Saturday, February 6, 2016

অন্তঃসত্ত্বাদের সতর্কতা

ব্রাজিলে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা যেন কাউকে চুমু দেয়ার আগে দু’বার ভাবেন। সতর্ক করা হয়েছে পুরুষদেরও। বলা হয়েছে, অন্তঃসত্ত্বা কোন নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা যেন অবশ্যই নিরাপদ সম্পর্কের বিষয়ে নিশ্চিত হন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। জিকা ভাইরাসের কারণে শিশুর জন্ম হয় অপরিপূর্ণভাবে। এ জন্য এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অনেক দেশকে গর্ভপাতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্তৃপক্ষ বলেছে, যেসব পুরুষ জিকা ভাইরাস কবলিত এলাকা সফর করেছেন তারা যেন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে অবশ্যই নিরাপত্তামুলক ব্যবস্থা নেন। ওদিকে কলম্বোর স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর গুরলিাইন-বেরে সিনড্রোমে সেখানে মারা গিয়েছেন ৩ জন। দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের পরিচালক মারথা লুসিয়া ওসপিনা বলেন, ওই তিন ব্যক্তিই জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফিওক্রুজের সভাপতি পাওলো গাদেলহা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিজ্ঞানীরা মানুষের থুথু (স্যালাইভা) ও মুত্রে জিকা ভাইরাস পেয়েছেন। এতে এই দুটি মাধ্যম থেকে অন্যের দেহে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ জন্য তিনি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে একান্ত সঙ্গী ছাড়া কাউকে চুমু না দিতে তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এমন এক সময়ে এ সতর্কবার্তা দেয়া হলো যখন ব্রাজিলে ৫ দিনব্যাপী বাচ্চানালিয়া কার্নিভাল শুরু হতে যাচ্ছে। এ উৎসবে বিরতিহীনভাবে লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়ে মদ পান করেন। পার্টি চলে, যেখানে একে অন্যকে চুমু দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। তবে এক্ষেত্রে তিনি সবাইকে বিরত থাকতে বলেন নি। গাদেলহা বলেছেন, এ সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে অন্তঃসত্ত্বাদের। গাদেলহা আরও বলেন, এডিস এইগপিটি মশারা শুধু ডেঙ্গু ছড়ায় না। একই সঙ্গে তারা হলুদ জ্বরের জন্যও দায়ী। এই মশা-ই হলো জিকা ভাইরাসের মূল বাহক। তাই এই মশা নির্বংশ করা হবে শীর্ষ অগ্রাধিকার।

ধন–মান নিয়ে লড়াই by আলী ইমাম মজুমদার

ধন ও মান মানুষের চিরন্তন চাওয়ার বিষয়। সবাই তা চায়। আর এটা পেতে চালায় সাধ্যসাধনা। অব্যাহত থাকে নিরন্তর প্রচেষ্টা। তবে সে প্রচেষ্টা যখন কিছুটা মাত্রা লঙ্ঘন করে, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যক্রম হয় ব্যাহত। শঙ্কিত হয় আপামর জনগণ। এরূপই অনেকটা ঘটে চলছে বর্তমান বেতন স্কেলটি ঘোষিত হওয়ার পর থেকে। এর কিছু কারণও আছে। আবার কেউবা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টায় আছেন। সরকারি মানক্রমের সঙ্গেও একে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে।
টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড রদ হওয়ায় কোনো কোনো ক্যাডার কিংবা নন-ক্যাডার পদগুলোয় ওপরের দিকে যাওয়ার সুযোগ কমে যায়। বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে বিষয়টির সুরাহা করতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি টিম কাজ করছে। তারা শিগগির গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমস্যাটি প্রধানমন্ত্রী নিজে দেখবেন বলে তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন। আমরাও এটার একটা যৌক্তিক ও দ্রুত সমাধানের অপেক্ষায় আছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে শিক্ষকেরা ক্লাসে ফিরে গেছেন। স্বীকার করতে হবে, এ শিক্ষকদের বিরতিহীন প্রচেষ্টায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট এখন আর নেই। সাফল্যটি ধরে রাখতে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ শান্ত রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। বিরত থাকা সংগত অন্যের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া থেকে। পাশাপাশি কারও ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করাও অসংগত। বেতন স্কেল ঘোষিত হলে বরাবরই কিছু অসংগতি দেখা দিয়েছে। তার মীমাংসাও হয়েছে। আর এবারেও হবে।
এর ধারাবাহিকতায় বরাবরই সাংবিধানিক পদধারীদের বেতন বা পারিতোষিকও বৃদ্ধি করতে হয়। প্রয়োজন হয় আইন সংশোধনের। এমনভাবে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বিচারপতি, স্পিকার, সাংসদদের বেতন বা পারিতোষিক এবং ভাতাদি বৃদ্ধির সংশোধনী বিলও পেশ করা হয়েছে জাতীয় সংসদে। এ-বিষয়ক সংসদীয় কমিটি সাংসদদের ব্যতীত বাকি সব কটি সুপারিশ করেছে পাসের পক্ষে। সাংসদদের প্রসঙ্গে তাদের মতামত, এ বৃদ্ধি অপ্রতুল। তা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের চেয়ে কম। পারিতোষিক বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁরা মর্যাদাক্রম নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে একে উন্নীত করার দাবি করেছেন। তাঁদের পারিতোষিক ২৭ হাজার ৫০০ থেকে ৫৫ হাজারে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। এটা শতভাগ বৃদ্ধি। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য তা বাড়ছে ৯৫ শতাংশ।
সাংসদদের পারিতোষিক তো প্রজাতন্ত্রের ঊর্ধ্বতন কর্মচারীদের চেয়ে কমই ছিল বরাবর। মানক্রমে তাঁরা সচিবদের ওপরেই। আর সে স্থিতাবস্থা বজায় রেখেই বিলটি তৈরি হয়। উপমহাদেশের অপর দুটো দেশ ভারত ও পাকিস্তান প্রসঙ্গ এখানে আলোচিত হতে পারে। ভারতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের বেতন ৯০ হাজার রুপির সঙ্গে ১০৭ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা ও অন্যান্য ভাতা যোগ করে ২ লাখ ১৯ হাজার রুপি। সেখানে সাংসদদের পারিতোষিক ৫২ হাজার রুপি। এটাকে কিছু বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। সে দেশটির মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মানক্রম উপমন্ত্রীর ওপরে। ইন্টারনেটের কল্যাণে এ বিষয়ে গুলগল্প করার সুযোগ নেই। পাকিস্তানে সিভিল সার্ভিসকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিভিল সার্ভিস বলা হয়। বেতন-ভাতা, সুবিধাদিসহ তাদের সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য মাসিক চার লাখ রুপি ব্যয় হয়। বিদ্যুৎ ও পানির বিল দিতে হয় না। সেখানে জাতীয় পরিষদ সদস্যরা পারিতোষিক লাভ করেন ১ লাখ ২০ হাজার রুপি। ওই দেশটিতেও এমএনএ ও সিনেটরদের মানক্রমে অবস্থান মন্ত্রণালয় বিভাগের দায়িত্বে থাকা সেক্রেটারি জেনারেলদের বেশ কয়েক ধাপ নিচে। এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রীদের অবস্থানও সশস্ত্র বাহিনীগুলোর প্রধানদের নিচে।
আপাতত স্থিতাবস্থা রাখতে আগের নিয়মটি চালু রাখা সংগত হবে। কোনো কারণেই শিক্ষকদের প্রতি অবজ্ঞা অগ্রহণযোগ্য। ঠিক তেমনি প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের পদে যেতে বিদ্যা, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের প্রতি অকারণ অবজ্ঞাও অযাচিত প্রকৃতপক্ষে একটি দেশের রাষ্ট্রীয় মানক্রম নির্ধারিত হয় সে দেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিসহ অন্য অনেক কিছু বিবেচনায়। তাই স্থান, কাল, পাত্রভেদে এর পার্থক্যও বড় ধরনের। বরাবর ঊর্ধ্বতন আদালতের বিচারপতিরা উঁচু মর্যাদা ভোগ করছেন প্রায় সব ক্ষেত্রে। সেও আবার সব দেশেই এক রকম নয়। যেমন যুক্তরাজ্যে রাজা-রানি ছাড়াও রাজপরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্যও মানক্রমে সর্বাগ্রে। তাঁদের পরে কেন্টার বাড়ির আর্চ বিশপ, লর্ড চ্যান্সেলর ও আরও দুজন আর্চ বিশপের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান। তারপর ফাস্ট লর্ড অব ট্রেজারি। অতঃপর প্রিভি কাউন্সিলের লর্ড প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, সংশ্লিষ্ট রাজ্যের গভর্নর, সংশ্লিষ্ট নগরীর মেয়র এবং হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভের স্পিকারের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি।
আমাদের উপমহাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতি মোটামুটি একই রকম। পাকিস্তানে নিরন্তর সেনাশাসনের জন্য সেদিকের পাল্লা ভারী। ভারতে গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা নিরবচ্ছিন্ন। তা সত্ত্বেও তারা বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর কোনোটিকেই অবজ্ঞা করেনি। যথোপযুক্ত স্থান দিয়েছে তাদের মানক্রমে। সেখানেও সামরিক বাহিনীর প্রধানদের মানক্রম উপমন্ত্রীদের ওপরেই। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের এক ধাপ নিচে। অবশ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সামরিক বাহিনীর প্রধানদের অবস্থান সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিচে। তবে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিদের ওপরে। তবে এমপিগণের অবস্থান কেন্দ্রীয় সরকারের সচিবদের ওপরেই রয়েছে।
আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় মাঝেমধ্যে আলোচনায় আসছে ইদানীং। আমাদের মানক্রমে উপাচার্যদের একটি অবস্থান নির্ধারণ করা আছে। এটা নিয়ে বিতর্ক হয়। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত প্রায় অর্ধশত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সেখানে ভারত সরকারের মানক্রমে উপাচার্যদের কোথাও রাখা হয়নি। তবে নিশ্চয়ই তাঁরা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন। আসন লাভ করেন যোগ্যতম স্থানেই। তবে গুটিকয় রাজ্য সরকার আবার ভারত সরকারের মানক্রমের সম্পূরক হিসেবে নিজস্ব একটি মানক্রম তৈরি করেছে।
এর মাঝে শিক্ষায় সবচেয়ে উন্নত কেরালা রাজ্য সরকারের সচিব পর্যায়ে উপাচার্যকে দেখানো হয়েছে। অর্থনীতিতে অগ্রসরমাণ গুজরাট সরকারে তাদের অবস্থান অতিরিক্ত মুখ্য সচিবের পর। রাজ্য সরকারের মুখ্য সচিব, অতিরিক্ত মুখ্য সচিব ও সচিব কেন্দ্রীয় সরকারের যথাক্রমে সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পর্যায়ে। অবশ্য পাকিস্তানে তাদের অবস্থান সচিবদের পরপর। এমনকি সে দেশটিতে ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষদের মর্যাদাও জেলা প্রশাসকের ওপরে। জেলা ও দায়রা জজ আর কর্নেলের সমান। অন্যদিকে, ভারতের কেরালা ও গুজরাটে জেলা ও দায়রা জজ আর জেলা প্রশাসকের অবস্থান একই স্তরে।
শ্রীলঙ্কার মানক্রম তালিকা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। জনপ্রতিনিধি ও উচ্চ আদালতের বিচারকদের পরপর সচিব, অ্যাটর্নি জেনারেল, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান এবং সরকারি সংস্থাসমূহের শীর্ষ নির্বাহীদের দিয়েই শেষ হয়েছে। মালয়েশিয়ায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের পরপরই মুখ্য সচিবের অবস্থান। তাঁর সমপর্যায়ে আছেন রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর। অবশ্য যে কয়টি দেশের প্রসঙ্গ এখানে আলোচিত হলো, তার বাইরেও অনেক দৃষ্টান্ত থাকবে। থাকতে পারে বেশ কিছু বিপরীতধর্মী চিত্র।
শিক্ষকদের লিখিত বা অলিখিত মানক্রমের সঙ্গে তাঁদের বেতন সম্পর্কিত করার যৌক্তিকতা নেই। এ বিষয়ে নিবন্ধকারের আগের অবস্থান অটুট রয়েছে এবং থাকবে। তাঁরা এত দিন যেসব সুবিধাদি ভোগ করেছেন, তা থেকে বঞ্চিত করা সংগত নয়। চাকরিতে সবাই আসেন এর সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা জেনে। সুতরাং, সর্বত্রই সমান সুযোগ থাকবে—এমনটা ভাবা অসংগত। এটা বুঝতে হবে প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারীসহ শিক্ষকদেরও। আর মর্যাদায় শিক্ষকেরা কারও চেয়ে কম নন। তাঁরা শুধু সচিব তৈরির কারিগর নন; রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীও তাঁদের কাছে লেখাপড়া শিখেছেন।
তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন নিতে পারে। শিক্ষক ও শিক্ষাদানের মানেও রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। বেতন কমিশনের সুপারিশেও কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার কথা রয়েছে। সেসব ভাবনা হয়তো সময়সাপেক্ষ। তবে কোথাও শুরু করতে হবে। আপাতত স্থিতাবস্থা রাখতে আগের নিয়মটি চালু রাখা সংগত হবে। কোনো কারণেই তাঁদের প্রতি অবজ্ঞা অগ্রহণযোগ্য। ঠিক তেমনি প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের পদে যেতে বিদ্যা, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের প্রতি অকারণ অবজ্ঞাও অযাচিত।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

নেতানিয়াহু কি খেপেছেন? by রবার্ট ফিস্ক

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কি খানিকটা পাগল হয়ে গেছেন? আমি এটাকে বিচ্যুতি বলতে নারাজ। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের কথার উত্তরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যা বললেন, তাতে আমি বুঝলাম, তিনি কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ। মুন গত অক্টোবর থেকে ইসরায়েলিদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, ‘তরুণ ফিলিস্তিনিরা বিচ্ছিন্নতা ও হতাশার গভীর অনুভূতি থেকে এসব করছে।’
বান কি মুন ঠিক কথাই বলেছেন, ‘গত ৫০ বছরের দখলদারি চলতে থাকা ও শান্তির প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার কারণে ফিলিস্তিনিদের হতাশা বেড়েছে।’ সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘সব যুগেই দেখা গেছে, নিপীড়িত মানুষেরা প্রকৃতিগতভাবে দখলদারির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।’
আমি জানি, জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে মুনের ক্ষমতা ফিজির নেতাদের সমান (ফিজির নেতাদের অশ্রদ্ধা করার জন্য বলছি না)। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মহাসচিবকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ উৎসাহিত করার জন্য কেন সমালোচনা করলেন?
আপনারা মনে করতে পারেন, তিনি ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের কথা বলছিলেন, কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও রাশিয়ার ইরানের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে কিছুটা খাপছাড়া হয়ে গেছেন, সে কারণেই হয়তো নিধিরাম সর্দার মুনের দিকে তির ছুড়েছেন তিনি।
কিন্তু আমাদের এ কথাও মনে রাখতে হবে যে এই নেতানিয়াহুই নিউইয়র্কে জাতিসংঘের দপ্তরে কালো ফিউজ দিয়ে বোমার এক হাস্যকর কার্টুন করেছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীকে এটা দেখানো যে তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে কী হতে পারে। অক্লান্ত লেখক ইউরি আভিনেরিসহ বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি লেখক নেতানিয়াহুর এই হাস্যকর কাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। এর মধ্যে কার্টুনের মতো একটা ব্যাপার ছিল, আমি আপনাদের বলতে পারি।
এটা মার্কিন, ইউরোপীয় ও রুশদের থামাতে পারত না, বিশেষত এ কারণে যে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও ইউরোপ তা করত না। কিন্তু নেতানিয়াহু কি এটা বুঝতে পারেন না যে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাঁর আচরণের কারণে ইউরোপীয়রা কতটা খেপত? ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা ফ্যাবিয়াস কী বলেছেন, তিনি কি তা লক্ষ করেননি? লঁরা বলেছিলেন, শান্তিপ্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে ফ্রান্স ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে।’ আমি মনে করি না যে সেখানে শান্তিপ্রক্রিয়া বলে কিছু ছিল। কারণ এটা সব সময়ই ছিল দখলদারদের সঙ্গে দখলীকৃতদের লড়াই, যেখানে সবাইকে ভান ধরতে হতো যে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সমপর্যায়ে রয়েছে। ব্যাপারটা কখনোই এমন ছিল না, এখনো নয়।
এবার একটু ইতিহাসের দোহাই পারা যাক। ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে জর্ডানের পশ্চিম তীর দখল করে নেয়। তারা সেখানে বসতি স্থাপন করে, পশ্চিম যেটাকে ইসরায়েলি ‘বসতি’ হিসেবে আখ্যা দেয়, অনেকটা আমেরিকার গহিন পশ্চিমে পশ্চিমা ‘বসতির’ মতো, যেটা ইসরায়েলিদের বসতি স্থাপনকে অনেকটা ইউরোপীয় মেজাজ দিয়েছিল। এরপর তারা দেখল, অন্যের জমিতে বেআইনিভাবে বসতি স্থাপন করার জন্য পশ্চিম তার সমালোচনা করছে। ইসরায়েল সরকার ঠিক কাজটিই করেছে, যে বিষয়ে অনেক ইসরায়েলিই এত দিন বিতর্ক করে এসেছে, কারণ এর ফলে ইসরায়েল জাতিসংঘের নির্ধারিত সীমান্তের বাইরেও ভূমির ‘মালিক’ হয়েছে। এর ফলে ইসরায়েলই এখন একমাত্র দেশ, যে এখনো উপনিবেশবাদী যুদ্ধ করছে।
ফিলিস্তিনিরা বলেছে, এটা একদম চুরির শামিল, অটোমান ও ব্রিটিশ শাসনে তারা এ ভূমির বৈধ মালিক ছিল। ঠিক কথাই বলেছে তারা। ফিলিস্তিনিদের দখলে থাকা জমি এভাবেই ইসরায়েলিরা কেড়ে নিয়েছে আর সেখানকার পণ্য যেমন সবজিসহ অন্যান্য জিনিস অবৈধভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে বিক্রি করত তারা। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন এর প্রতিবাদ করেছে, তখন তারা দুর্বৃত্তের মতো তাকে সেমিটীয়বিরোধী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এভাবেই ঘৃণার সঞ্চার হয়েছে।
আমি সন্দেহ করি, মুন যে ইহুদিদের আরব ভূমি দখল করে নেওয়ার কথা বলেছিলেন, সেটাই আসলে নেতানিয়াহুর পছন্দ হয়নি। তিনি যা বলেছিলেন তা হলো, ‘ধারাবাহিকভাবে এই বসতি স্থাপন চলতে থাকলে তা ফিলিস্তিনি জনগণ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি অবজ্ঞার শামিল’, আমি বরং ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। মুন যা বলেছেন আমরাও তা জানি। সেটা হলো অধিকৃত মানুষ দখলদারির বিরোধিতা করে, যেখান থেকে ওই ভূমি ‘ঘৃণা ও চরমপন্থার উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়’। ইরাকিরা কি এভাবে আমাদের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে? আফগানরাই–বা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে? আর ফিলিস্তিনি ইহুদিরাই-বা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যখন সেখানে ব্রিটিশরা ছিল?
কিন্তু এখন ‘ফিলিস্তিনে’ (দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইদানীং এই ইনভার্টেড কমা হরদম ব্যবহার করতে হচ্ছে) পরাধীন মানুষ আছে। আমরা জানি, দখলদারির মধ্যে কী হতে পারে। মানুষ হয় সাংঘাতিকভাবে প্রতিরোধ করে, না হয় তারা চলে যায়। ফিলিস্তিনিরা ভূমি ছেড়ে চলে গেলেই বোধ হয় নেতানিয়াহু খুশি হতেন। কারণ তাহলে তিনি আরও দ্রুত তাদের ভূমি দখল করতে পারতেন। কিন্তু তারা যদি পশ্চিম তীর থেকে ইউরোপের পথ ধরে, তাহলে কী হবে? আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, আরব ও মুসলমানরা কীভাবে অস্ট্রিয়া ও জার্মানির দিকে গিয়েছে। গাজার গোবরের স্তূপ থেকে মানুষ ছোট নৌকায় করে গ্রিস ও ইতালির দিকে যেতে শুরু করলে ব্যাপারটা কেমন হবে?
মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বিপদ আছে, যে ব্যাপারে ইউরোপীয়দের আরও সচেতন হওয়া উচিত। বা তারা কি সেটা বুঝতে পেরেও বলতে চায় না? বা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কি সত্য জানেন না? নাকি তিনি খেপেছেন?
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

গণতন্ত্রের স্বার্থেই দ্রুত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দরকার : পঙ্কজ ভট্টাচার্য

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে যে ঘাটতি ছিল তা পূরণের লক্ষ্যে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছেন ঐক্যন্যাপের সভাপতি প্রবীন রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, গনতন্ত্রকে মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থেই এটা অপরিহার্য। আর এজন্য একটি শক্তিশালী স্বশাসিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতাবান করতে হবে। এর পাশাপাশি বিচার বিভাাগর স্বাধীনতাও নিশ্চিতের পরামর্শ দেন তিনি।
প্রবীন এই রাজনীতিক দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করাকে সময়ের দাবি উল্লেখ করে আরো বলেন, এটা গণতন্ত্র মজবুতির পূর্বশর্ত।
আজ শনিবার সেগুনবাগিচাস্থ মুক্তিযুদ্ধ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। এতে অন্যদের মধ্যে আসাদুল্লাহ তারেক, অ্যাডভোকেট এ এস এম এ সবুর, আবদুল মুনায়েম নেহেরু, হারুনুর রশিদ ভুইয়া, অলিজা হাসান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, গণতন্ত্রের আরেক বিপদ হচ্ছে কায়েমী স্বার্থবাদী আমলাচক্র। সরকার বদল হয় কিন্তু গণবিরোধী আমলাচক্র অপরিবর্তিত থাকে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র বিপদাপন্ন হয় এমন কোনো উদ্যোগ কাম্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশ পাকিস্তান কূটনৈতিক সর্ম্পক পুণবিন্যাসের পরামর্শও দিয়েছেন।তিনি বলেন, অবন্ধুসুলভ রাষ্ট্রের আদলে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সর্ম্পক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। তিনি আরো বলেন, একাত্তরের অপরাধের জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে। অপরদিকে দেশটিকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করতে বিশ্বজনমতের গঠনের পরামর্শ দেন তিনি

‘মুরগির ব্যবসায় চুরিটাই লাভ’

রাজধানীর মালিবাগ বাজার। রেললাইনের পাশ ঘেষে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ বাজার। সারি সারি দোকানে বিক্রি হচ্ছে সবরকম নিত্যপণ্য। ডিজিটাল পাল্লার ছড়াছড়ির এ সময়েও অধিকাংশ দোকানি পণ্য বিক্রি করছেন সনাতন পদ্ধতির মিটার পাল্লায়। কয়েক ডজন মুরগির দোকান থাকলেও প্রত্যেকেই বেছে নিয়েছেন ওই পাল্লাই। মাথায় চড়ানো থাকে মস্ত বড় বালতি।
বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মিটার পাল্লা ও বালতির ওপর ভর করে গড়ে ওঠা এ ব্যবসায় ক্রেতাদের অবস্থান খুবই দূর্বল। তারা চাইলেও যাচাই-বাছাই করে ক্রয়কৃত পণ্যের পরিমাপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বালতি ভর্তি মুরগির পরিমাণ সম্পর্কে বিক্রেতা যা বলবেন সেটাই চূড়ান্ত। নিরূপায় ক্রেতা সাধারণ বাধ্য হয়েই মেনে নিচ্ছেন বিক্রেতার ঘোষণা।
তবে এমন ঘটনার ব্যাত্যয় যে ঘটে না তা নয়। আজ শুক্রবার সময় বেলা সাড়ে ১১টা। এক ব্যক্তি ১৪০ টাকা কেজিদরে কিনলেন দু’টি ফার্মের সাদা মুরগি। বালতি থেকে নামিয়ে বিক্রেতা জানালেন, চার কেজি ৩৫০ গ্রাম হয়েছে। দাম ৬১০ টাকা। অবাক ক্রেতা প্রশ্ন করলেন, এতো টাকা এসেছে? অনেকটা জোর করেই বালতি থেকে নামিয়ে নিলেন মুরগিগুলো। পাশের সবজি দোকানি ছিল তার পূর্ব পরিচিত। পা বেধে মুরগি দুইটি তুলে দিলেন ওই দোকানির ডিজিটাল পাল্লায়। মিটারে উঠলো তিন কেজি ৫১২ গ্রাম।
বিক্রেতার হাতে ৪৯০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে মুরগি নিয়ে হাটতে শুরু করলেন ক্রেতা। বিক্রেতার দাবি, আরো ১২০ টাকা দিতে হবে।
দীর্ঘ বিতর্কের পর বিক্রেতা সুমন অকপটে জানালেন, ‘চুরি না করলে মুরগির ব্যবসা করা সম্ভব নয়।’
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুমনের বক্তব্য, ‘এ মুরগি ১৪০ টাকা দরেই কিনতে হয়েছে। দুই জন লোকের বেতন, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, বিভিন্ন গ্রুপের চাঁদাসহ দৈনিক অন্তত দুই হাজার টাকা খরচ আছে। পুরো টাকাটাই এখান থেকে তুলতে হয়।’
১৪০ টাকায় মুরগি কিনে একই দামে বিক্রি করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুমন জানায়, ‘কমপিটিশনের ব্যবসা। চাইলেও অন্যদের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা যায় না। তাছাড়া মুরগির ব্যবসায় চুরিটাই লাভ। এই টাকা দিয়াই সব খরচ মিটাতে হয়।’
তার দাবি, ‘সারা ঢাকা শহরে একটা মুরগির দোকানও পাইবেন না যেখানে মাপে কম দেয়া হয় না।’ ১০০টা মুরগি আনলে ১০টা মরে যায় উল্লেখ করে সুমন জানায়, চুরি না করলে কেনা দামে বিক্রি করে কীভাবে?’
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মালিবাগ বাজারের ন্যায় রাজধানী ঢাকার প্রায় সব বাজারেই মুরগির পরিমাপ হয় মিটারের পাল্লায়। দুর্বোধ্য এ পাল্লার ক্ষেত্রে বিএসটিআইর আপত্তি থাকলেও বিক্রেতারা তাতে পাত্তা দিচ্ছে না। এ নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে প্রতিনিয়ত বচসা লেগে থাকতে দেখা যায়। আবার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বিবেচনায় তাদের বিরুদ্ধে বিএসটিআইও কোনো অভিযান পরিচালনা করে না। ফলে প্রতিনিয়তই প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলেছেন লাখ লাখ ক্রেতা।
এদিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। শীতকালে বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠান বেশি থাকায় এ বাড়তি দাম বলে জানান তারা। বাজারভেদে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। লেয়ার মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। আগের মতোই ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে গরুর গোশত। খাসী বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকায়।
মাছ বিক্রেতারা জানান, মওসুমি কারণেই হাওর-বাওরে এখন প্রচুর পরিমাণ মাছ ধরা পড়ছে। এ কারণে বাজারে মাছের দাম কিছুটা কম বলে জানান বিক্রেতারা। খুচরা বাজারে গতকাল প্রতি কেজি মাঝারি আকারের রুই ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, বড় দেশি রুই ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, আমদানি করা রুই ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, তেলাপিয়া ১৩০ থেকে ২০০ টাকা, পাঙ্গাস ১২০ থেকে ১৮০ টাকা, চাষের কৈ ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা, মাঝারি আকারে ইলিশের জোড়া ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, চিংড়ি, বেলে, বাইম, টেংরা, পোয়া প্রভৃতি মাছ ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতি কেজি গরুর গোশতের দাম ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা, খাসি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকা, লেয়ার ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়।
খুচরা বাজারে আজ প্রতি কেজি দেশি রসুন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা, তিন দানা রসুন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, একদানা রসুন ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা ও চীনা রসুন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, দেশি আদা ১০০ থেকে ১১০ টাকা এবং চীনা আদা ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। চিনি বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৪২ টাকা কেজিদরে। এছাড়া মশুরের ডাল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, ছোলার ডাল ৭২ থেকে ৮০ টাকা, ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি হালি ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা, দেশি মুরগি ডিম ৪৫ টাকা, হাঁসের ডিম ৪০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়।
বাজারে আজ অধিকাংশ সবজিই আগের সপ্তাহের দামে বিক্রি করতে দেখা যায়। অপরিবর্তিত আছে অধিকাংশ মুদিপণ্যের দামও। চালের মধ্যে মিনিকেট প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৪৫ থেকে ৪৮ টাকায়। মোটা চাল (স্বর্ণা) ৩২ থেকে ৩৫ টাকা, পাইজাম ৩২ থেকে ৩৫ টাকা, কাটারিভোগ ৬৫ থেকে ৭০ টাকা, আঠাশ ৩৮ থেকে ৪২, উনত্রিশ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সূচকে ৬ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সূচকে ছয় ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। এবার বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৭তম। বিশ্বের ১৭৮টি দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে গতকাল এ বছরের সূচক প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন।
এবারের সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা স্কোর গত বছরের চেয়ে ০.৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩.৩। আর দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘প্রধানত মুক্ত নয়’ (মোস্টলি আনফ্রি)।
গত বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার স্কোর ছিল ৫৩.৯ এবং তালিকায় বাংলাদেশ ছিল ১৩১ নম্বরে। ২০১৩ সালে ১৩২ এবং তার আগের বছর ১৩০ নম্বরে ছিল বাংলাদেশ। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২৯তম।
সংস্থাটি বলছে, সরকারি অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য সফলতা থাকলেও আইনের শাসন আর মুক্ত বাজার নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ।
বাংলাদেশ নিয়ে দেশভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ দারুণ ম্যাক্রোইকোনোমিকস স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। আর দেশটির অর্থনীতি গত পাঁচ বছরে স্থিতিশীলভাবে অগ্রগতি হয়েছে।
তবে অনিশ্চিত নিয়ন্ত্রক পরিবেশ, অনুন্নত অবকাঠামো এবং বেসরকারি খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অনুপস্থিতির কারণে উদ্যোক্ততাদের সার্বিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। দুর্বল আইনের শাসনের ফলে অব্যাহতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
দুর্নীতি আর সম্পদ অধিকারের প্রান্তিক প্রয়োগ মানুষ আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিক খাত থেকে ছিটকে ফেলেছে। আর মৌলিক পণ্য সরবরাহ করার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা ব্যবসাউন্নয়ন আর চাকরিতে অগ্রগতিতে আরো সীমাবদ্ধ করেছে।
এবার তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নিচে শুধু রয়েছে নেপাল (১৫১তম)। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ৯৩, ভুটান ৯৭, ভারত ১২৩, পাকিস্তান ১২৬ ও মালদ্বীপ রয়েছে ১৩২তম অবস্থানে।
তালিকায় শীর্ষ পাঁচ দেশ হলো হংকং, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া।

জড়িত পুলিশ সদস্যের বিচার দ্রুত বিচার আইনে করতে হবে : সুরঞ্জিত

পুলিশের নির্যাতনে চা বিক্রেতা মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এনে একমাসের মধ্যে বিচার শেষ করার আহবান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
তিনি বলেছেন, শাহ আলী থানার জড়িত পুলিশ সদস্যদের শুধু প্রত্যাহার করলে হবে না, অবিলম্বে ফৌজদারি অপরাধে ৩০২ ধারায় এফআইআর দাখিল করে প্রত্যেককে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করতে হবে। মানুষ দেখুক যে, আইন পুলিশের জন্যও আছে। এটাকেই বলে সুশাসন। শুধু ন্যায়বিচারের কথা বললেই হবে না, দেখাতে হবে ন্যায়বিচার হয়েছে।
আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু একাডেমি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এসব কথা বলেন। সরকারের উদ্দেশ সুরঞ্জিত সেন বলেন, তেলের আগুনে চা দোকানির মৃত্যু একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। মানুষ যার ওপর সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে সেই পুলিশ এ ঘটনার সাথে জড়িত। সেখানে তদন্তের কী আছে? অবিলম্বে এই মামলাটিকে দ্রুত বিচার আইনের আওতায় নিয়ে একমাসের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন।
আয়োজক সংগঠনের সহ-সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাসের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের উপ কমিটির সহ সম্পাদক ইস্কান্দর মির্জা শামীম, বঙ্গবন্ধু একাডেমীর মহাসচিব হুমায়ুন কবির মিজি প্রমুখ

প্রসূতিদের আপন ঠিকানা by মাহবুবুর রহমান

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দুর্গাপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য
ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে অস্ত্রোপচার ছাড়াই জন্ম
নেওয়া নবজাতককে পোশাক উপহার দিচ্ছেন ইউপি
চেয়ারম্যান এম এ জলিল। সম্প্রতি তোলা ছবি l ​প্রথম আলো
মাত্র বছর দুয়েক আগেও অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। নামমাত্র স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হতো কেন্দ্রটি থেকে। অন্য রোগীদের মতো প্রসূতিরাও সব সময় ছুটে যেতেন শহরের দিকে। কিন্তু বদলে গেছে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবা কার্যক্রম। প্রসূতি সেবাদানে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আজ অনন্য এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
আলোচিত এই সেবা প্রতিষ্ঠানটি হলো নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র। যেটি এখন শুধুই স্বাস্থ্যকেন্দ্র নয়, প্রসূতিদের কাছে নিরাপদ সন্তান প্রসবের এক আপন ঠিকানা। অল্প দিনে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে। এখানে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা প্রসূতি মায়েরা আসেন নিরাপদে সন্তান প্রসবের জন্য। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বিনা খরচে সন্তান প্রসব শেষে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যান তাঁরা।
তাই এখন শুধু দুর্গাপুর ইউনিয়নের প্রসূতিরাই নন, আশপাশের ইউনিয়ন এবং উপজেলার প্রসূতিরাও আসেন এখানে সেবা নিতে। এক মাসে ১১৪ শিশুর জন্মগ্রহণের সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি।
হঠাৎ কীভাবে কার উদ্যোগে বদলে গেল স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির চিত্র। সেই মানুষটি হলেন স্থানীয় দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদেরই (ইউপি) চেয়ারম্যান এম এ জলিল।
বদলে যাওয়ার কথা: চেয়ারম্যান এম এ জলিল জানালেন, এর আগেও একবার তিনি দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন সরকারি উদ্যোগে তাঁর ইউনিয়নে ওই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সেবা কার্যক্রম নিয়ে তখন তিনি ততটা ভাবেননি। এরই মধ্যে তাঁর মেয়াদ শেষ হয়। পরের কয়েকবার তিনি আর নির্বাচন করেননি। সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে তিনি আবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান হিসেবে ২০১৪ সালের প্রথম দিকে তিনি সেভ দ্য চিলড্রেনের একটি প্রকল্পের অধীনে এক কর্মশালায় যোগদানের সুযোগ পান। ওই কর্মশালায় মা ও শিশু স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিশেষ করে নিরাপদ মাতৃত্ব নিয়ে যেসব আলোচনা হয়, তাতে তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। সিদ্ধান্ত নেন নিজের ইউনিয়নে অবহেলায় পড়ে থাকা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে সেবাবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার। তিনি জানান, কর্মশালা ঘিরে পরিষদের সদস্যদের এক বৈঠকে তিনি তাঁর আগ্রহের কথা তুলে ধরলে তাঁরাও উৎসাহী হন। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগী বেসরকারি ওই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গেও যোগাযোগ করে তাঁদের সহযোগিতা চান তিনি।
বেসরকারি ওই প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তিনজন প্যারামেডিক (নার্স), দুজন আয়া ও একজন নিরাপত্তা প্রহরী দেওয়া হয়। এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ থেকে একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তার (সাকমো) পাশাপাশি দেওয়া হয় একজন চিকিৎসককে। যিনি সপ্তাহে দুদিন এই কেন্দ্রে বসে রোগী দেখেন। দুটি বেড (সিট) দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। এখন বেডের সংখ্যা নয়টি।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একদিন: গত ১৪ জানুয়ারি বেলা ১১টার দিকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকতেই চোখে পড়ে আশপাশের পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ। ভেতরে ঢোকার পর দেখা যায়, সামনে খোলামেলা কক্ষে বসা ১৩-১৪ জন নারী। কারও কারও সঙ্গে আছেন পুরুষও। তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেরই কোলে বিভিন্ন বয়সের শিশু। কারও কোলে নবজাতক। এরই মধ্যে ভেতরের একটি কক্ষ থেকে ভেসে আসে নবজাতকের কান্নার আওয়াজ। কয়েক মিনিট পর কর্তব্যরত সেবিকা রোখসানা হাসতে হাসতে এগিয়ে আসেন নতুন তোয়ালে মোড়ানো ওই নবজাতককে কোলে নিয়ে। বলেন, কেবলই দুনিয়ার আলোর মুখ দেখেছে এই নবজাতক।
কেমন লাগছে জানতে চাইলে রোখসানা বলেন, ‘অনেক ভালো। মায়ের গর্ভ থেকে সন্তান সুস্থভাবে দুনিয়ায় এলে মা যেমন সব কষ্ট ভুলে যান, তেমনি আমাদের কাছেও খুব ভালো লাগে।’
সেবা গ্রহণকারীদের বক্তব্য: বেগমগঞ্জের শরিফপুর ইউনিয়নের ফাতেমা আক্তার বলেন, তাঁর ছোট বোন আশেয়া গর্ভবতী ছিলেন। তাঁর স্বামীর বাড়ি বেগমগঞ্জের (চৌমুহনী শহরে)। তাঁকে গত ১০ ডিসেম্বর চৌমুহনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিলে একজন নারী চিকিৎসক বলেন, ‘গর্ভের বাচ্চা উপরে উঠে গেছে, দ্রুত অস্ত্রোপচার করতে হবে।’
তাঁরা দুশ্চিন্তা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। পরদিন লোকমুখে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কথা শুনে এখানে আসেন। এখানে বিনা অস্ত্রোপচারে তাঁর বোনের একটি কন্যাসন্তান প্রসব হয়।
শুধু ফাতেমাই নন, সেবা নিতে আসা একই উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের লাউতলীর সোনিয়া আক্তার, চৌমুহনী পৌরসভার শাহীন সুলতানা, ঝরনা আক্তার, হাজীপুরের শিরিন আক্তার ও কাদিরপুরের জাহানারা বেগম এবং পার্শ্ববর্তী সেনবাগ উপজেলার বীজবাগ গ্রাম থেকে আসা নুরুল হকও জানান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে বিনা অস্ত্রোপচারে নিয়মিত সন্তান প্রসব করানোর কথা।
চৌমুহনী পৌরসভার বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, এখানে বিনা খরচে যে ধরনের সেবা পাওয়া যায়, তা বেসরকারি হাসপাতালে টাকা দিয়েও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। তাই তিনিও তাঁর স্ত্রীর সন্তান প্রসব এখানে করিয়েছেন। চেষ্টা করেও কর্তব্যরত ব্যক্তিদের কোনো বকশিশ দিতে পারেননি। সন্তান হওয়ার পরও নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ তাঁরা পাচ্ছেন এখান থেকে।
পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ঝরনা বেগম জানান, পুরো ইউনিয়নের গর্ভবতী মায়েদের তথ্য রয়েছে তাঁদের কাছে। মাঠপর্যায়ে থাকা কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গর্ভবতী মায়েদের নাম-ঠিকানা ও মুঠোফোন নম্বর নিয়ে আসেন। এরপর মাসিক বৈঠকে ওয়ার্ড ও গ্রামভিত্তিক গর্ভবতী ও প্রসবযোগ্য মায়েদের দুটি আলাদা মানচিত্র তৈরি করা হয়। এসব কাজ সার্বক্ষণিক তদারক করেন ইউপি চেয়ারম্যান।
২৪ ঘণ্টা ক্লান্তিহীন সেবা: স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে এবং আশপাশের বাজারে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। যাতে লেখা রয়েছে, ‘এখানে ২৪ ঘণ্টা নরমাল ডেলিভারি করা হয়।’ সাইনবোর্ডের লেখা অনুযায়ী সেবাদানের হেরফের হয় না। দিন-রাতের কোনো ভেদাভেদ নেই। যখনই প্রসূতি আসেন, তখনই সেবা দেওয়া হয়। অনেক সময় গভীর রাতেও ঘুম থেকে উঠে সন্তান প্রসব করাতে হয় বলে জানালেন প্যারামেডিক রেবেনা আক্তার ও সিপু মজুমদার।
উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব বলেন, ২০১৪ সালের ২৩ জুলাই থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রেটিতে প্রসূতি মায়েদের সন্তান প্রসব শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৯০০ নবজাতকের জন্ম হয়েছে এখানে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বর মাসেই জন্ম হয়েছে ১১৪ শিশুর।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে জানানো হয়, প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবায় এই কেন্দ্রের সফলতার খবর শুনে পার্শ্ববর্তী কিছু ইউনিয়নেও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে একই ধরনের সেবা চালু করার জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যানরা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া এই কার্যক্রমের কথা জেনে ইতিমধ্যে তুরস্ক ও মিসরের একজন করে প্রতিনিধি কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে গেছেন।
চেয়ারম্যান এম এ জলিল বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি সেবামূলক অনেক কাজই করেছেন। কিন্তু নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যে ব্যবস্থা করতে পেরেছেন, সেটি জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সেবা বলে মনে হয় তাঁর। প্রতিটি নবজাতক শিশুর জন্মের পর এক সেট নতুন জামা ও একটি তোয়ালের ব্যবস্থা করেন তিনি।
জলিল সাহেব জানালেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সেবাকেন্দ্রটির জন্য সাধ্যমতো সহায়তা করা হয়। ওষুধপথ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকেও ভালো সহায়তা পেয়েছেন। তবে তাঁর ইচ্ছা একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, দুর্গাপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি সারা দেশের জন্য একটি মডেল হিসেবে ইতিমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে। উচ্চ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তাও এরই মধ্যে এ সফলতা দেখে গেছেন। একজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইচ্ছা করলে কী না করতে পারেন, এম এ জলিল তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের করুণ মৃত্যু

হাফিজুর মোল্লা
এক মাস আগে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবা অটোরিকশাচালক। বাসা ভাড়া করে থাকার সামর্থ্য ছিল না। তাই ছাত্রলীগের ‘বড় ভাইদের’ মাধ্যমে উঠেছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম (এস এম) হলে। থাকতে হতো বারান্দায়, যেতে হতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে।
মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হাফিজুর মোল্লা (১৯) শীতের রাতের এত ধকল সইতে পারেননি। আক্রান্ত হন নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডে। চলে যান গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ভাষানচর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুরে। শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ হলে ভালো চিকিৎসার জন্য রওনা দেন ঢাকায়। গত মঙ্গলবার রাতে পথেই তিনি মারা যান।
হাফিজুর বিশ্ব জাকের মঞ্জিল উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে জিপিএ-৫ পেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। গত বছর সদরপুর কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। গত মাসের প্রথম দিকে তিনি হলে ওঠেন। থাকতেন দোতলার দক্ষিণ পাশের বারান্দায়।
হাফিজুরের সহপাঠী ও পরিবারের অভিযোগ, শীতের মধ্যে বারান্দায় থাকা এবং রাতের বেলায় ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যাওয়ার কারণে হাফিজ ঠান্ডায় আক্রান্ত হন। অসুস্থ অবস্থায় তীব্র শীতের মধ্যেও হাফিজকে গত ২৬ জানুয়ারি রাতে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বাইরে থাকতে হয়। তাঁকে প্রায়ই অন্য কর্মীদের সঙ্গে হলের মাঠে ‘গেস্টরুম’ করতে হতো। তবে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হাফিজ আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন।
গেস্টরুম হচ্ছে ছাত্রলীগের একটি দলীয় রীতি। একটি নির্দিষ্ট সময়ে ছাত্রলীগের কনিষ্ঠ কর্মীদের সঙ্গে জ্যেষ্ঠরা বসে আলাপ-আলোচনা করেন। এ সময় তাঁদের ছাত্রলীগ করতে বা হলে থাকতে হলে কী করতে হবে, সে সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়। মূলত এটি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার একটি প্রয়াস। বিভিন্ন সময় সাধারণ ছাত্রদের এ কর্মসূচিতে যোগ দিতে চাপ দেওয়ারও অভিযোগ আছে।
হাফিজুরের বাবা ইসহাক মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত সপ্তাহের বুধবার হাফিজ ঢাকা থেকে বাড়ি এসেছিল। প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে এসেছিল। কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, “আমি আর বাঁচব না।” জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী হয়েছে। ও জানায়, শীতের মধ্যে বাইরে ‘‘ডিউটি’’ করতে হয়। ওই দিন নাকি সে ওদের বলেছে, তার শরীরটা ভালো না। ডিউটিতে যেতে পারবে না। কিন্তু তারপরও মাঠে নিয়ে গিয়ে রাত সাড়ে নয়টা থেকে একটা পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রেখেছে।’
হাফিজুর হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক দিদার মুহাম্মদ নিজামুল ইসলামের পক্ষের কর্মী ছিলেন। দিদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে সপ্তাহে দুই দিন গেস্টরুম করি। কিন্তু প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের গেস্টরুম করানো একেবারেই নিষেধ। তারা সিনিয়রদের সর্বোচ্চ সালাম দিয়ে চলে যায়।’ পরে তিনি খোঁজ নিয়ে জানান, গত ২৬ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) রাতে কিছুক্ষণের জন্য প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জ্যেষ্ঠরা মাঠে কথা বলেছিলেন। তবে জোর করে হাফিজুরকে কর্মসূচিতে নেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে ওকে হলে তুলেছি। বলেছি কোনো ধরনের সমস্যা হলে আমাকে বলতে। কিন্তু সে এ নিয়ে আমাকে কখনোই কিছু বলেনি।’
হাফিজুরের বাবা আরও বলেন, ‘হাফিজ ঢাকায় চিকিৎসক দেখিয়েছিল। তাকে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু বাড়িতে আসার পর আবার চিকিৎসক দেখালে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিউমোনিয়া ও টাইফয়েড ধরা পড়ে। স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করার পর অবস্থার অবনতি দেখে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য রওনা হই। পথে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে রাত ১১টা ২০ মিনিটে মারা যায় ছেলেটা।’
ফরিদপুরে হাফিজুরের চিকিৎসক আবু আহমেদ আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, হাফিজের নিউমোনিয়া ও টাইফয়েড হয়েছিল। ঠান্ডার কারণে বা ইনফেকশন থেকে এ রোগ হয়।
মুঠোফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইসহাক মোল্লা বলতে থাকেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। আমার সম্পদ ছিল একটাই। সেই পোলাডাই কষ্ট পাইয়া মইরা গেল।’
হাফিজুরের চাচা আবদুল জব্বার বলেন, গত বুধবার হাফিজের লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। কিস্তিতে একটি অটোরিকশা কিনে জীবিকা নির্বাহ করেন তাঁর বাবা ইসহাক মোল্লা। সেই কিস্তির টাকা আজও শোধ করতে পারেননি। পূর্ব শ্যামপুর গ্রামে আড়াই শতক জমির ওপর তাঁদের একটি টিনের ঘর রয়েছে। একটিই ছেলে ছিল। হাফিজুর বাবাকে বলতেন, ‘আর কয়েকটা বছর কষ্ট করো, বাবা। পড়াশোনা করে আমি একটা চাকরি তো পাব। আমাদের আর কষ্ট থাকবে না।’
জানতে চাইলে এস এম হলের প্রাধ্যক্ষ গোলাম মোহাম্মদ ভূঁইয়া বলেন, ছাত্রলীগের গেস্টরুমের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। হাফিজুরের বারান্দায় থাকার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘নিউমোনিয়া বারান্দায় থাকলেও হতে পারে, রুমে থাকলেও হতে পারে। আর বারান্দায় তো অনেকেই থাকে। তাদের তো কিছু হয়নি। হতে পারে সে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি চলে গেছে এবং সেখানে মারা গেছে

আপন রূপ ফিরে পাচ্ছে মেলা BY মাসুম আলী

অমর একুশে বইমেলার স্টলে পছন্দের বই খুঁজছে শিশুরা।
গতকাল ছুটির দিনের সকালটা ছিল বিশেষ করে তাদের জন্য
l ছবি: প্রথম আলো
 
মেলায় মানুষের ঢল নেমেছিল গতকাল শুক্রবার। বইমেলা যেন ছুটির দিনে তার আপন রূপ ফিরে পেল। বেলা ১১টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলায় ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। অনেককেই জোট বেঁধে আড্ডা দিতে দেখা যায়। বিক্রিবাট্টাও ছিল ভালো।
তবে হ্যাপাও ছিল। মানুষের পায়ে পায়ে ধুলা উড়ে বাতাস করে তুলেছিল ভারী। মেলা প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ছিটানো হয়নি—এমন অভিযোগ দর্শনার্থীদের। তবে ধুলা মাড়িয়ে সবাই ছুটে গেছেন পছন্দের বইটি কিনতে
মেলার এই ভিড় হাসি ফুটিয়েছে প্রকাশকদের মুখেও। অনিন্দ্য প্রকাশের প্রধান নির্বাহী আফজাল হোসাইন বললেন, বইমেলা এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। শুক্রবার বিপুল পাঠকের সমাগম ঘটেছে।
কথাপ্রকাশের সম্পাদক ও প্রকাশক জসিম উদদীন বলেন, আজকেই মূলত মেলা শুরু হলো। কারণ, এ কয়েক দিন কমবেশি মানুষ হলেও বিক্রি তেমন একটা হয়নি। আজ ভিড়ের সঙ্গে বিক্রিও হয়েছে ভালো।
সময় প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘এবার বৃহৎ পরিসরে মেলা হওয়ায় এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে পাঠকেরা আসছেন। আমি আশাবাদী এবারের মেলা নিয়ে।’ ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশের উদ্যোক্তা জহিরুল আবেদিন হতাশা প্রকাশ করেন ধুলাবালি নিয়ে। বলেন, এই ধুলাতে স্টলে বসে থেকে বিক্রি করা কঠিন।
প্রথমা প্রকাশনের সামনে প্রচণ্ড ভিড় দেখা গেছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়কারী জাফর আহমদ বলেন, নতুন বইয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো বইগুলোও পাঠকেরা খুঁজছেন।
গতকাল নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও নিশ্চিত করেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। সন্ধ্যার কিছুটা আগে বইমেলা পরিদর্শনে আসেন তিনি। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই জানিয়ে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, মেলা প্রাঙ্গণের নানা দিকে ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। দুরবিন দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। এ ছাড়া সিসি ক্যামেরায় সব ভিডিও ফুটেজে প্রত্যেক দর্শনার্থীর আগমন-নির্গমন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিকেল পাঁচটার দিকে বইমেলা পরিদর্শনে আসেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত বছর সেতুমন্ত্রীর একটি উপন্যাস বেরিয়েছিল বইমেলায়। এবার বেরিয়েছে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন নিয়ে বই যখন সাংবাদিক ছিলাম। চারুলিপি প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে বইটি।
বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে গুলতেকিন খানের আজো, কেউ হাঁটে অবিরাম বইটির প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে কবি গুলতেকিন খান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তাম্রলিপির প্রকাশক এ কে এম তরিকুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে গুলতেকিন বলেন, ‘আমি কবিতাগুলো নিজের মতো করে লিখেছি। এ কবিতাগুলোর কোনো একটি কিংবা কোনোটির দুই লাইন যদি আপনাদের কারও ভালো লাগে, সেটাই আমার সার্থকতা।’
সকালে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা: এর আগে সকাল সাড়ে আটটায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বসেছিল শিশু-কিশোর মেলা। তাদের জন্য সেখানে আয়োজন করা হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার। রংপেনসিল শহীদ মিনার, ফুল-ফল-প্রকৃতির ছবি মনের মাধুরী মিশিয়ে আঁকে তারা। আর তাদের জন্য বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সিসিমপুরের হালুম-ইকরি-টুকটুকি।
মূল মঞ্চের আয়োজন: বিকেল চারটায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী: অভিধান ও ব্যাকরণ কর্মসূচি, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার। আলোচনা করেন অধ্যাপক হাকিম আরিফ ও অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আহমদ কবির। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বেগম রাহিজা খানম ঝুনুর পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করেন ‘বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস’-এর শিল্পীবৃন্দ। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আবদুল লতিফ শাহ্, শফি মণ্ডল, রণজিৎ দাস বাউল, মমতা দাসী বাউল, ভজন কুমার ব্যাধ ও কোহিনুর আকতার গোলাপী।
নতুন বই: বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী গতকাল মেলায় নতুন ২৫৬টি বই এসেছে। নতুন বইয়ের তালিকায় প্রথমা প্রকাশন এনেছে গোলাম মুরশিদের আধুনিকতার অভিঘাতে বঙ্গরমণী, গেইল তুরিনের লেখা অসিত রায় অনূদিত আতঙ্কের দেয়াল: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত, কাইয়ুম চৌধুরীর জীবনে আমার যত আনন্দ ইত্যাদি।
এ ছাড়া মেলায় কথা প্রকাশন এনেছে সেলিনা হোসেনের নিঃসঙ্গতার মুখর সময়, মুনতাসীর মামুনের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি: দুই রাষ্ট্রপতি হত্যা, কবি প্রকাশন এনেছে নির্মলেন্দু গুণের না প্রেমিক না বিপ্লবী, রাতুল গ্রন্থপ্রকাশ এনেছে শামসুজ্জামান খানের নিষ্ঠুর রাজা ও দশ ভাই ইত্যাদি।
আজও মেলার দ্বার খুলবে ১১টায়: আজ শনিবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায়। চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত অভিভাবকসহ শিশুদের স্বাচ্ছন্দ্যে বই কেনার সুবিধার্থে শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হয়েছে

আপন রূপ ফিরে পাচ্ছে মে লা BY মাসুম আলী

মেলায় মানুষের ঢল নেমেছিল গতকাল শুক্রবার। বইমেলা যেন ছুটির দিনে তার আপন রূপ ফিরে পেল। বেলা ১১টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলায় ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। অনেককেই জোট বেঁধে আড্ডা দিতে দেখা যায়। বিক্রিবাট্টাও ছিল ভালো।
তবে হ্যাপাও ছিল। মানুষের পায়ে পায়ে ধুলা উড়ে বাতাস করে তুলেছিল ভারী। মেলা প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ছিটানো হয়নি—এমন অভিযোগ দর্শনার্থীদের। তবে ধুলা মাড়িয়ে সবাই ছুটে গেছেন পছন্দের বইটি কিনতে।
মেলার এই ভিড় হাসি ফুটিয়েছে প্রকাশকদের মুখেও। অনিন্দ্য প্রকাশের প্রধান নির্বাহী আফজাল হোসাইন বললেন, বইমেলা এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। শুক্রবার বিপুল পাঠকের সমাগম ঘটেছে।
কথাপ্রকাশের সম্পাদক ও প্রকাশক জসিম উদদীন বলেন, আজকেই মূলত মেলা শুরু হলো। কারণ, এ কয়েক দিন কমবেশি মানুষ হলেও বিক্রি তেমন একটা হয়নি। আজ ভিড়ের সঙ্গে বিক্রিও হয়েছে ভালো।
সময় প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘এবার বৃহৎ পরিসরে মেলা হওয়ায় এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে পাঠকেরা আসছেন। আমি আশাবাদী এবারের মেলা নিয়ে।’ ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশের উদ্যোক্তা জহিরুল আবেদিন হতাশা প্রকাশ করেন ধুলাবালি নিয়ে। বলেন, এই ধুলাতে স্টলে বসে থেকে বিক্রি করা কঠিন।
প্রথমা প্রকাশনের সামনে প্রচণ্ড ভিড় দেখা গেছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়কারী জাফর আহমদ বলেন, নতুন বইয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো বইগুলোও পাঠকেরা খুঁজছেন।
গতকাল নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও নিশ্চিত করেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। সন্ধ্যার কিছুটা আগে বইমেলা পরিদর্শনে আসেন তিনি। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই জানিয়ে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, মেলা প্রাঙ্গণের নানা দিকে ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। দুরবিন দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। এ ছাড়া সিসি ক্যামেরায় সব ভিডিও ফুটেজে প্রত্যেক দর্শনার্থীর আগমন-নির্গমন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিকেল পাঁচটার দিকে বইমেলা পরিদর্শনে আসেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত বছর সেতুমন্ত্রীর একটি উপন্যাস বেরিয়েছিল বইমেলায়। এবার বেরিয়েছে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন নিয়ে বই যখন সাংবাদিক ছিলাম। চারুলিপি প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে বইটি।
বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে গুলতেকিন খানের আজো, কেউ হাঁটে অবিরাম বইটির প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে কবি গুলতেকিন খান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তাম্রলিপির প্রকাশক এ কে এম তরিকুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে গুলতেকিন বলেন, ‘আমি কবিতাগুলো নিজের মতো করে লিখেছি। এ কবিতাগুলোর কোনো একটি কিংবা কোনোটির দুই লাইন যদি আপনাদের কারও ভালো লাগে, সেটাই আমার সার্থকতা।’
সকালে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা: এর আগে সকাল সাড়ে আটটায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বসেছিল শিশু-কিশোর মেলা। তাদের জন্য সেখানে আয়োজন করা হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার। রংপেনসিল শহীদ মিনার, ফুল-ফল-প্রকৃতির ছবি মনের মাধুরী মিশিয়ে আঁকে তারা। আর তাদের জন্য বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সিসিমপুরের হালুম-ইকরি-টুকটুকি।
মূল মঞ্চের আয়োজন: বিকেল চারটায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী: অভিধান ও ব্যাকরণ কর্মসূচি, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার। আলোচনা করেন অধ্যাপক হাকিম আরিফ ও অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আহমদ কবির। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বেগম রাহিজা খানম ঝুনুর পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করেন ‘বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস’-এর শিল্পীবৃন্দ। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আবদুল লতিফ শাহ্, শফি মণ্ডল, রণজিৎ দাস বাউল, মমতা দাসী বাউল, ভজন কুমার ব্যাধ ও কোহিনুর আকতার গোলাপী।
নতুন বই: বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী গতকাল মেলায় নতুন ২৫৬টি বই এসেছে। নতুন বইয়ের তালিকায় প্রথমা প্রকাশন এনেছে গোলাম মুরশিদের আধুনিকতার অভিঘাতে বঙ্গরমণী, গেইল তুরিনের লেখা অসিত রায় অনূদিত আতঙ্কের দেয়াল: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত, কাইয়ুম চৌধুরীর জীবনে আমার যত আনন্দ ইত্যাদি।
এ ছাড়া মেলায় কথা প্রকাশন এনেছে সেলিনা হোসেনের নিঃসঙ্গতার মুখর সময়, মুনতাসীর মামুনের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি: দুই রাষ্ট্রপতি হত্যা, কবি প্রকাশন এনেছে নির্মলেন্দু গুণের না প্রেমিক না বিপ্লবী, রাতুল গ্রন্থপ্রকাশ এনেছে শামসুজ্জামান খানের নিষ্ঠুর রাজা ও দশ ভাই ইত্যাদি।
আজও মেলার দ্বার খুলবে ১১টায়: আজ শনিবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায়। চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত অভিভাবকসহ শিশুদের স্বাচ্ছন্দ্যে বই কেনার সুবিধার্থে শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হয়েছে।

হিমালয়ের সেই ছেলেটির ‘বস’ হওয়ার গল্প

গুগলের সার্চ প্রধান অমিত সিংগাল
গুগলের সার্চ প্রধান অমিত সিংগাল অবসরে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে গুগলের সার্চ ব্যবসার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২৬ ফেব্রুয়ারি সিংগালের বিদায়ের দিন। তাঁর জায়গায় আসছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাগের নির্বাহী জন জ্ঞানেন্দ্র। ভারতের একটি ছোট শহর থেকে উঠে এসে গুগলের বড় একটি পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করার বিষয়টি তরুণদের জন্য প্রেরণাদায়ক। এ বিষয়টি সম্প্রতি উঠে এসেছে ইন্ডিয়া টুডে ও আইবিএনলাইভের প্রতিবেদনে।
২০০০ সালে গুগলে যোগ দিয়েছিলেন সিংগাল। তখন থেকে গুগলের ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিনের কারিগরি উন্নয়ন দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বে গুগল সার্চ ইঞ্জিনকে দ্রুত, স্মার্ট ও মোবাইল যন্ত্রে ব্যবহার উপযোগী করে তুলেছে। গুগল সার্চের ক্যালকুলেটর, আবহাওয়ার তথ্য যুক্ত করার মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। গুগল প্লাসে লেখা একটি পোস্টে সিংগাল লিখেছেন, ‘আমি যখন শুরু করেছিলাম, মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে আমরা গুগলকে এ অবস্থায় নিয়ে আসতে পারব। গুগলকে যে প্রশ্নই করা হোক না কেন, তথ্য খুঁজে এনে হাজির করবে। আমার প্রিয় স্টার ট্রেক কোম্পানি বাস্তবতার মুখ দেখছে। আমি যা ধারণা করেছিলাম, এটা তার চেয়ে বেশি কিছু।’
সিংগালের জন্ম ভারতের ঝাঁসিতে। তিনি আইআইটি রুকরি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি নেন। এরপর এমএস করেন মিনেসোটা ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্নেলে থাকা অবস্থায় ইনফরমেশনাল রিট্রাইভাল বিষয়ে গবেষণা করেন। এরপর গুগলে যোগ দেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মোবাইল অপারেটর এটিঅ্যান্ডটির কারগরি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। তিনি ৩০ টির বেশি গবেষণাপত্র ও বেশ কিছু পেটেন্টের স্বত্বাধিকারী।
গুগল প্লাসে ‘দ্য জার্নি কনটিউজ...’ শিরোনামে একটি পোস্টে সিংগাল লিখেছেন, প্রিয় বন্ধুরা, আমার জীবন একটি স্বপ্নময় যাত্রার মতো। হিমালয়ের পাদদেশে স্টার ট্রেক কম্পিউটারের স্বপ্ন দেখে ছোট একটি ছেলে হিসেবে বেড়ে ওঠা, এরপর অভিবাসী হিসেবে মাত্র দুটি সুটকেস হাতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো ছাড়া আর কিছু নয়। এরপর গুগল সার্চের দায়িত্ব নেওয়া। জীবনের প্রতিটি মোড় আমার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করেছে এবং উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।
সিংগাল বলেন, গুগলে ১৫ বছর পার হওয়ার পর নিজেকে এই প্রশ্নটি করেছি, ‘আগামী ১৫ বছর কী করতে যাচ্ছি?’ উত্তরটা হচ্ছে-অন্যদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। আমার কাছে কম সৌভাগ্যবান মানুষগুলোকে সবকিছু দেওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে সব সময়। পরিবারের জন্য সময় দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার এখনই উপযুক্ত সময়। দারুণ রূপ পাচ্ছে প্রযুক্তির বিষয়গুলো। সার্চ ইঞ্জিন আগের চেয়ে শক্তিশালী আরও অভিজ্ঞ মানুষের হাতে তা আরও উন্নত হবে।
সিংগাল তাঁর অভিজ্ঞতা হিসেবে লিখেছেন, গত ১৫ বছরে আমি যা তৈরি করেছি, এতে আমি গর্বিত। সার্চ মানুষের জীবনকে উন্নত করেছে। ১০০ কোটির বেশি মানুষ আমাদের ওপর নির্ভর করে। মানুষকে তথ্য দিয়ে ক্ষমতায়ন করা আমাদের লক্ষ্য। বিশ্বে গুগল সার্চ যে প্রভাব ফেলেছে তা অনস্বীকার্য। আমি যখন শুরু করেছিলাম, তখন কে ভেবেছিল মাত্র ১৫ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে আমরা একটি বাটন চেপে গুগলকে জিজ্ঞাসা করলেই সব উত্তর পেয়ে যাব। এখন আমাদের কাছে গুগল দ্বিতীয় প্রকৃতি। আমার স্বপ্নের স্টার ট্রেক কম্পিউটারের স্বপ্ন সফল হয়েছে। আমি যা ভেবেছিলাম এটা তার চেয়েও বেশি কিছু।
অমিত তাঁর বিদায় উপলক্ষে ব্লগ পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি গুগলকে ভালবাসি। এটা এমন কোম্পানি, যা সঠিক জিনিস তৈরিতে বিশ্বাস করে, বিশ্ববাসীর জন্য ভালো কিছু তৈরি এবং মানুষের কথা ভেবে জিনিস বানায়। পেছনে ফিরে দেখলে আমি অনেককে ধন্যবাদ দেব। আমি এখন গর্ব, কৃতজ্ঞতা আর আনন্দ আমার হৃদয়ে ধারণ করেছি। আমার পরবর্তী ১৫ বছর কীভাবে কাটাব, তা ঠিক করতে হবে। দাতব্য কাজের পাশাপাশি আমার পরিবারকে সময় দিতে চাই। আমার ব্যস্ত জীবনে স্ত্রীকে যে সময় দিতে পারিনি সেই স্ত্রী, সন্তানকে সময় দিতে চাই

প্লুটোয় পাহাড় ভাসছে!

প্লুটোয় ভাসমান পাহাড়
পাহাড় কি ভাসতে পারে? যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নাসার গবেষকেরা বলছেন, ভাসমান পর্বতমালা সত্যিই আছে। সেটি বামন গ্রহ প্লুটোয়। সেখানকার একটি স্থানে এমন ভাসমান পাহাড় দেখা গেছে।

সম্প্রতি নাসার পাঠানো নিউ হরাইজনস মিশন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েছেন। কারণ তাঁরা দেখেছেন, শীতল বামন গ্রহটিতে একটি পাহাড় ভেসে বেড়াচ্ছে। নাইট্রোজেন বরফের হিমবাহ এই পাহাড়কে বয়ে বেড়াচ্ছে। গবেষকদের ভাষ্য, এই পাহাড়ের নাম স্পুটনিক প্ল্যানাম। কয়েক মাইল বিস্তৃত এই পাহাড়টি বরফে আবৃত

২৭ বছর পর মায়ের কোলে BY মুক্তার হোসেন

মায়ের সঙ্গে মনোয়ারা। ছবি: প্রথম আলো
কালো বলে বাবা আদর করে শিশুকন্যাকে ডাকতেন ‘কালী মা’। কিন্তু সংসারের অভাব-অনটন স্নেহ-ভালোবাসা মানে না। খাওয়ানো-পরানোর কষ্টে একপর্যায়ে বাবা-মা মেয়েটিকে পরের বাড়িতে কাজ করতে দেন। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় ঢাকায়। তারপর সে হারিয়েও যায়।
২৭ বছর পর সেই মেয়েটি ফিরে এসেছে মায়ের কোলে। ফিরে পেয়েছে আপনজনদের। শুধু সেই বাবা নেই, যিনি তাকে আদর করে ‘কালী মা’ বলে ডাকতেন।
নাটোর সদর উপজেলার রায় আমহাটি গ্রামের সেই মা তাঁর মেয়ে মনোয়ারা খাতুনকে গত বুধবার ফিরে পেয়েছেন। বাসাবাড়িতে কাজ করার জন্য সাত বছর বয়সে এই মেয়েকে তুলে দিয়েছিলেন পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ীর হাতে। সেখান থেকে হারিয়ে গিয়েছিল মেয়ে।
মনোয়ারার বয়স এখন ৩৫। তিনি রায় আমহাটি গ্রামের মৃত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে শুধু মনোয়ারার গায়ের রং ছিল কালো। তাই বাবা-মা আদর করে ডাকতেন ‘কালী মা’।
মনোয়ারা খাতুনের ভাষ্য, তখন তাঁর বয়স ছিল সাত বছরের মতো। অভাবের সংসারে স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়নি। তাই ঢাকায় বাসাবাড়িতে কাজ করার জন্য স্থানীয় এক বৃদ্ধার হাতে তাঁকে তুলে দেন মা-বাবা। পুরান ঢাকার আলুবাজারের এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে কাজ জোটে। কিন্তু গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনে কিছুদিনের মধ্যে ওই বাড়ি থেকে পালান তিনি। আশ্রয় নেন অন্য এক ব্যবসায়ীর বাসায়। সেখানে কেটে যায় ১৬ বছর। এত দিন ‘নাটোর’ শব্দটি ছাড়া আর কিছুই মনে করতে পারেননি তিনি। এ অবস্থায় বাসার মালিকও তাঁকে ছাড়তে সাহস পাননি। সেখানকার এক বৈদ্যুতিক মিস্ত্রির সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। স্বামীর নাম হারুন অর রশিদ। তাঁরা থাকেন মগবাজার এলাকায়। সুখের সংসারে রয়েছে দুই ছেলে আকাশ (১২) ও আয়ান (৬)।
সন্তানেরা নানা-নানিকে দেখার আবদার করেছে বহুবার। কিন্তু বাবার বাড়ি নাটোরে শুধু এটুকুই তাঁর মনে আছে। তাই স্বামীও সাহস করে তাঁকে নাটোরে নিয়ে যাননি। হঠাৎ নাটোরের এক তৈরি পোশাক-কর্মীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। গত তিন বছর ধরে ওই লোক নাটোরের বিভিন্ন স্থানে তাঁর মা-বাবার সন্ধান করে ব্যর্থ হন। অবশেষে তিনি ওই কর্মীর সঙ্গে বুধবার ভোরে নাটোর আসেন। নাটোরে এসে ঘোরাফেরা করার একপর্যায়ে ভাটোদারা কালী মন্দিরের কাছে এলে তাঁর মনে পড়ে, এখানে তাঁর মেজ বোন সাজেদার বাড়ি ছিল। এলাকার লোকজনের সহযোগিতায় তিনি বোনকে খুঁজে পান। কিন্তু সাজেদা প্রথমে তাঁকে চিনতে পারেননি। আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি যখন বলেন, ছোট বেলায় বাবা আদর করে তাকে ‘কালী মা’ বলে ডাকতেন, তাঁর বড় বোনের নাম কুলসুম, তখন সাজেদা তাঁকে চিনতে পারেন। পরে মা আর অন্য ভাইবোনদের ডেকে পাঠান। তাঁরা এসে মনোয়ারাকে চিনতে পারেন। জড়িয়ে ধরেন।
বড় ভাই খলিল গাজি তাঁকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। মনোয়ারা গতকাল শুক্রবার দুপুরে মাকে আদর করতে করতে এই প্রতিনিধিকে বলেন, ‘স্বামী আর সন্তানদের মা-ভাইবোনদের খুঁজে পাওয়ার খবর দিছি। ওরা দু-একদিনের মধ্যে নাটোরে আসবে। এরপর মা আর ভাইবোনদের নিয়ে ঢাকায় যাব। এখন জীবনডা বদলায় গেছে!’
বাবার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মনোয়ারা। তিনি বলেন, ‘সবই পাইছি। কিন্তু আব্বার “কালী মা” ডাকটা পালাম না। এই ডাকটার অভাব আর মিটবে না।’
মা চন্দ্র বানু মেয়ে মনোয়ারাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘২৭ বছর পর আমার “কালী মা” ফিরা আইছে। এত দিন ভাবিছিনু আমার মাইয়াডা মরি গিছে। ওরে পায়া জানডা অনেক ঠান্ডা হয়ছে! এখন মরেও শান্তি পাব!’ তিনি বলেন, ‘এই দিনে তার আব্বা বাঁচি থাকলে সব চাইতে বেশি খুশি হতেন।’
ছয় ভাইবোনের মধ্যে তাঁকেই বাবা বেশি ভালোবাসতেন। বহুবার তিনি ঢাকায় গিয়ে তার খোঁজাখুঁজি করেছেন। কিন্তু কোনো হদিস পাননি। প্রায় দেড় বছর আগে তিনি মারা গেছেন।
খলিল গাজি জানান, যার মাধ্যমে মনোয়ারা ঢাকায় গিয়েছিলেন, সেই মহিলাও আর বেঁচে নেই। তাই তাঁরা ধরেই নিয়েছিলেন যে তিনি আর ফিরে আসবেন না।
বড় বোন কুলসুম বেগম জানান, খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তিনি মনোয়ারাকে দেখতে এসেছেন। প্রথম দেখাতেই তিনি তাকে চিনতে পেরেছেন। তাঁর মতো আত্মীয়স্বজন ও আশপাশের গ্রামের হাজারো মানুষ কয়েক দিন ধরে মনোয়ারাকে দেখতে এসেছেন। তাদের পরিবারে যেন উৎসবের আমেজ বইছে।
প্রতিবেশী চিকিৎসক খায়রুল ইসলাম জানান, মনোয়ারার আগমনে সারা গ্রামে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। ওদের সংসারে আগের মতো আর অভাব-অনটন নেই। তাঁকে দেখার জন্য শত শত মানুষ আসছে প্রতিদিন। সবাইকে মিষ্টিমুখ করানো হচ্ছে

৬০ ঘণ্টায় পূর্ব ইউরোপ দখলে নিতে পারে মস্কো

ভ্লাদিমির পুতিন
রাশিয়ার সামরিক বাহিনী তিন দিনের কম সময়ের মধ্যেই পূর্ব ইউরোপের রাজধানীগুলো দখল করে নিতে সক্ষম। কারণ, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর ওই অঞ্চলে তাদের মিত্রদের সুরক্ষা দেওয়ার মতো বাহিনী নেই। নতুন এক গবেষণায় এ কথা বলা হয়েছে। খবর দ্য ইনডিপেনডেন্টের।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান র্যা ন্ড করপোরেশনের সামরিক গবেষণা শাখা এ গবেষণা চালিয়েছে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপের বাল্টিক রাষ্ট্র এস্তোনিয়ার রাজধানী তাল্লিন ও লাটভিয়ার রাজধানী রিগা দখল করতে রুশ বাহিনীর সময় লাগবে মাত্র ৩৬ থেকে ৬০ ঘণ্টা। এতেই প্রতীয়মান হয়, এ অঞ্চলে ন্যাটোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতটা অকার্যকর।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের সম্পর্ক ক্রমেই তলানীর দিকে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রতিবেদন এল। চলতি সপ্তাহে খবর বেরোয়, ইউরোপের আরেক দেশ সুইডেন এমন একটি দ্বীপকে পুনরায় সামরিকীকরণ করেছে, যেটি স্নায়ুযুদ্ধের সময় ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রমবর্ধমান রুশ হুমকি মোকাবিলা করতেই গোটল্যান্ড নামের ওই দ্বীপকে পুনরায় সামরিকীকরণের পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে সুইডেন।
র্যান্ড করপোরেশনের ওই গবেষণা বলছে, রাশিয়া দ্বিমুখী আক্রমণ করতে পারে। প্রথমে তারা ভারী অস্ত্রসজ্জিত কয়েকটি ব্যাটালিয়ন পাঠিয়ে রাজধানী রিগার দিকে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করতে পারে। এই ব্যাটালিয়নগুলোই পুরো পথে লাটভিয়া ও ন্যাটোর বাহিনীগুলোর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। এরপর লাটভিয়ার দখল নিতে পারলেই রাশিয়ার ২৭ ব্যাটালিয়নের অন্যগুলো এস্তোনিয়ায় প্রবেশ করবে। প্রথমে তারা দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জাতিগত রুশ-অধ্যুষিত এলাকাগুলো করায়ত্ত করবে। এরপর রুশ বাহিনী এগোবে রাজধানী তাল্লিনের দিকে।
১৬ পৃষ্ঠার ওই গবেষণা চালানো হয়েছে ২০১৪ ও ২০১৫ সালের মধ্যে। এতে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, ন্যাটো ও বাল্টিক বাহিনীর সম্মিলিত শক্তিও রাশিয়ার অগ্রসর ঠেকাতে পারবে না; এমনকি মার্কিন বিমান শক্তির সহায়তাও এ ক্ষেত্রে খুব কমই কাজে দেবে। কারণ, সক্ষমতা বিবেচনায় রাশিয়ার ব্যাটালিয়নগুলোর সঙ্গে এ অঞ্চলে মোতায়েনকৃত ন্যাটোর স্থলবাহিনীর তুলনাই করা চলে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ব ইউরোপে মোতায়েনকৃত ন্যাটোর ১২ ব্যাটালিয়নে কোনো যুদ্ধট্যাংক নেই। এর মধ্যে কেবল একটি ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ব্যাটালিয়ন রয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার ২৭ ব্যাটালিয়নের সব কটিতেই ভারী যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত ট্যাংক রয়েছে। সুতরাং, বাস্তব অবস্থা একেবারে পরিষ্কার। বর্তমান পরিস্থিতিতে ন্যাটো তার সবচেয়ে অরক্ষিত সদস্যদের ভূখণ্ড রক্ষা করতে সফল হবে না।
র্যা ন্ড করপোরেশনের ওই গবেষণা বলছে, এমন দৃশ্যপটে তখন ন্যাটোর সামনে মাত্র দুটি বিকল্প অবশিষ্ট থাকবে। এক. পরাজয় মেনে নিতে হবে। তার পরিণতি হবে বাল্টিক অঞ্চলের জনগণের পাশাপাশি ন্যাটো জোটের জন্য বিপর্যয়কর। দুই. পাল্টা আক্রমণ চালাতে হবে, যা হবে খুবই ব্যয়বহুল। আবার সেটা পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
রুশ এই হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এই অঞ্চলে বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে। গবেষণা মোতাবেক, ন্যাটোকে এ অঞ্চলে আর্টিলারি ও বিমান শক্তির সমর্থনপুষ্ট অন্তত সাতটি ব্রিগেড মোতায়েন করতে হবে। এর মধ্যে তিনটি ব্রিগেড হবে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত। রুশ হুমকি মোকাবিলার জন্য এটাই যথেষ্ট। এর এ জন্য খরচ হবে বছরে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

বলুনতো মা কে!

একই রকম দেখতে তিনজন নারীর ছবি। মনে হতে পারে একই মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া তিন বোন। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এ তিন নারীর মধ্যে একজন মা। অন্য দু’জন তার গর্ভে জন্ম নেয়া যমজ মেয়ে। কিন্তু ছবি দেখে বোঝার উপায় নেই কে মা আর কে মেয়ে। কারণ, মায়ের চোখেমুখে বয়স বাড়ার কোন ছাপ নেই। দু’মেয়েকে দেখতে যেমন হুবহু সেই একই রকম মাও। তাই যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানাপোলিসের এই মা-মেয়ের ছবি নিয়ে সারা বিশ্বে চলছে তোলপাড়। যে-ই পাচ্ছেন এ ছবি খুব বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মা মেয়ের পার্থক্য নির্ধারণের চেষ্টা করছেন। ইন্ডিয়ানাপোলিসের হাই স্কুল পড়–য়া এক শিক্ষার্থী কেইলান মাহোমেস গত সপ্তাহে নিজেদের এই ছবিটি ধারণ করে তা পোস্ট করেন অনলাইনে। এতে আছেন তার যমজ বোন কিলা ও তার মা। ইন্টারনেটে ছবি পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গে তা হিট হতে থাকে। সব বয়সের মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে মা মেয়ের পার্থক্য বের করতে। এরই মধ্যে এই ছবিটি ২০ হাজার বারের বেশি রি-টুইট হয়েছে। মিডিয়ায় বলা হচ্ছে, কেইলান তার বোন ও মায়ের ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে ২৮শে জানুয়ারি। সঙ্গে ক্যাপশন জুড়ে দেয়- মা, আমি ও আমার যমজ বোন। কেইলান হয়তো কখনো আন্দাজও করতে পারেন নি যে, তার পোস্ট করা এই ছবি সারা বিশ্ব এভাবে লুফে নেবে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে তারা তিনজনে বসে আছেন একটি গাড়িতে। এতে সামনের দিকের দু’জনের চুলের অংশবিশেষ সামনের দিকে এনে ছাড়া। অন্যজন পিছনের সিটে বসে আছেন। তার চুল কিছুটা পাশ দিয়ে নামিয়ে রাখা। আরেকটি ছবিতে তাদেরকে একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। তাদের রয়েছে একই রকম ভ্রু। একই রকম চাহনি। মুখাবয়ব একই রকম। এতে মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়ছে এর মধ্যে মা কোনটি! ছবিটি লাইক করেছে ৩১ হাজারেরও বেশি। কেউ কেউ মন্তব্য করছেন তিন নারীই বোনের মতো। তবে কেইলান লিখেছেন, বিশ্বাস করুন আমরা তিন বোন নই। আমার একটিই বোন আছে। সঙ্গে অন্যজন আমার মা।  অন্যরা কেইলানের কাছে আবেদন জানিয়েছেন কে তাদের মা তা প্রকাশ করতে। মিডিয়ায় যখন এত মাতামাতি তখন কেইলান ফাঁস করে দিয়েছেন গোপন তথ্য। বলেছেন, সবার বামে যিনি বসে আছেন তিনিই আমার মা। আর বোন বসে আছে পিছনের সিটে। ছবিতে মাঝখানে। বলেছেন, আমার মায়ের বয়স এখন ৪৩ বছর।

ভূরাজনীতির কবলে বঙ্গোপসাগর by এ কে এম জাকারিয়া

এ অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিয়েছে সমুদ্র। কৌশলগত গুরুত্বের কারণে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের মধ্যে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। এখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও উপস্থিতি জরুরি। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে হাজির বাংলাদেশের জন্য দরকারি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মাধ্যমে হোক বা নানা সহযোগিতার আবরণেই হোক, সবাই চায় এ অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে। আমরা দেখলাম এ বছরের শুরুর মাসেই দেশে অন্তত তিনটি সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হয়ে গেল, যেখানে আলোচনার মূল বিষয় ছিল বঙ্গোপসাগর এবং এ অঞ্চলের সমুদ্র। গত মঙ্গলবার দিল্লিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব জানালেন, আগামী মার্চে সমুদ্র অর্থনীতিতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার জন্য ভারত ও বাংলাদেশ ঢাকায় বৈঠকে বসছে।
১৯ শতকের মার্কিন নৌকৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার মাহান সমুদ্রবাণিজ্য, নৌপথ, নৌশক্তি, এর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ—এসব নিয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন। সেই প্রবন্ধগুলোর সংকলন নিয়ে প্রকাশিত বইটির নাম দ্য ইন্টারেস্ট অব আমেরিকা ইন সি পাওয়ার (১৮৯৭)। সেখানে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, সমুদ্রবাণিজ্য বা নৌশক্তি যেভাবেই হোক, সমুদ্র যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার পক্ষে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার যুক্তি হচ্ছে, স্থলভূমিতে যতই সম্পদ থাকুক না কেন, সমুদ্রপথে সম্পদ বিনিময় বা বাণিজ্য যত সহজ, অন্য কোনো পথে অত সহজ নয়। তিনি লিখেছেন, একটি দেশ যদি দুনিয়ায় বড় শক্তি হতে চায়, তবে তাকে তার আশপাশের জলসীমায় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে হবে। দেশটিকে এমন এক অঞ্চল তৈরি করতে হবে, যাতে অন্যরা তাকে সমঝে চলে এবং বাইরের শক্তিকে তার আশপাশ থেকে দূরে রাখা যায়।
আলফ্রেড মাহানের এই বক্তব্য যে শত বছরেরও বেশি সময় পর সমান সত্য, তা স্বীকার না করে উপায় নেই। আজকের দুনিয়ায় বিশ্ববাণিজ্যের ৯০ ভাগই হয় সমুদ্রপথে। এবং সমুদ্র যোগাযোগব্যবস্থার ওপর কার্যত একক নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র সারা দুনিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ছড়ি ঘুরিয়ে যেতে পারছে। কিন্তু সেখানেই সম্ভবত ভাগ বসানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। এশিয়ার ভূরাজনীতি ও অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক রিচার্ড জাভেদ হেইডেরিয়ান আল-জাজিরায় এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘নতুন এক নৌশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সমুদ্রব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে উল্টে দিচ্ছে। চীন তার মহাদেশীয় প্রতিবেশীদের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, তার নৌশক্তিও ক্রমেই বাড়ছে। আবার দেশটির হাতে বিপুল পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে। এই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে চীন পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিকে সংকুচিত করতে চাইছে। হলুদ সমুদ্র থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনী তার আশপাশের সমুদ্রসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।’ (এ সিনো-আমেরিকান নেভাল শোডাউন ইন সাউথ চায়না সি’ ২৯ অক্টোবর ২০১৫)
এটা পরিষ্কার যে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিরোধের আশঙ্কাও। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির আধিপত্য বিস্তার ও বাণিজ্যস্বার্থের এই জটিল হিসাব-নিকাশে বাংলাদেশের কৌশলী অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই।
ভৌগোলিক কারণে সাগরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। সমুদ্র, সমুদ্রবন্দর বা সমুদ্রবাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে তাই এত নানামুখী তৎপরতা। আলফ্রেড থায়ার মাহান সমুদ্রবাণিজ্য ও সে কারণে এর ওপর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। কিন্তু শত বছরেরও বেশি সময় পর সমুদ্রের গুরুত্ব আরও বেড়েছে এই কারণে যে সমুদ্র এক বড় সম্পদেরও আধার। সমুদ্রপথে বাণিজ্যের বাইরে সমুদ্রের নিচের তেল ও গ্যাসের মতো মূল্যবান জ্বালানি ও নানা খনিজ সম্পদ এবং ওপরের মাছের ভান্ডার এক দীর্ঘস্থায়ী সম্পদের ক্ষেত্র। ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সমুদ্রকে ঘিরে অর্থনীতি বর্তমান বিশ্বে এক নতুন সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে।
বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চল ও সমুদ্র সীমানা সংগত কারণেই এখন বৈশ্বিক মনোযোগের মধ্যে রয়েছে। এ বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম ভাগে বাংলাদেশ সফর করে গেলেন মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিট কমান্ডার স্কট এইচ সুইফট। বাংলাদেশ নৌবাহিনী আয়োজিত ভারত মহাসাগরীয় নৌ সিম্পোজিয়ামে (আইওএনএস) অংশ নিয়েছেন তিনি। তাঁর এই বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে একটি লেখাও তিনি লিখেছেন। সেখানে এই অঞ্চলের সমুদ্রের গুরুত্ব, নিরাপত্তার বিষয় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বিএনএস সমুদ্র জয় ও বিএনএস সমুদ্র অভিযান নামে যে দুটি সামরিক নৌযান পরিচালনা করছে, তা একসময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড পরিচালনা করত। মার্কিন নৌবাহিনীর বার্ষিক নৌ অনুশীলন ‘কো-অপারেশন অ্যাফ্লোট রেডিনেস অ্যান্ড ট্রেইনিং’ (ক্যারাট) বাংলাদেশ গত অক্টোবরে চট্টগ্রামের সমুদ্রতীরে শেষ হয়েছে। ক্যারাট চলাকালে আমাদের দুই নৌবাহিনী জলদস্যুবিরোধী, চোরাচালানবিরোধী, সমুদ্রে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও বন্দর নিরাপত্তা বিষয়ে অনুশীলন করে। (প্রথম আলো ১৩ জানুয়ারি, ২০১৬)। তিনি এটাও পরিষ্কার করেছেন যে ‘ইউএস প্যাসিফিক ফ্লিট’ নামের কারণে কেউ যেন এই ভুল না করে যে তারা শুধু মালাক্কা প্রণালির পূর্ব ও সিঙ্গাপুরের ওপর গুরুত্ব দেয়। তারা এই দিকেও নজর রাখে এবং এর ফলে অনেক দেশই উপকৃত হয়েছে।
বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ ও বার্ষিক প্রায় ৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য শুধু দক্ষিণ-চীন সমুদ্র দিয়েই পরিচালিত হয়। প্রায় এক লাখ জাহাজ এই পণ্য সরবরাহ করে ভারত মহাসাগর থেকে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্য পথ ধরে। এখানে নিজেদের কর্তৃত্ব, খবরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা চীনের নিজস্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য খুবই জরুরি। বাংলাদেশ–চীন সম্পর্কের ৪০ বছর উপলক্ষে গত ২৬ জানুয়ারি এক সেমিনার হয়ে গেল। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে নিযুক্ত সাবেক পাঁচ চীনা রাষ্ট্রদূত এই সেমিনার উপলক্ষে ঢাকায় জড়ো হয়েছিলেন। চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের ছয় রাষ্ট্রদূতও সেই সেমিনারে হাজির ছিলেন। এই সেমিনারটিকে চীনের তরফ থেকে যে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট। সেই সেমিনারে দুই দেশের মধ্যে কানেকটিভিটির বিষয়টি যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও। (প্রথম আলো ২৭ জানুয়ারি)
আমাদের মনে আছে যে ২০১৪ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সব প্রস্তুতিই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। বিভিন্ন মহলে এই আলোচনা রয়েছে যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী কোনো কোনো দেশের আপত্তির কারণেই সরকার শেষ সময়ে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর থেকে সরে আসে। চীনের এ অঞ্চলে প্রবেশ নিয়ে এই দেশগুলোর আপত্তি রয়েছে। কিন্তু বোঝা যায়, বাংলাদেশে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে চীন এখনো আশা ছাড়েনি এবং বিষয়টি নিয়ে তারা লেগে রয়েছে।
৩১ জানুয়ারি বঙ্গোপসাগরীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট বিমসটেক সচিবালয়ের আয়োজনে প্রথম বিমসটেক ফাউন্ডেশন বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্বের বঙ্গোপসাগরীয় সংযোগ স্থাপন’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বল স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ কেনেথ আর হল সেখানে মূল বক্তব্য দেন। কেনেথ হল মনে করেন, বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা ও বিরোধের আশঙ্কা দুটোই রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দক্ষিণ চীন সাগরে বিরোধ দেখা যাচ্ছে। চীনের সম্প্রসারণবাদী নীতির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। তবে এরপরও এ অঞ্চলের সম্পদের প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এটা পরিষ্কার যে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিরোধের আশঙ্কাও। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির আধিপত্য বিস্তার ও বাণিজ্যস্বার্থের এই জটিল হিসাব-নিকাশে বাংলাদেশের কৌশলী অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই। তবে এ ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ভুল করার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি বিলম্ব বা দীর্ঘসূত্রতার সুযোগও কম। বাংলাদেশের জন্য দরকারি গভীর সমুদ্রবন্দর স্পষ্টতই এই ভূরাজনীতির খপ্পরে পড়েছে।
যে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বলতে গেলে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টি চূড়ান্তই হয়ে গিয়েছিল, সেই সোনাদিয়া নিয়ে এখন আর কোনো কথা নেই। এর ২৫ কিলোমিটার দূরে মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে প্রাথমিকভাবে কয়লা আমদানির জন্য একটি গভীর সমুদ্রবন্দর হতে যাচ্ছে জাপানি সাহায্য সংস্থা জাইকার অর্থায়নে। ইঙ্গিত রয়েছে, এটাই পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারিত হবে পূর্ণাঙ্গ গভীর সমুদ্রবন্দরে। চীনকে দূরে রাখার কৌশল হিসেবে কি তবে সোনাদিয়া প্রকল্পটি বাদই পড়ছে? চীন তবে কোন সমুদ্রবন্দরের আশায় দিন গুনছে? দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কর্তৃত্বের সুফল পেতে হলে বঙ্গোপসাগরেও যে তাদের জোরালো উপস্থিতি লাগবে। চীন কীভাবে তা কার্যকর করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

আশাবাদী বাংলাদেশিদের নির্বাচনী আকাঙ্ক্ষা by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রগুলো অনেক দিন ধরেই জাতীয় পর্যায়ে কোনো জনমত জরিপ পরিচালনা করে না। অথচ গণতান্ত্রিক সমাজে অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে এ ধরনের জরিপের গুরুত্বই আলাদা। অনেকে অবশ্য সংবাদপত্রগুলোর অনলাইন জরিপের কথা বলতে পারেন। কিন্তু ওই জরিপগুলো মোটেও বিজ্ঞানসম্মত নয় এবং তাতে নানা ধরনের প্রভাব বিস্তারের সংগঠিত চেষ্টার কথাও শোনা যায়। সংবাদমাধ্যম বা প্রতিষ্ঠিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বিরূপ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এড়াতে এ ধরনের জরিপ পরিচালনা থেকে বিরত থাকলেও জরিপ কিন্তু বন্ধ নেই। সে জন্যই তো গত পৌর নির্বাচনের আগে পুলিশের একটি গোপন জরিপের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। ক্ষমতাসীন দল ও জোটের তরফে নির্বাচনী মনোনয়নেও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার এ ধরনের জরিপের ভূমিকার কথাও আমরা বারবার শুনে আসছি। এ রকম একটি পটভূমিতে সপ্তাহ খানেক আগে প্রকাশিত এক জরিপে বলা হলো, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অধিকাংশ বাংলাদেশির মধ্যে আশাবাদ বাড়ছে। জরিপটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশটির ৪৫ শতাংশ মানুষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে বেছে নিচ্ছে। জরিপটি পরিচালনা করেছে ‘বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার কাজে নিয়োজিত’ (প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত লক্ষ্য) যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)।
আইআরআইয়ের এই জরিপটিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল ও তার অনুসারীরা খুশি হয়েছেন সন্দেহ নেই। অন্তত জনসমক্ষে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ায় সে রকমটিই দেখা গেছে। তবে অন্য অনেক জরিপের মতোই এই জরিপটিও অনেক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে। জরিপটি আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে পরিচালিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে সারা দেশের ২ হাজার ৫৫০ জন এতে মতামত দিয়েছেন। সাতটি বিভাগে ২৫০টি নমুনা সংগ্রহকারী ইউনিট এসব মতামত সংগ্রহ করেছে। যার মানে দাঁড়ায়, একেকটি ইউনিট গড়ে ১০ জনের মতামত নিয়েছে। আবার জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যায় যে ৪০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতার পারিবারিক আয় মাসিক ১০ হাজার টাকার নিচে। এই সামান্য আয়ের পরিবারগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে সন্তুষ্টি জানানোতে বলতেই হয়, বাঙালি যে অল্পেই সন্তুষ্ট, জরিপটি তার প্রমাণ!
আইআরআইয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশটির ৪৫ শতাংশ মানুষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে বেছে নিচ্ছে বলা হলেও দেখা যাচ্ছে যে ৫১ শতাংশ মানুষ কিন্তু গণতন্ত্রকেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন। গণতন্ত্রের আগে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বাণী দুবছর ধরে প্রচারের পরও জরিপের মূল বার্তাটি বলছে গণতন্ত্রের প্রতি দেশবাসীর আস্থা এখনো অবিচল।
আইআরআইয়ের ওয়েবসাইটে দেখা যায় যে তাদের আগের দুটি জরিপও একইসংখ্যক অংশগ্রহণকারীর ওপর একই পদ্ধতিতে চালানো হয়েছিল। গত তিনটি জনমত জরিপের মধ্যে মিল যে শুধু এটুকু তা নয়; জরিপের ফলগুলোতেও অনেক মিল দেখা যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিসহ সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশি ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের আশাবাদ প্রকাশ করে এসেছেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে এই আশাবাদীদের পরিমাণ ছিল ৫৭ শতাংশ, ২০১৫-এর জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬২ শতাংশে। এবারও যথারীতি তা বেড়েছে। গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নেও জনসমর্থনের পাল্লা ভারী অবস্থান অব্যাহত আছে। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ এবং গণতন্ত্রের প্রতি অব্যাহত আস্থার মতো ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি জরিপের যে ফলটি সবার জন্য দুর্ভাবনার বিষয়, তা হচ্ছে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে। কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়া যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপ ঘটানো হয়েছে, দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ এখনো সেই ব্যবস্থাকেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য মনে করে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন।
এই জরিপের আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এতে কথিত সংসদীয় বিরোধী দল সম্পর্কে কোনো কথা নেই। কোন দলের নেতৃত্ব দৃঢ় বা শক্তিশালী, কোন দল শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করছে, কোন দল নারীদের সমর্থন করে—এসব প্রশ্নে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। আবার কোন দল ধর্মের প্রতি বেশি বিশ্বাসী—এমন প্রশ্নে দেখা যাচ্ছে বিএনপি এগিয়ে। জাতীয় পার্টির কোনো নামগন্ধই এতে নেই। রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এখনো যেভাবে বিএনপিকেই সারাক্ষণ তুলাধোনা করে চলেছেন, তাতে এমন পরিণতিই তো স্বাভাবিক!
২.
গেল ৩০ জানুয়ারি ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকান ইউনিয়নের ২৬তম শীর্ষ সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, নেতাদের কখনোই অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং আইনগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা উচিত নয়। তাঁরা যখন এমনটি করেন, তখন তার যে করুণ পরিণতি হয়, আমরা সবাই তা দেখেছি। নেতাদের উচিত নিজেদের সুরক্ষার বদলে জনগণের সুরক্ষা দেওয়া। যেসব নেতা সাংবিধানিক মেয়াদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরে দাঁড়ান, আমি সেই নেতাদের প্রশংসা করি। তাঁদের দৃষ্টান্ত অনুসরণের জন্য আমি সবার প্রতি আহ্বান জানাই। জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ বছরে আফ্রিকার বাঘা বাঘা জাতীয়তাবাদী নেতার উপস্থিতিতে আরও বলেন যে ২০১৬ সালে আফ্রিকায় ১৬টি দেশ নির্বাচনে যাবে এবং এ কারণে যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের এই বক্তৃতার বিবরণটি পড়ার সময় চোখ যায় আফ্রিকার ওই সব জাতীয়তাবাদী নেতার দিকে, যাঁরা সাম্রাজ্যবাদের ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ছিন্ন করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার আন্দোলনে সফল হলেও গণতন্ত্র, আইনের শাসন কিংবা অর্থনৈতিক মুক্তি—এগুলোর সবকিছুই রয়ে গেছে অধরা। আফ্রিকার ওই শীর্ষ সম্মেলনে সভাপতি ছিলেন জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবে, যিনি স্বৈরাচার হিসেবে একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তরিত করায় তাঁর রেকর্ডটি শিগগির কেউ ভাঙতে পারবে কি না, তা বলা মুশকিল। ৪৪ বছর ধরে প্রেসিডেন্টের আসনে আসীন এই স্বৈরশাসককে পাশে রেখে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কুফল বর্ণনার সময় মহাসচিব বানের কোনো মর্মপীড়া হয়েছিল কি না, হয়তো ভবিষ্যতে তাঁর জীবনীগ্রন্থে তা জানা যাবে। তবে কূটনীতিকদের জন্য এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি একেবারে অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। ২০০৩ সালের কথা। তখন মহাসচিব ছিলেন কফি আনান। সে বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ধূমপান নিষিদ্ধ করলেন মি. আনান। রাশিয়ার বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ তখন জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি। মি. লাভরভ অভ্যাসবশত তাঁর সিগারেটে আগুন জ্বালাতে গেলে জাতিসংঘের কর্মীরা তাঁকে নিষেধাজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে গেলে ক্ষুব্ধ লাভরভ তাঁদের বলেন যে মহাসচিবের ওই সিদ্ধান্তের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু এটুকু বলেই তিনি থামলেন না। তিনি আরও বললেন, ‘জাতিসংঘ ভবনের মালিক হচ্ছে সদস্যরাষ্ট্রগুলো, আর মহাসচিব হলেন একজন ভাড়াটে ব্যবস্থাপক।’ (এনভয় ফিউমস এট ইউএন সিগারেট ব্যান, বিবিসি, ৯ সেপ্টেম্বর ২০০৩)।
জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব বান কি মুনের অবশ্য কপাল ভালো যে তিনি যখন সংবিধান সংশোধন করে অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতার সমালোচনা করেছেন, তখন তাঁকে সে রকম কোনো রূঢ় কথা শুনতে হয়নি। এর অন্যতম কারণ সম্ভবত এই যে আফ্রিকার কোনো দেশই রাশিয়ার মতো ভেটো ক্ষমতার অধিকারী নয়। তা ছাড়া আফ্রিকান ইউনিয়নের এখন সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে সদস্যদেশ বুরুন্ডিতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টার পরিণতিতে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ। দুবারের বেশি ক্ষমতায় না থাকার বাধা দূর করতে সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু হওয়া সংঘাত থেকে বাঁচতে বুরুন্ডির কয়েক লাখ নাগরিক ইতিমধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোয় উদ্বাস্তু হয়েছেন। আফ্রিকান ইউনিয়ন সেখানে শান্তিরক্ষী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়ায় দেশটির বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট পিয়ের এনক্রুনজেজা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন।
৩.
বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় জাতিসংঘের উদ্যোগ বা ভূমিকার কথা আমরা হয়তো অনেকেই ভুলতে বসেছি। ২০০৬–এ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে—এমন এক আশঙ্কার কথা শুনিয়ে এক–এগারোর পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ২০১৩ সালেও নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধ মেটাতে আসেন জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ। তবে সংকট মেটেনি। যে কারণে ২০১৪ সালে আবারও মহাসচিব বান তাঁর বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজকে পাঠাতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তাঁর আর আসা হয়নি। তবে আশাবাদী বাঙালির গণতান্ত্রিক চেতনায় এখনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা যে প্রবল, তা বলাই বাহুল্য। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর নৈরাজ্য সম্ভবত সে কারণেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নিয়ে ভোটারদের স্মৃতিকাতর করে তুলছে।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

ঘড়ির কাঁটা ডান দিকে ঘোরে কেন? by আব্দুল কাইয়ুম

গণিত উৎ​সবে প্রতিবছরই আমরা তরুণ
শিক্ষার্থীদের বিকাশমান প্রতিভার পরিচয় পাই
আমাদের দেশের তরুণেরা যে কত গভীরে চিন্তা করতে পারে, শিরোনামের প্রশ্নটিই তার প্রমাণ। এই মজার প্রশ্নের উত্তর পরে দিচ্ছি। তার আগে কিছু জানার আছে। এ প্রশ্নটি করেছিল গত ৩১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল গণিত উৎসবে একজন তরুণ শিক্ষার্থী। প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছিল। সকালে সোয়া এক ঘণ্টার গণিত আঞ্চলিক অলিম্পিয়াড প্রতিযোগিতায় পরীক্ষার পর ঘণ্টা খানেকের জন্য এ পর্বটি চলে। স্কুল-কলেজের তরুণেরা প্রশ্ন করে আর উত্তর দেন মঞ্চ থেকে বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা সাধারণত ওই অঞ্চলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের গণিত বা বিজ্ঞানের শিক্ষক।
সেদিনও এসেছিলেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের ডিন মো. মতিউর রহমান, পদার্থবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান মাসুম হায়দার, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাজ্জাদ ওয়াহিদ প্রমুখ। আমাদের আমন্ত্রণে তাঁরা যে নিজ উদ্যোগে এসেছেন, সে জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। গণিত উৎসব অনুষ্ঠিত হয় টাঙ্গাইল শহরের বিবেকানন্দ হাইস্কুল ও কলেজের মাঠে। শিক্ষা যে সত্যিই মহান পেশা এবং অধ্যাপকেরা যে তরুণদের জ্ঞানের ভিত্তি আরও একটু প্রসারিত করার জন্য একটা দিন ব্যয় করেন, সেটা সত্যিই গর্বের বিষয়।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও প্রথম আলোর সহযোগিতায় বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি প্রতিবছর সারা দেশে গণিত উৎসব ও অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে। প্রতিবছরই আমরা তরুণ শিক্ষার্থীদের বিকাশমান প্রতিভার পরিচয় পাই। এবারও পেয়েছি। তার প্রমাণ ওই সব প্রশ্ন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন তরুণ শিক্ষার্থী একটা মজার প্রশ্ন করেছিল, সাবানের রং ভিন্ন হলেও সব সাবানের ফেনা সাদা কেন? কক্সবাজারের এক তরুণ শিক্ষার্থীর প্রশ্ন শুনে তো আমাদের আক্কেল গুড়ুম! তাঁর প্রশ্নটি ছিল, আমাদের দেশের সব মোবাইল ফোন নম্বর শূন্য দিয়ে শুরু কেন?
প্রশ্নগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি আমাদের তরুণ প্রজন্ম অনেক বড় চিন্তাভাবনা করতে শিখে গেছে। ভালো প্রশ্ন করতে হলেও গভীর জ্ঞানের দরকার। বলুন তো, সব মোবাইল ফোনের নম্বর যে শূন্য দিয়ে শুরু হয়, সেটা আমরা যাঁরা বড়, তাঁদের কয়জনের মাথায় এসেছে? অথচ আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এ রকম কঠিন প্রশ্ন করতে শিখে গেছে। তাদের আর থামিয়ে রাখা যাবে না। প্রশ্ন যখন করতে শিখেছে, দেশকে তারা এগিয়ে নিয়ে যাবেই।
টাঙ্গাইলে আমি পঞ্চম শ্রেণির তিনজন ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। আতিয়া আদিবা, রুসমিয়া করিম ও জান্নাতুল বুশরা। তাদের মায়েরা শিশুসন্তানদের নিয়ে এসেছেন এই শীতের সকালে গণিত উৎসবে। আতিয়ার মা শারমিনা আকতার বললেন, আমরা চাই মেয়েরা গণিতে পারদর্শী হয়ে উঠুক। রুসমিয়ার মা ইয়াসমিন আরা ও বুশরার মা নুসরাত তানজিন লিজাও একই কথা বললেন। তাঁদের মেয়েরা ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়। বিজ্ঞানের প্রতি তাদের দারুণ আগ্রহ। মেয়েরা, মায়েরা বুঝতে পারছেন, এগিয়ে যেতে হলে বিজ্ঞান, গণিত ও অন্যান্য শিক্ষায় চৌকস হতে হবে। এটা আমাদের দেশের জন্য একটা বড় প্রাপ্তি।
মোবাইল ফোন নম্বর শুরু হয় একটা শূন্য দিয়ে। কারণ, এই শূন্য হলো আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশনের স্বীকৃত বাংলাদেশের ভেতরের মোবাইল কল সংকেত। যদি দেশের ভেতর থেকে কাউকে মোবাইলে ফোন করি, তাহলে এই শূন্য সংকেত থেকে টেলিকমিউনিকেশনস সিস্টেম বুঝে নেবে যে এই কলটি বাংলাদেশের ভেতরে যোগাযোগ করতে চায়। যদি বাইরের কোনো দেশ থেকে কল করতে হয়, তাহলে প্রথমে ০০৮৮ লিখে তারপর ০ নম্বর টিপতে হবে। কারণ, ০০ অর্থ আন্তর্জাতিক কল, ৮৮ হলো বাংলাদেশ, তারপর ০ দিয়ে শুরু মানে মোবাইলে বাংলাদেশের ভেতর কল যাবে। বাংলাদেশের কোড হলো ৮৮০। যদি নম্বরটি ০১৭.. হয়, তাহলে সেটা হবে গ্রামীণ ফোনের, ০১৫... হলে সেটা হবে টেলিটক ইত্যাদি।
সাবানের ফেনা কেন সাদা? কারণ সাবানের ফেনা যদি আলোর সবগুলো রং প্রতিফলিত করে, তাহলে সেটা সাদা দেখাবে। অনেক সময় ফেনার কোনো অংশ বেগুনি, লাল বা সবুজও দেখায়। তার মানে ফেনার মধ্য দিয়ে কিছু আলো প্রতিসরিত হয়ে চলে যায়, আর নীল, বেগুনি বা সবুজ রং প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে ফিরে আসে, তখন সেই রঙের দেখায়। কিন্তু এটা সাবানের রঙের জন্য নয়। আসলে সাবানের মধ্যে যে ক্ষার থাকে, তার রং সাদা। এর ওপর সবুজ বা গোলাপি রং মিশিয়ে হয়তো সাবান রঙিন করা হয়। কিন্তু পানিতে গোলানোর পর সেই রং আর থাকে না।
এখন দেখা যাক, ঘড়ির কাঁটা কেন ডান দিকে ঘোরে। কারণ, ঘড়ি আবিষ্কার হয়েছিল ইংল্যান্ড বা ইউরোপের কোনো দেশে। এর আগে ছিল সূর্যঘড়ি। ইংল্যান্ড পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে হওয়ায় সূর্য দক্ষিণ আকাশে হেলে থাকে। এ কারণে সূর্যঘড়ির যে দণ্ডের ছায়া দেখে সময় পরিমাপ করা হয়, সেই ছায়াটি বাঁ দিক থেকে ডান দিকে ঘোরে। কারণ, ওই স্থানটি উত্তর গোলার্ধে। ওখানে সূর্য যখন পূব থেকে পশ্চিমে যায়, তখন সূর্যঘড়ির দণ্ডের ছায়াটি বাঁ থেকে ডান দিকে ঘোরে। তাই ঘড়ি আবিষ্কারের সময় স্বাভাবিক ও অভিজ্ঞতালব্ধ চিন্তা অনুযায়ী ঘড়ির কাঁটা ডান দিকে ঘোরানোর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ঘড়ি যদি অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডে আবিষ্কার হতো, তাহলে হয়তো ঘড়ির কাঁটা বাঁ দিকে ঘুরত। কারণ, দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্যঘড়ির ছায়া উত্তর গোলার্ধের বিপরীত দিকে, অর্থাৎ ডান দিক থেকে বাঁ দিকে ঘোরে!
গণিতে অনেক মজা আছে। যেমন, আমি টাঙ্গাইলের গণিত উৎসবে বললাম, তরুণেরা বন্ধুর জন্মদিনে গণিতের একটা মজার ধাঁধা ধরতে পারে। প্রথমে সে বলবে ৬১৭৪ একটি ম্যাজিক সংখ্যা। কেন ম্যাজিক? কারণ যে কেউ চার অঙ্কের একটি সংখ্যা বলুক, যার অন্তত একটি অঙ্ক অন্যগুলোর থেকে পৃথক হবে। তাহলে সে ওই চার অঙ্কের সংখ্যা থেকে কিছু সংখ্যা নির্দিষ্ট নিয়মে সাজিয়ে যোগ-বিয়োগ করে ৬১৭৪ সংখ্যাটি বের করে দেবে। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। চার অঙ্কের সংখ্যাটি যা-ই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত ৬১৭৪ সংখ্যাটি বের করার কৃতিত্ব সে নিতে পারে। যেমন, কেউ ৩৭২৫ সংখ্যাটি বলল। এখন এই সংখ্যার চারটি অঙ্ক দিয়ে সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে ছোট সংখ্যাটি বের করতে হবে। এরপর বড়টি থেকে ছোটটি বিয়োগ করতে হবে। যেমন, এ ক্ষেত্রে বড় সংখ্যাটি হবে ৭৫৩২ এবং ছোটটি হবে ২৩৫৭। এর বিয়োগ ফল হবে ৫১৭৫। এখন আবার একই নিয়মে ৫১৭৫-এর সবচেয়ে বড় ও ছোট সংখ্যাটি বের করে আবার বিয়োগ। এভাবে কয়েকবার বিয়োগফল বের করলে শেষ পর্যন্ত ৬১৭৪ সংখ্যাটি পাওয়া যাবে। উৎসাহী তরুণেরা নিজেরা এটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
সামান্য কিছু প্রশ্ন করে বিজ্ঞানের কত কিছু জানা যায়, এটা আমরা কয়জন জানি বা বুঝি?
ছেলেমেয়েরা কিছু জানতে চাইলে বা প্রশ্ন করলে আমাদের অভিভাবক বা শিক্ষকেরা অনেক সময় রেগে যান। কিন্তু এটা একেবারেই উচিত নয়। প্রশ্ন করলে যদি বড়দের বকা খেতে হয়, তাহলে তো শিশুরা দমে যাবে। ওরা প্রশ্ন করতে ভয় পাবে। আর যদি প্রশ্নই না করে, তাহলে তাদের নতুন জ্ঞান অর্জনের সুযোগ ও সম্ভাবনাও নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা কি চাই আমাদের সন্তানেরা প্রশ্নবিমুখ হয়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকুক? না, এটা আমরা চাই না।
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বারবার একটা কথা বলেন, স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের শারীরিক বা মানসিক নিপীড়ন করা যাবে না। বেত বা স্কেল দিয়ে মারধর করা, শাস্তি দেওয়া, কাউকে বকাঝকা করা বা সবার সামনে অপমান করে নিচু করা ঘোর অন্যায়। এসবের কারণে শিশুরা দমে যায়। তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে আমরা দেশের কত সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীকে যে হারাচ্ছি, তার হিসাব–নিকাশ নেই। আমাদের এই খারাপ মনোবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আমেরিকা, ইউরোপের কোনো দেশে শিক্ষার্থীদের মারধর বা হেয় করা যায় না। তাহলে শিক্ষকের শাস্তি হয়। বরং শিশুদের নানাভাবে উৎসাহিত করা হয়। আমাদের সেই উন্নত সংস্কৃতির দিকে যেতে হবে।
আমরা যে গণিত উৎসব ও অলিম্পিয়াড করি, তা হয়তো শিশুদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ জোগায়। যত প্রশ্ন করবে শিশুরা, ততই ভালো।
আজকের শিশুরাই ভবিষ্যৎ। আমরা যেন তাদের মনের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে যা কিছু করা দরকার, তা করি।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com