Thursday, August 22, 2013

অচেনা পথে হাসিনা

কোন পথে হাঁটছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নতুন পথ কিছুটা চেনা, বেশিরভাগই অচেনা। অনেকে ২০০৬ সালের শেষ দিককার সঙ্গে বর্তমান সময়ের দৃশ্যপট মেলানোর চেষ্টা করছেন।

যেখানে ৫০ হাজার বেওয়ারিশ কুকুরের রাজত্ব... by কাজী আরিফ আহমেদ

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে জনবহুল শহর ডেট্রয়েট এখন কুকুরদের দখলে। তারা এখন সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

জনগণের ব্যাপক সমর্থনপুষ্ট সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেন তারেক রহমান: ডেভিড নিকোলসন by তানজির আহমেদ রাসেল

বাংলাদেশে অনির্বাচিত ও অভিজাত শ্রেণীর চাপিয়ে দেয়া কোন পদ্ধতি নয় বরং জনগণের ব্যাপক ভিত্তিক সমর্থনপুষ্ট সমাজ বিনির্মাণ করার স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

চুলচেরা চুক চিন্তা by সাযযাদ কাদির

সামনে জাতীয় নির্বাচন। এর প্রস্তুতি হিসেবে নানারকম সংযোজন বিয়োজন সংশোধনী এসে সংবিধান থেকে নির্বাচনী বিধি পর্যন্ত অনেক কিছুই নিজের পছন্দ ও প্রয়োজনমতো সাজিয়ে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তৃতীয় শক্তি ক্ষমতায় আসার কোনো সুযোগ নেই

বিদ্যমান আইনে দুই দলের বাইরে কোনো শক্তি ক্ষমতায় আসার কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট জনেরা। তারা বলেন, সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতায় আসেন। তাই তাদের মোকাবেলা করতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে।

প্রেমিকার ঘামভেজা শরীরে….

শরীর চেনা-জানার প্রথম পাঠ তো বোধহয় পর্নোগ্রাফির হাত ধরেই আসে। এমনিতে ছেলেদের দিকে পাইকারি আঙুল উঠলেও শরীর আনচান বয়ঃসন্ধির মেয়েরাই বা লুকিয়ে কম কি নগ্নছবির পাতা উলটেছে?

চতুর্থ দিনের জিজ্ঞাসাবাদে ঐশীর বিভ্রান্তিমূলক তথ্য

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যার ঘটনায় আটক মেয়ে ঐশী রহমান গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নিজের বক্তব্যে অনড় থাকছে না।

নির্দলীয় সরকার ছাড়া এদেশে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয়- ইউনূস

শান্তিতে নোবেল জয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নির্দলীয় সরকার ছাড়া এদেশে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হওয়া উচিত।

নাইট ক্লাবে প্রভা!

আবারও বেপরোয়া জীবন যাপনে মেতেছেন অভিনেত্রী প্রভা। রাজধানীর নাইটক্লাবের ঝলমলে অর্ধনগ্ন পার্টিতে এখন তার সচারচর যাতায়াত।

জামায়াত নিষিদ্ধ হলে আওয়ামী লীগেরই ক্ষতি by অনুরূপ আইচ

জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের বিষয়টি এখন সব মহলে আলোচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এ নিয়ে নানা মতপ্রকাশ করছেন। এ ক্ষেত্রে অনেক পর্যায়ে বিতর্কেরও সৃষ্টি হচ্ছে। আমার মতে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে আওয়ামী লীগ। ৯৬-এর নির্বাচনের কথা ভুলে গেলে চলবে না। তখন যদি জামায়াত না থাকত, তবে আওয়ামী লীগের জয়লাভের পথ সুগম হতো না । আরেকটি বিষয় হচ্ছে, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ হলে সারাদেশে তাদের নেতা-কর্মীরা যাবে কোথায়? অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, তখন জামায়াতিরা আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে চলে যাবে। দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করবে। এ আশংকা পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। যে দেশে জেএমবি কিংবা হিজবুত তাহরিরের মতো ছোটখাটো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার পর হিমশিম খেতে হয় সরকারকে, সে দেশে বড় একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পর পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়া হবে, তা বোধগম্য নয়। আশংকার কথা না হয় আগাম ভাবলাম না। জামায়াত নিষিদ্ধ হলে তাদের লাখ লাখ নেতা-কর্মী নিশ্চয়ই দেশত্যাগ করবে না। তখন তাদের নিরাপদ স্থান হবে বিএনপিতে। এতে বিএনপির ভোট বাড়বে। সংগঠন হিসেবেও শক্তিশালী হবে। তাতে আওয়ামী লীগের কী লাভ?
নিষিদ্ধ যদি করতে হয়, তবে ধর্মভিত্তিক সব রাজনৈতিক দলকেই নিষিদ্ধ করতে হবে। কিন্তু সে কথা উচ্চারণ করছে না সরকার। জামায়াত যেমন উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে, তেমন রাজনীতি ধর্মভিত্তিক অনেক দলই করে থাকে। এরকম রাজনৈতিক দল বিরোধীদলীয় জোটেও আছে আবার সরকারের মহাজোটেও রয়েছে । সবচেয়ে বড় কথা হল, বর্তমানে আওয়ামী লীগও ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে এক ধরনের উৎসাহিত করছে। তারা রেকর্ডসংখ্যক আসন পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তারা নির্বাচনের আগে বলেছিল বাহাত্তরের সংবিধান পুনর্বহাল করবে। সরকারে আসার পর আওয়ামী লীগ বাহাত্তরের সংবিধানের লেবাসে ধর্মভিত্তিক সংবিধান পুনর্বহাল রেখেছে। এতে করে আওয়ামী লীগ বাহাত্তরের সংবিধানের জনক তথা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই অবজ্ঞা করেছে। এটা কি তারা একবারও ভাবেনি?
সরকার বাহাত্তরের সংবিধান পুনর্বহালের নামে ধর্মভিত্তিক সংবিধান বহাল রাখার পর অনেক প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল প্রতিবাদ করেছিল। তাতে কান দেয়নি আওয়ামী লীগ। বরং অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকে বলতে শুনেছি, আমরা জনগণের ধর্মীয় চেতনাতে আঘাত না দেয়ার জন্য এমনটা করেছি। আওয়ামী লীগ যদি তা-ই মনে করে, তাহলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তো তারা পদদলিত করল। পেছন ফিরে দেখা যাক। পাকিস্তান আমলে এ বঙ্গের তথা পূর্ব পাকিস্তানের ৯০ ভাগ মানুষ ছিল অশিক্ষিত। ধর্মের ভিত্তিতে জন্ম নেয়া পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ মানুষ ছিল ধর্মভীরু। সে সময় আদর্শের পথে অবিচল বঙ্গবন্ধু আওয়ামী মুসলিম লীগ নাম থেকে মুসলিম শব্দটা ফেলে দিয়েছিলেন অনায়াসে। কারণ তিনি ক্ষমতার রাজনীতি করেননি কখনও। তিনি গণমানুষের কল্যাণে রাজনীতি করেছেন। দেশের জন্য সপরিবারে আত্মত্যাগ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। প্রশ্ন হল, পাকিস্তান আমলে যদি বঙ্গবন্ধু ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পরিহার করতে পারেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ কেন তা পারে না? ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পরিহার করে বঙ্গবন্ধু এদেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। তাহলে বর্তমান আওয়ামী লীগ কেন তেমন উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারল না?
তারা মনে করে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের দলীয় সম্পদ। তাই তো শাহবাগের স্বতঃস্ফূর্ত গণজোয়ারে তরুণ প্রজন্ম জয় বাংলা স্লোগান দিলেও জয় বঙ্গবন্ধু বলেনি। এ দায় আওয়ামী লীগের। তারা স্বীকার করুক আর না-ই করুক। শাহবাগের গণজোয়ারের পর আওয়ামী লীগ যদি মনে করে থাকে, এ প্রজন্ম আওয়ামী লীগের পক্ষের, তাহলে ভুল হবে। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের গোপন আঁতাতের সন্দেহ থেকেই শাহবাগে গণজোয়ারের সৃাষ্ট হয়েছিল। সরকার যদি ভেবে থাকে, শুধু জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে গণজাগরণ নিজেদের পক্ষে আনবে, তবে ভুল করবে। ধর্মভিত্তিক উগ্র রাজনৈতিক দল এ দেশে আরও আছে। আরও অনেক রাজনৈতিক দলে যুদ্ধাপরাধী রয়েছে। আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে, চোরে চোরে মাসতুত ভাই। অর্থাৎ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো কিংবা রাজাকাররা ভেতরে ভেতরে সবাই এক। এদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের পতাকা তলে এলেও তারা সবাই মুখোশধারী সুবিধাভোগী। কাজেই শুধু জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করলেই আওয়ামী লীগ অরাজনৈতিক গণজাগরণের সুফল পাবে না। শুধু বিরোধীদলীয় জোটকেন্দ্রিক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেই তারা জনগণের সুনজর পাবে না। রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার করতে হবে। রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হলে ধর্মভিত্তিক সব রাজনৈতিক দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। শুধু জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হলে রাজনৈতিক সুফলের চেয়ে কুফলই বেশি ভোগ করবে আওয়ামী লীগ।
অনুরূপ আইচ : লেখক ও সাংবাদিক

শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব বাড়াতেই হবে by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

আমাদের দেশটি সারা পৃথিবীর স্থলভাগের এক হাজার ভাগের মাত্র এক ভাগ দখল করে আছে আর বিশ্বের এক হাজার ভাগের ২৪ ভাগ মানুষের অন্ন, বাসস্থান, শিক্ষার দায়িত্ব পালন করছে। কাজটি নিঃসন্দেহে জটিল, চ্যালেঞ্জিং ও দুরূহ। উপরন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে আমাদের টিকতে হচ্ছে। তাই সীমিত সম্পদ দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা মেটানোর দায়িত্ব পালনে আমাদের অবশ্যই দূরদর্শী, উৎপাদনশীল ও সৃজনশীল হতে হবে। আমাদের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অপচয় কমাতে হবে। এজন্য অবশ্য বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগানটি খুবই সময়োচিত। তবে এ স্লোগানের কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। গত ২৫ বছরে বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত বাগাড়ম্বর আমরা কম শুনিনি। তবে তা দেশ ও সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখেনি।
কোরিয়ার সামরিক সরকার অনুধাবন করেছিল, দেশের উন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়টি আমাদের হৃদয়ঙ্গম করতে হবে এবং তার জন্য আন্তরিকভাবে কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হবে। এই মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশে প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি এবং যা নিয়ে এমনকি উন্নত দেশের পরিকল্পনাবিদরাও যে রীতিমতো হকচকিয়ে গেছেন তার মূলে রয়েছে- তাজরিন ফ্যাশন কিংবা রানা প্লাজার মৃত্যুকূপে বসে কাজ-করা অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মহিলাদের নিরলস পরিশ্রমে তৈরি পোশাক রফতানি করা আয় এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আরবভূমিতে পরিবার থেকে দূরে থাকা নিগৃহীত-অবহেলিত খেটে খাওয়া মানুষের রেমিটেন্স। আমাদের দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সফল ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য খাত হল কৃষি। স্বাধীনতার সময় আমাদের জনসংখ্যা ছিল বর্তমান সময়ের অর্ধেক। আবাদযোগ্য জমি ছিল বর্তমানের চেয়ে বেশি। তারপরও তখন আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলাম না। এখন জনসংখ্যা দ্বিগুণ, আবাদযোগ্য ভূমির পরিমাণ কম হওয়া সত্ত্বেও আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অন্যান্য প্রযুক্তির জ্ঞানে, দক্ষতায়, কারিগরিতে আমরা ঢের পিছিয়ে আছি। ভারত গঙ্গার ওপর সেতু তৈরি করেছে ১৯৭১ সালে। আজ ৪০ বছর পরও এমন একটি সেতু নির্মাণ করার যোগ্যতা আমাদের হয়েছে কি-না তা যাচাই করার, নিজেদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করার কোনো ঝুঁকিও আমরা নিতে পারছি না। আমাদের দেশের হাজার হাজার রোগী পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চিকিৎসা সেবার জন্য গিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হয়। এমনকি তিন চাকার সিএনজিচালিত বাহনগুলোও বিদেশ থেকে কিনতে হয়! একই সঙ্গে আদমজী জুট মিলের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-কারখানা, নিউজপ্রিন্ট মিল বন্ধ করে দিতে হয়, বিমানের ব্যবস্থাপনা বিদেশীদের হাতে ছেড়ে দিতে হয়, এমনকি বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বও আউটসোর্স করা নিয়ে ভাবতে হয়। এর অর্থ হল জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিদ্যায় দক্ষতায় আমাদের ঘাটতি রয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ সফলতার সঙ্গে মোকাবেলার জন্য এ বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
সুখের বিষয়, বিগত ১৫-২০ বছর ধরে সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নানা শাখায় গবেষণার জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দ করছে। আইসিটি মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংস্থা গবেষণাকে জোরদার করার জন্য নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তবে এর ফলে পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডার আমাদের অবদানে স্ফীত হয়েছে বলে কোনো প্রমাণ নেই।
পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিংয়ে, এমনকি এশিয়ার তালিকাতেও বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনবহুল আমাদের দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থান পায় না- যদিও থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বিভিন্ন আরব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে। এ পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার যে, জ্ঞান-বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিতে স্বাধীনতার পর বিশ্বসভায় আমরা আমাদের স্থান ধরে রাখতে পারিনি এবং ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছি। এমনকি পাকিস্তান থেকেও আমরা যথেষ্ট পিছিয়ে আছি। ভারত আমাদের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে রয়েছে। আর অনেক কম জনসংখ্যার দেশ শ্রীলংকা ও নেপালের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগে নিশ্চয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি সম্মানজনক র‌্যাংক পেত, যা এখন আর পাচ্ছে না। এর অর্থ হল, আমাদের শিক্ষা-গবেষণা নিয়ে যত উদ্যোগ, তা কার্যকর হতে পারেনি। আমরা যদি এ বৃত্ত থেকে বের হতে চাই তাহলে আমাদের কর্মকাণ্ড ও উদ্যোগগুলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে, আমাদের ভুল বের করতে হবে।
এ পর্যন্ত গবেষণায় আমরা যে অনুদানগুলো দিয়েছি, তা ঠিকমতো ব্যবহার করা হয়েছে কি-না- অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকরভাবে তা মনিটর করা হয়নি। এর ফলে দেশের সীমিত সম্পদ যথাযথভাবে ব্যয় করা হচ্ছে কি-না তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে গবেষণায় অর্থায়নের জন্য নানা সংস্থা রয়েছে। গবেষণালব্ধ ফলাফল যখন বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়, তখন অর্থ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি যথাযথভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক জার্নালগুলো আমি যখন নাড়াচাড়া করি, তাতে আমাদের অর্থ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম খুব একটা চোখে পড়ে না।
পাকিস্তানে অধ্যাপক আতাউর রহমান হায়ার এডুকেশন কমিশনের দায়িত্ব নিয়ে যেসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা যে সফল হয়েছে তার বড় প্রমাণ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বরাদ্দ বেড়েছে ৩৪০ শতাংশ, ২০০৩ থেকে ২০০৮-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের তৈরি ডিজিটাল লাইব্রেরিতে ৪৫ হাজার পাঠ্যবই এবং ২৫ হাজার আন্তর্জাতিক জার্নাল সব শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ২০০৩ সাল পর্যন্ত যেখানে কোনো পাকিস্তানি বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান করে নিতে পারেনি, সেখানে এখন প্রথম দু’শতে আছে দুটি। এক হাজার ছাত্রকে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ার জন্য কিউবা পাঠানো হয়েছে। পাঁচ হাজার ছাত্রকে উন্নত বিশ্বে পিএইচডি শিক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক জার্নালগুলোয় ২০০৩ সালে পাকিস্তান থেকে প্রকাশনার সংখ্যা ছিল ছয়শ’; ২০০৮-এ এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার হাজার তিনশ’তে। অধ্যাপক আতাউর রহমানকে বিভিন্ন বিদেশী সংস্থা তার সাফল্যের জন্য বড় বড় চারটি পুরস্কার দিয়েছে। সুবিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলোর প্রশংসাও করা হয়েছে। পাকিস্তানের এ পরিসংখ্যানের কাছে আমাদের অর্জন উল্লেখ করার মতো নয়।
দেশে সমস্যার অন্ত নেই। রাজধানীতে যানজটের কারণে মানুষের যে উৎপাদনশীলতা নষ্ট হচ্ছে, জ্বালানি খরচ হচ্ছে, তা হিসাব করলে জাতীয় অগ্রগতিতে এর বিরূপ প্রভাব হবে চোখে পড়ার মতো। তারপরও এগুলো নিয়ে আমাদের দেশে সমন্বিত গবেষণা লক্ষণীয় নয়। সোনালী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ কেলেংকারির কথা জাতীয় দৈনিকগুলোতে ফলাও করে প্রচারিত হল। ব্যাংকে শত শত কম্পিউটার থাকা সত্ত্বেও তাতে বাধা দেয়ার কোনো ব্যবস্থাই যদি করা না গিয়ে থাকে, তাহলে সেখানে কী কম্পিউটারায়ন হল? আমরা কি তাহলে শুধু ম্যানুয়ালি যে কাজগুলো করা হতো, তা কম্পিউটার দিয়ে প্রতিস্থাপন করছি? কম্পিউটার দিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি কিংবা সিস্টেমের উন্নয়নে অপটিমাইজেশনের কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছি না?
দেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। শিক্ষা শুধু আমাদের চারদিকে যে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে তা মানবকল্যাণে ব্যবহারের দক্ষতাই দেয় না, শিক্ষা আমাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরিতেও অবদান রাখে। শুধু প্রায়োগিক শিক্ষাই নয়, তাত্ত্বিক শিক্ষা ও গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ। একসময় জাপান জানা জ্ঞান-বিজ্ঞান কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তি তৈরি করেছে। কিন্তু এখন তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, নানা দেশের ছাত্ররা সেখানে গবেষণা করছে।
আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে অধিকতর কার্যকর করার জন্য পাকিস্তানের অনুরূপ লক্ষ্যভেদী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য নিচের প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।
১. সারাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে উৎসাহিত করতে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যেতে পারে। এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-গবেষক হিসেবে যোগদানের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যবহার করতে হবে। এ প্রতিষ্ঠান হবে সারা পৃথিবীর জ্ঞান ভাণ্ডারে বাংলাদেশের সঞ্চয়ের অগ্রপথিক, যা নিয়ে আমরা সবাই গর্ববোধ করব, যা আমাদের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করবে। এর বেতন কাঠামো ও অন্যান্য সুবিধা আর্থিকভাবে, সামাজিকভাবে লোভনীয় হবে, যাতে সারাদেশের শিক্ষক-গবেষকরা সেখানে চাকরি পাওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে নিজেদের প্রোফাইল উন্নত করে। এ প্রতিষ্ঠানের চাকরির স্থায়িত্ব ও পদোন্নতি শিক্ষকদের অর্জনের ওপর নির্ভর করবে। প্রতিষ্ঠানটি সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আদর্শ হিসেবে কাজ করবে।
২. উচ্চতর গবেষণার জন্য এখন যে অনুদানগুলো দেয়া হচ্ছে, তার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে মনিটর করতে হবে। যেসব গবেষক অনুদানের অর্থ ব্যবহার করে গবেষণায় সফলতা পাচ্ছে না, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণাকে উৎসাহিত করার জন্য নানা প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। জনগণের অর্থের যথাযোগ্য ব্যবহারে সবাইকেই আন্তরিক হতে হবে।
৩. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠান-প্রধানকে দায়দায়িত্ব নিয়ে বিদায় নিতে হবে। একটি স্বাধীন, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ও উচ্চ গুণাবলীসম্পন্ন শিক্ষাবিদ-নাগরিকদের দিয়ে তৈরি সার্চ কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান-প্রধানকে নিয়োগ দিতে হবে। অধিকতর মেধা ও দক্ষতাসম্পন্ন স্নাতকদের শিক্ষকতার চাকরিতে উৎসাহিত করতে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। বছর দুয়েক আগে পাকিস্তানের হায়ার এডুকেশন কমিশন শিক্ষকদের বেতন ও সুবিধাদি বৃদ্ধি করেছে। অধ্যাপকদের বেতন দুই লাখ চৌত্রিশ হাজার থেকে চার লাখের ওপর নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া উচ্চতর শিক্ষা-গবেষণাকে উৎসাহিত করার জন্য বিদেশ থেকে স্বনামধন্য শিক্ষকদের নিয়ে আসছে, যেমনটি করছে কোরিয়াও।
৪. শুধু উচ্চশিক্ষাই নয়, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যোগ্য শিক্ষকের অভাবে উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক দিয়ে অবহেলিত অঞ্চলের ছাত্রদের সাহায্য করা যেতে পারে। শিক্ষার জন্য নিবেদিত চ্যানেল ব্যবহার করে সারাদেশের ছাত্রদের জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষক দিয়ে সময়সূচি তৈরি করে ছাত্রদের জন্য পাঠদান করা যেতে পারে, যা স্কুল-কলেজের ছাত্ররা টেলিভিশন কক্ষে শিক্ষকের উপস্থিতিতে গ্রহণ করতে পারে। স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সুযোগ্য শিক্ষাবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের যৌক্তিক মাত্রার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হতে হলে তার আমলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্জন কিংবা ফলাফল বিবেচনায় আনতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যয়সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জনের অত্যন্ত ব্যয়সাশ্রয়ী পদ্ধতি হচ্ছে প্রতিযোগিতা। শিক্ষার প্রতিটি পর্যায়ে নানা ধরনের জনপ্রিয় প্রতিযোগিতার সূচনা করতে হবে। ছাত্রদের প্রশংসনীয় দক্ষতার জন্য লোভনীয় পুরস্কার দিতে হবে। বর্তমান বোর্ড কর্তৃক প্রশ্ন ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ছাত্রদের সৃজনশীলতা এবং বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা বাড়ছে না বলে জনসাধারণের মধ্যে যে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতিকে ক্রসচেক করার জন্য সব শ্রেণীতে সব বিষয়ে অলিম্পিয়াডের অনুরূপ সৃজনশীল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সূচনা ঘটাতে হবে। এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তরুণদের প্রাণশক্তি, জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের প্রতিযোগিতায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৫. সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অর্জনের ভিত্তিতে স্বীকৃতি, র‌্যাংক ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তদনুযায়ী অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সব প্রতিষ্ঠানের জন্যই অনুরূপ সাফল্য অর্জন করার উৎসাহ সৃষ্টি হয়। গোটা বিষয়টিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য গণমাধ্যমে এ বিষয়গুলোর ব্যাপক প্রচার করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উৎকর্ষ অর্জনের নানারকম প্রতিযোগিতা রয়েছে বলেই সারা পৃথিবীর মাত্র পাঁচ শতাংশ জনসংখ্যা নিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ মানব সভ্যতার নানা প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ডের ৯৫ শতাংশ স্বীকৃতির দাবিদার তারা। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন সরকারের আমলে উচ্চশিক্ষা কমিশনের তৈরি শিক্ষানীতির রিপোর্টগুলো যেভাবে আমাদের দেশে অবহেলিত হয়, তাতে মনে হয় না আমরা শিক্ষায় প্রকৃতই আগ্রহী। তবে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ যদি আমরা সফলভাবে মোকাবেলা করতে চাই, তাহলে অবশ্যই শিক্ষাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। যে কোনো দেশের উন্নয়নে এখন প্রাকৃতিক সম্পদের থেকে মানবসম্পদ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। যার ফলে প্রায় প্রাকৃতিক সম্পদহীন জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি, যদিও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়া কিংবা আরব দেশগুলো তা নয়। ১৬ কোটি মানুষকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ করতে পারলে আমরা নিঃসন্দেহে পৃথিবীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারব। কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং ও ভিয়েতনাম বিপুল বেগে অগ্রসর হচ্ছে। আমরাও পারব।
ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

কেন এই সামাজিক নিষ্ঠুরতা by কাজী সাইফুল ইসলাম

অসৎ উপার্জন চিরকালই মানুষের শত্র“। এ ব্যাপারটা আবারও কঠিনভাবে প্রমাণ হল ঐশীর ঘটনার মধ্য দিয়ে। ভাবা যায়, একটি মেয়ে নিজের বাবা-মা দু’জনকেই খুন করেছে! এর চেয়ে নিষ্ঠুর কাজ আর হয় না। একজন পেশাদার খুনি, যে একশ’জন মানুষ খুন করেছে, তাকেও যদি বলা হয় নিজের বাবা ও গর্ভধারিণী মাকে খুন করতে হবে, তাহলে সেও হয়তো ভয়ে সঙ্কুচিত হবে। আমার কাছে মনে হয়, নিজের বাবা-মাকে খুন করার চেয়ে নিজের গলায় দড়ি লাগিয়ে ঝুলে পড়া অনেক সহজ। অথচ কত সহজেই বাবা-মাকে খুন করতে পেরেছে ঐশী। এর কারণ কী? একটি মেয়ে তার বাবা-মাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করল, এজন্য শুধুই কি মেয়েটা দায়ী? তার দোষ থাকলেও কতটা? বাবা-মায়ের কি কোনোই দোষ নেই? মানুষ বলে তালগাছে তাল আর বেলগাছে বেলই ধরে। এই পুরনো কথাটা যদি মূল্যহীনও মনে করি, তাহলেও কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? যদি সমাধান হয়ই, তাহলে ঐশীর মতো এইটুকু মেয়ে এমন কাজ কী করে করতে পারল?
আমরা দিন দিন গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি। এ সত্য কথাটা উপলব্ধি করার অবসর কি আমাদের আছে? যদি না থাকে তাহলে বলব, এখনই ভেবে দেখার সময়। প্রত্যেক বাবা-মাকেই ভাবতে হবে। যেসব বাবা-মা নিজেদের বিবেকবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে বোধহীন মানুষের মতো অর্থ আর প্রতিপত্তির পেছনে ছুটছেন, তারা কি একবারও ভাবেন, তাদের এই টাকা কোন কাজে লাগবে? বাস্তবতা বলে, তাদের এই টাকা-পয়সা ছেলেমেয়েদের অহঙ্কারী, উচ্ছৃঙ্খল, নেশাগ্রস্ত আর অসামাজিক করার ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখছে। টাকা দিয়ে যদি মানুষকে সভ্য আর মেধাবী করার সুযোগ থাকত, তাহলে পৃথিবীর সব বুর্জোয়ার ছেলেমেয়েই ‘সেরা’ হতো। সভ্য আর ক্রিয়েটিভ কাজগুলো তারাই করত। তবে একজন ভালো ছাত্রের চেয়ে ভালো একজন মানুষ এদেশের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজন। সবার কথা বলছি না, তবে বেশিরভাগ ভালো ছাত্রই দেশের বারোটা বাজিয়ে দিতে বড় বড় কর্মকর্তা হয়েছেন, যাদের এতটুকু খেয়াল নেই দেশের বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও বারোটা বেজে যাচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই একটি ধারা চালু রয়েছে। ১৮ বছর বয়সের পর সন্তানের দায়িত্ব আর বাবা-মায়ের থাকে না। কিন্তু ১৮ বছর বয়সে তাদের লেখাপড়া শেষ হয় না। তাই কাজ করে নিজের পড়ার খরচ চালাতে হয়। একবার এক বইয়ে পড়েছিলাম, এক ইউরোপীয় যুবককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তোমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পাসের হার প্রায় শতভাগ হয় কিভাবে? যুবকটি উত্তর দিয়েছিল, কারণ আমাদের পড়ালেখার খরচ আমাদেরই জোগাড় করতে হয়। যদি কোনো সেমিস্টার খারাপ হয়, তাহলে পরের বছর সেই সেমিস্টার দিতে দ্বিগুণ টাকা লাগে। তাই সবাইকেই লেখাপড়া করতে হয়। ব্যতিক্রম থাকবেই। এখনও সমাজে যারা সৎভাবে জীবনযাপন করছে তাদের ছেলেমেয়েদের সামাজিক অবস্থা আর যেসব মানুষ অসৎ জীবনযাপন করছে তাদের ছেলেমেয়েদের সামাজিক অবস্থান কী লক্ষ্য করুন। সুকান্তের সেই ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতার কথা মনে পড়ে। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সে অসম্ভব ঝুঁকিতে থাকে প্রতিটি ছেলেমেয়ে। এ বয়সটা বিবেচনায় রেখে তাদের সুন্দর পথ দেখানোর দায়িত্ব কার। নিশ্চয়ই বাবা-মায়ের। আর বাবা-মাই যদি সন্তানের দিকে কোনো রকম খেয়াল না রেখে বৈধ-অবৈধ টাকার গরমে হাওয়ায় ভাসে, তাহলে ঐশীরা কতটুকু দোষী?
মাঝে মাঝে একটি কথা ভাবি। আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা বিনা প্রশিক্ষণে সন্তান জন্মদান করেন। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, সন্তান জন্ম দেব, তার জন্য আবার প্রশিক্ষণের কী আছে? আসলে প্রশিক্ষণটা হচ্ছে, সন্তান জন্ম দেয়ার পর সন্তানকে কিভাবে মানুষ করে গড়ে তুলতে হয় তার ট্রেনিং। এ রকম সামাজিক প্রশিক্ষণ সেন্টার থাকলে অন্তত বাবা-মায়েরা এতটা নির্বোধ হতেন না। শুধু কি ছেলেমেয়ে জন্ম দিলেই বাবা-মা হওয়া যায়? তাহলে যাদের আমরা পথের শিশু বলে ডাকছি, তাদের বাবা-মা কোথায়? তারা তো আর আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো টুপটাপ করে মাটিতে নেমে আসেনি। এ কারণে অবশ্যই সন্তানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে প্রত্যেক পিতামাতাকে। এমন একটা বয়স কিন্তু সবারই থাকে, যে বয়সে সবকিছুই ভালো লাগে। ভালো-মন্দ সবকিছুতেই আগ্রহ খুব বেশি। ঠিক সেই বয়সে ঐশীদের যে পথে চালানো হবে, তারা সে পথেই চলবে। ঐশীরা শুধু নেশা করে না, বাবা-মাকে হত্যা করে না; তারা দেশের জন্য, মানুষের জন্য ভালো ভালো কাজ করে পৃথিবীকে চমকে দিচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবদান রাখছে।
যে কোনো নিষ্ঠুর কাজকেই ঘৃণা করা উচিত। কোনো ধরনের নিষ্ঠুরতাই সমাজের মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। আমি ঐশীদের পক্ষে কথা বলছি না। আমি বলছি, মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলাই সমাধান নয়। ক’টা মাথাইবা কেটে ফেলা সম্ভব! তার চেয়ে মাথাব্যথার কোনো ওষুধ আবিষ্কার করাই কি ভালো নয়?
এসবি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের বেতন কত ছিল জানি না। তবে বুঝতে পারি, যে পরিমাণ টাকা তিনি তার পরিবারের পেছনে খরচ করতেন, তার সিকিভাগও বেতন থেকে আসত না। শোনা যায়, তার ওইটুকু মেয়েকে সপ্তাহে ১ লাখ টাকা হাত খরচ দিতেন তিনি। ঐশীর মতো বয়সী যদি কোনো মেয়ে বা ছেলে বাবা-মায়ের কাছ থেকে সপ্তাহে ১ লাখ টাকা হাত খরচ পায়, তাহলে সে ওই টাকা দিয়ে ভালো কিছু করবে নাকি খারাপ কাজ করবে? ভাবা যায়, একজন সরকারি কর্মকর্তা শুধু তার তরুণী মেয়েকে হাত খরচের জন্যই দেন সপ্তাহে ১ লাখ টাকা! মাসে চার লাখ! তাহলে সব মিলিয়ে তার মাসিক খরচ কত?
এর আগে, ৬ জুন ‘পুলিশের সেবাধর্ম কতদিন প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে?’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম যুগান্তরে। সেখানে উল্লেখ ছিল, ডিবি কর্মকর্তা বলেছিল এক কোটি টাকার নিচে সে ঘুষ খায় না। বিশাল গৌরবের কথা! এ ধরনের ঘুষখোরদের ছেলেমেয়েরা তো ঐশীর মতোই হবে, যতদিন তারা নিজেরা তাদের ভুলগুলো সুধরে নিতে না পারবে। সত্য দিয়েই সুন্দর কিছু গড়া সম্ভব। আর মিথ্যা দিয়ে রচনা হয় পাপ। আমি যদি সারাজীবন ধরে পাপ করতে থাকি আর চাই সুন্দর কিছু, তা কি সম্ভব?
এসবি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান যে তার মেয়েকে এত টাকা হাত খরচ দিতেন, সেই টাকার জোগাড় তিনি কী করে করতেন? আরও প্রশ্ন হল, গোটা দেশে কি এই একজনই মাহফুজুর রহমান ছিলেন? আর কেউ নেই? অবশ্যই আছে। তাদের কি এখনও চোখ খুলে সমাজের বাস্তব রূপটা দেখার সময় হয়নি? কতকাল আর চোখের সামনে কালো কাপড় ঝুলিয়ে রাখবে তারা? যদি রাখে, তার জন্য তাকেও খেসারত দিতে হবে। দেশে সামাজিক নিষ্ঠুরতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ নিষ্ঠুরতা সমাজ থেকে দূর করতে হলে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসতে হবে পরিবারকেই। সমাজ বা রাষ্ট্রের ওপর ভরসা করে বসে থাকার অর্থ অন্ধকারে বসে থাকে। কারণ এসব সামাজিক নিষ্ঠুরতার জন্য দায়ী পরিবার। তাই পরিবারকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে।
কাজী সাইফুল ইসলাম : প্রাবন্ধিক

বিশাল দুর্নীতির ঝুঁকি থেকে বিচার ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হবে by মইনুল হোসেন

আমরা অনেকেই জাতির আকাক্সক্ষা পূরণ করতে নানাভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। কিন্তু বিচার বিভাগ যদি ব্যর্থ হয় সেক্ষেত্রে স্বাধীন দেশের আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না এবং বিচার তখন নির্যাতনে পরিণত হয়। গণতন্ত্র ধ্বংস করার ক্ষেত্রেও প্রথমে বিচার বিভাগকে পোষ মানানো হয়। তারপর জাতি সভ্যতা ও শালীনতাবিবর্জিত রূপ পেতে থাকে। তেমনটি ঘটুক, তা অবশ্য আমরা চাই না। শাসনতন্ত্র বিচার বিভাগকে যে ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিয়েছে তার যাতে অপব্যবহার না হয় সেটা দেখা ও রক্ষা করার দায়িত্ব আর কারও নয়, বিচার বিভাগেরই নিজস্ব দায়িত্ব এটি। বিচার বিভাগের নাজুক অবস্থা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। জামিন মঞ্জুর করার যেমন ক্ষমতা আছে আদালতের, তেমনি একজন আসামিকে পুলিশ রিমান্ডেও পাঠাতে পারেন আদালত। তবে এক্ষেত্রে বেশির ভাগ আদেশের সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ রয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই একজন নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে শাসনতান্ত্রিক সুরক্ষার সম্পর্ক রয়েছে, যা বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। এজন্য কেবল বিচার বিভাগেরই বিশেষ এখতিয়ার রয়েছে জামিন ও পুলিশ রিমান্ড সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়ার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, বিচার বিভাগের সহায়তা ব্যতিরেকে আমরা দুর্নীতিবিরোধী সংগ্রামে বিজয়ী হতে পারব না। আমাদের দেশে দুর্নীতির মধ্যেই দুর্নীতি বাসা বাঁধে, তাই বড় ধরনের দুর্নীতির উদ্ঘাটন কোনো ক্ষেত্রের দুর্নীতি নিরোধে কোনো প্রভাব ফেলে না। বাস্তবতা হচ্ছে, দুর্নীতির মামলা যত বেশি বড় হচ্ছে, তত বেশি সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে অন্যদের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতিতে ভাগ বসানোর। লোকটি প্রধান অভিযুক্ত কি-না অথবা লোকটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির কোনো কেলেংকারি আছে কি-না সেটা কোনো বিষয় নয়, আসল কথা হচ্ছে নির্দোষ ব্যক্তি হলেও তাকে জড়িত করে কতটা ফায়দা তোলা যাবে, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। জামিন এবং পুলিশ রিমান্ড বিষয় দুটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং দুর্নীতির মামলা দ্রুততার সঙ্গে ও স্বচ্ছভাবে এগিয়ে নেয়ার প্রশ্নে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দুর্নীতির মামলার পেছনে থাকে বিপুল অংকের টাকার খেলা, আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে সহজে অর্থ উপার্জন করার এ কাহিনী আজ আর গোপন নেই। কাউকে পুলিশ রিমান্ডে দেয়ার ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টের সমর্থন না থাকার পরও পুলিশ রিমান্ডে নেয়া পুলিশের পক্ষে অত্যন্ত সহজ হচ্ছে। মানবাধিকার নেতা আদিলুর রহমান খানের ক্ষেত্রেও দেখা গেল হাইকোর্ট ডিভিশন পুলিশ রিমান্ডে পাঠানোর নিু কোর্টের আদেশ স্থগিত করেছেন। পুলিশের হেফাজতে একজন আসামিকে পাঠানোও যে শাসনতন্ত্রসম্মত নয়, তা গুরুত্ব পাওয়া একান্ত প্রয়োজন। কাউকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করতে হলে তা জেলে রেখেও করা যায়। আমাদের সর্বোচ্চ কোর্ট তো তাই বলছেন। মামলা বাড়ছে অথচ দুর্নীতি কমছে না। এর প্রধান কারণ মামলা তদন্তের নামে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেয়ার সুযোগ। কারও বিরুদ্ধে মামলা হলে তাকে পুলিশের কাছে অসহায় করা আইনের শাসন হতে পারে না। মামলা প্রথম, তদন্ত পরে- এটা আইনের প্রোটেকশন নয়।
তাই সব দিক বিবেচনায় নিলে এ সিদ্ধান্তে না এসে উপায় নেই যে, আমাদের দেশে এক দুর্নীতি থেকে বহু দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা বিচার ব্যবস্থার সহযোগিতায় হচ্ছে।
দুর্নীতির চাপ এতটা বাড়ছে যে বিচার বিভাগ তার পরিশুদ্ধ চরিত্র হারাচ্ছে এবং সেই অবক্ষয়ের স্বাক্ষর প্রকটিত হচ্ছে। আমাদের দেশে দুর্নীতির মামলা যে প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করা হচ্ছে সেই প্রক্রিয়ায় মারাত্মক গলদ রয়েছে। আমরা দুর্নীতির উৎসমূলে আঘাত হানতে ব্যর্থ হচ্ছি। জনজীবনে যারা পদচারণা করছেন, তাদের বিবেকবোধকে সমুন্নত রাখার জন্য যেহেতু দুর্নীতিবিরোধী সংগ্রাম, সেহেতু এই সংগ্রামে বিচারিক বিবেকবোধকে অম্লান অক্ষুণ্ন রাখতে হবে সর্বতোভাবে। একজন সমালোচক যথার্থই বলেছেন, রুই-কাতলাদের দুর্নীতি রোধে বিচার ব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে বলেই দুর্নীতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার ব্যাপার হল, নির্দোষকে বাঁচাতে হবে, সুরক্ষা দিতে হবে বিচারের এই মূলনীতি খুব কমই বিবেচনা করা হচ্ছে এবং এ কারণে দুর্নীতির মামলাগুলো পরিচালনার দায়িত্ব যারা পালন করছেন, তারা মামলা শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দোষকে নিষ্কৃতি দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কিছু লোকের জন্য দুর্নীতির মামলা হলেই লাভ। বিচার ব্যবস্থার দুর্নীতি অন্যায়-অবিচারকেই যে প্রশ্রয় দিচ্ছে তা তো সহজেই অনুমেয়। জনৈক ব্যক্তি বললেন, যেহেতু তার নাম এফআইআরে আছে সুতরাং পুলিশ তাকে গ্রেফতার করবে। আর এই গ্রেফতার এড়ানোর জন্য কিভাবে জামিন পাওয়া যায় সেই চেষ্টা শুরু করলেন তিনি। ভাগ্য ভালো না হলে জামিন পাওয়া কঠিন। আইনের কথা হচ্ছে, দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একজন নির্দোষ। কিন্তু জামিনের ক্ষেত্রে সেটা অনুসরণ করা হচ্ছে না। এজন্য জজ-বিচারককে দোষ দেয়া নিরর্থক, কারণ আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি কারও জামিন পাওয়ার অনুকূল নয়। এমনকি আমাদের আলোচিত গণমাধ্যমও ব্যাপারটিকে এভাবে মূল্যায়ন করে না যে, নির্দোষ ব্যক্তির সুরক্ষা ও বিচারের স্বচ্ছতার জন্য জামিনের সুযোগ অপরিহার্য। তবুও বিচারকদেরই বিচারিক নীতি-মূল্যবোধ রক্ষা করতে হবে।
অপরাধ সংক্রান্ত মামলা কারও বিরুদ্ধে সক্রিয় করার আগেই ভাবা উচিত কী কী কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তির মানমর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মামলা দিলেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বন্দি রাখার অর্থ যে তার ব্যক্তিগত প্রায় সব মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, সেটাও কর্তৃপক্ষের চিন্তাভাবনায় থাকতে হবে। এটা জামিনে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তির মৌলিক অধিকারগুলো রক্ষার জন্যই প্রয়োজন। যদি কেউ চাকরিজীবী হন আর জামিন না পান, তাহলে জীবিকা অর্জনের সুযোগ থেকেও তাকে বঞ্চিত করা হয়। আমরা যাতে একটি মানবতাবিবর্জিত নিষ্ঠুর সমাজ গঠন না করি, সেদিকে সবাইকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তার এবং পরিবারের সদস্যদের শাস্তি ভোগের পালা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। তার শুধু এই তিক্ত সত্য জানার সুযোগ হচ্ছে যে আইন কত অন্ধ হতে পারে। দুর্নীতির মামলার জালে আটকা পড়া কোনো নির্দোষ ব্যক্তির উদ্ধার পাওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে কর্তৃপক্ষের কেউ চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজনও বোধ করেন না। এক্ষেত্রে আইন হয়তো নির্দোষ ব্যক্তির বিপক্ষে নয়, কিন্তু আইন দুর্বলেরও কোনো কাজে আসছে না। বড় মাপের দুর্নীতিবাজদের রয়েছে আর্থিক ক্ষমতা ও সামাজিক প্রতিপত্তি। যারা কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছেন, তারা জানেন কিভাবে তা রক্ষা করতে হয়। তাদের সুনাম রক্ষার কোনো বালাই নেই, তারা ভালো করেই জানেন, অবৈধ অর্থ অবৈধ পথেই রক্ষা করতে হয়। রাজনীতিতে দুর্নীতি থাকায় দুর্নীতিপরায়ণদের রক্ষা পাওয়ার শেষ ভরসা হিসেবে রাজনীতি তো আছেই। তাই দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক সংযোগ ব্যতিরেকে কোনো বড় ধরনের দুর্নীতি হতে পারছে না। বিচারের নীতি ও অধিকার রক্ষায় বিচার বিভাগের জন্য জামিন মঞ্জুর করার কাজটি সহজ বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলার সুযোগ নেই। জামিন দেয়ার অর্থ কাউকে অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দেয়া নয়। এমনকি জামিনে এমন শর্ত আরোপ করা যেতে পারে, যাতে তাকে জেলে রাখা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সামাজিকভাবে নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক এমন কারও জামিন দেয়ার প্রশ্ন নিশ্চয়ই ভিন্নভাবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। যদি জামিন পাওয়া সহজ হয়, তাহলে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে দুর্নীতির প্রণোদনা কমে আসবে। জামিন লাভের পথে জটিলতা সৃষ্টি করায় বড় বড় দুর্নীতির মামলাগুলোকে ঘিরে দুর্নীতির ব্যাপক জাল বিস্তার লাভ করেছে। এসব বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা লাখ টাকা, কোটি টাকার শর্তে কথা বলে থাকেন। এটা বাড়িয়ে বলা হতে পারে, কিন্তু বিপুল অর্থের বিষয় চোখের সামনে থাকলে কোনো দাবিই অতিরিক্ত বিবেচিত হয় না। এটা আদালতেরও অজানা থাকার কথা নয় যে, জামিনের বিষয়টি বড় দুর্নীতির মতো বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এমনটি হওয়া উচিত নয়। উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির মামলার জন্য মূল হোতাদের শাস্তি প্রদানের বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তাদের মামলাগুলো প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকতে পারলে দুর্নীতি দমন কাজে সফল হওয়া সহজ হতো। মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি করে দুর্নীতির সুযোগ ব্যাপক করা হচ্ছে মাত্র।
বড় কোনো দুর্নীতি সম্পর্কে বিচার-বিবেচনা করতে চাইলে দুর্নীতির মূল হোতাদের ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হবে। সবাইকে একত্র করে মামলা পরিচালনা করলে গোটা মামলার পরিণতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ক্ষমতাধর কারও দুর্নীতির ব্যাপারে দুর্বলতা দেখিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম জোরদার করা যাবে না। জামিন মঞ্জুর করার ব্যাপারে কঠোর হওয়ার পরিবর্তে পুলিশ ও প্রসিকিউশনকে বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে বলাই সঠিক ও যথার্থ কাজ হবে। প্রসিকিউশন বিলম্বিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে প্রকৃত অপরাধীকে দুর্নীতির মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম ব্যর্থ করে দিতে সাহায্য করা।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

সিরিয়ায় যুদ্ধের ভেতর যুদ্ধ by মিজান মল্লিক

আল নুসরা ফ্রন্টের যোদ্ধা
সিরিয়ার সরকারবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন ফ্রি সিরিয়ান আর্মির (এফএসএ) অন্যতম শীর্ষ নেতা কামাল হামামিকে সম্প্রতি হত্যা করেছে জিহাদিরা। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে বিদ্রোহীদের অভ্যন্তরে উদারপন্থী ও আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট ইসলামপন্থীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব।
এফএসএর একজন নেতার ভাইকে অপহরণ করেছে সিরিয়ার সবচেয়ে বড় জিহাদি সংগঠন নুসরা ফ্রন্ট। সেই নেতা এখন নুসরা ফ্রন্টের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর। তিনি এখন সিরিয়ার সীমান্তের ওপারেই তুরস্কের কোথাও অবস্থান করছেন। ভাইয়ের মুক্তিপণ হিসেবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ৫০ হাজার মার্কিন ডলার গুনতে হয়েছে তাঁকে। এফএসএর এ নেতা জানেন, নুসরা ফ্রন্ট ওই টাকা দিয়ে কেবল অস্ত্র কিনবে। আর সেই অস্ত্র ব্যবহূত হবে এফএসএর বিরুদ্ধে।
এফএসএর ওই নেতা বলেন, তাঁর বাহিনীকে দুর্বল করে দিতে একজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীকে পাঠানো হয়েছিল। ওই হামলায় ১২ জন নিহত হয়। তখন এফএসএর অধিকাংশ যোদ্ধা কোসায়েরের লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকায় হামলাকারীরা সুযোগ নিয়েছিল।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিরোধ চলে আসছে। উদারপন্থী ও চরমপন্থীদের এই বিরোধ প্রায়ই রক্তাক্ত রূপ নেয়। সরকারি বাহিনীর আক্রমণে বিদ্রোহীরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লেও তাদের অভ্যন্তরীণ লড়াই থামেনি। এই লড়াইকে গৃহযুদ্ধের অভ্যন্তরে আরেকটি গৃহযুদ্ধ বলা যেতে পারে। এফএসএর জ্যেষ্ঠ নেতা কামাল হামামিকে হারানোর পর তা আরও জোরালো হয়েছে। তিনি লাতাকিয়া প্রদেশে এফএসএর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিগেড পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। বিদ্রোহীদের দাবি, হামামি এফএসএর সর্বোচ্চ সামরিক পরিষদের সদস্য ছিলেন বলেই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে। এফএসএর আরও কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিদ্রোহীদের এই অন্তর্কলহের কারণ কিছুটা স্বার্থগত ও কিছুটা আদর্শিক। এফএসএর কয়েকটি ব্রিগেডের যোদ্ধাদের ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে উভয়পক্ষই ধার্মিক। তাদের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য হলো এফএসএর ধর্মনিরপেক্ষ অংশটি ভবিষ্যতে সিরিয়াকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু জিহাদিরা দেশে ইসলামি শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী।
সরকারবিরোধী এক নারী মন্তব্য করেন, জিহাদিদের এই আধিপত্য গোটা বিপ্লবের জন্য ‘বিপর্যয়কর’। তিনি জানান, বন্দুকধারী কট্টর ইসলামপন্থী যোদ্ধারা নারীদের কঠোর পর্দাপ্রথা মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া সাংগঠনিক সভা ও কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণে বাধা দিচ্ছে তারা। ওই নারী বলেন, তাঁরা এমন যোদ্ধাদের চান না।
সিরিয়ার বিদ্রোহীদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে অনেক বিদেশি যোদ্ধা। মূলত এরাই জিহাদি। বলা হচ্ছে, এফএসএর অভ্যন্তরে যে দুর্নীতি ও অন্তর্কলহ রয়েছে তারই সুযোগ নিচ্ছে জিহাদিরা। এফএসএর লুটপাটের প্রতিবাদ করেছিলেন একজন বিদ্রোহী। এ জন্য তাঁকে দেশ থেকেই পালাতে হয়েছে।
মোট কথা, সিরিয়ায় বাশারবিরোধী গণবিক্ষোভের প্রথম দিকে যে আদর্শিক চেতনা কাজ করেছে, তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সিরীয় জনগণের অনেকে এখন মনে করছে, শুরুর সেই গণবিপ্লব কলুষিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে নতুন এক ধরনের অরাজকতা তৈরি হয়েছে। অপহরণ ও ডাকাতির মতো অপরাধের ঘটনাও সেখানে ঘটছে।
প্রেসিডেন্ট বাশারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভে সুন্নি মুসলমানদের প্রাধান্য লক্ষণীয়। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই বিদ্রোহীদের পক্ষ ছেড়ে যাচ্ছে। কারণ, সব দিক বিবেচনা করে তারা সরকারপক্ষকেই ‘মন্দের ভালো’ মনে করছে।
# মিজান মল্লিক, সূত্র: বিবিসি

হেমিংওয়ের বাড়ি by শাহাবুদ্দীন নাগরী

১৮ জুন, ২০১৩।
আমরা যখন কী-ওয়েস্টে পৌঁছুই তখন মধ্যদুপুর। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণপূর্বের সর্বশেষ প্রান্তসীমা কী-ওয়েস্ট, ফ্লোরিডা রাজ্যের মনরো কাউন্টির বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র। মায়ামি থেকে আমরা রওনা দিয়েছিলাম সকাল সাড়ে ন’টায়। প্রায় ১৬০ মাইল পথ পেরিয়ে আমাদের পৌঁছুতে সময় লেগে গেল ৪ ঘণ্টা। যাওয়ার পথের সরু যে ভূখণ্ডটি ফ্লোরিডা রাজ্য থেকে বেরিয়ে ঢুকে গেছে সমুদ্রের মধ্যে, তার একপাশে মেক্সিকো উপসাগর, অন্যপাশে আটলান্টিক মহাসাগর। কী ওয়েস্টে দাঁড়ালে কিউবা দেখা যায়, মাইলের হিসেবে ৯০ মাইল পেরুতে হবে আটলান্টিক।
কী-ওয়েস্টের বিশাল শহরটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান, অন্তত আমার কাছে, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে’র (১৮৯৯-১৯৬১) বাড়ি ও জাদুঘর। ৯০৭ হোয়াইটহেড স্ট্রিটের বাড়িটিতে হেমিংওয়ে তার জীবনের নয়টি বছর (১৯৩১-৩৯) কাটিয়েছিলেন। চমৎকার দোতলা বাড়ি, পেছনে সুন্দর একটি সুইমিংপুল। ১৮৫১ সালে নির্মিত এ বাড়িটি হেমিংওয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন ফেইফার ১৯৩০ সালের শেষদিকে চাচার কাছ থেকে উপহার পাওয়ার পর ২০ হাজার মার্কিন ডলার খরচ করে এই সুইমিংপুলটি নির্মাণ করেছিলেন, যার নীল জল এখনও পর্যটকদের চোখ আটকে রাখে। এই বাড়িতে এখনও আছে হেমিংওয়ের পোষা সেই বিড়ালগুলো, যাদের থাবায় রয়েছে পাঁচটির পরিবর্তে ছয়/সাত আঙুল। হেমিংওয়ের দ্বিতীয় পুত্র প্যাট্রিক ১৯৯৪ সালে মায়ামি হেরাল্ড-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কী-ওয়েস্টের এই বাড়িতে তার বাবা ময়ূর পুষতেন, বিড়াল পুষতেন কিউবাতে, যদিও হেমিংওয়ের চতুর্থ স্ত্রী মেরি এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে বলেছেন, বিড়ালগুলো এই বাড়িরই এবং কেউ তা বিক্রয় করেনি, বরঞ্চ বছর বছর প্রজননের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার অব্যাহত আছে।

বিংশ শতাব্দীর ইংরেজি কথাসাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী নাম আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। তার ভূমিকার জন্য পরবর্তী প্রজন্মর ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলেছিলেন মার্কিন এই লেখক ও সাংবাদিক। তার রোমাঞ্চকর জীবনধারণ এবং জনসমক্ষে প্রচারিত প্রতিচ্ছবি বিশ শতকীয় তরুণদের আগ্রহের বিষয়বস্তু হয়েছিল। তিনি তার জীবদ্দশায় মাত্র নয়টি উপন্যাস এবং ছয়টি ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়াও, অন্যান্য বিষয়ের বই ছিল মাত্র দুটি। এত অল্প লিখেও সাহিত্যে বিশাল ভূমিকা রাখার বিষয়টি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ছিল সে সময়ে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখার সময়কাল মোটামুটিভাবে ১৯২৫ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত। এ সময়ে বিচিত্র জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তার। কর্মজীবন পরিবর্তন করেছেন সময়ে সময়ে, জীবনসঙ্গীও পরিবর্তিত হয়েছে তার জীবনধারায়। তার মৃত্যুর পর তিনটি উপন্যাস, বহু ছোটগল্পের সংকলন এবং অনেক মননশীল লেখার সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, যা তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত গ্রন্থের চেয়েও অধিক। মার্কিন সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের প্রতিটি রচনাই ক্লাসিক হিসেবে খ্যাত হয়ে আছে। অনেকে বলে থাকেন, প্যারিসে বসবাসকালীন সময়ে যেসব লেখা হেমিংওয়ে লিখেছিলেন, সেসব লেখাই তাকে অধিক পরিচিতি দিয়েছে ও খ্যাতিমান করেছে।
১৯২০ সালের প্রেক্ষাপটে হেমিংওয়ে রচনা করেছিলেন ‘দি মুভেবল ফিস্ট’, তার প্যারিস জীবনের কথাকাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে উপন্যাসটি। একে উপন্যাস না বলে আত্মজৈবনিক রচনা বলাই শ্রেয়। এটি তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। ১৯৬৪ সালে, তার মৃত্যুর তিন বছর পর, যে সংস্করণটি প্রকাশিত হয় তাও পূর্ণাঙ্গ ছিল না। আড়ালে লুকোনো ছিল এর আরেকটি পাণ্ডুলিপি, যা ২০০৯ সালে প্রকাশিত হলে বিশ্বসাহিত্যে তুমুল আলোড়ন হয়। একটি ক্লাসিক রচনার পুনর্লিখন! তাও আবার হেমিংওয়ের হাতেই! ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত সংস্করণের সঙ্গে যোগ করা
হয় আরও নয়টি অনুচ্ছেদ এবং সংযুক্ত হয় নতুনভাবে লিখিত সমাপ্তি।
এক বিস্ময়কর জীবনযাপন হেমিংওয়ের। তার স্ত্রী ছিলেন চারজন, যারা তার জীবনের একেক সময়ে প্রবেশ করেছেন এলিজাবেথ রিচার্ডসন (১৯২১-২৭), পলিন ফেইফার (১৯২৭-৪০), মার্থা গেলহর্ন (১৯৪০-৪৫) এবং তার মৃত্যু পর্যন্ত মেরি ওয়েলস (১৯৬৪-৬১)। তিন সন্তান জ্যাক, প্যাট্রিক এবং গ্রেগরি- বেঁচে আছেন শুধু প্যাট্রিক, যিনি ‘দি মুভেবল ফিস্ট’-এর নবতর সংস্করণের ভূমিকা লিখেছেন। এলিজাবেথ এবং পলিন ছিলেন দুই বান্ধবী, হেমিংওয়ে এলিজাবেথকে ত্যাগ করে বিয়ে করেন স্ত্রীর বান্ধবী পলিনকে, যেই পলিন কী-ওয়েস্টে রেখে যাওয়া হেমিংওয়ের বাড়ির ক্রেতা এবং এই বাড়িতে থাকার পুরোটা সময় হেমিংওয়ের সঙ্গেই ছিলেন।
১৮৯৯ সালে ইলিনয়েসে জন্ম হয়েছিল হেমিংওয়ের, ১৯৬১ সালে নিজের শটগানের গুলিতে আÍহত্যা করেছিলেন আইদহ’তে। কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিডেল ক্যাস্ট্রো তার বন্ধু ছিলেন, তার সাংবাদিকতা জীবনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, স্পেনের গৃহযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ গভীর ছায়াপাত করেছিল, তিনি বুর্জোয়া ধনতান্ত্রিক রীতির চেয়ে পছন্দ করেছিলেন সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে। এ কারণেই জীবনের শেষদিকে এসে তিনি তার অর্থ এবং নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হয়ে পড়েছিলেন, তার ধারণা হয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই তাকে ক্রমাগত অনুসরণ করে চলেছে।
১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘দি টরেন্টস অব স্প্রিং’ এবং জীবদ্দশায় তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ (১৯৫২)। এছাড়া, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। জীবনের বিভীষিকাময় এবং অসম্ভব মানসিক বিপর্যয়ের কালে যখন তার লেখক বন্ধুরা একে একে মৃত্যুবরণ করতে থাকেন, ১৯৩৯ সালে ইয়েটস এবং ফোর্ড ম্যাডক্স ফোর্ড, ১৯৪০ সালে স্কট ফিটজিরাল্ড, ১৯৪১ সালে শেরউড অ্যান্ডারসন ও জেমস জয়েস, ১৯৪৬ সালে গ্রার্ট্রুড স্টেইন এবং ১৯৪৭ সালে দীর্ঘদিনের বন্ধু ম্যাক্স পার্কিনস, তখন হেমিংওয়ে গভীর বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এই সময়ে তার প্রচণ্ড মাথাব্যথা, উচ্চরক্তচাপ, ওজনজনিত সমস্যা দেখা দেয় এবং এর পরিণতিতে তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন।
জীবনে বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন হেমিংওয়ে। স্কুলপড়া শেষ করে তিনি কয়েক মাস ‘দি কানসাস সিটি স্টার’ পত্রিকায় রিপোর্টিংয়ের কাজ করেন এবং এরপর রেডক্রসের মনোনয়ন নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইটালি ফ্রন্টে যোগদান করেন (১৮১৮)। এখানে তিনি প্রথম আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং যুদ্ধ বাদ দিয়ে ফিরে আসেন বাড়িতে। এই দুর্ঘটনায় তিনি মিলানের রেডক্রস হাসপাতালে ছয় মাস শয্যাশায়ী ছিলেন। ১৯২৮ সালে প্যারিসে বসবাসকালীন সময়ে হেমিংওয়ে বাথরুমে ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। তিনি কমোডের চেইন ভেবে জানালা ধরে মাথার ওপর টান দিয়েছিলেন, যা ভেঙে পড়েছিল মাথার ওপর। কপালের ওপর ক্ষতটি আমৃত্যু চিহ্ন হয়েছিল তার, এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যেতেন। প্যারিস ত্যাগের সময় আর বড় শহরে বাস করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। ১৯৩৩ সালের দিকে হেমিংওয়ে সপরিবারে পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি সাফারি ভ্রমণ করেন। মোমবাসা, নাইরোবি, ম্যাকাকোস, তাঙ্গানিকা, লেক মনিয়ারা এবং তারাঙ্গির ন্যাশনাল পার্ক পরিদর্শন করেন। এ সময়ও তিনি দুর্ঘটনায় পড়েন, তার অ্যামিবা ঘটিত আমাশয় হয়, যা তার আন্ত্রিক স্থানচ্যুতি ঘটায় এবং তাকে বিমানে করে নাইরোবিতে স্থানান্তর করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই অভিজ্ঞতা তার ‘দি øোজ অব কিলিমানজারো’ গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে। এরপর হেমিংওয়ে যে দুর্ঘটনাটির শিকার হন তা ঘটে ১৯৪৫ সালে। তার গাড়িটি দুর্ঘটনায় পতিত হলে তার হাঁটু ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং কপালে মারাÍকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। ক্রমে ক্রমে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নানা বিষাদ তাকে গ্রাস করে ফেলে।
এর ভেতরেই ১৯৫১ সালে মাত্র আট সপ্তাহে তিনি লিখে ফেলেন তার ক্লাসিক উপন্যাস ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ এবং লেখা শেষ করে বন্ধুদের বলেছিলেন, সারাজীবনে এটিই আমার শ্রেষ্ঠতম লেখা। এই গ্রন্থটির জন্য তিনি ১৯৫২ সালে লাভ করেন পুলিৎজার পুরস্কার। বইটি মাসের পর মাস সেরা গ্রন্থের তালিকায় শ্রেষ্ঠ স্থান দখল করে রেখেছিল। ১৯৫৪ সালে পরপর দুটি বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন হেমিংওয়ে, প্রথমটিতে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান তিনি, দ্বিতীয়টিতে তার মগজ থেকে তরল পদার্থ নির্গত হতে থাকে। এ দুটি দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে উড়োখবর প্রচারিত হলেও শেষপর্যন্ত বেঁচে যান তিনি। পরবর্তীতে শারীরিক নানা সমস্যায় জড়িয়ে গেলে মদ্যপান বাড়িয়ে দেন, যা তাকে ক্রমে ক্রমে মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যায়। এসবের মধ্যেই ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে হেমিংওয়ে লাভ করেন নোবেল পুরস্কার। শারীরিক দুরবস্থা এবং বিমানভ্রমণ আতংকে তিনি স্টকহোমে তার নোবেল পুরস্কার সশরীরে উপস্থিত থেকে গ্রহণ করতে পারেননি। এটাও হেমিংওয়ের জীবনে একটা ট্র্যাজেডি হিসেবেই থাকবে।
হেমিংওয়ের সব লেখালেখির মূল চালিকাশক্তি ছিল প্রেম, যুদ্ধ, বন্যতা এবং হারানো। একদা মার্কিন সাহিত্য এসবের ওপর ভর দিয়ে অনেকটা চলেছিল, কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে, কিন্তু যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া রোমান্টিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে’র ভেতর সবকিছু যেন একসঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়ায়। হয়তো এ কারণেই মার্কিন সাহিত্যের এই ধারাটির প্রতি পরবর্তী প্রজন্মর আগ্রহ বেড়ে যায়, সমসাময়িক সাহিত্যিকরা থমকে দাঁড়ায় এই বিষয় এবং ভাষার ক্ষিপ্রতা দেখে। হেমিংওয়ের ভাষায় ছিল নতুনত্ব, তার সাহিত্য ও ব্যক্তিগত রচনায় তিনি ‘কমা’র পরিবর্তে ‘অ্যান্ড’ শব্দটি ব্যবহার করতেন, এতে পরবর্তী বাক্যটির অনিবার্যতা নিশ্চিত হয়ে যেত। চরিত্রের ইমেজ তৈরিতে তিনি গ্রহণ করেছিলেন নিজস্ব রীতি। একটি ‘রিয়াল থিং’ সৃষ্টিতে তিনি অনেক চরিত্রের কোলাজ আঁকতেন তার ভাষা দিয়ে, যা ক্রমে পৌঁছে যেত তার গন্তব্যে। এজরা পাউন্ড (১৮৮৫-১৯৭২), টিএস এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫), জেমস জয়েস (১৮৮২-১৯৪১) প্রমুখের রচনায় এই ইমেজের একটা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত চরিত্র খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি, তার গবেষকদের মতে, যে কোনো বই অন্তত দু’বার পড়তেন হেমিংওয়ে, খুঁজতেন সেসব বইয়ের ভেতর লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যের লালিমা।
খুব যতœ করে সাজানো হেমিংওয়ের কী-ওয়েস্টের বাড়িটি। কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই নিচতলার ডান দিকে তার লিভিং রুম, বাম দিকে ডাইনিং রুম। হেমিংওয়ে যখন ১৯৩১ সালে এই বাড়িটিতে ওঠেন তখন এটির অবস্থা ছিল ভঙ্গুর। দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন প্রথমেই প্রতিটি ঘরের ছাদ থেকে ফ্যানগুলো অপসারণ করেন এবং সেখানে মোমদানি স্থাপন করেন। লিভিং রুমের ভেতর ক্রিস্টালের দু’টো বিড়ালের মূর্তি ছিল, হেমিংওয়ে বিড়াল খুব পছন্দ করতেন বলে পলিন ওই দু’টো বিড়াল হেমিংওয়েকে উপহার দেন তার জন্মদিনে। বিড়াল ছিল হেমিংওয়ের প্রিয় প্রাণী, ৩০ বছরে সেখানে ৬০টি বিড়াল বড় হয়ে ওঠে। এখনও বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় বিড়ালগুলোকে। দোতলায় শোবার ঘরে শাদা ধবধবে বিছানায়, যে বিছানায় হেমিংওয়ে ঘুমোতেন, আমরা দেখলাম একটি বিড়াল শুয়ে আছে। তার লেখার টেবিলে শুয়ে আছে আরেকটি বিড়াল। এই ছয়-সাত আঙুলের বিড়ালগুলো এখনও বংশবিস্তার করে চলেছে এবং কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা ঝুলছে দেয়ালে, বিড়ালগুলোকে বিরক্ত না করার জন্য। তার চেয়ার-টেবিল-বেঞ্চি পলিশ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং প্রতিটি আইটেমের ওপর ট্যাগ বসানো আছে তাতে না বসার জন্য।
ডাইনিং রুমের দেয়ালে অনেক ছবি দেখা গেল। এগুলো সবই হেমিংওয়ের জীবনের ছবি। ওক-পার্কে তোলা তার ছোটবেলার ছবি থেকে শুরু করে জীবনের বিভিন্ন সময়ের ছবি দেয়ালে আটকানো। তার প্রথম স্ত্রী এলিজাবেথ রিচার্ডসনের ছবি উপরে বাঁ দিকে, তার ডান দিকে দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন ফেইফারের ফটোফ্রেম এবং সর্বডানে তাদের দুই পুত্র গ্রেগরি এবং প্যাট্রিকের ছবি। নিচে বাঁ দিকে তার তৃতীয় স্ত্রী মার্থা গেলহর্নের ছবি, আর তার ডানেই চতুর্থ স্ত্রী মেরি ওয়েলস’-এর ছবি। এই ঘরটির সঙ্গেই সংযুক্ত তাদের রান্নাঘর, যেটির নাম ছিল ‘দ্য কুকহাউস’। মাছ কাটাকুটার পর হেমিংওয়ে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে এর বর্জ্য অংশগুলো ছুঁড়ে ফেলতেন খোলা জায়গায় তার পোষা বিড়ালগুলোর জন্য। লিভিং রুমে এখন সাজানো আছে হেমিংওয়েকে নিয়ে লেখা বই, তার ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ চলচ্চিত্রের বিশালাকার পোস্টারসহ নানা জিনিসপত্র, যা ধারণ করে আছে এই মহৎ কথাশিল্পীকে।
বাড়ির পেছন দিকটায় গড়ে তোলা হয়েছে একটি স্যুভেনির শপ। এখানে হেমিংওয়েকে নিয়ে তৈরি টি-শার্ট, মগ, চাবির রিং, বাড়ির রেপ্লিকা থেকে শুরু করে তার রচিত বইগুলোর কপি পাওয়া যায়। এই বাড়িটি এখন প্রধানত জাদুঘর, যদিও কোথাও সেটি লেখা নেই, যেমন লেখা নেই শিলাইদহ বা পতিসরে আমাদের রবীন্দ্রনাথের বাড়িগুলোতে। প্রধান গেটে যে সাইনবোর্ডটি দেখলাম তাতেও লেখা ‘আর্নেস্ট হেমিংওয়ে হোম’। ১৩ ডলারের টিকিট কেটে ঢুকতে হয় এই বাড়িটিতে। মিজ জ্যাকি স্যান্ডস এই হোমের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমি ঢাকা থেকে অনুবাদক-কথাসাহিত্যিক ফখরুজ্জামান চৌধুরীর ‘দূরাগত ধ্বনি’ (সূচিপত্র, ২০১০) বইটির একটি কপি নিয়ে গিয়েছিলাম, যে বইয়ের একটি অংশে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে সম্পর্কে একটি ছোট নিবন্ধ আছে। আমি বইটি হেমিংওয়ে হোমকে উপহার দেয়ার জন্য মিজ জ্যাকি স্যান্ড্স’-এর হাতে তুলে দিই। তিনি পরম আগ্রহভরে বইটি নিয়ে জানান, এটি যত্নসহকারে এখানে প্রদর্শন করা হবে (বই হস্তান্তরের ছবিটিসহ)। আমার বন্ধুর ক্যামেরায় তখন আমি বন্দি হয়ে চলেছি। বাড়িটি ঘুরে দেখে যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম তখন এক অদ্ভূত অনুভূতি মনের ভেতর দোলা দিতে শুরু করল। মাথার ওপর সূর্যটা জানান দিয়ে গেল এটা কী-ওয়েস্ট, এখানেই হেমিংওয়ের বাড়ি। আটলান্টিকের ওপর দিয়ে উড়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাসের স্পর্শে আমি কিছুক্ষণের জন্য বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম হোয়াইটহেড স্ট্রিটের ওপর। আর কখনও কি আসা হবে এই বাড়িটিতে?
e-mail: snagari55@gmail.com