Sunday, October 21, 2018

নির্বাচনের আগে সোস্যাল মিডিয়ার ওপর ‘ক্র্যাকডাউন’

জাতীয় নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর ব্যপকহারে নজরদারি শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। ফলে বাকস্বাধীনতার ওপর শীতল প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে এমন মন্তব্য করেছে।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক, ইন্টারনেটে মন্তব্যকারী ও সম্প্রচার ব্যক্তিত্বদের টার্গেট করতে নিপীড়নমূলক আইন ও নীতিমালা ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। বিরোধী দলসমূহ ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ক্রমবর্ধমান এই দমনপীড়ন মূলত নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারের সমালোচনা ও বাকস্বাধীনতা সীমিত করার চেষ্টা। সরকার দাবি করছে, ক্ষতিকর গুজব, মিথ্যা তথ্য অথবা আপত্তিকর বিষয়বস্তুর লাগাম টেনে ধরে আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এসব প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে।
তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের স্তব্ধ করতে জননিরাপত্তার কারণকে ব্যবহার করছে বাংলাদেশ। নির্বাচনের আগে আগে সরকারের নজরদারিমূলক চর্চা মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘণ করছে।’
বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছে। ভিন্নমত প্রকাশে ও বিক্ষোভ আয়োজনে সোস্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে পরিণত হওয়ার পর থেকেই, কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও ইন্টারনেট ভিত্তিক যোগাযোগের ওপর নজরদারি শুরু করেছে।
এর ফলে ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সরকারের সমালোচনা করার অভিযোগে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বর্ধিত নজরদারি
২০১৮ সালের ৯ই অক্টোবর, সরকার ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘গুজব সনাক্ত’ করতে নয় সদস্য বিশিষ্ট একটি নজরদারি সেল গঠন করার ঘোষণা দেয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেছেন, যেসব বিষয়বস্তু (কনটেন্ট) সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে হুমকির মুখে ফেলে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা  বিঘ্নিত করে কিংবা রাষ্ট্রকে বিব্রত করে সেসবকে গুজব হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এবং, ফিল্টারিং  কিংবা  ব্লকিং-এর জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, শুধুমাত্র মানুষ যাতে ‘শুধু সঠিক তথ্য’ পায় তা নিশ্চিত করাই এই প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ সরকার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকেও অনলাইনে তাদের নজরদারি বৃদ্ধি করার আদেশ দিয়েছে। এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এই প্যারামিলিটারি বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বলপূর্বক অন্তর্ধানসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘণের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট। র‌্যাবের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘দেশের আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা ছাড়াও আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশুভ অপপ্রচার ও জঙ্গি তৎপরতা নজরদারি করা এবং নেপথ্যের ব্যক্তিদেরকে বিচারের আওতায় আনতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবো।’
সরকার ইতিপূর্বে ‘সাইবার থ্রেট ডিটেকশন অ্যান্ড রেসপন্স’ প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে বলেছিল, বাংলাদেশের যোগাযোগ নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গণনজরদারি যন্ত্রপাতি ইন্সটল করা হবে। এর মাধ্যমে ব্যপকহারে টেলিকম ও ইন্টারনেট নজরদারির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। অপরাধ কর্মকান্ডের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে কর্তৃপক্ষকে সহায়তার জন্য এই প্রকল্পের নকশা করা হয়েছে। তবে এর মাধ্যমে মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নজরদারি করার বিপুল ক্ষমতা পেয়েছে সরকার। ফলে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা গণহারে লঙ্ঘণের আশঙ্কা বেড়েছে।
ভিন্নমতের ওপর দমনপীড়ন
টেলিভিশন নেটওয়ার্কসমূহ ইতিমধ্যেই সরকারের চাপে রয়েছে। প্রস্তাবিত জাতীয় সম্প্রচার আইন ২০১৮-এর অধীনে তারা বর্ধিত বিধিনিষেধের  আওতায় পড়বে। এই আইন ১৫ই অক্টোবর মন্ত্রীসভা অনুমোদন দিয়েছে। আইনে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে যাওয়া কিংবা বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা তথ্য প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
১১ই অক্টোবর, প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য অ্যাক্টিভিস্ট  ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী,  যিনি বিরোধী রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত, তার বিরুদ্ধে টেলিভিশন টকশোতে সেনাপ্রধানের সমালোচনা করায় পুলিশি অভিযোগ (জিডি) দায়ের করা হয়েছে। গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে।
১০ই অক্টোবর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) নামে একটি আইন কার্যকর হয়েছে। এই আইন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি) ৫৭ ধারাকে প্রতিস্থাপন করেছে,  যেই ধারায় শাস্তি আরও কঠোর ও যেটি বিভিন্ন দিক দিয়ে অনেক বিস্তৃতভাবে সংজ্ঞায়িত। এই নতুন আইনানুযায়ী যেসব অনলাইন তথ্য ‘দেশ বা দেশের অংশবিশেষের ঐক্য, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, নিরাপত্তা,  প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জননিরাপত্তাকে বিনষ্ট করে কিংবা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রচার করে’ সেসব মুছে ফেলা বা ব্লক করতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যপক কিছু ক্ষমতা পাবে।
এই আইনের নয়টি ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়েছিল সাংবাদিকরা। সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ৩রা অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শুধুমাত্র যেসব সাংবাদিক আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করেছে এবং নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর একের পর এক আরও মিথ্যা সংবাদ ছড়াতে অপেক্ষা করছে, তাদেরই এই আইন নিয়ে চিন্তিত হওয়া উচিৎ।’
তবে সাংবাদিকদের চিন্তিত হওয়ার কারণ রয়েছে, কারণ রাষ্ট্রদ্রোহ ও ফৌজদারি মানহানি বিষয়ক বিদ্যমান আইনসমূহকে সাংবাদিকদের হুমকি দিতে বা আটক করতে ব্যবহার করা হয়েছে বাকস্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ চর্চার কারণে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাংবাদিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেন, ‘দেশের ওপর ভয়ের আচ্ছাদন বিরাজ করছে। আমরা জানি না কখন আমরা মুক্তি পাব।’
আরও উদ্বেগ রয়েছে যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি, আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার মতোই, সোস্যাল মিডিয়ায় শান্তিপূর্ণ বিষয়বস্তু দমনে ব্যবহৃত হবে।
৪ঠা আগস্ট রাতে পুলিশ নুসরাত জাহান সোনিয়া নামে ২৫ বছর বয়সী একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে পাটুয়াখালি জেলার প্রত্যন্ত এক অঞ্চল থেকে আটক করে। তিনি তখন ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ৫৭ ধারার অধীনে তাকে ২ সপ্তাহ আটক রাখে পুলিশ। সোনিয়ার কথিত অভিযোগ ছিল গুজব ছড়ানো। তবে তার পরিবারের এক সদস্য বলেছেন, তিনি স্রেফ একটি ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করেছিলেন যেখানে সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে চলা ছাত্র আন্দোলনে সতর্ক ও শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই মামলার  নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত তাকে সরকারী স্কুলের চাকরি থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে, যা হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
প্রায় একই ধরণের আরেক মামলায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইদুল ইসলাম সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে। তিনিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘মানহানিকর’ বক্তব্য প্রচারের অভিযোগে ৫৭ ধারায় অভিযুক্ত।
৫ই আগস্ট আন্তর্জাতিকভাবে প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহীদুল আলমকে ঢাকায় আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের সময় প্রতিবাদকারী ও সাংবাদিকদের ওপর দমনপীড়নের সমালোচনা করে ফেসবুকে মন্তব্য করার মাধ্যমে অস্থিরতা ‘উস্কে’ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। তিনি এখনও কারাগারে। এক জামিন শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতকে বলেন, ‘শহীদুল অনেকটা রাজনৈতিক নেতার মতো মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্য ছিল মিথ্যা ও বিদ্বেষপূর্ণ। আগামী সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। শহীদুলের বক্তব্যে এমন অনেক উপাদান রয়েছে যা দেশকে অস্থির করে তুলতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদুলের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা সংবাদ’ প্রচার ও ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ হওয়ার অভিযোগ এনেছেন।
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সংবিধির অধীনে বাংলাদেশ বাছবিচারহীন গ্রেপ্তার থেকে, তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও যোগাযোগের ওপর বাছবিচারহীন বা অবৈধ হস্তক্ষেপ থেকে তাদেরকে এবং তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করতে বাধ্য। মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও বাকস্বাধীনতার অধিকারের ওপর যেকোনো হস্তক্ষেপ স্পষ্ট আইনের মাধ্যমে যৌক্তিক কারণে করতে হবে। এবং, এটি অবশ্যই আনুপাতিক হতে হবে, অর্থাৎ যতটা কম হস্তক্ষেপ করা সম্ভব। সরকার ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের শান্তিপূর্ণ সমালোচনাকে সবসময়ই অনুমোদন দিতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নজরদারি করা ও সরকারকে বিব্রত করে এমন ব্যবহারকারীদের বিচারের আওতায় আনার যেসব নির্দেশনা নিরাপত্তা সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নিপীড়নমূলক বিধান উপর্যুক্ত অধিকারকে লঙ্ঘণ করে।
ব্রাড অ্যাডামস বলেন, ‘বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সাংবাদিকতা ও বাক স্বাধীনতার জন্য শীতল পরিবেশ বিরাজ করছে। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অস্পষ্ট পোস্ট শেয়ার করছেন, তারাও এমনকি গ্রেপ্তার ও হয়রানির ঝুঁকিতে রয়েছেন। সরকারের উচিৎ এখনই মানুষের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের ওপর এই আক্রমণ বন্ধ করা। বাংলাদেশীরা যাতে কোনো ভয় ছাড়াই তাদের নেতা নির্বাচন করতে পারে সেজন্য উপযোগি পরিবেশ তৈরি করা।’

মহাকাশে নকল চাঁদ বসাবে চীন

চীনের একটি কোম্পানি রাতের আকাশের উজ্জ্বলতা বাড়াতে মহাকাশে নকল চাঁদ স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। মহাকাশ বিষয়ক ওই বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২০ সালের মধ্যেই তারা এটিকে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করতে পারবেন। কোম্পানিটি বলছে, কৃত্রিম এই উপগ্রহটির আলো এতটাই তীব্র হবে যে রাতের জন্যে রাস্তায় আর কোন বাতি বসানো লাগবে না। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র পিপলস ডেইলির বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
খবরে বলা হয়, এ ঘোষণার পরপরই এ নিয়ে তীব্র কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন তুলেছেনে অনেক বিজ্ঞানীও। কেউ কেউ এই ঘোষণাকে তামাশা বলেও মন্তব্য করেছেন। চেংডু এরোস্পেস সায়েন্স ইন্সটিটিউট মাইক্রোইলেকট্রনিক্স সিস্টেম রিসার্চের উ চুনফেং এক সম্মেলনে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, গত বছর ধরেই তারা এই প্রকল্পটি নিয়ে কাজ করছেন ও বর্তমানে এটা বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি তাদের হাতে রয়েছে।
২০২০ সালেই তারা আলো সম্বলিত এই স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করবেন।
চায়না ডেইলি বলছে, কৃত্রিম এই চাঁদটি আসলে কাজ করবে যেভাবে একটি আয়না কাজ করে সেভাবে। কৃত্রিম এই উপগ্রহটি সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে পৃথিবীতে পাঠাবে। এই নকল চাঁদ পৃথিবীর ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকে চারপাশে ঘুরবে। আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনও পৃথিবী থেকে প্রায় একই দূরত্বে অবস্থান করছে। কো¤পানিটি জানিয়েছে, এটি ১০ থেকে ৮০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করবে। একইসঙ্গে, এর উজ্জ্বলতা হবে আসল চাঁদের আলোর তুলনায় আটগুণ বেশি। এছাড়া, এ চাঁদের আলোর উজ্জ্বলতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তবে এ প্রকল্পের পেছনে সরকারি কোন সমর্থন আছে কিনা তা জানা যায়নি।

পাষণ্ড পিতা!

শহীদ উল্যা (৩৫) এক মেয়ে ও তিন ছেলের জনক। নোয়াখালীর ছিলোনীয়া বাজারে রয়েছে তার চায়ের দোকান। গত ২মাস থেকে প্রতিদিন রাতে দোকান বন্ধ করে পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার সারে শহীদ। ঘটনাটি স্বাভাবিক মনে হলেও ভয়ংকর অপকর্ম করে আসছে সে। প্রায় রাতে স্ত্রী আমেনা খাতুন ও সপ্তম শ্রেণি পড়–য়া মেয়ে (১৪) এর খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিতো শহীদ। ঘুমের ওষুধে প্রভাব শুরু হলে নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করতো বর্বর পিতা শহীদ উল্যা।
কয়েকদিন আগে ঘটনা টের পেয়ে ভিকটিম তার মাকে বিষয়টি জানায়। এর সূত্র ধরে গত কয়েকদিন আগে শহীদ আসার আগে তারা রাতের খাওয়া শেষ করে শুয়ে যেত এবং আমেনা মেয়েকে পাহারা দিতো। একপর্যায়ে গত দু’দিন আগে শহীদ তার মেয়ের রুমে গিয়ে ঘুমের মধ্যে ভিকটিমকে ধর্ষণ করার সময় তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে আমেনা।
পরে বিষয়টি কাউকে বললে তাদের মা-মেয়েকে হত্যা করার হুমকি দেয় শহীদ। কিন্তু এরমধ্যে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়ে গেলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় ভিকটিমের। পরবর্তীতে নিরুপায় হয়ে গতকাল শনিবার বিকেলে ভিকটিম বাদী হয়ে সেনবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার সূত্রধরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ ছিলোনীয়া বাজারে অভিযান চালিয়ে শহীদ উল্যাকে গ্রেপ্তার করে। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, শহীদ উল্যা একজন মাদক সেবি ও জুয়াড়ি। এর আগেও সে মাদক ও জুয়া খেলার অপরাধে একাধিকবার পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল। সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে মানবজমিনকে জানান, প্রাথমিকভাবে মেয়েকে ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করেছে গ্রেপ্তারকৃত শহীদ উল্যা।
গ্রেপ্তারকৃত শহীদ উল্যাকে আজ রবিবার দুপুরে কারাগারে প্রেরণ ও ভিকটিমকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের প্রভাব by ড. আলী রীয়াজ

বাংলাদেশের সমাজে ধর্মের উপস্থিতি এবং প্রভাব নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ইসলাম সবসময়ই এক ধরণের ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে সমাজ জীবনে ইসলামের দৃশ্যমান উপস্থিতি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজের ইসলামীকরণ গত এক দশকে যতটা ঘটেছে আগের কোনো সময়েই তা ঘটেছে বলে মনে হয় না। পোশাক-আচরণ-দৈনন্দিন জীবনাচারণ-কথোপথন এগুলোর দিকে তাকালেই সমাজে ও সংস্কৃতিতে ইসলামী ভাবধারার ব্যাপক প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। (বিস্তারিতভাবে আলোচনার জন্যে দেখুন, রীয়াজ ২০১৭-এ)। যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত তা হচ্ছে বাংলাদেশের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে যে স্থানীয় ও সমন্বয়বাদী (সিনμেটিক) ইসলামের প্রাধান্য ও প্রভাব ছিল বলে ধারণা করা হতো তাঁর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, বিপরীতক্রমে একটি রক্ষণশীল আক্ষরিক (লিটারালিস্ট) ব্যাখ্যা এবং একই সঙ্গে একটি বৈশ্বিক ব্যাখ্যার ইসলামেরই প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এবং তা ক্রমবর্ধমান।
সমাজে ইসলামের এই প্রভাব এবং এক বিশেষ ধরণের ব্যাখ্যার প্রতি জনসাধারণের সম্মতির একটি কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম ধর্মের প্রতি পক্ষপাত, অন্যদিকে তা হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মানস গঠনে বড় ধরণের পরিবর্তন। রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় এই পরিবর্তনের সূচনা হয় কার্যত ১৯৭৪ সালেই, তবে সত্তরের দশকের মাঝমাঝি থেকে বিভিন্ন ঘটনা তাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে।
এর মধ্যে আছে ক্রমান্বয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ওপরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অপসারণ, রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে সেক্যুলারিজমের/ধর্মনিরপেক্ষতার অবসান, রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের আবির্ভাব, রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি এবং দল-নির্বিশেষে ধর্মীয় প্রতীক ও রেটরিকের ব্যবহার। নব্বইয়ের দশক থেকে ইসলামপন্থী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন ধরণের ইসলামপন্থী দলের সংস্কারবাদী, রক্ষণশীল, উগ্রপন্থী, সহিংস চরমপন্থী বিকাশ লাভ করে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করলেও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল থেকেছে, এবং ধর্মের প্রশ্নে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার কোনো লক্ষণই আর উপস্থিত নেই। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক ধরণের ইসলামপন্থী জঙ্গী সংগঠনের উপস্থিতি ঘটতে শুরু করে।
অন্য যে কোনো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মতোই বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির বিভিন্ন ধারা উপস্থিত ছিল এবং আছে। যদিও দীর্ঘদিন বাংলাদেশের অনেক বিশেষজ্ঞ ইসলামপন্থী রাজনীতি বলতে কেবলমাত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামকেই বিবেচনা করেছেন। এই রাজনীতি বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত হলেও প্রবণতার দিক থেকে আমরা একে দুইভাগে ভাগ করতে পারি তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল এবং সংস্কারপন্থী। গত কয়েক বছরে, বিশেষত ২০১১ সালের পর থেকে, বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের মধ্যেকার তুলনামূলকভাবে সংস্কারপন্থী ধারা দুর্বল হয়েছে; অতীতের ভুল রাজনীতি, সাংগঠনিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত, বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশ ইত্যাদি তাঁর অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল এই সংস্কারপন্থীদেরকেই তাঁদের চ্যালঞ্জ বলে বিবেচনা করায় এই ধারাটিকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে ফেলার চেষ্টা করেছে এবং তাতে বড় ধরণের সাফল্য অর্জন করেছে। এই জন্যে শক্তি প্রয়োগ, বিচারিক ও বিচার বহির্ভূত ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে এবং সিভিল সোসাইটির একটি অংশ ও গণমাধ্যম তাতে অংশ নিয়েছে। কিন্তু এই প্রচেষ্টার ফলে দলগতভাবে জামায়াতে ইসলামী কার্যত বিপর্যস্ত হয়েছে ঠিকই কিন্তু আদর্শিকভাবে ইসলামপন্থার আবেদন হ্রাস পায়নি, ইসলামপন্থীদের শক্তিও খর্ব হয়নি।
ইসলামপন্থীদের সংস্কারপন্থী বলে পরিচিত অংশের অনুপস্থিতির সুযোগে গত কয়েক বছরে রক্ষণশীল ইসলামপন্থীরা রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থান থেকে রাজনীতির কেন্দ্রে আসতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে রক্ষণশীল ইসলামপন্থীরা কেবল শক্তি সঞ্চয় করেছেন তা নয়, তাঁরাই এখন রাজনীতির এজেন্ডা নির্ধারণের মতো শক্তি রাখেন। এই রক্ষণশীল ধারার সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। হেফাজতে ইসলামের উত্থান, তাঁদের বক্তব্য, তাঁদের সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের সখ্যের আগ্রহ, ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠতা এবং এই গোষ্ঠীর দাবি দাওয়া মেনে নেয়ার ব্যাপারে সরকারের দ্বিধাহীনতা প্রমাণ করে যে এখন বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রধান প্রতিনিধি তারাই। তবে মনে রাখা দরকার যে, তাঁরাই এই ধারার একমাত্র প্রতিনিধি নয়, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার।
ক্ষমতাসীন দল গত দুই/তিন বছরে এই শক্তিকেই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। এটিকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, বাস্তবোচিত পদক্ষেপ, জনসাধারণের মনোভাবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, কৌশল, কো-অপটেশন - যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন এতে করে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে কট্টর রক্ষণশীল ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে এবং রাজনীতিতে তাঁদের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদের নির্বাচন যদি সকল দলের অংশগ্রহণমূলক হয় তবে প্রধান প্রধান দল বা জোটের কাছে ইসলামপন্থী দলগুলো গুরুত্ব পাবে, সেই গুরুত্ব ভোটারদের মধ্যে তাঁদের সমর্থনের অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশিই হবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। প্রধান জোটগুলো তাঁদের ইসলামী পরিচিতিকে প্রাধান্য দেবার জন্যেই এই ধরণের দলের দ্বারস্থ হবেন। এই প্রভাবের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পাবে যদি এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যাতে বিএনপি এবং অন্যান্য পরিচিত দল অংশগ্রহণ না করে। কেননা নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক হিসেবে উপস্থাপন, তৃণমূল পর্যায়ে ভোটারদের মোবিলাইজ করা এবং একপাক্ষিক নির্বাচনকে দৃশ্যত বৈধতা দেয়ার জন্যে ইসলামপন্থীদের প্রয়োজন দেখা দেবে। এই রক্ষণশীল ইসলামপন্থীদের আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করার রাজনৈতিক উদ্যোগ এখনও অনুপস্থিত, আর আদর্শের লড়াইয়ে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের চেষ্টার পরিণতি ইতিবাচক হয় না।
ভারতের ভূমিকা
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও নিকট প্রতিবেশী হিসেবে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার কারণে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব সময়ই একটা ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে উপস্থিত থেকেছে। যদিও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাংলাদেশে-ভারত সম্পর্ক সব সময়ই ছিলো ‘অম্ল-মধুর’ তথাপি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত প্রসঙ্গ উপস্থিত থেকেছে আলাপ-আলোচনায়, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্ধিতায়। অযৌক্তিক ও উগ্র ভারত-বিরোধী এবং ভারতের প্রতি অতিমাত্রায় সহানুভূতিশীল ও ভারত বিষয়ে স্পর্শকাতর জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে সব সময়ই ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করার প্রবণতাই প্রধান ধারা।
একথা সাধারণের কাছে স্পষ্ট যে, ভারতের পক্ষপাত সব সময়ই আওয়ামী লীগের অনুকূলে ছিল। অন্যদিকে বিএনপি’র রাজনীতির একটি অন্যতম উপাদান হচ্ছে ভারত-বিরোধিতা। ভারতের নীতি নির্ধারকরা স্ট্র্যাটেজিক বিবেচনায় বাংলাদেশকে তাঁদের পেছনের উঠোন বা ব্যাকইয়ার্ড বলে বিবেচনা করে এসেছেন। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে হুমকি হতে পারে এমন যে কোনো কিছুকেই ভারত মোকাবেলা করার তৎপর থেকেছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যাপারে ভারতের উৎসাহ কেবলমাত্র উৎসাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
অতীতে ভারতের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব সীমিত থাকার কারণে এবং বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর আগ্রহ ও নির্বাচনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার ফলে ভারত প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পর্দার আড়ালে ভারতের নীতি-নির্ধারকরা তাঁদের প্রভাব বৃদ্ধি করে (মুখার্জী ২০১৭) এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনুকূলে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা নেয়, তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশ সফরই কেবল তাঁর প্রমাণ নয়, এই একপাক্ষিক নির্বাচনের পরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার বিরুদ্ধে ভারত বাংলাদেশ সরকারের বর্ম হিসেবেই কাজ করেছে। গত কয়েক বছরে ভারত বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকে যা পেয়েছে তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায় ‘সারা জীবন মনে রাখবার’ মত (বাংলা ট্রিবিউন ২০১৮)। কিন্তু বিনিময়ে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যে তার প্রাপ্যও পায়নি সেটা এমন কি ভারতীয় বিশেষজ্ঞরাও খোলাখুলিভাবেই স্বীকার করেন।
২০১৮ সালে এসে চার বছর আগের পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। ভারত বাংলাদেশে তার ঘনিষ্ঠ মিত্র সরকার চায় চারটি কারণে; প্রথমত বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি; দ্বিতীয়ত এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবেলা; তৃতীয়ত দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মিত্রের অভাব এবং চর্তুত ইতিমধ্যে ভারতের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হয়েছে তা রক্ষা করা। ফলে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যাপারে এখন ভারতের আগ্রহ বেশি। এই আগ্রহ এবং সেই মর্মে সক্রিয় থাকার কারণে এটা এখন আরো স্পষ্ট যে ভারত বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ও সেই সূত্রে বাংলাদেশের রাজনীতির এক নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদের ভারত সফর, মে মাসে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে শান্তি নিকেতনে নরেন্দ্র মোদির আলোচনা বিষয়ে আনন্দবাজারের প্রতিবেদন (চট্টোপাধ্যায় ২০১৮), জুন মাসে বিএনপি প্রতিনিধি দলের নয়া দিল্লি সফর এবং জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের সফর এই ইঙ্গিতই দেয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাবকে কেউ আর অস্বীকার করছেন না।
বিএনপির প্রতিনিধিদের ভারত সফর যতটা দৃষ্টিকটুই হোক না কেন, দলের ভারত-বিরোধিতার নীতির পরিত্যাগের আন্তরিকতা নিয়ে যত প্রশ্নই উঠুক না কেন এবং এতে আদৌ ফলোদয় হবে কিনা সেই বিষয়ে যত সংশয়ই থাকুক না কেন, এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন ভারতের প্রভাব স্বীকৃত হল তেমনি আরেকটি প্রশ্নও উত্থিত হল - যারা ভারত-বিরোধিতার জন্যে বা ভারতের সঙ্গে অসম সম্পর্কের বিরোধী শক্তি হিসেবে বিএনপিকেই বিবেচনা করতেন বিএনপি’র সেই সমর্থক গোষ্ঠী কোথায় আশ্রয় নেবে? (আহমেদ ২০১৮)। বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী দিনে এই গোষ্ঠী কোন পথে অগ্রসর হয় তা লক্ষ্য করার বিষয়।
গত বছরগুলোতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের মাত্রা ও প্রকৃতি বাংলাদেশে ভারতের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে কিনা সেই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত আমাদের হাতে নেই, কিন্তু অব্যাহতভাবে এই প্রভাব বিস্তার দীর্ঘ মেয়াদে ভারতের জন্যে ইতিবাচক হবে বলে মনে করার কারণ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে ভারতের নীতি নির্ধারকদের বিবেচনা করা দরকার।
উপসংহার
বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি ব্যাখ্যার জন্যে আমি এই প্রবন্ধে চারটি বিষয়ের দিকে মনোনিবেশ করেছি। প্রথমত বর্তমান শাসন ব্যবস্থা, যাকে আমি হাইব্রিড রেজিম বলে বর্ণনা করেছি এবং যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দৃশ্যত গণতান্ত্রিক উপাদানের পাশাপাশি শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার উপস্থিতি এবং শাসন পরিচালনার জন্যে শক্তি প্রয়োগের ওপরে নির্ভরতা। এই ধরণের শাসন ব্যবস্থা স্থিতাবস্থায় থাকেনা বলেই পৃথিবীর অন্যত্র দেখা গেছে; সেসব ক্ষেত্রে আরো বেশি ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ঘটেছে এবং আরো বেশি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যেও সেটা বিবেচ্য হওয়া দরকার। এই ধরণের শাসনের বৈধতা ক্ষমতাসীনদের পরিকল্পিত নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি হয় যাকে তাঁরা এক ধরণের আনুষ্ঠানিকতা বলেই বিবেচনা করেন। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের সমাজে এক নতুন শ্রেণী বিন্যাস ঘটেছে এবং নতুন ধণিক শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে। রাষ্ট্রের আনূকূল্যে ও ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শ্রেণীর মধ্যে জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থার আকাঙ্খার ঘাটতি আছে, যা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে। নিকট ভবিষ্যতের জন্যে তা ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয় না। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সুবিধা বঞ্চিতদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হওয়াই স্বাভাবিক। তৃতীয়ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিমধ্যেই রক্ষণশীল ইসলামপন্থীদের প্রভাব বেড়েছে। আগামীতে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ক্ষেত্র যতই সীমিত হবে, এই শক্তির প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়বে। সকলের অংশগ্রহণমূলক অবাধ নির্বাচনের বিকল্প কিছু চেষ্টা করা হলে এই শক্তিই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। চর্তুত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত প্রায় নির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, যা কার্যত সব প্রধান দলই স্বীকার করে নিয়েছে; কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলে যে এতে করে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের লাভবান না হবার সম্ভাবনাই বেশি।
উৎস: সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর জন্য আলোচনাপত্র 
লেখক পরিচিতি :  লেখক, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

নির্বাচন নিয়ে কেন এই সংশয় by কাফি কামাল

আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংশয় সব মহলে। যদিও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- কেউ নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না। বর্তমান সরকারের অধীনেই সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। আভাস দেয়া হচ্ছে- নির্বাচনকালীন ছোট মন্ত্রিপরিষদ গঠন ও সংযোজন-বিয়োজনের। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে শেখ হাসিনার অধীনে এ দেশে আর কোনো নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না। সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বড় প্লাটফর্ম জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তরফে উত্থাপন করা হয়েছে ৭ দফা দাবি। কিন্তু এর কোনোটিই মানতে রাজি নয় সরকার।
এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রার্থী হতে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন থাকার বাধ্যবাধকতা ইস্যুতে আদালতে একটি রিট আবেদন হয়েছিল ২০১৪ সালে, যা আজও নিষ্পত্তি হয়নি। সেই রিটের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা না করতে নির্দেশনা চেয়ে এরই মধ্যে নতুন আরেকটি রিট দায়ের হয়েছে উচ্চ আদালতে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন আদৌ হবে কিনা- এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে সন্দেহ ও সংশয়। সংশয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছেন না রাজনৈতিক মহলও। ফলে এখন চা স্টলের আড্ডা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মীদের মুখে মুখে ফিরছে একটি প্রশ্ন- আদৌ নির্বাচন হবে তো?
এ সংশয়ের পালে নতুন হাওয়া দিচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। নির্বাচন নিয়ে এখন অনেক সংশয় রয়েছে। নির্বাচন কখন হবে জানি না। একটি দল ৭ দফা দিয়েছে (জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট)। সরকার তা মানতে রাজি নয়। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী মানা সম্ভব নয়। এ অবস্থার মধ্যে আগামী দিনগুলো স্বচ্ছদিন বলে মনে হয় না আমার।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জাতীয় পার্টি সব সময় নির্বাচন করেছি। এবারেও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। এর নিশ্চয়তা চাই। নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার, স্বাধীন বিচার বিভাগ চাই- এগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা জোটগতভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। তবে দেশের স্বার্থে নতুন মেরূকরণ হতে পারে।’ সাম্প্রতিক সময়ে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কয়েকটি অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপির সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম। ১৪ই অক্টোবর তেজগাঁওয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক যোগদান অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘দেশে আদৌ কোনো নির্বাচন হবে কিনা এ নিয়ে আমি এখনো নিশ্চিত নই। নির্বাচন হলেও জনগণ ভোট দিতে পারবে কি-না সে প্রশ্ন রয়েছে। কেউ জানে না আগামী দিন কী হতে যাচ্ছে।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন তো এখনও ঠিক করেই উঠতে পারেনি যে কী প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে এবং তাদের প্রতি অনাস্থা কীভাবে দূর করবে। বরং সিইসি প্রথমে বলেছিলেন, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচন হবে। তবে পরে তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারই তার এক বক্তব্যে এ সংশয় তৈরি করেন। তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হবে না এমন নিশ্চয়তা দেয়ার সুযোগ নেই।’
সাধারণ মানুষসহ রাজনৈতিক মহলের এই সংশয়ের পেছনে রয়েছে নানা কারণ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনে যায়নি বিএনপি-জামায়াতসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। তারা বর্জন করেছিল একতরফা নির্বাচন। দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারেও আগের অবস্থানের নড়চড় হয়নি বিরোধী জোটের। তার উপর সংবিধান প্রণেতা ডা. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে এরই মধ্যে এক তরফা নির্বাচন ঠেকাতে তৈরি হয়েছে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে সব দলের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা আদায় ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। ১৫ই অক্টোবর বিএনপিসহ নানা দল ও জোটের সমন্বয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ফ্রন্টের তরফে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সরকারের প্রতি ৭ দফা দাবি উত্থাপন ও নির্বাচনে বিজয়ী হলে পূরণের জন্য দেশবাসীর প্রতি ১১টি লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়। যা আগে কখনো দেখা যায়নি। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গঠিত হয়েছিল দুটি বড় জোট। কিন্তু এবার ক্ষমতাভোগীদের বাইরের দলগুলো দুটি জোটে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বিএনপিসহ বেশিরভাগ দলের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যেসব দাবি উত্থাপন করেছে তার সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্য রয়েছে স্বতন্ত্র বামজোটের। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে একাত্মতা জানাচ্ছে পেশাজীবী সংগঠন, সুশীল সমাজ, বিশিষ্ট নাগরিকসহ নানা মহল। যা সরকারের জন্য হয়ে উঠছে মাথাব্যথার কারণ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ড. কামালের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সুশীল সমাজ জড়িত রয়েছে সরাসরি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের গুরুত্বপূর্ণ ৩টি কারণ চিহ্নিত করেছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিএনপিসহ মধ্যপন্থি, মধ্যবামপন্থি ও ইসলামী মূল্যবোধ সম্পন্ন দলগুলোর সুনির্দিষ্ট দাবিতে ঐক্যপ্রতিষ্ঠা; দেশে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের পর্যবেক্ষণ; এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বই ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’-এর মাধ্যমে সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রকাশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনটি ঘটনায় সরকারের জন্য অস্বস্তির, বিব্রতকর এবং চাপে পড়ার। জনমতের বিচারে সরকার ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধীদের দাবি মেনে সরকার নির্বাচন দেবে কিনা তা নিয়ে সংশয় যৌক্তিক। পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করা, সরকারের নানা মহল থেকে চাপ দিয়ে দেশ ত্যাগ করানো এবং অসুস্থ সাজানোর পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে খোলামেলা লিখেছেন এস কে সিনহা তার বইয়ে। ফলে বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপের প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে এসেছে ফের। তাছাড়া, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সড়ক পরিবহন আইনসহ রেকর্ডসংখ্যক বিল পাস হয়েছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ও সরকারের শেষ সময়ে এসে এমন কর্মকাণ্ড ক্ষমতাসীনদের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের আরেকটি কারণ হচ্ছে, শেষ দুই মাসে সারা দেশে লাখ লাখ বিরোধী নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার গায়েবি মামলা দায়েরের বিষয়টি। যেসব মামলায় নাম উল্লেখ্য আসামির চেয়ে বেশি রাখা হয়েছে অজ্ঞাতনামা আসামি। বিএনপি নেতারা বলছেন, আগামী নির্বাচনের আগে ধরপাকড়ে সুবিধা করতেই আগাম এসব গায়েবি মামলা করেছে সরকার। বিএনপিসহ বেশিরভাগ বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের দাবিনামায় যেসব ইস্যু সংযুক্ত করেছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে বামজোটের দাবির। যেমন জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে সিদ্ধান্তটি বাতিলের দাবিতে সোচ্চার রয়েছে বিএনপি। ইভিএমের মাধ্যমে কারচুপি সম্ভব জানিয়ে এর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন। বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামানও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষণ নেই সরকারের পদক্ষেপ ও আচরণে। এতদিন বিএনপিকে কর্মসূচি পালনে বাধা দেয়া হতো এখন বামজোটকে বাধা দেয়া হচ্ছে। অনুমতি দেয়া হচ্ছে ডজন ডজন শর্তের বেড়াজালে। সবশেষ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি পালনে অনুমতি না দেয়ার মধ্য দিয়ে বাড়ছে সে সংশয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্ষমতাসীন সরকার সব হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে যখন বুঝতে পারবে জিতবো তখন নির্বাচন দেবে। যখন হেরে যাওয়ার সন্দেহ থাকবে তখন নির্বাচন দেবে না। আগামী নির্বাচনে জয়লাভ সম্পর্কে সরকার এখন নিশ্চিত হতে পারছে না। আন্তর্জাতিক মহলে যেসব কথা হচ্ছে- সেগুলোও সরকারের জন্য বিব্রতকর। এছাড়া যেসব আইন করছে, যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে তা নির্বাচনের পক্ষে ইতিবাচক নয়। ফলে এই সংশয়ের যৌক্তিকতা রয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন দেবে না। তারা নির্বাচন না করে অন্য কোনো প্রক্রিয়ার দিকে এগোবে। যার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তাদের কথায়। তারা নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে নানা ধরনের কথা বলছে। এমনকি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচিতেও বাধা দিচ্ছে। 
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি- বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, আওয়ামী লীগের অরাজনৈতিক আচরণের কারণে এ সংশয় তৈরি হয়েছে। দেশের মানুষ যা দাবি করছে, সরকার বলছে তার কিছুই দেবে না। তারা দুইবছর ধরে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে আর আমাদের বিরুদ্ধে দায়ের করছে গায়েবি মামলা। নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির লক্ষণ নেই। আওয়ামী লীগের এমন আচরণ অব্যাহত থাকলে নির্বাচন নিয়ে সংশয় ও আশঙ্কা তো উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, রাজনৈতিক নেতাকর্মীর বাইরে দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে একটি আশঙ্কা আছে। আস্থাহীনতা আছে। ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে কি-না, কেন্দ্রে যেতে পারলেও ভোট দিতে পারবে কি-না। এ সংশয় ও আশঙ্কা সাধারণ ভোটারদের মুখে মুখে। এ সংশয়ের কারণ একটি দুইটি নয়, অনেকগুলো। ফলে জনগণের সে স্পন্দনের প্রতিফলন ঘটছে রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনদের মুখে।
অবশ্য রাজনৈতিক মহলসহ সুশীল সমাজের কাছে এ সংশয় নতুন নয়। প্রায় ৮ মাস আগে ২৭শে ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার এক আলোচনা সভায় প্রথম আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন ড. কামাল হোসেন, প্রফেসর ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আসম রব ও কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছিলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে হলে বর্তমান সরকারকে সরে দাঁড়াতে হবে। কারণ দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না। আমি কিন্তু ভাবতে পারছি না যে, ভোট হবে।’ ১৪ই এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক আলোচনা সভায় প্রথম আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন বিকল্প ধারা বাংলাদেশের সভাপতি ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। গাজীপুর সিটি নির্বাচন স্থগিতের পর চলতি বছরের ৫ই মে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। রাজধানীর বনানীতে দলের চেয়ারম্যানের অফিসে স্বেচ্ছাসেবক পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় এই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। ৫ই সেপ্টেম্বর ‘রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনে কেমন জনপ্রতিনিধি পেলাম’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। দুইদিন পর ৭ই সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেছেন, ‘আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে সংশয় এবং শঙ্কা দুটোই রয়েছে।

উচ্চমূল্যে মালয়েশিয়াকে ফ্ল্যাট বানানোর কাজ, প্রতি বর্গফুটে খরচ লাগবে ৩৪৩৫ টাকা by দীন ইসলাম

উচ্চমূল্যে মালয়েশিয়া সরকারকে ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ দিতে যাচ্ছে সরকার। সরকার টু সরকার পর্যায়ে এ কাজ দেয়া হবে। উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে ১০৪টি ভবন বানাবে মালয়েশিয়ান সরকার নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান রেডটেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লি.। ফ্ল্যাট বানাতে প্রতি বর্গফুটে তারা খরচ নেবে তিন হাজার চারশ’ ৩৫ টাকা। সব মিলিয়ে এক কোটি ৪৮ লাখ ৪১ হাজার ২৭৩ বর্গফুট বানাতে পাঁচ হাজার ৯৭ কোটি ৯৭ লাখ ৭২ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা দেয়া হবে। শতভাগ কাজ শেষ হওয়ার পর মালয়েশিয়ান কোম্পানিকে চার কিস্তিতে এ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। মালয়েশিয়াকে কাজ দেয়ার এমন প্রক্রিয়া এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং মালয়েশিয়ান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিভাগের স্পেশাল এনভয় অফিস সবকিছু দেখভাল করছেন।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রস্তাবটি অনুমোদন মিললে কাজ পেয়ে যাবে মালয়েশিয়া সরকার নির্ধারিত কোম্পানি। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রস্তাবটি উত্থাপন করতে রাজউকের ১৪/২০১৮তম বোর্ড সভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ান কোম্পানিটি গতানুগতিক বীম ও কলামবিশিষ্ট স্ট্রাকচারের পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তির ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড বিল্ডিং সিস্টেম (আইবিএস) ব্যবহার করবে। ফলে দ্রুততার সঙ্গে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠান আশা করছে, ৩০ মাসের মধ্যে তারা ভবনগুলোর নির্মাণকাজ করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে ভবন বানাতে ২০১১ সালের ১৮ই অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এমওইউ’র আলোকে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচিত করে মালয়েশিয়া সরকার। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটি জানায়, তারা ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড বিল্ডিং সিস্টেম (আইবিএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘বি’ ও ‘সি’ ব্লকের ভবনগুলো বানাবে। অনেক আগে মালয়েশিয়ান কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হলেও কাজ বাস্তবায়নে অর্থায়নের বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকায় পরে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এরপর নতুন করে ২০১৪ সালের ২৯শে এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার এবং মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে আগের সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় সংশোধিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর ভিত্তিতে মালয়েশিয়ান সরকারের প্রস্তাবটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ঘুরে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। রাজউক সূত্রে জানা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনসাধারণের আবাসনের জন্য ২০১১ সালে উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কাজে হাত দেয়া হয়।
এজন্য ওই বছরের ৪ঠা অক্টোবর একনেকে নয় হাজার ৩০ কোটি টাকার অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প অনুমোদন পায়। মূল প্রকল্পে উত্তরা ১৮ নং সেক্টরের ২১৪ দশমিক ৪৪ একর জমিতে তিনটি ব্লকে ১৬ তলাবিশিষ্ট ২৪০টি ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। এসব ভবনগুলোতে ২০ হাজার ১৬০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের সংস্থান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ টাইপের ৭৯টি ভবনে ১২৫০ বর্গফুট আয়তনের ৬৬৩৬টি, ‘বি’ টাইপের ৮৬টি ভবনে ১০৫০ বর্গফুট আয়তনের ৭২২৪টি এবং ‘সি’ টাইপের ৭৫টি ভবনে ৮৫০ বর্গফুট আয়তনের ৬৩০০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের বিষয়টি সংস্থান ছিল। পরে স্থান সংকুলান ও নকশা পরিবর্তনজনিত কারণে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সংখ্যা কমিয়ে ১৭৯-তে নির্ধারিত করা হয়েছে। এর আগে একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের পর ২০১২ সালে ৭৯টি ১৬ তলা ভবনের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। ওই সময় ঠিকাদারদের ব্যর্থতার কারণে প্রায় দুই বছর ফ্ল্যাট প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এ কারণে ২০১৩ সালে ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। পরে ২০১৪ সালে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে ৭৯টি ভবন নির্মাণের কাজ শেষ করা হয়েছে। বাকি ভবনগুলো নির্মাণের জন্য প্রস্তাব ঘুরাফেরা করছে। আগামী ১১ই নভেম্বর প্রথম পর্যায়ের ভবনগুলোর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন হাইটেনশনের তবে সংলাপ সম্ভব -এনডিআইয়ের রিপোর্ট

ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) হতাশার মধ্যেও একটি আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। তারা বলেছে, নির্বাচনটি হবে হাইটেনশনের, তবে যদি সরকার ও বিরোধী দল একটি সত্যিকারের সংলাপে বসে তাহলে একটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ ও সবার জন্য মাঠ সমতলকারী অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করা সম্ভব। এর মধ্য দিয়ে একটি নতুন জাতীয় সমঝোতা  ধারার সূচনা এবং জাতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে চমৎকার অগ্রগতি ঘটেছে তা চলমান থাকতে পারে।
এনডিআই’র নতুন রিপোর্ট বলেছে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে এগিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত বিভিন্ন মৌলিক উপাদান রয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারা তার ইতিহাসে আছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, গতিশীল মিডিয়া, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যে লালিত সক্রিয় নাগরিক সমাজ, ক্রমবর্ধমানহারে তরুণদের সক্রিয়তা, এবং সহিংসতার প্রতি জনসাধারণের কম সহনশীলতার দিকগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এনডিআই উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছে যে,  এসব সত্ত্বেও আগামী নির্বাচনটি উচ্চ মাত্রার রাজনৈতিক মেরূকরণ, উচ্চতর উত্তেজনা এবং একটি সঙ্কুচিত রাজনৈতিক পরিসরে অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতিনিধি দল বৈদ্যুতিক ভোটিং মেশিন ইভিএম স্থাপন বিষয়ে পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম ও বিরোধীদলীয় নেতাদের তরফে নির্বাচন কমিশনের উদ্বেগজনক পরিকল্পনা সম্পর্কে শুনেছেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পূর্ণ অংশগ্রহণের বিষয়ে নারী ও যুবকরা উল্লেখযোগ্যভাবে বাধার মুখোমুখি হচ্ছে।
উপরন্তু, মিডিয়া প্রতিনিধি এবং নাগরিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সহ সুশীল সমাজের তরফে তারা জেনেছেন যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নানা ভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
রাজনৈতিক কর্মী ও সরকারের সমালোচকদের তারা গ্রেপ্তার করছে। এর পাশাপাশি বিতর্কিত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট আরো ভয়ানকভাবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোর বিপরীতে থাকা গুরুতর উদ্বেগকে আরো বেশি উসকে দিচ্ছে। বাকস্বাধীনতার পথ সংকীর্ণ হয়েছে।
এনডিআই প্রতিনিধি দল সংলাপ ছাড়া নিচের মুখ্য সুপারিশগুলো বিবেচনার জন্য পেশ করেছে।
? নির্বাচন কমিশনের কাজে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না, এই মর্মে সরকার প্রকাশ্যে জনসাধারণের সামনে অঙ্গীকার করা উচিত;
? দলীয় কর্মী, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের ভয় দেখানো থেকে বিরত থাকার জন্য সরকারের তরফ থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে একটি পরিষ্কার বার্তা পাঠানো উচিত;
? রাজনৈতিক দলগুলির উচিত হবে নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণের পথে বিভিন্ন বাধা মোকাবিলা করার উপায় খুঁজে বের করা। নারীদের এমনভাবে সামনে আনতে হবে যাতে তারা ভোটে জিতে আসতে পারে।
? রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং নির্বাচন কমিশনকে এমনসব পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে যুব সমাজ আরো বেশি সংখ্যায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে।
নির্বাচনী অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলোতে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি জোরালোভাবে ব্যবহার করার ফলাফল উত্তম হতে বাধ্য। এনডিআই প্রতিনিধি দল তাদের ১০ পৃষ্ঠার রিপোর্টে জোর দিয়ে বলেছে, এনডিআই বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে চায় না এবং এটি তারা স্বীকার করে যে বাংলাদেশের মানুষই তাদের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা, বৈধতা এবং তাদের দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নের ভাগ্য নির্ধারণে শেষ পর্যন্ত  ভূমিকা রাখবে। কি উপায়ে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন ও শক্তিশালী করা যাবে, বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন কেন অবাধে হওয়া দরকার, সেটাও তাদের বিষয়।
তবে এনডিঅআই প্রতিনিধি দল আসন্ন নির্বাচন অবাধে হওয়ার পথে সম্ভাবনা ও বাধাগুলো চিহ্নিত করেছে। ১২ই অক্টোবরে প্রকাশিত বিবৃতিটি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) এর আন্তর্জাতিক প্রাক নির্বাচন প্রতিনিধি দলের দেয়া। এই প্রতিনিধি দলের উদ্দেশ্য ছিল: বাংলাদেশের আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগাম নির্বাচনী প্রস্তুতি সঠিক এবং নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা প্রভাবিত করতে পারে যেসব কারণ তা পরীক্ষা করা; এবং একটি
শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, যার ওপর জনসাধারণের আস্থা অর্জনের সম্ভাবনাকে আরো  উন্নত করতে পারে, সেই লক্ষে সুপারিশ রাখা।
প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, বর্তমান এনডিআই বোর্ডের সদস্য এবং দক্ষিণ এশীয় বিষয়ক সাবেক মার্কিন সহকারী সেক্রেটারি রাষ্ট্রদূত কার্ল ইন্ডারফার্থ। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত বিষয়ক তিনি একজন বিশেষজ্ঞ। পাকিস্তানি লেখক ও সাবেক সংসদ সদস্য ফারাহ নাজ ইস্পাহানী এবং সিনিয়র সহযোগী ও এনডিআইয়ের এশিয়া প্রোগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক পিটার ম্যানিকাস। প্রতিনিধি দলে এনডিআই নির্বাচন উপদেষ্টা মাইকেল ম্যাকনুলি এবং এনডিআই এর এশীয় বিষয়ক সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার অ্যাডাম নেলসনও ছিলেন।
২০১৮ সালের ৫ থকে ১১ই অক্টোবর ওই দলটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতা, নির্বাচন কমিশন; সুশীল সমাজ প্রতিনিধি দল, নাগরিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক গ্রুপের সঙ্গে কথা বলেন। তারা নারী সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক কর্মী; মিডিয়া প্রতিনিধি, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা; ব্যবসায়ী নেতা এবং আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সমপ্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলেন।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী থিংক ট্যাংক ন্যাশনাল এন্ডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি বাংলাদেশের প্রাক নির্বাচনী অভিজ্ঞতা অর্জনে এনডিআইকে সহায়তা করছে।

সৌদি আরবে শঙ্কায় লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক by ওয়েছ খছরু

নতুন নতুন নিয়মের জালে আটকা পড়ছেন সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকরা। এ কারণে লাখ লাখ শ্রমিক অজানা আতঙ্কে ভুগছেন। যারা ব্যবসা করছেন তারাও হয়ে পড়ছেন তটস্থ। কেউ কেউ তল্পিতল্পা গুছিয়ে দেশের পথে রওনা দিয়েছেন। সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশিরা আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে সৌদি আরবের বিশাল শ্রম বাজার হারিয়ে ফেলবে বাংলাদেশ। সৌদি আরবকে তাড়িয়ে দিতে হচ্ছে না, নিয়মের জালে আটকা পড়ে দেশের পথে রওনা দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের। ইতিমধ্যে অনেকেই দিচ্ছেনও।
মদিনা শহরেই বসবাস করেন বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি।
ওখানে বাংলা মার্কেট নামে বাঙালি এলাকা রয়েছে। বাংলাদেশিরাই সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। খেজুর, জায়নামাজ, জুতা, তসবিহসহ নানা পণ্যের দোকানের মালিক ছিলেন বাংলাদেশিরা। কিন্তু গেল কয়েক মাসে ব্যবধানে ওই এলাকায় বাঙালি দোকানের সংখ্যা কমে এসেছে। যে কয়েকটি দোকান রয়েছে সেগুলোও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বাংলা মার্কেটে বসবাসরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা জানালেন, সৌদি আরবে নতুন নিয়ম চালু হয়েছে ভিনদেশিদের যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোতে বাধ্যতামূলক সৌদিয়ান নাগরিকদের চাকরিতে নিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের আয়কর বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে দিগুণ থেকে তিন গুণও। এ কারণে মদিনার বাংলা মার্কেট ও আশপাশ এলাকায় হাটলেই চোখে পড়ে অধিকাংশ দোকান বন্ধ। মদিনাতে বসবাসরত সিলেটের বালাগঞ্জের আব্দুল কাদির জানালেন, মদিনাতে যারা দোকান দিতেন তারা অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেছেন। সরকারের বেঁধে দেয়া নিয়মের কারণে তারা টিকতে পারছেন না বলে দেশে চলে গেছেন। এ কারণে দোকান বন্ধ থাকার দৃশ্যটি চোখে পড়ে বেশি।
উহুদের ময়দান ও আশপাশ এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কাজ করেন অন্তত ২০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক। প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে তারা পরিছন্নতা কর্মী হিসেবে ওখানে কাজ করেন। ওই এলাকার পরিচ্ছন্নতা কর্মী নরসিংদীর বেলাবো এলাকার আব্দুর রহমান। তিনি জানালেন, মাসে তারা ৫০০ রিয়াল বেতনে চাকরি করেন। এই টাকা বাংলাদেশের হিসেবে প্রায় ১২ হাজার টাকা। এতে তারা নিজেরাও খেয়ে বেঁচে থাকতে পারেন না। দেশে টাকা পাঠাবেন কী করে। তিনি জানান, প্রতি দুই বছর পরপর তাদের আকামা রি-এন্ট্রি করতে হয়। এতে খরচ পড়ে বাংলাদেশের হিসেবে প্রায় তিন লাখ টাকা। এই টাকা জোগাড় করা অনেক বাংলাদেশির পক্ষে সম্ভব হয় না। এ কারণে অনেকেই অবৈধ হয়ে পড়েছেন। ধরা পড়ে দেশে চলে গেছেন। আব্দুর রহমান জানান, আগে সৌদি আরবে এই নিয়ম ছিল না। সম্প্রতি সৌদিতে থাকা বাংলাদেশিরা এই নিয়মের মধ্য পড়েছেন।
মক্কার মিসফালাহ এলাকার পাশেই রয়েছে বাঙালিদের বাজার। প্রায় ৭০ বছর ধরে ওই এলাকায় পরিবারপরিজন নিয়ে বসবাস করেন কক্সবাজার এলাকায় দুই ভাই আব্দুল মনাফ ও তাহির আলী। তিন প্রজন্ম ধরে তারা বসবাস করে বাসাবাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু নতুন নিয়মের কারণে তাদের আকামা রি-এন্ট্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের কফিলের তরফ থেকে সম্প্রতি সময়ে সহযোগিতা পাচ্ছেন না। ফলে পরিবারপরিজন নিয়ে তারাও পড়েছেন শঙ্কায়। নিজ বাসায় তারা কথা বলেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। বললেন, বাঙালি বাজার ও আশপাশ এলাকায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস। এখানে ব্যবসাবাণিজ্যে বাংলাদেশিদের আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু সরকার মুখে কিছু বলছে না, আইন করে বাঙালিদের তাড়িয়ে দিতে শুরু করেছে। এমন কঠিন অবস্থায় অতীতে কখনো বাংলাদেশিরা পড়েননি বলে জানান ওই দুই ভাই। তারাও যেকোনো সময় দেশের পথে রওনা দিতে পারেন বলে আশঙ্কায় রয়েছেন।
মিসফালাহ এলাকার কবুতর চত্বর ও হেরেম শরীফের বাইরের এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে অনেক বাংলাদেশি বসবাস করেন। তারা মাসে কোম্পানীর মাধ্যমে মাত্র ৫০০ রিয়াল বেতনে চাকরি করেন। কিন্তু আকামা রি-এন্ট্রি করা নিয়ে তারা আশঙ্কায় রয়েছেন। এত টাকা তাদের পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার কফিলও তাদের ওই টাকা দিচ্ছে না। কয়েকজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী জানালেন, সৌদি আরবে এখন পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবেই বাংলাদেশিদের চাকরি দেয়া হয়। অন্য কোনো পেশায় বাংলাদেশিদের তেমন আধিপত্য নেই। বাংলাদেশিদের চাকরিও দেয়া হয় না। ব্যবসাবাণিজ্য যারা করছিলেন তারা নতুন নিয়মের কারণে ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছেন। এ কারণে বাঙালি বাজারে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা দিন দিন কমেই চলেছে। পরিচ্ছনতা কর্মী হিসেবে নিয়োজিত থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে চলছে- সৌদি আরবে কেবল পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে ব্রান্ডিং হতে পারেন বাংলাদেশিরা। এতে করে ইমেজ সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
জেদ্দা এলাকায় বসবাস করেন সিলেট সদরের বাবুল মিয়া। তিনি জানালেন, ‘আকামা’ সঙ্গে নিয়ে ঘুরলেও কোনো লাভ হয় না। পুলিশ প্রায় সময় আকামা নিয়ে গায়েব করে ফেলে। এরপর ধরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। কোনো কারণ ছাড়াই বর্তমানে সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের সঙ্গে এধরনের আচরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবে স্থানে স্থানে আছে পুলিশের চেকপোস্ট। এই চেকপোস্টে পুলিশের রোষানলে পড়েন বাংলাদেশি শ্রমিকরাই বেশি। তার কথা প্রমাণ মিললো মক্কার হেরেম শরিফ এলাকায়। ফজরের নামাজের পরপরই বাঙালি অধ্যুষিত মিসফালাহ এলাকায় পুলিশ চেকপোস্ট বসায়। তারা দেখে দেখে আকামা চেক করে। এমনকি বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ হজ্ব পালনে যাওয়া বাংলাদেশিরাও পড়েন ওই চেকপোস্টে তল্লাশির মুখে। ফলে ওমরাহ পালনে যারা মক্কা যান তাদের সব সময় পাসপোর্ট ও ভিসার কাগজ সঙ্গে রাখতে হচ্ছে। গত ১৫ দিনে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি ওমরাহ পালনে গিয়ে সঙ্গে কাগজপত্র না থাকা বেকায়দায় পড়েন। পরে হোটেল থেকে মুয়াল্লিমের মাধ্যমে কাগজপত্র এনে তাদের ছাড়িয়ে নিতে হয়েছে।
এমন কঠোর আইন সৌদি আরবে অন্য কারো জন্য নয়। পাকিস্তানি ছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার বিপুলসংখ্যক মানুষ ওমরাহ পালনে যান। তারা স্থানীয়ভাবে দেশের এম্বেসির সহযোগিতা পাওয়ার কারণে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে ওমরাহ পালন করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশ এম্বেসির পক্ষ থেকে সে ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই বলে জানালেন জেদ্দা এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা। তারা জানান, কোনো বাংলাদেশির সমস্যা হলে বারবার ধরনা দিলেও এম্বেসির কর্মকর্তাদের দেখা মিলে না। ফলে অসহায় অবস্থায় নিজেদের ঝামেলা নিজেদের মেটাতে হয়। মদিনার করিম আল হেজ্জাজ নামে বাংলাদেশি মালিকানাধীন এক আবাসিক হোটেল আগে পরিচালনা করতেন বাংলাদেশিরা। সম্প্রতি সময়ে ওই হোটেলে বাধ্যতামূলক চাকরি দিতে হয়েছে সৌদির কয়েকজন নাগরিককে। তারাই এখন হোটেল পরিচালনা করেন।
ফলে মালিকের কর্তৃত্বও দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে। ওই হোটেলের এক কর্মচারী জানালেন, যেসব সৌদি নাগরিকদের এখানে চাকরি দেয়া হয়েছে, তাদের উচ্চ মূল্যে বেতন দিতে হচ্ছে। এভাবে চললে বেশি দিন ওই মালিকের পক্ষে হোটেল চালানো সম্ভব হবে না। একদিন হোটেল ব্যবসাও গুটিয়ে দেশের পথে রওনা দিতে হবে।

খাসোগি হত্যার দায় স্বীকার সৌদির

অনেক জল ঘোলা করার পর অবশেষে সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির রাজপরিবারের সমালোচক ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটেই এক মারামারির ঘটনায় খাসোগি নিহত হন। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, জামাল খাসোগি কনস্যুলেটে প্রবেশের অনতিবিলম্বেই তাকে হত্যা করা হয়। তবে তার লাশ কোথায় রয়েছে সেটা এখনো জানানো হয়নি। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, এ ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে সৌদি আরবের উপ-গোয়েন্দা প্রধান আহমাদ আল-আসিরি ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সিনিয়র সহকারী সৌদ আল-কাহতানিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে খাসোগি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অংশ হিসেবে ১৮ সৌদি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। সৌদির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, বাদশাহ সালমান দেশটির গোয়েন্দা বিভাগকে ঢেলে সাজানোর জন্য প্রিন্স বিন সালমানকে প্রধান করে একটি মন্ত্রিপরিষদীয় কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে সৌদি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সৌদ আল-মোজেব জানিয়েছেন, খাসোগির সঙ্গে আলোচনারত অবস্থায় ঝগড়ার সূত্রপাত হলে তাকে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, জামাল খাসোগির সাক্ষাৎকার যিনি নিচ্ছিলেন তার সঙ্গে বাকযুদ্ধ এক পর্যায়ে মারামারিতে পরিণত হয়।
এতেই খাসোগির মৃত্যু হয়। তিনি খাসোগির আত্মার শান্তি কামনাও করেন। এই প্রথম সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জামাল খাসোগির নিহত হওয়ার খবর স্বীকার করা হলো। এর আগে সৌদি বাদশাহ সালমান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেফ তাইয়্যেপ এরদোগানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। তার কিছুক্ষণ পরই রাষ্ট্রীয় টিভির নিউজ বুলেটিনে এ ঘোষণা দেয়া হয়।
সৌদি আরবের পক্ষ থেকে সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয়ার পর এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রামপ। শুক্রবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সৌদি আরবের ব্যাখ্যাকে আমি গ্রহণযোগ্য মনে করছি। সৌদি সরকারের প্রশংসা করে ট্রামপ বলেন, এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ভালো একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ডনাল্ড ট্রামপ সৌদি আরবকে পরম বন্ধু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, যা ঘটেছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। ট্রামপ জানান, সৌদি আরবের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের আওতায় সেখানে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত থাকবে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও সৌদির দায় স্বীকারকে স্বাগত জানানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খাসোগি হত্যা নিয়ে তদন্তে যথাযথ স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও দোষীদের বিচারে সৌদি আরবের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে। তবে তারা সৌদির বয়ান শুনেছে ও স্বাগত জানিয়েছে।
এ ছাড়াও খাসোগির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি খাসোগির হত্যাকাণ্ডে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। গুতেরেস বলেন, সবরকম প্রভাবের বাইরে থেকে এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে হবে।
এদিকে, ডনাল্ড ট্রামপ ও হোয়াইট হাউস খাসোগি হত্যা নিয়ে সৌদি আরবের ব্যাখ্যাকে স্বাগত জানালেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই অনেকে সৌদির কঠোর সমালোচনা করছেন। দেশটির অনেক আইন প্রণেতাই সৌদি আরবের দাবিকে অগ্রহণযোগ্য বলে তা নিয়ে তাদের সন্দেহ প্রকাশ করেছে। মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এক টুইটারে লিখেছেন, প্রথমে বলা হলো খাসোগি কনস্যুলেট ত্যাগ করেছেন ও তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সৌদি আরবের কোনো হাত নেই।
এখন বলা হচ্ছে,  মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) অজ্ঞাতসারেই কনস্যুলেটের ভেতরে খাসোগিকে হত্যা করা হয়েছে। নতুন এ ব্যাখ্যা মেনে নেয়া যায় না। আরেক সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল  সিএনএনকে বলেছেন, সৌদি আরবের এ ব্যাখ্যার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। আমি এ হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক তদন্ত চাই। এ ছাড়া, প্রতিনিধি পরিষদে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি টেড লিউ সৌদি আরবের দাবিকে অর্থহীন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, মারামারিতে নিহত হলে খাসোগির মৃতদেহ করাত দিয়ে কেটে টুকরো করার প্রয়োজন ছিল না।