Friday, June 19, 2015

শান্তিরক্ষা মিশন ঢেলে সাজানোর পরামর্শ -আন্তর্জাতিক প্যানেলের প্রতিবেদন

সংবাদ সম্মেলনে হোসে রামোস-হোর্তা ও আমীরা হক
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক তৎপরতা’য় যুক্ত না করার পরামর্শ দিয়েছে একটি আন্তর্জাতিক প্যানেল। মিশনের সদস্যরা ‘লেনদেনের যৌনাচারে’ যুক্ত—এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া এক প্রতিবেদনে প্যানেলটি আরও কিছু পরামর্শ হাজির করেছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘের নিজস্ব এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সংঘাতময় দেশগুলোতে মোতায়েন অনেক শান্তিরক্ষী খাবার, নগদ টাকা, অলংকার, মুঠোফোনসহ বিভিন্ন জিনিসের বিনিময়ে দারিদ্র্যপীড়িত নারী ও মেয়েশিশুদের সঙ্গে নিয়মিত যৌনাচার করছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের গঠন করা প্যানেলটির প্রতিবেদনে সব শান্তিরক্ষা মিশনকে অধিকতর লিঙ্গ-সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মিশনের সদস্যরা যাতে যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনায় লিপ্ত না হয়, সে উদ্দেশ্যে একাধিক পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এমন কার্যকলাপে অভিযুক্ত সেনাদের স্থানীয় আদালতে সোপর্দ করার বিরোধিতাও করা হয়েছে। বর্তমানে অভিযুক্ত সেনাদের স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক আইন থেকে ‘অব্যাহতি’ দিয়ে, তাদের দেশের জাতীয় আইনে বিচারের নিয়ম রয়েছে। এই নিয়মে পরিবর্তন আনলে শান্তিরক্ষা মিশন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে বলে মনে করে প্যানেল।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সুচারুভাবে সমন্বয় করার স্বার্থে জাতিসংঘে একটি ‘অতিরিক্ত উপমহাসচিব’ পদ সৃষ্টিরও প্রস্তাব করেছে এই প্যানেল। বর্তমানে একজন উপমহাসচিব রয়েছেন, তিনি প্রশাসনিক বিষয়ে নেতৃত্ব দেওয়া ছাড়াও উন্নয়নসংক্রান্ত কাজগুলোতে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে ১৫ সদস্যের ওই আন্তর্জাতিক প্যানেল। এ সময় প্যানেলের সভাপতি তিমোর-লেসতের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হোসে রামোস-হোর্তা এবং বর্তমান সহসভাপতি বাংলাদেশের আমীরা হক উপস্থিত ছিলেন।
মহাসচিব বান কি মুন চলতি ও ভবিষ্যৎ শান্তিরক্ষা মিশনের ম্যান্ডেট পূর্বাপর সমীক্ষার লক্ষ্যে গত বছরের অক্টোবরে এই প্যানেল গঠন করেন। রামোস-হোর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন কর্মশালা, রাজনৈতিক শলাপরামর্শ ও সরেজমিন তদন্তের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এই সমীক্ষার সূত্রে তাঁরা ঢাকা সফর করেছেন বলেও জানান তিনি।
১৯৪৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি রক্ষার্থে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় শান্তিরক্ষা মিশন। গত ছয় দশকে মিশনের কার্যক্রম বহুলাংশে বদলে গেছে। নতুন বাস্তবতার আলোকে শান্তিরক্ষা মিশনের ম্যান্ডেট কী হওয়া উচিত, তাতে আলোকপাত করে প্যানেলের প্রতিবেদনটিতে চারটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রথমত, সামরিক উপায়ে নয়, শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই টেকসই শান্তি অর্জন সম্ভব—জাতিসংঘের সব শান্তি কার্যক্রমে এই নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। নিরাপত্তা পরিষদের উচিত হবে সমস্যা সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই তাতে হস্তক্ষেপ করা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, সব শান্তি মিশন এক রকম নয়, এটি মাথায় রেখে প্রয়োজনের ভিত্তিতে শান্তি মিশনের ম্যান্ডেট নির্ধারণ করা। তৃতীয়ত, অধিকতর বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, প্রতিটি শান্তি মিশন স্থানীয় জনগণের চাহিদা মাথায় রেখে গঠন করা।

পদচারী–সেতুগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে না by সামছুর রহমান

রাজধানীর পান্থপথে এই পদচারী–সেতু সারা দিন প্রায় এমনই
ফাঁকা পড়ে থাকে। ছবিটি গতকাল দুপুরে তোলা l প্রথম আলো
স্কুলফেরত দুই সন্তান রোহান ও রিহানকে নিয়ে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে কলেজগেট বাসস্ট্যান্ডের এক পারে দাঁড়িয়ে ছিলেন রেহানা আকতার। সড়কে যানবাহনের চাপ একটু কমতেই ইতিউতি দেখে অপর পারে যেতে দৌড় দিলেন। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত সড়ক পার হলেও তাঁদের ঠিক মাথার ওপরেই ছিল পদচারী-সেতু (ওভারব্রিজ)।
পদচারী-সেতু ব্যবহার না করে এভাবে রাস্তা পার হলেন কেন জানতে চাইলে রেহানা আকতার কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বলেন, ‘দুই বাচ্চাকে নিয়ে ওভারব্রিজে উঠতে-নামতে কষ্ট। আর ওভারব্রিজে উঠলে সময়ও বেশি লাগে।’
রেহানা আকতারের মতো অনেকেই পদচারী-সেতু ব্যবহার না করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তার এপার-ওপার যাচ্ছেন। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত সড়কে তৈরি করা পদচারী-সেতুগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকছে। পথচারীরা যানবাহনের সামনে দিয়ে বিপজ্জনকভাবে রাস্তা পার হওয়ায় প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
পথচারীদের উদাসীনতা থাকলেও পদচারী-সেতুগুলো কতটা পথচারীবান্ধব এবং চলাচল উপযোগী, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। পদচারী-সেতুর আশপাশের ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অস্থায়ী দোকান, সেতুতে ভবঘুরেদের আস্তানা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় নিরাপত্তার অভাবের মতো কারণে পথচারীরা এগুলো ব্যবহারে উৎসাহী হচ্ছেন না।
পদচারী-সেতুগুলো দেখভালের দায়িত্ব ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল (টিইসি) বিভাগের। টিইসি বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বললেন, ‘আমরা তো চাই জনগণ এগুলোতে উঠুক। তারা না উঠলে কী করা যাবে।’ পদচারী-সেতুগুলোর বিভিন্ন সমস্যার কথা জানানো হলে তিনি বলেন, ‘এসব আমার জানা ছিল না।’ তিনি পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করাসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
গত বুধবার রাতে ও গতকাল বৃহস্পতিবার মিরপুর, ধানমন্ডি ও পান্থপথ এলাকার আটটি পদচারী-সেতু ঘুরে দেখা যায়, পথচারীরা এসব পদচারী-সেতু ব্যবহার না করে নিচ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। কয়েকটি সেতুর সিঁড়ির সামনে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী চা-পানের দোকান, সিঁড়ির নিচে লোকজন মূত্রত্যাগ করায় ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। সেতুতে ভবঘুরেদের শুয়ে থাকতে দেখা যায়।
মিরপুর বাঙলা কলেজের সামনের ব্যস্ত সড়কটি পার হতে গিয়ে একাধিকবার দুর্ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে কলেজের মূল ফটক থেকে কয়েক মিটার দূরে নির্মাণ করা হয় পদচারী-সেতু। কিন্তু শিক্ষার্থী-সাধারণ পথচারী কেউই পদচারী-সেতুটি ব্যবহার করেন না।
গত বুধবার রাতে গিয়ে দেখা যায়, পদচারী-সেতুর আশপাশের এলাকায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। পদচারী-সেতুর সিঁড়ির সামনের অংশ মানুষের মূত্রে ভরা। সেতুর সিঁড়িতে বসে সিগারেট ফুঁকছিলেন যুবক বয়সী কয়েকজন।
নিচে রাস্তা পার হওয়ার জন্য অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলেন দুজন নারী পোশাকশ্রমিক। পদচারী-সেতু ব্যবহার করছেন না কেন—এমন প্রশ্ন শুনে যেন কিছুটা অবাক হলেন। তাঁদের একজন আকলিমা বললেন, ‘কেমন অন্ধকার দেখছেন। কয়েক দিন আগে উঠছিলাম। তিন-চারটা পোলাপাইন মিইল্যা যা-তা কইছে। তাই এহন আর সাহস পাই না।’ পান্থপথে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের ৫০ গজ দূরে নির্মাণ করা হয়েছে পদচারী-সেতু। কিন্তু গতকাল দুপুরে প্রায় ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে মাত্র ১০ জন পথচারীকে পদচারী-সেতু ব্যবহার করতে দেখা যায়। অথচ এ সময়ের মধ্যে শ খানেক পথচারী বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের সামনে বিপজ্জনকভাবে যানবাহনের ফাঁকফোকর দিয়ে রাস্তা পার হন।

পারলে জুতা মারো, চামড়া তুলে নাও -কথিত বিক্ষোভকারীদের বললেন আইভি

নারায়ণগঞ্জ নগর ভবনের বাইরে মেয়রবিরোধীদের ঘেরাও
কর্মসূচি চলাকালে হঠাৎ বিক্ষোভকারীদের সামনে হাজির
হন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী l ছবি: প্রথম আলো
নারায়ণগঞ্জ নগর ভবনের বাইরে চলছিল মেয়রবিরোধীদের ঘেরাও কর্মসূচি। ঘেরাওকারীরা স্লোগান দিচ্ছে, ‘আইভীর দুই গালে, জুতা মারো তালে তালে’, ‘আইভীর চামড়া, তুলে নেব আমরা’। হঠাৎ রাস্তায় নেমে কথিত বিক্ষোভকারীদের সামনে হাজির হলেন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী নিজেই। বললেন, ‘আমি তোমাদের সামনে এসেছি, এখন সৎসাহস থাকলে পারলে জুতা মারো, চামড়া তুলে নাও।’
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় নারায়ণগঞ্জ নগর ভবন পরিদর্শন করতে গিয়ে সেখানে অবস্থান করছিলেন মার্কিন দূতাবাস ও ব্রিটিশ সরকারের উন্নয়ন সংস্থা ডিএফআইডির প্রতিনিধিরা। এর কিছু আগে থেকে সাংসদ শামীম ওসমানের অনুগতরা নগর ভবন ঘেরাও কর্মসূচি শুরু করেন। ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ট্রাকে-বাসে করে কর্মসূচিতে লোক আনা হয়।
আইভীর কথা শুনে অবরোধে নেতৃত্ব দেওয়া নেতারা পিছু হটে যান। একপর্যায়ে তল্লা এলাকার যুবলীগের নেতা জানে আলম বিপ্লব মেয়র আইভীকে বলেন, ‘আপা, এটা তো আমাদের স্লোগানের ভাষা।’ বিদেশি দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা বেলা ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত নগর ভবনে ছিলেন। সাংসদের অনুগতরা ততক্ষণ ঘেরাও কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন।
নগর দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে অর্থায়ন বিষয়ে ডিএফআইডির প্রতিনিধিদল নগর ভবনে আসে। আগে থেকেই শামীম ওসমানের অনুগতরা ভবনের প্রধান প্রবেশপথ অবরোধ করে রাখে। ভবনের সামনের সড়কের দুপাশে ইংরেজিতে লেখা ব্যানার ঝোলানো হয়। ‘নারায়ণগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর নামে লেখা ব্যানারের বক্তব্য ছিল: ‘আমরা আইভীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত চাই।’
ঘেরাওকারীরা সেখানে সমাবেশ করেন। এতে বক্তব্য দেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা, জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ প্রমুখ।
পরে মেয়র আইভী তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বন্ধ করতে একজন এমপির অনুগতরা সুপরিকল্পিতভাবে বিদেশি দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের পরিদর্শনকালে ইংরেজিতে লেখা ব্যানার নিয়ে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে। নারী বলেই তারা আমাকে হেয় করার জন্য এ ধরনের পথ বেছে নিয়েছে। আমি যখন সাহস করে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন তারা কুরুচিপূর্ণ স্লোগান বন্ধ করে চুপ হয়ে যায়।’
খোকন সাহা বলেন, ‘উন্নয়নের নামে আইভী সিটি করপোরেশনের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। কর না কমালে উন্নয়নবঞ্চিত মানুষ আগামী দিনে নগর ভবন ঘেরাও করবে এবং মেয়রকে বের হতে দেবে না।’
নগর ভবন ঘেরাও কর্মসূচির সময় সদর মডেল থানার ওসি আবদুল মালেকের নেতৃত্বে পুলিশ মোতায়েন থাকলেও তারা কোনো বাধা দেয়নি।

এমপিপুত্র রনি কাশিমপুর কারাগারে

ঢাকায় জোড়া খুনের মামলায় গ্রেফতার সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনিকে ঢাকা থেকে কাশিমপুর কারাগারে নেয়া হয়েছে। কাশিমপুরের জেলার মো. জান্নাতুল ফরহাদ জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর রনিকে হাই সিকিউরিটি কারাগার -২ এ আনা হয়।
গত ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে গুলিতে এক অটো ও এক রিকশাচালক নিহত হন।
এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ৩১ মে রনিকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে চার দিনের রিমান্ড শেষে গত ১৩ মে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত।
এদিকে সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনির পিস্তলের গুলিতেই নিউ ইস্কাটনে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সিআইডির ব্যালাস্টিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভিকটিমদের গায়ে পাওয়া গুলি ও রনির পিস্তল একই ক্যালিবারের। রনির পিস্তলের গুলিতেই জোড়া খুন হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা ব্যালাস্টিক পরীক্ষা করার জন্যে রনির পিস্তল এবং ভিকটিমের শরীরে পাওয়া গুলি সিইসিডিতে পাঠিয়েছেলাম। বৃহস্পতিবার আমাদের কাছে যে প্রতিবেদন এসেছে তাতে হু্বহু মিল পাওয়ায় আমরা নিশ্চিত হয়েছি- এ পিস্তলের গুলিতেই দুই জন নিহত হয়েছেন।
গত ১৩ এপ্রিল রাতে নিউ ইস্কাটনে একটি গাড়ি থেকে ছোড়া গুলিতে এক অটোরিকশাচালক এবং এক রিকশাচালক মারা যান। যানজটের মধ্যে আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলে রনি ওই গাড়ি থেকে গুলি চালান বলে অভিযোগ ওঠে। সেদিন ওই গাড়িতে থাকা রনির বন্ধু কামাল মাহমুদও বুধবার ঢাকার হাকিম আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, লাইসেন্স করা পিস্তল থেকে সাংসদপুত্রই গুলি ছুড়েছিলেন।
কালো রঙের যে প্রাডো গাড়ি থেকে গুলি ছোড়া হয়েছিল, তা সংসদ সদস্য পিনু খানের বলে গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ। গাড়িটিও ইতোমধ্যে জব্দ করেছে পুলিশ।
ছেলের এই ঘটনায় বিব্রত এবং সমালোচনার মুখে আছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য পিনু খান। তার বিরুদ্ধে ছেলেকে বাঁচাতে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। যদিও তিনি তা অস্বীকার করে বলেছেন, আমি ন্যায়বিচার চাই।

ভারতীয় মিডিয়া : ভারতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ‘বদলা’ বাংলাদেশের

মিরপুরে বৃহস্পতিবারের জয়কে "ভারতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় 'বদলা' বাংলাদেশের' হিসেবে অভিহিত করেছে ভারতীয় মিডিয়া। কলকাতাভিত্তিক একটি অনলাইন পোর্টাল ঠিক এই শিরোনামই করেছে। এখানে প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো।
একেই বলে এলেন, দেখলেন, জয় করলেন৷মুস্তাফিজুর রহমানের ক্ষেত্রে অন্তত কথাটা ১০০ শতাংশ কাটে৷ক্রিকেট কেরিয়ারের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে নেমেই নিজের ক্যারিসমা দিয়ে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মন জয় করে নিতে সফল বাংলাদেশি বোলার৷ভারতের পাঁচটি উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশের জয়ের অন্যতম কাণ্ডারী হয়ে উঠলেন ১৯ বর্ষীয় রহমান৷ দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে পাঁচ উইকেট নেওয়ার নজির গড়ে এদিন ম্যাচের সেরাও হলেন এই পেসার৷ বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচে ভারতকে ৭৯ রানে হারিয়ে ওয়ানডে অভিযান শুরু করল বাংলাদেশ৷ টিম ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে এ যেন এক অচেনা বাংলাদেশ৷চলতি বছর বিশ্বকাপে প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল তারা৷ ধোনিবাহিনীর কাছে হেরেই বিদায় নিতে হয়েছিল মোরতাজাদের৷ সেই হারের বদলা যেন এদিন সুদে-আসলে উসুল করে নিলেন তাঁরা৷ভারতের বিপক্ষে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়৷ঘরের মাটিতে পাকিস্তানকে বাংলাওয়াশ করেছিলেন বেঙ্গল টাইগাররা৷ওয়ানডে-তে সেই ছন্দই বজায় রাখতে সফল বাংলাদেশ৷
১৮ জুন দিনটা বাংলাদেশের কাছে ‘লাকি ডে’৷ ২০০৫ সালের এই দিনেই কার্ডিফে বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে তাক লাগিয়েছিলেন বেঙ্গল টাইগাররা৷ এবারের ১৮ জুন হল ভারত বধ৷ সেই সঙ্গে আইসিসি ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে সাত নম্বর জায়গা নিশ্চিত করল তারা৷।
টস জিতে শুরু থেকেই ভালো খেলছিলেন দুই বাংলাদেশি ওপেনার সৌম্য সরকার (৫৪) ও তামিম ইকবাল (৬০)৷মাত্র ১৩.১ বলে ১০০ রান ছুঁয়ে ফেলে বাংলাদেশ৷ দু’জনে ১০২ রানের ইনিংস খেলে দলকে শক্ত মাটি দিয়ে যান৷ ব্যাট হাতে সফল শাকিব-আল-হাসান (৫২), সাব্বির রহমানও (৪১)৷১৫.৪ বলে এক উইকেটে ১১৯ রান থাকাকালীন বৃষ্টি নামে৷ বেশ কিছুক্ষণের জন্য খেলা বন্ধও হয়ে যায়৷ তবে তার প্রভাব ওভারের ওপর পড়েনি৷৪৯.৪ ওভারে সবকটি উইকেট হারিয়ে ৩০৭ রান তোলে বাংলাদেশ৷রবিচন্দন অশ্বিন ৩টি এবং ভুবনেশ্বর কুমার ও উমেশ যাদব ২টি করে উইকেট তুলে নেন৷
পাহাড় প্রমাণ রান তাড়া করতে নেমে ভারতের শুরুটা ভালো করলেও ছন্দপতন ঘটে ৯৫ রানে৷পরপর দু’ওভারে মুশফিকুর রহিম দুটো ক্যাচ ফেলে চিন্তা বাংলাদেশের বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে পরপর দুই ওভারে শিখর ধাওয়ান (৩০) আর বিরাট কোহলিকে (১) ফিরিয়ে জোড়া আঘাত হানেন তাসকিন৷ এক বছর আগে ভারতের বিপক্ষে অভিষেকে ৫ উইকেট পেয়েও সেবার জয়টা হাতছাড়া হয়েছিল৷রোহিত শর্মার ৬৩ রান এদিন কাজে এল না৷ মুস্তাফিজুর জোড়া আঘাত হানলে ভারতের স্কোর হয়ে যায় ৪ উইকেটে ১১৫। ২০ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারিয়ে ভারত তখন ধুঁকছে। রায়না-জাদেজার ৬০ রানের পার্টনারশিপে ভর করে ফের আশার আলো দেখতে শুরু করে ভারতীয় সমর্থকরা৷তবে রায়না (৪০) ও জাদেজা (৩২) প্যাভিলিয়নে ভারতের হার ফিরতেই এক প্রকার নিশ্চিত হয়ে যায়৷তাসকিন আহমেদ ও শাকিব দু’টি করে উইকেট নেন৷ বৃহস্পতিবারের পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ বার্তা দিয়ে গেল, তাদের হারাতে গেলে ভারতকে ব্যাটে ও বলে আরও খাটতে হবে৷ লজ্জাজনক হার মাথায় নিয়েই হোটেলে ফিরলেন ধোনিরা৷

যুক্তরাষ্ট্রে গির্জায় হামলাকারী গ্রেফতার

যুক্তরাষ্ট্রে সাউথ ক্যারোলাইনার চারলেসটনে গির্জায় হামলা করে নয়জনকে হত্যাকারী সন্দেহভাজন শেতাঙ্গ যুবক গ্রেফতার হয়েছেন।
আফ্রিকান-আমেরিকান কৃষ্ণাদের প্রতিষ্ঠিত এই গির্জা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রাচীন গির্জার মধ্যে একটি। পুলিশ বলছে, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে গির্জায় বন্দুক হামলা চালিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়েছে।
চারলেসটন পুলিশ জানিয়েছে, সাউথ ক্যারোলাইনার লেক্সিংটনের অধিবাসী ডিলান রুফকে নর্থ ক্যারোলাইনার সেলবি ট্রাফিক পয়েন্ট থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
চারলেসটনের গির্জায় বাইবেল নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় এক ঘণ্টা বসে ছিলেন ডিলান রুফ। এরপর তিনি বন্দুক নিয়ে সভায় উপস্থিত ব্যক্তিদের ওপর ওপেন ফারার শুরু করেন।
ডিলান রুফের (২১) হামলায় ছয়জন পুরুষ ও তিনজন নারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে চার্চের প্রধান যাজক রয়েছেন। এই ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘আমি ও আমার স্ত্রী এমানুয়েল এএমই গির্জায় হামলায় নিহত কয়েকজনকে চিনতাম।’ ওবামা বলেন, চারলেসটনের ইতিহাসে এই গির্জা একটি পবিত্র স্থান। আশা করি সেখানকার মানুষ এই বিদ্বেষের বিরুদ্ধে জেগে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক মালিকদের উদ্দেশে ওবামা বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে আমরা অগ্রগামী অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করতে পারি, যেখানে গির্জায় এ ধরনের হামলা হয় না।’
এ দিকে ইরানের সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, এই হামলায় সাউথ ক্যারোলাইনা রাজ্যের কৃষ্ণাঙ্গ সিনেটর ক্লিমেনটা পিঙ্কনি নিহত হয়েছেন। তিনি গির্জার প্রধান যাজক ছিলেন।
সূত্র : বিবিসি

এ কী করলেন ধোনি!

উইকেট পাওয়ার পর মুস্তাফিজকে ঘিরে সতীর্থদের উল্লাস।
এই আনন্দ বুকে পুষে শরীরে ব্যথা নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন
উদীয়মান এই পেসার। ছবি: শামসুল হক
নিজের আগের দুই ওভারে দুজনকে ফিরিয়েছেন। এর মধ্যে ওয়ানডের সর্বোচ্চ ইনিংসের রানের মালিককে দিয়ে খুলেছেন উইকেটের খাতা। আজই ওয়ানডেতে অভিষিক্ত মুস্তাফিজুর রহমানকে শেষ পর্যন্ত খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠ ছাড়তে হলো। নিজের সপ্তম আর ইনিংসের ২৫তম ওভারটি শেষই করতে পারেননি। উইকেটে মহেন্দ্র সিং ধোনির সঙ্গে ধাক্কা লেগে শেষ পর্যন্ত ড্রেসিংরুমে ফিরেছেন। আবার মাঠে ফিরতে পারবেন কিনা, এই প্রতিবেদন লেখার সময় বলার উপায় ছিল না।
ক্রিকেটের আইন বলবে ধোনি অন্যায় কিছু করেননি। তিনি তাঁর পথ ধরেই বলটা ঠেলেই সিঙ্গেল নেওয়ার জন্য ছুটেছেন। বরং মুস্তাফিজই ধোনির দৌড়ের পথের ওপর এসে পড়েন। কিন্তু আইনের ভাষায় সব লেখা থাকে না। আইনের ভাষাই শেষ কথা নয়। ধোনি চাইলে মুস্তাফিজের সঙ্গে ধাক্কাটা এড়িয়েও যেতে পারতেন। বরং রিপ্লে দেখে মনে হয়েছে, ভারতীয় অধিনায়ক যেন ক্ষণিকের জন্য মেজাজ হারিয়ে ইচ্ছে করেই ধাক্কাটা মেরেছেন।
পলকা শরীর। এখনো বয়স ২০ বছরও হয়নি। ওয়ানডে খেলতে নেমেছেন আজই প্রথম। সেই মুস্তাফিজ ধোনির মতো পেটানো শরীরের ধাক্কা সামলে উঠতে পারবেন কেন? এর আগে আন্তর্জাতিক ম্যাচই খেলেছেন একটি। সেটিও টি-টোয়েন্টি। ১১ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা ভারতীয় অধিনায়ক কি পারতেন না সংঘর্ষটা এড়াতে?
বলের দিকে চোখ ছিল মুস্তাফিজের। ধোনিরও। কিন্তু বলটা মি​ড অফের দিকে গিয়েছিল বলে মুস্তাফিজ ঘুরে গিয়েছিলেন। পেছন থেকে কে আসছে দেখার উপায় ছিল না তাঁর। কিন্তু ধোনি স্ট্রাইকিং প্রান্ত থেকে আস​ছিলেন। প্রথম দিকে চোখে না পড়লেও শেষ মুহূর্তে ঠিকই মুস্তাফিজকে দেখতে পান। আর সেই সময়ই সরে যাওয়ার বদলে যেন ইচ্ছে করেই ধাক্কা মেরে মুস্তাফিজকে সরিয়ে দেন। এর পর আম্পায়ারের কাছে অভিযোগও করেন।
আইনত ধোনি ঠিক আছেন। কিন্তু ভারতীয় অধিনায়কের যে ভাবমূর্তি, এর সঙ্গে এটি যেন বড্ড বেমানান। এমনিতে ২০ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারিয়ে ভারত ধুঁকছিল। ভীষণ চাপের মুখে পড়ে গিয়েছিল। হয়তো সেই চাপেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আজ থেকে বহু দিন পরও যদি এই ঘটনার ফুটেজ দেখেন, ধোনি নিশ্চয়ই অনুতপ্ত হবেন। ভারত অধিনায়ক অবশ্য নিজেও এই ঘটনার পর বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি। সাকিবের বলে মুশফিকের দুর্দান্ত ক্যাচ হয়ে ফিরেছেন।  কিন্তু এখনো মাঠে ফেরা হয়নি ৩৭ রানে ২ উইকেট নেওয়া মুস্তাফিজের।
শাস্তি পেলেন ধোনি, মুস্তাফিজও
মুস্তাফিজুর রহমানকে মহেন্দ্র সিং ধোনির ধাক্কার ঘটনায় হইচই পড়ে গিয়েছে ক্রিকেট দুনিয়ায়। কাল থেকেই প্রশ্নটা আসছিল, কী শাস্তি পেতে যাচ্ছেন ভারতীয় অধিনায়ক? এমনও শোনা যাচ্ছিল, এক-দুই ম্যাচ নিষিদ্ধও হতে পারেন। আপাতত বড় ধরনের কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। ম্যাচ ফি কাটার মধ্যেও সীমাবদ্ধ থেকেছে। ধোনির সঙ্গে শাস্তি পেয়েছেন মুস্তাফিজও।
ম্যাচের পরই দুজনের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন মাঠের আম্পায়াররা। শুনানির পর দুজনকেই জরিমানা করেন ম্যাচ রেফারি পাইক্রফট। জরিমানা হিসেবে কেটে নেওয়া হয়েছে ধোনির ৭৫ শতাংশ আর মুস্তাফিজের ৫০ শতাংশ ম্যাচ ফি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ম্যাচ অফিশিয়াল প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ‘‘শুনানিতে নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছে মুস্তাফিজ। বলেছে, আরেকটু সরে গেলে হয়তো ধাক্কাটা এড়ানো যেত। আচরণবি​ধির ভাষায় এটি ‘অ্যাভয়ডেবল’ ঘটনা। বোলার ওখানে দাঁড়িয়েছিল বলের জন্য। বল পাবে না জেনেও সে সরেনি। ওটা আসলে তার জায়গাও ছিল না। জায়গাটা ডানদিকে। এটা জেনে করে থাকুক বা না জেনেই করুক, অবশ্যই নিয়ম ভঙ্গ। নিয়ম বলছে, ‘কিছুতেই খেলোয়াড়েরা ধাক্কায় লিপ্ত হতে পারবে না।’ দুজনই একই লাইনে ছিল। ধোনির দোষ ছিল, দোষ হবে মুস্তাফিজেরও। যদি মুস্তাফিজ সরে দাঁড়াত এবং তার পরও ধোনি ধাক্কা দিত, তাহলে পুরো দোষ ধোনিরই হতো। তবে সব স্বীকার করে নেওয়ায় মুস্তাফিজকে ৫০ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছে।’’
মুস্তাফিজ সহজেই স্বীকার করে নিলেও ধোনি নাকি কিছুতেই নিজের দোষ স্বীকার করে নিতে চাননি। দাবি করেছেন, তাঁর সরে যাওয়ার জায়গা ছিল না। ও প্রান্তে থাকা ব্যাটসম্যানকে দৌড়ানোর জায়গা করে দিতে ওই পাশ দিয়ে আসতে হয়েছে। ধোনি বলেছেন, ‘আমি তাকে (মুস্তাফিজ) হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।’ কিন্তু ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছেন মুস্তাফিজকে। এটি আইসিসির আচরণবিধির লেভেল ২.২.৪-এর অপরাধ।
প্রশ্ন উঠবে, ধোনির শাস্তি কি যথার্থ হলো? ম্যাচ অফিশিয়াল বললেন, ‘চাইলে ধোনির পুরো ম্যাচ ফি কাটা যেত। কিংবা এক ম্যাচ বা দুই ম্যাচ নিষিদ্ধও করা যেত। এটা নির্ভর করে ম্যাচ রেফারির ওপর। তবে শাস্তি দেওয়ার আগে ওই খেলোয়াড়ের আগের ম্যাচগুলোয় তার শৃঙ্খলার বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা হয়। ধোনির ক্ষেত্রেও তা বিবেচনা করা হয়েছে। হয়তো আগের ম্যাচগুলোয় ভাবমূর্তি খুব ভালো থাকায় শাস্তিটা ৭৫ শতাংশেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।’

সেই মুস্তাফিজেই কাঁপল ধোনির ভারত!

ওয়ানডে অভিষেকেও বিস্ময় উপহার দিলেন মুস্তাফিজ
নিজের আগের দুই ওভারে দুই উইকেট তুলে নিয়েছেন। কিন্তু ২৫তম ওভারটি আর শেষ করা হলো না। দুই বল করেই ব্যথা নিয়ে ফিরে গেলেন সাজঘরে। একটু আগেই যে ধোনির সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছেন পলকা শরীরে। সেই ব্যথা সইতে পারেননি।
২০ বছর বয়সই এখনো হয়নি। মাত্রই নিজের প্রথম ওয়ানডে খেলতে নেমেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা বলতে পাকিস্তানের বিপক্ষে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। সেই ম্যাচে বিস্ময় উপহার দিয়েছিলেন। তার চেয়েও বড় বিস্ময় উপহার দিলেন আজ। ওয়ানডে অভিষেকেই ৫ উইকেট তুলে নিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। যে ধোনির ধাক্কা খেয়ে সাজঘরে যেতে হয়েছি​ল, ১২ ওভার পর মাঠে ফিরে পাঁচ বলের মধ্যে তুলে নিলেন তিন উইকেট!
ধোনি তো বটেই, পুরো ভারতকেই পলকা মুস্তাফিজ দিলেন বিরাট এক ধাক্কা। সেই ধাক্কায় ৭৯ রানের বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ল বাংলাদেশ। ঘরের মাটিতে এটি বাংলাদেশের টানা নবম জয়। যে জয় দিয়ে র‍্যাঙ্কিংয়ের সাত নম্বর জায়গা নিশ্চিত করল বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়।
২০০৫ সালের এই ১৮ জুন কার্ডিফে তখনকার মহাপরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে নতুন যুগের পথে ছোট্ট একটা কদম ফেলেছিল বাংলাদেশ। পাকিস্তা​নকে বাংলাওয়াশ করে সেই নতুন যুগের উদ্বোধন হয়ে গেছে আগেই। শুধু দশ বছর পর একই দিনে ভারতকে হারিয়ে সংশয়বাদীদের শেষ সংশয়টুকুও মুছে ফেলল বাংলাদেশ।
প্রথমে ব্যাট করে তামিম, সৌম্য ও সাকিবের ফিফটিতে ৩০৭ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম তিন শ পেরোনো স্কোর। বিনা উইকেটে ৯৫ রান তুলে নিয়ে ভারত পাল্টা জবাব দিচ্ছিল। পর পর দু ওভারে মুশফিকুর রহিম দুটো ক্যাচ ফেলে চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। পর পর দুই ওভারে ধাওয়ান আর কোহলিকে ফিরিয়ে জোড়া আঘাত হানেন তাসকিন, এক বছর আগে ভারতের বিপক্ষে অভিষেকেই ৫ উইকেট পেয়েও হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল যাঁকে। কিন্তু এবারের গল্পটা যে বাংলাদেশ অন্যভাবে লিখবে বলেই ঠিক করে রেখেছিল।
নিজের পর পর দুই ওভারে মুস্তাফিজও জোড়া আঘাত হানলে হুট করে ভারতের স্কোর হয়ে যায় ৪ উইকেটে ১১৫। ২০ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারিয়ে ভারত তখন ধুঁকছে। বড় স্কোর তাড়া করতে গিয়ে ভীষণ চাপের মুখে। এমন চাপ অনায়াসে সামলে সামলে ‘ক্যাপটেন কুল’ নাম পেয়ে যাওয়া ধোনি মেজাজ হারালেন। ২৫তম ওভারের দ্বিতীয় বলে ঘটল মুস্তাফিজের সঙ্গে তাঁর ধাক্কার ঘটনা।
ধোনির এমন আচরণ এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিয়েছে। একজন তো এমনও মন্তব্য করেছেন, ক্রিকেটের সবচেয়ে খ্যাপাটে, সবচেয়ে শৃঙ্খলাহীন ক্রিকেটারদের একজন অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস আজ মদ্যপ হয়ে ক্রিকেট খেললেও হয়তো কেউ এতটা অবাক হতো না! বিষয়টি বাংলাদেশ দলেরও ভালো লাগেনি। পরের ওভারেই সাকিব ধোনিকে ফিরিয়েই বুনো উল্লাসে মেতে উঠলেন। যেন ভেতরের রাগটার আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ হলো! ক্যাচ ফেলার প্রায়শ্চিত্ত করে দুর্দান্ত ক্যাচ নিলেন মুশফিক। পরে নিয়েছেন আরও অসাধারণ দুটো ক্যাচ। নিজের ভুলটা ভালোভাবেই মুছে দিয়ে সব মিলিয়ে পাঁচটি ক্যাচ নিয়েছেন উইকেটের পেছনে।
কিন্তু নায়ক মুস্তাফিজই। রায়না-জাদেজার ৬০ রানের জুটিটায় চেপে ভারত তখন ভালোভাবেই ফিরে আসছে ম্যাচে। ড্রেসিংরুমে শুশ্রূষা নিয়ে ৩৭তম ওভারে ফিরলেন মুস্তাফিজ। আর ওই ওভারের চতুর্থ আর পঞ্চম বলে ফেরালেন রায়না আর অশ্বিনকে। হ্যাটট্রিকটা হলো না। কিন্তু যা হয়েছে সেটাই বাংলাদেশের ক্রিকেটের গল্পগাথা হয়ে থাকবে। পরের ওভারের দ্বিতীয় বলে ফেরালেন জাদেজাকেও। দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে অভিষেকে ৫ উইকেট! ১৯৫ রানে নেই ভারতের ৮ উইকেট!
ভারতের লেজ আরও আটটি ওভার কোনো মতে চালিয়ে দিল। কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য যে ঠিক হয়ে গিয়েছিল ৩৭তম ওভারে, মুস্তাফিজ যখন বোলিং মার্কে ফিরলেন, তখনই। নাকি আরও আগে? ২৫তম ওভারে যখন ধাক্কাটা মারলেন ধোনি!
অবধারিতভাবেই ম্যাচ সেরা তিনি। ইংরেজি ভালো বলতে পারেন না বলে মাশরাফি এলেন অনুবাদকের ভূমিকায়। পরে দেখা গেল, সদ্য ​কৈশোর পেরোনো এই বাঁ হাতি পেসারটি ভীষণ লাজুক। বাংলাতেও গুছিয়ে বলতে পারছেন না। বরং কেমন যেন অস্বস্তি।
অসুবিধা নেই মুস্তাফিজ। আজকে বল হাতে আপনি অনেক বলেছেন। যে বলটা সুখপাঠ্য কোনো গদ্য নাকি ছান্দসিক কোনো কাব্য—এ নিয়েই সবাই ধন্দে। যা বলার বল দিয়েই বলুন না!

আলেম ও এতিমদের সঙ্গে খালেদার ইফতার

প্রথম রোজার ইফতার এতিম ও আলেম-ওলামাদের সঙ্গে করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। রাজধানীর লেডিস ক্লাবে আলেম ও এতিমদের সম্মানে এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেন তিনি। সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে ইফতার মাহফিলে উপস্থিত হন খালেদা জিয়া। এরপর বিভিন্ন টেবিল ঘুরে ঘুরে এতিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন তিনি। অনেককে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন আবার কাউকে জড়িয়ে ধরে আদর করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। এরপর দুই পাশে এতিম ও আলেমদের নিয়ে ইফতার করেন খালেদা জিয়া। ইফতারের আগে দেশবাসী ও মুসলিমদের কল্যাণে দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। ইফতার মাহফিলে তেজগাঁওয়ের রহমত আলেম ইসলামী মিশন, মদিনাতুন মুসলিম ইনস্টিটিউট এবং শান্তিনগর ও ফকিরেরপুল এতিম খানা ও হাফেজিয়া মাদরাসার তিন শতাধিক এতিম শিক্ষার্থী অংশ নেন। ওলামা-মাশায়েখদের মধ্যে নরসিংদীর জামেয়া কাশেমিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা কামালউদ্দিন জাফরী, ইসলামী ঐক্যজোটের সভাপতি মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, সহ-সভাপতি মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী, চট্টগ্রামের পটিয়া মাদরাসার পরিচালক মাওলানা মুহাম্মদ মোজজাফর আহমেদ, শর্ষিনার ছোট হুজুর মাওলানা আরিফ বিল্লাহ ও কামরাঙ্গীরচর মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিএনপি নেতাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান,  ব্রি. জে. (অব.) আসম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার,  সারওয়ারী রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মাসুদ আহমেদ তালুকদার,   দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছেলে শামীম বিন সাঈদী প্রমুখ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। ইফতার মাহফিলের দোয়া পরিচালনা করেন জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সভাপতি হাফেজ আবদুল মালেক।

ক্ষোভ আর হতাশায় বিভাজন জাপা by মনোয়ার জাহান চৌধুরী

ক্ষোভ হতাশা আর প্রতিবাদ; এ তিন শব্দে বিভাজন সিলেট জাতীয় পার্টিতে। সিলেট জেলা জাপার আহবায়ক কমিটি গঠনের পরই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। প্রকাশ্যে গঠিত কমিটি বিরোধী বলয় তৈরি হয়। এ কমিটিতে স্থান পাওয়া সিনিয়র এক নেতা পদবী ব্যবহারেও স্বচ্ছন্দ করেননি। বরং তিনি হয়ে ওঠেছেন প্রতিবাদী। এমন উদাহরণ তৈরি হয় জেলা জাপার আহবায়ক কমিটি গঠনের পরই। এমনকি বর্তমান নেতৃত্বের প্রতিও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন পদবঞ্চিতরা। তারা দাবি করেন, যাদেরকে নেতৃত্বে আনা হয়েছে তারা শহর ভিত্তিক রাজনীতিতে মানানসই নয়। শহরে মিছিল করতে চাইলে তাদের ডাকে কেউ সাড়া দেবে না বলেও দাবি করেন তারা। এছাড়া দলকে ঢেলে সাজাতে হলে শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপে সমন্বয়রে মাধ্যমে কমিটি গঠনের পক্ষে মত দেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেট জাপা নেতারা। আহবায়ক কমিটির শীর্ষ পদেও পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত তাদের।
চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি আবদুল্লাহ সিদ্দিকীকে আহবায়ক করে ৭১ সদস্যের কমিটি অনুমোদন করেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আর কমিটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহ দেখা দেয়। তখন অভিযোগ ওঠে কেন্দ্রে ভুল বুঝিয়ে কমিটি মেয়াদ থাকাকালীন অবস্থায়ই আহবায়ক কমিটি গঠিত হয়েছে। তাই প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন অভিযোগকারীরা। আর কমিটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে শোকজ নোটিশও পান সিলেট জাপার দুই নেতা। তারপরও থেমে থাকেনি দ্বন্দ্ব।
এদিকে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা, বিয়ানীবাজার উপজেলা ও পৌর, গোলাপগঞ্জ উপজেলা ও পৌর এবং দক্ষিণ সুরমা উপজেলা জাতীয় পার্টির কমিটি গঠন করে দিয়েছে জেলার আহবায়ক কমিটি। সম্মেলনের মাধ্যমেই ওই শাখাগুলো কমিটি গঠন করা হয়। আর অন্যগুলোর সম্মেলনও রমজান মাসের পর সম্পন্ন হয়ে যাবে। জেলা জাপার আহবায়ক আবদুল্লাহ সিদ্দিকি মানবকণ্ঠকে এমন তথ্যই জানালেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তৃণমূলই জাপার মূল শক্তি। তৃণমূল যদি শক্তিশালী না হয় দলও মজবুত হবে না। তাই দলকে তৃণমূলে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া চলছে, চলবে।
এ সব গঠিত কমিটি অনেকেই মেনে নেননি, এমন প্রশ্নে আবদুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, কারো মানা না মানায় যায় আসে না। দলকে শক্তিশালী ও সুসংহত করতে বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে গঠন করা হয়েছে। অন্যগুলোও রমজান মাসের পর হয়ে যাবে।
অপরদিকে আহবায়ক কমিটির গঠন করে দেয়া বিভিন্ন শাখার কমিটির বিরুদ্ধেও মুখ খুলতে শুরু করেছেন অনেকেই। তাদের অভিযোগ ত্যাগী, পরীক্ষিত এবং যারা রাজপথে আন্দোলন জমাতে পারবে তাদেরকে কমিটিতে আনা হয়নি। বরং যারা জেলা নেতৃবৃন্দের পছন্দের লোক তাদেরকেই কমিটিকে স্থান দেয়া হয়েছে।
সিলেট জেলা জাপার সাবেক সাধারণ সম্পাদক (বর্তমান যুগ্ম আহবায়ক) আবদুস শহীদ লস্কর বশির মানবকণ্ঠকে বলেন, গ্রামাঞ্চলে ২ হাজার কর্মী দিয়ে মিছিল করে দলের অবস্থান জানান দেয়া যায় না। শহরে এর মজবুত ভিত্তি থাকতে হয়। বর্তমান আহবায়ক কমিটির সে অবস্থান নেই। তিনি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, বর্তমান আহবায়ক কমিটির পদধারীরা একশ’ কর্মী নিয়েও সিলেট নগরীর জিন্দাবাজার পয়েন্টে মিছিল করতে পারবে না। কারণ তাদের ডাকে কেউ সাড়া দেবে না। বশির লস্ক জেলা জাপার বর্তমান আহবায়ক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক হলেও এ পদ ব্যবহারে তিনি স্বচ্ছন্দ করেন না।
বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর কমিটি গঠন প্রসঙ্গে বশির লস্কর বলেন, যতটুকু জানি এসব কমিটিতে ত্যাগীদের এবং সংগঠকদের মূল্যায়ন করা হয়নি। এক তরফাভাবে কমিটি হচ্ছে। এতে করে বিভাজন খুবই স্পষ্ট। তিনি দাবি রাখেন, দলকে ঢেলে সাজাতে হলে দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে সমন্বয়ের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এছাড়া তিনি জেলা জাপার শীর্ষ পদে পরিবর্তন আনারও ইঙ্গিত দেন।

বিজিবি সদস্য অপহরণ- মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব, রাজ্জাককে ফেরত দাবি

কক্সবাজারের নাফ নদীতে বিজিবির সদস্যদের ওপর গুলিবর্ষণ ও নায়েক আবদুর রাজ্জাককে অপহরণের ঘটনায় ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিউ মিন্ট থানকে গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) হাতে আটক রাজ্জাককে অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে জানান, সীমান্তে গুলিবর্ষণের ঘটনা নিয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের কাছে সরকারের এ অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
চলতি মাসে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হলো। এর আগে সমুদ্রপথে মানব পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া লোকজনকে বাংলাদেশের নাগরিক বলে মিয়ানমার অপপ্রচার চালালে দেশটির এ ভূমিকার প্রতিবাদে ৫ জুন মিউ মিন্ট থানকে তলব করা হয়েছিল।
আমাদের টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, নায়েক আবদুর রাজ্জাককে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে টেকনাফে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিজিপির মধ্যে গতকাল যে পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, গতকাল বিকেলে অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব মো. মিজানুর রহমানের দপ্তরে মিউ মিন্ট থানকে তলব করা হয়। এ সময় গত বুধবারের গুলিবর্ষণের ঘটনার ব্যাখ্যা দেন মিউ মিন্ট থান। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত জানান, বিজিপির সদস্যরা বিজিবির সদস্যদের ডাকাত ভেবে গুলি ছুড়েছিলেন। এ সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই গুলিবর্ষণের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। পাশাপাশি অবিলম্বে নায়েক রাজ্জাককে ফিরিয়ে দিতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিবের দপ্তরে বসেই মিউ মিন্ট থান মিয়ানমারে ফোন করেন। তিনি মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের বিজিবির সদস্যকে দ্রুত ফেরত দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নিতে বলেন।
বুধবার ভোরে বিজিবির ছয় সদস্যের একটি দল নায়েক আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে নাফ নদীতে টহল দিচ্ছিল। তাঁরা বাংলাদেশের জলসীমায় মাদক চোরাচালান সন্দেহে দুটি নৌকায় তল্লাশি করছিলেন। এ সময় মিয়ানমারের রইগ্যাদং ক্যাম্পের বিজিপি সদস্যরা একটি ট্রলারে করে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে বিজিপির সদস্যদের বহনকারী ট্রলারটি বিজিবির টহল নৌযানের কাছে এসে থামে। বিজিপির ট্রলারটিকে বাংলাদেশের জলসীমা ছেড়ে যেতে বলা হলে তাঁরা নায়েক রাজ্জাককে জোর করে ট্রলারে তুলে নেন। বিজিবির অন্য সদস্যরা এতে বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। এতে সিপাহি বিপ্লব কুমার গুলিবিদ্ধ হন। পরে বিজিপির ট্রলারটি মিয়ানমারের দিকে চলে যায়।
গত বছরের ২৮ মে বান্দরবানের পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকায় বিজিপির সদস্যরা বিনা উসকানিতে বিজিবির সদস্যদের ওপর গুলি চালান। ওই সময় মিয়ানমারের সদস্যরা বিজিবির সদস্য নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানকে অপহরণ করে হত্যা করেন। দুই দিন পর বিজিবি মিজানুর রহমানের লাশ ফেরত নিতে গেলে উল্টো বিজিপি ওই প্রতিনিধিদলের ওপর গুলি চালায়। পরে ৩১ মে মিজানুরের লাশ ফেরত দেয় বিজিপি।

দয়া করে প্রেসক্লাবে দেয়াল তুলবেন না by সোহরাব হাসান

সব দেশে জাতীয় প্রেসক্লাব নেই। আমাদের আছে। সব দেশে সাংবাদিক ইউনিয়নও রাজনৈতিক কারণে ভাগ হয় না। আমাদের দেশে হয়েছে। এখন প্রেসক্লাবটিও ভাগাভাগি হওয়ার পথে। ইতিমধ্যে প্রেসক্লাবের নতুন ও পুরোনো কমিটি একে অপরের বিরুদ্ধে বাগ্যুদ্ধ এবং আইনি লড়াইয়ে নেমেছে।
জাতীয় প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে, স্বাধীনতার আগে যা পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাব নামে পরিচিত ছিল। এর প্রথম সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে মুজিবুর রহমান খাঁ ও জহুর হোসেন চৌধুরী। তাঁরা দুজন দুই রাজনৈতিক মেরুর মানুষ ছিলেন। কিন্তু পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় ছিলেন এককাট্টা। প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় আরও উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন খায়রুল কবির, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবদুস সালাম, এবিএম মূসা, কে জি মুস্তাফা, হাসানুজ্জামান খান, সৈয়দ নূরউদ্দিন প্রমুখ। তাঁদের কেউ বেঁচে নেই। থাকলে হয়তো এভাবে আমরা সংকটে পড়তাম না।
জাতীয় প্রেসক্লাব পেশাজীবী সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান হলেও আর পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মতো নিছক বিনোদনকেন্দ্র নয়। প্রেসক্লাব অবশ্যই সাংবাদিকদের পেশাগত সুযোগ–সুবিধা ও মর্যাদার বিষয়টি দেখবে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশ ও জনগণের প্রতি তার দায়দায়িত্বও বিস্মৃত হতে পারে না। সব দেশেই প্রেসক্লাব বাক্স্বাধীনতা তথা চিন্তাচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করে থাকে। মানুষ যখন তার মনের কথা জাতীয় সংসদে জানাতে পারে না, সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে পেঁৗছাতেও ব্যর্থ হয়, তখনই তারা গণমাধ্যমকর্মী এবং তঁাদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রেসক্লাবে ছুটে আসে। অতীতে জাতীয় প্রেসক্লাব জাতির মনন ও চিন্তার কেন্দ্র ছিল। রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর উপযুক্ত জায়গা ছিল এটি। ১৯৬৪ সালে যখন পাকিস্তানি শাসকেরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দেয়, তখন এই প্রেসক্লাব থেকেই দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতারা ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ ব্যানার নিয়ে মিছিল বের করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার বন্ধ করে দিলে এই প্রেসক্লাব থেকেই লেখক-বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীরা মিছিল বের করেছিলেন। এমনকি গেল শতকের আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারী দলের নেতাদের অস্থায়ী ঠিকানা ছিল এই প্রেসক্লাব। বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলকারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে প্রেসক্লাবে আসতে দেওয়া হয়নি, মত ও পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
কিন্তু নব্বই-পরবর্তী ‘গণতান্ত্রিক’ শাসনামলে প্রেসক্লাব সেই ঐতিহ্য ও ভাবমূর্তি ধরে রাখতে পারেনি, ইউনিয়ন ভাগ হয়ে গেছে, প্রেসক্লাবের টেবিল–চেয়ারগুলোও আমরা আলাদা করে ফেলেছি। ১৯৯৩ সালে ক্ষমতাসীন বিএনপির ইঙ্গিতেই সাংবাদিক ইউনিয়ন বিভক্ত হয়ে গেল। এখন প্রেসক্লাবের নিচতলায় আলাদা অফিস, আলাদা নেতৃত্ব। এর আগে ১৯৯২ সালের ২১ জুন বিরোধী দলের একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রেসক্লাবের ভেতরে ঢুকে সাংবাদিকদের লাঠিপেটা করে; প্রেসক্লাবের দরজা–জানালাও ভেঙে ফেলে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসক্লাবে হামলার ঘটনা এটাই প্রথম। কিন্তু এ হামলাকারীেদর বিচার হয়নি। একযোগে আমরা সেই দাবিও জানাতে পারিনি। পরবর্তীকালে বিভক্ত ইউনিয়নের ঐক্য নিয়ে অনেক দেনদরবার, অনেক বৈঠক হয়েছে, অনেক যৌথ কমিটি হয়েছে, কিন্তু ইউনিয়নকে এক করা যায়নি।
ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক ইউনিয়নের সঙ্গে পূর্বাপর সরকারগুলো যেমন সমঝে চলার চেষ্টা করত, মালিকেরাও ইউনিয়নকে ভয় করতেন। এরশাদের আমলে কেবল বাংলাদেশ অবজারভারকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ২৬ দিন পত্রিকা বন্ধ ছিল। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর এরশাদের সেন্সরশিপের প্রতিবাদে বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে যান। এরশাদ ক্ষমতায় থাকতে আর কোনো পত্রিকা বের হয়নি। সাংবাদিকের কলম যে কতটা শক্তিশালী, সেটি সেদিন আমরা দেখিয়েছিলাম কলম বন্ধ রেখে। এখন বিভক্ত ইউনিয়নের পক্ষে সেই সাহসী ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়।
বর্তমানে প্রেসক্লাবে যে সংকট চলছে, সেটি কেবল ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনের সংকট নয়। সংকটটি হলো নীতি ও মূল্যবোধের। সংকটটি হলো পেশাদারত্ব ছাপিয়ে অসাধু দলীয় রাজনীতির আধিপত্য। প্রেসক্লাবের সংকটের শুরু যখন অসাংবাদিকদের সদস্যপদ দেওয়ার মাধ্যমে দল ভারি করার চেষ্টা চলে। ২০-২২ বছর ধরে সাংবাদিকতা করেও অনেকে আজও প্রেসক্লাবের সদস্য হতে পারেননি। আবার ১০-১৫ বছর আগে সাংবাদিকতা পেশা ত্যাগ করে কিংবা অন্য পেশা ও ব্যবসায়ে সক্রিয় থেকেও যথারীতি ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবের সদস্যপদ ঠিক রেখেছেন। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠানে তঁাদের নেতৃত্ব দিতেও কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। জাতীয় প্রেসক্লাবের কমিটি নিয়ে এখন যে অস্থিরতা চলছে, তার মূলে রয়েছে দলীয় রাজনীতি। ১৯৮৭ সালে ফ্রিডম পার্টিকে সভা করার অনুমতি দেয় প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ এবং সেই সভায় গোলাগুলিতে একজন মারাও যায়। এর প্রতিবাদে ব্যবস্থাপনা কমিটি থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে পরিচিত সদস্যরা পদত্যাগ করেন। এই সুযোগে প্রতিপক্ষ পছন্দসই কয়েকজনকে কো–অপ্ট করে এবং অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে কম্পিউটার অপারেটরকেও সদস্য করে নেয়। অনেকে এটিকে ২০০৬ সালে সাবেক সিইসি বিচারপতি এম এ আজিজের ভোটার তািলকার সঙ্গে তুলনা করেন।
জাতীয় প্রেসক্লাবের চলমান সংকটের ন্যায্য সমাধান হলো অসাংবাদিকদের বাদ দিয়ে একটি সুষ্ঠু ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও নির্বাচন। কিন্তু আগের ব্যবস্থাপনা কমিটি কিংবা তাদের প্রতিপক্ষ সেদিকে নজর দেয়নি। বরং তারা পদ ভাগাভাগির লক্ষ্যে তথাকথিত সমঝোতার চেষ্টা চালায়। বিএনিপ–সমর্থক সাবেক ব্যবস্থাপনা কমিটি ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রতিপক্ষকে ১০+৭ সমীকরণে ছাড় দিতে রাজি হয়। অপরপক্ষ এটা মেনে নেয় এ কারণে যে ভোটাভুটি হলে তাদের জয়ের সম্ভাবনা কম। কিন্তু উভয় পক্ষের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকেরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকার করে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে যেমন একজন জামায়াতের সমর্থককে প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মেনে নেওয়া কঠিন, তেমনি রাজনীতিতে চরমভাবে কোণঠাসা বিএনপির পক্ষে ছাড় দেওয়াও অসম্ভব। এ কারণেই তারা সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। ইতিমধ্যে বিএনপির সমর্থক গ্রুপের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। তারাও জামায়াত–সমর্থক সাধারণ সম্পাদকের ব্যাপারে আপত্তি জানায়। ফলে দুই পক্ষের সমঝোতা ভেস্তে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন পদত্যাগ করে এবং বিদায়ী ব্যবস্থাপনা কমিটি সাধারণ সভা স্থগিত করে এক মাস পর বিশেষ সাধারণ সভা আহ্বান করে। কিন্তু তাদের প্রতিপক্ষ এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে নির্ধারিত দিনেই সাধারণ সভা আহ্বান করে একটি কমিটি ঘোষণা করে। এই কমিটিতে আওয়ামী লীগ–সমর্থকদের মধ্য থেকে সভাপতিসহ ১০ জন এবং বিএনপির বিদ্রোহী সমর্থকদের মধ্য থেকে সাতজনকে নেওয়া হয়। কিন্তু আগের ব্যবস্থাপনা কমিটি ৭+১০ এই সমীকরণ না মেনে আদালতের শরণাপন্ন হয়। প্রেসক্লাবে উভয় পক্ষ নিজেদের বৈধ নেতৃত্ব বলে দাবি করে এবং প্রেসক্লাব অঙ্গনে সভা–সমাবেশ চলছে।
আমরা সাংবাদিকেরা দেশের গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলি, রাজনীতিকদের দুর্বলতা ও ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করি। আমরা সাংবাদিকেরা সরকার ও বিরোধী দলের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দাবি করি। কিন্তু আমাদের কাজে কতটা জবাবদিহি আছে? প্রেসক্লাবের নির্বাচন নিয়ে যা হয়ে গেল, সেটি আইন কীভাবে দেখবে জানি না, কিন্তু একজন পেশাজীবী গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে লজ্জিত বোধ করছি। সাংবাদিকতার মূল শক্তিই হলো নীতি–নৈতিকতা।
সাংবাদিক সমাজ আরও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছে যে কবি শামসুর রাহমান, যিনি দেশের বরেণ্য কবিই ছিলেন না, অধুনা লুপ্ত দৈনিক বাংলার সম্পাদকও ছিলেন, তাঁকে এই প্রেসক্লাব সদস্য না করে সদস্য করেছিল আলবদর নেতা কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লাকে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাঁদের ফাঁসি হয়েছে। সে সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার সাংবাদিকদের মধ্যে কজন প্রতিবাদ করেছিলেন? কেউ কি কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন? কেন করেন নি?
সম্প্রতি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে আদালত সংশোধিত তালিকা অনুযায়ী নির্বাচন করতে বলেছেন। প্রেসক্লাবের সমস্যার সমাধান কী?
এই প্রেসক্লাব অনেক সংগ্রাম, অনেক ত্যাগের প্রতিষ্ঠান। আমরা এখেনা বিশ্বাস করতে চাই, ইউনিয়ন ভাগ হলেও প্রেসক্লাব ভাগ হবে না। অনেক জ্যেষ্ঠ সদস্য আছেন, যঁারা অতীতে প্রেসক্লাব ও ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আছেন তোয়াব খান, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, গোলাম সারওয়ার, হাসান শাহরিয়ার, িরয়াজউদ্দিন আহমদ, হাবিবুর রহমান মিলনের মতো প্রবীণ সদস্য। আছেন নতুন প্রজন্মের অনেক দলনিরপেক্ষ সাংবাদিক, যঁারা প্রেসক্লাবটিকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান। তাঁরা বর্তমান সংকট উত্তরণে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে পারেন। ভূমিকা নিতে পারেন সম্পাদক পরিষদও।
সবেশষে সবিনয় নিবেদন, দলীয় স্বার্থে সাংবাদিক ইউনিয়ন ভাগ করেছেন, দেয়াল তুলেছেন, দয়া করে জাতীয় প্রেসক্লাবে আরেকটি দেয়াল তুলবেন না। দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার নয়, জাতীয় প্রেসক্লাব হোক পেশাজীবী সাংবাদিকদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
hsohrab03@gmail.com

বাবা-ছেলে হত্যা মামলার আসামি সোহেল গ্রেপ্তার

ছেলে বাবু ও বাবা জালাল হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি ভি​পি
সোহেলকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। ছবি: আসিফ হোসেন, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ছেলে নজরুল ইসলাম বাবু ও বাবা জালালউদ্দিনকে হত্যা মামলার আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহরিয়ার পান্না ওরফে ভিপি সোহেলকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে র‌্যাব-১১ একটি দল রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকা সোহেলকে গ্রেপ্তার করে।
রূপগঞ্জ থানা সূত্রে জানায়, ভিপি সোহেল ছেলে নজরুল ইসলাম বাবু হত্যা মামলার ও বাবা জালাল উদ্দিন হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি। সোহেল মুরাপাড়া ডিগ্রি কলেজের ছাত্র সংসদে ছাত্রলীগ প্যানেলের স্বঘোষিত ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি)।
সোহেলকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে র‌্যাব-১১ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব-১১ এর সিও লে. কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-১১ এর একটি দল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সালাহ্‌ উদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকা থেকে ভিপি সোহেলকে গ্রেপ্তার করে।
র‍্যাবের সিও জানান, ভিপি সোহেলের পরিকল্পনায় গত ১৪ মে বাবু হত্যা মামলার বাদী জালালকে পরিকল্পিতভাবে সাদা রঙের মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করা হয়। এরপর জালালকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ভিপি সোহেলের মিরকুটিরছেও বাসায় ওই অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। জালালকে অপহরণের আগে ওই মাইক্রোবাসটি ভিপি সোহেলের বাসার সামনে রাখা ছিল। সোহেলের অনুসারী ও সন্ত্রাসী লেদা ফারুক, সবুজ, সেলিম, মোহাম্মদ আলী, তাওলাদ হোসেন¦তালু, রশিদসহ অন্যান্যরা জালাল হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।
সিও লে. কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান জানান, ভিপি সোহেল ও জালাল হত্যায় অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীরা বাবু হত্যা মামলারও আসামি। জালাল জীবিত থাকাকালে সোহেল দীর্ঘদিন ধরে বাবু হত্যা মামলা তুলে নিতে তাঁকে চাপ দেয়। কিন্তু তাতে রাজি না হওয়ায় জালালকে হত্যা করা হয়। এরপর সোহেল আত্মগোপন করেন।
র‍্যাব-১১ সিও আরও জানান, তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও তিনি মূলত জমির দালাল ও শীর্ষ সন্ত্রাসী শওকত গ্রুপের সদস্য ছিলেন। শওকত মারা যাওয়ার সোহেল ওই গ্রুপরে নেতৃত্বে আসেন। রূপগঞ্জের মুরাপাড়ায় সন্ত্রাসী আলমাস ও শওকত গ্রুপরে দ্বন্দ্বে এ পর্যন্ত অনেকগুলো হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সোহেলকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
ভিপি সোহেল ও তার অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও অস্ত্র ব্যবসা করে আসছিল। ওই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় সোহেলের অনুসারীরা ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর বাবুকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় বাবুর বাবা জালাল বাদী হয়ে সোহেল ও তার অনুসারীদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। কিন্তু গত ১৫ মে বাবু হত্যার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে জালালকে বাড়ি থেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে হত্যা করে। এই ঘটনায় জালালের স্ত্রী বাদী হয়ে সোহেলসহ ২১ আসামির বিরুদ্ধে আরেকটি হত্যা করেন। পুলিশ সোহেলের সহযোগী ইকবালকে গ্রেপ্তার করে। জালাল হত্যার ঘটনায় ইকবাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাতে সোহেল ও তাঁর অনুসারীদের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রে গির্জায় বর্ণবাদী হামলায় ৯ জন নিহত

যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের চার্লসটন শহরে কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিনদের একটি ঐতিহাসিক গির্জায় গত বুধবার সন্ধ্যায় প্রার্থনা চলাকালে নয়জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন শ্বেতাঙ্গ যুবক ডিলান রুফকে গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির।
চার্লসটনের পুলিশপ্রধান গ্রেগরি মুলেন ঘটনাটিকে ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, বুধবারের ওই হামলায় ঘটনাস্থলেই আটজন নিহত হন। আরেকজনের মৃত্যু হয় চিকিৎসাকেন্দ্রে। ঘটনার ভয়াবহতা দেখে ওই ব্যক্তি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন।
বুধবারের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ওই গির্জার প্রধান যাজক (প্যাস্টর) এবং সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর ক্লেমেন্টা পিঙ্কনি। তবে হতাহত ব্যক্তিদের কারও নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ জানায়, বন্দুকধারী লোকটি গির্জায় প্রবেশ করে প্রার্থনারত ব্যক্তিদের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। প্রধান সন্দেহভাজন ডিলান রুফকে গতকাল চার্লসটন থেকে ৩৫০ কিলোমিটার উত্তরে নর্থ ক্যারোলাইনার শেলবি নামক স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্যদের হাতে বেশ কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হওয়ার জেরে সম্প্রতি সহিংসতার পর যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদী উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে—এমন এক সময়ে কৃষ্ণাঙ্গদের একটি গির্জায় হামলাটি হলো। ‘বিদ্বেষমূলক’ ওই ঘটনার তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ সহায়তা করবে।
চার্লসটনের ক্যালহুন স্ট্রিটে অবস্থিত গির্জাটির নাম এমানুয়েল আফ্রিকান মেথডিস্ট এপিস্কোপাল চার্চ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গ খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে পুরোনো উপাসনালয়। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং সেখানে ১৯৬২ সালের এপ্রিলে ভাষণ দিয়েছিলেন। আটলান্টিক উপকূলের শহর চার্লসটনে বেশ কয়েকটি গির্জা রয়েছে। তাই এটি ‘পবিত্র শহর’ নামে খ্যাত। অভিবাসী মিশ্র জাতিগোষ্ঠীর উপস্থিতিতে সেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসেও বৈচিত্র্য দেখা যায়। শহরের মেয়র জোসেফ রিলে বুধবারের ওই হামলাকে সবচেয়ে অবর্ণনীয় ও হৃদয়বিদারক বেদনার ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, একমাত্র ঘৃণাবোধের কারণেই কেউ গির্জায় ঢুকে প্রার্থনারত মানুষদের ওপর গুলি চালাতে পারে। এটা সবচেয়ে কাপুরুষোচিত কাজ।
বন্দুকধারীর হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এক নারীর উদ্ধৃতি দিয়ে স্থানীয় সংবাদপত্র চার্লসটন পোস্ট অ্যান্ড কুরিয়ার জানায়, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ঘটনার বিবরণ প্রকাশ করার জন্যই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী জেব বুশ ওই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে চার্লসটনে গতকাল নির্ধারিত নির্বাচনী প্রচারাভিযান বাতিল করেছেন। হতাহত ব্যক্তিদের পরিবার-পরিজনদের প্রতি তাঁর পক্ষ থেকে সমবেদনা জানানো হয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিলারি ক্লিনটনও ওই হামলার ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন।
আলাবামা অঙ্গরাজ্যের বার্মিংহামে আফ্রিকান-আমেরিকানদের একটি গির্জায় ১৯৬৩ সালে বোমা হামলা চালিয়ে চারজনকে হত্যা করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় ১৯৬০-এর দশকের নাগরিক অধিকার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়।

বাংলাদেশের জয় বিস্ময়কর কিছু নয়, বললেন গাভাস্কার

আবারও বাংলাদেশকে প্রশংসায় ভাসালেন গাভাস্কার। ফাইল ছবি
আগের ২৯ লড়াইয়ে বাংলাদেশ জিতেছিল মাত্র তিনবার। সেই বাংলাদেশ কাল ভারতকে হারাল ৭৯ রানের বিশাল ব্যবধানে। একেবারে হেসেখেলে। ভারতের এই অসহায় আত্মসমর্পণে হয়তো দেশটির অনেকেই অবাক। কিন্তু সুনীল গাভাস্কার বলছেন, বাংলাদেশের এই জয়ে তিনি অন্তত অবাক নন। এটি তাদের ধারাবাহিকতারই প্রতিচ্ছবি।
‘বাংলাদেশের কাছে ভারতের লজ্জাজনক হার’ শিরোনামে ভারতের শীর্ষ সংবাদ চ্যানেল এনডিটিভি একটি বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছিল। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেন ভারতীয় ক্রিকেট কিংবদন্তি গাভাস্কার। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, এমন নয় বাংলাদেশ হুট করে ভালো খেলতে শুরু করেছে। টেস্টে এখনো ধারাবাহিক হতে না পারলেও ওয়ানডেতে পোশাকের মতোই ঝলমলে তাদের পারফরম্যান্স।
‘লিটল মাস্টার’ বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে যদি ওদের খেলা আপনি দেখে থাকেন, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ওরা কিন্তু দারুণ খেলছে। তারা আগের তুলনায় অনেক বেশি সীমিত ওভারের ম্যাচ খেলছে। তারা যত বেশি খেলবে, ততই উন্নতি করবে। গত বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স তো অবিশ্বাস্য ছিল। প্রথম ওয়ানতে তাদের জয় আমার কাছে অপ্রত্যাশিত কিছু মনে হয়নি।’
কালকের জয়ের পর বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের উল্লাস, গ্যালারিতে দর্শকদের ‘মওকা মওকা’ কোরাস স্লোগানের উদাহরণ টেনে উপস্থাপক জানতে চান, এটি কি বাংলাদেশের কাছে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিশোধ ছিল কিনা। বিশেষ করে বিশ্বকাপের ওই ম্যাচটি বাংলাদেশের সমর্থকদের জন্য তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত নিয়েও তারা ছিল ক্ষুব্ধ।
উত্তরে গাভাস্কার বলেন, ‘হয়তো সমর্থকদের মধ্যে এমন একটা ভাবনা কাজ করেছে। তবে আমি মনে করি না বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা এমনটা ভেবেছে। দেখুন বিশ্বকাপের পর পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজ ছিল। সেখানে আম্পায়ারের কিছু সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের বিপক্ষে গিয়েছিল। তখন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা বলেছিল, খেলায় এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে। ব্যাপারটি এমন নয় আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের ঘটনা শুধু বাংলাদেশের বেলায় ঘটছে কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বেলায় ঘটছে না। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বড় কোনো ঘটনা নয়। সেটাকে বড় কোনো ঘটনা বানানো ম্যাচ হারার একটা অজুহাত হতে পারে। ভারতেরও আজকের (গতকাল) পরাজয়ের কোনো অজুহাত নেই। ওরা বড় ব্যবধানেই হেরেছে।’
উপস্থাপক আবার জানতে চান, বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেটে এখন নতুন একটা মাত্রা চলে এসেছে কিনা। গত বিশ্বকাপে রুবেল-কোহলির মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। এবার রোহিত শর্মার বাক্য বিনিময়, মুস্তাফিজের সঙ্গে ধোনির সেই ধাক্কার ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন উপস্থাপক।
গাভাস্কার বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা হচ্ছে। দুটো দলই, দুই দলের খেলোয়াড়েরাই মনে করে তারা জিততে পারে। টেস্ট ম্যাচে এই উত্তাপটা ছিল না। কারণ বাংলাদেশ টেস্টে আত্মবিশ্বাসী নয়। কিন্তু ওয়ানডেতে তারা সামান্য ছাড় দিতেও নারাজ। আর আপনার মধ্যে যখন এমন ভাবনা কাজ করবে, আপনি এমনটাই খেলবেন।’
বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটে বদলে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে বিপিএলের অবদান আছে বলে মনে করেন গাভাস্কার, ‘ওদের ওয়ানডেতে ভালো করা আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে বিপিএলের অনেক বড় অবদান আছে। আমি জানি এই টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টটা বেশ কয়েক বছর ধরেই হচ্ছে না। কিন্তু এই টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। বিদেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করেছে। অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছে। তাদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করেছে। চাপের মুখে কীভাবে খেলতে হয় বুঝতে শিখেছে।’

‘ক্যাপটেন কুলে’র মাথা গরমে অবাক ভারতীয় মিডিয়া

মুস্তাফিজকে এভাবেই ধাক্কা দিলেন ধোনি! ছবি: সংগৃহীত
কোথায় মহেন্দ্র সিং ধোনি আর কোথায় মুস্তাফিজুর রহমান! বয়সে, অভিজ্ঞতায়, তারকাখ্যাতি... কোনো দিক দিয়েই তুলনা চলে না। ধোনি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আয় করা ক্রীড়া তারকাদের একজন। তাঁর নাম ওঠে ফোর্বসে। তাঁকে চেনেন খোদ বারাক ওবামা। ধোনি ১২৫ কোটি মানুষের নয়নের মণি। ধোনি জনপ্রিয় বাংলাদেশেও। ‘ছিলেন’ লিখতেই হচ্ছে, কাল ছোট্ট একটা ঘটনা বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে গেল। শ্রদ্ধার জায়গাটি হারালেন ভারতের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক।
শুধু বাংলাদেশ? ছি-ছিক্কার উঠছে ক্রিকেট বিশ্বেই। এ কী করলেন ধোনি। মাত্রই প্রথম ওয়ানডে খেলতে নামা, এখনো ২০-এ পা না দেওয়া একজন তরুণ ক্রিকেটারকে এভাবে ধাক্কা মারবেন! মুস্তাফিজ হয়তো ভুলই করেছেন, কিন্তু বয়সে-অভিজ্ঞতায় এগিয়ে থাকা ধোনি সামান্য ঔদার্য্যটুকু দেখাতে পারলেন না? না হলে কীসের তিনি ‘ক্যাপটেন কুল’? না হলে ক্রিকেট কোন হিসেবে ভদ্রলোকের খেলা?
ধোনির ওই ঘটনার পর কাল অনলাইনে বেশ বাহাস হচ্ছিল। পক্ষে-বিপক্ষে চাপান-উতোর। এরই ফাঁকে ক্রিকইনফোর ধারাভাষ্যে একজনের মন্তব্যের পাল্টা জবাবে আড্রিয়ান মেরেডিথ ক্রিকেটের সবচেয়ে খ্যাপাটে চরিত্রদের একজনের উদাহরণ টেনে লিখেছেন, ‘আজকের এবং দশ বছর আগেকার মধ্যে পার্থক্য হলো, আজ যদি অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস মাতাল হয়ে মাঠে নামত, তবু বোধ হয় কেউ অতটা অবাক হতো না।’
স্বাভাবিকভাবে ভারতীয় সমর্থকদের একটা বড় অংশই ধোনির পক্ষে কথা বলেছেন। তবে তাঁদেরই অনেকে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে ধোনির সমালোচনা করছেন। ধোনির এমন আচরণের সমালোচনা করেছে দেশটির সবচেয়ে বড় পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়া। সমালোচনা করা হয়েছে দেশটির সবচেয়ে বড় বাংলা পত্রিকা আনন্দবাজারেও।

‘ক্যাপটেন কুল ধোনি পথরোধ করা বাংলা বোলারকে সজোরে ধাক্কা মারলেন’ শিরোনামে আলাদা একটি প্রতিবেদনই করেছেন টাইমস অব ইন্ডিয়ায়। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘ধোনি হয়তো বলতে পারেন, মুস্তাফিজ ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, তাঁর পথরোধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা গেছে, ধোনি সরে যাওয়ার চেষ্টা তো করেননি, উল্টো কাঁধ দিয়ে সজোরে ধাক্কা মেরেছেন।’
ধোনির দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। বরং বরাবরই তিনি ক্রিকেটীয় চেতনার কারণে আলাদাভাবে প্রশংসিতই হয়েছেন। সেটিও উল্লেখ করে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধোনির যে অবস্থান, সেটি বিবেচনায় নিলে, এটা অবশ্যই খুবই অখেলোয়াড়োচিত একটি আচরণ। যে অভিযোগে ভারত অধিনায়ক তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে আগে কখনো অভিযুক্ত হননি।’
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাঠের দুই আম্পায়ার বিষয়টি ম্যাচ রেফারির কাছে তোলেন কি না, সেটাই এখন দেখার। তবে ধোনি এর জন্য শাস্তি পান আর না-ই পান; ক্ষণিকের এই অভব্যতার জন্য ধোনি বিশ্বজুড়েই হাজার হাজার ভক্ত এরই মধ্যে হারিয়ে ফেলেছেন।’
আনন্দবাজার-এর ম্যাচ প্রতিবেদনে রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায় ঘটনাটি উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘ভারত অধিনায়ক এ দিন যা করলেন তা তাঁকে সাধারণত করতে দেখা যায় না। মুস্তাফিজুরকে ভারত অধিনায়ক ধাক্কা মেরে বসলেন...রান নিতে যাওয়ার সময় ধোনির কাঁধ মুস্তাফিজুরকে এমনভাবে গুঁতিয়ে দিল যে, উনিশের পেসারকে মাঠের বাইরে চলে যেতে হলো সঙ্গে সঙ্গে। প্রত্যুত্তরটাও পেলেন ভারত অধিনায়ক। মুস্তাফিজুর ফিরে এসে ভারতকেই ম্যাচ থেকে ধাক্কা মেরে বার করে দিলেন।’
কাল শুধু ভারত হারেনি। হেরেছেন ধোনি। হেরে গেছে তাঁর ভাবমূর্তি। কাল শুধু বাংলাদেশ জেতেনি, জিতেছে সাতক্ষীরার এক অখ্যাত তরুণ। এই লেখার প্রথম বাক্যে আবার ফিরে যান। কোথায় ধোনি আর কোথায় মুস্তাফিজ? উত্তর: ধোনি এমন কাণ্ডের পরও মাঠের আম্পায়ারকে নালিশ করতে গিয়েছিলেন। আর প্রচারের আলোয় অনভ্যস্ত সহজ-সরল মুস্তাফিজকে যেতে হয়েছিল ড্রেসিংরুমে। কিন্তু ১২ ওভার পর বোলিং মার্কে ফিরে, ৫ বলে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে তিনি ধোনিকে যেন মনে করিয়ে দিলেন, লড়াইটা ব্যাট আর বলের। শরীরের ধাক্কাধাক্কির নয়!

কচ্ছপ by জাহিদ হায়দার

বাবা কখনো কাছিম বলেন না, বলেন কচ্ছপ।
অনেক সময় লক্ষ করেছি, কোনো প্রসঙ্গে আলোচনা অথবা কথা-কাটাকাটি শুরু হলে, ওই প্রসঙ্গ বা কথার মধ্যে ডান হাতের তর্জনী সোজা করে কিছু বলার জন্য যেন সুযোগ খোঁজেন বাবা। বলেন, ‘এক্কেবারে কচ্ছপের মতো।’ একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এর মধ্যে কাছিমের মতো কী দেখলেন?’ সে কথা জিজ্ঞেস করাও যেন অপরাধ। বাবা সুযোগ পেয়ে যেতেন। তারপর এক ঘণ্টার চার ভাগের তিন ভাগ সময় নিয়ে চলত চুলচেরা ব্যাখ্যা। স্কুলশিক্ষক বাবা ঝাড়া ৪৫ মিনিট ধরে বিষয়ের বুকের ওপরে বসে বিষয়কে কাবু করতে না পারলে শান্ত হতেন না।
একদিন বিপদে পড়েছিল আমার বড় বোন হেনা। মায়ের সঙ্গে বাবার কথা-কাটাকাটি হচ্ছিল, যা প্রায়ই হয়। মাকে বাবা বললেন, ‘তুমি একটা মাদি কচ্ছপ।’
কথা-কাটাকাটি কিংবা অন্য কোনো প্রসঙ্গের চূড়ান্ত রায় বাবা কখন দেবেন, আমরা জেনে ফেলেছিলাম—যখনই তিনি ‘কচ্ছপ’ বলে বাক্য শেষ করতেন বুঝতাম, নিজের ঘৃণা কিংবা তুচ্ছার্থ প্রকাশের সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছেন তিনি। ‘একটা মাদি কচ্ছপ’ বলার পরেই হেনা আপা হেসে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কাছিমের স্ত্রীলিঙ্গ কী?’ এর ফল হলো বিশ্রী। বাবা এক লাফে উঠে গিয়ে হেনা আপার কোঁকড়ানো চুল ধরে টানতে টানতে বারান্দা থেকে নিয়ে গেলেন ঘরে। মা চিৎকার করে বললেন, ‘ওর কী দোষ, ওকে কি মেরে ফেলবে? দরজা খোলো।’ আমরা অবাক হয়ে শুনলাম হেনা আপাকে বাবা বলছেন, এই হচ্ছে খাতা, এই কলম, এক ঘণ্টা সময়, কচ্ছপের ওপর ৩০০ শব্দের মধ্যে একটা রচনা লিখতে হবে, স্ত্রী-কচ্ছপকে এক শব্দে কী বলা হয় সেটারও ব্যাখ্যা চাই, এ ছাড়া তোকে কে রেহাই দেয়, দেখে নেব।’
দরজায় শিকল দিয়ে বাবা বেরিয়ে গেলেন। আমার হাসি পেল। বাবার একবারও মনে হলো না, শিকল যে কেউ একটু পরেই খুলে দেবে। মা আমাকে বললেন, ‘যা, তোর বাবাকে ডেকে আন।’ আমি বলি, ‘কেন?’ মা আমার কথার জবাব দেন না। মনে হলো, কেঁদে ফেলবেন, তার বদলে বাজার থেকে কী কী আনতে হবে তার একটা ফর্দ আর ৫০০ টাকা দিয়ে চলে যান মা।
ঘরের ভেতর থেকে হেনা আপা দরজা ধাক্কাচ্ছে। আমি শিকল খুলে দিলে মা বললেন, ‘দরজাটা আমি খুললে ভালো হতো।’ মায়ের কথা শুনে আপা আর আমি পরস্পরের দিকে তাকালাম। মা চান, আমরা যেন বাবাকে ভয় পাই।
আমাদের চার ভাইবোনের মধ্যে তপনের ছোট শিরিন দশম শ্রেণির মধ্যমানের ছাত্রী, বাবাকে একটু বেশি ভয় পায়। এই জন্য বাবা বোধ হয় ওকে খানিকটা বেশিই স্নেহ করেন। আমার ছোট তপন পড়ে কলেজের প্রথম বর্ষে। বারবার আয়নার সামনে গিয়ে চুল আঁচড়ায়, কোনো কথা বোঝে না অথচ ইংরেজি গান শোনে। বাবার ব্যক্তিত্বকে আমলই দেয় না। বাবা কখনো কিছু বললে উঁচু গলায় সে জবাব দেবেই; এবং সেই উত্তর বাবা যা বলবেন হবে তার উল্টো। আমার মনে হয়, বাবা ওর প্রতিবাদে ভয় পান। মা একদিন নরম গলায় তপনকে বললেন, ‘তোর বাবার সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলতে পারিস না?’ তপনের মেজাজ তখন ভালো ছিল, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল সে। হাতের চিরুনি মাথার পেছনে, আয়নায় স্থির দেখাচ্ছে ওর চোখ দুটি। মনে হলো, সঠিক একটা জবাব খুঁজছে ও। বলল, ‘বাবার মতো লোকদের কথার জবাব জোরে না দিলে তারা মরে যাবে, তুমি বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখো তঁাকে আমি কতটা ভালোবাসি আর বাবাও আমাকে...এই বাসায় চিৎকার করার একজন মানুষ তো চাই।’ তপনের কথা শুনে এই প্রথম আমার মনে হলো, ও বিশ্লেষণ করা শিখছে, আগে ওকে কখনো এভাবে গুছিয়ে কথা বলতে শুনিনি।
আজ শেষ বিকেলে পলিথিনের হলুদ ব্যাগ হাতে বাবা বাসায় ফিরলেন ভিজতে ভিজতে। বাসা থেকে সকালে হেনা আপাকে ঘরে শিকল দিয়ে রেগে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিন জায়গায় সেলাই দেওয়া ছাতাটা নিয়ে যাননি। বাবার হাতে ব্যাগ দেখেই মা গজরাতে শুরু করলেন। মায়ের মুখের ভেতর কথাগুলো ভেঙে ভেঙে যা বের হয়ে এল তা এমন: ‘এই মানুষটার আর আক্কেল হলো না, সকালে যে বাজারের টাকা দিয়ে গেছে মনে নেই।’ সব শুনে একটু হাসলেন বাবা। এ রকম হাসি দেখলে মা আর আমরা বুঝি তাঁর মেজাজ ভালো। বললেন, ‘মাছগুলি তাজা তাই।’ ‘তাজা’ কথাটা মাছ কিনে আনার বাবা পর বলবেনই; এবং মা উত্তরে বলবেন, ‘সে তো প্রতিদিনই বলো।’ বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে শুনে আসছি অবেলায় বাবার বাজার করা মা পছন্দই করেন না। কিন্তু বাজার আনার পর মা-ই বেশ যত্নে রান্না করেন গরম-গরম ঝোল, বাবার সামনে বসে পাতে তুলে দিয়ে তাঁকে খাওয়ান। অসহায় মানুষকে আরেকজন মানুষ ভালোবাসছে, দুজনের চোখমুখই তৃপ্ত—দৃশ্যটি মন্দ নয়।
হেনা আপা সত্যি সত্যি কাছিমের ওপর ৩০০ শব্দের মধ্যে একটি রচনা লিখেছে। ও কি ভেবেছিল বাবা বাইরে থেকে এসেই ওর রচনা দেখতে চাইবেন? আমাকে কিছু কাগজ এগিয়ে দিয়ে হেনা আপা বলল, ‘এই দ্যাখ লিখেছি, বাবাকে দেব?’ আমি বললাম, ‘না, বাবা যদি তোমার রচনা দেখতে না চান, তুমি যদি নিজে থেকে দাও তবে তাঁকে অপমান করা হবে। মনে হয় ব্যাপারটা বাবা ভুলেই গেছেন।’ কথা শুনে আপা একটু হাসল, মনে হয়, বাবার মনটা বিচার করে নিল। ওদিকে ততক্ষণে রচনাটি পড়তে আরম্ভ করেছি আমি।
কচ্ছপ একটি সরীসৃপ প্রাণী। কচ্ছপের স্ত্রী-লিঙ্গ কচ্ছপী। নখযুক্ত চার পায়ে, বুকে ভর দিয়ে হাঁটে। এরা উভচর। ডিম পাড়ার সময় ডাঙায় আসে। অনেক ডিম পাড়ে। একবারে ১৫০-২০০টি। সাধারণত নদী, ডোবা বা পুকুরের পাশে যথাক্রমে কাশবন, জঙ্গল বা বাঁশঝাড়ের মধ্যে গর্ত করে হেমন্তের শেষে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো গোল গোল, সাদা, পিংপং বলের মতো। অনেকে কাছিমের ডিম ভেজে খায়। আমরা কখনো খাইনি। চরিত্র আত্মমর্যাদাশীল। কখনো কখনো আত্মসম্মান প্রদর্শনের জন্য ‘রেস’-এ প্রতিযোগিতা করে। আপাতভাবে মনে হয়, পরিশ্রমী কিন্তু অলস। শীতকালে খুব বিলাসী মেজাজে ডাঙায় উঠে রোদ পোহায়। দলবদ্ধ থাকতে ভালোবাসে। এতে মনে হয়, কিছুটা ভিতু। কচ্ছপের মাংস অনেকে খায়। শুনেছি, নরম মাংসের খুব স্বাদ। পৃথিবীর যে কয়টা প্রাণীর নিজের ঘর বা আশ্রয়স্থান নিজেরই শরীরে, তার মধ্যে অন্যতম হলো কচ্ছপ। খুব সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করে। প্রথমে নিজের খোলের মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে মাথাটা বের করে, তারপর ঠান্ডা চোখে চারদিকে তাকায় এবং যখন মনে করে সামনে এগিয়ে যাওয়া নিরাপদ, ঠিক তখনই বুকে ভর দিয়ে চার পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। এগিয়ে যাওয়ার মাঝখানে যদি হঠাৎ বিপদের আভাস পায়, তৎক্ষণাৎ গলাসমেত মাথাটা নিজের খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়; এবং সম্ভবত ভাবতে থাকে আমি বিপদমুক্ত। ভাবনাটা বেশির ভাগ সময় সঠিক হয় না। মানসিকতায় মধ্যবিত্ত, স্মৃতিবিলাসী।

আগেই বলেছি, কাছিম কখনো কখনো ‘রেস’-এ প্রতিযোগিতা করে। অনেক অনেক দিন আগে একবার এক খরগোশের সঙ্গে কাছিমের দৌড় প্রতিযোগিতা হয়েছিল। খরগোশের তাচ্ছিল্যের ভাব দেখে কাছিম খুব রেগে যায় এবং রাজি হয় দৌড় প্রতিযোগিতায়। প্রতিযোগিতা শুরু হলে খরগোশ কয়েক লাফেই অনেক দূর এগিয়ে যায়। বেচারা কাছিম প্রাণপণে দৌড়াতে থাকে। ওর বুকের নরম চামড়া রাস্তায় ঘষা খেতে খেতে রক্তাক্ত হয়ে যায়। হাঁপাতে হাঁপাতে গলা এত দূর পর্যন্ত বের হয় যে দর্শকদের মনে হয়, মুখে গ্যাজা তুলে মরবে এক্ষুনি। এদিকে খরগোশ অনেক দূর গিয়ে বিশ্রাম নিতে ব্যস্ত। ভাবখানা এমন, এই পর্যন্ত আসতেই প্রাণ ফেটে মরে যাবে কাছিম, রেসে জিতবে কী? কিন্তু দর্শকেরা অবাক হয়ে দেখল, গন্তব্যের একেবারে কাছে চলে এসেছে কাছিম। দর্শকদের চিৎকারে বিশ্রাম ভেঙে লাফিয়ে উঠে প্রাণপণে দৌড় দিল খরগোশ। ততক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছে বিজয়ী হয়ে গেছে কাছিম। কাছিমের এই বিজয়ের গল্প শুধু কাছিমকুলই গর্ভভরে নিজেদের উত্তরপুরুষদের কাছে বলে না, মানবসমাজের মধ্যে একটি শ্রেণিও, যারা ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত, বংশপরম্পরায় অনেক বিশেষণ দিয়ে বলে আসছে।
ঘরে কলম খুঁজতে এসে আমাকে দেখে বাবা বললেন, ‘কী পড়ছিস?’ বললাম, ‘হেনা আপার লেখা কাছিমের রচনা।’ ভেবেছিলাম, আমার হাত থেকে ছোঁ মেরে কাগজগুলো নিয়ে নেবেন তিনি। কিন্তু না, তাঁর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল মুহূর্তেই। চোখ দুটি ঠান্ডা। তিনি কেঁদে ফেলবেন নাকি? কিছু না বলে আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন বাবা। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এর মধ্যে বাবার সামনে কলম রেখে মা বলল, ‘তোমার পকেটেই তো ছিল।’ তবে কলমটি ছুঁয়েও দেখলেন না বাবা। শুধু বললেন, ‘ছেলেমেয়েরা কোথায়?’ তাঁকে তখন কি খুব অসহায় দেখাচ্ছিল?
রচনা লেখা কাগজগুলো নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম আমি। সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাস কেন যেন ভালো লাগল। আমাকে চুপচাপ বের হতে দেখে হেনা আপা জানতে চাইল, কী হয়েছে? কোনো উত্তর দিলাম না।
আমার স্কুলশিক্ষক বাবা এখন কী করছেন? আমি জানি, এখন পুরোনো রেডিওতে তিনি বিবিসি শুনছেন। রাত ১০টায় শুনবেন ভয়েস অব আমেরিকা। বিবিসি শোনার পর আমাদের বাসায় থাকা দূরসম্পর্কের চাচার সঙ্গে বিবিসির রাজনৈতিক খবরের চালাকি নিয়ে অনেকক্ষণ আলোচনা করবেন। আলোচনার মধ্যে একসময় এসে পড়বেন বাবার কোনো বন্ধু। রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা হয়তো বা পৌঁছাবে তর্কে। মনে পড়ে, একদিন পাশের বাসার করিম আলী চাচাকে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলেছিলেন বাবা। ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ পাঠক গলায় গর্বভাব তুলে বলেছিলেন, কীভাবে সাদ্দামকে ধরা হয়েছে। আমেরিকার এই কাজকে করিম চাচা সমর্থন করেন। তাঁর সমর্থন জানানোর ধরন বাবার পছন্দ হয়নি। চাচা তাঁর ডান হাতের তর্জনী তুলে এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেন বাবাকে শাসন করছেন। খেপে গিয়ে বাবা বললেন, ‘আঙুল তুলে কথা বলবেন না, জানেন না, এই আঙুল তুলে কথা বলার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান গুলি খেয়ে মরেছেন? তর্জনী দাঁড়ালে সোজা আর বন্দুকের নলও সোজা, দ্বিতীয় বস্তুটি কোনো সোজা জিনিস পছন্দ করে না।’ বাবার এই ব্যাখ্যার সঙ্গে সাদ্দামকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক কোথায়, কে জানে? মা সাধারণত যা করেন না, বাবা ও তাঁর বন্ধুদের আলোচনার মধ্যে যান না, তবে সেদিন গিয়েছিলেন এবং মায়ের কথা শুনে চুপসে গিয়েছিলেন উপস্থিত সবাই, ‘আপনারা আমেরিকার বিরুদ্ধে এত যে বলছেন, কিন্তু আমেরিকার কথা না শুনলে গরিব দেশগুলোর অবস্থা কী হয় জানেন তো?’
একটা মিছিল আসছে। আমি মৌচাকের বিপরীত দিকের ফুটপাতে দাঁড়ালাম। এখান থেকে মিছিলটাকে ভালো দেখা যাবে। কোন দলের মিছিল? ‘কোন’ ‘দল’ শব্দ দুটি একসঙ্গে উচ্চারণ করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্কের মধ্যে কী শব্দ হতে পারে, আঁচ করা যায়। আগামীকাল হরতাল। কেন হরতাল? হরতালের জন্য যে মিছিল হচ্ছে সেই মিছিলে কি আমার যাওয়া উচিত? তাদের দাবি কি আমার দাবি?
সিদ্ধেশ্বরীর গলির ভেতর থেকে কাছিমের মতো ভক্সওয়াগন গাড়িটি মৌচাকের বড় রাস্তায় আসতে গিয়ে মিছিল দেখে দ্রুত পেছনে চলে গেল সশব্দে ব্রেক কষে; ভয় পেলে কাছিম যেমন নিজের খোলে মাথা ঢোকায়, পালায়, ঠিক তেমনি।
রাত সাড়ে আটটা। আকাশে মেঘ। বৃষ্টি নামতে পারে। হাঁটতে হাঁটতে আমি অনেক দূর শান্তিনগর আর কাকরাইল মোড়ের মাঝখানে চলে এসেছি, এখন ফিরতে হবে বাসায়, পশ্চিম রামপুরায়। গত ২১ বছরে আমরা নয়টা বাসা বদলেছি বা বদলাতে বাধ্য হয়েছি। শহরের ভালো এলাকাগুলো থেকে, বড় সড়কগুলোর পাশ থেকে ধাক্কা খেতে খেতে বাবা—আমরা চলে গেছি ভালো বাসা থেকে ক্রমেই খারাপ বাসা আর খারাপ গলির ভেতর।
প্যান্টের পেছন পকেটে হেনা আপার কাছিম-বিষয়ক রচনাটা এখনো আছে। কাগজের মাথার কোনা সুড়সুড়ি দিচ্ছে আমার মেরুদণ্ডের কাছাকাছি। বোধ হয় খুঁজছে মেরুদণ্ড। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ভেবেছিলাম, রচনাটি কুটি কুটি করে ছিঁড়ে রাস্তায় ফেলে দেব। এতক্ষণ কেন যে ওটা পকেটে রেখেছি! তবে এখন ছেঁড়ার আগে রচনাটি পড়তে ইচ্ছে করল আবার। হলুদ সোডিয়াম আলোর নিচে দাঁড়িয়ে দেখছি লেখাটি, এমন সময় চলন্ত রিকশা থেকে এক বন্ধুর গলা, ‘স্বপন, প্রেমপত্র?’ তাকিয়ে ‘না’ বলতেই ভাঙতে ভাঙতে কানে এল দুটি শব্দ, ‘জী-ব-ন-প-ত্র।’
লেখাটি ছিঁড়ে ফেললাম। রাস্তার ধুলোর মধ্যে কাগজগুলো ঘষা খেতে খেতে আমারই গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
মালিবাগ মোড় থেকে রামপুরার বাস ধরলাম আমি। টিপ টিপ বৃষ্টি হয়েছে। বাস থেকে নেমে বাসার গলির মুখে ঢুকতেই মানুষের জটলা। নিম্ন মধ্যবিত্তের সীমাহীন কৌতূহল আমাকে যেন ধাক্কা দিল—কী ঘটতে পারে? ‘নিশ্চয়ই এই পচা ডোবা থেকে উঠে এসেছে...’, ‘তোমরা এত মেরেছ কেন?...’, ‘আহ্ পিঠটা থেঁতলে গেছে...’, ‘বড় রাস্তায় উঠে যেতে চাচ্ছিল বোধ হয়।’—জটলার মধ্যে এই শেষ কথাটি বাবার। তিনি সবাইকে সরে যেতে বলছেন। শিক্ষকের কথা এখনো কোনো কোনো মানুষ শোনে। বাবা বললেন, ‘চারদিকে শান্ত হলেই গলা বের করে পরিস্থিতি বুঝে কচ্ছপটা ডোবার দিকে চলে যাবে।’ বাবার চোখ দেখে মনে হলো, পারলে নিজের হাতে কাছিমের পিঠের ক্ষত মুছে দেবেন তিনি।
পরিবেশ শান্ত হলে দেখা গেল, কাছিমটা তার নিজের খোল থেকে ধীরে ধীরে মাথা আর গলা বের করে অসহায় চোখে একবার মানুষগুলোকে দেখল। তারপর আস্তে আস্তে হাঁটা শুরু করল। কিন্তু বড় রাস্তার দিকে কেন? বাবা রক্তাক্ত, দুর্বল কাছিমকে হাত দিয়ে ডোবার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এখনো ভালো শক্তি আছে, বেঁচে যাবে, জানেন তো কচ্ছপের কিন্তু মেরুদণ্ড নেই।’
টিপ টিপ বৃষ্টিতে বাবা আর আমি বাসায় ফিরছি। শরীর ভেজা। বাবা নিচু স্বরে বললেন, ‘হেনার লেখা রচনাটি কোথায়, কচ্ছপের মেরুদণ্ড সম্পর্কে কি লিখেছে?’

সাংসদপুত্রই তাঁর পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়েছিলেন by নজরুল ইসলাম

বখতিয়ার আলম রনি
সাংসদপুত্র বখতিয়ার আলম রনির লাইসেন্স করা পিস্তল থেকেই গুলি বেরিয়েছিল। অটোরিকশাচালক ইয়াকুবের শরীর থেকে উদ্ধার হওয়া গুলিটির ধরন পয়েন্ট ৩২ বোরের, যা সাংসদপুত্র কিনেছিলেন।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ব্যালাস্টিক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। তবে এই গুলিতেই ইয়াকুব নিহত হয়েছিলেন কি না, সেটি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়নি।
সিআইডি গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এই ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। জব্দ করা অস্ত্র থেকে গুলি বের হয়েছে কি না, সেই গুলিতেই কেউ মারা গেছে কি না, সেগুলো নিশ্চিত হওয়ার পরীক্ষাকে ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন বলে।
প্রতিবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নিহত অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলীর শরীর থেকে উদ্ধার করার সময় গুলিটি ভেঙে যায়। তাই ব্যালাস্টিক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে ভাঙা গুলিটি পয়েন্ট ৩২ বোরের। বখতিয়ার আলমের কেনা গুলিও একই বোরের। আর রিকশাচালক হাকিমের পেট দিয়ে গুলি ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তাঁর শরীরে কোনো গুলি পাওয়া যায়নি।
গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর ইস্কাটনে রিকশাচালক আবদুল হাকিম ও অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী গুলিবিদ্ধ হন। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ডিবি পুলিশ বখতিয়ার আলম ও গাড়িচালক ইমরান ফকিরকে ৩১ মে গ্রেপ্তার করা হয়। ইমরান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, ১৩ এপ্রিল রাতে যানজটে আটকা পড়ে বখতিয়ার এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েন। ৪ জুন বখতিয়ারের লাইসেন্স করা পিস্তল ও ২১টি গুলি জব্দ করা হয়। এরপর পিস্তলের ব্যালাস্টিক প্রতিবেদনের জন্য পিস্তলটি সিআইডিতে পাঠানো হয়। বখতিয়ারের মা সাংসদ ও মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পিনু খান। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে বখতিয়ার বলেন, তাঁর ছোড়া গুলিতে দুই শ্রমজীবী হাকিম ও ইয়াকুব মারা যান।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বখতিয়ার তুরস্কের কেনা লাইসেন্স করা পিস্তল (৭.৬৫) দিয়ে গুলি ছুড়লেও নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেননি। ১৩ এপ্রিল রাতে বখতিয়ার তাঁর মায়ের প্রাডো গাড়ির ভেতর থেকে গুলি ছোড়ার সময় দুই বন্ধু কামাল মাহমুদ ও মো. কামাল ওরফে টাইগার কামাল গাড়িতে ছিলেন। তাঁরা সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। আরেক বন্ধু জাহাঙ্গীর আলমও এ ঘটনায় সাক্ষ্য দিয়েছে।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, সাংসদপুত্রকে রিমান্ডে নিতে আবারও আবেদন করা হবে। পরে তাঁকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার জন্য আদালতে পাঠানো হবে।
দুই বন্ধুর জবানবন্দি: নিউ ইস্কাটনে ১৩ এপ্রিল রাতে যানজটে পড়ে বিরক্ত হয়ে বখতিয়ার পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে দুজন মানুষ মারা যান। গতকাল বখতিয়ারের দুই বন্ধু মো. কামাল ওরফে টাইগার কামাল এবং জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
গুলি ছোড়ার সময় বখতিয়ারের গাড়িতে তাঁর বন্ধু মো. কামাল ও জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন। এর আগের দিন গত বুধবার বখতিয়ার আলমের আরেক বন্ধু আবাসন ব্যবসায়ী কামাল মাহমুদ সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন।
আদালত সূত্র জানায়, জাহাঙ্গীর ও কামালকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির এসআই দীপক কুমার দাস তাঁদের ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে নিয়ে যান। জবানবন্দি দিয়ে পরে তাঁরা বাসায় ফিরে যান।
মামলার তদন্ত ও আদালত-সংলিষ্ট সূত্র জানায়, সাক্ষী জাহাঙ্গীর ও কামাল জবানবন্দিতে বলেন, কল্যাণপুরে একটি জমির বেচাকেনা নিয়ে কথা বলতে তাঁদের বাংলামোটরে শ্যালে বারে ডেকে পাঠান সাংসদপুত্র বখতিয়ার। সেখানে তাঁরা মদপান করেন। তখন বখতিয়ারের সঙ্গে তাঁদের আরেক বন্ধু কামাল মাহমুদ ছিলেন। রাত ১১টায় শ্যালে বার বন্ধ হয়ে যায়। তখন বখতিয়ার তাঁকে সোনারগাঁও হোটেলে মদ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে বন্ধু জাহাঙ্গীরকে বলেন। এতে জাহাঙ্গীর রাজি হলে তাঁরা চারজন (কামাল মাহমুদসহ) বখতিয়ারের প্রাডো গাড়িতে করে সোনারগাঁও হোটেলে আসেন। সেখানে বখতিয়ারের সঙ্গে আবার মদপান করেন।
জবানবন্দিতে তাঁরা বলেন, রাত দেড়টার দিকে তাঁরা সোনারগাঁও হোটেল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠেন। চালক ইমরান গাড়ি চালাচ্ছিলেন। বখতিয়ার বসেন চালকের পাশের আসনে। কামাল মাহমুদসহ তিন বন্ধু পেছনে। প্রথমে জাহাঙ্গীরকে মগবাজার ডাক্তার গলির সামনে নামিয়ে দেওয়া হয়।
কামাল আদালতকে বলেন, রাত পৌনে দুইটার দিকে নিউ ইস্কাটনে এলএমজি টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে গাড়ি যানজটে আটকে যায়। এতে অসহ্য হয়ে বখতিয়ার পিস্তল দিয়ে চার-পাঁচটি গুলি ছোড়েন। গুলি করতে দেখে তাঁরা বখতিয়ারকে বলেন, এটা কী করলা? জবাবে বখতিয়ার বলেন, কিছু হবে না, চুপ থাক।

মুস্তাফিজ নামের বিস্ময় by তারেক মাহমুদ

ভারতের ক্রিকেটার অশ্বীনকে আউট করার পর
এভাবেই আনন্দপ্রকাশ করেন মুস্তাফিজুর।
ছবিটি গতকাল মিরপুরের শের ই বাংলা
স্টেডিয়াম থেকে তোলা। ছবি: এএফপি
সেজো ভাই মোখলেছুর রহমানের কথা খুব মনে পড়ছিল। শীতের ভোরে এই ভাই-ই তো মোটরসাইকেলে চড়িয়ে বাড়ি থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের সাতক্ষীরা শহরে দিয়ে আসতেন তাঁকে অনুশীলনের জন্য! ওয়ানডে অভিষেকেই ৫ উইকেট, সে সুবাদে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কারও উঠে গেল হাতে। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের এমন আলো ঝলমলে রাতে সেই ভাইকে কীভাবে ভুলে থাকেন ১৯ বছর বয়সী মুস্তাফিজুর রহমান!
মুস্তাফিজের মনে পড়ল পরিবারের অন্য সদস্যদের কথাও, যাদের অকৃত্রিম সহযোগিতায় তিনি আজ ক্রিকেটার, বাংলাদেশের ক্রিকেটের উজ্জ্বলতম নবীন তারকা। মনে পড়ল বরেয়া মিলনি স্কুল আর সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের কথা, যেখানে একসময় ফাইভ স্টার বলে ব্যাটসম্যান হিসেবে শুরু তাঁর ক্রিকেটার জীবনের। অনূর্ধ্ব-১৭ ক্রিকেটারদের ক্যাম্পে অংশ নিয়ে প্রথম ঢাকার ক্রিকেট দেখা সেই মুস্তাফিজ বাংলাদেশ দলের আরেকটি ভারত-বধের নায়ক। ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের কেন্দ্রীয় চরিত্রও।
কাছের মানুষদের কাছে মুস্তাফিজ মোটেও লাজুক ছেলে নন। আবার খুব যে হইচই করা ছেলে, তাও না। সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ আর দশটা ছেলের মতোই তাঁর জীবন, চরিত্র। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের মুস্তাফিজকে দেখে কে বলবে সে কথা? যে রাতে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের অমন নাকানিচুবানি খাইয়ে ছাড়লেন, সেই রাতেই কত নিচু তাঁর স্বর! মাইক্রোফোনের সামনে বসেও শ্রোতাদের শোনাতে পারছিলেন না সব কথা। কখনো বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজার রাবীদ ইমাম, কখনোবা অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা মাইক্রোফোন টেনে উত্তর দিয়ে দিচ্ছিলেন তাঁর হয়ে।
পাঁচ উইকেট পাওয়া নিয়ে মুস্তাফিজের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ‘প্রথম ওয়ানডেতে ৫ উইকেট পেয়েছি, তাও ভারতের বিপক্ষে...সে জন্য খুব খুশি লাগছে।’ তা এর মধ্যে কোন উইকেটটা পেয়ে বেশি ভালো লেগেছে? এবার উত্তরটা আরও সংক্ষিপ্ত, ‘সব উইকেট পেয়েই ভালো লেগেছে।’ এক ম্যাচেই বিখ্যাত হয়ে যাওয়া তাঁর স্টক বল ‘কাটার’ নিয়েও অনেক কৌতূহল দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের। মুস্তাফিজ সেটা মেটালেন এভাবে, ‘অনূর্ধ্ব-১৯ দলে থাকা অবস্থায়, এরপর জাতীয় দলের অনুশীলনেও এটা অনেক প্র্যাকটিস করেছি।’ এই প্রশ্নে বাড়তি একটা গল্পও শোনালেন তিনি, ‘প্র্যাকটিসে বিজয় (এনামুল) ভাইয়া আমাকে বলেছিলেন এই বলটা করে দেখতে। করার পর দেখলাম উনি নিজেও এটা খেলতে পারছেন না।’
প্রথম ওয়ানডের একাদশে চার পেসার নেওয়ার মতোই বিস্ময় হয়ে এসেছিল নতুন বলে মুস্তাফিজের প্রথম ওভার করা। রোহিত শর্মা-শিখর ধাওয়ানদের বিপক্ষে এমন গুরুদায়িত্ব পেয়ে ভীষণই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সে জন্য ধন্যবাদ দিলেন অধিনায়ক মাশরাফিকেও। গল্পের বাকিটা বললেন মাশরাফি, ‘আমি অনেক আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম ওকে দিয়ে প্রথম ওভার করাব। কারণ ও একদমই নতুন বোলার, তার কাটারটা খেলা খুব কঠিন। স্পিনারদের বলের চেয়েও বেশি টার্ন করে ওটা। এ ধরনের উইকেটে এই বল খেলা যায় না।’
বাঁহাতি এই পেসারের দলে আসার পেছনেও কাজ করেছে তাঁর বোলিং বৈচিত্র্য। ‘আরাফাত সানির সাম্প্রতিক যা পারফরম্যান্স, ওকে আসলে বাদ দেওয়া যায় না। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল মুস্তাফিজ এখানে সফল হবেই। ওকে বাদ দিলে আমাদের কী ধরনের ক্ষতি হবে, দল নির্বাচনের সময় আমরা বরং সে আলোচনাই বেশি করেছি’—বলছিলেন মাশরাফি। ম্যাচ শেষে ভারত অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনিও পঞ্চমুখ হয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন আবিষ্কৃত এই তরুণ পেসারের, ‘ওর বোলিং বৈচিত্র্য অনেক ভালো। সেটা কাজে লাগিয়েই সফল হয়েছে সে।’
আর তাতেই বিধ্বস্ত পরাক্রমশালী ভারতীয় ব্যাটিং! জেগে উঠছে বাংলাদেশের সিরিজ জয়ের স্বপ্নও। বাংলাদেশ অধিনায়ক অবশ্য একটা ম্যাচ জিতেই আকাশে উড়তে চাইছেন না। এগোতে চান ম্যাচ ধরে ধরেই। তার মানে আপাতত তাদের চোখ ২১ জুনের দ্বিতীয় ওয়ানডের ওপর। কিন্তু ওটা জিতলেই যে জেতা হয়ে যায় সিরিজও! প্রথম ম্যাচে জেতার পর সিরিজে বাংলাদেশের নতুন লক্ষ্যটার কথা কি আর বলে দেওয়ার প্রয়োজন আছে?

ধোনিকে কেন আগে নামতে বলল না শাস্ত্রী

জঘন্য পারফরম্যান্স, না কি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। কাকে দায়ী করব এই হারের জন্য বুঝতে পারছি না। তবে বাংলাদেশ দেখিয়ে দিল, কী ভাবে ভারতের মতো তারকাখচিত দলকেও রীতিমতো নাকানিচোবানি খাইয়ে হারানো যায়। কয়েক সপ্তাহ আগে ঘরের মাঠেই পাকিস্তানকে ওয়ান ডে আর টি-টোয়েন্টিতে হারানোর আত্মবিশ্বাসটাই যেন বৃহস্পতিবার মীরপুরে তামিম ইকবালদের পারফরম্যান্সে ফুটে উঠল।
ওই ঘটনার পরই ভারতের আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল। ওদের মনে রাখা দরকার ছিল ঘরের মাঠে মাশরফিরা বিপজ্জনক হয়ে উঠতেই পারে। কিন্তু ভারতের পারফরম্যান্স দেখে তো মনেই হল না যে, ওরা কোনও সিরিয়াস প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলছে। আগাগোড়া ভাবখানা এমন, যে এখন যা হচ্ছে হোক, পরে ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে। এই ‘পরে ম্যানেজ’ করার প্রবণতাই ডুবিয়ে দিল ভারতকে।
শিখর ধবন-রোহিত শর্মারা ভারতকে ৯৫-০-য় পৌঁছে দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভারতের স্কোরবোর্ডে দেখা গেল ১১৫-৪! বিরাট কোহলি অযথা দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো অফ স্টাম্পের বাইরের একটা বল পেটাতে গিয়ে উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরত চলে গেল। ওর একটু পরেই রোহিত শর্মা। তখনই কিন্তু নামতে পারত ধোনি। দলের ব্যাটিংয়ের এমন বেহাল অবস্থা যেখানে, সেখানে ক্যাপ্টেন আগে ভাগে নেমে দলের হাল ধরবে না কেন? বাংলাদেশের বোলাররা দুর্দান্ত বল করছে বলে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকব! ধোনি আগে উইকেটে এলে রাহানের সঙ্গে বড় পার্টনারশিপ গড়ার অনেকটা সময় পেত।
ধোনি যখন ক্রিজে এল, তখন উল্টোদিকে রায়না। তখনও এই আশায় বসে ছিলাম যে ওরা দু’জনে মিলে হাল ধরে নেবে। ওই সময়ে খেলায় ফিরে আসার সেরা ফর্মুলা হল উইকেটে টিকে থেকে বিপক্ষের আত্মবিশ্বাসী বোলারদের হতাশ করে তোলা। তার পর ব্যাটে ঝড় তোলা। ধোনি ও রায়নার মতো দুই ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে এই চাওয়াটা বোধহয় বাড়াবাড়ি নয়। ওরা যে সেটা পারবে না, এটা ভাবাও কঠিন। কিন্তু সত্যিই পারল না। সাকিবের অনবদ্য বলে আউট হল ধোনি। রায়না প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা মুস্তাফিজুরের বলে ‘প্লেইড অন’। তখনই ভারতের লড়াই প্রায় শেষ।
এ রকম পরিস্থিতিতে ড্রেসিংরুমে থাকা কোচের একটা ভূমিকা অবশ্যই থাকে। এ ক্ষেত্রে টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রীরও নিশ্চয়ই একই ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে দলে যেখানে কোনও চিফ কোচ নেই। শাস্ত্রীরই বলা উচিত ছিল, ক্যাপ্টেনকে পাঁচে নামতে।
ভারতের বিরুদ্ধে ওয়ান ডে-তে বাংলাদেশের তোলা সর্বোচ্চ এটাই। যার পিছনে বাংলাদেশের দুই ওপেনারের কৃতিত্ব যেমন রয়েছে, তেমন ভারতের বোলারদের ব্যর্থতাও কম নয়। কিন্তু তামিম ইকবাল আর সৌম্য সরকারের মতো ব্যাটিং ভারতের তারকা ব্যাটসম্যানরা করতে পারল না কেন, এটাই আমার কাছে বিস্ময়ের। মীরপুরের যা উইকেট দেখলাম, তাতে ৩০৮ তাড়া করে জেতাটা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। কিন্তু কেউ যদি মাঠে নামার আগেই ভেবে বসে থাকে, আমরা জিতে গিয়েছি, তা হলে তো সর্বনাশ। বিপক্ষকে খাটো করে দেখার মাশুলই দিতে হল ধোনিদের। 
মাশুল অবশ্য শুরু থেকেই দিতে হয়েছে। প্রথমে মোহিত, ভূবনেশ্বরের আর উমেশের ব্যর্থতার মাশুল দিতে হল। তিন পেসারে খেলাটাই বোধহয় ভুল হয়েছে। মোহিতের জায়গায় অক্ষর পটেলকে খেলালে বোধহয় সেটা আরও কাজে দিত। রায়না-অশ্বিনদের বোলিং দেখে সে রকমই মনে হল। বাংলাদেশের ইনিংসের একশো রান উঠল ৭৯ বলে! পেসাররা বেদম মার খাচ্ছে দেখে রায়নাকে বোলিংয়ে আনার ধোনির সিদ্ধান্তটা একদম ঠিক। ওই সময় আর একটা স্পিনার হাতে থাকলে কাজে দিত। পেসারদের যা ইকনমি রেট! বিশেষ করে মোহিত। প্রায় সাড়ে এগারো। সেখানে রায়না ১০ ওভারে রান দিয়েছে ৪০। ও না থাকলে সাড়ে তিনশো তুলত বাংলাদেশ।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা