Friday, October 31, 2014

দালাল পুলিশ আনসারদের মিনি পাসপোর্ট অফিস

সাত দিন আগের কথা। রাজধানীর নিকেতনের বাসিন্দা গোলাম দস্তগীর মিয়া আগারগাঁওয়ে পাসপোর্ট অফিসে যান। উদ্দেশ্য পাসপোর্ট করাবেন। সেখানে যেতেই আয়নাল নামের এক ব্যক্তি তার পিছু নেন, বারবার বলতে থাকেন, ‘স্যার, কোনো ঝক্কিঝামেলা করতে হবে না। ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট পাবেন। কয়টা টাকা বেশি দিলেই পাসপোর্ট আপনার বাসায় গিয়ে হাজির হবে।’
চাপাচাপিতে গোলাম দস্তগীর শেষ পর্যন্ত কিছু টাকা বেশি দিয়ে আয়নালকেই পাসপোর্ট তৈরি করার দায়িত্ব দেন। আয়নাল পাসপোর্ট অফিসের দালাল। এভাবে পাসপোর্ট বানানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মেয়ের পাসপোর্ট বানাতে গিয়ে তার যে ঝামেলা সেই থেকে তিনি শিক্ষা পেয়েছেন। তাই দালালকেই তিনি বেছে নিলেন।’
দস্তগীরের পাসপোর্ট তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই পাসপোর্টসহ মঙ্গলবার ধরা পড়েছেন দালাল আয়নাল। অনেক দালাল ধরা পড়ার খবরে বুধবার পাসপোর্ট অফিসে ছুটে যান দস্তগীর। সেখানেই তার সঙ্গে কথা হয়।
সরকারি পাসপোর্ট অধিদফতরের পাশে মাত্র ২০০ গজ দূরেই ‘বেসরকারি পাসপোর্ট অফিস’ গড়ে তুলেছেন দালালরা। সরকারি অফিসের মতোই সেখানে চলে কার্যক্রম। কাজে দালালদের সহায়তা করে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। র‌্যাবের অনুসন্ধানে পাসপোর্ট অফিসের দুজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্যও মিলেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, দালালরা পাসপোর্ট অফিসের সামনে এবং সেখান থেকে একটু দূরে সোনালী ব্যাংকে গিয়ে পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের পিছু ধরছেন। দালালরা টোপ দেয়, ফরম পূরণ, ফরম সত্যায়ন, ব্যাংকে ফি জমা, কাগজপত্র ঘাটতি ভুল বা ভুয়া কাগজপত্র, এমনকি ২ থেকে ৬ হাজার টাকায় ভেরিফিকেশন ছাড়াই অতি দ্রুত পাসপোর্ট তৈরি করে দেবে। দালাল পান্নু খান জানান, তার হাত দিয়ে ভেরিফিকেশন ছাড়াই অসংখ্য পাসপোর্ট গেছে। তার সঙ্গে মিরপুরের একটি অপরাধী চক্রের যোগসূত্রের তথ্যও পাওয়া গেছে।
অনেকে আবার তাদের কাছে টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। র‌্যাবের কাছে আবুল ফজল ও কান্তিলাল নামের দুই ব্যক্তি সম্প্রতি এ ধরনের অভিযোগ দিয়েছেন। ফজল অভিযোগ করেছেন, হারুন নামের এক দালাল তার কাছে ৬ হাজার টাকা নেয়। আর কান্তির কাছে আসলাম মিয়া নামের একজন নেয় প্রায় ৭ হাজার টাকা। এরা দ্রুত পাসপোর্ট তৈরি করে দিতে পারে বলে জানায়। কিন্তু পাসপোর্ট তো নেই, টাকারও খবর নেই।
ফজল ও কান্তি জানান, পাসপোর্ট অফিসের দক্ষিণ দিকে একটি মেস বাসায় তাদের নেয়া হয়। সেখানে তারা টাকা দেন। হয়রানির শিকার অভিযোগকারী আবু বক্কর বলেন, একজন পুলিশ কনস্টেবল তার কাছে টাকা নিয়েছে। এছাড়া মারুফ আক্তারকে পাসপোর্ট দেয়ার কথা বলে টাকা নেন দুই আনসার সদস্য। তারা সরকারি অফিস থেকে ওই বাসায় নিয়ে গিয়ে ফরম পূরণ করিয়ে নেয়।
দালালদেও উৎপাতের কারণে, পাসপোর্ট অধিদফতরে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রচারিত করা হয়। বিজ্ঞপ্তিটি নোটিশ বোর্ড ছাড়াও বিভিন্ন দৃশ্যমান স্থানে ঝুলানো হয় এবং মাইকিং করে উপদ্রব সৃষ্টিকারী দালালদের সতর্ক করা হয়েছে। সতর্ক করা বিজ্ঞপ্তি বড় আকারের সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লিখে পাসপোর্ট অফিসের প্রবেশ গেট সংলগ্ন ভবনের দেয়ালে স্থাপন করা হয়। এতেও কোনো কাজ হচ্ছে না।
র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশা যুগান্তরকে বলেন, পাসপোর্ট অফিস ঘিরে পুরনো সিন্ডিকেটই নানাভাবে সক্রিয় হয়েছে। বেশির ভাগ সময় এরা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে।
র‌্যাব-২ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল কেএম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, একটি হেল্পডেস্ক প্রয়োজন, যেখান থেকে লোকজন পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে পারে। পাসপোর্ট অফিস থেকে টাকা জমা দেয়ার জন্য যারা সোনালী ব্যাংকে যান তারাও হয়রানির শিকার হন। পাসপোর্ট অফিস লাগোয়া টাকা জমা দেয়ার জন্য স্থায়ী বুথ স্থাপনও জরুরি।
তিনি বলেন, সরকারি অফিসের পাশেই দালালরা অবৈধ পাসপোর্ট অফিস তৈরি করে ফেলেছে। এ ধরনের অপরাধে ওই অফিসের কারও সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
‘বেসরকারি’ এই পাসপোর্ট অফিসের কার্যক্রম তদারকি করতেন দালাল আয়নাল হোসেন। ঢাকার মিরপুরের মধ্যপীরেরবাগে তার বাড়ি। তার সঙ্গে নাসির ও নুরুজ্জামান মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করে থাকে। এদের সঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রটেকশন বিভাগের কনস্টেবল ফিরোজ মিয়া এবং আনসার সদস্য আলতাফ হোসেন জড়িত। এই অফিসটি সাত মাস আগে স্থাপন করা হয়।
র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, এখানে অভিযান চালিয়ে ৯৭টি এমআরপি পাসপোর্ট এবং পাসপোর্ট তৈরির জন্য আবেদনকৃত অনেক ফরম পাওয়া গেছে। এগুলোতে দেখা গেছে, সরকারি কর্মকর্তাদের সিলমোহর ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সত্যায়িত করা। এর মধ্যে অনেকের পাসপোর্ট অধিদফতর থেকেই করে আনা।
মঙ্গলবার র‌্যাব অভিযান চালিয়ে এখান থেকে ৩০ জন দালালকে আটক করে। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। পুলিশ ও আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অধ্যাপক সালাউদ্দিন সর্বপ্রথম বাকশালের বিরোধিতা করেছিলেন -স্মরণসভায় বক্তারা

প্রয়াত ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সালাউদ্দিন স্মরণসভায় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, দেশে যখন বাকশাল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সর্বপ্রথম তিনিই এর প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিলেন। এজন্য তাকে অনেক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তারা বলেন, সংবিধান সংশোধন করে যখন বাকশাল প্রবর্তন করা হলো তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎসাহী কিছু শিক্ষক বাকশালে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি তখন সর্বপ্রথম বাকশালে যোগদানের বিরোধিত করেছিলেন। গতকাল বাংলা একাডেমিতে নাগরিক শোকসভায় অধ্যাপক সালাউদ্দিনকে স্মরণ করতে গিয়ে তারা এসব কথা বলেন।  শোকসভায় অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, তিনি দৃঢ়চেতা জীবনাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। সংবিধান সংশোধন করে যখন বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু উৎসাহী শিক্ষক বাকশালে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় ভিসি এনামুল হক বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনিও সভা করে আমাদের বাকশালে যোগ দিতে বললেন। কিন্তু এর প্রতিবাদ জানিয়ে সর্বপ্রথম অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ বাকশালে যোগদানের বিরোধিতা করেন। পরে আমরাও তার সঙ্গে সম্মতি জানাই। সেসময় একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেল। গণভবনের সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ভিসি মাত্র কয়েকজন কর্মচারীকে নিয়ে বাকশালে যোগ দিলেন, শিক্ষকরা কেউ সেখানে গেলেন না। ওই সময়ে একে খন্দকারের বই নিয়ে বিতর্ক সত্ত্বেও তিনি খন্দকারের পক্ষ নিতে দ্বিধাবোধ করেননি। অধ্যাপক সালাউদ্দিন যাপিত জীবনে যে চিন্তা রেখে গেছেন সেগুলো নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি সত্যের প্রতি আকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ উদার নৈতিক দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে গেছেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম সভাপতির বক্তব্যে বলেন, অধ্যাপক সালাউদ্দিন জ্ঞান এবং চিন্তাকে একত্রিত করেছেন। স্বাধীনতা বলতে কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয় এটা বুঝতেন তিনি। স্ব্বাধীনতা অর্জনের জন্য যা প্রয়োজন তা সালাউদ্দিনের লেখায় আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সমাজকে বদলাতে হবে রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ করতে হবে এ বোধটা সালাউদ্দিনের খুব দৃঢ় ছিল। ইতিহাসের মধ্য থেকে গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসকে বদলাতে চেয়েছিলেন তিনি। শোকসভায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, উনিশ শতকের সমাজ নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। মৌখিক ইতিহাস রচনায় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি স্বৈরাচার বিরোধী  আন্দোলন করেছেন সামনে থেকে। এ ছাড়াও জাতীয় জীবনের যে কোন সঙ্কটে ভূমিকা রেখেছেন অনবদ্যভাবে। নতুন প্রজন্মের মাঝে তার উদার নৈতিক ধ্যান ধারণা ছড়িয়ে পড়বে এবং তরুণরা সেটা অনুশীলন করবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। নাগরিক শোকসভায় আরও বক্তব্য রাখেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্ট্রাস্টি সদস্য মফিদুল হক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস প্রমুখ। অনুষ্ঠানের শুরুতে সদ্যপ্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ড. সালাউদ্দিন আহমেদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। 

খালেদাকে স্বাগত জানাতে উড়বে লক্ষাধিক বেলুন by ইসাহাক আলী

নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্রুত নির্বাচনের দাবির পক্ষে জনসমর্থন গড়তে কাল নাটোর যাচ্ছেন বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। শহরের নবাব সিরাজউদ-দৌলা সরকারি কলেজ মাঠে ২০ দল আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন তিনি। খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানাতে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে নাটোরকে। শহরজুড়ে  নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচ শতাধিক তোরণ। প্রধান প্রধান সড়কের মোড়ে মোড়ে টানানো হয়েছে ডিজিটাল ব্যানার। আলাইপুর বিএনপি কার্যালয় থেকে সমাবেশস্থল পর্যন্ত সড়কের দু’পাশে আলোকসজ্জার পাশাপাশি শোভা পাচ্ছে বর্ণিল প্ল্যাকার্ড। পতপত করে উড়ছে রঙিন কাপড়ের পতাকা। খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানাতে ওড়ানো হবে লক্ষাধিক রঙিন বেলুন। সমাবেশ শুরু আগে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের মুগ্ধ করবেন দেশের খ্যাতনামা শিল্পীরা। সমাবেশে শৃঙ্খলা রক্ষায় ২০ হাজার বিএনপি কর্মী স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দায়িত্বপালন করবেন। সরজমিন দেখা গেছে, বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের টোলপ্লাজা থেকে শুরু করে রাজশাহীর সীমানা এবং বগুড়ার নন্দীগ্রাম ও পাবনা দাশুড়িয়া পর্যন্ত দীর্ঘ মহাসড়ক এবং জেলার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক তোরণ। শহরজুড়ে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর ছবি সংবলিত শ’ শ’ ডিজিটাল বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছে। আলাইপুর থেকে জনসমাবেশস্থল পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশে রঙিন বাতি, নানা রঙের পতাকা শোভা পাচ্ছে। সন্ধ্যা হলেই নানা রঙের আলোকসজ্জায় মুগ্ধ হচ্ছে শহরবাসী। ঢাকা থেকে দুই শতাধিক মাইক এনে শহরজুড়ে লাগানো হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে ৬০ ফুট প্রস্থ ও ৪০ ফুট দৈর্ঘের সুবিশাল মঞ্চ। জেলা বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সমাবেশকে আকর্ষণীয় করতে বিএনপির সকল অঙ্গ সংগঠনের কর্মী-সমর্থকরা মাঠে আলাদা রঙের পোশাক পরে অবস্থান করবেন। এর মধ্যে ছাত্রদল লাল টি-শার্ট, যুবদল সবুজ টি-শার্ট, স্বেচ্ছাসেবক দল হলুদ টি-শার্ট, ওলামা দল সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি ও টুপি, কৃষকদল মাথায় মাথাল, তাঁতীদল ঘাড়ে গামছা ও মৎস্যজীবী দল ধুতি গেঞ্জি পরে এবং মাছ ধরার সামগ্রী হাতে নিয়ে মাঠে অবস্থান করবে। ২০ দলীয় জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থকদের জন্য মাঠের পশ্চিমপাশে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি অংশ বিএনপির সকল অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি ভাগে যার যার রঙের পোশাক পরে হাতে রঙিন বেলুন নিয়ে হাজার হাজার কর্মী সমর্থক অবস্থান নেবেন।  খালেদা জিয়া মাঠে আগমনের পর এক সঙ্গে পুরো মাঠে লাখ লাখ কর্মী-সমর্থক গ্যাসভরা বেলুন আকাশে ওড়িয়ে দেবেন। শনিবার সকাল ১০টায় গুলশানের বাসভবন থেকে খালেদা জিয়া সড়কপথে রওনা হয়ে দুপুরের মধ্যেই নাটোর পৌঁছবেন। জেলা সার্কিট হাউজে কিছুক্ষণ বিশ্রাম শেষে বিকালে জনসভা মঞ্চে উপস্থিত হবেন তিনি। সমাবেশের সভাপতি নাটোর জেলা বিএনপির সভাপতি ও রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেছেন, দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরু হলেও সকাল ১০টার মধ্যেই নাটোর সিরাজ উদ-দৌলা সরকারি কলেজ মাঠ ও আশপাশের রাস্তাঘাট মানুষে ভরে যাবে। দুপুরের আগ পর্যন্ত কণ্ঠশিল্পী ও জাসাস সাধারণ সম্পাদক মনির খান, কনকচাঁপা ও রিজিয়া পারভীন সংগীত পরিবেশন করবেন। জোহরের নামাজের সঙ্গে সঙ্গেই সমাবেশ শুরু হবে। খালেদা জিয়ার সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুরো শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। ২০ দলীয় জোট সূত্রে জানা গেছে, সমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহম্মেদ, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, ইসলামী ঐক্যজোটের আব্দুল লতিফ নেজামী, বিজেপির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, জাগপার শফিউল আলম প্রধান, খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মো. ইসহাক, জাতীয় পার্টি (জাফর) মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার, এনডিপির খন্দকার গোলাম মতুর্জা, এনপিপির ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ন্যাপের জেবেল রহমান গাণি ও সাম্যবাদী দলের সাঈদ আহমেদসহ ২০ দলের  শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখবেন।

খুলনাঞ্চলের অর্ধেক গাড়িই ফিটনেসবিহীন by রাশিদুল ইসলাম

খুলনাঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর তালিকা লম্বা হচ্ছে। অনুমোদন ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ ও অপেশাদার চালক দ্বারা গাড়ি চালানো, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা, ট্রাফিক বিভাগের অদূরদর্শিতা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের দুর্নীতির কারণে এমনটি ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মহাসড়ক শুধু নয়, বিভাগীয় শহর খুলনায় নগর পরিবহনের জরাজীর্ণতা ও লক্কড়-ঝক্কড় ট্রাকগুলো দুর্ঘটনায় পড়ছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ এ অঞ্চলের ৫০ শতাংশের বেশি ফিটনেসবিহীন গাড়িই এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। আর এ কারণেই অনুমোদন ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে বিআরটিএ ও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ একে অপরের ওপর দোষারোপ করছে। বাংলাদেশে রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত তাদের কাছে আসা ৫২ শতাংশ গাড়ির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাকি ৪৮ শতাংশ গাড়ির অনুমোদন দেয়া হয়নি। সে হিসাবে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ এ অঞ্চলের মোট গাড়ির পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ। ২০১০ সাল পর্যন্ত খুলনা বিআরটিএ থেকে অনুমোদন দেয়া গাড়ির পরিমাণ ৫৯ হাজার ৮৭৬টি। পরের বছর ২০১১ সালে ১০ হাজার ২৩৫টি গাড়ির অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু গত বছর সব জরিমানা মওকুফ করে গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে বিপুলসংখ্যক মালিক এ সুযোগটি গ্রহণ করেছেন। ফলে ৭৫ শতাংশ থেকে কমে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ৫০ শতাংশে নামে। তবে, বেসরকারি হিসাব মতে এর সংখ্যা আরও বেশি। আর এ বৃহৎসংখ্যক অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল করার কারণে। অদক্ষ চালকের কারণেও ঘটছে দুর্ঘটনা। গত ১২ই অক্টোবর দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, খানজাহান আলী (রহ.) সেতুর পূর্বপাড়ে ফারুক জুট মিলের সামনের সড়কে দু’টি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে ৫ জন আহত হন। এর একদিন আগে ১০ই অক্টোবর দুপুরে নগরীর খালিশপুরস্থ বিজিবি সদর দপ্তরের সামনে বিআরটিসি ও ইজিবাইকের সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হন। এ দু’টি দুর্ঘটনার জন্য অদক্ষ চালকদেরই দায়ী করেন যাত্রীরা। সর্বশেষ বয়রাস্থ মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন সংলগ্ন মহাসড়কে কনস্টেবল প্রদীপ কুমার চক্রবর্তী গড়াই পরিবহনের একটি বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, চলমান দুর্ঘটনার মধ্যে ৩৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে জাতীয় মহাসড়কে, ১২ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ১৫ শতাংশ শাখা সড়কে। খুলনা-কয়রা ও খুলনা থেকে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তাটি অধিকাংশ জায়গা গাড়ি চলাচলের জন্য মরণফাঁদ। ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে ডুমুরিয়া থেকে চুকনগরের পূর্ব পর্যন্ত সাতক্ষীরা থেকে শ্যামনগর পর্যন্ত অধিকাংশ জায়গা গাড়ি চলাচলের অনুপযোগী। এদিকে খুলনা-পাইকগাছা ও কয়রার ১০০ কিলোমিটার সড়কটি রয়েছে বেহাল দশায়। একই চিত্র খুলনা থেকে বাগেরহাট, পিরোজপুর, পটুয়াখালী খুলনা থেকে যশোর ঢাকা সড়ক। এসব সড়কের দুর্ঘটনা প্রতিবছর কমপক্ষে অর্ধশত ব্যক্তি মারা যান। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) খুলনার সহকারী পরিচালক এএসএম কামরুল হাসান বললেন, খুলনাঞ্চলে ১৮ লক্ষাধিক মোটরযান রয়েছে। গত বছর সব জরিমানা মওকুফ করায় গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের সুযোগটি মালিকরা গ্রহণ করেন। ইতিমধ্যেই অধিকাংশ যানবাহনে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে। প্রক্রিয়া চলছে। তবে অধিকাংশ গাড়ি এখনও ফিটনেসবিহীন রয়েছে। তবে, অনুমোদন ছাড়া অসংখ্য গাড়ি রয়েছে যেগুলো শনাক্ত করার দায়িত্ব ট্রাফিক বিভাগের। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির জন্য সড়ক দুর্ঘটনা বাড়লে সে দায়ভার আমাদের নয়। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী (ট্রাফিক) কমিশনার মো. কলিম উল্লাহ বলেন, মহানগরীতে অনুমোদনহীন গাড়ি চলতে দেয়া হয় না। ফিটনেস ও অদক্ষ চালকদের সম্পর্কে বিআরটিএ দেখবে। জানি না, তারা কিভাবে ফিটনেসবিহীন গাড়ির ও অদক্ষ চালকদের সার্টিফিকেট দেন।

ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে চা শ্রমিকরা by আবদুর রহমান সোহেল

রাজনগর উপজেলার চা জনগোষ্ঠীর ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ ম্যালেরিয়া ঝুঁকিতে রয়েছেন। গত ৭ বছরে চা বাগানগুলোতেই বেশি ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। শিক্ষা ও পরিবেশ সচেতনতার অভাবে প্রতিনিয়ত ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা করছেন তারা। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলায় ফাঁড়ি বাগানসহ মোট ১৪টি চা বাগান রয়েছে। এসব চা বাগানে মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। দেশে ম্যালেরিয়া ঝুঁকিপ্রবণ ১৩টি জেলার মধ্যে অন্যতম মৌলভীবাজার জেলা। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের চা জনগোষ্ঠী। ২০০৭ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফান্ড ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এনজিও সংস্থা বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস সেন্টার (বিডিএসসি) ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম শুরু করে। এ সংস্থার মাধ্যমে উপজেলার পাহাড়ি চা বাগান অধ্যুষিত ছাড়াও ম্যালেরিয়া ঝুঁকিপ্রবণ রাজনগর সদর, টেংরা, মুন্সিবাজার ও উত্তরভাগ ইউনিয়নে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বছরে একবার এ সংস্থার পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় কার্যক্রম। কিন্তু এ কার্যক্রম কাগজের বাইরে বাস্তবতায় কি পর্যায়ে রয়েছে তা কেউ জানে না। বিডিএসসির হিসাব অনুযায়ী, রাজনগর উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের ১৪টি চা বাগান এলাকায় ৬৫০ জনের মতো ম্যালেরিয়া রোগীকে চিকৎসা দেয়া হয়েছে। তবে বাগান সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, ম্যালেরিয়া প্রবণতা এখনও ঝুঁকির মধ্যেই আছে। এ কার্যক্রম আরও গতিশীল করা প্রয়োজন। বিডিএসসির তথ্যমতে, ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তাদের পরিচালিত কার্যক্রম থেকে জানা যায়, রক্তকাঁচ পরীক্ষা করা হয়েছে ১১৭৩০ জনের, পজেটিভ ৫৫৯, ফেলসিপেরাম ১৬, ভাইভেক্স ৫৪০, মিক্স ৩, আরডিটি পরীক্ষ ১৩১৩, পজিটিভ ৯৫, মোট পজিটিভ ৬৫৫ জন। ‘১৩ সাল পর্যন্ত এলএলআইএন মশারি বিতরণ ২৪ হাজার, ৬৫ হাজার ৯শ ৬০টি মশারি চুবিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে এই এনজিও সংস্থাটির কর্তারা জানিয়েছেন, চা শ্রমিকরা ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সেখানে তাদের কার্যক্রম বেশি। যদিও এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন চা শ্রমিক নেতারা। উত্তরভাগ চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি দিপক কৈরী বলেন, আমাদের বাগানে প্রায় ৮-৯ হাজার মানুষ বাস করে। তবে কতজন ম্যালেরিয়া রোগী আছে আমরা জানি না। তবে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বেশি আমাদের বাগানেই। বাগানের হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। করিমপুর চা বাগানের শ্রমিক কাজল রায় বলেন, আমরা বিডিএসসির দেয়া মশারি পাইছি। ম্যালেরিয়ার কি চিকিৎসা দেয়া হয় আমরা জানি না। আমাদের বাগানের অনেকেই এখনও মশারি পায়নি। বিডিএসসি ম্যানেজার মো. ওমর ফারুক শনিবার (২৫শে অক্টোবর) বলেন, রাজনগর উপজেলার চা বাগান এলাকায়ই ম্যালেরিয়া রোগী বেশি। চা বাগানগুলোতে মশারি এবং মশারি চুবিয়ে দেয়া হচ্ছে। ঝুঁকি থাকার পরও গ্লোবাল ফান্ড থেকে যা পাওয়া যায় তাই বিতরণ করা হয়। উত্তরভাগ, উদনা, সাকেরা, করিমপুর ও চাঁদভাগ বাগানে আমাদের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

রাস উৎসব লোনা পানিতে প্রার্থনা by আবু সাঈদ শুনু

আগামী ৫ই নভেম্বর সাগরপাড়ের দুবলার চর মহোৎসবে মেতে উঠবে। শুরু হবে রাস উৎসব। এর মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করেছেন আয়োজকরা। তেমনি সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে প্রস্তুত। একই সঙ্গে প্রস্তুতি নিয়েছে চোরা হরিণ শিকারিরা। এ উৎসবে প্রতি বছর গোপনে হরিণ নিধন করা হয়। কাজেই স্থানীয় প্রশাসন হরিণ শিকার রোধ ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। সুন্দরবনজুড়ে বন বিভাগ, জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে মেলা চলাকালে ওই এলাকায় জারি করা হবে রেড অ্যালার্ট। বন বিভাগ ও উৎসব আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন জানান, শত বছর ধরে বঙ্গোপসাগর কূলে সুন্দরবনের দুবলার চরে আলোর কোলে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বাংলা কার্তিক মাসের শেষে বা অগ্রহায়ণের প্রথম দিকের ভরা পূর্ণিমার তিথিতে এ রাস উৎসব উদযাপিত হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ সময় পূর্ণিমার জোয়ারের লোনাপানিতে স্নান করে তাদের পাপমোচন হবে- এমন বিশ্বাস নিয়ে উৎসবে যোগ দিলেও, কালের বিবর্তনে এখন তা নানা ধর্ম-বর্ণের লোকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আবালবৃদ্ধবনিতা নির্বিচারে সবার পদচারণায় মুখর হয়ে এ মেলা পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। দুবলার চরের মেলায় লঞ্চ, ট্রলার ও নৌকাযোগে তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীরা এসে সমবেত হয় দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে। সেই সঙ্গে আসেন অসংখ্য বিদেশী পর্যটকও। উৎসবের সময় কুটির শিল্পের বিভিন্ন মালের পসরা সাজিয়ে বসে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী। এ ছাড়া, নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আযোজন করা হয়। বেসরকারি একাধিক ট্যুরিস্ট কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, রাস উৎসবে যোগ দিতে ইতিমধ্যে অনেক ট্যুরিস্ট লঞ্চ ও বোট বুকিং নিতে প্রস্তুতি শুরু করেছেন। অনেকে আবার সুবিধামতো বুকিং না পেলে হতাশ হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন। মেলা উদযাপন কমিটির চেয়ারম্যান মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন জানান, আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে এবার বেশ জমজমাটভাবে মেলা উদযাপনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। মংলাসহ সুন্দরবনের ৮টি পয়েন্ট দিয়ে রাস মেলায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এসব পয়েন্ট দিয়ে অসংখ্য নৌকা ও ট্রলারে করে হাজার হাজার দর্শনার্থী আলোর কোলের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রবেশ করবে। মেলায় প্রবেশকারীদের নির্দিষ্ট ফি দিয়ে বন বিভাগের কাছ থেকে অনুমতিপত্র নিতে হবে। পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, রাস মেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন ও এর নিরাপত্তায় বন বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তাসহ হরিণ শিকার রোধে বনরক্ষীদের পাশাপাশি মেলায় এবারও র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল থাকবে। এ ছাড়া, মেলায় চোরা শিকারিদের রুখতে সব ধরনের দর্শনার্থীর অগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া, পূণ্য স্নানের সময় কোন পটকা ফোটানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চোরা শিকারিরা কৌশলে বন্দুক দিয়ে হরিণ শিকারের পরিকল্পনা করে থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও এ ধরনের তথ্য রয়েছে। এ কারণে এবারও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। তাদের মতে, মংলা, রামপাল ও দাকোপ এলাকার অনেকেই এ উৎসবে অংশ নেয়ার নামে হরিণ শিকারের প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। এ ব্যাপারে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও আমীর হোসেন চৌধুরী জানান, রাস মেলায় কোনভাবেই যেন হরিণ শিকার ও বনজ সম্পদের ক্ষতি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এনআইএ তদন্তকারী দল ঢাকা আসতে পারে

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমানে জঙ্গি ডেরায় বিস্ফোরণ ঘটনার তদন্তে নেমে জাতীয় ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি এনআইএ বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জামা’আতুল মুজাহিদীনের বিশাল কর্মকাণ্ডের হদিস পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে গিয়ে তারা তদন্ত করতে চাইছেন। আর এই উদ্দেশ্যে এনআইএ’র একটি প্রতিনিধি দল খুব শিগগিরই ঢাকা যেতে পারে বলে জানা গেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সূত্র দিয়ে সংবাদ সংস্থার দেয়া খবরে বলা হয়েছে, বর্ধমান কাণ্ডের তদন্তে জেএমবি’র নাম উঠে এসেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের যোগাযোগেরও নানা তথ্য এই ঘটনায় ধৃত ১০ জনকে জেরা করে পাওয়া গেছে। তদন্তে আরও জানা গেছে, চার দফায় পশ্চিমবঙ্গের জেএমবি’র জঙ্গি ডেরাগুলো থেকে কমপক্ষে ১২০টি গ্রেনেড বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।  সেই সঙ্গে এনআইএ তদন্ত করতে গিয়ে নিশ্চিত হয়েছে যে, বিস্ফোরণে নিহতদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী পশ্চিমবঙ্গে জেএমবি’র জঙ্গি মডিউল তৈরির কাজে যুক্ত ছিল। আর সে জন্যই এনআইএ তদন্তকারীদের ঢাকা যাওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকারি সূত্রে অবশ্য বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তদন্তের ব্যাপারে সব তথ্যই বিনিময় করা হচ্ছে। তবুও এনআইএ ঢাকা গিয়ে তদন্ত করতে আগ্রহী। বিশেষ করে সম্প্রতি ঢাকার সেগুনবাগিচায় ধৃত জেএমবি’র দুই সদস্য আসিফ আদনান ও ফজলে ইলাহি তানজিলকে জেরা করে র‌্যাব যে সব তথ্য পেয়েছে তা-ও খতিয়ে দেখতে চাইছে এনআইএ’র গোয়েন্দারা। বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মাধ্যমে ভারত বর্ধমান বিস্ফোরণ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য খুব শিগগিরই তুলে দেবে ঢাকাকে। সম্প্রতি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা দেশের গোয়েন্দা এজেন্সিগুলোর কর্তাদের নিয়ে বর্ধমানের বিস্ফোরণস্থল পরিদর্শন করে এসেছেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করে তদন্তের প্রথম কয়েকদিনে পুলিশের গাফিলতিতে যে জেএমবি’র অনেক মাথা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে সে কথা জানিয়েছেন। মমতাও স্বীকার করেছেন, পুলিশের প্রাথমিক গাফিলতির কথা। এনআইএ গোয়েন্দাদের ধারণা, কাওসার সহ অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে বা নেপালে চলে গিয়েছেন। তদন্তকারীরা পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের অন্যত্র জঙ্গি জাল বিস্তারে ৪০ জন জেএমবি সদস্যকে চিহ্নিত করে তাদের খোঁজ চালাচ্ছেন। এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা বর্ধমানের জঙ্গি ডেরায় হয়েছিল বলে যে খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে তাকে রাবিশ বলে জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত বর্ধমান কাণ্ডে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা কেউই জেএমবি’র জ্যেষ্ঠ নেতা স্তরের নন। তাই তাদের পক্ষে চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল কারা তা জানা সম্ভব নয়।

সাগরের গ্যাস ব্লক ছেড়ে দিয়েছে মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস

মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি কনোকোফিলিপস বঙ্গোপসাগরের ১০ ও ১১ নং গ্যাস ব্লক দু’টি ছেড়ে দিয়েছে। গত রোববার এ বিষয়ে পেট্রোবাংলাকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছেন তারা। জ্বালানি ও খনিজ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কনোকোফিলিপস বলছে ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে ৪ টিসিএফ গ্যাস আছে। কিন্তু এই গ্যাস উত্তোলন করে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন না। আগের পিএসসিতে গ্যাসের দাম কম হওয়ায় তারা দীর্ঘদিন ধরে দাম বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। সরকার এতে রাজি না হওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে ব্লক ছেড়ে দেয়ার কথা জানানো হয়। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) সই হওয়ার তিন বছর পর চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে কনোকোফিলিপস গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য চাপ দিতে শুরু করে। ওই সময় তারা পেট্রোবাংলার কাছে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রতিবেদন জমা দেয়। পুরনো পিএসসিতে সমুদ্রে গ্যাসের দাম বাড়ালে স্থলভাগে কাজ করা অন্য গ্যাস কোম্পানিগুলোরও দাম বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হবে। এতে দেশের গ্যাসের দাম অনেকটা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এমন ধারণা থেকেই সরকার কনোকোর প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। এছাড়া, পিএসসি সংশোধন করে গ্যাসের দাম বাড়ালে আইনগত জটিলতায় পড়ারও আশঙ্কা ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ১৬ই জুন সাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য কনোকোফিলিপসের সঙ্গে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) করে পেট্রোবাংলা। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২৮০ কিলোমিটার দূরে এ দু’টি ব্লকে সমুদ্রের গভীরতা এক থেকে দেড় কিলোমিটার। পেট্রোবাংলায় জমা দেয়া প্রতিবেদনে মার্কিন কোম্পানিটি ব্লকের একটি অংশে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলছে। সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে তারা। এর ৮০ শতাংশই নেতিবাচক বিবেচনা করা হচ্ছে এ বিনিয়োগকে। পিএসসি ২০০৮ অনুযায়ী প্রতি হাজার ঘনফুট (এক ইউনিট) গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয় ৪ দশমিক ২ ডলার। পরে গভীর সমুদ্রে ইউনিটপ্রতি ৬.৫ ডলার দাম নির্ধারণ করে পিএসসি ২০১২ নির্ধারণ করা হয়। কনোকো ওই দাম চেয়ে আসছিল। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় মাত্রার ভূকম্পন জরিপে (টু-ডি সাইসমিক সার্ভে) কতটুকু এলাকায় গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ওই বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। দ্বিতীয় মাত্রার জরিপের পর কূপ খনন না করা পর্যন্ত গ্যাস থাকা সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। এ ধরনের  কোন প্রযুক্তিও আবিষ্কৃত হয়নি। স্থলভাগেই দ্বিতীয় মাত্রার জরিপ করার পর গ্যাস পাওয়ার ঘোষণা দিয়ে পরে দেখা গেছে, সেখানে প্রকৃতপক্ষে কিছুই নেই। এদিকে বঙ্গোপসাগরের দু’টি ব্লকের ৫১৫৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করার কথা কোম্পানিটির। গভীর সমুদ্রের জন্য ৯ বছর মেয়াদি এ চুক্তিতে তিন ধাপে জরিপ ও খনন কাজ চালানোর কথা রয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানকাল পাঁচ বছর। প্রথম বর্ধিত অনুসন্ধানকাল দুই বছর। দ্বিতীয় বর্ধিত অনুসন্ধানকাল দুই বছর। উন্নয়নকাল সর্বোচ্চ তিন বছর নির্ধারণ করা ছিল। প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে করণীয় হলো এই সময়ে কন্ট্রাক্টরকে ম্যান্ডেটরি ওয়ার্ক প্রোগ্রাম এবং বিডেড ওয়ার্ক প্রোগ্রাম শেষ করতে হবে। এর মধ্যে আছে ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ, ভূ-পদার্থিক জরিপ, অন্যান্য জরিপ (গ্র্যাভিটি, ম্যাগনেটিক, জিওকেমিক্যাল সার্ভে ইত্যাদি)। এরপর তাদের দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করার কথা। তারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ শেষ করায় ব্যাংক গ্যারান্টি ফেরত পাবে। দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু করলে তাদের একটি কূপ খনন করতে হতো। এ কূপ খনন করলেই গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে গ্যাস রয়েছে কিনা জানা যেতো। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের ২৬টি গ্যাসক্ষেত্রের প্রাথমিক ও সম্ভাব্য মিলিয়ে উত্তোলনযোগ্য মজুতের পরিমাণ ২৭ দশমিক শূন্য ৪ টিসিএফ। এর মধ্যে গত মার্চ পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে ১১ দশমিক ৯৩ টিসিএফ গ্যাস।

ভাবীর সঙ্গে পরকীয়া, অতঃপর আত্মহত্যার চেষ্টা

তারা এখন মৃত্যুপথযাত্রী। হাসপাতালের পাশাপাশি কক্ষে এখন তাদের অবস্থান। দগ্ধ শরীর নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে রিনা বেগম ও আবদুর রহিম। একসময় তাদের মধ্যে ছিল পরকীয়া সম্পর্ক। আর এখন চলছে একে অপরের ওপর দোষারোপ। এ সম্পর্কের টানাপড়েনের জের ধরেই একজনের দেয়া আগুনে দগ্ধ হয়েছে দু’জনই। শরীরের অর্ধেকের বেশি অংশই তাদের পুড়ে গেছে। রহিম-রিনা সম্পর্কে দেবর-ভাবী। বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার বেলকপাড়া গ্রামে। গত মঙ্গলবার ভাবী রিনা বেগমের গায়ে পেট্রল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করে নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা চালায় রহিম। প্রতিবেশীরা জানান, বেলকপুর গ্রামের আক্কাছ আলীর ছেলে আনিসুর রহমান আনিস প্রায় ১৭-১৮ বছর ধরে সৌদি আরব থাকেন। মাঝে মাঝে তিনি ছুটিতে বাড়ি আসেন। দু’মাস পর আবারও সৌদি পাড়ি জমানোর কথা রয়েছে তার। প্রবাসে থাকার সুযোগে আনিসের আপন চাচাতো ভাই রহিম তার স্ত্রী রিনা বেগমের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে তোলে। রহিমের পিতার নাম ইকরাম আলী। তাদের পরকীয়ার বিষয়টি এলাকায় ওপেন সিক্রেট ছিল। এ নিয়ে দু’পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্বও চলছিল। এ কারণে আনিস বিদেশ চলে যাওয়ার সময় প্রতিবারই স্ত্রী রিনাকে তার বোনের বাড়িতে রেখে যেতেন। দেশে ফিরে তাকে বাড়িতে আনতেন। কিন্তু এর মধ্যেও থেমে থাকেনি রহিম ও রিনার পরকীয়া। রহিম এ কারণে তার স্ত্রীকেও পিতার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। সমপ্রতি আবারও আনিস ছুটিতে বাড়ি এলে উভয়ের এ সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। রিনা আর ওই সম্পর্ক রাখতে চায় না বলে রহিমকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু নাছোড়বান্দা রহিম কিছুতেই এ প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি হয়নি। রিনাও তাকে এড়িয়ে চলতে থাকে। এতে ক্ষিপ্ত হয় রহিম। ঘটনার দিন গত মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রিনাকে বাড়ির পাশে ডেকে নেয় রহিম। এ সময় কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে রিনার গায়ে পেট্রল ঢেলে দেয়। নিজের গায়েও পেট্রল ঢালে। প্রথম দিকে রিনা বুঝতে না পারলেও একটু পরেই পেট্রলের গন্ধ টের পেয়ে দৌড় দেয়। এ সময় পেছন থেকে ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন জ্বেলে রিনার দিকে ছুড়ে মারে। শরীরের আগুন ধরে গেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রিনা। এ সময় স্থানীয়রা তার শরীরের আগুন নিভিয়ে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। একই সময় রহিমও নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দৌড়াতে থাকে। এ সময় স্থানীয় দু’জন মহিলা তাকে ধাক্কা দিয়ে পুকুরে ফেলে দেন। পরে সেখান থেকে উদ্ধার করে তাকেও এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। উভয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ওই দিন দুপুরেই তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তাদের বার্ন ইউনিটে দোতলায় পাশাপাশি মহিলা ও পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। ডা. পার্থশঙ্কর পালের অধীনে তারা চিকিৎসাধীন। সেখানেই গত তিন দিন ধরে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে তারা। রিনার খাদ্যনালীতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে সে খাবার খেতে পারছে না। তার শরীরের ৫৮ ভাগ পুড়ে গেছে। অপরদিকে রহিমের পুড়েছে শরীরের ৪৮ ভাগ। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের উভয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক। প্রতিবেশীরা আরও জানিয়েছেন, আনিস-রিনা দম্পতির ১২ বছরের একটি ছেলে ও ৯ বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। অপরদিকে রহিম ৫ বছর আগে বিয়ে করে। বিএ পড়ুয়া স্ত্রী স্বামীর কাছে আসতে চাইলেও পরকীয়ার কারণে তাকে নিজের কাছে রাখে না রহিম। এর আগে ৫ বছর আফ্রিকাতে ছিল সে। এদিকে এ ঘটনায় রহিমকে দায়ী করছেন রিনার পরিবার ও তার পিতা তারা মিয়া। তিনি বলেন, রহিম প্রায়ই তার মেয়েকে বিয়ে প্রস্তাব দিতো। এতে সে রাজি না হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়েছে। এ সময় ওই আগুন অসাবধানতায় তার শরীরে লেগেছে। এ ব্যাপারে তিনি বাদী হয়ে ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। রহিমকে প্রধান আসামি করে উস্কানিদাতা হিসেবে তার মা ও ভাই ফজলের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। রহিম বর্তমান পুলিশ প্রহরায় রয়েছে। অপরদিকে এ ঘটনার জন্য রিনাকে দায়ী করেছে রহিমের পরিবার।

হরতালের পালে হাওয়া by সাযযাদ কাদির

রাজনীতির আকাশে আবার দেখা যাচ্ছে হরতালের ঘনঘটা। দীর্ঘ বিরতির পর এই ক’দিন আগে একটা হরতাল এসেছিল আমাদের আরজু ভাই (সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী)-এর বিরুদ্ধে। বয়সে তিনি বছর দশেকের বড় আমার, তবে বড় হয়েছি একই পাড়ায়, শৈশবে ও বাল্যে দূরত্ব থাকলেও কলেজ-জীবনে ছিলাম কাছাকাছি। পরে রাজনৈতিক জীবনে সুদূর হয়ে গেলেও এত বছর ধরে চেনা মানুষটি এখন খুব অচেনা হয়ে গিয়েছেন এমন মনে করি না। নিউ ইয়র্কে টাঙ্গাইল সমিতির অনুষ্ঠানে হজ, তাবলীগ জামাত, মহানবী (সা.) সম্পর্কে তাঁর যে বক্তব্য মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে তা প্রায় অবিশ্বাস্য ঠেকেছে আমার কাছে। যিনি নিজে হজ করে এসেছেন, প্রতি বছর এলাকার কয়েকজনকে হজে পাঠান নিজ খরচে, এবারও পাঠিয়েছেন, গাঁয়ের বাড়িতে নির্মাণ করেছেন এলাকার বৃহত্তম মসজিদ, তিনি হঠাৎ করে বলতে গেলেন কেন এসব কথা, এমন স্ববিরোধিতায় ভোগার মতো মানুষ তো নন তিনি! তখন থেকে এ পর্যন্ত এ নিয়ে একটা ধন্দ রয়েই গেছে আমার মধ্যে। ভিডিওতে দেখেছি তাঁর বক্তব্য রাখার সময় পাশে বসা ছিলেন আমাদের সামসময়িকদের একজন আতিকুর রহমান খান ইউসুফজয়ী সালু। আরজু ভাই যখন টাঙ্গাইল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, তখন সালু ছিলেন টাঙ্গাইল ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। ইচ্ছা আছে সালুর কাছ থেকে ঘটনাটি বিশদ ভাবে জানার। এ কৌতূহলের বিশেষ কারণও আছে। বিবিসি’র সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকারে আরজু ভাই বলেছিলেন তিনি যা বলেছেন তার একটি অক্ষরও প্রত্যাহার করবেন না, কিন্তু পরের সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন অপ্রাসঙ্গিক ভাবে উদ্ধৃত করে বিকৃত করা হয়েছে তাঁর বক্তব্য। এজন্যই মনে হয় কোনও ঘোরতর রহস্য আছে এর পেছনে। যাহোক, হরতাল এবার এসেছে ইসলামি দলগুলোর হাত ধরে। এখনও চলছে তাদের সাথে-সাথে। সামনে যে আরও হরতাল আসবে তা প্রায় নিশ্চিত। অবশ্য হরতালে আগের ধার নেই আর। এরশাদের আমলেই লাগাতার হরতাল দিয়ে-দিয়ে ভোঁতা করা হয়েছে এর ধার। এখন এর কার্যকরিতাও নেই কেমন। মশার নানারকম ওষুধ সহ্য করে-করে মশা যেমন ওষুধ-সহা হয়ে গেছে, তেমনই আমরা হরতালে অভ্যস্ত হয়ে পুরোপুরি হরতাল-সহা হয়ে পড়েছি অনেক আগেই। আর যাদের ঘা দিতে হরতাল ডাকা সেই সরকার-প্রশাসন এর জন্য আলাদা প্রস্তুতি ও বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখে আগেভাগে। ফলে তাদের কাজেকর্মে যদি ব্যাঘাত কিছু ঘটেই তবে তা অতি সামান্য। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মকর্তারা ঠিকই কাজ চালিয়ে যান, কাজের ক্ষতিও পুষিয়ে নেন ঠিকমতো। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা যতই যা বলুন তাঁরাও হরতাল মোকাবিলা করেন যার-যার মতো করে। আর হরতালের ঘা গিয়ে পড়ে তাদের ওপর যাদের কথা বলে বা দোহাই দিয়ে ডাকা হয় হরতাল। সাধারণ মানুষদের মধ্যে যাদের দিন এনে দিন খেতে হয়- লাথি পড়ে তাদের পেটে। দিনান্তে খাবার জোটানো এ সব মানুষের একটি বিবরণ আমার সবচেয়ে প্রিয় কবিদের একজন তারাপদ রায় দিয়েছেন তাঁর ‘দিন আনি, দিন খাই’ কবিতায় “...বৃষ্টির দিন, মেঘলা দিন, কুয়াশা ঘেরা দিন, / স্টেশনের প্লাটফর্মে অধীর প্রতীক্ষারত দিন, / অপমানে মাথা নিচু করে চোরের মতো চলে যাওয়া দিন, / খালি পেট, ছেঁড়া চটি, ঘামে ভেজা দিন, / নীল পাহাড়ের ওপারে সবুজ বনের মাথায় দিন, / নদীর জলের আয়নায়, বড় সাহেবের ফুলের বাগানে দিন, / নৌকোর সাদা জালে ঢেউয়ের চূড়ায় ভেসে যাওয়া দিন, / রোদে পোড়া, আগুনে জ্বলা রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা দিন...”। হরতালের আরও এক শিকার অল্প আয়ের ছাপোষা মানুষ। সারা মাস তাদের সংসার চলে যোগ-বিয়োগের কড়া হিসাব কষে। হরতাল এসে হঠাৎ খরচ বেড়ে গিয়ে ভণ্ডুল করে দেয় তাদের সব হিসাবের অঙ্ক। কারণ সেদিন আর বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে চলা যায় না, চড়তে হয় রিকশায়, তা-ও ডাবল ভাড়ায়। তারপর উপলক্ষের জন্য ওত পেতে থাকে যারা তাদের তো পোয়া বারো হরতালের গন্ধ পেলে। জিনিসপত্রের, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের, দাম বাড়িয়ে তারা পকেট কাটে সব কিছুতে মুখ বুজে থাকা এই মানুষগুলোরই। তাহলে লাভ কি হরতালে? লাভ সর্বগ্রাসী মিডিয়ার, আর প্রচার পেয়ে লাভ ‘যা নয় তা-ই’ দলগুলোর। সরকারের ক্ষতি ভাবমূর্তিতে, যার প্রভাব পড়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আর্থিক আনুকূল্যে। আন্তর্জাতিক জনমতে। ৫ই জানুয়ারির খেসারত হিসেবে এ সব ক্ষতি এখন দেখা দিতে পারে আরও ভারি হয়ে। কারণ দেখেশুনে মনে হয় বেশ হাওয়া লাগছে হরতালের পালে!
৩০.১০.২০১৪

তরুণদের কেন আমরা পথ দেখাতে পারছি না? by মহিউদ্দিন আহমদ

তারুণ্য নিয়ে উচ্ছ্বাস ও আশাবাদ আমাদের সমাজে প্রবলভাবে উপস্থিত। তরুণেরাই সমাজের বল-ভরসা। বাংলা ভাষার প্রধান কবি রবীন্দ্রনাথ আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা.../ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ছিলেন তারুণ্যের প্রতীক, প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তাঁর লেখা সেই চরণগুলো এখনো আমাদের উদ্দীপনা জোগায়: ‘আমরা শক্তি আমরা বল/ আমরা ছাত্রদল, মোদের চরণতলে মূর্ছে তুফান/ ঊর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল’। তরুণেরা স্বভাবতই প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী। রাজনীতির ভাঙা-গড়ার চিরন্তন প্রবাহে তরুণেরা সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দেয়। এর অনেক উদাহরণ আছে পৃথিবীতে। সাম্প্রতিককালে যতগুলো বড় ঘটনা ঘটেছে, তাতে গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে তরুণসমাজ। শুধু এই সময়ের কথা বলছি কেন, প্রাচীনকালেও এর ব্যত্যয় হয়নি। মেসিডোনিয়ার রাজা আলেকজান্ডার অর্ধেক পৃথিবী জয় করে যখন মারা যান, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৩। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স যখন বিশের কোঠায়, তখন তিনি হিলফুল ফুজুল নামের একটি সংগঠন তৈরি করে কুরাইশ বংশের বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংহতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। হিলফুল ফুজুলকে আধুনিক নাগরিক সংগঠনের আদিরূপ বলা যেতে পারে। তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবর মাত্র ১৩ বছর বয়সে দিল্লির সিংহাসনে বসেন এবং ১৯ বছর বয়সে একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রয়োগ শুরু করেছিলেন। তাঁর কূটনৈতিক ও সামরিক দূরদর্শিতার ফলেই ভারতবর্ষে একটি আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রের প্রথম সিঁড়িটি তৈরি হয়েছিল।
একুশ শতকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে তারুণ্যের সেই দীপ্তি খুঁজে পাই না। এখানে যে বয়সে ছাত্রসংগঠনের কমিটিগুলোতে ঢোকার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়, তার চেয়ে কম বয়সী অনেক বড় বড় রাষ্ট্রনায়ককে আমরা দেখেছি বিশ শতকে। লিড ট্রটস্কি ১৯১৭ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে সফল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মাত্র ৩৮ বছর বয়সে। মিসরে গামাল আবদেল নাসের একই বয়সে রাষ্ট্রের হাল ধরেছিলেন। কিউবায় যখন বিপ্লব সংগঠিত হয়, তখন এর নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর বয়স ছিল ৩২। তাঁর অন্যতম সহযোগী চে’ গুয়েভারার মাত্র ৩০ চলছে তখন। এ সবই ঘটেছে ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে। একই বছর লিবিয়ায় রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে আদিম যাযাবর সমাজের পালাবদল ঘটিয়েছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি মাত্র ২৩ বছর বয়সে। এ রকম উদাহরণ আরও অনেক দেওয়া যায়।
আমাদের দেশে তরুণসমাজ কোনো অবিমিশ্র ও অবিভাজ্য সামাজিক শক্তি নয়। একাত্তরে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনে তরুণসমাজের একটি অংশ সক্রিয় হয়েছিল। এদের সংখ্যা বড়জোর এক লাখ বা তার চেয়ে কিছু বেশি। বিরাটসংখ্যক তরুণ এদের সক্রিয় সহযোগিতা দিয়েছে, তা স্বীকার করতেই হবে। এর পাশাপাশি তরুণসমাজের একটি অংশ ছিল পুরোপুরি নির্লিপ্ত, এমনকি দখলদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সহযোগী। দেশের অবস্থা যে পুরোপুরি ‘স্বাভাবিক’ এবং দেশে ঘটে যাওয়া গণহত্যা ও অন্যান্য নৃশংস ঘটনাবলি যে ‘ভারতের ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা’, এটা দেখানোর জন্য তখন সামরিক জান্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিয়েছিল। আমাদের অনেক সতীর্থ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করেছিল এবং পরীক্ষা দিয়েছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ‘গণ্ডগোল’ যদি মিটে যেত, তাহলে কী হতো? হয়তো শেখ মুজিবের ফাঁসি হতো আর আমাদের মতো মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতকারী’ পরিচয় নিয়ে দালাই লামার সহযাত্রীদের মতো ভারতের কোনো আশ্রয়শিবিরে অথবা রাস্তাঘাটে ভবঘুরের জীবন যাপন করতে হতো। স্বাধীনতার প্রথম প্রহরেই আমরা এ দেশে তারুণ্যের বিভক্তি ও অবক্ষয়ের শুরু দেখতে পেয়েছি। জিন্দাবাদ-মুর্দাবাদের রাজনীতি, অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া তখন থেকেই চলে আসছে। ডাকসুর ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের ‘সাত খুন’, লাল সন্ত্রাসের নামে আতঙ্ক ছড়ানো—এ সবই ছিল তরুণদের কাজ। নেতৃত্বেও ছিল প্রধানত তরুণেরাই। এর মূল্যও দিতে হয়েছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তরুণদেরই।
আমরা অনেক সময় গর্ব করে বলে থাকি, এ দেশের ছাত্রসমাজ জাতীয় রাজনীতিতে অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল একটা সময় পর্যন্ত। উদাহরণ হিসেবে ভাষা আন্দোলন, আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন এবং উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের কথা আমরা অহংকারের সঙ্গে উচ্চারণ করি। এ ধারাটির অবসান হয় পরবর্তী রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ১৯৭৬ সালের একটি সামরিক ফরমানের মাধ্যমে, যেখানে রাজনৈতিক দলবিধি অনুযায়ী ছাত্রসংগঠন ও অন্যান্য গণসংগঠনকে মূল রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে এখনো। একটি রাজনৈতিক দল এখন ‘গ্রুপ অব কোম্পানিজ’। তার একটি মূল সংগঠন আছে, আছে একটি করে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষক সংগঠন। এ ছাড়া এখন ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে হাজারো নামসর্বস্ব সংগঠন, যেমন তাঁতী দল বা লীগ, স্বেচ্ছাসেবক দল বা লীগ, প্রজন্ম দল বা লীগ ইত্যাদি। ‘দল’-এর মালিক হলো বিএনপি, আর লীগ মানেই আওয়ামী লীগ। তরুণদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। সবাই নেতা হতে চায়। দলের কোনো একটা কমিটিতে থাকতে পারলে আখের গোছাতে সুবিধা হয় অনেক। তাই একটার পর একটা সংগঠন তৈরি হচ্ছে। দেশরত্ন প্রজন্ম লীগ, দেশনেত্রী সমর্থক দল, আমরা জিয়ার সৈনিক, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ—এ রকম আরও অনেক সংগঠন মাটি ফুঁড়ে উঠছে প্রায় প্রতিনিয়ত।
জাতীয় প্রেসক্লাবের দোতলায় কয়েকটা কামরা ভাড়া নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সারির নেতারা একটি সংগঠনের ব্যানার লাগিয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। আশপাশে ১৪-২০ জন তরুণ নিশ্চুপ বসে থাকে। এদের নানা উপায়ে জড়ো করা হয়। এই সভার পর আর হয়তো ওই সংগঠনের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। এতে প্রেসক্লাবের লাভ হয়, ঘরভাড়া পাওয়া যায়। আর টেলিভিশনের পর্দায় আমরা এই একঘেয়ে ও বিরক্তিকর নাটকে মঞ্চায়ন দেখি দিনের পর দিন। এসব তরুণের কি কোনো কাজ নেই?
২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতাসীন হয়। তখন একটা কথা চাউর হয়েছিল, তরুণ প্রজন্ম আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কেননা, তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারে এটা বলা হয়েছিল। হয়তো কথাটা সত্য। গত কয়েক বছরে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আমরা দেখলাম তারুণ্যের জয়জয়কার। শাহবাগে তারুণ্যের জোয়ার লক্ষ করি। টেলিভিশনের পর্দায় দেখলাম, যারা পুলিশ পেটাচ্ছে, গাড়িতে আগুন দিচ্ছে, লাঠি, সড়কি কিংবা রামদা নিয়ে প্রতিপক্ষকে তাড়া করছে, তারাও সবাই তরুণ। তাদের পরনে জিনস, হাতে হাতে ‘ককটেল’।
দেশে চরমপন্থার বিস্তৃতি ঘটছে। ধর্মীয় চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে অনেকেই। হিজবুত তাহ্রীর এবং এ–জাতীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তারা সবাই তরুণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, তাদের ধরা হচ্ছে অস্ত্র, জিহাদি বইসহ। যাদের ধরা হচ্ছে, তারা প্রায় সবাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এরা ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্রদলের ক্যাডারদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম বয়সী এবং অধিকতর মেধাবী। এসব তরুণ কেন চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে?
রাজনীতিতে চরমপন্থা নতুন বিষয় নয়। একসময় এ দেশের তরুণদের একটা বড় অংশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিল। তারা শ্রেণি-সংগ্রামের নামে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করাকে জায়েজ মনে করেছিল। এর ধারাবাহিকতায় অনেকেই পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি ও জাসদের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী গণবাহিনীর ঝান্ডা উঁচিয়ে রাজনীতিতে চরমপন্থা অবলম্বন করেছিল। এখন কমিউনিস্ট বা বাম ঘরানার চরমপন্থী রাজনীতির অবসান হয়েছে। তার জায়গায় দেখা যাচ্ছে ধর্মাশ্রয়ী চরমপন্থা। শুধু ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আউড়ে এই সমস্যার মীমাংসা হবে না। নিরাপত্তার নামে বাহিনীগুলোকে আরও নিষ্ঠুরতার দিকে ঠেলে দিয়েও এই তরুণদের দমানো যাবে বলে মনে হয় না। যেতে হবে আরও গভীরে। তরুণদের আহত মনস্তত্ত্ব পুলিশি অ্যাকশন দিয়ে সমাধান করা যাবে না।
দেশে অনুসরণযোগ্য নেতৃত্ব নেই। সব ক্ষেত্রেই গালাগাল, চিৎকার। তরুণেরা প্রেরণা পাবে কোথা থেকে? অর্থনীতির চাকা ঘুরছে মন্থর গতিতে। বিনিয়োগ পরিস্থিতি হতাশাব্যঞ্জক। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের অরণ্যে খুঁজে পাওয়া হতভাগ্য বাংলাদেশি তরুণদের দৃষ্টান্ত থেকেই বোঝা যায়, কত অনন্যোপায় হলে রুটিরুজির জন্য মানুষ এ রকম অনিশ্চয়তা ও বিপদের পথে পা বাড়ায়।
মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত দালাল চক্রের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। আমাদের রাষ্ট্র তরুণদের জন্য তেমন কোনো ‘স্পেস’ তৈরি করে দিচ্ছে না। আমরা শুধু বাগাড়ম্বর শুনি। সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো আয়োজন দেখি না। এসব তরুণ কোথায় যাবে? যাঁদের ক্ষমতা আছে, তাঁরা তাঁদের সন্তানদের দেশের বাইরে নিরাপদ পরিবেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাদের সন্তানদের জন্য কী ব্যবস্থা করবে? পাচার হওয়া, মাদকের কাছে সমর্পিত হওয়া অথবা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া ছাড়া তাদের সামনে কোনো গ্রহণযোগ্য পথ কি আমরা দেখাতে পারছি? নাকি সবাই আমরা আঁধারের যাত্রী?
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক। প্রথমা থেকে প্রকাশিত হলো তাঁর জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি।
mohi2005@gmail.com

শেয়ার বাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত সবার শাস্তি হোক by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

২০১০ সালে শেয়ারবাজার পতনের কারণে বহু মানুষ রিক্ত হয়েছেন। সেই ঘটনার পর সরকার এর কারণ খতিয়ে দেখতে আমাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির নির্ধারিত সময় ছিল দুই মাস। কমিটি যথাসাধ্য চেষ্টা করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দুই মাসের মধ্যে এত বড় একটি ঘটনার তদন্ত করা খুব কঠিন কাজ। তার পরও আমরা এ সময়ের মধ্যে কিছু অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছিলাম। আমাদের তদন্তে বেরিয়ে আসে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দুর্বলতার কারণে শেয়ারবাজারে এত বড় কেলেঙ্কারি ঘটেছিল।

বিশেষ করে অমনিবাস অ্যাকাউন্টবিষয়ক অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম। এই অমনিবাস অ্যাকাউন্ট ভুতুড়ে অ্যাকাউন্ট হিসেবে পরিচিত ছিল। এই অ্যাকাউন্ট নিয়ে সরকার বা বিএসইসি কেউই তেমন একটা মাথা ঘামাত না। এতে বোঝা যায়, এসব অ্যাকাউন্ট যাঁরা পরিচালনা করেন, তাঁরা অনেক শক্তিশালী। অনুসন্ধানে আমরা অমনিবাস অ্যাকাউন্টে দুর্নীতির সত্যতা খুঁজে পেয়েছিলাম। এ কথাও সত্য যে, সময়ের অভাবে আমরা এই কয়েক লাখ ছায়া হিসাব পরীক্ষা করতে পারিনি। আমরা পুনর্গঠিত বিএসইসিকে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিলাম।
কিন্তু আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করার পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বললেন, এ প্রতিবেদন ধারণাসম্মত, বাস্তবতার প্রতিফলন এখানে নেই। সরকারের আরও কোনো কোনো মন্ত্রী নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন বলে শুনেছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এ তদন্ত কমিটিতে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কেউই ধারণার ওপর ভিত্তি করে এত বড় একটি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করবেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
পরবর্তীকালে, আমাদের সুপারিশ অনুসারে বিএসইসি তদন্ত করে আমাদের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছে। এমনকি আমাদের কিছু সুপারিশ বাস্তবায়িতও হয়েছে। অর্থমন্ত্রী এখন তাঁর সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন বলে আশা করি। আমরা সুপারিশ করেছিলাম, শেয়ারের ডিমিউচুয়ালাইজেশন করতে হবে। বিএসইসি দেরিতে হলেও তা করেছে। এর ফলে পুঁজিবাজারে এখন বড় কোনো উল্লম্ফন নেই, আবার বড় পতনও নেই। বলা যায়, বাজারে একধরনের স্থিতিশীলতা এসেছে। এটা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ঘটনা।
সরকার অ্যান্টি মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট করতে গিয়ে একটি শর্ত পূরণ করতে বাধ্য হয়। কারণ, এ আইনটি করতে গেলে প্যারিসভিত্তিক এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হতে হয়। তাদের শর্তানুসারে কোনো দেশ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট করতে গেলে তাকে আগে অমনিবাস অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে হবে। ফলে সরকার অমনিবাস অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এ প্রক্রিয়া একরকম ধীরগতিতে চলছে। বলাবাহুল্য, আমরা প্রতিবেদনে অমনিবাস অ্যাকাউন্ট বন্ধের সুপারিশ করেছিলাম। একই সঙ্গে এখন বিএসইসির নজরদারিব্যবস্থা আরও উন্নত হয়েছে। এ কাজে লোক নিয়োগ করা হয়েছে, সফটওয়্যার প্রবর্তন করা হয়েছে। একটি সাির্ভল্যান্স বিভাগ চালু হয়েছে। এর ফলে শেয়ারবাজারের দুর্নীতি তারা এখন আরও দক্ষতার সঙ্গে চিহ্নিত করতে পারবে বলে আমি আশা রাখি।
এবার দুজন ব্যক্তিকে শেয়ারবাজার কারসাজি করার অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে। এটাকে শুভ সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আমরা আরও অনেকের বিরুদ্ধেই অমনিবাস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কারসাজি করার অভিযোগ এনেছিলাম, আশা করি তাঁদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করে বিএসইসি যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে, আর প্রমাণিত না হলে তাঁদের নির্দোষ ঘোষণা করবে।
শুধু শেয়ারবাজার নয়, বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মাফিয়া চক্রের প্রভাব খুব বেশি। সরকারের ওপরও এদের প্রভাব অনেক। অতীতে আমরা হাওয়া ভবন দেখেছি, এখন হয়তো হাওয়া ভবন নেই, কিন্তু কাজগুলো ঠিকই হচ্ছে। এখানে একটা উদাহরণ দিতে পারি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর আমরা যখন তদন্তের কাজ করছিলাম, তখন একদিন শেয়ারবাজারে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি আমাদের কাছে এলেন। পুরো তদন্ত কমিটির সামনে তিনি বললেন, ‘স্যার, আমাদের ঘাঁটায়েন না। কিছু করতে পারবেন না।’ আমি তখন তাঁকে বললাম, আমরা ঘাঁটানোর কে, তদন্তে যা বেরিয়ে আসবে, তাই আমরা তুলে ধরব। ঘাঁটাবে তো সরকার। তখন তিনি বললেন, ‘স্যার, ওটা ঠিক আছে। আপনারা ঘাঁটায়েন না।’ তখন তিনি আরও বললেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে আমরা সামনে থাকি আর বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে অন্যরা সামনে আসবে, আমরা পেছনে থাকব।’
বিএসইসি শেয়ারবাজার কারসাজির দায়ে মোসাদ্দেক আলী ফালু ও গোলাম মোস্তফাকে যথাক্রমে এক কোটি ও তিন কোটি টাকা জরিমানা করেছে। এর মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হলো যে প্রভাবশালীরা যত শক্তিশালীই হোন না কেন, তাঁরা আইনের ঊর্ধ্বে নন। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে কেউ এসে তদন্ত কমিটিকে এ কথা বলার সাহস পাবে না যে আমাদের ঘাঁটায়েন না। সরকারের উচিত এ ধরনের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
তবে শেয়ারবাজার তথা আর্থিক খাতের অনিয়ম রোধ করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই বড় বিষয়। শুধু একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হলেই সে কাজ করতে পারে না। ওই প্রতিষ্ঠানকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক দিন ধরে কাজ করতে করতে এখন একটি পর্যায়ে এসেছে। এটি যদি খুব খারাপও চলে, তার পরও অনেক অনিয়ম বেরিয়ে আসবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও বিএসইসির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ সম্পন্ন হয়নি। আমরা তদন্তের কাজ করতে গিয়ে দেখলাম বিএসইসির তেমন কোনো অর্গানোগ্রাম নেই,
আবার লোকবলেরও যথেষ্ট ঘাটতি ছিল তখন। ব্যবস্থাপনায় একটি কথা বলা হয়, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সুশাসন নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যবস্থাপকদের ওপর। তাঁরা যেভাবে আচরণ করবেন, প্রতিষ্ঠানও সে রকম আচরণ করবে।
বিএসইসির আগের কমিশনের মধ্যে অদক্ষতার পাশাপাশি দুর্নীতিও আমরা দেখতে পেয়েছি। মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ও ফারুক আহমেদ সিদ্দিকীর পর ওই মাপের যোগ্য নেতৃত্ব বিএসইসিতে আর দেখা যায়নি। সে জন্য বিএসইসির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সুশাসনের বিষয়টি বেশ সময়সাপেক্ষ বলে আমার মনে হয়। আমি ব্যবস্থাপনার ছাত্র ছিলাম। সেখানে আমাদের ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বিষয়গুলো শেখানো হতো। বলা হতো, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা যদি দুর্নীতিপরায়ণ বা অযোগ্য হন, তাহলে প্রতিষ্ঠানও সে রকম হবে।
আশার কথা, আমাদের সুপারিশ অনুসারে বিএসইসি পুনর্গঠন হয়েছে, যদিও সেটা করতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। নতুন বিএসইসি প্রথম দিকে অতটা আস্থা নিয়ে কাজ করতে পারেনি। তবে এখন তারা আস্থার সঙ্গে কাজ করছে। এ পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হচ্ছে বিএসইসি, এ সংস্থাটি যদি ঠিকঠাক কাজ না করে, তাহলে মানুষ পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরে পাবে না। ফলে তাদের তরফ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরি।
দেরিতে হলেও বিএসইসি যে দুজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, এটা ভালো লক্ষণ। কারণ, অনিয়মের শাস্তি না হলে তা আরও বাড়ে। তবে এই দুজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়েই যেন বিএসইসির কার্যক্রম থেমে না যায়। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে যদি তারা অভিযুক্ত আরও কয়েকজনকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে পারে, তাহলে সেটা বাজারের জন্য খুবই ইতিবাচক ব্যাপার হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিএসইসির কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, তারা যদি সরকারি দলের অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাঁচিয়ে কেবল অভিযুক্ত বিএনপি ও অন্য দলের লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তবে শেয়ারবাজারের কারসাজিও যেমন বন্ধ হবে না, তেমনি ন্যায়বিচারও নিশ্চিত হবে না। আমরা চাই শেয়ারবাজারের কারসাজির সঙ্গে জড়িত সবার শাস্তি হোক।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: ব্যাংকার, সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

শ্রদ্ধাঞ্জলি- অনন্য মাওলা বখশ চাচা by আসজাদুল কিবরিয়া

আবুল ফয়েজ সালাহ্উদ্দীন আহমদ। পারিবারিকভাবে আমাদের বাবা-চাচাদের মাওলা বখশ ভাইয়া। সেই সুবাদে আমাদের মাওলা বখশ চাচা, কারও মাওলা বখশ মামা। এমন একজন জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছে এই পারিবারিক সূত্রেই। ছোটবেলায় স্কুলের ছাত্রাবস্থায় তাঁকে প্রথম যখন দেখি, তখন তাঁকে সম্যকভাবে উপলব্ধি করার ক্ষমতা ছিল না। আমার পিতার আপন চাচাতো ভাই এবং এই ভাইদের মধ্যে তিনি সবার বড়, এটাই ছিল প্রাথমিক জানাবোঝা।
মাওলা বখশ চাচার খুব কাছাকাছি প্রথম আসি ১৯৮৭ সালে। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা ফখরুদ্দীন আহমদ তখন পররাষ্ট্রসচিব। সম্ভবত ওই সময় সরকারের একটা সিদ্ধান্ত ছিল যে সচিব ও জ্যেষ্ঠ আমলারা নিজ নিজ গ্রাম ও এলাকা পরিদর্শনে যাবেন। তারই অংশ হিসেবে ফখরু চাচা তাঁর আরও কয়েক ভাইকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের আদি নিবাসে যাওয়ার আয়োজন করেন। তিন দিনের সেই সফরে মাওলা বখশ চাচার সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। আরও ছিলেন আমার আব্বার দুই বড় ভাই ফজলে রাব্বি (জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক) এবং বজলে রাব্বি (সাবেক ব্যাংকার) ও তাঁর দুই ছেলে। সম্ভবত সেটাই মাওলা বখশ চাচার নিজ গ্রামে শেষবারের মতো যাওয়া। ফখরুদ্দীন আহমদ আবার বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন ১৯৯১ সালে। তিনি ইন্তেকাল করেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। তাঁদের আরেক ভাই মহিউদ্দীন আহমদ বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী। বাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে।
আদি নিবাসের কথা যখন এল, তখন সালাহ্উদ্দীন আহমদের পূর্বপুরুষের পরিচয়সূত্রটা স্পষ্টভাবে বলা দরকার। নিজে সারা জীবন নির্মোহভাবে কাটিয়েছেন বলেই বোধ হয় এ বিষয়ে তেমন কথা বলেননি। হয়তো ভেবেছিলেন, ব্যক্তির পারিবারিক বংশ-পরিচয়ের চেয়ে সমাজ–জাতির বৃহত্তর পরিচয়টা বেশি তাৎপর্যবাহী। এই ঔদার্যের ফলে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের শুভানুধ্যায়ী, গুণগ্রাহী থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই জানেন না যে তাঁর পিতামহ মৌলভি আহমদ অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান গ্র্যাজুয়েটদের একজন। আহমদের পিতা মুন্সি ফইজুদ্দীন এখন থেকে দেড় শ বছরের বেশি সময় আগে আজকের গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রাম থেকে পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়। উপলব্ধি করেছিলেন, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে পিছিয়েই থাকতে হবে। সে কারণেই পুত্র আহমদকে কলকাতায় পড়ালেখা করিয়েছিলেন।
কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ ও এমএ পাস করে মৌলভি আহমদ হয়েছিলেন ব্রিটিশ রাজের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। অবশ্য তার আগে কিছুকাল শিক্ষকতা ও স্কুল পরিদর্শকের কাজ করেছিলেন। মেদিনীপুর, ফেনী ও ময়মনসিংহে কর্মজীবন কেটেছে। ফেনীতে এসডিও অবস্থায় একটি স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। আর ময়মনসিংহে সম্ভবত এসডিও অথবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকা অবস্থায় অকালমৃত্যু হয় মৌলভি আহমদের। সেটা ১৯১৩ সালে। তাঁর তখন এক কন্যা ও তিন পুত্র। জ্যেষ্ঠ পুত্র আবু আহমেদ ফয়জুল মহীই হলেন সালাহ্উদ্দীন আহমদের বাবা। অন্যদিকে তাঁর মাতামহ বিহারের মতিহারি নিবাসী কাজী আজিজুল হক ছিলেন ফিঙ্গারপ্রিন্টের অন্যতম আবিষ্কারক, যা কিনা শত বছর ধরে অস্বীকৃত ছিল। ঘটনাচক্রে পিতামহ মৌলভি আহমদের মৃত্যুর ১০১ বছর পর এ বছরের ১৯ অক্টোবর তাঁরই জ্যেষ্ঠ পৌত্র সালাহ্উদ্দীন আহমদ চিরবিদায় নিলেন। তিনি জন্মেছিলেন ১৯২২ সালে ফরিদপুরে। তাঁর বাবা-চাচারা তখন ফরিদপুর শহরে বসবাস করতেন। তবে বাঁশবাড়িয়া গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। পরবর্তীকালে চাচার ভাইবোনেরা অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমান।
স্পষ্ট মনে আছে, প্রথম যেদিন বনানীতে মাওলা বখশ চাচার বাসায় গিয়ে সারা দিন তাঁর সঙ্গে কাটালাম, সেদিন তিনি আমার হাতে তাঁর বাঙালির সাধনা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বইটি তুলে দেন। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য এটি আসলেই একটি অসাধারণ গ্রন্থ। ১২টি প্রবন্ধ-নিবন্ধের সংকলন এই বইতে সালাহ্উদ্দীন আহমদ তত্ত্ব-তথ্য ও যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতার একটি চূড়ান্ত রূপ। তার মৃত্যুর পর বাসায় বইটি খুলে দেখলাম তাঁর স্বাক্ষরটি ১৯৯৪ সালের আগস্ট মাসের। অর্থাৎ আজ থেকে ২০ বছর আগে আমি মাওলা বখশ চাচার সান্নিধ্যে আসতে শুরু করি। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেদিন দুপুরে চাচা-চাচির সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করি। চাচি হামিদা খানমের কথাও একটু বলা দরকার। কলকাতার বেথুন কলেজের প্রথম দিককার মুসলমান ছাত্রীদের একজন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৃত্তি নিয়ে ব্রিটিশ আমলেই বিলেত গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার্থে। প্রখর ব্যক্তিত্ববোধসম্পন্ন চাচিও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে গেছেন। সর্বশেষ ছিলেন ঢাকার গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের অধ্যক্ষ। চাচার আগেই চাচি বিদায় নিয়েছেন। সেটা ২০১২ সালে। তাঁর বড় ভাই মরহুম আবদুল আহাদ হলেন বিখ্যাত সুরকার ও রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ।
মাওলা বখশ চাচার সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল মাঝখানে কয়েক বছর। তবে পারিবারিক বিভিন্ন আয়োজনে যেখানেই আমাকে দেখতেন, সস্নেহে কাছে টেনে নিতেন, হাসিমুখে কথা বলতেন নানা বিষয়ে। পড়তে বলতেন বিভিন্ন বইপত্র। আর তাঁর বাসায় গেলে আলাপচারিতায় সব সময়ই বলতেন মুক্তমনে চিন্তা করতে। তিনি প্রবলভাবে বিশ্বাস করতেন ধর্মনিরপেক্ষতায়। শুধু মুখের কথায় নয়, জীবনজুড়ে তিনি ও চাচি এই বিশ্বাসের লালন ও চর্চা করেছেন। ধর্মপরিচয়ের চেয়ে মানুষের পরিচয় তাঁদের কাছে সব সময়ই অগ্রাধিকার পেয়েছে। আর তাই ধর্মানুরাগ বা ধর্মের অনুশাসন যাঁরা অনুসরণ করতেন, কোনো রকম বিরাগের বাইরে থেকে তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রাখতেন। আর স্পষ্টতই ধর্মীয় গোঁড়ামি প্রচণ্ডভাবে অপছন্দ করতেন।
বস্তুত, মাওলা বখশ চাচা আমাদের শিখিয়েছিলেন ও বুঝিয়েছিলেন যে বাঙালির ইতিহাসে ইসলামের যে প্রভাব, তার মধ্যে সমন্বয়বাদী ধারাটিই মানবমুখী ধারা। অর্থাৎ মুসলমান ধর্মাবলম্বী হয়েও মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিলে জীবন যাপন করা, সহিষ্ণুতা ও উদারতার চর্চা করার মাধ্যমেই শত শত বছর ধরে এই ভূখণ্ডে বাঙালি মুসলমানের আলোকিত মানসলোক গড়ে উঠেছে। এর বিপরীতে রক্ষণশীল গোঁড়াপন্থী ধারায় বিশ্বাসী মুসলমানরা বরাবরই গোটা সম্প্রদায়কে পেছনে টেনে রেখেছে, কূপমণ্ডূকতায় নিমজ্জিত হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িকতার শিকলে বেঁধে রাখতে চেয়েছে। মাওলা বখশ চাচা এ বিষয়েও সব সময় আমাদের সতর্ক করেছেন। ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠতায় সচেষ্ট থেকেছেন সব সময়। জগন্নাথ কলেজ থেকে অধ্যাপনা শুরু করে পরবর্তী সময়ে ঢাকা, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের মূল পরিকল্পক তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার ক্যাসেটবন্দী করে তা পরবর্তী সময়ে লিখিত রূপ দেওয়ার একটি কাজে তিনি আমাকেও সম্পৃক্ত করেছিলেন। আমি কয়েকটি ক্যাসেটের শ্রুতিলিখন করেছিলাম।
মাওলা বখশ চাচার সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাৎ এ বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর। ওই তারিখে সন্ধ্যার পর আমরা বেশ কয়েকজন তাঁর বাসায় জড়ো হয়েছিলাম। অনেক খানাদানার আয়োজন ছিল। চাচার দীর্ঘদিনের সহকারী অমল ও শিল্পী যাবতীয় রান্নাবান্না ও আপ্যায়নের সবকিছু করত। অমলের ছেলে আশীষ চাচার আত্মজীবনীর শ্রুতিলিখন করেছে। চাচার শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের সময় এরা তিনজনই পাশে ছিল। এই তিনজন চাচার পরম আত্মীয় বললে অত্যুক্তি হবে না। বিশেষত, অমলকে চেনে না, চাচার এমন কোনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, গুণগ্রাহী বা ছাত্রছাত্রী নেই বললেই চলে।
ওই দিন চাচা বারবার করে সবার খাওয়া ঠিকমতো হয়েছে কি না, তার খোঁজ নিচ্ছেলেন। চলে আসার আগে আমার সহধর্মিণীর মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দেন। আমাদের বৃহত্তর পরিবারের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য যেন এভাবেই সবাইকে আশ্বস্ত করতেন, ভরসা দিতেন। সেই হাতটি চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
আসজাদুল কিবরিয়া: সাংবাদিক।
asjadulk@gmail.com

সরকারের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করা হবে : জামায়াত

সরকারের যে কোনো ষড়যন্ত্র বিনাচ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়া হবে না বলে মন্তব্য করে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর সেক্রেটারি নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেছেন, সরকারের দেশবিরোধী সব ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে মোকাবেলা করা হবে। আজ শুক্রবার সকালে ঢাকা মহানগর জামায়াত আয়োজিত এক দোয়া মাহফিলে তিনি একথা বলেন।

বুলবুল বলেন, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। সরকারের প্রতিহিংসার  কারণেই সাবেক আমিরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযম কারাগারেই ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু বরেণ্য এসব জাতীয় নেতাদের সাথে সরকারের ন্যাক্কারজনক আচরণ সচেতন জনতা বিনাচ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবে না।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি মোবারক হোসাইন, কর্মপরিষদ সদস্য আব্দুর রহমান মুসা ও লস্কর মোহাম্মদ তসলিম, জামায়াত নেতা আব্দুস সালাম, মাহফুজুর রহমান, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, সোলাইমান হোসেন, মিজানুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান প্রমূখ।

দিনে শিক্ষক, রাতে চোর

দিনের আলোতে  প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতেন এবং রাতের অন্ধকারে চুরি করার উদ্দেশে বেরিয়ে যেতেন ভ্যানিসা। ৩২ বছর বয়সি স্কটল্যান্ডের এই স্কুল শিক্ষিকা হেরোইন সেবনের খরচ যোগানোর জন্য চুরির পথ বেছে নিয়েছিলেন বলে জানায় ডেইলি মেইল।

তিনি স্কটল্যান্ডের মিথিলহিল প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তবে চুরির অভিযোগ এনে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে স্কটল্যান্ডের জেনারেল টিচিং কাউন্সিল।
ভ্যানিসা নেশার খরচ যোগানোর জন্য অন্যের ঘরের দরজা ভেঙে নগদ টাকা চুরি করেন। এ ছাড়া ২০১২ সালে গ্যারেজ থেকে পেট্রোল চুরি করার অভিযোগও আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
অবশ্য চেষ্টার পর তার হেরোইন আসত্তি ছুটে গেছে বলে জানিয়েছেন স্বয়ং ভ্যানিসা। এখন তিনি তার দাদির সাথে বসবাস করছেন।
ভ্যানিসা বলেন, আমি হেরোইনের নেশা ছাড়ার উদ্দেশে দাদির কাছে চলে আসি। প্রথমে দাদিকে জানাই আমি ভালো হতে চাই। তিনি আমাকে আশ্রয় দেন। এতে দিন দিন আমিও সুস্থ হয়ে উঠি।

মহররম ও আশুরা by মুসলিহুদ্দীন আহমাদ রূমী

মহররম মাস, ইসলামি বছর শুরু হয় এই মাস দ্বারা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে চারটি মাসকে বিশেষভাবে সম্মান দান করেছেন মহররম মাস তার অন্যতম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তার মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এতে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না’ (সূরা তাওবা : ৩৬)।

ওপরে উল্লিখিত আয়াতে সম্মানিত মাসগুলো কী তা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিস শরিফে বলে দিয়েছেন। সেগুলো হচ্ছে জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব (সহিহ বুখারি, দ্বিতীয় খণ্ড, ৬৭২)।
মহররম শব্দের অর্থ হচ্ছে যাকে ‘হুরমত’ প্রদান করা হয়েছে। আরবি ভাষায় হুরমত বলা হয় সম্মান, মর্যাদা, মাহাত্ম ও পবিত্রতাকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই মাসকে বিশেষ সম্মান দান করেছেন।
হজরত ইবরাহিম আ:-এর শরিয়তেও অন্যান্য নবীগণের মতো এই মাসগুলোর সম্মান-মর্যাদা স্বীকৃত ছিল এবং এগুলোতে জায়েজ উদ্দেশ্যও যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম ছিল। মক্কার মুশরিকরা নিজেদের হজরত ইবরাহিম আলাইহিসসালামের অনুসারী দাবি করত, এবং তাদের মধ্যে হজরত ইবরাহিম আ:-এর অনেক কথার প্রচলন ছিল। যদিও বাস্তবতা ছিল এর ভিন্ন, যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের এই অসার দাবি খণ্ডন করেছেন এই বলে, ‘তিনি (হজরত ইবরাহিম আ:) মুশরিক ছিলেন না’ (সূরা বাকারা : ১৩৫)।
তথাপি তারা এই মাসগুলোকে সম্মান করত এবং যুদ্ববিগ্রহকে হারাম মনে করত। তাই কুরআনে কারিমে হুকুম করা হয়েছে এই মাসগুলোকে সম্মান করতে। আর এগুলোর মধ্যে মহররম মাস অন্যতম।
হাদিস শরিফে নবী করিম সা: মহররমের দশ তারিখে রোজা রাখার আদেশ দিয়েছেন। শুরুতে যখন রমজানের রোজা ফরজ ছিল না তখন আশুরার রোজা ফরজ ছিল। পরে যখন রমজানের রোজা ফরজ হয় তখন আশুরার রোজা ফরজ থাকেনি (সুনানে আবু দাউদ : ২৪৪৪)।
তবে এই রোজা অনেক ফজিলতপূর্ণ এবং এর মহা সাওয়াবের কথা নবী করিম সা: হাদিস শরিফে ব্যক্ত করেছেন। নবী করিম সা: ইরশাদ করেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে মহররম মাসের রোজা’ (মুসলিম শরীফ)।
হজরত ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সা:- কে আশুরার দিন এবং রমজান মাসে যেরূপ যতেœর সাথে রোজা রাখতে দেখেছি, অন্য কোনো সময় দেখিনি’ (বুখারি, মুসলিম)।
হজরত আবু কাতাদাহ আল-আনসারী রা: থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা: আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইরশাদ করেন, এই রোজার দ্বারা বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ হয় (ইবনে মাজাহ, মুসলিম শরীফ)।
ওপরে উল্লিখিত আয়াত ও হাদিসগুলো দ্বারা এই মাসে, বিশেষভাবে আশুরার দিনে যা করণীয় ও বর্জনীয় সাব্যস্ত হয়, সেগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো।
করনীয় কাজগুলো : আগেই উল্লেখ হয়েছে, রমজান মাসের পর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ রোজা হচ্ছে মহররম মাসের রোজা, তাই সাধ্য অনুযায়ী পুরো মহররম মাসজুড়ে বেশি বেশি রোজা রাখতে সচেষ্ট হতে হবে। বিশেষভাবে আশুরা দিবসের রোজা রাখা। এর অনেক ফজিলত ও গুরুত্ব এসেছে হাদিস শরিফে। এর দ্বারা বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
আগেই উল্লেখ হয়েছে যে, আশুরার রোজা একসময় ফরজ ছিল, পরে যখন রমজানের রোজা ফরজ হয় তখন এই রোজা রাখা আর ফরজ থাকেনি। তবে যেহেতু এই দিন ইহুদিরাও রোজা রাখে, তাই নবী করিম সা: ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা এর সাথে আগে বা পরে একটি রোজা মিলিয়ে রাখো যেন ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য না হয়।’ তাই ওলামায়ে কিরাম বলেন, আশুরার সাথে আগে অথবা পরে অর্থাৎ ৯-১০ বা ১০-১১ তারিখে একসাথে দু’টি রোজা রাখা উত্তম।
এ দিনে আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী উম্মতের তওবা কবুল করেছেন এবং এ উম্মতকেও ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি হাদিস শরিফে এসেছে। তাই এ দিনে আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি ইসতেগফার করা এবং খালেস দিলে তওবা করা।
বর্জনীয় কাজগুলো : যে আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন যে, চারটি মাস সম্মানিত, সে আয়াতেরই শেষ অংশে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘অতএব তোমরা এই মাসগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম কোরো না’ (সূরা তাওবা : ৩৬)।
বাহ্যিক অর্থ হচ্ছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে জান আমাদের দান করেছেন এটার হিফাজত করা। একে কষ্ট না দেয়া, অকারণে একে বিপদে না ফেলা। সব ক্ষতিকারক জিনিস থেকে এর হিফাজত করা। তাই এই মাসে অনেকে হজরত হুসাইন রা:-এর শাহাদতের ওপর শোকের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ যে বুক চাপড়ায়, নিজের শরীরকে জখম করে, রক্তাক্ত করে, কুরআন মজিদ এই কাজকে কঠিনভাবে নিষেধ করছে।
নিজের জানকে কষ্টে ফেলে শোক প্রকাশ করার ওপর  হাদিস শরীফেও কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘ওই ব্যক্তি আমাদের (মুসলমানদের) দলভুক্ত নয় যে তার গাল চাপড়ায়, জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং জামানায় জাহিলিয়াতের মতো ক্রন্দন করে (শোক প্রকাশ করে)’ (সহিহ বুখারি, কিতাবুল জানায়েজ)।
আজকাল আশুরা উপলক্ষে যে মাতম করা হয়, ইসলাম তার অনুমতি দেয় না, এবং যার শাহাদতে শোক প্রকাশ করা হয়ে থাকে, তিনি নিজেও এরূপ করতে পরিষ্কারভাকে বারণ করে গেছেন।
এই মাসে নেক আমলের যেমন বিশাল সওয়াব রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে এ দিনগুলোয় গুনাহেরও ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে। তাই এমন কোনো কাজে লিপ্ত না হওয়া একান্ত কাম্য যার দ্বারা এ মাসের পবিত্রতা নষ্ট হয় অথবা এর মর্যাদাহানি হয়।
আমাদের সমাজে অনেকের একটা ভুল ধারণা রয়েছে, অনেকে মনে করেন, আশুরা বা দশই মহররমের ফজিলত এই জন্য যে, এই দিনে নবী দৌহিত্র হজরত হুসাইন রা: কারবালার ময়দানে শাহাদতবরণ করেছেন। অথচ এই মাসের, বিশেষ করে আশুরার ফজিলত নবী করিম সা:-এর দুনিয়াতে আগমনের আগে থেকেই সাব্যস্ত। যেহেতু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের হুকুম ছিল, তাই সব নবী আ:-এর ফজিলতের কথা উম্মতকে জানিয়ে গিয়েছেন। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ সা: ও এটাকে আল্লাহর হুকুমে অবশিষ্ট রেখেছেন। যখন তিনি এর ফজিলত উম্মতের সামনে পেশ করেন, তখন হজরত হুসাইন রা: ছিলেন শিশু। আর বাস্তবতাও হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আর তা হচ্ছে হজরত হুসাইন রা:-এর ফজিলত ও মহত্ত্বের বহিঃপ্রকাশের উদ্দেশ্যেই হয়তো আল্লাহ তায়ালা তাঁর শাহাদতের জন্য এই মহান দিনকে বেঁছে নিয়েছেন, যার ফজিলত পূর্ববর্তী আম্বিয়া আলাইহিমুসসালামের যুগ থেকে স্বীকৃত।
আমাদের সমাজে একটা প্রথা প্রচলিত রয়েছে, আর তা হচ্ছে এই দিনে অন্যান্য দিনের তুলনায় ঘরে ভালো রান্না করা। আর পেছনে বিভিন্ন ফজিলতও বর্ণনা করা হয়। যদিও কেউ কেউ এ বিষয়ক রেওয়াত এনেছেন, যেমন বাইহাকি ও ইবনে হিব্বান প্রমুখ; কিন্তু তা কোনো সূত্র দ্বারা সমর্থিত নয়।
লেখক : প্রবন্ধকার

আশুরার আমল by মাওলানা জিয়াউল আশরাফ

ইসলামী বর্ষপঞ্জি মতে, মহররম মাস হলো আরবি সনের প্রথম মাস। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে চারটি মাস সব মাসের চেয়ে ফজিলতপূর্ণ ও সম্মানিত। আর তা আল কুরআনের আয়াতে কারিমা দ্বারা প্রমাণিত। মহররম সেই চারটি মাসের মধ্যে অন্যতম মাস। অন্য তিনটি হলোÑ জিলকদ, জিলহজ ও রজব।আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, আল্লাহ তায়ালা আসমান-জমিন সৃষ্টি করার দিন থেকেই মাসের সংখ্যা ও বার নির্ধারণ করে রেখেছেন। তন্মধ্যে চারটি মাস অধিক সম্মানিত। সুতরাং তোমরা এই সম্মানিত মাসগুলোর মধ্যে (ঝগড়াবিবাদ ও খুনখারাবি করে) নিজেদের ওপর জুলুম করো না। ওপরের আয়াতে এ কথা প্রমাণিত যে, মহররম মাসটি অত্যন্ত ফজিলত ও বরকতপূর্ণ মাসগুলোর অন্যতম। মহররম মাসের সম্মানের বিষয়ে রাসূল সা: বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর মাস মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কেননা যে ব্যক্তি মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত দান করে সম্মানিত করবেন আল্লাহ তায়ালা’ (মুসলিম ইবনে মাজা)। অপর হাদিসে রাসূল সা: এরশাদ করেন, ‘রমজানের রোজার পরই আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রিয় হলো মহররম মাসের রোজা’ (মুসলিম)।
অপর হাদিসে রাসূলে করিম সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি মহররমের প্রথম দশ দিন রোজা রাখে, সে যেন দশ হাজার বছর যাবৎ দিনে রোজা রাখল এবং রাতে ইবাদত করল’ (বায়হাকি)। মহররম মাসের সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো ইয়াওমুল আশুরা তথা মহররমের দশ তারিখের রোজা। তবে যেহেতু ইহুদিরাও দশ তারিখের রোজা রাখে, তাই রাসূল সা: দশ তারিখের রোজার সাথে মিলিয়ে আরো একটি, অর্থাৎ মোট দু’টি রোজা রাখার কথা বলেছেন। নিঃসন্দেহে এই রোজা অনেক ফজিলতপূর্ণ, যা একাধিক হাদিস ও বুজুর্গানে দ্বীনের আমল দ্বারা প্রমাণিত। তবুও আমাদের মনে রাখতে হবে, এই রোজা ফরজ নয়। তাই যার যার ইচ্ছানুযায়ী এই দিনে রোজা রাখতে পারেন। না রাখলে কোনো গুনাহ হবে না। আজকের সমাজে অনেকে এই রোজা না রাখাকে মহাপাপ মনে করেন, যা চরম অজ্ঞতার পরিচায়ক। মহররম মাস যেহেতু পবিত্র ও সম্মানিত, তাই এ মাসে সামর্থ্য অনুসারে দান-খয়রাত, নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াতেরও বিশেষ ফজিলত রয়েছে। তাই এই মাসে এবাদতের প্রতি বিশেষভাবে মনোনিবেশ করা দরকার।
মহররম মাসে বিদআত : মহররম মাস আনন্দের মাস, আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করার মাস। নতুন বছরের শুরুর মাসেই নিজেকে সংশোধন ও সত্যের আলোয় রাঙানোর মাস। এখানে বিদআত তথা অতিরঞ্জিত কোনো কিছুর স্থান নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলোÑ আশুরাকে কেন্দ্র করে কিছু ভ্রান্ত মতবাদ সমাজে চালু আছে। যেমন তাজিয়া তৈরি, হোসাইন রা:-কে স্মরণ করার নামে মাতম করা অথবা অতি আনন্দে আলোকসজ্জা বা পটকা ফুটানো ইত্যাদি। এগুলো ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। ইসলামের মতো সত্য ও সুন্দর ধর্মে এসব ভণ্ডামির কোনো আশ্রয় নেই। মহররম মাসে আমাদের উচিত সর্বপ্রকার কুসংস্কার ও বিদআত থেকে মুক্ত হয়ে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এ মাসকে যথাযথ সম্মান করা এবং বেশি বেশি এবাদত করা।
লেখক : পরিচালক, মাদরাসা হাদিউল
উম্মাহ ইন্টারন্যাশনাল

কারবালার বিশ্বাসঘাতকেরা by রুমানা আক্তার রুমা

কারবালার যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসের হাজারো করুণ ও হৃদয়বিদারক ঘটনার একটি। ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার ময়দানে হজরত হুসাইন রা: ও ইয়াজিদ বাহিনীর মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই ঘটনার নেপথ্যে যারা কাজ করছে তারা ইতিহাসের পাতায় ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। হজরত হুসাইন রা: ও তার পরিবারবর্গের শাহাদতের পরপরই ওই সব নেপথ্য নায়কদের করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে।

১. ইয়াজিদ : ইয়াজিদের কারণেই কারবালা প্রান্তরে হজরত হুসাইনকে শহীদ করা হয়। কারবালা যুদ্ধের পর মুসলিম দুনিয়ায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। বিশেষ করে মক্কা-মদিনার অধিবাসীরা এমন বিয়োগান্ত ঘটনার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে লাগল। ইতোমধ্যে ইয়াজিদ বাহিনী মক্কা-মদিনা আক্রমণ করে বহুসংখ্যক লোককে শহীদ করল। এমনকি ইয়াজিদের বাহিনী পবিত্র কাবা শরিফে অগ্নিসংযোগ করে। যেদিন কাবা শরিফে আগুন দেয়া হয়েছিল সেদিন ইয়াজিদ এক অজ্ঞাত রোগে দামেস্কে মারা যায়। তার অনুসারীরা রাতের আঁধারে অজ্ঞাত স্থানে তাকে কবর দেয়। আজ পর্যন্ত কেউ ইয়াজিদের কবরের সন্ধান পায়নি। ইয়াজিদের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাবিয়া আসগরের হাতে লোকেরা বাইয়াত গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করল। কিন্তু সে তাতে রাজি হয়নি। এরপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ৪০ দিন পর মারা যায়।
মুখতার সকফির যথার্থ প্রতিশোধ গ্রহণ : ইয়াজিদের মৃত্যুর কিছু দিন পর মারওয়ান ক্ষমতা দখল করে। তখন মক্কা-মদিনা ও কুফাসহ সমগ্র আরব বিশ্বে বিদ্রোহ চরম আকারে দেখা দিলো। কুফাবাসী বেশি অনুতপ্ত ছিল। কেননা তাদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটল। তারা ভাবল, কিভাবে এর প্রায়শ্চিত্ত করা যায়। কুফার গভর্নর ইবনে জিয়াদ পালিয়ে দামেস্কে চলে যায়। মুখতার সকফি কুফায় গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুখতার সকফি ইমাম হুসাইনের শাহাদতের বদলা নেয়ার জন্য ডাক দিলেন। সাথে সাথে সমগ্র কুফাবাসী তার আহ্বানে সাড়া দিলো। শুরু হলো প্রতিশোধ নেয়ার পালা।
১. আমর বিন সাদ ও তার ছেলে : সর্বপ্রথম সেই নরাধম, পাপিষ্ঠ আমর বিন সাদকে তলব করা হলো, যে ইয়াজিদের বর্বর বাহিনীর সেনাপতি ছিল এবং তারই পরিচালনায় কারবালায় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তার ছেলে এসে বলল, আমার পিতা এখন সব কিছু ত্যাগ করে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছে। সে ঘর থেকে বের হয় না। সকফি কোনো অজুহাত গ্রহণ করলেন না। তারপর তাকে ধরে এনে পিতা-পুত্রের মাথা কেটে মদিনা শরিফে মুহাম্মাদ বিন হানফিয়া রা:-এর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
২. হাওলা বিন ইয়াজিদ : হাওলা বিন ইয়াজিদ ইমাম হুসাইনের মস্তক দেহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে তার নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। তাকে ধরে এনে হাত-পা কেটে শূলে চড়ানো হলো। তার লাশ জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল।
৩. সিমার : এই সিমার ইমাম হুসাইনের গলায় ছুরি চালিয়েছিল। মুখতার সকফি যখন ইমাম হুসাইন রা:-এর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারী একেকজনকে হত্যা করছিলেন তখন পাপিষ্ঠ সিমার কুফা থেকে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। এ পাপিষ্ঠের শেষ রক্ষা হয়নি। সে মুখতার সকফির বাহিনীর হাতে ধরা পড়ল। তারা তাকে দুই টুকরা করে মুখতার সকফির কাছে পাঠিয়ে দেয় এবং লাশ কুকুরকে দেয়া হয়।
৪. হাকিম বিন তোফায়েল : এই নরাধম, যে হজরত আব্বাস রা:-এর শরীর থেকে পোশাক খুলে নিয়েছিল এবং ইমাম হুসাইনের প্রতি তীর নিক্ষেপ করেছিল, তাকেও হত্যা করা হয়েছিল এবং তার মাথা বর্শার অগ্রভাগে উঠিয়ে মুখতার সকফির সামনে আনা হয়েছিল।
৫. জায়েদ বিন রেকাত : এই জালিম, যে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে আকিল রা:-এর কপালে তীর নিক্ষেপ করেছিল। তাকে ধরে এনে জীবিত জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল।
৬. উমর বিন সবি : এই লোক হজরত ইমাম হুসাইন রা:-এর সাথীদেরকে তীর নিক্ষেপ করে আহত করেছিল। তাকে ধরে তীরের আঘাতে হত্যা করা হয়েছিল।
৭. আমর বিন সবি : এই আমর বিন সবি, যে গর্ব করে বলে বেড়াত, ‘আমি হুসাইনের কোনো সাহাবিকে হত্যা করার সুযোগ পাইনি বটে, কিন্তু তীর নিক্ষেপ করে অনেককে জখম করতে সক্ষম হয়েছিলাম। একে ধরে সবার সামনে বর্শার আঘাতে হত্যা করা হয়েছিল।
৮. নরাধম ইবনে জিয়াদের করুণ পরিণতি : ইয়াজিদের পর এই নরাধম ইবনে জিয়াদ সবচেয়ে জঘন্য অপরাধী। কারবালার ঘটনার সময় এই ব্যক্তি কুফার গভর্নর ছিল। মুখতার সকফি এই নরাধমকে হত্যা না করা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। তিনি ইব্রাহিম বিন মালেক আলতাবের নেতৃত্বে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী ইবনে জিয়াদকে পরাস্ত করার জন্য প্রেরণ করেন। মুসল শহরের কাছে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। এ যুদ্ধে ইবনে জিয়াদের বাহিনীর পরাজয় ঘটে। ইবনে জিয়াদ পলায়নকালে ইব্রাহিম মালেকের সৈন্যবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। ইব্রাহিম মালেকের সৈন্যরা ইবনে জিয়াদের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। দেহ আগুনে পুড়িয়ে দেয়। মাথা বর্শার অগ্রভাগে তুলে কুফায় নিয়ে আসে। তখন সকফি কুফাবাসীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আজ থেকে ছয় বছর আগে এই দিনেই এই জায়গায়, এই জালিমের সামনে ইমাম হুসাইন রা:-এর মস্তক রাখা হয়েছিল। আজ আমার সামনে সেই জালিমের মাথা রাখা হয়েছে।’ এই সময় হঠাৎ একটি সাপ এসে ইবনে জিয়াদের নাকের ভেতর দিয়ে মস্তকে প্রবেশ করে বের হয়ে গেল। এই রূপ তিনবার করে সাপটি অদৃশ্য হয়ে গেল। এভাবে মুখতার সকফি কারবালার শহীদদের পবিত্র রক্তের যথাযথ বদলা নিয়েছিলেন।
লেখক : প্রবন্ধকার

হিজরি সনের প্রচলন ও তাৎপর্য by নইম কাদের

হিজরি সন সরাসরি চাঁদের সাথে সম্পর্কিত বিধায় এটাকে চন্দ্রবর্ষও বলা হয়। চাঁদ দেখা এবং চাঁদের তারিখের সাথে হিসাব মিলিয়ে ইসলামের অনেক মৌলিক বিধান পালন করা মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক বিধায় হিজরি সন মুসলমানদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। এ কারণে সাধারণভাবে হিজরি সন ইসলামী সন নামেও পরিচিত। হিজরি শব্দটি হিজরত থেকে এসেছে। এর মূল শব্দ ‘হাজরা’ অর্থ পরিত্যাগ করা, সম্পর্কচ্ছেদ করা, বর্জন করা, স্বদেশ ত্যাগ করা ইত্যাদি। তবে ইসলামী জীবনব্যবস্থায় হিজরত এক বিশেষ পরিভাষার নাম। আল্লাহ সুবহানুহু তায়ালা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে ও বিশেষ নির্দেশনা পেয়ে আল্লাহর সর্বশেষ পয়গাম্বর হজরত মুহাম্মদ সা: ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে প্রিয় জন্মভূমি মক্কা পরিত্যাগ করে মদিনায় চলে যান। ইসলামের ইতিহাসে এটাই হিজরত নামে পরিচিত। হজরতের মদিনায় হিজরত ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। হজরত সা: নববী ত্রয়োদশ সালে, রবিউল আউয়ালের শুরু অথবা সফর মাসের শেষ দিন সোমবার মক্কা ত্যাগ করেন। এ সময় হজরতের বয়স ছিল ৫৩ বছর।
হজরত মুহাম্মদ সা: এবং প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর রা:-এর শাসনকালে মুসলিম সমাজে হিজরি সন গণনা এবং সরকারি নথিপত্রে হিজরি সন-তারিখ ব্যবহারের প্রচলন ছিল না। তবে প্রাক-ইসলামী যুগ থেকে কিছু বিখ্যাত ঘটনাকে কেন্দ্র করে সন গণনার প্রথা প্রচলিত ছিল। যেমন পাপিষ্ঠ বাদশাহ আবরাহা কর্তৃক পবিত্র কাবাঘর ধ্বংসের জন্য আগমনের সালকে ‘হাতির বছর’ হিসেবে গণনা করা হতো। মুসলমানদের মাঝেও এ রকম কিছু সন গণনার প্রচলন ছিল। যেমন আল্লাহর রাসূল সা:-এর চাচা আবু তালিব ও উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজাতুল কোবরা রা:-এর ইন্তেকালের বছর ‘পেরেশানির বছর’, হিজরতের বছর ‘অনমুতির বছর’, হিজরতের দ্বিতীয় বছর ‘যুদ্ধের আদেশের বছর’ ইত্যাদি আরো কিছু সন গণনা করা হতো। তবে একটি স্বতন্ত্র কোনো ইসলামী ক্যালেন্ডার ছিল না।
হিজরি সন আনুষ্ঠানিকভাবে গণনা শুরু হয় হিজরতের ১৭ বছর পর, হজরত ওমর রা:-এর সময়ে, তার খিলাফতের চতুর্থ বছরে। অপর এক মত অনুযায়ী সর্বপ্রথম হিজরি সন গণনার প্রচলন করেন প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর রা: কর্তৃক নিযুক্ত ইয়েমেনের শাসনকর্তা হজরত ইয়ালা ইবনে উমাইয়া রা:। তবে এই মতটি খুবই দুর্বল। তা ছাড়া যুক্তিও এ মতকে পুরোপুরি গ্রহণ করে না। হজরত ইয়ালা ইবনে উমাইয়া রা: ছিলেন হজরত আবু বকর রা: কর্তৃক নিযুক্ত একটি প্রদেশের শাসনকর্তা। হজরত আবু বকর রা: কর্তৃক হিজরি সন গণনার কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না। খলিফা কর্তৃক নিযুক্ত একজন প্রাদেশিক শাসনকর্তা খলিফার অগোচরে এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন তা হতে পারে না। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রা: কর্তৃক তারই খেলাফতকালে সর্বপ্রথম হিজরি সন গণনা শুরু হয়। এটাই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত।
হিজরি সন গণনা শুরু হয় যেভাবে : স্বতন্ত্র ইসলামী সন গণনা বিষয়ে সর্বপ্রথম হজরত ওমর রা: সিদ্ধান্ত নেন। হজরত ওমর রা:-এর শাসনামলে ইসলামী সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। রাষ্ট্র পরিচলনা, কর, খাজনা, জাকাত আদায়, সরকারি চিঠিপত্র আদান-প্রদান ইত্যাদিতে সন-তারিখের উল্লেখ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অপর এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, এ সময় প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআ’রি রা: খলিফার কাছে এক চিঠিতে খলিফার পক্ষ থেকে প্রেরিত সরকারি চিঠিপত্রে সন-তারিখ উল্লেখ না থাকায় এর বিভিন্ন অসুবিধার কথা জানান। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে খলিফা সবার সাথে আলোচনা করেন এবং একটি আলাদা ইসলামী ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাব রা: ইসলামী সনের শুরু কী হবে, ইসলামী সনের প্রথম বছর কোন জায়গা থেকে আরম্ভ করা হবে তা নিয়ে বিভিন্ন জনের সাথে পরামর্শ করলেন। কারো পরামর্শ ছিল ইসলামী ক্যালেন্ডার শুরু করা হোক প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জন্মের তারিখ থেকে। আবার কেউ পরামর্শ দিলেন হজরতের ইন্তেকাল থেকেই ইসলামী ক্যালেন্ডার শুরু করার জন্য। হজরত আলী রা: ইসলামী ক্যালেন্ডার শুরুর পরামর্শ দিলেন হজরতের মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের তারিখ থেকে। অনেক আলোচনা পর্যালোচনার পর হজরত আলী রা:-এর পরামর্শই গৃহীত হয়। এরপর আবার প্রশ্ন সৃষ্টি হয়, কোন মাস থেকে ইসলামী ক্যালেন্ডার গণনা শুরু হবে? অর্থাৎ হিজরি সনের প্রথম মাস হবে কোনটি? এ প্রশ্নেও বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকম পরামর্শ দেন। কারো পরামর্শ ছিল রজব মাস হোক ইসলামী সন গণনার প্রথম মাস। তাদের যুক্তি ছিল প্রাক-ইসলামী যুগেও রজব মাসকে সবাই পবিত্র মাস হিসেবে মানত। আবার কেউ পরামর্শ দিলেন রমজান মাস দিয়ে ইসলামী ক্যালেন্ডার শুরু করতে। কারণ মাহে রমজান মুসলমানদের কাছে পবিত্র মাস। পবিত্র হজের মাস হিসেবে জিলহজ মাসকে ইসলামী ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস গণনার পরামর্শ ছিল কারো কারো। কিন্তু হজরত ওসমান রা: পরামর্শ দিলেন মহররম মাস দিয়েই ইসলামী সন গণনার। তার যুক্তি ছিল সমগ্র আরব অঞ্চলে নুতন সন গণনা শুরু হয় মহররম মাস দিয়েই। সুতরাং নতুন ইসলামী ক্যালেন্ডারও মহররম মাস দিয়ে শুরু করা হোক। অবশেষে হজরত ওসমান রা:-এর পরামর্শই গৃহীত হয়। বাকি মাসগুলো আরব অঞ্চলে প্রচলিত আগের নিয়ম মতোই রাখা হলো। ইসলামী ক্যালেন্ডারের নামকরণ হয় হিজরি সন।
হজরত মুহাম্মদ সা: নববী ত্রয়োদশ সাল, বরিউল আউয়ালের শুরু অথবা সফর মাসের শেষ দিন সোমবার মদিনার উদ্দেশে মক্কা ত্যাগ করেন। বেশির ভাগ ঐতিহাসিকের বর্ণনা মতে ৮ রবিউল আউয়াল, কারো কারো মতে ১২ রবিউল আউয়াল, নববী ১৩ সাল, মোতাবেক ২০ সেপ্টেম্বর, ৬২২ সাল তিনি মদিনায় পৌঁছেন। হিজরতের এ হিসাব অনুযায়ী হিজরি সন গণনা দুই মাস আট দিন বা ১২ দিন পিছিয়ে নিয়ে ১ মহররম থেকে শুরু করা হয়েছে।
মুসলমানদের প্রাত্যহিক জীবনে হিজরি সন গণনার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মুসলমান সন তারিখ হিসাবের জন্য যেকোনো ক্যালেন্ডার ব্যবহার করতে পারেন, ইসলামী শরিয়ায় তাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু তা হাদিসের ওপর আমল হবে না। হাদিসের ওপর আমল হবে যদি তা হিজরি সন হয়। হিজরি সন হচ্ছে ইসলামী ঐতিহ্য। যে ঐতিহ্যের সাথে সরাসরি সম্পর্ক আল্লাহর রাসূল সা: এবং সাহাবায়ে কেরামদের। হাদিসে বর্ণিত আছে যে, একদা আল্লাহর রাসূল সা:-কে প্রশ্ন করা হলো তিনি কী কারণে সোমবারকে বিশেষভাবে পালন করেন? উত্তরে তিনি ইরশাদ করলেন, ‘ওই দিন আমি জন্মগ্রহণ করি, ওই দিন আমি নুবুওয়াত লাভ করি এবং ওই দিন আমি স্বদেশ পরিত্যাগ করে মদিনাভিমুখে যাত্রা করি।’
একসময় মুসলমানদের দৈনন্দিন কাজে সন তারিখ গণনায় হিজরি সন ব্যবহার করা হতো। এমনকি বিয়ের তারিখ লেখায় প্রথমেই হিজরি সনের উল্লেখ থাকত, তারপর থাকত বাংলা ও ইংরেজি। বর্তমানে তা কমে গেছে। এটাকে কোনো মতেই আধুনিকতা বলা যাবে না। বরং নিজ ধর্ম ও ঐতিহ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় এটাকে হীনম্মন্যতা বলা চলে। আফসোসের বিষয় হচ্ছে, ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও হিজরি সন গণনার রেওয়াজ উঠে গেছে। এমনকি সরকারি মাদরাসাগুলোতেও হিজরি সনের প্রচলন নেই। অবশ্য কওমি মাদরাসাগুলো এখনো ইসলামের এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। হাদিসের ওপর আমল এবং মুসলিম জাতিসত্তা হিসেবে নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ ও সংরক্ষণ করার জন্য আমাদের উচিত দৈনন্দিন হিসাবে হিজরি সন, অর্থাৎ ইসলামী ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক

আমাদের গায়কপাখি আব্বাসউদ্দীন by ড. নাসের হোসেন

ভারতের অনগ্রসর সমাজের মানুষ, বিশেষ করে শ্রমিক, মাঝি, গাড়োয়ান, মজুরদের সামনে যখন বিনোদনের কোনো প্রশস্ত পরিসর ধরা দেয়নি, সেই প্রত্যুষে গানের পাখি হয়ে আনন্দ ও বিনোদনের ডালি হাতে নিয়ে হাজির হয়েছেন বাঙালির প্রাণের শিল্পী আব্বাসউদ্দীন (জন্ম ২৭ অক্টোবর ১৯০১; মৃত্যু ৩০ ডিসেম্বর ১৯৫৯)। আর কেবল শ্রমিক-মাঝিসহ বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া সামাজিক সম্প্রদায়ের কথাই বা বলি কেন- বাঙালি মুসলমান সমাজ যখন গানবাজনাকে সংস্কৃতির উপাদান বা বাহন হিসেবে ভাবতে ও গ্রহণ করতে ঠিক অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি, তখন এক প্রতিকূল পরিবেশে সঙ্গীতের সুন্দর সাধনা ও প্রয়োজনীয় প্রচারণার প্রাথমিক ধাপটি ব্যক্তিগত ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় নির্মাণ করেছিলেন আব্বাসউদ্দীন। সমাজে প্রচলিত ধারণা ও বিশ্বাসের বিপরীতে মানবিক এবং বৈশ্বিক অনুপ্রেরণা জাগরণ প্রতিষ্ঠা ছিল সাধনার মূল বিষয়। সমাজ-রূপান্তরের আধুনিক ও প্রাগ্রসর এই রূপকার কাজ করেছেন নিবিড় নিষ্ঠা আর প্রাতিস্বিক ভাবনাবলয়ের আভিজাত্যে। মানুষের সরল জিজ্ঞাসার জায়গাটিতে সমাধানের সোনালি ও সম্ভবপর সব প্রলেপ লাগানোর সফল কারিগর এই সঙ্গীতসাধক। তিনি সঙ্গীত প্রচারক ও প্রসারকও বটে।

বাংলা গানের অভিভাবকসম ব্যক্তিত্ব তিনি; বাংলার লোকসঙ্গীত-সংসারের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। আদিনিবাস ভারতের কোচবিহারের তুফানগঞ্জ এলাকায়। পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন জোতদার এবং পেশায় অ্যাডভোকেট। পারিবারিক আবহে, স্বাভাবিকভাবেই, তিনি সামাজিক সঙ্কট ও বিভ্রান্তি অবলোকনের সুযোগ পেয়েছেন। তার মানস গড়ে উঠেছিল সমাজ-রূপান্তরের সমাগত পরিপ্রেক্ষিতের ভেতর দিয়ে। এই স্বভাবশিল্পী তার চার পাশের জীবনাচার, মানুষের প্রাণের তাগিদ, সমাজের গতি ও প্রগতির দিকে প্রসারিত রেখেছিলেন নিজের সাবধানী ও অনুসন্ধানী দৃষ্টি। শৈশব থেকেই আব্বাসউদ্দীন গানের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলেন সরল ও স্বাভাবিক প্রাণময়তায়। অদ্ভুত সুন্দর ছিল তার কণ্ঠ; দারুণ আকর্ষণীয় ছিল গানের গলা। গান আয়ত্ত করার বা মনে রাখার ক্ষমতাও ছিল অবিশ্বাস্য রকম; যেকোনো গান দু-একবার শুনেই অবিকল সুরে গাইতে পারতেন তিনি।
অবিভক্ত ভারতে ও পরবর্তীকালের পাকিস্তানে সঙ্গীতসাধক ও প্রচার-প্রসারক হিসেবে তিনি সবিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণেই তিনি সমকালে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। এবং উত্তরকালেও নিজের প্রভাব ও অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন কেবল শৈল্পিক সাফল্যের ওপর ভর করে। এই সাধক সঙ্গীতশিল্পী কখনো কোনো শিক্ষকের বা গুরুর কাছে শিক্ষা বা তালিম নেননি।
নিজের প্রচেষ্টায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে নিখুঁতভাবে গান গাওয়ার রীতি ও কৌশলাদি আয়ত্ত করেছেন মেধা আর কণ্ঠের কারুকাজকে কাজে লাগিয়ে। সঙ্গীতে পারফর্ম ও পাবলিসিটিতে অনন্যসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাকে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ এবং বাংলাদেশ সরকার ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’-এ ভূষিত করে। তবে পুরস্কার দু’টি ছিল মরণোত্তর। এসব সামাজিক-রাষ্ট্রীয় সম্মাননার গণ্ডির অনেক ওপরে শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অবস্থান; যে জায়গাকে ঠিক সীমিত পরিসরের পুরস্কারের কাঠামোয় আঁকা যায় না। আর এ কথাও ঠিক, মরণোত্তর পুরস্কার প্রদান করায় তিনি আলোকিত হননি; বরং আমরা আনন্দিত হয়েছি; প্রসারিত হয়েছে আমাদের সংস্কৃতির উঠান ও সাধনার শোভা।
স্নাতক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে চাকরিতে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন কালজয়ী এবং উত্তরকালেও অসম্ভব জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন। দেশবিভাগের আগে কলকাতার বাংলা সরকারের রেকর্ডিং এক্সপার্ট এবং পরে অতিরিক্ত সং পাবলিসিটি অফিসার পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মপরিসরের পেশাগত দায়িত্ব পালন এবং ব্যক্তিগত ঝোঁকের কারণেই হয়তো বাংলা সঙ্গীত প্রচার ও প্রসারের দিকে তিনি বিশেষভাবে আগ্রহী ও মনোযোগী হয়ে ওঠেন। অবশ্য অন্তরে ছিল প্রকাশের ভার আর সৃজনকর্মের তাগিদ। চাকরিতে প্রবেশের অল্পকাল পরই কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে প্রফেশনালি সঙ্গীতভুবনে প্রবেশ করেন। কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানি হিজ মাস্টার্স ভয়েস থেকে নজরুলের ‘কোন বিরহীর নয়ন জলে’, ‘স্মরণ পারের ওগো প্রিয়’; শৈলেন রায়ের ‘আজি শরতের রূপ দিপালী’ এবং জীতেন মৈত্রের ‘ওগো, প্রিয়া নিতি আসি’- এ চারখানি গান রেকর্ড করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। তিনি তখনকার কলকাতায় গানের ভুবনে জনপ্রিয়তা সৃষ্টিকারী একজন অনবদ্য ও অনুকরণীয় কণ্ঠকারিগর। সঙ্গীতের ভুবনে মোহময়তা ও মায়াজাল বানানোর কৌশলী জাদুকর। আব্বাসউদ্দীনের তারুণ্যভরা ভরাট গলা তখনকার বাঙালি শ্রোতার কাছে ছিল আনন্দঘন অধীর অপেক্ষার বিষয়। নজরুল সঙ্গীতের রেকর্ড প্রকাশে তাঁর সাফল্য আজো আমাদের সঙ্গীতের ইতিহাসে উজ্জ্বল ইশারা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘বেণুকার বনে কাঁদে বাতাস বিধুর-/সে আমারি গান প্রিয় সে আমারি সুর’, ‘অনেক ছিল বলার’, ‘গাঙে জোয়ার এলো’, ‘বন্ধু আজো মনে রে পড়ে’- নজরুলের এইসব গানের রেকর্ড প্রচারে চার দিকে প্রবল সাড়া পড়ে যায়। অতঃপর এই সঙ্গীতসাধক নজরুলকে দিয়ে ইসলামি গান লিখিয়ে তাতে কণ্ঠ প্রদান করেন। আর এভাবে সরল ভাবনাকে সম্বল করে, বৃহৎ ও অনগ্রসর মুসলমান সমাজে সঙ্গীতের প্রবাহ প্রচলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। সেদিন তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন- বাঙালি মুসলমানের মনে কী ধরনের জীবন-জিজ্ঞাসার বীজ ও বাতাস প্রবাহিত এবং তাতে কোন কায়দায় আনন্দ ও বার্তা প্রবেশ করানো যেতে পারে। বিজ্ঞান ও যুক্তির যুগে কেবল ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি দিয়ে যে সমাজকে, মানুষের চিন্তাকে আর সভ্যতার অগ্রগমনকে বিবেচনা করা বোকামি, সে কথা বুঝতে সমাজলগ্ন শিল্পী ও সংগঠক আব্বাসউদ্দীনের এতটা অসুবিধা হয়নি। আর তার সেই অনুধাবনের জায়গাটি নিজের কাছে গোপন না রেখে, আটকে না ফেলে সাধারণ জনতার কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। এবং সে অনুযায়ী তিনি সমকালীন সঙ্গীতের ধারা ও সুর সংযোজনে আন্তরিক ও সচেষ্ট ছিলেন সর্বদা। তৎকালীন মুসলমান সমাজের বেশির ভাগ প্রতিনিধি ও সদস্য সঙ্গীতের প্রতি ছিল ভীষণ বীতশ্রদ্ধ। বিশেষত জ্ঞানবিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা এবং যুগের বাণীকে আত্মস্থ করতে না পারার বিষয়াদিই ছিল এর মূল কারণ। গান গাওয়া ও গান শোনা- উভয়ই ছিল তাদের কাছে অধর্মের কাজ। এমন একটি ভীষণ প্রতিকূল প্রতিবেশে সাধারণভাবে মুসলিম সমাজের এবং বিশেষভাবে সব ধর্ম-শ্রেণীর সাধারণ মানুষের প্রাণের চাহিদা অনুযায়ী সঙ্গীত সরবরাহ করার প্রতি তার অভিনিবেশ সত্যিই আজ নিবিড় গবেষণার বিষয়। আজ এত দিন পরও অনুমান করা যায়, অনুসন্ধিৎসা ও সমাজ-রূপান্তরের অভিজ্ঞান ও আন্তরিকতাই ছিল তার সমূহ সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। মুসলমান নাগরিকের চিন্তায় সাঙ্গীতিক আবহ প্রবেশের কৌশল হিসেবে তিনি নজরুলের কয়েকটি গান প্রচারের অভিযানে নেমেছিলেন। এ প্রসঙ্গে মনে করা যায়- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ’, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ/এল রে দুনিয়ায়/ আয় রে সাগর আকাশ বাতাস, দেখবি যদি আয়’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ প্রভৃতি দারুণ শ্রোতাপ্রিয় নজরুলসঙ্গীতের কথা। এসব ইসলামি গান শুনে সঙ্গীতের প্রতি তখনকার অনগ্রসর মুসলমান সমাজের আগ্রহ জেগেছিল- যা ছিল সমকালীন সমাজে রীতিমতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। এই যে একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সঙ্গীতের আনন্দভুবনের দিকে ডেকে আনা- এর প্রায় বেশির ভাগের দায় সেদিন নিয়েছিলেন আব্বাসউদ্দীন। আর কেবল একটি সম্প্রদায়ের কথাই বা বলি কেন- নানান জাতের ও বিভিন্ন ধাঁচের গান গেয়ে তিনি আমজনতাকে গানের বারান্দায়, আড্ডায় ও আসরে হাজির করতে পেরেছিলেন। কাজেই তিনি কেবল একজন কণ্ঠশিল্পী নন; প্রবল নিষ্ঠাবান সঙ্গীত সংগঠক এবং সমাজ রূপান্তরেরও অনন্য কারিগর।

আইসল্যান্ডের জাতীয় কবি ওনাস হলগ্রিমসন by ড. শাহাজাদা বসুনিয়া

আইসল্যান্ডের জাতীয় কবি ওনাস হলগ্রিমসনের (---) বিচরণ শুধু কবিতায় ছিল না; বরং তিনি একজন লেখক ও প্রকৃতিবাদী হিসেবে আইসল্যান্ডে পরিচিত ছিলেন। তিনি আইসল্যান্ডিক জার্নাল ফোলনির (ঋলড়ষহরৎ) -এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন; যা ১৮৩৫ সালে কোপেনহেগেনে প্রথম  প্রকাশিত হয়। এই জার্নালটি আইসল্যান্ডিক জাতীয়তাবাদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করত। শুধু তাই নয়- আইসল্যান্ডিক ইন্ডিপেন্ডেন্স ম্যুভম্যান্টকে ত্বরান্বিত করে এই জার্নাল। তার কবিতা আইসল্যান্ডে বহুল পরিচিত যা দেশ ও জনগণকে ঘিরে রচিত। ফলে আইসল্যান্ডের জনগণের প্রিয় কবি হচ্ছেন ওনাস হলগ্রিমসন। কবি ওনাস হলগ্রিমসন আইসল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে ১৮০৭ সালের ১৬ই নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হলগ্রিমুর পোরসটিনসন। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তার ভাই পোরসটিন ১৮০০ সালে, রেনভিগ ১৮০২ সালে এবং আনা মারগ্রেট ১৮১৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮১৬ সালে ওনাসের বাবা একটি হ্রদে ডুবে মারা যাওয়ার পর তাকে ফুপুর তত্ত্বাবধানে দেয়া হয়; কিন্তু ১৮২১ সালে তিনি পুনরায় তার জন্মভূমি অক্সনাডুলারে ফিরে আসেন। সেখানে একটি স্কুলে তাকে ভর্তি করা হয়। পাদ্রি ইনার এইচ থার্লাচার্স-এর তত্ত্বাবধানে দু’বছর লেখাপড়া করার পর বৃত্তিপ্রাপ্ত হয়ে অন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। ১৮২৯ সালে তিনি শিক্ষাজীবন শেষ করে রাইকয়াভিকে চলে আসেন এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে করণিক পদে কাজ শুরু করেন। করণিকের কাজের পাশাপাশি তিনি ডিফেন্স উকিল হিসেবে কাজ করতেন। ধারণা করা হয় যে, ১৮৩১-১৮৩২ সালের শীত মৌসুমে নুডসেন নামে এক মহিলাকে প্রেম ও বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হলে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন। এমনকি প্রেমে ব্যর্থতার কারণে তার জীবন তছনছ হয়ে যাচ্ছিল। ১৮৩২ সালে তিনি ডেনমার্কের উদ্দেশে রওনা হন। ইউনিভার্সিটি অব কোপেনহেগেন থেকে এন্ট্রান্স পাশ করার পর তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। শিক্ষাজীবনশেষ করার চার বছর পর তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। আইসল্যান্ডের শিক্ষা জীবনের চারজন সহপাঠীকে সাথে নিয়ে তিনি এই পিরিওডিক্যাল জার্নাল ফোলনির (ঋলড়ষহরৎ) চালু করেন। ¯œাতক ডিগ্রি অর্জনের পর রাজস্বকোষ থেকে তিনি অনুদানপ্রাপ্ত হয়ে বিজ্ঞানের ওপর গবেষণা শুরু করেন। ১৮৩৯ সাল থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত তিনি এই প্রকল্পে কাজ করেন। আইসল্যান্ডের ন্যাচারেল হিস্ট্রির ওপর তিনি সারা জীবন গবেষণা অব্যাহত রাখেন। ফোলনির জার্নালে তার অসংখ্য কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। বিদেশী অনেক বিষয়ের ওপর লেখা প্রবন্ধকে তিনি অনুবাদ করেন, যা আইসল্যান্ডের সাহিত্য ও বিজ্ঞানে বিশেষ অবদান রাখে।
কবি ওনাস হলগ্রিমসন আইসল্যান্ডের সাহিত্যে প্রথম রোমান্টিক ধারার প্রবর্তন করেন। আইসল্যান্ডের নিসর্গকে ধারণ করে তার লেখনীতে সার্থকভাবে ইমেজারি প্রয়োগ করেন তিনি। তার কবিতায় বিদেশী ছন্দ যেমন; প্যারামিটার ব্যবহার করে তিনি আইসল্যান্ডের কবিতাভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেন। একটি কবিতার অনুবাদ দেয়া হলো :
‘তুমি হচ্ছো মনোরম ও সুন্দর ভূমি ,
এবং যুকুলস (হিমবাহ)-এর চূড়া শুভ্র-সাদা,
মেঘহীন নীল আকাশ,
ওশান ঝিকিমিকি উজ্জল,
কিন্তু মাঠগুলো উঁচু যেখানে
ওসার নদী বয়ে চলে নিরবধি,
আর স্রোতস্বিনী মিশে যায় আলমানায়,
কোনোকিছু এখানে ধরে রাখা যায় না,
অথচ এখন সব জায়গা হচ্ছে চারণভূমি,
লগবার্জের গুল্ম অতি পবিত্র
আর মূল্যবান পাথরগুলো প্রতি বছরে
নীল হয় সবার কাছে, সন্তানের কাছে।
পূর্বপুরুষের অর্জিত খ্যাতি কিভাবে
ভুলে যাই, প্রিয় আইসল্যান্ড আমার।’
কবি ওনাসের বাবার মৃত্যুর ২০ বছর পর তিনি খধু ড়ভ এৎরবভ কবিতায় তার বাবার মৃত্যুর বিয়োগান্তক স্মৃতিচারণ করেন। নৌকা থেকে পড়ে হ্রদে তার বাবার মৃত্যুকে তিনি প্রতিনিয়ত স্মরণ করতেন বেদনাভারাক্রান্ত হৃদয়ে। নি¤েœ কবিতাটির অনুবাদ দেয়া হলো:
“আমি একজন বালক ছিলাম মাত্র
যখন দৃষ্টিহীন হ্রদের পানিতে
তার দৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়
এবং সারা জীবনের জন্য স্তব্ধ করে দেয় তাকে,
অথচ আমি কিছুই ভুলি নাই
যা ছিল শোকাহত অপূরণীয় ক্ষতি-
পৃথিবীতে এটিই প্রথম-
যখন আমার বাবা মৃত্যুবরণ করেন।
আমি স্মরণ করি
তার আত্মার অবিচল শক্তি,
তার পুরাদস্তুর আদর
যা তার চক্ষু থেকে প্রতিফলিত হতো;
তারা অতি উৎসাহে ভালবাসা বিতরণ করে
যেন বিধাতার আশীর্বাদের সূর্যালোকের
আলোকে সবুজের সমাহার।
আমার মনে পড়ে মায়ের অশ্রু বিসর্জন,
তিনি জানতেন বাবা আর ফিরে আসবে না
কখনো, তার ভালবাসা তাকে
আলোকিত করবে না জীবনে।
এমনকি তার সন্তানদের,
একি এক অনন্ত প্রস্থান।”
২১ মে, ১৮৪৫ সালে কবি ওনাস হলগ্রিমসনের জীবনাবসান ঘটে। মাত্র ৩৭ বছরে ব্লাড পয়জনিং- এ তিনি মারা যান। কোপেনহেগেনে তাকে সমাধিস্থ করা হয়; কিন্তু ১৯৪৬ সালে তার দেহাবশেষ কোপেনহেগেন থেকে আইসল্যান্ডে এনে পুনঃসমাহিত করার প্রয়াস নেন সিজারসন পিটারসন নামের তার এক শুভাকাক্সক্ষী । তদানিন্তন আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এতে বাধা দিয়ে বলেন যে, কবি হলগ্রিমসন রাষ্ট্রীয় সম্পদ। সুতরাং তাকে জাতীয় কবরস্থানে সমাহিত করা হবে। দেহাবশেষ বহনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও যানবাহন বরাদ্দে সরকারের অনীহার কারণে সিজারসন পিটারসন নিজেই সমুদয় ব্যয়ভার বহন করে কবির দেহাবশেষ আইসল্যান্ডে নিয়ে আসেন। উল্লেখ্য যে, তার পুনঃঅন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে পুরোহিতের অনীহার ফলে তার কফিন একটি গির্জায় এক সপ্তাহ রাখা হয়। পরবর্তীতে আইসল্যান্ড সরকারের পছন্দের জায়গায় তাকে ১৬ নভেম্বর ১৯৪৬ সালে পুনঃসমাহিত করা হয়। তাকে স্মরণ করার জন্য এই দিনটি আইসল্যান্ডে ল্যাংগুয়েজ ডে হিসেবে উদ্যাপন করা হয়।

গল্প- লুলা পেট্রল by রিপনচন্দ্র মল্লিক

আমি কি কখনো ভেবেছিলাম এভাবেই আমি শেষ হয়ে যাবো? না, এ কথা আমি কোনো দিনও ভাবিনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমি কেন ভাবিনি? এভাবে আমি শেষ হয়ে যাবো সেই বোধ, আমার ইন্দ্রিয়গুলো আগে কেন প্রয়োগ করেনি। আমি তো ভালোই ছিলাম। ছিলাম বেশ সুখে।
ছেলেবেলায় মায়ের মুখে শুনেছিলাম, আমি নাকি জন্মের পরে কাঁদিনি। মা মাঝে মাঝে আমাকে বলত, ‘বাদশা, তুই বড় পাষাণ হইছিস। তোর বুকে কোনো দয়ামায়া নাই। জন্মের পরে যার চোখ দিয়া দুই ফোঁডা পানি পড়ে নাই। তোর ভিতরে আবার কিসের দয়ামায়া। দয়ামায়া তো তুই দুনিয়ায় নিয়া আহোস নাই।’
মায়ের কথাই ঠিক। আমার চোখ দুটো পাথর দিয়ে বানানো। পাথরে চোখ চকচক করে। সেই চকচকা পাথরের সাথে সূর্যের আলোর বিকিরণে যতটুকু দেখা যায় আমি আসলে ততটুকুই দেখি। বাকিটা আমার কেবলই অন্ধকার। তবে আমি কিন্তু চোখে একেবারে কম দেখি না। চোখে যতটুকু দেখি তাতে এখনো নাকের ওপরে চশমা বসিয়ে তার দুই হাত দিয়ে নিজের কান দুটোকে ধরিয়ে রাখতে হচ্ছে না। বয়স তো কম হলো না। এই অক্টোবরে ত্রিশের ঘরে ঢুকে পড়ব। ডান হাতটা অকেজো হয়ে যাওয়ার পর থেকে বাম হাত দিয়েই সব কিছু করি।
আমার একটি মাত্র হাত। তাতে কোনো দুঃখ নেই। আখের রস বানানো মেশিনের চাপে ডান হাতটি যে বছর শেষ হয়ে গেল তারপর থেকেই মূলত আমি এক হাতবিশিষ্ট মানুষ। আমি দেখি আমার হাত আছে। কিন্তু অন্যরা দেখে না। তারা মনে করে মানুষের হাতের কব্জি, আঙুল না থাকলে সেই অঙ্গকে আর হাত বলা যায় না। আমি সেটা বিশ্বাস করি না। আমার কব্জি নেই, আঙুল নেই। তার পরও আমার অবশিষ্ট ডান হাতটিতে যে শক্তি পাই, আমার মনে হয় অনেকেরই সেই শক্তিটুকু ডান হাতে নেই। তেজগাঁও রেলগেটের আশপাশেই কাটিয়ে দিলাম জীবনের দশটি বছর। রেললাইনের পাশ ঘেঁষে একটি খুপরিঘরে আমার রসের জীবন। যেদিন থেকে রসের জীবন শেষ হলো, তারপর থেকে আমি আর কোনো কাজকর্মে মন দিতে পারি নাই। তেজগাঁও রেলগেটের পাশের ট্রাকস্ট্যান্ডের কাছে যে মসজিদটা, ওখানেই ভিা করে খাই। ভালোই আয়রোজগার হয়। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসে ভিা করি। কোনো দিন খুপরিতে এসে গুনে দেখি পাঁচ শ’ টাকা। আবার কোনো দিন গুনে দেখি সাত শ’ টাকা। তবে এখন মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান হয়ে গেছে। ভিুক দেখলেই সহজে ভিা দেয় না। আগে ভিুকের চোখ, মুখ, হাত, পা দেখে তার পরে দুই টাকা পকেট থেকে বের করে দেয়। অবশ্য একটি হাত না থাকায় অনেকেই দুই টাকা, পাঁচ টাকা পকেট থেকে বের করে দেয় আমাকে।
যখন গ্রামে ছিলাম, কোনো রকমে টেনেটুনে কাস নাইন পাস করেছি। জীবনে কোনো কিছুতেই সফল হতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত সব কিছু ছেড়েছুড়ে ভেবেছিলাম ধনী হবো। দামি দামি গাড়িতে চড়ব। লাইনটা পেয়েও গিয়েছিলাম। আমাকে যে এই লাইনে ঢুকে পড়ার টিকিট কেটে দিলো, বেচারা আমি লাইনে ওঠার আগেই একদিন সকালে ধপাস করে বুকে ব্যথা ওঠায় মরে গেল। আমি কোনো কষ্ট পাইনি। কাউকে মরতে দেখলে ছোটবেলা থেকেই আমার কোনো ব্যথা লাগে না। যে মানুষ জন্মের পরে কাঁদেনি তার আবার কিসের দুঃখ-ব্যথা!
এত ঝামেলাময় জীবন নিয়েও আমি কিন্তু খুব সুখীই ছিলাম। আমাকে সত্যিকারের ধনী হওয়ার স্বপ্ন একজনই দেখিয়েছিল, তার নাম মায়া। আমি তাকে আদর করে ডাকতাম ‘মায়াবি মায়া’। মায়ার চোখে তাকালেই আমি সব কিছু ভুলে যেতাম। আমার খুপরিঘরেই এসে মায়া দেখা দিত। মঙ্গার এলাকা থেকে পেটের জ্বালায় মায়া ঢাকা এসেছে। কারওয়ানবাজারের একটি হোটেলে রান্না করে। ঢাকায় আসার আগে একবার বিয়েও হয়েছিল বলে জেনেছি। তাতে কী, আমার তো মায়ার জন্য খুব মায়া লাগে। মায়াই আমাকে একদিন বলেছিল, ‘তুমি অনেক টাকা কামাও, টাকা না থাকলে কোনো সুখ নাই। তুমি টাকা কামাইলে আমরা ঘর বানমু।’ আমি জানতে চেয়েছিলাম, ‘কত টাকা কামাইতে হইবে মায়া?’
মায়ার মুখে কোনো কথা নেই। মায়া চুপ হয়ে যায়। আমিও মায়াকে বলি, ‘যাও শিগগিরই আমি ধনী হয়ে যাবো। যেভাবেই হোক আমাকে ধনী হইতেই হবে। লোকে আমাকে লুলা বাদশা বলে। আমাকে যারা লুলা বাদশা বলে আমি তাদের দেখিয়ে দিতে চাই, লুলা হইলেও আমি সত্যিকারের বাদশা।’ আমি ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। আমি আরো স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম, আমি আর মায়া বাবুইপাখির মতো ঘর বুনছি। আমার এ স্বপ্নগুলো বাস্তবতায় রূপ দেয়ার পথেই আমি আস্তে করে হাঁটছিলাম। একদিন মায়াকে ডেকে বললাম, ‘শোনো মায়া, আমি শিগগিরই ধনী হয়ে যাবো। তারপর তোমাকে নিয়ে বাবুইপাখির বাসার মতো করে একটি ঘর বানামু।’ আমার কথা শুনে মায়া শুধু হাসে। মায়ার সেই মায়াবী হাসির মধ্যে আমি আটকে যাই। শুধু আটকে যাই বললে ভুল হবে, আসলে মায়ার মুখে হাসি দেখলে আমি বিদিক হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যাই। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় মায়ার জন্য আমি সব কিছুই করতে পারি।
দেশে আন্দোলন এলেই আমার ডাক পড়ে যায়। দেশে যত দল আছে, দলের ওপরমহলে যত নেতা আছে, সবাই আমাকে খোঁজে। আমি নাকি তাদের আন্দোলনের হাতিয়ার। আমাকে খুঁজে না পেলে নাকি তেজগাঁও থেকে ফার্মগেট, ফার্মগেট থেকে শাহবাগ, শাহবাগ থেকে মতিঝিলে তাদের কোনো আন্দোলন হয় না। আমি মাঝে মাঝে নেতাদের বলি, ‘আমি লুলা মানুষ, আমাকে নিয়ে এত টানাটানি করেন ক্যান? এই ঢাকা শহরে কি আমি একাই আছি, আমি ছাড়া আপনাদের আর কোনো মানুষ নাই? আমি আপনাদের এত কাজ করে দিতে পারব না।’ Ñএই কথা বলে আমি আমার কাজের রেট বাড়ানোর চেষ্টা করি।
ইদানীং সব দলের ওপরমহলের নেতারা আমার কথা শুনে চোখেমুখে অন্ধকার দেখে। তারা ভাবতে পারে না আমি মুখফুটে খই ফোটার মতো করে কিভাবে এ কথা বলে ফেলছি। আমার কথা শুনে এই লাইনের পুরান মাল শ্যামলা বাবু বলে, ‘আরে কচ কী, বাদশা। তুই দেখি বদলাইয়া যাইতেছোস!’ ‘হ। এখন থেকে আমার বদলাইয়া যাইতে হবে। আপনেরা সুযোগ সুবিধা নিয়ে দল পাল্টে ফেলেন। আমিও এখন থেকে নিজেকে পাল্টে ফেলব।’
শ্যামলা বাবু আগে আমার মতোই কাজ করত। এখন কাজ করতে করতে অনেক টাকা আয় করে ফেলছে। এখন সে এই এলাকায় সাদা লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি পরে সরকারি দল আর বিরোধী দলের নেতাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সুবিধাবাদী আন্দোলনের ব্যবসা করছে। আমার কথা শুনে শ্যামলা বাবু বলে, ‘আ রে, দেশের সব নেতার কাছে তোর নামটি মুখস্থ হয়ে গেছে। আন্দোলনের আদর্শ হাতিয়ার হিসেবে সবাই তোকে এক নামেই চেনে। এই লাইনে তোর ক্যারিয়ারের জন্য এটা কম কিসের, বল।’
আমার চোখে শুধু মায়ার কথা ভাসে। মায়াকে নিয়ে ঘর বানাব। ভাই নেতারা আমাকে হাতিয়ার বলুক আর মতিয়ারই বলুক, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমাকে দিয়ে যদি আপনি কাজ করাতে চান তাহলে এখন থেকে রেট বাড়াতে হবে। প্রতি ্যাপে ১০ হাজার টাকা করে দিতে হবে।
আপনার কাজ সেরেই আমি ভিা করতে বসে পড়ব, মিডিয়ার লোকজন এসে আমার ছবি তুলবে না। তারা তুলবে পোড়া গাড়ি, পোড়া মানুষের ছবি। আপনিই বলেন ভাই, অনেক হরতাল-অবরোধেই তো আপনি আমাকে সরকারি দলের নেতাদের গাড়িও পোড়াতে বললেন আবার বিরোধী দলের নেতাদের গাড়িও পোড়াতে বললেন। একটি অপারেশনও কি মিস করেছি আমি?
ঠিক আছে, তুই যখন বলছিস রেট বাড়াতে হবে, তোকে রেট বাড়িয়ে দেবো। তবে অন্য সিস্টেমে।
আচ্ছা বলেন, কী সিস্টেমে?
আগামীকাল থেকে ১০ দিনের অবরোধ হবে দেশে। অফার আছে পেট্রলবোমার আগুন জ্বালাতে হবে। এই আগুন নিয়ে চুল টানাটানি। মানে বুঝছোস তো, টিভিতে নেতারা বুদ্ধিজীবীরা এই পেট্রল আগুন নিয়া চুলচেরা বিশ্লেষণ, টকশো, মিষ্টিশো ইত্যাদি করবে।
ভালো কথা। মাল ছাড়েন। কাজ ঠিক সময়মতো করে দেবো।
আমার কথামতো তোকে আগামী ১০ দিনে মোট ১৫টা বাস ও ট্রাকে পেট্রলবোমা মারতে হবে। তবে কথা আছে, আমরা যে গাড়িগুলোর নাম তোকে লিখে দেবো, ঠিকভাবে শুধু ওইসব গাড়িতেই বোমাগুলো মেরে দিতে হবে।
মেরে দেবো। কিন্তু টাকা?
প্রতিদিন কাজ শেষ করে রাতে ১০ হাজার করে টাকা নিয়ে যাবি।
আমি বাদশা। যে কিনা গত এক বছরে নেতাদের কাছে লুলা পেট্রল নামে পরিচিত হয়ে উঠেছি। আগামী ১০ দিন পরে আমার হাতে অনেক টাকা চলে আসবে। জীবনপ্রবাহে আমার সুদিন হাতছানি দিচ্ছে। মায়াকে খবর দিতে হবে, সামনের ১০ দিন পরে মায়াকে বিয়ে করে আমরা সুখী সংসার গড়ে তুলব। ঠিক করেছি। বিয়ের পরে এই শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবো। প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে গিয়ে আমরা একটা বাড়ি বানাব। বর্ষার দিনে বাড়ির চার পাশে থাকবে পানি আর পানি। পানিতে চার দিক থৈ থৈ করবে। সেই বাড়িতে আমি আর মায়া থাকব। যেদিন রাতের আকাশ ফুটে জোছনা ঝরে পড়বে, সেদিন আমি আর মায়া বাড়ির উঠানে সারা রাত জোছনায় ভিজে জবুথবু হবো। মায়াকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে এভাবেই কেটে যাচ্ছিল আমার একেকটি দিন।
দেশজুড়ে চলছে টানা অবরোধ। ‘....’ পরিবহনে পেট্রল মারতে হবে। বাবু ভাই সকালে নির্দেশ দিয়েছে। আমার আর কোনো কিছুই সইছে না। আজ রাতেই অপারেশনটা শেষ হলে আমি লাখপতি হয়ে যাবো। মায়াকে কাল বিয়ে করে ঢাকা শহর ছেড়ে চলে যাবো। দূরে চলে যাবো, অনেক দূরে চলে যাবো। এই পোড়া শহরে আর কোনো দিন আসব না। বাবু ভাইয়ের কথামতো রাতেই বাসে পেট্রলবোমা মেরেছিলাম। কিন্তু এরপর এমন ঘটনা ঘটবে আমি কোনো দিন ভাবিনি। এত পেট্রলবোমা মারলাম কোনো দিন তো এ রকম হয়নি।
গাড়িটিতে পেট্রল ছোড়ার সময় কে যেন আমাকে গুলি করল। সাথে সাথে শাহবাগের এই সড়কে আমি ধপাস করে পড়ে যাই। কিছুণের মধ্যেই দেখি, আমার মাথার কাছে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। আমি চোখ তুলে মানুষটির দিকে তাকাতে চেষ্টা করছিলাম। আমার চোখ দুটোকে মেলতে পারছিলাম না। অনেক চেষ্টা করে কিছুটা চোখ মেলে চেয়ে দেখি, আমার মাথার পাশে যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে, সে শ্যামলা বাবু। অদ্ভুত রকমের শব্দ করে হাসছেন আর বলছেন, ‘তুই নাকি তোর রেট বাড়াইছোস? এখন থেকে তোর যত খুশি রেট দরকার বাড়িয়ে ফ্যাল শালার লুলা পেট্রল, কেউ তোকে মানা করবে না।’
আমার দম বের হয়ে আসছে। কোনো কথা বলতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে শরীরের সমস্ত রক্ত বের হয়ে যাচ্ছে। আমি মারা যাচ্ছি। আমি কি কখনো ভেবেছিলাম এভাবেই আমি শেষ হয়ে যাবো? না, এ কথা আমি কোনো দিনও ভাবিনি। মায়ার কী হবে? মায়া তো আমার জন্য পায়জামা, পাঞ্জাবি আর পাগড়ি কিনেছে। নিজের জন্য কিনেছে শাড়ি, আলতা, কাচের চুড়ি, মেহেদি আর লাল রঙের টিপ। আমার মনে হচ্ছিল, এই আমি কত মানুষের জীবন এই সড়কে নিভিয়ে দিয়েছি। আজ আমি নিজেই এই সড়কেই নিভে যাচ্ছি। চার দিকে থৈ থৈ করা পানির মাঝে বাড়ি বানিয়ে আমার ও মায়ার কোনো দিন থাকা হলো না। কোনো দিন আর হলো না বাড়ির উঠানে চাটাই বিছিয়ে দু’জনে সারা রাত জোছনায় ভিজে জবুথবু হয়ে ঘুমিয়ে থাকা।

ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন by শেখ রকিব উদ্দিন

জন্মিলে মৃত্যু হবে অমর কে কোথা কবে? মৃত্যু অবধারিত। প্রত্যেককে একদিন মৃত্যুর শীতল স্পর্শে ঢলে পড়তে হবে। কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, রাজা, সম্রাট, শাসক দিগি¦জয়ী বীরসহ সবাইকে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হবে। প্রতিটি জীবন তরঙ্গ বিুব্ধ সমুদ্রে জল বুদবুদ... যেন বিশাল শক্তির উন্মত্ততায় গর্জন করে উঠছে মুহূর্তের মধ্যে সীমাহীন জলরাশির মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। জীবনটা হচ্ছে সমুদ্রের তরঙ্গ ক্ষণকালের জন্য তটভূমিতে আছড়ে পড়ে আবার ফিরে যায় সে মহাসমুদ্রের অতল নীলে। মহান ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিক আব্দুল মতিনের মৃত্যু সংবাদে বারবার উপরিউক্ত শব্দগুলো আমার হৃদয় কোণে উজ্জীবিত হচ্ছে।
ইতিহাসের খ্যাতনামা সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর ময়ূরকণ্ঠী গ্রন্থে লিখিত কয়েকটি বাক্য ভাষাসৈনিক মতিনের মৃত্যুতে আমার স্মৃতির কোণে ভেসে উঠছে। মুজতবা আলী একজন জাপানি কবির একটি কবিতার কয়েকটি লাইন অনূদিত করেছিলেন ওই গ্রন্থে...
‘কমলের দলে শিশিরের মতো মোদের জীবন হায়Ñ ঝড়ের সময় লাগে যে কম্পন সেই তো জীবন।’
অর্থাৎ যে জীবনপ্রবাহ বর্ণাঢ্য জীবন পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার প্রাক্কালে কম্পন দিয়ে যায় অর্থাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে যায়। শত শত, হাজার হাজার, লাখ লাখ ও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে ব্যথা বেদনার তাণ্ডব সৃষ্টি করে সেই জীবন বেশি সার্থক, বেশি সফল। ভাষা মতিন ইতিহাসে এমনই একজন খ্যাতিমান ইতিহাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব যিনি পৃথিবী থেকে প্রায় শতাব্দীর বর্ণাঢ্য জীবন যাপনের পর চলে গেছেন; কিন্তু তিনি অমর, অক্ষয়, ভাস্বর। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চির অগ্রগতির ছন্দে ছন্দে তার নামটি সুমধুর সঙ্গীতের লহরিতে ধ্বনিত হবে।
সম্ভবত ১৯৪৮ সালের শীতকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে এক জনাকীর্ণ সমাবেশে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। সাথে সাথে সমাবেশের একটি কোণ থেকে কয়েকজন বীরসিংহ বীরাচারী বীর দীপ্তকণ্ঠে প্রতিবাদ করলেন না না না। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। এরপর থেকে ধীরে ধীরে শুরু হলো সারা দেশে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। একসময় দেশের  সব শ্রেণীর মানুষ আবালবৃদ্ধবনিতা, শিক্ষক-কর্মচারী ছাত্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বর্তমান বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী, শহর, গ্রাম, বন্দরসহ সারা দেশে আন্দোলন অগ্নিকুণ্ডের মতো ছড়িয়ে পড়ল; যার ফলশ্রুতিতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে গুলিবর্ষণে শহীদ হলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার আরো অনেকে তাদের স্মৃতির প্রতি আমি শ্রদ্ধা নিবেদন না করে পারছি না। এই ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত।
১৯৫২ সালে আমি বাগেরহাট জেলার সদর থানার কারাপারা গ্রামের শরৎচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুল থেকে মিছিল করে তৎকালীন মহকুমা শহরে বর্তমানে জেলা শহরে সিসি ব্যাংকের সামনে ভাষা আন্দোলনের জনসভায় যোগদান করতাম। এ সভায় বক্তৃতা করতেন মরহুম মীর মোশারেদ আলী, মীর মুনসুর আলী, মুনসুর সাহেব, আমজাদ আলী গোরাই, সৈয়দ রওনক আলী, শেখ আশরাফ হোসেন ও এ জেড এম দেলোয়ার হোসেন। বাগেরহাটে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে যে ব্যক্তিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন তিনি হলেন নেতা শেখ আব্দুল আজিজ। শেখ আব্দুল আজিজ এখনো বেঁচে আছেন। গুলশানে তার বাসভবনে জীবনের শেষ প্রান্তে নিভৃত নীরব জীবনযাপন করছেন। কার্জন হলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভায় যে প্রতিবাদ করেন তার উল্লেখযোগ্য হলেন ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। আব্দুল মতিনসহ বেশ কয়েকজন মৃত্যুঞ্জয়ী বীর সে দিন বাংলা ভাষার পক্ষে বাংলা ভাষার মর্যাদার স্বার্থে ও মাতৃভাষার সম্মানে বিরোচিত কণ্ঠে আওয়াজ না তুলতেন তবে হয়তো ইতিহাস অন্য রকম হতে পারত। কাজেই এ মৃত্যুঞ্জয়ী বীরদের স্থান জাতির ইতিহাসে সবার ঊর্ধ্বে। আমার সাংবাদিকতার পেশাগত জীবনে ভাষা মতিনের সাথে বহু সভা সেমিনারে বক্তৃতা করেছি। তাকে সবসময় শ্রদ্ধাভরে সম্মান করতাম। আমি তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। তিনি চিরঞ্জীব, চির অমর ও চির অক্ষয়।

আফ্রিকার সাহিত্য ও সংস্কৃতি by সৈয়দ লুৎফুল হক

আফ্রিকা দীর্ঘ দিন ইউরোপীয়দের কাছে কালো মহাদেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। যেখানে কোনো সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি। যেখানে পশ্চিমা ও এশিয়ার কোনো সভ্যতা হাজার বছরেও স্পর্শ করেনি। এমনকি উত্তর আফ্রিকা মুসলমানদের জয় করার পরও। সপ্তম শতাব্দীতে আরবদের বাণিজ্যের কোনো ছোঁয়া আফ্রিকানদের স্পর্শ করেনি। আফ্রিকা স্বাধীনভাবে থেকে যায়। কোনো বিদেশী পণ্য ও ব্যবসায় তাদের কোনোভাবে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তারা তাদের নিজেদের স্থানীয় পণ্যের আদান-প্রদান ও বাণিজ্য চালিয়ে যায়। তাদের সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এটি বলবৎ ছিল আফ্রিকার সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সামগ্রিকভাবে এর ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র দৃশ্যমান। এদের প্রায় ৮০০ বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠন আফ্রিকার সীমানায় শত শত বছর ধরে গ্রামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ ছিল। বিস্তৃতভাবে দেখতে গেলে আফ্রিকাকে একটি সাম্রাজ্য অথবা রাষ্ট্র বলা যায়।

সবকিছু বাদ দিয়ে ভৌগোলিকভাবে দেখতে গেলে ভাষা এবং রাজনীতিগত বৈচিত্র তো আছেই। যদিও আফ্রিকার একটি স্বচ্ছ সংস্কৃতি রয়েছে, যা অন্যাদের সাথে বিনিময় করা যায়। চরিত্রগতভাবে দেখতে গেলে একটি জাতিত্ববোধ লক্ষ করা যায়; যার মূলভিত্তি হলো পরিবার। অথবা একটি গ্রুপ যা পরস্পরের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে অথবা বেঁচে থাকার জন্য পরস্পরের প্রতি সম্পৃক্ত হয়েছে। আফ্রিকার গোত্রগুলো একত্রিত রয়েছে একটি ফেডারেশনের মতো অথবা এক্সটেন্ডেন্ট পরিবারের বা গোষ্ঠীর মতো; যা শাসিত হয় পরিবারের বয়োজেষ্ঠদের শাসনের মাধ্যমে অথবা নির্বাচিত কোনো ব্যক্তি যিনি আধ্যাত্মিক যোগ্যতাসম্পন্ন। তা ছাড়া মূল বিষয় হলো যিনি এ পরিবারকে ধারণ করেন অথবা গোত্রের সদস্য। যিনি জীবিত বা মৃত এ গোত্রের সদস্য ছিলেন, তিনিই কেবল নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচিত হতে পারতেন। যদিও এ সব নিয়ম আফ্রিকার সমাজে কোনো সুন্দর বিষয় নয়, এটিকে নির্দিষ্ট করা যায় পৃথিবীর কৃষক সমাজের গ্রামীণ সভ্যতার সাথে। এসব গোত্রীয় কাঠামো পদ্ধতি ঐতিহ্যগতভাবে আফ্রিকান সংস্কৃতি যা প্রাথমিকভাবে প্রকৃতির বিষয়বস্তুর প্রতি বিশ্বাসের দিক নির্দেশনা প্রতীয়মান হয়। আফ্রিকার চরিত্রগত সম্পর্ক হলো পৃথিবীর সব প্রকৃতি যা প্রাকৃতিক ধ্যানধারণার অলৌকিক অধিক্ষমতার প্রতি নিজেকে নিবেদন করা। আফ্রিকানরা সব কিছু সৃষ্টি করেছেন যিনি অসীম ক্ষমতার অধিকারী তার প্রতি নিজেকে নিবেদন করে। আফ্রিকানদের বিশ্বাস হলো তাদের পূর্বপুরুষ যারা মারা গেছেন তাদের আত্মা প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে জীবিতদের সহায়তা করে এবং তাদের পরিচালিত করে। তাদের সম্মান দেখালে এ ট্রাইবগুলো বেঁচে থাকবে এবং তাদের জীবনের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে। যে কারণে আনুষ্ঠানিকতা, আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড এবং তাদের যাজকদের একটি উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তি ঘটে আফ্রিকান সমাজে।
কালো আফ্রিকানরা লেখার চেয়ে মৌখিকভাবে তাদের সাহিত্য নিজেদের মধ্যে প্রচার করত, যার ফলে তাদের সাহিত্যের কোনো রেকর্ডে বা মুদ্রিত কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না। হাজার হাজার বছর ধরে এভাবে তাদের সাহিত্য জনগণের কাছে শ্রুতির মাধ্যমে বেঁচে আছে। দশ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আরব স্কলাররা আফ্রিকানদের মধ্যে তাদের রূপকথাগুলো প্রচার করে আসছে, যা আরবি ভাষায় ছিল। বর্তমান সময়ে আফ্রিকানরা আরবিতে রচিত বিখ্যাত রূপকথাগুলো লিখিত রূপ দিতে শুরু করেছে। তা ছাড়া বিভিন্ন আফ্রিকান ভাষায় এগুলো লিপিবদ্ধ হচ্ছে। বর্তমান সময়ে এসব আফ্রিকান রূপকথা বিশ্বে আলোচিত হচ্ছে। তা ছাড়া তাদের সংস্কৃতিতে এর প্রাধান্য পাচ্ছে।
প্রাচীন আফ্রিকানরা মৌখিক এই সাহিত্যকর্ম ‘গ্রাইওটিস’ এক ধরনের বিশেষ শ্রেণী যারা মূলত কবি অথবা ঐতিহাসিক এগুলো সংগ্রহ করত। অতীতের এসব সঙ্গীত তারা মন থেকে গাইত জংলিদের মতো করে, মধ্যযুগের মতো। এসব গ্রাইওটসরা তাদের ইতিহাস মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিত বংশ পরম্পরায়। এর মধ্যে বিশেষভাবে সোন্দিতা রূপকথার ব্যাখ্যা বর্ণনা করত, যা মালির বিখ্যাত সাম্রাজ্যের কাহিনী। বিংশ শতাব্দীতে এগুলো ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। এই গ্রয়েটটি মনে করিয়ে দেয় নিজস্ব চেতনার দুয়ারকে। এ রূপ কথাটি সুন্দিতা প্রতিষ্ঠাতা মালি সাম্রাজ্যের প্রচার ও স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই রূপকথাগুলো গাওয়া হয়ে থাকে। যেমন করে পশ্চিমা সম্রাট ও শাসকদের কাহিনীগুলো লিখা হয়ে থাকে। যেমন গিলগামেস, এচিলিজ, আলেকজান্ডার এবং রোলেন্ডের (লায়েন চাইল্ড)। সুন্দিতা বিশেষভাবে উপস্থাপন করা হয় মৃতদের নিয়ে তাদের সম্মান, গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় এবং তাদের জনগণের ঐতিহ্যকে নিয়ে। প্রথমে তাদের গ্রয়েট (কবিতার) মাধ্যমে পরিচিত করানো হয়। যেসব গল্পে যুদ্ধের বর্ণনা থাকে ‘টেবন’ সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয় যাতে করে সুন্দিতাগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মালি চিত্রিত করা হয় শান্তির জায়গাকে, ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রা এবং শেষযাত্রার ইতিহাসকে।
আফ্রিকার সঙ্গীত অত্যন্ত কাব্যিক ও রিদমিক। এই সঙ্গীত একটি তালের ওপর ভিত্তি করে সুরের সমতায় গাওয়া হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় যার কোনো অর্থ থাকে নৃত্যের সাহায্যে সেটি মানুষদের বোঝানো হয়। এসব মিউজিক বা সঙ্গীতে কোনো বাদ্যযন্ত্রের প্রভাব না থাকলেও সুর সৃষ্টিতে কাঠের যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রয়োজনীয় বিষয় হলো জাতিগত ধ্যান-ধারণা এবং আফ্রিকার সংস্কৃতির প্রভাব ওই সঙ্গীত ও নৃত্যে প্রতিফলিত হতে হবে, যা আফ্রিকার কাব্যের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। যে বিষয়টি আফ্রিকান মিউজিকে দৃষ্টিগোচর হয় সেটি হলো পলিরিদমিক কাঠামো। একটি সঙ্গীতের পিসকে ৫ থেকে ১০ রকম বিভিন্ন রিদমে গাওয়া ও বাজানো হয়। কোনো কোনোটি বারবার একই সুর বাজানো হয়। এসব মিউজিক বাজানোর নিয়ম হলো বৈপরীত্যে অথবা বন্ধ করে মূল বিটের সাথে বাদ্যযন্ত্রটি গতানুগতিকভাবে বাজানো। পশ্চিম আফ্রিকার মিউজিক অনেকটা অফ বিটে বাজানো হয় আদিকালে বাজানো আধুনিক জাজ মিউজিশিয়ানদের মতো।
আফ্রিকানদের অনেক ধরনের পারকাশান রয়েছে যার মধ্যে অনেক রকম ড্রাম এবং রেটেল ব্যবহার করা হয় কবিতা ও নৃত্যশিল্পে উপস্থাপন করার সময়ে। বেলাফো বাদ্যযন্ত্রটি আফ্রিকায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি দেখতে জাইলোফোনের মতো। এই বোলন এবং কোরা বড় হাসের মতো দেখতে এবং সানসা কাঠের সাউন্ডবোর্ডের সাথে একটি মেনুবার, যার সাথে মেটেল টোঙ্গাস যুক্ত করতে হবে; যা আফ্রিকার ঐতিহ্যগত বাদ্যযন্ত্র হিসেবে পরিচিত। যেগুলো পরবর্তীতে এই দুইটি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয় গল্পের বর্ণনা দেয়ার সময়ে। যখন তারা কোনো অলৌকিক শক্তিকে বিশ্বাস করত সেখানে বেআইনি যে কোনো ঘটনা তাদের গোত্রের ওপর তার প্রভাব ফেলত। আফ্রিকাই একমাত্র স্থান যেখানে তাদের নিজস্বতাকে ধরে রেখেছে তাদের সমাজব্যবস্থা, সাহিত্য সঙ্গীত ও নৃত্যকলায়। এমনকি তাদের বেনজো (বেলস, ড্রাম এবং অন্যান্য ইনস্ট্রুমেন্ট যেগুলো হারিয়ে গেছে) এর মধ্যে অনেক বাদ্যযন্ত্র আছে অতি প্রাচীন যা ক্রীতাদাসরা আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার সময় বাজানো হতো অঙ্গভঙ্গি করে। এর ফলে একটি নাটকীয়তা সৃষ্টি হতো অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে। আফ্রিকার সংস্কৃতি ও সাহিত্য তাদের জাতিগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে ধারণ করে আছে। তাদের আনন্দ-বেদনার প্রকাশ হলো তাদের সাহিত্য সংস্কৃতি। জীবনকে জাগিয়ে রাখার সাধনায় তারা সাহিত্যকে ধারণ করে আছে।