Wednesday, September 14, 2011

সৃষ্টিশীল এক মানুষের নীরব প্রস্থান

আগস্ট এলেই বুকটা কেঁপে ওঠে। কাকে কখন ছিনিয়ে নেবে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। নেয় এমন সব ব্যক্তিত্বকে, যাঁরা আমাদের দেখান আলোর পথ। তেমনি একজন ব্যক্তিত্ব চলচ্চিত্রকার আখতারুজ্জামান। ২৩ আগস্ট অনেকটা নীরবে, নিভৃতে চলে গেলেন সৃষ্টির নেশায় মশগুল থাকা এই মানুষটি। তেমন আলোচিত নন, তবে আলোকিত একজন মানুষ। আত্মমগ্ন ও অভিমানী এই মানুষটি কখনোই প্রচারের আলোয় থাকেননি। কত কত জনকে পৌঁছে দিয়েছেন খ্যাতির সিংহাসনে, আর দূর থেকে তা দেখে মিটিমিটি হেসেছেন। নিজে কখনো সিংহাসনে বসতে চাননি। আত্মমর্যাদাশীল এই মানুষটি অনেক সুযোগ থাকার পরও কখনোই কারও কাছে করুণা চাননি। যতটুকু করেছেন, সবটাই নিজের যোগ্যতা আর সামর্থ্য দিয়ে। যতটা করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি করার স্বপ্ন নিয়ে ছটফট করতেন। সেটা করতে না পারার অসহায়তা তাঁকে অস্থির করে রাখত।
বাংলার বাণী ভবন থেকে প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক সিনেমা। চলচ্চিত্রবিষয়ক এই পত্রিকা নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮৫ সালে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হয়ে আসেন আখতারুজ্জামান। সাপ্তাহিক চিত্রালীর সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তখন তাঁর বেশ সুখ্যাতি। তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় সিনেমা পত্রিকার নবযাত্রা। সেই নবযাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফাল্গুনী হামিদ, শামীম আলম দীপেন, শাহনেওয়াজ করিম, মুজতবা সৌদ, গুলজার, খান আখতার হোসেন, অশোক দত্ত, মৃদুল সাহা।
১৯৮৭ সালে কর্মরত ছিলাম দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায়। এরশাদ সরকার রাজনৈতিক কারণে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। আমরা সবাই হঠা ৎ বেকার হয়ে যাই। বাংলার বাণীতে কর্মরত আমরা কেউ কেউ সিনেমা পত্রিকাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। সে সময় তাঁকে কাছ থেকে দেখার ও জানার কিছুটা সুযোগ হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি যখন বাংলার বাণী পত্রিকায় যোগ দেন, তখন তাঁকে পাই আরও কাছে। একটু একটু করে চিনতে পারি আত্মকেন্দ্রিক ও লাজুক স্বভাবের এই মানুষটিকে। একজন উদ্যমী, সৃষ্টিশীল, মেধাবী ও প্রাণোচ্ছল মানুষ বলতে যেমনটি বোঝায়, তিনি ছিলেন তেমনই। সব সময় বিভোর থাকতেন সৃষ্টির আনন্দে। পত্রিকার মেকআপ, গেটআপ বর্ণিল করার ব্যাপারে তাঁর জুড়ি মেলা ছিল ভার। চলচ্চিত্র সাংবাদিক হয়েও চটকদার কোনো কিছুতেই বিশ্বাসী ছিলেন না। গসিপ দিয়ে পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। ছিলেন না বলেই চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবাই তাঁকে সমীহ করতেন, আপন ভাবতেন।
১৯৪৬ সালের ১০ ডিসেম্বর নরসিংদীতে আখতারুজ্জামানের জন্ম। সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে সাংবাদিকতা করেছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। তবে চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর একটা ভালোবাসার টান। এ কারণেই চলচ্চিত্রের অন্যতম পুরোনো পত্রিকা চিত্রাকাশ দিয়ে তাঁর হাতেখড়ি হয় ১৯৬৬ সালে। এরপর কাজ করেছেন পিপল, নেশন, দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক চিত্রালী, সাপ্তাহিক সিনেমা, দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক মুক্তকণ্ঠ, দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায়। তবে চলচ্চিত্র সাংবাদিক হিসেবেই তাঁর পরিচিতি। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) সাধারণ সম্পাদক হন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি নতুন কিছু করার আশায় নির্মাণ করেছেন সিনেমা। ১৯৮৩ সালে বন্ধু সাংবাদিক রফিকুজ্জামানকে নিয়ে যৌথভাবে নির্মাণ করেন ফেরারী বসন্ত। ছবিটি শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ বাচসাসের ছয়টি পুরস্কার পায়। পরের বছর এককভাবে পরিচালনা করেন প্রিন্সেস টিনা খান। এটি শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ বাচসাসের আটটি পুরস্কার লাভ করে। এরপর নির্মাণ করেন লেখক মঞ্জু সরকারের উপন্যাস নগ্ন আগন্তুক অবলম্বনে একাই এক শ। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ছবিটি আজও মুক্তির আলো দেখতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে নির্মাণ করেন তাঁর জীবনের সেরা ছবি সেলিনা হোসেনের কাহিনি অবলম্বনে পোকামাকড়ের ঘরবসতি। সরকারি অনুদানে নির্মিত হয় ছবিটি। পোকামাকড়ের ঘরবসতি সেরা ছবি হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। এ ছাড়া সেরা পরিচালক, সেরা কাহিনি ও সেরা চিত্রগ্রাহক বিভাগেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় ছবিটি। একই সঙ্গে পায় বাচসাসের ১০টি পুরস্কার।
পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও একদমই চুপচাপ বসে থাকেননি। বেশ কয়েকটি নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মাণ করেছেন। জড়িয়েছেন শিক্ষকতার সঙ্গে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ও কল্পনা চারিত করেছেন তরুণ প্রজন্মের হূদয়ে। চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে দূরে থাকলেও তিনি কখনো থেমে থাকেননি। ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে প্রস্তুতি। দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতির পর সরকারি অনুদান নিয়ে শুরু করেছিলেন সূচনা রেখার দিকে। ছবিটির ৯০ শতাংশ কাজ শেষ করেছিলেন। অসুস্থতার কারণে বাকিটা করতে পারেননি। ছবিটাই শুধু অসম্পূর্ণ রয়ে গেল না, সেই সঙ্গে অসম্পূর্ণ থাকল তাঁর অনেক স্বপ্ন। আমরা হারালাম একজন স্বাপ্নিক ও সৃজনশীল মানুষকে।
দুলাল মাহমুদ
dulalmahmud@yahoo.com

সমালোচকেরা কি আওয়ামী লীগের শত্রু? by বিশ্বজি ৎ চৌধুরী

আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদেরের নির্ভয় উচ্চারণ শুনে বিস্মিত হয়েছি। নিজের নির্বাচনী এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেছেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যদি লস্কর-ই-তাইয়েবার সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার একসঙ্গে বসতে অসুবিধা কোথায়?’ প্রশ্নটা খুবই সাধারণ এবং যুক্তিটাও অকাট্য। কিন্তু বিস্মিত হওয়ার কারণ, এসব সাধারণ ও যুক্তিসংগত কথা বলার পরিণাম সম্পর্কে অতীতের অভিজ্ঞতা ও উদাহরণ থেকে যে শিক্ষা সরকার ও বিরোধী দলের রাজনীতিকেরা পেয়েছেন, তাতে সাহস হারানোটা স্বাভাবিক—ওই পথ পুনর্বার না মাড়ানোরই কথা। মনে পড়ে, দুই নেত্রীর একসঙ্গে বসা ও আলোচনার গুরুত্বের কথা বলে দলে কী রকম বেকায়দায় পড়েছিলেন বিএনপি নেতা নাজমুল হুদা। সরকারি দলের শীর্ষ ব্যক্তিরাও এ ধরনের কথা পছন্দ করবেন বলে মনে হয় না।
আমাদের বড় দুটি দলের শীর্ষ ব্যক্তিরা এই একটি কাজ (একসঙ্গে বসা ও আলোচনা করা) সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করেন। এ কথা ঠিক, পরস্পরকে অপছন্দ করার এক শ একটা কারণ হয়তো আছে। পরস্পরের বিরুদ্ধে সন্দেহ-অবিশ্বাসের শিকড়টাও অনেক গভীরে। সম্প্রতি ২১ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের সংশ্লিষ্টতার নানা তথ্য যেভাবে বেরিয়ে আসছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তো মনে হতেই পারে, তাঁদের সঙ্গে সমঝোতা করা মানে দলের নেতা-কর্মী হত্যাকারী, এমনকি তাঁর নিজের হত্যা-চক্রান্তকারীর সঙ্গেই হাত মেলানো। তবু ওবায়দুল কাদের বা নাজমুল হুদারা ঝুঁকি নিয়ে কদাচি ৎ দুই নেত্রীর বৈঠকের গুরুত্বের কথা বলে ফেলেন; আমরাও ঐক্যের কথা বলি। বলি, কেননা ঘটনাচক্রে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া শুধু ব্যক্তিবিশেষ নন, তাঁরা এমন দুটি দলের প্রধান, যে দল দুটির হাতে দীর্ঘকাল পালাক্রমে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে আসছে এ দেশের মানুষ। তবে বিভিন্ন জেলায় একই সঙ্গে সিরিজ বোমা হামলা, যশোরের সিনেমা হলে বা ঢাকায় রমনার বটমূলে হামলা, সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর বা গোপালগঞ্জে শেখ হাসিনার ওপর হামলাসহ অন্য যেসব চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র, ঘটনা-দুর্ঘটনা এ দেশে ঘটেছে, তার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও আইনি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হোক, তা আমরা চাই না। কিন্তু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় সরকার ও বিরোধী দলের ন্যূনতম সমঝোতা কি হতে পারে না? যেমন—তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ইস্যু বা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর, ট্রানজিট ও অন্যান্য চুক্তির বিষয়েও তো এ আলোচনার সূত্রপাত ঘটতে পারত। এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে সরকারেরই উচিত এক পা বাড়িয়ে রাখা।
উদারতা দিয়ে জয় করা বা জয় করে উদারতার ইতিহাস কি বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল? জীবনের সেরা ২৭টি বছর কারাভোগ করে, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে নেলসন ম্যান্ডেলা কি এ মহত্ত্বের জোরেই বিরোধীদের জয় করেননি, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেননি? জানি, এ উপমহাদেশে এ রকম উদাহরণ খুব একটা নেই। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সফরের সময় শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা সরকার ও বিরোধী দলের এ বৈরিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাঁর দেশের উদাহরণ তুলে ধরেছেন এবং দেশের অগ্রগতির পথে একে বড় বাধা বলে উল্লেখ করেছেন। এ বাধা অতিক্রম করা কি একেবারেই অসম্ভব? শুরুতেই শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক না হোক, অন্তত বরফ গলানোর কিছু ছোটখাটো প্রক্রিয়া তো শুরু হতে পারে। আমাদের ধারণা, পরস্পরকে সহ্য করার, পরস্পরের বক্তব্য আমলে নেওয়ার উদ্যোগের মধ্য দিয়েই ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের রাজনীতির পথ রুদ্ধ হতে পারে।

২.
সমালোচনা ও জনদাবিকে আমলে নেওয়ার মানেই নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া—এ রকমই কি ভাবছে সরকার? না হলে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে খোদ দলীয় সাংসদ ও মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত দলের সাংসদেরা যখন কয়েকজন মন্ত্রীর সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠলেন, প্রধানমন্ত্রী তা সহজভাবে নিলেন না কেন? কেন উল্টো উপদেশ দিলেন যে, শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দেবেন না। কারা শত্রু? বিরোধী দল? নাগরিক সমাজ বা গণমাধ্যম? একজন বা দুজন মন্ত্রীর ব্যর্থতাকে গায়ে পড়ে পুরো সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে কেন নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রিসভায় রদবদল বা পুনর্বিন্যাস তো খুব স্বাভাবিক ঘটনা। প্রয়োজনে এ সাধারণ নিয়মের চর্চা করলে সরকারের ভাবমূর্তি বাড়ত বলেই তো মনে হয়। এতে বিরোধী দল বা নাগরিক সমাজের ক্ষোভ প্রশমিত হতো, জনগণও সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারত। এর উদাহরণ তো সম্প্রতি আমরা প্রতিবেশী ভারতেই দেখেছি।
লোকপাল বিল নিয়ে সমাজকর্মী (অনেকে বলেন, উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল আরএসএসের গোপন সমর্থক) আন্না হাজারের অনশন নিয়ে ভারত সরকার শুরুতে ছিল কঠোর অবস্থানে। তাঁকে আটক করা ও অনশন করতে না দেওয়ার ঘটনায় যখন জনগণের ক্ষোভ তৈরি হলো এবং বিরাট জনসমর্থন পেলেন আন্না, তখন সরকার পিছিয়ে এল তার অবস্থান থেকে। আন্নার সঙ্গে সমঝোতা করে আপাতত পরিস্থিতির আরও অবনতিকে ঠেকানো হলো। এরই নাম সম্ভবত দূরদর্শিতা। শুধু এ ঘটনা কেন, যেখানেই প্রতিবাদ, যেখানেই জনরোষ, সেখানেই সরকার সক্রিয় হয়েছে, জনমতকে সম্মান জানিয়েছে। যেসব মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদেরই সরিয়ে দিয়েছেন মনমোহন সিং। দুর্নীতির অভিযোগে জেলে আছেন অন্তত চারজন মন্ত্রী। এর ফলে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সততা ও সদিচ্ছা নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই জনমনে, এর সুফল তাঁর দল ও সরকারের ঘরেও গেল অনেকটা।
আমাদের দেশে এ রকম উদাহরণ সৃষ্টি করা কি অসম্ভব? কোনো ক্ষেত্রেই সরকারের সাফল্য নেই, এ কথা তো বলছেন না কেউ। মতিয়া চৌধুরী, নুরুল ইসলাম নাহিদ বা ইয়াফেস ওসমানের মতো মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যকে নিয়ে তো কথা উঠছে না। তাহলে সৈয়দ আবুল হোসেন, ফারুক খান বা শাজাহান খানদের ব্যর্থতার দায় কেন বহন করতে হবে সরকারকে?

৩.
একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ একবার সখেদে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ শুধু সমর্থন চায়, কারও পরামর্শ চায় না। এটা কত নির্মম উপলব্ধি, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। আজ যাঁরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলছেন, কোনো মন্ত্রীর অযোগ্যতার সমালোচনা করছেন, তাঁদের অনেকের গায়েই ‘আওয়ামী বুদ্ধিজীবী’র তকমা লেগে আছে। অনেকে, এমনকি নিজেই আওয়ামী লীগের সমর্থক স্বীকার করে নিয়ে ‘আওয়ামী লীগ ডুবলে আমরাও ডুবব’ কিংবা ‘আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে কি ভুল করেছি?’ শিরোনামে কলামও লিখেছেন। কিন্তু শুভানুধ্যায়ীদের এসব কথা কর্ণগোচর হচ্ছে না সরকারের নীতিনির্ধারকদের। সমালোচনা মানেই শত্রুতা, এ ধারণায় অটল তাঁরা।
সম্প্রতি যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগের দাবিতে ‘ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবী-জনতা’র ব্যানারে যাঁরা একত্র হয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়ায় ঈদের দিন শহীদ মিনারে সমাবেশ করেছেন, তাঁদের অনেকেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নানাভাবে নিগৃহীত হয়েছিলেন। কারণ, জোট সরকারের দুঃশাসন, যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দান, জঙ্গি ত ৎ পরতায় তাঁদের সংশ্লিষ্টতাসহ নানা অভিযোগ তুলে সোচ্চার ছিলেন তাঁরা। আজ আবার বিবেকের তাড়নায় প্রতিবাদী ভূমিকা নিয়েছেন বলে তাঁরা আওয়ামী লীগের শত্রু?
নিজেদের মিত্র বাড়াতে নামসর্বস্ব দলগুলোর সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। অথচ প্রকৃত মিত্রদের দূরে ঠেলছে শুধু তাঁরা সরকারের ভুলত্রুটিগুলোর দিকে আঙুল তুলছেন বলে। ‘লেস দ্যান অনেস্ট’ এক বা একাধিক মন্ত্রীকে রক্ষার জন্য ক্রমে যে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে সরকার, এ উপলব্ধি তাদের কবে হবে বা আদৌ হবে কি না জানি না।
বিশ্বজি ৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwa_chy@yahoo.com

মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ ও জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের পরামর্শ

পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
ঢাকায় সফররত সংস্থাটির প্রতিনিধিদলের প্রধান এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপ্রধান ডেভিড কাউয়েন বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যু ৎ -ঘাটতি কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বিদ্যু ৎ উ ৎ পাদন বাড়ার সঙ্গে জ্বালানি তেলের চাহিদাও বাড়বে। ফলে, ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে গিয়ে বাজেট-ঘাটতি বাড়াবে। আর এ ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণনির্ভরশীলতা বাড়লে শেষ পর্যন্ত তা মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) মাসিক মধ্যাহ্নভোজের সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে কাউয়েন গতকাল মঙ্গলবার এসব কথা বলেন। তিনি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি আরও বাড়বে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন অ্যামচেমের সভাপতি আফতাব-উল ইসলাম। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির ভাইস চেয়ারম্যান খালিদ হাসান ও নির্বাহী পরিচালক এম এ গফুর। এ ছাড়া দর্শকসারিতে দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
ডেভিড কাউয়েন বলেন, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতিও ঊর্ধ্বমুখী। এতে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। তবে মুদ্রানীতি সংকুলানমূলকই রয়েছে। যদিও ২০১১ সালের এপ্রিলের উচ্চ ঋণপ্রবৃদ্ধি থেকে ঋণের প্রবাহ এখন অনেকটাই কমেছে।
তিনি বলেন, গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ মোট দেশজ উ ৎ পাদনের ১০ শতাংশ অতিক্রম করেছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের উন্নতি লক্ষ করা গেলেও খরচের পরিমাণ এখনো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।
ডেভিড কাউয়েন বলেন, অগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোর প্রত্যাশার চেয়ে প্রবৃৃদ্ধি কম হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প খাতের রপ্তানিসহ প্রবাসী-আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সর্বোপরি এটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি মনে করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি অভ্যন্তরীণ ক্রয়ক্ষমতা কমানোর পাশাপাশি বাহ্যিকভাবে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমাবে। তবে তৈরি পোশাকের বাজারের বিস্তৃতি প্রত্যাশার চেয়ে জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত পণ্যমূল্য দেশের প্রবৃদ্ধি, চলতি হিসাব ও মূল্যস্ফীতির জন্য কিছুটা স্বস্তি হয়ে দেখা দিতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
কাউয়েন বলেন, কর বৃদ্ধি, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাত সংস্কার বেসরকারি খাতে গতি সঞ্চার করবে, যা উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সহায়ক হবে।
সবশেষে আইএমএফ প্রতিনিধি বলেন, আগামী দিনে আন্তর্জাতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হবে এশিয়া। বাংলাদেশ এ অঞ্চলের সবচেয়ে গতিশীল জায়গায় অবস্থান করায় এর ছোঁয়া এখানেও লাগবে। তিনি আরও বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি ঘটাতে পারলে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগসহ সব ধরনের বিনিয়োগ বাড়বে।
আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের কারণে ব্যাংকের তারল্য ঘাটতি ও পুঁজিবাজারে দরপতন হচ্ছে—একজন ব্যবসায়ীর এমন প্রশ্নের জবাবে কাউয়েন বলেন, শক্তিশালী পুঁজিবাজার নিশ্চিত হোক, এটা তাঁরা চান।

ব্যাংক খাত মূলধন পর্যাপ্ততার দিক থেকে শক্ত অবস্থানে

কয়েকটি বাদে দেশের ব্যাংক খাত মূলধন সংরক্ষণ হারের (সিএআর) দিক থেকে শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে। ২০১১ সালের জুনভিত্তিক হিসাবে বেসরকারি খাতের কেবল দুটি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হারে ঘাটতির তথ্য মেলে। এর একটি হলো প্রিমিয়ার ব্যাংক অপরটি আইসিবি ইসলামী ব্যাংক।
এর বাইরে অবশ্য বিশেষ আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত কমার্স ব্যাংকে কিছু মূলধন ঘাটতি এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী, বিশেষায়িত কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণে ঘাটতি রয়েছে।
ব্যাসেল কমিটির সুপারিশ অনুসারে ব্যাসেল-২-এর আওতায় বাংলাদেশে জুন পর্যন্ত মূলধন পর্যাপ্ততার হার ধরা হয়েছিল নয় শতাংশ। জুলাই মাস থেকে এ হার ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে থেকে (সাবসিডিয়ারিসহ বা ‘সলো’) হিসাব করে দেখেছে, জুনভিত্তিতে দেশের সিংহভাগ ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এমনকি জুনভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, দেশের ৪৭টি ব্যাংকের মধ্যে ৩১টি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ১০ শতাংশের বেশি রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার হার সবচেয়ে বেশি। বিদেশি ব্যাংকগুলোর এই হারের গড় হয়েছে ১৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংকের হার হয়েছে ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর এই হার ঋণাত্মক (-) ৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। তবে রাষ্ট্র খাতের বিডিবিএলের মূলধন পর্যাপ্ততার হার বিদেশি ব্যাংকগুলোর পর্যায়ে রয়েছে, যা ৩১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে রাষ্ট্র খাতের অগ্রণী ব্যাংকে জুনভিত্তিতে মূলধন পর্যাপ্ততার হারের শর্ত নয় শতাংশের মধ্যে ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ রয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকে এই হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের এই হার ঋণাত্মক এবং তা (-) ৩৭ দশমিক ২০ শতাংশ। আর কমার্স ব্যাংকের কিছু মূলধন ঘাটতি থাকলেও আরও কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকায় তাদের সার্বিক মূলধন পর্যাপ্ততার বেশিই দাঁড়িয়েছে। বিশেষায়িত কৃষি ব্যাংকে মূলধন পর্যাপ্ততায় বড় ঘাটতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকটিতে ঘাটতি পর্যাপ্ততার হার দাঁড়িয়েছে (-) ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার জুন ভিত্তিতে ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
তিন ধরনের মূলধনকে পর্যাপ্ততার হিসাবের মধ্যে নেওয়া হয়। এর মধ্যে যেমন আছে ঋণ দেওয়ার পর সেই ঋণ আদায়ের বিভিন্ন ঝুঁকি, বাজার ঝুঁকি, ব্যবস্থাপনা বা কার্যক্রমজনিত ঝুঁকি। আবার আছে পরিশোধিত মূলধন, বিধিবদ্ধ সংরক্ষণ, রিটেন আর্নিং, ঋণের প্রভিশনিং বা সঞ্চিতিসহ আরও অন্যান্য মূলধন। সব বিবেচনা করে এই মূলধন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারকে মূলধন জোগান দিতে হবে। অন্যদিকে বেসরকারি প্রিমিয়ার ব্যাংকের সামান্য ঘাটতি আছে, এটা মেটানো যাবে। তবে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে আইসিবি ইসলামী ব্যাংক। তাদের মালিক পক্ষ বলছে, ব্যাংকটি বিক্রির বিষয়ে তাদের সঙ্গে দেশের একটি বড় ব্যবসায়িক গ্রুপের প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু, অপর এক পক্ষ মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা করে রাখায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।

পাকিস্তানে স্কুলবাসে গুলিতে নিহত ৫

পাকিস্তানের পেশওয়ারে গতকাল মঙ্গলবার একটি স্কুলবাস লক্ষ্য করে বন্দুকধারীদের গুলিতে চার শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছে। এদিকে সোয়াত উপত্যকার মেইদান শহরে বোমা হামলায় পাকিস্তানের স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা প্রাণ হারিয়েছেন।
ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ইজাজ খান জানিয়েছেন, পেশওয়ারের মাতানি এলাকায় একটি রকেট নিক্ষেপের পাশাপাশি বন্দুকধারীরা একটি স্কুলভ্যানে গুলিবর্ষণ করে। এতে চারজন শিশু ও গাড়ির চালক নিহত হন। নিহত ছাত্রদের বয়স নয় থেকে ১৪-এর মধ্যে। হামলার কারণ তা ৎ ক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে ওই শিশুরা সবাই ইংরেজি-মাধ্যম বিদ্যালয়ের ছাত্র। কট্টরপন্থী মুসলিম জঙ্গিরা এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার ঘোরবিরোধী। তা ছাড়া মাতানি এলাকাটি পাকিস্তানে আল-কায়েদার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
এদিকে দির অঞ্চলের পুলিশ-প্রধান সালেম মারওয়াত জানিয়েছেন, ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির (এএনপি) আঞ্চলিক প্রধান শের খানের গাড়ি লক্ষ্য করে গতকাল বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই শের খান নিহত হন। এ হামলার দায়িত্বও তা ৎ ক্ষণিকভাবে কেউ শিকার করেনি। তবে ইসলামি জঙ্গিরা এএনপির নেতাদের লক্ষ্য করে প্রায়ই এ ধরনের হামলা চালিয়ে থাকে।

ইরাকে বন্দুকধারীরা ২২ বাসযাত্রীকে গুলি করে হত্যা করেছে

ইরাকের আনবার প্রদেশে গত সোমবার বন্দুকধারীরা সিরিয়া থেকে বাসে করে আসা ২২ জন যাত্রীকে গুলি করে হত্যা করেছে। গতকাল মঙ্গলবার পুলিশের একজন কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, সোমবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে নয়টার দিকে রাজধানী বাগদাদের ৩০০ কিলোমিটার পশ্চিমে সেনাবাহিনী-নিয়ন্ত্রিত একটি এলাকায় ওই ঘটনা ঘটে। প্রথমে কয়েকজন সশস্ত্র লোক যাত্রীবাহী ওই বাস থামায়। এরপর বাস থেকে ২২ যাত্রীকে নামিয়ে তারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তিনি আরও বলেন, নিহত ব্যক্তিদের সবাই পুরুষ।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর সুন্নি-অধ্যুষিত আনবার প্রদেশ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়। এই সংগঠনের সদস্যরা বহু ইরাকি এবং সিরিয়া ও জর্ডানে ঘুরতে যাওয়ার পথে বিদেশি পর্যটকদের হত্যা করেছে।
এদিকে গত সোমবার ভোরে বাকুবায় পৃথক একটি ঘটনায় আল-কায়েদার প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন এক সুন্নি ইমামকে বন্দুকধারীরা গুলি করে হত্যা করেছে।

কায়ানির কর্মকর্তা শাহজাদকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন

পাকিস্তানের অনুসন্ধানী সাংবাদিক সালিম শাহজাদকে হত্যার নির্দেশ এসেছিল দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছ থেকে। শাহজাদের হত্যার বিষয়ে দ্য নিউ ইয়র্কার সাময়িকীর একটি প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুসারে, নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, শাহজাদকে হত্যার নির্দেশ কায়ানির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছ থেকে এসেছিল।’ এতে আরও বলা হয়, ‘ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, তিনি কায়ানির পক্ষে ওই নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের মেহরান নৌঘাঁটিতে গত ২২ মে জঙ্গিরা হামলা চালায়। হামলায় সমুদ্র পর্যবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি দুটি হেলিকপ্টার ধ্বংস হয় এবং ১০ জন নিহত হন।
তবে দ্য নিউ ইয়র্কার সাময়িকীর প্রতিবেদনে বলা হয়, শাহজাদের প্রতিবেদনটি ছিল ‘উসকানিমূলক’। শাহজাদ তাঁর প্রতিবেদনে লিখেছেন, ওই ঘাঁটির নাবিকেরা শুধু হামলাকারীদের সহায়তাই করেননি; বরং নৌবাহিনীর নেতৃত্ব আল-কায়েদার সঙ্গে সরাসরি দরকষাকষিও করেছিলেন। ওই প্রতিবেদন লেখার পরপরই শাহজাদ নিখোঁজ হন। এ সময় এশিয়া টাইমস অনলাইনের জন্য কাজ করছিলেন তিনি।

২০১২ সালের গ্রীষ্মের মধ্যে নতুন জ্বালানি নীতি

২০১২ সালের ‘গ্রীষ্মের মধ্যে’ নতুন জ্বালানিনীতি তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিকো নোদা। গতকাল মঙ্গলবার পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে তিনি এ প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রধানমন্ত্রী নোদা বলেন, জাপানের উচিত বিশ্বকে জ্বালানি সাশ্রয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের একটি অগ্রবর্তী নমুনা উপস্থাপনের সুযোগ গ্রহণ করা।
পার্লামেন্টে দেওয়া সাধারণ নীতিনির্ধারণী ভাষণে নোদা বলেন, ‘মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে যত বেশি সম্ভব পরমাণু জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্য থাকা উচিত আমাদের।’
যদিও ভবিষ্যতে পরমাণু জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টি উড়িয়ে দেননি প্রধানমন্ত্রী নোদা। তিনি বলেন, বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা পারমাণবিক চুল্লিগুলো আবারও চালু করা হবে।
১১ মার্চের ভূমিকম্প ও সুনামিতে জাপানের ফুকুশিমার দাইচি পারমাণবিক বিদ্যু ৎ কেন্দ্র ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ পরমাণু বিপর্যয়ের আগে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক পারমাণবিক বিদ্যু ৎ কেন্দ্রগুলো থেকে সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়েছিল জাপান। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস ও জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পর পারমাণবিক বিদ্যুতের বিরুদ্ধে জনগণের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বন্ধ করা পারমাণবিক চুল্লিগুলো চালু করা হয়নি। দেশটির ৫৪টি পারমাণবিক চুল্লির মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১১টি সচল আছে।

চেন্নাইয়ে ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত

ভারতে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে থাকা একটি ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীবাহী একটি চলন্ত ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চেন্নাইয়ের ৭৫ কিলোমিটার দূরে আরাক্কনাম স্টেশনে গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
কর্মকর্তারা জানান, চলন্ত ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে থাকা ট্রেনটির পেছনে এসে সজোরে ধাক্কা দিলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
টেলিভিশন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দুর্ঘটনার পর পরই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন।

ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি একটি নৈতিক দায়িত্ব

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রেসেপ তায়ইপ এরদোয়ান বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া একটি নৈতিক দায়িত্ব, এটি ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। মিসরের রাজধানী কায়রোতে আরব লিগের সম্মেলনে গতকাল মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘বছর শেষ হওয়ার আগেই আমরা ফিলিস্তিনে একটি ভিন্ন পরিস্থিতি দেখতে পাব।’
আঞ্চলিক পর্যায়ে তুরস্কের অবস্থান দৃঢ় করার লক্ষ্যে তিনটি আরব দেশ সফরের অংশ হিসেবে এরদোয়ান এখন মিসরে রয়েছেন। এরদোয়ান বলেন, ইসরায়েল সরকারের মানসিকতাই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও সম্প্রতি জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের চেষ্টা করছে ফিলিস্তিন। জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে ফিলিস্তিনের এ উদ্যোগের প্রতি সমর্থনের আহ্বান জানান এরদোয়ান। আরব লিগের সদর দপ্তর কায়রোতে সদস্যভুক্ত দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনি ভাইদের জন্য আমাদের হাতে হাত রেখে কাজ করতে হবে। রাষ্ট্রের স্বীকৃতির জন্য তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসানের সময় এসেছে। ফিলিস্তিনের দাবির সঙ্গে মানবিক মর্যাদার বিষয়টি জড়িত রয়েছে।’ এরদোয়ানের বক্তব্য মিসরের টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

অস্ট্রেলীয় পার্লামেন্টে বিতর্কিত কার্বন কর বিল উত্থাপন

অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে গতকাল মঙ্গলবার কার্বন করবিষয়ক নতুন বিল উত্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এই বিল আইন হিসেবে অনুমোদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ১২ অক্টোবর বিলটির ওপর পার্লামেন্টে ভোটাভুটি হবে। বিলটির প্রতিবাদে গতকাল দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে।
বিরোধী দল বলছে, এই আইন চালু হলে অনেক লোক চাকরি হারাবে, পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যাবে।
বিলটি উত্থাপনের সময় গ্যালারিতে বসা দর্শকদের এক পক্ষ বিপুল হর্ষধ্বনির মাধ্যমে জুলিয়াকে সমর্থন করে। আরেক পক্ষ চি ৎ কার করে এর প্রতিবাদ জানায়। এ ছাড়া দেশব্যাপী হাজার হাজার লোক এই বিলের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে।
বিতর্কিত বিলটি আইনে পরিণত হলে ২০১২ সালের ১ জুলাই থেকে অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রতি টন গ্যাসের জন্য উচ্চহারে কর দিতে হবে। সে দেশে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা দূষিত গ্যাস নির্গমনকারী এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৫০০টি।
অস্ট্রেলিয়ার হাজার হাজার মানুষ এর মধ্যে বিলটির প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ তাঁর প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ। গত বছর নির্বাচনের আগে জুলিয়া গিলার্ড এই বিল উত্থাপন না করার ব্যাপারে অঙ্গীকার করেছিলেন।
গতকাল পার্লামেন্টের প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি উত্থাপনের সময় গিলার্ড বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সে সময়টা এখনই। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ও কার্বনজনিত দূষণ রোধে এ ব্যবস্থা নিতে হবে।
কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের মাধ্যমে পরিবেশদূষণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে, এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া একটি। কার্বন ডাই-অক্সাইডের মূল উ ৎ স কয়লার অন্যতম বড় রপ্তানিকারক দেশও তারা। জলবায়ু পরিবর্তন হ্রাসে ব্যবস্থা নিতে অনেক দিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। এর আগে কার্বন নির্গমন রোধে আইন প্রবর্তনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
‘ক্লিন এনার্জি বিল-২০১১’ শীর্ষক বিলটি পার্লামেন্টে পাস করার মতো সমর্থন জুলিয়া গিলার্ডের রয়েছে। তবে রক্ষণশীল বিরোধী দল বিলটির ব্যাপারে কট্টর অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, এই আইন আসলে কোনো কাজে লাগবে না। বরং এতে চাকরি ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়বে, বেড়ে যাবে জীবনযাত্রার ব্যয়।
এই বিলের প্রতিবাদে অস্ট্রেলিয়ায় গতকাল হাজার হাজার লোক বিক্ষোভ করে। ২০১০ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অল্প ভোটে জয়ী হন গিলার্ড। বিক্ষোভকারীরা বলছে, গিলার্ডের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ক্ষমতায় গেলে পার্লামেন্টে কার্বন করবিষয়ক বিল তুলবেন না। কিন্তু পরের বছরই বিলটি পার্লামেন্টে উত্থাপন করে তিনি অঙ্গীকার ভেঙেছেন।
গিলার্ড বলেন, বহু বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। এখন বেশির ভাগ অস্ট্রেলীয় স্বীকার করে, কার্বনদূষণ জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে।’
সরকারের প্রত্যাশা, এই আইন চালু হলে ২০৫০ সালের মধ্যে দুই হাজার স্তরের কার্বন নির্গমনের হার ৮০ শতাংশ কমে যাবে।

বিবাহবিচ্ছেদ ঠেকাতে...

চীনে বিবাহবিচ্ছেদের হার বাড়ছে। আর এ বিচ্ছেদের হার হ্রাস করতে অভিনব এক উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির রাজধানী বেইজিংয়ের ডাক বিভাগ। উদ্যোগটি হলো: সাত বছর পর গন্তব্যে পৌঁছানো হবে প্রেমপত্র।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ডাক বিভাগ নতুন এক সেবা চালু করেছে। এ সেবার মাধ্যমে নতুন প্রেমে পড়া বা নববিবাহিত কেউ প্রিয়জনের কাছে প্রেমপত্র পাঠাতে পাঠাবেন, তবে সে চিঠি পৌঁছে দেওয়া হবে সাত বছর পর। বলা হয়, সাধারণত সাত বছর পর প্রায়ই প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে।
নতুন এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি বিশেষ খাম চালু করেছে ডাক বিভাগ। ব্যক্তিগত বার্তা লেখার জন্য খামে একটি কার্ড থাকবে। ৯ সেপ্টেম্বর থেকে বেইজিংয়ে এ বিশেষ খাম কিনতে পাওয়া যাচ্ছে।
যেসব জুটি বেইজিংয়ের ১৭টি বিবাহ নিবন্ধন অফিসের কোনো একটিতে বিয়ে করবেন, তাঁদের ওই বিশেষ খাম দেওয়া হবে। ডাক বিভাগের একজন কর্মী বলেন, ‘আমরা আশা করছি এ প্রেমপত্র ভবিষ্যতে হয়তো কিছু বিয়ে রক্ষা করতে পারবে।’
তবে কিছু ব্যক্তি এ উদ্যোগের ব্যাপারে ততটা আশাবাদী নন। সান লুবিন নামের এক ব্যক্তি চায়না ডেইলিকে বলেন, ‘যদি আমি সাত বছর পর প্রিয়জনের চিঠি পাই, আর ওই সময় যদি তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক না থাকে, তাহলে তা হবে বিষাদের চেয়েও বেশি কিছু।

ভিডিও বার্তা প্রকাশ আল-কায়েদার

যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদা। ওই ভিডিও বার্তায় আল-কায়েদার নিহত প্রধান ওসামা বিন লাদেনের অপ্রকাশিত ভিডিও ফুটেজ সংযুক্ত করা হয়েছে।
প্রায় ৬২ মিনিটের ওই ভিডিও বার্তায় আল-কায়েদার মিসরীয় নতুন প্রধান আইমান আল-জাওয়াহিরির ভাষণ রয়েছে। ‘সমাগত বিজয়ের ঊষালগ্ন’ শিরোনামের ওই ভিডিও বার্তাটি গত সোমবার ইসলামি জিহাদিদের একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা পর্যবেক্ষক সংস্থা এসআইটিই গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য জানায়।
এসআইটিইর ভাষ্যমতে, লাদেনের ওই ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে তাঁর গোপন আস্তানা থেকে উদ্ধার করা ভিডিও ফুটেজের মিল রয়েছে। এর আগেই ওয়াশিংটন ওই ভিডিও ফুটেজটি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু ওই ভিডিও ফুটেজে কোনো শব্দ ছিল না। প্রসঙ্গত, গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নেভি সিলের কমান্ডোরা অ্যাবোটাবাদের ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে। এ সময় লাদেনের ব্যবহূত কম্পিউটারসহ নানা তথ্য-উপাত্ত জব্দ করে ওয়াশিংটনে নেওয়া হয়।
ভিডিও ফুটেজে ওসামা বিন লাদেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা পুঁজিবাদী ইহুদি ও বড় বড় করপোরেশনের...ক্রীতদাসে পরিণত হবেন না।’
এ ছাড়া বব উডওয়ার্ডের লেখা ‘ওবামাস ওয়ার’ বইটির উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি ওসামা বিন লাদেন বলেন, ‘আপনারা এ বইটি পড়ে মার্কিন সেনাদের নীতিনির্ধারণের বিষয়ে বিস্তারিত জেনে গেছেন। আপনাদের এ-ও অজানা নয় যে “হ্যাঁ, আমরা পারি” যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এ স্লোগান মিথ্যা।’
প্রকাশিত ভিডিও বার্তাটির বেশির ভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে আল-কায়েদার নতুন প্রধান জাওয়াহিরির ভাষণ। আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করে জাওয়াহিরি বলেন, ‘আরব বিশ্বে চলমান বিপ্লব আল-কায়েদার সমর্থনপুষ্ট। আমরা আশা করি দেশগুলোতে এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সত্যিকারের ইসলামি ও শরিয়াহভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।’
জাওয়াহিরি বলেন, ‘এ জনপ্রিয় বিপ্লব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের পরাজয়। এটি দেশটির নাইন-ইলেভেন হামলা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়ার মতো কিংবা আফগান ও ইরাকে যুদ্ধে অসফল হওয়ার আরেক নজির।’
জাওয়াহিরি বলেন, ওসামা শহীদ হওয়ার পর গোটা মুসলিম উম্মাহর বিপ্লবের মুখ উদ্ভাসিত হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এ সত্য অস্বীকার করে আসছে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ঔদ্ধত্যপূর্ণ স্বভাবের কারণে বরাবরই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। কিন্তু এটাই সত্য যে দেশটি মুসলিম উম্মাহর উত্থানের মুখে পড়েছে। আর এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ স্বভাবের কারণেই আল্লাহর নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পতন হবে।’
ভিডিও ফুটেজটিতে জাওয়াহিরির স্থিরচিত্র সংযুক্ত করা ছিল। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে আল-কায়েদার ত ৎ কালীন প্রধান ওসামা বিন লাদেন আত্মগোপনে ছিলেন। সংগঠনটির ত ৎ কালীন দ্বিতীয় প্রধান জাওয়াহিরিও সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত আত্মগোপনে রয়েছেন।

প্রথম বিভাগ ক্রিকেট

২০১১-১২ মৌসুমের প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ শুরু আগামী ২৩ অক্টোবর। কাল সিসিডিএমের (ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিস) সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর দলবদল চলবে প্রতিদিন বিকেল তিনটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত।

দুশ্চিন্তার নাম ‘ইনজুরি’

প্রথম টেস্ট জিতে এগিয়ে অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় টেস্টেও ছিল চালকের আসনে। জিতলে শ্রীলঙ্কায় সর্বোচ্চ চারটি টেস্ট সিরিজ জয়ের রেকর্ড গড়ে ফেলত মাইকেল ক্লার্কের দল। কিন্তু সফরকারীদের সেই আশায় পানি ঢেলেছে বৃষ্টি। বৃষ্টি বাগড়ায় ড্র হয়েছে পাল্লেকেলে টেস্ট। আগামী শুক্রবার থেকে শুরু হতে যাওয়া সিরিজ নির্ধারণী ‘ফাইনাল’। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কলম্বো টেস্টের আগে শ্রীলঙ্কা-অস্ট্রেলিয়া উভয় শিবিরেই চোটের শঙ্কা।
পিঠের চোটের কারণে খেলবেন না অজন্তা মেন্ডিস। অস্ট্রেলিয়া শিবিরে দুশ্চিন্তার নাম রায়ান হ্যারিস। দ্বিতীয় টেস্টের শেষ দিনে হ্যামিস্ট্রংয়ে চোট পাওয়া হ্যারিসই সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে সফল বোলার। এই ৩১ বছর বয়সী ইতিমধ্যেই নিয়েছেন ১১ উইকেট। গলের প্রথম টেস্টে দলকে ১২৫ রানের জয় এনে দিতে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। বৃষ্টিবিঘ্নিত পাল্লেকেলে টেস্টেও ৬ উইকেট।
ক্লার্ক অবশ্য এখনো হ্যারিসকে পাওয়ার আশা ছাড়েননি, ‘ও এমন বোলার, যাকে আপনি দলে চাইবেনই। এই সিরিজে ও-ই বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে। দলকে দারুণ সাহায্য করছে। ও মানসিক এবং শারীরিকভাবে শক্তিশালী। লক্ষ্যে পৌঁছাতে ও সবকিছুই করতে পারে।’ গতকালই হ্যারিসের হ্যামস্ট্রিংয়ে স্ক্যান করা হয়েছে। ক্লার্ক তাকিয়ে আছেন আশাবাদী দৃষ্টিতে, ‘আমরা আত্মবিশ্বাসী যে স্ক্যানে কিছুই ধরা পড়বে না, নিশ্চিতভাবেই ওকে তৃতীয় টেস্টে পাওয়া যাবে।’
ক্লার্ককে ‘দুশ্চিন্তা’য় ফেলেছেন রিকি পন্টিংও। তৃতীয় টেস্ট খেলতে ফিরছেন সাবেক অধিনায়ক। স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় টেস্টের দল থেকে একজন ব্যাটসম্যানকে বাদ দিতে হবে। কাকে রেখে কাকে বাদ দেবেন—কঠিন সেই সিদ্ধান্তটি নিতে হবে। দ্বিতীয় সন্তান আগমন উপলক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের আগে দেশে ফিরে যান পন্টিং। পন্টিংয়ের জায়গায় দলে ঢুকে শন মার্শ অভিষেকেই খেলেছেন ১৪১ রানের অসাধারণ এক ইনিংস। জায়গা তাই তাঁর পাকা।
তার মানে কোপটা পড়ছে ওপেনার ফিলিপ হিউজ কিংবা উসমান খাজার ওপর। হ্যারিস শেষ পর্যন্ত খেলতে না পারলে তাঁর জায়গা নিতে পারেন সিরিজে এখনো মাঠে না নামা পিটার সিডল অথবা জেমস প্যাটিনসন।
শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক নিশ্চিতই করে দিয়েছেন, প্রথম টেস্ট মিস করা মেন্ডিস তৃতীয় টেস্টেও খেলতে পারবেন না। তবে দিলশানের দুশ্চিন্তা মুছে দিচ্ছেন বাঁহাতি স্পিনার রঙ্গনা হেরাথ। আঙুলের চোটের কারণে দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে না পারা হেরাথ সুস্থ তৃতীয় টেস্টের জন্য।

ব্রাজিলের ‘সমতায়’ ফেরার পালা?

গত কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দ্বৈরথ হয়নি। এ নিয়ে ফুটবলপ্রেমীরা হতাশ ছিলেন। তবে তা বেশি দিন স্থায়ী হচ্ছে না। পরপর দুটি ম্যাচে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রথম ম্যাচটি আজই, আর্জেন্টিনার করদোবায়। ২৮ সেপ্টেম্বর ফিরতি ম্যাচ ব্রাজিলের বেলেমে।
দুটি ম্যাচই ফিফার নির্ধারিত প্রীতি ম্যাচ সূচির বাইরে। আন্তর্জাতিক ম্যাচের মর্যাদা পাবে, কিন্তু এই ম্যাচের জন্য খেলোয়াড়দের ছাড়তে বাধ্য নয় ইউরোপের ক্লাবগুলো। যে কারণে তারকা খেলোয়াড়দের এই দুটি ম্যাচের জন্য পাবে না আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল কোনো দলই। এতে অবশ্য আক্ষেপ নেই আর্জেন্টিনার কোচ আলেসান্দ্রো সাবেলার। এটাকে তিনি আর্জেন্টিনার ঘরোয়া লিগে খেলা ফুটবলারদের পরখ করে দেখার সুযোগ হিসেবেই দেখছেন।
কলকাতা-ঢাকা সফর শেষে তৃপ্ত মনে দেশে ফেরা সাবেলা বলেছেন, ‘স্থানীয় খেলোয়াড়দের আমরা পরীক্ষা করে দেখব। আমাদের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই এখন বাইরে। তবে আর্জেন্টিনার জার্সি পরে খেলতে, দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে সবাই গর্ববোধ করে।’
জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কলকাতায় জয় দিয়ে অভিষেক। এরপর ঢাকায়ও জয়। তবে সাবেলার জন্য বড় পরীক্ষা আগামী মাসে। ৭ অক্টোবর চিলি ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব শুরু আর্জেন্টিনার। মূলত এই দুই ম্যাচ সেই বাছাইপর্বেরই প্রস্তুতি।
ব্রাজিলের বিপক্ষে এই ম্যাচ দিয়েই আবারও জাতীয় দলে ফেরার কথা ছিল হুয়ান রোমান রিকেলমের। যদিও শেষ পর্যন্ত চোটের কারণে তা হচ্ছে না। রিকেলমে এবং দলের আরেক সিনিয়র হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন ছিটকে গেছেন। ‘আমি রোববার রোমানের সঙ্গে কথা বলেছি। ও আমাকে জানিয়েছে, ম্যাচের জন্য সে ফিট নয়’—বলেছেন সাবেলা।
ওদিকে ব্রাজিল মোটামুটি একটা শক্তিশালী দলই নামাতে পারছে। ঘানার বিপক্ষে দারুণ খেলা রোনালদিনহো এবং ওই ম্যাচে গোল করা লিওনার্দো দামিয়া, সান্তোসের উঠতি তারকা সান্তোস থাকছেন। অবশ্য ব্রুনো করতেস, কাসেমিরো, সিসেরো, মারিও ফার্নান্দেজ, ওস্কার, পলিনহো, রেনাতো আব্রিউয়ের মতো নতুন মুখও আছেন।
দুই দলই তারকাবহুল নয়। তাতে কি, সমর্থকদের প্রত্যাশায় কিন্তু হেরফের নেই। ব্রাজিল তারকা নেইমার বলছেন, ‘প্রত্যাশা বিশাল। দলে অনেক নতুন মুখ এসেছে। তবে আমাদের লক্ষ্য ম্যাচটা জেতা।’
ফুটবল বিশ্বের এটি পরম প্রার্থিত দ্বৈরথ। এর আগে ৯০ বার মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল। ব্রাজিল জিতেছে ৩৩ বার, আর্জেন্টিনা ৩৪ বার। আজ ব্রাজিলের সমতা ফেরানোর পালা?

যেভাবে মিলবে বিশ্বকাপের টিকিট

প্রবল বিতর্কের মুখে ১০ দলের বিশ্বকাপ থেকে সরে এসেছিল আইসিসি। গত জুনে হংকংয়ে আইসিসির সাধারণ সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০১৫ বিশ্বকাপে চারটি সহযোগী দেশকেও সুযোগ দেওয়া হবে। এবার ঘোষণা করা হলো চার দল বাছাইয়ের প্রক্রিয়া। আগের মতো একটি নয়, দু-দুটি টুর্নামেন্ট থেকে বাছাই করা হবে চার দল!
শুরুতে আট দল নিয়ে একটা টুর্নামেন্ট হবে। এতে থাকবে ‘ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগ ডিভিশন ২’-এর শীর্ষ দুই দল। এই টুর্নামেন্টের শীর্ষ দুই দল জায়গা পাবে বিশ্বকাপে। বাকি ছয় দল খেলবে আরেকটি টুর্নামেন্টে, যেখানে থাকবে ‘ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগ ডিভিশন ২’-এর তৃতীয় ও চতুর্থ হওয়া দল। এই টুর্নামেন্টের শীর্ষ দুই দল পাবে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের টিকিট। দলগুলোকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া এবং সেরা চারটি দলকে বাছাই করতেই দুটি টুর্নামেন্ট করা হচ্ছে, জানিয়েছেন আইসিসির প্রধান নির্বাহী হারুন লরগাত। টুর্নামেন্ট দুটির সময়সূচি ও ভেন্যু চূড়ান্ত হয়নি এখনো।
১০ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন যিনি, সেই সাবেক আইরিশ অধিনায়ক ট্রেন্ট জনস্টন জানিয়েছেন উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া, ‘আইসিসি এবার একদম ঠিক করেছে। নতুন এই ফরম্যাটে সেরা দলগুলোই বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা পাবে।’

কেন গেল না ভারত

ম্যাচ তো ছিলই না। ছিল না অনুশীলনও। ভারতীয় দল ছিল লন্ডনেই। কিন্তু পরশু সন্ধ্যায় লন্ডনের গ্রসভেনর হাউস হোটেলে আইসিসি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে ছিলেন না ভারতীয় দলের একজনও!
অথচ তিনটি ক্যাটেগরিতে সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন ভারতের চারজন। অনুপস্থিতি নিয়ে ভারতীয় দল ও আইসিসি দায় চাপাচ্ছে পরস্পরের ওপর। তবে ব্রিটিশ মিডিয়ার ধারণা, পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা কম দেখেই আগ্রহ দেখাননি ভারতীয় ক্রিকেটাররা! আইসিসি অ্যাওয়ার্ডের অষ্টম আসরে পুরস্কৃত হয়েছেন কেবল একজন ভারতীয়। ট্রেন্টব্রিজ টেস্টে রান আউট হওয়া ইয়ান বেলকে ডেকে পাঠানোয় ‘স্পিরিট অব ক্রিকেট অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি।
ভারতের ম্যানেজার শিবলাল যাদবের দাবি, ‘অনুষ্ঠানের দিন বিকেলে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এত সংক্ষিপ্ত সময়ের নোটিশে এত বড় অনুষ্ঠানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আজই আমাদের কার্ডিফে চলে যাওয়ার কথা ছিল, শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনায় যাওয়া হয়নি।’ তবে ভারত ম্যানেজারের দাবিটা আবার উড়িয়ে দিলেন আইসিসির মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান কলিন গিবসন, ‘বিসিসিআইকে আমরা দুই মাস আগেই জানিয়েছিলাম। গত ২৬ আগস্ট পুরো দলকেই আবারও আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভারতীয় দল না আসায় আমরা বরং অবাক হয়েছি।’
বিসিসিআই ভারতীয় দলের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে—প্রমাণস্বরূপ এমন একটা ই-মেলও নাকি আছে, জানালেন আইসিসির এক মুখপাত্র। ওই মুখপাত্রের দাবি, অনুষ্ঠানের কারণেই সোমবার কার্ডিফে যায়নি ভারত। কিন্তু অনুপস্থিতির কারণ রহস্যজনক। অনুষ্ঠানে থাকা বিসিসিআইয়ের সহসভাপতি রাজীব শুক্লা বললেন আবার অদ্ভুত কথা, ‘আমি ভেবেছিলাম যারা মনোনয়ন পেয়েছে, তারা অন্তত আসবে।’
মজার ব্যাপার, আইসিসির প্রধান ও বিসিসিআইয়ের সাবেক প্রধান শারদ পাওয়ার ছিলেন অনুষ্ঠানে, তুলে দিয়েছেন কিছু পুরস্কার। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ, বর্ষসেরা ক্রিকেটারের স্যার গ্যারফিল্ড সোবার্স ট্রফি জয়ী জোনাথন ট্রট হয়ে পড়েছিলেন আবেগ আপ্লুত, ‘কখনোই ভাবিনি এই অ্যাওয়ার্ড পাব। সাফল্যের এই স্বীকৃতি পাওয়ার অনুভূতি অসাধারণ।’ পুরস্কারের জন্য বিবেচনায় নেওয়া সময়কালে (৩১ আগস্ট ২০১০ থেকে ৩ আগস্ট ২০১১) ১২ টেস্টে ৬৫.১২ গড়ে ১০৪২ রান করেছেন ট্রট, ২৪ ওয়ানডেতে ৪৮.৩৬ গড়ে রান ১০৬৪।
ট্রটের সতীর্থ অ্যালিস্টার কুক বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটারের ট্রফি নিয়েছেন কার্টলি অ্যামব্রোসের হাত থেকে। ইংলিশ ওপেনার কৃতিত্ব দিলেন সতীর্থদের, ‘বছরটি ছিল অসাধারণ। এই পুরস্কার শুধু আমার নয়, পুরো দলের।’ পরশু দুটো পুরস্কার জেতা একমাত্র ক্রিকেটার (বর্ষসেরা ওয়ানডে ক্রিকেটার ও পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড) কুমার সাঙ্গাকারা অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি অস্ট্রেলিয়া সিরিজের জন্য। প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভিডিও বার্তায়, ‘এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়াটাই দারুণ সম্মানের। পুরস্কার জেতা তো আরও বেশি সম্মানজনক।’ একই রকম প্রতিক্রিয়া ছিল বর্ষসেরা উদীয়মান ক্রিকেটার দেবেন্দ্র বিশুর, ‘সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকাটাই বিশ্বাস হচ্ছিল না। সেখানে পুরস্কারও পেয়ে গেলাম, খুব ভালো লাগছে।’ বর্ষসেরা টি-টোয়েন্টি পারফরম্যান্স জয়ী টিম সাউদির কথা, ‘এই পুরস্কার জয়ের স্মৃতি কখনোই ভুলব না।’
পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের কারণে অনুষ্ঠানে ছিলেন না বর্ষসেরা মহিলা ক্রিকেটার ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্টেফানি টেলর। থাকতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন সহযোগী ও অধিভুক্ত দেশগুলোর সেরা ক্রিকেটার রায়ান টেন ডেসকাট। গত চার বছরের মধ্যে তৃতীয়বার এই পুরস্কার জিতলেন ডাচ অলরাউন্ডার। বর্ষসেরা আম্পায়ারের ডেভিড শেফার্ড ট্রফি টানা তৃতীয়বার জিতেছেন পাকিস্তানের আলিম দার।

শাস্তি পেলেন তিন ফুটবলার

ঘরোয়া ফুটবলে পাঁচ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে দুই ফুটবলার জাহিদ হাসান (এমিলি) ও মিঠুন চৌধুরীকে। সঙ্গে দুই লাখ টাকা করে জরিমানা। জরিমানার টাকা না দিলে আরও তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা। কাল বাফুফের জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা কমিটি খেপ খেলার দায়ে দুই ফুটবলারকে এই শাস্তি দিয়েছে।
গত ২০ জুলাই বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে লেবাননের বিপক্ষে খেলতে যাওয়ার আগের দিনের ঘটনা। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে মানিকগঞ্জে খেপ খেলতে যান জাতীয় দলের দুই স্ট্রাইকার। পরে অবশ্য ধরা পড়েন। তার পর থেকে এই দুজনকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলে আসছিল ব্যবস্থাপনা কমিটি। তারই অংশ হিসেবে ঢাকায় মেসিদের বরণ করার তালিকা থেকে বাদ পড়েন দুজনই।
শাস্তি পাচ্ছেন জাতীয় দলের আরেক খেলোয়াড় জাহিদ হোসেনও। লেবাননের বিপক্ষে ঢাকায় হোম ম্যাচে কোচ ইলিয়েভস্কি প্রথমার্ধে তুলে নেন এই উইঙ্গারকে। মাঠের বাইরে এসে বোতলে লাথি মেরে ক্ষোভ জানান জাহিদ। তাঁকে ঘরোয়া ফুটবলে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সঙ্গে এক লাখ টাকা জরিমানা। অনাদায়ে আরও এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা।
কাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা শেষে চেয়ারম্যান বাদল রায় শাস্তির পক্ষে যুক্তি দিলেন, ‘এমিলি ও মিঠুনের বিরুদ্ধে তা ৎ ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু লেবাননের বিপক্ষে ম্যাচ হওয়ার কারণে আমরা তখন কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। অভিযুক্ত খেলোয়াড়দের আজীবন নিষিদ্ধ করা উচিত ছিল। কিন্তু তাদের ক্যারিয়ারের কথা বিবেচনা করে এমন শাস্তি দেওয়া হয়েছে।’
বাফুফের এমন সিদ্ধান্তে হতাশ জাহিদ হাসান, ‘ভুল করেছি। শাস্তিও পেয়েছি। মেসিদের বরণ করতে পারিনি। তার পরও বাফুফের সিদ্ধান্ত মানতেই হবে। খুবই খারাপ লাগছে। বড় একটা শিক্ষা হলো, ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হয়ে চলব। একটা প্রশ্ন অবশ্য আসছে মনে, আমাদের ভুলের কারণে ক্লাব কেন ভুগবে?’

মরিনহোকে ছাড়াই শুরু করছে রিয়াল

আজ যখন মাঠে নামবে রিয়াল মাদ্রিদ, হোসে মরিনহো তখন কী করবেন? এটা কোনো প্রশ্ন হলো! দল যখন খেলে, কোচের তখন ডাগ আউটেই তো থাকার কথা। না, সেটা হচ্ছে না মরিনহোর বেলায়। গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের একটা শাস্তি এই মৌসুমেও টেনে এনেছেন রিয়াল কোচ। উয়েফা বার্সার পক্ষপাতী—এমন সমালোচনার কারণে তিন ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ মরিনহো এই ম্যাচটায় থাকতে পারছেন না। খেলাটা তিনি দেখবেন জাগরেবে তাঁর হোটেল কক্ষে।
গত মৌসুমের শাস্তি এই মৌসুমে টেনে এনেছেন, তবে মরিনহো নিশ্চয়ই গত মৌসুমের ব্যর্থতা এই মৌসুমেও টেনে আনতে চাইবেন না। ভিন্ন দুটি ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা ইতিহাসের তিনজন মাত্র কোচের একজন মরিনহো। এবার তাঁর সামনে হাতছানি ইতিহাসের একমাত্র কোচ হিসেবে তিনটি ভিন্ন ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার। গতবার দারুণ ছুটছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেমিফাইনালে পড়ে যেতে হয়েছে বার্সেলোনার সামনে। এবার অবশ্য বার্সাকেও থোড়াই কেয়ার করেন ‘স্পেশাল ওয়ান’।
রিয়ালের শুরুটা তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ দিয়েই হচ্ছে। ডায়নামো জাগরেব এমনিতে রিয়ালের জন্য অচেনা প্রতিপক্ষ। তবে এর আগে কোনো ম্যাচ না খেললেও আজ ক্রোয়েশিয়ার ক্লাবটিকে হারানো রিয়ালের জন্য কঠিন হওয়ার কথা নয়। সর্বশেষ ১২ মৌসুম আগে চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলা ক্লাবটি নিজেদের মাঠের তিন ম্যাচের দুটোই হেরেছিল। এই ১২ বছরে অনেক কিছু পাল্টেছে। গতবার ইউরোপা লিগে খেলার সময় ডায়নামো হারিয়ে দিয়েছিল ভিয়ারিয়ালকে। তবে স্প্যানিশ কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে ১০ ম্যাচে ওই একটাই ম্যাচ জিতেছে তারা, হেরেছে সাতটিই।
গতবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ নিয়ে মরিনহোর দুঃখ যতটা, তার চেয়েও বেশি দুঃখ অ্যালেক্স ফার্গুসনের। স্যার ফার্গির দল ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েও পারল না। নতুন মৌসুমে নতুন মিশন। এবার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারুণ্যের জয়গান গাইছে। লিগে গত দুই ম্যাচে ১৩ গোল করা ম্যানইউ আজ মুখোমুখি দুবারের চ্যাম্পিয়ন বেনফিকার। মুখোমুখি লড়াইয়ের সাত ম্যাচের ছয়টিই ম্যানইউ জিতেছে ঠিকই, কিন্তু ফার্গুসনের জন্য আজ দুশ্চিন্তার কারণ, বেনফিকা ইউরোপ পর্যায়ে নিজেদের মাঠে গত ছয়টি ম্যাচই জিতেছে। জিতেছে আসলে গত দশ ম্যাচের নয়টিই। ইংলিশ প্রতিপক্ষের সঙ্গেও তাদের রেকর্ডটা ভালো। নিজেদের মাঠে ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচের চারটিই জিতেছে। তবে গত সাত ম্যাচে বেনফিকার যে একটি মাত্র পরাজয়, সেটিই ম্যানইউর বিপক্ষে। চার ম্যাচে ৮ গোল করা রুনি লিগের এই ফর্মটা ইউরোপেও টেনে নিতে পারেন কি না, দেখার বিষয়।
মরিনহোর সাবেক ক্লাব ইন্টার মিলান মুখোমুখি হবে ত্রাবজনস্পরের। ইতালিয়ান লিগে প্রথম ম্যাচে পালেরমোর কাছে ৪-৩ গোলে হেরে আসা ইন্টারের জন্য এই ম্যাচে দুশ্চিন্তা নিজেদের রক্ষণ নিয়ে। আজকের ম্যাচ দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেক হবে আরেক ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলির। এই দলটি মুখোমুখি হচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটির, চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যান সিটিরও এটি অভিষেক ম্যাচ। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সার্জিও আগুয়েরো মুখোমুখি হচ্ছেন তাঁর শ্বশুর ডিয়েগো ম্যারাডোনার সাবেক ক্লাবের। ম্যারাডোনার ছোঁয়ায় নাপোলি যেমন বদলে গিয়েছিল, আগুয়েরোও তেমনি বদলে দিতে চান সিটির ভাগ্য। দেখা যাক, শুরুটা কেমন হয় আগুয়েরো এবং ম্যান সিটির।
এই ‘এ’ গ্রুপে পড়েছে ভিয়ারিয়াল আর বায়ার্ন মিউনিখও। ফলে অনেকের চোখে এটাই হয়ে গেছে ‘গ্রুপ অব ডেথ’। সব কটি দলই প্রায় কাছাকাছি শক্তির। গ্রুপ অব ডেথের লড়াই মানে অন্য আকর্ষণও। সেই আকর্ষণ আজ বাড়াবে ভিয়ারিয়াল বনাম বায়ার্নের ম্যাচটিও।

মাহমুদুর রহমানের মন্তব্য প্রতিবেদনঃ তিস্তা আমাদের অধিকার করিডোর ওদের আবদার

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর উচ্চ নিনাদে ঢাকঢোল পেটানো সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের আগেরদিন ‘দেশপ্রেমিক হলে দেশের স্বার্থ দেখুন’ শিরোনামে যে মন্তব্য প্রতিবেদনটি লিখেছিলাম, সেখানে মূলত ট্রানজিটের মোড়কে করিডোর, পানি আগ্রাসন, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সীমান্ত হত্যা, এই চারটি প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছিল। সেই লেখায় তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পর্কে যে আগাম মন্তব্যটি করেছিলাম, সেটি উদ্ধৃত করেই ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং অমীমাংসিত ইস্যু বিষয়ক তিন কিস্তির মন্তব্য প্রতিবেদন শুরু করছি।
আমি লিখেছিলাম, “এদিকে দু’দিন আগে বলা হলো, তিস্তা নদীর পানিবণ্টনের বিষয়টি নাকি ড. মনমোহনের সফরের সময় দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের এজেন্ডা থেকেই বাদ দেয়া হয়েছে। কূটনৈতিক মহলে শোনা গেল, আলোচনা থেকে তিস্তাচুক্তি বাদ দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন একজন অতিমাত্রায় ভারতপন্থী উপদেষ্টা। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী অবশ্য তিস্তা পানিচুক্তি এজেন্ডায় ফেরত এসেছে। তবে সেই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ কী পরিমাণ পানি পেতে যাচ্ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আর এক অনিশ্চয়তা। ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় লেখা হয়েছে, গজলডোবা পয়েন্টে পানি ৫২:৪৮ হারে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগাভাগি হবে। অপরদিকে বিবিসি রেডিওতে পশ্চিমবঙ্গের ওই এলাকার সাংসদ বলেছেন, বাংলাদেশ নাকি মাত্র ২৫ শতাংশ পানি পাবে। উল্লেখ্য, গজলডোবা পয়েন্টের আগেই অন্তত ডজনখানেক স্থান থেকে ভারত তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে চলেছে। অথচ এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার নিশ্চুপ, জনগণ অন্ধকারে। তিস্তা নিয়ে প্রতিদিন যেভাবে নাটকের স্ক্রিপ্টের পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত কোনো রকম ভরসা পাচ্ছি না।”
আমার আশঙ্কা সত্যে পরিণত হয়েছে, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি শেষ পর্যন্ত হয়নি। তবে চুক্তি না হওয়ার জন্য আমি এদেশের একজন নাগরিক হিসেবে যতটা হতাশ হয়েছি, তার চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন হয়েছি এই চুক্তি না হওয়ার পেছনের কারণটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মারফত জানতে পেরে। বাংলাদেশ এবং ভারতের ক্ষমতাসীন মহল তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির নামে প্রকৃতপক্ষে এদেশের জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কল্যাণে সেই প্রতারণার বিষয়টি এখন ফাঁস হয়ে গেছে। বাংলাদেশের জনগণের তিস্তার পানির ন্যায্য অধিকারের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করলেও একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তার স্বচ্ছতার অবশ্যই
প্রশংসা করতে হবে। আমাদের দুই ‘সুপার’ উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিলে বাংলাদেশ ৪৮ শতাংশ পানি পাচ্ছে বলে প্রচারণা চালালেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কল্যাণে জানা গেল আমরা গজলডোবা পয়েন্টে মাত্র ৩৩ শতাংশ পানি পেতে যাচ্ছিলাম।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দাবি করছেন, তার সম্মতিতে যে খসড়া চুক্তি প্রাথমিকভাবে প্রণীত হয়েছিল সেখানে বাংলাদেশের অংশ আরও অনেক কম অর্থাত্ ২৫ শতাংশ স্থির হয়েছিল। সম্ভবত সে কারণেই পশ্চিমবঙ্গের ওই এলাকার সাংসদ বিবিসি রেডিওতে প্রদত্ত সাক্ষাত্কারে তেত্রিশের পরিবর্তে ২৫ শতাংশের কথাই জানিয়েছিলেন। খসড়া এবং চূড়ান্ত চুক্তির মধ্যকার ফারাকের কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষমুহূর্তে বেঁকে বসেছেন। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ তিস্তার পানির আধাআধি হিস্যা দাবি করে এসেছে। পানি নিয়ে এ ধরনের প্রতারণা ভারত অবশ্য আমাদের সঙ্গে নতুন করছে না। ১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল বাংলাদেশের তত্কালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রতারণা করেই।
১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ভারত সফর শেষে স্বাক্ষরিত যুক্ত বিবৃতির সূত্র ধরে ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে, এই ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালুর (Test run) ভারতীয় প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতিতে রূপান্তরিত শেখ মুজিবুর রহমান। দুই দেশের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল Feeder canal-এর এই অস্থায়ী Test run সম্পন্ন হলে উভয় দেশের মধ্যে গঙ্গার পানি ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভাগাভাগি করে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হওয়ার পরই কেবল ফারাক্কা বাঁধ স্থায়ীভাবে চালু করা হবে।
বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ফারাক্কা নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। সেই বিবৃতির নিচের উদ্ধৃতাংশেও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা Test run একটি সাময়িক কার্যক্রম হওয়ারই কথা ছিল—
"It is to be hoped that this question will now be resolved at the next meeting and a firm and final solution found in a spirit of understanding and friendship safeguarding the legitimate rights and interests of both the countries. A significant step forward had been taken with the conclusion in April 1975 of a short term arrangement providing for the operation of the Feeder canal of the Farakka Barrage during the lean season last year, pending further discussions regarding the allocation of the lean season flows of the Ganga in terms of the Joint Declaration of the Prime Ministers of India and Bangladesh of May 16, 1974."
(আশা করা যাচ্ছে যে, সমঝোতা ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে পরবর্তী আলোচনায় এই সমস্যার এমন একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত সমাধানে উপনীত হওয়া সম্ভব হবে যাতে করে উভয় দেশের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে ফারাক্কা বাঁধের সংযোগ খাল চালুর একটি স্বল্পকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে গত বছরের শুষ্ক মৌসুমের সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তবে ১৯৭৪ সালের ১৬ মে ভারত ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যৌথ বিবৃতির আলোকে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিবণ্টন সম্পর্কিত আলোচনা এখনও অমীমাংসিত রয়েছে।)
কিন্তু ভারত তার কথা রাখেনি। পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র ৪১ দিনের জন্য বাঁধ চালু করার ছদ্মাবরণে তারা সেই যে ফারাক্কা বাঁধ থেকে গঙ্গার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার শুরু করেছিল, তার অবসান আর কোনোদিন হয়নি। ফলে গত ৩৬ বছরে আমাদের এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মা ক্ষীণকায়া স্রোতস্বিনীতে পরিণত হয়েছে এবং সেই সঙ্গে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকাও আজ মরুকরণ প্রক্রিয়ায় পতিত। ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান আর মাত্র সামান্য ক’টা দিন জীবিত ছিলেন। কাজেই আমাদের জানার উপায় নেই যে, তিনি ভারতীয় প্রতারণা সম্পর্কে আগাম জানতেন কিনা। দুর্ভাগ্যবশত তার কন্যার ক্ষেত্রে সেই benefit of doubt দেয়া যাচ্ছে না। বরঞ্চ, অবস্থাদৃষ্টে দেশবাসীর কাছে আজ পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষের সঙ্গে যে প্রতারণা করছে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী এবং দুই সুপার উপদেষ্টাসহ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তিস্তাচুক্তি নিয়ে এই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে এখন আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তির দরকষাকষিতে অধিকতর সতর্ক হতে হবে। গজলডোবা পয়েন্টের পানি শতকরা হারে ভাগাভাগির পরিবর্তে গ্যারান্টি ক্লজসহ পানির পরিমাণ (হাজার কিউসেক) নিশ্চিত করা গেলেই কেবল বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে। যেনতেন একটি চুক্তি বাংলাদেশের জন্য বরং অমঙ্গলই ডেকে আনবে। ঝানু কূটনীতিকরা বলে থাকেন, "No treaty is better than a bad treaty" (চুক্তি না থাকা খারাপ চুক্তির চাইতে ভালো)। তিস্তা নদীতে মোট পানিপ্রবাহের পরিমাণের অঙ্ক নির্ধারণেও বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক পানি বিশেষজ্ঞদের অবিলম্বে সম্পৃক্ত হওয়া আবশ্যক, যেন সেখানেও বর্তমান সরকার এবং বাংলাদেশের ভারতবন্ধুরা মিলে আমাদের কোনো শুভঙ্করের ফাঁকিতে ফেলতে না পারে।
সেই পাকিস্তান আমল থেকেই ভারত আমাদের বিরুদ্ধে অব্যাহত পানি আগ্রাসন চালালেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির সব প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আমরা কেবল আশ্বাসবাণীই শুনে এসেছি। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প বাতিলের দাবির প্রেক্ষিতে ড. মনমোহন সিং তার পূর্বসূরিদের চর্বিত চর্বণ পুনরাবৃত্তি করে ঢাকায় বলেছেন, “ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” বছরের পর বছর ধরে এই অভিন্ন বাক্য শুনতে শুনতে বাংলাদেশের জনগণ ক্লান্ত হয়ে পড়লেও আশ্চর্যজনকভাবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীদের একই কথা বলাতে যেন কোনো ক্লান্তি নেই।
শেখ হাসিনা এবারের মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর মিসরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে প্রথমবার আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে অবিকল একই মন্তব্য করেছিলেন। অথচ ভারত বরাক নদীতে বাংলাদেশের জন্য আরও একটি মরণ বাঁধ নির্মাণ থেকে সরে আসার কোনো প্রতিশ্রুতি আজ পর্যন্ত দেয়নি। ১৯৫১ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেলে পাকিস্তান সরকারের উদ্বেগের জবাবে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুও এই কথাই বলেছিলেন। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হয়নি, বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ষাট বছর পর এমন দাবি ‘র’ (raw)-এর বেতনভুক বাংলাদেশী এজেন্টরাই কেবল করতে পারেন।
যা হোক, শেষ কথা হলো মহাজোট সরকার তিস্তার পানি নিয়ে আমাদের আশার এক প্রকাণ্ড বেলুন ফুলিয়ে তুললেও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি করতে ভারত চূড়ান্ত মুহূর্তে অসম্মতি জ্ঞাপন করেছে। ড. মনমোহন সিং বাড়ি বয়ে এসে শেখ হাসিনাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দিয়ে দেশের কোনো কল্যাণ সাধন হতে পারে না। এখন বাংলাদেশের জন্য অধিকতর আশঙ্কার বিষয় হলো, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই গণবিরোধী, ভারতপন্থীরা আমাদের স্বাধীনতা হরণের নতুন কৌশল প্রণয়নে কোমর বেঁধে লেগে গেছে।
এই গোষ্ঠী টেলিভিশন ‘টক শো’ এবং পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে তিস্তার পানির সঙ্গে করিডোর বিনিময়ের একটি পটভূমি তৈরির অপচেষ্টায় জনগণের মগজ ধোলাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশেই যে এরা মাঠে নেমেছেন, তার প্রমাণ বিতর্কিত ‘সুপার উপদেষ্টা’ ড. গওহর রিজভীর আরটিভিতে ৮ তারিখের লাইভ ইন্টারভিউতেই মিলেছে। শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম মেয়াদের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর তিস্তার পানি এবং করিডোর, এই দুই বিষয়কে এক না করার পরামর্শের জবাব এড়িয়ে ড. গওহর রিজভী দ্বিপাক্ষিক লেনদেনের বায়বীয় গল্প বলে সরকারের অস্বচ্ছ, রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানকেই পুনর্বার স্পষ্ট করেছেন। একটি চিহ্নিত কট্টর ভারত ও সরকারপন্থী পত্রিকায় ৯ সেপ্টেম্বর ‘আধাঘণ্টায় পাল্টে যায় পরিস্থিতি’ শিরোনামের লিড নিউজে লেখা হয়েছে, “আধাঘণ্টায় বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সব পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণতায় বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ঘুরে দাঁড়ায়। তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির সঙ্গে বাদ পড়ে যায় ট্রানজিটের সম্মতিপত্র সইও।”
মার্কিন ও ভারতপন্থী সুশীল (?) পত্রিকা দি ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম ওই ৯ তারিখেই তাদের সহযোগী বাংলা পত্রিকা প্রথম আলোতে লিখেছেন, “দুই দেশের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের কাছে ভারতের চাওয়ার প্রধান বিষয়—নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও ট্রানজিট সুবিধা। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আগেই দেয়া হয়েছে। ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার ব্যাপারেও বাংলাদেশ নীতিগত সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান বিষয়—অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং বাণিজ্য-বৈষম্য কমানো। দ্বিতীয়ত, ভারত কেন ট্রানজিট চাইছে? উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য। আমরা কেন পানি চাইছি? আমাদের উন্নয়নের জন্য।” কী চমত্কারভাবেই না আমাদের ন্যায্য অধিকারকে ভারতের আধিপত্যবাদী আবদারের সঙ্গে উন্নয়নের নামে তুলনীয় করে দেখানো হয়েছে! মাহফুজ আনাম এবং তার স্বগোত্রীয়রা দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে করিডোর দেয়ার পক্ষে ওকালতি করে চলেছেন। সেদিন মাছরাঙা টেলিভিশনে এক সাক্ষাত্কারে ট্রানজিটের মোড়কে করিডোরের পক্ষে তার নীতিগত অবস্থানের কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে তিনি অবশ্য সততার পরিচয় দিয়েছেন।
আসল কথা হলো, প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে ষোলো কোটি মানুষের অধিকারকে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবেশীর আবদারের কাছে বিসর্জন দিলেও দেশে কোনো কার্যকর প্রতিবাদের ঝড় না ওঠে। একথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ভারতপন্থীদের লক্ষণীয় প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থ বিকিয়ে ভারতের সন্তুষ্টি অর্জনই যাদের মোক্ষ, সেই গোষ্ঠী গত দুই দশক ধরে করিডোরের বিনিময়ে ঐশ্বর্য প্রাপ্তির এক অবাস্তব স্বপ্ন ফেরি করে বেড়িয়েছেন। ড. মনমোহনের সফর বাংলাদেশের মোহাবিষ্ট জনগণকে অবশেষে এক জোরদার ঝাঁকুনি দিয়ে কঠিন বাস্তবে নামিয়ে এনেছে। সেই বিবেচনায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নিষম্ফল সফর আমার বিবেচনায় একেবারে বৃথা হয়নি। রাস্তাঘাটের আলাপচারিতায় আমার কাছে অন্তত মনে হচ্ছে, একাত্তরের মহান মুক্তিসংগ্রামের সেই স্বাধীনতার স্ফুলিঙ্গ দীর্ঘকাল বাদে গণমানসে আবার যেন দেখতে পাচ্ছি। কবি ফরহাদ মজহারের প্রত্যাশামত এদেশের জনগণের হুঁশ বোধহয় ফিরতে শুর করেছে। ১৯৭১ সালে পিন্ডি যদি আমাদের ‘দাবায়ে’ রাখতে না পেরে থাকে, ইন্শাআল্লাহ্ ২০১১-তে দিল্লিও পারবে না।
বাংলাদেশের জনগণের উপলব্ধি করা কর্তব্য যে, আমাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে ভারতকে করিডোর দেয়ার প্রস্তাবে আমরা স্বপ্নে প্রাপ্ত কোনো ‘প্রাচুর্যের’ বিনিময়েই সম্মত হতে পারি না। আধিপত্যবাদী প্রতিবেশীকে একবার করিডোর দেয়া হলে এদেশে অশান্তি ও যুদ্ধবিগ্রহ অবশ্যম্ভাবী। ভারতের উত্তর-পূর্বের সাত রাজ্যের প্রতিটিতেই সেই ১৯৪৭ সাল থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংস আন্দোলন চলছে। সেসব সশস্ত্র সংগঠনকে দমনের জন্য বিপুলসংখ্যায় ভারতীয় কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ছয় দশক ধরে কেবল সেখানে অবস্থানই করছে না, আকাশ ও স্থলপথে তাদের বিদ্রোহ দমনের জন্য নিয়মিত প্রয়োজনীয় সামরিক রসদও প্রেরণ করা হচ্ছে। ভারতের মূল ভূখণ্ড এবং সাত রাজ্যের মাঝখানে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ার কারণে স্থলপথে রসদসমূহ জলপাইগুড়ির চিকেন নেক ঘুরে পাঠাতে হচ্ছে। ফলে একদিকে ভারত সরকারের যেমন ব্যয় বৃদ্ধি হচ্ছে, অপরদিকে বিরোধীপক্ষের সামরিক আক্রমণে চিকেন নেক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কাও সার্বক্ষণিকভাবে থেকে যাচ্ছে।
সুতরাং মুখে উন্নয়নের কথা প্রচার করা হলেও প্রকৃতপক্ষে সামরিক স্বার্থেই বাংলাদেশের বুক চিরে ভারতের করিডোর আবশ্যক। চীনের সঙ্গে ভারতের সম্ভাব্য সংঘর্ষের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ষোলো কোটি মানবসন্তানের এক দরিদ্র ও শান্তিপ্রিয় জনগোষ্ঠী। এশিয়ার দুই বৃহত্ শক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িত হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। বাংলাদেশের বর্তমান শাসকশ্রেণী ভারতকে করিডোর দিয়ে সেই দ্বন্দ্বে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টায় রত হয়েছে। তাছাড়া ভারতে বিভিন্ন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় জঙ্গিবাদ এক বিপজ্জনক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এই উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশই সামগ্রিকভাবে জঙ্গিবাদমুক্ত রয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যখন বাংলাদেশ সফর করছিলেন, সেই সময় দিল্লি হাইকোর্টে সন্ত্রাসী হামলায় শতাধিক ব্যক্তি হতাহত হয়েছে। করিডোর প্রদান করে আমরা এদেশে জঙ্গিবাদ আমদানির ঝুঁকি নিতে পারি না। বর্তমান সরকারের দেশের স্বার্থবিরোধী এসব কর্মকাণ্ডকে প্রতিহত করতে হলে দেশপ্রেমিক জনতার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
তাছাড়া অর্থনৈতিক বিবেচনাতেও করিডোর প্রদান দেশের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। এ বিষয়টি বুঝতে পেরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টারা এখন দেশবাসীকে প্রত্যক্ষ লাভের বদলে পরোক্ষ আয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরে পরিণত করার স্বপ্ন দেখানো ফতোয়াবাজরা ভোল পাল্টে সরকারকে সম্প্রতি ধীরে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন। অবশেষে শুভবুদ্ধির উদয় হওয়ার জন্য এসব মরশুমী বুদ্ধিজীবীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ড. গওহর রিজভী নতুন থিওরি কপচাচ্ছেন, শুল্ক তেমন একটা পাওয়া না গেলেও ভারতীয় ট্রাক ড্রাইভারদের সেবায় বাংলাদেশে হোটেল-রেস্তোরাঁ খুললে সেখান থেকেই আমাদের প্রচুর আয়-রোজগার হবে! এর আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ফতোয়া দিয়েছিলেন যে, একটি ‘ট্রানজিট রাষ্ট্র’ হওয়ার জন্যই নাকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। একই অর্থমন্ত্রী এমন দাবিও করেছেন যে, ২০১০ সালেই তারা ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে দিয়েছেন।
অপরদিকে ড. গওহর রিজভী এবং ড. মসিউর রহমান মনে করেন, ১৯৭২ এবং ১৯৭৪ সালে প্রণীত বাণিজ্য চুক্তি ও মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতেই নাকি মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে গেছেন। আমার বিবেচনায় এসব বক্তব্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য কেবল অবমাননাকরই নয়, সেই সঙ্গে রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলকও। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অপসংস্কৃতির সঙ্গে ভারতীয় মাদক আগ্রাসনেরও শিকারে পরিণত হয়েছে। করিডোর দেয়া হলে তরুণদের মধ্যে ভারতীয় মাদকের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য আনুষঙ্গিক অপরাধপ্রবণতাও এদেশে বৃদ্ধি পেতে বাধ্য। মরণব্যাধি ‘এইডসে’র মহামারীতে ভারত বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এ ধরনের ব্যাধি বিভিন্ন দেশে ভারী যানবাহন চালকদের মাধ্যমেই সচরাচর সংক্রমিত হয়ে থাকে। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে সর্বদিক থেকে একটি বিপজ্জনক রাষ্ট্রে পরিণত করতে উদ্যত হয়েছে। আগামী প্রজন্মকে নিরাপদ করতে হলে এদের প্রতিহত না করে উপায় নেই।
আসুন সমস্বরে বলি, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা ভারতকে দিতেই হবে, কারণ এটা আমাদের অধিকার। এবং সেই পানির বিনিময়ে করিডোর প্রদানের অপকৌশল আমরা কিছুতেই বাস্তবায়ন হতে দেবো না। ড. মনমোহন সিং তার এই সফরে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা হরণের অর্ধেকটা Framework Agreement স্বাক্ষর করতে শেখ হাসিনা সরকারকে বাধ্য করার মাধ্যমে সম্পন্ন করেছেন। এরপর করিডোর নিতে পারলেই বাংলাদেশকে আক্ষরিক অর্থেই একটি vassal state (পোষ্য রাষ্ট্র)-এ রূপান্তর করা যাবে। এ বিষয়ে দ্বিতীয় কিস্তিতে বিশদভাবে লেখার ইচ্ছে রইল। করিডোর প্রদানের সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেই এ সপ্তাহের মন্তব্য প্রতিবেদন সমাপ্ত করছি।
(দ্বিতীয় কিস্তি আগামী ২১ সেপ্টেম্বর ২০১১ বুধবার)