Monday, August 10, 2009

শ্রীলঙ্কায় স্থানীয় নির্বাচন

শ্রীলঙ্কায় গতকাল শনিবার দুটি স্থানীয় পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এ কথা জানিয়েছে। ভোট চলাকালে নির্বাচনী এলাকাগুলোয় সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
নির্বাচন কমিশন জানায়, জাফনা ও ভাভুনিয়া পৌরসভায় শনিবার সকালে ভোট শুরু হয়ে তা টানা নয় ঘণ্টা চলে। এলাকা দুটিতে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার ভোটার রয়েছেন। পৌরসভা দুটির অবস্থান সেদেশের ওয়ানি যুদ্ধাঞ্চলের কাছে। এই ওয়ানি এলাকায় গত মে মাসে তামিল বিদ্রোহীদের পরাস্ত করে সেনাবাহিনী।

আফগানিস্তানে যুক্তরাজ্যের অবস্থান ৪০ বছর স্থায়ী হতে পারে

আফগানিস্তানের পুনর্গঠন কার্যক্রমে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা কয়েক দশক পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছেন সে দেশের সেনা কর্মকর্তা জেনারেল স্যার ডেভিড রিচার্ডস। গতকাল শনিবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক টাইমস পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি এ কথা বলেন। আগামী ২৮ অগাস্ট নতুন ব্রিটিশ সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন স্যার ডেভিড রিচার্ডস। খবর বিবিসি ও এএফপির।
আফগানিস্তানে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা সম্পর্কে ডেভিড রিচার্ডস বলেন, ‘সেখানে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম হয়তো শেষ হয়ে আসবে। কিন্তু জাতি গঠনের কার্যক্রম হবে দীর্ঘমেয়াদি। আর আমার বিশ্বাস, আফগানিস্তানের এই পুনর্গঠনে যুক্তরাজ্যও যথাযথ ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে হয়তো মধ্যমেয়াদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা পর্যন্ত ব্রিটিশ সেনাদের দরকার হবে। তবে সেখান থেকে ন্যাটো বাহিনীর পুরোপুরি প্রত্যাহারের কোনো সম্ভাবনা নেই।’
আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় ও যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন উল্লেখ করে ডেভিড রিচার্ডস বলেন, ‘আমরা আফগানিস্তানকে সুইজারল্যান্ড বানানোর লক্ষ্যে কাজ করছি না। তবে সে দেশে সুশৃঙ্খল পুলিশ ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্যও অনেক কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশটির উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে যাবে যুক্তরাজ্য।’
এদিকে গত বৃহস্পতিবারও আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে আরও তিনজন ব্রিটিশ সেনা নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে ২০০১ সালে অভিযান শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত সেখানে নিহত ব্রিটিশ সেনার সংখ্যা দাঁড়াল ১৯৫ জনে। অভিযান শুরুর পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি বিদেশি সেনা নিহত হয়েছেন। তবে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সফল হওয়ার আশাবাদ জানিয়েছেন ডেভিড রিচার্ডস।

মুম্বাই কলকাতা দিল্লি ও পুনেতে সোয়াইন ফ্লুর ব্যাপক সংক্রমণ

দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ ও মহারাষ্ট্রে সোয়াইন ফ্লুর ব্যাপক সংক্রমণ ঘটেছে। এ কারণে ইতিমধ্যে মহারাষ্ট্র রাজ্যের মুম্বাই ও পুনের সব স্কুল-কলেজ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দিল্লিতে এখন পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৩৮ জন। রাজ্যের ১৩টি হাসপাতালে খোলা হয়েছে আইসোলেশন ওয়ার্ড।
মহারাষ্ট্রে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৩০০ জন। তাদের মধ্যে পাঁচজন চিকিত্সকও রয়েছেন। তবে পুনের অবস্থা ভয়াবহ। এখানে সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ১৫৮ জনকে। তাদের মধ্যে ৩৮ জনের দেহে সোয়াইন ফ্লুর জীবাণু পাওয়া গেছে। মুম্বাইতে আক্রান্ত হয়েছে ২৫ জন। এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৬১৫ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।
পুনেতে স্কুল-কলেজের পাশাপাশি এখানে রাত নয়টার পর সব হোটেল, রেস্তোরাঁ, থিয়েটার ও বিনোদনকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোয়াইন ফ্লু এড়াতে মুম্বাই ও পুনেতে মাস্ক বিক্রি বেড়ে গেছে।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব নরেশ দয়াল গত শুক্রবার জানান, বৃহস্পতি ও শুক্রবার দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ৪৫১ জনকে সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯৬ জনের দেহে এই জীবাণু পাওয়া গেছে।
কলকাতায় সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহে ৪৫ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ৪০ জনের রক্ত পরীক্ষা করে নয়জনের দেহে সোয়াইন ফ্লুর জীবাণু পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ছয়জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।
এদিকে গতকাল শনিবার কলকাতার বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে আরও পাঁচজন সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজন এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে তাদের আনা হয় হাসপাতালে। বাকি একজন হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের চিকিত্সক।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী গোলাম নবী আজাদ বলেন, সোয়াইন ফ্লু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কেন্দ্রীয় সরকার সোয়াইন ফ্লু প্রতিরোধে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এ রোগের চিকিত্সার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থ্রি লেয়ার মাস্ক সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষেধক হিসেবে মজুদ রাখা হয়েছে এক কোটি ট্যামি ফ্লু ট্যাবলেট। দেশের ১৯টি পরীক্ষাগারে বিনামূল্যে রক্ত পরীক্ষারও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নিহত হয়ে থাকলে দারুণ সুসংবাদ: যুক্তরাষ্ট্র -মেহসুদ নিহত হননি: তালেবান নেতার দাবি

পাকিস্তানের তালেবানপ্রধান বায়তুল্লাহ মেহসুদের মৃত্যু নিয়ে সংশয় কাটছে না। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলছে না। এরই মধ্যে গতকাল শনিবার তালেবানের একজন শীর্ষ কমান্ডার মেহসুদের নিহত হওয়ার খবর নাকচ করে দিয়ে এ সংক্রান্ত সব প্রতিবেদনকে ‘হাস্যকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
শীর্ষস্থানীয় তালেবান কমান্ডার হেইকমুল্লাহ মেহসুদ টেলিফোনে সাংবাদিকদের জানান, বায়তুল্লাহ মেহসুদ সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। শিগগিরই গণমাধ্যমের সামনে হাজির হয়ে তিনি এটা প্রমাণ করবেন। মেহসুদের মৃত্যুর খবরকে ‘অশুভ প্রচারণা’ আখ্যায়িত করে হেইকমুল্লাহ বলেন, তাঁকে (মেহসুদকে) প্রকাশ্যে নিয়ে আসতেই হাস্যকর এসব খবর প্রচার করা হচ্ছে। এটা মেহসুদকে গ্রেপ্তার বা তাঁকে হত্যার একটা কৌশল। এদিকে বায়তুল্লাহ মেহসুদের আরও এক ঘনিষ্ঠ সহচর মৌলানা মেরাজুদ্দিন বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, গত কয়েক দিনে বায়তুল্লাহ মেহসুদের মৃত্যু সম্পর্কে যা কিছু শুনেছি, তা অসত্য। ওয়াজিরিস্তানের স্থানীয় বাসিন্দারা আমাকে নিশ্চিত করেছেন, মেহসুদ জীবিত ও ভালো আছেন।’
পাকিস্তান নিশ্চিত করলেও বায়তুল্লাহ মেহসুদের নিহত হওয়ার খবর এখনো নিশ্চিত করেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে হোয়াইট হাউস বলেছে, মেহসুদ নিহত হয়ে থাকলে তা একটি দারুণ সুসংবাদ। এ খবরে পাকিস্তানের জনগণ নিঃসন্দেহে নিরাপদবোধ করবে। এদিকে মেহসুদের মৃত্যুর খবরে সোয়াতের জনগণ উত্সব করেছে। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস গত শুক্রবার বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখেছি, তালেবান সদস্যরাও মেহসুদের নিহত হওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু শতভাগ নিশ্চিতভাবে আমরা এটা বলতে পারছি না। খবরটি খতিয়ে দেখতে হবে।’ মেহসুদের মৃত্যুর ফলে পাকিস্তান-আফগানিস্তান অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রেসিডেন্ট ওবামার কৌশল সফল হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে গিবস বলেন, এটা সত্য যে, মেহসুদ নিহত হয়ে থাকলে পাকিস্তানের জনগণ অনেক বেশি নিরাপদে থাকবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র রবার্ট উড বলেছেন, মেহসুদ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত। এসব হামলায় বহু নিরপরাধ মানুষ হতাহত হয়েছে। এমনকি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকে হত্যার পরিকল্পনাকারীও মেহসুদ। সুতরাং তাঁর মৃত্যু পাকিস্তানের জনগণের জন্য একটি ভালো খবর। তিনি আরও বলেন, মার্কিন কর্তৃপক্ষ ও পাকিস্তান সরকার ওই অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিকারী তালেবান, আল-কায়েদা ও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনকে নির্মূল করতে পরস্পরকে সহযোগিতা করছে। সন্ত্রাসবাদ দমনে অন্য দেশের সঙ্গেও কাজ করবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে বায়তুল্লাহ মেহসুদের মৃত্যুর খবরে উত্সব করেছে সোয়াতের লোকজন। মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হতে তারা বিভিন্ন স্থানে জমায়েত হয়ে নানাভাবে খবর নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় অনেকে প্রার্থনাও করে। স্থানীয় বাসিন্দা জুবাইর তরওয়ালি বলেন, এখন এ অঞ্চলকে পাকিস্তানের অংশ মনে হচ্ছে। হামাইউদ্দিন বলেন, ‘এটা অবশ্যই সুসংবাদ, তবে আশা করি দ্রুত তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

প্রাচীন মূর্তির আদলে মাইকেল জ্যাকসন

প্রয়াত পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের হাজারো ভক্তের দৃষ্টি এখন শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়ামে একটি আবক্ষ মূর্তির দিকে। সেটি দেখে তাঁদের বিস্ময় আর প্রশ্নের যেন শেষ নেই। এত কিছু থাকতে মাইকেল-ভক্তরা তিন হাজার বছরের প্রাচীন মিসরীয় মূর্তিটি নিয়ে পড়লেন কেন? উত্তরটাও খুব সোজা। কারণ, সেই আবক্ষ মিসরীয় মূর্তিটির মুখায়বের সঙ্গে মাইকেল জ্যাকসনের চেহারার রয়েছে আশ্চর্য মিল! জন্মের তিন হাজার বছর আগে কী করে মূর্তি তৈরি হলো! আর এ নিয়ে মাইকেল-ভক্তদের প্রশ্নেরও শেষ নেই। খবর এএফপির।
এ আবক্ষ মূর্তিটি চুনাপাথরের তৈরি এক নারীর। ১৯৮৮ সাল থেকে সেটি শিকাগো ফিল্ড মিউজিয়ামের একটি আকর্ষণীয় ও দ্রষ্টব্য বিষয় হয়ে আছে। খ্রিষ্টপূর্ব ১০৫০ থেকে ১৫৫০-এর মধ্যে মূর্তিটি তৈরি করা হয়েছিল বলে সবার ধারণা।
মাইকেল জ্যাকসনের প্লাস্টিক সার্জারি করা চেহারার সঙ্গে মূর্তির মুখায়বের রয়েছে অদ্ভুত রকমের মিল। সবচেয়ে বেশি মিল মাইকেলের নাক এবং তাঁর চোখের সঙ্গে।
কিউরেটর জিম ফিলিপ বার্তা সংস্থাকে বলেন, ‘জাদুঘরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাইকেল-ভক্তদের এ সংক্রান্ত নানা প্রশ্নে জর্জরিত হচ্ছেন। অনেকেই এসে জিজ্ঞেস করেন—মাইকেল কোথায়? তখন আমরা বলি, এখানে মাইকেল নেই, তবে তাঁর চেহারার সঙ্গে মিল আছে এমন একটি আবক্ষ মূর্তি এখানে রয়েছে।’
মাইকেল জ্যাকসনের চেহারার আদলে এ মূর্তি গড়ার সব সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে ফিলিপ বলেন, তাঁর জানা মতে মাইকেল কোনো দিন ওই জাদুঘরে যাননি। মূর্তিটি অনেক প্রাচীন এবং মাইকেলের চেহারার সঙ্গে এর মুখায়বের মিল কাকতালীয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
তবে জিম ফিলিপ স্বীকার করেন, মূর্তিটির মুখায়বের সঙ্গে মাইকেলের চেহারার মিলটা খুবই স্পষ্ট।

আবারও খবরের শিরোনাম হলেন শিল্পা শেঠি

শিল্পা শেঠির গালে আবারও চুমু! তবে এবারের নায়ক কোনো হলিউড সেলিব্রেটি নন, মন্দিরের বয়োজ্যেষ্ঠ এক পুরোহিত। শুধু এবারই নয়, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে অতীতেও বেশ কয়েকবার সংবাদ শিরোনামে হয়েছেন এই বলিউড অভিনেত্রী।
সম্প্রতি উড়িষ্যার সাক্ষীগোপাল মন্দিরে গিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন শিল্পা শেঠি। অভিযোগ উঠেছে মন্দিরের আঙ্গিনার ভেতরে জুতো পায়ে শুটিং করেছেন তিনি। ওই বিতর্কের রেশ না কাটতেই আবারও সংবাদ শিরোনামে শিল্পা। ইন্টারনেটে তাঁর একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, শিল্পার গালে চুমু খাচ্ছেন মন্দিরের একজন পুরোহিত।
শিল্পা যখন মন্দিরের পুরোহিতের কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন, তখন তাঁর প্রতি দারুণ শিষ্টাচার দেখান ওই পুরোহিত। তিনি শুধু আশীর্বাদই করেননি, শিল্পার গালে এঁকে দেন পিতৃসুলভ চুমু। পুরোহিতের আচরণে অশ্লীল কোনো কিছু ছিল না।
চুমুসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে এর আগেও একবার ভারতজুড়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন শিল্পা শেঠি। এইডস সচেতনতাবিষয়ক এক অনুষ্ঠানে তাঁর গালে বেশ কয়েকবার চুমু খেয়েছিলেন হলিউড অভিনেতা রিচার্ড গিয়ার।

আফগানিস্তানে যুক্তরাজ্যের অবস্থান ৪০ বছর স্থায়ী হতে পারে

আফগানিস্তানের পুনর্গঠন কার্যক্রমে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা কয়েক দশক পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছেন সে দেশের সেনা কর্মকর্তা জেনারেল স্যার ডেভিড রিচার্ডস। গতকাল শনিবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক টাইমস পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি এ কথা বলেন। আগামী ২৮ অগাস্ট নতুন ব্রিটিশ সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন স্যার ডেভিড রিচার্ডস। খবর বিবিসি ও এএফপির।
আফগানিস্তানে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা সম্পর্কে ডেভিড রিচার্ডস বলেন, ‘সেখানে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম হয়তো শেষ হয়ে আসবে। কিন্তু জাতি গঠনের কার্যক্রম হবে দীর্ঘমেয়াদি। আর আমার বিশ্বাস, আফগানিস্তানের এই পুনর্গঠনে যুক্তরাজ্যও যথাযথ ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে হয়তো মধ্যমেয়াদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা পর্যন্ত ব্রিটিশ সেনাদের দরকার হবে। তবে সেখান থেকে ন্যাটো বাহিনীর পুরোপুরি প্রত্যাহারের কোনো সম্ভাবনা নেই।’
আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় ও যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন উল্লেখ করে ডেভিড রিচার্ডস বলেন, ‘আমরা আফগানিস্তানকে সুইজারল্যান্ড বানানোর লক্ষ্যে কাজ করছি না। তবে সে দেশে সুশৃঙ্খল পুলিশ ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্যও অনেক কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশটির উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে যাবে যুক্তরাজ্য।’
এদিকে গত বৃহস্পতিবারও আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে আরও তিনজন ব্রিটিশ সেনা নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে ২০০১ সালে অভিযান শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত সেখানে নিহত ব্রিটিশ সেনার সংখ্যা দাঁড়াল ১৯৫ জনে। অভিযান শুরুর পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি বিদেশি সেনা নিহত হয়েছেন। তবে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সফল হওয়ার আশাবাদ জানিয়েছেন ডেভিড রিচার্ডস।

মাটির ঘরে রাত কাটালেন রাহুল

উত্তর প্রদেশের আমেথির সংগ্রামপুর গ্রামের এক মাটির ঘরে গত বৃহস্পতিবার রাত কাটালেন রাহুল গান্ধী।
ভারতে জনসংখ্যার দিক দিয়ে বৃহত্ রাজ্য উত্তর প্রদেশ ছিল একসময় কংগ্রেসের ঘাঁটি। কংগ্রেসকে বারবার ক্ষমতায় বসিয়েছে এই উত্তর প্রদেশ। কিন্তু এই প্রদেশে কয়েক বছর ধরে ধস নেমেছে কংগ্রেস ঘাঁটিতে। এবার সেই পুরোনো ঘাঁটি পুনরুদ্ধারে মাঠে নেমে পড়েছেন কংগ্রেস নেতারা। আর এর মূল কাণ্ডারী হিসেবে হাল ধরেছেন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং রাজীব-সোনিয়া তনয় রাহুল গান্ধী।
গত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি বা মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টির সঙ্গে কোনো আপসরফা না করে একা লড়ে উত্তর প্রদেশের ৮০টি আসনের মধ্যে ২১ আসন ছিনিয়ে নিয়েছিল। এর আগের ২০০৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের ঝুলিতে ছিল মাত্র আটটি আসন। আট থেকে ২১ আসন বাড়ানোর মূল কারিগর ছিলেন রাহুল গান্ধী।
সেই রাহুল গান্ধী এবার দলকে চাঙা করার জন্য এখন চষে বেড়াচ্ছেন উত্তর প্রদেশে। মিলছেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। খাচ্ছেন তাদের বাড়িতে। এমনকি রাত যাপনও করছেন গ্রামের গরিব মানুষের মাটির ঘরে। নির্বাচনের সময় তিনি দুই দিন কাটিয়েছিলেন এই মাটির ঘরে। আর এবার বৃহস্পতিবার আরেক রাত কাটালেন উত্তর প্রদেশের আমেথির সংগ্রামপুর গ্রামে। হঠাত্ তিনি এদিন রাতে গিয়ে ওঠেন অবদেশ ও সীমা শ্রীবাস্তবের বাড়িতে। গিয়েই তিনি খান তাঁদের রান্না। রাতও কাটান তিনি এই বাড়িতে। আর এতে করে রাহুলের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়তে শুরু করেছে।

রিজার্ভ ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৮০০ কোটি ডলার অতিক্রম করে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রবাসী-আয়ের উচ্চ প্রবাহ ও আমদানি ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্রে জানা গেছে।
২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী-আয়ের পরিমাণ ছিল ৯৬৮ কোটি ডলার। প্রবাসী-আয়ের উচ্চ প্রবাহ লেনদেনের ভারসাম্যকে অনুকূল অবস্থায় রাখতে সাহায্য করেছে। পাশাপাশি চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও বড় ধরনের উদ্বৃত্তাবস্থা বজায় রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে আরও দেখা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরের শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭৪১ কোটি ৯১ লাখ ডলার। আর ২০০৭-০৮ অর্থবছর শেষে ছিল ৬১৪ কোটি ৮৮ লাখ ডলার।
বিশ্বমন্দার এই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি অর্থনীতিকে নিরাপদ রাখতে সহায়তা করছে বলে মনে করা হয়।

বিশ্বে প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন ডলারের বড় দরপতন দেশে টাকা-ডলারের বিনিময় স্থিতিশীল

রমজান মাসের ঠিক আগে দেশে আমদানিজনিত চাহিদা বাড়ার পটভূমিতে গত সপ্তাহে আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দর বাড়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। মূলত আগের টানা ১৫ সপ্তাহের মতো এবারও বাজারে ডলারের ব্যাপক জোগান দেখা গেছে, যে কারণে আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার দর প্রতি মার্কিন ডলারে ৬৯ টাকা ৬ পয়সাতেই স্থিতিশীল ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এমন আশাবাদ জেগে ওঠার মধ্য দিয়ে গত সপ্তাহ পার করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজার। সপ্তাহের গোড়ার দিকে সোমবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইউরোপের একক মুদ্রা ইউরো চলতি ২০০৯ সালের সর্বোচ্চে চলে যায়। এ দিন প্রতি ইউরো ১ দশমিক ৪৪০৬ ডলারের বেশি দরে কেনাবেচা হয়।
গত সপ্তাহে (১ থেকে ৭ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের শেয়ারবাজারগুলোতে ঊর্ধ্বগতি দেখা দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে যায়। এতে বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ডলার ছেড়ে দিতে থাকলে ডলারের বিপরীতে ইউরোর দর ব্যাপকভাবে বাড়ে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার খুচরা বিক্রির তথ্য ভালো আসায় সেই দেশের মুদ্রা অস্ট্রেলীয় ডলার জাপানি ইয়েনের বিপরীতে গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যায়। এ সময় প্রতি অস্ট্রেলীয় ডলার ৮০ দশমিক ৮১ ইয়েনে কেনাবেচা হয়।
মার্কিন ডলারের বিপরীতে ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ড-স্টার্লিংয়ের দরও গত নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চে উঠে গত মঙ্গলবার। এ দিন প্রতি পাউন্ড কেনাবেচা হয় ১ দশমিক ৭০০৪ ডলারে। যুক্তরাজ্যের উত্পাদন খাতের তথ্য ভালো হয়েছে এমন খবর প্রকাশ এবং ডলারের বিপরীতে অন্যান্য মুদ্রার দর বাড়ার কারণে এমনটি ঘটেছে বলে ধারণা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
অবশ্য বৃহস্পতিবার ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তাদের ‘পরিমাণগত সহজীকরণ’ শীর্ষক কার্যক্রম আরও কিছু দিন চালাতে পারে এমন ইঙ্গিত দিলে স্টার্লিংয়ের দর খানিকটা পড়ে যায়। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারণী সুদের হারও অপরিবর্তিত রাখে। ফলে প্রতি পাউন্ড-স্টার্লিংয়ের দর প্রায় ১ শতাংশ পড়ে ১ দশমিক ৬৮৫৫ ডলারে কেনাবেচা হয়। প্রতি ডলার প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৯৫ দশমিক ৫০ ইয়েনে কেনাবেচা হয়।
নিউজিল্যান্ডে বেকারত্ব বাড়ার খবরে সে দেশের ডলার মার্কিন ডলারের বিপরীতে কিছুটা মার খায়। এতে প্রতি মার্কিন ডলার শূন্য দশমিক ৬৭০৬ নিউজিল্যান্ড ডলারে লেনদেন হয়।
সপ্তাহের শেষে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভালো কর্মসংস্থান হয়েছে এমন খবর প্রকাশিত হওয়ায় দেশটির মুদ্রা ডলার তেজি হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির যেকোনো খারাপ খবরে কিছু দিন ধরে তাদের ডলার তেজি হয়ে উঠছিল ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের উত্সাহের কারণে। কিন্তু শুক্রবারের ট্রেডিং সেশনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ভালো তথ্য প্রকাশিত হওয়ার খবরে তাদের মুদ্রার দর বাড়ে, যেটাকে বাজারের নতুন মোড় হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা।
সপ্তাহ শেষে প্রতি ইউরো ১ দশমিক ৪১৭২ ডলারে, প্রতি পাউন্ড-স্টার্লিং ১ দশমিক ৬৬৮৫ ডলারে ও প্রতি মার্কিন ডলার ৯৭ দশমিক ৫৬ ইয়েনে কেনাবেচা হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশে আন্তব্যাংক কলমানির বাজারে (ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরস্পর থেকে স্বল্প সময়ের জন্য নেওয়া কর্জ) সুদের হার শূন্য দশমিক ১০ শতাংশে শুরু করে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশে লেনদেন হয়।

চীনের কাছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে বাংলাদেশ- ১০ প্রকল্পে সাড়া, ১৫টির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেই

২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের কাছে ৩২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা (৪৭৪ কোটি ৮২ লাখ ডলার) আর্থিক সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে পাঁচটি প্রকল্পের ব্যাপারে চীন অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছে। আরও পাঁচটির ব্যাপারে সমীক্ষা চালিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত জানাবে তারা। ১৫টির ব্যাপারে চীন এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। প্রকল্পগুলোর জন্য আর্থিক সাহায্য চাইতে ইআরডি সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে আট সদস্যের এক প্রতিনিধিদল সম্প্রতি চীন ঘুরে এসেছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১২টি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেতু বিভাগ এবং সড়ক ও রেলপথ বিভাগের। এ ছাড়া শিল্প, স্থানীয় সরকার, পানিসম্পদ, বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দুটি করে প্রকল্প রয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ, বাণিজ্য, বিদ্যুত্, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রয়েছে একটি করে প্রকল্প।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর মধ্যে সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর জন্য চীনের কাছে চারটি প্রকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর কাজীরটেক সেতু প্রকল্প বা সপ্তম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর জন্য উভয় দেশের মধ্যে ইচ্ছাপত্র সই হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় দুই কোটি ২৮ লাখ ৩০ হাজার ডলার। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের মধ্যে মেঘনা সেতু বা অষ্টম মৈত্রী সেতুর সম্ভাব্য ব্যয় নয় কোটি ২০ লাখ ৩০ হাজার ডলার। মেঘনা-গোমতী সেতু বা নবম সেতুর ব্যয় ১২ কোটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার ডলার, ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে লাবুখালী সেতু বা দশম মৈত্রী সেতুর ব্যয় চার কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার। দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ব্যয় ৫৭ কোটি ৯২ লাখ ১০ হাজার ডলার এবং পিরোজপুর-ঝালকাঠি সড়কের ওপর বেকুটিয়া সেতুর ব্যাপারেও তারা ইতিবাচক বলে জানিয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন নর্থ-ওয়েস্ট ফার্টিলাইজার কোম্পানির জন্য ৫৬ কোটি ডলারের অর্থায়ন প্রস্তাব অনেক আগেই দেওয়া হয়েছিল চীনকে। সিরাজগঞ্জে হওয়ার কথা থাকলেও গ্যাসসংকটের কথা তুলে ধরে এলাকা সরিয়ে তা সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে শাহজালাল সার কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারেও চীনের ইতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। তবে চার কোটি ৫১ লাখ ২৭ হাজার ডলার ব্যয়ের পোশাক খাতের জন্য একটি শিল্পপার্কের ব্যাপারে তারা কোনো আগ্রহ দেখায়নি।
অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুত্ বিভাগের অধীন বড়পুকুরিয়া ১২৫ মেগাওয়াট কোল ফায়ার্ড থার্মাল বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের জন্য ১২ কোটি ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ডলার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সাড়ে তিন কোটি ডলারের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শন কেন্দ্র, স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন ২৬ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার ডলার ব্যয়ের পাগলা/কেরানীগঞ্জ পানি শোধনাগার প্লান্ট প্রকল্প, ১২ কোটি ১৪ লাখ ২০ হাজার ডলার ব্যয়ের নর্থ ঢাকা সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট এবং অ্যাসোসিয়েটেড সুয়ারেজ সিস্টেম প্রকল্প। এর মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। ১০৪ কোটি ডলারের সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। এটিসহ আট কোটি ৮১ লাখ ২৬ হাজার ডলারের এ মন্ত্রণালয়েরই আরেকটি প্রকল্প নিয়ে চীন কিছু বলেনি বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ২১ কোটি ডলারের চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত একক লাইন মিটারগেজ রেলপথ, ১৭ কোটি ২০ লাখ ডলারের যমুনা নদীর ওপর রেলসেতু, ২৮ কোটি ৯৮ লাখ ৬০ হাজার ডলারের কর্ণফুলী টানেল, ৬০ কোটি ডলারের রূপপুর নিউক্লিয়ার বিদ্যুত্ প্রকল্প, ১৩ কোটি ডলারের জাতীয় আইসিটি ইনফ্রা নেটওয়ার্ক এবং পাঁচটি স্কুল নির্মাণসহ ছোটখাটো আরও কয়েকটি প্রকল্প রয়েছে।

গুলি লাগে সিরাজের বুকে by সাইফুল হক মোল্লা

আজ ৮ আগস্ট। মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিরাজ বীর বিক্রমের ৩৮তম শাহাদাতবার্ষিকী। একাত্তরের এই দিনে অসম সাহসী এই যোদ্ধা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শক্তিশালী দুর্গকে ভেঙে জয়ের আনন্দে যখন আত্মহারা, তখন পিছু হটা হানাদারদের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন টগবগে যুবক মো. সিরাজুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সুনামগঞ্জের সাচনাযুদ্ধ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ যুদ্ধেই বীরত্বের সঙ্গে শহীদ হয়েছিলেন তিনি।
কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামের মো. মুকতুল হোসেনের ছেলে ও কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের ছাত্রনেতা এবং সেই সময়ের কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি পদপ্রার্থী সিরাজুল ইসলাম একাত্তরে ভারতের ‘ইকোয়ান’ ক্যাম্পে মে মাসে পঞ্চম ব্যাচে ৩২ দিন প্রশিক্ষণ নেন। পরে মেজর মোসলেহ উদ্দিনের অধীনে সেক্টর-৫-এ যোগ দেন। তাঁর কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন জগেজ্যাতি দাস। কোম্পানিতে তিনি ছিলেন সহকারী কমান্ডার। এ বাহিনীর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর বাট।
৮ আগস্ট ১৯৭১। জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মেজর বাট ময়মনসিংহের চৌকস ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে অগ্রগামী দল (অ্যাডভান্সড পার্টি) গঠন করেন। এ দলের কমান্ডার নিযুক্ত হন সিরাজুল ইসলাম। অগ্রগামী দলের ওপর আদেশ হয় ঢাকা-সিলেট নৌপথে তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমার গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ‘সাচনা বাজার’ শত্রুমুক্ত করার।
রেল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনীর সব রসদপত্র এ পথেই সিলেটে আনা হতো। এর আগে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কপথটি পাকিস্তানি বাহিনী অভিযান পরিচালনা ও রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহার করত। সড়কে জলকলস ও পাগলা নামক দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে সার্বক্ষণিক পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা প্রহরায় থাকত। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ইউনিট চেষ্টা করেও সেতুটি ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়। তখন সিরাজুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীদের ওপর এ দায়িত্ব পড়ে। সিরাজ তাঁর তিন সহযোগীকে নিয়ে রাখাল-মজুরের ছদ্মবেশে সেতুর কাছে সুযোগের অপেক্ষায় জমিতে কাজ করতে থাকেন। ২০ মে রাত ১০টার সময় সুযোগ বুঝে সিরাজ ডিনামাইটের সাহায্যে জলকলস সেতুটি সম্পূর্ণ উড়িয়ে যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করেন।
এ অবস্থায় কোনো বিকল্প সড়ক না থাকায় সাচনা নদীবন্দরের মাধ্যমেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অস্ত্র-গোলাবারুদ ও রসদ সরবরাহ চলত। ফলে সাচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শক্তির সমাবেশ করে পাকিস্তানি বাহিনী গড়ে তোলে এক শক্ত ঘাঁটি। এতে সাচনা ‘রাক্ষুসী সাচনা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। কারণ ইতিপূর্বে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেও মুক্তিযোদ্ধারা সফলতা অর্জন করতে পারেননি। বরং বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের।
সিরাজের নেতৃত্বাধীন অগ্রগামী দলের ওপর সাচনা মুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পড়ে। অগ্রগামী দলের সদস্যরা বিভিন্ন দুঃসাহসী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে যথেষ্ট সুনাম ও প্রশংসা অর্জন করেন। তাই সিদ্ধান্ত হয়, এ বাহিনীর পক্ষেই গেরিলা কায়দায় সাচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প হটিয়ে দেওয়া সম্ভব।
সিদ্ধান্ত মোতাবেক সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে সিরাজের নেতৃত্বে দলটি দুটি ছিপ নৌকায় সাচনার ২৫ মাইল উত্তর দিক থেকে অভিযান শুরু করে।
শ্রাবণের মেঘে আচ্ছাদিত হালকা বৃষ্টির মধ্যে মেজর বাট, ক্যাপ্টেন বিজয় শর্মাসহ অন্যরা অনাড়ম্বরভাবে দলটিকে বিদায় জানান। অত্যাধুনিক অস্ত্র সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁদের অস্ত্র বলতে ছিল হালকা থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর গ্রেনেড। দীর্ঘ তরঙ্গ পাড়ি দিয়ে গভীর রাতে দলটি সাচনার উপকণ্ঠে পৌঁছে আঁটসাঁট করে মাথায় গামছা বেঁধে কমান্ডার সিরাজের সঙ্গে অন্যরা দীপ্ত কণ্ঠে শপথবাক্য উচ্চারণ করেন, ‘মন্ত্রের সাধন, না হয় শরীর পতন।’
ঠিক এ সময় পাকিস্তানি বাহিনী দৈবাত্ ঘটনা আঁচ করে সচকিত হয়ে পড়ে। সুরক্ষিত বাঙ্কারে অবস্থান নেয় এবং অগ্রগামী দলের ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করে। ঘটনার আকস্মিকতায় মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা বিব্রত হলেও কমান্ডার সিরাজ পাল্টা আক্রমণের আদেশ দেন। শুরু হলো প্রচণ্ড যুদ্ধ।
রাতের নীরবতা ভেঙে এক ভয়াল বিভীষিকা নেমে এল সাচনার বুকে। মুহুর্মুহু গর্জনে চারদিক প্রকম্পিত হতে লাগল। ভীতবিহ্বল পাখিরা আর্তকলরবে উড়তে লাগল দিশেহারা হয়ে।
পাকিস্তানি বাহিনী সংখ্যায় কয়েক গুণ বেশি এবং সুরক্ষিত বাঙ্কারে তারা। অগ্রগামী দল উন্মুক্ত জায়গায়। তা ছাড়া পাকিস্তানি বাহিনী মেশিনগানের সাহায্যে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে চলেছে। পাকিস্তানি হানাদার ও অগ্রগামী দলের দূরত্ব মাত্র ১০০ গজের মধ্যে। তার পরও অগ্রগামী দলের যোদ্ধারা মাটির সঙ্গে মিশে, শুয়ে শুয়ে বিভিন্ন কৌশলে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর গেরিলা আক্রমণ করে যেতে লাগল।
সিরাজ বারবার ‘আগাও’, ‘আগাও’ বলে চিত্কার করে তাঁর বাহিনীকে বিপুল বিক্রমে শত্রুশিবিরের সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। যুদ্ধকে প্রায় হাতাহাতি পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে ৩৬ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। শত্রুর প্রতিরোধ ব্যূহ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। তারা পালানোর প্রক্রিয়া শুরু করে।
ঠিক সেই মুহূর্তে যুদ্ধজয়ী সিরাজ আনন্দে আত্মহারা হয়ে নিজ অবস্থান ছেড়ে লাফিয়ে ওঠেন এবং স্বাধীনতার স্লোগান দিতে শুরু করেন। এ সময় ঘটে যায় সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা। পলায়নরত শত্রুর ‘কাভারিং ফায়ারের’ একটি বুলেট এসে লাগল সিরাজের চোখে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। আহত সিরাজকে চিকিৎসার জন্য মিত্রবাহিনীর হেলিকপ্টারে ভারত নেওয়ার সময় পথে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর লাশ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডের নিকটবর্তী টেকেরঘাটে অবতরণ করা হয়। সেখানে সন্ধ্যায় খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়। তাঁর গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানটিকে স্থায়ীভাবে চিহ্নিত করে রাখা হয়।
স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার বিশাল সমাবেশে সাচনার নামকরণ করা হয় ‘সিরাজনগর’। বঙ্গবন্ধু সরকার সিরাজকে অসামান্য বীরত্বের জন্য বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করে।
মৃত্যুর মাত্র নয় দিন আগে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদ সিরাজ তাঁর বাবার কাছে লিখেছিলেন সর্বশেষ চিঠি। একাত্তরের চিঠি বইতে সে চিঠিটি পড়া যাবে।

শেখ হাসিনা: তাঁর দল ও তাঁর সরকার -চলমান রাজনীতি by সৈয়দ বদরুল আহসান

সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার ছয় মাসেরও বেশি সময় অতিবাহিত হবার পর এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে শেখ হাসিনা তাঁর দলের ভেতর যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পর যেভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির ওপর নেতৃত্ব-বিস্তারের সুযোগ লাভ করেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে সবার কাছে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে দল বলতে যা বোঝায় সেই সত্যটি তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে। এবং সেটি হয়েছে তাঁর দৃঢ়তার ফলে, যে দৃঢ়তা তিনি পেয়েছেন দলের এই যুগের, অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের সমর্থনের মাধ্যমে। মোট কথায়, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রচণ্ডভাবে হাসিনা-নির্ভরশীল একটি প্রতিষ্ঠান বা দল এবং বর্তমান সময়ে দলের ভেতরে এমন কেউ নেই, যিনি নেতৃত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে হাসিনার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেন। অবশ্য এটা স্মরণ রাখা দরকার যে ১৯৮১ সাল থেকে আজ অব্দি দলের নেতৃত্বের বিষয়ে শেখ হাসিনা কখনো কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হননি। যাদের তিনি চ্যালেঞ্জ মনে করছেন, যেমন ড. কামাল হোসেন, তাঁদের দলে থাকার খুব একটা সুযোগ দেওয়া হয়নি। কথা এখানে একটাই, শেখ হাসিনার ক্ষমতা দলের ভেতর বরাবরই নিরঙ্কুশভাবে বিরাজমান ছিল এবং সেই ক্ষমতা এই গেল দলীয় কাউন্সিল অধিবেশনের মধ্য দিয়ে আরও শক্তি সঞ্চয় করেছে।
এক কথায় বলা যায়, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগে এক ধরনের ক্যু ঘটিয়ে দিয়েছেন। তিনি দলের শক্তিধর বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের ক্ষমতাচ্যুত করেছেন। এটি ভাবার বিষয় যে তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আব্দুর রাজ্জাকের মতো নেতা আজ এমন এক অবস্থায় আছেন, যেখানে দলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়া তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁরা দলের প্রেসিডিয়ামে নেই। তাঁরা মন্ত্রিসভায়ও নেই। বলা হয়ে থাকে, তাঁদের এ অবস্থার জন্য দায়ী তাঁদের সংস্কারবিষয়ক চিন্তাধারা। শেখ হসিনা ও তাঁর সমর্থকদের একটি বদ্ধ ধারণা হয়েছে যে এসব নেতা তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাইনাস-টু নীতিকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করেছিলেন। এবং সমর্থন করেছিলেন বলেই দলের বিপুলসংখ্যক সদস্য তাঁদের দলের বা সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখতে নারাজ। এবং সে কারণেই নাকি শেখ হাসিনা এঁদের দূরে ঠেলে দিয়েছেন। ভালো কথা। কিন্তু এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে বারংবার এই নেতাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শনের কথা বললেও দলের সভানেত্রী শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমা প্রদর্শনের কোনো মনোভাব দেখাননি। যখন ধরে নেওয়া হয়েছিল যে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যে দলীয় ঐক্য ফিরে আসছে এবং দল আবার সবাইকে নিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করছে, ঠিক তখনই শেখ হাসিনা দলের অভ্যন্তরে তাঁর প্রতিপত্তির কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। তথাকথিত সংস্কারপন্থীদের দল থেকে বহিষ্কার না করলেও তিনি তাঁদের দূরে ছুড়ে ফেলেছেন।
এ তো হলো একটা দিক, ক্ষমা প্রদর্শনের এবং সেই প্রতিশ্রুতি থেকে ফিরে আসার। কিন্তু যেটা আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তা এই যে, ভিন্নমত পোষণ করাকে অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করা। যদি আওয়ামী লীগে কেউ সংস্কারবাদী হয়ে থাকেন, এর অর্থ কখনো এই নয় যে, তিনি দলের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। হ্যাঁ এটা অবশ্য স্বীকার করে নিতেই হয় যে যাঁরা শেখ হাসিনার কঠিন সময়ে তাঁকে তাঁর দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করেছেন, তাঁরা খুব একটা বুদ্ধির পরিচয় দেননি। দলীয় নেতা বা নেত্রী কারাগারে থাকবেন আর সে সুযোগে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, সেটি একটি নৈতিকতাবিরোধী কাজ। তাই বলে এটা অস্বীকার করা চলবে না যে দলের অভ্যন্তরে ভিন্নমত প্রকাশ করার অধিকার দলের সব সদস্যের রয়েছে। ভিন্নমত প্রকাশ করা এবং দলের অন্যদের সেটি মনেপ্রাণে স্বছন্দে গ্রহণ করলেই দলে আধুনিকতা ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রচলন সম্ভব।
কিন্তু আওয়ামী লীগে সেই সত্যটি বিগত কাউন্সিল অধিবেশনে প্রতিফলিত হয়নি। এবং হয়নি বলেই শেখ হাসিনা আগের চেয়ে আরও অধিক ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন। তিনি শুধু বিনা প্রতিন্দ্বন্দ্বিতায় দলের সভানেত্রীর আসন বজায় রাখেননি। তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য একজন নতুন দলীয় সাধারণ সম্পাদকও দল মেনে নিয়েছে। এই যে বিনা নির্বাচনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দুই ব্যক্তিকে পাওয়া গেল এবং অন্যান্য পদ পূরণ করার বিষয়ে দলীয় সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদককে পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হলো, তাতে আওয়ামী লীগে গণতন্ত্র কতটা বিস্তার লাভ করেছে, সে প্রশ্নটি থেকে যায়। আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দলের ভেতর নির্বাচন হবে না এবং দলীয় সভানেত্রী বা নেতা যেমনটি চাইবেন তেমনটি হবে, সেটা বোধ করি দেশের জন্য সুখকর হবে না। দলের ভেতর এক ব্যক্তির প্রতিপত্তি কায়েম হয়ে গেলে সে সত্যটি ক্রমশ অন্য ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়, বিশেষ করে যদি সেই দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। যে অর্থে আমরা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের একমাত্র প্রতীক হিসেবে দেখছি, সেই একই অর্থে আমরা তাঁকে সরকারপ্রধান হিসেবে দেখতে পারি। প্রধানমন্ত্রিত্বে তিনি কী পরিমাণ ক্ষমতার অধিকারী, সে বিষয়ে কমবেশি আমরা সবাই জানি। বিশেষ করে ইদানীংকালে তিনি যেভাবে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়োগ করেছেন এবং মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ করেছেন, তাও লক্ষ করা যায়। তিনি কত ক্ষমতাবান প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠেছেন তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। এক কথায় বলতে গেলে, দেশে বর্তমানে কেবিনেট-শাসিত সরকারের পরিবর্তে চলছে প্রধানমন্ত্রী-শাসিত সরকার। এটা অবশ্য খালেদা জিয়ার সময়ও প্রথা হিসেবে প্রচলিত ছিল। এবং এই প্রথার একটি বিশেষ দিক হলো যে মন্ত্রীবর্গ বরাবরই তাঁদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে থাকেন অথবা জাতিকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেন যে তাঁদের আনুগত্য যতটা জাতীয় সংসদের প্রতি হওয়া দরকার, এর চেয়ে অধিক আনুগত্য রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি। যাঁরা সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন তাঁদের জন্য ব্যাপারটি অত্যন্ত পীড়াদায়ক এ কারণে যে, যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠেন সব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু তখন সংসদ হয়ে পড়ে গুরুত্বহীন। বাংলাদেশের ইতিহাসে, বিশেষ করে ১৯৯১-এর পর থেকে এই ধারাটিই চলে এসেছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাব সমগ্র দেশে যে কত ব্যাপক, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। রাজনীতি এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে আওয়ামী লীগ ও সরকার বলতে শেখ হাসিনাকেই বোঝায়। তিনি যেভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী নেতাদের দলীয় প্রেসিডিয়াম থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, এতে সে কথাই প্রমাণিত হয়। একইভাবে তিনি মন্ত্রিসভার ওপর তাঁর প্রভাব বিস্তার করেছেন। এতেও তাঁর ক্ষমতার ব্যাপকতা প্রকাশ পায়। শেখ হাসিনার এই শক্তিশালী অবস্থানের আরেকটি দিক রয়েছে, এবং সেটি হলো তাঁর উপদেষ্টাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে। যে সাতজন উপদেষ্টাকে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন, সে বিষয়ে যথার্থই জনমনে প্রশ্ন রয়েছে এবং এসব প্রশ্নের মূলে আছে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের কাজের ধরন ও নিয়ম। সাধারণত রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের ক্ষেত্রে উপদেষ্টাদের একটা ভূমিকা থাকে বা থাকতে পারে। থাকতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। তবে যখন ফ্রান্স বা যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি তাঁর কাজের সহায়তা ও সমন্বয়ের জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ করেন, তখন তিনি কখনো উপদেষ্টাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তদারক করতে বলেন না। এ নিয়মটা মেনে চলা হয় যে, একটি মন্ত্রণালয়ে কেবল মন্ত্রীই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। সেখানে কোনো উপদেষ্টার কোনো ভূমিকা নেই এবং থাকেও না। সে নিয়ম বা প্রথাটি আদৌ মনে হয় না মেনে চলা হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারে। মন্ত্রীদের পাশাপাশি উপদেষ্টা রয়েছেন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কাজ দেখার জন্য। পররাষ্ট্র, অর্থ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উপদেষ্টা দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, কার কর্তৃত্ব এসব মন্ত্রণালয়ে থাকবে? মন্ত্রী সংসদে জবাবদিহি করবেন তাঁর কাজ সম্পর্কে। অন্যদিকে উপদেষ্টা কাজ করবেন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে। তাঁরা নির্বাচিত নন এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে তাঁদের জন্য কোনো স্থান বরাদ্দ নেই। তবু তাঁরা আছেন এবং শোনা যাচ্ছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের কাজের ধরনের কারণে মন্ত্রীরা অস্বস্তি বোধ করছেন।
এই অস্বস্তিবোধ আমাদের কারও কাম্য নয়। কিন্তু এই উপদেষ্টাবিষয়ক আলোচনার মধ্য দিয়ে আবার ফুটে ওঠে দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিশালাকৃতির ক্ষমতা। এত ক্ষমতা কি দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে? প্রশ্নটা এ জন্য যে, আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবি। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এমন নেতা বেরিয়ে আসুন, যাঁরা ভবিষ্যতে জাতিকে পথ দেখাতে পারেন, যাঁদের মধ্য থেকে আমরা ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী পেয়ে যাই। সে রকম রাজনীতি আমাদের কাম্য। সে ক্ষেত্রে যখন দেশের রাজনীতি এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে, তখন আমাদের দুশ্চিন্তার উদ্রেক হয়। এই যে তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আব্দুর রাজ্জাক, সাবের হোসেন চৌধুরীর মতো ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের ভেতর দূরে সরিয়ে দেওয়া হলো, তাতে তো ক্ষতি সমগ্র জাতির হলো। আবুল হাসান চৌধুরীকে কয়েক বছর আগে বাধ্য করা হয় দল ত্যাগ করতে। অথচ তাঁর মতো মেধাসম্পন্ন রাজনীতিবিদের খুবই প্রয়োজন আমাদের এই দেশে।
শেখ হাসিনাই এ কাজটি করতে পারেন। কোন কাজ? তিনিই উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন এবং সেটা তাঁর ক্ষমতা ব্যবহার করে দলে ও মন্ত্রিসভায় এমন ব্যক্তিদের স্থান করে দিতে পারেন, যাঁরা তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার ক্ষমতা রাখেন। এবং দ্বিমতের মধ্য দিয়েই কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, দেশ এগিয়ে যায়।
সৈয়দ বদরুল আহসান: সাংবাদিক।

পার্বত্য সমস্যার সমাধান করতে হবে রাজনৈতিক পথেই -আদিবাসী অধিকার by ফিরোজ জামান চৌধুরী

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের এক বহুল আলোচিত বিষয়। সরকারের মেয়াদ সবে সাত মাস পেরিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সরকারের কিছু কর্মকাণ্ড ইতিবাচক বলেই মনে হচ্ছে। সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি খুবই তাত্পর্যপূর্ণ: ‘শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর আরও ৩৫টি ক্যাম্প ও তিনটি পদাতিক ব্যাটালিয়নসহ একটি সম্পূর্ণ ব্রিগেড প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইতিমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন ধাপে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট ২০০টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকার নতুন এই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে (প্রথম আলো, ৩০ জুলাই ২০০৯)।
সেনা প্রত্যাহার নিয়ে সর্বস্তরের জনগণ ও নাগরিক সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে। সবার কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় অবস্থানরত পাঁচ ব্রিগেড থেকে প্রাথমিকভাবে মাত্র এক ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার পরও সেখানে যে বিপুল পরিমাণ সেনাসদস্য অবস্থান করবেন, তা দেশের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে কয়েক গুণ। বিএনপি-জামায়াত আর কিছু বামপন্থী নামধারী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এ ইস্যুতে অকারণ বিরোধিতার ধোঁয়া তুলে পরিস্থিতি বাঁকা পথে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে— এটি কোনোভাবেই পার্বত্যবাসীর জন্য মঙ্গলকর হতে পারে না। তবে যারা বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চায়, তাদের কথা ভিন্ন। পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমেই পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে বা সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়ে যাবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে এই সিদ্ধান্ত পাহাড়িদের প্রতি সরকারের আস্থার প্রতিফলন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একইভাবে সরকারের প্রতিও পার্বত্য জনগণের আস্থা সৃষ্টি হবে যদি সরকার পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী সেখানকার লোকালয়গুলো থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করে নেয়।
এখানে একটি কথা বলা খুবই জরুরি যে সেনা প্রত্যাহার বা সেনাবাহিনীর সংখ্যা কমানোই বড় কথা নয়, পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর ‘অসীম ক্ষমতা’ সীমিত করাও অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাবাহিনী রয়েছে—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য যা থাকা জরুরি। পার্বত্য অঞ্চলেও সেনাবাহিনী থাকতে হবে। তবে পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থানরত সেনাবাহিনী যেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে পাশ কাটিয়ে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করতে পারে তা নিশ্চিত করা দরকার। অপারেশন দাবানল, অপারেশন উত্তরণসহ বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। মোটকথা, তিন পার্বত্য জেলায় সিভিল প্রশাসনকে পুরোপুরিভাবে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর নিয়ন্ত্রকের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
আমাদের বিবেচনায় নেওয়া জরুরি, পার্বত্য চুক্তির পর গত ১১ বছরে পার্বত্য অঞ্চলে কোনো ধরনের যুদ্ধাবস্থা নেই। দু-একটি বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র ঘটনার যে চিত্র আমরা দেখতে পাই, তা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কম। সুতরাং পাহাড়ে সশস্ত্র অবস্থা বিরাজমান—এই অজুহাতে এখানে কোনোভাবেই অতিমাত্রায় সেনা মোতায়েত করা যুক্তিসংগত নয়। অধিক সেনা মোতায়েনের ফলে এখানে যে বিপুল টাকার অপচয় হয়, সেনা প্রত্যাহার করে সেই টাকা পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে এবং এলাকাবাসীর জীবনমানের বিকাশে ব্যয় করা যেতে পারে। পর্যায়ক্রমে সেনা প্রত্যাহারের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে অভ্যন্তরীণ দিক থেকে যেমন স্থিতিশীলতা আনবে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সহায়তা করবে।

২.
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ১৮.১ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনী অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার অবসান করা হবে।’
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে চলেছেন। ২৯ এপ্রিল সফররত ফ্রান্সের নৌ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপে মনে হচ্ছে, সরকার সে পথেই এগোচ্ছে।
দীর্ঘ দুই দশকের সশস্ত্র আন্দোলন, রক্তক্ষয়ের পর অনেক প্রচেষ্টার ফসল পার্বত্য চুক্তি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর আওয়ামী লীগ সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় ছিল; কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নে তারা সত্যিকারভাবে গতিশীল পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এরপর ২০০১ সালে চুক্তির বিরোধিতাকারী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে চুক্তি বাতিল না করলেও চুক্তির বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির করে রেখেছিল। দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পার্বত্য অঞ্চলে মোবাইল ফোন চালুর বিষয়টি পাহাড়িদের জন্য ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা। যাঁরা আশঙ্কা করতেন, মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক চালু হলে পাহাড়ে সংঘাত-সংঘর্ষ বাড়বে, তাঁদের আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হয়েছে। এবারের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও পাহাড়ে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতার পুনরাবৃত্তি করবে না বলেই আশা করা যায়। সামরিক পথে পার্বত্য সমস্যার সমাধান মিলবে না—এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে রাজনৈতিক পথেই। শেখ হাসিনার সরকার দ্বিতীয়বারের মতো সে লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য জনপদের মানুষ তিনটি আসনেই আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করে পুনর্বার তাদের ওপর আস্থা স্থাপন করেছেন। তাই চুক্তি বাস্তবায়নে এই সরকারের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে।
পার্বত্য চুক্তির পরপরই প্রতিষ্ঠিত ওই অঞ্চলের প্রধানতম রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ শুরু থেকেই পার্বত্য চুক্তির বিরোধিতা করে আসছিল। তারাও এখন কিছুটা নমনীয় হয়েছে। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ইউপিডিএফও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন চাইছে। তাই সরকারের উচিৎ হবে, পার্বত্য চুক্তি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাহাড়ি জনগণের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট হওয়া।
চুক্তির অন্যতম প্রধান ও মৌলিক কাজ ভূমিবিরোধ নিরসন। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি সময়ভিত্তিক সূচি প্রণয়ন করে তা অনুসরণ করা উচিৎ। এতে চুক্তির বিভিন্ন বিষয়ের সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত হতে পারে। এটা আশা করা খুব অমূলক হবে না যে সরকারের সদিচ্ছা লোকদেখানো না হলে এ সরকারের সময়ই পার্বত্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।

৩.
খুবই বিস্ময়কর ও দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের সংবিধানে আদিবাসীদের কোনো স্বীকৃতি নেই। তারা যেন ‘নিজভূমে পরবাসী’। পার্বত্য অঞ্চলের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা) কর্তৃক গণপরিষদে উত্থাপিত (১৯৭২) আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নাকচ হয়ে গিয়েছিল। ড. কামাল হোসেন, আমীর-উল ইসলাম, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ সংবিধান প্রণেতারা এ দায় এড়াতে পারেন না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে রাঙামাটিতে এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘আজ থেকে তোমরা সবাই বাঙালি হয়ে যাও’—তাঁর এ বক্তব্যে পাহাড়িদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু নিপীড়নমূলক পথে অগ্রসর হননি ঠিকই, তবে পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে তাঁর কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। পরবর্তীকালে নিয়মতান্ত্রিক সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে এম এন লারমা সশস্ত্র বিপ্লবের পথ গ্রহণ করেন। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ সরকার পাহাড়িদের দমন-পীড়নের পাশাপাশি বাঙালি পুনর্বাসনের মাধ্যমে পাহাড়িদের সংখ্যালঘু করার কৌশল গ্রহণ করে। প্রায় দুই দশক সশস্ত্র সংঘর্ষের পর ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি।
বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলের প্রধান সমস্যা ভূমিবিরোধ ও ভূমিদখল। পার্বত্য চুক্তির ১২ বছর হতে চলল, কিন্তু এখনো এ সমস্যার কোনো পরিপূর্ণ সমাধান হলো না। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও পার্বত্য অঞ্চলে এখনো ভূমিদখল এবং বহিরাগত বাঙালিদের বসতি স্থাপন অব্যাহত রয়েছে। পাহাড়িদের ভূমিদখল বন্ধ করতে হলে এর পৃষ্ঠপোষকদেরও থামাতে হবে—এ ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
সর্বশেষ মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ‘উপজাতি’ শব্দটির পরিবর্তন করে তাদের আদিবাসী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বলে অভিহিত করা হবে। ১৯৯৭ সালে সরকার পার্বত্য চুক্তির দলিলে ‘উপজাতি’ শব্দটি পরিহার করার সাহস দেখায়নি; ১২ বছরের ব্যবধানে সেই সরকারই যখন ‘উপজাতি’র পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ বা ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ শব্দ ব্যবহার করতে উদ্যোগী হয়, তখন তা সরকারের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখা যায়। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষজন নিজেদের কী নামে পরিচয় দিতে আগ্রহী, সে বিষয়ে তাঁদের চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ। এ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পাহাড়ি আদিবাসী ও সমতলের আদিবাসী নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দীর্ঘ তিন যুগ পর আবার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। এই সংসদে আদিবাসী সম্প্রদায় থেকে পাঁচজন সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে দুজন প্রতিমন্ত্রী এবং দুজন প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় সরকারি দায়িত্ব পেয়েছেন। তাই সংগত কারণেই আমাদের প্রত্যাশা, তাঁরা আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে সংসদে উত্থাপন করবেন। সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৫৪তম বার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীও সংবিধানে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবির প্রতি সহমত পোষণ করেছেন।
সাংবিধানিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। কারণ, পার্বত্য অঞ্চল ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য রয়েছে পৃথক বিধিবিধান। যেমন: ১৯০০ সালের শাসনবিধি ও ১৯৯৭-এর পার্বত্য চুক্তির কার্যকারিতা যেমন সমতলের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তেমনি সমতলের আদিবাসীদের জন্য প্রযোজ্য অনেক আইন-কানুনও পার্বত্য চট্টগ্রামের উপযোগী নয়। তাই সংবিধানে পাহাড়ি আদিবাসী ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক বিধান রাখা অপরিহার্য।
বাঙালির পাশাপাশি দেশের সব জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পিছপা হবে না বলেই আমরা আশা করতে চাই। বাংলাদেশ বহু জাতি, বহু ভাষা, বহু ধর্ম ও বহু সংস্কৃতির দেশ—এই সত্যের স্বীকৃতি দিতে হবে সংবিধানসহ জীবনের সবক্ষেত্রে।
ফিরোজ জামান চৌধুরী: সাংবাদিক।
firoz.choudhury@yahoo.com

কলকাতার টুকরো ডায়েরি by ফারুক চৌধুরী

গত ২১ থেকে ৩১ জুলাই ২০০৯—এই ১০ দিন কলকাতায় কাটিয়ে এলাম। কলকাতা, শহর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ৩০০ বছর আগে। তত দিনে ঢাকার শতায়ু প্রাপ্তি হয়ে গেছে। গত ৩০০ বছরে এই শহর দুটি বিভিন্ন মর্যাদায় অবস্থান করেছে। ভারতের রাজধানী থেকে কলকাতা এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী, আর নানা উত্থান-পতনের চাকায় পড়ে সুবা বাংলার রাজধানী থেকে ডিভিশন শহর, আর প্রাদেশিক রাজধানী থেকে এখন ঢাকা রাজধানী একটি স্বাধীন দেশের। বিগত শতাব্দীগুলোয় আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণে দুই শহরের মাঝে সম্পর্কে এসেছে প্রভূত পরিবর্তন—কখনো নৈকট্যে, কখনো বা দূরত্বে। তবে গত ছয় দশকের ব্রিটিশ-উত্তর সময়ের মোদ্দাকথাটি হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহর দুটির বৈশিষ্ট্য এবং ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ভিন্ন থেকে ভিন্নতরই হচ্ছে। স্বভাবতই স্বাধীন দুটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আর ভারতের যাত্রাপথে ভিন্নতা রয়েছে। কেবল ভাষার বাঁধনের সীমাবদ্ধতা বহুরূপেই এখন দৃশ্যমান।
তবে এবার কলকাতা যাত্রায় উপলব্ধি করলাম, ঘড়ির কাঁটা ধরে সময়ের মাপে এখন দুই শহরের মাঝে যে ব্যবধান, এমনতর আমার জানামতে আগে কখনো ঘটেনি। এখন ঢাকায় যখন ভোর ছয়টা, কলকাতায় তখনো কাক ডাকেনি। বিমানযোগে ঢাকা থেকে মিনিট চল্লিশের ওড়ানের পরও হাতে সময় বাঁচে আধা ঘণ্টারও বেশি। এই অভিজ্ঞতায় নতুনত্ব ছিল বৈকি।
ঢাকার যেকোনো নাগরিকেরই আজকাল ঢাকা ত্যাগকালে যানজট থেকে, সাময়িক হলেও, পরিত্রাণের সুখকর একটি ভাবনা থাকে। কিন্তু বিধি বাম! আমার বেলায় এ যাত্রায় তা হলো না, বরং যা ঘটল তা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। কলকাতার নেতাজি সুভাষ বিমানবন্দর থেকে চৌরঙ্গিতে আমার হোটেলে যেতে লেগে গেল তিনটি ঘণ্টা। ঢাকা থেকে কলকাতা গিয়ে আমি যেন পড়লাম, ‘ফ্রাইং প্যান’ থেকে ‘ফায়ারে’! কলকাতায় নামার আগে জানা ছিল না ২১ জুলাই বিকেলে তৃণমূল কংগ্রেস বিরাট জনসভা ডেকেছে। সভা অনুষ্ঠিত হবে ‘অ্যাসপ্লেনেডে’ আমার চৌরঙ্গি হোটেলের অনতি দূরে। সভার প্রধান বক্তা ছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি।
তবে এইটুকু বলব যে যানজটের মাঝেও পুলিশের নির্দেশ মোতাবেকই গাড়ি চালান চালকেরা। এই বোধশক্তি চালকদের রয়েছে যে ট্রাফিক পুলিশের হুকুম শিরোধার্য করাই হচ্ছে যানজটের মাঝে গন্তব্যে পৌঁছার প্রকৃষ্ট পন্থা। ঢাকার মতো ‘ফ্রি ফর অল’ নয়।
কী বিরাট জনসভা মমতা ব্যানার্জির! প্রায় ছয় লাখ মানুষের সমাগম ছিল সেখানে। মমতা ব্যানার্জি, কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী, কিন্তু চোখ তাঁর ‘রাইটার্স বিল্ডিং’-এ ক্ষমতা দখলের ওপর। একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা তো মমতা ব্যানার্জির জনসভাকে বিগত কয়েক দশকের মাঝে চতুর্থ বৃহত্তম জনসভা বলে আখ্যায়িত করল। ১৯৭২ সালের বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরার ১০ লাখ মানুষের সমাবেশ ছিল, তার মাঝে বৃহত্তম। বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরার সেই জনসভার একটি ছবিও ছাপাল পত্রিকাটি। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণার আগে, জয় প্রকাশ নারায়ণের একটি জনসভায় নাকি নয় লাখ লোকের সমাগম হয়েছিল। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ১৯৭৭ সালে জ্যোতিবাবুর বামফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় রাজভবনের চারধারে জনতার ঢল। তারপরই হলো মমতা ব্যানার্জির ২১ জুলাইয়ের জনসমাগম আর যানজট। এমন দিনে কলকাতায় যাওয়া, একেই বলে ‘ফ্রাইং প্যান থেকে ফায়ারে’। তবে লক্ষ করলাম রাজপথে তৃণমূল সমর্থক জনতা আর বামপন্থী রাজ্য সরকারের পুলিশ বা প্রশাসন যন্ত্রের মাঝে কোনো অহেতুক তিক্ততা নেই। বিপুল করতালি আর হর্ষধ্বনির মাঝে মমতা ব্যানার্জি বললেন, রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় এলে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কংগ্রেসের প্রতি লক্ষ রেখে বললেন, “আমাদের সরকারে, ‘আমরা’-‘ওরা’ থাকবে না, ‘আমাদের’ থাকবে।” কথায় বড়, কিন্তু কাজে কি তত বড় হতে পারবেন মমতা? তিনি বললেন, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট টিকিয়ে রাখবেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে রাজ্য সরকার আর কেন্দ্রীয় সরকারের মাঝে ইতিমধ্যেই টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রহ এবং স্বার্থ, তৃণমূলের আগ্রহ আর স্বার্থের চেয়ে ভিন্নতর। অথচ মমতা ব্যানার্জি এখন তো কেন্দ্রেরই মন্ত্রী। জোটের ভবিষ্যৎ যে কণ্টকাকীর্ণ হবে, এর অনেক আলামত এখনই পাওয়া যাচ্ছে—তা লোকসভায় ভূমি অধিগ্রহণ আইন পাস করা থেকে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে। তা ছাড়া আগামীর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতায় আসতে অনেক কাঠখড়ই পোড়াতে হবে কংগ্রেস আর তৃণমূলের। এদিকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বামপন্থীদের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। যদি রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বিপন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে রাজ্যে গভর্নরের, অর্থাৎ কেন্দ্রীয় শাসনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতএব, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চিমবঙ্গের আগামীর বিবর্তন আগ্রহ-উদ্দীপকই বইবে। ওই জনসভায় মমতা ব্যানার্জি বললেন, ‘বিনয়’ আর ‘উন্নয়ন’—এই দুই ‘অস্ত্রের’ মাধ্যমেই তিনি রাজ্যে ‘পরিবর্তন’ আনবেন। তবে গ্রামাঞ্চল থেকে বামপন্থী আর তৃণমূলের সংঘর্ষে হতাহতের খবরে মনে হয় যে ‘বিনয়’ আর ‘উন্নয়নের’ চেয়েও ধারালো ‘অস্ত্র’ ব্যবহার করছেন দুই দলের অনুসারীরা!
কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী হিসেবে মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের রেলযোগাযোগে উন্নতিসাধনের যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। তবে তাঁর ‘চমক’ হবে কিছুদিনের মধ্যে চালু হওয়া কলকাতা-দিল্লি দ্রুত আরামদায়ক ট্রেন সার্ভিস, যা কলকাতা থেকে সোজা দিল্লিতে থামবে। কলকাতার এক বন্ধুর মন্তব্য, ট্রেনটি আসলে থামবে দিল্লিতে নয়—ফিরে এসে থামবে কলকাতার ‘মহাকরণ’ অর্থাৎ রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সচিবালয়ে!
কিছুদিন আগে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম ঢাকায় এসেছিলেন। কলকাতায় গিয়ে দেখি তাঁকে নিয়ে মহা হইচই। তাঁর বাংলাদেশ সফর নিয়ে নয়, সেই সফরে কলকাতার সংবাদমাধ্যম কোনো নজর দিয়েছে বলে মনে হলো না। হইচই হলো; গত ২১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার পথে দিল্লি বিমানবন্দরে নাকি যুক্তরাষ্ট্রের ‘কন্টিনেন্টেল এয়ারলাইনস’-এর নিরাপত্তাকর্মীরা আবদুল কালামের দেহ তল্লাশি করেছেন। এই দেহ তল্লাশি ভারতের রাষ্ট্রাচার নিয়মের পরিপন্থী বলে বিরোধী দল হইচই শুরু করল, প্রথমে লোকসভায় এবং পরে রাজ্যসভায়। বিষয়টি বেশি দূর গড়ানোর আগেই সরকারের চাপের মুখে কন্টিনেন্টেল এয়ারলাইনস ক্ষমা চাইল আবদুল কালামের কাছে (আবদুল কালাম বর্তমান বিরোধী দল গোষ্ঠীরই মনোনীত রাষ্ট্রপতি ছিলেন)। তবে মজার কথাটি হলো, তাঁর মুখপাত্রের ভাষ্যে, আবদুল কালাম কিন্তু জুতা খোলা থেকে দেহ তল্লাশি প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছায়ই আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কোনো ওজর-আপত্তি তিনি তোলেননি। তবুও ব্যবসায় সাবধানতার মার নেই—কথাটি কন্টিনেন্টেল এয়ারলাইনস ভালো করেই জানে!
আমার কলকাতা অবস্থানকালে ভারতের লোকসভায় ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে বিরোধী দল আর সরকারের মাঝে বিপুল উত্তেজনা সৃষ্টি হলো। কারণ হচ্ছে, মিসরের ‘শারম আল শেখ’-এ মনমোহন সিং আর ইউসুফ রাজা জিলানির সাক্ষাতের পর যে যুগ্ম বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী জিলানি জানিয়েছেন, বেলুচিস্তান এবং ‘অন্যান্য এলাকার’ ওপর সম্ভাব্য হামলার কিছু তথ্য পাকিস্তানের কাছে রয়েছে। এটা পড়ে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছে বিজেপি। তাদের কথা হলো, বেলুচিস্তান হলো পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। অতএব, বেলুচিস্তানের উল্লেখ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যুগ্ম বিবৃতিতে কেন থাকবে। তাদের কথা হলো, একবার পাকিস্তান যখন বেলুচিস্তানের কথা একটি যুগ্ম বিবৃতিতে উল্লেখ করে ফেলেছে, পাকিস্তান ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বারবার বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ টেনে আনবে। একা কাশ্মীরের রক্ষে নেই, এখন বেলুচিস্তান দোসর!
বেলুচিস্তানে কে কী হামলা করছে, তা আমার জানা নেই। তবে গত মে মাসে পাকিস্তান সফর শেষে আমি প্রথম আলোর পাতায়ই লিখেছিলাম, ‘পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে রয়েছে বিশালাকার বিক্ষুব্ধ, বিদ্রোহী বেলুচিস্তান। বিচ্ছিন্নতাবাদের দাবি এখন বেলুচিস্তানের সর্বত্র। যুগ যুগ ধরে বেলুচিস্তানের ওপর নিষ্পেষণ এবং সেই প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ জবরদখলের খেসারত এখন পাকিস্তানকে দিতে হচ্ছে। অবস্থা এতই গুরুতর যে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উত্তোলন অথবা জাতীয় সংগীত পরিবেশন বেলুচি সম্প্রদায়ের মধ্যে নিষিদ্ধ...।’
শারম আল শেখের যুগ্ম বিবৃতিতে বেলুচিস্তানের উল্লেখ, বিজেপির মতে, পাকিস্তানের কাছে ভারতের কূটনৈতিক পরাজয়ের শামিল। কারণ, বেলুচিস্তানের সমস্যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। তার সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই। এই লাইন ধরেই লোকসভায় লালকৃষ্ণ আদভানি, যশোবন্ত সিংহ, সুষমা স্বরাজ প্রমুখ বিজেপি নেতা সরকারের তুলোধোনা করে ছাড়লেন। এসব অভিযোগের জবাব প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাঁর স্বভাবসিদ্ধ নম্রতায় ভালোই দিলেন। তিনি বললেন, তাঁর পূর্বসূরি অটল বিহারি বাজপেয়ি লাহোর যাওয়ার রাজনৈতিক সাহস দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরে এল কারগিল এবং হাইজেকিং। তা সত্ত্বেও তিনি পারভেজ মোশাররফকে আগ্রায় আমন্ত্রণ জানালেন। তারপর দিল্লির পার্লামেন্টের ওপর সন্ত্রাসী হামলা হলো। তবুও দমলেন না বাজপেয়ি। মনমোহন সিং বললেন তিনিও বাজপেয়ির ‘ভিশনে’ বিশ্বাসী। তাঁর বিশ্বাস, শান্তি স্থাপন ভারতের মতো পাকিস্তানও কামনা করে। পাকিস্তানের নেতারা এখন অনুধাবন করেন যে পাকিস্তান যদি সন্ত্রাসকে পরাজিত না করে, তাহলে সন্ত্রাসই পাকিস্তানকে পরাস্ত করবে। মনমোহন সিং বললেন, পাকিস্তানের বর্তমান নেতৃত্ব সন্ত্রাস দমনে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে বলেই তাঁর বিশ্বাস। বললেন, যশোবন্ত সিংহ প্রশ্ন উঠিয়েছেন, ‘আমরা কি পাকিস্তানকে বিশ্বাস করি?’ ‘প্রেসিডেন্ট রেগানের উদ্ধৃতি দিয়ে মনমোহন সিং বললেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর উচিৎ একে অপরের ওপর বিশ্বাস রাখা, কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে নজরদারিও রাখা (Trust and Verify)। মনমোহন সিংয়ের মৃদুভাষণ ভালোই ছিল। কিন্তু তবুও তাঁর সমর্থনে জোরালো ভাষায় বক্তব্য দিলেন সাবেক বিদেশ মন্ত্রী এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। তিনি বললেন, বেলুচিস্তান সম্পর্কে পাকিস্তানের বক্তব্যটি একতরফা। আসলে এ বিষয়ে ভারতের কিছুই লুকানোর নেই। কিন্তু বিষয়টি যেহেতু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের, নবনিযুক্ত বিদেশ মন্ত্রী এস এম কৃষ্ণকে কিছু বলতেই হয়। প্রণব বাবুর কথার রেশ ধরে তিনি বললেন, বেলুচিস্তান নিয়ে ভারতের লুকানোর কিছু নেই। কিন্তু তার পরের উক্তিটি ছিল অপ্রয়োজনীয়। তিনি বললেন, ভারতের কিছু লুকানোর নেই বলেই যুক্ত বিবৃতিতে বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ উল্লেখ করার প্রস্তাবটিতে ভারত ‘তাত্ক্ষণিকভাবে’ (readily) রাজি হয়ে যায়। তার এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করল বিজেপি। তাদের অভিযোগ, বিদেশ মন্ত্রী হিসেবে এস এম কৃষ্ণ অদক্ষতা ও অনজ্ঞিতাই দেখিয়েছেন এবং তিনি বর্তমান সরকারের জন্য বিরাট বোঝা। এই বলে লোকসভা থেকে ওয়াকআউট করল বিরোধী দল।
কিছু বিশেষজ্ঞের অভিমত হলো, বেলুচিস্তানের উল্লেখটি না থাকলেই ভারতের জন্য ভালো হতো এবং এতে রাজি হয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়নি। তবে মহাভারত তাতে অশুদ্ধ হয়ে যায়নি, বরং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, মনমোহন সিংয়ের উক্তির প্রশংসা করেছেন এবং কিছুটা অনর্থক এই কাজিয়ার মধ্য দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবনে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে মতৈক্য আরও প্রগাঢ় হয়েছে। এখানে মনে রাখা ভালো যে, পাকিস্তানে যেহেতু এখন একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে, যার সঙ্গে ভাবনার লেনদেন ভারতের নেতাদের জন্য আগের চেয়ে সহজতর। তা ছাড়া সন্ত্রাস দমনের দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য শক্তির বাড়তি চাপ তো রয়েছেই।
বাংলাদেশ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে ক্রিকেটই ছিল আমার কলকাতা থাকাকালীন সেখানকার সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে উল্লেখের প্রধান বিষয়। মাশরাফি, সাকিব, আশরাফুল—তাদের নাম কলকাতার ক্রিকেট প্রেমিকদের কাছে এখন পরিচিত। তবে অবাক লাগল যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আর্থরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি, এমনকি টিপাইমুখের মতো দ্বিপক্ষীয় সমস্যার প্রতি, কলকাতার সংবাদমাধ্যমের চরম ঔদাসীন্য দেখে। কলকাতায় কোনো বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল দেখা যায় না। মুঠোফোন না থাকলে কলকাতায় বসে বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো খবরই পেতাম না। বাংলাদেশের খবর কখনো বা জেনেছি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী আপনজনের করুণায়। এ অবস্থাটি ভয়ানক অস্বস্তিকর। আর মুখের মিঠে বুলি সত্ত্বেও নৈকট্যের ভাবটি হারিয়ে যায়। মনে হয় দূরের কোনো এক দেশে যেন এসেছি।
পাশ্চাত্য দেশগুলোর, ঘরের অথবা এলাকার মানুষকে কূটনীতিক প্রতিনিধি করে পাঠানোর প্রবণতা যেন বাড়ছে (বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের আনোয়ার চৌধুরী এবং যুক্তরাষ্ট্রের গীতা পাসি)। যুক্তরাজ্য এবার কলকাতায় কূটনীতিক প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছে কলকাতায়ই জন্ম নেওয়া একজন কূটনীতিককে। কলকাতার যুক্তরাষ্ট্রের নবাগত এই হাইকমিশনারের নাম সঞ্চয় ওয়াদভানি। জন্ম কলকাতায় ১৯৬৬ সালে (আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলনের সময়ে) আর পরিবারের সঙ্গে দেশান্তরি হয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে। অবশ্য ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কূটনীতিক চুনোপুঁটিরা বাংলাদেশের মতো নাক গলানোর সুযোগ পান না। সেই অর্থে এই নিয়োগবিধির কোনো বিশেষ তাত্পর্য নেই।
ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব; কলাম লেখক।

দ্রুত এগুলো রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হোক -নষ্ট হচ্ছে ১৪টি ফেরি ও পন্টুন

কথায় বলে, ‘সরকার কা মাল দরিয়া মে ঢাল।’ তারই একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ তৈরি করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। পটুয়াখালীর কলাপাড়া-কুয়াকাটা সড়কের কলাপাড়া, হাজীপুর ও মহীপুর ফেরিঘাটের পাশে নয়টি ফেরি ও পাঁচটি পন্টুন কয়েক বছর ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। ফেরি ও পন্টুনের বেশির ভাগ অংশই কাদার নিচে চলে গেছে। মরিচা ধরে নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি একশ্রেণীর অসাধু কর্মচারীর সহায়তায় চোরেরা যন্ত্রাংশ বা লোহা কেটে নিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মঙ্গলবারের প্রথম আলোয় প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদনটি দেখলে বা পড়লে দেশের যেকোনো নাগরিক ব্যথিত হবেন। অস্ফুটে হলেও বলবেন, ‘আহারে!’ কিন্তু কয়েক কোটি টাকার সম্পদ এভাবে নষ্ট হওয়া নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কলাপাড়ায় কর্মরত সড়ক ও জনপথ বিভাগের সুপারভাইজার এনামুল হক বললেন, ‘আমার কাজ সচল ফেরি তদারক করা।’ তার মানে, অচল ফেরিগুলো সাগরে ভেসে যাক, তাতে তাঁর যেন কিছু আসে-যায় না। উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অবশ্য জানিয়েছেন, দুটি ফেরি মেরামতের উদ্যোগ তাঁরা নিয়েছেন। কয়েকটি ধাপে মেরামত করা হবে। বাকি অকেজো ফেরি ও পন্টুনগুলো নিলামে বিক্রি করার জন্য বিভাগীয় জরিপ করা হয়েছে। এখন নিলাম করা না-করা উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপার।
অথচ, কয়েক বছর আগেই যদি ফেরি ও পন্টুনগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো সব ফেরিই সচল করা যেত। এত বছর পড়ে থাকার ফলে মরিচা ধরা যন্ত্রপাতি আদৌ সচল করা যাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। আরও আগে নিলামে বিক্রি করলে যে দাম পাওয়া যেত, তাও এখন পাওয়া সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নিতে যদি আরও কয়েক বছর লেগে যায়, তাহলে এগুলো নিলামেও বিক্রি হবে কি না বলা কঠিন। কিন্তু সরকারি সম্পদের এ হাল কেন হবে? যাঁদের হাতে সরকারি সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব, তাঁদের সম্ভবত রাষ্ট্রের এই ক্ষতির জন্য কারও কাছে কোনো জবাবদিহিই করতে হয় না। জবাবদিহিতা থাকলে নিশ্চয়ই তাঁরা এটা করতে পারতেন না।
সরকারি সম্পদ জনগণের সম্পদ। এগুলো এভাবে নষ্ট করার অধিকার কারও নেই। আমরা আশা করি, জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসা মহাজোট সরকার এর গুরুত্ব বুঝবে। অচল ফেরি ও পন্টুনগুলো রক্ষায় দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি জনগণের সম্পদ ধ্বংসের জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।