Friday, September 26, 2025

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে চাপে ফেলেছে মিত্রদের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া

গাজা যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বজুড়ে ওয়াশিংটনের প্রতি বাড়তে থাকা ক্ষোভ খোলাখুলি প্রকাশ পেল এ সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে বড় ধরনের চাপে ফেলল।

দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ দ্রুত বন্ধের উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু এখন ফিলিস্তিনের আবদ্ধ ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনারা আক্রমণ বাড়াচ্ছে, অথচ তিনি আঞ্চলিক ঘনিষ্ঠতম মিত্রকে রাশ টানতে বলতে চাইছেন না। তাঁকে ক্রমেই একজন নিছক দর্শক বলে মনে হচ্ছে।

এ মাসেই কাতারে হামাস নেতাদের ওপর হানা দিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে চমকে দিয়েছিলেন। হামলাটির কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের গাজায় যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির সর্বশেষ উদ্যোগটি প্রায় ভেস্তে যায়।

এরপর ইসরায়েল গাজা নগরীতে স্থল অভিযান শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র নির্বিবাদে তা মেনে নেয়, যদিও বিশ্ব গাজায় মানবিক সংকটকে ধিক্কার দিচ্ছে।

আর চলতি সপ্তাহে নাটকীয় কূটনৈতিক মোড় ঘুরে জাতিসংঘের অধিবেশনের আগে এবং চলাকালে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের এক দল মিত্র ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ট্রাম্প অবশ্য এই বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে এই স্বীকৃতি আদতে হামাসের জন্য একটি উপহার।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্রায়ান কাটুলিস বলেন, ‘ট্রাম্প অঞ্চলটিতে (মধ্যপ্রাচ্যে) কোনো বড় অগ্রগতি বা সাফল্য অর্জন করতে পারেননি, বিশেষ করে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ক্ষেত্রে। পরিস্থিতি ট্রাম্পের দায়িত্ব নেওয়ার সময়ের তুলনায় এখন আরও খারাপ হয়েছে।’

প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই সংঘাত বন্ধ হওয়া এখন অনেক দূরের কথা। আপাতদৃষ্টে ট্রাম্প গৌণ হয়ে গেছেন। দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তাঁর উচ্চারিত একটি দাবি আরও বেশি সন্দেহের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, তাঁর মতো দক্ষ মধ্যস্থতাকারী শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের দাবি রাখে।

গতকাল মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ট্রাম্প যদি সত্যিই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিততে চান, তবে তাঁকে গাজার যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। নিউইয়র্ক থেকে ফ্রান্সের বিএফএম টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাখোঁ বলেন, ‘ইসরায়েলকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য চাপ দেওয়ার ক্ষমতা শুধু ট্রাম্পেরই আছে। তিনি এ কাজটা আমাদের চেয়ে ভালো পারবেন। কারণ, গাজায় যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার অস্ত্র আমরা জোগাই না।’

কিছু বিশ্লেষকের মতে, নেতানিয়াহুকে চাপ দিতে ট্রাম্পের অনীহা আছে। কারণ, তিনি বোঝেন যে এ যুদ্ধ অনেক বেশি জটিল ও কঠিন।

আরেক দল বিশেষজ্ঞ বলছেন, এ অনীহা আসলে পরোক্ষে মেনে নেওয়া যে নেতানিয়াহু নিজের ও ইসরায়েলের স্বার্থের বিবেচনা থেকেই কাজ করবেন। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সেটা বদলাতে তেমন কিছু করতে পারবেন না।

এমন জল্পনাও আছে যে অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার কারণে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সেভাবে মন দিচ্ছেন না। রয়টার্স হোয়াইট হাউসের কাছে মন্তব্য চেয়েছিল। তাৎক্ষণিক সাড়া মেলেনি।

ইসরায়েলের হামলার মুখে গাজা উপত্যকার গাজা নগরী থেকে দক্ষিণ দিকে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উপত্যকার কেন্দ্রীয় জাওয়াইদা এলাকায় একটি ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেন অনেকে। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ইসরায়েলের হামলার মুখে গাজা উপত্যকার গাজা নগরী থেকে দক্ষিণ দিকে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উপত্যকার কেন্দ্রীয় জাওয়াইদা এলাকায় একটি ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেন অনেকে। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগের সহিংস আচরণ, সরকারের ব্যর্থতা ও নতুন সংঘাতের লক্ষণ by আসিফ বিন আলী

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সহিংসতা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও পৌঁছে গেছে অনেক আগেই। যে–ই বিরোধী পক্ষে থাকে, সে–ই প্রবাসে চেষ্টা করেছে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে ও ক্ষমতায় থাকা মানুষদের প্রবাসে হেনস্তা করতে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখলাম যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপসহ সবখানেই আওয়ামী লীগের (দেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সমর্থক দাবি করে এমন কিছু মানুষের সহিংস আচরণ।

সাম্প্রতিকতম ঘটনা হলো আমেরিকার নিউইয়র্কে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনা। প্রথম আলোর খবর নিশ্চিত করে যে এই হামলার সঙ্গে প্রবাসী আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরাই জড়িত ছিলেন। আখতার হোসেনের সঙ্গে ছিলেন সফরসঙ্গী হিসেবে আসা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-সদস্যসচিব তাসনিম জারা।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা এ সময় তাসনিম জারাকে কটূক্তি বা অশ্লীল মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুলও এই অশোভন আচরণ থেকে নিরাপদে ছিলেন না। তাঁরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান।

এই ঘটনা মোটেই নতুন নয়। আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিমানবন্দরে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে একদল আওয়ামী লীগ সমর্থক হেনস্তা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ওপর হামলার চেষ্টা করেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। ওই সময় হাইকমিশনের গাড়িতে মাহফুজ আছেন, এই সন্দেহে গাড়ির ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়। কয়েকজন গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের হস্তক্ষেপে তাঁদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

প্রথম আলো লন্ডন হাইকমিশনের বরাতে প্রতিবেদন করে, যাতে আমরা জানতে পারি ওই গাড়ির ভেতরে মাহফুজ আলম ছিলেন না। আওয়ামী লীগের ওই নেতা-কর্মীরা যে মাহফুজ আলমকেই টার্গেট করেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ খুব কমই আছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সফরেও মাহফুজ আলমকে হেনস্তার চেষ্টা করে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট ভবনের কাচের দরজা ভেঙে ফেলেন তাঁরা।

এই ঘটনাগুলো আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি করে। প্রথম প্রশ্ন, এই ঘটনার দায় কাদের? উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা সংগঠিতভাবে জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ও বিশেষ করে যাঁরা সরকারে আছেন, তাঁদের টার্গেট করে আগ্রাসী বিক্ষোভ করেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই সেটি সহিংস হয়েছে।

সরকারপন্থী কারও বিরুদ্ধে প্রবাসে বিক্ষোভ কি নতুন কিছু? যেমন ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে যখনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত সফর করেছেন, প্রতিবারই তাঁর অবস্থানস্থল, এয়ারপোর্ট ও অনুষ্ঠানস্থলের সামনে বিভিন্ন ধরনের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের বিএনপি মূলত এর আয়োজন করে।

বাংলাদেশি রাজনীতিতে প্রবাসে নেতাদের টার্গেট করে বিক্ষোভ বা লাঞ্ছনার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেটি আরও চরম পর্যায়ে চলে গেছে।

২০১৪, ২০১৮, ২০২৪–এর বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে অকেজো করে দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। যার প্রেক্ষিতে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ। এর নেতৃত্বও পালিয়ে গিয়ে বিদেশে আশ্রয় নেয়।

এই বিষয়ে সন্দেহ নেই যে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফেরত আসতে মরিয়া। তবে তারা যে প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ প্রবাসে নিজেদের একত্রিত করে সরকার ও জুলাই আন্দোলনের জড়িত ব্যক্তিদের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করে, তা বরং জনগণকে আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তোলে তাদের প্রতি। যদিও আওয়ামী লীগের বয়ানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’, কিন্তু সেই বয়ান দেশের মানুষের কাছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও অগ্রহণযোগ্য।

তাই আওয়ামী লীগ যদি মনে করে গায়ের জোরে ও সহিংসতা করে তারা রাজনীতিতে ফিরতে পারবে, তবে ভুল করবে। বিগত কয়েক মাসে তাদের প্রতি যদি কোনো সহানুভূতি তৈরি হয়েও থাকে, তবে এ ধরনের আচরণ মানুষের মধ্যে বিরক্তি ও ঘৃণার উদ্রেক করবে।

আওয়ামী লীগের বোঝা উচিত, জুলাই-আগস্ট মাসে যে হত্যাযজ্ঞের নেতৃত্ব তারা দিয়েছে, তার স্মৃতি মানুষের মন থেকে সহজে মুছে যাবে না। নিউইয়র্ক বা লন্ডনকে মঞ্চ বানিয়ে ক্ষমতা দেখিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বোঝানো হচ্ছে, তারা এখনো প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কিন্তু প্রতীকী এই প্রদর্শন জনগণের কাছে উল্টো নেতিবাচক বার্তা দেয়।

এখন আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, প্রবাসে আওয়ামী লীগের এসব সহিংস আচরণে সরকারের দায় কী? বিশেষ করে নিউইয়র্কে যে বিষয়টি ঘটেছে, তার দায় সরকার ও নিউইয়র্কের বাংলাদেশের কনস্যুলেট অফিস এড়াতে পারেন না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া ভিডিওগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে সেখানে প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী রাজনীতিবিদদের নিরাপত্তার অভাব ছিল। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এমন ধারণা করা ভুল নয় যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এমন কাজ করতে পারেন, তবে কেন সরকার ও নিউইয়র্ক কনস্যুলেট ঘটনার মোকাবিলার জন্য যথাসম্ভব পূর্বপরিকল্পনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলো?

অন্যদিকে এই হামলার ঘটনায় যে প্রতিক্রিয়া দেশের অভ্যন্তরে আমরা দেখছি, তা আশঙ্কাজনক। কেউ কেউ হামলাকারীদের ছবি শেয়ার করে তাদের পরিবারের ‘খোঁজ খবর’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

একজন লিখেছেন, নিউইয়র্কে সরকারি প্রোটোকলের দায়িত্বে থাকা কনস্যুলেট অফিসারদের একটি তালিকা চাই—প্রশ্ন উঠেছে, তাঁরা এই তালিকা নিয়ে কী করবেন; আইন কি নিজেদের হাতে নেবেন? তাঁদের রাগ ও ক্ষোভের উৎস আওয়ামী লীগের কর্মীদের অবিবেচক আচরণ।

সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় পারস্পরিক উগ্রতা (রেসিপ্রোক্যাল র‍্যাডিকালাইজেশন), যেখানে এক পক্ষের সহিংসতা অপর পক্ষকে আরও উত্তেজিত করে তোলে। কিন্তু এই উত্তেজনা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? আমরা কি আরও সহিংসতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

যুক্তরাষ্ট্র, লন্ডন কিংবা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা শুধু বাংলাদেশি রাজনীতির নোংরামির ধারাবাহিকতা নয়, বরং এগুলো দেখায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা এখন আর অভ্যন্তরীণ পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই, সেটা ট্রান্স-ন্যাশনালাজাইড হয়েছে।

এই মুহূর্তে বিবদমান পক্ষগুলো এই সহিংসতার মাধ্যমে প্রতীকী ক্ষমতার প্রদর্শন করছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ দেখাতে চাচ্ছে যে প্রবাসের মাটিতে তারা রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম রেখেছে। কিন্তু এতে লাভ কি আওয়ামী লীগের?

এতে করে তাদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ ও রাগ আর বাড়বে। এ ধরনের আচরণ দেশে থাকা আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতা-কর্মীদের আরও বিপদের মুখে ঠেলে দেবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বও যাঁরা প্রবাসে থেকে এসব কাজের ইন্ধন দিচ্ছেন, তাঁদের বোঝা উচিত, সহিংসতা করে, মানুষকে হেনস্তা করে জনসমর্থন পাওয়া যায় না।

প্রবাসী সম্প্রদায় প্রায়ই নিজ দেশের রাজনীতির সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করে।সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, ডায়াসপোরা রাজনীতি ‘হোমল্যান্ড পলিটিকস’ ও ‘হোস্টল্যান্ড পলিটিকস’-এর মাঝামাঝি এক অস্বস্তিকর অবস্থানে থাকে। এই অস্বস্তিকর অবস্থানে যদি নেতারা সহিংসতার উসকানি দেন, তবে তার রাজনৈতিক ফলাফল ভালো হয় না।

বাস্তবতা হলো প্রবাসী রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু বিদেশে অশান্তি তৈরি করবে না, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করবে। পাশাপাশি সরকার কূটনৈতিক পর্যায়ে নিরাপত্তাসংকট পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিদেশের মাটিতে দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তা ব্যর্থতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আরও উসকে দেবে।

* আসিফ বিন আলী, ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি
- মতামত লেখকের নিজস্ব

নিউইয়র্কের ঘটনায় জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ স্ট্রিট থেকে আটক করা হয় যুবলীগ কর্মী মিজানুর রহমানকে
নিউইয়র্কের ঘটনায় জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ স্ট্রিট থেকে আটক করা হয় যুবলীগ কর্মী মিজানুর রহমানকে। ছবি: তোফাজ্জল হোসেন

যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তান–চীনের ‘ত্রিভূজ প্রেম’: মিলনবিন্দু নাকি সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র by মুহাম্মদ আমির রানা

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে ৫০ কোটি ডলারের ঐতিহাসিক বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। একই সময়ে ওয়াশিংটন পাকিস্তানকে বিধ্বংসী বন্যার কারণে জরুরি সহায়তাও প্রদান করে। এটি একটি উদ্যোগ, যা অনেককে বিস্মিত করেছে, বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যত্র মানবিক প্রতিশ্রুতি কমিয়ে দিচ্ছে। এ সাহায্য প্যাকেজটি পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অতীতের উষ্ণ মুহূর্তগুলোর স্মৃতি ফিরিয়ে আনে; আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের সময় থেকে শুরু করে ৯/১১-পরবর্তী সময় পর্যন্ত, যখন ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের কেন্দ্রীয় অংশীদার হয়ে ওঠে।

সাম্প্রতিক সময়ে এ পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে পরীক্ষিত এ সম্পর্কটি অন্তত নিকট ভবিষ্যতে স্থিতিশীল থাকবে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কি এ সম্পর্ককে আরও টেকসই কিছুতে রূপ দিতে পারবে? অর্থনৈতিক সংযোগ একটি দিক হতে পারে। তবে আসল পরীক্ষা হবে ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটন এমন ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য তৈরি করতে পারে কি না, যা দীর্ঘস্থায়ী।

ইতিহাস দেখায়, এমন সমন্বয় গড়ে তুলতে কয়েক দশক সময় লাগে এবং তা ধরে রাখা আরও কঠিন। পাকিস্তানের চেয়ে এটি আর কেউ ভালো বোঝে না। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বহুবার উত্থান-পতন দেখেছে। আজ ভারতও ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাবের সঙ্গে নিজের প্রত্যাশার ভারসাম্য রাখতে একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

পাকিস্তানের জন্য অভ্যন্তরীণ শক্তিই প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার সবচেয়ে নির্ধারক উপাদান। আশাবাদীরা বলতে পারেন যে ইসলামাবাদ অবশেষে এসব অগ্রাধিকারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, যদিও প্রমাণ এখনো দুর্বল। লক্ষণীয় হলো, দুর্বল অর্থনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত বৈশ্বিক ভাবমূর্তি, ভঙ্গুর নিরাপত্তা ও হতাশাজনক সামাজিক সূচক থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান আশ্চর্যজনকভাবে এক অশান্ত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে। এর অনেকটাই ইসলামাবাদের নিজস্ব কৌশলের ফল নয়—বরং বহিরাগত ধাক্কা—ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংঘাত ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হয়েছে।

এসব ঘটনায় তৈরি হওয়া ঢেউ পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে সম্প্রতি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন কাতারে হামাসের ওপর ইসরায়েলের আক্রমণকে পাকিস্তানে ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের সঙ্গে তুলনা করলেন, সেটি ছিল বিপজ্জনক ও অপছন্দনীয় একটি তুলনা।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি ছিল মে মাসে ভারতের সঙ্গে

অচলাবস্থা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়া, যা আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারত। যদিও ভারত এখনো পুনর্বিন্যাস করছে। এটি প্রমাণ করে যে সীমিত কিন্তু সঠিক পদক্ষেপ পাকিস্তানের জন্য কিছুটা সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এ সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধায় রূপান্তর করা নির্ভর করবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ দৃঢ়তা ও সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর, বড় শক্তিগুলোর উদারতার ওপর নয়।

এমন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৫০ কোটি ডলারের খনিজ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় একসঙ্গে উপস্থিত ছিল—এমন একটি দৃশ্য চীনের কাছে জটিল বার্তা বয়ে এনেছে। বেইজিং ইতিমধ্যেই সিপিইসি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে পাকিস্তানে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সম্প্রতি চীন সফরে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী আরও ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, যখন চীন অনেক বড় অঙ্কে বিনিয়োগ করছে, তখন ইসলামাবাদ কেন তুলনামূলকভাবে ছোট একটি মার্কিন বিনিয়োগ নিয়ে এত উচ্ছ্বসিত?

বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে পাকিস্তানের পশ্চিমমুখী ঝোঁকের ইঙ্গিত হতে পারে, অন্যদিকে আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরির কৌশলও হতে পারে। তবে পাকিস্তানি নেতৃত্ব মনে করে, এটি মূলত বিশেষ বিনিয়োগ সহায়তা কাউন্সিলের সাফল্য, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য গঠিত হয়েছিল।

তবে বাস্তবতা কঠিন। বিদেশি বিনিয়োগ টেকসইভাবে আকর্ষণ করতে হলে পাকিস্তানকে প্রথমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নিরাপত্তাসংকট কাটিয়ে উঠতে হবে। নিরাপত্তা ইস্যুটি, বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিজেই পাকিস্তানে কর্মরত চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। একই খাতে মার্কিন বিনিয়োগ এলে চীনের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। তবে উল্টো দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা পাকিস্তানের নিরাপত্তাসংকট মোকাবিলায়ও সহায়ক হতে পারে।

ওয়াশিংটন ইতোমধ্যেই বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির মজিদ ব্রিগেডকে নিষিদ্ধ করেছে, যা বেলুচ বিদ্রোহীদের ওপর চাপ বাড়াবে। তবে এর ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে আফগানিস্তানের ভূমিকায়, যেখানে চীন কাবুলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র শাস্তিমূলক অবস্থান নিচ্ছে। এদিকে তালেবান নিজেরা আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে স্থায়ী শাসনের দাবিতে এগোচ্ছে, যা পাকিস্তানের জন্য সরাসরি হুমকি।

এ প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানে মার্কিন বিনিয়োগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দুই বৃহৎ শক্তি যখন একই সঙ্গে পাকিস্তানের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে জড়িত হয়, তখন তা ভবিষ্যতের কূটনৈতিক ভারসাম্যের দিক নির্ধারণ করবে; এটি একটি মিলনবিন্দু হবে, নাকি সংঘাতের ক্ষেত্র, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।

* মুহাম্মদ আমির রানা, নিরাপত্তাবিশ্লেষক
- ডন অনলাইন থেকে নেওয়া
- ইংরেজি থেকে অনুবাদ

যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তান–চীনের ‘ত্রিভূজ প্রেম’: মিলনবিন্দু নাকি সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র

ক্ষুধায় গাজার শিশুর মৃত্যু আর ইসরায়েলি টিভির রান্নার অনুষ্ঠান by গিডিয়ন লেভি

গাজায় জাতিগত নিধন অভিযান চালানোর ইসরায়েলি পরিকল্পনা দ্রুতগতিতেই এগোচ্ছে, হয়তো প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দ্রুত। পদ্ধতিগতভাবে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি চলছে গাজার মানুষকে সুচিন্তিতভাবে অনাহারে রাখা।

এই অনাহারে রাখার নীতির ফল দ্রুতই কার্যকর, কারণ ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে মৃত্যুর সংখ্যাটা বোমাবর্ষণে নিহত মানুষের সংখ্যার চেয়ে তেমন পিছিয়ে পড়ছে না। খাবারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় যেসব মানুষ মারা পড়েননি, তাঁদের তো অনাহারে প্রাণ ত্যাগ করার আশঙ্কা অনেক বেশি।

বলতেই হয় যে ইচ্ছা করে অনাহারে রাখার হাতিয়ারটা বেশ কাজ করছে। গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) তো একটা ট্র্যাজিক বা বিয়োগান্ত সাফল্যে রূপ নিয়েছে। শুধু জিএইচএফ বিতরণকৃত খাবারের থলে সংগ্রহের জন্য অপেক্ষারত শত শত গাজাবাসীই গুলিতে নিহত হননি, বরং যাঁরা খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে যেতে পারেননি, তাঁরাও অনাহারে মারা যাচ্ছেন। আর তাঁদের বেশির ভাগেই নবজাতক ও শিশু।

স্থানীয় গণমাধ্যম গাজার চিত্র ইসরায়েলি জনগণের কাছ থেকে আড়াল করে যে অপরাধ করেছে, তা কখনোই ভোলা হবে না বা ক্ষমা পাবে না। অথচ সারা দুনিয়া গাজার ছবিগুলো দেখছে। আর এসব ছবি মনে করিয়ে দিচ্ছে হলোকাস্টের ছবিগুলোর কথা। এগুলো লুকানোর মানেই হলো যা ঘটছে, তা অস্বীকার করা।

নবজাতক ও শিশুদের কঙ্কালসার দেহগুলোর কিছু জীবিত আর কিছু মৃত। এসব কঙ্কালসার দেহের হাড্ডিগুলো বেরিয়ে পড়েছে চিমসে যাওয়া মাংসপেশি ঠেলে, এ তো মরণেরই প্রতিচ্ছবি। এই দেহগুলো হাসপাতালের মেঝেতে বা খোলা বিছানায় পড়ে আছে বা গাধায় টানা গাড়িতে করে টেনে নেওয়া হচ্ছে। অথচ ইসরায়েলে বহু মানুষ এগুলো অস্বীকার করছে, সন্দেহ পোষণ করছে এসব ছবির সত্যতা নিয়ে। অনেকে আবার গর্বে উল্লসিত হচ্ছে।

গাজাবাসীকে সুচিন্তিতভাবে অনাহারে রাখার কাজটি ইসরায়েলিদের কাছে একটি বৈধ ও গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার বানিয়ে তোলা হচ্ছে হয় প্রকাশ্য সমর্থন, নয় শীতল নীরবতার মাধ্যমে। আর এটাই তো গাজায় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের এযাবৎকালের সবচেয়ে দানবীয় পর্যায়। পাশাপাশি এটাই হলো একমাত্র বিষয়, যার জন্য কেউ কোনো যৌক্তিকতা, অজুহাত বা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেনি। ইসরায়েলের প্রচার-প্রচারণা যন্ত্রের সীমাহীন প্রয়াস সত্ত্বেও তা সম্ভব হয়নি।

পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, অনাহার এখন সর্বত্র বিরাজমান, সবাই এতে আক্রান্ত। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাবাহিনীর (আইডিএফ) হামলায় এখনো গাজার যেসব সাংবাদিক মারা যাননি, তাঁরা জানাচ্ছেন যে দু–তিন দিন ধরে তাঁরা কিছু খেতে পাননি। নাসের হাসপাতালে একজন কানাডীয় চিকিৎসক বলেন, বিগত দুই দিনে তিনি কেবল এক বাটি ডাল খেয়েছেন। এ রকম অবস্থায় তাঁর পক্ষে আহত ও অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া আর সম্ভব হবে না।

আল-জাজিরার একটি দল এক তরুণকে অনুসরণ করে। তরুণটি তার বাচ্চাদের জন্য খাবারের খোঁজ করছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা দোকানে দুই ব্যাগ ইসরায়েলি আটা ও এক বোতল তেলও পেয়েছিল।

কিন্তু প্রতি ব্যাগের দাম কয়েক হাজার টাকা। বেচারা খালি হাতে ফিরে আসে তার অনাহারী বাচ্চাদের কাছে। এক টিভি স্টুডিও থেকে অনাহারে মৃত্যুর তিনটি ধাপের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো যে এই লোকের বাচ্চাগুলো দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে; মানে পরের ধাপে গেলে মৃত্যু অনিবার্য।

কোনো সন্দেহ নেই, এভাবে চাপিয়ে দেওয়া অনাহার চলমান যুদ্ধকে ইসরায়েলের সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধে পরিণত করেছে এবং অবশ্যই সবচেয়ে বড় অপরাধীতেও। আরও যে খারাপ কাজটি ইসরায়েল করছে, এই ভয়াবহ কাজকে চরম নির্লিপ্ততার সঙ্গে গ্রহণ করা।

কয়েক দিন আগে উসুফ আল-সাফাদি নামের এক নবজাতক মারা গেল তার মা-বাবা দুধের বিকল্প একটু কিছু জোগাড় করতে না পারায়। আর এ জায়গা থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার গাড়ি চালানো দূরত্বে ইসরায়েলি চ্যানেল টুয়েলভ একটি রান্নার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছিল। বলতেই হয়, অনুষ্ঠানটি চমৎকার রেটিং পেয়েছে!

গিডিয়ন লেভি, ইসরায়েলি সাংবাদিক। হারেৎজ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ

ফিলিস্তিনি মা সামাহ মাতার অপুষ্টিজনিত অসুস্থতায় ভোগা ছেলে ইউসেফকে কোলে ধরে রেখেছেন
ফিলিস্তিনি মা সামাহ মাতার অপুষ্টিজনিত অসুস্থতায় ভোগা ছেলে ইউসেফকে কোলে ধরে রেখেছেন, ফাইল ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তান-সৌদি আরব চুক্তি মুসলিমদের যৌথ ‘সুপারপাওয়ার’: সানাউল্লাহ

নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান-সৌদি আরব সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহর মতে এই চুক্তি মুসলিম ঐক্যের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের প্রতীক। জিও নিউজের অনুষ্ঠান ‘জিরগা’তে সানাউল্লাহ বলেন, এই চুক্তি দুটি বড় শক্তিকে একত্রিত করেছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক সামর্থ্য ও সৌদি আরবের অর্থনৈতিক প্রভাবের ফলে এটা এক ধরনের সম্ভাব্য ‘সুপারপাওয়ার’ অবস্থান তৈরি করছে। তিনি চুক্তিটিকে মুসলিম বিশ্বের জন্য শুভ লক্ষণ বলে বর্ণনা করেন। রানা সানাউল্লাহ জানান, এতে প্রতিরক্ষা উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অন্তর্ভুক্ত আছে। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের ওপর কোনো আক্রমণ হলে তা সৌদি আরবের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে এবং সৌদি আরবের ওপর আক্রমণ হলে তা পাকিস্তানের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা চুক্তির কৌশলগত গভীরতাকে তুলে ধরে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আরও জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তান সবসময় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান ধরে রেখেছে। তিনি বলেন, আমাদের অবস্থান সবসময় স্পষ্ট। আমরা কখনো আগ্রাসন শুরু করি না। যদি ভারত আক্রমণ করে, আমরা জবাব দেব। এ কথা উল্লেখ করে অতীতের সংঘাতে পাকিস্তানের শক্ত প্রতিক্রিয়ার কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের অবস্থান সবসময় প্রতিরক্ষামূলক ছিল।

সানাউল্লাহ ইঙ্গিত দেন যে, এই চুক্তি ন্যাটোর বাইরে নজিরবিহীন এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেরও কোনো আপত্তি থাকবে না। তিনি আরও বলেন, এই চুক্তি পাকিস্তানের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে। কারণ অন্যান্য দেশ এখন ক্রমবর্ধমানভাবে প্রতিরক্ষায় পাকিস্তানের সহায়তা চাইছে। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, কাশ্মীর সমস্যা সমাধান এখন ভারতের জন্য প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) নেতৃত্বকে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানান।

এর একদিন আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাষ্ট্রদূত শফকত আলী খান পরিষ্কার করেন যে, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নয়। শুক্রবার সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিং-এ খান বলেন, উভয় দেশের নেতৃত্ব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রিয়াদ ও ইসলামাবাদ ১৭ই সেপ্টেম্বর এই পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা কয়েক দশকের পুরনো নিরাপত্তা অংশীদারিত্বকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করেছে, কাতারে ইসরাইলের হামলার এক সপ্তাহ পর যা অঞ্চলের কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশকে ওলটপালট করে দেয়।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন মানে উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে গণ্য হবে। ইসলামের পবিত্রতম স্থানের ভূমি সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের কয়েক দশকের পুরনো জোট যৌথ বিশ্বাস, কৌশলগত স্বার্থ ও অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র যোগ করেন যে, সফর চলাকালে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ের আলোচনা হয়েছে এবং উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল এতে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান ও সৌদি আরব ভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতার একটি অনন্য বন্ধনে আবদ্ধ, এবং পাকিস্তানি জনগণ দুই পবিত্র মসজিদের ভূমির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে।

তিনি আরও জানান, ১৯৬০-এর দশক থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে রয়েছে এবং দুই নেতা এই সম্পর্ক আরও জোরদার করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি বলেন, উভয় পক্ষ তাদের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক পর্যালোচনা করেছে এবং পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো নিয়ে মতবিনিময় করেছে।

তার মতে, এই চুক্তি দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও যৌথ নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, চুক্তির আওতায় এক দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন অন্য দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি কয়েক দশকের দৃঢ় অংশীদারিত্বকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যা আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

mzamin

ইরান চাইছে আধুনিক যুদ্ধবিমান, চীনের সামনে বাধা অনেক… by মুহাম্মদ শোয়াইব

ইরানের যুদ্ধ-পরবর্তী বিজয় উদ্‌যাপন হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু দেশটির শাসকদের উদ্বেগ এখনো কাটেনি। গত মাসের ঘটনাপ্রবাহ ইরানের বৃহত্তর কৌশলগত সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখন চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করছে। গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যাচ্ছে, ইরান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটার জন্য চীনের দিকে ঝোঁকার পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশেষ করে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা কাটাতে চীনের ওপর ভরসা করতে চাইছে ইরান।

কিন্তু ইরান-চীন প্রতিরক্ষাসহায়তা কয়েকটি কারণে কঠিন। এর মধ্যে ইরানের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ রয়েছে।

যদি অতীতের দিকে তাকানো যায়, তাহলে ১৯৭৯ সাল–পরবর্তী ইরানের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—বিমানবাহিনীর সক্ষমতার অবনতি, সমান্তরাল সামরিক কাঠামো সৃষ্টি ও অস্ত্র সংগ্রহে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা।

ইরানের বিমানবাহিনীর সক্ষমতার অবনতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একসময় ইরানের বিমানবাহিনী এশিয়ার অন্যতম সেরা বাহিনী ছিল। ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরান নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছিল। ১৯৮০ সালে অপারেশন কামান-৯৯ ও ১৯৮৩ সালে অপারেশন এইচ-৩ অভিযানে ইরানি বিমানবাহিনী ইরাকি বোমারু বিমানের বহরের বিপুল ক্ষতি করেছিল। শত্রুপক্ষের পাল্টা আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এসব অর্জনের কোনোটিই ইরানের বিমানবাহিনীর পতন ঠেকাতে পারেনি।

বছরের পর বছর ধরে অবহেলার কারণে ইরানের বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো (এফ-৪ ফ্যান্টম, এফ-৫, এফ-১৪ টমক্যাট, চীনা এফ-৭ এবং এসইউ-২৪ ফেন্সার) আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর (এফ-৩৫, এফ-১৫ এবং এফ-১৬) সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রস্তুতিহীনতা দেখা গেছে। ইরান প্রচার করে এসেছে যে দেশটি শুধু রাশিয়ায় নির্মিত এস-৩০০ বা টর-এম মিসাইল ব্যাটারির মতো ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে, তা-ই নয়; বরং নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বাভার ও খোরদাদের মতো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেও কৌশলগত দক্ষতা অর্জন করেছে। কিন্তু এসব প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কোনোটিই ইসরায়েলকে ইরানি আকাশসীমায় প্রবেশ থেকে বিরত রাখতে পারেনি কিংবা সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোকে সুরক্ষা দিতে পারেনি।

এ দুর্বলতার কারণে তেহরানের পক্ষে ইসরায়েলের ওপর পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে সীমিত করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েল দাবি করেছে যে তারা ইরানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যান ধ্বংস করে দিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হামলার যে চিত্র প্রকাশ করেছে তাতে দেখা গেছে, দেশটির বিমানবাহিনী খুব সহজেই ইরানের উৎক্ষেপণ যানগুলো ধ্বংস করতে পেরেছে।

এ সমস্যার মূল কারণ হলো ইরানে সমান্তরাল সামরিক কাঠামো গঠন। ইসলামি বিপ্লবের পর শাসকেরা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে গিয়ে একটি সমান্তরাল সামরিক কাঠামো তৈরি করেন। ফলে সদ্য গঠিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) প্রচলিত সামরিক বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়। শাসকগোষ্ঠীর বাহিনী হিসেবে আইআরজিসি দ্রুতই সম্পদ, কৌশল ও সামরিক সরঞ্জামের দিক থেকে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

আরজিসির কৌশলগত উইং ইরানের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি তদারকির দায়িত্বে আছে। আর আরজিসির বিমান শাখা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে। দুটি সমান্তরাল বিমানবাহিনী থাকলে সমস্যা কতটা, কীভাবে জটিল আকার ধারণ করে, তা গত জুনে স্পষ্ট হয়েছে। ইসরায়েলের বিমানবাহিনী খুব দ্রুত ইরানের আকাশসীমায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলে।

১২ দিনের যুদ্ধে যে বিষয় খোলাসা হয়েছে, সেটা হলো বছরের পর বছর ধরে চলা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইরানকে কতটা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছে। একই সঙ্গে তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা যে ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার প্রভাবও স্পষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত ছিল অস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংঘাতে (যেমন উপসাগরীয় যুদ্ধ, আর্মেনিয়া, ইউক্রেন ও ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে) রুশ সামরিক সরঞ্জামগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান ভুগেছে। কারণ, রাশিয়া প্রতিশ্রুত অস্ত্র সময়মতো সরবরাহ করতে পারেনি। বহু বছর ধরে বিশ্লেষকেরা বলে আসছিলেন, ইরান রাশিয়া থেকে এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাবে। বাস্তবে তারা পেয়েছে কেবল ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান, কিন্তু এসইউ-৩৫ কখনোই আসেনি। যুদ্ধ চলাকালে ইরানের রুশ সামরিক প্ল্যাটফর্মগুলোর কোনোটিতেই ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ ক্ষেপণাস্ত্র সচল করা সম্ভব হয়নি। একটি মাত্র স্কোয়াড্রন হয়তো সামরিকভাবে তেমন পার্থক্য আনতে পারত না, কিন্তু ইরানি বাহিনীর মনোবলের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ (ইরানের কৌশলবিদেরা সেটা পর্যবেক্ষণ করেছেন) থেকে দেখা যাচ্ছে, যন্ত্রাংশের ধারাবাহিক সরবরাহ এবং রিয়েল টাইমে (সঙ্গে সঙ্গে) স্যাটেলাইট উপাত্তে প্রবেশাধিকার বিমান যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া যখন সময়মতো উন্নত প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে, তখন অংশীদার হিসেবে চীনের প্রতি আস্থাশীল হওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে হাজির হয়েছে।

এ কারণেই ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব চীনকে একটি যুক্তিসংগত বিকল্প হিসেবে ভাবছেন। কেননা, ইরান এমন একটি কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে, যে দেশ হবে নির্ভরযোগ্য, সময়মতো যন্ত্রাংশ সরবরাহ করবে, উন্নত প্রযুক্তি দেবে ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে প্রবেশাধিকার প্রদান করবে। সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, ইরান চীন থেকে উন্নত প্রযুক্তির চীনা এসএএমএস, এইডব্লিউএসিএস বিমান ও যুদ্ধবিমান কেনার কথা চিন্তা করছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, চীন কি ইরানকে সাহায্য করতে পারবে? হ্যাঁ, সেটা চীন পারবে। কিন্তু চীন ও ইরান—দুই দেশের জন্যই এ ক্ষেত্রে রয়েছে জটিল ও কঠিন চ্যালেঞ্জ। চীনের রয়েছে আধুনিক গবেষণা, অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম উন্নত করার একটা জৈবব্যবস্থা। বিশাল একটি শিল্প সক্ষমতা। দেশটি স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম সরবরাহে সক্ষম। রাশিয়া, ফ্রান্স, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায়ও চীনের সক্ষমতা বেশি। চীন তার অংশীদারকে (যেমন পাকিস্তান) এমন ধরনের বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দেয়, যেটি আধুনিক যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেয়। একটি পূর্ণাঙ্গ কিল-চেইন (লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা থেকে শুরু করে ধ্বংস করা) সরবরাহ করে, যেটি আধুনিক আকাশযুদ্ধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের জন্য এমন কিছু করতে গেলে চীনের বেশ কিছু দিক সামলাতে হবে। প্রথমত, ইরানের কাছে উন্নত প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হস্তান্তর করলে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হবে। দ্বিতীয়ত, চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঝুঁকি তৈরি হবে। তৃতীয়ত, চীনের প্রযুক্তি এখন বৈশ্বিক নজর কাড়ছে। ফলে ইরানের কাছে উন্নত ব্যবস্থা হস্তান্তর চীনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

চীন যদি ঝুঁকি নিয়ে উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তর করেও তারপরও নতুন প্রযুক্তি আত্তীকরণের সময়টাতে ইরান সেগুলোর সুরক্ষা দিতে পারবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আকাশযুদ্ধের জন্য ইরানের কাছে তৃতীয় প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ও প্রযুক্তি আছে। ইরানকে ৪ দশমিক ৫ বা পঞ্চম প্রজন্মের প্রযুক্তি আত্তীকরণ করতে হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্য ইরানের সেটা করা অসম্ভব।

ইরানের সামনে নিজের ঘর গোছানো ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু এ জন্য দেশের ভেতরে ও বাইরে—দুই দিক থেকেই কয়েক বছরের জন্য শান্তি দরকার ইরানের। ইসরায়েল সেটা হতে দেবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

* মুহাম্মদ শোয়াইব, কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামাবাদের একজন সহকারী অধ্যাপক
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ভারত–পাকিস্তান সংঘাতের সময় ভারতের যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়
ভারত–পাকিস্তান সংঘাতের সময় ভারতের যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়। ছবি : এএফপি