Friday, September 26, 2014

আম্মির গল্প by আশিক মুস্তাফা

বাড়ি থেকে দূরে হোস্টেলটা। সপ্তম শ্রেণিতে উঠেই কুহু চলে আসে জেলা শহরের এই হোস্টেলে। সিঁড়িঘরের পাশে তার এইটুকুন একটা ঘর। অনেকটা জেল-কয়েদিদের মতো। রুমে ছোট্ট একটা জানালা। তাতে বসে সে বিড়াল ছানা কিডির কথা ভাবে, ভাবে গ্রামের দিনগুলোর কথা। আরেকজনের কথাও তার খুব মনে পড়ে। তখন আর স্থির থাকতে পারে না। বুকটা কেঁপে ওঠে। চোখে পানি আসে। টলমল করে গড়িয়ে পড়ে। কুহু হাতের পিঠ দিয়ে চোখের পানি মোছে। দৌড়ে যায় হোস্টেল সুপারের কাছে। ফোন করে। আম্মির কণ্ঠ শুনেই ‘ব্যাঁ...’। আম্মিও স্থির থাকতে পারেন না। ছোট ছোট কথা বলেন। কুহুকে শান্ত করেন, ‘তোর কথাই ভাবছিলাম।’

কথা শেষে কুহু ঘুমায়। রাতে ফের ঘুম ভাঙে। তখন আর ফোন করা যায় না। খোলা জানালা দিয়ে, রাতজাগা তারায় চোখ রেখে সে আম্মিকে ডাকে। আম্মিও সায় দেন। জমে ওঠে গল্প। গল্পে গল্পে সকাল হয়। পোলাপান দেখে খ্যাপায়, ‘সিঁড়িঘরে রাত জেগে ভূতের সঙ্গে কথা বলিস নাকি রে?’
উত্তর দেয় না কুহু। তারা তো জানে না, সে যে টেলিপ্যাথি দিয়ে আম্মির সঙ্গে কথা বলে। এদিকে গ্রাম থেকে খবর আসে, আম্মিও একাকি কথা বলেন। কুহু মিটিমিটি হাসে! কাউকে বলে না, আম্মির সঙ্গে তার যোগাযোগের গোপন কথাটা। বলেন না কুহুর আম্মিটাও।

নাকের ওপর গাছ! by রেদোয়ান আহমেদ

ঘুম থেকে উঠে লোকটা আবিষ্কার করল, তার নাকের ওপর একটা ছোট্ট গাছ গজিয়েছে! তাতে ডাল আছে, পাতা আছে। ছোট ছোট ফলও ধরেছে। অনেকটা আঙুরের মতো দেখতে। বোকা বোকা চেহারা করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লোকটা ভালো করে দেখল। হ্যাঁ, গাছই তো!
আলতো করে আঙুল দিয়ে ধরল গাছের একটা ডাল। আস্তে করে টান দিতেই...আউচ! ব্যথা লাগে! তার মানে ব্যাপারটা স্বপ্নও নয়। সত্যি! কী বিপদ রে বাবা!

২.
গা ঝাড়া দিয়ে উঠল আঙুরগাছটা। বিকেলের হালকা বাতাসে পাতায় দোল দিতে দিতে একটু ঘুম ঘুম লাগছিল। আর তাতেই কী বিদঘুটে একটা স্বপ্ন দেখল সে! ভেবেই আঙুরগাছের পাতার শিরা-উপশিরাগুলো কেঁপে কেঁপে ওঠে। মাটিতে না গজিয়ে সে কিনা গজিয়েছে একটা মানুষের নাকের ওপর! সেই মানুষ আবার তার ডাল-পাতা ধরে টানাটানি করছে! ছ্যাহ, কী বিচ্ছিরি স্বপ্ন!

হোমওয়ার্ক by আদনান মুকিত

হারুন স্যার ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কে কে হোমওয়ার্ক আনে নাই?’
কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু কার্নিশে দুটো চড়ুই কিচিরমিচির করে উঠল।
‘উঠে দাঁড়া!’ গর্জে উঠলেন হারুন স্যার। সেই গর্জনে উড়ে পালাল চড়ুইগুলো। সেকেন্ড বেঞ্চের কোনায় বসা ফাহাদের কলম পড়ে গেল মেঝেতে। একেবারে নীরব পুরো ক্লাস। হঠাৎ সবাই আতঙ্কিত চোখে দেখল নিহাল উঠে দাঁড়িয়েছে। চাপা গুঞ্জন উঠল ক্লাসে।
‘চোপ!’ স্যারের হুংকারে দেয়াল থেকে চুন খসে পড়ল। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে নিহাল। সে একাই হোমওয়ার্ক আনেনি।

‘যা, বাইরে গিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক।’ আদেশ দিলেন স্যার। শিউরে উঠল সবাই।
‘এই রোদে একা দাঁড়িয়ে থাকবে? ইশ্, নিশ্চয়ই খুব লজ্জা পাবে ও।’ ভাবল রাকিন। নিহালের পাশেই বসে আছে সে।
স্যার বললেন, ‘আর সবাই হোমওয়ার্ক এনেছিস তো? চেকিং হবে। নিহাল, তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বেরিয়ে যা ক্লাস থেকে।’
রাকিন বেঞ্চের ওপরে রাখা ওর হোমওয়ার্কের খাতাটা দ্রুত ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল। মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়াল। আবারও চাপা গুঞ্জন পুরো ক্লাসে।
‘আমিও হোমওয়ার্ক আনিনি, স্যার।’ রাকিন বলল। পাশ থেকে অবাক চোখে ওর দিকে তাকাল নিহাল।
‘দুজনই বের হ!’ স্যার এবার হুংকার দিলেন।
কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, বাইরের কড়া রোদে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুই বন্ধু। একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল ওরা।

সাদা ভাত by আমীরুল ইসলাম

শেখ সাহেব বাজারের মোড়টা যেখানে আজিমপুরের সঙ্গে মিশেছে, সেখানে সিংহ মার্কা একটা বাড়ি আছে।
বিশাল বড় বাড়ি।
সেই বাড়িতে এক বছর ধরে কাজ করে আমিনা নামের একটা মেয়ে। বয়স বারো বছর। কালো চুল মাথাভরা। টানা টানা হরিণের মতো চোখ। ঢলো ঢলো মুখ। আমিনা কাজ করে। বুয়ার কাজ।
বাড়িতে পিংকি আছে। পিংকি ছোট্ট একটা মেয়ে। আমিনা পিংকির দেখাশোনা করে। লালন পালন করে।
পিংকির বাবা মা দুজনেই ব্যাংকে চাকরি করেন। তাঁরা সকালে অফিসে বেরিয়ে যান। তার পর থেকে পিংকির সব দায়িত্ব আমিনার। আমিনা ওকে নাশতা খাওয়ায়। গোসল করায়। ঘুম পাড়ায়। পিংকির সঙ্গে খেলতেও হয়। টেলিভিশন দেখতে হয়।

অনেক কাজ করতে হয় আমিনাকে। যখন খালা খালু অফিস থেকে বাসায় ফেরেন, তখনো কাজের শেষ নেই। তখন কাজ আরও বেড়ে যায়। খালা বলেন, ‘আমার বাজারের ব্যাগ দে। বাজারে যাব।’
পিংকি হয়তো হঠাৎ তখন কান্না জুড়ে দেয়। কিন্তু আমিনা কারও ওপর রাগ করতে পারে না। মুখ বুজে তাকে সব কাজ করতে হয়।
ক্লান্ত শরীর নিয়ে বেচারি রাতে ঘুমিয়ে পড়ে। বিছানায় শোবার সঙ্গে সঙ্গে ওর শরীর ভেঙে ঘুম আসে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ও স্বপ্ন দেখে—অদ্ভুত সব স্বপ্ন। ওর গ্রামের কথা মনে পড়ে। ওর প্রায় অন্ধ বাবার কথা মনে পড়ে। ওর মা নেই। ছোট ভাইবোন দুজনের কথা মনে পড়ে। বাবা কি এখন গ্রামের হাটে ভিক্ষা করে? ছোট দুই ভাইবোন কি খাওয়া পায়? মনে পড়ে, আমিনা যখন গ্রামে ছিল তখন পেট ভরে খাবার পেত না। আধা পেটা খেয়ে তাকে দিন কাটাতে হতো। পাড়াপড়শিরা কেউ খবর নিত না। চাচারা অবস্থাপন্ন। তারা ফিরে তাকাল না আমিনার দিকে...
সেই সব দুঃখের দিনের কথা খুব মনে পড়ে। এই বাড়িতে কষ্ট হলেও দুই বেলা ভাত পাওয়া যায়! এর চেয়ে আনন্দ আর কী আছে? সাদা ভাতের চেয়ে প্রয়োজনীয় কিছুই নেই এই জীবনে।

মেঘের এই গল্পটা by ধ্রুব এষ

তারা মাঠে বসে গল্প লিখছিল। এমন জোর হাওয়া দিল হঠাৎ, সব গল্প উড়ে গেল হাওয়ায়। একি! একি! একি! একি! তারা উঠে গল্প ধরতে ছুটল। কেউ আঁকশি নিয়ে, কেউ মই নিয়ে।
ছুট! ছুট! ছুট!
এই যে মাঠের পাড়ে দেখা যাচ্ছে গল্পদের।
ছুট! ছুট! ছুট!
এই যে নদীর বাঁধে দেখা যাচ্ছে গল্পদের।
ছুট! ছুট! ছুট!
এই যে মেঠোপথে এখন গল্পরা।
এই যে রোদে। এই ছায়ায়।
এই যে বড় সড়কের দিকে।
বড় সড়ক বাঁক নিতেই উধাও!
সব গল্প একসঙ্গে উধাও!
হায়! হায়! হায়!
কোথায়? কোথায়?
কোথায় উধাও হলো গল্পরা?
‘ওই যে পাহাড়ে।’
কে বলল?
ছোট্ট একটা পাখি।
‘পাহাড়! পাহাড়ে! ওই যে! ওই যে!’
আবার তারা হইহই করে ছুটল। ছোট্ট পাখিকে ছোট্ট একটা ধন্যবাদ দিতেও কারোর মনে থাকল না। তাতে বয়েই গেল ছোট্ট পাখির। আরেক দিকে উড়াল দিল সে। আর শিস দিল, টুইট! টুইট!
গল্পরা এখনো পাহাড়ে।

তারা হইহই করে পাহাড়ে উঠল। কত উঁচু পাহাড়। তারা উঠল আর উঠল। উঠতে উঠতে দেখল, আরে সর্বনাশ। সব গল্প উঠে গেছে মেঘে। হইহই হইহই করে তারা যখন পাহাড়ের চূড়ায় উঠল, মেঘে মেঘে আকাশে উড়ছে তখন গল্পরা। উড়ে চলে যাচ্ছে এদিক-ওদিকে। এখন উপায়?
বুদ্ধি করে মইয়ের সঙ্গে মই জুড়ল তারা। আঁকশির সঙ্গে আঁকশি জুড়ল।
এই লম্বা এক মই হলো আর এই লম্বা এক আঁকশি হলো। সেই মইতে চড়ে সেই আঁকশি দিয়ে আকাশের মেঘ থেকে তারা পেড়ে আনল গল্পদের। তবে সব গল্প কি আর পেড়ে আনতে পারল নাকি?
পারল না।
কিছু কিছু গল্প ঠিকই থেকে গেল মেঘের আড়ালে-আবডালে পালিয়ে।
বিশ্বাস হলো না?
এই গল্পটা তাহলে কোত্থেকে, শুনি?

ভীষণ পাজি পিঁপড়া-ছেলে by আনিসুল হক

টিপরা খুব মুশকিলে পড়েছে।
সে একটা বয়ামে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু আর বেরোতে পারছে না। কাচটা ভীষণ পিচ্ছিল। আর টিপরা পড়ে আছে একদম বয়ামটার তলায়। ছয় পা দিয়ে সে যে পিলপিল করে উঠে পড়বে, তা সম্ভব হচ্ছে না। পা পিছলে যাচ্ছে।
তার ভীষণ কান্না পেল। সে পিঁপিঁ করে কাঁদতে লাগল। কিন্তু বয়ামের মুখ বন্ধ। তার কান্না শুনবেই বা কে?

এখন সে আফসোস করে মরছে। তার উচিত হয়নি পিঁপড়ার দলের সারি ছেড়ে এই বয়ামের দিকে আসা। চিনির বয়াম। চিনির গন্ধ পেয়ে সে চলে এল। সে যখন তাদের সারিটা ছেড়ে এদিকে পা বাড়ায়, তখন বন্ধুরা তাকে নিষেধ করেছিল। বলল, ‘যাস না, একা একা গেলে পথ হারিয়ে ফেলবি।’ সে বলল, ‘বেশি দূর যাব না। এই একটুখানি যাই, আবার দৌড়ে এসে লাইনে ঢুকে পড়ব।’
লাইন ছেড়ে বেলাইনে গিয়ে সে প্রথমে পেল একটা কৌটার মুখ। সে তাতে চড়ে বসল, তার গায়ে তিনটা চিনির দানা লেগে আছে। মনের সুখে চিনি তিনটা গপাস করে খেয়ে নিল টিপরা। তারপর কে যেন কৌটার মুখটা তুলে কৌটায় লাগিয়ে ফেলল। বেরোনোর পথ খুঁজতে সে কৌটার টিনের ঢাকনাটা ছেড়ে কাচের গায়ে পা দিল। অমনি পিছলে পড়ে গেল একেবারে তলায়। খালি কৌটা। সে কাচের দেয়াল বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই সে ওপরে উঠতে পারছে না।
সে কাঁদছে। এখন কী হবে তার?
তার মনে পড়ে গেল ভাইবোনদের কথা। তার বন্ধুদের কথা। কী সুখেই না সে ছিল এত দিন। আর সে কী ভুলটাই না করল। এখানে এই বয়ামে বন্দী থাকতে থাকতে সে না মরেই যায়।
বয়ামের মালিক বয়ামটা ধোয়ার জন্য হাতে নিলেন। বয়ামের মধ্যে পানি ভরা হচ্ছে। পানির তোড়ে টিপরার একটা পা ভেঙেই গেল প্রায়। সে পানিতে ভাসতে লাগল। তারপর ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে সিংকের মধ্যে চলে গেল। সেখানে সে ভাসছে। ভাসতে ভাসতে চলে গেল সিংকের কোণে। কোনো রকমে পা টানতে টানতে উঠে পড়ল সিংকের গায়ে। সেখান থেকে এখন সে কোথায় যাবে? তার দলের অন্য সবাই কোথায় সে জানে না। সে কাঁদছে। সে হাউমাউ করে কাঁদছে।
সিংকের গা থেকে সে উঠে পড়ল মানুষটার জামায়।
জামার মধ্যে কতক্ষণ থাকা যায়। সে কুটুস করে কামড় দিয়েই বসল।
উফ্ বলে একটা আওয়াজ পাওয়া গেল মানুষের গলায়। জামা ঝাড়ল মানুষটা।
অমনি সে ছিটকে পড়ল মেঝেয়। আর সেখানেই সে পেয়ে গেল পিঁপড়ার কাফেলাটাকে।
খোঁড়া পা’টা নিয়ে সে ভিড়ে গেল তাদের পিঁপড়ার দলের মিছিলে।

গল্প- শিমুর বিয়ের গল্প by আন্দালিব রাশদী

শিমু ও এখলাসুর রহমানের বয়সের ব্যবধান—যদি দুজনই ঠিক বয়স বলে থাকে, সাড়ে ১৪ বছর। দু-চার মাস বেশিই হবে। বয়স কমিয়ে রাখার প্রবণতাটি তো আর মিথ্যে নয়। প্রেম-ভালোবাসা করে বিয়ে নয়। আয়োজনটা পারিবারিক। পেশাদার না হলেও ঘটকের কাজটি করেছেন শিমুর ছোট ফুপা এ এন এম নুরুল মোস্তফা। বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেল। ছোট ফুপা যে কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল, সেখানেই ফিজিক্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এখলাসুর রহমান। এখলাসের দিক থেকে কোনো চাওয়া না থাকায় বিয়েটা চূড়ান্ত হতে সময় লাগেনি। বরপক্ষে নুরুল মোস্তফার কাউন্টারপার্ট এখলাসের বড় দুলাভাই হোসেন উদ্দিন বললেন, ‘বর ও কনের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির জন্য বাক্য আদান-প্রদান জরুরি। কিন্তু তা যেন শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে। সে ক্ষেত্রে বরং টেলিফোনে সীমিত আলাপ অনুমোদন করা যায়, কী বলেন?’

তাঁর জিজ্ঞাসার কেউ জবাব দেননি। আবার প্রস্তাব যে প্রত্যাখ্যান করেছেন, এটাও মনে হয়নি।
সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পর এক সন্ধিক্ষণে এখলাসুর রহমান সুরাইয়া আকতার শিমুকে ফোন করে এ কথা-সে কথার একপর্যায়ে সরাসরি বলল, ‘আপনি সত্যিই আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন তো?’
শিমু থতমত খায়, ‘মানে, আপনি কী জানতে চাইছেন? গার্ডিয়ানরা সবাই দেখেশুনে ফাইনাল করেছেন, আমার না চাওয়ার কী আছে? কেন, আমাকে আপনার পছন্দ হয়নি?’
‘আমি তো নিজেই পছন্দ করেছি। দেখলেন না আপনাকে দেখতে এসে সবার সামনে কেমন বেহায়ার মতো বললাম, খুব পছন্দ হয়েছে।’
এখলাসের কথায় হেসে উঠতে চাইল শিমু, কিন্তু এখনই হাসা ঠিক হবে না ভেবে ফোনের অপর প্রান্তে মুখ চেপে ভেতরের তাগিদটা সংবরণ করল।
এখলাস বলল, ‘আমি যত দূর জানি নুরুল মোস্তফা সাহেব আপনাদের বলেছেন, আমার বয়স তিরিশের একটু বেশি। কিন্তু কত বেশি তা বলেননি। আমি যদি আমার আসল বয়সটা আপনাকে অন্তত না বলি, নিজের মধ্যে একটা অপরাধবোধ থেকে যাবে। আমার জন্ম ১৯৩৫-এর এপ্রিলে, আর এখন ১৯৭২-এর মার্চ, মানে সাঁইত্রিশ বছর—থার্টি সেভেন ইয়ার্স। আর আপনার কেবল একুশ পেরিয়েছে। এখনো বাইশও হয়নি। ব্যবধানটা প্রায় ষোলো বছরের। এটা কি একবারও চিন্তা করেছেন, আপনি যথেষ্ট ইয়ং থাকতেই আমি বুড়ো হয়ে যাব। আপনার যখন হবে পঁয়ত্রিশ, তখন আপনার ভরা যৌবন, আমার সে সময় পঞ্চাশ পেরিয়ে যাবে। আপনার যখন চুয়াল্লিশ, আমি ষাট! আপনার তখনো পূর্ণ যৌবন। ষাট বছর বয়সী একজন মানুষের কথা ভাবুন তো।’
শিমু খেপেই গেল, ‘কী সব আবোল-তাবোল বলতে আমাকে ফোন করেছেন। আমি কি ফোন রেখে দেব?’
‘ভুল বুঝবেন না। সত্যিটা আগে থেকে জানা থাকলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তা ছাড়া আমরা তো সত্যিটাকে একটু রেখেঢেকে সুবিধামতো বলে থাকি। সেজন্যই আপনাকে একটু ভাবতে বলেছিলাম।’
‘আমার এত ভাবাভাবির সময় নেই।’
এখলাস বলল, ‘আপনি জানেন না, এমনকি বুড়ো মহিলারাও বুড়ো হাজব্যান্ড পছন্দ করেন না। তাই একটু ভেবে দেখতে বলছি। তা ছাড়া বয়সটা একটু কাছাকাছি না হলে একই ওয়েভলেঙ্গথে চিন্তাও করা যায় না।’
‘ফোনে যদি আপনার এসব নসিহত আমাকে শুনতে হয় তাহলে বরং খোদা হাফেজ।’
এখলাস বলল, ‘আপনি ইচ্ছে করলেই লাইন কেটে দিতে পারেন। তবে জেনে রাখুন, আপনাকে আমার সত্যিই খুব পছন্দ হয়েছে। আমি ভেবেছি, আপনাকে বিয়ে করতে পারাটা আমার জন্য বড় ভাগ্যের ব্যাপার হবে। কিন্তু বয়স লুকিয়ে আপনার সঙ্গে প্রতারণা করে ভাগ্যবান হলে পরে বিবেকের খোঁচা খেতে হবে। আমাদের প্রায় ষোলো বছরের বয়স ব্যবধান মাথায় রেখে ঠান্ডাভাবে চিন্তা করলে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আপনি নিতেও পারেন, সে জন্যই এটা বলা। আমার বাবা ও মায়ের বয়সের ব্যবধান আরও বেশি—তেত্রিশ বছর। মায়ের যখন আঠারো, বাবার তখন একান্ন। মা অবশ্য তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। বিয়েটা আমার মায়ের বেলায় অবশ্য প্রথম।’
এ কথাতে শিমু বেশ একটু জোর পায়। সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার বাবার বয়সের কারণে আপনার মায়ের বড় কোনো সমস্যা হয়েছে কি? আমার বাবা ও মায়ের বয়সের ব্যবধানও কমপক্ষে পনেরো বছর। তাঁদের কোনো অসুবিধে হয়েছে বলে তো শুনিনি।’
‘না, আমার মাকেও কখনো অভিযোগ করতে শুনিনি।’
‘বয়স-টয়সের কথা বলে প্যাঁচ বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। আমাকে পছন্দ হয়নি—সোজাসাপটা এই কথাটি বলে ফেলুন। আমার গায়ের রংটা যে ফর্সা নয়, এটা তো আমি জানিই। চোখে আঙুল দিয়ে নতুন আর কী দেখাবেন?’
টেলিফোন কথোপকথনে ভাঙনের সুরটাই প্রবল হয়ে ওঠায় সুর পাল্টে এখলাস বিনীত কণ্ঠে শিমুকে বলল, ‘আপনি আমাদের বিয়েটা ভেঙে দিতে চাইছেন? আপনাদের কার্ড তো এখনো ছাপাই হয়নি, আমাদের তো বিতরণও শেষ। এখন যদি বিয়েটা ভেঙে দেন, নিমন্ত্রিত চার-পাঁচ শ পরিবারের কাছে মুখ দেখাব কেমন করে?’
‘আপনি মেয়েলোকের মতো কথা বলছেন কেন? বিয়ে ভাঙলে কলঙ্ক হয় মেয়েদের; বিয়ে ভাঙায় পুরুষ মানুষ সমস্যায় পড়েছে এমন কখনো শুনিনি।’
এখলাস বলল, ‘আমরা এতক্ষণ যা বলেছি, দয়া করে তার সব আপনার স্মৃতি থেকে মুছে দিন। অনুষ্ঠানের আগে একবার আসুন না নিউমার্কেটে। নভেল ড্রিংস হাউসে একটু বসি, কথা বলি।’
‘আপনার পরিকল্পনাটা ভালোই। আমি যে ফরসা নই, এটা কাছে থেকে দেখে নিশ্চিত হতে চান? তারপর বয়স কিংবা অন্য কোনো অজুহাতে বিয়েটা ভেঙে দেবেন। এই তো?’
এখলাস অদ্ভুত এক কর্তৃত্বের স্বরে বলল, ‘শিমু।’
নিজের নাম শুনে বশীভূত শিমু বলল, ‘জি।’
‘তেইশে মার্চ তোমার-আমার বিয়ে। তৈরি থেকো।’
শিমু বলল, ‘আচ্ছা।’
বয়সের সমস্যা কোথায় যে তলিয়ে গেল!
২.
লোকটা কি বিয়ের আগেই তাকে বশীভূত করে ফেলল। বয়সটয়স নিয়ে কীসব পণ্ডিতি করল। বিয়েশাদিতে বয়স আবার একটা বিষয় হলো নাকি?
শিমুদের পক্ষে বিয়ের অনুষ্ঠানটি হয় ২৩ মার্চ ১৯৭২, লেডিস ক্লাবে। ২৫ মার্চ এখলাসদের পক্ষে বউভাতের অনুষ্ঠান। আজিমপুর কমিউনিটি সেন্টারে। এক বছর আগে এমন ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে গনগনে আগুনে জ্বলেছে ঢাকা।
বউভাতের অনুষ্ঠান সেরে এখলাসদের লালবাগের বাসায় পৌঁছাতে রাত বারোটা। শিমুর মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। ক্লান্তি ঘিরে ধরেছে এখলাসকেও। তবুও শিমুকে জড়িয়ে ধরল।
‘আজ না হয় থাক।’ শিমু বলল।
এখলাস বলল, ‘আচ্ছা।’ বলেই দু-তিন মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল।
শিমুর ঘুম এল না। এক ধরনের অস্থিরতায় ও চাপা যন্ত্রণায় মধ্যরাত পার হয়ে গেল। তারপর ঠিক ঘুম নয়, ঝিমুনি। চোখ দুটি লেগে আসে, আবার ভেঙে যায়। যদি একটু বেশিক্ষণ লেগে থাকে, তখন কীসব দুঃস্বপ্ন এসে হাজির হয়।
রাত তখন কত হবে—তিন কি চার। এখলাস পাশ ফিরে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি ঘুমোওনি?’
‘তুমি কেমন করে বুঝলে?’
এই প্রথম শিমু এখলাসকে তুমি বলল। একবার তুমি বলে ডাকতে পারলে আর আপনিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
‘এই তো আমার মনে হলো তুমি ঘুমোওনি।’ বলল এখলাস।
শিমু বলল, ‘আমার ভয় লাগছে।’
‘ভয় কিসের, আমি তো আছি।’
এখলাস তার একটা পা তুলে দিল সদ্যবিবাহিত স্ত্রীর ওপর। একজন অন্যজনকে আঁকড়ে ধরবে, পা তুলে দেবে, বুকে মুখ ঘষবে—এটাই তো হওয়ার কথা।
শিমুকে সংসারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল তোতলা শমসের।
দুভাবে শমসের তাকে ডাকত—শিইইইইইই (ইইই বলার সময় কয়েকবার ঢোঁক গিলবে) মু; অথবা শিমউউউউউ (উউউ করার সময়ও ঢোঁক গিলবে)। শিমু বলত, ‘থাক থাক এত কষ্ট করে ডাকতে হবে না। বলো, কী বলবে?’
‘কিইইইছু না, কিছু না, এমনি ডেকেছি।’
একবার কথা শুরু করলে আর থামে না। রবিকরোজ্জ্বল কিংবা কিংকর্তব্যবিমূঢ়-জাতীয় জটিল শব্দও অবলীলায় বলে যায়।
একই বয়সী দুজন। দু-চার মাস এদিক-ওদিক হতে পারে। শমসের দাবি করে, বেশির দিকটাতেই সে—বয়সে শিমুর চেয়ে বড়। শিমু বলে, ‘ধ্যাৎ, চার-ছয় মাসের বড় কোনো ব্যাপার হলো? যখন তুমি ন্যাংটা, আমিও ন্যাংটা।’
দুজনই তখন বিএ প্রথম বর্ষের; তখন মানে উনিশ শ সত্তরে। শিমু ইডেনে, শমসের ঢাকা কলেজে। শিক্ষা সপ্তাহের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইল অনেকে, কিন্তু তবলাবাদক একজনই, তোতলা শমসের। শিমু হারমোনিয়ামে হাত রেখেই তবলাবাদককে বলল, ‘সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানে বাজাতে পারবেন তো?’
শমসের এতটুকুও না তোতলিয়ে মুখের ওপর বলল, ‘আগে গানটা ধরেন, দেখি গাইতে পারেন কি না।’
শিমুল বলেই ফেলল, ‘এমন ভাব দেখাচ্ছিস যেন ওস্তাদ আল্লারাখা। বেশ গাইছি: পিয়া পিয়া পিয়া কে ডাকে আমারে মায়াময় এই মধু সন্ধ্যায়...।’
গানের শেষে আড়চোখে চেয়ে শমসের বলল, ‘অন্তরাতে তাআআল কেটে গেছে বোঝোনি?’
তাল কাটার কথা শমসের যেভাবে বলেছে, শিমু না রেগে বরং হেসে ফেলেছে। শুরুটা এভাবেই। দেখা হলে কথা-কাটাকাটিই বেশি হয়। এমনকি একপর্যায়ে শমসের শিমুকে বলেছে, ‘তোমাকে দিয়ে গান হবে না। তোমার মধ্যে সিরিয়াসনেস নেই।’
শিমু বলে, ‘তুমি কত বড় সিরিয়াস বাহাদুর, জানা আছে।’
তত দিনে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সমবয়সী অনেকেই শিমুকে ডাকতে শুরু করেছে, ‘শিইইইমু।’
শিমুর মনে হলো, তোতলা শমসের তার নামের ওপর চেপে বসেছে। সেই শমসেরই একদিন রিহার্সেলের এক ফাঁকে তাকে বলল, ‘আমি কিন্তু তোমাকেই বিয়ে করব।’
‘বয়েই গেছে। তোমাকে বিয়ে করে তোতলা বাচ্চার মা হতে আমার বয়েই গেছে।’
শমসের অবাক চোখে তাকিয়েছে শিমুর দিকে—বাচ্চা হওয়ার চিন্তা তার মাথায় আসেনি, এমনকি বিয়ে কথাটাও কথার কথা—শিমু এতদূর ভেবেছে!
একাত্তরের গনগনে মার্চের প্রথম দিন শমসের তাকে ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান বনাম কমনওয়েলথ একাদশের ক্রিকেট ম্যাচ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ হইহই রইরই শুরু হলো, গ্যালারির একদিকে আগুনও ধরানো হলো। কথা ছিল মধ্যাহ্ন বিরতির সময় স্টেডিয়ামে প্রভিন্সিয়াল রেস্টুরেন্টে বিরিয়ানি খাবে। জাতি তখন আর খাবারের কথা ভাবছে না—কেবল ভাবছে গনগনে আগুনে পাকিস্তান জ্বালিয়ে দেওয়ার কথা।
বাস, রিকশা কিছুই পায়নি। পায়ে হেঁটে পরিবাগের সরু রাস্তা দিয়ে হাতিরপুল। ওখানে দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়—শমসের ঢাকা কলেজের দিকে, শিমু ভূতের গলিতে।
শিমুদের বাড়িতে টেলিফোন ছিল। শমসেরের ফোন থাকার কথা নয়, ঠিকানাও শিমুর জানা ছিল না। শমসের যদি নিজে থেকে যোগাযোগ না করে, তাহলে বলতেই হবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
একুশে মার্চ শমসের হাজির। শিমুকে বলল, ‘এখন চলো। ধানমন্ডি স্কুলে রিহার্সেল হবে। তারপর গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে রাস্তায় নামব আমরা। একটা ট্রাকও পেয়ে যেতে পারি।’
‘কী করব?’ শিমু জিজ্ঞেস করে।
শমসের বলে, ‘ভয় কী মরণে জাগিছে সন্তানে/মাতঙ্গ মেতেছে আজ সমর রঙ্গে/তাথৈ তাথৈ থৈ দ্রিমি দ্রিমি দ্রাম দ্রাম...। বাসা থেকে একটা গামছা নিয়ে এসো আর হারমোনিয়ামটাও।’
দুই পাশের আংটার সঙ্গে গামছার দুই প্রান্ত বেঁধে তখনই হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে নিল শমসের। তবলাবাদক হারমোনিয়াম বাজাতেও জানে। গুনগুন করে গাইলও।
‘তুমি গাইলেই পারতে। গলাটা তো ভালোই।’
শমসের বলল, ‘একজনও তোতলা শিল্পীর নাম বলতে পারবে? তোতলারা গায়ক হয় না, বাদক হয়।’
ধানমন্ডি স্কুলের কয়েকটি রুম খোলাই ছিল। হারমোনিয়াম-তবলাও সাজানো। তবলার সামনে বসে শমসের বলল, ‘আগে হাত দুটো চালু করে নিই। শিমু, একটা গান ধরো তো।’
অমনি হারমোনিয়ামে আঙুল চালাল শিমু। গাইতে শুরু করল: ‘আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি/মোর নিশিথ বাসরশয্যায়/মন বলে ভালোবেসেছি/আঁখি বলিতে পারে না লজ্জায়।’
মুখটুকু গাওয়ার পর শমসেরকে ধমকে উঠল সে, ‘তুমি বাজাচ্ছ না কেন?’
‘শুনতেই ভালো লাগছে।’
‘ধ্যাৎ।’
‘অন্তরাটা ধরো।’
‘পারব না।’
৩.
ট্রাক এল দুটি। শিল্পীরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। শিমু গেল দক্ষিণে, শমসের উত্তরে। শিমু চাইছিল শমসেরের সঙ্গে থাকতে, কিন্তু হলো না।
সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরল শিমু। রাত এগারোটার মধ্যেও যখন হারমোনিয়াম ফেরত দিতে এল না, শমসেরের ওপর মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল তার।
সকালে বাবা ধমকাল শিমুকে, ‘কাদের সঙ্গে চলাফেরা করিস। একটা বদমাশ রাত সাড়ে বারোটার সময় একটা হারমোনিয়াম রেখে গেছে। এসব পাগল-ছাগলের সঙ্গে মেশামেশা বন্ধ কর। তুই যে মেয়েমানুষ, এটা মনে রাখিস। হারমোনিয়ামের প্যা-পো-প্যা-পো বাজিয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করা যাবে না, এটাও মনে রাখিস।’
শমসেরের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। কথাও না।
অবরুদ্ধ স্বদেশে শিমু ভূতের গলির বাসা ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের বাড়িতে, কখনো এই গাঁয়ে, কখনো ওই গাঁয়ে একাত্তরের ডিসেম্বর পার করেছে। ডিসেম্বরের শেষ দিন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নিজেদের বাড়িতে ঢুকে তার চোখ আটকে যায় দুই আংটায় গামছা বাঁধা হারমোনিয়ামে। তোতলা শমসেরটা এমনই পাষণ্ড, একবার খোঁজও নিল না। অবশ্য কোথায় খোঁজ নেবে। শিমু ঢাকায় ছিল না। যেসব জায়গায় ছিল, শমসের তার ঠিকানা পাবে কোথায়?
অস্থির শিমু তার পক্ষে যতটা সম্ভব খোঁজ নিয়েছে। শমসের—কোন শমসের? তোতলা শমসের! প্রায় সবাই বলেছে, ‘চিনি না।’ দু-একজন বলেছে, ‘মুক্তিতে যোগ দিয়েছিল। মরেটরে গেছে বোধ হয়। তাকে কী দরকার?’
এ প্রশ্নের জবাব শিমুর অন্তরে জমাট বেঁধে ছিল, ‘আমি একটি তোতলা সন্তানের মা হতে চাই।’
৪.
শিমু সশব্দেই এখলাসকে বলল, ‘এত বয়স বয়স কোরো না। বয়স তো কেবল একটা সংখ্যা—একুশও যা, সাতাশও তা, সাঁইত্রিশও একই কথা।’
বিয়ের আগে এখলাস যখন শিমুকে বয়সের কথা বলেছে, তার মনে হয়েছিল, বিয়ে ভেঙে দেওয়ার এটাও একটা হুমকি। সেদিন এখলাসের সঙ্গে কথা শেষ করে ঘর থেকে শিমু বেরিয়ে যায় তোতলা শমসেরের খোঁজে। ঢাকা কলেজে কেবল তরুণদের ভিড়ে একটি মাত্র তরুণী, সে শিমু; সে জনে জনে জিজ্ঞেস করে ওই যে শমসের—একটু তোতলায়, ভালো তবলা বাজায়, নাকটা খাড়া, চোখ খুব উজ্জ্বল, একাত্তরে বিএর ছাত্র। কেউ শনাক্ত করতে পারে না। নামের রেজিস্টার দেখে একজন বলল, ‘শমসের নামে বিএ-তে আমাদের কোনো ছাত্র ছিল না—সত্তরেও না, একাত্তরেও না, এ বছরও নেই।’
‘কিন্তু আমি তো তা-ই জানতাম।’ শিমু বলল কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে।
‘আপনি ভুল জানতেন। দেশটা ঠগ-প্রতারকে ভরে গেছে।’
তারই পাশে বসা অন্য আরেক কেরানি বলল, ‘আমাদের মাইজদিতে শমসের নামের এক মুক্তিকে জিপের সঙ্গে বেঁধে তিন মাইল হেঁচড়ে নিয়েছে। আধমাইল টানার পরই তাঁর মৃত্যু হয়। পরের আড়াই মাইল না টানলেও চলত।’
শিমুর পা টলছে। কেরানিকে বলল, ‘একটু বসি।’
‘এটা ব্যাটাছেলেদের কলেজ। এখানে মেয়েমানুষ বসতে পারবে না।’
মাথাটা চক্কর দিল শিমুর, শরীরটা মনে হলো ওজনশূন্য। যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানেই বসে পড়ল। কোনোভাবে মাথা ঘুরানো ব্ল্যাকআউট কাটিয়ে উঠে বলল, ‘আমার মনে হয় আমি এই শমসেরের কথাই বলছি।’
আধঘণ্টা পর তাকে রিকশায় তুলে দিয়ে কেরানি বলল, ‘শমসেরের জন্য বেহুদা চিন্তা কইরা লাভ নাই। পুরুষমানুষকে বিশ্বাস করলে ঠকবেন। শমসের নামে কেউ নেই। যদি থাকেও দেখবেন আপনার শমসের এখন কোথাও ঘরসংসার করছে।’
তাকে এত দূর এগিয়ে দিতে আসা লোকটির ওপর মেজাজ খারাপ হলো শিমুর। ধমকের স্বরে বলল, ‘বাজে কথা বলবেন না। এসব শুনতে আমার ভালো লাগে না।’
১৯৭২-এর ২৫ মার্চ, মধ্যরাতে ঘুমাক্রান্ত এখলাস যখন খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য শিমুকে জড়িয়ে ধরে, শিমু তখন তার একান্ত ব্যক্তিগত জগতে—একটি মিলিটারি জিপের সঙ্গে বাঁধা দড়ি তারই সমবয়সী তোতলা শমসেরকে মাইজদির এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তখনো প্রাণ যায়নি তার। অস্ফুট কণ্ঠে বলছে, ‘শিইইইমু, আমি কিন্তু তোমাকে বিয়ে করব।’
শিমু জবাব দেয়, ‘তোমার মতো বাচ্চা ছেলেকে কে বিয়ে করে। আমার সঙ্গে আমার হাজব্যান্ডের বয়সের ব্যবধান হতে হবে পনেরো থেকে কুড়ি বছর। ষোলো হলে সবচেয়ে ভালো। আমার হাজব্যান্ড এখলাসের বয়স সাঁইত্রিশ, আর আমার একুশ।’

ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্য প্রস্তাবিত লেখক ও বই by শামস আরেফিন

এবারই প্রথম ম্যান বুকার পুরস্কার সবজাতি-গোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। তাই ম্যান বুকার প্রাইজ ২০১৪তে প্রথমবারের মতো দু’জন আমেরিকান ও তিনজন ব্রিটিশ প্রস্তাবিত বুকার পুরস্কার বিজেতাদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে। যে কোনো ধরনের জাতি-গোষ্ঠীর জন্য পুরস্কার উন্মুক্ত করার ফলে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে- আমেরিকার উৎকৃষ্টমানের সাহিত্য ব্রিটেনের পুরস্কারে প্রাধান্য বজায় রাখবে। কিন্তু অবশেষে ‘ম্যান বুকার পুরস্কারের’ প্রস্তাবিত তালিকায় মাত্র দু’জন আমেরিকান জায়গা পেয়েছেন। একজন ‘জশুয়া ফেরেস’ আর অপরজন ‘ক্যারেন জয় ফোউলার’। এ তালিকায় অস্ট্রেলিয়ান লেখক ‘রিচার্ড ফ্লানাগন’ সেই সঙ্গে তিন ব্রিটিশ নাগরিক ‘হাওয়ার্ড জ্যাকবসন’, নীল মুখার্জি ও আলি স্মিথও আছেন। বুকার পুরস্কারের পরিমাণ ৫০ হাজার ইউকে পাউন্ড। এবার এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় উড়শুলা কে লে গুইন-এর দ্য বুন ক্লকস উপন্যাসটি বাদ পড়েছে। অথচ ৬০০ পৃষ্ঠার এই মেটাফিকশনাল উপন্যাস খুবই মেধাবী হাতের রচনা। প্রতিবারের মতো তেরজনের দীর্ঘ তালিকার তুলনায় এবারের জুরি বোর্ড মাত্র ছ’জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করেছে।
এবারের নির্বাচিত বইগুলো হল, জোশুয়া ফেরেস-এর ‘টু দ্য রাইস অ্যাগেইন অ্যাট অ্যা ডিসেন্ট হাউয়ার, রিচার্ড ফ্লানাগনের, ‘ দ্য ন্যারো রোড টু দ্য ডিপ নর্থ’, কারেন জো ফোউলারের ‘উই আর অল কম্পিলিটলি বিসাইড আউয়ারসেলভস’, হাওয়ার্ড জ্যাকবসনের ‘জে ’, নিল মুখার্জির ‘দ্য লাইভ অব আদার’স, আর আলী স্মিথের ‘হাউ টু বি বোথ’।
উল্লেখ্য, ‘টু দ্য রাইস অ্যাগেইন অ্যট অ্যা ডিসেন্ট হাউয়ার’ বইটি প্রাচীন ‘অ্যামলাকাইটস’ বংশদের অধঃপতন নিয়ে লেখা। এই বইটি আশ্চর্য ও অতিআশ্চর্য ঘটনাবলীতে ভরপুর। পুনরুত্থিত হওয়ার পর অতীতের কোনো সময়ে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, মূলত উপন্যাসটি তা ঘিরেই। এখানে রহস্যের ওপর বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের দোলাচালে পাঠক হাঁটতে হবে। ভাষাগত দিক থেকে বইটি খুবই সচল আবার কখনও গতিহীন। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বই অনেকটা রম্যগল্পের মতো রসেরও আধার। অন্যদিকে ‘দ্য ন্যারো রোড টু দ্য ডিপ নর্থ’ পাঠক যদি বইটির কাহিনীতে ততটা আলোড়িত না হলেও, উপন্যাসে সময়ের ব্যবহার, বর্ণনাভঙ্গির নিশ্চয়তা, গল্প হঠাৎ থমকে যাওয়ার প্রবণতা, এরপর গল্পের সচলতায়ন, সময় নিয়ে লেখকের কিছুটা স্বেচ্চারিতা ও দুঃসাহসিক ঘটনার পটভূমি দেখে চমকিত হবেন। সেই সঙ্গে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ‘উই আর অল কম্পিলিটলি বিসাইড আউয়ারসেলভস’ বইটিও দারুণ। কারণ এ পর্যন্ত দুষ্টু ছেলেমেয়েদের পিতা-মাতা নিয়ে অনেক উপন্যাস লেখা হয়েছে। কিন্তু এরপরও যদি কোনো উপন্যাস রোমহর্ষক আনন্দময়, হৃদপিণ্ড চমকে যাওয়া মতো হয়, তবে তা ফোউলারের এই দশম উপন্যাসটিই হবে। মনে হবে উপন্যাসের পটভূমি যেন চিরন্তন বাস্তব।
তালিকাভুক্ত উপন্যাসের মাঝে হাওয়ার্ড জ্যাকবসনের ‘জে ’ লেখা অন্যান্য উপন্যাসের মতো পাঠকের বিভ্রমের কারণ হবে। কিন্তু তার অন্যান্য রচনার মতোই এখানেও সেই ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়, যা অনেকটা আকর্ষণীয়। এখানে সামান্য খুঁটিনাটি তর্কবিতর্ক মানব-মানবীর সম্পর্কের চিরন্তর বিষয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু গুণগত দিক থেকে একে জর্জ ওরওয়েলের উপন্যাসের তুলনা করা যায়। নির্বাচিত সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্যান্য বইয়ের তুলনায় নিল মুখার্জির ‘দ্য লাইভ অব আদার’স দ্য কাস্ট উপন্যাসটি অনেক বড়। যা পড়তে পাঠকদের অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে। উপন্যাসের প্রথমাংশের চরিত্রগুলোর পরিচয় দিতে সময় নিয়েছেন লেখক। কিন্তু এখানকার কাহিনীটি পাঠককে আঁকড়ে ধরে রাখার মতো আকর্ষণীয়। উপন্যাসে রয়েছে অসংখ্য মোড় বা টাইমবোম। যা যে কোনো সময়, আমাদের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির বইয়ের পৃথিবীকে পরিবর্তন করে দিতে পারে। সবশেষে আলী স্মিথের ‘হাউ টু বি বোথ’ পাঠ করে পাঠককে বলতে হবে, লেখিকার দুর্দান্ত সাহস আছে লেখনীর। খুবই তীক্ষè-সৃষ্টিশীল লেখার ক্ষমতা পাঠককে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়তে বাধ্য করবে। উল্লেখ্য, আগামী ১৪ অক্টোবর ম্যান বুকার পুরস্কার বিজেতার নাম ঘোষণা করা হবে।

কথাসাহিত্যের বহুমাত্রিক শাহেদ আলী by আহমদ বাসির

শাহেদ আলী বাংলা সাহিত্যের অনন্যসাধারণ একজন কথাশিল্পগুী। মাত্র ৭০টি ছোটগল্পগু ও একটি উপন্যাস রচনা করেই তিনি বাংলা কথাসাহিত্যের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। ভাষা আন্দোলনে অবিস্মরণীয় অবদান, অধ্যাপনা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নানারকম পত্রপত্রিকা সম্পাদনা, তমদ্দুন মজলিস গঠন, চিন্তা ও মনন চর্চা এবং অনুবাদকর্মের মধ্য দিয়ে তার মেধা ও ব্যক্তিত্ব বিচিত্রভাবে বিকশিত হয়েছে। ১৯২৫ সালের ৩০ জুন বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামে শাহেদ আলীর জন্ম। ১৯৪৩ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা, ১৯৪৫ সালে এমসি কলেজ থেকে আইএ, ১৯৪৭ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ এবং ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন তিনি। ১৯৪৪ সাল থেকে ৪৬ সাল পর্যন্ত ‘মাসিক প্রভাতী’ এবং ১৯৪৫ থেকে ৫০ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের নির্ভীক মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ সম্পাদনা করেন। ১৯৫৫ সালে ‘দৈনিক বুনিয়াদ’ সম্পাদক, ১৯৫৬ সালে ‘দৈনিক মিল্লাত’-এর সহকারী সম্পাদক, ১৯৬২ সাল থেকে ইসলামিক একাডেমি পত্রিকার (পরবর্তীকালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা) সম্পাদক, ১৯৬৩ সাল থেকে ‘মাসিক সবুজ পাতা’র সম্পাদক এবং আল্লামা ইকবাল সংসদ গবেষণা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও তার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কর্মজীবনে শাহেদ আলী বগুড়া আজিজুল হক কলেজ, রংপুর কারমাইকেল কলেজ, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ এবং মিরপুর বাংলা কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন। বাংলা একাডেমির ফেলো ও নির্বাচিত কাউন্সিলর, ইসলামিক একাডেমির (বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন) প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। ১৯৮২ সালে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ ও সংকলন বিভাগের পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও বহু মূল্যবান গবেষণা পত্রিকা সম্পাদনা ও সংকলনের সঙ্গে একক এবং যৌথভাবে জড়িত ছিলেন তিনি।
শাহেদ আলীর প্রথম ছোটগল্পগু ‘অশ্রু’ ১৯৪০ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গল্পটি তার কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় তার ছোটগল্প গ্রন্থ ‘জিবরাইলের ডানা’। মাত্র ৭টি ছোটগল্পগু গ্রন্থটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এ গ্রন্থের নাম গল্পটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায় যত ঘটনা ঘটেছে বাংলা সাহিত্যের আর কোনো একক ছোটগল্প নিয়ে সম্ভবত এত ঘটনা ঘটেনি। গল্পটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হচ্ছে, বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষকে আলোড়িত করেছে। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, জহির রায়হান, জ্যোতির্ময় রায়, নৃপেণ গঙ্গোপাধ্যায়সহ বহু চলচ্চিত্র পরিচালক গল্পগুটি নিয়ে সিনেমা করতে চেয়েছেন। যদিও আজ পর্যন্ত গল্পটি নিয়ে কোনো সিনেমা নির্মিত হয়নি। গল্পটি রুশ, ইংরেজি, উর্দুসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ গল্পগু সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হলে একশ্রেণীর ধর্মপ্রাণ মুসলমান শাহেদ আলীকে মুরতাদ ঘোষণা করেছিল এবং ঢাকার রাজপথে তার ফাঁসির দাবিতে মিছিল-সমাবেশও হয়েছিল। পরে অবশ্য আন্দোলনকারীরা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছিল এবং শাহেদ আলীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছিল।
‘জিবরাইলের ডানা’র পর তার আরও পাঁচটি ছোটগল্পগু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
১৯৬৩ সালে ‘একই সমতলে’, ১৯৮৫ সালে ‘শা নযর’, ১৯৮৬ সালে ‘অতীত রাতের কাহিনী’ ও ‘অমর কাহিনী’ এবং ১৯৯২ সালে ‘নতুন জমিনদার’- এই ছয়টি গ্রন্থের ৫৭টি গল্প ছাড়াও ১৩টি অগ্রন্থিত গল্পের কথা জানা যায়। এ ছাড়াও তার কিছু গল্প বিভিন্ন পত্রপত্রিকার পাতায় ছড়িয়ে-ছিঁটিয়ে থাকতে পারে। শাহেদ আলীর একমাত্র উপন্যাস ‘হৃদয় নদী’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে।
অনুবাদ সাহিত্যে রয়েছে শাহেদ আলীর বেশকিছু অসামান্য কাজ। বিশ্বখ্যাত ইহুদি সাংবাদিক লিও পোল্ড, যিনি পরবর্তীকালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, মুহাম্মদ আসাদ নাম ধারণ করেছিলেন তার বিশ্বনন্দিত গ্রন্থ ‘মক্কার পথ’, হিরাডোটাসের বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘ইতিবৃত্ত’, কেবিএইচ কোনান্ট-এর ‘আধুনিক বিজ্ঞান ও আধুনিক মানুষ’, মুহাম্মদ আসাদের ‘ইসলামে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার মূলনীতি, মেজর আবদুল হামিদ রচিত ‘ককেশাসের মহানায়ক ইমাম শামিল’ এবং জেরোমি কাসোপিনোর ‘ডেইলি লাইফ অব এনশিয়েন্ট রোম’ তার উল্লেখযোগ্য অনুবাদকর্ম।
চিন্তা ও মননশীলতার চর্চায়ও শাহেদ আলী সমানভাবে নিবেদিত ছিলেন। এ ক্ষেত্রে তার গ্রন্থ ‘তরুণ মুসলিমের সমস্যা’, ‘তাওহীদ’, ‘বুদ্ধির ফসল আত্মার আশিস’, ‘মুক্তির পথ’, ‘একমাত্র পথ’, ‘জীবন নিরবচ্ছিন্ন’, ‘জীবনদৃষ্টি ও ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও শাহেদ আলীর গ্রন্থ ‘বাংলা সাহিত্যে চট্টগ্রামের ভূমিকা’, ‘ফিলিস্তিনে রুশ ভূমিকা’, ‘সাম্রাজ্যবাদ ও রাশিয়া’, ‘বিপর্যয়ের হেতু’ এবং শিশুসাহিত্য ‘সোনারগাঁয়ের সোনার মানুষ’, ছোটদের ‘ইমাম আবু হানিফা’ ও ‘রুহীর প্রথম পাঠ’ ব্যাপকভাবে পঠিত গ্রন্থ। তিনি ‘ইকোনোমিক অর্ডার অব ইসলাম’ ও ‘ইসলাম ইন বাংলাদেশ’ নামে দুটি ইংরেজি গ্রন্থও রচনা করেছেন। গ্রন্থ দুটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত ও মূল্যায়িত হয়েছে। ‘ইসলামী সংস্কৃতির রূপরেখা’ নামে উল্লেখযোগ্য একটি সংকলন গ্রন্থও তিনি সম্পাদনা করেছেন।
অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬৪ সালে কথাসাহিত্যে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৭০ সালে কথাসাহিত্যে ‘তমঘা-ই-ইমতিয়াজ’ ১৯৮১ সালে ভাষা আন্দোলন পদক, ১৯৮৫ সালে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন স্ব^র্ণপদক, ১৯৮৬ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার, ১৯৮৯ সালে একুশে পদক, ১৯৯২ সালে দুবাই সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে জাসাস পুরস্কার, ২০০০ সালে মাতৃভাষা পদক ও সেলুলাস সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৯৮ সালে রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার, ২০০২ সালে মরণোত্তর জাসাস স্ব^র্ণপদক ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পুরস্কার লাভ করেন। ২০০০ সালে কথাশিল্পী শাহেদ আলীকে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের পক্ষ থেকে জাতীয় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। ২০০১ সালের ৬ নভেম্বর তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের সভাপতি।
শিক্ষাবিদ হিসেবে শাহেদ আলীর নামের সঙ্গে অধ্যাপক শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে কথাশিল্পী হিসেবেও তিনি অধ্যাপক শাহেদ আলী নামেই পরিচিতি লাভ করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের অনবদ্য কথাশিল্পী হিসেবে স্ব^ীকৃত ও নন্দিত এই জীবনশিল্পগুীর অবদান প্রকৃতপক্ষে নানামাত্রিক। বিশেষ করে চিন্তাচর্চা ও অনুবাদ কর্মেও তিনি রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় অবদান।

বাউলসাধকদের গানে মানুষ-ভজনা by সুমনকুমার দাশ

বাংলা লোকগানে মানুষ-ভজনার বিষয়টি সুপ্রাচীনকাল থেকে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে প্রবহমান। বৈশ্বিক জীবনে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ও সংকটে লোক-গীতিকাররা মানবমহিমায় গান গেয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার জয়গান করেছেন। চণ্ডীদাসের বহুল প্রচলিত ‘শুনো হে মানুষ ভাই/সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ পঙ্ক্তি দুটো তো রীতিমতো প্রবাদতুল্য। এরকম শত-সহস্র মানবিকতামণ্ডিত পদাবলি বাংলা গানের ভুবনকে আলোকিত ও সমৃদ্ধ করেছে।
বৈষ্ণব সাহিত্য ও দর্শনে এবং লৌকিক প্রণয়-গীতিতেও জাতপাত আর উঁচু-নিচু ভেদাভেদের বিরুদ্ধে শুদ্ধ প্রেমের শাশ্বত বাণী উচ্চারিত হয়েছে। চৈতন্য ও চৈতন্যোত্তর যুগ পেরিয়ে ‘নানারূপ সঙ্গীতে- লৌকিক গাথা ও গীতিকাব্যে’ মানুষ-বন্দনার অসামান্য প্রভাব ছিল গীতিকারদের মধ্যে। গ্রামীণ নিরক্ষর এসব গীতিকারদের কাব্যরসে উন্নততর গুণের প্রমাণ স্পষ্ট। অনেকটা নীরবে-নিভৃতে মানবপ্রেমের বিকাশ ঘটাতে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে গেছেন অসংখ্য চেনা-অচেনা পল্লী গীতিকার-গায়ক।
বাংলার বাউল-ফকির পরম্পরায় সাধকদের কণ্ঠেও একইভাবে মানবপ্রেম সঞ্চারিত হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতার সুর তাদের গানের অন্যতম বিষয়বস্তু। আশরাফ-আতরাফ, ধনী-গরিব, কালো-সাদা, হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, জাত-পাত ভেদাভেদ দূরে ঠেলে সাধকরা যুগে-যুগে কালে-কালে অভিন্নভাবে ভারতবর্ষে মানবপ্রেমের মহিমা ছড়িয়েছেন। মানবিকবোধ-সংক্রান্ত উচ্চ চিন্তামূলক মনোভাব তাদের গানে দেখতে পাওয়া যায়।
বাউল-ফকির মতবাদের প্রচার ও প্রসারে কুষ্টিয়ার বাউলসাধক লালনের (১৭৭৪-১৮৯০) নাম সবার আগে উচ্চারিত হয়ে থাকে। তার একাধিক গানেও মানুষ-বন্দনার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা যায়। বলা যায়, তিনিই পরবর্তীকালে বাউল-ফকিরদের মধ্যে মানুষ ভজনার দর্শন প্রচারের সেতু তৈরি করেছেন। লালন লিখেছেন- ‘মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে/সে কি অন্য তত্ত্ব মানে’ কিংবা ‘এমন মানব জনম আর কি হবে-/অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই/শুনি মানবের উত্তম কিছু নাই/দেব দেবতাগণ করে আরাধন জন্ম নিতে মানবে’। উপর্যুক্ত গান দুটির অন্তরালে মানবপ্রেমের অন্তঃশীল সত্য প্রতিভাসিত হয়েছে। এ ধারা পরবর্তী সঙ্গীতসাধকদের মধ্যেও প্রবাহিত ছিল। যেমনটা রয়েছে বর্তমানের সঙ্গীতকারদের মধ্যেও।
সংকীর্ণ মৌলবাদ ও ভ্রান্ত সাম্প্রদায়িক চেতনা যখনই সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখনই যুথবদ্ধভাবে বাউলসাধকরা প্রতিবাদ-প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়েছেন। মানবসমাজে সম্প্রীতিতে যেন চির না-ধরে সেজন্য গ্রাম-জনপদ কাঁপিয়ে সাধকরা কণ্ঠে তুলেছেন মানবতার জয়গান। অথচ মানবধর্মের জয়গান-সংবলিত এসব গানকে অনেকটা অসচেতনতায় যথার্থভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না তেমনভাবে। তবে আবহমানকাল গ্রামীণ সাধারণ শ্রোতারা সেসব গান শুনেই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত হতেন।
সাম্প্রতিককালে বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশেও মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, আঞ্চলিকতাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা চরম সংকট তৈরি করেছে। এ সংকট তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে গ্রামীণ বিনোদনের অন্যতম ক্ষেত্র বাউলগানের বিস্তৃতি কমে যাওয়ার বিষয়টিও একটি অন্যতম কারণ। বাউলগানের আসর একদিকে দ্রুত কমে যাচ্ছে অপরদিকে ওয়াজ মাহফিলের পরিসর ক্রমশ বাড়ছে।
বাউলগানের আসরে মানবমহিমার যেসব গান গীত হতো, তা লোপ পাওয়ায় মানুষ-বন্দনা সম্পর্কিত মতবাদ প্রচারে অনেকটা ভাটা পড়েছে। প্রায় নীরবে-নিভৃতে চোখের অলক্ষে হারিয়ে যেতে বসেছে উজ্জ্বল সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হওয়া মানবপ্রেমের বন্দনামূলক গানের ক্ষেত্রটি। অথচ এর রোধ ঠেকাতে আমরা অনেকটাই নির্বিকার ভূমিকা পালন করছি। যদি মানবমুখী এসব গানের বিস্তৃতি ও পরিসর বাড়ানো সম্ভব হতো তাহলে ধর্মের নামে যেসব কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস সমাজে প্রচলিত রয়েছে সেসব থেকে সহজেই উত্তরণ সম্ভব হতো।
যশোরের দুদ্দু শাহ (১৮৪১-১৯১১) লিখেছিলেন- ‘কালী কিংবা মক্কায় যাও রে মন/দেখতে পাবে মানুষের বদন’। দুদ্দু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজ্যদেবী কালী কিংবা মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান মক্কায় মানুষের সত্তার অনুধাবন করার বিষয়টিতে জোরারোপ করে চিরায়ত মানববন্দনার বিষয়টিকেই উপস্থাপন করেছেন। একইভাবে সিলেটের একলিমুর রাজার কণ্ঠেও একই অভিমত প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেছিলেন- ‘মনেতে মথুরা আছে/মক্কা কাবার ঘর-/তারই মাঝে বিরাজিছে/মানুষ সুন্দর’। আর কুবির গোঁসাই তো সরাসরি ‘মানুষে নিষ্ঠারতি’ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সৃষ্টিকর্তা আসলে মানুষের ভেতরেই অবস্থান করছেন, এমনটিই বাউল-ফকিরদের মতবাদ। সে কারণেই নিত্য খ্যাপা বলেছেন- ‘মানুষেতে মানুষ আছে মানুষ নাচায় মানুষই নাচে/মানুষ যায় মানুষের কাছে মানুষ হইতে’। এ-রকম হাজারো সাধু-সন্তের বাণী মানবপ্রেমের মহিমাকে ধারাবাহিকভাবে চির উদ্ভাসিত করে রেখেছে। সাধক খোদা বক্শ শাহ মানুষ-ভজনার বিষয়টি এভাবেই গুরুত্ব দিয়েছেন :
মানুষ ভজন করব বলে মনেতে করি বাসনা
বনফুলে পুঁজি মানুষ মনফুল তো ফুটিল না।
মানবলীলা সব লীলার সার শুনেছি তাই শ্রবণে
কী রূপে ভজিব মানুষ তাহার সন্ধান জানিনে
সেবা কিংবা ভক্তি দিলে
তাই কি মানুষভজা বলে
চন্দন প্রদীপ আর বনফুলে কীসে হয় মানুষের ভজনা।
মানুষে মনহুঁশ কামনা করি বল কেমনে
ফুল তুলিতে বেলা গেল মালা গাঁথব কখনে
মম মনসুতা নাইকো ভালো
কেমনে মালা গাঁথব বলো
গাঁথতে গাঁথতে বেলা গেল কণ্ঠে পরাব কখনা।
ত্রিলোকের মনোহরা রূপ নববপু তাহার স্বরূপ
পুঁজিলে কি মেলে মানুষ গঙ্গাজল তুলসী দিলে ধূপ
উচ্চ করে আসন দিলে
তাই কি মানুষভজা বলে
শুকচাঁদ সাঁই মোর কীসে মেলে দীন বক্শর সদা এই ভাবনা।
সাধুসন্তরা ‘অন্তর-মন্দিরে’ মানুষকে স্থান দিয়ে তার মহিমা প্রচারে সদা ব্যস্ত ছিলেন। খোদাকে পেতে হলে মানুষ ভজনা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। গোপাল দাস সে বিষয়ে ইঙ্গিত করেই প্রশ্ন করেছিলেন : ‘মানুষ না ধরিলে/মানুষ না ভজিলে/খোদা কি মেলে-’। প্রকৃতপক্ষে তা-ই। বস্তুবাদী চেতনার অধিকারী নেত্রকোনা অঞ্চলের সাধক জালাল উদ্দীন খাঁ-তো সরাসরিই খোদাকে আক্রমণ করে বসেছেন :
আমি না-থাকিলে খোদা তোমার জায়গা ভবে নাই
স্থান না-পেয়ে অন্য কোথাও আমাতে লয়েছ ঠাঁই।
মানুষ থুইয়া খোদা ভজো এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে
মানুষ ভজো কোরান খুঁজো পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে।
বিচার করলে নাই রে বিভেদ কে হিন্দু কে মুসলমান
রক্ত মাংস একই বটে সবার ঘটে একই প্রাণ।
জালাল উদ্দীন খাঁ যেমন করে মানুষের প্রতি প্রেম-ভালোবাসা-প্রীতিকে সবার আগে ঠাঁই দিয়েছেন তেমনি হাউড়ে গোঁসাই, পাগলা কানাই, পাঞ্জু শাহ, দ্বিজদাস, মনোমোহন, হাসন রাজা, রশিদ উদ্দিন, দীন শরৎ, ফুলবাস উদ্দিন, শাহ আবদুল করিম, দুর্বিন শাহ, ভবা পাগলা, মহিন শাহসহ কতশত পদাকর্তাও একই ধারার পথিক ছিলেন।
বাউলেরা অনুমানে বিশ্বাস করেন না বলেই বস্তুবাদ তথা অস্তিত্ববাদী হিসেবে নিজেদের মনে করে থাকেন। এ কারণেই তারা মানুষের মধ্যে খোদাকে খুঁজে বেড়ান।
ভারতবর্ষের বাউল-ফকিররা যুগযুগান্তর ধরে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সর্ব মানুষের মিলনের ক্ষেত্রে একটা বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে আসছেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের আকুলতা ছিল তাদের গানে। মুসলমান সাধকের হিন্দু শিষ্য কিংবা হিন্দু সাধকের মুসলমান শিষ্য- এ রকম অসংখ্য উদাহরণ বাউল অনুসারীদের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করা যায়। মানবধর্ম প্রচারের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক ভেদবিচারের বিরুদ্ধে তাদের মনোভাবকেই পরিস্ফুট করেছে। বাউল-ফকির মতবাদের ঐতিহ্যগত পরম্পরায় ক্ষীণমাত্রায় হলেও সে ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে- সেটিই আশাবাদের বিষয়।

শিমুর বিয়ের গল্প by আন্দালিব রাশদী

শিমু ও এখলাসুর রহমানের বয়সের ব্যবধান—যদি দুজনই ঠিক বয়স বলে থাকে, সাড়ে ১৪ বছর। দু-চার মাস বেশিই হবে। বয়স কমিয়ে রাখার প্রবণতাটি তো আর মিথ্যে নয়। প্রেম-ভালোবাসা করে বিয়ে নয়। আয়োজনটা পারিবারিক। পেশাদার না হলেও ঘটকের কাজটি করেছেন শিমুর ছোট ফুপা এ এন এম নুরুল মোস্তফা। বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেল। ছোট ফুপা যে কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল, সেখানেই ফিজিক্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এখলাসুর রহমান। এখলাসের দিক থেকে কোনো চাওয়া না থাকায় বিয়েটা চূড়ান্ত হতে সময় লাগেনি। বরপক্ষে নুরুল মোস্তফার কাউন্টারপার্ট এখলাসের বড় দুলাভাই হোসেন উদ্দিন বললেন, ‘বর ও কনের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির জন্য বাক্য আদান-প্রদান জরুরি। কিন্তু তা যেন শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে। সে ক্ষেত্রে বরং টেলিফোনে সীমিত আলাপ অনুমোদন করা যায়, কী বলেন?’
তাঁর জিজ্ঞাসার কেউ জবাব দেননি। আবার প্রস্তাব যে প্রত্যাখ্যান করেছেন, এটাও মনে হয়নি। সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পর এক সন্ধিক্ষণে এখলাসুর রহমান সুরাইয়া আকতার শিমুকে ফোন করে এ কথা-সে কথার একপর্যায়ে সরাসরি বলল, ‘আপনি সত্যিই আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন তো?’
শিমু থতমত খায়, ‘মানে, আপনি কী জানতে চাইছেন? গার্ডিয়ানরা সবাই দেখেশুনে ফাইনাল করেছেন, আমার না চাওয়ার কী আছে? কেন, আমাকে আপনার পছন্দ হয়নি?’
‘আমি তো নিজেই পছন্দ করেছি। দেখলেন না আপনাকে দেখতে এসে সবার সামনে কেমন বেহায়ার মতো বললাম, খুব পছন্দ হয়েছে।’ এখলাসের কথায় হেসে উঠতে চাইল শিমু, কিন্তু এখনই হাসা ঠিক হবে না ভেবে ফোনের অপর প্রান্তে মুখ চেপে ভেতরের তাগিদটা সংবরণ করল। এখলাস বলল, ‘আমি যত দূর জানি নুরুল মোস্তফা সাহেব আপনাদের বলেছেন, আমার বয়স তিরিশের একটু বেশি। কিন্তু কত বেশি তা বলেননি। আমি যদি আমার আসল বয়সটা আপনাকে অন্তত না বলি, নিজের মধ্যে একটা অপরাধবোধ থেকে যাবে। আমার জন্ম ১৯৩৫-এর এপ্রিলে, আর এখন ১৯৭২-এর মার্চ, মানে সাঁইত্রিশ বছর—থার্টি সেভেন ইয়ার্স। আর আপনার কেবল একুশ পেরিয়েছে। এখনো বাইশও হয়নি। ব্যবধানটা প্রায় ষোলো বছরের। এটা কি একবারও চিন্তা করেছেন, আপনি যথেষ্ট ইয়ং থাকতেই আমি বুড়ো হয়ে যাব। আপনার যখন হবে পঁয়ত্রিশ, তখন আপনার ভরা যৌবন, আমার সে সময় পঞ্চাশ পেরিয়ে যাবে। আপনার যখন চুয়াল্লিশ, আমি ষাট! আপনার তখনো পূর্ণ যৌবন। ষাট বছর বয়সী একজন মানুষের কথা ভাবুন তো।’ শিমু খেপেই গেল, ‘কী সব আবোল-তাবোল বলতে আমাকে ফোন করেছেন। আমি কি ফোন রেখে দেব?’
‘ভুল বুঝবেন না। সত্যিটা আগে থেকে জানা থাকলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তা ছাড়া আমরা তো সত্যিটাকে একটু রেখেঢেকে সুবিধামতো বলে থাকি। সেজন্যই আপনাকে একটু ভাবতে বলেছিলাম।’ ‘আমার এত ভাবাভাবির সময় নেই।’
এখলাস বলল, ‘আপনি জানেন না, এমনকি বুড়ো মহিলারাও বুড়ো হাজব্যান্ড পছন্দ করেন না। তাই একটু ভেবে দেখতে বলছি। তা ছাড়া বয়সটা একটু কাছাকাছি না হলে একই ওয়েভলেঙ্গথে চিন্তাও করা যায় না।’ ‘ফোনে যদি আপনার এসব নসিহত আমাকে শুনতে হয় তাহলে বরং খোদা হাফেজ।’ এখলাস বলল, ‘আপনি ইচ্ছে করলেই লাইন কেটে দিতে পারেন। তবে জেনে রাখুন, আপনাকে আমার সত্যিই খুব পছন্দ হয়েছে। আমি ভেবেছি, আপনাকে বিয়ে করতে পারাটা আমার জন্য বড় ভাগ্যের ব্যাপার হবে। কিন্তু বয়স লুকিয়ে আপনার সঙ্গে প্রতারণা করে ভাগ্যবান হলে পরে বিবেকের খোঁচা খেতে হবে। আমাদের প্রায় ষোলো বছরের বয়স ব্যবধান মাথায় রেখে ঠান্ডাভাবে চিন্তা করলে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আপনি নিতেও পারেন, সে জন্যই এটা বলা। আমার বাবা ও মায়ের বয়সের ব্যবধান আরও বেশি—তেত্রিশ বছর। মায়ের যখন আঠারো, বাবার তখন একান্ন। মা অবশ্য তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। বিয়েটা আমার মায়ের বেলায় অবশ্য প্রথম।’ এ কথাতে শিমু বেশ একটু জোর পায়। সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার বাবার বয়সের কারণে আপনার মায়ের বড় কোনো সমস্যা হয়েছে কি? আমার বাবা ও মায়ের বয়সের ব্যবধানও কমপক্ষে পনেরো বছর। তাঁদের কোনো অসুবিধে হয়েছে বলে তো শুনিনি।’ ‘না, আমার মাকেও কখনো অভিযোগ করতে শুনিনি।’ ‘বয়স-টয়সের কথা বলে প্যাঁচ বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। আমাকে পছন্দ হয়নি—সোজাসাপটা এই কথাটি বলে ফেলুন। আমার গায়ের রংটা যে ফর্সা নয়, এটা তো আমি জানিই। চোখে আঙুল দিয়ে নতুন আর কী দেখাবেন?’
টেলিফোন কথোপকথনে ভাঙনের সুরটাই প্রবল হয়ে ওঠায় সুর পাল্টে এখলাস বিনীত কণ্ঠে শিমুকে বলল, ‘আপনি আমাদের বিয়েটা ভেঙে দিতে চাইছেন? আপনাদের কার্ড তো এখনো ছাপাই হয়নি, আমাদের তো বিতরণও শেষ। এখন যদি বিয়েটা ভেঙে দেন, নিমন্ত্রিত চার-পাঁচ শ পরিবারের কাছে মুখ দেখাব কেমন করে?’
‘আপনি মেয়েলোকের মতো কথা বলছেন কেন? বিয়ে ভাঙলে কলঙ্ক হয় মেয়েদের; বিয়ে ভাঙায় পুরুষ মানুষ সমস্যায় পড়েছে এমন কখনো শুনিনি।’ এখলাস বলল, ‘আমরা এতক্ষণ যা বলেছি, দয়া করে তার সব আপনার স্মৃতি থেকে মুছে দিন। অনুষ্ঠানের আগে একবার আসুন না নিউমার্কেটে। নভেল ড্রিংস হাউসে একটু বসি, কথা বলি।’ ‘আপনার পরিকল্পনাটা ভালোই। আমি যে ফরসা নই, এটা কাছে থেকে দেখে নিশ্চিত হতে চান? তারপর বয়স কিংবা অন্য কোনো অজুহাতে বিয়েটা ভেঙে দেবেন। এই তো?’
এখলাস অদ্ভুত এক কর্তৃত্বের স্বরে বলল, ‘শিমু।’
নিজের নাম শুনে বশীভূত শিমু বলল, ‘জি।’
‘তেইশে মার্চ তোমার-আমার বিয়ে। তৈরি থেকো।’
শিমু বলল, ‘আচ্ছা।’
বয়সের সমস্যা কোথায় যে তলিয়ে গেল!
২. লোকটা কি বিয়ের আগেই তাকে বশীভূত করে ফেলল। বয়সটয়স নিয়ে কীসব পণ্ডিতি করল। বিয়েশাদিতে বয়স আবার একটা বিষয় হলো নাকি?
শিমুদের পক্ষে বিয়ের অনুষ্ঠানটি হয় ২৩ মার্চ ১৯৭২, লেডিস ক্লাবে। ২৫ মার্চ এখলাসদের পক্ষে বউভাতের অনুষ্ঠান। আজিমপুর কমিউনিটি সেন্টারে। এক বছর আগে এমন ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে গনগনে আগুনে জ্বলেছে ঢাকা। বউভাতের অনুষ্ঠান সেরে এখলাসদের লালবাগের বাসায় পৌঁছাতে রাত বারোটা। শিমুর মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। ক্লান্তি ঘিরে ধরেছে এখলাসকেও। তবুও শিমুকে জড়িয়ে ধরল। ‘আজ না হয় থাক।’ শিমু বলল। এখলাস বলল, ‘আচ্ছা।’ বলেই দু-তিন মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল। শিমুর ঘুম এল না। এক ধরনের অস্থিরতায় ও চাপা যন্ত্রণায় মধ্যরাত পার হয়ে গেল। তারপর ঠিক ঘুম নয়, ঝিমুনি। চোখ দুটি লেগে আসে, আবার ভেঙে যায়। যদি একটু বেশিক্ষণ লেগে থাকে, তখন কীসব দুঃস্বপ্ন এসে হাজির হয়। রাত তখন কত হবে—তিন কি চার। এখলাস পাশ ফিরে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি ঘুমোওনি?’
‘তুমি কেমন করে বুঝলে?’
এই প্রথম শিমু এখলাসকে তুমি বলল। একবার তুমি বলে ডাকতে পারলে আর আপনিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। ‘এই তো আমার মনে হলো তুমি ঘুমোওনি।’ বলল এখলাস। শিমু বলল, ‘আমার ভয় লাগছে।’ ‘ভয় কিসের, আমি তো আছি।’ এখলাস তার একটা পা তুলে দিল সদ্যবিবাহিত স্ত্রীর ওপর। একজন অন্যজনকে আঁকড়ে ধরবে, পা তুলে দেবে, বুকে মুখ ঘষবে—এটাই তো হওয়ার কথা। শিমুকে সংসারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল তোতলা শমসের। দুভাবে শমসের তাকে ডাকত—শিইইইইইই (ইইই বলার সময় কয়েকবার ঢোঁক গিলবে) মু; অথবা শিমু করার সময়ও ঢোঁক গিলবে)। শিমু বলত, ‘থাক থাক এত কষ্ট করে ডাকতে হবে না। বলো, কী বলবে?’
‘কিইইইছু না, কিছু না, এমনি ডেকেছি।’ একবার কথা শুরু করলে আর থামে না। রবিকরোজ্জ্বল কিংবা কিংকর্তব্যবিমূঢ়-জাতীয় জটিল শব্দও অবলীলায় বলে যায়। একই বয়সী দুজন। দু-চার মাস এদিক-ওদিক হতে পারে। শমসের দাবি করে, বেশির দিকটাতেই সে—বয়সে শিমুর চেয়ে বড়। শিমু বলে, ‘ধ্যাৎ, চার-ছয় মাসের বড় কোনো ব্যাপার হলো? যখন তুমি ন্যাংটা, আমিও ন্যাংটা।’ দুজনই তখন বিএ প্রথম বর্ষের; তখন মানে উনিশ শ সত্তরে। শিমু ইডেনে, শমসের ঢাকা কলেজে। শিক্ষা সপ্তাহের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইল অনেকে, কিন্তু তবলাবাদক একজনই, তোতলা শমসের। শিমু হারমোনিয়ামে হাত রেখেই তবলাবাদককে বলল, ‘সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানে বাজাতে পারবেন তো?’
শমসের এতটুকুও না তোতলিয়ে মুখের ওপর বলল, ‘আগে গানটা ধরেন, দেখি গাইতে পারেন কি না।’ শিমুল বলেই ফেলল, ‘এমন ভাব দেখাচ্ছিস যেন ওস্তাদ আল্লারাখা। বেশ গাইছি: পিয়া পিয়া পিয়া কে ডাকে আমারে মায়াময় এই মধু সন্ধ্যায়...।’ গানের শেষে আড়চোখে চেয়ে শমসের বলল, ‘অন্তরাতে তাআআল কেটে গেছে বোঝোনি?’
তাল কাটার কথা শমসের যেভাবে বলেছে, শিমু না রেগে বরং হেসে ফেলেছে। শুরুটা এভাবেই। দেখা হলে কথা-কাটাকাটিই বেশি হয়। এমনকি একপর্যায়ে শমসের শিমুকে বলেছে, ‘তোমাকে দিয়ে গান হবে না। তোমার মধ্যে সিরিয়াসনেস নেই।’ শিমু বলে, ‘তুমি কত বড় সিরিয়াস বাহাদুর, জানা আছে।’ তত দিনে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সমবয়সী অনেকেই শিমুকে ডাকতে শুরু করেছে, ‘শিইইইমু।’ শিমুর মনে হলো, তোতলা শমসের তার নামের ওপর চেপে বসেছে। সেই শমসেরই একদিন রিহার্সেলের এক ফাঁকে তাকে বলল, ‘আমি কিন্তু তোমাকেই বিয়ে করব।’ ‘বয়েই গেছে। তোমাকে বিয়ে করে তোতলা বাচ্চার মা হতে আমার বয়েই গেছে।’ শমসের অবাক চোখে তাকিয়েছে শিমুর দিকে—বাচ্চা হওয়ার চিন্তা তার মাথায় আসেনি, এমনকি বিয়ে কথাটাও কথার কথা—শিমু এতদূর ভেবেছে! একাত্তরের গনগনে মার্চের প্রথম দিন শমসের তাকে ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান বনাম কমনওয়েলথ একাদশের ক্রিকেট ম্যাচ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ হইহই রইরই শুরু হলো, গ্যালারির একদিকে আগুনও ধরানো হলো। কথা ছিল মধ্যাহ্ন বিরতির সময় স্টেডিয়ামে প্রভিন্সিয়াল রেস্টুরেন্টে বিরিয়ানি খাবে। জাতি তখন আর খাবারের কথা ভাবছে না—কেবল ভাবছে গনগনে আগুনে পাকিস্তান জ্বালিয়ে দেওয়ার কথা। বাস, রিকশা কিছুই পায়নি। পায়ে হেঁটে পরিবাগের সরু রাস্তা দিয়ে হাতিরপুল। ওখানে দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়—শমসের ঢাকা কলেজের দিকে, শিমু ভূতের গলিতে। শিমুদের বাড়িতে টেলিফোন ছিল। শমসেরের ফোন থাকার কথা নয়, ঠিকানাও শিমুর জানা ছিল না। শমসের যদি নিজে থেকে যোগাযোগ না করে, তাহলে বলতেই হবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। একুশে মার্চ শমসের হাজির। শিমুকে বলল, ‘এখন চলো। ধানমন্ডি স্কুলে রিহার্সেল হবে। তারপর গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে রাস্তায় নামব আমরা। একটা ট্রাকও পেয়ে যেতে পারি।’ ‘কী করব?’ শিমু জিজ্ঞেস করে। শমসের বলে, ‘ভয় কী মরণে জাগিছে সন্তানে/মাতঙ্গ মেতেছে আজ সমর রঙ্গে/তাথৈ তাথৈ থৈ দ্রিমি দ্রিমি দ্রাম দ্রাম...। বাসা থেকে একটা গামছা নিয়ে এসো আর হারমোনিয়ামটাও।’ দুই পাশের আংটার সঙ্গে গামছার দুই প্রান্ত বেঁধে তখনই হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে নিল শমসের। তবলাবাদক হারমোনিয়াম বাজাতেও জানে। গুনগুন করে গাইলও। ‘তুমি গাইলেই পারতে। গলাটা তো ভালোই।’ শমসের বলল, ‘একজনও তোতলা শিল্পীর নাম বলতে পারবে? তোতলারা গায়ক হয় না, বাদক হয়।’ ধানমন্ডি স্কুলের কয়েকটি রুম খোলাই ছিল। হারমোনিয়াম-তবলাও সাজানো। তবলার সামনে বসে শমসের বলল, ‘আগে হাত দুটো চালু করে নিই। শিমু, একটা গান ধরো তো।’ অমনি হারমোনিয়ামে আঙুল চালাল শিমু। গাইতে শুরু করল: ‘আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি/মোর নিশিথ বাসরশয্যায়/মন বলে ভালোবেসেছি/আঁখি বলিতে পারে না লজ্জায়।’ মুখটুকু গাওয়ার পর শমসেরকে ধমকে উঠল সে, ‘তুমি বাজাচ্ছ না কেন?’ ‘শুনতেই ভালো লাগছে।’ ‘ধ্যাৎ।’ ‘অন্তরাটা ধরো।’ ‘পারব না।’
৩. ট্রাক এল দুটি। শিল্পীরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। শিমু গেল দক্ষিণে, শমসের উত্তরে। শিমু চাইছিল শমসেরের সঙ্গে থাকতে, কিন্তু হলো না। সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরল শিমু। রাত এগারোটার মধ্যেও যখন হারমোনিয়াম ফেরত দিতে এল না, শমসেরের ওপর মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল তার। সকালে বাবা ধমকাল শিমুকে, ‘কাদের সঙ্গে চলাফেরা করিস। একটা বদমাশ রাত সাড়ে বারোটার সময় একটা হারমোনিয়াম রেখে গেছে। এসব পাগল-ছাগলের সঙ্গে মেশামেশা বন্ধ কর। তুই যে মেয়েমানুষ, এটা মনে রাখিস। হারমোনিয়ামের প্যা-পো-প্যা-পো বাজিয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করা যাবে না, এটাও মনে রাখিস।’ শমসেরের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। কথাও না। অবরুদ্ধ স্বদেশে শিমু ভূতের গলির বাসা ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের বাড়িতে, কখনো এই গাঁয়ে, কখনো ওই গাঁয়ে একাত্তরের ডিসেম্বর পার করেছে। ডিসেম্বরের শেষ দিন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নিজেদের বাড়িতে ঢুকে তার চোখ আটকে যায় দুই আংটায় গামছা বাঁধা হারমোনিয়ামে। তোতলা শমসেরটা এমনই পাষণ্ড, একবার খোঁজও নিল না। অবশ্য কোথায় খোঁজ নেবে। শিমু ঢাকায় ছিল না। যেসব জায়গায় ছিল, শমসের তার ঠিকানা পাবে কোথায়? অস্থির শিমু তার পক্ষে যতটা সম্ভব খোঁজ নিয়েছে। শমসের—কোন শমসের? তোতলা শমসের! প্রায় সবাই বলেছে, ‘চিনি না।’ দু-একজন বলেছে, ‘মুক্তিতে যোগ দিয়েছিল। মরেটরে গেছে বোধ হয়। তাকে কী দরকার?’ এ প্রশ্নের জবাব শিমুর অন্তরে জমাট বেঁধে ছিল, ‘আমি একটি তোতলা সন্তানের মা হতে চাই।’
৪. শিমু সশব্দেই এখলাসকে বলল, ‘এত বয়স বয়স কোরো না। বয়স তো কেবল একটা সংখ্যা—একুশও যা, সাতাশও তা, সাঁইত্রিশও একই কথা।’ বিয়ের আগে এখলাস যখন শিমুকে বয়সের কথা বলেছে, তার মনে হয়েছিল, বিয়ে ভেঙে দেওয়ার এটাও একটা হুমকি। সেদিন এখলাসের সঙ্গে কথা শেষ করে ঘর থেকে শিমু বেরিয়ে যায় তোতলা শমসেরের খোঁজে। ঢাকা কলেজে কেবল তরুণদের ভিড়ে একটি মাত্র তরুণী, সে শিমু; সে জনে জনে জিজ্ঞেস করে ওই যে শমসের—একটু তোতলায়, ভালো তবলা বাজায়, নাকটা খাড়া, চোখ খুব উজ্জ্বল, একাত্তরে বিএর ছাত্র। কেউ শনাক্ত করতে পারে না। নামের রেজিস্টার দেখে একজন বলল, ‘শমসের নামে বিএ-তে আমাদের কোনো ছাত্র ছিল না—সত্তরেও না, একাত্তরেও না, এ বছরও নেই।’ ‘কিন্তু আমি তো তা-ই জানতাম।’ শিমু বলল কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে। ‘আপনি ভুল জানতেন। দেশটা ঠগ-প্রতারকে ভরে গেছে।’ তারই পাশে বসা অন্য আরেক কেরানি বলল, ‘আমাদের মাইজদিতে শমসের নামের এক মুক্তিকে জিপের সঙ্গে বেঁধে তিন মাইল হেঁচড়ে নিয়েছে। আধমাইল টানার পরই তাঁর মৃত্যু হয়। পরের আড়াই মাইল না টানলেও চলত।’ শিমুর পা টলছে। কেরানিকে বলল, ‘একটু বসি।’ ‘এটা ব্যাটাছেলেদের কলেজ। এখানে মেয়েমানুষ বসতে পারবে না।’ মাথাটা চক্কর দিল শিমুর, শরীরটা মনে হলো ওজনশূন্য। যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানেই বসে পড়ল। কোনোভাবে মাথা ঘুরানো ব্ল্যাকআউট কাটিয়ে উঠে বলল, ‘আমার মনে হয় আমি এই শমসেরের কথাই বলছি।’ আধঘণ্টা পর তাকে রিকশায় তুলে দিয়ে কেরানি বলল, ‘শমসেরের জন্য বেহুদা চিন্তা কইরা লাভ নাই। পুরুষমানুষকে বিশ্বাস করলে ঠকবেন। শমসের নামে কেউ নেই। যদি থাকেও দেখবেন আপনার শমসের এখন কোথাও ঘরসংসার করছে।’ তাকে এত দূর এগিয়ে দিতে আসা লোকটির ওপর মেজাজ খারাপ হলো শিমুর। ধমকের স্বরে বলল, ‘বাজে কথা বলবেন না। এসব শুনতে আমার ভালো লাগে না।’১৯৭২-এর ২৫ মার্চ, মধ্যরাতে ঘুমাক্রান্ত এখলাস যখন খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য শিমুকে জড়িয়ে ধরে, শিমু তখন তার একান্ত ব্যক্তিগত জগতে—একটি মিলিটারি জিপের সঙ্গে বাঁধা দড়ি তারই সমবয়সী তোতলা শমসেরকে মাইজদির এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তখনো প্রাণ যায়নি তার। অস্ফুট কণ্ঠে বলছে, ‘শিইইইমু, আমি কিন্তু তোমাকে বিয়ে করব।’ শিমু জবাব দেয়, ‘তোমার মতো বাচ্চা ছেলেকে কে বিয়ে করে। আমার সঙ্গে আমার হাজব্যান্ডের বয়সের ব্যবধান হতে হবে পনেরো থেকে কুড়ি বছর। ষোলো হলে সবচেয়ে ভালো। আমার হাজব্যান্ড এখলাসের বয়স সাঁইত্রিশ, আর আমার একুশ।’

আইএসকে হারাতে ‘কয়েক বছর’ লাগবে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের
সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বিভিন্ন আরব দেশের
প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব দেশ ইরাক ও
সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী মার্কিন
নেতৃত্বাধীন বিমান হামলায় সহায়তা করছে। বৈঠকে
ইরাকের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। এএফপি
আরব সহযোগীদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের বেশ ক্ষয়ক্ষতি করেছে। তবে সহজে তাদের পরাজিত করা যাবে না বলে মানছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক মুখপাত্র মঙ্গলবার বলেছেন, এই লড়াই শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। এদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট তুরস্ক সীমান্তের কাছে কুর্দি-অধ্যুষিত সিরীয় এলাকায় মঙ্গলবার রাতে কয়েক দফা বিমান হামলা চালিয়েছে। খবর বিবিসি ও এএফপির। তুরস্ক সীমান্তবর্তী সিরীয় শহর কোবানের আশপাশে নতুন বিমান হামলার খবরের মধ্যে লড়াইয়ের স্থায়িত্ব নিয়ে পেন্টাগন মুখপাত্রের ওই মন্তব্য এল। কুর্দি-অধ্যুষিত শহরটি কয়েক দিন ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে আইএস জঙ্গিরা। ওই এলাকার প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার বাসিন্দা এরই মধ্যে পালিয়ে তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল জন কারবি ওয়াশিংটনে বলেছেন,
সিরিয়ায় চালানো বিমান হামলা এরই মধ্যে আইএসের সক্ষমতাকে সফলভাবে ‘কমিয়ে দিয়েছে’। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, যেখানে চেয়েছিলাম, ঠিক সেখানেই আঘাত করেছি।’ অবশ্য, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইএসও যে নতুন পথ খুঁজে নিতে ও প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম, সেটাও স্বীকার করেছেন পেন্টাগনের মুখপাত্র। তিনি বলেন, আইএস যে ‘মারাত্মক হুমকি’ সামনে নিয়ে এসেছে, তা কয়েক দিন বা মাসে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। কারবি বলেন, ‘এটা হতে যাচ্ছে একটা ব্যাপক প্রচেষ্টা, যেখানে অন্তর্ভুক্ত থাকবে সবাই। আমরা মনে করি, এটা কয়েক বছরের বিষয় হবে।’ সিরীয় শহর কোবানের আশপাশে চালানো মঙ্গলবার মধ্যরাতের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল আইএসের অবস্থান ও সরবরাহ রুট। এ ছাড়া ইরাক সীমান্তের কাছেও দুই দফা বিমান হামলার কথা নিশ্চিত করেছে পেন্টাগন। সোমবার সিরিয়ায় প্রথম দিনের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আরব বিশ্বের অন্তত পাঁচটি দেশ সহায়তা করেছে। ওই হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল আইএসের শক্ত ঘাঁটি সিরীয় শহর রাকা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ওই শহরটির পাশাপাশি আরও কয়েকটি এলাকায় হামলা চালিয়ে আইএসের বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, যানবাহন ও সংরক্ষণাগার ধ্বংস করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই বিমান হামলা আইএসের যোদ্ধাদের ওপরে বিরাট প্রভাব ফেলেছে। আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, সিরিয়ার আলেপ্পো প্রদেশের একটি ভবনে বিমান হামলায় চার শিশুসহ অন্তত ১১ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীকে দায়ী করেছে স্থানীয় সরকারবিরোধীরা।
তবে এ বিষয়ে নিরপেক্ষ সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি জানিয়েছেন, আইএসবিরোধী লড়াইয়ে ৫০টিরও বেশি দেশ যোগ দিয়েছে। তিনি নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এই সন্ত্রাসীদের কোথাও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেতে দেব না।’ তুরস্কের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর কেরি বলেন, লড়াইয়ে আরব দেশগুলোর পাশাপাশি তুরস্কও যোগ দেবে। তবে তুরস্ক গতকাল বলেছে, তখন পর্যন্ত বিমান হামলায় তাদের বিমান কিংবা সে দেশে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটি ব্যবহৃত হয়নি। জাতিসংঘে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আইএসবিরোধী অভিযান: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে যাওয়া বিশ্বনেতাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরাক ও সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের বিষয়টি। অধিবেশনে ভাষণ দেওয়া প্রথম নেতাদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি এই অধিবেশনকে আইএসবিরোধী আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরালো করার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। ওবামার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৈঠকে সভাপতিত্ব করার কথা, যেখানে ইরাক ও সিরিয়ায় বিদেশি জিহাদিদের প্রবেশ ঠেকাতে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হতে পারে। প্রস্তাবটিতে দেশে দেশে এমন আইন করার কথা বলা হয়েছে, যাতে ইরাক ও সিরিয়ায় জিহাদে যোগ দেওয়াকে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।

মঙ্গলের কক্ষপথে মঙ্গলযান

মঙ্গলযান
মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে প্রবেশ করেছে মানুষবিহীন ভারতীয় নভোযান ‘মঙ্গলযান’। এ ব্যাপারে গতকাল বুধবার প্রথম চেষ্টায়ই সফল হয়েছে যানটি। এ অর্জনের মধ্য দিয়ে রহস্যময় ‘লাল গ্রহ’ নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে এশিয়ার যেকোনো দেশের চেয়ে এগিয়ে গেল ভারত। এত দিন শুধু যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এ কাজ করতে পেরেছে। খবর এএফপি ও বিবিসির। মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছানোর জন্য ১০ মাসে ৬৬ কোটি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে ভারতীয় নভোযানটি। এতে সংযুক্ত কৃত্রিম উপগ্রহটি (স্যাটেলাইট) মঙ্গলের কক্ষপথে স্থাপিত হবে এবং সেখানে সম্ভাব্য প্রাণের অনুসন্ধানমূলক গবেষণায় সহায়তা করবে। এ অভিযানে ভারতের ব্যয় হয়েছে সাত কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (নাসা) বা আন্তর্জাতিক মানে খুবই কম। বলা হয়েছে, হলিউডের কল্পবিজ্ঞাননির্ভর চলচ্চিত্র গ্র্যাভিটির নির্মাণব্যয়ও এর চেয়ে কম—১০ কোটি ডলার! নাসার স্যাটেলাইট ম্যাভেন মঙ্গলের কক্ষপথে পাঠাতে খরচ পড়েছে ৬৭ কোটি ১০ লাখ ডলার।
ম্যাভেনও সফলভাবে মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছে গত সোমবার গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করেছে। স্বল্প বাজেটে দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত মঙ্গলযানের এ সাফল্যে বিপুল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বেঙ্গালুরুর কাছে অবস্থিত ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (আইএসআরও) ঘাঁটিতে গিয়ে সেখানকার বিজ্ঞানীদের অভিবাদন জানিয়েছেন। মোদি তাঁদের বলেন, ‘ইতিহাস রচিত হয়েছে। আমরা অজানায় পৌঁছানোর সাহস দেখিয়ে প্রায় অসম্ভবকে অর্জন করেছি।’ লাল গ্রহের কক্ষপথে পৌঁছাতে মঙ্গলযানের সাফল্যে ভারতকে অভিনন্দন জানিয়েছে নাসা এবং চীন। ভারতীয় স্যাটেলাইটটি প্রায় ছয় মাস ধরে মঙ্গলকে এর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে থেকে প্রদক্ষিণ করবে। এটি বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠাবে। মঙ্গলে নভোযান পাঠানোর ক্ষেত্রে চতুর্থ দেশ হিসেবে সাফল্য পেল ভারত। এত দিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এ কৃতিত্বের দাবিদার ছিল। ভারত তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টায় মহাকাশ কর্মসূচিতে শত শত কোটি ডলার খরচ করেছে।

রাজনীতিতে ফিরছেন সারকোজি!

নিকোলা সারকোজি
ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির (৫৯) দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে চলমান একটি তদন্ত কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এ অবস্থায় একরকম অবসরে যাওয়া সারকোজির আবার রাজনীতিতে পুরোদমে ফেরার পথ সুগম হলো বলে মনে করা হচ্ছে। খবর বিবিসির। আদালত সূত্রের বরাত দিয়ে গতকাল বুধবার ফরাসি গণমাধ্যম জানায়, তদন্তকাজ স্থগিত হওয়ায় এখন প্যারিসের আপিল আদালত দুর্নীতির অভিযোগে সারকোজির বিরুদ্ধে চলা মামলা খারিজের জন্য তাঁর আবেদন বিবেচনা করে দেখবেন। তবে আরও কিছু ঘটনায় সারকোজির বিরুদ্ধে বিচারিক তদন্তকাজ চলছে। গত সপ্তাহে সাবেক এ প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, তিনি বিরোধী ইউএমপি দলের নেতৃত্ব চান।
তাঁর এ বক্তব্যকে ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথে প্রথম পদক্ষেপ বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হচ্ছে। সাবেক এই রক্ষণশীল প্রেসিডেন্টের মনোবাসনা নিয়ে কয়েক মাস ধরে চলা জল্পনাকল্পনারও অবসান ঘটেছে এতে। ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবার জয়ী হতে ব্যর্থ হওয়ার পর রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন সারকোজি। আগামী নভেম্বরে ইউএমপি দলের নেতৃত্ব নির্ধারণ প্রশ্নে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। যে দুর্নীতির মামলাটি স্থগিত করা হয়েছে, সেটি সারকোজির বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্বে থাকা বিচারপতিদের প্রভাবিত করার চেষ্টাসংক্রান্ত।

কৃষ্ণসাগরে আরও ৮০ যুদ্ধজাহাজ

রাশিয়া ২০২০ সালের মধ্যে তার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরে ৮০টি নতুন যুদ্ধজাহাজ যুক্ত করবে। আর ২০১৬ সালের মধ্যে নভোরসিয়াস্ক শহরের কাছে গড়বে দ্বিতীয় নৌঘাঁটি। কৃষ্ণসাগরে ন্যাটো বাহিনীর নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠার কথিত পরিকল্পনার জবাবেই এ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। খবর রয়টার্সের। রাশিয়ার কৃষ্ণসাগর নৌবহরের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল আলেক্সান্ডার ভিতকো গত মঙ্গলবার নতুন পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এ নৌবহরের প্রধান ঘাঁটি ক্রিমিয়া উপদ্বীপে অবস্থিত। প্রতিবেশী ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়া গত মার্চ মাসে নিজেদের অংশ করে নেয় রাশিয়া।
পূর্ব ইউরোপে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর ক্রমবর্ধমান তৎপরতার প্রেক্ষাপটে ক্রিমিয়া অধিকার করে দেশটি। রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রিমিয়া সফরে গেলে কমান্ডার ভিতকো তাঁকে বলেন, ২০২০ সালের আগেই নভোরসিয়াস্কে ৮০টি যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য জাহাজ পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভিতকো আরও বলেন, ন্যাটোর জাহাজগুলো প্রতিনিয়ত কৃষ্ণসাগরে অবস্থান করছে এবং তারা কৃষ্ণসাগরে একটি নৌঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। ন্যাটো কৃষ্ণসাগরে নৌঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বলে রুশ কমান্ডার দাবি করলেও জোটটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো তৎপরতা বা ইঙ্গিত আসেনি। ন্যাটোর একটি সূত্র বলেছে, তারা এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথা জানে না। তবে সূত্রটি জানায়, কৃষ্ণসাগর উপকূলে ন্যাটোর সদস্য বুলগেরিয়ার নৌঘাঁটি জোটের যুদ্ধজাহাজগুলো ব্যবহার করতে পারে।

‘সিটি ওভার নাইটে’ নতুন রূপে নবীন তারকা নায়লা নাঈম

সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত পরিচিত এক নাম নায়লা নাঈম। মিডিয়াতে মডেলিং-এর মধ্য দিয়েই পরিচিতি ঘটে তাঁর। তবে অল্পসময়ে তাঁর অভিনয় দক্ষতাও মুগ্ধ করেছে দর্শক ও নির্মাতাদের। সম্প্রতি তিনি নায়িকা হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন ‘মারুফ টাকা ধরে না’ শিরোনামে একটি চলচ্চিত্রে। এই ছবিতে তিনি চিত্রনায়ক মারুফের বিপরীতে জুটি বেঁধে অভিনয় করবেন। প্রিয়.কম বিনোদনকে আলোচিত এই মডেল-অভিনেত্রী বললেন তাঁর বর্তমান কর্মব্যস্থতা ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবনার কথা। নায়লা নাঈমের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ফারহাত আহমেদ-

মিডিয়ায় আসার পেছনের গল্প?
ছোটবেলা থেকেই আমার মিডিয়াতে কাজ করার ইচ্ছে ছিল। একসময়ের বিখ্যাত মডেলদের দেখে এই ইচ্ছেটা আরো প্রবল হয়। ডেণ্টাল কলেজে পড়ার সময় মনে হল পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু করার সুযোগ আছে, তখন থেকেই মনে হল মডেলিং করার কথা। যেখানে আমি আমার মেধা ও সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে ভালো কিছু করতে পারবো।
প্রথম দিকে মডেলিং করাটা শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আস্তে আস্তে যখন সাফল্য আসতে শুরু করলো, আমার কাজের প্রশংসা পেতে থাকলাম। নতুন নতুন সৃজনশীল, গঠনমূলক ও ভালো কাজের প্রস্তাব আসতে শুরু করলো, তখন থেকে আমি মডেলিং এ আরো প্রাধান্য দিয়ে পেশা হিসাবে কাজ করা শুরু করলাম। আমার ক্যামেরায় তোলা কিছু ছবি নতুন মডেলদের নিয়ে কাজ করে এরকম একটি মডেলিং এজেন্সির কাছে জমা দিই যারা নতুনদেরকে মডেলদেরকে গ্রুমিং করে। সেখানে নতুনদের মধ্যে আমি বেশ ভালো কাজ করতে থাকি। পরবতীতে ভিট, ইউ-গট-দ্য লুক প্রতিযোগীতায় আমি শীর্ষ দশের মধ্যে থাকি। এরপর আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ভালো কাজের মাধ্যমে মডেলিং-এ আমি আমার স্থান করে নিই। এরপর থেকে নাটকে ও সিনেমায় কাজ করার প্রস্তাব পাচ্ছি।
‘রান আউট’ সিনেমাতে আইটেম গান ?
রান আউট মুভির আইটেম গানটি আমার জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। আমার ও রানআউট টিমের অক্লান্ত পরিশ্রমে ও চেষ্টায় ৫২ ঘন্টা শুটিং এ আইটেম গানটির চিত্রায়ন করা হয়। আমি কোরিওগ্রাফার আসাদ, সহকারী কোরিওগ্রাফার রূপমনি এবং আমার সাথের ১০ জন পারফর্ম করা ছেলে মেয়ের কথা কখনোই ভুলবো না। তাদের আন্তরিকতা ও সহযোগীতা ছাড়া সফলভাবে গানটির শ্যুটিং করা কখনোই সম্ভব ছিল না। পরিচালক, প্রযোজক এবং অন্য সবার সহযোগীতায় আমরা আমাদের সেরা পারফরমেন্স দেয়ার চেষ্টা করেছি। আশা করি, সিনেমা হলে গিয়ে গানটি দেখে আপনাদের সবার ভালো লাগবে।
‘ভোট ফর ঠোঁট’ বাহারি পোশাকে নায়লা নাঈম- কেমন সাড়া পেয়েছেন?
‘ভোট ফর ঠোঁট’ এ পারফর্মিং মডেল হিসাবে দেখতে পাচ্ছেন আমাকে। গানটির প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক পোশাক নির্বাচন করা হয়। প্রেক্ষাগৃহ ভিজ্যুয়াল ফ্যাক্টরি প্রোডাকশনের থ্রিলিং এই মিউজিক ভিডিওতে সম্পূর্ণ ভিন্ন উপস্থাপনায় ও ভিন্ন আঙ্গিকে থ্রিলিং এই মিউজিক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে আমাকে এবং প্রীতম ভাইকে। আমি ইতিমধ্যে প্রচুর ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি সবার কাছে থেকে। গানটি এবং মিউজিক ভিডিওতে আমাদের উপস্থিতি দর্শকদের সবার কাছে ভালো লেগেছে বলে ভালো লাগছে।
দেশীয় সিনেমার ভবিষ্যৎ কেমন ? উন্নয়নের জন্য কি প্রয়োজন বলে মনে করেন?
আমাদের দেশীয় সিনেমার ভবিষ্যৎ বেশ ভালো। অনেক নতুন নতুন প্রতিভাময় অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক ও প্রযোজকরা আসছেন সিনেমায় কাজ করতে। পাশাপাশি ঢালিউডে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে, নতুন ধরনের আধুনিক গল্প নিয়ে অনেক নতুন নতুন কাজ হচ্ছে। মানুষ আবার সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন। তবে, আমি মনে করি আমাদের দেশে সিনেমা হলে সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং উন্নতমানের অত্যধুনিক সুবিধাসম্পন্ন সিনেমা হলের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এসব পদক্ষেপ গ্রহন করা হলে, আমরা আরো বেশি দর্শক আশা করতে পারি এবং আরো ব্যবসাসফল ছবি আশা করতে পারি ।
ঢালিউড সিনেমার আইটেম গান কি বলিউডের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে? এর জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?
আইটেম গান আমাদের চলচিত্রে নতুন সংযোজন। আইটেম গানের উপর নির্ভর করে বলিউডের অনেক সিনেমা ব্যবসা সফল হয়ে থাকে। আমাদের দেশের প্রযোজক এবং পরিচালকদের এই ব্যাপারটা বুঝতে হবে। আইটেম গানের জন্য যথোপযুক্ত বাজেট বরাদ্দ করতে হবে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। সেক্ষেত্রে, দেশীয় সিনেমার আইটেম গান বলিউডের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারার সম্ভাবনা আছে বলে আমি মনে করি।
বর্তমান কর্ম ব্যস্ততা? সামনে দর্শকরা আপনার নতুন কী কী কাজ দেখতে পাবে?
‘মারুফ টাকা ধরে না’ সিনেমায় আমাকে দেখতে পাবেন। সম্প্রতি সিনেমাটিতে চুক্তি বদ্ধ হয়েছি। এতে চিত্রনায়ক মারুফের বিপরীতে আমাকে দেখা যাবে। এছাড়া ‘Black Zang Bigg Spade’ খ্যাত সোহান এবং আসিফের সাথে ‘City Over Night’ একটা মিউজিক ভিডিওতে নতুন রূপে ভিন্ন উপস্থানপনায় দেখা যাবে আমাকে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?
আমি সিনেমাতে ভালো কাজের মাধ্যমে নিজের একটি স্থান করে নিতে চাই। এছাড়া অদূর ভবিষ্যতে নিজেকে একজন সফল ডেন্টিস্ট হিসাবে দেখতে চাই।