Sunday, September 14, 2014

সারদা চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি -আবিদা ইসলামকে মমতার তলব

সারদার আমানতকারীদের অর্থে বাংলাদেশে মৌলবাদীদের পুষ্ট করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ নিয়ে যখন দুই বাংলা সরগরম ঠিক তখনই বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনার আবিদা ইসলামকে তলব করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কাল সোমবার বিকাল চারটায় রাজ্য সচিবালয় ‘নবান্ন’-এ হাজির হওয়ার কথা আবিদা ইসলামের। অনলাইন দ্য হিন্দু এ কথা বলেছে। এতে বলা হয় আবিদা ইসলামকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শনিবার তলব করছেন। অন্যদিকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনার হিসেবে আবিদা ইসলাম কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতার দায়িত্ব ছেড়ে ঢাকা ফিরে যাচ্ছেন। তাই যাওয়ার আগে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার আবেদনের প্রেক্ষিতে মমতা  উপ-হাইকমিশনারকে সময় দিয়েছেন। প্রায় আড়াই বছর আগে আবিদা ইসলাম কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের দায়িত্ব নেবার পর রীতি অনুযায়ী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য সময় চেয়ে একাধিকবার আবেদন করলেও মুখ্যমন্ত্রী সময় দেননি। অথচ এখন তাকেই মুখ্যমন্ত্রীর সময় দেয়ার ঘটনাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর কাছে সারদা আমানতকারীদের অর্থ পৌঁছে দেয়ার অভিযোগের পাশাপাশি যেভাবে তৃণমূল কংগ্রেস সংসদ সদস্য আহমেদ হাসান ইমরানের নাম যুক্ত হয়ে পড়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন সবাই। ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক সব সময়ই ভাল। আর মমতার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বোনের সম্পর্ক কিছুদিন আগে পর্যন্তও বজায় ছিল। মমতার নির্বাচনে জয়লাভে একাধিকবার শুভেচ্ছাও জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তবে তিস্তা নিয়ে মমতা বেঁকে বসাতেই সেই সম্পর্ক খানিকটা তিক্ত হয়েছে। তবে ‘নবান্ন’ সূত্রে জানা গেছে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে তার দল, তার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত মতামত এই সুযোগে বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনারকে জানাতে পারেন মমতা। এদিকে বাংলাদেশে মৌলবাদী আন্দোলনকে পুষ্ট করতে সারদার আমানতকারীদের অর্থ যার মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে সেই তৃণমূল সংসদ সদস্য আহমেদ হাসান ইমরান সম্পর্কে মৌলবাদী যোগাযোগের নানা তথ্য সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে। ইমরান জামায়াতের সংবাদপত্র নয়া দিগন্ত এবং দিগন্ত টিভির ভারত প্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। এখনও বাংলাদেশ উপদূতাবাসের অতিথির তালিকায় তার নাম রয়েছে।  ইমরান ভারতে সিমির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম বলে অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে সিমিরও প্রধান ছিলেন তিনি। সিমির মুখপত্র হিসেবে ‘কলম’ নামে একটি সাময়িকীও তিনি প্রকাশ করতেন বলে পুলিশের দাবি। সেটিই মমতা সরকার গঠনের পর সারদা গোষ্ঠীকে বিক্রি করা হয়। সেটি তখন ইমরানের সম্পাদনাতেই দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। বাঙালি মুসলমানদের কাগজ হিসেবে তুলে ধরতে এই দৈনিক পত্রিকার উদ্বোধনে মমতা নিজেই হাজির হয়েছিলেন। এদিকে ২০০১ সালে সিমি ভারতে নিষিদ্ধ হলেও এর সঙ্গে ইমরান সম্পর্ক বজায় রেখেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা এজেন্সির রিপোর্টে। পশ্চিমবঙ্গে মৌলবাদী কাজে তার যোগাযোগ সম্পর্কে রাজ্যের গোয়েন্দাদের সতর্কবার্তা  প্রকাশ্যে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, এসব জানা সত্ত্বেও মমতা তাকে রাজ্যসভার সংসদ সদস্য করলেন কেন ? তবে ইমরান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসও একই দাবি করেছে।

আসামের গায়ক গ্রেপ্তার: সারদার আমানত  কেলেঙ্কারির তদন্তে আসামের প্রখ্যাত গায়ক এবং বিজ্ঞাপন নির্মাতা সদানন্দ গগৈকে শুক্রবার গ্রেপ্তার করেছে সিবিআই। সদানন্দ গগৈ সারদার জন্য একটি প্রমোশনাল অ্যাডফিল্ম বানাতে সুদীপ্ত সেনের থেকে চার কোটি টাকা নিয়েছিলেন। সেই টাকার অনেকটাই তিনি তছরুপ করেন বলে অভিযোগ। এছাড়াও সদানন্দ গগৈ আসামের সাবেক মন্ত্রী ও প্রখ্যাত রাজনীতিক হিমন্ত বিশ্বশর্মার ঘনিষ্ঠ। হিমন্ত বিশ্বশর্মা তাঁর কাছ থেকে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করেছিলেন বলে অভিযোগ সুদীপ্ত সেনের।

একজন এরশাদ সাহেব by বিভাংশু কুমার মল্লিক

সাবেক সেনানায়ক রাষ্ট্রপতি এরশাদ। জীবনের প্রায় আশিটি বসন্ত পেরিয়ে এসেও ষোড়শী নববধূর মতো এখনও যার বায়নার শেষ নেই। কখনও বলেন – আমাকে যদি রাষ্ট্রপতি বানানোর প্রতিশ্রুতি দাও তবে আমি আওয়ামীলীগের সাথে যোগ দিয়ে নির্বাচনে ব্যালটের সুনামি বইয়ে দেবো। সারা বাংলায় কায়েম করবো রাম রাজত্ব। জাতিও পার্টির বটবৃক্ষের ছায়ায় ঢেকে দেবো বাংলার দুপুর রোদের তপ্ত সূর্যালোক। যে হাসিনা আমার কোমরের বাতের বাথাকে উপেক্ষা করে কোমরে দড়ি বেঁধে নামিয়ে ছিল একনায়কের গদি থেকে সেই হাসিনাই আমাকে আবার রাষ্ট্রপতি বানাবে। সারা বিশ্ব দেখবে এরশাদের কেরামতি।
কিন্তু হল না।
এরশাদকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাপার সাথে জোট বেঁধে আওয়ামীলীগ ২০০৭ সালের নির্বাচনে জয় লাভ করে ক্ষমতায় গেলেও রাষ্ট্রপতি তো দূরে থাক একটা মন্ত্রীর পদও জুটল না এরশাদের কপালে।
তবে তিনি তো থামবার পাত্র নন। তার নাম এরশাদ। সাবেক সেনানায়ক, সাবেক রাষ্ট্রপতি, তিনি তো থামতে পারেন না। দুই- তিন বছর বিরতি নিয়ে আবার এসে হাজির হলেন মিডিয়ার লাইম লাইেট । এবার বি এন পির জোটের পক্ষে সাফাই গেয়ে বিশিষ্ট শুভাকাঙ্ক্ষী গায়ক হিসেবে গণ্য হন খালেদা ম্যাডামের কাছে। স্বপ্ন দেখতে থাকেন নতুন জোটের সাথে একই বৈতরণীতে চেপে জনগণ  নামক গাধাগুলোকে বোকা বানিয়ে বসবেন ক্ষমতার নরম মখমলের গদিতে । আলাদিনের মতো চেরাগ ঘষে বাংলার প্রতিটি মানুষের মনে বসিয়ে দেবেন জাপার ট্যাটু। সত্যজিৎ রায়ের মতো যন্তর মন্তর তৈরি করবেন , যার থেকে বেরিয়ে অষ্টাদশী তরুণীরা সব “এরশাদ, এরশাদ “ বলে আবেগে কেঁপে কেঁপে উঠবে। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অধগামিতায় বহুদিন নতুন বিবাহ করা হয়নি। এবার রাষ্ট্রপতি হলে প্রথম দিনই শুভ কাজটা সেরে ফেলবেন।

কিন্তু এবারও হল না।
রওশন এরশাদের চাপে আর উথাল পাথাল মনের খেলায় যোগ দেওয়া হল না বি  এন পির সাথে । তবুও ২০১৩  সালের নির্বাচন তাকে করে দিল কিংবদন্তি। একই সাথে সরকার ও বিরোধী দলে থেকে গিনেজ বুকে নাম লেখানো (কাল্পনিক) দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তার নাম লেখা হয়ে গেলো এতিহাসের পাতায়।

কিন্তু রাষ্ট্রপতি তো হওয়া গেল না।
তবে হাল ছাড়লে তো চলবে না । বয়স মাত্র আশি, এখন না পারলে আর কখন। ক্যাটরিনার মতো  ঘূর্ণিঝড় আটকানো যাবে, আইলার মতো জলোচ্ছ্বাস থামানো যাবে কিন্তু এরশাদের বায়নার ফিরিস্তি থামানো যে অসম্ভব। তার সর্বশেষ বায়নাটা জানা গেলো এই সেদিন। উদাত্ত কণ্ঠে আবেগ মাখা বাণীতে তিনি খালেদা জিয়াকে জাপায় যোগ দেওয়ার কথা বলেন। এবার বি এন পিকে অধিনস্ত করে রাষ্ট্রপতি হবার নতুন স্বপ্নে এরশাদ সাহেব। কথায় বলে- অভাগা যে দিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়। আপাত দৃষ্টিতে এরশাদ সাহেব এই ধরাধামে সবচেয়ে অভাগা। তবে কি ভাগ্যদেবী এবারও ছলনা করবেন তার সাথে, নাকি রচনা হবে নতুন ইতিহাস? 

আমাকে শিখণ্ডী করা হয়েছে by আহমেদ হাসান ইমরান

বাংলাদেশে মৌলবাদী আন্দোলনকে পুষ্ট করতে সারদার আমানতকারীদের অর্থ গোপনে সড়কপথে সীমান্ত পেরিয়ে জামায়াতের হাতে পৌঁছে দেয়ার খবর নিয়ে দুই দেশেই জোর আলোচনা চলছে। ভারতের একটি সংবাদপত্রে জানানো হয়, সারদার অর্থ ব্যবহার করে বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে বলে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন। তবে এ অর্থপাচারের অভিযোগ যার বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে, সেই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভা (উচ্চকক্ষ) সাংসদ আহমেদ হাসান ইমরান অভিযোগ করেছেন, সারদার সঙ্গে তার আর্থিক যোগাযোগের কোন তথ্য না পেয়েই পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি সংবাদপত্রে বানোয়াট সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগকে ঘৃণ্য প্রয়াস বলে বর্ণনা করে তিনি এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, আমি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে শুধু সমর্থনই করি না এ সরকারের সাফল্য কামনা করি। বঙ্গবন্ধু আমার কাছে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। সে দেশের বিরুদ্ধে আমি কোন কাজ করবো, এমন বেয়াকুব আমি নই। ইমরান জানান, আসলে আমাকে শিখণ্ডী করে তৃণমূল কংগ্রেস ও তার নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, মমতার কি স্বার্থ থাকতে পারে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াতকে মদত দেয়ার? তিনি বলেন, তাকে নিয়ে সংবাদপত্রের খবরকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিক দলগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিজেপি নেতা সিদ্ধার্থ সিংও অভিযোগ করেছেন সংবাদপত্রের খবরের ওপর ভিত্তি করে। ইমরান এ ব্যাপারে সিদ্ধার্থ সিংয়ের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন বলে দাবি করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আর অনেক আমার পরিচিত ব্যক্তিরাও বিভিন্ন থানায় এফআইআর করেছেন। শিগগিরই তিনি বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। এরই মধ্যে দৈনিক স্টেটসম্যান পত্রিকার বিরুদ্ধেও মানহানি মামলা করেছেন ইমরান। তিনি বলেন, আমার সবচেয়ে বড় ভুল হযেছে প্রথম থেকেই প্রতিবাদ না করা। তার ব্যক্তিগত পরিচয় জানাতে গিয়ে ইমরান বলেন, আমাকে বাংলাদেশের শ্রীহট্টের লোক বলা হচ্ছে। আদতে আমার জন্ম জলপাইগুড়ি জেলার মালনদী চা বাগানে। সেখানকার স্কুলে প্রাথমিক পড়াশোনা। পরে বানারহাট স্কুল থেকে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। কোন দিনই উচ্চশিক্ষা তিনি নেননি বা আলিগড়েও পড়াশোনা করেন নি। তবে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছেন, সিমি’র প্রতিষ্ঠাতা নন, একজন সদস্য হিসেবে তিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্ত ছিলেন। তার দাবি, তখন সিমি নিষিদ্ধ ছিল না। ইমরান দাবি করেন, তিনি কোন দেশবিরোধী কাজে যেমন জড়িত নন, তেমনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও তিনি কখনও কোন মনোভাব পোষণ করেন নি। বরং বাংলাদেশের প্রতি তিনি শুভেচ্ছাই বহন করেন। তিনি বলেন, সবই মিথ্যে প্রচার চলছে। ‘কলম’ পত্রিকা সারদাকে বিক্রি করা সম্পর্কে তিনি বলেন, বলা হচ্ছে ১৫ কোটি রুপিতে আমি এটি বিক্রি করেছি। তিনি প্রশ্ন করেন, একটি ট্যাবলয়েড কাগজ, যার প্রচার সংখ্যা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এটি কেন বিপুল অর্থ দিয়ে কেনা হবে? আসলে ৪ লাখ রুপির বিনিময়ে শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছিল। সারদা নিয়ে গঠিত শ্যামল সেন কমিশনের সামনে হাজিরার সময় সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেনও জানিয়েছেন কয়েক লাখ রুপিতে তিনি এটি নিয়েছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে কলম ও আজাদ হিন্দ পরিচালনায় সারদা ১৫ কোটি রুপি খরচ করেছিল। তার মৌলবাদী কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন করলে ইমরান বলেন, আমি কি এতটাই বেয়াকুপ, আমার কাজের পরিণতি কি হতে পারে তা আমি বুঝবো না? মুসলিম সম্প্রদায়ের যাতে কোন ধরনের ক্ষতি না হয় সে জন্য সতর্ক ছিলাম বলেই কোন বিরুদ্ধ কাজে আমার যোগ ছিল না। অবশ্য ইমরান তার মৌলবাদী যোগাযোগ খারিজ করলেও তিনি যে কট্টরপন্থি মনোভাব পোষণ করতেন, তার ট্যাবলয়েড আকারে প্রকাশিত ‘কলম’ পত্রিকায় পাতায় পাতায় তার উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে। ইমরানের রাজ্যসভায় নির্বাচন প্রসঙ্গে জানা গেছে, তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের নিশ্চিত প্রার্থী তালিকায় ছিলেন না। বরং তৃণমূল কংগ্রেসবিরোধীদের ভোট ভাগাভাগির ফলেই তিনি জয়ী হয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইমরানকে বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী হয়েছিলেন। সে জন্য বাঙালি মুসলমানদের নিজস্ব কাগজ হিসেবে দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত ‘কলম’ পত্রিকার উদ্বোধনে তিনি উৎসাহের সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন। এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবর উদ্দিন শুক্রবার বলেছেন, বাংলাদেশের ভারতীয় হাইকমিশন থেকে ইমরান সংক্রান্ত কোন রিপোর্ট তারা পাননি। আকবর উদ্দিনের কথার সূত্র ধরেই তৃণমূল কংগ্রেসের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তৃণমূলের টাকা বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে বলে আনন্দবাজারে যা প্রকাশিত হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভুল। বিবৃতির পাশাপাশি ইমরানের হয়ে বলার জন্য দলের বর্ষীয়ান নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং সংখ্যালঘু মুখ ফিরহাদ (ববি) হাকিম গত শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যম ‘অপ্রীতিকর ও অসত্য’ খবর করছে বলে অভিযোগ করে সুব্রতবাবুর দাবি, জামায়াত-সিমিকে জড়িয়ে, আমাদের দলের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কথা তুলে যে সব খবর প্রচার করা হচ্ছে, এত কুরুচিকর সংবাদ ইদানীংকালে দেখিনি! ওই সব অভিযোগের পক্ষে তথ্যপ্রমাণ হাজির করার জন্য সংবাদমাধ্যমকে চ্যালেঞ্জও করেছেন সুব্রতবাবু। না হলে তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন বলেও জানিয়েছেন। পাশাপাশি তার অভিযোগ, এর পেছনে বিজেপি রয়েছে। তারা প্রাদেশিকতা, সংঘর্ষ ছড়াতে চাইছে। তবে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জামায়াত-যোগ নিয়ে তদন্তের যে কথা বলেছেন সে সম্পর্কে ফিরহাদ বলেন, সংখ্যালঘু বলেই ইমরানকে জড়িয়ে এসব প্রচার হচ্ছে। তৃণমূল তাকে সাংসদ করেছে, এ অপরাধে বিজেপি সাধারণ ঘরের এক সংখ্যালঘু মানুষকে কালিমালিপ্ত করছে।

আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে

মিসরের রাজধানী কায়রোয় দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ
আল–সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।
আইএসবিরোধী জোট গঠনের বিষয়ে আলোচনা করতে
গতকাল কায়রো যান তিনি। ছবি: রয়টার্স
ইরাকের কট্টরপন্থী সুন্নি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে ‘যুদ্ধে’ জড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিল যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়, আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রথম দেশটি আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা সরাসরি ঘোষণা করল। গতকাল শনিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া রেডিও ও ইন্টারনেট ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, ‘আইএসের বিরুদ্ধে এই লড়াই ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ থেকে ভিন্ন। নতুন এই লড়াইয়ে অতীতের ভুল করা যাবে না।’
এই লড়াই আমেরিকার একার নয় উল্লেখ করে ওবামা আরও বলেন, সন্ত্রাসবাদবিরোধী এই লড়াইয়ে যোগ দিচ্ছে আরও অনেক দেশ। আইএসের বিরুদ্ধে জোট গঠনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই প্রচেষ্টা সফল করতে বিভিন্ন দেশ সফরের অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার তিনি মিসরে যান। খবর এএফপি, রয়টার্স ও এনবিসির। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জস আর্নেস্ট গত শুক্রবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। আল-কায়েদা ও আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন যেভাবে যুদ্ধ করছে, সেভাবে আইএসের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করছে।আর্নেস্টের এই ঘোষণার কয়েক মিনিট আগেই মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর পেন্টাগনের মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল জন কারবি ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা ২০০২ সালের ইরাক যুদ্ধ নয়। কিন্তু ভুলে যাওয়া চলবে না যে আমরা আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি। যেভাবে যুদ্ধ করেছি ও এখনো করছি, আল-কায়েদা এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে।’ হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের এই দুই কর্মকর্তার এই বক্তব্যকেই আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার প্রথম সরাসরি ঘোষণা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবারও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেন, ‘আমরা আগের মতো পুরোপুরি যুদ্ধে লিপ্ত নই। এখন যা চলছে, তা হলো সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিস্তৃত পর্যায়ের অভিযান।’ কেরি এও বলেন, এই অভিযানকে ‘যুদ্ধ’ বলা ভুল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও সরাসরি আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত থাকার কথা বলেননি।
ওবামা শুক্রবার নিজের দল ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য এক তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানেও আইএস প্রসঙ্গে কথা বলেন। আইএস জঙ্গিদের পরাজিত করার ব্যাপারে নিজের আত্মবিশ্বাসের কথা তুলে ধরেন ওবামা। মিসরে কেরি: গতকাল মিসরের রাজধানী কায়রো পৌঁছে আরব বিশ্বের দেশগুলোর জোট আরব লিগের প্রধান নাবিল আল-আরাবির সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেরি। পরে তিনি মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গেও বৈঠক করেন। কেরি এসব বৈঠকে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জোট গঠনের বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। নাবিল আল-আরাবি ও সিসির সঙ্গে বৈঠকের পর কেরি বলেন, আইএসবিরোধী অভিযানে মিসর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ, ইতিমধ্যে দেশের অভ্যন্তরে আইএসের পক্ষের কিছু কট্টরপন্থী গোষ্ঠীকে দমনে লড়াই করছে তারা। গতকাল মধ্যপ্রাচ্য সফরের শেষ পর্বে ছিলেন জন কেরি। আইএসবিরোধী লড়াইয়ের জন্য এ পর্যন্ত তিনি ১০টি আরব দেশের সমর্থন নিশ্চিত করতে পেরেছেন। শিয়া প্রাধান্যপুষ্ট ইরান আইএসের বিরোধী হলেও দেশটিকে জোটে নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। শুক্রবার তিনি তুরস্কে বলেন, ‘সিরিয়া ও অন্যত্র ভূমিকার জন্য’ ইরানকে জোটে নেওয়া যাবে না। ইরানের হুঁশিয়ারি: আইএস ‘দমনের নামে’ সিরিয়ায় বিমান হামলা না চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করেছে ইরান। সিরিয়ার মিত্র বলে পরিচিত দেশ ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার আলী লারিজানি বলেন, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালালে তা হবে আগুন নিয়ে খেলার শামিল। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী সামখানি অভিযোগ তুলেছেন, আইএস দমন অভিযানের নামে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে।

দিল্লি ও ঢাকার উচিত সমস্যার দ্রুত সমাধান করা -বিশেষ সাক্ষাৎকারে এম জে আকবর by সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান

শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় সাংবাদিক ও লেখক এম জে আকবর এখন ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র। সানডে, দ্য টেলিগ্রাফ ও ইন্ডিয়া টুডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বই শেড অব সোর্ডস: জিহাদ অ্যান্ড দ্য কনফ্লিক্ট বিটুইন ইসলাম অ্যান্ড ক্রিশ্চিয়ানিটি (২০০৩), ব্লাড ব্রাদার্স-এ ফ্যামিলি সাগা (২০০৬) ও টিন্ডারবক্স: দি পাস্ট অ্যান্ড ফিউচার অব পাকিস্তান (২০১২)। সম্প্রতি ঢাকা সফরকালে তাঁর এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
>>>সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান

প্রথম আলো :  হঠাৎ বিজেপিতে কেন? এটা আপনার ঢাকার বন্ধুদেরও অবাক করেছে।
এম জে আকবর : এর প্রচুর জবাব দিয়েছি। এটা যদিও ব্যক্তিগত বিষয় তবুও বলি, বিজেপি সম্পর্কে লোকের যে ধারণা, সেটা অত্যন্ত ভ্রান্ত ব্যাখ্যাপ্রসূত। আর সবচেয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা নরেন্দ্র মোদিই দিয়েছেন। গত বছরের ১৫ আগস্টে প্রথমেই তিনি ভারতকে সংজ্ঞায়িত করলেন। বললেন, পাবলিক লাইফ (জনজীবন) পরিচালিত হবে ভারতের সংবিধান দ্বারা। আর ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান। সুতরাং অঙ্গীকারের জায়গাটা এখানেই ফয়সালা হলো। দর্শনগত দিকও এতে স্পষ্ট।
প্রথম আলো : দর্শনের কথা যদি বলেন, তাহলে তো বলতে হয় যে আপনি নিজে মনে করেন যে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত লাকুম দিনুকুম (যার ধর্ম তার কাছে)-এর সঙ্গে আপনি ভারতীয় সংবিধানের বিরোধ দেখেন না।
এম জে আকবর : হ্যাঁ, ঠিক।
প্রথম আলো : লাকুম দিনুকুম-এর সঙ্গে বিজেপির হিন্দুত্ববাদের কি বিরোধ নেই? এর মধ্যে কীভাবে তার সমন্বয় ঘটাবেন?
এম জে আকবর : কোনো অসুবিধা দেখি না। আমাদের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, হিন্দুত্ববাদ হলো সাংস্কৃতিক বাস্তবতা।
প্রথম আলো : বিজেপি কি সেটা কেবল এই অর্থেই ব্যবহার করে?
এম জে আকবর :ওই অর্থেই ব্যবহার করে। কোনো ধরনের নিরাপত্তাবোধহীনতা সৃষ্টির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। যা চলছে সেটা একটা অসম্ভব, সম্পূর্ণরূপে অবিশ্বাসযোগ্য আনফিজিবল মাইন্ডসেট। এটা সাংস্কৃতিক মাইন্ডসেট। যেহেতু সাক্ষাৎকার দিচ্ছি, একটু ভেবে বলি। যেমন এই আমরা কথা বলছি, এই মুহূর্তে একটা সংকট হয়ে যাচ্ছে। আর ওই রকম একটা সংকট যখন আমাদের ওপর একটা আক্রমণ হচ্ছে। তখন ভাবি সব ভুলে যাব। তখন মগজে যা লেখা থাকে সেটা বেরোবে। আমার মনে পড়ে গান্ধী ময়দানে ঘটনা ঘটেছিল। সেটা বিহারের পাটনায়। গত বছরের অক্টোবরে মোদি যখন বক্তব্য দেন, তখন তাঁর ওপর সন্ত্রাসীরা হামলা চালাল। খুবই ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলা। ওনার ওপর তখন ২০০ ক্যামেরা। সেটা ছিল দেশের জন্য অত্যন্ত উত্তেজনাকর মুহূর্ত। দুবৃর্ত্তরা ধরা পড়েছে। ষড়যন্ত্রও উদ্ঘাটিত হয়েছে। তখন তিনি কী বললেন, আমি সেটা হিন্দিতে বলতে চাই। আপনি সেটা বাংলায় তরজমা করে দেবেন। প্রথমেই বললেন, উসকানি যতই আসুক, শান্তির কোনো বিকল্প নেই। তারপর তিনি বললেন, হিন্দুকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ও মুসলমানের সঙ্গে লড়বে, নাকি গরিবির সঙ্গে লড়বে। আর মুসলিমদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা হিন্দুর বিরুদ্ধে লড়বে, না গরিবির বিরুদ্ধে লড়বে। আমাদের শত্রু গরিবি। যত দিন না একত্র হচ্ছি তত দিন তো আমরা এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পারব না। এরপর বললেন, সামগ্রিক বিষয় হলো আপনি কী ধরনের মুসলিম দেখতে চান? মোদি মুসলমানদের এক হাতে কোরআন অন্য হাতে কম্পিউটার দেখতে চান।
প্রথম আলো : কিন্তু আমরা এতকাল বিজেপিকে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে জেনে এসেছি। আপনার বহু লেখালেখিও সেই সাক্ষ্য দেবে।
এম জে আকবর : সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আমরা সবাই লিখেছি। সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আমি কংগ্রেসের ওপর লিখিনি? হাজার হাজার দাঙ্গা সম্পর্কে লিখেছি। মোদির গুজরাটের রায়ট নিয়েই এই বিতর্কটা হচ্ছে। ১০ বছর হয়ে গেল। কংগ্রেস যত চেষ্টা করতে পারত, সরকার, পুলিশ, সিবিআই ও বিচার বিভাগের সব উপাদান ব্যবহার করেছে। বিষয়টি লোয়ার কোর্টস, মিডল কোর্টস এবং সুপ্রিম কোর্ট তদন্ত করেছে। কেউ তাঁর (মোদি) ওপরে ব্যক্তিগতভাবে দায় চাপাতে সক্ষম হননি।
প্রথম আলো : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়নে বিজেপির বর্তমান যে নীতি, সেটা কোথায়, কতটুকু সংগতিপূর্ণ বা অসংগতিপূর্ণ বলে মনে হয়?
এম জে আকবর : প্রথম থেকে এসব ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মাথা বেশ পরিষ্কার। তাঁর বিদেশনীতির কয়েকটি কদম আমরা দেখতে পেয়েছি। এবার তিনি প্রকাশ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে দক্ষিণ এশিয়ার না, বলব ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আমাদের শতকরা ৩০ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, তাদের কীভাবে ওপরে নিয়ে আসা যায়। যখন তিনি বললেন যে তাঁর মা কাজের বুয়ার কাজ করতেন। বুয়ার কাজ করে আমাদের খাওয়াতেন; ১০/১১ বছর বয়সে রেলস্টেশনে চা বিক্রি করেছেন, এসব কথা বলেছেন রেডফোর্টে গিয়ে, আর কোনো প্রধানমন্ত্রীর হিম্মত হয়নি এসব বলার। যখন তিনি নারীদের টয়লেট সমস্যার কথা বলেন, তখন কি আমরা ভাবতে পারি যে তাদের অবমাননা ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার বিষয়টি কত গভীরভাবে অনুভব করেন।
সংসদে নরেন্দ্র মোদি উদ্বোধনী ভাষণের শুরুতেই বললেন, গরিবদের জন্যই যদি সরকার না করা যায়, তাহলে সরকার বলতে আমরা কী বুঝব? এটা কিন্তু তাঁর ওই রাজনৈতিক দর্শনেরই সম্প্রসারণ। দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দারিদ্র্যপীড়িত ভূমি। তিনি বললেন, আমরা সংঘাতে থাকলে কোনো সমস্যার সুরাহা করতে পারব না। কিন্তু সহযোগিতার সংস্কৃতি এবং পরিবেশ সৃষ্টির যে চেষ্টা তিনি করছেন, তার বার্তাটা কিন্তু সাদরে গৃহীত হয়েছে। এটা কিন্তু তাঁর ওই দর্শনেরই একটি সম্প্রসারণ। দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দারিদ্র্য জলাভূমি।
প্রথম আলো : এখানেই...
এম জে আকবর : না। আমাকে বলতে দিন। এটা বিশ্বের বৃহত্তম দারিদ্র্য ডোবা। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, আমরা সংঘাতে থাকলে কোনো সমস্যার সুরাহা করতে পারব না। প্রথমত, একমাত্র সহযোগিতা হলেই পারব। দ্বিতীয় কথা হলো, কোনো জাতিই কিন্তু বিগ ব্রাদার নয়। প্রত্যেকেই সমান। সবাই সমান। আয়তন দিয়ে বড় ভাই বা ছোট ভাই হওয়া যায় না। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যতই সমস্যা থাকুক সেটা সমাধোনের বাইরে নয়। ভাইদের মধ্যেও টেনশন থাকে। কিন্তু আপনি হয়তো অবাক হয়ে যাবেন, নেপালে কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ১৭ বছর যাননি। সেখানে গিয়ে উনি বললেন, দিজ ইজ নো বিগ ব্রাদার স্টেট। আমি খুবই আশাবাদী। সব সমস্যার সমাধান তো সম্ভব নয়। কিন্তু সংস্কৃতি এবং পরিবেশ সৃষ্টির যে চেষ্টা করছেন, তার বার্তাটা কিন্তু উষ্ণতার সঙ্গে সাদরে গৃহীত হয়েছে।
প্রথম আলো : মোদি সরকার বাংলাদেশে কংগ্রেসের চেয়ে ভারতীয় সহায়তা হ্রাস করেছে। তাঁর নিকট প্রতিবেশীদের থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে কম। তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন কি?
এম জে আকবর : আমি এর বিস্তারিত জানি না।
প্রথম আলো : ভারতে সরকার পরিবর্তনের পরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন কেমন?
এম জে আকবর : বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র। একটি জাতি। মর্যাদার সঙ্গে তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। আমি বেশি বলতে চাই না। কারণ, এর একটি প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী জাতিরাষ্ট্র। তার সঙ্গে সম্মান ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়তে হবে। আপনাকে অবশ্যই অর্থনৈতিক সহযোগিতা খুঁজে বের করতে হবে। আপনাকে বিনিয়োগ খুঁজতে হবে। আপনি যদি আমাকে প্রশ্ন করতেন, ভারতীয় বাণিজ্যের মধ্যে বিনিয়োগ এখানে কতটা এসেছে বা আসছে, সেটা আমি অধিকতর নিজের বলে গ্রহণ করতাম। কারণ, বিনিয়োগ আপনাকে কবুল করতে হবে। বিনিয়োগেই দুই দেশের ভবিষ্যৎ নিহিত। কারণ, এটা একটা যৌথ সহযোগিতামূলক বিষয়। মোদি সাহায্যের জন্য জাপান সফরে যাননি।
প্রথম আলো : আপনার কথায় ওই সফর একটা রূপান্তরকরণ।
এম জে আকবর : নিশ্চয়ই। ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ। জাপানি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করবে তাদের শর্তে। আমাদের দেশে ৫০টি বড় শহর আছে। আমরা জাপানকে বলব তোমাদের কাছে প্রযুক্তি আছে। বিশেষজ্ঞ জ্ঞান আছে। আমি ভারতীয় সরকারের নই। আমি মনে করি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিহিত আমরা কতখানি প্রকৃত অভিন্ন সম্পদ সৃষ্টি করতে পারি তার ওপর। দক্ষিণ এশিয়ায় এটা কতটা পারি তার ওপর। সমৃদ্ধি এখানে অংশীদারিমূলক সমৃদ্ধি। আমাদের বিনিয়োগ পরিণত হচ্ছে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ বিনিয়োগে।
প্রথম আলো : এতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইচ্ছা আছে কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার যে সমস্যা ছিল, সেটা এখন আর খুব বড় বাধা নয় বলে মনে করেন?
এম জে আকবর : না, এখন আর কোনো বাধা মনে হয় না।
প্রথম আলো : পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় একটা পরিবর্তন এসে গেছে? একটা সময়ই তো সাম্প্রদায়িকতাকেই প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেটা আজ উল্টে গেছে?
এম জে আকবর : আমি এখানে এসেছি গত চার দিন হলো। আমি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের চোখ দেখেছি। দেখলাম, তারা সব ধরনের ‘হ্যাংওভার অব বিটারনেস’ বা তিক্ততার রেশ ধরে থাকতে আগ্রহী নয়। তারা নিজেদের জন্য উন্নত জীবন চায়। চাকরি চায়। চাকরি না দিলে মর্যাদা কোথা থেকে আসবে? চাকরি না দিলে আত্মমর্যাদা কোথা থেকে আসবে? উত্তর প্রদেশে পরাজয়ের একটা বড় কারণ হলো ১০ বছরে ওরা মাত্র দেড় কোটি চাকরি সৃষ্টি করেছে। ভেবে দেখো, আমার বয়স ২০। আমার ৩০ হয়ে গেল কিন্তু চাকরি পাইনি। সেখানে কি আর কোনো আশা থাকে? পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ওপর বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে একটি ধ্বংসকর তত্ত্ব (পরনিশাস থিওরি) আরোপ করা হয়েছে। সেটা হলো ট্রিকল ডাউন। আমি বিশ্বব্যাংককে বললাম, তোমরা কি জানো তোমরা কী বলছ? ট্রিকল ডাউন মানে যার সুইমিংপুল আছে, তাকে তুমি ঝরনা দেবে। আর যে পিয়াসে মরে যাচ্ছে, তাকে তুমি নালকার দুটি-তিনটি ফোঁটা দেবে। বিশ্বব্যাংকের এই নীতি ভারতের জন ধান কর্মসূচি উল্টে দিচ্ছে। আর সেটাই হলো ট্রিকলআপ।
প্রথম আলো : বাংলাদেশে অনেকেই এটা জানতে আগ্রহী হবেন যে দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান কতগুলো সমস্যা, বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি এবং স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থনের ব্যাপারে কত দূর কী হলো?
এম জে আকবর : এই প্রশ্ন করা আপনার অধিকার। আমি এতটুকুই জানি, সরকার কী করবে বা করবে না, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আমার নিয়তটা কী সেটা তো আমি বলতে পারি?
প্রথম আলো : জি, সেটাই বলুন।
এম জে আকবর : নিয়তটা হচ্ছে, কোনো সমস্যা যত তাড়াতাড়ি সমাধান করা যায়, তা-ই করো। সমস্যাকে জিইয়ে রেখো না। সেটা করলে তা সম্পর্কের ওপর বোঝা সৃষ্টি করবে। এবং ‘ডোন্ট ট্রিট বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল।’ মানে হলো, আচ্ছা ঠিক আছে, একটা আলোচনা হয়ে গেল। মেক অ্যান এফর্ট।
প্রথম আলো : এর আগে আমরা ধারণা পেলাম যে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকার রাজি ছিল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজি না হওয়ায় তা আটকে গেল। আপনাদের সংবিধান কী বলে? আইন কী বলে? প্রতিবেশীকে পানির হিস্যা দেওয়া কি রাজ্যের বিষয়? তারা কখনো না চাইলে কেন্দ্রীয় সরকারের কি কিছুই করার নেই? তিস্তা নয়, আপনি সাধারণভাবেই বলুন।
এম জে আকবর :এটা আপনার বৈধ প্রশ্ন। আমাদের ফেডারেল সরকার। সুতরাং তার ফেডারেল সম্পর্ক তো আছেই। রাজ্যের ক্ষমতা কোনো দিন কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। আমাদের ফেডারেল পদ্ধতির একটা অনন্য চরিত্র আছে। কেন্দ্রীয় সরকার কোনো জিওগ্রাফির ওপর কোনো হুকুমত করে না। অল দ্য জিওগ্রাফি ইজ রুলড বাই স্টেট গভর্নমেন্ট।
প্রথম আলো : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে পরিবর্তনের আভাস আছে। মমতাকে হটিয়ে পরের নির্বাচনে বিজেপি সেখানে আসতে পারে বলে তারা আশাবাদী। তাহলে কি তিস্তার জন্য আমাদের ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে?
এম জে আকবর : এই প্রশ্নটির সঠিক উত্তর আমাদের বিদেশমন্ত্রী জানবেন। কিন্তু আমার যে জবাবটা, সেটা জেনে আপনারা হয়তো অবাক হবেন যে আমরা চেষ্টা করব, এটাকে সমাধানের জন্য। নিশ্চিতভাবেই। কারণ, আমি আপনাকে এটা বলতে পারি, বিজেপি সরকার সম্পর্ক উন্নততর করতে আগ্রহী। কেবল বাংলাদেশের সঙ্গেই নয়, সরকার জনগণের সঙ্গে উন্নততর সম্পর্ক করতে চায়।
প্রথম আলো : মানে প্রতিবেশীদের সঙ্গে—
এম জে আকবর : জনগণের সঙ্গে। কারণ, আমরা প্রতিবেশী।
প্রথম আলো : আপনি সম্ভবত বলতে চাইছেন যে এই জনগণের কোনো সীমান্ত নেই।
এম জে আকবর : জনগণ। সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক রাখা জনগণের সঙ্গে। এবং অবশ্যই আমরা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই। নির্বাচিত সরকার যেই হোক, আমরা তার সঙ্গেই উত্তম সম্পর্ক রাখব।
প্রথম আলো : এই জনগণ প্রসঙ্গে একটা ধারণা সামনে আসে। আপনি একটু আগেই বলছিলেন যে সাম্প্রদায়িকতা চলে গেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে যে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদেরই কেবল তারা পুনর্বাসন দেবে। চাকরি দেবে। অন্ধ্রে শুরুও করেছে। এই লাইনে চলতে মমতাকে বিজেপি চাপ দিচ্ছে। একে আপনি কীভাবে দেখছেন? যদিও আমরা চাই না, কিন্তু ধর্মের জায়গা থেকে এটা তো দেখা হচ্ছে।
এম জে আকবর : আমিও সেটা মনে করি। আমাদের সমস্যাটা কী? সমস্যা হলো তো অবৈধ অভিবাসন?
প্রথম আলো :হ্যাঁ। এবং সেটা যে ধর্মেরই হোক।
এম জে আকবর : যখন অবৈধ, তখন অবৈধ। ঠিক আছে? আমাদের ইতিহাসও তো আছে। আমাদেরকে আমাদের অ্যাটিচুডের মধ্যে ইতিহাসকে ধারণ করতে হবে। কিন্তু আমি সত্যি বলছি এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে বলছি যে এসব ইস্যু মিটে যাবে। এটা সাধারণভাবে (ব্রডলি) বলছি, সামগ্রিকভাবে (হোললি) নয়। সাধারণভাবে ইতিহাসে দেখা যায়, অভিবাসন হলো অর্থনৈতিক ঘটনাবলির পরিণাম।
প্রথম আলো : এখানেও তা-ই ঘটছে।
এম জে আকবর : তাহলে আপনি সেটা মানছেন? এখন যদি বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হতে শুরু করে তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিবাসন কমবে। আমি চারপাশে দেখেছি, তারা গ্রিসে যাচ্ছে, তারা ইতালি যাচ্ছে। কেন যাচ্ছে?
প্রথম আলো : বাংলাদেশের একজন বন্ধু হিসেবে বলুন, আমাদের এখানে ১৫৩ আসনে ভোট না করে নির্বাচন নিয়ে একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এ বিষয়ে ভারত মনে করছে এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এখানে অস্থিতিশীলতা বাড়লেও তাতে ভারতের স্বার্থের ক্ষতি নেই। এটা আপনি কীভাবে দেখেন?
এম জে আকবর : বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের কোনো আগ্রহ নেই।
প্রথম আলো : সেটা এখানে যে ধরনের সরকারই হোক না কেন?
এম জে আকবর : সেটা আপনাদের ব্যাপার, ভারতের ব্যাপার নয়। আমি আপনার বন্ধু, সেটা বাংলাদেশে নয়। আপনার সরকার গ্রহণ করবে এদিক থেকে, ওদিক থেকে, সেটা আপনার ব্যাপার। আমাদের মতে কী এসে-যায়?
প্রথম আলো : কিন্তু গণতন্ত্রের উন্নয়নে—
এম জে আকবর : সেটা আপনার দায়িত্ব। আপনারা যা মনে করেন। এটা আপনার সমস্যা, আমাদের নয়। যিনিই বৈধ (লেজিটিমেট) সরকার হবেন। শেখ হাসিনা আছেন, বেশ ভালো। সেটা আপনারা যেমন চান, পাঁচ বছরের পরে নির্বাচন করতে চান, করুন। আগে করতে চাইলে সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। আমাদের কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নেই।
প্রথম আলো :ইউরোপীয় সংসদে, ব্রিটেনে যখন রেজুলেশন হয়েছে, ভারতকে বলা হয় বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক মেশিন—
এম জে আকবর : আমি আপনাকে এক্ষুনি বললাম, আমরা প্রত্যেকে সমান। আমরা শক্তিশালী নই। আমি আপনাকে পুনর্বার বলছি, আমরা উভয়ে সমমর্যাদাসম্পন্ন জাতি।
প্রথম আলো : একটি ধারণাগত জায়গা থেকে—
এম জে আকবর : আমি কোনো ধারণার ব্যাপারে আগ্রহী নই। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, আমরা উভয়ে সমমর্যাদাসম্পন্ন জাতি। আপনার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আপনার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আমাদের অভ্যন্তরীণ। ঠিক আছে? এ বিষয়ে এর চেয়ে বেশি কিছুই বলার নেই।
প্রথম আলো : বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিজেপি আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
এম জে আকবর : সব রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশের অংশ। আপনার সঙ্গে আমি কথা বলছি। যদি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী আমার সাক্ষাৎকার নিতে চায়, তাহলে আমি না বলে দেব?
প্রথম আলো : তাহলে কি এটা রুটিনের বাইরে নয়?
এম জে আকবর :এটা তো সাধারণ প্রক্রিয়া। আমি জানি না এখানে কী ঘটে, আমাদের দেশে কোনো ভিআইপি এলে সর্বদাই তিনি বা তাঁরা বিরোধী দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী থাকলে সোনিয়া বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। সবাই যেতেন। এটা তো সরকারি সফরসূচির অংশ। আর সেটাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। হারলেও তো আপনি বাংলাদেশে কিছু জনমতের প্রতিনিধিত্ব করেন। আমি চার দিন আছি। অনেকেই সাক্ষাৎ করেছেন। আমার কী এসে-যায়? তবে এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশ রাজনীতি বাংলাদেশের ব্যাপার। আমরা প্রত্যেক সমান যোগ্যতাসম্পন্ন জাতির সঙ্গে উষ্ণতম সম্পর্ক চাই।
প্রথম আলো : মোদি প্রথম ভুটান গিয়ে তাঁর প্রতিবেশী নীতি যে শক্তিশালী, সেটা বুঝিয়েছেন।
এম জে আকবর : ওটাই তাঁর মুখ্যনীতি।
প্রথম আলো : ভুটানে, নেপালে গেলেন। বাংলাদেশে তাঁর সফর কি নিকট ভবিষ্যতে আসন্ন?
এম জে আকবর : এটা বলতে আমার কোনোই দ্বিধা নেই যে কিছু হচ্ছে, তা আমাদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। প্রধানমন্ত্রীর সফর জটিল বিষয়। এটা পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সুরাহা হওয়া উচিত। শপথ অনুষ্ঠানে যখন আর সবাই এল, শেখ হাসিনা আসতে পারেননি।
প্রথম আলো : সেটা তো তাঁর জাপান সফরের কারণে।
এম জে আকবর : স্বাভাবিক। ওনার একটা অ্যারেঞ্জড ভিজিট আছে, সেখানে মনে করার তো কিছু নেই। সেটা দেশ শাসনের একটা বাধ্যবাধকতা। তাই উভয় দিক থেকে দিনপঞ্জি, সময় সব দেখেটেখে নিয়ে পরস্পরের জন্য সুবিধাজনক সময়ে সম্ভবত একটি তারিখ স্থির হবে।
প্রথম আলো : শেখ হাসিনা সম্প্রতি ঢাকায় ভারতীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তাড়া দিয়েছেন। এটা আগে দেখা যায়নি। ট্রানজিটসহ অনেক কিছুর সুরাহায় ভারত সন্তুষ্ট। কিন্তু আমাদের ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে একটা হতাশা আসতে পারে। কারণ, শেখ হাসিনা নতুন করে শুরুর পরেও লম্বা সময় কেটে গেল। তিস্তা ও মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি ঝুলেই রইল। বলেছেন দ্রুত হবে, নির্দিষ্ট করে বলা যায় কি?
এম জে আকবর : না। আমার পক্ষে বলা যায় না। আমি তো সরকারে নই।
প্রথম আলো : আপনি তো বিজেপিতে।
এম জে আকবর : বলছি তো, আমাদের হৃদয়ে উন্নত সম্পর্ক। আর উন্নত সম্পর্ক মানে দ্রুততার সঙ্গে পারস্পরিক সমস্যার সমাধান করা। সেটাই হওয়া উচিত উভয় জাতির অবজেকটিভস। সমস্যার সমাধান করা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির অংশ হওয়া উচিত।
প্রথম আলো : ভুটান, নেপাল বা অন্যদের সঙ্গে মোদি যেভাবে সম্পর্কের উন্নতিসাধন করছেন, তার সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করে কি কিছু বলা যায়?
এম জে আকবর : এগুলো আসলে ভাষার অর্থঘটিত। (হাসি) আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু কে? দ্বিতীয় বন্ধু কে, তৃতীয় বন্ধু কে, পররাষ্ট্রনীতি আসলে এভাবে ব্যাংকিং পদ্ধতিতে চলে না। আমরা সবাই বন্ধু, সেটাই বড় লক্ষ্য। এর অর্থ হলো নিজেদের ভেতর বিরোধাত্মক ইস্যুসমূহ দূর করে ফেলা। এবং এটা খুবই স্পষ্ট যে সেটা অর্জন করাই হলো দিল্লির লক্ষ্য।
প্রথম আলো : গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে এসে আপনি কী দেখলেন, কী অনুভব করলেন? নাড়ির স্পন্দন কি টের পেলেন?
এম জে আকবর: আমি এখানে শুনতে এসেছি।
প্রথম আলো : আপনার এ সফর কি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং ধরনের।
এম জে আকবর : আমি শুনতে এসেছি। অনেক দিন আসিনি।
প্রথম আলো : আপনি কী শুনতে পেলেন? যদি সংক্ষেপে বলেন।
এম জে আকবর : (হাসি) সবচেয়ে যেটা খুব ভালো লাগছে, আপনার হাসি আমি শুনতে পাচ্ছি। আপনার ক্রোধ শুনছি না।
প্রথম আলো : আপনি একটি পার্থক্য এনেছিলেন। যখন সাংবাদিকতা করবেন তখন রাজনীতি নয়। আর রাজনীতি করলে সাংবাদিকতা নয়। আপনার কি মনে হয় এটা একটা আন্তর্জাতিক রীতি হতে পারে। এর কি একটা সমালোচনা করা যায় না যে এখানে একটা সুবিধাবাদ রয়েছে।
এম জে আকবর : সুবিধাবাদ কেন হবে?
প্রথম আলো : এটা কি খুব নীতিনিষ্ঠ বলবেন?
এম জে আকবর : আমার তো মনে হয় এটা নীতির ওপর। কেননা অনেকেই দুটো করেন। আমি যখন সম্পাদক হব, তখন নিরপেক্ষ থাকব, সেটা আমার ধর্ম। আমি দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারি না। যখন আমি দলে আছি, তখন আমি প্রকৃতপক্ষেই দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ। তা আমি সম্পাদক কী করে হব। সে জন্য যোগদান করার আগে আমি যত সম্পাদকীয় পদে ছিলাম, সব থেকে পদত্যাগ করেছি। এখন আমার কোনো শেয়ার নেই। শেয়ার আগেই বিক্রি করে দিয়েছিলাম। কারণ, কোনো ব্যক্তি একই সঙ্গে মিডিয়া ও রাজনীতিতে অনুগত থাকতে পারে না।
প্রথম আলো : এই মুহূর্তে মিডিয়ায় আপনার কোনো বিনিয়োগ নেই। আর সেটা রাজনীতিতে আসবেন বলে সুচিন্তিতভাবে করেছেন, যাতে সাংবাদিক হিসেবে আপনার সততা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে?
এম জে আকবর : একদম সঠিক। আমরা কেউ ফেরেশতা নই। এখন যত দূর সম্ভব সম্পাদক ও রাজনীতিক হিসেবে ইন্টেগ্রিটি রাখতে পারি, জীবনে যদি এটা করে যাই, সেটাই হবে আমার জন্য মোর দ্যান এনাফ।
প্রথম আলো : ভারত বিশ্ব রাজনীতিতে প্রবেশ করছে। এতে কি তার প্রতিবেশীদের নিয়ে চলার লক্ষ্য রয়েছে? যদি থাকে তাহলে তার বহিঃপ্রকাশ কী?
এম জে আকবর : অবশ্যই রয়েছে। দেখুন আমরা উঠলে, যত দিন আমরা সবাই না উঠি, একা ওঠা মুশকিল হবে।
প্রথম আলো : এটা ভারতের উপলব্ধির মধ্যে আছে?
এম জে আকবর : অ্যাবসলিউটলি। আর সবাই উঠলে দেখবেন মহলটা কী রকম হয়ে যায়। সেটা হবে ট্রান্সফরমেশনাল মহল। অলমোস্ট রেভ্যুলেশনারি মহল।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
এম জে আকবর : ধন্যবাদ।

আইএসবিরোধী যুদ্ধে কুর্দি নারী

সশস্ত্র দুই কুর্দি নারী যোদ্ধা l এএফপি
কাঁধে ঝুলছে রাইফেল। কোমর–বন্ধনীতে মজুত গ্রেনেড। পুরোদস্তুর যুদ্ধের সাজে তেকোশিন। এক কুর্দি নারী যোদ্ধা তিনি। উত্তর ইরাকের পাহাড়ি অঞ্চলে লড়ছেন ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। তেকোশিনের লক্ষ্য, তাঁর ভাষায়, নারীদের স্বাধীন করা। আইএসের বিপক্ষে পুরুষের পাশাপাশি লড়াই করছেন তেকোশিনের মতো আরও বেশ কয়েকজন নারী। বিশেষ করে নারীদের প্রতি আইএস জঙ্গিদের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন তাঁরা। উত্তর ইরাকের মাখমুর পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আইএস জঙ্গিদের সঙ্গে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) যোদ্ধাদের তুমুল লড়াই চলছে এখন। কট্টর সুন্নি ইসলামপন্থী আইএস যোদ্ধারা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইরাক ও প্রতিবেশী সিরিয়ার বড় একটা অংশ। আইএস তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শরিয়া আইন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
তাদের ঘোষিত ‘খেলাফত রাষ্ট্রে’ নারী স্বাধীনতার ওপর নেমে এসেছে কঠোর বিধিনিষেধের খড়্গ। কুর্দি পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা যোদ্ধা তেকোশিন (২৭) বলেন, ‘আইএস জঙ্গিরা শুধু কুর্দিস্তানের জন্যই হুমকি নয়, এরা নারী স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী। নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আইএস জঙ্গিরা নারীদের বাজারে যেতে দেয় না। হিজাব পরতে বাধ্য করে। আর ঠিক এ কারণেই তাদের বিরুদ্ধে নারীদের যুদ্ধ করতে হচ্ছে। আমরা নারীরা এই জঙ্গিপনা রুখতে চাই।’ পিকেকের অন্তত ৫০ জন নারী যোদ্ধা লড়াই করছেন কুর্দিস্তানের পাহাড়ি মাখমুর শহরে। পিকেকে নিজেও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের তালিকাভুক্ত ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’। ১৯৮৪ সালে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই শুরু করেছিল তারা। ২০১২ সালে শুরু করে শান্তি আলোচনা। তেকোশিন জানালেন, সাধারণত একটি দলে চারজন নারী যোদ্ধা থাকে। তিনি এমনই একটি দলের কমান্ডার। লড়াই শুরু হলে পুরুষ যোদ্ধাদের সঙ্গেও যোগ দেন তাঁরা। বিবাহিতা কিনা জানতে চাইলে হেসে ওঠেন তেকোশিন। তারপর বলেন, ‘বিয়ে করতে সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই। এর পরও এখানে বেশির ভাগ নারীই অবিবাহিত। আমি মাত্র ১৪ বছর বয়সে পিকেকেতে যোগ দিয়েছিলাম।’ সূত্র: এএফপি

মহাসড়ক সমাচার by আতাউর রহমান

আমাদের রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা প্রায়ই বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ এই দেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। কিন্তু কবে আমরা সভ্য হব, তা কেউ বলেন না।
সম্প্রতি হাইওয়ে তথা মহাসড়ক দিয়ে নিজের গাড়িতে করে জন্মস্থান সিলেটে যাওয়া-আসার সময় কথাটা মনে পড়ল। সরকারি চাকরির সুবাদে বহু দেশ সফর করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে; কোথাও মহাসড়কের গোলচত্বরে দিকনির্দেশনাসংবলিত ফলকগুলোকে রাজনৈতিক পোস্টার ও বিজ্ঞাপন দিয়ে ঢেকে ফেলতে দেখিনি। এক জায়গায় চোখে পড়ল, দিকনির্দেশনার ফলকটি একটি চুলকানির ওষুধের বিজ্ঞাপন দিয়ে আবৃত। আমার মনে পড়ল, আমাদের ছোটবেলায় একবার গ্রামবাংলায় চুলকানির প্রাদুর্ভাব ঘটলে পল্লির চারণকবি গীত রচনা করেছিলেন: ‘ওগো সজনী, এবারকার বছর আইছে চুলকানি/ মায়ে চুলকান, বাপে চুলকান আরও চুলকায় চাকরানি/ ওগো সজনী, এবারকার বছর আইছে চুলকানি।’ এসব রোগ আমাদের দেশে এখন নির্মূলপ্রায়; কিন্তু এগুলোর তথাকথিত প্রতিষেধকের বিজ্ঞাপনের অত্যাচার থেকে বুঝি আর রেহাই পাওয়া গেল না।
সে যা-ই হোক। আজকাল প্রাইভেট কার, ট্রাক ও গণপরিবহনের যাতায়াত মহাসড়কগুলোতে ধারণাতীত বেড়ে গেছে। সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)–এর মাজারসংলগ্ন মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে প্রত্যক্ষ করা গেল উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মাজার জিয়ারতকারীদের নিয়ে আসা বাসের সুদীর্ঘ লাইন। এসব বাস ও ট্রাকের চালকেরা গোলচত্বরসমূহের দিকনির্দেশনামূলক ফলকগুলো আবৃত থাকায় ওগুলোতে দু-একবার চক্কর খেয়ে থাকবেন, এটা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে। আমি নিজেই এটার শিকার হয়েছি এবং একবার তো একজন পথচারী ভুল তথ্য দিয়ে আমাদের বিভ্রান্তই করে ফেলেছিল প্রায়। প্রসঙ্গত, বিদেশে সংঘটিত এ–সংক্রান্ত কিছু সরস ঘটনা মনে পড়ে গেল:
মহাসড়ক দিয়ে মোটরগাড়ি চালনাকালে জনৈক চালকের মনে সন্দেহ হওয়ায় তিনি পথিপার্শ্বস্থ বাড়ির দাওয়ায় উপবিষ্ট বৃদ্ধাকে প্রশ্ন করে সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে বেশ কিছুদূর এগোনোর পর গাড়ির আয়নায় প্রত্যক্ষ করলেন বৃদ্ধা তাঁকে হাতের ইশারায় ডাকছেন। তিনি গাড়ি নিয়ে ফিরে এসে বৃদ্ধার দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাতেই বৃদ্ধা এবার স্মিতহাস্যে বললেন, গৃহে অবস্থানরত আমার স্বামীকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনিও আপনার প্রশ্নের উত্তর জানেন না। বারান্তরে আরেক মোটরচালক পথ হারিয়েছেন সন্দেহ হওয়ায় পথিপার্শ্বস্থ শস্যক্ষেত্রে কর্মরত কৃষককে সড়কটির পরিচয় ও সেটা কত দূর পর্যন্ত গেছে জিজ্ঞেস করে না-বোধক উত্তর পাওয়ায় ঈষৎ উষ্মার ভাব দেখিয়ে যখন মন্তব্য করলেন, ‘আপনি দেখছি কিছুই জানেন না,’ তখন কৃষক ঝটপট জবাব দিল, ‘তা বটে, তবে আমি কিন্তু পথ হারাইনি।’
আরেক মোটরচালক নিজের গাড়িতে করে দেশভ্রমণে বেরিয়ে অনেক দূর যাওয়ার পর তাঁর ইচ্ছে হলো জায়গাটার নাম জানবেন। তিনি একজন পথচারীকে থামিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘বলতে পারেন, আমি কোথায় আছি?’ প্রত্যুত্তরে সে যা বলল তাতে তিনি একেবারে থ। ‘আমাকে বোকা বানাতে পারবেন না’, লোকটি আকর্ণবিস্তৃত হাসি হেসে বলল, ‘আপনি একটি গাড়ির ভেতরে আছেন।’ পরবর্তী ঘটনাটি প্রসঙ্গে জনৈক রসিক ব্যক্তির মন্তব্য ছিল: উত্তরটি একেবারে আমাদের দেশের সংসদীয় প্রশ্নোত্তরের মতো হয়েছে। প্রথমত, উত্তরটা টু দ্য পয়েন্ট হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি শব্দও বলা হয়নি। আর তৃতীয়ত, প্রশ্নকর্তা উত্তরের আগে যে অবস্থানে ছিলেন, ঠিক সেই অবস্থানেই রয়ে গেছেন।
তো মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের সংখ্যা ধারণাতীত বেড়ে গেছে বিধায় অচিরেই ওগুলোকে চার লেনে উন্নীত করে সড়ক-বিভাজক স্থাপন করা অত্যাবশ্যক। কেননা, আমাদের দেশের যানচালকদের মধ্যে স্বল্প পরিসরে ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। এভাবে সামনের গাড়িকে ডিঙ্গাতে গিয়েই বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসা কোনো মোটরযানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এবারকার সিলেটযাত্রায় আমার গাড়িচালক আর কী গাড়ি চালাল, চালালাম তো আমিই—সর্বক্ষণ তার পেছনে সতর্ক বসে থেকে নির্দেশ দিয়ে গেলাম, ‘আস্তে চালাও’, স্পিড আর বাড়িয়ো না’, ‘এখন ওবারটেক কোরো না,’ ইত্যাদি। ইংরেজিতে এটাকেই বুঝি বলে ‘ব্যাকসিট ড্রাইভার’!
আর মানলাম, আমাদের দেশের অধিকাংশ লোকই অশিক্ষিত ও গোঁয়ার, তাই তাঁরা সড়কদ্বীপগুলোকে ওভাবে কলুষিত করে থাকেন। কিন্তু সড়ক ও জনপথ বিভাগের মাঠকর্মীরা ও হাইওয়ে পুলিশ কি ভেরেন্ডা ভাজে? এগুলো দেখার দায়িত্ব তো তাদেরই, তাই নয় কি?
হাইওয়ে পুলিশের প্রসঙ্গে আরও দুটো মজার গল্প: এক বিলেতি সাহেব স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মহাসড়ক দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বেগে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হাইওয়ে পুলিশ আটকালে তিনি তর্ক জুড়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনাদের রাডারের যন্ত্রাংশে ত্রুটি থাকতে পারে।’ এই পর্যায়ে ওর স্ত্রী গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে পুলিশের উদ্দেশে বলে বসলেন, ‘ওর কথায় কান দেবেন না, অফিসার। ও মদ খেয়ে গাড়ি চালালে এ রকম জেদি হয়ে যায়।’ আরেক মহিলা মহাসড়কে ৬০ মাইল বেগে গাড়ি চালানোয় হাইওয়ে পুলিশ তাঁর পিছু নিল। তিনি সেটা বুঝতে পেরে স্পিড আরও বাড়িয়ে পথে সার্ভিস স্টেশন পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করে তড়িঘড়ি নারীদের শৌচাগারে ঢুকে পড়লেন। খানিকক্ষণ পর বেরিয়ে এসে দুই মূর্তিমান পুলিশকে দেখে মহিলা বললেন, ‘আমি বাজি ধরতে পারি, আপনারা ভেবেছিলেন আমি টয়লেট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব না।’
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷

আফ্রিকার গোপন ক্ষুধা by রামাদানি আব্দাল্লাহ নূর

বছর বিশেক আগে দক্ষিণ আফ্রিকার আলোকচিত্রী কেভিন কার্টার একটি ছবি তুলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ছবিতে দেখা যায়, একটি দুর্ভিক্ষপীড়িত সুদানি শিশু মাটিতে শুয়ে আছে আর তাকে চোখে চোখে রাখছে একটি শকুন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আফ্রিকা নিয়ে সব সময় একধরনের চাঞ্চল্য তৈরি করে, ছবিটিকে সে রকম একটি প্রয়াস হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়।
কিন্তু আসলে ছবিটি বিরক্তির উদ্রেক করে না। দুই দশক পরেও সেই ছবিটির বাস্তবতা এখনো বজায় রয়েছে, সেটাই আসলে মাথাব্যথার কারণ। দুনিয়ায় প্রতিবছর প্রায় ৩ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধায় মারা যায়।
আফ্রিকার একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি জানি, পুষ্টিহীনতা ও ক্ষুধার ধ্বংসাত্মক প্রভাব সব সময় খালি চোখে দেখা যায় না। তানজানিয়ার হাসপাতালে যে হাড়-জিরজিরে ভুতুড়ে চেহারার শিশুদের আমি দেখেছি, তাদের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের পরিণাম যতটা পরিষ্কার, উল্লিখিত ক্ষেত্রে সেটা ততটা নয়। এই শিশুদের নাকে নল দিয়ে পুষ্টিবর্ধক খাবার দেওয়া হতো, সেই টিউবের সঙ্গে এরা লেপ্টে থাকত। দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি বা ‘গোপন ক্ষুধা’র পরিণাম অন্য রূপে দেখা যায়, কিন্তু সেটা এর মতোই ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক হতে পারে। এদিকে ক্ষুধাজনিত মৃত্যু ও তীব্র অপুষ্টির হার কমলেও গোপন ক্ষুধার প্রকোপ এখনো মারাত্মক।
গত দুই দশকে এইডস, যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া নিরাময়ে আমরা যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছি। আফ্রিকায় নতুন করে এইচআইভির সংক্রমণ ৫০ শতাংশ কমে গেছে, এইডসজনিত মৃত্যুর হার কমেছে ৩০-৪৮ শতাংশ; যক্ষ্মাজনিত মৃত্যুর হার কমেছে ৪০ শতাংশ, ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যুর হার কমেছে ৩০ শতাংশ। কিন্তু অপুষ্টিজনিত কারণে শিশুর বিকাশ রুদ্ধ হওয়ার হার আগের মতোই উচ্চ, গত দুই দশকে এর পরিমাণ কমেছে মাত্র ১ শতাংশ। আফ্রিকায় শিশুদের মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ক্ষুধা। পাঁচ বছরের নিচে যত শিশু মারা যায়, তার অর্ধেক মারা যায় ক্ষুধার কারণে। এইডস, যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়ায় সম্মিলিতভাবে যত শিশু মারা যায়, তার চেয়ে বেশি শিশু মারা যায় ক্ষুধার কারণে।
অনেক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অপুষ্ট শিশুদের রোগ ও সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা এবং এসব কারণে ভোগার পরিমাণও পুষ্ট শিশুদের চেয়ে বেশি। যেসব শিশুর ওজন মারাত্মকভাবে কম, তাদের ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কা স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় ১২ গুণ বেশি। অথচ এই ডায়রিয়া খুব সহজেই চিকিৎসার মাধ্যমে সারানো সম্ভব। একইভাবে, তাদের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার হারও ৯ দশমিক ৫ গুণ বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের শৈশবের অপুষ্টিই হচ্ছে দুনিয়ার তাবৎ রোগের প্রধান কারণ। সংস্থাটির ২০১১ সালে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, পাঁচ বছরের নিচে যে শিশুদের মৃত্যু হয়, তাদের ক্ষেত্রে শতকরা ৪৫ ভাগেরই মৃত্যু হয় অপুষ্টির কারণে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক থেকে পাওয়া খবরে দেখা যায়, সেখানে গুলির চেয়ে ক্ষুধায় বেশি শিশু মারা যাচ্ছে।
এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে মনে হয়, অপুষ্টির বিষয়টি অলঙ্ঘ্য। কিন্তু কিসে এটা দূর হয়, তা মানুষের অজানা নয়: ভিটামিন এ, আয়োডিনযুক্ত লবণ ও বিশেষ খাদ্য। প্রতিবছর ভিটামিন এ-র অভাবে পাঁচ লাখ শিশু অন্ধ হয়, এদের অর্ধেক দৃষ্টি হারানোর ১২ মাসের মধ্যে মারা যায়। একইভাবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সন্তান ধারণে সক্ষম নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, আয়রনের অভাবে তাঁরা অ্যানেমিয়ায় ভুগছেন।
অপুষ্টির এই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সংক্রামক, এতে শিক্ষার প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক উন্নয়নের রাশ টেনে ধরে। এই সংকট মোকাবিলা করতে অর্থের প্রয়োজন, প্রতিবছর প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। ক্ষুধার কারণে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়, সে বিবেচনায় এই অর্থ তেমন কিছু নয়। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, আফ্রিকার শিশুদের অপুষ্টিজনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বছরে ২৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়া ও স্বাস্থ্যসেবার পেছনে ব্যয়ের হিসাব ধরলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অপুষ্টিজনিত ক্ষতির পরিমাণ হচ্ছে বছরে ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, জীবনরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে হলে আফ্রিকার একটি সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
আফ্রিকা ইউনিয়ন ২০১৪ সালকে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার বছর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এ বছর মহাদেশটির কৃষি খাতের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হওয়ার কথা। তত্ত্বগতভাবে, এতে সামগ্রিক পুষ্টিমানের উন্নয়ন হতে পারে, কিন্তু কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ালেই সব রোগের নিরাময় হবে না। আমাদের পুষ্টি সংবেদনশীল কৃষি কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, সেখানে ছোট কৃষক, নারী ও শিশু সবাইকে যুক্ত করতে হবে।
নারীদের ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে, তাঁদের কৃষিবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। কৃষিঋণ পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। ঘরের আশপাশে খাদ্য উৎপাদন, গরু পালন ও মুরগি পালনে ভর্তুকি দিয়ে তাদের উৎসাহিত করতে হবে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা অতিরিক্ত উপার্জন খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করে থাকেন। নারীদের কৃষিজাত আয় বৃদ্ধি পেলে তাঁরা শিশুর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবায় তা ব্যয় করবেন, সে কারণে তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বাড়ানো দরকার।
শিশুর জন্মের প্রথম এক হাজার দিনে পুষ্টির অভাব ঘটলে তার ফলাফল হয় খুব নিদারুণ, এতে শিশুর যে ক্ষতি হয় তা আর কোনো দিনই পূরণ করা যায় না। এই গোপন ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়তে বৈশ্বিক উন্নয়ন অংশীদারদের সহায়তায় আফ্রিকার সরকারগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। আফ্রিকা মহাদেশে শিশুদের ক্ষুধা আর যেন সেই ছবির পর্যায়ে না থাকে, মানে কার্টাররা যেন সে রকম ছবি তোলার সুযোগ আর না পান।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
রামাদানি আব্দাল্লাহ নূর: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য স্কুলের গবেষণা সহযোগী।

ইসলামিক স্টেট: বিপদ কোথায় by হাসান ফেরদৌস

খবরটা হয়তো অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। একাধিক ভারতীয় পত্রিকা জানিয়েছে, হায়দরাবাদ থেকে চার মুসলিম তরুণ এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ থাকার পর তাঁদের খোঁজ মিলেছে। তাঁরা অভিভাবকদের অজ্ঞাতসারে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার লক্ষ্যে কলকাতায় মিলেছিলেন। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশ হয়ে ইরাকে সুন্নি জিহাদি গ্রুপ ইসলামিক স্টেটের চলতি যুদ্ধে শামিল হওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের আলাপচারিতার দিকে গোয়েন্দা পুলিশ বেশ কিছুদিন থেকে নজর রাখছিল, ফলে সন্ধান পেতে দেরি হলো না। তাঁদের পুলিশি তত্ত্বাবধানে মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কোনো অপরাধ করেননি, ফলে এই মুহূর্তে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দাখিল করা হয়নি।
আদ-দাওলাহ্-ই-ইসলামিয়া নামের সংগঠনটি, যা পশ্চিমা তথ্যমাধ্যমে ইসলামিক স্টেট বা শুধু আইএস নামে পরিচিত, সেটি আল-কায়েদা ও তালেবানকে সরিয়ে এখন আমেরিকার এক নম্বর শত্রুতে পরিণত হয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নিপ্রধান দেশগুলো আদ-দাওলাহ্কে রীতিমতো ভীতির চোখে দেখছে। হায়দরাবাদের ঘটনা থেকে স্পষ্ট, আদ-দাওলাহ্ আমাদের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। শুধু ভারত বা পাকিস্তান থেকে নয়, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স থেকে এমনকি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও কয়েক শ মুসলমান তরুণ-তরুণী ইরাক ও সিরিয়ায় আদ-দাওলাহ্র পতাকাতলে সমবেত হয়েছেন। তাঁরা কারা, কিসের জন্য সম্ভাব্য বিপদ জেনেও যুদ্ধের ময়দানে জড়ো হচ্ছেন, তা খুব স্পষ্ট নয়।
যে কজন ব্রিটিশ তরুণ-তরুণীকে চিহ্নিত করা গেছে, তাঁদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত শ্রেণির, শিক্ষিত। ব্রিটিশ পুলিশ জানিয়েছে, ‘জিহাদ’-এ অংশ নেওয়ার অনুপ্রেরণা তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পেয়েছেন স্থানীয় মসজিদভিত্তিক জিহাদি গ্রুপগুলোর কাছ থেকে। ইউরোপে বেকারত্ব বাড়ছে, সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বহিরাগতবিরোধী মনোভাব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুসলিম অভিবাসীরা এই মনোভাবের শিকার। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এসব অভিবাসী তরুণ-তরুণী কিছুটা বেপরোয়া হয়েই জিহাদে যোগ দিচ্ছেন। ভয় হচ্ছে, ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধ ময়দান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসব তরুণ-তরুণী যাঁর যাঁর দেশে ফিরে যাবেন, সঙ্গে নিয়ে যাবেন জিহাদি মন্ত্র।
এই ভয় কেবল ইউরোপের বা যুক্তরাষ্ট্রের নয়, সুন্নিপ্রধান সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্কেরও। আদ-দাওলাহ্ জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য মুসলিম বিশ্বজুড়ে একটি অভিন্ন খেলাফত গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যে একজন খলিফার নামও তারা ঘোষণা করেছে। মুখ্যত ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক আল-কায়েদা থেকে বেরিয়ে একটি অতি উগ্র জিহাদি গ্রুপের নেতৃত্বে আদ-দাওলাহ্ গড়ে উঠেছে। এরা এতই উগ্র যে আল-কায়েদা পর্যন্ত এদের নিজেদের দল থেকে বহিষ্কার করেছে। ইরাক ও সিরিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার অতি দুর্বল, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিবাদে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াই নিয়ে ব্যস্ত। ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, আদ-দাওলাহ্ তারই সুযোগ নিয়েছে। প্রধানত সাদ্দাম হোসেনের সুন্নি সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই বাহিনী গত এক বছরে এই দুই দেশের ব্যাপক অঞ্চল নিজেদের দখলে এনে ফেলেছে। উভয় দেশের তেল সরবরাহের ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ অর্জন করায় তাদের কাঁচা টাকার কোনো অভাব নেই। অস্ত্রেরও কোনো কমতি নেই। কিন্তু শুধু ইরাক ও সিরিয়ায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে এরা খুশি হবে না। এদের আসল লক্ষ্য সৌদি আরব। সুন্নি মুসলমানদের নেতা, ধনে-মানে সবার ওপরে সৌদি আরব। সে দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জিত হলে একটি প্যান-ইসলামিক খেলাফত গঠন অনেক সহজ হয়ে যায়। এই লক্ষ্যে আদ-দাওলাহ্ তাদের ‘কাদেমুন’ অভিযান শুরুর কথা ঘোষণা করেছে। সে কথার অর্থ, আমরা আসছি।
আরব বিশ্বে সবচেয়ে বড় ও শক্তিধর দেশ মিসর। ইসলামিক ব্রাদারহুডের নেতৃত্বে সেখানে একটি অতি কট্টর জিহাদি আন্দোলন অনেক আগে থেকেই তৎপর। হোসনি মোবারকের আধা সামরিক সরকার পতনের পর দুই বছর আগে মিসরে যে গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আবরণে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে সরিয়ে সেখানে এখন সেনাপ্রধান জেনারেল সিসি নতুন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। কিন্তু ব্রাদারহুডের বিপদ দূর হয়ে যায়নি। সেই কারণে আদ-দাওলাহর হুমকি মিসরেও কম্পন সৃষ্টি করেছে।
শিয়াপ্রধান ইরান এই মুহূর্তে আদ-দাওলাহর লক্ষ্য নয়, কিন্তু ইরানের কাছে বন্ধু ইরাকের ওপর তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসন ভীতির কারণ হয়ে পড়েছে। ইরান ও সিরিয়ার মধ্যে নিকট আঁতাত দীর্ঘদিনের, মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের একমাত্র বন্ধু ইরান। এই মুহূর্তে আদ-দাওলাহর প্রধান টার্গেট সিরিয়া, এই ব্যর্থ রাষ্ট্রটির কোনো কোনো প্রদেশে তারা ইসলামি বেসামরিক প্রশাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। পশ্চিমা তথ্যমাধ্যমের দেওয়া সংবাদ যদি সত্য হয় তবে তো এসব প্রদেশের বেসামরিক শাসনভার পরিচালনায় ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আসা তরুণ-তরুণীরাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যেসব ইউরোপীয় তরুণ এই জিহাদে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ বাংলাদেশের, অথবা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। পুলিশি সূত্রে বলা হয়েছে, ‘ব্রিটেনি ব্রিগেড বাংলাদেশি ব্যাড বয়েস’ নামে একটি জিহাদি গ্রুপ আদ-দাওলাহ্র জিহাদে অংশ নিতে তুরস্ক হয়ে সিরিয়া ও ইরাকের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এদের মধ্যে হামিদুর রহমান নামের বাংলাদেশি এক তরুণ সিরিয়ায় যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় নিহত হন। ব্রিটিশ পুলিশ এই গ্রুপের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে আদ-দাওলাহ্র আবেদন উপমহাদেশের তরুণদের কাছে গিয়েও পৌঁছেছে। কেন, কোন সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে এসব আপাতশিক্ষিত ও শহুরে মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণী জিহাদের ডাকে সাড়া দেন, আমরা এখানে তার সমাজতাত্ত্বিক বা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যাব না। কিন্তু তাঁরা যে সাড়া দেন, সে প্রমাণ আমাদের আছে। ঢাকার একাধিক ইংরেজি মাধ্যম কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মৌলবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ, সে কথাও আমরা জানি। তাঁদেরই একজন বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে এসে বোমাবাজির অভিযোগে এখন কারাগারে।
ভয়টা সেখানেই। ইরাক ও সিরিয়া ও অন্য সুন্নি আরব দেশগুলোর মতো আমাদের দেশও যে আদ-দাওলাহ্র প্রস্তাবিত খেলাফতি আন্দোলনে আক্রান্ত হতে পারে, সে কথায় কোনো ভুল নেই। এই আন্দোলনের একটি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আবেদন রয়েছে, হয়তো সেই আবেদন তরুণদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু বিশ্বের প্রতিটি জিহাদি আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, এর প্রথম ও প্রধান শিকার যার যার নিজের দেশের মানুষ। একাত্তরে এই জিহাদিদের প্রথম প্রজন্মের হাতে বাংলাদেশের সেরা সন্তানেরা নিহত হন, অগুনতি নারী ধর্ষিত হন। এদের ব্যাপারে ভীতি কোথায়, আজকের পাকিস্তান, সোমালিয়া অথবা নাইজেরিয়ার দিকে তাকালেই সে কথা বোঝা যায়। শুদ্ধ ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠার নামে আদ-দাওলাহ্ দেড় হাজার বছর পিছিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। অতি নিষ্ঠুর এই আন্দোলন তাদের লক্ষ্য অর্জনে যে কী পরিমাণ অমানবিক হতে পারে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরাকে ভিডিও ক্যামেরার সামনে দুজন মার্কিন সাংবাদিককে গলা কেটে হত্যার ঘটনা তার প্রমাণ রেখেছে। নাইজেরিয়ায় আরেক খেলাফতি নেতার অনুসারীরা বন্দুকের ডগায় শ-তিনেক নাবালিকা স্কুলছাত্রী অপহরণ করেছে, তাদের অধিকাংশই এখন পর্যন্ত নিখোঁজ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্প্রতি আদ-দাওলাহ্র বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত অভিযানের কথা ঘোষণা করেছেন। শুধু সৌদি আরব নয়, তুরস্ক ও মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ সে অভিযানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অনেকেই ওবামার এই নয়া রণকৌশলে জর্জ বুশের ইরাক অভিযানের গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন। এই দুইয়ে মিল যে নেই তা নয়, কিন্তু একটা বড় ধরনের প্রভেদও রয়েছে। ওবামা গোড়াতেই বলে রেখেছেন, ইসলামিক স্টেট ঠেকাতে তিনি মার্কিন পদাতিক সেনা পাঠাবেন না। ইরান বা সিরিয়া দখল তাঁর লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য আদ-দাওলাহ্ ঠেকানো, সম্ভব হলে তা নিশ্চিহ্ন করা। নতুন সর্বদলীয় ইরাক সরকারের সেনাবাহিনী ও সিরিয়ার আসাদবিরোধী বাহিনীকে এ কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এমনকি প্রকারান্তরে ইরানও তাতে যুক্ত হবে। সৌদি আরব ও জর্ডানের বিমানবহর ইতিমধ্যেই বিমান হামলায় অংশ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোও এই অভিযানে সমর্থন দিয়েছে। সম্ভবত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনও মিলবে।
আদ-দাওলাহ্বিরোধী এই কোয়ালিশনে উপমহাদেশের দেশগুলোর কী ভূমিকা হবে, তারা কেউ এখনো খোলাসা করে বলেনি। আদ-দাওলাহ্র প্রধান, খলিফা আবু বকর আল-বাগদাদি দুই মাস আগে ভারতের নাম উল্লেখ করে ঘোষণা করেছিলেন, ইসলামের শত্রুকে যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই তাকে হত্যা করা হবে। এ কথার অর্থ ভারত অথবা বাংলাদেশ তার আক্রমণের বাইরে নয়। হায়দরাবাদের তরুণদের তৎপরতা থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশকে ‘ট্রানজিট’ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা নয়া জিহাদিরা করবে। এর আগে, আফগানযুদ্ধে পরাজয়ের পর বিদেশি তালেবানদের অনেকেই অন্যত্র যাওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল।
সমস্যাটি আন্তর্জাতিক, তার সমাধানও আন্তর্জাতিক পথে অর্জন করতে হবে। উপমহাদেশে আদ-দাওলাহ্র তিন প্রধান টার্গেট—পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশকে একে অন্যের সঙ্গে সলা–পরামর্শের মাধ্যমে সমন্বিত রণকৌশল গ্রহণ তাই জরুরি হয়ে পড়েছে। ওবামা যে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন গড়ার চেষ্টা করছেন, তার সঙ্গেই বা আমাদের সম্পর্ক কী হবে, সে প্রশ্নেও সমন্বিত সিদ্ধান্ত আখেরে সুফলদায়ক হবে।
যা-ই করি, হাত গুটিয়ে থাকার আর সময় নেই।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

আইএস যোদ্ধা ৩০ হাজারের ওপরে

ইরাক ও সিরিয়ার জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যোদ্ধার সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি হতে পারে। এত দিনকার ধারণার চেয়ে তা অনেক বেশি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছে। এদিকে আইএসবিরোধী জোট গঠন নিয়ে পাশ্চাত্যের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ আরও জোরদার হয়েছে। খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির। সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের হয়ে যুদ্ধ করা প্রকৃত জিহাদির সংখ্যা নিয়ে শুরু থেকেই বিভ্রান্তি রয়েছে। কট্টরপন্থী সুন্নি সংগঠনটির যোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে সিআইএ গত বৃহস্পতিবার যে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে, তা আগের অনুমানের চেয়ে তিন গুণের বেশি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাটির মুখপাত্র রায়ান ট্রাপানি এক বিবৃতিতে বলেন, সিরিয়া ও ইরাকে লড়াইয়ের মাঠে আইএসের ২০ থেকে সাড়ে ৩১ হাজার যোদ্ধা রয়েছে। গত মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সিআইএ এ হিসাব করেছে। এর আগের অনুমানে বলা হয়েছিল, জঙ্গিগোষ্ঠীটির যোদ্ধার সংখ্যা ১০ হাজারের মতো হবে। আইএসকে রুখতে জোট গঠন প্রশ্নে সৌদি আরবের জেদ্দায় গত বৃহস্পতিবার আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। ওই বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে বলা হয়, আইএসের বিরুদ্ধে ‘নিবিড় লড়াই’ চালাতে দেশগুলো নিজেদের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করতে সম্মত হয়েছে।
জেদ্দায় বৈঠক শেষে জন কেরি গতকাল শুক্রবার তুরস্কে যান। তুরস্ক আইএসবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নেবে না এবং এমনকি তাদের বিমানঘাঁটিগুলোও ব্যবহার করতে দেবে না—এমন ঘোষণার পরদিন কেরি সেখানে গেলেন। তুরস্কের দূরে থাকার বড় কারণ হচ্ছে, আইএসের হাতে তাদের কূটনীতিকসহ ৪৯ জন জিম্মি থাকা। ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে জার্মানি এবং সম্ভবত যুক্তরাজ্যও আইএসবিরোধী বিমান হামলায় অংশ নেবে না। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল গতকাল আবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অবশ্য একই দিন দেশটি ঘোষণা দিয়েছে, আইএসকে সহায়তা করার বিষয়টি তারা অপরাধ হিসেবে গণ্য করবে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ গতকাল ইরাকে বলেন, আইএসের বিরুদ্ধে ইরাকে লড়াইয়ে মানবিক ও সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে তিনি আলোচনা করবেন। িসরিয়াও জোটে থাকতে চায়: সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের উপদেষ্টা বুথানিয়া শাবান গতকাল বলেন, সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় শিকার সিরিয়া। তাই দেশটিকে অবশ্যই জিহাদিবিরোধী জোটে নিতে হবে। ওয়াশিংটন বলেছে, তারা সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে বিমান হামলার পরিকল্পনা করলেও সিরীয় সরকারের সঙ্গে কাজ করবে না

নয় রাজ্যে মোদির পরীক্ষা আজ

মোদি-হাওয়ার বেগ কতটা বজায় আছে, ভারতের নয় রাজ্যের ৩৩টি বিধানসভা ও তিনটি লোকসভা আসনের উপনির্বাচনে আজ শনিবার তা বোঝা যাবে। চলতি বছরের শেষে চার রাজ্যের বিধানসভা ভোটের আগে এটাই শেষ শক্তি পরীক্ষা। এই উপনির্বাচনে এও বোঝা যাবে, উত্তর প্রদেশে বিজেপিকে কোনো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে সমাজবাদী পার্টি ফেলতে পারবে কি না। মোট ৩৩টি বিধানসভা উপনির্বাচনের মধ্যে উত্তর প্রদেশে ভোট হবে ১১টি ও গুজরাটে নয়টি আসনে। এগুলোর প্রত্যেকটিই ছিল বিজেপির দখলে। এই দুই রাজ্য ছাড়া ভোট হচ্ছে রাজস্থানে চারটি, আসামে তিনটি, পশ্চিমবঙ্গে দুটি এবং তেলেঙ্গানা, ছত্তিশগড়, ত্রিপুরা ও সিকিমে একটি করে আসনে। লোকসভা উপনির্বাচনে মূল আগ্রহ উত্তর প্রদেশের মৈনপুরি আসনকে ঘিরে। সমাজবাদী পার্টির প্রধান মুলায়ম সিং যাদব আজমগড় রেখে মৈনপুরি ত্যাগ করেছেন। নরেন্দ্র মোদিও দুই আসনে জিতে বারানসি রেখে ভদোদরা ছেড়ে দেন। ভোট হচ্ছে সেখানেও। তৃতীয় আসনটি মেডাক। এই আসন ছেড়ে নতুন রাজ্য তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন চন্দ্রশেখর রাও।
বিজেপির চিন্তার জায়গা অবশ্যই উত্তর প্রদেশ। লোকসভা ভোটে রাজ্যের ৮০টি আসনের মধ্যে বিজেপি ও তার সহযোগী আপনা দল ৭৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল। মোদি-হাওয়ায় খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিল বিরোধীরা। মায়াবতীর দল বহুজন সমাজ পার্টি একটি আসনও জিততে পারেনি। উপনির্বাচনে তারা এবার লড়ছে না। ফলে ১১টি আসনে লড়াই প্রধানত বিজেপির সঙ্গে সমাজবাদী পার্টির। বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ প্রচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন গোরক্ষপুরের বিতর্কিত সাংসদ যোগী আদিত্যনাথের ওপর। শাহ ও আদিত্যনাথ দুজনেই সাম্প্রদায়িক প্রচারের দায়ে অভিযুক্ত। ‘লাভ জিহাদ’কে কেন্দ্র করে রাজ্য-রাজনীতি রীতিমতো সরগরম। গুজরাট আর রাজস্থানে হবে কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা ভোটে বিজেপির ফল ভালো হয়েছিল। আসামে ১৪টির মধ্যে বিজেপি পায় সাতটি। আর পশ্চিমবঙ্গে মাত্র দুটি আসন পেলেও ভোটের হার বেড়ে হয়েছিল ১৭ শতাংশের বেশি। বিজেপি এই দুই রাজ্যে প্রভাব বিস্তারে বিশেষ নজর দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে বিজেপি প্রাসঙ্গিক। সারদা চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে কোণঠাসা তৃণমূল এই দুই আসনে জিততে মরিয়া। তেমনি বসিরহাট কেন্দ্রটি ছিনিয়ে নিতে বিজেপিও চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না।

স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার গণভোট by সাযযাদ কাদির

ইতিহাসে, প্রত্নতত্ত্বে, কিংবদন্তিতে সুবিখ্যাত ট্রয় নগরী এখন তুরস্কের অন্তঃপাতী ট্রুভা। এর পাশেই দারদানেলেস প্রণালী। সেখানে আইদা পর্বতের উপরে স্থাপিত দারদানা নগরীর রাজপুত্র ছিলেন আনকাইসিস ও দেবী ভেনাস (আফরোদিতি)-র প্রেমজ সন্তান ইনিয়াস। ট্রয় যুদ্ধের অন্যতম বীর নায়ক তিনি। তাঁর বংশধর ব্রুটাস বা ব্রুট অভ ট্রয় পত্তন করেন বর্তমান বৃটেনের, তিনিই প্রথম রাজা বৃটেনের। এ উপকথার হদিস মেলে নবম শতকের ওয়েলশ সন্ত নেনিয়াস রচিত ‘হিসটোরিয়া বৃটোনাম’ নামের ইতিবৃত্তে। এ বৃত্তান্তের আরও বিশদ রূপ মেলে দ্বাদশ শতকের ওয়েলশ যাজক জিওফ্রে অভ মনমুথ রচিত ‘হিসটোরিয়া রিগাম বৃটানিয়া’য়। ইংরেজদের লোককথায় বলা হয়, ব্রুটাসের তিন পুত্র- লোকরিনাস, আলবানাকটাস ও কামবার। মৃত্যুর আগে লোকরিনাসকে ইংল্যান্ড, আলবানাকটাসকে স্কটল্যান্ড এবং কামবারকে ওয়েলশ শাসনের ভার দিয়ে যান তিনি। এ কিংবদন্তি মানতে রাজি নন স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের মানুষ। তাঁদের লোককথায় রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বৃত্তান্ত। সে বৃত্তান্ত অনুযায়ী জনপদ হিসেবে স্কটল্যান্ডের পত্তন আরও অনেক আগে। গ্রিক রাজপুত্র গোইডেল গ্লাস ও মিশরীয় ফারাও-দুহিতা স্কটা-র বংশধর বলে নিজেদের দাবি করেন তাঁরা। তাঁদের বিশ্বাস, ঐতিহ্যিক ‘স্টোন অভ ডেসটিনি’ মিশর থেকে স্কটা-ই এনেছেন স্কটল্যান্ডে।
দু’টি অঞ্চলের মানুষের এই স্বাতন্ত্র্যচেতনার পরিচয় মেলে সেই পৌরাণিক যুগ থেকেই। তবে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু ১২৯৬ অব্দ থেকে। ওই বছর ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডওয়ার্ড যুদ্ধাভিযান চালান স্কটল্যান্ডে। হানাদারদের তাড়িয়ে দিতে স্কটল্যান্ডের মানুষ যুদ্ধ শুরু করে উইলিয়াম ওয়ালেস-এর নেতৃত্বে। পরের বছর বিদ্রোহ করেন রবার্ট দ্য ব্রুস। যুদ্ধ চলে বছরের পর বছর। শেষে ১৩১৪ সালে বানোকবার্ন-এর যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে ইংরেজ বাহিনী। ওই যুদ্ধের ঠিক ৭০০ বছর পর, আসছে বৃহস্পতিবার ১৮ই সেপটেম্বর, আবারও এক স্বাধীনতা যুদ্ধে ইংল্যান্ড তথা গ্রেট বৃটেন তথা যুক্তরাজ্যের মুখোমুখি হয়েছে স্কটল্যান্ড। এ যুদ্ধ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, রক্তপাতহীন। ওই দিন গণভোট হবে স্বাধীনতার পক্ষে বিপক্ষে। এ গণভোটের জন্য অবশ্য সংগ্রাম করতে হয়েছে অনেক। সে সংগ্রামের শুরু ১৯৩৪ সালে। ওই বছর গঠিত হয় স্বাধীনতাপন্থি রাজনৈতিক দল স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এস এন পি)। এ দল পার্লামেন্টে প্রথম আসন পায় ১৯৪৫ সালে। ১৯৭৩ সালে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলশ-এ দায়িত্ব হস্তান্তরের সুপারিশ করে কিলব্র্যান্ডন কমিশন। ১৯৭৯ সালে গণভোট হয় স্কটল্যান্ডে  দায়িত্ব হস্তান্তর প্রশ্নে, কিন্তু প্রয়োজনীয় ৪০% ভোট পেতে ব্যর্থ হন হস্তান্তরপন্থিরা। মারগারেট থ্যাচারের রক্ষণশীল সরকার পোল ট্যাক্স চালু করায় স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে ১৯৭৯ সাল থেকে। ১৯৯৬ সালে রাজা-রানীর অভিষেক শিলা হিসেবে ব্যবহৃত ‘স্টোন অভ ডেসটিনি’ স্কটল্যান্ডে ফেরত পাঠায় বৃটিশ সরকার। ১৯৭৭ সালের গণভোটে বিপুল সমর্থন পায় কর-বৃদ্ধির ক্ষমতা সহ স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার দাবি। ১৯৯৮ সালে প্রণীত হয় স্কটিশ অ্যাক্ট- দেয়া হয় স্কটিশ পার্লামেন্টের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে দায়িত্ব। ১৯৯৯ সালে ১২৯ সদস্যের স্কটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টি পায় ৫৬ আসন, এসএনপি পায় ৩৫ আসন। ২০০৪ সালে হলিরুড-এ রাজকীয় উদ্বোধন হয় স্কটিশ পার্লামেন্টের। ২০০৭ সালে স্কটিশ সরকারের উদ্যোগে জাতীয় সংলাপ শুরু হয় স্কটল্যান্ডের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে। ২০০৭ সালে কয়েকটি ইস্যুতে গ্রিন পার্টির সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে এসএনপি। ২০১১ সালে ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স সালমন্ড-এর নেতৃত্বে ৬৯ আসন পেয়ে স্কটল্যান্ডের প্রথম সংখ্যাগুরু সরকার গঠন করে এসএনপি। ২০১২ সালের অকটোবরে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও অ্যালেক্স সালমন্ড স্বাক্ষর করেন ‘এডিনবরা এগ্রিমেন্ট’, খুলে যায় স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের পথ। ২০১৩ সালের নভেম্বরে স্কটিশ সরকার স্বাধীনতার পক্ষে কি ও কেন তুলে ধরে প্রকাশ করে স্কটল্যান্ড’স ফিউচার শীর্ষক শ্বেতপত্র। অবশেষে আগামী বৃহস্পতিবার গণভোট।
এখন এই শেষ সপ্তাহে পক্ষে বিপক্ষে প্রচার-প্রচারণা চলছে তুঙ্গে। জরিপের পর জরিপ চলছে, প্রকাশ পাচ্ছে প্রতিদিন। মিডিয়ায় এই হ্যাঁ তো এই না অবস্থা। তবে সব মিলিয়ে প্রচারে এগিয়ে আছে না-পন্থিরা। বিবিসি সহ বিভিন্ন গণমাধ্যম পক্ষপাতিত্বমূলক প্রচার চালাচ্ছে বলে প্রতিবাদ উঠেছে জোরেশোরে। স্কটিশরা দু’ ভাগ হয়ে গেছে প্রায় সমান-সমান। হাঁ-পন্থিদের পক্ষে বরাবরই জোরালো সমর্থন দিয়ে আসছেন প্রখ্যাত অভিনেতা স্যন কনেরি সহ অনেক নন্দিত স্কটম্যান। অন্যদিকে স্কটউওম্যান বেস্টসেলার লেখিকা জে কে রোলিং নেমেছেন না-পন্থিদের পক্ষে।  তাঁদের প্রচার-তহবিলে দিয়েছেন ১০ লাখ পাউন্ড।
স্বাধীনতা  সার্বভৌমত্ব পাবে কি স্কটল্যান্ড? বলা সম্ভব নয় কোনও ভাবেই। ১৯৮০ ও ১৯৯৫ সালে এমনই গণভোট হয়েছিল কুইবেক-এ, কানাডা থেকে আলাদা হতে চেয়েছিলেন ওই ফরাসিভাষী প্রদেশের মানুষ। কিন্তু জয়যুক্ত হয় না-ভোট। শেষের বার অবশ্য সামান্য ভোটের ব্যবধানে হেরে যান হাঁ-পন্থিরা। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনতা, মুক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তুলে নির্যাতিত হচ্ছে বহু জাতি, জাতিসত্তা, জনগোষ্ঠী- অনেকে বেছে নিয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষের পথ। শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় ব্যর্থ হচ্ছে জাতিসংঘ। এ অবস্থায় গণভোটের মাধ্যমে জনগণের আশাআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর ক্ষেত্রে কুইবেকের পর নিশ্চয়ই এক আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে স্কটল্যান্ড।
১২.০৯.২০১৪