Showing posts with label খাদ্যসমস্যা. Show all posts
Showing posts with label খাদ্যসমস্যা. Show all posts

Thursday, September 19, 2024

খাদ্য সরবরাহে অস্থিরতা তৈরির পাঁয়তারা

খাদ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করছে একটি পক্ষ। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা অস্থিতিশীল করার পেছনে খোদ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর যোগসাজশ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। গত ৫ই  আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর খাদ্য সরবরাহ নিয়ে ঘন ঘন সার্কুলার জারি ও পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত ২৪শে আগস্ট খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ-১ শাখার উপসচিব কুল প্রদীপ চাকমা স্বাক্ষরিত সার্কুলারে বলা হয়, বিভিন্ন কর্মসূচি কাবিখা, ভিডব্লিউবি, ভিজিএফ, ওএমএস, খাদ্যবান্ধব, টিআর, জিআরসহ অন্যান্য রেশনিং খাতে বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্য খাদ্য মন্ত্রণালয় তথা খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুদাম হতে বিতরণ করা হয়। বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্য গুদাম হতে উত্তোলন/বিতরণের জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা/জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে বিতরণ আদেশ (ডিও) জারি করা হয়। খাদ্যশস্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বিতরণ আদেশ (ডিও) জারি করার তারিখেই অর্থাৎ একই কর্মদিবসের মধ্যে গুদাম হতে খাদ্যশস্য বিতরণ/উত্তোলন করা আবশ্যক।
ওই সার্কুলারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বলা হয়। যেমন: খাদ্যশস্যের বিতরণ আদেশ (ডিও) জারি করার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুদাম হতে খাদ্যশস্য বিতরণ/উত্তোলন করতে হবে; বিতরণ আদেশাধীন খাদ্যশস্য কোনোভাবেই গুদামে মজুত রাখা যাবে না; বিতরণ আদেশাধীন খাদ্যশস্য কোনো গুদামে মজুত পাওয়া গেলে অনিয়মের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আবার গত ৯ই সেপ্টেম্বর স্মারক নং ১৭২ মোতাবেক বলা হয়, খাদ্যশস্যের বিতরণ আদেশ (ডিও) জারি করার পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গুদাম হতে খাদ্যশস্য বিতরণ/উত্তোলন করতে হবে। একইসঙ্গে গত ২৪শে আগস্টের পত্রটি বাতিল করা হলো।
এর আগের সার্কুলারে সাধারণত সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার ডেলিভারি আদেশ (ডিও) জারির পর এসব বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মাসের যেকোনো দিন পছন্দমাফিক সময়ে খাদ্য গুদাম থেকে মালামাল উত্তোলন করতে পারতেন। খাদ্য বিভাগের দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে ৫ই আগস্টের পর মালামাল উত্তোলন সংক্রান্ত এমন নির্দেশনা কেন জারি করতে হলো সে সম্পর্কে খাদ্য সচিব কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

ডিলারদের অভিযোগ, এভাবে বার বার সার্কুলার পরিবর্তন করা হলে আমাদের গুদাম থেকে খাদ্য উত্তোলন করা অসম্ভব। মালামাল গুদাম থেকে বের করার জন্য পরিবহন, শ্রমিক ও অফিসের কাগজপত্র তৈরি করার বিষয় থাকে, যা সময়সাপেক্ষ। সার্কুলার জারি করে একদিনেই মালামাল উত্তোলন করা বেশ চ্যালেঞ্জ। এটা নিঃসন্দেহে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার ষড়যন্ত্র।
খাদ্যপণ্য উত্তোলনের নিয়ম: চাল/আটা/গম উত্তোলনের জন্য ডিলারকে চাহিদাপত্র দেয়ার সময় আগের দিনের অবিক্রীত খাদ্যশস্য (যদি থাকে) সমন্বয় করে পরবর্তী দিনের চাহিদাপত্র তৈরি করতে হয়। প্রতিটি দোকানে কমপক্ষে ২ দিনের বিক্রয়যোগ্য খাদ্যশস্য একসঙ্গে উত্তোলন করতে হয়। তবে কোনো ডিলার ইচ্ছা করলে ও সংরক্ষণ সুবিধা থাকলে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ দিনের বিক্রয়যোগ্য খাদ্যশস্য উত্তোলন করতে পারে। বিক্রির দিনে খাদ্যশস্যের মূল্য কমপক্ষে একদিন আগে সরকারি কোষাগারে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে চাল/আটা/গম উত্তোলন করতে হয়। সরকারি গুদাম হতে সরবরাহকালে চাল/আটা/গমের নমুনা গ্রহণ করতে হয়। গুদাম কর্মকর্তা ও ডিলারের যৌথ স্বাক্ষরে সিলগালাকৃত একটি করে নমুনা গুদামে ও অপরটি ডিলারের নিকট সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়।

নাম প্রকাশ না করে একজন ডিলার বলেন, আগের সরকারে সুবিধাভোগী মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের কারণেই এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে।
সাবির্ক বিষয়ে খাদ্য সচিব ইসমাইল হোসেন বলেন, বর্তমানে অফিসিয়াল কাজকর্ম অনেক সহজ হয়েছে। দিনে দিনেই খাদ্য উত্তোলন করা সম্ভব। আর স্বচ্ছতা আনয়নের জন্যই আগেরটা বাতিল করে নতুন নিয়মে সার্কুলার দেয়া হয়েছে। এখানে ষড়যন্ত্র দেখার সুয়োগ নেই।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, খাদ্য সচিব ইসমাইল হোসেন তার সিনিয়রকে সুপারসিড করে সচিব হন। খাদ্য অধিদপ্তরের ডিজি ছিলেন ১০ম বিসিএসের কর্মকর্তা শাখাওয়াত হোসেন। আর ইসমাইল হোসেন এনডিসি নিজে ১১তম বিসিএসের কর্মকর্তা।
সচিব ইসমাইল হোসেন সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনির আস্থাভাজন হিসেবে চাঁদপুরের ডিসির দায়িত্ব পালন করার সময় বালুখেকো সেলিম চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মেঘনা নদী ধ্বংস করে বালু বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আওয়ামী সরকারের পতনের পর খাদ্য অধিদপ্তরের ক্যাডার কর্মকর্তাদের সময়ের আগে বদলি করার অভিযোগ উঠেছে সচিব ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, মাঠপর্যায়ে বদলি বাণিজ্য করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলির তথ্য সংগ্রহের জন্য গত কয়েক দিন আগে জরুরিভিত্তিতে তালিকা দিতে অধিদপ্তরকে পত্র দিয়েছেন ইসমাইল হোসেন। তার এই বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে এজেন্ট হিসেবে খাদ্য অধিদপ্তরের একজন কথিত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে দায়িত্ব প্রদান করেছেন তিনি। বদলি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে মাঠপর্যায়ে বদলি আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানান এই কর্মকর্তারা। মন্ত্রণালয়ে এমন কার্যকলাপে স্থিতিশীল খাদ্য বিভাগ এখন অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসমাইল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, এসব গল্প ভিত্তিহীন। যারা এসব বলছেন তারা আমার বিরুদ্ধে লেগেছে।

mzamin

Friday, September 13, 2024

খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা: এবার বন্ধ হলো ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার উৎপাদন

 - আগেই বন্ধ হয়েছে আরো তিনটি চালু থাকল শুধু ঘোড়াশাল
- ডিসেম্বর পর্যন্ত আছে সারের মজুদ। বোরো ও সরিষা মৌসুম নিয়ে শঙ্কা

অন্তর্বর্তী সরকার কি খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে যাচ্ছে? একের পর এক সারকারখানা বন্ধ, ডলার সঙ্কটে সার আমদানির জন্য এলসি খুলতে না পারায় এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সারের যে মজুদ রয়েছে তা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। এই সার দিয়ে চলমান আমন, আউশসহ অন্যান্য ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কৃষক। কিন্তু ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া দেশের সবচেয়ে বড় রবি মৌসুমে সারের সঙ্কট দেখা দিতে পারে। সে সময় সারের চাহিদা থাকে বেশি। সেই চাহিদা মেটাতে জরুরি ভিত্তিতে ইউরিয়া ও নন ইউরিয়া সার আমদানি করতে হবে। কিন্তু পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যে লুটপাট হয়েছে তাতে দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায়। পাচার হয়েছে অন্তত ১৮ লাখ কোটি টাকা। রিজার্ভ ঘাটতির কারণে ডলার সঙ্কটে ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে পারছে না। এতে কয়েক মাস ধরে বন্ধ আছে সার আমদানি।

এ আশঙ্কার মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের হজরত শাহজালাল সারকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম। এ অবস্থায় আগামী বোরো ও সরিষা মৌসুম নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে খাত সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, এমনিতেই চলমান বন্যায় এবার আউশ ও আমন মিলে প্রায় সাত-আট লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন কম হবে। এ ঘাটতি মেটানোর লক্ষ্যে আগামী বোরো মৌসুমকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল; কিন্তু এলসি সমস্যার সমাধান না হওয়া এবং ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ায় দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে হুমকি দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে যতগুলো সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, যদি সময় মতো সার আমদানি করা না যায়, দেশে উৎপাদন বাড়ানো না যায়, তাহলে কৃষি উৎপাদনে বড় সমস্যা হবে। দেশের খাদ্যনিররাপত্তা হুমকিতে পড়বে।

এ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক কৃষিসেবা বিভাগের ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার (ইউএসডিএ) চলতি মাসের গ্লোবাল অ্যাগ্রিকালচারাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের (গেইন) ‘গ্রেইন অ্যান্ড আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার বন্যায় বাংলাদেশের ২৪টি জেলার প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমির আউশ ও আমন আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার এই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের চাল উৎপাদনে। এবার আউশ মৌসুমে তিন লাখ টন এবং আমন মৌসুমে চার লাখ টন, সব মিলিয়ে চালের উৎপাদন কম হতে পারে সাত লাখ টন। এতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় পাঁচ লাখ টন চাল আমদানি করা লাগতে পারে।

মার্কিন কৃষি বিভাগ বলছে, গত অর্থবছরে এক কোটি ৪৬ লাখ টন আমন চাল উৎপাদন হলেও চলতি অর্থবছরে তা এক কোটি ৪২ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। এ ছাড়া আউশের উৎপাদন ২৪ লাখ টন থেকে ২১ লাখ টনে নামতে পারে। সবমিলিয়ে এ দুই মৌসুমে চালের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে সুখবর থাকবে আগামী বোরো মৌসুমে। বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন পাঁচ লাখ টন বাড়তে পারে। এ মৌসুমে মোট চালের উৎপাদন দুই কোটি টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দুই কোটি পাঁচ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে। সবমিলিয়ে আগামী মৌসুমে চালের উৎপাদন হতে পারে তিন কোটি ৬৮ লাখ টন; গত অর্থবছরে যা ছিল তিন কোটি ৭০ লাখ টন। ফলে তিন মৌসুম মিলিয়ে দেশে চালের উৎপাদন কমতে পারে দুই লাখ টন।

বন্ধ হলো ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানার উৎপাদন : জানা যায়, একসময় নিজস্ব উৎপাদিত ইউরিয়া সার দিয়েই দেশে কৃষি আবাদের চাহিদা মিটতো। আমদানি করতে হতো শুধু নন ইউরিয়া সার। কিন্তু গ্যাস সঙ্কটের কারণে গত ছয় মাসে দেশের পাঁচটি সারকারখানার মধ্যে তিনটিই বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ গতকাল সকালে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয় সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের হজরত শাহজালাল সারকারখানা। বিসিআইসি’র পরিচালক (উৎপাদন) শাহীন কামাল জানান, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হন তারা। এই কারখানা থেকে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টন ইউরিয়া সার উৎপান হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। প্রায় ছয় মাস আগে বন্ধ হয়ে যায় জামালপুরের সরিষাবাড়ি যমুনা সারকারখানার উৎপাদন। প্রায় একই সময়ে বন্ধ হয়ে যায় আশুগঞ্জ সারকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম। তার আগে বন্ধ হয় চট্টগ্রামের সিইউএল সারকারখানার উৎপাদন। এখন শুধু চালু আছে ঘোড়াশাল (পলাশ) সারকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম।

বিসিআইসি সূত্রে জানা যায়, পাঁচটি সারকারখানা থেকে প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার ৫০০ টন থেকে সাত হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদন হতো; কিন্তু বন্ধ হতে হতে দেশের ইউরিয়া সার এখন নন ইউরিয়ার মতোই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

বিসিআইসি ও বিএডিসি সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে চার লাখ ৩৫ হাজার টন ইউরিয়া সার মজুদ রয়েছে। নন ইউরিয়ার মধ্যে টিএসপি প্রায় তিন লাখ টন, ডিএপি সাড়ে তিন লাখ টন এবং এমওপি মজুদ আছে প্রায় চার লাখ টন। মজুদ থাকা ইউরিয়া ও নন ইউরিয়া দিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন কৃষি সচিব ড. মো: এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। গত ৮ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে নিজ কক্ষে বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচার রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএআরএফ) কার্যনির্বাহী কমিটির সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, ‘সারের বর্তমান মজুদ দিয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো যাবে। তবে সার আমদানির এলসি খোলার ক্ষেত্রে এখনো কিছুটা সঙ্কট রয়েছে, যেটা আমরা সমাধানে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি।’

বন্যার কারণে দেশ খাদ্যঘাটতিতে পড়বে কি না- জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘আগামী মৌসুমে বোরো উৎপাদনে কোনো সমস্যা না হলে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কোনো সঙ্কট হবে না। তাই এখন আমাদের টার্গেট, আগামী বোরো মৌসুমে ভালো উৎপাদন করা।’

বিসিআইসি ও বিএডিসি সূত্রে জানা যায়, ডলার সঙ্কটের কারণে ব্যাংকে এলসি খোলা যাচ্ছে না। গত তিন মাস যাবৎ সার আমদানি বন্ধ আছে। প্রায় সাত-আট লাখ টন নন ইউরিয়া (টিএসপি, ডিএপি এমওপি) সার আমদানির জন্য টেন্ডার হলেও এলসি সমস্যার সমাধান না হওয়ায় আমদানিকারকদের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। আমদানির সাথে যুক্ত একজন জানান, এই মুহূর্তে যদি এলসি সমস্যার সমাধানও হয়, এরপরও রবি মৌসুমের শুরুতে সার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম গতকাল সন্ধায় নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার ইতোমধ্যে ৬০ হাজার টনের বেশি সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া সারও রয়েছে। আমদানি করতে হলে যে টাকা লাগে দেশে উৎপাদন করলে তা অনেক কমে করা যায়। তিনি বলেন, দেশের পাঁচটি সারকারখানা সচল রেখে ইউরিয়া সার পুরোদমে উৎপাদন করলে ৩০-৩২ লাখ টন উৎপাদন করা যায়। এটি হলে আর আমদানি করতে হয় না; কিন্তু এখন গ্যাস সরবরাহ না থাকায় পাঁচটি কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ হয়ে গেছে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত এই কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, একসময় ইউরিয়া সারের চাহিদার বেশির ভাগই আমরা উৎপাদন করতাম। এখন ৩০ শতাংশেরও কম উৎপাদন করতে পারি। তা-ও আবার আরেকটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। বিসিআইসি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ইউরিয়া উৎপাদন করতে। আমদানির জন্য তো বিসিআইসি প্রতিষ্ঠা হয়নি; কিন্তু এখন সেটিই হচ্ছে। এটা ভালো কথা নয়।

তিনি বলেন, যেখানে আমাদের সারকারখানা আছে। উৎপাদনে আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। গ্যাস ব্যবহার অন্য জায়গায় কমিয়ে সার উৎপাদন করতে হবে। উৎপাদন না করে কেন আমদানিতে বড় আকারের অর্থ খরচ করা হচ্ছে প্রশ্ন রাখেন তিনি।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সারের যে মজুদ আছে তা দিয়ে হয়তো এই সিজন চলবে; কিন্তু সামনে রবি মৌসুম। তিন মাস পরেই বোরো মৌসুম আসছে। সরিষাসহ অন্যান্য আবাদ রয়েছে এ মৌসুমে। এখন যদি সার উৎপাদনে নজর না দিই বা বিদেশ থেকে আমদানি না করি বা সঠিক সময়ে যদি চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া না যায় তাহলে উৎপাদন কমবে। দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটবে।

Thursday, January 4, 2018

মুখরোচক কিন্তু মারাত্মক এই পিঠা!

জাপানে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর অংশ হিসাবে যে চালের পিঠা খাওয়ার প্রথা অনেকদিনের, সেই পিঠা খেয়ে এ বছরও মারা গেছে দু'জন। আহত হয়ে সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছেন আরো বেশ অনেকজন। মুখরোচক এই চালের পিঠা দেখে মনে হবে না এটা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু প্রতিবছর এই খেতে-কঠিন পিঠা বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবছরই নতুন বছরের আগে সরকারকে পিঠা খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক বার্তা জারি করতে হয়।
কী আছে এই মোচি পিঠায়?
মোচি নামে এই ছোট গোল আকৃতির পিঠাগুলো বানানো হয় নরম কিন্তু আঠালো একরকম চাল দিয়ে। এই চাল প্রথমে ভাপে সিদ্ধ করা হয়, তারপর তা গুঁড়ো করে মেখে মণ্ড বানানো হয়। এরপর আঠালো ওই ভাতের মণ্ড থেকে গোলাকৃতি পিঠাগুলো গড়া হয় এবং সেগুলো হয় চুলায় বেক করা হয় বা সিদ্ধ করা হয়। পরিবারগুলো প্রথাগতভাবে সবজি দিয়ে তৈরি পাতলা ঝোলের মধ্যে ফেলে এই মোচিগুলো সিদ্ধ করে।
কিন্তু মোচি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে কেন?
মোচি পিঠাগুলো আঠালো এবং চিবানো কঠিন। মোচি যেহেতু মুখে পুরে চিবানোর মত ছোট সাইজের নয়, তাই এই পিঠা গেলার আগে ভাল করে তা চিবানোর প্রয়োজন হয়। এই পিঠা চিবাতে হয় অনেকক্ষণ ধরে। কিন্তু যারা ভালো করে চিবাতে পারে না, যেমন শিশু বা বয়স্ক মানুষ - তাদের জন্য এই পিঠা খাওয়া খুবই কঠিন। এই পিঠা চিবানো যাদের জন্য কষ্টকর, তাদের পিঠা ছোট ছোট করে কেটে খাবার পরামর্শ দিচ্ছেন জরুরি স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্বে আছেন যারা তারা। যারা চিবাতে পারে না বা না চিবিয়ে এই পিঠা গিলে খাওয়ার চেষ্টা করে, এই আঠালো মোচি তাদের গলায় আটকে যায় এবং এর ফলে তাদের দমবন্ধ হয়ে যায়। জাপানী সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নববর্ষের এই পিঠা গলায় লেগে দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যাদের জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে ছুটতে হয়, তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ৬৫ বা তার বেশি।
নিরাপদে মোচি খাবার উপায় কী?
চিবানো- ভালো করে চিবিয়ে পিঠা খাওয়া। আর কারোর জন্য যদি সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে পিঠা ছোট ছোট টুকরো করে কেটে খাওয়া নিরাপদ। প্রতিবছর ইংরেজি নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে উৎসব পালনের আগে কর্তৃপক্ষ জনস্বাস্থ্য হুঁশিয়ারি জারি করে, বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের জন্য যাতে তারা মোচি পিঠা কেটে ছোট ছোট টুকরো করে সেগুলো খায়। তবে সতর্কবার্তা সত্ত্বেও প্রতি বছর এই রান্না করা পিঠা খেয়ে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। নিহতের সংখ্যা বিশাল না হলেও সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিবছর যত মানুষকে হাসপাতালে নিতে হয় তার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

Thursday, October 8, 2009

জনসংখ্যা বৃদ্ধি যখন খাদ্যনিরাপত্তার হুমকি -খাদ্যসমস্যা by এ জেড এম আবদুল আলী

তখন তিনি মেক্সিকো সিটি শহরের কাছেই একটি গমক্ষেতে গমের ফলন পরীক্ষা করে দেখছিলেন। তাঁর স্ত্রী মার্গারেট গাড়ি চালিয়ে তাঁর কাছে এসে বললেন, তুমি নোবেল পুরস্কার পেয়েছ। উনি স্ত্রীকে বললেন, কেউ তোমার সঙ্গে মশকরা করেছে, এসব গুজবে কান দিয়ো না। একটু পর তাঁর স্ত্রী আবার তাঁর কাছে এসে বললেন, না, খবরটি সত্যি। সত্যিই তোমাকে এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। উনি সেই নোবেলজয়ী নরম্যান বোরল্যগ (Dr. Norman Borlaug), তখন বললেন, দাঁড়াও, উত্সব একটু পরে করা যাবে। এর আগে আমি এই গমের গুণগত মানটি পরীক্ষা করে ফেলি।
নরম্যানের বয়স তখন মাত্র ৫৬। এই বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া মানুষটি ষাটের দশকে তাঁর গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীল গমের আবিষ্কার করে বিশ্বের জনগণকে আসন্ন দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। এখন যাকে আমরা ‘সবুজ বিপ্লব’ বলে থাকি, সেই বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন এই মানুষটিই। জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালে দাদা-দাদির খামারে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্যে। তাঁর মা-বাবাও একই সঙ্গে থাকতেন। খুব অবস্থাপন্ন ছিলেন না। তাই লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে তাঁকেও ক্ষেতে গিয়ে বাবার সঙ্গে কাজ করতে হতো। তখনই তাঁর মনে প্রশ্নের উদয় হয়, কোনো কোনো ক্ষেতে গমের ফসল ভালো হয় কেন, আবার কোনো কোনো ক্ষেতে ফসল মোটেও ভালো হয় না? দাদা-দাদি, মা-বাবা এবং অন্য কৃষকদের প্রশ্ন করে তিনি কোনো সদুত্তর পাননি। এই সময়েই তাঁর লেখাপড়া ছেড়ে দেওয়ার কথা। কেননা সেই সময়ে কৃষকের সন্তানের পক্ষে স্কুল-কলেজে পড়তে যাওয়াটা বিলাসিতা বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু তাঁর দাদা নিজে লেখাপড়া করতে পারেননি বলে তাঁর মনে একটা দুঃখ ছিল। তাই তিনি তাঁর এই মেধাবী নাতিকে লেখাপড়া ছাড়তে দেননি। তা ছাড়া বরাবর বৃত্তি পাওয়ায় তাঁর পরিবারের কোনো বাড়তি খরচ পড়েনি ওঁর পড়ালেখার কারণে। কাজেই তরতর করে সব পরীক্ষায় পাস করে ফেললেন তিনি। ওই সময় ত্রিশের দশকের সেই মহামন্দা চলছে। এরই মধ্যে তিনি মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। পথেঘাটে অজস্র ক্ষুধার্ত মানুষ দেখাটি তাঁর মনে এক চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়। কেন ফসল হয় না, কেন মানুষ খেতে পায় না ইত্যাদি প্রশ্ন তাঁকে অস্থির করে তোলে।
প্রথমে তিনি পড়তে শুরু করেছিলেন ফরেস্ট্রি বা বনরক্ষণবিদ্যা। পরে তাঁর একজন অধ্যাপক তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেন প্লান্ট প্যাথলজি পড়তে। তিনি সেই বিষয়ে পড়ে একটি ডক্টরেট উপাধি নিয়ে ফেলেন। পাস করে তিনি প্রথমে ১৯৪২ সালে যোগ দেন বিখ্যাত কোম্পানি ডু পন্টে (Du Pont)। সেই কোম্পানি তখন নানা ধরনের রাসায়নিক যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করছিল। আবার তাঁর জীবনে উদয় হন তাঁর অধ্যাপক এলভিন সি স্ট্যাকম্যান (Elvin C. Stakman)। তিনি নরম্যানকে বলেন ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে রকফেলার ফাউন্ডেশনের মেক্সিকান হাঙ্গার প্রকল্পে যোগ দিতে। তিনি তা-ই করেন। তখন রাস্ট ফাঙ্গাস নামের এক ধরনের ছত্রাক মেক্সিকোয় গমের ক্ষেতগুলো নষ্ট করে দিচ্ছিল। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের গমের মধ্যে সংকরায়ণ ঘটিয়ে অবশেষে এক ধরনের গমের বীজ সৃষ্টি করলেন, যাতে রাস্ট ছত্রাক বাধাপ্রাপ্ত হয় না। তাঁর এই সাফল্যে মেক্সিকোর খাদ্যাভাব তখনকার মতো ঘুচে গেল। কিন্তু তখনো তাঁর সামনে অনেক সমস্যা। তিনি দেখলেন যে গমের চারাগুলো অনেক লম্বা হয়, ফলে গমের ভারে সেগুলো নুয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তখন নানা রকমে কীট এসে সেগুলো খেয়ে ফেলে।
এবার তাঁর প্রচেষ্টা শুরু হয় নানা রকমের রাসায়নিক ফার্টিলাইজার নিয়ে। বিভিন্ন ধরনের গমের সংকরের সঙ্গে রাসায়নিক সার যোগ করে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে দিনের পর দিন। ১৯৫৩ সালের দিকে তিনি এক ধরনের গমের চারা সৃষ্টি করলেন, যেগুলো বেশি লম্বা হয় না। খানিকটা বেঁটে-খাটো এই চারাগুলোতে অনেক গমের দানা ফলাতে সক্ষম হলেন তিনি। যেহেতু চারাগুলোর গোড়া বেশ মোটা ও শক্ত, সেই কারণে গমের দানা যত বেশিই হোক, চারাগুলো ঠিকই দাঁড়িয়ে থাকে। এরই ফলে দেখা গেল যে একই জমিতে এই বেঁটে গমের চাষ করে তিনি দ্বিগুণ, ত্রিগুণ এমনকি চার গুণ বেশি ফসল ফলাতে সক্ষম হলেন। চল্লিশের দশক থেকে ষাটের দশকের মধ্যে মেক্সিকোর খাদ্য উত্পাদন ছয় গুণ বেড়ে গেল। তাঁর এই সাফল্যই সবুজ বিপ্লবের সূচনা করল গোটা পৃথিবীতে। এই সময়ে রকফেলার ফাউন্ডেশন তাঁকে ফিলিপাইনের ধান গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁর প্রযুক্তি ব্যবহার করতে বললেন। নরম্যানের প্রযুক্তি ফিলিপাইনের ধানেও অভাবনীয় ফলন ফলাতে সক্ষম হলো। একই প্রযুক্তি ভারতে ধানের ক্ষেতেও প্রয়োগ করে একই ফল পাওয়া গেল। দুটি দেশই অচিরে খাদ্যঘাটতি থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠল। ১৯৬৮ সালে ভারতে গমের ফসল এত বেশি হয়েছিল যে, সে বছর দেশের অনেক স্কুল বন্ধ করে দিয়ে সেই স্কুলঘরকে গমের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সারা বিশ্ব থেকে বোরল্যগের ডাক আসতে লাগল ধান, গম, ভুট্টা চাষে তাঁর পদ্ধতি কাজে লাগানোর জন্য। বোরল্যগও যতটা সম্ভব সেই ডাকে সাড়া দিতে লাগলেন। এক দুনিয়া-কাঁপানো বিপ্লবের সূচনা হলো সর্বত্র। মানুষের প্রাণে এক নতুন ভোরের উদয় হলো। অবশ্য ডক্টর বোরল্যগের কয়েকজন সমালোচকও দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন এই সময়। তাঁরা বলেছিলেন, নরম্যান এই নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করে শেষ পর্যন্ত মানুষের ক্ষতিই করলেন। কেননা কৃষকেরা সনাতন পদ্ধতির চাষবাস ভুলে গেলে শেষে ক্ষতিই হবে পৃথিবীর। তাঁর চাষের পদ্ধতি সমাজ ও পরিবেশের ক্ষতি করবে। কৃষকদের অতিমাত্রায় রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে। বামপন্থীরা বললেন, তিনি ছোট ছোট কৃষকের সর্বনাশ করে ফেলেছেন। কৃষিকর্মের ওপর বড় বড় করপোরেশনের প্রভাব সৃষ্টি করার ফলে ক্ষুদ্র কৃষকের কর্মসংস্থান বিপন্ন করেছেন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭০ সালে তাঁকে দেওয়া হলো নোবেল শান্তি পুরস্কার। নোবেল পুরস্কার গ্রহণের বক্তৃতায় তিনি এসব সমালোচনার জবাব দিলেন এই বলে যে, আসল সমস্যাটি হচ্ছে পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যদি কমানো না যায়, তাহলে কোনো প্রযুক্তি বা কোনো পদ্ধতির চাষবাসই শেষ পর্যন্ত মানুষ ও পৃথিবীকে বাঁচাতে পারবে না। অনেক দেশেই আজ খাদ্য যা উত্পাদিত হচ্ছে, এর চেয়ে খাওয়ার লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ফলে খাদ্যসংকট আবার হবে, আবার মানুষকে না খেয়ে থাকতে হবে। নরম্যান বোরল্যগ তাঁর জীবদ্দশাতেই নিজের ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যেতে দেখলেন। ২০০৭ সালে সারা পৃথিবীতে যে খাদ্যসংকট সৃষ্টি হয়েছিল, এর হাত থেকে পৃথিবীর অনেক দেশই আজ মুক্তি পায়নি। চীন, ভারত, ব্রাজিল, মেক্সিকো—সব দেশেই আবার খাদ্যসংকট ফিরে এসেছিল সে বছর। প্রকৃতপক্ষে সেই মন্দাবস্থা থেকে পৃথিবী আজও মুক্তি পায়নি।
আমাদের বাংলাদেশেও সেই সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এই সামান্য ভূখণ্ডে এখনই প্রায় ১৬ কোটি মানুষ হয়েছে। এসব মানুষকে খাওয়াতে হলে যে পরিমাণ খাদ্যশস্যের প্রয়োজন, কোনো প্রযুক্তিতেই আর তা উত্পাদন করা সম্ভব হবে না। অচিরে জনসংখ্যার গতি রোধ না করতে পারলে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সামনে সমূহ বিপদ উপস্থিত হতে বাধ্য। সৌভাগ্যক্রমে এ কথা এখন সবাই, বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার স্বীকার করছে। কাগজে দেখা গেল (প্রথম আলো, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০৯), সংসদের ডেপুটি স্পিকার অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল শওকত আলী বলেছেন, ‘জনসংখ্যাই এক নম্বর সমস্যা বাংলাদেশের।’ জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বঙ্গবন্ধু ও বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় সবাই একমত হয়েছেন যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্জন সম্ভব এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণই আমাদের সর্বাপেক্ষা বড় সমস্যা। সত্যি কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এ সমস্যা এখন বিশ্বব্যাপী। খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে হবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি অনুযায়ী এ মুহূর্তে পৃথিবীতে ১০০ কোটি নিরন্ন মানুষ রয়েছে।
ডক্টর নরম্যান বোরল্যগ তাঁর নোবেল বক্তৃতায় ঠিকই বলেছেন। এই মহান ব্যক্তিটি দিনকয়েক আগে গত শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ৯৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশ্বের মানুষকে জনসংখ্যা সম্পর্কে সচেতন করতে এই ব্যক্তির অবদান অতুলনীয়। অষ্টাদশ শতকে বিশপ ম্যালথাস জনসংখ্যা বৃদ্ধি বিষয়ে একটি সাবধানবাণী করেছিলেন। তবে তিনি সমস্যাটি সমাধানের কোনো বিশেষ পথ দেখাননি। বিংশ শতকে মনীষী নরম্যান বোরল্যগ এ সমস্যার সমাধান হাতেনাতে করে দেখিয়েছেন। মানবজাতিকে গত শতকের ষাটের দশকে তিনি আসন্ন দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁর উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল খাদ্যশস্য মানুষকে সেদিন বাঁচালেও মানবজাতি সাবধান না হলে এ বিপদ আবার আসতে পারে—এই সাবধানবাণী তিনি সেই ১৯৭০ সালেই করেছিলেন। আমরা আজ এই প্রয়াত কৃষিবিজ্ঞানীর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
এ জেড এম আবদুল আলী: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।