Tuesday, September 30, 2025

ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা: নেতানিয়াহুর পরাজয় নাকি হামাসের আত্মসমর্পণ by আরজু আহমাদ

গাজা পরিস্থিতি নতুন এক সন্ধিক্ষণে এসে হাজির হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ দফার একটি পরিকল্পনা হাজির করেছেন। যে পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বলা হচ্ছে গাজা যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটবে, কিন্তু গাজাকে যেভাবে সাজানো বা পুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সরকারি যে পরিসংখ্যান, তা জাতিসংঘ স্বীকৃত এবং নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিবেদনগুলোয় উদ্ধৃত হয়। সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজার ওপর চালিয়ে আসা ইসরায়েলি আগ্রাসনের আজ ৭২৪তম দিনে এসে মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৬৫ হাজার।

এই শতাব্দীর সবচেয়ে নজিরবিহীন এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে মাত্র ১৭ বর্গমাইলের উপত্যকাটি। এ সংখ্যা ভয়াবহ রকমের বিশাল, কিন্তু এই সংখ্যা কেবলই বোমা হামলা, জায়নবাদী স্নাইপারদের গুলি কিংবা ভবন ধ্বংসের মতো আঘাতে প্রত্যক্ষভাবে নিহত ব্যক্তিদেরই পরিসংখ্যানমাত্র।

এর বাইরে ইসরায়েলি অবরোধের দরুণ অনাহারে ধীরে ধীরে প্রাণহানির শিকার, অসুস্থতায় বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া ব্যক্তি, যাঁদের মৃত্যু ওষুধের সরবরাহ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রতিরোধযোগ্য ছিল।

কিন্তু অবরুদ্ধ অবস্থায় তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে, পঙ্গু ও অঙ্গহানির শিকার, যাঁদের নাড়াচাড়া করা কঠিন, কিংবা যাঁরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন অথচ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, সেসব ব্যক্তি; গর্ভেই যেসব শিশু সিজারিয়ান অপারেশন ও অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছে, তাদের সবার সংখ্যা হিসাব করলে এই প্রাণহানির পরিমাণ দাঁড়ায় বহুগুণ।

বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট কর্তৃক জুলাই ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, সরাসরি আঘাতের কারণে সরকারি হিসাবে যে মৃত্যুর সংখ্যা বলা হয়, তা প্রকৃতপক্ষে মোট প্রাণহানির সংখ্যার মাত্র ২০ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারি হিসাব মতে, প্রতিটি মৃতের বিপরীতে আরও চারজন মারা যাচ্ছেন ক্ষুধা, তৃষ্ণা অথবা চিকিৎসাহীনতায়। ফলে সরকারি হিসাব মতে, ৬৫ হাজার শহীদের বিপরীতে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় তিন লাখের অধিক। এ সংখ্যা চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর দিকের হিসাবে গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-অষ্টমাংশ।

লাশের এই সমুদ্রসম সারি আর লাখ লাখ আহত নিয়ে পৃথিবীর ধ্বংসস্তূপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উপত্যকাটি।

সেই গাজা উপত্যকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের সম্মিলিত চাপের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাশে রেখে ২০ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পাকিস্তান, তুরস্ক, আরব উপসাগরীয় দেশগুলো এতে সমর্থন জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে এক বছরের মধ্যে নির্বাচন করার কথাও জানিয়েছে। কিন্তু গাজার মূল শক্তি হামাস এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বলা আছে, গাজা হবে একটি নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চল, যা প্রতিবেশীদের জন্য কোনো হুমকি হবে না। গাজাকে পুনর্গঠন করা হবে, ইসরায়েল ও গাজার প্রতিনিধিরা যদি এ প্রস্তাবে সম্মত হয়, তবে এ হামলা অবিলম্বে বন্ধ হবে। ইসরায়েল তাদের সেনা প্রত্যাহার করবে, বন্দিমুক্তির প্রস্তুতি চলবে। এ সময়কালে সব সামরিক অভিযান বন্ধ থাকবে, নতুন করে কোনো প্রকার আক্রমণ করা হবে না। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সব বন্দী জীবিত ও মৃত ফেরত দেওয়া হবে। সব বন্দী মুক্ত হলে ইসরায়েল ২৫০ জন যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি বন্দী এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজা থেকে আটক করা প্রায় ১ হাজার ৭০০ জনকে মুক্তি দেবে।

এ পরিকল্পনার অধীন হামাস সদস্যদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও অস্ত্র ত্যাগ করার শর্তে দায়মুক্তি দেওয়া হবে। অন্য যাঁরা গাজা ছেড়ে যেতে চান, তাঁদের জন্য নিরাপদ প্যাসেজ প্রদান করা হবে। চুক্তির সঙ্গে সঙ্গে গাজায় অবিলম্বে ত্রাণ ও রসদ পাঠানো হবে। গাজায় ত্রাণসহায়তা বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে জাতিসংঘ, রেড ক্রিসেন্ট ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে, তাতে ইসরায়েল অথবা হামাস হস্তক্ষেপ করবে না। রাফাহ সীমান্ত খুলে দেওয়া হবে।

গাজা একটি টেকনোক্রেটিক, অরাজনৈতিক কমিটি দ্বারা শাসিত হবে। এই কমিটি গঠিত হবে নিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে নাম এসেছে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের। এর তদারকি করবে একটি নতুন আন্তর্জাতিক অস্থায়ী সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’।

এই বোর্ড অব পিস গাজার পুনর্গঠন ও বাজেট ব্যবস্থাপনা করবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করে। একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে। কাউকেই গাজা থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হবে না। হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠীর গাজার শাসনমূলকব্যবস্থায় অংশগ্রহণ থাকবে না।

গাজার সব সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে এবং পুনর্নির্মাণ করা হবে না। গাজার নিরস্ত্রীকরণ করা হবে স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে। আঞ্চলিক অংশীদারদের গ্যারান্টি দিতে হবে যাতে হামাস প্রতিবেশী, অর্থাৎ ইসরায়েলের জন্য হুমকি না হয়।

যুক্তরাষ্ট্র, আরব ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলিতভাবে একটি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) গঠন করা হবে। আইএসএফ ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবে এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে কাজ করবে। ইসরায়েল ও মিসরের সঙ্গে সীমান্ত এলাকাতেও তাদের দায়িত্ব থাকবে। ইসরায়েল গাজা দখল করবে না।

আইএসএফ গাজায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর, ইসরায়েল ধাপে ধাপে গাজা থেকে সরে যাবে এবং ইসরায়েলের সেনারা ধাপে ধাপে আইএসএফ বা গাজার অস্থায়ী প্রশাসনের হাতে এলাকা হস্তান্তর করবে। সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

গাজার পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া সামনে অগ্রসর হলে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তাদের সংস্কার পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হলে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গ্রহণযোগ্য রূপরেখা তৈরি করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে রাজনৈতিক ও ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সংলাপ শুরু করবে, যাতে শান্তি ও সমৃদ্ধি সহাবস্থান নিশ্চিত হয়। একটি স্থায়ী এবং শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের পথ তৈরি করা হবে।

সুস্পষ্টভাবেই এই চুক্তিতে একমত হওয়া হামাসের জন্য একপ্রকারের আত্মসমর্পণ। কিন্তু অনন্যোপায় হয়েই হামাসকে এ চুক্তি মানতে হবে। এই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াইকে অনন্তকালের জন্য অব্যাহত রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার নেতানিয়াহুর জন্যও এটা একপ্রকারের রাজনৈতিক পরাজয়ই বটে। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি গাজাকে সমূলে ধ্বংস করতে চেয়েছেন। যুদ্ধ থামাতে প্রস্তুত ছিলেন না।

কিন্তু এ ঘোষণায় একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট। নেতানিয়াহু তাঁর রাজনৈতিক জীবনজুড়েই এর বিরোধিতা করেছেন। ইসরায়েলের জন্যও এ যুদ্ধ ছিল ব্যাপক ব্যয়বহুল এবং বহুলাংশেই ধ্বংসাত্মক। কিন্তু তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করতে পারেননি। যদিও তাঁকে পাশে রেখে এ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। এমনকি কাতারে হামলার জন্য দেশটির আমিরের কাছে ফোন করে ক্ষমাও চাইতে হয়েছে তাঁকে।

কিন্তু নেতানিয়াহু আসলেই এ প্রস্তাবে বিশ্বাস করেন কি না, তা সন্দেহজনক। আন্তর্জাতিক রীতি ও আইনকে উপেক্ষা করার দীর্ঘ প্রতারণামূলক ইতিহাস রয়েছে ইসরায়েলের। এই চুক্তি বাস্তবায়নে একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠনের প্রশ্ন আছে। টেকনোক্র্যাট সেই শাসন বোর্ড ও টনি ব্লেয়ারের ভূমিকাও নিয়ে অস্পষ্টতা আছে।

ট্রাম্প ইতিমধ্যে হুমকি দিয়ে রেখেছেন, এ প্রস্তাব হামাস মেনে না নিলে গাজাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার যে ইসরায়েলি পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়ন করবেন। অথচ ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর এই পৃথিবীতে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় গণহত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে কারোর বিচারের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই; বরং ঔপনিবেশিকতা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনাই সুস্পষ্ট। ফলে শেষ পর্যন্ত এ ঘোষণা ফিলিস্তিনে স্বস্তি ও শান্তি আনতে কতখানি ভূমিকা রাখবে, তা এখনই সুস্পষ্টভাবে বলা কঠিন।

* আরজু আহমাদ, লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী

গাজাকে যেভাবে সাজানো বা পুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। হামাস এখন কী করবে? নেতানিয়াহু কি তাঁর প্রতিশ্রুতি রাখবেন?
গাজাকে যেভাবে সাজানো বা পুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। হামাস এখন কী করবে? নেতানিয়াহু কি তাঁর প্রতিশ্রুতি রাখবেন? -কোলাজ: প্রথম আলো

গাজার জন্য কি ক্ষীণ আশার আলো দেখা যাচ্ছে by আব্বাস নাসির

গাজায় প্রায় দুই বছর ধরে চলা ফিলিস্তিনি গণহত্যা থামিয়ে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আসবে—এমন কোনো বাস্তব আশার কারণ কি আছে? এ প্রশ্নই অনেকের মনে ঘুরছে।

আগের মতো এবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ব্যবসায়িক অংশীদার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, গাজায় শান্তি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কাছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো আগে যেমন তাঁদের আশাবাদ ভুল প্রমাণিত হয়েছিল, এবার তা হবে না, সে নিশ্চয়তা কোথায়?

আমি মনে করি, দুটি বড় ঘটনা এবার বাঁকবদল বিন্দু হতে পারে।

প্রথমটি হলো কাতারে হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। যদিও ইসরায়েল হামাস নেতাদের হত্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু এ ঘটনা বড় আকারে আলোচিত হচ্ছে।

পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র (যারা কাতারের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বে আছে এবং সেখানে তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে) শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ হামলার বিষয়ে কিছু জানত না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁদের মতে, হামাস নেতাদের হত্যা করতে ব্যর্থ হওয়ার পরই যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাটির দায় থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র তাদের এক মিত্রের ওপর হামলার নিন্দা করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে ইসরায়েলের ‘শত্রুদের যেকোনো জায়গায় টার্গেট করার অধিকার’ আছে বলে সাফাই দিয়েছে।

মূলত কাতারে ইসরায়েলি হামলায় আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়া ভয়ংকর রূপ নেয়। উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে ন্যায্যতা দিত এ যুক্তি দিয়ে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তার ঢাল। কিন্তু ইসরায়েল যখন কাতারের ওপর হামলা করল, তখন বিষয়টি পরিষ্কার হলো যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এ সুরক্ষা আসলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষা মূলত ইরান, ইয়েমেনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ কিংবা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ঠেকানোর জন্য কাজে লাগে। অর্থাৎ ইসরায়েল যদি হামলা করে, সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আরব দেশগুলোকে রক্ষা করবে না। এটাই আরব বিশ্বের চোখে এক ভয়ংকর বাস্তবতা হিসেবে ধরা দিল।

দ্বিতীয় বড় ঘটনা হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পশ্চিমা মিত্রদের কয়েকটি দেশ (যেমন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া) অবশেষে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞার কথাও বলেছে।

প্রথম বড় অগ্রগতি দেখা যায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্প যখন মিসর, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর পর থেকেই উইটকফ ও অন্যান্য সূত্র যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময়ের কথা বলতে শুরু করে।

এ বৈঠকের পর থেকেই মার্কিন মধ্যস্থতাকারী উইটকফ এবং অন্যরা যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। এখানে ‘বন্দিবিনিময়’ বলা হলেও বাস্তবে এটি অসম। কারণ, ইসরায়েল অনেক বেশিসংখ্যক বন্দীকে আটকে রেখেছে, আর অন্য পক্ষের কাছে সংখ্যাটা কম।

এরপর ট্রাম্প দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। সবচেয়ে আলোচিত ছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক। সেখানে ট্রাম্প তাঁদের ‘গ্রেট’ বলে উল্লেখ করেন এবং একসঙ্গে ‘থাম্বস আপ’ ছবিও তোলেন। যদিও বৈঠক শেষে দুই পক্ষই কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।

তবু ওয়াশিংটনভিত্তিক সাংবাদিকদের মাধ্যমে কিছু তথ্য ফাঁস হয়। সেখান থেকে ধারণা পাওয়া যায়, যদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, বন্দিবিনিময় হয় এবং ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনারা সরে যান, তাহলে পাকিস্তান হয়তো গাজায় নিরাপত্তা তদারকির জন্য একটি বহুজাতিক মুসলিম রাষ্ট্রের বাহিনীর অংশ হবে।

আরও কিছু পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, মার্কিন–সমর্থিত ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ ভেঙে দেওয়া (যা আসলে খাবার বিতরণের নামে ফিলিস্তিনিদের হত্যা ফাঁদে ফেলছিল) এবং যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে একটি নিশ্চয়তা দেওয়া যে পশ্চিম তীরকে ইসরায়েল দখল করবে না।

* আব্বাস নাসির, ডন–এর সাবেক সম্পাদক
- ডন পত্রিকা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

যত দিন যাচ্ছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবি ততই জোরালো হচ্ছে
যত দিন যাচ্ছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবি ততই জোরালো হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

টিউলিপের আশঙ্কা দোষী সাব্যস্ত করতে ‘ভুয়া’ নথি ব্যবহার হতে পারে

লন্ডনের সাবেক সিটি মন্ত্রী ও লেবার এমপি টিউলিপ সিদ্দিক বলেছেন, বাংলাদেশে চলমান দুর্নীতির মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য প্রসিকিউশন হয়তো ‘ভুয়া’ নথি ব্যবহার করতে পারে-এমন আশঙ্কা আছে তার। তিনি এ মন্তব্য করেন, যখন বৃটেন ও বাংলাদেশি সংবাদপত্রে তার নামে প্রকাশিত জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবি ছাপা হয়। সিদ্দিক বলেন, এসব নথি জাল। তিনি যোগ বলেন, এক বছর ধরে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভুয়া খবর চালানো হচ্ছে। কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি। এখন আবার জাল কাগজপত্র। মনে হচ্ছে, পরের ধাপ হবে জাল সাক্ষ্য। লন্ডনের অনলাইন দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছেন তিনি। আগাস্টের শুরু থেকে ঢাকার আদালতে টিউলিপ সিদ্দিক, তার খালা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মা শেখ রেহানা, ভাই, বোনসহ মোট ২১ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি তার খালা শেখ হাসিনার প্রভাব ব্যবহার করে ঢাকার উপকণ্ঠে পরিবারের জন্য একটি জমি বরাদ্দ করিয়েছেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

বৃটেনে তদন্ত ও পদত্যাগ: এ বছরের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের স্বাধীন উপদেষ্টা মন্ত্রিপরিষদ নীতিসংহিতা বিষয়ে তদন্ত করে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে। তবে উপদেষ্টা মন্তব্য করেন, টিউলিপ যথেষ্ট সচেতন ছিলেন না সম্ভাব্য সুনামহানির ঝুঁকি সম্পর্কে। টিউলিপ সিদ্দিক অভিযোগগুলোকে সরকারে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী দাবি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।

ভুয়া নথি নিয়ে বিতর্ক:
সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের তথ্যে বলা হয়েছে, এগুলো টিউলিপের আগের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আগে বলেছিলেন, তার কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই এবং তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রায় ২৫ বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ। সিদ্দিক আবারও দাবি করেন, তার বক্তব্য সত্য। তিনি বলেন, এসব জাল কাগজপত্রই নতুন ভুয়া প্রচারণার সূচনা হতে পারে। তবে তিনি কখনো অস্বীকার করেননি যে তিনি বাংলাদেশি নাগরিক, পাশাপাশি বৃটিশ নাগরিকও। মন্ত্রী হওয়ার সময় তিনি ট্রেজারিকে এ তথ্য জানিয়েছিলেন। দ্য গার্ডিয়ান তার ট্রেজারিকে দেয়া ঘোষণার কপি দেখেছে। লন্ডনে জন্ম নেওয়া টিউলিপ সিদ্দিক বাবা-মা উভয়ের বাংলাদেশে জন্মের কারণে বাংলাদেশি নাগরিকত্বও পান। শৈশবে তিনি বাংলাদেশি পাসপোর্ট পান। তবে ১৮ বছর বয়সের পর সেটি নবায়ন করা হয়নি। তার বিরুদ্ধে দাবি করা হচ্ছে, তিনি ২০০১ সালে লন্ডন থেকে নতুন পাসপোর্ট নেন এবং ২০১১ সালে ঢাকার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে নবায়নের আবেদন করেন। একই সঙ্গে তার জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার নম্বর রয়েছে। সিদ্দিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

পুরোনো সাক্ষাৎকার নিয়ে বিতর্ক: ২০১৭ সালে চ্যানেল ৪-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারও এখন তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কি বাংলাদেশি আইনজীবী আহমাদ বিন কাসেমের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে হস্তক্ষেপ করবেন? সিদ্দিক উত্তরে বলেন, আপনি জানেন আমি একজন বৃটিশ এমপি? আমি লন্ডনে জন্মেছি। আপনি কি ইঙ্গিত দিচ্ছেন আমি একজন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ? কারণ এটি বলা সঠিক নয়। আমি বৃটিশ, আমি হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন থেকে নির্বাচিত এমপি। তিনি এখন বলছেন, তার কথাগুলো ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আসলে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনি বৃটিশ এমপি হিসেবে বাংলাদেশি মামলায় হস্তক্ষেপ করবেন না।

আইনি সহায়তা না পাওয়া: সিদ্দিক অভিযোগ করেন, ঢাকার আদালতে তাকে কোনো আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেয়া হয়নি। কর্তৃপক্ষ এখনো তার সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন দাবি করেছে, তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় উল্লিখিত ঠিকানায় সমন পাঠানো হয়। কিন্তু সিদ্দিক বলেছেন, তিনি ওই ঠিকানায় কখনোই থাকেননি এবং এগুলো ‘ভুয়া নথি’তেই লেখা।

mzamin

গাজায় ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনায় যা আছে

গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে ঐতিহাসিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। এই পরিকল্পনা নিয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এরপরই পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এই পরিকল্পনায় আছে ২০ দফা প্রস্তাব। বলা হয়েছে, এই প্রস্তাব মেনে নিলে ইসরাইল তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে। হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে, যদি ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাস প্রস্তাব মেনে নেয়, তবে যুদ্ধ মুহূর্তের মধ্যেই থেমে যাবে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা মেনে নিয়েছেন। তবে হামাসের কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাভি বলেছেন, তারা গাজার জন্য কোনো লিখিত শান্তি পরিকল্পনা পাননি।

২০ দফা পরিকল্পনায় কি আছে তা এখানে তুলে ধরা হলো-

১. গাজাকে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত অঞ্চলে পরিণত করা হবে।

২. গাজাকে পুনর্গঠন করা হবে।

৩. উভয় পক্ষ প্রস্তাবে রাজি হলে যুদ্ধ সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হবে। ইসরাইলি বাহিনী জিম্মি মুক্তির প্রস্তুতির জন্য নির্ধারিত সীমারেখায় সরে যাবে। এ সময় সব সামরিক অভিযান-বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ বন্ধ থাকবে। যুদ্ধক্ষেত্রের সীমারেখা স্থির থাকবে, যতক্ষণ না ধাপে ধাপে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত পূরণ হয়। অর্থাৎ, দুপক্ষই তাদের জায়গা বদলাবে না। সব শর্ত যেমন, জিম্মি ও বন্দীমুক্তি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ঠিক করা ইত্যাদি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।

৪. ইসরাইল প্রকাশ্যে এই চুক্তি মেনে নেয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সব জিম্মিকে (জীবিত ও মৃত) ফিরিয়ে দেয়া হবে।

৫. সব জিম্মি ফেরত আসার পর ইসরাইল যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেবে। এর সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর আটক করা ১ হাজার ৭০০ গাজাবাসীকেও মুক্তি দেবে।

৬. সব জিম্মি ফেরত আসার পর, হামাসের যেসব সদস্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মেনে অস্ত্র ত্যাগ করতে রাজি হবেন, তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হবে। হামাসের যেসব সদস্য গাজা ছাড়তে চান, তাদের নিরাপদে অন্য দেশে যেতে দেয়া হবে।

৭. চুক্তি মেনে নেয়ার পরই গাজায় পুরোপুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশ করবে। ন্যূনতম সহায়তা সেই মাত্রায় থাকবে, যা গত ১৯ জানুয়ারির মানবিক সহায়তা চুক্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে অবকাঠামো (পানি, বিদ্যুৎ, নর্দমা ব্যবস্থা), হাসপাতাল, বেকারি মেরামত এবং ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে রাস্তা খোলার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

৮. জাতিসংঘ ও এর সংস্থাগুলো, রেড ক্রিসেন্ট এবং অন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত নয়, তারা গাজায় সহায়তা সরবরাহ ও বিতরণ করবে। রাফাহ সীমান্ত দুই দিকে খোলার বিষয়টি ১৯ জানুয়ারির চুক্তির অধীনে একই ব্যবস্থায় চলবে। অর্থাৎ, সীমান্ত খোলা ও বন্ধ হবে পুরোনো চুক্তির নিয়মে, দুপক্ষের সম্মতি ও তত্ত্বাবধানে।

৯. গাজার প্রশাসন সাময়িকভাবে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে থাকবে। রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এ কমিটি গাজার মানুষের জন্য দৈনন্দিন সেবা পরিচালনা করবে। কমিটিতে যোগ্য ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ থাকবেন। তাদের তত্ত্বাবধান করবে একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা- ‘বোর্ড অব পিস’। এর প্রধান থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সংস্থার সদস্য হিসেবে সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের নাম পরে ঘোষণা করা হবে। এ সংস্থা গাজা পুনর্গঠনের জন্য অর্থ ও কাঠামো ঠিক করবে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) সংস্কারপ্রক্রিয়া শেষ করে আবারও কার্যকরভাবে গাজার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম না হওয়া পর্যন্ত সংস্থা কাজ চালাবে। সংস্থাটির লক্ষ্য হবে গাজায় আধুনিক, কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা। সব জিম্মি ফেরত আসার পর ইসরাইল যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেবে। এর সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর আটক করা ১ হাজার ৭০০ গাজাবাসীকেও মুক্তি দেবে। এতে ওই সময় আটক সব নারী ও শিশুও থাকবে। প্রত্যেক ইসরাইলি জিম্মির মরদেহের বিনিময়ে ইসরাইল ১৫ জন গাজাবাসীর মরদেহ ফিরিয়ে দেবে।

১০. অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সফল আধুনিক শহরের পরিকল্পনায় কাজ করা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গাজা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিনিয়োগ-প্রস্তাব ও উন্নয়ন-পরিকল্পনা বিবেচনা করা হবে; যাতে কর্মসংস্থান, সুযোগ ও ভবিষ্যতের আশা তৈরি হয়।

১১. গাজায় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সঙ্গে শুল্ক ও প্রবেশাধিকারের বিষয়ে আলোচনা হবে।

১২. কাউকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না। যারা যেতে চাইবেন, যেতে পারবেন এবং ইচ্ছা করলে ফিরে আসতেও পারবেন। তবে মানুষকে গাজায় থাকতে উৎসাহ দেওয়া হবে; যাতে তাঁরা নতুন গাজা গড়ে তুলতে পারেন।

১৩. হামাস ও অন্যান্য সংগঠন প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ বা অন্য কোনোভাবে গাজার প্রশাসনে অংশ নেবে না। সব সামরিক অবকাঠামো- টানেল, অস্ত্র কারখানা ধ্বংস করা হবে এবং পুনর্নির্মাণের অনুমতি থাকবে না। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে নিরস্ত্রীকরণ করা হবে। অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করে সরিয়ে ফেলা হবে। অস্ত্র জমা দেওয়ার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক তহবিল দিয়ে এটির ক্রয় কার্যক্রম চালানো হবে। নতুন গাজা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।

১৪. আঞ্চলিক অংশীদাররা নিশ্চয়তা দেবে যে, হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী তাদের প্রতিশ্রুতি মানবে এবং নতুন গাজা প্রতিবেশী দেশ বা নিজের জনগণের জন্য হুমকি হবে না।

১৫. আরব ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র গাজার জন্য একটি অস্থায়ী বাহিনী ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ)’ গঠন করবে। এটি দ্রুত গাজায় মোতায়েন হবে। আইএসএফ গাজার জন্য বাছাই করা ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে এবং জর্ডান ও মিসরের সঙ্গে পরামর্শ করবে; যাদের এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ বাহিনী দীর্ঘমেয়াদে গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। আইএসএফ ইসরাইল ও মিসরের সঙ্গে মিলে সীমান্ত সুরক্ষার কাজও করবে। মূল লক্ষ্য হবে, গাজায় অস্ত্র প্রবেশ ঠেকানো এবং দ্রুত পুনর্গঠনের জন্য পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে একটি সমন্বয়প্রক্রিয়ায় উভয়পক্ষ রাজি হবে।

১৬. ইসরাইল গাজা দখল বা সংযুক্ত করবে না। আইএসএফ স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করলে ইসরাইলি সেনারা ধাপে ধাপে গাজা ছাড়বে। এ জন্য নিরস্ত্রীকরণের অগ্রগতি ও নির্ধারিত সময়সূচির ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা হবে। উদ্দেশ্য হবে এমন এক গাজা গড়ে তোলা, যা ইসরাইল, মিসর বা তাদের নাগরিকদের জন্য আর হুমকি হবে না। ইসরাইলি সেনারা ধাপে ধাপে গাজার নিয়ন্ত্রণ আইএসএফের হাতে তুলে দেবে। পুরো সেনা সরানোর পরও শুধু নিরাপত্তা রক্ষায় সামান্য সৈন্য থাকবে; যতক্ষণ না গাজা পুরোপুরি নিরাপদ হয়।

১৭. যদি হামাস এ পরিকল্পনা মানতে দেরি করে বা মেনে না নেয়, তবুও ইসরাইল যে জায়গা ছাড়বে (যেগুলো ‘সন্ত্রাসমুক্ত’ করা হয়েছে) সেই জায়গাগুলো আইএসএফের হাতে তুলে দেবে এবং ওই নিরাপদ এলাকায় সাহায্য ও পুনর্গঠনের কাজ চালু হবে।
১৮. গাজায় সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি আন্তধর্মীয় সংলাপ চালু হবে। এর লক্ষ্য হবে, ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বর্ণনা বদলানো; যাতে তারা শান্তির সুফল বুঝতে পারেন।

১৯. গাজা পুনর্গঠনের কাজ চলাকালে ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কারপ্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র গঠনে একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, এটাই ফিলিস্তিনি জনগণের আকাঙ্ক্ষা।

২০. যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংলাপ শুরু করবে; যাতে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সহাবস্থানের জন্য একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় তারা একমত হতে পারে।

mzamin

ইউক্রেনে ইউরোপীয় সেনা উপস্থিতি চায় না রাশিয়া, ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টার কী হবে

যুদ্ধ–পরবর্তী ইউক্রেনে ইউরোপীয় দেশগুলোর সেনা পাঠানোর বিষয়ে রাজি না হওয়ার বা ভেটোদানের ক্ষমতা চায় মস্কো। এর মধ্য দিয়ে দৃশ্যত ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগ কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। আজ বৃহস্পতিবার রাশিয়ার এ অবস্থান জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।

লাভরভ বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষে ইউরোপীয়রা ইউক্রেনে তাদের সেনা মোতায়েনের যে প্রস্তাব দিচ্ছে, সেটা কার্যকর করা হলে তা হবে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’। একে তিনি পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ইউক্রেনের নিরাপত্তার জন্য ২০২২ সালের একটি প্রস্তাবে ফিরে যেতে যায় মস্কো।

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২২ সালে ইস্তাম্বুলে ইউক্রেন নিয়ে প্রাথমিক শান্তি আলোচনায় যে কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেই আলোচনায় ফিরতে চায় মস্কো। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউরোপীয় মিত্রদের পাশাপাশি ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মস্কো ও বেইজিং সহায়তা করবে। তবে এ শর্তকে অগ্রহণযোগ্য বলেছে কিয়েভ।

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে গত সোমবার ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিসহ ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেখানে যুদ্ধ–পরবর্তী ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও এস্তোনিয়া জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষে ইউক্রেনে সেনা পাঠাবে তারা। আরও কয়েকটি দেশ এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এর আগে গত শুক্রবার আলাস্কায় ট্রাম্পের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকের পর মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমাদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়টি মেনে নিয়েছেন পুতিন। তবে লাভরভের সর্বশেষ বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, রাশিয়া আগের সেই অবস্থান ত্যাগ করেছে, অথবা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে ক্রেমলিনের অবস্থান ভুলভাবে তুলে ধরেছে ওয়াশিংটন।

এরই মধ্যে আজ রাশিয়াকে নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। রাশিয়ায় ‘পাল্টা হামলা’ চালানোর জন্য ইউক্রেনকে অনুমতি না দেওয়ায় সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ওপর দোষারোপ করেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, অনুপ্রবেশকারী দেশে পাল্টা হামলা চালানো ছাড়া যুদ্ধে জেতা খুবই কঠিন।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এ বক্তব্য কিয়েভ ও ইউরোপের রাজধানীগুলো স্বাগত জানাবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগেও কিন্তু যুদ্ধবিরতিতে না গেলে মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। ইউক্রেনের সহায়তা বাড়ানোর কথাও বলেছিলেন। পরে কিন্তু তিনি আবার তাঁর আগের অবস্থান থেকে সরে যান।

পুতিন ও জেলেনস্কির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নিয়ে যে আলাপ চলছে, তাতেও পানি ঢেলে দিয়েছেন সের্গেই লাভরভ। দুজনের এই বৈঠকের কথা তুলেছিলেন ট্রাম্প নিজেই। লাভরভ বলেছেন, পুতিন তখনই কেবল জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করবেন, যখন যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে রাশিয়ার শর্তগুলো মেনে নেওয়া হবে। আর রাশিয়ার ওই শর্তগুলো মেনে নেওয়ার অর্থ হলো ইউক্রেনের আত্মসমর্পণ।

রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে সই করার কোনো আইনগত বৈধতা জেলেনস্কির আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন করেছেন লাভরভ। এভাবে বিগত কয়েক দিনে ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিন ও জেলেনস্কির দফায় দফায় কূটনৈতিক আলোচনার পরও যুদ্ধ বন্ধে নিজেদের দাবিগুলোতে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে খুবই কম আগ্রহ দেখিয়েছে ক্রেমলিন।

এরপরও গত বুধবার বেশ ইতিবাচক সুরেই কথা বলেছে হোয়াইট হাউস। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র এদিন ফক্স নিউজকে বলেন, ‘যুদ্ধ বন্ধ ও হত্যাকাণ্ড থামাতে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের জন্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দল।’

এদিকে পুতিন যদি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাজি না হন, তাহলে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ‘কড়া প্রতিক্রিয়া’ আশা করছেন জেলেনস্কি। কিয়েভে বিদেশি সাংবাদিকদের তিনি প্রশ্ন করে বলেছিলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাবে আমি দ্রুতই সাড়া দিয়েছিলাম। আমরা প্রস্তুত আছি। তবে রুশরা যদি প্রস্তুত না থাকেন?’

গোলা ছুড়ছেন ইউক্রেনের এক সেনাসদস্য
গোলা ছুড়ছেন ইউক্রেনের এক সেনাসদস্য। ফাইল ছবি: রয়টার্স

আসামে দেশভাগ যুগের আইন পুনরুজ্জীবিত: সন্দেহভাজনকে নাগরিকত্ব প্রমাণে সময় ১০ দিন, ব্যর্থ হলেই বহিষ্কার

আসামে সন্দেহভাজন ‘অবৈধ অভিবাসী’দের মাত্র ১০ দিন সময় দেয়া হবে। এ সময়ের মধ্যে তাকে বা তাদেরকে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। ব্যর্থ হলে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বহিষ্কার করা হবে। এমনই ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (এসওপি) অনুমোদন করেছে হিমান্ত বিশ্ব শর্মা নেতৃত্বাধীন রাজ্য মন্ত্রিসভা। এই নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে ইমিগ্র্যান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট, ১৯৫০ অনুযায়ী। এটি এমন এক আইন যা মূলত দেশভাগ-পরবর্তী অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয়।

সমালোচকরা বলছেন, আসাম সরকার এই আইনকে ব্যবহার করে মানুষকে যথাযথ আইনি সুযোগ না দিয়ে জোরপূর্বক বহিষ্কার করছে। এ খবর দিয়েছে ভারতের অনলাইন স্ক্রল। এতে আরও বলা হয়, এতদিন আসামে সন্দেহভাজন বিদেশিদের মামলা যেত ফরেনার্স ট্রাইবুনালে। যদিও এই ট্রাইবুনালগুলো প্রায়শই এলোমেলো রায় দিয়ে মানুষকে বিদেশি ঘোষণা করেছে, ভুক্তভোগীরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারতেন। এর বাইরে ভারতের কেন্দ্রীয় নীতিমালা অনুযায়ী বহিষ্কারের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রত্যাশিত জন্মভূমি দেশের সঙ্গে জাতীয়তা যাচাই করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু মে মাস থেকে দেখা যায় আসাম পুলিশ আদালতে বিচারাধীন মানুষদেরও ধরে এনে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক সময় বন্দুকের মুখে তাদেরকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। দুই সপ্তাহে ৩ শতাধিক মানুষকে এভাবে তাড়ানো হয়। তাদের প্রায় সবাই বাঙালি মুসলিম বংশোদ্ভূত।

নতুন নিয়মের সরকারি সারাংশ অনুযায়ী, জেলা কমিশনার যদি কোনো সূত্র থেকে তথ্য পান যে কেউ ‘অবৈধ অভিবাসী’, তবে তিনি সেই ব্যক্তিকে ১০ দিনের মধ্যে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বলবেন। প্রমাণ সন্তোষজনক না হলে জেলা কমিশনার লিখিতভাবে তাকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ ঘোষণা করবেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বহিষ্কারের নির্দেশ দেবেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১০ দিন প্রমাণ জোগাড়ের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। ভোটার তালিকা বা জমির খতিয়ান তুলতে কয়েক সপ্তাহ লাগে। ২০১৯ সালের এনআরসি আপডেটের সময়ও লাখো মানুষ নাগরিকত্ব প্রমাণে হিমশিম খায়। এই প্রক্রিয়া কার্যত জেলা প্রশাসনকে ‘বিচারিক, জুরি ও জল্লাদ’ বানিয়ে দিচ্ছে।

১৯৫০ সালের আইনে দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে আসামের নেতারা আশঙ্কা করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে ব্যাপক অনুপ্রবেশ হবে। তাই নেহরু সরকার ইমিগ্র্যান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট, ১৯৫০ চালু করে। তবে একই বছরে নেহরু-লিয়াকত চুক্তির পর আইনের প্রয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৪ সালে গড়ে ওঠে ফরেনার্স ট্রাইবুনাল। এতদিনে ট্রাইবুনালগুলো ৪.৩৬ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করেছে, যার মধ্যে ১.৩২ লাখ মানুষকে ভারতীয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এসওডিতে জেলা কমিশনাররা ‘যত বেশি সম্ভব বিদেশি চিহ্নিত করার প্রতিযোগিতায়’ নামবেন। এর শিকার হবেন মূলত বাঙালি মুসলিম সংখ্যালঘুরা। আসাম হাইকোর্টের আইনজীবীরা প্রশ্ন তুলছেন- কেন্দ্রীয় আইন থাকা সত্ত্বেও কি রাজ্য মন্ত্রিসভা এমন নির্দেশনা দিতে পারে? বিরোধী নেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকার দ্বিচারিতা করছে। একদিকে ২০১৯ সালের সিএএ’র মাধ্যমে হিন্দু অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে মুসলিমদের নিশানা বানাচ্ছে।

mzamin

নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা: এরপর দক্ষিণ এশিয়ায় কোথায় আগুন জ্বলবে!

লোহার ফটকের কাঁপন যেন ঢাকের শব্দে রূপ নিল, জনতা এগিয়ে এলো ঢেউয়ের মতো। দেহের সমুদ্র ভেঙে ফেলল ব্যারিকেড- যা মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও ক্ষমতার প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দেশের নেতার বাড়ির করিডোরে প্রতিধ্বনিত হলো কাদামাখা পায়ের গর্জন। কেউ ভাঙল জানালা ও শিল্পকর্ম, কেউ তুলে নিল বিলাসবহুল বিছানার চাদর কিংবা জুতো। যে অট্টালিকা এতদিন কর্তৃত্বের প্রতীক হয়ে ছিল, অস্পৃশ্য, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে- তা হঠাৎ করেই কয়েক ঘণ্টার জন্য জনগণের হাতে চলে এলো। এ দৃশ্য নেপালের, গত সপ্তাহের। তবে এটি একইসাথে শ্রীলঙ্কার (২০২২) এবং বাংলাদেশের (২০২৪) ছবিও। অনলাইন আল জাজিরায় প্রকাশিত এক দীর্ঘ প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত ৩ কোটি মানুষের দেশ নেপাল এখন এমন এক পথে হাঁটছে যা প্রচলিত নির্বাচনী গণতন্ত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। একের পর এক যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে দক্ষিণ এশিয়ায় সরকার পতন ঘটছে। তাই প্রশ্ন উঠছে- বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চল কি জেনারেশন জেড বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে?

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, এটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। এক ধরনের নতুন অস্থিরতার রাজনীতি তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রায় ১০ হাজার নেপালি তরুণ- যাদের মধ্যে প্রবাসীরাও ছিলেন, তারা একজন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করল না শারীরিক ভোটে, না নির্বাচনী ব্যালটে, বরং গেমারদের প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ডে অনলাইন জরিপের মাধ্যমে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে তিন দিনের আন্দোলন সহিংস রূপ নিলে, নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নে ৭০ জনেরও বেশি নিহত হন। পরে নেপাল সরকার মার্চে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি যখন আন্দোলনকারীদের ‘জেন জেড উৎস’ নিয়ে ঠাট্টা করলেন, তার অল্প কিছুদিন পরেই তাকে পদত্যাগ করতে হলো। বার্তা স্পষ্ট- রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আস্থাহীন তরুণরা নিজেদের ক্ষমতাসীন ঘোষণা করছে যখন তারা প্রতারিত মনে করছে। স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রতিবাদের ইতিহাস আছে। কিন্তু শাসক পতনের ঘটনা বিরল। এটি সামরিক অভ্যুত্থান বা প্রচলিত রাজনৈতিক সংঘাতের ধারা নয়, বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রূপ।

তিন ভিন্ন প্রেক্ষাপট, এক অভিন্ন দৃশ্য

শ্রীলঙ্কা (২০২২): অর্থনৈতিক ধস, ঋণ খেলাপি, জ্বালানি ও খাদ্য ঘাটতি, আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি। জন্ম নিল ‘আরাগালায়া’ (সংগ্রাম) আন্দোলন। যুবকরা ‘গোটা গো ভিলেজ’ বানালো কলম্বো প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের সামনে। জুলাইতে প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
বাংলাদেশ (২০২৪): বৈষম্যমূলক চাকরির কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন। পুলিশি দমনপীড়নে শত শত নিহত হন। পরে আন্দোলন রূপ নেয় শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান দাবিতে। আগস্টে হাসিনা পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারে ভারতে পালান।
নেপাল (২০২৫): সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণ, তীব্র বৈষম্য, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন ৭০ জনের বেশি। পার্লামেন্ট ও মিডিয়া হাউসেও আগুন জ্বলে ওঠে। অবশেষে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী ওলি।

সাধারণ সূত্র: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে জেন জেড
মানবাধিকার সংস্থার মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, এই দেশগুলোতে যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মূল কারণ একই- অমীমাংসিত বৈষম্য, দুর্নীতি, প্রবীণ রাজনীতিকদের প্রজন্ম থেকে বিচ্ছিন্ন শাসন। জেন জেড তাদের জীবনে দুটি বড় মন্দা দেখেছে- ২০০৮-০৯ সময়ে এবং কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধস। এ প্রজন্ম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের শাসন করেছেন দাদা-দাদীর বয়সী নেতারা।  তার মধ্যে নেপালে ওলি (৭৩), বাংলাদেশে হাসিনা (৭৬), শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে (৭৪)। তরুণদের নৈতিক ক্ষোভ প্রবল হয়েছে স্বজনপ্রীতি, বৈষম্যমূলক বিলাসিতার প্রদর্শনী এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের জীবনযাত্রা দেখে।

ডিজিটাল প্রজন্মের শক্তি
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রুমেলা সেন বলেন, রাগান্বিত দৃশ্যের বাইরে দেখলে বোঝা যায়, এই তরুণদের আকাঙ্ক্ষা হলো ‘গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’ ডিজিটাল দক্ষতার কারণে তারা অনায়াসে অনলাইনে সংগঠন, প্রচার ও প্রতিবাদের নতুন কৌশল তৈরি করছে। সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করলে বা প্ল্যাটফর্ম ব্লক করলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। তিনি বলেন, এ প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যৎ চুরি হয়ে যেতে দেখছে। তাদের ক্ষোভ একেবারেই সত্যিকারের।

একে অপরের কাছ থেকে শিক্ষা
রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানী জীবন শর্মা বলেন, নেপালি তরুণরা শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের আন্দোলন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। এসব বিদ্রোহ আলাদা নয়, বরং গভীর হতাশা থেকে জন্ম নেয়া। স্ট্যানিল্যান্ডও বলেন, এরা একে অপরকে দেখছে, শিখছে এবং অনুপ্রাণিত হচ্ছে।
অবশেষে প্রশ্ন রয়ে যায়-এরপর কোথায় আগুন জ্বলবে?
https://mzamin.com/uploads/news/main/180299_Untitled-10.webp

ইরানের তেল নাকি ইসরায়েলের প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে এক থ্রিলার by লতিফুল হক

ইরান ও ইসরায়েল দুই দেশই ভারতের মিত্র। ইরান থেকে তেল কেনে ভারত, ইসরায়েল থেকে নেয় প্রযুক্তি। কিন্তু ইরান ও ইসরায়েল যখন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, তখন কার পক্ষ নেবে ভারত? নাকি ‘নীরবতা’ বেছে নেবে? আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই জটিল আর ধূসর দুনিয়ায় আলো ফেলেছে অরুণ গোপালনের থ্রিলার সিনেমা ‘তেহরান’।

জন আব্রাহাম অভিনীত থ্রিলারটি দর্শককে নিয়ে যায় এমন এক দুনিয়ায়, যেখানে নৈতিকতা ও বাস্তবতার মধ্যে সূক্ষ্ম সীমারেখা আঁকা হয়েছে। বাস্তব ঘটনার ছায়া ধরে তৈরি এই সিনেমা শুধু অ্যাকশন নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও মানবিক গল্পের উপাখ্যান।

‘তেহরান’ সিনেমার গল্পের মূল উৎস ২০১২ সালে নয়াদিল্লিতে ঘটে যাওয়া একটি হামলা, যেখানে ইসরায়েলি কূটনীতিকের গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ হয়।

একই দিনে জর্জিয়া ও থাইল্যান্ডেও ইসরায়েলি কূটনীতিকদের গাড়িতে একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ইসরায়েল তখনই ইরানকে সন্দেহ করেছিল। এই রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকেই তৈরি হয়েছে ‘তেহরান’।

সিনেমার নায়ক এসিপি রাজীব কুমার (জন আব্রাহাম) একটি বিশেষ পুলিশ ইউনিটের নেতৃত্ব দেন। তাঁর লক্ষ্য, হামলার মূল উৎস খুঁজে বের করা। দিল্লিতে হামলার পর যখন তাঁকে সেই তদন্তভার দেওয়া হয়, তিনি নিতে চাননি। তবে তাঁকে নাড়িয়ে দেয় এক পথশিশুর মৃত্যু। রাস্তায় ফুল বিক্রি করত মেয়েটি। আসা-যাওয়ার পথে রাজীব নিজেও কতবার ফুল কিনেছেন। হাসপাতালে রাজীবের চোখের সামনেই মৃত্যু হয় মেয়েটির, ছোট ভাইটির ফ্যাকাশে চোখ রাজীবের ভেতরটা দুমড়ে–মুচড়ে দেয়। শুরু হয় তদন্ত। রাজীব দ্রুতই বুঝতে পারেন, এই হামলার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর যোগ আছে।

ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় হামলার কারণ। এর আগে ইসরায়েল বেছে বেছে ইরানের পরমাণু বিশেষজ্ঞদের হত্যা করেছে, ইরান প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলি কূটনীতিকদের গাড়িতে হামলা চালিয়েছে। তদন্তে নেমে রাজীব বুঝতে পারেন এই ঘটনার শেকড় অনেক গভীরে। মূল উৎপাটনের  জটিল আর ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে যখনই তিনি নামবেন, তখনই তদন্ত থামিয়ে ফিরতে বলা হয়। কারণ, শিগগিরই ইরানের সঙ্গে তেল চুক্তি করবে ভারত। তার আগেই দেশটি চায় না ইরানকে অপরাধী হিসেবে সামনে এনে অস্বস্তি বাড়াতে। কিন্তু রাজীব খ্যাপাটে, বেপরোয়া এক কর্মকর্তা; তিনি কি ফিরবেন সরকারের নির্দেশ মেনে?

বেশ কিছু খামতি থাকলেও মোটের ওপর ‘তেহরান’ বেশ উপভোগ্য সিনেমা। এর সবচেয়ে বড় শক্তি বাস্তবঘেঁষা নির্মাণ। পরিচালক এটিকে বাণিজ্যিক উপাদান মিশিয়ে মচমচে থ্রিলার বানাতে চাননি বরং চেয়েছেন ছবিটি যেন দর্শকের ভাবনা নাড়িয়ে দেয়। ছবিতে গান নেই, গ্ল্যামার নেই, নায়কোচিত কোনো ব্যাপার নেই; মোট কথা বাণিজ্যিক থ্রিলারের ফর্মুলায় হাঁটেননি তিনি। ছবিতে অ্যাকশন আছে, ধাওয়ার দৃশ্য আছে, রোমান্স আছে, কিন্তু সেটা সিনেমাকে ছাপিয়ে যায়নি। বরং সব চরিত্রের নৈতিক দ্বন্দ্ব আর মানবিক প্রশ্ন মিলিয়ে ভিন্ন মেজাজ তৈরি করেছে।অনেক হিন্দি সিনেমায় আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রসঙ্গ কেবল পটভূমি হিসেবে ব্যবহার হয়। কিন্তু ‘তেহরান’ আলাদা।

পরিচালক অরুণ গোপালন এবং লেখক রিতেশ শাহ, বিন্দি কারিয়া ও আশিষ প্রকাশ ভার্মা গল্পে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। ভারতে স্পাই থ্রিলার মানেই পাকিস্তান প্রসঙ্গ; তবে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমাটি দর্শককে নতুনত্বের স্বাদ দিয়েছে।ভারতের অবস্থান, ইসরায়েল ও ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, আর ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ—সবই সিনেমায় বাস্তবভাবে ফুটে উঠেছে।

পুরোপুরি বাণিজ্যিক সিনেমার সঙ্গে বেশ কয়েকটি ভিন্নধারার সিনেমা করেছেন জন আব্রাহাম। অনেক ছবিতে তাঁকে দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে; এ ধরনের চরিত্রে তিনি যে ভালো মানিয়ে যান, বলাই বাহুল্য। আবেগের দৃশ্যগুলোতে কিছুটা খামতি থাকলেও মোটের ওপর ভালো করেছেন তিনি। মানবিক ও খ্যাপাটে পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে তিনি মানিয়ে গেছেন।

‘মাদ্রাজ ক্যাফে’, ‘বাতলা হাউস’, ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ সিনেমাগুলো তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে।বাকি অভিনেতারাও যথাযথ। তবে রাজীবের সহকর্মী বিদ্যা চরিত্রে মানুষি ছিল্লারকে কেন নেওয়া হয়েছে বোঝা গেল না, চিত্রনাট্য তাঁর কিছু করার মতো জায়গাই ছিল না। তবে আর অ্যান্ড ডব্লিউ প্রধান হিমাদ্রির চরিত্রে চমকে দিয়েছেন বাঙালি নির্মাতা কৌশিক মুখার্জি ওরফে কিউ। এর আগে দক্ষিণি ছবিতে তাঁকে খলনায়ক হিসেবে দেখা গেছে। এ সিনেমা হয়তো অনুরাগ কশ্যপের মতো তাঁর সামনেও পর্দার ‘ধূসর দুনিয়া’ খুলে দিতে পারে।

চিত্রগ্রাহক ইভজেনি গুব্রেঙ্কো ও আন্দ্রে মেনেজেসের ক্যামেরা সিনেমার গুরুগম্ভীর মেজাজের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। কেমন সৌধর আবহসংগীত চলনসই।ইরান সরকারের সঙ্গে বিদ্রোহী সেনাসদস্যদের দ্বন্দ্ব, ফিলিস্তিনকে সমর্থন, মোসাদের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাজ করা—সব মিলিয়ে সিনেমাটির যেন বিশ্ব রাজনীতির জানা-অজানা নানা অধ্যায় সামনে এনেছে। অবশ্যই সিনেমায় কে না জানে এর অনেক কিছুই বাস্তব থেকে নেওয়া।ফি সপ্তাহে ওটিটিতে আসা এন্তার থ্রিলারের সঙ্গে ‘তেহরান’কে মেলানো যাবে না।

নির্মাতারা হয়তো সচেতনভাবেই চেয়েছেন এটি যেন জনপ্রিয়তার দৌড়ে শামিল না হয়। কারণ, ছবির বড় অংশজুড়ে ফারসি সংলাপ, যা হিন্দি সিনেমার সাধারণ দর্শকবান্ধব নয়। সে কারণেই হয়তো নির্মাণের তিন বছর পর সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে নয়, মুক্তি পেয়েছে ওটিটিতে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-16%2Fsmmiy7cy%2FMV5BZDgyMGUxMDItYWViOC00OWM1LTljOWEtODRhM2I4MGJmNTJlXkEyXkFqcGc___V1_.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
‘তেহরান’ সিনেমার পোস্টারে জন। আইএমডিবি

Monday, September 29, 2025

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতিতে নতুন প্রশ্ন, নেতৃত্ব দেবে কে? by পল অ্যাডামস

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসে আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেন ফিলিস্তিনি কূটনীতিক হুসাম জমলট। তখনই বৃটেন, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দেয় বেলজিয়াম। জমলট একে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আখ্যা দিয়ে বলেন, নিউইয়র্কে যা হতে যাচ্ছে, সেটিই হয়তো দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান কার্যকর করার শেষ চেষ্টা। সেটা ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না।

কয়েক সপ্তাহ পর বৃটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও একই পদক্ষেপ নিল। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে আমরা শান্তির সম্ভাবনা ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান টিকিয়ে রাখতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। নিরাপদ ইসরাইলের পাশাপাশি টিকে থাকার মতো একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু এ মুহূর্তে আমরা কোনোটিই পাইনি।

এর আগে ১৫০টির বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে বৃটেন ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বলে মনে করছেন অনেকেই। সাবেক কর্মকর্তা জাভিয়ের আবু ঈদ বলেন, ফিলিস্তিন এখন বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে আছে। বিশ্ব ফিলিস্তিনের পক্ষে সংগঠিত।

রাষ্ট্রস্বীকৃতির জটিল প্রশ্ন:
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- কোন ভূখণ্ডকে ফিলিস্তিন বলা হচ্ছে? রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির জন্য ১৯৩৩ সালের মন্টেভিডিও কনভেনশন চারটি মানদণ্ড দিয়েছে। ফিলিস্তিনের আছে স্থায়ী জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা। কিন্তু ‘সংজ্ঞায়িত ভূখণ্ড’ বা কার্যকর সরকার নেই। ফিলিস্তিনিদের স্বপ্নের রাষ্ট্র হলো তিন অংশে বিভক্ত। তাহলো পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা। এর সবই ইসরাইল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করে। পশ্চিম তীর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে ইসরাইলি দখল ও বসতি স্থাপনের কারণে। গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত। আর পূর্ব জেরুজালেম বসতি দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে।

নেতৃত্ব সংকট: রাষ্ট্রের জন্য কার্যকর সরকার প্রয়োজন। কিন্তু ২০০৭ সালের পর থেকে ফাতাহ ও হামাসের দ্বন্দ্বে গাজা ও পশ্চিম তীরে দুই ভিন্ন শাসনব্যবস্থা চলছে। মাহমুদ আব্বাস নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ কার্যত অসহায়। সেখানে সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০০৬ সালে। এর মানে ৩৬ বছরের নিচে কেউ কখনো ভোট দেয়নি। আইনজীবী ডায়ানা বুত্তু বলেন, এত বছর নির্বাচন হয়নি- এটা অকল্পনীয়। নতুন নেতৃত্ব দরকার। এই নেতৃত্ব সংকটে বারবার উঠে আসে কারাগারে বন্দি মারওয়ান বারঘুতির নাম। জনসমর্থনে তিনি আব্বাসের চেয়ে অনেক এগিয়ে, যদিও ২০০২ সাল থেকে ইসরাইলি কারাগারে আছেন। জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি ফিলিস্তিনি তাঁকেই ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে চান।

ইসরাইলের অবস্থান: বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহুবার স্পষ্ট করেছেন, তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র চান না। বরং নতুন বসতি অনুমোদন দিয়ে পূর্ব জেরুজালেমকে পশ্চিম তীর থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করেছেন। ইসরাইলি মন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ বলেন, স্বীকৃতি দেয়ার মতো কোনো রাষ্ট্র নেই, আর স্বীকৃতি দেয়ার মতো কেউ নেই।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও বাস্তবতা: ফ্রান্স-সৌদি আরবের পৃষ্ঠপোষকতায় গৃহীত ‘নিউইয়র্ক ডিক্লারেশন’-এ বলা হয়েছে, হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করে গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের হাতে দিতে হবে। ১৪২টি দেশ এটি সমর্থন করেছে। হামাসও বলেছে, তারা টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের হাতে দায়িত্ব ছাড়তে প্রস্তুত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছেন এবং তার ‘রিভেরা প্ল্যান’-এ গাজার দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কোনো উল্লেখ নেই।

প্রতীকী স্বীকৃতির সীমাবদ্ধতা: ডায়ানা বুত্তু মনে করেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মূল্যবান হতে পারে, তবে নির্ভর করছে দেশগুলোর উদ্দেশ্যের ওপর। লন্ডনের কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল প্রতীকী স্বীকৃতিতে কাজ হবে না, বাস্তব অগ্রগতি দরকার। যেমন পশ্চিম তীর-গাজার একত্রীকরণ, নির্বাচন আয়োজন, পুনর্গঠন পরিকল্পনা ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে বড় বাধা ইসরাইলের কঠোর বিরোধিতা। ইসরাইল ইতিমধ্যে পশ্চিমতীর দখল করার হুমকি দিয়েছে।

শেষ কথা: অতএব, রাষ্ট্রস্বীকৃতি পেলেও ফিলিস্তিন এখনো কার্যকর নেতৃত্বহীন। আব্বাস প্রায় ৯০ বছরের, বারঘুতি কারাগারে, হামাস বিপর্যস্ত, আর পশ্চিম তীর খণ্ডিত। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অবশ্যই প্রতীকী শক্তি দেয়, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি বিষয় হলো- গাজায় রক্তপাত বন্ধ করা। ডায়ানা বুত্তু বলেন, আমার কাছে রাষ্ট্রস্বীকৃতির চেয়ে জরুরি হলো হত্যাযজ্ঞ থামানো। দেশগুলোকে এখনই কিছু করতে হবে।
(অনলাইন বিবিসি থেকে অনুবাদ)

mzamin

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়ায় নিউজিল্যান্ডে হতাশা

নিউজিল্যান্ড সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি না দেয়ার সিদ্ধান্তে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন দেশটির বিরোধী দল, ফিলিস্তিনি সংগঠন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত নিউজিল্যান্ডকে ইতিহাসের ভুল পাশে দাঁড় করিয়েছে এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সঙ্গেও বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।

এতে আরও বলা হয়, গত সপ্তাহে বৃটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বিশেষ সম্মেলনের আগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ মাস পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৫৭টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছিল, নিউজিল্যান্ডের জোট সরকারও একই পদক্ষেপ নেবে, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন ও অন্যান্য মন্ত্রীর পূর্ববর্তী মন্তব্যের আলোকে।

কারণ তারা বলেছিলেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়া হবে ‘কবে দেয়া হবে, সেটা প্রশ্ন, দেয়া হবে কি না- সেটা নয়।’ কিন্তু শনিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স জানান, যদিও নিউজিল্যান্ড দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে এখনই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে না। তিনি বলেন, যুদ্ধ চলমান অবস্থায়, হামাস যখন গাজার কার্যত শাসক, আর ভবিষ্যতের কোনো ধাপ পরিষ্কার নয়- তখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

তাই এখনই নিউজিল্যান্ডের পক্ষে স্বীকৃতি ঘোষণা করা যুক্তিযুক্ত হবে না। পিটার্স আরও দাবি করেন, স্বীকৃতি দেয়ার ফলে যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টায় জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত অনেক নিউজিল্যান্ডারের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছেন। সোমবার অকল্যান্ডে অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রীর অফিসের সামনে অ্যাংলিকান ও ক্যাথলিক ধর্মযাজকরা নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্ক বলেন, নিউজিল্যান্ড নিজেকে ‘ইতিহাসের ভুল পাশে’ দাঁড় করিয়েছে।

তিনি আরএনজেড’কে বলেন, যত বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে একটি সমাধানের পথে এগোনোর অংশ হিসেবে, নিউজিল্যান্ড ততটাই পিছিয়ে পড়ছে এবং এর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির ঘোষণাগুলো এসেছে এমন সময়ে, যখন ইসরাইল গাজা শহরে হামলা তীব্র করেছে এবং আশঙ্কা তৈরি হয়েছে স্বীকৃতির প্রতিশোধ হিসেবে পশ্চিম তীর দখল করতে পারে তারা। এর আগে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান কমিশন জানিয়েছে, ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে।

mzamin

খেলাধুলায় ‘চ্যাম্পিয়ন’ ফিলিস্তিনি কিশোরকে মরতে হলো খাবারের অভাবে

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় অনাহার ও অপুষ্টিতে ভুগে গতকাল শনিবার ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর মারা গেছে। আগে তার কোনো অসুস্থতা ছিল না। কিন্তু খাবারের অভাবে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে সে মারা যায়। কিশোরের স্বজনেরা ও চিকিৎসাকর্মীরা এমনটাই বলেছেন।

ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজা উপত্যকার মানুষ তীব্র সংকটে আছে। সেখানকার মানুষ এখন খাবারের জন্য মরিয়া। ইসরায়েল সেখানে ত্রাণ পৌঁছাতে দিচ্ছে না।

শনিবার মারা যাওয়া ওই কিশোরের নাম আতেফ আবু খাতের। গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালের একটি সূত্র আল–জাজিরাকে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

আল–জাজিরার গাজা প্রতিনিধি হানি মাহমুদ বলেন, আতেফ স্থানীয়ভাবে খেলাধুলায় চ্যাম্পিয়ন ছিল। কিন্তু খাবার খেতে না পারায় তার ওজন কমে যায়। প্রচণ্ড অপুষ্টিতে ভোগার পর অবশেষে সে মারা যায়। হানি আরও বলেন, আতেফ গাজায় তীব্র অপুষ্টির শিকার হাজার হাজার মানুষের একজন মাত্র।

আল–জাজিরার যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আতেফের পরিবার তাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছে। সেখানে তার শীর্ণকায় মরদেহ দেখা যাচ্ছে। তাঁর মুখ ক্যামেরা থেকে আড়াল রাখা হয়েছে।

আতেফ আবু খাতেরের পরিবার বলেছে, মৃত্যুর সময় তার ওজন কমে মাত্র ২৫ কেজি হয়েছিল। আগে তার ওজন ছিল ৭০ কেজি। ২৫ কেজি ওজন সাধারণত নয় বছর বয়সী শিশুদের হয়ে থাকে। আতেফের গালে একটুও চর্বি ছিল না। মুখমণ্ডলের হাড়গুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল।

ভিডিওতে দেখা যায়, আতেফের এক আত্মীয় তার পাঁজরের প্রতিটি হাড় আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখাচ্ছিলেন। তার পাঁজরের হাড়গুলো যেন গোনা যাচ্ছিল।

উইসাম শাবাত নামের এক সাংবাদিক ভিডিওটি নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন না খেতে পেরে এবং চিকিৎসার অভাবে আতেফের শরীরে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। আতেফ যখন হাসপাতালে আসে, তখন তার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন ছিল। শেষ পর্যন্ত সে মারা যায়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৯ জন ফিলিস্তিনি অনাহারে বা অপুষ্টিতে ভুগে মারা গেছে। এর মধ্যে ৯৩ জনই শিশু।

জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবিক সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোয় গাজায় ত্রাণ সরবরাহের ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হলেও ফিলিস্তিনিরা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। তাদের পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক সমালোচনার মুখে ইসরায়েল বলেছে, তারা ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণসহায়তা বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে উড়োজাহাজ থেকে নিচে খাবার ফেলার মতো ব্যবস্থাও আছে।

তবে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, এ ধরনের সহায়তা ঝুঁকিপূর্ণ ও অকার্যকর। তাদের দাবি, গাজার সব সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়া হোক, যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা অবাধ প্রবেশ করতে পারে।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি শনিবার বলেন, ‘গাজায় যে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ চলছে, তা মূলত জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত বিতর্কিত সংস্থা জিএইচএফকে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টার ফল।’

গাজায় জিএইচএফ পরিচালিত ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে খাবার নিতে আসা ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে নিয়মিত গুলি চালাচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা। জাতিসংঘ চলতি সপ্তাহে বলেছে, মে মাসে এই সংস্থার কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে এক হাজার তিন শতাধিক ত্রাণপ্রত্যাশী নিহত হয়েছে।

লাজারিনির অভিযোগ, ইসরায়েল সক্রিয়ভাবে জাতিসংঘ ও অন্য মানবিক সংস্থাগুলোকে ফিলিস্তিনিদের জন্য জীবনরক্ষাকারী ত্রাণ পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে। তিনি একে গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ প্রয়োগ ও তাদের শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পিত চেষ্টা বলেছেন।

এক্সে দেওয়া পোস্টে লাজারিনি লিখেছেন, আর সময় নষ্ট করা যাবে না। সীমান্তগুলো নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়ার জন্য এখনই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।

শিশুরা ধুঁকে ধুঁকে মরছে

এদিকে গাজার হাজার হাজার ফিলিস্তিনি পরিবার মরিয়া হয়ে খাবার ও অন্যান্য জরুরি জিনিস খুঁজে বেড়াচ্ছে। গতকাল গাজার মধ্যাঞ্চলীয় দেইর আল-বালাহ থেকে আল–জাজিরার সংবাদকর্মী হিন্দ খৌদারি বলেন, ইসরায়েল সৃষ্ট খাদ্যসংকটের কারণে শিশুসহ অনেক মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তেমনই একজন মিস্ক আল-মাধুন। অপুষ্টিতে ভোগা পাঁচ বছর বয়সী শিশুটিকে খাওয়ানোর মতো কোনো কিছুই তাঁদের কাছে নেই। তাঁরা বলছেন, প্রতিদিন চোখের সামনে তাঁরা তাঁদের মেয়েটিকে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখছেন। মা-বাবারা তাঁদের সন্তানদের বাঁচাতে যা যা করা সম্ভব, সবই করছেন বলে উল্লেখ করেন খৌদারি।

খৌদারি বলেন, ‘আমরা এমন অনেক মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি, যাঁরা দুধ না পেয়ে বাধ্য হয়ে শিশুদের শুধু পানি খাওয়াচ্ছেন। কারণ, তাঁদের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। আমরা আরও দেখছি, ফিলিস্তিনি মা-বাবারা প্রতিদিন প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ পথ হেঁটে রান্না করা খাবার বা ত্রাণ বিতরণকেন্দ্র খুঁজে ফিরছেন। এমনকি কেউ কেউ জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রগুলোতেও যাচ্ছেন। সেখানে তাঁরা মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকেন, আহত হন কিংবা খালি হাতেই বাড়ি ফেরেন।

গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক ক্ষুাবিষয়ক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) বলেছে, গাজায় দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হচ্ছে। সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার বেশির ভাগ এলাকায় মানুষ এত কম খাবার পাচ্ছে যে তা এখন দুর্ভিক্ষের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, অবিরাম সংঘর্ষ, গণহারে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সহায়তা প্রবেশে কঠোর বাধা, স্বাস্থ্যসেবাসহ প্রয়োজনীয় সব পরিষেবায় ধস নামার কারণে এই সংকট এখন এক ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছেছে।

খাবারের জন্য ফিলিস্তিনিরা গাজায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিচালিত বিতর্কিত সংস্থা জিএইচএফ পরিচালিত বিতরণ কেন্দ্রগুলোয় ভিড় জমায়
খাবারের জন্য ফিলিস্তিনিরা গাজায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিচালিত বিতর্কিত সংস্থা জিএইচএফ পরিচালিত বিতরণ কেন্দ্রগুলোয় ভিড় জমায়। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

গণ–অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ–নেপালে যে ৫টি জায়গায় বিস্ময়কর মিল by সুশীম মুকুল

নেপালের সরকার পতনের সঙ্গে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের সরকার পতনের বিস্ময়কর মিল দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে যেমন ছোট্ট একটি ইস্যু থেকে তরুণদের আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু হয়েছিল এবং তার জের ধরে নির্বাচিত সরকারের পতন হয়েছিল; নেপালেও তা–ই ঘটল।

কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করার পর সেখানে সেনাপ্রধান কার্যত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। পুরো ঘটনাই যেন ঢাকার ঘটনা পুনরাবৃত্তি। বিশেষ করে পাঁচটি ক্ষেত্রে এই দুই দেশের ঘটনায় আশ্চর্য রকমের মিল পাওয়া যাচ্ছে।

১. তরুণদের নেতৃত্ব

বাংলাদেশের মতো নেপালেও আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি। কাঠমান্ডু থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এক দিনে ছড়িয়ে পড়ে পোখারা, বিরাটনগর, ভরতপুরসহ ৭৭ জেলার রাজধানীতে। নেপালের ৩ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ জেন–জি; আর ৯০ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। তাই আন্দোলন মুহূর্তেই ব্যাপক হয়ে ওঠে।

স্কুল-কলেজের পোশাক পরা হাজারো শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছিল। ‘যুবসমাজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে’ স্লোগান তুলেছিল, যেটি সংগঠিত করেছিল এনজিও ‘হামি নেপাল’। এর নেতৃত্বে ছিলেন ৩৬ বছর বয়সী কর্মী সুদান গুরুং।

এই তরুণেরা ‘নেপো বেবি’ আর ‘নেপো কিডস’-এর বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিজাত পরিবারের সন্তানদের চাকচিক্যময় জীবনযাত্রা নিয়ে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছিল।

বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কারণ, কোটা আওয়ামী লীগের অনুগতদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করছিল। এখানেও প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিলেও পরে আন্দোলনে মৌলবাদী গোষ্ঠী ঢুকে পড়ে।

দুই দেশেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল তরুণদের মূল হাতিয়ার। বাংলাদেশে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ, আর নেপালে টিকটক (যেটি নিষিদ্ধ হয়নি) ও ভিপিএন আন্দোলন জমাতে ভূমিকা রেখেছিল।

২. ছোট্ট ট্রিগার থেকে বড় বিস্ফোরণ

বাংলাদেশে কোটা আন্দোলন আর নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ—দুটিই তুলনামূলক ছোট ইস্যু ছিল। কিন্তু এগুলো আড়ালে থাকা দুর্নীতি, বৈষম্য আর অকার্যকর শাসনের ওপর চাপা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে তোলে।

নেপালে ৪ সেপ্টেম্বর তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা গুরুং ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের ঘোষণা দেন। কারণ হিসেবে বলা হয়, স্থানীয়ভাবে নিবন্ধন না করা, ঘৃণা ছড়ানো ঠেকানো, প্রতারণা রোধ ইত্যাদি। কিন্তু জনগণের চোখে এটা ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের চেষ্টা।

টিকটক আগে থেকেই নিবন্ধন করায় নিষিদ্ধ হয়নি। আর সেটিই আন্দোলনকারীদের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে যেমন কোটা নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয়টা ছিল আসলে স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতির প্রতীক, তেমনি নেপালে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম বন্ধ করা ছিল তরুণদের কণ্ঠরোধের প্রতীক।

ফলাফল একই হয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘ আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার পতন হযেছে। আর নেপালে মাত্র দুই দিনেই অলি সরকারের পতন হয়েছে।

৩. বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু

বাংলাদেশে কোটা আন্দোলনে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হাজারো মানুষ মারা যায়। সরকারি হিসাবে ১ হাজার জন আর পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস জানান, প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন নিহত হয়েছিলেন।

নেপালে প্রথম দিনের সংঘর্ষেই ২০ জন নিহত হন। তাঁদের বেশির ভাগই তরুণ শিক্ষার্থী। বাংলাদেশে যেমন বিক্ষোভকারীদের হত্যার পর আন্দোলন তীব্র হয়েছিল, নেপালেও প্রথম দিনের মৃত্যুগুলো দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

৪. মন্ত্রীদের বাড়ি ও সরকারি স্থাপনায় হামলা

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার গণভবন, সংসদ ভবন, মন্ত্রীদের বাড়ি, থানা—সব জায়গায় হামলা হয়েছিল।

নেপালেও একই দৃশ্য। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী অলির বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। তাঁকে হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক ও বিরোধী দলের নেতা পুষ্প কমল দহলের বাসায় হামলা হয়। অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু পাউডেলকে আন্দোলনকারীরা প্রকাশ্যে মারধর করেন।

দুই দেশেই মন্ত্রীর বাড়ি, সরকারি কার্যালয় ও সংসদে হামলা হয়েছিল। এই আক্রমণগুলো ছিল দুর্নীতি আর কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধ।

৫. প্রধানমন্ত্রীর পতন আর সেনাবাহিনীর ভূমিকা

বাংলাদেশে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে বলেন। সেনাবাহিনী জানায়, তারা জনগণের পাশে থাকবে, গুলি চালাবে না। ৫ আগস্ট হাসিনাকে হেলিকপ্টারে করে দেশ ছাড়তে হয়।

নেপালেও একই ঘটনা। সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেল অলিকে বলেন, সেনাবাহিনী স্থিতিশীলতা আনতে পারবে, যদি তিনি পদত্যাগ করেন। ফলে মঙ্গলবার অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

আসরে বাংলাদেশের কোটাব্যবস্থা আর নেপালের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণ—দুটিই তরুণদের ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। দুই দেশেই আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা, পরে সাধারণ জনগণ তাতে যোগ দেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ দুটি দেশ ভারতের প্রতিবেশী ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই দুই সরকারের পতন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন নির্দেশ করছে।

* সুশীম মুকুল, ইন্ডিয়া টুডের সাংবাদিক
- ইন্ডিয়া টুডে থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে নেওয়া

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-09%2Fr9hnssbt%2Fsocial-media-ban.webp?rect=32%2C0%2C582%2C388&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভে উত্তাল রাজপথ। কাঠমান্ডু, নেপাল, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ দফা শান্তি প্রস্তাব

গাজায় যুদ্ধ বন্ধে এবং ভবিষ্যত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে ২১ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যার মধ্যে অবিলম্বে জিম্মি মুক্তি, ফিলিস্তিনিদের গাজায় অবস্থান এবং হামাসকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার প্রস্তাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে টাইমস অব ইসরাইল। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে আরব নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমটি।

খবরে বলা হয়েছে, গাজার বাসিন্দাদের উপত্যকাতেই থাকার প্রস্তাবটি মার্কিন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন। কারণ এর গাজার দখল নিয়ে ২০ লাখ গাজাবাসীকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তাছাড়া ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাটিও ট্রাম্পের নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। কারণ প্রশাসন কখনোই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করেনি।

এই প্রস্তাবে ইসরাইলের পক্ষেও কিছু অনুকূল বিষয় রয়েছে। যেমন হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করা এবং সেখানকার জনগণের উগ্রপন্থা দূর করার প্রক্রিয়া শুরু করা। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কখনোই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে প্রচার করেননি এবং তিনি শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বলেন, ৭ই অক্টোবরের পর জেরুজালেম থেকে এক মাইল দূরে ফিলিস্তিনিদের একটি রাষ্ট্র দেওয়াটা ১১ই সেপ্টেম্বরের পর আল-কায়েদাকে নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে এক মাইল দূরে একটি রাষ্ট্র দেওয়ার মতো। এটা চরম পাগলামি। এটা উন্মত্ততা এবং আমরা এটা হতে দেব না। ইসরাইল আমাদের গলায় সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র চাপিয়ে দিতে দেবে না।

তা সত্ত্বেও আরব নেতাদের সঙ্গে গাজা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ট্রাম্প। তিনি মনে করেন এ নিয়ে একটি চুক্তি হতে পারে। এ বিষয়ে চার দিন ধরে তীব্র আলোচনা চলছে এবং একটি সফল সম্পন্ন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে বলে ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, অঞ্চলের সকল দেশ এতে জড়িত। পাশাপাশি হামাস ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীও এ আলোচনায় আছেন।

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আরব নেতাদের সাথে বৈঠকের পর বলেন, আমাদের একটি খুবই ফলপ্রসূ অধিবেশন হয়েছে। আমরা মধ্যপ্রাচ্যে, গাজায় শান্তির জন্য ট্রাম্পের ২১-দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি। এ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। উইটকফ বলেন, আমি বলতে পারি এমনকি আত্মবিশ্বাসী যে আগামী দিনগুলোতে আমরা কোনো ধরনের অগ্রগতির ঘোষণা দিতে সক্ষম হব।

https://mzamin.com/uploads/news/main/182192_Kaium-3.webp

ট্রাম্প যেভাবে মিয়ানমারকে চীনের হাতে তুলে দিচ্ছেন by ডেভিড ব্রেনার

গত ২৫ জুলাই মিয়ানমারের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর। এ ঘটনা মিয়ানমার প্রশ্নে কয়েক দশক ধরে চলে আসা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পুরোপুরি বিপরীত অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের বার্ষিকীতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসন এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এর মাধ্যমে মিয়ানমারের নিষ্ঠুর সামরিক সরকারের অব্যাহত দমন-পীড়ন ও বিমান হামলার মুখে প্রতিরোধ করে যাওয়া দেশটির গণতন্ত্রপন্থীদের প্রতি সংহতি জানানো হয়েছিল।

এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে অনেকে ‘মিয়ানমারের ওপর ট্রাম্পের পিছু হটা যুদ্ধের’ সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরেকবার চীনের হাতে কৌশলগত বিজয় তুলে দেওয়া হলো। নৈতিকতার মানদণ্ডে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এ পদক্ষেপ মোটেও অবাক করার মতো বিষয় নয়।

ট্রাম্প এরই মধ্যে রাশিয়ার আগ্রাসনের মুখে ইউক্রেনকে একা ফেলে এসেছেন, গাজায় জাতিগত নিধনযজ্ঞের পক্ষে ওকালতি করেছেন এবং আমেরিকান গণতন্ত্রের যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটি মুছে ফেলতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন; কিন্তু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ঘটনাটি শুধু নীতিগত ব্যর্থতা নয়, এটি চরম মাত্রার কৌশলগত ভুলও।

মিয়ানমার প্রশ্নে মার্কিন নীতি পরিবর্তনের পেছনে কী আছে, সেটি এখনো অস্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ বিষয়ে এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি; কিন্তু সময়টা খুব কৌতূহলোদ্দীপক। কেননা, মাত্র কয়েক দিন আগে মার্কিন কংগ্রেসে দুই দলের (রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক) সমর্থনে তিনটি বিল পাস হয়েছে, যেখানে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয় এবং জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান জ্যেষ্ঠ জেনারেল মিন অং হ্লাইং সম্প্রতি শুল্ক নিয়ে আলোচনার সময় ট্রাম্পের বাড়াবাড়ি রকম প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি যে পরিচালিত হচ্ছে ব্যক্তিগত চাটুকারিতা ও আত্মপ্রশংসার ওপর ভর করে, এটা তার আরেকটি দৃষ্টান্ত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পাল্টানোর পেছনে আরও হিসাবি উদ্দেশ্য আছে। ব্যবসায়ী লবিস্টরা ট্রাম্পকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে মিয়ানমারে মাটির নিচে যে বিরল খনিজ আছে, তা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত সম্পদ হতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে মিয়ানমার এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।  বিশেষ করে চীন যখন পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের কথা বিবেচনা করে নিজ দেশে বিরল খনিজের খনন কমিয়ে দিয়ে সেই শূন্যস্থান মিয়ানমারকে দিয়ে পূরণ করছে।

কিন্তু এখানে মূল বিষয়টি হলো মিয়ানমারের বিরল পদার্থের খনিগুলো জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। এই খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে চীনের সীমান্ত সংলগ্ন রাজ্যগুলোর প্রভাবশালী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হাতে। বিশ্বের অন্যতম পুরোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন গত বছর বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

মিয়ানমারের এই পরিবর্তন ওয়াশিংটনের দৃষ্টি এড়ায়নি। এ কারণে কয়েকজন লবিস্ট দুটি প্রস্তাব সামনে এনেছেন। এক. যুক্তরাষ্ট্র কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশনের সঙ্গে বিরল সম্পদ উত্তোলনের জন্য সরাসরি কাজ করতে পারে। দুই. কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন ও সামরিক জান্তার মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় শান্তিচুক্তি করিয়ে যৌথভাবে এসব খনি ব্যবহার করার পথ তৈরি করতে পারে।

প্রথম প্রস্তাবটি যৌক্তিকতার বিচারে একেবারেই অবাস্তব। কাচিন রাজ্যটি ল্যান্ডলক বা স্থলবেষ্টিত। এই রাজ্যের চারপাশে যেমন জান্তানিয়ন্ত্রিত অঞ্চল আছে, তেমনি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা যুদ্ধ অঞ্চলও রয়েছে। এ ছাড়া উত্তর-পূর্ব ভারত ও চীনের দুর্গম এলাকাও রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রস্তাবটি আরও বিভ্রান্তিকর। এটি ওয়াশিংটনের ব্যবসায়িক লবিস্টদের সেই বিশ্বদৃষ্টি প্রতিফলিত করে, যেখানে অনেক দশক ধরে চলা রাজনৈতিক আন্দোলনকে শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়। যদি কাচিনরা কেবল মুনাফার আশায় পরিচালিত হতো, তাহলে তারা বহু আগেই চীনের দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতির চাপে নতিস্বীকার করত। তারা তা করেনি। কারণ, তাদের লক্ষ্য বাণিজ্যিক নয়, রাজনৈতিক।

কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন দীর্ঘদিন ধরে স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করছে এবং সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা প্রতিরোধ আন্দোলনের একটি মূল সহযোগী। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কিংবা আধুনিক অস্ত্র বিক্রি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়ার মতো এমন কিছু নেই, যা একটি চুক্তিকে মূল্যবান করে তুলতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার ঝুঁকি নেওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট নয়। কারণ, কাচিন ইনডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশনকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চীনের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়।

এদিকে বিরল উপাদানের খনির সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে। এ গোষ্ঠী এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনী। কমিউনিস্ট পার্টি অব বার্মা ভেঙে যাওয়ার পর এই গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছিল, এখনো তারা চীনের অস্ত্র ও সমর্থন পাচ্ছে। মিয়ানমারের বিরল খনিজ খাতে যুক্তরাষ্ট্র অর্থপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে, এ ধারণা শুধু শিশুসুলভ নয়, বাস্তবতাবিবর্জিতও। এর চেয়েও খারাপ ব্যাপার হচ্ছে, এতে সরাসরি চীনের স্বার্থে কাজ করার ঝুঁকি তৈরি হবে।

মিয়ানমারের ওপর চীন এরই মধ্যে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে। এ বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা সংস্থা ইউএসএআইডির বাজেট কাটছাঁট হওয়ার পর মিয়ানমারের রাজনীতিতে আরও শক্তভাবে প্রভাব তৈরির সুযোগ পায় চীন। এখন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় চীনের আধিপত্য আরও পাকাপোক্ত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হলো।

মিয়ানমারের জেনারেলরা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাবেন। তাঁরা এটিকে ব্যবহার করবেন তাঁদের পরিকল্পিত প্রহসনের নির্বাচনের বৈধতা দিতে এবং দেশে-বিদেশে তাঁদের প্রচারণা জোরদার করার কাজে। তাঁরা কখনো চীনকে ত্যাগ করবেন না। কারণ, তাঁদের অস্ত্র, অর্থ ও কূটনৈতিক নিরাপত্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস এখনো চীন।

অন্যদিকে মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলন (এখন দেশটির অর্ধেকের বেশি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে) যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তে আরও হতাশ হবে। বাইডেন প্রশাসন বার্মা অ্যাক্ট (প্রাণঘাতী নয়, এমন সহায়তার প্রতিশ্রুতি) পাস করলেও সেটি কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পশ্চিমা সমর্থন বরাবরই ছিল প্রতীকী। এখন সেই প্রতীকী সমর্থনও প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে।

বছরের পর বছর ধরে ফাঁকা বুলি শুনে আসা মিয়ানমারের প্রতিরোধযোদ্ধাদের কাছে পশ্চিমা বিশ্বের ওপর আস্থা আর অবশেষ নেই; কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বাসঘাতকতা তাদের চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধ্য করতে পারে।

* ডেভিড ব্রেনার, সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ফাইল ছবি

Sunday, September 28, 2025

ছোট দলের বড় ভুল ও প্রক্সি রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন by মনোজ দে

রাজনৈতিক পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রভাবের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবটাই বেশি। খুব কমসংখ্যক দল কিংবা রাজনীতিবিদ এ বাস্তবতাকে মাথায় নিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলে যাঁরা থাকেন, তাঁরা কখনোই দূরবর্তী ভবিষ্যতের কথা ভাবেন না। নগদ পাওনার কারবার করতে গিয়ে তাঁরা নিজের ও দলের পতন ডেকে আনেন, সমর্থক গোষ্ঠীকেও সংকটের মধ্যে ফেলে দেন। অতীত থেকে যে কেউ শিক্ষা নেন না—এ আপ্তবাক্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যতিক্রমহীনভাবে সত্য।

সাম্প্রতিক ইতিহাস প্রমাণ দেয়, বাংলাদেশ গণ–অভ্যুত্থানের দেশ। প্রতিটি অভ্যুত্থানই এখানে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বাস মিইয়ে যেতেও খুব বেশি দেরি হয় না। দেখা যায়, জনগণের ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতো গেড়ে বসা প্রবল কোনো প্রতিপক্ষকে সরাতে পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অনন্য ঐক্য তৈরি হয়। কিন্তু যে মুহূর্তে সেই প্রবল প্রতিপক্ষের পতন হয়, সে মুহূর্তেই রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজ নিজ দলীয় স্বার্থে পরস্পরের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে বড় দলগুলোই নির্ধারক শক্তি। গণ–আন্দোলন, গণ–অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে ছোট অনেক দল ও তাদের নেতারা সামনের সারির মুখ হয়ে ওঠেন। কারও কারও ক্ষেত্রে বিকাশের প্রবল সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কিন্তু সে সম্ভাবনাও অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে পারে, তার বড় একটা দৃষ্টান্ত জাসদ।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সমাজে পরিবর্তনের যে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে এসেছিল, তা থেকেই জন্ম হয়েছিল জাসদের। কিন্তু নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে পরিষ্কারভাবে সামনে আনার পরিবর্তে না জাতীয়তাবাদী, না সমাজতন্ত্রী—অস্পষ্ট একটা রাজনৈতিক অবস্থান নেয় জাসদ। বামপন্থী জোয়ারের সে সময়ে পরিবর্তনপ্রত্যাশী তরুণদের বড় একটি অংশকে ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল জাসদ। মাতৃসংগঠন আওয়ামী লীগকেও দুর্বল করে দিয়ে শেখ মুজিবের শাসনের পতন ত্বরান্বিত করে দিয়েছিল তারা।

জাসদের এ ভূমিকা নেওয়ার কারণ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীর জন্মের ইতিহাসের দিকে ফিরে যেতে হবে। একটি বহুল প্রচলিত মত হচ্ছে, একাত্তরে জনযুদ্ধের সময় এ ভূমিতে সশস্ত্র বামপন্থার উত্থান যাতে না হয় সেটা ঠেকাতে মুক্তিবাহিনীর সমান্তরাল বাহিনী হিসেবে মুজিব বাহিনী গড়ে তুলেছিল ভারত ও ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’। মুজিব বাহিনীর নেতৃত্বের বড় অংশটাই পরবর্তী সময়ে জাসদ গড়ে তোলে। জাসদের নেতা–কর্মীদের আত্মত্যাগ ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে ন্যূনতম প্রশ্নের অবকাশ নেই। কিন্তু জাসদের তৎপরতা শেষ বিচারে রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও ইসলামপন্থী শক্তির প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করেছিল।

নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—এই দুই ধারায় বিভক্ত। এর বাইরে মধ্যম মানের শক্তি জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি মূলত রংপুরকেন্দ্রিক দলে পরিণত হয়েছে। গৃহপালিত বিরোধী দল কিংবা মিত্রের ভূমিকায় আওয়ামী লীগের শাসনের বৈধতা দেওয়ায় দলটির গ্রহণযোগ্যতাও কমেছে। দেবর-ভাবির গৃহবিবাদে দলটির সাংগঠনিক শক্তিও দুর্বল হয়ে গেছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যেভাবে দমন ও তোষণ করা হয়েছে, তাতে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ইসলামপন্থীদের ভোট ও সমর্থন কতটা বেড়েছে, তার পরিষ্কার কোনো চিত্র নেই। ডাকসু, জাকসু নির্বাচনে বড় বিজয়ই পরিষ্কার একটা বার্তা দিচ্ছে যে উঠতি মধ্যবিত্তের মধ্যে তাদের সমর্থন অনেকটা বেড়েছে। সব মিলিয়ে এটা ধারণা করা যায়, জনসমর্থন যা–ই থাক, সাংগঠনিক শক্তির বিচারে ধর্মভিত্তিক দলগুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।

বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির দাবা খেলায় ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অনেকটা বোড়ের মতো। অনেক সময় তারা এমন সব কর্মসূচি নেয়, যাতে প্রশ্ন জাগে—তারা কি বড় কোনো শক্তির দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।

বাংলাদেশের ভোটের মাঠের যে বাস্তবতা, সেখানে ছোট দলের পক্ষে নির্বাচনে ভালো ফল করাটা কঠিন। ফলে মাঠের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ভোটের বৈতরণি পার হতে গেলে তাদের বড় দলের শরণাপন্ন হতে হয়। এ বাস্তবতা বড় দল ও ছোট দলের মধ্যে প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক তৈরি করে। তাৎক্ষণিক লাভের বিচারে বড় দলের ছেড়ে দেওয়া একটি–দুটি আসন পেলেও এতে দীর্ঘ মেয়াদে ছোট দলগুলোর রাজনীতিই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে বিকাশের সম্ভাবনাটা শেষ হয়ে যায়।

নতুন দল বিকাশের বাস্তবতা ও জনচাহিদা থাকার পরও দুই ধারার বিপরীতে তৃতীয় বড় ধারা সৃষ্টি না হওয়ার পেছনে এটি বড় কারণ। এ দায় যেমন ছোট দলের, নতুন দলের, আবার বড় দলেরও। বড় দল সব সময়ই চায় প্রথাগত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত যেন জারি থাকে। ফলে তাদের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, এমন রাজনৈতিক শক্তিকে তারা কৌশলেই নিষ্ক্রিয় করে দেয়। অভিজ্ঞতাহীন নতুন দল নগদ পাওনার স্বার্থে বড় দলের কৌশলের কাছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে বিক্রি করে দেয়। শুধু বড় রাজনৈতিক দল নয়, পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে স্বার্থের সম্পর্ক আছে, এমন গোষ্ঠীগুলোও চাইবে না নতুন রাজনীতি নিয়ে কেউ তাদের চ্যালেঞ্জ জানাক।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। পরপর তিনটি পাতানো নির্বাচনের কারণে বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে না পারায় খুব স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের প্রস্তুতি নেওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা দেখছি, জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে মতভেদ, তা নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

আবার এ মুহূর্তের ইস্যু নয়, এমন কিছু বিষয় নিয়ে যখন মাঠে হঠাৎই যে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, সেটা উদ্বেগজনকই। যেমন হঠাৎই জাতীয় পার্টি রাজনীতির ইস্যু হয়ে উঠল। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের গণ অধিকার পরিষদ জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে হাজির হলো। সেই দাবি ঘিরে কর্মসূচি একসময় সংঘাতেও রূপ নিল। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর লাঠিপেটায় মারাত্মকভাবে আহত হলেন নুর। সবারই প্রত্যাশা ছিল, গণ–অভ্যুত্থান নাগরিকের ওপর বাহিনীগুলোর বাড়াবাড়ি রকম বলপ্রয়োগের অবসান ঘটাবে। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলনসহ কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ ও বাহিনীগুলোকে আচরণের ক্ষেত্রে আগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দেখছি।

নুরকে আহত করার পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দলের নেতা–কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম হলো। তাঁরা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এ কর্মসূচিতে গণ অধিকার পরিষদের রাজনৈতিক অর্জন কতটা, সেটা একটা বড় প্রশ্নই থেকে যায়।

মে মাসে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সময়ও হঠাৎই এ রকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হতে আমরা দেখেছিলাম। চিকিৎসার জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সিঙ্গাপুরে যাওয়ার ঘটনা ঘিরে এর সূত্রপাত। গাজীপুরে এনসিপির একজন নেতা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। শাহবাগ ও যমুনা ঘেরাওয়ের কর্মসূচি আসে। শেষে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে সংঘটিত অপরাধের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।

দুটি ঘটনার সঙ্গে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমীকরণ যে আছে, সেটা বোঝা যায়। গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির সম্মেলন ঘিরে গোপালগঞ্জে যে সহিংস ঘটনা ঘটেছিল, সেটা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এনসিপির জুলাই পদযাত্রা ঘিরে সারা দেশেই আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গোপালগঞ্জের কর্মসূচির নাম হয়ে যায় ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’।

সংগঠনটির দু-একজন নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎই উসকানিমূলক পোস্ট দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আইনশৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর গুলিতে অন্তত পাঁচজন নিহত হন। এনসিপির নেতাদের সামরিক বাহিনীর গাড়িতে গোপালগঞ্জ ছাড়তে হয়। এ ঘটনার পর এনসিপির জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি স্বতঃস্ফূর্ততা হারায়। জুলাইযাত্রা গোপালগঞ্জে গিয়ে মার্চ ফর গোপালগঞ্জ হয়ে যাওয়ায় এনসিপি কী অর্জন করতে পেরেছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক প্রশ্ন।

১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যাচ্ছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, পিআর পদ্ধতির নির্বাচনসহ আট দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ ছয়টি ইসলামি দল ও গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচিতে যাচ্ছে এনসিপি। যদিও দলটির একজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি এখনো কোনো জোট বা যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। এনসিপি যদি সত্যি সত্যি ইসলামপন্থীদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে নামে, তাহলে মধ্যপন্থা হিসেবে দলটির যে নিজস্ব ভাবমূর্তি, সেটা অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রাজনৈতিক দলের মূল পরিচয় তার ঘোষণা ও কর্মসূচিই। নাগরিকদের সঙ্গে কোনো একটি দলের সংযোগ তৈরি করে দেয় কর্মসূচি। রাজনীতির দীর্ঘ রেসে টিকে থাকতে হলে নতুন, পুরোনো যেকোনো দলকেই নিজস্ব কর্মসূচি নিয়েই এগোতে হয়। রাজনীতির নগদ কারবারের চেয়ে বাকির লোভটা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট দল, নতুন দল সেই ভুল করলে বড় দলের ছায়া বা প্রক্সি শক্তি হওয়ার নিয়তিই তাকে বরণ করতে হয়।

* মনোজ দে, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-15%2Fps5apw13%2Fjatiyopartykk.JPG?rect=3%2C0%2C614%2C409&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সম্প্রতি জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত এইচএম এরশাদের ম্যুরাল ভাংচুর করা হয়। ছবি : প্রথম আলো

ভিসা বাতিল করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে যুক্তরাষ্ট্র: কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো গতকাল শনিবার তাঁর মার্কিন ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, এ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত শুক্রবার নিউইয়র্কের রাস্তায় ফিলিস্তিনপন্থী একটি বিক্ষোভে যোগ দেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট। এ সময় তিনি মার্কিন সেনাদের প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদেশ না মানার অনুরোধ জানান। এর পরই যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তাঁর ভিসা বাতিল করা হবে।

গুস্তাভো পেত্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এখন থেকে আমার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ভিসা নেই; কিন্তু আমি পরোয়া করি না। আমার ভিসার দরকার নেই…আমি শুধু কলম্বিয়ার নাগরিক নই, ইউরোপেরও নাগরিক। আমি নিজেকে বিশ্বের একজন স্বাধীন মানুষ মনে করি।’

গুস্তাভো আরও বলেন, ‘(গাজায় ইসরায়েলের) জাতি হত্যার নিন্দা জানানোয় ভিসা বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করেছে, তারা আর আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করছে না।’

গাজায় জাতি হত্যার অভিযোগ বারবারই অস্বীকার করে আসছে ইসরায়েল। দেশটি বলছে, হামাসের হামলার পর তারা শুধু আত্মরক্ষা করছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত উপত্যকাটিতে ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সেখানকার সব মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একাধিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও জাতিসংঘের এক তদন্ত বলছে, এ পরিস্থিতি জাতি হত্যার শামিল।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে পেত্রো বিশ্বব্যাপী একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠনেরও আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ বাহিনীর প্রধান কাজ হবে ফিলিস্তিনিদের মুক্ত করা। তিনি মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে বলেন, ‘মানুষের দিকে অস্ত্র তাক করবেন না। ট্রাম্পের আদেশ না মেনে মানবতার আদেশ মানুন।’

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেছে, বেপরোয়া ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর মার্কিন ভিসা বাতিল করা হচ্ছে।

জবাবে কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, যেখানে জাতিসংঘ তার সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মতপ্রকাশের অধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়, সেখানে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ভিসা বাতিল করা এ সংস্থার চেতনার পরিপন্থী।

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কলম্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। চলতি বছরের শুরুতে পেত্রো যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত মানুষদের দেশে ফেরত পাঠানোর ফ্লাইট বন্ধ করে দেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয়। পরে অবশ্য দুপক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়।

চলতি বছরের জুলাইয়ে পেত্রো অভিযোগ করেন, মার্কিন কর্মকর্তারা তাঁর দেশে অভ্যুত্থান ঘটানোর ষড়যন্ত্র করছেন। এরপর উভয় দেশ তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়। ওয়াশিংটন অবশ্য এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালে পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং দেশটিতে কয়লা রপ্তানি নিষিদ্ধ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ রয়টার্স

জাহাজভাঙা শ্রমিক: স্যাঁতসেঁতে ছোট ঘরে বাস, মজুরি দিনমজুরের অর্ধেকও নয় by কৃষ্ণ চন্দ্র দাস

৬৪ বর্গফুটের একটি ছোট কক্ষ। স্যাঁতসেঁতে মেঝের এক কোনায় থালাবাসন, গ্যাস সিলিন্ডার, চুলাসহ রান্নার সরঞ্জাম রাখা। বাকি অংশে ঘুমানোর জন্য কাঁথা-বালিশ। কক্ষের ওপরের দিকে বাঁধা দড়িতে ঝুলে আছে কিছু পোশাক। কক্ষটিতে সুমন মোল্লাসহ চারজন জাহাজভাঙা শ্রমিক গাদাগাদি করে থাকেন। রাত হলেই মেঝেতে কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে পড়েন।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বক্তারপাড়া এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে এমআই শ্রমিক কলোনির চিত্র এটি। কলোনিটিতে ১০৪টি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে তিন থেকে পাঁচজন শ্রমিক থাকেন। সব মিলিয়ে ২০ থেকে ২২টি কক্ষে থাকেন ১১০ জনের মতো শ্রমিক। বাকি কক্ষগুলো এখন ফাঁকা।

এই কলোনি থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে দেখা মেলে জামাল কলোনির। সেখানকার অবস্থা আরও খারাপ। কলোনির কক্ষগুলো একই রকম হলেও লম্বা আকৃতির ঘর মুখোমুখি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে হাঁটাচলা করতেই অসুবিধা হয়। রয়েছে খাবার ও গোসলের পানির সমস্যা।

শুধু এমআই ও জামাল কলোনি নয়, সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানার শ্রমিকদের প্রায় সব কলোনির অবস্থাই এমন।
সারি সারি ঘরগুলোতে থাকেন জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকেরা। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে
সারি সারি ঘরগুলোতে থাকেন জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকেরা। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। প্রথম আলো
খুপরিতে অস্বাস্থ্যকর জীবন

উপজেলায় মোট কতটি শ্রমিক কলোনি রয়েছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিরা, সোনাইছড়ি, ভাটিয়ারী ও সলিমপুর ইউনিয়নে অন্তত ৬০টি শ্রমিক কলোনি রয়েছে। এসবের মধ্যে বড় তিনটি শ্রমিক কলোনি ঘুরে দেখা গেছে, কোনোটিই বসবাসের উপযোগী নয়। এ তিনটি কলোনির অন্তত ২৫ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। প্রত্যেকের তথ্য অনেকটা একই রকম। কলোনিগুলোর প্রতিটি কক্ষের ভাড়া দুই হাজার থেকে চার হাজার টাকা হলেও নেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ।

এমআই কলোনির সুমন মোল্লা সীতাকুণ্ডের একটি গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ফিটারম্যান হিসেবে কাজ করেন। ওই কারখানার সবচেয়ে পুরোনো ফিটারম্যান তিনি। ২০ বছর ধরে জাহাজভাঙা কারখানায় কাজ করছেন। কাজ শুরু করেছিলেন শ্রমিক হিসেবে। এরপর ফিটারম্যানের সহকারীর কাজ করেন। ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও তিনি এখনো ঘণ্টাপ্রতি ৫৫ টাকা বেতন পান। সে হিসাবে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করে পান ৪৪০ টাকা। এটাই ওই কারখানার শ্রমিকদের সর্বোচ্চ বেতন। জাহাজভাঙা কারখানায় শ্রমিকদের বেতন হয় ঘণ্টা হিসাবে। এই বেতন দেশের বড় শহরগুলোতে কর্মরত দিনমজুরদের দৈনিক আয়ের প্রায় অর্ধেক। সরকার ঘোষিত দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা।

ওই কলোনির পাশে থাকা পুকুরঘাটে বসে কথা হয় সুমন মোল্লার সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে কথা বলা শুরু করতেই আরও অন্তত ১৫ জন শ্রমিক ঘাটে আসেন। শুরুতে কারখানার মালিকের ভয়ে কর্মক্ষেত্র ও আবাসন সম্পর্কে কিছু বলতে চাইছিলেন না তাঁরা। তবে একপর্যায়ে তাঁরা কথা বলতে শুরু করেন। ৪৭ বছর বয়সী সুমন মোল্লার বাড়ি নওগাঁ জেলায়। তাঁর দুই মেয়ে, স্ত্রী ও মা-বাবা থাকেন গ্রামের বাড়িতে। তিনি অন্য তিনজন শ্রমিকের সঙ্গে কক্ষ ভাগাভাগি করে থাকেন।

সেখানে অপর শ্রমিক আবুল কালাম বলেন, তিনি কাটারম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। আট ঘণ্টায় বেতন ২৮০ টাকা। তিনি বলেন, দৈনিক ২৮০ টাকা বেতন নিয়ে ২ হাজার টাকার ঘর ভাড়া নিলে খাব কী? বাড়িতে থাকা পরিবারের চারজনের ভরণপোষণ করব কীভাবে?
সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড
সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড। প্রথম আলো
কত মজুরি পান শ্রমিকেরা

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাহাজভাঙা শিল্পে কাটার (জাহাজ ও সমতল), ফিটার, লোডিং মিলে মোট সাত ধরনের শ্রমিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ফিটারশ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি মজুরি পান। দক্ষ একজন ফিটারশ্রমিক দৈনিক আয় করেন ৪৪০ টাকা। কাটার বা ওয়্যারশ্রমিকদের আয় দিনে ২৪০-৩৫০ টাকা।

জাহাজভাঙা শিল্পের অধিকাংশ শ্রমিকের নিয়োগপত্র, শ্রম আইন অনুযায়ী সবেতন ছুটি বা উৎসব বোনাস নেই বলে জানান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) পরিচালিত জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্যকেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির। তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, দুর্ঘটনা ও পেশাগত রোগ থাকলেও নেই চিকিৎসাসুবিধা। ২০১৮ সালে ঘোষিত নিম্নতম মজুরিও বাস্তবায়িত হয়নি। নেই ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর মনিরা পারভীন বলেন, এ শিল্পের শ্রমিকেরা অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত থাকেন বলে তাঁদের দায় নেন না জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকেরা। জাহাজে রয়েছে ক্যানসার সৃষ্টি করার মতো বিষাক্ত উপাদান অ্যাসবাস্টাস, পিসিবি ও টিবিটি। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী শ্রমিকদের ছোট্ট একটা ঘরে বেশ গাদাগাদি করে থাকতে হয়। সেই ঘরে নেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। শীত, বর্ষা—সব ঋতুতেই তাঁরা মাটিতে বিছানা করে থাকেন।

তবে গ্রিন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করছে বলে জানান কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক (সেফটি) মো. টিপু সুলতান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাঁদের জানামতে, খুব কমসংখ্যক কারখানায় দু-একটা পদে ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করছে না বলে তাঁরা জেনেছেন। ওই সব জাহাজভাঙা কারখানাকে তাঁরা নোটিশ দিয়েছেন। মজুরি বাস্তবায়নের জন্য আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

তবে শ্রমিকেরা যে মজুরি পাচ্ছেন, তা বেশি বলে দাবি করেন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শুধু জাহাজভাঙা কারখানা বলে মনগড়া বেতনকাঠামো আমাদের ওপর চাপিয়ে দিলে ঠিক হবে না। শিল্প বিবেচনায় বেতনকাঠামো ঠিক করতে হবে। গার্মেন্টসের মতো জায়গায় ১২ হাজার টাকা বেতন। জাহাজভাঙা শিল্পে তা ১৮ হাজার কিংবা তারও বেশি।’
https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-09%2F9cdkfc82%2FCtg-1.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
একটি কক্ষে রান্না ও ঘুমানোর ব্যবস্থা। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এম আই কলোনিতে। ছবি প্রথম আলো

তুরস্ক কি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের পরবর্তী লক্ষ্য? by এলিস গ্যাভোরি

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ কাতার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় মিত্র এবং ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ হিসেবে স্বীকৃতগত। কিন্তু গত সপ্তাহে ইসরাইল সেখানে হামলা চালায়। এরপরই ইসরাইলপন্থি মহল দৃষ্টি ঘোরায় তুরস্কের দিকে। ওয়াশিংটনে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মাইকেল রুবিন সতর্ক করে বলেন, ইসরাইলের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে তুরস্ক এবং দেশটির ন্যাটো সদস্যপদকে রক্ষাকবচ মনে করা উচিত নয়। ইসরাইলি একাডেমিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মেয়ির মাসরি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন- ‘আজ কাতার, কাল তুরস্ক।’ আঙ্কারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগানের এক শীর্ষ উপদেষ্টা লিখেছেন, জায়নবাদী ইসরাইলের প্রাণি, শিগগিরই তোমার মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার পর বিশ্বে শান্তি আসবে।

মাসের পর মাস ধরে ইসরাইলপন্থি গণমাধ্যম তুরস্ককে ‘ইসরাইলের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু’ আখ্যা দিয়ে আসছে। ইসরাইলি ভাষ্যকাররা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের উপস্থিতিকে হুমকি এবং যুদ্ধপরবর্তী সিরিয়া পুনর্গঠনে তার ভূমিকাকে নতুন বিপদ বলে প্রচার করছে।

আঞ্চলিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব: ইসরাইলের আগ্রাসী নীতি ও গাজায় চলমান গণহত্যার প্রেক্ষিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আগস্টে ইসরাইলের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করেন। আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো ওমর ওজকিজিলসিক আল জাজিরাকে বলেন, আঙ্কারায় এই কথাবার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইসরাইলকে আঞ্চলিক আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করতে দেখা হচ্ছে। তুরস্কের বিশ্বাস, ইসরাইলের আগ্রাসনের কোনো সীমা নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র এর পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে।

কাতারে হামলার পর আঙ্কারার সন্দেহ আরও গভীর হয়- ন্যাটো মিত্র হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই তুরস্কের ওপর হামলাকে নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে দেখবে?

ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী স্বপ্ন: ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে তিনি ‘গ্রেটার ইসরাইল’-এর ধারণায় বিশ্বাসী। ফিদান আল জাজিরাকে বলেন, এই ধারণা সিরিয়া, লেবানন, মিশর ও জর্ডান পর্যন্ত বিস্তৃত, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোকে দুর্বল ও বিভক্ত রাখা। গত কয়েক সপ্তাহেই ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালানোর পাশাপাশি পশ্চিম তীরে দৈনিক অভিযান, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় হামলা, এমনকি তিউনিশিয়ায় গাজা সহায়তা বহরেও হামলা চালিয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত তুর্কি অ্যাডমিরাল সেম গুরদেনিজ সতর্ক করে বলেন, তুর্কি-ইসরাইলি সংঘাতের প্রথম ক্ষেত্র হবে সিরিয়ার স্থল ও আকাশে। একই সঙ্গে সাইপ্রাসে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতিকে আঙ্কারা ঘেরাও কৌশল হিসেবে দেখছে, যা তুর্কি সামুদ্রিক স্বাধীনতা ও তুর্কি সাইপ্রিয়ট জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

সিরিয়া প্রশ্নে দ্বন্দ্ব: ইসরাইল স্পষ্ট করে বলেছে সিরিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু ফেডারেল কাঠামোর হতে পারে, যেখানে বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসন থাকবে। বিপরীতে, তুরস্ক নতুন সিরীয় প্রশাসনকে সমর্থন করছে, যারা কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে। সেটার গবেষণা পরিচালক মুরাত ইয়েসিলতাস বলেন, সিরিয়ায় তুরস্কের সুস্পষ্ট লাল রেখা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আঞ্চলিক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা আরও বিভাজন সৃষ্টি করছে। তিনি আরও বলেন, যদি তেল আবিব এই পথেই এগোয়, তবে আঙ্কারা-তেল আবিব সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠবে।

সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ: তবে কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন পূর্ণাঙ্গ দ্বন্দ্ব অনিবার্য নয়। তার মতে, ইসরাইল সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালাবে না; বরং সিরিয়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও দক্ষিণ ককেশাসে তুরস্কের স্বার্থকে লক্ষ্য করে অপ্রকাশ্য কৌশল- গোপন অভিযান, বিমান হামলা, প্রক্সি যুদ্ধ অবলম্বন করবে। ক্রিগ বলেন, ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থনের প্রেক্ষিতে আঙ্কারার কৌশল হওয়া উচিত প্রতিরক্ষা জোরদার করা, আঞ্চলিক জোট গড়া (কাতার, জর্ডান, ইরাকের সঙ্গে), আর একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে খোলা সংলাপ বজায় রাখা যাতে কৌশলগত বিচ্ছিন্নতা এড়ানো যায়।

(অনলাইন আল জাজিরা থেকে অনুবাদ)

mzamin

মোদি সরকার যেভাবে প্রবাসীদের মুখ চেপে ধরছে by রাউল লাই

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিনস্টারে রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রফেসর নিতাশা কৌল ১৯৯৭ সালে পোস্টগ্র্যাজুয়েট পড়াশোনার জন্য ইউনিভার্সিটি অব হালে আসেন। এর পর থেকেই তিনি যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তিনি গণতন্ত্র, ডানপন্থী রাজনীতি, ভারতীয় রাজনীতি ও কাশ্মীর নিয়ে কয়েকটি বই লিখেছেন এবং দেড় শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন।

ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নেওয়ার পরও কৌল ‘ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া’ বা ওসিআই মর্যাদার মাধ্যমে নিজের জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এই বিশেষ মর্যাদা ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের দেওয়া হয়। ওসিআই কার্ডধারীরা ভ্রমণ বা বসবাসের ক্ষেত্রে আজীবন ভিসার মতো বিস্তৃত সুবিধা পান। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ লক্ষাধিক মানুষ এই মর্যাদা ভোগ করছেন।

কিন্তু হঠাৎ গত মে মাসে কৌলের ওসিআই বাতিল করা হয়। ভারতের সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট ১৯৫৫–এর ৭ডি ধারায় বলা আছে, কিছু বিশেষ কারণে ওসিআই বাতিল করা যেতে পারে, যেমন ১. জালিয়াতির প্রমাণ মিললে, ২. ভারতের সংবিধানের প্রতি অনুগত না হলে, ৩. ভারতের শত্রু কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধকালে যোগাযোগ বা ব্যবসা করলে, ৪. দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড পেলে, ৫. ভারতের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, বৈদেশিক সম্পর্ক কিংবা জনস্বার্থের খাতিরে প্রয়োজন মনে করলে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব আইন প্রয়োগ অনেক সময় আইনসম্মত বাতিল নয়; বরং একধরনের শাস্তিমূলক সেন্সরশিপে পরিণত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা রক্ষা করা হয় না, যা আইনের মৌলিক নীতির বিরোধী। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি ও আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। যদিও দেশের ভেতরে আদালতগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে সরকারের এসব পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন।

নিতাশা কৌলকে যে নোটিশ দেওয়া হয়, সেখানে বলা হয় তিনি ‘ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত’। তাঁর এই কর্মকাণ্ড নাকি বিদ্বেষপ্রসূত ও ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করেছে। কিন্তু নোটিশে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ ছিল না।

কৌল আসলে ভারতের গণতন্ত্রের প্রবল সমর্থক এবং সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত সমালোচনা করে আসছেন। তিনি বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের ওপর দমননীতি আর হিন্দু ডানপন্থী সংগঠন আরএসএসের বিভাজনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে লেখালেখি করে আসছেন।

আন্তর্জাতিক সূচকগুলোয়ও কৌলের কথার সত্যতা মেলে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রিডম হাউসের গ্লোবাল ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারতকে ‘আংশিক মুক্ত’ বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বৈষম্যমূলক নীতি নিচ্ছে এবং মুসলমানদের লক্ষ্য করে নিপীড়ন বাড়িয়েছে। একইভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও অবনতির কথা বলা হয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম কার্যত ‘অনানুষ্ঠানিক জরুরি অবস্থায়’ আছে।

কৌল একা নন। গত ৯ বছরে ১২০ জনের বেশি মানুষের ওসিআই বাতিল করেছে ভারত সরকার। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার–এর তথ্য বলছে, এ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। শুধু ২০২৪ সালেই ৫৭ জনের ওসিআই বাতিল করা হয়েছে, আর ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে আরও ১৫ জন এই শাস্তির মুখে পড়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই সাংবাদিক, কর্মী বা শিক্ষাবিদ। তাঁরা বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সমালোচনা করেছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২২ সালে সুইডেনভিত্তিক একাডেমিক অশোক স্বাইনের ওসিআই বাতিল করা হয়। অভিযোগ ছিল তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলো ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে’ এবং ‘ভারতের সামাজিক বন্ধন দুর্বল করেছে’। কিন্তু অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। পরে স্বাইন দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করেন এবং ২০২৩ সালে আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেন।

আবার ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাংবাদিক রাফায়েল স্যাটারের ওসিআই বাতিল করা হয়। তিনি রয়টার্সে কাজ করেন এবং সাইবার নিরাপত্তা, গুপ্তচরবৃত্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে রিপোর্ট করেছেন। ভারত সরকার তাঁর সমালোচনামূলক প্রতিবেদনকে কারণ দেখালেও তিনি এখন সরকারের বিরুদ্ধে মামলা লড়ছেন।

ভারতে এখন সমালোচকদের দমনের ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে। রাজনীতিবিদ, এনজিও কর্মী, আন্দোলনকারী, সাংবাদিক বা সামাজিক নেতা—যিনিই সরকারকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাঁকেই নানা উপায়ে চুপ করানো হচ্ছে। কারও কারও বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে, কারও মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, আবার অনেককে ভীতি প্রদর্শন বা শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে।

এই দমন–পীড়ন আরও বেড়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালানোর পর। পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর সরকার এই অভিযান শুরু করে। এরপর এক্স প্ল্যাটফর্মকে প্রায় আট হাজার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে বলা হয়। এসবের মধ্যে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের অনেক অ্যাকাউন্টও ছিল। যেমন ফ্রি প্রেস কাশ্মীর, বিবিসি উর্দু ও দ্য ওয়্যার।

দেশের ভেতরে ভিন্নমত দমনের পাশাপাশি ভারত সরকার এখন প্রবাসীদের দিকেও নজর দিয়েছে। ওসিআই মর্যাদাকে তারা কার্যত ‘ব্ল্যাকমেলের হাতিয়ার’ বানাচ্ছে। ফলে প্রবাসী ভারতীয়রা ভয় পাচ্ছেন—সরকারের সমালোচনা করলে হয়তো ভারতে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমালোচনাকারী সাংবাদিকদের চুপ করাতেই ওসিআই ব্যবহার করা হচ্ছে। প্ল্যাটফর্ম ফর ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেসির এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৪ শতাংশ ব্রিটিশ ভারতীয় ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

আমি যেসব প্রবাসী ভারতীয়ের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের অনেকেই স্পষ্ট বলেছেন, তাঁরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা প্রকাশ্যে বলতে ভয় পান। কারণ, তাঁরা আশঙ্কা করেন, এতে ভারতে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

কিন্তু আমাদের, মানে ব্রিটিশ ভারতীয়দের এভাবে ভয় পাওয়া উচিত নয়। আমাদের ওসিআইয়ের মতো আইনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কারণ, আমরা পরিবার, বন্ধু, সংস্কৃতি ও কমিউনিটির মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিজেপি সরকার প্রবাসীদের যেভাবে চাপে রাখছে, তা ভারতের সংবিধানে প্রতিশ্রুত ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত।

যুক্তরাজ্যে ২০ লাখের বেশি ভারতীয় থাকলেও ব্রিটিশ সরকার ভারতের সঙ্গে বড় বাণিজ্যচুক্তি করেছে, কিন্তু ভারতের গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি। অথচ যুক্তরাজ্য চাইলে এই বিশেষ সম্পর্ক ব্যবহার করে ভারত সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করতে পারত। চুপ করে থাকলে কেবল বিজেপির অবস্থানই আরও শক্ত হবে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি এখন বিদেশে থাকা ভারতীয়দের দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে ডাক দিচ্ছেন। কিন্তু উন্নয়নে অংশ নেওয়ার মানে হওয়া উচিত—ভয় ছাড়া মতপ্রকাশ ও সমালোচনার সুযোগ। যদি সরকারকে প্রশ্ন করলেই প্রবাসীদের শত্রু মনে করা হয়, তাহলে একসময় এমন অবস্থা আসবে, যখন আমরা কেবল শাসক দলের শর্তে ভারতে যেতে পারব। এতে ভারতের অগ্রগতিতে আমাদের অবদান রাখার সুযোগও সীমিত হয়ে যাবে।

আসলে প্রবাসীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কই ভারতের গণতন্ত্রের মূল শক্তি। এই সম্পর্ক ছিন্ন হলে ভারতের গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়বে।

রাউল লাই, ব্রিটিশ ভারতীয়দের একত্র করে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষায় কাজ করা ‘প্ল্যাটফর্ম ফর ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেসি’ নামের একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দেন
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-09%2Fbah1sqrd%2FScreenshot-2025-09-09-190953.jpg?rect=52%2C0%2C525%2C350&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাজ্যে ২০ লাখের বেশি ভারতীয় আছেন। ছবি: পিটিআই

Saturday, September 27, 2025

১০৮ বছর পর ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলো বৃটেন, বালফোর ঘোষণা পরবর্তী ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত by মাযিয়ার মোটামেদি ও ফেদেরিকা মারসি

বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। বালফোর ঘোষণা দিয়ে ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতির জন্য ‘একটি জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠার সমর্থন জানানোর ১০৮ বছর পর এবং বৃটিশ ম্যান্ডেটাধীন ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির ৭৭ বছর পরে এমন স্বীকৃতি দিলো বৃটেন। স্টারমার এক ভিডিও বার্তায় রবিবার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে আমরা এমন এক পদক্ষেপ নিচ্ছি যা শান্তি ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে জীবিত রাখবে।

যুক্তরাজ্যের অবস্থান পরিবর্তন: জুলাই মাসে বৃটিশ সরকার জানায়, তারা বহুদিনের নীতি থেকে সরে আসছে। সেই নীতিতে বলা হয়েছিল ‘সবচেয়ে প্রভাবশালী মুহূর্তে’ স্বীকৃতি দেয়া হবে। কিন্তু শর্ত ছিল- ইসরাইলকে গাজায় গণহত্যা বন্ধ করতে হবে, একটি টেকসই শান্তি প্রক্রিয়ায় অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে এবং অবরুদ্ধ উপত্যকায় আরও বেশি ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। এরপরও গাজায় পরিস্থিতি আরও বিপর্যয়কর আকার ধারণ করে। ইসরাইলি সেনারা গাজা নগরী ধ্বংস করে দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুধার্ত ও বাস্তুচ্যুত জনগণকে অনাহারে রাখছে। পশ্চিম তীরেও প্রতিদিন ইসরাইলি সেনা অভিযান এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলা চলছে। একইসাথে ইসরাইল পশ্চিম তীর দখল ও পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি যুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে ‘দাফন’ করতে চাইছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ঢেউ: এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগালও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮০তম অধিবেশন শুরু হওয়ার দু’দিন আগে এ ঘোষণা আসে, যেখানে ইসরাইলের দশকব্যাপী দখল ও বর্ণবৈষম্যের পর ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্ব বড় আলোচ্য বিষয় হবে।

বৃটিশ নেতাদের বক্তব্য:
স্টারমার জানিয়েছেন, হামাস নেতৃত্বের সিনিয়র ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, হামাসের কোনো ভূমিকা ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনে থাকবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার বলেন, এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আমাদের অবিচল দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করছে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অবিচ্ছেদ্য অধিকারকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি সতর্ক করে বলেন, স্বীকৃতি দেয়ার অর্থ এই নয় যে রাতারাতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। তিনি বলেন, আমরা এই পদক্ষেপ নিচ্ছি কারণ আমরা চাই দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা টিকে থাকুক।

ফিলিস্তিনের প্রতিক্রিয়া: ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আঘাবেকিয়ান শাহিন বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। সবচেয়ে বড় কথা, এটি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য আশা- একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের আশা। এটি একইসাথে প্রমাণ করে যে ইসরাইলের আমাদের ভূমিতে কোনো সার্বভৌমত্ব নেই। তিনি আরও বলেন, ইসরাইল মানবতার অস্তিত্বের ওপর পরিকল্পিত আঘাত চালাচ্ছে, যাতে ফিলিস্তিনি জনগণ, তাদের সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ মুছে ফেলা যায়। বৃটেনের সংসদে প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধি লায়লা মোরান বলেন, দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এক অবিচারের সংশোধন হলো রোববার। তবে তিনি এটিকে যাত্রার শুরু মাত্র বলে উল্লেখ করেন এবং যোগ করেন, আমাদের এই পর্যায়ে পৌঁছাতে একটি গণহত্যা ঘটতে হয়েছে, যা হওয়া উচিত ছিল না।

ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া: ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই স্বীকৃতিকে হামাসের জন্য একটি ‘পুরস্কার’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি ঘটবে না। (অর্থাৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাবে না)। জর্ডান নদীর পশ্চিমে কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। উগ্রপন্থি মন্ত্রীরা নেতানিয়াহুকে পশ্চিম তীর দখলের পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেন, তিনি অবিলম্বে ইসরাইলি সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের প্রস্তাব দেবেন। অন্যদিকে ওৎজমা ইয়েহুদিত দলের মন্ত্রী ইসহাক ভাসারলাউফ দাবি করেন, ইসরাইলের ভূমি একচেটিয়াভাবে ইহুদি জাতির। ফিলিস্তিনি জনগণ বলে কিছু নেই, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রও নেই।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে চাপ: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই স্বীকৃতির বিরোধিতা করেন এবং জানান এটি তাদের কয়েকটি মতভেদযুক্ত বিষয়ের একটি। আজ সোমবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে ফ্রান্স ও সৌদি আরব যৌথভাবে একদিনের সম্মেলন আয়োজন করছে। সেখানে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান অগ্রসর করার পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার এ উদ্যোগ ইসরাইলি উগ্রবাদীদের পশ্চিম তীর দখলের পথে আরও উস্কে দিতে পারে, যদিও আন্তর্জাতিক চাপ ও নিন্দা ক্রমেই বাড়ছে।
(অনলাইন আল জাজিরা থেকে অনুবাদ)

https://mzamin.com/uploads/news/main/181235_bls.webp