দিয়েছে, যা পরিণত হয়েছে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসায়।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের সার্বভৌম তহবিল থেকে অর্থ পেয়ে তাঁর প্রাইভেট ইকুইটি কোম্পানি অ্যাফিনিটি পার্টনারস এখন জলদস্যুতারই আধুনিক রূপ নিয়েছে।

২০২৫ সালের আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমার জামাতাকে আনতেই হয়েছে, কারণ তাঁর মতো বুদ্ধিমান আর কেউ নেই।’ কুশনারের ‘দ্বিতীয় আগমন’ প্রকাশ্যে আসে যখন তিনি (টনি ব্লেয়ারসহ) হোয়াইট হাউসে গাজা-পরবর্তী ‘পুনর্গঠন পরিকল্পনা’ বৈঠকে অংশ নেন। প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি জ্যারেডকে দিয়েছি কারণ সে বুদ্ধিমান, অঞ্চলটিকে চেনে, মানুষকে জানে, অনেক খেলোয়াড়কে চেনে।’

নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কুশনার বলেন, ‘অনেকে ইতিহাসবিদ বা কূটনীতিক হিসেবে এই কাজ করেন, কিন্তু আমরা “ডিল গাই”। এটা অন্য খেলা।’

তাঁর (জ্যারেড) বাস্তব জ্ঞান এসেছে মূলত তাঁর বাবা চার্লস কুশনারের কাছ থেকে, যিনি দশকজুড়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও দক্ষিণপন্থী ইসরায়েলপন্থী প্রচারণার বড় অর্থদাতা।

নিউইয়র্ক টাইমস–এর তথ্যমতে, নেতানিয়াহু একসময় কুশনার পরিবারের নিউ জার্সির বাড়িতেও থেকেছেন। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, কুশনার ও স্টিভ উইটকফ ‘ইসরায়েলের সঙ্গে শতভাগ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছিলেন’। এটা প্রশ্নহীন পক্ষপাত।

ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে কুশনারের প্রধান অবদান হলো গাজাকে একটি ‘নতুন এবং মূল্যবান ওয়াটারফ্রন্ট’ হিসেবে পুনর্গঠনের প্রস্তাব; যেখানে ‘পরিষ্কার’ করার নামে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হবে।

অসংখ্য স্বার্থের সংঘাত ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এবং কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদ ছাড়াই কুশনার গাজা চুক্তির কেন্দ্রে অবস্থান করে নেন, যা তাঁকে বিপুল অর্থ এনে দিতে পারে। কিন্তু হোয়াইট হাউস মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট অক্টোবরে বলেন, ‘জ্যারেড তাঁর শক্তি ও সময় উৎসর্গ করছেন বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায়, এটা অত্যন্ত মহৎ কাজ।’

২০২৫ সালের অক্টোবরে কিরিয়াত গাতে নতুন বেসামরিক–সামরিক সহযোগিতা কেন্দ্র উদ্বোধনকালে কুশনার ঘোষণা করেন, ‘আমি এমন এক নতুন গাজা গড়তে চাই, যেখানে ফিলিস্তিনিরা বসবাস, কাজ ও জীবনের সুযোগ পাবে।’

এ বক্তব্যের জবাবে হারেৎজ পত্রিকার জোশুয়া লাইফার লেখেন, ‘এই তথাকথিত “অর্থনৈতিক শান্তি” আসলে দখল ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, যা ধরে নেয়, ফিলিস্তিনিদের কিছু জমির টুকরা দিয়ে কেনা যাবে।’

কুশনারের জনসমক্ষে আত্মপ্রদর্শন এক অদ্ভুত নিস্পৃহতার প্রতিমূর্তি, যেন কোনো মোমের মূর্তি। তাঁর মুখে আবেগের কোনো ছাপ নেই; যেন কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু মনে হচ্ছে রিয়েল এস্টেটের হিসাব দিচ্ছেন।

এই নতুন বাস্তবতায় ‘শান্তি’ ও ‘যুদ্ধবিরতি’ শব্দগুলো অরওয়েলীয় অর্থে ব্যবহার হচ্ছে। এক রাতেই অক্টোবর মাসে শতাধিক ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনি শিশু, নারী, বৃদ্ধ তাঁবুর নিচে বোমায় নিহত হয়েছেন।

গাজাকে নতুন করে ‘হলুদ রেখা’ দিয়ে ভাগ করার যে প্রস্তাব এসেছে, তা অসলো চুক্তির মতো প্রশাসনিক বিভাজনেরই পুনরাবৃত্তি। এতে গাজার অর্ধেকের বেশি অংশ সরাসরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে এবং এটি যদি স্থায়ী হয়, তবে তা হবে আরেক দফা দখল, সহিংসতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতার নতুন অধ্যায়।

জলদস্যুতার যুগ সত্যিই ফিরে এসেছে। এর নেতৃত্বে জ্যারেড কুশনার এবং তাঁর আন্তর্জাতিক সহযোগীরা: টনি ব্লেয়ার, রন ডারমার, স্টিভ উইটকফ প্রমুখ। ভূমি ও সম্পদ দখল এখন আর গোপন নয়; তাঁরা নিজেরাই তা ঘোষণা করছে।

‘ডিল গাই’-এর অভিধানে শান্তি মানে শুধু এক লাভজনক অধিগ্রহণ। লুণ্ঠনই এখন নীতি।

* ড. সাহার হুনেইদি, ফিলিস্তিনি ইতিহাসবিদ ও লেখক।
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও জ্যারেড কুশনার
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও জ্যারেড কুশনার। রয়টার্স

ভারত-পাকিস্তান সংঘাতকে ‘কাজে লাগিয়ে’ নিজেদের অস্ত্রের পরীক্ষা করেছিল চীন: মার্কিন প্রতিবেদনে দাবি

চীন গত মে মাসে ‘সুযোগ বুঝে’ ভারত-পাকিস্তান সংঘাতকে তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ‘পরীক্ষা ও প্রচারের’ জন্য কাজে লাগিয়েছে। দ্বিদলীয় মার্কিন কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিং চার দিনের এই সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে তাদের আধুনিক অস্ত্রের পরীক্ষা ও বিজ্ঞাপন চালিয়েছে। ভারতের সঙ্গে তাদের চলমান সীমান্ত উত্তেজনা ও তাদের সম্প্রসারিত প্রতিরক্ষা শিল্পের লক্ষ্য পূরণে এটি সহায়ক হবে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘এই সংঘর্ষে প্রথম চীনের আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থা—যার মধ্যে রয়েছে এইচকিউ–৯ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, পিএল–১৫ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং জে–১০ যুদ্ধবিমান সক্রিয় যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি বাস্তব অর্থে মাঠের পরীক্ষা হিসেবে কাজ করেছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরপর চীন নাকি জুনে পাকিস্তানকে জে–৩৫ পঞ্চম প্রজন্মের ৪০টি যুদ্ধবিমান, কেজে–৫০০ বিমান এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল।

কমিটির শুনানি ও গবেষণা এবং প্রকাশ্যে আসা তথ্য ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের কয়েক সপ্তাহ পর চীনের দূতাবাসগুলোও ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে তাদের অস্ত্রব্যবস্থার ‘সাফল্যের’ প্রশংসা করে, যা ‘অস্ত্র বিক্রি বৃদ্ধির’ চেষ্টা ছিল।

প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, মে মাসের এই সংঘাতকে ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বলা হলে ‘উসকানিদাতা’ হিসেবে চিনের ভূমিকাকে বাড়িয়ে বলা হবে।

ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদনে অভিযোগ তোলা হয়েছে, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর ফরাসি রাফাল যুদ্ধবিমানকে হেয় করতে চীন ‘ভুয়া তথ্য প্রচার’ চালিয়েছিল।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুসারে, চীন ফরাসি রাফাল বিপক্ষে তাদের নিজস্ব জে–৩৫-এর পক্ষে ভুয়া প্রচার শুরু করে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং ভিডিও গেমের ছবি প্রচার করে দাবি করে, সেগুলো চীনের অস্ত্রে ধ্বংস হওয়া যুদ্ধবিমানগুলোর ‘ধ্বংসাবশেষ’।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা ইন্দোনেশিয়াকে ফ্রান্সের সঙ্গে প্রক্রিয়াধীন থাকা রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি থামাতে রাজি করিয়েছিলেন।

তবে, চীন এসব প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া তথ্য’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং রাফাল নিয়ে ভুয়া তথ্য প্রচারের বিষয়ে ব্রিফিংয় এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আপনারা যে তথাকথিত কমিশন’-এর কথা বলছেন, তারা সবসময় চীনের প্রতি আদর্শগত বিদ্বেষ পোষণ করে। তাদের বলার মতো বিশ্বাসযোগ্য কোনো কিছু নেই।

মাও নিং আরও যোগ করেন, ‘কমিশনের তৈরি করা প্রতিবেদন নিজেই একটি ভুয়া তথ্য।’

ভারত-পাকিস্তান সংঘাত

জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্রগোষ্ঠীর হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ওই হামলায় ২৬ জন নিহত হয়েছিল।

ভারত এই হামলায় জড়িতদের পাকিস্তানের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে বলে ভারত অভিযোগ করে। তবে পাকিস্তান এই অভিযোগ নাকচ করে দেয়। গত ৭ মে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ নাম দিয়ে পাকিস্তানে হামলা চালিয়ে বসে। জবাবে পাকিস্তানও পাল্টা আঘাত করে।

পাল্টাপাল্টি হামলার পর দুইপক্ষের মধ্যে সংঘাত বেঁধে যায়। এই সংঘাত চার দিন ধরে চলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর মধ্যস্থতায় ১০ মে দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। তবে নরেন্দ্র মোদি সরকার ট্রাম্পের এই দাবি অস্বীকার করেছে। নয়াদিল্লি দাবি করেছে, ভারত–পাকিস্তান কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত বন্ধে রাজি হয়। 

ধাতব ধ্বংসাবশেষ দেখছেন স্থানীয় লোকজন। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার উয়ান গ্রামে
ধাতব ধ্বংসাবশেষ দেখছেন স্থানীয় লোকজন। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার উয়ান গ্রামে। ফাইল ছবি: রয়টার্স