Showing posts with label বাংলাদেশ-ভারত. Show all posts
Showing posts with label বাংলাদেশ-ভারত. Show all posts

Wednesday, June 17, 2026

ভারত জোর করে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে: এইচআরডব্লিউ

এইচআরডব্লিউ মনে করে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করাটা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এ ছাড়া মানুষকে খাদ্য, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসাসেবা ছাড়া ফেলে রাখাটা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।

ভারতের কর্তৃপক্ষ পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত অনেক মুসলিম বাঙালিকে ন্যূনতম আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই জোর করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। তারা মনে করে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করাটা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থাটি এমন উদ্বেগ জানিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বা সীমান্তে আটকে রেখে দিচ্ছে, তাদের মৌলিক মানবাধিকারকে উপেক্ষা করছে। সরকারকে (ভারত) অবৈধভাবে মানুষকে বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে, যথাযথ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে এবং মুসলিমদের প্রতি এই উদ্বেগজনক বৈরিতার অবসান করতে হবে।’

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের চালানো এ ধরনের ২১টি চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। এই ২১ ঘটনায় শিশুসহ ২০০ জনের বেশি মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, মার্চের নির্বাচনে তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় পাওয়ার পর তাঁর সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে আটক করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, তারা ৯ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা বলেছেন, বিএসএফের সদস্যরা রাতে দলে দলে মানুষকে সীমান্তে এনে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিজিবি প্রবেশে বাধা দিলে পরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা সেই মানুষদের আবার ফিরে যেতে দেয়।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পঞ্চগড়ে ৫ জুন শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে ৭৫ ঘণ্টার দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন এইচআরডব্লিউকে বলেন, ওই দলটি বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় ৫০ ফুট জায়গা পর্যন্ত ঢুকে পড়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি বিজিবিকে জানান। পরে বিজিবির সদস্যরা সেখানে পৌঁছালে তাঁরা পিছু হটে নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেন।

আটকে পড়া ব্যক্তিদের অবস্থা বর্ণনা করে প্রত্যক্ষদর্শী রুবেল হোসেন বলেন, প্রথম রাতে ওই মানুষগুলো প্রচণ্ড বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ছিল। দ্বিতীয় দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা কিছু শুকনা খাবার সরবরাহ করে।

রুবেল বলেন, ‘আমি যা দেখেছি, তা ছিল যুদ্ধের মতো এক অচলাবস্থা। সেখানে বিএসএফ ও বিজিবি দুই পক্ষেরই বড় সংখ্যার সদস্য মোতায়েন ছিল।’

রুবেল হোসেন আরও বলেন, সীমান্তে দুই বাহিনীর মধ্যে বারবার স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার চেষ্টা করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিএসএফ দলটিকে আবার ভারতের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

৬ জুন ভোরে বিএসএফের সদস্যরা দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে বাংলাদেশের তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেন। বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দেয়। বিএসএফও তাদের ভারতে ফিরতে দেয়নি। এমন অবস্থায় পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। পরদিন তাদের আবার ভারতে ফিরে যেতে দেওয়া হয়।

বিজিবির বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮ জুন ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রায় ৪৮ ঘণ্টা শূন্যরেখায় (সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডের সরু অংশে) আটকে থাকার পর বিএসএফ ১১ জনকে ভারতের দিকে ফিরিয়ে দেয়। তাঁদের মধ্যে এক গর্ভবতী নারীও ছিলেন।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মার্চে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ঠিক আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন তাড়াহুড়া করে ভোটার তালিকায় নিবীড় সংশোধন (এসআইআর) আনে। এর মাধ্যমে ৯০ লাখের বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এতে অনেকের মধ্যে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০১৯ সালে ভারতের আসাম রাজ্যে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের একটি ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক প্রক্রিয়ার কারণে ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন অবস্থার মধ্যে পড়ে যান। এরপর হাজার হাজার বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে আটককেন্দ্রে রাখা হয় এবং অনেককে অবৈধভাবে বহিষ্কার করা হয়।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি একটি সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই এবং সেখান থেকে সরাসরি সীমান্ত পার করে দিই। সেখানে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে কিছু কথিত অবৈধ বাংলাদেশি নিজেরাই ফিরে যেতে শুরু করেছে।’

পঞ্চগড়ের বাসিন্দা হাসিবুল ইসলাম বলেন, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির একটি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তাদের কাছে ভারতের আধার কার্ড ছিল, তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করেছিল। বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে।

হাসিবুল বলেন, পরিবারটির সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি চারবার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু চলতি বছর তাঁদের কেউ ভোট দিতে পারেননি। কারণ, তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

তিন দিন সীমান্তে আটকে থাকার পর শেষ পর্যন্ত পরিবারটিকে আবার ভারতে ফিরে যেতে দেওয়া হয়।

ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছেন এবং তাঁদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার জন্য সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সে প্রসঙ্গ টেনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিকার অর্থে স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরতে চান, তাহলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী তাঁকে সহায়তা করা যেতে পারে, কিন্তু কাউকে জোর করে দেশে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কার করা উচিত নয়।

সংস্থাটি আরও বলেছে, সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া কয়েকজনের অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের পরিচয়পত্র, অর্থ ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের কর্তৃপক্ষ শত শত কথিত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে বিভিন্ন অস্থায়ী আটককেন্দ্রে আটকে রেখেছে। আটক ব্যক্তিদের বেশির ভাগ মুসলিম হলেও তাঁদের মধ্যে কিছু হিন্দুও আছেন।

এক ভারতীয় অধিকারকর্মী এইচআরডব্লিউকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর আটককেন্দ্রে আনুমানিক ৪০০ ব্যক্তি আটক আছেন। তাঁদের অনেককেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার পর আটক করা হয়েছে।

ওই অধিকারকর্মী মনে করেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াটা এখন গ্রেপ্তার, আটক ও বহিষ্কারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষও বলেছে, আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো কাউকে গ্রহণ করা হবে না। তাদের মতে, কাউকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যথাযথ পরিচয় যাচাই এবং বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ এবং সব ধরনের জাতিগত বৈষম্য বিলোপবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী ভারত সবার অধিকার সুরক্ষিত রাখতে বাধ্য। একই সঙ্গে জাতি, বর্ণ, বংশপরিচয়, জাতীয়তা বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে যেন নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত না করা হয়, তা–ও ভারতকে নিশ্চিত করতে হবে।

সংস্থাটির মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করাটা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এ ছাড়া মানুষকে খাদ্য, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসাসেবা ছাড়া ফেলে রাখাটা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, যাঁদের বহিষ্কারের চেষ্টা করা হচ্ছে, তাঁদের জন্য ভারত সরকারের মৌলিক আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত। এর মধ্যে বহিষ্কারের কারণ সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য জানার সুযোগ, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার এবং বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকতে হবে।

সংস্থাটি আরও বলেছে, শিশুদের বহিষ্কার করা বা সীমান্তে আটকে রাখাটা জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের লঙ্ঘন। এই সনদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো শিশুদের জাতীয়তার সুরক্ষা দিতে বাধ্য। সনদটি অন্যায়ভাবে শিশুদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নিষিদ্ধ করেছে।।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই এবং নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফেরত পাঠানোর জন্য দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় অনেক মানুষ দুই দেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে আটকে পড়ছেন, যা তাঁদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘জাতীয়তা যা-ই হোক না কেন, কোনো মানুষকে দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়।’

এ ধরনের বহিষ্কার অভিযান বন্ধ করার জন্য মীনাক্ষী ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কারণে আর কখনো মানুষের মৌলিক মর্যাদা যেন ক্ষুণ্ন না হয়, তা দুই দেশের সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রতি কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ছয়জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ
সম্প্রতি কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ছয়জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, April 29, 2026

ভারতের মথ ডাল এ দেশে এসে মুগ ডাল হয়ে যাচ্ছে কেন by মাসুদ মিলাদ

বাজারে খুবই অপরিচিত ‘মথ’ ডাল নিয়ে এখন অনেকের কৌতূহল। এই ডালে ক্ষতিকর রং মিশিয়ে মুগ ডাল নামে বিক্রি হচ্ছিল। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বাজার থেকে নমুনা পরীক্ষা করে তার প্রমাণও পেয়েছে। এরপরই ক্রেতাদের সচেতন করতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে সংস্থাটি। সংস্থাটির সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয় প্রতিটি সরকারি ওয়েবসাইটে।

সরকারি সতর্কবার্তার আগে নাম না–জানা এই ডাল কোথায় থেকে আমদানি হয়, কীভাবে বাংলাদেশে এল, কারা আমদানি করে, কেনই–বা মুগ ডাল হিসেবে বিক্রি হয়, তা নিয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানা গেল নানা তথ্য।

শুরুতে জেনে নেওয়া যাক, এই ডাল কোথায় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যানে দেশে এই ডাল উৎপাদনের কোনো তথ্য নেই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, মথ ডাল খরা সহনশীল ডাল–জাতীয় ফসল। এটি ভারতের স্থানীয় ডাল। বিশ্বে মথ ডালের সিংহভাগ উৎপাদন হয় ভারতে।

ভারতের বাইরে দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে মথ ডাল উৎপাদন হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এটি পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। ভারতের মথ ডালের ৯৫ শতাংশের বেশি উৎপাদন হয় রাজস্থানে মরু এলাকায়। রাজস্থান সরকারের কৃষি পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্থানে গত ২০২৩–২৪ মৌসুমে ৪ লাখ ১৯ হাজার টন মথ ডাল উৎপাদিত হয়। রাজস্থানে এই ডাল বেশ জনপ্রিয়। এই ডাল দিয়ে পাঁপড় বানানো হয়।

বাংলাদেশে কখন আমদানি শুরু

বাংলাদেশে মথ ডাল আমদানি হচ্ছে শুধু ভারত থেকেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশে মথ ডাল আমদানি শুরু হয়েছে। এর আগে গত পাঁচ বছরে এনবিআরের তথ্যে মথ ডাল আমদানির কোনো রেকর্ড নেই।

এনবিআরের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজশাহীর বিসমিল্লাহ ফ্লাওয়ার মিল হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে মথ ডালের প্রথম চালান আমদানি করে। প্রথম চালানে ৬২ টন মথ ডাল আমদানি হয়। ২০২৪ সালে সব মিলিয়ে ৮ হাজার ৫১৬ টন মথ ডাল আমদানি হয়। তবে হঠাৎ এ বছর মথ ডালের আমদানি অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। যেমন চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে মথ ডাল আমদানি হয়েছে ২০ হাজার ৬৯১ টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০৮ শতাংশ বেশি।

বিসমিল্লাহ ফ্লাওয়ার মিলের হাত ধরে আমদানি শুরু হওয়া এ পণ্যটি এখন আমদানি করছে ৫৯টি প্রতিষ্ঠান। ভোমরা, হিলি ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে মূলত ভারত থেকে এই ডাল আমদানি হচ্ছে।

মথ ডাল কেন মুগ ডাল হিসেবে বিক্রি

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, মুগ ডাল কিছুটা গোলাকার। আর মথ ডাল কিছুটা লম্বা আকৃতির। এরপরও হলুদ রং মেশানো মথ ডাল ও মুগ ডাল পাশাপাশি রাখা হলে তা শনাক্ত করা কঠিন। ব্যবসায়ীরা জানান, মুগ ডালের চেয়ে মথ ডালের আমদানির মূল্য কম। এ কারণে বেশি দামের জন্য মথ ডালকে মুগ ডাল হিসেবে খুচরায় বিক্রি হয়।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানিতে কেজিপ্রতি দাম পড়েছে ১ ডলার ৯ সেন্ট বা ১৩৩ টাকা। অন্যদিকে মথ ডাল আমদানি হয়েছে কেজিপ্রতি ৮৫ সেন্ট বা ১০৪ টাকায়। অর্থাৎ মুগ ডালের চেয়ে মথ ডাল আমদানিতে কেজিতে ২৯ টাকা কম পড়ছে। খুচরা বাজারে মুগ ডাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। অন্যদিকে মুগ ডাল হিসেবে মথ ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। দামের পার্থক্যের কারণে তাই মথ ডালই বেশি বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে মথ ডালের আমদানিকারক নিউ মাতৃভান্ডারের কর্ণধার বাদল তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের রাজস্থানে উৎপাদন হওয়া এই ডাল দিল্লিতে বড় কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপরই আমদানি হয়। আগের কিছু চালানে রং মেশানো থাকলেও এখন যেসব মথ ডাল আমদানি হচ্ছে, সেগুলোয় কোনো রং নেই। মুগ ডালের চেয়ে দাম কম থাকায় মথ ডালের চাহিদা বেশি বলে জানান তিনি।

মুগ ডাল আমদানি কমছে, বাড়ছে মথ ডাল

পরিসংখ্যান ব্যুরো ও এনবিআরের হিসাবে দেখা যায়, দেশে বছরে গড়ে ৪৫ হাজার টন মুগ ডাল উৎপাদন হয় এবং বছরে গড়ে ৩০ হাজার টন মুগ ডাল আমদানি হয়। তবে মথ ডাল আমদানি শুরুর পর মুগ ডাল আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, বাজারে মুগ ডালের চাহিদা মেটাচ্ছে মূলত মথ ডাল। যেমন ২০২২–২৩ অর্থবছরে ২১ হাজার টন মুগ ডাল আমদানি হয়। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩–২৪–এ মুগ ডাল আমদানি কমতে শুরু করে। ওই বছরে মথ ডাল আমদানি শুরু হয়। তাতে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানি হয় প্রায় ১৮ হাজার টন। আর মথ ডাল আমদানি হয় ৯৯৬ টন।

গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানি আরও কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৯১৩ টনে। এ সময়ে ২১ হাজার ৪১৪ টন মথ ডাল আমদানি হয়। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আমদানির তালিকা থেকে কার্যত উধাও হয়ে গেছে মুগ ডাল। এ সময় পাঁচটি চালানে মুগ ডাল আমদানি হয়েছে ২১৩ টন। অন্যদিকে মথ ডাল আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ৭৯৯ টন।

রং মেশানো ডাল বিক্রি বন্ধে অভিযান

রং মিশিয়ে বাজারে ডাল বিক্রির অভিযোগে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে। গত ২৮ অক্টোবর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, মুগ ডাল নামে বিক্রি হওয়া ৩৩টি নমুনার ১৮টিতে টারটাজিন নামের একধরনের হলুদ রঙের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এরপরই অভিযান শুরু হয়। এখন প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও এ ধরনের অভিযান পরিচালনা হচ্ছে। যেমন গত বুধবার (৫ নভেম্বর) মথ ডালে রং মিশিয়ে মুগ ডাল বলে বিক্রির দায়ে টাঙ্গাইল শহরের ছয়আনী বাজারে দুই ব্যবসায়ীকে লাখ টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ডাল বা যেকোনো শস্যদানায় রং মেশানোর অনুমোদন নেই। টারটাজিন রং ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে আমদানির সময় মুগ ও মথ ডালে রং পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং রং মেশানো ডাল যাতে আমদানি না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

মথ ডাল
মথ ডাল। ছবি প্রথম আলো

Wednesday, February 18, 2026

জামায়াত আমীরের সঙ্গে বিক্রম মিশ্রির সাক্ষাৎ: বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত

বাংলাদেশে নতুন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য হিন্দু। বৈঠকে ডা. শফিকুর রহমানকে শুভেচ্ছা জানান বিক্রম মিশ্রি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত করেন। জবাবে জামায়াতের আমীর বলেন, দুই দেশ ‘গভীর সভ্যতাগত বন্ধনে’ আবদ্ধ এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের আশা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন এক্সে এক পোস্টে জানায়, ‘ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের ফাঁকে বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।’ পোস্টে আরও বলা হয়, ‘পররাষ্ট্র সচিব তার নতুন দায়িত্বের জন্য ডা. রহমানকে শুভেচ্ছা জানান এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের অব্যাহত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। ডা. শফিকুর রহমান দুই দেশের গভীর সভ্যতাগত বন্ধনের কথা উল্লেখ করে শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’
এদিকে, একই দিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে ভারত সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেন ওম বিরলা এবং ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। তিনি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট, ভুটানের প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

ওম বিরলার সফরকে স্বাগত জানান ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ। তিনি এক্সে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণে জনগণকেন্দ্রিক সহযোগিতা এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই দিনে তারেক রহমানকে সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের উষ্ণ আমন্ত্রণ জানান। তার চিঠিতে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমাকেও সফরসঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। চিঠিতে মোদি বাংলাদেশের জনগণের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য শুভকামনা জানান।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত

Wednesday, February 4, 2026

ভারতে বসে বাংলাদেশে রাজনীতিতে ফেরার ছক কষছেন নির্বাসিত আওয়ামী লীগের সদস্যরা

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশে তাঁরা অপরাধী ও পলাতক হিসেবে বিবেচিত। তাঁদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ বা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কলকাতার শপিং মলের জনাকীর্ণ ফুড কোর্টে আরাম করে ব্ল্যাক কফি আর ভারতীয় ফাস্ট ফুড খেতে খেতে আওয়ামী লীগের নির্বাসিত রাজনীতিবিদেরা রাজনীতিতে ফেরার ছক কষছেন।

১৬ মাসের বেশি সময় আগে বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান তাঁকে নাটকীয়ভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের প্রবল স্রোত তাঁর বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসতে থাকায় তিনি ভারতের উদ্দেশে হেলিকপ্টারে উঠে পড়েন। যেসব রাস্তা তিনি পেছনে ফেলে গিয়েছিলেন, সেগুলো ছিল রক্তে রঞ্জিত।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর শেখ হাসিনার সরকারের দমন-পীড়নে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছিলেন। এরপর তাঁর দলের হাজার হাজার সদস্যও পালিয়ে যান। আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা ‘মব ভায়োলেন্স’ এবং শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত অপরাধে সংশ্লিষ্টতার জন্য ফৌজদারি মামলার মুখে পড়েছেন, যার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

আওয়ামী লীগের ছয় শর বেশি নেতা-কর্মী বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের শহর কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে তাঁরা তখন থেকেই আত্মগোপন করে আছেন। তাঁদের দলীয় কর্মকাণ্ড ও সংগঠনকে চালিয়ে নিতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে উঠেছে।

গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার জনমতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে। এরপর দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে হত্যা, দুর্নীতিসহ নানা অপরাধের ঘটনায় দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার শুরু করে। হাসিনার পতনের পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠেয় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও দলটির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের শেষের দিকে হাসিনাকে তাঁর শাসনামলের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপরও নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি দেখা থেকে অনেক দূরে থাকা হাসিনা এই রায়কে ‘মিথ্যা’ বলে নাকচ করেছেন এবং অসংকোচে ভারত থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা করছেন, যার মধ্যে আসন্ন নির্বাচনে বিঘ্ন ঘটাতে হাজার হাজার সমর্থককে সংগঠিত করার বিষয়ও রয়েছে।

ভারতের রাজধানী দিল্লির এক সুরক্ষিত ও গোপন আস্তানা থেকে হাসিনা দিনের বড় একটা সময় বাংলাদেশে থাকা তাঁর কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে দলীয় সভা ও ফোনালাপে ব্যয় করেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালিত হয় ভারত সরকারের সতর্ক নজরদারিতে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল ভারত। তাঁকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধও এড়িয়ে গেছে দেশটি।

দলীয় কৌশল নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার জন্য গত এক বছরে সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্যসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়মিত কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি সাদ্দাম হোসেন তাঁদের একজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আমাদের লোকজনের সঙ্গে—আমাদের কর্মী-সমর্থক, দলের নেতা, তৃণমূল পর্যায়ের নেতা এবং অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। ভবিষ্যতের সংগ্রামের জন্য তিনি দলকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছেন।’

ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করছেন। সাদ্দাম বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) কখনো কখনো দিনে ১৫ বা ১৬ ঘণ্টা ফোন কল ও বৈঠকে ব্যস্ত থাকেন। আমাদের নেত্রী খুবই আশাবাদী, তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। আমরা বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনা বীরের বেশে ফিরবেন।’

শেখ হাসিনার অধীনে গত দুটি নির্বাচন ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

তবে আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়ায় গণতান্ত্রিক বৈধতার সব দাবি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। শেখ হাসিনার বিরাগ ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন অধ্যাপক ইউনূস। তাঁকে একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ অধ্যাপক ইউনূসকে তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থে লিপ্ত একজন ‘খল চরিত্র’ বলে অভিযোগ করছে। তবে অধ্যাপক ইউনূস এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

শেখ হাসিনার সাবেক মন্ত্রীদের একজন জাহাঙ্গীর কবির নানক। তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। নানক বলেন, ‘আমরা আমাদের কর্মীদের সব ধরনের নির্বাচনকেন্দ্রিক সংশ্লিষ্টতা থেকে দূরে থাকতে, প্রচার ও ভোট বর্জন করতে এবং মোটের ওপর এই প্রহসনের প্রক্রিয়ার অংশ না হতে বলছি।’

বাংলাদেশে যাঁরা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ১৫ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক ও দুর্নীতিপরায়ণ শাসনের অভিযোগ করেছিলেন, তাঁদের কাছে হঠাৎ করে দলটির গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি প্রবল সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, হাসিনার সরকার নিয়মিতভাবে তাদের সমালোচক ও বিরোধীদের দমন করেছে। হাজার হাজার মানুষকে গুম, নির্যাতন এবং গোপন কারাগারে হত্যা করা হয়েছে। অনেকেই কেবল হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রকাশ্যে এসেছেন। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে এবং নির্বাচনগুলোকে সাজানো প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল।

তবে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে একটি নতুন গণতান্ত্রিক পথে পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের বিরুদ্ধেও নির্যাতন-নিপীড়নের পথ বেছে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি। শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া ট্রাইব্যুনালও আন্তর্জাতিক মান বজায় না রাখার কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে।

মব ভায়োলেন্স (উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ সহিংসতা) দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে শেখ হাসিনার শাসনামলের কর্মকাণ্ডের প্রতিশোধ ও বদলার কথা বলে ন্যায্যতা দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাদের শত শত কর্মীর ওপর হামলা করেছে, হত্যা করেছে বা জামিন ছাড়াই তাঁদের কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক কর্মী-সমর্থক এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন। সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘কারাগারে যেতে হবে, সেই ভয়ে কলকাতায় থাকছি তা নয়। আমরা এখানে আছি কারণ দেশে ফিরলে আমাদের হত্যা করা হবে।’

ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন

কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় উপস্থিতি ভারতের জন্য ক্রমবর্ধমান অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভারতের ভূমি থেকে একটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে দেওয়া এবং বাংলাদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ রাজনৈতিক পলাতকদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। কলকাতায় অবস্থান করা আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, ভারত থেকে তাঁদের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে—এ নিয়ে তাঁদের কোনো ভয় নেই।

সম্প্রতি এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন তীব্র মাত্রা নেয়, যখন শেখ হাসিনা দিল্লিতে এক জনাকীর্ণ সভায় প্রথম জনসমক্ষে ভাষণ দেন। তাঁর গোপন বাসস্থান থেকে ধারণ করা একটি অডিও বার্তায় তিনি আসন্ন নির্বাচনের নিন্দা জানান। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেন।

এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে, ‘ভারতের রাজধানীতে এ ধরনের আয়োজনের অনুমতি দেওয়া এবং গণহত্যাকারী হাসিনাকে প্রকাশ্যে বিদ্বেষমূলক ভাষণের সুযোগ করে দেওয়া...এটি বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি একটি সুস্পষ্ট অবমাননা।’ ভারত সরকার এর কোনো জবাব দেয়নি।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে কলকাতায় আরামদায়ক বাসভবনে থাকা দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রায় কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ দেখা যায়নি। অধিকাংশ নেতাই তাঁদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা আন্দোলনকে একটি জনগণের বিদ্রোহ হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন; বরং তাঁরা একে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করছেন।

কলকাতার উপকণ্ঠে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় একটি বিলাসবহুল ভবনে থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘ওটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ছিল না, এটা ছিল আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার জন্য সন্ত্রাসীদের ক্ষমতা দখল।’ তিনি যে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন, সে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে হেসে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘মিথ্যা, মিথ্যা, মিথ্যা।’

এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নির্বাসিত এসব নেতার প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের ব্যর্থতার ওপর। তাঁদের দাবি, এই নির্বাচন দেশে কোনো স্থিতিশীলতা বা শান্তি বয়ে আনবে না এবং শেষ পর্যন্ত মানুষ আবার আওয়ামী লীগের দিকেই ফিরবে।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কলকাতায় বসবাস করছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয়। দলটির যাঁরা অতীতের ‘ভুল’ স্বীকার করছেন, হাতে গোনা সেই ব্যক্তিদের একজন তিনি। জয় বলেন, ‘আমি স্বীকার করছি যে আমরা সাধু ছিলাম না। আমরা কর্তৃত্ববাদী ছিলাম। আমরা পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ছিলাম না। আমি একমত যে ২০১৮ সালের নির্বাচন পুরোপুরি ঠিকমতো হয়নি। আমরা আশা করেছিলাম, সেটি আরও সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হতে পারত। এটা দুর্ভাগ্যজনক।’

দুর্নীতি ও লুটপাটের বিষয়ে জয়ের স্বীকারোক্তি, ‘অবশ্যই অনিয়ম ছিল। এমন কিছু আর্থিক লেনদেন হয়েছে, যেগুলো হওয়া উচিত ছিল না এবং এর দায় আমাদের নিতে হবে।’ তবে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আনুমানিক ২০০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

কলকাতায় অবস্থানরত অন্যদের মতো জয়ও জোর দিয়ে বলেন, ভারতে তাঁর এই নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। যদিও তিনি মেনে নিয়েছেন—শেষমেশ দেশে ফিরলে তাঁর জন্য হয়তো কারাগারই অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের জন্য সবকিছু খুব খারাপ। কিন্তু মনে করি না যে বেশি দিন এমন থাকবে।’

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট

Monday, January 26, 2026

গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন করে ভারত, এটি অব্যাহত থাকবে

প্রজাতন্ত্র দিবস সেলিব্রেশনে হাইকমিশনারঃ ঢাকায় ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেছেন- একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপ্রিয়, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন করে ভারত। যুগযুগান্তরে এ সমর্থন অব্যাহত থাকবে। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ওই সেলিব্রেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্ধ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা (সাবেক ও বর্তমান), শিক্ষক, গবেষক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ  প্রতিনিধিরা আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ওই মিলনমেলায় উপস্থিত ছিলেন। বর্ণাঢ্য তবে গাম্ভীর্যপূর্ণ ওই অনুষ্ঠানে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম চলাকালে যৌথ ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাসসহ আমরা একটি বিশেষ সম্পর্ক ভাগাভাগি করেছি। বছরের পর বছর ধরে, সংযুক্তি ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার দ্রুত রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে আমাদের পারস্পরিক আদান-প্রদান এবং যৌথ নির্ভরশীলতা আরও সুদৃঢ় হয়েছে। যা আমাদের সমাজ, জনগণ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, ভারতীয় শোধনাগার থেকে বাংলাদেশে ডিজেল পরিবহনের জন্য আন্তসীমান্ত পাইপলাইন, ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন—এসবই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রমাণ। জ্বালানি সংযুক্তির ভিত্তি, যা প্রকৃত অর্থে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

সরবরাহব্যবস্থা বাংলাদেশের সমৃদ্ধ পোশাকশিল্প ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতকে শক্তিশালী করছে, যাকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরশীলতার আরেকটি প্রমাণ উল্লেখ করে ভারতীয় দূত বলেন, দুই দেশের অংশীদারত্ব কীভাবে উভয়ের জনগণ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুবিধা বয়ে এনেছে তার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এই সাফল্যগুলো আরও দূরদর্শী ও ভবিষ্যতের সহযোগিতার উপায় অনুসন্ধানের প্রেরণা। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব পুনর্ব্যক্ত করছি। সেই সঙ্গে এ দেশের জনগণের ভবিষ্যৎ যাত্রায় শান্তি, সমৃদ্ধি ও সফলতা কামনা করছি।

mzamin

হাসিনা যা বলেননি

কদিন ধরেই জল্পনা ছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনসম্মুখে হাজির হবেন। বিশেষ করে সাংবাদিকদের সামনে। ২৩ সেপ্টেম্বর সেটা হলো। কিন্তু ভিন্ন মাধ্যমে। সরাসরি নয়, এক অডিওবার্তা নিয়ে। দিল্লির ফরেন করেসপনডেন্ট ক্লাবে তার অডিওবার্তাটি নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিপুলসংখ্যক সাংবাদিকের উপস্থিতিতে শেখ হাসিনা তার সরকারের কোনো ভুল, কোনো ভ্রান্তির প্রসঙ্গ টেনে আনেননি। ক্ষমা নয়, দুঃখও প্রকাশ করেননি। তবে নতুন কিছু প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। যা রাজনীতিতে আলোচনার খোরাক হতে পারে। তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন। দেশটি ধংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে এমন অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগের নিশানা হচ্ছেন প্রফেসর ইউনূস । হাসিনা পাঁচ দফা দাবি পেশ করেছেন এই অডিও বার্তায়।

এক, বাংলাদেশের সামনে অন্ধকার সময়। গণতন্ত্র ধংস হয়ে গেছে। অবিলম্বে গণতন্ত্র পুণরুদ্ধার করতে হবে। আর এজন্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তবে তার ভাষায়- ইউনূস সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হতে পারে না।

দুই, সহিংসতা ও নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে রক্তপাত। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করতে হবে।

তিনি, সংখ্যালঘুসহ নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

চার, সাংবাদিকসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

পাঁচ, জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে ’২৪-এর ঘটনাবলীর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। কীভাবে এই ঘটনা ঘটলো তা জনগণকে জানাতে হবে।

অডিওবার্তায় শেখ হাসিনা আরো বলেন, বাংলাদেশ ইতিহাসের এক দুঃসময় পার করছে।  পরিণত হয়েছে এক বিশাল কারাগারে। এছাড়া তিনি দেশি-বিদেশি চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করারও আহ্বান জানান।  

উল্লেখ্য যে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরইমধ্যে একটি মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।  

mzamin

Sunday, January 25, 2026

তিস্তা প্রকল্পে সমঝোতার ইঙ্গিত সমীক্ষা চালাচ্ছে চীন by মিজানুর রহমান

তিস্তা নদীর পানির হিস্যা পেতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে গেছে হাসিনা আমলেই। তবে ওই নদীকে বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে সরকারের তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগে আগে থেকেই আগ্রহী ছিল চীন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বেইজিং এতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। কিন্তু তখন প্রস্তাবটি বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। কারণ দিল্লি ছিল সক্রিয়। তারা তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগের কৌশলী প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিল। যা অগ্রাহ্য করার মতো অবস্থানে ছিলেন না শেখ হাসিনা। কিন্তু ৫ই আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর প্রেক্ষাপট পাল্টে গেছে। হাসিনা সরকারের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে দিল্লির প্রভাবও কমেছে। তিস্তায় বহুমাত্রিক প্রকল্প গ্রহণে একতরফাভাবেই চীনের দিকে অগ্রসর হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় উৎসাহী হয়েছে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে কাজ করছে। যদিও এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন অন্ধকারে।

দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বেইজিংয়ের সঙ্গে। আলোচনার ফোকাল পয়েন্টে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালে একাধিকবার এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে মন্ত্রণালয় এবং চীনা দূতাবাসের মধ্যে। প্রকল্পটির কারিগরি দিক খতিয়ে দেখেছেন চীনা বিশেষজ্ঞরা। এ নিয়ে চুক্তি বা সমেঝাতার জন্য একের পর এক সম্ভাব্য তারিখও হয়েছে। যদিও তা আর চূড়ান্ত হয়নি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চীনের তরফে প্রকল্পটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এই সমীক্ষা শেষ হলে চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হবে। আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই চুক্তির সম্ভাবনা নেই। তবে সমীক্ষা শেষ হলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো অবস্থায় রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এ বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মানবজমিনকে বলেন, তিস্তা চুক্তি ১২ই ফেব্রুয়ারির আগে হবে না, তবে হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা আমাদের কাগজপত্র সব জমা দিয়েছি। এখন তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এটা একটা জটিল প্রকল্প। আমরা দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এটা হচ্ছে না কারণ তাদের সমীক্ষা শেষ করার পর যদি সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে তারপরও এক মাস লাগবে। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মতি, দুই দেশ থেকে কারা যাবে, কোথায় সাইন হবে এমন নানা বিষয় আছে। এখনো যেহেতু সমীক্ষার ওপরে ওরা কনক্লুসিভ হয় নাই। ব্যাংকের রিভিউ, টেকনিক্যাল সাইডের রিভিউও চলছে। চায়না ফুললি কমিটেড। আবার প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে মনে হয় বিষয়টি আছে। তারাও আশাবাদী যে চুক্তিটা হয়ে যাবে। তারা কমিটেড আর আমরা আমাদের কাজ করে দিয়েছি।

ওদিকে গত ১৯শে জানুয়ারি তিস্তা নদী এলাকা পরিদর্শন করেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গাজীর ঘাট এলাকা পরিদর্শনকালে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত তার সঙ্গে ছিলেন। তিস্তা নদী পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন উপদেষ্টা। বলেন, আমরা আজ এখানে এসেছি মূলত কাজের অগ্রগতি দেখতে ও আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে। রাষ্ট্রদূত মহোদয় নিজেই এসেছেন, যা প্রমাণ করে চীন এই প্রকল্প নিয়ে কতোটা আন্তরিক। তারা প্রকল্প যাচাই-বাছাই করছে। আমরা কোনো তড়িঘড়ি করে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। বরং একটি টেকসই সমাধান খুঁজছি। আশা করি, শিগগিরই আমরা চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবো। পানি সম্পদ উপদেষ্টা বলেন, প্রকল্পটা করার ব্যাপারে চীন ও বাংলাদেশ সরকার উভয়ই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রকল্পটা অনেক বেশি জটিল হওয়ায় তিনটা জিনিস আমাদের দেখতে হচ্ছে- বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ ও একইসঙ্গে সেচ। ফলে এগুলো সঠিকভাবে যাচাই করার জন্য চীন একটু সময় নিচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে হতাশা না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমি আবারো আপনাদের বলছি, হতাশা ছড়িয়েন না। হতাশা ছড়িয়ে লাভ নেই তো কোনো। বরং আশার কথা, একজন রাষ্ট্রদূত এসেছেন, আমি এসেছি। নিশ্চয়ই এখানে আশার বড় বেশি জায়গা আছে বলেই আমরা এসেছি। আমরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই নদী খনন ও পাড় বাঁধার কাজটা করতে চাই, যাতে আপনাদের আর ঘরবাড়ি হারাতে না হয়। পরিদর্শনকালে বন, পরিবেশ ও পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথমে তিস্তা সড়ক সেতুতে যান।

সেখানে তাকে প্রকল্পের নকশা দেখান প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরে তিনি, চীনের রাষ্ট্রদূতসহ তিস্তা রেলসেতুর কাছে নৌকায় ঘোরেন। পরে কাউনিয়ার বালাপাড়া ইউনিয়নে গাজীর ঘাটে নদীভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। উল্লেখ্য, প্রতিনিধিদলের প্রাক্কলন মতে, ১০ বছর মেয়াদে ওই প্রকল্পে ব্যয় হবে ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ৫ বছরে সেচ, ভাঙন রোধ, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ গুরুত্ব পাবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার একটি খসড়া চীন সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। রিভারাইন পিপলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর তিস্তার ভাঙন ও প্লাবণে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন উত্তরের ৫ জেলার বাসিন্দা। এ ছাড়াও বাস্তুভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরুর আশা করেছিল চীনের ডিরেক্টর অব দ্য পলিটিক্যাল সেকশন জং জিং। তার নেতৃত্বে চীনা প্রতিনিধিদল বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনসহ নদীপাড়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১৪ সাল থেকে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি আরও কমে যায়, ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আর বর্ষাকালে তিস্তায় প্রবাহিত হয় তিন থেকে চার লাখ ঘনফুট পানি। সব কপাট খুলে দেয়া হয়। দ্রুত বেগে নেমে আসা তিস্তার পানিতে উত্তরের পাঁচ জেলা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। ভাঙনের পাশাপাশি ব্যাপক ফসলি জমি ক্ষতির মুখে পড়ে। তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানির মতে, ১০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে অববাহিকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছি।

বিগত আওয়ামী সরকার তিস্তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছিল, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তাতে তিস্তাপাড়ের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে। তবে তিস্তা নদীকে ঘিরে চীনের প্রস্তাবিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের আগে এ অঞ্চলের নদী ও প্রকৃতিকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন পরিবেশ ও নদী রক্ষা আন্দোলনের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, চড়া সুদের বিদেশি ঋণে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে নদী শাসনের যে কারিগরি নকশা করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে নদী আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বাপা’র সহ-সভাপতি ও জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণা বিভাগের সাবেক প্রধান নজরুল ইসলামের মতে, তিস্তা উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী এবং সারা দেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী। এই নদী আজ সংকটাপন্ন। এই সংকটের মূল কারণ দু’টি। একটি হচ্ছে ভারত এই নদীর পানি সরিয়ে নিচ্ছে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে বাংলাদেশে আর তেমন পানি আসে না। বিগত সরকার তিস্তা নিয়ে বহু আশা দেখিয়েছে উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম বলেন, ভারতের সঙ্গে এই বুঝি একটা চুক্তি হলো। চুক্তি হলেই এই সমস্যার সমাধান হবে। ওটা ছিল একটা মরীচিকা।

কারণ আমরা জানি ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নিয়ে চুক্তি হয়েছে ১৯৯৬ সালে। কিন্তু তাতে এই শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের গঙ্গা অথবা পদ্মায় সামান্যতম পানি বৃদ্ধিও ঘটেনি। চীনের প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, সেখানে বহু প্রশ্ন অমীমাংসিত। এই প্রকল্পে বলা হচ্ছে যে তিস্তা নদীকে প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংকুচিত করবে। এই রকম মারাত্মকভাবে সংকুচিত করলে শীতকালের প্রবাহ না হয় ধরা যাবে। কিন্তু বর্ষাকালে যে বিশাল প্রবাহ আসে অথবা হরকা বন্যা বা যে প্রবাহ আসে, সেটা কীভাবে এই নদী ধারণ করবে? তার উত্তর কি?’ যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামানের মতে নদীভাঙনের সমাধান হচ্ছে, ভাঙনের কারণ কী, এটা আমাদের বুঝতে হবে। কারণ হচ্ছে বর্ষাকালে অধিক পানি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভারত আমাদের দিকে ঠেলে দেয়। জাতিসংঘ নদী প্রবাহ আইনে বাংলাদেশকে সই করতে হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের (বেন) এই বৈশ্বিক সমন্বয়ক বলেন, এ আইনে সই করে নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। দরকার হলে আমাদের যে উন্নয়ন সহযোগী, অর্থাৎ যারা ভারতেও কাজ করে বাংলাদেশেও কাজ করে যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ হতে পারে। এ রকম সংগঠনের সহযোগিতায় ও মধ্যস্থতায় আমাদের এই পানির সমস্যার সমাধানটা করতে হবে।

mzamin

Friday, January 16, 2026

ক্রিকেট নিয়ে ‘নাটক’ ভারতের নৈতিক কর্তৃত্বকেই দুর্বল করে

দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়ঃ যে দেশ ক্রিকেটকে শুধু খেলা নয়, বরং কূটনৈতিক ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবেও দেখে- সেই ভারতই আশ্চর্যজনকভাবে খেলাধুলা ও রাজনীতির সীমারেখা আলাদা রাখতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। কলকাতা নাইট রাইডার্সের আইপিএল দলে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে না নেয়া নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কটি স্বাভাবিকভাবে একটি সাধারণ ক্রীড়া সিদ্ধান্ত হিসেবেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে দেশপ্রেম, পরিচয় ও জাতীয় আনুগত্য নিয়ে উচ্চকণ্ঠ গণভোটে।

এই বিচ্যুতি যতটা সামান্য মনে হয়, আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত জরুরি পার্থক্য। জাতীয় দল একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। ফ্র্যাঞ্চাইজি দল প্রতিনিধিত্ব করে একটি শহর, একটি ব্র্যান্ড এবং একটি ব্যবসায়িক মডেলকে।

যখন কোনো দেশ যুদ্ধ, সন্ত্রাস বা কূটনৈতিক ভাঙনের পর অন্য দেশের জাতীয় দলের বিপক্ষে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা রাষ্ট্রীয় আচরণ সম্পর্কে একটি প্রতীকী বার্তা দেয়। কিন্তু যখন একটি বেসরকারি মালিকানাধীন ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজনৈতিক চাপের মুখে কোনো বিদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দেয়, তখন বিষয়টি অনেক বেশি অস্পষ্ট ও সমস্যার হয়ে ওঠে। এতে একজন ব্যক্তিগত পেশাদার খেলোয়াড়কে গোটা একটি দেশের রাজনীতির প্রতীক বানিয়ে ফেলা হয়।

এটি বাংলাদেশের বিষয়ে বাস্তব উদ্বেগ অস্বীকার করার বিষয় নয়। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, বৈরী রাজনৈতিক ভাষ্য, এবং ঢাকার সাম্প্রতিক কৌশলগত সংকেত নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বাস্তব ও যুক্তিসংগত। এসব গুরুতর বিষয় দৃঢ় কূটনৈতিক আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু যাদের হাতে কোনো নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা নেই, যারা কোনো উসকানি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ নন- এমন ক্রীড়াবিদদের নিশানা করে সেই উদ্বেগের সমাধান হয় না। বরং উল্টো, এতে ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়; দেশটিকে নীতিনিষ্ঠ নয়, বরং আবেগতাড়িত ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াশীল বলে মনে হয়।

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট শুরু থেকেই সহাবস্থানের এক পরীক্ষাগার। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের খেলোয়াড়রা একই ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করে ব্যবহার করেন, একে অপরের সাফল্য উদযাপন করেন এবং এমন দর্শকদের সামনে খেলেন যারা জাতীয়তার চেয়ে দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। এতে কখনোই ভারতের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়নি; বরং এটি ভারতকে একটি আত্মবিশ্বাসী, উন্মুক্ত ক্রীড়াসংস্কৃতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাজনৈতিক প্রদর্শনীর জন্য সেই পরিসরকে দুর্বল করা কৌশলগত আত্মঘাতের শামিল। এই ফ্র্যাঞ্চাইজি সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রতিক্রিয়া আরেকটি অস্বস্তিকর প্রবণতাও উন্মোচন করেছে- পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির জন্য খেলাধুলাকে কত সহজে অস্ত্র বানানো হচ্ছে। যখন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, আর খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন করা হয় পারফরম্যান্স নয়, পাসপোর্ট দেখে- তখন নাগরিক গর্ব ও সাংস্কৃতিক অনিরাপত্তার মাঝের সীমারেখা ঝাঁপসা হয়ে যায়।

এটি জাতীয় শক্তির লক্ষণ নয়। এটি স্নায়ুবিক দুর্বলতার লক্ষণ।
একইভাবে, বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াও- সম্প্রচার সীমিত করা বা টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনার হুমকি, সংযম নয়, বরং উত্তেজনা বাড়ানোর রাজনীতিকেই প্রতিফলিত করে। প্রতিবেশীরা প্রতীকী প্রতিশোধে লাভবান হয় না। তারা লাভবান হয় সংযম, যোগাযোগ এবং এই বোধ থেকে যে, প্রতিটি উসকানি জোরালো হওয়ার যোগ্য নয়।
এর একটি গভীরতর ক্ষতিও আছে। যখন প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা ক্রিকেট মাঠে গড়ায়, তখন খেলাধুলা তার অনন্য ভূমিকা, একটি নিরপেক্ষ মিলনস্থল হারাতে থাকে। তখন ক্রিকেটও হয়ে ওঠে অভিযোগের আরেকটি মঞ্চ, রাজনৈতিক পয়েন্ট স্কোরিংয়ের আরেকটি ক্ষেত্র। এই ক্ষতি আমরা বহন করতে পারি না।
ভারতের প্রকৃত শক্তি বরাবরই ছিল তার বৈপরীত্য ধারণ করার ক্ষমতা কঠোর কিন্তু ভঙ্গুর নয়, আত্মবিশ্বাসী কিন্তু রূঢ় নয়, নীতিনিষ্ঠ কিন্তু দণ্ডনির্ভর নয়। যদি আমরা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সত্যিই সম্মান পেতে চাই, তবে আমাদের প্রমাণ করতে হবে- কখন সীমারেখা টানতে হয়, আর কখন তা না করাই শ্রেয়।
একজন ক্রীড়াবিদকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিতে পরিণত করা রাষ্ট্রনায়কোচিত আচরণ নয়।
এটি নিছক নাটক।
দীর্ঘমেয়াদে, এই নাটক ভারতের নৈতিক কর্তৃত্বকেই দুর্বল করে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/198499_1620745538_1606617524_5fc309b4f2a13_mustafizur-rahman.jpg

Tuesday, January 13, 2026

ভারতবিরোধী ‘রেটরিক’ নয়, চাই জাতীয় সক্ষমতা by মাহা মির্জা

নির্বাচনী জোট আর ভারতবিরোধী রাজনীতির ডামাডোলে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ইস্যু বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়নি। গত ২৭ ডিসেম্বর দেশের সুতা মিলের মালিকেরা জরুরি মিটিং ডেকেছিলেন। তাঁরা সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন দেশের সুতা মিলগুলোকে ভারতীয় আমদানির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।

আমাদের পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশের বেশি সুতা আসে ভারত থেকে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো কাঁচামালের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এর মানে কি এই যে আমাদের সুতা নেই, ভারতের সুতাই ভরসা? মোটেও তা নয়। আমাদের শিল্প অঞ্চলগুলোয় প্রায় ৫০০ সুতা কারখানা আছে। অথচ ভারতীয় সস্তা সুতা আমদানিতে দেশের সুতা কারখানাগুলো ধ্বংসের পথে। গত অর্থবছরে ভারতীয় সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ!

ভারতের সুতা আমাদের দেশীয় কারখানার সুতার চেয়ে সস্তা। কেজিতে ২ দশমিক ৭ ডলার। এদিকে লোকাল সুতা কেজিতে ৩ ডলার। যখন ‘ইনসেনটিভ’ ছিল, দামের পার্থক্য ছিল মাত্র ৫ সেন্ট। এখন পার্থক্য ৩০ সেন্ট। খুব স্বাভাবিকভাবেই গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা খরচ বাঁচাতে ‘ঢাকা’র সুতা বাদ দিয়ে ‘দিল্লি’র সুতাই কিনছেন। বিটিএমএ বলছে, এক বছরে বন্ধ হয়েছে ৫০টির বেশি সুতা কারখানা। চাকরি হারিয়েছেন দেড়-দুই লাখ শ্রমিক। অর্থাৎ ভারতীয় সস্তা সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারছে না দেশের সুতা মিল।

এখন যদি প্রশ্ন করি, দেশীয় সুতার উৎপাদন খরচ বেশি কেন? ভারতের খরচ কম কেন? আমরা অদক্ষ, অপদার্থ, আর ভারত দক্ষ, তাই? তা এই দক্ষতা, এই ‘এফিশিয়েন্সি’ কি আকাশ থেকে পড়ে, নাকি তৈরি করতে হয়? ভারতের আছে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, বিনিয়োগ আর ভর্তুকির ধারাবাহিক ইতিহাস। ভারতের সুতা মিলগুলো ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা পায়, প্রযুক্তি আধুনিকায়নে তহবিল পায়। কিন্তু ভারতীয় সুতার হাত থেকে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বাঁচাতে কী করেছে আমাদের ‘আধিপত্যবাদবিরোধী’ সরকার?

আগে স্থানীয় সুতা উৎপাদনে নগদ প্রণোদনা ছিল ৫ শতাংশ। সেটা কমিয়ে করা হলো ১ দশমিক ৫ শতাংশ। স্বভাবতই উৎপাদন খরচ বাড়ল, দামও বাড়ল। গার্মেন্টসের মালিক বেশি দামের দেশি সুতা কিনবে কেন? গার্মেন্টসওয়ালাদের ‘ভারতীয় দালাল’ বলে গালি দিয়ে আসতে পারেন, কিন্তু গার্মেন্টসের মালিক দিন শেষে ব্যবসায়ী, সস্তা ভারতীয় সুতাটাই সে কিনবে।

‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ তৈরি করার দায়িত্ব পোশাকশিল্পের মালিকের নয়। যে তরুণ শাহবাগে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে, এটা তার কাজও না। এটা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকের কাজ। তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকে সরকারি ‘ইন্টারভেনশনে’। অথচ কী ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক, একদিকে ইন্টেরিম আমলেই ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ২ বিলিয়ন ডলারের সুতা আর অন্যদিকে ১২ হাজার কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ স্থানীয় সুতার স্টক অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে! বিটিএমএ বলছে, সুতা মিলগুলো বাঁচাতে আমদানি করা সুতায় অন্তত ৩০ সেন্ট শুল্ক বসাতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের সাড়াশব্দ নেই।

অর্থাৎ একদিকে আমরা ভারতীয় আধিপত্যবাদ ঠেকাতে চাই, আরেক দিকে হাজার হাজার কোটি টাকার দেশীয় সুতার স্টক ফেলে ভারতীয় সুতা আমদানি করি। এটা কি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা, নাকি নিজেদের কৌশলগত সক্ষমতা তৈরিতে চরম ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতা? শুধু সুতাশিল্প নয়, আরও বহু শিল্পের ক্ষেত্রেই একই অবস্থা।

বিয়ের মৌসুমে ঢাকা না দিল্লি?

দেশে এখন বিয়ের মৌসুম চলছে। প্রতিদিন শত শত বিয়ে হচ্ছে শুধু রাজধানীতেই। খোঁজ নিন, বিয়েবাড়ির লোকেরা কোন দেশের শাড়ি বা লেহেঙ্গা বা কুর্তা পরছে? ঢাকার না দিল্লির? এখানে ঢাকা ঢাকা স্লোগান দিয়ে লাভ নেই। মিরপুর বেনারসিপল্লিতে গিয়ে খোঁজ নিলেই ঢাকাই শাড়ির করুণ অবস্থাটা টের পাওয়া যায়।

বেনারসিপল্লি করাই হয়েছিল দেশীয় তাঁতিদের সুরক্ষা দিতে। অথচ ঢাকার এই পল্লির ৬০ শতাংশ শাড়ি আসে ভারত থেকে। অর্থাৎ ঢাকাই তাঁতিদের প্রাণকেন্দ্রেই ঢাকাই কাতানের বদলে বিক্রি হচ্ছে ভারতীয় কাঞ্জিভরম, ভারতীয় বেনারসি। ধনীরা যেমন কিনছে, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তরাও কিনছে। মূল কারণ ওই একটাই, ভারতীয় শাড়ির উৎপাদন খরচ কম। দামও কম। কিন্তু ভারতীয় সুতা ও শাড়ির উৎপাদন খরচ কি এমনি এমনি কমেছে, নাকি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের ধারাবাহিক পলিসির কারণে কমেছে?

ভারত নিজেদের ‘হ্যান্ডলুম’ ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করেছে, প্রণোদনা দিয়েছে, প্রযুক্তি আধুনিকায়নে সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছে। আর আমরা কী করেছি? ১০ লাখ কারিগরের রুটিরুজির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা অমিত সম্ভাবনাময় শিল্পকে বাজারের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। দেশের মার্কেট ছেয়ে গেছে ভারতীয় শাড়িতে। কয়েক দশকের সুনিপুণ কারুকার্যের দক্ষতা নিয়ে ৭ লাখ তাঁতি কাজ হারিয়েছেন, কেউ হকারি করছেন, কেউ অটোরিকশা কিনেছেন।

আরও পরিহাসের বিষয় হলো অটোরিকশার পার্টসগুলো পর্যন্ত আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে! ইঞ্জিন, বিয়ারিং, শকার, জয়েন্ট—সবই আসছে ভারতীয় ব্র্যান্ড বাজাজ এবং লুম্যাক্স থেকে। স্থানীয় মেকানিকরা কম দামি ভারতীয় যন্ত্রাংশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারে না। এখানেও সেই একই কারণ। ভারতে অটোরিকশাশিল্পের বিকাশই হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রণোদনায় (ডিজেলচালিত যানবাহনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বাহনের প্রসার ঘটাতে)। এদিকে আমরা লাখে লাখে ভারতীয় পার্টস আমদানি করছি ঠিকই, কিন্তু দরিদ্র মানুষ অটোরিকশা কিনে রাস্তায় নামলে বুলডোজার চালাচ্ছি!

দেশের পাটকল বন্ধ, ভারতে পাটশিল্পের বিকাশ

আমাদের কাঁচা পাটের বৃহত্তম বাজার ভারত। ভারত পাটশিল্পের এমন প্রসার ঘটিয়েছে যে নিজেরা উৎপাদক হলেও বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট কিনছে। অথচ এই দেশের পাটচাষিদের কষ্টে ফলানো পাট এই দেশের শিল্পায়নে কাজে লাগার কথা ছিল না? আমরা ভুলিনি, আমাদের একশ্রেণির মিডিয়া, অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী ভর্তুকির ধুয়া তুলে রাষ্ট্রীয় ২৬টি কারখানা বন্ধ করার পক্ষে জনমত তৈরি করেছিলেন। অথচ এখন খুলনা, যশোর ও ডেমরার বৃহত্তম পাটকলগুলো পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দিয়ে কাঁচা পাট বিক্রির জন্য সেই ভারতের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

এদিকে ভারত এ দেশের কাঁচা পাট কিনে নিজেদের পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছে, ‘ভ্যালু এডিশনে’ বিনিয়োগ করেছে, সরকারি করপোরেশনগুলোয় দেশীয় পাটপণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে এবং পাশাপাশি ‘হাই-এন্ড’ পাটপণ্যের বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। বলা বাহুল্য, এগুলো বিচ্ছিন্ন পলিসি নয়; বরং জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করা নেহরুর আমল থেকেই প্রতিটি ভারত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

অন্যদিকে আমাদের রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলোয় ৫০ বছরে কোনো নতুন বিনিয়োগ হয়নি। অথচ কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের মূল শক্তির জায়গা ছিল কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন। পাট, চিনি, ডেইরি, পোলট্রি, ফিশারি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ। কিন্তু আমরা আমাদের সচল কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়ে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সের দরে বেচে দিয়েছি (ঘুরে আসুন, খালিশপুর, প্লাটিনাম ও ক্রিসেন্ট জুটমিল)।

একদিকে আমাদের লাখ লাখ চাকরির গল্প শোনানো হয়েছে; অন্যদিকে আমাদের মাটি, পানি, জলবায়ু ও স্থানীয় দক্ষতায় তৈরি হওয়া লাখো শ্রমিকের ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে, যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো, সক্ষমতাসহ এমন কিছু ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাঁদের ১০০ লোকের কাজ তৈরি করার সক্ষমতা নেই। ফল—ধসে পড়েছে দক্ষিণের গোটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্ট।

রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ ঠেকানো যায়?

ভারতীয় আধিপত্যবাদ ঠেকাতে চাইলে লাখো শ্রমিকের পাটকল, চিনিকল বাঁচানোর আন্দোলন করা দরকার ছিল না? স্কপ ও বিজিএমসি থেকে ক্রমাগত সুপারিশ গেছে, মাত্র ১ হাজার ২০০ কোটি বিনিয়োগ করুন, প্রযুক্তি ‘আপগ্রেড’ করুন, সেকিং/হেসিয়ান তাঁতের বদলে আধুনিক তাঁত বসান, স্পিনিং-ব্যাচিং বিভাগে আধুনিক যন্ত্র বসান, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ান, পাট ক্রয়ে মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি কমান; মোটকথা সংস্কার করুন।

রাষ্ট্র বিনিয়োগ না করলে ‘মডার্ন’ ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়ায় না—এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়? যারা মনে করে বাজার একটি অরাজনৈতিক ‘ম্যাজিক’, ‘ফ্রি মার্কেটের’ হাতে ছেড়ে দিলে এমনি এমনিই ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হয়ে যায়, তারা কি ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া বা ভারতের শিল্পায়নের ইতিহাসটা একটু ঘেঁটে দেখবেন?

ভর্তুকির দোহাই তুলে ভারতের হাতে চলে গেল বাংলাদেশের কাঁচা পাট। অথচ সেই ভারতের পাটকল, কাগজকল, টেক্সটাইলশিল্প, ওষুধশিল্প, জাহাজশিল্প, ইস্পাতশিল্প, পেট্রোকেমিক্যাল, সার কারখানা, বিমান, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি—এই সবকিছুর পেছনেই আছে দীর্ঘ কয়েক দশকের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও ভর্তুকির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মার্কিন মুলুকে একটিও ফুড চেইন, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প বা ব্যাংক-বিমা নেই, যারা ধারাবাহিকভাবে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পায়নি। ওয়াল-মার্ট, জেপি মরগান, ফেডেক্স, নাইকি, নেস্‌লে, আইবিএম, ইন্টেল, ম্যাকডোনাল্ডস, পিৎজা হাট, কেএফসি, বার্গার কিং, ডোমিনোস পিৎজা—কে পায় না ফেডারেল সরকারের ভর্তুকি?

এই যে আমরা স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশে অ্যামাজন আসবে, অ্যাপল আসবে, ডেল-এইচপি-স্যামসাং-লেনোভা-গুগল আসবে। একটু গুগল করেই দেখুন না, এই কোম্পানিগুলো ঠিক কী পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পায়? বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান কিনবে বাংলাদেশ, তো বোয়িং বা এয়ারবাস কি এমনি এমনি লাভ করে? নাকি এদের টিকে থাকার পেছনে আছে বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল ভর্তুকি? জেনারেল মোটর, ফোর্ড কিংবা বিএমডব্লিউ তাদের ‘এসেম্বলি লাইন’ বসাতে ভর্তুকি পায় না? বৈদ্যুতিক গাড়িকে উৎসাহিত করতে টেসলাকে ভর্তুকি দেওয়া হয়নি (টেসলা তো স্বীকারও করে যে ফেডারেল ভর্তুকি ছাড়া টেসলার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হতো না)?

ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া বা দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো পাবলিকের ট্যাক্সের টাকাতেই শিল্পায়ন করেছে। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে টানা ভর্তুকি দিয়েছে, স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণ দিয়েছে, আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছে, প্রযুক্তি খাতে বাজেট বাড়িয়েছে, ‘কৌশলগত’ খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ লাভ-লোকসানের হিসাব নয়, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত কৌশলগত শিল্পগুলোকে গড়ে তোলা, টেনে তোলা বা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই এসব ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাবৎ শিল্পোন্নত দেশের ইতিহাস ‘ফ্রি মার্কেটের’ অরাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও বিনিয়োগের রাজনৈতিক ইতিহাস।

অন্যদিকে আমরা আধিপত্য মোকাবিলার কথা বলে বাজার ছেড়ে দিয়েছি তথাকথিত ‘ফ্রি মার্কেটের’ হাতে। ভারতীয় হোক, চীনা হোক আর মার্কিন হোক, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া শক্তিশালী আধিপত্যবাদ মোকাবিলা করা কি সম্ভব? ভারতের বাজার, ভারতের কাঁচামাল আর ভারতের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি নিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা রেখে দাঁড়ানো সম্ভব?

আমাদের হাজার কোটি টাকার সুতার মজুত পড়ে থাকবে আর আমরা পোশাকশিল্পের সুতা আনব ভারত থেকে? আমাদের চিনিকলগুলো বন্ধ থাকবে, আর আমাদের রিফাইনারিগুলো কাঁচা চিনি আনবে ভারত থেকে? আমাদের বেনারসিপল্লি চলবে ভারতের বেনারসি দিয়ে, অটোরিকশার পার্টস আর ট্রাক্টর আসবে ভারত থেকে, আমাদের ৮০ শতাংশ পাটের বীজ আসবে ভারত থেকে, আমরা স্বনির্ভর হওয়ার পথে একটা আলাপও দেব না; কিন্তু মুখে মুখে শুধু ভারতবিরোধিতা করব?

আমাদের লাখো শ্রমিক দেশের ইন্ডাস্ট্রিগুলো বাঁচানোর জন্য প্রাণপণে লড়াই করেছেন, কাজ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, জেলে গেছেন, কিন্তু সেই দীর্ঘ লড়াইয়ে আমরা ভুলেও শরিক হইনি। দেশের সুতা মিল বাঁচাতে টুঁ শব্দ করিনি, অথচ এখন ভারতনির্ভর একটা অর্থনীতি জিইয়ে রেখে শুধু স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতি দিয়ে আমরা ভারতকে ঠেকাব?

‘ঢাকা না দিল্লি’ একটি শক্তিশালী স্লোগান। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘ সময় ধরে এই স্লোগান আমরা দিয়েছি। আমরা বরাবর বলেছি, ভারতের সঙ্গে হাসিনার নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, বিএসএফের সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যা, জ্বালানি খাতে আদানির আধিপত্যবাদী চুক্তি, তিস্তার পানির বণ্টন, অন্যায্য ট্রানজিট চুক্তি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ভারতের নিম্নমানের কয়লার ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ডে’ পরিণত করা—এসব অন্যায্য বন্দোবস্ত মোকাবিলা করতে হলে অর্থনীতির একটা স্বনির্ভর ভিত্তি লাগে। জাতীয় সক্ষমতা লাগে। ভারতনির্ভরশীলতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পলিসি লাগে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিল্লির হাতে তুলে দিয়ে মুখে ‘ঢাকা ঢাকা’ বললে জনতুষ্টিবাদের রাজনীতি হয়, আধিপত্যবাদ ঠেকানো যায় না।

* মাহা মির্জা, শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Sunday, January 4, 2026

ঢাকায় করমর্দন: ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বরফ গলবে?

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ ঢাকায় এক সংক্ষিপ্ত করমর্দন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেননা সাধারণত এ দুই দেশের সাধারণ জনগণ দূরে থাক ক্রিকেটাররাও নিজেদের সঙ্গে হাত মেলানো থেকে বিরত থাকেন। বিদায়ী বছরের শেষ দিন অর্থাৎ গত ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় এক বিরল দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিক। শোকাবহ ওই অনুষ্ঠানের ফাঁকে এ দুই উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিকে করমর্দন করতে দেখা যায়। যা নিয়ে রিতীমতো জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের কূটনীতিক এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সামনেই হাত মেলান আয়াজ সাদিক এবং জয়শঙ্কর। যদিও এটি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা। এমন বিরল দৃশ্য নতুন বছরে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত কিনা সে প্রশ্নও তুলেছেন বিশ্লেষকরা।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালের শেষ দিন, ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে এসে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের প্রতিনিধির সঙ্গে হাত মেলান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের একটি অপেক্ষাকক্ষেই এই করমর্দন হয় পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিকের সঙ্গে। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।

এই ঘটনার পর সাদিক বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেন, তিনি (জয়শঙ্কর) নিজেই এগিয়ে এসে আমাকে শুভেচ্ছা জানান। আমি দাঁড়িয়ে উঠলে তিনি হাসিমুখে পরিচয় দেন এবং বলেন, এক্সেলেন্সি, আপনাকে আমি চিনি, আলাদা করে পরিচয়ের দরকার নেই। সাদিক জানান, কক্ষে প্রবেশের পর জয়শঙ্কর প্রথমে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, এরপর তার দিকে এগিয়ে আসেন। তিনি কী করছেন, তা ভালো করেই জানতেন। অন্যদের উপস্থিতি সত্ত্বেও তার মুখে ছিল হাসি।

এই করমর্দনের ছবি শেয়ার করে পাকিস্তানি পক্ষের পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করেন। ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে, কারণ এর মাত্র কয়েক মাস আগেই এশিয়া কাপ ক্রিকেটে ভারতীয় দল পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানায়। সেই টুর্নামেন্টে ভারত শিরোপা জিতলেও, খেলার মাঠেও দুই দেশের রাজনৈতিক বৈরিতা কতটা গভীর, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিকতম বড় সংঘাত ঘটে ২০২৫ সালের মে মাসে। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভারত হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং এর পরপরই ছয় দশকের পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দেয়। পাকিস্তান অভিযোগ অস্বীকার করলেও, দুই দেশ চার দিনব্যাপী তীব্র আকাশযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যা ছিল প্রায় তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সামরিক সংঘর্ষ।

যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে সংঘাত থামে। পাকিস্তান পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার কথা জানায়। তবে ভারত দাবি করে, তৃতীয় পক্ষ ছাড়াই সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি হয়েছে। এই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে ঢাকার করমর্দনকে কেউ কেউ ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন।

ইসলামাবাদভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মুস্তাফা হায়দার সায়েদ আল জাজিরাকে বলেন, এটি নতুন বছরের জন্য একটি স্বাগত উন্নয়ন। অন্তত সম্মানজনক আচরণ ও স্বাভাবিক কূটনৈতিক সৌজন্য ফিরতে পারে। যা যুদ্ধের পর অনুপস্থিত ছিল। অন্যদিকে, ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস-এর পররাষ্ট্র সম্পাদক রেজাউল হাসান লস্কর এই ঘটনাকে ততটা গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তার মতে, একই কক্ষে উপস্থিত দুই জ্যেষ্ঠ নেতা সৌজন্য বিনিময় করেছেন। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই ঘটনার ছবি ভারতীয় নয়, বরং বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি সূত্র থেকেই প্রকাশিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত অগ্রগতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হবে সিন্ধু পানি চুক্তি। পাকিস্তানের জন্য ইন্দাস, চেনাব ও ঝেলাম নদীর পানি জীবন-মরণ প্রশ্ন। সাবেক কূটনীতিক সরদার মাসুদ খান বলেন, চুক্তিতে ভারত ফিরে এলে তা হবে বড় আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ। তবে বিশ্লেষকদের বড় অংশই এ বিষয়ে আশাবাদী নন।

এদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের অবস্থান সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে ইসলামাবাদ। বিপরীতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে চাপ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে শুল্ক আরোপ ও সাম্প্রতিক সংঘাত নিয়ে মন্তব্যের কারণে। সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- ২০২৬ সালে কি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সত্যিকারের সংলাপ শুরু হবে, নাকি ঢাকার করমর্দন কেবলই একটি প্রতীকী সৌজন্য বিনিময় হয়ে থাকবে?  বিশ্লেষকদের মতে, অন্তত নূন্যতম যোগাযোগ ও পূর্বনির্ধারিত সংকট মোকাবিলার কাঠামো গড়ে তোলা গেলে সেটিই হবে বড় অগ্রগতি।

https://mzamin.com/uploads/news/main/196946_dhf.webp

Wednesday, December 31, 2025

ভারতের ‘আন্তরাষ্ট্র দমন’ নিয়ে অভিযোগের শেষ কোথায় by হেলাল মহিউদ্দীন

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশন’ (আন্তরাষ্ট্র দমন) বলে একটি ধারণা রয়েছে। ধারণাটি দিয়ে রাষ্ট্রগুলোর নিজ রাষ্ট্র ছাড়িয়ে অন্য রাষ্ট্রে অন্তর্ঘাত চালানো বোঝায়। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক বিপর্যয়ের আগে এই ধারণাটি দিয়ে বোঝানো হতো সিআইএ, কেজিবি, এমআইসিক্স, মোসাদ ইত্যাদি আন্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে ভিনদেশে ভিন্নমতের সরকারকে চাপে রাখা। লক্ষ্য থাকত রাজনৈতিকভাবে কোনো দেশকে চাপে রাখা।

গোয়েন্দা সিনেমা, থ্রিলার, গেম, উপন্যাসে সেসব কার্যক্রমের কল্পগল্প উদাহরণ ভূরি ভূরি রয়েছে। সাধারণত আমনাগরিক পর্যায়ে ‘আন্তরাষ্ট্র দমন–এর ঘটনা মোটেই ঘটত না। অন্তর্ঘাতগুলো সাধারণ নাগরিক বা ছোটখাটো রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীর বিরুদ্ধে হতো না। ঘটত স্পাই-স্পাই, স্পাই-রুলিং এলিট, স্পাই-অস্ত্র উৎপাদক ও বিক্রেতা গোষ্ঠীর দালাল ও বাজার দখলদার পর্যায়ে। নিজ দেশের গোয়েন্দা তথ্য অন্য দেশের হাতে তুলে দেওয়া ডাবল এজেন্ট বা স্বপক্ষত্যাগীরাও লক্ষ্যবস্তু হতো।

গত তিন দশকে অপঘাতগুলো কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামছিল। আলোচনায় ছিল মাত্র দুটি ঘটনা। এক. ২০০৬ সালে লন্ডনে রাশিয়ার নাগরিক আলেক্সান্দর লিটভেঙ্কো হত্যাকাণ্ড। দুজন রুশ নাগরিকের সঙ্গে মিটিং ও খাবার শেষের পর পোলোনিয়াম-২১০ এর মতো মারাত্মক রেডিওঅ্যাকটিভ বিষক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। [২০১৮ সালে আরেক সাবেক রুশ গোয়েন্দা সের্গেই স্ক্রিপাল ও তাঁর কন্যা ইউলিয়া স্ক্রিপাল বিষাক্ত নোভিচক নার্ভ এজেন্ট-এর (এ-২৩৪) বিষক্রিয়ায় মরতে বসেছিলেন। তাঁরা অবশ্য শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছেন।] দুই. তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে স্বপক্ষত্যাগী অনুমিত জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ড।

লক্ষণীয়, উল্লিখিত দুটি হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। ভিনদেশের সাধারণ নাগরিককে বা রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীকে প্রবাসে কোনো দেশের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে কাউকে হত্যার ঘটনা কোনো গণতান্ত্রিক দেশ চালায় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটানো দেশ হিসেবে ভারত এবং তার গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর নাম বহুল আলোচিত হচ্ছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে।

কানাডা পৃথিবীর শান্তিবাদী দেশগুলোর অন্যতম। দেশটির রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ভারতের, বিশেষত পাঞ্জাবি ও গুজরাটি অভিবাসীদের অসামান্য আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি কানাডার শান্তিবাদী মানুষদের বড় অংশই অশান্ত হয়ে উঠছেন ভারতবিরোধিতায়।

ঘটনার শুরু কানাডায় শিখদের মধ্যে জনপ্রিয় নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ড। কানাডা সরকারের দাবি ভারত সরকার এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত। হাতে আছে নিশ্চিত গোয়েন্দা তথ্যপ্রমাণ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কানাডার তখনকার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো নিজেই নিজ্জর হত্যায় ‘বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ’ রয়েছে বলে জানিয়েছেন। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কুখ্যাত বিষ্ণোই গ্যাংকে (লরেন্স বিষ্ণোই নামের একজন গ্যাং লিডারের নামে এই গ্যাংয়ের নামকরণ হয়েছে) ব্যবহার করছে কানাডার জমিনে কানাডার নাগরিক শিখ নেতাদের নিধনের কাজে। নিজ্জর ছাড়া আরও অনেকেই নাকি আছে ‘র’–এর নিধন তালিকায়।

বিখ্যাত অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউট ও এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের যৌথ জরিপ প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালে। জরিপে দেখা যায়, কানাডার নাগরিকদের ভারতের প্রতি কূটনৈতিক সমর্থন তলানিতে ঠেকেছে। ২০২২ সালের জরিপে যেখানে ভারতের প্রতি সমর্থন ছিল ৫২ শতাংশ নাগরিকের, মাত্র এক বছর আট মাস পর ২০২৪-এ সেটি ২৪ শতাংশে এসে ঠেকেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পতনের হার ২৬ শতাংশ।

ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কানাডায় বিপন্ন। ঘটনাটির দায়দায়িত্ব বিষয়ে আদালত এখনো চূড়ান্ত সুরাহা দেয়নি। ভারত যথারীতি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কিন্তু আধুনিক কূটনীতিতে ‘চূড়ান্ত রায়’ আসার আগেই ‘আখ্যান’ তৈরি হয়ে যায়। আর আখ্যান তৈরি হয় রাষ্ট্রের বক্তব্য, গোয়েন্দা তথ্য, আদালতের নথি, সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মিশেলে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। কূটনীতিক বহিষ্কার, ভিসা ও সেবা সীমিত করা, আস্থার সংকট এখনো কমেনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ পর্যায়েই থেমে থাকেনি। অভিযোগ ছাড়িয়ে অভিযোগপত্র তৈরির পর্যায়ে চলে গেছে। মামলা হয়েছে আদালতে। মার্কিন বিচার বিভাগ ২০২৪ সালের অক্টোবরে ঘোষণা দেয়, একজন ভারতীয় সরকারি কর্মচারী বিকাশ যাদব যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি জোগাড়যন্ত্রসহ টাকাপয়সা লেনদেনের প্রায় সব প্রক্রিয়াই গুটিয়ে আনে। সব রকম যোগাযোগ হয়েছে গোপন ও কৌশলী এনক্রিপ্টেড বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে। কিন্তু দুর্ঘটনাটি ঘটার আগেই মধ্যস্থতাকারী সরকারি গোয়েন্দা দপ্তরে চর হিসাবে কাজ পেয়ে যান এবং ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেন। মার্কিন কর্তৃপক্ষের জানা হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ভারতের অন্তর্ঘাত তৎপরতা।

এই ধরনের মামলা কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কে আটকে থাকে না, ‘রুল অব ল’ পরিসরে ঢুকে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সমাজ প্রশ্ন তোলে—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়েও ভারত কীভাবে বিদেশের মাটিতে ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশনে সাহসী হয়ে উঠছে? ভারত যথারীতি এই অভিযোগগুলোও অস্বীকার করেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে উদীয়মান তরুণ নেতা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশের সব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নজরদারি ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে চিহ্নিত আততায়ী ভারতে পালিয়ে গেছে—এই তথ্যেই বিশ্বাস রাখছে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। তাদের সন্দেহ ও বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডটির দায় ভারতের। যথারীতি ভারত হত্যা-সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে চলেছে। কিন্তু জনমনে ভারতের প্রতি অনাস্থা ও অবিশ্বাস আরও কয়েক ধাপ বেড়েছে এবং বাংলাদেশের মানুষের অন্তরাত্মা থেকে ক্ষতটি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

ভারতই হবে বৈশ্বিক দক্ষিণের নেতা—একুশ শতকের শুরুতে এই প্রত্যাশা ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর। কিন্তু বর্তমান সময়ে নতুন বন্ধুত্বের আফগানিস্তান এবং ভুটান ছাড়া প্রায় সব প্রতিবেশীর চোখেই ভারত ‘বিতর্কিত বহিঃশত্রু’। দেশটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়বে ধারণা করা হয়েছিল তিনটি বাস্তবতায়। এক. দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ও বাজার, দুই. প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ, তিন. বড় কূটনৈতিক ভূমিকা, বিশেষত বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধি হয়ে ওঠার চেষ্টা।

অথচ কানাডায় নিজ্জর হত্যা ও যুক্তরাষ্ট্রের মামলা চতুর্থ বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্কট্যাংক কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্সের মতে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়ায় প্রবাসী বিরোধীদের টার্গেটিং’ তবে ভারতের ‘সফট পাওয়ার’, বিশেষত বহির্বিশ্বে ‘গণতান্ত্রিক উদাহরণ’কে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি শুধুই সত্য-মিথ্যার প্রশ্ন নয়। বরং ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ ও ‘স্বচ্ছতা’র প্রশ্ন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এ রকম অভিযোগ উঠলে আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা দুটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। এক. অভিযুক্ত রাষ্ট্র স্বচ্ছ তদন্তে সহযোগিতা করছে কি না। দুই. ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে অভিযুক্ত রাষ্ট্র সত্যিকার প্রাতিষ্ঠানিক সততা দেখায় কি না!

কানাডার নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলাপ-আলোচনার বড় অংশ জুড়েই থাকে বিদেশি হস্তক্ষেপ, অপতথ্য এবং প্রবাসী কমিউনিটির আচরণ। কানাডার সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি ম্যারি-জোসি হোগ-এর নেতৃত্বে ২০২৩ সালে গঠিত ‘পাবলিক ইনকোয়ারি ইনটু ফরেন ইন্টারফিয়ারেন্স ইন ফেডারেল ইলেকটোরাল প্রসেসেস অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউশনস’ এখন অবধি কাজ করে চলেছে।

আলোচনা ও প্রতিবেদনগুলোতে একাধিক দেশকে ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারত সেগুলোর অন্যতম। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কানাডীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মূল্যায়নমূলক পরামর্শ, ‘ভারতকে বিদেশি হস্তক্ষেপের অন্যতম ক্রীড়নক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হোক।

মূল্যায়নগুলো ভারতবিদ্বেষী যেমন নয়, ভারতকে সরাসরি দোষারোপও নয়। তবু ভারতের বিরুদ্ধে ‘কাঠামোগত সন্দেহ’ প্রবল হতে প্রবলতর হচ্ছে। কানাডার নীতিনির্ধারণেও তাই মূল্যায়নগুলোই বেশি ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের অন্যতম বড় খবর—ভারতীয় সংগঠিত অপরাধচক্রটিকে (লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং) ‘ক্রিমিনাল নেটওয়ার্ক’ ঘোষণা করা হয়েছে। কূটনৈতিক আস্থা প্রতিদিনই ভাঙছে। আস্থা ভাঙলে যা হয়—বাণিজ্য, ভিসা, শিক্ষা-অভিবাসন, এমনকি প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি সহযোগিতাতেও তার প্রভাব পড়ছে।

ভারত ‘বিশ্বাস হারানো’র মতো কৌশলগত সংকটে পড়েছে ভালোভাবেই। কারণ, দুটি দেশই ভারতের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগী রাষ্ট্র। উইলসন সেন্টারের বিশ্লেষণ—ভারত হয়তো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ ও ‘চরমপন্থী’দের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে দেশ দুটিকে অভিযুক্ত করতে পারে। কিন্তু উভয় দেশেই আইনি কাঠামো শক্ত ও স্বচ্ছ হওয়ায় এবং সংবাদমাধ্যম স্বাধীন ও অনুসন্ধানী থাকায় জনমত তৈরিতে সরকারের প্রয়োজন হয় না।

উইলসন সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের ‘অবিশ্বস্ত’ পরিচিতি ঘোচানোর উপায় স্বচ্ছ তদন্ত ও তথ্য বিনিময় সহযোগিতা। প্রয়োজনে স্পষ্ট ভাষায় রাষ্ট্রীয় দায় স্বীকার করা বা নাকচ করা। ভারত অবশ্য কোনোটিই করছে না। ফলে আস্থার সংকট বাড়ছেই। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অপরাধী বিনিময় চুক্তি রয়েছে। কিন্তু যখন কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বিষয়েই ভারত নির্বিকার, বাংলাদেশের দাবিকে দেশটি কতটা আমলে নেবে অনুমান করা কঠিন।

শাস্তিপ্রাপ্ত দাগি আসামিদের আশ্রয়দান ইতিমধ্যে ভারতের নৈতিক ও কূটনৈতিক সম্মানকে দারুণভাবে খর্ব করেছে। শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যদি সত্যিই ভারত জেনেশুনে আশ্রয় দিয়ে থাকে, তবে দুই দেশের সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। বল এখন ভারতের কোর্টে। কূটনৈতিক সমাধানে দেশটির আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসাই উভয় দেশের জন্য মঙ্গলকর।

* হেলাল মহিউদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সম্প্রতি উদীয়মান তরুণ নেতা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন
সম্প্রতি উদীয়মান তরুণ নেতা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন

ভারতনীতি: সর্বদা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন খালেদা জিয়া

এনডিটিভির রিপোর্টঃ ভারত নীতি নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং  শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। হাসিনা ভারতকে বন্ধুসুলভ হিসেবে দেখেন। খালেদা জিয়া তার প্রাথমিক বছরগুলোতে মোটামুটি সতর্ক। কখনো কখনো বিরোধী অবস্থান বজায় রাখেন। সর্বদা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় ভারতের সঙ্গে স্থলপথ সংযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি তার বিরোধিতা। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতা হিসেবে ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দুইবার এই বিরোধিতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ভারতের জন্য উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশী ভূখণ্ড ব্যবহার করার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন এটি দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। তিনি ভারতের ট্রাকগুলোর বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহারকে ‘দাসত্বের’ সমতুল্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি ১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চুক্তির নবায়নের বিরোধিতা করেন। অনেকেই এই চুক্তিকে সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তবে তিনি বলেন, তার দেশকে এই চুক্তি করতে ‘বাধ্য করা হয়েছে’। খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার ভোরে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি ৮০ বছর বয়সে হৃদরোগ ও ফুসফুস সংক্রান্ত সংক্রমণ, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ছিলেন। তাকে কৃতিত্ব দেয়া হয় দেশের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের জন্য। গত তিন দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা, এই দুই নারী প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।

এনডিটিভি আরও লিখেছে, বিএনপিকে ‘বাংলাদেশের স্বার্থের রক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খালেদা তার নীতিগুলোকে ‘ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা’ হিসেবে সাজিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে ঢাকায় এক সভায়, যখন হাসিনা প্রধানমন্ত্রী এবং খালেদা বিরোধী দলনেতা ছিলেন, তখন তিনি ভারতের জন্য শুল্কমুক্ত সংযোগ প্রদানের কারণে হাসিনাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে ভারতের রাজ্য বানানোর চেষ্টা প্রতিরোধ করব।’ তবে খালেদার লক্ষ্য কেবল সংযোগের অধিকার প্রত্যাখ্যান করা ছিল না, বরং তার দেশের জন্য বাস্তব লাভ নিশ্চিত করা ছিল। ২০১৪ সালে ঢাকার একটি পত্রিকা তাকে উদ্ধৃত করে বলেছে যে, সংযোগ অনুমতি অবশ্যই তিস্তা জল চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে তিনি সমালোচনা করেছেন। ১৯৭৫ থেকে কার্যকর এই চুক্তি। গঙ্গা থেকে হুগলির দিকে পানি প্রবাহের জন্য ব্যবহৃত হয় এই চুক্তি। সমালোচনায় তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশকে গঙ্গার পানি থেকে বঞ্চিত করছে। ২০০৭ সালে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে তারা বাঁধ খুলে দিয়ে দেশের বন্যা পরিস্থিতি খারাপ করেছে। সংযোগ ও অবকাঠামোর বাইরে প্রতিকূল অবস্থান ছিল তার কৌশলগত নীতির অংশ। ২০০২ সালে তিনি চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পন্ন করেন এবং ভারতের প্রতি উদাসীনতা দেখান। চীনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ঢাকার প্রধান সরবরাহকারী হয় ট্যাঙ্ক, ফ্রিগেট এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল সরাসরি কৌশলগত। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি এবং দিল্লি কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করে, বিএনপি সরকারের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি সংগঠন আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ আনে ভারত। খালেদার ভারতবিরোধী অবস্থান ছিল বাস্তবমুখী। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯২ সালের তিন বিঘা করিডোর লিজের কথা বলা যায়।  এর ফলে ঢাকাকে দহগ্রাম-আঙরপোতা এলাকায় স্থায়ী অ্যাক্সেস দেয়, যা ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে ২০০ মিটার গভীরে অবস্থিত। ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি এবং নতুন মাদক তস্কর বিরোধী চুক্তি স্বাক্ষরও তার বাস্তবমুখী নীতি প্রমাণ করে। ২০১২ সালের দিল্লি সফরের পর ভারত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। তিনি ভারত থেকে বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় সফরে এসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
যাইহোক, চাপ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০১৬-২০২৪ সালের মধ্যে তার ভারতবিরোধী ভাষণ, সীমান্ত হত্যা এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সমালোচনা, খালেদার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। আগস্ট ২০২৪-এর পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়, যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং বিএনপি সমান ও সম্মানজনক সম্পর্কের জন্য ইঙ্গিত দেয়। যখন তার স্বাস্থ্য অবনতি হয়, তখন প্রধানমন্ত্রী মোদী টুইটে লিখেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খবর জেনে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ তার মৃত্যুর পর তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি ২০১৫ সালে ঢাকায় তার সঙ্গে আমার উষ্ণ সাক্ষাৎ স্মরণ করি।’

mzamin

Tuesday, December 30, 2025

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে ফাটল, দায়ী ভারতের কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব

ডনের সম্পাদকীয়ঃ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক বর্তমানে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম তরুণ ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। হাদির সমর্থক ও সহানুভূতিশীলদের একটি অংশের দাবি, ভারতের ইন্ধনেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ডনের সম্পাদকীয় বলছে, দিল্লির বড় ভাইসুলভ ও কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাবই সমস্যার প্রধান কারণ; দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি চাইলে সবাইকে একে অন্যের সার্বভৌমত্ব মেনে চলতে হবে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ঘেরাওয়ের চেষ্টা চালায় একটি হিন্দুত্ববাদী উগ্র গোষ্ঠী। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য শহরেও বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ভারতের উগ্রবাদী সংগঠন ভিএইচপি (বিশ্ব হিন্দু পরিষদ) ময়মনসিংহে এক বাংলাদেশি হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে কূটনৈতিক মিশনে হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে। জবাবে দিল্লিতেও বাংলাদেশি প্রতিনিধি একই ধরনের তলবের মুখে পড়েন। যা কার্যত কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের শীর্ষ কূটনীতিক মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন। অন্যদিকে, ভারত সরকার এসব ঘটনাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছে, বিশেষ করে উগ্রবাদী জনতার মাধ্যমে বাংলাদেশি মিশনে হামলার বিষয়টি।

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ওয়াজেদের শাসনামলে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ ও সমন্বিত। তবে গত বছর তার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকে সমর্থন দিয়ে এসেছে।
গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন খুনি ভারতে পালিয়ে গেছে। এমন খবর বাংলাদেশের জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ভারতের বড়ভাইসুলভ ও কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব। হাদির হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে দিল্লির উচিত ঢাকার সঙ্গে সহযোগিতা করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে হলে প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করতে হবে। কোনো রাষ্ট্রই নিজেকে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে অন্যদের ওপর প্রভাব খাটাতে বা ভয় দেখাতে পারে না। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়াই স্থিতিশীল ভবিষ্যতের একমাত্র পথ।

mzamin

Monday, December 29, 2025

হাদি হত্যার দুই অভিযুক্ত মেঘালয়ে প্রবেশ করার খবর অস্বীকার করেছে ভারতীয় পুলিশ

বাংলাদেশে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দুই অভিযুক্ত ভারতে ঢুকেছে বলে বাংলাদেশের পুলিশ যে দাবি করেছে মেঘালয় পুলিশ তা অস্বীকার করেছে। মেঘালয় পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ডিএমপির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ওসমান হাদি হত্যার দুই অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং আলমগীর শেখ ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের এই দাবিকে মেঘালয় পুলিশের পক্ষ থেকেদ ‘অসত্য’ এবং ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বাংলাদেশ পুলিশের কাছ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হয়নি। পুলিশ সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছে, অভিযুক্তদের কাউকে গারো পাহাড়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তার করা  হয়নি। মেঘালয় পুলিশ এই দাবিগুলিকে সরাসরি খারিজ করে দিয়ে বলেছে যে, পুর্ত্তি এবং সামি নামে স্থানীয় দুইজন অভিযুক্তকে সীমান্ত অতিক্রম বা ভূমিকার সমর্থনে কোনও গোয়েন্দা তথ্য বা অপারেশনাল প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, পুর্ত্তি বা সামিকে মেঘালয়ের কোথাও শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে যাচাই বা সমন্বয় ছাড়াই এই বক্তব্য  দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মেঘালয় পুলিশের বক্তব্যকে সমর্থন করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের (মেঘালয় ফ্রন্টিয়ার) ইন্সপেক্টর জেনারেল ওপি উপাধ্যায় দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশ পুলিশের দাবিগুলি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন, এই ব্যক্তিদের হালুয়াঘাট সেক্টর থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে মেঘালয়ে প্রবেশের কোনও প্রমাণ নেই। বিএসএফ কর্তৃক এই ধরণের কোনও ঘটনা সনাক্ত বা রিপোর্ট করা হয়নি। এই দাবিগুলি ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেন উপাধ্যায়। 

mzamin

Sunday, December 28, 2025

ভারতের আসামে বাংলাদেশ মিশন ঘিরে বিক্ষোভ

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারতে বাংলাদেশ মিশনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ অব্যাহত আছে। গতকাল শনিবার ভারতের আসাম রাজ্যে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেছে হিন্দুত্ববাদী চারটি সংগঠন।

এদিকে গত কয়েক দিনে টানা বিক্ষোভের পর গতকাল ভারতের দিল্লি, কলকাতা, আগরতলা ও মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ মিশন ঘিরে কোনো বিক্ষোভ হয়নি। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আজ রোববারও বাংলাদেশের সব মিশনে ভিসা সেবা বন্ধ থাকছে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ বারবার নাকচ করে আসছে সরকার। বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে উল্লেখ না করতেও বলা হয়েছে দিল্লিকে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন ব্যবস্থাও নিচ্ছে সরকার।

আসামে বিক্ষোভ

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের কাছে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দুরাষ্ট্র দাবি সমিতি, হিন্দু যুব-ছাত্র পরিষদ, আসাম রাষ্ট্রীয় হিন্দু ফ্রন্ট ও আসাম হিন্দু ঐক্য মঞ্চের সমর্থকেরা।

ঢাকা ও আসামের কূটনৈতিক সূত্রগুলো গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে জানায়, হিন্দুত্ববাদী চার সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা গতকাল গুয়াহাটির বাংলাদেশ মিশনের সামনে টানা দ্বিতীয় দিন বিক্ষোভ করেন। গতকালের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৭৫ জনের মতো। তবে বিক্ষোভের আগে থেকে বাংলাদেশ মিশন স্থানীয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছিল। ওই অনুরোধে সাড়া দিয়ে গতকাল সকাল থেকে বাংলাদেশ মিশনের কাছে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভকারীরা মিশন অভিমুখে এলে মিশন থেকে ১০০ মিটারের কম দূরত্বে তাঁদের আটকে দেয় পুলিশ। পরে বিক্ষোভকারীদের একটি দল মিশনে গিয়ে ‘বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ’ জানিয়ে একটি স্মারকলিপি দেয়।

এর আগে গত শুক্রবার বিক্ষোভকারীরা গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের গেটের কাছে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। সেখানে তাঁরা প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে অবস্থান নিয়ে ময়মনসিংহের দীপু দাসের হত্যাকাণ্ডসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের নানা অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। পরে বিক্ষোভকারীদের একটি প্রতিনিধিদল মিশনে গিয়ে স্মারকলিপি দেয়।

এদিকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের বিক্ষোভ হলেও গতকাল দিল্লি, কলকাতা, আগরতলা ও মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ মিশন ঘিরে কোনো বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি।

দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের উদ্ভূত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিল্লি, আগরতলা ও শিলিগুড়ি মিশনে ভিসা সেবা বন্ধ থাকবে। ঢাকা থেকে পরবর্তী নির্দেশ পাওয়ার পর এসব মিশনে ভিসা সেবা চালু হবে। তবে আগামীকাল সোমবার থেকে মুম্বাই মিশনে ভিসা সেবা আবার চালু হবে।

২৯০০ সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের আগের অবস্থানের যে পরিবর্তন হয়নি, সেটি গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। ব্রিফিংয়ে জয়সোয়াল দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৯০০টির বেশি সহিংসতার ঘটনা স্বাধীনভাবে নথিভুক্ত হয়েছে, যেগুলোকে শুধুই ‘মিডিয়া অতিরঞ্জন’ বা ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আমরা কীভাবে দেখি, সে বিষয়ে আমাদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট।’

বাংলাদেশের কূটনীতিকদের কাছে জানতে চাইলে তাঁদের বেশ কয়েকজন ওই সংখ্যা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। এত বিপুল সংখ্যায় সহিংসতার ঘটনা আদৌ ঘটেছে কি না আর কীভাবে সেই সংখ্যা নথিভুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে তাঁরা সন্দিহান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কূটনীতিক এই প্রতিবেদককে বলেন, হুট করে ২ হাজার ৯০০ সংখ্যাটি কেন, কীভাবে এল! যদি সহিংসতার ঘটনা ঘটেই থাকে, তবে আগে কেন ভারত সে কথা বলেনি।

গতকাল আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশ মিশন অভিমুখে হিন্দুত্ববাদী চার সংগঠনের নেতা–কর্মীদের মিছিল আটকে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা
গতকাল আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশ মিশন অভিমুখে হিন্দুত্ববাদী চার সংগঠনের নেতা–কর্মীদের মিছিল আটকে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

Thursday, December 25, 2025

রোগীকে মারধর করলেন ভারতীয় চিকিৎসক

সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে অনুরোধ করায় শ্বাসকষ্টে ভোগা এক রোগীকে মারধর করেছেন ভারতীয় এক চিকিৎসক। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল। এতে বলা হয়, উত্তর ভারতের শিমলার ইন্দিরা গান্ধী মেডিকেল কলেজের (আইজিএমসি) এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সোমবার ওই রোগীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী অর্জুন পানওয়ার শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে পরীক্ষা করাতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। পরে শ্বাস নিতে অসুবিধা হওয়ায় অন্য একটি ওয়ার্ডের বিছানায় শুয়ে পড়েন। পানওয়ারের অভিযোগ, কোনো প্ররোচনা ছাড়াই ওই চিকিৎসক তার সঙ্গে রূঢ় ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। তিনি এ আচরণের প্রতিবাদ করলে দু’জনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। এরপর চিকিৎসক তাকে মারধর শুরু করেন বলে পানওয়ার জানান। পানওয়ার বলেন, আমি তখন মাত্র ব্রঙ্কোস্কপি করিয়েছি এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। অক্সিজেন চাইলে চিকিৎসক আমার ভর্তি সংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন।

তিনি আরও বলেন, আমি শুধু অনুরোধ করেছিলাম যেন তিনি সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু তিনি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। আমি যখন জিজ্ঞেস করি, তিনি কি নিজের পরিবারের সঙ্গেও এভাবে কথা বলেন? তখন তিনি বলেন আমি ‘ব্যক্তিগত’ বিষয়ে কথা বলছি এবং মারধর শুরু করেন। ঘটনাটির ভিডিও দ্রুত অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, চিকিৎসক বারবার ঘুষি মারছেন, আর পানওয়ার আত্মরক্ষার চেষ্টা করছেন। ঘটনার পর হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। শিমলা আইজিএমসি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

আইজিএমসি শিমলার মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রাহুল রাও জানান, কমিটি বিষয়টি তদন্ত করছে এবং শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে একটি পুলিশ মামলাও করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৭ সালে ভারতে আরেকটি ঘটনায় অপারেশন থিয়েটারের ভেতর দুই চিকিৎসকের পারস্পরিক গালাগালির ভিডিও ভাইরাল হয়। জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের সময় ওই বিতণ্ডার ফলে একটি শিশুর মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. অশোক নাইনিব্রাল ও অ্যানেস্থেটিস্ট ডা. মুরারি লাল তাক অচেতন রোগীর ওপর অস্ত্রোপচার চলাকালে একে অপরের সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। যোধপুরের উমাইদ হাসপাতালে সংঘটিত ওই ঘটনায় প্রায় এক ডজন চিকিৎসাকর্মী অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হন। উমাইদ হাসপাতালের তৎকালীন সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রঞ্জনা দেশাই জানান, ওই নারীকে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল এবং দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়। পরে গুরুতর জন্মকালীন শ্বাসকষ্টের কারণে তার শিশুর মৃত্যু হয়।

https://mzamin.com/uploads/news/main/195422_Abul-9.webp

Wednesday, December 24, 2025

পশ্চিমবঙ্গের কারাগারেই সবচেয়ে বেশি বিদেশি বন্দি, সর্বোচ্চ বাংলাদেশি

এনসিআরবি প্রতিবেদনঃ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কারাগারে দেশের অন্য যেকোনো রাজ্যের তুলনায় সবচেয়ে বেশি বিদেশি বন্দি অবস্থান করছে। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (এনসিআরবি) প্রকাশিত ‘প্রিজন স্ট্যাটিস্টিকস অব ইন্ডিয়া ২০২৩’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট ৬,৯৫৬ জন বিদেশি বন্দি আছেন। তার মধ্যে ২,৫০৮ জন, অর্থাৎ ৩৬ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গের সংশোধনাগারে আটক আছেন। এই বিদেশিদের মধ্যে ৮৯ শতাংশ অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের দায়ে অভিযুক্ত। তাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। বিদেশি বন্দিরা রাজ্যের মোট ২৫,৭৭৪ বন্দির মধ্যে শতকরা ৯ ভাগ। বাংলাদেশি বন্দিদের মধ্যে ৭৭৮ জন দণ্ডপ্রাপ্ত এবং ১৪৪০ জন বিচারাধীন। দ্বিতীয় স্থানে আছে মিয়ানমার। এদেশটির বিচারাধীন বন্দিদের বেশির ভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। রাজ্যের কারাগারে থাকা ৭৯৬ জন বিদেশি দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির মধ্যে ২০৪ জন নারী। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৪,৯০৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের অর্ধেকেরও বেশি অংশ পশ্চিমবঙ্গে। ফলে রাজ্যে বিদেশি বন্দির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০২৩ সালে রাজ্যের কারাগারগুলোতে ছিল ৭৯৬ জন বিদেশি দণ্ডপ্রাপ্ত এবং ১,৪৯৯ জন বিচারাধীন বন্দি।

এনসিআরবির তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। একজন আইনি সহায়তা পরামর্শক বলেন, বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ আছে। তার মধ্যে অন্যতম আইনজীবীর খরচ বহন করতে না পারা,বিচারিক বেঞ্চের অভাব এবং আগেই অতিরিক্ত চাপে থাকা আদালতগুলো। একজন জ্যেষ্ঠ রাজ্য কর্মকর্তা জানান, অবৈধ বাংলাদেশি বন্দিদের সাধারণত ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও)-এর নির্দেশে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

কিন্তু আমাদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে ডিপোর্টেশনের হার অত্যন্ত কম। ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের কারাগারগুলোর অকুপেন্সি রেট (দখল হার) ছিল ১২০ শতাংশ। অর্থাৎ, ২১,৪৭৬ জনের ধারণক্ষমতার জায়গায় ২৫,৭৭৪ জন বন্দি (দেশি ও বিদেশি) রাখা হয়েছিল মোট ৬০টি কারাগারে। রাজ্যের একমাত্র নারী কারাগারের বন্দি উপস্থিতির হার ছিল ১১০.২ শতাংশ। ২০৪ জন নারী এবং ১২ জন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি আছেন। ৩৭১ জন নারী এবং ৯ জন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি, যারা মোট ১,৪৯৯ জন বিচারাধীন বিদেশি বন্দির অংশ।

https://mzamin.com/uploads/news/main/183216_Abul-3.webp

Tuesday, December 23, 2025

শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্র বন্ধ করে দিলেন হিন্দুত্ববাদী বিক্ষোভকারীরা

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্র ভাঙচুর করেছেন হিন্দুত্ববাদী কয়েকটি সংগঠনের সদস্যরা। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), হিন্দু জাগরণ মঞ্চ ও শিলিগুড়ি মহানগর সংগঠনের সদস্যরা আজ সোমবার শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রে ভাঙচুরের পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

দিল্লি ও কলকাতার কূটনৈতিক সূত্রগুলো প্রথম আলোকে জানিয়েছে, কয়েক বছর ধরে ‘ডিইউডিজিটাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচারের ঘটনার প্রতিবাদে শিলিগুড়ির বাঘা যতীন পার্কে জমায়েত হন ভিএইচপি, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, শিলিগুড়ি মহানগর সংগঠনের প্রায় শ তিনেক সদস্য। এরপর তাঁরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বাংলাদেশের ভিসা অফিস ঘেরাও করেন। বিক্ষোভের সময় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, দীপু দাসের হত্যার বিচার ও দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানান।

পরে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে পাঁচজনের একটি প্রতিনিধিদল ভিসা অফিসে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এবং প্রতিবাদস্বরূপ ভিসা অফিস বন্ধ রাখতে বলে।

এ সময় প্রতিনিধিদলের এক সদস্য ডিইউডিজিটালের কর্মকর্তাকে ফোন করে বলেন, ‘আপনাকে একটাই অনুরোধ, এই অফিসের তালা খুলবে না। আপনার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে দিন, এই অফিসের তালা খুলবে না। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হবে, আপনি এখানে ব্যবসা করবেন, সেটা হবে না। বাংলাদেশের ভিসাসংক্রান্ত ব্যানার অথবা বোর্ড আজকের মধ্যে সরিয়ে নিন।’

প্রতিনিধিদলের ওই সদস্য পরে স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, তাঁরা সংগঠনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে জানাবেন। বাংলাদেশে তাঁদের হিন্দু ভাইদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। এখান থেকে যেন কোনো ভারতীয়, কোনো হিন্দু বাংলাদেশে না যায়, ব্যবসা না করে, সেটা তাঁরা চান।

কলকাতা থেকে একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা ভেবে ডিইউডিজিটাল সোমবার বেলা তিনটার আগেই ভিসা কেন্দ্রটি বন্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর পুনরায় ভিসা কেন্দ্র চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে শিলিগুড়িতে ওই ভিসা কেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কলকাতা দপ্তরে কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়েছে কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশন।

এদিকে আজ দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন সব ধরনের কনস্যুলার সেবা ও ভিসা দেওয়া বন্ধ করেছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

হিন্দুত্ববাদী কয়েকটি সংগঠনের সদস্যরা আজ সোমবার দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রে যান
হিন্দুত্ববাদী কয়েকটি সংগঠনের সদস্যরা আজ সোমবার দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রে যান। ছবি: শিলিগুড়ি টাইমস

Monday, December 22, 2025

দেশের অস্থিরতায় কলকাতায় বাংলাদেশি পর্যটকরা দুশ্চিন্তায়

ঢাকা ও দেশের অন্যান্য শহরে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার খবরে কলকাতার মধ্যাঞ্চলে অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশি পর্যটকের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে- এই আশঙ্কায় অনেকেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা সংক্ষিপ্ত করার কথাও ভাবছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। এই পর্যটকদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা ভিসায় কলকাতায় গিয়েছেন। তারা মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও কলিন স্ট্রিট সংলগ্ন হোটেল ও গেস্টহাউসে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশি পর্যটক, খাবারের দোকান, ট্রাভেল এজেন্সি ও মানি এক্সচেঞ্জের ঘনত্বের কারণে এলাকাটি অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত।

শুক্রবার অনেক পর্যটকই জানান, দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তা শুধু তাদের পরিবারের নিরাপত্তাই নয়, ভারত-বাংলাদেশের পারস্পরিক যাতায়াতকেও প্রভাবিত করতে পারে। এ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। শুক্রবার ভোরে পরিবারের এক সদস্যের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় পৌঁছেছেন মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরেই ঢাকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত। আর নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়াটা ভীষণ চিন্তার।
অনেক পর্যটককে ট্রাভেল এজেন্টদের সঙ্গে ফেরার টিকিট এগিয়ে আনা বা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করতে দেখা গেছে। আবার কেউ কেউ হোটেলের সামনে বা চায়ের দোকানে ছোট ছোট দলে জড়ো হয়ে দেশের খবর নিয়ে আলোচনা করছেন এবং নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

বাংলাদেশ থেকে আসা আরেক পর্যটক সুমন মণ্ডল বলেন, আমি প্রার্থনা করছি আগামী দু’এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি শান্ত হোক। প্রায় ১৫ মাস ধরে চলা দীর্ঘ মন্দার পর অক্টোবর থেকে বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। জুলাই মাসে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপ ভ্রমণ কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। ফলে ‘মিনি বাংলাদেশ’-এর ব্যবসায়ীরা অস্তিত্ব সংকটে পড়েন। হোটেল, গেস্টহাউস, মানি এক্সচেঞ্জ কাউন্টার ও পরিবহন ব্যবসায়ীরা কেবল সম্প্রতি আবার কিছুটা স্বস্তি পেতে শুরু করেছিলেন। এর বড় কারণ ছিল চিকিৎসা পর্যটনের পুনরুদ্ধার।

শিশুসহ পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রে এই অনিশ্চয়তা আরও বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুলনার বাসিন্দা আমিন ইসলাম স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় গিয়েছেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা। নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এবং হোটেল মালিকরাও আশঙ্কা করছেন, সদ্য শুরু হওয়া এই নাজুক ব্যবসায়িক পুনরুদ্ধার আবারও ব্যাহত হতে পারে। অনেকের মতে, বুকিং বাতিল বা আগেভাগে ফিরে যাওয়া সরাসরি সেই ব্যবসায় প্রভাব ফেলবে, যা ব্যাপকভাবে বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল।
কলিন স্ট্রিটের একটি গেস্টহাউসের একজন মালিক বলেন, আমরা আমাদের অতিথিদের আশ্বস্ত করছি যে কলকাতায় তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং এখানে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে দেশের অনিশ্চিত পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই তাদের পরিকল্পনা ও আমাদের ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলছে।

mzamin

দূতকে হুমকি অস্বীকার দিল্লির, বিষিয়ে উঠছে সম্পর্ক

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ক্রমেই উত্তেজনা বাড়ছে। দুই প্রান্তের সাম্প্রতিক নানা ঘটনা পরিস্থিতিকেই বিষিয়ে তুলেছে। শনিবার রাতে নজিরবিহীনভাবে দিল্লির নিরাপদ কূটনৈতিক জোনের বাংলাদেশ হাউজের গেটে গিয়ে বিক্ষোভ দেখায় একদল উগ্রপন্থি। তারা চাণক্যপুুরির একের পর এক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে একেবারে রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের সামনে (সড়কের ডিভাইডারে) গিয়ে অবস্থান নেয় এবং হাইকমিশনারের বাসভবন লক্ষ্য করে বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। তারা হাইকমিশনারকে উদ্দেশ্য করে উচ্চস্বরে গালমন্দ এবং নানা হুমকিও দেয়। ঢাকায় প্রাপ্ত রিপোর্ট বলছে এ ঘটনার সময় বাসভবনে থাকা বাংলাদেশ দূত এবং তার পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। শনিবার স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনার ব্যানারে একদল উগ্রপন্থি বাংলাদেশ হাউজের মূল ফটকে অবস্থান নেয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।

রোববার বিকালে তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। তাছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে পৃথক বিবৃতিও প্রচার করা হয়েছে। ওই ঘটনায় দিল্লির বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রের বরাতে প্রেসনোটও ইস্যু করা হয়েছে। যেখানে এ সংক্রান্ত বাংলাদেশি মিডিয়ার রিপোর্টকে অতিরঞ্জন বলে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশ দূতকে হুমকি দেয়ার বিষয়টি দিল্লি অস্বীকার করেছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা দিল্লির প্রেসনোটকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই বিক্ষোভ নিয়ে ভারতের দাবি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রশ্ন রাখেন দিল্লির সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতের বাসভবন পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা প্রবেশ করতে পারলো কীভাবে? এটাকে গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন- হাইকমিশনারের বাসভবনের সামনে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা শুধু বাংলাদেশে একজন হিন্দু নাগরিক হত্যার ঘটনায় স্লোগান দেয়নি বরং অন্যান্য বক্তব্যও দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সঠিক দাবি করে উপদেষ্টা বলেন ২৫ বা ৩০ জনের একটা হিন্দু চরমপন্থি সংগঠনের একটা দল এতদূর পর্যন্ত আসতে পারবে কেন একটা স্যানিটাইজড এলাকার মধ্যে। তার মানে তাদের আসতে দেয়া হয়েছে। তাহলে যেভাবে তারা আসছে, আসতে পারার কথা না কিন্তু নরমালি এবং তারপরে সেখানে তারা দাঁড়িয়ে শুধু ওই হিন্দু নাগরিকের হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়ে চলে গেছে তা না, তারা অনেক কিছু বলেছে সেটা আমরা জানি এবং আমাদের পত্রপত্রিকায় যে রিপোর্টটা আসছে সেটাকে তারা বলছে মিসলিডিং এটাও সত্য না। আমাদের পত্রপত্রিকায় মোটামুটি সঠিক রিপোর্টই এসেছে। আমরা যেটুকু তথ্য পেয়েছি আমার কাছে প্রমাণ নেই যে, হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। কিন্তু আমরা এটাও শুনেছি, তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে।

উপদেষ্টা বলেন, সেটা কেউ একজন কথা বললো, সেটার মধ্যে হতে পারে। কিন্তু আমার কথা হলো যে, এ পর্যন্ত আসতে পারবে কেন? এসে এখানে হুমকি দিতে পারবে কেন? সাধারণত আমরা যখন কোনো প্রটেস্ট গ্রুপ যখন যায় সেটা আগে থেকে ইনফর্ম করা হয় এবং পুলিশ তাদেরকে একটু দূরে এক জায়গাতে আটকে দেয়। কখনো যদি কোনো কাগজপত্র দেয়ার থাকে দুইজন এসে দিয়ে যায়। এটা হলো নর্ম। সবখানেই এটা হয় আমাদের দেশেও হয়। এটা আমরা গ্রহণ করি না। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, দ্বিতীয়ত বিষয় হচ্ছে যে একজন বাংলাদেশি নাগরিক নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। এটার সঙ্গে মাইনরিটিজের নিরাপত্তাকে একসঙ্গে করে ফেলার কোনো মানে হয় না। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক যাকে হত্যা করা হয়েছে এবং অবিলম্বে বাংলাদেশের সরকার এই ব্যাপারে অ্যাকশন নিয়েছে। ইতিমধ্যে আপনারা জানেন যে বেশ কিছু অ্যারেস্ট করা হয়েছে। তো এ ধরনের ঘটনা যে শুধু বাংলাদেশে ঘটে তা নয়। এই অঞ্চলের সব দেশেই ঘটে এবং প্রত্যেক দেশের দায়িত্ব হচ্ছে সেক্ষেত্রে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া। বাংলাদেশ নিচ্ছে অন্যদেরও উচিত সেরকম ব্যবস্থা নেয়া। প্রতিবাদে কীভাবে জানাবে ঢাকা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখুন ফরমেট নিয়ে বরং আমরা আলাপ না করাই ভালো কারণ তারাও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, আমরাও যোগাযোগ রাখি, যোগাযোগ আছে এবং আমরা যেটাকে বলার সেটা বলি, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই যে প্রেস নোট এসেছে, যে কারণে আমাদেরও এখন এটা একইভাবে ওপেনলি যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা ভরসা রাখছি যে ভারত যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেবে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এখানে ব্যাপারটা শুধু কিন্তু যে তারা এখানে এসেছে দুটো স্লোগান দিয়েছে তা না। এর ভেতরে কিন্তু একটা পরিবার বাস করে, হাইকমিশনার এবং তার পরিবার ওখানে বাস করে তারা থ্রেটেন ফিল করেছে এবং তারা কিন্তু আতঙ্কিত হয়েছে যে কারণ এডিকুয়েট সিকিউরিটি অফ ছিল, দুইজন গার্ড ছিল তারা চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। কাজেই এটাকে আমরা মনে করি যে আরেকটু পৃথক করাটা সত্যিকারই ওই দেশের দায়িত্ব।

দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা হয়নি: ভারত সরকার
এদিকে দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভকারীরা সেখানকার নিরাপত্তা বেষ্টনী (ফেন্স) লঙ্ঘন করেনি বলে দাবি করেছে দেশটির  বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। রোববার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ২০শে ডিসেম্বর রাতে বিক্ষোভের যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়ে মিডিয়ার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ওই ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের কিছু মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডার বিষয়টি আমরা জেনেছি। প্রকৃত সত্য হলো, ২০শে ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে ২০ থেকে ২৫ জন যুবক সমবেত হয়। তারা ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশে সব সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা রক্ষার আহ্বান জানায়। কোনো সময়ই তারা নিরাপত্তা বেষ্টনী বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি লঙ্ঘন করার উদ্যোগ নেয়নি। কয়েক মিনিট পরেই সেখানে থাকা পুলিশ ওই গ্রুপকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সবার দেখার জন্য এ বিষয়ে ভিজ্যুয়াল প্রমাণ আছে। ভিয়েনা কনভেনশনের অধীনে বিদেশি মিশন/পোস্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত। একই বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আবর্তিত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছে ভারত। জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন আমাদের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে আমাদের দৃঢ় উদ্বেগের কথা অবহিত করেছেন তারা। (দীপু চন্দ্র) দাসের বর্বর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানাই আমরা।

হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ নিয়ে দিল্লির দাবি প্রত্যাখ্যান ঢাকার: ওদিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শনিবার বাংলাদেশ হাইকমিশনের বাসভবনের সামনে সংঘটিত বিক্ষোভের ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত, অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘বিভ্রান্তিকর প্রচার’ চালানো হচ্ছে বলে ভারত যে দাবি করেছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না বলে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। রোববার সন্ধ্যায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্যের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এই প্রতিক্রিয়া জানায়। শনিবার রাতে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’র ব্যানারে বাংলাদেশের হাইকমিশনের সামনে এসে বিক্ষোভ করেছে একদল লোক। তারা প্রায় ২০ মিনিট ব্যানার নিয়ে বাংলাদেশ হাউসের সামনে অবস্থান করে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেয়। এ সময় ২০ থেকে ২৫ জনের ওই বিক্ষোভকারীরা ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকিও দেয়। এ বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালানো হচ্ছে বলে রোববার বিকালে দাবি করে ভারত। দিল্লিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ওই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ দূতাবাসের জন্য কোনো নিরাপত্তা ঝুঁঁকি তৈরি হয়নি।

ঢাকার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দুষ্কৃতকারীদের হাইকমিশনের সীমানার ঠিক বাইরে তাদের কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেয়া হয়। ফলে কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থানরত কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এ ধরনের একটি সংঘটিত কর্মসূচি সম্পর্কে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে আগাম কোনো তথ্য জানানো হয়নি। তবে আমরা ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা লক্ষ্য করেছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু দাসকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন হামলা’ উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘ভারত এ ঘটনাকে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। আমরা তাদের এমন প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করছি। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজনদের বাংলাদেশ সরকার দ্রুত গ্রেপ্তার করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সামপ্রদায়িক পরিস্থিতি ভালো। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এ অঞ্চলের সব সরকারেরই দায়িত্ব।

https://mzamin.com/uploads/news/main/195251_dut.webp