Sunday, February 1, 2015

পোশাক কারখানায় দেড় শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ, মারা গেছেন দুজন

(হাসপাতালে ভর্তি অসুস্থ শ্রমিকদের কয়েকজন। ছবি: অরূপ রায়, সাভার) সাভারের একটি পোশাক তৈরির কারখানায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় দেড় শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়েছেন। রিয়াজ (২০) ও দিদার হোসেন (২২‍) নামে দুই শ্রমিক মারা গেছেন। তাঁদের পায় সবারই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ ছিল বুক আর মাথা ব্যথা। তবে অসুস্থতার কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঢাকার সাভারের রাজফুলবাড়িয়া এলাকার একেএইচ নিটিং অ্যান্ড ডাইং নামের কারখানাতে এ ঘটনা ঘটে। কারখানাটির চারটি ভবনে অন্তত ছয় হাজার শ্রমিক কাজ করেন। সাভার মডেল থানার পুলিশ ও কারখানা সূত্র জানায়, গত শনিবার রাতের পালার কাজ শুরু হওয়ার পরপরই পাঁচ শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর আজ রোববার সকাল সাড়ে আটটার দিকে এসব ভবনের দেড় শতাধিক শ্রমিক পর্যায়ক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য দ্রুত তাঁদের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এঁদের মধ্যে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫৬ জন এবং রাজফুলবাড়িয়ার আফনান হাসপাতালে ১৬ জনকে ভর্তি করা হয়। বাকিরা নিজ উদ্যোগে অন্যান্য হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। কারখানার চিকিৎসক আমিনা বেগম জানান, এর আগে কর্মরত অবস্থায় গত ২৫ জানুয়ারি সকাল নয়টার দিকে রিয়াজ নামে একজন সুইং অপারেটর বুকে ব্যথা নিয়ে কারখানার চিকিৎসাকেন্দ্রে আসেন। প্রাথমিক চিকিৎসায় কাজ না হওয়ায় তাঁকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তিনি মারা যান। এর দুই দিন পর ২৮ জানুয়ারি সকালে নমুনা বিভাগের শ্রমিক দিদার হোসেন একই রকম সমস্যা নিয়ে কারখানার চিকিৎসাকেন্দ্রে এলে তাঁকেও দ্রুত এনাম মেডিকেলে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি মারা যান। এনাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন শ্রমিক মিঠুন হোসেন বলেন, কর্মরত অবস্থায় গত শনিবার রাত আটটার দিকে তিনি বুক ও মাথায় ব্যথা অনুভব করে অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রায় একই রকম সমস্যার কথা জানালেন, শ্রমিক বশির উদ্দিন, মেহেদি হাসান, ইতি আক্তার ও মঞ্জুয়ারা বেগম। কর্মরত অবস্থায় তাঁরা বুকে চাপ অনুভব করেন। এর পরপরই শুরু হয় বুক ও মাথা ব্যথা। এর পরের কথা তাঁরা আর বলতে পারেননি। কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক রাশেদ খান বলেন, ‘সপ্তাহ খানেক আগে যে দুই শ্রমিক মারা গেছেন, তাঁরা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে এবার যাঁরা অসুস্থ হন তাঁরা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আগের ঘটনায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়েও তাঁরা অসুস্থ হয়ে থাকতে পারেন।’ কারখানার পরিচালক এস এম সাদুল্লা বলেন, ‘অসুস্থ হওয়ার আগে শ্রমিকদের কোনো খাবার সরবরাহ করা হয়নি, যা খেয়ে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। তাই একসঙ্গে এত শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার কারণ আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’ এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক ও মাদকাসক্ত রোগ বিভাগের অধ্যাপক দেওয়ান এ কে এম আবদুর রহিম বলেন, রোগের লক্ষণ আর অসুস্থতার ধরন দেখে মনে হচ্ছে এটা মানসিক সমস্যা। একজনকে অসুস্থ হতে দেখে অন্যরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। জানতে চাইলে সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান মোল্যা বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি কারখানা পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। নির্দেশনা পেলে অসুস্থ হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা হবে।’

বেগম খালেদা জিয়ার মনোবল অটুট

বিশ দলীয় জোটের চলমান আন্দোলন কর্মসূচী চালিয়ে যেতে বেগম খালেদা জিয়ার মনোবল অটুট আছে বলে জানিয়েছেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুর রউফ। রোববার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাথে দেখা শেষে কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। এরআগে সন্ধ্যায় আব্দুর রউফ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক আ ফ ম ইউসুফ হায়দার সহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে তার গুলশান কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।
বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, টেলিফোন সংযোগ করার পর সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে যান বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। উক্ত দুইজন ছাড়াও তাদের মধ্যে আরো ছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল অধ্যাপক তাজমেরী এস এ ইসলাম, অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়–য়া, অধ্যাপক ড. সিরাজউদ্দিন, অধ্যাপক ড. মো: মোর্শেদ হাসান খান, ড. আব্দুল মান্নান। এ ছাড়া ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ কার্যালয়ে যান।
পরে কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের আব্দুর রউফ বলেন, চলমান সঙ্কট নিরসনে ঐকমত্যের সরকারের প্রয়োজন রয়েছে। আলাপ-আলোচনা ব্যতীত জোর জবরদস্তি করে চলমান সঙ্কটের সমাধান হবে না। তাই, যারা মতায় রয়েছে এবং যারা মতার বাইরে আছে তাদের সবাইকে এ বিষয়ে চিন্তা করতে হবে।
বিচারপতি রউফ বলেন, পুত্রহারা শোকে কাতর বেগম খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে এসেছিলাম। আমরা তাকে বলেছি এক ছেলে হারিয়ে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না, আপনাকে কোটি ছেলের দায়িত্ব নিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, চলমান আন্দোলন নিয়ে বেগম জিয়ার মনোবল অনেক শক্ত রয়েছে। তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা- রাজনৈতিক মেঘেও আলো ছড়াক

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কা ও হতাশার মধ্যেও আজ বাংলা একাডেমির আয়োজনে শুরু হওয়া 'অমর একুশে গ্রন্থ্থমেলা ২০১৫' নিয়ে আমরা আশাবাদী হতে চাই। আমরা জানি, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে যে টানা অবরোধ চলছে, তাতে করে দেশজুড়েই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যথেষ্ট ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু এটাও মানতে হবে যে জীবন থেমে থাকে না। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় জীবন সাময়িক থমকে যায় বটে, থেমে থাকে না। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন, উৎসব, পার্বণ নিজের নিয়মেই এগিয়ে চলে। আমরা আশা করি, ঐতিহ্যবাহী বইমেলাও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মেঘ সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও প্রেরণার আলো ছড়াবে। আমরা আনন্দিত যে, বাংলা একাডেমি চত্বর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সম্প্রসারিত বইমেলায় গত বছর যেসব বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল, কর্তৃপক্ষ এবার আগে থেকে তা নিরসনে উদ্যোগী হয়েছে। শনিবার বইমেলা উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান আশা প্রকাশ করেছেন, এবারের মেলা ইতিহাস সৃষ্টি করবে। অন্য বছরগুলোর তুলনায় স্টলের সংখ্যা, আকার ও পরিধি বাড়ায় তার এই আশাবাদ। আমরাও চাই বইমেলার প্রতিবছরের বৃদ্ধি এবারও অব্যাহত থাকুক। মানুষ যেন স্বস্তির সঙ্গে, উৎসবমুখর পরিবেশে বই দেখতে, কিনতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তার দিকে বাড়তি মনোযোগ দিতেই হবে। আর্চওয়ে, নিরাপত্তা প্রহরা, অগি্ননির্বাপক ব্যবস্থা যেন নিছক প্রদর্শন না হয়, সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে বলি। সব পক্ষ আন্তরিক হলে বইমেলার পরিবেশ নির্বিঘ্ন ও উৎসবমুখর করা কঠিন নয়। আমরা জানি, বইমেলা 'জমতে' কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু বাংলা একাডেমি চত্বর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সম্প্রসারিত পরিসরে যে জ্ঞান, প্রাণ ও প্রেরণার সম্মিলন ঘটে, তার অনুরণন বইপ্রেমী বাঙালি হৃদয়ে মেলার ফটক খোলার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই শুরু হয়। কারণ বাংলাদেশে লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের সবচেয়ে বড় আয়োজন এটি। ফেব্রুয়ারি আসার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় মেলার প্রস্তুতি। নতুন বই নিয়ে প্রকাশকরা হাজির হন, ক্রেতারাও জ্ঞান ও সৃজনশীল চর্চার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে সমৃদ্ধ হন। তবে এও আমরা জানি, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার এই মাসে আয়োজিত বইমেলা নিছক বিক্রেতা-ক্রেতার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয় গৌরব। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রক্তাক্ত আন্দোলন যে পরিণতি পেয়েছিল তা বাঙালিকে পেঁৗছে দিয়েছিল নতুন ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে। বায়ান্নর তীব্র স্রোতধারাই যে একাত্তরের সমুদ্রগর্জনকে ডেকে এনেছিল তা এখন ইতিহাসের স্বীকৃত সত্য। বাঙালির স্বাধিকার ও স্বকীয়তার সঙ্গে তাই ২১ ফেব্রুয়ারির অসামান্য যোগ। আর ২১ ফেব্রুয়ারি যে চেতনাকে উজ্জীবিত করেছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে তা সবসময়ই প্রাসঙ্গিক থেকেছে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছে ভাষার চেতনা। ফেব্রুয়ারি আজ শুধু শোকের নয়, বাঙালির জ্ঞানচর্চা ও প্রাণস্ফুরণের মাসও। এ মাসটির প্রথম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত নানা উৎসব-আয়োজনে ব্যস্ত থাকে দেশ। সবচেয়ে বড় যে আয়োজনটি ফেব্রুয়ারিকে আলোকিত করে তা অমর একুশে গ্রন্থমেলা। গত দুই বছর রাজনৈতিক অস্থিরতায় মেলা খানিকটা মিইয়ে থাকলেও প্রেরণার আলো ছড়াতে দ্বিধা করেনি। আমরা আশা করি, এবারও সব শঙ্কা বাঙালির বইপ্রেমের কাছে হার মানবে।

ছয় বছর পর সৌদির শ্রমবাজারে বাংলাদেশ

(বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল গত ১৮ থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সৌদি আরব সফর করেন। এ সফরেই সৌদির শ্রমবাজারে আবারও বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত মেলে। ফাইল ছবি। ছবি: প্রথম আলো) বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে সৌদি আরব। আজ রোববার সৌদি আরবের মন্ত্রিসভায় এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। এর ফলে দীর্ঘ ছয় বছর পর সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলো। সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সৌদি রয়েল কোর্ট বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ডেপুটি মিনিস্টার আহমেদ আল ফাহাইদ ফোন করে আমাকে এই খবর জানিয়েছেন। কাজেই বলা যায়, আজ থেকে বাংলাদেশি কর্মী আসতে আর বাধা নেই।’ বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল গত ১৮ থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সৌদি আরব সফর করেন। ওই সফরেই সৌদির শ্রমবাজার খোলার ইঙ্গিত মিলেছিল। ঢাকায় ফিরে গত ২৫ জানুয়ারি সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এ ছাড়া সৌদি আরবের শ্রমমন্ত্রী আবদেল ফকিহকে উদ্ধৃত করে ‘আরব নিউজ’ও একই খবর প্রকাশ করে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ২৫ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬৩ জন বাংলাদেশি সৌদি আরবে গেছেন। কিন্তু ২০০৮ সাল থেকেই নতুন করে ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব। ফলে ২০০৭ সালে যেখানে দুই লাখ চার হাজার ১১২ জন এবং ২০০৮ সালে এক লাখ ৩২ হাজার কর্মী সৌদি আরবে যায়; সেখানে ২০০৯ সালে মাত্র ১৪ হাজার ৬৬৬ জন কর্মী যায় দেশটিতে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত একই পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল। এদিকে, সৌদি আরবে কর্মী যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ে পুরো শ্রমবাজারে। জনশক্তি রপ্তানি অর্ধেকে নেমে আসে। কাতার, ওমান, বাহরাইনের মতো দেশে কর্মী যাওয়ার চাপ বেড়ে যায়। অনেকেই ছয় থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করে এসব দেশে যেতে থাকেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে সৌদি আরব সফর করেন। তিনি সৌদি বাদশাকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার অনুরোধ জানান। এরপর প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন পাঁচবার সৌদি আরব সফর করেন। ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিনি সৌদি শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী জানিয়েছেন, এবারের সফরে তাঁর সঙ্গে সৌদি শ্রমমন্ত্রীর দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় অভিবাসন খরচ কমিয়ে আনার বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। এ ছাড়া ভিসা, মেডিকেল ফি, কর্মীর এয়ার টিকিট সবই দেবে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ।

মোসাদ্দেক আলী ফালু আটক

(বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুকে আজ সন্ধ্যায় আটক করে পুলিশ।) বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোসাদ্দেক আলী ফালুকে আটক করেছে পুলিশ। আজ রাত ৭টা ৫৫ মিনিটে খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়। আটকের পরে তাকে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার ওবায়েদুল হক সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার সঙ্গে কথা বলতে  চেয়েছেন, এজন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেন নি ওই কর্মকর্তা।

মাহফুজকে ফিরে পেতে মায়ের আকুতি

মাহফুজুর রহমান (২৩)। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্স প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র। তার মা সখিনা বেগম অভিযোগ করেছেন মাহফুজকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে পুলিশ গ্রেপ্তারের কথা অস্বীকার করেছে। রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এ বিবৃতিতে তিনি এ অভিযোগ করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, গত ১লা ফেব্রুয়ারি দুপুরে মাহফুজ চকবাজারে পারিবারিক দাওয়াত খেতে না আসায় আমি তাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করি ‘দাওয়াত খেতে আসনি কেন?’ তখন সে আমাকে জানায় ‘আমি পুলিশের কাছে আছি’। এরপর একাধিকবার ফোন করলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। প্রকাশ্য দিবালোকে সবার সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করলেও এ ব্যাপারে কোতয়ালি থানায় যোগাযোগ করা হলে ডিউটি অফিসার তাকে গ্রেপ্তারের কথা অস্বীকার করেন। আমি আশঙ্কা করছি, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বা অন্য কোন কারণে পুলিশ তাকে আটক করে থাকতে পারে। তবে আমার জানা মতে, সে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এর পরও যদি সে কোন অন্যায় করে থাকে আইনের মাধ্যমেই তার বিহীত হওয়ার কথা এবং আমি তা’ই আশা করি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক দেশের বিভিন্ন স্থানে গুম ও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকা-ের ঘটনার প্রেক্ষিতে আমার ছেলের জীবন হানির আশঙ্কা করছি। এ ব্যাপারে আমি সরকার, পুলিশ ও সাংবাদিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সহযোগিতা কামনা করছি। আমি আশা করছি, অতি শীঘ্রই আমার সন্তানকে সুস্থ অবস্থায় আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং মুক্ত হয়ে সে তার অধ্যয়ন চালিয়ে যেতে পারবে।

দেশবাসীর প্রতি বিএনপির আহবান : সাফল্য নিশ্চিত, আন্দোলন চালিয়ে যান- ‘সংযোগ পুনঃস্থাপন না করলে অবিরাম হরতাল’

‘অবৈধ’ সরকারের পদত্যাগ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। রোববার এক বিবৃতিতে দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ এই ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘গণতন্ত্র হত্যাকারী সর্ববিনাশী আওয়ামী শক্তিকে বিতাড়নের এই সংগ্রামে সাময়িক ত্যাগ স্বীকারের জন্য আমরা দেশবাসীকে আহবান জানাচ্ছি। সাফল্য নিশ্চিত দাবী করে এতে বলা হয়, জনদাবি আদায়ের কষ্টসাধ্য ও শোকবেদনা গণতন্ত্রের বিজয় অর্জনের মাধ্যমে শিগগিরই সাফল্য লাভ করবে।’
বিবৃতিতে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের ক্যাবল নেটওয়ার্কসহ সকল বৈদ্যুতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা অবিলম্বে পূণ:স্থাপন করা না হলে হরতাল ও অবরোধ অব্যাহত রাখারও হুঁশিয়ারী দেয়া হয়।
সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দেশ এখন গণতন্ত্রের পরিবর্তে শেখ হাসিনার মনোতন্ত্র এবং ইচ্ছাতন্ত্রে প্রবেশ করেছে। ইচ্ছামতো গুলি করে আন্দোলনকারীদের হত্যার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে,  আর এর দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউ, বিভিন্ন দেশের  মানবাধিকার সংস্থা ও সংগঠনসমূহের উদ্বেগ সত্ত্বেও অবৈধ সরকার প্রতিনিয়ত ক্রসফায়ারের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পাইকারীভাবে হত্যা করছে।’
সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জনগণের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে কলুষিত করার কুমানসে সরকারী এজেন্টরা পেট্রোল বোমা হামলার মাধ্যমে মানুষ হত্যা করছে। আর এর দায়-দায়িত্ব বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের ওপর দোষ চাপানোর পুরনো কৌশল অবলম্বন করছে এই অবৈধ সরকার। অত্যন্ত চাতুরতার সঙ্গে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটকে আওয়ামী প্রচার কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে।’
পেট্রোল বোমা হামলাকারীদের গ্রেফতার ও তদন্তের মাধ্যমে বিচারেরও দাবী করেন বিএনপির এই নেতা।
তিনি বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামী করে মামলা করার জন্য সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু মনে রাখতে হবে ‘এক মাঘে শীত যায়না’, এই দিন দিন না, আরো দিন আছে।’
সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ভোটারবিহীন অবৈধ সরকারের ততোধিক অবৈধ এতিম মন্ত্রীরা দিনমান কোরাস গেয়ে বেড়াচ্ছেন অবৈধ প্রধানমন্ত্রীর কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে। প্রতিযোগিতা দিয়ে তারা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুন্ডুপাত করছেন। তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও ঘৃণ্য বক্তব্যের জবাব দেয়ার মতো বাংলা ভাষার অরুচিকর শব্দগুলো আমরা আয়ত্ত্ব করতে সক্ষম হইনি। তারা জনসভা করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘ভাতে মারার’, ‘পানিতে মারার’ ঘোষনা দিয়েছেন। এ যেন গণতন্ত্রকামী সংগ্রামী জনগণের বিরুদ্ধে বিজাতীয় শত্রুদের আস্ফালন। ’
বেগম খালেদা জিয়া জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবী আদায়ের সংগ্রামে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছেন  বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
সালাহ উদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, এদেশের জনগণ দু:শাসনের কবলে পড়েছে এবং গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে শেখ হাসিনার প্রহসনের একতরফা নির্বাচনের কারণে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করায় এই রাজনৈতিক সমস্যার সূত্রপাত,  যে সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা এককভাবেই নিয়েছেন। অবরোধের পাশাপাশি দেশব্যাপী চলমান ৭২ ঘন্টার হরতাল কর্মসূচি সফল করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান তিনি।

‘শান্তি বজায় রাখতে চেষ্টা করে যাব’ -একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাঙালি জাতি বীরের জাতি। এই জঙ্গিবাদী কর্মকান্ডের কাছে তারা মাথানত করবে না। দেশের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমরা চেষ্টা করে যাব। রোববার বিকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনেরও উদ্বোধন করেন।  চলমান আন্দোলনের নামে নাশকতা বন্ধের আহবান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে কেউ যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেন, তার খেসারত তাকেই দিতে হবে। কিন্তু সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ কি অপরাধ করেছে যে, তাদের পুড়িয়ে মারতে হবে। ককটেল, বোমাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধ হওয়া উচিৎ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। গত বছরও নির্বাচনের আগে বহু মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আমরা সে অবস্থা কাটিয়ে উঠেছিলাম। ১লা জানুয়ারি নতুন বই তুলে দিয়েছি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছিল। যখনই বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায় তখনই আঘাত আসে।  তিনি বলেন, এসএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, আমরা শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারি না। শেখ হাসিনা আরও বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আমরা ভাষার উন্নয়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছি। উদ্বোধন শেষে গ্রন্থমেলা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির সভাপতি প্রফেসর এমেরিটাস আনিসুজ্জামান, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সংস্কৃতি সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান প্রমুখ।

ইসলামি ব্যাংকিং ফ্রড : সংসদে অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছেন, ইসলামি ব্যাংকিং একান্তই একটি ফ্রড (প্রতারণা)। এটাকে অন্যান্য ব্যাংকের সাথে এক করার  অনেক উদ্যোগ আমি নিয়েছি যখন আমি সরকারে ছিলাম আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ছিলাম। এটাকে বন্ধ করার সুযোগ মুসলিম উম্মাহর ওপর। যখন তারা বুঝতে পারবে ইসলামের নামে একটি জঘন্য প্রথা চালু করা হযেছে।  অর্থমন্ত্রী বলেন, যারা ধর্ম নিয়ে কথাবার্তা বলেন, সুদ ও রিবা কে এক করে ফেলেন। ইসলামে রিবা  নিষিদ্ধ।  রিবা আর বর্তমান সুদ এক জিনিস নয়। সুদ মানবিক চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংসদে প্রশ্নোত্তরে সরকারি দলের হাবিবুর রহমান মোল্লাহর এক সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী একথা বলেন। বিকালে ডেপুটি স্পিকার  ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। হাবিবুর রহমান মোল্লা জানতে  চান-সাধারণ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের কার্যকলাপ এক করে দেবেন কিনা ? জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটাকে এক করার অনেক প্রচেষ্টা আমি নিয়েছি অনেক বছর যখন আামি সরকারে ছিলাম না। আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ছিলাম। এবং ইসলামি ব্যাংকিংক প্রথম থেকেই আমার কাছে  মনে হচ্ছে এটা একান্তই একটি ফ্রড এবং সেভাবেই এটাকে সবসময় বিবচেনা করেছি। দুর্ভাগ্য যে ইসলামী ব্যাংকের তত্ত্ব সারা দুনিয়াতেই গৃহিত। আইএমএফ পর্যন্ত তাদের অনুমোদন দিয়েছে। সুতরাাং এটাকে বন্ধ করার কোন সুযোগ এখানে নেই। এটাকে বন্ধ করার সুযোগ মুসলিম উম্মাহর ওপর। মুসলিম উম্মাহ যখন রেশনালিষ্ট হবে, যখন বুঝতে পারবে ইসলামের নামে একটি জঘন্য প্রথা  চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইসলামে রিবাহ নিষিদ্ধ। রিবা এবং বর্তমান সুদ এক জিনিস নয়।  রিবা চক্র বৃদ্ধি সুদ। রিবা এর মধ্যে কোন ধরণের মানবিক চিন্তা ধারা নেই। কিন্তু  সুদ মানবিক চিন্তাধারার ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুদ হলো  কস্ট অব ফান্ড এবং কস্ট অব এডমিনিষ্ট্রেশন। কিন্তু রিবাহতে সেটা ছিল না। যারা ধর্ম নিয়ে কথাবার্তা বলেন তারা সুদ ও রিবা কে এক করে ফেলেন।  এটা একান্তই ভুল এবং  এই ভুলের ওপর ভিত্তি করেই ইসলামিক ব্যাংকিং হয়েছে  এবং এখন আমার কিছুই করার নেই।
খালেদা জিয়া দেশের শত্রুতা করছেন
নাজমুল হক প্রধানের এক সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে অর্থ মন্ত্রী বলেন,  আমাাদের কাছে সে রকম কোন ডাটা নেই যে, প্রতিদিন হরতাল অবরোধে কত টাকা ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু যেভাবে  অবস্থা চলছে আমার মনে হয়  আমাকে সেরকম একটি  সমীক্ষা চালাতে হবে।  দেখতে হবে যে কত টাকা ক্ষতি হচ্ছে। তবে ক্ষতিটা শুধু এই কদিনের নয়। ক্ষতিটা দেশের ক্ষতি হচ্ছে।  এই যে হরতাল  এটা একান্তই েেদশ বিরোধী  হরতার। এটা কোন দল বিরোধী  হরতাল নয়।  এটা এক্কেবারে দেশের  শত্রুতা। এটাই আমাদের বিশেষ করে বোঝা উচিত যে খালেদা জিয়া দেশের শত্রুতা করছেন। শামীম ওসমানের এক প্রশ্নের  জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গাড়ীতে আগুন দেয়া এটা একটি অত্যন্ত  নিন্মমানের উদ্যোগ। এটা দেশের সঙ্গে শুত্রুতা। এটা কোন রাজনৈতিক উদ্যোগ নয়।  আমাদের উচিত হবে  রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে এটাকে অস্বীকার করা  এবং এটাকে বন্ধ করার জন্য ব্যাবস্থা নেয়।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা হলে অবিলম্বে সংলাপে বসুন by প্রধানমন্ত্রীকে কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা হলে অবিলম্বে সংলাপে বসুন। একই সাথে ২০ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানান তিনি। আজ রোববার রাজধানীর মতিঝিলে নিজ কার্যালয়ের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানান তিনি। গত ২৮ জানুয়ারি থেকে কাদের সিদ্দিকী মতিঝিলে তার কার্যালয়ের সামনে ২০ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। আজ এক সংবাদ সম্মেলনে কাদের সিদ্দিকী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশের দালালরা তাকে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছে। তার আশেপাশে থাকা শয়তানেরা গোলমাল বাধাচ্ছে। তিনি বলেন, যারা এক সময় আওয়ামী লীগ কর্মীদের পাখির মতো হত্যা করেছে, তারাই সরকারকে এখন উপদেশ দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের ত্রাণকর্তা সেজেছে। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, জনগণ না চাইলে একদিনও ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। পুলিশ দিয়ে ক্ষমতায় থাকা যায় না। তিনি আরো বলেন, আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তাই বিনা ভোটে আপনার প্রধানমন্ত্রী হওয়া মানায় না। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হলে অবিলম্বে সংলাপে বসুন। ২০ দলীয় জোটের অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, দেশে শান্তি না আসা পর্যন্ত তিনি রাজপথে অবস্থান করবেন।

সরকারের দেড়গুণ বেশি ঋণের ল্যমাত্রা- অসমঝোতা অর্থনীতিকে অচল করে দেবে

চলমান অবরোধ-হরতালে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের হোঁচট খাওয়ায় ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ব্যয়নির্বাহের জন্য অনেক বেশি করে ঋণ নিতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে অর্থবছরের দ্বিতীয় ভাগের মুদ্রানীতিতে সরকারের ঋণের ল্যমাত্রা আগের ছয় মাসের চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি ঋণ নেয়ার ল্যমাত্রা নির্ধারণের বিপরীতে বাস্তবে বাস্তবায়ন হয়েছে ৬ শতাংশ। কাক্সিত হারে উন্নয়নব্যয় করতে না পারায় সরকারের ঋণের ব্যবহার হয়নি। তবে সরকার বাকি সময়ে তার কর্মসূচি ঠিক রাখলে ছয় মাসে ৭২ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করতে হবে। আর সে কারণে প্রয়োজন হবে অতিরিক্ত অর্থের। এ বিষয়ে প্রকাশিত নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন অনুসারে, বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে কাক্সিত হারে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না এবার। এর ওপর নতুন করে যুক্ত হয়েছে চলমান হরতাল-অবরোধ। এ কর্মসূচি আর কত দিন চলবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন পরিস্থিতিতে স্থবির ব্যবসাবাণিজ্যে আরো স্থবিরতা নেমে এসেছে। এত দিন নতুন বিনিয়োগ না থাকলেও চলমান বিনিয়োগের কারণে কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর হরতাল অবরোধের কারণে তা-ও প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এলে ঘাটতিব্যয় মেটাতে সরকারের ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়ার প্রয়োজন হবে। আর এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে সরকারের ঋণের ল্যমাত্রা আগের ছয় মাসের চেয়ে আগামী ছয় মাসে দেড়গুণ বাড়ানো হয়েছে। দেশের চলমান পরিস্থিতি উন্নতি না হলে বিনিয়োগ-চাহিদা আগের মতোই থাকবে। এখন এমনিতেই ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত অর্থ রয়েছে। বিনিয়োগ করতে না পারায় ব্যাংকগুলো কম পরিমাণে আমানত নিচ্ছে। আমানতকে নিরুৎসাহিত করতে ইতোমধ্যে আমানতের সুদহার কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আগে যেখানে ত্রেবিশেষে ১০০ টাকা আমানত নিতে সর্বোচ্চ ১৪ টাকা ব্যয় করা হতো, এখন তা ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। বিনিয়োগ-চাহিদা না বাড়লে টাকারও চাহিদা বাড়বে না। আর টাকার চাহিদা না বাড়লে সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলেও এর কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা না থাকার অর্থ হলো অর্থনীতি নিস্তেজ হয়ে পড়া। এর প্রভাব ধীরে ধীরে প্রাণহীন করে ফেলবে অর্থব্যবস্থাকে। এতে দেশের অর্থনীতি স্বল্পচাহিদা, স্বল্পবিনিয়োগ, কর্মসংস্থানহীনতা, সামাজিক অসন্তোষ পরিণতিতে প্রবৃদ্ধিহীনতার এক দুষ্টচক্রে পড়ে যাবে। এই চক্র ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই, রাজনীতিকে বাদ দিয়ে অর্থনীতিতে গতি আনা অথবা গতি রক্ষা করার কোনো উপায় নেই। আজ অর্থনীতিতে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে সেটির মূল উৎস রাজনৈতিক সঙ্কট। এই সঙ্কট উত্তরণে পদক্ষেপ না নিলে কোনোভাবেই অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটানো যাবে না। এই উপলব্ধির কথা আমরা সুশীলসমাজ থেকে শুরু করে বিশ্বসংস্থার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা পর্যন্ত সবার কাছে শুনতে পাচ্ছি। কেবল এই উপলব্ধি হচ্ছে না শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের। এ ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা যে সরকারকে নিতে হয়, তাতে কোনো সংশয় নেই। আমরা দেশ ও দেশের মানুষকে ভয়াবহ ক্ষতি থেকে বাঁচাতে রাজনৈতিক সঙ্কটের অবিলম্বে নিষ্পত্তি কামনা করছি। আলাপ-আলোচনা ছাড়া কোনোভাবেই এ সঙ্কটের নিষ্পত্তি করা যাবে না।

সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানই খুঁজতে হবে -বিশেষ সাক্ষাৎকারে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী by এ কে এম জাকারিয়া

ব্যবসায়ী নেতা ও এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুই দফায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক এই সভাপতি বর্তমানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া
প্রথম আলো : দীর্ঘদিনের অবরোধে দেশ প্রায় অচল হয়ে আছে, হরতালও হচ্ছে, এভাবেই কি চলবে? সমাধানের কোনো আশা?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : আমি তো কোনো আশা দেখছি না। সবাই জানে, সবাই বোঝে যে আলাপ-আলোচনা বা সংলাপের মধ্য দিয়েই এই সমস্যা সমাধানের একটি পথ খোঁজা উচিত। কিন্তু যাদের শোনার কথা তারা তো শুনছে না। যেভাবে চলছে, তার পরিণতি কী বা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, কে জানে?
প্রথম আলো : সংলাপ করার পরিস্থিতি কি আছে? বা সংলাপ করে আদৌ কোনো ফল পাওয়া যাবে বলে মনে করেন কি?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : সংলাপ ছাড়া পথটাই বা কী? গত ৫ জানুয়ারি থেকে দেশ অচল হয়ে আছে। মানুষের জীবন-জীবিকা বন্ধ হওয়ার দশা। কিন্তু মানুষ করবে কী? তাকে তো রোজগার করতে হবে। মানুষ এখন এর মধ্যেই বের হচ্ছে। হরতালের মধ্যেও মতিঝিল গিয়ে মিটিং করে এসেছি। ভয় নিয়ে গেছি, কিন্তু উপায় ছিল না। আগে আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক দলের লোকজন নিজেরা নিজেরা মারামারি করত। এখন মারা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, তাদের পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। বুঝতে পারি না, এটা কেমন রাজনীতি? যাঁরা এসব করছেন, তাঁরা আসলে কাদের জন্য রাজনীতি করছেন? কিন্তু কথা হচ্ছে, এভাবে তো চলতে পারে না। তাহলে পথ কী? দুই পক্ষকেই তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। সাধারণভাবে আমরা তো এটাই বুঝি।
প্রথম আলো : যেভাবে চলছে, মানে এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কি পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েছেন?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : এমন একটি পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে আর উপায় কী? আমরা যাঁরা ব্যবসা করি, তাঁরা চরম বিপদের মধ্যে পড়েছি। শুধু বড় ব্যবসায়ীরাই নয়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানমালিকদেরও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থা। সব ব্যবসায়ী সংগঠন তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেতার কাছে আবেদন-অনুরোধ—সবই করা হয়েছে। এরপর আমাদের আর কী বলার আছে?
প্রথম আলো : আমরা সব সময়ই দেখি যে বিভিন্ন রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়, আবেদন জানানো হয়। এসবে আগে কোনো কাজ হয়েছে বলে মনে করেন কি?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : আমার তো মনে হয় না যে আগে আমাদের কোনো উদ্যোগে ফল পাওয়া গেছে। আমরা এ ধরনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতেই আমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে গেছি, আবেদন-নিবেদন করেছি, এবারও করে যাচ্ছি। অতীতের অচলাবস্থাগুলো দূর হওয়ার পেছনে অন্য বিষয় হয়তো কাজ করেছে, ব্যবসায়ীদের কথা কেউ শুনেছে বা তাঁদের কথা ভেবে কেউ সমাধানের পথে গেছে বলে তো মনে হয় না।
প্রথম আলো : বাংলাদেশের রাজনীতি তো এখন ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। ব্যবসায়ীরাই তো রাজনীতিতে জায়গা করে নিচ্ছেন। দলের পদ, সাংসদ—সবই হচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা কেন তবে ভূমিকা রাখতে পারছেন না? তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছেন না?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে এসেছেন, আসছেন এটা ঠিক। তাঁরা তাঁদের স্বার্থও রক্ষা করতে চান। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বিষয় বা দলের প্রশ্ন আসে, তখন আসলে তাঁরা কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেন না বা ব্যবসায়ী হিসেবে দলের মধ্যে থেকে আলাদা কোনো ভূমিকা পালন করা কঠিনও। সবচেয়ে বড় কথা, ব্যবসায়ীরা তো জনগণেরও অংশ। রাজনৈতিক দলগুলো তো জনগণের স্বার্থও বিবেচনায় নিচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা আর বাড়তি কী ভূমিকা পালন করবে?
প্রথম আলো : জনগণের স্বার্থই যদি রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচনায় না থাকে, তবে কী রাজনীতি এখন দেশে চলছে?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : এখন দেশে যা চলছে তা সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা আসলেই বুঝতে পারছি না যে মানুষ মেরে কিসের রাজনীতি? কোনো বিত্তশালী লোক এসবের শিকার হননি, কারা হচ্ছেন? যাঁরা সাধারণ জনগণ, বাসে করে চলাচল করেন। তাঁরা পেট্রলবোমার আগুনে পুড়ে মরছেন। আর আগুনে পুড়েও যাঁরা বেঁচে আছেন বা থাকবেন, তাঁদের সারা জীবন ভুগতে হবে। এসব লোকজন ও তাঁদের পরিবারের দায়দায়িত্ব কে নেবেন? সেদিন টিভিতে দেখলাম এক নারীর স্বামী পেট্রলবোমার আগুনে পুড়ে মরেছেন। তিনি প্রশ্ন করছেন, তিনি এখন কীভাবে বাঁচবেন, কীভাবে তাঁর সংসার চলবে? এটা রাজনীতি হয় কীভাবে!
প্রথম আলো : টানা অবরোধ বা এ ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোন খাত বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে বা হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে বেশি প্রভাব ফেলবে?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : এ ধরনের পরিস্থিতিতে সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র দোকানদার থেকে শুরু করে সব ধরনের ব্যবসাতেই এর প্রভাব পড়বে, যা পুরো অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আপনাদের পত্রিকাতেই দেখলাম পর্যটন খাতের কী অবস্থা! তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবসা করে থাকে। এখন পর্যটনের এই ভরা মৌসুমে তাদের ব্যবসা কার্যত শূন্য। তবে তৈরি পোশাকশিল্পসহ রপ্তানিমুখী খাত যে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে, সেটা অর্থনীতির জন্য বড় চাপ তৈরি করবে। অনেক চুক্তি বাতিল হবে, সামনে নতুন কোনো অর্ডার পাওয়া যাবে না। একটি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের হয়তো ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অর্ডার রয়েছে, তারা যখন সামনের কাজ নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে তখন বলা হচ্ছে, আগে বর্তমান অর্ডারের শিপমেন্ট শেষ করুন, সামনের অর্ডার পরে দেখা যাবে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, তারা সম্ভবত নতুন বা অন্য কোনো বাজার খোঁজার কথা ভাবতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকবে।
প্রথম আলো : ইতিমধ্যেই কিছু বড় ঋণ পুনঃ তফসিল করতে হয়েছে।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : বড় ব্যবসায়ীরা হয়তো সামনেও আরও সুযোগ পাবেন, কিন্তু ক্ষুদ্র অনেক ব্যবসায়ী, যাঁরা ঋণ নিয়েছেন ব্যবসার জন্য, তাঁদের কী হবে? ঋণদাতা বা ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে তাঁরা ছাড় পাবেন বলে মনে হয় না।
প্রথম আলো : রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সংঘাত-সহিংসতা বা অবরোধ-হরতালের মতো কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। এর পরও দেশে অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা অব্যাহত রয়েছে বলেই নানা মহল থেকে বলা হচ্ছে।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : দেখুন, এ ধরনের কিছু পরিস্থিতি আমরা আগে কাটিয়ে উঠেছি ঠিকই। কিন্তু আপনি এ ধরনের চাপ একবার নিতে পারবেন, দুবার নিতে পারবেন, কিন্তু বারবার তো নিতে পারবেন না। এভাবে চলতে থাকলে তো একটা পর্যায়ে চাপ নেওয়ার ক্ষমতা আর থাকবে না। দেশের দুটো বড় দলেরই বোধ-বুদ্ধি লোপ পেল কি না কে জানে। দেশের কথা কারও বিবেচনায় থাকলে তো এমন হওয়ার কথা নয়। সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের বিষয়টি তো নিশ্চিত করতে হবে। সরকার সেটাও করতে পারছে না আবার আলাপ-আলোচনার পথও ধরছে না।
প্রথম আলো : এ ধরনের অবরোধ যদি চলতেই থাকে আর সরকারও যদি আলাপ-আলোচনার কোনো পথ না ধরে?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : এমন একটি পরিস্থিতি তো বেশি দিন চলতে পারে না এবং এটার চাপ নেওয়ার ক্ষমতাও একপর্যায়ে আমাদের থাকবে না। অনেক পেশার মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, অনেকের কমে গেছে। তাদের জীবন চলবে কীভাবে? বেশি দিন এভাবে ধরে রাখা যাবে বলে মনে হয় না। পেটের জ্বালায় মানুষ বের হয়ে আসবে। আমি রাজনীতির কথা বলছি না কিন্তু মানুষের সহ্যের একটা সীমা আছে। তবে কখন মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে, তা জানি না।
প্রথম আলো : দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনি হতাশা প্রকাশ করলেন, আপনি শুধু একজন উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী নন, দু-দুবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের একজন জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি যদি কোনো আবেদন জানাতে চান, তবে কী বলবেন? সেই সংলাপে বসার আহ্বান?
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : এ ছাড়া আর কী আবেদন বা অনুরোধই করতে পারি বলুন। সমঝোতা ছাড়া সমস্যার কোনো সমাধান নেই। আর এ জন্য দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। এ জন্য আলোচনায় আসতে হবে, সংলাপ করতে হবে। সবচেয়ে জোর দিয়ে যে কথাটি বলতে চাই তা হচ্ছে, সমস্যাটির অবশ্যই একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী : ধন্যবাদ।

মস্কোয় লাইব্রেরিতে আগুন- পুড়ে গেছে ১০ লাখ দলিলপত্র ধ্বংস

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর অন্যতম বৃহত্তম একটি ইন্সস্টিউটের লাইব্রেরি আগুনে পুড়ে যাওয়ায় ১০ লাখেরও বেশি ঐতিহাসিক দলিলপত্র ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ দুর্ঘটনাকে সাংস্কৃতিক ‘চেরনোবিল’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ইনস্টিটিউট অব সায়েন্টিফিক ইনফরমেশন অন সোশ্যাল সায়েন্সেস(আইএনআইওএন)এর দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগে। আগুন লাইব্রেরির দু’হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। অগ্নিনির্বাপক দলের ২শ সদস্যের চেষ্টায় শনিবার সন্ধ্যায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউটটিতে এক কোটিরও বেশি দলিলপত্র রয়েছে। এসবের মধ্যে ১৬শ শতকের পুরনো দলিলও রয়েছে। রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির ফোরতভের উদ্ধৃতি দিয়ে রাশিয়ার সংবাদ সংস্থাগুলি জানায়, বিজ্ঞানের জন্যে এটি বড়ো ধরণের ক্ষতি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম সংগ্রহ। সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের সমপরিমাণ বই ও দলিলপত্র এখানে রয়েছে। তিনি ১৯৮৬ সালে ঘটে যাওয়া পরমাণু দুর্যোগের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যা ঘটেছে তাকে চেরনোবিল দুর্ঘটনার সঙ্গেই তুলনা করা যায়। ফোরতভ বলেন, লাইব্রেরীর প্রায় ১৫ শতাংশ সংগ্রহ ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংস হওয়া এসব সংগ্রহে স্লাভিক ভাষার মূল্যবান ডকুমেন্ট ছিল। আরো ছিল ব্রিটেন, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রেরও ডকুমেন্ট। তিনি কমারসেন্ট এফএম রেডিওকে বলেন, দলিলপত্র ধ্বংস হওয়ার অন্যতম কারণ অগ্নিনির্বাপক দলের ছোঁড়া পানি। আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহার করা পানির কারণেই অনেক ডকুমেন্ট নষ্ট হয়েছে। তবে অগ্নিকান্ডে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। রুশ সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা আগুন লাগার কারণ জানার চেষ্টা করছেন। তবে প্রাথমিকভাবে অগ্নিকান্ডের জন্য বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটকে দায়ী করা হচ্ছে।

পরীক্ষার্থীদের দুশ্চিন্তায় রেখে রাজনৈতিক নেতাদের লাভ কী?

কাল থেকে শুরু হওয়ার কথা এসএসসি পরীক্ষা। অথচ বিরোধী জোটের টানা অবরোধের মধ্যে আজ থেকে ৭২ ঘণ্টার হরতাল ডাকা হয়েছে। এ অবস্থায় পরীক্ষা হবে, নাকি পেছাবে? হলেও সেটা কীভাবে? পরীক্ষার হলে যাবে কীভাবে? জীবনের নিরাপত্তা দেবে কে? এ রকম নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের প্রায় ১৫ লাখ কিশোর পরীক্ষার্থীর মনে।
শিক্ষাজীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নিয়ে তাদের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা তাদের মুখোমুখি হয়েছেন, তারাও জানিয়েছে তাদের আকুতির কথা।
রাজশাহী মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ইশতিয়াক ফারুকী রাজনীতিকদের উদ্দেশে বলেছে, ‘আমরা আগামী দিনের বাংলাদেশ। আমাদের কথা ভাবুন। আমরা লেখাপড়া শিখে মানুষ হতে চাই। পেট্রলবোমায় পুড়ে কয়লা হতে চাই না।’
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার আড্ডা উমেদিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ইমান হোসেনের জিজ্ঞাসা, পরীক্ষার্থীদের উৎকণ্ঠায় রেখে রাজনৈতিক নেতাদের লাভ কী? আর রাজশাহীর বি. বি. হিন্দু একাডেমীর বিজ্ঞান বিভাগের পূজা সরকারের মন খারাপ ১০ বছর শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে এসে অনিশ্চয়তা গ্রাস করেছে বলে। এ রকম পরিস্থিতিতে তার জানতে ইচ্ছে করে, সবাই শিশুদের দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বলে কেন?
সিলেট সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সাদিয়া নাসরিন টানা অবরোধের কারণে মডেল টেস্টও ঠিকমতো দিতে পারেনি। হরতাল, বোমা আতঙ্কে মুষড়ে পড়েছে সে। সাদিয়ার আকুতি, ‘আমরা রাজনীতি বুঝি না। শুধু পরীক্ষাটা ঠিকমতো ও নিরাপদভাবে দিতে চাই।’
সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের রাজেশ সরকার শঙ্কা, কোনো পরীক্ষায় অনুপস্থিতি কিংবা পৌঁছাতে বিলম্বের কারণে শিক্ষাজীবনই থমকে দাঁড়াতে পারে। এই চিন্তায় পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও ব্যাঘাত ঘটছে।
খুলনা সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে আরফা নাজনীন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ জানিয়ে সে বলেছে, ‘পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তায় মানসিক চাপে আছি। হরতালের কারণে পরীক্ষার রুটিন বদল হলে আগে প্রস্তুতি নেব কোন বিষয়ে? আর বোমা ও মারামারির মধ্যে কীভাবে পরীক্ষা দেব?’
সেন্ট যোসেফ স্কুলের চন্দন কুমার সাহার অভিমত, একবার পরীক্ষা পেছালে প্রস্তুতিতে খুব সমস্যা হয়। যেকোনো মূল্যে রুটিন অনুযায়ী পরীক্ষাটা হোক।
সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুলের তৌফিকুল ইসলাম বলে, এ রকম একটা পরীক্ষার মধ্যে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেওয়া যায় কি না, সেটা রাজনীতিবিদদের ভাবা উচিত। রাজনীতি তো মানুষের জন্য। তাহলে এর জন্য আমরা মূল্য দেব কেন?
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের হাসিবুল হাসান বলে, যথাসময়ে পরীক্ষা না হলে পিছিয়ে পড়ব। ফলাফলেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তার অনুরোধ, পরীক্ষা পেছালেও যেন তা শুক্র ও অন্যান্য পরীক্ষার মাঝে না নেওয়া হয়। এতে পরবর্তী পরীক্ষার ওপর প্রভাব পড়বে।
লক্ষ্মীপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শারমিন ইসলাম বলেছে, ‘কাল পরীক্ষা, অথচ আমরা নিশ্চিত না যে পরীক্ষা হবে কি না। আর পরীক্ষা হলেও নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় থাকছে। এরপর আর পরীক্ষার মানসিকতা থাকে?’
বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের আনিকা তাহসিন প্রস্তুতি নিয়ে সন্তুষ্ট। কিন্তু প্রথম পরীক্ষা ইংরেজি পিছিয়ে গেলে সেটা আবার কবে হবে তার কোনো ঠিক নেই। এই অনিশ্চয়তা মানসিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে তাকে। একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিশিতা জাহান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, আমাদের জীবন নিয়ে যাঁরা রাজনীতি করছেন তাঁদের কাছে অনুরোধ নাশকতা বন্ধ করুন। পরীক্ষার সময় সব ধরনের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি বাতিল করুন। আমরা সুষ্ঠু পরিবেশে পরীক্ষা দিতে চাই।
সাঈদ আল আমরি রংপুর পুলিশ লাইনস স্কুল ও কলেজের বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী। তাদের বাসা রংপুর শহরের ধাপ এলাকায়। আর পরীক্ষাকেন্দ্র শহরের কালেক্টরেট স্কুল ও কলেজে। সাঈদের ভাষায়, হরতালে বাসা থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রে নির্বিঘ্নে যাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। এরপর পরীক্ষা হবে কি হবে না, সেই অনিশ্চয়তা তো আছেই।
কাজী রিফানুস সালেহীন বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী। বাড়ি শহরের সার্কিট হাউসের পেছনে। পরীক্ষার কেন্দ্র রংপুর জিলা স্কুলে। এই অবরোধ হরতালের মধ্যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে সে বলে, পরীক্ষার প্রস্তুতির চেয়ে এখন বেশি আলোচনা হচ্ছে হরতাল অবরোধের খবর। এ অবস্থায় আমাদের মন ভেঙে গেছে। পড়ায় মন বসতে কষ্ট হয়। শুধু থেমে থেমে মনে হয়, এই বুঝি হরতাল প্রত্যাহার হলো।
কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নিশাত জাহান অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রস্তুতি নিয়েছে। তার মতে, এখন সময়মতো পরীক্ষা না হলে প্রস্তুতিতেও ভাটা পড়বে।
একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাইজা আলমের দাবি, অন্তত পরীক্ষাকে হরতাল ও অবরোধের আওতামুক্ত রাখা হোক।
কুমিল্লা জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী নাঈম আহমেদের ক্ষেদ, পরীক্ষার্থীরা কেউ দল করে না। যাঁরা হরতাল ডেকেছেন, তাঁদের ছেলেমেয়েরাও পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এর পরও কেন বোধোদয় হয় না।
যশোর পুলিশ লাইন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের সৌরভ রায়ের মতে, হরতাল-অবরোধ থাকলে প্রস্তুতি নিয়ে চাপে থাকতে হয়। পরীক্ষা হলে এক ধরনের চাপ। পিছিয়ে গেলে আরেক চাপ। আমাদের চাওয়া হচ্ছে—ঠান্ডা মাথায় ভালো পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
এমএসটিপি গালর্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানবিক বিভাগের জিনিয়া সুলতানা বলে, ধরুন আমরা ইংরেজি বিষয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। হরতাল-অবরোধ বা অন্য যেকোনো কারণে ওই বিষয়ের পরীক্ষাটা পিছিয়ে গেল। পরবর্তী সময়ে ওই পরীক্ষার আগে আর পড়তে মন চায় না। মনে হয়, ওইটার প্রস্তুতি তো আগেই নেওয়া আছে। পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখা যায়, কিছুই হচ্ছে না।
মাহমুদুর রহমান বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাদিয়া পারভিনের অভিমত, পরীক্ষা পিছিয়ে গেলে খারাপ লাগে। কখন কোন বিষয়ের পরীক্ষা পড়ে সেই টেনশনে থাকি। নির্দিষ্ট দিনের পরীক্ষা নির্দিষ্ট দিনে না হলে প্রস্তুতি ঠিক থাকে না। মনে হয়, ওই পরীক্ষাটা ভালো হবে তো?

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কি যুদ্ধাপরাধের বিচার হবে না? by অনুরূপ আইচ

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে বলে ওয়াদা করেছিল। ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার দেরিতে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছে। এ প্রক্রিয়ার নাম দেয়া হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। এ জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। এখানে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজাকারদের বিচার চলছে এখনও। বেশ কয়েকজন চিহ্নিত রাজাকারের শাস্তি হয়েছে এরই মধ্যে। আরও অনেকের বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বর্তমান সরকার কথা দিয়েছে, তাদের এ শাসনামলে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হবে। অপরাধীদের রায় কার্যকর করা হবে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধাপরাধীদের রায় কি এক মাসে কার্যকর হবে? নাকি ঝুলে থাকবে? যে কারণে অনেক প্রশ্ন উঁকি মারছে জনগণের মাঝে। যদি বর্তমান সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হয় কিংবা পরবর্তী নির্বাচনে যদি বিএনপি জয়লাভ করে তবে কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে? এমন প্রশ্ন দেখা দেয়ার অনেক কারণ রয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে বিএনপির ভূমিকা স্পষ্ট নয়। এখনও তারা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে জোটবদ্ধ। হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করলেও বিএনপি বাদ দেয়নি জামায়াতকে। বাদ দেয়া প্রসঙ্গও তুলছে না। শাহবাগে যখন তরুণ প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিল, তখনও প্রথম দিকে বিএনপি ছিল নিশ্চুপ। পরে বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকদের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। শাহবাগের আন্দোলনকারীদের নাস্তিক বলেছে। যুদ্ধাপরাধীদের মদদদাতা হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আঁতাত করেছিল বিএনপি। এখনও পর্যন্ত এটাই স্পষ্ট যে, বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের দল। যদিওবা তারা দাবি করে তারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। এ কথা শুধু মুখের কথাই রয়ে গেছে। তারা একদিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক দাবি করে, অন্যদিকে তারা স্বঘোষিত স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রী বানিয়েছিল। শুধু তাই নয়, যে জামায়াত কিংবা হেফাজতিরা বলে থাকে, ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম, নারীদের পড়ালেখা কিংবা কাজ করার অধিকার নেই, অথবা নারীদের বোরখা পরা বাধ্যতামূলক, সেই জামায়াত কিংবা হেফাজতে ইসলাম বোরখাহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার পতাকা তলে সমবেত হতেও দ্বিধা করেনি। এটা কোন ধরনের ভণ্ডামি? ইসলামের দোহাই দিয়ে যারা যেসব বিষয়কে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে, সেসব নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি কেন ঝুঁকছে হেফাজতিরা! তারা এরই মধ্যে বিএনপির কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে, আগামী নির্বাচনে তারা ৫০টি আসন চায় বিএনপির কাছে। বিএনপি হয়তো এ প্রস্তাবে সাড়া দিতে পারে। কারণ তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে অনেক কিছু করতে পারে তার উদাহরণ আছে। এছাড়া চার সিটি কর্পোরেশনে তাদের সমর্থিত প্রার্থী জেতার পর ভেবেছে, হেফাজতিদের সমর্থনের কারণে জিতেছে। এবার বুঝুন- বিএনপির মনোবল এতই ভঙ্গুর যে, তারা নিজেদের ওপর আস্থা না রেখে পরগাছা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছে। অথচ বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে এ দলের। তবুও যে কেন তারা অবলম্বন খুঁজে বেড়ান তা প্রশ্নবিদ্ধ।
জামায়াত-হেফাজতিদের অবলম্বন করে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসেও তবে কি তারা নিজেদের আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন করবে? নাকি জামায়াত হেফাজতিদের স্বপ্ন পূরণ করবে? তবে কি তারা নারীদের পড়ালেখা, কাজকর্ম সব নিষিদ্ধ করে দেবেন? নাকি বিএনপির নেত্রীরা সবাই বোরখা পরা শুরু করবেন? তখন তাহলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার কী হবে? এ প্রশ্ন এখন জনগণের। বিএনপি হয়তো ভুলে যাচ্ছে, চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন মানে জাতীয় নির্বাচন নয়। যে চার সিটিতে বিএনপি সমর্থক মেয়র জয়লাভ করেছে সেই চার সিটি বিএনপির ঘাঁটি বলেই পরিচিত ছিল এক সময়। বিএনপির নেতারা যোগ্যতাবলে তাদের ঘাঁটিতে জয়লাভ করেছে। এটা না ভেবে বিএনপি হয়তো ভাবছে, তারা জামায়াত-হেফাজাতদের কল্যাণে জিতেছে। এটা খুবই দুঃখজনক। আমার মতো অনেকেরই ধারণা, বিএনপি যদি জোট থেকে জামায়াতকে বের করে দেয়, তবে আগামী নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। যদি বিএনপি হেফাজতিদের প্রশ্রয় না দেয় তবে আসন সংখ্যা বাড়বে বিএনপির। ভোটের আগে যদি বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয় তবে তাদের জনসমর্থন বাড়বে। বিএনপি যদি পরে ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচার করে তবে তাদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা বাড়বে।
ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যদ্ধাপরাধীদের সমর্থনের প্রয়োজন নেই বিএনপির। বিএনপি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনৈতিক দল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ৯১-এর নির্বাচনে খালেদার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল একক জনপ্রিয়তা নিয়ে। সেই জনপ্রিয়তায় ধস নামেনি। বরং যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে জোট বাঁধার কারণে বিএনপির জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। এটা বিএনপি বোঝে কিনা জানি না। তবে বিএনপির বোঝা উচিত, সারাবিশ্ব এখন বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে। এমতাবস্থায় যারাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে নাটকীয় ভূমিকায় থাকবে, তারাই জনসমর্থন হারাবে।
অনুরূপ আইচ :
লেখক ও সাংবাদিক

যেকোনো ব্যবস্থা নিন, দায়িত্ব আমার by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

প্রধানমন্ত্রী বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তাদের দেশের চলমান নাশকতা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে যেকোনো ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যবস্থার দায় ভবিষ্যতে কে নেবে এই সংশয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনে উদয় হতে পারে। সে কথা স্মরণে রেখেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার দায়দায়িত্ব তিনি নেবেন বলেছেন কি না জানি না। জানি না এ আদেশের মাধ্যমে এ দেশের নাগরিকদের যাকে যেখানে খুশি নির্বিচারে হত্যা করার লাইসেন্স তিনি ওই তিন বাহিনীকে দিয়ে দিয়েছেন কি না। এখন মন্ত্রীদের মুখে ভাষা: ‘হুকুমের আসামি’।
এটি নতুন কথা নয়। আমার ছেলেবেলায় দেখেছি, গ্রাম্য টাউট মাতবরেরা গ্রামের ভেতর নিজেদের কর্তৃত্ব বহাল রাখার জন্য মামলা করিয়ে দিয়ে, সেসব মামলা চালু রাখার জন্য নিজেরা মামলা কিনে নিতেন। সেসব মামলায় অন্য কাউকে ফাঁসিয়ে দেয়ার জন্য হুমুকের আসামি করা হতো। তেমনি গ্রাম্য পদ্ধতিতে সরকার বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ ২০ দলীয় জোটের প্রায় সব নেতার বিরুদ্ধে ‘হুকুমের আসামি’ করে মামলা করেছে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, শেখ হাসিনা যেন শতায়ু হন।
হতে পারে যখনকার ঘটনা তখন সংশ্লিষ্ট ‘আসামি’কে পুলিশ তার নিচ বাড়িতে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তালাবদ্ধ করে রেখেছে। হতে পারে তখন তিনি ইতোমধ্যেই কারারুদ্ধ আছেন। কিংবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। তাতে কিছু যায় আসে না। তাদের হুমুকের আসামি করে দেয়া যায়। এমনকি এসব হুমুকের আসামিদের কেউ ক্রসফায়ারে যেতে পারেন। দেশে একটি নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিতে জনগণ সর্বাত্মক আন্দোলন করছে। সে দাবি আদায়ের জন্য গত ২৬ দিন ধরে জনগণ সারা দেশে সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে। এর সাথে সরকারি নিপীড়নের প্রতিবাদে মাঝে মধ্যেই যুক্ত হচ্ছে ১০-১৫ জেলায় হরতাল। এই হরতালেরও ডাক দেয়া হচ্ছে কোথায়ও কোথায়ও সরকারের নির্বিচার হত্যা, জেল-জুলুমের প্রতিবাদে। জনগণ তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালনও করছে।
এই যে দেশব্যাপী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সবার অংশগ্রহণমূলক একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু হয়ে গেল, সেটি এত তাড়াতাড়ি শুরু হবে সেরকম পরিকল্পনা সম্ভবত ছিল না। শেখ হাসিনার জনসভায় যোগ দেয়ার জন্য যখন ভাড়ায়ও যথেষ্ট লোক মিলছিল না, তখন বেগম খালেদা জিয়া দেশের যে প্রান্তেই গেছেন সেখানেই লাখ লাখ মানুষ তার বক্তব্য শোনার জন্য এসে সমবেত হয়েছেন। প্রতিটি জনসভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। তা থেকে আওয়ামী নেতাদের এমন উপলব্ধি হয়নি যে, তাদের জনসমর্থনে ভাটা পড়ে গেছে। কিংবা সে উপলব্ধি হয়েছে বলেই তারা ঘোষণা করতে শুরু করে যে, খালেদা জিয়াকে আর কোথায়ও রাস্তায় নামতে দেয়া হবে না।
তাদের ভয় এই যে, খালেদা জিয়ার জনসভায় যে লাখ লাখ লোকের সমাগম হয় তারা যদি হুট করেই রাস্তায় বসে পড়ে তাহলে সরকার পালানোর পথ পাবে না। যে কথা সেই কাজ। তিনি গাজীপুরের ভাওয়াল কলেজ মাঠে জনসভা আহ্বান করেছিলেন ২৭ ডিসেম্বর। কিন্তু ওই গ্রাম্য কৌশল অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সেখানে ছাত্রলীগ দিয়ে এক সভা আহ্বান করায়। অথচ বেশ আগেই ওই স্থানে খালেদা জিয়ার জনসভা করার জন্য জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি ছিল। কিন্তু সরকারি নির্দেশে এসব ছুড়ে ফেলে দিয়ে ‘শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা’য় পুলিশ সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করে ওই জনসভা পণ্ড করে দেয়। আর পুলিশের ১৪৪ ধারার কী বহর! আমরা দেখলাম, মাঠে যাতে বিএনপি জনসভা করতে না পারে, তার জন্য শত শত পুলিশ মোতায়েন করা হলো। আর তার পাশ দিয়ে ১৪৪ ধারা ভেঙে দিনভর মিছিল করল ছাত্রলীগ। পুলিশ বাধা দিলো না। অর্থাৎ ১৪৪ ধারা জারি আছে, সেটি কার্যকর শুধু বিএনপির জন্য, যাকে কোনো অবস্থাতেই গণতন্ত্র বলা যায় না। এর প্রতিবাদে এক দিন হরতাল পালন করে ২০ দলীয় জোট।
এরপর এরা ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালনের ডাক দেয়। সে উপলক্ষে দেশব্যাপী কালো পতাকা প্রদর্শন ও ঢাকায় একটি সমাবেশ আহ্বান করে। সরকারও ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্রের বিজয় দিবস পালনের জন্য সোহরাওয়ার্দীতে একটি সমাবেশের ডাক দেয়। এটি ছিল সরকারের এক চরম দুরভিসন্ধি। সরকার জানত তাদের এই জনসমাবেশ ফপ হতে বাধ্য। সে কারণে পুলিশ দিয়ে তারা সারা দেশে সব ধরনের সভা-সমাবেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করে দেয়। আওয়ামী লীগ বলতে থাকে যে, পুলিশের অনুমোদন পাওয়া গেলে সোহরাওয়ার্দীতে তাদের সমাবেশ হবেই। কিন্তু ৩ জানুয়ারি রাত থেকেই সরকার সারা দেশ থেকে ঢাকা অভিমুখী সব যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতেও তাদের মতলব অস্পষ্ট থাকে না। এরা যদি গণতন্ত্রের বিজয় পালন করবেই তাহলে ঢাকায় লোক আসার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে কেন?
৩ জানুয়ারি রাত থেকেই এরা বেগম খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ে তালা দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। বিএনপি অফিস থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় রুহুল কবীর রিজভীকে। তারপর ওই অফিসেও তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। এ অবস্থায়ই বেগম খালেদা জিয়া নয়া পল্টনে তার প্রস্তাবিত জনসভায় যোগ দেয়ার জন্য গাড়িতে ওঠেন। কিন্তু পুলিশ তার কার্যালয়ের তালা তো খুলে দেয়ইনি, বরং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ঘোষণা করে বসলেন, যত দিন প্রয়োজন তত দিন তাকে সেখানে তালাবদ্ধ করে রাখা হবে।
অপর দিকে প্রধানমন্ত্রী বলতে থাকলেন, তিনি তো ইচ্ছে করলেই অফিস ছেড়ে বাড়িতে চলে যেতে পারেন। এক দিকে তার অফিসের দরজায় দরজায় তালা। অপর দিকে বাড়িতে যাওয়ার আহ্বান। এতে কেবল লোক হাসানোই হয়েছে। সরকারের লাভ হয়নি। সরকার কেবলই বলেছে, বেগম খালেদা জিয়া অবরুদ্ধের নাটক করছেন। তাকে যে শুধু ৫ জানুয়ারি তার অবরুদ্ধ অফিস থেকে বের হতেই দেয়া হলো না, তা-ই নয়, বরং যখন তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে দাঁড়ালেন, তখন তার দিকে স্প্রে করা হলো আদালতে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিষাক্ত পেপার স্প্রে। তাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া ও তার অন্য নেতাকর্মীরাও।
বেগম খালেদা জিয়াকে তার অফিসে অবরুদ্ধ করে রাখার জন্য অফিসের চার পাশে মোতায়েন করা হয় শত শত পুলিশ ও পানিকামান। সড়ক থেকে ইট-বালুর ট্রাক ধরে এনে তার বাড়িতে যাওয়ার পথ আটকে দেয়া হয়। এই ট্রাকের সংখ্যা ১৩টিতে উন্নীত করা হয়েছিল। এরপর কী করবেন খালেদা জিয়া? যা করা সঙ্গত, তিনি তাই করলেন। নিরপেক্ষ কোনো কর্তৃপক্ষের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দিলেন। যে অবরোধের সূচনা করেছিল আওয়ামী লীগই। সে অবরোধ চলছেই এবং প্রতিদিন তা আরো বেগবান হয়েছে। আরো বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিনই তাতে অংশগ্রহণ করেছে। এখন গোটা দেশই এই অবরোধে সম্পৃক্ত।
সরকার মনে করেছিল, বেগম খালেদা জিয়াকে আটকে রাখতে পারলে এবং ২০ দলীয় নেতাকর্মীদের পাইকারি হারে গ্রেফতার করতে পারলেই জনগণের এই অবরোধ একেবারে ধসে পড়বে। সেই প্রথম দিন থেকেই আওয়ামী নেতারা এই বলে তম্বি করছেন যে, সাত দিনের মধ্যে অবরোধ শেষ হয়ে যাবে। দেশের অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সেই সাত দিন ২৭ দিনে গড়িয়েছে। অচল অবস্থা শেষ তো হয়ইনি, বরং আরো জোরদার ও বেগবান হয়েছে। সরকার  দেখছে, অবরোধের মাত্রা দেখে নতুন নতুন এলাকায় তা বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে সরকার টিভি চ্যানেলগুলোকে ডেকে বলল, তারা যেন নিজ নিজ চ্যানেলে শুধু এটাই প্রচার করে যে, দেশে অবরোধ-টবরোধ কিছু হচ্ছে না। সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় চলছে।
কিন্তু টিভি চ্যানেলে দেখাক বা না দেখাক, সত্য ধামাচাপা পড়ে থাকেনি। অবরোধ জোরালো থেকে আরো জোরালো হয়েছে। তখন সরকার এক ভিন্ন কৌশল নিতে শুরু করল। ২০ দলীয় জোটের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও বেগবান আন্দোলন থেকে দৃষ্টি ফেরানোর জন্য সরকারের এজেন্টরা যানবাহনে পেট্রলবোমা ছুড়ে জানমালের ক্ষতি করতে শুরু করল। সরকারের ময়নাপাখি আলোচকেরা বার্ন ইউনিট, বার্ন ইউনিট বলে সরকারের ধুয়াকে আরো সরব করে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করল না যে, এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ২০ দলীয় জোটের লোকেরা করেছে। কারণ আগুনে মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো বীভৎসতা কেউ সমর্থন করে না। এজন্য যদি ২০ দলীয় জোট দায়ী হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ তাদের প্রতি বিরূপ ধারণাই পোষণ করবে।
পাঠক লক্ষ করে থাকবেন, প্রথম দিকে যে দু-একটি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়, তাতে অগ্নিসংযোগকারীরা যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে আগুন দিয়েছেন। কিংবা বলেছেন, ভাই আপনারা তাড়াতাড়ি নামেন। বাসে আগুন দেবো। এতে সাধারণ মানুষ হেসেছে। যদিও তাতেও সম্পদের অপচয় হয়েছে। সরকারের পেট্রলবোমা কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর এরা এখন একেবারে ১৯৭১ সালের পাকিস্তান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ  নিয়েছে। সরকার বলেছে, পাড়ায় পাড়ায় শান্তি কমিটির মতো সন্ত্রাস নির্মূল কমিটি গঠন করবে ছাত্রলীগ, যুবলীগ প্রভৃতি লীগের সদস্যরা। এরা পাড়া মহল্লার সম্ভাব্য ‘বোমাবাজ’দের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হতে ধরিয়ে দেবে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি নির্দেশ হলো, এরা এসব সম্ভাব্য বোমাবাজকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করতে পারবে।
১৯৭১ সালেও ঠিক তাই ঘটেছিল। এরকম শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এরা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দিত বা ধরিয়ে দিত। আর পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে তাদের হত্যা করত। কিন্তু ১৯৭১-এর যুদ্ধে এত কিছুর পরও সাধারণ মানুষেরই জয় হয়েছিল। অতবড় শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে জনগণের কাছে পরাজয় বরণ করে নিতে হয়েছিল। ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত উৎপীড়িতেরই জয় হয়। এ দেশের মানুষেরও বর্তমান গণতন্ত্রের লড়াইয়ে বিজয় সুনিশ্চিত।
এদিকে আন্তর্জাতিক কোনো অনুরোধ বিবেচনাকে সরকার সামান্যও মূল্য দেয়নি। ভারত ছাড়া গোটা পশ্চিমা বিশ্ব ২০১৪ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে, অতি দ্রুত সবার অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের আয়োজন করুক সরকার। এতে তো সরকার কোনো কান দেয়ইনি, বরং এসব রাষ্ট্র ও তাদের কূটনীতিকদের শিষ্টাচারবহির্ভূত ভাষায় গালিগালাজ করে দম্ভ করেছে। গত ২৯ জানুয়ারি ব্রিটেনের হাউজ অব কমন্সে আবারো বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। তাতে তারা গত বছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। সঙ্কট নিরসনে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি জাতীয় নির্বাচনই একমাত্র বিকল্প বলে তারা মত দিয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, হত্যা, গুম ও নির্বিচারে গ্রেফতারসহ নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মারাত্মক আইন লঙ্ঘনের বিচার করতে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা অপহরণ, হত্যা ও খেয়ালখুশিমতো আটক করছে। বিশেষ করে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের টার্গেট করা হচ্ছে। মুক্ত মত প্রকাশে অগ্রহণযোগ্য সীমারেখা আরোপ করেছে। সমালোচনা করায় ২০১৩ সালে কয়েকটি টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে সরকারের স্বার্থ রক্ষিত হওয়ায় সরকার নিরাপত্তা বাহিনীকে দায়মুক্তি দিয়ে রেখেছে। আর তাদের মারাত্মক ঘটনাগুলোর বেলায় চোখ বন্ধ করে রেখেছে।
জাতিসঙ্ঘ বলেছে, বিরোধী দলের কোনো শীর্ষ নেতাকে খেয়ালখুশিমতো গ্রেফতার করতে পারে না আইন প্রয়োগকারীরা। এ বিষয়টি সরকারকে খেয়াল করতে হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিপ্রেক্ষিতে শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশী সেনা মোতায়েনের বিষয়টি মানদণ্ড যাচাইয়ের নীতির অধীনে রাখা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মহাসচিব বান কি মুনের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, আমরা দেখেছি এবং দেখছি যে বাংলাদেশ পরিস্থিতি হতাশ হওয়ার মতো। এরকম বিশ্লেষণের যে সুদূরপ্রসারী মূল্য আছে সেটা সাম্প্রতিক ভারতের দিকে তাকালেও হয়তো সরকার বুঝতে পারবে।
এখানে আরো একটি কথা বলে রাখা ভালো, প্রধানমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার ওপেন জেনারেল লাইসেন্স দিয়ে দিলেন, যা কার্যত চলছিল অনেক দিন ধরেই। এখনো চলছে। সেটি যদি নিয়ন্ত্রণ না করা হয় এবং অব্যাহতভাবে চলতেই থাকে, তাহলে আত্মরক্ষার্থেই মানুষ সংঘাত সংঘর্ষের পথ অবলম্বনে বাধ্য হবে। তাতেও শেষ পর্যন্ত স্বৈরশাসকদের কোনো লাভ হবে না। সে ক্ষেত্রেও বেদনাদায়ক পরাজয়ই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়াবে।
সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

১৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন খালেদা

(বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর অন্ধকারাচ্ছন্ন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়। শুক্রবার রাত পৌনে তিনটার দিকে তোলা ছবি l সংগৃহীত) নৌপরিবহনমন্ত্রীর ঘোষণার ১০ ঘণ্টার মাথায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ের বিদ্যুৎ-সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে। ১৯ ঘণ্টা অন্ধকারে রেখে রাত ১০টার দিকে আবার সংযোগ চালু করা হয়। শুক্রবার দিবাগত রাত পৌনে তিনটায় বিদ্যুতের খুঁটি থেকে তার খুলে দেওয়া হলে কার্যালয়টি অন্ধকারে ডুবে যায়। এরপর গতকাল শনিবার দুপুরের দিকে কার্যালয়ের কেব্ল টিভি ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর বিকেলে ওই এলাকার মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কও বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশ্য রাতে তা আবার চালু হয়। বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শাইরুল কবির বলেন, রাতে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সময় এর কারণ জানতে চাইলে ডেসকোর লাইনম্যান বলেন, তিনি কিছু জানেন না। থানার নির্দেশে লাইন কাটতে এসেছেন।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে গুলশান থানার পুলিশ বিষয়টি অবহিত নয় বলে দাবি করেছে। কিন্তু কেন, কী উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেওয়া হলো, আবার ১৯ ঘণ্টা পর চালু করা হলো, সরকারের পক্ষ থেকে তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। যোগাযোগ করা হলে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারেননি। তবে বাগেরহাটে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার বাসার বিদ্যুৎ সরকার বিচ্ছিন্ন করেনি। আমাদের শ্রমিক-কর্মচারীরাই এটি বন্ধ করে দিয়েছে।’
গতকাল রাতে বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া শাখার একজন সদস্য জানান, রাত ১০টার পর চার-পাঁচজনের একটি দল হঠাৎ এসে বিদ্যুৎ-সংযোগ চালু করে দিয়ে দ্রুত কেটে পড়ে। গামছা দিয়ে এদের মুখ ঢাকা ছিল। শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সমাবেশে হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার না করলে খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ের বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী। তিনি এও বলেন, ওই কার্যালয় এমনভাবে অবরুদ্ধ করা হবে, যাতে খালেদা জিয়া না খেয়ে মরে পড়ে থাকবেন।
এদিকে গতকাল খালেদা জিয়ার কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় বিএনপির ১৩ জন নারী সদস্যকে আটক করে পুলিশ। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ছয় নারী আইনজীবী কর্মী, সাড়ে সাতটায় বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য খালেদা ইয়াসমিন, সাড়ে আটটায় আরও ছয়জন নারী কর্মীকে আটক করে পুলিশ। এ সময় আরও কিছু নারী কর্মী কার্যালয়ের পেছনের ফটক টপকে বের হয়ে যান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই কড়া নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যেই রাত সাড়ে নয়টায় খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের ৫০-৬০ গজ দূরে পর পর দুটি ককটেল ফাটে। কিন্তু পুলিশ এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়নি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, জনসভায় ঘোষণা দিয়ে গভীর রাতে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি দল ঘোষণা দিয়েছে, পানি, গ্যাস ও খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেবে। সভ্য দুনিয়ার ইতিহাসে এ রকম ঘৃণিত ও জঘন্য নজির কোথাও পাওয়া যাবে না।
বিবৃতিতে বিএনপির এই নেতা দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা আসুন, দেখুন। ভোটারবিহীন এই সরকারের বদৌলতে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে কত ঘৃণ্য জঙ্গলিতন্ত্র কার্যকর হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কাছে আহ্বান জানাই, আপনারা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অনুধাবন করে যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।’
বিএনপির চেয়ারপারসন তাঁর কার্যালয়ের বিদ্যুৎ-সংযোগ কেটে দেওয়ার ঘটনাকে ‘নিকৃষ্ট নিষ্ঠুরতা’ বলে মন্তব্য করেন। গতকাল কার্যালয়ে থাকা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলাপে তিনি এ মন্তব্য করেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তাঁর প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান। খালেদা জিয়া এ ঘটনায় ‘স্তম্ভিত’ জানিয়ে তিনি বলেন, বিনা নোটিশে নাগরিক সেবা বন্ধ করে দেওয়া মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে ডেসকো কোনো বক্তব্য দেয়নি। কোম্পানির একজন পরিচালক ও গুলশান অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোর কাছে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তাঁরা বলেন, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে ডেসকোর সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি ‘ট্রাবল শুটিং গ্যাং’ (বিদ্যুৎ সরবরাহ সুষ্ঠু রাখার কাজে যারা ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকে) চাওয়া হয়। সে অনুযায়ী গুলশান অঞ্চলের একটি দলকে সেখানে যেতে বলা হয়। গভীর রাতে পুলিশ তাদের নিয়ে গিয়ে ওই বাড়ির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। ডেসকোর সিদ্ধান্তে এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়নি।
বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর থেকে জেনারেটরের মাধ্যমে বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়। তবে কার্যালয়ের গ্যাস ও পানির সংযোগ চালু ছিল। বিদ্যুৎ, কেব্ল টিভি ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর বিকেল পর্যন্ত বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন কিংবা ২০-দলীয় জোটের কোনো নেতা খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে যাননি। বিকেলের দিকে মহিলা দলের কয়েকজন নেতা খাবার, মোমবাতি ও পানি নিয়ে ভেতরে যান। রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজী। ফিরে এসে এমাজউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে বিদ্যুৎ, মোবাইলসহ অন্যান্য সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া নিকৃষ্টতম পদক্ষেপ। তিনি বলেন, তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এমন আচরণের উদাহরণ কোথাও দেখা যাবে না। যারা এসব করছে, তাদের ‘গণতন্ত্রের প্রথম পাঠ’ নেওয়া উচিত। তাঁকে হত্যার কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
গুলশান-২-এর ৮৬ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাড়িটি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়। গত ৫ জানুয়ারি ‘একতরফা’ সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তির দিনে রাজধানী ঢাকায় পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ডেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সাংঘর্ষিক অবস্থান নিলে ৩ জানুয়ারি রাতেই পুলিশ ইট-বালুর ট্রাক দিয়ে কার্যালয়ের সামনের রাস্তা আটকে খালেদা জিয়াকে ‘অবরুদ্ধ’ করে। পরে পুলিশ ও ইট-বালুর ট্রাক সরিয়ে নিয়ে ‘অবরোধমুক্ত’ করা হলেও তিনি আর কার্যালয় থেকে বের হননি। ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় তিনি থাকছেন।
রাত আটটার দিকে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে রাতের খাবার ও কিছু বোতলজাত পানি নেওয়া হয়। এর আগে বেলা ১১টার দিকে ৫০টির মতো ফিল্টার পানির জার এবং দুপুর পৌনে ১২টার দিকে বড় দুটি ড্রামে করে জ্বালানি তেল খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের উত্তর ফটক দিয়ে ভেতরে নেওয়া হয়। কার্যালয়ের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ আছে। সাদা পোশাকে ওই কার্যালয়ের আশপাশের এলাকায় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায়।
কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার সঙ্গে এই কার্যালয়ে আছেন সদ্য প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান ও তাঁর দুই মেয়ে। এ ছাড়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, উপদেষ্টা আবদুল কাইয়ুম, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, মাহবুব আলম, প্রেস সচিব মারুফ কামাল খানসহ খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দলের সদস্য ও কার্যালয়ের কর্মচারীরা রয়েছেন।
মারুফ কামাল বলেন, গত রাতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর খালেদা জিয়া দুই নাতনিকে নিয়ে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন। তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকে কার্যালয়ের ফ্যাক্স মেশিন অকার্যকর। মোবাইল সেটগুলো চার্জ দিতে না পেরে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ভেতরের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন।
স্মারকলিপি: এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা চলাকালে অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহার করার দাবিতে গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে খালেদা জিয়াকে স্মারকলিপি দিয়েছেন ২৫-৩০ জন অভিভাবক। প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে কয়েকজন অভিভাবক গুলশানের কার্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেন। সাড়ে ১২টার দিকে কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা স্মারকলিপি গ্রহণ করেছেন বলে দাবি করেন আইরিন পারভীন নামের একজন অভিভাবক। এ ব্যাপারে তাঁরা আজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবেন বলে জানান।
লায়লা আফরোজ নামের আরেক অভিভাবক বলেন, তাঁর মেয়ে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে। তিনি কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে এখানে আসেননি। বিকেল চারটার দিকে আমজাদ হোসেন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে এসএসসি পরীক্ষার্থীর বাবা দাবি করে কার্যালয়ের ভেতর যেতে চান। তিনি ছেলের পরীক্ষার প্রবেশপত্র হাতে নিয়ে অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে খালেদা জিয়ার প্রতি অনুরোধ জানান।

আগুনে নিভে গেল ১৩ প্রাণ- মিরপুরে সনি সিনেমা হলের সামনে প্লাস্টিক কারখানায় বিস্ফোরণ

(রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে গতকাল বিকেলে প্লাস্টিক কারখানায় আগুনে মারা যাওয়া একজনের লাশ বের করে আনেন উদ্ধারকর্মীরা l ছবি: প্রথম আলো) রাজধানীর মিরপুরে গতকাল শনিবার বিকেলে একটি প্লাস্টিক কারখানায় বিস্ফোরণের পর আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ১৩ জন। আহত হন অন্তত তিনজন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০ জন পুরুষ ও ৩ জন নারী বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আগুনে পুড়ে বিকৃত হয়ে গেছে লাশ। তাঁদের মধ্যে তিনজনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে বলে রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। তাঁরা হলেন কারখানার মালিকের ব্যবসায়িক অংশীদার তাসবীর হাবিব (৩০), হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বাচ্চু মিয়া (৪৫) ও পিয়ন রাশিয়া বেগম (৫০)। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন আহত ব্যক্তিরা হলেন কারখানার নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক তৌহিদুল ইসলাম (৫০), নিরাপত্তাকর্মী কামাল হোসেন (৩৫) ও কারখানার শ্রমিক রবিউল ইসলাম (৩৫)। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, কারখানাটির মালিকের নাম আনিসুজ্জামান খান বলে জানা গেছে। ওই কারখানায় ব্রয়লার, গ্যাস সিলিন্ডারসহ দাহ্য পদার্থ ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে ব্রয়লার বা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর পুরো কারখানায় আগুন লেগে যায়। সরেজমিনে জানা যায়, ‘অ্যাপকো বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামের চারতলা ভবনের কারখানাটি মিরপুর ১ নম্বরে সনি সিনেমা হলের বিপরীত পাশে অবস্থিত। কারখানাটিতে প্লাস্টিক ও ফোমের মিশ্রণে একবার ব্যবহার উপযোগী খাবারের প্যাকেট, গ্লাস, প্লেটসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী তৈরি করা হয়। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কারখানাটির নিচতলায় বিকট শব্দে দুটি বিস্ফোরণ হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন আর কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় পুরো ভবন। ওই সময় ভবনে থাকা লোকজন এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। কেউ ভবন থেকে দৌড়ে বের হয়ে, কেউ ছাদে উঠে পাশের সংযুক্ত ভবনের ছাদে গিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। ঘটনার পর আশপাশের ভবন ও বাসাবাড়িতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে যান। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভেতর থেকে ১৩টি লাশ বের করে আনেন বলে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিমুজ্জামান নিশ্চিত করেছেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, মনে হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন ধরার পর ব্রয়লার বা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে তা ছড়িয়ে পড়ে। ভবনের ভেতরে দাহ্য পদার্থ বেশি থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্লাস্টিকের গৃহস্থালি বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির ওই কারখানায় অনেকগুলো গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। বিস্ফোরিত গ্যাস সিলিন্ডারও সেখানে দেখা গেছে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ঘটনাস্থলে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান চুন্নু সাংবাদিকদের জানান, এ ঘটনায় কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সন্ধ্যায় দেখা যায়, ওই ভবনে পাইপ দিয়ে পানি ছিটাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। আশপাশে উৎসুক জনতার ভিড়। ধোঁয়া-আগুনে প্রায় কালো হয়ে গেছে পুরো ভবন। ভবনের ভেতরে বিভিন্ন সরঞ্জাম পুড়ে গেছে। ঘটনাস্থলে কারখানাটির মেশিন অপারেটর মো. মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি চারতলায় চেয়ারে বইসা ছিলাম। হঠাৎ দুইটা জোরে শব্দ হইল। কয়েক সেকেন্ড পর দেখলাম, নিচ থেইকা আগুন আর ধোঁয়া ওপরের দিকে আইতাছে। আমি তাড়াতাড়ি ছাদে যাই। পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদে লাফ দিয়ে বাইর হইয়া গেলাম।’ মামুন জানান, কারখানায় সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা এবং রাত ১০টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত দুই পালায় কাজ চলে। পণ্য উৎপাদন, হিসাবরক্ষণ ও বিপণনের কাজ চলে এই ভবনে। গতকাল সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া পালায় ২২ জন পুরুষ ও ১০ জন নারী কর্মরত ছিলেন। গতকাল সাভার থেকে পিকআপ ভ্যানে করে ভবনের নিচতলায় কাঁচামাল আনা হয়। পিকআপ ভ্যানটির সহযোগী মো. সজীব প্রথম আলোকে বলেন, কাঁচামাল নামানোর পর গাড়ি বের করার সময় হঠাৎ দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন ধেয়ে এসে তাঁদের গাড়িতে লাগে। তিনি ও চালক দৌড়ে ভবন থেকে বের হয়ে আসেন। দেখেন, আগুনে দগ্ধ হয়ে বের হয়ে আসছেন দুই নিরাপত্তাকর্মীসহ তিনজন। কারখানাটির সামনে কিছুটা দূরে ‘আমার ভাই ভিতরে আছে’ বলে আহাজারি করছিলেন এক যুবক। জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন আরেকজন। আহাজারি করতে থাকা যুবকের নাম মো. শিপন। তাঁর বড় ভাই বিল্লাল হোসেন ওই কারখানায় চাকরি করেন। ঘটনার পর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ। শিপনের মতো স্বজনদের খোঁজে ভবনের সামনে ছুটে গেছেন অনেকেই। কেউ কেউ নিয়ে এসেছেন ছবি। বোনের খোঁজে এসেছেন মোছাম্মৎ লাকী। কাঁদতে কাঁদতে সাংবাদিকদের বললেন, তাঁর ছোট বোন শবনম পারভীন কারখানায় হিসাব শাখায় কাজ করেন। তাঁকে খুঁজে পাচ্ছেন না। ফোন বন্ধ। রাতে শাহ আলী থানার পুলিশ ১৩টি লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিয়ে যায়। স্বজনেরা লাশগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে শনাক্তের চেষ্টা করেই যাচ্ছিলেন। এক নারী লাশের পায়ে ছিল নূপুর। পুড়ে তা কালো হয়ে গেছে। মুঠোফোনে সেই নূপুরের ছবি তুলছিলেন এম এ কাদের। তিনি সাংবাদিকদের জানান, তাঁর শ্যালিকা ঈশিতা ওই কারখানায় চাকরি করেন। তাঁর খোঁজ পাচ্ছেন না। ইশিতা নূপুর পরতেন। নূপুর দেখে চেনা যায় কি না তা দেখার জন্য একজনের মারফত মুঠোফোনের ছবিগুলো তাঁর বোনের কাছে পাঠানো হয়েছে।

রাজধানীতে পুলিশের গুলিতে শিবির নেতা নিহত

রাজধানীর মিরপুর বেরিবাঁধ এলাকায় পুলিশের গুলিতে এমদাদ উল্লাহ (২২) নামে এক শিবির নেতা নিহত হয়েছেন। তবে পুলিশের দাবি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন এমদাদ। শনিবার দিবাগত মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল রূপনগর বেড়িবাঁধ এলাকার এনা প্রোপার্টিজের মেইন গেটের রাস্তার পূর্ব পাশ থেকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। নিহতের বড় ভাই হেদায়েত উল্লাহ আজ দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লাশ শনাক্ত করেন। এমদাদ ঢাকা কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তিনি জামালপুর সদর উপজেলার বানারীরপাড় গ্রামের মৃত জামাল উদ্দিন ও আনোয়ারা বেগমের পুত্র। মিরপুর মসজিদ মার্কেটের মেসে থাকতেন তিনি। তিন ভাই পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ। তিনি শিবিরের শাহআলী থানার ৯৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি। মিরপুর থানার ওসি সালাউদ্দিন খান জানান, কিছুদিন আগে দারুস সালাম এলাকায় শিবিরের একটি অফিসে অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায় এমদাদ উল্লাহ। গতরাতে তাকে পেট্রলবোমাসহ আটক করা হয়। পরে তাকে নিয়ে মিরপুর-২ নম্বরের মসজিদ মার্কেটে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর এমদাদ উল্লাহকে নিয়ে অন্য একটি অভিযানে বের হলে বেরিবাঁধ এলাকায় শিবিরের আর একটি গ্রুপ গাড়ি নিয়ে ওৎ পেতে থাকে। পুলিশের গাড়িটি ওই এলাকা অতিক্রম করার সময় এমদাদ উল্লাহ গাড়ি থেকে লাফ দেয়। এ সময় শিবিরের ওৎ পেতে থাকা গ্রুপটির সাথে পুলিশের বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। একপর্যায়ে এমদাদ উল্লাহকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। শিবিরকর্মীদের ছোঁড়া গুলিতেই এমাদুল্লাহ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওসি সালাউদ্দিন। তবে এমদাদ উল্লাহর ভাই হেদায়েত উল্লাহ জানান, গত রাত ৮টার দিকে মিরপুর থানা পুলিশ এমদাদ উল্লাহকে ধরে নিয়ে যায়। রাত ১০টার দিকে পুলিশের এসআই পরিচয় দিয়ে কামাল নামে এক ব্যক্তি তার বড় ভাই আনোয়ার উল্লাহকে ফোন দেন। তিনি জানতে চান এমদাদের সাথে তার সম্পর্ক কি। তিনি উত্তরে বলেন, ছোট ভাই। কি করেন জানতে চাইলে বলেন, ইসলামী ব্যাংকে চাকরি করেন। এরপর ওই পুলিশ সদস্য লাইন কেটে দেয়। হেদায়েত উল্লাহ আরো জানান, এরপর এমদাদের বন্ধুদের ফোন দিলে কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে সকালে টিভি স্ক্রল দেখে এমদাদকে ফোন দিলে মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার লাশ পাওয়া যায়। রূপনগর থানার এসআই মনির হোসেন জানান, এমদাদের বুক থেকে দুটি গুলি পিঠ দিয়ে বের হয়ে গেছে। এছাড়া বাম হাতে দুটি সহ তার শরীরে মোট ৪টি গুলির চিহ্ন রয়েছে।

কোকোর মৃত্যু এবং অমানবিক রাজনীতির অসৌজন্যতা by গোলাম মাওলা রনি

কোকোর মৃত্যুসংবাদ আমি প্রথম জানতে পারি ফেসবুকের মাধ্যমে। আর তখনই আমার মনে হয়েছিল যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী রাজনীতির এক মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। বাস্তবে হলোও তা-ই- তিনি হুট করে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে চার দিকে হইচই ফেলে দিলেন। দেশবাসীর কারো পক্ষে জানার সুযোগ হলো না যে বিএনপি অফিসের মূল ফটকের তালাটি কি তখন খোলা ছিল নাকি বন্ধ ছিল! দেশবাসী এ কথাও জানল না যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী কোনো বাড়িতে গেলে সেই বাড়ির আশপাশের সব ভবনে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানোর পর ভবনগুলোতে এসএসএফ অবস্থান নেয়। অন্য দিকে যে বাড়িতে তিনি যাবেন সেই বাড়ির প্রতিটি কামরা তারা যথাসাধ্য নিরাপত্তা তল্লাশি করার পর সব শেষে প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে তল্লাশি চালায়। বাড়ির ভেতরকার খাবারদাবার, পানীয়, ফুলদানি এমনকি টয়লেটের পাইপগুলোতেও তল্লাশি চালানোর পর সব কিছু ঠিকঠাক পেলেই ওয়্যারলেসে গ্রিন সিগন্যাল পাঠানো হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর নির্ধারিত গন্তব্যে রওনা করে। বিএনপির অভিযোগ মতে- কেবল লোকদেখানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। বিএনপির অভিযোগের বিপরীতে আওয়ামী লীগের অনেক কথা থাকতে পারে। কিন্তু তারা সেসব কথা বলেননি। তারা কেবল তাদের নেত্রীকে কেন যথাযোগ্য সম্মান ও সৌজন্যতা প্রদর্শন করা হলো না- এই ক্ষোভে বিএনপির সবাইকে তুলোধুনো করছেন। আমার মনে হয় প্রধানমন্ত্রী তার দলের কারো সঙ্গে পরামর্শ না করেই একক সিদ্ধান্তে হুট করে বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের দিকে রওনা দিয়েছিলেন। তিনি হয়তো গভীর মাতৃত্ববোধের প্রবল অনুরাগ থেকেই ওমনটি করেছিলেন। অথবা রাজনৈতিকভাবে নিজের উদারতা, শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা অতিমানবিকতা প্রমাণের জন্যও যেতে পারেন। এর বাইরে কূটকৌশল, ভাঁওতাবাজি কিংবা চমক দেখানোর জন্যও যেতে পারেন, যা, কিনা বিএনপির লোকেরা এখন জোরগলায় প্রচার করার চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রী যদি একটু ধীরস্থিরভাবে চিন্তা করতেন তবে নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারতেন যে বিএনপির কাপুরুষ বা কামহিলা জাতের লোকসকল তাকে যমদূতের মতো ভয় করে। তার নাম শুনলে ওই সব কাপুরুষ এবং কামহিলার কাপড়-চোপড় নষ্ট হয়ে যায়। অন্য দিকে বিএনপির মধ্যে এমন লোকও আছে যারা বেগম খালেদা জিয়ার চেয়ে তাকেই বেশি পছন্দ করে। কারণ বিএনপির আমলে উপার্জিত অর্থ, লাইসেন্স এবং ব্যবসাবাণিজ্য এখন শেখ হাসিনার সরকারের কল্যাণে ফুলে-ফেঁপে বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকলে তাদের বড়ই ক্ষতি হয়। অন্য দিকে দলীয় সরকার না থাকায় তাদের ঝক্কিঝামেলাও কম। সরকারি দলের বেকুব শ্রেণীর পাণ্ডাদের নামমাত্র কমিশন বা লভ্যাংশ দিয়ে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে বিরাট অঙ্কের মুনাফা। এই দুই শ্রেণীর বাইরে সংখ্যায় অল্প হলেও আরেকটি শ্রেণী রয়েছে, যারা প্রকৃতই সাহসী এবং আওয়ামী লীগ ও তার প্রধানকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে। তারা মরে যাবে কিন্তু আওয়ামী-অনুগ্রহ কিংবা ভিক্ষার দান গ্রহণ করবে না।
প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছে করলে খালেদা জিয়া সম্পর্কেও একটু চিন্তা করতে পারতেন। পারিবারিক জীবনে খালেদা জিয়া সব সময় তার স্বামীর আদেশ-নির্দেশ মেনে চলতেন। দুই পুত্রসন্তান, পুত্রবধূ ও নাতিনদের সঙ্গে তার রয়েছে চমৎকার সম্পর্ক। এই সম্পর্ক লোকদেখানো নয়Ñ সত্যিকার অর্থেই আবহমান বাংলার চিরায়ত পারিবারিক সম্পর্ক। তিনি কাজ ও অবসর দুটোই উপভোগ করেন। নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিবর্তে দলীয় লোকজনের সঙ্গে পরামর্শ করে সব কিছু করে থাকেন। কথা বলেন কম এবং শোনেন বেশি। নিজের প্রতিশ্রুতি, সিদ্ধান্ত, নীতি বা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন না। একবার যা বলেন তার ওপর অটল থাকেন শেষ দিন পর্যন্ত। জাতীয় রাজনীতিতে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নজির নেই একটিও। অন্য দিকে, ক্ষমতাকালীন সময়ে বিরোধী দলের দুটো দাবি মেনে নেয়ার মাধ্যমে নিজের গণতান্ত্রিক মনমানসিকতার পরিচয় ফুটিয়ে তুলেছেন জাতির কাছে। প্রথমটি ছিল সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তনে রাজি হওয়া আর দ্বিতীয়টি ছিল তত্ত্বাবধায়কপদ্ধতি মেনে নেয়া। আওয়ামী লীগ যদি খালেদা জিয়াকে নিয়ে আরো একটু গবেষণা করে তবে দেখতে পাবে যে, বিএনপি নেত্রী মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন অস্থির চিত্তের মানবী, যার কারণে তার জীবন-যৌবন শেষ হয়ে গেছে। এরশাদ আমলে তারা যুগপৎভাবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করলেন এবং মাঝপথে হঠাৎ রণে ভঙ্গ দিয়ে এরশাদের সঙ্গে মিলে গিয়ে ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ফলে রাজপথে বেগম জিয়া একা হয়ে গেলেন এবং সরকারের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হলেন। খালেদা জিয়া মনে করেন যে, শেখ হাসিনার জন্যই এরশাদ অতিরিক্ত তিন-চার বছর ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনা এরশাদকে জেলে পাঠানোর জন্য তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। অন্য দিকে, এরশাদকে জেলে ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গে পর্দার অন্তরালে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আঁতাত করে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি ঘটান। খালেদা জিয়া এবং তার অন্ধ সমর্থকগণ মনে করেন যে, শেখ হাসিনার একগুঁয়েমি ও শত্রুতামূলক মনোভাবের জন্যই লগি-বৈঠা এবং তারপর ১/১১-এর উদ্ভব হয়। ১/১১-এর কুশিলবেরা প্রথমে চেষ্টা করেন বিএনপি-আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নিজেরা কিছু করার জন্য। ব্যর্থ হয়ে তারা প্রথমে আপস প্রস্তাব নিয়ে খালেদা জিয়ার কাছে যান এবং প্রত্যাখ্যাত হয়ে অন্য দিকে মুখ ফেরান। এরই ধারাবাহিকতায় যখন ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয় তখন বেগম জিয়া প্রথমে বেঁকে বসেন নির্বাচনে অংশ না নেয়ার জন্য। কিন্তু দলের সুবিধাবাদী গ্রুপের প্রবল চাপে তিনি নতিস্বীকার করেন।
১/১১-এর ঘটনা জিয়াপরিবারকে তছনছ করে দেয়। তারেক রহমান ওরফে পিনু এবং আরাফাত রহমান ওরফে কোকোর ওপর এমন অমানবিক নির্যাতন করা হয় যাতে করে তাদের জীবননাশের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। তারেক বরাবরই কিছুটা ডানপিটে স্বভাবের। অন্য দিকে কোকো সে তুলনায় অনেক নিরীহ এবং গোবেচারা প্রকৃতির ছিলেন। মা হিসেবে তাই কোকোর প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার ছিল একধরনের অতিরিক্ত মমত্ববোধ ও স্নেহের দুর্বলতা। আর তাই ১/১১-এর সময় বিশেষ আদালতের কাঠগড়ায় হুইল চেয়ারে বসা অসুস্থ কোকোকে দেখে তিনি তার আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। নিয়মকানুন ভেঙে নিজের কাঠগড়া থেকে ছুটে গিয়েছিলেন কোকোর হুইল চেয়ারের কাছে। অসুস্থ ছেলের মুখমণ্ডলে হাত বুলাতে বুলাতে চোখের পানিতে অবগাহন করেছিলেন। এরপরই হয়তো সেনাকর্মকর্তাদের চাপের কাছে আংশিক নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। দুই ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে রাজি হলেও যেকোনো মূল্যে নিজে থেকে যান বাংলাদেশে। সেই সব দুঃসহ স্মৃতি, দুর্ভোগ এবং সব বঞ্চনার জন্য তিনি মনে-প্রাণে শেখ হাসিনাকেই দায়ী করেন।
নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি শতকরা হিসাবে উল্লেখযোগ্য হারে পপুলার ভোট পেলেও আসনসংখ্যার হিসাবে গো-হারা হারে। এটাকে খালেদা জিয়া একটি সাজানো ও পাতানো ঘটনা মনে করলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় সব কিছু মেনে নিয়ে সংসদে উপস্থিত হন। তার বিশ্বাস ছিল ১/১১-এর সময়ে জিয়াপরিবারের বিরুদ্ধে যেসব মামলা করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার তা প্রত্যাহার করে নেবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টো। সরকার বিএনপিকে বিরোধী দল মনে না করে তাদেরকে দেশ-জাতি ও সরকারের শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করল। বিএনপির বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোকে সরকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করলে শেখ হাসিনার ওপর ক্ষণিকের তরে সৃষ্টি হওয়া বেগম খালেদা জিয়ার বিশ্বাস ও আস্থায় ফাটল ধরে গেল। তিনি সংসদে আসা বন্ধ করে দিলেন।
বিএনপি কর্তৃক সংসদ বর্জনে আওয়ামী লীগ ভারি মজা পেল। তারা মনের আনন্দে বিএনপির চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে নানামুখী বক্তব্য দিতে লাগল। জিয়াপরিবারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা রকম কুৎসাকে কিচ্ছাকাহিনী বানিয়ে সংসদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করল। পরিস্থিতি এমন হলো যে, সরকারি দলের যে সদস্য যত বেশি মন্দ কথা বলতে পারবেন তারই মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলো। অন্য দিকে কিছু দিন পর বিএনপি সংসদে ফিরে বঙ্গবন্ধু পরিবার সম্পর্কে নানান কুৎসা ও কিচ্ছাকাহিনী বলতে আরম্ভ করল। তখন সরকারি দল মনে-প্রাণে চাইল বিএনপি যেন সংসদে না আসে। এরই মধ্যে একদিন পুলিশ কর্তৃক বিএনপিদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবেদিন ফারুক অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে বেধড়ক পিটুনির শিকার হন। ফলে উভয় দলের সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি দেখা দেয়। এরই মধ্যে বেগম জিয়া তার সুদীর্ঘকালের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হন। বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পর সরকারি টেলিভিশনে এমন সব ছবি, প্রতিবেদন ও মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যাতে স্পষ্টতই দেশের সম্মানিত একজন প্রধানকে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়।
বিএনপি নেত্রীকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পর তার চরিত্র, পারিবারিক জীবন ও রাজনীতিকে কলঙ্কময় করার জন্য হেন কাজ নেই যা সরকারি দলের লোকজন করেনি। ফলে শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল এক দূরত্বÑ হয়তো আটলান্টিক মহাসাগরের মতো দূরত্ব। সেই দূরত্ব আবার অতিক্রম করা সম্ভব নয় কারণ দু’জনের মাঝে রয়েছে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মতো ভয়াবহ এক রহস্যময় উপাখ্যান। শেখ হাসিনা সব সময় বেগম জিয়াকে একজন মেজরের বিধবা স্ত্রী ছাড়া বেশি কিছু মনে করেন না। তিনি যে সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতির স্ত্রী কিংবা দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, সে কথা শেখ হাসিনা ও তার কট্টর সমর্থকবৃন্দ ভুলেও স্মরণ করতে চান না। অন্য দিকে, আওয়ামী লীগের লোকজন শেখ হাসিনাকে যতই বঙ্গবন্ধুকন্যা বা জাতির জনকের কন্যা বলে সম্মান ও মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে বসাতে চান না কেন, বিএনপির লোকজন কিন্তু ওমনটি মনে করেন না। তারা তাকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক দরিদ্র গেরস্থ ঘরের কন্যা এবং উত্তরবঙ্গের আরেক নিন্মবিত্ত গেরস্থ ঘরের পুত্রবধূ মনে করে থাকেন।
শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে এত বিভেদ-বিসম্বাদ, এত পারস্পরিক ঘৃণা, অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধার মাঝে কোকোর মৃত্যু এবং সেই মৃত্যুতে শোক জানানোর জন্য শেখ হাসিনা কর্তৃক বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে হুট করে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে যারা সৌজন্যতা বা অসৌজন্যতার প্রশ্ন তুলছেন তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার জন্য আমার করুণা হয়। আওয়ামী লীগের শুভার্থীদের উচিত তাদেরকে সমালোচনা করা, যারা প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে অতিমানবীয় কিছু করাতে গিয়ে একটি দলের প্রধান, জাতির জনকের কন্যা এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করিয়ে আনল। সাংবাদিকেরা যদি একটু খোঁজ নিতেন তবে দেখতে পেতেন প্রধানমন্ত্রীর এপিএস শেখর এবং বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাসের সঙ্গে মোট তিনবারে কী কী কথা হয়েছে! কত মিনিটের মাথায় তারা কথা শেষ করেছেন এবং শেষমেশ কী কথার ওপর নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রী এলেন। তিনি গাড়ি থেকে নেমে কতক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন? তার আগমনের আগে এসএসএফ কি বাড়ির ভেতরে গিয়েছিল নাকি এসএসএফ শুধু প্রধানমন্ত্রীর বহরের সঙ্গে এসেছিল এবং আবার সঙ্গে সঙ্গে চলে গিয়েছিল? এসব বিবেচনায় পুরো মানুষটিকে নিয়ে দেখা দিয়েছে একধরনের অমর্যাদাকর বিশ্বাসহীনতা।
বিএনপির নীতিনির্ধারণীপর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বললাম, আচ্ছা ধরে নিলাম প্রধানমন্ত্রী চমৎকার অভিনয়শৈলী ও কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে আপনাদের দরজায় এসে আপনাদেরকে জাতির সামনে হেয় করার এক প্রয়াস চালিয়ে গেলেন। কিন্তু আপনারাও তো তার সঙ্গে অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করতে পারতেন! তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে ঢোকাতে পারতেন। তারপর একটি রুমে ঘণ্টাখানেক ধরে তাকে বসিয়ে আপ্যায়ন ও টুকটাক কথাবার্তা বলে সময় পার করে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারতেন। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর মনের গহিনে মারাত্মকভাবে আপনাদের ব্যবহার স্পর্শ করত এবং আপনারাও আরো অধিক পরিমাণ আনন্দ লাভ করতে পারতেন। আমি আশা করেছিলাম ভদ্রলোক আমার কথা শুনে হাসবেন কিংবা যুৎসই একটি উত্তর দেবেন। কিন্তু তিনি তা না করে একটি বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেনÑ রনি ভাই! আপনিও দেখছি ক্ষমতাসীনদের মতো আমাদের শোক ও দুর্বলতা নিয়ে মশকরা করছেন। সারা দেশে প্রায় দশ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৭০-৮০ হাজার মামলা। বিএনপির কোনো নেতা ঘরে থাকতে পারছেন না। সবাই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। দলের বেশির ভাগ সিনিয়র নেতা জেলে। বাকিরা পলাতক। শিমুল বিশ্বাস ও মারুফ কামাল খান নেত্রীর সঙ্গে গত প্রায় এক মাস অবরুদ্ধ। প্রতি মুহূর্তে তারা গ্রেফতার হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে স্বেচ্ছায় বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন প্রায় এক কাপড়ে। মূল গেটের চাবি পুলিশের কাছে। তারা সকালে তালা মারে আবার বিকেলে খোলে। বাড়ির সামনে একবার মাটির ট্রাক, আবার বালুর ট্রাক এবং মাঝে মধ্যে ময়লার ট্রাক। পুরো এলাকায় সার্কিট ক্যামেরা লাগানো। ফলে সাধারণ মানুষ ভয়ে ওদিকে পা বাড়ায় না। দলীয় নেতাকর্মীরা অফিসমুখী হলেই গ্রেফতার করা হন। বি চৌধুরীর মতো বিশিষ্টজনদের পুলিশ বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দেয় না। পুলিশের অনুমতি ছাড়া বাড়ির ভেতর ও বাইরে যাওয়ার সাধ্য কারো নেই। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা, গুলশান থানার একজন কনস্টেবলকে বাড়ির মধ্যে ঢোকার ব্যাপারে নিষেধ করার ক্ষমতা, সাহস ও কৃতিত্ব বিএনপির কেউ রাখে না। আমাদের নাকে দড়ি বেঁধে সরকার ঘোরাচ্ছে এবং তাদের ইচ্ছেমতো সব কিছু করিয়ে নিচ্ছে। ভদ্রলোকের কথা শুনে আমি যুৎসই একটি জবাব দেয়ার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু তার আগেই তিনি পুনরায় বলতে আরম্ভ করলেন আমাদের রাজনীতি বড়ই অমানবিক হয়ে গেছে। এ দেশের মানুষ আগে জীবন্ত মানুষের গায়ের চামড়া খুলে ডুগডুগি বাজাতে চাইত। মানুষের মৃত্যুর পর নাচগানের উৎসব করতÑ অনেকে তো ট্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে উল্লাসনৃত্য করেছে। অতীতের সব নিষ্ঠুরতা ম্লান হয়ে গিয়েছিল ১/১১-এর আগে যখন একদল মানুষ তাদের হাতের লাঠি দিয়ে অন্য দলকে পিটিয়ে মেরে লাশের ওপর দাঁড়িয়ে উল্লাসনৃত্য করেছে। এই লোকগুলো কারা? কোন দলের? তারা এখন কোথায় এবং কাদের সঙ্গে আছেন সেই লোকগুলো যে মৃত কোকোর লাশের সঙ্গে নৃশংসতা দেখায়নিÑ এটাই আমাদের চরম এবং পরম পাওনা। আমাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, কোকো একে তো অসুস্থ ছিলেন। তার ওপর ৭০ বছরের বৃদ্ধা মায়ের ওপর সরকারের একের পর এক নৃশংশ চাপ ও গ্রেফতারের হুমকি তিনি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সময় খালেদা জিয়ার বয়স মাত্র ৩৫ বছর আর কোকোর ১২ বছর। অসহায় বিধবা হিসেবে খালেদা জিয়া সব সময় অন্ধের যষ্টির মতো তার বালকপুত্রটিকে বুকে চেপে নিজের সব বেদনা ভুলতে চেষ্টা করেছেন। কোকোর সাথে তার বন্ধন এবং সম্পর্ক বোঝার জন্য মানুষের মতো মন থাকার দরকার। হায়েনার হিংস্রতা দিয়ে মা-ছেলের সেই বিশেষ সম্পর্ক মূল্যায়ন করা যায় না। কোকোর মৃত্যু তাই বেগম জিয়াকে সংজ্ঞাহীন কিংবা অস্থির করবে এটাই স্বাভাবিক। অন্য দিকে মৃত্যু নিয়ে যারা রাজনীতি করে তাদের বিচারের ভার বেগম জিয়া জীবনমৃত্যুর মালিকের কাছে সমর্পণ করেছেন।

আজ শুরু হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা

অপেক্ষার পালা শেষ হচ্ছে আজ। বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বর বিকেল থেকে আবার সরব হয়ে উঠবে বইপ্রেমীদের পদচারণে। প্রাণস্পন্দন ছড়িয়ে পড়বে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও। শুরু হতে যাচ্ছে মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন। বেলা তিনটায় এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। গতকাল শনিবার দুপুরে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে গ্রন্থমেলার সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। বলা হয়, গতবারের মতো এবারও মেলা একাডেমি প্রাঙ্গণের পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হচ্ছে। তবে এবার জায়গা আরও বাড়ানো হয়েছে। একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জানান, এ ছাড়া হবে চার দিনের আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিসচিব রণজিৎ কুমার বিশ্বাস, মেলার পৃষ্ঠপোষক টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন) মো. শাহ আলম প্রমুখ।
৩৫১ প্রতিষ্ঠানকে ৫৬৫টি ইউনিট: এবার মেলায় ৩৫১টি প্রতিষ্ঠানকে ৫৬৫টি ইউনিট স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৯২টি প্রতিষ্ঠানকে ১২৮টি ইউনিট এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ২৫৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৩৭টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এবারই প্রথম বাংলা একাডেমিসহ ১১টি প্রকাশনীকে প্যাভিলিয়ন দেওয়া হয়েছে।
একাডেমির ভেতরের অংশে থাকবে ৩২টি শিশু-কিশোর প্রকাশনা, ২৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠান, ১৯টি মিডিয়া ও আইটি প্রতিষ্ঠান ও ১৭টি অন্যান্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। বহেড়া তলায় ৭২টি লিটল ম্যাগাজিনকেও স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যাঁরা বই প্রকাশ করেছেন, তাঁদের বই বিক্রি ও প্রদর্শনের জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মিলিয়ে বাংলা একাডেমির পাঁচটি বিক্রয়কেন্দ্র থাকবে। এর একটি সম্পূর্ণভাবে একাডেমির প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থ দিয়ে সাজানো হবে।
আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন ও মেলা মঞ্চের আয়োজন: বাংলা একাডেমির ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনও শুরু হবে আজ। আগামীকাল থেকে সৃষ্টিশীল সাহিত্য নিয়ে দুটি করে অধিবেশনে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত প্রথম অধিবেশন এবং বেলা আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত দ্বিতীয় অধিবেশন। প্রতিটি অধিবেশনই অনুষ্ঠিত হবে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে। সম্মেলন চলবে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
৫ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল চারটায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সেমিনার। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি-সমকালীন প্রসঙ্গ এবং বিস্মৃতপ্রায় বিশিষ্ট বাঙালি মনীষার জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
সময়সূচি: প্রতিদিন বেলা তিনটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত, ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল আটটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত মেলা চলবে।

পরিবেশ- ধানখেতে অট্টালিকা by মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী

আমার প্রিয় জন্মভূমি চট্টগ্রাম। মাত্র ৩৭ কিলোমিটার দূরে রাউজানের হলদিয়া ইউনিয়নে ছোট-বড় টিলার বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ চমৎকার এক গ্রাম ইয়াসিননগর। ফসলের ঘ্রাণ, শিশিরভেজা ঘাস, সবুজ পাতার সৌরভ, ছোট ছোট প্রস্রবণ, উঁচু-নিচু টিলা আর ঝোপঝাড়ের সৌন্দর্যে অনন্য। সমতল ভূমির মধ্যে ছোট ছোট টিলা থেকে ক্রমেই উচ্চতায় পাঁচপুকুরিয়া, বৃন্দাবনপুর, কাউখালী হয়ে রাঙামাটির সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা। আমার গ্রামের শত বছরের ঐতিহ্য মাটির ঘর। প্রবল বর্ষা বা ঝড়ে এসব ঘর ধূলিসাৎ হয়নি। আমার পিতামহ ভূগোলশাস্ত্রের খ্যাতিমান শিক্ষক রুহুল আমীন চৌধুরী সপরিবারে এই মাটির ঘরে ৮৭ বছর জীবন কাটিয়েছেন। ব্রিটিশ যুগের গ্র্যাজুয়েট হয়েও শ্রম ও ঘামে ভরা ছিল তাঁর জীবনধারা। শীত ও গ্রীষ্মে খোলা রোদ ও হাতপাখাই ছিল তাঁর প্রকৃতিনির্ভর জীবনের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। মাটির ঘরে দেখেছি তাঁর সৎ জীবনের কষ্টসহিষ্ণুতা, মিতব্যয়িতা। মাটির এ ঘর ভেঙে সুরম্য ভবন তৈরির সক্ষমতা ও মানসিকতা আমাদের নেই; বরং পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া শতবর্ষী শ্বেতগোলাপ ও কাঁঠালগাছ অক্ষত রেখেছি। এ গ্রামে টিলার ওপর বা উঁচু জমিতে ছিল জনবসতি। সম্প্রতি আবাদি জমিতে ভবন নির্মাণের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে নিসর্গ। সময় ও সমাজ বদলেছে। তাই অর্থবিত্তের প্রবল ঢেউয়ে মানুষ পড়েছে অট্টালিকা তৈরির মোহে। আমার বাড়ির সামনেই খোলা মাঠের পাশে সবুজ ধানখেতের বুকে গড়ে উঠছে এক অট্টালিকা। তার পাশেই শোভা পাচ্ছে এক মুঠোফোন কোম্পানি সুউচ্চ টাওয়ার। নগরায়ণের পথ বেয়ে প্রকৃতি ধ্বংসের এ প্রক্রিয়া এখন দানবীয় শক্তিতে গ্রাস করছে পুরো গ্রামকে। এ গ্রামে অনাবিল সৌন্দর্যের আধার নেটটিলা। আনন্দ-বিনোদনে মুখর এ বিশাল টিলাকে এখন জনবসতি গিলে খাচ্ছে। ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে অতুলনীয় সৌন্দর্যের কানন নেটটিলা। প্রকৃতির সঙ্গে নিষ্ঠুর বৈরিতায় গ্রাম হচ্ছে সর্বহারা। এভাবে প্রতিবছর বাংলাদেশে দুই লাখ হেক্টর কৃষিজমি নগরায়ণ ও শিল্পায়নের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে। সমীক্ষা বলছে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৮৮ সালের মধ্যে দেশ কৃষিভূমিশূন্য হয়ে পড়বে। এরপর কোথায় যাবে খাদ্যনিরাপত্তা? কোথায় যাবে কৃষিভিত্তিক জীবন-জীবিকা? প্রকৃতিনির্ভর গ্রামীণ জীবনে নির্লোভ-নির্মোহ সরলতায় আঘাত হানছে নগরজীবনের স্বার্থপরতা। নির্বাসিত হচ্ছে পারিবারিক বন্ধনের মায়া-মমতা। কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ বড় বড় শহরের মতো গ্রামেও সৃষ্টি করবে অনিয়ন্ত্রিত জলাবদ্ধতা ও পরিবেশদূষণের ভয়াবহতা। নগরের অট্টালিকায় খাঁচার পাখির মতো বন্দী মানুষ মুক্ত বাতাসে বিচরণ, সবুজের মধ্যে অবগাহন ও পুকুরে সন্তরণের জন্য গ্রামে যায়। সেই গ্রামকে ইট-পাথরের নগর করার বিষময় ফল হবে অসংখ্য ইটভাটার প্রসার ও অগণিত গাছপালা উজাড়। গ্রাম ধ্বংসের বিনিময়ে আমরা নগর পাব, কিন্তু দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ পাব না। পরিবেশ সমীক্ষায় দেখা গেছে, যানবাহন ও জ্বালানির পর কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী ভবন। বিশ্বজুড়ে কার্বন হ্রাসের পদক্ষেপের ঠিক বিপরীতে চলছি আমরা। মাটিতে নির্বিচারে পাকা দালান উঠলে মাটিভিত্তিক ‘সফট সারফেস এলাকা’ কমে মাটির তাপমাত্রা শোষণের ক্ষমতাও কমবে। এতে উষ্ণতাকবলিত হবে গ্রাম। বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডে সুউচ্চ ভবনে কৃষি খামার গড়ে তুলে সবুজায়ন এবং জাপান ও চীনে ছাদে বৃক্ষরোপণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চীনে কেউ যদি ১ দশমিক ৩৩ হেক্টর বা তার বেশি পরিমাণ আবাদি জমি ধ্বংস করে, তবে তার পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান আছে। কৃষিজমি ধ্বংস করার অপরাধে চীনে ৫০ হাজার ইউয়ান (আট হাজার ডলার) জরিমানার বিধান আছে। বাংলাদেশে কৃষিজমি সুরক্ষার খসড়া আইনটি দ্রুত কার্যকর করে জেল-জরিমানার বিধান চালু করলে আপাতত বেপরোয়া এ ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানো সম্ভব হবে। রেমিট্যান্সের অর্থ উৎপাদনমুখী না হয়ে ভোগবিলাসে ব্যয় হচ্ছে। প্রবাসীরা কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করছেন গ্রামে সবুজ ধানখেতের ওপর আবাসিক ভবন, মার্কেট ও ইটভাটা নির্মাণে। এতে লাফিয়ে বাড়ছে জমির মূল্য। গ্রামের মানুষ কৃষি থেকে সরে যাচ্ছে, অকৃষি খাতে বিনিয়োগ করছে অনেক মুনাফার লোভে। যেকোনো ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের আগে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার যে বিধান ১৯৯০ সালের ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালে আছে, তা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আমাদের মস্তিষ্কের কোষে কোষে এখন অপচয় ও অপব্যয় ছড়িয়ে গেছে। অর্থের ওজনে মাপা হচ্ছে মানুষের সম্মান ও মর্যাদা। ফলে সবুজ ধানখেতে শোভা পাচ্ছে সুরম্য অট্টালিকা, সেখানে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক জীবনের সাজসজ্জা। এসব সুদৃশ্য ভবন দেখিয়ে বাড়ানো হয় তথাকথিত সামাজিক মর্যাদা। আলিশান ভবন মানেই উন্নত জীবনমান নয়। গ্রামে হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, সেতু, সড়ক, কালভার্ট হলে তা জীবনমান বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক। কিন্তু বৃক্ষলতা, আবাদি জমি, খাল, বিল ও টিলার সমাধি রচনা করে অট্টালিকা নির্মাণ ‘উন্নয়ন তত্ত্বে’র আওতায় পড়ে না। নগরায়ণ প্রত্যাশিত একটি পরিবর্তন প্রক্রিয়া, তবে নগরায়ণের নামে অট্টালিকার নিচে চাপা পড়ছে সবুজ গ্রাম। গ্রাম আমাদের মুক্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের স্থান, কৃষি অর্থনীতির প্রাণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সোপান। তাই গ্রামে নগরায়ণ হতে হবে সুনিয়ন্ত্রিত, সুপরিকল্পিত ও পরিবেশসম্মত। নগরায়ণের গতিকে সঠিক পথে রাখতে হলে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের শক্ত ভূমিকা নিতে হবে এবং জনগণকে সচেতন করতে হবে। রেমিট্যান্সের স্রোতকে সঠিক পথে প্রবাহিত করতে হবে। দুই বা তিন ফসলি আবাদি জমিকে সুনির্দিষ্ট ‘কৃষি-অঞ্চল’ ঘোষণা করে এর শ্রেণি পরিবর্তন (শিল্পায়ন/নগরায়ণ) নিষিদ্ধ করুন। সুপরিকল্পিত পল্লি অবকাঠামোর আওতায় সবুজ প্রকৃতি ও বনবনানী অক্ষত রেখে গ্রামগুলো সমবায় কৃষি খামার ও উন্নত জাতের গাভির খামারে স্বয়ংসম্পূর্ণ করুন। বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য সবুজ গ্রাম এবং ধানখেতের বুকে আঁকাবাঁকা মেঠো পথটি যেন হারিয়ে না যায়। আমাদের শেষ গন্তব্য সমাধি অভিমুখে, সুরম্য প্রাসাদে নয়। সুতরাং, বিত্তশালীদের অর্থ যেন অট্টালিকা তৈরির স্রোতে ভেসে না যায়।
মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী: সচিব, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি।
mmunirc@gmail.com

অবরুদ্ধ গণতন্ত্র : অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ by এফ ই শরফুজ্জামান জাহাঙ্গীর

গভীর এক সঙ্কটে সমগ্র বাংলাদেশ জনমানুষের দিন কাটছে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে। রাজপথে পরস্পর মুখোমুখি সরকার ও বিরোধী পক্ষ।  জাতি আজ চরম এক অনিশ্চয়তা ও গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।  দেশে আজ যে অরাজকতা ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে তার কারণ খুঁজতে একটু পেছনের দিকে যেতে হবে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদের নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৯৯৫ সালের শুরু থেকেই ‘তত্ত্বাবধায়ক ও নিরপেক্ষ সরকারের’ অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে এক আন্দোলন গড়ে তোলে। অন্যান্য দলের মধ্যে এই আন্দোলনে তাদের সঙ্গী ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল। ভাঙচুর ও সহিংসতা ছাড়াও তারা ১৭৩ দিন হরতাল পালন করেছিল। আমি নিজে বিএনপি মনোনীত একজন প্রার্থী থাকার সুবাদে সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্যক্রমে আমার সুযোগ হয়েছিল নির্বাচনবিরোধীদের হিংসাত্মক কার্যকলাপ দেখার। নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে এবং সরকার গঠন করে। তখনো ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও নিয়ম রক্ষার’ জন্যই ষষ্ঠ সংসদের নির্বাচন করতে বাধ্য হয়েছিল বিএনপি। তবে বর্তমান অবস্থার পার্থক্য হলো যে দেশের জনগণের স্বস্তি-শান্তি বিশেষ করে বেশির ভাগ জনমানুষের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে দেশপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইচ্ছায় ও নির্দেশে আমরা ষষ্ঠ সংসদের সদস্যরা ভবিষ্যতে সংসদ নির্বাচন ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীনে অনুষ্ঠানের বিধান করে শাসনতন্ত্রের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করি। এর পরপরই ষষ্ঠ সংসদ ভেঙে দিয়ে জুন মাসের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর ২০০১ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। ২০০৬ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সংবিধানের বিধান মোতাবেক সবশেষে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার কথা। কিন্তু বিচারপতি কে এম হাসান এক সময়ে বিএনপি করতেন এই অজুহাতে আওয়ামী লীগ তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে আপত্তি জানায়। এই নিয়েই শুরু হয় বিতর্ক-সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষের একপর্যায়ে লগি-বৈঠার আক্রমণে প্রাণও হারান কয়েকজন। এ অবস্থায় বিচারপতি কে এম হাসান নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে তার অনিচ্ছার কথা জানান। শেষপর্যায়ে আওয়ামী লীগ ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলে দেশে হিংসাত্মক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সংঘর্ষময় পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে সেনাসমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ দাবি করে যে, ‘এই সরকার তাদের আন্দোলনের ফসল’। এরপর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। ২০১১ সালের অক্টোবরে মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের এক বিভক্ত রায়ে প্রচলিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এই রায়ে আরো বলা হয় যে, সংসদ যদি ইচ্ছা করে তাহলে আগামী দু’টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে।
যে আওয়ামী লীগ ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীনে নির্বাচন নিয়ে সংগ্রাম-আন্দোলন করেছিল সেই আওয়ামী লীগই তাদের আন্দোলনের ফসল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা বাতিল করে।  দশম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপিসহ বিরোধীয় জোট আন্দোলন শুরু করে।  ওই নির্বাচন অনুষ্ঠান ও বিরোধীয় জোটের নির্বাচন বর্জনের আহ্বানের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪২টি দলের মধ্যে আওয়ামী লীগসহ মাত্র ১২টি দল এ নির্বাচনে অংশ নেয় । সংসদীয় ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনের একজন করে প্রার্থী থাকায় তাদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
২০ দলীয় জোট ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করতে একটি সমাবেশ করার অনুমতি চেয়ে ডিএমপির কাছে আবেদন করে ২২ ডিসেম্বর। কিন্তু ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ডিএমপির পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হয়নি। সরকার এক অলিখিত আদেশে ঢাকার সাথে সারা দেশের সড়ক ও নৌযোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। অর্থাৎ ঢাকা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এ দিকে ৩ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার গুলশানের কার্যালয়ে যান এবং একপর্যায়ে অসুস্থ অফিস সেক্রেটারি রিজভী আহমেদকে দেখতে যেতে চাইলে পুলিশ তাকে বের হতে দেয়নি। কার্যালয়ের অফিস গেটে বাইরে থেকে তালা মেরে দেয়া হয়। শত শত পুলিশ কার্যালয়ের সামনে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। ইট-বালু-পাথর বোঝাই ১০-১২টি ট্রাক, পুলিশের লরি, জলকামান, রায়ট কার ইত্যাদি দিয়ে গুলশান কার্যালয়ের রাস্তা বন্ধ করে দেয়।
কার্যালয় ঘিরে আট স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। গণতন্ত্র হত্যা দিবস উপলক্ষে ৫ জানুয়ারি আবারো তিনি বের হতে চাইলে তাকে বের হতে দেয়া হয়নি। ভেতরে আটকা মহিলা কর্মীসহ কিছু নেতাকর্মী মূল ফটক খোলার চেষ্টা করলে পুলিশ ফটকের ভেতর পেপার স্প্রে করে। ফটকের ভেতর গাড়িতে বসে থাকা দেশনেত্রীসহ অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একটু সুস্থ হলে বেগম জিয়া অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেন। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম জিয়া যে অবরুদ্ধ সেটা স্বীকার করতে রাজি হননি। অথচ দেশবাসী অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেছে চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ ছিলেন কি না?
রাজনীতি হলো মানুষের কল্যাণের জন্য আর রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব হলো দেশের জনগণের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করা। সর্ববৃহৎ বিরোধী দলের নেত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা তার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে জনগণের সুখ-শান্তি স্বস্তির উদ্দেশ্যেই সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। যার মধ্যে একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই হলো মূল দাবি আর এর সাথে এই সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি। তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার দাবি করেননি। তিনি সরকারকে অনুরোধ করেছেন জনগণের কাছে ফেরত যেতে নূতন ম্যান্ডেট নেয়ার। সমস্যা সমাধানের এটিই একমাত্র উপায়।
আমাদের সংবিধানের মূলনীতির অন্যতম হলো গণতন্ত্র। আর গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হলো ভোটাধিকার। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মতে, বিকৃত ও ভোটারবিহীন নির্বাচন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। (এ এফ এম শাহ আলম বনাম মজিবুর রহমান, ৪১ ডি এল আর (এ ডি) ১৯৮৯। বিরোধীপক্ষকে সন্ত্রাসী, জঙ্গি, দুষ্কৃতকারী, স্বাধীনতাবিরোধী আখ্যা দিয়ে উৎখাত-নির্মূল করতে যাওয়া কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। আর কোটি কোটি মানুষের সমর্থনপুষ্ট দল বিএনপি ও সেই দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করা অত সহজ বলে কেউই মনে করে না।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা অপরিহার্য। ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে জয়লাভ করেছিল। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ ছিল কমবেশি সব দলেরই এই বিরোধী দল প্রসঙ্গে রাজনীতিবিদ সাবেক মন্ত্রী মরহুম আবুল মনসুর আহমেদ তার ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইতে লিখেছেন,’ ... নৌকা চালাইতে হইলে ডাইনে-বাঁয়ে দুই সারি দাঁড়ি লাগে। নৌকার হাল ধরিবেন শেখ মুজিব নিজেই ঠিকই, কিন্তু দাঁড়ি হইবেন দুই কাতারের। সব দাঁড়ি একদিক হইতে দাঁড় টানিলে নৌকা সামনে চলিবার বদলে ঘুরপাক খাইয়া ডুবিতে পারে।’ আশা করব সরকারি দল বিষয়টি উপলব্ধি করবে।
লেখক : গোপালগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি