Sunday, January 17, 2016

রাব্বীকে নির্যাতনের ঘটনায় তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে নির্যাতনের ঘটনায় তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। একই সাথে এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাওয়া হয়েছে।
আজ রোববার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসানুর রহমান, জুলফিকার আলী জুনু ও রাব্বীর বন্ধু জাহিদ হাসান এ আবেদন করেন।
আগামীকাল সোমবার বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি এ কে এম সাহিদুল হকের বেঞ্চে এ রিট আবেদনের শুনানি হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী জুলফিকার আলী জুনু ।
রিট আবেদনে গোলাম রাব্বীকে নির্যাতন কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, রাব্বির অভিযোগ এজাহার হিসেবে নেয়া এবং উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ শিকদারকে কেন গ্রেপ্তার করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির আবেদন করা হয়েছে।
একইোথে অতিরিক্ত জেলা জজের নিচে নয় এমন মানের একজন বিচারক দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তাও জানতে চেয়ে রুল জারি করার আবেদন জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া রাব্বীকে নিরাপত্তা দেয়া ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিন কোটি টাকা দেয়ার নির্দেশ কেন দেয়া হবে তা জানতে চেয়ে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রসচিব, আইনসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, তেজগাঁও জোনের উপকমিশনার, মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ শিকদার ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে রিটে বিবাদী করা হয়েছে।
গত ৯ জানুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে আটক করে ইয়াবা ব্যবসায়ী-সেবনকারী বানানোর ভয় দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ শিকদারসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। এরপর রাত ৩টা পর্যন্ত রাব্বীকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন রাস্তা ঘোরান এবং তাকে মারধর করেন। এমনকি তাকে বেড়িবাঁধে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকিও দেন। ঘটনার পরের দিন ১০ জানুয়ারি এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন রাব্বী। এরপর সারা দেশে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসে বিষয়টি। ১১ জানুয়ারি এসআই মাসুদকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে মাসুদকে সাময়িক বরখাস্ত করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

বারকিনা ফাসোর হোটেলে আল কায়দার তাণ্ডব

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বারকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগুর একটি হোটেল ও রেস্টুরেন্টে জঙ্গিগোষ্ঠী আল কায়দার হামলায় ১৮টি দেশের অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। হামলাকারীদের হাতে জিম্মি ১২৬ জনকে মুক্ত করা হয়েছে। দেশটির তথ্যমন্ত্রী রেমিস দাঁদজিনৌ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। উদ্ধারকৃত জিম্মিদের মধ্যে এএফপির সাংবাদিকসহ দেশটির শ্রমমন্ত্রী ক্লিমেন্ট সোয়াদগু রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ হামলায় অন্তত ৩৩ জন আহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি পর্যবেক্ষক দল বলছে, সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়দা ইন ইসলামিক মাগরেব (একিউআইএম) হামলার দায় স্বীকার করেছে। খবর বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স ও ডেইলি মেইলের।
ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ওয়াগাদুগুর বিলাসবহুল স্পে­নডিড হোটেলে আল কায়দার স্থানীয় শাখার বেশ কয়েকজন মুখোশ পরিহিত বন্দুকধারী হামলা চালায়। এর আগে হোটেলটির সামনে গাড়িবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। ওই হোটেলে জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও পশ্চিমা দেশ থেকে আসা পর্যটকরা থাকেন। এ সময় হামলাকারীরা শতাধিক মানুষকে জিম্মি করে। জিম্মিদের মুক্ত করতে সেখানে অভিযান শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনী। একই সময়ে পার্শ্ববর্তী কাপুচিনো রেস্তোরাঁতেও হামলার খবর পাওয়া যায়। দুই স্থানে অভিযান শেষ হলে নিকটবর্তী হোটেল ইয়েবিতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা) অভিযান চলছিল। জঙ্গিরা পালিয়ে থাকতে পারে- এমন আশংকায় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ওই অভিযান চালাচ্ছে।
বারকিনা ফাসোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিমন কম্পাওরে রয়টার্সকে বলেন, ‘স্পে­নডিড হোটেল এবং নিটকবর্তী কাপুচিনো রেস্তোরাঁয় অভিযান শেষ হয়েছে। ১২৬ জন জিম্মিকে মুক্ত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৩৩ জন আহত।’ তিনি আরও বলেন, ‘তিন জঙ্গিকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন আরব ও দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ‘দুই স্থান মুক্ত করা হলেও জঙ্গিদের খোঁজে নিকটবর্তী হোটেল ইয়েবিতে এখনও অভিযান চলছে।’ ডেইলি মেইল জানায়, অভিযানে বারকিনা ফাসোর বাহিনীকে সাহায্য করেছে ফরাসি বাহিনী। ফ্রান্সের স্পেশাল ফোর্সের ৩০ জন সেনা ও একজন মার্কিন সেনা ওই হোটেলে অপারেশন চালায়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ এই হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ফরাসি বাহিনী বারকিনা ফাসো বাহিনীকে সহযোগিতা করছে। প্রেসিডেন্ট ওলান্দ বারকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট কাবরেকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।’ স্পে­নডিড হোটেলের অবস্থান বারকিনা ফাসোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বন্দুকধারীরা হোটেলের কাছে কাপুচিনো ক্যাফেতেও ঢোকে।
ওই ক্যাফেটি সাধারণত জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও পশ্চিমা নাগরিকরা ব্যবহার করেন। বার্তা সংস্থা এএফপির এক কর্মীও হামলার সময় ওই ক্যাফেতে ছিলেন। স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিবিসি ১৮টি দেশের অন্তত ২৩ ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া চার হামলাকারী নিহত, যাদের মধ্যে দু’জন নারী বলেও জানিয়েছে বিবিসি। আল কায়দা ইন ইসলামিক মাগরেব (একিউআইএম) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। এরা জঙ্গি নেতা মুখতার বেল-মুখতারের অনুসারী হতে পারে বলে বিবিসি ধারণা করছে। বারকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট রোচ কাবরে শনিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এদিকে পৃথক একটি ঘটনায় বারকিনা ফাসোর উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা থেকে অস্ট্রিয়ার এক দম্পতিকে অপহরণ করা হয়েছে বলে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে পশ্চিম আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত নভেম্বরে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন এক অভিজাত হোটেলে বিদেশীসহ ১৭০ জনকে জিম্মি করে বন্দুকধারীরা। ৯ ঘণ্টা পর এ জিম্মি দশার অবসান ঘটে। এ ঘটনায় অন্তত ২৭ জন নিহত হন। ওই হামলার দায়দায়িত্বও স্বীকার করে জঙ্গি দল আল কায়দা ইন ইসলামিক মাগরেব।

মিয়ানমারে হাতির ভয়ে ঘর সংসার গাছে!

একজন দু’জন নয়, গ্রামশুদ্ধ লোক গাছে থাকেন। গাছের ওপর তারা ছোট ছোট ঘর বানিয়ে নিয়েছেন। ওখানেই চলে তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম। না, শখ বা কোনো ধরনের পাগলামি থেকে তারা এমনটি করেননি। তাদের গাছে ঘর সংসারে বাধ্য করেছে একদল বন্যহাতি। হাতির হামলা থেকে বাঁচতেই মিয়ানমারের এক গ্রামের লোকজন তিন বছর ধরে গাছে বসবাস করছেন। খাবারের খোঁজে পাহাড় থেকে নেমে আসে বুনো হাতির দল। তারা গ্রামের শষ্যক্ষেত্রগুলো তছনছ করে দেয়। শুঁড় দিয়ে টেনে ভেঙে ফেলে তাদের ঘরবাড়ি। তাদের যাত্রপথে কেউ পড়লে আর রক্ষা নেই। নিমিষেই তাকে ধ্বংস করে ফেরবে। এমনি করে কতজনকে পিষে মেরেছে হাতি। তাই তো কিয়াত চুয়াং গ্রামের লোকের খুঁজে নিয়েছে বেঁচে থাকার নতুন উপায়।
তারা বাঁশ আর কাঠ দিয়ে বড় বড় গাছের ওপর ঘর বানিয়ে সেখানেই জীবনযাপন করতে শুরু করেছে। মাটি থেকে কয়েক মিটার ওপরে এক গাছে ঘর বেঁধেছেন ওই গ্রামের বাসিন্দা সান লুইন। তিনি জনান, ‘আমরা গাছের ওপর ঘর বেঁধেছি। কী করব বলুন, বাঁচতে তো হবে! এখন আমরা অনেক নিরাপদ।’ রাজধানী ইয়াংগুন থেকে কিয়াত চুয়াংয়ের দূরত্ব ১শ’ কিলোমিটার। এখানকার লোকজনের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। তিন বছর আগে ওই গ্রামের ওপর হাতির হামলা শুরু হয়। এখন তো তা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তো তারা গাছের ওপর বাঁশ দিয়ে কুঁড়েঘর বানিয়ে নিয়েছে। হাতির দল আসছে খবর পেলেই তারা গাছের মগডালে ওঠে যায়। সপ্তাহে তিন চারবার তো এমন হয়ই। কিন্তু এটা তো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এ কথা বললেন ৫৭ বছরের কৃষক থান শিন। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই ওদেরে এখান থেকে বিতাড়িত করা হোক। তাহলেই আমরা শান্তিতে বসবাস করতে পারব।’ মিয়ানমারে হাতিদের এ উৎপাতের জন্য বন ধ্বংস করার প্রবণতাকে দায়ী করে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সংক্ষেপে ফাওয়ের হিসাব মতে গত দুই দশকে (১৯৯০ থেকে ২০১০ ) দেশের মোট ২০ ভাগ বনাঞ্চল ধ্বংস করা হয়েছে। দেশটির সামরিক শাসনামলে কৃষিজমির পরিমাণ বাড়াতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব বন উচ্ছেদ অভিযান চালান হয়েছে যার পরিণতি ভোগ করছে কিয়াত চুয়াং গ্রামের মানুষগুলো। নিজেদের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার কারণেই খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে ছুটে আসছে এশিয়ার এই বন্যহাতিগুলো। শুধু কি বনাঞ্চল ধ্বংস? মূল্যবান দাঁতের কারণেও এসব হাতিদের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। এমনকি এসব পশুগুলোকে থাইল্যান্ডে পর্যন্ত পাচার করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। মিয়ানমারে ক্ষমতায় আসছেন দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি। সরকার গঠন করার পরই দেশের পরিবেশ ইস্যুতে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট সোয়ে নিয়ান্ট। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘আমরা মিয়ানমারে কয়েক দশক ধরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিবেশ উদ্ধার করার চেষ্টা করব। যদিও জানি কাজটা অত সহজ নয়।’ এএফপি।

চরম সংকটে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা by এম সাখাওয়াত হোসেন

ভেবেছিলাম, এ পর্যায়ে নির্বাচন নিয়ে লেখার পর্ব শেষ। কারণ, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৫-এর পৌর নির্বাচনের পর ওই নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা, আলোচনা আর অনেক বিশ্লেষণ হয়েছে। বারবার মনে হয়েছে, আমাদের দেশে মোটামুটি একটি সুস্থধারার নির্বাচনের যে প্রয়াস গত দুই দশকে কমবেশি দেখা গিয়েছিল, তা ২০১৪ সালের শুরুতে যে হোঁচট খেয়েছিল, সেখান থেকে আর বের হতে পারেনি। তারপরও অনেকে আশা করেছিলেন এ অবস্থা থেকে হয়তো বের হওয়া যাবে। তবে আমি একমত হতে পারছিলাম না। অনেকে বলেছিলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ২০১৪ সালের পরের অন্যান্য নির্বাচন থেকে অন্তত ভালো ছিল। সেখানেও আমার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল, এখনো আছে। অন্তত ১২ জানুয়ারি, ২০১৬ সালে পূর্বতন নির্বাচনে স্থগিত হওয়া মাধবদী পৌরসভার পূর্ণাঙ্গ এবং আরও বেশ কিছু স্থগিত বিভিন্ন পৌরসভার বিচ্ছিন্ন কেন্দ্রগুলোর ঘটনাবহুল পুনর্নির্বাচন তেমনটাই বলে।
কয়েকটি পত্রিকার বিস্তারিত তথ্য বিবরণে (প্রথম আলো, আমাদের সময়; ১৩ জানুয়ারি, ২০১৬) এবং দু-একটি বেসরকারি টেলিভিশনে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা সত্যিই হতাশাজনক। কারণ, মূল নির্বাচনে যা-ই হয়ে থাক না বা হয় না কেন, অতীতে ওই সব বিচ্যুতি ইতিপূর্বে স্থগিত নির্বাচনগুলোতে দেখা যায়নি। স্থগিত বা পুনর্নির্বাচন সাধারণত এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়, যেখানে ফাঁকফোকর যেমন থাকে না, তেমনি নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করায় কোনো সমস্যাই থাকে না। হাতে গোনা কয়েকটি এলাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা আমাদের নির্বাচন কমিশনের পক্ষে কোনো বড় ঘটনা হওয়ার কথা নয়। অতীতে এ ধরনের নির্বাচন নিয়ে সংবাদপত্র বা অন্যান্য মিডিয়ায় এতখানি জায়গা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলেও মনে হয় না।
অন্যান্য স্থগিত কেন্দ্রের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে জাল ভোটের মহোৎসব হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। তবে মাধবদী পৌরসভার সম্পূর্ণ ১২টি কেন্দ্রের যে বিস্তারিত তথ্য ১৩ জানুয়ারি, ২০১৬-এর প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, তা নির্বাচন বিষয়ে যাঁরা গবেষণা করার ইচ্ছা রাখেন, তাঁদের জন্য একটি ‘কেস স্টাডি’ হতে পারে। ওই উপনির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীই জয়ী হয়েছেন, হয়তো সুষ্ঠু ভোট হলেও তিনিই নির্বাচিত হতেন। এসব নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের এত বড় ব্যবস্থাপনার মধ্যে কেন এমন হবে, তা গবেষণার বিষয় হতে পারে।
প্রকাশিত তথ্যমতে, মাধবদী নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য প্রায় শতাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং ১২টি কেন্দ্রের জন্য আটজন নির্বাচনী কর্মকর্তাকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অভিজ্ঞতার আলোকে ধারণা করা যায় যে এসব কর্মকর্তা নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এমতাবস্থায় এমন কারচুপি, জাল ভোট আর কেন্দ্র দখল কেন এবং কীভাবে হতে পারে? এতসংখ্যক সদস্য থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন কি একেবারেই অন্ধকারে ছিল? তথ্যে প্রকাশ যে ওই পৌরসভার ভোট গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচন কমিশনের একজন অতি অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি কী দেখেছিলেন এবং নির্বাচন কমিশনে কী তথ্য দিয়েছিলেন, তাও জানা যায়নি। এত বেষ্টনীর মধ্যেও দুটি কেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণের পর প্রকাশ্যে দখল করা হয়েছিল। ওই কেন্দ্রগুলো স্থগিত করা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এত কিছুর পরেও কেন এই নির্বাচনকে বৈধ করতে রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণা করলেন? তিনি কি এ অরাজকতার খবর পাননি? এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশনের কী করণীয় ছিল বা করতে পারত? এতসব কাণ্ড যখন চলছিল তখন নির্বাচন কমিশনে কী ধরনের তথ্য আসছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশনই দিতে পারবে। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নির্বাচন কমিশনের না জানার কথা নয়। মাধবদী ঢাকা থেকে তেমন দূরেও নয়।
মাধবদীর নির্বাচন পর্যালোচনায় বেশ কয়েকটি বিষয় উঠে এসেছে, যার দু-একটির সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রথমই প্রশ্ন ওঠে যে সরকারি দলের প্রার্থী, যাঁদের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এগিয়ে থাকার কথা, তাঁদের পক্ষে কেন নির্বাচনে তথ্যমতে কারচুপির পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছে? সরকারি দলের বিপক্ষে মূলত যে দলটি রয়েছে, তাদের সাংগঠনিক অবস্থা দৃশ্যত দুর্বল এবং জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে প্রায় প্রতিদিন সরকারি দলের মুখপাত্ররা বলে থাকেন। এমনকি ইদানীং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেফাঁস অহেতুক মন্তব্যও তাদের বিপক্ষে গেছে বলে মনে করা হয়। তথাপি সরকারি দলের প্রার্থীকে এমন অবস্থায় কেন যেতে হলো?
কারচুপি নানাবিধ কারণে হয়ে থাকে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন। এলবার্টো সিম্পস তাঁর গবেষণা পুস্তক হোয়াই গভর্নমেন্টস অ্যান্ড পার্টিস ম্যানিপুলেট ইলেকশনস (Why Governments and Parties Manipulate Elections) উল্লেখ করেন যে মূলত দুটি কারণে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে কারচুপির আশ্রয় নেয়। প্রথমত, প্রধানত রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় নেয়। অবশ্য যদি প্রতিপক্ষ দুর্বল এবং প্রতিহত করার মতো অবস্থায় না থাকে। যদিও এখানে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সংস্থার কার্যকারিতার উল্লেখ করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, প্রার্থী পর্যায়ে কারচুপির আশ্রয় নেওয়ারও বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অবশ্য বিজয় নিশ্চিত করার বিষয়টি যেমন থাকে, তেমনি বিপক্ষকে শক্তিমত্তা প্রদর্শনের বিষয়টিও থাকে। অনেক সময় অনেক শক্তিশালী প্রার্থী, যাঁর বিজয় নিশ্চিত, এমন ক্ষেত্রেও ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় নিয়ে থাকেন ওপরে উল্লেখিত কারণে এবং তিনি যে ব্যাপক জনপ্রিয় তার প্রমাণ দিতে। হয়তো এসবের প্রয়োজন হয় না, তথাপি কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়। অবশ্য এসব গবেষণা আমাদের মতো আফ্রো-এশিয়ান দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে। এই গবেষক মনে করেন যে এভাবে যারা বা যে দল বিজয়ী হয়, তাদের এ জয় জনসমর্থিত বা বৈধ না হলেও প্রতিপক্ষকে দুর্বল প্রমাণ করা এবং জনগণকে শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়ে থাকে।
উপরিউক্ত গবেষণায় অনেক ফাঁকফোকর থাকলেও এমন কারচুপির নজির এন্তার। আমরা ইদানীং নির্বাচনে যে ধরনের কারচুপির উদাহরণ দেখছি, তা বিশ্লেষণ করলেও এমনই বিষয় দৃশ্যমান হয়। বিশেষ করে স্থানীয় নির্বাচন যদি সরকারি দলের জনপ্রিয়তার এবং প্রতিপক্ষকে আরও দুর্বল করার বিষয়টি যুক্ত থাকে। অবস্থাদৃষ্টে তেমনই মনে হচ্ছে। সরকারি দলের সমর্থিত প্রার্থীদের সিংহভাগ হয়তো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে জয়ী হতেন বলে অনেকেই মনে করেন। এ ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারি দল কতখানি লাভবান হয়েছে, তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।
আমি যে গবেষণার কথা বলেছি তা তাত্ত্বিক হলেও এর প্রতিফলন অনেক দেশের নির্বাচন পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশন বা নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংস্থার করণীয় তেমন আলোচনায় আসেনি। নির্বাচন যাতে ব্যাপক কারচুপির মুখে না পড়ে, সে কারণে আমাদের মতো দেশে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন সংবিধান দ্বারা গঠিত হয়েছে। সংবিধানের আওতায় প্রচুর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য করার জন্য। বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হতে হলে নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু করতেই হবে। বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সংবিধান ক্ষমতা দিয়েছে।
বিদ্যমান নির্বাচনী আইন মোতাবেক নির্বাচন চলাকালীন যেকোনো সময়ে যদি প্রতীয়মান হয় যে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য বা অবাধ হচ্ছে না, কমিশন তার ক্ষমতা বলে আংশিক অথবা সম্পূর্ণ নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। অপরদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা বেসরকারিভাবে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের কাছে আইনানুগ কতখানি ক্ষমতা রয়েছে তা তেমনভাবে উল্লেখ না থাকলেও সংবিধানের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, যদি কমিশন সে ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে দৃঢ় মনোভাব পোষণ করে। অবশ্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে, যদি সে ধরনের দৃঢ়চেতা কমিশন কার্যকর থাকে। মাধবদী একটি উদাহরণ হয়ে থাকত যদি নির্বাচন কমিশন পুনরায় স্থগিত করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিত। হয়তো উচ্চ আদালতে এখতিয়ার নিয়ে চ্যালেঞ্জ হতে পারত, তাতে বিপরীত সিদ্ধান্ত হলেও নৈতিকভাবে নির্বাচন কমিশন জয়ী হতো।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে আমাদের মতো দেশের এহেন পরিস্থিতিতে কারচুপি ঠেকাতেই এত আইন এবং যজ্ঞ করতে হয়, যার উদাহরণ মাধবদী। তথাপি কারচুপি ঠেকানো যায়নি কেন? কেনই-বা নির্বাচন চলাকালীন কমিশন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি, তার উত্তর নির্বাচন কমিশনই দিতে পারবে।
নির্বাচন কমিশনের হাতকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা অনেকেই বলে থাকেন। আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, এখানে যে ফাঁকফোকর রয়েছে তার প্রতিকারে আইনের মাধ্যমে রিটার্নিং কর্মকর্তার বেসরকারিভাবে ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ করার নিশ্চিত ক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে আইনে উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। তবে যত আইনই থাকুক বা সংযোজন করা হোক না কেন, তা প্রয়োগ না করলে দৃশ্যমান কারচুপি ঠেকানো সম্ভব নয়। এ আলোচনা শেষ করব মাও সেতুংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে। ‘ইট ইজ নট দ্য গান বাট মেন বিহাইন্ড দ্য গান মেটারস’ (কামান নয়, কামানের পেছনের মানুষই গুরুত্বপূর্ণ) অর্থাৎ আইন প্রয়োগ না করলে আরও শত আইন করেও লাভ হবে না। আইন প্রয়োগকারীরা যদি তা প্রয়োগ না করেন বা করতে উৎসাহী না হন তবে আইন থেকেও কোনো লাভ নেই। মাধবদীর পুনর্নির্বাচন এমনই একটি উদাহরণ।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

কী বার্তা দিয়ে গেল ব্রাহ্মণবাড়িয়া? by ফারুক ওয়াসিফ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসাছাত্রদের রাগের ধ্বংস-ছবি দেখে প্রায় সবাই হতভম্ব। কিন্তু এমন ঘটনা কি নতুন? মাত্র কয়েক মাস আগে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভের এমন বিস্ফোরণ কি ঘটেনি? তবে থানা বা সরকারি স্থাপনায় আগুন স্বতঃস্ফূর্ত সাধারণ মানুষ দেয় না সাধারণত। এর জন্য দলের বা উদ্দেশ্যবাদী লোকের হাত ও উসকানি লাগে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনে হামলার সময় মাদ্রাসাছাত্রদের সঙ্গে এ রকম কিছু বহিরাগত জিনস-শার্ট পরা যুবককে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রের খবর। বিক্ষোভের মানুষ মুখ লুকায় না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদ্রাসাছাত্রদের মধ্যে বহিরাগতরা কারা ছিল, তদন্তকারীরা তা খুঁজে দেখতে পারেন।
হত্যার চেয়ে শোকের আর ঘৃণার আর কী হয়? এক ছাত্রের মৃত্যুর শোক আর ক্রোধ আশপাশের মাদ্রাসাছাত্রদেরও খেপিয়ে তুলল। তাতে মাদ্রাসার শিক্ষকনেতাদের পরোক্ষ সমর্থন থাকাও অসম্ভব নয়। পাড়ার ছেলেরাও যোগ দেওয়ায় তারা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। পরদিন সকাল থেকে তারা শয়ে শয়ে বেরিয়ে পড়ল; শহরজুড়ে তাণ্ডব চালাল। এরই একপর্যায়ে আবির্ভাব ঘটল বহিরাগত কিছু যুবকের। পোড়ানো হলো উপমহাদেশের পরম শ্রদ্ধেয় সংগীতসাধক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিবিজড়িত অনেক সামগ্রী। রেলস্টেশনসহ অন্যান্য ক্ষতিও কম নয়। তাহলেও যারা হত্যা নিয়ে নীরব, তারা সংস্কৃতির ক্ষতি নিয়ে সরব। যারা হত্যার প্রতিবাদ করেছেন, তাঁরা লাগামছাড়া বিক্ষোভের সমালোচনা কম করছেন। জীবন ও সংস্কৃতির মূল্যের তুলনায় যাব না। ভাষার জন্য যে দেশের মানুষ জীবন দেয়, সে দেশে জীবন, সংস্কৃতি ও অধিকার মোটেই আলাদা ব্যাপার নয়। তাই হত্যা ও ধ্বংসের প্রতিবাদ একসঙ্গেই করতে হবে। বলতে হবে, আমাদের নামে আর হত্যা ও ঐতিহ্য ধ্বংস নয়। আমাদের এখন এমন চেতনা ও রাজনীতি দরকার, যা জীবন আর সংস্কৃতিকে এক করে দেখবে ও বাঁচাবে। মানুষই সংস্কৃতির জন্ম দেয়, সংস্কৃতিরই দায় মানুষের পক্ষে থাকবার।
প্রাণের চেয়ে বড় ক্ষতি নেই। বিগত জীবন আর ফিরে আসে না। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনের স্মৃতিচিহ্নগুলোও ফিরে আসবে না। মাদ্রাসাছাত্রের প্রাণও প্রাণ, সে-ও বাংলাদেশের নাগরিক এবং তার মৃত্যু হয়েছে হামলার শিকার হয়ে। অভিযোগ আছে, ছাত্রাবাসে পুলিশ ও বহিরাগতদের যৌথ অভিযানে তার মৃত্যু হয়। হত্যা হিসেবেই একে দেখতে হবে। পাশাপাশি শহরজুড়ে রেললাইন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি, রাজনৈতিক ও এনজিওর দপ্তর ভাঙাকে নৈরাজ্যই বলতে হবে। দুই ঘটনারই বিচার দরকার।
এ ঘটনা সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য সতর্কসংকেত। যেকোনো জায়গায় তিল পরিমাণ সংঘর্ষ থেকে দাবানল লেগে যেতে পারে। পরিস্থিতি অনেকটা মাইনফিল্ডের মতো, কখন কোথায় অসতর্ক পা ফেলেছ তো দুম করে বিস্ফোরণ!
বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ দিয়েই ঘটনাটা শেষ হয়ে যেতে পারত, যদি পুলিশ এবং ছাত্রলীগ বাহাদুরির লোভ সামলাত। প্রথম দফা সংঘর্ষের পর মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়ার বদলে তারা রাতের অন্ধকারে ছাত্রাবাসের ফটক ভেঙে ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর হামলে পড়ল। জামিয়া ইউনুছিয়া নামের ওই মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের অভিযোগ, ওই সময় মাসুদুর রহমান নামের এক ছাত্রকে লাথি দিয়ে ভবনের ওপর থেকে ফেলে দিলে তার মৃত্যু হয়। ঘটনাক্রমে ছাত্রটি মাদ্রাসার হাফেজ।
এ বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এমন ঘটনা কেমন করে ঘটে, তার সূত্রটা কিন্তু ধরা দিল না। শহরবাসীর অবাক হওয়াটা বোঝা যায়। একটা সাধারণ শান্তিপূর্ণ দিন হঠাৎ দুমড়ে-মুচড়ে গেল ক্ষোভের বিস্ফোরণে। পুলিশ-ছাত্রলীগ বনাম মাদ্রাসাছাত্রদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে সরকার ও প্রশাসনের বিপক্ষে। দুই পর্বে দুই দিন সহিংসতা চলল। নিহত হলো এক ছাত্র, আহত অনেক। ছাত্র-তরুণদের সহিংস বিক্ষোভ ও জ্বালাও-পোড়াও বাংলাদেশ অতীতেও দেখেছে। কিন্তু নৈরাজ্য সৃষ্টি করে কিছু আদায় করা যায়নি কখনো। যে আন্দোলন ভয় ছড়ায়, সেই আন্দোলনে মানুষ আসে না।
এই হতভম্বকর পরিস্থিতির দায় সরকারেরও। যে কেউ যে কাউকে খুন করতে পারবে না, করলেও পার পাবে না। এ জন্যই পুলিশ-প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতি ভরসা রাখা হয় এবং তাদের নির্দেশ মানা হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতি হঠাৎ দাঙ্গার ত্রাসে ডুবে যায় কীভাবে? সরকারি সংস্থাগুলো তখনই পরিস্থিতি পরিমাপ করতে পারে না, যখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওই দুটি দিন প্রশাসন কী করেছিল? তাদের যদি জনগণের ওপর, পুলিশের ওপর, সরকারি দলের কর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণই না থাকে, তাহলে কীভাবে আওতার বাইরের মাদ্রাসা ছাত্রদের তারা সামলাবে? সারা দেশের গ্রাম-মহল্লা কি শহর-মফস্বলে হঠাৎ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়া ঠেকাতে কী প্রস্তুতি আছে প্রশাসনের? গত কয়েক বছরে বারেবারেই তো এমন সহিংস ঘটনা ঘটেছে। কোনো ক্ষেত্রেই তো দেখা যায়নি যে, ক্ষয়ক্ষতির আগেই ঘটনার রাশ ধরা গেছে। জনবিচ্ছিন্ন প্রশাসন ও গজদন্ত মিনারবাসী রাজনীতি ছাড়া নৈরাজ্য বিস্তৃত হতে পারে না।
বলপ্রয়োগের পথ ছাড়া উত্তেজনা মোকাবিলার আর কোনো পথ তাদের জানা নেই। প্রতিষ্ঠিত আইন-রাজনীতি ও নৈতিকতা যখন মানুষের অসন্তোষ মেটাতে পারে না, তখনই প্রান্তিক জনসাধারণ ওই সভ্যতা ও নৈতিকতা ত্যাগ করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আমরা এটাই দেখেছি। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা যদি আদব ও নৈতিকতায় নিজেদের উন্নত ভাবেন, তাহলে কী করে ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের মতো ভাঙচুরের পথে যান? ব্রাহ্মণবাড়িয়া বারেবারেই এ ধরনের সহিংসতার কবলে পড়েছে, বারেবারেই মাদ্রাসাছাত্ররা সেখানে সহিংসতার হাতিয়ার ও শিকার দুটোই হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যর্থতা এই, এখানে বলপ্রয়োগ বা পাল্টা সহিংসতা ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিকতা, শাসনতরিকা বা প্রতিবাদের উপায় কারও জানা নেই। সমাজে ও রাজনীতিতে তাই আদিম হিংসার নৃত্য দেখা যাচ্ছে। এই আদিমতা আসলে ক্ষমতা দেখানোর আদিম অভ্যাসেরই আয়না-ছবি। ক্ষমতা যখন মানুষকে অসহায় করে তোলে, তখন সেই সব মানুষ নির্ভয় ও নির্লজ্জ হয়ে পাল্টা ক্ষমতা জাহির করে। অথবা পুলিশের হাতে নির্যাতিত ব্যাংক কর্মকর্তা রাব্বীর মতো ভয়ে ‘অস্বাভাবিক’ রকম গুটিয়ে যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই পক্ষের সহিংসতার বিচার আদালত করবেন, কিন্তু যে হিংসার তেজস্ক্রিয়তা সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে, তার চিকিৎসা করা রাজনীতির কাজ।
এমন সহিংসতার উৎস যাঁরা খোঁজেন, তাঁদের জন্য একটি গল্প। এক শ্রমিককে চোর বলে সন্দেহ করে ম্যানেজার। প্রতি সন্ধ্যায় কারখানা ছাড়ার সময় তার ট্রলিটি ভালো করে তল্লাশি চালানো হয়। কিন্তু কিছুই মেলে না। একদিন তারা অবাক হয়ে আবিষ্কার করে, শ্রমিকটা ট্রলিতে করে কিছু নিচ্ছে না বটে, সে আসলে ট্রলিটাই চুরি করছে! আমাদের সমাজ ওই ট্রলির মতো। সহিংসতার বীজ সমাজের কোনো একক গোষ্ঠীর মধ্যে খুঁজে লাভ নেই, পুরো সমাজ-রাজনীতিই সহিংস হয়ে উঠছে।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

দুই ভাই এবং একটি মোটরসাইকেলের গল্প by তারেক মাহমুদ

ভাই মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে মুস্তাফিজ।
বাংলাদেশি এই পেসারের জীবনের গল্পে
ভাই আর মোটরসাইকেল—দুইয়ের ভূমিকাই
খুব গুরুত্বপূর্ণ l ছবি: শামসুল হক
রাত ১২টায় ফোন। পরদিন মুস্তাফিজকে যে করেই হোক ঢাকায় পৌঁছাতে হবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল বাংলাদেশে এসেছে। তাদের নেটে বল করবে মুস্তাফিজ। হ্যাঁ, মুস্তাফিজ...মুস্তাফিজুর রহমান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাঁহাতি পেস বোলিং বিস্ময়।
ওই ফোনটা করেছিলেন মুস্তাফিজের একসময়ের কোচ শেখ সালাউদ্দিন। অতটুকু ছেলে অত রাতে এমন ফোন পেয়ে কী করবে বুঝতে পারছিল না। সেজো ভাই মোখলেছুর রহমানকে (পল্টু) কথাটা বলতেই অভয় দিলেন, ‘চিন্তা করিস না। আমি নিয়ে যাব।’ পরদিন ছিল হরতাল। তবু দমেননি পল্টু। ভোরে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ থানার তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে মোটর-সাইকেলে করে ছোট ভাইকে নিয়ে আসেন খুলনার চুকনগরে। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে ঢাকা। মুস্তাফিজের সেই প্রথম ঢাকায় বল করতে যাওয়া। তবে ওটাই প্রথম মোটরসাইকেলে চড়া নয়।
ক্রিকেটাররা বড় হয়ে তাঁদের খেলোয়াড় হওয়ার পেছনের গল্পে অনেককেই টানেন। মুস্তাফিজের গল্পে আছে সাতক্ষীরার গণজাগরণ সংঘের কোচ আলতাফ বা আরেক কোচ তপুর কথা। প্রয়াত কোচ সালাউদ্দিনের কথাও ভোলার নয়। তবে এই গল্পে ভাই পল্টু ও একটি বাজাজ ডিসকভারি মোটরসাইকেলও আছে প্রবলভাবে।
এর আগে গল্প আছে আরও। মুস্তাফিজের বয়স তখন ১৪ কি ১৫ বছর। তেঁতুলিয়া গ্রামের মাঠে মাঠে খুব জনপ্রিয় টেনিস বলের ক্রিকেট। বড় ভাই মাহফুজুর রহমান গ্রামীণফোনে চাকরি পেয়ে খুলনায় আসার পর আর না খেললেও মুস্তাফিজসহ বাকি তিন ভাই ছিলেন সেসব টুর্নামেন্টের নিয়মিত মুখ। তাঁদের দলের নাম ছিল রাজাপুর আরপি সংঘ। তো এক ম্যাচে প্রতিপক্ষের এক ব্যাটসম্যানের হাতে তুলোধোনা হচ্ছিল তাঁদের সব বোলার। তাঁকে ফেরানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে অধিনায়ক পল্টু মুস্তাফিজের হাতে বল তুলে দেন। মেজো ভাই জাকির হোসেনের অস্বস্তি হচ্ছিল। অতটুকু ছেলে কি পারবে ঠিকভাবে বল করতে! মুস্তাফিজ পারলেন। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে প্রথম বল হাতে নিয়েই দেখালেন জাদু।
কাল দুপুরে খুলনার সোনাডাঙা আবাসিক এলাকার ৬ নম্বর সড়কে বড় ভাইয়ের বাসায় বসে পল্টু বলছিলেন, ‘উইকেটকিপারকে সরিয়ে আমি নিজে কিপিংয়ে গিয়ে মুস্তাফিজকে বল দিই। প্রথম দুই বলেই পরাস্ত ব্যাটসম্যান। তৃতীয় বলে বোল্ড এবং ওটা কাটারই ছিল। বলটা ব্যাটসম্যানের পায়ের পেছন দিক দিয়ে ঘুরে এসে স্টাম্পে লাগে। অবশ্য টেনিস বল তো, কাটার এমনিতেই হয়ে যায়।’
ওই একটা বলই বদলে দেয় মুস্তাফিজের জীবন। তাঁকে দিয়ে নিয়মিত বল করানো শুরু হয় তেঁতুলিয়ার টুর্নামেন্টে। দলগুলো অনেক সময় তেঁতুলিয়ার বাইরে থেকেও ভাড়ায় খেলোয়াড় আনত। একজন খেলোয়াড়কে প্রতি ম্যাচ দিতে হতো চার-পাঁচ শ টাকা। ভাইয়েরা চিন্তা করলেন, টাকা দিয়ে বাইরে থেকে খেলোয়াড় না এনে মুস্তাফিজকেই গড়েপিটে নেবেন। কয়েকটি ম্যাচ খেলার পর ছোট ভাইয়ের প্রতিভা আরও স্পষ্টভাবে ধরা দিল তাঁদের কাছে। পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত হলো, মুস্তাফিজকে ক্রিকেট বলে অনুশীলন করার সুযোগ করে দিতে হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। গণজাগরণ সংঘের হয়ে ফুটবল খেলার সুবাদে ওই ক্লাবের ক্রিকেট কোচ আলতাফ হোসেনের সঙ্গে পরিচয় ছিল পল্টুর। তাঁর কাছে মুস্তাফিজকে নিয়ে যেতেই একটা শর্ত দিয়ে দিলেন কোচ-ভালো খেলোয়াড় হতে হলে টেনিস বলের খেলা ছাড়তে হবে। খেলতে হবে শুধু ক্রিকেট বলে। এরপর থেকে মুস্তাফিজ আর টেনিস বলে বল করেননি। তেঁতুলিয়ায় ক্রিকেট বলে অনুশীলন করার জায়গা না থাকায় বাড়ির পেছনেই ম্যাট বিছিয়ে ক্রিকেট বলের উইকেট বানিয়ে দেন ভাইয়েরা। আর পল্টুর কথা শুনে তো মনে হলো, টেনিস বলে বল করাটা এখন পারিবারিকভাবেই নিষিদ্ধ মুস্তাফিজের জন্য, ‘টেনিস বলে অনেক জোর দিয়ে বল করতে হয়। তাতে চোটের সম্ভ্রাবনা থাকে। আমরা চাই না ওর আমাদের দলে খেলার জন্য দেশের ক্ষতি হোক।’
টেনিস বলের মুস্তাফিজ যেদিন থেকে ক্রিকেট বলের মুস্তাফিজ হয়ে গেলেন, সেদিন থেকেই তাঁর ক্যারিয়ারে ঢুকে গেল একটা বাজাজ ডিসকভারি মোটরসাইকেল। মুস্তাফিজদের বাড়ি সাতক্ষীরা থেকে ৪০ কিমি দূরে। এই পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন ভোরে পল্টুর ওই মোটরসাইকেলের পেছনে চড়েই আসতেন গণজাগরণ সংঘের অনুশীলনে। জোরে চালালে ৪৫ মিনিটের মতো সময় লাগত। কিন্তু ছোট ভাইকে পেছনে বসিয়ে অত জোরে বাইক ছোটাতেন না পল্টু। তেঁতুলিয়া-সাতক্ষীরা-তেঁতুলিয়া যাওয়া-আসাতেই তাই সময় লেগে যেত ঘণ্টা দুয়েক। সাতক্ষীরা অনূর্ধ্ব-১৬ দলে ডাক পাওয়ার পরও রুটিন বদলায়নি। ফজরের আজানের পরপরই বের হওয়ার জন্য তৈরি হয়ে যেতেন পল্টু। শুরুর দিকে মুস্তাফিজের ঘুম ভাঙাতে অবশ্য বেশ কষ্টই হতো, ‘ছোট ছিল তো, অত ভোরে ঘুম থেকে উঠতে চাইত না। শীতকালে বেশি কষ্ট হতো। জোর করে তুলে নিয়ে আসতাম। পরে একটা সময়ে অভ্যস্ত হয়ে গেল।’
মুস্তাফিজকে শুধু গণজাগরণ সংঘ আর খুলনার চুকনগরেই পৌঁছে দেয়নি সেই মোটরসাইকেল, এটা এখন সবারই জানা যে, আজকের মুস্তাফিজুর রহমান হওয়ার পথটাকেও সেটা কমিয়ে দিয়েছিল অনেক। হরতাল আর শীতের সকালের মতো বাধা সে পথেও ছিল। তবু গতি হারাননি মুস্তাফিজ, ছন্দ হারায়নি তাঁর বোলিং। ছিপ ফেলেই নাকি পানি থেকে মাছ তুলে আনতে পারেন মুস্তাফিজ। উইকেট পাওয়াটাও এখন পানির মতো সহজ তাঁর কাছে।
সাতক্ষীরায় অনূর্ধ্ব-১৬ জেলা দলের ক্যাম্প হবে। কোচ আলতাফের পরার্মশে ছোট ভাইকে সেখানে নিয়ে যান পল্টু। প্রথম দিন গিয়ে দেখেন ১৪ জনের দলে ঢুকতে শ তিনেক ক্রিকেটার হাজির। এত ক্রিকেটার দেখে পল্টু কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও মুস্তাফিজকে বুঝতে তা দেননি। তিন শ জন থেকে যে মাত্র ১৪ জন নেবে, সেটাও বলেননি। উল্টো সাহস দিয়েছেন, ‘তোকে যদি একবার বল করতে দেয় তাহলে আর বাদ দিতে পারবে না। দোয়া কর যেন বল না করিয়েই বাদ দিয়ে না দেয়।’
প্রথম কয়েকটা বল এলোমেলো হয়। পল্টু বুঝে ফেললেন, ক্রিকেট বলে বোলিংয়ের অনভ্যস্ততার কারণেই এ রকম হচ্ছে। ভাইকে ডেকে বললেন, ‘এটা তো টেনিস বল না! ক্রিকেট বলে বল আরও ওপর থেকে ছাড়তে হবে। তখন জায়গামতো পড়বে। তুই টেনিস বলে খেলেছিস বলে নিচ থেকে ছাড়ছিস। এভাবে হবে না। ওপর থেকে বল ছাড়। চার-পাঁচটা বল করার পর বলে জোর দিস।’
মুস্তাফিজ সুযোগ পেয়ে গেলেন সাতক্ষীরা অনূর্ধ্ব-১৬ দলে। এরপর তো শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। বাগেরহাটে মেহেরপুরের সঙ্গে প্রথম ম্যাচেই ১০ ওভারে ৬ মেডেনসহ ৯ রান দিয়ে ৩ উইকেট! চুয়াডাঙ্গার বিপক্ষে পরের ম্যাচের আগে বড় ভাইয়ের হয়ে মুস্তাফিজের কাছে পুরস্কারের ‘ঘোষণা’ নিয়ে গেলেন পল্টু, ‘এই ম্যাচেও ৩ উইকেট পেলে তোকে স্পাইক কেডস কিনে দেব।’ প্রথমে বিশ্বাস হয়নি মুস্তাফিজের। কিন্তু ভাইয়ের স্নেহমাখা হাসি কি আর মিথ্যা বলবে! ওই ম্যাচেও ৩ উইকেট নিয়ে একসঙ্গে পেয়ে গেলেন দুই জোড়া স্পাইক কেডস। ছোট একটা বিপত্তি অবশ্য বেধেছিল। ‘খুলনায় ওর পায়ের মাপের কেডসই পাইনি আমরা। পরে সাতক্ষীরার টাউন স্পোটর্স নামে একটা দোকানে গিয়ে বললাম, এই মাপের কেডস এনে দিতে। তারাই পরে ব্যবস্থা করে দিল’-হাসতে হাসতে বলছিলেন পল্টু।
বল হাতে নতুন কিছু করার মন্ত্রও মুস্তাফিজের কানে প্রথম পড়ে দিয়েছিলেন তাঁর ওই সেজো ভাই-ই, ‘বলের গতি ওর শুরু থেকেই ভালো। ন্যাচারাল সুইংও হতো। কিন্তু আমি বলেছিলাম শুধু এগুলো দিয়ে হবে না। নতুন কিছু লাগবে।’ সেই ‘নতুন কিছু’র কিছু উদাহরণও তুলে ধরেছিলেন ছোট ভাইয়ের সামনে, ‘মালিঙ্গা যেমন আস্তে, জোরে দুই রকম ইয়র্কারই দিতে পারতেন। দুটি ঠিক একই জায়গায় গিয়ে পড়ত। ওয়াসিম আকরাম আউটসুইং যেমন দিতেন, আবার রিভার্স সুইংও করাতে পারতেন। তোরও সে রকম একটা কিছু লাগবে।’ এরপর তো জাতীয় দলের ব্যাটসম্যান এনামুল হকের পরার্মশে আবিষ্কৃত কাটার বিশ্ববিখ্যাতই হয়ে গেল। যেটা ক্রিস গেইল-শহীদ আফ্রিদিদের জন্যও এখনো দুর্বোধ্য। বিপিএলে গেইলের আউটের প্রসঙ্গ তুলতেই চকচক করে উঠল পল্টুর চোখ, ‘আমি শুরু থেকেই বলছিলাম, মুস্তাফিজ গেইলকে চারটা বলও যদি করে গেইল আউট হবে। আগের দিন ফোনেও আমি ওকে বলেছি, গেইলের উইকেট তোকেই নিতে হবে।’ মুস্তাফিজের উত্তর কি ছিল জানেন? ‘সামনে যদি পাই, তাহলে তো নেবই।’
এই আত্মবিশ্বাস, বল হাতে ঠান্ডা মাথার এই ‘খুনি’ স্বভাব মুস্তাফিজের ছোটবেলা থেকেই। স্নায়ুচাপ শব্দটাই যেন তাঁর অজানা! সেটি থাকলই বা। একজন মানুষকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই জানতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। মুস্তাফিজ শুধু পেস বোলিং আর কাটারটাকেই আরও ভালো করে জানুন। ও হ্যাঁ, সেই মোটরসাইকেলটার কথাও ভুলে যাওয়া যাবে না কিন্তু।

গাজীপুরে রিমোট কন্ট্রোলসহ ৫টি টাইমবোমা উদ্ধার: পুলিশ

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কুনিয়া তারগাছ
এলাকার বালুরমাঠ থেকে আজ রোববার ভোরে
একটি রিমোট কন্ট্রোলসহ পাঁচটি টাইম বোমা
উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। -মাসুদ রানা
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কুনিয়া তারগাছ এলাকার বালুরমাঠ থেকে আজ রোববার ভোরে একটি রিমোট কন্ট্রোলসহ পাঁচটি টাইমবোমা উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ইজতেমায় নাশকতার জন্য দুর্বৃত্তরা ওই বোমা বহন করছিল বলে পুলিশের ধারণা।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুমের পাশে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, গোপন খবরের ভিত্তিতে জয়দেবপুর থানার পুলিশ কুনিয়া তারগাছ এলাকায় অভিযান চালায়। ওই এলাকার একটি বালুরমাঠ থেকে একটি রিমোট কন্ট্রোলসহ পাঁচটি টাইমবোমা উদ্ধার করে। পরে বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়।
হারুন অর রশিদ আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্ব ইজতেমায় নাশকতা ও আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য দুর্বৃত্তরা ওই বোমা বহন করছিল। পুলিশের তৎপরতার কারণে দুর্বৃত্তরা সেগুলো ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। তবে দুর্বৃত্তদের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাদের চিহ্নিত করতে পুলিশের তৎপরতা চলছে। এ ব্যাপারে জয়দেবপুর থানায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

জাকার্তার হামলাকারীরা নতুন ধারার জঙ্গি?

ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের কুটা এলাকায় বালি বোমা হামলা স্মরণে
নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ পরিদর্শন করছেন পর্যটকেরা। রাজধানী জাকার্তায়
ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার এক দিন পর গতকাল তোলা ছবি
(বাঁয়ে)। জাকার্তার কেন্দ্রস্থলে গতকাল এক সন্ত্রাসবিরোধী
শোভাযাত্রায় শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে প্ল্যাকার্ড বহন
করে এক খুদে শিক্ষার্থী। ছবি: রয়টার্স
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার ব্যস্ত কেন্দ্রস্থলে গত বৃহস্পতিবারের হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচজন সন্ত্রাসীর চারজন শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন আগেই একটি জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। আর সাম্প্রতিকতম এ হামলার পর এতে জড়িত সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক উদ্ঘাটনে কাজ শুরু করেছে পুলিশ। বিবিসি ও আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ যে চার হামলাকারীকে শনাক্ত করেছে তাদের মধ্যে আফিফ সুনাকিম নামের একজনকে বৃহস্পতিবার হামলার সময় বন্দুক ও কাঁধে ব্যাগ বহন করতে দেখা গেছে। আচেহ প্রদেশের একটি জঙ্গি শিবিরে অংশগ্রহণের দায়ে ইতিপূর্বে সে সাত বছরের জেলও খাটে। গতকাল বিবিসির এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্দোনেশিয়ার জঙ্গি সংগঠনগুলোর এক নতুন ধারা বা প্রজন্মের সদস্যরা এ হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইয়োহানস সুলেইমান মনে করেন, যেভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে তা দেশটিতে একেবারেই নতুন ধাঁচের। ইন্দোনেশীয় পুলিশ প্রধান জেনারেল বাদরুদ্দিন হাইতির বরাত দিয়ে বিবিসির খবরে বলা হয়, শনাক্ত হওয়া চার সন্ত্রাসীসহ পাঁচ হামলাকারীই বৃহস্পতিবার গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়। হামলায় একজন কানাডীয় ও একজন ইন্দোনেশীয় বেসামরিক লোকও প্রাণ হারান। আহত হন অন্তত আরও ২০ জন। পুলিশ বলছে, হামলাকারীদের দুজন নিহত হয় একটি আত্মঘাতী বোমা হামলায়। বাকি তিনজন বন্দুক লড়াইয়ে। জেনারেল হাইতি জানান, সুনাকিম ও আরেক হামলাকারী উভয়ই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ছিল। আর জাকার্তার পুলিশ প্রধান টিটো কারনাভিয়ান বলেন, বৃহস্পতিবারের হামলায় যে সন্ত্রাসী সেল জড়িত বলে মনে করা হচ্ছে, তা উদ্ঘাটনে অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশের এই কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, ছোট একটা দল এ হামলা চালালেও সেটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা, মূল অপরাধীরা জাভা ও সুলাওয়াশিভিত্তিক অন্য সেলগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এরই মধ্যে, গতকাল সকালে জাকার্তার কাছাকাছি স্থান থেকে তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাহরুম নাইম নামের একজন ইন্দোনেশীয়র নাম প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। তাদের ধারণা, তিনি এ হামলার সমন্বয়কারী এবং আইএসের হয়ে লড়াই করতে সিরিয়া গিয়েছিলেন। সেখান থেকে দেশে ফিরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আইএস-সমর্থক গোষ্ঠীগুলোকে সংগঠিত করার কাজ করছিলেন তিনি। পুলিশ বলছে, গত বছরের শেষ নাগাদ আইএসের এক হামলার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছিল।
আটক করা হয়েছিল সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে। তাঁদের একজন বলেছিলেন, তিনি এই নাইমের কাছ থেকেই নির্দেশনা পান। নাইম সুলাওয়াশি দ্বীপের আইএস-সমর্থিত গোষ্ঠী ইস্ট ইন্দোনেশিয়া মুজাহিদীন গ্রুপের (এমআইটি) সঙ্গে জড়িত। গতকাল বিবিসির একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, জাকার্তায় বৃহস্পতিবারের হামলার লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী হলেও প্রাথমিক খবরে যা জানা গেছে সে অনুযায়ী এতে ছিল নানা ধরনের অনভিজ্ঞতার ছাপ। বড় রকমের হত্যাকাণ্ড ঘটাতেই জাকার্তার কেন্দ্রের ব্যস্ত এলাকা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয় হামলাকারীরা। কিন্তু তাদের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। তা ছাড়া, দৃশ্যত এটি ছিল এলোমেলো ও স্পষ্টতই কম সমন্বিত। প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণে এ ইঙ্গিতই মিলেছে, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর প্রজন্মরা নয়; বরং শৌখিন একটি গোষ্ঠীই এ হামলা চালিয়েছে। এর সদস্যরা এমন এক নতুন প্রজন্মের সদস্য, যারা হয় ইন্টারনেট ও উগ্রপন্থী সাইটগুলো থেকে এ কাজে উজ্জীবিত হয়েছে; নয়তো পুরোনো জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখার চেয়ে তাদের তৎপরতাই কেবল অনুসরণ করেছে।

মুসলিমবিদ্বেষ: আক্রমণের মুখে ডোনাল্ড ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম
মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ব্যাপারে ঢালাও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজ দলের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী জেব বুশের আক্রমণের মুখে পড়েছেন। গত বৃহস্পতিবার সাউথ ক্যারোলাইনার নর্থ চার্লসটনে অনুষ্ঠিত সম্ভাব্য সাত রিপাবলিকান প্রার্থীর ষষ্ঠ বিতর্কে ট্রাম্প বুশের এ আক্রমণের শিকার হন। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি আইওয়া অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত হবে রিপাবলিকান পার্টির প্রথম প্রাক্-নির্বাচনী বাছাই। ‘আইওয়া ককাস’ নামে পরিচিত এই নির্বাচনের ১৮ দিন আগে অনুষ্ঠিত হয় এ বিতর্ক। ফ্লোরিডার সাবেক গভর্নর জেব বুশ বিতর্কে ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন, সৌদি আরব ও জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। তাদের সবাইকে বাদ দিয়ে একা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াই বাস্তবসম্মত নয়। বিতর্কে জেব বুশ মন্তব্য করেন, মুসলিমদের নিষিদ্ধের ব্যাপারে ট্রাম্পের অবস্থান ‘পাগলামি’। বিতর্কের সঞ্চালক মনে করিয়ে দেন, বুশ ইতিপূর্বেও ট্রাম্পের বক্তব্য ‘পাগলামি’ বলেছিলেন—এর পরপরই সাউথ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৮ শতাংশ বেড়ে যায়। এ সময় ট্রাম্প মৃদু হেসে বলেন, ‘৮ নয়, ১১ শতাংশ।’ বিতর্কে ট্রাম্প জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধের আহ্বান জানিয়ে দেওয়া বিতর্কিত বক্তব্য থেকে সরে আসবেন না তিনি। বিতর্কে ট্রাম্পকে মুসলিমবিদ্বেষী পরিকল্পনা পর্যালোচনা করতে তাঁর প্রতি আহ্বান জানান জেব বুশ।
জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘“ইসলামি উগ্রপন্থা” নিয়ে আমরা গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন। এটা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বিশ্বজুড়েই সমস্যা।’প্রসঙ্গত, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়ার পর বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করলেও মার্কিনদের মধ্যে তাঁর সমর্থন বেড়ে গেছে। বৃহস্পতিবারের এ বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন টেক্সাস থেকে নির্বাচিত সিনেটর টেড ক্রুজ। অধিকাংশ সময় তাঁকে নিকটতম দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্প ও সিনেটর মার্কো রুবিওর কাছ থেকে সাঁড়াশি আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়। জনমত গণনায় জাতীয় পর্যায়ে ট্রাম্প এগিয়ে থাকলেও আইওয়াতে ওপরে আছেন ক্রুজ। সে কারণেই ট্রাম্প ক্রুজকে তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেন। তাঁর সর্বশেষ আক্রমণের বিষয় ছিল প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ক্রুজের আইনগত যোগ্যতা। মার্কিন শাসনতন্ত্র অনুসারে, শুধু জন্মগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকই প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন। ক্রুজের জন্ম কানাডায়, তাঁর বাবা কিউবান ও মা আমেরিকান। বিতর্কে ক্রুজ নানাভাবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর মা আমেরিকান হওয়ায় তিনি জন্মগতভাবে আমেরিকান—এই ছিল তাঁর যুক্তি। ক্রুজ এমন কথাও বলেন, ট্রাম্পের নিজের মা-ও স্কটল্যান্ডের। সে কথা উড়িয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি নিউইয়র্কের কুইন্সে জন্মেছেন, ফলে তাঁর জন্মগত কোনো সমস্যা নেই। এ বিতর্কের পর সিএনএনের এক তাৎক্ষণিক জনমত গণনায় ট্রাম্পকে জয়ী হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় মানবাধিকার লঙ্ঘন না করার আহ্বান -জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বান কি মুন

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো জঙ্গিবাদী সংগঠনকে রুখতে মানবাধিকার লঙ্ঘন না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, কঠোর পন্থা নেওয়ার ফলে জঙ্গিবাদ বরং বেড়েই গেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গত শুক্রবার বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি এই আহ্বান জানিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, প্রতিটি রাষ্ট্রকে জঙ্গিবাদ নির্মূলে একটি জাতীয় পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানান বান কি মুন। তিনি বলেন, আইএস বা অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর হুমকি মোকাবিলায় এখন সংকীর্ণ পরিসরে কেবল সামরিক ও নিরাপত্তাগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এদের মোকাবিলা করতে হলে এসব পন্থার বাইরে এসে পরিকল্পনা করতে হবে।
বান কি মুন বলেন, অপরিকল্পিত নীতি, ব্যর্থ নেতৃত্ব, কঠোর পন্থা, কেবল বল প্রয়োগ করে জঙ্গিবাদ নির্মূলের চেষ্টা হয়েছে। উপেক্ষিত হয়েছে মানবাধিকার। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এসব পন্থা নেওয়ার ফলে জঙ্গিবাদ বরং বেড়েই গেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, ‘ভুল নীতির ফলে আমরা নিষ্ঠুর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে হেরে চলেছি। এ ধরনের নীতি মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। কোণঠাসা হওয়া মানুষ দিন দিন আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। আর এর ফলে শত্রুদের হাতই শুধু শক্তিশালী হচ্ছে।’
বান কি মুন বলেন, ‘আমাদের মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে এবং সাধারণ জ্ঞান প্রয়োগ করতে হবে।’
বান কি মুন বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদের একপেশে ব্যাখ্যা দিয়ে প্রায়ই বিরোধী পক্ষ, সুশীল সমাজের সংগঠন বা মানবাধিকারকর্মীদের কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। কারও মুখ বন্ধ করতে বা কাউকে বাধা দিতে কোনো সরকারেরই এ ধরনের আচরণ করা উচিত নয়। জঙ্গিবাদ সব সময়ই এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ নেয়। আমরা যেন সেই ফাঁদে পা না দিই।’
মহাসচিব বলেন, ‘জঙ্গিবাদের হুমকি মোকাবিলায় আইনগত অধিকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রয়েছে। তবে এই সন্ত্রাসবাদের কারণ নির্ণয়েও আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে।’
বান কি মুন জঙ্গিবাদ নির্মূলে ৭৯ দফা সুপারিশ করেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো, যেসব বিদেশি ইতিমধ্যে আইএসের মতো জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিতে গেছে, তাদের শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ দিয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা।
মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে শিক্ষার প্রসারের তাগিদ দেন বান কি মুন। তিনি বলেন, এর ফলে আইএস বা বোকো হারামের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো তরুণদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা বন্ধ করবে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক সভায় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরেন।
প্রতিক্রিয়া: জাতিসংঘের মহাসচিবের ভাষণের বিষয়বস্তু নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে সরকার ও আওয়ামী লীগের দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে জাতিসংঘের মহাসচিবের ভাষণের বিষয়বস্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটের প্রতিফলন বলে মনে করেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণতন্ত্র না থাকলে যেকোনো দেশেই জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দেয়। বাংলাদেশেও আমরা এর লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি এবং সে জায়গায় পৌঁছে গেছি।’
বিএনপির কূটনৈতিক শাখার গুরুত্বপূর্ণ এই নেতা বলেন, যখন সরকার গণতন্ত্রের চেতনা থেকে সরে গিয়ে অন্য শক্তি দিয়ে দেশ পরিচালনা করতে চায়, তখন আইনের শাসন কমতে থাকে, মানবাধিকারের লঙ্ঘন বাড়তে থাকে, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। একপর্যায়ে জীবনের নিরাপত্তাই থাকে না। বাংলাদেশে এখন এর সবই বিদ্যমান।
এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। রাজনীতি এখনো জঙ্গিবাদের প্রতি আপসকামী। কেবল অস্ত্র দিয়ে আমরা যদি জঙ্গিবাদের মোকাবিলা করতে চাই, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’ জঙ্গিবাদ নির্মূলে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার বিকাশ ও শিক্ষার প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা।

আইএসের সংশ্লিষ্টতা কি অতিরঞ্জিত? by স্কট এডওয়ার্ডস

পরপর কয়েকটি আত্মঘাতী বোমা হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় অন্তত সাতজন মানুষ মারা গেছে, যে হামলার দায় আইএস ইতিমধ্যে স্বীকার করেছে। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আইএসের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমের যে কথা আমরা এত দিন শুনেছি, সেটা আরও পাকাপোক্ত হলো। কিন্তু ঘটনাটি একটি নির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে বোঝা যায়, ব্যাপারটা কিছুটা ভিন্ন।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আইএস ইন্দোনেশিয়ায় একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় সক্রিয়, তবে তার চেয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সে আরও বেশি সক্রিয়। শোনা যাচ্ছে, সংগঠনটি এ অঞ্চল থেকে অনেক যোদ্ধা জোগাড় করছে। সম্প্রতি এ কথাও জানা গেছে, যে দুজন আত্মঘাতী হামলাকারী ইরাক ও সিরিয়ায় হামলা করেছিল, তারা মালয়েশীয় বংশোদ্ভূত।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিপুলসংখ্যক মুসলমান জনগোষ্ঠীর বসবাস। এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন যেমন জামারা ইসলামিয়া ও আবু সায়াফের দীর্ঘদিনের বিবাদ চলছে। সে কারণে ইন্দোনেশিয়ার মতো রাষ্ট্রের পক্ষে আইএসের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ লড়াই চালানো আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। এই সন্ত্রাসবাদের অগ্রগতি রুখে দেওয়ার প্রচেষ্টা ভালোমতোই চলছে। মালয়েশীয় পুলিশ সম্প্রতি এক ফাঁস হওয়া মেমোর সত্যতা স্বীকার করেছে, যেখানে কুয়ালালামপুরে আসন্ন আত্মঘাতী হামলার ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ওদিকে ইন্দোনেশীয় পুলিশ আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ত জঙ্গিদের গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে, যারা জাকার্তায় নতুন বছরের উদ্যাপন অনুষ্ঠানে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিল। পুলিশ ও বিশ্ব গণমাধ্যম একইভাবে এই সন্দেহ করছে যে এই হামলার সঙ্গে সেই একই গোষ্ঠী যুক্ত।
এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও উদ্বিগ্ন। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল এক মারাত্মক কথা বলেছেন, আইএস নাকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘দূরবর্তী খেলাফত’ স্থাপন করতে চায়, যেটা বাস্তবায়িত হলে নিশ্চিতভাবেই এক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। এই ভীতিটা আরও প্রকট হয়েছে এই কারণে যে তরুণ ইন্দোনেশীয়রা ক্রমাগত মৌলবাদে দীক্ষিত হচ্ছেন, এমনকি তাঁরা আইএসেও যোগ দিচ্ছেন। বিশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এই দীক্ষায়ন ঘটছে, এই সামাজিক মাধ্যমেই সিরিয়ায় যুদ্ধরত কিছু ইন্দোনেশীয় ও মালয়েশীয়ের অনেক বন্ধু জুটে গেছে।
প্রায় ৫০০-৭০০ ইন্দোনেশীয় ও ২০০ মালয়েশীয় সিরিয়ায় আইএসে যোগ দিয়েছে। আর সিরিয়ায় ঢোকার আগে আরও ১২০ জন মালয়েশীয় গ্রেপ্তার হয়েছে। এর বাইরে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশে ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে, আর আইএসের সাম্প্রতিক ভিডিও বার্তায় থাই সাব টাইটেল দেখা গেছে। অন্যদিকে ফিলিপাইনের বিদ্যমান বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আবু সায়াফও ক্রমেই আইএসের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। নিজের জনগণের ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য ইন্দোনেশীয় প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো আহ্বান জানিয়েছেন, যেসব ইন্দোনেশীয় আইএস যোদ্ধা ফেরত আসছে, তাদের জন্য অধিকতর সম্পদ বরাদ্দ করা হোক। একই সঙ্গে, তিনি পাসপোর্ট বাতিল করার লক্ষ্যে বিধান করতেও রাজি হয়েছেন। তিনি সামরিক বাহিনীকে এ ধরনের হামলার ব্যাপারে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ওদিকে যেসব এলাকাভিত্তিক গোষ্ঠী আইএসের সঙ্গে যুক্ত, সেসব এলাকায় নানা কসরত শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট আরও ‘নরম মনোভঙ্গি’ গ্রহণের চাপ দিচ্ছেন, তিনি চরমপন্থায় দীক্ষায়নের ব্যাপারটা ঠেকানোর জন্য সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মনোভঙ্গি কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তার ওপর মনোনিবেশ করছেন, একই সঙ্গে দারিদ্র্য দূরীকরণের ওপরও নজর দিচ্ছেন তিনি। যথেষ্ট কাণ্ডজ্ঞানের সঙ্গেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমরা যদি তা আমলে না নিই, তাহলে ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আইএসের উপস্থিতি অতিরঞ্জিত করা হবে।
উল্লিখিত কথাটি বলার প্রথম কারণ হলো, গণ-অভ্যুত্থান হবে—এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ৫০০-৭০০ যোদ্ধা শুনতে অনেক মনে হলেও ইন্দোনেশিয়ার ২০ কোটি মুসলমান জনসংখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে তা একেবারেই নগণ্য, সাগরের পানিতে কয়েক ফোঁটা শিশির বিন্দু ঢালার মতো। আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করলেও হামলার ক্ষয়ক্ষতি কিন্তু অনুমিত মাত্রার চেয়ে কম। এই অঞ্চলে আইএসের প্রভাব তেমন একটা নেই বললেই চলে, হুমকি হিসেবেও তারা নগণ্য।
এ ঘটনাটি আল-কায়েদার যৌবনকালের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গায়ে কালিমা লেপন করা হয়েছিল। লোকে বলেছিল, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে যাচ্ছে এই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, কিন্তু সেটা কখনোই হয়নি। দ্য আটলান্টিক-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত সাংবাদিক এডওয়ার্ড ডেলম্যান বলেছিলেন, ইন্দোনেশিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পাল্টা লড়াই করার ক্ষমতা আছে। তিনি নাহদলাতুল উলামার মতো সংগঠনের কথা বলেছিলেন, যারা সহানুভূতির বাণী প্রচার করে। এ ধরনের সংগঠন মৌলবাদে দীক্ষায়নের রাশ টেনে ধরতে পারে। আর মুসলমান অধ্যুষিত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া তার জনগণের জন্য সেই স্থান তৈরি করে দিতে পারে, যেখানে তারা নিজেদের রাজনৈতিক ক্রোধের প্রকাশ ঘটাতে পারে। এমনকি চিন্তা যদি তুলনামূলকভাবে চরম হয়, তাহলেও সেটা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, আর স্বাভাবিক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে তার সমালোচনা করা যায়।
এ কথা বলার মানে এই নয় যে আত্মসন্তুষ্ট হওয়া যায়, আর সেটা সামগ্রিকভাবে ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু ভীতি ও বাস্তবতার মধ্যকার পার্থক্যটা ঘুচে যাওয়ার নয়। এ অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মুসলমানের বসবাস, শুধু সে কারণেই তার সম্পর্কে সবচেয়ে খারাপ চিন্তাটা করা সমীচীন নয়; অথবা এই দেশগুলোর সহিংস চরমপন্থা মোকাবিলার সামর্থ্য খাটো করে দেখা ঠিক নয়।
দ্য স্ট্রেইট টাইমস থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
স্কট এডওয়ার্ডস: যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক।

টিভিতে রাজনৈতিক দলের প্রচার by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

টেলিভিশন একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। বিভিন্ন দেশ এই মাধ্যম ব্যবহার করে বহু কিছু করেছে। আমরা এখনো এই মাধ্যমকে বিনোদন ও তথ্যের (খবর ও টক শো) জন্যই ব্যবহার করছি। বেশির ভাগ তথ্যই রাজনৈতিক। রাজনীতির বাইরে জ্ঞান-বিজ্ঞান, উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ ও আরও নানা বিষয়ের তথ্যও যে এই মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে প্রচার করার সুযোগ ছিল, তা আমরা করিনি। কয়েকটি বিষয়ে সামান্য ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু জোর দিয়ে বলব, টিভি মাধ্যমটি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার হয়নি। শুধু শিক্ষার প্রসার নিয়েই টিভি মাধ্যমে অনেক কাজ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু না সরকার, না বেসরকারি খাত—কেউ এ ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি। আমাদের ধারণা, শুধু শিক্ষা নিয়েই একটি সুপরিকল্পিত টিভি চ্যানেল জনপ্রিয় ও ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে পারে।
টেলিভিশনকে রাজনীতির কাজেও ভালোভাবে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সব টিভি চ্যানেলই তো দিন-রাত রাজনীতিই প্রচার করছে। তা আংশিক সত্য। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে রাজনীতি প্রচারিত হচ্ছে চ্যানেলের মালিক ও অনুষ্ঠান প্রযোজকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ যে যেভাবে দেখে বা বিশ্লেষণ করতে চায়, টিভি চ্যানেলে রাজনীতি সেভাবেই প্রচারিত হচ্ছে। কোনো দল তাদের বক্তব্য অসম্পাদিত বা অবিকৃতভাবে প্রচার করতে পারছে না। সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে রাজনৈতিক দল বিভিন্ন উপলক্ষে তাদের বক্তব্য প্রচার করতে পারছে (ক্রোড়পত্র)। কিন্তু টিভি মাধ্যমে পারছে না। এটা বৈষম্য, সরকারের ভুল নীতি। এটা গণতন্ত্রচর্চার প্রতিবন্ধক।
২৯ ডিসেম্বর ২০১৫ প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটা খবর থেকে জানতে পেরেছি, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বিএনপির একটি বিজ্ঞাপন প্রচারে সরকারের তরফ থেকে পরোক্ষভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। সরকার অবশ্য কোনো চিঠি লিখে বাধা দেয়নি। চিঠি ছাড়াও সরকার যে নানাভাবে বাধা দিতে পারে (তা প্রমাণও করা যায় না), সেই অভিজ্ঞতা আমাদের বহু আগেই হয়েছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বিএনপির বিজ্ঞাপন প্রচারে অপারগতা জানিয়েছে। কেন অপারগতা জানিয়েছে, সেটা বোঝাও কঠিন নয়। কয়েক দিন আগে বেগম খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের লাইভ কভারেজও কোনো কোনো আগ্রহী টিভি চ্যানেলকে প্রচার করতে দেওয়া হয়নি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এগুলো নিন্দনীয়। আমরা টিভি মাধ্যমের শক্তি ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না।
বিষয়টা শুধু বিএনপি বা আওয়ামী লীগের নয়। বিএনপি বা আওয়ামী লীগের জন্য কোনো পৃথক নীতি হতে পারে না। তথ্য মন্ত্রণালয় এমন একটি নীতিমালা করতে পারে, যার ভিত্তিতে যেকোনো রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান টিভি চ্যানেলের সময় কিনে নিয়ে তাদের বক্তব্য প্রচার করতে পারবে। তবে লাইভ প্রচারে যেহেতু নানা সমস্যা থাকে (যেমন প্রচারযোগ্য নয় এমন ভাষায় কথা বলা), সে জন্য প্রথম পর্যায়ে আগে ধারণকৃত বক্তব্য বা অনুষ্ঠান প্রচার করার সুযোগ থাকা উচিত। ধারণকৃত বক্তব্য প্রচারিত হলে দলের বা ব্যক্তির জন্যও ভালো। দল নেতাদের লাগামহীন বক্তৃতা সম্পাদনা করে বক্তব্য সুন্দরভাবে প্রচার করতে পারে। অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য ছেঁটে ফেলা যায়। সরাসরি সম্প্রচারে সেই সুযোগ থাকে না।
নীতিমালায় এ রকম কিছু শর্ত থাকতে পারে। কোনো টিভি চ্যানেল বিজ্ঞাপনের মতো টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করতে চাইলে সরকারের বাধা দেওয়া উচিত নয়। তবে টিভি চ্যানেলকে নিজস্ব সেন্সর নীতি রাখতে হবে। যে ভাষা জনসমক্ষে প্রচার করা যায় না, সে রকম ভাষার বক্তব্য, ব্যক্তিগত অভিযোগ, বিদ্বেষ, হিংসা প্রচার টিভি চ্যানেল স্বউদ্যোগে বাদ দেবে, এটাই প্রত্যাশিত।
আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন জনসভা, মিছিল ইত্যাদির নামে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে এমন তুলকালাম যানজট বাধিয়ে বসে, যার কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের এসব কর্মসূচি দেখলে মনে হয়, এই শহরের মালিক কেবল তারাই। শহরে যে আরও মানুষ থাকে, তাদের নানা জরুরি কাজ থাকতে পারে, জনসভামুখী রাজনৈতিক কর্মীরা (অনেকে ভাড়াটে) তা গ্রাহ্য করেন না। জনসভা ও মিছিল শুধু সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস আগে করলেই তো হয়। বছরের বাকি সময় রাজনৈতিক দল টিভি, বেতার ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে পারে। বাস, ট্রাক ও লোক ভাড়া করে জনসভা আয়োজনের চেয়ে টিভি ও বেতারে একটা ‘বক্তৃতা অনুষ্ঠান’ করলে অনেক ভালো ফল পাওয়া যাবে। এখন তো শুধু ঢাকায় বড়জোর এক লাখ লোক রাজনৈতিক দলের জনসভা শুনতে আসে। টিভি ও বেতারে প্রচার হলে ১৬ কোটি লোক নেতাদের বক্তৃতা শুনতে পারবে। বিদেশেও শুনতে পারবে। মাঠে জনসভার বদলে একটি মিলনায়তনেও সভার আয়োজন করা যায়। এতে স্লোগান দেওয়ার সুবিধা থাকবে, ঝামেলাও অনেক কমে যাবে। সেই সভার বক্তব্য পরে সম্পাদনা করে টিভি ও বেতারে প্রচার করলে ব্যাপকসংখ্যক শ্রোতার কাছে তা পৌঁছানো সম্ভব।
বিভিন্ন টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে মাসে একটি ‘দলীয় অনুষ্ঠান’ করার সুযোগ দিতে পারে। এটা মাসিক ভিত্তিতে হবে। এই অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দল তাদের পরিকল্পনামতো সময়টা ব্যবহার করবে। ধরা যাক, এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান। রাজনৈতিক দল এই এক ঘণ্টায় কোনো ইস্যুতে তাদের বক্তব্য, ভিন্ন দল বা সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা, তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, দর্শকদের চিঠির (ই-মেইল) জবাব ইত্যাদি বলবে। মোটকথা, এখানে চ্যানেল মালিক, অনুষ্ঠান প্রযোজক, মডারেটর তাঁদের গুপ্ত রাজনৈতিক এজেন্ডা দিয়ে ওই অনুষ্ঠানকে প্রভাবিত করতে পারবেন না। তবে চ্যানেল কর্তৃপক্ষের সম্পাদকীয় নীতি রাজনৈতিক দলকে মেনে চলতে হবে। সর্বোপরি এটা হবে আগে ধারণকৃত অনুষ্ঠান। চূড়ান্ত সম্পাদনার দায়িত্ব চ্যানেল কর্তৃপক্ষের, তা করা হবে দুই পক্ষের সম্মতিতে।
বর্তমানে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ফাঁকা কথাসর্বস্ব অনেক টক শো প্রচারিত হয়। একই বক্তা প্রায় একই বক্তব্য অন্তত কয়েক শ বার টক শোতে বলেছেন। এ ধরনের টক শোর পরিবর্তে মাসে একটি অনুষ্ঠান রাজনৈতিক দলকে দিলে খুব খারাপ হতো না। এ ধরনের অনুষ্ঠান হলে রাজনৈতিক দলকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। মাঠে-ময়দানে অনেক দায়িত্বহীন কথা বলা যায় করতালির লোভে। কিন্তু টিভি মিডিয়ায় দায়িত্বহীন কথা বলতে অনেক নেতাই আগ্রহী হবেন না। সেদিক থেকেও রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান বা বিপক্ষ দলের সমালোচনার সময় রাজনৈতিক নেতাকে সচেতন হতে হবে।
রাজনৈতিক দলের বক্তব্য টিভি বা বেতারে প্রচার হওয়া দোষের কিছু নয়। আর এই সুযোগ তো শুধু বিএনপি পাবে না, আওয়ামী লীগ ও অন্য দলও পাবে। রাজনীতিই তো গণতন্ত্রের মূলকথা। সেই রাজনীতিকে উপেক্ষা করলে গণতন্ত্রের আর থাকে কী! তা ছাড়া কোনো দল বা নেতাকে ফ্রিস্টাইলে টিভি মাধ্যম ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। প্রত্যেকের বক্তব্য হতে হবে দায়িত্বশীল, গঠনমূলক ও রুচিশীল ভাষায়। যেহেতু প্রতিটি অনুষ্ঠান রেকর্ডেড হবে, সেহেতু টিভি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব নীতিমালা প্রয়োগেরও সুযোগ থাকবে।
আশা করি, সরকার টিভি চ্যানেলগুলোকে এসব ব্যাপারে চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। টিভি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যবসাকৌশল ও সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী যেকোনো রাজনৈতিক দলের জনসভা, সংবাদ সম্মেলন, সেমিনার প্রচার করতে পারে। এর মাঝখানে সরকার যেন বাধা না হয়। শুধু পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠান নয়, টিভিতে সরকার, সরকারি দল, বিরোধী দল তাদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য, স্লোগান, আবেদন, ঘোষণা ইত্যাদি যেকোনো কিছু শোভন ভাষায় ‘বিজ্ঞাপন’ আকারে প্রচার করতে পারে। এটা প্রত্যেকের গণতান্ত্রিক অধিকার। বহুদলীয় রাজনীতি ও গণতন্ত্রচর্চার জন্য এই সুযোগ থাকা দরকার।
টিভি মিডিয়াকে আমরা খুব সীমিতভাবে ব্যবহার করছি। টিভির শক্তি অনেক। সরকার চাইলে শিক্ষা, উন্নয়ন ও ক্রীড়ার জন্য বিশেষায়িত টিভি চ্যানেল স্থাপনে নানা রকম আর্থিক ও কর সুবিধা দিতে পারে। কোনো প্রাইভেট কোম্পানি একটি শিক্ষা বা উন্নয়ন টিভি চ্যানেল স্থাপনের কথা চিন্তা করতে পারে। আমাদের আশা, এ ব্যাপারে সরকার নানাভাবে সহযোগিতা করবে। যেহেতু এই ধরনের চ্যানেল ব্যবসায়িক স্পনসর কম পাবে, তাই সরকারের নানা প্রণোদনা প্রয়োজন হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

দশজনের মধ্যে নয়জনই!! by আনিসুল হক

জাতীয় নিরাপত্তার প্রথম কথা কিন্তু নাগরিকদের নিরাপত্তা। আবার নিরাপত্তা হলো নিরাপত্তার বোধ। বাংলাদেশে নাগরিকেরা নিজেদের অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার চেয়েও বেশি নিরাপদ বলে মনে করেন, বিদেশি গবেষণা সংস্থার সেই রিপোর্ট ধরে এই কলামে একটা লেখা লিখেছিলাম।
তখনই প্রশ্নটা উঠল। পুলিশের কাছে গেলে প্রতিবিধান পাওয়া যাবে কি না, রাস্তায় রাতে চলতে ভয় লাগে কি না, আপনার বাড়িতে গত এক বছরে কোনো চুরিচামারি হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর যা পাওয়া গেছে, তা থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষেরা অনেক উন্নত দেশের মানুষের চেয়ে নিজেদের নিরাপদ ভাবছেন বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মানুষ কি তঁাদের নিজেদের ঘরে নিরাপদ? আরও একটু নির্দিষ্ট করে বললে, বাংলাদেশের নারীরা কি তাঁদের নিজেদের ঘরে নিরাপদ? আরও একটু নির্দিষ্ট করে বলা যায়, বাংলাদেশের একজন স্ত্রী কি তাঁর স্বামীর কাছে নিরাপদ?
এই বিষয়ে ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনের ফল ভয়াবহ। বাংলাদেশে প্রতি দশটা পরিবারের মধ্যে নয়টাতেই নারীরা পারিবারিক সহিংসতার শিকার। সব প্রশ্নের উত্তর নাকি হ্যাঁ বা না দিয়ে হয় না। যেমন? এই উদাহরণটা তখন দেওয়া হয়, ‘আপনি কি আগের মতো বউ পেটান?’
এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি কী বলবেন? যদি বলেন, ‘না’, তার মানেটা দাঁড়াবে, আপনি আগে বউ পেটাতেন, এখন আর আগের মতো পেটান না। হয় পেটানো ছেড়ে দিয়েছেন, নয়তো পেটানোর পদ্ধতিটা বদলেছেন। আর যদি বলেন ‘হ্যাঁ’, তাহলে তো কথাই নেই। আগেও স্ত্রীকে মারতেন, এখনো মেরে চলেছেন। কিন্তু পরিসংখ্যান যা বলছে, তাতে এই প্রশ্নটা বাংলাদেশিদের বেলায় বড়ই প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের নারীরা ঘরেই নির্যাতিত হন—এবং যে হারে হন, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক, তা ভয়াবহ, তা লজ্জাজনক। গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশে নিযুক্ত নয়টি দেশের রাষ্ট্রদূত, যাঁদের সবাই নারী, এই বিষয়ে একটা প্রচারণা শুরু করেছিলেন।
পারিবারিক নির্যাতনের এই হিসাবে মানসিক নিপীড়ন অন্তর্ভুক্ত আছে। কাজেই এই প্রশ্ন খুব উঠবে যে শারীরিক নির্যাতন আসলে শতকরা কত ভাগ হয়? এই প্রশ্নের উত্তরেও আপনার মাথা হেঁট হয়ে আসবে, তিনজন বিবাহিত নারীর দুজনই স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়েছেন, শারীরিকভাবে। এর মধ্যে চড়-থাপড় আছে; কোনো না কোনো হাতিয়ার দিয়ে আঘাত আছে; কিল, ঘুষি, লাথি আছে; পোড়ানো আছে; অ্যাসিড ছোড়াও আছে। এঁদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারীকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে, অনেকেই স্বামীর ভয়ে ডাক্তারের কাছে যাননি, কেউবা যাননি সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে।
তিনজনের মধ্যে দুজন বউ পেটান? আর ‘হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে’—সেটা তো আছেই। সবটা মিলিয়ে দশজনের নয়জনই বউ পেটান, হাতে বা ঠোঁটে। এই আমার বাংলাদেশ। পরিসংখ্যানটা চমকে দেওয়ার মতো, ঘাবড়ে দেওয়ার মতো, আঁতকে ওঠার মতো, লজ্জায় অধোবদন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নানা ধরনের কাপড়চোপড়—শার্ট-প্যান্ট, পাঞ্জাবি-পায়জামা, লুঙ্গি-গেঞ্জি, কোট-টাই পরে আমরা পথেঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছি কতজন স্ত্রী-নিপীড়ক। কোনো বাসের মধ্যে যদি ৪০ জন পুরুষ যাত্রী বসে থাকেন, তাঁদের ৩৬ জন বউ পেটান; কোনো অফিসে যদি ১০০ জন পুরুষ সহকর্মী থাকেন, তাঁদের ৮৭ জন স্ত্রী নিপীড়ন করেন!
পরিসংখ্যানটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, না না, এটা হতেই পারে না। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, তিনজনে দুজন একেবারে শারীরিকভাবেই নির্যাতন করেন! এবং এই লজ্জাজনক ব্যাপারটা নিয়ে আমরা কোনো কথাও বলি না। শেষে আমাদের এই নীরবতা ভাঙতে এগিয়ে এসেছেন এই দেশে কর্মরত বাইরের দেশের নয়জন নারী রাষ্ট্রদূত! তবু আমাদের নীরবতা ভাঙল বলে তো মনে হয় না! আসলে বায়ুসমুদ্রে ডুবে থাকলে যেমন বোঝা যায় না চারদিকে বায়ু আছে, তেমনি নারী নির্যাতন–সমুদ্রে ডুবে থেকে আমরা বুঝছি না যে আমরা নারী নির্যাতন করে আসছি!
সেই যে প্রচলিত কথাটা—আপনি কি এখনো আগের মতো বউ পেটান?—কথাটার মধ্যেই কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে। এক. বউ আপনি ঠিকই পেটান, আগে আর পরে, আগের মতো কিংবা এখন নতুন রকমে। দুই. বউ পেটানো কথাটার মধ্যেই একটা বস্তুবাচকতার ইঙ্গিত আছে। আপনি কি ঢোল পেটান কথাটা যেমন, তেমনি রকম আপনি কি বউ পেটান? হুমায়ূন আহমেদ তাঁর নাটকে একটা প্রবাদ ব্যবহার করেছিলেন, বউ আর ঢোল বাড়ির ওপরে রাখতে হয়! আমরা হয়তো এই প্রবাদটা বিশ্বাসই করি। প্রবাদ তো সমাজের বহুদিনের আচার-আচরণ থেকেই উদ্ভূত হয়!
রবীন্দ্রনাথের গল্পের কথাও তো আসবে। ‘শাস্তি’ গল্পে পাই—
‘ক্ষুধিত দুখিরাম আর কালবিলম্ব না করিয়া বলিল, “ভাত দে।”
বড় বউ বারুদের বস্তা স্ফুলিঙ্গ পাতের মতো এক মুহূর্তেই তীব্র কণ্ঠস্বর আকাশ-পরিমাণ করিয়া বলিয়া উঠিল, “ভাত কোথায় যে ভাত দিব। তুই কি চাল দিয়া গিয়াছিলি। আমি কি নিজে রোজগার করিয়া আনিব।”
সারা দিনের শ্রান্ত ও লাঞ্ছনার পর অন্নহীন নিরানন্দ অন্ধকার ঘরে প্রজ্বলিত ক্ষুধানলে, গৃহিণীর রুক্ষ বচন, বিশেষত শেষ কথাটার গোপন কুৎসিত শ্লেষ দুখিরামের হঠাৎ কেমন একেবারেই অসহ্য হইয়া উঠিল। ক্রুদ্ধ ব্যাঘ্রের ন্যায় গম্ভীর গর্জনে বলিয়া উঠিল, “কী বললি!” বলিয়া মুহূর্তের মধ্যে দা লইয়া কিছু না ভাবিয়া একেবারে স্ত্রীর মাথায় বসাইয়া দিল। রাধা তাহার ছোটো জায়ের কোলের কাছে পড়িয়া গেল এবং মৃত্যু হইতে মুহূর্ত বিলম্ব হইল না।’
সবটা মিলিয়ে দশজনে নয়জনই বউ পেটান, হাতে বা ঠোঁটে। পরিসংখ্যানটা চমকে দেওয়ার মতো, ঘাবড়ে দেওয়ার মতো, আঁতকে ওঠার মতো, লজ্জায় অধোবদন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
দুখিরাম খুন করল বউকে। দুখিরামকে বাঁচাতে এগিয়ে এল তার ভাই ছিদাম। কীভাবে? নিজের বউকে শিখিয়ে দিল, পুলিশ এলে বলবি, সে দা নিয়ে তোকে মারতে এসেছিল, নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে তুই তাকে খুন করেছিস। তা-ই হলো শেষ পর্যন্ত। বউকে খুন করল দুখিরাম আর শাস্তি পেল ছিদামের বউ।
এটা আমাদের সমাজে বহুদিন ধরে ঘটে আসছে বলেই তো রবীন্দ্রনাথ এই গল্প লিখতে পেরেছেন। আমরা আমাদের প্যান্টের আড়ালে লেজটা লুকিয়ে রাখব কী করে? যতই নখ কাটি না, আমাদের নখর বেরিয়ে পড়বেই। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ধারাবাহিক নাটক ৬৯-এ ফজলুর রহমান বাবু একটা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তাঁর স্ত্রী জয়া আহসান, এই অধ্যাপক বউকে পেটান না, কিন্তু হাতে একটা ছুরি রাখেন। না, বউকে মারার জন্য নয়, নিজের হাত কাটার জন্য। বউকে সন্দেহ করেন, কিছু হলেই ছুরি বের করে বলেন, কাটলাম কিন্তু নিজের হাত। ওই নাটকটা প্রচারের পরে পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে কাজ করেন, এমন বিশেষজ্ঞরা আমাকে বলেছিলেন, এটা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের একটা ধরন, ওই যে মানসিক অত্যাচার—এটা তার মধ্যে পড়ে।
এখন এই লজ্জা থেকে আমরা মুক্তি পাব কী করে? ব্যাপারটা কেবল লজ্জার নয়, বাস্তবেও নানাভাবে ক্ষতিকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ বলছে, নারীর প্রতি সহিংসতার অর্থনৈতিক কুফল মারাত্মক, যার মধ্যে আছে স্বাস্থ্য-চিকিৎসার খরচ, আয় হ্রাস, উৎপাদন হ্রাস, পরবর্তী প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া।
বাংলাদেশ তো মানব উন্নয়ন সূচকে অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো করছে। আমাদের মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। আমরা মায়ের স্বাস্থ্য শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় উন্নতি ঘটাতে পেরেছি। আমাদের মেয়েরা কাজ করছেন, মাঠে-ঘাটে, সংসারে, অফিসে-আদালতে, বিমানে-ট্রেনে। তারপরেও কেন কমছে না পারিবারিক নির্যাতন? দেখা যাচ্ছে, এই সমস্যা যেমন গরিব ঘরে আছে, তেমনি আছে ধনীর ঘরে, অশিক্ষিতের ঘরে যেমন আছে, তেমনি আছে শিক্ষিতের ঘরে।
তবুও আমাদের আশাবাদী হতেই হবে। সচেতনতা সৃষ্টি থেকে শুরু করে বিচার আর সাজা—নানাভাবে কাজ করে আমরা এই ক্ষেত্রেও অগ্রগতি ঘটাতে পারব বলে আমাদের বিশ্বাস। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারী, আমাদের দুজন বিরোধী নেতা নারী, আমাদের স্পিকার নারী। আমাদের মেয়েরা গ্রামগঞ্জে বেরিয়ে আসছেন ঘর থেকে, তাঁরা লেখাপড়া করছেন, তাঁরা কাজকর্ম করছেন।
আবারও আমি দেব রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার সাদেকার উদাহরণ। তিনি গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন বেগম রোকেয়া নারী সমিতি। সেই সমিতি গ্রামের মেয়েদের হাতের কাজ শেখায়, তঁারা পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করেন, হাঁস-মুরগি-গরুর চাষ করেন—সমিতি এখন বেশ ঋদ্ধ। তাঁদের গ্রামের প্রতিটা ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়, সবার বাড়িতে বিশুদ্ধ পানি আছে, আছে স্যানিটারি ল্যাট্রিন। ওই গ্রামে কোনো বাল্যবিবাহ হয় না। পুরো গ্রামের প্রতিটা পরিবার এখন পাল্টে গেছে। আমি পুরুষদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মেয়েরা এত কিছু করছেন, আপনারা বাধা দেন না? তাঁরা বলেছেন, কেন দেব? এতে তো আমাদেরই উন্নতি হচ্ছে। (সাদেকা খাতুনের একটা চিঠি এসেছে দুই দিন আগে, তাঁদের সমিতি গ্রামের বাড়ি বাড়ি কম্বল দিতে চায়। কিছু কম্বল কি আমরা পাঠাতে পারি!)
আমি মনে করি, সচেতনতা সৃষ্টি করলে কাজ হবে। আমরা যদি একটা আওয়াজ তুলতে পারি, আমরা যদি নীরবতা ভঙ্গ করতে পারি, আমরা যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাটা দেখতে পারি এবং প্রতিজ্ঞা করি—আগের মতো আর ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স করব না—হয়তো খানিকটা কাজ দেবে।
আমরা কি সেই প্রতিজ্ঞাটা করব? আজই। এখনই?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

মোবাইল ফোন মস্তিস্কে পরিবর্তন ঘটাচ্ছে!

আপনার কি কখনো এরকম হয়েছে যে আপনি আপনার মোবাইল ফোনের রিং বাজতে শুনেছেন, যদিও আপনার কাছে কোনো কল আসেনি?
শুনে থাকলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনি একা নন। আপনার মতো এরকম আরো অনেকেই এই অভিযোগ করেন।
শুধু তাই নয়, আপনার এমনও মনে হয়ে থাকতে পারে যে ভাইব্রেশন অপশনে থাকা আপনার ফোনটি কল না আসা সত্ত্বেও পকেটে কেঁপে উঠেছিলো।
অ্যামেরিকায় জর্জিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির অধ্যাপক এবং দার্শনিক ড. রবার্ট রোজেনবার্গার বলছেন, হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রমের কারণে এরকমটা হয়ে থাকে। আর উদ্বেগ উৎকণ্ঠা থেকেই এরকমটা হয় যা খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি যেমন এই বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে, তেমনি পরিবর্তন ঘটাচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কেও। আর একারণেই আধুনিক যুগের মানুষ এই বিভ্রমের শিকার হচ্ছে।
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ওপর প্রযুক্তির কি ধরনের প্রভাব পড়ছে – তার ওপর একটি গবেষণা করেছেন রবার্ট রোজেনবার্গার।
তিনি বলছেন, মানুষের মধ্যে এমন একটা মনোভাবের তৈরি হয়েছে যে তারা এখনই ইমেইল কিম্বা এসএমএসের জবাব দিতে মরিয়া হয়ে থাকে আর সেকারণেই মনে হয় যে ফোনটা বেজে উঠেছে।
তিনি বলেন, “এটাকে বলা হয় ফ্যান্টম ভাইব্রেশন। আপনার হয়তো মনে হলো যে পকেটে ফোনটা কেঁপে ওঠেছে। তখন আপনি পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলেন যে আপনাকে আসলেই কেউ কল করেছে কিনা বা এসএমএস পাঠিয়েছে কিনা। দেখলেন যে, না কেউ ফোন করেনি। কোনো এসএমএসও আসেনি। হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রমের কারণে এরকম হয়ে থাকে।”
তিনি বলেন, “আমরা গবেষণা করে দেখেছি প্রচুর মানুষ বলছে যে তাদের এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই বলছেন, ফোন আসেনি কিন্তু তাদের মনে হয়েছে যে ফোনটা কেঁপে উঠেছে।”
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমানে মানুষের মধ্যে প্রচুর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে টেলিফোন, ইমেইল, টেক্সট মেসেজ – এধরনের প্রযুক্তি কারণে।
মানুষের ধারণা সেখানে সবসময়ই কিছু না কিছু ঘটছে। আর সেই মন-মানসিকতার প্রভাব পড়েছে আমাদের শরীরেও। সেকারণে নিজেদের শরীরেও আমরা এই কম্পন অনুভব করছি।

রাজনীতিতে সুবাতাস বইছে! by সোহরাব হাসান

ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী পিটার বারটোসি বাংলাদেশের সমাজের চালচিত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গেল শতকের আশির দশকে লিখেছিলেন, ‘উচ্চ রাজনৈতিক অংশীদারত্বের দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে।’ কিন্তু সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রত্যাশা মেলাতে না পারলে ভয়ংকর পরিস্থিতির তৈরি হয়। বছর খানেক আগেও বাংলাদেশের মানুষ সেটি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। রাজনীতি এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গত বৃহস্পতিবার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আয়োজিত সেমিনারটি ছিল ‘দ্রুত অগ্রগতির সোপানে বাংলাদেশ: সিলেটের ভূমিকা’ নিয়ে। অর্থনৈতিক–বিষয়ক সেমিনারে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার কথা থাকবেই। কিন্তু সেদিন সেমিনারের প্রধান অতিথি ও অতিথিদের বক্তৃতায় অর্থনীতির পাশাপাশি এমন কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য উঠে আসে, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, দেশের রাজনীতি সঠিক খাতে প্রবাহিত না হলে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও থেমে যেতে বাধ্য।
সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ এবং ৫ জানুয়ারি ঢাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে অনেকেই রাজনৈতিক সুস্থিরতার লক্ষণ বলে মনে করেন। সেদিন সেমিনারের প্রধান অতিথি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘অনেক ঘটনা ও প্রাণক্ষয়ের ÿপর রাজনীতিতে সুবাতাস বইছে। এটিকে শক্তিশালী করতে হলে দুটি ঘোষণা প্রয়োজন। এক. বিএনপিকে ঘোষণা দিতে হবে যে ২০১৯ সালে তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। দুই. সরকারকেও সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে যে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ঢেলে সাজানো হবে।’ সেই সঙ্গে তিনি এও উল্লেখ করেন যে অনেকে বলেন রাজনীতিতে সমস্যা ও সংকট আছে। আমি বলি অস্বস্তি আছে।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞ একজন শিক্ষাব্রতী। তিনি বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন। বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদেশ থেকে এসে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ রকম একজন ব্যক্তি যখন রাজনীতি বিষয়ে কোনো বক্তব্য রাখেন, তখন সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হয়।
তাঁর দুটি প্রস্তাবই সমর্থনযোগ্য। কিন্তু সেই সঙ্গে এ কথাও যোগ করা প্রয়োজন যে রাজনৈতিক নেতাদের চিন্তাভাবনা ও মনমানসিকতা না বদলালে কেবল দুটি ঘোষণাই রাজনৈতিক স্থিতি আনতে পারবে না। রাজনীতিতে পথ ও মতের ভিন্নতা থাকবে। কর্মসূচি ও পরিকল্পনায় ফারাক থাকবে। সবকিছু এক হলে তো দেশে একটিই রাজনৈতিক দল থাকত। তবে মনে রাখতে হবে, সেই পথ ও মতের ভিন্নতা যেন রাজনীতিকে বিদ্বিষ্ট ও হিংসাশ্রয়ী না করে। সব ধরনের দমনপীড়ন কিংবা অন্তর্ঘাত থেকে রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশে রাজনৈতিক সংকট আর অস্বস্তি যাই থাকুক না কেন এর অবসান হতে হবে।
কিন্তু কীভাবে? প্রথমত, রাজনীতিতে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পর নির্বাচনের সময় তৃতীয় আম্পায়ার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকার সুযোগ নেই। তাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেই আম্পায়ার ঠিক করতে হবে। এ ব্যাপারে ফরাসউদ্দিন নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি যোগ্য লোক দিয়ে নতুন কমিশন গঠনের কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায় ‘২০১৭ সালে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। সরকারকে বলতে হবে যে এই কমিশনকে পুনঃ নিয়োগ দেওয়া হবে না। যোগ্যতর লোককে বেছে নিতে হবে।’ তাঁর বক্তব্য সমর্থন করে সেমিনারে অপর এক বক্তা বলেছেন, ‘যোগ্য লোকদের দিয়ে নির্বাচন কমিশন যদি পুনর্গঠিত হয়, তবে ভবিষ্যতে নির্বাচন নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষ থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারব।’
তবে সেই সংঘাত ও সংঘর্ষের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে দুই দলের মৌখিক ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। প্রস্তাবিত নির্বাচন কমিশন কীভাবে কাজ করবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞতা বলছে, এর আগে একাধিক নির্বাচন কমিশন নির্দলীয় সরকারের অধীনে বাঘের মতো দাপট দেখালেও দলীয় সরকারের আমলে এসে বিড়াল বনে গেছে। উদাহরণ হিসেবে বিচারপতি আবদুর রউফের কথা বলতে পারি। ১৯৯১ সালে তাঁর নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পেরেছিল। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে মিরপুরে ও পরে মাগুরার উপনির্বাচনে তারা সবকিছু ওলটপালট করে দিলেও নির্বাচন কমিশন কোনো ভূমিকা নিতে পারেনি। ফলে মাগুরা উপনির্বাচনের কেলেঙ্কারি থেকেই শুরু হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন।
অন্যদিকে মোহাম্মদ আবু হেনার নেতৃত্বাধীন কমিশন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন যে নির্বাচনটি করেছে, তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে টাঙ্গাইলে কাদের সিদ্দিকীর ছেড়ে দেওয়া আসনে উপনির্বাচনে যখন কারচুপি করে সরকারদলীয় প্রার্থীকে বেসরকারিভাবে জয়ী ঘোষণা করা হলো, তখন মোহাম্মদ আবু হেনা সেটি গেজেট করতে রাজি হননি। তাঁর পদত্যাগের পরই উপনির্বাচনের গেজেট প্রকাশ করা হয়।
অতএব নির্বাচন কমিশনে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন তাদের নির্বিঘ্নে কাজ করতে দেওয়ার সুযোগ। সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে ঢের ক্ষমতা দিলেও ক্ষমতাসীন দল কখনোই চায়নি যে সেটি তারা প্রয়োগ করুক। কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে এন্তার অভিযোগ। তাদের দুর্বলতা ও দোদুল্যমানতা সর্বজনবিদিত। কিন্তু এই নির্বাচন কমিশনই গাজীপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করেছে, যার প্রতিটিতে বিরোধী দলের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত হবিগঞ্জে সরকারদলীয় সাংসদের শূন্য আসনে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। সরকারি দলও সেই নির্বাচনে বাধা দেয়নি। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনী রাজনীতি বিপরীত ধারায় চলতে থাকে।
তাই আমরা ড. ফরাসউদ্দিনের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেও রাজনৈতিক অস্বস্তি দূর করতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে আরও কিছু ঘোষণা আশা করি। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনকে বশে রাখা কিংবা কথায় কথায় প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে জন্য আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সব স্বাধীনতাই ধুলায় গড়িয়ে যায়, যদি আর্থিক স্বাধীনতা না থাকে। অন্য নির্বাচনের সময় না হলেও জাতীয় নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে; যাতে অস্থায়ীভাবে হলেও তারা পছন্দসই লোকবল নিয়োগ করতে পারে।
এই মুহূর্তে বিরোধী দল যদি আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা এবং হরতাল–অবরোধ না করার ঘোষণা দেয়, দেশবাসীর জন্য তা হবে বিশাল আনন্দ ও স্বস্তির বিষয়। কিন্তু সেই ঘোষণার সঙ্গে সরকারকেও একটি ঘোষণা দিতে হবে যে বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার কোনো অবস্থায় তারা খর্ব করবে না। ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজ নিজ দলীয় কার্যালয় এলাকায় জনসভা করেছে, নিজ নিজ দলের কর্মসূচি ও রাজনীতি জনগণের সামনে তুলে ধরেছে, তাতে সরকারের কোনো সমস্যা হয়নি। দেশবাসী আশা করে, আগামী দিনেও বিএনপি যেখানে জনসভা-মিছিল করতে চাইবে, সরকার তাতে বাদ সাধবে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া বিরোধী দলের কাউকে গ্রেপ্তার করে কিংবা মামলা ঠুকে হয়রানি করবে না।
সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের কাছ থেকে এ রকম ঘোষণাও আসতে হবে যে তারা কেউ কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না। দলের কেউ নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তাঁকে আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে। একই সঙ্গে এ রকম ঘোষণাও আসা প্রয়োজন যে ভোট ও ভোটারের নিরাপত্তা রক্ষায় তাঁরা বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে একযোগে কাজ করবেন। নির্বাচন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হলেও এত বড় কর্মযজ্ঞ তারা একা করতে পারে না। সে কারণে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভোটার, প্রার্থী, রাজনৈতিক দল—সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। নির্বাচনী অনিয়ম, ভোট কারচুপি, সিল মারা ইত্যাদির দায়ে যদি দু-চারজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যায়, তাহলে অন্যরা এ ধরনের গর্হিত ও ঘৃণিত কাজ করতে সাহস পাবে না।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন যাকে অস্বস্তি বলেছেন, সেটি আসলে রাজনৈতিক ব্যাধি। এই ব্যাধিটি উপশমের দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরাই প্রতিবার ভুল ওষুধে কিংবা ভুল অস্ত্রোপচারে সেই ব্যাধিটি বাড়িয়ে তুলেছেন। আগে নির্বাচন এলে জোরেশোরে কালোটাকা ও পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য কমানোর দাবি উঠত। এখন প্রধান উদ্বেগ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোটটি দিতে পারবেন কি না? না, তাঁর ভোটটি অলৌকিকভাবে দেওয়া হয়ে যাবে? অলৌকিক ভোটের মহড়া থেকে মুক্ত হতে সব পক্ষকে সহিষ্ণু ও সংযত হতে হবে। ভোটার অর্থাৎ জনগণের ওপর আস্থা রাখতে হবে; যা সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনে কমই দেখা গেছে।
তবে সেমিনারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল যে অতি মূল্যবান কথাটি বলেছেন, তা হলো ‘দেশ অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যদি দুর্বৃত্তরা প্রশ্রয় পায়। তবে তার চেয়েও বেশি ÿক্ষতি হবে, যদি ভালো মানুষ চুপ থাকেন।’ গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো সবার বাক্ ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করা (কোনোভাবেই সেই স্বাধীনতা অন্যের স্বাধীনতা খর্ব করবে না)। বাংলাদেশের মানুষ নিশ্চয়ই এমন গণতন্ত্র চায় না, যাতে সবাইকে মুখ বন্ধ করে থাকতে হয়। আর মুখ বন্ধ করা গণতন্ত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষমতাসীনেরাই। তাদের পায়ের নিচের মাটি যে সরে যাচ্ছে, সেটি টের পান না।
মানুষকে কথা বলতে দিলে জনপ্রিয়তার বিষয়টি ভোটের আগেই আন্দাজ করা যায়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

তেলের দাম না কমানোর সিদ্ধান্ত আর কত দিন? by মইনুল ইসলাম

সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম কমানোর প্রসঙ্গ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা মহোদয়ের মধ্যে এক সেমিনারে বেশ তর্ক জমে ওঠার খবর পত্রপত্রিকায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। ওই বিতর্কে সেমিনারে উপস্থিত বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞও দাম কমানোর পক্ষে-বিপক্ষে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। এর জের টেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ প্রথম আলোতে স্বনামে একটি কলাম লেখায় ধারণা হচ্ছে যে ইস্যুটি নিয়ে সরকারের মধ্যে এখনো টানাপোড়েন চলছে। সরকার যে আসলেই জ্বালানি তেলের দাম কমানোর ব্যাপারটা নিয়ে বহুদিন ধরেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, সেটা অবশ্য বোঝা যাচ্ছিল এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের নানা রকম বক্তব্য ও মন্তব্য থেকে। কিন্তু দীর্ঘ দেড় বছর ধরে ক্রমাগতভাবে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে দাম কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণকে এই বিশাল দরপতনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখাটা আর কোনো যুক্তিতেই আমার কাছে সমর্থনযোগ্য মনে না হওয়ায় এবারের কলামে আমি বিষয়িট প্রথম আলোর পাঠকদের জানানোর জন্য বিবেকের তাড়না অনুভব করছি।
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দর প্রায় দেড় শ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, তখন বাংলাদেশে ওই দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তকে ভুল বলা যাবে না, কারণ জ্বালানি তেল মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্র্যাটেজিক’ অনুঘটক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে প্রচুর লোকসানের ধকল সামলাতে হয়েছিল। একপর্যায়ে ভর্তুকি দিয়ে এই লোকসানের কিয়দংশ মেটাতে গিয়ে সরকারকেও বিশাল বাজেট ঘাটতির কবলে পড়তে হয়েছিল। ওই সময় বাজেট ঘাটতিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির দাম কয়েক দফায় বাড়ানো সত্ত্বেও ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলচালিত প্ল্যান্টগুলোর বিদ্যুতের উৎপাদন ক্যাপাসিটি অব্যবহৃত রেখে ঘনঘন লোডশেডিং করে উৎপাদন ও জনজীবনকে বিপর্যস্ত করা হয়েছে প্রায় এক বছর। দাম বৃদ্ধির পরও ওই সময় পেট্রল ও অকটেন ছাড়া অন্য ধরনের তেলের প্রকৃত খরচ মেটানো যায়নি, যার ফলে ডিজেল, কেরোসিন ও ফার্নেস অয়েলের মতো জ্বালানি পণ্যের দামের সঙ্গে খরচের পার্থক্য মেটাতে সরকারের ভর্তুকিও বন্ধ করা যায়নি, আবার পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসানও তেমন কমানো যায়নি।
এরপর যখন তেলের আন্তর্জাতিক দামে ধস নামতে শুরু করেছে, তখন সরকার তেলের দাম বর্তমান পর্যায়ে অপরিবর্তিত রাখায় সরকারি ভর্তুকি কমতে কমতে শূন্য হয়ে যায় এবং পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসানের অঙ্কও দ্রুত কমতে কমতে শূন্য হয়ে উল্টো তাদের মুনাফার অঙ্ক দ্রুত স্ফীত হতে থাকে। অর্থমন্ত্রী ও জ্বালানি উপদেষ্টা দুজনই যাবতীয় দাবির মুখে তেলের দাম না কমানোর পক্ষে নানা যুক্তি দিয়ে তাঁদের ওই সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। একপর্যায়ে তেলের দাম না কমানোর পক্ষে উত্থাপিত তাঁদের যুক্তিগুলো দুর্বল হতে হতে এখন খোঁড়া যুক্তির রূপ পরিগ্রহ করেছে।
তর্কের খাতিরে ওই যুক্তিগুলোর পুনরুল্লেখ করছি। জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী নিজেই অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী মেধাবী অর্থনীতিবিদ এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাদের কাছে আলোকবর্তিকাস্বরূপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। অর্থমন্ত্রী ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। সিএসপি হওয়ার পর তিনিও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে মাস্টার্স করেছেন এবং তাঁর সুদীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক ক্যারিয়ারে বেশির ভাগ সময় তিনি অর্থনৈতিক নীতি–সংক্রান্ত নানা নীতিনির্ধারক পদে দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁকেও একজন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঝানু অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি শ্রদ্ধা করি। তেলের দাম না কমানোর পক্ষে তাঁদের যুক্তিগুলো আমিও গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। গত দেড় বছরে যেভাবে তাঁরা সরকারের একটা বিশাল ঘাটতির বোঝা হালকা করে ফেলেছেন, সেটাকেও আমি ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করার পক্ষে। কিন্তু এক ব্যারেল অশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম ৩০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসার পরও তেলের অভ্যন্তরীণ দাম আকাশচুম্বী রেখে শুধু পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মুনাফা ফাঁপানোর লক্ষ্যে এবং সরকারের রাজস্ব খাতে সুবিধা আদায় করে নেওয়ার অবস্থানকে আরও দীর্ঘকাল ধরে রাখাকে অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে আর সমর্থনযোগ্য মনে করতে পারছি না। কারণ, জ্বালানি তেল তো আর ১০টি পণ্যের মতো পণ্য নয়, এটা অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিকে এত মৌলিকভাবে প্রভাবিত করে যে তেলের দাম না কমানোর নীতিটা এখন পুরো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে জোয়ার আনার বিশাল একটা সুযোগ থেকে দেশকে বঞ্চিত করে চলেছে। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার এ বছর সাড়ে ৮ শতাংশ অতিক্রম করে গেছে, কিন্তু আমরা এখনো ৭ শতাংশই ছুঁতে পারলাম না। ভারতে জ্বালানি তেলের অভ্যন্তরীণ দামকে যেভাবে ধাপে ধাপে কমিয়ে অর্থনীতিতে এর সুফলগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তা থেকে কি আমাদের কিছুই শিক্ষণীয় নেই?
উল্লিখিত ওই সেমিনারে জ্বালানি উপদেষ্টা কিছু বাস্তবতা উল্লেখ করে তেলের দাম কমানোর পক্ষে ড. বিরূপাক্ষ পালের উত্থাপিত যুক্তিগুলো নাকচ করার প্রয়াস নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ দেশে দাম বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হলে বিক্রেতারা যত দাম বাড়ানো যৌক্তিক, তার কয়েক গুণ দাম বাড়িয়ে মুনাফাবাজিতে মেতে ওঠেন, অথচ বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দাম কমে গেলে এ দেশে ওই পণ্যের দাম যৌক্তিকভাবে কমিয়ে ক্রেতাদের তাঁরা দাম কমার ফায়দাটা পাওয়ার সুযোগ দেন না। উদাহরণ ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, মসলাপাতি ইত্যাদি পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম সম্প্রতি বেশ কমে গেলেও বাংলাদেশের ভোক্তারা এর সুবিধা পাননি। তিনি আরও বলেছেন, কোনো অজুহাত পেলেই পরিবহনমালিকেরা ভাড়া বাড়ানোর মওকা নিতে মোটেও দেরি করেন না, অথচ এখন যদি ডিজেলের দাম সরকার কমিয়ে দেয়, তাহলেও তাঁরা পরিবহনের ভাড়া কমাবেন না। বরং ভাড়া না কমানোর জন্য নানা ওজর দেখিয়ে তাঁদের খরচ সাশ্রয়ের ফলে উদ্ভূত মুনাফাটুকু নিজেদের ভাগেই টেনে নেবেন। ভাড়া একবার বাড়াতে পারলে আবার বাড়ানোর সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন এ দেশের বিক্রেতারা, এটাই এ দেশের বাজার-সংস্কৃতি। এই যুক্তিগুলো আসলে এ দেশের সরকার ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতারই পরিচায়ক। বাজার-শাসন বা মার্কেট-গভর্নেন্স যে মুক্তবাজার অর্থনীতির সাফল্যের প্রাণভোমরা ধারণ করে রয়েছে, সেটা বুঝতে অনেক দিন লাগবে আমাদের শাসক মহলের। যৌক্তিক মুনাফা করা আর মুনাফাবাজি করা এক কথা নয়। আর মুনাফাবাজির সুযোগ করে দেওয়া লুটপাটকে মেনে নেওয়া বৈকি! অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ও দাম ব্যবস্থা চালু করার জন্য ভোক্তাস্বার্থ রক্ষার যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়, তার ধারেকাছেও যাইনি আমরা। (এ দেশে পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের নেতা বনে যান মন্ত্রী, অযোগ্য চালক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ খুনের ক্রিমিনাল অপরাধ করলেও তাঁদের যথাযোগ্য শাস্তি দেওয়ার বিপক্ষে সংঘ-শক্তি জয়ী হয়ে যায়। অতএব এ দেশে ক্রেতাস্বার্থ অবহেলিত থাকাটাই স্বাভাবিক।)
উপদেষ্টা মহোদয় যুক্তি দেখিয়েছেন যে তেলের দাম কমানো হলে বিনিয়োগ বাড়বে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সত্য নয়। তেলের দাম কমানোর যুক্তি প্রদর্শনের সময় এসব বাস্তবতা বিবেচনা করাই সমীচীন হবে। তাঁর যুক্তি উপেক্ষা করা যাবে না। কিন্তু জ্বালানি তেলের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্য, মূলধিন পণ্যের ক্ষেত্রে এর ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজেস এতই সুদূরপ্রসারী যে দাম কমানোর সম্ভাব্য প্রভাবকে তিনি অবমূল্যায়ন করছেন বলে মনে হচ্ছে। এত দিন ধরে শুধু পেট্রল ও অকটেনের দাম বেশি রেখে মুনাফা করে ডিজেল এবং কেরোসিনে প্রদত্ত ভর্তুকি কিঞ্চিৎ মেটানো হতো। কিন্তু এখন তো ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও কেরোসিনেও মুনাফা করছে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন—এর কী অর্থনৈতিক যুক্তি থাকতে পারে? এই তিনটি পণ্য ধনীদের ভোগ্যপণ্য নয়। কেরোসিন তো সমাজের দরিদ্র জনগণের জ্বালানি, তাই এখানে তো সব সময় ভর্তুকি দেওয়াই সমীচীন। ডিজেল থেকে মুনাফা করাও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে গর্হিত কাজ। অন্ততপক্ষে ভর্তুকি না দিলেও যা উৎপাদন খরচ, তার বেশি দাম নেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। আর ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দাম কমলে বিদ্যুতের দাম কমানোর যুক্তি শক্তিশালী হবে। তাই আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব, পেট্রল ও অকটেনে লিটারপ্রতি ১০ টাকা মুনাফা রেখে দাম নির্ধারণ করা হোক, যার ফলে পেট্রলের দাম ৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ৭০ টাকায় নামিয়ে আনা যাবে। ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দাম ৪০ টাকায় নামিয়ে আনলেও পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কিছু মুনাফা থাকবে। কেরোসিনে কিছু ভর্তুকি অব্যাহত রাখার সুপারিশ করছি, ২০ টাকার নিচে কেরোসিনের লিটারপ্রতি দাম নির্ধারণ করলেই চলবে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত হয়েছে যে অশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম ৪০ ডলারের কমে (বর্তমানে ৩০ ডলার) কয়েক মাস ধরে স্থিতিশীল থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন নাকি ৬১ ডলারে এক ব্যারেল তেল কিনে চলেছে তাদের মান্ধাতা আমলের ক্রয়নীতির কারণে। অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে দুজন মেধাবী ও ঝানু অর্থনীতিবিদের দীর্ঘ নেতৃত্ব সত্ত্বেও এটা কীভাবে চলছে? পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উচ্চ বেতনের অতিরিক্ত কত ধরনের ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, সে সম্পর্কে দেশবাসী কি সঠিকভাবে অবগত আছেন? আমার মনে হয় না। এদিকে একটু নজর দেওয়া প্রয়োজন নয় কি? আর সরকার যে তেল আমদানির ওপর শুল্ক, ভ্যাট ও কর বাবদ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আহরণ করে থাকে, তা কি আমরা ভালোভাবে জানি?
পুরো তেল আমদানি, পরিশোধন, বিপণন ক্ষেত্রে যে মুনাফাবাজি চলছে, সেটা কি বন্ধ হবে না?
ড. মইনুল ইসলাম, অধ্যাপক: অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।