Showing posts with label চৌধুরী মুমতাজ আহমদ. Show all posts
Showing posts with label চৌধুরী মুমতাজ আহমদ. Show all posts

Saturday, June 9, 2018

সিলেটের পথের দুঃখ: টাকা উড়ে রেকারে by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী যানবাহন বা ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা প্রয়োজনীয় কাগজবিহীন গাড়ি, কিংবা বিকল হয়ে পড়া কোনো গাড়ি রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়াটাই এর কাজ। কিন্তু এসব কিছুই করতে হয় না। ‘নির্বিষ’ সাপের মতো এক কোণে পড়ে রয় এটি। তবে নিরীহদর্শন এ বাহনটি কোন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছে দেখলেই আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠে সিলেট নগরীর গাড়িচালকদের। বিশেষ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের তো এ বাহনটি দেখলে কলজে শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। ‘রেকার বা টো ট্রাক’ নামের এ বাহনটির ফাঁদে পড়লে বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে তো হয়ই পাশাপাশি নষ্ট হয়ে যায় আরো দু-একদিনের রোজগার।
রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি চালানো, রুট পারমিট না থাকা, গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকা বা গাড়ির ফিটনেস না থাকাসহ নানা কারণে রেকারিং করা হয়ে থাকে। তবে সিলেটে সবচেয়ে বেশি রেকারিং হয় ‘রং পার্কিং’এর অভিযোগে। কারণ এর জন্য খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় না ট্রাফিক সদস্যদের। সিলেট নগরীতে পার্কিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। তাই যেকোনো জায়গায় গাড়ি রাখলেই রং পার্কিংয়ের দোহাই দিতে পারেন ট্রাফিক সদস্যরা। রেকারে তোলার বিল হিসেবে বাড়তি জরিমানা নেয়া হলেও কোনো গাড়িই রেকারে তোলেন না। ট্রাফিকের একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে দিয়ে গাড়িচালককে দিয়েই গাড়ি পাঠানো হয় ট্রাফিক অফিসে। আর রেকারটি পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকে শোভা হিসেবে, আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য।
গাড়িচালকদের জন্য আতঙ্কের কারণ হলেও সিলেটে রেকারিং ট্রাফিক বিভাগের টাকা আয়ের বড় একটি উৎস হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন রেকার বাবদ বিশাল অঙ্কের টাকা জমা হচ্ছে ট্রাফিক বিভাগে। অভিযোগ রয়েছে, এ টাকার কোনো অংশই সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। পুরোটাই ভাগাভাগি হয়ে যায় নিজেদের মাঝে। রেকার ব্যবসা জমজমাট হওয়ায় দ্রুতই ফুরিয়ে যায় রেকার বিলের রশিদ বইও। সামাল দিতে তাই স্থানীয়ভাবেই ছাপানো হয় বইগুলো। সরকারি ছাপাখানা (বিজি প্রেস) থেকে এ ধরনের রশিদ বই ছাপিয়ে আনার কথা থাকলেও একটি সূত্রে জানা গেছে নগরীর লামাবাজারের একটি প্রেস থেকেই ছাপানো হচ্ছে রশিদ বই। রেকারিংয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন যানবাহনের জন্য হার নির্ধারিত থাকলেও এক্ষেত্রেও কোনো নিয়মনীতিই মানা হচ্ছে না।
এসএমপির ট্রাফিক বিভাগসূত্রে জানা গেছে, তিন চাকার অটো রিকশার জন্য রেকার বিলের হার হচ্ছে ৬শ’ টাকা, টেম্পো বা হিউম্যান হলারের জন্য বিল হচ্ছে ৯শ’ টাকা, মোটরসাইকেল, কার, মাইক্রোবাস, পিকআপের জন্য বিল হচ্ছে ১২শ’ টাকা, ট্রাকের জন্য ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা আদায় করা হচ্ছে। তা না হলে গাড়ি আটকে রাখা হয় দিনের পর দিন।
প্রাইভেট কার বা বড় গাড়ি সাধারণত রেকারিংয়ের (রেকারের আওতায় আনা) শিকার হয় না। কারণ এ সকল গাড়ির মালিকরা প্রায়ই প্রভাবশালী হয়ে থাকেন। এদের ছুঁয়ে ঝামেলা বাড়াতে চান না রেকারের দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা। তাই যা ঝড় যায়, তা তিন চাকার অটোরিকশার উপর দিয়েই যায়। প্রতিদিনই পয়েন্টে পয়েন্টে রেকারিং নিয়ে ঝামেলা হয় ট্রাফিক সদস্যদের সঙ্গে দরিদ্র অটোরিকশাচালকদের। রেকারিং থেকে বাঁচতে তারা হাতে-পায়েও ধরেন ট্রাফিক সদস্যদের। কিন্তু কাজ হয় না কিছুতেই। কান্নাকাটি করেও মন গলাতে পারেন না। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাল অঙ্কের এক বাণিজ্যের সুতো। তাই ছাড় দেয়ার উপায় থাকে না রাস্তায় দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক সদস্যদের। উপর থেকেই তাদের কাছে রেকারিংয়ের নির্দেশনা রয়েছে। অলিখিত একটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে প্রতিদিন নগরীতে অন্তত ৫০টি গাড়ি রেকারে তুলতেই হবে। এর মধ্যে বিভিন্ন পয়েন্টের জন্য সর্বনিম্ন টার্গেটও বেঁধে দেয়া আছে। নগরী বন্দরবাজারে অন্তত ১০টি, আম্বরখানায় ১০টি, হুমায়ূন রশীদ স্কয়ারে ৪টি, চণ্ডিপুলে ৪টি, রিকাবীবাজারে ২টি সুবিদবাজারে ২টি, টিলাগড়ে ২টি গাড়িকে রেকারিং করতে হয়। রাস্তায় দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক সদস্যদের বাধ্যতামূলকভাবেই এ টার্গেট পূরণ করতে হয়। রেকারিংয়ের চাপ সইতে না পেরে অনেক ট্রাফিক সার্জেন্টই ইতোমধ্যে সিলেটে ছেড়ে বদলি নিয়ে চলে গেছেন। এমনই এক ট্রাফিক সার্জেন্ট বললেন, উপরের নির্দেশে রেকারিং করতে গেলে কোনো মানবিক গুণই বাঁচানো সম্ভব নয়। সিলেট থেকে সরে গিয়ে বেঁচেছেন বলে মনে করেন এ সার্জেন্ট।
এসএমপিতে সব মিলিয়ে রেকার আছে ৩টি। এর মধ্যে একটির মালিকানা নিজেদের হলেও বাকি দুটো ভাড়ায় এনে কাজ সারা হচ্ছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ভাড়ায় আনা দুটো রেকারই মাঠে সক্রিয় রয়েছে। কভাড়ার হিসেবটাও কোনো নিয়মনীতির আওতায় নেই। এখানেও রয়েছে ভাগাভাগির হিসাব। একটি সূত্রে জানা গেছে, রেকার বিল হিসেবে যা আদায় হয় তা ভাগাভাগি হয় ‘ফিফটি-ফিফটি’ হিসেবে।
রেকারিং নিয়ে নানা অভিযোগের বিপরীতে কথা হয় এসএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (ট্রাফিক) নিকুলিন চাকমার সঙ্গে। রশিদ বই ছাপানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে নিজস্ব ইউনিট থেকে রশিদ ছাপাতে সমস্যা নেই। রেকারিং বাবদ আদায়কৃত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আদায়কৃত টাকা চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়। প্রায় চার বছর ধরে ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্ব সামলালেও অনেক প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারেননি পুলিশের এ কর্মকর্তা। অনেক তথ্যই জানা নেই বলে, উপকমিশনারের (ট্রাফিক) কাছ থেকে জেনে নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। নিকুলিন চাকমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো গত ৬ মাসে বা এক মাসে কতটা গাড়ি রেকারিং করা হয়। রেকারিং বাবদ গড়ে মাসে কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়-এমন প্রশ্নে তিনি উপকমিশনারকেই দেখিয়ে দেন। নিকুলিন চাকমার দেখানো পথে তথ্য পাওয়ার আপাতত সুযোগ নেই। কারণ ট্রাফিক বিভাগের মূল দায়িত্ব যিনি সামলাচ্ছেন তিনি বর্তমানে অন্যের উপস্থিতিতে শুধু রুটিন কাজই করছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত উপকমিশনার তোফায়েল আহমদ প্রশিক্ষণের জন্য গত ২২শে মে চীনে গেছেন। ফিরবেন আরো দিন দশেক পর।

Thursday, May 31, 2018

২৯টি মাস যদি ফিরে পেতাম আরিফের আক্ষেপ by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

২০১৩ সালের ১৫ই জুন জনতার ভোটে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেট নগরের বাসিন্দারা তাকে পাঁচ বছরের জন্য নগরভবনের চাবি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সে মেয়াদ এখন ফুরিয়ে যাওয়ার পথে। নির্বাচন কমিশন নতুন করে ভোটের দিনক্ষণ ঠিক করেছে। আসছে ৩০শে জুলাই সিলেটবাসী আবার নতুন করে বেছে নেবেন নিজেদের অভিভাবক। তবে আরিফের মনে দুঃখ রয়েই গেছে। পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব পেলেও তিনি প্রায় অর্ধেক সময়ই দায়িত্ব থেকে দূরে ছিলেন। তাই নগরবাসীকে দেয়া অনেক প্রতিশ্রুতিই পূরণ করতে পারেননি তিনি। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে সে দুঃখটাই অকপটে বলে গেলেন আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি মনে করেন, জনতার রায়ে তাদের সেবা করার যে অধিকার তিনি পেয়েছিলেন, সেটা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। সময়ের অভাবে অনেক প্রতিশ্রুতিই পূরণ করতে পারেননি। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা তাই তার কাছে ‘অসময়ে’ই বলে মনে হচ্ছে।
পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হলেও সব মিলিয়ে প্রায় ২৯ মাসই দায়িত্বের বাইরে ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় এ সময়টা পদহারা ছিলেন। এর মধ্যে কারাগারে বন্দি অবস্থায় কেটেছে পুরো দুই বছর। বাকি সময়টুকু কেটেছে পদ ফিরে পাওয়ার জন্য আইনি লড়াইয়ে। আরিফুল হক চৌধুরী মনে করছেন, যে সময়টুকুতে তিনি সেবা করার সুযোগ হারিয়েছেন সেটা যদি তাকে ফিরিয়ে দেয়া হতো তবে তিনি নগরবাসীকে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো হয়তো পূরণ করতে পারতেন। যে স্বপ্ন তিনি নগরবাসীকে দেখিয়েছিলেন সেটা পূরণ করতে না পারার আক্ষেপে পুড়ছেন আরিফুল হক। পেছন ফিরে চাইলে দেখতে পান অনেক কাজই বাকি রয়ে গেছে।
আরিফুল হক চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, নগরবাসী আমাকে তাদের পবিত্র আমানত হিসেবে নগরভবনের চাবি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আমি চেষ্টা করেছি, তাদের সে আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করে তাদের সেবা করে যেতে। দীর্ঘদিন দায়িত্বহীন থাকায় আমি তাদের সে সেবা হয়তো দিতে পারিনি। কিন্তু আমার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায়ও বিষয়টি আমাকে যন্ত্রণা দিয়েছিল যে, জনতার দায়িত্ব নিয়েও আমি সে দায়িত্ব পালন করতে পারছি না। আরিফ মনে করেন, পুরোটা না হলেও আরো কিছুটা সময় পেলে তিনি বাকি থাকা প্রতিশ্রুতির কিছুটা হয়তো পূরণ করতে পারতেন।
মেয়র হিসেবে আরিফের পথচলা মোটেও সুখকর ছিল না। দায়িত্বগ্রহণের দেড় বছরের মাথায় থমকে যায় সে চলার পথ। ২০১৪ সালের শেষ দিকে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার সম্পূরক চার্জশিটে অভিযুক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ওই বছরের ৩০শে ডিসেম্বর হবিগঞ্জের আদালতে আত্মসমর্পণ করেন আরিফুল হক। যেতে হয় কারাগারে, হারাতে হয় মেয়র পদও।
মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার কারণে ২০১৫ সালের ৭ই জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। কারাগারে থাকা অবস্থায়ই আরিফুল হক অভিযুক্ত হন ১২ বছর আগে সংঘটিত আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় বোমা হামলা সংশ্লিষ্ট মামলায়ও। মামলাগুলো মাথায় নিয়েই দুই বছর কারাগারের ভেতরে কাটাতে হয় আরিফুল হককে। উচ্চ আদালত থেকে সবকটি মামলায় জামিন লাভের পরই ২০১৭ সালের ৪ঠা জানুয়ারি মুক্তির দুয়ার খুলে আরিফের জন্য। মুক্তি পাওয়ার পর বরখাস্তের সাময়িক আদেশ চ্যালেঞ্জ করলে হাইকোর্ট ওই বছরের ১৩ই মার্চ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আদেশটি ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে দেন। রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের পর স্থগিতাদেশটি টিকে যাওয়ায় ওই বছরের ৩০শে মার্চ নগরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আরিফুল হক। তবে সে দায়িত্বকালের মেয়াদ ছিল মাত্র তিন ঘণ্টা। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে আবার বরখাস্তের চিঠি আসে আরিফুল হকের নামে। আবার পদ হারান, আবার আইনি লড়াইয়ে নামেন আরিফ। মাসখানেক আইনি লড়াই শেষে ২০১৭ সালের ৪ঠা মে আবার দায়িত্ব বুঝে নেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।

Wednesday, May 30, 2018

সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর, অপেক্ষার শেষ নেই by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

২৬শে মার্চ বা ১৬ই ডিসেম্বর- এরকম একেকটি বিশেষ দিবস সামনে এলেই প্রসঙ্গটি উঠে আসে। কয়েক বছর ধরেই নবনির্মিত সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্বোধনের ডেডলাইন হিসেবে বেছে নেয়া হচ্ছে এমন বিশেষ দিনগুলোকে। সেদিন চলে গেলে নতুন আরো একটি বিশেষ দিনকে টার্গেট করা হয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে গত ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসে কারাগারের উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিলো, তারও আগে গত ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের দিনেও কথা ছিলো কারাগার উদ্বোধনের। ১৬ই ডিসেম্বর চলে গেছে, ২৬শে মার্চও চলে গেছে, আপাতত কারাগার উদ্বোধনের কোনো টার্গেট দিনই নেই। কবে উদ্বোধন হবে সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে কোনো ধারণা দিতে পারেননি।
সিলেটে কারাগারের ইতিহাস ১২৯ বছরের পুরনো। ১৭৮৯ সালে নগরীর ধোপাদীঘির পারে ২৪.৬৭ একর ভূমির উপর ১ লাখ রুপি ব্যয়ে গড়ে উঠে কারাগার। বন্দি আধিক্য ও গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৯৭ সালে সিলেট কারাগার উন্নীত হয় কেন্দ্রীয় কারাগারে। সোয়া দুই শ’ বছর পর সেই কারাগারই সরে যাচ্ছে সিলেট নগর থেকে শহরতলিতে। পুরনো ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়া সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি কয়েদি থাকার কারণে ২০১০ সালে একনেকে ১৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ ও স্থানান্তর প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছিল। এরই পরিপেক্ষিতে ২০১১ সালের ১১ই আগস্ট তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জালালাবাদ থানাধীন বাদাঘাটে কারাগারের নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এক বছর পর ২০১২ সালের ১২ই জুলাই শুরু হয় নির্মাণ কাজ।
নির্মাণাধীন সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রকল্পস্থলে সংরক্ষিত মাস্টারপ্ল্যান থেকে জানা গেছে, কারা কম্পাউন্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকবে ৬৪টি ভবন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নির্মিতব্য নতুন কেন্দ্রীয় কারাগারে জায়গা হবে ২ হাজার বন্দির। বন্দিদের রাখা হবে ৭টি ভবনে। এ ভবনগুলোর মধ্যে পুরুষ বন্দিদের জন্য ৪টি এবং নারী বন্দিদের জন্য রয়েছে ৩টি ভবন। পুরুষ বন্দিদের ৪টি ভবনই ৬ তলাবিশিষ্ট আর নারী বন্দিদের জন্য নির্ধারিত ভবনের মধ্যে একটি ৪ তলা এবং দুটি দ্বিতল ভবন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নবনির্মিত কারাগারে হাসপাতাল রয়েছে ৫টি, এর মধ্যে ৪টি শুধুমাত্র বন্দিদের জন্য, অন্যটি কারাগার সংশ্লিষ্টদের। বন্দিদের জন্য নির্ধারিত হাসপাতালের মধ্যে পুরুষ ও নারীদের জন্য ১টি করে ৫ তলাবিশিষ্ট হাসপাতাল, একটি করে দোতলা যক্ষ্মা ও মানসিক হাসপাতাল। রান্নার কাজের জন্য রয়েছে একতলা ৫টি ভবন। খাবার মজুত রাখার জন্য রয়েছে ১ তলা ৪টি ভবন, দোতলা একটি রেস্ট হাউসও আছে। ৪ তলাবিশিষ্ট একটি ডে কেয়ার সেন্টার রয়েছে, মসজিদ আছে, স্কুল আছে, আছে লাইব্রেরিও। সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের ৩০ একর জায়গার মধ্যে মূল কারাগারের ভেতরে রয়েছে ১৪ একর ও বাইরে রয়েছে ১৬ একর জায়গা। কারাগারের বাইরের জায়গায় থাকছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন, ক্যান্টিন, বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার রুম, অ্যাডমিন অফিস, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও স্কুল।
১৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য কারাগারটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালের জুন মাসে। এ সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় লক্ষ্য বেঁধে দেয়া হয় ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। নির্মাণকাজের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়েও এ সময়ের মধ্যে কারাগারের ৭০ ভাগের বেশি কাজ শেষ করা সম্ভব না হওয়ায় তৃতীয় দফায় আরো এক বছর সময় দেয়া হয় কাজ শেষ করার জন্য। ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সে সময়ে কাজ শেষ হয়নি। এরপর আরো এক বছর অতিবাহিত হলেও কারাগার উদ্বোধনের কোনো নিশ্চিত তারিখ এখনো জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এখনো কারাগারের অনেক কাজই বাকি রয়ে গেছে। ফাঁসির মঞ্চ তৈরি হয়নি এখনো। ওয়াকওয়ে ও পুকুরের কাজও শেষ হয়নি। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ হয়নি। বিভিন্ন সূত্র বলছে, বাকি কাজগুলো দ্রুত শেষ করে আগামী নির্বাচনের আগেই সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্বোধন করা হবে।
সিলেট কারাগারের জেলার আবু সায়েম মানবজমিনকে বলেন, কবে নাগাদ কারাগার স্থানান্তর হবে বিষয়টি এখনই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তবে আমরা যেকোনো সময়েই নতুন কারাগারে যাওয়ার জন্য পুরো প্রস্তুত আছি।

Friday, May 18, 2018

ক্রাইম স্পট সিলেট মোটরসাইকেল ও ৩৭ চোর by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

সিলেটজুড়ে মোটরসাইকেল চোরের তালিকা রয়েছে পুলিশের হাতে। ঠিকানাও রয়েছে; কিন্তু চোরের দল দিব্যি তাদের কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই নগরীর কোথাও না কোথাও মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটছে। চিহ্নিত ৩৭ চোর নগরজুড়ে মোটরসাইকেলের  মালিকদের মাঝে  আতঙ্ক ছড়িয়ে রেখেছে।
চোরদের হাত থেকে কারোরই নিস্তার নেই। গত বছরের ২৩শে অক্টোবর নগরীর শিবগঞ্জ থেকে চুরি হয়ে যায় স্থানীয় কাউন্সিলর আবদুর রকিব তুহিনের মোটরসাইকেল। শিবগঞ্জের হাতিম আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেদিন ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছিল। সে কাজ তদারকিতে ব্যস্ত ছিলেন কাউন্সিলর আবদুর রকিব তুহিন। স্কুলের ভেতরই রেখেছিলেন তার লাল রঙের হিরো গ্ল্যামার মোটরসাইকেলটি। দোতলায় উঠেছিলেন কাজ দেখতে, নিচে নেমে দেখেন তার সাইকেলটি আর নেই। আবদুর রকিব তুহিন জনপ্রতিনিধি হওয়ায় তার সাইকেল চুরির খবরটি কাগজের পাতায় এসেছিল, কিন্তু প্রতিদিনই এমন চুরির ঘটনা ঘটছে সিলেটের পথে পথে। সেসব খবর অগোচরেই রয়ে যায়। থাকে হয়তো শুধু থানার সাধারণ ডায়েরিতেই।
জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) ট্র্যাকার, ডিস্ক লক, সিকিউরিটি অ্যালার্ম কিংবা ইঞ্জিন ইমোবিলাইজার সেন্সর সিস্টেম-কোনো প্রযুক্তিই চুরি থামাতে পারছে না। এসব প্রযুক্তির বিপরীতে চোরদের হাতে রয়েছে আরো উন্নত প্রযুক্তি। তাদের কাছে রয়েছে মোটরসাইকেলের লক কাটার আধুনিক ছুরি, মোটরসাইকেলের রঙ পাল্টে নেয়ার উপকরণ, চেসিস ও ইঞ্জিন নাম্বার পরিবর্তন করার যন্ত্র, বিআরটিএ’র জাল কাগজপত্র ও নাম্বার প্লেট, গাড়ির মালিকানার জাল দলিল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও  উপকরণ। আর তাই কোথাও মোটরসাইকেল রেখে একটু বেখেয়াল হলেই মুহূর্তে হাওয়া হয়ে যায় সেটি। চলে যায় চোরদের নিজস্ব ‘হেফাজতে’। সূত্র বলছে, চুরি করা মোটরসাইকেল প্রথমে বিভিন্ন শপিং মল, হাসপাতালের আন্ডারগ্রাউন্ডে রাখা হয়। এর বাইরে চোরদের ‘নিজস্ব’ কিছু গ্যারেজ রয়েছে, সেগুলোতেও রাখা হয়। তারপর সুবিধামতো সময়ে তা অন্যের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। খরিদ্দারের অভাবে বেশি সময় মোটরসাইকেল রাখতে হলে চোরের দল বিভিন্ন অংশ খুলে নিয়ে সাইকেলটিকে টুকরো টুকরো করে ফেলে।
মোটরসাইকেল চোরদের তৎপরতা ভাবিয়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও। চোরদের আইনের আওতায় আনতে তারাও মাঠে নেমেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ইতিমধ্যে ৩৭ চোরকে চিহ্নিত করে একটি তালিকা তৈরি করেছে তারা। মূলত, এ ৩৭ চোরই সিলেট বিভাগজুড়ে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটাচ্ছে।
পুলিশের তৈরি করা তালিকার শীর্ষ নামটি হচ্ছে দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দি গাঙু এলাকার ফারুক মিয়ার ছেলে মনির আহমদ ইমনের (২৬)। নামের তালিকায় মোটরসাইকেল চোরদের ‘দলনেতা’ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে তাকে। তার বিরুদ্ধে ৬টি মামলা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের চোখ এড়াতে সে কখনোই এক স্থানে অবস্থান করে না। কখনো নিজ জালালপুর এলাকার মিয়াজান আলীর বাড়ি, কখনো মামা আবদুর রহমান লন্ডনীর বাড়ি আবার কখনো নগরীর উপশহর এলাকায় থাকে সে।
চোরের লিস্টে টপ ফাইভে রয়েছে দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দির মৃত দুদু মিয়ার ছেলে মাইদুল (৩০), তার ভাই বদরুল, ছাতক উপজেলার গোবিন্দনগরের মৃত নজির আহমদের ছেলে তারেক আহমদ, কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার রসুলপুরের মৃত ছেনু মিয়া মেরাজের ছেলে ও নগরীর মেন্দিবাগস্থ আলমগীরের কলোনির বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান (৩৩)। এর মধ্যে মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে ৮টি, তারেক আহমদের বিরুদ্ধে ৬টি এবং মাইদুল ও বদরুলের বিরুদ্ধে তিনটি করে মামলা রয়েছে।
তালিকায় ৬ নম্বরে রয়েছে দক্ষিণ সুরমার গোটাটিকর পূর্বপাড়ার শহীদ আলীর ছেলে কয়েস আহমদ (৩০)। সে মোটরসাইকেল চুরি করতে গিয়ে কয়েকবার গণধোলাইয়েরও শিকার হয়েছে। জেলও খেটেছে কয়েকবার। তার বিরুদ্ধে রয়েছে ২ মামলা। তালিকার ৭ নম্বরে রয়েছে নগরীর পাঠানটুলার মোহনা ব্লকের এ ২৯/৫ নং বাসার তাহের আলী পাখি মিয়ার ছেলে সেলিম আহমদ (৩০)। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৪টি। তালিকার ৮ নম্বরে রয়েছে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানাধীন কদিমঙ্গল এলাকার স্বপন মিয়ার ছেলে ও নগরীর উপশহর এলাকায় একটি কলোনির বাসিন্দা মেহেদি হাসান। তার বিরুদ্ধে ৩ মামলা রয়েছে। তালিকার ৯ নম্বরে থাকা জৈন্তাপুরের রাইরাখেলের মৃত আলকাছ মির্জার ছেলে মো. সাব্বীর মির্জা (৩০) ও ১০ নম্বরে থাকা বিশ্বনাথের রশিদপুর এলাকার আবদুস সালিকের ছেলে রাসেল আহমদের বিরুদ্ধে ১টি করে মামলা রয়েছে।
তালিকায় ১১ থেকে ১৫ নম্বরে থাকা নামগুলো হচ্ছে যথাক্রমে- জালালাবাদ থানা এলাকার হাইদরপুরের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে সোহেল, শাহপরাণ থানা এলাকার খাদিমপাড়ার সফিক হোসেনের ছেলে আখতার হোসেন, মৌলভীবাজার সদরের ভৈরববাজার গিয়াসনগর এলাকার মেহের আলীর ছেলে ও নগরীর আখালিয়া নতুনবাজারের শাহেদের কলোনির বাসিন্দা লিটন ওরফে শাহীন (৩০), সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দশঘর এলাকার সিরাজের ছেলে আউয়াল হোসেন, উপশহরের তেররতন সাদারপাড়ার ৪৮/এ’র মৃত ওহাব আলীর ছেলে আবদুল মালেক (৩৫)। এদের মধ্যে আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে রয়েছে ২টি মামলা আর বাকিদের বিরুদ্ধে রয়েছে ১টি করে মামলা।
পুলিশের তৈরি করা তালিকায় ১৬ থেকে ২০ নম্বরে থাকা নামগুলো হচ্ছে- ছাতকের দশঘর এলাকার আবু লেইছের ছেলে আবু তাহের (১৬), একই এলাকার তাজ উদ্দিনের ছেলে হোসাইন আহমদ (১৬), সিলট নগরীর জালালাবাদ আবাসিক এলাকার গোয়াবাড়ির মন্তাজ মিয়ার ছেলে কবির আহমদ (২৬), জালালাবাদ থানা এলাকার মদিনা মার্কেট নির্বাসী ৩১নং বাসার মৃত আবদুল মতলিবের ছেলে গোলাম রব্বানী (৩৫), ছাতকের দিখালীর মৃত এখলাছ মিয়ার ছেলে এমরান হোসেন (২৭)। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই ১টি করে মামলা রয়েছে।
মোটরসাইকেল চোরের শীর্ষ ৩০ জনের তালিকায় থাকা অন্য নামগুলো হচ্ছে যথাক্রমে- নগরীর জালালাবাদ থানা এলাকার হাওলাদারপাড়ার কালিয়ারা-৯ এর মুর্শেদ আলীর ছেলে আঙুর মিয়া (২৯), মোগলাবাজার থানা এলাকার গোটাটিকরের হারুনুর রশিদের ছেলে হাবিবুর রহমান, শাহপরাণ থানা এলাকার সৈয়দপুরের তোতা মিয়ার ছেলে রুবেল, একই এলাকার ইসলামপুরের একটি কলোনির জামাল মিয়ার ছেলে কামরুল ওরফে কব্বুল, এয়ারপোর্ট থানা এলাকার বাইশটিলার মো. হানিফের ছেলে ইয়াসিন আরাফাত (১৬), মৌলভীবাজারের রাজনগরের গালিমপুর এলাকার মৃত সিদ্দিক আলীর ছেলে করিম আহমদ, দক্ষিণ সুরমার দক্ষিণ বলদি রাজবাড়ির রাজু আহমদের ছেলে সানজিদ আহমদ হাসান, দক্ষিণ সুরমার কৃষ্ণপুরের লোকমানের ছেলে লিটন, শাহপরাণ থানা এলাকার শান্তিবাগের মুজিবুর রহমানের ছেলে মো. এরশাদ (২৬), একই এলাকার সবুজবাগের আবদুল জলিলের ছেলে সাদ্দাম হোসেন (২১)। এ ১০ জনের বিরুদ্ধেও একটি করে মামলা রয়েছে।
৩৭ চোরের তালিকায় ৩১ থেকে ৩৭ নম্বর পর্যন্ত স্থান দখল করে আছে জকিগঞ্জ উপজেলার পীরনগর কাজী বাড়ির মৃত কাজী আবদুল খালিকের ছেলে কবির আহমদ (৩২), নগরীর সওদাগরটুলা-৭২ এর আনোয়ার হোসেন আনা মিয়ার ছেলে ইকবাল হোসেন (৩৪), জালালাবাদ থানা এলাকার পাঠানটুলার মাজেদ, দক্ষিণ সুরমা থানা এলাকার দিলু (২৪), হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার নয়নী এলাকার লেবু মিয়ার ছেলে নয়ন (২৮), মোগলাবাজার থানা এলাকার শিববাড়ির একটি কলোনির হাসন আলীর ছেলে আরশ আলী (২৭), সুনামগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দুর্গাপুর গ্রামের আজিম উল্লার ছেলে ফরিদুল আলম ওরফে কুটি মেম্বার (৩৭)। এর মধ্যে কুটি মেম্বারের বিরুদ্ধে ২টি কবির আহমদ ও ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ১টি করে মামলা রয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে মামলা না থাকলেও চোরচক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবেই এরা পরিচিত।
তালিকায় সবার শেষে নাম থাকলেও চোরচক্রের ‘গুরুত্বপূর্ণ’ সদস্য হচ্ছেন কুটি মেম্বার। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চুরি হওয়া অধিকাংশ মোটরসাইকেলই কুটি মেম্বারের মাধ্যমে বিক্রি হয়। তালিকার সবার উপরে থাকা ইমন আর সবার নিচে থাকা কুটি মেম্বার- দুজনে মিলে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছেন পুরো চোরের সিন্ডিকেটটিকে।

Wednesday, April 18, 2018

ফাঁসি থেকে মুক্তি মিলেছে কনডেম সেল থেকে নয় by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

একটি হত্যার জেরে আরেকটি হত্যা মামলায় ১৩ বছর আগে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছিলেন নিম্ন আদালত থেকে। হাইকোর্টে আপিল করলে সাজা কমে হয় ১০ বছরের কারাদণ্ড। আবার আপিল হয় সুপ্রিম কোর্টে, সে আপিলের নিষ্পত্তিও হয়েছে বছরখানেক আগে। মামলার বাদীপক্ষ জানালেন সাজা কমে যাবজ্জীবন হয়েছে। কিন্তু রায়ের কপি না আসায় মৃত্যুদণ্ডের আসামি হিসেবে ১৩ বছর আগে সেই যে অন্ধকার কনডেম সেলে জায়গা হয়েছিল। সেখান থেকে আর আলোর মুখ দেখেননি ছাতক উপজেলার বনগাঁও গ্রামের আবদুল খালিকের।
আবদুল খালিক নিজে প্রথমে একটি হত্যা মামলার বাদী ছিলেন। ২০০২ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর তার ছোট ভাই আবদুল মালিক অপহৃত হয়েছিলেন। ৫ দিন পর ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির রোপওয়ের একটি খুঁটির নিচে লাশ পাওয়া যায় মালিকের। লাশের গলায় দাগ ছিল। এ ঘটনায় আবদুল খালিক বাদী হয়ে ছাতক থানায় একটি মামলা করেছিলেন। মামলায় ছাতক উপজেলার নিজগাঁও গ্রামের বাবুল, লাল মিয়া, শানুর ও ছনবাড়ি গ্রামের জালালসহ ৭/৮জনকে আসামি করা হয়।
এ ঘটনার কিছুদিন পর ২০০২ সালের ৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যা রাতে ছনবাড়ি বাজার থেকে ফেরার পথে খুন হন ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বনগাঁওয়ের আবদুল জলিল ওরফে জলই মেম্বার। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে সৌদি আরব প্রবাসী সেলিম মিয়া বাদী হয়ে ছাতক থানায় মামলা করেন। এ মামলায় আসামি করা হয় বনগাঁও গ্রামের আবদুল খালিক ও তার বড় ভাই সমসুল ইসলাম ওরফে সমসু মিয়া, গাঙপাড় নোয়াকোট গ্রামের নূরুজ্জামান, তাজুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুস, আকদ্দস আলী, কামরুজ্জামান ও রতনপুর গ্রামের ফয়জুর রহমান ওরফে কালা বতাইকে। ভাইয়ের হত্যার বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে নিজেকে বাঁচাতেই এবার ছুটতে হয় আবদুল খালিককে। অন্যসব আসামির মতো ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়ান খালিক।
এ অবস্থায় ২০০৩ সালের ৭ই এপ্রিল বিশ্বনাথ থেকে আটক হন তিনি। ঐদিনই প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট খলিলুর রহমানের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আবদুল খালিক। পরে তাকে ছাতক থানায় হস্তান্তর করা হয়। ৭ মাস ১২ দিন তদন্ত শেষে ২০০৩ সালের ১৭ই জুলাই পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে ৮ আসামির মধ্যে সমসুল ইসলাম ওরফে সমসু মিয়া, নূরুজ্জামান, তাজুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুস, আকদ্দস আলী, কামরুজ্জামান ও ফয়জুর রহমান ওরফে কালা বতাইকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন এবং নতুন করে বনগাঁও গ্রামের সুন্দর আলীর ছেলে আবদুল হাই, জগম্বর আলীর ছেলে মানিক, জালালউদ্দিনের ছেলে মাখন ও ফয়জুর রহমান মাস্টারের ছেলে ছালিককে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেন। যুক্তি হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আবদুল জলিলের সঙ্গে চোরাচালান সংক্রান্ত বিরোধ ছিল এদের সকলের। এছাড়া আবদুল জলিলের সঙ্গে আবদুল হাই ও মানিকের নির্বাচন নিয়ে গোষ্ঠীগত বিরোধও রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা ৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করলেও রাষ্ট্রপক্ষ বনগাঁও গ্রামের মৃত তৈমুছ আলীর ছেলে আবদুল খালিক, সুন্দর আলীর ছেলে আবদুল হাই, জগম্বর আলীর ছেলে মানিক, জালালউদ্দিনের ছেলে মাখন ও ফয়জুর রহমান মাস্টারের ছেলে ছালিকের পাশাপাশি বনগাঁও গ্রামের সমসুল ইসলাম ওরফে সমসু মিয়া, গাঙপাড় নোয়াকোট গ্রামের নূরুজ্জামান, তাজুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। অবশ্য পরে তদন্ত কর্মকর্তার দেয়া ৫টি নামই অভিযুক্তের তালিকায় রাখে রাষ্ট্রপক্ষ।
২০০৫ সালে সুনামগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে মামলাটি সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৫ সালের ৭ই মে থেকে ৭০ কার্য দিবসে মামলার রায় প্রদান করা হয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিপ্লব গোস্বামী মামলার বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও জবানবন্দি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেটসহ ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ২৪শে জুলাই রায় দেন। রায়ে আবদুল খালিক, আবদুল হাই (পলাতক), মাখন (পলাতক), ছালিক (পলাতক), মানিক (পলাতক)কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। সমসুল ইসলাম ওরফে সমসু মিয়া, নূরুজ্জামান, তাজুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুসকে খালাস দেয়া হয়।
২০০৫ সালের ৪ঠা মার্চ থেকে জামিনে ছিলেন আবদুল খালিক। রায়ের পর আবার কারাবন্দি হন। তবে বাকিরা পলাতকই থাকেন। আবদুল খালিক ২০০৫ সালের ২৪শে জুলাই থেকে ২০১২ সালের ১৯শে মে পর্যন্ত ছিলেন সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে, এরপর স্থানান্তর হন কাশিমপুর কারাগারে। কাশিমপুর কারাগারের কনডেম সেলে ৪ বছর থাকার পর আবার ২০১৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি আবদুল খালিককে ফিরিয়ে আনা হয় সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে। এর আগে মামলা চলাকালে সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে ৭ই এপ্রিল ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের ৪ঠা মার্চ পর্যন্ত বন্দি ছিলেন তিনি।
২০০৫ সালে রায়ের বিরুদ্ধে আবদুল খালিক হাইকোর্টে আপিল (নং:৩৭৫৭) করেন একই সঙ্গে জেল থেকেও আপিল (নং: ৮৫৩) করেন তিনি। ইতিমধ্যে নিম্ন আদালত থেকে মামলাটি ডেথ রেফারেন্সের (নং:১১৬) জন্য হাইকোর্টে উত্থাপিত হয়। আপিলসহ ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয় বিচারপতি তারিক-উল হাকিম ও বিচারপতি সৌমেন্দ্র সরকারের বেঞ্চে। ২০১০ সালের ৩১শে জানুয়ারি থেকে ৮ই ফেব্রুয়ারি টানা ৭ কার্যদিবসে মামলাটির শুনানি হয়। ২২শে ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করা হয়। আদালত রায়ে আবদুল খালিকের মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রত্যাখ্যান করে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড নির্ধারণ করেন যা তার গ্রেপ্তার হওয়ার দিন থেকে গণনার কথা বলা হয়। পলাতক থাকাবস্থায়ই মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি পান আবদুল হাই, মাখন, ছালিক ও মানিক।
হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টে লিভ টু আপিল দায়ের করে সরকার পক্ষ (নং:২০/২০১১)। ২০১২ সালের ২৩শে জুলাই হত্যা মামলার বাদী সেলিম মিয়া আবদুল খালিকসহ সকল আসামির শাস্তি দাবি করে সুপ্রিম কোর্টে পৃথক আপিল আবেদন দায়ের করেন (নং: ৫৪২/২০১২)। ২০১৪ সালের ২রা মার্চ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী ও বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ দুটো আপিল আবেদনই মঞ্জুর করে হাইকোর্ট ডিভিশনের রায় স্থগিত করেন। পাশাপাশি পলাতক আসামিদের এ রায় ঘোষণার তিন মাসের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন এবং নিম্ন আদালতকে তাদের জামিনের বিষয় বিবেচনার নির্দেশনা দেন। ২০১৭ সালের ১১ই জানুয়ারি থেকে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে শুনানির জন্য কার্যতালিকায় উঠতে থাকে সরকারপক্ষের আপিলের (নং:৮৪/২০১৪) সঙ্গে আসামিপক্ষের আপিল (৫৪২/২০১২)। ১৯তম কার্যদিবসে ২০১৭ সালের ২২শে মার্চ শুনানি শেষে আপিল দুটো নিষ্পত্তি করেন আপিল বিভাগ। কিন্তু একটি বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি এখনো সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে না আসায় ঝুলে আছে আবদুল খালিকের ভাগ্য। দিন কাটছে কনডেম সেলের বদ্ধ কুঠুরিতে। আবদুল খালিক নিজের ভাগ্য জানতে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের মাধ্যমে ২০১৭ সালের ৩০শে মে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসের সচিবের কাছে আবেদন করেন। এরই প্রেক্ষিতে সিলেটের সে সময়কার সিনিয়র জেল সুপার মো. ছগির মিয়া মামলার অগ্রগতি জানতে পত্র দেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। তার সে পত্রের জবাবে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির সচিব ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট টাইটাস হিল্লোল রেমা জানান, ‘মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে না আসা অবধি মামলার সামগ্রিক ফলাফল আন্দাজ করা সম্ভব নয়।’
বাদী পক্ষের হয়ে এ মামলাটির তদারকি করছেন বিলাল মিয়া। তিনি মানবজমিনকে বললেন, মামলায় আবদুল খালিকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে।
মামলা নিয়ে গরজ শুধু একজনেরই। তিনি আবদুল খালিক। ফলাফল জানতে কনডেম সেলের ভেতরে এখনো অপেক্ষায় তিনি। কারা সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রায়ই জানতে চান তার ভাগ্যে কি হলো। কিন্তু কেউই তাকে কোনো জবাব দিতে পারেন না।

Sunday, April 15, 2018

হত্যা রহস্যের কিনারা: সাদা রঙের স্মার্টফোনটিই কাল হয়েছিল মাহিদের by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

স্যামসাং ডুওস মডেলের সাদা রঙের স্মার্ট ফোন। এ ফোনটিই কাল হয়েছিলো শাহ্‌জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) অর্থনীতি বিভাগের ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী মাহিদ আল সালামের। মোবাইল আর টাকার জন্য ছিনতাইকারীরা ছুরির আঘাতে তার প্রাণ কেড়ে নেয়। তবে সে মোবাইল ফোনটি নিজেদের কবজায় রাখতে পারেনি ছিনতাইকারীরা। পুলিশ ঠিকই সেটি উদ্ধার করেছে। আর এর মধ্য দিয়ে বলতে গেলে পুরোই উন্মোচিত হয়েছে মাহিদ হত্যা রহস্য। তদন্তও অনেকটা শেষই হয়ে গেছে। এ মামলার সকল আসামিই এখন পুলিশের খাঁচায়। অপেক্ষা শুধু চার্জশিট জমা দেওয়ার। সবশেষে আটক হওয়া মোবাইল ব্যবসায়ী শুক্রবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন।
মাহিদ হত্যা মামলায় আসামী ছিলো ৪ জন। ৩ জনকে আগেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিলো। পলাতক থাকা অপর আসামি শাকিল গত সোমবার আদালতে আত্মসমর্পণ করে। আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে ওইদিনই পুলিশ তাকে রিমান্ডে নেয়। অপরদিকে আগে থেকে গ্রেপ্তার হওয়া মির্জা আতিককে এয়ারপোর্ট থানার অন্য একটি ছিনতাই মামলার আসামি হিসেবে বুধবার রিমান্ডে  নেয় পুলিশ। ওইদিনই দুই পেশাদার ছিনতাইকারী আতিক এবং শাকিলকে মুখোমুখি করা হয়। চতুর শাকিল প্রথমে পুরো ঘটনা অস্বীকার করে। কিন্তু পুলিশের জেরার মুখে বেশিক্ষণ টিকতে পারে না। এক পর্যায়ে ঘটনার বর্ননা দিতে থাকে। রহস্যের গেরো খুলতে শুরু করে এক এক করে। সেই জানায় কার কাছে রয়েছে ছিনতাইকৃত মোবাইলটি। জনৈক জসিমের কাছে মোবাইল ফোনটি রয়েছে জানালেও শাকিল কৌশলে জসিমের ঠিকানা জানি না বলে এড়িয়ে যায়। তবে পুলিশ বসে থাকার পাত্র নয়। তারা ঠিকই সন্ধান পায় জসিমের। মো. জসিম উদ্দিন একজন মোবাইল ব্যবসায় ী। সিলেট নগরীর বন্দরবাজারস্থ করিমউল্লাহ মার্কেটের ৩য় তলায় জসিম টেলিকম নামে তার মোবাইলের দোকানও রয়েছে। সে নগরীর শেখঘাট খুলিয়াটুলা নিলিমা-২২ নম্বর বাসার ইব্রাহীম আলীর ছেলে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) সহকারী উপ-কমিশনার (দক্ষিণ, অপরাধ) জ্যোতির্ময় সরকারের নেতৃত্বে জসিমের খোঁজে বের হয় পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে খুলিয়াপাড়া থেকে জসিমকে মোবাইলসহ আটক করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে জসিম উদ্দিন জানায়, ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে মির্জা আতিকের মাধ্যমে শাকিল তার কাছে  মোবাইলটি বিক্রি করে। ২৫শে মার্চ গভীর রাতে সুরমা নদীর উপরে কিন ব্রিজের দক্ষিণ পাশের অন্ধকার এক কোনে খুন হয়েছিলেন মাহিদ আল সালাম। পুলিশের সামনে তখন কোনো ক্লুই ছিলো না। তবে মাহিদকে যে রিকশার যাত্রী ছিলেন মাহিদ সে রিকশার পেছন দিকের একটি ছবিই পুলিশের সামনে রহস্য সন্ধানের দ্বার খুলে দিয়েছিল। সে ছবির সূত্র ধরে ওই রাতেই পুলিশ নগরীর আখালিয়া থেকে রিকশাচালক জয়নাল আবেদীন ভাণ্ডারীর সন্ধান পায়। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ছিনতাইকারীদের সম্পর্কে একটি ধারণা পায়। সে ধারণা থেকেই ২৬শে মার্চ ভোররাতে পুলিশ ঘেরাও দেয় পুরো সুরমার দক্ষিণ পারের ভার্থখলা এলাকা। দুপুরের দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে ওই এলাকায় আসে ভার্থখলা এলাকার সোয়াব মীর্জার ছেলে মীর্জা আতিক। মীর্জা আতিক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তায়েফ মুহাম্মদ রিপন। ঘাতক হিসেবে পুলিশ এদেরই সন্দেহ করছিলো। পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে মোটরসাইকেল ফেলে দৌড় দেয় আতিক ও রিপন। ঢুকে যায় ভার্থখলা কবরস্থানে। পুলিশ কবরস্থান ঘেরাও করে তাদের আটক করে। ২৮শে মার্চ রাত ১টার দিকে গ্রেপ্তার করা হয় আরো এক ছিনতাইকারী- দক্ষিণ সুরমার বারোখলার বাসিন্দা রাসেলকে। বেশ কিছুদিন লুকোচুরির পর ৯ই এপ্রিল আদালতে আত্মসমর্পণ করে ভার্থখলার বাসিন্দা শাকিল আহমদ। এ শাকিলই মাহিদের শরীরের ছুরির আঘাত করেছিল। মাহিদ হত্যা রহস্য উন্মোচনে শুরু থেকেই নেতৃত্ব দেন এসএমপি’র এডিসি দক্ষিণ (অপরাধ) জ্যোতির্ময় সরকার। মানবজমিন-এর কথা হয় তার সঙ্গে। মাত্র ১৬/১৭ দিনের মধ্যে রহস্যের কিনার করতে পারায় তাকে বেশ সন্তুষ্টই মনে হলো। জানালেন, ক্লু-লেস এ মামলার সকল আসামিকেই ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জানান, ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত দু’টি মোটরসাইকেল, ছুরি এবং ছিনতাইকৃত মোবাইলও উদ্ধার করা হয়েছে। মোটরসাইকেল দু’টির মালিক শাকিল ও রিপন। পুলিশের এ কর্মকর্তা বললেন, এখন দ্রুততম সময়ে চার্জশিট জমা দেয়া হবে।

Friday, April 13, 2018

সিলেটে বিএনপির প্রার্থী কে? by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

তারা দুজনেই বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। একজন হলেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র অধ্যাপক এমএ মান্নান। অন্যজন খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুজ্জামান মনি। একজনের ভোটের ব্যবধান ছিল এক লাখ, অন্যজনের ৬০ হাজার। আওয়ামী লীগের জাঁদরেল প্রার্থীদের এমন বিশাল ব্যবধানে হারিয়েই বিএনপির এ দুই প্রার্থী নগরভবনের চাবি পেয়েছিলেন। গাজীপুরের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এমএ মান্নান। আর মনিরুজ্জামান মনি আওয়ামী লীগের দখল থেকে কেড়ে নেন খুলনা সিটি করপোরেশনের কর্তৃত্ব। মেয়র পদে থাকাকালীন সময়ে তারা দুজনেই জেল খেটেছেন নাশকতা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন অভিযোগে। তবুও তাদের দুজনের কারো উপরই এবার আস্থা রাখতে পারেনি দল। দুই সিটি করপোরেশনেই নতুন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। দুই ক্ষেত্রেই তৃণমূলের   মতামত গুরুত্ব পাওয়ায়ই এমনটি ঘটেছে বলে দলটির বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।
প্রার্থী নির্বাচনে তৃণমূলের মতামতের গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়টি দলের মধ্যে চাঙ্গাভাব এনে দেবে বলেই মনে করেছেন বিএনপি নেতাকর্মীদের অনেকেই। তবে বিষয়টি কারো কারো কপালে চিন্তার রেখাও এঁকে দিয়েছে। ‘হেভিওয়েট’ তকমা থাকলেই দলের মনোনয়ন পাওয়া যে নিশ্চিত নয় সেটারই ইঙ্গিত দিয়েছে গাজীপুর ও খুলনায় প্রার্থী নির্বাচনে। এ দুই সিটিতে বর্তমান মেয়রদের বাদ দিয়ে নতুন প্রার্থী বেছে নেয়ার বিষয়টি রেড সিগন্যাল হয়ে দেখা দিয়েছে সিলেটের মেয়র বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর জন্যও। গাজীপুর ও খুলনার মেয়রদের মতো একই গল্প রয়েছে আরিফেরও। ২০১৩ সালের ১৫ই জুন অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ও সে সময়কার মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। পৌরসভা আমলের পর সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রতিষ্ঠা থেকেই নগরভবনের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। কিন্তু গেল নির্বাচনে আরিফের কাছে তিনি হার মানেন ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে। নির্বাচনে আরিফ ভোট পেয়েছিলেন ১ লাখ ৭ হাজার ৩৩০টি। আর কামরান পেয়েছিলেন ৭২ হাজার ১৭৩টি ভোট। গাজীপুর ও খুলনার মেয়রের সঙ্গে আরিফের গল্পে আরো একটি মিল আছে। তিনিও মেয়র থাকাকালীন সময়ে জেল খেটেছেন হত্যা-বোমাবাজির অভিযোগে।
‘তৃণমূলের মতামত’ আরিফুল হক চৌধুরীর জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সিলেটের বিএনপি সংশ্লিষ্ট অনেকেরই অভিযোগ, আরিফুল হক তৃণমূল থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। ‘সরকারঘেঁষা’ বলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি দলকে খুশি রাখতে আরিফ দলের কর্মসূচি থেকে নিজেকে যথাসম্ভব ‘বাঁচিয়ে’ রাখেন বলেও কারও কারও অভিযোগ। তবে ইদানীং একটু গা-ঝাড়া দিয়ে আরিফুল হক তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করছেন বলে জানা গেছে। আগে দলীয় কর্মসূচিতে এতটা সক্রিয় না থাকলেও এখন তাকে সামনের কাতারেই দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সিলেটে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশেও আরিফুল হকের সক্রিয় অংশগ্রহণ অনেকেরই নজর কেড়েছে। তবে খুলনা ও গাজীপুরে প্রার্থী বদল ঠিকই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে-আরিফ কি পারবেন দলের সমর্থন ধরে রাখতে?
আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে আছেন সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম। খুলনা ও গাজীপুরে প্রার্থী বদলকে তারা দুজনেই গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ হিসেবেই দেখছেন। সিলেটের ক্ষেত্রেও এমনটি হলে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই বলেই তাদের বক্তব্য।
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, তৃণমূল থেকে নতুন মুখের দাবি উঠেছে। তিনি জানান, তৃণমূলের এ চাওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রও অবগত রয়েছে। গাজীপুর ও খুলনার মতো সিলেটেও তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হলে এখানেও নতুন মুখই আসার কথা। জানালেন, তৃণমূলের চাওয়াকে মূল্য দিতে তিনিও মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।
সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম মানবজমিনকে বলেন, দলের দুর্যোগের সময় অনেক নেতাকর্মীই আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। আমি কখনোই দলের সঙ্গ ছাড়িনি। গা-ঢাকা না দিয়ে সবসময়ই মাঠে ছিলাম। নির্যাতনের শিকার হয়েছি, তাছাড়া আমার মাঝে খাই খাই স্বভাবও নেই। তৃণমূল নতুন মুখ হিসেবে আমাকে চায়। নগরবাসীর চাপের মুখেই আমি প্রার্থিতা ঘোষণা করেছি। সেলিম জানান, আগের চেয়ে সিলেটে দল এখন অনেক সংগঠিত রয়েছে।
সকল অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমি তৃণমূলেরই নেতা। তৃণমূলের সমর্থনেই আমি আজ এ পর্যন্ত এসেছি। মাঠের নেতাকর্মীরা সব সময়ই আমার পাশে। আমিও সব সময়ই তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আরিফ আশাবাদী এবারো তিনিই দলের মনোনয়ন পাবেন। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমি কারো সঙ্গে কখনো আপস করিনি। এ কারণে অন্যদের মতো বড় ব্যবসাও বাগাতে পারিনি, সিআইপিও হতে পারিনি। তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে আপস করলে আমাকে তিন বছর জেল খাটতে হতো না। জনগণই ভালো জানে আমি কাদের জন্য কাজ করছি।
গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশনের আগের নির্বাচনের খতিয়ান এখানে টেনে আনা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ২০১৩ সালের ৬ই জুলাই দেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশনে প্রথমবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান এক লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লা খানকে। এমএ মান্নান ভোট পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৪৪টি। অপরদিকে আজমতউল্লা খান পেয়েছিলেন ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৭ ভোট।
একই বছরের ১৫ই জুন অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ও সে সময়কার মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেককে পরাজিত করেছিলেন ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে। মনিরুজ্জামান মনি পেয়েছিলেন ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৩  ভোট। আর তালুকদার আব্দুল খালেক পেয়েছিলেন ১ লাখ ১৯ হাজার ৪২২ ভোট।

Thursday, April 5, 2018

রহস্যময় বৈঠক by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন রোকেয়া বেগম। তাই বাসা ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন অন্য কোথাও। বাসা পাল্টানোর আগেই যে সন্দেহটা তিনি করছিলেন সেটাই সত্যি হয়ে যায়। যেদিন বাসা ছাড়ার কথা ছিল সেদিনই বাসা থেকে তার ও তার ছেলে রোকনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বাসা ছাড়ার আগেই ঘাতকের ছুরি তার ও তার ছেলের জীবনটাই কেড়ে নেয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ক’দিন ধরেই আতঙ্কের মাঝে ছিলেন রোকেয়া বেগম। স্থানীয়দের তার সে আতঙ্কের কথা জানিয়েও ছিলেন। বৈঠকও হয় এ নিয়ে। সেখানেই বাসা ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয় রোকেয়া বেগমকে। সে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাসার মালিক সালমান আহমদ, ওই এলাকার বাসিন্দা ও মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুর রহমান জামিল, খাঁপাড়া সন্ত্রাস প্রতিরোধ ও উন্নয়ন কমিটির সদস্য আলী হায়দারসহ স্থানীয় মুরব্বিরা।
স্থানীয় কিছু উচ্ছৃঙ্খল তরুণ বাসায় ঢুকে রোকেয়া বেগমকে মারধর করে মোবাইল ফোন, স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর এ বৈঠক বসেছিলো। বাসায় হামলাকারী হিসেবে উঠে আসে তিন তরুণের নাম। এরা হলো- তানিম, শিপলু ও সুমন। এর মধ্যে তানিম হচ্ছে রোকেয়া বেগমের বাসার গৃহকর্মী তানিয়ার ভাই। মোবাইল চুরির অভিযোগে সপ্তাহ দুয়েক আগে তানিয়াকে বিদায় দিয়েছিলেন রোকেয়া বেগম। এর জেরেই তার বাসায় হামলা হয় বলে জানা গেছে। তানিম, শিপলু, সুমনের কিছুদিন আগেও ছাত্রদলের ক্যাডার হিসেবে পরিচয় থাকলেও এখন তারা ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে চলছে। একটি সূত্র বলছে, এদের মাথার উপর ছাতা হয়ে আছেন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রহমান জামিল। সে সূত্রেই আবদুর রহমান জামিল রোকেয়া বেগমের বাসায় বৈঠকে গিয়েছিলেন বলে ওই সূত্রটি বলছে।
তবে আরেকটি সূত্র বলছে তানিম, শিপলু, সুমনের মাথায় ছায়া হয়ে আছেন তাদের মতোই নব্য এক যুবলীগ নেতা। যিনি কিছুদিন আগেও স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী হিসেবে সরকারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিলেন। তবে পরে নিজের সুবিধার কথা বিবেচনা করে হঠাৎই তিনি যুবলীগ নেতা বনে যান। অর্থমন্ত্রীর ছবি জুড়ে দিয়ে যুবলীগের পরিচয়ে তিনি বিভিন্ন উৎসবে-পার্বণে নগরীতে তোরণও নির্মাণ করেছেন। নতুন এ পরিচয়ে যুবলীগ নেতা জমশেদ সিরাজের সবচেয়ে বড় অবলম্বন হচ্ছেন তার বড় ভাই সিলেট নগরীর ১৯ নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাবেদ সিরাজ। সিলেট নগরীর রায়নগর এলাকার বাসিন্দা বিপ্লব রায় ওরফে বিকুল হত্যা মামলায়ও আলোচনায় উঠে এসেছিল এই জমসেদ সিরাজের নাম। আবদুর রহমান জামিলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার মোবাইল ফোন বারবারই বন্ধ পাওয়া যায়। তবে পুলিশ ঠিকই ইতিমধ্যে এ বিষয়ে তার সঙ্গে আলাপ সেরে নিয়েছে। গত রোববার নগরীর মিরাবাজার খাঁপাড়া মিতালি ১৫/জি বাসার ভেতর থেকে বিউটিশিয়ান রোকেয়া বেগম ও তার ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী রবিউল ইসলাম রোকনের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা হয় রোকেয়া বেগমের শিশুকন্যা রাইসাকে। ঘটনার পর থেকেই খোঁজ মিলছে না রোকেয়া বেগমের গৃহকর্মী তানিয়ার। এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে নাজমুল হাসান নামের এক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে পুলিশ।

Saturday, March 31, 2018

মাহিদ হত্যা: তদন্তে আলো ফেলে একটি রিকশার ছবি by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

ঘটনাটি ঘটেছে রাতের অন্ধকারে। রাতের অন্ধকারের মতো পুলিশও ছিল অন্ধকারে। আঁধারে আলো হয়ে দেখা দেয় এক পথচারীর মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ছবি। সে ছবিতে দেখা যায় একটি রিকশার পেছনের ছবি। মাহিদ আল সালাম হত্যা রহস্য উদঘাটনে সে ছবিই পুলিশের সামনে আলোর রেখা হয়ে দেখা দেয়। সে আলোর রেখা ধরেই সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) জ্যোতির্ময় সরকারের নেতৃত্বে তদন্ত দল পৌঁছে যায় ঘাতকের কাছে।
একটি মোবাইল দোকানের কর্মচারী ছবিটি তোলেন। রিকশার ছবিটিকে সামনে রেখেই তদন্ত এগুতে শুরু করে। পুলিশ তাদের নিজস্ব বিভিন্ন সূত্রের প্রয়োগ করে সন্ধান চালায় ছবির রিকশাটি খুঁজতে। সফলও হয়। রিকশার সন্ধান মেলে, সন্ধান মেলে চালকেরও। আখালিয়ায় সিটি কাউন্সিলর মখলিসুর রহমান কামরানের বাসার পাশের মজনু মিয়ার গ্যারেজ থেকে আটক করা হয় রিকশাচালক জয়নাল আবেদীন ভাণ্ডারিকে। ব্যাটারিচালিত ওই রিকশা চালকের বাড়ি দিনাজপুরে। ঘটনার রাতে তিনিই মাহিদকে বন্দর থেকে রিকশায় তুলেন। সেখান থেকে পাঠানটুলা হয়ে নিয়ে আসেন কদমতলিতে। পুলিশকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দেন ভাণ্ডারি। জানান, কালো রঙের পালসার মোটরসাইকেলে আসা একদল তরুণই হামলা চালিয়েছিল মাহিদের ওপর। রিকশাচালকের বর্ণনা মতে, লম্বা চুলের লিকলিকে শরীরের এক তরুণ মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলো। অন্ধকারে এর বেশি কিছু আর ঠাহর করতে পারেননি ওই রিকশাচালক। অন্ধকারে দেখা আবছা সে বর্ণনাই পুলিশের সামনে আলোর রেখা তৈরি করে দেয়। পুলিশ এবার নতুন উদ্যমে মাঠে নামে। রিকশাচালকের দেয়া বর্ণনামতো চালক আর মোটরসাইকেলের খোঁজ চলতে থাকে নগরজুুড়ে। সফল হয় পুলিশ। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলা কবরস্থানের পাশ থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলা এলাকার সোয়াব মির্জার ছেলে মির্জা আতিক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তায়েফ মুহাম্মদ রিপনকে। আতিকের স্বীকারোক্তি অনুসারে মাহিদকে ছুরিকাঘাতে ব্যবহৃত ছোরাও উদ্ধার করে পুলিশ। বুধবার রাত ১টার দিকে গ্রেপ্তার করা হয় আরো এক ছিনতাইকারী বারখলার বাসিন্দা রাসেলকে।
অপরাধ তদন্তে জ্যোতির্ময় সরকারের ঝুলিতে আরো অনেক সাফল্য জমা আছে। ‘সূত্রহীন’ এ মামলাকে তিনি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নেন। তাছাড়া এ মামলাটি বিশেষ কারণে তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণও ঘটাচ্ছিলো। নিজে যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠ নিয়ে গায়ে পুলিশের পোশাক জড়িয়েছেন নিহত মাহিদ আল সালামও সেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) ছাত্র। মাহিদ যেন তারই ছোট ভাই। সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকার অ্যাডভোকেট এম এ সালামের ছেলে শাবির অর্থনীতি বিভাগের ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী মাহিদ আল সালাম ২০১১-১২ সেশনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। চাকরির সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে রোববার মধ্যরাতে বেরিয়েছিলেন তিনি। পথে নগরীর কদমতলি এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। উরু ও হাঁটুর পেছনে ছুরিকাঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় তার। সে রক্তক্ষরণ নিজের হৃদয়ে টের পেয়েছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এসএমপির এডিসি জ্যোতির্ময় সরকার। নিজেই নিজের সামনে এ রহস্যের শেষ দেখার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। সফলও হন।
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া মির্জা আতিক হত্যার দায় স্বীকার করে বুধবার আদালত ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তার ভাষ্যমতে, মূলত ছিনতাইয়ে বাধা প্রধান করায়ই মাহিদকে হত্যা করা হয়েছে। দুটো মোটরসাইকেলে করে তারা চারজন মাহিদের পথ রোধ করে। তারপর মাহিদের কাছ থেকে তার জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিতে থাকে। মাহিদ তাদের বাধা দেন। তখনই ছুরির আঘাতে থামিয়ে দেয়া হয় তাকে। পরে ছিনতাইকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
ছিনতাই কাজে জড়িত চারজনকে আসামি করেই মামলা হয়েছে দক্ষিণ সুরমা থানায়। মামলায় আসামি করা হয় ৪ জনকে। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া নাহিদ, রিপন, রাসেলের পর মামলার অপর আসামি ভার্থখলার শাকিল আহমদের সন্ধানে রয়েছে পুলিশ। সেই মূল ঘাতক বলে জানা গেছে। শিগগিরই তারও নাগাল মিলবে বলে পুলিশের আশা।
এসএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জ্যোতির্ময় সরকার রহস্য উদ্ঘাটনের পেছনে নিজের একক কৃতিত্ব মানতে চান না। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এটা টিমওয়ার্ক। সকলের মিলিত প্রচেষ্টায়ই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

Saturday, March 24, 2018

আতিয়া মহলে অভিযানের ১ বছর by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

রাতটিকে বৃহস্পতিবার হিসেবে ধরা হলেও ঘড়ির কাঁটার হিসেবে শুক্রবারে ঢুকে গেছে। আর তারিখ হিসেবে ছুঁয়ে দিয়েছে ২৪শে মার্চকে। ২০১৭ সালের এমনই এক সন্ধিক্ষণে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ির আতিয়া মহলে। পাঁচতলা ও বাড়ির নিচতলায় জঙ্গিরা অবস্থান করছে বলে মধ্যরাতে খবর পায় পুলিশ। চট্টগ্রামের সিতাকুণ্ড থেকে আটক হওয়া দুই জঙ্গির কাছে এ খবর পায় পুলিশ। সে রাতেই বাড়িটি ঘেরাও করে আইন শৃঙ্ক্ষলা বাহিনী। রাত ভোর না হতেই আতিয়া মহলের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো সিলেটে-সিলেট ছেড়ে পুরো বাংলাদেশে- দেশ পেরিয়ে সারা বিশ্বে। ১১১ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়কতার পর নারীসহ ৪ জঙ্গির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় অভিযান। সফল এ অভিযানে দুঃখ হয়ে উঠে র‌্যাব ও পুলিশের ৩ সদস্যসহ ৭টি প্রাণের ক্ষয়।
২৪শে মার্চ সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পায় আতিয়া মহলের নিচ তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকা জঙ্গিরা। সকাল ৭টার দিকে ভেতর থেকে বিস্ফোরণ ঘটায় তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে থাকে। সকালে পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয় র‌্যাব, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), বিশেষ শাখা (এসবি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা। আতিয়া মহলের চার তলাবিশিষ্ট ভবনের বারো ফ্ল্যাটের সকল বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু পাঁচ তলাবিশিষ্ট ভবনটির নিচ তলায় জঙ্গি আস্তানা থাকায় ওই ভবনের বাকি ২৯টি ফ্ল্যাটে থাকা বাসিন্দাদের সরিয়ে আনার ঝুঁকি নেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুক্রবার সকাল থেকেই পুলিশ হ্যান্ড মাইকে ভেতরে থাকা জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। তবে জঙ্গিরা সাড়া দেয়নি সে আহ্বানে। উল্টো বিস্ফোরক ছুঁড়ে তারা নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিতে থাকে। পরিস্থিতি জটিল হতে থাকায় বিকালে ঢাকা থেকে আসে পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী ‘সোয়াত’। পুরো ভবন ঘিরে রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তারা। রাত ৮টার দিকে সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো ইউনিটের একটি দল ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ফিরে যায়। রাত কাটে উৎকণ্ঠায়। ২৫শে মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারি ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনীর শতাধিক সদস্যের প্যারা কমান্ডো টিম আসে ঘটনাস্থলে। ৯টার দিকে শুরু হয় ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ নামের রুদ্ধশ্বাস অভিযান। অভিযানের শুরুতেই পাঁচতলা ভবনে ২৯টি ফ্ল্যাটে আটকা পড়া ৭৮ জন বাসিন্দাকে উদ্ধার করা হয়। দুপুর ২টার দিকে শুরু হয় মূল অভিযান। দফায় দফায় গুলি আর বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো শিববাড়ি এলাকা। অভিযান যখন চলছিল তখন উৎসুক জনতা ঘিরে রেখেছিলেন চারপাশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বারবার তাদের সরিয়ে দিচ্ছিল, বারবারই তারা ফিরে আসছিলেন। আতিয়া মহল থেকে আড়াই শ’ গজ দূরে এমনই এক জটলার মাঝে প্রচণ্ড শব্দে দুই দফা বোমা বিস্ফোরণ হয়। সে বোমার বিস্ফোরণে নিহত হন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) গোয়েন্দা ইউনিট প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ, পুলিশের দুই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ও চৌধুরী মো. আবু কায়সারসহ ৭ জন।
পরদিন ২৬শে মার্চ। স্বাধীনতা দিবস। সিলেটের মানুষের কাছে অন্য এক রূপ নিয়ে ধরা দেয়। আতঙ্ক-উৎকণ্ঠার সে দিনটিও শুরু হয় বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দে। পরদিনও একই চিত্র। তবে এক সময় শান্ত হয়ে আসে আতিয়া মহল। ভগ্নদশা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আতিয়া মহল। আর বাড়ির ভেতরে পড়ে ছিল চার জঙ্গির মৃতদেহ। ওই দিনই দুই জঙ্গির মরদেহ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২৮শে মার্চ বিকালে পুলিশের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয় আতিয়া মহল। শেষ হয় ৬ দিনব্যাপী সেনা কমান্ডোদের ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’। ভবনটিকে ঝুঁকিমুক্ত করে ১১ই এপ্রিল থেকে ভাড়াটিয়াদের ঢুকতে দেয় র‌্যাব।
আতিয়া মহল এখন ফিরে এসেছে অনেকটাই আগের রূপে। এজন্য বাড়ির মালিক উস্তার মিয়াকে প্রায় ৬০ লাখ টাকার মতো খরচ করতে হয়েছে। আগের মতোই উজ্জ্বল সবুজ বর্ণ লেগেছে আতিয়া মহলের ভবন দুটোর গায়ে। তবে দুঃসহ স্মৃতির চিহ্ন হয়ে এখনও বাড়ির সামনে পড়ে আছে ইঁট পাথরের স্তূপ। সকলেরই প্রাণপণ চেষ্টা সে স্মৃতি ভুলে যাওয়ার। আগের মতোই প্রাণ ফিরে এসেছে আতিয়া মহলে। ৩০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ২৮টিতেই এখন ভাড়াটে রয়েছে। ৫ তলা ভবনের যে ফ্ল্যাটটিতে জঙ্গিরা ঠিকানা গেঁড়েছিল সে ফ্ল্যাটেই এখন নূরজাহান বেগমের সংসার। ৩ মাস হয়েছে তারা এ ফ্ল্যাটটিতে উঠেছেন। ফ্ল্যাটটির অতীতের গল্প তার জানা থাকলেও তিনি সেটিকে পাশে রেখেই সাজিয়ে নিয়েছেন নিজের সংসার।
আতিয়া মহলের মালিক উস্তার আলী কিছুতেই ভুলতে পারছেন না এক বছর আগের স্মৃতিটিকে। তবে সব কিছু তিনি ভুলে যেতে চান। গ্লানিময় স্মৃতি মুছে দিতে তিনি আতিয়া মহলকে অনেকটাই আগের রূপে ফিরিয়ে এনেছেন। সেনাবাহিনীর অভিযানে আতিয়া মহল একেবারে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। সংস্কারে তার খরচ হয় ৬০ লাখ টাকার মতো। তবে তার দুঃখ নেই। তার বাড়িতে যে প্রাণ ফিরে এসেছে এতেই তিনি সন্তুষ্ট।

Wednesday, March 21, 2018

দুই পরিবারেই আটকে আছে সুনামগঞ্জের মেয়র নির্বাচন by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

সুনামগঞ্জ শহরের রাজনীতি যেন আটকে আছে দুটো পরিবারের মাঝেই। বৃত্ত ভেঙে কেউই উঠে আসতে পারছেন না স্থানীয় রাজনীতিতে। পৌর নির্বাচনে আগেরবার দুই পরিবারের বাইরে থেকে একজন উঁকি দেয়ার চেষ্টা করলেও এবার তিনিও ক্ষান্ত দিয়েছেন। সুনামগঞ্জ ফিরে এসেছে ‘রাজা-বখত’-এ দুই ঘরের লড়াইয়ে। সুনামগঞ্জ পৌরসভার
মেয়র পদে উপনির্বাচনে প্রার্থী এসেছে এ দুই পরিবার থেকেই। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে নৌকা নিয়ে লড়ছেন প্রয়াত মেয়র আয়ুব বখত জগলুলের ছোট ভাই নাদের বখত। স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াইয়ে আছেন মরমি কবি দেওয়ান হাছন রাজার প্রপৌত্র দেওয়ান গণিউল সালাদীন। সালাদীনের ভাই প্রয়াত
মমিনুল মউজদীনও ছিলেন সুনামগঞ্জের মেয়র। নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন সালাদীনের চাচাতো ভাই দেওয়ান সাজাউর রাজা সুমনও। তিনি লড়ছেন বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে।
সুনামগঞ্জ শহরের কর্তার চেয়ারটি ঘুরেফিরে দখলে রয়েছে ‘রাজা-বখত’ পরিবারের মাঝেই। নাদের বখতের বড় দুই ভাইই ছিলেন সুনামগঞ্জ পৌরশহরের অভিভাবক। তাদের দশ ভাইয়ের পরিবারটি সুনামগঞ্জ শহরে প্রভাব বিস্তারকারী একটি পরিবার। সে প্রভাবেই মনোয়ার বখত নেক ১৯৮৫ সালে সুনামগঞ্জ পৌরসভার কর্তৃত্বও হাতের মুঠোয় নিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাঝে অনেক ঘটনা, অনেক গল্পের পর আরেক ভাই আয়ুব বখত জগলুল সে চেয়ারের দখল পান। ২০১১ সাল থেকে মৃত্যুর পর্ব পর্যন্ত টানা দুবার তিনিই ছিলেন সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র। গত ১লা ফেব্রুয়ারি তার আকস্মিক মৃত্যুতে মেয়রের পদটি শূন্য হয়। আর এজন্যই আবার সুনামগঞ্জ পৌরসভায় ভোটের আয়োজন।
সুনামগঞ্জের মেয়র পদে নৌকার হয়ে লড়তে আরো ৪ প্রার্থীর নাম জমা পড়েছিল কেন্দ্রে। এর মধ্যে ছিলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবীর ইমনের বড় ভাই ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জেলা জজ কোর্টের অ্যাডিশনাল পিপি ড. খায়রুল কবীর রুমেন, দেওয়ান হাছন রাজার প্রপৌত্র জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা সম্পাদক দেওয়ান এমদাদ রাজা, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শঙ্কর দাশ, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র নূরুল ইসলাম বজলু। তবে সবাইকে ছাপিয়ে মনোনয়ন পান নাদের বখত।
সুনামগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদের বাকি দুই প্রার্থী একই পরিবারের সদস্য। স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান গণিউল সালাদীন ও বিএনপি প্রার্থী দেওয়ান সাজাউর রাজা সুমন সম্পর্কে চাচাতো ভাই। দেওয়ান আনোয়ার রাজার ছেলে হচ্ছেন গণিউল সালাদীন আর আনোয়ার রাজার সৎভাই দেওয়ান জোহায়ের রাজার ছেলে হচ্ছেন সাজাউর রাজা সুমন।
১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সময়ে সুনামগঞ্জের টানা তিনবারের মেয়র মমিনুল মউজদীনের ছোট ভাই গণিউল সালাদিন। সড়ক দুর্ঘটনায় মমিনুল মউজদীন নিহত হওয়ার পরই নির্বাচনে মেয়র হয়েছিলেন আয়ুব বখত জগলু। মমিনুল মউজদীনকে আদর্শ ধরেই নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন সালাদীন। সালাদীনদের সবচেয়ে বড়ভাই দেওয়ান সামসুল আবেদীন জিয়াউর রহমানের আমলে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দল পাল্টে পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করেন। তারপর যোগ দেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে। সালাদিনের আরেক ভাই সুনামগঞ্জ পৌরসভারই সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা দেওয়ান জয়নুল জাকেরিন সুনামগঞ্জ উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান।
সর্বশেষ নির্বাচনেও গণিউল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আয়ুব বখত জগলু ও বিএনপি প্রার্থী শেরগুল আহমদের বিপক্ষে। শেরগুল এবার লড়াইয়ের মাঠ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়ায় সুযোগ পেয়েছেন সাজাউর রাজা।
শুধু শহরকেন্দ্রিক রাজনীতি নয় পুরো সুনামগঞ্জের রাজনীতি আটকে আছে বিভিন্ন পারিবারিক বলয়ে। রাজা-বখত পরিবারের বাইরে বিস্তৃত্ব রাজনীতিও আটকে আরো কিছু পরিবারের মাঝে। তাই তৃণমূলের নেতাদের কোথাও কোনো সুযোগ মিলছে না। এ নিয়ে তাদের ক্ষোভও রয়েছে। সুনামগঞ্জের জেলা পর্যায়ের রাজনীতিতে দাপট রয়েছে মুকুট পরিবার, ইমন পরিবারসহ বেশ কিছু পরিবারের। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুল হুদা মুকুটের ভাই খায়রুল হুদা চপল সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগের আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবীর ইমনের বড় ভাই খায়রুল কবীর জেলা আওয়ামী লীগে দায়িত্ব পেয়েছেন সহসভাপতি হিসেবে, যিনি পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে লড়তে চেয়েছিলেন। বড় আরো এক ভাই ফজলুল কবীর আছেন সদস্য হিসেবে। জেলা সভাপতি মতিউর রহমানের ছেলে আছেন কমিটিতে সদস্য হিসেবে। সহসভাপতি আপ্তাব উদ্দিনের মেয়েরও জায়গা হয়েছে সদস্য হিসেবে। জেলার যুগ্ম সম্পাদক ও ছাতক পৌরসভার চেয়ারম্যান আবুল কালাম চৌধুরীর ভাই শামীম আহমেদ চৌধুরী পেয়েছেন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের পদ। কৃষিবিষয়ক সম্পাদক করুণাসিন্ধুর ছোট ভাই পেয়েছেন একই কমিটির সদস্য পদ।

Thursday, March 15, 2018

ওরা ১১ জন: যেন সিলেটেরই ছেলেমেয়ে আর আসবে না কখনো by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

আকাশে উড়ছিল বিমান। সঙ্গে উড়ছিল তাদের স্বপ্নও। স্বপ্নকে মুঠোবন্দি করবে বলেই তারা বাবা-মা, পরিবার-পরিজন আর প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে এসেছিলেন দূর পরবাসে। তাদের চোখে ছিল চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। হিমালয়ের কোল ছেড়ে তারা পড়তে এসেছিলেন বাংলাদেশের সিলেটে চা বাগানের কোলে গড়ে ওঠা জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজে। ৫ বছরের সাধনা শেষে চূড়ান্ত পরীক্ষাও দিয়েছেন।
পরীক্ষার ফল বেরুলেই নামের পাশে বসে যাবে ডক্টর শব্দটি। তাদের তো হাওয়ায়ই ভেসে বেড়ানোর কথা। আশনা সানিয়া, আঞ্জিলা শ্রেষ্ঠা, সারুনা শ্রেষ্ঠা, শ্বেতা থাপা, পূর্ণিমা লোহানী, মিলি মেহেরজান, নেগা মেহেরজান, সঞ্চয় মেহেরজান, সঞ্চয় পদুয়াল, সামিরা বায়ানজানকার, চারু বড়াল, আলগিনা বড়াল, শিলা বাজগাইন, প্রিন্সি ধাম-এই ১৩ নেপালি শিক্ষার্থী স্বপ্ন ছোঁয়ার আনন্দ চোখে-মুখে মেখে নিয়ে উঠেছিলেন বেসরকারি বিমান সংস্থার নেপালগামী উড়োজাহাজে। আর ওদিকে নেপালে বাবা-মা, পরিবার-পরিজন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন হবু ডাক্তারদের বুকে জড়িয়ে নিতে।
ঢাকা থেকে উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজটি ঠিকই ছুঁয়েছিল নেপালের মাটি। কিন্তু বিমানটি মাটিতে স্বাভাবিকভাবে নামেনি। আছড়ে পড়ে মাটিতে। বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। ঝরে পড়ে ৪৯টি প্রাণ। তার মাঝে ছিল সিলেট থেকে আসা নেপালি শিক্ষার্থীদের ১১ জন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় শিলা বাজগাইন, প্রিন্সি ধাম। বিমান দুর্ঘটনার পরই আশঙ্কার কালো মেঘ ভর করে সিলেটের জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে। সহপাঠীরা উদ্বিগ্ন, না জানি কি পরিণতি হয়েছে নেপালি বন্ধুদের, শিক্ষকরাও আশঙ্কায় কান পেতে আছেন। সবারই চাওয়া যেনো কোনো দুঃসংবাদ না আসে। তবে দুঃসংবাদ ঠিকই আসে, ১৩ শিক্ষার্থীর ১১ জন মারা যান বিমান দুর্ঘটনায়। যার মধ্যে রয়েছেন ৯ ছাত্রী আর এক ছাত্র। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান শুধু ছাত্রী। এমন মৃত্যুতে শোকাহত রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। শোকে স্তব্ধ শিক্ষকরাও। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কলেজে চলছে ৩ দিনের শোক কর্মসূচি। মঙ্গলবার সকাল থেকেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বুকে শোকের কালোব্যাজ ধারণ করে আছেন। এছাড়াও কলেজের পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে এবং সব ক্লাস এবং পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে শোকের চাদরেই যেনো ঢাকা পড়ে আছে রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ। ক্যাম্পাসের পথে পথে, ক্লাসরুমে, হোস্টেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মৃতি। এখন কেবলই তারই রোমন্থন চলছে অশ্রুসিক্ত নয়নে। শিক্ষকরা, সহপাঠীরা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না ওদের হাসিমাখা মুখ। কানে বাজছে ওদের কণ্ঠ, ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলা ওদের কথাগুলো যেনো ভেসে বেড়াচ্ছে ক্যাম্পাসের শোকে ভারী হওয়া বাতাসে। তারাপুর হয়ে পাঠানটুলা, সে পথ থেকে নগরীর জিন্দাবাজার, আম্বরখানা কোথায় পা পড়েনি প্রাণোচ্ছল ওই শিক্ষার্থীদের। তাদের পদচিহ্ন হারিয়ে সিলেটও আজ শোকাকুল। দূর দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা যেনো সিলেটেরই ভাইবোন, সিলেটেরই ছেলেমেয়ে।
কথা হয় মনোজ কুমার যাদবের সঙ্গে। তিনিও নেপাল থেকে পড়তে এসেছেন সিলেটে। অবশ্য তিনি এখন পুরোদস্তুর ডাক্তার। ইন্টার্নশিপ করছেন। বললেন, পুরো ক্যাম্পাসজুড়েই এখন শোকের ছায়া। জানালেন তাদেরই এক বন্ধুর বোন মারা গেছেন বিমান দুর্ঘটনায়। আলগিনা বড়াল নামের নিহত ওই শিক্ষার্থী তাদের বন্ধু এরিকা বড়ালের ছোট বোন। বুধবারই এরিকা নেপাল গেছেন বোনের শেষকৃত্যে অংশ নিতে।
সোমবার ঢাকা থেকে যাওয়া বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয় নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ৭১ আরোহীর মধ্যে ৪৯ জনই মারা যান। বাংলাদেশি ৩৬ আরোহীর মধ্যে মারা যান ২৬ জনই। ওই উড়োজাহাজেই আরোহী ছিলেন জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের ১৯তম ব্যাচের ১৩ শিক্ষার্থী-যাদের ১১ জনই চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

Tuesday, March 13, 2018

হাওরের বাঁধে বাঁধভাঙা অনিয়ম by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

এবার টাকা এসেছে বেশি। লুটপাটের সুযোগও তাই বেশিই মিলছে। সুনামগঞ্জের হাওরপারে বাঁধ নির্মাণের টাকা খরচ হচ্ছে যাচ্ছেতাইভাবে। গত বছর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের ১৫৪টি হাওরের বোরো ধান তলিয়ে গিয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন জেলার ৩ লাখ ২৫ হাজার ৯৯০টি কৃষক পরিবারের সদস্য। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে। এর প্রেক্ষিতে এবার ঠিকাদারদের পরিবর্তে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে বাঁধের কাজ করানো হচ্ছে। তবে পিআইসিও ঠিকাদারদের পথেই হাঁটতে শুরু করায় ফসলরক্ষা করতে পারবেন কিনা এ নিয়ে আতঙ্কে আছেন সুনামগঞ্জের হাওরপারের কৃষকরা।
এবার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ এসেছে ১২২ কোটি টাকা। গতবারের চেয়ে বরাদ্দ বেশি আসায় অনেক ক্ষেত্রেই টাকা খরচ হচ্ছে পিআইসির ইচ্ছেমতো সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে। বোরো ফসল রক্ষায় আবশ্যক অনেক হাওরে বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ না করে অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। হাওরের বোরো ফসল রক্ষা বাঁধের টাকা দিয়ে শহর রক্ষা বাঁধ, গ্রামের যাতায়াতের রাস্তা, কোনো দিন কাজে আসবে না এমন রাস্তাও নির্মাণ করা হচ্ছে। সবচেয়ে আজগুবি কাজ হয়েছে সদর উপজেলার ছোট কাংলার হাওরে। হাওরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ধলাই নদী। বাঁধ দিয়ে ধলাই নদীর পানি ঠেকানো যাবে না। কিন্তু বাঁধের কাজ না থাকলে তো প্রকল্প মিলবে না। আর এ কারণেই ছোট কাংলার হাওরের বালুচর হাটি থেকে চকেরগাঁও পর্যন্ত তিন কিলোমিটার উঁচু সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এটা বাঁধ না সড়ক কিছুই বুঝতে পারছেন না স্থানীয় কৃষকরা। কারণ, এখানে সড়কের কোনো প্রয়োজনই নেই এবং এটি কোনো কাজেও আসবে না। আর এটির বাঁধ হওয়ারও কোনো যুক্তি নেই। মাঝখানে নদী খোলা রেখে তৈরি হওয়া এ ‘বাঁধ’ ফসল রক্ষায় কোনো কাজেই আসবে না। জানা গেছে, দুটো প্রকল্প মিলিয়ে এ বাঁধ তৈরি হয়েছে। বাঁধের পাশে সাইনবোর্ডে লিখা রয়েছে ৪৪ ও ৪৯ নং প্রকল্পের বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) নাম। ৪৯নং পিআইসির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন। এ পিআইসির বরাদ্দ ১৫ লাখ ৬৬ হাজার ৭৭৪ টাকা ৩৮ পয়সা। এর পাশের ৪৪ নম্বর পিআইসির সভাপতি মোতালিব মিয়া। ৪৪ নম্বর পিআইসির বরাদ্দ ২১ লাখ ৮১ হাজার ৬৭৭ টাকা ৪৪ পয়সা। অর্থাৎ সরকারি সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা ‘দরিয়া’তেই ঢালা হয়েছে।
অভিযোগ, জগন্নাথপুর উপজেলার গয়াসপুর গ্রাম সংলগ্ন ৩১ ও ৩২ নম্বর প্রকল্পে বাঁধের কাজের ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে ইট বিছানো সড়ক তৈরি হচ্ছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নবীনগর-ধাড়ারগাঁও এলাকায় দুটি প্রকল্প গ্রহণ করে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থানীয়দের চলাচলের রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। মোহনপুর ইউনিয়নে বাঁধের নাম ভাঙিয়ে চলাচলের রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়নের ডলুরা হতে কাইয়ারগাঁও-জরজরিয়া সড়কের কাজ হচ্ছে বাঁধের টাকায়। এ ছাড়া মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দরিয়াবাজ গ্রামে দেখারহাওরে মধ্যবর্তী স্থানে যে বাঁধটি নির্মাণ করা হচ্ছে এরও কোনো প্রয়োজন নেই বলে জানা গেছে। গৌরারং ইউনিয়নের ইনাতনগর থেকে উজান রামনগর পর্যন্ত পিআইসির বাঁধগুলোও অপ্রয়োজনীয় বলে জানা গেছে। একইভাবে দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের সুরমা নদীর পাড়ে নির্মিত বাঁধটিও বোরো ফসল রক্ষায় কোনো কাজে আসবে না বলে জানা গেছে। কাজে আসবে না দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নে খাগাউড়া-সেচনি-বাংলাবাজার বাঁধটিও। এ ছাড়া বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের পুটিয়া হাওরে ২৭, ২৮, ৪২, ৪৩ নম্বর পিআইসির বাঁধ, চলতি নদীর ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪ পিআইসির বাঁধগুলো ফসলরক্ষায় কাজে আসবে না বলেই জানা গেছে।
সুনামগঞ্জের হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে অনিয়মের যেন শেষ নেই। নিয়ম অনুযায়ী বাঁধের ৫০ মিটার (১৬৪ ফুট) দূর থেকে মাটি এনে বাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও বেশির ভাগ পিআইসি এর তোয়াক্কা করছে না। বাঁধের গোড়া থেকে মাটি উত্তোলন করেই চলছে বাঁধ নির্মাণের কাজ। এর ফলে বাঁধের ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় বাঁধগুলোর পানির চাপ সামলাতে না পেরে ভেঙে পরবে বলেই কৃষকদের আশঙ্কা।
বাঁধের নিচের অংশ উপরের অংশের তিনগুণ হওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ বাঁধেই নিচের অংশ সরু করা হয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের পকেট ভারি হলেও বাঁধগুলো সহজেই ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাটি শক্তভাবে বসানোর জন্য প্রতিটি বাঁধে বাধ্যতামূলকভাবে দুরমুশ করার কথা থাকলেও, কোনো বাঁধেই দুরমুশের কাজ হয়নি। অথচ এ কাজের জন্য ২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অর্থাৎ এ টাকার পুরোটাই ঢুকেছে বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে জড়িতদের পকেটে। বৃষ্টির পানি যাতে বাঁধের মাটি কেটে নিয়ে যেতে না পারে সেজন্য বাঁধে ঘাস লাগানোর কথা থাকলেও বাঁধ নির্মাণ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এর ধারে কাছেও যাচ্ছে না। এ খাতে বরাদ্দকৃত টাকার পুরোটাই লোপাট হয়েছে। কোথাও কোথাও মাটির পরিবর্তে বালু দিয়ে বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
হাওরে বাঁধের কাজের অনিয়ম প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়া সেন গুপ্তা মানবজমিনকে বলেন, দিরাই-শাল্লার বাঁধের ব্যাপারে আমি আশাবাদী- এবার আর ফসলহানি হবে না। বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে তার বক্তব্য, দু-একটা ঘটনা এরকম ঘটেছিল, তৎক্ষণাত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অনেকেই মুচলেকা দিয়েছেন।

Monday, March 12, 2018

হাওরে কপাল খুলেছে নেতার পোড়ার আশঙ্কা কৃষকের by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

গেলবার আগাম বন্যায় বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করে ডুবে গিয়েছিল সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার সোনালি ধান। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনিয়ম ও ঠিকাদারদের দুর্নীতির কারণে দুঃস্বপ্নের একটি বছর কেটেছে হাওর পাড়ের কৃষকের। গতবার ঠিকাদারে ডুবিয়েছিল হাওরের ফসল। ঠিকাদারে ভরসাহীন হওয়ায় এবার হাওরের ফসলরক্ষার বাঁধ নির্মাণে পুরোপুরি ভরসা হয়ে ওঠে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)। তবে বেঁধে দেয়া সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি পিআইসিগুলো। প্রকল্প নির্ধারণ ও প্রাক্কলন তৈরিতে বিলম্বের কারণে  নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু না হওয়ায়ই এমন লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার কারণেও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
আগের বারের ফসল বিপর্যয়ের কারণে এবার বরাদ্দও বেশি এসেছে। সব মিলিয়ে এবার বরাদ্দ এসেছে ১২২ কোটি টাকা। গত বছর এ বরাদ্দ ছিল ৬৮ কোটি টাকা।  প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দের পর বাঁধ নির্মাণের কাজ আশা জাগাতে পারেনি হাওরের খেটে খাওয়া মানুষকে। হাওরের কৃষককে আশ্বস্ত করতে না পারলেও বিশাল টাকার এ যোগানে কপাল খুলেছে প্রভাবশালীদের। দুর্নীতি ও অনিয়মের কাজের মাধ্যমে পকেট ভারী করছেন তারা। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ইতিমধ্যে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার বেশ কিছু পিআইসি সভাপতিকে আটক করেছে পুলিশ।
জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায় গত মৌসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। কিন্তু উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৫৪টি হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন জেলার ৩ লাখ ২৫ হাজার ৯৯০টি কৃষক পরিবার। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বড় ৩৬টি হাওরসহ সুনামগঞ্জের অর্ধশত হাওরের ফসলরক্ষার জন্য ৯৬৪টি বাঁধ প্রকল্পের কাজ চলছে ৯৬৪টি পিআইসির মাধ্যমে। একেকটি পিআইসি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারে। হাওরের প্রকৃত কৃষক এবং হাওরে যাদের জমি আছে তাদের সমন্বয়ে পিআইসি গঠন করে বাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও এ কাজের সঙ্গে মূলত ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই জড়িত। কাঁচা টাকার হাতছানি থাকায় কৃষকদের সামনে রেখে তারাই পেছন থেকে সবকিছু করছেন। এক্ষেত্রে তারা নিজেদের মতো করেই চলছেন। ২৮শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো অর্ধেকের মতো কাজ বাকি রয়েছে। প্রভাবশালীরা নির্মাণকাজের পেছনে থাকায় অনিয়মের প্রতিবাদ করেও ফায়দা মিলছে না। হাওর এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে কৃষক ও হাওর উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২১ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। যথাসময়ে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় এবারও ফসল বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন হাওরপারের বাসিন্দারা।  দেরিতে বাঁধের কাজ শেষ হলে তা পানির তোড়ে কতটুকু টিকতে পারবে এ নিয়ে আশঙ্কায় আছেন তারা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ বছর দিরাই উপজেলার ৯টি হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় ১শ’ ৩৫টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে প্রায় ২৩ কোটি টাকা। বেঁধে দেয়া সময়ে কোনো প্রকল্পই ৫০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি।  উপজেলার বরাম হাওর, চাপতির হাওরের বেশির ভাগ বাঁধেই অর্ধেকের বেশি কাজ হয়নি। জামালগঞ্জ উপজেলায় হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় ১০০টি পিআইসি গঠিত হয়েছে। বাঁধের কাজের জন্য বরাদ্দ এসেছে ১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। শনির হাওর, হালির হাওর, পাকনার হাওরের বাঁধসহ বেশিরভাগ বাঁধের কাজ সমাপ্ত হয়নি। কোথাও কোথাও মাত্রই শুরু হয়েছে বাঁধের কাজ।  ধর্মপাশা উপজেলায় উপজেলার ১শ’ ৩৪টি প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চন্দ্রসোনার থাল, সোনামোড়ল, গুরমাসহ বিভিন্ন হাওরে এখনো বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শতভাগ বাস্তবায়নের কথা থাকলেও অনেকগুলোরই অর্ধেক কাজও হয়নি। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটছে কৃষকের। উপজেলার বোরো ফসল রক্ষায় ৮০টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো এখনো ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করতে পারেনি। যার ফলে উপজেলার দেখার হাওর, জামখলা হাওর ও খাই হাওর, সাংহাই হাওর, কাচিভাঙ্গা হাওরের বাঁধের অসমাপ্ত কাজ এ উপজেলার বোরো ফসলকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। জগন্নাথপুর উপজেলায় এবার বোরো ফসল রক্ষায় ৯২টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। বরাদ্দ এসেছে সব মিলিয়ে ১৪ কোটি ৩৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। তবে কাজের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি এখানেও। উপজেলার নলুয়া হাওরের বেশ কয়েকটি বাঁধের কাজ এখনো শেষ হয়নি। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় বাঁধের কাজের জন্য মোট ৪১টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু কাজ শেষ হয়নি এখনো। করচার হাওর, আঙ্গুরআলী হাওরের অনেক বাঁধই অসমাপ্ত রয়ে গেছে। এছাড়া তাহিরপুর, শাল্লা উপজেলার হাওরগুলোর বাঁধের কাজেও একই রকম অবস্থা।
প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে প্রভাবশালীরা বাঁধের কাজের হর্তাকর্তা হওয়ায় কাজে এমন ধীরগতি ও অনিয়মের সৃষ্টি হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাহিরপুরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর খোকন, উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হাফিজ উদ্দিন, উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সামায়ূন কবীর, দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলু মিয়া, সাধারণ সম্পাদক ফুল মিয়া, উপজেলা যুবলীগ নেতা হাবুল মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মিয়া হোসেন, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক ও তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন বাঁধ নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। 
দিরাইয়ে বাঁধের কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নূরে আলম চৌধুরী। গেলবারও তিনি উপজেলার চাপতির হাওরের বৈশাখী এলাকার বাঁধ নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেবার ওই বাঁধ ভেঙে ফসলের সর্বনাশ হলেও এবারো তার ওপর ভরসা রাখা হয়েছে। তিনি একা নন, বাঁধের কাজে যুক্ত আছেন তার দুই চাচা আলাউদ্দিন চৌধুরী ও আফতাব উদ্দিন চৌধুরী, চাচাতো ভাই রিপন চৌধুরীও। এ উপজেলায় বরাম হাওরে বাঁধ নির্মাণের কাজে যুক্ত রয়েছেন তাড়ল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহমদ চৌধুরী। গত বছরের হাওর রক্ষা বাঁধ দুর্নীতি মামলার আসামি হওয়ায় নিজ নামে প্রকল্প নিতে না পারলেও আপন দুই ভাই আমিনুর রহমান চৌধুরী, আবিদুর রহমান চৌধুরী, চাচাতো ভাই জিয়াউর রহমান চৌধুরী, আফজল হোসেনের নামে চারটি প্রকল্প নিয়ে একাই কাজ করাচ্ছেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আকিকুর রেজা তার ছেলে সোহেলের নামে প্রকল্প নিয়েছেন। বাঁধের কাজে আছেন সরমঙ্গল ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য উদগল হাওরের মাছুয়ার খারা প্রকল্পের সভাপতি দুলাল মিয়া। জগদল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মিজানুর রহমান ছুবা মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি জগদীশ সামন্তের ছেলে উপজেলা যুবলীগ নেতা অঞ্জন সামন্ত, করিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা সুকেশ বর্মণও প্রকল্প কমিটির সভাপতি। কুলঞ্জ ইউপি আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সৈয়দ তহুর আলম, সৈয়দ ইয়াউর রহমান ও রাড়ইল গ্রামের ছাদ মিয়া, যুবলীগ নেতা চান মিয়া প্রকল্প কমিটির সভাপতি। যুক্ত আছেন আওয়ামী লীগ নেতা মতছির মিয়া চৌধুরী, আবদুস সালাম। কুলঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মুজিবুর রহমান, চরনারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা রতন কুমার দাস ও করিম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নজরুল ইসলামের ভাগ আছে বাঁধের কাজে।
সুনামগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়া সেনগুপ্তা মানবজমিনকে বলেন, নির্ধারিত ২৮শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ না হলেও আমার নির্বাচনী এলাকা দিরাই-শাল্লার সবক’টি বাঁধের কাজ শেষের পথে। ৭৫ থেকে ৯০ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে, আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে সব বাঁধের কাজ শেষ হয়ে যাবে। পিআইসিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই প্রাধান্য পেয়েছেন-এমন অভিযোগের জবাবে সংসদ সদস্য জয়া সেনগুপ্তা বলেন, কমিটি করেছেন ইউএনওরা। আমি কোনো কমিটিতে বসি নাই।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম মানবজমিনকে বললেন, নীতিমালার আলোকেই জেলা- উপজেলা কমিটিগুলো পিআইসি গঠন করে দিয়েছে। নীতিমালায় লেখা নেই রাজনীতিবিদেরা পিআইসিতে থাকতে পারবেন না। তিনি বলেন, পিআইসিতে সরকার দলীয় নেতারা যেমন আছেন বিরোধীদলীয় নেতারাও আছেন। পানি সংক্রান্ত একটি সভায় রয়েছেন উল্লেখ করে এর বেশি কিছু বলতে পারবেন না বলে মোবাইল ফোনের সংযোগ কেটে দেন জেলা প্রশাসক।
বক্তব্য জানতে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। বারবার তাকে ফোন দেয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।

Wednesday, March 7, 2018

বাবা ছেলের আলাদা পথ by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

সিলেট শহরতলির টুকেরবাজারের শেখপাড়া গ্রাম। সিলেট সুনামগঞ্জ রোডে কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের বিপরীত দিকে নেমে যাওয়া পথটিই শেখপাড়ার পথ। কংক্রিটে বাঁধানো পথের দু’পাশে ছিমছাম গ্রাম শেখপাড়া। শহর ও গ্রামের মিশেলে অন্যরকম এক আবহ। দালান আছে, আছে ধানের খেতও। আর কান পাতলে শোনা যায় মূল রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া বাস-ট্রাকের শব্দও। টুকেরবাজারের শেখপাড়া গ্রামটি এখন দেশজুড়ে আলোচনায়। এ গ্রামেরই বাসিন্দা ফয়জুর রহমানের ছুরির আঘাতে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন খ্যাতনামা লেখক ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল।
মঙ্গলবার ফয়জুর প্রসঙ্গে জানতে তার প্রতিবেশী জামিল আহমদ বুলবুলের বাড়িতে গেলে দেখা যায় বসার রুমের টেবিলে বসে ভাত খাচ্ছেন ‘লজিং মাস্টার’ তাহির হাসান। কুমারগাঁওস্থ পিডিবির ৫০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্টে কাজ করেন জামিল আহমদ। তিনি জানালেন, কয়েক বছর আগে তাদের এখানে বাড়ি করে এসেছেন ফয়জুরের বাবা হাফিজ আতিকুর রহমান। জামিল আহমদ বললেন, এ সময়ের মধ্যে তিনি ফয়জুরকে এক-দু’বারই দেখেছেন। জানালেন, গ্রামের কারো সঙ্গেই ফয়জুরের পরিচয় নেই। কেউই তাকে চেনেন না। হঠাৎই তাকে দেখা যেত। তবে ফয়জুরের বাবা আতিকুর রহমানকে তিনি নিঃসন্দেহে একজন ভদ্রলোক বলেই মনে করেন। বললেন, নির্বিরোধী এ মানুষটির সঙ্গে গ্রামের সবারই ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আতিকুর রহমানের টিউবওয়েল থেকে রমজানে পানিও সংগ্রহ করেন বলে জানালেন জামিল আহমদ।
শেখপাড়া গ্রামে ৬ শতক জায়গার উপর তৈরি হয়েছে ফয়জুরদের বাড়ি। মূল ফটক বন্ধ থাকলেও পকেট গেটটি এখনো খোলাই রয়েছে। সেখান দিয়ে ঢোকার পর দেখা যায় ঘরে প্রবেশের মুখে বারান্দার গ্রিলে তালা দেয়া। তবে ভেতরের দরজাগুলো যে খোলা রয়েছে তা গ্রিলের ফাঁক দিয়েই দেখা যায়। দিন কয়েক আগেই যেখানে একটি পরিবার দিনযাপন করছিল তা এখন একদমই সুনসান। শুধু বাড়ির পাশে এক দুটি মোরগ ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়ির চাবি এখন জালালাবাদ থানার ওসির কাছে রক্ষিত। এর আগে তা ছিল স্থানীয় টুকেরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গিয়াস উদ্দিনের কাছে। গিয়াস উদ্দিন জানালেন, তালা খুলে মঙ্গলবার সকালেও পুলিশ ফয়জুরদের বাড়িতে প্রবেশ করে তল্লাশি করেছে।
ফয়জুরের বাড়ির আগেই ‘রুবেল স্টোর’ নামের একটি মনোহারি পণ্যের দোকান। দোকানের স্বত্বাধিকারী মো. জুবের জানালেন, ফয়জুররা বছর কয়েক আগে এখানে এসেছে। কারো সঙ্গেই মিশত না ও। জানালেন, আলাদা পদ্ধতিতে নামাজ পড়ার কারণে তাকে মসজিদ থেকে নিষেধ করা হয়েছিল। তরপর থেকে সে আর মসজিদে আসেনি। জুবেরও বললেন, ফয়জুরের বাবা আতিকুর রহমান অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। ছেলের একদমই বিপরীত এ মানুষটি সবার সঙ্গে মিলেমিশেই চলতেন।
ফয়জুরের বাড়ির পেছনেই বাস করেন সোনা মিয়া। তিনিও বললেন, ফয়জুরকে হঠাৎই গ্রামে দেখা যেত। তিনিও এক-দুবারই দেখেছেন ফয়জুরকে। জানালেন, সে কারো সঙ্গে মিশত না। বাড়ির পাশে ফেলে রাখা একটি খাম্বার উপর বসে একা একা বিড়বিড় করতো। ফয়জুরের বাবার ব্যাপারে তিনিও ইতিবাচক মন্তব্য করেন। বললেন, আতিকুর রহমান অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। তার কথা থেকেই জানা গেল, ফয়জুরের বাবার জীবন যে ছেলের জীবনের থেকে একেবারেই আলাদা। অমিশুক ছেলের বাবা সবার সঙ্গে যেমন মিশতেন গ্রামের লোকও তাকে তেমনি শ্রদ্ধা করেন। তিনিই জানালেন, যে মসজিদে ফয়জুরের ব্যাপারে আপত্তি উঠেছে সে মসজিদই ফয়জুরের বাবার মাঝেই ভরসা খুঁজেছে। সোনা মিয়া জানালেন, দিন কয়েক আগে শেখপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মসজিদ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। তার অবর্তমানে ফয়জুরের বাবা আতিকুর রহমান মসজিদে বেশ কয়েক ওয়াক্ত নামাজে ইমামতি করেছেন। এমনকি কিছুদিন আগে এক জুমার নামাজে ইমামতি করেছেন, খুতবাও দিয়েছেন।
কথা হয় শেখপাড়া জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন হাফিজ জবরুল ইসলামের সঙ্গে। এখন তিনিই মসজিদে নামাজ পড়াচ্ছেন। মাস তিনেক আগে তিনি মসজিদে যোগ দিয়েছেন। ফয়জুরকে তাই তিনি চেনেন না। তবে ফয়জুরের বাবা আতিকুর রহমানকে ভালোভাবেই চেনেন। তিনিও জানালেন, ইমামের অবর্তমানে মসজিদে নামাজ পড়িয়েছেন আতিকুর রহমান।
ফয়জুর তার নিজগ্রামেও অচেনা এক তরুণ। সবার বিপরীতে অন্য রকম এক জীবন বেছে নিয়েছে সে। বাবা হানাফি মাজহাবের অনুসারী হলেও সে বেছে নিয়েছে সালাফি মতাদর্শ। কোনো মাজহাবের অনুসারী না হওয়ায় সালাফিরা অন্যদের কাছে ‘লা মাজহাবি’ হিসেবেই পরিচিত। নিজেদের আহলে হাদিস হিসেবে পরিচয় দানকারী সালাফিপন্থিদের ইসলামী অনেক আইনের ব্যাপারে মতভিন্নতা রয়েছে। ফয়জুরের ক্ষেত্রেও সে ভিন্নতা চোখে পড়ে তার গ্রামের মানুষের কাছে। তার নামাজ পড়ার ধরন অন্যদের চেয়ে একেবারেই আলাদা ছিল। তখনই গ্রামবাসী তাকে মসজিদে এভাবে নামাজ পড়তে নিষেধ করেন বলে জানান স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গিয়াস উদ্দিন।
সৌদি আরব থেকে বিস্তারলাভকারী সালাফি মতাদর্শ মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকেই ছড়িয়ে পড়ে দেশে দেশে। ফয়জুরের কাছেও এ মতাদর্শ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকেই। কুয়েতপ্রবাসী দুই চাচা আবদুজ জাহের ও আবদুস সাদিকের অনুপ্রেরণাতেই ফয়জুরের সালাফি আদর্শে দীক্ষা ঘটেছে বলে জানা গেছে। আর এ আদর্শ সবার সঙ্গে ফয়জুরের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। বাবার সঙ্গে বৈপরীত্যও গড়ে দিয়েছে এ আদর্শই।
ফয়জুর এখন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১২নং ওয়ার্ডের ২৭নং কেবিনে সার্জারি ইউনিট-২ এ প্রফেসর আবদুস সামাদ আজাদের অধীনে চিকিৎসাধীন। বর্তমানে সে অনেকটাই সুস্থ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেশ কিছু তথ্যও দিয়েছে। একটি সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশনায় হাসপাতালেই রাখা হয়েছে তাকে। তবে প্রফেসর আবদুস সামাদ আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
অপরদিকে ফয়জুর রহমানের বাবা আতিকুর রহমান ও মা মিনারা বেগম এখন পুলিশের জিম্মায় দিন কাটাচ্ছেন। ফয়জুরের কাছ থেকে কি তথ্য পাওয়া গেছে- এমন জিজ্ঞাসার জবাবে জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
জাফর ইকবাল হত্যাচেষ্টার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক হওয়া সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশনের কম্পিউটার ব্যবসায়ী মঈনুল হককে ছেড়ে দেয়া হয়েছে মঙ্গলবার। তবে তার দোকানের অপারেটর এখনো পুলিশ হেফাজতেই রয়েছে। ফয়জুর কয়েক দফায় এ দোকানে কাজ করেছে। পুলিশ এখনো চোখ রাখছে রাজা ম্যানশনে। আশপাশের দুয়েকটি দোকান থেকে ল্যাপটপ-কম্পিউটারও জব্দ করেছে পুলিশ।
গত শনিবার সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে খ্যাতনামা লেখক-শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর ছুরি দিয়ে হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলেই হামলাকারী ফয়জুর রহমান ওরফে ফয়জুলকে উপস্থিত ছাত্র-শিক্ষকরা আটক করেন। গণধোলাইয়ে আহত ফয়জুর রহমান সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

Thursday, June 29, 2017

যেভাবে আড়াল পড়ে যায় ঐতিহাসিক এক অধ্যায় by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

বৃটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম হুঙ্কার উঠেছিল বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের জনপদ সিলেট থেকেই। উপমহাদেশে ভালোভাবে শিকড় গেঁড়ে উঠার আগেই সিলেটে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন সৈয়দ মোহাম্মদ হাদী ও সৈয়দ মোহাম্মদ মাহদী দুই ভাই। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রথম শহীদ হন তারাই। স্থানীয়ভাবে হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া নামে পরিচিত এ দুই বীর সোয়া দুই শ’ বছর ধরে চির ঘুম ঘুমিয়ে আছেন সিলেট নগরীর মীরবক্সটুলায় একটি টিলার মাঝে। তবে এ দুই বীর যোদ্ধাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে চিনিয়ে দেয়ার দায় যেন কারো নেই। এমনকি এ দুই বীরের কবর রক্ষারও কোনো উদ্যোগ নেই। 
সোয়া দুই শ’ বছরে তারা আড়াল হয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতা থেকে। অথচ কি দোর্দণ্ড প্রতাপে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে। বৃটিশের শোষণ, অন্যায় ও নিপীড়নের প্রতিবাদে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া। তখনকার বৃটিশ কর্মকর্তা রবার্ট লিন্ডসের জবানে সে লড়াইয়ের বর্ণনা মেলে। ১৭৮২ সালে আশুরা উপলক্ষে ইংরেজ রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া। তারা পরিকল্পনা করেছিলেন আশুরার মিছিল থেকেই সিলেটের মাটি থেকে বিতাড়িত করবেন বৃটিশ রাজত্ব। তবে সে পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। সিলেটে শাহী ঈদগাহ ময়দানে আশুরার মিছিলগুলো জড়ো হওয়ার সঙ্গেই বাধা আসে বৃটিশ রাজের তরফ থেকে।
সিলেটের তৎকালীন কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসের নেতৃত্বে বৃটিশবাহিনী বাধা দেয় বিদ্রোহীদের। হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া দুজনে বাধা ভেঙে সামনে এগিয়ে আসতে চাইলে লিন্ডসের গুলিতে নিহত হন দুই ভাই। ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’র অপরাধে দুই ভাইয়ের লাশ সমাধিস্থ না করে ফেলে রাখা হয়েছিল ঈদগাহ’র ময়দানে। পরে স্থানীয়দের অনুরোধে লাশগুলো অযত্নে সমাধিস্থ করা হয় পাশের একটি টিলায়। যা পরে হাদা মিয়া মাদা মিয়ার টিলা নামে পরিচিতি পায়। আরো পরে ঐ টিলার কাছে চার্চ নির্মাণ হওয়ায় তা পরিচিত হয় পাদ্রির টিলা নামে। আড়াল পড়ে যায় ঐতিহাসিক এক অধ্যায়। বৃটিশ আমলের পর, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও সে ইতিহাস রক্ষায় তেমন কোনো উদ্যোগ আর নেয়া হয়নি। উল্টো বেদখল হয়ে পড়ে দুই বীরের সমাধিস্থলের ১০.৮১ শতক ভূমি। পাশের একটি মাদরাসার দখলে চলে যায় কবরস্থানের ভূমি। বিষয়টি পরে ইতিহাস সচেতন কিছু ব্যক্তির নজরে পড়লে গঠিত হয় সৈয়দ হাদী ও সৈয়দ মাহদী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ। ঐ পরিষদের তৎপরতায় গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রশাসন কবর এলাকার ভূমি দখলমুক্ত করে। পরবর্তীতে কবরস্থানের সীমানা চিহ্নিত করে দেয়াল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সিলেট সিটি কর্পোরেশন। সিটি কর্পোরেশনের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে কবরস্থানের ভূমি আবারো দখলে চলে যায় পাশের মাদরাসার দখলে। আবারো আড়ালে পড়ে যায় উপমহাদেশে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ সৈয়দ মোহাম্মদ হাদী ও সৈয়দ মোহাম্মদ মাহদীর স্মৃতি।
হাদা মিয়া ও মাদা মিয়ার মাজার রক্ষায় তৎপরতা অব্যাহত থাকে সৈয়দ হাদী ও সৈয়দ মাহদী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের উদ্যোগে। তাদের প্রচেষ্টায় ২০১৫ সালের ২৫শে জুন আবারও শুরু হয় কবরস্থানের সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম। সরকারি ভূমি অফিস ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে চিহ্নিত করা হয় কবরস্থানের সীমানা। সিলেট মিউনিসিপ্যালিটি মৌজার ৮২৯৭ নং দাগে কবর এলাকার প্রায় নয় শতক ভূমি চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে কবর এলাকার এক দিকে দেয়াল তোলা হলে তিন দিক এখনও অরক্ষিতই রয়ে গেছে।
সিলেট ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, নগরীর মীরবক্সটুলায় বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ হাদা মিয়া ও মাদা মিয়ার কবর বেদখল করার জন্য একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে পাঁয়তারা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রায় ৯ শতক জায়গার এই কবরস্থানের এক দিকে দেয়াল নির্মিত হলেও তিন দিকে কোনো দেয়াল নেই। ফলে অরক্ষিত অবস্থায় থাকা কবরস্থানের ভূমি দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। তিনি ঐতিহাসিক গুরত্বপূর্ণ কবরস্থানটি রক্ষায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

Sunday, April 2, 2017

দীপু নাম্বার ওয়ান by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

বাবা ছিলেন একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামের লড়াইয়ে। ছেলের বয়স তখন মাত্র ৫। দেশের জন্য বাবার জীবনপণ লড়াই তার স্মৃতিতে না থাকলেও বাবার কাছ থেকে দেশের প্রতি প্রেম ঠিকই ছড়িয়েছিল ছেলের মাঝে। দেশের জন্য কাজ করার স্বপ্ন থেকেই যোগ দিয়েছিলেন পুলিশ বাহিনীতে। দেশমাতার গায়ে ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে ওঠা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজের প্রাণ অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে বাবার কাছ থেকে পাওয়া দেশপ্রেমের শিক্ষাটাকে আরো উঁচুতেই যেন তুলে ধরলেন চৌধুরী মোহাম্মদ আবু কায়সার। সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়িতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলাকালে বোমা বিস্ফোরণে নিহত আবু কায়সার চৌধুরী তার পরিবার ও চেনা-জানাদের কাছে বেশি পরিচিত ‘দীপু’ নামেই। প্রিয় শহর সুনামগঞ্জও তাকে এ নামেই চেনে। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ছৈলা গ্রামে পৈতৃক নিবাস হলেও দীপুর জন্ম ও বেড়ে ওঠা সুনামগঞ্জ শহরেই। ১৯৬৬ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন দীপু। সুনামগঞ্জ শহরের কালিবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ শেষে ভর্তি হন সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক পাস করেন, ভর্তি হন সুনামগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিকের পর বিকম ডিগ্রিও নেন এ কলেজ থেকে। উচ্চতর পড়াশোনার জন্য প্রিয় শহর ছেড়ে ঢাকামুখী হন দীপু। ১৯৮৮ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গ্রহণের পাশাপাশি সিটি ল’ কলেজ থেকে এলএলবি পাস করেন। পড়াশোনার বাইরে দীপু ছিলেন খুব ভালো একজন ক্রিকেটার। সুনামগঞ্জ শহরের সুপরিচিত মডার্ন ক্রিকেট ক্লাবের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। খেলেছেন সুনামগঞ্জ প্রথম বিভাগ লিগে। যুক্ত ছিলেন নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডেও।
চৌধুরী মোহাম্মদ আবু কায়সার দীপুকে একজন নির্বিরোধী মানুষ হিসেবেই চেনে পুরো সুনামগঞ্জ। পুলিশ বিভাগেও তিনি তার একই পরিচয় ধরে রেখেছিলেন। সৎ ও দক্ষ অফিসার হিসেবে পুলিশ পরিবারে তার ভালোই পরিচিতি ছিল। বাবার কাছ থেকে পাওয়া দেশপ্রেমের শিক্ষা থেকেই পড়াশোনার পাঠ শেষে ১৯৯০ সালে পুলিশ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন দীপু। সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে তার প্রথম পোস্টিং হয় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানায়। দক্ষতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পথ পরিক্রমায় ইন্সপেক্টর হিসেবে পদোন্নতি পান। এরই মাঝে ২০১৩ সালে শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্য হিসেবে আইভরি কোস্টে ১ বছর ২ মাস কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
পুলিশের চাকরিতে থাকাকালেই ২০০০ সালের ২৩শে জুন সংসারী হন চৌধুরী মোহাম্মদ আবু কায়সার দীপু। কোনো সন্তান না থাকলেও স্ত্রী সায়রা চৌধুরীকে নিয়ে সুখের সংসার গড়েছিলেন তিনি। চাইলে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অন্যরকম নিঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতে পারতেন। জীবনটাকে অন্য রকম করে সাজানোর সুযোগ ছিল দীপুর সামনে। ভাগ্য তাকে পথ করে দিয়েছিল অনেকেরই স্বপ্নের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার। ২০০৪ সালে ডিভি লটারি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও সেখানে স্থায়ী হননি দীপু। দেশের টানে ১৩ মাস পরই ফিরে আসেন। আবার যোগ দেন পুলিশ বাহিনীতে। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দেশের হয়েই দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পারিবারিকভাবেই চৌধুরী মোহাম্মদ আবু কায়সার দীপুর রক্তের মাঝেই মিশেছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সুনামগঞ্জে তাদের পরিবারের আলাদা একটি পরিচয় রয়েছে। সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিভূমি হিসেবে যে কটি বাড়ির পরিচিতি রয়েছে এর মধ্যে তাদের বাড়িটিও অন্যতম। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে কজন সুনামগঞ্জে মুক্তিবাহিনীর দিক নির্দেশনায় ছিলেন এর মাঝে ছিল দীপুর বাবা অ্যাডভোকেট আসদ্দর চৌধুরীর নামও। মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয় থাকায় তার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল সে সময়। বাবা ছিলেন বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের জন্মক্ষণের লড়াইয়ের সৈনিক। সে দেশকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন দীপু। নিজের জীবন দিয়েই সে দায়িত্ব পালন করে গেলেন দীপু। প্রমাণ করে দিলেন তিনি যোগ্য বাবার যোগ্য সন্তান। প্রমাণ করেছেন দেশপ্রেমের মিছিলে তিনিও নাম্বার ওয়ান।

Monday, March 27, 2017

সিলেটে কান্না আর্তনাদ, আতঙ্ক by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ ও ওয়েছ খছরু

টিভিতে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার খেলা চলছিল। প্রথমে ব্যাট করে শ্রীলঙ্কাকে ৩২৫ রানের টার্গেট ছুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বিজয়ের সম্ভাবনায় সারা দেশের মতো সিলেটের দর্শকরাও আনন্দে উদ্বেলিত। তবে তাদের মাঝে কিছুটা উত্তেজনা ছিল শিববাড়ির জঙ্গি আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানকে ঘিরে। কি হচ্ছে জানতে খেলার চ্যানেল পাল্টে তারা কিছুক্ষণ পরপরই চোখ রাখছিলেন নিউজ  চ্যানেলে। তখনই জানতে পারেন ভয়াবহ সংবাদটি। শিববাড়িতে জঙ্গি আস্তানার কাছে হতাহতের সংবাদ। খেলা থেকে চোখ সরে যায় তাদের। সকলেই খোঁজ নিতে থাকেন জঙ্গি অভিযানের। একে একে শুনতে থাকেন ৬টি মৃত্যুর সংবাদ। জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারান দুই পুুলিশ কর্মকর্তাসহ ৬ জন। ৬ লাশের শোকে ভারি হয়ে উঠে সিলেট। আহত হন র‌্যাব-পুলিশের সদস্যসহ আরো অনেকেই। শনিবার সন্ধ্যার বোমা হামলার পর একে একে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হওয়া নামগুলো হচ্ছে সিলেটের কোর্ট ইন্সপেক্টর চৌধুরী আবু কায়সার, জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম, দক্ষিণ সুরমার বাসিন্দা ছাত্রলীগ নেতা ওয়াহিদুল ইসলাম অপু, ছাত্রলীগ নেতা ফাহিম আহমদ মাহদী, নগরীর দাঁড়িয়াপাড়ার বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম, অন্য আরেক জনের পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি কেউ। নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। আর আহতরা কাতরাচ্ছেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, কাঁদছেন তাদের স্বজনরাও। বোমা হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ ও র‌্যাব-৯ এর মেজর আজাদও। রাতেই লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায়।
শোকার্তরা ছুটতে থাকেন ওসমানী হাসপাতালে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি, তবুও ফিরে আসতে চান না তারা। রক্ত দেয়ার জন্য লাইন বেঁধে অপেক্ষা করতে থাকেন। ওসমানীতে সারারাতই চলতে থাকে শোকার্তদের মিছিল। শোকে আচ্ছন্ন সিলেটে রোববার দুপুরে অনুষ্ঠিত হয় দুই পুলিশ কর্মকর্তার জানাজা। সিলেট পুলিশ লাইন মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শামিল হন। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন মাওলানা সিরাজুল ইসলাম। এর আগে নিহত দুই কর্মকর্তার জন্য অশ্রুসজল কণ্ঠে দোয়া প্রার্থনা করেন নিহত আবু কায়সারের মামা আবদুল করিম চৌধুরী ও মনিরুল ইসলামের ভাই শামীম হোসেন। জানাজা শেষে দুই কর্মকর্তার প্রতি অন্তিম সম্মান জানানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। এরপর কফিনবন্দি করা হয় মরদেহগুলো। কফিনে জুড়ে দেয়া হয় নিহতদের নামলিপি। এরপর আবু কায়সারের মরদেহ নিয়ে পুলিশের গাড়ি ছুটে চলে সুনামগঞ্জের দিকে, আর মনিরুলের মরদেহবাহী পুলিশের গাড়ি ছুটে চলে নোয়াখালীর দিকে যেখানে নিহত দুই কর্মকর্তার স্বজনরা অপেক্ষায় তাদের প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য। 
জঙ্গি হামলায় নিহত কোর্ট ইন্সপেক্টর চৌধুরী আবু কায়সারের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ছৈলা গ্রামে। মরহুম অ্যাডভোকেট আসদ্দর চৌধুরীর ছেলে আবু কায়সার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষে ১৯৯৫ সালে পুলিশ বাহিনীতে সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগদান করেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ছিলেন তিনি। তার স্ত্রী সায়রা চৌধুরী, কোনো সন্তান নেই তাদের। ৭ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে আবু কায়সার ছিলেন তৃতীয়। অন্যদিকে নোয়াখালী থেকে সিলেটে দায়িত্ব পালন করতে এসেছিলেন ইন্সপেক্টর মনিরুল ইসলাম। নোয়াখালী সদরের পূর্ব এওজবালিয়া গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের চার ছেলে ও তিন মেয়ে সন্তানের মধ্যে মনিরুল দ্বিতীয়। ২০০৩ সালে সাব- ইন্সপেক্টর হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন তিনি। তার স্ত্রীর নাম পারভীন আক্তার। মোজাক্কেরুল ইসলাম ফারাবি নামে ১৫ মাস বয়সী ১ ছেলে সন্তানও রয়েছে তার।
নিহত ওয়াহিদুল ইসলাম অপু ও ফাহিম আহমদ মাহদী দুজনেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।  মহানগর ছাত্রলীগ নেতা অপু নগরীর ঝালোপাড়ার মরহুম সিরাজুল ইসলাম আওলাদের একমাত্র ছেলে। নিহত ফাহিম আহমদ মাহদী ছাত্রলীগ দক্ষিণ সুরমা উপজেলা শাখার উপ-পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক।
বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়িতে জঙ্গি আস্তানা ঘিরে রেখেছিলো পুলিশ। শুক্রবার পুলিশের সঙ্গে যোগ হয় বিশেষ বাহিনী সোয়াত। পরে আসে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো টিম। শনিবার সকালে শুরু হয় জঙ্গিবিরোধী অভিযান ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’। দিনভর চলে অভিযান, উদ্ধার করা হয় বাড়ির ভেতর আটকে পড়া বাসিন্দাদের। সেনাবাহিনীর অভিযান চলাকালীন সময়েই শনিবার সন্ধ্যায় পার্শ্ববর্তী পাঠানপাড়ায় প্রধান সড়কের পাশে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সড়কের ওই স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন ও সাধারণ মানুষকে আটকে দেয়া হয়েছিল। যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছিলেন। ব্যারিকেডের বাইরে উৎসুক মানুষজনও ভিড় করছিল। তখনই দুটো মোটরসাইকেলে চড়ে আসে তিন জন। তারা জনতার ভিড়ে ঢুকে যাওয়ার পর বিকট শব্দে ঘটে বিস্ফোরণ। সে হামলার শিকার হয়েই একে একে নিহত হন চার জন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলটি ঘিরে রাখে। সেখানে তখন পড়েছিলো  আরো একটি বোমা, কিছুক্ষণ পরই সেটার বিস্ফোরণ ঘটে। সে বোমার আঘাতেই নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশের ধারণা দ্বিতীয় বোমাটি ছিল টাইম বোমা। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেলেও একজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশের ধারণা অজ্ঞাতপরিচয় সে যুবকই হয়তো সেই তিন যুবকের একজন যারা বোমা বয়ে এনেছিলো। আহতদের মধ্যেও হামলাকারীরা থাকতে পারে বলেও ধারণা করছে পুলিশ। তাই আহত সকলেই রয়েছেন পুলিশের নজরদারিতেই।
সিলেট জুড়ে উদ্বেগ-আতঙ্ক: গোটা সিলেটেই যেন আতঙ্ক নেমে এসেছে। সিলেট নগরীর বাসিন্দারা রীতিমতো আতঙ্কিত। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘরের বাইরে যাচ্ছে না। এ ঘটনায় আতঙ্কের পাশাপাশি স্তম্ভিতও তারা। সিলেট নগরীর একপাশে শিববাড়ি। পাশেই শিব মন্দির। জনাকীর্ণ এলাকা। আর এই এলাকায় জঙ্গিরা ঘাপটি মেরে আছে এমনটি স্থানীয়রা কল্পনা করতে পারেননি। পাঠানটুলা এলাকার বাসিন্দা স্থানীয় সংবাদকর্মী গোলাম মর্তুজা বাচ্চু এ ঘটনায় হতবাক। তিনি বলেন, এলাকার মানুষ স্তম্ভিত। তারা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি এতো বড় জঙ্গি আস্তানা এই শিববাড়িতে। এই এলাকায় যারা বাসা ভাড়া দেন তারা যেন সব তথ্য রেখে যাচাই-বাছাই করে ভাড়া দেন এ অনুরোধ জানান তিনি। এদিকে শিববাড়ি জঙ্গি আস্তানায় ছুটে যাচ্ছেন সিলেটের রাজনৈতিক দলের নেতারাও। গত তিন দিনে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সিলেটের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী। তারাও এ ঘটনায় হতবাক। আর গতকাল দুই ইন্সপেক্টর নিহতের ঘটনায় তাদের চোখেও জল। সিলেটের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান জানিয়েছেন, ‘কী বলবো। এক সঙ্গে ছয় জন মানুষের মৃত্যুতে সিলেটবাসী শোকে শোকাহত। যে দুই পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন তারা আমাদের নিরাপত্তার জন্য মারা গেছেন। তিনি সিলেট নগরবাসীকে ধৈর্য ধারণ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের অনুরোধ জানান।’ সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেছেন, ‘জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। আর যাতে পুলিশসহ সাধারণ মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি না হয় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।’ শিববাড়ি জঙ্গি আস্তানা দেখতে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সিলেটের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দলে দলে এসেছে। কিন্তু জঙ্গি আস্তানার বাইরে পুলিশি ব্যারিকেডের সামনে পরপর দুটি বোমা বিস্ফোরণে আতঙ্ক নেমে এসেছে। এ কারণে ওই আস্তানায় দেখতে গতকাল স্থানীয় লোকজনের সংখ্যা ছিল খুব কম। এখন কোথায় বোমা বিস্ফোরিত হয় সেটি কেউ বলতে পারে না। স্থানীয়রা জানান, শিববাড়ি জঙ্গি আস্তানায় জঙ্গিদের একটি টিম অবস্থান করছে সেটি তারা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। মসজিদেও তাদের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়নি। তবে কয়েক দিন ধরে এলাকায় অচেনা-অজানা লোকদের আনাগোনা ছিল বলে জানান তারা। শিববাড়ি বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, আতিয়ার মহলের কাছাকাছি তাদের দোকান। ওই মহলে প্রায় ৩০টি পরিবার বসবাস করে। শতাধিক লোকের বাস ওখানে। সুতরাং যারা কয়েক বছর ধরে বাসায় বসবাস করছেন তাদের সঙ্গে সবার পরিচয় আছে। কিন্তু যারা নতুন ভাড়াটিয়া আসেন তাদের অনেককেই তারা চিনেন না। জঙ্গিদের অবস্থান তাদের দৃষ্টিতে পড়েনি। তবে ইদানীং নতুন লোকদের বিচরণ ছিল বেশি। শিববাড়ি জঙ্গি আস্তানার কথা এখন সিলেটবাসীর মুখে মুখে। সবাই পর্যবেক্ষণ করছেন বিষয়টি। ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দানা বেঁধেছে। অনেকেই বলছেন, শিববাড়ির জঙ্গি আস্তানায় অভিযান সিলেটের সবচেয়ে বড় জঙ্গিবিরোধী অভিযানে পরিণত হয়েছে। আগে কখনো এতো বড় জঙ্গি আস্তানার খোঁজ মেলেনি শান্তির জনপদ সিলেটে।

Saturday, February 20, 2016

চার কবরে ভারি সুন্দ্রাটিকি by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ ও নূরুল ইসলাম মনি

এক সারিতে ৪টি নতুন কবর। তাজেল, জাকারিয়া, মনির, ইসমাইল -এরা কেউ কারও চাচাতো ভাই কিংবা খেলার সাথী। দুর্বৃত্তরা তাদের সকল খেলা থামিয়ে দিয়েছে। কবরস্থান থেকে মাইলখানেক দূরে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামে এ চার শিশুর ঘরে কেবলই কান্নার রোল। মাটিচাপা লাশ উদ্ধারের পরদিন বৃহস্পতিবারও একই চিত্র। পাশাপাশি চারটি জীর্ণ ঘর, প্রতিটি ঘরেই এক দৃশ্য। সন্তান হারানোর বেদনায় পাগলপ্রায় মাকে কেউই কোনো সান্ত্বনা দিয়ে থামাতে পারছেন না।
কে বা কারা এমন পাষণ্ড, এত মায়ের চোখে জল এনে দিলো। সন্দেহের তীর গ্রামেরই এক প্রভাবশালী ব্যক্তির দিকে। ৮ পঞ্চায়েতের গ্রামে যিনি নিজেও এক পঞ্চায়েতের প্রধান। বাকি ৭ পঞ্চায়েতের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও আবদুল আলী তার পঞ্চায়েত নিয়ে একলাই চলতেন। সন্দেহের তীর সেই আবদুল আলীর দিকে। সাধারণের সন্দেহ ছড়িয়েছে পুলিশের মাঝেও। আবদুল আলী এখন তার দুই ছেলে নিয়ে পুলিশের খাঁচায় বন্দি। এর মধ্যে এক ছেলে জুয়েল মিয়াসহ তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। চার শিশুহত্যার ঘটনায় বৃহস্পতিবার তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন হবিগঞ্জের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাওসার আলম। বুধবার রাতেই এ দুজনকে আটক করা হয়। বৃহস্পতিবার আটক হন আবদুল আলীর আরেক ছেলে রুবেল মিয়া ও আরও তিন সন্দেহভাজন হাবিবুর রহমান আরজু, বাচ্চু মিয়া ও বশির মিয়া। পুলিশের সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মিজানুর রহমান গতকাল আবারও ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। ছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি ড. আক্কাস উদ্দিন ভুঁইয়া, হবিগঞ্জের এসপি জয়দেব ভদ্রও।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, আবদুল আলী ও তার পরিবারের সদস্যরা অনেক ‘কীর্তিগাথা’র কারিগর। পুরনো দুটো হত্যাকাণ্ডে আবদুল আলীর সম্পৃক্ততার তথ্য জানা গেছে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে। ভাদেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মোতাসির মিয়ার ভাই মোশাহিদ হত্যার ঘটনায় মামলার আসামিও ছিলেন তিনি, যে ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৯৫ সালে। বয়োবৃদ্ধরা স্মৃতি হাতড়ে জানালেন ২৫ বছর আগের জলিল হত্যা ঘটনার সঙ্গেও আবদুল আলীর সম্পৃক্ততার কথা। এর বাইরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণেও আবদুল আলী ও তার পরিবার গ্রামে আতঙ্কের কারণ। চাঁদা না পেয়ে গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় একটি লেবুবাগান দখল করতে গিয়ে কদিন জেলও খেটে এসেছেন আবদুল আলী। কম যান না তার পরিবারের সদস্যরাও। তার ছেলে রুবেল আহমদ গত বছরের ৩১শে অক্টোবর ভাঙচুর চালান স্থানীয় ফয়জাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হারুন আল রশিদ জানান, রুবেলের বিরুদ্ধে ইভটিজিংয়ের অভিযোগ ছিল। সালিশের উদ্যোগ নিলে খেপে গিয়ে দলবল নিয়ে হামলা চালায় সে।
গত জানুয়ারিতে আবদুল আলীর অনুসারীদের সঙ্গে গ্রামের বাকি ৭ পঞ্চায়েতের নতুন করে আবারও বিরোধের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় মুরব্বি সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আবদুল খালিক জানান, গ্রামের বাসিন্দা কাজল মিয়া, সাজিদ মিয়ার সঙ্গে তাদের চাচা রইসউল্লাহ’র জায়গা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে নতুন করে গোষ্ঠীগত বিরোধের সৃষ্টি করেন আবদুল আলী। গ্রামবাসীর ধারণা, এ বিরোধের জেরেই আবদুল আলীর লোকজন হত্যা করেছে ৪ শিশুকে।
গ্রামের এক প্রান্তে লোকের আনাগোনা অন্য প্রান্তে চিত্র অন্যরকম। কোনো পুরুষের দেখা মেলেনি আবদুল আলীর বাড়ির আশপাশে। নারীরাও যেন নিজেদের ঘরে বন্দি করে রেখেছিলেন। কথা হয়, আবদুল আলীর বড় স্ত্রী হালিমা বেগমের সঙ্গে। তার দাবি, তার স্বামী ও সন্তানরা নির্দোষ। তাদের ফাঁসানো হয়েছে। তিনি বলেন, ছেলের এসএসসি পরীক্ষা চলছে তাকেও ছাড় দেয়া হয়নি। পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। আবদুল আলীর পুত্রবধূ তফিনা বেগম দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, তার শ্বশুরকে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি সন্দেহ করেন, বাকি ৭ পঞ্চায়েতের মধ্য থেকে কেউই এ ঘটনা ঘটিয়ে তাদের ঘাড়ে দোষ চাপাতে চাইছে। তিনি তার শিশুকন্যার মাথায় হাত রেখে বলেন, তিনি জানেন তার শ্বশুর দোষী না। দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তির দাবি জানান তিনিও।
চার শিশুর লাশের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সম্পর্কে এ পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে, শিশুদের শ্বাসরোধ করে হত্যা হয়েছে। সে হিসেবে অনেকেই ধারণা করছেন এ ঘটনা একজন বা দুজনে মিলে ঘটানো সম্ভব নয়। তাদের সন্দেহ, বড় একটি দলই সরাসরি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। র‌্যাব-৯ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মাহবুব হাসান মানবজমিনকে বলেন, অনেক বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সন্দেহ করার মতো অনেক কিছু আছে-সন্দেহের কারণও আছে। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। সকলেরই একটাই লক্ষ্য-প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা। র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। আমরা সবার সহযোগিতা চাই।
শিশু চারটি হারিয়ে গিয়েছিল গত শুক্রবার। খুঁজে খুঁজে হয়রান হওয়ার পর গত বুধবার বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে ইছা বিলের গর্তে বালিচাপা লাশ মিলে চার শিশুর। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই শিশুদের স্বজনদের বুকে যে কান্না জমেছিল, লাশ উদ্ধারের পর তা যেন বাঁধ ভেঙে যায়। কেবলই কাঁদছেন তারা। বুকের কষ্ট বুকে চেপে রাখতে চাইলেও সে সুযোগ তারা পাচ্ছেন না। দর্শনার্থী-কৌতূহলীদের ভিড়ে, প্রশ্নে নীরবে দুই ফোঁটা জল ফেলতে পারছেন না। পুলিশ-মিডিয়ার আনাগোনায় ফুরসত নেই একটু দম ফেলারও। কাঁদতে কাঁদতে তাদের চোখের জল ফুরিয়ে যাওয়ার যোগাড় তাও নিস্তার নেই। টিভি ক্যামেরাগুলো বাড়তি দুঃখের আবহ তৈরি করতে চোখের জলের ‘আবদার’ জানায়। ঘটনার পর বিভিন্ন সংবাদে মায়েদের দেখানো হয়ে যাওয়ায় নতুন মুখেরও সন্ধান করেন তারা। টিভি ক্যামেরার সামনে হাজির হতে হয় দাদি, খালা, চাচিদেরও। ‘হৃদয়স্পর্শী’ আবহের জন্য ঘর থেকে শিশুদের পড়ার বইগুলো এনে ফেলা হয় কান্নারত স্বজনদের কোলে। এতো আয়োজনের অবশ্য দরকার ছিল না। শিশুদের ঘরের দরজায় পা রাখলে এমনিতেই চোখের পাতা ভারি হয়, ঝাপসা হয়ে আসে। একেক জন মায়ের জলহীন চোখ, ভাষাহীন মুখ বুকের ভেতরে আঘাত করবে যে কারোরই।
কান্নাভেজা বাতাস যেন বইছে পুরো সুন্দ্রাটিকিতে। আর আছে সন্দেহ-অবিশ্বাস। কেউ কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ভরসা রাখার সাহসও যেন তারা হারিয়ে ফেলেছেন।