Tuesday, October 1, 2024

পতিত সরকারের অনুগত আমলারা সরকারকে সফল দেখতে চায় না by ড. নুরুল আমিন বেপারী

আওয়ামী লীগের এমন করুণ পরিণতির মূলে রয়েছে গণতন্ত্রের প্র্যাকটিস না করা। সেটি দেশের সঙ্গে সঙ্গে দলের মধ্যেও করা হয়নি। একটি দলের মধ্যে যদি গণতন্ত্র না থাকে তাহলে তার পরিণতি ভয়াবহ হয়। এমনকি এ আন্দোলনের সময়ও যদি তাদের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা থাকতো তাহলে নিজেরা বুঝতে পারতেন যে- কোথায় ভুল হচ্ছে। কী করা উচিত। দলের পাশাপাশি আইন, বিচার, শাসন বিভাগ সব একজনের হাতে চলে গেছে। গণতন্ত্র শেষ হয়ে যায়। যার কারণে তিনি ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছেন। ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শ নিতে হয়। কিন্তু তিনি এককভাবে নেয়ায় এমন পরিণতি হয়েছে। পালিয়ে যেতে হয়েছে। অতীতের মতো আর এ ক্রাইসিস মোকাবিলা করতে পারেননি। গণতান্ত্রিকভাবে দলটি গড়ে উঠলে এ পরিণতি হতো না।

পতিত সরকারের আমলারা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সফল দেখতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নুরুল আমিন বেপারী। তিনি বলেন, গত ১৫ বছর আমলাদের অপব্যবহার করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ওই সরকারের সময় জটিল কোনো ক্রাইসিস দেখলে অ্যাকশনে গিয়েছে তারা। কারণ যতগুলো লোক মরবে তত পুরস্কার। পুলিশের মতো সুশৃঙ্খল একটা ইনস্টিটিউটকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। তাদের যারা এখনো আছে তারা তো পতিত সরকারের প্রতি অনুগত। সেই সরকারের লোকরা তো চাইবে যেন বর্তমান সরকার সফল না হতে পারে। ৫ই আগস্টের পর পুলিশ যেভাবে দৌড়ানি খেয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে পুলিশের এ দশা হয়নি। এমনকি পাকিস্তান আমলেও এমন হয়নি। তাই এ পুলিশ, আমলারা মনেপ্রাণে সরকারকে ভালোবাসতে পারছে না- তাই এ বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। প্রফেসর নুরুল আমিন বেপারী বলেন, ইনস্টিটিউশন একটি গাছের মতো। যত জীবন পাবে তত শক্তিশালী হবে। কিন্তু বাংলাদেশে ইনস্টিটিউশনগুলোকে ডেভেলপ করার সুযোগ দেয়া হয়নি। যার কারণে গণতন্ত্র হোঁচট খাচ্ছে। শেখ হাসিনা ওয়াজেদ দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এর কারণে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময়ও গণতান্ত্রিকভাবে ক্রাইসিস সমাধানের পথ খুঁজে পাননি তিনি। বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভালো চালাতে পারছে না। পজেটিভ দিক থেকে মানুষ প্রশংসা করছে ঠিকই। এখানে বুঝতে হবে ডায়নামিক কী কী? একটি কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিস্ট সরকারের হাত থেকে মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচছে। সে সময় বাক, ব্যক্তিস্বাধীনতা ছিল না। গুম, খুন, হত্যা, রাহাজানি চলতো। এ পরিবেশ থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি। গণতন্ত্র মানে হচ্ছে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়া। সেটি রাজনৈতিক দলের মধ্যেও করতে হবে। এ পরিবেশ সৃষ্টি করার অবস্থা আমাদের দেশে ছিল না।
এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে বর্তমান সরকারটি অভ্যুত্থানের, বিপ্লবের নয়। তিনি বলেন, যদিও কেউ কেউ বিপ্লবের সরকার বলছেন। কিন্তু পার্টি ছাড়া বিপ্লব হতে পারে না। এখানে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান হয়েছে। ফলে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় এসেছেন। অভ্যুত্থানের ফসল তার হাতে এসেছে। মানুষ খুশি হয়েছে। তাই আশা-আকাঙ্ক্ষা অনেক আছে। সে অনেক কিছু চাইলেই করতে পারে না। ব্যক্তি জীবনে দেড়/ দুই মাস যথেষ্ট সময় হলেও একটি জাতির জন্য সেটি যথেষ্ট নয়। কিছু কাজ তো হয়েছে। তবে বিভিন্ন নিয়োগ ইতিমধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ড. ইউনূসের প্রশাসনিক যাত্রাটা ভালোভাবে হয়নি। সব জায়গায় এলোমেলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় একটা লাশ পড়ে গেছে। যারাই শুনেছে তাদের বিবেকে নাড়া দিয়েছে। সবাই সমালোচনা করেছেন। এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কাউকে নিয়োগ দিলে এমন হতো না। এভাবে তিনি ব্যর্থ হচ্ছেন প্রশাসনিক দিক দিয়ে। আর ম্যাজেস্ট্রিসি পাওয়ার দিয়ে তিনি যে সেনাবাহিনী নামিয়েছেন সেটা তো ৮ই আগস্টই নামাতে পারতেন। তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতো না। ওয়ান-ইলেভেনের সরকারকে আমরা পছন্দ না করলেও তাদের সময়ে ল’ অ্যান্ড অর্ডার ঠিক ছিল। তাই সেনাবাহিনীকে আরও অ্যাক্টিভ ও সতর্ক হতে হবে। তা না হলে ড. ইউনূস ব্যর্থ হবেন। আর সিভিল সরকার ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিয়ে নেয়ার শঙ্কা থাকে।
সংস্কার কমিশন নিয়ে তিনি বলেন, এ কমিশনগুলোর মধ্যে কেউ কেউ শুরুতে বিতর্ক তৈরি করে ফেলেছেন। যেমন বদিউল আলম মজুমদার বলে বসলেন- আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন বৈধতা হবে না। তিনি বলবেন- তবে বলার একটা স্পেস আছে। এখন না। তখন আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে আসতে হবে যে কীভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে আসবে। সাখাওয়াত সাহেবও শুরুতে বিতর্ক তৈরি করেছেন। তাদের নিরপেক্ষভাবে কথা বলতে হবে। খুব বুদ্ধি খাটিয়ে কথা বলতে হবে। তাদের কথার অনেক মূল্য আছে। সংবিধান পুনর্লিখন বা সংশোধন এ কাজগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ। যদি পুনর্লিখন করতে হয় তাহলে তো জাতীয় বিপ্লবী সরকার গঠন করা উচিত ছিল। এখন তারা কিছু সংস্কার এনে একটি সংবিধান তৈরি করে জাতিকে দেবে কিন্তু সেটি পাস করবে কে। সংসদকেই করতে হবে। কিন্তু সে সংসদে তো এদের কেউ থাকবে না। সেখানে বিএনপি-জামায়াতের থাকবে- রাজনৈতিক দলগুলো থাকবে। তারা যদি পাস না করে তাহলে কী হবে। সে সময় বিএনপি যদি বলে বসে এটা কাটতে হবে, ওটা কাটতে হবে- তখন কী হবে। তাই আগে এদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে হবে না।
এবারের ছাত্র-জনতার আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য শিক্ষা- মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিশেষ করে বিএনপি’র জন্য একটা বড় শিক্ষা। কারণ তারা সবচেয়ে বড় দল। ইনস্টিটিউশনকে শক্তিশালী করতে হবে। তাহলে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে। বিএনপি’র আগের মান্ধাতার আমালের রাজনীতি ছেড়ে দিতে হবে। আওয়ামী লীগের দুর্নীতির কাজগুলো যদি বিএনপি এখন দখল করে তাহলে সেটা বড় ভুল হবে। মানুষ প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করবে। সহজভাবে বলতে হলে যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয় তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় সংস্কার আনতে হবে। দেশপ্রেমিক পুঁজিপতি প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে। তারা তাদের স্বার্থের জন্য ইনস্টিটিউশন গড়ে তোলে। তাহলে অনেকের কর্মসংস্থান হয়। অর্থনৈতিক সংস্কার করতে হবে যেন পুঁজিগুলো পাচার না হয়ে যায়। এগুলো দেশেই বিনিয়োগ করা যায়। পুঁজিপতিদের পুঁজিতে কিছু এলোমেলো থাকবেই। কিন্তু তাকে দেশে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, আমার দেশের গরিব মানুষ মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা পৃথিবীতে কায়িক পরিশ্রম করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠায়। আর চোরগুলো সে টাকা পাচার করে। পুঁজি না পেলে, ইন্ডাস্ট্রি গড়ে না উঠলে আমার দেশের ছাত্ররা পড়াশোনা করে চাকরি পাবে না। এভাবে অর্থনৈতিক সেক্টর রক্ষা করতে হবে। অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করে দেশ পরিচালনা করতে হবে। অর্থনীতি এবং রাজনীতি দুটোকেই গুরুত্ব দিতে হবে। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দেবে না এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে পারে। দেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ দেয়া উচিত। তাহলে দেশের বিকাশ হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রকেও সংস্কার করতে হবে। কারণ শিক্ষায় যারা যত এগিয়ে তারা তত অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে না পারলে কায়িক শ্রম করে উপার্জন করতে হবে। তখন তারা মজুরি কম পাবে। আজকে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরসহ অনেক জায়গায় ভারতের অনেক দক্ষ শ্রমিক কাজ করে। এটা যদি আমাদের কেউ করতো তাহলে টাকাটা দেশেই থাকতো। এদিকে লক্ষ্য রেখে এগুতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ প্রফেসর বলেন, ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে পরিবর্তন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা করতে হবে। সেটি দলগুলোর ভেতরে করতে হবে- বাইরে না। দুইবারের বেশি সরকার প্রধান হওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দিতে হবে। তারেক রহমান সাহেবকেও ধন্যবাদ যে, তিনি সেটি বলেছেন। কিন্তু তিনি বলেছেন, পর পর। তার মানে বিরতি দিয়ে আসতে পারবেন। এটা করতে দেয়া যাবে না। জনগণ এটা গ্রহণ করবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে কর্মসূচি ও নীতিতে ব্যাপকহারে পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বলেন, এ দেশে ইন্ডিয়া আওয়ামী লীগকে সকল অপকর্মে সহায়তা দিয়েছে। যার কারণে এখন বাংলাদেশের জনগণের কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত বৈদেশিক শক্তি ইন্ডিয়া। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকেও এটা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। বিএনপিসহ সব দলকেই জন চাহিদার ভিত্তিতে, সম্মানের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে। আমাদের সম্পর্ক হতে হবে সহায়তার- দাসত্বের নয়।
এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে আওয়ামী লীগের এমন করুণ পরিণতির মূলে রয়েছে গণতন্ত্রের প্র্যাকটিস না করা। সেটি দেশের সঙ্গে সঙ্গে দলের মধ্যেও করা হয়নি। একটি দলের মধ্যে যদি গণতন্ত্র না থাকে তাহলে তার পরিণতি ভয়াবহ হয়। এমনকি এ আন্দোলনের সময়ও যদি তাদের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা থাকতো তাহলে নিজেরা বুঝতে পারতেন যে- কোথায় ভুল হচ্ছে। কী করা উচিত। দলের পাশাপাশি আইন, বিচার, শাসন বিভাগ সব একজনের হাতে চলে গেছে। গণতন্ত্র শেষ হয়ে যায়। যার কারণে তিনি ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছেন। ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শ নিতে হয়। কিন্তু তিনি এককভাবে নেয়ায় এমন পরিণতি হয়েছে। পালিয়ে যেতে হয়েছে। অতীতের মতো আর এ ক্রাইসিস মোকাবিলা করতে পারেননি। গণতান্ত্রিকভাবে দলটি গড়ে উঠলে এ পরিণতি হতো না। নুরুল আমিন বেপারী বলেন, এভাবে চললে সরকার ফেল করবে। এনজিওভিত্তিক কেবিনেট বাদ দিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন লোকদের নিয়ে সরকার গঠন করা। কচিকাঁচার আসর দিয়ে সরকার চালানো কঠিন। যে ছাত্ররা কোটার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তারও কোটায় নিয়োগ পেয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য লোক নিয়োগ করা। এ সরকার ফেল করলে জাতির জন্য দুর্ভাগ্য রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের দুই থেকে তিন বছরের বেশি সময় নেয়া ঠিক হবে না। আর নির্বাচনের পর যেই সরকার গঠন করুক ড. মুুহাম্মদ ইউনূসকে কাজে লাগাতে হবে। তাকে পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হিসেবেও নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। যেন কাজগুলো থেমে না যায়। তৃতীয় শক্তির উত্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, এক/এগারোর সময় মাইনাস টু ফর্মুলা এসেছিল। কিন্তু সেটা পারেনি। এখন যদি ওরকম কিছু করতে চায় তাহলে শক্তিশালী একটা দল গঠন করতে হবে। কিন্তু ড. ইউনূসের এখন সে শক্তি আছে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে ছাত্ররাও এখন বিতর্কিত হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় তাদের প্রতিহত করছে শিক্ষার্থীরা।

mzamin

ছাত্র রাজনীতি কিছু প্রস্তাব by প্রফেসর ড. মোস্তফা নাজমুল মানছুর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট অতিসমপ্রতি এক জরুরি সভায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনীতিও নিষিদ্ধ করেছে। ছাত্ররাজনীতি নিয়ে একটি বিরূপ মনোভাব সমাজে রয়েছে। তাই আপাতদৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কর্তৃক নেয়া সিদ্ধান্তটি বেশ জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত বলেই মনে হচ্ছে। আমার কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কর্তৃক গৃহীত এই সিদ্ধান্তটিকে ‘জনপ্রিয় ভুল সিদ্ধান্ত’ বলেই মনে হয়। ছাত্রাবস্থায় ছাত্ররাজনীতির এবং কর্মজীবনে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তি হিসেবে তাই আমার নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সকলের সঙ্গে শেয়ার করে ছাত্ররাজনীতি বিষয়ে কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করছি।

আমি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকা অবস্থায়। শুধু যুক্ত ছিলাম বললে পুরোটা বলা হয় না, বরং বলা উচিত ছাত্ররাজনীতিতে আমি অত্যন্ত সক্রিয় ছিলাম এবং একাধিকবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জাকসু এবং হল সংসদ নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি ও নির্বাচিত হয়েছি। ছাত্ররাজনীতিতে এই সক্রিয়তা সত্ত্বেও আমি স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষাতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হই। সুতরাং, ক্যাম্পাসে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলেই একজন শিক্ষার্থীর লেখাপড়া উচ্ছন্নে যাবে কিংবা উচ্ছন্নে যাওয়া শিক্ষার্থীরাই কেবল ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হয়- এ ধরনের বক্তব্যগুলো আমার কাছে অতিসরলীকরণ বলেই মনে হয়। অবশ্য এই রকম অতিসরলীকরণ যারা করেন, তাদেরকে খুব দোষও দেয়া যায় না। গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ছাত্ররাজনীতির নামে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যে ধরনের বখাটেপনা, নিপীড়ন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আমরা দেখে আসছি, তাতে করে ওই ধরনের অতিসরলীকরণে আকৃষ্ট হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস তো কেবল এই দুই যুগের ইতিহাসই নয়। বরং, এই দুই যুগকে বলা যায় ক্যাম্পাসে ‘গ্রহণযোগ্য ছাত্ররাজনীতির অনুপস্থিতির দুই যুগ’। ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস আরও অনেক বিস্তৃত যেখানে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘটে যাওয়া ছোট-বড় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিবরণী; আবার সেই সঙ্গে পাওয়া যাবে অহংকার করার মতো সংগ্রামের ইতিহাসও।

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয় ১৯৮৯ সালের ১৬ই অক্টোবর। কলেজে থাকাকালেই ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই ছাত্ররাজনীতিতে স্বেচ্ছায় এবং উৎসাহের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। সেই সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা জাকসুতে নেতৃত্ব দিচ্ছিল তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, আর ক্যাম্পাসের একক বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বছর ঘুরতেই আবার জাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হলো এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল জাকসু এবং হল সংসদসমূহের প্রায় সকল পদেই জয়ী হয়। এই সময়ে পরপর তিনটি নির্বাচনেই (১৯৯০-৯১, ৯১-৯২, ৯২-৯৩) ছাত্রদল জাকসু এবং হল সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়। যতদূর মনে পরে, সর্বশেষ নির্বাচনে সব মিলিয়ে মোট ১০৬টি পদের মধ্যে ১০৪টিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বিজয়ী হয়। এ সবক’টি নির্বাচনেই আমি নিজে অংশগ্রহণ করেছি এবং বিজয়ী হয়েছি। এই বিবরণ দেয়ার কারণ হলো এটা দেখানো যে, ঐ সময়ে ছাত্রদলের যে দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল তা নিছক সন্ত্রাস বা সরকারি ক্ষমতানির্ভর ছিল না। বরং সংগঠনটি সত্যিকার অর্থেই ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের এই অতলস্পর্শী জনপ্রিয়তা এরশাদ জামানার মাধামাঝি সময় থেকে শুরু হয় এবং পরে তা বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন হিসেবেও অব্যাহত থাকে।
সরকার সমর্থক একটি ছাত্র সংগঠনের দোর্দণ্ড প্রতাপ থাকা সত্ত্বেও সেই সময়ের অন্তত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিকে গত দুই যুগের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে মোটেও মেলানো যাবে না। স্বীকার করতেই হবে যে, তখনো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দোকানে বাকি রাখার ঘটনা ছিল, হুমকি-ধামকির ঘটনা ছিল, গ্রুপিং ছিল, হলে পছন্দের সিট বরাদ্দ লাভ নিয়ে বচসা ছিল (তখন সকল শিক্ষার্থীই হলে সিট পেতো এবং গণরুম জাতীয় কিছু ছিল না), প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ছিল, এমনকি কিছুটা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও ছিল। কিন্তু, এসব সত্ত্বেও তখন পারস্পরিক সহমর্মিতা ছিল, সহনশীলতা ছিল, যূথবদ্ধতা ছিল। সর্বোপরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়মিত ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া ছিল।

ছাত্ররাজনীতির এই যে একটি মোটামুটি গ্রহণযোগ্য অবস্থা তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল, এটি কি করে সম্ভব হয়েছিল? আমার মতে এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, তখন ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত ছিল কেবল নিয়মিত শিক্ষার্থীরা যারা কিনা সকালে ক্লাস করতো, টিউটোরিয়াল পরীক্ষা দিতো, বিকালে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতো, সন্ধ্যায় মিছিল করতো আর রাতে পরের দিনের পরীক্ষার জন্য পড়তে বসতো। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ইয়ারড্রপ দিলে তখন সংগঠনে পদ থাকতো না। স্নাতক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত মোট দুইবারের বেশি ইয়ারড্রপ হলে একজন শিক্ষার্থী সংগঠনে পদ ধরে রাখতে পারতো না এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারতো না। আমি নিজে একজন জাকসু ভিপিকে দেখেছি নিয়মিত ব্যাচের সঙ্গেই স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ করে ভিপি থাকা অবস্থাতেই ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে। ঐ সময়ে প্রথম বর্ষ থেকে স্নাতকোত্তর শ্রেণি পর্যন্ত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের দ্বারা ছাত্র সংগঠনগুলোর কমিটি গঠিত হতো, আদুভাইদের কোনো স্থান ছিল না। আসলে আদুভাই বলে কোনোকিছু তখন ছিলই না। ছাত্র সংগঠনগুলোর কমিটিগুলো গঠিত হতো সংগঠনের কর্মীদের কাউন্সিলের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, উপর থেকে কোনো কমিটি চাপিয়ে দেয়া হতো না। আর নিয়মিত জাকসু নির্বাচন থাকায় রাজনীতি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘মারমুখী ক্যাডার’ হওয়ার চেয়ে জনপ্রিয় ছাত্রনেতা হওয়ার চেষ্টা বেশি থাকতো যার সদর্থক প্রভাব ছাত্রনেতাদের আচরণে স্পষ্ট হতো।

এমন ছাত্ররাজনীতি কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে, নাহলে অন্তত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়? আমি মনে করি সেরকম একটা চেষ্টা নেয়া যেতে পারে। আর সেই ধরনের কোনো চেষ্টা যদি থাকে, তাহলে সেই প্রচেষ্টাকে সহায়তা করার জন্য আমি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কিছু প্রস্তাবনা রাখতে চাই।
১. সকল ছাত্র সংগঠনকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদন লাভ করতে হবে। অননুমোদিতভাবে কোনো ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল হতে পারবে না।
২. কেবলমাত্র নিয়মিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ছাত্র সংগঠনের সদস্য হতে পারবে। এমফিল বা পিএইচডি শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে কোনো ছাত্র সংগঠনের সদস্য হতে পারবে না এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা হল সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।
৩. ছাত্র সংগঠনের কমিটিগুলো নিয়মিত ছাত্রদের দ্বারা গণতান্ত্রিকভাবে গঠিত হতে হবে। ক্যাম্পাসের বাইরের কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের দ্বারা কোনো কমিটি চাপিয়ে দেয়া যাবে না। কমিটির আপডেট কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। অন্যথায়, এ ধরনের কমিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে স্বীকৃতি পাবে না।
৪. কোনো ছাত্র সংগঠনের কোনো কর্মী সাংগঠনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো শিক্ষার্থীকে শারীরিক-মানসিকভাবে নিপীড়ন করলে কর্তৃপক্ষ নিপীড়নকারীর বিচারের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ঐ ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে স্থগিত করার অধিকার সংরক্ষণ করবে।
৫. স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ইয়ারড্রপ দিলে সংগঠনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর পদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঐ শিক্ষার্থীকে কোনো সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না।
৬. স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দুই বারের বেশি ইয়ারড্রপ দিলে কোনো শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব থাকবে না এবং সেই ‘ব্যক্তি’ তাৎক্ষণিকভাবে ‘সাবেক শিক্ষার্থী’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তার হলের সিট বাতিল হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ‘সাবেক শিক্ষার্থীকে’ অবশ্যই সাবেক হয়ে যাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে হল ত্যাগ করতে হবে।
৭. নিয়মিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ এবং হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। ছাত্র সংসদসমূহের মেয়াদ হবে এক বছর। বছরান্তে পরবর্তী নির্বাচনের আগেই ছাত্র সংসদ বিলুপ্ত হতে হবে। ছাত্র সংসদের কোনো পদে থাকা অবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীর স্নাতকোত্তর পরীক্ষা সম্পন্ন হয়ে গেলে, ঐ শিক্ষার্থী ছাত্র সংসদের ঐ পদে আর থাকবেন না।
৮. কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ এবং হল সংসদ নির্বাচনে একজন শিক্ষার্থী দলীয় ভিত্তিতে বা দলনিরপেক্ষভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে। দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও কোনো প্রার্থী নির্বাচনী পোস্টার/ব্যানার/প্রচারপত্রে জাতীয় নেতৃবৃন্দের ছবি ব্যবহার করতে পারবে না।
৯. নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্য হতে ৫ জন সিনেট সদস্য মনোনীত করতে হবে।
১০. শিক্ষার্থীদের হলে সিট বরাদ্দের বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে হল প্রশাসন কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হবে। এখানে এমনকি নির্বাচিত হল ছাত্র সংসদেরও কোনো ভূমিকা থাকবে না। প্রতিটি শিক্ষার্থীর হলে সিট প্রাপ্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেবে হল প্রশাসন। সকল কক্ষে সমসংখ্যক শিক্ষার্থীকে সিট বরাদ্দ দিতে হবে। বরাদ্দকৃত সিটে শিক্ষার্থীর দখল পাওয়ার বিষয়টি হল প্রশাসন নিশ্চিত করবে।
১১. হল প্রশাসন হলে হলে গণরুম বিলুপ্ত করবে এবং গেস্টরুমগুলোতে সিসিটিভি স্থাপন করবে।
১২. হলের ছাত্র সংসদের সহযোগিতায় হল প্রশাসন ডাইনিংয়ের খাবার মান উন্নত করবে।
১৩. সকল প্রকার র‌্যাগিং এবং নিপীড়নের তদন্ত সাপেক্ষে বিচার করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদন (যতটুকু প্রকাশযোগ্য) ও শাস্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে নোটিশ দিয়ে সকলকে অবহিত করতে হবে।  
১৪. ক্যাম্পাসে সকল ধরনের সামাজিক- সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া বিষয়ক কর্মকাণ্ডকে প্রশাসনিকভাবে উৎসাহিত করতে হবে।
১৫. শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিনিধি নিয়ে একটি ‘ক্যাম্পাস কমিটি’ গঠন করতে হবে যা ক্যাম্পাসের বিবিধ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ/প্রস্তাব দিবে।
আমি মনে করি, নতুন লব্ধ দ্বিতীয় স্বাধীনতার পর গুরুতর সংস্কার সাপেক্ষে ছাত্ররাজনীতিকে অনুমোদন দিয়ে আমরা আরেকবার দেখতে পারি। স্বৈরাচারের যুগে ছাত্ররাজনীতি আসলে উপস্থিত ছিল না। সুতরাং, সেই ছাত্ররাজনীতি দিয়ে গোটা ছাত্র রাজনীতিকে বিচার করা অতিসরলীকরণ হয়ে যাবে। স্বৈরাচার-পূর্ব সময়েও যে ছাত্ররাজনীতি খুবই আদর্শিক ছিল তেমন দাবি আমি করিনি। তবে কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্য এক ধরনের ছাত্ররাজনীতির বাস্তব উদাহরণ আমি এই লেখায় দিয়েছি। ৫ই আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতায় আমার দেয়া উদাহরণের চেয়েও অনেক ভালো ছাত্ররাজনীতি সংস্কার সাপেক্ষে সম্ভব হতে পারে বলে বিশ্বাস রাখি। এই বিশ্বাস থেকে আমি ছাত্ররাজনীতির পক্ষে। ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে আপনি যতটা শক্তি ব্যয় করবেন, তার চেয়ে অনেক কম শক্তি ব্যয় করে আপনি কিন্তু এখানে গুরুতর সংস্কার সাধন করতে পারবেন। অতএব, আরেকটু ভেবে সিদ্ধান্ত নিন।
লেখক: দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

mzamin

বেশি করে হাসুন, সুস্থ থাকুন

সুন্দর হাসি দিয়ে খুব সহজে সবার মন জয় করে নেওয়া যায়। তেমনি সুস্থ থাকতেও প্রয়োজন প্রাণ খোলাহাসি।

কারণ, হার্ট সুস্থ রাখতে হাসিকে বলা হয় ‌‘মহৌষধ’। হাসি সংক্রামক।

একজনকে হাসতে দেখলে অন্যদেরও হাসি পায়। ফলে সবার মনই ভালো থাকে আর আশেপাশের পরিবেশও হয়ে যায় উচ্ছল-প্রাণবন্ত। ফলে নিজেকে সুখী মনে হয়।  

এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সাধারণত প্রাণখোলা হাসির প্রতি বেশি সাড়া দেয়। হাসি আমাদের স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে। এছাড়া হাসার সময় আমাদের মুখের অনেকগুলো মাসল কাজ করার ফলে রক্ত সঞ্চালন বেশি হয় এবং এর ফলে মুখের ত্বক উজ্জ্বল হয়। হাসলে মানসিক চাপ কমে।
 
লাইভ সাইন্সের তথ্যানুযায়ী, চাপা হাসি বা মুচকি হাসির ক্ষেত্রে কণ্ঠনালি অনুরণিত হয় না, কারণ এ ধরনের হাসির সময় নিশ্বাস নাক দিয়ে বের হয়ে যায়।

মনোবিজ্ঞানী ড. ডানিয়েল কারলেট বলেছেন, শুধু রসিকতার ক্ষেত্রেই নয়, হাসি সমাজে পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ার ক্ষেত্রেও খুবই ইতিবাচক। তাই মনকে প্রফুল্ল রাখতে সব সময় হাসুন। হাসি যেমন আপনার হার্ট ভালো রাখবে, তেমনি পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট রাখবে।  

আজকাল সুস্থ থাকতে লাফিং-ক্লাব খোলা হচ্ছে, প্রায়ই সকালে পার্কে প্রাত ভ্রমণে এসে বয়স্কদের দলবেঁধে হাসতে দেখা যায়। এই দলে যোগ দিতে পারেন তরুণরাও। তবে সাবধান, হাসি দিয়ে যেমন সবার মন জয় করা যায়, তেমনি এমনভাবে হাসা যাবে না যা কাউকে ছোট করতে পারে বা তাচ্ছিল্য করা বোঝাবে। 

বেশি করে হাসুন, সুস্থ থাকুন

‘নির্বাচন কবে, এটা ঠিক করবে জনগণ’

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে, ১৬ না ১৮ মাস পরে, এটা ঠিক করবেন দেশের জনগণ।

সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর হেয়ার রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। ড. ইউনূসের যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিষয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেন, বিশ্বনেতারা রাষ্ট্র মেরামতের বিষয়ে সমর্থন জানিয়েছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র সংস্কারে ৬টা কমিশনের কাজ শুরু হয়েছে। তবে পুরোদমে সংস্কার শুরুর আগে উপদেষ্টা পরিষদ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আরেক দফা আলোচনা করবেন।

এ সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা হবে কি না সে বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদ সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন ১৬ মাস না ১৮ মাস পরে হবে এটা আসলে ডিসাইড করবে বাংলাদেশের জনগণ। কমিশনের রিপোর্ট, কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে পলিটিক্যাল কনসালটেশন এবং এই কনসালটেশনের পরে বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশের সোসাইটি, বাংলাদেশের সমস্ত স্টেকহোল্ডার যখন ডিসাইড করবেন, আমরা এ বিষয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছি- তখন নির্বাচনের একটি সমাধান হবে। এটা কবে হবে তা এখনই নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। আর আমার মনে হয়, সেনাপ্রধান এখানে মতামত দিয়েছিলেন। আলোচনাটা খুব দ্রুত হবে এটুকু আমি বলতে পারি, আলোচনাটা হওয়ার পরেই দেখবেন কমিশনের কাজ শুরু হচ্ছে।

এ ছাড়া বিশ্ব নেতারা টাইম ফ্রেম জানতে চাননি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং জনগণসহ সব স্টেক হোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা ও মতামত নিয়েই নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্বাচনে অংশগ্রহণসংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে শফিকুল আলম বলেন, তিনি এক কথার মানুষ। তিনি সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন, তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। তিনি রাষ্ট্র মেরামতের এ সুযোগকে মহৎ একটি কাজ হিসেবে বিবেচনা করছেন এবং এটিকে তিনি সফল জায়গায় নিয়ে যেতে চান।

আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার আর্থিক সমর্থনের বিষয়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পাশাপাশি বাংলাদেশের সংস্কার কমিশনগুলোকে বিশ্বনেতারা সমর্থন জানিয়েছেন।

একইসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতিসংঘে সফরের সময় তার সরকারকে বিশ্ব নেতারা সমর্থন জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

সোমবার সন্ধ্যায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন শফিকুল আলম। ছবি : সংগৃহীত
সোমবার সন্ধ্যায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন শফিকুল আলম। ছবি : সংগৃহীত



ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আহ্বান ইহুদিদের

রাতারাতি পাল্টে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের সব হিসাব-নিকাশ। লেবাননের বৈরুতে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সদরদপ্তর লক্ষ্য করে চালানো হামলায় ওই অঞ্চলে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। শুক্রবারের ওই হামলায় নিহত হন প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ। ইসরায়েলের জন্য একসময় ত্রাস হয়ে ওঠা, নাসরুল্লাহকে হত্যায় দীর্ঘদিন ধরেই পরিকল্পনা করছিল তেল আবিব। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে পুরো বিশ্বের নজর যখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে, তখনই এই হামলা চালায় ইহুদি রাষ্ট্রটি।

আবাসিক একটি ভবনের নিচে আন্ডারগ্রাউন্ডে সদরদপ্তর বানিয়েছিল লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধারা। কিন্তু ভয়ংকর বাংকার বাস্টার বোমা ফেলে সেই সদরদপ্তর গুঁড়িয়ে দেয় ইসরায়েল। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের গোপন এক মিটিং চলাকালে এমন হামলায়, পালানোর সুযোগ পাননি নাসরুল্লাহ। তাই সেখানেই মারা যান। নাসরুল্লাহ হত্যার এই মিশনে বেসামরিক ব্যক্তিরা নিহত হয়েছে। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উঠেছে নিন্দার ঝড়। তবে পরম মিত্র যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতো এবারও ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে।

সরকার পতনের আন্দোলন আর গাজা থেকে ইসরায়েলি জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা নিয়ে দেশের ভেতর ব্যাপক চাপে ছিলেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সেই ইস্যুর সমাধান না করে, জাতিসংঘে শুক্রবার হঠাৎ হাজির হয়ে সিরিয়া, ইরাক ও ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অভিশাপ বলে মন্তব্য করেন। গেল এক দশকের বেশি সময় ধরে সিরিয়া ও ইরাকে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হওয়ায় ধীরে ধীরে নিজের বলয় গড়েছে ইরান। সেই বলয় ভাঙতেই এখন মরিয়া ইসরায়েল।

তবে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই তেল আবিবের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধারা। বিশেষ করে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে গেল ১১ মাস ধরে প্রায় প্রতিদিনই রকেট ছুড়েছে তারা। আর তাই, মোক্ষম সুযোগ পেয়ে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নেতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার পর নাসরুল্লাহকেও দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দিয়ে ইরানকে সরাসরি বার্তা দিল দেশটি।

আর তাই চটে গেছেন ইরানের ইহুদিরাও। নাসরুল্লাহর এই হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারেননি তারা। এ ঘটনার পর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন ইরানের একজন ইহুদি আইনপ্রণেতা ড. হোমাউন সামেহ। ইরানের বার্তা সংস্থা ইসনাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসরায়েলের ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীকে অপরাধী হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। ইসরায়েল থেকে প্রকাশিত দৈনিক ওয়াইনেট নিউজ তাদের নিউজ পোর্টালে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

নাসরুল্লাহকে হত্যা করতে গিয়ে বেসামরিক ব্যক্তিদেরও নির্বিচারে টার্গেট করা হয় বলে অভিযোগ করেন ইহুদি এই আইনপ্রণেতা। আবাসিক ভবনে চালানো এসব হামলার জন্য শুধু মুখে প্রতিবাদ না করে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বানও জানান সামেহ।

তবে সামেহ শুধু একা নন, নাসরুল্লাহ নিহত হওয়ার ঘটনায় ইসফাহান ও তেহরানের ইহুদি সম্প্রদায় এক যৌথ বিবৃতি শোক প্রকাশ করেছে। জায়নবাদী রেজিমের নির্মম কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নাসরুল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে বলেও জানায় তারা। 

ফাইল ছবি।

যেভাবে গায়েব হয় সমবায়ের ১২ হাজার ভরি স্বর্ণ

রোববার অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ ‘সমবায় ব্যাংকের ১২ হাজার ভরি সোনার খোঁজ’ পাওয়া যাচ্ছে না, এমন বক্তব্য দেয়ার পর এ নিয়ে মতিঝিলের ব্যাংক পাড়ায় তোলপাড় শুরু হয়। ব্যাংকের সোনা কীভাবে গায়েব হলো সেটি নিয়ে কৌতূহল ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমেও আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।

এদিকে গ্রাহকরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। টাকা উত্তোলনে আমানতকারীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সোমবার ব্যাংকটির হেড অফিস মতিঝিল শাখায় এ চিত্র দেখা গেছে।
কুমিল্লায় এক অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা এএফ হাসান আরিফ বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর কোথায় কী অবস্থা রয়েছে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি। সমবায় ব্যাংকের অবস্থা দেখতে গিয়ে জানলাম, ব্যাংকের ১২ হাজার ভরি স্বর্ণের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংকের সম্পত্তি বেদখল হয়ে আছে। যারা একসময় ব্যাংকে ছিলেন তারাই বেদখল করে বসে আছেন। এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সমবায় ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতেও পারছে না। অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার জন্যই ডুবতে বসেছে ব্যাংকটি। তার এই বক্তব্য দেয়ার পরপরই বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে ওঠেন।

যেভাবে গায়েব হলো সোনা: ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৫ বছরে দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো অনেকটা আড়ালে থাকা বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডেও লুটপাটের মহোৎসব চলেছে। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে জুন মাসের মধ্যে ব্যাংকটি থেকে লুট হয়েছে ১২ হাজার ভরি স্বর্ণ।

এত স্বর্ণ কারা রেখেছিল-এই প্রশ্নের উত্তর জানতে সমবায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় সূত্র জানায়, সমবায় ব্যাংকের লকার থেকে খোয়া যাওয়া ওই ১২ হাজার ভরি স্বর্ণের মালিক নারায়ণগঞ্জ কো-অপারেটিভ ক্রেডিট লিমিটেড। তারা তাদের গ্রাহকদের স্বর্ণ বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা নিয়েছিল, যার সুদের পরিমাণ ১০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি ১৯৫৭ সাল থেকে সমবায়ের সঙ্গে এমন বন্ধকী ব্যবসা করে আসছিল। ২০১২-১৩ সালের দিকে তারা কাস্টমারের স্বর্ণ মেরে লাপাত্তা হয়ে যায়। এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে একটি ডিসপিউট মামলা করা হয়। মামলার রায় হলে তাদের সঙ্গে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে যোগাযোগও করা হয়। কিন্তু সেই স্বর্ণগুলো নিতে নারায়ণগঞ্জ কো-অপারেটিভ লিমিটেডের কেউ নিতে আসেননি। সবমিলিয়ে যথাসময়ে ঋণ শোধ না করায় এক পর্যায়ে ব্যাংক সেই সোনা নিলামে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সময় ব্যাংকের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, কো-অপারেটিভের সদস্যরা জমা রাখা সোনা ঋণ পরিশোধ সাপেক্ষে নিতে চাইলে নিতে পারবে। এ সুযোগটি নিয়েছিল কিছু অসাধু কর্মকর্তা। তারা ভুয়া ব্যক্তিকে ওই সমিতির সদস্য সাজিয়ে ভুয়া রসিদ বানিয়ে ঋণ হিসেবে নেয়া টাকা জমা দিয়ে সোনা তুলে নেয়।
ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানায়, যখন কো-অপারেটিভ লিমিটেডের কোনো সদস্য আসেনি তখন সেই সুযোগটি কাজে লাগায় খোদ ব্যাংকের একটি চক্র। গ্রাহকের পরিচয়পত্র নকল করে সমবায় ব্যাংকে আবেদন করার নাটক সাজায় চক্রটি। স্বর্ণ ফেরত পেতে ১ হাজার ৯৮৪টি আবেদন করেন গ্রাহকরা। কিন্তু এরা সবাই ছিল ভুয়া গ্রাহক। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ব্যাংকের পক্ষ থেকে দুদককে জানানো হলে তারা তদন্ত শুরু করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে চার্জশিট দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার আসামি করা হয়েছে সমবায় ব্যাংকের ৭ কর্মকর্তাকে। যদিও এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি একরত্তি স্বর্ণও।

ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জালিয়াতির ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল ব্যাংকের দুটি বিভাগ। একটি স্বর্ণ বিভাগ ও অপরটি হিসাব বিভাগ। সমবায় আইন অনুযায়ী বিভাগীয় সার্বিক কাজের দায়িত্ব ও তত্ত্বাবধানে ছিল সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডিজিএম বা উপ-মহাব্যবস্থাপক। তারা কোনো সমস্যায় পড়লে জিএম বা চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত চিঠি দেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু স্বর্ণ আত্মসাতের ঘটনা দুদক পর্যন্ত গড়ালেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাননি ডিজিএম। এ ঘটনায় দুদকের করা মামলায় সেই সময় গ্রেপ্তার হন সমবায় ব্যাংকের উপ-মহাব্যবস্থাপক আব্দুল আলিম, সহকারী মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) হেদায়েত কবীর, সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার ও সমবায় ভূমি উন্নয়ন ব্যাংকের এস এস রোড শাখার ব্যবস্থাপক মো. মাহাবুবুল হক, প্রিন্সিপাল অফিসার মো. ওমর ফারুক ও সিনিয়র অফিসার (ক্যাশ) নূর মোহাম্মদ।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, এসব ব্যক্তিরা ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৩১৬ জন গ্রাহকের বন্ধক রাখা সাত হাজার ৩৯৮ ভরি ১১ আনা সোনা আত্মসাতের চেষ্টা করেছে, যার তখনকার বাজার মূল্য উল্লেখ করা হয় ৪০ কোটি ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮৮ টাকা। এর মধ্যে, ভুয়া ব্যক্তিকে গ্রাহক সাজিয়ে প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকার সোনা তারা আত্মসাৎ করেন। এ মামলা এখনো চলছে।
সোমবার দুপুরে মতিঝিল শাখায় টাকা তুলতে আসেন যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, আমার ১০ ভরি সোনা রাখা ছিল। পাশাপাশি কয়েক লাখ টাকাও রাখা ছিল। সেটা তুললাম। এ ছাড়া সোনাও তোলার জন্য ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করলাম। কারণ কখন কী হয়ে যায় বলা যায় না।
আরেক মহিলা গ্রাহক কুলসুম বানু বলেন, এই ব্যাংকে টাকা ও সোনা জমা রেখেছি। সোনা গায়েব হওয়ার কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। তাই জমানো টাকাগুলো তুলে নিলাম। পাশাপাশি সোনাও তুলে নিলাম।

ব্যাংকটির এক পিয়ন বলেন, আগের অন্য যেকোনো দিনের তুলনায় আজ (সোমবার) সকাল থেকে অনেক গ্রাহক এসেছে। আগে এত আসতো না। সোনা গায়েব হওয়ার খবর প্রচার হওয়ার কারণে গ্রাহকরা শঙ্কিত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, করোনা মহামারির প্রকোপ শুরু হওয়ার পর ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত এই স্বর্ণ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ব্যাংকের ভল্ট থেকে তুলে নেয়া ওই ১২ হাজার ভরি স্বর্ণের মালিক ভুয়া ছিল। বর্তমানে ব্যাংকটির এমডি পদ শূন্য রয়েছে।
ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আহসানুল গনি জানান, কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে ভুয়া গ্রাহকরা তুলে নিয়েছিল। পরে এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করে, যা এখনো বিচারাধীন আছে। মূলত সোনার বাজার দর অনেক বেশি হওয়ায় লোন শোধ করেই ভুয়া ব্যক্তিরা সোনা তুলে নিয়ে লাভবান হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, সমবায় ব্যাংক হচ্ছে একটি বিশেষায়িত ব্যাংক। সমবায় আইনের বিধান অনুযায়ী এটি সমবায় খাতে অর্থ সরবরাহকারী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে থাকে। এটি সমবায় সমিতির ছাড়াও ব্যক্তি পর্যায়ে ঋণ দিতে পারে।

mzamin

কনস্টেবলের সম্পদের পাহাড় by শরিফ রুবেল

জাহাঙ্গীর আলম। পুলিশ কনস্টেবল। বিপি নম্বর ৮৭০৬১১৭৮৬১। বাড়ি শরীয়তপুর সদর উপজেলার ভাষানচর গ্রামে। ২০০৬ সালে পুলিশে যোগ দেন জাহাঙ্গীর। বর্তমানে তার চাকরির বয়স ১৮ ছুঁই ছুঁই। তবে চাকরি জীবনের ১২ বছরই তিনি ঢাকা জেলার ধামরাই থানায় কর্মরত। এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন। কীভাবে তিনি একই থানায় এত বছর চাকরি করেন? জাহাঙ্গীর আলম মূলত ধামরাই থানার কম্পিউটার অপারেটর। থানার ড্রাফটিং, এজাহার, অভিযোগপত্র, সাধারণ ডায়েরি, আপোষনামা, ছাড়পত্র, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, চার্জশিট ড্রাফটিং, অফিসিয়াল চিঠিপত্র সহ যাবতীয় লেখালেখিই তার হাতে হয়। সেই সুবাদে থানার ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গেও সখ্য তার। এই সুযোগে নিজের পদকে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। নিজের নামে থানার পাশেই কিনেছেন জমি।

সম্প্রতি সেই জমিতে ৫ তলা বাড়ি নির্মাণ করে আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। এদিকে একজন পুলিশ কনস্টেবলের হঠাৎ উত্থানে থানার আশপাশের বাসিন্দারাও রীতিমতো অবাক। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, কনস্টেবল এত টাকা কোথায় পেলেন? কীভাবে তিনি রাজকীয় জীবনযাপন করেন। অভিযোগ রয়েছে, শুধু ঢাকায় নয়, জাহাঙ্গীর আলম নিজ গ্রামেও কয়েক বিঘা জমি কিনেছেন। মাঝেমধ্যেই তিনি গ্রামে ছুটে যান। জমি দেখভাল করেন।  সেখানেও বাড়ি নির্মাণের তোড়জোড় করছেন। সম্পদ করেছেন শ্বশুরবাড়িতেও। জাহাঙ্গীরের শ্বশুরবাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার কোনা কালিহর গ্রামে।

ধামরাই থানা সূত্রে জানা গেছে, কোটাবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের ব্লক রেইড চলার সময় শিক্ষার্থী, বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যক মামলা দেয় পুলিশ। চলে গণগ্রেপ্তারও। ওই সময়ে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে মামলার এজাহার থেকে  বেশকিছু আসামির নাম মুছে দিয়ে ধরা পড়ে যান জাহাঙ্গীর। পরে তাকে ধামরাই থানা থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে ঢাকা জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। ছাত্রজীবনে জাহাঙ্গীর আলম ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শরীয়তপুর পৌর ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন এই জাহাঙ্গীর। ২০০৭ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেলের অনুসারী ছিলেন। বর্তমানে তার পরিবার ইকবাল হোসেন অপুর রাজনীতি করেন। সাবেক সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপুর প্রভাব খাটিয়েই তিনি প্রায় ১০ বছর ধামরাই থানায় চাকরি করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ সালে ধামরাই থানা রোডের বরাতনগর লাকুড়িয়াপাড়া মৌজায় বিআরএস ৪৩৬১ নং খতিয়ানের ৪৬৫ নং দাগে ৪ শতাংশের একটি প্লট কেনেন জাহাঙ্গীর। ধামরাই থানায় দায়িত্বরত থাকা অবস্থায় তিনি এই প্লট কিনেন। প্লট নং ই-১৬। সরজমিন গেলে ওই এলাকার স্থানীয়রা জানান, বরাতনগরে প্রতি শতাংশ জমির দাম স্থানভেদে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার উপরে।  সেক্ষেত্রে ৪ শতাংশ জমির দাম প্রায় ৫০ লাখ টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ওই প্লটে আবাসিক ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন জাহাঙ্গীর। ১০ তলা ফাউন্ডেশন ভবনের ৫ তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। এখন ফিটিংসের কাজ চলছে। সূত্র জানায়, এর মধ্যেই বাড়ির পাশের ৩ কাঠার খালি প্লটটিও কেনার চেষ্টা করছেন। জানা গেছে, এমনিতেই পুলিশের নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের বেহালদশা। কনস্টেবলদের সামান্য বেতনে সংসার চালাতে হাঁসফাঁস অবস্থা। সেখানে জাহাঙ্গীরদের মতো কনস্টেবলদের কোটি টাকার বাড়ি, গাড়ি ও সম্পদ অর্জন দেখে পুলিশের অনেক সদস্যই অবাক। আব্দুল বাসেত রানা নামের এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল মানবজমিনকে বলেন, একজন কনস্টেবলের মূল বেতন সাড়ে ৯ হাজার টাকা। অন্যান্য সুবিধাসহ তারা মোট ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা পান। এই টাকা দিয়ে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। পরিবার চালানো সম্ভব না। নিজের পকেট খরচ চলে না। একজন গার্মেন্টস কর্মীর চেয়েও একজন কনস্টেবলের বেতন কম। সেখানে  কোটি টাকার বাড়ি করা অসম্ভব। এটা অসৎ পথ অবলম্বন না করলে মোটেও সম্ভব না।

জানা গেছে, অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে কয়েক বছর আগে তাকে মুন্সীগঞ্জ পুলিশ লাইনে বদলি করা হয়। সেখান থেকে কয়েক মাস পরই তদবির করে আশুলিয়া থানায় আসেন। পরে আশুলিয়া থেকে ৯ মাস পর বদলি হয়ে পুনরায় ধামরাই থানায় চলে আসেন।

বাড়ি ও জমির বিষয়ে জানতে চেয়ে পুলিশ কনস্টেবল জাহাঙ্গীর আলমকে ফোন করা হলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমি বরাতনগরের জমিটি অনেক আগে কিনেছি। এখন সেখানে একটি বাড়ি নির্মাণ করছি। এটা আমার অনেক কষ্টের টাকা। অল্প অল্প করে সঞ্চয় করে বাড়িটি করেছি। এখানে আমার স্ত্রীও সহায়তা করছে। তবে টাকার উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে এই কনস্টেবল উল্টো প্রশ্ন রেখে বলেন, আমি বাড়ি করেছি, এতে কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি? আমি কি কারও ক্ষতি করেছি। কারও টাকা মেরে বাড়ি করেছি? চাকরি করি বলে আমরা কি কোনো বাড়ি-গাড়িও করতে পারবো না?

mzamin

কোটিপতি জামুকা’র অফিস সহকারী মামুন মিয়া by মতিউল আলম ও এনায়েতুর রহমান

মামুন মিয়া (৩০)। পিতা দুলাল মিয়া ফেরি করে খিলিপান বিক্রি করতেন। কিন্তু জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অফিস সহকারী পদে চাকরি পেয়েই ভাগ্য খুলে যায় মামুনের। ১০ বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি। চলাফেরা করেন প্রাইভেট কারে। ঈশ্বরগঞ্জের রায়েরবাজার স্টেশন রোডে ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় কিনেছেন জমিসহ ৪তলা ভবন। এ ছাড়া নামে-বেনামে রয়েছে ৭ একর জমি।

স্থানীয় দক্ষিণ বনগাঁও গ্রামের সাবেক ইউপি মেম্বার হাদিস জানান, মামুনের বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ বনগাঁও গ্রামে। বাবা দুলাল মিয়া ১০ বছর আগেও আঠারবাড়ি রায়ের বাজারে ফেরি করে খিলিপান বিক্রি করতেন। স্ত্রী, ৩ ছেলেও  ৩ মেয়েসহ ৮ সদস্যের পরিবার নিয়ে অতি কষ্টে সংসার চালাতেন।  ৬ষ্ঠ শ্রেণি পাস করার পর আর লেখাপড়া করেননি। ২০১৩ সালে এক সচিবের মাধ্যমে জামুকায় চুক্তিভিত্তিক  অফিস সহায়ক পদে যোগ দেন। এরপর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট বাণিজ্যে নামেন তিনি। দুহাতে টাকা কামানো শুরু করেন।  আড়াই কোটি টাকা দিয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানা এলাকায় প্রায় ৩ একর জমি ক্রয় করেন মামুন। যার বর্তমান বাজার মূল্যে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ঈশ্বরগঞ্জ থানার আঠারবাড়ী রায়েরবাজার রেল স্টেশন রোডে ৫ শতাংশ জমিসহ ৪তলা বিল্ডিং কেনেন। যার মূল্য ১ কোটি ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়াও ১১ই মার্চ দক্ষিণ বনগাঁও নিবাসী জালাল উদ্দিনের ছেলে মেয়েদের কাছ থেকে ২৬ শতাংশ জমি ৪০ লাখ টাকায় ক্রয় করেছেন। দক্ষিণ বনগাঁও গ্রামের সিরাজ মিয়ার কাছ থেকে ৫০ শতাংশ জমি ক্রয় করে এবং আঠারবাড়ী নিবাসী আ. খালেকের কাছ থেকে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করে। মামুন মিয়া ক্রয়কৃত সম্পত্তির বিক্রেতাদের কাছ থেকে জমি কিনেছেন তারা হলেন- স্থানীয় আব্দুর রশিদের নিকট থেকে ২০ শতাংশ এবং মোহাম্মদ-এর নিকট থেকে ৪০ শতাংশ এবং আহাম্মদ আলীর নিকট থেকে ৫০ শতাংশ এবং বিল্লাল হোসেনের নিকট থেকে ৬০ শতাংশ এবং আব্দুল খালেকের নিকট হতে ২০ শতাংশ, আবুল কালাম-এর নিকট থেকে ১০০ শতাংশ, শহীদ মিয়ার নিকট থেকে ২০ শতাংশ, শহীদ মিয়া লবুসহ আরও অনেকের কাছ থেকে জমি রয়েছে। অভিযুক্ত মামুন মিয়ার বর্তমানে নামে ও বেনামে প্রায় ৫০০ শতাংশ-এর উপরে জমি ক্রয় করেছে। যার আনুমানিক বর্তমান বাজার মূল্য ২৫ কোটি টাকা। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের একজন অফিস সহায়ক পদে চাকরি করে স্বল্প বেতন কীভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হলেন মামুন- এই প্রশ্ন এলাকাবাসীর।  
স্থানীয় মৃত গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী তাহমিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সনদ পায়নি। মামুন জামুকাতে চাকরি করে। অনেক মানুষ আছে যারা যুদ্ধ করে নাই, তাদেরকে টাকার বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ করে দিয়েছে। আমার স্বামীও পাঁচ বছর আগে কাগজপত্র দিয়ে কিছু টাকা পয়সা দিয়েছিল, দুই বছর হয় আমার স্বামী মারা গেছে। মামুনের কাছে টাকা চাইলে আরও হুমকি দেয়। টাকাও দেয় না কাগজপত্রও ফেরত দেয় না।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মামুন মিয়া মানবজমিনকে বলেন, তিনি প্রতিহিংসায় শিকার। সব অভিযোগ মিথ্যা। আমার পিতা ব্যবসা করে তিন ভাইয়ের নামে জায়গা জমি কিনেছেন। আমি মুক্তিযোদ্ধা সনদ বিক্রি করে দেয়ার নামে কোনো টাকা পয়সা নেইনি। প্রাইভেট কারটি আমার না।

mzamin

চাকরিতে বয়স ৩৫ প্রত্যাশীদের অবস্থান টিয়ারশেল

সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ করণের দাবিতে গতকাল আন্দোলনকারীরা দিনভর বিক্ষোভ করেছেন। শাহবাগ থেকে মিছিল নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান নিয়ে দিনভর নিজেদের দাবি তুলে ধরেন। তাদের অবস্থানের কারণে ওই এলাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায়। এক পর্যায়ে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। তারপরও আন্দোলনকারীরা অবস্থান চালিয়ে যান। তারা ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ ছাড়া অবস্থান ছাড়বেন না। সন্ধ্যার পর আন্দোলনকারীদের একটি দল আলোচনা করতে যমুনায় প্রবেশ করেন। আলোচনা শেষে রাত সাড়ে আটটার দিকে তারা জানান, আপাতত আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তাদের দাবি যৌক্তিক। দাবি আদায়ে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দাবির বিষয়ে মঙ্গলবার সরকার গঠিত কমিটি প্রধানের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথাও জানান আন্দোলনকারীরা। চাকরিতে প্রবেশে বয়স বাড়ানোর আন্দোলন চলার মধ্যেই গতকাল সরকার একটি কমিটি গঠনের তথ্য জানায়।

বৈঠক শেষে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধি রাসেল বলেন, প্রধান উপদেষ্টা আমাদের আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছেন এজন্য তাকে ধন্যবাদ। উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন জানিয়ে রাসেল বলেন, মঙ্গলবার জনপ্রশাসন সচিব ও কমিটি প্রধানের সঙ্গে দাবি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করা হবে।
বেলা ১২টার পর থেকেই প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের আশপাশে জড়ো হতে থাকেন ‘সরকারি চাকরিতে ৩৫ প্রত্যাশী’ আন্দোলনকারীরা। এ সময় এই সড়কটি যান চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। পুলিশ তাদের ছাত্রভঙ্গ করতে দুপুর দেড়টার দিকে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এসময় দু’জন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। এ বিষয়ে ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. ইসরাইল হাওলাদার গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে সভা-সমাবেশ করার বিষয়ে আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু আন্দোলনকারীরা পুলিশের নিষেধ অমান্য করে প্রধান উপদেষ্টার বাসার সামনে যান।
দুপুর ২টার দিকে যমুনার সামনে তারা আবার অবস্থান নেন। এসময় ৪ জনের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তারা সরকারি কর্ম কমিশনের একজন কমিশনারের পিএসের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন। বেলা ৩টার দিকে রাজধানীর হেয়ার রোডে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন আন্দোলনকারীরা। এসময় তারা প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাতের আবেদন জানান। প্রধান উপদেষ্টা ছাড়া কারও সঙ্গে তারা আলোচনা করতে চান না। এসময় সাক্ষাৎ না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর বিকাল পাঁচটার দিকে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের জন্য প্রবেশ করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর রাত আটটার দিকে তারা যমুনা থেকে বের হন।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির দাবি পর্যালোচনায় কমিটি গঠন:
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে সাবেক সচিব আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীকে, যিনি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান। কমিটির সদস্য সচিব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। এই কমিটি আগামী ৭ দিনের মধ্যে পরামর্শ দেবে। গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস-উর রহমান। তিনি বলেন, কমিটিতে যে ক’জন সদস্য নেয়ার তা নেবেন, সেই এখতিয়ার কমিটির আহ্বায়ককে দেয়া হয়েছে।
চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার দাবিতে দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন একদল চাকরিপ্রত্যাশী। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কয়েক দফায় কর্মসূচি পালন করেছেন তারা।
mzamin

ডিসি নিয়োগ নিয়ে হট্টগোল: ১৭ উপ-সচিবকে শাস্তির সুপারিশ

জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ নিয়ে হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা করায় ১৭ জন উপ-সচিবকে শাস্তির সুপারিশ করে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গতকাল সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান এ কথা জানান। বলেন, গত ১০ই ডিসেম্বর আমাদের মন্ত্রণালয়ে একটি আনরেস্ট (অসন্তোষ) পরিস্থিতি হয়েছিল। সেটার জন্য এক সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এটার প্রধান ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব এমএ আকমল হোসেন আজাদ। কমিটির রিপোর্ট পাওয়া গেছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। সাক্ষী-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ১৭ জনকে তদন্ত কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। ৩টি পর্যায়ে তিনি সাজেস্ট করেছেন কী কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। ৮ জনের বিষয় বলা হয়েছে, তদন্ত সাপেক্ষে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে গুরুদণ্ড দেয়া যেতে পারে। ৪ জনের বিষয়ে বলা হয়েছে, তদন্ত সাপেক্ষে বিধি-বিধান অনুযায়ী লঘুদণ্ড দেয়া যেতে পারে। অন্য পাঁচজনের ব্যাপারে বলা হয়েছে, তাদের শাস্তি তিরস্কার দেয়া যেতে পারে। তাদের সাবধান করা হবে যেন ভবিষ্যতে এমনটি না করেন।

তিনি বলেন, এটা আমাদের ফাইন্ডিংস। একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন এ বিষয়গুলো ফেস করেন তখন অনেকগুলো স্টেজ আছে। সেগুলো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। একটা পর্যায়ে দেখা যায় অনেকের সংশ্লিষ্টতা ছিল। আবার অনেকের ছিল না। আবার অনেক সময় দেখা যায় নিঃস্বার্থ ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এ রকম হলে অনেক সময় আমরা সেগুলো দেখি বলে জানিয়েছেন সচিব মোখলেস উর রহমান। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পদক্ষেপ নেয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতি ও সাধারণ মানুষ জানতে চায়। আমি ডিসি হতে পারিনি সেজন্যই এরকম একটা আন্দোলন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে, এটা কেউ ভালোভাবে নেয়নি। আমাদের সিনিয়র কলিগরা নেয়নি। আমাদের জুনিয়র কলিগরা নেয়নি। সর্বোপরি আপনারা নেননি এবং সত্যি কথা বলতে কি জনগণও ভালোভাবে নেয়নি।
সিনিয়র সচিব বলেন, অনেকে বলছে এগুলো যদি কঠোর হস্তে দমন না করেন, ব্যবস্থা না নেন, আমাদের প্রশাসন ভেঙে পড়বে। শৃঙ্খলা থাকবে না। প্রশাসনের একটি বড় দিক হলো শৃঙ্খলা। শৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় যা যা করার আমিও আইনের ঊর্ধ্বে না আপনারা কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-২০১৮’ অনুযায়ী গুরু এবং লঘুদণ্ড দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হবে। জড়িত কারও বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এমন কেউ আছেন কিনা- জানতে চাইলে মোখলেস উর রহমান বলেন, একজন যুগ্ম সচিব ছিলেন। তাকে এরই মধ্যে সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার করে বদলি করা হয়েছে। তিনি কিছু ওভার অ্যাক্ট করেছিলেন। এজন্য সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আমরা অ্যাক্ট করবো তবে ওভার অ্যাক্ট করতে পারি না। ১৭ জনের সবাই উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানিয়ে তিনি বলেন, এ কর্মকর্তাদের কারও নাম জানার দরকার নেই। উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সম্প্রতি ৫৯ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়াকে কেন্দ্র করে ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। ডিসি পদে নিয়োগপ্রত্যাশী উপ-সচিব পদমর্যাদার ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা গত ১০ই সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে প্রায় হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় জড়ান। কর্মকর্তাদের এমন ক্ষোভ প্রকাশ ও হট্টগোল এর আগে সচিবালয়ে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তারা।

mzamin