Saturday, October 4, 2014

প্রেমের গল্প: লাল ফড়িং, আমি এবং শ্যামলদার পাঞ্জাবি by রিনি জুলিয়েট রোজারিও

‘ইন্দ্রাণী, মায়ের শরীরটা ভালো না, এবারের পুজোর ছুটিতে একবার আয়।’—দাদার চিঠি। মুকুলগঞ্জ আমাকে ডাকল, ১২ বছর পর! চিঠিটা পড়ে মেঝেতেই শুয়ে পড়লাম। এ যেন বাড়ির পাশের সর্ষে ক্ষেত, আমি ছুটছি লাল ফড়িঙটার পিছুপিছু। আমার ফ্রক বাতাসে উড়ছে...লাল ফড়িঙের পাখা উড়ছে...আমি...ফড়িং...আমি... ফড়িং...আমি...শ্যামলদার পাঞ্জাবি। মুকুলগঞ্জের লেজ ধরে শ্যামলদাটা এসেই গেল! আসবেই জানতাম। মুকুলগঞ্জ আমাকে ছাড়লে কী হবে, নাছোড়বান্দা শ্যামলদাটা কি আমায় ছেড়েছে! এমনও কী হতে পারে, আমিই শ্যামলদাকে ছাড়িনি! বারোটা বছর এই ধ্রুপিদ অস্পষ্টতার মধ্যেই কেটে গেল। কার দায় পড়েছে জানার কে কাকে ছেড়ে গেল? ধুত্তোর!

দোতলার দক্ষিণের ঘরটা আমার। বিয়ের পর যেহেতু মান-অভিমান ভেঙে বাপের বাড়িতে প্রথম পদার্পণ, তাই যত্ন–আত্তিটাও বাড়াবাড়ি রকমেরই হচ্ছে বুঝতে পারছি। তার ওপর সময়টা পূজার। এখানে পা দেওয়ার পর থেকে আমার বরসহ ছানাপোনাদের সময় কাটছে পাড়ার প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে। আমার ‘উনি’ পারেনও বটে। শরীর থেকে জার্নির ধকলটুকু গেল না অব্দি, উনি পাড়া বেড়াতে নেমে পড়লেন। আমি যেতে পারছি কি পারছি না তার ধারটুকুও ধারছেন না। শুধু কি তাই? বাড়ি ফিরে ঝোলা থেকে রাজ্যের উটকো গল্প আমার কানের পোকা নড়িয়ে না শোনানো অব্দি তার শান্তি নেই। এই তো সেদিন পালপাড়া ঘুরে এলেন। এসেই ভাত খেয়ে পান চিবুতে চিবুতে একখানা হাতুড়ি পেটালেন, ‘আচ্ছা শ্যামল মাস্টারটা কে ছিল বলো তো?’
এই রে সুইটা বোধ হয় হাতে বিঁধেই গেল। উফ!
‘দেখতে পাচ্ছ সেলাই করছি। এর মাঝে এত কথা কেন তোমার বাপু?’
কেউ কি জানে কথার ফাঁকে আমি শ্যামলদাকে সরাচ্ছি। লোকটা আমাকে এত দিনেও শান্তি দিল না। উনি ব্যস্ত হলেন, ‘উফ, একটু দেখে সেলাই করবে না? কত রক্ত পড়ছে দেখ। দাঁড়াও, ব্যান্ডেজ আনছি।’
‘হয়েছে, বোসো তো, এমন কিছু হয়নি।’
উনি শান্ত হয়ে বসে আবার আমাকে অশান্ত করলেন, ‘লোকটার খুব প্রশংসা শুনলাম। বিরাট পরোপকারী। মুকুলগঞ্জের স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরি...সবকিছুর উদ্যোক্তা তিনি। একটা মিউজিয়ামও নাকি করছিলেন, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি। কোথায় এখন উনি, জানো? মুকুলগঞ্জই বা ছাড়লেন কেন?’
খুব অবাক লাগল ওর কথা শুনে। মুকুলগঞ্জের প্রতিটি ইট–কাঠ এর উত্তর জানে। অথচ কেউ ওকে বলেনি। আমিই কি বলতে পেরেছি?
পূজা ঘনিয়ে এল। প্রতিমা দেখতে বেড়িয়ে পথে একদিন হেড মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা। আমাকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরলেন। পূজার পরেই স্কুলের রি–ইউনিয়ন হচ্ছে, থাকার জন্য অনুরোধ করলেন। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে আমিও দোনোমোনো পায়ে এগোচ্ছি। ছয় হাত পেছনে মাস্টারমশাইয়ের গলা অথবা ঢাকের আওয়াজ শুনলাম, ‘রি-ইউনিয়নে থেকো ইন্দ্রাণী, শ্যামল আসছে...’
অভিজাত বংশের মেয়ে হয়ে সামান্য একজন গৃহশিক্ষকের প্রেমে পড়ার শাস্তি মুকুলগঞ্জ কি আমাকে দেয়নি? হায় ঈশ্বর! আর কেন? রক্ষা করো আমাকে। পালাচ্ছি আমি। আমার উনাকে রি-ইউনিয়নের দিনেই ফেরার টিকেট কাটতে বেজায় তাড়া দিলাম। উফ, আমি একটু শান্তি চাই!
বাইরে মধ্য আশ্বিনের বৃষ্টি। কিন্তু আমি তো আমার নিজের বৃষ্টিতে ভিজছি। ব্যাগ গোছানো শেষ। সবার সঙ্গে বিদায় পর্ব চলছে। মা চোখ ভেজা আঁচলে ছেলেমানুষি আবদার মাখাচ্ছেন, ‘ইন্দু, আর কয়টা দিন থেকে গেলে পারতি।’
বৃষ্টি অবশেষে ধরে এসেছে। পাশের বাড়ির ছাদের কার্নিশে দুটো জোড়া শালিক হলুদ রোদ পোহাচ্ছে। চারটে শালিকে যেন কী হয়, মনে পড়ছে না। আর মনে পড়ে কী হবে, খবর পেয়েছি শ্যামলদা রি-ইউনিয়নে থাকেননি, ভোরের গাড়িতে চলে গেছেন। আমার বিচ্ছিরি জেদের কারণে বাকি জীবনেও আর তার সঙ্গে দেখা হবে না। শাবাশ ইন্দ্রাণী, এই তো মনে মনে চেয়েছিলে, তাই না?
মুকুলগঞ্জ ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাচ্ছে। স্টেশনে যাওয়ার পথটুকুতে আমি একবারের জন্যও চোখ খুলতে পারিনি। বারো বছর আগে এই রাস্তা দিয়েই তো চৌদ্দ বছরের ইন্দ্রাণী খালি পায়ে দৌড়েছিল...শ্যামলদাকে নিয়ে হারিয়ে যাওয়া ট্রেনের পিছু পিছু।
স্টেশন এসে গেছে। আমার উনি টিকেট কাউন্টারে গেলেন। ছোট ছোট পায়ে শান্তিনিকেতনি ঝোলা কাঁধে স্থির দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকা লোকটি কে? আমি বিস্ময়ে স্থাণু হলাম। টের পাচ্ছি আমার পায়ের তলায় মুকুলগঞ্জের সর্ষেখেত... চারদিকে লাল ফড়িং...আমার ফ্রক উড়ছে...উড়ছে শ্যামলদার পাঞ্জাবি।

নারায়ণগঞ্জে লতিফ সিদ্দিকীর মাথার মূল্য ৫ লাখ নির্ধারণ

হজ, রাসুল (সা.) ও তাবলিগ জামাত নিয়ে মন্তব্য করায় ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভা থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর মস্তকের মূল্য ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ থেকে। গতকাল জুমার পর অনুষ্ঠিত সমাবেশে কয়েকজন বক্তা বলেন, ‘লতিফ সিদ্দিকী যে ধরনের অন্যায় কাজ করেছেন তাতে তার শাস্তি হলো শিরশ্ছেদ। যিনি লতিফের মাথার মস্তক এনে দিতে পারবেন তাকে ৫ লাখ টাকা পুরস্কৃত করা হবে।’
শহরের ডিআইটি বাণিজ্যিক এলাকায় কেন্দ্রীয় রেলওয়ে জামে মসজিদের সামনে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মুসল্লির সমাগম ঘটে। আর দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে আবারও জেগে উঠলো নারায়ণগঞ্জ হেফাজতে ইসলাম।
সমাবেশে আসা বক্তারা লতিফ সিদ্দিকীর বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা করেন। নারায়ণগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সাবেক ভিপি মশিউর রহমান পাবেল ও মুফতি শহীদউল্লাহ তাদের বক্তব্যে লতিফ সিদ্দিকীর মস্তকের দাম ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দিয়ে বলেন, ‘হজ, রাসুল (সা.) ও তাবলিগ নিয়ে কটূক্তি করায় লতিফের শাস্তি সরাসরি শিরশ্ছেদ ও কতল। সুতরাং তার মস্তক যে আনতে পারবে তাকে ৫ লাখ টাকা পুরস্কৃত করা হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে আবদুল কাদির বলেন, লতিফ সিদ্দিকীকে যদি সরকার ও রাষ্ট্র বিচার না করে তাহলে প্রয়োজনে তৌহিদি জনতাই তাকে বিচারের আওতায় আনবে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মুক্তি সরণিতে আদালত বসিয়ে বিচার করে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যের পরও সরকার কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এ ইস্যু নিয়ে কোন ধরনের সমঝোতা বা আপস হতে পারে না। এ অপরাধের শাস্তি সরাসরি শিরশ্ছেদ। আমি লতিফ সিদ্দিকীর শিরশ্ছেদ দাবি করছি। আর লতিফ সিদ্দিকীর এত বড় সাহস হয় নাই আমাদের নবী-রাসুল (সা.) আর হজ নিয়ে কটূক্তি করার। এর পেছনে নিশ্চয় সরকার কিংবা গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। ইসলামবিরোধী ইহুদিদের শক্তিকে কাছে টানতেই সরকার লতিফ সিদ্দিকীকে দিয়ে এ কথা বলিয়েছে। কারণ লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, একমাত্র প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে তিনি তার বক্তব্য থেকে সরে আসবেন।
হেফাজত নেতা মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ হেফাজত মরে নাই। আগের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে। সামনে আরও শক্তিশালী ও দৃঢ় হবে। রাসুল (সা.)-এর ইজ্জত রক্ষা করতে রক্ত দিতেও পিছপা হবে না।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ইসলাম রক্ষায় আমরা যখন আন্দোলন করেছিলাম তখন আমাদের বিরুদ্ধে ডজন ডজন মামলা হয়েছে। অথচ নারায়ণগঞ্জে এখনও লতিফের বিরুদ্ধে কোন মামলা হলো না।
হেফাজত নেতা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করার অপরাধে এক যুবকের ৭ বছরের জেল হলেও দেড় শ’ কোটি মানুষের রাসুল (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করার পরও কেন লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না সে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।’ অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইমরান আল হাদী, মুফতি আবুল কাশেম, আবুল খায়ের, ফরিদ আহমেদ, জহির উদ্দিন ফারুকী, আবদুর রহমান, মুসা কাশেমী প্রমুখ।

দুর্গা: উৎস থেকে নিরন্তর by আহমদ কবির

দুর্গার প্রতি আমার ভক্তি নেই, তবে প্রীতি আছে, বিপুল প্রীতি। এর কারণ, যে জ্ঞান শাখায় আমার সর্বানন্দ অর্থাৎ কলাবিদ্যা, যার ভেতরে রয়েছে সাহিত্য, বিশেষ করে বাংলা সাহিত্য, তা দুর্গার বাখানে ভরপুর। দুর্গা বাংলার সংগীত, নাটক ও নৃত্য; প্রতিমাশিল্প, পটশিল্প ইত্যাদির অনুপ্রেরণাও। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে দুর্গা যত্রতত্র বিরাজ করেন। কখনো হয়ে যান চণ্ডী, কখনো কালী, কখনো উমা, কখনো শ্যামা, কখনো পার্বতী, কখনো গৌরী, কখনো অপর্ণা, কখনো অন্নদা, কখনো আনন্দময়ী, কখনো হতদরিদ্র শিবের স্ত্রীরূপে ভিখারিনী। দুর্গা হলেন শক্তির দেবী।
বাংলা মঙ্গলকাব্যে দুর্গা স্বনামেও আছেন, যেমন ‘দুর্গামঙ্গল’। মিথিলার কবি বিদ্যাপতির রয়েছে দুর্গাভক্তি তরঙ্গিনী। দুর্গা বাংলা কবিতার উপমায়, রূপকে, প্রতীকে, চিত্রকল্পে, অনুপ্রাসে, দৃষ্টান্তে প্রায়ই এসে যান, এসে যান কথাসাহিত্যের চরিত্ররূপেও। যেমন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীর অবিস্মরণীয় কিশোরী দুর্গা। কেবল বাংলা সাহিত্যে নয়, নানা ভারতীয় সাহিত্যে দুর্গার রয়েছে প্রভূত সংস্থান। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের কথা বলাই অধিকন্তু।
এ প্রসঙ্গে আমরা কালিদাসের কুমারসম্ভব-এর কথা স্মরণ করতে পারি। হর-পার্বতীকে নিয়ে যে কত নাটক, কত যাত্রা, কত কাব্য, কত আখ্যান রচিত হয়েছে, তার হিসাব দেওয়াও দুষ্কর। দুর্গার ক্রমবিকাশের সূচনা পুরাকালের সতী উপাখ্যান থেকে, হয়তো তারও আগে আদ্যাশক্তিতে। আদ্যাশক্তি পৃথিবীর মাতৃরূপের আদি স্তর। সেটি ভারতীয় শক্তি সাধনার নানা বিবর্তনে, নানা উপাখ্যানে ও উপচারে পুষ্ট হয়ে সমৃদ্ধ ধারায় স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
পৃথিবীর সবচেয়ে আদি ধর্ম হলো হিন্দুধর্ম। একে সনাতন ধর্মও বলা হয়। কারণ, এ ধর্ম বেদনির্ভর। পৃথিবীর অন্য ধর্মগুলোর তুলনায় হিন্দুধর্ম বেশ জটিল। এর আচারের দিকটি অনেকান্ত, নানা স্তর ও উপস্তরের প্রলেপে প্রলেপে এটি শেষ পর্যন্ত কঠিন গ্রানাইটে রূপ নিয়েছে। দুর্গাও সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন অতি শক্ত ভূমিতে। শশিভূষণ দাশগুপ্ত ভারতীয় শক্তি সাধনার গবেষণায় ‘দুর্গা’ নামের উৎপত্তির স্তরগুলো সম্যক পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন দুর্গার প্রথম উল্লেখ আছে তৈত্তিরীয় আরণ্যক-এ। এটি উপনিষদেরই অন্তর্গত। দুর্গ নামের দৈত্য, যে নানা আপদের হোতা, তাকে বধ করে দেবী ‘দুর্গা’ নামে পরিচিত হয়েছেন বলে আখ্যান আছে। অন্যত্র আছে দুর্গম নামের এক মহা দৈত্যকে হনন করার প্রসঙ্গ। দুর্গা দুর্গতিনাশিনী ব্যাখ্যায়ও তাৎপর্যমণ্ডিত। শশিভূষণ দাশগুপ্ত যে মতটিকে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য মনে করেন তা হলো, দুর্গা দুর্গ রক্ষা বাহিনী দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।
দুর্গাপূজা শরৎকালেই হয়। এই সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে রামায়ণ। সীতা হরণকারী রাবণকে হত্যা করার জন্য ব্রহ্মার অনুরোধে রাম অকালে দেবীর বোধন, অর্থাৎ পূজা করেন। এটি অকালবোধন নামে পরিচিত। আগে বসন্তকালে পূজা হতো। দুর্গাপূজার শারদীয় সাড়ম্বর হিন্দু বাঙালির একান্ত নিজের। বাঙালি হিন্দুরা মাতৃসাধক। সে জন্য দুর্গা তাদের ধর্মানুভূতি ও উৎসবের প্রধান প্রমূর্তি হয়ে উঠেছেন। এবং সন্দেহ নেই, দুর্গা বাঙালি সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী প্রতীক।
দুর্গাকে নিয়ে বাঙালি বড় লেখক-কবিরা তাঁদের অনুভূতি চমৎকারভাবে ব্যক্ত করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রে তাই পাই দুর্গার আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। বাঙালির মধ্যে তিনিই প্রথম দুর্গাকে দেশমাতার রূপগত ও চেতনাগত অপূর্ব ধারণার জন্ম দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আনন্দমঠ-এর সন্তানধর্মীদের গাওয়া ‘বন্দে মাতরম’ গানটি স্মর্তব্য। উপনিবেশের কালে এ সংগীত মন্ত্রোচ্চারণের মতো। ‘বন্দে মাতরম’ নিশ্চয়ই ভারতমাতা, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র এ দিয়ে বঙ্গমাতাকেও বুঝিয়েছেন। কমলাকান্ত সেই মাতাকে আফিমের ঘোরে দেখে নিয়েছে, ‘দিগ্বূজা, নানা প্রহরণ প্রহারিণী, শত্রুমর্দ্দিনী, বীরেন্দ্র পৃষ্ঠবিহারিণী—দক্ষিণে লক্ষ্মী ভাগ্যরূপিণী, বামে বিদ্যাবিজ্ঞানমূর্ত্তিময়ী, সঙ্গে বলরূপী কার্ত্তিকেয়, কার্যসিদ্ধিরূপী গণেশ, আমি সেই কালস্রোতো মধ্যে দেখিলাম, এই সুবর্ণময়ী বঙ্গপ্রতিমা!’
বাঙালি হিন্দু দুর্গার আগমনকে নিজেদের মতো করে নিয়েছে। দুর্গার ছেলেমেয়েরা কেউ তাঁর নিজের নয়, এটি বাঙালি হিন্দুদের কল্পনা। অবশ্য কালিদাস কুমারসম্ভব-এ দুর্গা শিবের পুত্র হিসেবে কার্তিকের জন্মের আখ্যান লিখেছেন, যদিও কার্তিকের সম্ভবের অন্য আখ্যানও আছে। হিন্দু পুরাণে দুর্গা, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী আলাদা আলাদা দেবতা; কিন্তু বাংলাদেশে দুর্গার আগমন একক নয়, ওঁদের নিয়েই পূর্ণতা। দুর্গা সিংহবাহিনী, দশভুজা, ওই ভুজগুলোতেও নানা অস্ত্র। এক হাতে ত্রিশূল, অন্য হাত দিয়ে সেই ত্রিশূল দৃঢ়রূপে তেরছাভাবে ধরা, ত্রিশূলমুখ মহিষাসুরের বক্ষ বিদীর্ণ করছে আর ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। মহিষাসুর দমনের জন্য দুর্গার আরেক নাম মহিষমর্দিনী। দুর্গাপূজা সাংবাৎসরিক। হাজার হাজার বছর ধরে দুর্গাপূজা চলছে, কিন্তু প্রতিবছর দুর্গা ও তাঁর বাহিনী একই রূপে আসে—দুর্গা, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী, মায় সিংহ ও ওই অসুরের একই রূপ থাকে, এঁরা কখনো বুড়ো হন না। পুরাণের দেবদেবীরা এমনকি দৈত্যরাও অনন্তযৌবন, অনন্তযৌবনা।
বাংলাদেশে দেবী আসেন প্রতিবছরে শুচিস্নাতা হয়ে। শরতের আকাশ থাকে বৃষ্টি ঝরানো স্বচ্ছতা, মাঝে মাঝে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়, মেঘ রঙের সঙ্গে কাশের শুভ্রতা মিশে যায়। আকাশে-বাতাসে আগমনীর সুর, তার সঙ্গে বাজে ঢাকের বাদ্য প্রতিটি মন্দিরে। দেবী আসছেন, ওই যে তিনি মর্তে পদার্পণ করছেন। তাঁর বোধন হয়, মহালয়া হয়। প্রতিবছর দেবী আসেন একেক বাহনে। কখনো ঘোড়ায়, কখনো হাতিতে; এবার নৌকায়। আগে ধনাঢ্য ব্যক্তি, সামন্ত, জমিদারেরা পূজা করতেন বিরাট আয়োজনে। এখন পূজা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র, বিশ্বময়ও। যেখানে যেখানে বাঙালি হিন্দুরা গেছে, সেখানেই পূজামণ্ডপ প্রস্তুত হয়েছে, মানুষের ভিড়ও সেখানে বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুর সংখ্যা অনেক; দুর্গাপূজা তাদের জাতীয় উৎসব। বাংলাদেশেও পূজার উৎসব বেড়েছে। পূজার আনন্দের মধ্যে বিষাদের বিষয় হচ্ছে পূজামণ্ডপ ভাঙচুরের খবর। এগুলো কোনোটিই মুসলমান-হিন্দুর সম্প্রীতির জন্য ভালো নয়। উৎসবের প্রেরণা মানবিক সম্প্রীতি ও আনন্দ। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান সে আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এবার নৌকায় দেবীবাহিনীর মর্তে্য আগমন কম্পিউটার দিয়ে আরও আনন্দময় ও চিত্তাকর্ষক করা যায়।
শাস্ত্রবিদ ও পুরোহিতেরা দুর্গাপূজার আচার–পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন, কিন্তু শিক্ষিত পণ্ডিতের হাতে পড়লে সে পদ্ধতির আনুপুঙ্খিক ব্যাখ্যা-বিবরণ যে কতখানি স্বাদু হতে পারে, তার প্রমাণ ‘দুর্গোৎসবে নবপত্রিকা’ রচনাটি। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মুক্তমন রসিক পণ্ডিত। তিনিও দুর্গাপূজার মধ্যে নৃতাত্ত্বিক সূত্র খুঁজে পেয়েছেন; যেমন পরে পেলেন ফ্রেজার।
বঙ্কিমচন্দ্রের কথা আগেই বলেছি, অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক দেবী দুর্গাকে নিয়ে তাঁদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। বড় কবিদের মধ্যে মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ ও অমিয় চক্রবর্তীর রচনার কথা মনে পড়ে। দুর্গাকে দেশমাতা হিসেবে নিয়ে ‘আনন্দময়ীর আগমন’ লিখে নজরুল ব্রিটিশ বিরোধিতার জন্য জেল খেটেছেন। ১৯০৫-এ বঙ্গবিচ্ছেদ হলে রবীন্দ্রনাথ বেদনার্ত হৃদয়ে ওই অসাধারণ গানটি লিখলেন দুর্গার প্রমূর্তির আদলে—‘আিজ বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!’ এই রূপ বঙ্গমাতা দুর্গার। দুর্গাপূজার সর্বোত্তম আনন্দ উপহার নিশ্চয়ই সাহিত্য ও সিনেমা পত্রিকাগুলোর শারদীয় সংখ্যা এবং অবশ্যই অনেক অনেক বাংলা গান।
আহমদ কবির: অধ্যাপক বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জার্মানিকে নিয়ে সব সংশয় কেটে গেছে by সরাফ আহমেদ

গত জুলাই মাসে আটলান্টিকের ওপারে সুদূর রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে জার্মান ফুটবল দল যখন ১৯৯০ সালের পর চতুর্থবারের মতো আবার ফুটবলে বিশ্ব শিরোপা জয় করল—মনে হয়েছিল পরের দিন জার্মানিজুড়ে আনন্দের ঢেউ উথলে পড়বে। ১৩ জুলাই রোববার জার্মানির স্থানীয় সময় গভীর রাতের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ ওই রাতেই ভোর অবধি সীমাবদ্ধ রইল। পরের দিন আবার সেই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা—কোনো ছুটি নয়, সংবাদপত্রগুলোয় বিশেষ ক্রোড়পত্র নয়, ব্রাজিল থেকে বার্লিনে ফেরত আসা খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা দেওয়া ছাড়া দেশজুড়ে আলাদা কোনো হইহুল্লোড় বা ফুটবলভক্তদের আনন্দ মিছিলও দেখা গেল না, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কারণে আলাদা কোনো স্যুভেনিরও বাজারে এল না।
জার্মান জাতি তাদের অতীত ইতিহাসের তাড়না থেকেই, অতি উচ্ছ্বাস বা আগ্রাসী ভূমিকা পরিত্যাগ করে সংযম, ত্যাগ, শ্রম ও সমন্বিত ঐক্যপ্রয়াসী হয়েছে। ২৪ বছর আগে জার্মান জাতির পুনঃঐক্য ঘটলেও, ইউরোপীয় ও বিশ্ব রাজনীতিতে সতর্ক আর সাবধানে পথচলার ব্যাপারটি জার্মান রাজনীতিকের মধ্যে রয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ৪৫ বছর পুঁজিবাদী আর সমাজতান্ত্রিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে যাওয়া এবং জার্মান জাতির পুনরেকত্রীকরণের ২৪ বছর পার হয়ে গেলেও, জার্মান জাতির গত শত বছরে দুটি মহাযুদ্ধ এবং জার্মান জাতির বিভক্তি ও ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস নিয়ে নানা একাডেমিক বিশ্লেষণ গবেষণা ও বইপত্র প্রকাশিত হচ্ছে।
সম্প্রতি বার্লিনের বিখ্যাত ফ্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গের্ট ইয়োখিম গ্লেসনার তাঁর জার্মান ও ইউরোপীয় রাজনীতি এবং নিরাপত্তা ও মানবাধিকার শীর্ষক গবেষণামূলক বইয়ে লিখেছেন, ‘জার্মানির পুনরেকত্রীকরণের সময়টিতে তার প্রতিবেশীরা বাঁকা চোখে দেখলেও গত ২৪ বছরের ইউরোপীয় রাজনীতিতে জার্মানিকে নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো ও বিশ্বের সংশয়টা অনেকটাই কেটেছে৷ তবে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় ইউরোপীয় ও বিশ্ব রাজনীতিতে জার্মানির ভূমিকা বা কর্তৃত্ব কী হওয়া উচিত, তখন অনেকেই ব্যাপারটি এড়িয়ে যান।’ ১৯৮৯ সালে রক্ষণশীল ব্রিটিশ বুদ্ধিজীবী রজার স্কুটন লন্ডনের সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘ডোন্ট ট্রাস্ট দ্য জার্মান’, তিনি তাঁর প্রবন্ধে যৌক্তিক কারণ উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘ইউরোপীয় রাজনীতিতে জার্মান ঐক্য ভবিষ্যতে আবার সংকট ডেকে আনবে।’
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপীয় সমাজব্যবস্থা দেখে ষাটের দশকে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিখ্যাত জার্মান সাহিত্যিক পাউল টমাসম্যান বলেছিলেন, ইতিহাসকে ভুলে নয়, ইতিহাসের সত্যটাকে মূল্যায়ন করে ইতিহাসের পুরোনো খোলস থেকে জার্মানদের বেরিয়ে আসার ব্যাপারটিই মুখ্য, মানবিকতা আর প্রতিবেশীদের সহানুভূতি আদায় করেই জার্মান জাতিকে এগোতে হবে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী মিত্র শক্তির সমীহ আদায় করে জার্মানি পুনঃঐক্যের ২৪ বছর কাটলেও দুই ধরনের সামাজিক, রাজনীতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে একই কাঠামোতে সমন্বিত করার কাজটিও ছিল বেশ কঠিন।
২৪ বছর আগে মধ্য ইউরোপীয় ভূখণ্ডে, পূর্ব জার্মানি আর পশ্চিম জার্মানি নামের দুই দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকেই এই পুনরেকত্রীভূত দেশের পূর্বের পাঁচটি আর পশ্চিমের ১১টি রাজ্য নিয়ে আবার গঠিত হলো জার্মানি।
প্রায় ২৫ বছরের কাছাকাছি সময়ে যুক্ত জার্মানির জনগণ কেমন আছে বা জার্মান জাতির সামাজিক-অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে নানা সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, দেশটির দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্য, চাকরির সুযোগ, যোগাযোগব্যবস্থার ক্রমেই উন্নতি ঘটছে, তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে পূর্বের অংশ, পশ্চিমের তুলনায় এখনো ২৫ ভাগ পিছিয়ে রয়েছে। সাবেক পূর্ব জার্মানির কাঠামো পশ্চিমা ধাঁচে গড়ে তুলতে যে অঢেল অর্থের প্রয়োজন হয়েছে, তা জোগান দিতে সেই ১৯৯১ সাল থেকে সংহতি ভ্যাট চালু রয়েছে, যা ২০১৯ সাল পর্যন্ত চালু থাকার কথা রয়েছে। জার্মানির ৭৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, ঐক্যবদ্ধ জার্মানির সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল।
দুই ধরনের সমাজতান্ত্রিক আর ধনবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এক করে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি ছিল দুরূহ। পূর্ব জার্মানিতে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনীতির প্রচলন রইলেও তা ছিল পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্য সেরা অর্থনীতি, যদিও পুঁজিবাদের সমর্থকেরা তা মানেন না। আর পশ্চিমের অর্থনীতি পুঁজিবাদী শ্রেণির হলেও, সেখানে মানবিকতা ছিল। পশ্চিম জার্মানিতে একধরনের সামাজিক অর্থনৈতিক বাজারকাঠামো ছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশ না হয়েও মানুষের মৌলিক চাহিদা যেমন আবাস, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি—এসব সেবামূলক গ্যারান্টির নিশ্চয়তা ছিল আর সেই একই ধাঁচে ২৪ বছর ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ঐক্যবদ্ধ জার্মানির সামাজিক নিশ্চয়তামূলক অর্থনীতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর জার্মানির অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিকেরা যে সামাজিক অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করেন, ওই সামাজিক বাজার অর্থনীতি নানা ধকল বা পুনঃঐক্য জার্মানির অর্থায়ন সামাল দিয়ে ইউরোভুক্ত দেশগুলোর সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ১৮তম জার্মান পার্লামেন্ট নির্বাচনে বড় কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার কারণে বড় দলগুলো নির্বাচন-পূর্ব বাগ্বিতণ্ডা ভুলে জোট সরকার গঠন করে দেশ চালাচ্ছে। অবশ্য জার্মান রাজনীতিতে এই ঘটনা নতুন নয়। ১৯৬৬ সালের পর ২০০৫, আর এবার ২০১৩ সাল—এই নিয়ে তৃতীয়বার জার্মানির দুই জনপ্রিয় দল খ্রিষ্টিয়ান গণতান্ত্রিক দল ও সামাজিক গণতান্ত্রিক দল, ছোট দল ব্যাভেরিয়া রাজ্যের খ্রিষ্টিয়ান সামাজিক ইউনিয়নকে নিয়ে মহাজোট সরকার গঠিত হয়েছে এবং গত একটি বছর সাফল্যের সঙ্গেই তারা দেশ পরিচালনা করছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকেরা জার্মান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন এনেছেন, তা হলো বিভক্তি আর অনৈক্যকে পাশে সরিয়ে রেখে অভ্যন্তরীণ ও উপমহাদেশীয় ঐক্য সংহতির জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করা। আর এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জার্মানিকে। যুদ্ধ, হত্যালীলা, জবরদখল থেকে বের হয়ে এসে নতুন প্রত্যাশায় সবাইকে সমন্বিত করে অগ্রসরমাণ এই জাতি ভবিষ্যতে বিশ্বের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
সরাফ আহমেদ: প্রথম আলোর জার্মান প্রতিনিধি।

আইডিয়ায় মোদি এক নম্বরে, রূপায়ণ হবে তো? by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতের গত ১০ দিনের খবরের কাগজগুলোর প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ রাখুন। কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সংবাদ সম্প্রচার স্মরণ করুন। দেখবেন, একটি নামই জ্বলজ্বল করেছে, একজনের খবরই হেডলাইনসে প্রাধান্য পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁকে যাঁরা পছন্দ করেন, তাঁরা তো কাগজের বেশিটাই মোদি-বন্দনায় ভরিয়ে রেখেছেন। যাঁরা তাঁকে ততটা নেকনজরে দেখেন না, তাঁরাও কিন্তু মোদিকে উপেক্ষা করতে পারছেন না। চাঁদ সওদাগরের মনসাপূজার ঢঙে তাঁরাও মোদিকে প্রচারমাধ্যমে জায়গা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরটাই দেখা যাক। দিল্লির বদলে মোদি তাঁকে আহমেদাবাদে নামালেন। সেদিন মোদির জন্মদিন। জিনপিং ও মোদি সবরমতী নদীর তীরে গান্ধী আশ্রমে বহুক্ষণ কাটালেন। জিনপিংকে মোদি চরকায় সুতো কাটা শেখালেন, নদীর তীরে দুজনে দোলনায় দুললেন এবং পরের দিন দিল্লি এলেন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার জন্য। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী তখন দিল্লিতে। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় মোদি বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছেন, শেখ হাসিনা দেশটাকে রক্ষা করেছেন।’ পরিবর্তিত জামানায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কোন খাতে বইতে চলেছে, এই একটা বাক্যই তার ইঙ্গিতবাহী। এটাও প্রথম পাতার খবর হলো। এরপর মোদি গেলেন মার্কিন মুলুকে। এক যুগ অচ্ছুত থাকার পর মোদির সেই সফর নিয়ে যে কোলাহল সৃষ্টি হয়েছে, তার রেশ সংবাদমাধ্যম থেকে এখনো মিলোয়নি। ম্যাডিসন স্কয়ারে মোদির ঐতিহাসিক ভাষণ থেকে শুরু করে বারাক ওবামার গুজরাটি সম্ভাষণ ‘কেম ছো (কেমন আছেন) প্রাইম মিনিস্টার?’ নিয়ে এখনো গবেষণার শেষ নেই। দুই দেশের সম্পর্ক কোন উচ্চতায় পৌঁছাল এবং জাপান ও চীনের দিকে অনেকটাই ঝুঁকে পড়া ভারতকে আমেরিকা তাদের দিকে কতখানি টেনে আনতে পারবে, সে নিয়ে অন্তহীন গবেষণা চলছেই। এখানেও সংবাদমাধ্যম মোদিময়।
ভারত-আমেরিকা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আগামী দিনে পাঁচ গুণ বাড়াতে মোদি ও ওবামা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। সেই লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে একটা লগ্নি-উদ্যোগ স্থাপনে দুই নেতা রাজি হয়েছেন। আজমির, বিশাখাপট্টনম ও এলাহাবাদকে ‘স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পমহল রাজি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে দুই দেশ একজোট হয়ে কাজে নামার বিষয়েও অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। এ জন্য যা যা করণীয়, আগামী দিনগুলোতে তা করা হবে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য ২০০৫ সালে যে বোঝাপড়া দুই দেশের মধ্যে হয়েছিল, তা আরও ১০ বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে। এসব বিষয়ের পাশাপাশি সন্ত্রাস রোধে (দাউদ ইব্রাহিমসহ) একসঙ্গে কাজ করার যৌথ প্রচেষ্টা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রশ্নে সহমত হওয়া (যদিও আইএস মোকাবিলায় ভারত সেনা পাঠাবে না জানিয়ে দিয়েছে) মোদির এই সফরের বড় লাভ। কিন্তু এটাও ঠিক, এত মাখামাখি সত্ত্বেও মোদি কিন্তু ওবামার সব সুরে নাচেননি। বাণিজ্য প্রসারে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শর্তাবলি মোদির সরকার এখনো মানেনি। খাদ্য সুরক্ষার প্রশ্নে তিনি এখনো অনড়। তেমনই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণের জন্য ভারতীয় আইন নিয়ে যে টালবাহানা দীর্ঘদিন ধরে চলছে, তার সুরাহাও এই সফরে হয়নি। মীমাংসার জন্য একটা ‘কনট্যাক্ট গ্রুপ’ গঠনে দুই দেশ রাজি হয়েছে শুধু। তাতে চিড়ে ভিজবে কি না কিংবা ভিজলেও কবে, সে এক জটিল প্রশ্ন।
ফল যা-ই হোক, মোদি যে অন্য সবার চেয়ে অন্যভাবে চিন্তা করতে পারেন, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘আউট অব দ্য বক্স আইডিয়া’ এবং প্রচারের আলোকে অতি সহজে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন, তার প্রমাণ তিনি বারবার দিচ্ছেন। জাতিসংঘে তিনি ভাষণ দিলেন হিন্দিতে। লিখিত ভাষণের গণ্ডি টপকে বারবার তিনি বক্তব্যের বাড়তি ব্যাখ্যা দিলেন। ইংরেজি ভাষায় তিনি ততটা দক্ষ নন। কিন্তু সেই খামতিকে তিনি কমজোরি ভাবতে নারাজ। ইংরেজির জ্ঞান সীমিত হলে যাঁরা লজ্জা পান, মোদি সেই দলভুক্ত নন; বরং সেই দুর্বলতাকেই তিনি তাঁর হাতিয়ার করে তুলেছেন। তুখোড় ভাষণের মাধ্যমে তিনি অনায়াসে সাধারণের মন ছুঁয়ে যাচ্ছেন। কীভাবে এবং কোন সাবলীলতায় ভর দিয়ে তিনি জনতার সঙ্গে ‘কানেক্ট’ করছেন, ম্যাডিসন স্কয়ারের দীর্ঘ বক্তৃতাই তার প্রমাণ। এভাবে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া ভাষণ দিতেন অটল বিহারি বাজপেয়ি। মোদি সেই দক্ষতার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন তাঁর ‘মার্কেটিং স্কিল’কে। আজকের দিনে নিজেকে কীভাবে ‘প্রজেক্ট’ করতে হবে, কীভাবে মানুষকে শুনতে বা ভাবতে বাধ্য করাতে হবে, মোহিত করতে হবে, মোদিকে দেখে তা শেখা দরকার। সাধারণ নির্বাচনের আগে-পরের ছয় মাসে মোদি বারবার তার প্রমাণ রেখেছেন এবং এখনো প্রতিনিয়ত রেখে যাচ্ছেন।
এই যেমন মার্কিন মুলুক থেকে দেশে ফিরে মোদি কিন্তু বিশ্রামের ধার-কাছ দিয়েও হাঁটলেন না। ফিরলেন ১ অক্টোবর, পরের দিন জাতির জনকের জন্মদিন। সেদিন সকাল থেকে কাজ আর কাজ। গান্ধীজি স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দিতেন। স্বাধীনতা দিবসের দিন লালকেল্লা থেকে ভাষণে মোদি ২ অক্টোবরের জন্য দেশবাসীর কাছে একটা নতুন ‘এজেন্ডা’ রাখলেন। স্বচ্ছতা দিবস। গোটা দেশকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জঞ্জালমুক্ত করা ও রাখার একটা অঙ্গীকার তিনি আদায় করে নিলেন। কী করলেন তিনি? আমরা দেখলাম, সাতসকালেই তিনি ঝাড়ু হাতে নেমে পড়লেন। গান্ধীজি ‘মেথর’দের ডেকেছিলেন ‘হরিজন’ বলে। তাদের কলোনির নাম ক্রমে ক্রমে ‘বাল্মীকি কলোনি’ বলে পরিচিত হয়। মোদি সেই কলোনিতে ঢুকে ঝাড়ু চালাতে লাগলেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাড়ু হাতে সাফাই অভিযানে নেমে পড়ল গোটা দেশ। মন্ত্রীরা, নেতারা, আমলারা, শিল্পপতিরা, নায়ক-নায়িকারা এবং নামী-অনামী সাধারণ মানুষ উত্তর থেকে দক্ষিণে, পুব থেকে পশ্চিমে দিনভর ঝাড়ু হাতে রাস্তা থেকে, নালা থেকে জঞ্জাল তুলছেন, এমন দৃশ্য আমি কেন, সম্ভবত কেউই কখনো দেখেনি। মোদি বিভিন্ন ভাষণে বারবার বলেছেন, স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্নতাকে তিনি জাতীয় আন্দোলনের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। এবং সেই আন্দোলনে তিনি রাজনীতিকে মেলাতে চান না। বলতে দ্বিধা নেই, সেই লক্ষ্যের প্রথম ধাপে তিনি সফল। পরবর্তী পর্যায়ে কী হবে, সে বিষয়ে প্রশ্নচিহ্ন যদিও থেকেই যাচ্ছে।
প্রথম ধাপে কেন সফল? চিরায়ত রাজনীতির ঘেরাটোপের বাইরে বেরিয়ে মোদি সমাজের বিভিন্ন পেশার নয়জন বিশিষ্ট মানুষকে এই আন্দোলনের শরিক হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সেই নয়জন হলেন সিনেমা জগতের দিকপাল কমল হাসান, সালমান খান, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, যোগগুরু বাবা রামদেব, শিল্পপতি অনিল আম্বানি, ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার, গোয়ার রাজ্যপাল মৃদুলা সিনহা, কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর ও জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিক ‘তারক মেহতা কা উল্টা চশমা’র পুরো টিম। এই নয়জনের প্রত্যেকে আরও নয়জন করে মানুষ বাছবেন, তাঁরাও প্রত্যেকে বাছবেন নয়জন করে। এভাবে কোটি কোটি মানুষ শামিল হবেন স্বচ্ছ ভারত গড়ে তোলার আন্দোলনে। মোদি এঁদের উদ্দেশে বলেছেন, আপনারা পছন্দমতো জায়গা বেছে নিন। সেখানে নোংরা দেখলে প্রথমে ছবি তুলুন। তারপর সেই জায়গা পরিষ্কার করে ফেলুন। পরিষ্কার জায়গার ছবিও তুলুন। তারপর অপরিচ্ছন্ন ও পরিচ্ছন্ন দুই ছবিই সোশ্যাল নেটওয়ার্কে পোস্ট করুন। সাত দিন এই কাজ করুন। দেখুন কী বিপুল পরিবর্তন ঘটে যাবে দেশে।
মোদির এই আন্দোলনেরই একটা অঙ্গ দেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য পায়খানা তৈরি করা। ২০১৯ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারের জন্য ১১ কোটি ১১ লাখ পায়খানা তৈরি হবে। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক এ জন্য প্রতিটি গ্রামকে আগামী পাঁচ বছর ধরে বছরে ২০ লাখ রুপি দেবে। দেশের সাড়ে ছয় লাখ গ্রামের জন্য এই কাজে বছরে খরচ হবে ১৩ হাজার কোটি রুপি। স্বচ্ছতা অভিযানে মোদির বাজেট আগামী পাঁচ বছরে এক লাখ ৩৪ হাজার কোটি রুপি। এই অর্থের মধ্যে ২০১৫ সালে শহরাঞ্চলে তৈরি হবে দুই কোটি পায়খানা, খরচ হবে ৬২ হাজার নয় কোটি রুপি। ২০১৯ সালের মধ্যে এক কোটি চার লাখ বাড়িতে তৈরি হবে কলঘর ও পাকা পায়খানা। ওই বছরের মধ্যে চার হাজার ৪১টি শহরে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বন্দোবস্ত করা হবে। গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানে মাথায় করে মলমূত্র বয়ে নিয়ে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। এখন দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ উন্মুক্ত এলাকায় মলমূত্র ত্যাগ করে। দেশের ১০ শতাংশ স্কুলে এখনো মেয়েদের টয়লেট নেই। ২০২২ সালের মধ্যে এই অসুবিধে পুরোপুরি দূর করা মোদির লক্ষ্য।
সংবাদমাধ্যমে স্থান পাওয়া নিয়ে নরেন্দ্র মোদির এই ‘পাকাপাকি বন্দোবস্ত’র প্রধান কারণ তাঁর অন্য ধরনের ভাবনাচিন্তা, যা আমি আগেই ‘আউট অব দ্য বক্স আইডিয়া’ বলে লিখেছি। পরিচ্ছন্নতার প্রশ্নে তিনি রাজনীতি আনবেন না বলেছেন। না আনতেই পারেন। কিন্তু আশঙ্কা, দিনান্তে এই কর্মযজ্ঞ নিছকই ছবি তোলার মোচ্ছবে না পরিণত হয়। তেমন হলে পুরোটাই রাজনৈতিক ‘গিমিক’ হয়ে দাঁড়ালে এই ‘আউট অব দ্য বক্স আইডিয়াই’ শেষ পর্যন্ত প্রবল পরিহাস হয়ে মোদিকে ধাওয়া করবে। দি এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের (টেরি) হিসাব অনুযায়ী, ভারতের শহরগুলোতে প্রতিবছর ৬৮ মিলিয়ন টন জঞ্জাল জমে। এর মধ্যে ২৭ মিলিয়ন টন জমি ভরাটের কাজে লাগানো হয় অথবা গ্রামীণ এলাকায় ফেলা হয়। ১৪ মিলিয়ন টন শহরেই পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। ৩৮ বিলিয়ন লিটার তরল বর্জ্য দেশের ৪৯৮টি শহর ২০০৯ সালে উৎপন্ন করেছে। এর মধ্যে ২৬ বিলিয়ন লিটারের স্থান হয়েছে দেশের নদীগুলোতে! দেশকে পরিচ্ছন্ন করতে গেলে শুধু ঝাড়ু হাতে পথে নামাই শেষ কথা নয়; শেষ কথা হলো এই বিপুল কঠিন ও তরল বর্জ্যের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার বন্দোবস্ত করা। সে জন্য যে পাহাড়প্রমাণ অর্থের প্রয়োজন, তার জোগাড় কোন গৌরী সেন দেবেন, তা এখনো অজানা।
তিনি যে বসে থাকার পাত্র নন, এই চার মাসে নরেন্দ্র মোদি তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মগজে নিত্যনতুন আইডিয়া ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই কারণেই সংবাদমাধ্যমে তিনি সদা আলোচিত। কিন্তু শেষ হিসাবে তাঁকে প্রমাণ দিতে হবে, তিনি শুধু স্বপ্ন দেখিয়েই থমকে যান না, স্বপ্নকে তিনি সাকারও করেন।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

শিক্ষা- উষ্মা নয়, সঠিক পদক্ষেপ চাই by আবুল মোমেন

দেশের শিক্ষার মান নিয়ে শিক্ষিত সমাজের চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠাকে আমি একটি আশাব্যঞ্জক বিষয় বলে মনে করি। এতে সরকারপ্রধান এবং স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী, যিনি বিনয় ও পরমতসহিষ্ণুতার জন্য উচ্চ ভাবমূর্তির অধিকারী, তিনিও কড়া ভাষায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন এবং চলমান ব্যবস্থার সপক্ষে জোরালো সমর্থন ও সন্তুষ্টি ব্যক্ত করেছেন। তবু আশা করব, শিক্ষা নিয়ে দেশের চিন্তাবিদদের সঙ্গে সরকারের বিপরীতমুখী অবস্থান সাময়িক এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তা কেটে যাবে।

অপ্রাসঙ্গিক হবে না মনে করে ব্যক্তিগত কথা তুলছি। ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত ঘটনাবলি আমার আবেগ ও চিন্তার জগতে প্রচণ্ড নাড়া দেয়। মনে হলো ১৯৬২ থেকে রাজপথে যে স্লোগান দিয়ে এসেছি ‘শিক্ষাব্যবস্থা পাল্টাতে হবে’—পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে কি কেউ কাজ করেছি? এ জিজ্ঞাসার উত্তর জানা ছিল না। মূলত তখনকার দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে এবং মনের গভীরে উঁকি দেওয়া প্রশ্নটিতে চিন্তার ঘুরপাক নিয়েই কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে শিশুদের জন্য কাজ শুরু করি সেই পঁচাত্তরের শেষ দিক থেকে। পরে ১৯৮০ সালে ফুলকির শাখা হিসেবে সহজপাঠ নামে প্রাথমিক স্কুল চালু করি। সেই থেকে এই কাজে যুক্ত আছি। তখন থেকে মনে আশা ও বিশ্বাস ছিল, কোনো দিন সমমনা কোনো সরকার এলে আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দেওয়া যাবে, যেন অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কিছু তৈরি-দৃষ্টান্ত তাঁরা পেতে পারেন।
২.
শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, সমালোচনা নয় পরামর্শ থাকলে তা নিয়ে হাজির হোন। আমাদের মনের সুপ্ত বাসনার কারণে আমরা আওয়ামী লীগের প্রথম আমল থেকেই যোগাযোগের বিষয়ে সচেষ্ট হই। আর দ্বিতীয় পর্বে নাহিদকে শিক্ষামন্ত্রী পেয়ে সবাই খুবই আশান্বিত হয়ে উঠি। তাঁর সঙ্গে দাপ্তরিক যোগাযোগ, প্রস্তাবসহ আবেদন প্রদান, ব্যক্তিগত একান্ত আলাপ ইত্যাদি সবই হয়েছে। কেবল তাঁর সঙ্গে নয়, সরকারি মহলে আরও অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ হয়েছে। সত্যি বলতে কি, একমাত্র সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীকেই পেয়েছি নতুন পরামর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে।
শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় হয়তো বলবেন তাঁর অসংখ্য ভালো কাজ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। না, সেগুলো আমার নজরে ও বিবেচনায় আছে এবং বারবার সেগুলোর কথা বলেছি। কিন্তু এসব পরিবর্তনের সীমাবদ্ধতা না বুঝলে শিক্ষার আসল লক্ষ্য আমাদের জন্য অধরা থেকে যাবে।
প্রাথমিকে শতভাগ ভর্তি, বছরের প্রথম দিনে সবার জন্য বিনা মূল্যে বই, চমকপ্রদ ফলাফল সত্ত্বেও বলব শিক্ষার শেষ বিচার তো হলো ছাত্র কী শিখেছে। আমি প্রাক-প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণিতে পাঠদানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি উচ্চপর্যায়ের যে চিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা কাবেরী গায়েন তুলে ধরেছেন, তাতে কোনো অতিরঞ্জন নেই।
সমাধানের পরামর্শ দিতে ও নিতে হলে সমস্যাগুলো ঠিকভাবে শনাক্ত করতে হবে। আমার বরাবর মনে হয়েছে, সমাধানের জন্য যেসব মৌলিক কাজ (পরিবর্তন) হওয়া দরকার তা বুঝলেও বর্তমান সরকারও তাতে হাত দিতে সাহস পাচ্ছে না। এ কথা বললে আশা করি সজ্জন সার্থক (পূর্ববর্তী শিক্ষামন্ত্রীদের তুলনায়) নাহিদ ভাইয়ের অবদানকে খাটো করা হবে না যে তাঁর আমলে শিক্ষায় ব্যাপকভাবে পরিমাণগত উন্নতি হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা আদতে চর্চার মাধ্যমে অর্জনের বিষয়, যা শিক্ষক-ছাত্রের শ্রেণিকক্ষের যথার্থ ভূমিকায় সাধিত হয়। এ বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। আগের লেখায় বলেছিলাম (১২.০৯.২০১৪) পুরো ব্যবস্থাটা পুরোমাত্রায় পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় শৈশব থেকেই একজন শিশু শিক্ষার্থী না হয়ে পরীক্ষার্থীতে পরিণত হচ্ছে। সফল পরীক্ষার্থী তৈরির কারখানায় সচেতন শিক্ষার্থী তৈরি হতে পারছে না। এখানেই সমস্যার শিকড়।
৩.
এ আলোচনা স্কুল-শিক্ষার মধ্যে সীমিত রেখে চটজলদি চলমান ব্যবস্থার সমস্যা বা চ্যালেঞ্জগুলো মনে করে নিতে পারি:
দরিদ্র দেশে স্কুলগামী শিশুর বিপুল সংখ্যা—প্রায় চার কোটি।
শিক্ষার মাধ্যমের ভিত্তিতে স্কুল পর্যায়েই শিশুদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি। (মাদ্রাসা ধরে আদতে ত্রিধাবিভক্তি)
বিভিন্ন ধারার শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দে ব্যাপক তারতম্যের প্রভাবে শিক্ষার একাডেমিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে বৈষম্য সৃষ্ট হচ্ছে।
পেশা হিসেবে স্কুল শিক্ষকতার মর্যাদা ও আকর্ষণ কমে যাওয়ায় মেধাবী, মননশীল, ব্রতী তরুণেরা এ পেশায় আসছেন না।
•বিপুল ছাত্রকে সীমিত অবকাঠামোয় ধারণ করতে গিয়ে শিক্ষার বহু রকম সংকোচন ঘটেছে—স্কুল সময়ের স্বল্পতা, বড় আকারের শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক সংযোগের ঘাটতি, পরীক্ষার প্রস্তুতির বাইরে অন্য বিষয়কে উপেক্ষা, পরীক্ষার প্রাধান্য ও চাপে স্কুল ছাপিয়ে কোচিং সেন্টারের গুরুত্ব বৃদ্ধি, মুখস্থবিদ্যার প্রবণতা ইত্যাদি।
স্কুল-শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে সরকারি-বেসরকারি সব মহলে বিভ্রান্তি।
৪.
সমাধানের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বলা দরকার, বর্তমান সরকার পরিস্থিতির উন্নয়নের বিষয়ে সচেতন বলেই মনে করি এবং সে লক্ষ্যে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নসহ নানা রকম উদ্যোগ আয়োজনও চলছে। কিন্তু মূল ব্যাধি নিরাময়ে যে প্রায় বৈপ্লবিক কার্যক্রম প্রয়োজন তা নিতে দ্বিধান্বিত থাকছে। ফলে এ অনেকটা যোগাযোগমন্ত্রীর সড়ক মেরামতি কাজের মতো ফল দিচ্ছে। দুই টাকার কাজে দেড় টাকা
খরচ করলে ফল পাওয়া যায় না, ব্যয়িত দেড় টাকাই বরবাদ হয়।
এবার কাজের কথায় আসা যাক। বলে রাখা ভালো, দৈনিকের পাতায় বিস্তারিত লেখার সুযোগ নেই, সংক্ষেপে কিছু লেখা যায়।
শিক্ষা সংস্কারের কাজটি যেহেতু হবে মৌলিক ও বিপুল, তাই এর পক্ষে বিশেষজ্ঞসহ নাগরিকদের গরিষ্ঠাংশের ঐকমত্য তৈরির কাজটি প্রথম করণীয়। এটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়।
সমাজমানস এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে সবার জন্য মাতৃভাষাকে স্কুল শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাধ্যতামূলক করার মতো বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া সম্ভব হবে না। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ পর্যায়ে ফেরার জন্য মূলধারার বাংলামাধ্যম স্কুলে আগের মতো দক্ষতার সঙ্গে ইংরেজি শেখার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বর্তমানে মুখস্থবিদ্যার দৌরাত্ম্যে এবং বাণিজ্যিক বিষয়ের প্রতি সবার আগ্রহাতিশয্যের ফলে আধুনিক মানসগঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানশিক্ষা কাঙ্ক্ষিত মানে হতে পারছে না। হাতে-কলমে শেখার ব্যবস্থাসহ এর খোলনলচে পাল্টাতে হবে।
শিশু-কিশোরের আধিক্যপ্রবণ দেশে পশ্চিমের শিশু-দুর্লভ সমাজের মডেল ব্যবস্থাপনায় প্রযোজ্য হবে না। বরং চীন থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে প্রাথমিক থেকে ৪০-৬০ জনের শ্রেণি রাখতে পারি (ছাত্রসংখ্যা ৪০-এর বেশি হলে একজন করে সহায়ক শিক্ষক থাকবেন।)
সব স্কুলে ছোট ছোট পাঠাগার ও গবেষণাগার থাকবে আর প্রত্যেক উপজেলায় উপজেলা শিক্ষা দপ্তরের অধীনে এলাকার সব স্কুলে ব্যবহারোপযোগী পাঠাগার ও গবেষণাগার থাকবে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের ফলে মাঠ ও মুক্ত অঙ্গন কমে যাচ্ছে। ছাত্রদের মাঠে খেলা ও শরীরচর্চার চাহিদা মেটানোর জন্য সারা দেশের মাঠ ও খোলা জায়গার (খাস জমি হলে ভালো হয়) শুমারি করে সেগুলো উপজেলা শিক্ষা দপ্তরের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও বিভিন্ন স্কুলের ব্যবহারের সময়সূচি নির্ধারণ করা যায়।
মনে রাখতে হবে শুধু পাঠ্যবই পড়ে, তাও নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে, কোনোভাবেই শিক্ষিত জাতি নির্মাণ করা যায় না। এ ধরনের খাপছাড়া মুখস্থবিদ্যা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। বস্তুত এ কারণেই উচ্চ স্তরের ভর্তি পরীক্ষায় নিম্নস্তরের মেধাবীদের ফল-বিপর্যয় ঘটেছে। তাই প্রত্যেক উপজেলা শিক্ষা দপ্তরের অধীনে একটি শিক্ষা-সংস্কৃতি সমন্বয় বিভাগের মাধ্যমে শিশুদের পাঠের অভ্যাস
গড়ে তুলতে ও সাংস্কৃতিক পাঠে সহায়তা দিতে হবে। সংস্কৃতি শব্দটি এর ব্যাপ্ত অর্থে ব্যবহার করছি, গান-বাজনা-চারুকলার মতো শুধু শিল্পচর্চা অর্থে নয়। সাংস্কৃতিক পাঠ থেকেই তার নীতি ও মূল্যবোধসহ জীবনের মানবিক পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ মিলবে।
মেধাবী তরুণদের স্কুলশিক্ষকতায় আগ্রহী করে তোলার জন্য দুটি করণীয়—বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরের বহুমুখী অধস্তনতা থেকে মুক্তি। কম বেতন ও অতিরিক্ত অধীনতা শিক্ষকের মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষমতাও নষ্ট করে দেয়।
বিদ্যাসাগরের আমলের স্কুল বুক সোসাইটির আদলে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যাতিরিক্ত নানা বিষয়ের বই প্রকাশের জন্য একটা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠন করা যায়।
শিক্ষার মানোন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার ঘোষণা করে অবিলম্বে জাতীয় শিক্ষা দশক ঘোষণা করা হোক। এর প্রথম পাঁচ বছর নিবিড়ভাবে স্কুলশিক্ষার মানোন্নয়নে নিবেদিত হবে এবং এ সময় ইউনেসকোর প্রস্তাবের সঙ্গে সংগতি রেখে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের অন্তত ২০-২৫ ভাগ এখানে বরাদ্দ দিতে হবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নের এই কর্মযজ্ঞের ব্যাপকতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে একে জাতীয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব আখ্যা দিয়ে শিক্ষার কাজে দেশের সব উচ্চশিক্ষিত মানুষকে যুক্ত করে রীতিমতো জাতীয় জাগরণ তৈরি করতে হবে। আমরা জানি জাতি বিভক্ত, বহুধাবিভক্ত। আমরা এ-ও জানি র্যাব-পুলিশ-প্রশাসন দিয়ে মানুষকে দমিয়ে রাখা যায়, ঐক্য ও জাগরণ সৃষ্টি করা যায় না, তার পথ হলো পোশাকি পরিচয়ের আড়ালের মানুষগুলোকে নিয়ে ছোট ছোট সামাজিক কাজের সূচনা করা। আমরা সে পথের কথাই বলছি। একটু সাহস করে বলব, এই বিশেষ দশকে জাতীয় বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করার কথা ভাবা উচিত। প্রয়োজনে শিক্ষা করের কথাও ভাবা যায়।
পরিবর্তন যে কেবল সম্ভব তা নয়, পরিবর্তনের পক্ষে বড় রকমের উদ্যোগের এটাই সময়। কারণ দেশের সব স্তরের মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, এর গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা হয়েছে এবং ইদানীং শিক্ষার মান নিয়েও মানুষ ভাবিত হচ্ছে। এ খাতে সাধ্যানুযায়ী, এমনকি সাধ্যাতীত ব্যয়েও কুণ্ঠিত হচ্ছে না মানুষ।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

দু’টি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় ইসরাইলি পুলিশ

ইসরাইলে শুক্রবার মুসলমানদের অন্যতম প্রধান উৎসব ঈদুল আজহা ও ইহুদিদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় দিবস ইয়ম কিপ্পুর উপলক্ষে দু’পক্ষই যখন প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় ছিল দেশটির পুলিশ। খবর এপির। প্রায় তিন দশকের মধ্যে এবারই সর্বপ্রথম এ দু’টি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান দু’টি উৎসব একই দিনে হতে যাচ্ছে। গোটা ইসরাইলে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে করে কোনো ধরনের সহিংসতা তৈরি না হতে পারে। বিশেষ করে জেরুজালেম, জাফফা, ইয়াফো, হাফিয়া, একরে শহরে সংখ্যালঘু মুসলমানদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হওয়ায় সেসব শহর নিয়েই উদ্বেগ বেশি। ঈদুল আজহা মুসলমানদের বিশেষ দিন। এদিন মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কোনো পশু কোরবানি দিয়ে থাকে এবং গরিবদের মাঝে সেসবের অংশবিশেষ বিতরণ করে। ইসরাইলি মুসলমানরা সাধারণত ভেড়া কোরবানি দিয়ে থাকে বেশি। অপরদিকে ইয়ম কিপ্পুর হচ্ছে ইহুদিদের একটি বিশেষ দিন, যেদিন নিজেদের পাপের জন্য ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চায় তারা। এদিন ইহুদিরা পানাহার থেকে বিরত থেকে প্রার্থনায় মত্ত হয়। ইসরাইলে এ মুহূর্তে বিমানবন্দরগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। টিভি ও রেডিও স্টেশনগুলোও নীরব হয়ে গেছে। মহাসড়কে গাড়ি নেই বললেই চলে, তবে অনেক সেক্যুলার ইহুদি নিজেদের বাইসাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলেছে, নিরাপত্তার কারণে তারা পশ্চিম তীর ও গাজার সীমান্তসংশ্লিষ্ট রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। যে কোনো ইহুদি উৎসবের সময়ই সাধারণত এটি করা হয়।

প্রতিমন্ত্রীর ‘পলাতক’ বিয়ে–তত্ত্ব by সোহরাব হাসান

আমাদের মন্ত্রীরা বচনে যতটা পারদর্শী, কাজে ততটা পারদর্শী হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরকার পরিচালনা করতে এতটা পেরেশান হতে হতো না। ইন্দিরা গান্ধীর আমলে ভারতের মন্ত্রিসভা সম্পর্কে যে কথাটি চালু ছিল, তার পুনরাবৃত্তি করতে চাই না এবং করাটা মন্ত্রিসভার কোনো পুরুষ সদস্যের জন্য সম্মানজনকও নয়। আমাদের অধিকাংশ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী তাঁদের মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতেই সদা ব্যস্ত থাকেন। তিনি ভুল বললেও বাহ্ বেশ বেশ বলে শোরগোল তোলেন।
প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে গার্ল সামিট থেকে এসে বললেন, মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই নাকি ১৬ বছরে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। আর মন্ত্রীরা সোল্লাসে তার সমর্থনে নেমে পড়লেন। এমনকি মহিলাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীও এর পক্ষে নানা যুক্তি দেখাতে থাকলেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক রাজনীতিক হিসেবে যতটা না পরিচিত, তার চেয়ে বেশি খ্যাতিমান ব্যবসায়ী হিসেবে। সে কারণেই সম্ভবত ভদ্রলোক স্বাস্থ্য বিষয়ে কথাবার্তা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছেন। গত বৃহস্পতিবার সিরডাপ মিলনায়তনে জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতে পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন কর্মসূচির মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী মেয়েদের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে নতুন তত্ত্ব হাজির করলেন। তিনি বলেছেন, ‘অল্প বয়সী মেয়েরা আজকাল আকছার পালিয়ে বিয়ে করছে, সে জন্যই বিয়ের বয়স কমানোর কথা ভাবা হচ্ছে।’
আর কোনো কারণে নয়, অল্প বয়সে মেয়েরা পালিয়ে বিয়ে করছে, এ কারণে পালিয়ে যাওয়ার আগেই তাদের বিয়ে দিতে হবে। এই হলো প্রতিমন্ত্রীর মোক্ষম যুক্তি। যেন বিয়ের বয়স কমালেই দেশ বাল্যবিবাহ নামের অভিশাপ থেকে মুক্তি হবে। কী সহজ সমাধান!
বর্তমানে আইনত ১৮ বছরের নিচে কোনো মেয়ে এবং ২১ বছরের নিচে কোনো ছেলে বিয়ে করতে পারেন না।
আলোচনাটি ছিল জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের উন্নয়ন নিয়ে। আর প্রতিমন্ত্রী বললেন মেয়েদের পালিয়ে বিয়ে করার কথা। নিজের তত্ত্বের সমর্থনে জাহিদ মালেক আরও যেসব কথা বলেছেন, তা যেমন স্ববিরোধী, তেমনি হাস্যকর।
তাঁর এসব কথায় সেই বহুল কথিত গল্পটিই মনে পড়ল। এক ছাত্র পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখে রচনা কমন পড়েনি। সে পড়ে গিয়েছে গরুর রচনা, এসেছে নদী। অগত্যা ছাত্রটি গরুকে নদীতে নামিয়ে দিয়েছে। এবং গরু আরামে নদীতে সাঁতরাচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানেন না যে জনসংখ্যা ও পুষ্টি সমস্যার সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক না থাকলেও অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ের সম্পর্কটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অল্প বা অপরিণত বয়সে বিয়ে হলে মা ও সন্তান দুজনই অপুষ্টির শিকার হন। তাঁদের নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।
জাহিদ মালেক কোথায় পেলেন যে বাংলাদেশের মেয়েরা আকছার পালিয়ে বিয়ে করছে? লাখেও একটি হবে না। তাঁর দাবি, স্কুলগুলোয় মেয়েদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, এমনকি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের হার এখন বেশি।
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরা বেশি হারে যাচ্ছেন বলেই কি প্রতিমন্ত্রী বিয়ের বয়স কমিয়ে তাঁদের পড়াশোনা বন্ধ করতে চাইছেন? একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে মেডিকেল কলেজে পড়তে হয় এইচএসসি পাস করার পর, যা ১৬ বছরের আগে সম্ভব নয়। তাহলে তিনি কি আকছার পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে তাদের কলেজে আসার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে চান?
সরকার একদিকে এইচএসসি পর্যন্ত মেয়েদের পড়াশোনা ফ্রি করে দিয়েছে, অন্যদিকে যাতে কলেজে যাওয়ার বয়সের আগেই তাদের বিয়ের আইন করার উদ্যোগ নিচ্ছে। বিষয়টি কি স্ববিরোধী নয়? বর্তমানে মেয়েদের বিয়ের নিম্নতম বয়স ১৮ বছর হলেও অনেক অভিভাবক বয়স বাড়িয়ে ১৫–১৬ বছর বয়সী মেয়েকেও বিয়ে দিচ্ছেন। প্রতিমন্ত্রীর ভাবনাটি বাস্তবে রূপ পেলে তখন সেটিই আইনসম্মত হয়ে যাবে। মানুষ সামনে এগোয়, আর আমাদের সরকারগুলো পেছনে যেতেই পছন্দ করে। জামায়াতের নেতারাও যে ফতোয়া দেওয়ার সাহস পাননি, সেই ফতোয়াই দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী!
মেয়েদের বিয়ের বয়স কমালে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন হবে না, তবে অপরিণত মা এবং অপুষ্ট সন্তানের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।
প্রতিমন্ত্রী আরেকটি উদ্ভট কথা বলেছেন। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার জন্য নাকি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি প্রচণ্ড চাপ আছে। শেখ হাসিনা সাড়ে ১০ বছর ধরে সরকার পরিচালনা করছেন। কেউ কখনো মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর জন্য তাঁর কাছে দাবি তোলেনি। বরং সরকার বাল্যবিবাহ রোধ কমাতে না পেরেই বাড়তি চাপ অনুভব করছে।
প্রতিমন্ত্রীর জানা উচিত যে আকছার পালিয়ে যাওয়া নয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে অনেক সময় অভিভাবকেরা মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। প্রথমত, দারিদ্র্যের কারণে গরিব বাবা-মা মেয়েদের পড়াতে পারেন না এবং অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন। দ্বিতীয়ত, পাড়ার বখাটে এবং রাজনৈতিক মাস্তানদের (এরা সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক হয়) হাতে নিগৃহীত হওয়ার ভয়ে তাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হন।
প্রতিমন্ত্রী মহোদয় যদি পালিয়ে যাওয়া তত্ত্ব না দিয়ে মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলতেন, দেশবাসী আশ্বস্ত হতো।
ইতিমধ্যে মহিলা পরিষদসহ বেশ কিছু নারী সংগঠন মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর বিরোধিতা করেছে। বিরোধিতা করেছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও। লেখক-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ এই প্রথম আলোতেই একটি লেখায় সরকারের পশ্চাৎপদ চিন্তার একটি মোক্ষম জবাব দিয়েছেন।
অতএব, বিয়ের বয়স কমানোর মতো আত্মঘাতী চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন। আমাদের অবশ্যই বাল্যবিবাহ শূনে্যর কোঠায় নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু সেটি মেয়েদের বয়স কমিয়ে বা পালিয়ে যাওয়া তত্ত্ব দিয়ে নয়।
প্রতিমন্ত্রী মহোদয়, দয়া করে গরুর রচনাকে নদীতে নিয়ে যাবেন না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

যানজট-রাস্তাঘাট নিয়ে মন্ত্রী সন্তুষ্ট, খুশি নন

কয়েকটি দুর্ঘটনাকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজটের কারণ উল্লেখ করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, যানজট ও রাস্তাঘাট নিয়ে আমি মোটামুটি সন্তুষ্ট। আমি পুরোপুরি খুশি হতে পেরেছি, এ কথা বলার কোনো উপায় নেই। তবে ঘরমুখো মানুষের দুভোর্গের জন্য মন্ত্রী আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে তাদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন।

আজ শনিবার দুপুরে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ঈদ ও পূজা উপল‌ক্ষে মহাসড়কে যানজট ও রাস্তাঘাটের অবস্থা পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন ওবায়দুল কাদের।
সেতুমন্ত্রী বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি ভালো। পবিত্র ঈদুল আজহা ও দুর্গাপূজা একসঙ্গে হওয়ায় আমাদের এনফোর্সমেন্টের একটা ভাগ চলে গেছে পূজায়, একটি ভাগ কোরবানির পশুর হাটে ও আরেকটি ভাগ রয়েছে রাস্তায়। তার পরও যে সমস্যা হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি।
সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, ‘এবারই প্রথম রাস্তায় গরুর হাট একেবারেই কম বসেছে। এবার প্রশাসন সতর্ক থাকায় রাস্তায় গরুর হাটের যে বিড়ম্বনা, তা হয়নি। এবার দু–তিনটি বিষয় যুক্ত হওয়ায় আমাদের জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল। এ চ্যালেঞ্জ মোটামুটি অতিক্রম করেছি। তবে বেশির ভাগ জায়গায় মানুষ স্বস্তি পেয়েছে। শুধু চন্দ্রা থেকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর অংশে কয়েকটি দুর্ঘটনা হওয়ায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এ অংশে অনেক মানুষ বেশ কিছু সময় দুর্ভোগের কবলে পড়েছে। সে জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। তবে অন্যান্য মহাসড়ক যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, সিলেট, যশোর, খুলনা, ফরিদপুরের মহাসড়কগুলো যানজট মুক্ত রয়েছ। এসব স্থানের মহাসড়কে কোথাও কোন দুর্ভোগের কারণ হয়নি।’
ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, শনিবার দুপুরে বাসে যাত্রীদের তেমন চাপ নেই আর রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যাও কম। ঈদ ও পূজা উপলক্ষে যারা বাড়িতে যাবে তাদের বেশির ভাগ মানুষই চলে গেছে।
গাড়িতে বেশি ভাড়া নেওয়া প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এই সদস্য বলেন, ‘ঈদের সময় এমন ঘটনা হয়। শনিবার সকালে মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গেলে একটা গাড়িতে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে থেকে ভাড়ার চেয়ে নেওয়া বেশি টাকা ফেরৎ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। রাতারাতি পুরানো এ অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারব না। তবে এসব আস্তে আস্তে সহনীয় হয়ে আসছে। আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে এওয়ারনেস সমস্যা।’
এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পের উপপরিচালক লে. ক. আনোয়ার হোসেন, সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আফতাব উদ্দিন খান, গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ, গাজীপুর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মহিবুল হক, মানিকগঞ্জের সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খানসহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

‘চলচ্চিত্রের চরিত্রের আবেদন মানুষের মনে দীর্ঘদিন বিরাজ করে’

ঈদের একাধিক নাটকের কাজ নিয়ে গত দুই মাস ব্যস্ত সময় পার করেছেন চলতি সময়ের ব্যস্ত অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ। শুধু তাই নয়, এই সময়ে চলচ্চিত্রের শুটিংও করেছেন তিনি। দুই পর্দার কাজ নিয়ে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্যামেরার সামনে এখনও দাঁড়াতে হচ্ছে তাকে। অনন্য মামুনের ‘ব্ল্যাকমেইল’ ছবির শুটিং শেষ করেছেন তিনি। সেই ছবিতে বেশ গ্ল্যামারাস মৌসুমীকে দেখা যাবে। এদিকে কয়েক দিন ধরেই সাফিউদ্দিন সাফি পরিচালিত ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী-২’-এর শুটিং নিয়েও ব্যাপক ব্যস্ত এই অভিনেত্রী। এরই মধ্যে ছবির কিছু দৃশ্যের শুটিংয়ে অংশ নিয়েছেন তিনি। এ ছবিতে তাকে প্রথমবারের মতো দেখা যাবে শাকিব খানের বিপরীতে। এখানে আরও অভিনয় করছেন জয়া আহসান। এ ছবিতেও গ্ল্যামারাসভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে মৌসুমীকে। চরিত্রের প্রয়োজনে খোলামেলাও হয়েছেন কিছু দৃশ্যে। এ ছবিটি নিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে ছবির শুটিং হয়েছে টঙ্গীসহ বিভিন্ন মনোরম লোকেশনে। জয়া, শাকিব খানদের মতো শীর্ষ তারকার সঙ্গে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা ভালই উপভোগ করছেন। শুটিংয়ের পাশাপাশি বেশ মজাও করছেন তিনি। ছবির লোকেশন থেকেই সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড করছেন। এ ছবিতে কাজ করা প্রসঙ্গে মৌসুমী হামিদ বলেন, ‘ব্ল্যাকমেইল’-এ আমি কাজ করেছি মিলন ভাইয়ের বিপরীতে। অনেক গুণী অভিনেতা তিনি। তার সঙ্গে কাজ করে অনেক কিছু শিখেছি। এবার ‘পূর্ণদর্ঘ্য প্রেম কাহিনী-২’ ছবিতে আমি কাজ করছি জয়া আপু ও শাকিব ভাইয়ের মতো শীর্ষ অভিনয় শিল্পীর সঙ্গে। এটা আমার জন্য বড় পাওয়া। তাছাড়া সাফিউদ্দিন সাফি ভাইও অনেক গুণী নির্মাতা। সব মিলিয়ে গুণী মানুষদের সংস্পর্শটা উপভোগ করছি আমি। অনেক কিছু শেখার, জানার ও বোঝার চেষ্টা করছি। সময়টা ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে গেলেও অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করার সুযোগটা হচ্ছে। এ ছবির কাহিনী থেকে শুরু করে সবকিছুই আমার নিজের কাছে অনেক বেশি ভাল লেগেছে। ছবিটি নিয়ে আমি দারুণ আশাবাদী। আশা করছি দর্শকদের ভাল লাগবে। এদিকে মৌসুমী অভিনীত বেশ ক’টি ছবির কাজ শেষ হলেও সেগুলো এখন রয়েছে মুক্তি প্রতীক্ষায়। মৌসুমী নিজেও অপেক্ষা করছেন বড়পর্দায় নিজেকে দেখার। এর মধ্যে ঈদের পরই ‘ব্ল্যাকমেইল’ ছবিটির মুক্তির তারিখ নির্ধারণ হবে। পাশাপাশি পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু হবে ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী-২’-এর। চলচ্চিত্রের বাইরে গত দু’মাসে ঈদের হাফডজনেরও বেশি নাটকে অভিনয় করেছেন মৌসুমী হামিদ। তবে কাজের ব্যস্ততার ফলে কোন কোনটির নামও ভুলে গেছেন তিনি। নাটক ও একই সঙ্গে চলচ্চিত্রের শুটিং নিয়ে ব্যস্ততা প্রসঙ্গে মৌসুমী বলেন, আমি এখনও শিখছি। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে কাজ করে নিজেকে একটু ঝালিয়ে নিচ্ছি। এই শেখাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড়। দুই পর্দাতেই এখন কাজ করছি। তবে বড়পর্দাতেই সামনে নিয়মিত হওয়ার ইচ্ছা রয়েছে। কারণ, চলচ্চিত্রের চরিত্রের আবেদন মানুষের মনে দীর্ঘদিন বিরাজ করে।

তুরস্কের পার্লামেন্টে ইরাক ও সিরিয়ায় হামলা অনুমোদন

ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সেনা পাঠানোর ব্যাপারে অনুমোদন দিলো তুরস্কের পার্লামেন্ট। আইএসের বিরুদ্ধে সেনা পাঠানোর বিষয়টি দেশটির পার্লামেন্টে তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের ভোটে অনুমোদন পায়। পাশাপাশি বিদেশী সেনাদেরও তুরস্কের ভূমি ব্যবহার করে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর বিষয়টি অনুমোদিত হয়। আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক বাহিনীর লড়াইয়ে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখার ব্যাপারে তুরস্কের ওপর চাপ ছিল।
সেপ্টেম্বরে তুরস্কের ৪৬ অপহৃতকে আইএস ছেড়ে দেয়ার পর তুরস্ক সরাসরি এই জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পদপে গ্রহণের ব্যাপারে অনিচ্ছুক ছিল। সেনা পাঠানোর বিষয়টি পার্লামেন্টে তোলার সময় বাইরে এর বিরোধিতা করে বিােভ চলছিল। এরই মধ্যে সেনা পাঠানোর প্রস্তাব ৫৫০ সদস্যের পার্লামেন্টে তোলার পর ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের পর ২৯৮ জন এমপি সেনা পাঠানোর পে অবস্থান নেন। আর এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন ৯৮ জন।
এই প্রস্তাবের পে অবস্থান নিয়েছে মতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি এবং অন্যতম বিরোধী ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টি। আর প্রস্তাবের বিপে ভোট দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি এবং কুর্দি সমর্থিত পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। পার্লামেন্টের এই অনুমোদনের ফলে দেশটির প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের নেতৃত্বাধীন সরকার ইরাক ও সিরিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারবে। পাশাপাশি তুরস্কের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বিদেশী বাহিনী আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রাণঘাতী নয় এমন সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন করতে পারবে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, সিরিয়ায় একটি নো-ফাই জোন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বোমা বর্ষণ করে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
কোবানে প্রচণ্ড লড়াই
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের তুরস্ক সীমান্তসংলগ্ন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর কোবানের দিকে অগ্রসররত ইসলামিক স্টেট যোদ্ধাদের সাথে কুর্দি মিলিশিয়াদের প্রচণ্ড লড়াই চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সীমান্তের এপারে তুরস্ক থেকে বিবিসির সংবাদদাতা জানান, তিনি শহরটিতে গোলার আঘাতে বিস্ফোরণ ঘটার শব্দ শুনতে পেয়েছেন এবং ধোঁয়া উড়তে দেখেছেন। মার্কিন নেতৃত্বে বিমান হামলা চলা সত্ত্বেও আইএস যোদ্ধারা শহরটির মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত অগ্রসর হতে সক্ষম হয়েছে। বৃহস্পতিবার তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী আহমদ দাউদ ওগলু বলেন, কোবানের পতন ঠেকাতে তিনি সব কিছুই করবেন। তুর্কি পার্লামেন্ট আইএসের বিরুদ্ধে হামলা অনুমোদন করার কয়েক ঘণ্টা পর তিনি এ কথা বলেন।  সিরিয়ার মানবাধিকার গ্রুপ জানাায় গত বৃহস্পতিবার কোবানে সংঘর্ষে ১৬ জন আই এস যোদ্ধা ও ৭ জন কুর্দি মিলিয়াশিয়া নিহত হয়।

গো-হত্যা খুন হিসেবে গণ্য করা উচিত : বিজেপি নেতা

গো-হত্যাকে খুন হিসেবেই গণ্য করা উচিত। বৃহস্পতিবার বিধানসভা নির্বাচনের ইস্তেহার প্রকাশ করতে গিয়ে এমনটাই মন্তব্য করেছেন হরিয়ানার বিজেপি প্রধান রামবিলাস শর্মা।

হরিয়ানার বিধানসভা নির্বাচনের যে ইস্তেহারটি বৃহস্পতিবার রামবিলাস শর্মা প্রকাশ করেন তাতে লেখা হয়েছে, ‘বিজেপি যদি রাজ্যে ক্ষমতায় আসে তাহলে গো-হত্যা নিয়ে আইনের কঠোর বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী পদক্ষেপ নেয়া হবে। এমনকি ইস্তেহার কমিটির চেয়ারম্যান গণেষী লাল বলেছেন গো-হত্যাকে নিন্দনীয় নরহত্যার সমান গণ্য করা উচিত।’

রাজ্য বিজেপি মুখপাত্র বীর কুমার যাদব জানিয়েছেন, দল গো-হত্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় আসার পর আমরা আইনের সংশোধন করে খুনের মতো গো-হত্যা শাস্তিমূলক অপরাধ করে দেব। প্রয়োজনে এই আইনের সংশোধনে কেন্দ্রের অনুমতি নেব।’

ওই ইস্তেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র মুক্তার আব্বাস নাকভি। আগামী ১৫ অক্টোবর হরিয়ানায় বিধানসভা নির্বাচন। মোট ৯০টি বিধানসভা আসনের জন্য লড়াই হবে। এই প্রথমবার এককভাবে হরিয়ানায় এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বিজেপি।

ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন সুলতান মনসুর

‘মুজিব কোট ছাড়বো না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকেও বিচ্যুত হবো না। আওয়ামী লীগের সুলতান মনসুর হয়েই থাকবো। তবে, রাজনীতি থেকে আর নির্বাসনে থেকে নয়। আওয়ামী লীগের সুলতান মনসুর হয়ে জাতীয় ঐক্যের ডাক’র সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আর যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমাকে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠানোর জবাব দেওয়া হবে।’ তুখোড় রাজনৈতিক নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর গতকাল সিলেটে এক সংবাদ সম্মেলন করে রাজনীতিতে তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। বলেছেন, ‘আমাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কারণ হচ্ছে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তব হবে না। সুলতান মুনসুর জনগণের জন্য রাজনীতি করবে। সুলতান মনসুরকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সম্পাদক। ঢাকসু’র সাবেক ভিপি। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতিও। নিজের মুখে বললেন, ‘দীর্ঘ ৮ বছর ধরে তাকে রাজনৈতিক কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে। অথবা নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। আর এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- আমার জনপ্রিয়তায় ধস নামানো। কিন্তু অনেক অপেক্ষা করেছি। আর নয়। নিজের অবস্থান নিজেই গড়তে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছি। জাতীয় ঐক্যের ডাক’র সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের সুলতান মনসুর হয়ে রাজনীতিতে নামছি।’ সুলতান মোহাম্মদ মনসুর বলেন, ‘৫ই জানুয়ারির অনৈতিক নির্বাচনের জন্য স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করিনি। ওই নির্বাচন ‘সার্কাস মার্কা’ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে জনগণের রায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। ১৫৪টি আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রতিনিধিরা পাস করেছে। আর বাকিগুলোতে হয়েছে লোক দেখানো নির্বাচন। সুলতান  মোহাম্মদ মনসুর সিলেটের রাজনীতিতেও পরিচিত মুখ। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ায় গোটা বিভাগে রয়েছে তার ব্যাপক পরিচিতি। এ কারণে গতকাল সিলেটে নিজ উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি নতুন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা জানালেন। মতবিনিময়কালে সুলতান মনসুর আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিজ চোখে দেখার আগ থেকেই তিনি তার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন। এরপর ১৯৬৮ সাল  থেকে দীর্ঘ ৪৬ বছর তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে অবিচল থেকে রাজনীতি করে যাচ্ছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর অনেকেই মনে করেছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতি এখানেই শেষ। তাই অনেক নেতাই সে সময় ভিন্ন পথ ধরেছিলেন। কিন্তু তিনি আশাবাদী ছিলেন বলেই কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সুলতান বলেন, ১৯৭৫ এর পর আওয়ামী লীগের প্রথম বিজয় এসেছিল তার হাত ধরেই। ১৯৮৯ সালে ডাকসু’র ভিপি পদে তার বিজয় ছিল ’৭৫ পরবর্তী আওয়ামী লীগের প্রথম বিজয়। আর দ্বিতীয় বিজয় ছিল ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মো. হানিফের বিজয়। সুলতান মনসুর বর্তমান সরকার ও আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে বলেন, অনেকেই মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ দল ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন। ক্ষমতাসীন দল নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দাবি করলেও তারা কখনও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানী বা প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজ উদ্দিন আহমদের জন্মবার্ষিকী পালন করেনি। বর্তমান সরকারকে অবৈধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে নির্বাচন হয়েছে তা মানুষ আশা করেনি। এই সংশোধনীর মাধ্যমে মানুষের ভোট  দেয়ার স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আইনগত বৈধতা থাকলেও এটা একটি সার্কাস মার্কা নির্বাচন ছিল। দেশের বেশির ভাগ মানুষ তাদের ভোট দেয়ারই সুযোগ পাননি।  জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বসে  নেতারাই ঠিক করেছেন কোন আসনে  কে কত ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। বর্তমান সরকার জনগণের সরকার নয়, এটা অনৈতিক ও অবৈধ সরকার। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার প্রসঙ্গে সুলতান মনসুর বলেন, তার সামনে এখন দু’টি পথ, একটি রাজনীতি  ছেড়ে দেয়া, আর অন্যটি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা। মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে থাকা সম্ভব না হওয়ায় তিনি দ্বিতীয়টিই বেছে নিয়েছেন। তিনি বলেন- ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে একমাত্র   মৌলভীবাজার-২ আসনের তৃণমূল  নেতাকর্মীরা একক প্রার্থী হিসেবে তার নাম প্রস্তাব করেছিল। বাকি প্রতিটি আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাকে মনোনয়ন বঞ্চিত করা হয়। পরবর্তীতে  কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকসহ সকল পদ থেকে তাকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক কারাগারে বন্দি রাখা হয়। সাড়ে ৬ বছর অপেক্ষায় থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাকে শামিল হয়েছেন। গত ৩রা সেপ্টেম্বর গণফোরাম, জাসদ (রব), কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ (খালেকুজ্জামান) ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে ঢাকায় যে কনভেনশন হয়েছে  সেখানে তিনি আওয়ামী লীগের সুলতান মনসুর হিসেবেই অংশ নিয়েছিলেন। আপাতত তিনি ওই ঐক্যের সঙ্গেই রাজনীতিতে সক্রিয় থাকবেন। তবে যে ফ্রন্টেই তিনি থাকেন না কেন তার পরিচয় হবে আওয়ামী লীগের সুলতান মনসুর-এমনটাই দাবি করেন তিনি। অন্তরে মুজিব আদর্শ, মুখে জয় বাংলা  স্লোগান ও গায়ে মুজিব কোট পরেই তিনি আজীবন রাজনীতি করে যাওয়ারও  ঘোষণা দেন।

রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের ট্রিকস?

গতকাল সৌদি দৈনিক আরব নিউজে প্রকাশিত একটি লেখার অবিকল তরজমা নিচে দেয়া হলো:

জাকির হোসেন, মক্কা: এটা খুবই অস্বস্তিকর যে, বাংলাদেশের  টেলিকমমন্ত্রী হজ বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। হজ ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চম স্তম্ভ। বাংলাদেশ মন্ত্রীকে হজ বিষয়ক মন্তব্যের পর অপসারণ করা হয়েছে।
মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী কথিতমতে হজ সম্পর্কে এই বিরুপ মন্তব্য করেছেন যে, তিনি একে জনশক্তির অপচয় এবং দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর বলে বর্ণনা করেছেন।
মন্ত্রী বর্তমানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে রয়েছেন, যিনি হয়তো মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবকালে দেশের বাইরে অবস্থান করবেন (যা সত্য নয়, মানবজমিন ডেস্ক)। আর এটাই বাংলাদেশ সরকারের টিপিক্যাল চরিত্র, কারণ ইসলাম, তার মূল্যবোধ এবং বিপুল অনুসারীদের প্রতি এই সরকারের রয়েছে অত্যল্প শ্রদ্ধা। হাসিনা সরকারের প্রকৃত এজেন্ডা হলো দেশে ইসলামকে দুর্বল করা এবং অমুসলিম ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সহায়তায় ক্ষমতায় টিকে থাকা।
ওই মন্ত্রীকে অপসারণ করার কথিত সিদ্ধান্ত প্রচারও একধরনের বাগাড়ম্বর। গুজবমতে তাকে  ইসলাম সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য  অপসারণ করা হয়নি। তিনি হাসিনার পরিবারের সদস্যদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করেছেন। তিনি হাসিনার ছেলে সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপনি ধর্মবিরোধী মন্তব্য করতে পারবেন কিন্তু কখনও শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়ার পরিবারের কোন সদস্যের বিরুদ্ধে মন্তব্য করতে পারবেন না।
সুতরাং এটা চিন্তা করা ভুল যে, ইসলাম বা তার কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মন্তব্য করার কারণে লৌহ দণ্ড নিয়ে দেশ শাসনকারী হাসিনা সরকার কোন মন্ত্রীকে অপসারণ করবেন। এটা তার ছেলের বিরুদ্ধে মন্তব্য করার কারণে ঘটেছে।
মন্ত্রী সিদ্দিকী এর আগেও ইসলামের বিরুদ্ধে মন্তব্য করার জন্য পরিচিত। আর এখন তিনি হজের বিরুদ্ধে অনভিপ্রেত মন্তব্য করলেন যে, এটা অর্থের অপচয় এবং এর ফলে বাংলাদেশ অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে।
তিনি কি তাহলে বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেবেন যাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং অর্থনীতির ক্ষতি সাধন ঘটে। প্রবৃদ্ধি না বাড়ার  ঘাটতি হিসেবে জনগণের হজ গমনকে দায়ী করবেন না। দেশের দুর্নীতির দিকে তাকান, কারণ দুর্নীতিই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড খেয়ে ফেলছে। এবং সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের ক্রীড়নক হওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করবেন না।
পাশ্চত্যে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার জন্য এটা হতে পারে তার সস্তা ট্রিকস। কারণ ইসলাম বিরোধী দেশগুলো ভবিষ্যতে আরেকজন তসলিমা নাসরীন বা সালমান রুশদীকে লালন করতে আগ্রহী থাকবে।

শত্রুরা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত : খুতবায় সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি

পবিত্র মক্কা নগরীর অদূরে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের মধ্য দিয়ে গতকাল শুক্রবার হজের অন্যতম প্রধান কাজটি সম্পাদন করছেন হাজীরা। এর ফলে আরাফাতের ময়দানটি বিশ্ব মুসলিমের সর্ববৃহৎ মিলনস্থলে পরিণত হয়। হাজীদের আবেগ মিশ্রিত ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ময়দান। হজের খুতবা শুনে ইমামের পেছনে পরপর জোহর ও আসরের নামাজ জোহরের ওয়াক্তে আদায়ের পর সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন হাজীরা। সূর্যাস্তের পর আরাফাতের ময়দান  ত্যাগ করে মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হন তারা। ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিনকেই হজের দিন বলা হয়।

গতকাল দুপুরে সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার পর মসজিদে নামিরা থেকে খুতবা প্রদান করেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আব্দুল আজিজ আল আশ শেখ (৭৩)। খুতবায় গ্র্যান্ড মুফতি বলেন, শত্রুরা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। অনৈসলামিক শক্তিগুলো ইসলাম ও মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, ইসলামের মূল ধারা থেকে বিচ্যুত ‘খাওয়ারিজরা’ এখনো ইসলামের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, ইসলামি শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হওয়া বিশ্বে মুসলমানদের সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার অন্যতম কারণ। এ জন্য ইসলামের পতাকাকে বিশ্বে উড্ডীন করার জন্য মুসলিম দেশগুলোর সংবাদমাধ্যমকে ভূমিকা পালন করা উচিত।
তিনি বলেন, নিরীহ মানুষকে হত্যা করা সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা। কারণ ইসলাম বলেছে, ‘নিরীহ মানুষকে হত্যা করা পুরো মানবসমাজকে হত্যার শামিল’। তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও সমৃদ্ধির জন্য মুসিলম দেশগুলোর নেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা উচিত। কারণ এখন হচ্ছে ষড়যন্ত্রের সময়। গ্র্যান্ড মুফতি বলেন, ইসলাম হচ্ছে সবচেয়ে সহজ ধর্ম। ইসলাম মানবিকতার ধর্ম। এর ভিত্তি সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি মানুষের পুরো জীবনের নীতিকে ধারণ করে। তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ উম্মাহ হিসেবে ঘোষণা করেছে। কারণ তারা সৎকাজের আদেশ করেন এবং অসৎ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখেন। তিনি ইসলামের সঠিক শিক্ষা তুলে ধরা ও মানুষকে কুরআন সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত পথ দেখানোর জন্য ইসলামি স্কলারদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি মুসলমানদের বিশ্বময় ভালোবাসা ও মানবিকতা ছড়িয়ে দেয়ারও আহ্বান জানান।
আব্দুল আজিজ আল আশ শেখ ৩৪ বছর ধরে হজের খুতবা দিয়ে আসছেন। এই ইসলামি স্কলার তার ১৭ বছর বয়সে চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান।
সমবেত মুসল্লিরা খুতবা শুনেন ও জোহরের ওয়াক্তে জোহর ও আসরের নামাজ পরপর আদায় করেন একই ইমামের পেছনে। এরপর হাজীরা সেখানে অবস্থান করে চোখের পানিতে বুক ভিজিয়ে আল্লাহর দরবারে গুনাহ মাফের প্রার্থনা করেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও করুনা কামনা করেন কায়মনো বাক্যে। সূর্যাস্তের সাথে সাথেই আরাফাত ময়দান ত্যাগ করেন হাজীরা।
এবার ২০ লখের বেশি ধর্মপ্রাণ মানুষ পবিত্র হজ পালন করেছেন। ১৬০টির বেশি দেশের মুসলমানেরা হজ পালন করছেন। এ দিকে গতকাল ফজরের নামাজের পর মক্কায় কাবা ঘরের পুরনো গিলাফ খুলে নতুন গিলাফ লাগানো হয়। প্রতি বছর এই দিন কাবাঘরের গিলাফ পরিবর্তন করা হয়।
আজ থেকে ১৪ শতাধিক বছর আগে এই দিনে রাসূল সা: আরাফাতের ময়দানে লক্ষাধিক সাহাবিকে সামনে রেখে ভাষণ দেন, যা ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ নামে পরিচিত। এই ভাষণে তিনি ইসলামের পরিপূর্ণতা ঘোষণা করাসহ জীবন পরিচালনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।
সৌদি আরবের গ্র্যান্ড ইমাম হাজীদের উদ্দেশে খুতবা দেন সেই রীতি অনুযায়ীই।
আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেই হাজীরা হজের মূল কাজটি সম্পন্ন করেছেন। এই ময়দানে অবস্থান হজের অন্যতম ফরজ। ৮ জিলহজ বৃহস্পতিবার ইহরাম বেঁধে মিনায় অবস্থান নেয়ার মধ্য দিয়ে হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
হাজীরা গত রাত কাটান আরাফা ও মিনার মধ্যবর্তী স্থান মুজদালিফায়। সেখান থেকেই কংকর সংগ্রহ করেন পরের তিন দিন জামারায় শয়তানের প্রতিকৃতিতে নিক্ষেপের জন্য। আজ শনিবার সকালে হাজীরা মিনার তাঁবুতে ফিরে গিয়ে জামারায় কংকর নিক্ষেপ করবেন ও কোরবানি করবেন। কোরবানির পশু জবাইয়ের পরই ইহরাম ভাঙবেন। এরপর হাজীদের মক্কায় গিয়ে পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করতে হবে। এই তাওয়াফও হজের অন্যতম ফরজ। পাশাপাশি পাশেই অবস্থিত সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ে সায়ি (দৌড়ানো) করবেন। এ সায়ি করা ওয়াজিব। এরপর মিনার তাঁবুতে ফিরে গিয়ে পরপর দুই দিন অর্থাৎ ১১ ও ১২ জিলহজ জামারাতে তিনটি শয়তানের প্রতিকৃতিতে কংকর নিক্ষেপ করবেন। ১২ জিলহজ ইচ্ছে করলে হাজিরা মিনা ত্যাগ করতে পারবেন। তবে কেউ মিনায় অবস্থান অব্যাহত রাখলে পরদিন ১৩ জিলহজও তাকে কংকর নিক্ষেপ করে, তবে মিনা ত্যাগ করতে হবে। এরই মধ্য দিয়ে হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। মক্কা ত্যাগের আগে হাজীরা বিদায়ী তাওয়াফ করবেন।
উল্লেখ্য, হজ ইসলামের ফরজ বিধান। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। পবিত্র কাবাঘরকে কেন্দ্র করেই মূলত হজের কার্যক্রম। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইবরাহিম আ: ও তার ছেলে ইসমাঈল আ: কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেন। হজের বেশির ভাগ কাজই হজরত ইবরাহিম, তাঁর স্ত্রী হাজেরা ও ছেলে ইসমাঈল আ: এর সাথে সম্পর্কিত।

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে ইইউভুক্ত দেশ সুইডেন

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে সুইডেনের নতুন সরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রথম ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে দেশটি।

সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন লোভেন শুক্রবার পার্লামেন্টে তার উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব আন্তর্জাতিক আইনানুসারে শুধু দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সমাধান হতে পারে। আর এটি করতে হলে দরকার পারস্পরিক স্বীকৃতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সেজন্য সুইডেন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে। তবে কখন অথবা কীভাবে স্বীকৃতি দেয়া হবে তা বলেননি তিনি।

হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও রোমানিয়ার মতো কিছু দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলেও তা ছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগ দেয়ার আগে।

ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ মালকি সুইডেনের এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। সুইডেনের মতো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র জেন সাকিয়া সুইডেনের এ ঘোষণাকে ‘অপরিপক্ক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

গরু রপ্তানি নিষিদ্ধ চান ‘আরএসএস’ প্রধান

ভারতের উগ্র হিন্দুবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগবত প্রতি বছরের মত এ বছরও বিজয়া দশমিতে যে ভাষণ দিয়েছেন তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এবারই প্রথম সরকারি দূরদর্শনে সেই ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তবে বিজেপির নেপথ্য চালিকা শক্তি হিসেবে প্রচারিত আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত যথারীতি তার ভাষণে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ে সরব হয়েছেন। তার বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে জনসংখ্যার বৈষম্যেও মূলে রয়েছে সীমান্তের ওপার থেকে অবৈধভাবে আসা একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ। তিনি বলেছেন, এই সব রাজ্যে শাসক দল উগ্রবাদী শক্তির কাছে আত্মসমর্পন এবং তোষণনীতি অবলম্বন করায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা এই অঞ্চলে প্রবল হুমকির মুখে রয়েছে।  এই চ্যলেঞ্জ মোকাবেলায় ভাগবত সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সীমান্তে চোরা কারবারের সঙ্গে যুক্ত এই সমাজেরই সেই বিশেষ শ্রেণির মানুষই। আর সীমান্তের ওপার থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের যারা আশ্রয় দিচ্ছেন তারা এই দেশেরই নাগরিক। সামাজিক পরিস্থিতিই গরীবদেও শোষনের পরিস্থিতি তৈরি করেছ্।ে ফলে উগ্রবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিচ্ছে। উন্নয়নের সুফল নীচুতলার মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য প্রশাসকদেও সতর্ক থাকার কথা বলেছেন আরএসএস প্রধান। তিনি প্রস্তাব করেছেন, মাংস, বিশেষ করে গরুর মাংস রপ্তানি এবং গরু চোরাচালান নিষিদ্ধ করা উচিত।

কাতারে প্রবাসীদের নিরানন্দ ঈদ by শরিফুল হাসান

কাতারের স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে পাঁচটা। রাজধানী দোহার নাজমা জামে মসজিদে তিন থেকে চার হাজার মুসল্লি। তাঁদের প্রায় সবাই বাংলাদেশি। সূর্যের আলো ছড়ানোর আগেই পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ শেষ। পরস্পর কোলাকুলি সেরে সবাই রওনা হলেন নিজ নিজ বাসার দিকে। এ সময় অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি বললেন, ঈদের সারাটা দিন তাঁরা ঘুমিয়ে কাটাবেন। আজ শনিবার কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্‌যাপিত হচ্ছে। তবে কাতারের রাস্তাঘাট ঘুরে বোঝার উপায় নেই—এখানে ঈদ উদ্‌যাপিত হচ্ছে। কোথাও কোরবানির কোনো আয়োজন চোখে পড়ে না। আগের দিন পুরো দোহা শহর ঘুরে কোথাও কোনো ব্যানার বা সজ্জা দেখা যায়নি।

কাতারের প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যে এভাবে নিরানন্দ ঈদ কাটে অধিকাংশ বাংলাদেশির। আত্মীয়-স্বজনহীন মানুষগুলোর কাছে ঈদ মানে একটা ছুটির দিন, দেশে পালন করা ঈদের স্মৃতিচারণা।
কাতারের বেশ কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি বললেন, দেশটিতে ঈদ উপলক্ষে রাস্তাঘাট সাজানো হয় না। ১৮ ডিসেম্বর কাতারের জাতীয় দিবসে সাজসজ্জা করা হয়। ঈদুল আজহায় কোরবানি দেওয়ার জন্য পুরো দোহার কোথাও কোনো উট-গরু-ছাগল দেখা যায় না। কারণ, শহরে পশু জবাইয়ের নিয়ম নেই। সেটি করতে হয় শহর থেকে বাইরে গিয়ে।
বাংলাদেশ থেকে তিন ঘণ্টা পিছিয়ে কাতার। বাংলাদেশে যখন সকাল আটটা, কাতারে তখন ভোর পাঁচটা। ফজরের নামাজের পর এখানকার মসজিদগুলোতে ঈদের নামাজ আদায় কারা হয়। কারণ, সূর্য উঠলেই প্রচণ্ড গরম। তাই আলো ছড়ানোর আগেই মুসল্লিরা নামাজ শেষ করেন।
বাংলাদেশি প্রবাসীরা কীভাবে ঈদ উদ্‌যাপন করেন, তা জানতে ভোর পাঁচটায় হাজির হই দোহার নাজমা মসজিদে। সেখানেই কথা হয় চাঁদপুরের সাইফুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুরের মোহাম্মদ সোহেল, কক্সবাজারের নূর মোহাম্মদ, মাদারীপুরের আমির হোসেন, নোয়াখালীর ওমর হোসেনসহ অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে।
সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি ১৬ বছর ধরে কাতারে আছেন। স্ত্রী-দুই সন্তানের সবাই দেশে। এবার দেশে গিয়ে ঈদ করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু কাজের জন্য পারেননি। তিনি বলেন, ‘পরিবার-পরিজন ছাড়া ঈদ কোনো ঈদ নয়। তাই প্রবাসীদের ঈদ কাটে নিরানন্দভাবে।’
চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট আমির হোসেন মাত্র এক মাস আগে কাতার এসেছেন। পরিবার ছেড়ে দেশের বাইরে এটাই তাঁর প্রথম ঈদ। তিনি বলেন, দেশে থাকতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আনন্দ করে ঈদ করতেন। কিন্তু এখন তাঁর কিছুই ভালো লাগছে না।
নূর মোহাম্মদ মন খারাপ করে বলেন, ‘ভাই, একদম একা। ঈদের দিনটায় মনে হয়, আমার বুঝি কেউ নেই। দেশে কাটানো ঈদগুলোর কথা খুব মনে পড়ে।’
কাতারে কি কেউ কোরবানি দেয় না—জানতে চাইলে ওমর ফারুক ও ফখরুল ইসলাম বলেন, এখানে শহরের মধ্যে পশু জবাইয়ের কোনো নিয়ম নেই। আবু হামর এলাকায় গিয়ে পশু কিনে আসে অনেকেই। সেখানেই কোরবানি হয়। সেখান থেকে মাংস নিয়ে আসতে হয়। তবে অনেক সময় বাংলাদেশিরা ঈদের আনন্দ করার জন্য ক্যাম্পে লুকিয়ে ছাগল কোরবানি করেন। তবে পুলিশ জানলে ঝামেলা হয়। তাই পুরো কাজটাই হয় গোপনে। এর বাইরে সচ্ছল কিছু ধনী বাংলাদেশি, যাঁদের নিজের বাড়ি আছে, তাঁরা নিজেদের আঙিনায় অনেকটা গোপনে কোরবানি সম্পন্ন করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার সিরাজুল ইসলামের ভাষ্য, কাতারে আসার আগে তিনি ছয় বছর সৌদি আরব ও চার বছর দুবাই ছিলেন। কেবল কাতার নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঈদ খুব নিরানন্দভাবে কাটে। তাঁরা সারা দিন পরিবারের কথা ভেবে মন খারাপ করে থাকেন। তবে সন্ধ্যার পর গল্প ও আড্ডা দিয়ে সময় কাটানোর চেষ্টা চলে।

কাতারপ্রবাসী কয়েকজন পেশাজীবী বাংলাদেশি জানান, তাঁরা ঈদের দিন এখানে থাকা অন্য সহকর্মীদের বাসায় গিয়ে দিনটি কাটানোর চেষ্টা করেন।
বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি আক্ষেপ করে বলেন, ঈদে যদি দূতাবাস সবাইকে নিয়ে কোনো একটা আয়োজন করত, তাহলে খুব ভালো হতো।
কাতারে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর শফিউল আজিম প্রথম আলোকে জানান, এখানে শহরের মধ্যে যেখানে-সেখানে পশু জবাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। কোরবানি করা হয় আবু হামর এলাকায়। সেখানেই পশু কেনাবেচা হয়। কেউ কোরবানি দিতে চাইলে সেখানেই দেন।
প্রবাসীদের ঈদ কীভাবে কাটে জানতে চাইলে বাংলাদেশ দূতাবাসের এই কর্মকর্তা বলেন, পরিবার-পরিজন ছাড়া আসলেই প্রবাসীদের ঈদ ভালো কাটে না। তবে ঈদের দিন কোথাও কোথাও বাংলাদেশিরা কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেটাই তাঁদের একমাত্র বিনোদন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজ ঈদ উপলক্ষে দোহার আল-আরাবিয়া স্টেডিয়ামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আয়োজনের নাম ‘সুপারস্টার ঈদ কনসার্ট ২০১৪’। অনুষ্ঠানের আয়োজক বাংলাদেশ কালচারাল ফোরাম।
অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডশিল্পী জেমস, চলচ্চিত্রের নায়ক সাকিব খান, নায়িকা অপু বিশ্বাস, সংগীতশিল্পী এলিটা, কোনাল, সিলভী, ঝিলিকসহ অনেক তারকার উপস্থিত থাকার কথা।
সংগঠনের আহ্বায়ক ওহিদ ভূঁইয়া প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, জেমসসহ অধিকাংশ শিল্পী ইতিমধ্যে দোহায় এসেছেন। ঈদের এই অনুষ্ঠানটি দারুণ জমজমাট হবে।

২৬শে অক্টোবর সারা দেশে সকাল সন্ধ্যা হরতালের আলটিমেটাম

আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বিচারের দাবিতে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে গণমিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করছে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন। তবে সবচেয়ে বড় সমাবেশ হয় ১১টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী দলের ব্যানারে। এ সমাবেশ থেকে ১৫ই অক্টোবরের মধ্যে লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দিয়েছেন বক্তারা। অন্যথায় ২৬শে অক্টোবর সারা দেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি পালন করবে তারা। গতকাল জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ শুরু হয়। প্রথমে পুলিশ মসজিদের উত্তর গেটে বিক্ষোভকারীদের বাধা দেয়। তবে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। তারা জুতা এবং ঝাড়ু হাতে নিয়ে লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন। লতিফ সিদ্দিকীর ফাঁসি দাবি করে। এ সময় দৈনিক বাংলার মোড় থেকে পুরানা পল্টন মোড় পর্যন্ত বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একই ইস্যুতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি, মাদ্‌রাসা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, মুজাহিদ পরিষদ, খেলাফত মজলিস মিছিল সমাবেশ করেছে। বিকালে আলাদা বিক্ষোভ সমাবেশ করে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন। এছাড়া লতিফ সিদ্দিকীর কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন বাংলাদেশ তরিকত  ফেডারেশনের মহাসচিব এমএ আউয়াল। সম্মিলিত ইসলামী দলের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, যুগ্ম মহাসচীব ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী, মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, অধ্যাপক মাওলানা আবদুল করিম, মুফতি আজিজুর রহমান আজিজ, মুফতি ফখরুল ইসলাম, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, মাওলানা আবু জাফর কাসেমী, অধ্যাপক মাওলানা আবদুস সবুর মাতুব্বর প্রমুখ। মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, ঈমান-আকিদা, পবিত্র হজ নিয়ে বিষোদগার এবং মহানবী (সাঃ) নিয়ে কটূক্তি করে লতিফ সিদ্দিকী নাস্তিক-মুরতাদদের কাতারে শামিল হয়েছেন। ওলি-আউলিয়াদের এই পবিত্র জমিনে কোন নাস্তিক- মুরতাদের স্থান হবে না। তিনি আগামী ১৫ই অক্টোবরের মধ্যে আত্মস্বীকৃত মুরতাদ লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শান্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। অন্যথায় ২৬শে অক্টোবর তৌহিদী জনতা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করবে বলে ঘোষণা দেন।

ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, প্রিয় নবীজীর (সাঃ) সম্মান  ও মর্যাদা রক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ কোরবানি করতে প্রস্তুত। ‘কোন ঈমানের দাবিদার মহানবীর (সাঃ) জীবন অপেক্ষা নিজের জীবনের অধিক মর্যাদা দিতে পারে না’। তিনি বলেন, কোন অশুভ শক্তির খুঁটির জোরে লতিফ সিদ্দিকী রাসূল (সাঃ) এর বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্য ও কটূক্তি করার ধৃষ্টতা দেখালেন তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। সরকার তাকে মন্ত্রিসভা ও দল থেকে বহিষ্কার করে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু সচেতন জনতা সরকারের এ ষড়যন্ত্র কোনভাবেই মেনে নেবে না। তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব এমএ আউয়াল এমপি বলেন, লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিদ্যমান আইনেই তার বিচার সম্ভব। আমরা লতিফ সিদ্দিকীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

তবু ফিরতে হচ্ছে আফসোস নিয়ে by তারেক মাহমুদ

সবখানে বিদায়ের সুর। করুণ রাগিণী। আজ সমাপনী অনুষ্ঠান দিয়ে পর্দা নামবে ১৭তম ইনচন এশিয়ান গেমসের। আর এর মধ্যেই এল ‘গেচ্ছন জন্নাল’। স্থানীয় ভাষায় গেচ্ছন জন্নালই বলা হয় কোরিয়ার জন্মদিনকে। কাল ছিল সেই জন্মদিন, যে দিনে পাঁচ হাজার বছর বয়স পূর্ণ করল কোরিয়ানরা। এই জন্মদিনের সঙ্গে আবার স্বাধীনতার ব্যাপার-স্যাপার মেলাবেন না। এই দিনে কোরিয়ার মানুষ জন্মদিনটা পালন করে প্রাচীন সংস্কৃতির একটা রীতি মেনে।
গেচ্ছন জন্নালের সৃষ্টি নিয়ে বিরাট গল্প আছে। সেদিকে আপাতত না গিয়ে জন্মদিনে এশিয়ান গেমসের ছবিটাই দেখুন। জন্মদিন উপলক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ায় কাল ছিল সরকারি ছুটি এবং তার প্রভাব পড়ল গেমসেও। ছুটির দিনে অসংখ্য মানুষ সপরিবারে এলেন ইনচনের মূল স্টেডিয়াম এলাকায়। উৎসবের আবহ গায়ে মেখে ঘুরে বেড়ালেন স্টেডিয়াম চত্বরে বসা ফুড ফেয়ার আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টলে। তাদের উৎসবের সঙ্গে একটা উৎসব মিলে গেল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলেরও। কোরিয়ানদের গেচ্ছন জন্নালের দিনেই যে তৃতীয় স্থাননির্ধারণী ম্যাচে হংকংকে ২৭ রানে হারিয়ে ব্রোঞ্জ পেল বাংলাদেশ! এবারের গেমসে এটি বাংলাদেশের তৃতীয় পদক, যার দুটিই এসেছে ক্রিকেট থেকে। অন্যটি পেয়েছে মহিলা কাবাডি দল।

বলতে পারেন সোনা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আসা গেমসে ব্রোঞ্জ পেয়ে আবার কিসের উৎসব! আসলে বাংলাদেশ দল যে সোনা জয়ের লড়াইটা লড়তে পারল না, সেটা তো নিতান্তই দুর্ভাগ্যের কারণে। টস নামক নিয়তিই ছিটকে দিয়েছে তাদের সেই দৌড় থেকে। তার চেয়ে বরং হংকংয়ের বিপক্ষে যে বাংলাদেশ দল বাংলাদেশ দলের মতোই খেলে ব্রোঞ্জ জিতল, ব্যর্থতার দীর্ঘ সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে একটু আশার আলো দেখাল, সেটাই বা কম কী! ব্যর্থতার ক্লান্তিময় পথ পেরিয়ে হয়তো এখান থেকেই আবার শুরু হবে নতুন পথচলা।
এশিয়ান গেমসে কাল প্রথমবারের মতো টসে জিতলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। আগে ব্যাটিং নিয়ে হংকংয়ের সামনে লক্ষ্য দিলেন ১৬৩ রানের। জবাবে হংকং একেবারে খারাপ করেনি। ৭ উইকেটে ১৩৫ রান তাদের জন্য ভালোই সান্ত্বনা হতে পারে। অবশ্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দুই দলের সর্বশেষ ম্যাচটা যেহেতু হংকংই জিতেছিল, থাকতে পারে আরেকটি অঘটন ঘটাতে না পারার মৃদু আফসোসও।
কুয়েতের বিপক্ষে ম্যাচে ব্যাট হাতে তেমন কিছু করতে পারেননি। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যে ১১ ওভার ব্যাটিং করেছিল বাংলাদেশ, সাকিব আল হাসান আউট হয়ে গিয়েছিলেন তাতেও। বহিষ্কারাদেশ থেকে খেলায় ফেরা এই অলরাউন্ডার অপেক্ষায় ছিলেন ফর্মে ফেরার। কাল ব্যাট হাতে দুই ছক্কায় ৩৭ বলে ৪৬ রান আর বল হাতে ২ উইকেট নিয়ে সাকিব যেন ফিরে আসারই ঘোষণা দিলেন। দুই ছক্কা আর এক বাউন্ডারিতে ২১ বলে ৩৫ রান করে মাহমুদউল্লাহও ধরে রেখেছেন সদ্য ফিরে পাওয়া ফর্মটা।
হংকংয়ের ব্যাটিং দেখে কখনোই মনে হয়নি তারা বাংলাদেশের ১৬২ রান তাড়া করে জেতার জন্য খেলছে। বরং বাংলাদেশের স্পিনারদের খেলতে কষ্টই হচ্ছিল তাদের। সাকিবের ২ উইকেটের পাশে ২২ রানে ৩ উইকেট নিয়েছেন আরাফাত সানিও।
তা সোনা ধরে রাখতে এসে ব্রোঞ্জ জিতে কেমন লাগল খেলোয়াড়দের? ম্যাচ শেষে দলের প্রতিনিধি হয়ে আসা মাহমুদউল্লাহ জানালেন, ‘মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। ভালো লাগছে কারণ আজ (গতকাল) আমরা ভালো ক্রিকেট খেলেছি। পদক পেয়েছি। আবার আফসোসও আছে, কারণ আমরা সোনা জয়ের জন্য এসেছিলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা হয়নি। টস তো যেকোনো দিকেই যেতে পারে। সে জন্য আফসোসটাই বেশি।’ তবে মাহমুদউল্লাহ এর মধ্যেও খুঁজে নিতে চান ভালো কিছু, ‘আজ (গতকাল) ভালো ক্রিকেট খেলতে পারাটাই আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল। সবাই সেটা করতে পারায় আমরা খুশি।’
কালই হওয়া ফাইনালে আফগানিস্তানকে ৬৮ রানে হারিয়ে সোনা জিতেছে শ্রীলঙ্কা। আর বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের প্রাপ্তির খাতায় একটা ব্রোঞ্জ পদকের সঙ্গে থাকবে গেমসে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও। দলের কারও কারও সে অভিজ্ঞতা আগেই হয়েছে, যদিও মাহমুদউল্লাহসহ বেশির ভাগ খেলোয়াড়ের জন্য তা নতুন। মাহমুদউল্লাহ বলছিলেন, ‘শামসুর-সাব্বিরসহ বেশ কয়েকজন এর আগেও এশিয়ান গেমসে খেলেছে। তবে আমার এবং মাশরাফি, সাকিব, তামিমসহ অনেকেরই এটা প্রথম অভিজ্ঞতা। গেমস নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি। এবার আমারও অন্য রকম একটা অভিজ্ঞতা হলো। সব মিলিয়ে ভালোই লেগেছে।’
গত গুয়াংজু এশিয়ান গেমসে খেলা সাব্বির অবশ্য ইনচন এশিয়ান গেমসের তুলনায় এগিয়ে রাখলেন প্রথম অভিজ্ঞতাকেই, ‘চীনের এশিয়ান গেমসটাই ভালো হয়েছিল। সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি ছিল সেবার।’
ইনচনের চেয়ে গুয়াংজুকে এগিয়ে রাখার আরেকটা কারণও আছে। গুয়াংজু থেকে বাংলাদেশ দল দেশে ফিরেছিল গলায় সোনার পদক পরে। অথচ গতবারের তুলনায় শক্তিশালী দল নিয়ে এসেও ভাগ্যের ফেরে আজ বাংলাদেশ দল দেশের বিমানে উঠবে ব্রোঞ্জ নিয়ে। সোনা জয়ের সুখস্মৃতি আছে যাঁদের, ব্রোঞ্জ গলায় ঝোলাতে নিশ্চয়ই তাঁদের খারাপ লাগবে?
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১৬২/৬ (তামিম ২২, এনামুল ১১, শামসুর ২৬, সাকিব ৪৬, সাব্বির ১১, মাহমুদউল্লাহ ৩৫*, শুভাগত ১, মাশরাফি ২*; আদিল ০/২০, ইরফান ০/৩৯, নাদিম ৩/৩৬, নিজাকাত ১/৩০, আইজাজ ১/২৫, ওয়াকাস ০/১২)। হংকং: ২০ ওভারে ১৩৫/৭ (ইরফান ৩১, ওয়াকাস ০, অ্যাটকিনসন ৭, নিজাকাত ০, চ্যাপম্যান ৩৮, শাখাওয়াত ১১, আইজাজ ২৬*, ল্যামস্যাম ৩, নাদিম ১০*; মাশরাফি ০/২৬, আরাফাত ৩/২২, রুবেল ১/৩৫, সাকিব ২/২৩, তাসকিন ০/১১, শুভাগত ০/১৩)। ফল: বাংলাদেশ ২৭ রানে জয়ী।

সাত জেলায় আজ ঈদ

সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে আজ দেশের সাতটি জেলায় পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হচ্ছে।  চাঁদপুর, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা, চট্টগ্রামের সীতাকু- ও পটিয়া উপজেলা, সাতক্ষীরা,  ভোলায় লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ ও দিনাজপুরের চিরিবন্দরে ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে।

লালমনিরহাটে তিন গ্রামে  আজ ঈদ
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার সুন্দ্রাহবি মৌজার হাড়িশ্বরের মুন্সিপাড়া, চন্দ্রপুরের বালাপাড়া ও পানিখাওয়ার ঘাট গ্রামে পৃথক তিনটি জামাতে সহস্্রাধিক মুসল্লি আজ ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেন।
হাড়িশ্বর মুন্সিপাড়া গ্রামের ঈদগাহ মাঠের সভাপতি মওলানা আব্দুল আজিজ ও জামাতের খতিব মওলানা ইমান আলী বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে একইদিনে  বিগত ৪ বছর ধরে এলাকায় ঈদুল আজহা, ঈদুল ফিতর, শবে-কদর, শবে মেরাজসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করছেন।
দিনাজপুরে ১৪টি গ্রামে  আজ ঈদ
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও দিনাজপুরের ১৪টি গ্রামে পালিত হচ্ছে  পবিত্র ঈদুল আযহা। আজ সকাল সোয়া ৮টায় দিনাজপুর শহরের ডেফোডিল কমিউনিটি সেন্টারে ঈদের প্রধান জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। এই জাময়াতে শতাধিক মুসল্লী অংশ নেয়।
এছাড়াও চিরিরবন্দর উপজেলার নশরতপুর,বারো জামায়াত চত্বর,সাইতারা রাবার ড্যাম,কাহারোল উপজেলার মুকুন্দপুর,রসুলপুর ও বিরামপুর উপজেলার কয়েকটি স্থানে পৃথকভাবে পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপিত হচ্ছে।  পরে পশু কোরবানি দেন তারা।
চাঁদপুরে ৪০ গ্রামে আজ ঈদ
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে চাঁদপুরের ৪০ গ্রামে আজ ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হচ্ছে। গ্রামের কয়েক হাজার মুসল্লি সকালে বিভিন্ন জায়য়গায় ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেন। পরে তাঁরা পশু কোরবানি দেন।
পিরোজপুরে ছয় গ্রামে আজ ঈদ
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের ছয় গ্রামে আজ ঈদ উদ্যাপন করা হচ্ছে। সকাল নয়টায় সাপলেজার ভাইজোড়া গ্রামের খোন্দকার বাড়ি ও সাে নয়টার দিকে কচুবাড়িয়া গ্রামের হাজি ওয়াহেদ আলী হাওলাদার বাড়িতে ঈদের দুটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সাপলেজা ইউনিয়নের পূর্ব সাপলেজা, ভাইজোড়া, কচুবাড়িয়া, খেতাছিঁড়া, বাদুরতরী ও চড়কগাছিয়া গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ অনেক দিন ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা, ঈদ পালন করে আসছেন।
সীতাকুণ্ডে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে উপজেলার বারবণ্ডে ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার আজ ঈদুল আজহা উদ্যাপন করছেন। সকাল নয়টায় সীতাকু-ের রহমতেরপাড়া গ্রামে জাহাঁগিরিয়া জামে মসজিদে ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
পটিয়া ৬০ গ্রামে আজ ঈদ
দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়ার ৬০টি গ্রামে পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হচ্ছে। আজ সকাল নয়টায় জাহাঁগিরিয়া শাহ্ সুফি মমতাজিয়া দরবার শরিফ প্রাঙ্গণে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
সাতক্ষীরায় ১০ গ্রামে আজ ঈদ
সাতক্ষীরা সদর, তালা, কলারোয়া ও আশাশুনি উপজেলার ১০টি গ্রামে ঈদুল আজহা উদ্যাপন করা হচ্ছে। আজ সকালে সাতক্ষীরার শহীদ আবদুর রাজ্জাক পৌর মিলনায়তনে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
ভোলায় ১০ গ্রামে আজ ঈদ
ভেলার ১০টি গ্রামের মানুষ আজ শনিবার ঈদ উদ্যাপন করছেন। জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার চারটি, তজুমদ্দিন উপজেলার তিনটি, লালমোহন উপজেলার দুটি এবং চরফ্যাশনের একটি গ্রামে ঈদ উদ্যাপিত হচ্ছে।

চামড়া শিল্পনগরের কাজে অগ্রগতি by আবুল হাসনাত ও অরূপ রায়

ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সব ট্যানারি সাভারের চামড়া শিল্পনগরে স্থানান্তর হওয়ার এখনকার সময়সীমা ২০১৫ সালের জুনে। আর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা আগামী মার্চে। সে অনুযায়ী কাজও চলছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সিইটিপির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকটি ট্যানারি তাদের কারখানা ভবনের নির্মাণকাজও শুরু করেছে। কিন্তু যেভাবে কাজ চলছে, তাতে নির্ধারিত সময়ে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, ঈদের পর পুরোদমে কারখানা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করবেন বলে ট্যানারি মালিকেরা জানিয়েছেন। কারণ, কোরবানি নিয়ে তাঁরা এখন কর্মব্যস্ত সময় পার করবেন। এটা শেষ হলেই কারখানা ভবন তৈরিতে পুরোপুরি মনোযোগী হবেন।
শিল্পনগর প্রকল্পের পরিচালক সিরাজুল হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ মাস আগের সঙ্গে এখনকার শিল্পনগরের কোনো মিলই নেই। তখন শিল্পনগরটি ছিল বালুর চর। এখন সেখানে কারখানা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। সিইটিপির নির্মাণও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে। হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোও সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ প্রস্তুত চামড়া, চামড়াপণ্য ও জুতা রপ্তানিকারক সমিতির (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ট্যানারির মালিকেরা সাভারে যেতে আগ্রহী। কিন্তু সিইটিপি নির্মাণ না হওয়ার কারণে এত দিন হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তরের প্রক্রিয়া আটকে ছিল। তবে এখন এর কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।
২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) চামড়া শিল্পনগর প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। সাভারের হেমায়েতপুরে ২০০ একর জায়গাজুড়ে নির্মাণাধীন এই শিল্পনগরের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৫ সালে। নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটি সংশোধন করে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১০ সাল পর্যন্ত। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকায়। তাতেও কাজ শেষ হয়নি। ব্যয় না বাড়িয়ে আবারও ২০১২ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাজ শেষ হয়নি। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় সংশোধিত প্রকল্পের অনুমোদন হয় একনেকে। এ সময় ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকায়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিসিক। শিল্পনগরে ২০৫টি প্লটে ১৫৫টি কারখানা স্থাপন করা হবে।
কারখানার নির্মাণকাজ চলছে: শিল্পনগর সূত্র বলছে, ১৫৫টি ট্যানারির মধ্যে ১৪৭টির লে-আউট পরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০৪টি ট্যানারি তাদের কারখানা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেছে।
অবশ্য গত বুধবার সরেজমিন সাভারের শিল্পনগর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পুরো প্রকল্প এলাকায় কোনো কারখানা গড়ে ওঠেনি। এমনকি নির্মাণ শুরু হয়নি কোনো ভবনেরও। অনেক প্লটের সামনে ট্যানারির সাইনবোর্ড ঝোলানো আছে। কোথাও নির্মাণশ্রমিকদের থাকার জন্য কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। শ্রমিকেরা পাইলিংয়ের কাজ করছেন। কোথাও ট্রাক থেকে ইট নামানো হচ্ছে। কোথাও বালু নামানো হচ্ছে।
প্রকল্প এলাকায় নিয়োজিত সহকারী প্রকৌশলী মইন উদ্দিন আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, ১২০টি কারখানা তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। কারখানা ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে ২০টি ট্যানারির।
ট্যানারি মালিকেরাও বলছেন, অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের কারখানা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। ১৫-২০টি কারখানার পাইলিং শেষের দিকে।
বিএফএলএলএফইএর সভাপতি আবু তাহের বলেন, ‘আমার কারখানার (রুমা লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ) ২১৭ মিটার পাইলিংয়ের মধ্যে ১৭০ মিটারই শেষ হয়েছে। বলতে পারেন, মাটির নিচের কাজ শেষ।’
এগোচ্ছে সিইটিপির কাজও: প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সিইটিপির নির্মাণকাজ ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে।
সূত্র বলছে, সিইটিপির অংশ হিসেবে বর্জ্য পরিশোধনের জন্য চারটি মডিউল তৈরি করার কথা। কয়েকটি চেম্বার নিয়ে একেকটি মডিউল। এসব চেম্বার তৈরির জন্য আরসিসি ঢালাইয়ের (রড দিয়ে কাঠামো বানিয়ে তাতে সিমেন্ট ও বালু দিয়ে ঢালাই) কাজ প্রায় শেষ। আর দুটি সিসি ঢালাইয়ের (রড ছাড়া অন্যান্য উপকরণ দিয়ে ঢালাই) কাজ অর্ধেক হয়েছে। ঈদের পর তা শেষ করা হবে। নতুন করে দুটি আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ শুরু হবে।
এলাকায় গিয়ে দূর থেকে শ্রমিকদের সিইটিপি নির্মাণে কাজ করতে দেখা গেছে। তবে সিইটিপি এলাকার ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সিইটিপির নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তব্যরত চীনা প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রািজ হননি।
চীন-বাংলাদেশ যৌথ প্রতিষ্ঠান জেএলইপিসিএ-ডিসিএল জেভিকে ২০১২ সালের ১১ মার্চ চামড়া শিল্পনগরে সিইটিপি নির্মাণের কার্যাদেশ দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। শর্ত ছিল ১৮ মাসে কাজ শেষ করতে হবে। ওই মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়ায় এক বছরের বেশি সময় সিইটিপির নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। সে কারণেই নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি। এরপর তাদের সময় দেওয়া হয় এ বছরের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। এ সময়েও কাজ শেষ হয়নি। পরে আরেক দফায় তাদের সময় দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তোড়জোড়: গত ১০ সেপ্টেম্বর ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। বৈঠকে তিনি বলেন, শিল্পনগরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান ট্যানারি স্থানান্তরে ব্যর্থ হবে, তাদের প্লট বাতিল করে নতুন উদ্যোক্তাদের বরাদ্দ দেওয়া হবে।
এর পরই শিল্পনগর প্রকল্প কার্যালয় থেকে ৪৩টি ট্যানারি মালিককে তাঁদের প্লট কেন বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ পাননি কেউ: শিল্প মন্ত্রণালয় ১০ সেপ্টেম্বর বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয় যে যেসব ট্যানারির মালিক ইতিমধ্যে সাভার চামড়া শিল্পনগরে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ পুরোদমে শুরু করেছেন, তাঁদের ওই মাসেই আনুপাতিক হারে ক্ষতিপূরণের প্রথম কিস্তি পরিশোধ করা হবে।
তবে ঈদের আগে কোনো ট্যানারি মালিকই ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না।
শিল্পনগর সূত্র বলছে, কারা ক্ষতিপূরণ পাবেন, কী পরিমাণ পাবেন, তা নির্ধারণ করার জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে প্রকল্প কার্যালয়। সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ওই কমিটি গঠিত হলে কমিটির সদস্যরা সরেজমিন কারখানা ভবনের নির্মাণকাজের অগ্রগতি দেখে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। এর পরই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আবু তাহের বলেন, ঈদের আগে প্রথম কিস্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না।
ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের এই প্রকল্প নেওয়া হয় ২০০৩ সালে। দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর কারণে বেড়েছে ব্যয়ও। ২০১৫ সালের জুনের মধ্যে সব ট্যানারি স্থানান্তর করতে হবে
প্রকল্প কার্যালয়ের দাবি
১০৪টি কারখানার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। আর কারখানা ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে ২০টি ট্যানারির
‘‘পাঁচ মাস আগে শিল্পনগরটি ছিল বালুর চর। এখন সেখানে কারখানা ভবন ও সিইটিপির নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে
সিরাজুল হায়দার
প্রকল্প পরিচালক, চামড়া শিল্পনগর, সাভার
প্লট বাতিলের শঙ্কা
কারখানা নির্মাণ শুরু না করায় প্রকল্প কার্যালয় থেকে ৪৩টি ট্যানারিকে তাদের প্লট কেন বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে
ক্ষতিপূরণ হলো না
কারখানার নির্মাণকাজ শুরু করা ট্যানারি মালিকদের ঈদের আগেই ক্ষতিপূরণের প্রথম কিস্তি দেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তা পাননি

কুতুবদিয়া উপজেলার শমসের নেওয়াজ কক্সবাজার জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক

কক্সবাজার জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন কুতুবদিয়া উপজেলার আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের ফ্লাইট লে কাইমুল হুদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শমসের নেওয়াজ। গত ২৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় ২০১৪ সালের জন্য তাঁকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা নির্বাচিত করা হয়। শমসের নেওয়াজ শিক্ষকতার পাশাপাশি নানা সমাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। তিনি ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষায় সপ্তাহ-২০০৯ বর্ষে শিক্ষক পর্যায়ে নজরুল ও লোকসংগীতে অংশ নিয়ে প্রথম স্থান লাভ করেন। ২০০২ সালে জেলায় শ্রেষ্ঠ গালর্স গাইড নির্বাচিত হন। — নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার

হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী পদত্যাগ করছেন না

হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী লিউন চুং-ইং বলেছেন, তিনি পদত্যাগ করছেন না। তবে তাঁর সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি আছে। খবর এএফপি, বিবিসি ও রয়টার্সের। গতকাল বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের মধ্যে লিউনের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা হংকংয়ের সরকারি দপ্তরগুলো অবরোধের হুমকি দিয়েছিলেন। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার কিছু আগে এক সংবাদ সম্মেলনে লিউন এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তিনি তাঁর মুখ্য সচিবকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি আন্দোলনকারীদের সংযম প্রদর্শন এবং সরকারি দপ্তরগুলো পাহারায় নিয়োজিত পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। লিউন তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ভবন ঘেরাও করে আন্দোলনকারীরা আইন লঙ্ঘন করছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, সরকারি ভবন দখলের চেষ্টা করা হলে পুলিশ দিয়ে তার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে। হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী বলেন, আন্দোলনকারীরা ‘খুবই যৌক্তিক’ কারণে সরকারি ভবনগুলো ঘেরাও করে রেখেছেন। তাঁরাএখন পর্যন্ত ‘খুবই নিয়ন্ত্রিত’ আচরণও করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি, তাঁরা এভাবেই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।’ লিউন বলেন, আন্দোলনকারী ছাত্ররা মুখ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠকে বসতে চেয়ে আজ (বৃহস্পতিবার) রাতে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তাঁরা হংকংয়ের সাংবিধানিক অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করতে চান।
তিনি বলেন, ‘আমরা চিঠিটি বিস্তারিত পড়ে দেখেছি। আমি এখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য হংকং সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমার মুখ্য সচিবকে নিয়োগ দেব।’ তিনি বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করব না। কারণ আমাকে নির্বাচন নিয়ে কাজ করতে হবে।’ এদিকে হংকংয়ে গণতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলনকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে সতর্ক করে দিয়েছে চীন। ক্ষমতাসীন দল কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত একটি সংবাদপত্র ‘বিশৃঙ্খলার’ ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়ে হংকংয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তার প্রতি সরকারের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। এ ছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংযমের আহ্বানের জবাবে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হংকং পরিস্থিতিকে চীনের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ বলে উল্লেখ করেছেন। হংকংয়ের সরকারি সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি গতকাল কিছু কমে আসে। আগের দিন চীনের জাতীয় দিবস উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠানেও সেখানে হাজার হাজার মানুষ অবস্থান নিয়েছিল। গতকাল প্রশাসকের কার্যালয় পুলিশ বাহিনী বেষ্টনী দিয়ে রাখে। আন্দোলনকারী ছাত্ররা কড়া রোদ ও পুলিশের সম্ভাব্য মরিচের গুঁড়ার হামলা থেকে বাঁচতে ছাতা নিয়ে অবস্থান নেন। বেইজিং থেকে প্রকাশিত সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দ্য পিপলস ডেইলি প্রথম পৃষ্ঠায় এক মন্তব্য প্রতিবেদনে গতকাল লিখেছে, কেন্দ্রীয় সরকার হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী লিউন চুং-ইংয়ের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল এবং তাঁর কাজে সন্তুষ্ট। হংকংয়ে ‘অবৈধ তৎপরতা’ বন্ধ করতে পুলিশের ভূমিকারও প্রশংসা করেছে বেইজিংয়ের পত্রিকাটি। চীনের বিশেষ প্রশাসনিক এলাকা হংকংয়ের প্রশাসক নির্বাচন প্রশ্নে গত মাসে নেওয়া চীনের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এ বিক্ষোভ শুরু হয়।

অর্থনৈতিক উদ্বেগই হংকং বিক্ষোভের মূল কারণ

হংকংয়ে অধিকতর গণতান্ত্রিকভাবে প্রশাসক নির্বাচিত করার অধিকারের দাবিতে বিক্ষোভ চলছেই। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশের শক্তি প্রয়োগ ও চীন সরকারের হুমকি এতে অংশগ্রহণকারীদের আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তাদের দাবিগুলো মৌলিক অধিকারবিষয়ক বলেই সহজে তারা মাঠ ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গণতান্ত্রিক অধিকারকর্মীদের আয়োজনে চলমান এ বিক্ষোভে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করেছে। ছত্রভঙ্গ করতে ছুড়েছে মরিচের গুঁড়াও। কিন্তু বিক্ষোভ শুরু হওয়ার বেশ কয়েক দিন পরও হাজারো আন্দোলনকারী পথে রয়ে গেছে। বরং নুতন নতুন জায়গায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলেকজান্ডার চ্যান বলেন, ‘আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা আমার ছিল না। কিন্তু ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। এটা খুবই বাড়াবাড়ি। তাই আমি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছি।’ বিশ্লেষকেরা কেউ কেউ মনে করছেন, হংকংয়ের এ বিক্ষোভ আরও কয়েক দিন চলতে পারে। চায়নিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের চীনবিষয়ক বিশ্লেষক ও-লাপ লামও বলেন, পুলিশের ভূমিকায় সাধারণ মানুষ খুবই ক্ষুব্ধ। তারা কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করায় আরও বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। এই সহিংস পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হতে পারে। লামের মতে, বেইজিং নমনীয় হবে এবং তাদের দাবি মেনে নেবে—বিক্ষোভকারীদের মধ্যে এ আশা খুব ক্ষীণ।
তাই ব্রিটিশ শাসনাধীনে অর্জিত আইনের শাসন, বাক্স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষ বেসামরিক প্রশাসনের মতো মৌলিক মূল্যবোধগুলো রক্ষায় তারা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের শাসন থেকে ১৯৯৭ সালে হংকং দ্বীপ আবার কমিউনিস্ট চীনের শাসনে ফিরে আসে। একদলীয় শাসনের দেশ চীন এ সময় সেখানে, বিশেষ করে ব্রিটিশ শাসকদের চালু করা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিধিব্যবস্থা এবং মূল্যবোধ রক্ষার অঙ্গীকার করেছিল। ‘ফেডারেশন অব স্টুডেন্টস’-এর মহাসচিব আলেক্স চাও ইয়ং-কাং বলেন, ‘এ বিক্ষোভের সম্ভাব্য মূল প্রভাব হলো হংকংয়ের সাধারণ মানুষ আরও সচেতন হবে এবং আরও বেশি সংখ্যায় রাস্তায় নেমে আসবে। এতে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে।’ বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক বিষয়ে হংকংয়ের যুবকদের উদ্বেগই এই বিক্ষোভের মূল কারণ। চায়নিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের বিশ্লেষক ও-লাপ লাম মনে করেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাই ছাত্রদের পথে নামিয়েছে। চাকরিজীবীরা মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছেন না। হংকং কনফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়নও শ্রমিকদের দুরবস্থার অবসানে বিক্ষোেভ যোগ দিয়েছে। ১৯৯৭ সালে হংকং চীনের শাসনে ফিরে আসার পর দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১০ লাখ লোক অর্থনৈতিকভাবে উন্নত এ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পাড়ি জমায়। এ কারণেও স্থানীয় লোকজন বেইজিংয়ের ওপর ক্ষুব্ধ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় হংকংয়ে গুরুতর আবাসনসংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে এ পরিস্থিতি।

সিরিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ শহরের প্রবেশমুখে আইএস

সিরিয়ার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর কোবানির প্রবেশমুখগুলোতে অবস্থান নিয়েছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা। যেকোনো সময় তারা তুরস্কের সীমান্তসংলগ্ন এই শহরে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পশ্চিম ইরাকের হিত শহরের প্রায় ৯০ শতাংশ দখল করে নিয়েছে জঙ্গিরা। এই পরিস্থিতিতে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তুরস্ক। খবর এএফপি, রয়টার্স ও সিএনএনের। আইএসের জঙ্গিরা কয়েক দিন ধরেই কোবানি শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলাও তাদের ঠেকাতে পারেনি। গতকাল বৃহস্পতিবার তারা কোবানি শহরের প্রবেশমুখগুলোতে অবস্থান নেয়। শহরে তাদের প্রবেশ ঠেকাতে মার্কিন বিমান হামলার সহায়তা নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে কুর্দি যোদ্ধারা। এই শহরের আরেক নাম আইন আল-আরব। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরীয় মানবাধিকার সংগঠন অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, ‘আশঙ্কার বিষয় হলো, আইএসের জঙ্গিরা যেকোনো সময় কোবানি শহরে ঢুকে পড়তে পারে।’
এদিকে ইরাকের আনবার প্রদেশের প্রাদেশিক কাউন্সিলর আদনান আল-ফাহদায়ি বলেছেন, জঙ্গিরা প্রদেশের হিত শহরের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা দখল করে নিয়েছে। স্থানীয় হাসপাতাল ও নিরাপত্তা বাহিনী সূত্র জানায়, এ সময় আইএস হিত শহরের পুলিশ সদর দপ্তরে হামলা চালায়। এতে পুলিশের সাত সদস্য ও সেখানে থাকা চারজন সেনা নিহত হয়। এ ছাড়া রামাদি শহরে আইএসের হামলায় কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ছয়জন সদস্য নিহত হয়েছে। পৃথক এই হামলার সময় আইএসের অন্তত ৪০ জঙ্গি নিহত হয়। লড়াইতে যোগ দিচ্ছে তুরস্ক: তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গত বুধবার পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে বলেন, ‘এই অঞ্চলে আইএসসহ সব সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধেই কার্যকরভাবে লড়াই করব আমরা।’ তিনি বলেন, সিরিয়ায় আইএস জঙ্গিদের দমনে ‘টন টন বোমা ফেলা’ দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
‘মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে আইএস’: ইরাকে আইএসের জঙ্গিরা ‘যুদ্ধাপরাধ পর্যায়ের’ মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে। অন্তত ৫০০ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, সুন্নি চরমপন্থীদের ওপর ইরাক সরকার যে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তাতেও অনেক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। সরকার বিভিন্ন গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি হাসপাতালেও বিমান হামলা চালাচ্ছে; যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
সিরিয়ায় ৪১ শিশু নিহত: সিরিয়ায় বুধবার জোড়া বোমা বিস্ফোরণে ৪১ শিশুসহ ৪৫ জন নিহত হয়েছে। অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানায়, সরকারনিয়ন্ত্রিত হোমস শহরের আকরামেহ আল-মাখজুমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ওই বিস্ফোরণ ঘটে। আরব দেশগুলোর হামলা চায় না ইরাক: ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-এবাদি বলেছেন, আইএস দমনের লক্ষ্যে অন্য আরব দেশগুলো ইরাকে হামলা চালাক, সেটা তিনি চান না। পশ্চিমা বিমান হামলার সহায়তা নিয়ে ইরাকি বাহিনীই আইএসকে পরাজিত করতে পারবে বলে দাবি করেন তিনি।