Tuesday, November 19, 2013

আওয়ামী লীগ কি বিএনপির পথেই হাঁটছে? by মোঃ আবু সালেহ সেকেন্দার

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাস বেশ পুরনো। সংঘাতে না জড়িয়ে সমঝোতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজার ইতিহাসও বেশ গৌরবের। বাংলার প্রথম সার্বভৌম শাসক শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে যে মাৎস্যন্যায় বা অরাজকতার যুগের সূচনা হয়েছিল, তার সমাপ্তির মধ্যেই ওই গৌরবের ইতিহাস লুকায়িত আছে। ঐতিহাসিক লামা তারানাথ অরাজকতার যুগের অবসানের ইতিহাস আলোকপাত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘...দেশের রাজা নির্বাচিত হতেন। কিন্তু শেষের দিকের একজন নির্বাচিত রাজার রানী প্রত্যেক নির্বাচিত রাজাকে রাতে হত্যা করতেন। কয়েক বছর পর এইরূপ কিছুদিনের জন্য নির্বাচিত রাজা গোপাল এই রানীর হাত থেকে মুক্তি লাভ করেন (অর্থাৎ রানীকে হত্যা করেন এবং স্থায়ী রাজা নির্বাচিত হন)।’ তারানাথের ওই কাহিনীটি মোটামুটি সত্য বলে খ্যাতিমান আরেক ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তার ‘বাংলাদেশের ইতিহাস : প্রাচীন যুগ’ গ্রন্থে মত প্রকাশ করেছেন। ঐতিহাসিক লামা তারানাথের ‘নির্বাচন’ শব্দটির ব্যবহারই এই ইঙ্গিত দেয় যে, ওই যুগে বাংলাতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রচলিত ছিল এবং শাসক কে হবেন তা নির্বাচনের মাধ্যমেই ঠিক করা হতো। রাজা গোপালের নির্বাচনও সেই কথারই প্রমাণ দেয়। আর যদি রানী কর্তৃক রাজাকে হত্যার ঘটনাকে সত্য হিসেবে ধরে নেই; তবে ওই ঘটনাতে আমাদের বর্তমান রাজনীতিক ও কথিত তৃতীয় শক্তির জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। একের পর এক রাজা নির্বাচিত করা হচ্ছে। আর রানী সবাইকে হত্যা করছেন। কিন্তু এই অরাজকতার পরিপ্রেক্ষিতে সিংহাসনে শূন্যতার সুযোগে অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতা গ্রহণ করেনি অথবা বাঙালিরা নির্বাচিত রাজা হত্যার শিকার হলেও নির্বাচন থেকে সরে এসে অন্য কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করেনি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই উত্তর আধুনিক যুগে এসে আমরা রাজনৈতিক সংকটে আশংকা প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছি যে, যদি দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা না হয়; তবে কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করবে। তা’হলে কি এই প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়াটা অযৌক্তিক যে, অরাজকতার যুগেও বাংলার গণতন্ত্র যতটুকু শক্তিশালী ছিল; আজ তাও নেই?
বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের গণতন্ত্রের পথচলা মসৃণ নয়; তাই প্রধান দুই দলের দুই মেরুতে অবস্থান আমাদের আতংকিত করে। এ প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে, আমাদের মধ্যে ওই আতংক কে বা কারা তৈরি করেছে? কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তিই কি এর জন্য দায়ী? ইতিহাস বলে, বারবার গণতন্ত্রের বিকাশকে রুদ্ধ করার জন্য অগণতান্ত্রিক শক্তি দায়ী নয়; এর জন্য ‘গণতন্ত্র’, ‘গণতন্ত্র’... বলে সারা দিন জিকির করা রাজনৈতিক শক্তিই দায়ী। তাদের অগণতান্ত্রিক মানসিকতাই বারবার এ দেশের গণতন্ত্রের পথ চলাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তাদের মধ্যে অনৈক্যই অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে বা সুযোগ করে দিয়েছে।
রাজা গোপালের কথাই ধরি না কেন! তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করলেও রাজদণ্ড হাতে নিয়েই উত্তরাধিকারী মনোনয়ন পদ্ধতি চালু করেন। তিনি গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করে একনায়কতন্ত্রেরও পথে হাঁটেন। ফলে পালদের প্রায় চারশ’ বছরের শাসনামলে বাংলার আর কোনো শাসককে আমরা নির্বাচিত হতে দেখিনি। সবাই অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই ক্ষমতার মসনদে বসেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয় যে, আমরা বিরোধী দলে থাকতে ‘গণতন্ত্র’, ‘গণতন্ত্র’... বলে চেঁচামেচি করলেও ক্ষমতায় যাওয়া মাত্রই আওয়াজ পাল্টে ফেলি। সংবিধান প্রেমে মগ্ন হই! নিজেদের প্রয়োজন মতো সংবিধান সংশোধন করে নেই। আইন প্রণয়ন করি। একবার ক্ষমতার স্বাদ পেলে আর ক্ষমতা ছাড়তে চাই না। গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিক যে কোনো উপায়েই হোক ক্ষমতায় টিকে থাকা চাই। ফলে সদ্য বিদায়ী সরকার আর সদ্য নির্বাচিত সরকারের কাজ-কর্মে কোনো পার্থক্য থাকে না। প্রাচীন বাংলার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শাসক গোপালের মানসিকতার প্রতিছবিই যেন সেখানে উদ্ভাসিত হয়।
বাংলার যুগ যুগান্তরের ইতিহাস বলে, ক্ষমতা সর্বদা শাসককে গোপালে পরিণত করেছে। শাসকদের মধ্যে অগণতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বাঙালিরা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছিল হয়তো অনেক কারণে। কিন্তু প্রধান কারণ ছিল, পাকিস্তানিদের গণতান্ত্রিক মানসিকতার অভাব। এমনকি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের ভোটে পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোও মানসিকতার দিক থেকে ছিলেন অগণতান্ত্রিক। তাই তিনি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করুন তা মনেপ্রাণে চাননি। পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানও ওই পথেই হেঁটেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর হাতে শাসন ক্ষমতা না দিয়ে সামরিক বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। যার ফল শুভ হয়নি। এই ইতিহাস প্রায় সবার জানা। কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় কয়জনে! বাঙালিরাও নেয়নি। তাই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই দেশ স্বাধীন হলেও ওই যুক্তিযুদ্ধের বহু সেনানীই অগণতান্ত্রিক পথে হেঁটেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে।
সামরিক শাসনের কথা না হয় বাদই দিলাম। জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের সব আচরণই সব সময়ই কি গণতান্ত্রিক ছিল? সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইন, ১৯৭৫-এর কথাই যদি ধরি, ওই আইন কতটুকু গণতান্ত্রিক ছিল? ওই সংশোধীনতে শুধু একটি রাজনৈতিক দল গঠনের কথা বলা হয়েছিল তা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী নয়? আজ যারা সংবিধানের জন্য মায়াকান্না করছেন, গণতন্ত্রের জন্য অঝোরে চোখের পানি ফেলছেন, মুক্তিযুদ্ধের জন্য মাতম করছেন, তারা সেদিনও ছিলেন, কিন্তু তারা কি সেদিন প্রতিবাদ করেছিলেন? দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কথা বলেছিলেন? কেন জানি সেদিন তাদের চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল, তাই সেদিন সদ্য প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বুকে নির্মম ছুরি চালানো হলেও তারা আওয়াজ তোলা তো দূরের কথা, ‘উহ’ শব্দটি উচ্চারণ পর্যন্ত করেনি। খুব জানতে ইচ্ছে করে, গণতন্ত্রের কথিত ফেরিওয়ালাদের সংবিধান প্রেম সেদিন কোথায় ছিল?
নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে দুই দলের অনড় অবস্থানে এ দেশের গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা অনিশ্চিতার ঘেরাটোপে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ। এখন সাধারণ মানুষের সরকারি দলের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করা উচিত, যে ক্ষতি বর্তমান সরকারি দল বিরোধী দলে থাকতে করেছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে ১৭৩ দিন হরতাল পালনের মাধ্যমে। ওই দাবি যে গণতান্ত্রিক ছিল না সেই বোধোদয় কেন এতদিন পরে হল সেই প্রশ্নেরও জবাব চাওয়া উচিত। ওই নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করতে গিয়ে তৎকালীন বিরোধী দলের হরতালে যেসব নিরীহ মানুষ হত্যার শিকার হয়েছিল, তাদের পরিবারের কাছেও বর্তমান সরকারি দলের ক্ষমা চাওয়া উচিত। কিন্তু জানি, এ দেশে রাজনীতিকদের কথাই শেষ কথা। তাই ওই সব ক্ষতিপূরণ সাধারণ জনগণ পাবে না। ক্ষমা চাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। বরং জনগণকে সর্বদা শিল আর পাটার ঘষাঘষির মাঝখানে পড়ে প্রাণ হারাতে হবে, এটাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
জনগণের উচিত আজ সরকারি দলের নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে নেয়া যে, আগামীতে যদি আপনি বিরোধী দলে যান, তবে তখনকার সরকারি দলের অধীনে নির্বাচনে যাবেন কিনা সেই বিষয়টি। নাকি আপনি আগের মতো আপনার প্রতিশ্র“তি (‘আমরা বিরোধী দলে গেলেও হরতাল দেব না’) থেকে সরে আসবেন সেই বিষয়েও। অন্যদিকে বর্তমান বিরোধী দলের নেতার কাছ থেকেও জনগণকে এই প্রতিশ্র“তি আদায় করে নিতে হবে যে, আপনারা যদি ক্ষমতায় যেতে পারেন; তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও নির্দলীয়-নিরপেক্ষ ব্যক্তির অধীনে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবেন ইত্যাদি। আমরা আর দুই দলের মাঝখানে পড়ে কচুকাটা হতে চাই না। আমরা দুই দণ্ড শান্তি চাই। দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা চাই। আমরা এ দেশের উন্নয়ন অবশ্যই চাই। কিন্তু গণতন্ত্রকে বিকিয়ে দিয়ে নয়। তবে ওই গণতন্ত্রও চাই না, যে গণতন্ত্রে শিশু মনিরকে পিতার সামনেই পুড়ে অঙ্গার হতে হয়। প্রতিদিন পুলিশের গুলিতে নিরীহ মানুষের প্রাণ যায় অথবা হরতালের নামে জ্বালাও-পোড়াও, ককটেল ফাটিয়ে সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করা হয়। পরিশেষে, এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে এই সত্য উদ্ভাসিত হবে যে, আজ সরকারি দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যা বলছে, সেই কথাই আমরা ১৯৯৬ সালে বিএনপিকে বলতে শুনেছি। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালে বিরোধী দলে থেকে আওয়ামী লীগ যা বলেছে, আজ বিএনপি সেই কথাই বলছে। সেদিনও নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ হরতাল, মানববন্ধন, মিছিল-সভা-সমাবেশ, জ্বালাও-পোড়াও করেছে। আজ বিএনপিও তাই করছে। তারা নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে হরতাল, সংঘাত-সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। সেদিন বিএনপি ১৫ ফেব্র“য়ারির একদলীয় নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। আজ আওয়ামী লীগ অফিসে মনোনয়ন উৎসব, সর্বদলীয় সরকার গঠন ও নির্বাচন কমিশনের তোড়জোড় দেখে মনে হচ্ছে বর্তমান সরকারও সেই পথেই হাঁটছে।
মোঃ আবু সালেহ সেকেন্দার : শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

পাড়াপড়শীর ঘুম নেই by ড. মোকাম্মেল এইচ ভূঁইয়া

দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে গত ২২ বছরেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নির্বাচন এলেই শুরু হয় রাজনৈতিক ঝড় আর এতে প্রাণ যায় মানুষের। কেন এমনটি হচ্ছে? কারণ একটাই- ক্ষমতায় থাকা আর ক্ষমতায় যাওয়া, তা যে কোনো উপায়েই হোক না কেন। কী এর উদ্দেশ্য? জনকল্যাণ নাকি ব্যক্তি/গোষ্ঠীর কল্যাণ? যদিও বলা হয়, সব কিছু করা হয় জাতির মঙ্গলের প্রয়োজনে। দু’দলই জাতির মঙ্গল করার সুযোগ চায়। তবে এ কথাও সত্য, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশ এগিয়েছে দু’দলের সময়েই। তাই আমরা সামাজিক ও মানব উন্নয়নের সূচকে প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়েছি। এখন আমাদের প্রয়োজন টেকসই ও প্রকৃত গণতন্ত্রের প্র্যাকটিস। আর ক্ষমতার মোহমুক্তি। যদিও সব কিছুই হয় Of the people, by the people, for the people-এর নামে, কিন্তু অন্তরে লালিত হয় এবং বাস্তবে প্রয়োগ হয় Off the people, buy the people, far the people-এর গণতন্ত্র।
যুগান্তরে ৮ নভেম্বর ‘একমত হতে পারছেন না বিদেশীরা’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। দেশ আমাদের, নির্বাচন আমাদের, ভোট দেবে আমাদের জনগণ, কিন্তু একমত হতে পারছেন না পাড়াপড়শীরা। বর্তমান পৃথিবীকে বলা হয় গ্লোবাল-ভিলেজ। তাই যুক্তরাষ্ট্রকেও পড়শীদের অন্তর্ভুক্ত করছি। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পড়শী পর্যায়ে জাপান-কোরিয়া-চীন কিংবা গ্লোবাল-ভিলেজের একক ক্ষমতার মালিক যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য স্টেকহোল্ডারদের কিছু সুপরামর্শ দেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। পাশাপাশি আমাদের প্রতিবেশী ভারতও যেহেতু বাংলাদেশের জন্মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এবং মূল প্রতিবেশী, তাই তাদের পরামর্শও নেয়া যেতে পারে। অবশ্য ভারতও সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কিছুটা যুক্ত হয়েছে। তবে তারা ইদানীং অনেক বেশি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সরকার নিয়ে। সম্প্রতি ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার আয়োজিত ‘বাংলাদেশ : প্রোস্পেক্ট অব ডেমোক্রেটিক কনসলিডেশন’ বিষয়ক এক সেমিনারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। সেখানে সুস্পষ্টভাবে সংবিধানের মধ্যে থেকে নির্বাচন বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সংবিধান নিয়েই চলছে যত তর্ক এবং বিরোধী দলের আপত্তি, যা সংঘাতের বড় কারণ। ভারত আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান সাহায্যকারী বন্ধু। বাংলাদেশে যদি কোনো ধরনের জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করে, সেটা ভারতের কিছু অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে দেখা দিতে পারে। যদিও ভারতের সেভেন সিস্টার্স, পশ্চিমবঙ্গের কিছু অঞ্চলে মাওবাদসহ কাশ্মীরে বহু বছর ধরে চলছে অস্থিতিশীলতা। এছাড়া কোনো কোনো সময়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা ভারতের জন্য অস্বস্তিদায়ক। তাছাড়া ভারতের রয়েছে পার্লামেন্ট ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে বিদেশী মদদে আক্রান্ত হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা। ফলে ভারত কোনোভাবেই চাইবে না বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা তার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠুক। কিন্তু এর অন্য পিঠে রয়েছে বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিবেশ ও জনগণ। তাদের ভাবনাচিন্তা কিংবা ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার। এটা অবশ্যই সত্য যে, বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ জঙ্গিবাদ উত্থানের বিরোধী, কারণ এটা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে কিছু অমীমাংসিত সমস্যা যেমন- তিস্তা ও ছিটমহল বিনিময় চুক্তি, টিপাইমুখ বাঁধ বিষয়ে অস্পষ্টতা, সীমান্ত হত্যা, রামপালে যৌথ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে প্রতিবেশ-পরিবেশের ওপর প্রভাব। আর ফারাক্কার প্রভাব তো এক সময়ের প্রবল প্রমত্ত পদ্মায় শুকনো মৌসুমে গাড়ি চলাচল করতে দেখে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়াই বোঝা যায়। দুঃখজনক যে, এ সরকারের সময়েও এগুলো মীমাংসিত হয়নি। পাশাপাশি ভারতেরও রয়েছে কিছু অভিযোগ। বন্ধুত্ব টিকে থাকে পারস্পরিক সহমর্মিতায়। এক্ষেত্রে ভারতকে বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। বিশ্বায়নের এই যুগে কেউ কারও কাছ থেকে আলাদা নয়। পারস্পরিক প্রয়োজন রয়েছে। আমরা আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের যে কোনো ইতিবাচক ভূমিকাকে স্বাগত জানাব। ভারতের থিংক ট্যাঙ্কদের মধ্য থেকেই এ বক্তব্য এসেছে যে ‘একা বড় হওয়া যায় না’। অন্যদিকে আমেরিকা বহু বছর ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার। তারা জঙ্গিবাদের ভয়ে ভীত। এ ভয় যেমন রয়েছে আমেরিকা-ভারতের, তেমনি রয়েছে সৌদি আরব কিংবা বাংলাদেশের। ফলে অনেকগুলো ফ্রন্ট বিভিন্ন দেশে খুলতে হয়েছে আমেরিকার, তৈরি করেছে অনেক শত্র“। এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ঠাণ্ডা যুদ্ধোত্তর বিশ্ব ব্যবস্থায় একক আধিপত্য বজায় রাখার বিষয়টি। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অনেক দেশের কাছে। বঙ্গোপসাগরে প্রাকৃতিক সম্পদ- গ্যাস ব্লক ইজারা, চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রকে চিন্তিত করে তুলেছে। ভাবিয়ে তুলেছে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের নৌশক্তির প্রভাব এবং পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গোয়াদরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ কাজে চীনের উপস্থিতিও। গোয়াদরের অবস্থান পারস্য উপসাগরের মুখে এবং সেখান থেকে সহজেই হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এ ছাড়া ইরানের সঙ্গেও রয়েছে চীনের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সামরিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক। অন্যদিকে শ্রীলংকার কলম্বোতে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে চীন, যেটি আগস্টে উদ্বোধন করা হয়। ২০১২ সালে দক্ষিণ শ্রীলংকার হাম্বানটোটা শহরে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করেছে চীন। তিব্বতের নিকটবর্তী শহর নেপালের লারছাতে চীন ১৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি স্থলবন্দর নির্মাণ করছে। অন্যদিকে মিয়ানমারে রয়েছে চীনের প্রবল প্রভাব। ফলে ঠাণ্ডা যুদ্ধোত্তর বিশ্বে ভারত-রাশিয়া মৈত্রী বন্ধন ভেঙে যুগের চাহিদায় নির্মিত হয়েছে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মৈত্রী, যা সামরিক-বেসামরিক সব ক্ষেত্রেই ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। এ ছাড়াও সন্ত্রাসবাদবিরোধী অবস্থান তাদের এক সঙ্গে আসতে সাহায্য করেছে। কারণ দুটি দেশই সন্ত্রাসবাদের শিকার। ফলে একে অন্যের সহযোগী। মতদ্বৈততা যে হয় না তা নয়। কিন্তু পেশাদারিত্ব ও দেশের স্বার্থে ভারত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তা মোকাবেলা করে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশ আবেগনির্ভর কূটনীতির কারণে ও পেশাদারিত্বের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতার দায় ভারত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে লাভ নেই, প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও পেশাদারিত্বের। যা হোক, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুত্ব অনেকটাই সুদৃঢ়। অনেক বিষয়েই দু’দেশ একমত। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র আর কর্তৃত্ব দিতে চাচ্ছে না ভারতকে। যুগান্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্তকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু আস্তে আস্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ ক্ষুণœ হওয়ায় ভারতের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে চাইছে না দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান নেয়ার নেপথ্যে ভারতের ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া রাশিয়া থেকে বাংলাদেশের বিরাট অংকের টাকার অস্ত্র ক্রয়, ফ্রান্স থেকে ভারতের অস্ত্র ক্রয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান থেকে ভারতের তেল ক্রয়সহ বিভিন্ন ইস্যুতে সাম্প্রতিককালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতানৈক্য হয়।’ অবশ্য আরেক সংবাদ অনুযায়ী, ড্যান মজিনা বলেছেন, বাংলাদেশের প্রশ্নে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অভিন্ন। মন্তব্যটিকে আমরা দু’ভাবে নিতে পারি- এক. নিছক কূটনৈতিক মন্তব্য; দুই. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর তার সরকারের বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে একত্রে কাজ করার নির্দেশনা। ভারতের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন টেকসই গণতন্ত্র, দেশপ্রেম ও পেশাদার আমলাতন্ত্র। এ ছাড়াও ভারত তার প্রভাব মার্কিন সরকার পর্যন্ত গড়িয়েছে। ভারতীয়-আমেরিকান নাগরিকরা আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টসহ জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। ফলে তারা ভারতের স্বার্থ কিছুটা হলেও দেখবে বৈকি!
অন্য এক পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশ বিষয়ে একমত। পাকিস্তানের কথা বলব না, কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে পাকিস্তানের প্রভাব নেই বললেই চলে। আর পাকিস্তান মার্কিন বলয়ভুক্ত দেশ, যদিও সে দক্ষতায় চীনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তদুপরি দেশটি জঙ্গিবাদের কারণে নিজেই পর্যুদস্ত। আর সৌদি আরব যদিও বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থানে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে, তথাপিও মার্কিন বলয়ের বাইরের কোনো দেশ নয়। যদিও সাম্প্রতিককালে নিরাপত্তা পরিষদে সদস্যপদ নেয়া-না নেয়া নিয়ে মার্কিনিদের সঙ্গে মনোমালিন্য চলছে, মূলত ইরান দমনে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কার্যকর ভূমিকা দেখতে না পাওয়ায় এই মান-অভিমান। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে খুব বেশি কিছু করার নেই সৌদি রাজপরিবারের। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গেও সৌদি সম্পর্ক ভালো। কয়েক বছর আগে সৌদি বাদশাহ ভারত সফর করেছেন, করেছেন বিভিন্ন চুক্তি। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এবারের নির্বাচনী অচলাবস্থা নিয়ে প্রথমবারের মতো মন্তব্য করেছে চীন, যা এর আগে কখনও দেখা যায়নি। চীন বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং সামরিক দিক থেকেও অন্যতম শক্তি। ফলে সে তার প্রভাববলয় আরও বৃদ্ধি করবে বিশেষভাবে এশিয়ায়, আর এটাই স্বাভাবিক। যা হোক, আমেরিকা, ভারত, চীন কিংবা সৌদি আরবের মধ্যে যতই বন্ধুত্ব কিংবা শত্র“তা থাকুক, বাংলাদেশের বিষয়টিকে তারা নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চাইবে এবং ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবে।
দেশ আমাদের, এর ভালো-মন্দ দুটোই নির্ভর করছে দুটি বড় রাজনৈতিক দলের ওপর। একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন দেশকে এগিয়ে নেবে। পাড়াপড়শীদেরও এ বিষয়ে লক্ষ্য রাখা উচিত। ভারতে যেমন কখনও ভাবা যায় না অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন, বাংলাদেশেও আমরা চাই একটি গণতান্ত্রিক ইনক্লুসিভ নির্বাচন। যাতে আমরাও সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি। আর যে ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে অনেক রাষ্ট্রই কনসার্ন আমাদের বিষয়ে, সেটাকে দক্ষতা-যোগ্যতা-প্রজ্ঞার মাধ্যমে ব্যবহার করে নেতারা আত্মনির্ভরশীল, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবেন। আর আস্থা অর্জন করবেন জনগণের। প্রয়োজনে বিদেশী বন্ধুদের পরামর্শ নেবেন, কিন্তু ভরসা রাখবেন নিজ দেশ ও জাতির ওপর। সবার উপরে দেশ।
ড. মোকাম্মেল এইচ ভূঁইয়া : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ওয়ারশ সম্মেলন নিয়ে বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা by অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম

আজ থেকে কোটি বছর আগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বর্তমান সময়ের মতোই বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বায়ুমণ্ডলে অধিক মাত্রার কার্বন ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতির কারণে তখন বিশ্বের তাপমাত্রা বর্তমান সময়ের তুলনায় পাঁচ থেকে ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি ছিল। তখন বিশ্বে বিদ্যমান তাপমাত্রার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। অধিক উষ্ণতার কারণে এক সময় বিশ্বব্যাপী বরফের পরিমাণ ছিল খুবই কম। ওই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পৃথিবীতে কী ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিয়েছিল, সেসব নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা হওয়া দরকার। এতে ওই সময়ের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া যাবে। টেকসই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য কোটি বছর আগের সেসব তথ্যও বিস্তারিত জানা দরকার। জাতিসংঘের উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোর মধ্যে কিয়োটো সম্মেলন ও কোপেনহেগেন সম্মেলন বিশ্ববাসীর যতটা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল অন্য সম্মেলনগুলো তা পারেনি। উল্লিখিত দুই সম্মেলনের বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড পরবর্তী সম্মেলনগুলোকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এসব সম্মেলন কাক্সিক্ষত মাত্রায় ফলপ্রসূ হচ্ছে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনের অভিজ্ঞতা মনে রেখেই আগামীতে অনুষ্ঠেয় এ বিষয়ক সম্মেলনগুলো নিয়ে আশাবাদী হতে চাই। এসব সম্মেলনের পর তাৎক্ষণিক সুফল না মিললেও বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর আন্তঃসম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন, ফিচার ও প্রবন্ধে উল্লিখিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে এটাই স্পষ্ট হয়, পোল্যান্ডের ওয়ারশে চলমান বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ-১৯) থেকে তেমন বড় কোনো প্রাপ্তি মিলবে না। কিন্তু ওয়ারশ জলবায়ু সম্মেলনের আলোচনা ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠেয় কপ-২১কে সফল করতে সহায়ক হবে। প্যারিসে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-২১) প্রথম প্রস্তুতি সভাটি ১৭ জুন-২০১৩ প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন নিয়ে বিশ্ববাসী বিশেষভাবে আশাবাদী হতে শুরু করেছে। কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের সময় আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যতটা সরব ছিল, বর্তমানে তা লক্ষ্য করা যায় না। এটা দুঃখজনক। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন সফল করার ক্ষেত্রে মিডিয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখতে হবে।
শিল্প বিপ্লবের পর থেকে শিল্প সমৃদ্ধ দেশগুলোর কলকারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ দূষিত গ্যাস নির্গত হয়ে পরিস্থিতি কী ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তা প্রতিনিয়ত আলোচিত হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য শিল্প-কারখানা থেকে যে দূষণ নির্গত হয় তা ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে বিশ্ব সম্প্রদায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছে না। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এমন প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে হবে যাতে কলকারখানা থেকে নির্গত দূষণ ন্যূনতম পর্যায়ে আনা সম্ভব হয়।
শিল্পোন্নত দেশগুলোর দায় স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। কিন্তু ক্ষতিপূরণ প্রদান নিয়ে নানা রকম জটিলতা সৃষ্টির বিষয়টি দুঃখজনক। আমরা লক্ষ্য করেছি, একেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়। এসব আলোচনা আবার দ্রুত থেমে যায়। বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার জন্য আরেকটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে কেন? যেহেতু বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার, তাই নতুন করে প্রকৃতির রুদ্র রূপ দেখার অপেক্ষা না করে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো তাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পেলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা বাড়বে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোও বহুমাত্রিক গবেষণায় মনোনিবেশ করতে পারবে, যেসব গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর উপকৃত হওয়ার পথ সুগম হবে। ফিলিপাইনে টাইফুনের তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ওই ঘটনার দীর্ঘ সময় পরও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়নি। দেশটিতে টাইফুন আঘাত হানার ৩৬ ঘণ্টা পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে টাইফুনের তাণ্ডবের যে চিত্রটি ফুটে উঠেছিল, এটা ছিল একেবারেই খণ্ডিত। হয়তো যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয়ই ছিল এর অন্যতম কারণ। টাইফুন আঘাত হানার প্রায় ৬০ ঘণ্টা পরই বিশ্ববাসী ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা পেল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ধ্বংসস্তূপের ছবি দেখে বোঝার উপায় নেই- সেখানে এক সময় লাখো মানুষ বসবাস করত। নতুন করে যেন এ দৃশ্য আর দেখতে না হয় সেজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
২.
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাথমিক কারণ হিসেবে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে চিহ্নিত করার পর শিল্পোন্নত দেশগুলোর উচিত ছিল গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু দুঃখজনক হল, বাস্তবে তা লক্ষ্য করা যায়নি। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শিল্পোন্নত দেশগুলোতে কয়লার ব্যবহার কাক্সিক্ষত মাত্রায় কমেনি। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ করার বিষয়ে বিশ্বের সব দেশ বহুমুখী তৎপরতা অব্যাহত রাখার পরও বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়েই চলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ১৮৮০ সালের তুলনায় বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই বেড়েছে ০.৮৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সম্প্রতি জাপানের পরমাণু চুল্লিতে দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন দেশ কয়লার ব্যবহার বাড়াতে যতটা আগ্রহ প্রকাশ করেছে, নিরাপদ জ্বালানি খাতে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ততটা মনোযোগী হয়েছে- এমন তথ্য আমাদের জানা নেই। অথচ জাপানের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের দুর্ঘটনার পর বিশ্বব্যাপী নিরাপদ জ্বালানি খাতে ব্যাপক পরিসরে গবেষণা শুরু হওয়া উচিত ছিল।
উন্নয়নশীল দেশগুলো কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে গ্রিন হাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণ না করেও বহুমুখী সংকটের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারছে না। বিদ্যমান বাস্তবতায় উন্নয়নশীল দেশগুলো আপাতত গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনে কৃচ্ছ্র পরিচয় দিলে কর্মসংস্থান কমবে যা প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিদ্যমান বাস্তবতায় উন্নত দেশগুলোকে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে মনোযোগী হতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা সম্ভব হলেই গ্রিন হাউস গ্যাসের নির্গমন কমবে।
আমরা অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাশ্রয়ী মূল্যের প্রযুক্তি আবিষ্কারের কাজটি কঠিন। সেক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিশেষত এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর উচ্চ প্রবৃদ্ধি যাতে অব্যাহত থাকে সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দূষণ কমানোর বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। সব দেশই এ বিষয়ে একমত হয়েছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের দূষণ ১৯৯০ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। আমরা জেনেছি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতাও বাড়বে। হাইয়ানের তাণ্ডবে ফিলিপাইনের একটি শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার একদিন আগেও আমরা কল্পনা করিনি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এত ভয়ংকর গতিতে আঘাত করতে পারে। টাইফুনের কারণে সৃষ্ট সুনামিতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। হাইয়ানের তাণ্ডবে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার প্রেক্ষাপটে গৃহহীন হয়েছে লাখো মানুষ। গণমাধ্যম কর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তথ্য দ্রুত জানতে পারেননি। দেশটিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছাতে দেরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকার পর আশ্রয় ও খাবারের সন্ধানে অনেকেই দিশাহারা হয়ে যায়। বিভিন্ন দেশ থেকে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। সবার সহযোগিতায় একদিন ফিলিপাইনবাসী ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন। কিন্তু ঝড়ের আঘাতে যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের হৃদয়ের ক্ষত কি কখনও শুকাবে? বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ রকম বা এর চেয়েও তীব্র মাত্রার ঝড় যে কোনো সময় যে কোনো দেশে আঘাত হানতে পারে। কাজেই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
যে কোনো সামুদ্রিক ঝড়ের পর উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলও নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া সামুদ্রিক ঝড়ের কারণে উপকূলীয় এলাকার মাটির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টিসহ এসব বহুমুখী সমস্যা বাড়তে থাকবে। এতে হতদরিদ্র মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করবে।
যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর কিছু মানুষকে হিংস্র আচরণ করতে দেখা গেছে। আবার অভুক্ত মানুষকে নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে দেখা যায়। হাইয়ানের আঘাতের পর ফিলিপাইনেও তা লক্ষ্য করা গেছে। কাজেই যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্ববাসীকে দ্রুত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
হাইয়ানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত এক মহিলা আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমকে জানান, তিনি তার স্বামীকে হারিয়েছেন। তিনি জানেন না এখন তিনি কোথায় যাবেন। ওই মহিলা নিজেকে নিয়ে যতটা চিন্তিত তার চেয়ে বেশি চিন্তিত তার ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। গণমাধ্যমে এখন হতাহতের সংখ্যা জানানো হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্তরা বেঁচে থাকার জন্য কী লড়াই করছে, কোনো কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে তাও বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু হাইয়ানের আঘাতে যেখানে একটি পুরো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে সেক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র কখনোই জানা সম্ভব হবে না। যেখানে হতাহতের প্রাথমিক তথ্যের জন্য আমাদের প্রায় ৬০ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হল- এই দীর্ঘ সময়ে কত আহত ব্যক্তি সামান্য চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারিয়েছেন তা কি কখনও জানা যাবে? এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি অসহায়ভাবে প্রাণ হারায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। হাইয়ানের আঘাতের কয়েক দিন পরও আমরা লক্ষ্য করি স্বজনদের খোঁজে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। তাদের এই আর্তনাদ কখন থামবে তা কি কেউ বলতে পারবে?
৩.
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদারভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্র“ত সাহায্য প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তখন ক্ষতিগ্রস্তদের ভোগান্তি বাড়তে থাকে। বাংলাদেশে সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত হতদরিদ্র অনেক মানুষের ক্ষেত্রেও তা লক্ষ্য করা গেছে। তাই এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে তাদের প্রকৃত ক্ষতিপূরণ পায় সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিল্পোন্নত দেশগুলো দূষণের দায় স্বীকার করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হলেও ক্ষতিপূরণ প্রদান ও প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ, কোন দেশ কী হারে ক্ষতিপূরণ পাবে, ক্ষতিপূরণ প্রদানে কোন দেশ কতটা দায় নেবে- এ ধরনের অনেক বিষয় দ্রুত মীমাংসা হওয়া জরুরি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, উল্লিখিত বিষয়ে আলোচনা খুব মন্থর গতিতে চলে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হতাশা বেড়েই চলেছে।
আমরা লক্ষ্য করেছি, ব্রিটেনের এক তরুণ সাংবাদিক জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত, তা জানার জন্য বাংলাদেশে দীর্ঘসময় অবস্থান করেছেন। তার এ আন্তরিকতার জন্য তিনি দেশে-বিদেশে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছেন। বাংলাদেশের গণমাধ্যম কর্মীদেরও এ ধরনের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং এ তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। এতে হতদরিদ্র মানুষের দুরবস্থার বিষয়টি বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হবে, যা ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
৪.
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক যে কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বর্তমানে ক্ষতিপূরণ প্রদান ও প্রাপ্তির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। সামুদ্রিক ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিল্পোন্নত কোনো দেশের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া আর স্বল্পোন্নত কোনো দেশের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি ভিন্ন। দুর্বল অবকাঠামোর কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে স্বল্পোন্নত দেশের হতদরিদ্র মানুষ বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা হলেও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রকৃত ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি বারবার আলোচনায় এলেও অন্য অনেক ক্ষয়ক্ষতির দিক তেমন গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসে না। সিডরের আঘাতের পর সুন্দরবন আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সুন্দরবন এবং এর আশপাশের এলাকাটি আগের অবস্থায় ফিরে আসতে আরও অনেক সময় লাগবে। ওই এলাকার পরিবেশ পুরোপুরিভাবে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে কিনা তাও বলা যাচ্ছে না। কারণ সিডরের সময় জলোচ্ছ্বাসে যে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে, ওই এলাকার জীববৈচিত্র্যে যে পরিবর্তন এসেছে- এ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কতদিন লাগবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। জীববৈচিত্র্যে পরিবর্তন ওই এলাকার পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর জন্য মাছ-মাংস ক্রয় করতে পারে না। এসব দরিদ্র মানুষ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে নদ-নদী-খাল-বিল-পুকুর এসব উৎসের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দরিদ্র মানুষের উল্লিখিত উৎস থেকে মাছ সংগ্রহের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় অনেক খাল-বিল বছরের বেশিরভাগ সময় পানিশূন্য থাকে। আবার অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে উঁচু এলাকার পানিতে নিচু এলাকার মাঠ-ঘাট-পুকুর সব পানির নিচে তলিয়ে যায়। সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মিঠা পানির মাছের উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া সমুদ্রের পানি বেশি পরিমাণে নদী-নালায় প্রবেশ করার ফলে মিঠা পানির মাছের উৎপাদন কমে যায়। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হওয়ায় পশুখাদ্যের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিরক্ষর। কিন্তু এই নিরক্ষর জনগোষ্ঠী বংশপরম্পরায় যে অভিজ্ঞতা ধারণ করে আছে তা অত্যন্ত মূল্যবান। অর্থাৎ তারা অগ্রজের কাছ থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে থাকেন। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য ও অভিজ্ঞতার আলোকে একজন অশিক্ষিত কৃষক সফলভাবে শস্য উৎপাদন করতে সক্ষম হন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাধারণ কৃষকের হাজার বছরের অভিজ্ঞতা এখন আর কাজে লাগছে না। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কিংবা হঠাৎ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে কী করণীয় তা তারা জানেন না। ফলে তারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেন না। এ পরিস্থিতিতে কোনো কোনো কৃষক ন্যূনতম পরিমাণ ফসল ফলাতেও ব্যর্থ হন। এরই ধারাবাহিকতার এক পর্যায়ে তারা গৃহহীন হয়ে শহরে পাড়ি জমান। এই গৃহহীন মানুষের একটি বড় অংশ রাজধানীতে এসে আশ্রয় নেয়। রাজধানীতে আসা এসব মানুষ বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। এক পর্যায়ে এদেরই কেউ কেউ নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
সম্প্রতি কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে দেশে মাছের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। এছাড়া নিচু এলাকার জমিকে আবাদের আওতায় আনায় মাছের বিচরণ ক্ষেত্র অনেক কমেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন জাতের মুরগির উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে ডিম পাড়া মুরগির খামারের তাপমাত্রা বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাপমাত্রা নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় কম-বেশি হলে ডিমের উৎপাদন কমে যায়। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে মুরগি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বড় খামারে তাপমাত্রা বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ছোট ছোট খামারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে এসব খামারে ডিমের উৎপাদন কমে যায়। তাপমাত্রা হ্রাস-বৃদ্ধির কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের খামারের মুরগি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বড় উদ্যোক্তাদের খামারে কোনো মুরগি রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেলে দ্রুত মৃত মুরগিকে স্থানান্তর করা হয় এবং ডাক্তারের নির্দেশমতো দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের খামারে মৃত মুরগিকে কোনো কোনো সময় আশপাশের নদী-নালায় ফেলা হয়। এতে পরিবেশ দূষিত হয়। মৃত মুরগির বিভিন্ন অঙ্গ মাছেরা খেয়ে থাকে। এসব মাছ খেলে মানবদেহে নানারকম সমস্যা সৃষ্টির আশংকা থেকে যায়। উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে এ রকম আরও কী কী সমস্যা সৃষ্টি হয়, সেসব চিহ্নিত করে সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সহিংসতাও বেড়ে যাচ্ছে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, স্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টি না হলে যে কোনো এলাকার অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে যায়। এতে সহিংসতা বাড়তে থাকে। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ক্ষুধার্ত ও হতাশাগ্রস্ত মানুষকে নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। ক্ষুধার্ত মানুষ কতটা বেপরোয়া হতে পারে, ফিলিপাইনের ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকায় তা দেখা গেল। দেশটির ত্যাকলোবান শহরের নিকটবর্তী অন্য এক শহরে সম্প্রতি সরকারি চালের গুদামে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। অনুমান করা হচ্ছে, হামলাকারীরা ঘূর্ণিঝড়ে সর্বস্ব হারিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। হামলাকারীরা সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে এক লাখের বেশি চালের বস্তা লুট করে নিয়ে যায়। গুদাম লুটপাটের সময় গুদামের দেয়াল ধসে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
উচ্চ তাপমাত্রা, খরা, হঠাৎ ভারি বৃষ্টিপাত- এসব কারণে দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির বাইরেও অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্প্রতি বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স (তড়কা) রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছিল। গবেষকরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট পরিবেশ তড়কা রোগের জীবাণুকে সক্রিয় হতে সহায়তা করে। এ বিষয়ক গবেষণাও অব্যাহত রাখতে হবে।
আমরা লক্ষ্য করেছি, জাতিসংঘের উদ্যোগে যখন জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন চলতে থাকে, তখন বিভিন্ন দেশ গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে করণীয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু করতে চায়। কিন্তু এসব আলোচনা এক সময় থেমে যায়। এ ধরনের আলোচনা যাতে সারা বছর অব্যাহত থাকে তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
হাইয়ানের আঘাতে ফিলিপাইনে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের বা এর চেয়ে তীব্র মাত্রার ঝড় যে কোনো সময় যে কোনো দেশে আঘাত হানতে পারে।
৫.
গত দুই দশকে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক সম্মেলনের বাইরে ব্যাপক লেখালেখিও হয়েছে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী কয়লার ব্যবহার দ্রুত হারে কমবে এমনটা প্রত্যাশিত হলেও বাস্তবতা হল, এই সময়ে কয়লার ব্যবহার কমেনি। বরং গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী কয়লার ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১১ সালে কানাডায় কয়লার ব্যবহার কিছুটা কমলেও ওই সময়ে মেক্সিকোতে কয়লার ব্যবহার বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে এর ব্যবহার বেড়েছে। দেশটিতে ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে ধারাবাহিকভাবে কয়লার ব্যবহার কমলেও ২০১২ সালেও যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ কয়লা ব্যবহৃত হয়েছে। ব্রাজিলে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০০৯-এর তুলনায় ২০১০ ও ২০১১ সালে কয়লার ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ২০১১ সালের তুলনায় ২০১২ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও ২০১২ সালে দেশটিতে বিপুল পরিমাণ কয়লা ব্যবহৃত হয়েছে। বেলজিয়ামে ২০০৮ সালে যে পরিমাণ কয়লা ব্যবহৃত হয়েছে, ২০১২ সালে এর অর্ধেকেরও কম কয়লা ব্যবহৃত হয়েছে। বুলগেরিয়ায় ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লা কম ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু ২০১২ সালে দেশটিতে ২০০৮ সালেরও বেশি কয়লা ব্যবহৃত হয়েছে। ডেনমার্কে ২০০৮ সালে যে পরিমাণ কয়লা ব্যবহৃত হয়েছে, ২০১২ সালে এর চেয়ে অনেক কম কয়লা ব্যবহৃত হয়েছে। ফ্রান্সে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও ২০০৯-এর তুলনায় ২০১০ সালে কয়লার ব্যবহার বেড়েছে। দেশটিতে ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও ২০১১ সালের তুলনায় ২০১২ সালে এর ব্যবহার বেড়েছে। জার্মানিতে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে ধারাবাহিকভাবে কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রিসে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার বেড়েছে। দেশটিতে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ ও ২০১২ সালে এর ব্যবহার বেড়েছে। আয়ারল্যান্ডে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ ও ২০১০ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ ও ২০১২ সালে এর ব্যবহার বেড়েছে। ইতালিতে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে কয়লার ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। নেদারল্যান্ডসে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ ও ২০১০ সালে কয়লার ব্যবহার বাড়লেও দেশটিতে ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ ও ২০১২ সালে এর ব্যবহার কমেছে। নরওয়েতে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে কয়লার ব্যবহার বেড়েছে; দেশটিতে ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ ও ২০১২ সালে এর ব্যবহার কমেছে। পোল্যান্ডে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ ও ২০১১ সালে এর ব্যবহার বেড়েছে। দেশটিতে ২০১১ সালের তুলনায় ২০১২ সালে এর ব্যবহার কমেছে। স্পেনে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ ও ২০১০ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ ও ২০১২ সালে এর ব্যবহার বেড়েছে। সুইডেনে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ ও ২০১১ সালে এর ব্যবহার বেড়েছে। দেশটিতে ২০১১ সালের তুলনায় ২০১২ সালে এর ব্যবহার কমেছে। সুইজারল্যান্ডে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ ও ২০১১ সালে এর ব্যবহার বেড়েছে। যুক্তরাজ্যে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে এর ব্যবহার বেড়েছে। দেশটিতে ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ সালে এর ব্যবহার কমলেও ২০১১ সালের তুলনায় ২০১২ সালে এর ব্যবহার বেড়েছে। রাশিয়ায় ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে কয়লার ব্যবহার কমলেও দেশটিতে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে এর ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। উপরের আলোচনায় ২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বিভিন্ন দেশে কয়লার ব্যবহার হ্রাস-বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছি। নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড ছাড়া উল্লিখিত বেশিরভাগ দেশেই ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বিপুল পরিমাণ কয়লা ব্যবহৃত হয়েছে। উল্লিখিত আলোচনা থেকে এটাই স্পষ্ট হয়, শিল্পোন্নত দেশগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের পরিবেশ সুরক্ষার জন্য জোরালো প্রতিশ্র“তি দিলেও বাস্তবে তারা প্রতিশ্র“তি রক্ষায় কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছে না।
দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারে সক্ষম না হলেও শিল্পোন্নত দেশগুলো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে বিশ্বের পরিবেশ সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মতো শিল্পোন্নত দেশগুলোও যদি কয়লার মতো সাশ্রয়ী জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে থাকে, তাহলে বিশ্বের পরিবেশ সুরক্ষার জন্য কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। স্বল্পোন্নত দেশগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই কয়লার মতো সাশ্রয়ী জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রাখতে চায়।
শিল্পোন্নত দেশগুলোর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি পেলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোও কয়লার পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে আগ্রহী হবে। এক্ষেত্রে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে উদারতার পরিচয় দিতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে প্রযুক্তির গবেষণা প্রসারে শিল্পোন্নত দেশগুলো আন্তরিক হলে উল্লিখিত বিষয়ে অনেক জটিল সমস্যা সমাধানের পথ বিস্তৃত হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ধারাবাহিক আলোচনার পরও বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণীত না হওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। শিল্পোন্নত দেশগুলো আন্তরিক না হলে এ বিষয়ে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিলম্ব হবে। এর ফলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও বাড়তে থাকবে। যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্বল্পোন্নত দেশের জনগণের ভোগান্তি বেড়ে যায়। তাই এদের জীবনমানের উন্নয়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুততম সময়ে ত্রাণ পৌঁছানো নিশ্চিত করার জন্য স্বেচ্ছাসেবী কর্মী বাহিনীও গড়ে তুলতে হবে। প্রতিশ্র“ত অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদানে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি খাতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। প্রযুক্তি খাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তেল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস- এসব সম্পদ এক সময় ফুরিয়ে যাবে। তাই বিকল্প জ্বালানির বিষয়ে এখনই ভাবতে হবে। পরমাণু প্রযুক্তিকে সাশ্রয়ী ও সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা গেলে স্বাভাবিকভাবেই কয়লার ওপর নির্ভরতা কমে যাবে। তাই এ বিষয়ক গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের পরিবর্তনে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই জনগোষ্ঠীর বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে, তাই শিক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। বয়স্ক জনগোষ্ঠীকেও এ কার্যক্রমের আওতায় আনতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশে সহায়ক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলে এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মও উপকৃত হবে। এভাবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। ওয়ারশ সম্মেলন যাতে গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য অবশ্য পালনীয় নীতিমালা প্রণয়নের কাজটি ওয়ারশ সম্মেলনেই সম্পন্ন করতে হবে। এ সম্মেলনে প্যারিস সম্মেলনের লক্ষ নির্ধারণসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজও সম্পন্ন করতে হবে। বিশ্ববাসীর স্বার্থে ওয়ারশ সম্মেলনকে সফল করার জন্য সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যেহেতু শিল্পোন্নত দেশগুলোর কর্মকাণ্ডের ফলে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে, তাই এ বিষয়ক বহুমুখী সংকট মোকাবেলায় শিল্পোন্নত দেশগুলোকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ন্যায্য ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য জরুরি বিষয়ে ওয়ারশ সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবেন, এটাই বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা।
অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম : প্রতিমন্ত্রী; সম্পাদক ও প্রকাশক, যুগান্তর

সরকারই পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে

গতকাল নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমঝোতার প্রয়াস কি শেষ হয়ে গেল? নির্বাচনটি কি সব দলের অংশগ্রহণে হবে? এ নিয়ে দুই শিক্ষাবিদের মতামত প্রকাশ করা হলো: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে সমঝোতা, তথা সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। আর এটি করা হলো এমন সময়ে, যখন সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, সমঝোতার ব্যাপারে সরকার আন্তরিক। প্রকৃতপক্ষে যদি সরকারের সদিচ্ছা থাকত, তাহলে দুই দলের মধ্যে অনেক আগেই আলোচনা হতো। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার টেলিফোন সংলাপ যাঁরা শুনেছেন, যাঁরা সরকারি দলের অন্যান্য নেতার বক্তৃতা-বিবৃতি লক্ষ করেছেন, তাঁরা স্বীকার করবেন, ক্ষমতাসীন দলটি বারবার তাদের প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকারের ফর্মুলা বিরোধী দলের ওপর চাপাতে চাইছে।
বিএনপির নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সম্পর্কে কোনো কিছুই তারা আমলে নিচ্ছে না। এ অবস্থায় সমঝোতা কীভাবে হবে? সর্বশেষ গতকাল নির্বাচনকালীন সরকারটি যেভাবে করা হলো, তা গায়ের জোর ছাড়া কিছু নয়। এটি মহাজোট সরকারেরই আরেক রূপ। দুঃখ হয়, আমাদের নেতা-নেত্রীরা, বিশেষ করে যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁরা সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট এবং মনের ভাষা বোঝেন না। আজ প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্বাচনকালীন সরকার করলেন, সেটি যদি ন্যায্য হয়ে থাকে, তাহলে ১৯৯৪ সালে কেন তাঁরা স্যার নিনিয়ানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন? স্যার নিনিয়ান তো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে (খালেদা জিয়া) রেখে দুই দলের সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা বলেছিলেন। সাধারণ মানুষ শান্তি চায়, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ চায়। কিন্তু সরকার যেভাবে নির্বাচন করতে চাইছে, তাতে শান্তি আসবে না। হরতাল কেন হচ্ছে? বিরোধী দল অযৌক্তিক কোনো দাবি করছে না। তারা নির্বাচন চায় এবং সেই নির্বাচনের জন্য একটি সুষ্ঠু পরিবেশ তথা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির কথা বলে আসছে।
যেহেতু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, সেহেতু নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির দায়িত্বও তাদের। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে জনপ্রিয়তা যাচাই করা যেত, দলগুলো নিজেদের কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যেতে পারত। তবে সরকারের এটাও জানা উচিত, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। একটি জবরদস্তির নির্বাচন চাপিয়ে দিলে বিএনপি বাধ্য হবে রাজপথে আন্দোলন করতে। কেননা তারা সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে সেই নির্বাচনে যেতে পারে না। ফলে দেশে সংঘাত-সংঘর্ষ বাড়বে। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠবে। এসবের দায়দায়িত্ব কিন্তু সরকারকেই নিতে হবে। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত ছিল অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করা, তাদের দাবিদাওয়া শোনা। বিএনপি আলোচনার দরজা বন্ধ করে দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণও খালেদা জিয়া প্রত্যাখ্যান করেননি। বলেছিলেন, হরতালের পর তিনি যেতে পারবেন। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিএনপির দাবি, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে, একজন নির্দলীয় ব্যক্তিকে সরকারপ্রধান করতে হবে।
কিন্তু সরকার সেসব নিয়ে কোনো আলোচনাতেই রাজি হলো না। দুই দলই তাদের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে পারত। তারপর কে কতটুকু ছাড় দিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারত। কিন্তু সরকার যখন বলে, সবকিছু সংবিধান অনুযায়ী হতে হবে, তখন তো আলোচনার সুযোগ থাকে না। একদিকে সরকার বিএনপিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখছে, অন্যদিকে বলছে, ওরা ক্ষমতায় এলে দেশ মৌলবাদীদের হাতে চলে যাবে। এটি সরকারের চরম অসহিষ্ণুতা বলেই আমি মনে করি। আদালতের রায়ে দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সরকার সেটি একেবারে বাতিল করে দেওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের এসব কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, তারা সমস্যার সমাধান চাইছে না। সবার অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ একটি নির্বাচন হোক—সেটি তাদের কাম্য নয়। তারা চাইছে নিজেদের পছন্দমতো একটি নির্বাচন করে আবার ক্ষমতায় আসতে।
কিন্তু প্রধান বিরোধী দলটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলে তো জনরায়ের প্রতিফলন ঘটবে না। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন হয়ে যে দলই জিতুক না কেন, সেটি গ্রহণযোগ্য হতো। সরকারি দলের নেতারা বিরোধী দলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে এত কথা বলছেন। কিন্তু কাউকে তো শাস্তি দিতে পারেননি। বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে একটি নির্বাচন করলে তারাও নিশ্চয়ই বসে থাকবে না। সাধ্যমতো আন্দোলন করবে। রাস্তায় সংঘাত হবে। তাতে আরও মানুষ মারা যাবে। দেশের সম্পদ নষ্ট হবে। দুই দলই যদি সমান শক্তি নিয়ে মাঠে নামে, কী অবস্থা তৈরি হবে, ভাবুন। এসবই এড়ানো যেত আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে একটা সমঝোতায় আসতে পারলে। আমার ধারণা, বিএনপি অনেকটাই ছাড় দিতে প্রস্তুত আছে; কিন্তু আওয়ামী লীগই কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
অধ্যাপক সদরুল আমিন: সাবেক সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।

সমঝোতার সুযোগ এখনো আছে

গতকাল নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমঝোতার প্রয়াস কি শেষ হয়ে গেল? নির্বাচনটি কি সব দলের অংশগ্রহণে হবে? এ নিয়ে দুই শিক্ষাবিদের মতামত প্রকাশ করা হলো: সময় বেশি নেই। সংবিধান অনুযায়ী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। সমঝোতার লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি তৎপরতাও রয়েছে। নির্বাচনের পথেই যে সরকার এগোচ্ছে, তার প্রমাণ নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে এই সরকারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা আসেনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সরকার ও বিরোধী দলের সমঝোতার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করি না। সমঝোতার সুযোগ এখনো আছে। আমরা আশা করি, বিএনপি নির্বাচনে আসবে। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থেই তাদের নির্বাচনে আসা উচিত। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মধ্যে দোদুল্যমানতা লক্ষণীয়। তারা কখনো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলছে, কখনো অন্তর্বর্তী সরকারে ৫+৫ সমতার কথা বলছে, আবার কখনো বলছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে সরে যেতে হবে। আসলে নির্বাচন নিয়ে বিএনপিতে দুটি ধারা রয়েছে।
একটি অংশ নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষপাতী, কেননা তারা মনে করে, মাঠ তাদের অনুকূলে আছে। কিন্তু জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল অংশটি নির্বাচন না করে রাজপথে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা কিংবা অন্য কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে। বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়া নিজেকে আপসহীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও তিনি সরাসরি স্বাধীনতাবিরোধীদের মদদ দিয়ে চলেছেন। নির্বাচন ছাড়া বিএনপির সামনে কী পথ খোলা আছে? বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা পুরোপুরি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুকূলে। এখানে স্বাধীন গণমাধ্যম আছে, নাগরিক সমাজ আছে, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা আছেন। অতএব, কারও পক্ষেই আশির ও নব্বইয়ের দশকের মতো পাতানো নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। বর্তমান সরকারের আমলে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, সব কটি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, সেসব নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। এমনকি একাধিক উপনির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীরাও জয়ী হয়েছেন। সর্বশেষ গাজীপুরসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীরা অনেক ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। অতএব, বিএনপির উচিত হবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাই করা। বর্তমান সরকারের আমলে কোনো নির্বাচনে কারচুপি হয়নি। কিন্তু কারচুপির আশঙ্কা আছে—এ অজুহাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি কিংবা প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে শেখ হাসিনাকে সরে যেতে বলা যুক্তিসংগত হতে পারে না।
আওয়ামী লীগ আমলে যেহেতু মাগুরা, মিরপুর কিংবা ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো নির্বাচন হয়নি, সেহেতু বিএনপি সরকারের ওপর পলিসি ডিকটেট করতে পারে না। তাদের মনে রাখতে হবে, বর্তমান পরিস্থিতি আর ১৯৯৬ সালের পরিস্থিতি এক নয়। সে সময় বিএনপি ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন করেছে। কিন্তু আগামী নির্বাচনে বিএনপি না এলেও জাতীয় পার্টি, ১৪ দলসহ অনেক রাজনৈতিক দলই অংশ নিচ্ছে। ১৯৯৬ সালে ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া দাবি মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে বিরোধী দল যে ৬০ ঘণ্টা ও ৮৪ ঘণ্টার হরতাল পালন করেছে, তাতে জনগণের সম্পৃক্ততা নেই। এমনকি দলের নেতা-কর্মীরাও মাঠে নামেননি। কেবল বোমা মেরে, ককটেল ফাটিয়ে বা গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা যায়, আন্দোলন সফল করা যায় না। প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতাকে টেলিফোনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ না করা ভুল সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি। কেননা, প্রধানমন্ত্রী একটি প্রতিষ্ঠান। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকলেও আমি একই কথা বলতাম। তিনি প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ রক্ষা করলে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিতেন।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য নির্বাচনের বিকল্প নেই। এরশাদ ও মহাজোটের অন্য শরিকেরা সেই উপলব্ধি থেকেই নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে—এই অযৌক্তিক দাবিতে বিএনপি অনড় থাকলে কিংবা নির্বাচন বর্জন করলে সেটি হবে তাদের জন্য আত্মঘাতী। বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান করে বা না করে নির্বাচনে আসুক, সেটাই সবার প্রত্যাশা। জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও শান্তির লক্ষ্যেই বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবে। সরকারেরও উচিত হবে বিরোধী দলের যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণের চেষ্টা করা। যেমন নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা, নির্বাচনের সময়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা। বিএনপি যদি নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দাবি করে, সরকারের উচিত হবে সেগুলো তাদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া। বিএনপির নেতৃত্বকে এ কথাও মনে রাখতে হবে, বিএনপি নির্বাচনে না এলে নির্বাচনটি আটকে থাকবে না। বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিয়েই প্রমাণ করতে হবে, তাদের অন্য কোনো এজেন্ডা নেই।
অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ: উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

রাজনীতি আর রাজনীতিকদের হাতে নেই!

সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইকে দিয়ে রাজনৈতিক দল ভাঙাগড়া শুরু করেছিলেন। ক্ষমতার মসনদে থেকেই তিনি গড়েছিলেন বিএনপি। আবার তিনিই একবার বলেছিলেন, ‘আই শ্যাল মেক পলিটিকস ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ানস।’ কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে জিয়াউর রহমান এ কথা বলেননি। তিনি রাজনীতিকে সামরিক-বেসামরিক আমলা, তস্কর ব্যবসায়ী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন সুবিধাবাদের গর্ভে ডুবে যাক বাংলাদেশের রাজনীতি। একই ধারাবাহিকতায় সামরিক শাসক এরশাদ জাতীয় পার্টি গড়ে তোলেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি হয়ে ওঠে আরও জটিল। ওই আশির দশক থেকে সামরিক শাসকদের কুমতলব, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ফন্দি-ফিকির ও অপতৎপরতায় ‘রাজনীতি রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে থাকে,’ রাজনীতি ক্রমশ পেশাদার রাজনীতিবিদদের হাত থেকে ঋণখেলাপি, লুটেরা ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজ সামরিক-বেসামরিক আমলাদের কাছে চলে যেতে থাকে। এ ব্যাপারে কিছু পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ১৯৭০ সালে যাঁরা গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে শতকরা ৩০ জন ছিলেন ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি, অথচ পঞ্চম, অষ্টম ও নবম সংসদে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি কাম সাংসদের হার মোট সাংসদদের ৫০ শতাংশেরও বেশি। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আইন পেশা বা অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সাংসদ হওয়ার হার আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রথম সংসদে আইন ও অন্যান্য পেশার যেসব ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁদের হার ছিল মোট সাংসদের ৪২ শতাংশ, অথচ নবম অর্থাৎ বর্তমান সংসদে তাঁদের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২২ শতাংশে।
আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয়েছে ‘ফুলটাইম পলিটিশিয়ানদের’! তাঁদের হার ১৩ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশ হয়েছে। ওদিকে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের নির্বাচিত হওয়ার হার বাড়ছে। ১৯৭০ সালে যাঁরা গণপরিষদে সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ৩ শতাংশ ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলা, বর্তমান সংসদে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে (অধ্যাপক রওনক জাহান ও ড. ইনগে আমুন্দসেন, CPD-CMI Working Paper 2, THE PARLIAMENT OF BANGLADESH Representation and Accountability, এপ্রিল ২০১২।) কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণী বা পেশার মানুষের রাজনীতিতে আসতেও যেমন বাধা নেই, তেমনি সাংসদ হওয়ার ক্ষেত্রেও নেই কোনো প্রতিবন্ধকতা। তবে রাজনীতি যেন কারও স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও সবার নজর রাখা জরুরি। একসময় তাঁরাই রাজনীতিতে আসতেন, যাঁরা ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়া’তে প্রস্তুত ছিলেন। যাঁরা মানুষের সেবা করতে চান, নিজের জীবন উৎসর্গ করে হলেও দেশ ও জাতির কল্যাণে অবদান রাখতে চান, তাঁরাই রাজনীতি করতেন। মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ চন্দ্র বসু, শেরেবাংলা, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ আমাদের সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। কয়েক দশক আগেও রাজনীতির নিয়ন্ত্রণটা রাজনীতিবিদদের হাতে ছিল। ডাক্তার, আইনজীবী,
শিক্ষকসহ যেসব পেশাজীবী সাধারণ মানুষকে নানাভাবে সেবা দিতেন এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতেন, তাঁদের অনেকেই রাজনীতিতে আসতেন। কিন্তু আজ সংসদ সদস্যদের মধ্যে শতকরা ৫০ জন অথবা তারও অধিক হচ্ছেন ব্যবসায়ী। রাজনীতির মধ্য দিয়ে মানুষের সেবা করা তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য নয়, কিংবা দেশ ও জনগণের স্বার্থে আইন প্রণয়নও নয় তাঁদের অগ্রাধিকার, তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য তাঁদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে সুরক্ষিত করা, উত্তরোত্তর তার উন্নয়ন ও প্রসার ঘটানো। নানা তথ্য দ্বারা আজ এটা প্রমাণিত যে ব্যবসায়ী-কাম সাংসদদের ব্যবসাটাই আসল, আর সংসদ সদস্য পদ হচ্ছে তাঁদের সাইনবোর্ড! রাজনীতির জন্য আরও বড় বিপদের কথা হচ্ছে, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক আমলারা বড় দুটি রাজনৈতিক দলের পলিসি মেকিংয়ে চলে এসেছেন। আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী দল, যে দলের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু সারা বাংলার হাটে-মাঠে-ঘাটে হেঁটে হেঁটে, সেই দলটি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০০৯ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর পাঁচটি বছর ধরে বাংলাদেশ চালালেন আমলা উপদেষ্টারা! আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অনেক ব্যর্থতা ও ভুল সিদ্ধান্তের জন্য ওই আমলা উপদেষ্টারা দায়ী বলে অনেকেই মনে করেন। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, সাংবাদিক,
সাবেক বিচারপতি ও কূটনীতিকদের নিয়ে আওয়ামী লীগের একটি সমৃদ্ধ ‘থিংক ট্যাংক’ গঠন করা উচিত ছিল। ক্যান্টনমেন্টের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া এবং ব্যবসায়ী ও আমলাদের নেতৃত্বাধীন দল হওয়া সত্ত্বেও নানা কারণে বিএনপি বিভিন্ন সময়ে বিপুল জনসমর্থন পেয়েছে, কিন্তু দলের শীর্ষ নেতৃত্ব জ্যেষ্ঠ নেতাদের যেমন আস্থায় নিতে পারেননি, তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চায়ও স্থূলতার পরিচয় দিয়েছেন। কিছুদিন আগে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে উপস্থিত সব নেতার মোবাইল ফোন জব্দ করে বৈঠকের সময় ফোনগুলো তাঁর সহকারীর কাছে জমা রাখেন। তাহলে কি তিনি তাঁর দলের নেতাদের বিশ্বাস করেন না? এ কেমন রাজনীতি, যেখানে দলের চেয়ারপারসন তাঁর নিজের দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের আস্থায় নিতে পারেন না! তাহলে কি আমরা ধরে নেব, রাজনীতি আজ লুটেরা ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদী আমলাদের হাতে চলে যাওয়ায় রাজনীতিতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে? দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপারসন নিজ নিজ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রায় কাউকেই বিশ্বাস করেন না অথবা ওই নেতাদের নানামুখী যোগাযোগ এবং বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সংস্থার স্বার্থরক্ষায় তৎপরতার (বা অপতৎপরতা)
কারণে তাঁদের ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না। গত ২১ অক্টোবর বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এক সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা তুলে ধরেন। পরে এ ব্যাপারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন উত্থাপন করেন, এমনকি বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতারা জানান, এ বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানতেন না। বিএনপির চেয়ারপারসন তাঁর গুলশান কার্যালয়ের কতিপয় কর্মকর্তাকে নিয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা তৈরি করেন, যা ছিল অত্যন্ত দুর্বল এবং প্রস্তাবিত রূপরেখায় অনেক ভুল তথ্যও ছিল (প্রথম আলো, ২২ অক্টোবর ২০১৩।) প্রিয় পাঠক, একবার ভাবুন তো, বাংলাদেশের রাজনীতি কোথায় এসে উপনীত হয়েছে? তথ্য-প্রমাণ দ্বারা আজ এটা প্রতিষ্ঠিত যে আশির দশক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিপুল সংখ্যায় লুটেরা ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদী সামরিক-বেসামরিক আমলা অনুপ্রবেশ করতে শুরু করেন। এখন রাজনীতি ওই লুটেরা ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদী আমলাদের হাতে জিম্মি হতে চলেছে। আর বেশি দিন বোধ হয় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে না, যখন আমরা দেখতে পাব যে ‘পলিটিশিয়ানস আর টোটালি আউট!’
শেখ হাফিজুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
hrkarzon@yahoo.com

প্রশ্নকাঠামোয় সমস্যা

হরতাল ও নানান কারণে নাকাল পরিস্থিতির মধ্যে জেএসসির পর এবার চলে এল পিএসসি অর্থাৎ প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা। আতঙ্ক শিশু-পরীক্ষার্থীদের চোখেমুখে। তারাও কি এসব বিড়ম্বনার কবলে পড়বে? জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা বলে তাদের উদ্বেগটা একটু বেশিই; অভিভাবকদের মধ্যেও উৎকণ্ঠা অনেক। তার ওপর যুক্ত হয়েছে নতুন বই ও প্রশ্নকাঠামোর পরিবর্তন। প্রশ্নকাঠামো প্রণয়ন করে থাকে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) নামের প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা নানা বিষয় বিবেচনায় এনে প্রশ্নকাঠামো প্রণয়ন করেন বলেই জানানো হয়। স্বভাবতই আশা করা যায়, শিশুমনস্তত্ত্বের বিষয়টি তাঁরা সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেন। কিন্তু নেপ প্রণীত এবারের প্রশ্নকাঠামো ভালোভাবে নিরীক্ষা করলে মনে হয়, কর্তৃপক্ষের মনোযোগের যেন ব্যত্যয় ঘটেছে। একটি প্রশ্ন দিয়ে মূল আলোচনায় প্রবেশ করি: পঞ্চম শ্রেণীতে ইংরেজি পরীক্ষায় প্রথমেই গ্রন্থবহির্ভূত অনুচ্ছেদ (‘আন-সিন প্যারাগ্রাফ’)
দিয়ে প্রশ্ন শুরু করা কি শিশুমনস্তত্ত্ব অনুমোদন করে? এটি আবার সাধারণ ‘আন-সিন’ নয়। এখানে সংলাপ, ছবি বা বিচিত্র অঙ্কনও থাকতে পারে বলে নেপ জানিয়েছে। যেখানে গ্রন্থভুক্ত অনুচ্ছেদ থেকেও প্রশ্ন থাকছে, সেখানে গ্রন্থবহির্ভূত শিশুমনে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী অনুচ্ছেদ দিয়ে প্রশ্নের সূচনা কেন? একইভাবে বাংলার ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্নটিই থাকছে পাঠ্যবই-বহির্ভূত অনুচ্ছেদসহ যোগ্যতাভিত্তিক। পরীক্ষার সূচনা-প্রশ্নে এভাবে ‘আন-সিন’ হোঁচট কোমলমতি পরীক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক নিশ্চয় নয়; যেখানে পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষার্থীদের গড় বয়স প্রায় ১১ বছর। লক্ষ করলে দেখা যাবে, বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রশ্নকাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, প্রশ্নের সংখ্যাবৃদ্ধিও ঘটেছে। গত বছর প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় বাংলায় ১৪ ধরনের প্রশ্ন ছিল, এবার সেখানে সংখ্যাটা হয়েছে ১৬; ইংরেজিতে গতবার ছিল ১২ ধরনের প্রশ্ন, এবার বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৫। বাংলায় বহুনির্বাচনী প্রশ্নের পরই গত বছর ছিল কবির নামসহ একটি কবিতা মুখস্থ লেখা। এবার অনুচ্ছেদ বা কবিতাংশ পড়ে সেখান থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। অর্থাৎ কবির নামসহ কবিতা সম্পূর্ণভাবে মুখস্থ লেখার ব্যাপারটি আর থাকছে না।
সেখানে থাকছে কবিতার চরণ এলোমেলো করে দেওয়া—সাজিয়ে লিখতে হবে শুধু। ইংরেজিতেও একটি কবিতার আট চরণ মুখস্থ লিখতে হয়েছে গতবার। এবার সেটা সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কি সৃজনশীলতার মানে মুখস্থকরণ থেকে পরীক্ষার্থীদের পরিপূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়া? বাংলা ও ইংরেজি কবিতা মুখস্থ করার যে সুন্দর সংস্কৃতিটি দীর্ঘদিন থেকে আমাদের মধ্যে চালু ছিল, সৃজনশীলতার ঝড়ে সেটা উড়ে যাবে? কেউ তর্ক তুলতে পারেন, ইংরেজি কবিতা মুখস্থ শিখতে দোষ কোথায়, শুধু পরীক্ষায় আসবে না! আমি বলব, পরীক্ষায় না এলে শিশুদের মধ্যে কবিতা মুখস্থ করার আগ্রহটি আর আগের মতো থাকে না। বাংলা ও ইংরেজি কবিতা মুখস্থ করে সেটা কারণে-অকারণে আওড়ানো বা আবৃত্তি করা—যেটা এক অর্থে সৃজনশীলকর্মভুক্ত, এই প্রশ্নকাঠামোর মাধ্যমে তার অপমৃত্যু হলো বলে মনে করি। প্রশ্নকাঠামো বিচার করলে দেখা যাবে, বাংলা বিষয়ে এবার শিশুদের ‘কোনটি কোন পদ’ তা লেখার বিষয়টি থাকছে। আমি ভেবে অবাক হই, পঞ্চম শ্রেণীতে কীভাবে পদ চিহ্নিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হলো?
এটি সত্যি বেশ কঠিন এবং উচ্চতর শ্রেণীতে পাঠোপযোগী বিষয়। অন্যদিকে, পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বয়স ও পাঠধারণক্ষমতা বিবেচনা করে বোর্ড থেকে একটিমাত্র বাংলা বই দেওয়া হয়েছে, কোনো ব্যাকরণ ও নির্মিতি বই দেওয়া হয়নি। অথচ, পদসংক্রান্ত উল্লিখিত প্রশ্ন ছাড়াও একাধিক ব্যাকরণবিষয়ক প্রশ্নে ভার করা হয়েছে প্রশ্নকাঠামো। ইংরেজি প্রশ্নের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, প্রথমেই পাঠ্যগ্রন্থবহির্ভূত অনুচ্ছেদ দিয়ে শুরু; এরপর গ্রন্থভুক্ত অনুচ্ছেদ—এ দুটো থেকে মোট ছয়টি প্রশ্ন। তারপর অর্থপূর্ণ গল্প তৈরি; যতিচিহ্ন ও বড় হরফের ব্যবহার; ভুল-শুদ্ধ; ইংরেজিতে অনুবাদ; বাংলায় অনুবাদ; সংলাপ রচনা; নির্ধারিত সংকেত মেনে রচনা লিখন; ব্যক্তিপর্যায়ের চিঠি লেখা—কী নেই? নিশ্চয়ই, এসবই পরীক্ষা-উপযোগী, মানি। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণী যে বিবেচনা করতে হবে, এটা। তাই বলতে হয়, প্রশ্নের খড়্গ আর কত? প্রশ্নের উত্তরকরণেও বিভ্রান্তি দূর করতে পারেনি নেপ। ইংরেজি ‘কম্পোজিশন’ রচনাপদ্ধতি নিয়ে শিক্ষককুলও বিভ্রান্ত।
নেপ ‘কম্পোজিশন’ সম্পর্কে শুধু বলেছে, এটা হবে ‘শর্ট অ্যান্ড সিম্পল’। এর আগের বছরের প্রশ্নকাঠামোয় অনুচ্ছেদ রচনায় ৬০ থেকে ১০০ শব্দের কথা লেখা ছিল। ‘কম্পোজিশন’ সম্পর্কে নেপের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য প্রকাশ না পাওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এই মতপার্থক্যের বলি হতে পারে পরীক্ষার্থীরা। প্রশ্নকাঠামো প্রদানের ক্ষেত্রে বছরের ছয় মাস অতিক্রান্ত হলে তা অনুসরণ করা গ্রামের স্কুলগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রস্তাব হলো, প্রশ্নকাঠামোয় বিদ্যমান অসংগতিগুলো দূর করে পরিবর্তিত বা নতুন যা-ই হোক না কেন, যথাসময়ে প্রশ্নকাঠামো নির্ধারণ করে আগামী জানুয়ারি মাসের বই-উৎসবের দুই সপ্তাহের মধ্যেই তা দেশের স্কুলগুলোতে পাঠানোর ব্যবস্থা হোক। বছরের প্রথম মাসে প্রশ্নকাঠামো জেনে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় সময় হাতে পাবেন শিক্ষকেরাও। শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে তাঁরা যেমন বিস্তারিতভাবে জানাতে পারবেন, তেমনি অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়াও গড়ে উঠবে।
ড. সৌমিত্র শেখর: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
scpcdu@gmail.com

২৭ বছর বয়সে পররাষ্ট্রমন্ত্রী!

বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন অস্ট্রিয়ার সেবাস্তিয়ান কার্জ। দেশটির নবগঠিত জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান করে নিয়েছেন ২৭ বছর বয়সী এই রাজনীতিক! সোমবার দেশটির রাজধানী ভিয়েনায় শপথ অনুষ্ঠানে কার্জের সঙ্গে শপথ নেন আরও ১২ জন মন্ত্রী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে অস্ট্রিয়ার সমন্বয় সচিবের পদে ছিলেন কার্জ। এই পদে দায়িত্ব পালনকালে স্কুল ও মুসলিম অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করার জন্য ব্যাপক প্রশংসিত হন তিনি। গত সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে দেশটির ক্ষমতাসীন সোস্যাল ডেমোক্র্যাটস ও রক্ষণশীল পিপলস পার্টি (পিপি) জয়ী হয়। পিপলস পার্টির জনপ্রিয় তরুণ রাজনীতিবিদ কার্জ। ডেমোক্রেটরা পায় ২৭ দশমিক ১ শতাংশ ভোট, অন্যদিকে পিপি পায় ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। বিশ্বের সবচেয়ে কমবয়সী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কার্জ শপথ নিলেও কোনো দেশের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার সময় বয়সে আরও ছোট ছিলেন এমন নজিরও আছে সমসাময়িক বিশ্বে।
বিশ্বের সবচেয়ে কমবয়সী নেতা হিসেবে ১৯৮৬ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সোয়াজিল্যান্ডের রাজার আসনে আসীন হন তৃতীয় এমস্বতি। এছাড়াও যুব বয়সেই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পেয়েছেন এমন উদাহরণ রয়েছে আরও অনেক। ২০১১ সালে ২৮ অথবা ২৯ বছর বয়সে (সঠিকটি প্রকাশ করা হয় না) দায়িত্ব নেন উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং-উন। ২০০৪ সালে ৩২ বছর বয়সে ডোমিনিকা’র প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেন রুজভেল্ট স্কেরিট। ভুটানের রাজার সিংহাসনে আসীন হওয়ার সময় জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুকের বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিনা রাব্বানি খারের দায়িত্ব নেয়াটিও ছিল বিশ্বের কূটনীতিক মহলে একটি অন্যতম আলোচনার বিষয়।

ত্রাণে ধীরগতি ক্ষোভ বাড়ছে

ফিলিপিন্সে সুপার স্টর্ম হাইয়ান আঘাত হানার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এখনও চলছে উদ্ধার কাজ, উদ্ধার করা হচ্ছে মৃতদেহ। বিভিন্ন দেশ ত্রাণ পাঠালেও তা বিতরণে দেরি হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে দুর্গতদের মাঝে। রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে আছে মৃতদেহ। টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, নেই বিদ্যুৎ। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ত্রাণ বিতরণও ব্যাহত হচ্ছে। হাইয়ান আঘাত হানার এক সপ্তাহ পরেও ত্যাকলোবানের অবস্থা এখন এমনটাই।
ত্রাণ কাজে ধীরগতি এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে শরণার্থীদের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র নাইকা আলেকজান্ডার ফিলিপিন্স সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে মৃতদেহ উদ্ধারের চেয়ে শরণার্থীদের প্রতি বেশি নজর দেয়া হয়। তাই ফিলিপিন্স দুর্গতদের যারাই সাহায্য করতে চাচ্ছেন, চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন। হংকংয়ের মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী জানালেন, অনেক চেষ্টা করেও টেলিফোনে সংযোগ স্থাপন করতে পারেননি তিনি। হংকংয়ে ১ লাখ ৩৩ হাজার ফিলিপিনো অধিবাসীর বসবাস। তাই তারা উদগ্রীব স্বজনদের খবর জানতে এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। এদিকে ফিলিপিন্স সরকার নিহতদের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করছে না এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৬২১। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগের প্রধান এদুয়ার্দো দেল রোসারিও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েই তারা এই সংখ্যা প্রকাশ করছেন। এমনকি ত্যাকলোবানের ৯৫ ভাগ মানুষ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে-এই তথ্য অস্বীকার করে প্রেসিডেন্ট বেনিগনো একুইনো অভিযোগ করেছেন, কর্মকর্তারা বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করছেন। এদিকে ত্রাণ কাজে সরকারি সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডে হতাশ জনগণ। ত্রাণ কাজে ধীরগতির কারণে স্থানীয় গণমাধ্যম একুইনোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ফিলিপিন্সের ডেইলি ইনকুইরার পত্রিকার শিরোনাম- ‘হু ইজ ইনচার্জ হিয়ার?’
বিশ্লেষকরাও বলছেন, এই ঝড়ে একুইনোর কর্মকাণ্ড পরবর্তী নির্বাচনে বেশ প্রভাব ফেলবে। হাইয়ানের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছে ফিলিপিন্সের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও। জাতীয় অর্থনীতি ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০১৩ সালে দেশটির গড় উৎপাদন ০.৩ শতাংশ থেকে ০.৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। যার ফলে প্রবৃব্ধি কমবে ৬.৫ ভাগ থেকে ৭ ভাগ।

কেনিয়ায় উড়াল শৌচাগার

শৌচাগার ব্যবহার মানুষের জন্য খুব সাধারণ একটা বিষয় ও জীবনের অঙ্গ হলেও, কেনিয়ার মতো আফ্রিকার বহু দেশেই কিন্তু তেমন নয়। সেখানে কার্যকর, পরিষ্কার পয়ঃপ্রণালী না থাকায় অনেকের কাছেই ঠিকঠাক ‘টয়লেট’-এ যাওয়াটা একটা স্বপ্ন! বিশ্বের বহু দেশেই এ ধরনের একটা দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। রোগ-জীবাণু ভর্তি ময়লা শৌচালয়, যেখানে না আছে পানি, না আছে অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা। অনেক জায়গায় আবার কোনো শৌচাগারই নেই। এই যেমন, কেনিয়ার কিবেরিয়া অঞ্চল। শৌচাগার নেই বললেই চলে। কারণ, সেখানে মাথাপিছু প্রতি ৩০০ জন মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র একটি শৌচালয়। সচরাচর যেটা হয়ে থাকে, সেটা হল বেগতিক অবস্থায় পড়লে প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করে মাঠে-ঘাটে ফেলে দেয়াটাই তাদের আদি অভ্যাস। তবে আর নয়। কারণ, এবার সেখানে আসছে ‘ফ্লাইং টয়লেট’ বা ‘উড়াল শৌচাগার’। কেনিয়ার এই দরিদ্র মানুষদের খোলা জায়গায় মলত্যাগ করার অভ্যাসটা না পাল্টিয়েই এই ‘উড়াল শৌচাগার’ নামের প্রকল্পটি তৈরি করেছেন ক্যামিলা ভিরসিন। তিনি সুইডেনের ‘পিপিপল’ নামের একটি সংস্থার সঙ্গে জড়িত। বলা বাহুল্য, মানব স্বাস্থ্য রক্ষায় ‘স্যানিটেশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তুলতে সচেষ্ট জাতিসংঘ। ‘পিপিপল’ তাদেরই দেখিয়ে দেয়া পথ অনুসারে কাজ করছে।
এই প্রকল্পের আওতায় কিবেরিয়ার মানুষ এবার থেকে তাদের পুরাতন অভ্যাস না পাল্টে আগের মতোই মলত্যাগ করতে পারবেন। তবে সাধারণ প্লাস্টিকে নয়, বরং পরিবেশবান্ধব বা ‘বায়ো-ডিগ্রেডেবেল’ এক ধরনের ব্যাগে। দেখতে পাতলা, অথচ হাঁড়ির মতো মুখবিশিষ্ট এই ব্যাগগুলোর ভেতরে রয়েছে গুঁড়ো করা ইউরিয়া। এটা এমন এক অ্যামোনিয়া, যা একদিকে যেমন ক্ষতিকারক প্যাথোজেনকে দূরে রাখে, তেমনই এর ফলে থাকে না কোনো দুর্গন্ধ। ক্যামিলা ভিরসিন জানান, এগুলো দু-তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। এছাড়া, কিবেরিয়ার বেশ কয়েকটি জায়গায় কিছু ‘ড্রপ-অব পয়েন্ট’ করা হয়েছে, অর্থাৎ এমন কিছু জায়গায় চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে কয়েক সপ্তাহ অন্তর গিয়ে ওই ‘উড়াল শৌচাগার’-গুলোকে ফেলে এলেই হল। পরবর্তীতে এগুলো দিয়ে সার তৈরিরও পরিকল্পনা করছেন ভিরসিন। শুধু তাই নয়, পরিবেশবান্ধব এই শৌচাগারের নির্মাণ খরচও খুব কম। এমনকি, ‘কোল্ড ড্রিংক’-এর বোতলে যেমন ‘ফান্ড’ থাকে, তেমনই এটা কিনে ব্যবহারের পর ফেরত দিলে কিছু অর্থ ফেরতও পাওয়া যায়। তাই কেনিয়ার দরিদ্র মানুষের কাছে খুব দ্রুতই যে এই ‘উড়াল শৌচাগার’ জনপ্রিয় হয়ে উঠবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই বলেই মন্তব্য করেছেন ভিরসিন। এএফপি, এপি।