Showing posts with label টাঙ্গাইল. Show all posts
Showing posts with label টাঙ্গাইল. Show all posts

Wednesday, May 14, 2025

ছাত্র আন্দোলনে নিহত হাফেজ সাদিক এখন শুধুই স্মৃতি

মো. সাদিক। একজন পূর্ণাঙ্গ হাফেজ। তার মধুর কণ্ঠের তিলাওয়াত শুনে সহপাঠীরা অনুকরণ করতেন তাকে। স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে মাওলানা হয়ে মায়ের দুঃখ-কষ্ট দূর করে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা আনবে। সে স্বপ্ন বুকে নিয়ে টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদের তরুণ সাদিক পাড়ি জমিয়েছিল ঢাকা শহরে কেবল পড়াশোনা করতে নয়, একজন আলোকিত মানুষ হতে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের পথে বুকভরা আশা নিয়ে তার এই পথচলা থেমে গেল অকালেই, ঢাকা শহরে পা রাখার কয়েক বছরের মধ্যেই ইতি ঘটলো তার যাবতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া-পাওয়ার। জীবনের সমস্ত স্বপ্ন-সাধ, সম্ভাবনা আর মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর অতৃপ্ত বাসনা পেছনে ফেলে সে এখন শুধুই একটি স্মৃতি। ‘শহীদ’ নামের এক ভারী পরিচয়ে ঢাকা পড়েছে হাফেজ সাদিকের, সমস্ত অপূর্ণ স্বপ্ন, অপরিমেয় সম্ভাবনা আর লালিত বাসনা।

উচ্চশিক্ষা নিয়ে স্বপ্ন পূরণের আগেই মাত্র ২২ বছর বয়সে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়ে শহীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছে সাদিক। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গণ-অভ্যুত্থানের সেই উত্তাল সময় ২৬শে জুলাই শুক্রবার ২০২৪ ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ব্যাপকভাবে রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেদিন জুমার নামাজ শেষে সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন সাদিক। এ সময় পুলিশ মিছিলে গুলিবর্ষণ করলে একটি গুলি সাদিকের পিঠ ভেদ করে নাভির পাশে আটকে যায়। নিভে যায় দুখিনী মায়ের স্বপ্ন।
পরিবারের লোকজন সেদিন অনেক খোঁজাখুঁজি করেও খবর পাননি। পরদিন ২৭শে জুলাই শনিবার উত্তরা আধুনিক মেডিকেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি গুলিবিদ্ধ লাশের পরিচয় না পেয়ে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
লাশের শরীরে ইসলামী পোশাক ও চেহারা-সুরত দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আশপাশের মাদ্রাসাগুলোতে খবর দেয়। খবর পেয়ে আবদুল্লাহপুর উত্তরা জামিয়া দীনিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার সুপার গিয়ে সাদিকের লাশ শনাক্ত করেন। পরে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল হাসপাতাল থেকে তার লাশ টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ফুলবাড়ীয়া করিমগঞ্জ ঘোনা পাড়া এলাকায়  পৌঁছে দেয়া হয়।
সাদিকের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সাগরদীঘি ইউনিয়নের ফুলবাড়ীয়া করিমগঞ্জ ঘোনাপাড়া গ্রামে। সরজমিন কথা হয় সাদিকের মা শাহনাজ বেগমের সঙ্গে। তার মুখে ছড়িয়ে রয়েছে বিষণ্নতার ছাপ। সাংবাদিক এসেছেন শুনে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময় কথা হয় প্রতিবেদকের সঙ্গে। শাহনাজ বেগম (৫৫) জানান, সাদিকের বাবা লুৎফর রহমান লেবু একজন কুয়েতপ্রবাসী। তিন ছেলের মধ্যে সাদিক ছিল দ্বিতীয়। বড় ছেলে শামীম সিঙ্গাপুরপ্রবাসী এবং ছোট ছেলে শাহেদ ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। সাদিক সখিপুরের আড়াইপাড়া মাদ্রাসা থেকে হাফেজী শেষ করে ঢাকার আবদুল্লাহপুর জামিয়া দীনিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় হাদিস বিষয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করছিল।
সাদিকের মা মানবজমিনকে বলেন, ‘সাদিক প্রায়ই বলতো, ‘মা, তুমি সংসারের জন্য এত কষ্ট করো, সেটা দেখতে আমার আর ভালো লাগে না। আমি বড় মাওলানা হলে তখন আর তোমাকে কোনো পরিশ্রম করতে দেবো না। বাড়িতে টিনের ঘরটা আমি বিল্ডিং বানিয়ে দেবো। তুমি শুধু নামাজ পড়বে আর ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবে। এটাই ছিল সাদিকের সঙ্গে আমার শেষ কথা। আমার ছেলেকে আমি আর ফিরে পাবো না।’ এ কথা বলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমার শহীদ পুত্র সাদিক পবিত্র কোরআনের হাফেজ। সে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছে ও দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। আল্লাহ্‌ তা’আলা তাকে শহীদের মর্যাদা দেবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। সময় তিনি কেঁদে  বলেন, শেখ হাসিনার নির্দেশেই পুলিশ আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। আমি চাই, সরকার দোষীদের বিচারের আওতায় আনুক। আমি আমার জীবদ্দশায় হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেখে যেতে চাই।
সাদিকের ছোট ভাই শাহেদ বলেন, ভাইয়া খুব ভালো মানুষ ছিলেন। মাওলানা হয়ে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল ভাইয়ার। সেটি পূরণ হলো না। যারা আমার নিরপরাধ ভাইকে নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে, তাদের যেন এ দেশের মাটিতেই বিচার হয়। তাহলেই আমার ভাইয়ের আত্মা শান্তি পাবে। সাদিকের চাচা মো. মাসুদ জানান,  সাদিকের মৃত্যুর পর ওর মা শাহনাজ বেগম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ছেলে সাদিককে খুব ভালোবাসতেন তিনি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘাটাইলের অন্যতম সমন্বয়ক রাকিবুল হাসান রাকিব জানান, শত শত শিক্ষার্থী শহীদ হয়েছে এই আন্দোলনে। তাদের মধ্যে আমাদের ঘাটাইল উপজেলার হাফেজ সাদিক অন্যতম। আমাদের চাওয়া, সাদিকের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার পাশাপাশি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। এ ব্যাপারে ঘাটাইল উপজেলার নির্বাহী অফিসার মো. আবু সাঈদ বলেন,  হাফেজ সাদিক দেশের গর্ব। সে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। তিনি আমাদের অকুতোভয় বীর।

mzamin

Tuesday, March 4, 2025

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন: শরীরে ৩০০ গুলি, পরিবার নিয়ে অসহায় সুজন

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট, ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক বিজয়ের দিন। সেদিন স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে সারা দেশের ন্যায় রাজধানী ঢাকার বাড্ডা এলাকায় ঘেরাও কর্মসূচি ছিল ছাত্র-জনতার। সেই কর্মসূচিতে সকাল ৯টায় অংশ নেন সিএনজিচালক সুজন। শুধু তিনিই নয়, তার মতো হাজারো ছাত্র-জনতা কর্মসূচিতে জড়ো হয়। সকাল ১০টার দিকে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হলে এক ছাত্র আহত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়লে সুজন জীবন বাজি রেখে সেই ছাত্রকে উদ্ধারে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে যায় এবং গুলি তারও সারা শরীরে লাগে। গুলি লাগার পর সে অসচেতন হয়ে বিকাল পর্যন্ত পড়ে থাকে। সে সময় বাড্ডার রাজপথে পুলিশের গোলাগুলি চলমান থাকায় তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিকাল ৪টার দিকে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ঢাকার আফতাব নগর নাগরিক হাসপাতালে নেন আন্দোলনকারীরা।

এরপর ওই হাসপাতালে আহত সুজন চিকিৎসা না পেলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়, কিন্তু সেখানেও অতিরিক্ত হতাহতদের চিকিৎসার কারণে ভর্তি করা হয়নি। তারপর সেখান তাকে নিয়ে আসা হয় তার গ্রামের বাড়ি। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারিভাবে তাকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করলেও পরিবারের উপার্জনসক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় অর্থাভাবে পথে বসতে হয় তাকে। অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে জীবিকানির্বাহ করলেও তার খোঁজখবর কেউ নেননি বলে জানায় সুজন। এখন সে খেয়ে-না খেয়ে পরিবার নিয়ে দিনযাপন করছে। সুজন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অলোয়া ইউনিয়নের আকালু গ্রামের মৃত আনছের আলীর ছেলে। প্রাইমারিতে পড়ার সময় বাবাকে হারালে পরিবারের হাল ধরতে পড়াশোনা বন্ধ করে রিকশা চালানোর উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায় রাজধানী ঢাকায়। রিকশা চালানোর পাশাপাশি স্থানীয় জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন।
সুজন বলেন, জুলাই বিপ্লবের আন্দোলনে অন্যদিনের মতো ৫ই আগস্ট সকাল ৯টার দিকে বাড্ডা থানা ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করি। সকাল ১০টার দিকে পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি করে। পুলিশ আমাদের ওপর একতরফা গুলিবর্ষণ করে। একপর্যায়ে পুলিশের ছররা গুলির ২৯৬টি স্প্লিন্টার আমার শরীরে লাগে। আমি অচেতন অবস্থায় দেয়ালের পাশে পড়ে থাকি। পরদিন সকালে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমার জ্ঞান ফিরে। আমার শরীরে এখনো স্প্লিন্টার রয়েছে। আমি চলাফেরা করতে পারি না। ক্রাচের মাধ্যমে হাঁটলেও ব্যথা বেড়ে যায় ও শরীর ফুলে শক্ত হয়। কেউ খোঁজ নেয় না। এমন অবস্থায় উন্নত চিকিৎসা ও আর্থিক সহযোগিতার অনুরোধ করেন তিনি।
সুজনের স্ত্রী নূপুর বলেন, আহত হওয়ার পর থেকে সংসারে কোনো আয় নেই। এখন খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে। এদিকে সন্তানদের লেখাপড়াও বন্ধ হওয়ার পথে। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক মাস আগে উপজেলা থেকে কিছু সাহায্য পেয়েছিলাম যা আমাদের বেশ উপকার হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে আহত স্বামীর চিকিৎসা ও সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারছি না।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোছা. পপি খাতুন বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এ উপজেলায় একজন নিহত ও তালিকামতে ১৬ জন আহত রয়েছে। এর বাহিরেও আহত থাকতে পারে। নিহত ও আহতদের পরিবারকে সরকারি ও ব্যক্তিভাবে সহযোগিতা প্রদান করে আসছি। আহতদের মধ্যে অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারিভাবে এখনো আহতের কর্মসংস্থানের কোনো নির্দেশ আসেনি। তবে, তারা যাতে কোনো সমস্যায় না পড়ে সে ব্যাপারে প্রশাসন ও সমাজসেবা কাজ করছে।

mzamin

Sunday, November 3, 2024

বুলেটে ঝাঁজরা শরীর নিয়ে লড়ছেন আরিফ

মো. আরিফ হোসেন (২১)। মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন তিনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়ে পুলিশের ছোড়া বুলেটে ঝাঁজরা পুরো শরীর। প্রায় ২ মাস চিকিৎসা নিচ্ছেন ঘাটাইলের আরিফ। স্থানীয় ধলাপাড়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেছেন তিনি। হত-দরিদ্র ঘরের সন্তান তিনি। বৈষম্যের শিকল ভাঙতে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। উপজেলার শালিয়াবহ গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের পুত্র আরিফ হোসেন। জুলাই অভ্যুত্থানের মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি।

১৯শে জুলাই ঢাকার উত্তরা বোনের বাসায় বেড়াতে যান আরিফ। ২০শে জুলাই বিকালবেলা চা খাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হন। এমন সময় দেখেন উত্তরা ৭নং সেক্টরের বিভিন্ন সড়ক দিয়ে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছে। তখন সন্ধ্যা ৭টা। আরিফ হোসেন বসে না থেকে সংযুক্ত হন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। তিনি বলেন, মিছিলে কিছু পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের বাধা অতিক্রম করে সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে আন্দোলনকারীরা। এমন সময় পুলিশের তিনটা গাড়ি আসে। ওই গাড়ি থেকে ভারী অস্ত্রে মুহুর্মুহ গুলি ছুড়ে পুলিশ। তাদের ছোড়া গুলি পিঠবিদ্ধ হয়ে আমার বুকের পাঁজর ও ডানা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। সড়কে লুটে পড়ি আমি। তখনো আমার জ্ঞান আছে। পরে আমার সহযোদ্ধা বন্ধুরা প্রথমে উত্তরাস্থ ঢাকা স্পেশালাইজড হসপিটালে নিয়ে যায়।

সেখান থেকে রাত ১২টার পর নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে প্রথমে সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। বুলেটের ছোড়া গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়ায় প্রথমে তার খাদ্যনালিতে ৭ ঘণ্টা অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে বুকের বাঁ-পাশে পাঁজরে ইনফেকশন দেখা দেয়। এতে দ্বিতীয় দফায় তাকে আরও একটি অপারেশন করা হয়। দিন দিন অবস্থার অবনতি হতে থাকে। এরইমধ্যে ফুসফুসে পচন ধরে যায়। ফলে ৩য় দফায় অস্ত্রোপচার করে তার ফুসফুস কেটে ফেলা হয়। এভাবে দীর্ঘ প্রায় ২ মাসের অধিক সময় চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। এতে তার নিজের পকেট থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। এরমধ্যে ১৪ই আগস্ট থেকে ১০ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি খরচে চিকিৎসা সুবিধা পেয়েছেন তিনি। আরিফ দুঃখ করে বলেন, চিকিৎসার সময়ে ঢাকা মেডিকেলে আমার পরিবারের লোকজন ছাড়া আমাকে কেউ দেখতে আসেননি। ২১শে জুলাই থেকে ১০ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই ছিলেন। একটু উন্নতি হলে নিজ বাড়ি ঘাটাইলের শালিয়াবহ গ্রামে আসেন তিনি। এক রাত যেতে না যেতেই পেটে গ্যাস জমে তার অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়। পরে ১১ই সেপ্টেম্বর অ্যাম্বুলেন্সে করে পুনরায় নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বর্তমানে তিনি বাড়িতে থাকলেও মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন। ডাক্তার বলেছে, শঙ্কামুক্ত নন তিনি। সুস্থ হতে অনেক সময় লাগবে। আরিফের মা বলেন, আমার নাড়ি ছেড়া ধন সন্তানটি নিয়ে নানাবিধ সমস্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছি আমরা। দু’বলা আহার জোগার করাই আমাদের জন্য যেখানে ভীষণ কষ্ট, সেখানে চিকিৎসার খরচ জোগার করবো কীভাবে। সারা রাত ঘুমাতে পারি না। ছেলেটার বাবা নেই। আমার বয়স হয়েছে। চোখেও কম দেখি। ছেলের চিন্তায় আমিও অসুস্থ। এভাবে চলতে থাকলে পরিবারের সবাইকে না খেয়ে মরে যেতে হবে।

আরিফ হোসেন অশ্রুসজল কণ্ঠে মানবজমিনকে বলেন, আমার পরিবারে মা, নানী, স্ত্রী, সন্তান ও এক ভাই নিয়ে ৬ জনের সংসার। বাঁচা-মরার সঙ্গে যুদ্ধ করে কোনোমতে বেঁচে থাকলেও এই দরিদ্র সংসার চলবে কীভাবে।  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়ে তার জীবনে যেন নেমে এসেছে চরম বিপর্যয় আর অন্ধকারের অমানিশা। চিন্তার ভাঁজ পড়েছে কপালে। বাবা মারা যাওয়ার পর টিউশনি করে, মানুষের দ্বারে দ্বারে কাজ করে লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসার চালাতাম। এখন কীভাবে চালাবো সংসার। সমাজের বিত্তবানসহ সরকারের সুদৃষ্টি ছাড়া আর যেন কোনো গত্যন্তর নেই আমাদের। ভীষণ কষ্টে আছি। তিনি বলেন, আমি তো মরেই যাবো। কিন্তু মরে গেলেও তো শান্তি নিয়ে মরতে পারছি না। বৃদ্ধ মা, সন্তান, স্ত্রী, ছোট ভাই ও বৃদ্ধা নানিটাকে কার কাছে রেখে যাবো। বড় স্বাদ জাগে, মরার আগে যদি আমার পরিবারের একটা মাথাগোঁজার ঠাঁই দেখে যেতে পারতাম তাহলে শান্তি নিয়ে মরতে পারতাম। কথাগুলো বলে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন হতভাগা আরিফ।

mzamin

Saturday, October 5, 2024

ঘাটাইলে ১২১৩ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ৮ শতাধিকই ভুয়া, ভাতা তুলছেন সবাই

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিল ৪০০ জনের কিছু ও বেশি। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৩ জনে। তারা ভাতাসহ সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। অতিরিক্ত এই ৮ শতাধিক অমুক্তিযোদ্ধারা নানা অপকৌশলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হয়েছেন বলে দাবি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের। এইসব অমুক্তিযোদ্ধাদের সনদ বাতিল ও ভাতা বন্ধের দাবিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত হোসেন অভিযোগ দায়ের করায় যাচাই-বাছাই হলেও কিছু অসাধু মুক্তিযোদ্ধার সাফাই সাক্ষীর ফলে তারা বহাল তবিয়তে থেকে যান। ফলে এসব অমুক্তিযোদ্বারা বীরদর্পে ভাতা উত্তোলনসহ সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা ১৯৭২ সালে ৪০০ জনের কিছু বেশি মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে সম্মেলন করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় সে তালিকা এখন উধাও হয়ে গেছে। উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তোফাজ্জল হোসেন বলেন, উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবকসহ ৪৬৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিল এখন ভাতা তুলছেন ১২১৩ জন। এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল।

প্রায় ৮ শতাধিক অমুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে অনুসন্ধানে নামে মানবজমিন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধাসহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসাবে তাদের সন্তান নাতি-পুতিদের জন্য রাষ্ট্রীয় দাঁড় উন্মুক্ত থাকায় উপজেলার কিছু সুবিধাবাদী লোক মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং তারা জেলা ও উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও তাদের সহযোগীসহ একটি চক্রের সঙ্গে মোটা অংকের টাকা লেনদেন করে পর্যায়ক্রমে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাছেদ করিম জানায়, আমি একজন প্রকৃত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে  রাষ্ট্রীয় ভাতাসহ সকল সুবিধা ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসাবে সম্মান পেয়ে আসছিলাম। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ২০১৯ সালের নভেম্বর মাস থেকে আমার সেই ভাতা বন্ধ করে দেয়াসহ সকল কিছু কেড়ে নেয় নিশিরাতের অবৈধ সরকারের কিছু স্বার্থান্বেষী মহল। আমাদের মতো অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের স্থান করে দিয়েছে সরকারের কিছু দালাল, আমলা ও আওয়ামী এজেন্টরা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মজিবর রহমান জানায়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাহিরে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করি। এখন ১২ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পায়। এরা কারা। কোথা থেকে এলো। এদের বিচার হওয়া জরুরি। আমি বর্তমান সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ করবো যাদের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে মাসের পর মাস ভাতা দিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে তাদের কাছ থেকে সমুদয় টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে এমন প্রতারণার জন্য তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করে কঠিন বিচারের আওতায় এনে বিচার করা জরুরি।

 নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক মুক্তিযোদ্ধা জানান, বিএনপি, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ঘুরে ফিরে প্রত্যেকেই যার যার সুবিধা মতো অমুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করেছেন। তবে এসব অমুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করার সবচাইতে বেশি অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ২০১৭ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির বিরুদ্ধে। ওই সময় জেলা ও উপজেলার কতিপয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সঠিক তালিকা প্রণয়নের কথা বলে আবেদনকৃত প্রায় ৮ শতাধিক অমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে অনৈতিক লেনদেন করে বাছাই কমিটির সদস্যরা একেকজন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। ফলে ওই বাছাই কমিটির সদস্য সচিব তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল কাশেম মুহাম্মদ শাহীন বাছাই কমিটিতে স্বাক্ষর না করে অনিয়মের বিষয়টি লিখিত আকারে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। পরে ওই বাছাই কমিটির কাছে ২৩ জন চিহ্নিত রাজাকার, ৫২ জন অযুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং ২১ জন অশহীদ মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত হলেও ওই সময়ে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদের অনেকের বন্ধ ভাতা চালু করার সুপারিশ করে উত্তোলনের ব্যবস্থা করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে ঘাটাইল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার তোফাজ্জল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন, নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে এই সময়ে আমি কোনো বক্তব্য দিবো না। এ বিষয়ে ঘাটাইল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইরতিজা হাসান বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই বিষয়টি পরিচালিত হয় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মাধ্যমে। ঘাটাইলে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে এসব অভিযোগ লিখিত আকারে পেলে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে পাঠানো হবে। কর্তৃপক্ষের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।


Tuesday, May 23, 2023

কিশোরীকে দিয়ে পতিতাবৃত্তি, স্বামী-স্ত্রী গ্রেপ্তার

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে কিশোরীকে ভাড়া করে এনে পতিতাবৃত্তি করার সময় স্বামী ও স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে ভূঞাপুর থানায় তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচার ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। শুক্রবার সকালে গোপালপুর উপজেলার নলীন এলাকা থেকে কিশোরীসহ স্বামী ও স্ত্রীকে গোপালপুর থানা পুলিশ আটক করে ভূঞাপুর থানায় সোপর্দ করে। গ্রেপ্তার মিন্টু (৩৮) উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের কষ্টাপাড়া গ্রামের হবি মণ্ডলের ছেলে এবং তার স্ত্রী তানিয়া (৩২)। এ ছাড়া সাতক্ষীরা থেকে আনা ওই কিশোরী ভূঞাপুর থানায় পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। জানা যায়, মিন্টু ভূঞাপুর পৌরসভার ফসলান্দি এলাকায় নুরুল ইসলামের বাসা ভাড়া নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারী এনে দেহ ব্যবসা করেন। এই ব্যবসায় তার স্ত্রীও জড়িত ছিল। গত মার্চের ২৩ তারিখে সাতক্ষীরা থেকে একজন কিশোরীকে ভূঞাপুর নিয়ে এসে ব্যবসা শুরু করেন।

এ সময় উপজেলার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ওই কিশোরীকে দিয়ে পতিতাবৃত্তির কাজ করানো হয়। শুক্রবার মিন্টু ও তার স্ত্রী তানিয়া ওই কিশোরীকে গোপালপুরের নলীন এলাকায় একটি বাসায় নিয়ে যায় পতিতাবৃত্তির জন্য। পরে স্থানীয়দের সন্দেহ হলে কিশোরীসহ স্বামী-স্ত্রীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
এ ঘটনায় শুক্রবার দুপুরে সাতক্ষীরার ওই কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে মিন্টু ও তার স্ত্রী তানিয়ার বিরুদ্ধে মানব পাচার ও ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন।  এ ব্যাপারে ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফরিদুল ইসলাম জানান, ওই কিশোরীকে সাতক্ষীরা থেকে এনে মিন্টু ও তার স্ত্রী ব্যবসা করাতো। এ ছাড়া তার স্ত্রীও পতিতাবৃত্তির কাজ করতেন। পরে স্থানীয়রা তাদের আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। শনিবার তাদের কোর্টে প্রেরণ করা হবে। এ ছাড়া সাতক্ষীরা থেকে আনা ওই কিশোরীর মেডিকেল পরীক্ষার জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হবে। তিনি আরও জানান, ওই কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে মিন্টু ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। বর্তমানে তারা থানা হেফাজতে রয়েছে।

Monday, April 20, 2020

যমুনার বুকে ধান চাষ by কামাল হোসেন

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে শুরু হয়ে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জের বুক চিরে গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরের গোয়ালন্দে পদ্মায় গিয়ে মিলিত হয়েছে যমুনা নদী। এক সময় যমুনা নদীতে চলতো বড় বড় স্টিমার, জাহাজ, লঞ্চসহ নৌ-পথের পরিবহন। কিন্তু কালের বিবর্তনে প্রমত্তা যমুনা তার যৌবন হারিয়ে এখন মৃতপ্রায়। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে যেমন বাস্তুহারা করছে চরাঞ্চলের মানুষকে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে যমুনা মরা খালে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, দুই যুগ আগেও যমুনার পূর্ণ যৌবন ছিল। কিন্তু দেশের সর্ববৃহৎ বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের পর যমুনা নদী অস্তিত্ব হারাচ্ছে। যে কারণে বঙ্গবন্ধু সেতুর তলদেশে এখন চাষাবাদ হচ্ছে বোরো ধান। শত শত একর জমিতে শোভা পাচ্ছে বোরো ধানের চাষ।
বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে নদী শাসনের কারণে তার স্বাভাবিক গতিপথ সেতুর পিলারের মাধ্যমে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় উজানে অতিরিক্ত ভাঙন দেখা দেয়। যার ফলে নদীর গভীরতা কমে চরের প্রবণতা বেড়ে গেছে। দীর্ঘকাল ধরে নদী শাসন না হওয়ায় গতিপথ পরিবর্তন হয়ে শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালু চরে রূপ নিয়েছে যমুনা। আর এসব জেগে উঠা চরগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ হচ্ছে তিল, তিসি, কাউন, ডাল, চিনাবাদাম ভুট্রাসহ নানা মৌসুমী ফসল। সেতুর উত্তরাংশ টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুরের অর্জুনা, গাবসারা, ফলদা, গোবিন্দাসী ও নিকরাইল ইউনিয়নের পশ্চিম সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এই নদী। এক কালে অথৈ পানিতে থৈ থৈ করা নদী আজ পৌষ মাস থেকেই পানি শুকিয়ে মাইলের পর মাইল ধু-ধু বালু চরে রূপ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরির পূর্বে টাঙ্গাইল দিয়ে সিরাজগঞ্জ হয়ে উত্তরবঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল এই নদী। ফেরি, যন্ত্রচালিত নৌকার মাধ্যমে নদী পার হয়ে উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের এটাই ছিল একমাত্র অবলম্বন। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর গরুর হাট গোবিন্দাসী গরুর হাট জমে উঠেছিল যমুনা নদীকে কেন্দ্র করে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে নৌ-পথে গরু আসতো এ হাটে। এ হাটটির মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্বাহ হতো। যমুনার নাব্য কমে যাওয়ায় এ হাটটিও যেন মরে গেছে। সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
যমুনার মাছ সারা দেশে সমাদৃত। এখানে পাওয়া যেত লোভনীয় ইলিশ, বোয়াল, চিংড়ি, পাবদা ও গোলসাসহ নানা প্রজাতির মাছ। নদীর নাব্য কমায়, অতি দ্রুত নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে মাছের আকাল। নদীতে মাছ ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করতো তারা আজ অন্য পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করেছে। জাল দিয়ে মাছ ধরা জেলে বাবলু হালদার বলেন ‘কি আর কমু খারি ভর্তি মাছ ধরতাম, আজ খালইয়ের তলাই ভরতে পারি না।’ নদীতে পানি থাকে না এবং সঠিক সময় পানি আসেও না, তাই মাছও আসে না। বর্তমানে এ নদীতে মাছের খুব আকাল।
যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর দূরপাল্লার যাতায়াত সহজ হলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের। নদী তীরবর্তী টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের লোকজন যেখানে নৌকায় চড়ে বাড়ির ঘাটে উঠা-নামা করতো, সেখানে আজ মাইলের পর মাইল হেঁটে চলাচল করতে হয় তাদের। বর্ষাকাল ছাড়াও যেখানে এ নদীতে সারা বছর পানি থাকতো সেখানে আজ ধু-ধু বালু চর। নৌকাযোগে অল্পসময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের যে সুবিধা মানুষ ভোগ করতো সেখানে আজ পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ।
নৌকার মাঝি সবজাল বলেন ‘প্রমত্তা যমুনা আজ হাহাকার বালু চর। অতিরিক্ত স্রোতের কারণে এই নদীতে নৌকা বাইতে সাহস পাইতাম না, সেখানে আজ নৌকার হালও ধরতে হয় না, এমন অবস্থা যমুনার। কি নদী ছিল আজ কি হয়ে গেছে! যে ঘাটে বড় বড় ফেরি বাঁধা থাকতো সেখানে আজ বাঁধা থাকে গরু।’
যমুনা নদীর উপর ব্রিজ হওয়ায় ভূঞাপুরের গোবিন্দাসীর ফেরিঘাট উঠে গেছে অনেক আগেই। এখন আর আগের মতো নৌকাও চলে না। যাতায়াতের বিকল্প হিসেবে যমুনার চরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে একমাত্র ভরসা ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল। যমুনার এ চরাঞ্চলে রাস্তা-ঘাট নেই বললেই চলে। কিন্তু ধু-ধু বালু চরে মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে কয়েক’শ পরিবার।
ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী, নিকরাইল, গাবসারা ও অর্জূনা ইউনিয়নের চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা গেছে, চর ও নদী এলাকার যেসব গ্রামে শুষ্ক মৌসুমে মাইলের পর মাইল হেঁটে যাতায়াত করতে হতো চরের মানুষকে। উৎপাদিত পণ্য আনা নেয়া করতে হতো হেঁটে। সেসব জায়গায় ঘোড়ার গাড়ির পাশাপাশি মোটরসাইকেলে যাতায়াত করছে লোকজন।
ভূঞাপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের চরাঞ্চলে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। স্কুল, মাদরাসা, হাসপাতাল, ব্যাংক-বিমা, কমিউনিটি সেন্টার ও এনজিও প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লোকজন প্রতিদিন চরাঞ্চলে যাতায়াত করে। এসব মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা মোটরসাইকেল। তবে, চরের অনেক মানুষ এখনো হেঁটেই বিশাল চর পাড়ি দেয়।
গাবসারা ইউনিয়নের পুংলীপাড়া মোটরসাইকেলচালক আইয়ুব বলেন, সংসারে তিন সন্তান রয়েছে। মোটরসাইকেল চালানো তার পেশা। আগে তিনি ইটভাটায় কাজ করেছেন। এখন তিনি প্রতিদিন মোটরসাইকেল চালিয়ে ৮-৯শ’ টাকা আয় করেন। চরাঞ্চলের অনেকেই জানান, চরে ঘোড়ার গাড়ির পাশাপাশি মোটরসাইকেল চলাচল করায় চরের মানুষের দুর্ভোগ অনেকটা কমেছে।
যমুনার নাব্য কমে যাওয়ায় সেখানে এখন প্রায় পানি শূন্য। জেগে ওঠা চরগুলোতে চাষাবাদ করছে চরাঞ্চলের চাষিরা। ফলে এখানে মানুষের বসতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিও চাঙ্গা হচ্ছে। এর সঙ্গে সেখানে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু গবাদি পশুর খামার। এতে পাল্টে যাচ্ছে টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ জেলার চরাঞ্চলের অর্থনীতি। আজ থেকে ২০ বছর আগেও যমুনার তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। তখন কেউ চিন্তাও করতে পারেনি যমুনার বুকে এক সময় চাষাবাদ হবে। কিন্তু যমুনা নদীতে ‘বঙ্গবন্ধু সেতু’ স্থাপিত হওয়ার পর থেকে এর নাব্য কমতে থাকে। যমুনার বুক এখন ফসলে ভরা। জেগে উঠা ধু-ধু বালুচরে এখন উঠতি বোরো ধান শোভা পাচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যমুনার হারানো গৌরব ফেরাতে এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

Monday, November 11, 2019

ড্রাগন-লেবু চাষে সফল শামসুল by মাহমুদ কামাল, টাঙ্গাইল ও মো. নজরুল ইসলাম

এস এম শামসুল আলম। পাঁচ বছর আগে উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তার চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। বয়স এখন ৭৫-এর কোঠায়। বয়স তাকে অবসরে নিতে পারেনি। পেশার পরিবর্তন ভেবে বর্তমানে তিনি কৃষিতে আত্মনির্ভর হয়েছেন। ৫০ বিঘা জমিতে ড্রাগন ও লেবুর বাম্পার ফলন হওয়ায় তিনি অনেকেরই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার নবগঠিত লক্ষিন্দর ইউনিয়নের মধুপুরচালায় বিশাল এলাকাজুড়ে তিনি এসবের চাষ করছেন।
সঙ্গে রয়েছে পেয়ারা, আম, লিচু, কুল, পেঁপে, মাল্টা ও কফি। একসময়ের ব্যাংক কর্মকর্তা এস এম শামসুল আলম এখন সফল কৃষি উদ্যোক্তা।
এস এম শামসুল আলম ১৯৪৯ সালে ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউনিয়নের কাঁশতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতা তোরাব আলী মৌলভী ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ৫ ভাই ও ৫ বোনের মধ্যে শামসুল আলম তৃতীয়। করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে লেখাপড়া শেষে ১৯৭২ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি করেছেন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে ড. নাজমুন্নাহার শামস ইঞ্জিনিয়র, ছোট মেয়ে ডা. নুসরাত শামস শিশু বিশেষজ্ঞ এবং ছেলে নাজমুছ শামস ও পুত্রবধূও ইঞ্জিনিয়ার। প্রতিষ্ঠিত এই পরিবারের সান্নিধ্য ছেড়ে পাহাড়ে সমন্বিত কৃষি প্রকল্পে তিনি আত্মনিয়োগ করেছেন। বয়স হলেও এখনও নিজেই রান্না করে খান।
এস এম শামসুল আলম মনে করেন, জীবনে অবসর বলতে কিছু নেই। জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোনো না কোনো কাজ মানুষকে করতেই হয়। তা পেশাই হোক কিংবা নেশাই থেকে। তিনি ব্যাংকের উচ্চপদের চাকরি শেষে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন কৃষিতে। তিনি মনে করেন বেকার তরুণেরা ৫-৭ লাখ টাকা খরচ করে দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেয়ার চেয়ে যদি সমন্বিত কৃষি কাজ করে তবে তারা যেমন উপকৃত হবে পাশাপাশি দেশও এগিয়ে যাবে।
গত বৃহস্পতিবার তার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, গাছে গাছে ঝুলে আছে অসংখ্য কাঁচাপাকা ড্রাগন ফল, লেবু, পেঁপে, মাল্টা এবং কফি।
বাগানে বেশ কয়েকজন শ্রমিক কাজ করছেন। এস এম শামসুল আলম জানান, ছেলেবেলায় স্কুলে যাওয়ার পথে দু’পাশে কৃষি জমি দেখে তার ভালো লাগতো। তখন ভাবতেন, বড় হয়ে সুযোগ হলে তিনি কৃষিচাষ করবেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ব্যাংকে চাকরি নেন। এক সময় তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকায় কাজ করেন। তখন তিনি সেখানে ধান আবাদের জন্য কৃষিঋণ কার্যক্রম শুরু করেন। এজন্য কৃষকের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এভাবেই ছোটবেলার কৃষিপ্রেম আরো গভীর হয়। অফিসে বসেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন ভবিষ্যতে তিনি কৃষির সঙ্গে যুক্ত হবেন।
২০১৫ সালের দিকে নিজের সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ঘাটাইলের মধুপুরচালা এলাকায় একটু একটু করে জায়গা কিনে বাগান গড়তে শুরু করেন। ২০১৪ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি যোগাযোগ করেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কি ধরনের গাছ, কীভাবে লাগালে ভালো ফলন পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরের বছরে তিনি একই এলাকায় ৬০০ শতাংশ জায়গা কিনে ফেলেন। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ও সাপমারা এলাকায় পর্যাক্রমে ২২০০ শতাংশ জায়গা লিজ নেন শামসুল আলম। অপরদিকে রসুলপুর ইউনিয়নের ধলী বিলের প্রায় ১০ একর জমি লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছেন। প্রায় ৫০ একর জমিতে মিশ্র ফল এবং মাছ চাষ করছেন। বাণিজ্যিকভাবে সুবিধা ও লাভবান হতে তিনি লেবুর প্রতি আগ্রহী হন বেশি। তার বাগানে সব সময় প্রায় ৪০ জন শ্রমিক কাজ করেন। বিশেষ সময় আরো অন্তত ৫০ জন শ্রমিক নিয়ে কাজ করতে হয় তাকে। গত বছর এক বিঘা জমির ১৮০টি ড্রাগন গাছে ফল উৎপাদন হয়েছে। খরচ বাদে সাড়ে চার লাখ টাকা আয় হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ওই এক বিঘা জমির ড্রগন ফল বাজারে তোলা হবে। খরচ বাদে এবারও প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লাভ হবে বলে ধারণা করছেন শামসুল তিনি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রতি বিঘায় ৪০ হাজার লেবু বাগান থেকে তোলা হয়েছে যার দাম প্রায় এক লাখ টাকা। খরচ বাদে লাভ হয়েছ ৫০ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলক কফি চাষ করেছেন। ইতিমধ্যে গাছে কফি ফল আসা শুরু করেছে। আগামী বছর পুরোপুরি কফি উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাত করা যাবে বলে তিনি আশা করছেন । তিনি মনে করেন, কৃষিচাষ করে মানুষের জীবনমান পরিবর্তন করা সম্ভব। দেশীয় ফল আবাদ করলে আমদানি নির্ভরতাও কমে যাবে। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, চাকরি নির্ভর মনোবৃত্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে আত্মনির্ভর হতে হবে। এজন্য কৃষি সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম।

Saturday, October 26, 2019

যৌনপল্লীতে শিশুদের দুর্বিষহ জীবন by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

শ্যামলা মায়াবী চেহারার কলি ও শিউলি। এক যুগ আগে কিশোরী বয়সে পায়ে নূপুর আর মুখে প্রসাধনী মেখে দু’বোন পা রেখেছিল মা-নানীর পেশায়। জন্ম সূত্রেই তারা যৌন দাসত্বের অন্ধকার বৃত্তে ঘুরছে। তাদের মা কল্পনা বেগম। ছোটবেলায় স্কুলে ভর্তি করাতে চেয়েছিল দু’জনকেই। দুইজন নাকি স্কুলেও গিয়েছিল দু’দিন। এ পর্যন্তই। মানুষের বাঁকা চাহনি, স্কুলের সহপাঠী আর শিক্ষকদের তাচ্ছিল্যে দুইদিনেই ইতি টানতে হয় স্কুল জীবনের।
এর পরের গল্পটা মা নানীর মতোই।
টাঙ্গাইল শহরের কান্দাপাড়ার প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো  যৌনপল্লীতে জন্ম নেয়া প্রতিটি  শিশুই বেড়ে ওঠছে এভাবেই। কথা হয় কলি ও শিউলের সঙ্গে। তারা বলেন, এখানে জন্ম নেয়া যে কত বড় পাপ সেটা একমাত্র আমরা ছাড়া অন্য কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। আমরা যখন স্কুলে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম, দুইদিন ক্লাস করেছিলাম। তখন আমাদের দিকে মানুষ এভাবে তাকাচ্ছিলো কেন? বলতে পারবেন? আমাদের সঙ্গে টেবিলে পর্যন্ত কেউ বসেনি, বলে আমরা খারাপ মানুষ। পরে রাগে ক্ষোভে দু’বোন আর স্কুলে যাইনি। সেই দিন যদি আমাদেরকে সবাই ভালোভাবে নিতো আজ আমাদের এ জায়গায় থাকতে হতো না। এ পল্লীতে জন্ম নিয়েছি। এ জন্মে কি আমাদের কোনো হাত আছে?
যৌন পল্লীর শিশুদের সঙ্গে মিশতে মানা, খেতে মানা, কথা বলতে মানা। এসব মানা নিয়েই বেড়ে ওঠছে তারা। শুধু তাই নয় নিজেদের পল্লীর মধ্যেও টেনেহিঁচড়ে চলছে তাদের জীবন। ছোট একটি রুম। দিনে ভাড়া তিন’শ থেকে চার’শ টাকা। সেখানেই থাকা, খাওয়া, সন্তানদের পরিচর্যা। সঙ্গে মায়েদের যৌন ব্যবসা। এখানে শিশুদের পড়ার পরিবেশ নেই। অলি-গলিতে মদের দোকান, নাচানাচি ও চিৎকার চেঁচামেচি। ঘরে জায়গা না পাওয়ায় রাস্তায়, ফুটপাতে কিংবা মাসির ঘরে দিনাতিপাত করে যৌনকর্মী মায়ের অবুঝ শিশুরা। ?এতো গেলো পল্লীর ভিতরের অবস্থা। পল্লী থেকে বের হয়ে সন্তানদের বাবা মায়ের পরিচয়সহ নানান বিষয় নিয়ে প্রতি পদে পদে সঙ্কটে পড়তে হয় তাদের। বিয়ের ক্ষেত্রে, চাকরি পেতে, বিদেশ গমনে, সম্পত্তি রক্ষাসহ সর্বত্র তারা হয়রানির শিকার হয়। সবার জন্ম যে এখানে এমনটি নয়। অনেকে আছে যাদের জন্মের অনেক পরে মা যৌনকর্মী হয়েছেন। এসব মায়ের সন্তানরাও পরিচয় সঙ্কটে ভুগছে।
কথা হয় যৌন পল্লীর এক কিশোরী শিক্ষার্থীর সঙ্গে। পড়ছেন টাঙ্গাইলের একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেনীতে। ওই কিশোরী বলেন, মা পল্লীতে থাকলেও আমি থাকি না। আমি আমার বোনের সঙ্গে আলাদা বাসা নিয়ে থাকি। তারপরও কত কথা শুনতে হয়। সবাই জানে আমি এই পল্লীর মেয়ে। মানুষ আমাদের দেখলেই ঘেন্নার চোখে তাকায়। ক্লাসে নানান ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলে। তখন খুব কষ্ট হয়। নিরবে কাঁদি।
যৌনকর্মী হাজেরা বেগম দুই সন্তানের মা। তিনি বলেন, ঘর ভাড়া, খাওয়া দাওয়া,  বৃদ্ধ মায়ের দেখাশুনা, সাজসজ্জায় অনেক রকম ব্যয়। কাস্টমার না ধরলে একদিনও চলে না। ঘরে কাস্টমার নিলে বাচ্চার পড়ার জায়গা দিতে পারি না। কিন্তু বাচ্চা তো মানুষ করতে হবে। আমি চাই না মায়ের মতো,আমার মতো বাচ্চা দু্‌ইটা এ পথে আসুক। কষ্ট করে হলেও আমি তাদের মানুষ করবো। কেউ আমাদের ভালো চোখে নেয় না। আর আমাদের বাচ্চাদের তো দেখতেই পারে না।
হাজেরা বলেন, সবাই শুধু বাচ্চার বাবার পরিচয় চায়। স্কুলে বা কোনো জায়গায় কিছু করতে গেলে এই সমস্যায় ভুগি। আর আমার আসল পরিচয় পেলে তো কথায় বলতে চায় না কেউ।
আরেক যৌনকর্মী বৃষ্টি রানী বলেন, সরকার আমাদের কোনো সুযোগ সুবিধা না দিক আমাদের সন্তানদের তো পড়াশোনার ব্যবস্থাটা করে দিতে পারে। বাচ্চাদের জন্য একটা জন্মসনদ আনতে গেলেও আমাদের নানা হয়রানির মুখে পড়তে হয় ।
প্রতিদিন একটু একটু করে অন্ধকার জগতের হিমশীতল গলিতে হারিয়ে যাচ্ছে এ শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ। পল্লীর শিশুরা সবাইকে আপন করে নিতে পারলেও সাধারণ মানুষ তাদের আপন করে নিতে পারে না।  যার জন্য তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা ব্যহত হয়। ফলে কন্যা শিশুরা তাদের মায়েদের পথে হাটে আর ছেলে শিশুরা বখাটে হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে।
এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা.ঝুনু শামসুন নাহার বলেন, একটা শিশু যখন দিনে দিনে এমন তাচ্ছিলো বড় হবে, তখন তার মানসিক অবস্থা খুব ভয়ঙ্কর হয়ে দাড়াবে। সে মানুষ হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করবে না। তাদেরকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এসব শিশুদের মানসিকভাবে হেয় করা যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং সামজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, যৌন পল্লীর শিশুদের মূলশ্রোতে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তারাও এ দেশের নাগরিক। বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ না নিলে তাদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। তাদের শিক্ষা, বস্ত্র, খাদ্য, বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

Friday, October 25, 2019

ত্রিশ বছর ঘুরে বেড়ানো ববিতাকে নিয়ে কৌতূহল by এবিএম আতিকুর রহমান

দাঁত নেই, তবুও মুচকি হাসে ববিতা। কিন্তু কি যেন মনে করে ক্ষণে ক্ষণে কাঁদে আবার পরক্ষণেই হাসে। তার এই হাসি-কান্না বড়ই রহস্যময়। এলাকায় সে ‘ববিতা পাগলিনি’ হিসেবে পরিচিত। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে ঘাটাইল উপজেলার কলেজ মোড় থেকে বাসস্ট্যান্ডে তাকে দিন-রাত ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। তার প্রকৃত বয়স কত, কোথা থেকে এসেছে, বাড়ি কোথায় তা সবার অজানা। ত্রিশ বছর আগে তার শারীরিক অবস্থা যেমন ছিল এখনো ঠিক তেমনই আছে। রাতের বেলায় ঘুমানোর জন্য সে বেছে নিয়েছে নির্মাণ সংগঠনের (এনজিও) বারান্দা।
ববিতা সবার অতি পরিচিত মুখ। দিনমজুর, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সবাই ববিতাকে আদর করে নাম ধরে ডাকে। কখনো ডাকে সাড়া দেয় আবার কখনো দেয় না। সবার দেয়া খাবারও সে খায় না। আবার যাকে ভালো লাগবে তার কাছ থেকে এটা- ওটা চেয়ে খায়। খাবার হোটেলগুলোতে তার জন্য সব সময় দরজা খোলা থাকে। কখনো খাবার খেতে গেলে কি যে আদর আপ্যায়ন তা আর বলে শেষ করা যায় না। কারো সঙ্গে কথা তেমন একটা বলে না ববিতা। আর যাও দু’একটা বলে তা বোঝা যায় না। তবে কি যেন মনে করে ক্ষণে ক্ষণে কাঁদে আবার পরক্ষণেই হাসে। সড়কের দু’ধারের দোকানদারগুলো ববিতাকে অনেক ভালোবাসে। কারো দোকানে গেলে দোকান মালিক তার চেয়ার ছেড়ে দেয় বসার জন্য। যতক্ষণ মন চায় দোকানে বসে থাকে। এর ভেতরে চলে আপ্যায়ন। চা এবং পান এ দুটোই সে বেশি ভালোবাসে। সবাই বলে ববিতা যেদিন দোকানে আসে তাদের বিক্রি নাকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাকে সব সময় দেখেন এবং জানেন স্থানীয় মোহাম্মদ আলী। তিনি জানান, ত্রিশ বছর ধরে সে এই এলাকায় আছে। কোনোদিন তাকে গোসল করতে দেখিনি। অথচ তার কাছে গিয়ে বসলে শরীর থেকে কোনো গন্ধ আসে না। সে কোনোদিন অসুস্থও হয় না। ত্রিশ বছর আগে তার শারীরিক অবস্থা যেমন ছিল এখনো ঠিক তেমনই আছে। কলেজ মোড় এলাকার জেমি ফার্মেসির মালিক জামাল হোসেন বলেন, তার ভেতরে মনে হয় অলৌকিক কিছু আছে। আমার দোকানের কর্মচারী একদিন চুরি করেছিল যা আমি নিজেও জানতাম না। কোথা থেকে যেন ববিতা এসে সেই কর্মচারীকে জুতা দিয়ে পিটানো শুরু করলো। পরে চুরির বিষয়টি জানতে পারি। ঘাটাইল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম (লেবু) বলেন, প্রায় ত্রিশ বছর ধরে আমি তাকে এ এলাকায় দেখে আসছি। তার ভেতরে অলৌকিক কিছু থাকতে পারে। দোকানদাররা আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাকে দোকানে বসায় এবং সেবাযত্ন করে। আবার সবার দেয়া খাবার সে খায় না। যাকে ভালো লাগে তার কাছ থেকে চেয়ে খায়। কখনো কারও ক্ষতি করেছে এমনটাও জানা নেই কারও। এক কথায় তাকে ঘিরে এক বিরাট রহস্য তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন অনেক লোকজন আসছে তাকে এক নজর দেখার জন্য।

Tuesday, September 10, 2019

মধুপুরে বেগুন চাষে শাহিনুরের ভাগ্যবদল by মো. নজরুল ইসলাম

টাঙ্গাইলের মধুপুরে বেগুন চাষ করে ভাগ্যবদল করেছেন এক সময়ে দিন না চলা শাহিনুর বেগম। উপজেলার নাগবাড়ী (পশ্চিমপাড়) গ্রামের আবদুল জলিলের স্ত্রী শাহিনুর বেগম এখন অনেকের কাছে ঈর্ষণীয়। স্বামী-স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও শ্বশুর-শাশুড়ির সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। তাকে আর পেছনে ফিরেও তাকাতে হয় না। পেছনের রহস্য খুঁজে জানা গেল, বেগুন চাষ করে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে তার ৭ সদস্য বিশিষ্ট সংসারে। কয়েক বছর আগেও স্বামী আবদুল জলিল দিনমজুরের কাজ করে যা আয় করতো তা দিয়ে সংসার চলতো না। অর্থের অভাবে সংসার চালানো তার পক্ষে খুবই কষ্টের ব্যাপার ছিল। আবদুল জলিলের পক্ষে এত বড় সংসার ও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
কীভাবে সংসারের সচ্ছলতা ফিরে আসবে, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় শাহিনুর বেগম। তবে, স্বামী-স্ত্রী মিলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছা ও চেষ্টা ছিল তাদের। চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাবে কোনো কিছু করতে পারছিলেন না তারা। এমতাবস্থায় বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি (বিজিএস)-এর মধুপুর শাখার ক্রেডিট অফিসার হাদিউজ্জামান পাশে এসে দাঁড়ান। ২০১৭ সালের ওই সময় বিজিএস’র সহায়তায় শাহিনুর বেগম সন্ধাফুল কেন্দ্রের সদস্য হয়ে প্রথমে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেন নিজের মতো কিছু করার। স্বল্প পরিসরে নিজের ভিটা জমিতে বেগুন চাষ শুরু করে সফলতার মুখ দেখা শুরু করেন। বছর শেষে মোটামুটি ভালো আয় হয় দেখে খুশি হয়ে, দ্বিতীয় দফায় ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বেগুন চাষ করে সচ্ছলতার মুখ দেখেন। বর্তমানে বিজিএস থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বেগুন চাষ আরো সম্প্রসারিত করেছেন। বর্তমানে তিনি এক একর জমিতে বেগুন চাষ করছেন। ভালোভাবে সংসার চালিয়ে ছেলেমেয়েকে মধুপুর মাদ্রাসায় লেখাপড়া করাচ্ছেন। সাহস আর ইচ্ছা শক্তির বলে দারিদ্র্যকে জয় করে সংসারে এনেছেন সচ্ছলতা।
স্বামী আবদুল জলিল জানান, তার ছিল অভাবের সংসার। এক সময়কার টানাটানির সংসারে স্ত্রী ও তার যৌথ চেষ্টার ফলে সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। তাদের ভাষ্যমতে, বেগুন বেচা টাকা দিয়ে তারা একটি বাছুরসহ গাভী ক্রয় করেন। বর্তমানে তাদের ২টি গাভী, ১টি ষাঁড় গরু ও ১টি বাছুর গরু রয়েছে। তাদের এখন বাৎসরিক গড় আয় প্রায় আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা। আলাপকালে শাহিনুর বেগম জানান, অভাবের কারণে ছেলেমেয়েদের দু’বেলা খাবার খাওয়ানো কষ্টের ছিল। আর্থিক ঋণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি (বিজিএস) সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছে। বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি (বিজিএস)এর মধুপুর শাখা ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম জানান, বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বেসরকারি সংস্থাগুলো দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে মানুষের সার্বিক উন্নয়নে যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি (বিজিএস) ও তার সে চেষ্টায় অবিচল।
তিনি আরো বলেন, শাহিনুর বেগমকে অনুকরণ করে যদি সমাজের দরিদ্র মানুষগুলো আত্মকর্মমুখী হয় তাহলে সমাজের সাফল্য অনিবার্য। মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, বাড়ির গৃহিণীরা যদি বিভিন্ন সবজি চাষে উদ্যোগী হন, তবে তাদের কৃষি বিভাগ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। তারা যদি আমাদের পরামর্শ নিয়ে কৃষি কাজ করেন, তাহলে আরো লাভবান হবেন।

Sunday, September 8, 2019

কেমিক্যালমুক্ত ফল চাষে সফল শিক্ষক শামছুল by আতিকুর রহমান

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নে কেমিক্যালমুক্ত ফল চাষ করে সফলতা পেয়েছেন শামছুল আলম দাখিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও ঘাটাইল এস.ই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃষি বিষয়ক শিক্ষক শামছুল আলম। তার নিজ গ্রাম রসুলপুরে ৭ একর জমির ওপর দেশি-বিদেশি ৭৮ প্রকার ফলদ গাছ লাগিয়ে পুরো জেলাজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছেন। পেশায় কৃষি শিক্ষক হওয়ার সুবাদে কৃষি কাজের প্রতি রয়েছে তার সীমাহীন আগ্রহ ও অদম্য চেষ্টা। গত ৫ বছরের অধিক সময় ধরে পাহাড়ি মাটিতে কেমিক্যালমুক্ত মাল্টা, লটকন, সৌদি খেজুর, মালয়েশিয়ার ডোরিয়ান, ফোর কেজি আম, ড্রাগন, রামভুটান কমলা, বারি-৪ মালটা, বাতাবি লেবু, আতা, আমড়া, জাম, বারোমাসি কাঁঠাল, চায়না-৩ লিচু, আপেল, ডালিম, তাল, লেবু, কলা, জামরুল, শরিফা, পেয়ারা, আতা, ডালিম, কামরাঙা, জলপাই, নারিকেল, মালবেরি, লেবু, পেঁপে, কদবেল, কালফল, বেল, বিলম্বি, কাজু বাদাম, পেস্তা বাদাম, মোসম্বি, ছাগলনাদা, তিতি জাম, লুকলুকি, তীনফল, কালো আঙ্গুর, আপেল, নাসপাতি, এগফ্রুড, দুরিয়ান, এভোগ্যাডো, ম্যাংগো স্টিন, কফি, মিরাক্কেল, জাপাটিকাবা, থাই বাতাবিলেবু, চায়না কমলা, থাই পেয়ারা, লকেট, সুদানী সরিফা, আলু বোখারা, প্লামফল, পামওয়েল, বিলেতি গাব, সাকরা, ব্রুনাই কিং আম (কেজিয়াম), আমলকী, চালতা, কাঠলিচু, গাব, পিচফল, জামানফল, চেরিফল, হেমফল, কাইফল, মিষ্টিগাব, প্লামফল, ছবেদা, অরবরই, আলো বোখড়া, আনারসসহ ৭৮ প্রজাতির মিশ্র ফল এবং মশলা জাতীয় কালো এলাচ, তেজপাতা, পোলাওপাতা। ঔষধি গাছ- কালোমেঘ, তুলসি, শতমুলি, ধুতুরা, গ্যাস্টিক গাছ চাষ করে কৃষি সেক্টরে আমূল পরিবর্তন এনে এ দেশের কৃষকের মনে আশা জাগিয়েছেন। তার এই কর্মযজ্ঞ দেখে অনেক কৃষক বাগান করার জন্য আগ্রহ পোষণ করেছেন। শামছুল আলম কৃষি বিষয়ক শিক্ষক হওয়ার কারণে তার নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকতর শিক্ষার পাশাপাশি কৃষি বিষয়ের উপরে হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়ার জন্য শখের বসে ফলের বাগান করেন। এ বাগান করার সুবাদেই মনে প্রবল আগ্রহ দেখা দেয় বাণিজ্যিকভাবে কেমিক্যাল মুক্ত ফল চাষ করার।
পরবর্তীতে উপজেলা ও জেলা কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে ৭ একর জায়গায় ওপর ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নিজে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গড়ে তোলেন দেশি-বিদেশি ৭৮ প্রজাতির ফলদ বৃক্ষের বিশাল বাগান। এ ছাড়াও বাড়ির আঙ্গিনায়ও রয়েছে নানা প্রজাতির ফলের গাছ। বর্তমানে প্রায় সব গাছেই ফল আসা শুরু হয়েছে। এ বছর তিনি বাণিজ্যিকভাবেও ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। বাজারে তার ফলের ব্যাপক চাহিদা। সরকারি ভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা পেলে দেশের বিভিন্ন স্থানে কেমিক্যাল মুক্ত ফল চাষের ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে পারবেন বলে মনে করেন স্কুল শিক্ষক শামছুল আলম। তার বাগানের ৭ একর জমিতে ৩২ প্রজাতির বেদেশি ও ৪৬ প্রজাতির ফলদ বৃক্ষ রয়েছে। সরজমিনে দেখা ও কথা হয় শামছুল আলমের সঙ্গে। তিনি বাগান ঘুরে প্রতিটি প্রজাতির ফলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ও খোলামেলা কথা বলেন। তিনি বলেন, আমি সিলেট শহরের মোহাম্মদ মকন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ছিলাম কিন্তু আমার এই বাগান আমাকে দূরে থাকতে দেয়নি। সব সময় মনটা পড়ে থাকতো বাগানের প্রতি। পরে অনেক চেষ্টা করে বদলি হয়ে ঘাটাইলে আসি। এখানে এসেই পুরোদমে বাগানের পরিচর্যায় মনোনিবেশ করি। বর্তমানে আমি সফলতার মুখ দেখছি। প্রতিদিন অনেক লোকজন আমার বাগান দেখতে আসেন এবং এমন বাগান করার জন্য উৎসাহিত হয়ে চারা নিয়ে বাগান তৈরি করছেন। আমি তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য, সহযোগিতা ও নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছি। এবং বেশ কয়েকটি বাগান পরিদর্শন করেছি। তিনি বলেন বর্তমানে কৃষকদের খুব দুরবস্থা চলছে। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্যে পাচ্ছে না। ধানের দাম পাঁচশত টাকা মণ। বর্তমানে কৃষকদের পলিছি চেঞ্জ করা উচিত। এ ছাড়াও আমি চাই আমার দেশের মানুষ ভেজালমুক্ত বিষমুক্ত কেমিক্যালমুক্ত ফলমূল ও শাক-সবজি পাক যাতে বিদেশি ফলমূলের ওপর নির্ভরশীল না হতে হয়। আমার মূল উদ্দেশ্য ও আন্দোলনই হচ্ছে ভেজালমুক্ত কেমিক্যালমুক্ত ফল চাষ করা। এছাড়া তিনি কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এ ব্যাপারে ঘাটাইল উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ আবদুল মতিন বিশ্বাস বলেন, শামছুল আলমকে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সাহায্য, সহযোগিতা-পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করেছি। যার কারণে সে উৎসাহিত হয়ে কেমিক্যালমুক্ত ৭৮ প্রজাতির ফল চাষাবাদ করে যাচ্ছে। এবং বিভিন্ন প্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে তিনি আজ সফল হয়েছেন।

Friday, September 6, 2019

বন্যাদুর্গত কৃষকদের দুর্বিষহ জীবন

‘গরের মইদ্দে গলা পানি আছিল, বউ পোলাপাইন নিয়া যামু কুনু, তাই সড়কের পাড়ে পলিথিন দিয়া গর বানাইয়া আছি ১ মাস ধইরা। দিনে বেলায় মেলা গরম আর রাইতে বৃষ্টি অইলে মনয় পলিথিন উড়াইয়া নিয়া গেল। আমাগো কেউ দেখবার আহে না। একবার ৩ দরা (১৫ কেজি) চাইল পাইছিলাম।’ এভাবেই নিজের দুঃখের বর্ণনা দেন বন্যা কবলিত আফাজ উদ্দিন শেখ (৫৫)। তিনি বন্যার কারণে পরিবারবর্গ নিয়ে টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে কালিহাতীর সরাতৈল নামক স্থানে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
একইস্থানে ভাসমান অবস্থায় থাকা বর্গাচাষী আবদুুর রশিদের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এবার তিলের হাতে আমন বুনছিলাম। বন্যার পানিতে সব খাইয়া গেছে। এহন আমাগো ৪ ম্যায়া পোলা নিয়া চলাই কষ্ট।
লাভতো অইলনা আবার মেলা লোকসান।’ এভাবেই বন্যায় অনেক পরিবার তাদের সহায় সম্বল হারিয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন।
রাক্ষুসী যমুনা নদীর তীরবর্তী টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, কালিহাতী, টাঙ্গাইল সদর, নাগরপুর, দেলদুয়ার উপজেলায় এবার বন্যায় অসংখ্য মানুষের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠ।

বন্যার পানি বর্তমানে কমতে শুরু করেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ সহযোগিতা চলমান থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
যমুনা তীরবর্তী গড়িলাবাড়ী এলাকার লাইলী বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী মারা গেছে। আমরা গরিব মানুষ। বন্যায় কোনমতে বেঁচে আছি। বাচ্চাদের নানারকম রোগব্যাধি হইতাছে।’ ৭০ বছর বয়সী জনাব আলী বলেন, ‘এহন পর্যন্ত ৮ বার বাড়ি পালটাইছি।’
নদীর তীরে দেখা হয়, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার নদী তীরবর্তী চরপৌলী গ্রামের মোশারফ হোসেনের (৬০) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের শত বিঘা জমি ছিল। আমরা ছিলাম এলাকার বড় গিরস্থ। কিন্তু যমুনা নদীই আমাদের সর্বনাশ করে দিছে।’  
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এবারের বন্যায় টাঙ্গাইলের সখিপুর ছাড়া ১১টি উপজেলার ১৫ হাজার ১৩৬ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ফসলের মধ্যে রোপা আমন, বোনা আমন, আউশ, রোপা আমন বীজতলা, সবজি ও কলা উল্লেখযোগ্য।

জেলার ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ লক্ষ ৫৭ হাজার ৮১১টি। ক্ষতির পরিমাণ ১৪১ কেটি ২৫ লক্ষ টাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে ভূঞাপুর উপজেলায়। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, ৬৮৬টি পুকুরের চাষীর প্রায় ৫ কোটি টাকার মাছের ক্ষতি হয়েছে এবারের বন্যায়।
 একদিকে বন্যার পানিতে ফসলের ক্ষতি, অন্যদিকে তীরবর্তী এলাকায় নিয়মিত ভাঙন। গ্রামীণ রাস্তাঘাট, অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হয়েছে ভীষণ ক্ষতি। বন্যার পরবর্তী সময় দেখা দিচ্ছে, পানিবাহিত রোগ।  এবারের বন্যায় টাঙ্গাইলে কৃষকের স্বপ্ন ভেসে গেছে বন্যা জলে। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা শুষ্ক মওসুমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি করেছেন। সেইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্থদের সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণ দেয়ার  দাবিও করেন কৃষকরা।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, টাঙ্গাইলে স্থায়ীভাবে ২২ কিলোমিটার এলাকায় নদীভাঙন রোধে গাইড বাঁধ নির্মাণের জন্য ২১৯৩ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পের প্রপোজাল তৈরি করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে।

Friday, August 16, 2019

৪০ ঘণ্টা পর যমুনায় ভেসে উঠলো শিশু রাবেয়ার লাশ

ছবি তুলতে গিয়ে যমুনা নদীতে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার ৪০ ঘণ্টা পর ৫ বছরের শিশু রাবেয়ার লাশ পেয়েছে পরিবার। আজ শুক্রবার সকাল ৯ টার দিকে নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বুধবার বিকালে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই লাশের অপেক্ষায় দিনরাত নদীর তীরেই পড়ে থাকতেন মা নাসরিন বেগম,  বাবা এরশাদ আলী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।
আজ সকালে ৯ টার দিকে বালুবাহী সেই ভলগেটের পাশে হঠাৎ করেই রাবেয়ার লাশ  ভেসে উঠে। পরে লাশটি উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসে। এ ঘটনায় রাবেয়ার পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
উল্লেখ্য, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার নিকরাইল ইউনিয়নের সিরাজকান্দি গ্রামের এরশাদ আলী ঈদ উপলক্ষে বুধবার বিকালে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ল্যাংড়া বাজার এলাকার যমুনা নদীর তীরে ঘুরতে যায়। এ সময় রাবেয়াকে বালুবাহী ভলগেটের ওপর দাঁড় করিয়ে ছবি তুলতে গেলে সে নদীতে পড়ে যায়। স্রোত বেশি থাকায় পরিবারের সদস্যরা চেষ্টা করেও তার কোন খোঁজ পায়নি।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় টাঙ্গাইল ও ভূঞাপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তারা উদ্ধারের চেষ্টা চালালেও অতিরিক্ত বালুবাহী ভলগেট থাকায় রাত ৯ টার দিকে প্রথম দফা উদ্ধার কাজ চালিয়ে ফিরে যায়। বৃহস্পতিবার পুনরায় দ্বিতীয় দিনের মতো তারা উদ্ধার কাজ চালিয়েও ব্যর্থ হয় ফায়ার সার্ভিস।

Thursday, August 8, 2019

১ টনের বুদ্দু বাবু

কয়েকদিন বাদেই কোরবানির ঈদ। পবিত্র ঈদকে টার্গেট করে সারা দেশের ন্যায় টাঙ্গাইলের নাগরপুরের খামারিরাও প্রস্তুত তাদের গরু নিয়ে। দীর্ঘ পরিচর্যা শেষে খামারিরা এখন তাদের পশু বিভিন্ন হাটে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। টাঙ্গাইলের নাগরপুরে এবার বাড়তি আকর্ষণ অজিত রায়ের বুদ্দু বাবু। বুধবারে জন্ম নেয়া কালো সাদার মিশেল রঙের সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী ষাঁড়টিকে আদর করে নাম দেয়া হয়েছে বুদ্দু বাবু। বুদ্দু বাবু খুবই শান্তশিষ্ট প্রকৃতির ফ্রিজিয়ান জাতের একটি ষাঁড় গরু। গরুটি টাঙ্গাইলের নাগরপুরের খামার কাঠুরি গ্রামের অজিত রায়ের। গরুটিকে সন্তান স্নেহে লালন পালন করে আসছেন তিনি।
প্রাকৃতিক খাবার যেমন সবুজ ঘাষ, খড়, ভুষি, ভুট্টার ভাঙা দানা খেয়ে বেড়ে উঠেছে। নজরকাড়া গরুটি সার্বক্ষণিক দেখভাল করেন অজিত রায়ের স্ত্রী। গরুটির ওজন প্রায় ১ টন। খুবই শান্ত, রোগ মুক্ত এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি নেই বুদ্দু বাবুর। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে উৎসুক মানুষ ওই বাড়িতে এসে ভিড় করছেন। গরু পালনের বিষয়ে খামারি অজিত বলেন, নাগরপুর উপজেলার প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে গরুর ওজন এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রাকৃতিক (ব্যালেন্সড) সুষম খাবার খাওয়ানো হয়েছে। নিয়মিত গোসল করানো, পরিষ্কার ঘরে রাখা, বাবুর ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত হাঁটানো, রুটিন অনুযায়ী ভ্যাকসিন দেয়া ও কৃমির ওষুধ খাওয়ানো এ সব বিষয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরামর্শেই আজ বুদ্দু বাবু ১ টন। বুদ্দু বাবুকে মোটাতাজা করার ব্যাপারে কোনো প্রকার ওষুধ ও ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়নি বলে জানান তিনি। ্রবুদ্দু বাবুর দামের প্রত্যাশায় অজিত রায় বলেন, বাজার অনুযায়ী বিক্রি করতে হবে। তবে ন্যায্য দাম পেলে স্থানীয়ভাবে বিক্রি করার ইচ্ছা রয়েছে। তিনি গরুটির দাম হাঁকছেন ৮ লাখ টাকা।

Sunday, July 28, 2019

‘কালা বাবু’র দাম ১৫ লাখ টাকা! by এনায়েত করিম বিজয়

কালা বাবু
এবার কোরবানির ঈদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে প্রায় ৪০ মণ ওজনের ‘কালাবাবু’কে। কালা বাবু দেশীয় জাতের ষাঁড় গরু। তাকে লালন পালন করা হচ্ছে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার হাবলা উত্তরপাড়ার মেহেদী হাসানের খামারে। ৮ ফুট লম্বা এই কালাবাবুই এবার কোরবানির ঈদে টাঙ্গাইলের সবচেয়ে বড় গরু বলে দাবি করেছেন মেহেদী হাসান।
জানা যায়, প্রায় সাড়ে ছয় বছর আগে মেহেদীর খামারেই জন্ম হয় কালাবাবুর। এরপর থেকে তাকে কোনও ক্ষতিকর ওষুধ ছাড়াই দেশীয় খাবার খাইয়ে লালন-পালন করা হচ্ছে। গত কোরবানির ঈদে এই গরুটির ওজন ছিল প্রায় ৩৭ মণ। সেই সময় কালাবাবুকে ঢাকার একটি হাটে উঠানো হয়। সেখানে ক্রেতারা গরুটির দাম ৭/৮ লাখ টাকা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মেহেদী বেশি দামের আশায় গরুটি ওই সময় বিক্রি করেনি। এবার মেহেদী হাসান এই গরুটির দাম হাঁকছেন ১৫ লাখ টাকা। এদিকে, খবর ছড়িয়ে পড়ায় কালাবাবুকে দেখতে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এসে ভিড় করছেন।
গরুর মালিক মেহেদী হাসান বলেন, ‘ষাঁড়টি দেখতে কালো বলে নাম রেখেছি কালাবাবু। কালাবাবু খুবই শান্ত প্রকৃতির। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের পরামর্শক্রমে কোনও ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার ছাড়াই দেশীয় খাবার খাইয়ে গরুটিকে লালন-পালন করেছি। এখন গরুটির ওজন হয়েছে প্রায় ৪০মণ। এবার কালাবাবুর দাম চাচ্ছি ১৫ লাখ টাকা।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রৌশনী আকতার বলেন, ‘মেহেদী হাসান তার খামারে দেশীয় খাবার খাইয়ে গরুটিকে লালন-পালন করেছেন। ষাঁড়টিকে নিয়মিত দেখাশোনা করা হচ্ছে। উপজেলায় এই ষাঁড়টিই সবচেয়ে বড়।’
বাসাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এসএম তুহীন আলী বলেন, ‘কোনও কোরবানির যাতে পশু চুরি হতে না পারে, সে জন্য পুলিশের বিশেষ টহল চলছে।’
কালা বাবু

Saturday, July 20, 2019

‘কখনও ভাবিনি বেঁচে দেশে ফিরতে পারবো’ by এনায়েত করিম বিজয়

সেন্টু মিয়া
‘ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ছোট্ট একটি নৌকায় আমরা ৭৫ জন, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মনে হচ্ছিল সাগরের মধ্যেই না খেয়ে মারা যাবো। কখনও ভাবিনি বেঁচে দেশে ফিরতে পারবো।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন তিউনিসিয়া থেকে দেশে ফেরত আসা টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার বাঘেরবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা সেন্টু মিয়া।
জানা যায়, সেন্টু বাঘেরবাড়ির চানু মিয়ার ছেলে। তার রয়েছে পাঁচ বছর বয়সী দুই যমজ ছেলে। চার ভাইয়ের মধ্যে সেন্টু সবার বড়। অভাবের সংসার হওয়ায় স্কুলের গণ্ডি পেরোতে পারেননি তিনি। বাবা কৃষি কাজ করে কোনোমতে সংসার চালান। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় সংসারের ভার পড়ে তার ঘাড়ে। এরপর কিশোর বয়সেই ঢাকায় একটি বইয়ের ছাপাখানায় কাজ নেন। এরপর তার ছোট ভাই মিন্টুকে ধারদেনা করে কাতারে পাঠান। কাতারে মিন্টুর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার বাসিন্দা হামিদের। হামিদের ভাই থাকেন ইতালিতে। মিন্টুর স্বপ্ন জাগে বড় ভাই সেন্টু মিয়াকে ইতালি পাঠাবেন। এরপর সেন্টুর ইতালি যাওয়ার বিষয়ে মিন্টু তার বন্ধু হামিদের সঙ্গে কথা বলেন। বিষয়টি হামিদ তার ভাই ইতালি প্রবাসী জনিকে জানান। পরে আখাউড়া উপজেলার ইতালী প্রবাসী জনি ও একই এলাকার লিবিয়া প্রবাসী রফিকুল ইসলাম সেলিম মিলে সেন্টুকে ইতালি পৌঁছে দিয়ে সাড়ে আট লাখ টাকা নেবেন বলে চুক্তি করেন। চুক্তি মোতাবেক সেন্টুর পরিবার ঋণ, গরু বিক্রি, জমি বন্ধক ও স্বজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে সাড়ে আট লাখ টাকা জমা দেয় ব্যাংকের মাধ্যমে।
সেন্টু মিয়া বলেন, ‘এ বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে দুবাই, মিসর হয়ে লিবিয়ার বেনগাজি এলাকার একটি ক্যাম্পে পৌঁছাই। সেখানে এক সপ্তাহ থাকার পর দালাল রফিকুল ইসলাম সেলিম আমাকেসহ পাঁচ জনকে সেখান থেকে নিয়ে অন্য আরেকটি রুমে আটকে রাখে। তারা অতিরিক্ত টাকা দাবি করে বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালায়। দালাল সেলিম আমার কাছে আরও এক লাখ টাকা দাবি করে। পরে তাকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ওই সময় একটি রুমে আমরা ৫৩ জন ছিলাম। তাদেরও বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হতো। সেখানে প্রায় চার মাস থাকার পর ইতালির উদ্দেশে সাগর পাড়ে আমাদের ৭৫ জনকে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে বড় একটি জাহাজের ছবি দেখানো হয়। ওই জাহাজে করেই ইতালি নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সাগর পাড়ে গিয়ে দেখি ছোট্ট একটি নৌকা। আমরা ওই নৌকায় উঠতে চাচ্ছিলাম না। অস্ত্রের মুখে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে আমাদের নৌকায় তোলা হয়। ৭৫ জন গাদাগাদি করে নৌকায় উঠে ইতালির উদ্দেশে রওনা হই। কয়েক ঘণ্টা যাওয়ার পর নৌকার তেল শেষ হয়ে যায়। ভাসতে থাকি ভূমধ্যসাগরে।’
সেন্টু মিয়ার স্ত্রী ও দুই পুত্র
সেন্টু মিয়া আরও বলেন, ‘সাগরে ব্যাপক ঢেউ ছিল। কোনও ধরনের খাবার ছিল না আমাদের সঙ্গে। শুধু পানি খেয়ে নৌকায় চারদিন কেটে যায়। খাবার না থাকায় সবার জীবনই মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিল। চারদিনের মাথায় একটি তেলের জাহাজ সাগর দিয়ে যেতে দেখি। আমরা ওই জাহাজকে হাত ইশারা করে ডাকার চেষ্টা করছিলাম। অনেকেই নৌকা থেকে লাফিয়ে জাহাজের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিউনিসিয়ার তেলবাহী জাহাজের লোকজন এসে আমাদের জাহাজে ওঠান। ওই জাহাজে ১০ দিন কেটে যায়। পরে জাহাজকর্মীরা সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানালে আমাদের বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। আমি তৃতীয় ধাপে গত ২৫ জুন দেশে ফিরেছি। পরে ২৬ জুন গ্রামের বাড়িতে আসি।’
ভূমধ্যসাগর থেকে ফেরা এই যুব্ক বলেন, ‘দালাল জনি ও সেলিমের মোবাইল ফোন এখন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। কী করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
সেন্টুর বাবা চানু মিয়া বলেন, ‘ঋণ, জমি বন্ধক ও আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার নিয়ে সাড়ে আট লাখ টাকা দালালদের দেওয়া হয়। এখন আমাদের আর কিছুই রইলো না। কবে এই ঋণ শোধ করতে পারবো সেটাও জানি না।’
সেন্টু দেশে ফিরতে পারলেও ঋণের বোঝা মাথায় থাকায় এই অসহায় পরিবারের সদস্যদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবারটি।
সেন্টু মিয়ার বাড়ি

Friday, July 19, 2019

বৃদ্ধা শাশুড়িকে রাস্তায় ফেলে গেল পুত্রবধূ

প্রায় ৬-৭ মাস পূর্বে এক শীতের সকালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বাড়ই খাল ব্রিজের পাশে গাড়ি থামিয়ে ৫৫-৬০ বছরের এক বৃদ্ধাকে ফেলে রেখে যায় এক নারী। পেছন থেকে বৌ মা বৌ মা আমারে রাইখা যাইওনা বলে কাঁদতে থাকে বৃদ্ধা। কিন্তু বউ মা আর থামে না। স্থানীয় অনেকেই সেই দৃশ্য দেখেছেন কিন্তু কাছে যাওয়ার আগেই স্থান ত্যাগ করেন বৃদ্ধার বৌ-মা ওই নারী। এভাবেই বৃদ্ধার করুন ঘটনার বর্ণনা দেন তাকে দীর্ঘ সময় আশ্রয় দেয়া মালেকা বেওয়া।
সেই থেকে বৃদ্ধার ঠিকানা কখনো গাছের নিচে, কখনো রাস্তার পাশে, কখনো আবার ব্রিজের নিচে। বর্তমানে তার ঠিকানা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুর বাইপাস এলাকার আন্ডারপাসের নিচে। গতকাল সকাল ৮টায় সেই বৃদ্ধাকে খাইয়ে দিতে দেখা যায় সেখানে অবস্থান করা একজন পাগলকে। বৃদ্ধা বর্তমানে কোনো কথা বলতে পারেন না, শারীরিক অবস্থাও খুব মুমূর্ষু।
দীর্ঘ সময় ওই বৃদ্ধাকে দেখভাল করা মালেকা বেওয়া জানান, বৃদ্ধাকে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার পর তিনি তাকে তার বাড়িতে রেখেছিলেন দীর্ঘদিন। যাকাত হিসেবে পাওয়া ৫টি কাপড় বিক্রি করে, মানুষের কাছে হাত পেতে, কখনো আবার নিজের পঙ্গু ও ভিক্ষাবৃত্তি করা ছেলের থেকে টাকা নিয়ে ওই বৃদ্ধাকে লালন পালন করেছেন। কিন্তু বাড়ির মালিক ঝুঁকি মনে করায় ওই বৃদ্ধার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হয় তাকে। তিনি আরো জানান, বৃদ্ধা নিজের নাম ভালমতো বলতে না পারলেও ঢাকার রাঙ্গামাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার নাতি-নাতনি লেখাপড়া করে বলে তার (বৃদ্ধার) কাছ থেকে তিনি জেনেছেন। ওই বৃদ্ধার একটি মাত্র ছেলে সন্তান ছিল সে জীবিত নেই বলেও ওই বৃদ্ধার কাছ থেকে জানা গেছে বলে তিনি জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মালেক জানান, খবর পেয়ে একবার ওই বৃদ্ধাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন তিনি। সেখানে কয়েক মাস চিকিৎসা করানো হয়েছে তাকে। তবে তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবগত নন উল্লেখ করে বৃদ্ধার বিষয়ে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করা যায় কিনা সে ব্যাপারে তিনি চেষ্টা চালাবেন বলে জানান।

Monday, June 10, 2019

নিজের অন্ডকোষ খেয়ে ফেললেন মাদকসেবী

টাঙ্গাইলের মধুপুরে এক মাসকসেবী ব্লেড দিয়ে নিজের অন্ডকোষ কেটে খেয়ে ফেলার খবর পাওয়া গেছে। ঈদেরদিন সন্ধ্যায় উপজেলার শালিকা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ওই মাদকসেবীর নাম মো.রাজীর আহম্মেদ রাজু (২৫)। সে শালিকা গ্রামের মো.খায়রুল ইসলামের ছেলে। রাজীব এক সন্তানের জনক।
স্থানীয়রা জানান, রাজীব বেশ কিছুদিন আগে থেকে মাসদকাসক্ত হয়ে পড়েন। অভিবাবকরা তাকে ময়মনসিংহ মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রেখে আসেন। দু’ছর পর সেখান থেকে ফিরে পুনরায় মাদক সেবন শুরু করেন। রাজীব ঈদের আগের দিন নিজ গ্রামের পাশের এক বাড়িতে একটি পাঠা ছাগলের বাচ্চাকে খাসা করাতে দেখেন।
স্থানীয় একজনকে সেই ছাগলের অন্ডকোষ কেটে কাঁচা অবস্থায় খেয়ে ফেলতে দেখেন। ছাগলের অন্ডকোষ খাদক রাজীবকে জানায়, অন্ডকোষ খেলে নাকি শরীরে অন্যরকম শক্তি হয়।
ঈদের দিন সন্ধ্যায় দোকান থেকে ব্লেড কিনে নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিজেই নিজের অন্ডকোষ কেটে একটি কোষ খেয়ে ফেলেন। পরে ঘরের দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসলে পরিবারের লোকজন ঘরে গিয়ে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
রাজীবকে উদ্ধার করে প্রথমে মধুপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন।
রাজীবের চাচা মো.নূরুজ্জামান জানান, অন্ডকোষ কেটে খায়নি,নেশা অবস্থায় কেটে ফেলেলি। ময়মনসিংহ থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। সে এখন সুস্থ্য আছে।
স্থানীয় মহিষমারা ইউ.পি সদস্য মো. লাল মিয়া জানান, অনেকদিন ধরে রাজীব মাদকাসক্ত। ইতিপূর্বে নেশা অবস্থায় সে তার স্ত্রীর মাথায় আঘাত করেছিল। সেই ঘটনায় চেয়ারম্যানসহ আমরা শালিস করেছি। শোনেছি এবার সে নিজের অন্ডকোষ কেটে খেয়ে ফেলেছে।

Saturday, June 8, 2019

যানজটে আটকা পড়ে সড়কেই সন্তান প্রসব

হাবিব হোসেন কাজ করেন গাজীপুরের একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে। পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে ঈদ করতে সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে গাজীপুর থেকে একটি কুড়িগ্রাম যাচ্ছিলেন। দীর্ঘ যানজটের কারণে তাদের বহনকৃত বাসসহ অন্যন্য বাস আটকে পড়ে বঙ্গবন্ধু সেতু গোলচত্বর এলাকায়। এ সময় ওই এলাকায় প্রসব বেদনা শুরু হয় স্ত্রী আফরোজার। পরে সড়কের উপরই স্ত্রী কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। পরে ভূঞাপুর থানা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের দুই নার্স সেতু এলাকায় এসে শিশু সন্তানসহ মাকে চিকিৎসা দেন।  মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। হাবিব হোসেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগদাঙ্গা ইউনিয়নের পোড়ার ভিটাগ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে। হাবিব তার মেয়ের নাম রেখেছেন সরণি।
স্থানীয়রা এর নাম রেখেছেন সেতু। স্বামী হাবিব হোসেন জানান, পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে স্ত্রীকে নিয়ে গাজীপুর থেকে কুড়িগ্রাম যাচ্ছিলাম। মাঝে ঢাকা-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের গোলচত্বর এলাকায় আমার স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু হয়। গাড়িতে প্রসব বেদনা শুরু হলে তাকে ধরে সড়কের পাশে গাছের নিচে রাখা হয়। এ সময় গাড়ির একজন ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে। পরে স্বাভাবিকভাবেই স্ত্রী আফরোজা বেগম কন্যাশিশু জন্ম দেন। এরপর ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স থেকে নার্সসহ একটি এম্বুলেন্স আসে। পরে নার্সরা স্ত্রীকে চিকিৎসাসেবা দেন। মা ও মেয়ে দুইজনই সুস্থ  রয়েছে। এদিকে সন্তানসহ হাবিব সাড়ে ১১টার দিকে নীল রঙের একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করে বাড়ির দিকে রওনা দেন। এ বিষয়ে ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র নার্স সাজেদা খাতুন বলেন, ঘটনাস্থলে আসার আগেই সন্তান প্রসব হয়েছে সড়কের উপরে। এরপর মা-মেয়েকে চেকআপ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুইজনকে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়েছে। দুইজনই সুস্থ রয়েছেন।

Thursday, June 6, 2019

ঘাটাইলে ‘শিক’ মেরে পাকানো হচ্ছে কাঁঠাল by আতিকুর রহমান

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা মূলত কাঁঠালসমৃদ্ধ এলাকা। ঘাটাইলের দুই-তৃতীয়াংশ পাহাড়ি এলাকা থাকায় মৌসুমি ফল আনারস, আম, কলা সহ ব্যাপক পরিমাণে কাঁঠাল আবাদ হয়। উপজেলার প্রায় ১৯/২০টি বাজারে প্রতিদিন সকালে কাঁঠালের হাট বসে। গারোবাজার, সাগরদিঘী, জোড়দিঘী, আষাঢ়িয়াচালা, রামদেবপুর, শহরগোপিনপুর, ধলাপাড়া, দেওপাড়া, দেলুটিয়া, ছনখোলা, চাপড়ী বাজার, পেচারআটা, মাকড়াই, কুশারিয়া, পাকুটিয়া বাজার সহ  বেশ কিছু হাটে ব্যাপক পরিমাণের কাঁঠাল আমদানি হয়। এসব কাঁঠাল স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রাক কাঁঠাল ভর্তি করে বিভিন্ন স্থানে চলে যায়। এ ছাড়াও ঘাটাইলের পার্শ্ববর্তী উপজেলা মধুপুর ও সখিপুরেও ব্যাপক পরিমাণে কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। এসব উৎপাদিত জাতীয় ফল কাঁঠাল পাকাতে এখন আর প্রকৃতির ওপর নির্ভর করছে না কেউ। মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই অধিক মুনাফা লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করে কচি কাঁঠাল পাকাচ্ছে।
এসব কচি কাঁঠাল পাকাতে তারা নির্বিচারে বিষাক্ত ক্যালসিয়াম-কার্বাইড, ইথাইড, কপার সালফেট, পটাশের তরল দ্রবণ, কার্বনের ধোঁয়া, রাইপেন জাতীয় বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি  লোহার শিক  দিয়ে কাঁঠালে প্রবেশ করাচ্ছেন। এক কথায় বলতে গেলে সরসরি বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। স্থানীয় ভাষায় রাসায়নিক প্রয়োগের এ পদ্ধতিকে ‘শিক’ মারা বলে। প্রায় দেড় ফুট লম্বা লোহার শিক কাঁঠালের বোটা বরাবর ঢুকিয়ে দিয়ে ছিদ্র পথে ইনজেকশনের বড় শিরিঞ্জ এর মাধ্যমে কার্বাইড, ইথ্রায়েল, ইথিকন ও রাইপেন জাতীয় বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগ করা হচ্ছে। পরে এক জায়গায় কাঁঠাল স্তূপ আকারে সাজিয়ে পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে চাপা দিয়ে রাখলেই ১৮-২৪ ঘণ্টার মধ্যেই একটি কচি কাঁঠাল পেকে মিষ্টি পাকা কাঁঠালের মতো গন্ধ ছড়ায় দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই এটি একটি অপরিপক্ব বিষাক্ত কাঁঠাল। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক স্থানীয় কিটনাশকের দোকানেই পাওয়া যায়। স্থানীয় ভাবে এসব অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকান। কিটনাশন ব্যবসায়ী মো. হায়দার আলী জানান আমরা অনুমোদিত বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে এসব ঔষধ ক্রয় করে থাকি। কোম্পানিগুলো বাহারি রঙ্গের বোতলে আমাদের কাছে এগুলো পৌঁছে দেয়। কাঁঠাল ও আনারসের মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ বোতল মেডিসিন বিক্রি হয়। অন্য আরেক ব্যবসায়ী মো. সালামত খান প্রায় একই কথা বলেন। এদিনে ধলাপাড়া বাজারের ঔষধ ব্যবসায়ী মো. আ. হান্নান বলেন রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করে কাঁঠাল পাকালে আমরা যেমন একদিকে সরাসরি বিষ খাচ্ছি অপরদিকে এই সাধুপন্থা গ্রহণ করার কারণে ঘাটাইলে কাঁঠালের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। যার ফলে কাঁঠালের বাজারে মন্দা ভাব বিরাজ করছে। কৃষক তার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এ ব্যাপারের ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সাইফুর রহমান খান বলেন এসব রাসায়নিক মিশ্রিত কাঁঠাল খেলে আমাশয়, লিভারডিজিস, রাতকানা, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমা সহ ক্যানসারের মতো জটিল ও কঠিন রোগ হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এসব খাদ্য গ্রহণ না করাই ভালো।