Sunday, March 15, 2015

সঙ্কট সমাধানে তৃতীয় কোনো ফর্মুলায় যেতে হবে : ড. ইমতিয়াজ আহমেদ

আর্ন্তজাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুই পক্ষের ২৫% থেকে ৩৫% কোর সাপোর্ট রয়েছে, যা কখনো সরানো যাবে না। মাঝখানে কিছু ভাসমান ভোট থাকে তারা পরিবর্তিত হলে সরকার পরিবর্তন হয়। আর সরকার পরিবর্তীত হলে হেরে যাওয়া দলের উপর এক ধরনের সুনামি চলে আসার ভয় থাকে বলে কেউ নির্বাচন দিতে চায় না। সে জন্য বিরোধী দলের জন্য একটা জায়গা দিতে হবে, যাতে নির্বাচনে হেরে গেলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলায় যেমন সম্ভভ নয়, তেমনি ৫ জানুয়ারির ফর্মুলাও আর সম্ভব নয়। তাই তৃতীয় কোনো গ্রহণযোগ্য ফর্মুলায় যেতে হবে যা না তত্ত্বাবধায়ক সরকার না ৫ জানুয়ারির পদ্ধতি। এ জন্য এবার শুধু রাজনৈতিক চুক্তি নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা সামাজিক চুক্তিরও প্রয়োজন রয়েছে।
আজ রোববার সকালে তেজগাঁওস্থ এফডিসি মিলনায়তনে এক পাবলিক পার্লামেন্ট বিতর্ক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
ডিবেট ফর ডেমোক্রসি আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের নানা বিষয় নিয়ে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় সরকারি দল ইডেন মহিলা কলেজ বিরোধী দল হিসেবে প্রাইম ইউনিভার্সিটিকে পরাজিত করে তৃতীয় স্থান অধিকার করে।
অনুষ্ঠানে শান্তিরক্ষিতে নিয়োজিত বাংলাদেশের সশস্র বাহিনীর সদস্যদের প্রসঙ্গে ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ এক নম্বর শান্তিরক্ষী দেশ হিসেবে নিজের দেশে যদি শান্তি না থাকে তাহলে বিদেশীদের কাছে প্রশ্ন আসতে পারে তোমার নিজের দেশেই তো শান্তি নেই। কিন্তু বাইরের দেশে শান্তি রক্ষা করে বেড়াও এটা কেমন করে সম্ভব।
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, দেশের বর্তমান সমস্যা যত দ্রুত উত্তরণ করা হবে তত তাড়াতাড়ি দেশের মানুষ অস্থিতিশীল ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে মুক্তি পাবে। পারস্পরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সকল পক্ষকে এগিয়ে এসে এই সঙ্কট সমাধান জরুরি। তাই দেশের ১৬ কোটি মানুষ তাকিয়ে রয়েছে দেশের দুই প্রধান দলের নেত্রী যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং ২০ দলীয় জোট নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারস খালেদা জিয়ার দিকে। তা না হলে এ সঙ্কট মহসঙ্কটে রূপ নেবে। ফলে জনগণ রাজনীতিবিদদের উপর ভীতশ্রদ্ধ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

ছাড় দিতেও প্রস্তুত বিএনপি by হাবিবুর রহমান খান

চলমান সংকট নিরসনে ছাড় দিতে প্রস্তুত বিএনপি। নতুন নির্বাচনের দাবিতে সরকার একটি কার্যকরী সংলাপের দৃশ্যমান উদ্যোগ নিলে চলমান কর্মসূচি প্রত্যাহারের চিন্তাভাবনা রয়েছে দলটির। এমনকি পর্দার আড়ালে দুই পক্ষের সমঝোতা হলেও শিথিল বা স্থগিত করা হতে পারে কর্মসূচি। শুধু তাই নয়, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা- নির্দলীয় বা অন্য কোনো নতুন ফর্র্মুলার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা করতে প্রস্তুত বিএনপি। তবে সব রাজনৈতিক দলের সম্মতির ভিত্তিতেই হতে হবে নতুন ফর্মুলা। সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি অথবা দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়া গেলেই ছাড় দেয়ার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে দলটির হাইকমান্ড। তবে শেষ পর্যন্ত সংলাপ আয়োজনে ক্ষমতাসীনরা ইতিবাচক সাড়া না দিলে দাবি আদায়ে রাজপথেই থাকবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
সূত্র জানায়, চলমান আন্দোলনে কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে বিভিন্ন মাধ্যমে বিএনপির হাইকমান্ডকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আলোচনার পথ তৈরি করতে কোন ধরনের ছাড় দেয়া যায়, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। এরই অংশ হিসেবে আন্দোলন অব্যাহত থাকলেও সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমে আসে। সরকারের আচরণেও কিছুটা নমনীয়তা প্রমাণ মেলে। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ও গুলশান কার্যালয় তল্লাশির নির্দেশ দেয়া হলেও এখনও পর্যন্ত সেটি কার্যকর হয়নি। এমন অবস্থায় দল ও জোটের অবস্থান স্পষ্ট করতে ৫২ দিন পর শুক্রবার গণমাধ্যমে মুখোমুখি হন খালেদা জিয়া। সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার দেয়া বক্তব্যেও সংকট নিরসনে ছাড় দেয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি ক্ষমতাসীনদের হাতে। সংকট নিরসনের মাধ্যমে সরকার জাতীয় ঐক্যের পথ খুলে দিতে পারে। তাহলেই আমরা সংকটমুক্ত হয়ে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস পালন করতে পারব। সভা-সমাবেশ, কার্যালয়ের তালা খুলে দেয়াসহ স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর সব ধরনের বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়ার এমন আহ্বানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকে। তাদের মতে, আলোচনার উদ্যোগ নিলে চলমান আন্দোলন থেকে বিএনপির সরে আসা কঠিন কিছু নয়।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমরা শুরু থেকেই সংলাপের কথা বলে আসছি। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সংকটের নিরসন করতে হবে। শুক্রবার দলের চেয়ারপারসন তার বক্তব্যে তা আরও স্পষ্ট করেছেন। আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে বা দুই দলের মধ্যে একটা আস্থার জায়গা তৈরি হলে অনেক কিছুই ছাড় দেয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, বিএনপি তো ছাড় দিয়েই আছে। সবশেষ দলের চেয়ারপারসনও আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকার আলোচনায় বসলেই তো সব সমাধান হয়ে যায়। ক্ষমতাসীনদের আন্তরিকতা ছাড়া কখনোই সংকট নিরসন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন বিএনপির এ নীতিনির্ধারক। সূত্র জানায়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে যে অনড় অবস্থানে রয়েছে, সেখান থেকেও সরে আসার চিন্তাভাবনা রয়েছে বিএনপির হাইকমান্ডের। বিগত সময়ে নানা মাধ্যমে তারা এমন বার্তাও দেয়ার চেষ্টা করেছেন। বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবী প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমেদ কয়েকবারই বলেছেন, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান করে নির্বাচনকালীন জাতীয় সরকার গঠন করা যেতে পারে। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকদের সঙ্গে বৈঠকেও খালেদা জিয়া এমন আভাস দিয়েছেন। সবশেষ শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে বিরাজমান সমস্যা সমাধানে যে তিন দফা প্রস্তাব দিয়েছেন সেখানেও এ বিষয়ে ইঙ্গিত করেছে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায় সরকারের দাবির পরিবর্তে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য- এমন সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে সংলাপের আহ্বান জানান তিনি। তার এমন ঘোষণাকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, নতুন নির্বাচনের দাবিতে চলমান আন্দোলনের একটি যৌক্তিক পরিণতি চাচ্ছেন বিএনপির হাইকমান্ড। শুরুর দিকে দাবি আদায়ে হার্ডলাইনেও থাকলেও নানামুখী চাপে সেখান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিশেষ করে চলমান আন্দোলনে সহিংসতা ও সন্ত্রাসের দায়ভার বিএনপির কাঁধে চাপানোর চেষ্টা চলে। বিষয়টি তারা অস্বীকার করলেও এর দায় থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাচ্ছে না দলটি। সংকট নিরসনে দেশী-বিদেশী নানা উদ্যোগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সহিংসতা। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে সব পক্ষ সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায়। সহিংসতা কমিয়ে কিভাবে আন্দোলন করা যায় তার উপায় বের করতেও কূটনৈতিকদের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে আহ্বান জানানো হয়। সরকারও এ কৌশলকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। সহিংসতা বন্ধ না হলে কোনো আলোচনা নয় বলে প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন পক্ষের এমন আহ্বানে বিএনপির হাইকমান্ডও নতুন করে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও কর্মসূচি যাতে সহিংস না হয় সেদিকে নজর দেয়। আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের এমন বার্তাও পৌঁছে দেয়া হয়। কেন্দ্রের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিফলনও দেখা যায়। বিগত সময়ে বিশেষ করে কূটনৈতিকরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের পর সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমে আসে। সারা দেশে বিচ্ছিন্নভাবে পিকেটিং হলেও বড় ধরনের কোনো নাশকতার ঘটনা ঘটেনি।

সরকারের পোড়ামাটি নীতির কারণেই রাজনৈতিক সঙ্কট : রফিকুল ইসলাম খান

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী আমির মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, সরকারের পোড়ামাটি নীতির কারণেই রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে। চলমান দুঃশাসন থেকে মুক্তির একমাত্র পথ অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ। আজ রোববার এক বিবৃতিতে তিনি একথা বলেন। বিবিৃতিতে ২০ দলের অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি সফল করায় মহানগরবাসীকে অভিনন্দন জানান তিনি।
তিনি বলেন, বিরোধীজোটের আপোষহীন সংগ্রামে দিশেহারা সরকার ক্ষমতা আকড়ে রাখতেই নিষ্ঠুর আতঙ্কবাদী শাসন চালাচ্ছে। গুম-খুন-গণহত্যা-গণগ্রেফতারকে রাষ্ট্রীয় কর্তব্যে পরিণত করেছে। সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য, রাজনীতিক, বিশিষ্ট নাগরিক থেকে শুরু করে ছাত্র-তরুন এমনকি শিশুদেরকেও গুম-খুনের শিকার হতে হচ্ছে। এসবই এক গভীর অশনি সঙ্কেত। উন্মত্ত স্বৈরাচারের আন্ধা কানুনের কারণেই দেশ আজ মৃত্যুপূরিতে পরিণত হয়েছে। সরকারের এই পোড়ামাটি নীতির কারণেই রাজনৈতিক সঙ্কট এক ঘোর অন্ধকারের আবর্তের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। চলমান দুঃশাসন থেকে মুক্তির একমাত্র পথ অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ।
মাওলানা খান আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদল নির্মূলের জন্য শক্তির পথ বেছে নিয়েছেন। গুম খুন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্মম রসিকতা করছেন। সাবেকমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে উদ্ধারের বিষয়ে আদালতের রুলের বিষয়ে সরকার নির্বিকার। ক্ষমতা ধরে রাখতে জনগণের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। এই সংঘাত দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে, ক্ষমতাসীনদেরই বা পরিণতি কি হতে যাচ্ছে শাসকগোষ্ঠী কে তা অনুধাবন করতে হবে।
সরকারের তীব্র বাঁধা, জুলুম-নির্যাতন, গণগ্রেফতার সত্ত্বেও অবরোধ কর্মসূচির অংশ হিসাবে আজ মগবাজার, রমনা, পল্টন, মতিঝিল, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, বনানী, শাহজাহানপুর, কলাবাগান, ধানমন্ডি, ডেমরা, যাত্রাবাড়ি, গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও এলাকায় অবরোধ সমর্থনে জামায়াতের কর্মীরা মিছিল, পিকেটিং ও রাজপথ অবরোধ করে। এছাড়া অবৈধ সরকার পতনের দাবিতে ২০ দলের আহবানে চলমান অবরোধ এবং ৭২ ঘণ্টা লাগাতার হরতালের প্রথম দিনের প্রতিটি কর্মসূচিতে সর্বাত্মক অংশগ্রহণের জন্য ঢাকা মহানগরবাসীকে অভিনন্দন জানান মহানগরী আমির মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। সেই সাথে গণতন্ত্র ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিরোধ আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর করতে তিনি কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল, সাংবাদিক, শিক্ষক-ছাত্র, আইনজীবী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারক ও ব্যাংক-বীমার কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সকল পেশা ও শ্রেণীর মানুষকে মাঠে নেমে আসার পাশাপাশি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থেকে সকল মিথ্যাচার ও কারসাজিকে মোকাবিলা করে তাদের হৃত অধিকার ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে অটল থাকার আহবান জানান।
তিনি আরো বলেন, বিরোধীদলের আন্দোলন ঠেকানোর জন্য পুলিশ যখন দেখামাত্রই গুলি করছে, তখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলছেন, গুলি করে মারলে কষ্ট কম হয়। কতটা বিকৃত রুচির উম্মাদরা এখন দেশ চালাচ্ছে তা দেশবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। এই দুঃশাসন থেকে উদ্ধার পাবার একটাই পথ, ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার দাবিতে দেশবাসীকে একসাথে রাজপথে নেমে আসতে হবে। জালেম সরকারের বিরুদ্ধে জনতার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
জামায়াত নেতা আরো বলেন, পুলিশ বাহিনী এখন পতন উন্মুখ স্বৈরাচারের রক্ষায় খুনি বাহিনীর ভূমিকা পালন করছে। সিলেটে পুলিশের বাসা থেকে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অপহৃত শিশু আবু সাইদের অ্যাসিডে পোড়া বস্তাবন্দী লাশ পাওয়া যাচ্ছে। এসব কারণে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে পুলিশ-র‌্যাব নিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচেছ। সারাবিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের যে গৌরব ছিল তা ভয়ানক রকম ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দখলদার সরকারের পতনের জন্য এখনি দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে রাজপথে নামতে হবে। কার্যকর প্রতিরোধ লড়াই গড়ে তুলতে পারলে গণহত্যা, গুপ্তহত্যা ও গণতন্ত্রহত্যাকারী এই ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন সুনিশ্চিত। প্রতিটি এলাকায় ২০দলীয় জোটের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটির মাধ্যমে সর্বাত্বক হরতালের পিকেটিংয়ে নিজ নিজ এলাকাকে মুক্তঅঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। জনতার রুদ্ররোষে দখলদার বাহিনীর আস্তানা ও গণদুশমনদের গুড়িযে দিতে হবে। দেশপ্রেম ও সাহসিকতার সাথেই গণতন্ত্র পূনরুদ্ধারের সংগ্রামকে বিজয়ী করে হারিযে যাওয়া মৌলিক, সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশে চলমান গুম ও বিচারবহির্র্ভূত হত্যা বন্ধে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ত্বরিৎ ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানান তিনি। সরকার সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে বিশ্বের সকল গণতন্ত্রকামী মানবিক সংগঠনেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্ভোধন

চট্টগ্রাম নগরীর নুরনগর হাউজিন সোসাইটির মাঠে গত ১৫ মার্চ সকালে মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজের বার্ষিক ক্রীড়ার প্রতিযোগিতা বেলুন উডিয়ে উদ্ভোধন হয়েছে । উদ্ভোধন অনুষ্টানে অধক্ষ ড. সানাউল্লাহ্'র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল পরিচালনা পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট লায়ন সৈয়দ মোরশেদ হোসেন, আরো উপস্থিত ছিলেন চান্দগাঁও ক্যাপাসের উপধ্যক্ষ নুর কাশেম তালুকদার ।চিফ একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর শিহাব ইকবাল, কো-অর্ডিনেটর শিহাব উদ্দিন, ওসমান বেনজির, প্রমুখ।

ঐতিহাসিক বিভাজন দূর করতে হবে -অধ্যাপক মীজানুর রহমান

রাজনীতিতে চলমান সঙ্কট মীমাংসা করতে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন। কারণ রাজনীতিতে ঐতিহাসিক কিছু বিভাজন বিদ্যমান। সেগুলো দূর করতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি বদল করলেই সমস্যা দূর হবে- বিষয়টি এমন নয়। নির্বাচনকালীন সরকার বা মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে যারা গণভোটের কথা বলছেন তারা ভুল বলছেন। কারণ এই গণভোট নেয়ার সুযোগ বর্তমান সংবিধানে নেই। এছাড়া, প্রশ্ন হচ্ছে এই গণভোট কার অধীনে হবে? এটা কী শেখ হাসিনার অধীনে হবে? তা হলেও সারা দেশে আওয়ামী লীগের লোকজন ভোট চুরি করেছেন এমন অভিযোগ উঠবে। তাই এগুলো হলো অবাস্তব প্রস্তাব।
মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মীজানুর রহমান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আমাদের স্টাফ রিপোর্টার নুর মোহাম্মদ
অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার দিয়ে বর্তমান সন্ত্রাস দমন করা যাবে না। সাংস্কৃতিক বিপ্লব করতে হবে। সন্ত্রাসকে সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সংলাপে কোন সমাধান হবে না। তারপরও প্রধান কিছু ইস্যু নিয়ে সংলাপ করা উচিত। তবে এটি অবশ্যই গণতান্ত্রিক দলগুলোকে নিয়ে করতে হবে। কারণ গণতান্ত্রিক দলের নামে যারা অগণতান্ত্রিক কাজ করে তাদের সঙ্গে সংলাপ নয়। তারা সেই অধিকারও রাখে না। যে দল নিজেই অগণতান্ত্রিক তাকে গণতান্ত্রিক অধিকার দেয়াও ঠিক হবে না। এবং দেয়াও হয় না। বিএনপির পক্ষে এই মুহূর্তে জামায়াত ছাড়া সম্ভব না। জামায়াত না ছাড়লে বিএনপির সুস্থ রাজনীতিতে ফিরে আসা সম্ভব না। এই অবস্থায় সংলাপ হলেও এটি ফলপ্রসূ হবে না। কারণ খুব দ্রুত একটি নির্বাচন কিংবা সমস্যা দ্রুত সমাধান জামায়াতের এজেন্ডা না। তাদের এজেন্ডা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও দলকে বাঁচানো। অতএব জামায়াত আর বিএনপি একসঙ্গে সংলাপে আসতে পারবে না। জামায়াত বাদ দিয়ে বিএনপি আসলে ওয়েলকাম। তবে সব কিছুর আগে সন্ত্রাস বন্ধ করা উচিত। কারণ গণতান্ত্রিক অধিকার গণতান্ত্রিকভাবে আদায় সমর্থনযোগ্য।
তিনি বলেন, রাজনীতিতে বিভিন্ন সময় যে সঙ্কট তৈরি হয়েছিল তা রাজনৈতিকভাবেই উত্তরণ ঘটেছে। বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশে সকল রাজনৈতিক সঙ্কট রাজনৈতিকভাবে উত্তরণ ঘটেছে। আমাদের দেশে রাজনীতিতে চিরায়ত কিছু কালচার আছে। যেমন হরতাল, অবরোধ, মশাল মিছিল, মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট, অনশন ধর্মঘট, দীর্ঘদিন এগুলো রাজনীতিতে ব্যবহার হয়ে আসছে। এগুলোর মাধ্যমে রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া আদায়ও হয়েছে। কিন্তু এবার রাজনীতিতে ঘৃণ্যতম উপাদান যুক্ত হয়েছে পেট্রলবোমার ব্যবহার। এই পেট্রলবোমাকে রাজনৈতিক কালচারের অংশ করা যাবে না।

পুলিশের বাসায় মিলল অপহৃত শিশুর লাশ

সিলেটের রায়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র
আবু সাঈদের লাশ এক পুলিশ সদস্যের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে
সিলেট নগরের কুমারপাড়ায় পুলিশের এক সদস্যের বাসা থেকে গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে অপহৃত স্কুলছাত্রের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অপহরণ করে হত্যার অভিযোগে এক পুলিশ সদস্যসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
নিহত শিশুর নাম আবু সাঈদ (১০)। তাঁর বাবার নাম মতিন মিয়া। সাঈদ রায়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত।
এ ঘটনায় আটক হওয়া ব্যক্তিরা হলেন মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানার কনস্টেবল এবাদুর রহমান, র‌্যাবের কথিত ‘সোর্স’ গেদা মিয়া ও ওলামা লীগের মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রকিব।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. রহমত উল্লাহ বলেন, গত মঙ্গলবার থেকে সাঈদকে পাওয়া যাচ্ছিল না। এরপর ওই দিন রাতেই সাঈদের পরিবারের কাছে মুক্তিপণ হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে অপহরণকারীরা। এরপর পরিবার সাঈদের অপহরণের ব্যাপারটি পুলিশকে জানায়। তখন সাঈদকে উদ্ধার করতে তার পরিবারের পূর্বপরিচিত পুলিশ কনস্টেবল এবাদুর ও র‌্যাবের কথিত ‘সোর্স’ গেদা মিয়া মুক্তিপণ দিতে উদ্বুদ্ধ করেন। এবাদুর ও গেদা মিয়া ওই পরিবারের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নেন।
রহমত উল্লাহর ভাষ্য, এবাদুরের তৎপরতায় সন্দেহের সৃষ্টি হওয়ায় এবাদুর ও গেদা মিয়ার মোবাইল ফোনে কলট্র্যাপ করে পুলিশ। তখন হত্যার সঙ্গে তাঁদের জড়িত থাকার ব্যাপারটি জানা যায়। এবাদুরের বাসা থেকে উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রতিবেশীরা পুলিশকে জানায়। এরপর রাতে ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে বস্তাবন্দী অবস্থায় সাঈদের লাশ উদ্ধার করা হয়। ছয়টি চটের বস্তায় লাশটি জড়িয়ে রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া লাশটির শরীরে অ্যাসিড জাতীয় পদার্থ ছিটানো ছিল। তিন-চার দিন আগে সাঈদকে হত্যা করা হতে পারে বলে সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সাঈদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে সাঈদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

মসজিদ ধর্মস্থান নয়, চাইলেই গুঁড়িয়ে ফেলা যায় -বিজেপি নেতার মন্তব্য

মসজিদ কোনও ধর্মস্থানই নয়! তাই ইচ্ছা হলেই নাকি তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়াই যায়! গুয়াহাটিতে এমন মন্তব্য করলেন বিজেপি নেতা সুব্রহ্মনম স্বামী। সুব্রহ্মনম স্বামীর এই মন্তব্যের জেরে স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের ঝড় উঠেছে। অসমে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে ফৌজদারি মামালাও।
অবশ্য দমতে রাজি নন সুব্রহ্মনম স্বামী। তাঁর দাবি নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে তাঁর কাছে নাকি প্রমাণও আছে। শুক্রবার রাতে গুয়াহাটিতে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে এই বিজেপি নেতা বলেন ''মসজিদ মোটেও কোনও ধর্মস্থান নয়। এটা সাধারণ একটা বিল্ডিং মাত্র। যে কোনও সময় চাইলেই মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। আমার সঙ্গে কেউ সহমত না হলে আমি বিতর্কে যেতে রাজি। সৌদি আরবের মানুষদের কাছ থেকে এই তথ্য আমি পেয়েছি।''
এর সঙ্গেই আরএসএস-এর সঙ্গে সুর মিলয়ে স্বামীর দাবি সব ভারতীয় মুসলিমরাই আদতে হিন্দু। শনিবার, গুয়াহাটিতে ভিন্ন একটি অনুষ্ঠানে এই কথার পুনরাবৃত্তি করেন তিনি।
স্বামীর এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে আজ গোটা অসম জুড়েই একাধিক সংগঠন বিক্ষোভ দেখিয়েছে। প্রকাশ রাস্তায় পোড়ানো হয় সুব্রহ্মনম স্বামীর কুশপুত্তলিকা। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০ (বি) ও ১৫৩ (এ) ধারায় সুব্রহ্মনম স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতি। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
কেএমএসএস-এর প্রেসিডেন্ট অখিল গগৌর অভিযোগ ''বিধানসভা নির্বাচনের মুখে বিজেপি এ রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাইছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে স্বামীর এই বিতর্ক সেই ষড়যন্ত্রের অংশমাত্র। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অসম সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি এ রাজ্যে সুব্রহ্মনম স্বামীর প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হক।''
অসমের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৌও স্বামী ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে সুর চড়িছেন। তিনি বলেছেন ''অসমের অনুভূতির উপর এই ধরণের আঘাত হানার ভারী মূল্য চোকাতে হবে বিজেপিকে।''
অন্যদিকে, এই অবস্থায় অসমের রাজ্য বিজেপি সুব্রহ্মনম স্বামীর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলের তরফ থেকে জানানো হয়েছে ''এই মন্তব্য স্বামীর ব্যক্তিগত, এর সঙ্গে আমাদের দলের কোনও সম্পর্ক নেই। তবে এই বিষয়ে আমরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে চিঠি লিখব।'' - সূত্র : জিনিউজ।

এই স্বপ্নটা সত্যি হয় না কেন? by আসিফ নজরুল

দেশের রাজনীতিতেও যদি এই আনন্দ ধরে রাখা যেত
রফিক সাহেব প্রচণ্ড রেগে আছেন। কিন্তু রাগটা কার ওপর বুঝতে পারছেন না। তাঁর জীবনের বারোটা বেজে গেছে এত দিনে। সরকার বলছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক, কিন্তু তাঁর অনেক কিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। ছোটখাটো একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় চাকরি করেন তিনি। সেই পত্রিকা চলে বিজ্ঞাপনের টাকায়। কিন্তু ব্যবসার অবস্থা খারাপ বলে এখন কেউ বিজ্ঞাপন দিতে চাইছেন না। রফিক সাহেবদের বেতন বন্ধ হয়ে আছে কয়েক মাস ধরে। চিন্তায় তাঁর ঘুম আসে না ঠিকমতো। আজকে ছুটির দিনে অনেকক্ষণ ঘুমানোর ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু বাচ্চাকাচ্চার চিৎকার-চেঁচামেচিতে তা-ও হয়নি। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। এখন সাতসকালে উঠে তারা সারা বাড়ি ছুটোছুটি করছে। তিনি কষে ধমক দিয়ে সব কটাকে বের করে দিলেন। পত্রিকা নিয়ে বারান্দায় এসে বসলেন।
বারান্দায় প্রথম সূর্যের নরম আলো, বাতাসে শেষ শীতের রেশ। রফিক সাহেবের চোখ বুজে এল। কিন্তু পত্রিকার পাতায় চোখ পড়তেই তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। এটা কি আজকের পত্রিকা? এত কিছু কবে ঘটল দেশে? তিনি বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকলেন প্রধান শিরোনামের দিকে। ‘বিএনপির জনসভায় মানুষের ঢল’। আবরোধ-কর্মসূচি প্রত্যাহার করার পর বিএনপিকে এই জনসভার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সারা দেশ থেকে লোক আসতে দেওয়া হয়েছে, সরকার কোথাও বাধা দেয়নি। লোকে লোকারণ্য জনসভায় বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছেন যে মধ্যবর্তী নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনে করতে রাজি আছেন তিনি। তবে এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে এবং নির্বাচন জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হতে হবে।
রফিক সাহেব কিছুই বুঝতে পারছেন না। তাঁর বিস্ময় বাড়তে লাগল দিনকে দিন। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, আওয়ামী লীগ দেশের স্বার্থে এই প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। বিএনপিকে অবরোধ ও সহিংসতা বন্ধের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে। এমনকি পেট্রলবোমা ও ক্রসফায়ার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাবও মেনে নিয়েছে।
রফিক সাহেবের মনে হলো, এগুলো আওয়ামী লীগ-বিএনপির নতুন চালাকি। তিনি তো আর কম দেখেননি এ দুই দলের কার্যকলাপ। এরা ক্ষমতায় এলেই হিসাব শুরু করে কীভাবে ছলচাতুরি করে আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা যায়। কীভাবে বিরোধী দলকে মেরে-কেটে শেষ করা যায়। কীভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ লুটে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া যায়। কীভাবে নিজেদের সম্পদ আর পরিবারকে বিদেশে নিরাপদে রেখে দেশের মানুষকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যায়। রফিক সাহেব তিক্ত হয়ে ওঠেন এসব ভাবতে ভাবতে। এক দল করবে ভারতের দালালি, আরেক দল আমেরিকা, না হয় পাকিস্তানের। এক দল চেতনার জিকির তুলবে, আরেক দল ধর্মের। এদের আসল জিকির তো নিজেদের নিয়ে! এরা করবে সমঝোতা!
কিন্তু রফিক সাহেবের ভুল ভাংতেই থাকে। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, দুই দল মিলে আসলেই একটি সমঝোতা করতে পেরেছে। আওয়ামী লীগের পক্ষে তোফায়েল আহমেদ আর বিএনপির পক্ষে মওদুদ আহমদ মিলে সমঝোতার রূপরেখা তৈরি করতে পেরেছেন। দুই জোটের তিনজন করে মিলে একটি বাছাই কমিটি হবে। তাঁরা অন্যদের সঙ্গে আলাপ করে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। কমিশন নির্বাচনকালে নির্বাচনসংক্রান্ত সব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। আগে ডেপুটি সেক্রেটারির ওপরে কারও বদলির জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি লাগত। এখন যেকোনো পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নির্বাচন চলাকালে কমিশন বদলি করতে পারবে, অনিয়মের জন্য দ্রুত সময়ে তাদের বিচার করতে পারবে, আইন ভঙ্গ করলে যে কারও প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে। দুই দল মিলে নির্বাচনকালে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানও মেনে নিয়েছে।
এর মধ্যে কিছু ঝামেলাও তৈরি হলো। বাম দলগুলো আর সুশীল সমাজ মিলে শুধু নির্বাচন নয়, সুশাসনের লক্ষ্যে ব্যাপকভিত্তিক সমঝোতার দাবি তুলল। এসব নিয়ে এখন আলোচনা শুরু হলে কয়েক বছর লেগে যাবে বলে কেউ কেউ সাবধান করল। কেউ কেউ সিপিডি বা সুজনের সুশাসনের দলিলের কথা তুলল। অন্যরা সিপিডি বা সুজন কে—এসব প্রশ্ন তুলল। অবশেষে সবাই পুরোনো একটি জিনিস নতুন করে আবিষ্কার করল। সুশাসনের রূপরেখা আসলে অনেক আগেই তৈরি হয়ে আছে। সেটি তৈরি করেছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো মিলেই।
আজ থেকে ২৫ বছর আগে তিন জোটের এই রূপরেখা প্রণয়ন করেছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুটি জোট ও বাম দলগুলোর একটি জোট মিলে। কাজেই এটি পরিপূর্ণভাবে একটি রাজনৈতিক দলিল। এটি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে জনগণের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধও রয়েছে। রফিক সাহেব বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলেন, তিন জোটের রূপরেখায় শুধু নির্বাচন নয়, বরং নির্বাচন-পরবর্তী দেশ গঠনের লক্ষ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যও রয়েছে। যেমন সরকারি রেডিও-টিভির স্বায়ত্তশাসন, জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ, সব কালো আইন বাতিলকরণ এবং সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধকরণ। রফিক সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন, তিন জোট এমনকি একটি অভিন্ন আচরণবিধিতে ‘ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা এবং অপর দলের দেশপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে কটাক্ষপাত থেকে বিরত থাকার’ অঙ্গীকারও করেছিল।
এই দলিল এত দিন কোথায় ছিল? কেন সবাই ভুলে গেল এর কথা? বিএনপি, আওয়ামী লীগ না হয় ভুলেছিল, অন্যরা কেন? দেশের নাগরিক সমাজ কেন? রফিক সাহেব অবাক হয়ে এসব ভাবতে থাকেন। এর মধ্যে আবার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্য অনেক বিষয়ের ঐকমত্য নিয়ে কথা উঠল। দুই দলের নেতারাই বলেছিলেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা, স্থানীয় শাসন শক্তিশালী করার কথা, দুর্নীতি দমন কমিশন আর মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন করার কথা। মজার বিষয় হচ্ছে, দুই দলই এসব বলেছিল বিরোধী দলে থাকার সময়। তবু বলেছিল তো! কবে কোথায় তারা এসব বলেছে, তা–ই নিয়ে লেখালেখি শুরু হলো। সবাইকে অবাক করে দিয়ে আওয়ামী লীগ এসব লক্ষ্যে সব দলের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রস্তাব দিল, এমনকি দলের গবেষণা সেল এ লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের লিখিত দলিল তৈরি করল। বিএনপি আবার পার্লামেন্টারি কমিটিগুলো শক্তিশালী করার জন্য কিছু লিখিত প্রস্তাব জাতির কাছে পেশ করল। বিএনপি এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত রাখার জোরালো অঙ্গীকারও জাতির কাছে প্রকাশ করল।
দেশের মানুষ হতবাক হয়ে এসব লক্ষ করতে লাগল। প্রায় প্রতিদিন আনন্দ মিছিল বের হচ্ছে। অনেক জায়গায় এই মিছিলে সব দলের লোক একাকার হয়ে গেল। এর মধ্যে আগ বাড়িয়ে কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের ভেতরে গণতন্ত্রায়ণের কথা তুলল; প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্ট করা, তাঁর ক্ষমতা কমিয়ে ভারতের আদলে পার্লামেন্ট, রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিসভার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার দাবি তুলল। এরশাদের দল যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের জোরালো প্রস্তাব পেশ করল, বাম দলগুলো কৃষক-শ্রমিকের অধিকার রক্ষার্থে কিছু আইনগত সংস্কারের কথা তুলল। সবগুলোই খুব ন্যায়সংগত প্রস্তাব। কিন্তু কেন যেন এগুলোতে আর দুই দলের সমর্থন পাওয়া গেল না।
যেসব ক্ষেত্রে সমর্থন পাওয়া গেল, তা-ও বা কম কী? রফিক সাহেবের খুব ইচ্ছা হলো, কেউ একজন বলুক যে দুই নেত্রীকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হোক এবার। যদি কেউ না-ও বলে, তবু তো তাঁরা নোবেল পাওয়ার মতো একটি কাজ করলেন! যদি তাঁরা নোবেল না-ও পান, দেশের ১৬ কোটি মানুষের ভালোবাসা আর দোয়া তো পাচ্ছেন। এক জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্য আর কী হতে পারে!
রফিক সাহেবের চোখ ভিজে গেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, বাংলাদেশ যেদিন ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তান-ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল, নিশাত নামের ছোটখাটো মেয়েটি যেদিন এভারেস্ট জয় করেছিলেন, সেদিনও তিনি এত আনন্দ পাননি।
রফিক সাহেবের ভেজা চোখে একসময় তেজি সূর্যের আলো ঝলসে ওঠে। তিনি আড়মোড়া ভেঙে বসেন। এতক্ষণ কি তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন? নাকি মনে মনে এসব চিন্তা করছিলেন? স্বপ্নও যদি হয়, তাঁর নিজের চিন্তাও যদি হয়, বাংলাদেশের প্রায় সব মানুষ কি একই স্বপ্ন দেখে না?
এত সুন্দর একটি স্বপ্ন সত্যি হয় না কেন?
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের ১৩ বছর কারাদণ্ড

মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। শুক্রবার এ সাজা ঘোষণা করেন রাজধানী মালের একটি আদালত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনের কার্যালয় থেকে সাবেক প্রেসিডেন্টের ১৩ বছর সাজা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। রায় ঘোষণার পরপরই রাজধানী মালের ধুনিধু কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় সাবেক এ প্রেসিডেন্টকে। নাশিদের বিচার ও তার সঙ্গে মালদ্বীপ সরকারের আচরণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। খবর এএফপি, আল জাজিরা।
এদিকে নাশিদ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নাশিদের সমর্থকরা বলছেন, ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নাশিদ যাতে নামতে না পারেন, সে জন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই এ অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এ মামলায় কোনো রাজনৈতিক প্ররোচনা নেই বলে দাবি করেন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন। নাশিদের কার্যালয় থেকে দেয়া বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এ বিচার ‘অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবেই রাজনৈতিক’। নাশিদকে তার অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করা এবং আপিলের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট নাশিদ ক্ষমতায় থাকাকালে ২০১২ সালে প্রধান বিচারপতিকে গ্রেফতারের আদেশ দিয়েছিলেন। সেই আদেশ যথাযথ ছিল না বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর মাত্র তিন বছর ক্ষমতায় ছিলেন নাশিদ। বিতর্কিত পরিস্থিতির জন্য তিন বছরের মাথায় তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। এরপর একটি বিতর্কিত নির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন তিনি।
বিচারপতিকে দেয়া গ্রেফতারের আদেশ নিয়ে ‘ক্ষমতার অপব্যবহারের’ অভিযোগে ফেব্রুয়ারিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। মামলার রায়ে বিচারক আবদুল্লাহ দিদি বলেন, নাশিদ প্রধান বিচারপতিকে গ্রেফতারের আদেশ দিয়েছিলেন, এরপর তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে গিরিফুশি দ্বীপে আটকে রেখেছিলেন। বিচারিক সাক্ষ্যপ্রমাণে সন্দেহাতীতভাবে বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। তিনজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের রায়ে কোনো দ্বিমত ছিল না।
এর আগে নাশিদকে গ্রেফতারের ঘোষণা শুনে হাজার হাজার মানুষ মালের রাস্তায় বের হয়ে বিক্ষোভ করে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা।
ক্ষমতায় কম সময় থাকলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে নাশিদের জয় ইয়ামিনের সৎ ভাই মামুন আবদুল গাইয়ুমের ৩০ বছরের একনায়কত্বের অবসান ঘটিয়েছিল।

বিদেশী বিনিয়োগ তলানিতে- এক মাসে নিবন্ধন কমেছে ৯০ ভাগ by আশরাফুল ইসলাম

চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটে স্থানীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগও তলানিতে ঠেকে গেছে। বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধনের হার কমেছে ৯০ ভাগ। এ হিসাব গত জানুয়ারি মাসের। ফেব্রুয়ারি মাসের হিসাব এখনো আসেনি। তবে বিনিয়োগ বোর্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসের অবস্থা আরো খারাপ। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সঙ্কট দ্রুত না কাটলে কাক্সিত বিনিয়োগ অর্জন করা সম্ভব হবে না। এতে অর্থনীতি পিছিয়ে পড়বে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
বিনিয়োগ বোর্ডের শতভাগ বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগে নিবন্ধিত শিল্পসংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে সাড়ে ৪২ কোটি ডলারের বিনিয়োগ এসেছিল। কিন্তু এক মাসের ব্যবধানে জানুয়ারিতে এসে তা নেমে গেছে চার কোটি ডলারে। শুধু বিনিয়োগই কমেনি, নিবন্ধিত শিল্পের সংখ্যাও কমে গেছে। গত জানুয়ারিতে বিদেশী শিল্প নিবন্ধিত হয়েছে ৯টি, যেখানে আগের মাসে ছিল ১৫টি। বিনিয়োগ ও নিবন্ধিত শিল্পের পাশাপাশি প্রস্তাবিত কর্মসংস্থানও কমে গেছে। গত ডিসেম্বরে বিদেশী শিল্পের মাধ্যমে নিবন্ধিত কর্মসংস্থান ছিল এক হাজার ৪২২ জনের। কিন্তু জানুয়ারিতে তা নেমেছে ৮৮৯ জনে। বিদেশী শিল্পের মাধ্যমে প্রস্তাবিত কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পে কর্মসংস্থানও কমে গেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জানুয়ারিতে স্থানীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে নিবন্ধিত কর্মসংস্থান হয়েছে ১৪ হাজার ৪৬৮ জনের, ডিসেম্বরে ছিল ১৭ হাজার ৩৫১ জনের। সামগ্রিকভাবে জানুয়ারিতে ডিসেম্বরের চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মসংস্থান কমেছে।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, চলমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই বিনিয়োগে আসছেন না, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কথা তো ভাবাই যাবে না। তাদের মতে, এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো এখন মহাবিপাকে পড়েছে। তারা রেমিট্যান্স আনছেন, তার বিনিময়ে টাকা দেয়া হচ্ছে; কিন্তু বিনিয়োগ না থাকায়, তা তারা কাজে লাগাতে পারছেন না। আবার এ বৈদেশিক মুদ্রা তারা ধরেও রাখতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী দিন শেষে তারা মোট মূলধনের ১৫ ভাগের সমপরিমাণের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা হাতে রাখতে পারবে না। বেশি থাকলে হয় তাকে মুদ্রাবাজারের মাধ্যমে বিক্রি করতে হবে, অন্যথায় তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হবে। তা-না হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরিমানা গুনতে হয়। কিন্তু বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা না থাকায় তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আসছে; কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে স্থানীয় মুদ্রা না দিয়ে ছয় মাস মেয়াদি সরকারি বিল ধরিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ ব্যাংক নগদে ডলার কিনে ছয় মাসের বাকিতে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করছে। এতে তাদের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে চলছে। দ্বিতীয়ত, তারা যে আমানত নিচ্ছেন, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না। ফলে বেড়ে যাচ্ছে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তহবিল। এ পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে সরকারের ঋণের জোগান দিচ্ছে। এখান থেকে কিছু কাগুজে মুনাফা পাচ্ছে, যা দিয়ে তাদের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের একটি অংশ উঠে আসছে। ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে ব্যাংকে বেসরকারি বিনিয়োগ শূন্য হয়ে যাবে, যা দেশের জন্য মোটেও কল্যাণকর হবে না।
সার্বিক বিনিয়োগবিষয়ে অর্থনীতিবিদেরা জানিয়েছেন, গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে বিরোধী দল টানা আন্দোলন করে আসছে। সরকারও এ বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশীরা কেন, দেশীয়ও কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করবেন নাÑ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটা অর্থনীতিকে যে তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে, তা প্রায় অবধারিত হয়ে গেছে। সঙ্কট দ্রুত কাটানোই একমাত্র সমাধান বলে তারা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, এই অবস্থা নিঃসন্দেহে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে হয়েছে। তিনি জানান, এমনিতেই দেশের রেগুলেটরি বডিগুলোর (নিয়ন্ত্রক সংস্থা) অদক্ষতা ও তাদের নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে না দেয়ার কারণে অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ ও বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এমনিতেই আস্থার সঙ্কটে ছিলেন, এর ওপর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আরো খারাপ অবস্থানে এসেছে। আর এটা অব্যাহত থাকলে দেশে কাক্সিত হারে কর্মসংস্থান হবে না, বেড়ে যাবে বেকারত্বের হার। এ থেকে উত্তরণের জন্য এখনই সবাইকে সচেতন হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবিলম্বে ক্লাস–পরীক্ষা চালুর দাবি

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার দাবিতে গতকাল ক্যাম্পাসের
ডায়না চত্বরের সামনে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা l প্রথম আলো
অবিলম্বে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর দাবিতে কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল শনিবার মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা। এতে পুলিশ বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দ্রুত ক্যাম্পাস খুলে দেওয়া না হলে অনশনের হুমকি দিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৩০ নভেম্বর বাসের চাপায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয় টানা ৩৭ দিন বন্ধ থাকে। পরে এ বছরের ৮ জানুয়ারি ক্যাম্পাস খোলা হয়। তবে অবরোধের সমর্থনে ৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের মিছিলকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও শিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসগুলো খোলা থাকলেও বন্ধ রয়েছে আবাসিক হলসহ সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম।
টানা সাড়ে তিন মাস ধরে বন্ধ থাকায় ভয়াবহ সেশনজটের কবলে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দ্রুত ক্যাম্পাস খোলার দাবিতে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসির সামনে জড়ো হন। বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে মানববন্ধন করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় থানার পুলিশ এতে বাধা দেয়। পরে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়না চত্বর ও প্রধান ফটকের মাঝামাঝি এসে মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। ১৭ মার্চের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ১৮ মার্চ অনশন করার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
তনা রায় নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এমনিতেই সেশনজটে আছি। সেটিও আবার দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দ্রুত ক্লাস-পরীক্ষা চালু না হলে আমাদের আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো পথ নাই।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ত ম লোকমান হাকিমের নির্দেশে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে পুলিশ বাধা দিয়েছে বলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন। এ জন্য মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা প্রক্টরের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে ত ম লোকমান হাকিম বলেন, ‘তাঁদের (শিক্ষার্থীদের) কার্যক্রমে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। আর ক্যাম্পাসে প্রশাসনের কোনো কর্তাব্যক্তি না থাকায় আমি তাঁদের আগামী বুধবার ভিসি, প্রো-ভিসির সঙ্গে দেখা করতে বলেছি।’
বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রক্টর স্যারের সঙ্গে কথা বলে তারপর মানববন্ধন করতে বলেছি।’
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে সব পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, হরতাল-অবরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা চলবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ১০টি ও ভাড়া করা ৩৫টি গাড়ি আছে। গাড়িগুলো যখন ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া অভিমুখে যায়, তখন প্রশাসনের কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন থাকেন। তাই তাঁরা ক্যাম্পাস খোলার তারিখ ঘোষণা দিতে পারছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও দুজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের কেউই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হাকিম সরকার বলেন, ‘ক্যাম্পাস খোলার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগির ক্যাম্পাস খুলে দেওয়া হবে।’

ব্রাজিলে পর্যটকবাহী বাস খাদে : নিহত ৪২

ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলে শনিবার একটি বাস খাদের পড়ে অন্তত ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে।  স্থানীয় সরকারের এক মুখপাত্র এএফপিকে জানিয়েছেন, সান্টা ক্যাটারিনা রাজ্যে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই সরকারি মুখপাত্র।
তিনি আরো জানান, পর্যটকবাহী বাসটিতে ৫০ আরোহী ছিলো। এটি রাতের বেলা ৪০০ মিটার (১৩০০ ফুট) নিচে একটি গিরিখাদে পড়ে যায়। এতে উদ্ধার তৎপরতা কঠিন হয়ে পড়ে। উঁচু-নিচু মহাসড়কে চালক নিয়ন্ত্রণ হারায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত করা হচ্ছে।
কর্নেল নেলসন কোয়েলহো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই দুর্ঘটনায় পাহাড়ে বাসের ধ্বংসস্তূপের ভেতর মানুষ আটকা পড়েছে। এদের কাউকে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই কম।’
প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৪৩ হাজার ব্রাজিলীয় নাগরিক প্রাণ হারায়।

মা হলেন বান্ধবী পুতিন উধাও!

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনের হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়া নিয়ে মস্কোজুড়ে নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে খবর পাওয়া গেছে পুতিনের দীর্ঘদিনের বান্ধবী অ্যালিনা কাভায়িভা (৩১) সুইজারল্যান্ডে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। আর পুতিন নাকি সেখানেই গেছেন। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের একটি ট্যাবলয়েড দেশটির একজন স্থানীয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। ট্যাবলয়েডটির দাবি, সম্প্রতি বান্ধবী কাভায়িভাকে নিয়ে সুইজারল্যান্ড আসেন পুতিন। বলতে গেলে সবার অগোচরেই লুনাগোর কাছাকাছি সেন্ট অ্যানা নামে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে বান্ধবীকে ভর্তি করান। সেন্ট অ্যানা ক্লিনিক স্ত্রীরোগ চিকিৎসার জন্য ধনী রাশিয়ানদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তবে পুতিনের হঠাৎ অন্তর্ধান নিয়ে মস্কোজুড়ে চলছে নানা কানাঘুষা। গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে পুতিনকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
এমনকি অংশ নেননি কোনো রাষ্ট্রীয় বৈঠকেও। প্রসঙ্গত, কাভায়িভা পুতিনের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত। তার কারণেই প্রথম স্ত্রী লুধিয়ানার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছিল। জানা গেছে, পুতিনের অনুপস্থিতির কারণেই স্থগিত করা হয়েছে তার কাজাখস্তান সফর। এছাড়া পিছিয়ে দেয়া হয়েছে দক্ষিণ ওসেটিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার একটি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানও। এমনকি পুতিনকে দেখা যায়নি দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি’র বার্ষিক বৈঠকেও। পুতিনকে সর্বশেষ দেখা গেছে, ৫ মার্চ। সেদিন তিনি ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজির সঙ্গে বৈঠক করেন। মস্কোজুড়ে গুঞ্জন রয়েছে, ৬২ বছর বয়সী পুতিন ‘স্ট্রেন ফ্লু’ সংক্রমণের শিকার হয়েছেন। কারণ মস্কোজুড়ে বর্তমানে এখন স্ট্রেন ফ্লুর প্রকোপ দেখা দিয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এ তথ্য এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ পুতিনের অসুস্থ হওয়ার খবর অবশ্য উড়িয়ে দিয়েছেন। পুতিন সুস্থ আছেন বলেই জানিয়েছেন তিনি। টেলিগ্রাফ, এনডিটিভি।

সেই অর্ধনগ্ন ফকিরই আজ চার্চিলের পাশে

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি শনিবার লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ারে স্থাপন করা হবে। ব্রিটেনের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা উইনস্টন চার্চিলের পাশেই শোভা পাবে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি। বিগ বেন ও হাউস অব কমন্সের উল্টো পাশে লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ার অবস্থিত। বার্তা সংস্থা এএফপির এক খবরে বলা হয়েছে, এক সময় মহাত্মা গান্ধীকে ‘অর্ধনগ্ন ফকির’ বলে অভিহিতকারী চার্চিলসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে স্থাপন করা হচ্ছে মহাত্মা গান্ধীর এ মূর্তি।
শনিবার ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীর ব্রোঞ্জের এ মূর্তি উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, বলিউড সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন ও গান্ধীর নাতি শ্রী গোপালকৃষ্ণ গান্ধী উপস্থিত ছিলেন। ব্রিটেনের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতার জন্য অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীর ওপর এক সময় ঐতিহাসিকভাবে ওয়েস্টমিনিস্টারের অনেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। অবশেষে ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করে। অনুষ্ঠানের আগে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ক্যামেরন বলেন, ‘এই মূর্তি বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং এই বিখ্যাত স্কয়ারে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে আমাদের এই দেশে তাকে চিরকালীন স্থান দিচ্ছি।’

মিসরে নতুন রাজধানীর পরিকল্পনা

মিসরে কায়রোর বদলে নতুন একটি রাজধানী তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সেদেশের সরকার। কায়রোর পূর্ব দিকে ওই রাজধানীতে পার্লামেন্ট, মন্ত্রীদের কার্যালয় আর দূতাবাসগুলো থাকবে। ৭০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট শহরটিতে প্রায় পঞ্চাশ লাখ মানুষ বসবাস করতে পারবে। আগামী ৪০ বছরের মধ্যে কায়রোর ওপর জনসংখ্যার চাপ, যানজট ও পরিবেশ দূষণ কমানোর লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ কাজ শেষ করতে ৫-৭ বছর সময় লেগে যেতে পারে।মিসরের অর্থনীতিবিষয়ক একটি সংবাদ সম্মেলনে নতুন রাজধানী তৈরির এ ঘোষণাটি দেয়া হয়। কায়রো আর লোহিতসাগরের মাঝামাঝি কোনো স্থানে নতুন শহরটি গড়া হবে। তবে এখনও শহরটির কোনো নাম ঠিক করা হয়নি।নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এর মধ্যেই ১২শ’ কোটি ডলার সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে সরকার বলছে।
কুয়েত, সৌদি আরব আর সংযুক্ত আরব আমিরাত এ অর্থ দেবে।মিসর থেকে সংবাদদাতারা বলছেন, কায়রোর ভিড় আর পরিবেশের ওপর চাপ কমাতেই নতুন এ রাজধানী তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শহরটির পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত আলাব্বর নামের একজন কর্মকর্তা বলছেন, নতুন শহরটি হবে অনেক বেশি জনবান্ধব।পুরনো কায়রোর ঐতিহ্য ও নকশার ওপর ভিত্তি করেই নতুন শহরটি তৈরি করা হবে এবং সেখানে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাই থাকবে।এই শহরটি তৈরি হলে তা মিসরের অর্থনীতির জন্য সুবাতাস আনবে বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।কারণ, এ প্রকল্প ১০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। হিথরোর চেয়ে বড় একটি বিমানবন্দরও সেখানে থাকবে। আবাসন ব্যবসায়ীরা জানান, শহরটিতে ২ হাজার স্কুল ও ৬০০ হাসপাতাল থাকবে।সংবাদদাতারা বলছেন, অতীতেও মিসরে এ রকম বড় প্রকল্প নেয়া হলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেগুলো শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখতে পায়নি। তবে বর্তমান সরকার এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নেবে। কারণ অর্থনীতির গতি ফেরাতে না পারলে মিসরের সংকট আরও বাড়বে।অনেকেই বলছেন, আরব গণজাগরণ শুরু হওয়ার পর থেকেই মিসরে বিদেশী বিনিয়োগ কমে গেছে। সেই বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতেই সরকার নতুন এ শহর স্থাপনসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিবিসি।

তামিলদের সমমর্যাদা চান মোদি

শ্রীলংকার তামিলদের সমমর্যাদা, শান্তি ও সমৃদ্ধ জীবন প্রত্যাশা করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শনিবার তামিলদের প্রাণ কেন্দ্র জাফনা সফরে পাবলিক লাইব্রেরিতে তামিলদের উদ্দেশে এক ভাষণ দেন তিনি। এ সময় জাফনা সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও সংঘর্ষ বিধ্বস্ত এ অঞ্চলের ৫০ হাজার পরিবারকে বাড়ির দলিল তুলে দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি প্রথমবারের মতো জাফনা সফর করেন।
সঙ্গে ছিলেন শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। এই সফরে জাফনার তামিলদের জন্য সমমর্যাদা, উন্নয়ন ও সব নাগরিকের সমৃদ্ধ জীবন গঠনের আহ্বান জানান তিনি। এলটিটিই ও সেনাবাহিনীর দীর্ঘকালের সংঘাত সংঘর্ষের পর একটি নতুন জীবনধারা গড়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন মোদি। এর আগে শুক্রবার সংখ্যালঘু তামিলদের আরও স্বায়ত্তশাসন দিতে শ্রীলংকার নতুন নেতৃত্বকে আহ্বান জানান মোদি। বিশ্বনেতাদের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে তামিল অঞ্চল জাফনায় গেলেন নরেন্দ্র মোদি। এর আগে ২০১৩ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সেখানে সফরে যান। শনিবার জাফনায় একটি বৃহৎ সংস্কৃতি কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন নরেন্দ্র মোদি। ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ সময় মোদি বলেন, জাফনা আজ একটি মাইলফলক স্পর্শ করল। সারা বিশ্বের প্রতি শান্তির বার্তা ছড়াবে জাফনা। আন্তর্জাতিকমানের এ সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়ে ভারত নিজেকে গর্বিত মনে করছে। জাফনা পাবলিক লাইব্রেরিতে গণবক্তৃতায় মোদি বলেন, যখন একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে অগণিত বই পাওয়া যায়। এই বইগুলো প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধ করে। এদিকে কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ হাজার তামিল পরিবারের বাড়ির কাগজ হস্তান্তর করেন মোদি। শ্রীলংকার জাতীয় সংহতি প্রচেষ্টায় সহযোগিতার অংশ হিসেবে ভারতের অনুদানে এসব ঘরবাড়ি নির্মিত হয়েছে। গৃহযুদ্ধকালে যারা ক্ষতির শিকার হয়েছিলেন তারাই এ বাড়ির মালিক হয়েছেন।
এছাড়া সিরিসেনাকে সঙ্গে নিয়ে তালাইমানার ১৬৫০ পিয়ার রেলওয়ে স্টেশনের উদ্বোধন করেন নরেন্দ্র মোদি। ভারতের সবচেয়ে কাছাকাছি জায়গায় তালাইমানার অবস্থিত। এর ফলে শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলীয় রেল যোগাযোগ আবার চালু হবে। বৌদ্ধমন্দির মহাবোধিতে মোদির প্রার্থনা : শ্রীলংকার বৌদ্ধমন্দিরে প্রার্থনা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশটির প্রাচীন রাজধানী পবিত্র স্থান অনুরাধাপুরায় অবস্থিত মহাবোধি মন্দিরে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটান? সেই সময় তার সঙ্গী ছিলেন শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা? ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে কুর্তা-পায়জামা পরিধান করেছিলেন মোদি। খবর দ্য হিন্দুর। বিশ্বের বৌদ্ধধর্মাবলম্বী জনগণের কাছে মহাবোধি মন্দির পবিত্রতম স্থান। ভারতের অবস্থিত বোধগয়ার সঙ্গে মহাবোধি মন্দিরের এক গভীর সংযোগ রয়েছে। বৌদ্ধ সিংহলি জাতীয়তাবাদীদের খুশি করতেই শনিবার বৌদ্ধ ঐতিহ্যের শহর অনুরাধাপুরায় যান তিনি। প্রায় আধঘণ্টা এখানে সময় কাটান নরেন্দ্র মোদি। সেখানে দাঁড়িয়ে মোদি জানিয়েছেন, দক্ষিণ শ্রীলংকার সিংহলি অধ্যুষিত মাতারা জেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামাঙ্কিত প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করবে ভারত। অনুরাধাপুরায় গার্ড অব অনার দিয়ে সম্মানও জানানো হয় তাকে।

তারা পুলিশের ব্ল্যাকশিপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে পুলিশের নাকের ডগায় ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড মেনে নেয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। তিনি দায়িত্বে গাফিলতির জন্য দায়ী পুলিশ সদস্যদের ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। আমি অনেকগুলো কেসের কথা জানি, যেখানে কর্তব্যরত পুলিশকে বলা হয়েছে- ওমুক জায়গায় ঘটনা ঘটছে একটু সহযোগিতা করুন। তারা আসে নাই। যারা করছে না, আমি ধরে নেবো তারা এই সার্ভিসের ‘ব্ল্যাকশিপ’। এদের খুঁজে বের করুন, শাস্তি দিন। তাহলে পুলিশের ওপর গণমানুষের আস্থা ফিরে আসবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনও হবে না। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট ভবনে বেসরকারি সংগঠন ‘জার্নি’র উদ্যোগে ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদান এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। এসব মন্তব্যের সময় পুলিশের আইজিপি শহীদুল হক ছাড়াও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, একাত্তরে মুজিবনগর সরকারের গার্ড অব অনার প্রদানকারী মাহবুব উদ্দিন আহমেদ শহীদ, পুলিশকন্যা ফারজানা শাহনাজ মজিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এইচ টি ইমাম বলেন, অভিজিৎ হত্যার বর্ণানা দিয়ে বলেন, কয়েক গজ দূরে পুলিশের অবস্থানের মধ্যেই অভিজিতের ওপর হামলা হলো এবং সেখানে তাকে কুপিয়ে জখম করছে। কিন্তু এ ঘটনার পুলিশ যে ব্যাখ্যা দিয়েছে সেটি কিন্তু গ্রহণযোগ্য নয়। লেখক-অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলাকারীদের শাস্তি দিতে না পারার ফল লেখক অভিজিৎকে হত্যা। আমরা আর কোন ব্যর্থতা মেনে নিতে পারি না। হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার মামলাটি যথাযথভাবে তদন্ত করে যদি শাস্তি দেয়া যেত, তাহলে মনে হয়, অভিজিতের ঘটনা ঘটতো না। যুদ্ধাপরাধ মামলার রায় ও দশম সংসদ নির্বাচন ঘিরে ২০১৩ সালে পুলিশের ওপর যেসব হামলা হয়েছে, থানায় আক্রমণ হয়েছে, সেসব ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও তাগিদ দেন তিনি। অভিজিতের মতো আর কেউ যাতে এ ধরনের হামলার শিকার না হন তার জন্যই এগুলোর সুরাহা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। জার্নির প্রধান উপদেষ্টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার বজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ডাকসুর সাবেক ভিপি অধ্যাপক মাহফুজা খাতুন।

সবাই আমাদের ভালো চায়, আমরা নই by কামাল আহমেদ

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীকে ধন্যবাদ জানাতেই হয় যে তিনি তাঁর পূর্বসূরির পথ অনুসরণ না করে বরং সত্য বলার চেষ্টা করেছেন। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ২৮তম অধিবেশনে মন্ত্রীপর্যায়ের এক সভায় তিনি বলেছেন, ‘পর্যাপ্ত উন্নয়ন ছাড়া সব সময় সবার মানবাধিকার রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারে না।’ নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে থাকা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দেশের ভেতরে-বাইরে সমালোচনা তীব্রতর হওয়ার পটভূমিতে তিনি অন্তত ঢালাও অস্বীকৃতি জানানোর পথে পা বাড়াননি। তাঁর পূর্বসূরি তো এর আগে ওই একই ফোরামে এ ধরনের সব অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছিলেন। যার ফলে তখন তিনি দেশে ফিরে দেখলেন যে দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো একজোট হয়ে বিবৃতি দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য বিকৃতির অভিযোগ এনেছিল। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে মাহমুদ আলীর বক্তব্যে অবশ্য আমাদের শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, তাঁর বক্তব্যে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে তাঁর সরকারের দর্শনের ভিত্তি হচ্ছে উন্নয়ন আগে, মানবাধিকার পরে। তাহলে কেউ যদি ধরে নেন যে মানবাধিকার পরিস্থিতির যত অবনতিই ঘটে থাকুক না কেন, অদূর ভবিষ্যতে সেটার উন্নতির কোনো আশা নেই, তাহলে কি তিনি ভুল করবেন? কথিত উন্নয়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ যদি তিরোহিত হয়, যদি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও পরিবারগুলোর একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তাকে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছাড়া আর কী বলা যাবে? অথচ সারা দুনিয়ায় এখন উন্নয়ন দর্শনের ভিত্তি হচ্ছে—যাদের জন্য উন্নয়ন, তাদের অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো উন্নয়ন নয়।
এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রাদ আল হুসেইন বাংলাদেশের চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতির সমাধান খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন। পরে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি যেসব দেশের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। জেইদ রাদ আল হুসেইন বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি মহাসচিব বান কি মুনের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সহিংসতা বন্ধ, রাজনৈতিক সংলাপের পথ খোঁজা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সব রাজনীতিকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি গণতন্ত্রের পরিধি ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। হাইকমিশনার জেইদ ২০১৪ সালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অন্যায় নিয়ন্ত্রণ আরোপকারী যে কয়টি দেশের নাম উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়েছে মিসর, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর পাশাপাশি, যেসব দেশে গণতন্ত্র হয় নির্বাসিত, নতুবা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চলছে। তিনি বাক্স্বাধীনতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন যে এটি শুধু উগ্রপন্থীদের দ্বারাই আক্রান্ত হচ্ছে না, বরং সরকারের দমনমূলক আচরণেরও শিকার হচ্ছে [ভাষণটির পূর্ণ বিবরণ অফিস অব দ্য হাইকমিশনার অন হিউম্যান রাইটসের (ওএইচসিএইচআর) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে]। বাংলাদেশে মানবসম্পদ উন্নয়নের নানা সূচকে অগ্রগতির কৃতিত্ব যে রাজনীতিকেরা দাবি করেন, তাঁরা গণতন্ত্রের মূল উপাদান—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশের মর্যাদা অবনমনের দায় স্বীকার করবেন কবে?
আমাদের ঘরের ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন ও কলহ যে সর্বনাশা ও অন্তহীন সহিংসতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, তাতে পাড়া–পড়শিদের উদ্বেগকেও আমাদের অনেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একধরনের বাড়াবাড়ি বলে মনে করেন। আমাদের একজন সাবেক সামরিক শাসক ও ক্ষমতাসীন সরকারের দ্বিতীয় প্রধান শরিক, জাতীয় পার্টির প্রধান দেশের বিদ্যমান গণতন্ত্রকে ‘সালিস মানি কিন্তু তালগাছ আমার’ ধরনের গণতন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ বিষয়ে যাঁদেরই আগ্রহ আছে, তাঁরা এত দিন যে ‘দুই নেত্রীর অবস্থান দুই মেরুতে’ বলে শুনে এসেছেন, তাঁদের সেই বৈপরীত্যের বাস্তব রূপ বোধ হয় এর চেয়ে প্রকট আর কখনো ছিল না। একজনের নিয়ন্ত্রণে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র-প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, প্রচারমাধ্যম ও বিচার বিভাগ। এমনকি, প্রশাসন পরিচালনায় যাদের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই, এমন ধরনের প্রতিষ্ঠান-সংগঠন-সংস্থার সব কটিতেই দলীয় আনুগত্যের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ব্যক্তিদের সমাবেশ। অন্যদিকে, অপর নেত্রী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় একঘরে হয়ে থাকার পরও কথিত ‘আপসহীনতায়’ এখনো অনড়। অচলাবস্থা ভাঙার জন্য শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে তিনি কিছু একটা বললেও বলতে পারেন বলে যাঁরা আশা করেছিলেন, তাঁদেরকে নিরাশ করে তিনি আবারও বলেছেন যে ‘যৌক্তিক পরিণতিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে’। সরকারি হিসাবে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি, লাখো কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি, কোটি কোটি শিক্ষার্থীর জীবন নাকাল হলেও দুই নেত্রীর কারও মন গলার কোনো লক্ষণ নেই। এত সব মৃত্যু ও সম্পদহানি শুধুই পরিসংখ্যানের উপাদান। এ যেন অভূতপূর্ব আত্মহননের এক জাতীয় আয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও নানাভাবে বলা হয়েছে যে সহিংসতা পরিহার এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগের ঘোষণা দিলেই বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। সহিংসতার দায় বিএনপি স্বীকার না করলেও তারা বলছে যে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেই এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা বন্ধ হয়ে যাবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সংলাপের সম্ভাবনা আটকে আছে জামায়াতকে ছাড়া না-ছাড়ার বিষয়টিতে। এই বহুল বিতর্কিত প্রশ্নটির একটা চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, যাঁকে আর যা-ই হোক, বিএনপি-জামায়াত ঘরানার বুদ্ধিজীবী বলে তকমা লাগানো যাবে না। তিনি বলছেন, রাষ্ট্র যেখানে জামায়াতে ইসলামীকে প্রত্যাখ্যান করছে না এবং করতেও ইচ্ছুক নয় (জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘কোনো দলকে সরকার নিষিদ্ধ করবে না’ এ ক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য), সেখানে বিরোধী দলের প্রতি সেই দলকে প্রত্যাখ্যান করার দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক জেদাজেদি কতটা যুক্তিগ্রাহ্য? ধারণা করা যায়, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে তাদের সমর্থকদের আশ্রয় হবে বিএনপি, যেটা আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের জন্য বরং অসুবিধাই তৈরি করবে। কিন্তু বিএনপি কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর জামায়াত সামান্য রাজনৈতিক সংস্কার মেনে নিলেই তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ার নতুন সুযোগ তৈরি হলেও যে হতে পারে, সেই সম্ভাবনাকে জিইয়ে রাখাই আওয়ামী লীগের জন্য লাভজনক।
জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন দুই নেত্রীকে যে চিঠি দিয়েছিলেন, তাতে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, অন্তত সৌজন্যের খাতিরে উভয় পক্ষই ইতিবাচক সাড়া দেবে। আমাদের উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্যের বড় অংশীদার দেশগুলোও নিশ্চয় তেমনটি ভেবেছিল। সে কারণে তাদের বিবৃতিতেও মহাসচিবের উদ্যোগের প্রতি সমর্থনের কথা রয়েছে। কিন্তু সরকারের কৌশল সম্পর্কে যতটা আভাস মেলে, তা হলো সাধ্যমতো কালক্ষেপণ। যাঁরাই এই চলমান অচলাবস্থাকে রাজনৈতিক সংকট বলে মূল্যায়ন করেন এবং তার সমাধানে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ দেখতে চান, তাঁদের কথা শোনার সময় ক্ষমতাসীনদের কারও নেই। তা তিনি বিদেশি কূটনীতিকই হোন অথবা দেশের উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ। ডিজিটাল যুগেও চিঠি যায় শম্বুকগতিতে। অনুমান করা যায় যে এর উদ্দেশ্য একটাই—মামলা, আদালত, পুলিশ ও শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে সহযোগী নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা বিএনপির নেত্রীকে হার মানতে বাধ্য করা।
গত ৬৭ দিনেও এসব কৌশল সফল না হওয়ায় ক্ষমতাসীনদের অনেকেই সম্ভবত হতবাক। মনে হয়, বিএনপি যেমন ভোঁতা হয়ে যাওয়া হরতাল-অবরোধের বাইরে কোনো কর্মসূচি ভাবতে অক্ষম, ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগও বিএনপির নেত্রীকে হার মানানোর কোনো সৃজনশীল পথ পাচ্ছে না। আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কিংবা অফিস তল্লাশির পরোয়ানা জারিতেও খুব একটা ভয় দেখানো গেছে বলে মনে হয় না। ফলে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং সংসদের ভেতরে-বাইরের সব বক্তব্য-বিবৃতির লক্ষ্য এখনো তাই বিএনপির নেত্রী। স্বেচ্ছায় অফিসবন্দী অথবা দপ্তর তালাবদ্ধ করে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় কৌশল ঠেকানো—এই দুটির যেটিই সত্য হোক না কেন, বিএনপির নেত্রী যে তাঁর অফিস না ছাড়ার পণে অনড়, সেটা কারও বুঝতে বাকি থাকার কথা নয়। ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও এমপিদের নানা নাটকীয়তার কেন্দ্রও তাই বিএনপির নেত্রীর ওই দপ্তর। পরিবহনশ্রমিক, ছাত্রছাত্রী, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে গিয়ে কার্যালয় ঘেরাওয়ের পর সেখানে সম্প্রতি স্মারকলিপি দিয়ে এসেছেন কতিপয় চিকিৎসক-এমপি। একটি বড় দলের প্রধানকে তাঁর কার্যালয় থেকে উচ্ছেদ করলে সরকারের সাফল্যের তালিকা দীর্ঘায়িত হয় কি না, তা অবশ্য সরকারই ভালো বলতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর যে সফর ও বক্তৃতার কথা এই নিবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করেছি, সেই বক্তৃতারই আরেকটি অংশ দিয়ে লেখাটি শেষ করব। মাহমুদ আলী তাঁর ওই বক্তৃতায় আশা প্রকাশ করেছেন, ‘মানবাধিকার পরিষদ শুধু মানবাধিকারের ইস্যুগুলো তুলে ধরবে না, বরং মানবাধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পথ বাতলে দেওয়ার সংস্থায় পরিণত হবে।’ মানবাধিকার পরিষদ কিন্তু সংলাপের কথাই বলেছে। কোনো অজুহাতেই রাষ্ট্র যেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথে পা না বাড়ায়, যাকে তিনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বলে অভিহিত করেছেন, সেই বিষয়টিতে সাবধানতার কথা বলেছে। আমরা কি সেই পথ অনুসরণ করব? নাকি সারা বিশ্বের সবাই আমাদের ভালো চাইলেও আমরা আমাদের ভালো চাইব না?
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

‘স্বীকারোক্তি’ আইনের অপব্যবহার by তৈমূর আলম খন্দকার

বিচারব্যস্থাকে সঠিক পন্থায় প্রয়োগের জন্য ১৮৯৮ সালের ২২ মার্চ ব্রিটিশ শাসিত পাক-ভারত উপমহাদেশের জন্য ‘ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ ইং’ নামে একটি আইন পাস হয়েছিল, যা ওই বছর ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়।
ওই আইনের ১৬১ ধারায় সাক্ষীর জবানবন্দী রেকর্ড করার জন্য তদন্তকারী দারোগাকে মতা দেয়া হয়, যা জুডিশিয়াল রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয় না। কিন্তু ওই আইনের ১৬৪ ধারাবলে কোনো জবানবন্দী বা স্বীকারোক্তি যদি ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক গৃহীত হয়, তবে তা জুডিশিয়াল রেকর্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় বিধায় বিচারামলে এর গুরুত্ব অপরিসীম। সংশ্লিষ্ট আইন ও উচ্চ আদালতের গাইডলাইন মতে, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ও বিধিবদ্ধ নিয়মে স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালনের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে। তার পরও এই দায়িত্ব পালনে ও মতা ব্যবহারে ম্যাজিস্ট্রেটরা মতার অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ করছেন বলে অভিযোগ উঠে থাকে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগ স্বীকারোক্তি গ্রহণে ম্যাজিস্ট্রেটদের এহেন কর্মকাণ্ডে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে কোনো কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ প্রদান করেছেন। তার পরও জজ মিয়ার স্বীকারোক্তি রেকর্ড করার পর বিষয়টি ধরা পড়লেও বোধোদয় হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে দায়িত্বে অবহেলার জন্য শাস্তি প্রয়োগ না করা পর্যন্ত অজ্ঞতা বা দলবাজি কিংবা প্রভাবান্বিত হওয়া যেকোনো কারণেই হোক কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মোতাবেক স্বীকারোক্তি রেকর্ডের অপপ্রয়োগ হয়তো বন্ধ হবে না।
উল্লেখ্য, কার্যবিধির ১৬৪(৩) ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে-
১। স্বীকারোক্তি রেকর্ড করার আগে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক সংশ্লিষ্ট আসামিকে এই মর্মে আশ্বস্ত করতে হবে যে, ‘পুলিশ আবেদন করলেও আসামি স্বীকারোক্তি করতে আইনত বাধ্য নহে।’ এবং
২। তাহার স্বীকারোক্তি বিচারামলে ‘স্বীকারোক্তিকারীর বিরুদ্ধেই সাক্ষী হিসাবে ব্যবহার হতে পারে।’
ওই আইনে আরো স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যতণ পর্যন্ত না সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট এই মর্মে নিশ্চিত হবেন যে- ‘স্বীকারোক্তিটি স্বেচ্ছায় প্রদান করা হচ্ছে যা সম্পূর্ণ সত্য’ ততণ পর্যন্ত তিনি (ম্যাজিস্ট্রেট) স্বীকারোক্তি রেকর্ড করবেন না। ম্যাজিস্ট্রেট যদি সন্তুষ্ট হন যে, স্বীকারোক্তি প্রদানকারীকে আইনের ভাষা বুঝানো হয়েছে, যা সে বুঝতে পেরে স্বেচ্ছায় সত্য বক্তব্য প্রদান করছে- বিষয়টি তিনি (ম্যাজিস্ট্রেট) নিশ্চিত হয়েই জবানবন্দী রেকর্ড করবেন এবং রেকর্ড করার পর উক্ত আইনের বিধানমতে তিনি নিজে নিম্নবর্ণিত মন্তব্য প্রদানপূর্বক নিজ নাম স্বার করবেন।
"I have explained to (Name) that he is not bound to make a confession and that if he does so, aû confession he may make may be used as evidence against him and I beleve that this confession was voluntarily made. It was taken in my presence and hearing and was read over to the person making it and admitted by him to be correct, and it contains a full and true account of the statement made by him.
-Signed By Magistrate"
বাংলা ভাষায় যা নিম্নরূপ-
‘আমি (আসামির নাম) ....-কে বুঝাইয়া দিয়াছি যে, তিনি দোষ স্বীকার করিতে বাধ্য নহেন এবং যদি তিনি উহা করেন, তাহা হইলে দোষের স্বীকারোক্তি তাহার বিরুদ্ধে স্যা হিসাবে ব্যবহৃত হইতে পারে এবং আমি বিশ্বাস করি যে, দোষ স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে করা হইয়াছে। ইহা আমার উপস্থিতিতে ও শ্রবণে করা হইয়াছে এবং স্বীকারোক্তিকারীকে ইহা পড়িয়া শুনানো হইয়াছে এবং তিনি ইহা নির্ভুল বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন এবং তিনি যে বিবৃতি দিয়াছেন, ইহাতে তাহার পূর্ণাঙ্গ ও সত্য বিবরণ রহিয়াছে।
-ম্যাজিস্ট্রেটের স্বার’
অর্থাৎ স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করার পর ম্যাজিসস্ট্রেট এই মর্মে প্রত্যয়ন (Memorandum) প্রদান করবেন যে, সংশ্লিষ্ট আসামি স্বীকারোক্তি প্রদান করতে বাধ্য নয় এবং যদি করে তবে স্বীকারোক্তিকারীর বিরুদ্ধে তা স্যা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে ম্যাজিস্ট্রেট তাকে (আসামিকে) বুঝিয়েছেন এবং স্বীকারোক্তিটি সত্য ও স্বেচ্ছায় প্রদান করা হচ্ছে মর্মে নিশ্চিত হয়ে লিপিবদ্ধ করে তিনি নিজ নাম স্বার করলেন। তা ছাড়া উচ্চ আদালতের এই মর্মে নির্দেশনা রয়েছে যে, আসামিকে উক্ত আইনি ব্যাখ্যা বুঝানোর পর তিন ঘণ্টা সময় দিতে হবে যাতে আসামি ম্যাজিস্ট্রেটের উক্ত আইনি ব্যাখ্যা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। এ ছাড়া স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করার সময় [কার্যবিধির ১৬৪(২) ধারা মোতাবেক] একই আইনের ৩৬৪ ধারার বিধিবিধান অনুসরণ করার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতি নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, যা আরো সুস্পষ্ট নির্দেশনামূলক। অধিকন্তু সংবিধানের ৩৫(৪) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘কোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে স্যা দিতে বাধ্য করা যাইবে না।’
এ ছাড়া শুধু স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য কোনো আসামিকে রিমান্ডে দেয়া যাবে নাÑ এ মর্মেও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, সংশ্লিষ্ট আইন বা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বিশেষ করে রাজনৈতিক মামলায় এখন প্রতিপালন করা হচ্ছে না, এ কথা দায়িত্ব নিয়েই বলছি। অভিযোগে প্রকাশ, আসামিকে আইনের ভাষায় সতর্কতা বাণী বুঝানো তো দূরের কথা, পুলিশ যা লিখে এনে দেয় তা হুবহু লিখে দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের দায়িত্ব শেষ করছেন এবং মন্তব্যে ও ছকে এমনিভাবেই স্বার দিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও পুলিশ পুনরায় রিমান্ডে নেয়ার হুমকি দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করে, তা ম্যাজিস্ট্রেটের জ্ঞাতসারেই। স্বীকারোক্তি লিখতে যতণ সময় লাগে (বড়জোর ১৫-২০ মিনিট), ততণ আসামিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে রাখা হয়। রাজনৈতিক মামলাগুলোতে ইদানীং এটাই দৃশ্যমান। তবে ব্যতিক্রম আছে, যা বিরল ঘটনা। যেমনÑ নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া বোমা হামলা মামলায় সিআইডির শিখানো মতে স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করতে ম্যাজিস্ট্রেট শরীফুর রহমান অস্বীকার করেছিলেন।
বিচারকের আসনে যিনি বসেন তিনি অনেক সম্মানিত আসনে বসেন যা ‘দাঁড়িপাল্লা’ মোহরখচিত। দেশের প্রচলিত আইন এবং সংবিধানের ১১৬ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচার কার্যক্রমে ম্যাজিস্ট্রেটরা স্বাধীন তো বটেই, তদুপরি কাগজকলমে হলো বিচারব্যবস্থা স্বাধীন হয়েছে। সেখানে জনগণ সরকার বা পুলিশি প্রভাবমুক্ত স্বাধীন কার্যক্রম বিচার বিভাগে যদি দেখতে না পায়, তবে এ স্বাধীনতার অর্থ কী?
স্বীকারোক্তি গ্রহণে জজ মিয়া নাটক ম্যাজিস্ট্রেসির ওপর যে কালিমা লেপন করেছে, তার পরও যদি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদের বোধোদয় না হয়, তবে এর প্রতিকার কোথায়, মাননীয় প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ ছাড়া!
ডিঙিয়ে প্রমোশন ও সুবিধামতো পোস্টিংয়ের জন্য প্রজাতন্ত্রের সর্বস্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের অনেকেই দলবাজি করেন। কোথাও সরবে, কোথাও নীরবে দলবাজির মহোৎসব বা কমপিটিশন চলছে। প্রমোশন ও পোস্টিংয়ের বিশেষ জেলাভিত্তিক কোটারিজম তো আছেই। তবে বিচারকার্যে ম্যাজিস্ট্রেটদের কোনো দলের প্রতি দুর্বল থাকা উচিত নয়Ñ এ মর্মে মাননীয় প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আল্লাহকে তায়ালা আছেন, দেখেন, শোনেন ও সর্বশক্তিমানÑ এ কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। তার কাছে আমি বা আপনি সবাইকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। তার শক্তিই বড় শক্তি। এর প্রমাণ দুনিয়ায় সব শক্তির য় বা পতন হয়েছে।
ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘আইনের শাসন এখন প্রশ্নবিদ্ধ’। ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক বলেছেন, ‘হাওয়া দেখে রায় হয়’। জজ মিয়া নাটকে দেশবাসী খুশি হয়নি বরং থুথু দিয়েছে। জানি না, বিচার বিভাগ প্রকৃত অর্থে কবে স্বাধীন হবে? জাতির সাথে আমিও এর প্রত্যাশায় রইলাম। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মানসিকভাবে স্বাধীন না হলে কাগজে কলমে স্বাধীনতা অর্থহীন, যা অপমানজনক।
লেখক : আইনজীবী ও রাজনৈতিক কর্মী, সহ-আইন সম্পাদক, কেন্দ্রীয় বিএনপি

পেশাদারিত্ব না দেখালে অর্থনৈতিক সামাজিক অগ্রগতি স্থিতিশীল হবে না by এম জি কিবরিয়া

বর্তমান সঙ্কট সহিংস নৈরাজ্য হিসেবে ছড়িয়ে পড়ার আগে অবশ্যই বাংলাদেশে বিবদমান রাজনৈতিক পক্ষকে অর্থবহ সংলাপে (সিরিয়াস ডায়ালগ) বসে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। এর বাইরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যদি তাদের সংগঠনগুলোতে পেশাদারিত্ব নিয়ে না আসে এবং দুর্নীতি নির্মূল না করে তাহলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি স্থিতিশীল হবে না। সরকার বিরোধীদের ধ্বংস করে দেয়ার ক্ষেত্রে সফল হলেও তাতে যে ক্ষত সৃষ্টি হবে তা রয়ে যাবে অনেক বছর। তাই দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার। সরকার ও বিরোধী দল আন্তরিকতার সঙ্গে সহযোগিতা না করলে তা অর্জন করা যাবে না। বিরোধী দলীয় নেতাদের হয়রানি করার মাধ্যমে দেশের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি শান্ত করার ক্ষেত্রে কোন কাজে আসে নি। ‘ইমপ্লোডিং বাংলাদেশ’- শীর্ষক এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ইন্সটিটিউটের সাবেক সিনিয়র উপদেষ্টা এমজি কিবরিয়া। তিনি বর্তমানে মরগান স্টেট ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট-এর প্রফেসর। বাংলাদেশে পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ডিসটিঙ্গুইশড ফেলো। তার ওই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে অনলাইন প্রজেস্ট সিন্ডিকেট-এ। চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগ-ভিত্তিক এই ওয়েবসাইটটির সদস্য ১৫৪টি দেশের ৫ শতাধিক সংবাদপত্র ও অন্যান্য প্রকাশনা। এটি মূলত মন্তব্যধর্মী ওয়েবসাইট। এতে তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশ কি আরও একবার রাজনৈতিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবন অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেম বোমা বিস্ফোরণ থেকে। বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। রাজধানীতে সহিংস বিক্ষোভ ও অগ্নিসংযোগ ব্যাপকহারে দেখা দিয়েছে। এতে দৃশ্যত দেশটি ভয়াবহভাবে রসাতলে যাচ্ছে। অবিশ্বাস দীর্ঘদিন বাংলাদেশে রয়েছে মহামারী আকারে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে রক্তপাতের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে এ দেশটি। তখন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বিখ্যাত একটি উক্তি করেছিলেন নতুন জন্ম নেয়া এ দেশটির অর্থনীতি নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, এ দেশের অর্থনীতি হবে দুর্বল। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ক্ষতি অর্থনীতি দিয়ে হচ্ছে না, ক্ষতিটা হচ্ছে অকার্যকর রাজনীতি দিয়ে। বিভিন্ন ঘাত- প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যাত্রার পর দ্রুততার সঙ্গে উন্নতি করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। গত দু’দশকে বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে গড়ে শতকরা প্রায় ৬ ভাগ। ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর তুলনায় বাংলাদেশের সামাজিক সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতি করেছে। এক্ষেত্রে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। যদি রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে শান্ত থাকতো তাহলে বাংলাদেশ যোগ দিতে পারতো মধ্য আয়ের দেশগুলোর তালিকায়। উল্টো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ফেলছে ঝুঁকিতে। সরকারের বৈধতা প্রশ্নে দেশের সবচেয়ে বড় দু’টি রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ভয়াবহ লড়াইয়ে লিপ্ত। গত ৮ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ১০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। কোটি কোটি টাকা মূল্যের সহায়-সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে বা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদনসহ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে। স্থানীয় ও বিদেশী নতুন বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে থমকে আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো মানব শক্তি ও তৈরী পোশাক রপ্তানি। এ খাত মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে মৃত্যু, ধ্বংসযজ্ঞ ও রাজনৈতিক পরম্পরা নতুন কিছু নয় বাংলাদেশে। দেশটির জন্মের সময় থেকেই রাজনৈতিক সহিংসতা বার বার ফিরে এসেছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে চার দশকেরও বেশি আগে। কিন্তু এখনও কর্ম-উপযোগী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি হয়নি বললেই চলে। যে দেশ জাতিগত ও ভাষাগত সম্প্রতির জন্য নিজে গর্ব বোধ করে সেখানে এমন বৈরিতা থাকার কারণ দৃশ্যত নেই বললেই চলে। এ দেশটি পাকিস্তানের কাছ থেকে তৎকালীন পূর্ব- পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) মানুষ লড়াই করে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু তড়িঘড়ি করে প্রণয়ন করা হয় ১৯৭২ সালের সংবিধান। এত কোন চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা ভারসাম্য না রেখে প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া হয় অতিরিক্ত ক্ষমতা। প্রথমে এ পদে আসেন সবার শ্রদ্ধেয় জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তড়িঘড়ি করে এমন সংবিধান করাই হতে পারে বাংলাদেশের আসল নীতিবিরুদ্ধ কাজ। ১৯৭০ এর দশক ও ১৯৮০ এর দশকে দেশটি প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকারের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। প্রকৃতপক্ষে  বেসামরিক বা সামরিক কর্তৃত্ববাদীদের লজ্জাজনক পরিস্থিতি লুকানোর জন্য এটা ছিল একটি প্রক্রিয়া। ১৯৯০ এর দশকে দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা দেয়া হয় প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু তাতে রাজনৈতিক পরিবেশের কোন উন্নতি হয়নি। ১৯৯১ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে পর্যায়ক্রমে আসা-যাওয়া করছেন দু’ মুসলিম নারী। তাদের রাজনৈতিক পূর্বসূরিকে হত্যার পর উত্তরাধিকার সূত্রে তারা তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধিকারী হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হলেন শেখ মুজিবুর রহমানের কন্য। শেখ মুজিবুর রহমানকে সামরিক অভ্যুত্থানে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালে। তার প্রতিরক্ষ খালেদা জিয়া হলেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। জিয়াউর রহমানকেও ১৯৮১ সালে একই ভাগ্য বরণ করতে হয়। এ দু’নেত্রীর মধ্যকার ভালবাসা বা আন্তরিকতা হারিয়েছে সামান্যই। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিতে তাদের মধ্যে পার্থক্য খুবই সামান্য বা পার্থক্য নেই বললেই চলে। তারা যেভাবে নিজ নিজ দল চালান তাতেও কোন পার্থক্য নেই। এটা হলো তাদের পারিবারিক বিষয়। তাদের সরকার সুশীল, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার খর্ব করেছে। ব্যাপক আকারে বেড়েছে খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার, বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মুক্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমন করা হয়েছে, কর্ম পরিবেশ করা হয়েছে ত্রুটিপূর্ণ। যদি চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা ভারসাম্যকে একেবারে মুছে দেয়া হয় তাহলে গণতন্ত্র সঙ্কুচিত হয়ে পড়বে। যেখানে কর্তৃত্ববাদী কোন প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্টের স্বৈরাচারী ক্ষমতাকে দাম্ভিকতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন। দু’নেত্রীর দলই সুশাসন ও প্রশাসনের দুর্নীতির ক্ষেত্রে অদক্ষ হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর শীর্ষ তালিকার খুব কাছাকাছি বাংলাদেশ। দুর্নীতির কারণে ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক দাতা বিশ্বব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা এ কারণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বাতিল করেছে।
যখন ক্ষমতায় থাকে তখন প্রতিটি দলই নির্বাচনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। অন্যদের বাইরে রাখে। বর্তমানের সঙ্কট শুরু ২০১১ সালের জুনে। ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশে নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচন তদারক করছিল। কিন্তু ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধান সংশোধন করিয়ে তা বাতিল করেন। এতে কারচুপি বা জালিয়াতির আশঙ্কায় ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও তার জোট। ফলে পার্লামেন্টের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪ আসনের প্রার্থী নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রান করা এবং বিএনপি’র প্রধান মিত্র জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার কথায় রাজনৈতিক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি শান্ত করায় কোন কাজে আসেনি। খালেদা জিয়া দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে তার দল ও মিত্ররা নির্বাচন বর্জন করে যাবে। বর্তমান সঙ্কটের ফল যা-ই হোক না কেন, দৃশ্যত পরিস্থিতির কোন উন্নতি হচ্ছে না। সরকার যদি বিরোধীদের ধ্বংস করে দিতে সফল হয় তাহলে তার ক্ষত যদি কয়েক দশক স্থায়ী না হলেও অনেক বছর থেকে যাবে। যদি দেশের সুশাসনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত না করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমঝোতায় আসে তাহলে হয়তো একটি সাময়িক নিষ্কৃতি মিলবে। দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার। সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে আন্তরিক সহযোগিতা না থাকলে তা করা যাবে না।

সাকিবের সিদ্ধান্ত ক্রিকেটীয় ভুল না ইচ্ছাকৃত? -আনন্দবাজারের রিপোর্ট by গৌতম ভট্টাচার্য

মাঠ অভিমুখী অকল্যান্ড-হ্যামিল্টন মোটরওয়েতে একটা ফোনে কথা বলতে গিয়ে আপাত আজব টিপ অফটা পাওয়া গেল! বাংলাদেশ নাকি আজ নিউজিল্যান্ডের কাছে হারলে এতটুকু দুঃখিত হবে না। কারণ তারা সেটাই চায়।
একমাত্র তা হলেই যে মেলবোর্নে ভারতের সামনে পড়বে।
কিছু পরে সেডন পার্কে ঢুকে টিমলিস্টটা পাওয়া গেল। স্বয়ং অধিনায়ক মাশরফি মর্তুজাই খেলছেন না। গলার সংক্রমণ ও হাঁটুর ব্যথা কারণ হিসেবে দেখানো হলেও আসল কারণ নাকি কোনওটাই নয়। মাশরফি স্লো ওভার রেটের জন্য কড়া শাস্তি পাব-পাচ্ছির ট্র্যাফিক লাইটে দাঁড়িয়ে আছেন। হ্যামিল্টনে বেগতিক কিছু ঘটলেই লাল আলো জ্বলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। একেবারে সাসপেন্ড হয়ে যেতেন। বহু বছর আগে ভারত অধিনায়ক থাকার সময় যেমন হয়েছিল সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের।
আর সবচেয়ে বড় কারণ নাকি তিনি সম্পূর্ণ ফিট অবস্থায় ভারতের সঙ্গে এমসিজির কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে চান। আজ ম্যাচ জিতলে বাংলাদেশ পড়বে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে। কিন্তু তারা নাকি সেটা চায় না। এই বিশ্বকাপের যুগ্ম সেরা দল ভারত। লোকে তাদের থেকে পালাতে চাইবে এটাই স্বতঃসিদ্ধ। অথচ টিম বাংলাদেশ তাদেরই চায় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে।
এই সব জল্পনার অনেক উর্ধ্বে থাকা বাংলাদেশি জনতা ততক্ষণে কন্ট্রোল নিয়ে নিয়েছে। স্থানীয় বিয়ার কোম্পানি মাঠে ঢোকার সময় কমলা রঙের পোশাক এগিয়ে দিচ্ছিল স্পেশ্যাল অফার সমেত। অফারটা হল, ওই কমলা ড্রেস পরে যদি গ্যালারিতে উড়ে আসা কোনও ছক্কা আপনি লুফতে পারেন, তা হলে হাজার ডলার জিতবেন। লোভনীয় অফার। স্যর রিচার্ড হ্যাডলি যে দিকটায় বসে খেলা দেখছিলেন, সেই স্পনসরস্‌ বক্সের ডান দিকটা তো পুরো কমলায় কমলা! কিন্তু অকল্যান্ড থেকে এসি বাস বোঝাই করে, হাইওয়ে ভর্তি লাইন দেওয়া গাড়িতে যে গর্বিত বাংলাদেশিরা এসেছেন তাঁরা কোন দুঃখে দেশের লাল-সবুজ রঙ ছেড়ে কমলা পরবেন?
কিছু লাল-সবুজ শাড়িও দেখলাম। মহিলারা সঙ্গে সবুজ রঙ নিয়ে এসেছেন। সেগুলো সমর্থকেরা নিজেরাই ভাগাভাগি করে মেখে নিচ্ছেন। ভারতে যেমন পেশাদার রং-করিয়েরা স্টেডিয়ামের বাইরে বসে থাকে এখানে সে সব নেই। কিন্তু তাতে কিছু আটকাচ্ছে না। ডিজে দ্রুত শুরু করে দিলেন। কখনও অরিজিত্‌ সিংহ। কখনও বাংলাদেশের বিখ্যাত পপ গায়িকা মুমতাজের আইটেম নম্বর। কখনও অকৃত্রিম সাধের লাউ।
মেঘলা স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ আর নতুন পিচে ব্রেন্ডন ম্যাকালাম ব্যাট করতে পাঠিয়েছেন। বল তো শুধু সুইং নয়, আজ মনে হচ্ছে সিমও করবে। এই রকমই পিচে তো সচিন-সহবাগ সমেত সৌরভের সময়কার এত জাঁদরেল টিম ইন্ডিয়া দু’ইনিংসে আছড়ে পড়েছিল ৯৯ আর ১৫৪। প্রথম দশ ওভারে টুর্নামেন্টের সেরা পেস বোলিং কম্বিনেশন টিম সাউদি আর ট্রেন্ট বোল্ট যখন দুটো উইকেট পড়াকে আরও স্বাগত জানাতে স্লিপ সংখ্যা তিন থেকে চার করে নিলেন, তখন মনে হচ্ছিল ডিজে-র খুব বেশি গান স্টক করতে হবে না!
সেই ম্যাচ কি না থরথর উত্তেজনার মধ্যে গিয়ে শেষ হল একেবারে শেষে। সাত বল বাকি থাকতে তিন উইকেটে জিতে গেল নিউজিল্যান্ড। ম্যাচে যে পরিমাণ নাটকের আমদানি ছিল তাতে নিউজিল্যান্ড আচমকা হেরে গিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের গতিপথ বদলে যেতে পারত। ম্যাচের শেষ দশ মিনিটেও টুইটারে তীব্র জল্পনা চলেছে, সাংবাদিকবন্ধু এবং ভারতীয় ফ্যানেরা এখুনি টিকিটটা করে ফেলো না। অকল্যান্ডে টিভির সামনে বসে থাকা ভারতীয় ক্রিকেট দলও তখন উত্‌কণ্ঠিত। অদ্ভুত পরিস্থিতি— বাংলাদেশ হারলে তারা মেলবোর্ন যাবে। জিতলে এসসিজিতে শ্রীলঙ্কার সামনে পড়বে।
নিউজিল্যান্ডের টুর্নামেন্টে অপরাজিত থাকার গরিমা প্রায় কেড়েই নিয়েছিল বাংলাদেশ। মাহমুদুল্লাহ টানা দু’টো সেঞ্চুরি শুধু করে ফেললেন না, টুর্নামেন্টের সেরা পাঁচ রানকারীর মধ্যে শিখর ধবনকে এ দিন টপকে গেলেন। ময়মনসিংহের ছেলে। যে শহরের ধানের কথা কবিতায় পাওয়া যায়। আর শুঁটকি মাছের গৌরবকাহিনি ভোজনরসিকদের নিত্য আলোচনায়। কিন্তু ময়মনসিংহ শহরের আপাতত তিনিই সেরা রফতানি। ডাকনাম রিয়াধ। এ দিনও বাংলাদেশি সাংবাদিকদের গরিষ্ঠ অংশ হ্যামিল্টন প্রেসবক্সে বসে বলছিলেন, রিয়াধ এমন সব কাণ্ড ঘটাচ্ছেন তাঁদের চিমটি কেটে দেখার মতো! সত্যিই তো? মুশফিকুর রহমানের তিনি ভায়রাভাই বলে নির্বাচিত হয়েও তাঁকে নিয়মিত কথা শুনতে হয়েছে। স্বজনপোষণের সুযোগ পাওয়াই নাকি তাঁর একমাত্র যোগ্যতা। সমালোচনা-সমালোচনায় আক্রান্ত তিনি মাঝে বছরখানেক টিম থেকে বাদ ছিলেন। গত ডিসেম্বরে আবার ফিরেছেন। টিমে একমাত্র হিন্দু ক্রিকেটার সৌম্য সরকার এবং রিয়াধের পার্টনারশিপ এই ধারণার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় মাস্তুল যে না, বাংলাদেশ ইচ্ছাকৃত ম্যাচ ছাড়েনি। আপ্রাণ লড়েও পারেনি।চার উইকেট নিয়েও সাকিব-আল-হাসান অবিসংবাদী ভাবে তালিকায় নেই। খেলার শেষে এ দিনের অধিনায়ক সাকিবের কতগুলো বিহ্বল করা সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল জল্পনা চলছিল। ক্রিকেটীয় ভুল? না ইচ্ছাকৃত? যেমন নিজে এত ভাল বল করেও কোটার চেয়ে এক ওভার কম করা। মার্টিন গুপ্টিল এবং রস টেলর— ম্যাচ নিয়ে যাওয়ার পার্টনারশিপ যখন করে ফেলেছে নিউজিল্যান্ড, তিনি দ্বিতীয় স্পেলে দু’ওভারের জন্য আসবেন না? রুবেল হোসেন আগের ম্যাচে ইংল্যান্ডকে চমকে দিয়ে বিশ্ব দরবারে ঢুকে পড়েছেন। তাঁকেও তো দু’ওভার কম বল করালেন সাকিব। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করলেন আট জনকে। টিমে আট জন ব্যাটসম্যান ছিল। আট জন বোলার কোথা থেকে এল?
তিনটে কারণ হতে পরে।
এক, সাকিবের ডাহা ট্যাকটিক্যাল ভুল।
দুই, টিমের দীর্ঘকালীন স্বার্থের কথা ভেবে সমস্ত অঙ্গ মেপে নেওয়া। তাতে স্বল্পকালীন ক্ষতি হতে পারে জেনেও।
তিন এবং হয়তো নিছক গুজবের তিন, বাংলাদেশ সত্যিই মনপ্রাণ দিয়ে ম্যাচটা জিততে চায়নি।

অর্থাত্‌ বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাষায় পাতানো খেললাম না। ওটা ঘৃণ্য কাজ। আবার জেতার জন্য মরণবাঁচনও গেলাম না। আমাদের জন্য কোয়ার্টার ফাইনাল সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট। সেটায় জেতার জন্য যা যা করলে ভাল, সেই ট্যাকটিক্যাল লগ্নিটা করে রেখে দিলাম।
ম্যাচ শেষে সেডন পার্ক ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে আসা বাংলাদেশ ম্যানেজার সুজন অবশ্য বলে গেলেন, “বাংলাদেশ হারতে চেয়েছিল এটা আজগুবি। এটা ঠিক সাকিবের কিছু সিদ্ধান্ত আশ্চর্যজনক। কিন্তু ক্রিকেটে ক্যাপ্টেন কি এমন ভুল করে না?” সুজন মনে করেন, তাঁদের জন্য ভারতীয় বিস্ফোরক ব্যাটিং লাইন-আপ আর এমসিজি ভর্তি ভারত সমর্থক অনেক বেশি কঠিন হবে দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে। শখ করে কোন টিম চাইবে তার সামনে পড়তে?
তিনি অস্বীকারের পরেও গুঞ্জনটা কিন্তু থেকেই গেল। দক্ষিণ আফ্রিকা মানে নক আউটে আরও ভয়ঙ্কর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেখানো মর্কেল-স্টেইন। সেটার মোকাবিলা করা নাকি বাংলাদেশিরা বড় ঝুঁকি মনে করছেন। তুলনায় ভারতের তেমন হাড়হিম করে দেওয়া বোলার নেই। তা ছাড়া বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ওয়ান ডে-তে ভারতকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বাসটা আছে, আবার পারবে। যতই মীরপুরের মাঠে আগের বিশ্বকাপ উদ্বোধনীতে সহবাগের ১৭৫ একাই তাদের উড়িয়ে দিক!
আরও একটা অদ্ভুত কথা শোনা গেল। ছেলেরা নাকি বলেছে, উল্টো দিকে ভারত প্রতিদ্বন্দ্বী হলে তাদের চার্জড হতে খুব সুবিধে হয়! শুনতে শুনতে মনে হল, ফরাক্কার জল কি তা হলে এত দূরমহাদেশেও পৌঁছে গেল?

‘ওয়াদা অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিন’ -বি. চৌধুরী

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের কাছে নতুন নির্বাচন দাবি করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিকল্পধারা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘চলমান পরিস্থিতি ও উত্তরণে করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ দাবি জানান। বি. চৌধুরী বলেন, ৫ই জানুয়ারি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন করেছেন। এবার ওয়াদা অনুযায়ী সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। মন্ত্রীদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আল্লাহ সাক্ষী। আপনার ওয়াদা করেছিলেন। এখন উল্টোপাল্টা বলবেন না।
ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য দেশবাসীকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আজ হোক কাল হোক জেগে উঠতেই হবে। ৭১ সালে পাকিস্তানের অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে জেগে উঠতে পারলে এখন দেশের অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে জেগে উঠবেননা কেন? বসে থাকবেন না, জেগে উঠুন।
বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। আরও বক্তব্য রাখেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সম্মিলিতি পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক রুহুল আমিন গাজী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শওকত মাহমুদ প্রমুখ।

‘ইতরপনা কার্য আমার’ by মাহমুদুজ্জামান বাবু

পেট্রলবোমায় নিহত স্বজনদের এই কান্না আর কত দিন?
পেট্রলবোমায় নিহত স্বজনদের এই কান্না আর কত দিন?
আরও অনেকের মতোই আমারও ইচ্ছা করে সারাক্ষণ প্রচণ্ড চিৎকারে ভেঙে খান খান করি এই সময়ের চারপাশ। প্রবল ঘূর্ণিঝড় হয়ে অচলায়তন ভাঙি। তীব্র কশাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে দিই সমাজ ও রাষ্ট্রের নাদুসনুদুস রাক্ষসমতো চেহারাটাকে। সব গিলে খেয়েছে সে, খাচ্ছে অবিরাম। আমাদের শুভবোধ, মানসিকতা, যুক্তিবাদ, সৃজনশীল উদ্যম, ভালোবাসা—সবকিছু উদগ্র উল্লাসে গিলে গিলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে এই দুঃসময়। কালো রাত কাটছে না। কালো কালো রাতে যাঁরা দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য ওত পেতে থাকছে পেট্রলবোমার আগুনে মৃত্যু ও শঙ্কা, নিম্ন আয়ের মানুষের আয়-উপার্জন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রায়, শিক্ষার্থীরা জিম্মি হয়ে অবসাদগ্রস্ততায় ডুবিয়েছে তাদের রংধনু মস্তিষ্কের কোষ; গৃহবাসীর অপেক্ষা প্রতিদিনের শুধু নয়, প্রতিক্ষণের। তার ভাবনা, যে আছে বাইরে, সে ফিরবে তো ঠিকঠাক? নিরাপদে?
এর নাম জীবনযাপন? এর নাম সমাজ? স্বদেশ?
মোটেও নয়। এটা তৈরি করা হয়েছে। আমাদের মতোই দেখতে কিন্তু ভাবনায় ভিন্ন কিছু মানুষ এই সর্বনাশা সময় তৈরি করেছে। জানুয়ারির শেষ দিকে একদিন কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে, চারপাশের বহমান সময় নিয়ে। তিনি বলছিলেন, ‘যে বাংলাদেশ আমরা এখন দেখছি, এটা প্রকৃত বাংলাদেশ নয়। রাজনীতি করে যারা নিজেদের সম্পদশালী ও ধনী করতে চায়, এ রকম কয়েক হাজার মানুষ তাদের অপকর্ম দিয়ে দেশকে এত নিচে টেনে নামিয়েছে।’
হরেক রকম অপকর্ম, যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য; সবাই চলছে প্রতিরোধহীন। যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি তার ২০-দলীয় জোটের সর্বস্তরের মানুষের ‘না-চাওয়া’ হরতাল-অবরোধ-সহিংসতা চালাচ্ছে। আর ক্ষমতাসীন ১৪-দলীয় জোট, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব থেকে উদ্ভূত দমন-পীড়নের নানামুখী পদক্ষেপ অচলাবস্থাকে করছে দীর্ঘায়িত। জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের। তা এখন শূন্যের কোঠায় পৌঁছে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে হাসছে। তবু আমরা কেউ জ্বলছি না। টলছি না। দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে যাঁরা প্রায়ই গম্ভীর মুখ করে টেলিভিশনের ‘টক শো’তে গিয়ে মিষ্টি মিষ্টি আশাবাদের কথা বলেন, তাঁদের বিশ্লেষণে চারপাশের এই নির্লিপ্ততার কোনো কার্যকারণ জানা যাচ্ছে না। দেশটা কি তবে মেধাহীন পোশাকি কপট মানুষে ভরে গেল? কবে হলো এই সর্বনাশ? কীভাবে হলো? কেন হলো?
ভাবনাহীনতা ও প্রশ্নহীনতার এই কালে কয়েকটি প্রশ্ন খুবই সহজ ও সরল। সবারই জানা। যেন ঠোঁটের ডগায় ঝুলে আছে। কিন্তু উত্তর? জানা নেই। তা-ই কি? নাকি জানা আছে, বলা বারণ? বারণ কেন? বললে কী হবে? সরল উত্তর, অসুবিধা হবে। কী অসুবিধা? ব্যক্তিগত অসুবিধা। ধর্ম নয়, ধর্মতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে যুক্তিহীন মৌলবাদের রোষে লেখক তসলিমা নাসরিন অনিচ্ছুক পরবাসী হয়েছেন। তখন যদি আমরা প্রশ্ন তুলতাম, তাহলে পরবর্তী সময়ে কবি শামসুর রাহমানের বাসা আক্রান্ত হতো না। ধারাবাহিকভাবে মৌলবাদের চাপাতি একে একে ঝাঁপিয়ে পড়ত না হুমায়ুন আজাদ, রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়সহ আরও অনেকের ওপর। আমাদের ফিসফিস কথাগুলো মৌনতার নামান্তর। মৌনতা বিজ্ঞানমনস্ক করে না মানুষকে।
দেশের বিবদমান হিংসুটে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর জন্য কেউ কেউ উদ্যোগ নিলেও আমাদের তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনীতিকেরা ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি’ প্রবাদটি অক্ষরে অক্ষরে মানছেন। দেখেশুনে যে কেউই বুঝবেন যে তাঁদের কাছে দেশ বা দেশের উন্নয়ন এমনকি মানুষের জীবনও কোনো দাবি তৈরি করছে না। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে চিরবিনাশ করতে চাইছে, নির্মূল করতে চাইছে। যারা ক্ষমতায় আছে, তারা একাধিপত্য বিস্তার করছে। প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতির বাসনায় স্বৈরতান্ত্রিক মন গড়ে তুলছে নিজেদের ভাবনার জগতে। এটা একটা অশনিসংকেত। সবার জন্যই। এটা বুর্জোয়া রাজনীতির দৌরাত্ম্য ও দেউলিয়াত্বও বটে। আর এই দেউলিয়াপনার উৎকট চেহারা দেখে দেশের সার্বভৌমত্বের গালে চপেটাঘাত করে নাক গলাচ্ছেন জাতিসংঘ ও ভিনদেশি কূটনীতিকেরা। প্রতিষ্ঠান ও দেশ হিসেবে যাদের নিজস্ব চেহারা বিশ্বময় খুবই লজ্জার, সেসব স্বার্থান্বেষী মহলকে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মতামত দেওয়ার অবস্থাটা আমাদের লোভী রাজনীতিকেরাই তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁদের ‘লজ্জা’তে ফরমালিন দেওয়া কি?
আমরা যে স্বৈরতন্ত্র ও সন্ত্রাসী সময়ে বেঁচে থাকছি, এমন মন্তব্যে কেউ কেউ রুষ্ট হতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে কি তা-ই নয়? দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি-জামায়াত জোটের পাশবিক পেট্রলবোমা-মার্কা ক্ষমতায় যেতে চাওয়ার আন্দোলনে যারা অগ্নিদগ্ধ হয়ে পুড়তে পুড়তে মারা যাচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই, তাদের কাছে কি রাজনীতি কোনো গণতান্ত্রিক বার্তা পৌঁছাচ্ছে? এই আন্দোলনের কোনো কর্মসূচিতে কি দেশের অধিকারহীন ব্যাপকসংখ্যক মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছে? মীমাংসিত অপরাধী মানবতাবিরোধী অপশক্তি প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াত-শিবিরকে এখনো বিএনপি ছাড়তে পারল না। পারে না, কারণ নিজেদের নীতিহীন, আদর্শহীন লুটেরা রাজনীতির বর্ম হিসেবে এদের ধর্মকে ব্যবহার করতে হয়। দুর্ভাগা ও গরিব সাধারণ মানুষকে মানবেতর জীবনের জন্য অদৃষ্টনির্ভর বানাতে হয়। অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারগ্রস্ত, ব্যক্তিগত জীবনযাপনে তুমুল বিলাসী ও লোভী এসব নানা পরিচয়ের ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আশ্রয় করে জোট বেঁধেছে বিএনপি। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও সমানভাবে পাল্লা দিচ্ছে। কখনো হেফাজতকে প্রশ্রয়, কখনো নিজেদের ওলামা সংগঠনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নিজেদের ধার্মিক পরিচয়টি উজ্জ্বল করতে চেয়েছে। যে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হিসেবে তারা নিজেদের দাবি করে, সেই ধর্মে নিষেধ থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিল সিলেটের হজরত শাহজালালের মাজার থেকে। নির্বাচনী স্লোগানে আল্লাহকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছে। আওয়ামী লীগ বলেছে, ‘নৌকার মালিক তুমি আল্লাহ’। ‘ধানের শীষে বিসমিল্লাহ’ বলেছে বিএনপি। আর জামায়াতের সব খুনি গোষ্ঠী বলেছে, ‘ভোট দিলে পাল্লায়, খুশি হবে আল্লায়’। ধর্মকে এরা নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছে। এই জায়গায় এরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে এককাট্টা। শুধু দলের নাম আলাদা। উদ্দেশ্য এক।
যত দিন যাচ্ছে, রাষ্ট্রের অকার্যকর ও স্বৈরতান্ত্রিক চেহারা উৎকট হয়ে উঠছে। অভিজিৎ রায়কে খুন করার প্রতিবাদে ৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র জোটের মিছিলে ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীদের হুমকি দিয়ে মতিহার জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার বলেছেন, ‘ক্যাম্পাসে শুধুই ছাত্রলীগ মিছিল করতে পারবে, আর কেউ না (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম, ৪ মার্চ)। বোঝা যাচ্ছে, পুলিশও যেন আওয়ামী লীগ করছে এখন।
কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস সম্ভবত বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। পদ্মা সেতুর নির্মাতা চীনা প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান সেতুর পাইলিংয়ের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করার দিনে কালো রঙের গরু-ছাগল বলি দিয়ে এদের রক্ত পদ্মা নদীতে ঢালল এই প্রত্যাশায়, নির্মাণকাজ যেন নির্বিঘ্নে শেষ হয়। হায় কমরেড মাও সে তুং! আপনি বেঁচে থাকলে কি এদের কুৎসিত গালে কষে থাপড় মারতেন? কিছুদিন আগে পবিত্র হজ পালন করে আসা বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির শীর্ষ নেতা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ছাত্রমৈত্রীর সম্মেলনে ভাষণ দিয়ে বলেছেন, ‘ছাত্রসমাজের সংগ্রামী রূপ ম্লান হয়ে গেছে।...ছাত্রসমাজ আগের মতো জাগ্রত থাকলে অভিজিৎ হত্যার মতো ঘটনা ঘটত না। ভেবেছিলাম অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর অন্তত ছাত্রসমাজ ফুঁসে উঠবে। কিন্তু সেখানেও ঘাটতি রয়ে গেল’ (প্রথম আলো, ৪ মার্চ)।
কেন এমন হলো মেনন ভাই? আপনিও জানেন না?
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
mzaamanbabu71@gmail.com