Wednesday, July 15, 2020

সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন শিরাজী by সৈয়দ শামীম শিরাজী

১৮৯৯ সালের কোনো একদিন। সিরাজগঞ্জ শহরতলির বড়ইতলা মাঠে (বর্তমানে পদ্ম পুকুরের পাশে) সভা চলছে। সভার প্রধান আকর্ষণ তৎকালীন মুসলিম বাংলার জনপ্রিয় নেতা, প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক যশোরের মুন্সী মেহেরুল্লাহ। খ্রিষ্টান মিশনারিদের সঙ্গে লড়াই করে বাংলাদেশের মুসলমানদের কাছে তিনি তখন মর্দে মুজাহিদের মর্যাদা লাভ করেছেন। এ সময় বাংলাদেশের সহজ সরল দরিদ্র শ্রেণির মুসলমানদের সামনে নানা প্রলোভনের ফাঁদ পেতে খ্রিষ্টান পাদ্রিরা তাদের ধর্মান্তরিত করছিল। সেদিন মুসলমানদের ধর্মান্তর রোধ করতে বাংলাদেশের কোনো জমিদার, নেতা কেউই এগিয়ে আসেননি- এলেন যশোরের দড়াটানার একজন অতি সাধারণ মানুষ- দর্জি মুন্সী মেহেরুল্লাহ। তার জ্ঞানগর্ভ ও বুদ্ধিমত্তার বলে প্রতিরোধের মুখে খ্রিষ্টান মিশনারিদের সে অপতৎপরতা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। তিনি তাদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে ওঠেন। একের পর এক বাহাসে তার কাছে পরাজিত হয়ে মুখ কালি করে নিজেদের মিশনে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে বাঘা বাঘা পাদ্রি। এ সাহসী ভূমিকার কারণে সারা বাংলাদেশেই অত্যন্ত মশহুর হয়ে ওঠেন মুন্সী মেহেরুল্লাহ। অক্লান্ত এ মানুষটি যেখান থেকে ডাক আসে, সেখানেই ছুটে যান। শোনান ধর্মের কথা। ইসলামের মূল আদর্শের কথা। তার যুক্তিপূর্ণ জ্ঞানগর্ভের কথা শুনে মুসলমানরা বিপর্যয়ের মধ্যে আশার আলো দেখতে পায়, ঈমানি জজবায় নতুন করে বলীয়ান হয়ে ওঠে। সেই ত্যাগী মুন্সী মেহেরুল্লাহ আসছেন বড়ইতলার ধর্মসভায়Ñ এ কথা শুনে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল, বগুড়াসহ নানা স্থান থেকে মানুষ এসে হাজির হয়েছে। মুন্সী মেহেরউল্লাহর জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনবে তারা।
স্থানীয় বক্তাদের বক্তৃতা শেষ পর্যায়ে। এর পরই মুন্সী মেহেরউল্লাহ জ্বালাময়ী বক্তৃতা করবেন। এমন সময় সভার আয়োজকদের মধ্যে এক বিশিষ্ট ব্যক্তি মুন্সী সাহেবের কাছে এসে বললেন, হুজুর একটি ছেলে সভায় কিছু কথা বলতে চায়। একটি কবিতা সে পাঠ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করছে এ সভায়। আমরা তাকে চিনি। এ শহরেরই ছেলে, খুব শরিফ ঘরের। যেমন তেজস্বী তেমনি ভালো বক্তা। আপনি যদি মেহেরবানি পূর্বক অনুমতি দেন তাহলে ছেলেটি দু-চার কথা বলতে পারে। উদার হৃদয়ের খাঁটি মানুষ মুন্সী মেহেরউল্লাহ সাহেব সহজেই অনুমতি দিলেন। ছেলেমানুষ বলুক দু-চার কথা। সভা-সমিতিতে কথা বলতে পারে এমন ছেলের দেখা-সাক্ষাৎ মুসলমান সমাজে বেশি মেলে না। এ ছেলেটি যখন আগ্রহ করে সভায় কথা বলতে দুঃসাহস করছে, তাকে সুযোগ দিয়ে দেখা যাক না কী বলে।
সুঠাম দেহের তরুণ যুবক বক্তৃতা শুরু করলেন। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পর মুন্সী মেহেরউল্লাহর মনোযোগের পুরোটাই কেড়ে নেয় সেই তরুণ। ততক্ষণে তার কণ্ঠে মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জনের আভাস ধ্বনিত হতে শুরু করেছে। মুন্সী সাহেব অবাক দৃষ্টিতে এই প্রথম যুবকের দিকে তাকালেন। ছেলে ঠিক নয়- মাঝারি উচ্চতার কিন্তু বলিষ্ঠ দেহের সদ্য কৈশোর পেরোনো এক উচ্ছল তরুণ। কোরআন, হাদিস, ইসলামের ইতিহাস, মুসলমানদের বর্তমান দুরবস্থা সবই তার কথায় উঠে আসছে। আশ্চর্য! এত বড় সভা, হাজার হাজার লোক। মাইক নেই; কিন্তু বিনা মাইকেই তার বজ্রগম্ভীর কণ্ঠস্বর সভাস্থলের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে অনায়াসে। কিছুক্ষণ পরই শেষ করল সে। সবার কাছে সবিনয়ে অনুমতি চাইল একটি জাতীয় কবিতা পাঠের। অতি সহজেই তা মিলে গেল। জানাল, কবিতাটি তার নিজেরই লেখা। যা হোক, কবিতা পাঠ শুরু করল সে। কবিতাটির নাম ‘অনল প্রবাহ’- বিশাল অগ্নিঝরা কবিতা।
আর ঘুমিও না নয়ন মেলিয়া
ওঠরে মুসলিম ওঠরে জাগিয়া
আলস্য জড়তা পায়েতে ঠেলিয়া
পূত বিভু নাম স্মরণ করি।

বিস্ময়, আনন্দে শিহরিত হয়ে উঠলেন মুন্সী মেহেরউল্লাহ। সুদীর্ঘ সে বক্তৃতার পুরোটাই শুনলেন তিনি মুগ্ধ হয়ে। কবিতা নয়- যেন আগুন ঝরছে লেখকের কণ্ঠে। তার বক্তব্যে মুসলমানরা ঘুমিয়ে আছে। তারা বেখেয়াল। তারা সব জায়গায় মার খাচ্ছে। ইংরেজরা এদেশের শাসক। হিন্দুরা তাদের সহযোগিতা করে কত উন্নতি লাভ করছে। আর বাদশাহর জাতি মুসলমান আজ সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। তাদের অবস্থা যেন মৃতপ্রায়। একদিন সারা বিশ্বে যে মুসলমানরা সভ্যতার আলো ছড়িয়েছিল, তারা আজ চরম দুর্দশায়; কিন্তু আর নয়। ওঠ, মুসলমানরা জাগো। শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন দাও, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করো। ব্রিটিশদের অধীনে আর গোলাম থাকা নয়। স্বাধীনতা লাভ করতে হবে। মুসলমানরা, সিংহের বিক্রমে মাথা তুলে দাঁড়াও। আল্লাহর নাম স্মরণ করে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়। তোমরা বিশ্বের সেরা জাতি ছিলে। আবার সেরা জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর দেরি নয়, ওঠো মুসলমান জেগে ওঠো।
মুন্সী মেহেরউল্লাহ নিজেই নিজেকে বললেন, এ যেন আমারই উত্তরসূরি। বাংলাদেশে এত মুসলমান, দু-চারজন লেখকের দেখাও এখন মিলছে। কিন্তু এ রকম বজ্রনিনাদ, মুসলমানদের জেগে ওঠার এমন বলিষ্ঠ আহ্বান তো আর কারও কণ্ঠে শোনা যায়নি। কিংবা কারও লেখায়ও দেখা যায়নি। এ রকম সাহস তো আর কারও মধ্যে দেখিনি। মহাশক্তিমান ব্রিটিশ সরকারকেও পরোয়া করে না- কে এই তরুণ!
তরতাজা এ তরুণকে মুন্সী সাহেব কাছে ডেকে নিলেন। কত আর বয়স, আঠারো-উনিশ হবে বোধ হয়। বুকে জড়িয়ে ধরে যেন সান্ত¡না খুঁজে পেলেন। ভাবলেন ভবিষ্যতে আমার দলের কান্ডারি হবে। উৎসাহ দিলেন আরও লেখার জন্য। এ রকম আগুনঝরা লেখাই তো এখন চাই। মোক্ষম সময়ই তুমি লিখেছ। বাংলার ঘুমন্ত মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তুলতে হলে তাদের বজ্রের গর্জন শোনাতে হবে, সেতারের সুললিত ঝংকার নয়, এখানেই থেমে থাকলেন না বাংলার মর্দে মুজাহিদ মুন্সী মেহেরউল্লাহ। কিছুদিনের মধ্যে টাকা-পয়সা জোগাড় করে তার সেই কাব্য পুস্তকটি প্রকাশ করলেন যশোর থেকে। বাংলার মুসলমান বিশেষ করে যুব তরুণ সমাজের কাছে পৌঁছে গেল জ্বালাময়ী কাব্য ‘অনল প্রবাহ’। সেই তরুণের নাম সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন শিরাজী। এ গ্রন্থ প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকারের ভিত কেঁপে ওঠে।
১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে অনল প্রবাহ কাব্য সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং ইসমাইল হোসেন সিরাজীকে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে দুই বছর সশ্রম কারাদ- দেয়। মুসলমানদের মধ্যে সিরাজীই প্রথম যিনি কবিতা লেখার অভিযোগে কারাদ- ভোগ করেন। সে সময় মহকুমা ম্যাজিস্ট্র্রেট লয়েড অনল প্রবাহ বাজেয়াপ্ত করতে এসে সিরাজী সাহেবের ফ্যামিলি লাইব্রেরির গ্রন্থগুলো আগ্রহ সহকারে দেখে মন্তব্য করেন,  "সিরাজী শুধু একজন জাতীয় কবি এবং উচ্চস্তরের বাগ্মীই নহেন, তিনি একজন বিরাট পন্ডিত ব্যক্তি)।" মুন্সী মেহেরউল্লাহর বদৌলতে সিরাজী গ্রন্থখানা ছাপা হওয়ায় এবং ব্রিটিশ সরকার তাকে জেল দেওয়ায় সিরাজীর নাম সর্বত্র আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।  উৎসাহ-উদ্দীপনায় সিরাজী আরও ক্ষুরধার অস্ত্রে পরিণত হয়ে উঠল। ইংরেজীতে একটি কথা আছে, যার সারকথা ‘রচনাশৈলীর ভেতরেই মানুষটির যথার্থ পরিচয়।’ সিরাজী সাহেবের রচনাভঙ্গি তার বৈশিষ্ট্য সূচিত করে। সে অগ্নি তার কবিতা, সংগীত, কাব্য, বাগ্মিতা ও কর্মপ্রচেষ্টায় ছড়িয়ে পড়েছিল। জাতির জীবনে তা নিষ্ফল হয়নি। মানুষের প্রতি, জাতির প্রতি, কওমের প্রতি কোনো অন্যায় জুলুম তিনি সহ্য করেননি। জাতির মানমর্যাদা রক্ষার্থে আজীবন আপসহীন সংগ্রাম করেছেন। জাতির কল্যাণ, সমাজের কল্যাণ এবং মুসলমান সমাজভুক্ত মানুষের কল্যাণ তার জীবনের উদ্দেশ্য ছিল। ধর্মের অনুসারীদের তিনি সব ভয়-ভীতি, দুঃখ-দৈন্যের, ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও অগ্রসর হওয়ার আহ্বান শুনিয়েছেন। শিক্ষায়, সাহিত্যে, জীবনে তিনি বিজাতীয় অন্ধ অনুকরণের তীব্র প্রতিবাদ যেমন করেছিলেন, তেমনি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান আয়ত্ত করার জন্য প্রবল উৎসাহ সঞ্চার করাও তার জীবনের ব্রত ছিল। দেশের স্বাধীনতার অর্থে এ দেশের কোটি কোটি শ্রমক্লিষ্ট, কৃষক-মজুরের জীবন বিকাশের সুষ্ঠু ব্যবস্থাই বুঝিয়েছেন।
সর্বগুণে গুণান্বিত মুন্সী সাহেব একাই একাধিক দায়িত্ব পালন করে সফলকাম হয়েছেন। সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন অতুলনীয় বাগ্মী। বাগ্মিতায় সে সময় মুসলমানদের মধ্যে তার সমকক্ষ কেউ ছিল না। ধর্ম-সমাজ, স্বাধীনতা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তা, মুসলমানদের জাগরণের কথা, সব বিষয়ে কথা বলার যোগ্যতা ছিল তার। তার সেই তেজস্বী কণ্ঠের বক্তৃতা লোকজন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। মানুষকে বক্তৃতার মাধ্যমে প্রভাবিত করার ঈর্ষণীয় ক্ষমতা ছিল তার। একইভাবে গাজী সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজীও পরবর্তীকালে বাংলার অদ্বিতীয় বাগ্মী, বক্তৃতার জাদুকর, বাংলার এডমন্ড বার্ক ইত্যাদি আখ্যায় আখ্যায়িত হয়েছিলেন। এজন্যই বলা যায়Ñ যখন এক ধাপ এগিয়ে যায় তখনই তো আকাক্সক্ষা পূর্ণ হয়। মুন্সী মেহেরুল্লাহর সান্নিধ্য, সংস্পর্শ পেয়ে তেমনি বেগবান হয়ে উঠেছিল সিরাজী। সেই সঙ্গে মুন্সী সাহেবের আদর্শকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে সিরাজী বিদ্রোহী কবি নজরুলকে উৎসাহিত, অনুপ্রাণিত করেছিলেন। নজরুলের ভাষায়Ñ “আমি তখন প্রথম ভয়ে ভয়ে কাব্য-কাননে পা টিপে টিপে প্রবেশ করেছি- ফিঙ্গে বায়স বাজপাখির ভয়ে ভীরু পাখির মতো কণ্ঠ ছেড়ে গাইবারও দুঃসাহস সঞ্চয় করতে পারিনি। নখচক্ষুর আঘাতও যে না খেয়েছি এমন নয়- এমনি ভীতির দুর্দিনে মানি অর্ডারে আমার নামে দশটা টাকা এসে হাজির। একপাশে সিরাজী সাহেবের হাতের লেখা, ‘তোমার লেখা পড়িয়া সুখী হইয়া দশটি টাকা পাঠাইলাম। ফিরাইয়া দিও না, ব্যথা পাইব। আমার থাকিলে দশ হাজার টাকা পাঠাইতাম।’ চোখের জলে স্নেহ-সুধাসিক্ত ওই কয় পঙ্্ক্তি লেখা বারে বারে পড়লাম। টাকা দশটা লয়ে মাথায় ঠেকালাম। তখনও আমি তাকে দেখিনি। কাঙ্গাল ভক্তের মত দূর হতেই তার লেখা পড়েছি। মুখস্থ করেছি। শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি।”
সে সময়ে সিরাজীর দশটি টাকা কবি নজরুলকে কতটা অনুপ্রাণিত করেছিল নজরুলের উপর্যুক্ত অভিমতে তা স্পষ্ট। শুধু তাই নয়, কায়কোবাদ যখন মহাশ্মশান লিখে অর্ধশিক্ষিত মুসলমানদের চাপের মুখে পড়লেন। ঠিক তখনি সিরাজী তাকে সোনার দোয়াত-কলম উপঢৌকন দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তাকে সে বিপদ থেকে উদ্ধার করলেন। একইভাবে পল্লীকবি জসীমউদ্্দীনকে সিরাজী উৎসাহিত করেছিলেন। আবার সিরাজীর মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র তূর্যনাদের অমর কবি সৈয়দ আসাদুদ্দৌলা সিরাজী কবি নজরুল ইসলামকে সিরাজগঞ্জে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। বিদ্রোহী কবি তখন বাণীকুঞ্চে এসে সিরাজীর মাজারে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘এ যেন হজ্ব করতে এসে কাবা শরিফ না দেখে ফিরে যাওয়া।’

জাকাত কে কাকে দেবেন by মুফতি এহছানুল হক মুজাদ্দেদী

প্রধানত ইসলামি রাষ্ট্রের জিহাদরত, জিহাদে আহত বা জিহাদের খাত। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) বলেন, ফি সাবিলিল্লাহর অর্থ- যারা ইসলাম প্রচার প্রসারের কাজে নিয়োজিত আছেন।
‘জাকাত’ আরবি শব্দ। অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, পবিত্রতা বা পরিশুদ্ধতা। জাকাতের আরেক অর্থ পরিবর্ধন। ইসলামি বিশ্বকোষে জাকাতের অর্থ লেখা আছে, জাকাত অর্থ পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে নবী (সা.)! আপনি তাদের মালামাল থেকে জাকাত গ্রহণ করুন, যাতে আপনি এর মাধ্যমে সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং বরকতময় পরিশুদ্ধ করতে পারেন।’ (সূরা তওবা : ১০৩)। এটাকে জাকাত বলার কারণ হলো এভাবে জাকাত দাতার অর্থসম্পদ এবং তার নিজের আত্মা পবিত্র-পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। প্রিয় রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘জাকাত ইসলামে ধনী-গরিবের সেতুবন্ধন।’ (মুসলিম)।
যাদের ওপর জাকাত ফরজ
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন সব ‘সাহেবে নিসাব’ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ, সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মালিক মুসলিম পরুষ-নারীর ওপর জাকাত প্রদান করা ফরজ। কোনো ব্যক্তি মৌলিক প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যতীত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার পর চাঁদের হিসাবে পরিপূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে তার ওপর পূর্ববর্তী বছরের জাকাত প্রদান করা ফরজ। অবশ্য যদি কোনো ব্যক্তি জাকাতের নিসাবের মালিক হওয়ার পাশাপাশি ঋণগ্রস্ত হয়; তবে ঋণ বাদ দিয়ে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে, তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। জাকাত ফরজ হওয়ার পর যদি কোনো ব্যক্তি জাকাত প্রদান না করে টাকা খরচ করে ফেলে, তাহলেও তাকে তার পূর্বের জাকাত দিতে হবে। নাবালেগ ও পাগলের ওপর জাকাত ফরজ হবে না। কারণ তাদের ওপর শরিয়তের বিধান আরোপিত হয় না। তবে যদি কোনো মস্তিষ্ক বিকৃত ব্যক্তি নিসাবের মালিক হওয়ার সময় এবং বছর পরিপূর্ণ হওয়ার সময় সুস্থ থাকে; কিন্তু মধ্যবর্তী সময় মস্তিষ্ক বিকৃতির শিকার হয়, তাহলেও তাকে জাকাত প্রদান করতে হবে।
জাকাত বণ্টনের খাত
জাকাত বণ্টনের ব্যাপারে কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণা হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই সদকা (জাকাত) তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটাই আল্লাহর বিধান।’ (সূরা তওবা : ৬০)।
মহাগ্রন্থ কোরআনের আলোকে জাকাত ব্যয়ের খাত আটটি। যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো।
নিঃস্ব ফকির : ফকির বলা হয় যার কোনো সম্পদ নেই, নেই তার উপযোগী হালাল উপার্জন, যা দ্বারা তার প্রয়োজন পূরণ হতে পারে। যার খাওয়া-পরা ও থাকার স্থান নেই। অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেই। আবার কেউ বলেছেন, ফকির সে, যার সামান্য সম্পদ আছে। তবে জীবন ধারণের জন্য অপরের ওপর নির্ভর করে।
অভাবগ্রস্ত মিসকিন : মিসকিন বলা হয় যার এমন পরিমাণ সম্পদ আছে, যা দ্বারা তার ওপর নির্ভরশীল লোকদের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট নয়। মিসকিন সেই, যার কোনো কিছুই নেই। আবার কারও মতে, মিসকিন সে ব্যক্তি যার কিছু সম্পদ আছে; কিন্তু লজ্জা সম্মানের ভয়ে কারও কাছে হাত পাতেন না যারা। তারা জীবন-জীবিকার জন্য প্রানান্তকর প্রচেষ্টা করার পরও প্রয়োজন মতো উপার্জন করতে পারেন না। এতকিছুর পরও নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারেন না। মোটকথা, মিসকিন এমন ব্যক্তিকে বলা হয়, যার কিছুই নেই, যিনি মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়ান এবং খোরাক-পোশাকের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী হন।
জাকাত বিভাগের কর্মচারী : যারা জাকাত আদায়কারী, সংরক্ষণকারী, পাহারাদার, লেখক, হিসাবরক্ষক এবং জাকাতের বণ্টনকারী এদের সবাইকে জাকাতের ফান্ড থেকে বেতন দিতে হবে। তবে এমন যেন না হয়, আমিল কর্মচারীদের পারিশ্রমিক দিতে গিয়ে জাকাতের কোনো অর্থ অবশিষ্ট না থাকে, সে ক্ষেত্রে তাদের আদায়কৃত জাকাতের অর্ধেকের বেশি দেওয়া যাবে না। এ ব্যবস্থা এজন্য করা হয়েছে, যেন তারা জাকাতের মালের মালিকদের থেকে অন্য কিছু গ্রহণ না করেন। বরং এটা আসলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের আওতায় পড়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ববান জাকাতের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা, গঠন ও পরিচালনা করবেন।
যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য : ইসলামের জন্য যাদের মন আকর্ষণ করা প্রয়োজন কিংবা ইসলামের ওপর তাদের সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য এমন লোকদের জাকাতের খাত থেকে জাকাত প্রদান করা। অধিকাংশ হানাফি আলেমের মতে, এ খাতটি রহিত হয়ে গেছে।
দাসমুক্তির জন্য : যে ক্রীতদাস তার মালিককে অর্থ প্রদানের বিনিময়ে মুক্তিলাভের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এখানে এ পর্যায়ে মুসলিম যুদ্ধবন্দিও এ খাতের আওতায় পড়বেন। কাজি ইবনুল আরাবি বলেন, মুসলিম দাসকে যখন মুক্ত করতে জাকাতের খাত থেকে দেওয়া যাবে, ঠিক তেমনি মুসলিম বন্দিকে ও কাফেরদের দাসত্ব শৃঙ্খলা ও লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত করার কাজে জাকাতের অর্থ ব্যয় করা অধিক উত্তম বলে বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে বিখ্যাত তাফসিরকারদের অভিমত, কোরআনে ফির রিকাব বলে জাকাতের যে ব্যয় খাতটি নির্দিষ্ট করা হয়েছে তাকে পরাধীন গোত্র ও জাতিগুলোকে মুক্ত করার কাজে ও ব্যবহার করা যাবে।
ঋণগ্রস্তদের জন্য : এমন ব্যক্তি, যিনি ঋণভারে জর্জরিত অবস্থায় পতিত। তাকে জাকাতের ফান্ড থেকে সাহায্য করা। তবে যে কোনো অসৎ কাজে বা অপব্যয়ের কারণে ঋণগ্রস্ত হলে তওবা না করা পর্যন্ত জাকাতের ফান্ড তাকে দেওয়া যাবে না। আবার ঋণগ্রস্ত এর পর্যায়ে যেমন জীবিত ব্যক্তি শামিল, তেমনি মৃত ব্যক্তিও এর আওতায় পড়ে, মৃতব্যক্তি যিনি ঋণ রেখে মারা গেছেন। ইমাম কুরতুবি (রহ.)ও তাই বলেছেন।
আল্লাহর পথে : প্রধানত ইসলামি রাষ্ট্রের জিহাদরত, জিহাদে আহত বা জিহাদের খাত। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) বলেন, ফি সাবিলিল্লাহর অর্থ- যারা ইসলাম প্রচার প্রসারের কাজে নিয়োজিত আছেন।
মুসাফিরদের জন্য : এমন ব্যক্তি, যার নিজ আবাসস্থলে সম্পদ আছে; কিন্তু সফরে তিনি বিপদগ্রস্ত ও নিঃস্ব অবস্থায় আছেন, তাকে জাকাতের তহবিল থেকে সাহায্য করা। তবে তার সফর পাপের কাজের বা অনুরূপ পর্যায়ের কোনো সফর হওয়া যাবে না। আল্লামা তাবারি (রহ.) মুজাহিদ সূত্রে বর্ণনা করেছেন, জাকাতের সম্পদ ধনীর হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের নিঃস্ব পথিকেরও একটি হক রয়েছে। যদি তিনি নিজের ধনসম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

বিদেশি সবজি স্কোয়াস চাষ করবেন যেভাবে

স্কোয়াস মূলত একটি বিদেশি সবজি। এরমধ্যে জুকিনি একটি জনপ্রিয় জাত। বাংলাদেশেও এর চাষ শুরু হয়েছে। আমাদের দেশে লম্বা স্কোয়াস চাষাবাদ হচ্ছে। বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানি স্কোয়াসের বীজ বাজারজাত করছে। তাহলে জেনে নিন স্কোয়াস চাষের নিয়ম-
স্কোয়াসের বীজ একটি একটি করে বপন করা যায়। এছাড়া একটি মাদায় একাধিক বীজও বপন করা যায়। প্রায় ৩ ফুট দূরে দূরে একটি মাদায় ২-৩টি বীজ বপন করা হয়। বীজ প্রায় ১ ইঞ্চি গভীরে বপন করতে হবে। চারা গজানোর পর মাটি তুলে ৬-১২ ইঞ্চি উঁচু করে দিতে হবে। এছাড়া ১-২ ফুট প্রশ্বস্ত করতে হবে। বীজ বপনের ৪-৬ সপ্তাহ পরই ফল ধরতে শুরু করে।

স্কোয়াস চাষে মালচিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। চারা টিকে গেলেই গোড়ার চারপাশে মালচিং করলে তাপমাত্রা ঠিক থাকে এবং মাটি তার আর্দ্রতা ধরে রাখে। বিষয়টি স্কোয়াসের ফলন আগাম ও বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
স্কোয়াস গাছ সপ্তাহে ২ ইঞ্চি পানি শোষণ করে থাকে। তাই প্রয়োজনে সেচ দিতে হবে। গাছে বা ঝাড়ে ৫০ থেকে ৬০ দিনে ফল তোলার উপযুক্ত হয়ে যায়। বিঘাপ্রতি ৫০ কুইন্টাল ফলন হয়।

গল্প- আমার বাবার মাথা by ওকউইরি ওদুর

অনুবাদ : তানভীর আহসান।
ওকউইরি ওদুর জন্ম কেনিয়ার নাইরোবিতে। তার উপন্যাসিকা দ্য ড্রিম চেজারস  কমনওয়েলথ বুক প্রাইজ ২০১২-তে খুব প্রশংসিত হয়েছে। তিনি সম্প্রতি উগান্ডার কাম্পালায় রাইটিভিজম ফেস্টিভ্যাল পরিচালনা করেছেন। তিনি তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই তরুণ লেখিকাদের ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এর শিক্ষক এবং বর্তমানে তার পূর্ণদৈর্ঘ্য উপন্যাসের কাজটি করছেন। >>>>>>
আমি বাবাকে ডেকেছিলাম ওর মাথাটা দেখতে কেমন হয়েছে সেটা দেখার জন্যই, কিন্তু এখন ও এখানেই রয়েছে আর আমি জানিও না যে, ওকে কী করে ফেরত পাঠাবো।

ঘটনাটা শুরু হয়েছিল সেই বিষ্যুদবারে যেবার ফাদার ইগনাটিয়াস কিটগুমে মা মেরির নিষ্পাপ গর্ভ উৎসব থেকে ফেরত এলেন। বয়স্ক মহিলারা তাদের রবিবাসরিয় ফ্রক পরেছিল, আর বয়স্ক লোকগুলো বেড়া থেকে বাগানবিলাসের থোকা তুলে তাদের বুক পকেটে গুঁজে রেখেছিল। একজন বুড়ো তার শিকওয়ারুসিটা খুঁজে পাচ্ছিল না বলে ডরমিটরি থেকে আসতে চাইছিলো না। আমি পীড়াপীড়ি করলে সে তার চুলে চাপড় দিয়ে বলল, ‘খোদার কিরে, তুমি কী আমাকে সবসময় কেমন দেখায় তাই উগাণ্ডার পাদ্রীকে দেখাতে চাও?’

আমি সামনের উঠানে এভোকাডো গাছের তলায় চেয়ারগুলো সাজিয়ে রাখলাম, আর বুড়োবুড়িরা সেখানে বসে তাদের হাসিটা প্র্যাকটিস করে নিতে লাগলো। যে জনাকয়েক হোমে থাকতো না তারাও এলো, এই যেমন ঐ মহিলা যে উত্তর মাতাহারির স্টেজকোচ বাসে ক্যান্ডির হকারি করতো, সেই লোকটা যার একরুমের এপার্টমেন্টটা দিনের বেলায় কিন্ডারগার্টেন আর সন্ধ্যায় বেশ্যাবাড়ি হয়ে যায়, আর সেই মহিলা যার অবৈধ চোলাই খেয়ে গত জানুয়ারিতে পাঁচজন অন্ধ হয়ে গেছে।

ফাদার ইগনাটিয়াস একটা বোদাবোদার পিছনে চড়ে এলেন, আর সবাই তার টুপির ভিতরে একটা করে কয়েন ফেলার পর বোদাবোদার লোকটাকে পঞ্চাশ শিলিং দিলেন। বোদাবোদার লোকটা বলল, ‘ঈশ্বর মহান’, আর তারপর যে রাস্তায় এসেছিল সেই রাস্তায়ই আবার চলে গেল।

ফাদার ইগিনাটিয়াস কোটটা খুললেন আর তার জন্য, ‘ফাদার ইগনাটিয়াস ওকেলো, নতুন পাদ্রি,’ লিখে রাখা চেয়ারটাতে বসলেন, আর বুড়ো মানুষগুলো এতক্ষণ যে হাসিটা প্র্যাকটিস করছিলো সেই হাসিটাই তাকে দিল। হাসি যেটা ঘিয়ের মতন গলে গেল, যেটা তাদের ঠোঁটের কোণা ধরে পিচপিচ করে বেরিয়ে এলো আর তাদের কোলের উপর টুপটুপ করে পড়তে লাগলো, যতক্ষণ না যার জন্য এই হাসি সে বাতাসে টকে ওঠে।

ফাদার ইগনাটিয়াস বললেন, ‘ঈশ্বর আপনাদের সহায় হোন’—মানুষগুলোও বলে উঠলো, ‘আপনারও সহায় হোন’। তারপর তারা গান গাইলো আর চায়ে পাউরুটির টুকরো চুবিয়ে চুবিয়ে ভোজ খেল। যখন তাদের পশমী সোয়েটারের হাতায় ফোঁটা ফোঁটা চা পড়ল, তাদের ধূমায়িত, দারুচিনি জিহ্বা দিয়ে তা চুষেও নিল।

ফাদার ইগনাটিয়াসের সর্বপ্রথম ধর্মোপদেশ ছিল ভালোবাসা নিয়ে : ভালোবাসো তোমার প্রতিবেশিকে যেমন ভালোবাসো নিজেকে, এরকম সব আত্মোপলব্ধি মার্কা কথা। বুড়ো মানুষগুলোর ভালোবাসা নিয়ে কমই আগ্রহ ছিলো। ওরা আসলে কিটগুম জায়গাটা কেমন, আর বাগিসু লোকেরা সত্যি সত্যিই জংলি মানুষখেকো কিনা তাই শুনতেই উন্মুখ ছিল।

আমার জানার আগ্রহ হচ্ছিল যে, ফাদার ইগনাটিয়াস আসলে নিজেকে কী মনে করেন, অন্যদেরকে এমনভাবে ভালোবাসা বিলাতে বলেছেন, যেন ভালোবাসা পাল্লায় ওজন করে গ্লাসের জারে ভরে প্রতিবেশিদের ইচ্ছেমতো নিয়ে যাওয়ার জন্য, তাকের উপর সাজিয়ে রাখা যায়। যেন কেউ একজন দেখে বলতে পারে, ‘দেখ : আমার সবমিলিয়ে দশখানা ভালোবাসা আছে। আচ্ছা, তিনখানা আমার দেশের জন্য রাখলাম আর বাকিসব আমার প্রতিবেশিদের দিয়ে দিলাম’।

মনে হয় যেমন করে ফাদার ইগনাটিয়াস তার মগটা ভরে নিতেন—যতক্ষণ না চা মগটার মেটে কানা উপচে টুলের পায়া ধরে গড়িয়ে তার ক্যানভাসের জুতোটা ভিজিয়ে দিচ্ছে—সেটাই আমার নিজের বাবার কথা ভাবিয়ে তুলেছিল। এই আমি আচোলি শৌর্যের গল্প শুনছি, আর তারপরই আমি আমার বাবার ছবিগুলোকে একসাথে গেঁথে চলেছি, তার হাত-পা নাড়াচ্ছি, তার মুখ দিয়ে কথা বলাচ্ছি। তাই শেষ পর্যন্ত—সে আমার হাতে একটা পুতুল, আর তার সাথে আমার স্মৃতিগুলো একটা নাটকের দৃশ্যের মতন হয়ে গেল।

এমনকি যখন আমি ফাদার ইগনাটিয়াসকে তার ঘর দেখিয়ে দিলাম, টেবিল পরিষ্কার করে চেয়ারগুলো ভেতরে নিয়ে গেলাম, আমার পার্সটা নিলাম আর নিজেকে টেনে উহিরু পর্যন্ত একটা মাতাতু ধরার জন্য ওডেনে নিয়ে গেলাম—আমি আমার বাবার চোখের ভুট্টারঙা ছুলির কথা ভাবলাম, আর তার কোটের পকেটের সেই পঞ্চাশ সেন্টের কয়েন, যার কথা সে সবসময় ভুলে যেত, আর যেরকম করে শনিবার সকালে লোকেরা এসে আমাদের দরজায় ঘা দিত আর বলত, ‘জনসন, এখন তো বাইরে আসা লাগে; পানির পাইপটা ফেটে গেছে আর আমাদের গ্লাসে গু ভরছি’, আর ‘জনসন, কাপড় পরার সময় নেইরে ভাই; যেরম আছো ওরমই বেরিয়ে এসো। মাতারিটা রাতেই বিইয়েছে আর বাচ্চাকে পায়খানায় ফ্ল্যাশ করে দিয়েছে’।

প্রত্যেকদিন কাজের পরে, আমি রাস্তা থেকে একটা পোড়ানো ভুট্টা কিনে ওটার একটা একটা দানা চিবাতাম, আর যখন বাড়িতে পৌঁছতাম, আমার মসলিনের পোশাকটা থেকে মুচড়ে বেরিয়ে একটা ডাংগেরি পরতাম আর এককাপ মসলা-চা খেতাম। তারপর আমি বাবার যন্ত্রপাতির বাক্সটা বাথরুমে নিয়ে যেতাম। আমি ভাঙা টাইলসগুলো ছেনি দিয়ে দেয়াল থেকে খুলে নিতাম, আর ওগুলো আমার বুটের উপর পড়তো আর ধুলো উড়তো, রঙিন কাচের ফাটলের ভিতর দিয়ে লাফিয়ে আসা আগুনের লকলকে জিহ্বার উপর বিস্ফোরিত হতো।

এইবার, যখন আমি এইসব করছি, আমি সেই দিনটার কথা ভাবলাম—যেদিন আমি বাবার পায়ের কাছে বসে ছিলাম। সে মুঠোভর্তি চিনাবাদাম তুলে নিয়ে দু’হাতের তালুতে ঘষলো, এরপর সেগুলোকে চিবালো, তারপর মুখ থেকে নিয়ে আমাকে সেটা খাওয়ালো। ওই বয়সে আমি কৌতূহলীই ছিলাম; নিজের দাঁতে চিবানোর মতো বড় হয়ে গেছি, তারপরও ঐ উষ্ণ, চর্বিত ভালোবাসার লোভ করার মতো ছোট রয়ে গেছি, ভালোবাসা হিতোপদেশমূলক কিংবা কফ সিরাপের কাপে মাপার মতো নয়।

যে বিষ্যুদবারে ফাদার ইগনাটিয়াস কিটগুম থেকে এলেন, আমি বসার ঘরে পুরোটা রাত পেটের উপর শুয়ে আমার বাবার ছবি আঁকলাম। মনে মনে আমি তার চোখ দেখতে পেলাম, মুখের চারপাশের বলিরেখা দেখতে পেলাম, দেখতে পেলাম তার চোখের মনিতে ছোট্ট আলোর বিন্দুটা, যেখানটাতে কান তার মাথার সাথে জুড়েছে সেখানকার ভাঁজও দেখতে পেলাম। এমনকি আমি তার শার্টের কলারে তেল আর ঘামের মোটা দাগটাও দেখতে পেলাম—ছোট ছোট বাদামী শিরা যেগুলো ময়লার মূলস্রোত ভেঙে বেরিয়ে নিজেরাই নেমে এসেছিল।

এইসব আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, তারপরও আমি যাই করি না কেনো, তার মাথাটা কাগজের সীমানার ভিতরে কিছুতেই আসতে রাজি হচ্ছিলো না। আমি তার পা থেকে শুরু করলাম আর ক্রমশ উপরের দিকে আঁকতে থাকলাম আর শেষে আমার বাবার মাথাটা কাগজের প্রান্তে, ঘষা তিসির তেল, প্লাস্টিকের গাঁদাফুল আর ভেঁজা বাথরুম চপ্পলের উপরে টুপ করে ভেসে উঠলো।

আমি বউইবোকে কয়েকটা ড্রয়িং দেখালাম। বউইবো বুড়ো মানুষগুলোর হোমের রাঁধুনি ছিল। ওর সাথে আমি একটা সহজ আস্থার সম্পর্ক গড়ে নিয়েছিলাম।

‘ঈশ্বর!’ বউইবো ওগুলো দেখতে দেখতে বিড়বিড় করে বলল, ‘সিমবি, এতো অস্বাভাবিক’।

‘অস্বাভাবিক’ শব্দটা ঝুরঝুরে হয়ে বেরিয়ে এলো, আর এটা টেবিলের তীক্ষ্ণ কানায় লেগে ভেঙে গেল এবং মেঝের প্লাস্টিক কভারের উপর একটা আঠালো দলা হয়ে রইলো। বউইবো হাতের তালুতে ওর মাথাটা রাখলো, আর ওর ক্রিমরঙা কাফতানের ঘটি হাতাটা এমন ফুলে উঠলো যেন ওগুলোর ভিতরে কুমড়ো ঠাসা রয়েছে।

আমি যেটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম সেটা ওকে বললাম, যে খুব সম্ভবত আমার বাবার একটা মুখ থাকলেও তার কোনও মাথা ছিল না। আর যদি আমার বাবার মাথাটা থেকেও থাকে, আমি তা দেখিনি : মানুষের মাথাটা এমন কিছু না যেটা কেউ দেখে। কেউ একজনের দিকে তাকায়, আর যা দেখে সেটা হলো তার মুখ : একটি সাধারণ মুখের আদলের মুখ, যেটা একটি সাধারণ মাথার আদলের মাথাকে ঢেকে রাখে। মুখটা মনে রাখার মতো হলে কেউ দুবার তাকায়। কিন্তু, একজনের চোখকে আরেকজনের মাথার গতানুগতিকতায় আঁকার মধ্যে আসলে কী আছে? বেশিরভাগ সময়ই যখন কেউ কারোর দিকে তাকায়, ওখানে তাদের মাথাটা দেখতেই পায় না।

বউইবো কোমর উঁচু জিকোটার সামনে দাঁড়ালো, আর একটি পাত্রে ফুটন্ত পানির মধ্যে কাসাভা ময়দা ঢাললো আর একটা রান্নার হাতা দিয়ে ওটা নাড়তে শুরু করলো। ‘বাছা,’ সে বললো, ‘তুমি কি করে বুঝেছো যে ঐসব ড্রয়িংয়ের লোকটা তোমার বাবা? ওরতো কোনো মাথাই নেই, কোনো মুখ নেই’।

‘আমি ওর পোশাক চিনেছি। ওই লাল কর্ডুরয়টা, যেটা সে সবসময় হলুদ শার্টটার সাথে মিলিয়ে পরতো’।

বউইবো মাথা নাড়লো। ‘শুধু একটা হালকা ঝুড়ি দিয়েই যে কেউ বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পারে’।

দিনের এই সময়টায় বুড়ো মানুষগুলো তাদের কাঠের পুঁতির ছড়ায় হাত বুলাতো আর মন্ত্রপাঠের মধ্যে মধ্যে ঘুম তাড়াতে নাক দিয়ে বিকট শব্দ করতো। আমি তাদেরকে একটি ছোট, অপ্রতিভ ঝিমুনি দিতে দিতাম, ততটুকুই যতক্ষণে তারা বিশ্বাস করত যে, পুরো জপটাই তারা শেষ করেছে। তারপর আমি দড়ি ধরে টানলে দুপুরের খাবারের ঘণ্টা টুংটাং বেজে উঠত। বুড়ো মানুষগুলো প্রতি টেবিলে আটজন করে বসত, আর উগালি, টক ডাল আর ঢেঁড়সের স্যুপে তাদের মুখ ভর্তি করে বলে উঠত, ‘কাদিমা’র দোকান থেকে চাপাতি কিনো না—কাদিমা’র বউ ময়ানের উপর বসে আর ওর পাছা দিয়ে ওটা তুকতাক করে’ অথবা, ‘তোমায় কি ওয়ামবুয়ার কথা বলেছি, ওই যে, যার গরুটা একটা বাচ্চাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলল, বাচ্চাটা কান্না থামাচ্ছিল না তাই’।

বিকেলে আমি বেডপ্যানগুলো খালি করে দিতাম আর বুড়ো মানুষগুলোর পা উষ্ণ জল আর বেকিং সোডায় ভিজিয়ে দিতাম, আর যখন তারা দলবেঁধে প্রার্থনায় রওনা দিত, আমি আমার পার্সটা নিতাম আর বাড়ি যেতাম।

আখের ট্র্যাক্টর আমার বাবাকে মেরে ফেলার আগের বড়দিনে, সে প্লেট থেকে চা খেয়েছিল, কফি জারের ঢাকনার উপর ডিম ভেজেছিল আর ঘরের পেছনের আবছায়া, টিকটিকি ভরা কোণা থেকে তার ইয়ামাহা ড্রাম সেটটা এনে বারান্দায় বসে যতক্ষণ না তার আঙুল ফেটে রক্ত বেরোয় ততক্ষণ বাজিয়েছিল ।

একদিন সে তার টুল আর হাত রেডিওটা নিয়ে বারান্দায় গেল, আমি তার পায়ের কাছে বসে রইলাম, তার জুতোর ফিতে খুলে দিলাম আর পা থেকে চটচটে মোজাটা ছাড়িয়ে নিলাম। সে খানিক্ষণ তার আঙুল নাড়ালো। ওগুলোয় খানিকটা পচা গন্ধ ছিল, টক ছানার মতো।

আমার বাবা ধূমপান করত আর আফ্রিকার শিংয়ের আরও ভেতরে যে দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ছে তার বর্ণনা শুনতো, আর ঘড়িতে আটটা বাজলে নব ঘুরিয়ে মৃত্যুর খবরগুলো শুনতো। তার চেনা কারোর নাম তার কানে লাগতে সময় নিতো না। সে বিষম খেতো আর ধোঁয়া তার গলায় আটকে যেত।

আমার বাবা বলতো, ‘শুনলে ওটা? সোপস্টার চলে গেল! সোপস্টার, মিকাহ’র ছেলে, মিরেকে মাধ্যমিকে যে কৃষি পড়াতো। ঈশ্বর, আমি বলছি, সবাই চলে যাচ্ছে। এমনকি আমিও, আমার নামও খুব শিগগিরই মৃত্যুর খবরে শুনবে’।

আমি তাকে বিকেলের চা নিয়ে এসে দিলাম। বারান্দায় সে তার সিগারেটটা পিষে দিল, তারপর ধীরে ধীরে কাপটা তার ঠোঁটের কাছে তুললো। কাপটা তার পছন্দ মতোই ভরা ছিল, এতটাই যে, একটু ঝাঁকুনিতেই তার আঙুল আর কোল ভেসে যাবে।

আমার বাবা চায়ে একটা চুমুক দিত আর বলত, ‘সোপস্টার আমার ভাইয়ের মতো ছিল। ওর মরার খবর কেন আমায় এমন করে জানতে হবে, এরকম রেডিওতে?’

তারপর আমার বাবা ভাঁজ করা সোফাটায় শুতো, আমি টুলে বসে তাকে দেখতাম, ভয় পেতাম, যদি আমি নজর ফেরাই তাহলে সেও চলে যাবে। সেবারই প্রথম আমি তার মৃত্যু কল্পনা করি, প্রথম আমি শোক করি।

আর তারপরও আমি আসলে আমার বাবার জন্য শোক করছিলাম না, বাবার মৃত্যুর অসম্ভব বার্তাবরণের মাঝে আমার আমির জন্য শোক করছিলাম। আমি কল্পনা করছিলাম এটা কেমন লাগবে : মৃত্যু সংবাদটা জানাবে যে, আমার বাবা একটা নরককুণ্ডের ভিতর ডুবে গেছে, আর মানুষ এমনভাবে আমার দিকে তাকাবে যেন, আমি রাস্তার ম্যানহোলে আটকে পড়া একটা গুঁইসাপ। আমি কল্পনা করলাম যে, যখন আমি খবরটা পাব তখন আমার পরনে একটা সবুজ পোশাক থাকবে—যেটার জমিনে লাল গন্ধরাজ বোনা থাকবে—মানুষ আসবে, আমার কাঁধে চাপড় দেবে আর প্লাস্টিকের কাপে উষ্ণ কোকাকোলা আমার হাতে দিয়ে বলবে, ‘খবরটা পাওয়ার সাথে সাথেই আমি আমার সব শোক একটা ঝুড়িতে ভরে এখানে চলে চলে এসেছি। আর কীভাবে তোমার বাবার আত্মা জানবে যে, তার মৃত্যুতে আমার কোনো দোষ নেই’।

আমার বাবার মাথাটা আমি কেনো স্মরণ করতে পারছিলাম না, তা নিয়ে বউইবোর একটা ব্যাখ্যা ছিল।

ও বলল, ‘যদিও সবার মাথাই তাদের মুখের পেছনে থাকে, কেউ কেউ সহজেই তাদেরটা দেখিয়ে দেয়; যখন তারা তোমার দিকে পেছন ফেরে আর তাদের মাথাটাই শুধু তুমি দেখতে পাও। তোমার বাবা ভালো মানুষ ছিল আর ভালো মানুষেরা কখনও তাদের মাথা দেখায় না; তারা তোমাকে তাদের মুখ দেখায়’।

হয়তো ও ঠিকই বলছিলো। এমনকি যেদিন আমার বাবার সাথের লোকেরা ফোন করে বলছিলো যে শিবালে যাওয়ার পথে একটা আখের ট্র্যাক্টর তাকে রাস্তার সাথে পিষে ফেলেছে, কেউই তার মাথা দেখার কথা কিছু বলেনি। মাপা সূক্ষ্মতায় তারা বাকি শরীরটার বর্ণনা দিচ্ছিল : কীভাবে তার পা রাস্তায় টাটকা পিচে চটচটে আর চকচকে হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল, কীভাবে তখনও তার একটা পা টায়ারের স্যান্ডেলের মধ্যে থেকে বাইসাইকেলের প্যাডেল মেরেই চলেছে, কীভাবে আখের রসে তার মুখ ভর্তি হয়ে গিয়েছিল আর তার পলিয়েস্টার শার্টের কলার ভিজিয়ে দিয়েছিল, কীভাবে তখনও তার মুখে একটা ধৈর্যশীল প্রশান্তি লেপ্টে ছিল, এমনকি তার চোখদুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে বৃষ্টি জলে গড়াচ্ছিল।

যখন তারা আমাকে এইসব বলছিল, সেসব শুনেই কাঁদার বদলে আমি ভাবছিলাম, আমার বাবা কী সত্যিই ওবাওয়ামিদের দীর্ঘ ধারা থেকে এসেছিল আর তার লোকেরা তাকে গলায় রাজকীয় কড়ির একটা মালা ঝুলিয়ে বসা অবস্থায় কবর দেবে কিনা।

‘যাই হোক’ বউইবো বলে চলল, ‘তোমার বাবাকে নিয়ে আর চিন্তা করে কী হবে, হ্যাঁ? ও দুধ বহু আগেই উপচে গেছে আর মাটিতে মিশেও গেছে’।

দিনটা আমি ডরমিটরিতে কাটালাম, বিছানা তুললাম, তোষক রোদে দিলাম, পিভিসি ম্যাট্রেস ঘষে পরিষ্কার করলাম। একটা বুড়ো লোক আমার সাথেই থাকলো। সে শোনালো কিভাবে সে তার জীবনের অস্তগামী বছরগুলো কাটানোর জন্যে এই হোমে এসেছিলো—১৯৯৮ সালের আগস্টে সে মোম্বাসায় তার বাড়িতে ফেরার জন্য বিকেলের ট্রেনে উঠতে স্টেশনে অপেক্ষা করছিল। আমেরিকান দূতাবাসে বোমা ফাটলে পুলিশ সারা শহরে চিরুনি চালালো আরব বংশোদ্ভূত সব লোককেই হাজত করলো। যেহেতু সে বাহাত্তুরে বুড়ো ছিল আর খুব দ্রুতই ভীমরতির লক্ষণ দেখাচ্ছিল, তাই ওরা তাকে এই বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে যায়, আর তখন থেকে সে এখানেই আছে।

‘তোমার লোকেরা তোমাকে কখনও নিতে আসেনি?’ হতভম্ব হয়ে আমি জানতে চাইলাম।

বুড়োটা নাক টানলো। ‘আমার লোকেরা?’

‘সবারই তো নিজের নিজের লোকেরা আছে’

বুড়োটা হেসে ফেললো। ‘যে খাবারটা তুমি খেয়ে ফেলেছো কেবল সেটাই তোমার নিজের, বাছা’

পরে বুড়ো মানুষগুলো ঝুলঝুলে গোছা হয়ে উঠানে বসলো। বউইবো আর আমি রান্নাঘরের পেছনের সিঁড়ি থেকে তাই দেখলাম। ঘাসের মধ্যে পিঁপড়েরা একটি শুয়োপোকা সাবাড় করছে। কুকুরটা ঘষা গোলাপি রঙের উপর সবুজ শিরার আঁকিবুঁকি করা নাকটা কুঁচকাচ্ছে। কাঠচাঁপা গাছটার ওপরে পাখিগুলো একটি আরেকটির সাথে পাল্লা দিচ্ছে। ওদের একটি বিদ্যুতের তারে ধাক্কা খেল আর শ্যাওলা-ঢাকা বিদ্যুতের খুঁটিটায় মাথাটা থেতলে ফেলল।

বোলতারা ঘাসের ওপর নিচুতে উড়ছে। শ্যাওলায় দম আটকে ধরা একটি গাছের গুড়ির উপর একটি টিকিটিকি বেয়ে উঠলো। কুকুরটা নিজের পায়ের ভেতর দিকটা চেটে নিল। রাজকীয় নৃত্যশিল্পী প্রজাপতির একটা দল লিলির সারির উপর ভেসে এল, ওদের বর্ণিল নাচের ঘাগরা অশ্রুত বাতাসের দাপটে কাঁপছিল। কুকুরটা ঘাসের উপর পাশ ফিরে শুয়ে নিঃশেষিত শুয়োপোকা আর সেটাকে চিবিয়ে চলা পিঁপড়েদের দলাই-মলাই করছিল। কুকুরটার লোমশ পেট থেকে বেরিয়ে থাকা স্তনের বোঁটাগুলো থুতু লেগে থাকা ছাগলের লাদির মতো লাগছিল।

বউইবো বলল, ‘আমি তোমার বাবার মাথা মনে করতে তোমায় সাহায্য করতে পারি’।

আমি বললাম, ‘কী সব ফ্যালদা কথা শুরু করলে তুমি এখন?’

বউইবো তার তর্জনিটা চাটলো আর পরমবিশ্বাসে তুলে ধরল। ‘লাল বাইবেলের কসম! আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি, আর আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি’।

তোমায় বলি : একদিন তুমি তোমার নির্বাসন অস্বীকার করবে, তুমি বাড়ি ফিরে যাবে, আর তোমার মা সবচেয়ে সুন্দর চিনামাটির বাসনগুলো বের করবে, আর তোমার বাবা তোমার জন্য একটি তেজি মোরগ জবাই করবে, আর তোমার বোন তার নেভি ব্লু পি. ই. র‍্যাপারটা পরবে, আর তোমার ভাই আঙুলের ফাঁক দিয়ে হড়কে যাওয়া ভাত আর সুরুয়া চটকানোর বদলে চামচ দিয়ে খাবে।

আর তুমি তাদের সেই জায়গার গল্প বলবে যেগুলো এখানের না, আর সেইসব লোকদের গল্প : যারা জিক ব্লিচে টেবিল ন্যাপকিন ভেজায় আর লন্ডন নিয়ে এমনভাবে কথা বলে যেন লন্ডন এমন একটা জায়গা যে লাফ দিয়ে একটা বাসে উঠে নাকুরু, আর কিসুমু। এবং কাকামেগার ভিতর দিয়ে গিয়েই ওরা সেখানে পৌঁছে যায়।

তুমি সেইসব লোকেদের গল্প বলবে, যারা তরমুজ ফালি ফালি করে কাটে না বরং তরমুজটাকে দুই ভাগ করে প্রতিটি ভাগ থেকেই চামচ দিয়ে খায় এবং সেইসব মহিলাদের গল্প করবে যারা হাত ধরাধরি করে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের চারিধারে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়, ধূসর মাদার ইউনিয়নরঙা ঘটি অন্তর্বাসের ছিটেফোঁটা দেখিয়ে ফেলে এই গানটা গাইতে গাইতে :

কিজেমবে নি কিকালি, পারাম-পারাম

কিলিকাতা মওয়ালিমু, পারাম-পারাম

তুমি মনে কর যে, তোমার লোকেরা আসলে তোমার, সবসময়ই তাদের মনে আর দিলে তোমার জন্যে একটা জায়গা রাখা আছে। তুমি মনে কর যে, তোমার লোকেরা সবসময় তোমার ফেরার পথ চেয়ে থাকে।

হয়তো তুমি যেদিন ঘরে তোমার লোকদের কাছে ফিরে যাবে, বারান্দায় বেতের একটা চেয়ারে তুমি একা বসতে পারবে, একা তামাক টানতে পারবে কারণ তোমার লোকেরা তোমায় ফেরত চাইলেও কেউই আসলে চায়নি যে তুমি থেকে যাও।

আমার বাবা বারান্দায় বেতের চেয়ারটার উপর ঝুলে ছিল, পুরাতন দিনগুলোর মতোই তামাক তানছিল আর হাতরেডিওটা দেখছিল। রেডিও থেকে মৃত্যুসংবাদটা উঠে এলো, আর নিচুতে ভাসতে ভাসতে, বসার ঘরের জানালার শীতল কাঁচে লেপ্টে থাকা ধোঁয়াশা হয়ে গেল।

আমার বাবার জামা বাতাসে ঝাঁপটালো, আর ধোঁয়ার সরু শুড়গুলো তার মুখের সামনে ফট করে ভেঙে গেল। সে আপনমনে শিস দিয়ে উঠলো। প্রথমে সুরটার মুখায়বয়ব ছিল না, যাচ্ছেতাই জিনিস, যেন কেউ পথের উপর একটি বোতল পেয়েছে আর লাথি দিতে দিতে ওটা বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তারপর সুরটা নিজের ভিতর অন্য সুরের খণ্ডগুলি ধরতে পেল, আর তখন নিজের মনখোলা ওঠা-নামাটা হারিয়ে ফেলল।

আমার বাবার একটা মাথা ছিল। এখন যখন আমি এটার দিকে তাকাতে মনস্থির করলাম আমি এটা দেখতে পেলাম। তার মাথাটা একটি চালকুমড়োর মতো দেখতে ছিল। সম্ভবত সে কারণেই আমি এটার সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম; এটা ভয়াবহ, মাথা আউলা করে দেওয়ার মতো দেখতে।

আমার বাবা কলের মিস্ত্রি ছিল। সে যে নর্দমার পাইপগুলো সে নাড়াচাড়া করতো তার নখে তখনোও সেগুলোর গায়ের রঙ লাগানো, আর তার বুটে তখনোও যতসব অবর্ণনীয় কিচেনসিংকগুলোর চিটচিটে ময়লায় ছিবড়ানো। তাকে দেখে আমার সেই দিনটার কথা মনে পড়ল যেদিন সে কারোর বর্জ্যের আঁশে একটা সোনার হার পেঁচানো দেখতে পেয়েছিল, আর সে তার কর্ডুরয়ে ময়লাটা মুছে হারটা নাগিনপত্নীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল, আর সেই সন্ধ্যায় কাঁধে করে লাল গ্রেটওয়েল টেলিভিশনটা বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। বসার ঘরের এক কোণায় সে ওটা বসালো আর বলল, ‘দেখতো জিনিসটা কেমন ঝকঝক করছে, যেন এটার ভিতর কোন গু-ই পোরা নেই’।

আর প্রতিদিনই আমি একগোছা লবঙ্গফুল তুলে নিয়ে আসতাম আর ওদের ডাঁটাগুলি তেরছা করে ভেঙে একটা কাঁচের বাটিতে করে টেলিভিশনের উপরে রাখতাম যাতে করে আমার বাবা সন্ধ্যার খবর দেখতে দেখতে গুয়ের কথা না ভাবে।

আমি বউইবোকে বললাম, ‘আমাদের ওকে ফেরত পাঠাতে হবে’

বউইবো বলল, ‘সেই কলিজাটাই তো চাইলে যেটা তুমি খাও’

‘কিন্তু আমি ঠিক তাকে ফেরত চাইনি, আমি শুধু তার মাথাটা দেখতে চেয়েছিলাম’

বউইবো বলল, ‘শেষতক সে তো তোমার কাছে ফিরেই এলো আর এরও তো কিছু একটা ব্যাপার আছে, তাই না?’

সম্ভবত আমার বাবার ফিরে আসায় আর কোনো ব্যাপার নেই, শুধুমাত্র সারাবাড়িটা তার গন্ধ গন্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া—পোড়া ডাল, গলন্ত নখ আর তেতো কুইনিনের বাকল আর ভাঙা সিগারেটের টুকরায় ভেজা নেকড়ার অম্লতা।

আমার বাবার দিকে আমি জিনিসপত্র ছুঁড়ে দিয়েছিলাম; রসুন, আগর, লবণ, শুকরের মাংস, আর যখন কোনোকিছুই তাকে ফেরাতে পারলো না, আমি বাড়িটার শান্তি-সস্ত্যয়ন করে দেওয়ার জন্য ফাদার ইগনাটিয়াসকে অনুরোধ করলাম। উনি এক শিশি পবিত্র জল নিয়ে এলেন, আর সব ঘরে ছিটিয়ে দিলেন, আমার বাবার উপরেও ছিটালেন। ফাদার ইগনাটিয়াস বললেন, আমার আরোও সুরক্ষা দরকার, তার আগে তাকে আমার একটি চেক লিখে দিতে হবে।

একদিন যখন আমি রাস্তার কোণা থেকে পোড়ানো ভুট্টা কিনছিলাম, দোকানদারটা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘সবজির দোকানি যা বলছে, এটা কি সত্যি নাকি যে, তুমি শেষ পর্যন্ত তোমাকে ভালোবাসার মানুষটা খুঁজে পেয়েছো কিন্তু তাকে দরজা দিয়ে ঢুকতেই দিচ্ছ না?’

সেই সন্ধ্যায় আমি আমার বাবাকে ভিতরে ডেকে নিলাম। আমরা ভাঁজ করা সোফাটায় পাশাপাশি বসলাম, আর একটা মাছিকে জানালার কাঁচ আর গ্রিলের মাঝের স্ক্রিনটায় বেয়ে উঠতে দেখলাম। বেয়ে উঠতে উঠতে ওটা একটু ভনভনালো। ছাদের পাখাটা ক্যাঁচকোঁচ করলো আর ওটা করিডোরের মেঝেতে ছায়া বিছালো। ছায়াটা উঁচুতে লাফ দিলো আর দরজায় চড়ে বসলো আর দেয়ালের ঘুলঘুলিতে উঁকি দিল।

বাতাস একটি কাপ উল্টে ফেলল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য কাপটা জানলার কার্নিশে কাত হয়ে রইলো। তারপর এটি একপাশে গড়িয়ে পড়লো আর মেঝের উপর দিয়ে গড়গড়িয়ে চলে গেল। আমি ছিটকিনিটা তুলে জানালাটা আটকে দিলাম। কাঁচের গায়ে বাতাস-ভেজা ঠোঁট বুলিয়ে দিল। ধুলো আর লালার একটি দাগ রেখে গেলো, আর গ্লাসের কানা ধরে লালাটা ধীরে গড়িয়ে নেমে গেল। বাতাসের মুখটা লালাভর্তি ছিলো। শিগগিরিই লালায় সারা জানালা ঢেকে গেলো, ততক্ষণ ধরে ছড়াতে লাগলো যতক্ষণে জানালার বাইরের রোজমেরি ব্রাশউডের ঝোপটা ঝাপসা হয়ে যায়। বাইরে জাকারান্ডা নিচু হয়ে ছাদে আঁচল কেটে গেলো। পাশের ঘরে দরজা জানালা দমদম বাড়ি খেলো।

আমি আমার বাবার দিকে তাকালাম। তাকে একইসাথে অচেনা আর চেনা লাগছিলো, একই সাথে দারুণ আর ভীতিকর—সে ঝুরঝুরে ছিলো, চিনামাটির চিড়ধরা হাতলের মতো, আর সে ছিলো পেঁচার শীতল পীতবর্ণ দৃষ্টির মতো।

আমার বাবা আমার হাত ছুঁলো—এতো হাল্কা, এতো নরম করে যেন, ভয় পাচ্ছিলো আমি শিউরে উঠবো আর হাত সরিয়ে নেব। আমি চোখ তোলার সাহস করলাম না, কিন্তু সে আমার চিবুক ছুঁলো আর উপরে তুললো যাতে করে তার দিকে তাকানো ছাড়া আমার আর উপায় রইলো না।

আমার মনে পড়লো সেই সময়ের কথা যখন আমি ছোট ছিলাম, যখন আমি প্রায় এরকমভাবেই আমার বাবার চোখের দিকে তাকাতাম। ওখানে আমি দেখতাম বিভিন্ন আকৃতি; বৃত্ত, ত্রিভুজ আর চতুর্ভুজের একটি মাতাল, বুদ্ধিহীন পিণ্ড। আমি বিস্মিত হতাম আমার বাবার চোখের ভিতরে ওগুলো ঢুকলো কীভাবে। আমি কল্পনা করতাম সে টেবিলে বসে, রঙিন বই থেকে চকচকে স্মৃতিগুলো কেটে নিয়েছে, আর আঠা দিয়ে মেখে ওগুলো চোখের ভিতর দিকে সেটে দিয়েছে যাতে তার মণির ভিতরে একটা উদ্ভট এলোমেলো কোলাজ তৈরি হয়।

আমার বাবা বলল, ‘একটু চা হবে, সিমবি?’

আমি নিয়ে এলাম, আর সে জানতে চাইলো তার পুরনো বন্ধু পাইয়াস ওবোতে এখনো শনিবারগুলোতে বাড়িতে আসে কি না, এখনোও বাদাম সাবান আর কুমড়ো পাতা আর পোস্ট অফিস থেকে আসার পথে তোলা চিঠির গাদা হাতে হাজির হয় কিনা।

আমি বললাম, ‘পাইয়াস ওবোতে চার বছর হলো মারা গেছে’

আমার বাবা তার কাপটা ঠেলে সরিয়ে দিলো। সে বলল, ‘যদি চাও যে তোমার চা না খাই, বললেই পারো, তোমার মুখ দিয়ে লোক মারা-মারা খেলো না’

আমার বাবা খানিকক্ষণ চুপ রইলেন, এই পাইয়াস ওবোতে লোকটার জন্য দুঃখ করলেন, যে আমাকে সবসময় হাঁটুতে হাঁটুতে বাড়ি খাবার কথা মনে করিয়ে দেয়। পাইয়াস ওবোতে খুব চোখ পিটপিট করতো, পকেটের মধ্যে বলপেনের জন্য হাতড়াতো আর হাতে উঠে আসতো একটা মুরগির হাড়, তখনো লালা, তখনো রসালো।

আমার বাবা আমাকে বলল, ‘তোমার সাথে দেখা হলো। তুমি চা খাওয়ালে। এখন আমি যাব’।

‘কোথায় যাবে?’

‘এখান থেকে দূরে কোনো শহরে কাজ খুঁজে নেব। হয়তো এলদোরেতে। ওখানে একসময় আমার লোকেরা ছিল।‘

আমি বললাম, ‘তুমি এখানে আর কয়েকটা দিন থেকে যেতে, বাবা’।

গল্প- আত্ম+সুখ+হনন by চাণক্য বাড়ৈ

সেলুন থেকে বেরোনোর পর মেজাজের সলতেটায় আরেক দফা আগুন ধরে ওঠে বশিরের। শালার হাটুরেদেরও ট্রেনিং নেওয়া দরকার। বশির হাঁটছিল খুব সাবধানে; চিপা গলির মধ্য দিয়ে, প্রয়োজনমতো ডানে-বাঁয়ে কাৎ হয়ে ব্যস্ত, বেয়াক্কেল আর উদাসী মানুষগুলোর ছোঁয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে। এরই মধ্যে এক বেকুব আচমকা কোথা থেকে এসে কচুর ডগার ঘষা দিয়ে গেল বশিরের অফিসিয়াল একমাত্র সাদা শার্টটিতে। ধ্যাৎ! জামার আস্তিন হয়ে মাজার সামনের দিকটায় এক লহমায় এমন এক বাড়ি লাগল, ডগার মাথায় চুঁইয়ে থাকা সবটুকু কষ যেন মেখে গেল। ওর ইচ্ছা ছিল কিছু পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ কিনে বাসায় ফিরবে। তা আর হলো না। বাসার সামনে থেকে দু-টাকা দামের একটা মিনিপ্যাক শ্যাম্পু আর তিন টাকা দামের ডিটারজেন্ট কিনে বাসার মেইন গেট পার হলো। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে নিচের ফ্লোরে বহু দিনের পুরোনো কপাটের ফাঁক দিয়ে প্রোফাইল ভিউতে যে মেয়েটিকে বই পড়তে অথবা ব্যাক ভিউতে চুল বাঁধতে অথবা ফ্রন্ট ভিউতে নখ কাটতে অথবা শুয়ে থাকলে পায়ের একটি পাতার ওপর আরেকটি পাতার নাচানাচি দেখা যেত, তাকে গত এগারো দিনের মতো আজও দেখা গেল না। সারা মাস কুরিয়ারের চিঠি বিলি করে ওর বাবা যে বেতন পায়, তা দিয়ে বোধ হয় বাড়তি ভাড়া টানা সম্ভব নয়। এ সমস্যা বশিরেরও আছে। এ মাসে বাসা ভাড়া বাবদ ওকে আরও পাঁচশ টাকা বেশি গুনতে হবে।

দরজা খুলতেই ছোট্ট রুমে আটকে থাকা যে বোঁটকা গন্ধটা প্রতিদিন তাকে সম্ভাষণ জানায়, আজ তার উপস্থিতি আর টের পেল না বশির। এবার ঘেন্নায় তার গা আরও গুলিয়ে গেল। চুল কাটা পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু কেনো যে বলতে গেল—‘দাঁড়িটাও কামায়ে দে’। এইসব পাতি নাপিতের সেলুনে দাঁড়ি কামানো যে অস্বাস্থ্যকর, তা সে ভালো করে জানত। তার উপর পশ্চিম দিকের গলি দিয়ে পনেরো-বিশ মিনিট হাঁটলে যে নিষিদ্ধপল্লিটা, তার নিয়মিত খদ্দেরগুলো ওই সেলুনে নিয়মিত চুল-দাড়ি কাটায়। এক টাকা বাঁচাতে গিয়ে নাপিত ব্যাটা পুরোনো ব্লেড টানা শুরু করে দিল। ভাগ্যিস কাটেনি। নইলে এইচআইভি, হেপাটাইটিস এ-বি-সি, এসটিডি—কিছু একটা নির্ঘাত হয়ে যেতে পারত। রাজ্যের মানুষের মুখে ঘষা ফিটকিরি, ঘামে জবজবে পাউডারের প্যাড, আঠায় আটকে থাকা ব্রিসলের ব্রাশ আর ব্যবহারে জর্জর স্পঞ্জ তার নাকে-মুখে ঘষে দিল আর দুর্গন্ধযুক্ত নষ্ট পাউডার মাখিয়ে দিল নাপিতটা। সবমিলিয়ে তার চারপাশে এমন একটা অচেনা গন্ধের আবহ, রুমের চেনা গন্ধটাও তার ধারে-কাছে আসতে পারল না। অসহায়ের মতো খাটের উপর ধপাস করে বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয় সে।

টেবিল ফ্যানটা দেখে খুব পুরাতন মনে হয় না। সেটি ঘুরল সুইচ টেপার পাঁচ-সাত মিনিট পর। ততক্ষণে জামাকাপড় ছাড়ে বশির। টেবিলের নিচে আলু, দুটি পেয়াঁজ আর চিমসে কয়েকটি কাঁচামরিচ দেখে স্বস্তি পায়। বারান্দার গ্যাসের চুলোয় পরিমাণমতো চাল, একটা ডিম, কয়েকটি আলু আর কয়েকটি মরিচ চড়িয়ে দিয়ে স্নানে যায় সে। শেয়ারের চুলো হলেও এ সময়ে সেটি ফাঁকা থাকে। তার বাথরুমটা অ্যাটাচড। চুল ছোট থাকলে একবারে মিনিপ্যাকের অর্ধেক শ্যাম্পু হলেই তার চলে। চুলগুলো ধোয়া হলে, নাকে-মুখে সাবান ঘষা হলে সেলুনের বোঁটকা গন্ধটা গা থেকে উধাও হয়ে যায়। মাথায় মগের পর মগ জল ঢালতে ইচ্ছে করে তখন। কিন্তু চুলোর জ্বলন্ত ভাতের হাঁড়ির দুশ্চিন্তায় ইচ্ছাপূরণের আগেই স্নানঘর থেকে বের হতে হয় তাকে।

খেতে বসে সে আরও নিশ্চিন্ত হয়। কোথাও কাটেনি, এটা ভেবে একধরনের তৃপ্তি আসে মনে। কোথাও সামান্য ছাল উঠে গেলেও স্নানের সময় টের পেত। জল লাগার সঙ্গে সঙ্গে ছ্যাঁৎ করে উঠত। তা হয়নি। এই যুক্তিতে জীবাণুর সংক্রমণ না হওয়ার নিশ্চয়তা আরও বদ্ধমূল হয়। খাওয়া শেষে বশিরের চোখজুড়ে ঘুমের পাতলা একটা পর্দা নেমে আসতে থাকে। দেয়ালে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ ঝিমায় সে। বেশ অনেক্ষণ পরে তার ঝিমুনিটা কাটে ট্রেনের শব্দে। দিনের বেলা হলে মাথাটা ঘোরালেই সে দেখতে পেত। জানালার কারণে ট্রেনটা অবশ্য দেখা যায় না। ছাদের উপরের মানুষগুলোকে শুধু দেখা যায়। এটাই বরং ভালো। মনে হয় জাদুর মাদুরে উড়ে যাচ্ছে মানুষগুলো। আর শোনা যায় ঝমঝম শব্দ আর তীব্র হুইসেল। বশির ভাবে, মাত্র কয়েক মিনিটের ঝিমুনিতে ধরেছিল তাকে। কিন্তু না। টেবিলের অ্যালার্ম ঘড়িতে চেয়ে দেখে পোনে দু’টা বাজে। ট্রেনের শব্দটা নিঃশেষিত হতে বেশ সময় লাগে। সম্ভবত মাল-ট্রেন হবে। মনে হয় জরাগ্রস্ত সাপের মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছে মালভর্তি প্রায় অর্ধশত ভারী ওয়াগন। কিছু ভেবে উঠতে পারে না বশির। কী এক ভোঁতা ঘোরগ্রস্ততায় উঠে বালতিতে ডিটারজেন্ট গুলে কচুর কষ লাগা জামাটা এবং একটি স্যান্ডো গেঞ্জি ভেজায়। জামার যে জায়গাটায় কচুর দাগ লেগে আছে, সেখানে এক চিমটি গুঁড়ো দিয়ে কিছুক্ষণ ঘষাঘষি করে। ভালো ফল না পেয়ে জলে চুবিয়ে রেখে বিছানায় গিয়ে আগের মতোই দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে। টের পায়, ঘুমের ঝোঁকটা এখন আর অবশিষ্ট নেই। সে নিচের তলার মেয়েবিষয়ক একটা ভাবনার পুকুর তৈরি করে খানিকক্ষণের জন্য তাতে ডুব দেয়। এই ডুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। পিঠের ত্বকের একটা বিন্দু আলপিনের মতো মস্তিষ্কে ভীষণ জোরে একটা খোঁচা মারে। খুব দ্রুত ঘুরে, যা অনুমান করে, তা-ই দেখতে পায়, প্রায় কচ্ছপাকৃতির একটি ছারপোকা, তার পিঠ সরিয়ে নেওয়ায় দেয়ালে হঠাৎ আলো এসে পড়ায়—হতবিহব্বলের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। বশির সেটাকে মারতে উদ্যত হয়; পারে না। দেয়ালে ময়দার আঠায় সাঁটা পুরোনো পত্রিকার নিচে ছারপোকাটি আত্মগোপন করে। আঙুল ঢুকিয়ে পত্রিকার কিছু অংশ আলগা করতেই সেটির দেখা মেলে। আবারও ধরতে গিয়ে ব্যর্থ হয় বশির। আরও কিছু অংশ ছিঁড়ে শেষমেশ সে নিজেকে একটি হত্যার অপরাধে জড়াতে সক্ষম হয়।

ততক্ষণে পত্রিকার খানিকটা অংশ ঝুলে পড়েছে। পত্রিকার উল্টো দিকে দুটি নগ্ন পায়ের ছবি। হাই হিলের চাপে পায়ের টসটসে গোড়ালি দেখে উপরের অংশ দেখার লোভ সামলাতে পারে না বশির। আরও কিছু অংশ সে টেনে ছিঁড়ে বের করে। দীপিকা পাড়ুকোন। বেগুনি রঙের বক্ষবন্ধনীর নিচে অদ্ভুত ক্ষীণ ফর্সা দেহকাণ্ড। মাঝখানে নাভীর মোহময় কূপ, যার চারপাশে নির্মেদ কমলালেবুর মতো ত্বক, আর তার নিচে ফিনেফিনে ছোট স্কার্ট ঊরুর মাঝামাঝি এসে থেমেছে। ডান হাতে কিছু একটা ধরে থাকলেও থ্যাবড়ানো আঠার কারণে তা দেখা সম্ভব হয় না। বশিরের দৃষ্টি পায়ের গোড়ালি থেকে একটু একটু করে উপরের দিকে উঠতে গিয়ে স্কার্টের প্রান্তে এসে সহসা চলৎশক্তি হারায়। সে ভাবে, হঠাৎ যদি একটা ঊর্ধ্বমুখী দমকা হাওয়া আসে আর স্কার্টটা...

দ্রুত বিছানার নিচ থেকে মলাটবিহীন একটা বই নিয়ে বশির পাতা ওল্টাতে থাকে। নতুন কিছুই নেই। মলাটটা থাকলে সেটা বদলে যেকোনো জায়গা থেকে দশ টাকার বিনিময়ে নতুন আরেকটা বই আনতে পারত সে। অফিসের কলিগদের নজর এড়াতে গিয়ে মলাট ছিঁড়ে ফেলায় সে সুযোগ এখন হাতছাড়া। নতুন কিছু কিনতে গেলে পকেট থেকে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা খসে যাবে। পুরোনো পছন্দের গল্পটাই শুরু করে বশির, ‘পুজোর ছুটিতে মেজ মামার বাড়ি বেড়াতে গিয়াছিলাম। সেবার মামার ছোট শালার ছোট মেয়ে সবিতাও কলিকাতা থেকে বেড়াতে আসল। সবিতা কলিকাতার স্মার্ট মেয়ে। কলেজে নতুন ভর্তি হয়েছে, বয়স কেবল ষোল। দুপুরে মামার বাড়িতে কেউ থাকে না...’ গল্পটা খুব অল্প সময়ে শেষ করে বইয়ের ভেতরকার গ্লোসি পেপারের ছবিগুলোতে চোখ বুলিয়ে নেয় কয়েক মুহূর্ত। তারপর অর্ধব্যয়িত শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক নিয়ে একদৌড়ে বাথরুমে গিয়ে ঢোকে।

এবার বরং কিছুটা ঝামেলায় পড়তে হয় তাকে। সবিতার কল্পিত চেহারার সাথে সে দীপিকার মুখ বসিয়ে দিতে গিয়ে এই ঝামেলা তৈরি করে। কেউই যেন শেষমেশ স্পষ্ট হয়ে ধরা দিতে চায় না। না সবিতা, না দীপিকা। শ্যাম্পুসৃষ্ট পিচ্ছিল মুষ্ঠিবদ্ধ বাঁ হাতটি ততক্ষণে একটু একটু আসা-যাওয়া করতে থাকে। তারও পরে একসময় গাঢ় কুয়াশা ভেদ করে দীপিকা পাড়ুকোনের যখন অনেক কাছে চলে আসে, বশির দীপিকার হাই হিল পরা পায়ের গোড়ালি থেকে দৃষ্টি ওপরের দিকে ওঠাতে থাকে। তার ব্যস্ত হাতটি আরও ব্যস্ত হয় আর ফ্রি ডান হাতটি কোন ফাঁকে যেন ফিনফিনে স্কার্টটি ওপরে তুলে ধরে। এ সময় দীপিকার ধবধবে দুটি ঊরু একটা বিন্দুতে গিয়ে মিলিত হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেলে তার বাঁ হাতটি, যেন সিরাপের বোতল ঝাঁকাচ্ছে, এমন গতিশীল হয়। তার দাদার মৃত্যুর আগে তাকে প্রায়ই এভাবে সালসার বোতল ঝাঁকিয়ে দিতে হতো। এই পর্যায়ের পর একটা অদ্ভুত অনুভূতি তাকে পেয়ে বসে এবং তার সবকিছু শিথিল হয়ে আসে। কপাল, গলার নিচে, বগল আর কুঁচকি ঘামে ভিজে যায়। সেই অবস্থায় বালতির ভেজানো জামা আর গেঞ্জি ধুয়ে দিয়ে তা ঘরের কোনায় ঝোলানো দড়িতে মেলে দেয়। এবং বেশ ব্যস্ততার সাথে আরও একবার স্নান করে আসে।

এবার শিডিউল অনুযায়ী সে তার বাকি কাজটা শেষ করার প্রস্তুতি নেয়। প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে মোবাইলফোনে একটি এসএমএস লেখে— Rasel vi, ofis er lokar er upre amar droyar er cabi ache. maf korben, boshir. মেসেজটা সেন্ট হয়; কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও ডেলিভারি রিপোর্ট না এলে তার মনে পড়ে, রাসেল ভাই মোবাইলফোন অফ করে ঘুমান। এবার বশিরও মোবাইলফোনটা বন্ধ করে টেবিলটা রুমের মাঝবরাবর এনে গামছাটা নিয়ে তার ওপরে দাঁড়ায়। বহু দিনের অব্যবহৃত সিলিং ফ্যানের মরিচা-জর্জর আংটায় গামছাটা বেঁধে এদিক-ওদিক টান দিয়ে পরখ করে নেয়। তারপর একটা ফাঁস বানিয়ে নিচে নেমে টেবিলটা আগের জায়গায় সরিয়ে আনে। টেবিলফ্যানের সুইসটাও অফ করে দেয় এবার।

দুই রাকাত নামাজ পড়ে উঠে দাঁড়ালে বশিরের কাছে খাট আর জীবনের কিনার সমার্থক হয়ে যায়। ফাঁসের মধ্যে মাথাটা গলিয়ে ঝুলে পড়লে প্রথমে গভীর রাতে বনের মধ্য থেকে ভেসে আসা বাদুড়ের কান্না বা গোঙানির মতো শব্দ হয় এবং একসাথে তিন-চারটা বাদুড়ের উড়ে যাওয়ার শব্দ শেষ হয়ে এলে রুমে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে আসে।

সকাল সোয়া সাতটার দিকে টেবিলঘড়ির অ্যালার্ম বেজে বেজে এক সময় নিজে থেকে থেমে যায়। এর পরের দিনও ঠিক এমনটিই হয়। তৃতীয় দিন আর ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি ঘটে না।

আধুনিক গদ্যের রূপকার আন্তন চেখভ by কাজী মাহবুবুর রহমান

আন্তন চেখভ
কিংবদন্তি রুশ কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার আন্তন চেখভকে বাংলা সাহিত্যে প্রথমবারের মতো পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সম্ভবত সৈয়দ মুজতবা আলী। ‘পঞ্চতন্ত্র’ গ্রন্থে তিনি চেখভকে নিয়ে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ রচনা করেন। এবং রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্যদের সাথে তূলনামূলক একটি রচনাও সেখানে স্থান পায়। চেখভ হলেন বিশ্বের সেসকল অল্প কিছু প্রভাব বিস্তারকারী সাহিত্যিকদের একজন, যাদের নামেই পরবর্তী বিশ্বসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র শৈলি তৈরি হয়।

চেখভের শুরুর জীবন ছিল দুঃখ কষ্টে জর্জরিত। শৈশব থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সাথে নিজেকে মানিয়ে একরকম সংগ্রাম করে বেড়ে উঠেছেন তিনি। তাকে বলা যায় গদ্যের চার্লি চ্যাপলিন৷ চেখভ তার অনেক গল্পই লিখেছেন কমেডির আদলে; কিন্তু চেখভের পাঠকেরা জানেন, এরই আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর দুঃখবোধ ও বেদনার আবহ।

১৮৬০ সালের ২৯ জানুয়ারি দক্ষিণ রাশিয়ার আজভ সাগর সংলগ্ন তাগানরোগ শহরে জন্মগ্রহণ করেন চেখভ। বাবা ছিলেন প্রাক্তন ভূমিদাস কৃষক। তিনি তাগানরোগে একটি দোকান চালাতেন। পাশাপাশি গির্জার ধর্মসংগীতে নেতৃত্বদানকারী গায়কদের পরিচালক ছিলেন। তাঁর স্বভাব ছিল ভীষণ রূঢ় ও কঠোর। মা জেভলোনিয়া জাকোভলেভনা ছিলেন ঠিক উল্টো। অত্যন্ত স্নেহবৎসল আর চমৎকার গল্পকথক; অবিকল রুশ উপন্যাসের মায়েদের মতো। তবে চেখভের বাবা ছিলেন মেধাবী ও তৎপর একজন ব্যক্তি। অভাবের সংসার চালিয়ে নিতে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হতো। চেখভ বলেছিলেন, আমরা আমাদের মেধা বাবার কাছ থেকে পেয়েছি আর হৃদয় মা’র কাছ থেকে।

চেখভের শৈশব-কৈশোর কেটেছে সীমাহীন দারিদ্র্যে। গৃহশিক্ষকতা, পাখি ধরে বিক্রি আর খবরের কাগজে ছোট ছোট স্কেচ এঁকে তিনি নিজের লেখাপড়ার খরচ যোগাতেন। সেই সাথে প্রচুর পড়তেন। মাধ্যমিকেই পড়ে ফেলেছিলেন তুর্গেনিভ, গনসারভ ও শোপেনহাওয়ার। ১৮৭৯ সালে ভর্তি হন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজে। পাশাপাশি চলছিল গল্প লেখা। তবে প্রথম দিকের গল্পগুলো লিখেছিলেন জীবনযাপন ও লেখাপড়ার খরচ যোগাতে। পরবর্তীকালে তা-ই হয়ে উঠল অন্তরের তাগিদ। ডাক্তারি পাশ করলেও সেই পেশা ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন চেখভ। তাঁর রচিত গল্পগুলোর মধ্যে : ‘স্তেপ’, ‘চাষী’, ‘ওয়ার্ড নম্বর ছয়’, ‘বিষণ্ণ কাহিনি’ উল্লেখযোগ্য।

নাটক লিখেছেন অনেক। তবে নাট্যকার হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এসেছে ‘থ্রি সিস্টার্স’, ‘দ্য সিগাল’ এবং ‘দ্য চেরি অরচার্ড’ নাটকের মাধ্যমে। চেখভের কাহিনি অবলম্বনে মঞ্চস্থ হয়েছে বহু নাটক। এদিক থেকে শেকসপিয়র ও ইবসেনের পাশাপাশি চেখভের নাম উল্লেখ্য।

সাহিত্যচর্চায় চেখভের স্বকীয় রীতি আধুনিক ছোটগল্পের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। চেখভের রচনা শৈলির ওপর দাঁড়িয়ে যায় ‘চেকভিয়ান ম্যানার’। পরবর্তীকালে জেমস জয়েস ও অন্যান্য আধুনিক কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে প্রকটভাবে চেখভের প্রভাব লক্ষ করা যায়।

১৯০৪ সালের ১৫ জুলাই আজকের এই দিনে চেখভ প্রয়াত হন।

হজের আহকাম

হজ্বের ফরজ চারটি : (১) ইহরাম বাঁধা। হজ্বে ক্বিরান বা হজ্বে ইফরাদ বা হজ্বে তামাত্তুর উমরাহ্ বা শুধু উমরাহর জন্য। এ চারটির মধ্যে যেকোন একটির ইহরামের নিয়্যত করা। (২) তালবিয়া পাঠ করা। (৩) আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। অর্থাত্, ৯ যিলহজ্ব দ্বিপ্রহর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেকোন সময় এক মুহূর্তের জন্য হলেও আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা (সীমানার ভেতরে)। (৪) তাওয়াফে যিয়ারত করা। অর্থাৎ, ১০ যিলহজ্বের ভোর থেকে ১২ যিলহজ্বের সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বাইতুল্লাহ্ শরীফে তাওয়াফ করা, কিন্তু ১০ তারিখ করা উত্তম। হজ্বের ওয়াজিবসমূহ: (১) নির্দিষ্ট জায়গা তথা মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা। (২) সা’য়ী করা। অর্থাৎ, সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে দৌঁড়ানো। (৩) সাফা হতে সায়ী করা। (৪) তাওয়াফের পর সায়ী করা। (৫) সূর্যাস্ত পর্যন্ত উকুফে আরাফা করা। (৬) মুযদালিফায় অবস্থান করা। (৭) মাগরিব এবং এশার নামাজ মুযদালিফায় এসে একত্রে পড়া। (৮) ১০ তারিখ শুধু যামরাতুল আকাবায় (মানে বড় শয়তানকে) এবং ১১ ও ১২ তারিখে তিন যামরায় রামি (কংকর) নিক্ষেপ করা। (৯) যামরাতুল আকাবার (বড় শয়তানকে) রামি বা কংকর নিক্ষেপের কাজটি ১০ তারিখে হলক তথা মস্তক মুণ্ডনের আগে করা। (১০) কুরবানির পর মাথা কামান কিংবা চুল ছাঁটা। (১১) ক্বিরান এবং তামাত্তু হজ্ব পালনকারীর জন্য কুরবানি করা। (১২) তাওয়াফ হাতীমের বাহির দিক দিয়ে করা। (১৩) তাওয়াফ ডান দিক থেকে করা। (১৪) বিশেষ অসুবিধা না থাকলে পায়ে হেঁটে তাওয়াক করা। (১৫) ওযুর সঙ্গে তাওয়াফ করা। (১৬) তাওয়াফের পর দু’রাক’আত নামাজ পড়া। (১৭) তাওয়াফের সময় সতর ঢাকা থাকা। (১৮) কংকর নিক্ষেপ করা ও কুরবানি করা, মাথা মুন্ডানো এবং তাওয়াফ করার মধ্যে তারতীব বা ক্রমধারা বজায় রাখা। (১৯) মীক্বাতের বাইরে অবস্থানকারীদের বিদায়ী তাওয়াফ করা। (২০) ইহরামের নিষিদ্ধ কাজগুলো না করা। হজ্বের সুন্নাতসমূহ: ১. তাওয়াফে কুদুম (ক্বিরান ও ইফরাদ হজ্ব পালনকারীদের জন্য)। তাওয়াফ হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করা। যে তাওয়াফের পর সায়ী আছে সে তাওয়াফে রমল এবং ইযতিবা করা। সাফা এবং মারওয়ার মধ্যে যে দু’টো সবুজ স্তম্ভ আছে, তার মধ্যবর্তী স্থান দৌঁড়ে অতিক্রম করা; তবে মহিলাদের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। ২. তাওয়াফে কুদুমে রমল করা। ৩. ৭ তারিখ হেরেমে, ৯ তারিখ আরাফায় এবং ১১ তারিখ মিনার মাঠে ইমামের ৩টি খুত্বা শুনা। ৪. ৮ তারিখে মিনাতে অবস্থান এবং মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া (যোহর, আছর, মাগরিব, এশা এবং পরের দিনের ফজর) ৫. নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে মাথা মুন্ডালে বা চুল ছাঁটলে ‘দম’ দিতে হবে। ৬. একটি উকুন বা পোকা মারলে একটি রুটির টুক্রা, তিনটি পর্যন্ত মারলে এক মুঠো গম আর এর বেশি মারলে সদকা কতে হবে। ৭. ওযর ছাড়া সুগন্ধি ব্যবহার করলে ‘দম’ দিতে হবে। ওযরবশত: ব্যবহার করলে কুরবানি বা তিনটি রোযা বা ছয়জন মিস্কীনকে সদকা ফিতেরর পরিমাণ অর্থাত্ পৌনে দু’সের (১ কেজি ৬৫০ গ্রাম) গম বা তার মূল্য প্রদান এ তিনটির যেকোন একটি করতে হবে। ৮. সেলাই করা কাপড় যদি একদিন এক রাতসহ পুরো একদিন পরিধানে থাকে, তবে ‘দম’ আর এর কম পরিমাণ সময় হলে সদকা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম গম বা তার মূল্য আদায় করতে হবে। ৯. স্বীয় স্ত্রীকে যৌন কামনাসহ চুমু খেলে কিংবা আলিঙ্গন করলে ‘দম’ দিতে হবে।

কিভাবে চিনবেন ডেঙ্গু ও এনকেফেলাইটিসের মশা

ডেঙ্গুর মশা:
  • *এডিস ইজিপ্টাই এবং এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার মাধ্যমেই ডেঙ্গুর ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করে। উপমহাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় এই দু’ধরনের মশার দেখা মেলে। এছাড়াও পানামা, মেক্সিকো ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও এই দু’ধরনের মশা দেখতে পাওয়া যায়।
  • *এই দুই মশার মধ্যে পার্থক্য হলো— এডিস ইজিপ্টাই-এর পিঠে বীণার মতো চিহ্ন থাকে। আর এডিস অ্যালবোপিকটাসের মশার পিঠে সাদা রডের মতো অংশ থাকে।
  • *এই দু’ধরনের মশার শরীরে কালো-সাদা ডোরাকাটা দাগ থাকে। বাঘের শরীরের ডোরাকাটা দাগের সঙ্গে আপাত মিলের জন্য একে টাইগার মশাও বলা হয়।
  • *এই প্রজাতির মশা সাধারণত স্বচ্ছ-পরিষ্কার পানিতে থাকে। ফেলে দেয়া টায়ার, পাত্র, নির্মীয়মান বাড়ির চৌবাচ্চা ইত্যাদি জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে বা অন্য কোনও কারণে পানি জমলে এই মশা সেখানে ঘর বাঁধতে পারে। এরা সেখানেই ডিম পাড়ে।
  • *যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা রয়েছে এই মশাগুলোর। সমুদ্রপৃষ্ঠে যেমন থাকতে পারে, তেমনই ৬০০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায়ও নিমেষে উড়ে বেড়াতে পারে। তিন মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে ডেঙ্গুর মশারা। প্লেন, ট্রেন বা যেকোনো গণ পরিবহণে করে এক জায়গা থেকে অন্যত্র চলেও যেতে পারে।
  • *ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করা এই ধরনের মশাগুলো বংশবিস্তার করলে, তাদের সন্তানাদিও ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করতে থাকে। একে বলা হয় ট্রান্স ওভারিয়ান ট্রান্সমিশন। অন্যান্য মশার কিন্তু এই ক্ষমতা নেই।
  • *এই মশা দমনের প্রধান উপায় হল পানি জমতে না দেয়া। বাড়ির টব, পট, চায়ের কাপ, ভাঁড় ইত্যাদি জায়গায় পানি জমা আটকাতে হবে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন নির্মীয়মান বাড়ির গর্তে দিনের পর দিন পানি জমে থাকতে দেখা যায়। এই জায়গাগুলোতে পানি না জমার ব্যবস্থা করা চাই। এখন বর্ষাকাল, তাই এই বিষয়টিতে আরো বেশি করে জোর দেয়া দরকার।
জাপানিস এনকেফেলাইটিসের মশা
  • *কিউলেক্স মশা এই রোগ ছড়িয়ে থাকে। এই মশার তিনটি প্রজাতি রয়েছে— কিউলেক্স বিষ্ণু আই, কিউলেক্স সিউডো বিষ্ণু আই, কিউলেক্স ট্রাইটেনিওরিঙ্কাস। তবে সাধারণত কিউলেক্স বিষ্ণু আই মশার কারণেই বেশি সংখ্যক মানুষ জাপানি এনকেফেলাইটিস অসুখটিতে আক্রান্ত হন।
  • *এই মশা নোংরা জায়গায় থাকতে পছন্দ করে। নর্দমা, ডোবা, খাল ইত্যাদি অপরিষ্কার জায়গা এই মশার বাসস্থান।
  • *সাধারণত শীতকালে পরিযায়ী পাখির মাধ্যমে এই ভাইরাস এদেশে আসে। এরপর সেই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে শূকরের শরীরে। কোনো কিউলেক্স প্রজাতির মশা ভাইরাস বহনকারী শূকরকে কামড়ালে মশার শরীরে এই ভাইরাস চলে আসে। তারপর সেই মশা কোনো সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তার শরীরে প্রবেশ করে এই ভাইরাস।
  • *এই মশাকে আলাদা করে চেনার কোনো সহজ উপায় নেই। আর পাঁচটা সাধারণ মশার মতোই কিউলেক্স মশা দেখতে হয়। শরীরে দাগও থাকে না।
  • *তবে অন্যান্য মশার সঙ্গে কিউলেক্স মশার বসার ভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। অন্যান্য মশার প্রজাতি একটি নির্দিষ্ট কোণে বসে, সোজা হয়ে বসতে পারে না। সেখানে কিউলেক্স মশা সোজা হয়ে বসতে সক্ষম।
  • *এই মশার বংশবৃদ্ধি আটকাতে বাড়ির আশপাশের নোংরা ও জলা জায়গাগুলোকে পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনে প্রশাসনকেও যথাযোগ্য ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করুন।

ডেঙ্গু মায়োকার্ডিটিস রূপ নিলেই সর্বনাশ! ঝুঁকি কমাতে এই তথ্যগুলো জেনে রাখুন

এখন ডেঙ্গুর মৌসুম। ঢাকা শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপও বেড়েছে। ভাইরাসজনিত এ রোগের কারণে শঙ্কা বাড়ছে মানুষের মনে। তবে ডেঙ্গু নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। বরং শুরু থেকে সচেতন থাকলে জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন, মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
এডিস ইজিপটি নামের মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু ভাইরাস মানব শরীরে প্রবেশ করে। এই মশা ভাইরাসবাহী কাউকে কামড়ানোর পর অন্য আরেকজনকে কামড়ালে সেই মানুষটি আক্রান্ত হয়। এডিস মশা স্থির পানিতে, যেমন—পরিত্যক্ত টায়ার, পানির বোতল, কনটেইনার, ফুলের টব, এয়ারকুলারের পানি ইত্যাদির মধ্যে বংশবৃদ্ধি করে। সাধারণত শহরাঞ্চলে রোগটি বেশি হয়, তুলনামূলকভাবে গ্রামে কম হয়। এক রোগী থেকে অন্য মানুষের শরীরে সরাসরি ডেঙ্গু ছড়াতে পারে না। তাই রোগীর সংস্পর্শে গেলেই ডেঙ্গুও হয় না।
চারটি সেরোটাইপ
ডেঙ্গুর বিষয়টি মানুষ জানলেও এর যে গতি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন হচ্ছে, সে সম্পর্কে সচেতনতা নেই অনেকের। অনেক চিকিৎসকেরও এ বিষয়ে ভালো ধারণা নেই। ফলে সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক থাকা উচিত।
ডেঙ্গু রোগের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে (ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪)। সাধারণত একবার এক সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হলে পরবর্তী সময় আরেকটি দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কারো হয়তো ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে, কিন্তু ঠিক কোন টাইপের ডেঙ্গু তা শনাক্ত করা হচ্ছে না। ফলে ডেঙ্গু পরীক্ষার পাশাপাশি টাইপিং বের করাটাও জরুরি। না হলে রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
রকমফের
ভাইরাসজনিত জ্বর ডেঙ্গু, যা এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। ডেঙ্গু ক্লাসিক্যাল, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোম—এই কয়েক ধরনের ডেঙ্গু হয়। যেমন—
ক্লাসিক্যাল : ক্লাসিক্যাল বা সাধারণ ডেঙ্গুতে প্রচণ্ড জ্বর হয়, যা ১০৪ থেকে ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্তও হতে পারে। জ্বর দুই থেকে সাত দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সঙ্গে মাথা ব্যথা, পেট ব্যথা, বমি বমি ভাব, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি বা গিঁটে ব্যথা, শরীরে র‌্যাশ থাকতে পারে। ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু হলে তেমন সমস্যা নেই, এতে মৃত্যুর মতো ঘটনা সাধারণত ঘটে না।
হেমোরেজিক : ডেঙ্গু হেমোরেজিকে জ্বর কমে যাওয়ার দু-তিন দিনের মধ্যে শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাল লাল র‌্যাশ বা রক্তবিন্দুর মতো দাগ দেখা যায়। অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে মাড়ি বা নাক দিয়ে আপনা-আপনি রক্তক্ষরণ, রক্তবমি, কালো রঙের পায়খানা, ফুসফুসে বা পেটে পানি জমা ইত্যাদি। রক্ত পরীক্ষা করালে দেখা যায়, রক্তের অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেটের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি বেশি, যাতে শরীর থেকে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হতে পারে।
ডেঙ্গু শক সিনড্রোম : ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের উপসর্গগুলোর পাশাপাশি রোগীর রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায়, নাড়ির গতি বৃদ্ধি পায়, হাত-পা শীতল হয়ে আসে, রোগী নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এমনকি রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের জ্বর হলে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া উচিত। অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত বা অণুচক্রিকাও দিতে হতে পারে। তবে সবার যে এমন হবে, তা কিন্তু নয়।
জ্বর হলে করণীয়
► যেকোনো জ্বরে আক্রান্ত রোগী যত বেশি বিশ্রামে থাকবে, যত বেশি তরল খাবার খাবে, তত দ্রুত জ্বর নিয়ন্ত্রণে আসবে। তাই ডেঙ্গুর মূল চিকিৎসা প্রচুর তরল বা পানি গ্রহণ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রামে থাকা ইত্যাদি।
► যেকোনো জ্বরে ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপর তাপমাত্রা গেলেই তা কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সাপোজিটরি ব্যবহার করতে হবে।
► প্রচুর পানি, শরবত ও তরল খাবার বেশি দিতে হবে। কোনো অবস্থায়ই শরীরে যেন তরলের ঘাটতি না হয়।
► জ্বর হলে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাবেন না। অন্যান্য ওষুধ প্রয়োগ না করাই উচিত। তবে যেকোনো জ্বর তিন দিনের বেশি থাকলে, শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই।
► চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ সেবন নয়। কেননা হেমোরেজিক ডেঙ্গু হলে কিছু ব্যথার ওষুধ রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে বিপদ ঘটাতে পারে।
► তীব্র জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথা, মাথা ব্যথা, চোখ ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ থাকলে অবশ্যই বিশ্রাম নিতে হবে।
► মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু কোনো মারাত্মক রোগ নয় এবং এতে চিন্তার কিছু নেই। এই রোগ নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়, এমনকি কোনো চিকিৎসা না করালেও। তবে মারাত্মক জটিলতা এড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত।
► জ্বর কমে যাওয়ার পরের কিছুদিনকে বলা হয় ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড। এ সময়টায় সবার সচেতন থাকা খুব জরুরি।
► ডেঙ্গু নিয়ে অহেতুক ভয় নেই। সাধারণ ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি ১ শতাংশের কম।
কখন হাসপাতালে
► ডেঙ্গুর চিকিৎসা বাড়িতেও সম্ভব, তবে বেশি দুর্বল ও পানিশূন্য হয়ে পড়লে বা শরীরের কোথাও রক্তবিন্দুর মতো দাগ, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, নাক বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার মতো যেকোনো লক্ষণে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।
► ডেঙ্গু আক্রান্তদের কারো পেট ব্যথা বা ডায়রিয়া হলে সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত।
► ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে দ্বিতীয়বার আক্রান্তরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
মায়োকার্ডিটিসে ভয় বেশি
এখনকার ডেঙ্গু রোগের প্রকৃতি ও ধরন অনেকটা বদলে গেছে। ডেঙ্গু হলে অনেকের হার্ট, লিভার ও কিডনি আক্রান্ত হচ্ছে। নতুন আতঙ্ক হয়ে সামনে এসেছে মায়োকার্ডিটিস বা হৃদযন্ত্রের প্রদাহ। ডেঙ্গু হলে সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা না নিলে হৃপিণ্ডের পেশির প্রদাহ বা মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। ডেঙ্গুর কারণে মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হওয়া খুবই বিপজ্জনক। এটি প্রায়ই ভাইরাল সংক্রমণের কারণে হলেও অনেক চিকিৎসকের পক্ষে তা দ্রুত বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
মায়োকার্ডিটিসের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—শ্বাস-প্রশ্বাসের হ্রস্বতা, বুকের ব্যথা, ব্যায়াম করার ক্ষমতা হ্রাস, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন ইত্যাদি। এই রোগ নির্ণয়ে রক্ত পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে, ইলেকট্রোক্রেডিওগ্রাফি (ইসিজি), ইকোকার্ডিওগ্রাম (হৃদযন্ত্রের বিশেষ আল্ট্রাসাউন্ড) ইত্যাদি পরীক্ষা করা যেতে পারে।
প্রতিরোধে করণীয়
► ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ হলেও এর কার্যকর কোনো টিকা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই রোগটি প্রতিরোধ করতে হলে যেকোনোভাবেই হোক, নিজেকে মশার কামড়ের হাত থেকে বাঁচাতে হবে।
► স্ত্রী এডিস মশা সাধারণত অল্প পানিতে, যেমন ঘরের ভেতরে জমে থাকা পানি, টবের পানি, ফ্রিজের পেছনে জমে থাকা পানি ইত্যাদিতে ডিম পাড়ে। তাই ফুলের টবসহ বাসার বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি নিয়মিত অপসারণ করুন। অন্তত তিন-চার দিন পর পর করা ভালো।
► এডিস মশা সাধারণত দিনের প্রথম ভাগে (সকালে) ও শেষ ভাগে (বিকালে) বেশি কামড়ায়। তবে রাতে ও অন্যান্য সময়ও কামড়াতে পারে। এ জন্য সব সময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করা উচিত।
► প্রয়োজনে মশার কয়েল, ইনসেক্ট স্প্রে ব্যবহার করুন।
► পারতপক্ষে দিনের বেলা ঘুমানোর অভ্যাস কমানো উচিত। দিনে ঘুমালেও মশারি বা মশানিরোধক ব্যবহার করুন।
► শিশুদের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখুন। কেননা তারা মশা তাড়াতে পারে না বলে মশা সহজেই কামড়ায়।
► গাঢ় রঙের কাপড়ে মশা বেশি আকৃষ্ট হয়, তাই হালকা রঙের কাপড় পরিধান করুন। এ ছাড়া এমন পোশাক পরুন, যাতে হাত-পা আলগা না থাকে। সম্ভব হলে ফুলহাতা জামা, হাত ও পায়ে মোজা পরিধান করুন।