Sunday, September 21, 2025

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিল যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। আজ রোববার একযোগে এই তিন দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিল। এর মধ্য দিয়ে শিল্পোন্নত (জি সেভেন) সাত দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্য ও কানাডা প্রথম ফিলিস্তিনকে এই স্বীকৃতি দিল।

আজ প্রথম কানাডা ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক বিবৃতিতে বলেন, আজ থেকে কানাডা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয় রাষ্ট্রের একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পূরণে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

এরপর অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির ঘোষণা দেন। এই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এই দুই দেশের পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহতা বাড়তে থাকার মুখে আমরা দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান ও শান্তির সম্ভাবনাকে জাগিয়ে রাখতে কাজ করছি। এর অর্থ একটি টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পাশে একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত ইসরায়েল, যার কোনোটি এই মুহূর্তে আমরা দেখছি না।’

এরপর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সময় এখন এসেছে।

‘তাই আজ দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান ও শান্তির আশা পুনরুজ্জীবিত করতে আমি এই মহান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্পষ্টত ঘোষণা করছি যে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।’

ফিলিস্তিনের গাজায় হামাসের হাতে বন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্যার কিয়ার স্টারমার। একইসঙ্গে তিনি ইসরায়েল সরকারের প্রতি গাজায় আরও ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ দিতে এই উপত্যকার সীমান্তে আরোপিত বিধি–নিষেধ শিথিল করার আহ্বান জানিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনে মুখ্য ভূমিকা ছিল ব্রিটেনের। এরপর দীর্ঘকাল ইসরায়েলের মিত্র দেশ হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে যুক্তরাজ্য। সে কারণে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাজ্যের এই স্বীকৃতির প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে।

লন্ডন আজ এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বিশ্বের আরও ১৪০টির বেশি দেশের কাতারে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে। কিন্তু তাদের এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েল ও তার প্রধান মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরক্তির কারণ হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সফরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির বিষয়ে নিজের আপত্তির কথা উল্লেখ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর আজ কিয়ার স্টারমারের ঘোষণার পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সে এক পোস্টে বলেছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ‘জিহাদি হামাসকে পুরস্কৃত করা ছাড়া আর কিছু নয়’। 

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-21%2F9nq33th6%2FWhatsApp-Image-2025-09-21-at-8.22.20-PM.jpeg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার পতাকা

সৌদির সঙ্গে চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে পারমাণবিক ইস্যুতে জল্পনা বাড়ছে

* পাকিস্তান বারবার বলে আসছে, শুধু ভারতকে প্রতিহত করতেই তারা নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলেছে।

* চুক্তির মধ্য দিয়ে রিয়াদ পাকিস্তানের পারমাণবিক সহায়তা পেতে যাচ্ছে, এই ধারণা প্রথম প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা।

রিয়াদ-ইসলামাবাদের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য চুক্তির পারমাণবিক দিক নিয়ে জল্পনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতে এক টিভি টক শোতে অংশ নিয়ে খাজা আসিফ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, নতুন চুক্তির অধীনে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা (অস্ত্র ও প্রযুক্তি সহায়তা) সৌদি আরবকে দেওয়া হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের যা আছে এবং যে সক্ষমতা আমরা আয়ত্ত করেছি, তা এই চুক্তির অধীনে (সৌদি আরবকে) দেওয়া হবে।’

তবে খাজা আসিফ জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তান সব সময় একটি দায়িত্বশীল পারমাণবিক দেশ হিসেবে কাজ করেছে।

রিয়াদে ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে অনুষ্ঠিত ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (এসএমডিএ) সই অনুষ্ঠানে খাজা আসিফও উপস্থিত ছিলেন। তাই তাঁর বৃহস্পতিবারের মন্তব্যকে পাকিস্তান প্রয়োজনে সৌদি আরবকে পারমাণবিক সহায়তা দিতে পারে—এই বিষয়ে প্রথম স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

তবে পরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র এই চুক্তির অংশ নয়। তাঁর ভাষায়, এ চুক্তির ‘আওতায়’ পারমাণবিক অস্ত্র নেই।

এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার ‘কৌশলগত নীরবতা’ অনুসরণ করা শুরু করে এবং সতর্ক অবস্থান নেয়।

শুক্রবার সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শাফকাত আলী খান চুক্তি-সংক্রান্ত কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে কি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক নীতিতে পরিবর্তন আসছে? চির বৈরী ভারতের বিষয়েই কেবল পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে, এটাই পাকিস্তানের ঘোষিত পারমাণবিক নীতি।

এই নীতিতে পরিবর্তন হয়েছে কি না, শাফকাত আলী খানকে এই বিষয়ে দুবার প্রশ্ন করা হয়। দ্বিতীয়বার তিনি বলেন, যেকোনো নীতির মতো এই নীতিও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এবং (পরিবর্তনের ধারা) অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখানে নীতির নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে আসিনি। তবে আমাদের অবস্থান সবার জানা আছে।’

পাকিস্তান বারবার বলে আসছে, শুধু ভারতকে প্রতিহত করতেই তারা নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলেছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, ‘ইসলামাবাদ এটা যথেষ্ট পরিমাণে স্পষ্ট করেছে, আমাদের কৌশলগত কর্মসূচি এবং সম্মিলিত সক্ষমতা শুধু আমাদের প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা সুস্পষ্ট ও বাস্তব অস্তিত্বের হুমকি প্রতিহতের জন্য ব্যবহার করা হবে। এসবকে অন্য কোনো দেশের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা উচিত নয়।’

শুক্রবার শাফকাত আলী খানের কাছে আরও জানতে চাওয়া হয়েছিল, চুক্তির ফলে সৌদি আরবে পাকিস্তানের সেনা মোতায়েনের নিয়মে পরিবর্তন আসবে কি না? কিন্তু তিনি এ প্রশ্নের উত্তরও এড়িয়ে যান। রিয়াদ-ইসলামাবাদের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি দেশ দুটির দীর্ঘদিনের সম্পর্কের একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শাফকাত আলী খান বলেন, ১৯৬০-এর দশক থেকে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। নতুন কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কয়েক দশকের পুরোনো ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের আগ্রাসী পরিকল্পনা মোকাবিলা করতেই চুক্তিটি করা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, এই চুক্তির ধরন প্রতিরক্ষামূলক। তৃতীয় কোনো দেশকে লক্ষ্য করে এই চুক্তি করা হয়নি। এটি আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে।

চুক্তির মধ্য দিয়ে রিয়াদ পাকিস্তানের পারমাণবিক সহায়তা পেতে যাচ্ছে, এই ধারণা প্রথম প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা। চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই তিনি একটি পশ্চিমা সংবাদ সংস্থাকে ইঙ্গিতে বলেছিলেন, চুক্তির অধীনে রিয়াদ পারমাণবিক সুরক্ষা পাবে। পরবর্তী সময়ে সৌদি ভাষ্যকারেরা দাবিটি আরও শক্তিশালী করেন।

চুক্তির ঘোষণার যৌথ বিবৃতিতে এটি ‘দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন দিককে উন্নত করতে এবং যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করার’ একটি উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অন্যান্য দেশও ‘আগ্রহী’

লন্ডনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইঙ্গিত দেন, আরও কিছু দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি তৈরিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এক সাংবাদিক ইসহাক দারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ইসলামাবাদ-রিয়াদের প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আরও কোনো দেশ যোগ দেবে কি না। অন্য কোনো দেশও কি পাকিস্তানের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি করতে আগ্রহী?

উত্তরে দার বলেন, ‘এখনই চূড়ান্তভাবে কিছু ঠিক হবে না। তবে আরও কিছু দেশ এ ধরনের চুক্তি করতে চায়। এটি করতে কয়েক মাস সময় লেগেছে, রাতারাতি স্বাক্ষর হয়ে যায়নি।’

চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সে রকম একটি অনানুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সব সময় ছিল।

ইসহাক দার বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, উভয় পক্ষই বেশ খুশি। সত্যি বলতে কি, নিষেধাজ্ঞার মতো কঠিন সময়ে সৌদি আরব আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের সমর্থন খুবই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০২২-২৩ সাল থেকে চলমান সংকটে যখন আমাদের আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তার প্রয়োজন ছিল, তখনো সৌদি আরব আমাদের পাশে ছিল।

প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর শেষে আলিঙ্গন করছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর শেষে আলিঙ্গন করছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

কেনিয়ার জঙ্গলে গাছের ওপরে ঘরে ওঠার সময় ছিলেন রাজকন্যা, নেমে এলেন রানি হয়ে by ফাহমিদা আক্তার

১৯৫২ সালে বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় এলিজাবেথ উত্তরাধিকারী হিসেবে ব্রিটিশ সিংহাসনে বসেন। তিনি টানা সাত দশক ব্রিটিশ সিংহাসনে আসীন ছিলেন। ২০২২ সালের জুনে তিনি তাঁর সিংহাসনে আরোহণের ৭০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করেন। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাসে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সবচেয়ে বেশি সময় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ওই বছরেই রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ৯৬ বছর বয়সে মারা যান। গত ৮ সেপ্টেম্বর রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের আয়োজন।

১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। ব্রিটিশ রাজকন্যা দ্বিতীয় এলিজাবেথের বয়স তখন মাত্র ২৫ বছর। তাঁর বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জ ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন। বাবা অসুস্থ থাকায় তাঁর হয়ে স্বামী ফিলিপকে নিয়ে কমনওয়েলথ সফরে বের হয়েছিলেন এলিজাবেথ। সেই সফরের প্রথম গন্তব্যই ছিল কেনিয়া। তখন কেনিয়া ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ।

সফরকালে এলিজাবেথ ও ফিলিপ কেনিয়ার গভীর বনে একটি ট্রি হাউসে ছিলেন। গাছের ওপর বসে বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ করছিলেন তাঁরা। এর মধ্যে হঠাৎ করে খবর আসে, কয়েক হাজার মাইল দূরে যুক্তরাজ্যে বাবা রাজা জর্জ মারা গেছেন। আর সেই মুহূর্ত থেকেই ব্রিটিশ রাজকন্যা এলিজাবেথ হয়ে যান ব্রিটিশ রানি। এরপর ৭০ বছর ছিলেন রাজ সিংহাসনে।

প্রকৃতিবিদ ও শিকারি জিম করবেট রাজদম্পতিকে ওই ট্রি হাউসে সঙ্গ দিয়েছিলেন। ওই ট্রি–টপস হোটেলের পরিদর্শক বইয়ে তিনি লিখেছিলেন: ‘বিশ্ব ইতিহাসে প্রথমবার এক তরুণী একদিন রাজকন্যা হিসেবে গাছে উঠলেন, একে তাঁর জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করলেন এবং পরদিন গাছ থেকে নেমে এলেন এক রানি হয়ে।’

সিংহাসনে বসাটাও ছিল অপ্রত্যাশিত

১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন মা–বাবার প্রথম সন্তান। তাঁর বাবা প্রিন্স আলবার্ট তখন ডিউক অব ইয়র্ক ছিলেন। পরে তিনি রাজা ষষ্ঠ জর্জ হিসেবে রাজকার্য চালিয়েছেন। দ্বিতীয় এলিজাবেথের মায়ের নাম ছিল এলিজাবেথ বোয়েস লিয়ন।

পরিবারের সদস্যরা দ্বিতীয় এলিজাবেথকে আদর করে লিলিবেট বলে ডাকতেন। তাঁর জন্মের ৪ বছর পর ১৯৩০ সালে বোন মার্গারেটের জন্ম হয়।

দ্বিতীয় এলিজাবেথের যখন জন্ম হয়, তখন তিনি ছিলেন ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের তৃতীয় উত্তরসূরি। রাজা পঞ্চম জর্জ ছিলেন তাঁর দাদা। তাঁর বাবা ছিলেন দাদার দ্বিতীয় সন্তান এবং সিংহাসনের দ্বিতীয় উত্তরসূরি। আর প্রথম উত্তরসূরি ছিলেন চাচা অষ্টম এডওয়ার্ড। সেদিক থেকে দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাজ সিংহাসনে বসার কোনো সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে।

দাদা পঞ্চম জর্জের মৃত্যুর পর ১৯৩৬ সালে তাঁর চাচা এডওয়ার্ড রাজ সিংহাসনে বসেন। তবে তিনি বেশিদিন ক্ষমতায় থাকেননি। বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়া এক মার্কিন নারীকে বিয়ে করতে তিনি রাজপদবি ছাড়েন। রাজা হিসেবে অষ্টম এডওয়ার্ডের পদত্যাগের পর সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় এলিজাবেথের বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জ। আর এলিজাবেথ তখন হয়ে যান সিংহাসনের প্রথম উত্তরসূরি।

রাজদপ্তরের লেখক এবং ইতিহাসবিদ সারাহ গ্রিস্টউডের মতে, ষষ্ঠ জর্জ আগে থেকে ধরেই নিয়েছিলেন, বড় ভাই এডওয়ার্ডই রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাই হঠাৎ রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার মতো প্রস্তুতি তাঁর ছিল না। রাজা হওয়ার পর তিনি দৃঢ়সংকল্প করেন যে মেয়ে এলিজাবেথকে অন্তত ভালোভাবে প্রস্তুত করে তুলবেন।

এলিজাবেথকে ব্যক্তিগতভাবে পড়াতেন ইটনের প্রভোস্ট। তিনি তাঁকে ব্রিটিশ ও মার্কিন সংবিধান শেখাতেন। পাশাপাশি এক ফরাসি শিক্ষক তাঁকে সাবলীল ফরাসি ভাষাও শিখিয়েছিলেন—যা পরে কানাডার ফরাসিভাষী জনগণের রানি হিসেবে তাঁর জন্য বিশেষ কাজে আসে।

বোনের সঙ্গে সম্পর্ক

দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং বোন মার্গারেটের মধ্য ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে দুই বোনের কেউ–ই স্কুলে যাননি। বাড়িতেই টিউটর এসে তাঁদের পড়াতেন। বাবা ষষ্ঠ জর্জ রাজা হওয়ার পর অনিচ্ছা সত্ত্বেও এলিজাবেথ ও মার্গারেট তাঁদের মা–বাবার সঙ্গে বাকিংহাম প্যালেসে চলে যান। এলিজাবেথ তখন আর নির্ভার রাজকন্যা হয়ে থাকতে পারলেন না। তিনি ভবিষ্যৎ দায়িত্বের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।

এলিজাবেথ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার পর তিনি বোনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কম পেতেন। রাজদপ্তরের ইতিহাসবিদ ক্যারোলিন হ্যারিসের ভাষায়, ‘মার্গারেট চাইতেন যেখানে এলিজাবেথ থাকবেন, তাকেও সেখানে থাকতে দেওয়া হোক। আর তাই এলিজাবেথ যখন ইটনে পড়াশোনার জন্য যেতেন, মার্গারেটের কাছে তা কষ্টকর ছিল। কারণ, তারা সবকিছু একসঙ্গেই করতেন।’

গ্রিস্টউড বলেন, দায়িত্বটা কঠিন হলেও এলিজাবেথ ভালোভাবেই বুঝে গিয়েছিলেন সামনে কী আসছে এবং তা মেনে নিয়েছিলেন। তরুণী রাজকন্যা প্রহরীদের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতেন, যাতে তারা অস্ত্র তোলে। তখন থেকেই তাঁর মনে হতো, তাঁর জীবনের যেন নির্দিষ্ট পথে গড়ে দেওয়া হয়েছে।

যেভাবে বাইরের মানুষের সঙ্গে মিশতে শুরু করেন

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানি পোল্যান্ডে আক্রমণ করলে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখন পরিবারটি বালমোরালে ছুটিতে ছিল। কোথায় থাকা নিরাপদ হবে বুঝতে না পেরে রাজা জর্জ ষষ্ঠ ও রানি লন্ডনে ফিরে যান। এলিজাবেথ ও মার্গারেটকে রেখে যান ধাত্রীদের কাছে। কিছুদিন স্যান্ড্রিংহ্যামে থাকার পর দুই রাজকন্যাকে উইন্ডসরে নিয়ে যাওয়া হয়। যুদ্ধকালে প্রায় পুরো সময়ই তারা সেখানেই ছিলেন।

যুদ্ধের বছরগুলোতেই শুরু হয় এলিজাবেথের প্রকাশ্য জীবন। ১৯৪০ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার বিবিসির চিলড্রেনস আওয়ার অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি শিশুদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমার বোন মার্গারেট রোজ আর আমি তোমাদের কষ্ট বুঝতে পারি। কারণ আমরাও জানি, সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকতে কেমন লাগে।’

এলিজাবেথের এই বক্তব্য শুধু ব্রিটিশ শিশুদের মনোবলই বৃদ্ধি করেনি, বরং জার্মানির বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের লড়াইয়ে শামিল হতে যুক্তরাষ্ট্রকেও উদ্বুদ্ধ করেছিল। গ্রিস্টউডের মতে, অল্প বয়সে এলিজাবেথ যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেটা কার্যত ‘সফট ডিপ্লোমেসি’।

১৯৪৩ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জ মেয়ে দ্বিতীয় এলিজাবেথকে গ্রেনেডিয়ার গার্ডসের কর্নেল-ইন-চিফ ঘোষণা করেন। সেই বছরই তিনি প্রথমবারের মতো সেনাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুই বছর পর, যুদ্ধের শেষ দিকে তিনি তাঁকে উইমেনস টেরিটোরিয়াল অক্সিলিয়ারি সার্ভিসে যোগ দেওয়ার অনুমতি দিতে বাবাকে রাজি করান। সেখানে তিনি একজন চালক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

গ্রিস্টউডের মতে, এই সিদ্ধান্ত ছিল এলিজাবেথের সম্পূর্ণ নিজের। তিনি বলেছিলেন—‘যদি আমার বয়সী অন্য সব মেয়ের যুদ্ধের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে আমাকেও দেওয়া উচিত।’

১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হলে হাজারো মানুষ লন্ডনের রাস্তায় নেমে বিজয় উদ্‌যাপন করেন। সেই রাতে এলিজাবেথ আর মার্গারেটকে সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়ার বিরল সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

রানি পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন—সেটি ছিল তাঁর জীবনের সেরা রাতগুলোর একটি।

প্রেম–বিয়ে–সংসার

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে রাজপরিবার ডার্টমাউথ নেভাল কলেজ পরিদর্শনে গিয়েছিল। সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন গ্রিসের তরুণ প্রিন্স ফিলিপ।

ইতিহাসবিদ গ্রিস্টউডের ভাষায়, ‘সেই প্রথম দেখা থেকেই এলিজাবেথ বুঝে গিয়েছিলেন—কাকে তিনি চান।’

ফিলিপ দায়িত্ব থেকে ছুটি পেলেই এলিজাবেথকে দেখতে যেতেন। আর যুদ্ধ চলাকালে দুজন নিয়মিত একে অপরকে চিঠি লিখতেন।

গ্রিস্টউড বলেন, এলিজাবেথ তখনো অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেও ফিলিপের মামা লর্ড মাউন্টব্যাটেন এই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে উৎসাহ দিচ্ছিলেন।

তখন থেকেই ধারণা ছিল—একদিন ফিলিপ আর এলিজাবেথের বিয়ে হবেই।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই বছর পর ফিলিপ ও এলিজাবেথের আনুষ্ঠানিক বাগদান হয়। ওই বছরেরই শেষ দিকে বিয়ে। আর তারপর থেকে ২০২১ সালে ফিলিপের মৃত্যু পর্যন্ত টানা ৭৩ বছর একসঙ্গে ছিলেন তাঁরা। তাঁদের চার সন্তান–চার্লস (বর্তমান রাজা), প্রিন্সেস অ্যান, প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও প্রিন্স এডওয়ার্ড।

রাজতন্ত্রের উত্থান–পতনের সাক্ষী

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাবা রাজা জর্জ মারা গেলে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে বসেন এবং কমনওয়েলথের প্রধান হন। তাঁর রাজ্যাভিষেক বিশ্বজুড়ে টিভি রেকর্ড গড়ে। এ ছাড়া রাজতন্ত্র ও ব্রিটিশ কমনওয়েলথের জন্য নতুন এক যুগের সূচনা করেন তিনি।

১৯৫০–এর দশকে রাজপরিবার ও রানির প্রতি মানুষের ব্যাপক শ্রদ্ধা ছিল। তবে, পরবর্তী কয়েক দশকে সম্প্রচারমাধ্যমের প্রসারের কারণে রাজপরিবারের অনেক গোপন ঘটনা প্রকাশ্যে চলে আসতে থাকে। রানির সন্তানদের বৈবাহিক সমস্যা এবং এ–সম্পর্কিত কেলেঙ্কারির বিষয়গুলো গণমাধ্যমের শিরোনামে জায়গা করে নেয়। তবে এরপরও মানুষ রানির কারণে রাজপরিবারের প্রতি উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন।

রানি কমনওয়েলথকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তাঁর কাজের ওপর খুব জোর দিয়েছিলেন। কারণ, যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে কঠিন কাজ। অনেক দেশ ব্রিটিশ উপনিবেশমুক্ত হয়ে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছিল। তবে কমনওয়েলথকে সত্যিকারের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন।

নব্বইয়ের দশকে কিছু সমস্যায় পড়লেও ২০০০ সালের পরে এসে রানির জনপ্রিয়তা আবার বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর শাসনকালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকেন। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজনে খ্রিষ্টান হিসেবেই তাঁর বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেন রানি।

তবে চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান হিসেবে ভূমিকায় থাকলেও রানি এলিজাবেথ সব ধর্মের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধান রানি হলেও যুক্তরাজ্যের সরকারব্যবস্থার প্রধান প্রধানমন্ত্রী। দ্বিতীয় এলিজাবেথের ৭০ বছরের শাসনামলে যুক্তরাজ্য ১৬ জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে।

বিশ্ববাসীর কাছে রানি ছিলেন বিপুল সম্মানের পাত্র। যে দেশে তিনি সফরে গেছেন, সেখানেই পেয়েছেন রাজকীয় সম্ভাষণ। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর লন্ডন থেকে অনেক দূরে স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনশায়ারের বালমোরাল প্যালেসে মৃত্যুবরণ করেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর।

মৃত্যুর পরদিন থেকে টানা ১০ দিনের জাতীয় শোক পালন শেষে তাঁকে আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে ও রাজকীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

৭০ বছর আগে যে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে তাঁর অভিষেক, সেখানেই তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর আগে ওয়েস্টমিনস্টার হলে রানির কফিন রাখা হয়েছিল তাঁর প্রতি সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। সেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ রানির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।

তথ্যসূত্র: স্কাই নিউজ, এএফপি, বিবিসি

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

অপহৃত হওয়া জেলেরা কি ফিরবেন না পরিবারের কাছে by নাহিদ হাসান

তখন করোনার কাল। কুড়িগ্রাম জেলার ২৬ জন জেলে তাঁদের কাজের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ভারত থেকে বাংলাদেশের পথে রওনা দেন। কিন্তু করোনার কারণে হঠাৎ বিধিনিষেধ আসে। তাঁরা রাস্তায় আটকা পড়েন। তবু ঝুঁকি নিয়ে কয়েক দিন পর আবার বের হন। আসাম পুলিশ তাঁদের আটকায়।

মানববন্ধন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনের শরণাপন্ন হয়ে ছাড়িয়ে আনতে আনতে একজন জেলখানায় মারা যান। এরপর বাকিরা বাংলাদেশে ফিরতে পারেন। কিছুদিন আগে সাতজন জেলে ভারতের মেঘালয়ে আটকা পড়েন। তাঁরা এখন ভারতের জেলে। ভারতের আদালত কী রায় দিয়েছেন জানি না। পরিবারগুলোর কান্না থামছে না। এটা গেল চিলমারীর ব্রহ্মপুত্রপারের জেলেপাড়ার ঘটনা।

আগে বঙ্গোপসাগরের ভারত সীমান্তে বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর প্রায়ই পত্রিকায় আসত। ভারতীয় কোস্টগার্ডও ধরে, ভারতীয় জলদস্যুরাও ধরে। এগুলো ‘ডাল-ভাত ব্যাপার’। ভারত বড় শক্তি। তারা স্থলে মারবে, পানিতে মারবে—এটাই নিয়তি। দয়া করে লাশ ফেরত দিলে তাতেই আমরা খুশি।

দুই.
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ দৈনিক ইত্তেফাক–এর খবর থেকে জানা যায়, ৪০ জেলেকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি, উদ্ধার হননি আগের ৮১ জনও। কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিনের অদূরে সাগর থেকে মাছ ধরার পাঁচটি ট্রলারসহ ৪০ বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মির সদস্যরা। পাঁচটি ট্রলারের মধ্যে তিনটি টেকনাফ পৌর এলাকার, অন্য দুটির মালিক শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, জেলেদের উদ্ধারে কাজ চলছে। এ বিষয়ে বোট মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বিজিবি, কোস্টগার্ড ও উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলেও জানান সাজেদ আহমেদ।

কিন্তু বিজিবি, কোস্টগার্ড ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দেশবাসী জানে না। শুধু জানা যাচ্ছে, জেলেরা এখনো উদ্ধার হয়নি। পরিবার–স্বজনদের অপেক্ষা বাড়ছে।

তিন.
১৫১৭ সালের কথা। পর্তুগিজরা বাংলার উপকূলে আসে। প্রথম দিকে এরা বাণিজ্য করলেও ধীরে ধীরে দস্যুতা, অপহরণ ও দাস ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে।

হুগলি, চট্টগ্রাম ও সুন্দরবন থেকে শুরু করে নোয়াখালী থেকে বরিশাল পর্যন্ত উপকূল এদের ডাকাতির শিকার হয়। গ্রামের পর গ্রাম আক্রমণ করে নারী, শিশু ও পুরুষদের ধরে নিয়ে যেত এবং দাস হিসেবে বিক্রি করত। এদের নিয়ে যেত পর্তুগিজ উপনিবেশে (গোয়া, মালাক্কা), এমনকি ইউরোপ পর্যন্ত। আর মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল থেকে আসা মগ জলদস্যুরা ডাকাতি চালাত বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, সীতাকুণ্ড ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের মানুষদের তুলে নিয়ে যেত। বিক্রি করা হতো আরাকানের রাজধানী ম্রাউক উ এবং চট্টগ্রামের কাছে দাসের হাটে।

ফরাসি পর্যটক সেজার ফ্রেডেরিক লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলে দস্যুর হাতে ধরা পড়লে মুক্তি নেই, তারা মানুষ ধরে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে।’ ডাচ পর্যটক ভ্যান ডেন ব্রুক ১৭ শতকে আরাকানিদের দাস ব্যবসার বর্ণনা দিয়েছেন। এই সময়কালে বাংলার উপকূল থেকে অপহৃত মানুষের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে কিছু জায়গা জনশূন্য হয়ে পড়ে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি ভেঙে যায়। গ্রামবাসীরা ভয়ে চলে যায় উপকূল ছেড়ে ভেতরের দিকে।

মোগল শাসকেরা জানতেন, তাঁদের সমৃদ্ধি এই জেলে, কৃষক ও কারিগরদের ওপর নির্ভরশীল। শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৬ সালে এই পর্তুগিজ ও মগদের দমন করেন। এখন কে করবেন দমন?

চার.
মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে জেরবার। আগে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীরা মাঝেমধ্যে বাহাদুরি দেখাতেন, আমরা নিরীহ বাঙাল হিসেবে মেনে নিতাম। ইদানীং তাঁদের তাড়িয়ে আরাকানের দখল নিয়েছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি। তারা আমাদের জেলেদের সেন্ট মার্টিনে যেতে দেয় না, মাছ ধরতে দেয় না। প্রতি সপ্তাহে জেলে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সরকার টেরই পায় না।

উজানের ব্রহ্মপুত্র থেকে ভাটির সমুদ্র—সর্বত্রই জেলেদের জীবন কচুপাতার মতো টলমল। তাঁদের শ্রম ছাড়া আমাদের পাতে মাছ ওঠে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় জেলেদের নৌকাই ছিল আমাদের ভরসা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলে গেছেন, তাঁদের ‘পল্লীতে ঈশ্বর থাকেন না’। রাষ্ট্র থেকে বলা হয়, বঙ্গোপসাগর হলো বাংলাদেশের সদর দরজা; কিন্তু সেই সাগরেই আমাদের জেলেদের নিরাপত্তা নেই।

* নাহিদ হাসান, লেখক ও সংগঠক
- nahidknowledge1@gmail.com

টেকনাফের জেলেরা মাছ ধরার জন্য নৌকা নামাচ্ছেন সমুদ্রে
টেকনাফের জেলেরা মাছ ধরার জন্য নৌকা নামাচ্ছেন সমুদ্রে। ছবি: প্রথম আলো

ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু: ভুটান কি যুব-ভূমিকম্প টের পাচ্ছে? by নামগে জাম

কুয়েন্সেলের নিবন্ধঃ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির বিশাল মঞ্চে টেকটোনিক পরিবর্তন ঘটছে। ঢাকা শহরের বর্ষামাখা রাস্তাগুলো থেকে শুরু করে কাঠমান্ডুর উঁচু উপত্যকা পর্যন্ত এক প্রজন্ম-নির্ধারণ করে দেয়া কম্পন অনুভূত হচ্ছে। এটি এক ‘যুব-ভূমিকম্প’ (ইয়ুথ আর্থকোয়েক)। এটা যুব প্রজন্মের ডিজিটালপ্রজন্ম নাগরিকদের চালিত এক ভূমিকম্পের মতো ঢেউ। এই যুব সমাজ আর স্থিতাবস্থায় সন্তুষ্ট নয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন নাটকীয় গণআন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে দেয়। নেপালে চলমান সংস্কার আন্দোলনও কোনো বিচ্ছিন্ন ঝড় নয়। বরং এগুলো গভীর আঞ্চলিক রূপান্তরের ইঙ্গিত, যা হিমালয়ের ওপার থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রতিটি দেশের জন্য শিক্ষার বার্তা নিয়ে, আমাদের স্নেহের ড্রাগন কিংডম ভুটানসহ।

ভুটানের জন্য, যা তার স্থিতিশীলতা ও অনন্য উন্নয়ন দর্শনের জন্য পরিচিত, এসব ঘটনা আতঙ্কের কারণ নয়। বরং এগুলো আমাদের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে যে নীতিগুলো মেনে এসেছে- আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব, তার শক্তিশালী স্বীকৃতি। মূল প্রশ্ন হলো, আমরা এসব অস্থিরতা থেকে মুক্ত কিনা তা নয়; বরং আমরা কি আমাদের প্রতিবেশী রাজধানীগুলোর রাস্তায় লেখা শিক্ষাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছি?

ঢাকার প্লাবন: ভেঙে যাওয়া আস্থার কেস স্টাডি
আঞ্চলিক পরিবর্তনের ব্যাপ্তি বুঝতে হলে প্রথমে তাকাতে হবে বাংলাদেশের দিকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাগুলো দশক ধরে অধ্যয়ন করা হবে। যা শুরু হয় সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে ছাত্র প্রতিবাদ দিয়ে, তা অবিশ্বাস্য গতিতে রূপ নেয় দেশব্যাপী আন্দোলনে এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হয় সরকারের পতনের আন্দোলনে। কোটার ইস্যু ছিল কেবল স্ফুলিঙ্গ; মূলত এটি ছিল এক প্রজন্মের ক্ষোভের বিস্ফোরণ- একটি ব্যবস্থা, যা তাদের কাছে অস্বচ্ছ, জবাবদিহিতাহীন ও অন্যায্য মনে হয়েছিল।

বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতি, রাজনৈতিক দায়মুক্তি এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তরুণদের আকাঙ্ক্ষার ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ জমে উঠছিল। ছাত্ররা কেবল চাকরি চাইছিল না; তারা চাইছিল সমান সুযোগ, যেখানে আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আন্দোলনের দ্রুত বিস্তার সম্ভব হয়েছিল ডিজিটাল টুলসের কারণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের স্নায়ুতন্ত্র, যা বাস্তব সময়ে সংগঠন ও গতিশীলতা তৈরি করেছিল। এ ঘটনা নতুন বাস্তবতা তুলে ধরল: আজকের দিনে সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো- ডিজিটালি সংযুক্ত তরুণদের আস্থা হারিয়ে ফেলা। ঢাকার শিক্ষা স্পষ্ট: সুশাসনের ভিত্তি যখন ভেঙে পড়ার মতো মনে হয়, তখন রাজনৈতিক ভূমিকম্প দ্রুত ও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

কাঠমান্ডুর ঐকমত্য: স্থায়ী সংস্কারের আহ্বান
বাংলাদেশের ঘটনাগুলো ছিল আকস্মিক প্লাবন; আর কাঠমান্ডুর ফিসফিসানি হলো পরিবর্তনের দীর্ঘস্থায়ী স্রোত। ‘জেনারেশন জেড আন্দোলন’ কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি হলো এক বিপ্লবী আহ্বান। দশকের পর দশক ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ তরুণ নেপালিরা এবার রাস্তায় নেমেছে স্পষ্ট বার্তা নিয়ে: তারা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক চুক্তির মৌলিক পুনর্গঠন চায়।
তাদের ক্ষোভ কোনো একক নেতার বিরুদ্ধে নয়, বরং গোটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। তারা দায়মুক্তির অবসান, স্বজনপ্রীতির বদলে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতাপূর্ণ সরকার দাবি করছে। এই আন্দোলন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- গণতন্ত্র কেবল ভোট দেয়া নয়; বরং এটি প্রতিদিনের সুশাসনের চর্চা। তরুণরা গণতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করছে না; তারা চাইছে এর একটি উন্নত সংস্করণ- যেখানে জনসেবা দায়িত্ব, ব্যক্তিগত স্বার্থলাভের সুযোগ নয়।

ভুটানের আয়না: আতঙ্ক নয়, আত্মপ্রত্যয়
ভুটানের জন্য সবচেয়ে সহজ, কিন্তু মারাত্মক ভ্রান্তি হবে আঞ্চলিক ঘটনাগুলোকে দূর থেকে উদাসীনভাবে দেখা। আমাদের রাজতন্ত্রের প্রজ্ঞায় পরিচালিত স্থিতিশীলতা পুরো অঞ্চলের ঈর্ষার বিষয়। আমাদের মোট জাতীয় সুখ দর্শন আমাদের জাতীয় সত্তায় সুশাসন, ন্যায় ও সাম্যের নীতিকে প্রোথিত করেছে।
তাই ঢাকার প্রতিধ্বনি ও কাঠমান্ডুর ফিসফিসানি আমাদের কাছে ধ্বংসের সতর্কবার্তা নয়; বরং এগুলো আমাদের বেছে নেওয়া পথের বহিঃস্বীকৃতি। এগুলো আয়নার মতো আমাদের অর্জনের মূল্য এবং এগুলো রক্ষা করার অপরিসীম গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে। প্রতিবেশী দেশগুলোর অস্থিরতা বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে- যখন ভুটানের লালিত নীতিগুলো ক্ষয়ে যায়, তখন কী ঘটে।

আত্মতুষ্টি কোনো বিকল্প নয়
আমাদের প্রজ্ঞা স্বীকার করা কেবল প্রথম ধাপ। আঞ্চলিক যুব-ভূমিকম্প থেকে প্রকৃত শিক্ষা হলো- সুশাসন কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তাই বর্তমান সরকারসহ ভবিষ্যতের প্রতিটি সরকারকে সক্রিয়ভাবে শুনতে হবে।
প্রথমত, আমাদের নিজেদের তরুণদের কথা শুনতে হবে। চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক একসময় বলেছিলেন: ‘দেশের ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্মের হাতে।’ এই কথাটি আজও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দিশারী। ভুটানের তরুণরা আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি শিক্ষিত, বৈশ্বিকভাবে সচেতন এবং ডিজিটালি সংযুক্ত। আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থা-বিচার বিভাগ, সিভিল সার্ভিস, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া- ভুটানের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের আকাক্সক্ষার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সংলাপ হচ্ছে।

আমাদের প্রশ্ন করতে হবে:
সংলাপের চ্যানেলগুলো কি খোলা ও কার্যকর? তরুণরা কি মনে করে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে?
দ্বিতীয়ত, আমাদের মূল নীতিগুলো রক্ষা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সংস্থার প্রতি অক্লান্ত সমর্থন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। জবাবদিহিতা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি দৃশ্যমান হতে হবে। যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তখন এটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে আইনের শাসন পরম। যখন সরকারের সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ হয়, তখন এটি হতাশার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা তৈরি করে।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল যুগে স্বচ্ছতা আর ঐচ্ছিক নয়। তথ্য অবাধে প্রবাহিত হয়, নাগরিকদের কাছে নেতাদের খতিয়ে দেখার আরও বেশি উপায় আছে। অস্বচ্ছভাবে কাজ করার যে কোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। সরকারকে অবশ্যই নতুন বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করতে হবে- নীতিমালা ব্যাখ্যা করে জানানো, সিদ্ধান্তের বিষয়ে খোলামেলা থাকা, চ্যালেঞ্জ স্বীকার করা। যে সরকার তার জনগণের সঙ্গে তথ্য ভাগ করে নেয়, সেই সরকারই আস্থা অর্জন করে।

উপসংহার
ঢাকা থেকে প্রতিধ্বনি ও কাঠমান্ডুর ফিসফিসানি হুমকি নয়, বরং এক গর্জন তোলা শিক্ষা। এগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়- আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হলো দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে জাতীয় স্থিতিশীলতার অপরিহার্য উপাদান। মনোযোগ দিয়ে শুনে, এই মূল্যবোধগুলোতে আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্নিশ্চিত করে এবং জনগণের- বিশেষ করে তরুণদের- আস্থা ক্রমাগত অর্জন করে ভুটান নিশ্চিত করতে পারে যে ‘যুব-ভূমিকম্প’ আমাদের কাছে গবেষণার বিষয় থাকবে, অভিজ্ঞতার নয়। আমাদের স্থায়ী শান্তি এর ওপরই নির্ভর করছে।

(লেখক: নামগে জাম (এলএলএম), ইউনেস্কো মাদঞ্জীত সিং সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজ (ইউএমএসএআইএলএস), এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ) 

mzamin

সরকার বদলায় কিন্তু শিক্ষার অবহেলা বদলায় না by মোস্তাফিজুর রহমান

স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে একের পর এক সরকার এসেছে, শিক্ষা কমিশন গঠন হয়েছে, বড় বড় নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। সরকারের রূপ পাল্টেছে, কিন্তু শিক্ষার প্রতি অবহেলা বদলায়নি। আজকের বাংলাদেশে চার কোটির বেশি শিক্ষার্থী, দেড় লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ১০ লাখের বেশি শিক্ষক রয়েছেন।

প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হার ৯৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, মাধ্যমিকেও ভর্তি বেড়েছে। সংখ্যার হিসাবে নিঃসন্দেহে ভালো শোনায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভর্তি ও পরীক্ষার সাফল্য কি শিক্ষার্থীদের দক্ষ করছে? বাস্তব উত্তর হচ্ছে ‘না’। তারা ডিগ্রি হাতে পাচ্ছে, কিন্তু শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার মতো সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা কিংবা বিদেশি ভাষার দক্ষতা, যা আধুনিক চাকরির বাজারে জরুরি—এসব দক্ষতা শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না।

কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকার শিক্ষাকে কখনোই প্রকৃত অর্থে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেনি, বরং শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে। আর শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে গিয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা গবেষণায় বিনিয়োগ না করে ভরসা করা হয়েছে প্রাইভেট টিউশন, কোচিং আর গাইড বইয়ের ওপর।

শিক্ষা বাজেটই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ (জিডিপির ২.৪৯ শতাংশ)। কিন্তু ক্রমান্বয়ে তা কমতে কমতে নেমে এসেছে বাজেটের ১২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে। আমরা আশা করেছিলাম বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে হয়তো ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হবে। বাস্তবে তা হলো না, হতাশা রয়ে গেল।

করোনা মহামারির অভিঘাত এখনো কাটেনি। গণসাক্ষরতা অভিযান-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আগস্ট ২০২৩ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ৪২৭ দিনের মধ্যে ২৭৯ দিন স্কুল বন্ধ ছিল। অর্থাৎ মাত্র ১৪৮ দিন ক্লাস হয়েছে। এত দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি শিশুদের শেখার ক্ষতি করেছে ভয়াবহভাবে। এ ঘাটতি পূরণে কোনো বিশেষ উদ্যোগ না থাকায় নতুন প্রজন্ম ‘হারানো প্রজন্মে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

শিক্ষায় বৈষম্য বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা। শহর ও গ্রামের মধ্যে, ধনী ও গরিবের মধ্যে, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার মধ্যে এই বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। প্রাথমিক স্তরে অনেক ধরনের—সরকারি স্কুল, মাদ্রাসা, এনজিও স্কুল, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম ইত্যাদি। ফলে শিক্ষার্থীদের মান, সুযোগ ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিতে বিশাল ফারাক তৈরি হচ্ছে। এই বৈষম্যকে আরও গভীর করেছে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই অংশ নিতে পারবে। অথচ দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী এনজিও ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে। এ সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে বৈষম্য তৈরি করছে।

এই পটভূমিতে সরকার পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি–৫) হাতে নিয়েছে এবং ২০২৭ সাল থেকে নতুন পাঠ্যক্রম শ্রেণিকক্ষে চালুর পরিকল্পনা করছে। এটি বড় সুযোগ হলেও আশঙ্কা রয়ে গেছে। কারণ, এর পূর্ববর্তী কর্মসূচি (পিইডিপি–৪) জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২৩–এর জন্য ডিজাইন করা হলেও পরে জুন ২০২৫ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু এখনো এর ১৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি, যা আমাদের সক্ষমতার ঘাটতিকে নির্দেশ করে। আর এবারও যদি সেই ধারাবাহিকতা থাকে, তবে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসবে না।

পিইডিপি–৫ সফল করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে একীভূত করতে হবে। পাঠ্যক্রমকে কর্মসংস্থানমুখী করতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকেই প্রযুক্তিশিক্ষা, জীবনদক্ষতা, কারিগরি জ্ঞান ও উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা বাড়ানো। এগুলো ছাড়া মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।

সরকার একা এই সংস্কার করতে পারবে না। নাগরিক সমাজ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এনজিওগুলো বহু বছর ধরে শিশুশিক্ষা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে ফিরিয়ে আনা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর সহায়তা ও কমিউনিটি স্কুলে কাজ করছে। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো দরকার। কমিউনিটির অংশগ্রহণও অপরিহার্য। শিক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক-শিক্ষক সমিতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া শিক্ষায় কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে অনেক বড় বড় কথা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো তরুণেরা ডিগ্রি পেলেও চাকরি পাচ্ছেন না, দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। সরকার বদলায়, কিন্তু শিক্ষার প্রতি অবহেলা বদলায় না।

এখন সময় এসেছে সত্যিকারের পরিবর্তনের। যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা যায়; যদি সরকার, এনজিও, শিক্ষক সংগঠন ও কমিউনিটি একসঙ্গে কাজ করে এবং বৈষম্য দূরীকরণকে মূল লক্ষ্য বানায়, তবে শিক্ষার ভবিষ্যৎ বদলানো সম্ভব। শিক্ষা শুধু ডিগ্রি নয়, এটি কর্মসংস্থান ও জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি। সেই চাবিকেই শক্ত হাতে ধরতে হবে, না হলে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল কথার ফুলঝুরিই হয়ে থাকবে।

* মোস্তাফিজুর রহমান, লেখক ও গবেষক
- smostafiz_r@yahoo.com

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-07%2F9k6q9i42%2Feducation.JPG?rect=86%2C0%2C897%2C598&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif