Sunday, July 27, 2014

ঈদ উৎসবে ৮ পরিবারের কান্না

ঈদের আর মাত্র ৩ দিন বাকি। সমগ্র রাজধানীতে উৎসবের আনন্দ। এই উৎসবের মুহূর্তে সন্তানহারা, স্বামীহারা, পিতাহারা কিছু মুখ গতকাল সকালে একত্রিত হয়েছিল জাতীয় প্রেসক্লাবে। তারা দাবি জানিয়েছে গুম হওয়া প্রিয়জনকে ফিরিয়ে দেয়ার। স্বজনদের আরজি, ‘ওরা গুম, ওরা স্বজনদের কাছে ঈদ করতে চায়। ওদের ফিরিয়ে দিন।’ জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে গুম হওয়া ৮ ব্যক্তির পরিবার শনিবার সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই আকুতি জানায়। গুম হওয়া ৮ ব্যক্তি হলেন ঢাকা মহানগর বিএনপির ৩৮নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন, তার খালাতো ভাই জাহিদুল করিম তানভীর, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম জন্টু, পূর্ব নাখালপাড়ার আবদুল কাদের ভূইয়া মাসুম, পশ্চিম নাখালপাড়ার মাজহারুল ইসলাম রাসেল, মুগদার আসাদুজ্জামান, উত্তর বাড্ডা এলাকার আল-আমিন ও শাহীনবাগের এএম আদনান চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে সমাজের বিশিষ্ট নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা অংশ নিয়ে সংহতি প্রকাশ করেন। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না শোকার্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, আমাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করলে চলবে না। অসহায়ত্বই আমাদের শক্তি। প্রয়োজনে ঈদের পরে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে অনশনসহ কঠোর কর্মসূচি পালন করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমালোচনা করে মান্না বলেন, থানায় জিডি করতে গিয়ে স্বজনরা জিডি করতে পারেননি। জিডির ভাষা থানা থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। পুলিশ র‌্যাবকে ওপর থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেই তারা এমন করেছে। বিএনপির সমালোচনা করে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান দাবিতে বিএনপি তেমন কোন ভূমিকা রাখেনি। তাই সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের দাবি আদায় করতে হবে। তিনি র‌্যাবকে ‘কিলার বাহিনী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, র‌্যাব কোন এলিট ফোর্স নয়। এটা কিলার ফোর্স। এখানে পুলিশ, আনসারসহ সব বাহিনীর সদস্য আছে। এলিট ফোর্স শুধুমাত্র এলিট শ্রেণীর নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ের গুমের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করে মান্না বলেন, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সব গুমের ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রী দায়ী। তার উচিত কোন থানার কোন পুলিশ বা র‌্যাব এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। তিনি শাস্তি না দিলেও এক সময় ঠিকই তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। প্রধানমন্ত্রী সবকিছুর ঊর্ধ্বে নন। একদিন প্রত্যেক ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাকতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, গাজায় ৮০০ লোককে হত্যা করার কারণে সারা বিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠেছে। অথচ বাংলাদেশে একটা বাহিনী ৮০০ লোক মেরে ফেলেছে। কিন্তু কোন প্রতিবাদ হচ্ছে না। তিনি বিএনপি নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানান, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে র‌্যাব বিলুপ্ত করতে হবে এমন অঙ্গীকার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, গুম হওয়া সদস্যদের পরিবারের দুঃখ আপনার বোঝার কথা। ঈদের উপহার হিসেবে ৮ ব্যক্তিকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন। এটা আপনার নৈতিক দায়িত্ব। প্রয়োজন হলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান দাবিতে নাগরিক সমাজ ঈদের পরে কঠোর আন্দোলন করবে বলে ঘোষণা দেন তিনি। সাংবাদিক সম্মেলনে সংহতি প্রকাশ করে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, এতো কিছুর পরেও অনেকেই র‌্যাবের পক্ষে কথা বলছেন। আমরা আর কত অসভ্য-বর্বর হবো। দেশে আইন থাকা সত্ত্বেও একটা বাহিনী বিনা বিচারে ৮০০ লোককে হত্যা করলো। এটা প্রমাণ করেছে আইন জিনিসটা খুব খারাপ। তারা আইনকে বিশ্বাস করে না। তিনি র‌্যাবকে সৃষ্টিকর্তার চেয়েও সর্বজান্তা দাবি করে বলেন, শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ মানুষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেবেন। তাদের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি অথবা পুরস্কৃত করবেন। অথচ র‌্যাব কোন প্রকার বিচার ছাড়াই মানুষকে মেরে ফেলছে। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সব সময় বলেন আমাদের দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করবেন। এর মানে দেশে আইনের সুশাসন কায়েম হতে হবে। এখন যদি গুম-খুনের বিচার না হয় তবে ৩০-৪০ বছর পরে এর বিচার হবে। তখন জড়িত সবার বিচার হবে। র‌্যাবে কর্মরত কাউকে শান্তি মিশনের নিয়োগ না দেয়ার জন্য বাংলাদেশে সফররত জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান ড. শাহদীন মালিক। মানবাধিকার কর্মী ও নারীনেত্রী শিরিন হক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানবাধিকার কর্মীরা অসহায়বোধ করছে। কোন ব্যাপারেই কোন প্রতিকার মিলছে না। বর্তমানে কাউকে আশা দেয়া যাচ্ছে না যে এর প্রতিকার হবে। রাজনৈতিক দলগুলো শুধু বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। অধিকার সম্পাদক আদিলুর রহমান খান সাংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে বলেন, ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে ও পরবর্তী সময়ের ন্যায় বর্তমানে গুমের ঘটনা ঘটছে। গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট ২৮ ব্যক্তিকে গুম করা হয়েছে। একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। অবিলম্বে গুম বন্ধে রাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষে সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন ফেরদৌসী সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমার মধ্যে আবার নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে আমাদের ভাইদের খুঁজে পাবো। সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।

বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতা by সাইদা হামিদ

আমি ১১ বছর পর বাংলাদেশে ফিরছিলাম। ২০০৩ সালে আমি সর্বশেষ দেশে এসেছিলাম, সে সময় উইমেন্স ইনিশিয়েটিভ ফর পিস ইন সাউথ এশিয়া (ডব্লিউআইপিএসএ) কর্মসূচির আওতায় কলকাতা থেকে ৪৩ জন নারীর সঙ্গে এখানে এসেছিলাম।
এবার এমন একদল নারী-পুরুষের সঙ্গে দেশে এসেছি, যারা সারা দুনিয়ায় ক্ষুধা নিবারণের পণ নিয়ে মাঠে নেমেছে। আমি দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টে (টিএইচপি) কাজ শুরু করি মাত্র দুই বছর আগে। কিন্তু আমার সঙ্গে এই সফরে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা এই লক্ষ্যে কাজ করছেন ২৭ বছর ধরে।
এ গল্প অবশ্য বাংলাদেশ নিয়ে, এই দেশটি আমাদের এবারের সফরের দ্বিতীয় গন্তব্য। এই গল্পে একজন মা ও মেয়ে আছেন। আমার কাছে মনে হয়, এটাই এই গল্পের সবচেয়ে অসাধারণ ও মর্মভেদী অংশ। শেরি স্ট্রমবার্গ তাঁর মেয়ে সোফিকে নিয়ে নিউইয়র্ক থেকে এসেছেন শুধু একটি কারণে, ক্ষুধা কী জিনিস সেটা তাঁর মেয়েকে দেখাতে। এই শেরি টিএইচপির গ্লোবাল বোর্ডের সদস্য ও নিউইয়র্কের সিটি ব্যাংক সিটি শেয়ার সার্ভিসের বৈশ্বিক প্রধান। সোফি মেয়েটার চুল বেশ লম্বা, তাঁর পরনের উজ্জ্বল রঙের লেহেঙ্গা ও ফিতার মতো দোপাট্টায় তাঁকে আমাদের দলে কাদম্বরীর মতো লাগত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাদম্বরী আমি পড়েছি, কিন্তু খুলনায় গিয়ে এই চমৎকার কদম ফুলটি দেখার আগ পর্যন্ত আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি, এটা আসলে কী বস্তু। আমার কাছে এটা ছিল সোফি। পুরো সফরে তিনি রাতের বেলা জার্নাল লিখতেন। প্রথমে ভারত ও পরে বাংলাদেশবিষয়ক তাঁর অভিব্যক্তি তিনি রেকর্ড করে রেখেছেন। রাজস্থানের মরুভূমির শক্তিমান নারীরা তাঁদের গ্রামের পরিবর্তনের দূত হিসেবে কাজ করেন, মেয়েটি এই বিস্ময়ের কথা যেমন লিখেছেন, তেমনি খুলনার যে সাহসী নারীরা গ্রামের নেতা ও সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের কথাও তিনি লিখেছেন। মেয়েটি সফরের বিভিন্ন স্থানে নানা রকম খাদ্যের স্বাদ পেয়েছেন, মেয়েটি সে কথা উৎসাহ নিয়ে লিখেছেন। আবার রাস্তার মোড়ে গাড়ি থামলে যে শিশুরা গাড়ির জানালায় এসে ভিক্ষা চাইত, তাদের কথাও তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বর্ণনা করেছেন। সোফি কাব্যিক ঢঙে এসব ঘটনার বিবরণ লিখেছেন।
এই মেয়েটি খুব সাধাসিধেভাবে নিজের পরিচয় দিতেন, ‘আমি সোফি, নিউইয়র্ক থেকে এসেছি, উনি আমার মা।’ এই মেয়েটি আমার কাছে ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের প্রতীক। বিশ্বের সবচেয়ে সচ্ছল এলাকার মেয়ে ক্ষুধা দেখে কষ্ট পেলে বুঝতে হবে, আমাদের আশার কোনো কমতি নেই—দুঃখের বৈতরণি পার হতে আশাই একমাত্র ভেলা।
আমরা বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মানুষেরা একটি বেসরকারি বাসে চেপে ছয় ঘণ্টার ভ্রমণ করে খুলনায় যাই। উদ্দেশ্য হচ্ছে, হাঙ্গার প্রজেক্ট কেমন কাজ করছে তা দেখা। বদিউল আলম মজুমদারের আতিথ্যে আমরা সেখানে যাই। নিজের কাজে তিনি নিরলস। আমাদের দলে নিউইয়র্ক, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন, মোজাম্বিক ও ভারতের প্রতিনিধি ছিলেন।
আমাদের দলে নানা বয়সী নারী-পুরুষ ছিলেন। ১১ বছরের সোফি থেকে ৭৪ বছর বয়সের মোহিনী গিরি—ভারতের ন্যাশনাল অব উইমেনের সাবেক সভানেত্রী। সুসজ্জিত মহাসড়ক ধরে আমাদের বাস এগিয়ে চলে। এটা ঢাকা থেকে শুরু হয়ে শ্যামল গ্রামগুলোর ভেতর দিয়ে গেছে। পথে আমাদের পদ্মা নদীও পার হয়ে যেতে হয়। এ নদীর অপর পারেই বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। ত্রিপুরার সাব্রুম থেকে আমি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দেখেছি। আখাউড়া যৌথ চেকপোস্ট থেকেও আমি আগরতলা সীমান্ত দেখেছি। সীমানা ও সীমান্ত রাজনীতিতে পূত–পবিত্র ব্যাপার হলেও জনগণের কাছে তা বিস্তৃত ধানের খেত ছাড়া কিছু নয়, কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে সেটা আরেকটি দেশ হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত আমরা বটিয়াঘাটা ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছালাম। সেখানে বাস থেকে নেমে ছোট ভ্যানে করে গ্রামের সরু পথ ধরে আমরা এগিয়ে চললাম। বৈঠকের নির্দিষ্ট স্থান বাশুরাবাদে গিয়ে পৌঁছালাম। একটি হলে বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল, শতাধিক নারী-পুরুষ সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। নারীনেত্রী সুচিত্রা বসাক বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এবং নারী শিশুর শিক্ষাবিষয়ক প্রচারণার ব্যাপারে আমাদের অবহিত করলেন। তারপর ১৬ বছর বয়সী সপ্রতিভ কিশোরী জুলি বলল, সে কীভাবে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে তার বড়দের মতামত গঠনের চেষ্টা করেছে। সেখানকার প্রধান মনোরঞ্জন, ইউএনও শান্তময় চাকমা ও অ্যানিমেটর সুপ্রিয়া গাইন বললেন, তাঁরা জন্মনিবন্ধন, উপার্জন বৃদ্ধিবিষয়ক এবং যৌতুক ও সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন। সেখান থেকে আমরা বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদে গেলাম, সেখানেও এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হলো। দেখলাম, অধিকাংশ নারী সিঁদুর ও বিন্দি পরিহিত। শুধু এক বা দুজন নারী হিজাব পরিহিত। দুজন তরুণী নিরাপত্তারক্ষী আমাকে বলল, এটা মূলত হিন্দু–অধ্যুষিত একটি গ্রাম, তবে সেখানে হিন্দু ও মুসলমানেরা শান্তিতে বসবাস করে। এই মেয়ে দুটো মুসলমান।
সফরে আমরা জানতে পারলাম, বটিয়াঘাটা ইউনিয়ন পরিষদে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা, বাশুরাবাদ ও হেতালবুনিয়ার মানুষজন একত্র হবেন। বাগেরহাটের বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদে নারী নেতারা, যুবনেতা ও ওয়ার্ড অ্যাকশন দলের সদস্যরা সত্যিকার অর্থেই উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা শুধু ব্রশিওরের ছবির জন্য পোজ দিতে আসেননি। আমাদের সবার কাছে এগুলো ছিল অপরিচিত নাম, আমাদের সফরসূচিতে যে শব্দগুলো লেখা ছিল। হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের তিনটি স্তম্ভ আমাদের সামনে বাস্তব হয়ে ধরা দিল। প্রথমত, আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য তৃণমূলে জনগণকে একত্র করা, নারীরা পরিবর্তনের দূত এবং স্থানীয় সরকারের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারি গড়ে তোলা।
আমরা দেখলাম, কীভাবে প্রশিক্ষণ ও উদ্দীপনা জোগানোর মাধ্যমে টিএইচপি তৃণমূলে এক লাখ ৪০ হাজার মানুষকে একত্র করেছে। এই কাজে যারা অংশ নিয়েছে, তাদের ৪০ শতাংশই নারী। দ্বিতীয় স্তম্ভ, অর্থাৎ পরিবর্তনের দূত হিসেবে নারী—এই কৌশলটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়ই কাজে দিয়েছে। ভারত সরকারের ১১তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রথমবারের মতো ‘নারীদের কর্মকাণ্ডের’ কথা বলা হয়েছে, ১২তম পরিকল্পনায় সেটাকে আরও পোক্ত করা হয়েছে। টিএইচপি প্রায় ছয় হাজার নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের মধ্যে নেতৃত্ব বিকশিত করেছে, তাঁরা এখন স্থানীয় সরকারের কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। তৃতীয় ও সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ হচ্ছে স্থানীয় সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্ব। বেতাগী ও বটিয়াঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে আমাদের অংশীদারি সফল হয়েছে। দুজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে আমি অভিভূত।
তৃণমূলের পরিবর্তন ঘটাতে হলে অনেক আশা ও ধৈর্য প্রয়োজন। টিএইচপি বাংলাদেশের কার্যক্রম দেখে জালালউদ্দিন রুমির কয়েকটি চরণের কথা মনে পড়ে গেল:
বহমান ও ধীর পদক্ষেপে আমরা কাজ করতে শিখি
খাঁড়ির নিস্তরঙ্গ পরিষ্কার পানির মতো
এ ধারা থামে না, এ ধারা বয়ে যায় আর
পথ খুঁজে নেয়
ছোট ছোট অসংখ্য পদক্ষেপে, স্বেচ্ছায়
আর তাতেই আমরা আশার খোরাক পেয়ে যাই।
আমি বাংলাদেশে কাটানো সেই তিনটি দিনের কথা ভাবছি। ঢাকা শহরে বড় বড় বিলবোর্ডে মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপন আর নারী-পুরুষের বাহারি পোশাকের বিজ্ঞাপন দেখে ঢাকাকে দক্ষিণ এশিয়ার আর দশটি শহরের মতোই মনে হয়। কিন্তু খুলনার পথে আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজের যে সমারোহ দেখলাম, তা আমি আর কোথাও দেখিনি। অন্যদিকে সুন্দরবন দেখার লোভ আমার কাছে অধরা স্বপ্নের মতোই রয়ে গেল, এ বনটির বাংলাদেশ অংশ ভারতের অংশের চেয়ে সুন্দর।
এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশ দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বলেই মনে হয়। এমনকি আইএমআর এবং এমএমআর হ্রাসে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করেছে বাংলাদেশ। ইউনিয়ন পরিষদ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিরা টিএইচপিতে কাজ করতে গিয়ে ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভালোবাসার এই দেশের ভবিষ্যৎ ভালোই বোধ হচ্ছে, দেশের সাধারণ মানুষের সচেতনতার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে।
সারা দুনিয়ার নারী-পুরুষদের নিয়েই এই টিএইচপি গঠিত। তৃণমূলের ক্ষমতায়নে এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক কাজগুলো সরকারের সঙ্গে মিলেমিশেই করা হয়, এতে উভয়ই লাভবান হয়। এটা সরকারের সমান্তরাল কিছু নয়। সারা দুনিয়ার মানুষ এ গ্রহের সবচেয়ে গরিব ও দুর্বল মানুষদের জন্য চিন্তা করছেন, এটা ভাবতেই আমার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে—তাঁরা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে এসব জায়গায় এসে কাজ করছেন, যেটা তাঁদের জন্য নতুন দুনিয়াই বটে।
সফর শেষে আমি ভারতে ফিরে গেলাম। সঙ্গে ছিল বাংলাদেশের আলো আর সোফির হাতে লেখা জার্নালের মধ্যে যে আশা প্রোথিত হয়ে আছে, সেই আশা।

ড. সাইদা হামিদ: ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য।

টানা বিভী​ষিকার পর আধা দিনের যুদ্ধবিরতি

আকাশ থেকে পড়েছে বোমা। গলি থেকে ছুটে এসেছে বুলেট।
জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘরের কোণে কোনো রকমে
কেটেছে ১৯টি দিন। গতকাল ১২ ঘণ্টার জন্য থেমেছিল
সেই বিভীষিকা। এই সুযোগে হাতের কাছে সহায়সম্বল
যেটুকু পাওয়া গেছে, তা-ই নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের
সন্ধানে বের হয় গাজার মানুষ। ছবি: এএফপি
টানা ১৯ দিনের বিভী​ষিকার পর গতকাল শনিবার ১২ ঘণ্টার জন্য দম নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন ফিলিস্তিনের গাজাবাসী। ইসরায়েল-হামাস উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে প্রতিষ্ঠিত হয় এই মানবিক অস্ত্রবিরতি। এই সময়টুকুতে বাড়ি ফিরে অনেক ফিলিস্তিনি ধ্বংসাবশেষের ভেতরে আটকে পড়া স্বজনদের তল্লাশির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার ফুরসত পেয়েছেন। তবে অস্ত্রবিরতির ঠিক আগে ইসরায়েলের এক হামলাতেই নিহত হয়েছেন অন্তত ২০ ফিলিস্তিনি। গাজার খান ইউনুস এলাকায় নিহত ওই ব্যক্তিদের মধ্যে একই পরিবারের সদস্য অন্তত ১৬ জন। খবর এএফপি ও বিবিসির।
গতকাল স্থানীয় সময় সকাল আটটায় মানবিক অস্ত্রবিরতি শুরু হয়। তখন পর্যন্ত গাজায় ১৯ দিনের ইসরায়েলি অভিযানে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ৯৪০। আহত প্রায় ছয় হাজার। অন্যদিকে ইসরায়েলের পক্ষে নিহতের সংখ্যা ৩৮। ফিলিস্তিনের গাজা শাসনকারী ইসলামপন্থী গোষ্ঠী হামাসের মুখপাত্র সামি আবু জুহরি গত শুক্রবার রাতে বলেন, শনিবার ১২ ঘণ্টার জন্য একটি মানবিক অস্ত্রবিরতির ব্যাপারে একটি ‘জাতীয় মতৈক্য’ হয়েছে। পরে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীও (আইডিএফ) নিজস্ব টুইটার অ্যাকাউন্টে অস্ত্রবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করে। তবে আক্রান্ত হলে জবাব দেওয়ারও হুমকি দেয় তারা। আইডিএফের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সন্ত্রাসীরা আইডিএফের সদস্যদের আক্রমণ করার জন্য এই সময়কে ব্যবহার করলে বা ইসরায়েলি বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে রকেট ছুড়লে আমরা তার জবাব দেব।’ এ ছাড়া মানবিক অস্ত্রবিরতি চলাকালেও গাজায় হামাসের সুড়ঙ্গগুলোর অবস্থান ‘নির্ণয় ও নিষ্ক্রিয় করা’ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় তারা। এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই গতকাল সকাল আটটায় অস্ত্রবিরতি শুরু হওয়ার পর গাজা উপত্যকায় কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসে। ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শাজাইয়া, খান ইউনুস, বেইত হানুনসহ গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় সকাল আটটার পরপরই লোকজনের ঢল নামে। যদিও তা না করতে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। চারদিকে দেখা যায় ধ্বংসের চিহ্ন।
এদিকে গাজায় দীর্ঘমেয়াদি একটি অস্ত্রবিরতির জন্য গতকালই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আন্তর্জাতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সেখানে তুরস্ক, কাতার, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টানা বৈঠকে মিলিত হন। অন্তত এক সপ্তাহের অস্ত্রবিরতির ব্যাপারে কেরির শুক্রবারের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তাঁর ওই অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব ইসরায়েল এদিন প্রত্যাখ্যান করে। তবে কেরি দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্রবিরতির ব্যাপারে এখনো আশাবাদী। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর মিসরের কায়রোতে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, একটি অস্ত্রবিরতির ব্যাপারে সম্মত হতে ইসরায়েল ও হামাস উভয়ের সামনে ‘কিছু পরিভাষা এখনো রয়েছে’। এরপর কেরি গতকাল ফ্রান্সের প্যারিসে উড়ে যান। সেখানে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা ফ্যাবিয়াস গাজা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওই বৈঠকের আয়োজন করেন। ফরা​সি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে গাজায় একটি অস্ত্রবিরতির জন্য যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি তৈরি করতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে এককাট্টা করা।’ গাজা থেকে ইসরায়েলের ভেতরে হামাসের রকেট নিক্ষেপ বন্ধ করার ধুয়া তুলে ৮ জুলাই ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামে অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী। এই অভিযান প্রথম দিকে আকাশ ও নৌপথ থেকে বোমা নিক্ষেপ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৭ জুলাই ট্যাংক ও  কামান নিয়ে স্থল অভিযানও শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধ শিশু অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো হবে

বারাক ওবামা
যুক্তরাষ্ট্রে বৈধতা না থাকা অভিবাসী শিশুদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মধ্য আমেরিকার নেতাদের এ কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত হয়ে অভিবাসী শিশুদের ব্যাপক হারে প্রবেশ নিয়ে সৃষ্ট সংকটের বিষয়ে আলোচনা করতে ওই নেতারা যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। খবর বিবিসির। মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সহিংসতা, চরম দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন কারণে জীবনমান খুব একটা ভালো নয়। পাশাপাশি সম্প্রতি গুজব রটে, কোনো উপায়ে শিশুরা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে গেলে সেখানে তাদের থেকে যেতে দেওয়া হবে। এরপর দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত হয়ে অবৈধ শিশু অভিবাসীদের ঢল নামতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায় গত অক্টোবর মাস থেকে এ পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি শিশুকে আটক করা হয়েছে। এখনো ওই সীমান্ত হয়ে অভিভাবকহীন অসংখ্য শিশু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট অট্টো পেরেজ মোলিনা,
হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্দো হার্নান্দেজ ও এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট সানচেজ কেরেন এখন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তাঁরা গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে মধ্য আমেরিকার তিন প্রেসিডেন্টকে পাশে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ওবামা। তিনি ওই নেতাদের বলেছেন, আরও শিশু যাতে এভাবে না আসতে পারে, সে জন্য তাঁদের অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। ওবামা বলেন, ‘আমাদের সবাই এটা স্বীকার করবেন যে এ সমস্যা সমাধানে সবারই দায়িত্ব রয়েছে।’ গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এসব সমস্যার মূলে রয়েছে দারিদ্র্য এবং পর্যাপ্ত চারকির সুযোগের অভাব। অভিবাসনের পেছনে এগুলোই আসল কারণ।’

উন্নয়নের সূচকে এগিয়ে, রাজনীতির সূচকে পিছিয়ে

অসুস্থ রাজনীতির শিকার গীতা সেনের
পাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা- ফাইল ছবি
একজন লেখকের যেমন কোনো বিষয়ে কিছু বলার বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, তেমনি পাঠকেরও অধিকার আছে সেই মতের সমালোচনা করার। গত সপ্তাহে প্রকাশিত কলাম ‘যাহা জয় বাংলা, তাহাই জিন্দাবাদ!’ নিয়ে বিপুলসংখ্যক পাঠক যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তাকে আমি সানন্দদৃষ্টিতে নিয়েছি। তার পরও একটি ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি এ কারণে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কবি নির্মলেন্দু গুণ লেখাটির প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। একজন অগ্রজ বন্ধু পত্রিকান্তরে লেখাটি উপলক্ষ করে একটি উপসম্পাদকীয়ই লিখে ফেলেছেন। নির্মলেন্দু গুণ আমার অত্যন্ত প্রিয় কবি ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। আমি তাঁর সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত যে বাংলাদেশে একশ্রেণির পাকিস্তানবাদী লোক ১৫ আগস্টের পর জয় বাংলার বিপরীতে জিন্দাবাদ স্লোগান ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশ বেতারকে রেডিও বাংলাদেশ বানিয়েছিল। একশ্রেণির মতলববাজ যে জয় বাংলার বিপরীতে জিন্দাবাদ জিগির তোলে, সে কথা আমিও লিখেছি। জয় বাংলা স্লোগানের ইতিবৃত্ত তুলে ধরার অর্থ জিন্দাবাদিদের সমর্থন করা নয়। এ কলামে আমি এ কথাও বলেছি যে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে কেউ অন্যায় করলে সেটি যেমন ভালো কাজ হয় না, তেমনি কেউ জয় বাংলা না বললেই তিনি পাকিস্তানপন্থী হয়ে যান না। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ জয় বাংলা স্লোগানটি দলীয় বৃত্ত থেকে বের করে এনে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দিয়েছিল—এ কথা দিবালোকের মতো সত্য। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কারা সেই মঞ্চকে বিভক্ত ও প্রায় নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে, জয় বাংলার তাৎপর্য অনুধাবনের পাশাপাশি সেই প্রশ্নের জবাবও খোঁজা জরুরি। সব দায় জিন্দাবাদপন্থীদের ওপর চাপিয়ে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু একটি সত্যিকার অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া যাবে না। আমার লেখায় পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকারী কিংবা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সায়াদ হত্যাকারীদের মুখে জয় বাংলা স্লোগানের বিপদ সম্পর্কেই পাঠককে সতর্ক করে দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র। শফিউল আলম প্রধানরাও একসময় জয় বাংলা স্লোগান দিতেন এবং যাঁরা এই স্লোগান দিতেন না, তাঁদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত পর্যন্ত করেছেন।
২. গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনডিপি) বার্ষিক প্রতিবেদনে মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়েছে বলে জানানো হয়। বর্তমানে (২০১৪) মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২তম। গতবার বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩তম।দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার অবস্থান ৭৩তম। ভারত ও পাকিস্তান রয়েছে যথাক্রমে ১৩৫ ও ১৪৬তম অবস্থানে। বাংলাদেশ ভারতের পেছনে থাকলেও পাকিস্তানের আগে রয়েছে। নারী-পুরুষ সমতা উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় ভালো। এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান যেখানে ১০৭তম, ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ১৩৫ ও ১৪৬তম। দেশ দুটির তুলনায় বাংলাদেশি নারীরা নিজ দেশের পুরুষের তুলনায় বেশি হারে উন্নতি করেছেন। ২০১৩ সালের সূচকে দ্রুত উন্নয়ন করেছে বিশ্বের এমন ১৮টি দেশের মধ্যে ছিল বাংলাদেশ। এবারও সেই ধারা রেখেছে। এ বছর বাংলাদেশ মানব উন্নয়ন সূচকে প্রবৃদ্ধি দশমিক ৭ শতাংশ। সার্বিক উন্নয়ন সূচকেও বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের চেয়ে বেশি উন্নতি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নারী-পুরুষের বৈষম্য সূচকেও বাংলাদেশ ভালো করেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম, ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই এ সূচকে ১২৭তম অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ এ দুই দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নারীর প্রতি বৈষম্য কম। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকেও বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় ভালো করেছে। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু এখন ৬৯ দশমিক ২ বছর, শিক্ষা গ্রহণের গড় সময়কাল ৫ দশমিক ৮ বছর এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই, পিপিপি ভিত্তিতে) দুই হাজার ৭১৩ ডলার। সব মিলিয়ে মানব উন্নয়ন সূচকে এবার বাংলাদেশের স্কোর দশমিক ৫৪৪।
৩. কেবল ইউএনডিপির প্রতিবেদন নয়; নিকট অতীতে আর্থসামাজিক বিষয়ে যতগুলো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিবেদন হয়েছে, তার প্রায় সবটাতেই বাংলাদেশ তুলনামূলক এগিয়ে আছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং ভারতকে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন। এটি কম কৃতিত্বের কথা নয়। লন্ডনের ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির গালমন্দ করলেও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বলেছে ধাঁ ধা বা প্যারাডক্স। এ ধাঁ ধা তৈরিতে সরকারের যতটা না ভূমিকা, তার চেয়ে বেশি ভূমিকা সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের। বাংলাদেশের মানুষ উদ্যমী ও পরিশ্রমী। দুমুঠো খাবার ও থাকার আশ্রয় পেলে দিনরাত কাজ করতে পারেন। দেশের উন্নয়নের এ চিত্র আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নেওয়া যেত, যদি আমাদের রাজনীতি সুস্থ ও সুস্থির থাকত। স্বাধীনতার পর দেশের রাজনীতি প্রকৃত অর্থে কখনোই সুষ্ঠু ও সুস্থধারায় প্রবাহিত হয়নি। কেন হয়নি, সেই প্রশ্নের জবাব রাজনীতিকদেরই দিতে হবে। অনেক ডাকসাইটে মন্ত্রী ও নেতা আক্ষেপ করে বলেন, রাজনীতি আর রাজনীতিকদের হাতে নেই। তাহলে কাদের হাতে? বিগত সংসদে ৫২ শতাংশ আসন ছিল ব্যবসায়ীদের দখলে। এবারের সংসদের হিসাবটা তার চেয়ে খারাপ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। অসুস্থ রাজনীতি ও অসাধু ব্যবসার যে যুগলবন্ধন ঘটেছে, তার কারণেই হল-মার্ক কেলেঙ্কারি হয়, শেয়ারবাজার লুট হয়ে যায়,
বেসিক ব্যাংক ধ্বংস করেও এর অধিকর্তারা পার পেয়ে যান। স্বাধীনতার পর একশ্রেণির বিপ্লববাদী দেশের স্বাধীনতাকেই মেনে নেয়নি। তারা তখন জনগণকে বুঝিয়েছিল, প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি। প্রকৃত স্বাধীনতা পেতে হলে আওয়ামী লীগকে হটাতে হবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপালিত কুচক্রীদের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা থামল না। প্রায় একই পরিস্থিতি তৈরি হয় নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতনের পরও। স্বৈরাচারকে তাড়াতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক হলেও দেশশাসনে কেউ কাউকে আস্থায় নেয়নি। বরং পরস্পরকে শত্রু ভাবছে। একজন স্বৈরাচার ও অপরজন রাজাকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণতন্ত্র ও দেশ উদ্ধারের মহড়া দিচ্ছে। বাংলাদেশ আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে উন্নতি-অগ্রগতি করেছে, তার সিংহভাগ কৃতিত্ব কৃষক, তৈরি পোশাক কারখানায় নিয়োজিত অপুষ্ট শরীরের ৪০ লাখ নারী শ্রমিক এবং বিদেশে অবস্থিত ৮০ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের। কিন্তু রাজনীতি তঁাদের নিরাপত্তা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে পারেনি বলেই এক সরকারের আমলে সারপ্রার্থী কৃষকেরা গুলি খেয়ে মরেন, আরেক সরকারের আমলে তাজরীন ও রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি ঘটে, যার শিকার হন শত শত শ্রমিক। রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় যে সন্ত্রাস চলছে, তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ ফেনী, নারায়ণগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুর।
৪. অসুস্থ ও বৈরী রাজনীতি দেশকে বারবার বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দেয়। এবং সাধারণ মানুষ সেই বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চাইলেও রাজনীতি সেটি করতে দেয় না। আইলা-সিডরের পর দেশে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলেও মানুষ অহরহ রাজনীতিসৃষ্ট দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। ৫ জানুয়ারির আগে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাতে মারা গেছে কয়েক শ মানুষ; চিরতরে পঙ্গু হয়েছে হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু; সহায়-সম্বল হারিয়ে অনেকে নিঃস্ব, রিক্ত। ক্ষমতামত্ত রাজনীতি তাদের খোঁজ রাখে না। আমরা পুরান ঢাকার গৃহবধূ সেই গীতা সেনের কথা ভুলে যাইনি। সন্ত্রাসীদের বোমায় আহত গীতা সেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কাছে পেয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা আপনাদের তৈরি করছি, আপনারা আমাদের তৈরি করেন নাই। আমরা আমাদের স্বামীরটা খাই। আপনারা আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন।...আমরা ভালো সরকার চাই...আমরা অসুস্থ সরকার চাই না।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমরা অসুস্থভাবে আমাদের সন্তানকে বড় করতে চাই না। আমরা আর অসুস্থ থাকতে চাই না। আমরা একটা ভালো সরকার চাই। ওরা কেন আমাদের মারে? আমরা তো ওদের ক্ষতি করি নাই। আমরা তো কিচ্ছু করি নাই, আমরা তো যাচ্ছিলাম, আমরা তো ওদের চিনিও না। আমরা খালেদারেও চিনি না, হাসিনার কাছেও যাই না। আমরা যার যার সংসার নিয়ে থাকি, আমাদের কেন মারে ওরা?.. দিদি, আপনি এগুলার বিচার করেন, এগুলার বিচার করেন, আর সহ্য হয় না। কত লোক এইখানে আছে, আমরা সবাই অসুস্থ...।
(প্রথম আলো, ২ ডিসেম্বর, ২০১৩) সম্প্রতি লন্ডন সফরকালে বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না গিয়ে ভুল করেছে। সেই ভুলের মাশুল তাকে দিতে হবে। যুক্তির খাতিরে যদি তাঁর কথাটি মেনেও নিই, তার পরও কথা থাকে। পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন নিয়ে এ ক্যাচাল হয় কেন? কেন সব দল মিলে একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। যখন যার সুবিধা তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইবে, যার অসুবিধা বাতিল করবে, এর নাম গণতন্ত্র নয়। প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে যে একটি রাজনৈতিক দল ভুল করলে সেই দলকে তার খেসারত দিতে হয়। কিন্তু একটি সরকার ভুল করলে গোটা দেশ ও দেশের মানুষকেই তার খেসারত দিতে হয়। নির্বাচন বর্জন অবশ্যই খারাপ কাজ। কিন্তু একতরফা নির্বাচনও কোনো ভালো কাজ নয়। প্রধানমন্ত্রীকে দেশে দেশে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কৈফিয়ত ও ব্যাখ্যা দিতে হলে সেটি তাঁর জন্য যেমন, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও মহা লজ্জার বিষয়। (দ্রষ্টব্য: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্রের বক্তব্য) বিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট লিখেছে, আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কিছুটা কেটে গেছে। বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিবর্তনের দাবি চালিয়ে যাবে। ফলে ২০১৪-২০১৮-এ দেশব্যাপী ধর্মঘটের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষ এগিয়ে গেলেও রাজনীতি এগোচ্ছে না। ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। ন্যূনতম নীতিনৈতিকতা, মূল্যবোধ ও আদর্শ হারিয়ে এখন রাজনীতি হয়ে উঠেছে হিংসা ও বিদ্বেষের হাতিয়ার। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

রমজানে দরুদ পাঠের ফজিলত

রমজান মাসে রোজাদাররা সিয়াম সাধনা করে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রয়াস চালান। ইবাদত গ্রহণযোগ্য বা দোয়া কবুল হতে মহানবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি। দরুদ শরিফ পাঠে আল্লাহর দরবারে ইবাদতের বিনিময় সুনিশ্চিত হয়। আল্লাহর কাছে সমুদয় ইবাদত-বন্দেগি গ্রহণযোগ্য করতে পরম ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাপূর্ণ অন্তরে নিবিষ্টভাবে নবী করিম (সা.)–এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা নেক আমল। তাই মাহে রমজানে প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের উচিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর অধিক দরুদ পাঠ করা। কেননা দরুদ পড়া এমন এক ইবাদত, যা আল্লাহ অবশ্যই কবুল করেন। এমনকি স্বয়ং আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবের ওপর সব সময় দরুদ পড়েন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর ওপর দরুদ ও সালাম পেশ করে (অনুগ্রহ প্রার্থনা করে)। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবীর ওপর দরুদ পড়ো (অনুগ্রহ প্রার্থনা করো) এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।’ (সূরা আল-আহজাব, আয়াত: ৫৬) মাহে রমজানে বেশি বেশি দরুদ পড়া ও সালাম পেশ করা অতীব বরকত ও পুণ্যময় আমল। দরুদ পাঠ আল্লাহর কাছে এতই পছন্দনীয় যে নিজেও পড়েন এবং তাঁর বান্দাদের দরুদ পড়ার হুকুম জারি করেছেন। তাই দরুদ শরিফ পাঠের ফজিলত অপরিসীম। একদিন এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে নামাজ পড়ে এই দোয়া করল: ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার গুনাহ মাফ করো এবং আমার ওপর রহম করো!’
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন: ওহে মুসল্লি! তুমি খুব জলদি করেছ। শোনো, যখন তুমি নামাজ পড়বে তখন প্রথমে আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করবে, তারপর আমার ওপর দরুদ পাঠ করবে এবং (পরিশেষে নিজের জন্য) দোয়া করবে।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত) হজরত কাব ইবনে ওজারা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে যে তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনার ওপর আমরা কীভাবে দরুদ পড়ব?’ তিনি বললেন, বলো: ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আ-লি ইবরাহিম ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ; আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ কামা বারাকতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আ-লি ইবরাহিম ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর বংশধরদের ওপর এই রূপ রহমত নাজিল করো, যেমনটি করেছিলে ইবরাহিম ও তাঁর বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করো, যেমন বরকত নাজিল করেছিলে ইবরাহিম ও তাঁর বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়। (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত) ভক্তিসহকারে দরুদ শরিফ পাঠের মাধ্যমে বান্দার গুনাহখাতা মাফ করা হয়। দরুদ পাঠের অশেষ সওয়াব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর মাত্র একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর ১০ বার রহমত নাজিল করেন এবং কমপক্ষে তার ১০টি গুনাহ মাফ করেন।
তার আমলনামায় ১০টি সওয়াব লিপিবদ্ধ করেন এবং আল্লাহর দরবারে তার মর্যাদা ১০ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়।’ (নাসাঈ) তিনি আরও বলেন, ‘সেই ব্যক্তির নাক মাটিতে ঘেঁষে যাক, যার কাছে আমার নাম উচ্চারিত হয় অথচ সে আমার ওপর দরুদ পড়ে না।’ (তিরমিজি) তিনি বলেন, ‘কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে, যে ব্যক্তি আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পড়ে।’ (তিরমিজি) দৈনন্দিন জীবনে দরুদ শরিফ পাঠের দ্বারা আল্লাহর দরবারে মানুষের দোয়া কবুল হয়। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে ‘কোনো দোয়াই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না, যতক্ষণ সে দোয়ার আগে ও পরে নবী করিম (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়া না হয়।’ হাদিসে আরও বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-এর পবিত্র নাম শোনার পর তাঁর ওপর দরুদ পড়ে না, সে ব্যক্তি সবচেয়ে বড় কৃপণ। তার ধ্বংসের জন্য জিব্রাইল (আ.) দোয়া করেন।’ হজরত ওমর ফারুক (রা.) বলেন, ‘দোয়া ততক্ষণ পর্যন্ত আসমান ও জমিনের মধ্যখানে লটকে থাকে, ওপরে ওঠে না, যতক্ষণ পর্যন্ত নবী করিম (সা.)-এর ওপর দরুদ না পড়ে।’ (তিরমিজি, মিশকাত) পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে নবী করিম (সা.)-এর জীবনচরিতের সুমহান গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে দরুদ শরিফে। ইশকে রাসুল (সা.) বা নবীপ্রেমের আবেগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সেরা নজরানা দরুদ শরিফ।
তাই ইহকাল ও পরকালের উন্নতি, মুক্তি ও সব বিপদ-আপদ, দুর্যোগ-দুর্দশা থেকে বাঁচার জন্য দরুদ শরিফ নিয়মিত পাঠ করার অভ্যাস করুন! এতে অশেষ উন্নতি ও কল্যাণ নিহিত। বহুভাবে দরুদ শরিফ পড়া যায়। তবে উল্লেখযোগ্য ও ফজিলতপূর্ণ দরুদ হচ্ছে, ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যেদিনা মুহাম্মাদিন ওয়ালা আলি সাইয়্যেদিনা মুহাম্মাদিন ওয়া বারিক ওয়াসাল্লিম।’ প্রতিদিন নিয়মিতভাবে বিশুদ্ধ অন্তরে বিভিন্ন দরুদ পাঠে মানুষ আল্লাহর করুণা, দয়া এবং মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসা লাভ করতে পারেন। নবী করিম (সা.) হচ্ছেন মানবতার করুণাধারা ও আল্লাহর রহমতের কেন্দ্রবিন্দু। জগতে এত পাপাচার, অনাচার, হানাহানি ও জুলুম-নিপীড়নে মানুষের সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও শুধু তাঁর কারণেই এখনো আল্লাহর রহমতের ঝরনাধারা অবারিত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ধরাধামে শুভাগমন ও উপস্থিতির সুবাদে আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ায় জগৎজুড়ে সমগ্র মানবতা ধন্য হচ্ছে। এ জন্য উম্মতকে সব সময় নবী করিম (সা.)-এর মেহেরবানির কথা স্মরণ, কৃতজ্ঞতার প্রতিদান হিসেবে বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠে সচেষ্ট হতে হবে। আল্লাহ তাআলা মাহে রমজানে বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠে রোজাদারদের শান্তিময় সৌভাগ্যের দ্বার উন্মুক্ত করার সুযোগ দিন।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক।
dr.munimkhan@yahoo.com

হৃদয়ে ঈদ ও বড়দিন -একজন ‘বাংলাদেশি বিদেশির’ কথা by জুলিয়ান ফ্রান্সিস

আজ থেকে বছর দশেক আগে ঈদ ও বড়দিন কাছাকাছি সময়ে পড়ত। মানুষ নিজেদের পরিজন ও বন্ধুবান্ধবদের এ উপলক্ষে নানা উপহার দেয়, এ দৃশ্য দেখে প্রাণটা সত্যিই জুড়িয়ে যায়।এই দেওয়ার সঙ্গে জাকাতের সম্পর্ক আছে—মানে আমার জানামতে, বছরে একবার মোট আয়ের ২ দশমিক ৫ শতাংশ চরম দরিদ্র মানুষ ও এতিমদের জন্য দান করা (নগদ, সঞ্চয় ও গয়না)। বাংলাদেশে একজন বিদেশি হিসেবে আমি বড়দিন ও ঈদের মধ্যে অনেক মিল দেখতে পাই—এ দিন উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা একে অপরের বাড়িতে যায়, বিশেষ বিশেষ খাবার রান্না হয়, যাদের কিছুই নেই বললেই চলে, তাদের জন্য কিছু করা প্রভৃতি।
২০০৪ সালে বাংলাদেশে আমার কাজ ছিল সরকারি একটি প্রকল্পের অধীনে সবচেয়ে দরিদ্র্য মানুষদের সহায়তা করা। এ প্রকল্পের নাম ছিল আদর্শ গ্রাম, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এর কাজ ছিল গ্রামের গৃহহীন ও ভূমিহীন দরিদ্র মানুষদের ঘর তৈরি করে দেওয়া। বিশেষত, নদীভাঙা মানুষদের এ প্রকল্পে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হতো। এ রকম একটি প্রকল্প পরিচালনায় নানা প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক ঝক্কি পোহাতে হয়, তবু সেখান থেকে যে অভিজ্ঞতা আমরা অর্জন করেছিলাম, তা ছিল অমূল্য ও অসাধারণ। পরে ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আমি চরম দরিদ্র মানুষদের নিয়ে কাজ করি। ডিএফআইডি ও অস্ট্রেলিয়া এইডের অর্থায়নে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে চর লাইভলিহুড কর্মসূচির আওতায় আমরা এ কাজ করেছি।
আদর্শ গ্রামে কাজ করার সময় আমাকে প্রতিদিন বনানীর আরামদায়ক ফ্ল্যাট থেকে নীলক্ষেত যেতে হতো। যাওয়া ও আসায় দুবার হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও অতিক্রম করতে হতো। অধিকাংশ দিনই এ হোটেলের মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকার সময় দুটি প্রতিবন্ধী বাচ্চা মেয়ে ফুল বা ছোট ছোট তোয়ালে নিয়ে হাসিমুখে আমার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াত। তারা এসব বিক্রি করে টাকা আয় করত। তারা একভাবে আমার পরিবার ও নৈমিত্তিক জীবনের অংশ হয়ে যায়। ঈদের দিন তাদের হাতে নতুন কাপড় তুলে দিতে পারার আনন্দ ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। ওদের বাবা মাকে ছেড়ে চলে গেছে। ওদের মায়ের দোষ হচ্ছে সে শুধু মেয়েরই জন্ম দেয়নি, সে বিকলাঙ্গ মেয়ের জন্ম দিয়েছে। মেয়ে দুটি খুবই নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে থাকত, তাদের হাসিমুখ দেখে হৃদয়ে একঝাঁক ময়ূর পেখম মেলে নাচতে শুরু করে।
হৃদয়ের এ স্বতোৎসারিত কথামালায় কোনো যুক্তিপরম্পরা না পেয়ে পাঠক হয়তো ভাবতে পারেন, তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন। ১০ বছর আগে আমি ঢাকা স্টেজের প্রযোজনায় চার্লস ডিকেন্সের এ ক্রিস্টমাস ক্যারোল নাটকের চারটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। এটা একটা আপতিক ঘটনাই বটে। এটি ১৮৪৩ সালের বড়দিন উপলক্ষে প্রথম প্রকাশিত হয়। ডিকেন্স খুব দরিদ্র পরিবারে বড় হয়েছেন, বইটি সে অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেই তিনি লিখেছেন। ঋণের কারণে ডিকেন্সের বাবার কারাদণ্ড হলে তাঁর মা তাঁকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে একটি জুতা পলিশের কারখানায় কাজে লাগিয়ে দেন, সেখানে তিনি সপ্তাহে ছয় শিলিং আয় করতেন। বইটি যখন লেখা হয়, ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ড তখনো দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্ত হয়নি, শিশুমৃত্যুর হারও তখন বেশি, ১৮৭৫ সালে সুয়ারেজ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে প্রায়ই কলেরার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যেত।
ক্রিস্টমাস ক্যারোলের গল্প একজন ব্যবসায়ীকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, তার নাম এবেনেজার স্ক্রুজ। সে ছিল ভীষণ কৃপণ। কোনো কিছুর প্রতিই তার কোনো খেয়াল ছিল না। মানবতা শুধু টাকাওয়ালাদের ক্ষেত্রেই খাটে, তা সে টাকা শোষণ বা ভয়ভীতি প্রদর্শন যেভাবেই আয় করা হোক না কেন। সে বিশেষভাবে বড়দিনকে ঘৃণা করত। বছরের এ সময়টা এলে ‘নিজের বয়স তার এক বছর বেশি মনে হয়, নিজেকে একপ্রস্থ বেশি ধনী মনে হয় না।’ বড়দিনের প্রাক্কালে তার সাবেক অংশীদার জ্যাকব মার্লের ভূত এসে তার সামনে আবির্ভূত হয়। সে সাত বছর আগে বড়দিনের প্রাক্কালে মারা গিয়েছিল।
মারলে স্ক্রুজের মতোই কিপটে, সে এখন পারলৌকিক জীবনের ঝক্কি পোহাচ্ছে। সে চায় স্ক্রুজকে যেন তার মতো ভাগ্য বরণ করতে না হয়। সে স্ক্রুজকে বলে, তিনটি আত্মা তার পিছু নেবে। এই তিনটি আত্মা হচ্ছে বড়দিনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভূত। এই তিনটি ভূত স্ক্রুজকে তার ভুল বুঝতে সহায়তা করে। তারপর তার মধ্যে এক অভাবনীয় পরিবর্তন দেখা যায়, বড়দিনের দিন সে তার দীর্ঘদিনের কেরানি বেচারা বব ক্র্যাটচিটের কাছে ক্রিসমাসের উপহার পাঠায়, বড়দিনের সকালটা তার ভাতিজা ফ্রেডের সঙ্গে কাটায়, যাকে সে আগে অবজ্ঞা করত। স্ক্রুজ তার নবলব্ধ উদারতায় বলীয়ান হয়ে ক্র্যাটচিটের বেতন বাড়িয়ে দেয়, তার পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়। এমনকি ববের বিকলাঙ্গ পুত্র টিনি টিমের দেখভালও সে করবে বলে জানায়। শেষে ডিকেন্স বলেন, ‘স্ক্রুজ সেই ভালো মানুষ, ভালো কর্তা ও বন্ধু¬ হয়ে যায়, সেই পুরোনো শহর যেমনটা জানত।’ বড়দিনের ছুটি সম্পর্কে ডিকেন্স যে বিবরণ দিয়েছেন, সেটাই এ রকম উৎসবের মাহাত্ম্য হওয়া উচিত।
‘ভালো সময়: দয়ালু, ক্ষমাশীল, পরহিতকর, সুখী সময়। বছরের শুধু এ সময়েই নর-নারী নিজেদের হৃদয়ের কপাট খুলে দেয়। এ সময় তাঁরা সমাজের নিচুতলার মানুষদের কথাও ভাবেন, যাঁরা তাঁদের কবরযাত্রার সহগামী, ভিন্ন কোনো পথের যাত্রী তাঁরা নন। উৎসব লোভী বাণিজ্যের মুনাফা কামানোর উপলক্ষ নয়, এটা মানুষের হৃদয়ের ব্যাপার।’
বাংলাদেশের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেই ১৯৭১ সাল থেকে, ফলে আমার অনেক বন্ধুই আমাকে ‘বাংলাদেশি বিদেশি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে। আমি বিশ্বাস করি, আমার হৃদয়ের এই স্বতোৎসারণ অন্যদের হৃদয়ের তন্ত্রীতেও মানবতার সুর তুলবে—তাঁরা শুধু এ রকম উৎসবের দিনেই সমাজে যাঁদের কম আছে, তাঁদের কাছে যাবেন বা সহানুভূতি দেখাবেন না, বছরজুড়েই তাঁরা সেটা করবেন।

ইংরেজি থেকে অনূদিত
জুলিয়ান ফ্রান্সিস: ২০১২ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন।

গাজায় গণহত্যা -নেতানিয়াহু ও ‘বৃহত্তর ইসরায়েলের খোয়াব’ by এম সাখাওয়াত হোসেন

জুন মাসে পূর্ব ইউরোপ সফরকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি বাহিনীর ইহুদি নিধনের দুটি কনসেনট্রেশন শিবির দেখতে গিয়েছিলাম। একটি জার্মানির ডাকাউ, অন্যটি পোল্যান্ডের ‘অস্িভৎস্’।এমন আরও বেশ কিছু শিবির ছিল, যেখানে পরিকল্পিতভাবে ইহুদিদের গণহত্যা করা হয়েছিল।পরিসংখ্যানমতে, প্রায় ছয় লাখ ইউরোপীয় ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে হত্যা করা হয়েছিল৷ তবে ইসরায়েলের হলোকস্ট মেমোরিয়াল মোতাবেক ছয় মিলিয়ন হত্যা করেছিল হিটলারের বাহিনী। আর গ্যাস চেম্বার ও ফার্নেসগুলো হিটলারের পরাজয়ের প্রাক্কালে ধ্বংস করা হয়েছিল৷ তবে ওই দুটি ধ্বংসস্তূপ এখনো দর্শনীয় জায়গা হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। ‘ডাকাউ’ ছিল প্রথম শিবির আর ‘অস্িভৎস্’ ছিল বৃহত্তম কনসেনট্রেশন ক্যাম্প।

এ জায়গায় দাঁড়িয়ে যে সহমর্মিতা আসার কথা, তা আজকের ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা এবং আগ্রাসী ভূমিকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর হিটলারি কায়দায় নির্যাতনের কারণে তা অনেকেই পূর্ণভাবে অনুভব করে না। ইহুদিরা যে বর্বরতার শিকার হয়েছে, তেমনটা আর কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর ওপর হোক তেমনটা তারা চাইবে না, এটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটেছে ঠিক বিপরীত।
যখন নাৎসিদের হাতে ইহুদি নিধন চলছিল, তখন ইউরোপ ছিল নিশ্চুপ। আর সেই অপরাধবোধ থেকেই পরবর্তীকালে তারা ইহুদি রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করেছিল হাজার হাজার বছরের ফিলিস্তিনি আরবদের উৎখাত করে। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর ফিলিস্তিনি ভূমি দখল থেকে শুরু করে সব ধরনের নির্যাতনের পথ বেছে নেয় জায়নবাদীরা। অধিকৃত পশ্চিম তীর আর গাজা ভূখণ্ড ছেড়ে দিলেও ক্রমেই পশ্চিম তীরের ভূখণ্ডের বহু অংশ দখল করে রেখেছে ইসরায়েল। গাজা পরিণত হয়েছে বড় ধরনের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। মিসর আর ইসরায়েলের কৃপায় রয়েছে গাজার প্রায় ১৮ লাখ নিবাসী। ইদানীং মিসর রাফা চেকপয়েন্ট বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে, সমুদ্র আর স্থলসীমানা ইসরায়েলিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
দুই
বর্তমানে গাজায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে পৈশাচিক গণহত্যা। এ পর্যন্ত হাজারেরও বেশি নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। অত্যাধুনিক ট্যাঙ্ক বিমান আর কামান নিয়ে ইসরায়েল যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তা ১৯৪৩-৪৫ সালের নাৎসি জার্মানির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নেতানিয়াহু প্রথম ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী, যিনি স্বাধীন ইসরায়েলে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি ম্যানহেম বেগিনের লিকুদ পার্টির নেতা। যদিও বেগিনের সময় মিসরের সঙ্গে শান্তি চুক্তি হয়েছিল। আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বাবা পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই ১৯২০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ অধিকৃত ফিলিস্তিনে চলে আসেন৷ পরে জেরুজালেমে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। আরও পরে যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিবাদীদের সংগঠিত করেন। রিভিশনিস্টরা থিওডোর হারজেলের জায়নবাদের এক ধাপ বেশি কট্টরপন্থী। রিভিশনিস্টরা বিশ্বাস করে বৃহত্তর ইসরায়েল বা প্রমিজড ল্যান্ডে। বৃহত্তর ইসরায়েলের সীমানা সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনি ভূমি, যা ব্রিটিশ সনদের অধীনে ছিল। রিভিশনিস্ট জায়নবাদের আদর্শে গড়ে ওঠে লিকুদ পার্টি, যদিও এই পার্টিতে কিছু মধ্যমপন্থী রয়েছে, তবে চরমপন্থীরা রয়েছে শক্ত অবস্থানে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেই বাবার ছেলে, যিনি বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করার অভিপ্রায় থেকে এক পা পেছাননি। কাজেই নেতানিয়াহুর গায়ে রয়েছে বৃহত্তর ইসরায়েলের ‘জিন’। অন্তত তাঁর বর্তমান গাজা অভিযান সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
তিন
বর্তমানে লিকুদ পার্টি রিভিশনিস্ট জায়নবাদীদের উত্তরসূরি, তথা সংস্কারপন্থী জায়নবাদীরা বৃহত্তর ইসরায়েলের বিষয় নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য না করলেও তার মানে এই নয় যে এ ধারণা বিসর্জিত হয়েছে। বর্তমানে গাজায় যে অভিযান চলছে, তার প্রেক্ষাপট এমন ছিল না যে ইসরায়েলকে সর্বাত্মক হামলা করতে হবে। প্রথমে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল যখন ‘নাকাবা’ দিবস পালনের দিন ইসরায়েলি সৈনিকদের গুলিতে তিন ফিলিস্তিনি বালক নিহত হয়। ওই দিনটি প্রতিবছর গাজা, পশ্চিম তীর এমনকি ইসরায়েল থেকে বিতাড়িত ফিলিস্তিনিরা কালো দিবস হিসেবে স্মরণ করে থাকে। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে ওই দিনই প্রায় সাত লাখ ফিলিস্তিনি নিজেদের পূর্বপুরুষের ভিটাবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে জর্ডান, সিরিয়া, লেবাননে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নেয়। আজও তাদের প্রজন্ম ওই সব দেশে উদ্বাস্তু শিবিরে রয়েছে। প্রতিবছর ফিলিস্তিনিরা এই দিনটি নাকাবা দিবস হিসেবে স্মরণ করে থাকে। ফিলিস্তিনি বালকদের নিহত হওয়ার ঘটনার পর তিন ইসরায়েলি নব্য বসতির বাসিন্দা বালক, যাদের মধ্যে একজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অপহৃত হয়। গত ১২ জুন ওই তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার হলে ইসরায়েল অপহরণ আর হত্যার জন্য হামাসকে দায়ী করলেও তারা এর সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করে। এ ঘটনার পর থেকে হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান শুরু হয়। কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে, যাদের মধ্যে পাঁচজনকে হামাস-সমর্থক বলে দাবি করে ইসরায়েল। সন্দেহভাজনদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে উগ্র জায়নবাদীরা পূর্ব জেরুজালেমে এক ফিলিস্তিনি বালককে প্রহার করে মুখের মধ্যে পেট্রল ঢেলে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে মেরে ফেলে। পরের শুক্রবারে জেরুজালেমে তার জানাজায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি আরব যোগ দিলে পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে হামাসের রকেট আক্রমণ বাড়তে থাকে বলে ইসরায়েল দাবি করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে গাজায় নেতানিয়াহু হত্যাযজ্ঞে চালাচ্ছেন।
চার
বর্তমানে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের যে ধরন ও ব্যাপকতা, তা ওপরে বর্ণিত প্রেক্ষাপটের কারণেই ঘটেছে, এমন ভাবার অবকাশ নেই। এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর ইসরায়েল বাস্তবায়নের সংশোধিত পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সহায়ক বলে মনে করেছেন ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকেরা। এ হামলার প্রেক্ষাপটে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সহায়ক পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়াই নয়, হঠাৎ ঘটে যাওয়া ফাতাহ-হামাস একতাবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টাকে নষ্ট করাও ছিল এর উদ্দেশ্য। মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বের প্রতি ক্রমেই পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। বিনা প্রতিবাদে পশ্চিম তীরের ভূমি দখল, ইসরায়েলি আগ্রাসন হজম করা; যুক্তরাষ্ট্রে তথা ইসরায়েলের প্রভাব বিস্তার এবং ব্যাপক দুর্নীতির কারণে পশ্চিম তীরে হামাসের সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফাতাহকে টিকে থাকতেই হামাসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রিসভা তৈরি করা হয়েছিল। অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় একযোগে কাজ করার।
যুক্তরাষ্ট্র এসব ভালো চোখে দেখেনি। হামাসের জনপ্রিয়তা, জোট মন্ত্রিসভা ও ইসরায়েল ‘সীমিত হলেও’ চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতাকে খর্ব করার প্রয়াসে ইসরায়েল সর্বাত্মক হামলায় নেমেছে। প্রধান উদ্দেশ্য হামাসের নেতৃত্বকে দুর্বল অথবা নিশ্চিহ্ন করা, একই সঙ্গে গাজায় তথা পশ্চিম তীরে হামাসের সমর্থক এবং হামাস নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা। ইসরায়েল প্রচারমাধ্যম গাজায় হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য হামাসকেই দায়ী করে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেও লিপ্ত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ইসরায়েলকে উৎসাহিত করেছে হামাস তথা গাজার হামাস-সমর্থক জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়ার প্রয়াসকে। মিসরের পটপরিবর্তন হামাসের হাতকে দুর্বল করেছে। কারণ, মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় আসার পরপরই মিসরের প্রত্যক্ষ সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট মুরসি। মিসরের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তুরস্ক। তুরস্কের সঙ্গে হামাসের যোগাযোগ রয়েছে। মুরসির প্রশাসন বহু বছর সীমিত থাকা রাফা ক্রসিং উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। প্রসঙ্গত, রাফা ক্রসিং মিসর আর গাজার মধ্য একমাত্র বৈধ ও নিশ্চিত পথ। এ পথই গাজার প্রশাসন ও গাজাবাসীর জিয়নকাঠি। এ পথটি এখন পুনরায় সীমিত করা হয়েছে। মুরসির ক্ষমতাচ্যুতি এবং সিসির মাধ্যমে মিসরের সেনাবাহিনীর আধিপত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় হামাসকে দুর্বল ও কাবু করার প্রয়াসে উৎসাহিত হয়েছে ইসরায়েল। তাদের ধারণা, নাউ অর নেভার—এখন না হলে কখনো না। এর অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিকর অবস্থা। ইরাক তথা সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে সুন্নি কট্টরপন্থীদের উত্থান ওই অঞ্চলে শিয়া-সুন্নির মধ্যে বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের মুখোমুখি করেছে। ইরান বাগদাদে মালিকি সরকারকে টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধবিমানও পাঠিয়েছে। অন্যদিকে, ইরাকের উত্তরাঞ্চলের শহর কিরকুক কুর্দিদের দখলে যাওয়ার পর আগামী দুই মাসের মধ্যে কুর্দিরা নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণার কথা জানিয়েছে। এমনিতেই বর্তমানে ইরাকি কুর্দিস্তান প্রায় আলাদা সত্তা হিসেবে রয়েছে। সাদ্দাম হোসেনের সময় থেকেই ইসরায়েল কুর্দিদের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে আসছে। বর্তমানে পেশমার্গদের প্রশিক্ষণ ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শে চলছে পেশমার্গার অভিযান। ইরাকি কুর্দিস্তানের স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপ নেওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমর্থন না থাকলেও নতুন মধ্যপ্রাচ্যের পরিকল্পনার একাংশ কুর্দি স্বাধীনতা। কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে ইসরায়েলের অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত হবে একসময়ের ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। প্রসঙ্গত, একসময় কিরকুক থেকে ইসরায়েলে তেল পাইপলাইনে রপ্তানি হতো।
পাঁচ
ইরাক তিন খণ্ডে ভাগ হলে কুর্দিস্তান নিয়ে অস্বস্তিতে থাকবে ইরাক আর তুরস্ক। অন্যদিকে, ইসরায়েলিদের অন্য শক্ত প্রতিপক্ষ সিরিয়ার অবস্থাও তথৈবচ।সিরিয়াও দুই ভাগে ভাগ হওয়ার পথে। মধ্যপ্রাচ্যের এহেন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব তথা উপসাগরীয় দেশগুলো দারুণ উৎকণ্ঠায় রয়েছে। এ অবস্থায় প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপে রয়েছে ইসরায়েলের রিভিশনিস্ট জায়নবাদীরা।
যা-ই হোক, গাজার রক্তপাত বন্ধ করতে যার যার মতো করে যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে মিসর ও জাতিসংঘ তৎপর রয়েছে। এর মধ্য দিয়েও চলছে ইসরায়েলি বর্বরতা। যুদ্ধ বন্ধ করতেই হবে, তার জন্য ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। তবে যুদ্ধ বন্ধ করলেই এই চলমান সংকটের সমাধান আসবে না। যুদ্ধ বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে প্রথমত হামাসের ন্যূনতম দাবি, অবরোধ প্রত্যাহার করা এবং গাজাবাসীকে স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও পশ্চিম তীরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা ইত্যাদির সমাধান করতে হবে, যাতে গাজায় এ রক্তপাত বৃথা না যায়। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রও ইসরায়েলকে তৈরি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে স্বীকার করতে হবে যে গাজার ১৮ লাখ মানুষকে বাদ দিয়ে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়। ইসরায়েলকে এতদঞ্চলে শান্তিতে বাস করতে হলে বৃহত্তর ইসরায়েলের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হবে। তবে গাজার এই রক্তপাতের এবং গণহত্যার জন্য দায়ী ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুকে অবশ্যই বিশ্ববিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

কুতুবদিয়া দ্বীপ রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী সব কিছু করবেন: সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক

কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় বিলীন হয়ে যাওয়া সাড়ে ৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ প্রাথমিক ভাবে সংষ্কার করা হবে আগামি অমাবশ্যার আগে। বর্ষার পরেই স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হবে। ইতোমধ্যেই কুতুবদিয়ায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। ২৪ জুলাই বৃহস্পতিবার গত পূর্ণিমার জোয়ারে কুতুদিয়ায় বিলীন হয়ে যাওয়া বেড়িবাঁধ পরিদর্শন ও উপজেলার আইন শৃংখলা বিষয়ক সভায় মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক এ কথা বলেন।

এ সময় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ রুহুল আমিন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান নির্বাহী এম. শফিকুল হক উপস্থিত ছিলেন। ২৪ জুলাই বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী কুতুবদিয়ায় বিভিন্ন কর্মসূচীতে অংশ নেন তিনি। বেড়ীবাঁধ পরিদর্শন শেষে নেতৃবৃন্দ হজরত আবদুল মালেক শাহ (রাঃ) মাজার জিয়ারত করেন। পরে কুতুবদিয়া কলেজের ভবন নির্মাণ কাজ পরিদর্শন শেষে উপজেলার আইন শৃংখলা বিষয়ক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন এমপি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এম মমিনুর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্টিত সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, জেলা প্রশাসক মোঃ রুহুল আমিন। আরো বক্তব্য রাখেন, উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান নির্বাহী, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির হায়দার, ভাইস চেয়ারম্যান মেহেরুন্নেছা ও কুতুবদিয়া থানার ওসি আলতাজ হোসেন। এ সয়ম উপস্থিত ছিলেন,উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছৈয়দ আহমদ কুতুবী, সাধারণ সম্পাদক নুরুচ্ছফা বিকম, চেয়ারম্যান সিরাজদৌল্লাহ, চেয়ারম্যান আজমগীর মাতব্বর,চেয়ারম্যান শাকের উল্লাহ,চেয়ারম্যান ফিরোজ খান ও চেয়ারম্যান আলা উদ্দিন আল আজাদ।

সভায় আশেক উল্লাহ রফিক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার উন্নয়নে বিশ্বাসী। কুতুবদিয়ায় কাজ করে তা প্রমান করতে চাই। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, চিন্তার কোন কারণ নাই। আপনাদের পাশে রয়েছেন গণমানুষের নেত্রী শেখ হাসিনা। আগামি ১৫/২০ দিনের মধ্যে বেড়িবাঁধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ করতে যা করণীয় তা করার নির্দেশ দিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডকে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোঃ রুহুল আমিন বলেন আপনাদের চিন্তার কোন কারণ নেই। আমরা সব সময় আপনাদের পাশে আছি। কুতুবদিয়ার উন্নয়নের জন্য ইতোমধ্যে মাস্টারপ্লান তৈরী করা হয়েছে। তা আগামিতে বাস্তবায়ন শুরু হবে।

সমুদ্রকে জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনে কাজে লাগাতে হবে by ড. আনু মাহমুদ

ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমাবিরোধ নিষ্পত্তির সালিশ আদালতের রায়ে সুবিচার পেয়েছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরের পশ্চিমাঞ্চলে ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার এলাকা তার প্রাপ্য বলে দাবি করেছিল। আদালতের রায়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকার নিরঙ্কুশ অধিকার লাভ করেছে বাংলাদেশ। আসলে বিরোধ দেখা দিয়েছিল দুই দেশের জলসীমা শুরুর স্থান নির্ধারণ এবং ভূমিরেখার মূলবিন্দু থেকে সমুদ্রে রেখা টানার পদ্ধতি নিয়ে। ভারত সমদূরত্বের ভিত্তিতে রেখা টানার পক্ষে মত দিলে বাংলাদেশ ন্যায্যতার ভিত্তিতে রেখা টানার দাবি জানায়। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগর ও ভূমির মূলবিন্দু থেকে সমুদ্রের দিকে ১৮০ ডিগ্রি সোজা রেখা টানার দাবি জানালে ভারত বলেছিল, সমুদ্রতট বিবেচনায় এ রেখা হবে ১৬২ ডিগ্রি থেকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের সময়কার র‌্যাডক্লিফের ম্যাপ অনুযায়ীই সীমানাবিন্দু ধরা হয়েছে। বলা বাহুল্য, সেটাই বৈধ ভিত্তি। রায় ন্যায়ভিত্তিক হওয়ায় ভারতও রায় মেনে নিয়েছে।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির আলোচনা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। দীর্ঘ সময়ে কয়েকটি বৈঠক হলেও সমাধান না পেয়ে ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক আদালতে যায় বাংলাদেশ। সেখানেও সমঝোতা না হওয়ায় ২০১১ সালের মে মাসে বিষয়টি দ্য হেগের আদালতে গড়ায়। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব অক্ষুণœ রেখে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ মীমাংসা হওয়ায় সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। এর আগে ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে জাতিসংঘ সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার রায়ের মাধ্যমে উপকূল থেকে বঙ্গোপসাগরের ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহিসোপান অঞ্চলে আইনগত অধিকার লাভ করে বাংলাদেশ। এ ছাড়া মহিসোপানের বাইরের সামুদ্রিক সম্পদেও বাংলাদেশের নিরংকুশ ও সার্বভৌম অধিকার সুনিশ্চিত হয়। মিয়ানমার এ সমুদ্র অঞ্চলকে নিজের বলে দাবি করায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন এর সম্পদ আহরণে ব্যর্থ হয়েছে। এ নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধ চলে আসছিল দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে। দুর্ভাগ্যজনক যে, এ বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়নি দীর্ঘদিন। ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি উদ্যোগ নেয় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কিন্তু সে উদ্যোগ বেশিদূর এগোয়নি। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর সরকার আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিরসনের দাবি জোরালো হয় সন্দেহ নেই। তবে ভারতের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসায় বাংলাদেশ ট্রাইব্যুনালের বদলে আরবিট্রেশনে গেছে। এ পথ বেয়েই এসেছে সাফল্য।
ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় এ বিরাট জলসীমায় অবস্থিত প্রাণিজ-অপ্রাণিজ সম্পদ, খনিজ জৈবসহ সব ধরনের সম্পদের মালিকানা এখন বাংলাদেশের। এখন সরকারের দায়িত্ব হল এ সম্পদ খুঁজে বের করে আহরণ করা। সে ক্ষেত্রে বর্ধিত এ সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের বিদ্যমান সম্পদের অপ্রতুলতা দূর করতে হবে। বাড়াতে হবে জনবল।
ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে সমুদ্রসীমা সমস্যার নিষ্পত্তি হওয়ার বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান অন্যান্য অমীমাংসিত সমস্যা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, এটাই প্রত্যাশা। কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক টেলিগ্রাফের শিরোনাম- একটি বড় সমুদ্র অঞ্চল ভারতের হাতছাড়া হল। আমাদের মনে আছে, বঙ্গোপসাগরের বিরোধপূর্ণ এলাকায় মৎস্যসম্পদ আহরণ বা তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের অধিকার নিয়ে দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে মাঝে মধ্যেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ হওয়ার পর এমন পরিস্থিতির আশংকা তিরোহিত হয়েছে বলে মনে করি। যে বিরোধপূর্ণ এলাকায় ভারতের বাধার জন্য বাংলাদেশ তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করতে পারছিল না বা দরপত্র আহ্বানের পরও বিদেশী কোম্পানিগুলো সাড়া দিচ্ছিল না, তা এখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কাজে লাগাতে পারবে। এখন অভিন্ন সমুদ্রাঞ্চলের অমিত সম্ভাবনা দুই দেশই কাজে লাগাতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
সার্বভৌমত্ব, সমরনীতি ও সম্পদের সদ্ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতেও আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায় গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকে বেঠকে সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ব্যয় করে সমস্যা সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সালিশির দ্বারস্থ হতে হয়েছিল। সাহসী ও দূরদর্শী এ সিদ্ধান্তের কারণে অর্জিত এই সাফল্যের জন্য সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে অভিনন্দন জানাই আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে। তাদের মেধা, শ্রম ও অধ্যবসায় সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে আদালতে সওয়াল-জওয়াবে অংশ নিয়েছেন যেসব বিদেশী আইনজীবী, তাদেরও অভিনন্দন। ভারত আদালতের কার্যক্রমে সহযোগিতার মাধ্যমে সৎ প্রতিবেশীসুলভ নীতির পরিচয় দিয়েছে। আমরা আশা করি, সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির পর ঢাকা-নয়াদিল্লি এবং ঢাকা-ইয়াঙ্গুনের বন্ধুত্ব আরও জোরদার হবে। এখন উদ্যোগী হতে হবে নিষ্পন্ন সমুদ্রসীমার সর্বোত্তম ব্যবহারের প্রতি। আমাদের জলসীমার মৎস্যসম্পদ অন্য দেশের জেলেরা আহরণ করার অভিযোগ পুরনো। বিরোধপূর্ণ এলাকার কারণে এতদিন সেখানে পূর্ণ নজরদারি সম্ভব হয়নি। এখন আর বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ বাংলাদেশের সমৃদ্ধিতে কাজে লাগানো কঠিন হবে না। আমাদের সমুদ্রসীমায় দেশী-বিদেশী জলদস্যু নিয়ন্ত্রণও এখন সহজ হবে। সীমানা নির্ধারণের পর বাংলাদেশের সমুদ্রবক্ষের তেল-গ্যাস উত্তোলনের দিকে এখন মনোযোগ দিতে হবে। ভারতের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির পর পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত তার এক নিবন্ধে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিকে সক্রিয় ও সক্ষম করার তাগিদ দিয়েছেন। আমরাও তার সঙ্গে একমত। পাশাপাশি আমাদের সমুদ্র এলাকার জীব ও খনিজ সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। অমিত সম্ভাবনাময় সমুদ্রকে জাতীয় সমৃদ্ধিতে কাজে লাগানোর এখনই সময়। পাহাড়, সমুদ্র, নদীনালা ও সমতল ভূমি মিলে বৈচিত্র্যময় এ দেশ। দক্ষিণে রয়েছে আমাদের সুবিস্তীর্ণ সমুদ্র, বঙ্গোপসাগর। এ সাগরে বিপুল সম্পদের সমাহার রয়েছে। এখান থেকে বিপুল পরিমাণ মৎস্য আহরণ করা হয়, যা আমাদের প্রোটিনের একটি বড় অংশের জোগান দিয়ে থাকে। এরই মধ্যে সাগরতলে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাসের সন্ধান মিলেছে। এ ছাড়া রয়েছে জানা-অজানা আরও সম্পদের বিপুল ভাণ্ডার। সমুদ্রের সম্পদ তাই আমাদের অর্থনীতির গতিশীলতার জন্য জরুরি। কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে গত তিন দশকজুড়ে সমুদ্রবিরোধ থাকায় আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না সমুদ্রসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। এখন আদালতের রায়ে বঙ্গোপসাগরে ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) ও ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহিসোপান অঞ্চলে বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ ও সর্বাভৌম অধিকার সুনিশ্চিত হয়েছে। এর ফলে সমুদ্র ব্যবহারের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হল।
আদালতের রায়ের ফল নির্ধারিত হয়েছে ন্যায্যতার ভিত্তিতে। রায়ের পর বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার আয়তন যেমন বেড়ে গেল, তেমনি বেড়ে গেল আমাদের দায়িত্বও। এখন আমাদের উচিত হবে জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে সামুদ্রিক সম্পদের কার্যকর ব্যবহার। দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে তেল-গ্যাসের সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা। সমুদ্রের অপার সম্ভাবনা নিয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণায় অবতীর্ণ হওয়া। এ রায়ের গুরুত্বের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অভিন্ন নদীগুলোর বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি ভাবতে পারি কি-না- সেটিও বিবেচনাযোগ্য।
ড. আনু মাহমুদ : অর্থনীতি বিশ্লেষক
anumahmud@yahoo.com