Friday, September 18, 2009

ঈদ আনন্দময় হোক তাদের -চলতি পথে by দীপংকর চন্দ

রিকশার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা। অপেক্ষার প্রহর অসহনীয় মনে হচ্ছিল। অবচেতনে আমরা এই অসহনীয় অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজছিলাম। ঠিক সে সময়ই স্বল্প প্রচলিত যন্ত্রযানটির আবির্ভাব। ভূমিকর্ষণ যন্ত্রের সঙ্গে কাঠের পাটাতন জুড়ে সৃষ্টি করা হয়েছে যানটি। ভালোভাবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার ভ্রমণসঙ্গী জুলফিকার উঠে পড়ল অদ্ভুত সেই যন্ত্রযানের পাটাতনে। অপরিসীম নির্লিপ্ততায় পা ঝুলিয়ে বসল পেছনে। অবলম্বনহীন মানুষের মতো জুলফিকারকে অনুসরণ করলাম আমিও। ভ্রু-জোড়ায় অকৃত্রিম কৌতূহল চিত্রিত করে বসলাম পাশাপাশি। পিচঢালা রাজপথ কাঁপিয়ে যন্ত্রযান ছুটল এবার। অমার্জিত ধ্বনি আর বিচিত্র কম্পন তুলে মিনিট দশেক চলার পর থামল যানটি। আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নামলাম বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার কসবা গ্রামে।
ঢাকা বরিশাল মহাসড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত এই কসবা গ্রামটি মূলত তিনটি গ্রামের সমন্বয়। ছোট কসবা, বড় কসবা ও লাখেরাজ কসবা। অতি প্রাথমিক দৃষ্টিতে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর সঙ্গে কসবা গ্রামটির লক্ষণীয় কোনো পার্থক্য নেই। অথচ গ্রামটির স্থান-নামের উত্স ফারসি। বাংলায় কসবা শব্দটির অর্থ শহর। ঐতিহাসিক সূত্র মতে, কসবা সুপ্রাচীন বাঙালাবাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৩ শতকে কোটালীপাড়ার মদনপুরে প্রাপ্ত বিশ্বরূপ সেনের তাম্রলিপিতে বাঙালাবাদের উল্লেখ আছে। শোনা যায়, ফরিদপুরের দক্ষিণ অঞ্চল এবং সমগ্র চন্দ্রদ্বীপ অর্থাত্ প্রাচীন বাকলা বা অধুনা বরিশাল বাঙালাবাদের অন্তর্গত ছিল। পাল আমলে বাঙালাবাদে উন্নত বৌদ্ধসভ্যতা গড়ে ওঠে। বৌদ্ধসভ্যতা বিলুপ্ত হওয়ার পর ১৩ ও ১৪ শতকে সেন রাজবংশ এ অঞ্চল শাসন করে। ১৪ ও ১৫ শতকে বাঙালাবাদে মুসলমানদের আগমন ঘটে। ১৫ শতকের মধ্যভাগে হজরত খান জাহান আলী (রা.) এই অঞ্চলে পদার্পণ করেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁর শিষ্যগণ এ স্থানে ইসলামধর্ম প্রচার শুরু করেন। সম্ভবত সে সময়ই কসবার পত্তন হয়। তারপর ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয় বাঙালাবাদে উল্লিখিত রামসিদ্ধির নিকটবর্তী এই অঞ্চলটি। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। কসবায় তৈরি হয় নানা ধরনের ইমারত, গড়ে ওঠে নান্দনিক গঠনশৈলীর বেশ কিছু মসজিদ। সেই সব ইমারত কিংবা মসজিদের অধিকাংশই কালের গর্ভে বিলীন হলেও টিকে থাকা একটি অনন্য স্থাপত্যকর্মই গড়ে দেয় কসবার সঙ্গে অন্য যেকোনো গ্রামের লক্ষণীয় পার্থক্য। স্থাপত্যকর্মটি নিঃসন্দেহে কসবার ঐতিহ্যবাহী নয় গম্বুজ মসজিদ।
যন্ত্রযান থেকে নেমে কসবা গ্রামের সংকীর্ণ শাখাপথে পা বাড়ালাম আমরা। হরেক রকম গাছের ছায়ায় আচ্ছন্ন সেই শাখাপথের একাংশে কয়েকটি দোকান সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান। দোকানগুলো পেছনে ফেলতে না ফেলতেই জং-ধরা গ্রিলের গেট আর কাঁটাতারে ঘেরা বিরাট আঙিনা। পরিচ্ছন্ন সেই আঙিনার কেন্দ্রস্থলে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত কসবার নয় গম্বুজ মসজিদ।
আনুমানিক ১৫ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত এই মসজিদটির চার কোণে চারটি গোলাকৃতি মিনার রয়েছে, উপরিভাগে রয়েছে তিন সারিতে নয়টি গম্বুজ। মসজিদের সামনের দেয়ালে তিনটি প্রবেশপথ। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আরও একটি করে প্রবেশপথ থাকলেও কেবল সামনের দেয়ালের মাঝখানের প্রবেশপথটি ছাড়া অন্য পথগুলো গ্রিল দিয়ে বন্ধ এখন। বহিরঙ্গের সৌন্দর্য অবলোকন শেষে আমরা প্রবেশ করলাম মসজিদের অভ্যন্তরে। বর্গাকার এই মসজিদটির পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব। এ ছাড়াও কেন্দ্রস্থলে রয়েছে চারটি প্রস্তরনির্মিত স্তম্ভ। মসজিদের খাদেম হিসেবে পরিচয়দানকারী বাবুল ফকির জানালেন, এ অঞ্চলের অনেক মানুষই স্তম্ভগুলোকে অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন বলে মনে করে। তারা বিশ্বাস করে, মিহরাব-নিকটবর্তী স্তম্ভ দুটো থেকে অবিরাম ঘাম নিঃসৃত হয় এবং নিঃসৃত এই ঘামের স্পর্শে সর্বরোগ নিরাময় হয়। বাবুল ফকিরের কথা শুনতে শুনতে রোগ নিরাময়ের আশায় আগত মানুষদের দেখি আমরা, নির্ণয় করার চেষ্টা করি তাদের সামাজিক বলয়, অর্থনৈতিক অবস্থান। স্বাভাবিকভাবেই দারিদ্র্যসীমার অনেক নিচে তাদের বাস। দেশে প্রচলিত চিকিত্সাব্যবস্থার ওপর আস্থা স্থাপনের সংগতি নেই তাদের। আগৈলঝাড়ার রহিমা খাতুনের সঙ্গে কথা হয়। হতদরিদ্র এই প্রৌঢ়া চার বছর বয়সী নাতি সুজনকে নিয়ে এসেছেন মসজিদের পবিত্র স্তম্ভের কাছে মানত করতে। সুজনের পা-জোড়া কোনো এক অজ্ঞাত রোগে দীর্ঘদিন চলত্শক্তিহীন। ভীষণ মায়াভরা চোখের নাতিটিকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন রহিমা খাতুন। তাঁর বিশ্বাস, স্তম্ভের অলৌকিক শক্তিতে নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে উঠবে সুজন। আসন্ন ঈদের আগেই হেঁটে বেড়াবে পৃথিবীর বুকে। রহিমা খাতুনের বক্তব্য, আমাদের বিজ্ঞানমনস্ক সত্ত্বার সঙ্গে দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হলেও আমরা তাঁর বিশ্বাসের বিপরীতে কোনো যুক্তির অবতারণা করি না মোটেই। কারণ যে দেশে চিকিত্সা নামের সাংবিধানিক অধিকার সুনিশ্চিত নয়, সে দেশে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল মানুষের সরল বিশ্বাসের বিপরীতে বৈজ্ঞানিক যুক্তির অবতারণা করার নৈতিক অধিকার কোথায় আমাদের! তারচেয়ে বরং বিশ্বাসই জয়ী হোক, আমাদের বোধগম্যতার অতীত কোনো আলৌকিক শক্তির স্পর্শে হলেও সেরে উঠুক রহিমা খাতুনের নাতি সুজন! কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, আসন্ন ঈদ আনন্দময় হোক তাদের!

শিশুরা বলছে, ‘আমরাও আছি, তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ’ by ফারুক ওয়াসিফ

‘...হাঁটিহাঁটি শিশুটিকে আর কোথাও দেখি না, কতগুলো রাজহাঁস দেখি...মুখস্থ মানুষ দেখি।’

কলকাকলি করা শিশুদের তেমন দেখি না ঢাকা শহরে। ব্যালকনিতে বিষণ্ন শিশুদের দাঁড়িয়ে থাকা দেখি, রাজহাঁসের মতো গর্বিত গাড়ির বহর দেখি। গাছগাছালিঘেরা খেলার মাঠ দেখি না, বাহারি শপিং মল দেখি, রাজধানীর রাজা-উজির-বণিক-অমাত্যদের মহড়া দেখি। মার্কেটের ভিড় আর আওয়াজের মধ্যে বাবা বা মায়ের হাতে ধরা লাজুক শিশুদের যদিবা দেখি, মনে হয় এটা তাদের জায়গা নয়। দেশের তিন ভাগের এক ভাগই শিশু। তাদের বেশির ভাগের জীবনই এমন নিরানন্দ। এ শহরে, শিশুদের জন্যই নেই কোনো ছাড়।
ঢাকা শহর কেবলই বড়দের শহর। বাড়িয়ে যে বলিনি, ৯ সেপ্টেম্বরের প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠার ছবিটি তার প্রমাণ: একটি ছয়-সাত বছর বয়সী শিশু চলন্ত বাসের বন্ধ দরজার বাইরের পাদানিতে ঝুলে ঝুলে ফিরছে স্কুল থেকে। হয়তো এভাবেই তাকে ফিরতে হয় প্রতিদিন।
যে সমাজে শিশুরা সুখী ও স্বচ্ছন্দ নয়, সেই সমাজকে কোনোভাবেই সুস্থ বলা যায় না। শিশুদের অবস্থা দিয়েই বোঝা সম্ভব কোনো দেশ বা ব্যবস্থা কতটা মানবিক। শিশুরা সমাজের আয়নাও বটে। সেই আয়নায় ভাসা চেহারাটা দেখে তৃপ্তি পাওয়া কঠিন।
শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সময়, সঙ্গ ও সুযোগ। এই তিনটিই যেন বিরান এই ঢাকা শহরে। বাবা-মা জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত ও ছুটন্ত। ঢাকার রাজপথে এই ক্লান্ত-বিরক্ত ও ছুটন্ত মানুষেরই দেখা মেলে। নগরজীবনে সমাজ মৃত প্রায়। বড়দের সমাজ যখন মরতে থাকে, তখন ছোটোদের সমাজ আরো বিপন্ন হয়ে যায়। অথচ আমরা ভুলে যাই, শিশুদেরও আছে নিজস্ব সমাজ। বন্ধুত্ব বিষয়ে শিশুরা অনেক সিরিয়াস। তারাও চায় তার মতো শিশুদের সঙ্গে মিলতে, খেলতে, ঝগড়া করতে আবার ভালোবাসতে। স্কুলেও তাদের সেই সুযোগ কম। এভাবে আমাদের বেশির ভাগ শিশু নিঃসঙ্গ অবস্থায় বড় হয়। মাঠ নাই, গাছ নাই, পার্ক নাই; এত সব নাই-য়ের মধ্যে তাদের শৈশবটাও যে নাই হয়ে যায়, তার খেয়াল রাখে ক’জনা?
আসলে আমাদের শিশুরা সত্যিকারভাবে কেমন আছে, তা হয়তো আমরা জানি না। সবটা জানা সম্ভবও নয় হয়তো। কারণ, নিজস্ব চাওয়া-পাওয়া স্পষ্ট করে জানাতে পারে না শিশুরা। জানালেও তা বোঝার মন সব সময় আমাদের থাকে না। আমাদের মন পড়ে থাকে আপন-আপন স্বার্থ মেটানোর খায়েশে!
গবেষক জাকিউল ইসলাম জানাচ্ছেন, ‘‘ঢাকার তিন ভাগের এক ভাগ শিশু দৈনিক এক মিনিটও বাইরে খেলতে যায় না। ঢাকার প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে একজনের পাড়ায় একটাও বন্ধু নেই এবং বড়দের সাহায্য ছাড়া বাসার সীমানা থেকে এক পা-ও যাওয়ার সাধ্য নেই। ...একটি শিশু, নাম মতিউর, বয়স আট বছর, থাকে সেন্ট্রাল রোডে; সে অভিযোগ করছিল যে সে আগে তার বন্ধুদের নিয়ে বাসার সামনের ছোট্ট গলিটাতে খেলত। কিন্তু সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে বাড়িওয়ালার ধমকে। এমনকি বাবা-মায়েরাও ... যখন অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন (বা ভাড়া নেন), তখন বেডরুমের সাইজ দেখেন, দেখেন মার্বেল আছে কি না। কিন্তু বাচ্চাদের খেলার জায়গা আছে কি না, সেটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।’
“ঢাকার শিশুরা এখন খেলার মাঠের অভাবে ছাদে খেলে। সেটাও অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়। নজরুল, বয়স ১০, আমাকে বলছিল, ‘আগে আমরা ছাদে খেলতাম, কিন্তু ছাদে বিরাট একটা বিলবোর্ড লাগানোর পর থেকে এখন আর সেখানে খেলার জায়গা নাই।... ঢাকায় মেয়েশিশুদের অবস্থা আরও করুণ। যেখানে ঢাকার ছেলেশিশুরা গড়ে প্রতিদিন ৪৫ মিনিটের মতো বাইরে সময় কাটায়, সেখানে মেয়েরা মাত্র ৩০ মিনিট বাইরে থাকে (স্কুলের সময়টা বাদ দিয়ে)।’’ (জাকিউল ইসলাম, প্রথম আলো, ৩০ জুন ০৯)
এভাবে শৈশবের আনন্দ হারিয়ে বড়দের পৃথিবীতে বন্দী হতে হতে যে বেদনা হয়, যে মন-খারাপ করা মন হয়, সেই মন তখন কম্পিউটার গেম আর টেলিভিশনে আসক্ত হয়। বড়রা যেমন করে অফিস করে, তেমন করে তারা পড়া তৈরি করে, হোমওয়ার্ক করে—করানো হয়। তাদের দেওয়ার মতো সময় রাখিনি, তাই কম্পিউটার বা ভিডিও গেম খেলতে বসিয়ে দিয়েছি। তাদের খেলার মাঠগুলোকে আমরা বিপণিবিতান আর অ্যাপার্টমেন্টে ভরিয়ে দিয়েছি। সেখানে সত্যিকার গাছ-পাখির বদলে তাদের দিচ্ছি প্লাস্টিকের গাছ-ফুল, রোলার কোস্টার। তাদের ওয়ান্ডারল্যান্ডে নিয়ে যাই, কিন্তু কোনো দিন যাই কি ওয়ান্ডারল্যান্ডের পাশেরই বন কিংবা নদী চেনাতে? তারা এখন হিন্দি ও ইংরেজি ছবি ও কমিক হিরোদের চেনে, কিন্তু ডালিমকুমার আর কাজলরেখাদের জানে না, জানে না কোন গাছের কী নাম, কোন ফুলের কেমন ঘ্রাণ। শৈশবেই মানুষের ইন্দ্রিয় ও মন অতি প্রখর ও তাজা থাকে; অথচ আজকের বেশির ভাগ শিশু গাছ না দেখে পাখি না দেখে, নদী ও আকাশ তথা প্রকৃতির মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ না পেয়েই কল্পনাশক্তি বিকাশের সুযোগ হারায়। অন্যদিকে তাদের খাদ্য তালিকার বড় অংশও (আইসক্রিম, চকোলেট, বার্গার ইত্যাদি) নানান ক্ষতিকর উপাদানে ভরা। সব দিক থেকেই পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধের স্বাদ থেকে তারা বঞ্চিত।
এই বঞ্চনার মধ্যেই স্বচ্ছর বাড়ির শিশুরা টেলিভিশন, আর ভিডিও গেমে বুঁদ হয়ে থাকতে বাধ্য হয়। এসব উত্তেজক ও মনকে আসক্ত করার মতো আনন্দ-উপকরণ শিশুর মনের বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করছে কীনা, তা কি ভেবে দেখা হয়েছে? অন্যদিকে দরিদ্র, বস্তিবাসী, ফুটপাত-আশ্রয়ী শিশুদের প্রায় পশু-জীবনে রেখে দিয়ে চলতে থাকা উন্নয়ন-বিলাসের কথা এখানে বলব না। সেটা বলা কঠিন, সওয়া আরও কঠিন।
খেলা ও কল্পনার অবারিত আমন্ত্রণ, শৈশবের প্রাণস্পন্দন এটাই। শিশুদের প্রতিটি খেলাই আসলে জীবনে ঢোকার মহড়া। তাদের প্রতিটি কল্পনা—যতই অদ্ভুত তা হোক—আসলে বাস্তব দুনিয়াকে নিজের মতো করে বোঝারই চেষ্টা। এসবের মাধ্যমে তারা ভেতরে ভেতরে তৈরি হয় জীবনের জন্য। তা না করে তাদের জীবনযুদ্ধে নামিয়ে দেওয়াটা যে কত বড় নিষ্ঠুরতা, সেই সত্য আজ জ্ঞান করা চাই।
বড়রা বলছে দুষ্টুমি করো না, ভাল রেজাল্ট করো। টেলিভিশন তাকে শেখাচ্ছে ফ্যাশন, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও চকমকে হওয়ার বাসনা। চেনাচ্ছে না দেশ, জাতি ও সংস্কৃতির শোভা। শহরাঞ্চলে তারা কেবল দাদা-দাদি, নানা-নানির সাহচর্য থেকেই বঞ্চিত হয় না, বঞ্চিত হয় রূপকথা-ছড়া-শ্লোকের রঙিন জগত্ থেকেও। ফলে কল্পনার দিগন্তটি কুঁজো হয়ে যায়। সামাজিক অস্থিরতাও শিশুর মনোজগতে আঁচড় কাটে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো, বিজ্ঞাপনে শিশুদের যেমন খুশি তেমনভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা। গাড়ি-বাড়ি-টেলিভিশন-শ্যাম্পু-সিমেন্ট-রড-ইট-ঘটি-বাটি হেন জিনিস নেই, যেখানে শিশুর কমনীয়তা ও সুন্দর সত্তার বাণিজ্যিক ও রুচিহীন ব্যবহার হয় না। বিজ্ঞাপনে নারী-শরীরের ব্যবহার নিয়েও আপত্তি আছে। কিন্তু সেখানে যারা ব্যবহূত হয়, তারা তো সাবালিকা। অন্তত তারা যায় স্বেচ্ছায়। কিন্তু শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে কার ইচ্ছায়? বাবা-মায়ের ইচ্ছায়? তাহলে কি বাবা-মা শিশুদের মালিক? কথাটা কঠিন, কিন্তু অসত্য নয়। এখানেও আমরা ভুলে যাই যে শিশুর মন-মেজাজ-শরীর সবকিছুর নিজস্ব অধিকার ও আকাঙ্ক্ষা আছে। শিশুর সত্তা ব্যবহারের জিনিস নয়। শিশুরা সমাজের স্বপ্ন, ভবিষ্যতের সুবাতাস। একে খর্ব করে কোন ভবিষ্যত্ আমরা গড়তে চাইছি?
শিশুদের কটি অ্যানিমেশন ছবির গল্প বলে শেষ করি। গল্পটা এই: এক সাদা হাতি ছোট্ট লাল একটি ফুলকে বাঁচানোর জন্য বনের পশুদের সঙ্গে লড়াই করে। ফুলটিকে শুঁড়ের মধ্যে আগলে রেখে সে ছোটে। বাকি সব প্রাণী ওই ফুলটি পুড়িয়ে সুবাস বানাতে চায়। কিন্তু হাতিটি তাদের বোঝায়, এটা নিছক ফুল নয়, এর ভেতর রয়েছে আস্ত একটা জগত্। সেই জগতে আকাশের নিচে, মাটির ওপরে, বনের ধারে, নদীর পাড়ে আছে অজস্র প্রাণীর এক সুখী পৃথিবী। তারাও আমাদেরই মতো ছেলে-মেয়ে-পরিবার আর স্বপ্ন-ভালোবাসা ও আশা নিয়ে বেঁচে আছে। ফুলটি ধ্বংস করলে তার সবই ধ্বংস হবে। তখন সবাই বলে, প্রমাণ দাও যে তারা আছে?
কী প্রমাণ দেবে অসহায় হাতিটি আর তার শুঁড়ে আগলে রাখা ফুল-জগতের দুর্বল অধিবাসীরা? বন্দী হাতি তখন ফুলের ভেতর খবর পাঠায়, ‘তোমরা চিত্কার করো, তোমরা শব্দ করে জানাও যে তোমরা আছো!’
ফুলের ভেতরের জগতে তখন বিরাট আলোড়ন জাগে। সবাই ঘরবাড়ি ছেড়ে নেমে আসে মাঠে-রাস্তায়। একসঙ্গে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে বলে, ‘ও পৃথিবীর প্রাণীরা, তোমরা শুনছ? আমরা আছি!’
ক্ষমতা আর বিত্তের মোহে আমরা আজ নিজেদেরই ভুলে গেছি। তারপরও নিবিড় ভাবে কান পাতলে কেউ কেউ হয়তো টের পাবেন আমাদের শিশুদের ভেতরকার বন্দী শৈশবের হাহাকার। শুনতে পাবেন বোবা কান্নার গুমড়ানো চিত্কার, ‘ও বড় মানুষেরা, আমরাও আছি, তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ?’
>>>ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com

শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জনের সম্ভাবনা -শিক্ষা দিবস by নুরুল ইসলাম

বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের প্রতীক ১৭ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক ‘শিক্ষা দিবস’। শিক্ষার জন্য সংগ্রাম, ত্যাগ, বিজয়, গৌরব ও ঐতিহ্যের প্রতীক এই শিক্ষা দিবসের এবার ৪৭তম বার্ষিকী। ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর প্রতিভূ সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের চাপিয়ে দেওয়া গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয় শিক্ষানীতি বাতিল করে সবার জন্য শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণমুখী, বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক, সহজলভ্য, আধুনিক শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে ছাত্রসমাজ অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
১৯৫৯ সালে প্রেসিডেন্ট ও সামরিক শাসক আইয়ুব খান তত্কালীন শিক্ষাসচিব এস এম শরিফকে চেয়ারম্যান করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন করেন। এই কমিশন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর লক্ষ্য ও স্বার্থের প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি গণবিরোধী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। ১৯৬২ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে আয়ুব সরকার এই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই তথাকথিত ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’তে যেসব বিষয় সুপারিশ করা হয় তার মধ্যে ছিল: শিক্ষাকে ব্যয়বহুল পণ্যের মতো শুধু উচ্চবিত্তের সন্তানদের স্বার্থে সীমিত করা; সাধারণ মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ একেবারেই সংকুচিত করে ফেলা; শিক্ষাব্যয় পুঁজিবিনিয়োগ হিসেবে দেখে শিক্ষার্থীদের তা বহন করা; যে অভিভাবক বেশি বিনিয়োগ করবেন তিনি বেশি লাভবান হবেন; অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাকে ‘অবাস্তব কল্পনা’ বলে উল্লেখ; ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে স্নাতক পর্যন্ত ইংরেজি পাঠ বাধ্যতামূলক; উর্দুকে জনগণের ভাষায় পরিণত করা; সাম্প্রদায়িকতাকে কৌশলে জিইয়ে রাখার চেষ্টা ইত্যাদি।
এসব বিষয় ছাত্রসমাজ ও সচেতন মহলকে দারুণভাবে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এরই পরিণতিতে শিক্ষার দাবিতে ছাত্রসমাজের আন্দোলন ব্যাপক রূপ লাভ করে এবং ১৭ সেপ্টেম্বরের অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন আইয়ুব সরকারকে বাধ্য করে ওই শিক্ষানীতি স্থগিত করতে। তত্কালীন দুই বৃহত্ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন এবং ডাকসু, বিভিন্ন হল ও কলেজ ছাত্রসংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সাধারণ ছাত্রসমাজের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। যার ফলে সব আন্দোলন ও কর্মসূচির প্রতি সাধারণ ছাত্রসমাজের সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। ১৭ সেপ্টেম্বর সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ সারা দেশে হরতাল ঘোষণা করে। ওই দিন ঢাকাসহ দেশের সব শহরের রাজপথে বিরাট বিক্ষোভমিছিল চলতে থাকে। লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস প্রভৃতি তা দমন করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল থেকে ছাত্রদের একটি বিক্ষুব্ধ মিছিল আব্দুল গনি রোড হয়ে অগ্রসর হলে পুলিশ পেছন থেকে অতর্কিতে তার ওপর গুলিবর্ষণ করে। ওই দিন পুলিশের গুলিতে বাবুল, মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ শহীদ হন। বহু ছাত্র-জনতা পুলিশ ও ইপিআরের নির্যাতন ও গুলিতে সারা দেশে আহত হন। ১৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ছাত্র আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে। ছাত্রসমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সাধারণ জনগণ ছাত্রসমাজের প্রতি আরও দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করে। আইয়ুবের সামরিক সরকার তথাকথিত ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে এবং একটি গণমুখী সর্বজনীন আধুনিক শিক্ষানীতির দাবিতে, ঐতিহাসিক ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র আন্দোলন ও শহীদদের আত্মদান তথা শিক্ষার ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক ১৭ সেপ্টেম্বরকে সেদিন ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে বিগত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বহু উত্থান-পতনের মধ্যেও প্রতিবছর এই দিনটি ছাত্রসমাজ এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে আসছে।
তত্কালীন সরকার ১৯৬৪ সালে বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি কমিশন গঠন করে নতুন মোড়কে তাদের পরিকল্পিত শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থা কায়েমের পথ গ্রহণ করে। কিন্তু প্রবল ছাত্র আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার তা বাস্তবায়নে সক্ষম হয়নি।
স্বাধীন বাংলাদেশে ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশন স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি আধুনিক গণমুখী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করলেও ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর প্রায় অর্ধডজন শিক্ষানীতি প্রণীত হলেও দুর্ভাগ্যক্রমে আজও একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
২.
এবারের শিক্ষা দিবস এক নতুন সম্ভাবনাময় পরিস্থিতিতে উদ্যাপিত হচ্ছে। ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের অভূতপূর্ব রায়ের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার গঠনের পর ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবসের মূল লক্ষ্য এবং জাতির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের এক বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপকল্প-২০২১ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন, তা আমাদের বাস্তবায়ন করতেই হবে। সে জন্য আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা। আমাদের নতুন প্রজন্মকে যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে এবং এই দক্ষ নতুন প্রজন্মকেই তা বাস্তবে প্রয়োগ করে আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।
২০১১ সালের মধ্যে সব শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করা, ঝরে পড়া বন্ধ করা, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করা একেকটি বড় বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যাপক উন্নয়ন ও প্রসারের মাধ্যমে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষাকে বিশ্বমানে উন্নীত করাসহ সামগ্রিক শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা ইতিমধ্যে অনেক বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা কার্যকর করতে শুরু করেছি। আশা করি, এগুলো দেশবাসীর অজানা নয়। তবে এগুলোর সুফল পেতে সময় লাগবে। শিক্ষকেরা আমাদের আসল শক্তি। তাঁদের প্রতি দায়িত্বপালনে আমরা সচেতন রয়েছি। আবার তাঁদের কাছেও জাতির দাবি, আমাদের নতুন প্রজন্ম ও জাতির ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হিসেবে তাঁরাই প্রস্তুত করে দেবেন। একদিকে মানসম্মত আধুনিক যুগোপযোগী শিক্ষা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে হবে; সেই সঙ্গে আমাদের নতুন প্রজন্মকে নৈতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ করে প্রকৃত শিক্ষিত, জ্ঞানী, সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
দারিদ্র্য, ক্ষুধা, নিরক্ষরতা, দুর্নীতি, পশ্চাত্পদতার অবসান ঘটিয়ে, আধুনিক-উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে, বাষট্টির ঐতিহাসিক শিক্ষানীতির আন্দোলনের ৪৭ বছর পর, এবার নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আমরা খসড়া শিক্ষানীতি সবার মতামত গ্রহণের জন্য ওয়েবসাইটে (www.moedu.gov.bd) দিয়েছি। সবার মতামত নিয়েই তা চূড়ান্ত করতে চাই। আমরা আশা করব, দেশের সব শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মানুষ এবং দলমতনির্বিশেষে সাধারণ জনগণ তাদের সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শ দিয়ে প্রস্তাবিত খসড়া শিক্ষানীতিকে চূড়ান্ত করার কাজে এগিয়ে আসবেন। (সংক্ষেপিত)
নুরুল ইসলাম: শিক্ষামন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

জন্মভূমির সঙ্গে রয়েছে মানুষের এক রহস্যময় যোগসূত্র -প্রবাসী বাঙালি by আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

‘প্রবাসী বাঙালি’ শব্দটার সূচনা এ কালে নয়, ব্রিটিশ আমলে। উনিশ শতকের শেষ দিক থেকেই বাঙালি ‘বাবু’রা সারা ভারতে বিদ্বান হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ফলে ভালো চাকরিবাকরি নিয়ে তারা বাংলার বাইরে পাড়ি জমাতে শুরু করে। তবে ব্রিটিশ যুগে বাঙালির প্রবাসের দৌড় এই উপমহাদেশের বাইরে খুব একটা পৌঁছায়নি। ভারতবর্ষের নানা জায়গা, বিশেষ করে উত্তর ভারতের ছোট-বড় শহর ও অন্যান্য এলাকায় এরা বেশ ভালোভাবেই জেঁকে বসে। আগেই বলেছি, এদের অধিকাংশই ছিল উচ্চ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু। বিদ্যার জন্য ভারতবর্ষের সবখানে এদের কদর ছিল। সঞ্জীব চন্দ্রের ‘পালামৌ’, রবীন্দ্রনাথ, শরত্চন্দ্রের বেশ কিছু লেখায়, বিভূতিভূষণের আরণ্যক-এর মতো অন্যান্য লেখকের অনেক লেখায় বাঙালির এই বহির্মুখী যাত্রার ছবি রয়েছে। বিশ শতকের শুরুতেই এলাহাবাদে প্রবাসী বাঙালিদের যে বড়সড় একটা গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল তা বোঝা যায় সেখানে অতুল প্রসাদের নেতৃত্বে আয়োজিত বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের ঘনঘটা দেখেই।
প্রবাসী বাঙালি আজ শুধু এই উপমহাদেশের চৌহদ্দীতে সীমাবদ্ধ নয়, পৃথিবীর সব দেশের সব শহরে এরা ছড়িয়ে পড়েছে। দারিদ্র্যের দুঃসহ চাবুক থেকে বাঁচার জন্য বা সচ্ছল জীবনের স্বর্ণমৃগের পেছনে ছুটে বাঙালি আজ বসত গাড়েনি এমন জায়গা পৃথিবীতে কম। আমার ধারণা, আল্পসের উচ্চতম শৃঙ্গের ওপর পৌঁছাতে পারলেও সেখানে দোকান খুলে বসে থাকা অন্তত একজন বাঙালির দেখা মিলবে। গত ৪০ বছর বাংলাদেশের বাঙালিদের জীবনে বল্গাহীন গোল্ডরাশের যুগ। সৌভাগ্যের সোনার হরিণের পেছনে ছুটে লাখ লাখ বাঙালি এ সময় সারা পৃথিবীতে ছড়িয়েছে। বাংলাদেশ বা পশ্চিম বাংলার বাইরের এই বিশ্ববাংলাকে তারা বলে ‘তৃতীয় বাংলা’। তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে গেছে মূলত শিক্ষিত পেশাজীবী বাঙালিরা। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এখানকার মানুষের সামনে আচমকা সুযোগের কোটি কোটি রুদ্ধ দরজা খুলে যাওয়ার ফলে এখান থেকে শিক্ষিত মানুষের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী বাঙালি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। তাদের সংখ্যা আজ মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। লন্ডন শহরের ৮০ লাখ অধিবাসীর মধ্যে সাড়ে তিন লাখই আজ বাঙালি। নিউইয়র্কে বাঙলির সংখ্যা এক লাখের বেশি, লস অ্যাঞ্জেলেস, টরন্টো বা রোমে কম, সে কম ৫০ হাজার করে। পৃথিবীতে ছোট-বড় এমন শহর কমই আছে, যেখানে বাঙালির একটা ছোটখাটো ডেরা নেই। আজ বাংলাদেশের মানুষের জন্য কোনো দেশই যেন আর বিদেশ নয়। যে দেশে যে শহরেই যান মুহূর্তের মধ্যে সেখানে কিছু ‘বাঙালি ভাই’ পেয়ে যাবেন এবং প্রাণভরে বাংলায় কথা বলতে পারবেন। ‘প্রবাসে বাঙালিমাত্রেই সজ্জন’। কাজেই বেশ কিছু দেশায়ালি ভাইয়ের বাড়িতে ভাত-মাছের নিমন্ত্রণ পেয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-পড়া প্রবাসী বাঙালির সংখ্যা আজ ৫০ লাখের ওপর। প্রবাসী বাঙালি শ্রমিকদের পাঠানো টাকা আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের বৃহত্তম উত্স।

২.
একজন মানুষের শৈশব-কৈশোরের সুন্দর দিনগুলো যে দেশে কাটে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেটিই তার দেশ। সেটিই তার চিরকালের জন্মভূমি। যত দূরে বা যে দেশেই সে যাক, শৈশবের স্নিগ্ধ রঙিন অনুভূতিভরা দিনগুলোয় যে দেশের গাছপালা, নদী, আকাশকে সে তার রক্তকণিকায় আহরণ করেছে, সেই জন্মভূমির জন্যই তার আমৃত্যু কান্না। এর কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। আমাদের জীবনের প্রিয়তম, রঙিনতম জিনিসগুলো আমরা তো আহরণ করি আমাদের শৈশব-কৈশোরেই। এ সময় চারপাশ থেকে আমরা যা কিছুই গ্রহণ করি, তা এমনভাবে আমাদের রক্তের কণায় কণায় মিশে যায় যে তা-ই হয়ে যায় আমাদের আজন্মের পরিচয়। মৃত্যু পর্যন্ত ওই মানুষটাই আমরা থাকি। প্রবাসজীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো ওই স্বপ্ন আর ভালোবাসার দেশটাকে তাদের আচমকা হারিয়ে ফেলতে হয়। তাই দেশত্যাগী স্মৃতিভারাতুর এই মানুষগুলো পৃথিবীর নানা বিচ্ছিন্ন প্রান্তে গিয়েও এই দেশটির চারপাশেই সারা জীবন জেগে থাকে। কেবল তারাই নয়, তাদের সন্তানসন্ততি এমনকি অনেক পরের প্রজন্মের মানুষেরা—যারা নানা দেশের বাসিন্দা হয়ে পুরো ভিন্ন মানুষ হয়ে গেছে, যাদের সংস্কৃতি আলাদা, ভাষা আলাদা, পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ আলাদা, তারাও তাদের পিতৃপিতামহের ফেলে আসা সেই অতীত দেশটির জন্য—নিজেদের আদি শেকড়ের জন্য—একটা ব্যাখ্যাহীন আকুলতা অনুভব করে। যে দেশে যত দিন ধরেই তারা থাকুক, ঐতিহ্য, ধর্ম বা বর্ণগত পার্থক্যের কারণে সেখানকার মানুষের সঙ্গে তারা কখনোই পুরোপুরি এক হতে পারে না—তাদের জীবনের ভেতর কিছু পরিমাণ ফাঁকা জায়গা থেকেই যায়। উেসর সঙ্গে একাত্ম হয়ে এ জন্যই তারা হয়তো তাদের সেই শূন্য স্থান পূরণের চেষ্টা করে।
প্রবাসী জীবনের একটা খুব বড় ধরনের দুঃখের দিক আছে, সেটা হলো, যত সুখ আর সম্ভোগের মধ্যেই তারা থাকুক, শেষ হিসেবে তারা যাযাবর, উদ্বাস্তু। ঘরবাড়ি, আত্মীয়, বন্ধু-শৈশব-কৈশোর, জন্মভূমি জননী পিছে ফেলে অপরিচিত দূরদেশে, অচেনা পরিবেশে পরিচয়হীনভাবে মৃত্যু পর্যন্ত তাদের ঘুরে বেড়াতে হবে, যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজ, প্রকৃতি কোনো কিছুর সঙ্গেই তাদের আত্মার সত্যিকার যোগ নেই। তাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সন্তানসন্ততিরা মিশে যাবে ওসব দেশের জল-হাওয়া বা ভাষা-সংস্কৃতির সঙ্গে, ওইসব সংস্কৃতির বৈভব আর উত্তেজনার ভেতর মর্যাদাবান (কিংবা হয়তো তাদের মতোই মর্যাদাহীন) জীবন কাটাবে; কিন্তু তাদের সেখানে বেঁচে থাকতে হবে বহিরাগতের মতো, প্রায় অবাঞ্ছিত হিসেবে। তারা সেখানকার সবকিছুই দেখবে, উপভোগ করবে—সেসব থেকে আনন্দও হয়তো পাবে। কিন্তু কোনো কিছুকেই নিজের বলে ভাবতে পারবে না। যেন এসব তাদের নয়, অন্য কারও। যেন নাগরিক হয়েও তারা নাগরিক নয়, যেন তারা এক ধরনের চির পর্যটক। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে উদ্বাস্তুজীবনের এই গভীর দুঃখ আমি সব জায়গায় অনুভব করেছি। লক্ষ করেছি বাংলার গাছপালা-ঢাকা সবুজ গ্রাম, মেঘ-ওড়া নীল আকাশ, নদীর কলকণ্ঠ—সবকিছুর পাশে কীভাবে তাদের হূদয় মরে পড়ে আছে। ছেলেবেলার বন্ধু, শৈশব-কৈশোরের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিনী, বাংলার মাটি, বাংলার জল—সবকিছুর জন্য তাদের কী আকুতি, কী ব্যাকুলতা।
সন্দেহ নেই আমরা যারা বাংলাদেশে থাকি তাদের চেয়ে বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভেতর অনেক বেশি। এটা অকারণে নয়। আমরা যারা বাংলাদেশে বাস করছি, প্রতিদিন এর প্রিয়-অপ্রিয়, তিক্ত বা বিরক্তিকর সান্নিধ্য বা উপস্থিতি সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছি, তাদের কাছে দেশ যতখানি স্বপ্নের জিনিস, তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব আর কাঠখোট্টা। এ সম্পর্ক একেবারেই দাম্পত্য সম্পর্ক বা তেল-নুন-লাকড়ির মতো হিসাব করার ব্যাপার। অতি পাওয়ায় এ একঘেয়ে, বিরক্তিকর। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্ক দাম্পত্যের মতো বিস্বাদ, কটু বা একঘেয়ে নয়, এ সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক। বিচ্ছেদের কষ্টে এ দীর্ণ; তাই এ এমন হাহাকার-ভরা। জেলখানার কয়েদির কাছে প্রাচীরের বাইরের তুচ্ছ একটা পাখির গান বা দূরের কোনো মানুষের কণ্ঠের ছোট্ট একটু সজীব আওয়াজ যেমন মুক্ত আর চিরযৌবনের বার্তা নিয়ে হাজির হয়, তাদের কাছে মাতৃভূমিও তা-ই। দেশ হয়ে ওঠে স্বর্গাদপি গরীয়সী।
এই স্বপ্নের জন্য পৃথিবীজোড়া দেশ-বিদেশের অসংখ্য শহরে আজ লাখ লাখ বাঙালি বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাসে দিন কাটায়। অনেক উপস্থিত বাস্তব দুঃখ তাদের এই বিষণ্নতা আর অসহায়তাকে বাড়িয়ে দেয়। চোখের সামনে তারা দেখে, বিদেশে জন্ম নিয়ে বা বেড়ে উঠে তাদের ছেলেমেয়েরা ভিন্ন সংস্কৃতির ভেতর বিচ্ছিন্ন হতে হতে একসময় অচেনা হয়ে যাচ্ছে, তাদের বিজাতীয় ও অশালীন চালচলন মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। নিজেদের দুর্ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে কখনো দেশে ফিরে যাওয়ার কথাও তারা হয়তো ভাবে। কিন্তু তত দিনে নিজেদের তৈরি বিধিলিপিই তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। আজ দেশে ফিরলেও সন্তানসন্ততির সঙ্গে চিরবিচ্ছিন্নতা, না ফেরা মানেও তাদের হারানো। তারা টের পায় নির্মম অর্থকষ্টের চাবকানি বা বেশি রকম লাভের মোহে দেশ ছাড়ার পর সত্যি সত্যি বড় বেশি দেরি করে ফেলেছে তারা। সে দেশের মাটিতে তাদের শেকড় ছড়িয়ে গেছে। তাদের ছেলেমেয়েদের অস্তিত্ব বা ভবিষ্যত্ও আজ সে দেশের মাটির সঙ্গে নিয়তির মতো বাঁধা।
তাদের এ কথা ভাবতে কষ্ট লাগে যে তাদের সন্তানেরা তাদের মতো বাংলাদেশি নয়। ওই সন্তানদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে ওই দেশে। তাদের দেশ আমেরিকা বা এমনই কোনো দেশ। তাদের বাবাদের যেমন আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের সঙ্গে কোনো আত্মিক যোগ নেই, তাদেরও তেমনি নেই বাংলাদেশের সঙ্গে। সন্তানদের এভাবে অপরিচিত হয়ে ওঠার কষ্ট বাবা-মায়ের বুকে পেরেকের মতো বেঁধে। মানুষ ভাবতে ভালোবাসে তাদের জৈবিক অস্তিত্বের মতো তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও সন্তানদের মধ্য দিয়ে বহমান থাকুক। কিন্তু যখন তারা দেখে, তাদের ছেলেমেয়েরা আলাদা দেশের অপরিচিত মানুষ হয়ে যাচ্ছে, নিজস্ব সংস্কৃতির গৌরবময় পরিচয়কে পর্যন্ত সম্মান করছে না, তখন তারা এক নিদারুণ একাকিত্বে ভোগে। এ দেশে আসার সময় এই পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। যে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য একদিন তারা প্রিয় জন্মভূমি, বন্ধু, ভাই, আত্মীয়স্বজন ছেড়ে অনিশ্চিত বিদেশের পথে পা বাড়িয়েছিল, তাদের উপেক্ষা-তাচ্ছিল্য তাদের ভেতরে ভেতরে কাঁদায়, ভেঙে দেয়।
পৃথিবীর সব দেশেই বাঙালিদের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য যে উত্কণ্ঠা, আগ্রহ বা ব্যাকুলতা দেখি, তা দেখে উগ্র জাতীয়তাবাদী না হয়েও আমার মনে হয়েছে মানুষ আর তার জন্মভূমির মধ্যে রয়েছে এক রহস্যময় যোগসূত্র।

৩.
দেশের জন্য এই ব্যাকুলতা প্রবাসীদের মধ্যে যে কতখানি প্রবল, একটা গল্প শুনিয়ে তা বোঝানোর চেষ্টা করি। আগেই বলেছি, বিদেশে বাস করা সম্পন্ন বা সচ্ছল বাঙালিদের মধ্যে এই ব্যাকুলতা যতখানি তার চেয়ে এ অনেক বেশি পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শ্রমিক শ্রেণীর গরিব-অসহায় মানুষের মধ্যে। সচ্ছল মানুষদের মনকে জন্মভূমির রক্তিম হাতছানি যে কখনো কখনো উতলা করে না তা নয়। কিন্তু গাড়ি-বাড়ি, বিলাস-বৈভবে, ঝলমল করা তাদের জীবনে সে পিছুটান খুব বড় কিছু নয়। তা ছাড়া ইচ্ছা করলেই তো তারা মাঝেমধ্যে দেশে এসে ঘুরে যেতে পারে। তারা তা যায়ও। তাই বিদেশে থাকলেও দেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার কষ্ট তাদের অত প্রবল নয়। কিন্তু গরিব প্রবাসীদের ব্যাপারে ঘটনাটা আলাদা। আদম বেপারিদের খপ্পরে পড়ে জমি-বাড়ি বিক্রি বা বন্ধক দিয়ে নামমাত্র রোজগারের আশায় অচেনা দূর বিদেশের পথে পাড়ি জমায় তারা। দূরদেশের নির্মম আবহাওয়া বা ঝলসানো রোদের ভেতর শরীর আয়ু ক্ষয় করে অমানুষিক শ্রমে তাদের জন্য দূর প্রবাস থেকে এরা বছরের পর বছর টাকা পাঠায়। সেই টাকা দিয়ে তার ভাইয়েরা বাজার থেকে চড়াদামে মাছ-মাংস কিনে নবাবী হালে দিন কাটায়, চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে ফূর্তিতে সময় গুজরান করে। ভাইয়ের পাঠানো টাকায় তার জন্য জমি কেনার বদলে অনেক সময় গোপনে তা নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেয়। তবু এই মানুষগুলো তাদের মুখ স্মরণ করেই হাজারো শৌখিন জিনিসে বড় বড় ব্যাগ-বস্তা ভর্তি করে বাড়ি ফেরে।
এমনই একদল দুঃখী মানুষের সঙ্গে বছর তিনেক আগে দেখা হয়েছিল, দুবাই এয়ারপোর্টে। সেবারও আমেরিকা থেকে ফিরছিলাম। দুবাইয়ে প্লেন পাল্টে ঢাকার প্লেনে উঠছি। বের্ডিং কাউন্টারে গিয়ে দেখি ফ্লাইটে বিদেশি নেই বললেই চলে। কাউন্টারজুড়ে গিজগিজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের নানা জায়গা থেকে জড়ো হওয়া ঘরমুখো বাঙালি শ্রমিকের দল। বুঝলাম, এদের নিয়মিত আনা-নেওয়ার জন্যই এমিরেটস, ইতিহাদ, কাতার বা কুয়েত এয়ারলাইনসের এত ঢাকামুখো ফ্লাইট। এদের কেউ তিন বছর কেউ চার বছর কেউ এমনকি পাঁচ বছর পর দেশে ফিরছে, সবার সঙ্গে বিরাট বিরাট বাক্স-পেঁটরার ভেতর কেনাকাটা করা সাধ্যমতো জিনিসপত্র। প্রিয়জনের জন্য কেনা এই জিনিসগুলো তাদের হাতে তুলে দেওয়ার স্বপ্নে তাদের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। দেশের জন্য কী ব্যাকুলতা আর স্বপ্ন সবার চোখে। বাঁধভাঙা বন্যার মতো উদ্বেল হূদয় নিয়ে ফ্লাইটের পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ সময়টুকু সহ্য করার শক্তিও যেন তারা হারিয়ে ফেলেছে। যেন পারলে দুবাইয়ে প্লেনে উঠেই সরাসরি ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে যায়। কথা বলে বোঝা গেল এদের অধিকাংশই লিখতে-পড়তে পর্যন্ত জানে না। আমার পাশেই বসেছিলেন রীতিমতো স্যুটটাইপরা ডাকসাইটে এক ভদ্রলোক। কিছুক্ষণ আলাপের পরে একগাল বিগলিত হাসির সঙ্গে হাতের ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের কাগজ দুটো আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ভাবলাম, আমার ওগুলো দরকার ভেবেই হয়তো ওগুলো আমাকে দিচ্ছেন। বললাম, আমার আছে, লাগবে না।
‘একটু ফিলাপ কইরা দিবেন স্যার?’ মুখে দাঁত বের করা বিগলিত হাসি। কী আশ্চর্য! এ রকম একজন স্যুটপরা পুরোদস্তুর ডাঁটপাটওয়ালা ভদ্রলোক লিখতে পর্যন্ত জানেন না? কিন্তু না, এমন বাঙালি একজন-দুজন না, হাজারে হাজারে পাবেন মধ্যপ্রাচ্যের মতো পৃথিবীর নানা দেশের খেটে-খাওয়া মানুষের ভিড়ে।
কথায় কথায় জানলাম, তিনিও একজন শ্রমিক। বাড়ি সিলেটে। রিয়াদে কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। প্রথম এসেছিলেন বসরায়, ইরাকে। সেখানে যুদ্ধের তাড়া খেয়ে আরবে পাড়ি জমিয়েছেন।
তার ফরম ফিলাপ শেষ হতেই আরেকটা হাত এগিয়ে এল সামনের দিক থেকে। তারটা শেষ হতেই দেখি চারপাশ থেকে ডজনখানেক হাত আমার দিকে এগিয়ে আছে। সব হাতে একই ফরম। সবাই যে ভদ্রভাবে অনুরোধ করছে তা-ও না। অনুরোধ করার ভাষাও অনেকে জানে না। এ ধরনের দেহাতী মানুষের পক্ষে কী করেই বা তা সম্ভব?
‘এই যে, দেন তো, আমারডা ফিলাপ কইরা দেন।’
মনে হয় হুকুম করছে।
দুঃখী এই লোকগুলোর জন্য মমতায় মনটা ভরে উঠল। প্লেনযাত্রার পুরো সময়টা এদের ফরম ফিলাপ করে চললাম। এদিকে বাংলাদেশ এগিয়ে আসছে। প্লেন ভর্তি লোকগুলোর মধ্যে টানটান উত্তেজনা। কখন আসবে বাংলাদেশ। কেন আসছে না। লোকগুলোর চেহারায় আগ্নেয় উগ্রতা। সবার কথাবার্তার বিষয় একটাই: বাংলাদেশ। ঘরে ফেরার আগ্রহে, আনন্দে, উত্তেজনায় যেন ফেটে পড়ছে সবাই।
সামনের টিভির পর্দায় প্লেনের ছুটে চলার ছবি চোখে পড়ছে। আরব সাগরের ধার দিয়ে করাচির পাশ কাটিয়ে দিল্লি-কানপুর পেরিয়ে প্লেন এখন বিহারের ওপর। এখনো অন্তত ঘণ্টাখানেক বাকি। যাত্রীরা অস্থির, বেসামাল। উত্তেজনায় যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। কোথায় বাংলাদেশ, কোথায় তুমি? মাতৃভূমি, তুমি কত দূর! অধিকাংশ লোকই মানচিত্র চেনে না। বুঝতে পারছে না ঠিক কোনখানে আছে। হঠাত্ জানালার পাশ থেকে কে একজন চিত্কার করে উঠল: ওই যে! ওই যে।
তার ব্যগ্র চিত্কার সারা প্লেনে যেন কেঁপে কেঁপে বেড়াতে লাগল। সবাই যেন মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিল। হঠাত্ প্লেনের ভেতর ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। প্লেন ভর্তি প্রায় সব লোক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে হুড়মুড় করে জানালার দিকে ঝুঁকে কী যেন আঁতিপাতি করে খুঁজছে। গলায় শুধু একটাই চিত্কার—কই? কই? (কোথায় আমার দেশ—ভাই, সন্তান, জীবনসঙ্গী, বাপ, মা, কোথায় তোমরা?) প্লেন ভর্তি এত লোক পাগলের মতো উঁকিঝুঁকি দিয়ে শুধু বাংলাদেশ দেখার চেষ্টা করছে।
হঠাত্ গোটা প্লেন ভর্তি লোক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলে যে বিমানের বিপদ হতে পারে সে জ্ঞান নেই এই লোকগুলোর। বিমানবালা আর পুরুষ ক্রুরা ধমক দিয়ে, চিত্কার করে পাগলের মতো দুই হাতে টেনেহিঁচড়ে ঘাড় চেপে তাদের বসানোর চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু জানালা থেকে তাদের ফেরানো সোজা নয়। প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশ এমনই এক জ্বলন্ত রূপসী। আমাদের কাছে এর কতটুকু?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: লেখক, প্রাবন্ধিক। প্রতিষ্ঠাতা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র।

হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ রজনী ‘লাইলাতুল কদর’ -সিয়াম সাধনার মাস ধর্ম by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

আল্লাহ তাআলা যে মহিমাময় রাত্রিকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন, যে একটি মাত্র রজনীর ইবাদত-বন্দেগিতে হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও অধিক সওয়াব অর্জিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, উম্মতে মুহাম্মদীর পরম সৌভাগ্য যে কালপরিক্রমার ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর মাহে রমজানে সেই মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর পুনরায় কল্যাণ, শান্তি ও মুক্তির সওগাত নিয়ে মুসলমানদের জীবনে ফিরে আসে। ‘লাইলাতুল কদর’ আরবি শব্দ। এর অর্থ অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্ব্বিত রাত বা পবিত্র রজনী। আরবি ভাষায় ‘লাইলাতুন’ অর্থ হলো রাত্রি বা রজনী এবং ‘কদর’ শব্দের অর্থ সম্মান, মর্যাদা। এ ছাড়া এর অন্য অর্থ হলো ভাগ্য, পরিমাণ ও তাকদীর নির্ধারণ করা। এ রাত্রিকে ‘লাইলাতুল কদর’ হিসেবে নামকরণ করার কারণ হলো, এ রজনীর মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদীর সম্মান বৃদ্ধি করা হয়েছে বা এ রাতে মানবজাতির তাকদীর পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তাই এ রাত অতি পুণ্যময় ও মহাসম্মানিত।
লাইলাতুল কদর এমন মহিমান্বিত বরকতময় ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এ জন্য যে এ রাতের শ্রেষ্ঠত্ব মাহাত্ম্য ও মর্যাদার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এ গৌরবময় রজনীতে অবতীর্ণ হয়েছে মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও মুক্তির সনদ মহাপবিত্র ঐশী গ্রন্থ ‘আল-কোরআন’। একদিন নবী করিম (সা.) বনী ইসরাঈলের শামউন নামের একজন আবিদ-জাহিদের দীর্ঘকালের কঠোর সাধনা সম্পর্কে বলছিলেন। সেই মহত্ ব্যক্তি এক হাজার মাস লাগাতার দিবাভাগে সিয়াম ও জিহাদে রত থাকতেন এবং সারা রাত জেগে থেকে আল্লাহর ইবাদতের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতেন। উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম আল্লাহর এই নেক বান্দার কঠোর সাধনার কথা শুনে বলতে লাগলেন, ‘হায়! আমরাও যদি ঐ লোকটির মতো দীর্ঘায়ু পেতাম, তাহলে আমরাও ঐ রকম ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে দিবস-রজনী অতিবাহিত করতে পারতাম।’ এমন সময় সূরা ‘আল-কদর’ নাজিল হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কী জানো? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত।’ (সূরা আল-কদর, আয়াত ১-৫)
শবে কদরের যাবতীয় কাজের ইঙ্গিত দিয়ে এ রাতের অপার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, ‘হা-মীম! শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) এক মুবারকময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।’ (সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ১-৪) কদরের রাতে অজস্রধারায় আল্লাহর খাস রহমত বর্ষিত হয়। এ রাতে ফেরেশতাগণ ও তাদের নেতা হজরত জিবরাঈল (আ.) পৃথিবীতে অবতরণ করে ইবাদতরত সব মানুষের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করতে থাকেন। এ রাতে এত অধিকসংখ্যক রহমতের ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন যে সকাল না হওয়া পর্যন্ত এক অনন্য শান্তি বিরাজ করতে থাকে। হাদীস শরিফে বর্ণিত আছে, শবে কদরে হজরত জিবরাঈল (আ.) ফেরেশতাদের বিরাট এক দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাজরত অথবা জিকরে মশগুল থাকে তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। (মাযহারী)
লাইলাতুল কদরে পরবর্তী এক বছরের অবধারিত বিধিলিপি ব্যবস্থাপক ও প্রয়োগকারী ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এতে প্রত্যেক মানুষের বয়স, মৃত্যু, রিযিক, বৃষ্টি ইত্যাদির পরিমাণ নির্দিষ্ট ফেরেশতাদের লিখে দেওয়া হয়, এমনকি এ বছর কে হজ করবে, তাও লিখে দেওয়া হয়। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর উক্তি অনুযায়ী চারজন প্রধান ফেরেশতাকে এসব কাজে সোপর্দ করা হয়। যথাক্রমে তাঁরা হলেন হজরত ইসরাফিল (আ.), হজরত মীকাঈল (আ.), হজরত আযরাঈল (আ.) ও হজরত জিবরাঈল (আ.)। (তাফসীরে মারেফুল কোরআন)
লাইলাতুল কদরের মহিমা অপার। হাজার মাস ইবাদতে যে সওয়াব হয়, কদরের এক রাতের ইবাদত তার চেয়ে উত্তম। লাইলাতুল কদরের এ ফজিলতময় রাতে মুমিন মুসলমানদের ওপর আল্লাহর অশেষ রহমত ও নিয়ামত বর্ষিত হয়। লাইলাতুল কদরে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে মাগফিরাত, নাজাত ও ক্ষমা পাওয়ার পরম সুযোগ লাভ করা যায়। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি এ রাত ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করবে আল্লাহ তার পূর্বে কৃত সব গুনাহখাতা মাফ করে দিবেন।’ অন্য একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে আত্মসমর্পিত হূদয় নিয়ে ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাবে আল্লাহ তার ইজ্জত ও মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিবেন।’
লাইলাতুল কদরের রজনীতে যে বা যারা আল্লাহর আরাধনায় মুহ্যমান থাকবে মহান স্রষ্টা তার ওপর থেকে দোজখের আগুন হারাম করে দেবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সমস্ত রজনী আল্লাহ তাআলা লাইলাতুল কদর দ্বারাই সৌন্দর্য ও মোহনীয় করে দিয়েছেন, অতএব তোমরা এ বরকতময় রজনীতে বেশি বেশি তাসবিহ-তাহলিল ও ইবাদত-বন্দেগিতে রত থাক।’ অন্য হাদীসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের কবরকে আলোকিত পেতে চাইলে মহিমান্বিত লাইলাতুল কদর রাতে জেগে রাতব্যাপী ইবাদত-বন্দেগিতে কাটিয়ে দাও।’ সুতরাং আল্লাহর অশেষ রহমতে আবৃত এ রাত্রি যাতে বৃথা না যায়, সে জন্য রাত্রিব্যাপী ইবাদত-বন্দেগি, তাসবিহ-তাহলীল এবং অন্তরের আকুতি ভরা প্রার্থনার মাধ্যমে রাহমানুর রাহীমের অসীম করুণা ও ক্ষমা ভিক্ষা করা বান্দার জন্য খুবই জরুরি।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে কদরের রাতে (ইবাদতের জন্য) দণ্ডায়মান হয়, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (বুখারী ও মুসলিম) হজরত্রআয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা রমজানের শেষ ১০ রাতে শবে কদর সন্ধান করো।’ (বুখারী ও মুসলিম) আরেকটি হাদীসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে তোমরা শবে কদর সন্ধান করো।’ (বুখারী)
সুতরাং কিয়াম করা, ইবাদত বা সাধনা করা দ্বারা এ রাতে তারাবি-তাহাজ্জুদসহ অধিক নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, একাগ্রচিত্তে দোয়া এবং অতীত পাপমোচনে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য পরিবার-পরিজনকে উদ্বুদ্ধ করা উচিত। এসব ইবাদতের মাধ্যমে রাত্রি জাগরণ করাই মুমিন মুসলমানের প্রধান কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সিজদায় বান্দা তার প্রভুর অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। তাই তোমরা অধিক দোয়া করো।’ (মুসলিম) হজরত আয়েশা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ! আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তখন কী করব? তিনি বললেন: তুমি বলবে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুব্বুন, তুহিব্বুল আফ্ওয়া ফা’ফু আন্নী’, অর্থাত্ হে আল্লাহ্! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করে দিতে ভালোবাসেন, অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন।’ (তিরমিযি)
লাইলাতুল কদর গোটা মানবজাতির জন্য অত্যন্ত পুণ্যময় রজনী। এ রাত্রি বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর অশেষ রহমত, বরকত ও ক্ষমালাভের অপার সুযোগ এনে দেয়। এ রাত হচ্ছে মহান আল্লাহর কাছে সুখ, শান্তি, ক্ষমা ও কল্যাণ প্রার্থনার এক অপূর্ব সুযোগ। এ রাতে অবতীর্ণ মানবজাতির পথ প্রদর্শক ও মুক্তির সনদ পবিত্র কোরআনের অনুপম শিক্ষাই ইসলামের অনুসারীদের সার্বিক কল্যাণ ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি, ইহকালীন শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তির পথ দেখায়। অতএব, আসুন! মাহে রমজানে অফুরন্ত নিয়ামতের আধার এ লাইলাতুল কদর তালাশ করতে সচেষ্ট হই এবং এর সম্ভাব্য রাতগুলোতে সমগ্র রাত ইবাদত-বন্দেগিতে নির্ঘুম কাটিয়ে দিই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে সৌভাগ্য অর্জনের তওফিক দান করুন, কেননা এ রাতের কল্যাণলাভে ব্যর্থ ব্যক্তি মহা হতভাগা বলে গণ্য হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।

বিরোধী দল সংসদে ফিরে আসুক -সংসদকে প্রাণবন্ত করুন

নবম জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোর সাংসদেরা সংসদ অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না, কিন্তু সাংসদ হিসেবে প্রাপ্য সব সুযোগ-সুবিধাই তাঁরা নিচ্ছেন। প্রথম আলোয় বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এর বিবরণ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন উপলক্ষে তাঁদের বিদেশভ্রমণ এবং এর মাধ্যমে আর্থিক ও অবকাঠামোগত সুবিধাগুলো ভোগ করার তথ্য রয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এ ছাড়া সাংসদদের আবাসন-সুবিধা, নিয়মিত বেতন-ভাতা ইত্যাদি সুবিধাও তাঁরা নিচ্ছেন। প্রথম অধিবেশনের পর থেকে পাঁচ মাস ধরে সংসদ অধিবেশন বর্জন করে চলেছেন বলে তাঁদের কেউ যে এসব সুযোগ-সুবিধা নেওয়া থেকে বিরত হয়েছেন, এমন তথ্য নেই।
এবারই যে প্রথম এমনটি ঘটছে, তা মোটেও নয়। অতীতেও একইভাবে বিরোধীদলীয় সাংসদদের অধিবেশনের পর অধিবেশন বর্জন চলেছে, কিন্তু সব সুযোগ-সুবিধাই তাঁরা ভোগ করেছেন। বরং এবার কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ করা যাচ্ছে। যেমন, অধিবেশন বর্জন করলেও বিরোধীদলীয় সাংসদেরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সভায় অংশ নিচ্ছেন, মতামত দিচ্ছেন। ফলে পরোক্ষভাবে এবং কিছু মাত্রায় হলেও সংসদীয় কার্যক্রমে তাঁরা ভূমিকা রাখছেন। এটি বেশ ইতিবাচক একটি অনুশীলন। কেননা, এর মধ্য দিয়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কিছুটা হলেও দায়িত্বশীলতার প্রকাশ ঘটছে।
তবে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সভায় যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সাংসদদের দায়িত্ব শেষ হওয়ার নয়। সংসদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে বিভিন্ন জাতীয় বিষয়ে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া, মতামত প্রকাশ করা, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন করে জবাবদিহির পথ প্রশস্ত করা—সব সাংসদেরই উচিত এই দায়িত্বগুলো পালন করা এবং এর কোনো বিকল্পই নেই। বিরোধী দলের সাংসদেরা বর্তমান সংসদের শুধু প্রথম অধিবেশনটিতেই উপস্থিত ছিলেন। তারপর অতি গুরুত্বপূর্ণ বাজেট অধিবেশনে তাঁরা ছিলেন না; যোগ দেননি সম্প্রতি মুলতবি হওয়া অধিবেশনেও। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে অধিবেশন আবার শুরু হলে সেটিতেও তাঁরা অংশ নেবেন কি না, তা জানা যায়নি। বিদেশভ্রমণসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি এভাবে অধিবেশনের পর অধিবেশন বর্জন করা শোভনীয় নয়।
সেনাকুঞ্জের ইফতার পার্টিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া এক টেবিলে ইফতার করেছেন, তাঁদের মধ্যে কুশল বিনিময় হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেত্রীকে সংসদে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তারপর আর কোনো সুসংবাদ নেই। আসলে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে যোগাযোগ অপরিহার্য, আমাদের দেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা অনুপস্থিত। উভয় পক্ষ মাঠে-ময়দানে, সভা-সেমিনারে, সংবাদমাধ্যমে পরোক্ষভাবে পরস্পরের উদ্দেশে নানা ধরনের কথা বলে, কিন্তু সরাসরি সংলাপের উদ্যোগ নেয় না। এভাবে তো গণতন্ত্র ফলপ্রসূ হওয়ার নয়।
সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হলে সংসদ অধিবেশনে সব দলের সাংসদদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আমরা আশা করব, অক্টোবরে অধিবেশন আবার শুরু হলে বিএনপিসহ সব দলের সাংসদেরা অংশ নেবেন। বাদ-প্রতিবাদ, তর্ক-বিতর্ক যা কিছুই হোক না কেন, সাংসদেরা তা করবেন অধিবেশনে হাজির হয়ে। এটাই শোভন, এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি। জনগণের প্রত্যাশাও তাই। আমরা একটি প্রাণবন্ত সংসদ দেখতে চাই।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য বিরোধ নিয়ে উত্তেজনা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত শুক্রবার চীন থেকে আমদানি করা মোটরগাড়ির চাকার ওপর জরুরি ভিত্তিতে শুল্ক আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর ফলে বিদ্যমান চার শতাংশ হারে আমদানিশুল্কের সঙ্গে আরও ৩৫ শতাংশ হারে শুল্ক যোগ হয়ে চীন থেকে চাকা আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। প্রথম বছরের জন্য ৩৫ শতাংশ হারে বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরের জন্য এ হার হবে যথাক্রমে ৩০ ও ২৫ শতাংশ।
মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর দাবির মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত শুক্রবার উচ্চহারে আমদানিশুল্ক আরোপের নির্দেশে স্বাক্ষর করেছেন।
ট্রেড ইউনিয়নের দাবি, চীন থেকে সস্তায় চাকা আমদানির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য সাত হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তে নিশ্চুপ বসে নেই চীন। তারা বরং দুই দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছে।
এর অংশ হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চহারে শুল্ক আরোপের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য আবেদন জানিয়েছে।
এর ফলে সংস্থার নিয়মানুসারে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দুই দেশ নিজেদের মধ্যে বসে আলোচনা করে বিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারবে। যদি এই সময়ের মধ্যে সমঝোতা না হয়, তাহলে চীন ডব্লিউটিও বিরোধ নিষ্পত্তি প্যানেলের হস্তক্ষেপ চাইতে পারবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পোলট্রি এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ সেদেশে ‘ডাম্পিং’ করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা হবে বলে সোমবার চীন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
যদিও চীন সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, এর সঙ্গে চাকার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চহারে শুল্ক আরোপের কোনো সম্পর্ক নেই। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, চীনের এ পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছুটা উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশের সস্তা শ্রম ও ইপিজেড ভারতীয় বিনিয়োগের বড় সুযোগ -ঢাকা চেম্বারে ভারতীয় হাইকমিশনার

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, বাংলাদেশের সস্তা শ্রম ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) থাকায় ভারতীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের বড় ধরনের সুযোগ রয়েছে। ইপিজেডে যৌথ বিনিয়োগে শিল্প স্থাপন করে ভারতীয় কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উত্পাদন করে ভারতের বাজারে বিক্রিরও সুযোগ রয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-ব্যবধান কমে আসবে।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) এবং ভারতের ক্যাপেক্সেলের যৌথভাবে আয়োজিত ‘পণ্য প্রদর্শন ও ক্রেতা-বিক্রেতা সম্মেলন’-এ তিনি এসব কথা বলেন। তিনি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে ডিসিসিআই সভাপতি জাফর ওসমানের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতা চিত্তরঞ্জন ভট্টাচার্য, ডিসিসিআই সহসভাপতি মো. সিরাজউদ্দিন মালিক, পরিচালক রফিকুল ইসলাম খান, আলহাজ মো. নাসিরউদ্দিন খান, এম আনওয়ারুল হক, মো. সিরাজুল ইসলাম, এম শাহজাহান খান প্রমুখ।
দীপংকর তালুকদার বলেন, বর্তমান সরকার দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য-ঘাটতি কমাতে কাজ করে যাচ্ছে। দেশে শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার বিদ্যুত্ খাতের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের তৈরি পোশাক, সিরামিক, চামড়া, পাট ও পাটজাত শিল্প, আইসিটি প্রভৃতি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য আহ্বান জানান। তিনি বিদেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মান ও দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
ডিসিসিআই সভাপতি জাফর ওসমান বলেন, এ আয়োজন দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য-ঘাটতি হ্রাস, বাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

উপযুক্ত পাঁঠার অভাব

নেপালে বছরের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব পালনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। আর এই সময় রাজধানী কাঠমান্ডুতে বলির জন্য উপযুক্ত পাঁঠার সংকট দেখা দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সরকারি কর্মকর্তারা এ কথা জানান। সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব ‘দুর্গাপূজা’ বা ‘দশায়ন’-এ পাঁঠা বলি দেওয়া উত্সবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংকট কাটাতে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে প্রয়োজনীয় পাঁঠা সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে সে দেশের খাদ্য বিভাগ।
খাদ্য বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক বিজয়া থাপা বলেন, ‘উত্সবের সময় কাঠমান্ডুতে সাধারণত পাঁঠার ঘাটতি দেখা দেয়। ওই সময় পাঁঠার চাহিদাও অনেক বেড়ে যায় এবং দামও আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।’
১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ দিনব্যাপী দুর্গাপূজা উত্সব শুরু হবে।

মায়ের পথ অনুসরণ করলেন রাহুল গান্ধী

মাকে অনুসরণ করেছেন ছেলে রাহুল গান্ধী। আগের দিন মা কংগ্রেসের নেত্রী সোনিয়া গান্ধী বিমানের ইকোনমি ক্লাসে (দ্বিতীয় শ্রেণী) করে দিল্লি থেকে মুম্বাই গেছেন। আর গতকাল মঙ্গলবার দলের সাধারণ সম্পাদক ও সোনিয়া-তনয় রাহুল গান্ধী আকাশপথে না গিয়ে ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় চেপে দিল্লি থেকে পাঞ্জাবে গেলেন। সরকারের ব্যয় সংকোচননীতির সমর্থনে তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।
দিল্লির রেল কর্মকর্তারা জানান, রাহুল গান্ধী গতকাল সকাল ছয়টায় ব্যাপক নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রেলস্টেশনে আসেন। এরপর তিনি ‘স্বর্ণ শতাব্দী এক্সপ্রেস’-এ চড়েন। রাহুল গান্ধী ট্রেনটির তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় উঠলে সাধারণ যাত্রীরা তাঁকে দেখে রীতিমতো চমকে ওঠে। চার ঘণ্টা ভ্রমণ শেষে তিনি পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় পৌঁছেন। এ সময় পুরো যাত্রাপথে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
কংগ্রেসের তরুণ কর্মীদের একটি কর্মশালায় অংশ নিতে রাহুল গান্ধী পাঞ্জাব ভ্রমণ করেন। কর্মশালায় অংশগ্রহণ শেষে গতকাল সন্ধ্যায় একই ট্রেনের একই শ্রেণীর কামরায় চেপে তাঁর দিল্লি ফেরত যাওয়ার কথা।
রাহুলের সফরসঙ্গী ছিলেন রাজস্থানের সাংসদ হিতিন্দার সিং, হরিয়ানার সাংসদ অশোক কানওয়ার ও তামিলনাড়ুর সাংসদ মানিক ঠাকুর।
সরকারের ব্যয় সংকোচননীতি গ্রহণের আগে ভারতের রাজনীতিবিদেরা সাধারণত ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারে করে লুধিয়ানায় যেতেন। কারণ দিল্লি থেকে লুধিয়ানার মধ্যে কোনো সরাসরি বিমান যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই।

সোমালিয়ায় মার্কিন সেনা অভিযানে আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা নিহত

আফ্রিকার সহিংসতাপূর্ণ দেশ সোমালিয়ায় মার্কিন সেনাদের হামলায় আল-কায়েদার একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হয়েছেন বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে। ওই জঙ্গি নেতা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এফবিআইয়ের একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। কয়েক বছর ধরে মার্কিন সেনারা তাঁকে খুঁজছিল।
গত সোমবার সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন সেনারা বিশেষ অভিযান চালিয়ে কেনীয় বংশোদ্ভূত ওই জঙ্গি নেতাকে হত্যা করে। তাঁর নাম সালেহ আলী সালেহ নাভান। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং সোমালিয়া সরকারের কয়েকটি সূত্র এ খবর নিশ্চিত করেছেন।
২০০২ সালে কেনিয়ায় ইসরায়েলের মালিকানাধীন একটি হোটেলে হামলার জন্য জঙ্গি নেতা নাভানকে দায়ী করা হয়। ওই হামলায় ১৫ ব্যক্তি মারা যায়। একই বছর ইসরায়েলের একটি বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্যও তাঁকে দায়ী করা হয়।
সোমালিয়ার চরমপন্থী ইসলামি গোষ্ঠী আল-শাহাব তাদের নেতাকে হত্যার বদলা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনটির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, মুসলমানরা এ হত্যার পাল্টা জবাব দেবেই। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে ইসলামের চিরন্তন শত্রু। আমরা তাদের কাছ থেকে কখনোই ক্ষমা আশা করতে পারি না। আর তাদেরও আমাদের কাছ থেকে কখনো ক্ষমা প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।’
সোমালিয়া সরকারের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা জানান, গত সোমবার বেলা দেড়টার দিকে রাজধানী মোগাদিসুর ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে বারাবি জেলার এরিল গ্রামে জঙ্গি নেতা নাভান কয়েকজন বিদেশি সহযোদ্ধা নিয়ে একটি গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন। এ সময় মার্কিন সেনারা একটি হেলিকপ্টার থেকে ওই গাড়িতে গোলা ছোড়ে। এতে জঙ্গি নেতা নাভান ও তাঁর চার বিদেশি কমান্ডার নিহত হন। নাভানের মরদেহ বর্তমানে মার্কিন সেনাদের হেফাজতে রয়েছে।
মোগাদিসুতে সম্প্রতি বিদ্রোহীদের হাতে একজন ফরাসি নিরাপত্তা উপদেষ্টা অপহূত হন। এ ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর এ অভিযান চালানো হলো। ওই ফরাসি উপদেষ্টা পরে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে বিদ্রোহীদের হাতে এখনো আরও একজন ফরাসি নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিম্মি রয়েছেন। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, নাভানকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে বিদ্রোহীরা এখন তাঁকে মেরে ফেলতে পারে।
সোমালিয়া সরকারের কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, নাভানের বিরুদ্ধে অভিযানে ছয়টি হেলিকপ্টার অংশ নেয় এবং তারা দুটি গাড়ির ওপর হামলা চালায়।
এ অভিযানের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রেখেছে এমন কয়েকটি মার্কিন সূত্র বলেছে, তাদের বিশ্বাস, সোমবারের অভিযানে জঙ্গি নেতা নাভান মারা গেছেন।
পেন্টাগনের মুখপাত্র ব্রায়ান হোয়াইটম্যান অবশ্য এ অভিযানের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেছে, এ অভিযানে ফরাসি সেনারাও অংশ নিয়েছে। তবে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, আল-কায়েদার শীর্ষস্থানীয় নেতা নাভান ২০০২ সালে কেনিয়ায় ইসরায়েলের মালিকানাধীন একটি হোটেলে হামলার পরপরই সোমালিয়ায় পালিয়ে আসেন। কেনিয়ার কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ১৯৯৮ সালে আফ্রিকার দুটি দেশে মার্কিন দূতাবাসে হামলার পেছনেও নাভানের হাত রয়েছে।
সোমালিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী আল-শাহাবের সঙ্গে আল-কায়েদার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি। তাঁরা বলছেন, আল-শাহাব সোমালিয়ায় আল-কায়েদার হয়ে কাজ করছে।

করাচির তেলবন্দরে হামলার পরিকল্পনা নস্যাত্: কর্তৃপক্ষ

পাকিস্তানের বাণিজ্যিক রাজধানী করাচিতে তেলবন্দর কমপ্লেক্সের কাছে গতকাল মঙ্গলবার বন্দুকধারীদের সঙ্গে পুলিশের গুলিবিনিময় হয়েছে। পুলিশের ধারণা, বড় ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর পরিকল্পনা করছিল বন্দুকধারীরা। তাদের তত্পরতায় তা ব্যর্থ হয়েছে। এ সময় বন্দুকধারীদের গুলিতে কমপ্লেক্সের একজন নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন।
করাচি শহরের পুলিশের প্রধান ওয়াসিম আহমেদ জানান, বোরকা পরিহিত তিনজন পুরুষ বন্দুকধারী একটি ভ্যানে চড়ে তেলবন্দর কমপ্লেক্সে ঢুকতে চাইলে নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের বাধা দেন। বন্দুকধারীরা নিরাপত্তারক্ষীদের গুলি করে। এ সময় টহল পুলিশের একটি ভ্যান ওই কমপ্লেক্সের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশের সদস্যরা বন্দুকধারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে তারা পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ১০টি গ্রেনেড ও তিনটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল উদ্ধার করেছে।

ইসরায়েলি নির্যাতনের শিকার ফিলিস্তিনি শিশুরা

আপনি শিশুদের ধরলেন, চোখ বাঁধলেন, হাতকড়া পরালেন। ভয়ে কাঁপছে তারা। মাঝেমধ্যে তাদের পা দুটোও বাঁধা হয়। এ কারণে তাদের শরীরে রক্তসঞ্চালন পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। চারপাশে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও কিছু বুঝতে পারে না তারা। আপনি তাদের নিয়ে কী করতে যাচ্ছেন, তারা সেটা জানে না। তারা শুধু জানে, আপনারা সশস্ত্র সৈনিক। আপনারা মানুষ হত্যা করেন। সম্ভবত তারা এটাই ভাবে, তাদেরও আপনারা হত্যা করতে যাচ্ছেন।’
কথাগুলো অবসরপ্রাপ্ত ইসরায়েলি সেনা কমান্ডার ইরান ইফরাতির। বলছিলেন ইসরায়েলি সেনাদের হাতে আটক ফিলিস্তিনি শিশুদের করুণ অবস্থা সম্পর্কে। এভাবেই তিনি এসব শিশুর ওপর চালানো ইসরায়েলি সেনাদের নির্মম অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরলেন। পেশাগত জীবনে এই সেনা কমান্ডার মোতায়েন ছিলেন অধিকৃত পশ্চিম তীরে।
ইফরাতি বলেন, এসব শিশু প্রায়ই ভয়ে প্যান্টের মধ্যে প্রস্রাব করে দিত। কান্নাকাটি করত। তবে তারা বেশ শান্ত থাকত।
পাথর ছোড়ার অভিযোগে আটক ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর প্রায়ই নির্যাতন চালায় ইসরায়েলি সেনারা—এ অভিযোগ অকপটে স্বীকার করে নেন সাবেক এই ইসরায়েলি সেনা কমান্ডার। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘অভিযোগটা সত্য।’
বিবিসিকে ইফরাতি বলেন, ‘আমি কখনোই ৯-১০ বছরের নিচে কাউকে গ্রেপ্তার করিনি। তবে ১১, ১৩ বা ১৪ বছর বয়সীরাও আমার কাছে শিশু। কিন্তু তাদের বয়স্কদের মতোই গ্রেপ্তার করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘অধিকৃত ভূখণ্ডে মোতায়েন করা সব ইসরায়েলি সেনাই আপনাকে একই গল্প শোনাতে পারবে। সেনাবাহিনী ছাড়ার পর প্রথম এক মাস আমি শিশুদের সম্পর্কে স্বপ্ন দেখতাম। ইহুদি শিশু। আরব শিশু। তারা আর্তনাদ করছে।’
ইফরাতি বলেন, ‘সম্ভবত তাদের চোখ বাঁধা হতো এ কারণে, যাতে তারা ঘাঁটির ভেতরটা দেখতে না পারে এবং আমরা কীভাবে কাজ করি, সেটা বুঝতে না পারে। তবে আমার ধারণা, আমরা হয়তো তাদের চোখ দেখতে চাই না বলেই চোখ বেঁধে রাখি। সে আপনার দিকে তাকাবে, নির্যাতন বন্ধ করার জন্য অনুনয় করবে অথবা আমাদের সামনে কান্নাকাটি করবে, তেমন কিছু আমরা দেখতে চাই না। আমরা যদি তাদের চোখ দেখতে না পাই, তাহলে কাজটি সহজ হবে।’
বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয় ইহুদি বসতি স্থাপনকারী অথবা ইসরায়েলি সেনাদের ওপর পাথর ছোড়ার অভিযোগে। ফিলিস্তিনি তরুণদের মতে, ইসরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর এটাই একমাত্র পথ।
পাথর ছোড়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মোহাম্মদ বালাসির ১৫ বছর বয়সী সন্তানকে। ইসরায়েলি সামরিক ট্রাইব্যুনালে তার বিচার করা হচ্ছে।
আদালতে দোষ স্বীকার করেছে মোহাম্মদ বালাসির ছেলে। পশ্চিম তীরে একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির সামনে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ বালাসি ও তাঁর কান্নারত স্ত্রী বললেন, ‘আপনাকে যখন এভাবে প্রহার করা হবে, তখন আপনি নিজের মায়ের বিরুদ্ধেও স্বীকারোক্তি দেবেন। সে এখনো শিশু। তার বন্ধুরা যখন রাস্তায় খেলছে, তখন তার হাতে হাতকড়া পরানো হয়েছে। আমি আদালতে কান্না ধরে রাখতে পারিনি। আমার হূদয় ফেটে যাচ্ছিল।’
মাত্র ১৩ বছর বয়সে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল মোহাম্মদ খোওয়াজাকে। সে জানায়, ‘তারা ঘাড় ধরে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যায়। আমি যতই কাঁদছিলাম, ততই তারা আমার ঘাড় চেপে ধরছিল। আমার হাঁটু থেকে রক্ত ঝরছিল। তারা বন্দুক দিয়ে আমাকে পেটাচ্ছিল। জিপে তোলা পর্যন্ত পুরোটা পথে আমাকে তারা লাথি মেরেছে। তারা আমার হাত-পা বেঁধে ফেলে। আমার চোখও বেঁধে ফেলা হয়। ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত আমাকে এক জায়গায় ফেলে রাখে। আমার মনে হয়েছিল আমি মারা যাচ্ছি।

অধিকাংশ মার্কিন চিকিত্সক ওবামার স্বাস্থ্যনীতির পক্ষে

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যনীতির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ চিকিত্সক। একটি শীর্ষস্থানীয় সাময়িকীর জরিপে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। গত সোমবার ওই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন (এনইজেএম) নামের এ সাময়িকীর জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া চিকিত্সকদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ বেসরকারি স্বাস্থ্যবীমার পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যবীমার পক্ষে। আর এ নীতির প্রতি অসমর্থন জানিয়েছেন ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ চিকিত্সক। তাঁদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে কেবল বেসরকারি বীমাই চালু থাকা উচিত। এ ছাড়া ৯ দশমিক ৬ শতাংশ চিকিত্সক শুধু সরকারি স্বাস্থ্যবীমার পক্ষে মত দিয়েছেন।
সাময়িকীটি বলেছে, জরিপ থেকে এটাই স্পষ্ট হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ চিকিত্সক সব নাগরিককে স্বাস্থ্যসুবিধার আওতায় আনার পক্ষে এবং এ জন্য তাঁরা সরকারি ও বেসরকারি—উভয় স্বাস্থ্যবীমারই ব্যবস্থা চান। জরিপে অংশ নেওয়া ৫২ থেকে ৬৯ শতাংশ চিকিত্সক বেসরকারি স্বাস্থ্যবীমার পাশাপাশি সরকারি স্বাস্থ্যবীমার সুবিধা চান।
এ বছরের শেষ নাগাদ ওবামা তাঁর স্বাস্থ্যনীতি সংস্কারের পক্ষে একটি আইন চূড়ান্ত করতে পারেন। এ আইন পাস হলে যুক্তরাষ্ট্রের সাড়ে চার কোটি নাগরিক সরকারিভাবে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসবেন।
কিন্তু ওবামার এ স্বাস্থ্যনীতি তীব্র বাধার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বিরোধী শিবির রিপাবলিকান দলের সদস্যরা এর তীব্র সমালোচনা করছেন।
এনইজেএম বলেছে, ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ চিকিত্সক স্বাস্থ্যসুবিধা বাড়ানোর পক্ষে। তাঁরা চাইছেন, ৬৫ বছর ঊর্ধ্বের লোকজন যেন সরকারি স্বাস্থ্যবীমার সুবিধা পান।
সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করেন, এমন দুই হাজার ১৩০ জন চিকিত্সকের ওপর জরিপ চালিয়ে এনইজেএম এ তথ্য পেয়েছে।
এদিকে ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজ পরিচালিত অপর এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিনিরা স্বাস্থ্যনীতি সংস্কার ইস্যু নিয়ে এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। সেখানে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া মার্কিনিদের ৪৬ শতাংশ প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যনীতি সংস্কারের পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ এর বিপক্ষে।

যুক্তরাষ্ট্রে দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেড়েছে ২৫ লাখ

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে গত এক বছরে দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৫ লাখ। দেশটিতে গত এক যুগের মধ্যে দারিদ্র্যের হার সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। পরিবারপিছু আয় কমেছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দাই মূলত এই দারিদ্র্য বাড়ার কারণ। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানানো হয়।

চীনে শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্মের হার বাড়ছে

চীনে শারীরিক ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্মের হার দ্রুত বাড়ছে। নারীদের দেরিতে সন্তান নেওয়া এবং পরিবেশদূষণের কারণে এই সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এই খবর জানিয়েছে।
গত বছর বেইজিংয়ে প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে ১৭০টি শিশু জন্ম নিয়েছে শারীরিক ত্রুটি নিয়ে। ১৯৯৭ সালের চেয়ে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। দ্য চায়না ডেইলি পত্রিকা এই খবর দিয়েছে।
বেইজিং পৌর স্বাস্থ্য বিভাগকে উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, আধুনিক প্রযুক্তির অত্যধিক ব্যবহার এবং নারীদের দেরিতে সন্তান নেওয়ার ফলে এমনটা হচ্ছে।
এ জন্য পরিবেশদূষণকেও দায়ী করা হচ্ছে। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপ্রোডাকটিভ হেলথ ইনস্টিটিউটের পরিচালক রেন আইগুয়ো বলেন, রাসায়নিক ও বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের ফলে মা-বাবার শরীরের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। এটা সম্ভবত গর্ভস্থ শিশুর ওপরও প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের অন্যান্য অঞ্চলেও জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্মের হার বেড়ে যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ গুয়াংদংয়ে ২০০৩ সালে প্রতি ১০ হাজার নবজাতকের মধ্যে ১৮৬টি শিশু জন্ম নিয়েছে শারীরিক ত্রুটি নিয়ে। চার বছর পর সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪৯ জনে। পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝেজিয়াংয়ে প্রতি ১০ হাজারে শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ১১৫ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৮।

বর্ষসেরার সংক্ষিপ্ত তালিকায় ভারতীয়দের প্রাধান্য

মনোনীতদের তালিকায় বাংলাদেশের ছিলেন দুজন। আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটার ও বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটারের তালিকায় ছিলেন সাকিব আল হাসান। বর্ষসেরা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি পারফরম্যান্সের তালিকায় আবদুর রাজ্জাক। কাল প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত তালিকায় এঁদের কেউই নেই। সেখানে ভারতীয়দেরই জয়জয়কার।
বর্ষসেরা ক্রিকেটারের তালিকায় ভারতীয় দুজন—মহেন্দ্র সিং ধোনি ও গৌতম গম্ভীর। গম্ভীর আছেন বর্ষসেরা টেস্ট খেলোয়াড়ের তালিকাতেও। বর্ষসেরা ওয়ানডে খেলোয়াড়ের সংক্ষিপ্ত তালিকায় চারজনের তিনজনই ভারতীয়—ধোনি, যুবরাজ সিং ও বীরেন্দর শেবাগ। ওয়েবসাইট।
বর্ষসেরা ক্রিকেটার: মহেন্দ্র সিং ধোনি, গৌতম গম্ভীর, মিচেল জনসন, অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস।
বর্ষসেরা টেস্ট খেলোয়াড়: গৌতম গম্ভীর, মিচেল জনসন, থিলান সামারাবীরা, অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস।
বর্ষসেরা ওয়ানডে খেলোয়াড়: শিবনারায়ণ চন্দরপল, মহেন্দ্র সিং ধোনি, যুবরাজ সিং, বীরেন্দর শেবাগ।
বর্ষসেরা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি পারফরম্যান্স: শহীদ আফ্রিদি (দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৪ বলে ৫১ রান ও ২/১৬), তিলকরত্নে দিলশান (ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫৭ বলে ৯৬ রান), ক্রিস গেইল (অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫০ বলে ৮৮ রান) ও উমর গুল (নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৬ রানে ৫ উইকেট)।

এক ধাপ এগোলেন সাকিব আল হাসান

আইসিসি বোলিং র্যাঙ্কিংয়ে এক ধাপ এগিয়ে এখন তিনে বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান। শ্রীলঙ্কায় ত্রিদেশীয় সিরিজে ভালো করতে না পারায় দুই থেকে চারে নেমে গেছেন নিউজিল্যান্ডের মিডিয়াম পেসার কাইল মিলস। মিলসের অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেট্টোরি উঠে গেছেন দুই নম্বরে। ব্যাটিংয়ে শীর্ষ দুইয়ে আগের মতোই আছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি ও যুবরাজ সিং। কমপ্যাক কাপের সেঞ্চুরিতে দশ মাস পর শীর্ষ দশে ফিরেছেন শচীন টেন্ডুলকার (৭)। অলরাউন্ডারদের র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরেই আছেন সাকিব। তবে দুইয়ে উঠে এসেছেন যুবরাজ সিং। যৌথভাবে তিনে জ্যাক ক্যালিস ও জ্যাকব ওরাম। দুই থেকে পাঁচে নেমে গেছেন অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ।

ক্রীড়াপল্লীতে খেলোয়াড় বিদ্রোহ

নারকেল আর কাঁঠালগাছের ছায়াঢাকা মিরপুর ক্রীড়াপল্লী কাল বৃষ্টিভেজা দিনেও ছিল বেশ উত্তপ্ত। গেটের সামনেই ফার্নিচারের অনেকগুলো দোকান। দোকানের সামনে অবস্থান নিয়েছেন হ্যান্ডবলের আমজাদ, ভলিবলের শাজাহান, কারাতের শামীম ওসমান, উশুর সুমনসহ প্রায় সব খেলোয়াড়। ওই সময় তাঁদের থাকার কথা ছিল মিরপুর শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামের অনুশীলনে। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় তাঁরা ক্রীড়াপল্লীর প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান ধর্মঘটে গেছেন। অবরুদ্ধ করে রাখেন কর্মকর্তাদের। একপর্যায়ে পল্লীর গেটেও তালা ঝুলিয়ে দেন কোনো এক খেলোয়াড়।
সাংবাদিক পরিচয় দিতেই অভিযোগের মিছিল। কেউ বলছেন খাবারের মান ভালো না, পরিমাণও কম। কেউ বলছেন আবাসন সমস্যার কথা, কেউ বলছেন, শাওয়ার নষ্ট, পানি নেই, গোসল করতে পারছেন না ঠিকমতো। জন্ডিস আর ফ্লুতেও নাকি ভুগছেন অনেকে। সব অভিযোগ মিলে যেটা দাঁড়াচ্ছে—এস এ গেমসের ক্যাম্পে ভালো নেই খেলোয়াড়েরা।
মিরপুর ক্রীড়াপল্লীতে আবাসিক ক্যাম্পে রয়েছেন পাঁচটি ফেডারেশনের (বাস্কেটবল, ভলিবল, হ্যান্ডবল, কারাতে ও উশু) খেলোয়াড়েরা। হ্যান্ডবলে ২৪ জন, কারাতেতে ২৫ জন, উশুতে ২০ জন, বাস্কেটবলে ৮ জন এবং ভলিবলের ২০ জন খেলোয়াড় গত ৩ জানুয়ারি থেকে এই পল্লীতে অনুশীলন করছেন।
খেলোয়াড়দের মূল দাবি, তাঁদের আবাসন ব্যবস্থা ঠিক করে দিতে হবে। হ্যান্ডবলের মাহবুব হোসেন বললেন, ‘একটা রুমে সাত-আটজন গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। অনেকেই ফ্লোরিং করছে। এখন যেভাবে থাকি সেটা আসলেই অমানবিক। গোয়ালঘরের মতো অবস্থা। বৃষ্টি হলেই ওপর থেকে অঝোরে পানি পড়ে সিঁড়িতে। এভাবে চললে এস এ গেমসে ভালো ফল আসবে কীভাবে?’ পানি সমস্যা নিয়ে উশুর রাকিব বললেন, ‘ক্রীড়াপল্লীর পানির ব্যবস্থা এতটাই অপর্যাপ্ত যে প্রতিদিন অনুশীলন শেষে কেউই ঠিকমতো গোসল করতে পারে না। সেখানে যেসব নির্মাণশ্রমিক কাজ করছে তাদের সঙ্গে ভবনের বাইরের নোংরা পানি দিয়ে গোসল করতে হয় আমাদের।’
খাবারের মান নিয়েও ক্ষোভের শেষ নেই। হোস্টেল সুপার কাজী আরিফ আহমেদকে চাপ দিলে খাবারের মানের একটু উন্নতি হয়, আবার কয়েক দিন পর তথৈবচ। এমনিতেই খেলোয়াড় অনুপাতে টয়লেটগুলোর সংখ্যা খুব কম। প্রতি ফ্লোরে থাকা ৩০-৩৫ জন খেলোয়াড়ের জন্য মাত্র চার-পাঁচটি টয়লেট। সেগুলো এত দুর্গন্ধময় আর নোংরা যে সেখানে স্বচ্ছন্দে বসে টয়লেট করাও দুষ্কর। সম্প্রতি টয়লেটের ময়লা ভেসে ওঠায় গোটা পরিবেশই অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ খেলোয়াড়দের।
দুই সপ্তাহ আগে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার গিয়েছিলেন ক্রীড়াপল্লী পরিদর্শনে। তিনি নিজেও নাকি এসব অব্যবস্থাপনা দেখে অসন্তুষ্ট। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মিজানুর রহমান মানু বলছেন, ‘আমরা নিজেরাও কয়েক দিন আগে দেখে এসেছি। ক্রীড়াপল্লীর খেলোয়াড়েরা মানবেতর জীবনযাপন করছে, এটা সত্যি। এখন যে সমস্যা দেখা দিয়েছে সেগুলো দেখার বিষয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি)। আর আবাসনের সমস্যা আছে, এ জন্য বাধ্য হয়েই বেশি বেশি খেলোয়াড়কে এক কক্ষে রাখতে হচ্ছে।’
প্রায় একই কথা বললেন বিওএ মহাসচিব কুতুবউদ্দিন আহমেদও, ‘আসলে সবকিছু দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। এ ছাড়া সব সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও আমাদের হাতে নেই। আর খাবার-দাবারের বিষয়টা দেখে ফেডারেশন। তবে এটা নিয়ে আমরা আলোচনায় বসেছি।’
জানা গেছে, কাল খেলোয়াড়দের বিদ্রোহের পর এনএসসির পরিকল্পনা বিভাগ থেকে বিওএ কর্মকর্তাদের অনুরোধ করা হয়, বিষয়টা যেন তাঁরা একটু দেখেন। কিন্তু বিওএ কর্মকর্তারা জানান, তাঁদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। এনএসসিকেই যা করার করতে হবে। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এনএসসির পরিকল্পনা বিভাগকে বললে তারা তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজটা হয় না। হলেও অনেক দেরিতে।’
এনএসসির সচিব শফিক আনোয়ারের কথা, ‘আমি ঘটনাটি শুনেছি। আসলে খেলোয়াড়েরা কাউকে অবরুদ্ধ করে রাখেনি। কয়েক ঘণ্টা বাগিবতণ্ডা করেছে মাত্র। আর যেসব সমস্যার কথা শুনলাম এগুলো সময়মতো আমাদের জানানো হয়নি। আশা করি, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান করা হবে।

টেন্ডুলকারের দুঙ্গারপুর-স্মরণ

স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছেন শচীন টেন্ডুলকার। রাজ সিং দুঙ্গারপুরের প্রয়াণ এক ঝটকায় তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে কৈশোরের দিনগুলোতে। এই দুঙ্গারপুরই আইন সংশোধন করে ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, ১৪ বছর বয়সী টেন্ডুলকার যেন ভারতের এমসিসি হিসেবে খ্যাত ক্রিকেট ক্লাব অব ইন্ডিয়ার ড্রেসিংরুম ব্যবহার করতে পারেন। এই দুঙ্গারপুরই প্রধান নির্বাচক থাকার সময় জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলেন ১৬ বছর বয়সী টেন্ডুলকার।
স্মৃতির অথৈ সমুদ্রে পড়ে যাওয়া ভারতের ব্যাটিং কিংবদন্তি মনেপ্রাণে মানেন, তাঁর আজকের এই অবস্থানের পেছনে অনেক বড় অবদান দুঙ্গারপুরের। তাই ভারতের ক্রিকেটের সবার ‘রাজভাই’ দুঙ্গারপুরকেই নিজের ৪৪তম ওয়ানডে সেঞ্চুরিটা উত্সর্গ করলেন টেন্ডুলকার, ‘এই সেঞ্চুরিটা আমি মিস্টার রাজ সিংকে উত্সর্গ করতে চাই। তাঁর বিদায়ে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, সেটি কখনো পূরণ হওয়ার নয়।’
স্বর্গবাসী দুঙ্গারপুর নিশ্চয়ই খুশি হবেন, কারণ ১৩৩ বলে ১০টি চার ও ১ ছক্কায় খেলা ১৩৮ রানের ইনিংসটি টেন্ডুলকার নিজে বলেছেন, তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা, ‘কন্ডিশন, মাঠ আর বাতাসের আর্দ্রতা বিবেচনায় এই ইনিংসটাকে আমি ওপরের দিকেই বিবেচনা করব।’
তা ছাড়া এই সেঞ্চুরির মাহাত্ম্যও অনেক। অস্ট্রেলিয়ার পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও আটটি সেঞ্চুরি হলো তাঁর। যে কীর্তি আর কারও নেই। এটিই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাঁর ক্যারিয়ার-সেরা। এই ইনিংসটি খেলার পথে প্রথম বিদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে কলম্বোর প্রেমাদাসায় এক হাজার রান পূর্ণ করেছেন। ১৪ বারের মতো ম্যান অব দ্য সিরিজ আর ৫৯ বারের মতো ম্যান অব দ্য ম্যাচও নিশ্চিত করেছে এই ইনিংস। তবে এসব ব্যক্তিগত প্রাপ্তি ছাপিয়ে টেন্ডুলকারকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দিচ্ছে, তাঁর এই ইনিংসে ভর করেই ভারত পরশু ৪৬ রানে জিতে নিয়েছে কমপ্যাক কাপের ফাইনাল। বের হয়ে এসেছে ওয়ানডে টুর্নামেন্টের ফাইনালে বার বার ব্যর্থ হওয়ার চক্র থেকেও। ২০০০ সাল থেকে ওয়ানডে টুর্নামেন্টের মোট ২১টি ফাইনালের মাত্র চারটি জিতল ভারত। তা ছাড়া এটি ১৯৯৮ সালের পর শ্রীলঙ্কায় তাদের প্রথম কোনো ফাইনাল জয়!
এই জয়টা ভারতকে তুলে দিয়েছে র্যাঙ্কিংয়ের দুই নম্বরে। মহেন্দ্র সিং ধোনি তাই এই জয়টাকে বলছেন ‘স্পেশাল’, ‘এই জয়টা বিশেষ কিছু। শ্রীলঙ্কায় এত বছর পর ট্রফি জিততে পেরে দারুণ লাগছে। র্যাঙ্কিংয়ের দুই নম্বরে ওঠায় আমাদের ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে যেতে হবে, মানটা ধরে রাখতে হবে।

বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্টিনা

বুয়েন্স এইরেস প্রোভিন্সের দক্ষিণ-পশ্চিমের মফস্বল শহর টান্ডিল। দুই দিন আগেও টান্ডিলিয়া পাহাড়ের পাদদেশের এই ছোট্ট শহরটিকে আর্জেন্টিনার বাইরে কেউ চিনত না। অথচ লাখ খানেক লোকের এই শহরই এখন খবরের শিরোনামে। সদ্য ইউএস ওপেনজয়ী হুয়ান মার্টিন দেল পোত্রো যে এই শহরেরই বাসিন্দা! ঘরের ছেলের কীর্তিতে শহরটিতে বয়ে যাচ্ছে আনন্দের বন্যা। ছয় বছর বয়সে যে ক্লাবে টেনিসে হাতেখড়ি দেল পোত্রোর, সেই ক্লাব ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তেতে বিশাল পর্দায় খেলা দেখেছে শত শত দর্শক। গর্বে বুক ফুলে যাচ্ছে ক্লাব প্রেসিডেন্ট পেদ্রো গোমেজের, ‘আমি দেল পোত্রোকে এতটুকুন থাকতেই দেখেছি। ওর এমন জয় দেখতে পেরে আমি অসম্ভব খুশি।’ আর দেল পোত্রোর শৈশব গুরু মার্সেলো গোমেজ জানাচ্ছেন টান্ডিলে কেমন খুশির জোয়ার বইছে, ‘দেল পোত্রো ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। মানুষ রাস্তায় এমনভাবে আনন্দ করছে যেন আমরা বিশ্বকাপ ফুটবল জিতে গেছি। টান্ডিলে ওর মতো একজন ক্রীড়াবিদকে পাওয়াটা অবিশ্বাস্য।’