Tuesday, July 8, 2025

ইসরায়েল আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল: ইরানের প্রেসিডেন্ট

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সংঘাতের সময় ইসরায়েল তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। মার্কিন রক্ষণশীল উপস্থাপক টাকার কার্লসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। গতকাল সোমবার সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করা হয়।

সাক্ষাৎকারের বেশির ভাগ অংশে পেজেশকিয়ান সোজাসাপটা কথা বলেন। এতে ইরানের প্রেসিডেন্ট প্রত্যাশিত উত্তর দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ইরানের জন্য আমি আমার জীবনকে কোরবানি দিতেও ভয় পাই না।’

ইসরায়েল তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিল—এ কথা বিশ্বাস করেন কি না, টাকার কার্লসনের এমন প্রশ্নের জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘হ্যাঁ, তারা আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। তারা সেই অনুযায়ী কাজও করেছে, তবে তারা ব্যর্থ হয়েছে।’

কখন তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল, সে ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু না জানিয়ে পেজেশকিয়ান শুধু বলেন, ‘একটি বৈঠকের সময়।’

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি একটি বৈঠকে ছিলাম। তারা সে জায়গায় বোমা হামলার চেষ্টা করেছিল, যেখানে আমরা বৈঠক করছিলাম।’

সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমি আমার দেশ রক্ষায় প্রাণ দিতে ভয় পাই না। আমাদের কোনো সরকারি কর্মকর্তা জীবন দিতে ভয় পান না। কিন্তু আরও রক্তপাত, আরও হত্যাকাণ্ড কি এ অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বয়ে আনবে?’

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা পারমাণবিক বোমার পেছনে কখনো ছুটিনি। ইরান কখনোই পারমাণবিক বোমা বানাতে চায়নি।’

সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘সত্য কথা হলো আমরা অতীতে, বর্তমানে বা ভবিষ্যতে—কখনোই পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে চাইনি। কারণ, এটি ভুল। এটি আমাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার নির্দেশনারও বিরুদ্ধে।’

পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ‘পারমাণবিক বোমা ধর্মীয়ভাবে হারাম। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা সেটাই প্রমাণ করেছি।’

ইরান কতটা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে—টাকার কার্লসনের এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে আলোচনা ও পর্যবেক্ষণে প্রস্তুত। আমরা যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলাম, তখন ইসরায়েল ১৩ জুন বিনা উসকানিতে হামলা চালিয়ে সে আলোচনা ভেঙে দিয়েছে।’

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা আবারও পারমাণবিক আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী, তবে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি।’

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমাদের আলোচনায় বসতে আপত্তি নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব, আলোচনার মাঝপথে আবার ইসরায়েলকে হামলার অনুমতি দেওয়া হবে না?’

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমার পরামর্শ হলো যুক্তরাষ্ট্র যেন এমন যুদ্ধে না জড়ায়, যা তাদের যুদ্ধ নয়। এটা নেতানিয়াহুর যুদ্ধ। তাঁর লক্ষ্য হলো অন্তহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া।’

সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, তাঁদের লক্ষ্য হলো শান্তি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে দ্বন্দ্বের সমাধান সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময়ই শান্তির পক্ষে ছিলাম। আমি মন থেকে বিশ্বাস করি, আল্লাহ আমাদের অল্প সময় বাঁচতে দিয়েছেন। সেই সময়টা শান্তি ও সম্প্রীতিতে থাকা উচিত।’

ইরানি নেতা বলেন, গত ২০০ বছরে ইরান কোনো দেশে আক্রমণ করেনি; বরং বারবার ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন ইরাক যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ।

ট্রাম্প অঞ্চলকে শান্তির পথে নিতে পারেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে পেজেশকিয়ান বলেন, তাঁর বিশ্বাস, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা ট্রাম্পের আছে। ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও তাঁর রয়েছে। তিনি যদি তা না করেন, তাহলে কেবল মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ বাধবে, আরও অস্থিরতা ছড়াবে। অথচ এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে নয়।

আইএইএ ইসরায়েলের সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি করছে কি না, কার্লসনের এমন প্রশ্নের উত্তরে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমাদের মধ্যে বিশ্বাস নেই। এ সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো আমাদের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলকে অবৈধ হামলা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে। এমনকি এরপরও সংস্থাটি ওই হামলার নিন্দা করেনি বা বন্ধ করার কোনো চেষ্টা করেনি।’

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি। রাশিয়া বা চীনের সামরিক সাহায্য ইরান চাইবে না। আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি। আমরা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে পারি।’

কার্লসন বলেন, ইরানি প্রেসিডেন্টের এ সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য তিনি সমালোচিত হতে পারেন। তবে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সব তথ্য জানার অধিকার আছে। এমনকি তারা যাদের সঙ্গে লড়ছে, তাদের কথাও শোনার অধিকার রয়েছে।

পেজেশকিয়ানের এ সাক্ষাৎকার এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র জুনের শেষ দিকে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এমনকি তাঁর নিজের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (এমএজিএ) সমর্থকেরাও হামলার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে তাঁরা আরেকটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ চান না।

কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্লসনও ইরানে হামলার ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে খোলাখুলি কথাবার্তা বলেছেন। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক সাক্ষাৎকারে টাকার কার্লসন রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজকে বলেন, ‘আপনি ইরান সম্পর্কে কিছুই জানেন না।’

যুদ্ধবিরতির মধ্যে চীনের কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের চালান পেল ইরান

চীনের কাছ থেকে ভূমি-থেকে-আকাশে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র–ব্যবস্থা হাতে পেয়েছে ইরান। ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুনরায় শক্তিশালী করতে তেহরান নিজেদের অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে।

একজন আরব গোয়েন্দা কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, গত ২৪ জুন ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির পর চীনের তৈরি ওই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তেহরানে পাঠানো হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক আরব কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্ররা জানত যে তেহরান তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। হোয়াইট হাউসকেও ইরানের অগ্রগতির বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।

ইরান যুদ্ধবিরতির পর চীনের কাছ থেকে কতগুলো ভূমি-থেকে-আকাশে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বা এসএএম পেয়েছে সে বিষয়ে ওই কর্মকর্তা কিছু বলেননি। তবে একজন আরব কর্মকর্তা বলেন, ইরান তেলের বিনিময়ে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কিনেছে।

ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থার (ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট চীনে রপ্তানি হয়। কনডেনসেট হলো প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় সংগৃহীত হালকা তরল জ্বালানি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গত কয়েক বছর ধরে চীন ইরানের কাছ থেকে রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করে আসছে। আমদানি করা তেলের উৎস গোপন রাখতে চীন মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোকে ট্রানশিপমেন্ট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।

দ্বিতীয় আরব কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, (নিষেধাজ্ঞা এড়াতে) নানা সৃষ্টিশীল উপায়ে ইরান বাণিজ্য করে থাকে।

এই চালানগুলো বেইজিং ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতার ইঙ্গিত দেয়। ইরানে এমন এক সময় ক্ষেপণাস্ত্রের ওই চালান এসেছে যখন পশ্চিমাদের ধারণা, ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলার সময় চীন ও রাশিয়া ইরান থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেছে।

১২ দিনের ওই সংঘাতে ইসরায়েল ইরানের আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। ইসরায়েল সুপরিকল্পিত হামলা চালিয়ে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্থাপনাগুলো নিশানা করতে এবং কয়েকজন শীর্ষ ইরানি জেনারেল ও পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করতে সক্ষম হয়।

ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের তেল আবিব ও হাইফা শহরের বেশ কিছু সংবেদনশীল স্থাপনা ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।

পরে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে বিবদমান দুদেশ একটি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। গত ২৪ জুন থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যদিও যুদ্ধবিরতির আগে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধকালীন ইরান চীন থেকে উত্তর কোরিয়ার মাধ্যমে এইচওয়াই-২ সিল্কওয়ার্ম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছিল। এ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরান কুয়েতের ওপর হামলা করে এবং তথাকথিত ‘ট্যাংকার যুদ্ধের’ সময় একটি মার্কিন পতাকাবাহী তেল ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

২০১০ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইরান চীনের কাছ থেকে এইচকিউ৯ বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে।

ধারণা করা হয়, ইরান বর্তমানে রাশিয়ার তৈরি এস-৩০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে, যা ধেয়ে আসা বিমান ও ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম। একই সঙ্গে ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও কিছুটা আছে এটির।

পাশাপাশি ইরান চীনের তৈরি পুরোনো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও নিজেদের তৈরি খোরদাদ সিরিজ এবং বাভার-৩৭৩–এর মতো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে।

তবে এ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি স্টেলথ যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ ভূপাতিত করার সক্ষমতা সীমিত বলে মনে করা হয়। সম্প্রতি ইরানে বিমান হামলা চালাতে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ইসরায়েল।

জানা গেছে, চীন ইতিমধ্যে পাকিস্তানের কাছে তাদের এইচকিউ-৯ ও এইচকিউ-১৬ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিক্রি করেছে। মিসরও চীনের এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হয়।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। রয়টার্স

ট্রাম্পকে নোবেলে মনোনয়ন নেতানিয়াহুর, গাজাকে রিসোর্ট বানানোর পরিকল্পনায় সমর্থন by জেফ মরডক

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সেই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছেন, যাতে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দিয়ে অঞ্চলটিকে বিলাসবহুল ‘রিভেরা’ রিসোর্টে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে নৈশভোজে নেতানিয়াহু এ পরিকল্পনাকে ‘চমৎকার এক দূরদর্শী পরিকল্পনা’ বলে অভিহিত করেন এবং ইঙ্গিত দেন যে ফিলিস্তিনিরা চাইলে সম্পূর্ণভাবে গাজা ত্যাগ করতে পারে।

নেতানিয়াহু বলেন, এটিকে বলে স্বাধীন পছন্দ। যদি কেউ থাকতে চায়, তারা থাকতে পারে। তবে যদি কেউ চলে যেতে চায়, তবে তাদের সেই সুযোগ থাকা উচিত। নেতানিয়াহু আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বর্তমানে অন্য কয়েকটি দেশের সঙ্গে কাজ করছে, যাতে গাজা থেকে সরিয়ে নেয়া ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যায়। তিনি বলেন, তারা ফিলিস্তিনিদের একটি উন্নত ভবিষ্যৎ দিতে চায়। আমরা কয়েকটি দেশের সঙ্গে ইতিবাচক অবস্থানে এগোচ্ছি। এটি তাদের পছন্দের স্বাধীনতা দেবে। আমি আশা করি আমরা সেটি নিশ্চিত করতে পারব।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুর প্রথম সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন যে, প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে গাজা থেকে সরিয়ে দিয়ে সেই অঞ্চলকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে এনে উন্নত রিসোর্ট হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। পরবর্তীতে তিনি ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিরা’ মন্তব্যটি থেকে খানিকটা পিছু হটেন। এই আলোচনা তাদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের অংশ, যেখানে গাজার ভবিষ্যৎ, ইসরাইল-হামাস যুদ্ধবিরতি এবং হামাসের হাতে জিম্মি ব্যক্তিদের মুক্তির সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে কথা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেতানিয়াহু নোবেল পুরস্কার কমিটিকে একটি চিঠি দিয়েছেন, যেখানে তিনি ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, শান্তি উদ্যোগে অবদানের পরও তিনি পুরস্কার পাননি। কারণ (নোবেল) কমিটি ‘বামপন্থী’।

(ওয়াশিংটনে দুই নেতার এই) ব্যক্তিগত নৈশভোজ ছিল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সর্বশেষ প্রচেষ্টা। এটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে- ইসরাইলের বড় অভিযানের অংশ হিসেবে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছেছে, যেটিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রশাসনের অন্যতম বড় অর্জন বলে দাবি করেছেন। ট্রাম্প ইরানে হামলার সিদ্ধান্তের তুলনা করেন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের ১৯৪৫ সালে জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলার সিদ্ধান্তের সঙ্গে। তিনি বলেন, আপনি যদি অনেক পেছনে যান, এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। হ্যারি ট্রুম্যানের ছবি এখন লবিতে, এক সুন্দর স্থানে টাঙানো, যেখানে এটি থাকা উচিত ছিল। সেটি অনেক যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিল এবং এটিও অনেক যুদ্ধ থামিয়েছে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, দুই নেতা ‘মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে চলা ইতিবাচক অগ্রগতি’ নিয়ে আলোচনা করবেন। প্রেসিডেন্টের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো গাজায় যুদ্ধ শেষ করা এবং সকল জিম্মির মুক্তি নিশ্চিত করা। ইসরাইল যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে, সেই প্রস্তাব হামাসকে পাঠানো হয়েছে। আমরা আশা করছি, হামাস এটি গ্রহণ করবে। আমরা চাই, সকল জিম্মিকে মুক্ত করা হোক। লেভিট জানান, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিসঙ্গত। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এই সপ্তাহে কাতার সফর করবেন। সেখানে ইসরাইলি কর্মকর্তারা হামাসের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আলোচনায় কাতার ও মিশরের প্রতিনিধি দলও অংশ নিচ্ছে।

রবিবার রাতে ট্রাম্প ভবিষ্যদ্বাণী করেন একটি চুক্তি ‘খুব কাছাকাছি’ এবং এ সপ্তাহেই তা হতে পারে। নেতানিয়াহুও বলেন, তার এই সফর কাতারে চলমান আলোচনাকে আরও এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তবে আলোচনার পথে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। ইসরাইল ও হামাস মূলত দ্বিমত রয়েছে এই চুক্তি কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি, নাকি পূর্ণ যুদ্ধ সমাপ্তির পথ খুলে দেবে তা নিয়ে। হামাসের শীর্ষ নেতারা ইসরাইলি হামলায় নিহত হওয়ায় সংগঠনটি এখন নতুন নেতা ইজ্জুদ্দিন আল-হাদিদের অধীনে। তিনি বলেন, ইসরাইলের সেনা পুরোপুরি গাজা থেকে সরে না যাওয়া পর্যন্ত সকল জিম্মিকে মুক্তি দেয়া হবে না। নেতানিয়াহু আবারও দাবি করেছেন, হামাসকে পুরোপুরি বিলুপ্ত, অস্ত্রহীন ও নির্বাসিত হতে হবে। তবে তার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে হামাস।
যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, ইসরাইল কি এমন কোনো শান্তিচুক্তি চায় যা পূর্ণ সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ দেবে না, তখন নেতানিয়াহু বলেন, আমরা আমাদের ফিলিস্তিনি প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করব- যারা আমাদের ধ্বংস করতে চায় না। আমাদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌম ক্ষমতা আমাদের হাতেই থাকবে। কেউ যদি বলে, ‘এটি একটি পূর্ণ রাষ্ট্র নয়’, তাহলে আমরা বলব, আমরা পাত্তা দিই না।

এই সংঘাতে ইতিমধ্যেই ৫৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হাজার হাজার গুরুতর আহত। অসংখ্য মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। তারা মারা গেছেন বলে ধরে নেয়া হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১২০০ ইসরাইলি ও বিদেশি নাগরিক নিহত হয়। প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে হামাস। এর পরেই গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরাইল। একইসঙ্গে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়, যখন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। সোমবার ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বৈঠকের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। হুতি বিদ্রোহীরা একদিন আগেই একটি লাইবেরিয়ায়-নিবন্ধিত পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও গ্রেনেড হামলা চালায়। এর ফলে ২২ জন ক্রু জাহাজ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হন।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা হোদাইদা, রাস ইসা ও সালিফ বন্দরে এবং রাস কানাতিব বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। এগুলো হুতিদের অস্ত্র পরিবহনের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ এক্সে লিখেছেন, তেহরানের ভাগ্যই ইয়েমেনের ভাগ্য। এটা ইঙ্গিত করে যে হুতিরাও ইরানের মতোই আক্রমণের মুখে পড়বে। এছাড়া সোমবার গাজার উত্তরে একটি বিস্ফোরণে ৬ জন ইসরাইলি সেনা নিহত ও কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

এটি ছিল জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর নেতানিয়াহুর তৃতীয় হোয়াইট হাউস সফর, যা বিশ্বের অন্য কোনো নেতার চেয়ে বেশি। নৈশভোজের আগে স্টিভ উইটকফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। মঙ্গলবার তার হাউস স্পিকার মাইক জনসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। ওদিকে নেতানিয়াহুর সফরের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউজের বাইরে প্রায় দু’ডজন বিক্ষোভকারী গাজায় হামলার প্রতিবাদে অবস্থান নেন। এ সময় তারা নানা রকম স্লোগান দেন। লেভিট বলেন, নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন, এই অঞ্চল শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে যেতে পারে। তবে এর জন্য যুদ্ধ থামানো, জিম্মিদের মুক্তি এবং হামাসের সম্মতি প্রয়োজন।

নৈশভোজে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইসরাইল-সিরিয়া সম্পর্ক এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণ। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইসরাইল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয় এই চুক্তিতে। গত মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়ার উপর দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যাতে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে দেশ পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, সিরিয়া ও ইসরাইলের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা হ্রাস করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। নেতানিয়াহু বলেন, ইসরাইল ছাড়ার আগে তার মনে হয়েছিল, শান্তির বৃত্ত সম্প্রসারণের সুযোগ এখন আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বড়।

mzamin

ইউক্রেনের পরাজয় ঠেকানোর একমাত্র পথ... by স্টিফেন ব্রায়েন

সম্প্রতি ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও রুশ বাহিনীর অগ্রগতি যুদ্ধের শেষ পরিণতির পূর্বাভাস দিচ্ছে। এটি ইউক্রেনের ওপর নেমে আসবে যদি দেশটি এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প উপায় খুঁজে না পায়। সম্ভাব্য একটি সমাধান হতে পারে জেলেনস্কিকে সুরক্ষা দিয়ে অপেক্ষাকৃত একটি নমনীয় পক্ষ তৈরি করা। সেরা উপায়টি হতে পারে ইউক্রেনে একটি জোট সরকার গঠন করা, যারা রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার বোঝা বহন করতে পারবে।

আজ আমরা জেলেনস্কি ও তাঁর সহযোগীদের কাছ থেকে বারবার শুনছি, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াই তাঁরা এই যুদ্ধ জিততে পারবেন। ঘৃণিত রুশদের কাছে তাঁরা ইউক্রেনের এক মিটার ভূমিও ছাড়বেন না। এ–ও বলছেন, তাঁরা ‘ভাড়া হিসেবে’ আমেরিকান সামরিক সরঞ্জাম কিনতে পারবেন অথবা জার্মানিকে ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহার করে আমেরিকান যন্ত্রাংশ কিনত পারবেন।

এখন প্রশ্ন হলো, ইউক্রেনের নেতারা যেটা বলছেন, সেটা কি তাঁরা সত্যিই বিশ্বাস করেন?

আমার ধারণা, তাঁরা নিজেরাও এটা বিশ্বাস করেন না। তাঁরা মূলত জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু যখন সবখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিস্ফোরিত হচ্ছে, আর আপনাকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা ঠান্ডা বেজমেন্টে ঘুমাতে হচ্ছে, তখন এ ব্যাপারে আশ্বস্ত হওয়া খুব কঠিন।

আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুলটি হয় ২০২২ সালের ৩০ মার্চ। ধারণা করা হয়, যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ইস্তাম্বুলে হওয়া শান্তিচুক্তি থেকে জেলেনস্কিকে সরে আসতে রাজি করিয়েছিলেন।

আমার নিজের পর্যালোচনা হচ্ছে, জেলেনস্কি রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তি থেকে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার কারণ হলো তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, এতে তাঁর নিজের সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারে এবং হয়তো তাঁকে হত্যাও করতে পারে। ফলে জেলেনস্কির সিদ্ধান্তকেই অনেকটা বৈধতা দিয়েছিলেন জনসন।

এর আগে ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট জানিয়েছিলেন, জেলেনস্কি ভয় পাচ্ছিলেন যে রুশরা তাঁকে হত্যা করবে। তখন বেনেট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে ‘সেটা করা হবে না’ বলে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন। কিন্তু হুমকিটা ইউক্রেন সেনাবাহিনীর চরমপন্থী অংশ থেকে এলে সেখানে কোনো প্রতিশ্রুতি আদায় করা সম্ভব ছিল না।

এর পর থেকে জেলেনস্কি রাশিয়ার সঙ্গে যেকোনো সমঝোতামূলক আলোচনার প্রশ্নে সম্পূর্ণ অনমনীয় ও একরোখা অবস্থান নেন। তিনি দাবি করতে থাকেন, রুশ সেনাদের ইউক্রেন ছেড়ে চলে যেতে হবে এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য পুতিনের শাস্তি হতে হবে। জেলেনস্কির এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো সফল মধ্যস্থতার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

নিজের সিদ্ধান্তের দায় ঢাকতে জেলেনস্কি ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির দাবি তোলেন। এটি এমন একটা দাবি, যেটা রাশিয়া কখনোই মানবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি নিয়ে মস্কোকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু সেটা ফলপ্রসূ হয়নি। ৩ জুলাই পুতিন ও ট্রাম্প টেলিফোনে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কথা বলার সময় ধারণাটি আবারও সামনে এসেছে।

ইউক্রেনের সমস্যা এখন শুধু জেলেনস্কির জন্য সৃষ্ট সমস্যা নয়। ইউক্রেনের অস্ত্রভান্ডার ফুরিয়ে আসছে। আশঙ্কাজনকভাবে সেনা ও ভূখণ্ড হারাতে শুরু করেছে। ইউক্রেনের সরবরাহ পথ, গোলাবারুদের গুদাম, কমান্ড সেন্টার ও কারখানাগুলো একের পর এক ধ্বংস হওয়ার কারণে প্রতিদিনই পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার হাতে এখনো বেশ কিছু তুরুপের তাস রয়ে গেছে। প্রথমত, রাশিয়ার একটি বিশাল সেনাবাহিনী আছে, যার বড় একটি অংশ এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়নি। সেই তুলনায় ইউক্রেন নতুন সেনা সংগ্রহের পাশাপাশি পুরোনোদের ধরে রাখার ক্ষেত্রেও ভয়ানক সমস্যায় পড়েছে। সেনাদের পলায়নের হার ভয়ানক হারে বেড়ে গেছে। কেননা, যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় সেনাদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

রাশিয়া এখন উত্তর কোরিয়া থেকে আরও বেশি সেনা নিয়ে আসছে। এটা উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং–উনের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। কিম সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত তাঁর সেনাদের (মাত্র পাঁচটি কফিন) জন্য অশ্রুসিক্ত রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করেন। বিশাল একটি কনসার্টের মাধ্যমে ‘পিতৃভূমির জন্য জীবন উৎসর্গ করা’ সেনাদের মহিমা প্রচার করেন।

এ বাস্তবতায় সামনে এগোনোর পথ কী তাহলে? প্রথম ধাপটি হলো ট্রাম্পকে এমন কিছু কৌশলগত হাতিয়ার দেওয়া, যেটা তিনি রাশিয়ার সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জেলেনস্কি ঠিক উল্টো কাজটি করেছেন। এটা যদি চলতেই থাকে, তাহলে সেটা হবে আত্মঘাতী।

২০২২ সালে ইস্তাম্বুলে যে সমঝোতায় পৌঁছনো গিয়েছিল, সেখানে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা এবং সেখান থেকে শুরু করাটাই হবে সবচেয়ে সেরা পথ। রাশিয়া বলার চেষ্টা করবে যে ইস্তাম্বুল চুক্তিটি এখন পানির অতলে হারিয়ে গেছে। তবে একটা সম্ভাবনা আছে, পুতিন এটাকে আলোচনা শুরুর সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় অনেকবার বলেছেন, ইস্তাম্বুল চুক্তি যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারত এবং রাশিয়া এটি মেনে নিত।

ইস্তাম্বুলে আলোচনার সময় রাশিয়ার এমন কিছু দাবি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি, সেগুলো অবশ্যই এখন বিবেচনায় নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইস্তাম্বুল চুক্তিকে সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরুর জন্য একটি ‘বাস্তব’ বিষয় থাকবে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো রাশিয়ার জন্য বাজারে প্রবেশের সুযোগ, প্রযুক্তি ভাগাভাগি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং ইউক্রেন পুনর্গঠনের সহায়তা—এসব জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা পাওয়ার বাস্তব সুযোগ রয়েছে।

পুতিন বলেছেন, দানেস্ক, জাপোরিঝঝিয়া, খেরসন ও ক্রিমিয়া অঞ্চলের যেসব এলাকা যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছে, সেগুলো পুনর্গঠনের ব্যাপারে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু রাশিয়ার কাছে এ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ বা অর্থ নেই। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার এ ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের একটি সমঝোতার পথ খুঁজছে।

তৃতীয় বিষয়টি হলো ইউক্রেন সরকারের ধরন। ফরমান জারি করে জেলেনস্কি সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেছে। বিরোধী রাজনীতিকদের জেলে পাঠানো হয়েছে কিংবা তাঁদের কর্মকাণ্ড সীমিত করা হয়েছে কিংবা নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে।
জেলেনস্কির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো সামরিক শাসন তুলে দেওয়া এবং নির্বাচন আয়োজন করা। তবে জরুরি ভিত্তিতে যেটি করা দরকার, তা হলো রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার জন্য একটি জোট সরকার গঠন করা।

একটি জোট সরকার যেকোনো চুক্তির দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সব কটি রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ভাগ করে দিতে পারে, যার ফলে তাদের পক্ষে ছাড় দেওয়ার পথও সহজ হয়। জোট সরকার গঠন করা হলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুফল হতে পারে, এর মাধ্যমে ফুরিয়ে যাওয়ার হাত থেকে জেলেনস্কিকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।

ইউক্রেন এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হয় দেশটি একই পথেই চলতে থাকবে এবং যুদ্ধে হারবে, অথবা বাস্তবতার নিরিখে সিদ্দান্ত নেবে, যেটি দেশটিকে আলোচনার টেবিলে ফেরাবে।

* স্টিফেন ব্রায়েন, এশিয়া টাইমসের বিশেষ সংবাদদাতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষানীতি বিষয়ক সাবেক উপপ্রতিমন্ত্রী
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ইউক্রেনে রাশিয়ার বিমান হামলা বাড়ছেই
ইউক্রেনে রাশিয়ার বিমান হামলা বাড়ছেই। ছবি : রয়টার্স

‘বিশ্ব আর কোনো সম্রাট চায় না’, ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট লুলার পাল্টা হুঁশিয়ারি

ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো ‘যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী’—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা এমন অভিযোগ গতকাল সোমবার নাকচ করে দিয়েছেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর এ জোটের নেতারা। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা তাঁকে উদ্দেশ করে সাফ জানিয়ে দেন, ‘বিশ্বের আর কোনো সম্রাটের প্রয়োজন নেই’।

এর আগের দিন গত রোববার রাতে ট্রাম্প ব্রিকস দেশগুলোর ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। তিনি বলেন, যারা ‘যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী’ নীতি গ্রহণ করবে বলে মনে হবে, তাদের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধমূলক’ শুল্ক বসানো হবে। এরপর গতকাল ১৪টি দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন তিনি।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট হুমকি দিলেও আপাতত ব্রিকস দেশগুলোর ওপর ১০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপ করার পরিকল্পনা নেই। তবে কোনো দেশ যদি এমন কোনো নীতি নেয়, যা ট্রাম্প প্রশাসনের চোখে ‘বিরুদ্ধাচরণ’ বলে বিবেচিত হয়, তাহলে ওই বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।

রিও ডি জেনিরোতে ব্রিকস সম্মেলন শেষে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে লুলা বলেন, ‘বিশ্ব বদলে গেছে। আমরা আর কোনো সম্রাট চাই না।’

প্রেসিডেন্ট লুলা বলেন, এই দেশগুলোর জোট একটি ভিন্ন অর্থনৈতিক কাঠামোর খোঁজ করছে। তাই হয়তো ব্রিকস এখন অনেকের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ব্রিকস যদি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ভূমিকা খর্ব করতে চায়, তবে এ জোটকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের মুখে পড়তে হতে পারে। যদিও ব্রাজিলের সভাপতিত্বে হওয়া বর্তমান ব্রিকস সম্মেলনে সদস্যদের মধ্যে যে অভিন্ন মুদ্রা চালুর পরিকল্পনা ছিল, তা থেকে সরে এসেছে এ জোট। গত বছর জোটের কিছু দেশ এমন অভিন্ন মুদ্রার প্রস্তাবি দিয়েছিল।

তবু লুলা তাঁর অবস্থানে অনড়। গতকাল তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের বিকল্প খোঁজা এখন জরুরি।

‘বিশ্বকে এমন একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে, যাতে বাণিজ্যিক লেনদেনের সব কিছু ডলারের মাধ্যমে না করতে হয়’, বলেন লুলা।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘এটা অবশ্যই দায়িত্বশীলতা ও সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উচিত, অন্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া। এটা এক দিনে সম্ভব নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে।’

ট্রাম্পের হুমকির জবাবে অন্যান্য ব্রিকস দেশের প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্পের হুমকির পর অন্যান্য ব্রিকস সদস্যরাষ্ট্রও নরমভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। যেমন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেন, ব্রিকস কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চায় না এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি হবে বলে তিনি আশাবাদী।

বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, শুল্ককে চাপে রাখার বা বাধ্য করানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ব্রিকস ‘উভয় পক্ষের স্বার্থরক্ষামূলক’ সহযোগিতার পক্ষে এবং এ জোট কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়।

ক্রেমলিনের একজন মুখপাত্র বলেন, ব্রিকসের সঙ্গে রাশিয়ার সহযোগিতা একটি ‘অভিন্ন বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি’র ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং এটি কখনোই কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না।

ভারতের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। ব্রিকস সদস্য ও সহযোগী অনেক দেশ তাদের বাণিজ্যের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।

ব্রিকসের নতুন সদস্য ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এয়ারলাঙ্গা হারতার্তো ব্রিকস সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও শুল্ক আলোচনা তদারক করতে গতকালই যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন তিনি। ইন্দোনেশিয়ার একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।

অন্যদিকে সহযোগী দেশ হিসেবে ব্রিকসে অংশ নেওয়া মালয়েশিয়া—যাদের ওপর ২৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল (যদিও পরে তা স্থগিত হয়), জানিয়েছে, তারা স্বাধীন অর্থনৈতিক নীতিতে বিশ্বাসী এবং কোনো আদর্শগত পক্ষপাতিত্বের সঙ্গে নেই।

উল্লেখ্য, রোববার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে ব্রিকস নেতারা সদস্যদেশ ইরানে সাম্প্রতিক বোমা হামলার নিন্দা জানান এবং বলেন, শুল্ক বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়ছে। এতে পরোক্ষভাবে ট্রাম্পের শুল্ক নীতিরও সমালোচনা করা হয়।

তবে কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প হুমকি দেন, যারা ব্রিকসে যোগ দিতে চাইছে, তাদের ‘শাস্তি’ পেতে হবে।

২০০৯ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন প্রথমবারের মতো ব্রিকস সম্মেলনে বসে। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হয়। গত বছর থেকে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

সৌদি আরব এখনো পুরোপুরি সদস্য না হলেও অংশীদার দেশ হিসেবে এতে অংশ নিচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩০টির বেশি দেশ ব্রিকসে সদস্য বা অংশীদার হিসেবে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা। রিও ডি জেনিরো, ৭ ব্রাজিল ২০২৫
ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা। রিও ডি জেনিরো, ৭ ব্রাজিল ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

একসঙ্গে নৈশভোজ, ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিলেন নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল সোমবার বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এবারের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন। এ জন্য নোবেল কমিটির কাছে একটি চিঠিও লিখেছেন নেতানিয়াহু। ওই চিঠির একটি কপি তিনি ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে গতকাল ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে চিঠির কপি তুলে দেন নেতানিয়াহু। এ সময় দুই নেতা নৈশভোজে অংশ নেন। নেতানিয়াহু তখন বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) আমাদের কথায় একের পর এক দেশে, একের পর এক অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছেন।’

ট্রাম্প বছরের পর বছর ধরে সমর্থক ও অনুগত আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য একাধিকবার মনোনয়ন পেয়েছেন। যদিও পুরস্কার এখনো অধরাই রয়ে গেছে। মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার না পাওয়ায় ট্রাম্প বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যেই বিরক্তি দেখিয়েছেন।

রিপাবলিকান রাজনীতিক ট্রাম্পের মতে, ভারত-পাকিস্তান এবং সার্বিয়া-কসোভোর মধ্যকার সংঘাতে লাগাম টানার ক্ষেত্রে তাঁর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নরওয়ের নোবেল কমিটি উপেক্ষা করেছে। মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে ‘শান্তি বজায় রাখা’ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য সই করা ‘আব্রাহাম চুক্তি’র মধ্যস্থতার জন্যও কৃতিত্ব দাবি করেন ট্রাম্প।

নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকেই নিজেকে একজন ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন ট্রাম্প। তিনি ইউক্রেন আর ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান সর্বাত্মক যুদ্ধ বন্ধে নিজের আলোচনার দক্ষতা কাজে লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এবার নিয়ে তৃতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউস সফরে গেলেন নেতানিয়াহু। এমন এক সময়ে এই দুই নেতা সাক্ষাৎ করলেন, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির গতিকে কাজে লাগানোর আশা করছেন।

নৈশভোজের শুরুতে সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের কাছে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ক্ষেত্রে বাধার বিষয়ে জানতে চান। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি মনে করি না যে কোনো কিছু আটকে আছে; বরং আমার মনে হয়, সবকিছু খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে।’

লম্বা একটি টেবিলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি বসে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, গাজায় প্রায় ২২ মাসে ধরে চলা সংঘাত বন্ধে ফিলিস্তিনের হামাস ইচ্ছুক হবে বলে মনে করছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা সাক্ষাৎ করতে চায়। তারা যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে চায়।’

ওয়াশিংটনে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যখন নৈশভোজে অংশ নেন, তখন কাতারের দোহায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গাজায় অধরা যুদ্ধবিরতি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনার দ্বিতীয় দিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে পূর্ণাঙ্গ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের বলেন, ইসরায়েল গাজা উপত্যকার ওপর সব সময় ‘নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ’ বজায় রাখবে। তিনি বলেন, ‘এখন মানুষ বলবে এটা পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র নয়। আদতে এটা একটি রাষ্ট্র নয়। আমাদের কিছুই যায় আসে না।’

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নৈশভোজ চলার সময় হোয়াইট হাউসের সামনে বিক্ষোভ করেন কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী। তাঁরা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’র অভিযোগ তুলে নানা রকম স্লোগান দেন।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়ে লেখা চিঠির একটি কপি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ৭ জুলাই, ওয়াশিংটনে
শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়ে লেখা চিঠির একটি কপি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ৭ জুলাই, ওয়াশিংটনে। ছবি: এএফপি

ইরান এবার বড় যুদ্ধের জন্য যেভাবে প্রস্তুত হবে by মোহাম্মদ ইসলামি ও ইব্রাহিম আল-মারাশি

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যে অস্বস্তিকর যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তাতে ১২ দিনের পাল্টাপাল্টি হামলার অবসান ঘটেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সংঘাতে নিজেদের বিজয় ঘোষণা করেছেন। একুশ শতকের স্বল্প স্থায়ী একটি যুদ্ধ হিসেবে এটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

ইরানও এই যুদ্ধে বিজয় দাবি করেছে। ১৯৮০-১৯৮৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ শেষে যেমন করে ইরান বিজয় দাবি করেছিল, এবারের ঘটনাটি অনেকটাই তার সঙ্গে মিলে যায়। সেই যুদ্ধ ছিল বিশ শতকের অন্যতম দীর্ঘ প্রথাগত যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনও বিজয় দাবি করেছিলেন।

দুটি ক্ষেত্রেই ইরান আক্রান্ত হয়েছে। ইরানের শাসকেরা দুটি সংঘাতকেই ‘আরোপিত যুদ্ধ’ বলে চিত্রিত করেছেন এবং দাবি করেছেন এই যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবুজ সংকেত’ ছিল।

দুটি ক্ষেত্রেই ইরান তাদের বিজয় ঘোষণার ক্ষেত্রে কৌশলগত ধৈর্য (সব্র-ই রাহবর্দি) প্রদর্শনের নীতি নিয়েছে। অর্থাৎ সংযম প্রদর্শনের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারসাম্যকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে যাওয়ার নীতি অবলম্বন করেছে ইরান।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর, ইরান অপেক্ষা করে ছিল। সময় ও পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইরান নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রই ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সাদ্দামের গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস করেছিল। এরপর ২০০৩ সালে তাঁকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।

তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে আজকেও তারা সেই একই কৌশলগত ধৈর্যের নীতি প্রয়োগ করছে।

বর্তমান যুদ্ধবিরতিকে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছে ইরান। কিন্তু দেশটির শাসকেরা বিশেষ করে রাজনৈতিক ও সামরিক মহল এটিকে একটি কৌশলগত যুদ্ধবিরতি হিসেবে দেখছেন। তাঁরা এটাকে টেকসই শান্তি হিসেবে দেখছেন না।

ইরানের জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে এই যুদ্ধবিরতি একটি স্পষ্ট কৌশলগত উদ্দেশ্য বহন করছে।

ইরানের এই কৌশলগত ধৈর্যের নীতিতে সময়কে একটি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইরান এখন সময়কে পারমাণবিক কৌশল পুনর্মূল্যায়নের, আঞ্চলিক জোট সম্প্রসারণের এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দৃঢ়তার সীমা পরীক্ষার উপায় হিসেবে গ্রহণ করবে।

এই সময়ে ইরানের নীতিনির্ধারকেরা তাঁদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে আবার পর্যালোচনা করবেন। বিশেষ করে নৌবাহিনীর সক্ষমতা এবং সাইবার অপারেশনের সক্ষমতার মতো বিষয়গুলো তাঁরা আবারও মূল্যায়ন করবেন। আর এসব কিছুর লক্ষ্য হচ্ছে, একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা তৈরি করা।

সময়, তেহরানের সামনে তিনটি জায়গায় নতুন করে চিন্তাভাবনা করার গুরুত্বপূর্ণ ফুরসত এনে দিয়েছে। প্রথমত, নেতৃত্ব পুনর্গঠন; দ্বিতীয়ত, অস্ত্রভান্ডার পূর্ণ করা এবং তৃতীয়ত, একটি আন্তর্জাতিক পরিসরে কূটনৈতিক আক্রমণ শানানোর পরিকল্পনা।

১৯৮১ সালের জুন মাসে ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির কার্যালয়ে বোমা হামলা করা হয়। এতে দলটির মহাসচিব মোহাম্মদ বেহেশতিসহ ৭৪ জন উচ্চপদস্থ কর্তা নিহত হন। ওই একই মাসে, ইরান ইরাক সীমান্তে এক লড়াইয়ে দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার মোস্তাফা চামরান নিহত হন।

১৯৮১ সালের আগস্ট মাসে ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলি রাজাই এবং প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ-জাভাদ বাহোনার তেহরানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বোমা হামলায় নিহত হন।

এই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল মুজাহিদিন-ই-খালক নামে সশস্ত্র গোষ্ঠী। বিরোধী এই গোষ্ঠী ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তুলেছিল।

বোমাটি স্থাপন করেছিল মাসউদ কেশমিরি। তিনি ছিলেন মুজাহিদিন-ই-খালকের সদস্য। নিরাপত্তা কর্মকর্তার ছদ্মবেশে তিনি সরকারে অনুপ্রবেশ করেছিল। বিস্ফোরণে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় পুলিশের প্রধান, জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসহ আটজন পদস্থ কর্তা নিহত হয়েছিলেন। যুদ্ধের শুরুর বছরে এটি ছিল ভয়ানক একটি নাশকতা।

এত বড় ক্ষয়ক্ষতির পরেও ইরান পাল্টা আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়েছিল। ইরানের ভূখণ্ড থেকে ইরাকের সমস্ত সেনাকে বিতাড়িত করেছিল।

গত ১৩ জুন ভোররাতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান শুরু করে।

এই হামলা শুধু পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও বিজ্ঞানীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল ইসরায়েল। নিহতদের মধ্যে ছিলেন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কমান্ডার হোসেইন সালামি, এবং অ্যারোস্পেস প্রধান আমির আলী হাজিজাদেহ। বেশ কয়েকজন পারমাণুবিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাকেও হত্যা করেছিল ইসরায়েল।

এরপরও ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করতে সক্ষম হয়। ইসরায়েলের বহুল প্রশংসিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চরম চাপের মুখে ফেলে দেয়। এই যুদ্ধে ইরানের স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শান্তির এই নতুন পর্যায়ে, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার পূর্ণ করা এবং আধুনিকায়নে অগ্রাধিকার দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ফাত্তাহ ও খাইবার শেকানের মতো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের যেকোনো আকস্মিক হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে ইরান এখন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও জোরদার করবে।

সদ্যসমাপ্ত যুদ্ধ থেকে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে, একটি আধুনিক যুদ্ধে একটি সক্ষম ও উন্নত বিমানবাহিনী ছাড়া বিজয় অর্জন সম্ভব নয়।

যদিও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা কিছুটা কৌশলগত শক্তি দেখিয়েছে। কিন্তু এর বড় ধরনের দুর্বলতাও উন্মোচিত হয়েছে। আধুনিক বিমান ও বৈদ্যুতিন যুদ্ধের সক্ষমতা আছে, এমন শক্তির বিরুদ্ধে শুধু এই ব্যবস্থা সেভাবে কাজ করে না।

এই কৌশলগত ঘাটতি পূরণে, ইরান এখন জরুরি ভিত্তিতে রাশিয়ার এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সু-৩৫ যুদ্ধবিমান সংগ্রহের উদ্যোগ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান নেওয়ার বিষয়টিকেও ইরান এখন বিবেচনা করবে। কেননা, সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় চীনের যুদ্ধবিমান সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

এ ছাড়া ইরানের সামরিকবিদেরা আরেকটি বড় ঘাটতিকে চিহ্নিত করেছেন। সেটা হলো, এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম বা আকাশপথে কোনো আক্রমণ হলে আগেভাগেই সতর্ক করার প্রযুক্তি না থাকা।

সবচেয়ে উন্নত ভূমিভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতাও মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম ছাড়া। এ কারণে তেহরান এখন চীন বা রাশিয়া থেকে এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম সংগ্রহে অগ্রাধিকার দেবে।

এর বাইরেও ইরান এখন কূটনৈতিক ও আইনি পাল্টা আক্রমণ শাসানোর ভূমি প্রস্তুত করবে।

- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

* মোহাম্মদ ইসলামি, পর্তুগালের মিনহো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
* ইব্রাহিম আল-মারাশি, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি সান মারকোসের মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক।

ইরানের  রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সদস্যরা যুদ্ধর মহড়া দিচ্ছে। ২০১৮ সালে রয়টার্সের তোলা ছবি
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সদস্যরা যুদ্ধর মহড়া দিচ্ছে। ২০১৮ সালে রয়টার্সের তোলা ছবি

কোন ভয়ে দলে দলে ইরান ছেড়ে যাচ্ছেন আফগান শরণার্থীরা

ইরানে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ আফগান শরণার্থী ও অভিবাসীকে দেশ ছাড়তে সময় বেঁধে দিয়েছিল তেহরান সরকার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইরান ছাড়তে ব্যর্থ হলে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে বলেও হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছিল। তেহরানের বেঁধে দেওয়া সেই সময় গতকাল রোববার শেষ হয়েছে।

গত মাসে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর ইরানে জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে দারুণ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আর এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যেই আফগানদের ইরান ছেড়ে চলে যাওয়ার সরকারের বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হলো।

২০২৩ সালে ইরান সরকার সে দেশে ‘অবৈধভাবে’ বসবাসরত বিদেশিদের দেশ থেকে বের করে দিতে অভিযান শুরু করে। এ বছরের মার্চে ইরানি সরকার নির্দেশ দেয়, আফগানিস্তানের যেসব নাগরিকের ইরানে থাকার বৈধতা নেই, তাঁরা যেন ৬ জুলাইয়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় ইরান ছাড়েন, নইলে তাঁদের বিতাড়িত করা হবে।

সরকারের ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত সাত লাখের বেশি আফগান ইরান ছেড়েছেন। আরও লাখো মানুষ বিতাড়নের মুখে রয়েছেন। শুধু জুনেই ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি আফগান ইরান ছেড়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।

তেহরানের একটি রেস্তোরাঁর মালিক বাতুল আকবরি আল–জাজিরাকে বলেন, তেহরানে বসবাসরত আফগানরা ‘আফগানবিরোধী মনোভাবের’ কারণে কষ্ট পাচ্ছেন। লোকজনকে এমন একটি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেটিকে তাঁরা চিরকাল নিজের বলে জেনেছেন। এটা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।

বাতুলের মা–বাবা আফগানিস্তান থেকে এসেছেন, কিন্তু তাঁর জন্ম ইরানে। এ রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী বলেন, ‘ইরানে জন্ম নেওয়ার ফলে আমাদের মনে হয়, আমাদের দুটি দেশ। আমাদের মা–বাবা আফগানিস্তান থেকে এসেছেন, কিন্তু আমরা এ দেশকেই আমাদের বাড়ি বলে জেনে এসেছি।’

মোহাম্মদ নাসিম মেজাহেরি একজন শিক্ষার্থী। তাঁর পরিবারকেও ইরান ছাড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, বিতাড়নের এই প্রক্রিয়া বহু পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সময় থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজারের বেশি আফগান ইরান ছাড়ছেন। যেখানে আগের হার ছিল দৈনিক গড়ে দুই হাজার।

ইরান থেকে এত ব্যাপক হারে আফগানদের দেশে ফেরত যাওয়া নিয়ে সতর্ক করেছে নানা মানবাধিকার সংগঠন। তাদের আশঙ্কা, এতে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ আফগানিস্তান আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।

ইরানে প্রায় ৪০ লাখ আফগান অভিবাসী ও শরণার্থী বসবাস করেন, যাঁদের অনেকেই দশকের পর দশক ধরে সেখানে বসবাস করে আসছেন।

আশ্রয় নেওয়া আফগান শরণার্থীদের বিতাড়িত করা নিয়ে ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি গত মঙ্গলবার বলেন, ‘আমরা সব সময় ভালো আতিথেয়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সবকিছুর আগে জাতীয় নিরাপত্তার। তাই স্বাভাবিকভাবেই যাঁরা অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তাঁদের ফিরে যেতে হবে।’

আফগানিস্তানে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি আরাফাত জামাল ইরান-আফগান সীমান্ত পারাপারের একটি দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তাঁরা বাসে করে আসছেন। কখনো কখনো একসঙ্গে পাঁচটি বাস আসছে, সেগুলোতে পরিবারসহ অনেক মানুষ থাকেন। বাস থেকে নামার পর তাঁরা সম্পূর্ণ হতবুদ্ধ, দিশাহারা, ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকেন।

ইসরায়েলের সঙ্গে সর্বশেষ সংঘাতের কারণে এই পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে, কিন্তু এর শুরু হয়েছিল আগেই।

আরাফাত জামাল বলেন, ‘যুদ্ধের ফলে এই পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে। তবে বলতেই হবে, এটা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা প্রবণতার একটি অংশ। আমরা অনেক দিন ধরে ইরান থেকে আফগান নাগরিকদের ফিরে আসতে দেখে আসছি। এর কিছু অংশ স্বেচ্ছায় ফিরে এলেও বড় একটি অংশকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’

তেহরান থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক রাসুল সেরদার বলেন, ইরানে অর্থনৈতিক সংকট, পণ্যের ঘাটতি ও সামাজিক সমস্যার জন্য আফগানদের ওপর দায় চাপানোর প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।

সেরদার বলেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাতের পর রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চালানো প্রচারের কারণে এসব অভিযোগ আরও বেড়েছে। ওই সব প্রচারে দাবি করা হচ্ছে, ইসরায়েল আফগান নাগরিকদের গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।

আফগানিস্তান-ইরান সীমান্ত পেরিয়ে ইরান থেকে আফগান শরণার্থীরা আফগানিস্তানে ফিরে যাচ্ছেন। ৫ জুলাই ২০২৫
আফগানিস্তান-ইরান সীমান্ত পেরিয়ে ইরান থেকে আফগান শরণার্থীরা আফগানিস্তানে ফিরে যাচ্ছেন। ৫ জুলাই ২০২৫ ছবি: এএফপি

অগ্নিঝরা জুলাই: মাহিনের বাবার আক্ষেপ by ফাহিমা আক্তার সুমি

শূন্যতা আর হাহাকার নিয়ে বেঁচে আছি। আমার ঘরে এখন আর আলো নেই। কার কাছে বিচার দিবো? আমার সন্তান বিজয়টা দেখে যেতে পারেনি। মাহিন আর আমাদের বাবা-মা বলে ডাকে না। হৃদয়ের এই ক্ষত কোনোদিনও মুছবে না। আমার সন্তান দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু অভ্যুত্থানে শহীদদের স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো স্বীকৃতি পায়নি আন্দোলনে শহীদেরা। যে বৈষম্যের জন্য আন্দোলন সেই বৈষম্য রয়ে গেছে। কোনো পরিবর্তন হয়নি দেশের।

কথাগুলো বলছিলেন ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ আব্দুল্লাহ আল মাহিনের (১৬) বাবা জামিল হোসেন। শহীদ মাহিনের বাবা জামিল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমাদের সন্তানরা জীবন দিয়েছে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়, কোটা আন্দোলন, চাঁদাবাজি বন্ধে। কিন্তু বর্তমান সরকার আবার ২৪-এর কোটা বহাল রেখেছে। যদি ২৪-এর কোটা সে রাখে তাহলে কেন ’৭১-এর কোটার জন্য আমার সন্তান জীবন দিয়েছে। এটা কি ঠিক হচ্ছে? আজকে আমার সন্তান মারা গেছে এক বছর কিন্তু আমাদের সন্তানদের কোনো স্বীকৃতি দেয়নি। আমার সন্তান তো সারা বাংলাদেশের জন্য জীবন দিয়েছে। সন্তান মারা যাওয়ার কয়েকদিন পর আমরা ময়মনসিংহ চলে আসি। এখান থেকে বলে আমার সন্তানের অধিকার আদায় করতে হলে আমাকে ঢাকায় যেতে হবে, সে ঢাকায় মারা গেছে।

তিনি আরও বলেন, আমার সন্তানের মামলায় আমি নিজে বাদী। উত্তরা পশ্চিম থানায় গত বছরের ২৮শে আগস্ট মামলা করেছিলাম। তিনি বলেন, মাহিনকে নিয়ে ছিল আমাদের সব স্বপ্ন। সে সময় আমার ফ্লাইট ছিল, সন্তান যেহেতু নেই আমি আর বিদেশ যাইনি।

তিনি বলেন, ৪ঠা আগস্টের সকাল এগারোটার দিকে মাহিন ঘুম থেকে উঠে ফোনে কিছু একটা দেখে দ্রুত মাকে নাশতা দিতে বলে। এরপর নাস্তা না খেয়ে শুধু একটা ডিম সিদ্ধ দুই কামড়ে মুখে পুরে পানি দিয়ে গিলে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যায়। আধঘণ্টা পর আমি বাসায় ফিরলে ওর বাইরে যাওয়ার কথা শুনে মুঠোফোনে কল দেই। অন্য একজন ফোন ধরে জানায় মাহিন গুলি খেয়েছে। খবর শুনে উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে গিয়ে দেখি চিকিৎসক-নার্সরা মাহিনের রক্ত মুছছেন আর কাঁদছেন। সেখান থেকে একটি এম্বুলেন্সে করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে মাহিনকে নিয়ে যাই। রাত সাড়ে ৯টায় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মারা যায় মাহিন। দুইটা গুলি লেগেছিল মাহিনের বাম চোখ ও মাথার পেছনে। সে সময় আমার সন্তান একদম স্তব্ধ ছিল।

জামিল হোসেন বলেন, দিয়াবাড়ি মডেল হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করে মাহিনকে ভর্তি করা হয়েছিল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এনআইইটি)। মাহিনের স্বপ্ন ছিল কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হবে। কবরের কাছে প্রতিদিন যায়। আমরা কীভাবে এই শোক সহ্য করতে পারি। এখনো স্বাভাবিক হতে পারছি না, কোনো কিছুর বিনিময়ে এই কষ্ট দূর করা যাবে না। মাহিন ছিল আমার একমাত্র সন্তান। মাহিন মারা যাওয়ার পর আমরা দুজনেই অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আর বিদেশ যাবো কার জন্য, বাড়ির সামনে একটা মুদি দোকান দিয়েছি। তিনি বলেন, ওর জন্ম হয়েছে ঢাকার উত্তরায়, মৃত্যুও হয়েছে সেখানে। মাহিনদের স্বপ্ন দেশে বাস্তবায়ন হয়নি। যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে  আন্দোলন সেই বৈষম্য রয়ে গেছে। কোনো পরিবর্তন হয়নি দেশের। যদি কিছুটা পরিবর্তন হতো তবুও মনটাকে মানানো যেতো। আমাদের সন্তানদের জীবনের বিনিময়ে দেশের পরিবর্তন দেখতে চাই। তাদের রক্ত বৃথা যেতে দেয়া যাবে না।

mzamin

ময়নার জন্য কাঁদছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া by জাবেদ রহিম বিজন ও মাহবুব খান বাবুল

এমন নৃশংস, পৈশাচিক ঘটনা শাহবাজপুরের ইতিহাসে আর ঘটেনি। হতবাক গ্রামের মানুষ। গোটা গ্রামই স্তব্ধ। কে এই পাষণ্ড? তার মুখ দেখতেই উদগ্রীব সবাই। তবে এখনো পুলিশ চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার কূলকিনারা করতে পারেনি। পৈশাচিক নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ছোট্ট শিশু ময়নাকে। মসজিদে পাওয়া যায় তার নিথর দেহ। মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই বর্বর এ হত্যার ঘটনা নিয়ে আলোচনা সবার মধ্যে। এ ঘটনায় কাঁদছে গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

নিষ্পাপ এক শিশুকে কেন এভাবে হত্যা। কারা জড়িত এই হত্যাকাণ্ডে?  সোমবার আসরের পর শাহবাজপুর খেলার মাঠে শিশু ময়নার নামাজে জানাজা হয়। এতে যোগ দেয় হাজার হাজার মানুষ। তাদের সবাই চান হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার। শাহবাজপুরের সাবেক ইউপি সদস্য, বিশিষ্ট সালিশকারক এ কে এম বাবুল হক বলেন-এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা শাহবাজপুরের ইতিহাসে নেই। আমরা সাংঘাতিকভাবে ব্যথিত। খুনিদের খুঁজে বের করে ফাঁসির ব্যবস্থা করতে হবে। এটাই আমাদের সবার দাবি।  

ঘটনা  রোববারের। এদিন সকালে ভয়ঙ্কর খবরে ঘুম ভাঙে শাহবাজপুরের মানুষের। নয় বছর বয়সী শিশু ময়নার লাশ পাওয়া যায় বাড়ির পাশের মসজিদের দ্বিতীয় তলায়। শনিবার বিকাল থেকেই সে ছিল নিখোঁজ। ময়না শাহবাজপুরের ছন্দু মিয়া পাড়ার বাহরাইন প্রবাসী আবদুর রাজ্জাকের মেয়ে। সে লতিফ মোস্তারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এ ছাড়াও স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় নূরানী বিভাগে পড়তো। নিহতের পরিবার জানায়, শনিবার দুপুরে ময়না বাড়ি থেকে খেলাধুলা করার জন্য বের হয়। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।  

ময়নাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তার মায়ের। সেই স্বপ্ন এমন নৃশংস বর্বরতম কাণ্ডের মাধ্যমে মিইয়ে যাবে তা ভাবেননি কখনো। ঘটনার পর থেকে ময়নার মা ও পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে কাঁপছে আকাশ বাতাস। এমন নিষ্ঠুর ঘটনায় স্তব্ধ তার নিজ গ্রাম সরাইলের শাহবাজপুরসহ গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। সহমর্মিতা ও সান্ত্বনা জানাতে ময়নাদের বাড়িতে ছুটে যাচ্ছেন সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের লোকজন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সেনাবাহিনী, পুলিশ বিভাগসহ প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের লোকজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ন্যক্কারজনক এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ বিচারের দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয় ও প্রবাসীরা। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে গেছেন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনকে। গতকাল ময়নার মা লিপি আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে সরাইল থানায় হত্যা মামলা করেছেন।

সরজমিন অনুসন্ধানে পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, শাহবাজপুর গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ড ছন্দু মিয়া পাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক মিয়া। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাহরাইন প্রবাসী। ৩ মেয়ে ও ১ ছেলের মধ্যে ময়না তৃতীয়। সন্তানদের সুখ-শান্তির জন্যই পরিবার ফেলে প্রবাসে জীবনযাপন করছেন রাজ্জাক। সুশ্রী সদা হাস্যোজ্জ্বল মায়মুনা জাহান ময়নাকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল পরিবারের। পড়ালেখায় মেধাবী হওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে খুবই আদরের ছিল ময়না। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ময়না বাড়ির পাশের মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগেও পড়াশুনা করতো। শনিবার বিকালে ময়না খেলতে বেরিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত আর বাড়ি ফিরেনি।  যেখানে সন্ধ্যার পরই প্রাইভেট পড়তে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। সেখানে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাচ্ছে বাড়ি ফিরছে না। ময়নার মা সহ পরিবারের সকলেই চারদিকে খুঁজতে থাকে। আশপাশসহ দূর-দূরান্তের স্বজনদের বাড়িতেও সন্ধান মিলেনি ময়নার। অস্থিরতা বাড়তে থাকে ময়নার মা’র। গভীর রাত পর্যন্ত ময়নার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। রাত ১টার দিকে সরাইল থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন  ময়নার মা। রাতে ঠিকমতো ঘুমাননি কেউই। পরের দিন   রোববার ভোরে তাদের বাড়ি থেকে ১০ গজ দূরে হাবলীপাড়া মসজিদের মক্তবে পড়তে যায় শিশুরা। তারা মসজিদের দ্বিতীয়তলায় ময়নাকে পড়ে থাকতে দেখে ভয় পায়। বিষয়টি হুজুরকে জানায়। ইমাম সাহেব ময়নাদের বাড়িতে গিয়ে ময়নার মাকে বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে থাকা লাশের খবর দেন। সকলে মসজিদে এসে দেখেন দ্বিতীয়তলায় খাটিয়ার সঙ্গে বাঁধা ও গলায় পরনের সেলোয়ার দিয়ে ফাঁস লাগানো অবস্থায় উপুর হয়ে পড়ে আছে শিশু ময়নার নিথর দেহ। রক্তাক্ত মুখসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লালচে ও কালো দাগ। বাম পাশের গালের মাংস দেখা যায়। ময়নার মা পরিবার ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে সেখানকার পরিবেশ। শোকে কষ্টে নির্বাক ও স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা গ্রাম। সকলেই ধারণা করতে থাকেন শিশু ময়নার ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের পর গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করেছে পাষণ্ডরা। ময়নার লাশ এক নজর দেখার জন্য গ্রাম, উপজেলা ও জেলা থেকে হাজার হাজার লোক ওই বাড়িতে ভিড় করেন। তারা এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। যাতে আর কেউ কোনোদিন শিশুর স্বপ্ন নষ্ট করার সাহস না পায়।’ পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি নিয়ে যায়। সেই সঙ্গে ওই মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ থানায় নিয়ে যান। ময়নার মা লিপি আক্তারসহ পরিবারের ধারণা, শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলায় সেলোয়ার পেছিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে পাষণ্ডরা। ময়না হত্যার বিচার দাবি করে মামলাটিতে শেষ পর্যন্ত বিনা ফিতে আইনি সহায়তা দিয়ে পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন সরাইল উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নুরুজ্জামান লস্কর তপু।   

থামছে না আহাজারি: নিহত ময়নার মা পরিবার ও স্বজনদের আহাজারি থামছে না। বুক ছাপড়িয়ে সর্বক্ষণ বিলাপ করছেন ময়নার মা লিপি আক্তার। সন্তানের অগণিত স্মৃতিচারণ করে চিৎকার করছেন। পৈশাচিক নির্যাতন ও হত্যার সময় সন্তানের কষ্টের কথা বলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ছেন। হত্যা ও নির্যাতনকারীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে উনার চোখের সামনে ফাঁসি দেয়ার দাবি করছেন প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে।

সর্বমহলে বিচারের দাবি: স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সহমর্মিতা জানাতে আসছেন ময়নাদের বাড়িতে। সকলেই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ বিচারের দাবি করছেন। ফেসবুকে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ময়নার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বিচার দাবি করছেন।

কাঁদছে শিক্ষক ও সহপাঠীরা: ময়নার নির্মম মৃত্যুতে কাঁদছেন লতিফ মোস্তারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী ময়নার এমন মৃত্যু তারা কখনো কল্পনাও করেননি। প্রতিদিনের ক্লাসের সাথীর আকস্মিক বর্বর মৃত্যুতে শোকে কাতর হয়ে পড়েছে সহপাঠীরা। ময়নার কথা জিজ্ঞেস করতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে হোজাইফ মিয়া, আসিফা নুজহাত ও মো. নিশাত মিয়া। তারা বলেন, কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।

মাদকের বিস্তৃতিকেই দায়ী করছেন অনেকে: ময়না হত্যাসহ গ্রাম এলাকায় চুরি, ছিনতাই আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয় উল্লেখ করেন অনেকেই। শাহবাজপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রাজিব আহমেদ রাজ্জি বলেন, ময়নার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তার পিতা- মাতাকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষাই খুঁজে পাচ্ছি না। আমাদের চারদিকে মাদক বিস্তৃতির ভয়াবহতা এমন সব কাণ্ডের জন্য অনেকটা দায়ী। আমার সন্তান দিনে রাতে কখন কোথায় যায়? কি করে? বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্কুলে গেল কিনা? সন্ধ্যার পর বাইরে কেন? এসব বিষয়ের জবাবদিহিতা নেয়া সকল অভিভাবকের দায়িত্ব। আমরা কি সেটা করছি?

জানাজায় মানুষের ঢল: ময়নার জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। পিতার জন্য ১২ ঘণ্টা বিলম্বে ময়নার জানাজা হয়েছে। পিতা আব্দুর রাজ্জাক বাহরাইন থেকে আসছেন। এরপর জানাজা হয়েছে। গতকাল সোমবার বাদ আসর শাহবাজপুর খেলার মাঠে ময়নার জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। জানাজায় অংশগ্রহণকারী সহস্রাধিক লোকের চোখেই ছিল অশ্রু।

ময়নার পিতা আব্দুর রাজ্জাক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার কলিজার টুকরা বুকের ধন যারা কেড়ে নিয়েছে তাদের সর্বোচ্চ বিচার চাই। পুলিশসহ সকল বাহিনীর কাছে আমার অনুরোধ দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করুন। এমন জঘন্য অপরাধীরা যেন কোনো ভাবেই রেহাই না পায়। তাদের ফাঁসি হলে আমার ময়নার আত্মা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।   

ময়নার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোসা. লায়লা বেগম বলেন, ময়না অত্যন্ত মেধাবী ছিল। আগামীতে বৃত্তির জন্য তাকে প্রস্তুত করতে ছিলাম। একজন মেধাবী শিশু শিক্ষার্থী যদি এমন পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়। তবে আর মেধাবী বের হবে না। দেশ হয়ে যাবে মেধাশূন্য। পরিবার হারিয়েছে তাদের সন্তান। আর দেশ হারিয়েছেন ভবিষ্যৎ অমূল্য সম্পদ। এভাবে আর কতো ময়নাকে ইজ্জত ও প্রাণ দিতে হবে। আমরা দ্রুত ময়না হত্যার সর্বোচ্চ বিচার চাই। সরাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোরশেদুল আলম চৌধুরী বলেন, ইমাম- মুয়াজ্জিনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্তও চলছে। মামলাটির তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই বলা যাবে না। সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসাইন বলেন, বিষয়টি লোমহর্ষক, মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। পুলিশ বিভাগসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিয়ে খুবই গুরুত্বসহকারে কাজ করছেন। আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অপরাধীকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন। 
mzamin