Saturday, August 15, 2009

ক্ষমতা এক হাতে পুঞ্জীভূত হওয়া কি ঠিক by আবুল মোমেন

দেশকে দারিদ্র্য ও পশ্চাত্পদতার বৃত্ত থেকে বের করে আনতে হলে দুটি ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন জরুরি। একটি হলো শাসনব্যবস্থা এবং অপরটি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি। মোটা দাগে বলা যায়, শাসনব্যবস্থায় দুটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন—জবাবদিহিতা-স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ। ভোটাধিকার জনগণের একটা বড় প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে, কিন্তু কেবল এটুকুতে তার ভূমিকা সীমিত থাকলে সে কেবল সরকার গঠন ও পরিবর্তনে অবদান কিছু রাখতে পারে, শাসনকাজে তার কোনো ভূমিকাই থাকে না। তাতে শেষ পর্যন্ত যাঁদের তারা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে, তাঁরা হয়ে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে ক্ষমতাবান, আর জনগণ ক্ষমতাহীন উমেদার ও ভুক্তভোগীতে রূপান্তরিত হয়। আর এভাবে কেবল নির্বাচন-নাট্যের মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ে গণতন্ত্র; সমাজ ও সরকারের যথার্থ ভূমিকা পালন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
এ কথা মানতে হবে যে দুই বড় দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে এগিয়ে রাখতে হবে। ফলে আওয়ামী লীগের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। সে কারণেই এ সরকারের প্রথম সাত মাস এবং সাত বছর পরে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আগ্রহ ছিল।
সবাই একমত হবেন যে বিরাজমান বাস্তবতায় বড় দুই দলে দুই নেত্রীর স্ব স্ব দলে একচ্ছত্র অধিকর্ত্রীর ভূমিকা নিরঙ্কুশ। তাঁদের ইচ্ছাতেই কমিটি গঠিত ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ব্যাপারে তাঁরা নিশ্চয় বিভিন্নজনের সঙ্গে আলোচনা করেন, কিন্তু সেটা ঘটে নেপথ্যে বা গোপনে অনানুষ্ঠানিকভাবে, আর তাতে বোঝা যায় প্রকাশ্যে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্যদের অংশীদারি দেওয়ার মতো মনোভাব বা বাস্তবতা নেই। তাতে সমাজ নিজস্ব বোধ ও বুদ্ধি খাটিয়ে, ভেবে নেত্রীর আস্থাভাজন নেতাদের চিনে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং সমাজের উচ্চাভিলাষী ব্যক্তিরা, যাদের একটা অংশ ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য বেপরোয়া হয়ে ওঠে, তারা সেভাবে খাতির জমানোয় তত্পর হয়। তাঁদের মাধ্যমে নেত্রীকে প্রভাবিত করার বা নেত্রীর আনুকূল্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যায় তারা। এতে নেত্রীর আস্থাভাজনদের কেন্দ্র করে ক্ষমতার আঞ্চলিক ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বলয় তৈরি হয় এবং গণতন্ত্র কেবল হোঁচট খেতে থাকে।
আমার মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম চালিয়ে অনেক পোড় খেয়ে বিপুল জনসমর্থন ও সংসদে বিশাল সংখ্যাধিক্য নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করবেন তাঁর হাতে পুঞ্জীভূত হতে থাকা দল ও সরকারের ক্ষমতা বিকেন্দ্রিত করার কাজটা।
মন্ত্রিসভা গঠন করার সময় তাঁর প্রথম পরীক্ষায় দেখা গেল মন্ত্রী নির্বাচনে প্রধান বিচার্য বিষয় হয়েছে নেত্রীর আস্থা ও প্রার্থীর তাঁর প্রতি আনুগত্য। মন্ত্রিসভা যাতে একটি দল হিসেবে কাজ করতে পারে তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বাকি সব মন্ত্রীর আনুগত্য একটি বিচার্য বিষয় হতে পারে, কিন্তু মন্ত্রী হিসেবে গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে মাপকাঠি ছিল একমাত্র সেটিই। তাতে সরকারের প্রায় সব ক্ষমতা পুঞ্জীভূত হয়ে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
অথচ এভাবে ক্ষমতা পুঞ্জীভূত না করেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। সে জন্য নির্ভর করতে হয় স্বাধীন ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর। স্থানীয় সরকারের প্রসঙ্গে পরে আসছি। দেশে নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমের জন্য এর স্বাধীনতা, তথ্য অধিকার এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা দরকার। এই মুক্ত পরিবেশেই ক্রমে গণমাধ্যম ও সংবাদকর্মীরাও তাঁদের দায়িত্বশীলতা, বৃহত্তর স্বার্থে সংযত থাকার প্রয়োজন এবং পরিণত প্রজ্ঞা অর্জন করবেন। মুক্ত পরিণত সংবাদপত্র গণতন্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সে কারণেই অতীতে সংবাদপত্রকে বলা হয়েছে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ—নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভার মতো রাষ্ট্রের মূল তিন স্তম্ভের সমান গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করার সময় মন্ত্রিসভার মতোই অন্ধ আনুগত্যের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সবটা মিলে শেখ হাসিনার হাতে প্রভূত ও অবাধ ক্ষমতা পুঞ্জীভূত হয়েছে। ফলে সরকার ও সরকারি দল কতটা গণতান্ত্রিকভাবে চলবে তা অনেকটা নির্ভর করবে একজন ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। একটু আগাম সতর্কবাণী হলেও বলে রাখতে চাই, জনমনে একটা ধারণা হলো, আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে থাকে, তখন সে যথার্থই গণতান্ত্রিক কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অনেক সময় স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে, নিন্দুকের ভাষায় ফ্যাসিস্ট। ফলে এদিকটা মাথায় রাখা দরকার।
আমরা অতীতে দেখেছি, অত্যন্ত গণতান্ত্রিক আদর্শের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ঐতিহাসিকভাবে ও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতার কারণে স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারে বঙ্গবন্ধুর হাতেই ক্ষমতা পুঞ্জীভূত হয়ে গিয়েছিল। এর চরম ফলস্বরূপ একপর্যায়ে তিনি হয়ে পড়েছিলেন রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই নিঃসঙ্গ। এ রকম সময়ে যেসব আস্থাভাজন উপনেতা তৈরি হন, তাঁরা প্রায়ই বাস্তবতার কারণেই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব ও বক্তব্য বিসর্জন দিয়ে তোষামোদকারীতে রূপান্তরিত হন। তাতে কেবল নিঃসঙ্গতা নয়, জনপ্রিয়তার সংকটও তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, অনুগত বাধ্য মানুষ নিয়ে সরকার পরিচালনা সহজ, তদ্রূপ সহজ দল পরিচালনাও। কিন্তু সরকার এবং রাজনৈতিক দল চালানো নিছক একটি অফিস চালানোর মতো ব্যাপার নয়। এখানে প্রতি মুহূর্তে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কৌশল নির্ধারণ করতে হয়, স্থায়ী ও সাময়িক মিত্র সন্ধান করতে হয় এবং অনবরত নানা সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। রাজনীতি কেবল রুটিন কাজে সীমাবদ্ধ থাকে না—সরকার বা দল তাই রুটিন কাজ চালানোয় দক্ষ হলেই চলবে না। তাকে চালাতে হয় দেশ—তদুপরি আমাদের ক্ষেত্রে এমন এক দেশ, যে দেশে মানুষ অনেক, সমস্যা অসংখ্য।
এখন হয়তো সরকারে ভিন্নমতের আশঙ্কা থাকল না, দলে মতান্তরের অবকাশ রইল না। কিন্তু তার সঙ্গে সরকার ও দলের সচলতা, গতিশীলতা এবং প্রয়োজনে সৃজনশীলতা ক্ষুণ্ন হবে কি না তা ভাবার বিষয়। ক্ষমতার প্রবণতা হলো তা নিরঙ্কুশ হতে চায়, তা সম্ভাব্য সব উপায়ে জবাবদিহিতা এড়িয়ে অস্বচ্ছ হয়ে পড়তে চায়। আর এ রকম হয়ে পড়লে তা দুর্নীতি বাড়ায় ও কর্মক্ষমতা হ্রাস করে দেয়। বিপদে পড়ে যায় সরকার, আর চূড়ান্ত বিচারে তার দায় বহন করে দল।
তদুপরি মন্ত্রিসভা যদি প্রধানমন্ত্রীর মুখ চেয়েই কাজ করে, তাহলে সেই সন্তর্পণ সতর্ক আচরণের প্রভাব গিয়ে পড়বে মন্ত্রণালয়ের কাজে, তার সূত্র ধরে সব দপ্তরে, অধিদপ্তরে। আর সেই ফাঁকে কাজকর্মের নিয়ন্তা হয়ে উঠবে আমলাতন্ত্র। একটি জবরদস্ত আমলাতান্ত্রিক সরকার লালফিতার দৌরাত্ম্যে ও ফাঁসে আটকা পড়বে। কাজকর্ম চলবে গতানুগতিক পথে এবং দুর্নীতি ও তার ফলস্বরূপ অদক্ষতা বাড়বে।
মানুষের মধ্যে এই সরকার নিয়ে যেমন আশা আছে, তেমনি ভেতরে ভেতরে কিন্তু অস্থিরতাও আছে। মানুষ বেশি ভোগান্তি, বেশি ভুলভ্রান্তি সম্ভবত মেনে নেবে না, ছাড় দেবে না। মোটকথা, সমালোচনার আওয়াজ সে তুলতে থাকবে। তবে জোট সরকারের দুর্নীতি ও অনাচারের ঐতিহাসিক আমলটির কথা তারা এখনো ভোলেনি। তাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্পও নেই। কেবল এ কারণে অস্থির মানুষের পক্ষেও দ্রুত সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে নামা সম্ভব হবে না।
এটা সরকারের জন্য স্বস্তির বারতা হলেও এখানেই কিন্তু বড় রকমের আশঙ্কার একটা বীজ লুকিয়ে আছে। আওয়ামী লীগের সরকার ও দল শেখ হাসিনার হাতে কেন্দ্রীভূত, তিনি ও তাঁর মন্ত্রিসভা ব্যতিব্যস্ত থাকবেন সরকার পরিচালনার কাজে। আর মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকলে বিএনপির পক্ষে কি সম্ভব প্রকৃত জনস্বার্থের রাজনীতি নিয়ে মাঠে নামা? সরকারের ওপর মানুষ যদি অসন্তুষ্ট হয়, মাঠে যদি কোনো গণতান্ত্রিক দল না থাকে, তাহলে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী মাঠ দখলের চেষ্টা করবে না? মৌলবাদী রাজনীতি সে সুযোগ কাজে লাগাবে না? কিংবা নৈরাজ্য বাধানোর অপশক্তি মাঠে নামবে না? বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি এখন অতি দুর্বল। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের দায় অনেক। সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো যেমন তার কাজ, তেমনি দলের মাধ্যমে মাঠপর্যায়েও গণতান্ত্রিক ধারাকে রাজনীতির প্রধান স্রোত হিসেবে ধরে রাখাও তার কাজ। ফলে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনায় ব্যর্থ হলে ও দল হিসেবে দুর্বল হলে দেশের সমূহ বিপদ।
পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সরকারকে হটানো এবং তারপর সামরিক স্বৈরশাসন ও ধর্মান্ধ অগণতান্ত্রিক শক্তিকে জোরদার করে তোলার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দলকে কঠিন প্রতিকূলতায় ঠেলে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল বলে পুনরায় গণতন্ত্রের রাস্তায় আসতে অনেক সময় লেগেছে আমাদের। তাই ভয় পাই শেখ হাসিনাকে ঘিরে ক্ষমতাবলয় ক্রমে আওয়ামী লীগ ও সরকারকে যদি জনবিচ্ছিন্ন করে তোলে, তাহলে দেশের জন্য তা ভালো হবে না। দেশে এখনো সরকার ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে চোরাবালিতে টেনে নামানোর ও নানাভাবে বিপদে ফেলার জন্য অনেক গোষ্ঠীই সক্রিয় আছে। তাই গণতান্ত্রিক শক্তির উচিত সমাজে সর্বত্র মিত্র শক্তির খোঁজ করা ও তাদের সঙ্গে সক্রিয় মৈত্রী স্থাপন করা। দল ও সরকারকে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে এককেন্দ্রিক হয়ে ওঠার পরিবর্তে ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের কথা ভাবতে হবে।
ফলে গণতান্ত্রিক সরকারের সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকারে ও ক্ষমতায় জনগণের অংশীদারি নিশ্চিত করা। সেদিক থেকে স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা ও শক্তিশালী সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই ক্ষমতায় জনগণের অংশীদারি নিশ্চিত হয় আর ক্ষমতা জনগণের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এ জন্য স্থানীয় সরকারকে হতে হবে শক্তিশালী ও স্বাধীন। এর অর্থ হলো স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসন পরিচালনা ও উন্নয়নকাজের দায়িত্ব থাকতে হবে স্থানীয় সরকারের হাতে এবং স্থানীয় সরকার হতে হবে নির্বাচিত। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি, আমাদের দেশের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী সাংসদেরা কিছুতেই ক্ষমতার ভাগ কাউকে দিতে চান না। যে শেখ হাসিনা তাঁর বইয়ে শক্তিশালী স্বাধীন স্থানীয় সরকারের পক্ষে লিখেছেন, তাঁর পক্ষেও সেই অবস্থানে থাকা কঠিন হচ্ছে, সাংসদের চাপ আছে, সঙ্গে হয়তো আমলাদের চাপও যুক্ত হয়েছে, আর রয়েছে সরকারের দ্বিধা ও দোদুল্যমানতা।
দীর্ঘদিনে আমরা দেখেছি বাংলাদেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের পথে সরকারের দিক থেকে দুটি বড় বাধা হলো প্রশাসনের তথা শাসনযন্ত্রের সর্বস্তরে দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার কারণে লক্ষ্য ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করতে না পারা। সোজা কথায়, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ও বাজেট ব্যয়ে আমাদের অপারগতা বহুদিন ধরেই প্রমাণিত। এ ক্ষেত্রে হয়তো দক্ষতা এবং সততার অভাবের কথা স্বীকার করতে হবে।
রাষ্ট্রে ক্ষমতার যেমন কেন্দ্রীভবন ঘটছে, তেমনি প্রশাসনে কর্মরত জনবলেরও একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান। বাংলাদেশের সাংসদ, রাজনীতিবিদ, আমলা, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী, বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই চান রাজধানী ঢাকায় থাকতে। একান্ত অনিচ্ছায় ঢাকার বাইরে যেতে হলেও কেউই চাকরিস্থলে পরিবার নিয়ে বসবাস করতে রাজি নন। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, বাবা-মায়ের চিকিত্সা ইত্যাদি নানা অজুহাতে সবাই ভিড় করে ঢাকায় থাকবেন। এতেও কিন্তু দুর্নীতি ও অদক্ষতা বাড়ছে। এ নিয়ে বারান্তরে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল।
কিন্তু শেখ হাসিনা তাঁর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে দিলেন কেন? দিনবদলের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসে গতানুগতিকভাবে ক্ষমতার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লে দেশ ও গণতন্ত্র বিপদে পড়বে। এটা যেন তাঁর স্বল্প সময়ের কৌশলী পদক্ষেপের বেশি না হয়। আমার বিবেচনায় বাংলাদেশ এই তিন দশকের পথ পরিক্রমায় কেবলই ব্যর্থতার চক্র তৈরি করেছে। এবারে যদি সেটি ভাঙা না যায়, ভেঙে সামনে এগোনো না যায়, তাহলে কিন্তু পুরো জাতি গভীর বিপদে ও হতাশার গহ্বরে নিমজ্জিত হবে। আর হতাশা থেকে নৈরাজ্য খুব দূরে নয়। যাদের মনে জঙ্গিবাদী তত্পরতার পরিকল্পনা থাকে, তারাও বসে থাকবে না এবং এই পরিস্থিতিতে দুর্নীতি আর অদক্ষতাই বাড়বে।
ফলে এই সরকারের ব্যর্থতার কথা আমরা ভাবতে চাই না। আমরা চাই, শেখ হাসিনা রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেবেন, স্বাক্ষর রাখবেন একজন যথার্থ রাষ্ট্রনায়কের প্রজ্ঞা, সৃজনশীলতা ও সাহসী নেতৃত্বের।
গতানুগতিক পথে বাংলাদেশের মুক্তি নেই, পরিত্রাণ অসম্ভব।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠা by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলাম ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে এতিমদের অধিকারকে সুনিশ্চিত করেছে। যে মা-বাবা তাঁর সন্তানদের অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় রেখে মৃত্যুবরণ করেন, দৈনন্দিন জীবনে তাদের অপরিসীম দুঃখ-কষ্ট ও দুর্বলতা বৃদ্ধি পায়। মা-বাবার আকস্মিক মৃত্যু অপ্রত্যাশিতভাবে এসে কারও কারও পার্থিব জীবনে দুর্দশা অনেক বাড়িয়ে দেয়। এমতাবস্থায় পরিবারে তারা অনাথ-এতিম হিসেবে চিহ্নিত হয়। এদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তারা তোমাকে এতিম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তুমি বলে দাও তাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে গুছিয়ে দেওয়া উত্তম। যদি তাদের ব্যয়ভার নিজেদের সঙ্গে একত্র করো, তাহলে মনে করবে তারা তোমাদের ভাই।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২০) পূর্ববর্তী উম্মতদেরও এতিমদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যখন বনী ইসরাঈলদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করবে না, পিতা-মাতা, নিকট-আত্মীয়, এতিম দীন-দরিদ্রদের সাথে সত্ ব্যবহার করবে।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৮৩)
ইসলাম এতিমের অধিকার রক্ষায় সুন্দর সুন্দর উত্সাহ দেওয়ার পাশাপাশি সদাচরণের জন্য জোরালো তাগিদ দিয়েছে। সামর্থ্যবান মুসলমান ব্যক্তি ও প্রশাসকদের এতিমের অধিকার আদায় করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাঁরা আপন সন্তানসন্ততির মতো ধর্মীয় শিক্ষা, সুন্দর সংস্কৃতিমান ও আদর্শ চরিত্রবানরূপে এতিমদের গড়ে তোলার কাজে যথার্থ ভূমিকা নিতে পারেন। প্রাক-ইসলামি যুগে এতিম-মিসকিনদের জান-মালের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। তাই এতিমের ধন-সম্পদ লুটেপুটে খাওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ঘোষিত হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে এতিমের ধন-সম্পদ ভোগ করে, তারা নিজেদের পাকস্থলীকে অগ্নি দ্বারা পূর্ণ করে এবং অতিসত্বর তারা অগ্নিতেই প্রবেশ করবে।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত-১০)
এতিমদের ধন-সম্পদ রক্ষার সার্বিক বিষয়ে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন, ‘আর এতিমদের প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখবে, যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছে। যদি তাদের মধ্যে বুদ্ধি-বিবেচনার উদ্ভব আঁচ করতে পার, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পণ করতে পারবে। এতিমের সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ কোরো না অথবা তারা বড় হয়ে যাবে মনে করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না। যারা সম্পদশালী তারা অবশ্যই এতিমের সম্পদ ব্যয় করা থেকে বিরত থাকবে। আর যে অভাবগ্রস্ত সে সংগত পরিমাণ খেতে পারবে। যখন তাদের কাছে তাদের সম্পদ সোপর্দ করবে তখন সাক্ষী রাখবে। অবশ্যই আল্লাহ হিসাব নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬)
আল্লাহ তাআলা এতিমের জীবনযাত্রায় সার্বিক বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যদি কোনো উচ্চবংশের সুন্দরী যুবতী মহিলা বিধবা হয়ে যায় এবং তার ছোট সন্তানসন্ততি থাকে, তাহলে সে যদি নিষ্কলঙ্ক অবস্থায় তার এতিম সন্তানদের লালন-পালনে জীবন কাটিয়ে দেয় এবং অন্য স্বামী গ্রহণ না করে, তাহলে সে জান্নাতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশাপাশি থাকতে পারবে। এ সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমি দুই ধরনের দুর্বল লোকের অধিকারকে পবিত্র বলে ঘোষণা করছি। তাদের একজন এতিম ও অপরজন নারী। এতিম ছেলেমেয়ের প্রতিপালনের জন্য অন্য স্বামী গ্রহণ না করা মহিলাদের বিশেষ মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি এবং রোদে পোড়া দুই গাল মহিলা অর্থাত্ বিবর্ণ চেহারার মহিলা কিয়ামতের দিন এ দুটো আঙুলের ন্যায় থাকব (তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যম আঙুল ইশারা করলেন), যে সম্ভ্রান্ত বংশীয়া সুন্দরী যুবতীর স্বামী মারা গেছে এবং সে স্বামীর ঔরসজাত এতিম সন্তানদের লালন-পালনে নিয়োজিত রয়েছে, যতক্ষণ না তার সন্তানেরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে।’ (নাসায়ী)
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও এতিম অসহায় ছিলেন। তাই তিনি এতিমের দুঃখ-কষ্ট যথার্থ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এতিমদের পরিচর্যায় তিনি ছিলেন উদারতার মূর্ত প্রতীক। একদা ঈদের দিনে রাসূলুল্লাহ (সা.) হঠাত্ দেখতে পেলেন, ঈদগাহের এককোণে বসে একটি অনাথ ছেলে কাঁদছে। তিনি শিশুটির কাছে গেলেন এবং মাথায় হাত বুলিয়ে এ আনন্দের দিনে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলে ছেলেটি বলল, তার বাবা যুদ্ধে মারা গেছেন এবং তার মা অন্যত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোমল হূদয় বেদনায় পরিপূর্ণ হলো এবং তিনি শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। এরপর হজরত আয়েশা (রা.)-কে ডেকে বললেন, ‘হে আয়েশা! তোমার জন্য একটি ছেলে এনেছি।’ তিনি ছেলেটিকে বললেন, ‘এখন থেকে আমি তোমার পিতা, আর আয়েশা তোমার মাতা এবং ফাতেমা তোমার বোন।’ এরপর তাকে নতুন জামা কিনে দিলেন, এতিম ছেলেটির মনের সব দুঃখ মুছে গেল।
ইসলামের দৃষ্টিতে এতিমের প্রতি দয়ার্দ্র ও সহানুভূতিশীল হওয়া একটি অত্যন্ত মহত্ কাজ। এতিম, নিঃস্ব, হতদরিদ্র, অসহায়, বিধবা ও অভাবগ্রস্তদের সহযোগিতা করা সুনিশ্চিতভাবে নেক কাজের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে সার্বিক সহযোগিতা, সদাচরণ, দয়া, সেবা-যত্ন ও বিপদ-আপদ লাঘবে এতিমরা সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এতিমদের মাথায় শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যে হাত বুলায়, তবে যেসব চুলের ওপর দিয়ে হাত বুলিয়েছে তার প্রত্যেকটি চুলের বিনিময়ে কয়েকটি করে নেকি লাভ করবে।’ নবী করিম (সা.) সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘মুসলমানদের মধ্যে সর্বোত্তম ঘর হলো যে ঘরে এতিমদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হয়, আর মুসলমানদের মধ্যে নিকৃষ্টতম ঘর হলো যে ঘরে এতিম বসবাস করে কিন্তু তার সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়।’
সারা দেশে ছিন্নমূল মা-বাবাহারা অগণিত এতিম ও অসংখ্য এতিমখানা রয়েছে। এই এতিমদের চলাফেরা ও যাতায়াতের সুবিধার্থে সব ধরনের গাড়ি ভাড়া মওকুফের জন্য সুব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে ব্যক্তিমালিকানাধীন সরকারি যানবাহন বাস, নৌযান, রেলগাড়ি প্রভৃতি যন্ত্রচালিত গাড়িতে এতিমদের চলাচলের ক্ষেত্রে ভাড়া মওকুফ করা হলে অতি মহত্ মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। অতএব, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে আশপাশে যেসব এতিম অসহায় লোক বসবাস করে, মুসলমানদের উচিত তাদের লালন-পালন, ভরণ-পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে নেক কাজের দরজা উন্মুক্ত রাখা। তাহলেই ইসলামের সাম্যবাদিতার আদর্শ শিক্ষা অনুযায়ী এতিমের দুঃখ-কষ্ট মোচন হয়ে মানবসমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

আরও একটি শোকের মাস by জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

আগস্ট মাস আমাদের শোকের মাস। একাধিক মহান ব্যক্তির তিরোধানে এ মাসটিকে আমরা গণ্য করছি আমাদের শোকের মাস হিসেবে। তবে বিশেষভাবে এ মাসটি আমাদের জাতীয় শোকের মাস হয়েছে এ মাসের ১৫ তারিখের ভোরে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু ও যে হত্যাযজ্ঞ রেহাই দেয়নি তাঁর নিকটতম আত্মীয়স্বজনকে, সেই কারণে।
এ বছর আগস্ট এসেছে একটু ভিন্ন অবয়বে। বিগত দিনের অনেক আগস্টে আমরা শোক প্রকাশেও সহজ ও স্বাভাবিক ছিলাম না। পঁচাত্তরের মধ্য-আগস্টের ওই হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। মানবিক বিচারে যা ছিল নিষ্ঠুরতম বর্বরতা, আইনের বিচারে যা ছিল সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ—তাকেই অপরাধমুক্ত করে দিয়েছিল সেদিনের সরকার, তাকেই বৈধতা দিয়েছিল একটি অবৈধ সরকার। বৈধতা ও অবৈধতার, ন্যায় ও অন্যায়ের, শুভ ও অশুভের ভেদরেখা লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। সত্য যখন অসত্য হয়ে যায়, অসত্য হয়ে যায় সত্য, তখন রাজনীতির মঞ্চও হয়ে পড়ে জটিল ও কুটিল। আমরা সেই জটিল ও কুটিল রাজনীতির পথ বেয়ে এত দূর এসেছি। মিথ্যার ঘোর কুজ্ঝটিকা অনেকটাই কেটে গেছে। সত্য আবার স্বরূপে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার সফল অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির মর্যাদা দিয়েছে দেশের মানুষ। বিপুল ভোটে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে জয়ী করে, তাঁকে সরকার গঠনের পথ তৈরি করে দিয়ে দেশের মানুষ বোধ হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার অপরাধ মোচনের সুযোগ সৃষ্টি করে নিল। দেশের মানুষের অপরাধ, তারা ওই জঘন্যতম অপরাধের উত্তরাধিকার দীর্ঘকাল মাথা পেতে নিয়েছে, সেই অপরাধের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। অতীতের কোনো চেষ্টাই স্থায়ী সুফল বয়ে আনেনি। সর্বশেষ চেষ্টার সাফল্য থেকে আবার আশার আলো দেখতে পাচ্ছে দেশের মানুষ। আপাতত এইটুকু বলা যায়। এর বেশি বলার সময় আসেনি।
এ দেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ অনেক দিন থেকেই তুলাদণ্ডে দোদুল্যমান অবস্থায় আছে। কখনো এদিকে হেলছে, কখনো ওদিকে। ব্রিটিশ ভারত ভেঙে প্রথমে দুই টুকরা, পরে তিন টুকরা হয়েছে। ভারত হচ্ছে এর মধ্যে বড় টুকরা। ভারতে গণতন্ত্র একটা সুস্থির অবস্থায় আছে। যত দোদুল্যমানতা, তা পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে। অবশ্য তুলনামূলকভাবে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পাকিস্তানের চেয়ে দৃঢ়তা লাভ করেছে। এই যে তিন দেশে তিন পরিস্থিতি, চেষ্টা করলে এর একটা ব্যাখ্যা, একটা কার্যকারণ নিশ্চয়ই খুঁজে পাওয়া যাবে। যেকোনো দেশের প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তি হচ্ছে সেদেশের রাজনৈতিক দল। সাতচল্লিশের স্বাধীনতার পর ভারতে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেস ছিল ক্ষমতায় এবং কংগ্রেস তার প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করেছে। কীভাবে? কংগ্রেস সরকার গঠন করেছে, কিন্তু দল হিসেবে তার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেছে। সরকারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়নি, সরকারের নীতিনির্ধারকের ভূমিকা পালন করেছে। যিনি সরকারপ্রধান অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী, তিনিই দলপ্রধান—এটা ভারতে হয়নি, পাকিস্তানে হয়েছে, বাংলাদেশে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম পর্যায়ে হয়নি, বঙ্গবন্ধুর সময়ে হয়নি, পরবর্তীকালে হয়েছে। একই ব্যক্তি সরকারপ্রধান ও দলপ্রধান হলে দলের ভূমিকা খর্ব হতে বাধ্য। দলের ভূমিকা খর্ব হলে দেশে গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা ব্যাহত হয়। বাংলাদেশে যা হয়েছে। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন হয়ে গেল কদিন আগে। অধিবেশন যে আদৌ হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে, এ এক ইতিবাচক ঘটনা। যেভাবে হয়েছে, সেটা পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। আরও স্বচ্ছতার প্রয়োজন ছিল। আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রয়োজন ছিল। সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের। দল হিসেবে, সক্রিয়তা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা দেয়। সেই লক্ষ্য থেকে বাংলাদেশ এখনো দূরে রয়েছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা থাকলে সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে কাজ করে। আর এই দৃঢ়তার অভাবে পাকিস্তানে প্রথম থেকেই প্রতিরক্ষা বাহিনী অনেকটা সমান্তরাল শক্তি হিসেবে রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। এরই প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের মিলিটারির নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা পাকিস্তানি মিলিটারির শিক্ষায় শিক্ষিত। সুতরাং একটি গণতান্ত্রিক দেশে মিলিটারির প্রকৃত ভূমিকা তাঁরা প্রায়শই ভুলে গিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে দেশের প্রয়োজনে বাংলাদেশের মিলিটারি পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছে। একটি দুর্গম অঞ্চলে শান্তিরক্ষার দুরূহ কাজ করেছে। অনেক সৈন্য, অনেক তরুণ কর্মকর্তা প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু দেশের প্রয়োজন আর সেনাবাহিনীর প্রয়োজন, দুটিকে এক করে দেখা যায় না। দেশের প্রয়োজনে সেনাবাহিনী যেকোনো উপদ্রুত অঞ্চলে যাবে, সেখানে অবস্থান করবে, যত দিন প্রয়োজন, তার বেশি এক দিনও নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের জমিতে বাইরে থেকে সমতল ভূমির মানুষের বসতি গড়ার কাজটি ঠিক হয়নি। কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে এ ধরনের অবিবেকি, এ ধরনের অদূরদর্শী কাজ হয় না। বাংলাদেশে হয়েছে, যেহেতু বাংলাদেশে মধ্য-পঁচাত্তরের পর থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর, কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষ সামরিক শাসন চালু ছিল। সামরিক শাসকেরা অস্ত্র চালনায় দক্ষ হলেও দেশ পরিচালনার শিক্ষা তাঁদের নেই, হওয়ার কথা নয়। এ দায়িত্ব পালন তাঁদের জন্য অস্বাভাবিক ও অবাঞ্ছিত। প্রতীকীভাবে হলেও যিনি রাষ্ট্রপ্রধান, তিনিই প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান। যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সে জন্য বেসামরিক সরকারের, কোনো জেনারেলের নয় বা কোনো ফিল্ড মার্শালের নয়। সেনাবাহিনীর আসল শক্তি তার শৃঙ্খলা। তার চেইন অব কমান্ড। এটি ভাঙলে যেকোনো অঘটন ঘটতে পারে, রাষ্ট্রনায়কের হত্যা হতে পারে, নিজেদের মধ্যে হানাহানি হতে পারে—আত্মকলহ থেকে আত্মঘাতী হওয়া, সবই হতে পারে। একাত্তরের স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর কত সদস্য প্রাণ দিয়েছেন, যুদ্ধে নয়, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তার হিসাব নেই। আমাদের ডিসিপ্লিনড আর্মি কতবার ডিসিপ্লিন ভঙ্গ করেছে। কেন করেছে, কত অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়েছে। একসময় সেটা সুস্থিরভাবে চিন্তা করতে হবে।
এটি বলা আমার উদ্দেশ্য নয় যে এই প্রয়োজনীয় দায়িত্ববোধের অভাব রয়েছে। তা যদি হতো, তাহলে নিকট অতীতের বিডিআর বিদ্রোহের সময় সেনাবাহিনী, নিজের প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতির মুখেও অমন ধৈর্যের পরিচয় দিতে পারত না। ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালন করে সেনাবাহিনী তার হূতসম্মান পুনরুদ্ধার করেছে, অনেকটাই। সেনাবাহিনীর এই দৃষ্টান্তটি ইতিবাচক। তার পরও বলব, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ এখনো আমরা সন্দেহমুক্ত করতে পারিনি। যে অপশক্তি কখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করেনি, যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যার জন্য দায়ী, যারা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, গণতন্ত্রকেও হত্যা করেছে, তারা এখনো সক্রিয়, দেশে ও বিদেশে। আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীগুলোর অতীতের রেকর্ড ভালো নয়। কোনো দুর্ঘটনারই আগাম হুঁশিয়ারি দিতে পারেনি তারা। এ জন্য এই বাহিনীগুলোকে ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কদিন আগে এদেরই মধ্য থেকে কোনো একটি বাহিনী খবর দিয়েছে যে অতীতে যারা বারবার অঘটন ঘটিয়েছে, অনেক হত্যকাণ্ডের যারা নেপথ্যের কুশীলব, তারা আবার তত্পর হয়ে উঠেছে এমন কিছু করতে, যাতে প্রশাসনের স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত পড়ে। নিষিদ্ধ ঘোষিত দলগুলো পুলিশ ও র্যাবের সকল নজরদারির আড়ালে এখনো ভিন্ননামে তাদের অভিন্ন সংকল্প সিদ্ধির কাজে লিপ্ত রয়েছে। মতাদর্শের দিক দিয়ে এরা মৌলবাদী। আন্তর্জাতিক মৌলবাদী তথা সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ যে বহুদিনের, সে খবর ওরাই দিয়েছে ধরা পড়ার পর। এদের একটা বড় অংশ বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থান করছে বছরের পর বছর, মাদ্রাসাশিক্ষকের ছদ্মবেশ ধারণ করে। বেশ কিছু তথাকথিত মাদ্রাসাই যে আসলে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি, তাদের অভয়াশ্রম, এটা কোনো নতুন সংবাদ নয়।
প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এ জন্য গৃহীত ব্যবস্থা নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। তবে বিশেষ ব্যবস্থার সীমা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ উচিত হবে না, যা অপ্রয়োজনীয় বা চিরাচরিত ব্যবস্থার বাইরে। এতে অসমর্থক সন্দেহ ও বিতর্কের সৃষ্টি হবে। যে ভুল অতীতে একবার করা হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হোক, কেউ চাইবে না। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ভীষণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে—প্রতিদিনের সংবাদপত্রে আমরা সে খবর পাচ্ছি। এই বিরস সত্য অস্বীকার করার মূর্খতা যেন সরকারের না হয়। শোকের মাস আমরা পালন করব অশ্রুসিক্ত বেদনায়, নম্রতায় এবং প্রার্থনা করব, যেন আর কোনো নতুন শোকের কারণ না ঘটে।
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী: শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বার্ষিক গড় নেমে এসেছে সাড়ে ৬ শতাংশে- জুনে মূল্যস্ফীতির হার ২.২৫%

মূল্যস্ফীতির হার বেশ নিম্ন পর্যায়ে রেখে ২০০৮-০৯ অর্থবছর শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সর্বশেষ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, জুন মাসে মাসওয়ারি মূল্যস্ফীতির হার নেমে এসেছে ২ দশমিক ২৫ শতাংশে।
এর আগে মে মাসে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর গত বছরের জুন মাসে এ হার ছিল ১০ শতাংশ।
এর ফলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বেশ খানিকটা স্বস্তি পেতেই পারেন। কারণ, ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যহ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ উত্পাদন পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ায় মূল্য পরিস্থিতির এই (নিম্নমুখী) ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরের জন্য বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে দাঁড়াবে বলে অনুমান করা হয়েছে।’
বাস্তবে মূল্যস্ফীতির বার্ষিক গড় হার অর্থবছর শেষে সাড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি নেমে গেছে।
২০০৭-০৮ অর্থবছর শেষে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ (৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ)।
মূলত ডিসেম্বর থেকে বিশ্ববাজারে পণ্যসামগ্রীর দাম কমতে শুরু করায় দেশের বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, যার প্রতিফলন ঘটেছে মূল্যস্ফীতির হারে। এর পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে মূল্যস্ফীতির হার নিম্নমুখী রাখতে সহায়তা করেছে।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরবরাহজনিত পরিস্থিতির উন্নতি হওয়াই মূল্যস্ফীতির হার নিম্নমুখী হওয়ার প্রধান কারণ।’
জায়েদ বখত ব্যাখ্যা করে বলেন, বিশ্ববাজারে দাম কমে আসা এবং দেশে কৃষি উত্পাদন ভালো হওয়া সরবরাহকে স্থিতিশীল করতে ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম অনেক কমেছে। ভারতসহ যেসব দেশ খাদ্য রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
গত অর্থবছরে এক কোটি ৬০ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বোরোর উত্পাদন হয়েছে এক কোটি ৮৫ লাখ টন। অন্যদিকে আমনের এক কোটি ২০ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ফলন হয়েছে এক কোটি ৩০ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এ তথ্য দিয়েছে।
তবে নিম্ন মূল্যস্ফীতিতে এখনই বেশি সন্তুষ্ট না হওয়ার পক্ষে মত দেন জায়েদ বখত। তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোয় মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়ে গেছে। কারণ, বিশ্ববাজারে দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সরকারের সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আগাম প্রস্তুতি হিসেবে নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাজারদর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জায়েদ বখত বলেন, সরকারকে বিশ্ববাজার থেকে নিম্নমূল্যের সময় পণ্য কিনে মজুদ বাড়াতে হবে, যেন যখনই মূল্যস্ফীতির চাপ দেখা দেয় তখনই মজুদ থেকে বাজারে ছেড়ে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। এ জন্য তিনি আবার সরকারের মজুদ ও বণ্টনক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন।

জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্প

জাপানে গতকাল বৃহস্পতিবার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ছয় দশমিক সাত। ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে রাজধানী টোকিওসহ জাপানের মধ্যাঞ্চল।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে জানায়, স্থানীয় সময় সকাল পৌনে আটটার দিকে টোকিও থেকে ৩২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি।

আফগানিস্তানের কাতারে ভারতের অবস্থান- সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে গঠিত মার্কিন কংগ্রেসের একটি প্যানেল কমিশন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য ভারতকে আফগানিস্তান, সোমালিয়া ও কিউবার মতো দেশের সঙ্গে একই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে দেশটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা বলেছে। কমিশন বলেছে, ভারতে ধর্মীয় সহিংসতা বৃদ্ধির মাত্রা উদ্বেগজনক। খবর বিবিসির।
প্যানেলটি তার বার্ষিক প্রতিবেদন গত মে মাসে প্রকাশ করলেও ভারতের অংশটি সদ্য প্রকাশ করেছে। এর কারণ, আগে এই কমিশনের সদস্যদের ভারত সফরের ভিসা দেওয়া হয়নি। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর এ বিষয়ে ভারত সরকারের কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।
সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটি নামের সংস্থাটি মানবাধিকার বিষয়ে গবেষণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেস যে চিত্র তুলে ধরেছে, বাস্তবতা কি আসলে তাই? এ বিষয়ে মানবাধিকার-সম্পর্কিত গবেষণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ভারতের সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটির গবেষক আদিত্য নিগম বিবিসিকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি জাতীয়তাবাদী অবস্থান থেকে কথা বলতে চাই না। প্রতিবেদনে মূলত দুটো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে, উড়িষ্যায় খ্রিষ্টানবিরোধী সহিংসতা, অন্যটি গুজরাটে ২০০২ সালের ঘটনা। ভারতকে আফগানিস্তানের সঙ্গে রাখা হয়েছে, জাতীয়তাবাদী অবস্থান থেকে দেখতে গেলে সেটা খারাপ লাগতে পারে। কারণ আমাদের এখানে তালেবান নেই। ২০০২ সালে গুজরাটে দাঙ্গার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের এখনো শাস্তি দেওয়া হয়নি।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা সহিংসতার শিকার হয়েছে তাদের প্রতিকার বা সুরক্ষা দিতে বিচার বিভাগ ও পুলিশ হয় অনিচ্ছুক নয়তো অক্ষম। আসলে কোনটা? বিবিসির এই প্রশ্নের জবাবে আদিত্য নিগম বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রকাশিত সব প্রতিবেদনেই দেখা গেছে, পুলিশ সংখ্যাগরিষ্ঠদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় থেকে আসে, সেভাবেই তারা চিন্তাভাবনা করে। কাজেই দৃষ্টিভঙ্গির কোনো তফাত্ আলাদাভাবে নেই।’
আদিত্য নিগম বলেন, এর মধ্যে রাজনৈতিক ব্যাপারও আছে। সরকার কিংবা রাজ্যের তরফ থেকে যেটার অভাব, সেটা হচ্ছে রাজ্যের সংস্থাগুলোর (বিচার বিভাগ, পুলিশ) আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ নেই। ছোটখাটো যে আদালতগুলো চলে, ওখানকার বিচারকদের দৃষ্টিভঙ্গির তফাত্ এদের থেকে বেশি নেই।

আইএসআইয়ের ৩২ কর্মকর্তাকে ছাঁটাই

পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) শীর্ষস্থানীয় ৩২ জন কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করেছে সে দেশের সরকার।
দেশটির সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানানো হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই ব্রিগেডিয়ার ও কর্নেল পদের। তাঁদের অনেকেরই অবসরের বয়স হয়েছিল, অনেককে অবসরের পরও ফের কাজে নিয়োগ করা হয়েছিল। প্রয়োজনে অতিরিক্ত লোক কাজ করছিলেন আইএসআইয়ে। তাই শুধু সংস্থার মেদ ঝরাতে সরকারের এই পদক্ষেপ এবং এ প্রক্রিয়া চলবে আরও দুই বছর। এমনটাই দাবি করছে আইএসআই।
তবে সংস্থার দাবি যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থায় এই রদবদল নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছে আইএসআই। আর সে কারণে অভিযানের সময় জঙ্গিদের ধরা যায় না। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, মার্কিন চাপেই এই ব্যাপক রদবদল করতে বাধ্য হয়েছে আইএসআই।

আর্জেন্টিনায় সাবেক জেনারেলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

আর্জেন্টিনার এক সাবেক জেনারেলকে গত বুধবার সে দেশের আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। দেশটিতে সেনাশাসন চলাকালে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে এ সাজা দেওয়া হয়েছে। খবর এএফপির।
আর্জেন্টিনায় ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ‘ডার্টি ওয়ার’ চলার সময় সাবেক জেনারেল সান্তিয়াগো ওমর রিভেরস (৮৬) একটি কুখ্যাত বন্দিশিবিরের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তখন ‘ক্যাম্পো ডি মেও’ নামের ওই বন্দিশিবিরে বহু মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। ১৯৭৬ সালে রিভেরস ১৫ বছর বয়সী কমিউনিস্টপন্থী তরুণ ফ্লোরিয়েল অ্যাভেলানিদাকে পিটিয়ে হত্যা করেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা এ অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ওই তরুণের মা ইরিস পেরেইরাকেও সেনারা তখন বন্দিশিবিরে ধরে নিয়ে যায়। তিনি আদালতকে জানান, তখন তাঁর বাহু ও বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। তাঁকে তিন বছর আটক রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় অন্তত ৩০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়।
নির্যাতন ও হত্যার দায়ে রিভেরসের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান ফারনান্দো ভেরপ্লাতেসেনকে ২৫ বছর এবং অন্য চার সেনা কর্মকর্তাকে আট থেকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ডানপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠী মাথা চাড়া দিচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে বারাক ওবামা নির্বাচিত হওয়ায় দেশটির ডানপন্থী স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো এক দশক নিশ্চুপ থাকার পর আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। গত বুধবার সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টারের (এসপিএলসি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। খবর এএফপির।
মার্কিন ‘হেট গ্রুপ’ ও চরমপন্থীদের গতিবিধি নিয়ে ‘দি সেকেন্ড ওয়েভ: রিটার্ন অব দ্য মিলিশিয়া’ শিরোনামে প্রতিবেদনে বলা হয়, আদর্শগতভাবে বর্ণবাদী এবং তীব্রভাবে সরকারবিরোধী, অভিবাসী ইস্যু এবং করারোপের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের বিরোধী স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো নব্বইয়ের দশকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এরপর থেকে তারা ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালানোর তাড়না অনুভব করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মাত্র ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে গোষ্ঠীগুলো ওই অবস্থায় এসে দাঁড়ায়।’ একে তিনি হুমকি ও সহিংসতার প্রাক-মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেন।
১৯৯৫ সালে ওকলাহোমা সিটিতে সরকারি ভবনে বোমা হামলায় ১৬৮ জন নিহত হওয়ার পর ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। গত দশকে প্রায় নিয়মিতই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এসপিএলসির মার্ক পোটক বলেন, রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় সন্ত্রাসী হামলা অনেকাংশে কমে আসে। তাদের মতে, ওই সময়ের সঙ্গে আজকের মূল পার্থক্য হলো প্রেসিডেন্ট পদে একজন কৃষ্ণাঙ্গের আসীন হওয়া, যা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যকামীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এসপিএলসির গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সালে ‘হেট গ্রুপের’ সংখ্যা ছিল ৬০২টি। ২০০৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২৬টিতে। এতে বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সন্ত্রাসীদের হাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের খুনের সংখ্যা তুলে ধরে আগের সময়ের তুলনা করা হয়। এসপিএলসির ল্যারি কেলার বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নির্বাচিত হওয়ায় ‘চরম হতাশ’ এক ব্যক্তি তেজস্ক্রিয় ‘নোংরা বোমা’ তৈরি করেছেন। আর এক ক্ষুব্ধ ব্যক্তি ফ্লোরিডার প্রধান দুই আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে হত্যার জন্য মিলিশিয়া গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বারাক ওবামা জন্মগতভাবে মার্কিন নাগরিক না হওয়ায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না—এই অভিযোগ তুলে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে ‘বার্থার’ নামের একটি গোষ্ঠী।
ডানপন্থী নানা আন্দোলনের দীর্ঘদিনের বিশ্লেষক চিপ বার্লেট বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহিংসতারই সৃষ্টি করবে বলেই মনে হয়।
মিলিশিয়ারা তাদের আদর্শকে তুলে ধরতে মূলধারার গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও রাজনীতিকদেরও চাপ দিচ্ছে। ফক্স নিউজের বিশ্লেষক গ্লেন বেকের নিচের এই মন্তব্য বিষয়টিকে কিছুটা হলেও তুলে ধরে। তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামাকে ‘ফ্যাসিবাদী’, ‘নািস’ ও ‘মার্কসবাদী’ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রতিদিন গড়ে আড়াই মিলিয়ন দর্শক সন্ধ্যার পর পরই প্রচারিত গ্লেন বেকের ওই অনুষ্ঠান উপভোগ করে থাকেন।
এপ্রিলে সরকারি এক প্রতিবেদনে ডানপন্থী চরমপন্থীরা অর্থনৈতিক মন্দা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে বলে সতর্ক করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি নির্বাচনের সময় বারাক ওবামা যাঁদের নির্বাচনী কাজে নিয়োগ দিয়েছিলেন তাঁদেরও সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করতে পারে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। এর মাধ্যমে তাঁরা ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন বলে সরকারি ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

রোমারিওর দুঃসময়

রোমারিও
বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে খেলবে তাঁর প্রিয় ক্লাব আমেরিকা আরজেতে। কিন্তু ওই ক্লাবে না খেলেই রোমারিও শেষ করলেন তাঁর ফুটবল-জীবন। খেলা ছেড়ে দেওয়ার এক বছর পর এটা মনে পড়াতেই যন্ত্রণাবিদ্ধ সাবেক ব্রাজিলীয় স্ট্রাইকার। পেলের পর ক্যারিয়ারে হাজার গোল করা ইতিহাসের দ্বিতীয় ফুটবলার তাই ঠিক করেছেন অবসর ভেঙে আবার মাঠে ফিরবেন, ‘আমি আমেরিকার হয়ে একটি বা দুটি ম্যাচে কয়েক মিনিট খেলব। বাবার স্বপ্নটা পূরণ করার এটাই একটা পথ।’
গত বছর খেলা ছেড়ে ব্রাজিলের ’৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক যুক্ত হয়েছেন ফুটবল প্রশাসনে। বলাই বাহুল্য, প্রয়াত বাবার প্রিয় ক্লাব আমেরিকাতেই। কিন্তু ক্লাবটি রিওর ক্যারিওকা দ্বিতীয় বিভাগে ধুঁকছে। ৪৩ বছর বয়সী রোমারিওর কি মনে হচ্ছে, নেপথ্যে কাজ না করে মাঠে নেমে পড়াই উত্তম!
শুধু ধুঁকতে থাকা ক্লাব নয়, রোমারিওকে সামলে নিতে হচ্ছে নিজের অর্থনৈতিক দুর্দশাও। দেনার দায়ে জর্জরিত এই সাবেক তারকা স্ট্রাইকারকে পাওনা পরিশোধ করতে বেচে দিতে হয়েছে নিজের বিলাসবহুল বাড়িটি। কর ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে সাড়ে তিন বছরের সাজা আর ৯ লাখ ডলারের বিশাল অঙ্কের জরিমানার খড়্গও ঝুলছে মাথার ওপর।
বিপদ যখন আসে, চারপাশ থেকেই আসে। অবৈধ বাজির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্ত চলছে। প্রথম স্ত্রীর খোরপোশ ঠিকমতো না দেওয়ার কারণে কদিন আগে হাজিরা দিতে হয়েছে আদালতেও!
সব ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে সমুদ্র-সৈকতের ধারে প্রাসাদসম বাড়িটি বেচে দিতে হয়েছে। যে বাড়ির দাম প্রায় ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। নিলামে তোলার মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যেই সেটি ৪৩ লাখ ৭০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়ে যায়। বাড়ি বিক্রির সব টাকা ব্রাজিলের আদালতের কাছে গচ্ছিত থাকবে। এখান থেকেই মেটানো হবে ৪২ বছর বয়সী রোমারিও সব ঋণ।

মহারণের আগে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার হুঙ্কার

চেতনায়-আদর্শে চে গুয়েভারা, কার্ল মার্কস আর লেনিনের অনুসারী ডিয়েগো ম্যারাডোনা সমাজতন্ত্রের আদি তীর্থভূমি রাশিয়ায় গিয়েছিলেন আরেক বিপ্লবের সন্ধানে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সর্বশেষ তিন ম্যাচের দুটো হেরে কোণঠাসা আর্জেন্টিনা আগামী মাসে ব্রাজিল-পরীক্ষার আগে পেল দারুণ এক জয়। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ছয় নম্বরে থাকা রাশিয়াকে ৩-২ গোলে হারিয়ে এ ম্যাচে দলে ছন্দ ফিরে আসার ছায়াও দেখতে পাচ্ছেন কোচ ম্যারাডোনা।
পরশু প্রীতি ম্যাচের পসরায় জয় তুলে নিয়েছে ব্রাজিলও। এস্তোনিয়ার বিপক্ষে জিতেছে তারা লুই ফাবিয়ানোর একমাত্র গোলে। আর্জেন্টিনার মতো ব্রাজিলের ছন্দ ফিরে পাওয়ার ব্যাপার-স্যাপার ছিল না। ছিল ছন্দ ধরে রাখার। বাছাইপর্বের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষেই তারা। কদিন আগে জিতেছে কনফেডারশনস কাপও। ওই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ফাবিয়ানোই এদিন ৪৩ মিনিটে গোল করে জিতিয়ে দিয়েছেন দলকে।
কনফেডারেশনস কাপের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনও ফিরেছে জয়ের ধারায়। ০-২ গোলে পিছিয়ে থেকেও ফার্নান্দো তোরেস, জেরার্ড পিকে আর রিয়েরার দ্বিতীয়ার্ধের তিন গোল মেসিডোনিয়ার বিপক্ষে ৩-২ গোলে জিতিয়েছে স্পেনকে। ফিরে পাওয়ার ব্যাপার ছিল ইতালিরও। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গোলমুখ খুলতেই পারেনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। গোলশূন্য ড্র ম্যাচে একমাত্র প্রাপ্তিটা ব্যক্তিগত, পাওলো মালিদিনির ইতালির পক্ষে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন ফ্যাবিও ক্যানাভারো (১২৭ ম্যাচ)। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে প্রথমার্ধে দুই গোল খেয়ে হারতে বসেছিল ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধে দু গোল করে ইংল্যান্ডের পরাজয় এড়ান জার্মেইন ডিফো।
একগাদা প্রীতি ম্যাচের আড়ালে আসলে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের পরের রাউন্ডের আগে নিজেদের ঝালিয়ে নিল দলগুলো। তাতে সবচেয়ে বড় আনন্দের সংবাদ আর্জেন্টিনাই পেয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বর বাছাইপর্বে ব্রাজিলের সঙ্গে মহারণ। ওই ম্যাচে হারলে আর ইকুয়েডর একই দিন বলিভিয়ার বিপক্ষে জিতলে আর্জেন্টিনা নেমে যাবে ৫ নম্বরে। এই কোণঠাসা অবস্থায় শুধু জয় নয়, দলে মরিয়া চেষ্টার ছাপও দেখতে চেয়েছিলেন ম্যারাডোনা। মেসি-তেভেজবিহীন আর্জেন্টিনা খুশিই করেছে কোচকে।
১৭ মিনিটে ইগর সেমশোভের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল রাশিয়াই। গোল খেয়ে চৈতন্য ফেরা আর্জেন্টিনা মরিয়া হয়ে ওঠে। ৪৫ মিনিটে জামাতা সার্জিও আগুয়েরোই দুশ্চিন্তামুক্ত করেন ম্যারাডোনাকে। ৪৬ মিনিটে লিওঁ স্ট্রাইকার লিসান্দ্রো লোপেজের গোলে এগিয়ে যায় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৮ নম্বরে থাকা আর্জেন্টিনা। আর ৫৯ মিনিটে নাপোলির জেসাস দাতোলো স্কোরটাকে বানিয়ে দেন ৩-১। ৭৮ মিনিটে রোমান পাভলিউচেঙ্কোর গোলে ব্যবধান কমালেও সমতা আর ফেরাতে পারেনি রুশরা।
সোভিয়েত জমানার পর এই প্রথম মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। আর জাদুকর কোচ গাস হিডিঙ্কের ছোঁয়ায় ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা রাশিয়ার মতো দলের বিপক্ষে জিততে পেরে ম্যারাডোনা খুশি, ‘রাশিয়া এখন বিশ্বের সেরা দলগুলোর একটি। তার পরও আমরা ওদের বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলেছি। তিনটি গোল দেওয়া, জয়—সব মিলে দারুণ ফলাফল।’
এ ম্যাচে ম্যারাডোনা নিজেও খেলেছেন বেশ। ধুরন্ধর হিডিঙ্ক হার মেনেছেন তাঁর কৌশলের কাছে। বদলি হিসেবে নামানোর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই গোল করেছেন লোপেজ। তৃতীয় গোলটিও অন্য ‘সুপার সাব’ দাতোলোর।
শিষ্যরা তাঁর কথামতো খেলতে পেরেছেন বলেও খুশি ম্যারাডোনা। গত তিন ম্যাচের দুটোতে হেরে যাওয়ার পর সরব সমালোচকদেরও একটা মৃদু জবাব ম্যারাডোনা দিয়ে দিলেন, ‘আজ (পরশু) আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, আমরা এখনো জীবিত, এখনো আমরা আমাদের সমর্থকদের আনন্দ দিতে পারি।’
এ ম্যাচে কয়েকজন নতুন খেলোয়াড়কে বাজিয়ে দেখার ঝুঁকি নিয়েও সফল ম্যারাডোনা। তাই বললেন, ‘এ দলটিরই ৮৫ থেকে ৮৮ শতাংশ খেলোয়াড় ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলবে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচের আগে আমরা যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি, সেটি দেখিয়ে দেওয়াও জরুরি ছিল। ছেলেরা সেটি পেরেছে।’
দুই দল ভিন্ন ভিন্ন দুই দেশে, ভিন্ন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলেও চোখ রেখেছিল একে অন্যের বিপক্ষে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দুদলই জয় পেয়ে ৫ সেপ্টেম্বরের জন্য হুঙ্কারও দিয়ে রাখল।

সাঈদ আনোয়ার আবার ক্রিকেটে

কবজির মোচড়ে ফ্লিক বা নিখুঁত কভার ড্রাইভ—তাঁর আভিজাত্যপূর্ণ স্ট্রোক-প্লে এখনো রোমাঞ্চিত করে ক্রিকেট-সৌন্দর্যপিপাসুদের। ২০০৩ সালে তাঁর অবসরের পর পাকিস্তান এখনো নির্ভরযোগ্য কোনো ওপেনার না পাওয়ায় আরও বেশি করে মনে করিয়ে দেয় সাঈদ আনোয়ারকে। ছয় বছর পর ব্যাট হাতে আবারও দৃশ্যপটে ফিরছেন সাবেক এই স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান। তবে এবার নিজে মাঠে নামবেন না, দীক্ষা দেবেন উত্তরসূরিদের। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে খুব শিগগিরই পাকিস্তানের ব্যাটিং কোচ হিসেবে দেখা যাবে ৪০ বছর বয়সী আনোয়ারকে।
টপ-অর্ডার ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা পাকিস্তান ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা। এই রোগ সারানোর জন্য আনোয়ারকেই সবচেয়ে যোগ্য লোক মনে করেছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। যে দলের হয়ে দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর মাঠ মাতিয়েছেন, সেই দলের দুর্দিনে সাড়া না দিয়ে পারেননি দীর্ঘদিন ক্রিকেটের আড়ালে থাকা এই সাবেক ওপেনার। বোর্ডের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সম্প্রতি দেখা করেছেন বোর্ড সভাপতি ইজাজ বাটের সঙ্গে। আলোচনা ফলপ্রসূ হওয়ায় সন্তুষ্ট ইজাজ বাটও, ‘পিসিবি ও পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সহায়তা করতে রাজি হওয়ায় আমরা সাঈদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি নিশ্চিত, পাকিস্তানের ক্রিকেটে সে অনেক অবদান রাখতে পারবে।’ বোর্ডসূত্র জানিয়েছে, আরও কয়েক দফা আলোচনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।
৫৫ টেস্টে ১১ সেঞ্চুরিতে সাঈদ আনোয়ারের রান ৪০৫২। তবে বর্তমানে ধর্মকর্ম নিয়ে বেশি ব্যস্ত এই ব্যাটসম্যান স্মরণীয় হয়ে আছেন ওয়ানডেতে বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের জন্য। ২৪৭ ওয়ানডেতে ২০ সেঞ্চুরিতে তিনি করেছেন ৮৮২৪ রান। ১৯৯৭ সালে ভারতের বিপক্ষে চেন্নাইয়ে তাঁর খেলা ১৪৬ বলে ১৯৪ রানের ইনিংস ওয়ানডের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংস হিসেবে টিকে আছে এখনো।

আজই শেষ ঘটনাবহুল ফুটবল ক্যাম্প

ফুটবল দলের ঘটনাবহুল আবাসিক ক্যাম্প শেষ হচ্ছে আজ। এই ক্যাম্পে কোচ ডিডো যেমন তাঁর ভবিষ্যত্ যাত্রার একটা ধাপ পেরোলেন, তেমনি নানা ঘটনায় বেশ উত্তপ্তই ছিল সময়টা। ফুটবলারদের এমন আবাসিক ক্যাম্প এর আগে বাংলাদেশের ফুটবলে হয়নি!
একই সঙ্গে আট খেলোয়াড়কে ক্যাম্প থেকে বের করে দেওয়া, ডিডোর নিজে পদত্যাগ করে চলে যেতে চাওয়া, বাফুফের মধ্যস্থতায় ওই আট খেলোয়াড়কে ক্যাম্পে ফিরিয়ে নিলেও ডিডো তাঁদের আলাদাই অনুশীলন করিয়েছেন শেষ পর্যন্ত। সর্বশেষ চার দিন আগে কোচ ক্যাম্পে প্রীতম নামের তরুণ এক খেলোয়াড়কে ধাক্কা মেরেছেন বলে শোরগোল উঠল, আবার দেনদরবার। সবকিছু মিলিয়ে এই ক্যাম্প যতটা অনুশীলনের জন্য আলোচিত, তার চেয়ে বেশি আলোচিত অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় সামনে হাজির হওয়ায়।
সবকিছুর কেন্দ্রেই কোচ ডিডো। বারবার খেলোয়াড়দের অনুশীলন-সুবিধার স্বার্থে ফেডারেশনকে চাপ দিয়ে গেছেন, চেয়েছেন পর্যাপ্ত সুযোগ। কিন্তু অনুশীলনের জন্য যতটা সময় চেয়েছিলেন, ততটা পাননি ডিডো। কক্সবাজারে তিন সপ্তাহ কন্ডিশনিং ক্যাম্পের পর বিকেএসপিতে মাসখানেক চলল ক্যাম্প। এতে কি সন্তুষ্ট ব্রাজিলীয় কোচ? বিকেএসপি থেকে ফিরে আসার আগের রাতে ফোনে ডিডো জানালেন, পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন, ‘অনুশীলনসূচিটা তো শেষ করতে পারিনি। ঘাটতি তো রয়েই গেছে।’
অধিনায়ক আমিনুল অবশ্য খুশিই। তবে অনুশীলনটা বেশ কার্যকরই হয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস, ‘ডিডো এবারের ক্যাম্পে আমাদের ফিটনেস নিয়েই বেশি কাজ করেছেন। রানিংটার ওপরই জোর দিয়েছেন। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো হয়েছে এই অনুশীলন পর্বটা। খেলোয়াড়েরা অনেক উপকৃত হবে।’
আজ থেকে খেলোয়াড়েরা ফিরে যেতে পারবেন নিজ নিজ ক্লাবে। সামনে ফেডারেশন কাপ, বি-লিগ। এখানেই খেলোয়াড়দের দিতে হবে আসল পরীক্ষাটা। ডিডো ৩০ জন খেলোয়াড় নিয়ে ক্যাম্প শুরু করেছিলেন ডিসেম্বরের সাফ ফুটবল সামনে রেখে, এরপর আছে এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপ। নভেম্বরে প্রস্তুতি টুর্নামেন্ট খেলতে ব্যাংককে যাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু কক্সবাজার এবং বিকেএসপিতে যাঁরা ক্যাম্প করলেন, তাঁরা কিন্তু কেউই দলে নিশ্চিত নন। ঘরোয়া ফুটবলে পারফরম্যান্স দেখেই কোচ আবার নতুন করে খেলোয়াড়দের ক্যাম্পে ডাকবেন—এই হলো ক্যাম্প শেষ হওয়ার আগের দিনের সিদ্ধান্ত।
আট খেলোয়াড় যেমনটা আশঙ্কা করছেন, কোচ তাঁদের দলে নাও রাখতে পারেন, সেই সুযোগ আর থাকবে না এই সিদ্ধান্তের পর। কোচ তাঁদের আলাদা অনুশীলন করালেও শেষ পর্যন্ত মূল দলে থাকার সুযোগ তাঁরা পাচ্ছেনই। কাজেই অনুশীলন করতে চাননি বলে কোচ তাঁদের ক্যাম্প থেকে বহিষ্কার করার পর বাফুফে সভাপতির মধ্যস্থতায় ফিরে যাওয়ার পরও এত দিন ধরে যে মনোবেদনায় ভুগছেন, সেটি অমূলক। মাঠেই নিজেদের প্রমাণ করতে হবে, বলে দিয়েছেন কাজী সালাউদ্দিন।
সালাউদ্দিন বরাবরই বলে এসেছেন, কোচই দলের সর্বেসর্বা। তিনি যেভাবে দল চালাচ্ছেন সেভাবেই চলবে। বাফুফের জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে কাল নিজের বাসায় দীর্ঘ তিন ঘণ্টার সভায়ও সেটিই বহাল থাকল। এই সভায় ঠিক হয়েছে, ডিডো আপাতত খেলা দেখে বেড়াবেন। আর সহকারী কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক চলে যাবেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সঙ্গে। ওই দলটির কোচ থাকবেন মানিক। এরই মাঝে ডিডো চাইলে তাঁর কোচিং স্টাফ আরও শক্তিশালী করতে পারেন। প্রয়োজনে তাঁকে আরও সহকারী কোচ দেওয়া হবে।
সভাশেষে সালাউদ্দিন বলেছেন, ‘খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি, কোন এক খেলোয়াড়কে ডিডোর ধাক্কা মারার বিষয়টি অতিরঞ্জিত। এটা নিয়ে শোরগোল তোলার কিছু নেই। ক্যাম্পে টুকটাক ব্যাপার-স্যাপার হতেই পারে, এটাকে রং দিয়ে দলে ভাঙন ধরানোর কোনো যুক্তি নেই। ক্যাম্প যেভাবে চলছে, ডিডোর নেতৃত্বে সেভাবেই এগিয়ে যাবে। আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করব না।’
ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান বাদল রায়েরও একই সুর। সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছেন, তাঁরা মনে করেন শিক্ষক হিসেবে খেলোয়াড়কে শাসন করার ক্ষমতা আছে কোচের। কাজেই এক খেলোয়াড়কে ধাক্কা মারার বিষয়টি বড় কিছু নয়। তবে কোচের ‘জেদ’ দেখছেন তাঁরা। এটা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ কোচের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে থাকলেও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোচকে সমর্থন দিয়ে যাওয়ারই পক্ষে কমিটি। তবে ভবিষ্যতে কোচিং স্টাফ বদলে দেওয়ার চিন্তাটাও কমিটির মাথায় আছে।