Wednesday, January 31, 2018

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করবে by জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া দেখে মনে হচ্ছে, প্রস্তাবিত আইনে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাই নতুন করে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এখানে যেসব বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে প্রচারিত খসড়ায় তার অনেক কিছুই ছিল না। বিশেষ করে আইনের ২৫,২৮, ৩০,৩১ ও ৩২ ধারা নিয়ে শঙ্কা ও ঝুঁকি থেকেই যায়। এ কথা ঠিক যে নতুন আইনে কোনো কোনো বিষয়ে শাস্তির মাত্রা কমানো হয়েছে। যেমন মানহানি মামলায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ৭ বছর থেকে ১৪ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান ছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তিন বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই আইনের তো প্রয়োজন ছিল না। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ৫০০ ধারায় এর শাস্তি নির্ধারিত আছে। আবার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা ধর্ম অবমাননার বিষয়ে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ২৯৫ থেকে ২৯৮ ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে। সে ক্ষেত্রে এই আইনে সংশ্লিষ্ট ধারা সংযোজনের কোনো দরকার ছিল বলে মনে করি না। আর ধর্মীয় অনুভূতির ব্যাখ্যা কার কাছে পাব? আমরা দেখতে পাই, ধর্মীয় অনুভূতি বলতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাবলম্বী মানুষের অনুভূতির কথাই বোঝানো হয়। অন্য ধর্মের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত নিয়ে কোনো মামলা হতে দেখি না। বরং নাসিরনগরে দেখেছি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার নামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক তরুণের বিরুদ্ধ ৫৭ ধারায় মামলা করে তাঁকে জেলে পাঠানো হয়েছে। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমাদের ভয়ের আরেকটি কারণ হলো, বাংলাদেশে অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন এখানেও আইন ক্ষমতাবানদের পক্ষে এবং দুর্বলের বিপক্ষে ব্যবহারের সমূহ আশঙ্কা থেকে যায়। অনেকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপব্যবহারের কথা বলে থাকেন। এর মাধ্যমে কিন্তু আইনটির যৌক্তিকতা দেওয়া হয়। আমরা মনে করি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দ্বারা আমলাদের দুর্নীতি আড়াল করার একটা প্রয়াস রয়েছে। এই আইনে সংযুক্ত উল্লিখিত ধারাগুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত করবে। গণমাধ্যম বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খবর প্রকাশ করে থাকে। স্বভাবতই তারা সূত্রের নিরাপত্তার স্বার্থে তথ্যসূত্র গোপন রাখা হয়। কিন্তু আইন বলছে গোপনে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো তথ্য সংগ্রহ করা যাবে না। কেউ সরকারি অফিস থেকে গোপনে কোনো তথ্য সংগ্রহ করলে তার জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে।
পৃথিবীব্যাপী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি বড় উপাদান হলো সূত্র প্রকাশ না করা। গণমাধ্যম কোন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে, সেটি জানাতে বাধ্য নয়। সংশ্লিষ্টদের দেখার বিষয়, তথ্যটি ঠিক আছে কি না। সাংবাদিক কোথা থেকে এই তথ্য পেলেন, তা জানতে চাওয়া সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পরিপন্থী। তদুপরি ২০০৯ সালে প্রণীত তথ্য অধিকার আইনে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব অধিকার দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান আইন তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সেই আইনের উদ্দেশ্য ছিল সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা এই অধিকার খর্ব করবে। আইনটি যেভাবে করা হয়েছে, তাতে কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছবি প্রকাশ করলেও এই আইনে মামলা করা যাবে। কর্তৃপক্ষ বলতে পারে, এ ছবি তাদের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন গবেষণার ক্ষেত্রও সংকুচিত হবে। যেমন, সড়ক দুর্ঘটনাবিষয়ক গবেষণার কাজে যদি কেউ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবহার করে থাকেন, এই আইনবলে সেই তথ্যের জন্য তাঁর কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হতে পারে। এটিও তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৭ থেকে ৩৮ ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন। কিন্তু আমরা মনে করি, এসব ধারার প্রয়োজন ছিল না। বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতেই সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তি ও প্রতিকারের বিধান রয়েছে। এসব ধারা যেমন জটিলতা বাড়াবে, তেমনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত করবে।

অপরাধের সংজ্ঞার পরিসর অনেক বড় by তানজীব উল আলম

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বহুল আলোচিত ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা বিলুপ্ত করে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’-এর যে খসড়া চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা, তাতেও মানুষের শঙ্কা দূর হয়নি। এর আগে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অপব্যবহার নিয়ে অনেক সমালোচনা হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তা বিলুপ্ত করল। অর্থাৎ সরকার একভাবে মেনে নিল, ৫৭ ধারায় সমস্যা ছিল। কিন্তু নতুন আইনে ওই ধারার বিধানগুলো ঘুরেফিরে থেকে গেল। দেখা যাচ্ছে, ৫৭ ধারার বিষয়গুলো প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫,২৮, ২৯ ও ৩১ ধারায় ভাগ হয়ে গেছে। আইসিটি আইনের সমালোচিত ৫৭ ধারায় অপরাধের যে বর্ণনা ছিল, তার পরিসর ছিল অনেক বড়, যেগুলো নতুন আইনেও বিভিন্ন ধারার মধ্যে রয়ে গেছে। অর্থাৎ ইলেকট্রনিক বিন্যাসে মিথ্যা ও অশ্লীল তথ্য প্রচার করা যাবে না, এমন কোনো তথ্য প্রচার করা যাবে না, যা মানুষকে নীতিভ্রষ্ট ও অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এমন তথ্য প্রচার করা যাবে না, যাতে কারও মানহানি ঘটে বা কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। অন্যদিকে ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়ার মতো তথ্য প্রচার করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মানহানি বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো ব্যাপারগুলো কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। এই পরিস্থিতিতে ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাসও কারও জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কাউকে ধরা বা কাউকে ছাড়ার সুযোগ থাকবে। ব্যাপারটা হলো, যদি কোনো আইনে এমন সুযোগ থাকে, তাহলে সেটা মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী, অর্থাৎ তা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। আমাদের সংবিধানে মতপ্রকাশের অধিকারের সুরক্ষা থাকলেও তা নিরঙ্কুশ নয়। ফলে যে আইনে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তার ব্যাখ্যা এমনভাবে দিতে হবে, যাতে তার এই অধিকারের সুরক্ষা থাকে। কিন্তু আইনে মৌলিক অধিকার সংকুচিত হলে তা সংবিধানের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচ্য হবে। এই ধরনের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ মাথায় রাখতে হবে। যাহোক, এর আগে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সব অপরাধের একই রকম শাস্তি ছিল,
যা ছিল সর্বনিম্ন সাত বছর। আমার প্রস্তাব ছিল, অপরাধের মাত্রাভেদে শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা হোক। সেটা করা হলেও দেখা যাচ্ছে, শাস্তির পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির তুলনায় বেড়ে গেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শন করার মতো তথ্য সম্প্রচার বা প্রকাশ করতে পারবেন না। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ করা হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তিন বছরের কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। অথচ বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারা অনুসারে মানহানির জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান আছে। অর্থাৎ মানহানির অপরাধে কারও বিরুদ্ধে যদি দণ্ডবিধিতে মামলা করা হয়, তাহলে অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড হবে, আবার একই অপরাধের মামলা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হলে তিন বছর সাজা হতে পারে। অন্যদিকে প্রিন্ট মাধ্যমে যদি এই মানহানি করা হয়, তাহলে এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করা যাবে না। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এক যাত্রায় ভিন্ন ফল হচ্ছে। অন্যদিকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে দণ্ডবিধিতে যেখানে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে, সেখানে এই আইনে সর্বোচ্চ সাত বছর এবং দ্বিতীয়বার একই অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে তা ১০ বছর। তবে শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধিতে যেখানে সর্বোচ্চ ১০ বছরের দণ্ডের বিধান আছে, সেখানে এই আইনে তা সর্বোচ্চ সাত বছর এবং দ্বিতীয়বার একই অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে তা ১০ বছর। অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে যে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, সে প্রসঙ্গে বলা দরকার, তাঁরা তো সরকারি দপ্তরে বেআইনিভাবে প্রবেশ করেন না। কিন্তু দপ্তরে গিয়ে গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ করলে কী হবে? ফলে এই ধারাটি দ্ব্যর্থবোধক। অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের সঙ্গে এই ধারাটি সামঞ্জস্যপূর্ণ করা দরকার। প্রকৃতপক্ষে এই ধারায় শাস্তি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না, তবে অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

মানুষ আছে, নাম নেই

সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেতে সিনেমার নাম পরিবর্তন করতে শোনা যায়। সনদে ভুল নাম দেওয়া হলেও নাম পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হতে নাম পরিবর্তনের ঘটনা সম্ভবত এই প্রথম। কিন্তু গন্ডগোল বেধেছে অন্য খানে। নানা দেনদরবারের পর এমডি পদে নিয়োগ পেয়েছেন ঠিকই, তবে আগের নামে। এখন তাহলে নতুন নামের কী হবে? এ যেন মানুষ আছে, নাম নেই। পুরো ব্যাংক খাতে বিষয়টি হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ঘটনাটি বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের ন্যাশনাল ব্যাংকের। আর নাম পরিবর্তন করা এই এমডি হলেন আলোচিত চৌধুরী মোসতাক আহমেদ। তাঁকে এমডি নিয়োগ নিয়ে বহুদিন ধরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে দেনদরবার করছে ন্যাশনাল ব্যাংক।
গত বছরের ৩১ জুলাই ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে তাঁকে পূর্ণাঙ্গ এমডি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে অনুমোদনের জন্য তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছিল। চৌধুরী মোসতাক আহমেদ আগে ছিলেন ফারমার্স ব্যাংকের এমডি। সে সময় তাঁকে ১০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ জন্যই তাঁকে এমডি করতে প্রথমে আগ্রহী ছিল না নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এ কারণেই নাম পরিবর্তন করে অনুমোদনের এই চেষ্টা।  গত ২৭ ডিসেম্বর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের ৪০৮ তম সভায় সিদ্ধান্ত হয়, অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে ‘চৌধুরী মোসতাক আহমেদ’ নাম পরিবর্তন করে ‘চৌধুরী রাসেল আহমেদ’ হয়েছেন। নিয়ম মেনে পত্রিকায় নাম পরিবর্তনের বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়। এরপর নতুন নামেই তাঁকে অনুমোদন দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দেওয়া হয়। পাশাপাশি ব্যাংকের সব শাখা, বিভাগীয় প্রধান ও সব কর্মকর্তাকে এক চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়, দাপ্তরিক সব নথিতে চৌধুরী রাসেল আহমেদ নাম ব্যবহার হবে। এরপর ব্যাংকটির সব নথিপত্র, চিঠি ও ওয়েবসাইটে তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাসেল আহমেদ করা হয়। তবে পুরো পরিস্থিতি পালটে যায় গত সোমবার। সেদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক চৌধুরী মোসতাক আহমেদকে এমডি পদে অনুমোদন দেয়। ওই দিনই তা ব্যাংককে জানিয়ে দেওয়া হয়। ফলে নাম পরিবর্তন করায় বিপাকে পড়েন রাসেল আহমেদ। তবে শেষ পর্যন্ত আগের নামেই তিনি কাজে যোগদান করেন। অর্থাৎ নিয়োগ পেয়েছেন চৌধুরী মোসতাক আহমেদ। কিন্তু যোগ দিয়েছেন রাসেল আহমেদ। ব্যাংকটির কোম্পানি সচিব ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম বুলবুল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘চৌধুরী মোসতাক নামেই কাজে যোগদান করেছেন এমডি। পরবর্তীতে দেখা হবে, এতে কোনো সমস্যা আছে কি না। উনিই ভালো বলতে পারবেন বিষয়টি।’ রাসেল আহমেদ বা মোসতাক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এমডি হিসেবে কাজে যোগ দেওয়া ছাড়া বেশি কিছু বলতে রাজি হননি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকের এমডির এ ধরনের নাম পরিবর্তন জনগণের হাসির উদ্রেক করবে। সূত্র জানায়, চৌধুরী মোসতাক আহমেদ ফারমার্স ব্যাংকের এমডি থাকাকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা অফিস ভাড়া পরিশোধ করেন। তবে তিনি বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে আনেননি। এ কারণে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ১০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা করা হয়। এর কিছুদিন পরই এক ধাপ নিচে অতিরিক্ত এমডি হিসেবে ন্যাশনাল ব্যাংকে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

মুদ্রানীতির প্রভাব শেয়ারবাজারে

মুদ্রানীতির টান ব্যাংকের টাকায় তাৎক্ষণিকভাবে লাগুক বা না লাগুক, শেয়ারবাজারের সূচকে ঠিকই টান লাগিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি ঘোষণার পরদিনই বাজারে সূচক কমেছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪৯ পয়েন্ট কমেছে। অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচকটি কমেছে ৮৯ পয়েন্ট। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মুদ্রানীতিতে কাগুজে হিসাবে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ানো হয়েছে। ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এই হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশে। এরই নেতিবাচক প্রভাবে গতকাল মঙ্গলবার বাজারে দরপতন ঘটেছে। তবে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ এটিকে ‘অযৌক্তিক’ প্রতিক্রিয়া হিসেবেও অভিহিত করেছেন। এদিকে বাজার পতনের ধারায় থাকায় কোনো কোনো কোম্পানির লভ্যাংশ, আয় বৃদ্ধির খবর সত্ত্বেও দাম কমেছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত টেলিকম খাতের কোম্পানি গ্রামীণফোনের বছর শেষের লভ্যাংশ ও আয়ের খবর প্রকাশ হয়েছে গতকাল। তাতে কোম্পানিটি বছর শেষে ১০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর আগে ১০৫ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন লভ্যাংশ দিয়েছিল কোম্পানি, যা এরই মধ্যে শেয়ারধারীদের মধ্যে বিতরণও করা হয়েছে। ফলে বছর শেষে কোম্পানিটির মোট লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০৫ শতাংশে। আগের বছরের চেয়ে গ্রামীণফোনের শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসও বেড়েছে। তারপরও গতকাল কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৫ টাকা ৪০ পয়সা বা প্রায় ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫০৫ টাকায়।
জানতে চাইলে শীর্ষস্থানীয় একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, মুদ্রানীতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। এ কারণে কিছু বিষয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে বাজারে। এমনটি ঘটে যখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থাকে তখন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ হেলাল বলেন, মুদ্রানীতিতে শেয়ারবাজারের জন্য নেতিবাচক তেমন কিছুই নেই। যার কারণে বাজারে পতন ঘটতে পারে। মুদ্রাবাজারে আমানতের সুদ হার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। ব্যাংকে আমানতের সুদ হার বাড়লে তাতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কিছুটা কমতে পারে। এ আশঙ্কা থেকে বিনিয়োগকারীদের অনেকে সতর্ক অবস্থানে থাকায় কিছুটা পতন ঘটেছে বাজারে। শেয়ারবাজারের শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউস লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের গতকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সূচক কমলেও আগের দিনের চেয়ে গতকাল বাজারের মূল্য আয় অনুপাত বেড়েছে। সোমবারের চেয়ে তা প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৭৯-এ। এদিন ঢাকার বাজারে লেনদেনে আধিপত্য ছিল ব্যাংক ও প্রকৌশল খাতের। বাজারের মোট লেনদেনের ৩২ শতাংশই ছিল এই দুই খাতের দখলে। এদিকে দাম কমলেও গতকাল ঢাকার বাজারে লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে গ্রামীণফোন। এদিন ডিএসইতে কোম্পানিটির ২৯ কোটি টাকার শেয়ারের হাতবদল হয়। ঢাকার বাজারে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল দিন শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১২৮ পয়েন্টে। ডিএসইতে এদিন লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৯৯ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ১৪ কোটি টাকা কম। চট্টগ্রামের বাজারে গতকাল লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩২ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ১১ কোটি টাকা বেশি।

ডেপুটি গভর্নর পদে ছয় প্রার্থী

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর (ডিজি) পদে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে বাছাই করা ছয়জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। সরকার গঠিত বাছাই (সার্চ) কমিটি গতকাল মঙ্গলবার এসব কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে। সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং অন্যজন একটি সরকারি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)।
তাঁরা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নির্বাহী পরিচালক আবদুর রহিম, মো. মাসুম কামাল ভূঁইয়া, আহমেদ জামাল ও মো. মিজানুর রহমান জোদ্দার, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ডিএমডি কাজী আলমগীর। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের নেতৃত্বে বাছাই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখ্ত ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ। কমিটির সদস্যসচিব হলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফজলুল হক। সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরে বাছাই কমিটি এখন যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত করে সরকারের কাছে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ দেবে।
জানতে চাইলে জায়েদ বখ্ত গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আগ্রহীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। চলতি সপ্তাহেই প্রার্থী চূড়ান্ত করে নিয়োগের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডেপুটি গভর্নরের চারটি পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন তিনজন। এর মধ্যে এস কে সুর চৌধুরীর মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ বুধবার। আরেক ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসানের মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর। তাই বাছাই কমিটির সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে দুজনকেও বেছে নিতে পারে সরকার। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন। একই ঘটনায় সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই ডিজি আবুল কাসেম ও নাজনীন সুলতানাকে সরিয়ে দেয়। ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তখনকার নির্বাহী পরিচালক এস এম মনিরুজ্জামান।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

গত সোমবার মন্ত্রিসভায় ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৭’ নামে যে নতুন আইনের খসড়া অনুমোদিত হয়েছে, তা কোনোভাবেই স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার ব্যাপক অপব্যবহারের যে প্রবণতা আমরা ইতিমধ্যে লক্ষ করেছি, নতুন আইনের কয়েকটা ধারা নিয়েও একই আশঙ্কা রয়েছে। নতুন আইন বরং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলে সাংবাদিক মহলের অনেকে মনে করছেন। অন্যদিকে আইনটি তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আর সামগ্রিকভাবে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও হুমকির মুখে ফেলবে। ৫৭ ধারায় বিচারযোগ্য অপরাধগুলো নতুন আইনের চারটি ধারায় সন্নিবেশিত হয়েছে। এতে দণ্ডের মাত্রা কিছুটা কমানো হলেও নিরপরাধ মানুষের হয়রানির ঝুঁকি কমেনি। ন্যূনতম দণ্ডের বিধান তুলে দেওয়া এবং কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে আসামির জামিন লাভের সুযোগ রাখাকে ৫৭ ধারার পর্যায় থেকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, ‘ধর্মীয় অনুভূতি’, ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’ ইত্যাদি বিষয় সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার কাজটি খুবই জটিল ও কঠিন। ফলে এসব প্রত্যয়ের মনগড়া ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে এ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকে যাবে। মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতা–সম্পর্কিত ২১ নম্বর ধারাটির সর্বোচ্চ দণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। দণ্ডের এই উচ্চমাত্রা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে লক্ষণীয় ধারাটি সম্ভবত ৩২, যেখানে কম্পিউটার বা ডিজিটাল মাধ্যমে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ বলে বিবেচিত হবে,
এমন অপরাধের বিচারের বিধান রয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বেআইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ এবং এই অপরাধের সর্বোচ্চ দণ্ড ১৪ বছর কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। আমাদের বিবেচনায়, এই ধারা অত্যন্ত কঠোর এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকারের পরিপন্থী। এখানে ‘অতিগোপনীয়’ ও ‘গোপনীয়’ তথ্য-উপাত্ত আরও সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। এই ধারার সুযোগে তথাকথিত দাপ্তরিক গোপনীয়তার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা শেষ বিচারে গণতন্ত্র ও সুশাসনের পরিপন্থী এবং অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে ডিজিটাল বা সাইবার মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে, এমন সমুদয় অপরাধের বিষয়ে যথাযথ আইন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে আইনের কোনো অংশ যেন কালাকানুনে রূপ নিতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখাও একান্ত প্রয়োজন।

রুবিনা, শফিক ও এক জোড়া নীল জুতা

প্রায় এক দশক আগের জুন মাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ছুটি। হলের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই বাড়িতে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসার আগে একপশলা বৃষ্টি ঝরেছে। বছরের প্রথম দিকের হিম হিম বৃষ্টি। এই বৃষ্টিতে ভিজেছে এক জোড়া নীল জুতা। হলের ব্যালকনিতে শুকাতে দেওয়া জুতা জোড়ার ভেতরে একটু পানি। সেই জুতা জোড়ার দিকেই এক পলকে তাকিয়ে এক তরুণ শিক্ষার্থী, একজন বন্ধু। যার গাল বেয়ে অঝোরে ঝরছে উষ্ণ অশ্রু। এই জুতা জোড়া উদ্যমী, দুরন্ত যে তরুণের, সে আর কোনো দিন এই জুতা পরে ছুটবে না। সে ছুটবে না তেজগাঁও, পুরান ঢাকার অলিগলি বা কড়াইল বস্তিতে। হনহন করে হাঁটবে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে। এই জুতা যার, সে আর কোনো দিন জুতা পরবে না। তার দুই পা মুহূর্তে কেড়ে নিয়েছে রেলগাড়ি নামের এক নিদারুণ নিষ্ঠুর যন্ত্রদানব। এই যন্ত্রদানবের নিষ্ঠুরতাতেই অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে বন্ধুর চোখে। রেললাইনে বন্ধুর পা হারানো আর ওই জুতা জোড়ার নীল কষ্টের কাহিনি শুনেছিলাম পা হারানো দুরন্ত ওই তরুণের বন্ধুর কাছেই। সেই থেকে রেললাইন বা রেলগাড়ি মনের ভেতর অন্য রকম গা শিরশির করা ভয় জাগায়, যা বহাল আছে এখনো। গা ছমছম করা সেই ভয় আবার পেলাম পত্রিকা মারফত ২২ জানুয়ারি। নীল জুতা জোড়ার মালিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মতোই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক তরুণ পা হারিয়েছে সিরাজগঞ্জে। তার নাম শফিকুল ইসলাম। শফিকুল বাড়ি থেকে ফিরছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সামান্য অসতর্কতার চড়া মূল্য দিতে হলো তাকে। ট্রেনে উঠতে গিয়ে দুই পা হারিয়েছে ধাতব চাকার নিচে। প্রাণ বাঁচলেও এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছে এই তরুণ। শফিকুলের এই দুঃখ-যন্ত্রণা হালকা না হতেই আবার পত্রিকায় এল রুবিনা আক্তারের করুণ কাহিনি। রুবিনা ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরেছিল। পরিকল্পনা ছিল দ্রুত ক্লাসে ফেরার। কিন্তু কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে এসে কী যে হলো! একটু অসতর্কতা অথবা ক্ষণিকের খেয়াল। তাতেই সব শেষ। ইঞ্জিনের নিচে পিষ্ট হয়ে দুই পা হারাল। সঙ্গে চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেল একটি সংগ্রামময় পরিবারের বাধা পেরোনোর প্রচেষ্টার কান্ডারি। আহ্, রুবিনা, একটু সতর্ক থাকতে পারলে না! আহা রে! তোমার জন্য পরিবারের যে গভীর দীর্ঘশ্বাস, তা কীভাবে দূর হবে? কিসে মিটবে অঙ্গ হারানোর এই ক্ষতি? বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে রেলওয়ে লাইন আছে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার। প্রতিদিন চলাচল করে প্রায় ৩৫০টি ট্রেন। রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। আর প্রতি মাসে গড়ে রেল দুর্ঘটনা ঘটে প্রায় ৫০ টি, যা রেললাইন ও চলাচলকারী রেলের সংখ্যা অনুপাতে ভারতের চেয়েও বেশি। এসব তথ্য থেকে সহজেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের রেলযোগাযোগ কতটা অনিরাপদ। এ ক্ষেত্রে যেমন অবকাঠামো আর অরক্ষিত রেলক্রসিং দায়ী, ঠিক তেমনি আরও বেশি দরকার জনসাধারণের সচেতনতা। রেলওয়ে তার নিজস্ব লাইনেই চলে। তারপরও অসতর্কতা, তাড়াহুড়াসহ নানাবিধ কারণে এই দুর্ঘটনার পরিমাণ বাড়ছেই, যা কমাতে উদ্যোগ খুবই জরুরি। তা না হলে নীল জুতার স্বত্বাধিকারীদের সংখ্যা বাড়বেই। নীল জুতার ওই তরুণ রেললাইনে পা হারানোর পর তার পাশে দাঁড়িয়েছিল তার অফিস। বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের বন্ধুদের সঙ্গে একজন শিক্ষিকা মা হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা ওই শিক্ষিকাকে দেখেছি পরম মমতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে ওই তরুণকে তিনি বুঝিয়েছিলেন ‘তোমার পা নেই তো কী হয়েছে, আমার দুই পা আছে, এই পায়ের শক্তিতেই তুমি চলবে।’ নানা মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করার পর একসময় নীল জুতার ওই তরুণ সত্যিই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। পা হারিয়েও সে এখন সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। অনেক অসাধ্য সাধন করে যাচ্ছে। শফিকুল ও রুবিনার এখন বন্ধু, সহপাঠী আর পিতা-মাতার রূপ ধারণকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার খুবই প্রয়োজন। তাঁরাই এই দুজনের শক্তি হতে পারেন। তাঁরাই সাহস জোগাতে পারেন, যাতে ভর দিয়ে আবার জগৎ-সংসার জয়ের চেষ্টা করতে পারে শফিকুল ও রুবিনা। একটু কি চেষ্টা করবেন রুবিনা ও শফিকুলের বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী আর শিক্ষক-শিক্ষিকারা!
তাহমিনা হক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
dina.haque@gmail.com

‘গরিব’ বিদ্যালয়ের কৃতিত্ব


নামীদামি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ও অবকাঠামো নিয়েও লেখাপড়ার সাধারণ মান ধরে রাখতে পারছে না, তখন খুলনার ‘গরিব’ স্কুল নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি যে কৃতিত্ব দেখিয়েছে, তা সবার জন্য অনুসরণীয় বলে মনে করি। বিদ্যালয়টির ২০১৩ সালে জেলার মধ্যে সেরা স্কুলের মর্যাদা লাভ, প্রতিবছর ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিলাভ এবং প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় শতভাগ পাসের রেকর্ড সৃষ্টি বিরল ঘটনা বলেই মনে করি। আমরা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানাই। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী খুলনা শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত মুহাম্মদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক হাজারের বেশি ছলেমেয়ে পড়াশোনা করে। আর সেখানে শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন মাত্র পঁাচজন। শিক্ষার্থী বেশি থাকায় সাতজন শিক্ষককে এর আগে প্রেষণে আনা হলেও গত নভেম্বরে শিক্ষক সমন্বয় কমিটির সভায় তঁাদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ফলে দুই মাস ধরে পঁাচজন শিক্ষক দিয়ে হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে পড়ানোর মতো কঠিন কাজটি করতে হচ্ছে। যেখানে অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতকের ঘরে পৌঁছাতে হিমশিম খায়, সেখানে এই বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিতেই দেড় থেকে দুই শ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে। এমনকি বিদ্যালয়টিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষককক্ষ,
খেলার মাঠ ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও নেই। অবিলম্বে শিক্ষা প্রশাসনের উচিত হবে বিদ্যালয়টির অবকাঠামো সমস্যার সমাধান করা। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। যেখানে সারা দেশে সরকারি-বেসরকারিনির্বিশেষে প্রাইভেট টিউশনির মহামারি লক্ষ করা যাচ্ছে, সেখানে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শত সমস্যা কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান করে যাচ্ছেন। আরও উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনা হলো, শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা ভেবে এলাকার কজন শিক্ষানুরাগী এগিয়ে এসেছেন। তঁাদের এই মহৎ দৃষ্টান্ত প্রশংসনীয়। সরকারি ও বেসরকারিনির্বিশেষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা শিক্ষার উন্নয়নে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, মুহাম্মদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই তার প্রমাণ। গরিব বিদ্যালয়টি যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছে, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা সেগুলো অনুসরণ করলে শিক্ষার দুর্গতি অনেকটা কমবে আশা করি।

পুলিশ সংস্কারের খসড়া আইন কার্যকর হোক

প্রথম আলো: পুলিশে সংস্কারে ২০১১ সালে যে খসড়া অধ্যাদেশ করা হয়েছিল, তার অগ্রগতি? দলীয় প্রভাবের বাইরে আনতে এটা সুফল দেবে?
শহীদুল হক: সেটি কার্যকর হওয়া উচিত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাইয়ে কমিটি করেছিল, তার রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। হ্যাঁ, সেটা বাস্তবায়িত হলে একটা পর্যায়ে আসবে। দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করতে ব্যক্তি অফিসারের মানসিকতার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আমার চাকরিজীবনে দলীয় প্রভাবে বেআইনি কিছু করাতে পারেনি। বিএনপি আমলে সিরাজগঞ্জে এসপি ছিলাম। রাঁধুনীবাড়ি ক্যাম্পে পুলিশের চার সদস্যকে হত্যা করে ক্যাম্প লুট হলো। ওই মামলায় একটি রাজনৈতিক দলের জ্যেষ্ঠ নেতাকে জড়াতে চাপ দিলে আমি তা অগ্রাহ্য করেছিলাম। এটা বিবেকের বিষয়, কারও তা করা উচিত নয়।
প্রথম আলো: আপনি বলেছিলেন কারা পেট্রলবোমা মেরেছে, তা সূর্যের মতো স্বচ্ছ, কিন্তু আমরা তো অমাবস্যায় আছি।
শহীদুল হক: একটি দলের আন্দোলনের অংশ হিসেবে এটা ঘটেছিল, তাদের নেতা-কর্মীরাই করেছে। বস্তুনিষ্ঠ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তদন্তেও তা প্রমাণিত।
প্রথম আলো: আপনার এই মৌখিক উক্তির বাইরে বিষয়টির বিচারিক প্রক্রিয়া কী বলে?
শহীদুল হক: বোমাসহ কেউ হাতেনাতে গ্রেপ্তার হলেই তো চিহ্নিত হয়ে যায়, অধিকাংশই মামলাতেই অভিযোগপত্র হয়ে গেছে। কোনো বিচার শেষ বা রায় হয়েছে কি না, সে তথ্য এখন নেই, জানতে হবে।
প্রথম আলো: জামায়াতের সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশের ৩০ জন সদস্যকে হত্যার দায়ে কারও দণ্ড হয়েছে কি?
শহীদুল হক: সবটাতেই অভিযোগপত্র দিয়েছি, কোনোটিতেই বিচারকার্য শেষ হয়নি।
প্রথম আলো: ৩২ বছরের চাকরিজীবনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে পুলিশের যে অপব্যবহার, আপনি এখন কীভাবে দেখেন?
শহীদুল হক: অভিযোগ পুরোনো। অন্যায়ভাবে কাউকে হয়রানিতে ব্যবহার করা উচিত নয়। আমরা সরকারি দল, বিরোধী দল, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী-সবার কাছ থেকেই তদবির পাই, আইনি প্রক্রিয়ায় তার সুরাহা করি, বাইরে সম্ভব নয়, কর্তৃপক্ষকেও আদালতে জবাবদিহি করতে হয়।
প্রথম আলো: এখন আর দলীয় বিবেচনায় পুলিশ নিয়োগ হয় না, নাকি আরও অবনতি ঘটেছে? জনসংখ্যা ও লোকবলের আনুপাতিক হার সন্তোষজনক?
শহীদুল হক: আমরা কনস্টেবল নিয়োগ দিই। ২০০৯ সালে ১ হাজার ১০০ জনে ১ জন ছিল, সেটা কমিয়ে ৮৫০ জনে ১ জন করা হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, ৪০০ জনে ১ জন থাকবে। একটা বড় অংশ প্রটোকলে থাকে, তাতে থানার কাজ ব্যাহত হয়, তাই আমরা গার্ড অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন গঠনের প্রস্তাব করেছি। আর প্রভাবশালীরা তাঁদের গ্রুপের লোক ঢোকাতে চাইবেন। আমি আইজিপি হওয়ার পর নিশ্চিত করি যে লিখিত পরীক্ষায় পাস না করলে কোনো তদবির আমার কাছে আসবে না। ভাইভায় অনেকে তদবির করতে পারে। বন্ধুবান্ধব, আপনাদের সাংবাদিকেরা অনেক সময় তদবির করেন। রিটেনে ভালো করলে হয়তো ভাইভায় একটু কমবেশি দেওয়া হয়, এর চেয়ে বেশি কিছু করিনি।
প্রথম আলো: নিয়োগ কীভাবে আরও স্বচ্ছ করা যায়?
শহীদুল হক: শতভাগ স্বচ্ছতায় পুলিশ সার্জেন্ট ও এসআই নিয়োগ হেডকোয়ার্টার করে, কারও কোনো অভিযোগ নেই। গত তিন বছরে আমি প্রায় তিন হাজার নিয়েছি।
প্রথম আলো: চাকরি পেতে কারও ঘুষ দিতে হয়নি?
শহীদুল হক: না, হয়নি।
প্রথম আলো: আপনার অজ্ঞাতসারে টাকাপয়সার লেনদেন হতে পারে।
শহীদুল হক: আমার অজ্ঞাতসারে বলতে পারব না। কিন্তু এ রকম কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। শুধু কনস্টেবল নিয়ে অভিযোগ আসছে, যা জেলা এসপিরা করে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, রিটেনে শতভাগ স্বচ্ছ হতে হবে, রিটেনে পাস করতে হবে। স্থানীয় নিয়োগ বোর্ডের ডিসক্রিশন থাকে, কিন্তু ভাইভায় তেমন মার্কও থাকে না। আর সরকার রাজি হলে হেডকোয়ার্টারের সরাসরি তদারকিতে নিয়োগ হতে পারে, কিন্তু দুই শ বছর ধরে স্থানীয় এসপি যেটা করছেন, সেটা খর্ব হলে তাঁরা আহত বোধ করতে পারেন।
প্রথম আলো: সাধারণ মানুষ প্রথমেই থানায় যান, কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণু আচরণের অভিযোগ আছে।
শহীদুল হক: এটা আছে, এর অপনোদনে তাদের প্রশিক্ষণ ও মাইন্ডসেট পরিবর্তনে আমরা বহুমুখী চেষ্টা করেছি। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থায় কিন্তু জনগণের কাছে একটা জবাবদিহি থাকছে।
প্রথম আলো: দুই ইতালীয়কে হত্যার পর ঘটনা ঘটতেই থাকল, এখন বন্ধ, এর মানে জঙ্গিবাদ কার্যকরভাবে দমন হয়েছে? আমরা আইএসের হুমকিমুক্ত?
শহীদুল হক: এটা বৈশ্বিক সমস্যা। আল-কায়েদার পর আইএস এসেছে, যে সমস্যা আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইরাকে বেশি হয়েছে। ওরা ওদের মতাদর্শ ইন্টারনেটে ছড়িয়েছে, সেটা দেখে তরুণেরা স্বপ্রণোদিত হয়েছে। ৯০ ভাগ মুসলিম দেশের কিছু তরুণ ইন্টারনেটে ওসব পড়ে প্রণোদিত হয়েছে। ৬৩ জেলায় বোমাবাজি করা জেএমবির বিচারের ফলে তারা অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়েছিল, পরে তারা ইন্টারনেটে পুনরায় উদ্দীপ্ত হয় এবং অনুসারী বাড়িয়ে সংগঠিত হয়ে অপারেশন শুরু করেছিল। তারা অনেকগুলো সুইসাইড স্কোয়াড করেছিল। হোলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার পর পুলিশ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আলেম-ওলামাসহ সর্বস্তরের মানুষও রাস্তায় নেমেছিলেন। গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে আমরা ওদের নেটওয়ার্ক ও আস্তানা চিহ্নিত এবং তাতে প্রায় ৪০টি অভিযান চালাই। তারা এখন অবশ্যই দুর্বল হয়ে গেছে। আইএস সরাসরি কোনো লিংক স্থাপন করতে পারেনি, তাদের কোনো নেতা এখানে কারও সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ করেছে, তার প্রমাণ এখনো পাইনি।
প্রথম আলো: এই মুহূর্তে ইন্টারপোল বা বিদেশি রাষ্ট্রের কোনো অনুরোধে কিছু তদন্ত করছেন?
শহীদুল হক: না। জঙ্গি বিষয়ে কোনো দেশ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু পাইনি।
প্রথম আলো: পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারসসহ আমরা বিদেশে টাকা পাচারের কিছু অভিযোগ শুনি। কোনো তদন্ত চলমান?
শহীদুল হক: না। কেউ এ বিষয়ে আমাদের সাহায্য চায়নি।
প্রথম আলো: দেশে গুম কারা করছে?
শহীদুল হক: গুম বলে তো আইনে কিছু নেই, এটা অপহরণ।
প্রথম আলো: রাষ্ট্র যেখানে পদ্ধতিগতভাবে মানুষ নিধন করে, সেটা আন্তর্জাতিক আইনে গুম বা এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স। আপনার তিন বছরে শতাধিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুম হয়েছে। কোনো একটি ক্ষেত্রেও কি আপনি পুলিশের জড়িত থাকা তদন্ত করেছেন? এনকাউন্টারের পর প্রেস রিলিজ পেতাম, তা বন্ধ করলেন কেন?
শহীদুল হক: কিছু ফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স ঘটেছে। কাউকে জোর করে নিলে পুলিশের দায়িত্ব আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলি না, এনকাউন্টার হয়। না, আমরা পুলিশ জড়িত থাকাসংক্রান্ত কোনো তদন্ত করিনি। প্রতিটি এনকাউন্টার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত করেন, এতে কাউকে দায়ী করা হয়নি। আর প্রেস রিলিজ পুলিশের দেওয়ার কথা, অনেক সময় দেওয়া হয় না। যারা মারা যায়, তারা বেশির ভাগ সন্ত্রাসী, খারাপ লোক।
প্রথম আলো: আপনার মন্তব্য সংবিধানবিরোধী। কারণ, খুনিরও মানবাধিকার আছে। আর এমন যুক্তি দিয়েই অপারেশন ক্লিন হার্ট শুরু করেছিল বিএনপি। বিচার বিভাগে প্রতিকার নেই, তাই এভাবে রাষ্ট্র নিষ্ফল প্রতিকার খুঁজছে।
শহীদুল হক: না, পুলিশপ্রধান হিসেবে আমি এটা বলতে পারি না। এটা মানুষের ধারণা, সেটাই বলেছি মাত্র। এরা দুর্ধর্ষ ক্রিমিনাল, বারবার তারা গ্রেপ্তার হয়েছে। বিচার হচ্ছে না। জেলে রাখা যাচ্ছে না। কাজেই এগুলো সমাজ ও মানুষের জন্য হুমকি। একসময় চুয়াত্তরের স্পেশাল অ্যাক্টে এ ধরনের লোকদের আমরা ডিটেনশন দিতাম। কিন্তু বিভিন্ন সময় হাইকোর্টের নির্দেশনার কারণে অনেকে ডিটেনশন দিতে ভয় পান। এল ক্লিন হার্ট, এরপর পাবলিক ক্রসফায়ার আবিষ্কার করল। দুর্ধর্ষ অপরাধীরা পুলিশকে পরোয়া করে না, তখন পুলিশ বাধ্য হয়ে এগুলো করে।
প্রথম আলো: ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
শহীদুল হক: তিন বছরে অনেক জঙ্গি ধরা পড়েছে, অনেকে জামিনে বেরিয়ে গেছে, এটা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক।
প্রথম আলো: ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদির দায়ে আপনি গত তিন বছরে কতজন বড় অফিসারকে চাকরিচ্যুত করেছেন, সংখ্যায় তাঁরা কত?
শহীদুল হক: (হেসে) আমরা জিরো টলারেন্স রাখি।
প্রথম আলো: জিরো টলারেন্সের নমুনা দেখান। পুলিশের ভালো কাজ আছে, আবার ব্যাপক অভিযোগ আছে, তারা মাদক ব্যবসাসহ বিরাট অপরাধের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুষ ছাড়া পুলিশি সেবা মেলে না।
শহীদুল হক: ঢালাও অভিযোগের বাইরে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ আছে, তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে শাস্তি হয়। ফৌজদারি অপরাধে জড়ালে কোনো খাতির করি না। নিয়মিত মামলা হয়। এসব পত্রিকায় যতটা ব্যাপক, বাস্তবে ততটা নয়।
প্রথম আলো: তিন বছরে একটি দৃষ্টান্ত দিন, যা আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে খুব বিচলিত করেছে।
শহীদুল হক: কক্সবাজার থেকে ফিরছিলাম। একজন সাব-ইন্সপেক্টরের কাছে সাত লাখ ইয়াবা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, পুলিশের জন্য এটা লজ্জার।
প্রথম আলো: আপনার চাকরিজীবনের ৩২ বছরে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত?
শহীদুল হক: ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রামে অতিরিক্ত এসপি হিসেবে ২২টি পরোয়ানা জারি থাকা সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীপ্রধান শিবির ক্যাডার নাছিরের আস্তানায় সফল অভিযান চালাই, পরে তাকে গ্রেপ্তার করি। ওই বছরই হাটহাজারীতে সাড়ে তিন ঘণ্টা আটকে রেখে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গাড়ি থেকে অস্ত্রসহ এক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করি, ছোট এক অফিসার হয়ে তাঁকে এভাবে আটকে রাখা অকল্পনীয় ছিল।
প্রথম আলো: এবার একটু তুলনামূলক মন্তব্য করুন। আপনি ১৯৮৬ সালের পরের সব ঘটনারই সাক্ষী।’ ৯৩-এ বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, আর তার ক্ষমতাবান মিত্র সাকা চৌধুরী। এই ২০১৮ সালের বাংলাদেশে কোনো অতিরিক্ত অফিসারের পক্ষে এমন অভিযান চালানোর বাস্তবতা আছে? ছাত্রলীগের জেলা নেতা ধরতেও পুলিশ দ্বিধান্বিত।
শহীদুল হক: বাস্তবতা অবশ্যই আছে। দ্বিধান্বিত যেটা বলছেন, সেটা কোনো ব্যক্তি কর্মকর্তার সীমাবদ্ধতা হতে পারে। সার্বিকভাবে আইনপ্রয়োগে দলনির্বিশেষে আমরা জিরো টলারেন্সে আছি। সাকা চৌধুরীর মতো সন্ত্রাসী গডফাদার আওয়ামী লীগে নেই। তা ছাড়া চট্টগ্রাম বিএনপির কেউ তাঁকে পছন্দ করতেন না। আর অতীতে, ইমদুর সঙ্গে সরকারপ্রধানের ছবি, কালীগঞ্জের ঘটনা দেখেছি। এরশাদের আমলের ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটার ছিল না, তখন ছিল প্রশাসন ঠিক তো ক্ষমতা ঠিক।
প্রথম আলো: পুলিশের বদলি ও পদোন্নতিতে বিএনপিপন্থী, আওয়ামী লীগপন্থী, এসব কেমন চলছে? আপনি বিএনপি আমলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন?
শহীদুল হক: আমার বহু কাজের স্বীকৃতি দিতে বিভাগীয় প্রস্তাব ছিল, আমাকে আওয়ামী ঘরানার বিবেচনায় বিএনপি সেসব নাকচ করেছে। দলীয় ভালো লোক, পরিচয়নির্বিশেষে তাদের নিয়ে আমরা কমিউনিটি পুলিশিং চালু করেছি।
প্রথম আলো: সরকার চায়নি, কিন্তু পুলিশপ্রধান হিসেবে আপনার স্বাধীন সিদ্ধান্তে বিএনপিকে সভা করতে দেওয়ার একটি নজিরও আছে কি?
শহীদুল হক: সরকার চায়নি, এ রকম কম হয়েছে। জননিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগ দেখতে হয়।
প্রথম আলো: জনমনে ধারণা হলো আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা চাইলেই সভা করতে পারে, গত ৫ জানুয়ারিতে এক অখ্যাত সংগঠনের করা দরখাস্তের যুক্তি দেবেন, কিন্তু মানুষ এসব বোঝে না? আপনাদের প্রতি এতে জন-আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না?
শহীদুল হক: যাঁরা আগে আসবেন, তাঁরা অগ্রাধিকার পাবেন। এখানে জনগণ ভুল বুঝলে আমাদের কিছু করার নেই।
প্রথম আলো: ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলেছে, এর আগের নয় মাসেই পুলিশি হেফাজতে অন্তত ১৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। খালেদা জিয়া এক টুইটে প্রায় সাড়ে সাত শ কর্মী গুমের অভিযোগ করেছেন, এর সত্যতা চ্যালেঞ্জ করবেন না?
শহীদুল হক: পুলিশের নিরাপত্তা হেফাজতে গত তিন বছরে কোনো নির্যাতন বা হত্যা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আগে যেটা থার্ড ডিগ্রি হতো বলে কথা ছিল, সেটা আমরা করি না। এখন ডিজিটালসহ নানা কৌশল আছে। কাউকে চ্যালেঞ্জ করতে চাই না। চেষ্টা করব তথ্যটা তাদের (বিএনপি) কাছ থেকে আনতে। প্রতিটি অভিযোগই আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।
প্রথম আলো: আপনাদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, খুন বছরে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার ছিল, যা ২০১৩ সালের পর গড়ে সাড়ে চার হাজারের দিকে যাচ্ছে। কেন?
শহীদুল হক: এই পরিসংখ্যানের ভিত্তি কী, আমি জানি না। তবে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৪ সাল থেকে ক্রমাগত অপরাধ কমেছে।
প্রথম আলো: তোফায়েল আহমেদ ও মির্জা ফখরুল ইসলামের নামে যথাক্রমে ৫৯টি ও ৮৬টি মামলা হয়েছিল। এটা কি ইঙ্গিতবহ যে মিথ্যা মামলা করার একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি আছে?
শহীদুল হক: কিছু কালচার তো বাংলাদেশের আছে। তোফায়েল আহমেদের মতো ব্যক্তির নামে যদি এতগুলো মামলা নিয়ে থাকে, তিনি তো এত কিছু করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। এটাই বাস্তবতা। এটা কমাতে হলে সবার চেষ্টা লাগবে। পুলিশ রাজনীতিসংশ্লিষ্টতার বাইরে, অপরাধ দমনে যা করে, তাতে হস্তক্ষেপ নেই, আর তার যতটা রাজনীতিসংশ্লিষ্ট, তা দূর করতে হলে রাজনৈতিক ঐকমত্য লাগবে।
প্রথম আলো: আপনার অর্জন কী? বাহিনীর মূল চ্যালেঞ্জ কী?
শহীদুল হক: আমার বড় অর্জন জঙ্গি দমনে, বিদেশিরা চলে যাচ্ছিল, জঙ্গি আতঙ্ক দূর করে বাংলাদেশকে একটি মোটামুটি নিরাপদ দেশে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছি। ক্রমাগতভাবে বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়া তার সাক্ষ্য দেবে। ২২টি দেশের পুলিশপ্রধানরা এলেন। আমরা প্রতিটি মামলা চিহ্নিত করে ব্লগার ও মুক্তমনাদের হত্যা বন্ধ করেছি। আরেকটি হলো জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কমিউনিটিভিত্তিক অর্থাৎ গণমুখী পুলিশিং চালু করা। দেশি-বিদেশি সবাই বলে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। জঙ্গিবাদ দমনে ইন্টারপোল বিশেষজ্ঞরা আমার বক্তব্য জেনেছেন। ৯৯৯ যে বাংলাদেশে চালু করা যায়, তা অনেকে ভাবতেই পারেননি, এটা যুগান্তকারী। মূল চ্যালেঞ্জ বলতে পুলিশের মনোবল টিকিয়ে রাখা ও পুলিশের সামর্থ্য বৃদ্ধি। পরিবহন ও লোকবল বাড়ানো। তিন শতাংশের কম পুলিশ আবাসন সুবিধা পায়, এ সমস্যা দূর করতে হবে। ডিজিটাল সরঞ্জাম যা দরকার, তা সেভাবে আমাদের নেই। পুলিশকেও তার মাইন্ডসেট, আচার-আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। জনগণের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে, তাদের মূল্যায়ন করতে হবে, তাহলে কোনো চ্যালেঞ্জই আর চ্যালেঞ্জ থাকবে না।
প্রথম আলো: গুলশানের হোলি আর্টিজানের ঘটনার অপ্রকাশিত কোনো দিক? ফারাজের আত্মত্যাগকে পুলিশ কীভাবে দেখেছে?
শহীদুল হক: এর সবকিছুই প্রকাশ পেয়েছে। সব আসামি ধরা পড়েছে। এর অভিযোগপত্র ফেব্রুয়ারির মধ্যেই হবে। ফারাজ সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। বন্ধুকে ছাড়া তিনি যাবেন না, এই ছিল তাঁর প্রতিজ্ঞা। অত বড় বিপদের মধ্যেও তিনি যে মহত্তম ভূমিকা রেখেছেন, সেটা তো সবাই নিতে পারেন না।
প্রথম আলো: বেগম খালেদা জিয়াকে লক্ষ করে আপনি বলেছিলেন, জঙ্গিবাদের জন্য একটি দল দায়ী। বলেছিলেন, রাজনীতিবিদদের দায়িত্বশীল হওয়া উচিত, আপনার সমালোচনা হলো, রাজনীতিকরা অসত্য মন্তব্য করলেও সে বিষয়ে বলা পুলিশপ্রধানের কাজ নয়, এটা আপনার পদমর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
শহীদুল হক: জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গি দমন করেছে পুলিশ। তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ভিন্ন উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তুললে, অহেতুক তার কর্মকাণ্ড বিতর্কিত করলে তার উত্তর দেওয়া আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমি সেটাই করেছিলাম। আমি বেগম জিয়ার কোনো রাজনৈতিক মন্তব্যের উত্তর দিইনি।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
শহীদুল হক: ধন্যবাদ।

পেশাজীবীদের আন্দোলনের বছর! by সোহরাব হাসান

সরকারের আশ্বাসে শেষ পর্যন্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা তাঁদের ‘আমরণ অনশন’ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এর ফলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল সেটি কেটে গেছে। অবশ্য এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের একাংশ আগে থেকেই এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অসুবিধার কথা ভেবে আন্দোলন থেকে পরীক্ষার সময়টি বাদ রেখেছিল। তাঁরা ২৩ থেকে ২৭ জানুয়ারি পাঁচ দিন পূর্ণদিবস ক্লাস বর্জন কর্মসূচি শেষে ১৪ মার্চ ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে। তৃতীয় ধাপে জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা লাগাতর আন্দোলনে আছেন। তাঁদের আন্দোলন অবশ্য এসএসসি পরীক্ষায় কোনো প্রভাব ফেলবে না। এদিকে চাকরি জাতীয় করণের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন কয়েক হাজার কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) । বর্তমানে ১৩ হাজার ৪৪২টি ক্লিনিক চালু আছে। প্রতিটি ক্লিনিকে দৈনিক ৩৫ থেকে ৪০ জন মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেয়। সেই হিসাবে দৈনিক পাঁচ লাখের বেশি গ্রামীণ মানুষ এসব ক্লিনিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর আগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকেরা তিন ধাপে আন্দোলন করেছিলেন। ডিসেম্বরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা আমরা অনশন শুরু করলেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে। প্রথমে সরকার প্রাথমিক শিক্ষকদের দাবিদাওয়ার বিষয়টি আমলে নেয়নি। পরে যখন শিক্ষকেরা আমরণ অনশনের ঘোষণা দিলেন তখন সরকারের টনক নড়ল। দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের ইতি ঘটে। এরপর নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনশন শুরু করেন। তাঁদের দাবি, ২০১০ সালের পর যখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত না করায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছেন। প্রথমে শিক্ষামন্ত্রী পর্যায়ক্রমে দাবি পূরণের আশ্বাস দিলেও শিক্ষকেরা আশ্বস্ত হননি। পরে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দাবি পূরণের কথা বলা হলে শিক্ষকেরা অনশন প্রত্যাহার করে বাড়ি বলে যান। নন-এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্মচারীরা একই দাবিতে আন্দোলনে নামেন। কয়েক দিনের অনশনের মুখে সরকার তাঁদের দাবিও মেনে নেয়। সরকারি প্রাথমিক কিংবা নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আন্দোলন থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলনের ধরন অভিন্ন হলেও চরিত্রগত পার্থক্য আছে। সারা দেশে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। এ অবস্থায় সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন উঠবেই। বর্তমান বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মূল বেতনের পুরোটা সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হলেও তাঁদের বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা হিসেবে যা দেওয়া হয়, তা খুবই সামান্য। সে ক্ষেত্রে বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক। কিন্তু স্বল্প সময়ে সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা অসম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। শিক্ষকদের এই আন্দোলনের পেছনে সরকারের ভুল সিদ্ধান্তও অনেকাংশে দায়ী। সরকার প্রতিটি উপজেলায় একটি মাধ্যমিক ও একটি কলেজ সরকারি করার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু অনেক উপজেলায় রাজনৈতিক প্রভাবে ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে যেনতেন প্রকারে চালু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারি করা হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা সমান বেতন-ভাতার দাবি না করে কেন সরকারীকরণের দাবি করছেন, সেই প্রশ্নও করেছেন কেউ কেউ। দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি করে শিক্ষার সর্বনাশ করা হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। শিক্ষকেরা ন্যায্য বেতন-ভাতা পাবেন, তাঁদের চাকরির নিরাপত্তা থাকবে। কিন্তু সরকারি করণের নামে শিক্ষার কর্তৃত্ব সরকার কিংবা ক্ষমতাসীনদের হাতে ছেড়ে দেওয়া কাজের কথা নয়। বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের সম্পৃক্ত করতে পারলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা লাভবান হবে। তবে যেই প্রশ্নটি সামনে এসেছে পেশাজীবীদের দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য কেন আন্দোলন করতে হবে? কেন ঘরবাড়ি ছেড়ে শীতের রাতে তাঁদের ঢাকার ফুটপাতে অবস্থান নিতে হবে। নন এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা আন্দোলনকালে একটি প্লাকার্ডে লিখেছিলেন, ‘হয় দাবি মেনে নাও না হয় গুলি কর।’ আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি যে শিক্ষক বা অন্য পেশাজীবীরা যখন দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন-ধর্মঘট শুরু করেন, তখন সরকার বিষয়টি আমলেই নিতে চায় না। আন্দোলনের পেছনে নীতিনির্ধারকেরা সরকারবিরোধী তৎপরতার গন্ধ খোঁজেন। কিন্তু পেশাজীবীদের আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছালে সরকার আলোচনার তোড়জোড় শুরু করে এবং একপর্যায়ে দাবিও মেনে নেয়। কিন্তু এরই মধ্যে যে ক্ষতি হয়ে গেছে সেটি পূরণের কোনো উপায় থাকে না। এই যে শিক্ষকদের লাগাতার কর্মসূচির কারণে শিক্ষা বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ থাকল তার দায় কে নেবে? শিক্ষকেরা জাতির বিবেক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নির্মাতা। তাঁদের প্রতি একটি দায়িত্বশীল সরকার এতটা উদাসীন থাকে কীভাবে? ২০১৮ সালের শুরুর আলামত দেখে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের বছরে পেশাজীবীদের আন্দোলন শুধু শিক্ষকদের মধ্যে সীমিত নেই। অন্যান্য পেশার মানুষও রাস্তায় নেমে আসছেন। তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের দাবির মুখে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রমিক সংগঠনের নেতারা ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকার কম হলে চলবে না। কয়েক দিন আগে খুলনার আটটি সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরা আন্দোলন করেছিলেন বকেয়া বেতন-ভাতা আদায়ের দাবিতে। এটি খুলনার সুপরিচিত দৃশ্য। সরকারি পাট ও সুতাকলগুলো খোলা ও বন্ধ রাখার মহড়া চলে আসছে বহু বছর ধরে। সরকার মূলত লোকসানের দোহাই দিয়ে কারখানাগুলো বন্ধ রাখে। বিএনপি সরকার একই কারণ দেখিয়ে দেশের বৃহত্তম আদমজী পাটকলও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বেসরকারি পাটকলগুলো যদি লাভ করতে পারে, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত শোধ করতে পারে, সরকারি কারখানাগুলো কেন পারবে না? শিল্পকারখানা রাষ্ট্রের হাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল এর সুফল শ্রমিক-কর্মচারীসহ সবাই পাবেন। কিন্তু শুরু থেকে এসব কারখানা কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নির্বাচনের বছরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো চাপ দিয়ে সরকারের কাছ থেকে কোনো দাবি দাওয়া আদায় করতে না পারলেও পেশাজীবীরা যে সুযোগটি পুরোপুরি নিতে চাইবে তার লক্ষণগুলো স্পষ্ট।
সোহরাব হাসান: কবি ও সাংবাদিক।

ইসলামবিদ্বেষীর ধর্মান্তর ও জার্মান রাজনীতি by মারুফ মল্লিক

আর্থুর ভাগনার দল ছাড়লেন। ব্যক্তিগত কারণের কথা বলে জার্মানির চরম ডানপন্থী ও ইসলামবিদ্বেষী দল অলটারনেটিভ ফুওর ডয়েচল্যান্ডের প্রথমসারির এই নেতা দল থেকে চলতি মাসের ১১ তারিখ পদত্যাগ করেছেন। দলত্যাগের জন্য ব্যক্তিগত কারণের কথা বলা হলেও সম্প্রতি খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষাগ্রহণই যে এর কারণ, সেটি এখন অনেকটাই বোধগম্য। জার্মানির বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আর্থুরের দলত্যাগ ও নতুন ধর্ম গ্রহণ বেশ সাড়া ফেলেছে। নানাভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা চলছে, আর্থুর কেন ধর্ম পরিবর্তন করলেন। কিন্তু আর্থুর মুখে তালা মেরে আছেন। তিনি এ নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। কোনো প্রলোভনে পড়ে ধর্ম পরিবর্তন করলেন? নাকি তিনি কোনো উগ্রপন্থীদের খপ্পরে পড়েছেন? অথবা তিনি নেহাত ইসলামের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই নতুন ধর্ম গ্রহণ করলেন। এসব নিয়ে পরবর্তী সময়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে আর্থুরের ধর্মান্তর ও এ বিষয়ে অন্যদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে জার্মান রাজনীতির বর্তমান চলনটা বোঝা যায়। জার্মান রাজনীতির অন্যতম আলোচিত দুটি বিষয় হচ্ছে শরণার্থী অভিবাসন ও ইসলামের প্রসার। গত সেপ্টেম্বরে নির্বাচনরে পর সরকারের গঠনে এতটা বিলম্বের কারণও কিন্তু আর্থুরের সদ্য সাবেক দল এএফডির উত্থান বা শরণার্থী ও ইসলামের প্রসার নিয়ে জার্মানদের মধ্যকার মতভেদ। কীভাবে? চরম অভিবাসী ও ইসলামবিরোধী প্রচারণা চালিয়েই এএফডি প্রথমবারের মতো জার্মান পার্লামেন্ট বুন্ডেসটাগে প্রবেশ করেছে। নির্বাচনে দলটি ১২ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট লাভ করে। শরণার্থী ও ইসলামবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে এএফডির এই উত্থান উদারপন্থী দলগুলোকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। কারণ, চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের দল খ্রিষ্টান গণতান্ত্রিক দল (সিডিইউ) বা মার্টিন শুলজের সামাজিক গণতন্ত্রী দল (এসপিডি) কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সিডিইউ ও এসডিপি মিলে সরকার গঠন করলে এএফডি বুন্ডেসটাগে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হবে। কারণ, অন্য দলগুলো এএফডির থেকে কম ভোট পেয়েছে। তাই নির্বাচনর পরপরই মার্টিন শুলজ ম্যার্কেলের সঙ্গে কোয়ালিশনে যেতে চাননি।
তবে সিডিইউ কয়েক দফা সরকার গঠনে ব্যর্থ হওয়ার পর এসডিপি-সিডিইউ একসঙ্গে সরকার গঠনে সম্মত হয়েছে। তাই এএফডি এখন সংসদে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হবে। বিশ্লেষকেরা মনে করছিলেন, প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসলে এএফডির সমর্থনের পালে আরও জোর হাওয়া লাগবে। চরম ডানপন্থীদের উত্থানে যখন অনেকেই নড়েচড়ে বসছেন, ঠিক তখনই চমকে দেওয়ার মতো একটা খবর এল; আর্থুর দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। একেবারে বিপরীত শিবিরের ধর্মে দীক্ষাও নিয়েছেন। নিতান্তই ব্যক্তিগত বলে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি তিনি। এরপর তাঁকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখাও যায়নি। আর্থুর এএফডির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে গির্জা ও ধর্মীয় কমিউনিটির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি নিজেও ইসলাম ধর্মবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন সক্রিয়ভাবে। তবে রাশিয়ান বংশোদ্ভূত এই এএফডি নেতার মধ্যে কিছুদিন ধরেই পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছিল। তিনি এএফডিতে খ্রিষ্টান ও সমকামীদের পাশাপাশি মুসলিমদের অধিকার ও আগ্রহ নিয়ে কথা বলে—এমন গোষ্ঠীগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর দলকে জাতিবিদ্বেষ থেকে বের হয়ে আসার পরামর্শও দেন। জার্মানি চেষ্টা করছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে শুরু হওয়া এই জাতিবিদ্বেষী রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসার। ব্যাপক হারে শরণার্থীদের আগমন ও সন্ত্রাসী হামলা আবার জাতিবিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে। বিশেষ করে মুসলিম শরণার্থীদের নিয়ে জার্মান রাজনীতি এখন স্পষ্টতই দুই শিবিরে বিভক্ত। শরণার্থীবিরোধী শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছে এএফডি। গত বছরের জুনে নির্বাচনী প্রচারে আর্থুর মন্তব্য করেছিলেন, চ্যান্সেলর হিসেবে ম্যার্কেল শরণার্থীদের ঢুকতে দিয়ে মহা ভুল করেছেন। নির্বাচনে এর হিসাব ম্যার্কেলকে দিতে হবে। এবং তিনি এও বলেছিলেন, ইসলাম জার্মানির ঐতিহ্যকে বহন করে না। অনেক দিন ধরেই বলাবলি হচ্ছে, এসব প্রচারণার কারণে জার্মানিতে জাতিবিদ্বেষী দলগুলোর সমর্থন বাড়ছে। সর্বশেষ নির্বাচনে জার্মানির পূর্বাংশে সামাজিক গণতন্ত্রীরা এএফডি থেকে কম ভোট পেয়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণেও ক্রমে এএফডির সমর্থন বাড়ছে; বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। জার্মানদের মধ্যে দলীয় সমর্থনে বয়সের একটি প্রাধান্য ছিল। এত দিন দেখা গিয়েছে, অপেক্ষাকৃত বয়স্করা খ্রিষ্টান গণতন্ত্রীদের সমর্থন করতেন। তরুণেরা ছিলেন সামাজিক গণতন্ত্রীদের সমর্থক। এখন তরুণেরা আর ঠিক আগের মতো সামাজিক গণতান্ত্রিকদের সমর্থন করছেন না। নির্বাচনে পরাজয়ের পর মার্টিন শুলজ নিজেও এ কথা বলেছেন। তরুণদের কিছু অংশ সবুজ দলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে; সংখ্যায় কম হলেও। আর বড় অংশ ঝুঁকছে এএফডির দিকে। এই বেকার তরুণদের মধ্যে শরণার্থীবিরোধী মনোভাবও সক্রিয় হচ্ছে। কারণ, এদের বড় একটি অংশই মনে করে, অধিক হারে শরণার্থী নেওয়ার কারণে তাদের বিভিন্ন সুবিধায় টান পড়তে পারে। অর্থনৈতিক ইস্যুকে পুঁজি করে দক্ষিণপন্থী দলগুলো জনসমর্থন নিজেদের দিকে টেনে নিচ্ছে। এর প্রভাবও পড়ছে রাজনীতিতে। পশ্চিমের দেশগুলোয় নির্বাচনে সর্বত্র একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনে চরম দক্ষিণপন্থী দলগুলো অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফল করছে। এরপর সবাই বসে যাচ্ছে, কেন ডানপন্থীরা ভোট পাচ্ছে, সেই বিশ্লেষণ করতে। উত্তর খোঁজা হচ্ছে, কেনইবা মধ্যপন্থীদের জনপ্রিয়তা আর আগের মতো নেই। অবশ্য এর বিপরীত চিত্রও আছে। আর্থুরের মতো লোকজন আবার বহুপক্ষীয় সমাজের দিকে ফিরেও আসছেন। এখানে আর্থুর ধর্মান্তরিত হয়েছেন, এটি যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, আর্থুর নিজেই তাঁর সাবেক দলের মধ্যে সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন। এটিই বহুপক্ষীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির সৌন্দর্য। আমরা যদি ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখা যাবে, এখানকার ধর্মনিরপেক্ষতা সর্বধর্মীয় সংযুক্তিমূলক বহুপক্ষীয় এক সমাজ গঠনের দিক নির্দেশ করে। যেখানে সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। অবশ্যই অন্যের ক্ষতি না করে। সেই সমাজে সবার কথা শোনা হবে। কাউকে বাতিল বা খারিজ করে দেওয়া হবে। ইউরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক কাঠামোর অনেক সমালোচনাই রয়েছে। এটিই স্বাভাবিক। যুক্তি, তর্ক, সমালোচনার মধ্য দিয়েই সমাজ এগিয়ে যাবে। এরপরও ইউরোপিয়ান গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হচ্ছে অন্যের মতকে প্রকাশের সুযোগ দেওয়া। এখানে বিরোধী মতকে রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে মোকাবিলা করা হয়। দমন বা পীড়ন করে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যযুগীয় চেষ্টা নেই। যদি তা-ই হতো, তাহলে ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই এখন সাধারণ নির্বাচন বন্ধ ঘোষণা হতো এই বলে যে নির্বাচন দিলেই চরম ডানপন্থীরা ক্ষমতায় এসে যাবে। বরং তা না করে এখানকার রাজনৈতিক দলগুলো ডানপন্থী সমর্থকদের কথা শোনার চেষ্টা করছে। সমাজের সমস্যার কারণ কী, তা খুঁজে বের করছে। নতুন নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে। ইউরোপের সহনশীল এই রাজনীতির সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে আর্থুরের ধর্মান্তরের ঘটনা। চরম ডানপন্থী হওয়ার পরও আর্থুরের দল এএফডি তাঁর ধর্মান্তরের বিষয়টি গ্রহণ করে জানিয়েছে, জার্মানির সংবিধান অনুসারে যেকোনো ব্যক্তির ধর্ম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে। এটি নিতান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। আর্থুরের চিন্তার পরিবর্তন ঘটেছে। যদিও দলটির ওয়েবসাইটে এখনো লেখা রয়েছে, বহুমাত্রিক সংস্কৃতি-সামাজিক শাস্তি ও ঐক্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এরপরও দলটির সবাই মিলে আর্থুরের ওপর হামলে পড়েনি বা তাঁকে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী বলে এখনো চিহ্নিত করেনি। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও আর্থুরের ধর্মান্তরের বিষয়ে তেমন কোনো মন্তব্য করেছে বলে জানা যায়নি। অনেকেই মনে করছেন, আর্থুরের ইসলাম গ্রহণ প্রকৃতপক্ষে কী নির্দেশ করে? মোটাদাগে বলা যায়, আর্থুরের ধর্মান্তর এবং সবার সেটি মেনে নেওয়া ইউরোপের সহনশীল ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে নতুন মাত্রা যোগ করবে। আর্থুর হয়তোবা একজন ব্যক্তি। তিনি কোন ধর্মে গেলেন, সেটি বিবেচ্য নয়। কিন্তু আর্থুর আপাত জাতিবিদ্বেষ, জোনোফোবিয়াকে প্রত্যাখ্যান করলেন, এর মধ্যে নতুন এক ইউরোপের ইঙ্গিতও আছে।
ড. মারুফ মল্লিক, রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর কনটেমপোরারি কনসার্নস, জর্মানি।

মার্কিন বিমান রুখে দিল রুশ এসইউ-২৭

যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা বিমানের পথরোধ করেছে রাশিয়ার একটি এসইউ-২৭ যুদ্ধবিমান। সোমবার কৃষ্ণ সাগরের ওপরে ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে রাশিয়ার বার্তা সংস্থা আরআইএ। রুশ বিমানটি মার্কিন বিমানটির একেবারে দেড় মিটারের মধ্যে চলে আসে। রাশিয়ার যুদ্ধবিমানের গতিবিধিকে ‘দুই তরফের জন্য বিপজ্জনক’ বর্ণনা করে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে আরআইএ জানিয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনীর বিমান, যা ছিল ইপি-৩ই অ্যারিস টু প্লেন, রাশিয়ার আকাশসীমা লঙ্ঘন করেনি। এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি ইপি-৩ কে বিপজ্জনকভাবে বাধা দিয়েছে রাশিয়ার একটি য্দ্ধুবিমান, সেটি সরাসরি ইপি-৩’র গমন পথের সামনে দিয়ে পার হয় এবং পাঁচ ফুট বা দেড় মিটার দূরত্বের মধ্যে চলে আসে। ‘আন্তর্জাতিক নিয়ম ও সমঝোতাকে উপেক্ষা করে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর চালানো তৎপরতার সর্বশেষ উদাহরণ এটি।’ বিবৃতিতে এসব বিপজ্জনক পদক্ষেপ বন্ধ করার জন্য রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অপর দিকে আরআইএ জানিয়েছে, এ ঘটনার বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিমানটি সীমান্ত এলাকা থেকে সরে গিয়ে এর গতিপথ পরিবর্তন করলে এসইউ-২৭টি ঘাঁটিতে ফিরে আসে।’

৮ মাসের এক শিশু ধর্ষণ: যৌনাঙ্গে আঘাত ভয়াবহ



ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আট মাসের একটি শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, তার এক ভাই (কাজিন) তাকে ধর্ষণ করেছে। কাজ থেকে ফিরে শিশুটির বিছানা রক্তে ভেসে যেতে দেখে বাবা মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পুলিশ বলছে, তার অবস্থা গুরুতর এবং তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তার ২৮ বছর বয়সী কাজিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দিল্লিতে নারী বিষয়ক কমিশনের প্রধান স্বাতী মালিওয়াল মেয়েটিকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, শিশুটির অবস্থা 'ভয়াবহ।' পুলিশ বলছে, এই মেয়ে-শিশুটিকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে গত রবিবার তবে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে এটি প্রকাশিত হওয়ার পর সোমবার এটি আলোচনায় আসে। মিস মালিওয়াল টুইট করে জানিয়েছেন যে তিন ঘণ্টা ধরে মেয়েটির শরীরে অপারেশন করা হয়েছে। "তার বুক ভাঙা কান্না হাসপাতালের পুরো ইনটেনসিভ কেয়ার জুড়েই শোনা যাচ্ছিলো।
সে তার যৌনাঙ্গে ভয়াবহ রকমের আঘাত পেয়েছে," হাসপাতাল ঘুরে এসে সোমবার রাতে টুইট করেছেন মিস মালিওয়াল। এই ঘটনায় তিনি আরো একটি টুইটে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। লিখেছেন, "কি করা যায়? রাজধানীতে যখন আট মাসের একটি বাচ্চা নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণের শিকার হয় তখন দিল্লির লোকজন কীভাবে ঘুমাবে? আমরা কি এতোটাই অসংবেদনশীল হয়ে উঠেছি নাকি এটাকেই আমরা আমাদের নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছি?" প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি তিনি আহবান জানিয়েছেন, দেশের নারীদের রক্ষায় আরো কঠোর আইন তৈরি করে পুলিশের ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করার জন্যে। অনেকেই তার সাথে যোগ দিয়ে এই ধর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দিল্লি থেকে বিবিসির সংবাদদাতা গীতা পাণ্ডে বলছেন, এরকম একটি বাচ্চা শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা পুরো ভারতকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এবং সংবাদ মাধ্যমে এটা একটা বড় ধরনের খবরে পরিণত হয়েছে। তার আঘাত এতোটাই ভয়াবহ যে অনেকেই এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এবং ভাবছেন মানুষ কি এতোটা নিচে নামতে পারে! তবে শিশু ধর্ষণের ব্যাপারে সরকারি যে পরিসংখ্যান আছে সেটা দেখলে কিন্তু বোঝা যায় যে এধরনের অপরাধ ভারতে নতুন কিছু নয়। শুধু তাই নয়, উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো যে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর সবশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, ভারতে ২০১৬ সালে ১৯,৭৬৫টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা হয়েছে যা এর আগের বছরের চেয়ে ৮২% শতাংশ বেশি। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১০,৮৫৪। কয়েক বছর আগে ১১ মাস বয়সী একটি মেয়ে-শিশুকে অপহরণ করার পর তার প্রতিবেশী দুই ঘণ্টা ধরে ধর্ষণ করেছিলো। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ হায়দ্রাবাদে অপহরণ করে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিলো।

ইরান-আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা ব্যর্থ : বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে ট্রাম্প

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরান-আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ‘জাল প্রমাণ’ উপস্থাপন করছেন। ট্রাম্প জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ উত্থাপনের পর জারিফ এ মন্তব্য করলেন।
তিনি সোমবার তার অফিসিয়াল টুইটার পেজে লিখেছেন, ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের ভুয়া খবর উৎপাদন বিভাগ ইরানের প্রতিবেশী একটি যুদ্ধরত দেশের পক্ষ থেকে দেয়া জাল প্রমাণকে ভিত্তি করে ইরান-আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু এ ধরনের অভিযোগ ওই ব্যর্থ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা ছাড়া আর কেউ বিশ্বাস করবে না। ট্রাম্প সোমবার জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যাহ্নভোজে দেয়া বক্তৃতায় অভিযোগ করেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদের ওই মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এর আগে নিকি হ্যালি গত ১৪ ডিসেম্বর একটি বিধ্বস্ত ক্ষেপণাস্ত্রের লম্বা পাইপ সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করে দাবি করেন, ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি হুথি যোদ্ধারা সৌদি আরবের রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করেছিল। ক্ষেপণাস্ত্রটি নির্মাণের বিভিন্ন কলাকৌশল বর্ণনা করে হ্যালি দাবি করেন, এটি ইরানে তৈরি হয়েছে এবং তেহরান তা হুথি যোদ্ধাদের হাতে পৌঁছে দিয়েছে।

রেল ইঞ্জিন সংকট

রেল ইঞ্জিনের অভাব চরমে ওঠায় দেশের অন্যতম এ পরিবহন মাধ্যমের যাত্রীদের প্রায়ই বিপাকে পড়তে হচ্ছে। জানা গেছে, রেলওয়ের ২৮০টি ইঞ্জিনের (লোকোমোটিভ) মধ্যে অন্তত ১৯৫টি প্রায় ৭০ বছর আগেই আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। ফলে চলন্ত অবস্থায় প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ছে ইঞ্জিনগুলো। এছাড়া ইঞ্জিন পুরন ো হওয়ায় নির্ধারিত গতির চেয়ে অধিকাংশ ট্রেন চলছে কম গতিতে। এর ফলে ক্রমাগত সিডিউল বিপর্যয় ঘটায় যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এতে যে কোনো মুহূর্তে মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। রেলওয়ের উন্নয়নে সরকার ৪৫টি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর একটি হল ৭০টি মিটারগেজ রেলইঞ্জিন ক্রয়।আশ্চর্যজনক হল, ইঞ্জিন ক্রয় প্রকল্পটি ২০০৯ সালে গৃহীত হলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ সময়কালে পুরনো ইঞ্জিনগুলোর অবস্থা আরও করুণ হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ অবস্থায় যে কোনো সময় অনেক ট্রেন সার্ভিস একেবারেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। দেশে প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ছিল রেলওয়ে খাত। এ সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা হয়েছে।
এর ফলে রেলওয়ের অস্তিত্বই এখন হুমকির সম্মুখীন। জনবল সংকটের কারণে অনেক রেলস্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার না করায় সারা দেশের রেলপথ হয়ে পড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের নানা জায়গায় যখন ঘণ্টায় ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলছে, তখন আমরা ১০০ তো দূরের কথা, গতিবেগ ৬০ কিলোমিটারের উপরে তুলতে পারছি না। দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক ইঞ্জিনও রেলওয়ের ভাণ্ডারে নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোর অধিকাংশের অবস্থা এত সঙ্গিন যে, চলতে চলতে কখন তার চলৎশক্তি থেমে যাবে তা কেউ জানে না। জোড়াতালি দিয়ে ট্রেন চলাচলের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখা সম্ভব নয়। প্রশ্ন হল, এভাবে আর কতদিন? স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে গেছে। এখন অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। রেলের ইঞ্জিন সমস্যার সমাধান করে প্রায় অচল রেলকে সচল করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, এর সঙ্গে জনস্বার্থের প্রশ্ন জড়িত।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারাসহ ৫টি ধারা বিলুপ্ত করা হলেও এ ধারার অনুরূপ বেশকিছু বিধান রেখে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’র খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। বিষয়টি উদ্বেগের। কারণ এ বিধানগুলোর অপপ্রয়োগের আশঙ্কা প্রবল। উল্লেখ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন প্রথম করা হয় ২০০৬ সালে। পরে ২০১৩ সালে শাস্তি বাড়িয়ে আইনটিকে আরও কঠোর করা হয়। এ আইনের ৫৭ ধারায় গত কয়েক বছরে সাংবাদিক ও সরকারি দলের প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বহু মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এতে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। ৫৭ ধারায় অপরাধের ধরনগুলো উল্লেখ ছিল একসঙ্গে, নতুন আইনে সেগুলো বিভিন্ন ধারায় ভাগ করে দেয়া হয়েছে মাত্র। তবে অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা কিছুটা কমানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও নতুন আইনের ১৪টি ধারার অপরাধ জামিন অযোগ্য। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারায় মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে হয়রানির আশঙ্কা প্রবল, যা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করবে। যেমন, আইনটির ৩২ ধারায় ডিজিটাল অপরাধের বদলে গুপ্তচরবৃত্তির সাজার বিধান রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে সরকারি,
আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কোনো ধরনের গোপনীয় বা অতি গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা সংরক্ষণে সহায়তা করেন, তাহলে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ বলে গণ্য হবে।’ এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর এ অপরাধ একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা বারবার করলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারাটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা হিসেবে ফিরে আসছে কিনা? এটি স্পষ্ট, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বিলুপ্ত হলেও নতুন আইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী অনেক উপাদান রয়েছে। তাই আইনটি সংসদে পাস করার আগে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি যথার্থই বলেছেন, আইনটি সংসদে পাস করার আগে সাংবাদিক প্রতিনিধি, শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মতামত নেয়া উচিত। আমরাও বলব, বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে আইনটিতে যথাযথ পরিবর্তন আনা হোক। আমরা বলতে চাই, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কোনো ধারা যেন কোনোক্রমেই তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অনুলিখন না হয়। প্রস্তাবিত নতুন আইন থেকে সেই সব বিধান অপসারণ করা হোক, যেগুলোর অপপ্রয়োগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী ও হয়রানিমূলক কোনো আইনই কাম্য হতে পারে না। রাষ্ট্রকে বাক্স্বাধীনতার পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।

যমজ হাতির বাচ্চার মৃতদেহ উদ্ধার

শ্রীলঙ্কায় বন্যপ্রাণীর একটি পার্কে হাতির দুটি যমজ বাচ্চার মরদেহ পাওয়া গেছে। বলা হচ্ছ ে, জন্মের নির্ধারিত সময়ের আগেই এই দুটি বাচ্চার জন্ম হয়েছে। বন্যপ্রাণী কর্মকর্তারা বিবিসির সিনহালা বিভাগকে বলেছেন, জন্মের সময়েই তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। তারা বলছেন, হাতির যমজ বাচ্চা জন্ম দেয়ার ঘটনা খুব বিরল। কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের জানা মতে, শ্রীলঙ্কায় তাদের হেফাজতে থাকা কোনো মা হাতি এর আগে কখনো যমজ বাচ্চার জন্ম দেয়নি। কর্মকর্তারা আরো বলছেন, এমনকি বনে জঙ্গলেও কোনো হাতি যখন যমজ শিশুর জন্ম দেয় তখন তাদের বেঁচে থাকার হারও হয় খুব কম। পূর্ব শ্রীলঙ্কার মাদুরু-ওয়া ন্যাশনাল পার্কে এই দুটো হাতির বাচ্চার মৃতদেহ পাওয়া গেছে। বন্যপ্রাণী চিকিৎসক নিহাল পুস্পাকুমারা, যিনি যমজ বাচ্চা দুটোর ময়না তদন্ত করেছেন, তিনি বলেছেন, আরো পরীক্ষার জন্যে এদের মৃতদেহ এখন রাজধানী কলম্বোতে নিয়ে যাওয়া হবে। এই একই ধরনের মৃত্যুর খবর এর আগেও দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড এবং ভারত থেকে পাওয়া গেছে। শ্রীলঙ্কায় পশু চিকিৎসক সমিতির সদস্য ভিজিথা পেরেরা বিবিসির সিনহালা বিভাগকে বলেছেন, এর আগেও শ্রীলঙ্কার জঙ্গলে এরকম দুটি ঘটনা ঘটেছে বলে তারা জানেন। চার বছর আগে দক্ষিণ শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় দুটো যমজ শিশুর জন্ম হয়েছিল এবং মা হাতি ও হাতির পাল একটিকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলো। "গ্রামবাসীরা মা হাতি এবং হাতির পালকে দেখেছে একটি বাচ্চাকে সাথে নিয়ে চলে যেতে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তারা পরিত্যক্ত আরো একটি বাচ্চাকে দেখতে পায়। ওই বাচ্চাটিকে সাহায্য করার জন্যে আমরা সেখানে ছুটে গিয়েছিলাম কিন্তু তাকে বাঁচাতে পারিনি," বলেন তিনি। ভিজিথা পেরেরা বলছেন, জন্মের সময় এরা সুস্থ থাকলেও, পুষ্টির চাহিদার কারণে পরিত্যক্ত হাতির বাচ্চাটির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতির গর্ভধারণ কাল সাধারণত ২২ মাস হয়ে থাকে। পশু চিকিৎসক ভিজিথা পেরেরা বলেছেন, একটি হাতির বাচ্চা সাধারণত জন্ম হওয়ার দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যেই সে নিজে থেকে উঠে দাঁড়াতে পারে। তবে কখনো কখনো আরো কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে। ভিজিথা পেরেরা বলছেন, এরকম পরিস্থিতিতে মা হাতিকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে সে তার বাচ্চাটির সাথে থেকে যাবে, নাকি বাচ্চাটিকে ফেলে হাতির পালের সাথে সেও চলে যাবে। "প্রকৃতি এরকমই। মা হাতিটির একই সাথে যেমন তার বাচ্চাটির দরকার, তেমনি তার হাতির পালেরও দরকার। তখন তাকে একটিকে বেছে নিতে হয়," বলেন তিনি। ধারণা করা হয়, শ্রীলঙ্কায় বর্তমানে ৭,০০০ এরও বেশি হাতি রয়েছে। দেশটিতে এই প্রাণীটিকে 'পবিত্র' হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটিকে রক্ষার জন্যে আইনও রয়েছে। বলা হচ্ছে, ১৯০০ সালে শ্রীলঙ্কায় হাতির সংখ্যা ছিল ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০।

কেউ যদি আমার জীবন ফিরিয়ে দিত...

সাবিনা সাঈদের বয়স ৩৬। সপ্তাহে তিন দিন তাকে ডায়ালাইসিস করতে হয়। কিডনি ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে তার শরীরের রক্ত পরিশোধন করা হয়। কিন্তু এভাবে বেঁচে থাকাটা সাবিনার কাম্য নয়। তার চলাফেরা সীমিত, তিনি কাজ করতে পারেন না, দূরে কোথাও ঘুরতে যেতে পারে না এমনকি খাওয়া-দাওয়াও খুব সীমিত। সবসময় ক্লান্ত অনুভব করেন। "আমি এগুলো নিয়ে ভাবতে চাই না। আমি বেঁচে আছি ঠিকই, কিন্তু জীবন আমার কাছে উপভোগ্য নয়। আমার মনে হয় কেউ যদি আমার জীবন ফিরিয়ে দিত," বলছিলেন সাবিনা। সাবিনার দুটো কিডনিই অকেজো। একটি নতুন কিডনি পাওয়ার আশায় তিনি এখন অপেক্ষা করছেন। কিন্তু এজন্য তাকে হয়তো পাঁচ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ব্রিটেনে এখন কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ অপেক্ষা করছে। সেজন্য এখন ডায়ালাইসিসের উপর বেঁচে আছেন সাবিনা।
সাবিনা যখন ছোট ছিলেন তখন তার কিডনি অকেজো হয়ে যায়। বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর মায়ের একটি কিডনি সাবিনার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। এখন সেটিও অকেজো হয়ে গেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে এখন তার রক্তের গ্রুপ মিলছে না। ফলে তাদের কেউ সাবিনাকে কিডনি দান করতে পারবে না। সাবিনা বলছিলেন, "আমি জীবনটা উপভোগ করতে চাই। একজন জীবন সঙ্গী খুঁজে পেতে চাই।" ব্রিটেনে যারা কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য অপেক্ষা করছেন তাদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ এবং এশিয়ানরা ৩০ শতাংশ। কিন্তু এশিয়ান এবং কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে কিডনি দানকারী মাত্র ছয় শতাংশ। গবেষকরা বলছেন, অনেকে মনে করেন তারা কিডনি দান করলে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন থাকবে। তাছাড়া অনেকে মনে করেন, বয়স বেশি হয়ে গেলে কিডনি দান করা যায় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনো বয়সে কিডনি দান করা যায় এবং একজন সুস্থ মানুষ একটি কিডনি নিয়ে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে। সাবিনা অনেক কিছুই খেতে পারে না। যেমন - আলু, লবণ, চকলেট এবং ফলমূল। প্রতিদিন আধা লিটারের বেশি তরল খাবার তিনি খেতে পারে না। ফলে গ্রীষ্মকালে সবসময় তৃষ্ণার্ত থাকেন সাবিনা। ২০১৬-১৭ সালে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য অপেক্ষমাণের তালিকায় থাকা অবস্থায় ৪৭০ জন রোগী মারা গেছেন। এ পরিস্থিতি কি সাবিনাকে উদ্বিগ্ন করে? "আমি সবসময় ইতিবাচক থাকতে চাই। নতুবা আমি পাগল হয়ে যাব। মাঝে মধ্যে আমি আমার মায়ের সামনে কাঁদি," বলছিলেন সাবিনা।

খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীরা হোয়াইট হাউজে

বিগত ১৮ জুলাই ইসরাইলের পক্ষে কাজ করা খ্রিষ্টানদের সংগঠন ‘ক্রিশ্চিয়ান্স ইউনাইটেড ফর ইসরাইল বা সিইউএফআই’-এর বার্ষিক সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ‘জন হ্যাগি’ একজন ধর্মপ্রচারক, যিনি খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। সিইউএফআইয়ের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের পক্ষে কাজ করা সবচেয়ে বড় সংগঠন এটি। ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে হ্যাগি সমর্থন দেন ২০১৬ সালের মে মাসে।  পেন্স এর আগেও একবার অঙ্গীকার করেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলে মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নেবে। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণায় ইসরাইলের পক্ষে ট্রাম্প যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পূরণ করতে না পারায় ইসরাইলের যেসব খ্রিষ্টান সমর্থক ক্রমাগতভাবে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাচ্ছিল, তার এই অঙ্গীকার তাদের স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, হোয়াইট হাউজ মতাদর্শগতভাবে বড় পরিবর্তনের দিকেই যাচ্ছে।
মতাদর্শগত পরিবর্তন
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের গবেষক ড্যান হামেল ওয়াশিংটন পোস্টে লিখেছেন, ‘পেন্সের এই বক্তব্য ইসরাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুরোদস্তুর পরিবর্তনেরই স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।’ এই মৌলিক পরিবর্তন খ্রিষ্টান ইহুদিবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ইসরাইলের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ‘খ্রিষ্টান ইহুদিবাদ’ অনুযায়ী, বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীর স্পষ্ট নিদর্শন আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও এই ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারেই। পেন্সকে হামেল ব্যাখ্যা করেছেন ‘অতিউৎসাহী খ্রিষ্টান ইহুদিবাদী’ হিসেবে, যিনি ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী দ্ব্যর্থহীনভাবে ইসরাইলকে সমর্থন করেছেন। ওই সম্মেলনে তার উপস্থিতি ছিল ‘হোয়াইট হাউজে খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীদের প্রভাব প্রতিপত্তির নতুন যুগের সূচনা’। বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়নে খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীরা ট্রাম্পকে দিয়ে যা করিয়ে নিতে চায়, সেই প্রচেষ্টায় পেন্স একা নন। ট্রাম্প প্রশাসন এবং অতিউৎসাহী খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীদের নিয়ন্ত্রণ করছেন আরকানসাসের সাবেক গভর্নর মাইক হুকাবি, তার মেয়ে ও হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ হুকাবি স্যান্ডার্স এবং সারাহ পলিন। এই দলে আলাবামার রয় মুরও আছেন, যাকে সিনেট নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছেন ট্রাম্প।
খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীদের শেষ লড়াই
ইসরাইল রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রায় দুই কোটি খ্রিষ্টান ইহুদিবাদী কয়েক দশকে কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে। রাশিয়া, ইথিওপিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকে ইহুদিদের অভিবাসনে তারা অর্থ সহায়তাও দিয়েছে। ফিলিস্তিনের দখল করা ভূমিতে বাড়িঘর তৈরিতে কোটি কোটি ডলার বিলিয়ে দিয়েছে। হ্যাগি উল্লেখ করেছেন, ‘জেরুসালেমে দূতাবাস স্থানান্তর প্রমাণ করেছে, আমাদের প্রেসিডেন্ট কথা রেখেছেন।’ বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের মতের বিরুদ্ধে জেরুসালেমে দূতাবাস স্থানান্তর আর তালেবানের মতের বিরুদ্ধে যাওয়া একই কথা।’ এগুলো হ্যাগি বলেছেন তার নিজস্ব বিশ্বাস থেকে এবং সম্ভাবত সিইউএফআইয়ের ৩০ লাখ অনুসারীও একই বিশ্বাস লালন করেন। খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার আন্দোলনে চার কোটি অংশগ্রহণকারীও সম্ভাবত একই বিশ্বাস বা কমপক্ষে আংশিকভাবে এই বিশ্বাস লালন করেন। চিন্তার বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট কিংবা আরো অনেকেই হয়তো একই বিশ্বাস পোষণ করেন। সিইউএফআইয়ের সাবেক প্রধান ফলওয়েলসের ইসলামবিরোধী মতামতের মতোই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও হয়তো ইসলাম সম্পর্কে একই ঘোরের মধ্যেই আছেন।
সত্যের পক্ষে আর কেউ নেই
গত ৬ ডিসেম্বর দুই রাষ্ট্র সমাধান প্রস্তাব ট্রাম্প স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘দুই দশক ধরে চেষ্টা চালানোর পরও ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে টেকসই শান্তিচুক্তি সম্ভব হয়নি। তাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস, জেরুসালেমকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণার সময় এখনই। একই চিন্তার পুনরাবৃত্তি আলাদা বা আরো ভালো কোনো সমাধান বের করবেÑ এমন ধারণা মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।’ জেরুসালেমকে ইসরাইলের প্রকৃত রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার অর্থ অনেক বেশি কিছু। বাস্তবে এর মাধ্যমে দুই রাষ্ট্র সমাধানভিত্তিক শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতিকেই অস্বীকার করা হয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস তা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছেন। ফিলিস্তিনিরাও বুঝে গেছে, যুক্তরাষ্ট্র এই শান্তি প্রক্রিয়ার সৎ বা পক্ষপাতহীন মধ্যস্থতাকারী নয়। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র কোনো দিনই নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী ছিল না। ইসরাইলের অপরিসীম প্রভাবেই যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে না এবং তার এই প্রতারণা সুস্পষ্ট। আব্বাস এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত নিরসনের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র অযোগ্য। তার এই উক্তি কয়েক দশক ধরে দাবি করা, মার্কিন সুনামের জন্য এক বিরাট নীতিগত পরিবর্তন। আব্বাসের এই ঘোষণা আসে জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন স্বীকৃতির প্রতিক্রিয়ায়। মুসলিম নেতাদের ওই সম্মেলনে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করে পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়ের দাবি তোলা হয়। ২১ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের মার্কিন সিদ্ধান্তের নিন্দা জানানো হয়। অর্থ সহায়তা বন্ধের মার্কিন হুমকির পরও জাতিসঙ্ঘের প্রায় সব সদস্য দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানায়। ইসরাইলের চাহিদার কাছে ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ আত্মসমর্পণের জন্য ট্রাম্পের জামাতা ও জ্যেষ্ঠ পরামর্শক জ্যারেড কুশনারের সফল প্রচেষ্টার পরই শান্তি প্রক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। কুশনারের পরিবারের সদস্যরা এবং তিনি নিজেও পশ্চিম তীরে ইসরাইলের বসতি নির্মাণ কার্যক্রমে লাখ লাখ ডলার খরচ করেছেন। কোনোই সন্দেহ নেই যে, ট্রাম্প কুশনারকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়েছেন এবং সে কারণেই ফিলিস্তিনিরা তাদের কোনো অভিযোগেরই প্রতিকার পাবে না।
যিশুখ্রিষ্টের প্রত্যাবর্তন
কট্টর ইহুদিবাদী ও তাদের খ্রিষ্টান মিত্রদের জন্য এক জটিল বিষয় হলো আল আকসা মসজিদের সীমানা ঘেঁষে অবস্থান করা প্রথম ও দ্বিতীয় গির্জার ধ্বংসাবশেষ। তৃতীয়টি ইসলাম ধর্মের জন্যও পবিত্রতার প্রতীক। খ্রিষ্টান ইহুদিবাদী মতবাদের একটা মৌলিক বিষয় হলো, নতুন গির্জাটি তৈরি করতে হবে ঠিক ওই ধ্বংসাবশেষের জায়গাতেই। ফিলিস্তিনিরা বিশ্বাস করে যে, আল আকসা মসজিদ কম্পাউন্ডের ঠিক পাশেই খোঁড়াখুঁড়িতে মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীরা তাদের বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণী পূরণের ব্যাপারে কট্টর। তারা বিশ্বাস করে, কোনো একসময় নতুন গির্জা নির্মাণের মাধ্যমে কোনো একসময় যিশুখ্রিষ্টের প্রত্যাবর্তন পূর্ণ হবে। ফিলিস্তিনিদের জন্য একমাত্র আশা, পশ্চিম তীর ও গাজার বাসিন্দাদের ক্রমান্বয়ে এক জাতি হিসেবে ইসরাইলে অন্তর্ভুক্তি। অবশ্যই এটি খুবই অপ্রিয় পরিণতি। ইসরাইলিরা কখনোই ফিলিস্তিনি মুসলিম কিংবা খ্রিষ্টান কাউকেই নাগরিক হিসেবে বিনা আপত্তিতে মেনে নেবে না এবং ভোটের অধিকারও দিতে চাইবে না। নেতানিয়াহু ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের জন্য এখন একই কথা বলে বেড়াচ্ছেন। এমনো মনে করা হয়, ইহুদি জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তিনি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত! সাবেক একজন শীর্ষ রাজনৈতিক পরামর্শক আয়াল আরাদ বলেছেন, ‘মসিহ’র সাথে প্রধানমন্ত্রীর এক ধরনের মিল আছে, যিনিই একমাত্র হলোকাস্টের মতো ঘটনা থেকে ইহুদিদের রক্ষা করতে পারেন।’ তাকে সব কিছু দ্রুতই করতে হবে। কেননা দুর্নীতি ও অনৈতিক কাজের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে চতুর্থবারের মতো তদন্ত শুরু হয়েছে। স্রষ্টার আহ্বানে পেন্সও সমানভাবে অনুরক্ত। তার প্রিয় বাইবেলীয় বর্ণনা, যা থেকে তিনি প্রায়ই উদ্ধৃতি দেন এভাবে- ‘আমি জানি, আপনাদের জন্য আমার করণীয় কী। ঈশ্বরের কসম, আমার চিন্তা শুধু আপনাদের কল্যাণ, ক্ষতি নয়; আপনাদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশা জাগানো।’ গ্রহণযোগ্যতার অভাব এবং গভর্নর হিসেবে রাজনৈতিক ব্যর্থতার পরও পেন্স খুবই উচ্চাকাক্সক্ষী। রিপাবলিকান দলের জাতীয় কমিটিকে পেন্স খুবই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে, ২০১৬ সালের অক্টোবরে হলিউডের ভিডিও টেপ প্রকাশ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থিতার ব্যাপারে দল যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তিনি ট্রাম্পের জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রস্তুত।
আধ্যাত্মিক প্রেসিডেন্ট?
নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে, মাইক পেন্স প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পেন্স অবশ্য এ সংবাদের কড়া প্রতিবাদ জানান। পেন্স বুঝতে পেরেছিলেন, ট্রাম্পের আরো একটি কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশের পর বৃহৎ এ দলটি সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে এবং ট্রাম্পের পর হয়তো তিনিই উঠে আসবেন। মূলধারার খ্রিষ্টান পণ্ডিতেরা বাইবেলের বর্ণনাকে নিয়েছেন ‘রূপক’ অর্থে। কিন্তু খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীরা এর শাস্তিমূলক ব্যাখ্যাকে বিবেচনা করে আক্ষরিক হিসেবে। খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীর বাইবেল অনুযায়ী অলীক কল্পনার ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় শত শত বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। ১৬০০ সালে রাজা প্রথম জেমস যান, একদিন এটি ফিলিস্তিনে প্রতিষ্ঠা পাবেই। এখনকার খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীদের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন যে, হিব্রু উপজাতি একদিন সব জায়গা থেকে এখানে এসে জড়ো হবে এবং শয়তান ও যিশুখ্রিষ্টের অনুসারীদের মধ্যে শেষ লড়াই হবে।
আরেকটি ‘ব্যালফোর ঘোষণা’
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড ব্যালফোর এবং প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ খ্রিষ্টান ইহুদিবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। জাতিসঙ্ঘ ফিলিস্তিনের ব্যাপারে ব্রিটেনকে কর্তৃত্ব দেয়ার তিন বছর আগে, ১৯১৭ সালে ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ব্যাংক ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য ও ইহুদিবাদের অন্যতম প্রবক্তা লর্ড রথচাইল্ডকে পত্র পাঠান ব্যালফোর। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় বাসভূমি প্রতিষ্ঠায় সরকারের সমর্থন আছে এবং এই লক্ষ্য অর্জনে তাদের সব প্রচেষ্টায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।’ ব্যালফোর ঘোষণা ছাড়া ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো না। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে যখন যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দিলো, তখন আংশিকভাবে হলেও আমরাও যিশুকে ডাকতে পারি এবং ভালো-খারাপের যে যুদ্ধ হওয়ার কথা তার প্রস্তুতি নেয়াও শুরু করতে পারি। খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীরা এটাই তাই বিশ্বাস করে এবং শাসন করার সে দাবিও ক্রমাগতভাবে তারা করেই যাচ্ছে।‘ মুসলমান, ইহুদি, বৌদ্ধ, হিন্দু, সর্বপ্রাণবাদী, ক্যারিবীয় অঞ্চলের ভুদু ধর্মের মানুষ, ক্যাথলিক, অজ্ঞেয়বাদী, নাস্তিক এবং আরো যারা আছে তাদের সবাই খ্রিষ্টান ইহুদিবাদে দীক্ষিত হয়ে স্রষ্টার দলে অন্তর্ভুক্ত হবে। আমাদের অনিষ্টকারী সব শয়তানকে বশীভূত করে যিশুখ্রিষ্ট বিজয়ী হবেন। তিনি রাশিয়াসহ খ্রিষ্টানবিরোধী ও তাদের দোসরদের ধ্বংস করবেন এবং হাজার বছরের শান্তি ও প্রাচুর্যপূর্ণ রাজ্যের রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত হবেন।’ তবে বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, যিশুর এই প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রথমেই ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার ব্যালফোর ব্রিটেনের ইহুদি নেতা লর্ড রথচাইল্ডকে এক পত্র লিখেছিলেন। ৬৭ শব্দের ওই চিঠিতে ব্যালফোর যে ঘোষণাটি দেন, তা প্রথমবারের মতো কোনো ক্ষমতাশালী কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আলাদা দেশ গঠনের পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছিল। ১৯১৭ সালে সেখানকার ৯০ ভাগ জনসংখ্যাই ছিল ফিলিস্তিনি। তারা ইহুদিবাদীদের আগ্রাসন ও তাদের ভূমি ইহুদিদের কাছে তুলে দেয়ার জন্য এই ঘোষণাকেই দায়ী করে, যা ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ওই চিঠি এখনো ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।
বাইবেলীয় ইসরাইল
খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, দ্বিতীয় যে ব্যালফোর ঘোষণা আসছে তা ইহুদিদের জন্য মোটেও শুভ ইঙ্গিত নয়। এই অলৌকিক ঘটনা ঘটলে ইসরাইল রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ইহুদিরা যিশুখ্রিষ্টকে মসিহ হিসেবে মান্য না করায় তিনি ক্ষুব্ধ এবং খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ না করলে কিংবা আরো স্পষ্টভাবে বললে, খ্রিষ্টান ইহুদিবাদে বিশ্বাস না করলে তিনি সব ইহুদিকে হত্যা করবেন। সম্ভাবত পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর জাতি খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীরা হোয়াইট হাউজে অবস্থান করা মাইক পেন্স ও তার সহকর্মীদের মতো ক্ষমতার লোকদের দিয়ে সব করায়ত্ত করতে পারে। তারা বিশ্বাস করে ওই অলৌকিক ঘটনা ঘটলেই কেবল পৃথিবীকে শুদ্ধ করা যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র হবে ঈশ্বরের ক্রোধ প্রশমনের হাতিয়ার। এই ঘটনা ঘটানোর ঐশ্বরিক পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় সম্পদ সম্ভাবত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। অন্ধ আনুগত্যের কারণেই এ দলের জন্য ট্রাম্প সব কিছুই করবেন। অর্থ ও ভোট উভয়ের জন্যই রিপাবলিকান পার্টি ওদের প্রতি অত্যাধিক ঝুঁকে পড়েছে। শুধু দল পরিচালনার ক্ষেত্রেই নয় বরং এই দলটির মধ্যে এখন রাজনীতির চেয়েও ধর্মকেন্দ্রিক চিন্তা যে বেশি কাজ করছে, সে ব্যাপারেও আছে খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীদের গভীর প্রভাব। দুই কোটির বেশি খ্রিষ্টান ইহুদিবাদী ভোট দেয়ার ব্যাপারে ব্যাপক উৎসাহী এবং অর্থ খরচ করতে পছন্দ করে। রিপাবলিকান ধর্মতত্ত্বের তারাই মূলভিত্তি। তারা ফিলিস্তিনিদের জন্য শান্তি চায় না। বাইবেলীয় ইসরাইলে ফিলিস্তিনিদের কোনো জায়গা নেই। খ্রিষ্টান ইহুদিবাদীরা তাদের বিতাড়িত করে ইসরাইলের ‘পবিত্র ও চিরকালীন স্বর্গীয় শান্তি’ নিশ্চিত করতে চায়।
লেখক : মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বিষয়ের সাবেক অধ্যাপক
মিডল ইস্ট আই থেকে ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম

ব্যাংক ডাকাতির নতুন পদ্ধতি by আলফাজ আনাম



বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় যে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা নতুন কোনো খবর নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের পর খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ চুরি হয়ে গেছে। এরপর আমরা দেখছি, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো সরকারঘনিষ্ঠ বিভিন্ন ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। এ জন্য বেশ কয়েকটি ব্যাংকের সাধারণ সভায় হঠাৎ করে এমডি এবং চেয়ারম্যানরা অনুপস্থিত থাকতেন। এরপর নতুন পরিচালকদের নাম ঘোষণা করে মালিকানায় পরিবর্তন এসেছে। সরকারের মন্ত্রী ও এমপিরা একাধিক ব্যাংকের মালিক হয়েছেন।
এ দিকে অনেকে নতুন ব্যাংক চালু করে আমানত ‘খেয়ে ফেলেছেন’। এ ধরনের ব্যাংকের মধ্যে একটি হচ্ছে ফারমার্স ব্যাংক। এই ব্যাংকের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, ফারমার্স ব্যাংকের উপদেষ্টা প্রদীপ কুমার দত্ত বলেছেন, ব্যাংকের আমানতের চেয়ে ঋণ দেয়ার পরিমাণ বেশি হওয়ায় গ্রাহকের টাকা ফেরত দেয়া যাচ্ছে না (যুগান্তর, ২১ ডিসেম্বর ২০১৭)। অপর দিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ব্যাংকটি সম্পর্কে বলেন, ‘ফারমার্স ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতারাই ব্যাংকটিকে লুটপাট করে শেষ করে দিয়েছে।’ জলবায়ু তহবিলের ৫০৮ কোটি টাকা এই ব্যাংক আদৌ ফেরত দিতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ফারমার্স ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। বর্তমান সরকারের আমলেই ফারমার্স ব্যাংক অনুমোদন পেয়েছিল। তখনো অর্থমন্ত্রী ছিলেন মুহিত। ওই সময় নতুন ব্যাংকগুলো অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক তথা দলীয় বিবেচনার কথা তিনিও স্বীকার করেছিলেন। ঋণ কেলেঙ্কারি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে চাপের মুখে ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ ছাড়তে হয় মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীমকেও এরপর অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে শত শত কোটি টাকা অনিয়ম দেখে ফারমার্স ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর এ অবস্থার মূল কারণ, অস্তিত্বহীন ও সাইনবোর্ডসর্বস্ব অনেক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া হয়েছে। শুধু ফারমার্স ব্যাংকে নয়, প্রবাসীদের উদ্যোগে গঠিত এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকেও মূলধন জোগান থেকে ঋণ দেয়াসহ সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। ৭০১ কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের দায়ে ব্যাংকটির এমডির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। ২০১৩ সালের এপ্রিলে যাত্রা করা এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৯১ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের টাকা লোপাট নিয়ে মামলা চলছে। বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু দীর্ঘ দিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার পর এখন দুর্নীতি দমন কমিশনে হাজিরা দিচ্ছেন। অপর দিকে সোনালী ব্যাংকের কয়েক হাজার কোটি টাকার হলমার্ক কেলেঙ্কারির জন্য ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক বা নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা হলেও সে সময় যারা পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন, তাদের কাউকেই জবাবদিহি করতে হচ্ছে না।
ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। কিন্তু এই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের মুখোমুখি করা হচ্ছে না। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা কোন পর্যায়ে রয়েছে, এককথায় এর চিত্র তুলে ধরেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বিদায়ী ২০১৭ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে ‘ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সিপিডি মনে করছে, এ পরিস্থিতি ২০১৮ সালেও তেমন পরিবর্তন হবে না। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা আগের চেয়ে এখন আরো বেশি নাজুক। সরকার যদি এখনি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে তার প্রভাব চলতি বছরেও থাকবে। এর সাথে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন আরো ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।’ ব্যাংকিং খাতে কী ধরনের অনিয়ম ঘটছে, সে প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া কয়েকটি ব্যাংক থেকে বিদেশে অর্থপাচার করা হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। এ বিষয়ে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কয়েকটি ব্যাংকে ঋণের ওপর ব্যক্তির প্রাধান্য বিস্তারের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ব্যক্তি খাতের নতুন ব্যাংক কার্যকর হতে পারেনি। পুঁজি সঞ্চালন করে ব্যাংকগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সময় ঋণখেলাপির পরিমাণও বাড়ছে।’ সিপিডির এই মূল্যায়নে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘সিপিডি বাংলাদেশকে টেনে নামানোর চেষ্টা করছে। তারা কখনো বাংলাদেশের উন্নয়ন চোখে দেখে না; শুধু নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে। বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, সিপিডি আর বিএনপির বক্তব্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারা বিএনপির ভাষায় কথা বলছেন। সরকারের আরেক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেন, সিপিডি এখন পলিটিক্যাল ইকোনমি করছে।
তারা একটি রাজনৈতিক দলের তাঁবেদারি নিয়ে ব্যস্ত।’ আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী নিজে স্বীকার করেছেন ব্যাংকিং খাতে লুটপাট চলছে। কিন্তু সিপিডি কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যখন এই লুটপাটের দিকটি তুলে ধরেছে তখন তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকেন। ব্যাংক লুটের চেয়ে তা তুলে ধরা বা সমালোচনাকে যেন বড় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে কথিত দুই কোটি টাকা তসরুপের অভিযোগ এনে তাকে কারাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। সরকারের একাধিক মন্ত্রী বলছেন, এক দিনের জন্য হলেও তাকে কারাগারে যেতে হবে। কিন্তু বেসিক ব্যাংক বা ফারমার্স ব্যাংকের শত কোটি টাকা লোপাটকারীদের জেলে যেতে হয় না। বরং দাবি করেছেন আরেকবার যদি দায়িত্ব পান তাহলে লোপাট করা টাকা ফিরিয়ে আনতে পারবেন। ব্যাংক খাতে যে অস্থিরতা, এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ঋণ জালিয়াতি। ফলে খেলাপি ঋণের লাগাম কোনোভাবেই টেনে ধরা যাচ্ছে না। দেশে ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে বর্তমানে ১৮টি ব্যাংক নানাভাবে আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে এক ডজনেরও বেশি ব্যাংকের অবস্থা খুবই নাজুক। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ব্যাংকগুলোর লাখ লাখ আমানতকারী। প্রশ্ন হচ্ছে, আর্থিক খাতের এ অস্থিরতার দায় কে নেবে? অবশ্যই এ দায় অর্থ মন্ত্রণালয় তথা অর্থমন্ত্রী এড়াতে পারেন না। কারণ, দেশে সরকার আছে। আছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং ব্যাংক নিয়ন্ত্রণকারী বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের অনেক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি ব্যাংকের এসব লুটপাটের দায়ও সরকারের দায়িত্বশীলরা এড়াতে পারবেন না। কেননা ব্যাংকের অনুমোদন তারাই দিয়েছেন। ক্ষমতাসীনদের মদদে আসলে কৌশলে ব্যাংক ডাকাতির নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করা হয়েছে। এই পদ্ধতির একটি হচ্ছে, নতুন ব্যাংক খুলে আমানত সংগ্রহ করে তা পাচার করা। অপরটি হচ্ছে, পুরনো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়া। একবার টাকা নেয়ার পর তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যান। ব্যাংক লুণ্ঠনের এই নতুন পদ্ধতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে তা পাস হয়েছে। নতুন এ আইনের কারণে একই পরিবারের চারজন সদস্য যেকোনো বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন। আগে এই সংখ্যা ছিল দুইজন। এ ছাড়া তিন বছর করে পরপর দুই মেয়াদে তারা ব্যাংকের পরিচালক থাকতে পারতেন মোট ছয় বছর। এখন নতুন আইনে তিন বছর করে তিন মেয়াদে মোট ৯ বছর পরিচালক থাকতে পারবেন একাধারে। এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে মূলত ‘পরিবারতন্ত্র’ কায়েম হবে। একটি বেসরকারি ব্যাংকে মাত্র ১০ শতাংশ অর্থের মালিকানা হচ্ছে পরিচালকদের, বাকি ৯০ শতাংশ টাকা জমা রাখেন সাধারণ আমানতকারীরা। মাত্র ১০ শতাংশ অর্থের মালিকদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করে ব্যাংকগুলোকে কার্যত পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আইন পাস করা হলো। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন পুরো ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। মুষ্টিমেয় পরিচালকের স্বার্থরক্ষার এমন প্রচেষ্টার বিষয়কে ব্যাংকার, আমানতকারী, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকও সমর্থন করেনি। একটি ব্যাংকের সাফল্য নির্ভর করে আমানতকারীদের বিশ্বাস ও আস্থার ওপর। ব্যাংক যদি নিছক একচেটিয়া পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তাহলে সেই ব্যাংকের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আর থাকার কথা নয়। দেশের ব্যাংকিং খাতে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন তা আরো বাড়িয়ে দেবে। কার্যত ব্যাংকিং খাতে লুটপাট এবং পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেটেড ঋণের পরিমাণ বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতিকে শেষ পর্যন্ত হুমকির মুখে ফেলবে। এর মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা অনেকটা খর্ব হয়ে যাবে। শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, দেশের অর্থনীতি এখন ঝুঁকিতে পড়েছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে ব্যাংক, ব্যবসায় ও বিনিয়োগ- তিন খাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক ধরনের মাফিয়াতন্ত্র। সরকারসমর্থক হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যবসায়ী এখন দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। অর্থমন্ত্রী কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত তাদের কাছে অসহায়। কিন্তু শেষ বিচারে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, এর দায় অর্থমন্ত্রীকে নিতে হবে। তিনি ‘রাবিশ’ বলে এই দায় নেয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দিতে পারবেন না।
alfazanambd@yahoo.com

পানি, ট্যানারি এবং সুপ্রিম কোর্টে বিরল ঘটনা



আজকের কলামটির বিন্যাস অতীতের কলামগুলোর তুলনায় একটু ভিন্ন প্রকৃতির। একাধিক বিষয়ের অবতারণা করতে চাই। আলোচনাটা এমনভাবে করতে চাই যেন পাঠকের বুঝতে কোনো কষ্ট না হয়। নতুন খনন করা পুকুরে পানি জমতে যেমন সময় লাগে, একটু একটু করে জমতে জমতে পানির স্তর ওপরে ওঠে, ওই রকমই নদীর মাঝখানে একটি চর জাগতেও অনেক বছর সময় লাগে, অর্থাৎ একটু একটু করে পলিমাটি জমতে জমতে অনেক বছরে একটি চর জেগে উঠে। ভূগোলের এ ঘটনা বা প্রকৃতির এ বৈশিষ্ট্য থেকেই এসেছে কবির সেই অমোঘ বাক্য: ‘ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকনা বিন্দু বিন্দু জল; গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল।’ কবিতার এই লাইনগুলোর সঙ্গে এই কলামের পাঠকদের বেশির ভাগেরই পরিচয় আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। অতএব, একটু একটু করে আলোচনা যদি অনেক দিন ধরে করা হয়, তাহলে এটি পাঠকের চিন্তার জগতে একটু একটু করে ভিত্তি পায়।
পানি নিয়ে আলোচনা: কিন্তু কেন?
প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে দিনাজপুর গিয়েছিলাম, স্থানীয় জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সম্মেলন উপলক্ষে। সেই সময় পুরনো বিষয় নতুন করে উপলব্ধি করলাম। ঢাকার কাছে সাভারে প্রায়ই যাই। যাওয়ার পথে ছোট ছোট নদীর ওপর দিয়ে যে ব্রিজগুলো, সেগুলো পার হতে হয়। নদীগুলোর ১২ মাসে যে চারটি রূপ হয় সেটি বহু বছর ধরেই আমার মনে দাগ কাটে। সাত-আট দিন আগে সড়ক পথে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিলাম। কুমিল্লা এবং ঢাকার মাঝখানে তিনটি বড় ব্রিজ আছে, যথা দাউদকান্দি ব্রিজ, মেঘনা ব্রিজ এবং কাঁচপুর ব্রিজ। দাউদকান্দি ব্রিজ পার হওয়ার সময় আমার গাড়ির (দীর্ঘ দিনের পুরনো) ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলেন আমাকে, আসল নদী কোনটা চেনা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে; আপনি যেহেতু যাতায়াত করতে করতে পরিচিত, আপনি চিনবেন কোনটা নদীর মূল স্রোত। ঢাকা কুমিল্লা ইত্যাদি অঞ্চল, বাংলাদেশের পূর্ব অংশে পড়ে। কিন্তু আমি বাংলাদেশের অন্য অংশের নদী নিয়ে আলোচনা করব; যদিও ক্ষুদ্র পরিসরে।
ভারত-বাংলাদেশ ও নদীর পানি বণ্টন
বাংলাদেশের সুবৃহৎ প্রতিবেশীর বদৌলতে বাংলাদেশের নদী-নালাগুলো শুকিয়ে মৃতপ্রায়। বাংলাদেশকে যদি চারটি ভৌগোলিক ভাগে ভাগ করি, তাহলে একটি অংশ হতে পারে উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশ তথা উত্তরবঙ্গ; যার পরিচয় নিম্নরূপ: সাধারণভাবে পদ্মা নদীর উত্তরে এবং যমুনা নদীর পশ্চিমে ও ভারত সীমান্ত দিয়ে বেষ্টিত; অর্থাৎ বর্তমানের রংপুর বিভাগ ও রাজশাহী বিভাগ। পদ্মা নদীর দক্ষিণে এবং যমুনার পশ্চিমে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশ বলা যেতে পারে; অর্থাৎ খুলনা বিভাগ। যমুনা নদীর পূর্ব দিকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সিলেট ঢাকা কুমিল্লা ইত্যাদি নিয়ে বাংলাদেশের মধ্য ও পূর্ব অংশ; অর্থাৎ ঢাকা বিভাগের উত্তর অংশ, নতুন ঘোষিত ময়মনসিংহ বিভাগ, সিলেট বিভাগ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের উত্তর অংশ তথা কুমিল্লা ও নোয়াখালী। দক্ষিণ বাংলা বা দক্ষিণ বঙ্গ বলতে বোঝায় ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর জেলা এবং পুরো বরিশাল বিভাগ। অনেকে খুলনাকেও দক্ষিণ বঙ্গ হিসেবে গণ্য করে; আবার অনেকে ফরিদপুরকে দক্ষিণবঙ্গের অংশ হিসেবে মানতে চান না। এটা বড় কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। বাংলাদেশের উত্তর অংশে বা দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে, অর্থাৎ রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে, রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে, এবং খুলনা বিভাগের উত্তর অংশে বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও বৃহত্তর যশোর জেলায়, বাংলাদেশের অন্য অংশগুলোর তুলনায় নদীনালা কম এবং যা-ও আছে সেগুলো শুকিয়ে যায় দ্রুত। এর কারণ হচ্ছে, এই অঞ্চলগুলোর নদীগুলোর উজানের অংশ ভারতের মাটিতে। আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী কর্তৃক পদ্মার উজানে ফারাক্কার বাঁধ নির্মাণ এবং তিস্তা নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণ করে পানি নিয়ন্ত্রণ করায়, আমাদের নদীগুলোতে, শুকনা মৌসুমে যথেষ্ট পানি আসে না কিন্তু, বর্ষা মৌসুমে অঢেল পানি এসে বন্যা ঘটায়। ভারত পানির সরবরাহ বা গতি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই বাংলাদেশের নদীগুলোর প্রবাহ ভারতের শুভেচ্ছা বা আন্তরিকতার ওপর নির্ভরশীল। অপর পক্ষে বাংলাদেশের কৃষি এবং গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা আমাদের নদীগুলোর পানির ওপর নির্ভরশীল। আমার আলোচনার উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শুধু ভারতকে দোষারোপ ও কটাক্ষ করা নয়; বরং আমার উদ্দেশ্য হলো, আমাদেরকে বিষয়টি সমাধানের জন্য আরো যে সচেষ্ট হতে হবে, সেই বিষয়টি তুলে ধরা। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ার কারণে নদীর উভয় তীরে জবরদখল ব্যাপক হয়েছে। ফলে বর্ষাকালে পানির স্রোত বাধা পায়।
পানি নিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক
দুইটি রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বের অন্যতম শর্তই হলো, এই বন্ধুত্ব উভয় পক্ষের জন্য উপকারী হতে হবে। দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যত প্রকারের বিষয় জড়িত, সবগুলো বিষয়েই যে উভয় রাষ্ট্রের স্বার্থ সমানভাবে রক্ষিত হবে-এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। অর্থাৎ একটি বিষয়ে একটি রাষ্ট্র বেশি ত্যাগ স্বীকার করবে এবং অপর একটি বিষয়ে অন্য রাষ্ট্র বেশি ত্যাগ স্বীকার করবে। ইংরেজি পরিভাষায় বলতে পারি, গিভ অ্যান্ড টেক। কিন্তু বাংলাদেশ আর ভারতের সম্পর্কের মধ্যে পানি বণ্টনের বিষয়টি যেন একটি গলার কাঁটা। এখানে ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ থিওরি কাজ করে না। তবে একটি চিন্তার খোরাক উপস্থাপন করে রাখি। আগামী সম্ভাব্য পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে, ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে একটি চুক্তি হওয়া খুবই সম্ভাবনাময়। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক সরকার, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সরকারকে, আগামী নির্বাচনে সুবিধা দেয়ার জন্য এই কাজটি করতে পারে। অর্থাৎ তখন বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বলবে, আমরাই পারি সমস্যার সমাধান করতে; আমরাই পারি আমাদের অধিকার আদায় করতে। নিবেদন করে রাখছি যে, তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের জন্য ভারত বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া মানেই, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ভিন্ন নদীগুলোর পানি সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু টেলিভিশন প্রচারণার সুযোগ নিয়ে, মিষ্টি মিষ্টি ভাষণ ব্যবহার করে বাংলাদেশের মানুষের ভাবনা ও চিন্তাকে আবেগাপ্লুত করে রাখার সম্ভাবনা প্রচুর। বৃষ্টির পানি যখন মাটিতে পড়ে, সেই পানি খাল, বিল, নদী দিয়ে বয়ে যায়; পানি একটু একটু করে চুইয়ে পৃথিবীর ভেতরে প্রবেশ করে। হাজার-কোটি বছর ধরে এরূপ হতে হতে এবং পৃথিবীর জন্মলগ্নের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় যেরূপ হয়েছিল সেই মতে, ভূগর্ভে পানির আধার আছে; যার কারণে আমরা চাষাবাদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনে ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করতে পারি। কিন্তু বাংলাদেশের সর্বত্র, বিশেষত উত্তর-পশ্চিম অংশে তথা উত্তরবঙ্গে, এবং দক্ষিণ পশ্চিম বাংলাদেশে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অতি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। কারণ, সেচের জন্য ও অন্যান্য কারণে আমরা যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করি, তত পানি ভেতরে প্রবেশ করছে না। কারণ মাটির ওপরের অংশে তথা নদী-নালা-খালে-বিলে-পুকুরে পানি থাকছে না। দীর্ঘ মেয়াদে এটা আমাদের জন্য মারণফাঁদ। বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিম অংশ বা মধ্যম পশ্চিম অংশে মরুকরণের লক্ষণ ব্যাপক। এর জন্য দায়ী, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া। সম্মানিত পাঠক সম্প্রদায়ের মধ্যে এ প্রসঙ্গে সচেতনতা যেন বজায় থাকে, সেই আবেদন করছি।
পলিউশন তথা ট্যানারি দূষণ
পুরনো ঢাকার নাগরিকদের জন্য একটি বড় ধরনের সঙ্কট হিসেবে পরিচিত ছিল হাজারীবাগের ট্যানারি। ট্যানারি মানে চামড়া শিল্প। ট্যানারি এবং তার থেকে উদ্ভূত বিশেষ দুর্গন্ধের সাথে আমি ছোটকাল থেকে পরিচিত। কারণ, গ্রামের বাড়ি থেকে আমরা চট্টগ্রাম শহরে আসার জন্য যে মহাসড়ক ব্যবহার করতাম এবং এখনো করি, সেটার নাম কাপ্তাই-চট্টগ্রাম মহাসড়ক; সাধারণ ভাষায় কাপ্তাই রোড। কাপ্তাই থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রাম মহানগরের মোহরা অংশে এসে রাস্তাটি কালুরঘাট রোডের সাথে মিলিত হয়। স্থানীয় মানুষের কাছে এ মিলন স্থানটির নাম কাপ্তাই-রাস্তার মাথা। এখানে একটি বড় ট্যানারি ছিল দীর্ঘ দিন ধরে। ছোটকালে এই ট্যানারির বদৌলতে, চামড়া শিল্পের এবং চামড়ার দুর্গন্ধের সাথে পরিচয়। ঢাকা মহানগরে থাকি অনেক দিন এবং হাজারীবাগের সঙ্গে পরিচয় অনেক দিনের। হাজারীবাগ বলি বা অন্য জায়গার কথা বলি, বাংলাদেশে ট্যানারি ছিল এবং থাকবে। চামড়া শিল্প থাকতেই হবে। চামড়া শিল্প বাংলাদেশের রফতানি আয়ের অন্যতম বড় মাধ্যম। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও চামড়া শিল্প আছে। কোনো কোনো বছর আমাদের দেশ থেকে কাঁচা চামড়া বেশি চোরাচালান হয়ে ভারতে ঢোকে, কোনো বছর কম ঢোকে। চামড়া চোরাচালান কেন কম বা বেশি হয় ওই প্রসঙ্গে এখানে আলোচনায় যাবো না। ট্যানারির দুর্গন্ধের প্রভাব থেকে এবং এই শিল্প থেকে বের হওয়া দূষিত তরল পদার্থের প্রভাব থেকে, মানুষের জীবনকে বাঁচানোই হলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা মহানগরের হাজারীবাগে যখন ট্যানারি শিল্প ছিল, তখন সে এলাকায় প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছিল এবং ট্যানারি থেকে দূষিত তরল পদার্থ বুড়িগঙ্গা নদীতে পড়ত। এর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে মিডিয়ায় লেখালেখি হয়েছে, টেলিভিশন টকশোতে বলাবলি হয়েছে, পার্লামেন্টে আলোচনা হয়েছে। একপর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি পল্লীকে সরিয়ে ফেলা হবে। অনেক জরিপ করার পর, ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার তেঁতুলঝোরা ইউনিয়নে, নতুন জায়গা নির্ধারণ করা হয়। প্রাইভেট সেক্টরের বিভিন্ন অসুবিধা ছিল, ঢাকা মহানগর থকে সরে যাওয়ায় অনীহা ছিল, সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিং ও তদারকি কম ছিল। ফলে সাভার ট্যানারি পল্লীতে, অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিল্পগুলো স্থানান্তর করায় বহুদিন বিলম্ব ঘটে। ২০১৬ সালের শেষের দিক এবং ২০১৭ সালের শুরুর দিক থেকে বর্তমান রাজনৈতিক সরকার এ বিষয়ে কঠোরভাবে মনোযোগী হয়। সরকার ট্যানারি শিল্প মালিকদের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগ করে যাতে তারা দ্রুত ট্যানারি স্থানান্তর করে। শিল্প মালিকরাও হঠাৎ চাপ প্রয়োগের পরিপ্রেক্ষিতে কী করবেন এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। একপর্যায়ে হাইকোর্টে মামলা হয়। হাইকোর্টের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত রায় বের হয় এ মর্মে যে, একটা নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে অবশ্যই যেন হাজারীবাগ থেকে সব চামড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান সাভারে সরিয়ে নেয়া হয়। সরিয়ে নিতে ব্যর্থ হলে, হাজারীবাগের শিল্পগুলোতে বিদ্যুৎ ও পানি বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। যতটুকু জানি, সাভারে যাওয়ায় বিলম্ব যে ঘটেছে তার অন্যতম কারণ সেখানে সরকারি উদ্যোগে অবকাঠামো গড়ে তোলার ব্যর্থতা বা বিলম্ব এবং ট্যানারি থেকে বের হবে এমন বর্জ্য পদার্থগুলোর দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব। ট্যানারি মালিকদের দুঃখের কথা কেউ শুনেছেন কেউ শুনেননি। গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাভার ট্যানারি পল্লী এখন কর্মচঞ্চল। হাজার হাজার মানুষ সেখানে শ্রম দিচ্ছেন; শ্রমিকদের আবাসনের জন্য নানা প্রকারের অস্থায়ী-স্থায়ী ঘর-বাড়ি নির্মিত হচ্ছে। রিকশা, ভ্যানগাড়ি ও ছোট মালবাহী মোটরগাড়ি প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন নতুন বিল্ডিং হয়েছে ট্যানারি শিল্পের। আশেপাশে জমির দাম আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। সাথে একটি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, ট্যানারি শিল্পগুলো থেকে দূষিত তরল পদার্থ বের হয়ে ধলেশ্বরী নদীতে যাচ্ছে। হাজারীবাগে দূষিত পদার্থ সংশোধনের ব্যবস্থা ছিল না; সাভারের তেঁতুলঝোরা ট্যানারি পল্লীতে দূষিত বর্জ্য সংশোধনের প্রকল্প এখনো অসম্পূর্ণ বা অপ্রতুল। কারিগরি বা ব্যবসায়িক ভাষায় এগুলোকে ‘এফফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ বলে। সাভারের ট্যানারি পল্লীর চতুর্দিকের গ্রামের মানুষগুলো এখন দূষণের প্রভাবে, চামড়া শিল্পের তরল ছাড়াও অন্যান্য বর্জ্যরে গন্ধে জর্জরিত। আমার প্রশ্ন বা আমার নিবেদন, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এটুকু সমন্বয় করতে ব্যর্থ হলো কেন? হাইকোর্ট সরকারের জন্য কোনো ধরনের সতর্কবাণী তাদের গুরুত্বপূর্ণ রায়ে রেখেছিলেন কি না সেটাও একটা প্রশ্ন। যে দূষণের কারণে বুড়িগঙ্গা নষ্ট হচ্ছিল, সেই দূষণের কারণে এখন ধলেশ্বরী নষ্ট হচ্ছে। চূড়ান্তপর্যায়ে ধলেশ্বরীর পানি বুড়িগঙ্গার সাথে এসে মিশে বুড়িগঙ্গার পানিতেই পড়ে; অর্থাৎ ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা যমজ বোনের মতো। যেকোনো সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকারের কাজ কর্মে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত। এক্ষেত্রে প্রকট আরেকটি উদাহরণ হলো, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পেছনের কারণগুলো; সেখানেও সমন্বয়ের অভাবই প্রধানত দায়ী; তবে আজ এ নিয়ে আলোচনা করছিনা।
দু’টি সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে মিল বা অমিল
ব্রিটিশ আমলে একটি কথা প্রচলিত ছিল: যেটা বঙ্গ আজকে চিন্তা করে, সেটা অবশিষ্ট ভারতবর্ষ আগামীকাল চিন্তা করে। ইংরেজি পরিভাষায় কথাটা অনেকটা এরকম ছিল: হোয়াট বেঙ্গল থিংক্স টুডে, রেস্ট অব ইন্ডিয়া থিংকস টুমোরো। এই কথা মনে এসে গেল। কারণ, বাংলাদেশের বিচার বিভাগে গত তিন-চার মাসের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। পত্রপত্রিকায় যেরূপ সংবাদ বা সংবাদ ভাষ্য বা মূল্যায়ন উঠে এসেছে সেই মোতাবেক আমার বক্তব্য। প্রথম কাজটি বা ঘটনাটি সম্বন্ধে প্রায় সবাই অবহিত। তা হলো, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে ‘বিবিধ পরিস্থিতি’ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রথমে ছুটিতে যেতে এবং পরে অবসরে যেতে বাধ্য করা। এ রূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং তাঁকে বাধ্য করার কাজটি কে বা কারা করেছে এবং কেন করেছে তা নিয়ে এখানে আলোচনা করছি না। দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো, প্রধান বিচারপতি কর্তৃক কথিত অথবা বাস্তব পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার আগের একটি ঘটনা। তা হলো এ রূপ: মহামান্য রাষ্ট্রপতি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিদের বঙ্গভবনে দাওয়াত দিয়েছিলেন আলোচনা বা মতবিনিময়ের জন্য বা অবহিতকরণের জন্য। বঙ্গভবনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, বিচারপতিদের হাতে কিছু তথ্য ও প্রামান্য কাগজ তুলে দেন। প্রশ্ন: কিসের তথ্য ও কিসের কাগজ? উত্তর: বিচারপতি সিনহা দুর্নীতি করেছেন-এ রূপ অভিযোগের সপক্ষে তথ্য ও প্রামান্য কাগজ। প্রকাশিত খবর মোতাবেক বা খবরের মূল্যায়ন করে আমরা বুঝতে পারি, বিচারপতিরা ওইরূপ পরিস্থিতিতে কনভিন্সড বা আশ্বস্ত হয়েছেন যে, বিচারপতি সিনহা দুর্নীতি করেছেন। অতএব বিচারপতিরা সিদ্ধান্ত নেন, তারা সিনহার সাথে একসাথে বসে আর কোনো বিচারকার্য পরিচালনা করবেন না। এ সিদ্ধান্ত তারা মিডিয়াকে জানালেন। দায়িত্ব বা কর্তব্য পালনরত অবস্থায় কোনো বিচারপতি কর্তৃক বা বিচারপতিদের মাধ্যমে মিডিয়াকে এরূপ প্রত্যক্ষভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানানোর উদাহরণ বা প্রিসিডেন্স দুষ্প্রাপ্য। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিদের গৃহীত পদক্ষেপটি ভালো না মন্দ, তা নিয়ে আলোচনা করছি না। আমার আলোচনার ফোকাস অন্যত্র; এখন সে বিষয়ে বলতে চাই। ১২-১৪ দিন আগে প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র হিসেবে অধিকতর পুরনো ও অধিকতর ঐতিহ্যবাহী ভারতের রাজধানী দিল্লিতে, বাংলাদেশের মতো একটি ঘটনা ঘটেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মধ্যে বর্তমান প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে পরবর্তী চারজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি একজোট বা একমত হন। ওই চারজন বিচারপতির মধ্যে চতুর্থজন আগামী অক্টোবরে নিজেই প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেবেন। কারণ বর্তমান প্রধান বিচারপতি তখন অবসরে যাবেন। এই চারজন এমন একটি কাজ করেছেন যা ভারতের সচেতন বোদ্ধা মহলের কিছু অংশের নিকট অভিনন্দিত এবং কিছু অংশের নিকট অতি পরিত্যাজ্য। প্রশ্ন: কাজটি কী ছিল? উত্তর: এটি ছিল একটি সংবাদ সম্মেলন। ওই চারজন বিচারপতি, প্রেস কনফারেন্স ডাকেন এবং সাংবাদিকদের সামনে সুপ্রিম কোর্ট পরিচালনায় বিশেষত মামলা বণ্টনের কর্মে, প্রধান বিচারপতির কিছু নীতির সমালোচনা ও সংশোধন কামনা করেন। তারা জানান যে, তারা চেষ্টা করেছেন প্রধান বিচারপতি মহোদয়কে আশ্বস্ত করতে যে, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। ওই চারজনের মতে, যেহেতু প্রধান বিচারপতি তাদের আহ্বানে সাড়া দেননি, তাদের ইতিবাচক সমালোচনায় সাড়া দেননি, সেহেতু তারা বাধ্য হয়েছেন মিডিয়ার সামনে আসতে। মিডিয়ার মাধ্যমে তারা ভারতবাসীকে সচেতন করতে চাচ্ছেন, যদি ত্রুটিগুলো বা ভুলগুলো সংশোধন করা না হয়, তাহলে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তথা ঊর্ধ্বতন বিচার ব্যবস্থা বিপদে পড়বে। খবরটি যখন পত্রিকায় পড়লাম, বিস্তারিত যখন ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিনে পড়লাম, তখন মুচকি হাসলাম। মনে মনে বললাম, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দিল্লিকে অনুসরণ করি; এই একটা বিষয়ে মনে হয়, দিল্লি আমাদের অনুসরণ করল। এখন সিরিয়াস প্রশ্ন হলো, বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন অংশ এবং মিডিয়ার মধ্যে সম্পর্ক কী হতে পারে? সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য কি শুধু প্রদান করা হবে, নাকি বক্তব্য আদান-প্রদান হবে? প্রিসিডেন্সবিহীন বা ‘রেয়ার’ ঘটনা ঢাকা ও দিল্লির সুপ্রিম কোর্টের অঙ্গনে যেমন ঘটেছে, তেমন কোনো কিছু অন্য কোথাও যেন না ঘটে এটাই কামনা। অর্থাৎ স্বাভাবিকতা, ধারাবাহিকতা ও যৌক্তিকতা কাম্য।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com