Tuesday, April 17, 2018

সংসারে সংসারে অশান্তির ঝড় by হাফিজ মুহাম্মদ

শাহরিন ও জামাল দম্পতি। দুই ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। ছেলে দুটি নবম শ্রেণি এবং মেয়েটি চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। শাহরিনের স্বামী থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। মাস শেষে টাকা পাঠান। ছেলেমেয়েদের    পড়ালেখার খরচ মিটিয়ে ভালোভাবে সংসার চলে যায়। কিন্তু অগত্যা এ দম্পতির সংসারে নেমে আসে কালো ছায়া। শাহরিনের স্বামী তাকে প্রতিমাসে টাকা দিলেও তার কোনো হিসাব রাখতেন না। নিজ স্ত্রীর কাছে জানতেও চাইতেন না কোথায় কি খরচ করেছে। মনে করতেন ছেলেমেয়েদের খরচ মিটিয়ে যে টাকা-পয়সা উদ্বৃত থাকে তা তার ব্যাংক একাউন্টে জমা রয়েছে। ওদিকে হঠাৎ স্ত্রী শাহরিন তার সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন।
সারাদিনের কাজ শেষে যখন একটু সময় পান তখন স্ত্রীকে ফোন দিলে তেমন একটা পাত্তা দেন না। কথা বলতেও যেন অনাগ্রহ। এক পর্যায়ে শাহরিন তার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনেন। একসময় টাকার প্রয়োজন ছাড়া শাহরিন তার স্বামীকে ফোন দিতেন না। বিষয়টা জামালের কাছে খটকা লাগতে থাকে। সন্দেহ করতে থাকেন স্ত্রীর পরিবর্তনে। কিন্তু স্ত্রীকেও তিনি বুঝতে দিতেন না। শাহরিনের হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ হিসেবে তিনি আবিষ্কার করেন অন্য পুরুষের সঙ্গে প্রেমে জড়ানো। তিনি মজেছেন সিয়াম নামে এক তরুণের প্রেমে। শাহরিনের এ প্রেমের সূত্রপাতটা তার মোবাইলে রঙ নম্বরের ফোন দিয়ে।
প্রথমে শাহরিন কথা বলতে না চাইলেও একসময় কথা বলতে শুরু করেন। রাতভর কথা বলতে থাকলেও পরিবারকে জানাতেন স্বামীর সঙ্গে কথা বলি। নিয়মিত কথা বলতে বলতে তার জালে একসময় বিদ্ধ হন তিনি। প্রেমে হাবুডাবু খেতে থাকেন নিজের থেকে কম বয়সী তরুণটির। এদিকে সিয়ামও ধীরে ধীরে শাহরিনের সবকিছু জেনে নেয়। তার একাউন্টে জমানো টাকা থেকে নিজের দুর্বলতা সবকিছু। একসময় সিয়াম শাহরিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন। দুজনে দেখা করেন, মেলামেশা করেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রাখেন প্রতিমুহূর্ত। এদিকে শাহরিন তার সন্তানদের প্রতিও নজর কমিয়ে দেন। ঠিকভাবে খোঁজখবর রাখেন না। শুধু টাকা দিয়েই দায়সারা। জামাল উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি দেশে চলে আসেন। স্ত্রীর একাউন্টে ২৫ লাখ টাকা জমা ছিল বলে জানতেন জামাল। কিন্তু এখন তার একাউন্ট দেখছেন ফাঁকা।
এ বিষয়ে স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে বিভিন্ন ছুতা দিয়ে এক পর্যায়ে শাহরিন জানিয়ে দেন জামালের সঙ্গে তিনি আর সংসার করবেন না। জামাল টাকার মায়া বাদ দিয়ে ছেলেমেয়ের কথা ভেবে স্ত্রীকে বুঝাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। আসলে জামাল দেশে আসার আগেই শাহরিন সিয়ামের সঙ্গে কাজী অফিসের মাধ্যমে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার আগে থেকেই শারীরিক মেলামেশা করতেন। যেটা গোপনই ছিল। মাঝেমধ্যে সিয়ামের বাড়িতে বেড়াতেও যেতেন। সিয়ামের পরিবার শাহরিনকে ছেলের কুমারী পুত্রবধূ বলে জানতেন। এদিকে শাহরিনের মা-বাবার তো চিন্তার শেষ নেই। বংশের সম্মান, নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা। তার পরিবার নানাভাবে বুঝাতে থাকেন। কিছুতে কিছু হয় না। শেষমেশ তিন সন্তান রেখেই সিয়ামের হাত ধরে পালিয়ে যান শাহরিন। এদিকে সিয়াম তার বাবার নিম্নবিত্ত সংসারে শাহরিনকে বোঝা না বানিয়ে রেখে পাঠিয়ে দেন মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে। এদিকে জামাল তার সন্তানসহ পড়েন অথৈ সাগরে। 
শুধু জামাল আর শাহরিন দম্পতির সংসার নয়। এরকম অনেক পরিবার ভাঙা কিংবা ফাটল ধরার ঘটনা  শোনা যায় চারপাশে। এর অধিকাংশ কারণ হচ্ছে মোবাইল ফোন। যোগাযোগের অন্যতম এ ডিভাইসটির সুযোগে অনেকেই এমন ঘটনার শিকার হন। অনেকে আবার শিকার করেন। আর তাতে যোগ দিয়েছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। মোবাইল ফোন আমাদের যোগাযোগ বছর-মাস থেকে সেকেন্ডে নিয়ে এসেছে। অপরদিকে এর অপব্যবহার সমাজে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
সমাজ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের কারণেই সমাজে পরিবারে ভাঙন শুরু হয়েছে। এটা কখনো স্বামী-স্ত্রীর একজনের পরকীয়ায়  জড়িয়ে পড়া, কখনো বাসার একমাত্র ছেলে-মেয়েটি অন্য ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া অথবা মোবাইলে সারাদিন পড়ে থাকা। অন্যদিকে আলেমরা বলছেন, মোবাইল ফোন যোগাযোগ অনেক কাছাকাছি করেছে। পাশাপাশি এর ভিন্নদিকও দেখা যায়। এটা নৈতিকতার মারাত্মক অবক্ষয় ঘটিয়েছে। সংসারে ফাটল ধরিয়েছে। তরুণ-তরুণীদের মাঝে অবাধ মেলামেশার সুযোগ করে দিয়েছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধির কারণে আজকাল সংসার ভাঙছে। মোবাইলে অপরিচিতদের সঙ্গে কথোপকথন, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ই-মেইলের মাধ্যমে সহজেই অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হচ্ছে। অপরিচিতদের সঙ্গে নিজের নেতিবাচক জিনিসগুলো শেয়ার করে অন্যের ফাঁদে পড়ে যায় এবং সেই ফাঁদটা যদি কোনো খারাপ পাত্র হয় তাহলে বিষয়টি আরো বিপজ্জনক হয়। মোবাইল বা ফেসবুক  কালচারের কু-প্রভাব, এসবে অন্যের ঘাটতিগুলো বেশি দেখা, গুণগুলো না দেখায় এসব মাধ্যম আমাদের বিপদগামী করে। এসব করতে গিয়ে কষ্টগুলো বেড়ে যায়, হতাশা বেড়ে যায়। ফলে অ্যাডজাস্টমেন্টে সমস্যা শুরু হয়। পারিবারিক অশান্তি, কলহ বেড়ে যায়। যার পরিণতি চূড়ান্ত পর্যায় বিবাহ বিচ্ছেদ, হত্যাসহ নানা দুর্ঘটনা। মোবাইল ফোনের কারণে যে, আমাদের পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে তা ফুটে উঠেছে খোদ আমাদের প্রেসিডেন্টের কথায়। ৪ঠা এপ্রিল খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) তৃতীয় সমাবর্তনে তিনি বলেন, এখন মোবাইল ফোন নিয়ে সবাই ব্যস্ত।
এ কারণে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রযুক্তি উন্নয়নের সহায়ক। তবে এই প্রযুক্তি যেন সর্বনাশের কারণ না হয় সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সেদিন তিনি। ইতিবাচক পরিবর্তন ও মানবতার কল্যাণে কাজে লাগানোর মধ্যেই প্রযুক্তির সার্থকতা নিহিত বলে প্রেসিডেন্ট  মনে করেন।
পাঁচবছর আগের ঘটনা। এইচএসসি পড়ুয়া ঝুমা বেগম। তিন ভাই বিদেশে থাকায় ঘরের মোবাইল ফোন তার কাছেই থাকতো। হঠাৎ একদিন অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন। আমিনুল নামে একজন ভাইয়ের বন্ধু পরিচয়ে কথা বলেন। এরপর নিয়মিত কথা হতো। একসময় তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন প্রেমের সম্পর্কে। এক পর্যায়ে বিবাহ হয় আমিনুল-ঝুমার। কিন্তু আমিনুলের যে বউ-ছেলে রয়েছে তা আর জানতে পারেনি ঝুমা। কী করবেন ভেবে না পেয়ে বাবার সংসারে বসেই সম্পর্ক চালিয়ে নেন। কিন্তু দুই বছর যেতেই আমিনুল ঝুমার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। একটি মেয়ে সন্তান আসে তাদের সংসারে। আরো দুই বছর অপেক্ষা করে মেয়ের জীবন এবং নিজের মোহরানার টাকা আদায়ে কোর্টে মামলা করেন। বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
সমাপ্তি ঘটে তাদের সংসারের। এরকম বহু ঘটনা শুনতে পাওয়া যায় প্রতিনিয়ত। গবেষকদের দাবি, মাঝরাতে অতিরিক্ত সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা কমে যাচ্ছে। যার ফলে সম্পর্ক টিকছে না। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ২৪ হাজার ইউরোপিয়ান দম্পতিকে নিয়ে এই গবেষণা করেছেন। গবেষণায় তারা সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটের ব্যবহার ও বৈবাহিক জীবনের তুষ্টির মধ্যে সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টি ধরতে পেরেছেন বলে দাবি করেছেন। সামপ্রতিক আরেক এক গবেষণায় একটি বিষয় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে আর তা হচ্ছে শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টিকে হালকা করে দিচ্ছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। এ ছাড়াও পরস্পরের কাছ থেকে চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টিও অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে না।
একারণে সম্পর্ক ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার কোনো অংশে কম নয় বরং ইউরোপ থেকে আরো বেশি বলে জানিয়েছেন আমাদের দেশের সমাজ বিজ্ঞানীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক মাসুদা এম রশিদ চৌধুরী বলেন, আধুনিক যুগে মানুষ একজন আরেকজনকে বিশ্বাস করছে না। আরেকদিকে কেউ কাউকে বাধা দিতে পারছে না। মোবাইল ফোন আমাদের কাজ সহজ করেছে। মোবাইল ফোনটা আজকাল ভিন্নদিকে যাচ্ছে। এখানে কথা বলার বাইরেও মোবাইলে ফেসবুক, ইউটিউবসহ আরো একাধিক সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার বেড়ে গেছে। ইদানীং এ কারণে অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে। সব থেকে বড় কথা হচ্ছে বাবা-মা ছোটবেলা থেকে সন্তানদের যে মানুষ করবে সে মানসিকতা এখন নেই। তারা যে শাসন করবে, সেটা তারা করতে পারছে না। এখন বাবা-মা’রাই নোংরা পথে চলে যাচ্ছে। তাহলে সন্তানরা তো যাবেই। তিনি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, আমার বিবেক যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন আমি যা মনে চায় তাই করতে পারি। মোবাইল ফোনে যে অন্যায়গুলো হচ্ছে এটার কোনো শাস্তিও দেয়া হচ্ছে না। পরিবারের ভাঙন কীভাবে ঠেকাবে যদি তারা এর অপব্যবহার করে। তিনি মোবাইলের কারণে সংসার ভাঙার তিনটি মূল কারণ উল্লেখ করে বলেন, মানুষের বিবেক, ছেলেমেয়েদের নৈতিক শাসন না করা এবং মোবাইল ফোন দিয়ে শত্রুকে ঘায়েল করা।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ভারপ্রাপ্ত খতিব মাওলানা মহিউদ্দিন কাশেম বলেন, যেকোনো প্রযুক্তির অপব্যবহার ইসলামে অবৈধ। আর এ অপব্যবহার হলে সংসার ভাঙাসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হবে। এখন মোবাইলে শুধু সংসার ভাঙছেই না, নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ফোনে নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। এটা ভালোর জন্য ব্যবহার না করে আমাদের সমাজের তরুণ-তরুণী থেকে যুবক-যুবতীরা বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। এটা বন্ধ করতে হলে পরিবার থেকে ধর্মীয় শিক্ষায় জোর দিতে হবে। এবং সন্তানদের সঠিক জ্ঞান দিতে হবে।

আসিফার ধর্ষণ ও হত্যা: একটি যাযাবর মেয়ে তার পরিবার ও অভিযুক্তরা

জানুয়ারির এক শীতল বিকেলে সানজি রাম তার ভাতিজাকে বলছিল, মেয়েটাকে হত্যা করার সময় হয়েছে। প্রাথমিক আচার-অনুষ্ঠান শেষে আট বছর বয়সী ভবঘুরে মুসলিম শিশু আসিফাকে একটি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কাঠুয়া জেলার রাসানা গ্রামের এক মন্দিরের সামনের সাঁকোতে নিয়ে যাওয়া হয়। চারদিন ধরে সেখানেই তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।
আসিফাকে প্রথমে গলা টিপে হত্যা করার পর তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে মাথায় দুইবার পাথর দিয়ে আঘাত করা হয়। তবে এর আগে বিশেষ পুলিশ কর্মী দীপক খাজুরিয়া একটি ইচ্ছার কথা বলেন। তিনি মেয়েটিকে হত্যার আগে ধর্ষণের প্রস্তাব রাখেন। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আর এভাবেই শিশু মেয়েটিকে আরো একবার গণধর্ষণ করা হয়। এরপরের তিন মাস আসিফার ঘটনাটি কেবলই আরো একটি যৌন হামলার ঘটনায় পরিণত হয়। ভারতে যৌন হামলার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তবে কাশ্মীরে এরকম ঘটনা বিরল। তাই ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় তদন্ত সংস্থা ক্রাইম ব্র্যাঞ্চের ১৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন বের হওয়ার পর তা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তদন্তে এটা প্রকাশ পায় যে, আসিফার ধর্ষণ ও হত্যা ছিল পদ্ধতিগত, পূর্বপরিকল্পিত ও সানজি রামের ধর্মীয় বিদ্বেষের ফসল। সোমবার এই ঘটনায় অভিযুক্তদের বিচারকার্য শুরু হয়েছে। দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই ঘটনায় অভিযুক্তদের প্রথম শুনানি এটি। অভিযুক্তদের পক্ষের আইনজীবী অঙ্কুর শর্মা জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা আদালতে দোষ স্বীকার করেনি। এছাড়া একটি মিথ্যা-আবিষ্কারক পরীক্ষা দিতেও রাজি হয়েছেন তারা। গত কয়েকদিন ধরেই ভারতের বিভিন্ন শহরে এই ধর্ষণের বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিবাদ চলছে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র নেতারা অভিযুক্তদের প্রথম দিকে সমর্থন দেয়ায় প্রতিবাদ আরো উত্তাল হয়।
যাযাবর মেয়েটি
আসিফা নামের যাযাবর মেয়েটির পছন্দ ছিল ঘোড়াকে ঘাস খাওয়ানো। রাসানা’র এক কোনায় তার বাড়ির পাশের বনে প্রায়ই ঘোড়াকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যেত সে। সানজি রাম তাকে টার্গেট হিসেবে নির্বাচিত করার পেছনে এটা একটা কারণ ছিল- সে জানতো আসিফা নিয়মিত বনে আসে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা গ্রাম থেকে মুসলিম সম্প্রদায়কে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। বয়সে ছোট হওয়ায় আসিফা ছিল সহজ টার্গেট। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, মন্দিরের ভেতর তাকে নিয়মিতভাবে ধর্ষণ করা হয়। তবে এই অপরাধের নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল ভিন্ন কারণ- মুসলিম যাযাবর সম্প্রদায়কে গ্রাম থেকে তাড়ানো।
আসিফার মা, রাফিজা বানু (৫৫) তার মেয়ের মৃতদেহ দেখার ভয়ানক দৃশ্যের কথা মনে করে বলেন, ‘তার গালে আঁচড়ের দাগ ছিল। তার ঠোঁট কালো হয়ে গিয়েছিল। তার চোখ ফেটে বের হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। একজন মায়ের জন্য এটা বেশ ভয়ানক দৃশ্য ছিল। সে ছিল আমার সবচেয়ে ছোট সন্তান। সে অনেক বর্বরতা সহ্য করেছে।’ রাফিজা বানু এখন তার ১৩ বছর বয়সী অপর মেয়েকে নিয়ে চিন্তিত। তিনি বলেন, তারা একটি আট বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে এসব করেছে। কল্পনা করুন একজন ১৩ বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে তারা কি করতে পারে।
যাযাবর পরিবার
আসিফার বাবা মোহাম্মদ আখতার এর বয়স ৪৫ হলেও দেখতে আরো বেশি বয়স্ক লাগে। যাযাবর হওয়ার ছাপ পড়েছে মুখে। কিন্তু এখন তার মাথায় আরো বড় এক বোঝা চেপেছে। নিজের মেয়ের ধর্ষণ ও হত্যার বিচার আদায়। তিনি বলেন, তার পুরো মুখে আঁচড় আর কামড়ের দাগ ছিল। আমি কখনো ভাবিনি তারা একটি শিশুর সঙ্গে এমন করতে পারে। এখনো তার দুধ দাঁতও পড়েনি। জন্মসূত্রে আসিফার বাবা আখতার হলেও সে বেড়ে উঠছিল তার চাচা মোহাম্মদ ইউসুফ এর মেয়ে হিসেবে। নিজের তিন সন্তানকে হারানোর পর আসিফাকে দত্তক নেন ইউসুফ। তিনি জানান, এই ঘটনার পর তার পরিবারকেও হুমকি দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তার বলেছে- তাদের লোকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলে তারা আমাদের সবাইকে এক এক করে মেরে ফেলবে। মৃতদেহ আবিষ্কারের পর হিন্দুরা এসে আমাদের হুমকি দিয়ে গেছে। আসিফার বড় বোন মানেগা (১৩) কথা বলার সময়ও স্তম্ভিত ছিল। সে বলেছে, আমি তার লাশ দেখেছি। আমার এখন অনেক ভয় করে। আমরা খেলিনা, একা একা বাড়ির বাইরে যাই না। আসিফার হত্যা আমাদের চুরমার করে দিয়েছে।    
অভিযুক্তরা
পুলিশের প্রতিবেদন অনুসারে, আসিফার হত্যায় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তা; তার সন্তান, যে অন্য এক শহর থেকে রাসানা’য় গিয়েছিল নিজের লালসা মেটাতে; তার কিশোর ভাতিজা ও তার বন্ধু; এক বিশেষ পুলিশ কর্মী। সব মিলিয়ে ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যা ও অপহরণের দায়ে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার তাদের বিচারকার্য শুরু হয়েছে। তবে আদালতে তারা দোষ স্বীকার করেনি। আসিফাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর তা দেশটির হিন্দু জাতীয়তাবাদী ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির জন্য বেশ সমালোচনা বয়ে আনে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহুদিন ধরে ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর, বিশেষ করে মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের কথা তুলে ধরছে। সমপ্রতি এক প্রতিবেদনে, লন্ডন-ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে,  ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপ্রসূত হামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশজুড়ে অন্তত ১০ মুসলিম পুরুষ বিচারবহির্ভূতভাবে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছেন। ওই দুর্বৃত্তদের অনেককে ক্ষমতাসীন বিজেপি’র সমর্থন নিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে।
(আল জাজিরা ও বিবিসি অবলম্বনে)

ক্যাম্প ছেড়ে পালাতে চেয়েছিল ৫৩ হাজার রোহিঙ্গা by দীন ইসলাম

নির্ধারিত ক্যাম্প ছেড়ে পালাতে চেয়েছিল ৫৩ হাজার রোহিঙ্গা। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানের বিভিন্ন চেকপোস্টে আটক করে তাদেরকে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কড়াকড়ির পরও বিভিন্ন জেলায় অনেক রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে। এদের মধ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে তিন হাজার ২০ জন রোহিঙ্গাকে কুতুপালং ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়েছে। গত ১০ই এপ্রিল চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) ত্রাণ কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে এসব কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশেপাশে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও আনসারের সমন্বয়ে আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও আনসারের সহায়তায় চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। এসব ভ্রাম্যমাণ আদালত এরই মধ্যে ৬২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছে। বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় এক হাজার পুলিশ সদস্য, ২২০ জন ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে এবং সেনাবাহিনীতে এক হাজার সাতশ’ জন সদস্য ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে সহায়তা করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ৪ঠা এপ্রিল পর্যন্ত সব মিলিয়ে রোহিঙ্গার সংখ্যা আট লাখ ৯৬ হাজার ১৫৬ জন। এর মধ্যে দুই লাখ তিন হাজার ৪৩১ জন আগে থেকেই ছিল। গত বছরের ২৫শে আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ছয় লাখ ৯২ হাজার ৭২৫ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়া, মরক্কো, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ইরান, সৌদি আরব, সুইজারল্যান্ড, জাপান, চীন, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, ইতালি, সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত ও স্লোভাকিয়াসহ ১৬টি দেশ থেকে ত্রাণ সহায়তা পেয়েছে সরকার। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রথমে অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়া হয়।
ওই সব আশ্রয় ক্যাম্পে সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন দাতা সংস্থার দেয়া ত্রাণসামগ্রী পান। এদের মধ্যে কিছু লোক দেশের বিভিন্ন এলাকায় পালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ হিসেবে জানা গেছে, যেসব রোহিঙ্গা মিয়ানমারে সচ্ছল জীবনযাপন করতেন এরাই মূলত ক্যাম্প ত্যাগ করে বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া নিয়ে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছেন। আবার অনেকের ছেলেমেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকায় সেখান থেকে সব কাগজপত্র তৈরি করে জাল ভিসার মাধ্যমে পরিবার-পরিজন নিয়ে যাচ্ছেন। তারা মনে করছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাবাসন চুক্তি আদতে কোনো ফল বয়ে আনবে না। ওই চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া যাবে না। তাই দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছেন তারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ পরিবার ধনাঢ্য। তাদের ছেলেমেয়েরা মালয়েশিয়া, আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। বাকি ৭৫ শতাংশ পরিবারের মধ্যে ২০ শতাংশ পরিবার সচ্ছল। যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে উন্নত জীবনযাপনের জন্য গোপনে দালালের মাধ্যমে ক্যাম্প ত্যাগ করছেন। আর বাকি ৫৫ শতাংশ পরিবার হতদরিদ্র। যারা মিয়ানমারের চাইতে এখানে ভালো রয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। এসব রোহিঙ্গার দাবি, তাদের বসতভিটা ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা ও স্বাধীন চলাফেরার সুযোগ নিশ্চিত করলে তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবেন। এরই মধ্যে কুতুপালং ক্যাম্প থেকে প্রায় শতাধিক পরিবার বিদেশে চলে গেছে। আরো কিছু পরিবার চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তারেক রহমানের বার্তায় বিভক্ত খুলনা বিএনপি একাট্টা by রাশিদুল ইসলাম

দীর্ঘদিন ধরে খুলনা জেলা ও মহানগর বিএনপি ছিল দ্বিধা বিভক্ত। আন্দোলন সংগ্রামে পৃথক পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করে আসছিল। সম্প্রতি খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দ্বিধা-বিভক্তি প্রকাশ্যে রূপ নেয়। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের একাধিকবার হস্তক্ষেপের পরেও এর কোনো সুরাহা হয়নি। অবশেষে সব বিভক্তি নিরসন করে ঐক্যবদ্ধভাবে ‘নগর ভবন’র কর্তৃত্ব ধরে রাখতে নির্দেশ দেন লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার নির্দেশে খুলনা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল ইসলাম বকুল। সে মোতাবেক গতকাল সকালে খুলনা জেলা ও মহানগর বিএনপির যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ২০ দলীয় জোটের পক্ষে নির্বাচন পরিচালনার জন্য সমন্বয়কারীর দায়িত্ব প্রদান করা হয় জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনাকে। এ ছাড়া কেসিসি নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। এতে নগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সাহারুজ্জামান মোর্ত্তজাকে আহ্বায়ক, আমীর এজাজ খানকে সদস্য সচিব এবং নগর ও জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নগর ও জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের দূরত্ব বেশ বছর খানেকের পুরানো। পৃথক কর্মসূচি পালন ও মনোমালিন্য ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’। সেটার প্রকাশ্যে রূপ নিলো কেসিসি নির্বাচনে। নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বর্তমান মেয়র মনিরুজ্জামান দলের মনোনয়ন চাইলেন, সঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনাও। এ দু’জন গেল কেসিসি নির্বাচনেও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন, পরে মনিরুজ্জামানকে প্রার্থী মনোনীত করে শফিকুল আলম মনাকে তার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট করে দলটির কেন্দ্রীয় নীতি-নির্ধারকরা। ফলে এবারেও দাবি করে বসেন শফিকুল আলম মনা। একপর্যায়ে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম ও মনোনয়ন বোর্ড কাকতালীয়ভাবে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও নগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুকেই কেসিসির মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেন। ফলে তিন জন হয়ে যায় দলের প্রার্থী, প্রত্যেকেই মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করেছিলেন কেসিসি রিটার্নিং অফিসার থেকে। শেষমেশ বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট মনোনীত নজরুল ইসলাম মঞ্জু ব্যতীত মনিরুজ্জামান ও শফিকুল আলম মনা নির্বাচন অফিসে মনোনয়নপত্র জমা দেননি। তবে, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েই যায় অভ্যন্তরে। সর্বশেষ গত ১৩ই এপ্রিল জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সভায় কেসিসি নির্বাচন পরিচালনায় ১১১ সদস্যের কমিটি গঠন ও নগর বিএনপির গঠিত বোর্ডে মনোনয়ন না পাওয়া দু’জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে সমর্থন দেয়া হয়। এর আগে গত ১০ই এপ্রিল নগর বিএনপির অনুষ্ঠিত সাংগঠনিক সভায় নির্বাচন পরিচালনায় ১০১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এতে বিরোধ ও অনৈক্য প্রকাশ্যে রূপ নেয়।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ থাকায় নগর ও জেলা বিএনপির এ বিরোধের দীর্ঘসূত্রিতা পেয়েছে। এ দু’টি ইউনিটের দূরত্ব নিরসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে খুলনাতে ছাত্রদলের সাবেক এক নেতাকে পাঠিয়েছেন। শনিবার দিবাগত রাতে তিনি খুলনায় পৌঁছান। পৌঁছেই নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও পরে শফিকুল আলম মনার সঙ্গে একান্তে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বার্তা জানান।
সেখানে উপস্থিত বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যেকোনো মূল্যে খুলনা বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধভাবে কেসিসি নির্বাচনে ২০ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী দেখতে চাইছেন। সে জন্য দলটির শীর্ষ নেতাদের যার যা করণীয় তাই করতে নির্দেশ দিয়েছেন। শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনৈক্য থাকলে তৃণমূলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সে সুযোগটি ক্ষমতাসীনরা লুফে নেবে বলে খুলনার শীর্ষ নেতাদের সতর্ক করেছেন তিনি। যদিও এসব বিষয়ে খুলনা বিএনপির শীর্ষ নেতারা কেউ মুখ খুলছেন না। খুলনা জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনা বলেছেন, ‘দলের জন্য তো সারাজীবনই ছাড় দিয়েছি, এবারো দিলাম। অবশ্যই আমরা ‘ধানের শীষ’র পক্ষে ঐক্যবদ্ধ; কারণ প্রতীকটি শহীদ জিয়ার, প্রতীকটি কারারুদ্ধ বেগম খালেদা জিয়ার। ‘ধানের শীষ’র ব্যাপারে কোনো ছাড় নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।’ তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে খুলনা বিএনপি আজ ঐক্যবদ্ধ।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও খালেদা জিয়ার মুক্তির লক্ষ্যে কেসিসি ও গাজীপুরের নির্বাচনকে আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। এ জন্য সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আমাদের বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বার্তা আমি খুলনার শীর্ষ নেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। তারা দলের বৃহত্তর স্বার্থে সব দ্বিধাবিভক্তি ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিজয় আমাদের হবেই ইনশাআল্লাহ।
এদিকে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের বিজয়ের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের চ্যালেঞ্জ ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করবে জেলা ও মহানগর বিএনপি। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় কেডি ঘোষ রোডে দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত যৌথসভা থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়।
সভায় বলা হয়, ১৫ই মে কেসিসির আসন্ন নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে জনজোয়ার সৃষ্টি করা হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভোট কেন্দ্র পাহারা দিয়ে ফলাফল বুঝে নেয়া হবে। যাতে কোনো ভোট ডাকাত, সন্ত্রাসী, পেশীশক্তি ও কালো টাকার মালিকরা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে না পারে।
যৌথ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও খুলনা জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনা। প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা মহানগর সভাপতি এবং কেসিসি নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, কেসিসির মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং নগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সাহারুজ্জামান মোর্ত্তজা। সভা পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান।
সভা থেকে ২০ দলীয় জোটের পক্ষে নির্বাচন পরিচালনার জন্য সমন্বয়কারীর দায়িত্ব প্রদান করা হয় জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনাকে। এ ছাড়া কেসিসি নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। এতে নগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সাহারুজ্জামান মোর্ত্তজাকে আহ্বায়ক, আমীর এজাজ খানকে সদস্য সচিব এবং নগর ও জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া নির্বাচনী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আরো ১১টি উপ-কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়।

আরব লীগ সম্মেলন: সিরিয়ায় মার্কিন হামলা ইস্যুতে নীরব নেতারা

সৌদি আরবে সমবেত হয়েছেন আরব দেশগুলোর নেতারা। রোববার রিয়াদে আরব লীগের সম্মেলনে অংশ নেন তারা। কিন্তু এই সম্মেলনে যুদ্ধে জর্জরিত আরব দেশ সিরিয়ায় মার্কিন হামলার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয় নি। তবে ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণার সমালোচনা করেছেন আরব নেতারা। তারা এই ঘোষণাকে ‘সারশূন্য ও অবৈধ’ আখ্যা দেন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।
খবরে বলা হয়, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের হামলা শুরুর একদিন পরই সম্মেলনে বসলেন আরব লীগের নেতারা। আঞ্চলিক এই জোটের মুখপাত্র ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়ের বলেন, আরব দেশগুলোর নেতারা সিরিয়ার সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সিরিয়ার হোমস প্রদেশে চালানো মার্কিন হামলার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয় নি। তারা সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের নিন্দা জানিয়েছেন। একটি আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। উল্লেখ্য, রাসায়নিক হামলার অভিযোগ তুলে শনিবার সিরিয়ায় বেপরোয়া হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট। এতে সমর্থন দিয়েছে সৌদি আরব, বাহরাইন ও কাতার। এক বিবৃতিতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের সমর্থনের কথা জানান। আর সিরিয়ায় মার্কিন হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মিশর, ইরাক ও লেবানন। সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেন আরব লীগের নেতারা। তারা জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্তকে ‘সারশূন্য ও অবৈধ’ আখ্যা দিয়েছেন।  জেরুজালেম ঘোষণার বিরোধিতা করে এবারের আরব লীগ সম্মেলনের নাম দেয়া হয়েছে ‘কুদস সম্মেলন’। আরবিতে জেরুজালেম শহরকে কুদস বলা হয়। সৌদি বাদশাহ সালমান বলেন, নিশ্চিতভাবে পূর্ব জেরুজালেম ফিলিস্তিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর ফিলিস্তিনের  প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেন, ওয়াশিংটন জেরুজালেম ইস্যুতে সমঝোতার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। এটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। এই অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় এটি বড় বাধা।
কাতার ও চার উপসাগরীয় দেশের কূটনৈতিক যুদ্ধের পর এটিই আরব লীগের প্রথম সম্মেলন। তবে এবারের সম্মেলনে  কাতার সংকটের বিষয়েও কোনো আলোচনা হয় নি। আল জুবায়ের বলেন, কাতার কোনো বড় বিষয় না। তাই এ বিষয়ে আলোচনা হয় নি। তার ভাষায়- ‘এটা কোনো বড় সমস্যা না। খুবই ছোট বিষয়।’সব দেশের সরকার প্রধান অংশ নিলেও আরব লীগের সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না কাতারের আমীর। তার পক্ষে আরব লীগে নিযুক্ত কাতারের প্রতিনিধি এতে অংশ  নেন। আর ২০১১ সালে সিরিয়াকে আরব লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাই আরব দেশ হওয়া সত্ত্বেও আরব লীগের সম্মেলনে অংশ নিতে পারে নি সিরিয়া।

ইলিয়াস আলী গুমের অর্ধযুগ by কাফি কামাল

ইলিয়াস আলী গুমের অর্ধযুগ আজ। ২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল রাজধানীর রূপসী বাংলা হোটেলে আড্ডা শেষে ফিরছিলেন বনানীর বাসায়। পথে মহাখালী সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে থেকে গাড়িচালকসহ নিখোঁজ হন তিনি। ঘটনাস্থল থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় তার ব্যবহৃত গাড়িটি উদ্ধার করে পুলিশ। ইলিয়াস আলীকে উদ্ধার ও ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিল তার নির্বাচনী এলাকা সিলেটের বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জের মানুষ। আন্দোলন করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন বেশ কয়েকজন। দলের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের একজন ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের দাবিতে টানা কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। স্বামীকে উদ্ধারের আবেদন জানাতে সন্তানদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছুটে গিয়েছিলেন ইলিয়াস পত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনা। নানা তথ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ছুটে গেছেন গাজীপুরসহ কয়েক জায়গায়। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৬ বছর। নিখোঁজের পর ইলিয়াস আলীর তথ্য জানতে হাইকোর্টে একটি রিট করেছিলেন তাহসিনা রুশদীর লুনা। আদালতের নির্দেশনা মেনে কয়েক মাস উদ্ধার অভিযানের তথ্য জানিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সে তৎপরতাও বন্ধ হয়ে গেছে বেশ আগেই। পিতাকে উদ্ধারে ভূমিকা রাখতে বাংলাদেশ সফররত তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের কাছে চিঠি লিখেছিলেন ইলিয়াসের ছোট্ট মেয়ে সাইয়ারা নাওয়াল। দেশের পাশাপাশি তাকে উদ্ধারের দাবিতে বিদেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও মুখর হয়ে উঠেছিল। ইলিয়াস আলীর মোবাইল নম্বর থেকে বিভিন্নজনের কাছে রহস্যময় ফোনকল আসা, ভারতের কারাগারে তার বন্দিজীবন নিয়ে নানা সময়ে গুঞ্জন ছড়ালেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো পরিণত হয়েছে গুজবে। পরিবারের সদস্যরা ইতিমধ্যে ২১৯০টি দিন পার করেছেন তার ফিরে আসার অপেক্ষায়। চোখের জল শুকিয়ে গেছে মা সূর্যবান বানুর। দরোজায় কড়া নাড়ার শব্দে এখনো কান পেতে রাখেন স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। বাবার অপেক্ষায় এখনো আনমনা হয়ে থাকেন সন্তানরা। কিন্তু আজও ফিরেননি ইলিয়াস আলী। তার গাড়িচালক আনসার আলীরও মেলেনি সন্ধান। এদিকে, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রথমদিকে ইলিয়াসকে উদ্ধারের জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করা হলেও দীর্ঘ ৬ বছরেও তার কোনো সন্ধান দিতে পারেনি তারা। তবুও ইলিয়াস আলী ফিরবেন- এই আশায় এখন বুক বেঁধে আছেন স্ত্রী-সন্তানরা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রথমদিকে বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমসহ বেশ কয়েকজন নেতা নিখোঁজ হন। কিন্তু ইলিয়াস আলী নিখোঁজের পর গুমের বিষয়টি দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে বিএনপি ও অঙ্গ দলের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিখোঁজ হন। সে নিখোঁজের প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে কয়েক মাস নিখোঁজ থাকার পর নানা সময়ে বিএনপির বেশকিছু নেতাকর্মী উদ্ধার হয়েছেন। কিন্তু যাকে নিয়ে দেশে-বিদেশে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ হয়েছে সে ইলিয়াস ফিরেনি। 
ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ- রেজিস্ট্রার। বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য পদ পেয়েছেন তিনি। লুনা জানান, অপেক্ষার অনিশ্চয়তা নিয়েই তারা দিন কাটাচ্ছেন। ইলিয়াস আলীর ব্যাপারে নতুন কোনো তথ্য নেই। আশাও দিন দিন ক্ষীণতর হয়ে আসছে। মানুষ আশা নিয়েই বাঁচে, তারাও আশা নিয়েই বেঁচে আছেন। তিনি বলেন, নিখোঁজের পর পুলিশ তো মামলা নেয়নি। বনানী থানায় একটি জিডি করেছিলেন। সে জিডির ভিত্তিতে তেমন কোনো অনুসন্ধান চালানো হয়নি। এখনো জানি না পুলিশের অগ্রগতি কী? হাইকোর্টে রিট দায়েরের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উদ্ধার তৎপরতা সম্পর্কে জানাতে একটি নির্দেশ দিয়েছিল উচ্চ আদালত। কয়েক মাস পর সে নির্দেশ আর রক্ষা করেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এখন তো এ ব্যাপারে পুলিশ কোনো কথাই বলতে চায় না। লুনা বলেন, এক সময় নানা গুঞ্জন-গুজব শোনা যেত। এখন সেসবও বন্ধ হয়ে গেছে। তবুও আমি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বিশ্বাস রাখতে চাই ইলিয়াস একদিন ফিরে আসবে। তার এলাকার মানুষও এটাই বিশ্বাস করে। লুনা জানান, ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের দাবিতে সিলেটের লোকজন রাস্তায় নেমে এসে প্রাণবিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেনি। এ ঘটনায় উল্টো বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীসহ অন্তত ১২ হাজার এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর থানায় দায়ের করা হয়েছিল ৪টি মামলা। সেগুলো এখন বিচারাধীন। ইলিয়াস আলী ফিরে না এলেও মামলার ঘানি টানছেন সিলেটের হাজার হাজার মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে ইলিয়াস আলীর সন্ধান নেই। সিলেট বিএনপির নেতাকর্মীদের দাবির মুখে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন তাহসিনা রুশদীর লুনা। দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদের দায়িত্ব পেয়েছেন। সিলেটের রাজনীতিতে সময় দেন তিনি। স্বামীর নির্বাচনী এলাকার বিএনপি ও অঙ্গ দলের নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ান। লুনা জানান, পারিবারিক জীবনে তারা নিজেরাও কাটাচ্ছেন আর্থিকভাবে দুঃসময়। আইনগত জটিলতার কারণে ইলিয়াস আলীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ। আইনজীবীরা জানিয়েছেন গুমের সাত বছর না পেরোলে অ্যাকাউন্টগুলোতে লেনদেন করতে পারবেন না পরিবারের সদস্যরা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি ও পারিবারিক টুকটাক ব্যবসার আয় দিয়েই সাংসারিক ব্যয় নির্বাহ করছেন। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য ঋণ করেছেন বাধ্য হয়ে।
লুনা জানান, তাদের তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে আবরার ইলিয়াস যুক্তরাজ্যের বিস্টলে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্ট ইংল্যান্ডে এলএলবি ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছে। ছোট ছেলে লাবিব সারার যুক্তরাজ্যের কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটিতে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সের সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। ইলিয়াস আলী নিখোঁজের সময় ক্লাস থ্রিতে পড়ুয়া একমাত্র মেয়েটি এখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। লুনা জানান, ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর দুশ্চিন্তায় তিনি নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। হার্টের সমস্যায় ভুগছেন। গত মাসে ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত ২০ দিন ধরে প্রায় শয্যাশায়ী অবস্থায় রয়েছেন তিনি। অন্যদিকে তার বৃদ্ধা শাশুড়িও অনেকটাই শয্যাশায়ী। ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার ৬ বছরের দিনে আজ সিলেট বিএনপির তরফে সিলেট সদর, ওসমানীনগর-বালাগঞ্জ ও বিশ্বনাথে মসজিদে মসজিদে দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে। ঢাকায় বসবাসরত বৃহত্তর সিলেটবাসীর উদ্যোগে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাবে। গতকালও একটি প্রতিবাদী যুব সমাবেশ হয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-ডিআরইউতে। ইলিয়াস আলীর সন্ধানের দাবিতে লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশিরাও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছে।

ভিডিও কনফারেন্সে বিচারকাজের নজির নেই by উৎপল রায়

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় নতুন একটি বিষয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে থাকা খালেদা জিয়া যেহেতু অসুস্থ এবং আদালতে হাজির করা যাচ্ছে না- তাই বিচারকাজ ভিডিও করফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালনার জন্য আদালতে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। তবে, খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এমন প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলছেন, দেশে প্রচলিত আইনে এ  ধরনের কোনো সুযোগ নেই। এমনটা করতে হলে ফৌজদারি ও অপরাধ আইন সংশোধন করতে হবে। ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রচলিত আইনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচার পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। দেশে এখন পর্যন্ত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কোনো ফৌজদারি মামলার বিচারকাজের নজির নেই। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের কিছু পরামর্শ ও নির্দেশনা রয়েছে। তবে তা আনুষ্ঠানিক কিংবা বাধ্যতামূলক নয়।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ রাজধানীর বকশিবাজারের কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতে চলছে। বর্তমানে মামলাটি যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের পর্যায়ে রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এক আদেশে এ মামলার অসমাপ্ত যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামী ২২শে এপ্রিল দিন ধার্য করেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান। একই সঙ্গে ওই দিন পর্যন্ত এ মামলার আসামি খালেদা জিয়ার জামিন বর্ধিতকরণের আদেশ দেয়া হয়। অসুস্থতার কারণে এই মামলায় একাধিক ধার্য তারিখে খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করা যায়নি বলে কারা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে দুদকের আইনজীবীরা জানান। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছর ও অন্য আসমিদের ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেন একই আদালত। রায়ের পর থেকে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। ৫ই এপ্রিল জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার শুনানিতে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, খালেদা জিয়া আর্থ্রাইটিসে ভুগছেন। অসুস্থতার কারণে তাকে আদালতে আনা হচ্ছে না। তিনি যেহেতু অসুস্থ তাই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার পরবর্তী বিচারকার্যক্রম ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালনা করা যায় কি না- এ বিষয়ে তারা আদালতে আবেদন করবেন। প্রচলিত সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী এ সুযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ সময় তিনি ভারতের লালু প্রসাদ যাদবের (বিহার রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী) মামলার বিচারকাজ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। দুদক আইনজীবীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে খালেদা জিয়ার আইনজীবী আব্দুর রেজাক খান বলেন, এ ধরনের বক্তব্যের কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং তা বাড়াবাড়ি ও অবান্তর। তিনি বলেন, সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশের আইন-আদালত চলছে। তাই আদালতের কার্যক্রম যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলবে। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনের বিধানে এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই বলেও জানান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। 
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, দুদকের আইনজীবী হয়তো নতুন কোনো চমক সৃষ্টি করার জন্য অনলাইন ভিডিওর মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনার কথা বলেছেন। এটি নিতান্তই বেসামাল ও রাজনৈতিক বক্তব্য। তিনি বলেন, যেখানে কথায় কথায় আদালতে সমস্যা সৃষ্টি হয় সেখানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনা করা নেহায়েতই ছেলেমানুষি বক্তব্য। আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো বিধান নেই আর তা সম্ভবও না। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যদি এ পদ্ধতিতে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হয় তাহলে প্রচলিত আইনের পরিবর্তন করতে হবে। আরো অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে হবে। যেটি আমাদের দেশে সম্ভব নয়। 
সাবেক আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, আমাদের দেশে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকাজের কোনো উদাহরণ এখন পর্যন্ত নেই। দেশের প্রচলিত আইনেও এ ধরনের কিছু বলা নেই। আর এ পদ্ধতিতে বিচারকাজের জন্য সুপ্রিম কোর্টের কিছু নির্দেশনা থাকলেও এটি আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা নয় যে, এভাবেই বিচারকাজ পরিচালনা করতে হবে। তবে উভয়পক্ষের আইনজীবীরা সম্মত হলেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালিত হতে পারে। তার পরও নানা প্রশ্ন আছে। তিনি বলেন, দুদকের আইনজীবী হয়তো একটি প্রস্তাব করেছেন। এ পদ্ধতিতে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হলে আগে বিচারিক আদালতে আবেদন করতে হবে। প্রশ্ন হলো বিচারিক আদালত আবেদন গ্রহণ করবে কি না? অনুমতি দেবেন কি না? ঢাকা শহরে বসে ভিডিও কনফারেন্সের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না? এমন তো না যে দূর অন্ত। তাই সবকিছুই নির্ভর করছে বিচারিক আদালতের ওপর। কাজেই বিষয়টি এত সহজ না যে বললেই হয়ে গেল। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, আমার জানামতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনার নজির বা উদাহরণ আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত নেই। দেশের প্রচলিত আইনেও এ বিষয়ে কিছু বলা নেই। তাই এর বেশি কিছু এ বিষয়ে বলতে পারবো না।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী আব্দুর রেজাক খান বলেন, আদালতের বাইরে তো আদালত বসতে পারে না। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনার বিষয়ে দুদক আইনজীবী কথার কথা বলেছেন। আমাদের দেশে এটি করা যায় না। এ ধরনের কোনো নজিরও এখন পর্যন্ত নেই। তিনি বলেন, সরকার আদালত সেটআপ করতে পারে কিন্তু তা করতে হবে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ ও আলোচনা করে। আব্দুর রেজাক খান বলেন, ভারতে (বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবের মামলা) কীভাবে করেছে না করেছে সেটা তারা জানে। সেখানে কনসেন্ট থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো নজির নেই।

ইউনাইটেডে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দাবি বিএনপির

কারাগারে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে জানিয়ে সুচিকিৎসা নিশ্চিতের দাবি   জানিয়েছে বিএনপি। এ জন্য ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেয়ার দাবিও জানিয়েছে দলটি। গতকাল বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ দাবি জানান। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনদের দাপটে কারাকর্তৃপক্ষ মুঠোবন্দি হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে ফ্যাসিবাদের রোগ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এখন খালেদা জিয়া আগের চেয়ে গুরুতর অসুস্থ। নির্জন, পরিত্যক্ত ও স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখায় তার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাঁটু ও পায়ের সমস্যায় ভুগছেন। কারাগারে তাকে দেয়া বিছানা-বালিশ অর্থোপেডিকের একজন রোগীর জন্য অনুপযোগী। আমরা দলের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগত চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা দেয়ার দাবি জানালেও তা দেয়নি সরকার। রিজভী বলেন, সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী সরকারি চিকিৎসকদের দিয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডও কারাগারে খালেদা জিয়াকে অর্থোপেডিকের বেড দেয়ার সুপারিশ করেছে। তারপরও খালেদা জিয়াকে সেই বেড দেয়া হয়নি। যে কারণে তার হাত-পা ও কোমরের ব্যথা আগের চেয়ে বেড়েছে। এখন তার জরুরি ভিত্তিতে এমআরআইসহ উন্নত চিকিৎসা দরকার। এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী আহমেদ বলেন, খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা কিছুদিন পরপর তার সঙ্গে দেখা করেন। তাদের মাধ্যমে আমরা তার অসুস্থতার কথা জানতে পেরেছি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সরকার খালেদা জিয়াকে অবনতিশীল স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ফেলে রাখার জন্যই কারাকর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে। বিষয়টি গভীর উদ্বেগের ও বন্দি নির্যাতনের শামিল। রিজভী আহমেদ বলেন, আগে খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে দেখা করা যেতো। এখন ১০ দিন পরপর দেখা করার নির্দেশ হতে যাচ্ছে। এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে বেগম জিয়াকে মানসিকভাবে যন্ত্রণা দেয়া। সরকারের নির্দেশেই কারাকর্তৃপক্ষ বেগম জিয়ার প্রতি নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করছে। এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে বার বার প্রতিবাদ করলেও কারাকর্তৃপক্ষ আমলে নিচ্ছে না। উল্টো প্রতিদিন তাদের নির্যাতনের মাত্রা বাড়ছে। রিজভী বলেন, দেশের একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ও কোটি কোটি মানুষের আশা ও ভরসার স্থল খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক তিনি। বারবার দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে তিনি সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সুচিকিৎসা নিয়ে কারাকর্তৃৃপক্ষের টালবাহানা অত্যন্ত রহস্যজনক। সরকারের নির্দেশেই কারাকর্তৃপক্ষ খালেদা জিয়ার প্রতি এমন নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করছে। একজন জাতীয় নেতার ওপর এহেন নির্দয় আচরণ শুধুমাত্র প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা ছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই। বিএনপির মুখপাত্র বলেন, সরকার বলছে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে বিএনপি নোংরা রাজনীতি করতে না পারায় হতাশায় ডুবছে। লন্ডন ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ছিল সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু আমি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উদ্দেশে বলতে চাই- বিএনপি কোনো ষড়যন্ত্র করেনি। যৌক্তিক আন্দোলনে বিএনপির সমর্থনের বিষয়ে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমাদেরই দলের এক নেতার সঙ্গে আলাপ করেছেন। বরং আপনারা (সরকার) কোটা সংস্কার চাননি। কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে পরাজিত হওয়ায় এখন বেসামাল হয়ে পড়েছেন। পরাজয়ের গ্লানি অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য দিশাহারা হয়ে প্রতিদিন বেশরমের মতো বকবক করছেন। রিজভী বলেন, এর আগে ভিসির বাসায় হামলার কথা বলে সাধারণ ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে দিকভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা আরো প্রমাণিত হয়েছে রগকাটা ছাত্রলীগ নেত্রী এশার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের মাধ্যমে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার চেয়েছিল, বাতিল নয়, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জেদের বশে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে দিলেন। বিষয়টি যে শুভঙ্করের ফাঁকি এবং সাম্প্রতিককালের সেরা প্রহসন সেটি আমরা আগেই বলেছিলাম। এটি নিয়ে শিক্ষার্থীসহ গোটা জাতি এখনো অন্ধকারে। ছাত্রদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিলেও এখনো প্রজ্ঞাপন জারি না করার মাধ্যমেও প্রমাণিত হয়েছে সরকার আন্দোলনকে দিকভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। রিজভী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা এখনো চলছে। এখনো ছাত্রলীগের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ব্রিফিংয়ে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার, আবদুস সালাম ও সহ দপ্তর সম্পাদক মুনির হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

কোটা বাতিল প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি নেই by দীন ইসলাম

সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর-পর্বে গত ১১ই এপ্রিল এ ঘোষণা দেন। বলেন, সরকারি চাকরিতে আর কোটা রাখারই দরকার নেই। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। এর পাঁচ দিন পর এখন পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলে প্রজ্ঞাপন জারির কোনো অগ্রগতি নেই। এছাড়া কোটা সংস্কার খতিয়ে দেখতে এ সংক্রান্ত কমিটি গঠনের আলোচনা হলেও তা এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোটা সংস্কার বা বাতিল নিয়ে কাজ করার কথা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয়টির সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে ফাইলটি উঠানোর কথা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শাখার এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, তাদের কাছে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দিলে কাজ শুরু করবেন তারা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ই এপ্রিল মন্ত্রিসভা বৈঠকে কোটা সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়। এতে বলা হয়, কোটা সংস্কার নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এরপর কোটা সংস্কারকারীদের আন্দোলন অন্যদিকে রূপ নেয়। যার কারণে কমিটি গঠন থেমে যায়। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানান, কোটা সংস্কারের কমিটি এখনো গঠিত হয়নি। এ বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতিও নেই। এর আগে গত ৮ই এপ্রিল কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন সারা দেশের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা।
শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার কারণে আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। এর জের ধরে সারা  দেশেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন তীব্রতা পেলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর সচিবালয়ের দপ্তরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সভা করে সরকার পক্ষ। ওই সভার সিদ্ধান্ত মানতে অপারগতা জানায় আন্দোলনকারীদের এক পক্ষ। এরপর সারা দেশে আন্দোলন তীব্রতা পায়। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। একই দিনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান সাংবাদিকদের বলেন, কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে। এ বিষয়ে আমরা পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি। ওই সময় জানতে চাওয়া হয় প্রজ্ঞাপন কবে নাগাদ হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, প্রজ্ঞাপন যথাসময়েই হবে। সুস্পষ্ট নির্দেশনা পেলেই এই বিষয়ে বলা যাবে। প্রধানমন্ত্রীর কোটা বাতিলের ঘোষণার পর দিন কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন করা সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দেন।
এদিকে গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যে সফরের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। আট দিনের সফর শেষে ২৩শে এপ্রিল তার  দেশে ফেরার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসছে না। এটা অনেকটা নিশ্চিত। উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে ৪৫ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়। আর বাকি ৫৫ শতাংশ অগ্রাধিকার কোটায় নিয়োগ হয়।

রংপুরের ২২ আসন আমাকে দেন আমি সরকার উপহার দেব

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, ‘এ আসনসহ আমাকে রংপুরের ২২টি আসন আমাকে দেন আমি আপনাদের সরকার উপহার দেব। ১০ টাকা কেজির চাল আর ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছিলেন। তবে বর্তমান সরকার তার দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারে নাই। মানুষ ১০ টাকার চাল ৪০/৫০ টাকায়   কিনছে আর বেকাররা চাকরিও পায়নি’। সোমবার দুপুরে নীলফামারীর জলঢাকায় ডা. বাদশা আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর জাতীয় পার্টিতে যোগদান উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় তিনি একথাগুলো বলেন। ১৬ মিনিটের বক্তব্যে এরশাদ খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে বলেন, আমার প্রতি যে অত্যাচার আপনি করেছিলেন তার প্রতিফলনে আল্লাহ আপনার বিচার করেছে। তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, খালেদা জিয়া আজ কোথায়? ডাকবাংলো মাঠের জনসভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শাহ্‌ আব্দুল কাদের বুলু চৌধুরী। সরকারের কড়া সমালোচনা করে এরশাদ তার বক্তব্যে বলেন, “বর্তমান সরকারের সময় মানুষ অত্যাচার, খুন, গুম আর জুলুম ছাড়া কিছুই পায়নি। আগামীতে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় আসলে দেশের মানুষ শান্তিতে থাকবে”। উন্নয়ন যতটুকু হয়েছে সব ঢাকায়, ঢাকার বাইরে কোনো উন্নয়ন হয়নি। আমি তিস্তা ব্যারেজ করেছিলাম, তবে তিস্তা আজ ধু-ধু বালুচর। তিস্তা নদীতে এখন গরুর গাড়ি চলে। সভাটি পরিচালনা করেন উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মমিনুল ইসলাম মঞ্জু। এ সময় বক্তব্য রাখেন দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব.) খালেদ আক্তার, স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা এমপি, রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তাফা, বিরোধীদলীয় হুইপ শওকত আলী চৌধুরী এমপি, গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, নীলফামারী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, নীলফামারী জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব একেএম সাজ্জাদ পারভেজসহ জেলা ও উপজেলা নেতৃবৃন্দ।

৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ৯৭ হাজার কোটি টাকা

পণ্য ও সেবা ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মোট বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৭৩ কোটি ২০ লাখ ডলার বা ৯৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে; ৯৯৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
২০১১-১২ অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯৩২ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের সাত মাসে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি এক হাজার ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার দাঁড়ায়। যা দেশের ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের করা হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের আট মাস শেষে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৭৩ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬০৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৫৬৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ৯২ শতাংশের উপরে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি ডলার ৮৩ টাকা হিসেবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে ৪৬ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানান, রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় যতটুকু বেশি, তার পার্থক্যই বাণিজ্য ঘাটতি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ চলছে। এসব বড় বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানি বেড়ে গেছে। এ ছাড়াও শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে। আর এসব কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। তবে এই ঘাটতি মেটানো হয় রেমিট্যান্স ও বিদেশি বিনিয়োগ দিয়ে। এই খাতেও নিম্নগতি রয়েছে। ফলে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অফ পেমেন্ট বা বিওপি) ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের আমদানি যে হারে হয়েছে সেই হারে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বাড়েনি। এ কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ফেব্রুযারি শেষে ইপিজেডসহ রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে দুই হাজার ৪০৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৮২ কোটি ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় এক হাজার ১৭৩ কোটি ২০ ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি ডলার ৮৩ টাকা হিসেবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এ ছাড়া আলোচিত সময়ে, আমদানি বেড়েছে ২৬.২২ শতাংশ হারে। অন্যদিকে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৮.০৬ শতাংশ। ফলে চলতি হিসাবে ঘাটতি বড় হয়েছে।বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছর জুড়ে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল। এতে বৈদেশিক দায় পরিশোধে সরকারকে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১৪৮ কোটি ডলার (-) ঋণাত্মক হয়। যা এখনো অব্যাহত রযেছে।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি শেষে ৬৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলার ঋণাত্মক হয়েছে। আলোচিত সময়ে সেবাখাতে বিদেশিদের বেতনভাতা পরিশোধ করা হয়েছে ৫৭৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আর বাংলাদেশ এ খাতে আয় করেছে মাত্র ২৮০ কোটি ২০ লাখ ডলার। এ হিসাবে আট মাসে সেবায় বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৯৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারে। যা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল (ঘাটতি) ২১১ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে ফেলা হয় ওদের

কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছে। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে মামলা প্রত্যাহারে দুইদিনের নতুন আলটিমেটাম দেয়ার পর আন্দোলনকারীদের অন্যতম তিন নেতাকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তুলে নেয়ার ঘটনায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের ছেড়ে দেয়া হলেও আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন তারা। গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করে আগামী দুইদিনের মধ্যে গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার না হলে ফের আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেন নেতারা। এর কিছুক্ষণ পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ফটক থেকে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক নুরুল  হক নূর, মোহাম্মদ রাশেদ খান ও ফারুক হাসানকে তুলে নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল।
মিন্টু রোডের গোয়েন্দা কার্যালয় থেকে ছেড়ে দেয়ার পর তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। তাদের গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে ফেলা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ- কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে হামলার ঘটনায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল। পরে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। গত ৮ই এপ্রিল শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন টানা চারদিন চলার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। পরের দিন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ৫ শর্তে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষার্থীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের শর্ত ছিল।
এই কয়েকদিনে এই দুই শর্তের কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় গতকাল বেলা ১১টায় সংবাদ সম্মেলন করে নেতারা নতুন আলটিমেটাম দেন। এর পর পরই তিন নেতাকে তুলে নেয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ তথ্য ছড়িয়ে দেন তারা। নেতাদের সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জড়ো হতে থাকেন। এদিকে ছাত্রলীগের নেতারা ফেসবুকে তিন নেতাকে তুলে নেয়ার বিষয়টি ‘গুজব’ বলে প্রচারণা চালান। তারা শিক্ষার্থীদের জড়ো হতে নিষেধ করেন। দুই ঘণ্টা পর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয় থেকে ছাড়া পান তিন নেতা। এরপর বিকাল সাড়ে তিনটার পর ঢাবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি। সেখানে বক্তৃতা করেন পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক বনি ইয়ামিন, নুরুল হক নূর, রাশেদ খান ও ফারুক হাসান।
বনি ইয়ামিন বলেন, বেলা পৌনে ১টার দিকে আমরা কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন দুপুরের খাবার খেতে রিকশায় করে চানখাঁরপুল যাচ্ছিলাম। মোট তিনটা রিকশা ছিলো। প্রথম রিকশায় ছিলেন রাশেদ, নূর ও ফারুক। শেষের রিকশায় ছিলেন বনি ইয়ামিন। খেতে যাওয়ার জন্য রিকশায় করে পরে তারা আহত শিক্ষার্থীদের দেখার জন্য মেডিকেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম রিকশাটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আসলে পেছন থেকে তিনটা মোটরসাইকেল ওই রিকশার গতিরোধ করে। পরে পেছন থেকে একটি সাদা রঙের হাইএস মডেলের মাইক্রোবাস আসে। মোটরসাইকেল ও গাড়ি থেকে ৭-৮ জন নেমে ওই তিনজনকে রিকশা থেকে নেমে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, তিনি রিকশা থেকে নেমে মোবাইলে গাড়িতে তুলে নেয়ার ভিডিও ধারণ করেন। এবং বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে হাসপাতালের ফটকের বিপরীত পাশে খাবার দোকানের কর্মচারী সোহেলও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, হঠাৎ করে তিনটি মোটরসাইকেল ও একটি সাদা মাইক্রোবাস এসে রিকশায় বসা তিনটি ছেলেকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। এ সময় কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম সমন্বয়ক নূর বলেন, আজকে আমরা ন্যায়ের জন্য আন্দোলন করতে এসে সারা বাংলার ছাত্র সমাজের যৌক্তিক দাবি কোটা সংস্কার আন্দোলন করতে এসে হত্যার হুমকি পাচ্ছি। পুলিশ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা মেডিকেলের সামনে থেকে অনেকে দেখেছে বলে ফিরে এসেছি। না হলে ফিরে আসতাম কিনা, এই পৃথিবীর আলো দেখতে পারতাম কিনা সেটা নিয়ে আমরা সন্দিহান ছিলাম। তাই আপনাদের বলবো এই ন্যায় আন্দোলনের  সৈনিকদের ওপর যখন অত্যাচার হবে তখন আপনারা আপনাদের কলম দিয়ে তা তুলে ধরুন। সাংবাদিকরা একটি জাতির বিবেক। আপনারা যদি কিছু লুকায়িত রাখেন এই দেশের মানুষ কিছু জানবে না। তাই আপনাদের বারবার আহ্বান জানাবো, আপনারা আপনাদের দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে সঠিক সত্যটি তুলে ধরবেন, কখনো সত্য তুলে ধরতে কার্পণ্য করবেন না। আমরা আজকে সকালে সংবাদ সম্মেলনের পর অসুস্থ ভাইবোনদের দেখতে ঢাকা মেডিকেলে যাচ্ছিলাম। আমাদের প্ল্যান ছিল তাদের দেখে আমরা চানখাঁরপুলে খেতে যাবো। কিন্তু আমরা ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের ফটকে যাওয়ার পর পরই কিছু লোক ঘিরে ধরে। অনেকের হাতে দেখেছি রিভলবার। তারা আমাদের একজনকে টেনেটুনে বলে আমরা ডিবির লোক গাড়িতে উঠ। আমরা পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে আমাদের সুযোগ না দিয়ে ধাক্কা মেরে গাড়িতে উঠিয়েছে। গুলিস্তান যাওয়ার পর গামছা দিয়ে চোখ বাঁধা হয়। এর আগে আমাকে হেলমেট দিয়ে আটকানো হয়। আমি হয়তো ভেবেছিলাম এটাই আমার শেষ। মুসলমান ধর্ম অনুযায়ী আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে নিই। ভেবেছিলাম আজকে হয়তো শেষ। তিনি বলেন, আমরা সবসময় সরকারের সঙ্গে সমাঝোতা চেয়েছি। সরকারের কথা শুনেছি। তাদের ডাকে সচিবালয়ে গিয়েছি।
আমাদের দাবি দাওয়া যেহেতু প্রধানমন্ত্রী মেনে নিয়েছেন। আমরা সেটাকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল করেছি। তারপরও আমাদের বারবার হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। গুম করার হুমকি দেয়া হচ্ছে এবং আজকে যে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খুবই নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমাদের চোখ বাঁধা ছিল। আমি একটু অসুস্থ হয়ে পড়ি। চোখ খুলে দেখি আমরা ডিবির কার্যালয়ে। ওখানে আমাদের বললো তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। আমাদের ভিডিও ফুটেজ দেখানো হবে। আমাদের ওপর নাকি হামলার আশঙ্কা ছিল। এই জন্য তারা নিয়ে এসেছে। আমাদের ভিডিও ফুটেজ কোনো কিছু দেখায়নি। বলছে তোমরা এখন চলে যাও। তোমাদেরকে ডাকলে আবার আসবা। তবে আমাদের কোনো ভিডিও দেখায় নাই। নূর আরো বলেন, সারা বাংলার ছাত্র সমাজকে জানিয়ে দিতে চাই। আমরা শুধু নিজের জন্য এই আন্দোলন করিনি। তোমাদের সকলের জন্য নিজের জীবনকে হত্যার সম্মুখীন করে এই আন্দোলনে এসেছি। এজন্য আমাদের ওপর বারবার নির্যাতন নেমে আসছে। তোমরা যদি সোচ্চার না হও। আর কেউ তোমাদের হয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না। আর কোনো সুষ্ঠু বিবেক বুদ্ধির ন্যায়বান মানুষ, মানুষের ন্যায় অধিকারের হয়ে কথা বলবে না। জাতির বিবেক মরে যাবে। ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার মানুষ থাকবে না। জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি বলবো শুধু আমি না। যখনই কোনো অন্যায় হবে। তখনই তোমরা গর্জে উঠো।
আমি আজকে ঢাকা মেডিকেলের সামনে দেখেছিলাম শত শত লোক। কেউ তো বলে নাই কেন আপনারা এই ছেলেগুলোকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। বলেছিলাম ভাই আমাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কেউ এগিয়ে আসেনি। অথচ আমরা তো সবার স্বার্থের জন্য এই আন্দোলন করেছিলাম। আরেক যুগ্ম সমন্বয়ক মোহাম্মদ রাশেদ খাঁন বলেন, আমাকে না হয় মেরে ফেলল, আমার আব্বা কি অন্যায় করেছে। তার ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে  কি সে অন্যায় করেছে। তার ছেলে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলায় কি সে অন্যায় করেছে। আজকে জাতির কাছে আমি এ বিচার দিলাম। আমাকে না হয় মেরে ফেলল আমার আব্বাকে কেন থানায় নেওয়া হয়েছে। আমার আব্বাকে কেন পুলিশ গালিগালাজ করলো। যা-তা বলল। আমার আব্বা কান্না করতে করতে ফোন দিচ্ছে। কেন আমাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা কি অন্যায় করেছি। আপনারা এই নিউজটা তুলে ধরেন। আমার আব্বাকে গালিগালাজ করা হয়েছে। সে কান্না করছে। তিনি বলেন, আমাদের চোখ বেঁধে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। একই সাথে আমার আব্বাকে গ্রাম থেকে বলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এই বলে তাকে থানায় আটকে রাখা হয়েছে। এবং তাকে ওইখানকার ওসি বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করছে। এবং তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেয়ার চেষ্টা হয় সে জামায়াত-শিবির করে এবং তার ছেলে শিবির করে। আমার আব্বাকে আটকে রাখা হয়। আমার আব্বা কোনো অন্যায় করেনি। সে একজন দিনমজুর। অনেক কষ্ট করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হইনি। আমি একটি ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে এসেছি। আমি একজন সাধারণ ছাত্র। আমি কি সাধারণ ছাত্র হিসেবে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে পারি না। আজ আমার কোনো পোস্ট নেই। আমি কোনো রাজনীতি করি না। এজন্য কি আমাকে ট্যাগ দেয়া হবে। আমার আব্বাকে থানায় আটকে রাখা হবে। তাকে কি গালিগালাজ করা হবে। আজকে আমাদের বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের ঠিকানা নেয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাসায় হামলা করবে। তাদের গ্রেপ্তার করবে। আজকে যেমন আমার আব্বাকে গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছে। যুগ্ম সমন্বয়ক ফারুক হোসেন বলেন, আমাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সবার হাতে রিভলবার ছিল। আমাদের কাছে তথ্য চাইলে আমরা তাদের সঙ্গে গিয়ে তথ্য দিয়ে আসতাম। কিন্তু এভাবে চোখ বন্ধ করে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো কেন?
সংবাদ সম্মেলনের পরে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করে। এর আগে সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলন করে কেন্দ্রীয় কমিটি। সেখানে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ আন্দোলনে অংশ নেয়া যে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে আগামী দু’দিনের মধ্যে সেগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। এ সময়ের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার না হলে ফের আন্দোলনে নামবে বলে জানিয়েছেন তারা। আন্দোলনকারীরা বলেন, আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল জামায়াত-শিবির পরিচয় দিতে উঠেপড়ে লেগেছে, যা পুরোপুরি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
নেতারা বলেন, ‘এ ধরনের সংবাদ প্রচার করা হলে আমরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবো। আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্যদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আমরা যদি এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলি, পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আমাদের সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। তারা ইতিবাচক পেয়েছে বলেই আমাদের আন্দোলনে কোনো বাধা দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীও আমাদের দাবি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য আমাদের ভিন্ন পরিচয় দিয়ে আন্দোলন ভিন্ন পথে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে।’ সংগঠনের সমন্বয়ক হাসান আল মামুন বলেন, ‘আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। এবং আমি মহসীন হলে ছাত্রলীগের সহসভাপতি। আমি সাধারণ ছাত্রদের ব্যানারে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। কেউ যদি আমাকে সন্দেহ করে থাকেন, তাহলে আমার পরিবারে খবর নিতে পারেন।’ সংবাদ সম্মেলন থেকে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকাকে বিকেল ৫টার মধ্যে প্রকাশিত সংবাদ প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাইতে সময় বেঁধে দেয় আন্দোলনকারীরা। পরে পত্রিকাটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্ষমা চেয়ে সংবাদ প্রত্যাহার করে নেয়।

সৌদি আরবে সামরিক মহড়া দেখলেন প্রধানমন্ত্রী

সৌদি আরব  নেতৃত্বাধীন ২৪ দেশের যৌথ সামরিক মহড়া ‘গালফ শিল্ড-১’-এর কুচকাওয়াজ ও সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল  সৌদের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সোমবার অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছলে বাংলাদেশের সরকার প্রধানকে স্বাগত জানান বাদশাহ সালমান। দেশটির আল-জুবাঈর প্রদেশে ওই মহড়ায় বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ নন আরব অনেক দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বাইরের অনেকে অংশ নিয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা এবং ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের বিবেচনায় এ মহড়াকে উপসাগরীয় অঞ্চলে হওয়া অন্যতম বৃহৎ সামরিক মহড়া হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এর আগে সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে অংশ নিয়ে এবার সামরিক মহড়ায় যোগ দিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিবেশী  দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে  সৌদি আরব মাসব্যাপী এই মহড়ার আয়োজন করে। মহড়ায় অংশগ্রহণকারী অন্য দেশগুলো হলো- বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, মিশর, জর্ডান, সুদান, মৌরিতানিয়া, মালয়েশিয়া, শাদ, জিবুতি, নাইজার, কমোরোস, আফগানিস্তান, ওমান, গায়ানা, তুরস্ক, ও বুরকিনা ফাসো। গত ১৮ই মার্চ ওই মহড়া শুরু হয়। এতে বাংলাদেশের ১৮ সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। মহড়ার মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল-সুবাইন বলেন, সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ২৪টি দেশের পদাতিক, বিমান ও  নৌবাহিনী এই মহড়ায় অংশ নিয়েছে। আবদুল্লাহ বলেন, মহড়ায় দুই ধরনের সামরিক চর্চা করা হয়েছে। একটি হলো শত্রুর বিরুদ্ধে প্রথাগত সামরিক  অভিযান; অন্যটি অপ্রথাগত। গালফ শিল্ড ওয়ানের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের  বৈঠকে (সিএইচওজিএম) যোগ দিতে  সোমবার বিকালেই দাম্মাম থেকে লন্ডনের পথে রওনা হচ্ছেন শেখ হাসিনা। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা  মে’র আমন্ত্রণে ১৭ থেকে ২১শে এপ্রিল ২৫তম কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সফরে তার সঙ্গে থাকছেন। আট দিনের এই সফর  শেষে আগামী ২৩শে এপ্রিল শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

হাতিয়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে শিশু নিহত, বাবাও গুলিবিদ্ধ

হাতিয়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে শিশুপুত্র নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় বাবাও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। রোববার রাতে হাতিয়া উপজেলার খবির মিয়ার বাজার সংলগ্ন এলাকায় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে হাতিয়া রহমানিয়া মাদরাসার ৫ম শ্রেণির ছাত্র মিশকাতুর রহমান নীরব (১০) নিহত হয়েছে। এ সময় তার বাবা মিরাজ উদ্দিন (৪০) গুলিতে আহত হয়েছেন বলে হাতিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ কামরুজ্জামান শিকদার জানান। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আধিপত্য ও অটোরিকশা চার্জকে কেন্দ্র করে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে গত রোববার দিবাগত রাত ৯টার সময় স্থানীয় খবির মিয়ার বাজারে মিরাজের দোকানে হামলা চালায় কতিপয় সন্ত্রাসী। পরে সন্ত্রাসীদের ধাওয়ায় মিরাজ উদ্দিন নিজ বাড়িতে আশ্রয় নিলে সন্ত্রাসীরা গুলি ছোড়ে। এ সময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে মাদরাসাপড়ুয়া ছাত্র মিশকাতুর রহমান নিরব (১০) ও তার বাবা মিরাজ উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হয়। রাতে নিরবকে প্রথমে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। রাতে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পথে নিরব এর মৃত্যু হয়। নিহত নিরবের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে রাখা হয়েছে। হাতিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. কামরুজ্জামান শিকদার মানবজমিনকে জানান, স্থানীয় খবির মিয়ার বাজারে অটোরিকশা চার্জের ব্যবসা করেন আহত মিরাজ উদ্দিন ও প্রতিপক্ষ জিন্নুর উদ্দিন। এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। মিরাজের পরিবার সূত্রে উদ্ধৃতি দিয়ে ওসি কামরুজ্জামান আরো বলেন, ইতিমধ্যে জিন্নুর উদ্দিন চাঁদার জন্য মিরাজ উদ্দিনকে হুমকি দিয়ে আসছিল এবং অটোরিকশা চার্জ বন্ধ রাখার জন্যও চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু অটোরিকশা চার্জ বন্ধ না করায় জিন্নুর এ আক্রমণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি। পুলিশ জিন্নুরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে ওসি জানান। অপর একটি সূত্র জানায়, হাতিয়ায় ইদানীং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জ ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। প্রতিটি বাজারেই ২/৩টি অটোরিকশা চার্জ ব্যবসা কেন্দ্র রয়েছে। খবির মিয়া বাজারে আওয়ামী লীগ নেতা জিন্নুরের একটি অটোরিকশা চার্জ ব্যবসা কেন্দ্র রয়েছে। এরই মধ্যে নিহত মাদরাসা ছাত্র নিরবের পিতা বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত মিরাজ উদ্দিন আরো একটি অটোরিকশা চার্জ ব্যবসা কেন্দ্র চালু করে। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন দ্বন্দ্ব, কথাকাটাকাটি ও হুমকি-ধামকি চলে আসছিল। ঘটনার দিন জিন্নুর লোকজন নিয়ে মিরাজের উপর সশস্ত্র আক্রমণ চালালে এ ঘটনা ঘটে।

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য এক দিন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই দিনে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। পরে এই বৈদ্যনাথতলাকেই ঐতিহাসিক মুজিবনগর হিসেবে নামকরণ করা হয়। এর আগে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানোর পর ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচিত জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ১০ই এপ্রিল মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকার মুক্তাঞ্চলে এক বিশেষ অধিবেশনে মিলিত হন এবং স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। এই অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুমোদন ও বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত হয় বাংলাদেশ সরকার। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় তার অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি করা হয়। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। ওই দিন ঘোষিত ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করা হয়। এ ছাড়া জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এবং মেজর জেনারেল এম এ রব চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন। পরের দিন দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকা এবং সংবাদ মাধ্যমে ১৭ই এপ্রিল শপথগ্রহণের এই সংবাদ ফলাও করে ছাপা হয়। অস্থায়ী সরকারের সফল নেতৃত্বে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিনটি উপলক্ষে ঢাকা এবং মুজিবনগরে পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ ভোর ৬টায় ধানমন্ডিস্থ বঙ্গবন্ধু ভবন ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং দেশের সকল জেলা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয়  পতাকা উত্তোলন। সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ। মুজিবনগরের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ১০টায় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে গার্ড অব অনার এবং ১০টা ৩০ মিনিটে মুজিবনগরের মেহেরপুরে শেখ হাসিনা মঞ্চে মুজিবনগর দিবসের জনসভা। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ও ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাসিম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। এ ছাড়াও ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী  ওবায়দুল কাদের।

ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম রুট: অপ্রতুল বরাদ্দ, যাত্রীরা জড়াচ্ছেন বিতণ্ডায় by এম ইদ্রিস আলী

ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিটের চাহিদা দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় টিকিট দিতে না পারায় সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে স্টেশনে কর্তব্যরত কাউন্টার ম্যানেজার ও স্টেশন মাস্টারদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হচ্ছে। এই চিত্র এখন শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনের নিত্যদিনকার ঘটনা। পর্যটকের একটি অংশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপদ বাহন মনে করে আন্তঃনগর ট্রেনসমূহে যাতায়াত করে থাকেন। বিশেষ করে সরকারি ছুটির দিন, বিভিন্ন উৎসবে, সপ্তাহের বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার স্টেশনের বরাদ্দকৃত টিকিটের কোটার চেয়ে তিনগুণ টিকিটের চাহিদা বেড়ে যায়। তাছাড়া প্রতিবছরের নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে টিকিটের চাহিদা দ্বিগুণ থাকে। শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে-৭১৮ নং আন্তঃনগর জয়ন্তিকা ট্রেনে শোভন চেয়ার ঢাকার দৈনিক কোটা ২৫টি। প্রথম শ্রেণি এসি ৬টি।  শোভন ২০টি। মাসিক কোটা ৬৫০টি। অথচ শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনের গত মার্চ মাসের টিকিট বিক্রির এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ স্টেশনে মাসিক কোটার বিপরীতে ৬৫৩ টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। বিক্রির হার ১০১%। শোভন সিটে এ স্টেশনে দৈনিক কোটা আছে ২০টি। মাসিক কোটা ৫২০টি। বিক্রি হয় ৭২৩ টি। বিক্রির হার ১৩৯%। এ ট্রেনে  প্রথম সিট বা কেবিনের দৈনিক কোটা আছে ৯টি। বিক্রির হার ২৩৩%। কালনী ট্রেনে প্রথম শ্রেণির শ্রীমঙ্গল স্টেশনে দৈনিক কোটা ৬টি। শোভন চেয়ার ২০টি। শোভন ২৫টি। মাসিক কোটা ১৫৬। বিক্রি শতভাগ। শোভন চেয়ারের দৈনিক কোটা ২০টি। মাসিক কোটা ৫২০টি। বিক্রি শতভাগ। শোভন সিটের দৈনিক কোটা ২৫টি। মাসিক ৬৫০টি। বিক্রি ৮৩৭। হার ১২৯%। এ ট্রেনে এসি নেই। চাহিদা ব্যাপক রয়েছে। ৭১০ নং পারাবত ট্রেনে দৈনিক ঢাকার কোটা শোভন চেয়ার ৬০টি। এসি চেয়ার ৩০টি ও এসি কেবিন ১৫টি। মাসিক ১৬২০টি। বিক্রি হয় ১৯১৫টি। বিক্রির হার ১১৮%। কোটা নেই অথচ শায়েস্তাগঞ্জে বিক্রি হয় ৮৬টি। নোয়াপাড়া স্টেশনে বিক্রি হয় ১৫৮টি। একই ভাবে আজমপুর স্টেশনে বিক্রি হয় ৯৯টি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে দৈনিক কোটা ৫টি। মাসিক কোটা ১৩৫। বিক্রি হয় ১৭৪টি। হার ১২৯%। ভৈরব স্টেশনে কোনও কোটা নেই অথচ বিক্রি হয় ২২টি। ৭৪০ নং উপবন ট্রেনে ঢাকার দৈনিক কোটা চেয়ার ২০টি। শোভন ২৫টি। নন এসি প্রথম শ্রেণি চেয়ার ৬টি। স্লিপিং বার্থ ৬টি। সব মিলিয়ে মাসিক কোটা ৯৩০টি। কিন্তু এর বিপরীতে বিক্রি হয় ১৪৫৬টি। টিকিট বিক্রির হার ১৫৭%। শ্রীমঙ্গল থেকে চট্টগ্রামগামী ৭২০ নং পাহাড়িকা ট্রেনে চট্টগ্রামে দৈনিক কোটা ৪০টি। মাসিক কোটা ১০৪০টি। বিক্রি হয় ১২৩৫টি। হার ১২৯%। এর মধ্যে শোভন ৩০টি। এসি ৪টি। প্রথম শ্রেণি নন এসি ৪টি। কুমিল্লা লাকসাম ১০টি। কুমিল্লা স্টেশনের দৈনিক যাত্রী কোটা ১৩০। কিন্তু সেখানে বিক্রি হয় ২৯৭টি। বিক্রির হার ২২৮%। কসবা স্টেশনে কোন কোটা নেই। অথচ এ স্টেশনে বিক্রি হয় ১০৯টি। আখাউড়া স্টেশনে মাসিক কোটা ১৩০। বিক্রি হয় ৪২৭ টি। লাকসামে কোন কোটা নেই অথচ বিক্রি হয় ৩৩৯টি। লাঙ্গলকোটে মাসিক কোটা ১৩০। বিক্রি হয় ২১৯। বিক্রির হার ১৬৮%।
৭২৪ নং চট্টগ্রামগামী উদয়ন ট্রেনে শ্রীমঙ্গল থেকে চট্টগ্রামে দৈনিক কোটা শোভন ৩০টি। মাসিক কোটা ৮১০। বিক্রি হয় ১১১৩। হার ১৩৭%। এ স্টেশন থেকে আখাউড়া স্টেশনে কোটা নেই অথচ বিক্রি হয় ৪৫টি। কুমিল্লা স্টেশনে মাসিক কোটা ১৩৫। বিক্রি ৩৫২। টিকিট বিক্রির হার ১৬১%। লাকসাম স্টেশনের মাসিক কোটা ১৩৫। বিক্রি ২৭৭। বিক্রির হার ২০৫%। এ ট্রেনে শোভন চেয়ার, এসি চেয়ার ও স্লিপিং বার্থ নেই।
জানতে চাইলে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনের মাস্টার মো. জাহাঙ্গীর আলম দৈনিক মানবজমিনকে বলেন- ‘শ্রীমঙ্গল স্টেশনে যাত্রীদের টিকিট পাওয়ার সংখ্যা আর না পাওয়ার সংখ্যা প্রায় সমান। এক্ষেত্রে যারা টিকিট পান না তারা আমাদের গালাগাল দিচ্ছে বাক-বিতণ্ডা হচ্ছে। না পেয়ে ক্ষোভে কেউ বলছে টিকিট কালোবাজারি হচ্ছে। স্টেশন মাস্টার জাহাঙ্গীর আরও বলেন- ‘এসব ট্রেনে এসি চেয়ার, কেবিনসহ অন্যান্য সিটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যাত্রীদের দাবি অনুযায়ী বৃহস্পতি, শুক্র, শনিবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে যদি ট্রেনগুলোতে অতিরিক্ত বগি সংযোজন হতো তাহলে সাধারণ যাত্রী ও দেশি-বিদেশি পর্যটকরা শ্রীমঙ্গলে স্বাচ্ছন্দ্যে রেলভ্রমণ করতে পারতেন। অন্যদিকে রেলের সুনাম বৃদ্ধিসহ আয় বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীদের দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব হতো’।

মায়ের পরকীয়ায় স্কুলছাত্রকে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন

আড়াইহাজারের বাড়ৈপাড়া এলাকায় পরকীয়ায় আসক্ত মা ও প্রেমিকের নির্মমতার শিকার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র হৃদয় (৯) হত্যার প্রতিবাদে দোষীদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছে উপজেলার ৩৫নং বাড়ৈপাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। সোমবার বেলা ১১টার দিকে ৩৫নং বাড়ৈপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে অন্যান্য কয়েকটি বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ  অংশ নেন। ১৩ই এপ্রিল রাতে শেপালী আক্তার ও তার পরকীয়া প্রেমিক রাশেদুল ইসলাম মোমেন ঘুমন্ত দুই শিশুকে কাঁথা মুড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ঘটনাস্থলে শেপালী আক্তারের বড় ছেলে হৃদয় মারা যায় এবং ছোট ছেলে জিহাদ আগুনে মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়। তারা ওই বিদ্যালয়ের তৃতীয় ও প্রথম শ্রেণির ছাত্র। মানববন্ধনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বক্তারা বলেন, ঘটনার ৫ দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ মূল অভিযুক্ত রাশেদুল ইসলাম মোমেনকে গ্রেপ্তার করছে না। মানববন্ধনে আগুনে ঝলসানো শিশু জিহাদকে উপস্থিত করা হলে অনেকেই কান্নাকাটি করেন। এলাকাবাসী রাশেদুল ইসলাম মোমেনকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান। মানববন্ধনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কামরুজ্জামান, আড়াইহাজার থানা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি লোকমান হোসেন, আড়াইহাজার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম, সাইফুল ইসলাম, নজির মেম্বার, খোকন, বাদল প্রমুখ।
এদিকে নিহত হৃদয়েরর দাদা বাদী হয়ে আড়াইহাজার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ঘাতক মা শেপালীকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও পলাতক রয়েছে রাশেদুল ইসলাম মোমেন। এদিকে ১৪ই এপ্রিল হত্যার দায় স্বীকার করে শেপালী আক্তার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

মিয়ানমারে প্রথম রোহিঙ্গা পরিবারের প্রত্যাবর্তন ‘শঠতা’

বাংলাদেশ থেকে প্রথম রোহিঙ্গা পরিবারের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। ইউরোপে রোহিঙ্গা অধিকার কর্মীদের পরিচালিত ওয়েবসাইট রোহিঙ্গা ব্লগার বলছে, এই প্রত্যাবর্তন এক ধরনের  ‘শঠতা।’ শনিবার ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার ঘোষণা দেয় যে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ৫ সদস্যের একটি পরিবার রাখাইনে ফিরেছে। গত বছরের আগস্টে রাখাইন অঙ্গরাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমার। এর পর থেকে কমপক্ষে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। মিয়ানমারের সামরিক অভিযানকে জাতিসংঘ বর্ণনা দিয়েছে ‘জাতিগত দমন অভিযানের প্রকৃষ্ট উদাহরণ’ হিসেবে। আল জাজিরার খবরে বলা হয়, মিয়ানমার সরকারের ফেসবুক পোস্টে ওই রোহিঙ্গা পরিবারকে ফেরানোর ঘোষণার পাশাপাশি কিছু ছবিও দেয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, পাঁচ সদস্যের ওই পরিবারের হাতে পরিচয়পত্র তুলে দিচ্ছেন উর্দিধারী কর্মকর্তারা। এই পরিচয়পত্র অবশ্য নাগরিকত্বের সনদ নয়। ওই পরিবারকে স্বাস্থ্যসেবা ও রেশন দিতেও দেখা যায় ছবিতে।
সরকারি ওই ঘোষণায় রোহিঙ্গা পরিবারকে শুধু ‘মুসলিম’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদেরকে জাতিগত গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। তবে আরো লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে কীভাবে বা কখন প্রত্যাবর্তন করা হবে, তার ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি ওই বিবৃতিতে।
রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের এক নেতা বার্তা সংস্থা এএফপির কাছে ওই রোহিঙ্গা পরিবারের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রোহিঙ্গা ব্লগার ওয়েবসাইট অবশ্য বলছে, ছবিতে দেখানো ব্যক্তিবিশেষ হলো টং পো লাত্যা গ্রামের প্রশাসকের পরিবারের সদস্যরা। যেসব শরণার্থী ফিরে যাবেন তাদের জন্য নির্ধারিত প্রবেশ পথ হলো এই গ্রাম।
রোহিঙ্গা ব্লগার ওয়েবসাইটকে একটি সূত্র জানায়, ‘রাখাইনে বর্তমানে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সেই অবস্থায় কেউ সেখানে ফিরে যাবেন, এটা শুনে আমরা হতভম্ব।’ ওয়েবসাইটটি বলছে, তাদের নিজস্ব তদন্ত শেষে জানা গেছে, মূলত অন্যান্য রোহিঙ্গা পরিবারকে ফিরে যেতে রাজি করাতেই এই সাজানো প্রত্যাবর্তন।
ওই পরিবারকে ফিরিয়ে নেয়ার অনুষ্ঠানকে ‘ভুয়া অনুষ্ঠান’ আখ্যায়িত করে ওয়েবসাইটটি বলছে, এর উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদেরকে প্রলুব্ধ করে মিয়ানমারে নিয়ে সেখানকার শিবিরে বন্দি করে রাখা।
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস (এফআইডিএইচ)-এর আন্দ্রিয়া জর্জেত্তা এএফপিকে বলেন, সরকারের ওই ঘোষণা ‘এক ধরনের জনসংযোগ প্রচেষ্টা, যার উদ্দেশ্য হলো রাখাইন রাজ্যে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার বিচার করার প্রয়োজনীয়তা থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে দেয়া।’ তিনি আরো বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরুর আগে, মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদেরকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তাদের সকল মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।’