Showing posts with label অস্ট্রেলিয়া. Show all posts
Showing posts with label অস্ট্রেলিয়া. Show all posts

Monday, May 18, 2026

সন্ধান পাওয়া গেল ‘শিংযুক্ত’ মৌমাছির

অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা ‘শিংযুক্ত’ এক নতুন মৌমাছির প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘মেগাকাইল লুসিফার’।

অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডফিল্ডস অঞ্চলের ব্রেমার রেঞ্জেস এলাকায় একটি বিরল বুনো ফুল পর্যবেক্ষণ করার সময় গবেষকেরা এই মৌমাছির সন্ধান পান। এই ফুল শুধু ওই এলাকাতেই জন্মে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই মৌমাছির স্ত্রী প্রজাতির মাথায় রয়েছে ক্ষুদ্র কিন্তু স্পষ্ট ‘শিং’। এ শিং সম্ভবত আত্মরক্ষার কাজে, মধু বা পরাগ সংগ্রহে, কিংবা বাসা বানাতে রেজিন–জাতীয় উপাদান জোগাড়ে সহায়তা করে।

গবেষণার নেতৃত্ব দেন অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী কিট প্রেন্ডারগাস্ট। তিনি বলেন, স্ত্রী মৌমাছিটির মুখে ছোট ছোট শিং রয়েছে। নেটফ্লিক্সে লুসিফার নামের ধারাবাহিকটি দেখার সময় এটি আবিষ্কার করা হয়। তাই নামটি একেবারেই উপযুক্ত মনে হয়েছে।

‘লুসিফার’ শব্দটি লাতিন ভাষায় ‘আলো-বাহক’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। গবেষক প্রেন্ডারগাস্ট জানান, এই নামের মাধ্যমে তিনি দেশীয় মৌমাছি সংরক্ষণের গুরুত্ব এবং বিপন্ন উদ্ভিদের পরাগায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে চেয়েছেন।

এই আবিষ্কার–সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি জার্নাল অব হাইমেনোপটেরা রিসার্চ–এ প্রকাশিত হয়েছে। যে এলাকায় নতুন মৌমাছি ও বিরল বুনো ফুলটি পাওয়া গেছে, সেটিকে সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা এবং সুরক্ষিত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকেরা।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-11%2Fm404q8r3%2Fbee.jpg?rect=0%2C0%2C916%2C611&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
এই মৌমাছির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মেগাকাইল লুসিফার’ ছবি: বিবিসি থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট

Friday, February 13, 2026

অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী দলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন, নতুন নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর

বড় ধরনের নাটকীয়তা আর ভোটের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান বিরোধী দল লিবারেল পার্টির নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আজ শুক্রবার সকালে ক্যানবেরায় দলের সংসদীয় কমিটির ভোটাভুটিতে সুসান লিকে পরাজিত করে নতুন নেতা নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাঙ্গাস টেইলর। ৩৪-১৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে তিনি এখন অস্ট্রেলিয়ার বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসলেন।

অ্যাঙ্গাস টেইলরের এই জয়ের পরপরই সুসান লি রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ অবসর নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে নিউ সাউথ ওয়েলসের ‘ফারের’ আসনটি তাঁর দখলে ছিল। সুসান লি বলেছেন, তিনি এখন তাঁর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চান এবং নিজের আজীবনের শখ বিমান চালনায় আরও বেশি মনোনিবেশ করতে চান। তাঁর এই আকস্মিক বিদায়ে ওই আসনে এখন উপনির্বাচন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

এদিকে দলের উপনেতা নির্বাচিত হয়েছেন ভিক্টোরিয়ার সিনেটর জেন হিউম। তিনি টেড ও’ব্রায়েনকে ৩০-২০ ভোটে পরাজিত করেন।

নতুন নেতৃত্ব অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সময় আজ বিকেলেই গণমাধ্যমের সামনে তাঁদের আগামীর কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। জেন হিউম বলেন, তাঁরা লিবারেল পার্টিকে বাম বা ডানের সংকীর্ণতায় না আটকে বরং সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান। নতুন নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসনসংকটের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

সংবাদ সম্মেলনে অভিবাসন নীতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে টেইলর বলেন, অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থ রক্ষায় একটি স্বচ্ছ অভিবাসনব্যবস্থা প্রয়োজন। তাঁর মতে, যারা এ দেশের মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, তারাই প্রকৃত অর্থে এ দেশের সম্পদ। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি দলের নতুন অভিবাসন নীতি প্রকাশ করবেন বলে জানান।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সুসান লির বিদায়ের ফলে শূন্য হওয়া ফারের আসনের উপনির্বাচন হবে অ্যাঙ্গাস টেইলরের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা। একদিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হেলেন ডাল্টন এবং অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী দল ওয়ান নেশনের বার্নাবি জয়েস এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে এখন নতুন এক মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী দল লিবারেল পার্টির নতুন নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর ও উপনেত্রী জেন হিউম
অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী দল লিবারেল পার্টির নতুন নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর ও উপনেত্রী জেন হিউম। ছবি: অ্যাঙ্গাস টেইলরের ফেসবুক থেকে

Wednesday, February 11, 2026

ঘোড়ায় চেপে অস্ট্রেলিয়ায় ৪,৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেন মার্কিন তরুণী

নিজের প্রিয় ঘোড়া ফ্যাবলের পিঠে চেপে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন মার্কিন অশ্বারোহী জিন জ্যাগোলা।

জিন জ্যাগোলা তাঁর ঘোড়া ফ্যাবলের পিঠে চেপে গত বছরের ২০ মে যাত্রা শুরু করেন। ফ্যাবল কোনো প্রশিক্ষিত ঘোড়া নয়, এটি ব্রাম্বি বা বুনো ঘোড়া। ব্রাম্বি অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরে বেড়ায়। সেখানে এসব ঘোড়াকে ‘ওয়াইল্ড হর্স অব অস্ট্রেলিয়া’ নামে ডাকা হয়।

পর্যটক বা সাধারণ মানুষ অস্ট্রেলিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ভ্রমণ করতে সাধারণত গাড়ি বেছে নেন। কিন্তু ২৫ বছর বয়সী জ্যাগোলার বেছে নেন ঘোড়া, তাও আবার বুনো ঘোড়া।

জ্যাগোলা অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণ উপকূলীয় শহর ট্যাথরা থেকে যাত্রা শুরু করেন। তিনি ভিক্টোরিয়া ও সাউথ অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের উপকূল ধরে নুলারবোর সমভূমি দিয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হন এবং ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের পার্থে যাত্রা শেষ করেন।

জ্যাগোলা বলেন, তিনি খুবই সতর্কভাবে আট মাস ধরে এ পথ পাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর ঘোড়া দিনে সর্বোচ্চ ৩২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। এভাবে আট মাসে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার (২ হাজার ৭০০ মাইল) পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। পার্থ শহর থেকে ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণের বুসেলটনের ফরেস্ট বিচে তাঁদের যাত্রা শেষ হয়।

এই তরুণী বলেন, ‘আমি সব সময় ফ্যাবলের সুস্থতাকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তাই, প্রতি এক ঘণ্টা ঘোড়া চড়ার পর আমরা ১০ মিনিট করে বিরতি নিতাম। এ ছাড়া দিনের প্রায় এক–চতুর্থাংশ সময় আমি হেঁটেছি, যেন ফ্যাবলের পিঠ খানিকটা বিশ্রাম পায়।’

জিন জ্যাগোলার বাড়ি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া। তিনি এর আগে নিজে দেশে ঘোড়ার পিঠে চড়ে লম্বা পথ পাড়ি দিয়েছেন।

জ্যাগোলা বলেন, ‘যখন আমি অস্ট্রেলিয়ার ব্রাম্বি ঘোড়া সম্পর্কে জানতে পারি, এটি সত্যিই আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি এখানে এসে একটি ব্রাম্বিকে নিজে একেবারে শুরু থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সেটির পিঠে চেপে এই মহাদেশ অতিক্রম করার অনুপ্রেরণা পাই।’

কোসচিউসকো ন্যাশনাল পার্কের একটি বুনো ব্রাম্বি ছিল ফ্যাবল। ভিক্টোরিয়ান ব্রাম্বি অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে সেটিকে দত্তক নেন জ্যাগোলা।

জ্যাগোলা বলেন, তিনি যখন প্রথম ফ্যাবলকে দেখেন, সেটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু সেটির আচরণ তখনো পুরোপুরি বুনো ঘোড়ার মতো ছিল।

এই মার্কিন তরুণী বলেন, ‘যাত্রা শুরু করার আগে আমি প্রায় ছয় থেকে আট মাস পরিকল্পনা করেছি। এরপর ফ্যাবলকে তিন মাস প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমি নিজেকে বলেছিলাম, “ঠিক আছে, হয় সবকিছু ভালোভাবে হবে এবং আমি বুঝতে পারব, আমরা এটা আসলেই করতে পারি, নইলে সবকিছু পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং আমরা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যাব”।’

জ্যাগোলা অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সরল সড়ক নুলারবোর সমভূমি অতিক্রম করেছেন, যা প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার বিস্তৃত।

প্রতিদিন রাতে জ্যাগোলা তাঁর ঘোড়ার পাশেই ঘুমিয়েছেন। তাদের সঙ্গে ছিল একটি তাঁবু আর স্যাডল ম্যাট। শুরুতে অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে জ্যাগোলার খুব বেশি চেনাজানা ছিল না, বিশেষ করে নুলারবার পার হওয়ার সময়। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত সফলভাবে এ সফর শেষ করতে পেরেছেন।

জ্যাগোলা বলেন, ‘আমি সত্যিই বুনো ঘোড়ার প্রেমে পড়ে গেছি।’

এ সফর শেষ করার পর জিন জ্যাগোলা ২০ জানুয়ারি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে (জিন অ্যান্ড ফ্যাবল) একটি পোস্ট দেন।

এতে জ্যাগোলা লেখেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব থেকে পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত, ৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। একটি ঘোড়ার সঙ্গে একটি মহাদেশ অতিক্রম করা প্রথম ব্যক্তি আমি। আমার চিরসত্য ও সাহসী সাথি, যাকে আমি সবকিছুর জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। ফেবল, দ্য স্নো মাউন্টেন ব্রাম্বি।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-30%2F5kirmrp0%2FGin-Szagola.jpg?rect=0%2C0%2C750%2C500&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ফ্যাবলের পিঠে জিন জ্যাগোলা। ছবি: জিন জ্যাগোলার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

Tuesday, February 10, 2026

ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের সফর ঘিরে উত্তাল সিডনি, পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ

প্রকাশ ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের রাষ্ট্রীয় সফরকে কেন্দ্র করে আজ সোমবার সিডনির রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠেছে। একদিকে বন্ডাই সৈকতে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, অন্যদিকে নগরের প্রাণকেন্দ্র টাউন হলে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের সফরের প্রতিবাদে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ—এই দুই বিপরীতমুখী চিত্রে দিনভর টালমাটাল ছিল অস্ট্রেলিয়ার এই বাণিজ্যিক রাজধানী।

সফরের প্রথম ভাগে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট হারজগ বন্ডাই প্যাভিলিয়নে গিয়ে নিহত ইহুদিদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং জেরুজালেম থেকে আনা বিশেষ পাথর স্থাপন করেন।

এ সময় নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ক্রিস মিনস ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। তবে এই সফরকে কেন্দ্র করে সিডনির রাজপথ ছিল উত্তপ্ত। প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গ্রুপের ডাকে হারজগকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে টাউন হলের সামনে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সমবেত হন।

ফিলিস্তিনি পতাকা ও প্রতীকী রক্তাক্ত পুতুল হাতে নিয়ে বিক্ষোভকারীরা গাজায় চলমান পরিস্থিতির নিন্দা জানান। একই সঙ্গে তাঁরা হারজগকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

বিকেলের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সুপ্রিম কোর্ট পুলিশের বিশেষ ক্ষমতা বহাল রাখায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশকে ঘুষি চালাতে এবং তীব্র ঝাঁজালো মরিচের গুঁড়া ব্যবহার করতে দেখা যায়।

অনেক বিক্ষোভকারী পুলিশের ব্যারিকেড আঁকড়ে ধরে প্রতিরোধের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরেজমিনে দেখা যায়, সিডনি সময় রাত ১০টা পর্যন্ত এ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।

প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গ্রুপ পুলিশের এই আচরণকে ‘বর্বর হামলা’ হিসেবে অভিহিত করে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের নিন্দা জানিয়েছে।

সিডনির আকাশজুড়ে পুলিশের হেলিকপ্টার ও ড্রোনকে চক্কর দিতে দেখা গেছে। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এই সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংঘর্ষের কারণে সিডনির জনজীবন ও যাতায়াতব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রতিবাদে সিডনিতে ফিলিস্তিনপন্থীদের বিক্ষোভ। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সিডনির টাউন হল
ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রতিবাদে সিডনিতে ফিলিস্তিনপন্থীদের বিক্ষোভ। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সিডনির টাউন হল। ছবি: এএফপি

Tuesday, December 30, 2025

সিডনির হত্যাযজ্ঞ গাজার কোনো গণহত্যাকে ঢাকতে পারবে না by গিডিয়ন লেভি

দুই খুনি যখন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বন্ডি সমুদ্রসৈকতে গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা করছিল, তখন গাজার খান ইউনিস সৈকতে এক নারী একটা ঝাড়ু নিয়ে সয়লাব হয়ে যাওয়া তাঁর তাঁবু থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছিলেন। এই তাঁবুটাকেই তিনি তাঁর ঘর বলে মেনে নিয়েছেন। এ সময় তিনি চিৎকার করে তাঁর বাচ্চাদের করুণ দশা দেখাচ্ছিলেন। ছিন্ন ও ভেজা পোশাকে বাচ্চাগুলো ঠান্ডায় বারবার শিউরে উঠছিল। কিন্তু না। কেউই তাঁর কথা শোনেনি। সারা দুনিয়ার নজর তখন সিডনি হত্যাযজ্ঞের দিকে।

পরের দিনগুলোয় সারা দুনিয়া ১৫ জন ইহুদিকে নৃশংসভাবে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের জন্য শোক প্রকাশ করতে থাকল। যা ঘটেছে তা সবাইকেই ভয়ার্ত করে তোলে। বন্ডি হত্যাকাণ্ড অবশ্যই বৈশ্বিক শোক প্রাপ্য। কিন্তু এই যে শোক, তা তো একাধারে দ্বিচারিতা, প্রতারণামূলক ব্যবহার ও দ্বৈত নীতি দিয়ে ভরা। সবার প্রথমেই বলতে হয় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথা, যিনি তড়িঘড়ি করে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করলেন।

নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে দায় নেওয়ার একটা বা দুটো বিষয় জানেন। আর তাই চট করে তিনি অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিযুক্ত করলেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। তার মানে তিনি বোঝাতে চাইলেন যে এই হত্যাকাণ্ড ও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে!

আসলে যেকোনো সন্ত্রাসী হামলা থেকেই রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ও প্রচারণা চালানোর কোনো সুযোগই ইসরায়েল কখনো হাতছাড়া করে না। এ রকম হামলা হতে পারে বলে মোসাদ যে একটা পূর্বাভাস দিয়েছিল, অস্ট্রেলিয়া তা উপেক্ষা করেছে—তাৎক্ষণিকভাবে এই তথ্যটাও ছড়িয়ে দেওয়া হলো। ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এ রকম যে অস্ট্রেলীয়রা তো সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করতে জানে না, এমনকি তারা তা করতে চায়ও না! অথচ আমাদের [ইসরায়েলিদের] দিকে তাকালে তারা দেখত যে এখানে কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়নি!

একজন ইসরায়েলি মন্ত্রী তো সিডনিতে উড়ে গেলেন নিহত ব্যক্তিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগদান করতে। জেরুজালেম থেকে সিডনির দূরত্ব যত দ্রুত অতিক্রম করা গেল, তার চেয়ে শতগুণ কম দূর হওয়ার পরও জেরুজালেম থেকে নির ওজে কোনো সরকারি প্রতিনিধির দেখা মেলেনি গাজা যুদ্ধে নিহত নিজ দেশের নাগরিকদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে। [২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় গাজা–সংলগ্ন নির ওজে সবচেয়ে বেশি ইসরায়েলি নিহত হয়েছিল।] অথচ তাঁরাই আবার ‘কীভাবে অস্ট্রেলীয় সরকার ইহুদিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় একজন প্রতিনিধি না পাঠিয়ে থাকতে পারল?’ বলে উষ্মা প্রকাশ করছে। এহেন অতি স্পর্ধা তো সব সীমা অতিক্রম করে গেছে।

অবশ্য একটা কৌতুককর স্বস্তি নেমে আসে যখন জানা গেল যে একজন অস্ট্রেলীয়-সিরীয় কয়েকজন ইহুদির প্রাণ বাঁচিয়েছে। নেতানিয়াহু তো ইহুদিদের বীরগাথা বর্ণনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আহমদ আল আহমদ নামের ব্যক্তিটি সাহসিকতার সঙ্গে এক হত্যাকারীর বন্দুক কেড়ে নিয়ে তাকে নিরস্ত্র করে ফেলে—এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলিদের জন্য ‘বিব্রতকর’ হয়ে যায়। সব মুসলমান ও আরব সহজাতভাবেই খুনের জন্য অপরাধী—এহেন প্রচারণাও থেমে যায়।

এটা কি সম্ভব যে একজন আরব এ রকম সাহস ও মানবিকতা দেখিয়েছেন? কয়েক মুহূর্তের জন্য আরেকটা তাসের ঘর ধসে পড়ল। অবশ্য তার জায়গায় স্থান করে নিল ইহুদিবিদ্বেষ (অ্যান্টি-সেমিটিজম) নিয়ে বিতর্ক যদিও এটা খুব পরিষ্কার যে হত্যাকারীরা আইএসআইএসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর আইএসআইএসের লড়াই শুধু ইহুদিদের বিরুদ্ধে নয়, বরং গোটা পশ্চিমের বিরুদ্ধে।

এমনকি ইরানকে দায়ী করার চিরাচরিত প্রয়াসও তথ্যগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে উঠল। ইরান ও আইএসআইএস পরস্পরের শত্রু। সবচেয়ে বড় লজ্জার বিষয় হলো হামলাকারীরা কেউই ফিলিস্তিনি নয়! সেটা হলেই তো কাজ সেরে যেত, জোর প্রচারণা ও ফায়দা লোটার মাত্রা অনেক বাড়ত।

তবে যাই হোক না কেন, এই ধরনের সন্ত্রাসী হামলা ইসরায়েলি প্রচারণাকে সহায়তা করে, ইসরায়েলি ও ইহুদিদের বিপর্যয়ের একই পাত্রে ধারণ করে। সারা দুনিয়া যখন আমাদের বিরুদ্ধে তখন এভাবে একত্র হওয়াটা তো খুব ভালো বিষয়, নয় কি?

সর্বোপরি রয়েছে দ্বৈত মানে কালো মেঘ: সিডনির এক সৈকতে ১৫ জন মানুষের হত্যাকাণ্ড গাজার ভয়াবহ সব বড় বড় গণহত্যাগুলোকে ঝাপসা করে দিল। অথচ বন্ডি সৈকতে ছিল মাত্র দুজন হত্যাকারী। আর গাজায়? গোটা একটি দেশ ও তার সশস্ত্র বাহিনী এসব গণহত্যা চালিয়েছে, চালাচ্ছে। এইতো সেদিন, ১৮ জন শিশুসহ ৩৬ জন মানুষ মারা গেল গাজার বেইত হানাউনের এক স্কুলে ইসরায়েলি হামলায়। এ রকম আরও অনেক হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে, এমনকি কথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেও শত শত নিরীহ গাজাবাসী এখনো মারা পড়ছে।

না, বন্ডি সৈকতের হত্যাযজ্ঞ গাজা উপত্যকার সব গণহত্যাকে ঢেকে দিতে পারবে না। তবে ফিলিস্তিনিরা অশ্রুসজল চোখে কেবল দেখবে যে তাঁদের ধসে পড়া তাঁবুগুলো তাঁদের শীতার্ত বাতাসের চাবুক থেকে রক্ষা করতে পারেনি। বরং সারা দুনিয়া বন্ডি শোকে আক্রান্ত হয়ে তাঁদের কত দ্রুত ভুলে গেছে!

* গিডিয়ন লেভি, ইসরায়েলের সাংবাদিক। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লিখে আসছেন।
- হারেৎজ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ আসজাদুল কিবরিয়া

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-08%2Fjustnmop%2FCapture.PNG?rect=0%2C0%2C945%2C630&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজায় ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছে ফিলিস্তিনি কিশোরেরা। গাজা নগরীর আল-শাতি শরণার্থীশিবিরের পাশে। ছবি: এএফপি

Monday, December 22, 2025

বন্দুক হামলায় নিহতদের স্মরণ অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে দুয়ো

অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে নিহতদের স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ। এক সপ্তাহ আগে এ সৈকতে ইহুদিদের হানুক্কা উৎসবে দুই বন্দুকধারীর হামলায় ১৫ জন নিহত ও অনেকে আহত হয়েছিলেন।

ওই বন্দুক হামলার স্মরণে রোববার অস্ট্রেলিয়ায় জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। সরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।

১৪ ডিসেম্বর হামলা শুরু হয়েছিল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪৭ মিনিটে। রোববার ঠিক একই সময়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

বন্ডাই সৈকতে আয়োজিত শোক অনুষ্ঠানে আলবানিজসহ দেশটির অন্য নেতারা অংশ নেন। হাজার হাজার মানুষের এ অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আশপাশের ভবনের ছাদে স্নাইপার এবং সমুদ্রে নৌ-পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

আলবানিজ বন্ডাই সৈকতে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে দর্শকেরা দুয়োধ্বনি দিতে শুরু করেন। স্মরণ অনুষ্ঠানে বক্তাদের নামের তালিকায় আলবানিজের নাম ছিল না। কিন্তু একপর্যায়ে বক্তৃতার জন্য তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়। তাঁর নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকসারি থেকে আবারও দুয়োধ্বনি ওঠে। অনুষ্ঠানের সামনের সারিতে বসা আলবানিজের মাথায় ইহুদিদের ঐতিহ্যবাহী টুপি ‘কিপ্পা’ দেখা গেছে।

গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার শুরুর পর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় ইহুদিবিদ্বেষ বেড়েছে। এটা নিয়ে শুরু থেকে আলবানিজের মধ্য-বামপন্থী সরকার চাপে ছিল। বন্ডাই হামলার পর তা আরও বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বাড়বাড়ন্ত ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ন্ত্রণে আলবানিজ সরকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি।

কিন্তু সরকার বলেছে, তারা গত দুই বছরে ধারাবাহিকভাবে ইহুদিবিদ্বেষের নিন্দা জানিয়েছে এবং ঘৃণামূলক বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে আইন পাস করেছে। ইহুদিবিদ্বেষ থেকে করা দুটি অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তেহরানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলে চলতি বছরের শুরুতে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে আলবানিজ সরকার।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তৃতায় নিউ সাউথ ওয়েলসের জিউয়িশ বোর্ড অব ডেপুটিজের প্রেসিডেন্ট ডেভিড অসিপ বলেন, ‘আমরা নিরাপদ থাকার অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছি…। গত সপ্তাহ আমাদের নিরাপদ থাকার অনুভূতি কেড়ে নিয়েছে।’

ইহুদি জনগোষ্ঠীর এই নেতা বলেন, ‘বন্ডাইয়ের এই ঘাসের মতো আমাদের জাতির গায়েও রক্তের দাগ লেগেছে। আমরা এক অন্ধকার জায়গায় এসে পড়েছি। কিন্তু বন্ধুরা, হানুক্কার শিক্ষা হলো—আলো ঘোরতর অন্ধকার স্থানকেও আলোকিত করতে পারে। একটি সাহসী পদক্ষেপ, আশার একটি আলোকচ্ছটা আমাদের পথ নির্দেশ করতে এবং দিশা দেখাতে পারে।’

দুই বন্দুকধারীর একজনকে নিরস্ত্র করেছিলেন আহমেদ আল আহমেদ নামের এক ব্যক্তি। গুলিবিদ্ধ আহমেদ এখন বীরের মর্যাদা পাচ্ছেন। স্মরণ অনুষ্ঠানে তাঁর বাবা উপস্থিত ছিলেন।

বন্দুক হামলা হয়েছিল হানুক্কা উৎসবের প্রথম দিন। রোববার ছিল ইহুদিদের বার্ষিক উৎসবটির অষ্টম ও শেষ দিন। হামলার স্মরণে ঘরে ঘরে মোমবাতি প্রজ্বলিত করতে নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

স্মরণ অনুষ্ঠানে হামলায় আহত ১৪ বছর বয়সী চায়া দাদোন বলেন, ‘একটি জাতি হিসেবে আমরা শক্তিশালী হচ্ছি। আমরা বিকশিত হচ্ছি। বিকশিত হতে গিয়ে আমরা কখনো কখনো আঘাত পাই...কিন্তু জীবন এগিয়ে চলে। তাহলে কেন আমরা সেরা জীবনটা যাপন করব না?’

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আগে দেশের আইনশৃঙ্খলা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনার ঘোষণা দেন আলবানিজ। এর আগে তিনি নিজেদের অস্ত্র আইন আরও কঠোর করারও ঘোষণা দিয়েছিলেন।

এদিকে রোববার সকালে সিডনি ও মেলবোর্নে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। এ বিক্ষোভে মাত্র ২০০–এর মতো মানুষ অংশ নিয়েছেন। আলবানিজ এসব বিক্ষোভের সমালোচনা করেছেন।

বন্ডাই সৈকতের বন্দুক হামলায় অংশ নেওয়া দুজন সম্পর্কে বাবা–ছেলে। এর মধ্যে ৫০ বছর বয়সী সাজিদ আকরামকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়। আর তাঁর ২৪ বছর বয়সী ছেলে নাভিদ আকরাম ঘটনাস্থলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। সাজিদ আকরামের বিরুদ্ধে হত্যা, সন্ত্রাসবাদসহ ৫৯টি অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি এখন পুলিশ হেফাজতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-21%2Fe2vey95f%2FAustralias-Prime.JPG?rect=0%2C2%2C5014%2C3343&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে নিহতদের স্মরণ অনুষ্ঠানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ। বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

Saturday, December 20, 2025

সিডনি সৈকতে রক্তপাত: ‘ইসলামভীতি’ বনাম ‘ইহুদিবিদ্বেষ’ by কাউসার খান

১৪ ডিসেম্বর সিডনির বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে ঘটে যাওয়া নৃশংস রক্তপাত কেবল অস্ট্রেলিয়ার গত ৩০ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাই ছিল না, এটি ছিল বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা আমাদের মানবিক সত্তার ওপর এক চরম আঘাত। ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের আলোক উৎসব ‘হানুক্কাহ’ উদ্‌যাপনের প্রথম সন্ধ্যায় যখন হাজারের বেশি মানুষ সমবেত হয়েছিলেন, তখন দুই বন্দুকধারীর নির্বিচার গুলিবর্ষণ ১৫টি তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এই ঘটনার পর সিডনির আকাশে-বাতাসে এখন থমথমে শোকের ছায়া কিন্তু এর চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠছে এই ট্র্যাজেডিকে ঘিরে শুরু হওয়া ট্যাগিং বা তকমা লাগানোর অসুস্থ চর্চা।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ যখন জাতীয় ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দানে আমরা দেখছি এক নজিরবিহীন ‘ন্যারেটিভ’ বা বর্ণনার লড়াই। এক পক্ষ একে ‘ইসলামভীতি’ ছড়ানোর হাতিয়ার বানাচ্ছে। অন্য পক্ষ ‘ইহুদিবিদ্বেষ’-এর তকমা দিয়ে আক্রমণাত্মক বয়ান তৈরি করছে। অথচ এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে সত্যটি আজ সিডনির সেন্ট জর্জ হাসপাতালের বিছানায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শুয়ে আছে, তা হলো মানুষের পরিচয় তার কর্মে; তার চামড়ার রঙে বা ধর্মীয় তকমায় নয়।

বন্ডাইয়ের সেই বিভীষিকাময় সন্ধ্যায় ৪৩ বছর বয়সী ফল ব্যবসায়ী আহমেদ আল আহমেদ যা করেছেন, তা তকমা লাগানো এই বিভাজনের রাজনীতিকে এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। তিনি যখন খালি হাতে একজন সশস্ত্র সন্ত্রাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বন্দুক কেড়ে নিচ্ছিলেন, তখন তিনি কোনো ধর্ম বা গোত্রকে বাঁচাতে যাননি, তিনি গিয়েছিলেন মানুষকে বাঁচাতে। আহমেদ নিজে একজন সিরীয় অভিবাসী, যিনি এক দশক আগে সন্ত্রাসবাদের আগুন থেকে বাঁচতে সিডনিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অন্যদিকে ঘাতক হিসেবে নাম এসেছে সাজিদ আকরাম ও তাঁর ছেলে নবীদ আকরামের। সাজিদ ১৯৯৮ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় এই দেশে এসেছিলেন।

এই সমীকরণ আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়, যদি সিডনির রাজপথে গুলি চালানো ব্যক্তিটি মুসলমান হয়ে থাকে, তবে সেই ঘাতককে রুখে দিয়ে শত শত মানুষের জীবন বাঁচানো প্রথম ব্যক্তিটিও একজন মুসলমান। অথচ আমাদের সমাজ আজ মানুষকে ‘বাইনারি’ বা দ্বিমাত্রিক ছকে বিচার করতে অভ্যস্ত। হয় ভালো, নয় খারাপ; হয় আমাদের লোক, নয় তাদের লোক। আহমেদ আল আহমেদের বীরত্ব এই ঘৃণা ছড়ানোর যন্ত্রগুলোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে শয়তান সবখানে আছে, কিন্তু দেবত্ব বা মানবতাও সবখানে বিরাজমান।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই শোকাবহ ঘটনাকেও অসুস্থ চর্চা বা রাজনীতিকরণের চেষ্টা থেমে নেই। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করে একে ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ফল বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় অংশ একে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা সাজানো নাটক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টায় লিপ্ত। এ ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব কেবল বিভেদকেই উসকে দেয়। অতীতে ১৯৫০-এর দশকে ইরাকের ইহুদিদের সঙ্গে যা ঘটেছিল, তা ইতিহাসের পাতায় ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি করলেও আজ বন্ডাইয়ের রক্ত কোনো নাটক নয়; এটি ১৫টি পরিবারের চিরস্থায়ী হাহাকার।

এই হামলার পর অভিবাসীদের প্রতি সন্দেহের দৃষ্টি আরও প্রখর হবে, এটা অনেকটা নিশ্চিত। বিশেষ করে বাদামি চামড়ার মানুষ তা সে ভারতীয় হোক বা পাকিস্তানি কিংবা বাংলাদেশি; তাদের ভিসা বা বসবাসের ক্ষেত্রে আরও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি উদার দেশেও যদি এখন ধর্ম বা উৎপত্তিস্থলের ভিত্তিতে তকমা লাগানো শুরু হয়, তবে তা হবে চরম দুর্ভাগ্যজনক।

সিডনি থেকে বসে আজ যা অনুভব করছি, তা হলো আমরা যেন মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে ভুলে যাচ্ছি। আমরা ব্যস্ত কে ঘাতক তার ধর্ম খুঁজতে কিন্তু ভুলে যাচ্ছি সেই ঘাতককে থামানো বীরের পরিচয়। আহমেদ আল আহমেদের শরীরে আজ দুটি বুলেটের ক্ষত কিন্তু তাঁর এই ক্ষতগুলো আমাদের সমাজের ঘৃণার ক্ষত মোছার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আলবানিজের উচিত আহমেদের মতো নায়কদের গল্পকে ঘৃণার বাণীর চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া।

সন্ত্রাসবাদের কোনো ধর্ম নেই, কোনো দেশ নেই। যে সন্ত্রাস ছড়িয়েছে, তার কঠোরতম শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু যারা এই রক্তপাতের ওপর দাঁড়িয়ে ঘৃণার রাজনীতি করছে, তাদেরও পরাজিত করা জরুরি। সিডনি তথা পুরো বিশ্বের উচিত এখন ঘৃণা নয় বরং শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের পথে ফেরা।

আহমেদ আল আহমেদ আমাদের দেখিয়েছেন কীভাবে মানবতা রক্ষা করতে হয়। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো তাঁকে অনুসরণ করে বিভাজনের রাজনীতি বন্ধ করা এবং মানুষকে কেবল মানুষ হিসেবেই সম্মান করা। অন্যথায় ঘৃণা জয়ের পথে সন্ত্রাসবাদই চূড়ান্তভাবে সফল হবে।

* কাউসার খান, প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অভিবাসন আইনজীবী
- kawsark@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-17%2Fuj1njpdd%2Fahmedajj.JPG?rect=3%2C0%2C557%2C371&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ফল ব্যবসায়ী আহমেদ আল আহমেদ যা করেছেন, তা তকমা লাগানো এই বিভাজনের রাজনীতিকে এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। ছবি : এএফপি

Thursday, December 18, 2025

ভুয়া ‘বীর’, হামলাকারীর ভিন্ন পরিচয়—সিডনির হামলা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি

অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে ইহুদি উৎসবে গুলির ঘটনায় হতাহতের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন ভুল ও ভুয়া তথ্যের স্রোত বইছে। বিশেষ করে একজন বন্দুকধারীকে নিরস্ত্র করে প্রশংসায় ভাসা এক ‘নায়কের’ পরিচয় নিয়ে ইলন মাস্কের এআই চ্যাটবট ‘গ্রোকের’ ভুল তথ্য দেওয়ার ঘটনা আলোচনায় উঠে এসেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে গত রোববার সন্ধ্যায়। সিডনির বন্ডাই সৈকতে ইহুদিদের হানুক্কেহ উৎসবে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ১৫ জনকে হত্যা করেন বাবা ও ছেলে সাজিদ আকরাম ও নাভিদ আকরাম। পুলিশের পাল্টা গুলিতে নিহত হন ৫০ বছর বয়সী সাজিদ। আর ২৪ বছরের নাভিদ পুলিশি পাহারায় হাসপাতালে আছেন।

এরই মধ্যে হামলাকারীদের পরিচয় নিয়ে নেট মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ভুল আর ভুয়া খবর। বলা হচ্ছে, ‘ব্রেকিং’ কোনো ঘটনার সময় এআই ব্যবস্থা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে মিথ্যা প্রচারকে আরও বাড়িয়ে তোলার বিষয়ে থাকা উদ্বেগের সর্বশেষ ঢেউ এটি।

সিডনির এ ঘটনায় ৪৪ বছর বয়সী আহমেদ আল আহমেদ নামের এক ব্যক্তি বন্দুকধারীর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেন। হামলাকারীকে নিরস্ত্র করে ‘নায়ক’ বনে যান তিনি। যদিও নিজেও হাত ও বাহুতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এখন তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

কিন্তু এআই চ্যাটবট গ্রোকে অন্য একজনকে ‘এ ঘটনার নায়ক’ হিসেবে দেখানো হয়। ভুয়া একটি সংবাদে বলা হয়েছে, হামলাকারীকে নিরস্ত্র করা ওই ‘নায়কের’ নাম ‘এডওয়ার্ড ক্র্যাবট্রি’। বয়স ৪৭ বছর। তিনি পেশায় আইটি বিশেষজ্ঞ। এমনকি সংবাদটিতে ‘হাসপাতালে আহত অবস্থায় শুয়ে থাকা’ ভুয়া ‘এডওয়ার্ডের’ বানোয়াট মন্তব্য প্রকাশ করা হয়।

‘দ্যডেইলিএইউএস.ওয়ার্ল্ড’ নামের একটি ওয়েবসাইট থেকে ভুয়া সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল। রোববারই আইসল্যান্ডে এ ওয়েবসাইট নিবন্ধন করা হয়েছে। জানা গেছে, যুব সংবাদ ওয়েবসাইট ‘দ্য ডেইলি এইউএস’–এর সঙ্গে এই ওয়েবসাইটের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

সিডনিতে জন্ম নেওয়া সাইবার নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ ও ‘বাগক্রাউডের’ প্রতিষ্ঠাতা ক্যাসি এলিসের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি থাকে। হোয়াইট হাউস ও অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পরামর্শ দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য, দুঃখজনক ও আবেগময় একটি ঘটনা। এটা লাখো মানুষের মনোভাবকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারে।’

এলিসের মতে, এমন ঘটনার (হামলা) পর যখন চারপাশে ‘ধোঁয়াশাপূর্ণ’ পরিস্থিতি থাকে, মানুষ নানা কিছু জানার জন্য বেশ উদ্‌গ্রীব থাকেন, ঠিক তখনই ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রচুর সুযোগ তৈরি হয়।

রবি ও সোমবার আহমেদ আল আহমেদকে নিয়ে একের পর এক ভুয়া তথ্য দিয়েছে গ্রোক। এতে ব্যবহারকারীরা যখন আহমেদের বন্দুকধারীর সঙ্গে লড়াইয়ের ভিডিওটি চ্যাটবটকে দেখান, তখন সেটি দাবি করে, ফুটেজটি ‘একজন লোকের পামগাছে ওঠার একটি পুরোনো ভাইরাল ভিডিও’।

অন্য আরেকটি ক্ষেত্রে আহত আহমেদের ছবিকে গাজায় ‘হামাসের হাতে আটক এক ইসরায়েলি জিম্মির’ ছবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

রেডিট, এক্স আর হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন গ্রুপ চ্যাটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে বানানো একটি ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে মেকআপ ও নকল রক্ত ​​লাগানো একজন ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আসল ছবিটি মানবাধিকার আইনজীবী আর্সেন অস্ট্রোভস্কির। রোববারের ওই হামলার সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা মুখ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলেছিলেন।

এ ছাড়া ঘটনাস্থলে থাকা দুজন নারী পুলিশ সদস্যের ক্রপ বা কাটছাঁট করে ছোট করা ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পূর্ব ইউরোপভিত্তিক ‘ব্যারন ট্রাম্প’ ফ্যান অ্যাকাউন্ট থেকে এটি পোস্ট করা হয়। এতে দাবি করা হয়, তাঁরা ‘পুরোপুরি নিথর’ বা মারা গেছেন। আরও বলা হয়, ‘বন্দুকধারীরা কোনো বাধা ছাড়াই ২০ মিনিট পর্যন্ত গুলি চালিয়েছে।’

ওই পোস্ট এক লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে। নারী বিদ্বেষমূলক প্রচুর মন্তব্য এসেছে। অথচ আসল ছবিটিতে (ক্রপ না করা) রয়েছে, বন্দুকধারীকে নিরস্ত্র করার পর ওই নারী পুলিশ সদস্যরা বেসামরিক লোকজনকে ঘটনাস্থল থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন।

নিউ সাউথ ওয়েলসে বসবাস করা পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, তাঁর জীবন রীতিমত ‘দুঃস্বপ্নে’ পরিণত হয়েছে। কেননা বন্ডাই সৈকতে ‘সন্দেহভাজন হামলাকারী’ হিসেবে তাঁর একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

ওই ব্যক্তির নামও নাভিদ আকরাম। বয়স ৩০ বছর। মূলত হামলাকারীর সঙ্গে নামের মিল থাকায় তাঁর ছবি ভাইরাল হয়েছে। ভুল করে তাঁকে ‘হামলাকারী’ ভাবছে অনেকেই। মূলত ভারতভিত্তিক অ্যাকাউন্টগুলো থেকে নাভিদের বিষয়টি ছড়িয়েছে বেশি। সিবিএস নিউজ নির্দোষ নাভিদের বিড়ম্বনা নিয়ে প্রতিবেদন করেছে।

ডোভার হাইটস ও ডাবল বেতে সমন্বিত হামলার মিথ্যা দাবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ একটি বিবৃতি দিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছে, ডোভার হাইটস এলাকায় এমন কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। দয়া করে অসমর্থিত তথ্য বা গুজব ছড়াবেন না।

অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশনারের দপ্তরে সিডনির হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ফুটেজ দেখানোর বিষয়ে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। কমিশনার নিয়ন্ত্রক প্ল্যাটফর্মগুলোকে মনে করিয়ে দিয়েছে, সংবেদনশীল আধেয়র (কনটেন্ট) ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক লেবেল ও ঝাপসা ফিল্টার ব্যবহার করা উচিত।

প্রতিক্রিয়া জানতে এক্সের এআই চ্যাটবটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। স্বয়ংক্রিয় উত্তর পাওয়া গেছে, ‘প্রথাগত বিদ্যমান সংবাদমাধ্যম মিথ্যা বলে।’

আহত আহমেদ আল আহমেদকে হাসপাতালে দেখতে যান অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ
আহত আহমেদ আল আহমেদকে হাসপাতালে দেখতে যান অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ। ছবি: রয়টার্স

অস্ট্রেলিয়ার সৈকতে হামলাকারীর পরিচয় নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য

অস্ট্রেলিয়ার বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে গত রোববার ঘটে মর্মান্তিক এক ঘটনা। এদিন ইহুদিদের একটি ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে সৈকতে জড়ো হয়েছিলেন শত শত মানুষ। এরই মাঝে হঠাৎ করে বাবা-ছেলে মিলে ওই অনুষ্ঠানে ভয়াবহ গুলি চালায়। যাতে ১৫ জন নিহত হয়। আর এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তে তা ভাইরাল হয়ে যায়। এরপরই অভিযানে নামে দেশটির পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় ছেলেকে। তবে গোলাগুলির ঘটনায় ঘটনাস্থলেই সন্দেহভাজন সাজিদ আকরাম পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তার ছেলে নাভিদ আকরামকে আটক করা হয়।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্রসৈকতে গোলাগুলির ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। যাতে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, হামলাকারীদের একজন সাজিদ আকরাম ১৯৯৮ সালে ভারতের হায়দ্রাবাদ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন। তেলেঙ্গানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনের পর সাজিদ তার বয়স্ক মা-বাবাকে দেখার জন্য ছয়বার ভারতে এসেছিলেন। তবে সাজিদ আকরাম ও তার ছেলে কী কারণে উগ্রপন্থায় জড়িয়েছেন তার সাথে ভারত কিংবা তেলেঙ্গানার স্থানীয় কোনো বিষয়ের যোগসূত্র নেই। এছাড়া সাজিদের বিরুদ্ধে ভারতে অপরাধ সংঘটনের কোনো রেকর্ডও নেই।

বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে হামলা করার আগে ওই বাবা-ছেলে ফিলিপাইন সফরে গিয়েছিলেন। সে সময়ে সাজিদ আকরাম ভারতের পাসপোর্ট এবং তার ছেলে নাভিদ আকরাম অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। কারণ সাজিদ ভারতে শিক্ষা জীবন শেষ করে কাজের সন্ধানে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে গিয়ে তিনি ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত এক নারীকে বিয়ে করেন। আর তাদের ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তানরা অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্টধারী ও দেশটির নাগরিক।

এদিকে ওই বাবা-ছেলে কেন ফিলিপাইনে গিয়েছিলেন তার কারণ খুঁজে বের করতে অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ পারস্পরিক তথ্য বিনিময়ে একমত হয়েছে। 

ছবি : সংগৃহীত

বন্ডি বিচ হামলায় সন্দেহভাজন ভারতীয় পাসপোর্টে ভ্রমণ করে

অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ গুলিবর্ষণের একটিতে অভিযুক্ত পিতা-পুত্র নভেম্বর মাসের প্রায় পুরোটা সময় ফিলিপাইনে অবস্থান করে। এ কথা মঙ্গলবার জানিয়েছে অস্ট্রেলীয় পুলিশ। তারা জানায়, পিতা সাজিদ আকরাম ফিলিপাইনে প্রবেশ করে ভারতীয় পাসপোর্টে। ৫০ বছর বয়সী সাজিদ আকরাম এবং তার ২৪ বছর বয়সী ছেলে নাভিদ আকরামের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সিডনির বন্ডি বিচে একটি হনুক্কা (ইহুদি ধর্মীয় উৎসব) উদ্যাপনে হামলা চালিয়ে ১৫ জনকে হত্যা এবং আরও বহু মানুষকে আহত করে।

পুলিশ জানিয়েছে, তারা ১ থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত ফিলিপাইনে ছিল। এই সফরের উদ্দেশ্য তদন্তাধীন রয়েছে এবং সন্দেহভাজনরা সেখানে সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বলেও তথ্য মিলেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। রোববারের এই হামলাটি প্রায় ৩০ বছরে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ গুলিবর্ষণ এবং এটি ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে চালানো একটি সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে। নিহতের সংখ্যা ১৬তে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সাজিদ আকরামও আছে। সে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। তার ছেলে ও কথিত সহযোগী নাভিদ আকরাম পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। ফিলিপাইনে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। যদিও বর্তমানে এসব নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে মূলত দেশটির দক্ষিণাঞ্চল মিন্দানাও এলাকায় সীমিত রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের কমিশনার ক্রিসি ব্যারেট এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রাথমিক তথ্য বলছে, এটি ইসলামিক স্টেট দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি সন্ত্রাসী হামলা, যা কথিতভাবে একজন পিতা ও তার ছেলে চালিয়েছে। তিনি আরও বলেন, এটি কোনো ধর্মের কাজ নয়, বরং সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড। পুলিশ জানায়, নাভিদ আকরামের নামে নিবন্ধিত একটি গাড়ি থেকে হাতবোমা সদৃশ বিস্ফোরক এবং আইএস সম্পর্কিত দুটি হাতে বানানো পতাকা উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াসহ বহু দেশ আইএসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/194359_Abul-9.webp

Wednesday, December 17, 2025

সিডনির ‘বীর’ আহমেদ নিয়ে কী বলছেন তাঁর মা–বাবা

দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ডঃ অস্ট্রেলিয়ার সিডনির জনপ্রিয় বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে গতকাল রোববার এক বন্দুকধারীকে নিরস্ত্র করে প্রশংসায় ভাসছেন আহমেদ আল আহমেদ। শরীরে প্রায় পাঁচটি গুলি নিয়ে সিডনির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহমেদ বলেন, ‘ঝুঁকি নিয়ে বন্দুকধারীকে নিরস্ত্র করতে আমার বিন্দুমাত্র ভয় কাজ করেনি। বরং এমন কোনো ঘটনা আবার ঘটলে আমি আবার একই কাজ করব।’

স্থানীয় সময় আজ সোমবার রাতে আহমেদের অভিবাসন আইনজীবী স্যাম ইসা তাঁর সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করার পর এ কথা বলেন। ইসা জানান, আহমেদের ব্যথা ক্রমশ বাড়ছে। এটা তাঁকে ক্লান্ত করে তুলছে।

সিডনির সেন্ট জর্জ হাসপাতালে আহমেদের চিকিৎসা চলছে। তাঁর প্রথম অস্ত্রোপচার সফলভাবে শেষ হয়েছে। তবে গুলির যন্ত্রণায় তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। ইসার ভাষায়, ‘আমাদের নায়ক এই মুহূর্তে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।’ আহমেদ তাঁর বাঁ হাত চিরতরে হারাতে পারেন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইসা।

ইসা জানান, আহমেদের বাঁ হাতের বিভিন্ন অংশে প্রায় পাঁচটি গুলির আঘাত লেগেছে। একটি গুলি তাঁর বাঁ কাঁধের দিকে চলে গেছে, যা কিছুটা ‘অদ্ভুত’। গুলিটি এখনো বের করা যায়নি।

ঘটনাস্থলের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বন্দুকধারীকে পেছন দিক থেকে গলায় ধরে মাটিতে ফেলে দেন এক ব্যক্তি। তিনি বন্দুকটি কেড়ে নিয়ে হামলাকারীর দিকে লক্ষ্য করে তাক করেন। এতে ভয়ে পেয়ে হামলাকারী দূরে সরে যান। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে অদূরে থাকা আরেক বন্দুকধারীর গুলি তাঁকে নিশানা করে গুলি ছোড়েন।

পরে জানা যায়, নিরস্ত্রকারী এই সাহসী ব্যক্তিই আহমেদ আল আহমেদ। প্রাথমিকভাবে তাঁর হাতে দুটি গুলি লেগেছিল বলে জানা গিয়েছিল। এখন ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর প্রায় পাঁচটি গুলি লেগেছে।

আহমেদ বন্দুকধারীকে নিরস্ত্র না করলে আরও মানুষ প্রাণ হারাতে পারত। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ক্রিস মিনস এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অনেক বিশ্বনেতা আহমেদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। তিনি এখন রীতিমতো ‘বীরের’ মর্যাদা পাচ্ছেন।

আহমেদের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ইসা বলেন, ‘তাঁর অবস্থা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক খারাপ। বাঁ হাতে গুলি লাগাটা এতটা গুরুতর ব্যাপার ছিল না। কিন্তু তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে।’

২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়া আহমেদ দেশটির ‘সমাজের প্রতি গভীরভাবে ঋণী’ জানিয়ে ইসা বলেন, ‘তিনি একজন বিনয়ী মানুষ। সংবাদমাধ্যমের এত প্রচারের প্রতি তাঁর তেমন কোনো আগ্রহ নেই। একজন মানুষ হিসেবে যা করা দরকার, তিনি শুধু তাই করেছেন।’ আহমেদ অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে পারা এবং নাগরিকত্ব পাওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বলেও জানান আহমেদ।

বাবা ফাতেহ ও মা মালাকা

আজ সকালে আহমেদের বাবা ফাতেহ এবং মা মালাকা বলেন, তাঁদের ছেলের মনের অবস্থা বেশ ‘ফুরফুরে’।

ফাতেহ বলেন, ‘দানব ও খুনিদের’ কাছ থেকে নিষ্পাপ মানুষকে রক্ষায় সাহায্য করতে পারায় আহমেদ সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানান।

আহমেদের মা মালাকা জানান, তাঁর ছেলে মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন, এ খবর শোনার পর তাঁর কান্না চলে আসে। অনেকক্ষণ তিনি কান্না থামাতে পারেননি।

আহমেদের সাহসিকতার প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার এক সাহসী মানুষের কথা আপনারা হয়তো খবরের কাগজে পড়েছেন। তিনি একজন অত্যন্ত সাহসী মানুষ। তিনি সরাসরি এক বন্দুকধারীকে নিরস্ত্র করেছেন।’

আহমেদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ট্রাম্প যুক্ত করেন, ‘তিনি অনেকের জীবন বাঁচিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত সাহসী মানুষ। তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় এখন হাসপাতালে আছেন।’

আহমেদ ২০০৬ সালে সিরিয়ার থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। ৪৩ বছর বয়সী আহমেদ একটি তামাকের (অবশ্য শুরুতে বলা হয়েছিল ফলের) দোকানের মালিক। তাঁর দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। তাঁদের বয়স ছয় ও পাঁচ বছর।

আহমেদের চাচাতো ভাই মোস্তফা বলেন, রোববার রাতে হাসপাতালে পৌঁছার পর থেকে তিনি ঘুমাতে পারেননি।

মোস্তফা বলেন, ‘আহমেদ অন্যদের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনও হারাতে পারতেন। নিঃসন্দেহে তিনি একজন নায়ক। আমি আশা করি, অস্ট্রেলিয়ার সবাই আহমেদের জন্য শুভকামনা জানাবে এবং তিনি আবার তাঁর পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন।’

আহমেদের দোকান যে এলাকায়, সেখানকার লরি অ্যান্টোনিয়াডিস নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘যখন আমি জানতে পারলাম বন্দুকধারীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করা ব্যক্তি আমার মহল্লার তামাকের দোকানের মালিক। তখন আমি তাঁর দোকানে যাই। আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়েছিলাম। তিনি একজন অসাধারণ মানুষ। কিন্তু আজ আহমেদের দোকান বন্ধ ছিল।’

গতকাল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে দুই বন্দুকধারীর গুলিতে অন্তত ১১ জন নিহত হন। এক শিশুসহ আহত হন ২৯ জন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। সন্দেহভাজন হামলাকারীদের একজন নিহত হয়েছেন। আরেকজনকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়।

বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইহুদিদের বার্ষিক ‘হানুক্কাহ’ উৎসব শুরু উপলক্ষে বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে গতকাল এক হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। সেই উৎসব লক্ষ্য করেই এ হামলা চালানো হয়।

হামলাকারীর একজন ২৪ বছর বয়সী নাভিদ আকরাম। তিনি পেশায় নির্মাণশ্রমিক। সম্প্রতি বেকার হয়ে পড়েন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে পুলিশ। তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল আছে।

অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, নাভিদের বাবা সাজিদ ১৯৯৮ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। তবে তিনি কোন দেশ থেকে এসেছিলেন, তা জানাননি।

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেছেন, নাভিদ জন্মসূত্রে অস্ট্রেলীয় নাগরিক। ২০১৯ সালের অক্টোবরে তিনি অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন (এএসআইও) নামের গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে ছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-15%2Fy8xs4xnx%2FMinns-visits-Ahmed-al-Ahmed.jpg?rect=0%2C490%2C930%2C620&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আহত আহমেদ আল আহমেদকে হাসপাতালে দেখতে যান নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ক্রিস মিনস। ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

Monday, December 15, 2025

রাতারাতি নায়ক আহমেদ

রাতারাতি ‘নায়ক’ উপাধি পেয়েছেন আহমেদ আল আহমেদ। তিনি যে সাহসিকতায় অস্ত্রধারীকে জাপটে ধরে গুলি করা থামিয়েছেন তাতে তাকে বীর বললে কমই বলা হয়। রোববার অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বন্ডাই বিচে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে হামলাকারী পিতাপুত্র হত্যা করে কমপক্ষে ১৫ জনকে। এ সময় অসীম সাহস নিয়ে পিছন থেকে গিয়ে হামলাকারীকে জাপটে ধরেন আহমেদ। তিনি সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীর বন্দুক নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। এতে রক্ষা পায় অনেক মানুষ। এ জন্য অস্ট্রেলিয়াজুড়ে প্রশংসায় ভাসছেন আহমেদ। এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, সিডনির বন্ডাই বিচে গুলিবর্ষণের সময় তার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সাহসিকতা বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নিরস্ত্র ওই ব্যক্তি গুলি চলার মধ্যেই এক বন্দুকধারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাকে কাবু করে ফেলেন। মাত্র ১৫ সেকেন্ডের সেই ভিডিওতে দেখা যায়, পার্ক করা গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা লোকটি হঠাৎ পেছন দিক থেকে বন্দুকধারীর দিকে দৌড়ে যান। তিনি বন্দুকধারীর গলা চেপে ধরেন, তার হাত থেকে রাইফেল কেড়ে নেন এবং তাকে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর তিনি অস্ত্রটি উল্টো করে বন্দুকধারীর দিকেই তাক করে ধরেন। ওই সাহসী ব্যক্তির নাম আহমেদ আল আহমেদ। বয়স ৪৩ বছর। পেশায় তিনি একজন ফল বিক্রেতা। হামলার সময় তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হন। দুটি গুলি তার শরীরে লাগে।
একটি টুইট পোস্টে বলা হয়েছে, এখানে দেখা যাচ্ছে এক সাহসী মানুষ একাই বন্দুকধারীকে ধরাশায়ী করছেন। অবিশ্বাস্য দৃশ্য। সেভেন নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মুস্তাফা নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি আহমেদের চাচাতো ভাই। তিনি বলেন, তিনি (আহমেদ) হাসপাতালে আছেন। ভেতরে ঠিক কী অবস্থা, আমরা পুরোপুরি জানি না। তবে আমরা আশা করছি তিনি ভালো থাকবেন। তিনি শতভাগ একজন নায়ক।

আহমেদের ওই রাতেই অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি কেবল ওই এলাকায় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি বুঝে তিনি নিজ উদ্যোগেই হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেন। অনলাইনে তার সাহসিকতার জন্য ব্যাপক প্রশংসা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ নিজেও তাকে ‘নায়ক’ বলে অভিহিত করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এই হামলায় কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হন। পরে ঘটনাস্থলেই এক বন্দুকধারীর মৃত্যু হওয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬। আহত অবস্থায় ২৯ জনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা পিতা ও পুত্র। পিতার বয়স ৫০ বছর। তার নাম সাজিদ আকরাম। তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। ছেলে ২৪ বছর বয়সী নাভিদ আকরাম। গুরুত্বর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি।

নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ জানিয়েছে, হানুক্কার প্রথম দিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শত শত মানুষ জড়ো হন। এই হামলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে একজন ইসরাইলি নাগরিকও রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, হামলার পরপরই জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। তিনি বলেন, হানুক্কা বাই দ্য সি অনুষ্ঠানে বন্ডাই বিচে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। এটি ইহুদি অস্ট্রেলীয়দের ওপর লক্ষ্য করে চালানো আক্রমণ। আনন্দ ও ধর্মীয় উদযাপনের দিনে এটি ছিল চরম অশুভ কাজ- ইহুদিবিদ্বেষ, সন্ত্রাসবাদ, যা আমাদের জাতির হৃদয়ে আঘাত করেছে। তিনি আরও বলেন, ইহুদি অস্ট্রেলীয়দের ওপর হামলা মানে প্রতিটি অস্ট্রেলীয়র ওপর হামলা। আমাদের দেশে ঘৃণা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের কোনো জায়গা নেই। আমরা একে নির্মূল করব।

mzamin

হামলাকারীর বন্দুক কেড়ে নিয়ে বাঁচালেন বহু মানুষের প্রাণ

অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় বন্ডি বিচে বন্দুক হামলার ঘটনায় এ পর্যন্ত ১২ জনের নিহতের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সময় রোববার আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে দুই বন্দুকধারী এলোপাতাড়ি গুলি চালালে এতে আরও ২৯ জন আহত হন। ভয়াবহ এই হামলার সময় এক পথচারী হামলাকারীর কাছ থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছেন বহু মানুষের জীবন। তার এই বীরত্বপূর্ণ কাজের ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। এর মাধ্যমে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

এতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ১৫ সেকেন্ডের  ভিডিওতে দেখা যায়, গোলাগুলি শুরুর পর নিরস্ত্র এক পথচারী একটি পার্ক করা গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। এরপর তিনি পেছন দিক থেকে বন্দুকধারীর দিকে দৌড়ে যান। তার গলা চেপে ধরে বন্দুকটি ছিনিয়ে নেন। বন্দুকধারী মাটিতে পড়ে গেলে ওই সাহসী ব্যক্তি তার দিকেই বন্দুক তাক করে রাখেন।

তার এই সাহসিকতায় অনেকগুলো প্রাণ বেঁচে গেছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এই পথচারীর নাম-পরিচয় সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বন্ডি বিচে হতাহতের ঘটনা মর্মান্তিক ও গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমরা এনএসডব্লিউ (নিউ সাউথ ওয়েলস) পুলিশের সঙ্গে কাজ করছি এবং আরও তথ্য নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপডেট দেব। (নাগরিকদের) জীবন রক্ষার জন্য পুলিশ ও জরুরি সেবাকর্মীরা ঘটনাস্থলে কাজ করে যাচ্ছেন।

mzamin

Wednesday, November 26, 2025

বোরকা অবমাননা, অস্ট্রেলিয়ার সেই নারী সিনেটর বহিষ্কার

চরম দক্ষিণপন্থী নেত্রী পলিন হ্যানসনকে টানা সাত কার্যদিবসের জন্য বহিষ্কার করেছে অস্ট্রেলিয়ার সিনেট। সোমবার তিনি সংসদে বোরকা পরে হাজির হয়ে জনসমক্ষে মুসলিম নারীদের বোরকা নিষিদ্ধ করার দাবিতে রাজনৈতিক প্রদর্শনীর চেষ্টা করলে ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়েন। পরে মঙ্গলবার তাকে বহিষ্কার করা হয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সোমবার তিনি জনসমক্ষে বোরকা ও অন্যান্য মুখঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করার বিল উপস্থাপনের অনুমতি না পাওয়ার পর প্রতিবাদস্বরূপ সিনেটে বোরকা পরে প্রবেশ করেন। তার এই আচরণ মুসলিম আইনপ্রণেতাসহ বহু সিনেটরের কাছে সরাসরি বর্ণবাদী ও অবমাননাকর হিসেবে বিবেচিত হয়। সিনেটের কেন্দ্রীয় বাম দল লেবার সরকারের নেতৃত্বে থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়ং বলেন, সিনেটর হ্যানসনের এই ঘৃণাত্মক ও তুচ্ছ প্রদর্শনী আমাদের সামাজিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যা অস্ট্রেলিয়াকে দুর্বল করার সামিল। এর নিষ্ঠুর প্রভাব পড়ে আমাদের সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর। তিনি আরও বলেন, হ্যানসন পুরো একটি ধর্মকে উপহাস ও হেয় করেছেন। উল্লেখ্য অস্ট্রেলিয়াতে প্রায় দশ লাখ মুসলিম রয়েছে। হ্যানসনের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাবটি ৫৫-৫ ভোটে পাস হয়।

বর্ধমান জাতীয়তাবাদী মনোভাব ও অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি কাজে লাগিয়ে হ্যানসনের ওয়ান নেশন পার্টি গত মে মাসের সাধারণ নির্বাচনে সিনেটে আরও দুইটি আসন পেয়ে এখন চারটি আসনের দলের রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে হ্যানসন ও তার দলের প্রতি সমর্থন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। হ্যানসন অবশ্য নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সংসদে পোশাকবিধি নেই, তাই বোরকা পরা নিয়েও প্রশ্ন ওঠার সুযোগ নেই। তিনি আরও দাবি করেন, শেষ পর্যন্ত জনগণই এর বিচার করবে।

কুইনসল্যান্ডের এই সিনেটর ১৯৯০-এর দশকে এশিয়া থেকে অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে পরিচিতি পান। ইসলামী পোশাকের বিরুদ্ধেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। এর আগে ২০১৭ সালেও তিনি সংসদে বোরকা পরে প্রবেশ করে দেশব্যাপী বোরকা নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছিলেন।

mzamin

Monday, September 29, 2025

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতিতে নতুন প্রশ্ন, নেতৃত্ব দেবে কে? by পল অ্যাডামস

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসে আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেন ফিলিস্তিনি কূটনীতিক হুসাম জমলট। তখনই বৃটেন, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দেয় বেলজিয়াম। জমলট একে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আখ্যা দিয়ে বলেন, নিউইয়র্কে যা হতে যাচ্ছে, সেটিই হয়তো দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান কার্যকর করার শেষ চেষ্টা। সেটা ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না।

কয়েক সপ্তাহ পর বৃটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও একই পদক্ষেপ নিল। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে আমরা শান্তির সম্ভাবনা ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান টিকিয়ে রাখতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। নিরাপদ ইসরাইলের পাশাপাশি টিকে থাকার মতো একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু এ মুহূর্তে আমরা কোনোটিই পাইনি।

এর আগে ১৫০টির বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে বৃটেন ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বলে মনে করছেন অনেকেই। সাবেক কর্মকর্তা জাভিয়ের আবু ঈদ বলেন, ফিলিস্তিন এখন বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে আছে। বিশ্ব ফিলিস্তিনের পক্ষে সংগঠিত।

রাষ্ট্রস্বীকৃতির জটিল প্রশ্ন:
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- কোন ভূখণ্ডকে ফিলিস্তিন বলা হচ্ছে? রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির জন্য ১৯৩৩ সালের মন্টেভিডিও কনভেনশন চারটি মানদণ্ড দিয়েছে। ফিলিস্তিনের আছে স্থায়ী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা। কিন্তু ‘সংজ্ঞায়িত ভূখণ্ড’ বা কার্যকর সরকার নেই। ফিলিস্তিনিদের স্বপ্নের রাষ্ট্র হলো তিন অংশে বিভক্ত। তাহলো পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা। এর সবই ইসরাইল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করে। পশ্চিম তীর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে ইসরাইলি দখল ও বসতি স্থাপনের কারণে। গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত। আর পূর্ব জেরুজালেম বসতি দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে।

নেতৃত্ব সংকট: রাষ্ট্রের জন্য কার্যকর সরকার প্রয়োজন। কিন্তু ২০০৭ সালের পর থেকে ফাতাহ ও হামাসের দ্বন্দ্বে গাজা ও পশ্চিম তীরে দুই ভিন্ন শাসনব্যবস্থা চলছে। মাহমুদ আব্বাস নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ কার্যত অসহায়। সেখানে সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০০৬ সালে। এর মানে ৩৬ বছরের নিচে কেউ কখনো ভোট দেয়নি। আইনজীবী ডায়ানা বুত্তু বলেন, এত বছর নির্বাচন হয়নি- এটা অকল্পনীয়। নতুন নেতৃত্ব দরকার। এই নেতৃত্ব সংকটে বারবার উঠে আসে কারাগারে বন্দি মারওয়ান বারঘুতির নাম। জনসমর্থনে তিনি আব্বাসের চেয়ে অনেক এগিয়ে, যদিও ২০০২ সাল থেকে ইসরাইলি কারাগারে আছেন। জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি ফিলিস্তিনি তাঁকেই ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে চান।

ইসরাইলের অবস্থান: বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহুবার স্পষ্ট করেছেন, তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র চান না। বরং নতুন বসতি অনুমোদন দিয়ে পূর্ব জেরুজালেমকে পশ্চিম তীর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করেছেন। ইসরাইলি মন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ বলেন, স্বীকৃতি দেয়ার মতো কোনো রাষ্ট্র নেই, আর স্বীকৃতি দেয়ার মতো কেউ নেই।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও বাস্তবতা: ফ্রান্স-সৌদি আরবের পৃষ্ঠপোষকতায় গৃহীত ‘নিউইয়র্ক ডিক্লারেশন’-এ বলা হয়েছে, হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করে গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের হাতে দিতে হবে। ১৪২টি দেশ এটি সমর্থন করেছে। হামাসও বলেছে, তারা টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের হাতে দায়িত্ব ছাড়তে প্রস্তুত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছেন এবং তার ‘রিভেরা প্ল্যান’-এ গাজার দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কোনো উল্লেখ নেই।

প্রতীকী স্বীকৃতির সীমাবদ্ধতা: ডায়ানা বুত্তু মনে করেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মূল্যবান হতে পারে, তবে নির্ভর করছে দেশগুলোর উদ্দেশ্যের ওপর। লন্ডনের কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল প্রতীকী স্বীকৃতিতে কাজ হবে না, বাস্তব অগ্রগতি দরকার। যেমন পশ্চিম তীর-গাজার একত্রীকরণ, নির্বাচন আয়োজন, পুনর্গঠন পরিকল্পনা ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে বড় বাধা ইসরাইলের কঠোর বিরোধিতা। ইসরাইল ইতিমধ্যে পশ্চিমতীর দখল করার হুমকি দিয়েছে।

শেষ কথা: অতএব, রাষ্ট্রস্বীকৃতি পেলেও ফিলিস্তিন এখনো কার্যকর নেতৃত্বহীন। আব্বাস প্রায় ৯০ বছরের, বারঘুতি কারাগারে, হামাস বিপর্যস্ত, আর পশ্চিম তীর খণ্ডিত। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অবশ্যই প্রতীকী শক্তি দেয়, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি বিষয় হলো- গাজায় রক্তপাত বন্ধ করা। ডায়ানা বুত্তু বলেন, আমার কাছে রাষ্ট্রস্বীকৃতির চেয়ে জরুরি হলো হত্যাযজ্ঞ থামানো। দেশগুলোকে এখনই কিছু করতে হবে।
(অনলাইন বিবিসি থেকে অনুবাদ)

mzamin

Monday, September 22, 2025

ফিলিস্তিনকে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার স্বীকৃতির গুরুত্ব কতটা

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো শিল্পোন্নত দুই দেশ যুক্তরাজ্য ও কানাডা। শিগগিরই এ তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেক প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশ ফ্রান্স। এটা হলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যদেশের মধ্যে চারটি দেশেরই স্বীকৃতি পাবে ফিলিস্তিন। এর আগে ১৯৮৮ সালে অন্য দুই স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

আজ যুক্তরাজ্য ও কানাডার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যদেশের প্রায় ৭৫ শতাংশের স্বীকৃতি পেল ফিলিস্তিন। এখন প্রশ্ন হলো, এ স্বীকৃতির অর্থ কী বা এটি কি বাস্তবে ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য কোনো পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে?

আসলে ফিলিস্তিন এমন একটি রাষ্ট্র, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক মিশন রয়েছে। অলিম্পিকের মতো ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও অংশ নেয় ফিলিস্তিন। জাতিসংঘের স্থায়ী পর্যবেক্ষক সদস্যও তারা। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান দীর্ঘ সংঘাতের কারণে ফিলিস্তিনের কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা, রাজধানী বা সেনাবাহিনী নেই।

ইসরায়েলি দখলদারির মুখে নব্বইয়ের দশকে পশ্চিম তীর শাসনের জন্য ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ (পিএ) গঠন করা হয়েছিল। তবে তাদের পুরো ভূখণ্ডটির ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। ফিলিস্তিনের গাজা অংশেও প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি প্রতীকী ছাড়া কিছু নয়। এর মাধ্যমে শক্তিশালী নৈতিক বার্তা দেওয়া গেলেও বাস্তবে খুব একটা পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার এই স্বীকৃতি প্রদান ফিলিস্তিনিদের প্রতি ঐক্য ও সংহতির ক্ষেত্রে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই তিন দেশই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের মধ্য দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশাকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলেছে।

তা ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনে মুখ্য ভূমিকা ছিল যুক্তরাজ্যের। এরপর দীর্ঘকাল ইসরায়েলের মিত্রদেশ হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে লন্ডন। সে কারণে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাজ্যের এই স্বীকৃতির বড় ধরনের প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে।

গত জুলাইয়ে জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছিলেন, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের সমস্যার দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের প্রতি সমর্থন জানানোর এক বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে যুক্তরাজ্যের। তিনি ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার কথা উল্লেখ করেন। এ ঘোষণায় সই করেছিলেন তাঁরই পূর্বসূরি আর্থার বেলফোর।

বেলফোর ঘোষণায় ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য একটি আবাস গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল। ডেভিড ল্যামি বলেন, ঘোষণায় এই প্রতিশ্রুতিও ছিল যে ইহুদি বাদে এই ভূখণ্ডে অন্য সম্প্রদায়ের যেসব লোকজন বসবাস করেন, তাঁদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কিছু করা হবে না। যদিও ইসরায়েলের সমর্থকেরা বলে থাকেন, ঘোষণায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কিছু বলা হয়নি।

এমন সব জটিলতার মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সমস্যার সমাধান সামনে এগোয়নি। দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৬৭ সালে আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের আগে পশ্চিম তীর ও গাজার যে সীমানা ছিল, তা নিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। রাজধানী হওয়ার কথা ছিল পূর্ব জেরুজালেম। তবে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়নি।

এখন যদি যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি ফ্রান্সও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়, তাহলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনের অবস্থান আরও শক্ত হবে। স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র থাকবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না দেওয়া দেশ। যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন প্রেসিডেন্ট একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যতিক্রম। তাঁর প্রশাসন ইসরায়েলের প্রতি এককাট্টা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের মূল কারণগুলোর একটি জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র আল-আকসা মসজিদ
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের মূল কারণগুলোর একটি জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র আল-আকসা মসজিদ। ছবি: এএফপি

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলো বৃটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া

ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে বৃটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। রোববার পর্যায়ক্রমে এ ঘোষণা দিয়েছে ওই তিন দেশ। এরমধ্যে প্রথম ঘোষণা আসে কানাডার পক্ষ থেকে। এরপর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ও সর্বশেষ বৃটেন ফিলিস্তিনিকে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে যোগ হলো নতুন এক অধ্যায়। পশ্চিমা শক্তি তথা যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা জি৭ ভুক্ত এই তিন দেশের স্বীকৃতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে নতুন পথে পরিচালিত করবে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউরোপীয় এই দেশগুলোর স্বীকৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিন। এদিকে এই পদক্ষেপকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। পাশাপাশি এই স্বীকৃতিকে ‘সরাসরি সন্ত্রাসবাদকে পুরষ্কৃত’ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। 

স্কাই নিউজের এক খবরে বলা হয়েছে, রোববার ফিলিস্তিনকে প্রথমে স্বীকৃতি দেয় কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, কানাডা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং আমরা ফিলিস্তিন ও ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যত গঠনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কানাডার দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে দৃঢ় অবস্থান ছিল, কিন্তু এই সম্ভাবনা এখন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বীকৃতি প্রদানে দ্বিতীয় দেশ হলো অস্ট্রেলিয়া। কানাডা এবং বৃটেনের সঙ্গে সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবেনিজি। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তটি একটি আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ, যা শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যাবে। একই দিন পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে বৃটেন। প্রধানমন্ত্রীর স্যার কিয়ের স্টারমার এই পদক্ষেপের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মুখে আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে জীবিত রাখতে এবং দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে এই সিদ্ধান্তকে হামাসের প্রতি কোনো পুরস্কার হিসেবে দেখা যাবে না বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। স্টারমার বলেন, হামাসের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, এবং তাদের কোনো সরকারি বা নিরাপত্তা ভূমিকা থাকবে না। হামাসের বিরুদ্ধে আগের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে সামনে নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে এই প্রক্রিয়ায় আরও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়াকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন নেতানিয়াহু। বলেছেন, রাজনৈতিক প্রয়োজনে দেয়া ইউরোপের এই স্বীকৃতিতে আত্মহত্যা করবে না ইসরাইল। দেশটির মুখপাত্র শোশ বদরোসিয়ান এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহুর মন্তব্য পড়ে শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মিডিয়ায় কিছু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যেখানে বলা হচ্ছে, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার আজ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এই পদক্ষেপকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ‘অযৌক্তিক’ এবং ‘সরাসরি সন্ত্রাসবাদের পুরস্কার’ বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে আমাকে জানিয়েছেন যে, তার বার্তা হচ্ছে- গাজায় হামাসের হাতে আটক ইসরাইলি নাগরিকদের দুঃখ-দুর্দশা উপেক্ষা করে যেসব দেশ এই পথ বেছে নিচ্ছে তাদের চাপে আত্মহত্যা করবে না ইসরাইল।

এই বিরোধিতা নতুন নয় এবং ইসরাইল আগেও বৃটেন এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর এই ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মতামত জানিয়েছে। বদরোসিয়ান আরও নিশ্চিত করেছেন যে, নেতানিয়াহু নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে যাবেন, সেখানে কিছু দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিতে পারে।

mzamin

Sunday, September 21, 2025

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিল যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। আজ রোববার একযোগে এই তিন দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিল। এর মধ্য দিয়ে শিল্পোন্নত (জি সেভেন) সাত দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্য ও কানাডা প্রথম ফিলিস্তিনকে এই স্বীকৃতি দিল।

আজ প্রথম কানাডা ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক বিবৃতিতে বলেন, আজ থেকে কানাডা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয় রাষ্ট্রের একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পূরণে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

এরপর অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির ঘোষণা দেন। এই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এই দুই দেশের পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহতা বাড়তে থাকার মুখে আমরা দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান ও শান্তির সম্ভাবনাকে জাগিয়ে রাখতে কাজ করছি। এর অর্থ একটি টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পাশে একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত ইসরায়েল, যার কোনোটি এই মুহূর্তে আমরা দেখছি না।’

এরপর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সময় এখন এসেছে।

‘তাই আজ দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান ও শান্তির আশা পুনরুজ্জীবিত করতে আমি এই মহান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্পষ্টত ঘোষণা করছি যে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।’

ফিলিস্তিনের গাজায় হামাসের হাতে বন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্যার কিয়ার স্টারমার। একইসঙ্গে তিনি ইসরায়েল সরকারের প্রতি গাজায় আরও ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ দিতে এই উপত্যকার সীমান্তে আরোপিত বিধি–নিষেধ শিথিল করার আহ্বান জানিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনে মুখ্য ভূমিকা ছিল ব্রিটেনের। এরপর দীর্ঘকাল ইসরায়েলের মিত্র দেশ হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে যুক্তরাজ্য। সে কারণে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাজ্যের এই স্বীকৃতির প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে।

লন্ডন আজ এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বিশ্বের আরও ১৪০টির বেশি দেশের কাতারে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে। কিন্তু তাদের এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েল ও তার প্রধান মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরক্তির কারণ হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সফরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির বিষয়ে নিজের আপত্তির কথা উল্লেখ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর আজ কিয়ার স্টারমারের ঘোষণার পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সে এক পোস্টে বলেছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ‘জিহাদি হামাসকে পুরস্কৃত করা ছাড়া আর কিছু নয়’। 

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-21%2F9nq33th6%2FWhatsApp-Image-2025-09-21-at-8.22.20-PM.jpeg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার পতাকা

Thursday, September 4, 2025

অ্যাটর্নি জেনারেলকে অপসারণ চেষ্টায় অচলাবস্থা, নেতানিয়াহুর সরকার বিপাকে: অস্ট্রেলিয়া-ইসরাইল সম্পর্ক তলানিতে

মানবজমিনঃ ইসরাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারাকে অপসারণের প্রক্রিয়া আইনি অচলাবস্থায় থেমে গেছে। ঠিক এমন সময়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার প্রকাশ্যে স্বীকার করছে- হুমকি দেয়া ছাড়া তাদের হাতে আর কার্যকর কোনো পথ নেই। এ খবর দিয়ে অনলাইন হারেৎজের রিপোর্ট জানাচ্ছে- সুপ্রিম কোর্ট সরকারের এই প্রচেষ্টাকে অবৈধ বলেছে। তারা বলেছে, অ্যাটর্নি জেনারেলকে অপসারণের প্রচেষ্টা এগিয়ে না নিতে। এর ফলে এক সরকারি সূত্র মন্তব্য করেন, বিচারপতিরা অন্তত আমাদের একদিনের অর্থহীন বিতর্ক থেকে রক্ষা করেছেন। এই অচলাবস্থা সরকারের অবস্থান নরম করেনি, তবে উন্মোচন করেছে ভেতরের বিভাজন ও তীব্র সমালোচনা।

বিশেষ করে ন্যায়বিচার বিষয়ক মন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিনের বিরুদ্ধে তা তীব্র হয়েছে। তিনি এ প্রচেষ্টার মূল কারিগর। শাসক জোটের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য বলেন, লেভিন অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে হয় ‘সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ’, নয়তো ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ’ চালাতে পারতেন। সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধে বেতন বন্ধ করে দেয়া, তার নির্দেশ মানলে প্রসিকিউটর অফিস থেকে লোক বরখাস্ত করা, এমনকি হাইকোর্টকে উপেক্ষা করা হতো। কিন্তু সেই পথ নেয়া হয়নি। ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে ঢুকে পড়া হলো, আর তাও ঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি। তার মতে, একের পর এক ভুল হয়েছে পদ্ধতি বেছে নেয়া থেকে শুরু করে সার্চ কমিটি না ডাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে, লেভিনের সমর্থকরা বলছেন, তিনি যা-ই করতেন না কেন, শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টই তা বাতিল করত। একজন সরকারি সূত্র বলেন, যদি লেভিন আইন পরিবর্তন করে অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা ভাগ করার চেষ্টা করতেন, তাও আদালতে বাতিল হয়ে যেত। তখন আবার বলা হতো, কেন বরখাস্তের চেষ্টা করলেন না? তবে তারা স্বীকার করেন, লেভিন নিখুঁত নন, ভুল করেছেন।

শাসক জোটের আশা- বাহারাভ-মিয়ারা দীর্ঘ স্নায়ুযুদ্ধের ক্লান্তিতে নিজেই অবসর নেবেন, যেমনটা করেছিলেন শিন বেত-এর সাবেক প্রধান রোনেন বার। তবে বাস্তবে সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। বাহারাভ-মিয়ারা ডেমোক্রেসিপন্থি শিবিরে এক প্রতীকী ব্যক্তিত্ব- আইনের শাসনের শেষ প্রহরী হিসেবে বিবেচিত। তাকে অপসারণের পুরো প্রক্রিয়া অনিয়ম আর আইনি লঙ্ঘনে ভরা ছিল। এমনকি সরকারের নীতির প্রতি সহানুভূতিশীল রক্ষণশীল বিচারকরাও এই প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে পারবেন না।

অস্ট্রেলিয়া-ইসরাইল সম্পর্ক তলানিতে, কিন্তু আড়ালে চলছে সব
২৪শে আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, ফিলিস্তিনিদের সমর্থন জানায় এবং নিজেদের সরকারকে আরও শক্ত অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানায়। এর আগে ৩রা আগস্ট সিডনি হারবার ব্রিজে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশ ছিল অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক বিক্ষোভ। সেই বিক্ষোভ সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। অস্ট্রেলিয়া-ইসরাইল সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ভিসা বাতিল, উভয়পক্ষের কঠোর বক্তব্য, এমনকি ইসরাইলের অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ পর্যন্ত ওঠে। অস্ট্রেলিয়া ও ইসরাইলের সম্পর্ক নিয়ে এক বিশ্লেষণে এসব কথা অনলাইন বিবিসিতে লিখেছেন সাংবাদিক গাভিন বাটলার। তিনি আরও লিখেছেন, এ সপ্তাহে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলার্স ঘোষণা দিয়েছে- জাতিসংঘ কনভেনশনের আইনি সংজ্ঞা অনুযায়ী ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। তারা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ত্রাণ খাতে ব্যাপক হামলা এবং প্রায় ৫০ হাজার শিশু নিহত বা আহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরে। ইসরাইল এসব অভিযোগকে ‘হামাসের মিথ্যা’ প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে জাতিসংঘ সমর্থিত বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা নিশ্চিত করেছে গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে। অর্ধ মিলিয়নের বেশি মানুষ ‘ক্ষুধা, নিঃস্বতা ও মৃত্যু’ পরিস্থিতিতে রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, ইসরাইল খাদ্য প্রবেশ ‘পদ্ধতিগতভাবে বাধাগ্রস্ত’ করছে।

ক্রমবর্ধমান জনরোষ ও পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বৃটেন, ফ্রান্স ও কানাডার পথে হেঁটে ঘোষণা দেন- অস্ট্রেলিয়া শর্তসাপেক্ষে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে। তিনি পরে জানান, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপ তাকে স্পষ্ট করে দেয়, নেতানিয়াহু গাজার মানবিক সংকট নিয়ে ‘অস্বীকারের ভেতরেই’ আছেন। ১৮ই আগস্ট নেতানিয়াহু আলবানিজকে পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগ করেন, এই সিদ্ধান্ত ইহুদি বিরোধী আগুনে ঘি ঢালার সমান এবং হামাসকে তুষ্ট করার নীতি। এরপর থেকে তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কঠোর ভাষায় আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাকে দুর্বল নেতা আখ্যা দিয়ে দাবি করেছেন, অস্ট্রেলিয়ার ইহুদিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছেন, নেতানিয়াহু আসলে ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক ইয়ান পারমিটার বলেন, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কখনো ইসরাইলের এত খারাপ সম্পর্ক আমি দেখিনি। তার মতে, পরিবর্তনের পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করেছে- নেতানিয়াহুর গাজার মানবিক সংকট অস্বীকার ও গোটা ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনা। আরেকটি বড় কারণ ছিল সিডনি হারবার ব্রিজের ঐতিহাসিক মিছিল, যা জনমতের শক্ত চাপ প্রকাশ করে। ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনের অনেকেই মনে করেন, সরকার আসলে প্রতীকী পদক্ষেপই নিয়েছে। আড়ালে সামরিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রায় অপরিবর্তিত। ইসরাইলের ব্যবহৃত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের অংশ সরবরাহ করে অস্ট্রেলিয়া। বিশেষ করে বোমা বহনের দরজা খোলার যন্ত্র, যা অন্য কোথাও তৈরি হয় না। যদিও সরকার দাবি করে, এসব প্রাণঘাতী নয়, জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী এটিও অস্ত্র বাণিজ্যের অংশ। এ কারণে আন্দোলনকারীরা সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। সম্প্রতি ইরানের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছে অস্ট্রেলিয়া । যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো ঘটল। ইসরাইল এ সিদ্ধান্তকে নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য বলে দাবি করেছে। কূটনৈতিক বিবাদ যতই তীব্র মনে হোক, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি স্থায়ী প্রভাব ফেলবে না। মানবসম্পর্ক ও দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বন্ধনই সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক করে তুলবে।mzamin

Monday, August 25, 2025

ফিলিস্তিন ইস্যুতে যেভাবে অস্ট্রেলিয়া-ইসরায়েল সম্পর্কে চূড়ান্ত ভাঙন by কাউসার খান

আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতির হাওয়া বেশ কিছুদিন ধরেই ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হচ্ছিল, কিন্তু গত কয়েক দিনে তা যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘটনার গতিপথ কোন দিকে যাচ্ছে, তা বুঝতে কিছুটা সময় লেগেছে। তবে এখানে সিডনিতে বসে বুঝতে পারছিলাম একটি বড় পরিবর্তনের সাক্ষী হতে যাচ্ছি আমরা। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নজিরবিহীন ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং পাল্টা ভিসা বাতিলের পদক্ষেপে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।

সিডনিতে এই কূটনৈতিক দাবানলের উত্তাপ সরাসরি অনুভব করা যাচ্ছে। এটি আর শুধু সংবাদপত্রের শিরোনাম নয়, বরং এখানকার ক্যাফে, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ মানুষের আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু একটি কূটনৈতিক অবস্থান নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার আত্মপরিচয় এবং বিশ্বমঞ্চে তার ভূমিকা নিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই অস্ট্রেলিয়া তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ এবং ঐতিহাসিক মিত্র। কিন্তু এক বছর ধরে সেই সম্পর্কে ফাটল ধরছিল।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ব্যাপক সহানুভূতি পেয়েছিল। কিন্তু এরপর গাজায় তাদের সর্বাত্মক ধ্বংস অভিযান সেই সহানুভূতিকে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে ফেলেছে। গাজার অনাহার এবং ধ্বংসের ছবি বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, যা অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি মানবতাবাদী দেশকে তার অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনেরই চূড়ান্ত রূপ।

তবে এটা ঠিক, এই উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢেলেছে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের সিদ্ধান্ত। ইসরায়েলি নেসেট (ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ) সদস্য সিমচা রথম্যানের ভিসা বাতিল করা। রথম্যান, যিনি ফিলিস্তিনি শিশুদের ‘শত্রু’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, তাঁর ভিসা বাতিল করে অস্ট্রেলিয়া একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে।

টনি বার্কের কথায়, ‘শক্তি পরিমাপ করা হয় কতজনকে আপনি মারতে পারেন বা কত শিশুকে ক্ষুধার্ত রাখতে পারেন, তা দিয়ে নয়।’ এই বক্তব্য রাজনৈতিক বিবৃতির চেয়েও বেশি একটি নৈতিক অবস্থানের প্রকাশ। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের ভিসা বাতিল করা আর কোনো সাধারণ মানুষের ভিসা বাতিল করা কি এক? অবশ্যই নয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া এখানে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তাদের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কোনো স্থান নেই, তা সে যে–ই হোক না কেন। এটি অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষার একটি নীতিগত পদক্ষেপ, কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়।

অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত আক্রমণ ছিল নজিরবিহীন। তিনি আলবানিজকে ‘দুর্বল’ এবং ‘অস্ট্রেলিয়ার ইহুদিদের ত্যাগকারী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আলবানিজকে আন্তর্জাতিকভাবে দুর্বল এবং দেশের ভেতরে ইহুদি সম্প্রদায়ের কাছে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে প্রমাণ করা। কিন্তু ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। নেতানিয়াহুর এই আক্রমণ অস্ট্রেলিয়ায় একধরনের জাতীয় ঐক্য তৈরি করেছে।

অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী দলের নেতা, যাঁরা ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক, তাঁরাও একজন বিদেশি নেতার কাছ থেকে নিজেদের প্রধানমন্ত্রীর এমন ব্যক্তিগত আক্রমণে তাঁর পাশেই দাঁড়িয়েছেন। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার ইহুদি সম্প্রদায়ের শীর্ষ নেতারাও নেতানিয়াহুর মন্তব্যকে ‘অশোভন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন, তিনি আলবানিজকে একঘরে করে দেবেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি নিজেই অস্ট্রেলিয়ায় ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনকে আরও দুর্বল করে ফেলেছেন।

বিশ্লেষক মনে করছেন, নেতানিয়াহুর এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার পেছনে তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট একটি বড় কারণ। ৭ অক্টোবরের গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন এবং তাঁর জোট সরকার টিকে আছে রথম্যানের মতো কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের সমর্থনের ওপর। এই পরিস্থিতিতে বাইরে একটি শক্তিশালী ভাবমূর্তি ধরে রাখা তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য জরুরি। তাই অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি বন্ধুপ্রতিম দেশকে আক্রমণ করে তিনি হয়তো নিজের দেশের কট্টরপন্থীদের এই বার্তাই দিতে চাইছেন যে তিনি ইসরায়েলের স্বার্থে কারও সঙ্গে আপস করবেন না।

আবার অস্ট্রেলিয়ার এই নীতিগত পরিবর্তনের পেছনে জনমতের একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। এ মাসের প্রথম দিকে সিডনির আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফিলিস্তিনের জন্য যে জনসমুদ্র দেখা গেছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানাতে এবং গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিবাদে সিডনির আইকনিক হারবার ব্রিজের ওপর দিয়ে হেঁটে গেছে এক অবিস্মরণীয় জনসমুদ্র, যা এই শহরের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ফলে অস্ট্রেলিয়া সরকারও আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আর দ্বিধায় থাকেনি।

এই পুরো বিষয় শুধু অস্ট্রেলিয়া-ইসরায়েল সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এখন তার কিছু নিকটতম মিত্রদের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা এবং এখন অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো যখন দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে এমন জোরালো অবস্থান নিচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র একা হয়ে পড়ছে বললে খুব একটা ভুল হবে না। বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, যেখানে মধ্যম শক্তিধর দেশগুলো আর বড় শক্তিগুলোর দেখানো পথে হাঁটতে সব সময় রাজি নয়।

অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়। এটি একটি নতুন আন্তর্জাতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে দেশগুলো তাদের নৈতিক অবস্থান এবং পরিবর্তনশীল জনমতের ভিত্তিতে স্বাধীন নীতি গ্রহণ করছে। নেতানিয়াহুর তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং ভিসা যুদ্ধের মতো পদক্ষেপ দেখলেই বোঝা যায় এই স্বীকৃতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

একটি দুর্বল বা গুরুত্বহীন পদক্ষেপ হলে এত তীব্র প্রতিক্রিয়া আসত না। অস্ট্রেলিয়ার এই সাহসী পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যেখানে নৈতিক অবস্থান এবং মানবাধিকারের চেয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই। সময় বলে দেবে, এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিপ্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত কী ভূমিকা রাখে, তবে এটি যে বিশ্বমঞ্চে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানকে নতুন করে চিনিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

* কাউসার খান, প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি ও অভিবাসন আইনজীবী

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ