Showing posts with label গ্রিনল্যান্ড. Show all posts
Showing posts with label গ্রিনল্যান্ড. Show all posts

Tuesday, March 31, 2026

পৃথিবীর শেষ প্রান্তভাগের গ্রামটির মানুষ কীভাবে বাঁচে

গ্রিনল্যান্ডের ইতোকোর্তোরমিত গ্রামটি প্রতিবছর নয় মাস বরফে ঢেকে থাকে। পৃথিবীর উত্তর প্রান্তভাগের জীবনধারা কেমন, তা এই জায়গায় গেলে বোঝা যায়।

পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত বিশ্বব্যবস্থায় সত্যিকারের দুর্গম জায়গায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাওয়াটা খুবই বিরল। একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোর মানুষেরা কীভাবে জীবন যাপন করে, তা জানতে পারাটা আরও বিরল অভিজ্ঞতা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আলোকচিত্রী কেভিন হল সেই বিরল অভিজ্ঞতাই লাভ করেছেন। বিবিসিতে লেখা এক নিবন্ধে তিনি সে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

ইতোকোর্তোরমিত হলো ছোট একটি গ্রাম। সেখানে ৩৭০ জন মানুষের বসবাস। গ্রামের ঘরগুলো বর্ণিলভাবে রং করা।

গ্রামটিতে নেই কোনো সড়ক। সেখানে পৌঁছানোর উপায় হলো হেলিকপ্টার, নৌকা (গ্রীষ্মকালে) ও স্নোমোবাইল নামের যানে চড়া। এ ছাড়া প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দরগামী ফ্লাইটে চড়েও যাওয়া যায়। এ ফ্লাইট সপ্তাহে দুবার হয়। এর মধ্যে একটি আসে আইসল্যান্ড থেকে, আর অন্যটি পশ্চিম গ্রিনল্যান্ড থেকে।

ইতোকোর্তোরমিতের খুব কাছাকাছি কোনো গ্রাম বা শহর নেই। এর সবচেয়ে নিকটবর্তী শহরের অবস্থান প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে। গ্রামের আশপাশের এলাকা বরফময়। সেখানকার হিমশৈলে বাস করে মেরুভালুক (পোলার বিয়ার), মাস্ক অক্স আর লাখ লাখ সামুদ্রিক পাখি।

বছরের নয় মাস গ্রামটি সাগরের পানিজমা বরফে ঢাকা থাকে। ইতোকোর্তোরমিতের আদিবাসী গোষ্ঠী ইনুইটরা তখন কুকুরে টানা স্লেজ বাহন ব্যবহার করে বরফের ওপর ভ্রমণ করে এবং শিকারের খোঁজ করে।

২০২৫ সালে গ্রামটির শতবর্ষ উদ্‌যাপিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এখানে জনসংখ্যা কমতে দেখা গেছে। কিছু হিসাব অনুসারে, ২০০৬ সালের পর জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে।

কারণ হচ্ছে, পূর্বসূরিদের শিকারনির্ভর জীবনধারা থেকে বের হয়ে নতুন ধরনের পেশার খোঁজে কিংবা পড়াশোনা করতে তরুণেরা শহরে চলে যাচ্ছেন। তা ছাড়া, উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে আশপাশের সাগরের বরফ জমতে বেশি সময় নিচ্ছে এবং দ্রুত গলে যাচ্ছে।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বারবারই ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে। সব মিলে ইতোকোর্তোরমিত এখন দুটো বড় সমস্যার মুখোমুখি। একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যটি হলো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা।

আলোকচিত্রী কেভিন হল লিখেছেন, ইতোকোর্তোরমিতে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ভ্রমণ করাটা শুধু রোমাঞ্চকর অভিযানই ছিল না, এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।

কেভিন প্রথমে আইসল্যান্ড থেকে ফ্লাইটে করে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দরে পৌঁছান। এর পর তিনি জমে থাকা বরফের ওপর পাঁচ দিন কাটিয়েছেন। সেখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেত।

কেভিন হল লিখেছেন, ‘আমি কুকুরে টানা স্লেজ বাহনে ভ্রমণ করেছি, তাঁবু ও শিকারিদের ছোট কুটিরে ঘুমিয়েছি। সেখানে ছিল না বিছানা, চলমান পানিপ্রবাহ, উষ্ণতা বা অন্য কোনো সুবিধা। আমি ঘণ্টায় ৮০ মিটার গতির বাতাস আর তুষারঝড়ের মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার এলাকা স্নোমোবাইলে পার হয়েছি।’

কেভিনের মতে, এটি নিতান্তই একটি ফটোগ্রাফি অভিযান ছিল না, বরং এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে মানুষের জীবনযাপনের বিরল চিত্রটা একঝলক দেখার সুযোগ দিয়েছে। এ ছাড়া ইতোকোর্তোরমিতের বাসিন্দারা কীভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সংগ্রাম করছেন, তা–ও জানার সুযোগ হয়েছে।

চরম ঠান্ডার সঙ্গে বসবাস

কেভিন হলের জন্য এই ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছিলেন খ্যাতিমান আলোকচিত্রী জোশুয়া হোলকো। তিনি ওগে ড্যানিয়েলসেন ও মানাসে টুকো নামের দুজন স্থানীয় ইনুইট গাইডের ব্যবস্থা করেন। কুকুরে টানা স্লেজে করে কেভিনসহ তিনজন আলোকচিত্রীকে নের্লেরিট ইনাট বিমানবন্দর থেকে ইতোকোর্তোরমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জন ও বিস্ময়কর মেরুপ্রকৃতির ছবি তোলা।

ভ্রমণের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে কেভিন হল লিখেছেন, ‘প্রথম রাতেই আমরা বিমানবন্দরের কাছাকাছি ছোট ছোট তাঁবুতে ক্যাম্প করি। তখন তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা ক্রমাগত নামছিল।

ড্যানিয়েলসেন ও টুকো বরফের ওপর জমে থাকা কড মাছ কাঠমিস্ত্রির মতো করে করাত দিয়ে কেটে নেন এবং গলানো বরফের পানি গরম করে সেখানে তা (মাছ) সেদ্ধ করেন। তাঁরা বললেন, রাতের খাবার প্রস্তুত। মাছ সুস্বাদু ছিল, যদিও অনেক কাঁটা ছিল। কিন্তু আমাদের আসল চিন্তা ছিল, সামনে কী অপেক্ষা করছে।’

কেভিন লিখেছেন, তিনি এর আগে কখনো এমন শীত অনুভব করেননি। রাতে যখন তাঁরা গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিলেন, তখন প্রবল বাতাসে তাঁবু কাঁপছিল। স্লেজ টানার কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করছিল।

কেভিন বলেন, তাঁর ধারণা, উত্তর মেরু অঞ্চলের শিয়াল বা ভালুক তখন সেদিক দিয়ে চলাচল করছিল। তাপমাত্রা আরও কমতে থাকলে তাঁর পায়ে টান ধরে যায়।

কেভিন হলের মতে, এটা ছিল সত্যিকার অর্থেই ঠান্ডায় দীক্ষা নেওয়ার মতো এক অভিজ্ঞতা।

জাতীয় প্রতীক

পরদিন সকালে নাশতার পরপরই ড্যানিয়েলসেন ও টুকো তাঁদের সঙ্গে থাকা মালামাল গুছিয়ে নিতে শুরু করেন। তাঁরা ব্যাগ, কুলার বক্স, ক্যামেরার কেস, কুকুরের খাবারসহ আরও বিভিন্ন জিনিসপত্র স্লেজে তুলে শক্ত করে বেঁধে ফেলেন।

এরপর একেকটি স্লেজে দুজন করে বসলেন। সামনে ছিলেন একজন গাইড, যিনি স্লেজটানা কুকুরগুলোকে পরিচালনা করতেন। পরবর্তী ছয় দিন ধরে প্রতিটি স্লেজে নিযুক্ত ১২টি গ্রিনল্যান্ড স্লেজ কুকুর ৪৫০ কিলোগ্রামের বেশি বোঝা টেনে নিয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়েছে তারা।

এই আদুরে প্রাণীগুলোকে গ্রিনল্যান্ডের ইনুইট ভাষায় ‘কিম্মিত’ নামে ডাকা হয়। ইনুইটদের আদিগোষ্ঠীর মানুষেরা বড় ও হাস্কি জাতের এই কুকুরকে প্রায় এক হাজার বছর আগে সাইবেরিয়া থেকে গ্রিনল্যান্ডে নিয়ে এসেছিল বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে এগুলো গ্রিনল্যান্ডে একধরনের জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

এক সকালে স্লেজে করে ইতোকোর্তোরমিত গ্রাম থেকে ১০ কিলোমিটার পশ্চিমের দিকে যাওয়ার সময় কেভিন হলরা দূরের একটি পাহাড়ের চূড়ায় চারটি মাস্ক অক্সকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন।

মাস্ক অক্স দেখতে কেমন, সেটার বর্ণনা দিয়ে কেভিন হল লিখেছেন, প্রায় ৪০০ কেজি ওজনের এই প্রাগৈতিহাসিক চেহারার প্রাণীগুলোর গাল থেকে বেরিয়ে থাকা ছোট শিং আর শক্ত বাতাসে উড়তে থাকা লম্বা কালো-বাদামি লোমের আবরণ—সব মিলিয়ে তারা যেমন ভয়ংকর, তেমনি দারুণ ফটোজেনিক।

কেভিন হল ও তাঁর সঙ্গীরা স্লেজ থেকে নেমে অত্যন্ত সতর্কভাবে এগোতে শুরু করেন। কারণ, হোলকো তাঁদের আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে বরফযুগের এই জীবাশ্মসদৃশ প্রাণীগুলো খুব সহজেই চমকে ওঠে এবং আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। খুব দ্রুত নড়াচড়া করলে তারা পালিয়ে যাবে, আবার খুব কাছে গেলে সোজা তেড়ে আসতে পারে।

কেভিন লিখেছেন, ‘বিশালাকার প্রাণীগুলোর ছবি তুলতে প্রায় এক ঘণ্টা কাটানোর পর তারা ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথের আরও উঁচু দিকে উঠে যেতে শুরু করল। হয়তো তারা জানত, ইতোকোর্তোরমিত এলাকায় তাদের স্থানীয়ভাবে সুস্বাদু খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’

শিকারি

তৃতীয় দিনে কেভিন হলকে ড্যানিয়েলসেন জানালেন যে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে তাঁর একটি কুঁড়েঘর আছে। সেখানে দুটি রাত কাটানোর আমন্ত্রণ জানান তিনি। কুঁড়েঘরটির অবস্থান এমন এক জায়গায় যে আমন্ত্রণ পাওয়ামাত্রই কেভিন হল রাজি হয়ে যান। কারণ, তাঁর মনে হলো, ওখানে গেলে জমে থাকা বরফের ওপর মেরুভালুকের দেখা পাওয়া যেতে পারে।

ড্যানিয়েলসেনের কুঁড়েঘরটি ছিল উজ্জ্বল নীল রঙে রাঙানো। ভেতরে আছে ছোট একটি সোফা, একটি চেয়ার, একটি সিঙ্ক, একটি চুলা আর একটি টয়লেট।

ড্যানিয়েলসেন যদিও আয়ের বাড়তি উৎস হিসেবে গাইডের কাজ করেন, তবে শিকার করাই তাঁর আসল ভালোবাসা, পেশা ও বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য। সেখানকার আইনে শিকারিদের শিকার করা প্রাণীর মাংস বা চামড়া বিক্রি করার অনুমতি নেই। মাস্ক অক্সের ক্ষেত্রে তো সেগুলো দেশের বাইরে নেওয়াও নিষেধ।

আইন অনুযায়ী, শিকার করা মাংস কেবল পরিবারের খাবার ও পোশাকের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়, ঠিক যেমনটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হয়ে আসছে।

ড্যানিয়েলসেনের কুঁড়েঘর থেকে কেভিন হলরা প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করেন। পাঁচ দিন ভ্রমণের পর তাঁরা ক্যাপ হোপে পৌঁছান। এটি ইতোকোর্তোরমিত থেকে ১৪ কিলোমিটার পশ্চিমে ছোট একটি বসতি। সেখানে প্রায় ২০টি পুরোনো কুঁড়েঘর রয়েছে। রাতে তাঁরা সেখানেই ঘুমিয়েছেন।

পরদিন সকালে দেখা মিলল মেরুভালুকের। ড্যানিয়েলসেন দুরবিন দিয়ে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করলেন, ‘পোলার বিয়ার! পোলার বিয়ার!’ কেলভিনরা তখন ছবি তোলার প্রস্তুতি নেন। ভালুকটি প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে বরফের ওপর দাঁড়িয়ে ২০ মিনিট কাটায়, তারপর ধীরে ধীরে চলে যায়।

আলোকচিত্রী জোশুয়া হোলকোর কাছ থেকে গল্প শুনে আরেক ধরনের মেরুভালুকের ছবি তুলতে চেয়েছিলেন কেভিন হল। সাদা লোমের ওই মেরুভালুককে ‘আর্কটিক অঞ্চলের ভূত’ নামে ডাকা হয়। কারণ, তাদের সাদা লোম এত নিখুঁতভাবে আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায় যে এদের খালি চোখে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কেভিন হল ওই ভালুকদের দেখা পাননি।

পৃথিবীর প্রান্তভাগের জীবনধারা

কেভিন হলের তথ্য অনুসারে, পায়ে হেঁটে ইতোকোর্তোরমিত গ্রামের পুরোটা ঘুরে বেড়াতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে। এখানে আছে একটি গির্জা, ছোট একটি ট্রাভেল এজেন্সি, পুলিশ স্টেশন, একটি বার, একটি অতিথিশালা, একটি হেলিপোর্ট এবং পিলেরুইসোক নামের একটি ছোট সুপারমার্কেট। এই সুপারমার্কেটে প্রতি মৌসুমে মাত্র দুটি জাহাজে করে পণ্য আসে।

দোকানের প্রায় ফাঁকা তাক ঘুরে দেখে আমার চোখে পড়ে, সবকিছুর দাম অস্বাভাবিক বেশি। তখন ভাবি, যেখানে কাজের সুযোগ খুব কম, সেখানে স্থানীয় মানুষ এসব জিনিস কিনে কীভাবে চলে?

সবশেষে কেভিন হল লিখেছেন, বাইরে বেরিয়ে অনেক বাড়ির পাশে ঝুলতে থাকা মেরুভালুকের চামড়া আমাকে এই সম্প্রদায়ের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি এই অভিযানে এসেছিলাম বন্য প্রাণীর অনন্য ছবি তুলতে। এ যাত্রায় তথাকথিত ‘আর্কটিক অঞ্চলের ভূত’দের দেখা না পেলেও তাতে আফসোস নেই। কারণ, এর চেয়ে বেশি কিছু আমি পেয়েছি। পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী একটা স্থানে মানুষ কীভাবে জীবন চালিয়ে যায়, তা আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি।’

ইতোকোর্তোরমিত গ্রাম
ইতোকোর্তোরমিত গ্রাম। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

Tuesday, February 24, 2026

ট্রাম্পের হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর ঘোষণায় গ্রিনল্যান্ডের জবাব, ‘লাগবে না, ধন্যবাদ’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘এলোমেলো মন্তব্য’ না করে সরাসরি কথা বলতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডরিক নিয়েলসেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডের মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে দ্বীপ অঞ্চলটিতে তিনি একটি মার্কিন হাসপাতাল জাহাজ পাঠাচ্ছেন।

ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে লিখেছিলেন, তিনি চিকিৎসাসামগ্রীভর্তি একটি জাহাজ পাঠাতে যাচ্ছেন। ট্রাম্প দাবি করেন, দ্বীপটিতে ‘অনেক মানুষ অসুস্থ এবং ঠিকমতো স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না।’

এ বিষয়ে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিয়েলসেন বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে উত্তর হলো—লাগবে না, ধন্যবাদ। গ্রিনল্যান্ডে সব নাগরিকের জন্য বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রয়েছে।’

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই বিশাল আর্কটিক দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন। প্রয়োজনে এটি দখল করারও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। তবে জানুয়ারিতে ট্রাম্প বলেন, তিনি জোর করে এটি দখল করবেন না।

পরে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে একটি ‘ভবিষ্যৎ চুক্তির কাঠামো’ ঘোষণা করেন। তখন ডেনমার্ক ও ন্যাটো মিত্ররা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, তারা সার্বভৌমত্ব ছাড়ার কোনো আহ্বানে সাড়া দেবে না।

গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, তিনি এবং তাঁর গ্রিনল্যান্ডবিষয়ক দূত জেফ ল্যান্ড্রি মিলে গ্রিনল্যান্ডে একটি বড় হাসপাতাল জাহাজ পাঠাতে যাচ্ছেন, যেন সেখানে অসুস্থ এবং যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়া অনেক মানুষের যত্ন নেওয়া যায়। ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘এটি পথে রয়েছে।’

ট্রাম্প ওই পোস্টে এআই দিয়ে তৈরি একটি জাহাজের ছবি যুক্ত করেন। এটিকে দেখতে ইউএসএনএস মার্সি জাহাজের মতো দেখাচ্ছিল। ইউএসএনএস মার্সি হলো যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী পরিচালিত দুটি হাসপাতাল জাহাজের একটি।

তবে ট্রাম্প আসলে ওই জাহাজগুলোর কোনোটিকে বোঝাচ্ছিলেন কি না বা কী কারণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্পের পোস্টের জবাবে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিয়েলসেন বলেন, ‘ট্রাম্পের পরিকল্পনাটির বিষয়ে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের একটি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা আছে, যেখানে নাগরিকদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

নিয়েলসন ফেসবুকে আরও লেখেন, ‘এটা (গ্রিনল্যান্ড) যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়, যেখানে চিকিৎসকের কাছে যেতে অর্থকড়ি লাগে।’

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিয়েলসেন আরও বলেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা দেওয়ার জন্য এখনো খোলাখুলি অবস্থানে আছে। তবে তিনি সরাসরি আলোচনার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।

নিয়েলসেন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কমবেশি এলোমেলো মন্তব্য করার বদলে আমাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন।’

 যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতাল জাহাজ
যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতাল জাহাজ। ফাইল ছবি: এএফপি

Sunday, February 22, 2026

গ্রিনল্যান্ডে ভাসমান হাসপাতাল পাঠানোর ঘোষণা ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল শনিবার বলেছেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডে একটি হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর বিষয়ে লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রির সঙ্গে মিলে কাজ করছেন।

গ্রিনল্যান্ড হলো ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন।

গতকাল রিপাবলিকান গভর্নরদের সম্মানে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত নৈশভোজের ঠিক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি গ্রিনল্যান্ডে হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘লুইজিয়ানার অসাধারণ গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রির সঙ্গে কাজ করে আমরা গ্রিনল্যান্ডে একটি বড় হাসপাতাল জাহাজ পাঠাতে যাচ্ছি, যেন সেখানে অসুস্থ এবং যথাযথ সেবা না পাওয়া অনেক মানুষের চিকিৎসা করা যায়। জাহাজটি রওনা দিয়েছে!’

নৈশভোজে ল্যান্ড্রির পাশেই ট্রাম্পকে বসতে দেখা গেছে। তাঁরা দুজন গল্প করছিলেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের পোস্টের বিষয়ে হোয়াইট হাউস বা ল্যান্ড্রির দপ্তর কোনো প্রশ্নের জবাব দেয়নি। জাহাজটি ডেনমার্ক বা গ্রিনল্যান্ডের অনুরোধে পাঠানো হচ্ছে কি না এবং কারা অসুস্থ, সে বিষয়েও কিছু জানানো হয়নি। যুদ্ধবিষয়ক দপ্তরও তাৎক্ষণিকভাবে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি।

গত সপ্তাহে ডেনমার্কের রাজা ফ্রেডরিক এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো গ্রিনল্যান্ড সফর করেন। দ্বীপটি কিনে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহের প্রেক্ষাপটে এ সফরকে গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ডেনমার্ক সরকারের ঐক্য প্রদর্শনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কয়েক মাসের উত্তেজনার পর সমস্যার সমাধানে গত মাসের শেষ দিকে গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়।

ডেনমার্কের জয়েন্ট আর্কটিক কমান্ড বলেছে, গতকাল ট্রাম্পের ওই পোস্টের কয়েক ঘণ্টা আগে গ্রিনল্যান্ডের জলসীমায় একটি মার্কিন সাবমেরিনের এক নাবিকের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল। পরে তারা ওই নাবিককে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছে।

তবে এ ঘটনায় জেফ ল্যান্ড্রির কী ভূমিকা ছিল বা ট্রাম্পের পোস্টটির সঙ্গে ওই উদ্ধার অভিযানের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে দুটি হাসপাতাল জাহাজ আছে। এগুলো হলো ইউএসএনএস মার্সি ও ইউএসএনএস কমফোর্ট। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই লুইজিয়ানায় অবস্থান করে না।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-22%2Fwhcqizzl%2FHospital-Ship.jpg?rect=0%2C0%2C1121%2C747&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রিপাবলিকান গভর্নরদের সম্মানে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত নৈশভোজে বক্তৃতা দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

Saturday, January 24, 2026

গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেনকে এক সুতায় বাঁধল কে by সাইমন টিসডাল

গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—ভৌগোলিকভাবে একে অপরের থেকে বহুদূরের এই তিন অঞ্চল আজ একটি অদ্ভুত মিলের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই মিলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর লাগাতার মিথ্যাচার, নৈতিক শূন্যতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আর তার বিপরীতে ইউরোপীয় নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ও দ্বিধা—এই তিন সংকটকে এক সুতায় বেঁধে ফেলেছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট–এর হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে মোট ৩০ হাজার ৫৭৩টি ‘মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি’ করেছিলেন। অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ২১টি মিথ্যা তিনি বলেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সেই অভ্যাসে কোনো ছেদ পড়েনি। প্রতিদিনই তিনি মার্কিন জনগণ এবং বিশ্ববাসীর কাছে সত্য বিকৃত করছেন। মিনিয়াপোলিসে প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার পর তাঁর ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়া আবারও দেখিয়ে দিয়েছে—জনজীবনে সত্য ও সততার প্রতি তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এই অবজ্ঞা শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, গভীরভাবে অনৈতিক এবং বিপজ্জনক।

যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মতোই বিশ্বের বহু নেতা ট্রাম্পের এই দীর্ঘস্থায়ী মিথ্যাচারের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এই মিথ্যাকে মেনে নেওয়ার, চুপ করে থাকার বা এর বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়ার মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—এই তিন জটিল আন্তর্জাতিক সংকটে ট্রাম্পের মিথ্যা ও প্রতারণা একটি সাধারণ, উত্তেজনা বাড়ানো উপাদান হিসেবে কাজ করছে।

গ্রিনল্যান্ডের কথাই ধরা যাক। ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছেন, চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ নাকি গ্রিনল্যান্ডজুড়ে ছড়িয়ে আছে আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়া দরকার। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, কোথায় সেই জাহাজ? তিনি তো নিজেই ওই স্বশাসিত দ্বীপে গেছেন। গ্রিনল্যান্ডবাসী ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে সরাসরি আজগুবি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

ডেনমার্ক স্পষ্ট করে বলেছে, তারা গ্রিনল্যান্ডে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং সেখানে চীনা বিনিয়োগের ‘স্রোত’ যাচ্ছে বলে ট্রাম্প যেসব কথা বলছেন, তা তাঁর বানানো গল্প। জনমত জরিপ বলছে, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ ট্রাম্পের কাছে দ্বীপ বিক্রি বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরোধী। তারা চায় স্বাধীনতা। যুক্তরাষ্ট্র রাজা তৃতীয় জর্জকে তাড়িয়ে দিয়ে স্বাধীন হয়েছিল। তারা এখন স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদ্‌যাপন করছে। ফলে তাদের তো বিষয়টি বোঝার কথা। ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডকে ‘নিরাপদ’ করতে চান। বাস্তবে তিনি চান এর খনিজ সম্পদ এবং আমেরিকাকে আবার বড় করতে।

ভেনেজুয়েলায় পরিস্থিতি আরও রক্তাক্ত। গত সপ্তাহান্তের অভ্যুত্থানের আগে মিথ্যার এক ভয়াবহ স্রোত বয়ে যায়। ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই দেশটির নেতা নিকোলা মাদুরোকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। এই অভিযোগ তুলে ট্রাম্পের প্রশাসন মাদক পাচারের সন্দেহে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে ১০০ জনের বেশি মানুষকে নৌকায় হত্যা করে কোনো যাচাই–বাছাই ছাড়াই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধে আছে’ বলে ঘোষণা দেন এবং এর মাধ্যমে তিনি কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা অবৈধভাবে দখল করেন।

আসলে, ২০১৮ সালে মাদুরো সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতা চলছে। ট্রাম্প এখন স্বীকারও করেছেন, এই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য গণতন্ত্র ফেরানো নয়; যদিও দেরিতে হলেও তিনি বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছেন। ট্রাম্পের লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার জনগণকে ‘উদ্ধার’ করা নয়, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নয়। লক্ষ্য একটাই—তেল। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই, নির্মমভাবে দেশটি লুট করছেন। সঙ্গে সঙ্গে মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াকেও হুমকি দিচ্ছেন।

এবার ইউক্রেন। আরেকটি অচলাবস্থার মুখে পড়া ভূমি। এখানে ট্রাম্পের সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে না পারার অক্ষমতা ভয়াবহ ক্ষতি করছে। তিনি মিছেমিছি বলেছিলেন, ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করে দেবেন। ব্যর্থ হয়ে তিনি বারবার ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার হুমকি দেন। আর পুতিন (আরেকজন পেশাদার মিথ্যাবাদী) ট্রাম্পকে সামান্য তোষামোদ করে আবার বোমাবর্ষণ শুরু করেন। প্রতিবারই ট্রাম্প পিছু হটেন, আর প্রায়ই দোষ চাপান ইউক্রেনের নির্দোষ নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর।

গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—এই তিন সংকটে ট্রাম্পের মিথ্যাচার ছাড়াও আরেকটি বিষয় স্পষ্ট। সেটি হলো ইউরোপীয় নেতাদের ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুর্বলতা ও বিভক্তি। এখন অন্তত ইউরোপের বোঝা উচিত—এই প্রেসিডেন্টকে বিশ্বাস করা যায় না, তাঁর ওপর নির্ভর করা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে ব্রেক্সিট আর শুধু ভুল সিদ্ধান্ত মনে হয় না; এটি প্রায় আত্মঘাতী বলে মনে হয়।

মার্ক টোয়েনের কথাকে একটু বদলে বললে বলা যায়, ‘মিথ্যা তিন প্রকার—মিথ্যা, মারাত্মক মিথ্যা আর ডোনাল্ড ট্রাম্প।’

সাইমন টিসডাল, দ্য গার্ডিয়ান-এর পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2023-01%2F7ffc292e-3088-4db4-8c3b-3113f675422c%2FUkraine.jpg?rect=51%2C0%2C5298%2C3532&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। ফাইল ছবি: এএফপি

গ্রিনল্যান্ড কার হাতে যাবে, তা রাশিয়ার বিষয় নয় : পুতিন

গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নিয়ে চলমান বিতর্কে রাশিয়ার কোনো উদ্বেগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ কার হাতে থাকবে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের নিজেদের মধ্যেই মিটিয়ে নেওয়ার বিষয়।

বুধবার রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে কথা বলেন পুতিন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কী ঘটছে বা ঘটছে না, তা মস্কোর মাথাব্যথার কারণ নয়। তবে একই সঙ্গে দ্বীপটির প্রতি ডেনমার্কের অতীত আচরণের কড়া সমালোচনা করেন তিনি। খবর রয়টার্সের।

পুতিনের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও মস্কো বিষয়টি কিছুটা আগ্রহের সঙ্গেই পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার শক্ত অবস্থানের কারণে এই ইস্যুর ভূরাজনৈতিক প্রভাব তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরোধিতাকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিলেও, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি আশ্বস্ত করেন, গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হবে না। ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন, ডেনমার্কের এই আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নিয়ে চলমান বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে মেটানো সম্ভব।

রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, ডেনমার্ক ঐতিহাসিকভাবে গ্রিনল্যান্ডকে একটি উপনিবেশ হিসেবে দেখেছে এবং সেখানকার জনগণের প্রতি কঠোর আচরণ করেছে। যদিও তিনি উল্লেখ করেন, এটি আলাদা প্রসঙ্গ এবং বর্তমান বাস্তবতায় এ নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ খুব বেশি নেই।

পুতিনের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে রাশিয়ার কোনো আপত্তি নেই। বরং তিনি মনে করেন, ইতিহাসে এ ধরনের ভূখণ্ড কেনাবেচার নজির রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা কেনা এবং ১৯১৭ সালে ডেনমার্কের কাছ থেকে ভার্জিন আইল্যান্ডস কেনার কথা উল্লেখ করেন।

আলাস্কার সেই সময়কার মূল্য বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি, গ্রিনল্যান্ডের বিশাল আয়তন এবং স্বর্ণের দামের পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করে পুতিন বলেন, গ্রিনল্যান্ড কিনতে ডেনমার্ককে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার দিতে হতে পারে। তাঁর মতে, ওয়াশিংটনের সেই অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য রয়েছে।

ছবি : সংগৃহীত
ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : সংগৃহীত


Friday, January 23, 2026

গ্রিনল্যান্ড দখলে বিরোধিতা করায় ইউরোপের ৮ দেশের ওপর শুল্ক আরোপ ট্রাম্পের

গ্রিনল্যান্ড দখলে নেওয়ার বিরোধিতা করায় যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের ৮টি দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন এ শুল্ক কার্যকর হবে।

স্থানীয় সময় শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’–এ দেওয়া এক পোস্টে এ ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো সব ধরনের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে। আর আগামী ১ জুন থেকে এই হার বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে।

ট্রাম্প আরও বলেন, কয়েক শতাব্দী পর এখন (গ্রিনল্যান্ড) ফেরত দেওয়ার সময় এসেছে ডেনমার্কের। বিশ্বশান্তি ঝুঁকির মুখে! চীন গ্রিনল্যান্ড নিতে চায়, কিন্তু ডেনমার্ক এ বিষয়ে কিছুই করতে পারবে না।

ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড ‘অজ্ঞাত উদ্দেশ্যে গ্রিনল্যান্ডে গেছে’। তারা ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি খেলা’ খেলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, এই সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতির দ্রুত এবং কোনো প্রশ্ন ছাড়াই অবসান ঘটাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এর আগে শুক্রবার হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কোনো দেশ তাঁর অবস্থানের সঙ্গে একমত না হলে তিনি তাদের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড খুব জরুরি।

গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা কম হলেও দ্বীপটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মধ্যে এর অবস্থান হওয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা স্থাপনে এবং ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর নজরদারি করতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-17%2Fp5m4hf8o%2FGreenland-takeover.jfif?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Wednesday, January 21, 2026

গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে অনড় ট্রাম্প: পিছু হটার কোনো পথ নেই

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি আরও জোরালো করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেছেন, ‘এখানে পিছু হটার কোনো পথ নেই’ এবং ‘গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য’। হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করতে তিনি কতদূর যেতে প্রস্তুত। জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখবেন।’

এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি বলছে- সুইজারল্যান্ডে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) এক বৈঠকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব এখন ‘নিয়মবিহীন এক ব্যবস্থার দিকে সরে যাচ্ছে’। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি বলেন, ‘পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা আর ফিরে আসছে না।’ আজ বুধবার দাভোসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে ট্রাম্পের। তিনি জানিয়েছেন, সেখানে গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে ‘অনেক বৈঠক নির্ধারিত আছে’।
দীর্ঘ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে সবকিছু বেশ ভালোভাবেই মিটে যাবে। বিবিসি যখন তাকে জিজ্ঞেস করে, গ্রিনল্যান্ডের জন্য ন্যাটো জোট ভেঙে যাওয়াটা কি এমন কোনো মূল্য, যা দিতে তিনি রাজি? ট্রাম্প জবাবে বলেন, ন্যাটো’র জন্য আমার চেয়ে বেশি কেউ করেনি, কোনো দিক থেকেই না। তিনি আরও বলেন, ন্যাটো খুশি থাকবে, আমরাও খুশি থাকব। তিনি আরও বলেন, বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য আমাদের এটি দরকার।
তবে এর আগেই তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন হলে ন্যাটো আদৌ কি তার পাশে দাঁড়াবে? তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি জানি আমরা ন্যাটোকে বাঁচাতে এগিয়ে আসব। কিন্তু সত্যি বলতে আমি সন্দেহ করি যে তারা আমাদের বাঁচাতে আসবে কি না।

নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো বর্তমানে ৩২টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ১২টি প্রতিষ্ঠাতা দেশের একটি। সমষ্টিগত প্রতিরক্ষার মাধ্যমে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই জোটের মূল উদ্দেশ্য। ন্যাটোর অন্যতম মৌলিক নীতি অনুচ্ছেদ ৫। সেখানে বলা হয়েছে, এক বা একাধিক সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।

গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি ট্রাম্প। এনবিসি নিউজ তাকে জিজ্ঞেস করে, তিনি কি বলপ্রয়োগে অঞ্চলটি দখল করবেন? ট্রাম্প উত্তরে বলেন, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিবিসি নিউজনাইটকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ডের শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী নাজা নাথানিয়েলসেন বলেন, ট্রাম্পের দাবিতে গ্রিনল্যান্ডবাসী হতবাক। তিনি বলেন, আমরা আমেরিকান হতে চাই না। এ কথা আমরা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছি। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, আমাদের সংস্কৃতি আর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে আপনি কতটা মূল্য দেন?

দাভোস ফোরামের আগে ট্রাম্প কিছু স্ক্রিনশট শেয়ার করেন, যেগুলোতে তার দাবি অনুযায়ী ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন ও ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুট্টের পাঠানো বার্তা। সেখানে রুট্টে বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সমাধানের পথ খুঁজতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ম্যাক্রন লিখেছেন, তিনি ‘বুঝতে পারছেন না আপনি কী করছেন’। তবে প্যারিসে অন্য নেতাদের নিয়ে একটি বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন মঙ্গলবার ফোরামের প্রথম দিনে দেয়া ভাষণে সরাসরি বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপ সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি কেবল যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব। একই সঙ্গে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত অতিরিক্ত শুল্ককে তিনি ভুল সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দেন।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, যদি ইউরোপের আটটি দেশ গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে, তবে ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি সেসব দেশ থেকে আমদানি করা সব ধরনের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন। ভন ডার লিয়েন তার ভাষণে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক রাজ্যের পাশে পূর্ণ সংহতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং তাদের সার্বভৌমত্ব আলোচনার অযোগ্য। তার এই বক্তব্যে সমর্থন জানান কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি। তিনি বলেন, ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর প্রতি কানাডার অঙ্গীকার অটল। কারনি বলেন, আমরা গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পাশে দৃঢ়ভাবে আছি এবং গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের তাদের অনন্য অধিকারকে পুরোপুরি সমর্থন করি। ম্যাক্রন তার বক্তব্যে বলেন, তিনি ‘বুলিংয়ের চেয়ে সম্মান’ এবং ‘বর্বরতার চেয়ে আইনের শাসন’-কেই বেশি পছন্দ করেন।
এর আগে মঙ্গলবার ট্রাম্প হুমকি দেন, ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। কারণ হিসেবে বলা হয়, ম্যাক্রন গাজা নিয়ে প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

mzamin

মুখোমুখি অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ

দৃশ্যত মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার পারদ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যেমন গ্রিনল্যান্ডকে দখল করে নেয়ার অঙ্গীকার করছেন, তেমনি গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষায় ইউরোপিয়ান নেতারাও পাল্টা পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা করছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবির বিরোধিতা করলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের যে হুমকি তিনি দিয়েছেন, তা শতভাগ বাস্তবায়ন করবেন। পক্ষান্তরে ইউরোপীয় মিত্ররা গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়ে আধা-স্বায়ত্তশাসিত এই ডেনিশ ভূখণ্ডের মালিকানা নিতে পারেন না। বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার পুনরায় জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল ‘গ্রিনল্যান্ডের জনগণ ও ডেনমার্কের’। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

গ্রিনল্যান্ডকে দখলে নিতে সোমবার ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি এবং বৃটেনসহ ন্যাটোর সাত মিত্র দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি কার্যকর করার বিষয়ে অনড় থাকার কথা জানান। গ্রিনল্যান্ড দখলে তিনি বলপ্রয়োগ করবেন কিনা- এনবিসি নিউজের এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই। তিনি বলেন, বৃটেন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো ‘যেকোনো ও সব পণ্যের’ ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে। তা ১লা জুন থেকে বেড়ে ২৫ শতাংশ হবে, যতক্ষণ না ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়। ট্রাম্প জানান, একই নীতি ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এ দেশগুলো সবাই ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য।

শুল্কের হুমকি সত্যিই কার্যকর করবেন কিনা জানতে চাইলে ট্রাম্প এনবিসিকে বলেন, আমি করবো ১০০ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, ইউরোপের উচিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে মনোযোগ দেয়া। সত্যি বলতে, দেখুন তারা এতে কী অর্জন করেছে। ইউরোপের মনোযোগ সেখানেই থাকা উচিত, গ্রিনল্যান্ডে নয়। ওদিকে ডেনমার্ক সতর্ক করে বলেছে, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ন্যাটোর সমাপ্তি ডেকে আনতে পারে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইউরোপীয় মিত্ররা গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কয়েকটি দেশ প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে গত সপ্তাহে সেখানে অল্পসংখ্যক সেনাও পাঠিয়েছে। তবে এই মোতায়েনের পরপরই ট্রাম্প ওই আট ন্যাটো মিত্রের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন স্কাই নিউজকে বলেন, ইউরোপকে দেখাতে হবে যে, শুল্কের হুমকি সঠিক পথ নয়। তিনি বলেন, আমাদের কিছু সীমারেখা আছে যা অতিক্রম করা যাবে না। আপনি হুমকি দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নিতে পারেন না। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, জোট আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে জরুরি শীর্ষ সম্মেলন ডেকেছে। সেখানে নেতারা গ্রিনল্যান্ড দখলের সর্বশেষ হুমকির জবাব কী হবে তা নিয়ে আলোচনা করবেন। ইইউ’র পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, আমাদের ঝগড়া করার কোনো আগ্রহ নেই। তবে আমরা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখবো। তিনি আরও বলেন, বাণিজ্যিক হুমকি কোনো সমাধান নয়। সার্বভৌমত্ব কোনো বেচাকেনার বিষয় নয়।

এর মধ্যেই ট্রাম্প ও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্তোরের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার জন্য নরওয়ে দায়ী। স্তোরে ব্যাখ্যা করেন, পুরস্কারটি নরওয়ে সরকার নয়, একটি স্বাধীন কমিটি দেয়। গত অক্টোবরে যা ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে দেয়া হয়েছে। স্তোরে আরও লিখেছেন, গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে নরওয়ের অবস্থান স্পষ্ট। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক রাজ্যের অংশ এবং এ বিষয়ে নরওয়ে ডেনমার্ককে পূর্ণ সমর্থন দেয়।

সোমবারের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারো দাবি করেন, নরওয়েই আসলে নোবেল পুরস্কার পুরো নিয়ন্ত্রণ করে, তারা যা-ই বলুক। তারা বলে সরকারের কিছু করার নেই। কিন্তু বাস্তবে সবকিছুই তাদের হাতে। এদিকে উত্তর আমেরিকার যৌথ প্রতিরক্ষা সংস্থা নোরাড সোমবার জানিয়েছে, একাধিক সামরিক বিমান গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক স্পেস বেসের দিকে যাচ্ছে। সংস্থাটি বলেছে, এগুলো দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত নোরাড কার্যক্রমের অংশ এবং ডেনমার্কের সঙ্গে সমন্বয় করেই পরিচালিত হচ্ছে; গ্রিনল্যান্ড সরকারকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। ২০২২, ২০২৩ ও গত বছরেও একই ধরনের নোরাড অভিযান ওই ঘাঁটিতে পরিচালিত হয়েছিল।

mzamin

মাখোঁর ব্যক্তিগত বার্তার স্ক্রিনশট ফাঁস করলেন ট্রাম্প, কী আছে তাতে

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর পাঠানো একটি ব্যক্তিগত বার্তার স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ঘিরে চলমান সংকটের মধ্যেই এ কাজ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফরাসি মদের ওপর বিশাল শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ওই স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন ট্রাম্প। পোস্টের শিরোনাম—‘ফ্রান্সের হয়ে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর বার্তা।’ স্ক্রিনশটে থাকা বার্তা যে সঠিক, তা সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে নিশ্চিত করেছে মাখোঁর ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র। তবে বার্তাটি কবে পাঠানো, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্ক্রিনশটের থাকা বার্তার শুরুতেই লেখা—‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ।’ এরপর তাতে লেখা—‘আমার বন্ধু, সিরিয়ার বিষয়ে আমরা পুরোপুরি একমত। ইরান নিয়ে আমরা বড় কাজ করতে পারি। আমি বুঝতে পারছি না, আপনি গ্রিনল্যান্ডে কী করছেন। চলুন বড় কিছু করার চেষ্টা করি।’

বার্তায় ‘বড় কিছুর’ তালিকাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমেই মাখোঁ বলেছেন, সুইজারল্যান্ডের দাভোস শহরে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার প্যারিসে জি–৭ সদস্যদেশগুলোকে নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করতে পারেন তিনি। সেখানে ইউক্রেন, ডেনমার্ক ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানাবেন। এরপর প্যারিসে ট্রাম্পকে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান মাখোঁ।

গ্রিনল্যান্ড দখল করা নিয়ে ট্রাম্পের একের পর এক হুমকির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বেশির ভাগ নেতাই সোচ্চার। তবে সবচেয়ে কঠোর হয়েছেন মাখোঁ। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী বাণিজ্যিক হাতিয়ার ব্যবহারের জন্য চাপ দিচ্ছেন। এ ছাড়া ডেনমার্কের সমর্থনে গ্রিনল্যান্ডে ফরাসি সেনাও পাঠাচ্ছেন মাখোঁ।

ট্রাম্পও মাখোঁর বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ফিলিস্তিনের গাজা পরিচালনায় তদারকির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ গঠন করা হচ্ছে, তাতে ফরাসি প্রেসিডেন্টকে রাখতে চান না তিনি। ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত গাজায় জাতিসংঘের ভূমিকার ওপর এই বোর্ডের প্রভাব পড়বে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্যারিস।

বোর্ড অব পিস নিয়ে ফ্রান্সের অবস্থান সম্পর্কে ট্রাম্পের কাছে জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকেরা। জবাবে তিনি বলেন, ‘তিনি কি এটি বলেছেন? ভালো কথা, তাঁকে কেউ চান না। কারণ, খুব শিগগির তাঁকে পদ ছাড়তে হবে। তাঁর ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর আমি ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করব।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Friday, January 16, 2026

গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছেছেন ইউরোপের সেনারা

গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছেছেন ইউরোপের ছয়টি দেশের সেনারা। যৌথ মহড়ায় অংশ নিতে আজ বৃহস্পতিবার গ্রিনল্যান্ডের রাজধানীতে পৌঁছান তাঁরা।

দ্বীপটির নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করতে ডেনমার্ক ও তার মিত্ররা এ পদক্ষেপ নিয়েছে। এই দলে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের সেনারা রয়েছেন।

সুমেরু অঞ্চলের এই দ্বীপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের মধ্যে গতকাল বুধবার একটি বৈঠক হয়। এ সময় ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলে নেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তবে বৈঠকে সমস্যা সমাধানে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বেশ কিছুদিন ধরে ট্রাম্প বলে আসছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য খুবই জরুরি। রাশিয়া কিংবা চীন যাতে এটি দখল করতে না পারে, সে জন্য এর মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা দরকার। এই ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব বিকল্প তাঁর বিবেচনায় আছে। তাঁর দাবি, সুমেরু অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব ঠেকাতে ডেনমার্ক সক্ষম নয়।

তবে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক বারবার বলে আসছে, দ্বীপটি বিক্রির জন্য নয়। যেকোনো ধরনের হুমকি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ মিত্রদের মধ্যে আলোচনা করেই সমাধান করা উচিত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ ডেনমার্কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপের অনেক নেতা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অভিযান চালিয়ে দ্বীপটি দখলে নেয়, তাহলে কার্যত ন্যাটোর সমাপ্তি হতে পারে।

গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক জানিয়েছে, তারা গ্রিনল্যান্ড ও এর চারপাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো শুরু করেছে। প্রতিরক্ষা জোরদারের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ন্যাটো মিত্রদের সহযোগিতায় এ পদক্ষেপ নিচ্ছে তারা।

জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, নরওয়েসহ ইউরোপীয় মিত্ররা বলেছে, চলতি বছরের শেষ দিকে বড় ধরনের মহড়ার প্রস্তুতি নিতে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক বাহিনীর সদস্য পাঠাচ্ছে তারা।

ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনী সুমেরু ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে শিগগিরই যৌথভাবে যাচাই করে দেখবে যে ওই অঞ্চলে বাস্তবে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং মহড়া কার্যক্রম কীভাবে কার্যকর করা যায়।

ট্রাম্পকে সমর্থন প্রতি পাঁচজনের একজন আমেরিকানের

রয়টার্স/ইপসোসের একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৭ শতাংশ আমেরিকান ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টাকে সমর্থন করেন। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দলের উল্লেখযোগ্য অংশ দ্বীপটি দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিরোধী। গত মঙ্গলবার দুই দিনব্যাপী জরিপটি শেষ হয়। জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন বলেছেন, তাঁরা গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনার কথা শোনেননি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-15%2Fsm3qtiak%2F3126fb20-f202-11f0-b5f7-49f0357294ff.jpg.webp?rect=29%2C0%2C675%2C450&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ডেনমার্ক বিমানবাহিনীর একটি বিমানে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানীতে পৌঁছান ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারা। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, January 13, 2026

আমরা মার্কিন নাগরিক হতে চাই না: ট্রাম্পের হুমকির জবাবে গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতারা

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির জবাবে গ্রিনল্যান্ডের রাজনীতিবিদেরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা ‘আমেরিকান হতে চান না’। এই আর্কটিক দ্বীপের ভবিষ্যৎ গ্রিনল্যান্ডবাসী নিজেরাই নির্ধারণ করবে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডবাসী পছন্দ করুক বা না করুক, যুক্তরাষ্ট্র ‘কিছু একটা করবেই’।

গত শুক্রবার রাতে গ্রিনল্যান্ড পার্লামেন্টের পাঁচটি রাজনৈতিক দলের নেতারা একজোট হয়ে এই বিবৃতি দেন। এর কিছুক্ষণ আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দ্বীপটি দখল করার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডরিক নিলসেনসহ ওই নেতারা বলেন, ‘আমরা আমেরিকান হতে চাই না, আমরা ডেনিশ হতে চাই না, আমরা গ্রিনল্যান্ডবাসী হতে চাই। গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ গ্রিনল্যান্ডবাসীকেই নির্ধারণ করতে হবে।’

নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করার অধিকারের ওপর জোর দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের নেতারা বলেন, ‘অন্য কোনো দেশ এতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কোনো চাপ বা দেরি না করে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ আমাদেরই ঠিক করতে হবে।’

ট্রাম্পের ‘সহজ বা কঠিন’ পথ

শুক্রবার হোয়াইট হাউসে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ড মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা রাশিয়া বা চীনকে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে দেব না। আমরা যদি ব্যবস্থা না নিই, তবে তারাই এটা করবে। তাই আমরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কিছু একটা করতে যাচ্ছি, তা সে সহজ পথেই হোক বা কঠিন পথে।’

হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, ট্রাম্প তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে দ্বীপটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে ‘সক্রিয়ভাবে’ আলোচনা করছেন।

জনমত এবং ডেনমার্কের প্রতিক্রিয়া

২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের ৮৫ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে মাত্র ৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযানের পক্ষে মত দিয়েছেন।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সম্প্রতি বলেছেন, এ ধরনের কোনো পদক্ষেপের অর্থ হবে ন্যাটো এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমাপ্তি। তিনি ট্রাম্পকে হুমকি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ডেনমার্কের কোনো অংশ দখল করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

জবাবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি না থাকলে ন্যাটোর অস্তিত্বই থাকত না। ন্যাটো রক্ষা করবেন নাকি গ্রিনল্যান্ড দখল করবেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, ‘এটি একটি পছন্দ হতে পারে।’

ভূরাজনৈতিক পটভূমি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকেই গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ডেনমার্কের সঙ্গে বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, ট্রাম্প সেখানে যত খুশি সৈন্য পাঠাতে পারেন। কিন্তু ট্রাম্প মনে করেন, কেবল চুক্তিতে কাজ হবে না। তিনি বলেন, ‘মালিকানা থাকতে হয়। আপনি মালিকানা রক্ষা করেন, লিজ নয়।’

এর আগে ট্রাম্প ২০১৯ সালেও দ্বীপটি কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন তাঁকে জানানো হয়েছিল, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।

ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ডের চারপাশে প্রচুর রুশ ও চীনা জাহাজ ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে গ্রিনল্যান্ডের জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের প্রধান জেস বার্থেলসেন এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘আমরা এমন কিছু দেখি না। ট্রাম্পের কথা আমাদের বোধগম্য নয়।’

গ্রিনল্যান্ডের ওল্ড নুক
গ্রিনল্যান্ডের ওল্ড নুক। রয়টার্স ফাইল ছবি

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টায় ভেঙে যাবে ন্যাটো by মুজতবা রহমান

২০২৫ সালজুড়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে ঘিরে ইউরোপীয় নেতাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের নিরাপত্তাকাঠামো, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ন্যাটোর সঙ্গে যুক্ত রাখা। তাঁরা চেয়েছিলেন ওয়াশিংটন যেন হঠাৎ করে ইউরোপীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে নিজেকে সরিয়ে না নেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, তাহলে ২০২৬ সালে সেই লক্ষ্য অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের আশঙ্কা, হোয়াইট হাউস ধীরে ধীরে সেদিকেই এগোচ্ছে।

ইউরোপের চোখে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর নিছক মিত্ররাষ্ট্র নয়, বরং একটি শিকারি শক্তি। ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপজুড়ে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যাদের অনেক ইউরোপীয় নেতা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বদলে ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজছে।

তবু ইউরোপ এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না। এর প্রধান কারণ হলো ইউরোপ এখনো নিজের নিরাপত্তার জন্য ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। সামরিক পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য হতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগবে। এই সময় পর্যন্ত ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখতে ইউরোপকে মার্কিন অস্ত্র, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা সহায়তা ও কৌশলগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতেই হবে। একইভাবে রাশিয়াকে চাপে রাখতে ন্যাটোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নির্ভরতা থেকেও যাবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের এই দুর্বলতা দেখছে এবং তা কাজে লাগাচ্ছে।

গত বছর তারা ইউরোপকে চাপ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক মেনে নিতে বাধ্য করেছিল, যাতে ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ না করা হয় এবং ইউক্রেন ও ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সরে যাওয়ার ঝুঁকি না বাড়ে। এবারও একই ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র যে এখনো ইউরোপের বন্ধু—এই ধারণা ভেঙে পড়বে।

ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, আর্কটিকে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলা, চীনের নতুন সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদার, যুদ্ধের সময় ওই অঞ্চলে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো। তাঁরা মনে করেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড এসব নিরাপত্তা চাহিদা পূরণে যথেষ্ট কার্যকর নয়।

অবশ্য ডেনমার্কের যুক্তি অনুযায়ী, তারা ছোট দেশ হলেও ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষায় জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ ব্যয় করেছে এবং আর্কটিকে নজরদারি, জাহাজ, ড্রোন ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর ভূখণ্ডের অংশ; তাই সেখানে সার্বভৌমত্ব নিয়ে চাপ তৈরি হলে শুধু কোপেনহেগেন নয়, পুরো জোটের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। এ কারণেই অনেক ইউরোপীয় রাজধানীতে বিষয়টি ‘সীমান্ত বদলের রাজনীতি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইউরোপীয় নেতাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা সহজেই পূরণ করা সম্ভব: দ্বীপটিতে আরও মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনে আপত্তি নেই, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতেই নিশ্চিত, আর ১৯৫১ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে উল্লেখযোগ্য সামরিক প্রবেশাধিকার ভোগ করছে। অর্থনৈতিক আগ্রহ থাকলে দ্বীপটির খনিজ ও বিরল খনিজ সম্পদ আহরণও ইতিমধ্যে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত।

এই কারণেই ইউরোপ আশঙ্কা করছে, আসল লক্ষ্য নিরাপত্তা নয়, বরং ভূখণ্ড সম্প্রসারণ। সরাসরি সেনা পাঠানোর বদলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের ৫৭ হাজার বাসিন্দাকে প্রভাবিত করা হতে পারে, এমনকি একটি গণভোটের মাধ্যমেও।

এভাবে যুক্তরাষ্ট্র এগোলে ইউরোপের হাতে কার্যকর বিকল্প সীমিত। তারা ‘ইউরোপীয় ন্যাটো’ গড়ার কথা ভাবতে পারে, চীনের সঙ্গে ঝুঁকি কমানোর নীতি ধীর করে নতুন সমীকরণ খুঁজতে পারে বা সবচেয়ে বাস্তবসম্মতভাবে কোপেনহেগেনকে চাপ দিতে পারে যেন হোয়াইট হাউসের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়।

ডেনমার্ক ইতিমধ্যে কৌশল বদলেছে। প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, ন্যাটোর কোনো সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে আক্রমণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা থেমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ডলার দিয়ে হলেও গ্রিনল্যান্ড দখল করে, তা ইউরোপের জন্য চরম অপমান হবে—জোটের শেষ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর অপূরণীয় ক্ষতি।

* মুজতবা রহমান, ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপ অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক
- টাইম ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলে নিতে চাওয়ার বিরুদ্ধে সেখানকার অধিবাসীদের বিক্ষোভ
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলে নিতে চাওয়ার বিরুদ্ধে সেখানকার অধিবাসীদের বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি

Monday, January 12, 2026

গ্রিনল্যান্ডে সামরিক আগ্রাসনের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ ট্রাম্পের

ডেইলি মেইলের রিপোর্টঃ দ্য মেইল অন সানডে-এর তথ্যমতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য একটি সামরিক আগ্রাসনের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তার বিশেষ বাহিনীর কমান্ডারদের। তবে এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। সূত্রগুলো বলছে, ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানের ‘সাফল্য’ ট্রাম্পকে ঘিরে থাকা কট্টর নীতিনির্ধারক গোষ্ঠীকে আরও সাহসী করে তুলেছে। এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন রাজনৈতিক উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার। তাদের দাবি, রাশিয়া বা চীন কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগেই দ্রুত গ্রিনল্যান্ড দখল করা উচিত। বৃটিশ কূটনীতিকদের ধারণা, ট্রাম্পের এই আগ্রহের পেছনে আরেকটি বড় কারণ রয়েছে।

তাহলো এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে ভোটারদের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া। ওই নির্বাচনে ট্রাম্প ডেমোক্রেটদের কাছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। তবে এমন একটি নাটকীয় পদক্ষেপ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে ট্রাম্পকে সরাসরি সংঘাতে ফেলবে এবং কার্যত ন্যাটোর ভাঙনের পথ খুলে দেবে। সূত্র অনুযায়ী, ট্রাম্প যৌথ বিশেষ অভিযান কমান্ডকে আগ্রাসনের পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে বলেছেন। কিন্তু জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ এই নির্দেশের বিরোধিতা করছে। তাদের যুক্তি, এ ধরনের অভিযান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে এবং কংগ্রেসের সমর্থনও পাবে না। একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্পের মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাতে তারা কম বিতর্কিত কিছু প্রস্তাব সামনে আনছেন।

যেমন রাশিয়ার তথাকথিত ‘ঘোস্ট শিপ’ আটকানো। এগুলো হচ্ছে মস্কোর পরিচালিত শত শত গোপন জাহাজের নেটওয়ার্ক, যেগুলো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলে। অথবা ইরানে হামলার পরিকল্পনার কথাও তোলা হচ্ছে। কূটনীতিকরা একটি সম্ভাব্য ‘উত্তেজনামূলক পরিস্থিতি’ নিয়ে যুদ্ধাভ্যাস চালিয়েছেন, যেখানে ট্রাম্প সামরিক শক্তি বা ‘রাজনৈতিক চাপ’ ব্যবহার করে গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ডেনমার্কের সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেন। একটি কূটনৈতিক বার্তায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিকে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, ‘এর পরিণতি হতে পারে ন্যাটোর ভেতর থেকেই ধ্বংস।’ ওই বার্তায় আরও বলা হয়েছে, কিছু ইউরোপীয় কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রাম্পের আশপাশের কট্টর মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (এমএজিএ) গোষ্ঠীর প্রকৃত লক্ষ্যই এটি। যেহেতু কংগ্রেস ট্রাম্পকে ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যেতে দেবে না, তাই গ্রিনল্যান্ড দখল ইউরোপীয়দের বাধ্য করতে পারে ন্যাটো ছাড়তে। যদি ট্রাম্প ন্যাটোর অবসান চান, তবে এটাই হতে পারে সবচেয়ে সহজ পথ।

একটি ‘সমঝোতা পরিস্থিতি’ অনুযায়ী, ডেনমার্ক ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ডে পূর্ণ সামরিক প্রবেশাধিকার দেবে এবং রাশিয়া ও চীনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আগেই সেখানে অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে, তবে সেটিকে আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হবে। কূটনৈতিক বার্তায় বলা হয়েছে, ঘরোয়া রাজনৈতিক কারণে ট্রাম্প শুরুতে একটি উত্তেজনামূলক অবস্থান নেবেন, যা পরে সমঝোতায় রূপ নিতে পারে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের সময়সীমা দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। তাই গ্রীষ্মের মধ্যেই কোনো পদক্ষেপ আসতে পারে। ৭ জুলাইয়ের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনটি একটি সমঝোতার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হতে পারে।

বার্তাটি উপসংহারে বলেছে, বর্তমান উদ্বেগের মূল উৎস স্টিফেন মিলারের কাছ থেকে আসা সবচেয়ে চরম মতামতগুলো। যুক্তরাজ্যের অবস্থান হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তারা ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে থাকবে, নাকি ট্রাম্পের পথে হাঁটবে।

একজন কূটনৈতিক সূত্র বলেন, জেনারেলরা মনে করেন ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড পরিকল্পনা পাগলামি এবং বেআইনি। তাই তারা অন্য বড় সামরিক অভিযানের কথা তুলে ধরে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। তাদের ভাষায়, এটা যেন পাঁচ বছরের একটি শিশুর সঙ্গে কাজ করার মতো।

mzamin

Sunday, January 11, 2026

গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড আমাদের প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড আমরা না নিলে রাশিয়া ও চীন তা দখল নিতে পারে, আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ওই ভূখণ্ড “নিজের মালিকানায়” নেওয়া প্রয়োজন।’

গত শুক্রবার এক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘দেশগুলোর মালিকানা থাকতে হয়। আর মালিকানা থাকলে আপনি তার সুরক্ষা দেবেন, ইজারা থাকলে নয়। গ্রিনল্যান্ডকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সহজ উপায়ে হোক অথবা কঠিন উপায়ে, আমরা এটা করব।’ গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি চুক্তির মাধ্যমে, মানে সহজ পথে বিষয়টিকে সমাধান করতে চাই। এতে কাজ না হলে কঠিন পথেই করব।’ ট্রাম্পের দাবি, খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ এ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি। কারণ, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমরা রাশিয়া বা চীনকে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে দেব না। আমরা পদক্ষেপ না নিলে তারা ঠিকই সেটিকে দখল করে নেবে। তাই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আমাদের কিছু করতে হবে। হয় তা সুন্দরভাবে, না হয় আরও কঠিন কোনো উপায়ে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও চীন আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বাড়ালেও এখন পর্যন্ত বিশাল এই বরফাচ্ছাদিত দ্বীপের ওপর কোনো মালিকানা দাবি করেনি। এদিকে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে ট্রাম্পের এই হুমকিতে ডেনমার্কসহ ইউরোপীয় মিত্ররা বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

গ্রিনল্যান্ডে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। হোয়াইট হাউস সম্প্রতি বলেছে, প্রশাসন ন্যাটোভুক্ত সহযোগী দেশ ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে অঞ্চলটিকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও তারা নাকচ করছে না। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষ বলে দিয়েছে যে ভূখণ্ডটি বিক্রি হবে না। ডেনমার্ক বলেছে, সামরিক অভিযান চালানো হলে তা ট্রান্স আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটোর শেষ হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেবে।

সবচেয়ে কম জনবহুল অঞ্চল হলেও গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান উত্তর আমেরিকা ও উত্তর মেরু অঞ্চলের মধ্যে হওয়ায় এটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা পাওয়ার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। তা ছাড়া ওই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজ পর্যবেক্ষণের জন্যও স্থানটি বেশ উপযোগী।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবারই বলে আসছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই তিনি দাবি করেছেন, অঞ্চলটি ঘিরে রুশ ও চীনা জাহাজ অবস্থান করছে। গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত পিটুফিক ঘাঁটিতে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ জনের বেশি সেনাসদস্য স্থায়ীভাবে মোতায়েন আছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র এ ঘাঁটি পরিচালনা করে আসছে। ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগুলোর আওতায় গ্রিনল্যান্ডে নিজেদের ইচ্ছেমতো সংখ্যায় সেনা মোতায়েনের ক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

তবে ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইজারাভিত্তিক চুক্তি যথেষ্ট নয়। দেশগুলোর মালিকানা থাকতে হবে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, দেশগুলো ৯ বছরের চুক্তি এমনকি ১০০ বছরের চুক্তির ভিত্তিতে চলতে পারে না।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চীনের মানুষকে ভালোবাসি। আমি রাশিয়ার মানুষকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি চাই না, তাঁরা গ্রিনল্যান্ডে আমাদের প্রতিবেশী হোন। সেটা হবে না। ব্যাপারটা ন্যাটোকেও বুঝতে হবে।’

গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদ

গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলো গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার যুক্তরাষ্ট্র বা ডেনমার্কের নেই।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সে দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে আনার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজরে গ্রিনল্যান্ড। তিনি দ্বীপটির দখল চান বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন। তার প্রতিবাদে গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলো জোরালোভাবে বলেছে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে একমাত্র গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদেরই। যুক্তরাষ্ট্র বা ডেনমার্ক তা ঠিক করবে না। গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টে সব রাজনৈতিক দল যৌথ বিবৃতি দিয়ে এমনই জানিয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডকে আমরা রক্ষা করব: ডেনমার্ক

এনডিটিভি জানায়, ডেনমার্কের পার্লামেন্ট সদস্য এবং প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান রাসমুস জারলোভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডে আক্রমণ করে, তবে ডেনমার্কের নিজেকে রক্ষা করতেই হবে। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, মার্কিন সেনারা গ্রিনল্যান্ডে আক্রমণ করলে ডেনমার্কের সেনাবাহিনীও তাঁদের আটকাতে পারবে না। তবু এমন কোনো হামলা গ্রহণযোগ্য নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

এনডিটিভির সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জারলোভ বলেন, ‘আমরা এটাও স্পষ্ট করতে চাই, আমাদের ওপর সামরিক হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। এতে ন্যাটোভুক্ত দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার মতো একটি বোকামিপূর্ণ এবং বিধ্বংসী পরিস্থিতি তৈরি হবে, যা সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক এবং খুবই, খুবই বোকামি এবং অপ্রয়োজনীয়।’

জারলোভ মনে করেন, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডে হামলার হুমকি দেওয়া বা শত্রুতার কোনো কারণ নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশাধিকারের সুযোগ আগে থেকেই আছে। দুই দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যার মধ্যে তাদের খনি খননের জন্য প্রবেশাধিকার দেওয়া আছে। এর ব্যাখ্যায় ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘এর আসলেই কোনো প্রয়োজন নেই এবং আশা করি, আমরা আবার সঠিক পথে ফিরে আসতে পারব এবং এ নিয়ে উত্তেজনা বাড়বে না।’

ট্রাম্প এর আগে ২০১৯ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন তাঁকে উত্তরে বলা হয়েছিল, এটি বিক্রির জন্য নয়। ২০২৪ সালে নির্বাচনে জিতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাম্প আবার একই প্রস্তাব দেন। এবারও তাঁকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

গ্রিনল্যান্ড আমরা রক্ষা করব’- যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ধ্বংসাত্মক’ ন্যাটো যুদ্ধের সতর্কবার্তা ডেনমার্কের

গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক হামলা চালায়, তবে ডেনমার্ককে আত্মরক্ষা করতে হবে। এমন মন্তব্য করেছেন ডেনমার্কের সংসদ সদস্য ও পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান রাসমুস জারলোভ। তিনি স্বীকার করেন, ডেনমার্কের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে থামাতে সক্ষম না হলেও এমন কোনো হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এনডিটিভিকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে জারলোভ বলেন, আমরা স্পষ্ট করে জানাতে চাই আমাদের ওপর সামরিক হামলা চালানো গ্রহণযোগ্য নয়। এতে ন্যাটোর দুই সদস্য দেশের মধ্যে একেবারেই অযৌক্তিক ও বিপর্যয়কর যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হবে, যা সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক, অত্যন্ত বোকামিপূর্ণ এবং অপ্রয়োজনীয়।

জারলোভ বলেন, গ্রিনল্যান্ডে হামলা চালানোর মতো কোনো হুমকি, শত্রুতা বা যুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশাধিকার ভোগ করে এবং দুই দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। এর আওতায় খনিজ অনুসন্ধানসহ নানা কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, এর একেবারেই কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা আশা করি বিষয়টি আবার সঠিক পথে ফিরবে এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হবে না।

গ্রিনল্যান্ড বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না
ডনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম প্রেসিডেন্সির সময়ে ২০১৯ সালে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তখনই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল, এই দ্বীপ বিক্রির জন্য নয়। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের পর ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড কেনার সেই পুরোনো প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা ফের প্রত্যাখ্যান করা হয়। এ প্রসঙ্গে জারলোভ বলেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির বিষয়টি দামের প্রশ্ন নয়। তার ভাষায়, আমরা ৫৭ হাজার ড্যানিশ নাগরিককে বিক্রি করে আমেরিকান বানাতে পারি না। গ্রিনল্যান্ডের জনগণ এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।

‘মার্কিন সামরিক হামলা হলে ন্যাটোর অবসান’
এদিকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক হামলা চালায়, তাহলে ৭৬ বছরের পুরোনো পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। এ বিষয়ে জারলোভ বলেন, নিশ্চিতভাবেই সামরিক হামলা হলে সেটাই হবে ন্যাটোর শেষ। কারণ তখন ডেনমার্ককে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫  কার্যকর করতে হবে। এই ধারাটি সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার দেয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশ বাধ্য হবে ডেনমার্ককে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই রক্ষা করতে। অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র এতে ভেটো দেবে, আর সেখানেই ন্যাটোর মৃত্যু ঘটবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য তারা ‘বিভিন্ন বিকল্প’ বিবেচনা করছে। ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেন, সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি। লিভিট জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার এবং আর্কটিক অঞ্চলে প্রতিপক্ষদের ঠেকাতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, তিনি আগামী সপ্তাহে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা করছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুবিও স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কিনতে চান, সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে চান না।
ডেনমার্ক সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই বৈঠককে স্বাগত জানিয়েছে এবং একে ‘প্রয়োজনীয় সংলাপ’ বলে অভিহিত করেছে।

mzamin

Saturday, January 10, 2026

গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে সামরিক শক্তি ব্যবহার হতে পারে: হোয়াইট হাউস

অবশেষে গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেয়ার বিষয়ে নিজের প্রশাসনের ভিতরে আলোচনা শুরু হয়েছে মার্কিন প্রশাসনে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড দখলে বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা আছে। বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস বলেছে, গ্রিনল্যান্ডকে অধিগ্রহণ করা ‘জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অগ্রাধিকার’। গ্রিনল্যান্ড হলো ন্যাটো সদস্য ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। হোয়াইট হাউসের এই বিবৃতির কয়েক ঘন্টা আগে ইউরোপীয়ান নেতৃবৃন্দ যৌথ বিবৃতি দিয়ে ডেনমার্কের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। ডেনমার্ক শুরু থেকেই ট্রাম্পের আর্কটিক দ্বীপটি অধিগ্রহণের আকাঙ্ক্ষার বিরোধিতা করে আসছে।

সপ্তাহান্তে ট্রাম্প আবারও বলেন যে, নিরাপত্তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড ‘প্রয়োজন’। এর জবাবে ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করেন। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আক্রমণ হলে ন্যাটোর সমাপ্তি ঘটতে পারে। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস জানায়, প্রেসিডেন্ট ও তার দল এই গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিগত লক্ষ্য অর্জনে একটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন এবং অবশ্যই, সামরিক বাহিনী ব্যবহার করা হলো সেই বিকল্পগুলোর একটি। এই সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক প্রেসিডেন্ট নিজে। ফলে তার হাতে সবসময় এটা ব্যবহারের সুযোগ থাকে।

উল্লেখ্য, ন্যাটো হলো একটি আন্তঃমহাসাগরীয় সামরিক জোট। এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো বহিঃশত্রুর আক্রমণের ক্ষেত্রে একে অপরকে সহায়তা করার অঙ্গীকার করে। মঙ্গলবার ছয়টি ইউরোপীয় মিত্র দেশ ডেনমার্কের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে। তারা যৌথ বিবৃতিতে বলে, গ্রিনল্যান্ড হলো তার জনগণের, এবং কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডই তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারা আরও জোর দিয়ে জানায়, আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মতোই উদ্বিগ্ন। তবে এটি অবশ্যই ন্যাটো মিত্রদের মাধ্যমে ‘সমষ্টিগতভাবে’ অর্জিত হতে হবে। এছাড়া তারা জাতিসংঘ সনদের নীতি- সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সীমান্তের অক্ষুন্নতা বজায় রাখার আহ্বান জানায়। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন এই বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে ‘সম্মানজনক সংলাপের’ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সংলাপ হতে হবে এই সম্মানের ভিত্তিতে যে গ্রিনল্যান্ডের মর্যাদা আন্তর্জাতিক আইন ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার নীতিতে প্রতিষ্ঠিত।

গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ বিতর্কটি নতুন করে সামনে আসে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পর। সেখানে এই অভিযানের নিন্দা জানায় বেইজিং ও পিয়ংইয়ং। সেই অভিযানের এক দিন পর ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার সামাজিক মাধ্যমে আমেরিকার পতাকার রঙে রঙিন একটি গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্র পোস্ট করেন। ইংরেজিতে পাশে লিখেছেন- ‘সুন’। অর্থাৎ গ্রিনল্যান্ডেও একই রকম ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে শিগগিরই। সোমবার স্টিফেন মিলার জানান, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করা হলো ‘মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান’। সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একাধিকবার জিজ্ঞাসা করা হলেও তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেউ লড়াই করবে না।

রয়টার্সকে মার্কিন এক কর্মকর্তা জানান, বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিনল্যান্ড সরাসরি কিনে নেয়া, অথবা এর সঙ্গে ‘কমপ্যাক্ট অব ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন’ চুক্তি করা। এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী, যা আমেরিকান জনগণ ও গ্রিনল্যান্ডের মানুষের জন্য উপকারী হবে। আমাদের অভিন্ন প্রতিপক্ষরা ক্রমবর্ধমানভাবে আর্কটিকে সক্রিয় হচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও ন্যাটো মিত্রদের যৌথ উদ্বেগের বিষয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার কংগ্রেসে গোপন বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, প্রশাসনের গ্রিনল্যান্ড আক্রমণের পরিকল্পনা নেই। তবে ডেনমার্কের কাছ থেকে এটি কেনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক জানিয়েছে তারা দ্রুত রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ করেছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিকের সঙ্গে কথা বললে কিছু ভুল বোঝাবুঝির নিরসন হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর এরিক শ্মিট বিবিসিকে বলেন, তারা এখন কেবল আলোচনার পর্যায়ে আছে। আমার আশা- ইউরোপ বুঝবে যে শক্তিশালী আমেরিকা পশ্চিমা সভ্যতার জন্য ভালো।

ট্রাম্প তার প্রথম প্রেসিডেন্সির মেয়াদে গ্রিনল্যান্ডকে আর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত ঘাঁটিতে রূপান্তরের ধারণা তোলেন। ২০১৯ সালে তিনি বলেন, মূলত এটি একটি বড় রিয়েল এস্টেট চুক্তি। ওদিকে, রাশিয়া ও চীনের আগ্রহ বাড়ছে দ্বীপটিতে। সেখানে রেয়ার আর্থ খনিজ বা বিরল খনিজ সম্পদের মজুদ আছে। বরফ গলতে থাকায় নতুন সমুদ্রপথের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। মার্চে ট্রাম্প বলেন, দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ পেতে যুক্তরাষ্ট্র যতদূর যেতে হয়, যাবে।

গত গ্রীষ্মে কংগ্রেসীয় শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে জিজ্ঞেস করা হয়, প্রয়োজনে গ্রিনল্যান্ড দখলে নেয়ার কোনো সামরিক পরিকল্পনা আছে কিনা। তিনি বলেন, যে কোনো পরিস্থিতির জন্য আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
৫৭ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ড ১৯৭৯ সাল থেকে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে, যদিও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে। বেশিরভাগ গ্রিনল্যান্ডবাসী একদিন স্বাধীনতা সমর্থন করলেও, জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার ব্যাপারে তাদের বড় ধরনের বিরোধিতা রয়েছে। দ্বীপটিতে ইতিমধ্যে একটি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। ইলুলিসাতের ২৭ বছর বয়সী ইনুইট নাগরিক মর্গান আঙ্গাজু বিবিসিকে বলেন, বিশ্বনেতাকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ে হাসতে শোনা ভয়ংকর ছিল, যেন আমরা কোনো বস্তু, যাকে দাবী করা যায়। তিনি বলেন, আমাদের ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডবাসীরা দাবি করে কালাল্লিত নুনাত। যার মানে গ্রিনল্যান্ডিকদের ভূমি।
তিনি আরও জানান, দুশ্চিন্তায় আছেন কী ঘটতে পারে সামনে। মাদুরোর মতো পরিণতির মুখে পড়বেন কিনা গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ‘আমাদের দেশ আক্রমণ করবে কিনা’ তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত।

https://mzamin.com/uploads/news/main/197636_Abul-1.webp

Friday, January 9, 2026

ট্রাম্পকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী: গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি দেয়া বন্ধ করুন

অনেকদিন আগেই গ্রিনল্যান্ডের ওপর চোখ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে তিনি বার বার গ্রিনল্যান্ডকে দখল করে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। তার এসব হুমকির কড়া জবাব দিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। সর্বশেষ ভেনেজুয়েলা অপারেশন ও সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দম্পতিকে তুলে নেয়ার পর বিষয়টি বিশ্ববাসীকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আলোচনায় উঠেছে ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি একটি সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে এবং সেখানকার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে যে অভিযান চালিয়েছেন তাতে কর্তৃত্ববাদীরা বিশেষত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্বুদ্ধ হতে পারেন। এমন প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে শেষবারে সতর্ক করেছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে দেয়া ‘হুমকি’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার প্রয়োজন আছে-  (ট্রাম্পের) এমন কথা বলার কোনো অর্থই হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড্যানিশ সাম্রাজ্যের তিনটি জাতির কোনো একটিকেই সংযুক্ত করার অধিকার নেই।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করার পর তিনি এ মন্তব্য করলেন। ওই ছবিতে গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার জাতীয় পতাকার রঙে দেখানো হয়েছিল, সাথে লেখা ছিল ‘সুন’ (শিগগিরই)।
ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার সম্ভাবনার কথা বহুবার তুলেছেন। তার কৌশলগত অবস্থান ও খনিজ সম্পদের কথা তুলে ধরেছেন। ফ্রেডেরিকসেনের সমালোচনার পরও তিনি নিজের বক্তব্যে অনড় থাকেন। ড্যানিশ সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ‘খুব সরাসরি’ এই বার্তা দিচ্ছেন। তার ভাষায়, ডেনমার্ক এবং সেইসঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর সদস্য এবং জোটের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার আওতায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডেনমার্কের এমনিতেই একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি আছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশাধিকার পায়। পাশাপাশি ডেনমার্ক আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা বিনিয়োগও বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, আমি যুক্তরাষ্ট্রকে জোরালোভাবে অনুরোধ করব, একটি ঐতিহাসিক মিত্র দেশের বিরুদ্ধে এবং এমন এক দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়া বন্ধ করুন, যারা খুব পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে তারা বিক্রির জন্য নয়।

কয়েক ঘণ্টা পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প আবার বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার, আর ডেনমার্ক এটা করতে পারবে না। এর আগে কেটি মিলারের পোস্টের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ড্যানিশ রাষ্ট্রদূত এক ‘বন্ধুসুলভ মনে করিয়ে দেয়া’ বার্তায় জানান- দুই দেশ মিত্র এবং ডেনমার্ক তার ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রত্যাশা করে।

এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র শনিবার ভেনিজুয়েলায় বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। পরে ট্রাম্প বলেন, ভেনিজুয়েলা পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্র এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দেশটির অবকাঠামো ঠিক করে দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।

ট্রাম্প আগে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে বল প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। তার দাবি, দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর কৌশলগত অবস্থান ও উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য জরুরি বহু খনিজসম্পদ সেখানে রয়েছে। সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডে একটি বিশেষ দূত নিয়োগ করায় ডেনমার্ক ক্ষোভ প্রকাশ করে। গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা ৫৭ হাজার। ১৯৭৯ সাল থেকে অঞ্চলটি ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে- যদিও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি এখনো ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে। বেশিরভাগ গ্রিনল্যান্ডবাসী ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা চায়। তবে জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে তারা প্রবলভাবে বিরোধিতা করে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/197360_Abul-3.webp

Thursday, December 25, 2025

গ্রিনল্যান্ড ‘দখল’ করার কোনো উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নেই: ট্রাম্পের নতুন দূত

গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন নিযুক্ত দূত জেফ ল্যান্ড্রি বলেছেন, দ্বীপটি ‘দখল’ করার কোনো উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তবে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে ‘সংলাপ শুরু করতে’ চায় যুক্তরাষ্ট্র।

মঙ্গলবার ফক্স নিউজের সঙ্গে আলাপকালে ল্যান্ড্রি জোর দিয়ে বলেন, গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করতেই হবে এটা বুঝতে যে সামনে এগিয়ে যেতে তারা কী চায়

ল্যান্ড্রি প্রশ্ন করেন, ‘তাঁরা কী খুঁজছেন? কী ধরনের সুযোগ তাঁরা পাননি? যে সুরক্ষা তাঁদের পাওয়ার কথা, তা কেন পাননি?

জনমত জরিপে গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দারা বরাবরই তাঁদের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দখলদারির বিরোধিতা করে আসছেন।

রোববার ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জেফ ল্যান্ড্রি গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করবেন, যদিও তাঁর কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে।

এই ঘোষণার পর ল্যান্ড্রি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে ট্রাম্পের উদ্দেশে লেখেন, ‘গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার এই স্বেচ্ছাসেবী পদে আপনার জন্য কাজ করতে পারাটা সম্মানের।’

জবাবে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ও গ্রিনল্যান্ডের প্রিমিয়ার জেন্স-ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডবাসীরই অধিকারে থাকবে।

ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড তার কৌশলগত অবস্থান এবং বিপুল খনিজ সম্পদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ কেড়েছে।

ট্রাম্প বলছেন, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে, খনিজ সম্পদের জন্য নয়।

ল্যান্ড্রিকে বিশেষ দূত নিয়োগের পর সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।

গ্রিনল্যান্ড ও কানাডা—দুই দেশ ও অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার বিষয়ে ট্রাম্পের বারবার উচ্চারিত আকাঙ্ক্ষা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন, তাঁর এই জেদি আচরণ ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-24%2Fnjokpzef%2FJeff-Landry.jpg?rect=0%2C0%2C720%2C480&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
হোয়াইট হাউসের রুজভেল্ট রুমে জেফ ল্যান্ড্রির বক্তব্য শুনছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র। ২৪ মার্চ, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

Thursday, August 28, 2025

গ্রিনল্যান্ডে গোপন তৎপরতা, মার্কিন শীর্ষ দূতকে তলব করেছে ডেনমার্ক

কোপেনহেগেনে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছে ডেনমার্ক। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা গ্রিনল্যান্ডে গোপন তৎপরতা চালাচ্ছেন—এমন অভিযোগে দেশটিতে নিযুক্ত শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিককে বুধবার তলব করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘ডিআর’ একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ গোপন তৎপরতার খবর জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশ্য গ্রিনল্যান্ডের সমাজে ঢুকে পড়া এবং ডেনমার্ক থেকে দ্বীপটিকে বিচ্ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করার পক্ষে প্রচার চালানো। তবে ওই ব্যক্তিরা কারা, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, রাষ্ট্রের (ডেনমার্ক) অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করার যেকোনো চেষ্টা অগ্রহণযোগ্য। এ অবস্থান থেকেই মার্কিন কূটনীতিককে তলব করা হয়েছে।

এদিকে ডেনমার্কের গোয়েন্দা সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালানোর জন্য গ্রিনল্যান্ডকে নিশানা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্য জানার জন্য ডেনমার্কে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বিবিসি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময় বলেছেন, ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ডের দখল নিতে চান তিনি। কোপেনহেগেন এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

কয়েক মাস আগে গ্রিনল্যান্ড সফর করেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। ওই সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ‘আপনারা অন্য কোনো দেশকে নিজ ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করতে পারেন না।’

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বিবিসিকে বলেন, বিভিন্ন বিদেশি শক্তি গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে এবং সেখানে ডেনমার্কের অবস্থান নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার অবগত।

ডেনমার্ক পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখে এসেছে দেশটি। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর গ্রিনল্যান্ড দখলে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ডেনিশরা অবাক হয়েছেন।

বরফে ঢাকা গ্রিনল্যান্ডের একটি শহর
বরফে ঢাকা গ্রিনল্যান্ডের একটি শহর। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Thursday, April 10, 2025

আমেরিকান পণ্য বর্জন করছেন কানাডিয়ান এবং ড্যানিশরা

টড ব্রেম্যান আর তার প্রিয় রেড ওয়াইন কিনছেন না, যা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আসতো। কানাডিয়ান সশস্ত্র বাহিনীর একজন অভিজ্ঞ সৈনিক ছিলেন ব্রেম্যান। কানাডা, ইউরোপ এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক লোকেদের মধ্যে তিনিও একজন, যারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক এবং মার্কিন মিত্রদের প্রতি তার আচরণের কারণে মার্কিন পণ্য কেনা এড়িয়ে চলেছেন। নোভা স্কটিয়ায় বসবাসকারী ব্রেম্যান বলেন, ‘আমি আমেরিকান বাহিনীর সাথে কাজ করেছি। আমাদের দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক কোথায় যাচ্ছে তা দেখে আমি খুবই হতাশ। কিন্তু আমার মনে হয় এখনই সময় এসেছে উঠে দাঁড়ানোর। আমার মনে হয়, স্থানীয় পণ্য কেনা এবং কানাডিয়ান ব্যবসাকে সমর্থন করার এটাই সঠিক সময়।’

তার স্ত্রীর সাথে বাজারে বেরিয়ে ব্রেম্যান পছন্দের ওয়াইনসহ যে সমস্ত আমেরিকান পণ্য কিনতেন তার পরিবর্তে এখন কানাডিয়ান ওয়াইন পান করা শুরু করেছেন। ব্রেম্যানের কথায়, তবে কোন পণ্যগুলো কানাডিয়ান তা নির্ধারণ করা সবসময় সহজ নয়। কখনও কখনও লেবেলিং বিভ্রান্তিকর হতে পারে। সাহায্য করার জন্য তিনি এখন তার ফোনে একটি অ্যাপ ব্যবহার করেন যা কোনও পণ্যের বারকোড স্ক্যান করতে পারে এবং এটি কোথা থেকে এসেছে তা শনাক্ত করতে পারে। ম্যাপেল স্ক্যান নামে এই অ্যাপটি কানাডার স্থানীয় পণ্য কেনাকাটা করতে সাহায্য করার জন্য তৈরি করা।

ম্যাপেল স্ক্যানের প্রতিষ্ঠাতা সাশা ইভানভ বলেছেন যে, গত মাসে চালু হওয়ার পর থেকে তার অ্যাপটি ১০০,০০০ বার ডাউনলোড হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন যে কানাডিয়ানরা এভাবেই নিজের দেশের জিনিস কিনতে থাকবে। ট্রাম্প কর্তৃক আরোপিত আমদানি শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় ব্রেম্যানের মতো কানাডিয়ানরা আমেরিকান পণ্য বর্জন করছেন। ইতিমধ্যেই সমস্ত বিদেশি গাড়ি, ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়ামের উপর ২৫% শুল্ক এবং অন্যান্য কানাডিয়ান এবং মেক্সিকান পণ্যের উপর ২৫% শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। তার জেরেই এই প্রতিক্রিয়া।

এদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের উপর ২০% শুল্ক আরোপ করা হবে, যেখানে যুক্তরাজ্য ১০% শুল্ক আরোপের সম্মুখীন হবে।ট্রাম্প বলেছেন যে, এই শুল্ক মার্কিন উৎপাদন বৃদ্ধি করবে। কর রাজস্ব বৃদ্ধি করবে এবং মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি কমাবে। তবে, তারা বিশ্ব বাজারকে আতঙ্কিত করে তুলেছে, যা গত মাসে তীব্রভাবে পতনের সম্মুখীন হয়েছে। ট্রাম্প এমনকি কানাডাকে ৫১তম রাজ্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পৃক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। যা কানাডিয়ান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। অটোয়াও পাল্টা শুল্ক হিসেবে ৬০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার এবং মার্কিন অটো সেক্টরের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে। সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণকারী কানাডিয়ানদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

ইউরোপীয় দেশগুলোতেও মার্কিন পণ্য বর্জনের হিড়িক বেড়েছে। মার্কিন পণ্য বয়কটের জন্য বিশেষভাবে জোরালো আন্দোলন শুরু হয়েছে ডেনমার্কে, যেখানে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করতে চান বলে জানিয়েছেন। ডেনমার্কের বৃহত্তম মুদি দোকান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান স্যালিং গ্রুপ সম্প্রতি ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলোকে ফোকাস করতে পণ্যের ওপর একটি কালো তারকা প্রতীক যুক্ত করেছে। কোপেনহেগেনের শহরতলির স্কোভলুন্ডে বসবাসকারী একটি স্কুলের অধ্যক্ষ বো আলবার্টাস বলেন, তিনি এই বয়কটে যোগ দিয়েছেন।

তার কথায়, ‘গ্রিনল্যান্ড কিনতে চাওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প যে বিবৃতি দিয়েছেন, তা মেনে নেয়া যায় না। আমি আমেরিকান রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুই হয়তো করতে পারবো না, তবে আমি আমার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ভোট দিতে পারি।’

আলবার্টাসসের প্রথম পদক্ষেপগুলোর মধ্যে একটি ছিল নেটফ্লিক্স, ডিজনি প্লাস এবং অ্যাপল টিভিসহ মার্কিন স্ট্রিমিং পরিষেবাগুলোর সাবস্ক্রিপশন বাতিল করা। আলবার্টাস হলেন ডেনিশ ফেসবুক গ্রুপের প্রশাসক যিনি মার্কিন পণ্য বর্জনে জনগণকে সহায়তা করার জন্য নিবেদিতপ্রাণ। ৯০,০০০ সদস্য বিশিষ্ট এই গ্রুপে, লোকেরা জুতা থেকে শুরু করে লন মাওয়ার পর্যন্ত মার্কিন পণ্যের স্থানীয় বিকল্পগুলো শেয়ার করে।

কোপেনহেগেনের ব্রডার্স নামক একটি মুদি দোকানের মালিক মেটে হিরুল্ফ ক্রিশ্চিয়ানসেন তার দোকানে চিটোস ক্রিস্পস এবং হার্শি'স চকলেটের মতো আমেরিকান পণ্য মজুদ করা বন্ধ করে দিয়েছেন। ডেনিশ বা ইউরোপীয় পণ্য দিয়ে সেগুলো প্রতিস্থাপন করছেন। তিনি মনে করছেন যে, কিছু পণ্য প্রতিস্থাপন করা সহজ। যেমন কোকা-কোলা ডেনিশ ব্র্যান্ড জলি কোলা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সহজ। কিন্তু ফেসবুকের মতো প্রযুক্তি এড়ানো বেশ কঠিন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, ডেনমার্কের বয়কট আন্দোলন ট্রাম্পের নীতি এবং বাগাড়ম্বরের প্রতি মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

মার্কিন বাণিজ্য নীতির ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ  যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ডগলাস আরউইন  বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য হ্রাসের ক্ষেত্রে ভোক্তাদের পণ্য বয়কট কতটা অর্থনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে তা বিচার করা কঠিন। অতীতে, বয়কট দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং তা থেকে খুব বেশি কিছু অর্জন করা যায়নি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পদক্ষেপের প্রতি প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া হিসাবে শুরু হয় কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা ম্লান হয়ে যায়।

যদিও  কানাডায় ‘বাই কানাডিয়ান’ মনোভাব বৃদ্ধির ফলে অনেক স্থানীয় ব্র্যান্ডের বিক্রয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। কানাডিয়ান মুদি দোকানের সিইও লোবলা লিঙ্কডইনে পোস্ট করেছেন যে কানাডিয়ান পণ্যের সাপ্তাহিক বিক্রয় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কানাডার আলবার্টার বাসিন্দা বিয়ানকা পার্সনস, স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্যের প্রচারণার জন্য ‘মেড ইন আলবার্টা’ নামে একটি উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।  তিনি বলেন, ‘শুল্ক আরোপের পর থেকে এই পণ্যের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। আমরা এখন প্রতি দুই সপ্তাহে ২০,০০০ এরও বেশি ভিজিটর পাচ্ছি।’

অন্টারিও এবং নোভা স্কটিয়াসহ বেশ কয়েকটি কানাডার প্রদেশ শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় তাদের মদের দোকানের তাক থেকে আমেরিকার তৈরি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় সরিয়ে ফেলেছে। জ্যাক ড্যানিয়েলের নির্মাতা ব্রাউন-ফরম্যানে এই পদক্ষেপকে ‘শুল্কের চেয়েও খারাপ’ বলে অভিহিত করেছেন।বয়কটের শিকার হওয়া আমেরিকান ব্যবসাগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যালেডোনিয়া স্পিরিটস, যা কানাডিয়ান সীমান্তের কাছে ভার্মন্টে অবস্থিত একটি ডিস্টিলার। ক্যালেডোনিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান ডিস্টিলার রায়ান ক্রিশ্চিয়ানসেন বলেছেন যে, শুল্ক ঘোষণার পর তার অনেক অর্ডার সরাসরি বাতিল করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কে অবস্থিত আমেরিকান মশলা কোম্পানি বার্ল্যাপ অ্যান্ড ব্যারেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইথান ফ্রিশ, যারা  কানাডাতেও মশলা রপ্তানি করে, বলেছেন যে তিনি ভোক্তা বয়কটের চেয়ে তার কোম্পানির আমদানির উপর শুল্কের প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে বেশি চিন্তিত। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এমন একটি ধারণা আছে যে, যদি আপনি কোনও আমেরিকান কোম্পানি বয়কট করেন, তাহলে এর অর্থনীতির উপর প্রভাব পড়বে। সেইসঙ্গে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত, আমার মনে হয় এই ধারণাটি সঠিক নয়। কারণ মার্কিন অর্থনীতি এমনিই ভেঙে পড়ছে। আমাদের মতো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে।’

সূত্র: বিবিসি

mzamin