Showing posts with label শিল্প ও সাহিত্য. Show all posts
Showing posts with label শিল্প ও সাহিত্য. Show all posts

Friday, October 16, 2026

গল্প- সিক্স-বি by মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

বাড়িঅলা যখন দেখলেন, গ্রাম থেকে আমার বাসায় যত বার আমার ভাইবোন-ভাস্তেভাস্তিরা বেড়াতে আসে, তত বার খেজুরের পাটালি, তালের পিঠা, মটরশুঁটির শাক, বেতের আগা, তালশাঁস, মেটে আলু তার ঘরে চলে যায়‒তিনি জুনের এক তারিখ থেকে ভাড়া ৩০০ টাকা বাড়িয়ে দিলেন, আর গ্যাস ওনার ভেতরে ছিল, আমার ভেতরে দিয়ে দিলেন, বললেন, ‘কেডায় কইব, বাজেটের আলোচনা হুইনা ইলিশের ব্যাপারি থিকা পটলের আড়ৎদার, টিভির শোরুম থিকা দাঁতনের ক্যানভাসার‒সবাই হঠাৎ ক্ষেইপা উঠব? বিপদ আফনেরও, বিপদ আমারও। এখুন তো আর কইতে পারি না, ‘মনির ভাই, যান গিয়া, আফনের কষ্ট অইব এইহানে। কষ্ট করলে দুই ভাই একলগেই করুম। কী কন্?’ আমি বলতে চাচ্ছিলাম, ‘গ্যাসটা আপাতত আপনার ভেতরেই থাক।’ কথাটা মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল কি না নিশ্চিত করে বলতে পারব না‒বাড়িঅলার হঠাৎ আর্তনাদে আমার কান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, অথবা তিন সেকেন্ড স্মৃতিলিখন হয়নি। উনি ডান হাত দিয়ে দুই চোখ ঢেকে আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘ওরে, মাইচ্চে রে, মাইচ্চে!..আইচ্চা থাউক, আফনের কষ্ট অইলে আমার এক টেকাও লাগত না। আমি এক বেলা নাহয় খামু না; মিনিকেট খাইতাম, পাইজাম খামু। তবু নিজের ভাইরে কষ্ট দিমু না।’ সে মাসে বাড়িঅলা দুই বার ভাড়া চাইতে এলেন‒দুই বার ভাড়া চাওয়ার পর দুই বার ভুল স্বীকার করলেন, দুই বার ভুল স্বীকার করে দুই বার মাফ চাইলেন। অথচ উনি জানেন, আমি মাসের প্রথম বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যায় আগের মাসের ভাড়া দেই। সাত বছর আগের কথা বলছিলাম। দীপের বয়স তখন ছয় বছর। অক্ষর জোড়া দিয়ে শব্দ লিখতে শিখেছে কেবল, সেই বিদ্যা দিয়েই ক্লাশের বইয়ের পাশাপাশি কমিক্স পড়ে ফেলত।

সাত বছর আগে এই ছোট্ট এপার্টমেন্টটায় ওঠার আগে, মতি, জয়গুন, রাফেজা, সালামত ভাই, মজিদ চাচাদের সাথে শেওড়াপাড়ায় একটা টিনশেড বাড়ির দুই রুম নিয়ে থাকতাম। সকালে মজিদ চাচা সামনের প্যাসেজে হেঁটে হেঁটে দাঁতন করত, খক খক করে কফ ফেলত, দুপুরে আওয়াজ দিত রাফেজা-সালামতরা, আর রাতে হিস্ হিস্ করত মতি-জয়গুনরা। ছেলেকে নিয়ে এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে থাকব বলে অফিস বন্ধের দিনগুলোতে বাসা খুঁজতে শুরু করলাম। প্রতি বন্ধের দিনে ঘর থেকে বেরুতে দেখে দীপ একদিন জানতে চাইল, ‘ফ্রাইডেতে তুমি কোথায় যাও, বাবা?’
‘বাসা খুঁজতে যাই।’
‘আমাকেও নিয়ে যাও।’
‘রোদের ভেতর ঘুরে ঘুরে তোর জ্বর হবে।’
‘হোক। জ্বর হলে ভালোই হবে। ঘরে শুয়ে থাকতে পারব।’
‘ঘরে শুয়ে শুয়ে কী করবি?’
‘হিটলু বিটলু পড়ব।’
‘আচ্ছা, তাহলে শুয়ে শুয়ে হিটলু বিটলু পড়্, আমি বাসা খুঁজে আসি।’

আরেকদিন ও আমাকে আটকে ফেলল‒দুই হাত দুই দিকে মেলে ধরে পথের উপর দাঁড়াল, বলল, ‘আজ আমাকে নিয়ে যাও, বাবা।’ আমি বললাম, ‘ঘরে শুয়ে শুয়ে হিটলু বিটলু পড়্। কাল থেকে তো আবার স্কুলে যেতে হবে।’ ও দুই পা নাচাতে নাচাতে বলল, ‘হিটলু বিটলু সব শেষ করে ফেলেছি।’
‘তাহলে এখন রিভাইজ দে।’
‘রিভাইজ দিয়ে রেখেছি।’
ও দৌড় দিয়ে ওঘরে চলে গেল, ডেস্ক থেকে একটা হিটলু বিটলু নিয়ে এল। পাতা খুলে একটা ডায়লগ বক্সের উপর আঙুল রেখে একটা ইংরেজি শব্দ দেখাল, ‘ফাইট‒ফাইট মানে লড়াই করা।’ তারপর বই বন্ধ করে দৌড়ে গিয়ে ডেস্কে রেখে এল। কমিকসের কোনো নতুন বই পেলে, এক বসায় পড়ে ফেলে, প্রথম বার পড়ার সময় মাথা তোলে না, কারোর সাথে কথাও বলে না। দ্বিতীয় বার পড়ার আগে মারুফার কাছ থেকে অজানা শব্দগুলোর মানে জেনে নেয়।

ওর হিটলু বিটলু সব পড়া শেষ। অগত্যা ওকে সাথে করে নিয়ে বেরুতে হলো সেদিন। কাজিপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে বেশ ভেতরে, যেখানে বাড়িগুলো বাড়ির গায়ে গা লেগে উঠেছে, ড্রইং রুমের জানালা খুলে প্রতিবেশীদের বেডরুমে পাওয়া যায়, বেডরুমের জানালা খুলে হাত বাড়িয়ে বেলকনির তারে কাপড় নাড়তে হয়‒দরজা দিয়ে ঢুকে বেলকনিতে দাঁড়ানো যায় না, পানের পিক মুখে নিয়ে ঘোরার পরামর্শ যেখানে দেওয়া হয় না‒সিঁড়িতে খালাস করে শান্তি লাভের সুযোগ দেওয়া হয়‒তেমন একটি এলাকার তেমন একটি বাসায় টু-লেট দেখে ঢুকেছিলাম।

শীতল কালো বর্ণের মাঝবয়েসি এক লোক চাবি হাতে নিয়ে ছয়তলা দালানের ছয় তলার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের খালি হওয়া ফ্ল্যাটটা খুলে দিয়েছিলেন। ঢোকার সময় চোখ পড়ল দরজার চৌকাঠে সাঁটা টিনের নম্বর প্লেটের উপর‒সিক্স-বি‒মাঝ বরাবর একটিমাত্র পেরেক ঠোকা।  এপার্টমেন্টের নম্বর থাকে। ভদ্রলোক পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিলেন, আমি ঠিকমতো দেখেশুনে নিচ্ছি কি না, আর তিন তলায় এনে তার দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা ড্রইং রুমের ঠান্ডা সোফায় বসে আমাকে দেখেশুনে নিচ্ছিলেন‒দেখেশুনে তিনি বুঝেছিলেন, বাসা পছন্দ হয়েছে, আর আমি বুঝেছিলাম, আমার পোষাবে। লেবুর সরবত দেখিয়ে দীপকে বললেন ‘খাও, মিস্টি লাগব।’ তারপর দীপের কাছে ওর স্কুলের গল্প শুনলেন।

এ চেহারার মানুষ আমি এর আগেও দেখেছি। এদের মুখণ্ডল একটি চ্যাপ্টা পান পাতার মতো। পান পাতার যে জায়গাটাতে পত্রশীর্ষ সরু হয়ে নেমে গেছে, সে জায়গায় এদের একগুচ্ছ দাড়ি মোচড় দিয়ে থুতনির নিচে নেমে গেছে, থুতনি ধরে ঝুলে পড়েনি, ঝুলে পড়ার ভয়ে মাঝে মাঝে হাত দিয়ে ডলে নিচে পরিপাটি করে রেখে দেয় এরা‒এ ধরণের লোকরা খুব বাকসংযত হয়‒কথার তাৎক্ষণিক অর্থ, স্বল্পমেয়াদি অর্থ আর দীর্ঘমেয়াদি অর্থ‒তিনটাই আলাদা করে জানে। মুখের চামড়া অভিজ্ঞতার আঁচে পুড়িয়ে পাকা করা‒মনের ভাব বোঝা যায় না। ভাবশূন্য একজন মানুষের সাথে আমার ভাব হওয়ার কথা না, কিন্তু হয়ে গেল, রীতিমতো ভালোবাসাই হয়ে গেল, উনি যখন বললেন, ‘আপনার ছেলেটারে খুবই ভালা লাগল, ম্যাথমেটিক্যাল ব্রেইন।’ আমি একটু চমকে উঠেছিলাম। উনি ‘ম্যাথ’ শব্দটা জানেন।

এপার্টমেন্টে থাকব বলে বাসাটা নিয়ে নিয়েছিলাম। সাত বছর ধরে দীপকে নিয়ে সেখানেই আছি। সাত বছরে বাসার দেয়ালের সিমেন্ট-চুনকাম খসে পাতলা হয়ে গেছে, বাথরুমে শাওয়ার বিকল হয়ে ঝুলে পড়ে আছে সেই কবে থেকে, বেসিনের কল ঘুরাতে গেলে সহজে হাতের ভেতরে আসে না‒দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে না বলে দেয়‒ম্যালা টাকার কাজ জমে গেছে‒আর বাসাভাড়া নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে বেড়ে দ্বিগুনে ঠেকেছে। এত টাকার কাজ একসাথে জমানোর জন্য আমিই দায়ী। ভালোবাসার কারণেই সময়ে-অসময়ে বিরক্ত করিনি। ফলে যেদিন একটু বিরক্ত করতে গেলাম, অনেক দিনের ভালোবাসার বিপরীতে জমানো অনেক বিরক্তি সালেক ভাই একসাথে ঝেড়ে ফেললেন, আমি ঝড়ের মতো উড়ে গেলাম, বিশ্বাস আর আত্মবিশ্বাসের সবগুলো ভিত নড়ে উঠল, কটাদিন দীপকে ডাকতে গেলেও গলা ছেড়ে আওয়াজ করতে পারতাম না। গেল মাসে আমি শুধু বলেছিলাম, ‘পানির একটা ব্যবস্থা করেন, সালেক ভাই, বালতিতে পানি ধরে আর কয়দিন? দীপের টাইফয়েড। ছাদে সিক্স-বি-এর চাবিটা মোচড় দিয়ে রাখা হয়েছে, আমি তা জানি, দীপও জানে‒সাত বছরে ওর এটা জেনে ফেলা স্বাভাবিক। কিন্তু হাশেম চাচা নিচে মোটর ছাড়লে ছাদে উঠে ঘুরিয়ে দেয়নি ও কখনও‒চাপ খেয়ে যতটুকু পানি আসে, তা-ই বালতিতে ধরে রাখে, হাশেম চাচা ছাদে উঠে মোচড় দিয়ে বাকিটা বন্ধ করে দেওয়ার আগ পর্যন্ত। সালেক ভাই একদিন সুবিচারের কথা বলছিলেন, ‘পানি কম আসে লাইনে। যা আসে সবাইরে সমান ভাগ কইরা নিতে হইব। কেউ বেশি খাইব, কেউ পাইবই না‒এইটা কোনো বিচার হইল?’ তার কথা আমি মেনেছিলাম। কিন্তু আরেক দিন যখন দীপের অসুখের কথা বারবার বললাম, তিনি বুঝলেন, তার কথা আমি বিশ্বাস করিনি, সহে নিয়েছিলাম মাত্র। আমার মনোভাব প্রকাশিত হলে সালেক ভাই যারপর নাই বিরক্ত হলেন, শুকনো চোখে তাকিয়ে শুধু বললেন,  ‘দেখি।’

আমি ভালো ব্যবহার সম্পর্কে অনেক আগেই একবার বলেছিলাম, এটা অন্যের কাছ থেকে সুবিধা বের করে আনার কৌশল, একবার তা বেরিয়ে আসলে কৌশলের আর দরকার পড়ে না‒মাছ ধরা পড়লে বড়শি তুলে ফেলা হয়‒পানিতে ফেলে রেখে বসে থাকে না কেউ।

দীপের জ্বর বাড়ছে। মহল্লার ডাক্তারের কাছে সন্ধ্যায় কয়েক দিন বসে থেকেছি। ডাক্তার বলেছে প্রচুর পানি খেতে। ওকে মারুফার কাছে একা ফেলে রেখে অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না। মারুফা রান্নায়-কান্নায়-ভালো গোছের মেয়ে, একটা রুটিনমাফিক কাজ আর অন্যটা মর্জিমাফিক। কান্নার মর্জি হলে কাঁদে, না হলে অস্থির হয়ে ওঠে‒খানিক্ষণ চোখের সামনে বই ধরে চোখ ভিজিয়ে নেয়। এর বাইরেও অনেক কিছু আছে‒ও জানে না, ওর হাজবেন্ড জানত, তাই বেচারা বাইরে বাইরে ঘুরত; কিন্তু কতকাল আর বাইরে বাইরে ঘুরবে? একদিন ঘরে এসে ওকেই বাইরে বের করে দিল।

জিএম স্যার সেদিন ডাকলেন। খুব সংক্ষেপে ধমকালেন, ‘আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, আপনার মতো একজন লোককে একাউন্টসের দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হয়নি। ঘরে সমস্যা করে রাখলে, অফিসের হিসাব মিলাবেন কী করে? এমডি স্যারের কাছে যান, উনি বোধহয় আপনাকে কিছু বলবেন।’ এমডি স্যারের চেম্বারে গেলাম। ‘মনির সাহেব, আমি আপনার বড়ভাই হিসাবে বলছি‒কথাগুলো অন্যভাবে নেবেন না‒মানুষ সোশ্যল জীব, তাছাড়া ফিজিক্যাল নিড বলে একটা বিষয় আছে। আপনার কাজে অমনোযোগের বিষয়টা নতুন নয়‒অনেক দিন ধরেই বলব বলব করে বলিনি‒আপনি আবার কীভাবে নেন‒লাইফে অনেক কিছুই হয়‒তাই বলে সব থেমে থাকে না‒আবার একবার চেষ্টা করে দেখেন। আমরা আপনাকে হারাতে চাই না,’ এমডি স্যার তার বিশাল শরীর নিয়ে চেয়ারের ভেতরে গেড়ে বসে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললেন। আমি বললাম, ‘স্যার, আমি কি এখন যাব?’ স্যার বললেন, ‘যান, কাজগুলো মোসাব্বিরকে বুঝিয়ে দেন। অর্ডারটা কিছুক্ষণের ভেতরে হাতে পাবেন। আমরা আর আপনাকে একাউন্টসের কাজ দেখতে দিচ্ছি না‒ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত। আপনি বরং লজিস্টিক্স এন্ড সেনিটেশনটা দেখেন। মকবুল সাহেবের কাছে যান, উনি সব বুঝিয়ে দেবেন।…বেচারা মকবুল সাহেবের বয়স হয়েছে। কুড়ি বছর একই ডেস্কে একই পোস্টে থাকতে থাকতে লেথার্জিক হয়ে গেছেন। ভাবছি ওনাকে এজিএম করে রিটায়ারমেন্টে পাঠাব‒ম্যানেজমেন্টের তেমনই মত।’ আমি ডেস্কে এসে কিউবিকলের সেল্ফ থেকে লুকা প্যাসিওলির প্ল্যাস্টার-অব-প্যারিসের আবক্ষ মূর্তিটা তুলে নিয়ে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলাম। মোসাব্বির আশেপাশের ডেস্কে ঘোরাঘুরি করছে, এর ওর সামনে গিয়ে বসছে, অসংলগ্নভাবে কথা বলছে‒ডাকলেই এদিকে চলে আসবে। একাউন্টসের কাজে ওর খুব কৌতূহল। সময় পেলেই পাশে এসে বসে, জিজ্ঞাসা করে, কী করছি। একদিন অবসরে ম্যানেজমেন্ট একাউন্টিং বোঝাচ্ছিলাম ওকে। সবশুনে দাঁত-দুপাটি বের করে বলল, ‘ওসব ফালতু হিসেব নিকেশ, ওভাবে প্রোফিট-লস ক্যালকুলেট করা যায় না।’ তারপর ডেস্কের উপর থেকে টিএ-ডিএর ভাউচারগুলো হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে খানিক্ষণ পড়ল, তারপর ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল।

অনেক দিন স্কুলে যায় না দেখে, দীপের বন্ধুরা স্কুল থেকে ফেরার পথে ওকে দেখতে এসেছিল। আমি ছিলাম না। দীপ চাবি হাতে করে ছয়তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ওদের সাথে দেখা করে গেছে। দারোয়ান হাশেম চাচার দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত হওয়ায়, পাশ ফিরতে ফিরতে হাক দিয়েছিল, ‘সাবধান! সাবধান! দেখতাছি কইলাম।’ দীপের খুব লেগেছিল কথাটা। এ মাসে ভাড়া দেবার সময়, দীপের অসুখের বিষয়টা আবার বললাম। সালেক ভাই সেদিনের মতো শুকনো চোখে একবার তাকালেন। বেরিয়ে আসার সময় শুনি সালেক ভাই বিড়বিড় করছেন, ‘বন্ধুগো নিয়া বাসার সামনে খাড়াইয়া গপ করে দেখি!…আবার কয় জ্বর!’

শুক্রবার সকালে গ্যারেজে চ্যাঁচামেচি দেখে সিঁড়ি বেয়ে নেমে দেখি পুরো বিলডিংয়ের পুরুষ মানুষরা সবাই নিচে, আর দোতলার সাবু ভাইয়ের বাসার পুরুষ মহিলা শিশুরা সবাই। হাশেম চাচাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রেখেছে। আমি বললাম, ‘কী হয়েছে?’ সাবু ভাই কড়া দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তারপর দারোয়ানের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ধমকের সুরে বললেন, ‘কী হইব আর!’ চারতলার ভাড়াটিয়া আশিক ভাইয়ের দিকে তাকালাম। উনি বললেন, ‘রাতে দোতলার সাবু ভাইয়ের মোটর সাইকেল বের করে নিয়ে গেছে।’ সাবু ভাই বাইং হাউজে আছেন। মাঝে মাঝে অনেক রাতে ফিরতে হয় বলে মোটর সাইকেল কিনে নিয়েছেন। আমি বললাম, ‘হাশেম চাচা ছিলেন না?’ জিপারঅলা গোলাপি পায়জামার পকেটে দুই হাত গুঁজে দিয়ে পাঁচতলার মতি ভাই রসিয়ে রসিয়ে জবাব দিলেন, ‘দারোয়ান আবার থাকে নাকি? একরাতে থাকে ভাসানট্যাক বস্তিতে, অন্য রাতে শান্তির ছাপড়ায়। আরেক রাতে…।’ আশিক ভাই আর বলতে দিলেন না, কথার মাঝখানে মন্তব্যের গোঁজ ঢুকিয়ে দিলেন, ‘কিন্তু ফজরের ওয়াক্তে তো পানির মোটর ছাড়তে শুনি।’ মতি ভাই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আহা বুঝেন না! ফজরের আগ দিয়া আইসা পড়ে।’

সালেক ভাই সব দেখে হতভম্ব হয়ে গেছেন। তার ট্যান পড়া চামড়ায়ও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। হাশেম চাচার বুকের উপর নারিকেলের ছোবড়ার দড়ি শক্ত করে বসে ছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সালেক ভাই হাশেম চাচার সামনে গিয়ে বসলেন। দুই হাত দিয়ে দড়িটা টেনেটুনে একটু আলগা করে দিয়ে উঠে এলেন। বাড়িঅলা নতুন ভাড়াটিয়া সাবু ভাইয়ের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন না, কোনো কথায় দ্বিমত করেন না, আবার ‘ঠিক আছে’-ও বলেন না।

বেচারি সাবু ভাবির সাথে আজ দুবার চোখাচুখি হলো‒উনি নির্লিপ্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। এই বিল্ডিংয়ে নতুন এলেও ওই ভাবিকে আমি চিনি। মতি ভাই একদিন দোতলার সিঁড়িতে আমাকে পেয়ে গলা চড়িয়ে বলছিলেন, ‘এইখানে আর থাকন যাইব না।’ আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কেন?’
‘কেন‒বুঝেন না?’
‘সালেক মিঞা নতুন ভাড়াটিয়া তুলব।’
‘আমরা কি ভাড়া দিচ্ছি না?’
‘দিতাছেন, নতুন ভাড়া দিতাছেন না, পুরান ভাড়া দিতাছেন।’
‘পুরান-ভাড়া নতুন ভাড়া‒এসব কী বলছেন?’
‘ভাড়াটিয়া রাখলে পুরান ভাড়া, ভাড়াটিয়া নামাইলে নতুন ভাড়া।’
‘কই, উনি তো কিছু বললেন না।’
‘কয় নাই‒কইব। আর কইলেও আফনে বুঝেন নাই। যাগো বুঝনের হ্যারা ঠিকই বুঝছে।’
‘আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘দোতলার কাদের ভাই…’
‘কাদের ভাই! কাদের ভাই তো তিন মাস আগেই চলে গেছেন।’
‘বুঝছে দেইখা চইলা গেছে।’

আমি বুঝব না দেখে মতি ভাই আমার সাথে আর কথা বাড়ালেন না। মনে হলো বাকি কথাগুলো নিজের সাথে বললেন‒গলা আরেকটু চড়ালেন‒সামনে দাঁড়ানো মানুষের সাথে এত জোরে কথা বলে না কেউ। মতি ভাই চ্যাঁচাচ্ছিলেন, ‘দ্যাখতাছেন না, দোতলার বাইং-হাউজ ভাই পরিবেশ নষ্ট করতাছে! এডভান্স সিস্টেম আছিল না‒তিনি আইসা চালু কইরা দিলেন‒ছয় মাসের এডভান্স দিয়ালাইছেন। দেয়াল ঘইষা একটুন চুন লাগাইয়া দিছে, কলের নাট বল্টু দুই খান প্যাঁচাইয়া দিছে, ভাইজানের মন গইলা পানি হইয়া গ্যাছে‒দুইগুন ভাড়া চাইছে, দুইগুনেই সই।’ মতি ভাই সিঁড়ি বেয়ে ধুপধাপ উপরে উঠে গেলেন। সিঁড়ির উপর ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ আর কর্কশ হাকাহাকি শুনে, দোতলার নতুন ভাড়াটিয়া সাবু ভাইয়ের মিসেস আস্তে করে ড্রইং রুমের দরজা খুলে দেখে নিলেন। আমি ওনার দিকে একবার তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম।

সালেক ভাই সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আফনেরা যান। আফনেগো এহেনে কী কাম? আফনেগো তো কিছু চুরি অয় নাই।’ ‘হইতে কতক্ষণ!’ মতি ভাই অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন। সালেক ভাই সেদিকে কান দিলেন না, সাবু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মেয়েছেলেরা যান। পুলিশ আসতাছে।’ মতি ভাই স্পিরিংয়ের মতো পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে এক নিমিষে উধাও হয়ে গেলেন। সাবু ভাবি এক হাতে সিঁড়ির রেলিং আর অন্যহাতে ছেলের হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন। একে একে অন্যরাও সিঁড়ির পথ ধরলেন। সাবু ভাই দারোয়ানের দিকে শ্যেন দৃষ্টি হেনে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি উপরে উঠলাম না, এগিয়ে গিয়ে সালেক ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালাম। আমি সবচেয়ে পুরোনো ভাড়াটিয়া। সালেক ভাই আমার দিকে তাকালেন‒দুদিন আগের সেই শুকনো চাহনি। দুদিন চোখের পাতা ফেলেও যে চোখ ভেজেনি, দুরাত ঘুমিয়ে যে চাহনি মিলায়নি, সে চাহনি অনেক শক্তিশালী‒যে কাউকে ঠেলে সরিয়ে দিতে পারে। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, সিঁড়ির রেলিং ধরে ধীর পায়ে উঠে এলাম।

সাবু ভাইয়ের মোটর সাইকেল পাওয়া গেছে কি না, জানি না। দীপের টাইফয়েড বাড়ছে। সারা দিন অফিস করি, সন্ধ্যায় মহল্লার ডাক্তারের চেম্বারে লাইনে বসে থাকি; না হলে প্যাথলজিকার টেস্টের জন্য ঢাকা প্যাথের রুমে রুমে দৌড়োই, নয়তো দীপের মাথাটা কাঁধের পরে নিয়ে লবিতে বসে অপেক্ষা করি। বাড়িঅলার সাথে কদিন আর দেখা হয় না। মতি ভাইয়ের সাথে একদিন গ্যারেজে দেখা। উনি বললেন, ‘সালেক মিঞার সাথে কথা হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘না!’ উনি বললেন, ‘পুলিশের লোকজন কিছু জিগাইছে?’ আমি বললাম, ‘না!’ উনি বললেন, ‘পোলা ক্যামুন আছে?’ আমি বললাম, ‘ভালো না।’ উনি আর কিছু বললেন না, গেট খুলে বাইরে চলে গেলেন। পকেট গেট দিয়ে মাথা নিচু করে বেরুবার আগে, আমার দিকে আরেক বার তাকালেন।

ডাক্তার ওষুধ দিচ্ছে। মারুফা জলপট্টি দিচ্ছে। দীপ জ¦রের ভেতরে প্রলাপ বকছে, ‘এফেকশন‒এফেকশন মানে ভালোবাসা… এফেকশন‒এফেকশন মানে ভালোবাসা…।’ আমি অফিস বন্ধ করে দিয়েছি। ডাক্তার বলেছে, টাইফয়েড এমনিতেই সেরে যায়, একটু সেবা শুশ্রুষা করলে। তবে শরীরে র‌্যাশ উঠলে একটু সাবধান থাকতে হবে। সকাল থেকে ওর র‌্যাশ উঠতে শুরু করেছে।

ওইদিনই সন্ধ্যায় সালেক ভাই এলেন। হাতে এক জোড়া সবুজ ডাব, কিন্তু মুখ নারকেলের ছোবড়ার মতো শুকনো। বসতে বসতে বললেন, ‘ছেলের অবস্থা কী?’
আমি বললাম, ‘ভালো না। জ¦র কমছে না।’
‘ডাক্তার কী বলে?’
‘ওষুধ দেয়।’
‘কিছু বলে না?’
‘বলে।’
‘কী বলে?’
‘প্রচুর পানি খেতে।’
সালেক ভাই উত্তর শুনে মুখ কালো করে ফেললেন, ‘সে কথা না।’
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওনার চোখের দিকে তাকালাম। উনি জবাব দিলেন, ‘সারতে আর কয়দিন লাগবে‒সেই কথা।’ মারুফা লেবুর শরবত নিয়ে ড্রইং রুমে ঢুকল, ‘স্লামালাইকুম ভাইয়া।’ সালেক ভাই মাথা নেড়ে সালাম গ্রহণ করলেন, তারপর  আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি মহল্লার সিক্যুরিটিগুলারে ধমকাইছি। ব্যাটা, কারে দেখতে কারে দেখছস্‒উল্টাপাল্টা কথা কবি না!’ আমি বুঝলাম, উনি সেদিনের মোটর সাইকেল চুরির কথা বলছেন। এ বিষয়ে আলাপ করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আমার নাই। তবুও কথা চালাবার জন্য বললাম, ‘ওরা কী বলছে?’
‘ওরা তো কয়, ওই রাতে দীপরে দ্যাখা গেছে, গেট খুইলা দ্ইু বন্ধুরে নিয়া বাড়ির ভিতরে হান্দাইছে।’

Saturday, September 19, 2026

‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ ও চব্বিশের বিপ্লবীরা by মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

১৯২২ সালের নভেম্বরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যে তরুণ কবিটিকে কলকাতার জেলে এনে তোলা হয়েছিল, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাকে চিনেছিল কেবল একটি মামলার নম্বর হিসেবে—রাজবন্দি। কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যে জবানবন্দিটি লিখে দিলেন, সেটি আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল না; সেটি ছিল বিচারকের আসনটিকেই উল্টে দেওয়ার দলিল। ‘ধূমকেতু’তে ছাপা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহের প্রমাণ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম জবাবে শুরু করলেন এইভাবে—‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।’ বাক্যটি নালিশ নয়, ঘোষণা। যে ভাষায় মানুষ ক্ষমা চায়, সে ভাষা এখানে নেই; আছে সেই ভাষা, যে ভাষায় মানুষ রায় শোনায়।

এরপর তিনি যা বললেন, সেটিই এই লেখার কেন্দ্রীয় বাক্য—‘একধারে রাজশক্তি, একধারে সত্য। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আর একজন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড।’ এক বাক্যে গোটা ঔপনিবেশিক আইনব্যবস্থার মুখোশটা খুলে গেল। রাষ্ট্র বলতে চায়, আইন আর ন্যায় এক জিনিস; আদালত বলতে চায়, রায় আর সত্য এক জিনিস। নজরুল দেখিয়ে দিলেন—না, ওরা দুই জিনিস এবং প্রায়ই ওরা পরস্পরের শত্রু। রাজদণ্ডের হাতে থাকে পুলিশ, দণ্ডবিধি, কারাগার আর ফাঁসিকাঠ। ন্যায়দণ্ডের হাতে থাকে কেবল একটি কণ্ঠস্বর। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, দ্বিতীয়টিকে ভয় পায় প্রথমটি; উল্টোটা নয়।

নজরুল নিজের অবস্থানকে গুলিয়ে ফেলতে দেননি এক মুহূর্তের জন্যও। তিনি রাজদ্রোহী নন—তিনি অন্যায়ের বিদ্রোহী। এই পার্থক্যটুকু তার জবানবন্দির প্রাণ। রাষ্ট্র চেয়েছিল তাকে একটি অপরাধীর খোপে ঢুকিয়ে দিতে, যাতে তার কথার কোনো নৈতিক ওজন না থাকে। তিনি সেই খোপ ভেঙে বেরিয়ে এসে বললেন, তার বিদ্রোহ কোনো ব্যক্তি বা সিংহাসনের বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ‘আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদান করার জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত।’ এই আত্মপরিচয়ের ঠিকানাটিই ঔপনিবেশিক আদালতের কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিল। কারণ যে মানুষ নিজের বৈধতা রাষ্ট্রের কাছ থেকে নেয় না, তাকে রাষ্ট্র অবৈধ ঘোষণা করে কোনো লাভ নেই।

একশ বছর পর, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, বাংলাদেশের রাস্তায় ঠিক এই দৃশ্যটাই আবার মঞ্চস্থ হলো। একদিকে রাজদণ্ড—রাষ্ট্রীয় বাহিনী, দলীয় ক্যাডার, কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, গণগ্রেপ্তার, ‘ব্লক রেইড’। অন্যদিকে ন্যায়দণ্ড—হাতে কেবল একটা প্ল্যাকার্ড আর গলায় একটা স্লোগান নিয়ে দাঁড়ানো শিক্ষার্থী। রংপুরে আবু সাঈদ যখন দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়ালেন, তখন তিনি আসলে একটি বাক্যকেই শরীরে অনুবাদ করছিলেন। রাজদণ্ডের হাতে ছিল রাইফেল, তার হাতে ছিল একটি লাঠি আর একটি সত্য। গুলিটা তার বুকে লাগল, কিন্তু ভিডিওটা লাগল গোটা দেশের বুকে।

রাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে তাদের গায়ে নাম সেঁটে দিতে চাইল—জঙ্গি, রাজাকার, দেশের শত্রু, বিদেশি ষড়যন্ত্রের দালাল। ঠিক যেভাবে একশ বছর আগে নজরুলের গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছিল ‘রাজবিদ্রোহী’ তকমাটি। এই নামকরণের রাজনীতিটা বোঝা জরুরি—শাসক আগে প্রতিবাদকারীর পরিচয় নির্ধারণ করে নেয়, তারপর সেই পরিচয়ের উপযুক্ত শাস্তিটা প্রয়োগ করে। নজরুল সেই ফাঁদে পা দেননি; তিনি রাষ্ট্রের দেওয়া নামটা ছুড়ে ফেলে নিজের নামটা নিজে ঘোষণা করেছিলেন। চব্বিশের শিক্ষার্থীরাও তাই করলেন—‘রাজাকার’ গালিটাকে তারা স্লোগানে রূপান্তরিত করে ফিরিয়ে দিলেন। অপমানকে অস্ত্র বানিয়ে ফেরত পাঠানোর এই কৌশলটা আসলে আত্মপরিচয়ের ওপর নিজের দখল ফিরিয়ে নেওয়া।

কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র কখনোই নতুন কৌশল আবিষ্কার করে না, সে কেবল ঔপনিবেশিক পুরোনো ম্যানুয়ালটাই আবার খুলে বসে। ব্রিটিশ যে ১২৪-ক ধারা দিয়ে নজরুলকে ধরেছিল, ফ্যাসিবাদী সরকার সেই একই যুক্তি দিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বানিয়েছিল। ব্রিটিশ যেভাবে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’র নামে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করত, চব্বিশে সেভাবেই হল বন্ধ করে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে, শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা হলো। রিমান্ডের নামে নির্যাতন, গুম হয়ে যাওয়া তরুণ, আয়নাঘরের গল্প—এসবের কোনোটিই বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভাবন নয়। এগুলো ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার, যা স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র পরম যত্নে সংরক্ষণ করেছিল, শুধু বন্দুকের নলটা ঘুরিয়ে দিয়েছিল নিজের নাগরিকদের দিকে।

নজরুল জানতেন, কারাগার আসলে ভয় উৎপাদনের কারখানা। শাসক একজনকে বন্দি করে দশ হাজারকে চুপ করানোর জন্য। তাই তার জবানবন্দির সবচেয়ে বড় আঘাতটা ছিল ভয়ের বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, সত্য স্বয়ং-প্রকাশ; তাকে কারারুদ্ধ করা যায় না। কবিকে জেলে পোরা যায়, কিন্তু কবির বাণীকে নয়। এই কথাটির সত্যতা চব্বিশে আমরা চোখের সামনে দেখেছি। সরকার শত শত শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে গেছে, ডিবি অফিসে বসিয়ে জোর করে আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি পড়িয়েছে ক্যামেরার সামনে। ফল কী হলো? পরদিন সেই ভিডিওটাই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় প্ররোচনা। জোর করে আদায় করা স্বীকারোক্তি রাষ্ট্রকে বাঁচায় না, ফাঁস করে দেয়।

‘কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট’—নজরুলের এই লাইনটা এতদিন আমাদের কাছে ছিল অনুষ্ঠানের গান। চব্বিশে এটা আবার কাজের নির্দেশনা হয়ে উঠল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে যেদিন শিক্ষার্থীরা দখলদার ছাত্রসংগঠনকে বের করে দিলেন, যেদিন গেটের তালা ভেঙে মিছিল রাস্তায় নামল, সেদিন গানটার প্রতিটি শব্দ আক্ষরিক অর্থ ফিরে পেল। রাষ্ট্র ভেবেছিল হলগুলোই তার সবচেয়ে বড় দুর্গ, কারণ ওখানে সিট মানেই আনুগত্য। অথচ সেই দুর্গই প্রথম ভাঙল। ভয় জিনিসটা এমন—যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ পাথরের মতো শক্ত, আর ভাঙলে বালির মতো গুঁড়ো।

জবানবন্দিতে নজরুল নিজেকে বলেছিলেন বাঁশি—যন্ত্র, যন্ত্রী নন। বাণীটা তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তিনি কেবল বাহক। এই বিনয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সত্য—যে কথার মালিক কোনো একক ব্যক্তি নয়, সেই কথা মেরে ফেলা যায় না। ব্রিটিশ নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিল, ভেবেছিল ‘ধূমকেতু’র আগুন নিভে যাবে। নেভেনি। চব্বিশের আন্দোলনেরও কোনো একক নেতা ছিল না, কোনো একক দপ্তর ছিল না, যেটা দখল করলেই সব শেষ। সমন্বয়কদের ধরে নিয়ে গিয়েও রাষ্ট্র দেখল, পরদিন রাস্তায় মানুষ আরো বেশি। দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি, ফেসবুকের প্রোফাইল লাল—বাণীর কোনো একটা ঠিকানা ছিল না বলেই সেটা তল্লাশি করে পাওয়া গেল না।

তবে নজরুলের জবানবন্দিকে কেবল সাহসের দলিল বলে পড়লে তার অর্ধেকটা হারিয়ে যায়। ওটা একই সঙ্গে একটা নৈতিক দর্শনের দলিল। তিনি কোথাও প্রতিশোধের কথা বলেননি, ঘৃণার চাষ করেননি। তার বিদ্রোহ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অন্যায়কারীর ব্যক্তিসত্তার বিরুদ্ধে নয়। এই জায়গাটায় চব্বিশের তরুণদের সঙ্গে তার মিলটা সবচেয়ে গভীর। যখন আন্দোলনকারীরা নিহত পুলিশ সদস্যের জানাজায় দাঁড়িয়েছেন, যখন মন্দির পাহারা দিতে সারারাত জেগে থেকেছেন, তখন তারা আসলে সেই একই নীতিতেই দাঁড়িয়েছিলেন—অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই আর প্রতিহিংসা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটুকু হারিয়ে ফেললে বিদ্রোহ নিজেই নতুন রাজদণ্ড হয়ে ওঠে।

আরেকটি প্রশ্ন এই লেখাটি লেখকদের দিকে ছুড়ে দেয়। নজরুল আদালতে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন, কবির দায়িত্ব সত্যকে প্রকাশ করা—সরকারের স্তুতি করা নয়, নিরপেক্ষতার ভান করে চুপ থাকাও নয়। অথচ চব্বিশের জুলাইয়ে যখন ছেলেমেয়েগুলো রাস্তায় মরছিল, তখন দেশের বহু প্রতিষ্ঠিত কবি, অধ্যাপক ও সাংবাদিক নীরবতাকেই ভদ্রতা বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ কেউ আরো এগিয়ে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের যৌক্তিকতা খুঁজেছিলেন। ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ তাদের জন্য কোনো ছাড় রাখে না। যে কলম রাজদণ্ডের ছায়ায় আরাম খোঁজে, নজরুলের সংজ্ঞায় সে কলম আর কবির থাকে না, কেরানির হয়ে যায়।

এখানেই ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ আমাদের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটা করে। নজরুল রাজশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজার বিরুদ্ধে নয়। রাজদণ্ড হাতবদল হতে পারে, কিন্তু রাজদণ্ড রাজদণ্ডই থাকে। যে গুম-খুন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে চব্বিশের ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিলেন, সেই একই যন্ত্র কাল অন্য কারো হাতে গেলে সে কি আপনাআপনি ন্যায়দণ্ড হয়ে যাবে? নজরুলের উত্তর পরিষ্কার—না। যে কণ্ঠ শুধু নিজের প্রতিপক্ষ ক্ষমতায় থাকলে সোচ্চার হয় আর নিজের লোক ক্ষমতায় এলে চুপ করে যায়, সে কণ্ঠ ন্যায়দণ্ড ধরেনি, সে শুধু রাজদণ্ডের পালা বদলের জন্য অপেক্ষা করছিল।

এই কারণেই জবানবন্দিটি এখনো ব্যবহারযোগ্য, জাদুঘরের জিনিস নয়। একটা রাষ্ট্র যখন প্রশ্নকে অপরাধ বানায়, তখন সে যে নামেই ডাকা হোক—ঔপনিবেশিক, জাতীয়তাবাদী, উন্নয়নবাদী, বিপ্লবী—চরিত্রে সে একই। নজরুল আদালতে দাঁড়িয়ে যে মৌলিক প্রশ্নটা তুলেছিলেন, সেটা হলো—সত্য বলার অধিকারের বৈধতা কে দেয়? রাষ্ট্র? তাহলে রাষ্ট্র যা শুনতে চায় না, তা কখনোই বলা যাবে না এবং কথার স্বাধীনতা কথাটার আর কোনো মানে থাকে না। তিনি সেই বৈধতার উৎসকে রাষ্ট্রের বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন—বিবেক ও সত্যের কাছে। এই স্থানান্তরটাই তার সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ, কবিতার চেয়েও বড়।

চব্বিশের জুলাইয়ে যে ছেলেটি টিয়ারশেলের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে সহপাঠীর রক্তাক্ত শরীরটা কাঁধে তুলে নিয়েছিল, সে হয়তো ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ পড়েনি। কিন্তু সে ঠিক ওই কাজটাই করছিল, যেটা নজরুল কাগজে করেছিলেন—রাষ্ট্রের ভয়কে অস্বীকার করা। বইয়ের সঙ্গে রাস্তার সম্পর্কটা এভাবেই তৈরি হয়। কোনো প্রবন্ধ কোনো মিছিল তৈরি করে না, কিন্তু মিছিলটা যখন তৈরি হয়ে যায়, তখন সে নিজের ভাষা খুঁজতে গিয়ে পুরোনো কণ্ঠস্বরগুলোকে আবিষ্কার করে। শহীদ মিনারের দেয়ালে যেদিন কেউ নজরুলের লাইন লিখে দিল, সেদিন একশ বছর আগের একটা আদালতকক্ষ আর ২০২৪ সালের একটা রাস্তা এক হয়ে গেল।

নজরুল সেই মামলায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেয়েছিলেন। জেলে গিয়ে অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে চল্লিশ দিন অনশন করেছিলেন। রাষ্ট্র শাস্তি দিতে পেরেছিল, কিন্তু বশ করতে পারেনি। শাস্তি আর বশীকরণের এই ব্যবধানটাই সব স্বৈরশাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা। চব্বিশেও তাই হলো—রাষ্ট্র মারতে পেরেছিল, আটকাতে পারেনি; ইন্টারনেট বন্ধ করতে পেরেছিল, খবর আটকাতে পারেনি; কারফিউ দিতে পেরেছিল, রাস্তা খালি রাখতে পারেনি। যেদিন একটা রাষ্ট্র বুঝতে পারে যে তার নাগরিক আর ভয় পাচ্ছে না, সেদিন তার হাতে আর কোনো হাতিয়ার অবশিষ্ট থাকে না। বন্দুক তখন কেবল শব্দ করে, শাসন করে না।

‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ তাই কোনো একটি সালের দলিল নয়, একটি অবস্থানের নাম। যতদিন কোথাও কোনো তরুণকে সত্য বলার অপরাধে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, যতদিন কোনো আদালত ন্যায়ের বদলে ক্ষমতার সেবা করবে, ততদিন এই লেখাটা কাউকে না কাউকে খুঁজে নেবে। চব্বিশ আমাদের শিখিয়েছে, ন্যায়দণ্ড কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জিনিস নয়; প্রতিটি প্রজন্মকে সেটা নিজের হাতে তুলে নিতে হয় এবং প্রতিটি প্রজন্মকেই আবার প্রমাণ দিতে হয়, সে সেটা রাজদণ্ড বানিয়ে ফেলেনি। নজরুল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নটা রেখে গিয়েছিলেন, সেটা এখনো আমাদের ঘাড়ের ওপর ঝুলে আছে—আপনার হাতে কোনটা?

‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ ও চব্বিশের বিপ্লবীরা

Tuesday, September 15, 2026

গল্প- ডুমুরের ফুল এবং সাপের পাঁচ পা by নীহারুল ইসলাম

ডুমুরের ফুল আর সাপের পাঁচ পা দেখা নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। তবে ওই দুই জিনিসই কখনো চোখে দেখা যায় না। কেউ কখনো দেখেনি। আমি অন্তত এতদিন সেটাই জানতাম। কিন্তু হঠাৎ করে আন্দু আমাকে বলল, ডুমুরের ফুল দেখবি?

আন্দু আমাদের বন্ধু। তার কথায় আমি চমকে উঠলাম। বললাম, তুই একটা পাগল নাকি! ডুমুরের ফুল হয় নাকি যে তুই আমায় দেখাবি?

আন্দু বলল, হয় রে হয়! দেখার চোখ থাকলে দেখাও যায়। আমি আজকাল রোজ দেখি।

ছোঁড়া বলে কী? ডুমুরের ফুল হয়, সেই ফুল আবার সে দেখতে পায়! ছোঁড়া কি তবে সত্যিই পাগল হয়ে গেল?

আন্দুর কথা আমার বিশ্বাস হয় না। তাকে আমি বলি, চল – কোথায় ডুমুরের ফুল আছে আমি দেখব।

আন্দু বলল, আজ নয়, কাল দেখাব তোকে। ঠিক দশটার সময় রেডি থাকিস।

– ঠিক আছে রেডি থাকব। কথার খেলাপ করবি না কিন্তু।

– কথা খেলাপের কী আছে? আমি রোজ দেখি। তুই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। না হয় তুইও একদিন দেখলি। তাছাড়া একা দেখে সুখ হয় না, সঙ্গে কেউ থাকলে বেশি সুখ পাওয়া যায়।

আন্দুর এমন কথায় আমার গর্ব হয়। সে যে আমাকে এত পাত্তা দেয়, বন্ধু ভাবে – এর আগে কখনো বুঝতে পারিনি। তাই হয়তো আন্দুর ডুমুরের ফুল দেখার গল্পটা আমি বিশ্বাস করে বসি।

আন্দু আমাদের গ্রামের ছেলে। আমার বয়সী। বলতে গেলে আমরা একসঙ্গে জন্মেছি – একসঙ্গেই বেড়ে উঠছি। তাই ওকে আমি যতটা জানি, আর কেউ জানে না। এমনকি ওর মা সখী বেওয়া পর্যন্ত জানে না। সখী বেওয়া জানবে কী করে, সে তো স্বামী-মরা, চাকরি করে বেড়ায়, শহরে যায় চাকরি করতে। সেই ফজরের নামাজের আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ফিরে আসে মাগরিবের নামাজের আজানের পর।

আন্দু যখন খুব ছোট ছিল সেও মায়ের সঙ্গে যেত। শহরের ইংলিশ মিডিয়াম ইশকুলে পড়ত। কিন্তু যেই সে বিড়ি-সিগারেট টানতে শিখল, মায়ের সঙ্গ ছেড়ে দিলো। আজকাল সে আর স্কুলে যায় না। আমরা যখন গ্রামের ইশ্কুলে পড়তে যাই, সে তখন ডোমকুল-মাঠে তার রাখালবন্ধুদের সঙ্গে খেলে বেড়ায়। পাখপাখালি শিকার করে। কিংবা বিল-ডোমকুলের নহরে ছিপ ফেলে মাছ ধরে। সেইসব মাছ আবার ওই মাঠেই রাখালবন্ধুদের সঙ্গে পুড়িয়ে খায়। আরো অনেক ব্যাপারস্যাপার আছে তার।

শুধু বিকেলবেলা সে আমাদের সঙ্গী হয়, দরগার মাঠে যখন আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলি কিংবা গুলিডাণ্ডা। আমাদের সঙ্গে আরো অনেকেই খেলে। কিন্তু আন্দুর সঙ্গে আমরা কেউ কোনো খেলাতেই কখনো পেরে উঠি না। সবকিছুতে সে একাই একশ। সত্যি কথা বলতে আমরা প্রত্যেকেই তাকে রীতিমতো সমীহ করে চলি। সমীহ না করে আমাদের কোনো উপায় থাকে না। আমরা জানি, এই বয়সে সে যা যা করে বেড়ায় তার জন্য যে সাহস লাগে তা আমাদের কারোর নেই।

যেমন দরগার মাঠের সেই জঙ্গলে গোদানা আছে। এটা আমরা সকলেই জানি। তাই সন্ধ্যার আগে সেখান থেকে বাড়ি ফিরে আসি। আন্দু কিন্তু ফিরে আসে না। একা একা বসে থাকে। বিড়ি টানে। স্বভাবতই এই বয়সে আমাদের চোখে আন্দু রীতিমতো হিরো সালমান খান। না হলে পরদিন আমি হঠাৎ করে তার সঙ্গী হয়ে ডুমুরের ফুল দেখতে যেতে রাজি হবো কেন?

-----দুই-----

আমার স্কুল ছিল। বাড়ি থেকে স্কুলে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে আমি দরগাতলায় এসে বসে আছি। আন্দু আমাকে এখানেই আসতে বলেছে; কিন্তু কোথায় সে? এখনো তার পাত্তা নেই কেন? আমার যে ভয় করছে! ঘুরেফিরে মনে পড়ছে আমি যেখানে বসে আন্দুর অপেক্ষা করছি, জায়গাটার নাম দরগাতলা। এখানে জিনের একরাত্রে তৈরি একটা ইঁদারা আর একটা মসজিদ আছে। যদিও এখন দুটোই পরিত্যক্ত। একটা বিশাল বটগাছ ঝুরি নামিয়ে দুটোকেই ঢেকে রেখেছে। আর এসবের দখল নিয়ে রেখেছে একটা শয়তান গোদানা। ভেতরে প্রবেশের কোনো পথ নেই। কেউ প্রবেশ করতে চাইলেও পারে না, ওই গোদানার ভয়ে। গোদানাটা নাকি পাহারা দেয় জায়গাটা। কেউ প্রবেশ করলে তার আর রক্ষে থাকে না। মুরব্বিরা গল্প করে, বহুদিন আগে ডিহিপাড়ার বাশেদ সেখ নামে একজনকে ঘাড় মটকে মেরে ফেলেছিল ওই গোদানাতেই।

আন্দুর অপেক্ষা করতে করতে গোদানার ভয় আমাকে ঘিরে ধরছে। আমাদের স্কুলটা এখন থেকে খুব বেশি দূরে নয়, শেষ পর্যন্ত স্কুলেই চলে যাব কি না ভাবছি। হঠাৎ দেখি আন্দুকে। কী একটা গান গুনগুন করতে করতে চামাবেড়ার ডিহির ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে।

বুঝতে পারি যেখানে আতঙ্ক, সেখানেই আন্দু। সাধারণত আমরা কেউ চামাবেড়ার ডিহি মাড়াই না। আমরা জানি, যত অপদেবতার আশ্রয় নাকি ওই ডিহিতেই। আমাদের গ্রাম, এমনকি আশপাশের গ্রামে যদি কারো ওপর অপদেবতা ভর করে, দুলহাবুড়ি কিংবা সায়েদ ওঝার তাড়া খেয়ে তারা আশ্রয় নেয় ওই ডিহিতেই। তাই নাকি সেখানে কোনো আবাদ হয় না, ফসল ফলে না। সারাবছর অনাবাদি পড়ে থাকে। বাড়ির গরু-ছাগল-কুকুর-হাঁস-মুরগি মরলে ফেলে আসা হয় সেখানে। অথচ আন্দু বলে, ওরকম ডিহি নাকি দুনিয়ায় আর একটিও নেই।

একদিন আন্দুকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, দুনিয়ায় কেন নেই ওরকম আর একটি ডিহি?

কোনো জবাব দেয়নি সে। বদলে একদিন সে আমাকে নিয়ে গেছিল ওই ডিহিতে। আমি দেখেছিলাম সেই ডিহি। অদ্ভুত জায়গা বটে। মাটি যা আছে তার চেয়ে বেশি আছে খোলামকুচি। সবুজের চিহ্ন নেই। গাছ বলতে যা আছে কাঁটাঝোপ আর দু-চারটে বাবলা গাছ। যেগুলোর ডালে সর্বক্ষণ কাক-শকুন বসে থাকে লোলুপদৃষ্টি মেলে। অথচ বৃষ্টি হলে নাকি ওই ডিহি ফুঁড়ে চাঁদির মোহর উঠে আসে। সেই গল্পও করছিল আন্দু। শুধু গল্পই করেনি, পকেট থেকে একটা চাঁদির মোহর বের করে আমাকে দেখিয়ে বলেছিল, জানিস – কালিপালের ডিহিতে পাওয়া এরকম মোহর আমার কাছে প্রচুর আছে।

শেষ পর্যন্ত আন্দু যখন আমার কাছে এলো, দেখলাম তার দুই হাতে আলতো করে ধরা একটা ফুটফুটে ফড়িং। আমি কিছু বলার আগেই সে বলতে শুরু করল, জানিস বন্ধু – এটা আমার একটা নতুন খেলা। এই খেলার নাম ফড়িংধরা খেলা। এর একটা একটা করে পাখনা ছিঁড়ে এর মৃত্যু দেখতে আজকাল আমার খুব ভালো লাগে। হয়তো জিজ্ঞেস করবি, এমন নিষ্ঠুর খেলার শখ আবার আমার হলো কী করে? তার উত্তরে বলি, খেলাটা নিষ্ঠুর বটে। তবে খুব মজার। আর এ-খেলার শখটা আমার এমনি এমনি হয়নি। তুই জানিস – একসময় আমার প্রিয় শখ ছিল পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা। সেটাও একটা নিষ্ঠুর খেলা। যদিও মানুষ তা স্বীকার করবে না। মাছেভাতে বাঙালি একটা কথা আছে না! সেটা অন্য প্রসঙ্গ। যাই হোক, আমি ছিপ ফেলে ফাতনার দিকে চেয়ে থাকতাম আর অপেক্ষা করতাম, কখন মাছ বড়শির টোপে মুখ দেবে আর আমি আমার হাতে ধরা ছিপে মারব খাঁচ আর উঠে আসবে মাছ! কিন্তু তার আগেই কোথা থেকে ফড়িং উড়ে এসে বসল জলে ভাসা আমার ছিপের ফাতনার ওপর। ফাতনা নড়ে যেত। আমি ভাবতাম মাছ বড়শির টোপে মুখ দিয়েছে। ছিপে খাঁচ মারতাম। অথচ শূন্য বড়শি উঠে আসত আমার হাতে, আমার ভীষণ খারাপ লাগত। খুব রাগ হতো।

সেই রাগ থেকেই আমার ছিপে মাছ ধরার শখ কোথায় হারিয়ে গেছে। এখন আমি ফড়িংয়ের পেছনে পড়ে থাকি। যেখানেই ফড়িং দেখি, খুব ধৈর্য ধরে আগে সেটাকে ধরি। তারপর তার একটা একটা করে পাখনা ছিঁড়ি। সে ছটফট করতে থাকে, কিন্তু আমি তারিয়ে তারিয়ে তার মৃত্যু দেখি। আজ অবশ্য ধৈর্য ধরে শুধু ফড়িংটাকে ধরেছি মাত্র। তারপর ডুমুরের ফুল দেখাব বলে তোকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি ব্যাপারটা মনে পড়তেই একে সঙ্গে করে নিয়ে সরাসরি তোর কাছে চলে এলাম। এই বিরান মাঠে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে যদি তুই ভয় পাস! কে জানে, ওই জঙ্গলের গোদানা যদি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে তোর ঘাড় মটকে দেয়।

আন্দু বলল, আর একটু দাঁড়া। আগে এটাকে সাপের পাঁচ পা দেখিয়ে নিয়ে আসি। তারপর তোকে ডুমুরের ফুল দেখাব। বলেই আন্দু ফড়িংটাকে সঙ্গে নিয়ে ভয়ংকর জঙ্গলটার ভেতর ঢুকে গেল।

----তিন----

আন্দুকে আমার কেমন লাগে! তার কথা যেন আমি ঠিক ঠিক বুঝতে পারছি না। তার কথায় ডুমুরের ফুল দেখতে এসে আমি কোনো ভুল করিনি তো? আমার পিঠে স্কুলব্যাগ। অথচ আমি স্কুলের বদলে ডুমুরের ফুল দেখব বলে বিরান মাঠের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছি। যার একদিকে দরগাতলার সেই ভয়ংকর জঙ্গল। আর একদিকে যতসব অপদেবতার আশ্রয় ওই চামাবেড়ার ডিহি।

নিজের অবস্থান টের পেতেই আমি ডুমুরের ফুল দেখার কথা ভুলে যাই। আর আমার মনে পড়ে সেই গোদানাটাকে, যে ওই জঙ্গলটা পাহারা দেয়। যার বিনা অনুমতিতে ওই জঙ্গলে কেউ প্রবেশ করতে পারে না, করলেই ঘাড় মটকে মেরে ফেলে। যেমন বহুদিন আগে বাশেদ সেখকে মেরে ফেলেছিল। তাহলে যে আন্দু ফড়িংকে সঙ্গে করে ওই জঙ্গলে গিয়েই প্রবেশ করল! যদি তার কিছু হয়ে যায়! যদি ছোঁড়া মরে যায়!

আন্দুর ভাবনা ভাবতে গিয়ে আমার ভীষণ ভয় করতে শুরু করল। দুপাশে দুই বিপদ নিয়ে আমি আর দরগার বিরান মাঠে একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না, প্রাণভয়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করলাম।

----চার----

যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো, দেখলাম আমি আমার বিছানায় শুয়ে আছি। আমাকে ঘিরে আছে আমার আত্মীয়স্বজন। তাদের সবার চোখেমুখে আতঙ্ক! আমার কী হয়েছে বুঝতে পারি না। সময়টা ভোর হতে পারে, আবার সন্ধ্যাও। তা বলে ফজরের কিংবা মাগরিবের নামাজের আজান শুনতে পাই না, তার বদলে আমার কানে আমাদের প্রতিবেশী কাদুখালার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। খুব করুণ স্বরে কাদুখালা কাঁদছে। কাদুখালা কাঁদছে কেন? আমি জিজ্ঞেস করি, কাদুখালার কী হলো যে এভাবে কাঁদছে?

আমার মা বসেছিলেন আমার মাথার কাছে। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, অর বিটি ফড়িংকে জি দরগার জঙ্গলে গোদানায় মেরে ফেলেছে বেটা।

এতক্ষণে বুঝতে পারি, আন্দু আমাকে শুধু ডুমুরের ফুল দেখায়নি, সাপের পাঁচ পা-ও দেখিয়েছে। কিন্তু সে-কথা আমি কাউকে বলতে পারি না।

Tuesday, August 25, 2026

নবীজীবনচর্চায় নতুন আলো by ড. ইসাম তালিমা

তুলনামূলক সিরাতঃ মানবসভ্যতার ইতিহাসে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জীবন ও কর্ম নিয়ে যত বেশি চর্চা, গবেষণা এবং লেখালেখি হয়েছে, অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন নজির দেখা যায় না। তার জীবন ও কর্ম নিয়ে যত বিস্তৃত গবেষণা, আলোচনা এবং জীবনী রচিত হয়েছে, ইতিহাসে তার কোনো তুলনা নেই। সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই তার সিরাত (জীবনচরিত) ও সুন্নাহ (আদেশ-নিষেধ ও জীবননির্দেশনা) সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন যুগে, নানা পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে সিরাত এবং সুন্নাহচর্চা ক্রমেই বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ হয়েছে।

মুসলিম সভ্যতার প্রতিটি যুগেই মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা ও রচনাকর্ম হয়েছে। কখনো তার সমগ্র জীবনকে ধারাবাহিক ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে; কখনো বিভিন্ন বর্ণনার সত্যতা যাচাই, সনদ পরীক্ষা এবং ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে; আবার কখনো তার জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনা, বৈশিষ্ট্য বা দিককে কেন্দ্র করে আলোচনা করা হয়েছে। তার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিরা যেমন তার জীবনচরিত রচনা করেছেন, তেমনি বিদ্বেষী এবং বিরোধীরাও তাকে নিয়ে লিখেছে। এমনকি নিরপেক্ষ ও ন্যায়নিষ্ঠ গবেষকরাও তার জীবন এবং কর্মকে তাদের গবেষণার বিষয় করেছেন। ফলে মহানবী (সা.)-এর সিরাত যুগে যুগে ভালোবাসা, বিরোধিতা ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান—তিন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষেরই আগ্রহের বিষয় হয়ে থেকেছে।

সিরাতচর্চার দুটি ধারা

মহানবী (সা.)-এর সিরাত নিয়ে প্রচলিত চর্চাকে মূলগতভাবে দুটি প্রধান ধারায় ভাগ করা যায়। প্রথম ধারা হলো ‘ঐতিহাসিক বর্ণনাভিত্তিক সিরাতচর্চা’। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জন্ম, জন্মের পূর্ববর্তী সময় ও তৎকালীন পরিবেশ থেকে শুরু করে তার ইন্তেকাল এবং ইন্তেকাল-পরবর্তী ঘটনাবলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়।

এই ধারার মধ্যেও রয়েছে একাধিক গবেষণাপদ্ধতি। সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন না করেই কেউ আলোচিত সব তথ্য একত্র করেছেন। আবার কেউ তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সনদ নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করেছেন; যেসব বর্ণনা বিশুদ্ধ, সেগুলো গ্রহণ করেছেন এবং যেগুলো প্রমাণিত নয় বা দুর্বল, সেগুলোর ব্যাপারেও পাঠককে সতর্ক করেছেন। এই ধারার আরেকটি প্রবণতা হলো, সিরাতের ঘটনাবলি আলোচনা করে সেখান থেকে শিক্ষা, উপদেশ ও জীবনের নানা দিকনির্দেশনা আহরণ করা। কারো আলোচনায় সাধারণ শিক্ষাগুলো গুরুত্ব পেয়েছে, আবার কেউ বিশেষ কোনো শিক্ষা বা তাৎপর্যের ওপর জোর দিয়েছেন।

সিরাতচর্চার দ্বিতীয় ধারাটিও প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো একটি বিশেষ দিককে বেছে নিয়ে সেটিকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়। মুসলিম ঐতিহ্যে এর প্রাথমিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মহানবী (সা.)-এর শামায়েল (বাহ্যিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য) এবং খাসায়েস (বিশেষ বৈশিষ্ট্য) নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলোয়। কাজী ইয়াজ, মাকরিজি প্রমুখের রচনায় এ ধরনের চর্চার উদাহরণ রয়েছে।

আধুনিক যুগে মহানবী (সা.)-এর জীবনের বিশেষ কোনো দিক নিয়ে গবেষণার এই ধারা আরো বিকশিত হয়েছে। সিরাতের নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অনেক বইপত্র। আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ, খালিদ মুহাম্মদ খালিদ, ইউসুফ আল-কারজাবি, মাহমুদ শিত খাত্তাব ও অন্যরা এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।

পাশাপাশি পাশ্চাত্য লেখকদের মধ্যেও মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন। এসব রচনার মধ্যে যেমন ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি পক্ষপাতদুষ্ট ও বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থিতিরও প্রমাণ পাওয়া যায়।

সিরাতচর্চার তৃতীয় ও নতুন আরেকটি ধারা

সিরাতচর্চায় তৃতীয় একটি ধারা রয়েছে, যে ধারায় তেমন বিস্তৃত চর্চা হয়নি। বরং অল্প কয়েকজন লেখক এ পদ্ধতিতে কাজ করেছেন। এই ধারার বিষয় শুধু মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিত নয়; বরং যারা লেখক ও গ্রন্থকার হিসেবে নবীজির সিরাত নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের নানা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সিরাতকে নতুন করে পাঠ করা।

এ পদ্ধতিকে আমরা বলতে পারি ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’—অর্থাৎ সিরাতের কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন লেখক কীভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা পাশাপাশি রেখে তুলনামূলক আলোচনা করা। কারণ প্রত্যেক লেখক তার নিজস্ব সংস্কৃতি, সাহিত্যিক পরিমণ্ডল, ভাষাশৈলী এবং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার আলোকে সিরাতের ঘটনা বিশ্লেষণ করেন। ফলে একই ঘটনা নিয়ে তাদের লেখায় বৈচিত্র্যময় চিন্তা, সৃজনশীলতা ও অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ ঘটে।

ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন তুলনামূলক ফিকহ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ফকিহের মতামত ও ফিকহি সিদ্ধান্তের তুলনা করা হয়; এসব মতের পেছনের প্রেরণা, কারণ ও যুক্তি বিশ্লেষণ করা হয়; কোনো একটি মতের পেছনে থাকা ফিকহি দর্শন এবং তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিধানগুলোও পর্যালোচনা করা হয়। তাফসির শাস্ত্রেও এই পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়।

তাই সিরাতের ক্ষেত্রেও যদি এ ধরনের তুলনামূলক পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয়, তাহলে মহানবী (সা.)-এর সিরাতচর্চায় নতুন ও স্বতন্ত্র একটি ধারা সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে সিরাতের অনেক দিক ও তাৎপর্য সামনে আসবে, বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ করলে যা হয়তো আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়বে না। ফলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে বোঝার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি সিরাতচর্চাকে আরো সমৃদ্ধ এবং গভীর করে তুলতে পারে।

বিয়ুমির দৃষ্টান্ত

ড. মুহাম্মদ রজব আল-বায়ুমি ছাড়া এ ধরনের প্রচেষ্টা আর কারো মধ্যে আমার চোখে পড়েনি। তবে তিনি তুলনামূলক সিরাতচর্চার কোনো স্বতন্ত্র পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতিতে লেখেননি; বরং সিরাত রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন মাত্র। তার প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল من روائع السيرة النبوية: الرسول يبكي ولده إبراهيم (সিরাতের অনুপম সৌন্দর্য : সন্তান ইব্রাহিমের জন্য রাসুলের কান্না)। প্রবন্ধটি ‘ফি মিজানিল ইসলাম’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এতে তিনি মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে জন্ম নেওয়া নবীজি (সা.)-এর ছেলে ইব্রাহিমের অল্প বয়সে ইন্তেকালের ঘটনা আলোচনা করেছেন।

বায়ুমি সমকালীন সাহিত্যিক ও চিন্তক আব্বাস আল-আক্কাদ, তাহা হুসাইন, আহমদ হাসান আল-জাইয়াত ও মুহাম্মদ হুসাইন হাইকলের সিরাতগ্রন্থে এ ঘটনাটির উপস্থাপন নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন।

সিরাতের গ্রন্থগুলোতে ঘটনাটি বড়জোর আধা থেকে এক পৃষ্ঠার হলেও, এই চার সাহিত্যিকের কলমে তা অসাধারণ মূল্যবান হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ভিন্ন। আক্কাদ প্রথমে যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে বিষয়টি দেখেছেন, এরপর আবেগের দিকে গেছেন; তাহা হুসাইন ঠিক বিপরীতভাবে আবেগ দিয়ে শুরু করে যুক্তিতে পৌঁছেছেন। যাইয়াত নিজের সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে এ ঘটনায় সান্ত্বনা ও শিক্ষা খুঁজে পেয়েছেন। আর হাইকল ঘটনাটিকে প্রবহমান সাহিত্যিক ভাষায় বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করেছেন।

এই ধারণার পক্ষে আরো কিছু দৃষ্টান্ত

বায়ুমি যে আঙ্গিকে আলোচনা করেছেন, সেটি ছাড়াও এ ধারার গবেষণা পদ্ধতির পক্ষে অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। দেখা যায়, প্রত্যেক ফকিহ বা সাহিত্যিক মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো ঘটনা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। এসব দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে নবুয়তের আরো পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট চিত্র আমাদের সামনে বিকশিত হবে।

এর একটি দৃষ্টান্ত ইউসুফ আল-কারজাবি ও খালিদ মুহাম্মদ খালিদের রচনায় পাওয়া যায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতে একটি কাকলাস (টিকটিকি জাতীয় একধরনের সরীসৃপ) হত্যা করবে, তার জন্য একশ নেকি লেখা হবে। দ্বিতীয় আঘাতে এর চেয়ে কম এবং তৃতীয় আঘাতেও এর চেয়ে কম (নেকি পাবে)।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ৫৭৪০)

প্রথম আঘাতের জন্য ১০০ নেকি এবং পরবর্তী আঘাতের জন্য ক্রমহ্রাসমান নেকি কেন, এর ব্যাখ্যায় ইউসুফ কারজাবি একজন আইনজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেছেন, এটা মূলত সঠিকভাবে লক্ষ্যভেদ করার দক্ষতার পুরস্কার। শত্রুর মোকাবিলায় কাজে লাগাতে মুসলমানের এ ধরনের দক্ষতা থাকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে খালিদ মুহাম্মদ খালিদের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার মতে, এখানে নেকির পুরস্কারের মধ্য দিয়ে মূলত দয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যদি কাকলাসকে হত্যা করতেই হয়, তবে যেন দ্রুত হত্যা করা হয়; কারণ বারবার আঘাত করলে প্রাণীটি অযথা কষ্ট পাবে।

আমরা যে পদ্ধতিকে ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’ নামে অভিহিত করছি, তা সিরাতের বিস্তৃত ভান্ডারে ছড়িয়ে থাকা অমূল্য রত্নগুলোকে পাঠকের সামনে তুলে আনার একটি কার্যকর পথ হতে পারে। বিশেষত সিরাতের এমন সব পার্শ্বঘটনা ও অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত বিষয় রয়েছে, যেগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা অনেক সময় বৃহৎ বর্ণনার আড়ালে পড়ে যায়।

সিরাতের লেখক ও কবিরা সাধারণত মহানবী (সা.)-এর জীবনের বড় ঘটনাগুলোর প্রতিই বেশি মনোযোগ দেন। নবীজির জন্ম, নবুয়তপ্রাপ্তি, হিজরত ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলো তাদের রচনায় প্রাধান্য পায়। অথচ তার জীবনের অনেক ছোট ও আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ঘটনার মধ্যেও নিহিত রয়েছে গভীর তাৎপর্য, মূল্যবান শিক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ঈমানি ও জাগতিক দিকনির্দেশনা। সেই বিস্মৃত বা আড়ালে থাকা রত্নগুলো খুঁজে বের করে বিভিন্ন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে একত্র করা গেলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে আরো গভীর, পূর্ণাঙ্গ ও বহুমাত্রিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।

আরবি থেকে বাংলা : আহমাদ ফাহমি

নবীজীবনচর্চায় নতুন আলো

খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার by কাজী যুবাইদা তোহফা

সাম্য ও জনকল্যাণের কালজয়ী মডেলঃ পর্ব-১

মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো বড় সাম্রাজ্যের উত্থানের পেছনে থাকে সামরিক পরাক্রম। আর তার দীর্ঘস্থায়িত্বের আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে একটি সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর। সাত শতকে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকাল ছিল বৈশ্বিক ইতিহাসে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অনন্য জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকাল। কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক দর্শন ও নীতির ওপর ভিত্তি করে তিনি যে অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, তা সমকালীন রোমান বা পারস্য সাম্রাজ্য তো বটেই, আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তায়ও তার ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিমালা গভীর গবেষণার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল সম্পদকে শুধু ধনীদের মধ্যে আবর্তিত হতে না দিয়ে সমাজের প্রান্তিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং রাষ্ট্রে কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

খলিফা উমর (রা.)-এর প্রবর্তিত এই বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল গভীরতা অনুধাবন করতে হলে তার পূর্ববর্তী শাসনকালের বাস্তব পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনে কোনো স্থায়ী বা প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র গড়ে ওঠেনি। তখন পর্যন্ত রাষ্ট্রে সুনির্দিষ্ট কোনো কর কাঠামো, জাতীয় বাজেট কিংবা স্থায়ী অর্থনৈতিক নীতিমালার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, খেলাফতের ভৌগোলিক পরিধি তখন প্রধানত আরবের মরুভূমির মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং রাজস্বের আকারও ছিল তুলনামূলক ছোট। কিন্তু উমর (রা.) যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, তখন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ের মাধ্যমে খেলাফত রাষ্ট্রের সীমানা বিশাল রূপ ধারণ করে। কোটি কোটি দিরহামের রাজস্ব এবং লাখ লাখ নতুন অনারব নাগরিকের অন্তর্ভুক্তির ফলে আগের সেই অনানুষ্ঠানিক ও সাময়িক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দূরদর্শী খলিফা উমর (রা.) অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, একটি বিশাল আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রকে শুধু সামরিক পরাক্রমের জোরে টিকিয়ে রাখা যাবে না, যদি না তার পেছনে একটি সুশৃঙ্খল, স্থায়ী এবং সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো থাকে। ঠিক এই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই তিনি প্রথাগত আরবীয় সাময়িক রাজস্ব বণ্টন পদ্ধতি থেকে বের হয়ে এসে রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

বাইতুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়ন

ইসলামের শুরুর যুগে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা ‘বাইতুল মালে’র কোনো স্থায়ী অবয়ব ছিল না; রাজস্ব এলে তাৎক্ষণিকভাবে বণ্টন করে দেওয়া হতো। বাহরাইন থেকে আসা ৮ লাখ দিরহামের বিশাল রাজস্বও মহানবী (সা.) এক বৈঠকে সর্বসাধারণের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। কিন্তু খেলাফত রাষ্ট্রের পরিধি বৃহৎ পরিসরে বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা উমর স্থায়ী ও সুসংহত কেন্দ্রীয় বাইতুল মাল ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। মদিনায় কেন্দ্রীয় সুবৃহৎ কোষাগার ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রতিটি বিজিত প্রদেশে এর শাখা বিস্তৃত করা হয় এবং সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক পাহারাদার নিযুক্ত করা হয়। কর আদায়ের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক করতে তিনি ‘সাহেবুল খারাজ’ বা কর সংগ্রাহক এবং কোষাগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘সাহিবে বাইতুল মাল’ বা কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের মতো সম্পূর্ণ নতুন প্রশাসনিক পদের সৃষ্টি করেন। বাহরাইন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসার পর উমর (রা.) সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভায় বসেন এবং ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরার প্রস্তাব অনুযায়ী পারস্য ও রোমানদের আদলে হিসাব সংরক্ষণের স্থায়ী দপ্তর চালু করেন। এই নতুন কেন্দ্রীয় কোষাগারের প্রধান কোষাধ্যক্ষ বা ‘সাহেবে বাইতুল মাল’ হিসেবে তিনি প্রখ্যাত আমানতদার সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম (রা.)-কে নিযুক্ত করেন।

দেওয়ান ব্যবস্থা ও নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারি

প্রশাসনিক দূরদর্শিতার আলোকেই খলিফা উমর (রা.) আরবে প্রথম সুশৃঙ্খল আমলাতান্ত্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনা হিসেবে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বিভাগ গঠন করেন। এই ব্যবস্থার নিখুঁত বাস্তবায়নে তিনি খেলাফত রাষ্ট্রে প্রথম নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারির ব্যবস্থা করেন। নাগরিকদের সংখ্যা ও প্রকৃত আর্থিক অবস্থা তালিকাভুক্ত করার পর তিনি বীরত্ব ও ইসলামের ত্যাগের তারতম্য অনুযায়ী ভাতার বৈজ্ঞানিক স্তরবিন্যাস করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকের জন্য বার্ষিক ৫ হাজার দিরহাম, ওহুদ যুদ্ধের শহীদদের পরিবার ও হাবশায় হিজরতকারীদের জন্য ৪ হাজার দিরহাম এবং তরুণদের জন্য ২ হাজার দিরহাম করে নিয়মিত বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করা। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে সাদের ‘আত-তবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থের ৩৬০৫ নম্বর বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা উমর ঘোষণা করেছিলেন, ‘(আমি প্রদান করি কিংবা না-ই বা করি) পৃথিবীর সব স্বাধীন মুসলিমের রাষ্ট্রীয় সম্পদে অধিকার রয়েছে। আর আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই ইয়েমেনের মেষপালকের কাছেও তার প্রাপ্য অধিকার পৌঁছে যাবে তার মুখ লাল হওয়ার আগেই (নিজের হকের জন্য কষ্ট করে দাবি করার আগেই)।’ এই দেওয়ানব্যবস্থা ও ভাতা নির্ধারণের শুরুর সময়ে খলিফা উমর (রা.) আরবের বংশ তালিকা ও বীরত্ব অনুযায়ী নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করার জন্য আকিল ইবনে আবু তালেব, মাখরামাহ ইবনে নাওফাল এবং জুবাইর ইবনে মুতইমকে দায়িত্ব দেন। তালিকা প্রস্তুতের পর ভাতা বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি নিজের পরিবার বা গোত্রকে নয়, বরং ইসলামের প্রথম যুগের ত্যাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে সর্বপ্রথম মহানবী (সা.)-এর পরিবার এবং বদরি সাহাবিদের নাম রাষ্ট্রীয় খাতায় সবার ওপরে তালিকাভুক্ত করেন।

নিয়মিত সামরিক বাহিনী গঠন ও আর্থিক নিরাপত্তা

উমর (রা.)-এর আগে খেলাফতে নিয়মিত কোনো বেতনভুক্ত সামরিক বাহিনীর অস্তিত্ব ছিল না। তিনি খেলাফতের ইতিহাসে প্রথম নিয়মিত বেতনভুক্ত ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী গঠন করেন। পদাতিক, অশ্বারোহী ও তীরন্দাজদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে তাদের নাম রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বা দেওয়ানে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং বাইতুল মাল থেকে নিয়মিত বেতন ও উন্নতমানের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা হয়।

যুদ্ধের ময়দানে থাকা সেনাদের পরিবার-পরিজনের সার্বিক অর্থনৈতিক দায়িত্ব খলিফা নিজে তদারকি করতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বৈপ্লবিক ব্যবস্থা করেছিলেন। সৈন্যদের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খলিফা উমরের এই নীতি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল স্পর্শকাতর ঐতিহাসিক ঘটনা।

এক রাতে খলিফা উমর মদিনার অলিগলিতে সাধারণ প্রজাদের অবস্থা তদারকি করছিলেন। সে সময় একটি বাড়ি থেকে এক নারীর কণ্ঠে গভীর বিরহ ও আকুলতার কবিতা শুনতে পান, যার স্বামী দীর্ঘ সময় ধরে খিলাফতের সীমান্ত রক্ষায় যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত ছিলেন। এ ঘটনা খলিফার মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। পরদিন সকালেই তিনি উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.)-এর কাছে গিয়ে জানতে চান, একজন বিবাহিত নারী তার স্বামী ছাড়া সর্বোচ্চ কতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারে? উত্তরে তিনি জানান, এই সময়সীমা সর্বোচ্চ চার মাস।

এ ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন—কোনো বিবাহিত সৈনিককে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চার মাসের বেশি সময় পরিবার থেকে দূরে যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে তিনি আইন করেন, যুদ্ধকালীন এই চার মাস সৈন্যদের পরিবারের যাবতীয় ভরণপোষণ ও অর্থনৈতিক ব্যয়ভার রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মাল থেকে সুনিশ্চিত করা হবে।

খলিফা নিজে রাতের আঁধারে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈন্যদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ পৌঁছে দিতেন এবং দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা সৈন্যদের চিঠিপত্র নিজে বহন করে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতেন।

এই নিয়মতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফলেই খেলাফত রাষ্ট্রে সৈন্যদের বীরত্ব এবং তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অভূতপূর্ব এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

নবজাতকের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা

উমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থায় ‘শাসক’ পদের চেয়ে নিজেকে জনগণের ‘পাহারাদার’ ভাবা খলিফা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ছিলেন আপসহীন। মদিনার এক অসহায় মায়ের কষ্ট দেখে তিনি নীতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের প্রতিটি নবজাতক শিশুর জন্যই মায়ের বুকের দুধপানের সময় থেকেই নিয়মিত রাষ্ট্রীয় ভাতার নিয়ম চালু করেন। এই মানবিক রাষ্ট্রদর্শনের পেছনে মদিনার উপকণ্ঠে ঘটে যাওয়া এক স্পর্শকাতর বাস্তব চিত্র বিদ্যমান। এক গভীর রাতে খলিফা উমর এবং আবদুর রহমান ইবনে আওফ যখন মদিনার বাইরে তাঁবু খাটিয়ে থাকা এক কাফেলার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন, তখন দূর থেকে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ঘরের দরজায় গিয়ে মাকে সান্ত্বনা দিতে বললেও দীর্ঘক্ষণ পর আবার কান্নার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা নিজে গিয়ে এর কারণ অনুসন্ধান করেন। খলিফাকে চিনতে না পেরে সেই দুঃখী মা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান, খলিফা শুধু দুধ ছাড়ানো শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার ঘোষণা দিয়েছেন; তাই পেটের দায়ে তিনি জোরপূর্বক তার এই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে মায়ের বুক থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছেন, যাতে দ্রুত সরকারি সাহায্য পাওয়া যায়।

অসহায় মায়ের এই নিদারুণ স্বীকারোক্তি খলিফার বিবেককে প্রচণ্ড নাড়া দেয় এবং অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে তিনি ফজরের নামাজে এতটাই কান্না করছিলেন যে মুসল্লিদের পক্ষে তার কিরাত বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মোনাজাত শেষে তিনি বিলাপ করে বলতে থাকেন যে উমরের ভুলের কারণে আজ কত নিষ্পাপ শিশু কষ্টের শিকার হয়েছে। এ ঘটনার পরদিনই খেলাফতে জরুরি ফরমান জারি করা হয়, এখন থেকে কোনো শিশুকে জোর করে দুধ ছাড়াতে হবে না, বরং প্রতিটি নবজাতক পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই বাইতুল মালের নিবন্ধিত নাগরিক হিসেবে স্থায়ী ভাতার অধিকার লাভ করবে।

স্বজনপ্রীতি রোধ ও মিতব্যয়িতার আদর্শ

দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কোনো গভর্নর বা সরকারি কর্মকর্তা নিযুক্ত হওয়ার আগে সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হতো এবং দায়িত্ব ছাড়ার সময় অতিরিক্ত বা অবৈধ কোনো সম্পদ পাওয়া গেলে বাজেয়াপ্ত করা হতো। আর এই জবাবদিহির সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলেন খলিফা নিজে, যিনি বাইতুল মাল থেকে সাধারণ একজন নাগরিকের সমপরিমাণ সর্বনিম্ন ভাতা গ্রহণ করতেন। অগণিত তালি দেওয়া সাধারণ পোশাক পরে বিশ্ব কাঁপানো এই রাষ্ট্রনায়ক প্রমাণ করেছিলেন, শাসকের ভোগবিলাস নয়, বরং মিতব্যয়িতাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। এই কঠোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও মিতব্যয়িতার নীতিটি খলিফা শুধু মুখে বলেননি, বরং তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিজের পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের প্রভাবশালী সেনাপতিদের প্রতিও কোনো ছাড় দেননি। খেলাফতের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী গভর্নর আমর ইবনুল আস যখন মিসরের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন তার ব্যক্তিগত সম্পদে আকস্মিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করে খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ হিসাব তলব করেন। গভর্নর তার এই অতিরিক্ত সম্পদকে বৈধ ব্যবসা ও ব্যক্তিগত উপার্জনের ফসল বলে দাবি করলেও, খলিফা তার নীতিতে অটল থাকেন এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত উপার্জনের আশঙ্কার কারণে গভর্নরের সেই বর্ধিত সম্পদের অর্ধেক অংশ রাষ্ট্রীয় ফরমান বলে বাইতুল মালে বাজেয়াপ্ত করেন। এমনকি নিজের প্রিয় পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) রাষ্ট্রীয় চারণভূমি ব্যবহার করে চড়া দামে উট বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করলে, খলিফা সরকারি চারণভূমির অনৈতিক সুবিধার কারণে পুত্রের সেই লভ্যাংশের পুরোটা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করে দেন। নিজের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রপ্রধানের এমন নজিরবিহীন ও আপসহীন অর্থনৈতিক জবাবদিহি সমগ্র খিলাফতে দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছিল।

খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার
মুসলিমদের বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক ‘ওমর ইবনুল খাত্তাব ময়দান’

Tuesday, July 21, 2026

বিবলিওথেরাপি: বইয়ের মাধ্যমে মনের আরোগ্য by সরদার আব্দুল মতিন

মানুষের জীবনে মানসিক সুস্থতা ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা শারীরিক সুস্থতা। আজকের দ্রুতগতির তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও একাকিত্ব যেন এক অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘বিবলিওথেরাপি’ বা বইয়ের মাধ্যমে মানসিক আরোগ্য একটি প্রাচীন অথচ আধুনিক প্রেক্ষাপটে পুনরুজ্জীবিত ধারণা হিসেবে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে।

‘বিবলিওথেরাপি’ শব্দটি এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ থেকে—‘বিবলিও’ অর্থাৎ ‘বই’ এবং ‘থেরাপিয়া’ অর্থাৎ ‘চিকিৎসা’। সহজভাবে বলতে গেলে, বিবলিওথেরাপি হলো এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে বই পড়ার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি, আত্মজ্ঞান ও আবেগীয় ভারসাম্য ফিরে পাওয়া যায়। এটি শুধু গল্প বা উপন্যাস পড়া নয়, বরং পাঠকের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বই বা সাহিত্য নির্বাচনের মাধ্যমে তার চিন্তা ও অনুভূতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো।

আমেরিকান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনের (এএলএ) দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী, বিবলিওথেরাপি হলো চিকিৎসা ও মনোরোগবিদ্যায় থেরাপিউটিক সহায়ক হিসেবে নির্বাচিত পাঠ উপকরণের ব্যবহার এবং নির্দেশিত পাঠের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানে নির্দেশনা।

স্যামুয়েল জনসন যথার্থই বলেছিলেন, ‘আ রাইটার অনলি বেগিন আ বুক; আ রিডার ফিনিশেস ইট’ বিবলিওথেরাপি কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের নিরাময় নয়, এটি নতুন করে বেঁচে থাকার মন্ত্র। একটি ভালো বই যে আলো জ্বালাতে পারে, তা কোনো ওষুধ বা পরামর্শ হয়তো পারে না।

বিবলিওথেরাপির ইতিহাস

বিবলিওথেরাপির শিকড় অনেক প্রাচীন। প্রাচীন গ্রিসে ‘থিবস’ শহরের গ্রন্থাগারের প্রবেশদ্বারে একটি শিলালিপি ছিল—‘হিলিং প্লেস ফর দ্য সোল’, অর্থাৎ ‘এটি আত্মার আরোগ্যের স্থান।’ প্রাচীন মিসরের রাজা দ্বিতীয় রামেসিস তাঁর লাইব্রেরির দরজায় লিখে রেখেছিলেন ‘আত্মা নিরাময়ের ঘর’ এগুলোই ইঙ্গিত দেয় যে মানুষ বহু আগে থেকেই বইকে মনের চিকিৎসা হিসেবে দেখত।

আধুনিক অর্থে ‘বিবলিওথেরাপি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৯১৬ সালে স্যামুয়েল ম্যাককর্ড ক্রোথারস ফোনেটিক নামক একজন আমেরিকান ধর্মযাজক, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদের প্রবন্ধে। ১৯৪১ সালে ডরল্যান্ডস মেডিকেল ডিকশনারিতে বিবলিওথেরাপি মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার অংশ হিসেবে স্বীকৃত পায়। তবে বিশ শতকের মাঝামাঝি এসে এটি মনস্তত্ত্ব ও সমাজচিকিৎসার অংশ হিসেবে সুসংগঠিত রূপ পরিগ্রহ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিবলিওথেরাপির প্রয়োগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা শুধু মানুষের দেহ নয়, মনকেও ক্ষতবিক্ষত করেছিল। যুদ্ধ শেষে হাজার হাজার আহত ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত সৈনিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিল। অনেকের মধ্যে হতাশা, অপরাধবোধ, ভয় ও যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাত (পোস্ট–ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার–পিটিএসডি) দেখা দেয়।

এ সময় ইউরোপ ও আমেরিকার হাসপাতালগুলোতে বিশেষভাবে ‘হসপিটাল লাইব্রেরিস’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রশিক্ষিত গ্রন্থাগারিক ও মনোবিজ্ঞানীরা সৈনিকদের জন্য মানসিক প্রশান্তিদায়ক বই বেছে দিতেন। গল্প, আত্মজীবনী, ভ্রমণকাহিনি, কবিতা ও ধর্মগ্রন্থ—এসব বই পাঠের মাধ্যমে সৈনিকদের মনে আশার আলো জ্বালানো হতো।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেটেরান্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হাসপাতালগুলোতে ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ‘বিবলিওথেরাপি প্রোগ্রাম’ চালু করা হয়। গ্রন্থাগারিকেরা রোগীর মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে বইয়ের তালিকা তৈরি করতেন। উদাহরণস্বরূপ—যেসব সৈনিক ভয়ের কারণে কথা বলতেন না, তাঁদের দেওয়া হতো সাহসিকতা ও আত্মবিশ্বাসের গল্প; যাঁরা পরিবার হারিয়ে একাকিত্বে ভুগতেন, তাঁদের দেওয়া হতো মানবিক সম্পর্ক ও সহানুভূতির গল্প। ফলাফল ছিল আশাজাগানিয়া—অনেক সৈনিক তাঁদের হতাশা কাটিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এই সফলতার কারণেই বিবলিওথেরাপি পরবর্তী সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যচিকিৎসার স্বীকৃত অংশে পরিণত হয়।

বিবলিওথেরাপির ধরন

বিবলিওথেরাপি সাধারণত দুটি প্রধান ধরনে প্রয়োগ করা হয়—

১. ক্লিনিক্যাল বিবলিওথেরাপি: এটি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এখানে রোগীর মানসিক সমস্যার ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বই বেছে দেওয়া হয়। পড়ার পর থেরাপিস্ট রোগীর প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পরামর্শ দেন। এটি হতাশা, উদ্বেগ, পিটিএসডি বা আচরণগত সমস্যায় ভুগছেন, এমন রোগীদের জন্য কার্যকর।

২. স্ব-সহায়ক বা উন্নয়নমূলক বিবলিওথেরাপি: এখানে পাঠক নিজের ইচ্ছায় এমন বই বেছে নেন, যা তাকে অনুপ্রাণিত করে বা আত্মোন্নয়নে সহায়তা করে। যেমন আত্মজীবনী, প্রেরণাদায়ক সাহিত্য বা আধ্যাত্মিক বই।
বিবলিওথেরাপি কেন মানসিক রোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ

মানুষের মন এমন এক জটিল ক্ষেত্র, যেখানে প্রত্যেকের যন্ত্রণা ও প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। কিন্তু সাহিত্য, গল্প বা কবিতার মাধ্যমে মানুষ নিজের মতো করে আরেক জীবনের সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পায়। এটাই বিবলিওথেরাপির মূল জাদু।

১. সহমর্মিতা জাগায়: গল্পের চরিত্রের সঙ্গে পাঠক নিজের অনুভূতির মিল খুঁজে পায়। এতে একাকিত্ব কমে, সহমর্মিতা বাড়ে এবং নিজের সমস্যাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়।

২. আবেগ প্রকাশে সাহায্য করে: অনেকেই নিজের ব্যথা বা ভয় প্রকাশ করতে পারেন না। কিন্তু কোনো বইয়ের চরিত্র যখন সেই অনুভূতি প্রকাশ করে, পাঠক মানসিকভাবে মুক্তি পেতে শুরু করেন।

৩. আত্মজ্ঞান বৃদ্ধি করে: পাঠক নিজের চিন্তা ও আচরণ নিয়ে ভাবতে শেখে। এতে আত্মবিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়ে এবং মানসিক ভারসাম্য ফিরে আসে।

৪. স্ট্রেস কমায়: বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পাঠ মানসিক চাপ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। বই পড়া মস্তিষ্কে প্রশান্তি আনে, হার্টরেট ও টেনশন হরমোন কমায়।

৫. আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে: ইতিবাচক গল্প বা প্রেরণাদায়ক বই মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালায়। এতে জীবনের প্রতি বিশ্বাস ও আশাবাদ বাড়ে।

আধুনিক যুগে বিবলিওথেরাপির পুনর্জাগরণ

একুশ শতকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে ‘রিডিং ফর ওয়েল–বিয়িং’ বা ‘বুকস অন প্রেসক্রিপশন’ নামে জাতীয় পর্যায়ের বিবলিওথেরাপি প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ—যুক্তরাজ্যে ২০১৩ সালে ‘রিডিং ওয়েল’ উদ্যোগ নেওয়া হয়, যেখানে ডাক্তাররা রোগীদের নির্দিষ্ট বই পড়ার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশে বর্তমানে মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু আমাদের দেশে মনোরোগ চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই সীমিত। এ অবস্থায় বিবলিওথেরাপি একটি কার্যকর, সাশ্রয়ী ও মানবিক সমাধান হতে পারে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক লাইব্রেরিতে ‘রিডিং থেরাপি কর্নার’ স্থাপন করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য ইতিবাচক পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। লাইব্রেরিয়ানরা প্রশিক্ষিত হয়ে মানসিক অবস্থা অনুযায়ী বই সুপারিশ করতে পারেন।

বিবলিওথেরাপি মানুষের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলার এক নীরব শক্তি। বই মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু—তা শুধু জ্ঞান দেয় না, মনের গভীরে শান্তির আলো জ্বালায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের মনোবল পুনরুদ্ধারের ইতিহাস যেমন প্রমাণ করেছে, তেমনি আজও বই হতে পারে একাকী বা হতাশ মানুষের শ্রেষ্ঠ নিরাময়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-23%2Fzyc9qduq%2FWhatsApp-Image-2025-11-23-at-20.10.13.jpeg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গ্রাফিকস: এআই/প্রথম আলো

Tuesday, June 23, 2026

দেবব্রত বিশ্বাস : রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্রাত্য পুরুষ by অনুরুদ্ধ গোস্বামী

"যে রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তা আমার চিন্তাধারার ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ অমান্য করে, নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে মাঝারি কর্তাদের বিধিনিষেধ মেনে আর রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই, প্রবৃত্তিই নেই। এই ব্যাপারে যুক্তিহীন কতগুলি নিয়ম যতদিন বলবৎ থাকবে, ততদিন নিজেকে দূরে সরিয়েই রাখব"— দেবব্রত বিশ্বাস, (ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত, পৃ. ১৩০)

এই কথাগুলোই ছিল দেবব্রত বিশ্বাসের সমগ্র সংগীতজীবনের সারসত্য। প্রতিষ্ঠানের চোখে তিনি ছিলেন ব্রাত্য, কিন্তু মানুষের কাছে ছিলেন অনিবার্য। তাঁর ভরাট কণ্ঠ, স্বতন্ত্র গায়কি আর আবেগময় পরিবেশনায় রবীন্দ্রসংগীতকে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্তের সংকীর্ণ সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে নিয়ে এসেছিলেন সাধারণ মানুষের জীবনে, পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়।

রবীন্দ্রসংগীতের 'শুদ্ধতা' রক্ষার নামে তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন একা, ঋজু মেরুদণ্ড নিয়ে এবং আপসহীনভাবে। সমালোচনা, বিতর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, তবু থেকেছেন নিজ দর্শন ও বিশ্বাসে অবিচল। অর্থ, খ্যাতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মোহ—এসবের কোনো কিছুই দেবব্রত বিশ্বাসকে কোনোদিন স্পর্শ করেনি। যা তিনি অন্তরে ধারণ করতেন, সেই বিশ্বাসেই গেয়ে গেছেন আমৃত্যু।

১৯১১ সালের ২২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার বরিশালে এক ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম নেন দেবব্রত বিশ্বাস। বাবা দেবেন্দ্রকিশোর বিশ্বাস, মা অবলাদেবী। পিতৃপুরুষের ভিটা ছিল কিশোরগঞ্জের ইটনা গ্রামে। তাঁর ঠাকুরদা ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করায় গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেই বিতাড়নের উত্তাপ পরবর্তী প্রজন্মেও পোহাতে হয়েছে দেবব্রতকে। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চোখে তিনি ছিলেন 'ম্লেচ্ছ'। শৈশবের এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অপমান পরবর্তী জীবনে অন্যায় ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল তাঁকে। 'জর্জ' নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত—জন্মের সময় ইংল্যান্ডের সিংহাসনে ছিলেন পঞ্চম জর্জ, সেই অনুষঙ্গেই বাবা এই নামটি রেখেছিলেন।

কিশোরগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, আনন্দমোহন কলেজ হয়ে কলকাতা সিটি কলেজে আই.এ., তারপর বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। ১৯৩৪ সালে যোগ দেন হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে, যা পরে জীবনবিমা নিগম নামে পরিচিতি পায়। সেখান থেকেই ১৯৭১ সালে অবসর নেন। সংগীতে কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না তাঁর—মায়ের কণ্ঠে ব্রহ্মসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতে বেড়ে ওঠা। ১৯২৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের শতবার্ষিকী উৎসবে প্রথমবার দেখেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীচৌধুরানীর হাত ধরে। পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে পিয়ানোর সাহচর্যে তিনি রবীন্দ্রসংগীতের ভেতরের আলোটুকু অনুভব করতে শিখলেন। বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের পরিচালনায় কনক দাসের সঙ্গে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত "সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান" এবং "হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব"—গান দুটির মাধ্যমে প্রথম দ্বৈত রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডের মাধ্যমে এই জগতে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু।

১৯৩৮ সালে পিতৃবিয়োগ ও তীব্র আর্থিক অনটনের মধ্যেই দেবব্রতর জীবনচেতনা বামপন্থার দিকে দৃঢ়ভাবে ঝুঁকতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলায় গড়ে ওঠা প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মঞ্চে তিনি নিয়মিত গাইতে শুরু করলেন স্বদেশি গান ও রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গানগুলো। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের লেখা গানে সুরারোপ করলেন দেবব্রত—ঐতিহাসিকভাবে যার নাম হলো 'নবজীবনের গান'।

দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেই গান। বিজন ভট্টাচার্যের নাটক 'নবান্ন' এবং গণনাট্য সংঘের ছায়ানাটক 'শহীদের ডাক'-এর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মতো প্রতিভাধর মানুষদের সঙ্গে এই সময়েই গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গণনাট্যের তরুণ গায়ক কলিম শরাফীকে নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগ তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে—যে পূর্ববঙ্গের মাটিতে জন্ম ও শৈশব, তা রাতারাতি 'বিদেশ' হয়ে যাওয়া তিনি মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে নতুন রেকর্ডের মাধ্যমে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের পর জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছালেন দেবব্রত। কিন্তু ১৯৬৪ সাল থেকে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার নিতে থাকে। বোর্ড একের পর এক রেকর্ড অননুমোদিত করতে লাগল—কখনো অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে, কখনো গানের গতি নিয়ে, কখনো স্বরলিপির প্রশ্নে। কিন্তু ঠিক কোথায় কী ভুল, তা কখনো স্পষ্ট করা হয়নি। বিচারটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতিনির্ভর, কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

১৯৭৪ সালে বোর্ডের সেক্রেটারিকে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে দেবব্রত রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাই তুলে ধরলেন। গায়কের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ দিলীপকুমার রায়কে বলেছিলেন, "গানের গতি অনেকখানি তরল, কাজেই তাতে গায়ককে খানিকটা স্বাধীনতা তো দিতেই হবে।" আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি তিনি তুলে ধরলেন— "সরস্বতীকে শিকল পরাইলে চলিবে না... সংসারে কেবল মাঝারির রাজত্বেই এমন নিদারুণতা সম্ভব।"

যে রবীন্দ্রনাথের নামে নিয়মের বেড়াজাল তৈরি হচ্ছিল, সেই রবীন্দ্রনাথই যে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন—এই সত্যটাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন দেবব্রত। ১৯৭৭ সালে বোর্ড কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি আর আগের জায়গায় ফেরেনি। দেবব্রত তখন জানালেন, বোর্ডের পরীক্ষকরা বয়সে ও অভিজ্ঞতায় তাঁর চেয়ে কম—তাদের হাতে নিজের ব্যাখ্যা ও প্রকাশের স্বাধীনতা তুলে দিতে রাজি নন তিনি। তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বস্ত বন্ধু জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রকে রেকর্ড অনুমোদনের দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু ২৫ অক্টোবর ১৯৭৭-এ জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র প্রয়াত হলেন—বন্ধ হয়ে গেল শেষ সম্ভাবনাটুকুও। বোর্ডের অনুমোদন না পেয়ে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে রচিত নিজের 'গুরু বন্দনা' গানটিও প্রকাশ করতে পারেননি তিনি। পাহাড়সম বেদনার ভার বুকে নিয়ে ১৯৮০ সালে লিখলেন— "কে রে হেরা আমারে গাইতে দিল না।"

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বদেশে স্বজনদের লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ও সুরে দুটি গান রেকর্ড করেন দেবব্রত বিশ্বাস। ওপার বাংলার জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন তিনি। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশেও একাধিকবার এসে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেছেন।

জীবনের শুরুতে যিনি ছিলেন 'ম্লেচ্ছ', শেষ জীবনে নিজেই বললেন রবীন্দ্রসংগীত জগতে তিনি হয়ে গেছেন 'হরিজন'। এই বিচিত্র পরিহাসই তাঁর গোটা জীবনের প্রতীক হয়ে উঠল। ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট, ৬৯ বছর বয়সে কলকাতায় দেবব্রত বিশ্বাসের দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। দেবব্রত বিশ্বাস আজও প্রথাবিরোধী মানুষের কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর শিল্পীস্বাধীনতার এক অবিনশ্বর নাম— সফদার হাশমির মতো তাই দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়েও একই কথাই বলা যায়, দেবব্রত বিশ্বাস মানে জাগা, জেগে থাকা, জাগানো।

দেবব্রত বিশ্বাস : রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্রাত্য পুরুষ
দেবব্রত বিশ্বাস

Monday, June 15, 2026

গল্প- ফুলি

ফজলুর শুধু মনে আছে বাসটা চলছিল একটা বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁষে, ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্য দিয়ে। বাঁশঝাড়ে ভূত থাকে বলে দাদি ভয় দেখাতেন, ভয়টা সে পেতও, তবে সন্ধ্যার আঁধার নামলে। কিন্তু সেদিন বাসটা চলছিল ভরদুপুরে, তাছাড়া সে বসেছিল মার হাত ধরে। মা অনেক হাসতেন, তার হাসি ফজলুর সব ভয় দূর করে দিত। ভয় ছিল না বলে ফজলু বাঁশঝাড়ের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। একসময় নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছিল, যেমন ঘুমিয়ে পড়েছিল বাসের ড্রাইভার, অথবা সেরকমই আমাদের ধারণা। একটা শব্দে তার ঘুমটা ভেঙেও গেল। শব্দটা ছিল তার ছয় বছরের জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার।

পাহাড় ভাঙার জন্য দাদি বজলুকে, অর্থাৎ  ফজলুর বাবাকে দোষ দিতেন। কেন সে ভরা বর্ষায় বন্ধুর বিয়ে খেতে ছেলে-বউসহ একটা ভাঙা বাসে চড়ে নিয়ামতপুর রওনা হবে? সেই বন্ধুকে দাদি কখনো চোখে দেখেননি, এমনি দূরে দূরে থাকত লোকটা। অনেকদিন ধরে সৌদিতেও ছিল লোকটা। দশদিনের ছুটিতে এসে কেন বজলুকেই ডাকতে হবে বিয়েতে যেতে?

দাদি বলেন, ফজলুর বাবা-মার লাশ লোকটাই অবশ্য বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল; ফজলুকেও – অথবা যেটুকু ফজলু তখনো জাগা ছিল। দাদির ধারণা, ফজলু যে কোনোদিন মানুষ হয়নি, সেটি ওই বর্ষাদিনে তার জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার জন্য।

তোরে আমি অনেক চেষ্টা করছি ফজলু, মানুষ করতে। পারলাম না, দাদি ফজলুকে বললেন। আমাদের হিসাবে হাজার তিনশোবারের  মতো।

ফজলু পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি তুলে একটা কাটা ড্রামে রাখছে। ড্রামের পাশে দাদির প্রিয় গরুটা ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে গোসল দিতে হবে। গরুটা একটা গাভী, দাদি যার একটা নাম দিয়েছেন, ফুলি। তার কড়া বাদামি চামড়ায় সাদা কিছু দাগ, দেখলে মনে হয় কোনো বুনো ফুল। গাভীটা বিষণ্ণ, তার বাছুরটা মারা গেছে। ফজলু সকাল সকাল গাভীটার দুধ দুইয়েছে। সেই দুধ কিছু গরম করে সে খেয়েওছে। এখন তাকে গোসল দিলে তার বিষণ্ণতা কমবে। দাদি তাকে বলেছেন।

পাড়ার লোক ফজলুকে ভয় পায়। ছেলেটা একটা গুন্ডা, তার মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব, কাউকে সে পরোয়া করে না, এমন কথা প্রতিবেশী ইন্তাজ আলি সবাইকে বলেন, বিশেষ করে ফজলুদের বাড়ির তিনটি মরাগাছ তিনি লোক লাগিয়ে লাকড়ির জন্য কেটে নেওয়ার পর সে যেভাবে তার বাড়িতে গিয়ে তা-ব চালিয়েছিল, তারপর। পাড়ার লোক অবশ্য এখন খুশি, ফজলু নারায়ণগঞ্জ থাকে। মাঝেমধ্যে আসে, কিন্তু বাড়ি ছেড়ে খুব একটা বেরোয় না। আগে যখন গ্রামে ছিল, মানুষ তার সামনে পড়তে চাইত না। ফজলুর এক মামা, যিনি পুলিশে চাকরি করতেন, এবং চাকরি চলে গেলে বাড়িতেই থাকেন, তাকে গুন্ডা থেকে ‘মানুষ’ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। এই মামাই তাদের দেখাশোনা করেছেন, তাদের বাড়িটা যে দখল হয়ে যায়নি, সেটিও তার জন্য। ফজলু সেজন্য মামার সামনে বেয়াদবি করে না; কিন্তু তার কোনো কথা শোনার দায় তার আছে, তা বিশ্বাস করে না।

একটা মানুষের সামনেই শুধু ফজলু কখনো মেজাজ দেখায় না এবং তিনি হচ্ছেন তার দাদি। তার জীবনের ওপর পাহাড় ধসে পড়ার পর তাকে টেনেটুনে তুলেছেন দাদি। তাকে আগলে রেখেছেন। তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। সেবা দিয়েছেন। তার দিকে তাকিয়ে দাদি বললেন, বাপের মতো অত চওড়া-লম্বা হইতে গেলি কেনরে ফজলু? চওড়া লম্বা ছিল বইলা তো জানালায় আটকায়া গেল, বাইর হইতে পারল না।

গরুটার গা ডলতে ডলতে ফজলুর মন কিছুটা খারাপ হলো। বাছুরটা মুখে ফেনা তুলে আচমকা মরে গেল। ফজলু নারায়ণগঞ্জ ছিল। খবর পেয়ে বাড়ি আসতেই দাদি বললেন, ফুলির বাচ্চাটা মইরা গেছেরে ফজলু, এই দুঃখে ফুলিও যদি এখন যায়?

ফুলি কি বাসে করে বাচ্চাটাকে নিয়ে নিয়ামতপুর যাচ্ছিল?

তবে ফজলু জানে, কারো মারা যাওয়ার দুঃখে যদি কেউ মারা যেত, তবে সে-ই তো অনেক আগে যেত। অনেক বছর মার মুখটা তার যখন-তখন মনে ভেসে উঠত, তার হাসিটা কানে বাজত। তখন সে ঠিক থাকতে পারত না। চোখ বন্ধ করে ঝিম মেরে থাকত – ফুলি এখন যেমন থাকে, চোখে পানি নিয়ে – না হয় বাইরে গিয়ে পুকুরের কোনার বাঁশঝাড়টাতে একটার পর একটা রাগী ঢিল মারত।

একসময় ঝিম মারা থেকে বেরিয়ে সে রাগের ঝাপটায় পড়ল। রাগটা কার ওপর, সে জানে না। হয়তো বাঁশঝাড়গুলির ওপর, অথবা বাঁশঝাড়ে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকা ভূতগুলির ওপর। একসময় তার বিশ্বাস হলো নিয়ামতপুর যাওয়ার পথের বাঁশঝাড়ের ভূতগুলিই তার ওপর ভেঙেপড়া পাহাড়টা কেটেছিল, এজন্য এক সন্ধ্যায় সে সাইকেল চালিয়ে ওই বাঁশঝাড়ে গিয়ে তা-ব করেছে। ঢিল ছুড়েছে। বাঁশ কেটেছে। কচি বাঁশে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছে। তাতে আগুন না জ্বললেও ধোঁয়া হয়েছে বেশ। রাতঘুমে থাকা পাখিগুলি জেগে উঠে হইচই করেছে।

ঘণ্টাদুয়েক বাঁশঝাড়ে তুফান তুলে সে ফিরেছে। সাইকেলটা বন্ধু মনুকে ফেরত দিয়ে বাড়িতে এসে দা-টা রান্নাঘরের দেয়ালে গুঁজে পুকুরে নেমে গোসল করেছে। গোসল করতে করতে তার চোখে ভেসেছে একটা ডোবা। ফজলুর ওপর নেমে আসা পাহাড়টা ওই ঝিরঝির বৃষ্টিদিনের বাসটাকে এক ধাক্কায় বাঁশঝাড়ের উল্টোদিকের ডোবায় ফেলে দিয়েছিল। গত তিন-চার বছরে তাকে কয়েকবার নিয়ামতপুর যেতে হয়েছে। তার বাবার বন্ধু তাকে টাকা-পয়সা দিয়েছেন, জামা-জুতা দিয়েছেন, একবার দাদির জন্য শাড়ি দিয়েছেন। ফজলু নিয়েছে, কিন্তু দাদি ছুঁয়েও দেখেননি সেই শাড়ি। সেটি গেছে রইসুন বুয়ার ভাগে। রইসুন বুয়া আরেক মানুষ, যিনি ফজলুর রাগটা তেমন দেখেননি। নিয়ামতপুরে যাওয়া-আসার পথে ফজলু শুধু বাঁশঝাড়ের দিকেই তাকিয়ে থেকেছে। কোনো ডোবার দিকে তার চোখ যায়নি।

ফুলির গা ডলতে ডলতে ফজলু খেয়াল করল, গাইটা চোখ বুজেছে, এবং চোখের কোনা বেয়ে পানি পড়ছে। ফজলু বুঝল, গাইটা এখন তার মতোই স্মৃতির ঝাপটা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চোখ বোজার রাস্তা নিয়েছে।

গরুর কি কোনো স্মৃতি থাকে? থাকলে কি তার মতো টুকরো টুকরো, এলোমেলো?

দাদি বসে ডাঁটাশাক বাছছেন। ডাঁটাশাক ফজলুর প্রিয় খাবার। আর ট্যাংরা মাছ। রইসুন বুয়ার হাঁটতে কষ্ট হয়, তারপরও ট্যাংরা মাছ এনে দিয়ে গেছেন, সাত সকালে। দাদি জিজ্ঞেস করলেন, তুই যেহানে থাহিস, জায়গাটার নাম কী?

বন্দর। অনেকবার কইছি দাদি।

হ। তা বন্দরে কোনো সুন্দর মাইয়া নাই? চোহে পড়ে না? এই প্রশ্নটা দাদি তাকে গত কয়েকমাসে অন্তত ত্রিশবার জিজ্ঞেস করেছেন। ফজলু হাসল, বলল, চোহে পড়লে তোমারে জানাইমু, দাদি।

হ। এই গেরামের, আশপাশের কুনু গেরামের, কুনু মাইয়া তো তোরে বিয়া করব না।

বিষয়টা ফজলুর জন্য স্বস্তির। সে কথা বাড়ায় না।

পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বাজে। ফজলু ধরে, এবং ফুলিকে চোখ বুজে স্মৃতির ঝাপটা সামলাতে দিয়ে একটু দূরে হেঁটে যায়। ফোন করেছে তার বন্দরের বন্ধু, নাম খাদেম। সে বলল, ওরে ফজলু, ভালো খবর। ম্যানেজ করা গেছে। অহন সব মোটামুটি কিলিয়ার। তুই আইতে পারিস।

ঠিকাসে, ফজলু বলল।

শুন, শুন, কথা আছে, খাদেম বলল, মনুরে ছুটাইবার রাস্তা পাওয়া গেছে। অবশ্য তাতে খরচ দেড় লাখ। বস আধা দিবেন, বাকিটা আমাগো ম্যানেজ করতে হইব। তোর ভাগে পড়ছে দশ। টেহাটা কাইল লাগব। একটা নম্বর এসেমেস কইরা দিতাছি। ওই নম্বরে বিকাশ কইরা দিস। দুইবারে করিস, সকালে একবার, বিকালে আরেকবার।

খাদেমরে, আমার টাকা নাই। একশ টাকাও নাই। দশ হাজার কইত্থে দেই? কাতর কণ্ঠে বলল ফজলু।

না দিলে বস রাগবো। বস রাগলে মনুও ফৌত। তুইও। তোরে কিলিয়ার করতে বসের কত লাগছে জানিস তো। আইচ্ছা রাখি।

খাদেম ফোন রেখে দিলে ফজলু চিন্তায় পড়ল। গ্রামে তার একটাই বন্ধু, মনু। ফজলুকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার পর মনুই তাকে সঙ্গ দিয়েছে। সিনেমা দেখতে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে গেছে। মনু মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে পালায়। তার মা আছে, আবার সৎমাও আছে। সৎমা এক খতরনাক মহিলা, তার বাবাকে পোষ মানিয়ে একটা ফাউল মানুষ করে ফেলেছে। মনু এসব কথা যখন ফজলুকে বলেছে, তার গলায় অবশ্য রাগ ছিল না। কারণ তার মা আছেন। কিন্তু রাগের বদলা মনুর গলায় একটা দুঃখ বেজেছে। এখন সেটা নেই। দুই বছর ধরে বন্দরে থাকতে থাকতে, ফজলুর সঙ্গে মেসের একটা ঘর ভাগ করতে করতে, তার মনে রাগ এসেছে। একদিন বাড়ি এসে সৎমাকে বলেছে, আমার মারে আর একটা খারাপ কথা কইলে আফনারে আর আফনার পোলাডারে আমি ডোবায় ফালাইয়া চুবাইমু। চুবাইয়া চুবাইয়া দম আটকাইয়া মারমু, বুঝলেন?

ফাউল মানুষ বাবা ঘরের দাওয়ায় বসে মনুর রাগী গলা শুনেছেন। এই রাগ তিনি কোনোদিন দেখেননি। একে তাৎক্ষণিক সামাল দেওয়াটাও তার জ্ঞানের ভেতর নেই। তিনি চুপ করে থাকলেন।

মনু তার মাকে একটা মোবাইল ফোন দিয়েছিল। সে মাকে বলল, একদিনও যদি তোমারে একটা বদ কথা কয়, আমারে জানাইও মা। চললাম।

সেই থেকে মনুর মা স্বস্তিতে আছেন। ফাউল মানুষটাও মাঝেমধ্যে তার বিছানায় আসেন; কিন্তু মা স্বস্তিতে গেলেও মনুর রাগটা থাকল। এটি সে ফজলু থেকে সারা জীবনের মতো কর্জ নিয়েছে।

বন্দরের তারা মিয়ার ক্যাডার বাহিনীতে মনুই প্রথম নাম লিখিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে সিনেমা দেখতে এসে খাদেমের সঙ্গে তার পরিচয়ের সুবাদে। তারা মিয়ার ক্যাডার হলেও তাদের বস আরেকজন, যিনি থাকেন নারায়ণগঞ্জে এবং বন্দরে আসেন মাঝে মধ্যে, শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিয়ে। তার স্পিডবোট আছে। গাড়িও আছে। তাকে কেউ ডাকে ডন সাহেব, কেউ জিয়া সাহেব। তারা মিয়া তাকে সমীহ করেন। লোকটার নিশ্চয় অনেক টাকা, কারণ মনুদের চার-পাঁচজনকে তিনি ভালোই পয়সা দেন। তারা মিয়া লোকটা কিপ্টা। হাড্ডি কিপ্টা, কিন্তু বস হাতখোলা হওয়ায় তারা মিয়াকে মনুরা ছেড়ে যায়নি। বসের কেন তারা মিয়াকে দরকার, যেখানে তাকে পুলিশও দেখলে সালাম দেয়, হেসে হেসে কথা বলে, থানায় ডেকে চা খাওয়ায়, এ-প্রশ্নটি মনু একদিন করেছে খাদেমকে। উত্তরে খাদেম বলেছে, বড় দালানের খুঁটি লাগে না মনু? বন্দুক সগিরের পিস্তল লাগে না?

ফজলু জানে, বসের সাম্রাজ্য শীতলক্ষ্যা পার হয়ে নারায়ণগঞ্জকে পেছনে ফেলে ঢাকা পর্যন্ত ছড়ানো। তবে বন্দর তার কাছে পয়া। এখানে অনেক জমি এখন তার দখলে, যার বেশিরভাগ তারা মিয়ার ক্যাডারেরা ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বসের সঙ্গে তারা মিয়ার পার্থক্যটা ফজলু বুঝেছে এভাবে : বসের যেখানে বন্দরে একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে, তারা মিয়ার আছে কিনা ঝুট ব্যবসা, যে-কাজে তার নির্ভরতা আবার ক্যাডারদের ওপর। খাদেম বলে, এখন অবশ্য তারা মিয়ার ইয়াবা ব্যবসা ঝুট ব্যবসা থেকেও বেশি পয়মন্ত।

বস এবং তারা মিয়া সম্বন্ধে মনুর উৎসাহটা বেশি। ফজলুর আবার কোনো মানুষকে নিয়ে উৎসাহটা কম। কারো সম্পর্কে কথা উঠলে সে শোনে, মনে মনে নোট করে নেয়, ব্যস। তাছাড়া, এখন ভাবাভাবির সময়টা কম। কারণ একটু সমস্যা যাচ্ছে তারা মিয়ার ক্যাডারদের। থানার ওসি পাল্টালে কিছুদিন তাদের দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। এই তিনমাস যেমন। থানায় নতুন ওসি এসেছেন, একদিন বস থানায় গিয়ে ওসির সাক্ষাৎ না পেয়ে তারা মিয়ার গদিতে বসে গজর গজর করেছেন। তারা মিয়ার সিমেন্ট ব্যবসা, খুবই নিরীহ ধরনের, তাও একদিন ওসি এসে দেখে গেছেন। তাকে বলেছেন সাবধান হয়ে যেতে। তিনি তারা মিয়াকে চোখে চোখে রাখবেন। যেদিন একটা পা বিপথে ফেলবেন তারা মিয়া, তাকে আইনের দড়ি দিয়ে বাঁধবেন।

তারা মিয়া বিগলিত হেসেছেন। এই হাসিটা অভিনয়ের, কিন্তু অভিনয়টা এমনই নিপুণ, ওসিও বুঝলেন না। তিনি কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। ওসি চলে গেলে তারা মিয়া যা বললেন তা ওসির কানে গেলে কী হতো কে জানে। তিনি চোখ সরু করে বললেন, আমার পথ তো একটাই ওসি সাহেব। দেখি এই পথ আপনি কতদিন আগলে রাখতে পারেন।

ঝুট ব্যবসায় মারামারি, এমনকি খুনাখুনিও হয়। কিন্তু তারা মিয়া এই ব্যবসা করেন শান্তিতে। কারণ তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। নতুন ওসি আসার পর প্রতিদ্বন্দ্বী এলো, একদিন মারধরও হলো। তাতে মাথা ফেটে একজন হাসপাতালে গেল, পেটে গুলি লেগে আরেকজন গেল ঢাকা মেডিক্যালে। গুলিটা খাদেমের পিস্তলের। পিস্তলটা তাকে ভাড়ায় দিয়েছে বন্দুক সগির, যাকে প্রটেকশন দেন বন্দরের এক সরকারি দলের নেতা।

পুলিশ এসে হানা দিলো। খাদেম পালাল। মনু ধরা পড়ল। ফজলুকে নারায়ণগঞ্জ একটা কাজে পাঠিয়েছিলেন তারা মিয়া, সে বেঁচে গেল। বন্দর না ফিরে সে সোজা বাড়ি গেল।

খাদেম তাকে ফোনে জানাল, বাড়িতেই যেন থাকে, আর অকারণে বাইরে না যায়। ওসির প্রমোশন হয়েছে, বন্দর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারেন। গেলে একটা কিছু হবে, না হলে রূপগঞ্জ না হয় আড়াইহাজারে বস তাদের একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।

বছরখানেক আগে একটা জমি দখল করতে গিয়েছিল তারা মিয়ার ক্যাডারদল। তাদের সঙ্গে ছিল বন্দুক সগির। লোকটা ছোটখাটো, কিন্তু বিরাট তার তেজ। জমিটা ছিল সোনার, এর জন্য বস অনেকদিন চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এরকম জমি সহজে দখলে আসে না। দখলের ব্যবস্থাটা সেজন্য বস পাকাপোক্ত করে রেখেছিলেন, শুধু একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। আরেকটা পার্টি নেমেছিল মাঠে, যাদের হাতটা ছিল অনেক লম্বা। পুলিশ শুধু না, প্রশাসনেও সেই হাত পৌঁছেছিল।

জমিতে পৌঁছানোর আগেই খাদেম ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। সে বন্দুক সগিরকে বলেছিল, ভাইজান, আইজকা থাক। আইজ প্যাঁচটা বড়।

সগির শোনেনি।

পুলিশ সগিরকে ধরেছিল, ফজলুকেও। আরো দু-একজনকে। খাদেম পালানোতে ওস্তাদ। সে পালিয়েছিল। বসকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সবাইকে ছাড়িয়ে নিতে। জীবনে প্রথম জেলের ভাত খেয়েছে ফজলু। দাদি অবশ্য কিছুই টের পাননি। প্রতিদিন দাদিকে ফোন করে সে। সূর্য ওঠা-ডোবার মতোই নিয়মে। জেলে বসেও প্রতিদিন তার কথা হয়েছে দাদির সঙ্গে। ব্যবস্থাটা তারা মিয়া করে দিয়েছেন।

তারপরও অন্তত আধামণ চালের জেলের ভাত তাকে খেতে হয়েছে।

অবাক কা-, ফজলু বেরিয়ে দেখল, জমিটাতে বিরাট সাইনবোর্ড, যাতে বড় করে কোম্পানির নাম লেখা। কোম্পানির নাম ডন ভ্যালি। খাদেম বলে, এটা রিয়াল ইস্টেট।

হেলাফেলা, মোড়ামুড়ি বস পছন্দ করেন না, ফজলু জানে। জেল থেকে মনু তাকে ফোনে বলেছে, জেলে এবার বিপদ। গেল বছর কিছু লোককে মেরে তক্তা করেছিল তারা মিয়ার ক্যাডাররা। তাদের দুজন এখন একই জেলে। তারা মনুকে বলেছে বাড়িতে মিলাদ পড়াতে। তার জান এবার শেষ।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতে হবে, মনু বলেছে, যা পারো তোমরা করো।

আর আজ সকালে খাদেমের ফোন। এখন সে কী করে? হাতে আছে একটা দিন। সে কি পিয়ারু মামার কাছে যাবে? পিয়ারু-পুলিশ মামার কাছে? নাকি বাবার বন্ধুর বাড়ি যাবে নিয়ামতপুর? দাদির হাতে টাকা নেই। তাকে যত টাকা সে দিয়েছে, তার কিছু তিনি খরচ করেছেন, বাকিটা জমিয়েছেন। কিন্তু কোথায় রেখেছেন, ফজলু জানে না। তারপরও দাদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

ফজলু শ-পাঁচেক টাকা চাইলে নিশ্চয় দাদি দিতেন, কিন্তু একসঙ্গে দশ হাজার সে কী করে চায়।

দুপুরে তার জন্য দাদি ভাত বেড়ে দিলে সে অবশ্য কথাটা তুলেছে। জরুরি দরকার, সে দাদিকে বলেছে।

টাকা দিলে তুই কই যেন কুনখানে থাহিস সেইখানে চইলা যাবি?

হ। ফজলু আসেত্ম করে বলেছে।

দাদিকে দেখলে মনে হতে পারে ভুলাভালা মানুষ, কেউ ঠকালেও বোঝেন না, লোকের চালাকি ধরতে পারেন না; কিন্তু আমরা জানি দাদি সহজ মানুষ নন। তিনি বোঝেন। ফজলু কোনো কারণে একটা বিপদে আছে, তিনি সেটা টের পেয়েছেন। দাদির মন। মাস দুই নাতিটা আছে তার সঙ্গে, তার মনটা ভরে আছে। টাকা দিলে সে চলে যাবে। তিনি উদাসীনভাবে বললেন, হাতে টাকা নাইরে ফজলু। যা ছিল আছিয়ারে কিছু দিছি। কিছু জমা আছে সুফিয়া বইনের কাছে।

আছিয়া ফজলুর চাচাত বোন। পিয়ারু চাচার বড়ভাই আজমত মুন্সির মাদ্রাসা পাশ মেয়ে। বিধবা। জীবনটা কাটে কষ্টে। ফজলু তাকে দেখেছে কদাচিৎ।

দাদির ওপর ফজলুর কখনো রাগ হয় না, আজো হলো না, তবে তার রাগ গিয়ে পড়ল আছিয়ার ওপর। আছিয়া বুবুকে দাদি বলেছিলেন তার কাছে চলে আসতে। দুই ছেলেমেয়েসুদ্ধ। কিন্তু আছিয়া পড়ে থাকল শ্বশুরবাড়ি, আধাপেটা খেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার সয়ে। ফজলুর ইচ্ছা হয় একদিন বুবুর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ওই দুই বুড়া-বুড়িকে সাইজ করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।

দাদি বললেন, ফুলিটা গোসল কইরা আরাম পাইল ফজলু। কিন্তু তারপর ঘাস-বিচালি কিছুই খায় নাই। উপোস করতেছে। ফুলিটার বুকে দুধ, ছাওয়ালটা নাই। সকালে দুধ দুইলে ওর পরানটা কান্দে। শূন্য হয়। ফুলি বাঁচবে না।

খাওয়া শেষ করে উঠানে নামল ফজলু। বদনার পানি ঢেলে হাত ধুলো। ফুলিকে চোখে পড়ল। সজনেগাছের নিচে বসে আছে ঝিম মেরে। স্মৃতির ঝাপটা কি একটা গাইকেও এমন উদাসী করে দেয় যে কিছু খেতে তার ইচ্ছা হয় না?

ফজলু যেমন মিষ্টি খায় না। খেতে না পেরে মরে গেলেও, এবং আধাসের ম-া অথবা রসগোল্লা পৃথিবীর শেষ খাদ্য হলেও, না, সেদিন থেকে, যেদিন তাকে দাদি বলেছিলেন, তোর মা মিষ্টির পোকা ছিলরে ফজলু, মিষ্টি পাইলে আর কিছু না খাইলেও তার চলত।

ফুলির বোজা চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে একটা চিন্তা তার মাথায় এলো। মনে মনে একটা হিসাব করল। দাদি ঘণ্টাখানেকের জন্য ঘুমাতে যাবেন, তিনটার দিকে। তার আগেই তার চিন্তাটা পাকা করতে হবে। আজ হাটবার। প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবার হাটটা খুব জমে। আজ শেষ মঙ্গলবার।

-----দুই-----

হাটের যেখানটায় গরুর বেচাকেনা হয়, সেখান পর্যন্ত ফুলিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে একবারও কোনো সমস্যা হলো না ফজলুর। দাদি ঘুমিয়ে গেলে ফুলিকে যখন সে জাগিয়ে তুলল, এবং ফুলি উঠে দাঁড়াল, সে যেন বুঝল তাকে নিয়ে ফজলুর কোনো মতলব আছে। ফজলু ভেবে দেখেছে, না খেয়ে ফুলি যখন মরেই যাবে, তাকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিলেই তো হলো। এমনিতে ফুলি তরতাজা, একটা তিন-সাড়ে তিন বছরের গাই যেমন হয়। গরুর দাম এখন ভালো, কম করে হলেও পঞ্চাশ-ষাট হাজার তো পাওয়া যাবেই। দশ হাজার বিকাশ করে বাকিটা রেখে দিলেই হবে। ফুলিকে দাদি ভুলে গেলে তার হাতে টাকাটা একসময় সে তুলে দেবে।

ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর খদ্দের পাওয়া গেল। খদ্দের ইমামগঞ্জের। ফজলু স্বস্তি পেল। সে তাকে চেনে না, ফজলুও তাকে চেনে না। খাদেমের দেওয়া নম্বরে সে আজ পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেবে। বাকিটা কাল সকালে। তারপর সে বাসে উঠবে বন্দরের পথে।

যতক্ষণ ফুলিকে ধরে ফজলু দাঁড়িয়ে ছিল, ফুলি ঝিম মেরেই ছিল। কিন্তু খদ্দেরের হাতে তাকে তুলে দিলে ফুলির মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিলো। সে বুঝতে পারছিল না, তার চেনা পৃথিবীর বাইরের একজন মানুষ কেন তাকে ধরেছে। ফজলুই বা কেন এটি করতে দিচ্ছে। খদ্দেরটা একটা দড়ি লাগিয়েছে ফুলির গলায়, এবং দড়িটা যেন তাকে বাস্তবে জাগিয়ে দিলো। একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি মেলল সে ফজলুর দিকে। তারপর তার চাঞ্চল্য চলে গেল। একটা অবসাদ যেন নামল তার শরীরে। চোখ দুটি বন্ধ করে দিলো। ফজলু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। কেন জানি তার ধারণা হলো ফুলির সঙ্গে তার আর চোখাচোখি হবে না। হলোও না। ফজলু দাঁড়িয়ে থাকলেও খদ্দেরের তাড়া ছিল, সে চলে গেল।

ফুলি চোখ খুলল না। অথবা খুলল এমন চিকন করে, মাটির দিকে, যেন ফজলুর ছায়াটাও তার চোখে না লাগে।

বাড়ি ফিরে ফজলু দেখল, দাদি দাওয়ায় বসে আছেন। তার প্রিয় বেতের মোড়ায়। তার সামনে যেতে যেতে সে তার বিলাপ শুনল।

বিলাপের সুরে দাদি বললেন, তুই কই ছিলিরে ফজলু? আমার ফুলিটা চইলা গেছে।

চইলা গেছে? কোথায়? অবাক হওয়ার ভান করল ফজলু।

জানি না। দাদি বললেন, তারপর চোখ বুজলেন।

ফজলুর কেন জানি খুব রাগ হলো। না দাদির ওপর না, নিজের ওপরও না। কিসের ওপর তাও সে জানে না। কিন্তু তার রাগ হলো, সবাই কেন তাকে দেখে চোখ বুজবে? দাদি কি সব বুঝেছেন? তিনি কি জানেন ফুলি যায়নি, তাকে ফজলুই নিয়ে গেছে?

অবাক, সে কোথায় ছিল এতক্ষণ, একবারও দাদি জিজ্ঞেস করলেন না। তাকে শুধু বললেন, ফুলিটা চইলা গেল। তুইও কি যাবি?

এ-কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন তার ভুলাভালা দাদি?

আমি একটু খুইজ্জ্যা দেহি, দাদি? সে বলল।

দাদি বন্ধ চোখেই একটুখানি হাসলেন। বললেন, ফুলি চইলা গেছে। এখন তুইও চইলা যাবি। তয় যা।

-----তিন-----

সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বলল, যদি না যাই দাদি, ক্যামনে কী হইব? খামু কী?

খাওনের অভাব হইবে নারে ফজলু, দাদি বললেন। তোর তাগড়া শরীর। বাপদাদার ভিটা আছে। একটুখানি জমি আছে, একটা পুকুর আছে।

ফুলি যেখানে বসে বসে ঝিমাচ্ছিল গতকাল, দাদি ঠিক ওই জায়গায় বসেছেন মোড়া পেতে।

তৈরি হয়ে তার রংওঠা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে দাদির সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, কেউ যাইতে চাইলে তারে আটকানো যায় নারে ফজলু। তোর বাপেরে পারি নাই। তোরেও পারমু না। যা।

ফজলু হাঁটা দিলো।

কিছুদূর গিয়ে সে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে মাটিতে রাখল। তারপর একটা গাছের সঙ্গে মাথা ঠুকল। এবার রাগটা তার নিজের ওপর।

কপাল দিয়ে রক্ত বেরুলো। রক্ত মিশল চোখের পানির সঙ্গে।

-----চার-----

বন্দরে মেসঘরে পৌঁছল সে বেলা বারোটায়। বেশ ক্ষুধা লেগেছে, কিন্তু ফুলির মতো সে একটা সিদ্ধান্ত নিল, আজ কিছুই খাবে না।

খাদেম তাকে জিজ্ঞেস করল, কপাল ফাটল ক্যামনে?

ফজলু উত্তর দিলো না। খাদেমও দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করল না। জিজ্ঞেস করে নষ্ট করার মতো সময় তার নেই। গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে বেরুতে হবে আজ রাতে। বস পইপই করে বলে দিয়েছেন, কাজটা ঠিকঠাক করতে হবে।

কী কাজ?

পরে বলব। এখন খা। খাইয়া ঘুমা। তিনটায় উঠিস। তিনটায় মিটিং, খাদেম বলল, তারপর চলে গেল।

ফজলু খেলও না, ঘুমালও না। শুধু বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকল।

তিনটায় মনু এলো। জেলে থেকে সে শুকিয়ে গেছে। রংটাও কালো হয়ে গেছে। মনুর পেছন পেছন উত্তম এলো – উত্তম বসের খাস মানুষ। ওর সঙ্গে পিস্তল থাকে। ফজলু বুঝল আজকের কাজটা সহজ নয়। উত্তম যেখানে যায়, খবর তৈরি করে দিয়ে আসে।

থানার ওসি চলে গেছেন। এখনো নতুন ওসি আসেন নাই। বস এই সময়টা বেছে নিয়েছেন তার কাজের জন্য। খাদেম জানালো বসের সোনার মতো দামি জমিটা সাত কোটি টাকায় রফা করেছিলেন এক পেপার মিলের সঙ্গে। কিন্তু সেটা কাল হঠাৎ দখলে নিয়েছে গোদনাইলের হাজি এহসান। লোকটা ঘাঘু। বন্দুক সগিরকে সে কৌশলে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে সেখানে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন উত্তম ভরসা।

উত্তমের কথা শুনে মনে হলো, লাশ পড়বে। মনু শিউরে উঠল। ফজলু অবশ্য উত্তমের কথা শুনেছে আবার শোনেওনি। তার মন পড়ে আছে দাদি আর ফুলির বোজা চোখে। সে ঠিক জেনেছে, দাদি সব বুঝেছেন। সব বুঝে দাদি রেগে বাড়ি মাথায় তুললে সে খুশি হতো, তাকে চেলা কাঠ দিয়ে পেটালে সে আরাম পেত, তিনি দাওয়ায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদলে তার স্বস্তি হতো। কিন্তু দাদি এসব কিছু না করে শুধু চোখ বুজেছেন।

কেন?

সন্ধ্যার মধ্যেই খবর এলো, সর্বনাশ! ওসি ফিরেছেন, কিন্তু ঠিক কী কারণে খাদেম বলতে পারল না। মধু নামের উত্তমের এক সঙ্গী বলল, ওসি কঠিন মানুষ, একটা মেরামতি চালাচ্ছিলেন বন্দরে, সেইটা শেষ করতে ফিরে এসেছেন। এক সপ্তা থাকবেন।

উত্তমের, খাদেমের ফোন বাজতেই থাকল। একজন কেউ জানালো বন্দুক সগিরকে নিয়ে পুলিশ বন্দরে এসেছে, আরেকজন বলল, ডন সাহেব নারায়ণগঞ্জ ফিরে গেছেন। খাদেম নিজেই একটা নাম্বারে ফোন করে শুনল, বসের এক ইস্পিশাল ক্যাডারকে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে হাসপাতালে পাঠিয়েছে এহসানের লোকজন। লোকটা বাঁচে কিনা সন্দেহ।

এহসানের লোকজনকে নিয়ে অবশ্য ভয় নেই তারা মিয়ার ক্যাডারদের। ঢাকা থেকে কঠিন কিছু লোক তিনি আনিয়েছেন, তারাই তাদের সামাল দেবে। তাদের ভয়টা ওসিকে নিয়ে। এ লোক তার মেরামতির কাজে কাউকে তোয়াক্কা করে না।

তারা মিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় ফোন করলেন খাদেমকে, বললেন কিছু একটা করতে। পুলিশ তার গদি ঘিরে রেখেছে।

খাদেম বেরিয়ে গেল। মধুও গেল। উত্তমও একসময় উঠল। যাওয়ার আগে সে ফজলুকে বলল নিতাইবাবুর আড়তের পেছনের খালটা পার হয়ে ইনাম মার্কেটের গেটে কিসলুর চায়ের দোকানে চলে যেতে। সে মনুকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।

ফোনটা খোলা রাখিস, সে বলল।

কিন্তু বাড়ির সামনের গলিটার মোড়েও হয়তো উত্তম পৌঁছাতে পারল না, পুলিশের বাঁশি বাজা শুরু হলো। একই সঙ্গে দ্রুতপায়ে দৌড়াদৌড়ি। দরজা খুলে ফজলু দেখল, গলিটায় সাত-আট পুলিশ। দুই পুলিশ তাদের মেসবাড়ির দিকেই আসছে। তাদের হাতে বন্দুক উঁচু করে ধরা। গলিতে আলো নেই, কিন্তু একটা ফাজিল চাঁদ উঠে আলোর অভাবটা অনেকটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। ফজলু দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ভেতর থেকে একটা তাড়া আসছে, পালা, পালা, ডাইনে দৌড়  দে। না-হয় ঘরে ঢুইকা পিছনে যা, পিছনের পাঁচিল বাইয়া পালা। কিন্তু তার পা গলির ইট আর খোয়ায় আটকে গেছে। পা নড়ে না। সে দেখল দুই পুলিশ দৌড়ে আসছে বন্দুক তাক করে। পুলিশ নিশ্চয় জানে তারা মিয়ার ক্যাডাররা কোথায় থাকে। ওসি তো জানতেন। এই দেড়তলা আধাপাকা দালানে, চার কামরার মেসবাড়িতে।

চাঁদের আলোটা স্থির, দুধ-ঘোলা সাদা। গলির রাস্তার দুই দিকে দুটা নিমগাছ, কে কবে লাগিয়েছিল কে জানে, কিন্তু কেউ কাটে না, গাছ দুটা নাকি গলিটার হাওয়া পরিষ্কার করে। নিমগাছের পাতায় চাঁদের আলো তিরতির করে। উলটো দিকের গাছটার নিচে দু-একটি ভাঙা চেয়ার, তক্তা, কেরোসিন কাঠের বাক্স। মোক্তার অ্যান্ড সন্সের পরিত্যক্ত তৈজসপত্র। দোকানটা মেরামত হয়েছে কদিন আগে, আবর্জনাগুলি সরানো হয়নি। সেই আবর্জনার ওপার থেকে হঠাৎ একটা ছায়া রাস্তাটা পার হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। একটা গরু। কড়া বাদামি পিঠ আর গা, চাঁদের আলোয় কিছুটা অস্পষ্ট, কিন্তু সেই অস্পষ্টতার মধ্যেও সাদা সাদা কিছু অবিন্যস্ত টুকরো আভা জেগেছে, যা দেখলে হঠাৎ বুনোফুল বলে মনে হতে পারে।

ফুলি! ফজলু নিজেকেই বলল। ফুলি এখানে কী করে এলো? এও কি সম্ভব? নাকি চাঁদের আলো তার চোখে বিভ্রম ছড়িয়েছে?

সে চাঁদটার দিকে তাকাল। চাঁদের ওপর কিছু সাদা মেঘ হালকা চাদর বিছিয়েছিল। সেই চাদর এখন সরে গেছে। চাঁদটা তাজা। যেমন তাজা গরুটাও। গরুটার দিকে চোখ নামাতে হলো ফজলুর। এটি এখন মাথাটা শক্ত করে সামনে মেলে বেশ তেজে এগিয়ে যাচ্ছে দুই পুলিশের দিকে, যেন তার মাথাটা ঢাল, অথবা একটা কামানের নল।

পুলিশ দুজন ভড়কে গেল। তারা গরুটার দিকে তাকাল। তারা বুঝতে চেষ্টা করল, কেন তাদের দিকেই এটি ধেয়ে আসছে। তারা বন্দুক চালাতে পারত, বন্দুক তো তাক করাই ছিল। কিন্তু তারা গ্রামের ছেলে, একটা গাভীকে বন্দুকের গুলিতে মারার কথা ভাবতে পারে না। তারা বরং গাভীটা থেকে দূরে সরে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু গাভীটা তেজি, তার চোখে পানি নেই, তার শরীরেও অবসাদ নেই। সে গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল। গলিতে কয়েকজন পথচারী ছিল, মোক্তার অ্যান্ড সন্সের কর্মচারী ছিল। তারা অবাক হয়ে দেখল, গাভীটা এক পুলিশের সামনে গিয়ে মাথা তুলে তার বন্দুকে একটা হালকা টোকা দিলো। তারপর জিভ বের করে বন্দুক ধরা হাতটা চাটতে লাগল।

মোক্তার অ্যান্ড সন্সের এক কর্মচারী শব্দ করে হাসল। বলল, পুলিশভাই, গরুটা আপনারে পছন্দ করেছে।

পুলিশটার জন্য বিব্রতকর অবস্থা। অন্য পুলিশটাও এই অবাক দৃশ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের চোখ এখন গাভীটার দিকে। সেটি এখন স্থির দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। অন্য পুলিশটার দিকে তাকিয়ে যেন জানতে চাইছে, তোমার হাতটাতে একটু আদর করে দিলে রাগ করবে?

চাঁদের আলোয় দুই পুলিশ, একটি গাভী, কিছু মানুষ যেন একটা শান্ত ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর চাঁদের সামনে ক্ষক্ষরের দেয়াল তুলে দিতে একটা মেঘ এগিয়ে এলো। হেলতে দুলতে।

এই দৃশ্য দেখার জন্য ফজলু অবশ্য আর দাঁড়িয়ে ছিল না। গাইটা তেজি ভাব নিতেই তার পায়ে চাঞ্চল্য এসেছে, সে ঘরে ঢুকে দুপুরে কাঁধে ঝুলিয়ে আনা ব্যাগটা তুলে নিয়েছে, যার ভেতরের একটা পকেটে এখনো কাল হাটে পাওয়া বাকি টাকাগুলি আছে। তারপর পেছনের পাঁচিল টপকে হাওয়া হয়ে গেছে।

বন্দর পার হতে হতে সে চাঁদটার দিকে আবার তাকিয়েছে। চাঁদটা ক্ষক্ষরের পাঁচিলের পেছনে বন্দি। আলোটা অস্পষ্ট। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের হুটোপুটি।

-----পাঁচ----

বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে গেল ফজলুর। সে জানে দাদি ততক্ষণে উঠে যাবেন, নামাজ পড়বেন, কিছুক্ষণ উঠানে হাঁটবেন। হয়তো নিচুস্বরে বিলাপ করবেন – তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের জন্য, হয়তো ফুলি এবং ফজলুর জন্য। অথবা চুপ করে মোড়াটাতে বসে থাকবেন।

গত সন্ধ্যার ঘটনা ফজলুকে বিমূঢ় করে রেখেছে। যে-গাইটা তাকে বাঁচিয়ে দিলো দুই পুলিশের হাত থেকে, সে কোত্থেকে এলো। সে কি ফুলি? যদি ফুলি হয়, দুনিয়ায় এর থেকে অসম্ভব কথা আর কে  কবে শুনেছে?

মেসবাড়ি থেকে পালিয়ে সে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেছে, খবর নিয়েছে। তার মোবাইলে ফোন করেছে মনু, বলেছে খাদেম মারা পড়েছে, বস আটক হয়েছে। মনু বলেছে, তুই পালা। বন্দরে আর জীবনে না। মনু যাবে চাঁদপুর। তার এক মামার ইলিশের আড়ত আছে সেখানে।

বাড়ির কাছাকাছি এসে ফজলুর ইচ্ছা হয়েছে, একটা গাছে তার মাথাটা ঠুকবে। কিসের জন্য, সে বলতে পারবে না। ঠুকতে ইচ্ছা হয়েছে, কিন্তু ঠুকল না, কারণ কপালে রক্ত জমলে দাদি দেখলে ভয় পাবেন। এমনিতেই গতকালের রক্তের দাগটা কপালে আছে।

দাদি রক্ত ভয় পান। বাবা-মার লাশ যখন বাড়িতে আসে, তার পুলিশ মামা তাকে বলেছেন, তাদের গায়ে রক্ত ছিল। রক্ত দেখে দাদি জ্ঞান হারিয়েছিলেন।

বাড়িতে ঢুকতেই দাদিকে দেখা গেল। তিনি বেতের মোড়া পেতে বসে আছেন ফুলি যেখানে ঝিম মেরে থাকত সেখানে। ফজলুর বুকটা একটা মোচড় দিলো। হালকা পায়ে সে এগোল। কিন্তু সামনে তাকাতেই তার চোখটা কপালে উঠল। ফুলি! নাকি অন্য কোনো গাই? একটু এগিয়ে সে দেখল গাইয়ের চামড়াটা কড়া বাদামি, ভোরের হালকা আলোতেও যা বোঝা যাচ্ছে। এবং এখানে-সেখানে সাদা দাগ। যেন বুনোফুল। গাইটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে একটা টুকরিতে ঘাস, বিচালি। কিন্তু সে খাচ্ছে না, শুধু তার চোয়াল নড়ছে।

ফজলুর পায়ের শব্দে দাদি তাকালেন। গত সন্ধ্যার চাঁদটার মতো একটা আলোময় হাসি দিয়ে বললেন, ফজলু, তুই আইলি? দ্যাখ। আমার ফুলিও ফিরা আইছে। যা, এখন পুকুরে গিয়া একটা ডুব দিয়া আয়। তোর পেটে ক্ষুধা, ফুলিটার মতো। তুই কাইল থাইক্ক্যা কিছু খাস নাই। তুই খাইলে ফুলিও খাইব।

Saturday, June 13, 2026

মৃত্তিকা ও কালের কবি আল মুজাহিদী by সীমান্ত আকরাম

বিশ শতকের ষাটের দশকের একজন প্রধান কবি আল মুজাহিদী (১ জানুয়ারি, ১৯৪৩)। সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব এবং আত্মদর্শন ভাবনা তার কাব্যবোধকে প্রাতিস্বিক করেছে। মৃত্তিকা, মানুষ ও দেশের প্রতি গভীরতম মমত্ববোধ, ঐতিহ্য-কেন্দ্রিকতা, নিসর্গ ও নারীর প্রতি ঐকান্তিক সংবেদনশীলতা তার কবিতার শরীর ও আত্মা গঠন করেছে। কায়িক ও আত্মিক শক্তি-সামর্থ্য অর্জিত না হলে একজন সৃষ্টিশীল লেখক মাঝপথেই নিঃশেষিত হয়ে যেতে পারেন বলে কবি মন্তব্য করেন। এ মন্তব্য তার আত্মিক সমুৎকর্ষের এবং সৃষ্টিশীলতার প্রাতিস্বিক চ্যালেঞ্জের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ, উদ্ভিদ, গাছপালা, গুল্মলতা, বিহঙ্গরাজি প্রভৃতি সৃষ্টিকুল মৃত্তিকার উৎস থেকে আসা এবং মাটিতেই সেগুলো প্রত্যাবর্তিত হবে—এ বুদ্ধিবৃত্তিক বিজ্ঞানসম্মত তাত্ত্বিকতায় তিনি বিশ্বাস করেন বলে মাটির প্রতি তার অগাধ মমতা। মৃত্তিকা ও স্বদেশের প্রতি গভীরতম আকর্ষণবোধ কবিকে তার কাব্যবোধের স্বাতন্ত্র্যে উপনীত করেছে। যেকোনো শিল্পীর দর্শন মূলত মৃত্তিকা ও মানবকে কেন্দ্র করেই বিনির্মিত হয়। কবি আল মুজাহিদীর কবিতার দর্শন মৃত্তিকানির্ভর বলেই তাকে মৃত্তিকার কবি বলে অভিহিত করা হয়।

তার পিতা আবদুল হালিম জামালী নাট্যকার, নাট্য প্রযোজক এবং কুশীলব ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেছেন। উল্লেখ্য, তার পিতার নাট্যচর্চা এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে তার অংশগ্রহণ, মুজাহিদীকে যথাক্রমে সাহিত্যচর্চা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভাবিত করেছে বলেই আমাদের মনে হয়। বহুরৈখিক সাহিত্য আঙ্গিকের প্রতি আকর্ষণবোধ আল মুজাহিদী অন্তঃশীলভাবে তার পৈতৃক সাহিত্যচর্চাসূত্রে লাভ করে থাকতে পারেন। তার পিতৃরক্তেই শুধু সাহিত্যচর্চা ছিল না; তার মা সাখিনা খানও গীত-রচয়িতা এবং সমাজসেবিকা ছিলেন। তার মা নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার চর্চাই শুধু করেননি; সে সমস্ত জ্ঞানের প্রচারও তিনি করেছেন। আল মুজাহিদী তার শিল্পবোধের নৈতিক পরিশীলন তার মাতৃরক্তসূত্রে জন্মগতভাবেই লাভ করেছেন বলে মনে করা যায়।

আল মুজাহিদী ষাটের দশকের স্বৈরাচারী সামরিক শাসক আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে ভূমিকা পালন করতে গিয়ে ছয়বার কারাবরণ করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকই শুধু নন; তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন তাত্ত্বিক ব্যক্তিত্বও। আন্তর্জাতিক ফোরামে বাঙালির গেরিলা যুদ্ধতত্ত্বের তিনি একজন ব্যাখ্যাতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিকতার ব্যাখ্যাকারও তিনি।

কবি আল মুজাহিদীর সাহিত্যশৈলী মূলত ষাটের দশকের আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে লোকায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। তার লেখার ভাষা যেমন সংবেদনশীল, তেমনই তার ভাবনার জগৎ অত্যন্ত গভীর ও বিশ্বজনীন। সমাজবিজ্ঞানে তার ভালো দখল থাকার কারণে নৃতাত্ত্বিক, পৌরাণিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহ্যিক উপাদানকে তিনি অবলীলায় কাব্যের শিল্পনৈপুণ্যের সঙ্গে সাজাতে সমর্থ হয়েছেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আহসান তার কবিতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘কবি আল মুজাহিদী প্রাচীন গ্রিক কাব্যের মৃত্তিকা বোধের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেছেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’। নামটিতে বোঝা যায় গ্রিক জীবনদর্শন তাকে কত প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। এ কাব্যগ্রন্থে তিনি চাঁদকে ছুঁয়ে দেখেছেন, নক্ষত্রকে স্পর্শ করেছেন এবং নীহারিকাপুঞ্জকে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কখনো মৃত্তিকাকে ভুলতে পারেননি।’

মৃত্তিকাই কবির বোধের জায়গায় আশ্রিত ও ভাবনায় প্রোথিত। তিনি একটি কবিতায় বলেছিলেন—

‘আমরা পৃথিবীর প্রথম বৃক্ষের নীচে সান্ধ্য মানব-মানবী।’

এ পঙ্‌ক্তিতে প্রকৃতি, সময় এবং অস্তিত্বের একটি গভীর কাব্যিক ছোঁয়া রয়েছে। ‘পৃথিবীর প্রথম বৃক্ষ’ যেন আমাদের আদি উৎস, প্রকৃতি এবং ইতিহাসের প্রতীক। আর ‘সান্ধ্য মানব-মানবী’ বলতে হয়তো গোধূলি লগ্নে প্রকৃতির মাঝে আশ্রিত, চিন্তাশীল বা দার্শনিক মানবসত্তাকে বোঝানো হয়েছে।

অন্য একটি কবিতায় তিনি বলেছেন—

‘কৃষ্ণ গূঢ় অন্ধকারে জন্মাক মানুষ

পবিত্র আগুন

দেখো, পৃথিবী কেমন উর্বর ধ্বংসহীন

দেখো মৃত্তিকার ভালোবাসা কেমন প্রোজ্জ্বল,

ধ্বংসহীন-নারী

তুমি চলে এসো স্বর্ণমৃত্তিকার দেশে দ্রাবিড় বাংলায়, নারী।

অন্য একটি কবিতায় তিনি বলেছেন—

‘পৃথিবীর জনপদ-জোর আমার অস্তিত্ব’

অপর একটি কবিতায় বলেছেন—

‘প্রাণবন্ত করে তোল পৃথিবীর

প্রত্নবিম্ব : পোড়া বাড়ি।’

আদিম মৃত্তিকা দিয়ে এ পৃথিবী গড়া হয়েছিল গৌড় নগরীর সোনালি তোরণ এবং সভ্যতার চিলেকোঠা। তিনি কখনো নক্ষত্রের স্তূপে বসবাস করার কথা বললেও চূড়ান্তভাবে বলেছেন যে, মৃত্তিকায় ফিরে আসেন। কবি তার কাব্যগ্রন্থ ‘মৃত্তিকা, অতি মৃত্তিকা’, আর এ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার নাম সুমৃত্তিকা। কবিতাটির শুরুতে তিনি বলেছেন—

‘সুমৃত্তিকা, জানো পৃথিবীর সব থেকে বেশি দরকার

সুশীতল হাওয়ার

তুমি খুলে দেবে খিল সেই ঝরোকার?’

এ কাব্যগ্রন্থের সর্বশেষ কবিতায় মৃত্তিকাকে আবেদন জানিয়েছেন যেন সে চিরকালীন সংগীতের স্তবক উপহার দেয়। কেননা, সে হচ্ছে গোটা মানবজাতির অস্তিত্বের স্পন্দন। কবি তার শেষ আবেদন জানিয়েছেন—

‘তুমি গোটা মানবজাতির অস্তিত্ব স্পন্দন

আমি আজ তোমার কাছেই ফিরে আসি

পদ্মা-মেঘনা-যমুনাবিধৌত পলল ভূমিতে

তুমিই আমার

আমি তোমার অখণ্ড গতির

মহাকাব্য।’

রোমান্টিক আত্মনিমজ্জন, তীব্র সমাজচেতনা, গ্রিক মিথোলজির ব্যবহার এবং মাটির কাছাকাছি থাকা—এই চার উপাদানের মিশ্রণই হলো আল মুজাহিদীর নিজস্ব লিখনশৈলী। আল মুজাহিদীর সাহিত্যশৈলীর কতিপয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে—

ক. গ্রিক জীবনদর্শন ও মৃত্তিকাবোধ : আল মুজাহিদীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’ নামটিতেই প্রাচীন গ্রিক জীবন-দর্শনের প্রভাব স্পষ্ট। তিনি তার কবিতায় মহাজাগতিক উপাদান (চাঁদ, নক্ষত্র, নীহারিকাপুঞ্জ) ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও সবসময় নিজের মাটির কাছে ফিরে এসেছেন। আদিম মৃত্তিকা বা আদি মাটি দিয়ে গড়া এই পৃথিবী এবং মানবসভ্যতার আদি রূপকে তিনি তার কবিতার মূল উপজীব্য করেছেন।

খ. লোকায়ত ঐতিহ্য ও স্বভূমি-চেতনা : তিনি মূলত স্বভূমি, স্বদেশ এবং সমতটের লোকায়ত ঐতিহ্যের বন্দনায় আত্মমগ্ন এক কবি। বাংলার চিরন্তন লোকজ রূপকল্প, লোকগাথা এবং গ্রামীণ জীবনধারা তার কবিতার ছত্রে ছত্রে নতুনভাবে নান্দনিকতায় রূপ পেয়েছে।

গ. সমকালীন বাস্তবতা ও বিশ্ববীক্ষা : আল মুজাহিদী একাধারে একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সমাজসচেতন কবি। তাই তার লেখার শৈলীতে সমকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ এবং সমাজবিকাশের রূপরেখা ফুটে ওঠে। ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’র মতো কাব্যে তিনি কেবল বাংলার কবি থাকেননি, বরং বিশ্বমানবতার বিপর্যয় ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।

ঘ. ভাষাভঙ্গি এবং অন্তর্লোকের অনুভূতি : তার কবিতার ভাষা সাধারণত সহজ, সাবলীল এবং সংবেদনশীল। তিনি মানুষের অন্তর্লোকের অনুভূতি, আত্মঅনুসন্ধান, প্রেম, ব্যক্তিগত মনস্তাপ এবং তীব্র সামাজিক প্রতিবাদকে একই সুতোয় বাঁধতে পারতেন।

কবি আল মুজাহিদীর কবিতায় সময় ও কাল কেবল ঘড়ির কাঁটার পরিমাপ নয়; বরং তা ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মানবসভ্যতার আদি-অন্তের এক প্রগাঢ় প্রকাশ। তিনি সময়কে দেখেছেন একজন ইতিহাস-সচেতন রাজনৈতিক যোদ্ধা এবং বিশ্বনাগরিকের দৃষ্টিতে। তার কবিতায় সময় ও কালের বহুমাত্রিক রূপ আমরা দেখতে পাই—

ক. ষাটের দশকের উত্তাল কাল ও রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত : কবি আল মুজাহিদী নিজেই তার কবিতার একটি সময়কালকে ‘ফেরারি সময়’ বলে উল্লেখ করেছেন। ষাটের দশকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, রাজবন্দি হওয়া এবং রাজনৈতিক ফেরারি জীবনের অস্থিরতা তার কবিতায় তীব্রভাবে মূর্ত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার কাব্যিক সময়ের একটি বড় কেন্দ্রবিন্দু। যুদ্ধ, হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ এবং স্বাধীনতার রক্তিম লগ্নকে তিনি তার কবিতায় যন্ত্রণাদগ্ধ কিন্তু আশাবাদী এক কালখণ্ড হিসেবে ধারণ করেছেন।

খ. ইতিহাস ও সভ্যতার কালানুক্রম : তিনি বর্তমান সময়কে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। গ্রিক মিথোলজি ও বাংলার প্রাচীন লোকঐতিহ্যের কালকে তিনি বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার কবিতায় ‘পিতৃপুরুষের ফসিল’ বা ‘শতাব্দীর ঝরাপাতা’র মতো শব্দবন্ধের মাধ্যমে অতীতকাল বর্তমানের সমান্তরালে এসে দাঁড়ায়। তিনি সভ্যতার উত্থান ও পতনের বিশাল কালখণ্ডকে কবিতার ফ্রেমে বন্দি করতে ভালোবাসেন।

গ. বৈশ্বিক সময় ও যুদ্ধবিদ্ধ কাল : কবি কেবল নিজ দেশের গণ্ডিতে আটকে থাকেননি; আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমকালীন রক্তঝরা সংঘাত ও যুদ্ধবিদ্ধ সময়কে তিনি তীব্রভাবে অনুভব করেছেন। ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’ কাব্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই অভিশপ্ত কাল এবং তার পরবর্তী বৈশ্বিক ক্ষতকে তিনি মানব ইতিহাসের এক অন্ধকারতম সময় হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

ঘ. আদিম বা শাশ্বত কাল : আল মুজাহিদী প্রায়ই মানুষকে মহাবিশ্বের প্রথম সৃষ্টিলগ্নে নিয়ে যান। কবি বর্তমানের যান্ত্রিক কাল ছেড়ে মানুষকে এক আদিম, শাশ্বত ও পবিত্র প্রাকৃতিক সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করান। মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবন, প্রতিটি মুহূর্তের নিঃশ্বাস এবং তার বিপরীতে প্রকৃতির অনন্তকাল ধরে বয়ে চলার দ্বন্দ্ব তার দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।

ঙ. ভবিষ্যৎ ও আশাবাদের কাল : ধ্বংস, যুদ্ধ আর ক্ষয়িষ্ণু সময়ের বিবরণ দিলেও আল মুজাহিদীর কালচেতনা শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক। তিনি বিশ্বাস করেন, অন্ধকার সময়ের বুক চিরে একদিন নতুন ভোর আসবে, যা পৃথিবীকে আবার উর্বর ও বাসযোগ্য করে তুলবে।

বলা যায়, আল মুজাহিদীর কবিতায় সময় ও কাল হলো এক চিরপ্রবাহমান নদীর মতো, যা একাধারে অতীতে আদিম মাটির কাছে ফিরে যায়, বর্তমানে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে দগ্ধ হয় এবং ভবিষ্যতে একটি সুন্দর ও মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়।

কবি আল মুজাহিদীর কালজয়ী দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’ এবং ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’-র কবিতা ও পঙ্‌ক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার ‘সময় ও কালচেতনা’ আরো গভীরভাবে অনুধাবন করা যায়। তিনি ‘হেমলকের পেয়ালা’ (১৯৮৪) কাব্যগ্রন্থে সময়কে দেখেছেন এক আদিম, মহাজাগতিক এবং চিরন্তন প্রেক্ষাপটে। গ্রিক দর্শনে সক্রেটিসের হেমলক পানের অনুষঙ্গকে তিনি মানুষের শাশ্বত সত্য অনুসন্ধান এবং সময়ের নির্মমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

‘আমরা যেন পৃথিবীর প্রথম বৃক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আদিম মানব-মানবী,

যেখানে আধুনিক সভ্যতার কৃত্রিম ঘড়ি এখনো এসে পৌঁছায়নি।’

এখানে ‘সময়’ কোনো ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের এক অবিচ্ছেদ্য শাশ্বত বন্ধন। কবি ক্ষণস্থায়ী বর্তমানের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে এক অনন্ত ও আদিম সময়ের আশ্রয় খোঁজেন।

‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’ কাব্যগ্রন্থে আল মুজাহিদীর কালচেতনা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়। এখানে সময় কোনো শান্ত বা আদিম রূপ নয়, বরং তা মানবইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এবং রক্তক্ষয়ী এক আধুনিক ক্রান্তিকাল। ১৯৪৫ সালের পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের সময়কালকে তিনি কবিতার ফ্রেমে জীবন্ত করেছেন।

‘যে সময়ে আকাশ থেকে নেমে এসেছিল আগুনের বৃষ্টি,

স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল হিরোশিমা ও নাগাসাকির সমস্ত সৃষ্টি।’

এখানে কবি দেখিয়েছেন, কীভাবে বিজ্ঞানের আগ্রাসন মানুষের স্বাভাবিক ‘সময়’ বা জীবনকে এক নিমেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। এখানে তিনি সমকালীন সময়ের যুদ্ধোন্মাদনার বিরুদ্ধে এক তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন।

আল মুজাহিদী একাধারে ইতিহাসের প্রাচীন পাতায় এবং সমকালের জ্বলন্ত বাস্তবতায়—উভয় কালেই সমানভাবে বিচরণ করতে পারতেন। ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’ এবং ‘যুদ্ধ নাস্তি’ কাব্যগ্রন্থে তার ‘সময় ও কালচেতনা’ আরো ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’ কাব্যে কবি সময়কে পরিমাপ করেছেন বাংলার ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং পোড়ামাটির শিল্পের (টেরাকোটা) দীর্ঘস্থায়িত্বের মধ্য দিয়ে। ‘ধ্রুপদ’ (শাস্ত্রীয় বা ক্ল্যাসিক) এবং ‘টেরাকোটা’ (লোকজ শিল্প)—এই দুইয়ের মিলনে তিনি এমন এক কালখণ্ড তৈরি করেছেন, যা হাজার বছরের প্রাচীন।

‘টেরাকোটার অবয়বে জমা হয়ে আছে শতাব্দীর ধুলো,

ধ্রুপদি সুরে জেগে ওঠে আমাদের অতীত দিনগুলো।’

এখানে সময় স্থবির নয়। পোড়ামাটির ফলকে যেভাবে ইতিহাস হাজার বছর ধরে জীবন্ত থাকে, কবি তার কবিতায় বাংলার লোকজীবন ও ঐতিহ্যকে সেই চিরন্তন কালের রূপ দিতে চেয়েছেন।

‘যুদ্ধ নাস্তি’ কাব্যে আল মুজাহিদীর সময়চেতনা ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত। সমকালীন যুদ্ধবিদ্ধ অস্থির কালকে পেছনে ফেলে তিনি এক শান্তিময় ও যুদ্ধহীন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কালখণ্ড বিনির্মাণ করতে চান। কবি হিংসা ও হানাহানির সময়কাল পার হয়ে এক নতুন ভোরের প্রত্যাশা করেন। তিনি লিখেছেন—

‘অস্ত্রের গর্জন থেমে যাক, মুছে যাক রক্তের দাগ,

পৃথিবীতে আসুক এবার এক শান্তির অনুরাগ।’

এখানে কবি বর্তমানের সংঘাতময় সময়কে অস্বীকার করে এক মানবিক ও অহিংস ভবিষ্যৎ কালের আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই সময়চেতনা অত্যন্ত আশাবাদী এবং বিশ্বজনীন।

কবি আল মুজাহিদী বাংলা কাব্যসাহিত্যে প্রাচীন গ্রিক জীবনদর্শন, ইতিহাসচেতনা এবং মাটির গভীর মমত্ববোধকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তিনি শুধু মাটির গভীর অনুরাগীই নন, বরং বাংলা সাহিত্যে একজন অন্যতম প্রধান কাল ও সমাজসচেতন বিশ্ববীক্ষণের কবি। তিনি তার সুদীর্ঘ কাব্যযাত্রায় সময়, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিশ্বরাজনীতির সমকালীন প্রেক্ষাপটকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কবিতায় ধারণ করেছেন।

বাংলা কবিতার প্রাগ্রসর পাঠকদের কাছে আল মুজাহিদীর কবিতা আনন্দের পাঠ হয়ে ওঠে। কবিতার ঐতিহ্যকে অনন্যপূর্বতায় সংস্থাপিত করার এক সুদক্ষ কারুকার তিনি। কবিতায় তার স্বভূমি-স্বদেশ প্রবলভাবে মূর্ত; মানবসম্প্রীতির সমুজ্জ্বল সম্ভাষে স্ফূর্ত। তার কবিতা সহজ-সম্ভোগে অধিকার করে নেয় পাঠকের হৃদয়। শিল্পে পুরাণ, মৃত্তিকা ও জীবনের মর্মভূমে প্রোথিত শেকড়সন্ধানী পুরুষ। প্রাতিস্বিক চেতনাভাষ্যে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে তার কবিতার প্রতিটি ছত্র। ধ্রুপদি ব্যঞ্জনা এবং ভাষার প্রগাঢ় স্বকীয়তায় প্রদীপ্ত আল মুজাহিদীর কবিতাপৃথিবী।

মৃত্তিকা ও কালের কবি আল মুজাহিদী