Monday, July 27, 2015

ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল কালাম মারা গেছেন

ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট, বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালাম মারা গেছেন। আজ রাতে তিনি শিলংয়ে মারা যান।  তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট ইন শিলংয়ে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি অকস্মাৎ অচেতন হয়ে পড়ে যান। তাকে দ্রুততার সঙ্গে বিথানি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয় তাকে। রাখা হয় হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউতে)। তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকরা তৎপর হয়ে ওঠেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে পারেন নি তারা। চিকিৎসকরা বলেছেন  তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন।  ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, । এতে বলা হয়, খাসি হিলসের এসপি এম খারক্রাং এ কথার সত্যতা স্বীকার করেছেন।  মহত এই ব্যক্তিত্ব ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩১ সালের ১৫ই অক্টোবর রামেশ্বরমে তার জন্ম। ১৯৯৮ সালে পোখরান-২ নিউক্লিয়ার যে পরীক্ষা চালানো হয় তাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করেন। এর আগে ১৯৭৪ সালে প্রথম ভারতে এ পরীক্ষা করা হয়েছিল। তিনি ভারতে দ্য মিসাইল ম্যান নামেও বেশি পরিচিত। তার অসাধারণ অর্জনের জন্য ভারত সরকার তাকে পদ্ম ভ’ষণ ও ভারত রত্ন সম্মানে ভ’ষিত করে। এরপর ২০০২ সালে তিনি ১১তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব নির্বাচন করুন -সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিকতর যোগ্য, দক্ষ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের উচ্চতর পদে পদোন্নতি দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছেন। সেনা সদর দপ্তরে গতকাল রোববার সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ-২০১৫-এ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দেন। খবর বাসসের।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনাদের সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার-বিশ্লেষণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, দেশপ্রেমিক যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে বের করতে হবে। সেনাবাহিনীতে যাঁরা নেতৃত্ব দেবেন, তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই যে আপনারা অধীনস্থদের প্রতি যত্নবান হবেন।’
প্রতিরক্ষা সচিব কাজী হাবিবুল আওয়াল, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম অন্যান্যের মধ্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আদর্শগতভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সামরিক বাহিনীর জন্য মৌলিক ও মুখ্য বিষয়। এটি আপনাদের সব সময় লক্ষ রাখতে হবে, যাতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেশপ্রেমিক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কর্মকর্তাদের হাতে ন্যস্ত হয়।’
প্রধানমন্ত্রী উচ্চ পদে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, সততা, বিশ্বস্ততা ও আনুগত্য এবং নেতৃত্বের যোগ্যতাকে বিবেচনায় নিতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, উপযুক্ত ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমেই যেকোনো বিজয় বা সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
শৃঙ্খলাকে একটি সুসংগঠিত বাহিনীর মেরুদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পদোন্নতির প্রশ্নে শৃঙ্খলার বিষয়টি অন্য কোনো গুণাবলির সঙ্গে তুলনীয় নয়। এ জন্য শৃঙ্খলার সঙ্গে কোনো প্রকার আপস অবশ্যই বর্জন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী পদোন্নতির জন্য জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাসহ জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদানকেও মূল্যায়নের পরামর্শ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে তাঁর সরকার সেনাবাহিনীর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে অনেকগুলো ইউনিট গঠন এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং, বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টার ও এনসিও’স একাডেমির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠা করেছে।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, বর্তমান সরকার সেনাবাহিনীকে আরও কার্যক্ষম ও যুগোপযোগী করতে অত্যাধুনিক মেইন ব্যাটেল ট্যাংক, সেলফ প্রোপেল্ড গান সিস্টেম, রাডার, এন্টি ট্যাংক গাইডেড উইপন, মাল্টিপল লঞ্চড রকেট সিস্টেম, আর্মাড পার্সোনেল ক্যারিয়ার, ইউটিলিটি বিমান ছাড়াও সিগন্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের জন্য অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ক্রয় করেছে।
ঢাকা সেনানিবাসের সেনাসদর কনফারেন্স হলে গতকাল সেনাসদর নির্বাচনী পর্ষদ ২০১৫-এর অনুষ্ঠানের ফটোসেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা l ছবি: ফোকাস বাংলা

বিচার মাটিচাপা দিল পুলিশ

নৃশংস গণপিটুনি l ফাইল ছবি
মিলন হত্যার চার বছর
২০১১ সালের ২৭ জুলাই কোম্পানীগঞ্জের চর কাঁকড়া ইউনিয়নের ঘটনা। কিশোর মিলনকে ডাকাত সাজিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মামলা না চালাতে চাপ, প্রলোভন, ৫২ বার আদালত থেকে সময় নিয়ে তদন্ত দীর্ঘায়িত করা। অবশেষে পাঁচ লাখ টাকায় রফা এবং পুলিশের কাছে বাদীর হার, একদিকে ছিল মামলা না চালানোর জন্য চাপ, অন্যদিকে ছিল প্রলোভন। একই সঙ্গে চলছিল তদন্ত বিলম্বিত করার কৌশল। ৫২ বার আদালত থেকে সময় নিয়ে তদন্ত দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। চার বছরের মাথায় অসহায় বাদী শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে পুলিশের কাছে হার মেনেছেন। পাঁচ লাখ টাকায় রফা করে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের কিশোর শামছুদ্দিন মিলন হত্যা মামলাটি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনের নামে আপাতত মাটিচাপা দিতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।
মিলন
২০১১ সালের ২৭ জুলাই কোম্পানীগঞ্জের চর কাঁকড়া ইউনিয়নের নিরীহ কিশোর মিলনকে (১৬) ডাকাত সাজিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ গাড়িতে করে এনে উন্মত্ত জনতার হাতে ছোট্ট এই কিশোরকে ছেড়ে দেয়। সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। পুলিশের গাড়ি থেকে তাকে নামিয়ে দেওয়াসহ পুরো ঘটনাটির ভিডিওচিত্র প্রকাশিত হলে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষ।
১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া, মিলনের ছোট ভাইকে পুলিশে চাকরি দেওয়া এবং বাবাকে বৈধভাবে বিদেশে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের কিশোর শামছুদ্দিন মিলন হত্যা মামলা চালানো থেকে তাঁর পরিবারকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছে স্থানীয় পুলিশ। তাদের পরামর্শে গত ২৪ ডিসেম্বর মিলনের মা মামলার বাদী কোহিনুর বেগম আদালতে ‘এজাহারনামীয় ও সন্দিগ্ধ ধৃত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নাই; আসামিরা অভিযোগের দায় হইতে মুক্তি পাইতে ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে কোনো আপত্তি নাই ও থাকিবে না’ মর্মে আবেদন করেন। এরপর মিলনের বাবাকে দেওয়া হয় পাঁচ লাখ টাকা। তারপর দ্রুতই মামলা ‘গুছিয়ে ফেলে’ পুলিশ।
টেনে–হিচড়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য
কেন এমন আবেদন করলেন জানতে চাইলে মিলনের মা কোহিনুর বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাড়ে তিন বছর ধরে বিচারের আশায় আদালতের বারান্দায় ঘুরেছি। ডিবি পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা বলে কোর্ট থেকে ডিবি পুলিশ ৫২ বার সময় নিয়েও তা দেয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আদালত আর ডিবি পুলিশের কাছে যাতায়াত করতে করতে আরও নিঃস্ব হয়েছি। তাঁরা (পুলিশ) এবং অন্য লোকজনও মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য সব সময় চাপ দিয়ে আসছে।’
কোহিনুর বেগম বলেন, মিলনের বাবা বিদেশ থেকে চলে আসায় সংসারে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় মিলনের ছোট ভাই সালাউদ্দিনকে পুলিশে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন বর্তমানে কোম্পানীগঞ্জ থানায় কর্মরত এসআই মো. রবিউল। এসব কারণে তিনি মামলা নিষ্পত্তিতে রাজি হন। তবে আদালতে দাখিল করা আবেদনটিও পুলিশের লোকজন ঠিক করে দিয়েছেন।
চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের মাধ্যমে মামলটি নিষ্পত্তির আগে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে সন্দেহভাজন কোম্পানীগঞ্জ থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আকরাম উদ্দিন শেখ পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন মিলনের বাবাকে। প্রায় তিন মাস আগে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ওরফে বাদলের মাধ্যমে ওই টাকা দেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার সময় কোম্পানীগঞ্জ থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে বাগেরহাটের ফকিরহাট থানায় কর্মরত এসআই আকরাম উদ্দিন শেখ মামলা নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মিলনের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন প্রথম আলোর কাছে। তিনি বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, এখন আর কী করা।’
মিলন হত্যার মতো একটি চাঞ্চল্যকর মামলা টাকার বিনিময়ে নিষ্পত্তি করা হলো কেন—জানতে চাইলে চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিলনের বাবার পাগলামির জন্যই এটি হয়েছে। বাড়িতে ঘর করতে তিনি মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে টাকা নিয়ে দিতে বারবার আমার কাছে আসেন। একপর্যায়ে এসআই আকরামকে বললে তিনি রাজি হন।’
তবে মিলনের বাবা গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, এসআই আকরাম শেখ তাঁকে দফায় দফায় ফোন করে ‘বেয়াই’ সম্বোধন করেন। তাঁকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এবং বৈধভাবে আবার বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। এসআই আকরামই তাঁকে প্রায় দেড় বছর আগে সৌদি আরব থেকে দেশে আনেন বলে জানান তিনি।
মিলনের বাবা এ-ও বলেন, দেশে আসার পর সংসারে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি বাড়িতে অন্যের জায়গায় যে বসতঘর ছিল, তারাও তা সরিয়ে নিতে চাপ দিতে থাকে। এ অবস্থায় তিনিও টাকা নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় দেখছিলেন না। তাই বাধ্য হয়ে মামলা নিষ্পত্তিতে রাজি হন।
তবে গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ করেন, এসআই আকরাম শেখ মামলা নিষ্পত্তির কথা বলে তাঁকে দেশে এনেও প্রতারণা করেছেন। ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে পরে আট লাখ, তারপর সাত লাখ; শেষে পাঁচ লাখ টাকার বেশি দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। উপায় না দেখে তিনি পাঁচ লাখ টাকাতেই রাজি হন। তিন মাস আগে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী গিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসেন।
মিলনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে উন্মত্ত
জনতার হাতে তুলে দেয় পুলিশ
কোহিনুর বেগম ও গিয়াস উদ্দিন দুজনেরই একই আক্ষেপ, ‘বছরের পর বছর আদালতে ও ডিবি কার্যালয়ে ঘুরেও ছেলে হত্যার বিচার পাইনি। নিজে আরও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। দুনিয়ার আদালতে বিচার পাইনি, আল্লাহর কাছে এর বিচার চাই।’
মামলাটির সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা নোয়াখালী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-ডিবি) মো. আতাউর রহমান ভূঁইয়া চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের ২ নম্বর আমলি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। জানতে চাইলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা নিশ্চিত করেন আতাউর রহমান। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এ রকম আলোচিত একটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম আশরাফুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় এবং আদালতে বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হবে।
আদালতে দাখিল করা ছয় পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ডিবির ওসি মো. আতাউর রহমান উল্লেখ করেন, ‘তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে এজাহারে বর্ণিত ঘটনা সত্য বলিয়া প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হইলেও কে বা কাহারা উক্ত ঘটনা করিয়াছে, উহা প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত সুনির্দিষ্ট কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় ভবিষ্যতে মামলা প্রমাণ করার মতো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা সাপেক্ষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হইল। এবং প্রথম পৃষ্ঠায় বর্ণিত আসামি ও পুলিশ সদস্যদের অত্র মামলার দায় হইতে অব্যাহতির আবেদন করছি।’
অথচ চূড়ান্ত প্রতিবেদনেই গ্রেপ্তার আসামি শাহ আলমের ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং চর কাঁকড়া ইউনিয়নের চারজন চৌকিদারসহ আরও তিনজন আসামি তদন্তকারী কর্মকর্তার সামনে ভিডিও চিত্র দেখে হত্যার ঘটনায় জড়িত হিসেবে যে চারজন পুলিশ সদস্যসহ ৩২ জনকে চিহ্নিত করেছেন, তাঁদের নাম উল্লেখ করা আছে।
এ ছাড়া ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসন অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তসহ কিছু বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়। কিছুদিন পরে অবশ্য তাঁরা সবাই স্বীয় পদ ফিরে পান।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ইন্সপেক্টর রফিক উল্লা বর্তমানে বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), এসআই আকরাম উদ্দিন শেখ বাগেরহাটের ফকিরহাট থানায়, হেমারঞ্জন নিঝুম দ্বীপ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে এবং আবদুর রহিম চৌমুহনী পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত আছেন।
জেলা জজ আদালতের সরকারি আইন কর্মকর্তা (পিপি) এ টি এম মহিব উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার আসামির ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দি, ভিডিও চিত্রে আসামিরা চিহ্নিত হওয়া এবং তাঁদের নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হওয়ার পরও সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না বলে যেসব কথা বলা হয়েছে, তা তদন্তকারী কর্মকর্তার ব্যর্থতা। তাঁরা ইচ্ছা করেই এটা করেছেন।
সব জেনেও কেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে পিপি মহিব উল্যাহ বলেন, ‘পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে সবকিছু চূড়ান্ত করেই আমার কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। তখন আমি উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মিলনের বাবা-মাকে ডেকে আনি। তাঁদের মামলায় সব রকম আইনি সহায়তা দেওয়ার আশ্বাসও দিই। কিন্তু তাঁদের আর মামলা চালাতে রাজি করাতে পারিনি। তাই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পক্ষে মত দিয়েছি।’
বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ফৌজদারি মামলা হয় রাষ্ট্র বনাম অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে। এখানে পরিবার সাক্ষী ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ পরিবারের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র লিখে নেওয়ার কোনো ভিত্তি নেই, আইনে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তদন্তের নামে পুলিশ যা করেছে, সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পুলিশের কাজ দোষীকে চিহ্নিত করা। তারা সেটা না করে উল্টো দোষী ব্যক্তিদের রক্ষা করেছে। যারা এ কাজ করেছে, তাদের অদক্ষতা ও অসততার অভিযোগে অবিলম্বে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া উচিত।

ফেনীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, নতুন এলাকা প্লাবিত

ফেনীর ফুলগাজী বাজার এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে
ফেনীর ফুলগাজী বাজার এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে
ফেনীর ফুলগাজী বাজার এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে
ফেনীর ফুলগাজীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আর সদর ও দাগনভূঞা উপজেলায় প্লাবিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। পৌরসভার শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক এক থেকে দেড় ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে।
মুহুরী ও কহুয়া নদীর বেড়িবাঁধের পাঁচটি ভাঙন স্থান দিয়ে বন্যার পানি ফুলগাজী বাজার ও আশপাশের গ্রামে ঢুকে পড়েছে। ফেনী-পরশুরাম সড়কে ফুলগাজী বাজার অংশ দুই ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে অধিকাংশ দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়েছে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রমজান আলী প্রামাণিক বলেন, গতকাল রোববার রাত থেকে ফুলগাজীতে মুহুরী ও কহুয়া নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। আজ সোমবার সকাল থেকে দুটি নদীতে পানি বিপৎ​সীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং পানির প্রবাহ বেড়েই চলেছে।
সদর ও দাগনভূঞা উপজেলায় নতুন নতুন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সদর উপজেলার শর্শদি ইউনিয়নের দক্ষিণ আবুপুর, উত্তর আবুপুর, উত্তর খানেবাড়ী, দক্ষিণ খানেবাড়ী ও পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের জগৈরগাঁও ও এলাহিগঞ্জ গ্রামের সব সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের মোহরবাগ, কশুল্যা, রঘুনাথপুর, গোতমখালী, সেকান্দরপুর, নারায়ণপুর, শরিফপুর ও কৈখালী, রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর, রাজাপুর ঘোনা, জয় নারায়ণপুর, বক্তারপুর, গনিপুর, শিবপুর, জায়লস্কর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর, ওমরপুর, সোনাপুর, খুশিপুর, জায়লস্কর, বারাহিগনি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এতে আমনের বীজতলা, আউশ ধান ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব অঞ্চলের মৎস্য খামার ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানিয়েছে, ফেনীতে ৬৫৭ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৬০৫ হেক্টর আউশ ধানের ফসল ও ৫০ হেক্টর জমির সবজি পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফেনী পৌর এলাকার শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক, জয়নুল হক সড়ক (হায়দার ক্লিনিক), শান্তি কোম্পানি সড়ক, নাজির রোড, একাডেমি হাসপাতাল সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক বৃষ্টির পানিতে এক থেকে দেড় ফুট তলিয়ে গেছে।

স্বাধীনতার চেতনা ফিরিয়ে আনতে হবে by কুলদীপ নায়ার

সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার
বিস্ময়কর হলেও ব্যাপারটা সত্য যে ইন্দিরা গান্ধী ভারতে যে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন, তার বিরোধিতা করেছিল তখনকার জনসংঘ যা এখন বিজেপি এবং শিখদের আকালি দলের মতো সংকীর্ণমনা রাজনৈতিক শক্তিগুলো। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিসহ ধর্মনিরপেক্ষ অন্য দলগুলো বিনা প্রতিবাদে ইন্দিরা গান্ধীর কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন মেনে নিয়েছিল। মার্ক্সবাদীরা এতে অখুশি হলেও নিশ্চুপ ছিল।
মনে হতে পারে, ৪০ বছর অনেক লম্বা সময়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর ভারতে যে জঙ্গলের রাজ কায়েম হয়েছিল, সেই স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য ৪০ বছর অত দীর্ঘ সময় নয়। বর্তমান কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচনের সময় সরকারি সুবিধা ব্যবহার করার কারণে এলাহাবাদ হাইকোর্ট তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করেছিলেন। তখন তাঁর পদত্যাগ করা উচিত ছিল। আবার সর্বোচ্চ আদালতের অবকাশকালীন বিচারক সে রায়ে স্থগিতাদেশ দিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে রেহাই দিয়েছিলেন।
তারপরও ইন্দিরা গান্ধী চূড়ান্ত ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না। আবার রায়ের পর নাকি এমন একটা সময় ছিল, যখন তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত সময়ের জন্য পদত্যাগ করে জগজ্জীবন রাম বা তৎকালীন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কমলাপতি ত্রিপাঠিকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তাঁর ছেলে সঞ্জয় গান্ধী, যিনি পরবর্তীকালে সংবিধানবহির্ভূতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, এমনকি সরকারও চালিয়েছেন, তিনি তাঁর মায়ের দুর্বলতা সম্পর্কে জানতেন। তিনি তখন হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী বংশী লালের সহায়তায় একদল লোক ভাড়া করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে তাদের দিয়ে মিছিল করিয়েছিলেন। এতে ইন্দিরার মধ্যে প্রকৃত অর্থেই এই প্রত্যয় সৃষ্টি হয় যে মানুষ তাঁকে চায়, শুধু রাজনীতিকদের একটি অসন্তুষ্ট অংশ তাঁর বিরুদ্ধে। তারপর থেকে ইন্দিরা সঞ্জয়ের ওপর চূড়ান্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবনের সূত্রে জানা যায়, তিনি সঞ্জয় গান্ধীর সঙ্গে একান্তে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন। সে সময় তিনি রাজীব গান্ধীকে উপেক্ষা করতেন। তিনি ভাবতেন, রাজীব রাজনীতিবিমুখ। আবার এটাও সত্য, রাজনীতিতে রাজীবের আগ্রহ খুব কমই ছিল। তিনি বিমান চালনায় উৎকর্ষ অর্জন করেছিলেন। রাজীব তখন ভারতের একমাত্র অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল কোম্পানি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের সবচেয়ে দক্ষ পাইলট। এটা একটা ভিন্ন বিষয় যে ইন্দিরা গান্ধী রাজীবের ওপর রাজনীতি চাপিয়ে দেন আর রাজীব, তার বদলে নিজের প্রধানমন্ত্রিত্ব চাপিয়ে দেন জনগণের ওপর।
তখন গণমাধ্যমের ভূমিকাও ছিল খুব করুণ (তখন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম ছিল না)। তারা শৌর্য ও মূল্যবোধের প্রচারণা চালিয়েছে, কিন্তু খুব কম পত্রিকা ও মানুষই ইন্দিরার জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করেছে। ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘একটি কুকুরও ঘেউ ঘেউ করেনি।’ এ কথার মধ্যে এক রকম কর্তৃত্বের সুর ছিল। তথাপি, এটা তো সত্য যে গণমাধ্যম তখন মাথা নত করে ছিল।
সাবেক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী তাঁর সহকর্মীদের প্রায়ই উপদেশ দিতেন, গদিতে বসলে হালকাভাবে বসুন, শিকড় গেড়ে নয়। সে কারণে রেলমন্ত্রী থাকার সময় তামিলনাড়ুতে বড় এক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় নিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন তাঁর মন্তব্যের হুলে বিদ্ধ হয়ে আমি ১০৩ জন সাংবাদিককে (সেই তালিকা এখনো আমার কাছে আছে) প্রেসক্লাবে জড়ো করতে পেরেছিলাম। এর জন্য আমাকে বিভিন্ন পত্রিকার কার্যালয়ে যেতে হয়েছে, দুটি সংবাদ সংস্থার কার্যালয়েও যেতে হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন টাইমস অব ইন্ডিয়ার আবাসিক সম্পাদক গিরিলাল জৈন। জরুরি অবস্থা ও সেন্সরশিপ আরোপের সমালোচনা করে আমি যে প্রস্তাবের খসড়া প্রণয়ন করেছিলাম, সেটা তাঁদের পড়ে শোনাই। একজন সাংবাদিক বললেন, কয়েকজন সম্পাদককে আটক করা হয়েছে। আমি উপস্থিত সাংবাদিকদের ওই খসড়ায় স্বাক্ষর করার আহ্বান জানাই। আমি বললাম, আমার স্বাক্ষরে সেটি প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও তথ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠাব।
প্রেসক্লাব ত্যাগ করার আগে আমি প্রস্তাবের কপিটা পকেটে ভরি, পাছে পুলিশ সেটা হস্তগত করে। বাসায় পৌঁছার পরপরই তথ্যমন্ত্রী ভি সি শুক্লা ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, আমি তাঁর কার্যালয়ে যেতে পারব কি না। শুক্লা তখন পর্যন্ত আমার বন্ধুই ছিলেন। কিন্তু শুক্লার বাসায় গিয়ে আমি এক ভিন্ন মানুষকে আবিষ্কার করি। তাঁর কথায় ছিল কর্তৃত্বের সুর, ভাবে–ভঙ্গিতে তিনি আমাকে হুমকিই দিলেন। তিনি আমাকে সাংবাদিকদের স্বাক্ষর করা কাগজটি তাঁকে দিতে বলেন। আমি ‘না’ বললে তিনি আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে ভয় দেখান। তিনি বলেন, ‘আপনাকে বুঝতে হবে, এটা এক ভিন্ন সরকার। এই সরকারের হোতা হচ্ছেন সঞ্জয় গান্ধী। এটা ইন্দিরা গান্ধীর সরকার নয়।’
তারপরও আমি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে বলি, ‘...ম্যাডাম, কখন কী প্রকাশ করা উচিত তা একজন সাংবাদিকের পক্ষে নির্ধারণ করা সব সময়ই কঠিন...একটি মুক্ত সমাজে, জরুরি অবস্থার পর আপনি বলেছিলেন, মুক্ত সমাজের ধারণায় আপনি বিশ্বাসী, সংবাদপত্রের দায়িত্ব হচ্ছে, মানুষকে তথ্য দেওয়া। কখনো কখনো এটি তেমন সুখকর কাজ নয়, কিন্তু এটা করতে হবে। কারণ, তথ্যের অবাধ প্রবাহের ওপরই মুক্ত সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে। গণমাধ্যম এখন যেমন সরকারের তথ্য বিবরণী ও সরকারি বিবৃতি প্রচার করছে, সেটাই যদি তার কাজ হয়, তাহলে সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি, ঘাটতি—এসব দেখাবে কারা?...’
তিন মাস জেল খাটার পর আবার সবকিছু শুরু করার চেষ্টা করলে আমি হতাশার সঙ্গে দেখলাম, সাংবাদিকেরা ভয় পেয়ে গেছেন, তঁারা আমাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতে চান না। তৎকালীন জনসংঘের নেতা এল কে আদভানি ঠিকই বলেছিলেন, ‘আপনাদের সাংবাদিকদের মাথা নিচু করতে বলা হলেও আপনারা হামাগুড়ি দেওয়া শুরু করেছিলেন।’
আজকের প্রজন্মের কাছে জরুরি অবস্থার সময়ের ইতিহাস জানাতে হলে পুরোনো একটি কথাই আবার বলব, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। ৭০ বছর আগে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের সময় যেমন এটা সত্য ছিল, তেমনি সেটা আজ আরও বেশি সত্য। উচ্চ আদালত অভিযুক্ত করার পর একজন প্রধানমন্ত্রী স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে না গিয়ে সংবিধান স্থগিত করবেন, এটা কেউ কোনো দিন ভাবতে পারেনি।
সাবেক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী তাঁর সহকর্মীদের প্রায়ই উপদেশ দিতেন: গদিতে বসলে হালকাভাবে বসুন, শিকড় গেড়ে নয়। সে কারণে রেলমন্ত্রী থাকার সময় তামিলনাড়ুতে বড় এক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় নিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি ঘটনার নৈতিক দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
আজ সেই নজির কেউ অনুসরণ করবে, এটা চিন্তা করাও কঠিন। কিন্তু দুনিয়া এখনো মনে করে, ভারতে মূল্যবোধের কদর আছে। মহাত্মা গান্ধী জাতিকে যা বলেছিলেন, আজ আমাদের সেখানে ফেরত যেতে হবে: বৈষম্যের কারণে জাতি মরিয়া হয়ে উঠেছে।
এই যে স্বাধীনতাসংগ্রামের সেই দিনগুলো স্মরণ করছি, তার কারণ আছে। সবাই তখন হাতে হাত রেখে ব্রিটিশদের তাড়িয়েছিল। আমি আশা করি, সেই চেতনা পুনর্জীবিত করে আমরা দারিদ্র্য দূর করব। তা না হলে স্বাধীনতা শুধু সম্পদশালীদেরই উন্নত জীবন দেবে, বাকিদের নয়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তি পরিবর্তন করা হচ্ছে by অরুণ কর্মকার

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরের প্রযুক্তি পরিবর্তন করা হচ্ছে। আগে নির্ধারণ করা হয়েছিল এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার তৃতীয় প্রজন্মের (জেনারেশন থ্রি) ‘ভিভিইআর-১০০০’ প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর। এখন তা পরিবর্তন করে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ‘ভিভিইআর-টিওআই’ (থ্রি প্লাস জেনারেশন) প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হচ্ছে।
সরকারের ‘ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং টাস্কফোর্স’-এর একটি সূত্র জানায়, প্রযুক্তি পরিবর্তন নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিনিধিদল রাশিয়া সফর করে এই প্রযুক্তির দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেছে। এরপর ৫ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তাতে প্রযুক্তি পরিবর্তনের বিষয়টি চূড়ান্তই বলা যায়।
এ ছাড়া কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ দলের রাশিয়া সফর এবং ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে রূপপুর প্রকল্পের অর্থায়ন ও চূড়ান্ত চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) সইয়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে ওই সূত্রে জানা গেছে।
রূপপুর প্রকল্পের সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্পটি বাংলাদেশের হলেও প্রযুক্তি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মূলত রাশিয়া। প্রকল্পের শুরু থেকে দেশে এবং প্রবাসে কর্মরত ও অভিজ্ঞ বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা প্রযুক্তি পরিবর্তনের কথা বলে এসেছেন। তাঁদের কথায় অবশ্য সরকার কখনোই কান দেয়নি। এখন সবুজ সংকেত দিয়েছে সরকার।
সূত্রগুলো জানায়, রূপপুর কেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরের নকশা প্রণয়নকারী রুশ প্রতিষ্ঠান ‘নিঝনি নভগোরাদ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’-এর (রুশ ভাষার আদ্যক্ষরে এনআইএইপি) মহাপরিচালক ভ্যালেরি লিমারেঙ্কো গত জুন মাসে কয়েক ঘণ্টার এক সফরে ঢাকা এসে প্রযুক্তি পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পর্কে প্রথম সরকারের নীতিনির্ধারকদের অবহিত করেন। এরপর পূর্বোক্ত প্রতিনিধিদলের রাশিয়া সফর ও ঢাকায় সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এখন সরকারের সবুজ সংকেত পেয়ে নতুন প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টরের নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে এনআইএইপি।
চুক্তি সইয়ের বিষয়ে সূত্রগুলো জানায়, আগামী নভেম্বর অথবা ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে। সেই চুক্তিতে প্রযুক্তি পরিবর্তনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হবে। ‘ভিভিইআর টিওআই’ রাশিয়ার ‘ভিভিইআর ১২০০’ মডেলের রিঅ্যাক্টরের রপ্তানি সংস্করণ। অর্থাৎ রাশিয়া তাদের ‘ভিভিইআর ১২০০’ প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর ‘ভিভিইআর টিওআই’ নামে বিদেশে রপ্তানি করবে। রাশিয়ার বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) প্রযুক্তির ওই রিঅ্যাক্টর এখন পর্যন্ত শুধু রাশিয়ার নভোভারোনেঝ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া পৃথিবীর কোথাও স্থাপন করা হয়নি। নভোভারোনেঝ কেন্দ্রটি এখন পরীক্ষামূলক উৎপাদনে আছে। কয়েক মাসের মধ্যে সেটি রাশিয়ার জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এ ছাড়া, লেনিনগ্রাদে এই প্রযুক্তির একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু করেছে তারা। রাশিয়ার বাইরে সম্ভবত রূপপুরেই এই রিঅ্যাক্টর প্রথম স্থাপিত হতে যাচ্ছে। এটি এখন পর্যন্ত উদ্ভাবিত সবচেয়ে নিরাপদ পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বলে দাবি রুশ কর্তৃপক্ষের।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী আবদুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিভিইআর টিওআই’ মডেলের রিঅ্যাক্টর ইউরোপীয় মানসম্পন্ন। রূপপুরে এই প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হলে নিরাপত্তা (সেফটি) নিয়ে আর আপত্তি উঠবে না। দুশ্চিন্তাও থাকবে না।
আবদুল মতিন বলেন, আগে যে মডেলটি নির্ধারণ করা হয়েছিল (ভিভিইআর ১০০০), সেটি যথেষ্ট মানসম্পন্ন পূর্ণাঙ্গ মডেলের কোনো রিঅ্যাক্টর ছিল না। ওই মডেলের সঙ্গে একেকটি দেশ নিজেদের বা অন্য দেশ থেকে কিছু কিছু যন্ত্রাংশ এনে ব্যবহার করেছে। যেমন চীন রাশিয়ার কাছ থেকে ‘ভিভিইআর ১০০০’ মডেলের রিঅ্যাক্টর নিয়ে তা চালানোর কন্ট্রোল প্যানেল এনেছে ইউরোপ থেকে। ভারত কুদনকুলাম কেন্দ্রে ওই প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টরের সঙ্গে নিজেদের উদ্ভাবিত কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছে। কিন্তু ইউরোপ ‘ভিভিইআর ১০০০’ মডেলটি গ্রহণ করেনি। তাই ইউরোপের বাজার ধরার জন্য রাশিয়া ‘ভিভিইআর টিওআই’ মডেলটি উদ্ভাবন করেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট এই পরমাণু প্রকৌশলী বলেন, ‘ভিভিইআর ১০০০’ ও ‘ভিভিইআর টিওআই’ মডেলের রিঅ্যাক্টরের দামে খুব বড় একটা হেরফের হওয়ার কথা নয়। মানসম্পন্ন প্রযুক্তি ও মডেলের দাম অপেক্ষাকৃত কম হয়। তা ছাড়া নতুন মডেলের রিঅ্যাক্টর ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার হওয়ায় বিদ্যুৎ অনেক বেশি পাওয়া যাবে। সে তুলনায় দাম বেশি হবে না বলে তাঁর ধারণা।
সরকার রূপপুর প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ২০০ কোটি (১২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। এই প্রকল্পে রাশিয়া সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ ঋণ দেওয়ার কথা রয়েছে। সে হিসাবে প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে (সমীক্ষার ব্যয় ৫৫ কোটি ডলারসহ)।
ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং টাস্কফোর্সের সূত্র জানায়, সরকারের পূর্ব ধারণার চেয়ে রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যাচ্ছে। তবে এর কারণ শুধু প্রযুক্তি পরিবর্তন নয়, প্রকল্প এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং পানিস্বল্পতাও ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ। রুশ বিশেষজ্ঞরা সরকারকে জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রূপপুরে তাঁদের বিশেষ কিছু কারিগরি কর্মকাণ্ড করতে হবে, যেগুলোকে সহজ কাজ বলা যায় না। সেখানে যে স্থাপনা করা হবে, তা হতে হবে রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল। কিন্তু রূপপুরের মাটি নরম ও বেলে প্রকৃতির।
এর আগে, গত ফেব্রুয়ারিতে রোসাতোমের আরেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান, রূপপুরে সমীক্ষা পরিচালনায় নিয়োজিত অ্যাটমপ্রয়েক্ট-এর বিশেষজ্ঞরা রূপপুর প্রকল্পের জন্য কুলিং টাওয়ার (বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টর ঠান্ডা রাখতে সীমিত পরিমাণ পানি ব্যবহারের জন্য নির্মিত স্থাপনা) তৈরি করতে হবে বলে জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ বর্তমানে পদ্মায় পানির যে প্রাপ্যতা, তা (কুলিং টাওয়ার করা না হলে) রূপপুর প্রকল্পের জন্য যথেষ্ট হবে না।
এ বিষয়েও দেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকে বলে এসেছেন, পদ্মা নদীতে বর্তমানে পানির যে প্রাপ্যতা, তা দিয়ে দুই হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার (ভিভিইআর টিওআই প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হলে ক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট) পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো সম্ভব হবে না। তাঁরা ‘ভিভিইআর ১০০০’ প্রযুক্তি পরিবর্তন এবং রূপপুরে ভূমিকম্পের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলে এসেছেন। তবে সরকার কখনোই তাঁদের কথায় কান দেয়নি। এখন রুশদের সুপারিশের সঙ্গে ওই বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের হুবহু মিল পাওয়া যাচ্ছে।
শুধু একটি বিষয়ে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও অভিমত এখনো উপেক্ষিত আছে। বিষয়টি হলো রূপপুর প্রকল্পের জন্য দক্ষ জনবলের অভাব। আবদুল মতিন এবং আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ প্রথম আলোকে বলেন, সরকার আরও পরে এ বিষয়টি অনুধাবন করবে বলে তাঁদের বিশ্বাস। কিন্তু ২০০৯-১০ সাল থেকে দক্ষ জনবল তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও পরিচালনায় দেশ যতটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারত, তা আর সম্ভব হবে না।
রূপপুর প্রকল্পের বর্তমান বাস্তবায়ন পরিস্থিতি সম্পর্কে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, প্রকল্প এলাকায় দুই বছর মেয়াদি সমীক্ষার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি রিঅ্যাক্টরের নকশা প্রণয়নের কাজও (মস্কোতে) চলেছে। আগামী নভেম্বরে এসব কাজ শেষ হবে। তারপর সই হবে প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত চুক্তি।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকার চেষ্টা করছে, আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অতিথি করে আনার। তা সম্ভব হলে তখনই দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিটি সই হবে। আর পুতিনের আসা সম্ভব না হলে নভেম্বরে চুক্তি হবে। এর আগে প্রকল্পের জন্য তিনটি আলাদা চুক্তি সই হয়েছে। প্রথম চুক্তির বিষয় হচ্ছে সমীক্ষা চালানো। দ্বিতীয় চুক্তি হয়েছে প্রকল্পের মৌলিক নকশা প্রণয়নের বিষয়ে। তৃতীয় চুক্তির বিষয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণস্থলে ভৌত অবকাঠামো তৈরি। এই তিনটি কাজই যুগপৎভাবে চলেছে।
২০১৩ সালের ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের সমীক্ষার কাজ উদ্বোধন করেন। প্রকল্প এলাকার আবহাওয়া, ভূতাত্ত্বিক অবস্থা, পানি পরিস্থিতি, ভূমিকম্প ও মাটির বিভিন্ন ধরনের অনুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এই সমীক্ষার অন্তর্ভুক্ত। এর প্রথম পর্যায় শেষে গত বছর নভেম্বরে সরকারকে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের সমীক্ষাও এখন শেষ পর্যায়ে। প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হবে সমীক্ষার ফলাফল এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে।
সরকার ২০২০-২১ সালে প্রকল্পের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। দ্বিতীয় ইউনিট চালু করার পরিকল্পনা ২০২৩ সালে।

সমাপনী দুটি বয়ান by হিলাল ফয়েজী

মানুষটিকে প্রবল ঈর্ষা করি। এই তিরাশি পেরিয়েও এত নিরলস কাজের ক্ষমতা। দারুণ ইচ্ছাশক্তি। সবচেয়ে জটিল মন্ত্রণালয়। ইদানীং কথায় সামাল দিতে পারেন কম। তবুও যে হিম্মতে চলেন, ভাবা যায় না। সরকারের প্রতিপক্ষরা তার বেসামাল কথার সুযোগ নেন। সরকারের ভেতরের একদল তো পারলে আজই নিষ্ক্রান্ত করে দেন ৫১ বছর বয়সে আমলার দাপুটে চাকরি ছেড়ে দেয়া মানুষটিকে। বস্তুত সোজাসাপ্টা সাহসী মানুষ তিনি। সাত শতাংশ জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি অর্জন বর্তমান বাংলাদেশের জন্য কোনো ‘অসম্ভব কল্পনা’ কিংবা ‘অলীক স্বপ্ন’ নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। বলছি আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কথা।
সোমবার ২৯ জুন, ২০১৫ তারিখে জাতীয় সংসদে নিজের দেয়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তৃতায় মুহিত বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতা তুলে ধরে এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বাধাকেই বড় করে দেখেছে। এটি হলো রাজনৈতিক সুস্থিতি। ‘দেশের জনসাধারণের বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সুবিবেচনা চলমান রাজনৈতিক সুস্থিতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, এ প্রত্যাশা করা অমূলক হবে না বলেই আমি মনে করি। কাজেই ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন বর্তমান বাংলাদেশের জন্য কোনো অসম্ভব কল্পনা কিংবা অলীক স্বপ্ন নয় বলে আমি মনে করি।’ গত ৪ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। সেই বাজেটের ওপর গত কয়েক দিন ২১৯ সংসদ সদস্য ৫৭ ঘণ্টা আলোচনা করেন।
ওই বাজেটে অর্থমন্ত্রী জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্থমন্ত্রী ধরেছেন ৭ শতাংশ। বিদায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, অর্জিত হয়েছিল ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশগুলো গ্রহণ করে ‘সরকারের আর্থিক প্রস্তাবাবলি কার্যকরণ এবং কতিপয় আইন সংশোধনে আনীত অর্থবিল-২০১৫’ সংসদে উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। আগামী ১ জুলাই নতুন অর্থবছরের শুরুতে এই বাজেট কার্যকর হবে। নিজের দেয়া বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ স্বীকার করে নিয়ে মুহিত বলেন, ‘আমাদের বিগত বছরের বাজেটের পরও একই সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে গড়ে প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। ২০০৯ থেকে ২০১৪ মেয়াদে বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৬-২০) জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করে ২০১৯-২০ সাল নাগাদ ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা আমরা নির্ধারণ করেছি। এ লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের বাজেটের আকার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করতে হবে। কাজেই আমাদের বাজেট কিছুটা উচ্চাভিলাষী হবে সেটাই স্বাভাবিক।’ টানা সাতটি বাজেট দিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করা মুহিত বলেন, ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল জিডিপির ১৪.৩ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে জিডিপির ১৭.২ শতাংশ করা হয়েছে।
বিগত অর্থবছরগুলোতে দক্ষতার সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়নের দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৯-১০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত বাজেট বাস্তবায়নের গড় সক্ষমতা ৯১ শতাংশ। এই সক্ষমতা এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখেই ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেটের প্রস্তাব করা হয়েছে। আমাদের বাস্তবায়ন সক্ষমতা আছে বিধায় ২০০৮-০৯ সালে যে বাজেট ছিল ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকার তাকে আমরা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করতে পেরেছি।’ বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, অনেকে সংশয় প্রকাশ করলেও তাও পূরণে আশাবাদী মুহিত।
গত দু-তিন বছরে বিভিন্ন সময়কালে অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কারণে বাজেটের লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ ও ব্যয় সম্ভব হয়নি। কিন্তু এটা বাজেটের আর্থিক কাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ করে না। অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত ঘটনার প্রভাব প্রমিত প্রক্ষেপণ প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা দুরূহ। যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় ছিল তখন বাজেটের লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ সম্ভব হয়েছে বলে তথ্যও সংসদে উপস্থাপন করেন মুহিত। ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯২ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৭ শতাংশই অর্জিত হয়েছিল। অর্থাৎ স্বাভাবিক বছরগুলোতে আর্থিক কাঠামোর তেমন কোনো দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়নি, এটাই তার প্রমাণ, বলেন তিনি। বাজেট ঘাটতি নিয়ে সমালোচনাকে ‘অহেতুক’ বলে উড়িয়ে দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বলা হচ্ছে, বাজেট ঘাটতির আকার অনেক বড়, ঘাটতি অর্থ সংস্থানে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার বেশি ঋণ গ্রহণ করলে তাতে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইত্যাদি।’ এবারের বাজেটে ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ। সরকারের প্রাজ্ঞ রাজস্বনীতি অনুসরণের ফলে বাজেট ঘাটতি কখনোই গত ছয় বছরে জিডিপির ৫ শতাংশ অতিক্রম করেনি। প্রকৃতপক্ষে, ২০০৯-১০ হতে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত বাজেট ঘাটতি ছিল গড়ে জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতি বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় পরিমিত বলেও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বলেন মুহিত। ২০১৪ সালে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারত (৭.২), শ্রীলঙ্কা (৫.৯) ও মালদ্বীপ (১০.৬) বাজেটে ঘাটতির তুলনায় আমাদের বাজেট ঘাটতি বেশ কম। ঘাটতি অর্থায়নের মাধ্যমে প্রাক্কলিত বাজেট বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সার্বিক সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক অনেক কার্যক্রম সংকোচনের প্রয়োজন পড়ত বলেও উল্লেখ করেন তিনি। মুহিত বলেন, ‘শত প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি, বৈরিতা এবং এক ধরনের নির্বোধ দেশশত্রুতার মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, সব প্রতিবন্ধকতা তুচ্ছ করে আমাদের কর্মঠ, কষ্টসহিষ্ণু, সাহসী ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা সাধারণ জনগণ তাদের শ্রম, মেধা, প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতা দিয়ে এই অগ্রগতির চাকা সচল রেখেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের এই অগ্রযাত্রা থাকবে নিয়ত সঞ্চরণশীল। আমি বরাবরই এদেশের অপরিমেয় সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। আবারো পুনরাবৃত্তি করব যে, আমি অশোধনীয় আশাবাদী।’ এমনি আশাবাদী বক্তৃতার পরদিন শুনুন একই ব্যক্তির আরেকটি সমাপনী বয়ান।
জালিয়াত ধরতে বাধা দলীয় লোকজন: মুহিত দলের মধ্য থেকে ‘বাধা’ পাওয়ায় হল-মার্ক জালিয়াতির আসামি সব ব্যাংক কর্মকর্তাকে ধরতে পারছেন না বলে ক্ষোভ জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে সরকারি দলের নেতারা জড়িত বলে অর্থমন্ত্রীর এই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এলো।
মঙ্গলবার সংসদে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট পাসের আগে ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় মুহিত বলেন, ‘আমরা সোনালী ব্যাংকের একজন ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে জেলে নিতে সক্ষম হই। তিনি জেলেই মারা গেছেন। আরেকজন মনে হয়, ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে জেলে নেয়া হয়েছে। আরো কয়েকজন ডিরেক্টরকে আমি কোনো মতেই জেলে নিতে পারছি না। এরা সবাই আসামি, জালিয়াতির আসামি। এরা আমাদের লোকজনের সমর্থনে বাইরে রয়েছে। আমি এটাতে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ।’ ২০১০ সাল থেকে ২০১২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে নিয়ম লঙ্ঘন করে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার অভিযোগ ওঠার পর তার তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন। ওই ঋণের আড়াই হাজার কোটি টাকাই নিয়েছে হল-মার্ক গ্রুপ, যার এমডি তানভির মাহমুদের সঙ্গে আসামি করা হয়েছে সোনালী ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তাকে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক একেএম আজিজুর রহমান গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। আসামিদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এখনো পলাতক। সংসদে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ মঞ্জুরের দাবির বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিম বলেন, ‘হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। আমরা কিসের মাঝে আছি? এই টাকা জনগণের টাকা। এর বিচার হয়নি।’ কুমিল্লা-৮ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মিলন বলেন, ‘ব্যাংকগুলো তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থার জন্য আমার এই ছাঁটাই প্রস্তাব।’ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, ‘৫৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ! সোনালী নাম শুনলে আঁতকে উঠি।’ সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের পর অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই ব্যাংকে কাজ করলে আস্থা ও বিশ্বাসের প্রয়োজন। সেটার যখন ঘাটতি হয়, তখন অনেক অসুবিধা হয়। আমাদের কিছু ঘাটতি হয়েছে সোনালী ব্যাংকে, বেসিক ব্যাংকে ...। তার জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। এই ধরনের শাস্তি যেটা কোনোদিনই বাংলাদেশে হয়নি। ম্যানেজিং ডিরেক্টর তো দূরের কথা, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর... আনথিংকেবল। এতদিন কেউ সাহস করেনি এদের টাচ্ করতে। আমি তাদের জেলে নিয়েছি।’ তবে ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কাজটি গতিশীল নয় বলে স্বীকার করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘একেবারে যে স্পিডে যাওয়া উচিত, সে স্পিডে যেতে পারছি না।’ বেসিক ব্যাংক প্রসঙ্গে মুহিত বলেন, ‘বেসিক ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ করেছি। তারা অনুসন্ধান চালিয়ে রিপোর্ট ঠিক করছে। সে রিপোর্ট পাওয়ার পর যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ইতোমধ্যে আমরা কিছু ব্যবস্থা নিয়েছি, যাতে বেসিক ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুষ্টু লোক দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে।’ খেলাপি ঋণের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন করার আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, তিনি অবশ্যই তার জবাব দেবেন। পরপর দুদিনের মুহিতীয় দুটি বয়ান, একদিকে চিত্তহিল্লোলিত করে। অন্যদিকে ভয়াল আশঙ্কিত করে তুলছে। শাসকদলের লুটপাটপটু কাউকে কাউকে যতটুকু জানি, ওরা মুহিত-ওজারতির কাল ঘনিয়ে আনতে পাগলপারা। মুহিতের হিতভাবনা, হিতউদ্যোগের ইতি ঘটাতে ওরা ওই বাজেট-অন্তিম বক্তৃতাটিকে ব্যবহারে এতটুকু ছাড় দেবেন মনে হয় না।
লেখক: গবেষক ও রম্যলেখক

মোবাইল কোর্টে জরিমানার অর্থ গায়েব হচ্ছে by দীন ইসলাম

মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আরোপিত জরিমানার আদায় করা অর্থ গায়েব হয়ে যাচ্ছে। এসব অর্থ আত্মসাতে জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দেশের কয়েকটি জেলা প্রশাসন দণ্ডের অর্থ গায়েবের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হাতেনাতে পেয়েছে। জেলা প্রশাসনগুলোর এ-সংক্রান্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আদায়কৃত দণ্ডের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমাদান নিশ্চিত করা ও আত্মসাৎ ঠেকাতে গত ৮ই জুলাই একটি পরিপত্র জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ম্যাজিস্ট্রেসি পরিবীক্ষণ অধিশাখা। পরিপত্রে বলা হয়েছে, মোবাইল কোর্ট কর্তৃক আরোপিত দণ্ডের আদায় করা অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, জরিমানা আদায় রেজিস্ট্রার, চালানের কপি ইত্যাদি কাগজপত্র মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিতভাবে পরিবীক্ষণ করবেন। সরকারি কোষাগারে জমাকৃত অর্থের ক্যাশ ট্রানজিকশন রিপোর্ট (সিটিআর) প্রতি মাসে সংগ্রহ করতে হবে এবং জমাকৃত অর্থের হিসাবের সঙ্গে সিটিআর যাচাই করে নিতে হবে। এরই মধ্যে পরিপত্রটি সব বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের কাছে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা মানবজমিনকে বলেন, মাঠ প্রশাসনের সবাইকে সতর্ক করতেই বিভিন্ন খাতে আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করা হয়েছে। স্টাফ লেভেলে সরকারি অর্থ জমা দিতে দেরি করে। তাদেরকে মনে করিয়ে দেয়ার জন্যই মূলত এটা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মোবাইল কোর্টের জরিমানার দণ্ড হিসেবে আদায়কৃত অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে শরীয়তপুর জেলায়। ওই জেলার বেঞ্চ সহকারী ইমাম উদ্দিন এসব অর্থ গায়েব করেছেন। তাকে সহায়তা দেন তার স্ত্রী কমলা আক্তার। শরীয়তপুরের ডিসি রাম চন্দ্র দাসের স্বাক্ষরে পাঠানো এ সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়েছে, ইমাম উদ্দিন বেঞ্চ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ৩০ জন ম্যাজিস্ট্রেট মোট ৮৫৪ দিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। এই সময়ে মোবাইল কোর্ট কর্তৃক আরোপিত ও আদায়কৃত জরিমানার অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি খাতে জমা দেয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে ইমাম উদ্দিন গ্রহণ করেন। ওই টাকা সরকারি খাতে জমা দেয়ার নাম করে ব্যাংকের উদ্দেশ্যে অফিস থেকে বের হন। কিন্তু টাকাগুলো ব্যাংকে জমা না দিয়ে ৭৬৪ টি ভুয়া চালান তৈরি করেন। তৈরি করা ৭৬৪টি চালান মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের দেখিয়ে তা রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করেন। রেজিস্ট্রারে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর নেন এবং অফিসে তা সংরক্ষণ করেন। নিখুঁতভাবে প্রস্তুতকৃত চালানগুলো দেখতে প্রকৃত চালানের মতোই, সোনালী ব্যাংক, শরীয়তপুর শাখার সিল এবং নির্ধারিত স্থানে ব্যাংক কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে। এসব স্বাক্ষর জাল এবং ইমাম উদ্দিন নিজে এগুলো স্বাক্ষর করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। ইমাম উদ্দিন এসব কার্যক্রম এতো নিপুণভাবে করেছেন যে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট, জে,এম শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, জে,এম শাখার অন্য কর্মচারী বা অন্য কেউই কখনও কোন সন্দেহ বা অবিশ্বাস করেনি। তাই ইমাম উদ্দিন সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে এসব অপকর্ম করেছেন। অভিযুক্ত কর্মচারী গত ১লা জুন থেকে পলাতক রয়েছেন। তার স্ত্রী গত ১৮ই জুন থেকে জেল হাজতে আছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে মামলার পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালায় তাদেরকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এদিকে সরকারি অর্থ কোষাগারে জমা দেয়ার বিষয়ে জারি করা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়, উপজেলা ভূমি অফিস, ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক সায়রাতমহাল ইজারার অর্থ/লাইসেন্স ফি/ভ্রাম্যমাণ আদালতের অর্থদণ্ড/ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা হয়ে থাকে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে আদায়কৃত অর্থ যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণে যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট খাতে জমা দেয়া হয় না। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অনিয়মের আশঙ্কা থেকে যায়। উপযুক্ত প্রেক্ষাপটে মাঠ পর্যায়ের সাধারণ ও রাজস্ব প্রশাসন কর্তৃক সায়রাতমহাল ইজারার অর্থ/লাইসেন্স ফি/ ভূমি উন্নয়ন কর/ভ্রাম্যমাণ আদালতের অর্থদণ্ড ইত্যাদি আদায়ের পর অতি দ্রুত যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার ক্ষেত্রে ছয় ধরনের বিষয় অনুসরণের অনুরোধ জানিয়ে পরিপত্রে বলা হয়েছে, আদায়কৃত অর্থ বা ফি অবশ্যই নির্ধারিত রশিদের মাধ্যমে আদায় করতে হবে এবং রশিদের মূলকপি সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে দিতে হবে। ডুপ্লিকেট কার্বন রশিদ (ডিসিআর) যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। আদায়ের দিন বা পরবর্তী কার্য দিবসে আদায় করা অর্থ নির্ধারিত চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসে অন্তত একবার এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেয়ার বিষয়টি তদারক করবেন। বিভিন্ন জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মাঠ প্রশাসন চালাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে মোবাইল কোর্ট ছাড়া বর্তমানে অন্য কোন অস্ত্র নেই। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে মোটা অঙ্কের অর্থদণ্ড আদায় করা হচ্ছে। তাৎক্ষণিক রশিদ বা প্রত্যয়নপত্র না দিয়ে জরিমানার অর্থ নিয়ে নেয়া হচ্ছে। ফলে অনেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। মাঠ প্রশাসনে কর্মরত এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা বা টার্গেট পূরণে মোবাইল কোর্টের অপব্যবহার করতে হচ্ছে। এটা ঠিক হচ্ছে না। এক সময় দেখা যাবে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মতো মোবাইল করার ক্ষমতাও থাকবে না নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের। তখন মাঠ প্রশাসন চালাতে নতুন সমস্যায় পড়তে হবে।

মালয়েশিয়ায় সংকটে বাংলাদেশি ছাত্ররা by শরিফুল হাসান

‘আন্তর্জাতিক মানের পড়াশোনা। পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি। নিজের খরচ চালিয়ে বাড়িতে টাকা পাঠানোর সুযোগ।’—পত্রিকা বা অন্য কোনো মাধ্যমে এমন বিজ্ঞাপন দেখে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় এসে পড়াশোনা-আয়ের কথা ভেবে থাকলে এখনই সাবধান হোন। কারণ, এমন বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে মালয়েশিয়া এসে এখন ভয়াবহ সংকটে আছেন বাংলাদেশি ছাত্ররা। কাজ না পাওয়ায় পড়াশোনাও হচ্ছে না।
গত দুই সপ্তাহে মালয়েশিয়ায় এমন শতাধিক ছাত্রের সঙ্গে দেখা হয়েছে। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন হোটেল ও সুপারশপে এখন যত বাংলাদেশি কর্মীর দেখা মিলছে, তাঁদের একটা বড় অংশ বাংলাদেশি ছাত্র। নিজেদের কষ্টের কথা বলার পাশাপাশি দালালদের প্রলোভনে পড়ে মালয়েশিয়া না আসার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনও এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক হতে বলেছে।
মালয়েশিয়ায় পড়ার পাশাপাশি কাজ করতে এসে কত ছাত্র প্রতারিত হয়েছেন, তার সঠিক তথ্য বাংলাদেশ হাইকমিশনে নেই। তবে অনেকের মতে, এই সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে এক লাখ। এঁদের অনেকেই পড়তে এসে অবৈধ শ্রমিক হয়ে গেছেন। কারণ, দালালেরা এখানে আনলেও নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্টে ভিসার স্টিকার লাগায়নি। আবার দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পরিশ্রম করেও কলেজের ফি পরিশোধ করতে পারছেন না অনেক ছাত্র। ফলে অবৈধ হয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হতে হচ্ছে। আবার অনেকে মালয়েশিয়ায় আসার খরচ তুলতে গিয়ে পুরোপুরি শ্রমিক হয়ে গেছেন। অনেকে নিজেরাই দালাল হয়ে দেশ থেকে ছাত্র আনার ব্যবসায় নেমেছেন।
কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রীয় বাসস্টেশনের কাছে মালয়েশিয়ার চেইন সুপারশপ মাইডিনের একটি বিশাল শাখা আছে। সেখানে দেখা গেল, বিক্রেতা হিসেবে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের প্রায় সবাই বাংলাদেশি তরুণ। তাঁরা মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কলেজের ছাত্র। তাঁদের মধ্যে ঢাকার মিরপুরের মাহবুবুর রহমান দুই বছর আগে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ করে এসেছেন টিএমসি কলেজে পড়তে।
মাহবুব বলেন, সপ্তাহে দুই দিন কলেজে যান। বাকিটা সময় কাজ করেন। কিন্তু এরপরও বছর শেষে কলেজে সাড়ে ছয় হাজার রিঙ্গিত (প্রায় দেড় লাখ টাকা) দিতে অনেক কষ্ট হয়। সেই টাকা পরিশোধ করতে না পেরে অনেকে অবৈধ হয়ে যাচ্ছেন। তিনি অনুরোধ জানান, দালালদের কথায় প্রলোভনে পড়ে বাংলাদেশ থেকে আর কেউ যেন পড়তে না আসে।
মাইডিনের ওই সুপারশপের ইনচার্জ রকিবুল ইসলাম। নয় বছর ধরে আছেন এখানে। তিনি বললেন, এই শাখায় ২৬০ থেকে ২৭০ জন বাংলাদেশি ছাত্র খণ্ডকালীন চাকরি করেন। ঘণ্টায় পারিশ্রমিক পাঁচ রিঙ্গিত (এক রিঙ্গিতে বাংলাদেশি ২০ টাকা)। আট ঘণ্টা কাজ করেন। কিন্তু এই আয়ে তাঁরা কিছুই করতে পারেন না। ফলে লেখাপড়াও হয় না। কাজেই এই ভুল যেন আর কেউ না করে। বাংলাদেশ সরকারেরও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সেলানগরের একটি রিসোর্টে কাজ করেন বাংলাদেশি ছাত্র মোহাম্মদ ফাহাদ। বাড়ি ময়মনসিংহে। তিনি বলেন, দালালদের কথায় পটে গিয়ে এসে দেখেন বাস্তবতা ভিন্ন।
বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি ছাত্র বললেন, ছাত্র ভর্তি ও প্রতারণার দিক থেকে টিএমসি, লিংকন ও ভিক্টোরিয়া কলেজ সবচেয়ে এগিয়ে। এই তিন প্রতিষ্ঠানে সব মিলে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি ছাত্র আছেন। এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড ফরেন একাডেমি, কোয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, মেলভার্ন কলেজ, লাইফ কলেজ, এডাম কলেজসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠানেও আছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। কিছু ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আছেন। নামসর্বস্ব কলেজেও আছেন।
মালয়েশিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিরা বললেন, ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আনা বন্ধ হওয়ার পর এভাবে ছাত্র আসা বেড়েছে। গত তিন বছরে এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। জমজমাট ব্যবসার কারণে দুই দেশের দালালেরা এক হয়ে মালয়েশিয়ার অলিতে-গলিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। আর ঢাকার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন স্থানে আকর্ষণীয় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। কয়েক দিন আগে পুলিশ অভিযান চালিয়ে এমন কয়েক শ ছাত্রকে কর্মস্থল থেকে আটক করেছে।
মালয়েশিয়ার মালয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বললেন, মালয়েশিয়ায় যাঁরা সত্যিকারভাবে পড়তে আসবেন তাঁরা একটু খোঁজখবর করলেই স্বচ্ছ ধারণা পাবেন। এখানে কোনো স্তরেই ছাত্রদের বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ নেই।
মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছাত্র হিসেবে কেউ মালয়েশিয়ায় আসতে চাইলে তাকে এসে শুধু লেখাপড়া নিয়েই থাকতে হবে। এখানে তার আয়ের সুযোগ নেই। শ্রমিক হিসেবে এলে শুধু শ্রমিক। কেউ যেন ছাত্র হিসেবে এসে শ্রমিক না হয়ে যায়। সবাইকে এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার অনুরোধ করছি।’
মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশিদের সাফল্য -কায়সার হামিদ হান্নান
আপডেট : ১০-১৯-২০১৪ -সূত্রঃ DesheBideshe.Com by বাংলানিউজ
কুয়ালালামপুর, ১৯ অক্টোবর- আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ায় চমক দেখিয়েছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে এ বছর  ৫৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেছেন। গত ১১ অক্টোবর থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন দিনব্যাপী সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এ ডিগ্রি সনদ ও সম্মাননা ক্রেস্ট গ্রহণ করেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০তম সমাবর্তনে এ বছর মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চার হাজার ৮০৬ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি প্রদান করা হয়। সমাবর্তনে কোরলিয়া অব ইসলামিক রিভিল  নলেজ অ্যান্ড হিউম্যান সায়েন্স’র ওপর উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন ৯৭৫ জন।  অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার একেএম আতিকুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও উচ্চতর ডিগ্রির সাটির্ফিকেট তুলে দেন । এদের মধ্যে কোরলিয়া অব ইসলামিক রিভিল  নলেজ অ্যান্ড হিউম্যান সায়েন্স বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন ফেনী জেলার শিক্ষার্থী  মো. মহি উদ্দিন। এ সাফল্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বাংলানিউজকে বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা ভাল করছে। আমাদের সাফল্য অন্যদেরও অনুপ্রেরণা দেবে। এখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।  আইআইইউএম’এ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সংগঠক পেয়ার আহমেদ আকাশ, মনসুর আল বাশার সোহেল, প্রবাসী বাংলাদেশি জহিরুল ইসলাম হিরন, সালেহ আহমেদ সাগর, শাহনূর আজিম, জিয়া উদ্দিন মাহমুদ, ফেরদোসী বেগম রুপা প্রমুখ।

পথে পথে ঝরে গেল অর্ধশত প্রাণ

সাবির পরিবহনের বাসটি চট্টগ্রাম থেকে ছুটছিল রংপুরের উদ্দেশে। একনাগাড়ে এই যাত্রায় ক্লান্ত চালক গাড়ি চালাচ্ছিলেন বেপরোয়াভাবে। এ জন্য চালককে বারবার সতর্ক করছিলেন যাত্রীরা। তবে তা পাত্তা দেননি চালক। একপর্যায়ে অপর একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। গত রোববার ভোরে বঙ্গবন্ধু সেতুর সংযোগ মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার মূলিবাড়ি এলাকায় ওই দুর্ঘটনায় বাসের চালকসহ ১৭ জন নিহত হন। সিরাজগঞ্জের এই দুর্ঘটনাসহ ঈদের আগের দিন শুক্রবার থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় আরও কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনায় অর্ধশত লোক নিহত হয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, সিরাজগঞ্জে সাবির পরিবহনের ওই বাসটি আকস্মিকভাবে সড়কের ডানে চলে আসার কারণেই মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় গঠিত কমিটির প্রাথমিক তদন্তেও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালনা এবং পরিশ্রান্ত ওই চালকের তন্দ্রাচ্ছন্নতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সিরাজগঞ্জ কার্যালয় থেকে জানা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত বাস দুটির কোনোটিরই রুট পারমিট ছিল না। এ ছাড়া সাবির পরিবহনের ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ ২০১৪ সালের এপ্রিলে শেষ হয়েছে। ফিটনেসও ২০১২ সালের ২৭ এপ্রিল উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।
দুর্ঘটনাকবলিত সাবির পরিবহনের বাসের চালকের আসন থেকে দুই আসন পেছনে ছিলেন যাত্রী মো. আছিব উদ্দীন। আহত হয়ে তিনি সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আছিব জানান, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত ভালোভাবেই বাসটি চালিয়ে আসেন চালক। ঢাকা ছাড়ার পর গাড়ির চাপ কম থাকায় সড়ক উন্মুক্ত পেয়ে তিনি এলোমেলোভাবে বাসটি চালাতে থাকেন। এ সময় যাত্রীরা চালককে সতর্ক করেন। কিন্তু চালক তাতে কান দেননি। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর কারণে পরিশ্রান্ত ওই চালক তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পান আছিব। এরপর তাঁর আর কিছু মনে নেই। চেতনা ফেরার পর দেখেন হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে রয়েছেন।
ঈদের দিন সন্ধ্যা সাতটায় সাবির পরিবহনের ওই বাসটি চট্টগ্রাম থেকে রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। ঈদের পরের দিন রোববার ভোর পাঁচটার দিকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড় সংযোগ মহাসড়কে ওই বাসটির সঙ্গে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকাগামী আজাদ এন্টারপ্রাইজের একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ দুর্ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে আহত হন দুই বাসের অর্ধশত যাত্রী। তবে সাবির পরিবহনের বাসের চালকের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তিনি অচেতন রয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিচয় পাওয়া ১৫ জন হলেন: আজাদ এন্টারপ্রাইজের বাসের চালক গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার পার্বতীপুর গ্রামের শাজা প্রধানের ছেলে মেনহাজ প্রধান (২৮); একই উপজেলার মোহাদিপুর গ্রামের বাবু মিয়ার ছেলে লিটন মিয়া (৪২), দুবলাগাড়ি গ্রামের বাদশা মিয়ার ছেলে মিলন মিয়া (২২) ও আমিনুল ইসলাম (২৫); গাইবান্ধা সদরের আফসার মাস্টারের ছেলে সবুজ হোসেন (২০); বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার চামুর গ্রামের হাবিব তালুকদারের ছেলে জিল্লুর রহমান (৪৬); নন্দীগ্রাম উপজেলার কালাম হোসেন (৩৫); দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মনমতপুর কৈপতপাড়ার কার্তিকের ছেলে চান বাবু (২২); চিরিরবন্দর উপজেলার পূর্ণতী গ্রামের আসিনাত রায়ের ছেলে বিপ্লব (২৩); রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পোড়াচাকলা কাশিমপুরের মোয়াজ্জেম হোসেনের স্ত্রী মৌসুমী খাতুন (২০); বদরগঞ্জ উপজেলার নয়াপাড়া এলাকার আজিজুল হকের ছেলে আনোয়ারুল ইসলাম (১৯); পীরগঞ্জ উপজেলার কিশমতকাউলা এলাকার হোসেন আলীর ছেলে আবদুল কারী (৪৫); একই উপজেলার সোনারায় গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে মফিজুল ইসলাম (২৬) ও তাম্বুল গ্রামের আছির উদ্দিনের ছেলে মাহবুব হোসেন (৫৪); বদরগঞ্জ উপজেলার তাহেরা বেগম (৩০)।
বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হেলাল উদ্দিন জানান, সাবির পরিবহনের বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। বাসটি আকস্মিকভাবে সড়কের ডান দিকে চলে আসে। আর তখনই ওই বাসটির সঙ্গে ঢাকাগামী আজাদ এন্টারপ্রাইজের বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। দুটি বাসের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা, সেতু কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের সদস্যরা স্থানীয় লোকদের সহযোগিতায় বাস দুটিকে কেটে পৃথক করার পর লাশগুলো ও আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করেন। ঘটনাস্থলেই মারা যান উভয় বাসের চালকসহ ১২ জন। সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যার হাসপাতালে নেওয়ার পথে দুজন, বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে একজন ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুজন মারা যান। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আনোয়ার পাশাকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বলা হয়েছে। রোববার থেকেই কাজ শুরু করে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত দলের সদস্য বিআরটিএর সিরাজগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, রুট পারমিট, ট্যাক্স টোকেন এবং ফিটনেস ছাড়াই গাড়ি দুটি চলছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কাগজপত্রগুলো আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে অনলাইনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া ব্যাংক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস দুটির প্রকৃত মালিকের বিষয়ে সবকিছু জানা যাবে।
তদন্ত দলের সদস্য সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ব্রেনজন চাম্বুগং বলেন, সাবির পরিবহনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছিল। বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। চালক ক্লান্ত ও তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। ঢাকা থেকে গাড়ি ছাড়ার পরই তিনি এলোমেলোভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। এসব কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক বিল্লাল হোসেন জানান, লাশ পরিবহনের জন্য প্রত্যেক লাশের জন্য ১০ হাজার টাকা ও আহত ব্যক্তিদের ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। আহত ব্যক্তিরা যাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান, সে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আরও কয়েকটি দুর্ঘটনা: এ ছাড়া ঈদের আগের দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়কে বানিয়াগাতী এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস উল্টে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে ছয়জন নিহত হন। একই দিন দিবাগত রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার উত্তর সোনাপাহাড় এলাকায় বাস উল্টে দুই পোশাকশ্রমিক নিহত হন। একই রাতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে পীরগঞ্জের মাদারহাট এলাকায় একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। ঘটনাস্থলেই বাসের চালক ও তাঁর সহকারী মারা যান। একই রাতে মিঠাপুকুর উপজেলার বৈরীগঞ্জ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাস খাদে পড়ে গেলে একজন নিহত হন।
পটুয়াখালীতে ঈদের দিন পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যু হয়। একই দিন পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় কুমিল্লায় বাবা-ছেলেসহ তিনজন মারা যান। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা যান দুজন। কুষ্টিয়ায় নিহত হয় এক কিশোর। ঈদের পরের দিন বিকেলে রংপুর-সৈয়দপুর মহাসড়কের উত্তম মুচির মোড় এলাকায় অটোরিকশা থেকে ছিটকে পড়ে নিহত হয় এক শিশু।
এ ছাড়া গতকাল মাদারীপুরের শিবচরে বাস খাদে পড়ে একজন, নওগাঁয় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক কিশোর, ময়মনসিংহের ত্রিশালে বাসের চাপায় প্রাইভেট কারের তিন আরোহী, বগুড়ার শেরপুরে ট্রাকের চাপায় এক নারী, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। মুন্সিগঞ্জে গত তিন দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন।

৮৫ বছর পর অধরা কণার খোঁজঃ ভাইল ফার্মিয়নের সন্ধান পেলেন জাহিদ হাসান by মুনির হাসান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ গবেষণাগারে
পদার্থবিজ্ঞানী জাহিদ হাসান l ছবি: সংগৃহীত
পঁচাশি বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল বহুল প্রতীক্ষিত অধরা কণা ফার্মিয়ন, ভাইল ফার্মিয়ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী জাহিদ হাসানের নেতৃত্বে একদল গবেষক পরীক্ষাগারে এই কণা খুঁজে পেয়েছেন।
এই আবিষ্কার এখনকার মুঠোফোন, কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক সামগ্রীর গতি বাড়াবে, হবে শক্তিসাশ্রয়ী। গত বৃহস্পতিবার বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ ভাইল ফার্মিয়নের পরীক্ষামূলক প্রমাণের বিষয়টি বিস্তারিত ছাপা হয়েছে।
গতকাল সোমবার জাহিদ হাসানের সঙ্গে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব নিয়ে কথা হয়। টেলিফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ভাইল ফার্মিয়নের অস্তিত্ব প্রমাণের মাধ্যমে দ্রুতগতির এবং অধিকতর দক্ষ নতুন যুগের ইলেকট্রনিকসের সূচনা হবে।
কেমন হবে সেই নতুন যুগের ইলেকট্রনিক সামগ্রী—জাহিদ হাসান বিষয়টির ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, ‘উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, এই আবিষ্কার কাজে লাগিয়ে তৈরি নতুন প্রযুক্তির মুঠোফোন ব্যবহারের সময় সহজে গরম হবে না। কারণ, এই কণার ভর নেই। এটি ইলেকট্রনের মতো পথ চলতে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ে না।’
গ্রহ-নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, গাছপালা, ফুল কিংবা মানুষ—সবই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার পিণ্ড। দুনিয়ার এসব বস্তুকণাকে বিজ্ঞানীরা দুই দলে ভাগ করেন। এসব কণার একটি ফার্মিয়ন, যার একটি উপদল হলো ভাইল ফার্মিয়ন। ১৯২৯ সালে হারম্যান ভাইল এই কণার অস্তিত্বের কথা প্রথম জানিয়েছিলেন। সম্প্রতি তাঁরই পরীক্ষামূলক প্রমাণ হাজির করলেন জাহিদ হাসান। আরেক জাতের কণা হলো ‘বোসন’, যার নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তাঁর আবিষ্কারের ৯১ বছর পর ভাইল ফার্মিয়নের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়ে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে যুক্ত হলেন আরেক বাঙালি জাহিদ হাসান।
জাহিদ হাসান জানালেন, মোট তিন ধরনের ফার্মিয়নের মধ্যে ডিরাক ও মায়োরানা নামের বাকি দুই উপদলের ফার্মিয়ন বেশ আগেই আবিষ্কৃত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা ভেবেছেন, নিউট্রিনোই সম্ভবত ভাইল ফার্মিয়ন। কিন্তু ১৯৯৮ সালে নিউট্রিনোর ভরের ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে আবার ভাইল ফার্মিয়নের খোঁজ শুরু হয়।
দীর্ঘদিন ধরে ফার্মিয়ন নিয়ে কাজ করছেন কানাডার ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী আন্তন ভার্খব। আন্তর্জাতিক জার্নাল আইইইই স্পেকট্রামকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উচ্ছ্বসিত ভার্খব বলেন, তত্ত্বীয় জগতের জিনিসপত্র বাস্তব জগতে খুঁজে পাওয়ার মতো আনন্দের বিষয় আর কিছুই নেই।
জাহিদ হাসানের গবেষক দল এই কণাকে খুঁজে পেয়েছেন একটি যৌগিক কেলাসের (ক্রিস্টাল) মধ্যে এবং কেলাসেই কেবল এটি পাওয়া যায়। অবশ্য জাহিদ হাসানের ধারণা, নতুন যুগের সেই ইলেকট্রনিকসের জন্য হয়তো আরও ১০ থেকে ২০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। জাহিদ হাসানের নেতৃত্বে গবেষক দলের অন্য সদ্যসরা হলেন ইলিয়া বেলোপোলস্কি, ড্যানিয়েল সানচেজ, গুয়াং বিয়ান ও হাও শ্যাং।
ইতিমধ্যে নতুন যুগের ইলেকট্রনিকসের অন্যতম উপকরণ হিসেবে গ্রাফিন পরিচিতি পেয়েছে। বেশ কিছুদিন হলো এই গ্রাফিন দিয়ে ট্রানজিস্টর, অপটিক্যাল ফটো সেন্সর, ন্যানো সেন্সর বানানোর কাজ চলছে। কিন্তু গ্রাফিন তৈরির কাজটি বেশ কঠিন। অবশ্য গ্রাফিন আবিষ্কারের জন্য ২০১০ সালে বিজ্ঞানী আন্দ্রে জেইম ও কনস্টানটিন নভোসেলভ পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আরশাদ মোমেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রাফিন আবিষ্কার করার পর তা দিয়ে যে ধরনের ব্যবহারের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছিল এবং এখনো হচ্ছে, ভাইল সেমি-মেটালের (অর্ধ ধাতু) ব্যবহারও একই ক্ষেত্রে হতে পারে। তবে গ্রাফিন দ্বিমাত্রিক কাঠামোবিশিষ্ট হওয়ায় তা তৈরি করা কঠিন। এর তুলনায় ভাইল সেমি-মেটাল ত্রিমাত্রিক হওয়ায় তা তৈরি ও পরিবর্তন করা অনেক সহজ। কিন্তু প্রায়োগিক দিকের চেয়ে ভাইল ফার্মিয়নের অস্তিত্বের প্রমাণ আমার কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। আইনস্টাইনের প্রতিধ্বনি করলে বলতে হবে, বিধাতা একটি চমৎকার গাণিতিক ধারণা প্রকৃতিতে ব্যবহার করতে পিছপা হননি।’
আইনজীবী রহমত আলী ও গৃহিণী নাদিরা বেগমের দুই ছেলে এবং এক মেয়ের মধ্যে সবার বড় জাহিদ হাসান। তিনি ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান করে নেন। বিজ্ঞানের নানান বিষয় পড়তে পড়তে জাহিদের মনে আইনস্টাইনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। তবে, শেষ পর্যন্ত তা না হলেও তিনি পড়েন অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে কাজ করেছেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী স্টিভেন ভাইনবার্গের সঙ্গে। তাঁর আগ্রহেই জাহিদ পরীক্ষানির্ভর পদার্থবিজ্ঞানে কাজ করতে শুরু করেন। পরে, প্রথম সুযোগেই জাহিদ হাসান আইনস্টাইনের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খ্যাত প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন শিক্ষক হিসেবে। বর্তমানে তিনি সেখানে পদার্থবিজ্ঞানে অধ্যাপনা করছেন।
গত বছর টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর নামের এক বিশেষ ধরনের অন্তরক পদার্থ আবিষ্কার করে নতুন বস্তু তৈরির জগতে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন বাঙালি এই পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর গবেষণা নিয়ে

রাজ্য বিজেপি নেতাদের ডুবিয়ে গেলেন অমিত শাহ by সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত
রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্বকে একেবারে ডুবিয়ে দিয়ে চলে গেলেন সভাপতি অমিত শাহ। হাওড়ার শরৎ সদনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি ২০১৬-য় তৃণমূল কংগ্রেসকে কার্যত ওয়াকওভার দিয়ে ২০১৯-এর দিকে পাখির চোখ স্থির করতে বলেন। এই বক্তব্য শরৎ সদনের চার দেয়ালের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরে বের হওয়া মাত্র হুলস্থূল কাণ্ড শুরু হয়ে যায়। হতাশ রাজ্য বিজেপি নেতারা বলতে শুরু করেন, এ কি সর্বনাশ করে দিলেন অমিতজি। কার্যত রাজ্য বিজেপির লড়াইকে তিনি যে ঠাণ্ডা ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। সাত্তোরের নির্যাতিতা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে রুপা গঙ্গোপাধ্যায়ের টানাপড়েন, পাড়–ইয়ে মাটি কামড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত বিজেপি কর্মীদের লড়াই, রাজ্যের সর্বত্র যে কোনো ঘটনায় বিজেপির তীব্র প্রতিক্রিয়া সমস্ত লড়াই কার্যত চিলেকুঠুরিতে তুলে রাখার ব্যবস্থা করা হলো। গতকাল সাত্তোর নিয়ে ব্যস্ত থাকায় রুপা গঙ্গোপাধ্যায় অমিত শাহের সভায় যেতে পারেননি। যদিও রাজ্য কমিটির আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে তিনি ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকার ডাক পেয়েছিলেন। রাতে তার কাছে এই খবর পৌঁছা মাত্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। সকাল থেকে সেভাবে কারো সঙ্গে কথা বলেননি। অন্যদিকে জেলার শীর্ষ স্থানীয় বিজেপি নেতারা চেষ্টা করেছেন কিভাবে অমিত শাহর বক্তব্যর ওপর জ্বালা-যন্ত্রণা উপশমের প্রলেপ লাগানো যায়। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ইতোমধ্যে জেলার নিচু তলার কর্মীরা বলতে শুরু করেছেন, তাহলে আর এতদিন বিজেপি করে লাভ কি হলো? এ তো দেখছি মোদি-মমতা তলায় তলায় খেলার ফলাফল ঠিক করে নিয়েছেন। ওপরে যা হচ্ছে সবই গট-আপ গেম। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছেন সারদা তদন্তে সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়েও। গ্রামগঞ্জে চিট ফান্ড সাফায়ার্স ফোরামে বিজেপির কিছু লোকজন শামিল হয়েছিলেন। যেখানে ফোরামের পক্ষ থেকে আন্দোলন হয়েছে বিজেপির লোকজন হাজির হয়েছেন। কিন্তু গত বেশ কয়েকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে সিবিআই তদন্তে গা এলিয়ে দিয়েছে। নতুন তথ্য থাকা সত্ত্বেও নতুন করে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে নিচুতলার কর্মীরা শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রশ্ন করলে তাদের মুখ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এই ইস্যু নিয়েও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি রাজ্যে গভীর অনাস্থা তৈরি হয়েছে। তার ওপর অমিত শাহর এই বক্তব্য কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে ছড়িয়ে দিয়েছে।
রাজ্য জুড়ে সাধারণ মানুষ এবং বিজেপি কর্মীদের মধ্যে এই নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এই খবর পেয়ে রাত থেকেই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ফোন করে বিজেপি নেতারা অমিত শাহর ‘প্রকৃত বক্তব্য’ বোঝানোর চেষ্টা করেন। রাহুল সিনহা, রীতেশ আগরওয়াল থেকে শুরু করে একমাত্র বিধায়ক শর্মীক ভট্টাচার্য কে ছিলেন না সেই তালিকায়। তাদের বক্তব্য, অমিত শাহ এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গসহ পূর্বাঞ্চলের পাঁচ রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিজেপির সদস্য পদ বাড়ানো সংক্রান্ত সাংগঠনিক বৈঠক করতে। এই বৈঠকের নাম দেয়া হয়েছিল ‘সম্পর্ক অভিযান’। সেখানে প্রথম পর্বে তিনি বলেন, ২০১৯-এর নির্বাচনে পূর্বাঞ্চল থেকে ভালো ফল করতে হলে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। যেহেতু আলাদা করে তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গ টানেননি তাই ২০১৬-এর নামগন্ধ তার বক্তৃতায় ছিল না। তার মানে এই নয় যে, তিনি রাজ্য লড়াই ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছেন। বরং সন্ধ্যায় রাজ্য বিজেপির কোর কমিটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন, ‘আমরা কি জিনিস মমতা টের পাবে নির্বাচনের আগে। আপনাদের বলছি সাংগঠনিক পরিকাঠামো তৈরি করুন। ২০১৬-এর বিধানসভায় তৃণমূলকে আমরা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব।’ অমিত শাহ দাওয়াই দেন, ‘মহাসম্পর্ক অভিযান, বুথভিত্তিক সভা ভালো করে করুন। বাকিটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দিন। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের বক্তব্য, সভাপতি কার্যত অল আউট খেলার বার্তাই দিয়েছেন।
একটা পক্ষ এই যুক্তি মেনে নিলেও অন্য পক্ষ মানছে না। তাদের বক্তব্য পাঁচটি রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়ে বৈঠক হলেও হল ভরিয়েছিলেন মূলত পশ্চিমবঙ্গের লোকজনই। ফলে মূল বার্তাটি গিয়েছে এই যে ২০১৬ কে তিনি কোনো গুরুত্বই দিচ্ছেন না। এই নেতাদের একাংশ দিল্লি উড়ে গিয়ে বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্বকে বোঝাতে চান, অবিলম্বে অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিবৃতি না দিলে দল টিকিয়ে রাখাই মুশকিল হবে। বৈদ্যুতিন মাধ্যমে খবর পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই জেলা থেকে বিজেপি দফতরে ফোন আসা শুরু হয়। শুধু তাই নয়, কয়েকটি জায়গায় জেলা বিজেপি দফতরের সামনে ক্ষুব্ধ তৃণমূল পর্যায়ের বিজেপি কর্মীরা বিক্ষোভ দেখান। ইতোমধ্যে রাহুল সিনহা বিরোধী নেতৃত্ব বলতে শুরু করেছে, সংগঠনের কি হাল তা বেশ ভালোমতোই জানেন সর্বভারতীয় নেতৃত্ব। সে কারণেই ২০১৬তে বিজেপির কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না। আজ সকালে গোটা ব্যাপারটা নিয়ে বিজেপি কর্মীদের সামনে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন, সদ্য নির্বাচিত রাজ্য পর্যবেক্ষক কৈলাশ বিজয় বর্গী। বিজেপির সর্ব সময়ের কর্মীদের সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তৃণমূল কংগ্রেসকে রাজ্য থেকে তাড়ানোই হবে প্রধান লক্ষ্য। রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা এই বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও বিশেষ কথা বলেননি। চুপ করে বসেছিলেন। অন্যদিকে বিভিন্ন জেলা সভাপতিরা কৈলাশ বিজয় বর্গীর কাছে গতকাল বিজেপি সভাপতির বক্তব্য বিষয়ে ব্যাখ্যা চান। বীরভুমের জেলা সভাপতি রামকৃষ্ণ পাল দাবি করেন, অমিত শাহ ঠিক কি বলতে চেয়েছেন তা বিস্তারিত জানিয়ে বিবৃতি দিতে হবে। তা না হলে জেলায় সাধারণ বিজেপি কর্মীদের কাছে জবাবদিহি করতে করতে প্রাণান্ত হচ্ছে। 
লেখক: কলকাতার সাংবাদিক

গায়েবি আপসনামা by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

‘গায়েবি’ আপসনামায় মামলা নিষ্পত্তির পথ তৈরি করে দিলেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। অথচ এর কিছুই জানা নেই মামলার বাদী সিলেট শহরতলির কুশিঘাটের বাসিন্দা জুবের আহমদের। প্রাণে মারার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগে তিনি ছাত্রদলের জনা চল্লিশেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। আদালতে বিচার শুরুর আগেই পুলিশ তাদের বাঁচিয়ে দিতে চাইছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোন সাক্ষী-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে শেষের দিকে মন্তব্যেই মামলার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেছেন তিনি। ‘মামলার বাদী আপসনামা দাখিল করত: জানান যে, তিনি আর মামলা চালাইবেন না এবং আর কোন সাক্ষী-প্রমাণ হাজির করা সম্ভব নহে।’ ছাত্রদল নেতা জিল্লুল হক জিল্লু হত্যার প্রতিবাদে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে ২০১৪ সালের ১৬ই জুলাই নগরী মিরবক্সটুলায় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন সিলেট শহরতলির কুশিঘাটের বাসিন্দা ও সিলেট এমসি কলেজের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছাত্রদল নেতা জুবের আহমদ। হামলাকারীরা প্রথমে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তার মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। পরে তাকে রাস্তায় ফেলে কোপাতে থাকে এবং তার বুকে ও পিঠে ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন ছাত্রদল নেতা জিয়াউল গণি আরেফিন জিল্লুর, অমর আশরাফ ইমন, সৈয়দ সাফেক মাহবুব, মাহবুব কাদির শাহী, জামাল আহমদ উরফে কালো জামাল, কাজী মেরাজসহ ২৬ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০/১৫ জনকে আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মামলা (নং: ১৫) করেন। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পান কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই মো. মাসুদুর রহমান। তদন্তকালে তিনি মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পারলেও সন্ধিগ্ধ আসামি হিসেবে জনৈক বেলাল আহমদকে গ্রেপ্তার করেন। ওই কর্মকর্তা মামলার বাদী জুবের আহমদ, সাক্ষী মঞ্জু দাস, আবুল বাশার ও মো. শাওনের ১৬১ ধারায় জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। এ মামলার আসামিদের নাম ঠিকানা যাচাই করতে বিভিন্ন থানায় অনুসন্ধান স্লিপও পাঠান। পাশাপাশি অন্য মামলায় কারাগারে আটক থাকা ছাত্রদল নেতা আলী আকবর রাজন, সাব্বির আহমদ সুমনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তিন দিনের রিমান্ড আবেদনও করেন। তবে হঠাৎই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে মামলাটি তদেন্তর দায়িত্ব পড়ে এসআই মুহাম্মদ বোরহান উদ্দিনের কাঁধে। আর তখন থেকেই মামলাটির বাঁক বদলের শুরু। প্রথম অবস্থায় মামলাটি যে পথে এগুচ্ছিল নতুন তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব নেয়ার পর তা ঘুরে যায় একেবারে উল্টো দিকে। তখন থেকেই মামলার বিষয়ে অন্ধকারে রাখা হতে থাকে মামলার বাদীকে। পুলিশের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ করা হয়নি। মামলার নথিপত্রে দেখা যায়, প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান ২০১৪ সালের ১৭ই জুলাই ১৬১ ধারায় মামলার সাক্ষী মঞ্জু দাস, আবুল বাশার ও মো. শাওনের যে জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন তাতে তারা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবেই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। এ তিন সাক্ষীর একজন আশপাশের দোকান মালিক ও দুজন কর্মচারী। জবানবন্দিতে তারা উল্লেখ করেন, ঘটনার সময় তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তারা হামলাকারীদের নামোল্লেখ করে শনাক্তও করেন। অথচ মামলার পরবর্তী তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বোরহান উদ্দিন চলতি বছরের ২৫শে ফেব্রুয়ারি আবার যখন এ তিনজনের বক্তব্য রেকর্ড করেন, তাতে ঘটনা প্রত্যক্ষের কোন বর্ণনা নেই। এ তিনজনের পাশাপাশি এসআই মুহাম্মদ বোরহান উদ্দিন নতুন আরও দুজন সাক্ষীর জবানবন্দি চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। মো. নূরুল ইসলাম ও মো. আসাদ নামের এ দুই সাক্ষী ঘটনার সময় ছিলেন না, পরে ঘটনাস্থলে গেছেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বুরহান উদ্দিন স্পষ্টই ঘোষণা দেন, ‘মামলার তদন্তকালে কে বা কাহারা বাদীকে জখম করিয়াছে সেই বিষয়ে কোন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী পাওয়া যায় নাই।’ অবশ্য ঘটনা যে ঘটেছে তা তিনি নিশ্চিত হতে পেরেছেন। মামলার অভিযুক্তদের বাঁচানোর চূড়ান্ত প্রয়াস দেখা যায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে। তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ‘ছাত্রদল ও যুবদলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে মামলার ঘটনায় পক্ষ বিপক্ষ সৃষ্টি হইলেও পরে শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ পরস্পরের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি আপস-মীমাংসা করিয়া দিয়াছেন জানাইয়া মামলার বাদী আপসনামা দাখিল করত: জানান যে, তিনি আর মামলা চালাইবেন না এবং আর কোন সাক্ষী-প্রমাণ হাজির করা সম্ভব নহে।’
তদন্ত কর্মকর্তা আপসনামার উল্লেখ করলেও মামলার বাদী এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। মামলার বাদী জুবের আহমদ কোন আপসনামা দেননি জানিয়ে মানবজমিনকে বলেন, যারা আমাকে প্রাণে মারার লক্ষ্যে হামলা চালিয়েছে তাদের সঙ্গে  আপসরফার তো প্রশ্নই আসে না। মামলার বিষয়ে তাকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে উল্লেখ করে জুবের আহমদ বলেন, চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এমনকি মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও যে পরিবর্তন হয়েছে তাও তাকে জানানো হয়নি। মামলার বাদী জুবের আহমদ ও তার আইনজীবী ফখরুল ইসলাম মানবজমিনকে নিশ্চিত করেন, তদন্ত কর্মকর্তা কর্তৃক দাখিলকৃত চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তারা ২৭শে জুলাই মামলার পরবর্তী ধার্য্য তারিখে আদালতে নারাজির আবেদন দাখিল করবেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মুহাম্মদ বোরহান উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সরকার পক্ষের কৌশলীর মৌখিক অভিমত নেয়া হয়েছে। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল আহমদ ও সহকারী কমিশনার একেএম সাজ্জাদুল আলম চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি আদালতের উদ্দেশ্যে অগ্রবর্তী করেছেন। আপসনামা প্রসঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, বাদীই তাকে আপসনামাটি দিয়েছেন এখন অস্বীকার করলে কিছু করার নেই। আদালতে যদি আপসনামাটি জাল প্রমাণ হয়, তখন কি হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে এসআই মুহাম্মদ বোরহান উদ্দিন বলেন, আদালত বিষয়টি দেখবে।

ফরিদপুর রেলস্টেশনে অবৈধ স্থাপনা: পদ্মা সেতুর কাজে আনা পাথর খালাস ব্যাহত

রেলের জায়গায় অবৈধ স্থাপনা থাকায় পদ্মা সেতুর কাজের জন্য ভারত থেকে আনা প্রায় দুই হাজার টন পাথরের বেশির ভাগ রেলের বগিতেই পড়ে আছে। এতে আরও পাথর আনার কথা থাকলেও রাখার জায়গার অভাবে তা আনা যাচ্ছে না।
পাথর সরবরাহে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকার ওভারসিজ কমার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান এসব পাথর ভারত থেকে আমদানি করেছে। এ পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর সীমান্ত দিয়ে ১৫ র্যা ক ‘পাকুর স্টোন’ (খোয়া পাথর) এনে রাখা হয়েছে। এক র্যা কে ৪২টি ওয়াগন (বগি) থাকে। প্রতি বগিতে ৫৭ টন পাথর ধরে। এর মধ্যে ২০ জুলাই ৩০টি বগিতে করে ফরিদপুর রেলস্টেশনে পাথর আনা হয়েছে। কিন্তু জায়গার অভাবে ২২টি ওয়াগনের পাথর খালাস করা যায়নি।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে শহরের লক্ষ্মীপুরে অবস্থিত রেলস্টেশনে দেখা যায়, রেলের গুদামের পশ্চিম পাশে কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। সেখানে মেঝেতে চাটাই ও পলিথিন বিছিয়ে পাথর রাখা হচ্ছে। কিন্তু রেল গুদামের পূর্ব ও উত্তর পাশে এখনো কাঠের আসবাব, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, ওয়ার্কশপ, লেপতোশকের দোকান, চা ও কাঠের দোকানসহ ১৬টি দোকান আছে।
ওভারসিজ কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধি আক্তার হোসেন বলেন, ট্রেনে আরও পাথর আসার কথা। কিন্তু প্রথম চালানই এখনো খালাস করতে না পারায় বগিগুলো ফিরতে পারছে না। পাথর আনার তিন দিন পর গত বৃহস্পতিবার কিছু অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করায় আটটি বগির পাথর খালাস করা শুরু হয়েছে।
এ পাথর খালাস করে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হবে শিবচরের মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে পদ্মা সেতুর নির্মাণস্থলে। এগুলো দিয়ে পদ্মা সেতুর পাইলিং কাজ করার কথা। কিন্তু পাথর খালাস করতে না পারায় গতকাল শনিবার পর্যন্ত সেগুলো পাঠানো শুরু করা যায়নি।
রেলগেটসংলগ্ন কাঠের দোকানদার আবদুস সামাদ বলেন, রেলওয়ের গুদামের পশ্চিম পাশ দিয়েই এর আগে ট্রাকে মালামাল আনা-নেওয়া করা হতো। তিনি আরও বলেন, রেলের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে ২০ বছর ধরে নিয়ে তিনি এ জায়গা ভোগদখল করছেন। রেল কখনো তাঁকে জায়গা ছেড়ে দিতে বলেনি—দাবি করে তিনি বলেন, তবে গত চার বছর ধরে ইজারা নবায়ন করছে না রেলওয়ে।
রেলগেটসংলগ্ন এলাকার দোকানদার লিটন শেখ বলেন, তাঁর মামা রেলের কাছ থেকে এ জমি ইজারা নিয়েছেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) শওকত জামিল বলেন, ‘অবৈধ দখলের কারণে ফরিদপুর রেলস্টেশনে পাথর নামাতে সমস্যা হওয়ার ঘটনাটি আমি জানি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভাগীয় প্রকৌশলী ও বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক সরদার সরাফত আলী বলেন, পাথর খালাসের জন্য রেল মন্ত্রণালয় থেকে গত বৃহস্পতিবার তিনি একটি বার্তা পেয়েছেন। দ্রুত এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জায়গার অভাবে পদ্মা সেতুর কাজের জন্য ভারত থেকে আনা পাথরের বেশির ভাগ রেলের বগিতে এভাবে পড়ে আছে। ছবিটি গতকাল সকালে ফরিদপুর শহরের লক্ষ্মীপুর এলাকায় ফরিদপুর রেলস্টেশন থেকে তোলা l প্রথম আলো