Tuesday, March 31, 2015

শাকসবজি, চিংড়ি ও শুঁটকিতে ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক by শেখ সাবিহা আলম

শাকসবজি, চিংড়ি ও শুঁটকিতে ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশকের অস্তিত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে শুঁটকিতে।
২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দেশের ১২টি জেলার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত ৪৫৪টি নমুনা পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বারি এই তথ্য জানিয়েছে। এতে বলা হয়, এখনই ব্যবস্থা না নিলে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
‘খাদ্যে কীটনাশকের অবশেষ: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক বারির এই গবেষণা প্রতিবেদন গতকাল সোমবার অষ্টম ওয়ান হেলথ বাংলাদেশ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়। সম্মেলনে নিরাপদ খাদ্য নিয়ে ছিল আরও তিনটি গবেষণা প্রতিবেদন। সম্মেলনের আয়োজক সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
সম্মেলনে গবেষকেরা বেলছেন, যেকোনো খাবার খাওয়ার আগে ভালো করে বিশুদ্ধ পানিতে ধুয়ে নিলে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ফল খাওয়ার সময় চামড়া ছিলে নিলে ঝুঁকির হার কমে আসতে পারে বলেও তাঁরা জানান।
২০০৯ সালে ধামরাইয়ে তিনজন এবং ২০১৩ সালে দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও রহস্যজনক কারণে ১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। আইইডিসিআরের তথ্যমতে, এসব মৃত্যুর কারণ ছিল খাদ্যে ব্যবহৃত কীটনাশক।
বারির জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বে একটি গবেষকদল ২০১১-২০১৪ সাল পর্যন্ত যশোর, জামালপুর, বগুড়া, নরসিংদী, গাজীপুর, কুমিল্লা অঞ্চল থেকে শাকসবজির ৩৬২টি নমুনা সংগ্রহ করে। নমুনাগুলোর ২৩ শতাংশে ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক পাওয়া যায়।
গবেষণার আওতাভুক্ত শাকসবজিগুলো ছিল শিম, বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, করলা, চিচিঙ্গা, পটল, শসা, ঢ্যাঁড়স ও ধনেপাতা।
শুঁটকির ৪৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয় চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, জামালপুর, যশোর, ময়মনসিংহ ও লালমনিরহাটের বাজার থেকে। শুঁটকির মধ্যে ছিল কাঁচকি, মলা, ফাইসা ও চ্যাপা। এসব নমুনার ৭৪ শতাংশে ডিডিটি, অ্যালড্রিন ও ডিয়েড্রিনের মতো কীটনাশক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ডিডিটি বিশ্বব্যাপী ব্যবহার নিষিদ্ধ।
গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির শুঁটকিতে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক ছিল। রংপুরের চ্যাপা শুঁটকিও সমান বিপজ্জনক।
খুলনা ও চট্টগ্রাম থেকে ৪৯টি চিংড়ির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে সাতটিতে ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশকের উপস্থিতি ছিল।
বারির গবেষকেরা সংগৃহীত নমুনাগুলো কীটতত্ত্ব বিভাগের গবেষণাগারে পরীক্ষা করেন। সবজিতে কীটনাশকের উপাদানগুলো হলো ক্লোরোপাইরিফস, ডাইমেথোয়েট, ফেনিট্রোথিয়ন এবং ম্যালাথিয়ন।
গবেষক মো. সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘ফসল উৎপাদনে কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। দেশে অনুমোদনপ্রাপ্ত কীটনাশক আছে ২ হাজার ৮১১টি ব্র্যান্ডের। অন্যদিকে কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর যে উদ্যোগ তা সীমিত। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার আওতায় আছে মাত্র ২ শতাংশ কৃষিজমি।’
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য ভালো রাখতে মানুষ শাকসবজি খায়। কিন্তু তা যদি ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশকে ভরা থাকে, তাহলে তার যকৃৎ ও কিডনি নষ্ট হতে পারে। কীটনাশক একবার শরীরে ঢুকলে তা আর বেরোতে চায় না। জীবনভর ক্ষতি করে যায়। কীটনাশকের উপস্থিতির কারণে অস্থিমজ্জা যা কিনা শরীরে রক্ত তৈরি করে তা-ও কার্যকারিতা হারাতে পারে। দেশে হাঁপানি রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ খাবারে কীটনাশকের উপস্থিতি। এ ছাড়া গর্ভবতী নারী কীটনাশকযুক্ত খাবার খেলে শারীরিক ও মানসিক বিকারগ্রস্ত শিশুর জন্ম দিতে পারেন।’
সম্মেলনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান কারিগরী উপদেষ্টা জন রাইডার বলেন, কৃষকেরা ভালো ফলনের আশায় অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছেন। না হলে তাঁরা ক্ষতির মুখে পড়েন। কৃষকদের যদি প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তাঁরা ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসবেন।
সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে আরও তিনটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এর একটি বাংলাদেশে খাবারে সিসার উপস্থিতি বিষয়ে। এতে প্রধান খাদ্য ভাতে সিসার উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। এই দলের প্রধান ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্টিফেন লুবি।
বাংলাদেশে খাদ্যে আর্সেনিকের দূষণ নিয়ে গবেষণা প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মীর মিসবাহউদ্দিন। এতে বলা হয়, কচুতে রয়েছে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় আর্সেনিক।
এফএওর আন্তর্জাতিক খাদ্য বিশ্লেষণ বিশেষজ্ঞ শ্রীধর ধার্মাপুরি উপস্থান করেন খাবারে ঝুঁকির ধারণাবিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিবেদন। এতে বলা হয়, খাবারে বিশেষ করে ফলমূলে মাত্রাতিরিক্ত ফরমালিন ব্যবহারের অভিযোগ চলে আসছে বহুদিন ধরে। সব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শিশুকন্যার টানেই ঘরে ফিরেছিলেন খোকন by কাজী সুমন

৬ই মার্চ রাত ১০টা। রাজধানীর আদাবর ১২ নম্বর রোডের বাসা থেকে ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক  সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার খোকনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। এরপর র‌্যাব-পুলিশের দপ্তর থেকে আদালতপাড়া, হাসপাতালের মর্গ থেকে নদীরপাড়। সব জায়গায়ই পাঁচ মাসের শিশুকে নিয়ে স্বামীকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন শাহ ইসরাত আজমেরী। কোথাও স্বামীর সন্ধান পাচ্ছেন না তিনি। উল্টো শিকার হচ্ছেন নিষ্ঠুর রসিকতার। প্রায় দিনই অজ্ঞাত পরিচয়ে তার মোবাইলে ফোন দিয়ে বলা হচ্ছে, ওমুক থানায় একটি লাশ পাওয়া গেছে, তমুক এলাকায় একটি মৃতদেহ পাওয়া গেছে- সেটি আপনার স্বামীর কিনা একটু খোঁজ নেন। এমন নির্মম রসিকতার শিকার হচ্ছেন নিখোঁজ বিএনপি নেতাদের প্রতিটি পরিবারই। নিখোঁজ আনিসুর রহমান তালুকদার খোকনের স্ত্রী ইসরাত আজমেরী মানবজমিনকে বলেন, ৬ই মার্চ রাতে পাঁচ মাস বয়সী শিশুকন্যাকে দুধ খাওয়াচ্ছিলাম। এসময় বাসার কলিংবেল বেজে উঠে। খোকন দরজা খুলে দিলে ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে কয়েক ব্যক্তি বলেন, আপনাকে আমরা নিতে এসেছি। তারা তাকে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমার আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে ডিবি কার্যালয় ও র‌্যাব সদর দপ্তরে খোঁজ নেই। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পাচ্ছিলাম না।  এরপর আদাবর থানায় জিডি করতে যাই। ইসরাত আজমেরী বলেন, জিডির কপিতে খোকনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে গেছে লিখতে চাইলে বাধা দেয় দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা। তখন ওই পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে বলেন, এভাবে লিখলে আপনার জিডি নেবো না। বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরেনি- এভাবে নিখোঁজের জিডি লেখার পরামর্শ দেন। অসহায় আজমেরী পুলিশ কর্মকর্তার কথামতো নিখোঁজের জিডি করেন। এরপর স্বামীর সন্ধান দাবিতে হাইকোর্টে আবেদন দায়ের করেন আজমেরী। এরপর প্রতিদিনই পুলিশ, র‌্যাব ও ডিবি কার্যালয়ে স্বামীর খোঁজে হন্যে হয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। কিন্তু কোথাও স্বামীর সন্ধান পাচ্ছেন না। বাবার সঙ্গে অবুঝ দুই কন্যার সময় কাটার স্মৃতি তুলে ধরে আজমেরী বলেন, আমার বড় সন্তান জায়রা রহমান তৃধার বয়স সাড়ে তিন বছর। আর ছোট সন্তান জায়না রহমান নিধার বয়স সাড়ে পাঁচ মাস। ছোট সন্তান জন্মের পর থেকে তৃধা বাবার কাছে বেশি থাকতো। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে খোকন বাসায় থাকতো না। কিন্তু আদুরে কন্যাদের টানে প্রায়সময়ই রাতে বাসায় চলে আসতো খোকন। রাতে বাবার সঙ্গেই ঘুমাতো তৃধা। বাবার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠতো সাড়ে পাঁচ মাস বয়সী নিধাও। এখন রাত হলেই বাবাকে খোঁজে অবুঝ দুই কন্যা। দিনের বেলায় অনেক সময় খোকনের জন্য কান্নাকাটি করলে তৃধা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, চিন্তা করো না- আমি বলেছি না, আমি বাবাকে চাই। ওরা আমার বাবাকে ফেরত দিবে। খোকনের স্ত্রী বলেন, জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে প্রায়ই সাদা পোশাকের ডিবি পুলিশ বাসার সামনে আসতো। কিন্তু কোনদিন বাসায় ঢুকেনি। ফেব্রুয়ারিতে না এলেও মার্চের শুরুতে ফের খোকনের গতিবিধিতে নজর রাখছিল পুলিশ। কিন্তু কোনদিন কল্পনা করতে পারিনি ধরে নিয়ে একেবারে নিখোঁজ করে দেবে। অজ্ঞাত নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে নিষ্ঠুর রসিকতার ঘটনা তুলে ধরে ইসরাত আজমেরী বলেন, কয়েকদিন আগে কক্সবাজার থেকে আমার মোবাইল নাম্বারে ফোন করে থানা পুলিশের পরিচয় দিয়ে বলেন, এখানে কয়েকজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে আপনার স্বামীর লাশ আছে কিনা এসে দেখে যান। পরদিন নরসিংদী থানা পুলিশের পরিচয় দিয়ে আরেকটি নাম্বার থেকে আমার মোবাইলে ফোন দেয়া হয়। তারা আমাকে জানান, নরসিংদী জেলা সরকারি হাসপাতালে একটি মরদেহ রয়েছে। সেটি দেখতে আপনার স্বামীর মতোই। ওইসময়ে নিজেদের মানসিক অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, এরপরও আমার এক নিকটাত্মীয় দিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি- ওই মৃতদেহ খোকনের নয়। একইভাবে ময়মনসিংহ থেকে একটি অজ্ঞাত নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে আমাকে বলেন, এখানে একটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার হয়েছে। সেটি আপনার স্বামীর কিনা খোঁজ নেন। এদিকে খোকনের ছোটভাই ইমরান বলেন, ভাইয়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে আমার বৃদ্ধ বাবা-মা পাগলপ্রায়। ক্ষণে ক্ষণে ফোন করে ছেলের খোঁজ জানতে চান তারা। কিন্তু তাদের মিথ্যা সান্ত্বনা দিতে হয়। ভাইয়ের চিন্তার আমাদের পরিবারের সবারই অস্থির সময় কাটাচ্ছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বন্ধে চাপ বাড়ছে -বিবিসির প্রতিবেদন

বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে সরকার ও বিরোধী দলকে আলোচনায় বসতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। কিন্তু স্বজন হারানো কিছু পরিবারের জন্য তা ইতিমধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এ বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতায় কমপক্ষে ১০০ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন কয়েক শ’ মানুষ। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। প্রতিবেদনের শুরুতে পেট্রলবোমা হামলার শিকার এক বাংলাদেশী নুরুজ্জামান ও তার পরিবারের ঘটনা তুলে ধরা হয়। যে বাসে চড়ে তারা বাড়ি ফিরছিলেন তা আর গন্তব্যে পৌঁছায়নি। বাসটি পেট্রলবোমা হামলার শিকার হয়। নুরুজ্জামানের মা নুরুন নাহার বলেন, ভোরের দিকে একটা ফোন আসে। আমার পুত্রবধূ ফোনে আমাকে জানায়, ‘আমার ছেলে আর নাতনী পেট্রলবোমা হামলায় নিহত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মানুষ এখানে অনিশ্চয়তায় দিনাতিপাত করছে। আপনি বাসা থেকে বের হলে কোন নিশ্চয়তা নেই যে, নিরাপদে ফিরে আসবেন।’ এমন দুর্দশা শুধু নুরুজ্জামানের পরিবারের নয়। জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সহিংসতায় নিহত ও আহতদের বেশির ভাগই বাসে, ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলা শিকার। সহিংস পরিস্থিতি ছড়িয়ে দেয়া এ সঙ্কটের মূলে রয়েছে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যকার রাজনৈতিক বিরোধ। বিরোধী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি গতবছরের নির্বাচন বর্জন করে। তারা অবাধ ভোটের সুযোগ না দেয়ার অভিযোগ আনে সরকারের বিরুদ্ধে। জানুয়ারি মাসে তারা প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেয়। কিন্তু সহিংস হামলার পেছনে তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে। জানুয়ারির  পর থেকে বিভিন্ন শহরে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, এখানে কোন গণতান্ত্রিক সুযোগ নেই। আমরা কোন সমাবেশ বা অন্য কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আয়োজন করতে পারি না। এ কারণে আমরা অবরোধের ডাক দিয়েছি। কিন্তু আমরা এটা শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে চাই। এসব পেট্রলবোমা হামলা কারা চালাচ্ছে আমরা তা জানি না।  আমাদের সমর্থকরা এতে জড়িত নয়। আমাদের সম্পৃক্ততা কেউই প্রমাণ করতে পারবে না। বিরোধী দল আরও বলেছে যে, তাদের কয়েক ডজন সমর্থক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে মারা গেছে। তারা পুলিশের বিরুদ্ধে কঠোর দমনপীড়ন নীতি অবলম্বনের অভিযোগ এনেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলছে, পুলিশ শুধু তাদের দায়িত্ব পালন করছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী  লীগ নেতা নুহ-উল-আলম লেনিন, বিরোধীদের ডাকা এ অবরোধে জনগণের কোন সমর্থন নেই বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা এর বিরুদ্ধে জনগণকে একত্রিত করছি। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। দেশে যারা নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চায় প্রয়োজনে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হবো। প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়, বাংলাদেশের গণতন্ত্র দুর্বল আর রাজনৈতিক বিভক্তি গভীরে প্রোথিত। সেইসঙ্গে দেশটির দীর্ঘ সামরিক শাসনের ইতিহাস রয়েছে। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বিগ্ন পশ্চিমা শক্তিগুলো। তারা উভয় পক্ষকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব আহ্বান অরণ্যে রোদন বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।

আব্বাস-মিন্টুর ওপর মামলার বোঝা, খোকন-আনিস শূন্য

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নামে ৩৭টি মামলা। তবে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী সাঈদ খোকনের নামে কোনো মামলা নেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর নামে ১৩টি মামলা থাকলেও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী আনিসুল হকের নামে কোনো মামলা নেই। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামা থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিএনপির নেতাদের দাবি, তাঁদের দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে দায়ের করা অধিকাংশ মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ঢাকা দক্ষিণে আওয়ামী লীগের নেতা সাঈদ খোকনের নামে অতীতে পাঁচটি মামলা থাকলেও সেগুলোতে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। বিস্ফোরক দ্রব্য ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে এসব মামলা হয়েছিল। মির্জা আব্বাসের হলফনামায় ৬১টি মামলার বিবরণ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান সরকারের আমলে ৩৭টি ও আগের ২৪টি মামলা রয়েছে। এ আমলের মামলাগুলোর মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, দ্রুত বিচার এবং দুর্নীতি দমন আইনে দায়ের করা মামলা আছে। অতীতের ২৪টি মামলায় অব্যাহতি ও খালাস পেয়েছেন আব্বাস। বিএনপি-সমর্থিত অপর প্রার্থী আবদুস সালামের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে।
হলফনামায় ছয়টি মামলার তথ্য উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ-সমর্থিত প্রার্থী বজলুর রশিদ ফিরোজ। তাঁর ছয়টি মামলার মধ্যে চারটিতে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। চারটি মামলার তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করেছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আবদুর রহমান।
হলফনামা অনুযায়ী, উত্তরের মেয়র পদপ্রার্থী ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আওয়াল মিন্টুর নামে ১৩টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে পাঁচটি, ২০১৪ সালে একটি ও চলতি বছরে পাঁচটি মামলা করা হয়েছে।
একই নির্বাচনী এলাকায় মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়ালের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। মামলা নেই আনিসুল হকের নামে। তাঁর দেওয়া হলফনামায় বেশ বড় ও গাঢ় কালি দিয়ে ‘প্রযোজ্য নহে’ লেখা রয়েছে।
মামলা নেই ঢাকা উত্তরের প্রার্থী আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সাংসদ সারাহ বেগম কবরীর নামেও। তবে জাতীয় পার্টি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী বাহাউদ্দিনের নামে ২০০৬ সালে দ্রুত বিচার আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে সেটি উচ্চ আদালতে স্থগিত আছে। বিএনপির সাবেক নেতা চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীর ছেলে ইরাদ আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে দায়ের করা একটি মামলা রয়েছে। বর্তমানে যেটি হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে। এ ছাড়া সিপিবির আবদুল্লাহ আল ক্বাফী, বিকল্পধারার মাহি বি চৌধুরীর নামেও কোনো মামলা নেই।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান: উত্তরের মেয়র পদপ্রার্থী আনিসুল হক ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএ। বছরে তাঁর আয় ৭৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া পান ২ লাখ ৪০ হাজার, ব্যবসায় (পারিতোষিক) আয় ২৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা, শেয়ার ও ব্যাংক আমানতে আয় ১ লাখ ৬১ হাজার ১৫৬ টাকা। এফডিআরে আয় ৪৫ লাখ ৮৯ হাজার ৮৩১ টাকা। এসব খাত থেকে তাঁর স্ত্রীর আয় ৮৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৬২ টাকা। তাঁর ছেলের আয় ২ লাখ ৯১ হাজার ৫১৯ টাকা। তাঁর দুই মেয়ের আয় ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৬০ টাকা।
আনিসুল হকের নিজ নামে অস্থাবর সম্পদ আছে ২২ কোটি ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৪ টাকার। নগদ টাকার পরিমাণ ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ৩০ টাকা। ব্যাংকে জমা ৬ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৯ টাকা। শেয়ার রয়েছে ১১ কোটি ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকার। স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৮৬ টাকা। স্বর্ণালঙ্কার আছে ১১ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকার। স্ত্রীর নামে অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৫৬ কোটি ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪৭ টাকা। অকৃষি জমির দাম ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬৮ হাজার ৬৭৫ টাকার। ঋণ আছে ৫ কোটি ২৯ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৭ টাকা।
আবদুল আউয়াল মিন্টু কৃষি, অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় এমএসসি পাস করেছেন। ১৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাঁর। বার্ষিক আয় ৫ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫০৩ টাকা। কৃষি খাতে আয় ৩ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৫২২ টাকা। বাড়িভাড়া পান ৯ লাখ ৪ হাজার ৫০০ টাকা। ব্যবসায় (পারিতোষিক) আয় ৯৩ লাখ টাকা। শেয়ার ও ব্যাংক আমানতে আয় ২৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৭০ টাকা। এ ছাড়াও অন্যান্য মূলধনী লাভ ৪১ লাখ ১০ হাজার ৮১১ টাকা।
মিন্টুর অস্থাবর সম্পদ আছে ৫৩ কোটি ৯৮ লাখ ৬৩ হাজার ২১৭ টাকার। তাঁর স্ত্রীর আছে ৯ কোটি ১২ লাখ ১৭ হাজার ৫৪৩ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ টাকা ৮ লাখ ৫০ হাজার ৩২০ টাকা, স্ত্রীর নামে ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭৪৩ টাকা। ব্যাংকে জমা ৬৮ কোটি ৮৯ লাখ ২৬ হাজার ৩৮৬ টাকা। শেয়ার রয়েছে ৪০ কোটি ৫৮ লাখ ৯০ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার। স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ রয়েছে ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫৪ টাকা। পুরোনো কয়েন, সরকারের কাছে জমা, অগ্রিম ও ঋণ প্রদান এবং জীবন বিমা খাতে আছে ১১ কোটি ৫১ লাখ ৯১ হাজার ৬৬৩ টাকা।
মিন্টুর স্থাবর সম্পদের মধ্যে ৩ কোটি ৮৫ লাখ ১৪ হাজার ৮৩০ টাকার অকৃষি জমি। নিজ নামে ২৯ লাখ ৮২ হাজার ৮৫৪ টাকার বাড়ি, স্ত্রীর নামে ১৯ লাখ ৪১ হাজার ৪২৩ টাকা মূল্যের একটি বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়াও যৌথ মালিকানাধীন বাড়ি রয়েছে ৬১ লাখ ৭৬ হাজার ১৪৯ টাকা মূল্যের। তবে আবদুল আউয়াল মিন্টু তাঁর ছেলে তাফসির মোহাম্মদ আউয়ালের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন ১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট থেকে ঋণ ১ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ফ্ল্যাট ভাড়া থেকে অগ্রিম নিয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার টাকা। ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন এক কোটি ৪৭ লাখ ২৬ হাজার ৩১৭ টাকা।
হলফনামা অনুযায়ী, অর্থ-সম্পদের দিক থেকে এগিয়ে আছেন মিন্টু। তবে আনিসের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেশি। অন্যদিকে মিন্টুর দেনা ছেলের কাছে আর আনিসের চেয়ে বেশি সম্পদ রয়েছে তাঁর স্ত্রীর।

আবার ব্লগার হত্যা

কাকে, কেন খুন করা হচ্ছে, তার কিছুই জানা ছিল না মাদ্রাসাছাত্র জিকরুল্লাহ ও আরিফুল ইসলামের। এমনকি যাঁকে হত্যা করা হলো, তিনি কোথায় কী লিখেছেন, তা-ও জানতেন না। তাঁদের শুধু বলা হয়েছে, ধর্মের অবমাননা হয়েছে। এরপর ছবি দেখানো হয়েছে, বাসা চিনিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাতে দেওয়া হয়েছে চাপাতি। আর তা দিয়ে কুপিয়ে একজন মানুষকে খুন করে ফেলেছেন তাঁরা। ব্লগার ও অনলাইন লেখক ওয়াশিকুর রহমানকে (২৭) হত্যার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়া এই দুই মাদ্রাসাছাত্র সাংবাদিকদের কাছে এমন কথা বলেছেন। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের দক্ষিণ বেগুনবাড়ী দীপিকার মোড়ে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ওয়াশিকুরকে। জিকরুল্লাহ, আরিফুলসহ তিনজন হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন হিজড়া, স্থানীয় অন্যান্য মানুষ ও পুলিশ মিলে দুজনকে ধাওয়া দিয়ে ধরে ফেলে। এঁদের বয়স ২০-এর কোঠায়।
বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় খুনের এক মাস পর ওয়াশিকুরকে হত্যা করা হলো। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় অভিজিৎকে। এ সময় তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে কুপিয়ে জখম করে শত শত মানুষ ও পুলিশের সামনেই পালিয়ে যায় খুনিরা। এর আগে ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুরে একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে। একই বছরের ১৪ জানুয়ারি রাতে একইভাবে কুপিয়ে আহত করা হয় আরেক ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে। রাজীব হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহর প্রধান মুফতি মুহাম্মদ জসীমউদ্দিন রাহমানীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৯ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। মামলাটি এখন বিচারাধীন। ব্লগার আসিফের ওপরও একই সংগঠন হামলা করেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আর গত বছরের ১৫ নভেম্বর বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফিউল ইসলামকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যার পর ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে দায় স্বীকার করে স্ট্যাটাস দেওয়া হয়। আর সর্বশেষ অভিজিৎ হত্যার পর ‘আনসার বাংলা সেভেন’ নামের একটি টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে হত্যার দায় স্বীকার করা হয়। তবে একজন হুমকিদাতাকে গ্রেপ্তার ছাড়া পুলিশ আর কাউকেই শনাক্ত করতে পারেনি।
ঘটনার শুরু: গ্রেপ্তার হওয়া দুজনের মধ্যে জিকরুল্লাহ চট্টগ্রামের দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার আর আরিফুল রাজধানীর মিরপুরের দারুল উলুম মাদ্রাসার ছাত্র বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। জিকরুল্লাহর বাড়ি নরসিংদী, আরিফুলের কুমিল্লা। তবে পুলিশ গতকাল রাত পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি যে তাঁরা ওই দুটি মাদ্রাসার ছাত্র কি না।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় জিকরুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর পূর্বপরিচিত ‘মাসুম ভাই’র কথামতো শনিবার তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন। যাত্রাবাড়ীর দিকে একটি মাদ্রাসায় এক বন্ধুর কাছে রাত কাটান। এরপর রোববার বিকেলে হাতিরঝিল লেকের পাড়ে সেই ‘মাসুম ভাই’য়ের সঙ্গে দেখা হয়। সেখানে মাসুম, তিনি (জিকরুল্লাহ), আরিফুল ও তাহের মিলে আলোচনা হয়। এর আগে তিনি আরিফুল বা তাহেরকে চিনতেন না। মাসুম তাঁদের ওয়াশিকুরের ছবি দেখিয়ে বলেন, এই লোক মহানবী (সা.)-এর অবমাননা করেছেন, আল্লাহ ও ইসলামকে নিয়ে কটূক্তি করেছেন। তাঁকে হত্যা করতে হবে। এরপর মাসুম তাঁদের সঙ্গে গিয়ে হাতিরঝিলের পাশে দক্ষিণ বেগুনবাড়িতে ওয়াশিকুরের বাসা দেখিয়ে দেন। তিনি কখন বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার জন্য বের হন, কোন দিক দিয়ে কীভাবে হামলা করা যাবে, সেসব বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা হয়। তাঁরা ওয়াশিকুরের বাসার আশপাশের এলাকা ভালোভাবে চিনে নেন। মাসুম তাঁদের তিনজনকে তিনটি চাপাতি দেন। এরপর গতকাল সকালে তাঁরা দক্ষিণ বেগুনবাড়ি দীপিকার মোড়ে অবস্থান নেন। ওয়াশিকুরকে দেখে জিকরুল্লাহ ও তাহের চাপাতি বের করে কোপ দেন। আরিফুল চাপাতি বের করার আগেই স্থানীয় মানুষ ধাওয়া দেয়। চাপাতিসহ ব্যাগ হাতে আরিফুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
জানতে চাইলে জিকরুল্লাহ বলেন, তিনি এর আগে কখনোই ওয়াশিকুরকে দেখেননি। তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই। ওয়াশিকুর কোথায়, কী লিখেছেন, তা-ও জানেন না। শুধু ‘মাসুম ভাই’য়ের কথাতেই তাঁরা হত্যাকাণ্ড ঘটান। তাঁরা কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কি না, জানতে চাইলে জিকরুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের কোনো দল নাই।’ মাসুম ভাইয়ের পরিচয় জানতে চাইলেও কোনো তথ্য দেননি জিকরুল্লাহ।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার প্রথম আলোকে বলেন, মতাদর্শগত কারণেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অর্থাৎ ওয়াশিকুরের লেখার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে একটি গোষ্ঠী এই হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে। এই হত্যার ধরনের সঙ্গে অভিজিৎ রায়, রাজীব হায়দার হত্যার মিল রয়েছে।
যেভাবে ঘটনা: প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নীলচে ফুলশার্ট ও জিনস পরিহিত ওয়াশিকুর দীপিকার মোড়ের দিকে যেতেই গলির মধ্যে তিনজন লোকের মধ্যে দুজন তাঁকে হঠাৎ কোপাতে শুরু করেন। পাশেই কয়েকজন হিজড়া দাঁড়ানো ছিলেন। তাঁরাসহ কয়েকজন নারী ‘মাইরা ফেললো, মাইরা ফেললো’ বলে চিৎকার শুরু করলে হামলাকারী দুজন ঘটনাস্থলেই চাপাতি ফেলে দৌড় দেন। এ সময় হিজড়ারাও পিছু ধাওয়া করেন। এলাকার লোকজনও যোগ দেন তাতে। অল্প দূরত্বেই তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশের একটি দল ছিল। তারাও দৌড়ানো শুরু করে। হিজড়ারা প্রথমেই জিকরুল্লাহকে ধরে ফেলেন। এরপর জনতা ও পুলিশ মিলে প্রায় এক কিলোমিটার ধাওয়া করে একটি ব্যাগসহ আরিফুলকে ধরে ফেলেন।
জিকরুল্লাহর পরনে ছিল লাল ডোরাকাটা টি-শার্ট, জিনস, পায়ে কাপড়ের কেডস। আর আরিফুলের পরনে ছিল লাল টি-শার্ট, কালো প্যান্ট ও স্যান্ডেল। পুলিশ জানিয়েছে, এই দুজনের লাল গেঞ্জির নিচেই আরেক প্রস্থ গেঞ্জি ছিল। এ ছাড়া তাঁদের সঙ্গে চাপাতির ব্যাগের ভেতরে অতিরিক্ত পাঞ্জাবিও ছিল। খুনের পর রক্তের দাগ যেন বোঝা না যায়, সে জন্য পরিকল্পিতভাবে তাঁরা লাল পোশাক পরে এসেছিলেন বলে পুলিশের ধারণা। এরপর পোশাক বদলে খুব সহজে সাধারণ মানুষের কাতারে মিশে যাওয়ার জন্য দুই প্রস্থ পোশাক পরেছিলেন তাঁরা। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন পাঞ্জাবিও।
পুলিশ জানায়, হামলাকারীরা নিহত ওয়াশিকুরের শরীরের শুধু মুখমণ্ডল ও গলাসহ শরীরের ঊর্ধ্বাংশে আঘাত করেছিলেন। তাঁর মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। চোখ, নাক থেঁতলে চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে। প্রচুর রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিচয় ও লেখালেখি: নিহত ওয়াশিকুর নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। তাঁদের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তেজগাঁও কলেজ থেকে স্নাতক পাস করে ফারইস্ট এভিয়েশন নামে মতিঝিলের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে শিক্ষানবিশ হিসেবে চাকরি নিয়েছিলেন। বাবাকে নিয়ে দক্ষিণ বেগুনবাড়িতে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন ওয়াশিকুর।
ফারইস্ট এভিয়েশনের মহাব্যবস্থাপক শাহেদ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এক বছর ধরে ওই অফিসে কাজ করতেন ওয়াশিকুর। গতকাল সকাল ১০টার দিকে দিনের কাজ বুঝিয়ে দিতে তিনি ওয়াশিকুরকে ফোন করলে একজন পুলিশ সদস্য ফোন ধরে জানান, তিনি খুন হয়েছেন।
একটি গোষ্ঠীবদ্ধ ব্লগে ‘বোকা মানব’ নামে লিখতেন ওয়াশিকুর। সেখানে নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমার নাম মো. ওয়াশিকুর রহমান। জন্ম গ্রামে হলেও শৈশব কেটেছে ঢাকায়। তবে আট বছরের সময় বেশ কিছুদিন গ্রামে কাটাতে হয়। তারপর বছর দুয়েক মফস্বল শহরে কাটিয়ে আবার ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করি। কিন্তু মাস ছয়েক না কাটতেই আবার গ্রামে ফিরে যেতে হয়। একটানা ছয় বছর গ্রামে কাটিয়ে পুনরায় ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করি। এখন পর্যন্ত ঢাকাতেই আছি। এভাবে গ্রামে ও শহরে মিশ্রভাবে বসবাসের ফলে আমার মধ্যে একধরনের সংমিশ্রণ ঘটেছে। না হতে পেরেছি শহরের স্মার্ট, মেধাবী, অতি আধুনিক, না হতে পেরেছি গ্রামের পরিশ্রমী, গেছো, ভালো সাঁতারু। দুই স্থানেই আমি একজন অতি বোকা। তাই আমি আজ বোকা মানব।’ এই ব্লগে তিনি সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়ে একটি লেখা পোস্ট করেছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে তাঁর পাতানো বোন তামান্না সেতু প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর ধরে ওয়াশিকুর শুধু ফেসবুকেই লিখতেন।
ওয়াশিকুরের বন্ধুরা জানিয়েছেন, তিনি ফেসবুকে ‘আসুন নাস্তিকদের কটূক্তির দাঁতভাঙা জবাব দেই...’ শিরোনামে একটি ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখতেন। সেই লেখাটি ১০৩ পর্ব পর্যন্ত পৌঁছেছে। ওই লেখায় মূলত বিভিন্ন ধর্মীয় রীতি-নিয়মকে খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন তিনি।
তামান্না সেতুসহ ওয়াশিকুরের বন্ধুরা জানিয়েছেন, অভিজিৎ খুন হওয়ার পর ভীষণ মুষড়ে পড়েন ওয়াশিকুর। তাঁর লেখায় তিনি এর প্রতিবাদ জানান। তখন বন্ধুরা তাঁকে সাবধান করেছিলেন। জবাবে ওয়াশিকুর বলেছিলেন, ‘আমি তো প্রোফাইল পিকচারও দেইনি। আমারে চিনবে ক্যামনে।’
কেঁদে ফেলে তামান্না সেতু বলেন, ‘ও এমন কিছু লিখত না, যার জন্য কুপিয়ে মেরে ফেলতে হবে। আমরা জানি না, এরপর কার পালা।’

নগর প্রশাসন নির্বাচনে প্রত্যাশা by ইকবাল হাবিব

যদিও বর্তমান বাস্তবতায় ও বিদ্যমান আইনের আলোকে দ্বিখণ্ডিত ঢাকার উত্তর বা দক্ষিণের ‘মেয়র’ পদের যে ক্ষমতায়ন, তাতে সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিকল্পিত, জনবান্ধব নগর উন্নয়ন ও তার ব্যবস্থাপনা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি প্রত্যাশা করাও যথার্থ হবে না;
তবু আসন্ন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সিটি করপোরেশনগুলোর মেয়র ও কাউন্সিলর পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন, তাঁদের দ্বারাই আইনের যথাযথ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারের উদ্যোগে প্রকৃত ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়ে জন-আকাঙ্ক্ষার ‘নগর সরকার’ব্যবস্থা গড়ে তুলে ‘জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা এবং জনগণেরই সরকার’ পদ্ধতির গণতান্ত্রিক নগর সরকার প্রতিষ্ঠার প্রকৃত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে;
এই বিশ্বাসে বর্তমানে মেয়র-কাউন্সিলরদের ‘সিটি করপোরেশন’ আইনানুযায়ী যতটুকু ক্ষমতা রয়েছে, তার আলোকে তাঁদের কাছে নির্বাচন-পরবর্তী জনপ্রত্যাশা এরূপ হতে পারে:
পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ সহযোগে একটি ‘কার্যকর সেল’ গঠনের মধ্য দিয়ে:
এক. ইতিমধ্যে প্রণীত বিশদ পরিকল্পনাসমূহের আলোকে ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রণয়ন করা। এই অ্যাকশন প্ল্যানের আলোকে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে ‘উদ্যোগী ও সমন্বয়কারী’র ভূমিকা গ্রহণ করা এবং এতে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে তার দ্রুত বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা রাখা;
দুই. ‘স্থানিক’ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর লক্ষ্যে স্থানীয় জনগণের মতামতকে উন্নয়নের সব কার্যক্রমে যুক্ত করা এবং যুক্ত করার মাধ্যমেই কেবল তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব—এ লক্ষ্যে ‘আঞ্চলিক কমিটি’কে সর্বদা সচল রাখার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া;
তিন. জনসম্পৃক্ততার শক্তি কাজে লাগানোর লক্ষ্যে সব নগর উন্নয়ন কর্মসূচির ‘বাস্তবায়ন-পূর্ব জনশুনানির ব্যবস্থা’ চালু করা, তা সে যেকোনো ‘সেবা এজেন্সির’ই কার্যক্রম হোক না কেন। বিশেষ করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের আগে ‘প্রকল্প চলাকালীন জনস্বাস্থ্য ও জনহয়রানি নিরসনে নেওয়া ব্যবস্থাসমূহ’ ও প্রকল্প-পরবর্তী প্রাপ্তি বিষয়ে যথেষ্ট পর্যালোচনার সুযোগ নিশ্চিতের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করা;
চার. এসব কাজে ‘জনচাহিদা’ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রতি অঞ্চলভিত্তিক ‘সুপারিশ গ্রহণ কেন্দ্র’ চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এবং একটি সুযোগ্য তরুণ কর্মী দলের মাধ্যমে এর ‘পরিশীলিত সংস্করণ’ প্রস্তুতপূর্বক সব গৃহীত কার্যক্রমে তা ধারণ করার ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিচের পাঁচটি লক্ষ্যমাত্রা বা রূপকল্প প্রত্যাশিত বলে বিবেচিত হতে পারে:
১. পথচারী প্রাধান্য ও সর্বজন সুগম্য নগর:
(ক) সব সড়কসংলগ্ন ফুটপাত পথচারীবান্ধব করার লক্ষ্যে, অর্থাৎ প্রশস্ত, বৃক্ষ ও ছাউনিসমৃদ্ধ, যথাযথ ঢাল ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা সম্মিলিতভাবে পুনর্গঠন বা ঢেলে সাজানো;
(খ) রাস্তা পারাপারসহ চলাচলের সিগন্যাল-ব্যবস্থায় পথচারীদের প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি সবার সহজগম্যতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা (জেব্রা ক্রসিং, পথচারী সংকেত ইত্যাদি);
(গ) হকারসমৃদ্ধ কিন্তু পথচারীবান্ধব ‘চর্চাকে’ প্রাধান্য দিয়ে একটি পরস্পর নির্ভরশীল ব্যবস্থাপনার আয়োজন করে নগরের নির্দিষ্ট স্থানসমূহে এরূপ ব্যবস্থা গড়ে তোলা;
(ঘ) গণপরিবহনব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সব কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা এবং তাতে সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট থাকা, বিশেষ করে যথাযথ স্থানে বাস বে ও বাসস্টপ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া;
(ঙ) এ বিষয়ে নিয়মিত জনসংযোগ কার্যক্রমের ঐতিহ্য গড়ে তোলা এবং এলাকার বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়কে তাতে যুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া, সেই সঙ্গে নিবিড় ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এসবের বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে নিয়মিত অঞ্চলভিত্তিক সভার ব্যবস্থা করা।
২. জলজট ও যানজটমুক্ত পরিচ্ছন্ন নগর:
ক) এতদঞ্চলের উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ, জলাধার, খাল, জলাশয় উদ্ধার করা এবং উদ্ধার কার্যক্রম সচল রাখতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে সংশ্লিষ্ট ‘সেবাদানকারী সংস্থা’সমূহকে আশু পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্দীপ্ত করা, এ ক্ষেত্রে স্ব-উদ্যোগী কার্যক্রমের জন্য বিশেষ প্রয়াস নেওয়ার চেষ্টা করা;
খ) উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ, জলাধার, খাল, জলাশয়সমূহ সংরক্ষণে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি এর তত্ত্বাবধানে স্থানীয় জনগণ ও তাদের সংগঠনসমূহকে ‘কো-ম্যানেজমেন্ট’-এর ভিত্তিতে সম্পৃক্ত করে ‘যৌথ তত্ত্বাবধানব্যবস্থা’র প্রচলন করার উদ্যোগী হওয়া;
গ) ইতিমধ্যে নেওয়া কমিউনিটি পুলিশের মতো সৃজনশীল উদ্যোগের পাশাপাশি ‘কমিউনিটি ট্রাফিক’ গঠন করা। এদের কার্যকর সহযোগে যানজটমুক্ত চলাচলের ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণে অগ্রণী হওয়ার পাশাপাশি অবৈধ পার্কিং ও এর উৎসসমূহ নির্মূলে জনগণের সহায়তায় একটি বিশদ কর্মসূচি গ্রহণ করা;
ঘ) যথাযথ পরীক্ষণ শেষে পানিনিষ্কাশনে কার্যকর ভূমিকা পালনে ‘ওয়াসা’কে প্রণোদিত করার পাশাপাশি পয়ঃ ও কঠিন বর্জ্য নিষ্কাশনব্যবস্থায় বাস্তবোচিত আমূল পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টা গ্রহণ। এ ক্ষেত্রে ওয়েস্ট কনসার্ন-এর ‘বর্জ্য থেকে সার’ প্রকল্পের মতো অন্যান্য সৃজনশীল ও কার্যকর উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে তা বাস্তবায়নে স্থানীয় লোকজনের সমন্বয়ে আঞ্চলিক উদ্যোগের ব্যবস্থা নেওয়া;
ঙ) প্রতিটি অঞ্চলের বা ওয়ার্ডের জনচলাচল ও জনসমাগম অঞ্চলভিত্তিক নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর যথোপযুক্ত স্থানে বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে নান্দনিকতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাসমৃদ্ধ ‘গণশৌচাগার’সমূহ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ;
৩. শব্দ ও দৃষ্টিদূষণমুক্ত নগর:
ক) জনসচেতনতা কার্যক্রমকে ভিত্তি করে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করার বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা কার্যক্রম গ্রহণ এবং পাশাপাশি ‘শব্দসীমা’ বিষয়ে প্রণীত আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও সংস্থাগুলোকে নিয়ে কার্যকর কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করা;
খ) নগরের যেখানে-সেখানে অনিয়ন্ত্রিত ‘বিলবোর্ড অরাজকতার’ বিরুদ্ধে কঠোর কর্মসূচি গ্রহণের মধ্য দিয়ে ‘নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক’ বিলবোর্ড কার্যক্রমের মাধ্যমে ‘যথাযথ’ রাজস্ব আয়ের উত্তম ক্ষেত্র হিসেবে একে কাজে লাগানো এবং এর পাশাপাশি ‘জনসচেতনতা কার্যক্রমে’ও এই বিলবোর্ড ব্যবহার করার উদ্যোগ গ্রহণ করা;
৪. ধুলা ও বায়ুদূষণমুক্ত নগর:
ক) ‘অঞ্চলভিত্তিক সমীক্ষা’র ওপর ভিত্তি করে কলকারখানার দূষণ কার্যক্রম পরিশীলিতকরণ, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কার্যক্রমকে যথাযথকরণ, দূষণকারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের মতো উদ্যোগ নেওয়া এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে এর জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা;
খ) নতুন বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি বর্তমান বৃক্ষরাজির যথাযথ পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও বৃক্ষবিরোধী ক্ষতিকর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে (যেমন: গাছের গায়ে বিজ্ঞাপন, উন্নয়ন অজুহাতে বৃক্ষ নিধন, বৃক্ষের গোড়া পাকাকরণ ইত্যাদি) প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা;
গ) নগরের অবহেলিত উন্মুক্ত স্থানসমূহ সবুজীকরণের পাশাপাশি ‘সূর্যোদয়ের আগেই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম’ নিশ্চিতকরণ, শীতের শুকনো দিনগুলোতে সড়কে ও সড়কের পাশের বৃক্ষরাজিতে ‘জল সিঞ্চনের’ মাধ্যমে ধূলি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা;
৫. সবার বসবাসযোগ্য আবাসনের নগর:
ক) ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ’-এর আওতায় নির্মাণ-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন–মধ্যবিত্তদের আবাসন নির্মাণের ক্ষেত্রকে কর্মোদ্দীপ্ত করার কার্যকর ‘সমন্বয়কের’ ভূমিকা গ্রহণের মাধ্যমে ‘সব পক্ষের জন্য লাভজনক’ উদ্যোগ হিসেবে এই খাতটিকে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নেওয়া;
খ) ‘সাইট ও সার্ভিস’–ব্যবস্থার অধীনে বর্তমানের ‘ইনফরমাল’ বা অ-আনুষ্ঠানিক আবাসন অঞ্চলসমূহের সার্বিক উন্নয়নে এবং এ খাতে দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় সৃজনশীল উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করায় ভূমিকা রাখা;
গ) এ ক্ষেত্রে ‘উদ্যোগী প্রয়াস’কে প্রণোদিত ও উৎসাহিত করার পাশাপাশি বাসস্থান, পরিবেশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাধান্য দেওয়ার কার্যক্রমকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা;
ঘ) ‘স্থানিক’ পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ‘কালচার’ তৈরি করার বিশেষ মনোযোগী উদ্যোগ গ্রহণ এবং এ ক্ষেত্রে খাসজমি ব্যবহারের বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে সব মহলকে প্রণোদিত করায় সচেষ্ট থাকা বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে তার ‘বাস্তবায়ন রূপরেখা’ প্রণয়ন করা।
ইকবাল হাবিব: সদস্যসচিব, নগরায়ণ ও সুশাসন কমিটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।

আরও দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন

সিলেটে স্কুলছাত্র সাঈদ অপহরণ ও হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে
গতকাল সকালে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে
নগরের মিরাবাজার এলাকায় মানববন্ধন করা হয় l ছবি: প্রথম আলো
সিলেটে স্কুলছাত্র আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শনাক্ত হওয়া আরও দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীরা।
গতকাল সোমবার নগরের মিরাবাজার এলাকায় সিলেট সিটি করপোরেশনের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে ওই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
কিশোরী মোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মডেল হাইস্কুল, সিলেট সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন মানববন্ধনে একাত্ম হয়। ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ বি এম জিল্লুর রহমান উজ্জ্বলের সভাপতিত্বে মানববন্ধন চলাকালে সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল মুহিত জাবেদ, আবু সাঈদের বাবা মতিন মিয়া, মডেল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিক পিয়ারা বেগম প্রমুখ বক্তব্য দেন।
নগরের হাজী শাহমীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আবু সাঈদকে ১১ মার্চ অপহরণ করে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। ১৪ মার্চ রাতে নগরের কুমারপাড়ায় মহানগর পুলিশের কনস্টেবল এবাদুর রহমানের বাসা থেকে তার বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ওই রাতেই এবাদুরসহ কুমারপাড়ায় বসবাসকারী ‘সোর্স’ গেদা মিয়া ও ওলামা লীগের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এন ইসলাম তালুকদার ওরফে রাকীবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এবাদুর পরদিন ও রাকীব ১৬ মার্চ হত্যা অপহরণের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন।
দুজনের জবানবন্দিতে ঘটনার সঙ্গে মুহিবুল ইসলাম ওরফে মাসুম নামে জেলা ওলামা লীগের প্রচার সম্পাদক পদে থাকা একজন ও অজ্ঞাত আরেকজনের নাম প্রকাশ পায়। এঁদের অবস্থান জানতে গেদাকে ১৬ মার্চ প্রথম দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ১৯ মার্চ দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর ২৩ মার্চ তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

মেরন সান ও মেরিট বাংলাদেশ কলেজের এইচ এস সি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন

নগরীর মেরন সান ও মেরিট বাংলাদেশ কলেজের এইচ এস সি পরীক্ষার্থীদের শতভাগ সাফল্য কামনায় একাদশ শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের আয়োজনে দোয়া মাহফিল ও বিদায় অনুষ্ঠান গত ২৯ মার্চ অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্র সভাপতিত্বে চকবাজার ক্যাম্পাস কলেজ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট লায়ন সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে বক্তব্য রাখেন উপাধ্যক্ষ রাজেশ কান্তি পাল, চিফ একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর শিহাব ইকবাল, শিক্ষক মোহাম্মদ শওকত ওসমান, মোহাম্মদ শাহ আলম, হেফাজতুর রহমান, সোমা সেন গুপ্তা প্রমুখ। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন- পরীক্ষার্থী আবদুল আল হাসান লিমন, শাবনুর জাহান মুনিরী, একাদশ শ্রেণির সাজ্জাদ হোসেন ফাহিম ও জয়শ্রী মারমা। বিদায়ী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মানপত্র পাঠ করে একাদশ শ্রেণির ছাত্রী মেহজাবীন শহীদ। প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘পিতা-মাতা ও শিক্ষক-শিক্ষিকার স্বপ্ন  পূরণ করতে হলে, প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও সম্মানকে অক্ষুণœ রাখতে হলে, এমনকি, নিজের জীবনকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বোর্ড পরীক্ষায় সফলতার বিকল্প নেই। তোমরা চাইলে সাফল্যের পথ বেয়ে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারো।’ পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যক্ষ মহোদয় বলেন, ‘‘বিদায় প্রত্যেকটা মানুষের জন্য বেদনাদায়ক। তোমাদের আজকের এ বিদায় দুঃখের হলেও পরম আনন্দের, কেননা, আজকের বিদায়ের মাধ্যমে তোমরা একটা বৃহত্তর জগতে পদার্পণ করতে যাচ্ছ। তোমরা অত্র প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করলেও আমাদের সহযোগিতা ও দোয়া সব সময় তোমাদের সাথে থাকবে। মনে রাখবে, শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য শিক্ষা বাস্তব জীবনে কোন প্রভাব ফেলতে পারে না। একমাত্র প্রকৃত শিক্ষাই পারে সমাজ, দেশ ও জাতির মান উন্নত করতে।’ তিনি আশা করেন, অন্যান্য বারের চেয়ে এবার শিক্ষার্থীরা আরো ভালো ফলাফল অর্জন করবে, কারণ, এবারে বিগত সময়ের বিভিন্ন ঘাটতি পূরণ করে পরীক্ষার্থীদেরকে আরো ভালোভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। সভায় পরীক্ষার্থীদের মঙ্গল ও দোয়া কামনা করে মিলাদ পরিচালনা করেন মাওলানা রাহমত উল্লাহ আজাদ। মিলাদের পর প্রতিষ্ঠান প্রধানের হাতে প্রতিষ্ঠানের জন্য গিফট তুলে দেয় দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীবৃন্দ। অনুষ্ঠান শেষে বিদায়ী শিক্ষার্থীদেরকে তাবারুক ও উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শিক্ষিকা স্বপ্না রাণী দত্ত। অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

মধ্যপ্রাচ্যে একনায়কতন্ত্রই কি ভালো ছিল?

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতময় বিপর্যয়কর পরিস্থিতি পশ্চিমা নীতির গর্ভজাত ফসল। একনায়কতন্ত্রকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তি নিজেদের সুবিধামতো দ্বিমুখী নীত নিয়েছিল। ব্যবহার করেছিল একনায়কতন্ত্রকে। সেই একনায়তন্ত্র দেশে স্বৈরাচারী শাসন চালালেও তবু স্থিতিশীলতা ছিল। এখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে চলছে জাতি ধ্বংসের যুদ্ধ। তবে কি মধ্যপ্রাচ্যে একনায়কতন্ত্রই ভালো ছিল? লিখেছেন মো. হাসানুজ্জামান
ঐতিহ্যগতভাবে দীর্ঘকাল রাজতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে থাকা মধ্যপ্রাচ্যে কি একনায়কতন্ত্রই উত্তম শাসনব্যবস্থা? ইয়েমেন থেকে লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রতিক সংঘাত দেখে এ প্রশ্নটাই এখন সামনে আসছে। ২০১১ সালের কথিত আরব বসন্তের পর থেকে এই তিনটি দেশের পথ-পরিক্রমা ভিন্ন হলেও সংঘাত সবখানেই রয়েছে। একটা বিষয় স্পষ্ট, এই অস্থিতিশীলতা থেকে বের হওয়ার স্বল্পমেয়াদি কোনো রাস্তা সামনে দেখা যাচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতায় পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যত বেশ অস্বস্তিতে রয়েছে। যদিও এ অঞ্চলের বর্তমান করুণ অবস্থাটি তাদেরই গর্ভজাত ফসল। একনায়কতন্ত্রের প্রতি আরব বসন্তের আগে-পরে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির দ্বৈত অবস্থা ও তাদের আধুনিক ইতিহাসের অদূরদর্শিতা আজকের এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
২০১১ সালের আগে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের চেয়ে স্থিতিশীলতা বেশি মূল্যবান ছিল। দশকের পর দশক ধরে আরব একনায়তন্ত্র সহ্য করা হয়েছে, কারণ তারা পশ্চিমাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে দিয়েছিলেন। মিসরে হোসনি মোবরককে ইসরাইলের সঙ্গে শান্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও বাণিজ্যচুক্তিতে রাজি ছিলেন। সিরিয়ার বাশার আল আসাদকে গোলান হাইটস নিরাপত্তার রক্ষক বিবেচনা করা হয়েছিল। আর ইয়েমেনের আলী আবদুল্লাহ সালেহ ছিলেন আল কায়দাবিরোধী মিত্র। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ কিংবা মানবাধিকার কর্মীদের ততটা উচ্চবাচ্য ছিল না। এ অবস্থা দেখে পশ্চিমা বিশ্ব খুশি ছিল তাদের স্বার্থ অনন্তকাল নিরাপদ।
বিনিময়ে আরবের একনায়করা পশ্চিমাদের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা পেতেন। নিজেদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিশ্চয়তাও পেতেন। এর মধ্যে ইয়েমেন ছিল গতিশীল চুম্বক। সালেহর ব্যক্তিস্বার্থে করা নানা উচ্চাভিলাষী অপকর্মের অন্ধ সমর্থন করতেন পশ্চিমা কূটনীতিকরা। অস্ত্র চোরাকারবারি থেকে ব্যবসায়িক পার্টনারও ছিলেন তিনি। অথচ ইয়েমেনের অধিকাংশ জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। সালেহর আবেদন আরও বেড়ে যায়, যখন আরব উপদ্বীপে আল কায়দার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলা চালানোর সুযোগ দিয়েছিলেন।
একনায়কতান্ত্রিক বাস্তবতা উল্টে গেল যখন আরব বসন্ত শুরু হল। পশ্চিমা বিশ্ব তা উপেক্ষা করতে পারিনি। প্রকাশ্যে তারা বিপ্লবকে সমর্থন দিল। কিন্তু একনায়কতন্ত্র পরবর্তী অবস্থা সামলানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ঠিক করতে পারেনি। বর্তমান অরাজকতার জন্য দায় তাই পশ্চিমাদেরই। লিবিয়াকে স্থিতিশীল করার স্পষ্ট কোনো ভিশন ছাড়াই তড়িঘড়ি করে তারা আন্তর্জাতিক সামরিক অপারেশন চালালো। যার পরিণতিতে এখন ধুঁকে ধুঁকে মরছে দেশটি। কূটনৈতিক নানা হম্বিতম্বিতে সত্ত্বেও সিরিয়া নোংরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।
ইয়েমেনের গণঅভ্যুত্থানের মীমাংসা হল এভাবে, উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলের (জিসিসি) উদ্যোগে সালেহ তার ডেপুটি আব্দো রাব্বো আল মানসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। কিন্তু এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া ভেবে দেখা হয়নি। যার মূল্য এখন শোধ করছে ইয়েমেন। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইয়েমেনের জাইদি হুথি ও সুন্নিদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে আমলে নেয়নি। হুথিদের ওপর একনায়ক সরকারের অবদমনকে গুরুত্ব দেয়নি। মার্কিন ড্রোন হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার এক ধরনের জনঅসন্তোষও ছিল। হুথিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠতা ও সমর্থন বিবেচনা না করে তাদের অধিকার অগ্রাহ্য করা হয়েছিল।
এখন অনেকেই বলছেন, ওটা ‘আরব বসন্ত’ ছিল না, ছিল ‘আরব শীত’। একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ কখনও সোজাসাপ্টা হয় না। ইয়েমেনের বর্তমান বিপর্যয় এটাই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একনায়কতান্ত্রিক শাসনেই স্থিতিশীলতা ও স্বস্তি ছিল। যদিও ভেতরে অগ্ন্যুৎপাতের আয়োজন ছিল।
কিন্তু একনায়করা তাদের জনগণের ওপর কড়াকড়ি করলেও বিনিময়ে দেশকে নিরাপদ রাখে। পশ্চিমা সাহায্য নিলেও একনায়কদের নিজস্ব স্বার্থে যখন আঘাত লাগে, তারা ঘুরে দাঁড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এই যে সংঘাত, তা একনায়কদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বৈরাচারের ফল। একনায়কী সেই ঢাকনা খুলে যাওয়ায় তা বের হয়ে পড়েছে। তাই মনে হচ্ছে ওই সব লৌহ মানবরাই ‘সাময়িক’ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার চাদরে মুড়ে রেখেছিল। সেই ‘সাময়িক’ সময়টাই তো কয়েক দশক।

কেমন হবে পরবর্তী সরকার?

ব্রিটেনের নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। আগামী ৭ মে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হচ্ছেন ডেভিড ক্যামেরন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা বিরোধী দল লেবার পার্টির এড মিলিব্যান্ড গড়তে যাচ্ছেন পরবর্তী সরকার। তবে কয়েক দশকের মধ্যে এটাই এমন নির্বাচন, যাতে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করা যাচ্ছে না। নির্বাচনে কোন দল কেমন ভোট পেলে কেমন সরকার গঠিত হবে সেদিকে নজর বুলানো যাক। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার (মেজরিটি গভর্নমেন্ট) : ব্রিটেন পার্লামেন্টের নিুকক্ষ হাউস অব কমন্সের নির্ধারিত ৬৫০ আসনের মধ্যে কোনো দল কমপক্ষে ৩২৬টি আসন পেলে তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করতে পারবে। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে সাধারণ ও নির্ভেজাল পদ্ধতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ব্রিটেনের ১৮টি সরকারের মধ্যে ১৬টিই একক সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার। বর্তমান ক্যামেরনের কনজারভেটিভ পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়ে লিবারেল ডেমোক্রেটের সঙ্গে জোট সরকার গঠন করেছে।
জোট সরকার (কোয়ালিশন গভর্নমেন্ট) : জোট সরকার তখন গঠিত হবে, যখন কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাবে। এমতাবস্থায় দুটো বড় দল কনজারভেটিভ বা লেবার পার্টি ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোট করে ৩২৬টি বা তার বেশি আসন নিশ্চিতের চেষ্টা করবে। ২০১০ সালে এভাবেই সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে সরকার পরিচালনায় দুই দলের জন্যই বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়। সংখ্যালঘু সরকার (মাইনরিটি গভর্নমেন্ট) : যদি কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠ না হয় এবং দুই দলের জোট গঠনেও ব্যর্থ হয়, তখন সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হতে পারে। ছোট ছোট দলগুলোকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিতে সরকারে ভাগ দিতে হয়। এই সরকার দুর্বল ও অস্থিতিশীল হয়। যে কোনো ইস্যুতে সমর্থন আদায়ে বেগ পেতে হয়। যে কোনো মুহূর্তে এ সরকার ভেঙেও পড়তে পারে। ইইউবিরোধী ইউকিপ ও উত্তর আয়ারল্যান্ড ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন কনজারভেটিভ দলের সঙ্গে মিশে সরকার গঠন করতে পারে। অথবা স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী স্কটিশ ইন্ডিপেন্ডেন্স লেবার পার্টিকে সমর্থন করতে পারে। ওই জোটকে আবার রানীর সম্মতি অর্জন করতে হবে এবং পার্লামেন্টের কার্যক্রম শুরু হলে আস্থা ভোটে টিকতে হবে।
নতুন নির্বাচন (ফ্রেশ ইলেকশন) : ছোট দলগুলোর সমর্থন না পেয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে কিংবা আস্থা ভোটে না জিতলে অথবা কোনো দলের সমর্থন উঠিয়ে নিলে সরকার টিকবে না। তখন নতুন নির্বাচনে অংশ নেয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না। তখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের লক্ষ্যে দ্রুত নতুন নির্বাচন হবে। এবার এমনটি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা যদি হয়, তবে ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবারের মতো এক বছরের মধ্যে দু’বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এএফপি।

বাশার পুতিনের চেয়েও মার্কিনিদের বড় হুমকি ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ইস্যুতে ডেমোক্রেট-রিপাবলিকানদের দ্বন্দ্ব যেমন বাড়ছে তেমনি দল দুটির সমর্থকদের মধ্যেও পারস্পরিক বিদ্বেষ বাড়ছে। বিদ্বেষের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে, আমেরিকার নিরাপত্তার বিষয়ে রিপাবলিকান সমর্থকরা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের চেয়েও প্রেসিডেন্ট ওবামা বড় হুমকি। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপসোস পরিচালিত এক জরিপে এ তথ্য জানা গেছে। জরিপে কোন দেশ, গ্রুপ ও জনগণ আমেরিকার জন্য হুমকি এবং হুমকি সে বিষয়ে ২ হাজার ৮০৯ জন মার্কিনিকে পাঁচটি প্রশ্ন করা হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে চারটিই ছিল, আসন্ন বা এই মুহূর্তে হুমকি কারা আর মাত্র একটি প্রশ্ন ছিল হুমকি নয় কারা সে বিষয়ে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি (৩৪ শতাংশ) রিপাবলিকান সমর্থকের মতে,
এ মুহূর্তে আমেরিকার জন্য পুতিন ও বাশারের তুলনায় ওবামাই বেশি হুমকি। আর পুতিন ও বাশারকে হুমকি বলে রায় দিয়েছেন মাত্র ২৪ ও ২৩ শতাংশ সমর্থক। প্রসঙ্গত, ইউক্রেন ইস্যুতে পুতিনের বিরুদ্ধে সরব রয়েছে আমেরিকাসহ পশ্চিমা জোট। আর নিজের দেশের জনগণের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করছেন অভিযোগ তুলে বাশারের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট। জরিপে ওবামার দল ডেমোক্রেটিক পার্টিকেও আমেরিকার জন্য হুমকি বলে মত দিয়েছেন ২৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। অপরদিকে ২২ শতাংশ ডেমোক্রেট সমর্থক মনে করেন রিপাবলিকানরা আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্টের মতে, মার্কিন রাজনৈতিক মেরুকরণ যে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে তা এই জরিপে উঠে এসেছে। তবে মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ব্যারি গ্ল্যাসনার এতে বিস্মিত নন। তার মতে, রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটদের ‘ব্যবসায়ীদের ভয়’ ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একটি বড় ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, ‘টিভি মিডিয়া ও আমেরিকার রাজনীতির ব্যবসার ভয়টা অনেক বেশি।’

আইএস আরও বিস্তৃত হয়েছে

সিরিয়া ও ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিমান হামলার পর ইসলামিক স্টেট (আইএস) আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। রোববার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস টেলিভিশনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রোববার এ কথা বলেন তিনি। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সিরিয়ায় চালানো মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিমান হামলায় তার সরকার কতটুকু উপকৃত হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে বাশার বলেন,
‘কখনও আপনি স্থানীয় পর্যায়ে কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি আইএসআইএল (বর্তমানে আইএস) নিয়ে সাধারণভাবে চিন্তা করেন তাহলে দেখবেন, প্রকৃতপক্ষে হামলার পর সংগঠনটি আরও বিস্তৃত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিমান হামলার পর থেকে প্রতি মাসে অন্তত এক হাজার জনকে দলে টানতে সক্ষম হয়েছে আইএসআইএস।’ ‘শুধু সিরিয়ায়ই নয়; ইরাক, লিবিয়া বা অন্যান্য অঞ্চলে আল কায়দা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো আইএসআইএসের প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করেছে। এটাই প্রকৃত পরিস্থিতি।’

তিন কারণে ঝুলছে ইরান চুক্তি

ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির পরমাণু আলোচনার সময়সীমা শেষ হচ্ছে আজ (৩১ মার্চ)। ১৮ মাস ধরে সমঝোতার চেষ্টা এবারও ভেস্তে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। সোমবার পশ্চিমা একজন কূটনীতক এএফপিকে জানিয়েছেন, তিন কারণে ইরান চুক্তি আটকে রয়েছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাওয়াদ জারিফের সঙ্গে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সোমবার নতুন করে বৈঠকে বসে। বৃহস্পতিবার থেকে সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে আলোচনা শুরু হয়।
পশ্চিমা একজন কূটনীতিক বলেন, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এখনও একমত হতে পারেননি নেতারা। তা হচ্ছে, ইরানের পরমাণু নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা, অবরোধ তুলে নেয়া ও চুক্তি লংঘনে করণীয়। পরমাণু নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা : ইরানের পরমাণু কর্মসূচি অন্তত ১০ বছরের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে চায় বিশ্বশক্তি। ইরান চায় ওই সময়ের পরে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠিয়ে নিতে হবে। কিন্তু পশ্চিমারা বলছে, ধীরে ধীরে পরবর্তী পাঁচ বছর নাগাদ নিষেধাজ্ঞা উঠবে। অবরোধ তুলে নেয়া : ইরান চায় চুক্তি হওয়ার পরপরই জাতিসংঘের সব অবরোধ উঠিয়ে নিতে হবে। তবে পশ্চিমারা বলছে, এটা ক্রমে ক্রমে হবে। আর পরমাণু সংক্রান্ত কোনো প্রযুক্তি আমদানিতে অবরোধ তোলা হবে না। চুক্তি লংঘনবিষয়ক : যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা চায় এমন একটি কর্মকৌশল ঠিক করা, যাতে ইরান চুক্তিসংক্রান্ত কোনো কিছু লংঘন করলেই জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনরায় কার্যকর হবে। এই প্রস্তাব রাশিয়াও গ্রহণ করেছে।
এদিকে সোমবার বৈঠকের আগে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরমাণু আলোচক দলের সদস্য সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি দেশটির ইংরেজি নিউজ চ্যানেল প্রেসটিভিকে বলেন, আলোচনা শেষ পর্যায়ে পেঁঁছেছে। তবে উভয়পক্ষ খসড়া চুক্তিতে পৌঁছেছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তা নাকচ করে দিয়েছেন আরাকচি। এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রেসটিভিকে তিনি বলেন, এসব বিষয়ই রাজনৈতিক উভয়পক্ষের কাছেই কারিগরি সমস্যা রয়েছে কিন্তু সেসব বিষয়েও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই নিতে হবে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করার অর্থ হচ্ছে, ইয়েমেনে তেহরানের আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করা। তিনি এই চুক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বশক্তিকে সতর্ক করে দেন। তিনি বলেন, কেন এই চুক্তি হবে? এই চুক্তির মানে এই যে ইয়েমেনে আগ্রাসনের জন্য ইরানকে কোনো মূল্য দিতে হল না। বরং তারা পুরস্কৃত হল। অবশ্য শুরু থেকে ইরানের সঙ্গে যে কোনো চুক্তির বিরোধিতা করছে ইসরাইল। তেহরানের ওপর আরও অবরোধ আরবের পক্ষে তেলআবিব।

বিশ্বকাপসেরা স্টার্ক শীর্ষে

আইসিসির ওয়ানডে বোলারদের র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে উঠে এসেছেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় মিচেল স্টার্ক। অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ে দারুণ অবদান ছিল ২২ উইকেট নেয়া স্টার্কের। মাত্র ১০.১৮ গড়ে উইকেট নেয়া এই বাঁ-হাতি পেসার টুর্নামেন্টে ওভারপ্রতি মাত্র ৩.৫০ করে রান দেন।
বিশ্বকাপে ১৫ উইকেট নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার লেগ-স্পিনার ইমরান তাহির উঠে এসেছেন দুই নম্বরে। বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান আছেন ১০ নম্বরে। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের র‌্যাংকিংয়েও উন্নতি হয়েছে। সাতে আছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ১২ নম্বরে উঠে এসেছেন স্টিভেন স্মিথ। আইসিসির ওয়ানডে ব্যাটসম্যানদের র‌্যাংকিংয়ে প্রথম পাঁচটি স্থান অপরিবর্তিত রয়েছে, যার শীর্ষে আছেন এবি ডি ভিলিয়ার্স। ওয়েবসাইট।

আবার জুটি হলেন সজল ও হাসিন

ষষ্ঠবারের মতো জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করছেন হাসিন ও সজল। সম্প্রতি জাকির হোসেন উজ্জ্বলের রচনা ও কাওছার হোসেন জয়ের পরিচালনায় ‘টাচস্ক্রিন’ নামের একটি নাটকে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন তারা। নাটকে গ্রামের সহজ-সরল বোকা স্বভাবের একটি ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সজল। আর এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন হাসিন রওশন জাহান। এরই মধ্যে রাজধানীর অদূরে পুবাইলে নাটকের শুটিং সম্পন্ন হয়েছে।
নাটকে অভিনয় প্রসঙ্গে সজল বলেন, ‘রোমান্টিক গল্পের বহু নাটকে অভিনয় করেছি আমি। এ সময়ে এসে আমি একটু অফট্র্যাকধর্মী চরিত্রে কাজ করার চেষ্টা করছি। টাচস্ক্রিন নাটকের গল্পে দর্শক আমাকে নতুনভাবে দেখতে পাবেন। হাসিনের সঙ্গে আমার আগের কাজগুলো বেশ দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। আশা করি এ নাটকটিও ভালো লাগবে দর্শকের।’ হাসিন বলেন, ‘সজল ভাইয়ের সঙ্গে এখন পর্যন্ত যে কাজগুলো করেছি প্রত্যেকটিরই আমি ভালো রেসপন্স পেয়েছি। টাচস্ক্রিন নাটকের গল্পের কারণে আমি বেশি আশাবাদী।’ শিগগিরই নাটকটি একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচার হবে বলে নির্মাতা সূত্রে জানা যায়।

আক্কেল গুড়ুম by মাহবুব তালুকদার

বাংলাদেশের দুজন মহান রাজনীতিবিদের বক্তব্য আমাকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত করে তুলেছে। তারা দুজনই বিশিষ্ট সংসদ সদস্য। তাদেরকে মহান বলে আখ্যায়িত করার কারণ এদের উভয়েই আপন মহিমায় ভাস্বর। প্রথমজন হলেন ঢাকা-৭ আসনের নির্বাচিত এমপি হাজী সেলিম। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেছেন- ‘আমার এলাকায় অনেক লোক আমাকে জানিয়েছেন, আমি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে না দাঁড়ালে তারা আত্মহত্যা করবেন।’ খবরটি পড়ার পর থেকে আমি শয়নে-স্বপনে অসংখ্য আত্মহত্যা-উদ্যত মানুষকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, হাজী সেলিম যাদের নাম বা সংখ্যা উল্লেখ করেননি। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে হাজী সেলিমকে মনোনয়ন দিয়ে ওই সব আত্মহত্যায় অঙ্গীকারবদ্ধ অজ্ঞাত ব্যক্তিবর্গকে আত্মহনন থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা চালানো প্রয়োজন।
হাজী সেলিমকে আমি এক অসাধারণ রাজনীতিবিদ মনে করি প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত, তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করে জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছেন। তবে তিনি আওয়ামী লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করে দূরে সরে যাননি বরং মহানগর আওয়ামী লীগে তার উপস্থিতি অতীব জোরদার। এবার তিনি মেয়র পদপ্রার্থী হতে সংসদ সদস্যপদ ত্যাগ করে নির্বাচনের ময়দানে লড়াই করতে আবির্ভূত হয়েছেন। আত্মবিশ্বাস না থাকলে এমন ঝুঁকি ক’জন নিতে পারে? কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, হাজী সেলিম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে পরাজিত হলে আত্মহত্যায় নিবেদিত আত্মদানকারী ওই সব হাজী সেলিম-ভক্ত ব্যক্তিদের কি অবস্থা হবে? নির্বাচন কমিশনের কি উচিত নয়, সম্ভাব্য গণমৃত্যুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা?
অপর মহান রাজনীতিবিদের নাম আবুল কালাম আজাদ। তিনি বিএনএফ নামক একটি রাজনৈতিক দলের সভাপতি ও ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচিত এমপি। বিএনএফ বা বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের নাম বিএনপির কাছাকাছি হলেও তার অবস্থান বিএনপির বিপরীত প্রান্তে এবং অনেকটা আওয়ামী লীগের পদপ্রান্তে। আমি তাকে বিশাল মাপের রাজনীতিবিদ মনে করি এজন্য যে, তিনি গুলশান এলাকা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ওই এলাকায় সংসদ সদস্য ছিলেন। জনশ্রুতি আছে, এরশাদ নির্বাচনে জিততে পারবেন না জেনে সংগোপনে আবুল কালাম আজাদকে ওয়াক ওভার দিয়ে দেন। যাই হোক, সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে জনাব আজাদ তার দল থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের উত্তর ও দক্ষিণের মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য দুজন করে চারজনের প্রার্থিতা  ঘোষণা করেন। দুজন করে প্রার্থীর নাম ঘোষণা কেন, এরকম প্রশ্নের জবাবে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশে বর্তমানে অপহরণ-গুম ও খুনের প্রচলন শুরু হয়েছে। তাই আমরা সিটি নির্বাচনে দুজন করে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছি। একজন গুম হয়ে গেলে অন্যজন নির্বাচনে অংশ নেবেন।’
মাননীয় এমপির এই উক্তি অত্যন্ত দূরদর্শিতার পরিচায়ক। সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের পর সিটি করপোরেশনের প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে এ ধরনের আশঙ্কা অমূলক নয়। আমার মনে হয়, অন্যান্য দলের প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও গুমের বিষয়টি মাথায় রেখে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া উচিত। কিন্তু বিএনএফ প্রধানের ওই উক্তির পর আরেকটি দুশ্চিন্তা আমার মাথায় ভর করে আছে। যদি নির্বাচনকালে বিএনএফ-এর মেয়রপদের দুজন করে চারজন প্রার্থীই গুম হয়ে যান, তাহলে অবস্থাটা কি দাঁড়াবে? আমার মনে হয়, প্রতিটি মেয়র পদের জন্য যদি পাঁচজন করে প্রার্থীর মনোনয়ন দেয়া হয়, তাহলে জনাব আজাদের আশঙ্কার কিঞ্চিৎ উপশম হতে পারে। নির্বাচন কমিশন অনুগ্রহপূর্বক দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই বাস্তব চিত্রটি অনুধাবন করবেন।
এক ঢাকার কেন দুজন পিতা হবেন, এ ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক অসাধারণ বাগ্মী নূরে আলম সিদ্দিকী। তিনি ফাউন্ডেশনের এক আলোচনা সভায় সম্প্রতি বলেছেন, ‘সিটি মেয়রকে নগরপিতা বলা হয়। নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, দিল্লির মতো বড় শহরে যেখানে একজন করে মেয়র, সেখানে ঢাকায় দুজন নগরপিতা হবেন কেন?’ বিষয়টি আমাকেও রীতিমত ভাবিয়ে তুলেছে। আমার এক প্রবাসী বন্ধু নূরে আলম সিদ্দিকীর বক্তব্য শুনে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, ‘নির্বাচনের পর আপনি আমাকে দয়া করে জানাবেন, আমি কোন পিতার সন্তান?’
আমার আক্কেল গুড়ুম!

সিলেটে খালেদ হত্যা- ৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট by ওয়েছ খছরু

১২ লাখ টাকা লুটের জন্য অপহরণ করা হয় সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ছাত্র খালেদুজ্জামানকে। পরে স্কুলছাত্র আবু সাঈদ খুনের স্টাইলে তাকেও খুন করে লাশ গুম করার চেষ্টা চালিয়েছিল ঘাতকরা। খালেদ হত্যার ৭ মাস পর পুলিশ আলোচিত এ হত্যা মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দিয়েছে। রোববার আদালতে দেয়া চার্জশিটে পুলিশ মূল ঘাতক কবির ও তার পরিবারের ৫ সদস্য সহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করেছে। এর আগে দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিল ঘাতকরা। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর (তদন্ত) এবিএম বদরুজ্জামান সিলেটের আদালতে এই চার্জশিট দাখিল করেন। ২০১৪ সালের ২১শে জুলাই  গোলাপগঞ্জ উপজেলার নিমাদল গ্রামের ছালেহ আহমদ ছলকু মিয়ার পুত্র ও সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ছাত্র খালেদুজ্জামান খালেদ (২০) ও তার খালাতো ভাই জহিরুল ইসলাম তাদের পূর্ব পরিচিত হুমায়ুন কবির ও তার সহযোগীরা নগরীর বন্দরবাজার থেকে অপহরণ করে। অপহরণকারীরা খালেদ ও জহিরুলকে মুক্তির বিনিময়ে ১২ লাখ টাকা দাবি করে। জহিরুল ৩ লাখ টাকা জোগাড় করে দেয়ার শর্তে ছাড়া পায়। টাকা না পেয়ে অপহরণকারীরা খালেদকে হত্যা করে এবং বিয়ানীবাজার উপজেলার সেওলা ব্রিজের উপর থেকে নিহত খালেদের লাশ কুশিয়ারা নদীতে ফেলে দেয়। অপহৃত হওয়ার ৪ দিন পর ২৫শে জুলাই সকালে ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীতে স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো হাত-পা বাঁধা অবস্থায় খালেদের লাশ পাওয়া যায়। খালেদ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পিতা প্রথমে গোলাপগঞ্জ মডেল থানায় ও পরবর্তী পর্যায়ে বিয়ানীবাজার থানায় যোগাযোগ করেন। লাশ পাওয়ার পর খালেদের পিতা ছলুছ মিয়া বিয়ানীবাজার থানায় ৮ জনকে অভিযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে বিয়ানীবাজার উপজেলার উত্তর চন্দ্র গ্রামের আসামি হুমায়ুন কবির (২৫), মৃত বশারত আলীর পুত্র কবিরের পিতা সাইব উদ্দিন (৫০), গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউপির উত্তরপাড়া গ্রামের আব্দুছ ছত্তারের পুত্র ফাহিম আহমদ (২৫) ১৬৪ ধারায় হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে সিলেটের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরে পুলিশ তদন্ত শেষে চার্জশিট আদালতে প্রেরণ করে। চার্জশিটে অভিযুক্ত আসামিরা হচ্ছে বিয়ানীবাজার উপজেলার উত্তর চন্দ্র গ্রামের হুমায়ুন কবির (২৫), মৃত বশারত আলীর পুত্র সাইব উদ্দিন (৫০), জকিগঞ্জ উপজেলার বিলেরবন্দ গ্রামের মৃত আব্দুল মন্নানের পুত্র মোহাম্মদ মুকিত আল মাহমুদ (২২), বিয়ানীবাজার থানার মোহাম্মদপুর এলাকার মৃত হাজী যোয়াদ আলীর পুত্র মোহাম্মদ গৌছ উদ্দিন (৫০), গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউপির উত্তরপাড়া গ্রামের আব্দুছ ছত্তারের পুত্র ফাহিম আহমদ (২৫), বিয়ানীবাজার উপজেলার উত্তর চন্দ্র গ্রামের ঘাতক কবিরের মা রিনা বেগম (৪৫), কবিরের বোন লাকী (২০) ও ফারজানা ডলি (১৯)। তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এদিকে পুলিশের তদন্তের পর ন্যায় বিচার দাবি করেছেন খালেদুজ্জামানের পিতা সালেহ আহমদ ছলুছ মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমি ন্যায় বিচার চাই। আর কিছু না। আমার নিষ্পাপ সন্তানটিকে কেবলমাত্র টাকার জন্যই মেরে ফেলা হয়েছে।’ আদালতে দেয়া আসামিদের জবানবন্দি ও সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে ঘটনার বিশদ বিবরণ। সেটি চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র খালেদুজ্জামানের সঙ্গে গোলাপগঞ্জ বাজারের নুর ম্যানশনের স্পাইডার অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্সের দোকানে পরিচয় হয় কবিরের। সেই সুবাদে মাঝে মধ্যে কম্পিউটার ও ল্যাপটপের কাজ করাতে খালেদ কবিরের দোকানে প্রায়ই আসতো। গত ১৭ই জুলাই খালেদের বন্ধু জহিরুল মোবাইল ফোনে কবিরকে জানায় সে একটি ল্যাপটপ বিক্রি করবে।  ঠিক সেই মুহূর্তে কবির তার সহযোগীদের নিয়ে পরিকল্পনা করে যে জহিরুলকে আটক করে মুক্তিপণের জন্য কিছু টাকা চাইবে। পরিকল্পনা মোতাবেক গত ২০শে জুলাই কবিরের সঙ্গে জহিরুলের কথা হয়। পরদিন সকালে পরিকল্পনা অনুযায়ী কবির সিলেট করিমউল্লাহ মার্কেটের নিচতলায় দাঁড়িয়ে জহিরুল ইসলামকে ফোন করে তার ল্যাপটপ সঙ্গে করে নিয়ে আসতে বলে। তখন মার্কেটের ৫ম তলায় কাজে আসা জহিরুল ও খালেদুজ্জামান মার্কেটের নিচ তলায় এসে কবিরের সঙ্গে দেখা করে ও জহিরুল তার ল্যাপটপ দেখায়। এ সময় কবির জানায়, ল্যাপটপ ক্রয়ের কাস্টমার তার এলাকায় আছে। তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলে খালেদুজ্জামান ও জহিরুল বিয়ানীবাজার থানাধীন রামধাস্থ উত্তর চন্দ্রগ্রাম কবিরের বাড়িতে যায়। পরিকল্পনা মোতাবেক আগে থেকে কবিরের বাড়িতে সহযোগী মুকিত ও ফাহিম তার কক্ষে অবস্থান করছিল। জহিরুল ও খালেদ কবিরের ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই ফাহিমের হাতে থাকা ছুরি দ্বারা জহিরুল ও খালেদকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করতে থাকে। পরে তাদের দুইজনকে ২টি চেয়ারে বসিয়ে রামদা ও খেলনা পিস্তল দ্বারা জীবননাশের ভয়ভীতি দেখায় মুকিত ও ফাহিম। এ সময় তারা স্কচটেপ দ্বারা দুইজনের সারা শরীর পেচিয়ে বাঁধে। এক পর্যায়ে কবির মুক্তিপণের জন্য তাদের কাছে ১২ লাখ টাকা দাবি করে। জহিরুল ৩ লাখ টাকা দিতে সম্মত হয়। ৩ লাখ টাকা দিলে খালেদকে ছেড়ে দেবে বলে খালেদুজ্জামানকে আটক রেখে জহিরুল ইসলামকে ছেড়ে দেয়। জহিরুল গোলাপগঞ্জ থানাধীন হেতিমগঞ্জ তার মামা সবুজের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানায়। জহিরুল কবিরের বাড়ি থেকে যাওয়ার পর আটক থাকা খালেদুজ্জামানকে রুমের মধ্যে মুকিত ও ফাহিম দুইজনে দুই পাশে ধরে রাখে এবং খালেদকে স্কচটেপ দিয়ে শক্তভাবে নাক-মুখ পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলায় শ্বাসরোধ হয়ে কবির মারা যায়। তখন তার লাশ কবিরের খাটের পাশে রেখে দেয়া হয়। পরে কবির জহিরুল ইসলামকে মুক্তিপণের টাকা নিয়ে আসার জন্য ফোন করলে তখন জহিরের মামা সবুজ ফোন ধরে বলে যে, তারা টাকা নিয়ে আসছে। এরপর কবির, মুকিত ও ফাহিম ইফতারের পর পর সড়ক ফাঁকা থাকায় লাশ প্রাইভেট কারে নিয়ে নদীতে ফেলে দেয়।

গণমাধ্যমবিষয়ক কিছু খারাপ দৃষ্টান্ত by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বেশ কয়েক মাস ধরে খ্যাতনামা ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর কোনো সাংবাদিককে প্রধানমন্ত্রীর কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা হচ্ছে না। বিনা আমন্ত্রণে ডেইলি স্টার-এর সাংবাদিক অনুষ্ঠানস্থলে গেলেও তাঁকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না। ডেইলি স্টার পত্রিকা বার্তা সংস্থা বা অন্য কোনো সূত্র থেকে প্রধানমন্ত্রীর খবর সংগ্রহ করছে। আমাদের সাংবাদিকতায় এ ধরনের সমস্যা আগে কখনো হয়েছে বলে মনে পড়ে না। যেকোনো সংবাদপত্রের জন্য এই অবস্থা অস্বস্তিকর। আর তা যদি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে হয়, তা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি হুমকিস্বরূপ।
অনেকে বলতে পারেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করতে পারে। হয়তো পারে। তবে যেকোনো প্রতিষ্ঠান আর সংবাদপত্র বা টিভি এক জিনিস নয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ নয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে ‘দ্য ফোর্থ এস্টেট’ বলা হয় না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা বিরাট। এটা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। তার পরও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর যদি এ রকম ব্যবহার করে থাকে, তা খুবই অন্যায় ব্যবহার হয়েছে বলে মানতে হবে। এ ধরনের আচরণ সামরিক শাসন বা স্বৈরাচারী শাসনে হয়তো সম্ভব। কারণ, তখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বা গণতন্ত্রচর্চা স্বীকার করা হয় না। কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের আচরণ অকল্পনীয়।
ডেইলি স্টার পত্রিকা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। পত্রিকাটির পক্ষে নানা ভুল-ত্রুটি করাও সম্ভব। পত্রিকাটি যদি এমন কিছু করে থাকে, যা আইনানুগ নয়, তাহলে তার বিচার হতে পারে, যা অন্য দশজন অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ঘটছে। এ রকম কোনো প্রক্রিয়ায় না গিয়ে একতরফাভাবে ডেইলি স্টার-এর মতো অভিজাত ও খ্যাতনামা দৈনিকের প্রতিনিধিকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রবেশাধিকার না দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস নয়। এটা সরকারের প্রধান নির্বাহীর অফিস। অনুমতি সাপেক্ষে এখানে নীতিগতভাবে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের প্রবেশাধিকার রয়েছে। কোনো সংবাদপত্র প্রতিনিধির প্রবেশাধিকার অন্য অনেকের চেয়ে বেশি রয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী দলমত-নির্বিশেষে সবার প্রধানমন্ত্রী। তিনি রাগ বা অনুরাগবশত কোনো কাজ করবেন না বলে শপথ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আচরণ তা প্রমাণ করছে না।
ডেইলি স্টার পত্রিকা যদি প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে কিছু লিখে থাকে বা পত্রিকাটির কোনো মন্তব্য প্রতিবেদন বা কলাম প্রধানমন্ত্রীকে আহত করে থাকে, তাহলে তার প্রত্যুত্তরে আরও শক্ত লেখা বা প্রতিবাদ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস বিভাগ পাঠাতে পারত। সংবাদপত্রে মত, ভিন্নমত, আরও নানা মত প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। এটাই গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সৌন্দর্য।
দুই.
কয়েক দিন আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁর গুলশান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিতে এই সংবাদ সম্মেলন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেখানে তিনি কী বলেছিলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছেন। এখানে সেই বিশ্লেষণ করছি না। শুধু একটা কথা লেখার জন্য এই বিষয়ের অবতারণা করেছি। তা হলো: তিনি বরাবরের মতো এবারও সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি। এটা খুবই অন্যায় হয়েছে।
খালেদা জিয়া একজন প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। তিনি তিনবার এ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি তাঁর দলকে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি কোনো নবিশ নন। কাজেই তাঁর দল বা জোটের রাজনৈতিক কর্মসূচি, চলমান আন্দোলন, বহুল নিন্দিত পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস, ছাত্রছাত্রীদের পাবলিক পরীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষয়ক্ষতি ইত্যাদি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর তো তাঁকে দিতেই হবে। সাংবাদিকেরা তো তাঁকে ক্রিকেট খেলা সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন না। দেশের রাজনীতি নিয়েই প্রশ্ন করতেন। সেই প্রশ্ন করার সুযোগ তিনি দেননি। এটা মোটেও নেতাসুলভ কাজ হয়নি। রাজনীতি করতে হলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি তাঁকে হতেই হবে। এটা খেলার নিয়ম। দুনিয়াজুড়ে রাজনীতিকদের এই নিয়ম মেনে চলতে হয়। খালেদা জিয়া কোনো ব্যতিক্রম হতে পারেন না। অন্য যেকোনো পেশার ব্যক্তি সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে তাঁরা বাধ্য নন। কিন্তু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিবিদের সেই সুযোগ নেই। খালেদা জিয়া অতীতেও তাঁর কয়েকটি সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের উত্তর দেননি। এই প্রবণতা নিন্দনীয়। রাজনৈতিক নেতা হলে, দলের নেতৃত্ব দিলে তাঁকে উত্তর দিতেই হবে। শুধু নিজের বক্তব্য বলার জন্য কেউ সাংবাদিক বৈঠক ডাকেন না। গণমাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে বক্তব্য প্রচার করা যায়। বিএনপির প্রেস বিভাগকে এই পার্থক্যটা বুঝতে হবে। সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানালে তাঁদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে। খালেদা জিয়া যখন বড় নেতা হয়েছেন, তখন তাঁকে বড় নেতার মতোই আচরণ করতে হবে।
তিন.
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নানা উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন ও সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। তাঁর এই উদ্যোগ ও প্রবণতা খুবই প্রশংসনীয়। আজকাল তাঁর সংবাদ সম্মেলন কোনো কোনো টিভি চ্যানেলে লাইভ প্রচার করা হয়। সেই সুবাদে এই অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ আমার বহুবার হয়েছে। একজন রিপোর্টার হিসেবে সত্তরের দশকে বহু সংবাদ সম্মেলন আমি কাভার করেছি। কিন্তু এখন দেখি পরিস্থিতি অন্য রকম। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী ঘরানার অ্যাকটিভিস্ট সাংবাদিকেরাই অংশ নেন। তাঁদের কারও কারও প্রশ্ন প্রশংসা বা স্তুতিমূলক। অনেকে প্রশ্নের বদলে প্রধানমন্ত্রীর কৃতিত্ব বর্ণনা করেন। এখন সাংবাদিকতা পেশায় নেই এমন ব্যক্তিও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য স্তুতিমূলক প্রশ্ন করেন। সবটা মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি একটা তৈলাক্ত জবজবে সাংবাদিক বৈঠক হয়ে ওঠে। যেখানে আর যা-ই থাকুক, পেশাদারি থাকে না। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বসার জায়গায় আওয়ামী লীগের সাংসদ, মন্ত্রী, নেতারাও আসন গ্রহণ করেন। অনেকে করতালিও দেন। এগুলো কোনোটাই বাঞ্ছনীয় নয়। সংবাদ সম্মেলন শুধু সাংবাদিকদের জন্য আয়োজন করতে হয়; নেতাদের জন্য নয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বোধ হয় এগুলো জানেন না। বা জানলেও বাস্তবায়ন করতে পারেন না। সংবাদ সম্মেলন কারও স্তুতি করার জায়গাও নয়। খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন করার জায়গা।
চার.
দেশের একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল একুশে টিভি (ইটিভি) ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে দর্শকেরা দেখতে পাচ্ছেন না। রাজধানী ঢাকায় প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকায় ইটিভির অনুষ্ঠান দেখা যায় না। ঢাকার বাইরে ৫০ শতাংশ জেলায় দেখা যাচ্ছে বলে ইটিভি সূত্রে জানা গেছে। ইটিভি কর্তৃপক্ষ বলেছে: কেব্ল অপারেটররা ওপরের নির্দেশে এই চ্যানেলের প্রচার বাধাগ্রস্ত করছে। উল্লেখ্য, একুশে টিভির মালিক ব্যবসায়ী আবদুস সালাম কিছুদিন আগে পর্নোগ্রাফি আইনে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর গ্রেপ্তারের সঙ্গে একুশে টিভির সম্প্রচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না জানি না। তবে কোনো কেব্ল টিভি চ্যানেল কেব্ল অপারেটরদের উদ্যোগে আংশিক বন্ধ করা যায়, এ রকম অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। এ ব্যাপারে কোনো আইন আছে কি না, তা-ও জানি না। কেব্ল অপারেটররা ব্যবসায়ী সংস্থা। অর্থের বিনিময়ে তারা সার্ভিস দেয়। একুশে টিভি সম্পর্কে তাদের কোনো অভিযোগ আছে কি না, তা-ও তারা বলেনি। বিষয়টা পরিষ্কার করে গণমাধ্যমে কোনো পক্ষ কথা বলেনি। তথ্য মন্ত্রণালয়ও কিছু বলেনি। এভাবে কেব্ল অপারেটররা কোনো টিভি চ্যানেল বিনা অভিযোগে বন্ধ করে রাখার ক্ষমতা রাখে কি না, তথ্য মন্ত্রণালয় আমাদের জানাতে পারে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো: কেব্ল টিভি চ্যানেল মালিক সমিতির এ ব্যাপারে নীরবতা পালন। এসব সমিতি নিশ্চয় বনভোজন করার জন্য প্রতিষ্ঠা হয় না। তাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। ইটিভি কর্তৃপক্ষ বলেছে: তারা এ ব্যাপারে আইনের আশ্রয় নিয়েছে।
বর্তমান সরকার গণমাধ্যম জগতে কয়েকটি খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমাদের দূষিত রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হিসেবে ভবিষ্যতে অন্য দল ক্ষমতায় গেলে তারা যে এসব দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে না, তা কি নিশ্চিত বলা যায়?
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

আমাকে ট্রফি দিতে না দেয়া গঠনতন্ত্রবিরোধী : কামাল

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির সভাপতি আ.হ.ম. মোস্তফা কামাল বলছেন, মেলবোর্নে বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে চ্যম্পিয়ানের হাতে ট্রফি তুলে দেয়ার সুযোগ তাকে না দিয়ে আইসিসি তার গঠনতন্ত্র ভঙ্গ করেছে। বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে মি. কামাল জানান, দেশে ফেরেই আইসিসির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার লক্ষ্যে তিনি তার কৌঁসুলিদের সাথে কথা বলবেন। আইসিসির সভাপতির বলেন, তার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইসিসির গঠনতন্ত্রে বলা আছে যে টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়নের হাতে পদক তুলে দেবেন আইসিসির প্রেসিডেন্ট। এ আইন এখনো পরিবর্তন করা হয় নি। তাহলে কেন তিনি ফাইনালের দিন ট্রফি দিতে পারেন নি, প্রশ্ন করা হলে মি কামাল বলেন, "আমাকে বলা হয়েছে যে আমি দিতে পারবো না কারণ আমি আইসিসির প্রেসিডেন্ট হয়ে বাংলাদেশ-ভারত খেলা নিয়ে মন্তব্য করেছি।" তিনি বলেন, ক্রিকেটে অনিয়ম হলে তা তুলে ধরাটা তার দায়িত্ব এবং সেটাই তিনি করেছেন। তিনি আরো বলেন কোন প্রতিষ্ঠান যদি আইন না মানে, এবং তা খারাপ লোকেরা চালায় - তাহলে তিনি নিজেই সে প্রতিষ্ঠানে থাকবেন না। সূত্র: বিবিসি বাংলা

পুলিশের অবহেলা খুঁজে পায়নি কমিটি! by নুরুজ্জামান লাবু

অমর একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
টিএসসির কাছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন ফুটপাতে খুন হন অভিজিৎ রায়।
আহত হন তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে তোলা ছবি।
ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের সময় তিন দিকের সড়কেই পুলিশের উপস্থিতি ছিল। যে স্থানে অভিজিতের ওপর হামলা হয়েছে তার দক্ষিণ দিকে টিএসসিসংলগ্ন একুশে বইমেলার গেটে ছিল পুলিশি নিরাপত্তা। পাশের মিলন চত্বরেও ছিল পুলিশের অপর একটি টিম। উত্তরে শাহবাগ থানার দিকেও ছিল আরেকটি চেকপোস্ট। এর মাঝখানেই অভিজিৎ ও তার স্ত্রীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। চারপাশে পুলিশ থাকার পরও খুনিরা পালিয়ে যাওয়ায় সমালোচনা শুরু হয় পুলিশের বিরুদ্ধে। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের অবেহলা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্তৃপক্ষ। তিন দিন আগে সেই কমিটি ডিএমপি কমিশনারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের তদারকি ও সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এদিকে এই প্রতিবেদনের কথা শুনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিজিতের পিতা ড. অজয় রায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে সরাসরি কোনও পুলিশ সদস্যের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সুপারভিশন ও কো-অর্ডিনেশনের অভাব ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যেই জায়গায় অভিজিতের ওপর হামলা হয়েছিল, সেই স্থানটি কিছুটা অন্ধকার ছিল। আর পুলিশ যেখানে অবস্থান করছিল সেখান থেকে ঘটনাস্থল কিছুটা বাঁকা পথ। এছাড়া রাস্তায় গাড়ি ও প্রচুর লোকজনেরও উপস্থিতি ছিল। এ কারণে পুলিশ সদস্যদের ঘটনাটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ ছিল না।’
গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পাশে মিলন চত্বরের বিপরীতে নির্মম হামলার শিকার হন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় এবং তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারা যান অভিজিৎ। গুরুতর আহত রাফিদাকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যালে ও পরে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। তিন দিন পর উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নেয়া হয় তাকে। ঘটনার পরপরই চারপাশে পুলিশি বেষ্টনী থাকা সত্ত্বেও অভিজিৎ ও বন্যাকে কুপিয়ে দুর্বৃত্তদের নির্বিঘ্নে চলে যাওয়ায় পুলিশের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কিছুটা সুস্থ হয়ে রাফিদা আহমেদ বন্যাও অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি আর অভিজিৎ যখন নৃশংসভাবে আক্রান্ত হচ্ছি, স্থানীয় পুলিশ খুব কাছেই নিষ্ক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়েছিল।’ গত ১৪ই মার্চ  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে লেখক অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম। পুলিশের ‘নাকের ডগায়’ এ হত্যাকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয় মন্তব্য করে ‘দায়িত্বে গাফিলতির’ জন্য দায়ী পুলিশ সদস্যদের ব্যবস্থা নিতে বলেন তিনি। ওই অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হকও উপস্থিত ছিলেন।
এর ঠিক দুদিন পর রাজধানীর ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে পুলিশের আরও কঠোর সমালোচনা করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমান আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হক। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য পুলিশ মহাপরিদর্শকের সেদিনই পদত্যাগ করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে এফবিআইকে ডেকে আনার সমালোচনা করে খায়রুল হক বলেন, ‘১৫ গজ দূরে বেশ কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের কি উচিত ছিল না, ঘটনাস্থলে দ্রুত যাওয়া। তাদের কি উচিত ছিল না, পুলিশের গাড়ি ব্যবহার করে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। তাদের কি উচিত ছিল না, বন্যা আহমেদকে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।’ তিনি বলেন, তাহলে দেখেন, কতগুলো ব্যর্থতা আমরা দেখতে পাচ্ছি। নির্বিকারভাবে মীর মদনের মতো, মীর জাফরের মতো দাঁড়িয়ে (পুলিশ) আছে। একজন সাংবাদিক জীবন তাড়াতাড়ি একটি স্কুটারে নিয়ে গেছেন। পুলিশের গাড়িগুলো কি করছিল? এর জন্য কোন আইনের প্রয়োজন নেই। এটা একটা নর্ম, সংস্কৃতি। মানুষের প্রতি মানুষের ব্যবহার। তিনি বলেন, মানুষ মারা যায়, মৃত্যু যন্ত্রণায় চিৎকার করে তারপরও আমাদের আইন চুপ করে দাঁড়িয়ে, নিঃস্তব্ধ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মীর রেজাউল করিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যেও একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন ডিএমপি হেডকোয়ার্টারের উপকমিশনার (প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন) আক্তারুজ্জামান ও উপকমিশনার (অর্থ) মাসুদুর রহমান ভূঁইয়া। গত দীর্ঘ প্রায় এক মাস তদন্ত শেষে গত সপ্তাহের শেষ দিনে কমিটির পক্ষ থেকে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। কমিটির প্রধান মীর রেজাউল করিম বলেন, আমরা তদন্তের পর প্রতিবেদনটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছি। প্রতিবেদনে কি রয়েছে তা কর্তৃপক্ষ বলার অধিকার রাখে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে কমিটিসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কমিটির সদস্যরা ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা শাহবাগ থানা পুলিশ, নীলক্ষেত ফাঁড়ির পুলিশ সদস্য ও রমনা থানার একটি টহল টিমসহ অন্তত ৩০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্যদের ডিএমপি হেডকোয়ার্টারে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এছাড়া কয়েক দফা তারা ঘটনাস্থল ও পুলিশ সদস্যদের অবস্থানের জায়গাগুলো সরজমিন গিয়ে প্রত্যক্ষ করেন। ওই সূত্র জানায়, তারা তদন্ত করে দেখেছেন অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ সদস্যরা যেখানে ছিল তার দূরুত্ব ২২০ ফুট। অভিজিৎ খুন হওয়ার স্থানটি টিএসসির পুলিশের দায়িত্ব পালনের জায়গা থেকে কিছুটা পূর্ব দিকে বাঁকা হওয়ায় সরাসরি দেখার কোনও সুযোগ নেই। পুলিশ সদস্যরা সবাই ঘটনার পর বিষয়টি জানতে পারেন এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ঘটনার সময় মিলন চত্বরে ছিলেন নীলক্ষেত পুলিশ  ফাঁড়ির এসআই ওয়াহিদুজ্জামান, ঘটনাস্থল থেকে শাহবাগের দিকে যেতে এসআই হাফিজুল ও সোহরাওয়ার্দীর গেটে রমনা থানার এসআই মজিবুর রহমান ফোর্স নিয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে জানা গেছে।
যোগাযোগ করা হলে গতকাল রাতে ড. অজয় রায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুলিশ দায়িত্ব পালন করলে তো দায়িত্বে অবহেলা খুঁজে পাবে। পুলিশ তো তখন দায়িত্বই পালন করেনি। তারা মনে করেছে ছাত্রলীগ-যুবলীগের মধ্যে মারামারি হচ্ছে। এদিকে অভিজিৎকে কচুকাটা করছে। আরে বাবা, কারা মারামারি করছে তা তো কাছে গিয়ে দেখতে হবে। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলে তো হবে না।’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, ‘অভিজিৎকে চাপাতি দিয়ে কোপানোর পর মাটিতে উপুড় হয়ে পড়েছিল, তার স্ত্রী বন্যাও আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চিৎকার করেছে। পুলিশ তখন কি করেছে? কেন তারা এগিয়ে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়নি। একজন ফটো সাংবাদিকের (জীবন) বিবেকে বাঁধলো, আর পুলিশের বিবেকে বাঁধলো না?’ তিনি বলেন, ‘ছবিতে দেখা গেছে, পুলিশ সদস্যরা সেখানে শাড়িওয়ালার দোকানে দাঁড়িয়ে শাড়ি দেখছিল।’ অজয় রায় বলেন, ‘আমি আজ (রোববার) আইজিপির কাছে গিয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, কমিটি পুলিশের অবহেলা খতিয়ে দেখছে। আমি তাকে সরাসরি বলেছি, কমিটি কারও অবহেলা খুঁজে পাবে না। ঠিকই তারা কোনও অবহেলা খুঁজে পেলো না। এটা কি করে সম্ভব?’

টুনটুনি নিখোঁজ রহস্যময় চিঠি by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

রহস্যজনক এক চিঠি আরো একটুখানি রহস্যময় করে তুললো সিলেটের আলোচিত শিশু জয়ী ওরফে টুনটুনি নিখোঁজ কাণ্ডকে। ২০ মাস হলো ছোট্ট মেয়ে ‘টুনটুনি’র খোঁজ মিলছে না। হারিয়ে যাওয়ার সময় ওর বয়স ছিল ৪ বছর। এখন তার বয়স হওয়ার কথা ৬ বছর। তবে ২ বছর ধরে বাবা-মা’র চোখে ৪ বছরেই বন্দি আছে মেয়েটি। রহস্যময় চিঠিটি বলছে, টুনটুনি বাবা-মা’র চোখের আড়াল হয়ে বন্দি আছে ভারতে। মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটা থেকে তিনটার মাঝের কোন এক সময়। সিলেট সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর সিকন্দর আলী নগরীর কাজিরবাজারস্থ তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘সিকন্দর রেস্টুরেন্ট’-এর ক্যাশ কাউন্টারে বসা ছিলেন। কুরিয়ার সার্ভিসের এক লোক বাদামি রঙের মুখবন্ধ একটি খাম দিয়ে যায় তার কাছে। সিকন্দর আলী ভাবেন কোন অনুষ্ঠানের চিঠি হয়তো। দুপুরের ব্যস্ত সময়, চিঠি নিয়ে তাই আর মাথা ঘামান না সিকন্দর আলী। না দেখেই রেখে দেন। বাসায় নিয়ে এসে পড়ে জানতে পারেন চিঠিটি লিখেছেন এক ‘ভারতীয় নাগরিক’। চিঠিটিতেই এমন দাবি করা হয়। চিঠিটি পড়তে গিয়ে চমকে উঠেন সিকন্দর আলী। চিঠিটি তারই এলাকার এক ‘নিখোঁজ’ ঘটনা প্রসঙ্গে। ‘টুনটুনি’র নিখোঁজ ঘটনা শুধু তিনিই নন, জানে পুরো সিলেটই। শিশুটির নাম উল্লেখ না করলেও ‘ভারতীয় নাগরিকের’ লেখা ঐ চিঠিটিতে জানানো হয় টুনটুনিকে অপহরণ করা হয়েছে। সে এখন আছে ভারতেই। আর অপহরণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় শেখঘাটের বাসিন্দা শঙ্কর দাম ও অনিতা ভট্টাচার্যকে। তারা দুজনেই সন্দেহভাজন হিসেবে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। শঙ্কর জামিনে থাকলেও অনিতা এখনও জেলের ভেতরেই আছেন।
চিঠিটিতে উল্লেখ করা হয় শঙ্কর-অনিতাই টুনটুনিকে অর্থের বিনিময়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। তার মা-বাবার কাছ থেকে টাকা আদায় করে পরে তাকে ছাড়িয়ে নেয়া হবে- এমন শর্তেই টাকা নেয় তারা। চিঠির ভাষ্যমতে, এর লেখক শিশু পাচার চক্রের মূল হোতা এবং শঙ্কর-অনিতা তার বা তাদের সহযোগী। তবে পত্রলেখক নিজেকে কিন্তু মোটেও অপরাধী ভাবছেন না। তার ভাষায় যত দোষ সব শঙ্কর-অনিতারই। পরতে পরতে তাদেরই দোষী করার প্রয়াস দেখা গেছে চিঠিটিতে। এমনকি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে চিঠিতে শঙ্করের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ উত্থাপন করা হয়- শঙ্করকে মন্দ মানুষ প্রমাণের জন্য। ‘শঙ্কর দাস তার ভাইয়ের স্ত্রীর সোনা চুরি করেছে, ভাইয়ের পকেট থেকে টাকা চুরি করেছে, মামার প্রতিবেশীর বাসা থেকে পিতলের বাসন চুরি করেছে’। শঙ্করকে অভিযুক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এ প্রয়াস চিঠিটিকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে শঙ্কর-অনিতা তাদের কাছে আরো একটি ছেলে শিশুকে দিয়েছিলো, কিন্তু সে শিশুটি বুঝে পাওয়ার আগেই পালিয়ে যায়। চিঠিটিতে টুনটুনিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে কিনা, কিংবা টুনটুনি এখন কোথায় আছে সে সম্পর্কে পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি। শঙ্করকে দায়ী প্রমাণের চেষ্টা থাকলেও টুনটুনি যে তাদের কাছে এর কোন প্রমাণ উপস্থাপন করেনি পত্র লেখক। টুনটুনি কোথায় আছে সে ঠিকানা তো বলা হয়নি এমনকি ভারতের কোন রাজ্য বা শহরে আছে তাও বলা হয়নি।
ভারতীয় পরিচয়ে আসা চিঠিটিতে উল্লেখ করা হয় শঙ্কর টুনটুনিকে ফিরিয়ে না নেয়ায় পত্র লেখক তার দলবল নিয়ে সিলেট এসেছেন। কিন্তু এসময় টুনটুনি তাদের সঙ্গে ছিল কিনা তার উল্লেখ নেই পত্রে। পত্রে বলা হয়েছে, শিশুটিকে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতে শঙ্করের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে ভারত থেকে আসা দলটি। কিন্তু তারা টুনটুনির পরিবারের সঙ্গে কোন ধরনের যোগাযোগ করেনি। যদিও তাদের কাছে টুনটুনির বাবার মোবাইল ফোন নম্বরও আছে বলে পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিগ্যাল সাইজ (৮.৫্থ্থক্ম১৪্থ্থ) কাগজে কম্পিউটারে টাইপ করা গুরুচণ্ডালী (সাধু-চলতি ভাষার মিশ্রণ) দোষে দুষ্ট ৪৭ লাইনের চিঠিটিতে কোন নাম-ঠিকানা বা তারিখ উল্লেখ না থাকলেও প্রেরক হিসেবে খামের উপর একটি অসম্পূর্ণ ঠিকানা লেখা ছিল ‘শ্রী নিখিল দাস, রাজারগাঁও, অদ্বৈতবাড়ি সুনামগঞ্জ’। তবে খুব সম্ভব এটি কারো ব্যক্তিগত ঠিকানা নয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় রাজারগাঁও নামের দুয়েকটি গ্রামের অস্তিত্ব রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নে। সুনামগঞ্জে রাজারগাঁও নামে আরো একটি গ্রামের খোঁজ পাওয়া যায় তাহিরপুর উপজেলায়।
২০ মাসেও চোখের জল, বুকের ক্ষত এতোটুকুও কমেনি টুনটুনির মায়ের। শনিবার সন্ধ্যায় তার সঙ্গে আলাপকালে চিঠির প্রসঙ্গ তুলতেই কান্না আর থামাতে পারছিলেন না। বললেন চিঠি দিয়ে আমি কি করবো আমার টুনটুনি তো ফিরে আসেনি। তিনি বলেন, আজ বাসন্তী পূজা। সব বাচ্চারা আনন্দ করছে, শুধু আমার টুনটুনি। কান্না থামিয়ে আর কথা বলতে পারেন না শর্বানী দেব।
কোতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) মোশাররফ হোসেনের হাতে রয়েছে এ চিঠি। তিনি বলছেন, চিঠিটি ভুয়া হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। তবুও আমরা চিঠিটিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি- কে এই নিখিল দাস। শিশুটি আসলেই ভারতে আছে কিনা।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ১৪ই জুলাই সিলেট নগরীর শেখঘাট ভাঙাটিকর এলাকা থেকে হারিয়ে যায় স্কুলশিক্ষক সন্তোষ কুমার দেব ও সিলেট জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার অফিস সহকারী শর্বানী দেব তুলির একমাত্র মেয়ে স্নিগ্ধা দেব জয়ী। মা-বাবা যাকে আদর করে ডাকতেন টুনটুনি নামে।

নাদিয়ার সাহসকে সম্মান দিল যুক্তরাষ্ট্র by মানসুরা হোসাইন

আইডব্লিউওসি) পুরস্কার হাতে নাদিয়া শারমিন
হাত পেতে ক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু নিতে হয়নি বাংলাদেশের সাহসী সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনকে, বরং তারাই নাদিয়াকে খুঁজে বের করে সম্মান জানিয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের সাহসী এই সাংবাদিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন। বিশ্বকে সগর্বে জানিয়েছেন এ দেশের নারীদের সাহসের কথা। জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নারীরা পিছিয়ে নেই। তাঁরা কারও চেয়ে কম নন। সেই সাহসকে সম্মান না দিয়ে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ৭ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্তর্জাতিক নারী সাহসিকতার (ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড-আইডব্লিউওসি) পুরস্কার অর্জন করেন নাদিয়া শারমিন। যে নারীরা তাঁদের সাহসিকতা দিয়ে সমাজ বদলাতে অবদান রাখেন, তাঁদেরই এই সম্মান জানায় আইডব্লিউওসি। ২০০৭ সাল থেকে এ পুরস্কারটি দেওয়া হচ্ছে। এ বছর বিভিন্ন দেশের ১০ জন নারী এই পুরস্কার পেয়েছেন। গ্লোবাল উইমেন ইস্যুজের অ্যাম্বাসেডর ক্যাথরিন এম রাসেল তাঁদের মধ্যে নাদিয়াকেই ‘প্রাণশক্তি’ হিসেবে মিশেল ওবামার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পুরস্কারপ্রাপ্ত ১০ নারীর পক্ষে কথা বলেন নাদিয়া। এমন এক সাংবাদিকের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গর্বিত হয়েছেন ক্ষমতাধর নারী মার্কিন ফাস্টলেডি মিশেল ওবামা। এ কথা অকপটেই নাদিয়াকে বলেছেন তিনি। আর নাদিয়ার ভালো লাগা তখন আকাশ ছুঁয়েছে।
কথা ছিল ৬ মার্চ মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা পুরস্কার দেবেন। প্রচণ্ড তুষারপাতের কারণে অনুষ্ঠান এক দিন পিছিয়ে দিতে হয়। তারপর হোয়াইট হাউসেই পুরস্কারপ্রাপ্তদের সঙ্গে মিশেল ওবামা দেখা করেন। সবার কথা শোনেন। টুইট বার্তায় তিনি এই নারীদের কথা লেখেন। লেখেন নাদিয়ার কথাও।
নাদিয়ার কাছে এটি কেবল পুরস্কার নয়, এটি তাঁর দেশের সম্মান। নিজের দেশকেই সগর্বে তিনি তুলে ধরেছেন বিশ্বের কাছে। গত রোববার প্রথম আলো কার্যালয়ে বসে নাদিয়া বলেন, ‘বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ নাম মানেই বন্যা-দুর্যোগের সঙ্গে তুলনা। এটা কি ভারত? পাকিস্তানের অংশ? এ ধরনের প্রশ্নও শুনতে হয়েছে। কিন্তু এবার যাঁরা এই প্রশ্নগুলো করেছেন, তাঁদের সামনে উত্তর দেওয়া সহজ হয়েছে। বাংলাদেশের একজন নারী প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠিত করতে জানেন। আমার পরে যে নারীরা সংগ্রাম করবেন, তাঁরাও জানবেন যে সংগ্রাম চালিয়ে গেলে তার প্রতিদান হিসেবে ভালো কিছু পাওয়া যায়। তাই লড়াই থামালে চলবে না। প্রথমে একা লড়াই শুরু করলেও পরে পাশে পাওয়া যায় অনেককে।
নাদিয়া বলেন, ‘একা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। এখন আমি যোদ্ধা নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছি। পুরস্কারটা পাওয়ার পর দায়িত্ববোধ বেড়ে গেছে। স্বপ্নের বিস্তৃতিটা বেড়ে গেছে। এখন আর একা পথ চললে হবে না। সম্মিলিতভাবে সামনে এগোতে হবে।’
২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল দেশে আলোড়ন তুলেছিলেন নাদিয়া। সেদিন নাদিয়া অফিসের অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েছিলেন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে। অফিস থেকে কিছু ফুটেজ নিতে বলা হয়েছিল। এ ছাড়া সার্বিক দিক খেয়াল রাখতে হবে। কাজ করার একপর্যায়ে হেফাজতে ইসলামের একজন প্রশ্ন তোলেন, নারী হয়ে তিনি সমাবেশে কী করছেন। তারপর আস্তে আস্তে জড়ো হন অনেকে। তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, তিনি নারী হিসেবে সমাবেশে যাননি, গেছেন সাংবাদিক হিসেবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। কিছু বোঝার আগেই ৫০-৬০ জনের দলটি একুশে টেলিভিশনের প্রতিবেদক নাদিয়া শারমিনের ওপর হামলা করে। মাটিতে ফেলে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে তাঁকে। কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু, গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যদের সহায়তায় নাদিয়া প্রাণে বেঁচে যান।
পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহসী নারীরা । মাঝে লাল-সবুজের সাজে বাংলাদেশের নাদিয়া
ওই ঘটনার জের টানতে হয়েছে অনেক দিন। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় থাকতে হয়েছে নাদিয়াকে। দুটো অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। আর্থিক সংগতি না থাকায় দেশের বাইরে গিয়ে আরেকটি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি। এই দুঃসময়ে একুশে টেলিভিশন থেকে তাঁর চাকরিটাও চলে যায়। কিন্তু নাদিয়া থেমে যাননি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যোগ দেন একাত্তর টেলিভিশনে অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদক হিসেবে।
দুঃসময়ের কথা মনে করে নাদিয়া বলেন, যাঁরা একসময় কাজে বাধা দিয়েছেন, ভেবেছেন আমি কাজ করতে পারি না তাঁরাই এখন আমাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। তাঁরা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বাধ্য হয়েছেন।
নাদিয়া বলেন, ‘হেফাজতের ঘটনার পর অনেকবার মনে হয়েছে আমার ক্যারিয়ারটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড সাপোর্ট আমাকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। ঘুরে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টার ফলাফল হচ্ছে, আমি আবার মিডিয়ায় ফিরে এসেছি। হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য চ্যালেঞ্জিং অ্যাসাইনমেন্ট করছি।’
আসলে সাংবাদিকতা ছিল নাদিয়ার নেশা। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল সাংবাদিক হবেন। স্বপ্নের বীজ ছিল পরিবারেই। নাদিয়ার নানি সৈয়দা সুফিয়া খাতুন চল্লিশের দশকে সাহিত্যরত্ন পুরস্কার পান। নানির ছোট বোন হাসিনা আশরাফ দৈনিক বাংলার সাংবাদিক ছিলেন। তাঁর মুখ থেকে সাংবাদিকতার গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন নাদিয়া। নাদিয়ার নানা মারা যান অনেক আগে। নানি সংগ্রাম করে পাঁচ ছেলেমেয়েকে বড় করেছেন। নাদিয়ার মা সৈয়দা তৈয়বা বেগম ছিলেন বড় মেয়ে। বাস্তবতার চাপে অনেক স্বপ্নই পূরণ হয়নি তাঁর। মায়ের সেসব স্বপ্নকেই সফল করে তুলছেন নাদিয়া ও তাঁর বোন।
নাদিয়ার এই অর্জন বাবা আবু তৈয়ব আজিজুর রহমান দেখে যেতে পারেননি। গত বছর মারা গেছেন। ছোট নানিও দেখে যেতে পারেননি।
নাদিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটে। তবে রাজধানীতেই কেটেছে পুরো সময়।
পুরস্কার পাওয়ার পর কাজের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে নাদিয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটর লিডারশিপ প্রোগ্রামের আওতায় পুরস্কারপ্রাপ্ত ১০ নারী সে দেশের নারী ও মানবাধিকারকর্মী এবং গণমাধ্যমকর্মী ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেটওয়ার্কিং করতে পারবেন। নাদিয়া বলেন, এ সুযোগটি কাজ করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।