Tuesday, October 8, 2024

মুইজু-মোদি সম্পর্কের বরফ গলছে

চীনপন্থি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজু অবশেষে ভারতের প্রতি নমনীয় হয়েছেন। মোদি-মুইজুর সম্পর্কের বরফ গলছে। দেশটির অর্থনীতিতে ভারতের অবদান স্বীকার করলেন। বললেন, ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি হলো আমাদের দুই দেশের জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক।

উল্লেখ্য, ভারত সফরে সোমবার এ কথা বলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মুইজু। মালদ্বীপ মারাত্মকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে সঙ্কটে। এমন সময় দুই দেশের সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক চুক্তিকে শক্তিশালী করতে মালদ্বীপকে কমপক্ষে ৬৩০০ কোটি রুপি সহায়তা দিতে রাজি হয় ভারত। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য হিন্দু ও হিন্দুস্তান টাইমস। রিপোর্টে বলা হয়, মোহাম্মদ মুইজু বলেছেন, মালদ্বীপের জন্য পর্যটন মার্কেটের সবচেয়ে বড় উৎসের একটি হলো ভারত। তিনি আশা করেন এই দ্বীপরাষ্ট্রটিতে অধিক পরিমাণ ভারতীয় পর্যটক সফর করবেন।

হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার পর তিনি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। বলেন, ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে সম্পর্ক কয়েক শতাব্দীর। ভারত সফরকে তিনি উল্লেখযোগ্য হিসেবে অভিহিত করেন। গত বছর প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে মালদ্বীপের কয়েকজন মন্ত্রী মন্তব্য করেন। তাতে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে অনলাইনে শুরু হয় ‘বয়কট মালদ্বীপ’ প্রচারণা। ওই সময় সেলিব্রেটিসহ অনেক ভারতীয় ঝাঁপিয়ে পড়েন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তারা মালদ্বীপের পরিবর্তে ভারতের ভিতরে লঙ্কাদ্বীপের মতো নয়নাভিরাম পর্যটন স্পটগুলো বেছে নেয়ার আহ্বান জানান। এসব বিষয়ে মুইজু বলেন, মালদ্বীপের বহু মানুষ পর্যটনের জন্য, চিকিৎসার জন্য, শিক্ষার জন্য এবং আরও অনেক কারণে ভারত সফর করেন। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মালদ্বীপ সফরে যান। তা মালদ্বীপের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। ভারত হলো আমাদের পর্যটন বাজারের অন্যতম বৃহৎ উৎস। আমরা মালদ্বীপে অধিক পরিমাণ ভারতীয় পর্যটককে স্বাগত জানাই। এতে আমাদের জনগণের সঙ্গে বোঝাপড়া ভাল হবে। প্রবৃদ্ধি ঘটবে।

গত বছর ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারণা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মুইজু। তারপর এটাই ভারতে তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। নির্বাচিত হয়েই তিনি তার দেশে নিয়োজিত ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারে নয়া দিল্লির প্রতি আহ্বান জানান। এর ফলে মালদ্বীপ এবং ভারতের মধ্যে সম্পর্কে টান ধরে। গত বছর নভেম্বরে ক্ষমতায় বসেন মুইজু। তারপর থেকে মনে করা হয়, তিনি খুব বেশি চীনপন্থি। এবার ভারত সফরে তিনি রোববার এসেছেন সন্ধ্যায়। সঙ্গে রয়েছেন ফার্স্টলেডি সাজিদা মোহামেদ এবং প্রতিনিধি দল। তাকে রাষ্ট্রপতি ভবন কমপ্লেক্সে গার্ড অব অনার দেয়া হয়েছে সোমবার। পরে দ্বিপক্ষীয় বিস্তৃত বিষয়ে পর্যালোচনা করতে হায়দরাবাদ হাউসে মোদির মুখোমুখি বসেন মুইজু। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ভারত ও মালদ্বীপ একসঙ্গে কাজ করবে, যাতে উভয় দেশ উপকৃত হয়। তিনি বলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এতে দুই দেশই উপকৃত হবে। পর্যটন খাতে বাড়বে ভারতের বিনিয়োগ। 

mzamin

শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবেন হাসিনা by মতিউর রহমান চৌধুরী

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন কী করবেন? দলের দায়িত্ব কাকে দেবেন? তিনিই বা যাবেন কোথায়? এ নিয়ে তিনি মনস্থির করতে পারছেন না। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে ভারতে পালিয়ে যান। এখনো তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। দুবাই চলে যাচ্ছেন- এমনটা চাউর হয়ে আছে ক’দিন থেকে। বিশেষ করে মানবজমিনে রিপোর্ট প্রকাশের পর। মানবজমিন আন্তর্জাতিক চাপের প্রসঙ্গ টেনে খবর দিয়েছিল ভারত সরকার তাকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে পাঠাতে সম্মত হয়েছে। যাই হোক, মাঝেমধ্যে তিনি তার দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। অনেকেই এটাকে ‘অডিও বিপ্লব’ বলছেন। পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে অডিও বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে নিমিষেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব কার হাতে দিচ্ছেন। এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র। নেতাকর্মীরাও চাচ্ছেন দলকে সংগঠিত করতে।

সর্বশেষ অডিও বার্তা থেকে জানা যায়, হাসিনা বলছেন- কাকে দায়িত্ব দেবো? যাকেই দেবো সেই তো গ্রেপ্তার হয়ে যাবে। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা বলছেন, হাসিনা দলের কাউকেই বিশ্বাস করেন না। তিনি শেষদিন পর্যন্ত চেষ্টা করবেন পরিবারের মধ্যেই কাউকে বেছে নিতে। দু’মাস হয়ে গেল তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন ছোটবোন রেহানা। কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল কাজের সূত্রে দিল্লিতে রয়েছেন। মাঝেমধ্যে তিনিও দেখা করছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তার সঙ্গে দেখা করছেন। করছেন শলা-পরামর্শও। এ নিয়ে নানা গুজব তো রয়েছেই। ওদিকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। দলকে সংগঠিত করার তাগিদ দিচ্ছেন। ডাকসাইটে সাবেক এক মন্ত্রীকে দল গোছানোর দায়িত্ব দিয়েছেন, অঘোষিতভাবে।

এই নেতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। বলছেন, ধৈর্য ধরো নেত্রী সহসাই নির্দেশ দেবেন। এর আগেও এমন অবস্থা হয়েছিল আওয়ামী লীগের। ১৯৭৫ সনের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল আওয়ামী লীগ। দলের একাংশ ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তবে অনেক বড় নেতা দেশেই অবস্থান করছিলেন। অনেকে অবশ্য জেলে গিয়েছিলেন। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই পালিয়ে গেছেন ভারতে। বিদেশে থাকায় ১৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা বেঁচে গিয়েছিলেন। পশ্চিম জার্মানি থেকে ভারতে নিয়েছিলেন রাজনৈতিক আশ্রয়, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। শেখ হাসিনার পথ অনুসরণ করেছেন দলটির অনেক বড় বড় নেতা। বলাবলি আছে, যাওয়ার আগ মুহূর্তে কাউকে কিছু না বললেও দলের অন্তত দু’জন নেতাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পরিস্থিতি বিবেচনায় নেতাকর্মীরা যেন ভারতে চলে যায়। এ কারণেই কি সব ‘মাস্টারমাইন্ড’ও ভারতে পৌঁছে গেছেন নিরাপদে!

যারা শেখ হাসিনাকে ডুবিয়েছেন তারাই আবার ঘুর ঘুর করছেন তার চারপাশে। এরাই কিন্তু নিজ দেশের নিরীহ জনগণের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুড়েছিল। যাই হোক, এটা কোনো সেইফ এক্সিটের অংশ কিনা- এ নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন। ঢাকায় আত্মগোপনরত কোনো নেতাই মুখ খুলছেন না। বরং যারাই রয়েছেন তাদের প্রায় সবাই শেখ হাসিনাকে দায়ী করছেন। বলছেন, তার একগুঁয়েমি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি এবং সীমাহীন দুর্নীতি দলকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে। এই সংকট এখন সর্বগ্রাসী। শেখ হাসিনা কবে দেশে ফিরতে পারবেন? অসংখ্য হত্যা মামলা তার বিরুদ্ধে। গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে চলেছেন।

দলের কেউ কেউ বলছেন, অতিমাত্রায় ভারত নির্ভর হওয়ার কারণে শেখ হাসিনার এমন পরিণতি হয়েছে। সঙ্গে ভারতও একপেশে নীতির কারণে দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছে। আত্মগোপনরত একজন আওয়ামী লীগ নেতা বললেন, হাসিনার সমস্যা হাসিনা নিজেই। আমলাদের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন দলকে ব্যবহার করতেন লাঠিয়াল হিসেবে। দল আর সরকার এক হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে হাসিনার পতনের পর ঐতিহ্যবাহী এই দলটি হারিয়ে গেছে রাজনীতির মাঠ থেকে। আওয়ামী লীগ হয়তো আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু তা সময়ের ব্যাপার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যারা বিগত সাড়ে ১৫ বছরে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন, এখন তারাই বলছেন- হাসিনার স্বৈরাচারী মনোভাব চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কতিপয় আমলা ও নেতার ওপর ছিলেন হাসিনা অন্ধ। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রোবটের মতো আচরণ করতেন। তাকে যা বলা হতো তাই তিনি বলে যেতেন অবলীলায়। এক পর্যায়ে তিনি বনে গেলেন ‘বিএনপি বিষয়ক মন্ত্রী’। প্রতিদিনই বিএনপি, তারেক রহমান আবার কখনো জিয়াউর রহমানকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন। ফ্যাশান আর টাকা বানানোর নেশায় তাকে পেয়ে বসেছিল। এখন তিনি কোথায়? সিঙ্গাপুর না ভারত, কেউ বলতে পারছেন না। শুরুতে শোনা গিয়েছিল তিনি নাকি যশোর সেনানিবাসে রয়েছেন।

আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের সাধারণ সম্পাদক যখন নিরাপত্তা বাহিনীকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেন তখনই প্রশ্ন ওঠে এই কাজটি কার। কারফিউ জারি হলে পুলিশ বা সেনাবাহিনী এই নির্দেশ দিয়ে থাকে। আন্দোলন দমাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট- এই বার্তাও দিয়েছিলেন। এতে করে ছাত্রলীগ পরিণত হয় দানবে। জনমানুষের ঘৃণা সৃষ্টি হয় তাদের বিরুদ্ধে। এ জন্য কাদেরকেই দায়ী করা হচ্ছে। তিনি হয়তো বলবেন, আমাকে যা বলা হয়েছিল- আমি তাই বলেছি। সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে এসব নির্দেশে। এখন আসলে পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে। হাসিনার সামনে বিকল্প কী? ভারতে কতোদিন থাকতে পারবেন? বেশিদিন নেই এটা তো এখন স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক চাপে ভারত তাকে বলেছে, ভিন্ন গন্তব্য খোঁজার। সর্বশেষ খবর তিনি দুবাই চলে যেতে পারেন।

হাসিনা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমের নিত্যদিনের হিসাব-নিকাশ পেয়ে যাচ্ছেন মুহূর্তেই। তিনি তার সহকর্মীদের বলছেন, মজা টের পাক। কতোদূর যাবে? দলের গোপালগঞ্জের এক নেতাকে বলেছেন, দেখ এক মাসও টেকে কিনা! শেখ হাসিনা যাই বলেন না কেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখনো নড়বড়ে, দুর্বল। দিক নির্দেশনাহীন। পেছনে সেনা সমর্থন না থাকলে তাদের অবস্থা কেমন হবে? সরকারের ভেতরে রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি না থাকায় এমনটা হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। দু’মাস কেটে গেল এভাবেই। সংলাপে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বিএনপি চাচ্ছে যৌক্তিক সংস্কার শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন।  জামায়াত হাঁটছে ভিন্ন স্রোতে। তারা চায় সংস্কার শেষে নির্বাচন। এটা কিন্তু বলা হচ্ছে না সংস্কারের জন্য কতোদিন সময় দরকার। জামায়াত হয়তো জানে না এই কৌশল পরাজিত শক্তিকেই উৎসাহিত করবে। তারা অবশ্য বারবার ভুল পথেই পা বাড়ায়। ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ার এক আড্ডায় শোনা গেল, জামায়াতের এই কৌশলকে উৎসাহিত করছে আঞ্চলিক একটি শক্তি। এখানে একটা সত্য কাহিনীর অবতারণা করছি। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক যখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখনকার ঘটনা। একদিন মুখ্যমন্ত্রীর একান্ত সচিব হাসতে হাসতে এসে বললো, স্যার আজ একটা সুখবর আছে। শেরেবাংলা জানতে চাইলেন কী সেই সুখবর। বলো, বলো! একান্ত সচিব বললেন, স্যার আজ আনন্দবাজার আপনার প্রশংসা করেছে। তখন শেরেবাংলা বললেন, আরে গর্দভ, এটা সুখবর নয়। খোঁজ নিয়ে দেখো আমি কোথাও ভুল করেছি। মনে রেখো, ওরা যখন আমার প্রশংসা করবে তখন বুঝবে আমি ঠিক পথে নেই। আর যখন সমালোচনা করবে তখন বুঝবে আমি সঠিক পথে রয়েছি। ওদিকে ইসলামপন্থিরা সংগঠিত হচ্ছে। তারা নতুন এক কাফেলা তৈরি করতে যাচ্ছে। যেটা এর আগে কখনো হয়নি। এই ভূখণ্ডে নতুন।  নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে এই কাফেলা ততো লম্বা হবে। দেখা যাক না শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়!

mzamin

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যেভাবে আয়রন ডোমকে ফাঁকি দিয়েছিল

গত ১ অক্টোবর দখলদার ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্কগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। তেল আবিবসহ ইসরায়েলের অন্যান্য শহরের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরান ১৮১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বহুল আলোচিত ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোমকে ফাঁকি দেয় এবং বেশিরভাগই সফলভাবে আঘাত হানে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে।

ইরানের এই হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কৌশল ও নিয়ম-কানুনে বড় ধরনের পরিবর্তন বলে অভিহিত করেছেন ‘নেগাহ’ নিউ স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক ও সম্পাদক মোহাম্মাদ আলি সানুবেরি। আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করাকে ইরানের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন তিনি।

সম্প্রতি গনমাধ্যমে এ সম্পর্কে তার লেখা একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয় যার শিরোনাম : ‘কীভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দখলদার ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটিগুলো ধ্বংস হলো ও তেল আবিবেব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হয়ে গেল?’

নিবন্ধে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক লিখেছেন, ‘ট্রু প্রমিজ-২ নামের ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান আধুনিক সামরিক কৌশলের একটি ভাগ্য নির্ধারণী মুহূর্ত এবং ইরান ও ইহুদিবাদী দখলদারদের মধ্যে চলমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।’ পার্সটুডে জানিয়েছে, ইরান কীভাবে ইসরায়েলের সামরিক শক্তি ও ভাবমূর্তি মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে তার কয়েকটি দিক বিশ্লেষণ করেছেন সানুবেরি-

ইসরায়েলের মূল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ

ট্রু প্রমিজ-২ অভিযানে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো ব্যাপকভাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। ফলে ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো পর্যন্ত এই অভিযানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ইহুদিবাদী দৈনিক মাআরিভ জানিয়েছে, যেসব ইসরায়েলি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে ছিল নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত ‘নেভাতিম’ বিমান ঘাঁটি এবং রাজধানী তেল আবিবের নিকটবর্তী ‘তেল নুফ’ ও ‘হাতজেরিম’ সামরিক ঘাঁটি। এ ছাড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিবে অবস্থিত ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদরদপ্তরেও আঘাত হানে।

ইরানের সমন্বিত হামলা

ট্রু প্রমিজ-২ অভিযান ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনাকে ধ্বংস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং এটি ছিল ইরানের পক্ষ থেকে চালানো একটি জটিল ও উচ্চমাত্রার অত্যাধুনিক হাইব্রিড যুদ্ধ যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সাইবার হামলা ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের সমন্বয় ঘটানো হয়েছিল।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা অবকাঠামোতে সাইবার হামলা

ট্রু প্রমিজ-২ অভিযানের আগে ও অভিযান চলাকালে ইরানি হ্যাকাররা ইসরায়েলের আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করে দিয়েছিল। এ সময় আয়রন ডোম তৈরিতে সহায়তাকারী পশ্চিমা কোম্পানি ফায়ার আই’র বিরুদ্ধেও সাইবার হামলা চালানো হয়, যার ফলে আয়রন ডোমের ব্যর্থতা তীব্রতর হয়। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এভাবে অকার্যকর করে দেয়ার ফলেই ৯০ শতাংশ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পেরেছে।

ইহুদিবাদীদের বিরুদ্ধে ইরানের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা

ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শেষ হওয়ার আগেই ইরানি হ্যাকাররা ইসরায়েলি নাগরিকদের টেলিফোনে এসএমএস পাঠানোর সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হন। তারা ইহুদিবাদীদের মোবাইল ফোনে এমন এসএমএস প্রেরণ করতে সক্ষম হন যাতে লেখা ছিল ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শেষ হয়ে গেছে। এর ফলে তারা হামলা শেষ হওয়ার আগেই তাদের ভূগর্ভস্থ আশ্রয় কেন্দ্রগুলো ছেড়ে বেরিয়ে আসে। মনস্তুত্বিক যুদ্ধের এই কৌশল গ্রহণের ফলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরবর্তী পরিস্থিতিনিয়ন্ত্রণে আনতে ইহুদিবাদী নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে বেশ বেগ পেতে হয়।

প্রতিরোধ ফ্রন্ট ও ইরান একযোগে সমন্বিত অভিযান চালায়

ইরান যখন তেল আবিবের আশপাশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তখন ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস তেল আবিবের একটি রেল স্টেশনে স্থল অভিযান চালায়। প্রতিরোধ ফ্রন্টের মধ্যে যে উচ্চমাত্রার যোগাযোগ ও কৌশল প্রণয়নের ম্যাকানিজম রয়েছে তা এই ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে। এতে বোঝা গেছে, আধুনিক যুদ্ধ এখন আর একটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই বরং বিমান ও স্থল বাহিনীর পাশাপাশি ইলেকট্রনিক টিমের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কৌশলগত লক্ষ্যগুলো হাসিলের লক্ষ্যে এই যুদ্ধ পরিচালিত হয়।

ইরানের হাইপারসনিক মিসাইল। ছবি : সংগৃহীত
ইরানের হাইপারসনিক মিসাইল। ছবি : সংগৃহীত



লেবাননে স্থল অভিযান চালিয়ে হুমকির মুখে ইসরায়েলি বাহিনী

লেবাননে স্থল অভিযান চালিয়ে ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। একদিকে যখন ইসরায়েলি সেনারা অভিযানের জন্য লেবাননে ঢুকছে তখনই অন্যদিকে ফাঁদ পেতে ইসরায়েলি সেনাদের দলগুলোকে আক্রমণের মুখে ফেলছে হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও চালিয়ে যাচ্ছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলি বাহিনী প্রযুক্তি ও মার্কিন অস্ত্রের বলে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও স্থল অভিযানে লেবাননের মাটিতে তারা বিপাকে পড়বে। বলা হচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা ট্যাংক অথবা বিমান থেকেই ভালো যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারে। স্থল অভিযানে তাদের কোনো রকম আশ্রয় ছাড়া জীবন বাঁচানোর জন্যই দৌড়াতে হবে। এরআগে ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে একপ্রকার পিছু হটতে বাধ্য হয় ইসরায়েলি সেনারা।

স্থল অভিযান শুরুর পর দক্ষিণ লেবাননের ওদাইশেহ শহরে ঢোকার মুখে হিজবুল্লাহর প্রবল প্রতিরোধে পিছু হটতে বাধ্য হয় ইসরায়েলি সেনারা। এ ছাড়াও সীমান্তের অন্যান্য স্থানে গেরিলা কায়দায় ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর দফায় দফায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে লেবাননের যোদ্ধারা। এতে আহত সেনাদের নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় নেতানিয়াহু বাহিনী।

এদিকে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে প্রবল সংঘাতের মধ্যেই লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে শনিবার রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত তীব্র বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়, ‘ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে বৈরুতের দক্ষিণের শহরতলিগুলোতে ৪টি খুবই ভয়ংকর হামলা চালানো হয়েছে এবং একটি হামলা হয়েছে চুয়েফাত এলাকায়।

স্যাটেলাইটের ছবিতে বার্জ আল-বারাজনেহ, হারেত হারিক ও চুয়েফাত আল-আমরুসিয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হওয়ার ছবি ফুটে উঠেছে। শনিবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল ড্যানিয়েল হাগারি বলেন, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্থলাভিযানে তারা ৪৪০ হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। ধ্বংস করেছে হিজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে প্রায় দুই হাজার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থল। 

ইসরায়েলি বাহিনীর সৈন্যরা। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলি বাহিনীর সৈন্যরা। ছবি : সংগৃহীত

গাজা ধ্বংসে ইসরায়েলকে রেকর্ড অস্ত্র দিয়েছে আমেরিকা

গেল বছরের ৭ অক্টোবর গাজায় শতাব্দীর ভয়াবহ হামলা শুরু করে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল। অবরুদ্ধ উপত্যকাটিকে মাটিয়ে মিশিয়ে দেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা দেয় তেলআবিব। শুধু তাই নয় নিরীহ ফিলিস্তিনিদের মানব জানোয়ার বলেও মন্তব্য করেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ। আহত হয়েছেন এক লাখের বেশি ফিলিস্তিনি। নেতানিয়াহু প্রশাসনের এমন হিংস্র ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম সহযোগী হিসেবে নিরবচ্ছিন্নভাবে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

সম্প্রতি প্রকাশ্যে এলো গাজা ধ্বংসে ইসরায়েলি বাহিনীকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তার পরিমাণ। এতে দেখা যায়, ইসরায়েলের জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত চলমান গাজা যুদ্ধে তেল আবিবকে রেকর্ড সামরিক সহায়তা করেছে ওয়াশিংটন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এক বছরে ইসরায়েলের জন্য কমপক্ষে ১ হাজার ৭৯০ কোটি ডলার পরিমাণ সামরিক সহায়তা পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এটা ইসরায়েলকে এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো সর্বোচ্চ পরিমাণ সামরিক সহায়তা। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

গত বছরের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়। এর জবাবে সেদিন থেকেই ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। সে ঘটনার বর্ষপূর্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের কস্টস অব ওয়ার প্রকল্প। প্রতিবেদনে গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সহায়তার হিসাব দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের আয়রন ডোম ডেভিডস স্লিং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করতে ৪০০ কোটি ডলার খরচ করা হয়েছে। এ ছাড়া বন্দুক ও উড়োজাহাজের জ্বালানি বাবদ খরচ করার জন্য দেশটিকে নগদ অর্থ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত এক বছরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান চালানোর জন্য অতিরিক্ত ৪৮৬ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে। লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে হুতিদের হামলা ঠেকাতে মার্কিন সামরিক অভিযান বাবদ খরচগুলোকে এ হিসাবের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। ইয়েমেনভিত্তিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের দাবি, গাজার জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে তারা এসব হামলা চালাচ্ছে।

গবেষক উইলিয়াম ডি হারটাং ও স্টিফেন সেমলারকে সঙ্গে নিয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন এফ কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের অধ্যাপক লিন্ডা জে বিলমেস মার্কিন সহায়তার হিসাব করেছেন। নাইন ইলেভেনের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের চালানো যুদ্ধগুলোর খরচের হিসাব-নিকাশও তিনিই করেছিলেন।

মার্কিন অস্ত্র। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন অস্ত্র। ছবি : সংগৃহীত



গাজা ও লেবাননে যা ঘটবে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে

এক বছর পূর্ণ হলো গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের। গেল বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে নজিরবিহীন সামরিক হামলা চালায় গাজার স্বাধীনতকামী সংগঠন হামাসের সামরিক শাখা আল কাসসাম ব্রিগেড। ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে চালানো এ হামলার প্রতিশোধ নিতে সেদিন থেকেই গাজায় বর্বরোচিত হামলা শুরু করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী।

গাজাকে সম্পূর্ণ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার কথা জানান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব বলেই মনে করেন ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক প্রধান জিওরা এইল্যান্ড।

ইসরায়েলি সাবেক এ কর্মকর্তা জানান, গাজা ও লেবাননে কখনোই সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করতে পারবে না ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যালেন টুয়েলভ-এ দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এইল্যান্ড জানান, হামাস ও হিজবুল্লাহ কখনোই আত্মসমর্পণ করবে না বরং তারা ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে সবসময়ই প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।

তিনি জানান, দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা ইসরায়েলের জন্য কখনোই স্বার্থ রক্ষা করবে না, এরচেয়ে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আলোচনা করাটাই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করেন এইল্যান্ড। সাবেক এ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করেন, গাজা ও লেবাননে একমাত্র সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেই সমাধান পাওয়া যাবে এমনটা বিশ্বাস করা খুব দুর্ভাগ্যজনক।

এদিকে, গাজা যুদ্ধের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দক্ষিণ গাজা থেকে ইসরায়েলের তেলআবিব শহর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে হামাসের সামরিক শাখা আল কাসসাম ব্রিগেড। 

ইসরায়েলি বাহিনীর সদস্যরা। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলি বাহিনীর সদস্যরা। ছবি : সংগৃহীত

ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হিজবুল্লাহ ও হামাসের

ইসরায়েলের হামলার জবাবে পাল্টা হামলা চালিয়েছে হামাস ও হিজবুল্লাহ। গতকাল সোমবার ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি শহরে হামলা চালিয়েছেন ওই দুই সশস্ত্র সংগঠনের যোদ্ধারা। এ সময় ইসরায়েলজুড়ে সতর্কসংকেত বাজতে শোনা যায়। গাজা ও লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজা ও লেবাননে অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন।

লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, গতকাল ভোরে ইসরায়েলের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হাইফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালান তাদের যোদ্ধারা। এরপর বিকেলেও একই শহরে দ্বিতীয় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালান তাঁরা। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি উত্তর ইসরায়েলে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলাও চালায় হিজবুল্লাহ।

হাইফার দক্ষিণে ইসরায়েলের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সেই ঘাঁটি লক্ষ্য করেই ফাদি-১ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। হাইফার থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরের আরেক ইসরায়েলি শহর তিবেরিয়াসেও গতকাল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে সংগঠনটি। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তিবেরিয়াসের উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে অন্তত ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এর মধ্যে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে তারা।

গতকাল জাল আল-আলম সামরিক ঘাঁটিতে ইসরায়েলের সেনা ও সাঁজোয়া যান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। এ ছাড়া উত্তর ইসরায়েলের কারমিয়েল শহরে রকেট হামলা চালানোর দাবি করেছে তারা।

আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে হাইফায় অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যদিও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন সামান্য আহত হয়েছেন। বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে তারা।

গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা শুরুর এক বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ উপত্যকাটির শাসকগোষ্ঠী হামাস জানিয়েছে, গতকাল ইসরায়েলের বাণিজ্যিক নগরী তেল আবিবে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তারা। হামলায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের একাধিক সংবাদমাধ্যম।

তেল আবিব লক্ষ্য করে একযোগে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে হামাসের সামরিক শাখা কাসেম ব্রিগেডস। গত আগস্টের পর গতকাল ইসরায়েলের কোনো বড় শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাল তারা।

হামাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল নির্বিচার হামলা চালিয়ে গাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে। ইসরায়েলের হামলার মুখে গাজার উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ইসরায়েলের এ হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে তাদের যে লড়াই চলছে, তেল আবিবে হামলা তারই অংশ।

গতকাল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে ইসরায়েলের ফার ভেরাদিম শহরেও। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি বাড়ি ও কয়েকটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

গাজার আরেক সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠন ইসলামিক জিহাদ জানিয়েছে, গতকাল গাজা সীমান্তবর্তী ইসরায়েলের সেদরত, নির আমসহ বেশ কয়েকটি শহরে রকেট হামলা চালিয়েছে তারা।

গতকাল তেল আবিবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। হুতিদের সামরিক মুখপাত্র জেনারেল ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, তেল আবিবে দুটি সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে গতকাল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালান তাঁরা। পাশাপাশি ড্রোন হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলের এলিয়াত শহরেও একাধিক ড্রোন হামলা চালিয়েছেন হুতি যোদ্ধারা।
গাজায় হামলা অব্যাহত

গাজায় বিমান থেকে বোমা হামলার পাশাপাশি স্থল হামলাও অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। গতকাল গাজার দেইর-এল-বালাহ এলাকায় আল-আকসা হাসপাতালে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, ওই হাসপাতাল ‘যুদ্ধ পরিচালনার ঘাঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে হামাস।

এর আগে গত রোববার রাতে দেইর-এল-বালাহর সাহদা আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত হন। উদ্বাস্তু বহু ফিলিস্তিনি ওই মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

গতকাল গাজার খান ইউনিস এলাকায় বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলার অল্প কিছু আগে ওই এলাকায় আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের অন্যত্র সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্যত্র সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই হামলা শুরু হয়।

গতকাল হাজার বির আন–নাজা, বেহিত লাহিয়া, খিরবেত আল–আদাস, গাজা সিটি ও জেইতুন শহরে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এ ছাড়া গতকাল উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় স্থল হামলা করেন ইসরায়েলি সেনারা।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ২৪ ঘণ্টায় গাজায় অন্তত ৩৯ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজার অন্তত ৪১ হাজার ৯০৯ ফিলিস্তিনি নিহত হলেন। এ ছাড়া একই সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৯৭ হাজার ৩০৩ জন। তবে বিশ্লেষকদের শঙ্কা, হতাহতের এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
লেবাননে ইসরায়েলি ২ সেনা নিহত

লেবাননেও নির্বিচার হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল দেশটির রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে একযোগে একাধিক বিমান হামলার ঘটনা ঘটে। গতকাল বৈরুতের কেন্দ্রস্থলের একটি আবাসিক ভবনে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, ওই ভবনে রয়েছে হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার। তবে এক বিবৃতিতে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে হিজবুল্লাহ।

গতকাল বৈরুতসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বোমা হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বিনত জাবেলি এলাকায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় গতকাল দেশটির অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর ১০ সদস্য প্রাণ হারান।

লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লড়াই চলছে। গতকাল লেবাননে আরও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী।

হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্মুখ লড়াইয়ে গতকাল দুজন সেনা নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গতকাল এক বিবৃতিতে জানায়, লেবাননে আরও দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া সম্মুখ লড়াইয়ে আহত আরও দুই সেনার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর উদ্ধারকাজে অংশ নেন জরুরি সেবা বিভাগের কর্মীরা। হাইফা, ইসরায়েল, ৭ অক্টোবর, ২০২৪
ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর উদ্ধারকাজে অংশ নেন জরুরি সেবা বিভাগের কর্মীরা। হাইফা, ইসরায়েল, ৭ অক্টোবর, ২০২৪ ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা হামলার পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। গাজার উত্তরাঞ্চল, ফিলিস্তিন, ৭ অক্টোবর, ২০২৪
ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা হামলার পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। গাজার উত্তরাঞ্চল, ফিলিস্তিন, ৭ অক্টোবর, ২০২৪ ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধবিমান থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা হামলা ধসে গেছে ভবনের ওপরের অংশ। টাইরে, লেবানন, ৭ অক্টোবর, ২০২৪
যুদ্ধবিমান থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা হামলা ধসে গেছে ভবনের ওপরের অংশ। টাইরে, লেবানন, ৭ অক্টোবর, ২০২৪ ছবি: রয়টার্স

ফিলিস্তিন–ইসরায়েল সংঘাত: এক বছরে গাজার ৪০ হাজার স্থাপনায় হামলা

গত এক বছরে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ৪০ হাজারের বেশি স্থাপনা লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এ সময় ৪ হাজার ৭০০ সুড়ঙ্গের সন্ধান পেয়েছে তারা। এ ছাড়া গাজার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১ হাজার রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলে হামাসের হামলার এক বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল। হামাসের হামলার পরপরই গাজায় পাল্টা হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। শুরু হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ। এর এক বছর পূর্তিতে গতকাল সোমবার ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

অনুমতি সাপেক্ষে গাজা যুদ্ধে নিহত ইসরায়েলি সেনাদের একটি তালিকাও প্রকাশ করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। তালিকা অনুযায়ী, গত এক বছরে এই যুদ্ধে ৭২৬ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৮০ জনেরই মৃত্যু হয়েছে ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার সময়। অপর দিকে ২৭ অক্টোবর থেকে গাজায় স্থল অভিযান শুরুর পর মৃত্যু হয়েছে বাকি ৩৪৬ সেনার। এ সময় ৪ হাজার ৫৭৬ সেনা আহত হয়েছেন। অভিযান চালানোর সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ৫৬ জন সেনা নিহত হয়েছেন। তবে তাঁদের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, এ বিষয়ে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

৭ অক্টোবরের বর্ষপূর্তিতে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৩ লাখ রিজার্ভ সেনার তালিকা করেছে তারা। তাঁদের মধ্যে ৮২ শতাংশ পুরুষ ও ১৮ শতাংশ নারী। তাঁদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ২০ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে।

গাজায় ইসরায়েলের হামলার পর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেয় লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজুবল্লাহ। এ ছাড়া ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও ইসরায়েলকে হুমকি দেয়। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর গাজা থেকে ইসরায়েলে অন্তত ১৩ হাজার ২০০ রকেট ছোড়া হয়েছে। এ সময় লেবানন থেকে ছোড়া হয়েছে ১২ হাজার ৪০০ রকেট। এ ছাড়া ইরান থেকে ৪০০, ইয়েমেন থেকে ১৮০ ও সিরিয়া থেকে ৬০টি রকেট ছোড়া হয়েছে ইসরায়েলে।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা লেবাননের ৮০০–এর বেশি যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। এ সময় ৪ হাজার ৯০০টি স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা ও প্রায় ৬ হাজার স্থাপনায় স্থল হামলা চালানো হয়েছে। এ সময় দখল করা পশ্চিম তীর ও জর্ডান উপত্যকা থেকে ৫ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে তারা।

গাজা যুদ্ধের বর্ষপূর্তিতে দেওয়া তথ্যে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত এক বছরে তারা হামাসের আটজন ব্রিগেড কমান্ডারকে হত্যা করেছে। এ ছাড়া ৩০ জন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ও ১৬৫ জন কোম্পানি কমান্ডারও নিহত হয়েছেন।

গত বছরের ৭ অক্টোবর গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। এর আগে হামাস ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নাগরিককে হত্যা ও ২৫০ জনকে জিম্মি করে। গত এক বছরে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৪২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ঘরবাড়ি।  এর মধ্যেই কোনোরকম তাঁবু টানিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। গতকাল গাজায়
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ঘরবাড়ি। এর মধ্যেই কোনোরকম তাঁবু টানিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। গতকাল গাজায়। ছবি: রয়টার্স

অন্তর্বর্তী সরকারের দুই মাস: প্রত্যাশা প্রাপ্তির ফারাক বাড়ছে

ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ৮ই আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পূর্ণ করেছে দুই মাস। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েই কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়েছে সরকারকে। এ সময়ে সরকারের নেয়া বেশকিছু উদ্যোগ প্রশংসিতও হয়েছে। তবে জনপ্রত্যাশা কতোটুকু পূরণ করতে পেরেছে বর্তমান সরকার, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, লাগামহীন দ্রব্যমূল্যে ভুগছে সাধারণ মানুষ। এ ছাড়াও অস্থিরতা রয়েছে জনপ্রশাসন, পুলিশ, ব্যাংক ও শিক্ষাখাতে। পুরোপুরি পুনর্গঠন করা যায়নি বিচার বিভাগ। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, কল-কারখানা অচলায়তন, বন্যাসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিপ্লব পরবর্তী দুই মাসে একটি দেশকে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন। দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন এটিও বলা যাচ্ছে না। তাই ড. ইউনূস সরকারকে পুরোপুরি সফল হতে সময় লাগছে।
সরকারের দুই মাসের কার্যক্রম নিয়ে দলগুলোর মধ্যেও আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার, নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা, প্রশাসন নিরপেক্ষকরণ, নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহার করা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে যথেষ্ট অস্পষ্টতা ও ধীরগতি রয়েছে বলে মনে করে বিএনপি’র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন দলটির নেতারা। সর্বশেষ সরকারের সঙ্গে সংলাপে বিএনপি’র পক্ষ থেকে সরকারের কিছু দুর্বলতার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি তা কাটিয়ে উঠতে পরামর্শও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংলাপে জামায়াতে ইসলামীও কিছু পরামর্শ দিয়েছে সরকারকে। অন্যান্য দলের পক্ষ থেকে যেসব পরামর্শ এসেছে তা পর্যালোচনা করে বাস্তবায়ন করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, এক থেকে দুই মাস ব্যক্তি জীবনে অনেক হলেও একটি রাষ্ট্র বা সরকারের জন্য যথেষ্ট নয়। অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্রকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে কিছুটা সময় লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে প্রধান উপদেষ্টাকে এনজিওভিত্তিক সরকার থেকে বের হয়ে রাজনৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন করা উচিত। কাউকে কাউকে বাদ দিয়ে নতুন রাজনৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিদের যোগ করে সরকার পুনর্গঠন করতে পারলে সফল হবেন তিনি। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ই আগস্ট শপথ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ২১ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ ৪১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। যেখানে রয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম দুই সমন্বয়ক। দায়িত্ব গ্রহণের পরই সরকার বেশকিছু উদ্যোগ ও কাজ করেছেন। বিশেষ করে মানবাধিকার, অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, বিচার বিভাগসহ বেশকিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ছাড়াও রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। যেগুলোর মাধ্যমে প্রস্তাবিত পরামর্শ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ঐক্যমতের ভিত্তিতে সরকার নতুন সংস্কার কাজে হাত দেবে। ৬টি কমিশন হলো- ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, সফর রাজ হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশন, বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমানের নেতৃত্বে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, ড. ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বে দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন, আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন এবং প্রফেসর ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বে সংবিধান সংস্কার কমিশন। এসব কমিশন আগামী ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের সংস্কার প্রস্তাবনা দেবে। তারপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ঐক্যমতের ভিত্তিতে সংস্কার কাজে হাত দেবে সরকার। এরই অংশ হিসেবে গত শনিবার থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করছেন প্রধান উপদেষ্টা। এদিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর ছাত্র আন্দোলনে হওয়া বিভিন্ন মামলা প্রত্যাহার ও বন্দিদের মুক্তি দেয়। এ ছাড়াও আইসিটি আইনে হওয়া বন্দিদের মুক্তি দেয়া হয়। ছাত্র-জনতার ওপর হওয়া হত্যাযজ্ঞের তদন্তে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারা দেশে এসে কাজ করছেন। ছাত্র আন্দোলনে আহত-নিহতদের চিকিৎসা ও পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের জড়িতদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালকে সচল করা হয়েছে। এ ছাড়াও গত ২৯শে আগস্ট গুম বিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। গঠন করা হয়েছে গুম বিষয়ক একটি  অনুসন্ধান কমিশন। প্রধান বিচারপতি নিয়োগসহ বিচার বিভাগ দলীয়করণ থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জনপ্রশাসন ও পুলিশকে দলীয়করণ থেকে মুক্ত করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরের সচিব পরিবর্তন ও পুলিশের শীর্ষ পদে নতুনদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে পূর্বের সব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। অপসারণ করা হয়েছে অধিকাংশ জেলার ডিসিকে। অর্থনৈতিক খাতের ওপর শ্বেতপত্র প্রকাশের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অপসারণ করা হয়েছে ফ্যাসিবাদী সময়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। সব সরকারি কর্মচারীকে সম্পদের হিসাব দেয়ার নির্দেশনাও দিয়েছে নতুন সরকার। ৪ঠা সেপ্টেম্বর থেকে ছিনতাই হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করছে যৌথ বাহিনী। সেনাবাহিনীসহ তিন বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ১২ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে গণশুনানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয়ে। এ ছাড়াও গণভবনকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এদিকে অস্থির শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে সব স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। অন্যদিকে ব্যর্থতাও রয়েছে সরকারের। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি এখনো। মব জাস্টিসের মতো ঘটনা ঘটছে। খুন, রাহাজানির ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। চলছে চাঁদাবাজি, দখলদারি, টেন্ডারবাণিজ্যের মতো ঘটনা। পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি সক্রিয় না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। এ ছাড়া পুলিশ সক্রিয় না হওয়ায় শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাও একেবারেই ভেঙে পড়েছে। এমতাবস্থায় আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে তিন বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে জুলাই হত্যাকাণ্ড নিয়ে হওয়া মামলা ও আসামিদের নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। তাই এসব মামলায় ন্যায়বিচার কতোটুকু নিশ্চিত হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর অধিকাংশ মামলার আইনিভিত্তি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। একটা মামলার ভিত্তি নিয়ে যখন বিতর্ক থাকে তখন শেষ পর্যন্ত কী ধরনের  বিচার হতে পারে সেটি শুরু থেকেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস অবস্থা সাধারণ মানুষের। বাজারে এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। সরকার থেকে কয়েকটি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও তার চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, বিশ্ববাজারে বেশকিছু পণ্যের দাম কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশে তার প্রভাব নেই। বরং উল্টো জিনিসের দাম বেড়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কথায় পরিবহন চাঁদাবাজি কমেছে। তাহলে সেই প্রভাব বাজারে নেই কেন? এ ছাড়া ২৯টি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হলেও তার প্রভাবও বাজারে দেখা যাচ্ছে না। আগের কারবার এখনো চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে না। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল সরকার থেকে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। অস্থিরতা রয়েছে জনপ্রশাসনে। পুরনো সরকারের আমলারা সরকারকে ঠিকমতো সহযোগিতা করছেন না। এ ছাড়াও পদোন্নতি ও দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রতিনিয়ত সরকারকে বেকায়দায় ফেলছে সরকারি চাকরিজীবীরা। অন্যদিকে প্রশাসনের লোকদের দুর্নীতির অভিযোগও সামনে আসছে। যা সরকারকে বেকায়দায় ফেলছে। বেহাল আর্থিক খাতও। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাংকিং খাত। এ ছাড়াও তারল্য সংকট, সুশাসনের অভাবসহ একাধিক সমস্যায় ভুগছে অনেকগুলো ব্যাংক। মালিকানা নিয়েও রয়েছে দ্বন্দ্ব। বেশ কয়েকটি ব্যাংকে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব ব্যাংকের পরিচালকরা আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, ইতিমধ্যে সেসব ব্যাংকের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। ফলে ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। এমনিতেই এই খাত উচ্চ খেলাপি ঋণে ধুঁকছে। অস্থিরতা রয়েছে পুঁজিবাজারেও। সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বেশির ভাগ সময়ই দরপতন হয়েছে। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি। চলমান এই দরপতনকে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন বলে মনে করেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। শিক্ষাঙ্গনেও অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ক্লাস পরীক্ষা চালু হলেও এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা রয়ে গেছে। শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বসে আছেন পতিত সরকারের অনুগতরা। তাই বিক্ষোভ চলমান এসব প্রতিষ্ঠানে। বিশেষ করে পিএসসি চেয়ারম্যানসহ সদস্যদের পদত্যাগ না করায় আটকে আছে চাকরি পরীক্ষা ও ভাইবা। বন্ধ রয়েছে বেশির ভাগ নিয়োগ পরীক্ষা। যার কারণে ভুগতে হচ্ছে চাকরিপ্রত্যাশীদের। অন্যদিকে যত্রতত্র বিভিন্ন দাবিতে রাস্তায় নেমে পড়ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। যার কারণে অস্থিরতা রয়েছে রাষ্ট্রে। এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগও নেই সরকারের। অনেকে সরকারকে অস্থিরতায় ফেলতে এমন করছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায় একটি গোষ্ঠী। অস্থিরতা কাটেনি পাহাড়েও। সেখানেও বিভিন্ন সহিংসতায় কারও কারও উস্কানি রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়াও অস্থিরতা রয়েছে পোশাকখাতেও। এখনো পোশাকখাতে শৃঙ্খলা ফেরানো যায়নি। বিক্ষোভে বন্ধ রয়েছে অসংখ্য পোশাক কারখানা। যার কারণে এ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আহতদের সঠিক চিকিৎসা দেয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন অনেক আহতব্যক্তি। ইতিমধ্যে সরকারের সমালোচনাও করছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তারা বিভিন্ন বক্তব্যে নিজেদের অসন্তুষ্টির কথা বলছেন তাদের বক্তব্যে।

mzamin

শিক্ষক থেকে ৫০০ কোটি টাকার মালিক হেনরী by সুজন সরকার

সিরাজগঞ্জের আলোচিত নাম ড. জান্নাত আরা তালুকদার হেনরী। ছিলেন গৃহবধূ, সংগীত শিল্পী ও স্কুল শিক্ষিকা। পরবর্তীতে হন রাজনৈতিক নেত্রী। সেখান থেকে সংসদ নির্বাচনে নৌকার টিকিট পেয়েও ভোটে পরাজিত হন। এরপর সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পদ পেয়ে   যান। পদ পেয়ে বনে যান প্রভাবশালী নেত্রী। এই পদটি যেন আলাদীনের চেরাগের মতো ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেয় তার। এখান থেকেই তার উত্থান শুরু। হয়ে যান অঢেল সম্পদের মালিক। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে দলীয় পদ-পদবির পাশাপাশি বাড়তে থাকে তার সম্পদের পরিধিও কথিত আছে, টাকার জোরেই ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সদর আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বাগিয়ে নেন তিনি। শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও কোটি কোটি টাকা খরচ করে হয়ে যান এমপি। এমপি হয়েই জেলার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন। নিজে সংসদ সদস্য হওয়ার ৩ মাসের মধ্যে ১৬ কোটি টাকা খরচ করে স্বামী শামীম তালুকদারকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বানিয়ে আনেন। হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ঋণপ্রদান ও মওকুফ, চাকরি বাণিজ্য, কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, বদলিসহ নানা অপকর্মের মাধ্যমে শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে কোটিপতি বনে যান স্থানীয় সবুজ কানন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক হেনরী। শুধু নিজ জেলা সিরাজগঞ্জ নয়, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, পটুয়াখালী ও ঢাকায় তার অঢেল সম্পদ। দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ১৬ বছরে ৫০০ কোটিরও বেশি টাকার সম্পদের মালিক হেনরী। অথচ ২০০৮ সালে মাত্র সাড়ে ৬ লাখ টাকার সম্পদের মালিক ছিলেন তিনি। সরকারি হিসেবেই তার সম্পদ বেড়েছে ৮৮৪গুণ, বেসরকারি হিসেবে যা ২১শ’ গুণেরও বেশি।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে হেনরীর নির্বাচনী হলফনামা থেকে জানা যায়, গত ১৬ বছরে তার সম্পদ বেড়েছে ৮৮৪গুণ। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় হলফনামায় উল্লেখ করেছিলেন স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা। শিক্ষকতা ও কৃষি থেকে আয় ছিল ১ লাখ ২২ হাজার টাকা। বার্ষিক খরচ দেখানো হয়েছিল ৮০ হাজার টাকা। আয়কর নথির হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত ১৪ বছরে তার সম্পদ ৮৮৪ গুণ বেড়ে হয়েছে ৫১ কোটি ৯৮ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।
সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের সদানন্দপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষক আব্দুল হামিদ মিঞার মেয়ে ড. জান্নাত আরা তালুকদার হেনরী। রাজনীতিবিদ ভাষা সৈনিক সাবেক গভর্নর মোতাহার হোসেন তালুকদারের ছেলে শামীম তালুকদার লাবুর সঙ্গে বিয়ের পর সবুজ কানন স্কুল এন্ড কলেজে সংগীত শিক্ষকের চাকরি নেন। পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হিসেবে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।

রাজনৈতিক পরিবারের পুত্রবধূ হওয়ার সুবাদে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন মহিলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান হেনরী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠন করার পর ড. হেনরীকে করা হয় সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। সোনালী ব্যাংকের আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে ড. জান্নাত আরা তালুকদার হেনরীর নামও ছিল। কারাগারে থাকা হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ব্যাংকের কয়েকজন পরিচালকের বিরুদ্ধে তার কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের কথা বলেন। পরে দুদক তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে। পর্যায়ক্রমে ৩ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিলেও অবৈধ সম্পদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। অবশেষে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওই অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পান হেনরীসহ পরিচালকরা।

হেনরীর আয়কর নথিতে ২০১৯ সালের ৩০শে জুন নিট সম্পদ দেখানো হয় ১১ কোটি ৬৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে জমির দাম হিসেবে ২ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার কালো টাকা সাদা করা হয়। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত নিট সম্পদ দেখানো হয় ৪৭ কোটি ৩৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকার। এর মধ্যে তিনি ৩২ কোটি ৫০ লাখ কালো টাকা সাদা করেন। ২০২১ সালের ৩০শে জুন আয়কর নথিতে নিট সম্পদ উল্লেখ করা হয় ৪৭ কোটি ৭১ লাখ ৮৮ হাজার টাকার। ২০২২ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত আয়কর নথিতে আবার ১ কোটি ৩০ লাখ কালো টাকা সাদা করা হয়। নিট সম্পদ দেখানো হয় ৫১ কোটি ৯৮ লাখ ৫৮ হাজার টাকার।

সিরাজগঞ্জ ও গাজীপুরে হেনরীর নামে সাইনবোর্ড দেয়া স্থাবর অনেক সম্পদ আছে। সিরাজগঞ্জের গজারিয়ায় রিসোর্ট কিছুক্ষণ, নলিছাপাড়ায় জান্নাত আরা হেনরী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ এবং হেনরী ইনস্টিটিউট অব বায়োসায়েন্স টেকনোলজি, মুজিব সড়কে রাস মেডিকেয়ার নামে ক্লিনিক, গজারিয়ায় হেনরী ভুবন নামে বৃদ্ধাশ্রম, গজারিয়ায় মোতাহার হোসেন তালুকদার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ফজল খান রোডে হেনরী স্কলাসটিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ গড়ে তোলা হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-২ (সদর-কামারখন্দ) আসন থেকে এমপি হয়ে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। জেলার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন। সদর আসনের সাবেক এমপি হাবিবে মিল্লাত মুন্নার অনুসারীদের কোণঠাসা করতে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর চালান স্টিমরোলার। সিনিয়র নেতাদের বাদ দিয়ে জেলার রাজনীতি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন।

উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সিরাজগঞ্জ শহরের যুবদল ও ছাত্রদলের ৩ নেতাকর্মীকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলার পর থেকে তারা পলাতক ছিলেন। পরে তথ্য প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা শাখার সহযোগিতায় র‌্যাব-১২ ও র‌্যাব-৯ যৌথ অভিযানিক দল মৌলভীবাজারের সোনাপুর এলাকার দেলোয়ার হোসেন বাচ্চুর বাসায় অভিযান চালিয়ে এজাহারনামীয় পলাতক আসামি ড. জান্নাত আরা তালুকদার হেনরী ও তার স্বামী লাবু তালুকদারকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করে। বর্তমানে তারা ৭ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। ৯ই অক্টোবর রিমান্ড শেষ হবে।

mzamin

বিশ্বের প্রভাবশালী ৫০০ মুসলিমের মধ্যে ড. ইউনূস

বিশ্বে প্রভাবশালী ৫০০ মুসলিমের মধ্যে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম স্থান পেয়েছে। জর্ডানের অভিজাত রয়েল ইসলামিক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার সোমবার প্রভাবশালী মুসলিম নেতাদের তালিকা সংবলিত ৩২১ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘পারসন্স অব দ্য ইয়ার: দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ৫০০ ইনফ্লুয়েন্সিয়াল মুসলিমস’। এই তালিকায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়েছে।

অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী কী অবস্থার মধ্যে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তা তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়, শেখ হাসিনার শাসনকাল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও বিতর্কিত হয়ে আছে। ছাত্র বিক্ষোভের ফলে দেশ শাসন করা শেখ হাসিনার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। ছাত্রদের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। তার ফলে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রিপোর্টে বাংলাদেশ অধ্যায়ে ড. ইউনূস সম্পর্কে বলা হয়েছে- শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ছাত্রদের আহ্বানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যোগ দিতে বলা হয়। এই সরকারের কাজ হবে অন্তর্বর্তী সময় ক্ষমতায় থাকা এবং একটি নতুন নির্বাচন করা। ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন অর্থনীতিবিদ এবং ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। তার ক্ষুদ্র ঋণ ধারণা কোনোরকম জামানত বা গ্যারান্টার ছাড়াই ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে দারিদ্র্য দূরীকরণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ড. ইউনূসের এই মডেলে ঋণ নিয়েছেন এক কোটি ৬ লাখ মানুষ। তার মধ্যে শতকরা ৯৭ ভাগই নারী। এই মডেল বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।

দারিদ্র্যদূরীকরণে ড. ইউনূসের অর্জন এবং যে প্রতিশ্রুতি তার জন্য তিনি গভীর শ্রদ্ধা পেয়েছেন। দেশের এই উত্তাল সময়ে তিনি দেশকে পরিচালনার জন্য একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার তিন দিনের মাথায় তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য এবং নির্ভরতাভিত্তিক অর্থনীতির ফলে যে চাপ দেশের কাঁধে তাতে তাকে এ পদে নিয়োগ দেয়ায় আশার আলো জেগেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ অন্যতম সবচেয়ে দরিদ্র দেশ হিসেবে রয়ে গেছে। এখনো অব্যাহতভাবে গভীর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে। এমন একটি ইস্যু হলো দেশটির গার্মেন্ট শিল্প। এতে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। দেশের রপ্তানির শতকরা ৮২ ভাগ এই খাতের। বছরের পর বছর ধরে এসব শ্রমিক অমানবিক পরিস্থিতিতে কাজ করছিলেন। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এতে কমপক্ষে এক হাজার মানুষ নিহত ও কমপক্ষে ২৫০০ আহত হন। এর ফলে এই খাতে অনিয়মের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি পড়ে। যদিও ওই ট্র্যাজেডির পর কিছুটা সংস্কার হয়েছে, তবু এই শিল্পের পরিস্থিতি এখনো অনিরাপদ। বেতন কম। বলা হয়, ২০২৪ সালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ বছরেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেন। তার ক্ষমতার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও বিতর্কিত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে  গেছে। এর ফলে বাংলাদেশের সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ বছরের এই উত্তেজনাকর অবস্থার সূত্রপাত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মীয়স্বজনদের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখা নিয়ে। এর প্রতিবাদে সারা দেশে ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ শুরু করে। এর আগে ২০১৮ সালে এমন আন্দোলন হয়েছিল। ফলে কোটা বাতিল হয়েছিল। কিন্তু এবার তা আবার পুনর্বহালের রায় দেন আদালত। ফলে ২০১৩ ও ২০১৮ সালের মতো আন্দোলন এবার শুরু হয়। কিন্তু এ বছর প্রতিবাদ বিক্ষোভ ফুটন্ত পানির মতো ফুটতে থাকে। জুলাই মাসে আন্দোলন দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। হতাশাগ্রস্ত মানুষ তাতে অংশ নেন। তারা কর্তৃত্ববাদী, দুর্নীতিপরায়ণ এবং অপশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা নিষ্ঠুরভাবে শক্তি প্রয়োগ করে। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিহত হন। বিক্ষোভ আরও ফুঁসে ওঠে। শেখ হাসিনার শাসন চালিয়ে নেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ৫ই আগস্ট তিনি পালিয়ে ভারতে চলে যান। এর মধ্যদিয়ে তার দীর্ঘমেয়াদি শাসনের অবসান ঘটে। তার বিদায়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহে বড় রকম পরিবর্তন ঘটে। নেতৃত্বশূন্যতা দেখা দেয়। ছাত্রদের নেতৃত্বে তা দ্রুত সমাধান করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, দেশকে স্থিতিশীলতায় আনা, প্রতিষ্ঠানগুলোতে আস্থা ফেরানো, অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার এক দুর্দান্ত কাজ হাতে নিয়েছেন ড. ইউনূস। জনগণ যখন একটি পরিবর্তনের জন্য উদগ্রীব এবং ছাত্ররা সংস্কার দাবির কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন, তখন বাংলাদেশ এক ‘ক্রিটিক্যাল ক্রসরোডে’। ২০২৪ সালটি নিঃসন্দেহে দেশের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে স্মরণ করা হবে। একে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের ইতি এবং নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হবে। এই তালিকায় ৫০০ প্রভাবশালী মুসলিম নেতার মধ্যে ড. ইউনূসের অবস্থান ৪৫০। কিন্তু তার মধ্যে আবার সর্ব শীর্ষ ৫০ জনকে বাছাই করা হয়েছে। তাতে ড. ইউনূসের অবস্থান ৫০তম।

mzamin

অ্যাপ্রনে দশ আঙুলের ‘রক্তের’ ছাপ, তা পরেই রোগী পরিষেবা দেবেন জুনিয়র ডাক্তাররা by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

কলকাতার আরজি কর হাসপাতালের নির্যাতিতা তরুণী চিকিৎসকের কথা তুলে ধরতে উদ্যোগ নিলেন জুনিয়র ডাক্তারেরা।  সাদা অ্যাপ্রন। তার চারদিকে  দশ আঙুলের ‘রক্তের’ দাগ। এমন অ্যাপ্রন পরেই আজ  মেডিক্যাল কলেজগুলিতে রোগী পরিষেবা দেবেন জুনিয়র ডাক্তাররা। সাদা অ্যাপ্রন ও গলায় স্টেথোস্কোপ, এই রূপেই এক চিকিৎসককে দেখে অভ্যস্ত আমরা। কিন্তু সেই সাদা অ্যাপ্রনে যদি রক্তের দাগ লাগে, তখন? এমনই তো হয়েছিল আর জি করের তরুণী চিকিৎসকের সঙ্গে। রক্তের দাগ লেগেছিল তাঁর অ্যাপ্রনে। এবার তাই সেই রক্ত মাখা অ্যাপ্রন হয়ে উঠল জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনের প্রতীক। সেই প্রতীক নিয়েই আন্দোলনে সামিল তারা।সিনিয়র চিকিৎসকদেরও এই অ্যাপ্রন পরার অনুরোধ জানান জুনিয়র ডাক্তাররা। গত ৯ আগস্ট আরজি করের সেমিনার হলে তরুণী চিকিৎসকের  দেহ উদ্ধার হয়। তাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল। তার নৃশংস পরিণতির প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন জুনিয়র ডাক্তাররা। টানা কর্মবিরতির পর আবার কাজে ফিরেছেন তারা। কিন্তু, আন্দোলন থামাননি। ১০ দফা দাবিতে ধর্মতলায় আমরণ অনশনে বসেছেন সাত জুনিয়র ডাক্তার। এবার নির্যাতিতার  যন্ত্রণার কথা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে সোমবার সাদা অ্যাপ্রনে প্রতীকী রক্তের ছাপ লাগিয়ে রোগী পরিষেবা দেবেন জুনিয়র ডাক্তাররা।  এক আন্দোলনকারী বলছেন , “আমরা কাজে ফিরেছি। কিন্তু, অপরাধ কমেনি। ধর্ষকদের বিন্দুমাত্র ভয় নেই, কারণ উপযুক্ত শাস্তি হয়নি। তাই, দিনের পর দিন একই অপরাধ করে চলেছে তারা ।” তাঁরা চাইছেন, সিনিয়ররাও তাঁদের সঙ্গে এই অ্যাপ্রন পরে কাজ করুন।
mzamin

গণঅভ্যুত্থানে নিহত ৭৩৭ আহত ২৩ হাজার

জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ৭৩৭ জন শহীদ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম। আহত হয়েছেন ২২ হাজার ৯০৭ জন। গতকাল স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান তিনি।

উপদেষ্টা বলেন, সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সারা দেশে (৬ই অক্টোবর পর্যন্ত) মোট শহীদের সংখ্যা ৭৩৭ জন। তবে এটা ভেরিফায়েড নয়। ছাত্রদের একটা তালিকা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, নিহত দেড় হাজারের বেশি। ছাত্ররা তাদের তালিকা আমাদের দিলে আমরা ক্রস চেক করে দেখবো। তিনি বলেন, আন্দোলনে আহত হয়েছেন ২২ হাজার ৯০৭ জন। এর মধ্যে ৪০০ জন চোখ হারিয়েছেন। দুই চোখ হারিয়েছেন ২০০ জন। নুরজাহান বেগম বলেন, মঙ্গলবার দুই মাস পূর্ণ হবে অন্তর্বর্তী সরকারের। আমরা এতদিন কী কাজ করলাম। আমরা যখন দায়িত্বে এলাম, তখন হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ছিল। চোখ অন্ধ হয়ে গেছে, এমন ছাত্র-জনতা আছেন। হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে এমন ছাত্র-জনতা আছেন। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করলাম আন্দোলনে আহত ছাত্র-জনতার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়ার। আর একটা কাজ ছিল কারা নিহত হলো, কারা আহত হলো তাদের তথ্য সংরক্ষণ করা, তৈরি করা। আমরা একটি কমিটি গঠন করে দিলাম, সেই কমিটিকে কিছু নির্দেশনা দেয়া হলো। যারা আহত হলো বা নিহত হলো তাদের পরিবারকে সহায়তা করতে হবে। আমরা একটা নীতিমালা করে দিলাম। তারা শিগগিরই আমাদের একটা তালিকা দেবেন, তবে ওটাই সর্বশেষ তালিকা না। এ পর্যন্ত যে তথ্য আমাদের কাছে আছে, সেখানে ৭৩৭ জন নিহত হয়েছেন। এগুলো যাচাই করা হয়নি। ছাত্রদের কিছু তথ্য আছে, প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনের উপরে। সেগুলো আমরা তাদের সঙ্গে সমন্বয় করছি। তাদের তালিকা আমাদের দিক। ওভারল্যাপ হতে পারে। কাজেই সেগুলো বাদ দিলে আসল তালিকা হবে। নিহতদের ক্ষেত্রে আমাদের বেশ বড় রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিছু কিছু আছে কেস করেননি, পোস্টমর্টেম হয়নি, সার্টিফিকেট পায়নি। আবার কিছু কিছু আছে যখন ভর্তি হয়েছে, তখন সত্যিকারের ঠিকানা লুকিয়েছেন। কারণ তারা ভয় পেয়েছেন, যদি ধরা পড়েন তাদের পরিবারের ওপর আক্রমণ চালাবে। কাজেই যখন মারা গেছেন, আমাদের কাছে যেই ফলস ঠিকানা ছিল সেটা নিয়েই কাজ শুরু করতে হয়েছে। আহতের সংখ্যা প্রায় ২৩ হাজারের মতো। চোখের প্রায় ৪০০-এর মতো ইনজুরিড। আবার কারও হাত-পা কাটা গেছে। প্রথমদিকে ভালো হয়ে গেছে, চলে গেছে তারা; আসল ঠিকানা দেননি। গুরুতর আহত কতোজন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে নুরজাহান বেগম বলেন, গুরুতর আহত ৭০০-৮০০ জন। তাদের মধ্যে ৪০০ জন চোখের। এর মধ্যে দুই চোখ হারিয়েছেন ৩৫ জন। অঙ্গহানি হয়েছে ২২ জনের। এর মধ্যে হাত কাটা গেছে ৩ জনের, পা কাটা গেছে ১৯ জনের। এ সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ২০০ জনের মতো। এর মধ্যে ক্রিটিক্যাল মুসা। তাকে আমরা সিঙ্গাপুর নেয়ার চিন্তা করছি। বাকিদের মধ্যে একজনের স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি আছে, তাকেও হয় তো বাইরে পাঠাতে হতে পারে। চেষ্টা করছি, সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তাদের সঙ্গে কনসালট্যান্ট করে এখানে চিকিৎসা দিচ্ছি। আশাকরি আমরা ক্রমান্বয়ে তাকে সুস্থ করে তুলতে পারবো। সুস্থ না হলে পাঠাতে হবে।

mzamin

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সচলে মন্ত্রণালয়ের চিঠি by ওয়েছ খছরু

সিলেটের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের  চৌহাট্টাস্থ ক্যাম্পাস দুষ্কৃতকারীরা তালাবদ্ধ করে রাখায় ভিসিসহ সংশ্লিষ্টরা প্রবেশ করতে পারছেন না। রোববার এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা পত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা-১ শাখার উপ-সচিব কামরুন নাহার সুমি এ অভিযোগ উল্লেখ করে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেছেন। ওই পত্রে কামরুন নাহার সুমি উল্লেখ করেছেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ কর্মকর্তা, কর্মচারীরা অফিসে প্রবেশ করতে না পারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর এনায়েত হোসেন দুস্কৃতকারীদের কর্মকাণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি পত্র পাঠিয়েছিলেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন, নতুন স্থাপিত সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহাট্টাস্থ অস্থায়ী ক্যাম্পাস গত ৫ই আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। অভিযোগ রয়েছে- এই ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া দুই শতাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই জড়িত ছিলেন। এর প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়। বর্তমানে এ দু’টি জিডি’র তদন্ত করছে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবুল কালাম মো. ফজলুর রহমান একটি ভাঙচুর ও অপরটি হুমকি প্রদানের ঘটনার অভিযোগ আনেন। ওই ঘটনার পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগ পাওয়া ভিসি প্রফেসর এনায়েত হোসেন, রেজিস্ট্রার ফজলুর রহমানসহ অনেকেই অফিসে আসতে পারছেন না। ভাঙচুরের পর একে তো এখন বসার পরিবেশ নেই অন্যদিকে হুমকির কারণেই তারা ক্যাম্পাসের বাইরে রয়েছেন। তবে ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ঘটনার পর থেকে ঢাকায় অবস্থান করে সবকিছু দেখভাল করছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তারা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ও ওসমানী মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপালের নেতৃত্বে এখন কার্যক্রম চলছে। ইতিমধ্যে একটি নার্সিং পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাজে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে, পরিবেশ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি সচল হচ্ছে না। ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বিতর্কিত ভিসি প্রফেসর মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী দুর্নীতির মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে ২৪০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এই নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ায় স্থায়ী নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে এক নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে ২৬ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বর্তমান প্রশাসন নিয়োগ দিয়েছিলেন। তখন অন্যদের বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেয়া হয়। এই নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ ওঠায় গত ১লা এপ্রিল দুর্নীতিদমন কমিশন সিলেট অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন ইমন বাদী হয়ে দুদকে একটি মামলা করেছেন। এ মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সাবেক ভিসি মোর্শেদ আহমদ চৌধুরীকে। এ ছাড়া অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া অনেককেই এ মামলায় আসামি করা হয়েছে।


এদিকে ৫ই আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর ৬ই আগস্ট থেকে ফের আন্দোলনে নামেন অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে আন্দোলন করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকেই ‘দুষ্কৃতকারী’ উল্লেখ করে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দায়ের করা জিডির পর থেকে ওই ২ শতাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী আন্দোলনের গতি বাড়িয়েছেন। গতকাল তারা সিলেটে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন ছাড়াও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। স্মারকলিপিতে আন্দোলনকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পক্ষে স্বাক্ষর করেন মাইদুল ইসলাম চৌধুরী, মো. আবু মুসা, মোশারফ হোসেন, কাজী মাসুদ, রাসেদুল ইসলাম, আব্দুল মুনিম, রুহেল আলম। স্মারকলিপিতে তারা ভিসি’র পদত্যাগ দাবি করে বলেন, ৫ই আগস্টের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, রেজিস্ট্রার ও ট্রেজারারসহ তাদের অনুগামীরা অনুপস্থিত রয়েছেন। এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এতে সিলেট বিভাগের চিকিৎসা শিক্ষার শিক্ষার্থীরা সেশনজট ও অন্যান্য সমস্যার সম্মুখীন হবে। তারা বলেন, ভিসি ও রেজিস্ট্রারের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে দীর্ঘ ২২ মাস ধরে ২৪০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী বেতন ভাতা পাচ্ছেন না। এ কারণে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এর আগে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর দেয়া এক স্মারকলিপিতে তারা সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটি পুনর্বহাল করার দাবি জানান। একইসঙ্গে ভিসি, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রারের অপসারণ, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক দুদক মামলা থেকে নির্দোষদের নাম অপসারণ, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের ২২ মাসের বকেয়া বেতন প্রদান ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে চাকরি স্থায়ীকরণের দাবি জানান। আন্দোলনে থাকা কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম চৌধুরী মানবজমিনকে জানিয়েছেন, গতকাল আন্দোলনের সময় পুলিশের মধ্যস্থতায় তারা সিলেটের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেখানে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বিষয় নিয়ে জেলা প্রশাসককে অবগত করেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসক দেখবেন বলে তাদের আশ্বস্ত করেছেন বলে জানান মাইদুল।

সংসদীয় গণতন্ত্রে দলীয়করণ মহাপাপ এবং নির্দলীয়করণে মোক্ষ লাভ by মু. আবদুল হাকিম

বহুদলীয় গণতন্ত্রে নির্দলীয় পোলিং অফিসার, নির্দলীয় প্রিজাইডিং অফিসার, নির্দলীয় রিটার্নিং অফিসার, নির্দলীয় নির্বাচন কমিশন এবং সর্বোপরি নির্দলীয় সরকার অপরিহার্য। গোটা জাতিকে দলীয়করণ করলে নির্দলীয় মানুষ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। নির্দলীয় মানুষ পেতে হলে নির্দলীয় স্কুল- কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় লাগবে। শিক্ষক ও ছাত্রদের  দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। অনুরূপ সকল পেশাজীবীদেরও দলীয় রাজনীতির বলয় থেকে মুক্ত থাকতে হবে। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে দলীয় রাজনীতি কারা করবে? ছাত্র-শিক্ষক ব্যতীত অন্যান্য পেশাজীবীরা ব্যক্তি হিসেবে যেকোনো দল করতে পারে। কিন্তু পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাহী পদে যারা থাকবে তাদের দলীয় রাজনীতি করতে দেয়া সমীচীন হবে না। সেক্ষেত্রে দলদাসত্বের কারণে কোনো পেশাজীবী সংগঠন ন্যায্য পেশাস্বার্থ আদায়ে সক্রিয় ও সোচ্চার হতে পারবে না। অপেশাজীবী জনগণ অবাধে দলীয় রাজনীতি করতে পারবে। তবে কাউকে দলীয় রাজনীতি করতে বাধ্য করা যাবে না। সিভিল সমাজই একটি রাষ্ট্রের শক্তিশালী নির্দলীয় সমাজ এবং তারাই জাতির বিবেক হিসেবে মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে বিরোধী দলের পাশাপাশি সিভিল সমাজকেও বিগত পনেরো বছরে প্রায় নির্মূল করে দেয়া হয়েছিল। সবকিছু নির্মূল করে মাফিয়া তন্ত্র নিজেকে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্র ক্ষমতার পট পরিবর্তন চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেয়া।

দলীয়করণ কোথায় হয়? রাশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা, ভেনিজুয়েলা, বেলারুশ এবং উত্তর কোরিয়ায় যেখানে গণতন্ত্র নেই। ইউরোপ আমেরিকার গণতান্ত্রিক কোনো দেশে দলীয় ছাত্ররাজনীতি এবং পেশাজীবীদের দলীয়করণ নেই। দলকে চিরদিন ক্ষমতায় রাখার জন্য পেশাজীবীদের দলীয়করণ দরকার হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রে এক দলের চিরদিন ক্ষমতায় থাকার কোনো অবকাশ নেই। তাহলে অন্য দলের রাজনীতি করার কোনো যুক্তি থাকে না। ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক হস্তান্তর বহুদলীয় গণতন্ত্রে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এজন্য বায়তুল মোকাররম মসজিদের ইমাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং সচিবদের পালাতে হয় না। আর এই স্বাভাবিক ঘটনাটি ঘটে নির্দলীয় মানুষ তথা সিভিল সমাজের নির্দলীয় ব্যবস্থাপনায়। সব লোককে দলীয় রাজনীতির গোডাউনে জোর করে না ঢুকিয়ে মুক্ত বাতাসে নির্দলীয় রাজনীতি করতে দিলে কি গণতন্ত্র ভেস্তে যাবে? নিশ্চয়ই না। বরং এতে করে দেশে অনেক স্বাধীনচেতা নেতা তৈরি হবে যারা পরে নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে নতুন দলের নেতা হতে পারেন। মনে রাখতে হবে নেতার পেছনে থেকে নেতাকে তাল দিয়ে নেতা হওয়া যায় না। খুব জোর ভালো চামচা বা চাটুকার হওয়া যায়। ঔপনিবেশিক ডিসি এবং কমিশনার দিয়ে আর কতোদিন মাঠ প্রশাসন চলবে এবং চালাতে হবে? কেন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্দলীয় রাষ্ট্রপতি, জেলা পরিষদ এবং বিভাগীয় পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হচ্ছে না? স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন দলীয় ছাত্র রাজনীতি মুক্ত হচ্ছে না? প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমে যাবে তাই। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বাড়িয়ে জনগণ কি চিরকাল বুকে গুলি খেতেই থাকবে?  রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও পদোন্নতি দলীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে রেখে কীভাবে দলীয়করণ ঠেকানো সম্ভব? পেশাজীবীদের প্রধানমন্ত্রীর চামচা এবং চাটুকার হয়ে বাঁচতে হবে কেন? কেন তাদের রক্তে দলদাসত্বের এত জীবাণু? পেশাভিত্তিক উচ্চকক্ষ থাকলে কি কোনো সরকার আইন করে ব্যাংকগুলোর মালিকানা পরিবারের হাতে তুলে দিতে পারতো? ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইন বানাতে পারতো? ডিজিএফআই-এর কাজকে আইনের বাইরে রাখতে পারতো? কোনো সরকার মানুষ গুম করতে বা আয়নাঘর বানাতে পারতো? নিশ্চয়ই পারতো না। তাহলে সংবিধানে পেশাভিত্তিক উচ্চ কক্ষের বিধান রাখতে আমাদের এত আপত্তি কেন? পেশাজীবীদের দলীয় দাসত্বে বাধ্য করার জন্য? তাহলে বাঙালিরা এত লেখাপড়া করছে দলদাস এবং জ্ঞানপাপী হওয়ার জন্য?           
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব 

mzamin

৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন: দ্বিমুখী চক্রে বন্দি দুদক

রাজনৈতিক বিবেচনায় চেয়ারম্যান-কমিশনার নিয়োগ এবং প্রেষণে আসা আমলা- এই দ্বিমুখী চক্রে বন্দি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই চক্র থেকে মুক্তি পেতে সংস্থাটিকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনার কথা জানালেন দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক নিয়োগ ও আমলাতন্ত্রের প্রভাবের কারণে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না।

সোমবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবি’র কার্যালয়ে দুদক সংস্কারে যে কমিশন গঠন করেছে সরকার, তার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলন করে এসব কথা বলেন দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান। বৈঠকে কমিশনের সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম, আইনজীবী মাহদীন চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা শারমিন উপস্থিত ছিলেন। অনলাইনে যুক্ত হোন  ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মোস্তাক খান।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদকের কমিশনার ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দুদকের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রেষণে আসেন। এতে দুদকের অন্য কর্মীরা কাজ করতে পারেন না।

তিনি জানান, প্রথম সভায় তারা কমিশনের দায়িত্ব, এখতিয়ার, কর্মপরিধি বোঝার চেষ্টা করেছেন।  তিনি বলেন, দুদকের যে এখতিয়ার তার দু’টি আঙ্গিক হচ্ছে প্রতিকার ও প্রতিরোধ।  যারা দুর্নীতি করেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা ও বিচার করা। দ্বিতীয়ত দুর্নীতি যাতে না হয়, তার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। দুটি বিষয়কে বিবেচনায় রেখে তারা সংস্কারের জন্য কাজ করবেন।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার যে ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুদকের কাজে বাধা তৈরি করা আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা করা। শুধু আইনি সংস্কার দিয়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে- সেটি ভাবা ঠিক নয়। সার্বিকভাবে শাসন পদ্ধতির পাশাপাশি এক ধরনের মানসিকতা তৈরি হয়ে গেছে যে, দুর্নীতি করে পার পাওয়া যায়। সেটা কীভাবে প্রতিহত করা যায়,  সেই জন্য সুপারিশমালা প্রণয়ন করবেন তারা।  

বাংলাদেশে যে কর্তৃত্ববাদ বিকাশ হয়েছিল, তাতে যে উপাদানগুলো সবচেয়ে জোরালো ভূমিকা পালন করেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে দুর্নীতি- উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতিকে সুরক্ষা দেয়া,  বিচারহীনতা দেয়ার কারণে সমাজে বিশাল বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি, অপচয়, আত্মসাৎ হয়েছে। টাকা পাচার হয়েছে। এই সমস্যাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়ার কারণেই দুদককে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

তিনি বলেন, কমিশনের কাজ হচ্ছে দুদক কীভাবে কার্যকর হবে, তার দিকনির্দেশনা, সুপারিশমালা ও পরামর্শ প্রদান করা। কাজটি তারা আজ থেকে শুরু করেছেন। আগামী ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে সংস্কার কমিশন সরকারের কাছে প্রতিবেদন তুলে দেবে। মধ্যবর্তী সময়ে কোনো প্রতিবেদন দেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মাঝামাঝি কোনো প্রতিবেদন দেয়া হবে না। তবে সরকার চাইলে এর মাঝামাঝি সময়ে কোনো পরামর্শ বা মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে।  
সংস্কারের পর রাজনৈতিক সরকার চাইলে দুদকে নিজেদের লোক বসাতে পারবেন কিনা- জানতে চাইলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দলীয় প্রভাবের যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, তারা সেই বিষয়টি নিয়ে কাজ করবেন।

বর্তমান কমিশনের নেতৃত্বে যে চেয়ারম্যান-কমিশনার রয়েছেন তাদের পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংস্কার কমিশনের কোনো মন্তব্য নেই। তবে টিআইবি’র পক্ষ থেকে আমি আগেও বলেছি- রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য দুদক কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ফলে পুরো প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ঢেলে সাজানো উচিত।
সংস্কার কমিশনের অফিস কোথায় হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আমাদের কমিশনের সঙ্গে একমত হয়েছি। তাদের পরামর্শে এখন  টিআইবি’র কার্যালয়েই সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এটা আসলে কাজের উপরে নির্ভর করবে। যদি কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করার প্রয়োজন হয় তাহলে কমিশনে বসেই করবো। আবার আমাদের এখানেও থাকতে পারে।
ছাত্রদের মধ্যে একজন প্রতিনিধি এই সংস্কার কমিশনে থাকা প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ছাত্র প্রতিনিধি আমাদের কমিশনে একজন থাকার কথা। তবে এখনো ঠিক হয়নি কে হবেন তিনি। সেটা যেকোনো দিন পেয়ে যাবো।

mzamin

ড. ইউনূসের লুকানো সেই বই প্রদর্শনে প্রতিযোগিতা by কাজী সোহাগ

মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে একটি বইয়ের অবস্থান নিয়ে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। বইটির লেখক বর্তমানে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২০২২ সালে সংসদ সচিবালয় নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের লেখা-এ ওয়ার্ল্ড অফ থ্রি জিরোস: দ্য নিউ ইকোনমিকস অফ জিরো প্রভার্টি, জিরো আনইমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড জিরো নেট কার্বন ইমিশনস বইটি কেনে। কিন্তু বইটি কেনার পর থেকে বিপাকে পড়েন সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরির কর্মকর্তারা। বইটি নিয়ে চলে লুকোচুরি। একবার বইটি সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরি কক্ষের শেলফে রাখা হয়। আবার কখনো কোনো কর্মকর্তার রুমে থাকা শেলফে স্থান পায় বইটি। কখনো শেলফে রাখা হলেও বইটি উল্টো করে রাখা হয়, যেন বইয়ের নাম দেখা না যায়। তবে ২০২২ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে বইটি আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি। ওইসময় সর্বশেষ লাইব্রেরির যে কর্মকর্তার শেলফে বইটি উল্টো করে রাখা ছিল সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।

এভাবে দুই মাসে বইটির অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে ১৫ থেকে ২০ বার। কিন্তু এবার ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে প্রধান উপদেষ্টার লেখা ওই বই নিয়ে। বইটি আবার ফিরে এসেছে সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরিতে। তবে বইটি রাখা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন সংসদ সচিবালয়ের কয়েক কর্মকর্তা। আগে চেষ্টা করা হয়েছে লুকিয়ে রাখার। এখন চেষ্টা হচ্ছে কীভাবে বইটি সামনে রাখা যায়। একবার ওই শেলফে রাখা হয় তো আবার অন্য শেলফে। কেউ বলছেন- এই শেলফে ভালোভাবে দেখা যায় তাই বইটি এখানে রাখা উচিত। আবার অন্যজন বলছেন, ওই শেলফে রাখা হলে আরও বেশি ভালো করে দেখা যাবে তাই বইটি ওখানেই রাখা ভালো হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংসদ লাইব্রেরির এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানান, নোবেলজয়ীর বই নিয়ে একসময় আমরা খুব বিপদে ছিলাম। তখনকার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ সংসদ সচিবের কাছে ওই বই কেনার তথ্য গোপন করা হয়। তারা জানলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে এমন শঙ্কা ছিল। তবে বইটি কেনার পর থেকে নানাভাবে লুকোচুরি করা হয়েছে। তখন আমরা বইটাকে আর বই হিসেবে দেখতে পারিনি দেখেছি একটি ভাইরাস হিসেবে। কিন্তু এখন গণেশ উল্টে গেছে। ৫ই আগস্ট দেশের পট পরিবর্তনের পর অনেক কিছুই পাল্টে গেছে সংসদ সচিবালয়ের। এখন নোবেলজয়ীর বই কোথায় রাখা হবে তা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ২০২২ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর ‘ড. ইউনূসের বই কিনে বিপাকে সংসদ’- শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে মানবজমিন। সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরির সঙ্গে যুক্ত ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, সংসদ লাইব্ররিতে ৮৫ হাজারের বেশি বই রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার বই ৫ই আগস্ট লুট হয়েছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই লাইব্রেরির বই উদ্ধার করা হচ্ছে। সংসদ সচিবালয়ের বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে লাইব্রেরির বই। কিছু লোকবল নিয়ে লাইব্রেরি সাজানো শুরু হয়েছে। কাজ অনেকটা গোছানো হয়েছে। তিনি বলেন, এই গোছাতে গিয়েই নোবেলজয়ীর লেখা বইটি পাওয়া গেছে। এখন বইটি সসম্মানে লাইব্রেরির শেলফে রাখা হয়েছে। আগে যেটা সম্ভব হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালের মে ও জুন মাসে দুই দফায় চার শতাধিক বই কেনে সংসদ সচিবালয়। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটিডের মাধ্যমে বইগুলো কেনা হয়। এর মধ্যে ১৯শে জুন পাঞ্জেরীকে ৩৩টি বইয়ের চূড়ান্ত তালিকা দেয়া হয়। যার অর্ডার নং-১১.০০.০০০০.৬০৪.০৭.০৮৭.২, তারিখ: ১৯-০৬-২০২২। এতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের লেখা-এ ওয়ার্ড অফ থ্রি জিরোস: দ্য নিউ ইকোনমিকস অফ জিরো প্রভার্টি, জিরো আনইমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড জিরো নেট কার্বন ইমিশনস বইটি তালিকাভুক্ত ছিল। অর্ডার অনুযায়ী ২০২২ সালের ৫ই জুলাই বইটির দুই কপি সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরির জন্য সরবরাহ করা হয়। এরপরই ড. ইউনূসের লেখা বইটি নিয়ে শুরু হয় টানাহেঁচড়া। সংসদ সচিবালয়ের বই নিয়ে গঠিত যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যরা প্রথম বইটি নিয়ে আপত্তি তোলেন। তারা জানান, বইটিতে সরকারবিরোধী নানা ধরনের লেখা ও মন্তব্য রয়েছে। তাই এ বইটি কেনা ঠিক হয়নি। সংশ্লিষ্টরা কোনোভাবে এ বইয়ের বিষয়ে জানতে পারলে লাইব্রেরিতে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হতে পারে। যাচাই-বাছাই কমিটির এ ধরনের মন্তব্যর পর লাইব্রেরিতে কর্মরত কর্মকর্তারা বইটি নিয়ে কি করবে তা বুঝে উঠতে পারেননি । কারণ বইটির নাম চূড়ান্ত তালিকায় ছিল আবার তা কেনার পর দামও পরিশোধ করা হয়েছে। তাইতো প্রতিনিয়ত বইটির অবস্থান পরিবর্তন করা হয়। হাতেগোনা কয়েকজন এমপি সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরি কক্ষে আনাগোনা করেন। প্রথমে বইটি লাইব্রেরির শেলফে রাখা হলেও পরে তা সরিয়ে ফেলা হয়। লাইব্রেরিতে আসা কোনো এমপি’র নজরে যেন বইটি না পড়ে সেজন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়। পরে রাখা হয় উপ-পরিচালক (গ্রন্থাগার) জেব উন নেছার অফিস কক্ষে। তবে সেখানে বইটি উল্টো করে রাখা হয় যেন কারও নজরে না পড়ে। পরে সেখান থেকেও সরিয়ে ফেলা হয়। ওইসময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংসদ লাইব্রেরির এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, বইটি কেনার পর থেকে আমাদের মধ্যে আতঙ্ক পেয়ে বসেছে। প্রায় প্রতিদিনই বইটি শেলফ থেকে শেলফে সরিয়ে রাখতে হচ্ছে। অতি উৎসাহী কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। তারা ভয় দেখিয়ে বলছেন- সংসদে প্রতিনিয়ত সংসদ নেতাসহ সরকারি দলের নেতারা নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন। সেখানে সংসদ লাইব্রেরির কর্মকর্তাদের তার লেখা বই কেনা ঠিক হয়নি। কারণ ওই বইয়ে রয়েছে সরকারবিরোধী নানা ধরনের কথাবার্তা ও মন্তব্য। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথমে সংসদ লাইব্রেরি থেকে বইয়ের একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। পরে তা অনুমোদন দেয় লাইব্রেরি কমিটি। ওই কমিটির প্রধান থাকেন পদাধিকার বলে ডেপুটি স্পিকার। কিন্তু তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার এডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া অসুস্থ হয়ে আমেরিকায় চিকিৎসাধীন থাকায় লাইব্রেরি কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি। তাই লাইব্রেরি কর্মকর্তাদের তৈরি তালিকা অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত বইগুলো কেনা হয়। অন্যদিকে যাচাই-বাছাই কমিটি বইগুলো কেনার আগে কোনো আপত্তি জানায়নি। বই কেনার পরে তারা হঠাৎ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বইটি নিয়ে আপত্তি তোলে। এরপরই বইটি নিয়ে শুরু হয় লুকোচুরি। ২৮৮ পৃষ্ঠার বইটির প্রথম সংস্করণ বের হয় ২০১৭ সালে। রকমারিতে যার মূল্য দেয়া রয়েছে ১০৭৮ টাকা। বইটি প্রকাশ করে ভারতের বিখ্যাত প্রকাশনী সংস্থা হাচিতী ইন্ডিয়া।

mzamin

স্থবির শিক্ষা খাত by পিয়াস সরকার

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পেরিয়ে গেছে দু’মাস। এখনো স্থবিরতা কাটেনি শিক্ষা প্রশাসনে। কিছুটা গা এড়িয়েই চলছেন প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা। আবার নানা কর্মকাণ্ডেই সমালোচনা কুড়িয়েছেন তারা। পরীক্ষা নিচ্ছে না পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি), সদস্যের অভাবে কাজ করতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ২০২৫ সালের বই দেয়ার সময় এগিয়ে এলেও এগোয়নি পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ। তালগোল পাকিয়ে গেছে শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ে। দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে বদলির আশ্বাস দেয়ার পরও রোডম্যাপ ঠিক করা হয়নি। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দ্রুততার সঙ্গে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগ দেয়া হলেও কাটেনি স্থবিরতা। প্রশাসন চাইলেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না সিদ্ধান্ত। ফ্যাসিবাদের দোসররা এখনো নানা দিক সরাসরি ও পর্দার আড়ালে থেকে নাড়ছে কলকাঠি।

স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে হটাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাখাতটাই রয়েছে প্রদীপের আলো থেকে দূরে। শিক্ষার্থীরা মূলত আন্দোলন শুরু করেছিলেন কোটা সংস্কারের দাবিতে। তারা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোটার সংস্কার চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকারি চাকরি নিয়ন্ত্রণ করা পিএসসিকে সচল করতে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও হাত গুটিয়ে বসে আসে প্রতিষ্ঠানটি। আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক সুবিধাভোগী পিএসসি’র চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইনসহ সদস্যরা। ব্যাপক সমালোচনার পরও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তই নেয়া হয়নি। আটকে আছে তিনটি বিসিএসসহ একাধিক নন-ক্যাডারের নিয়োগ কার্যক্রম। হচ্ছে না পদোন্নতির পরীক্ষাও। আন্দোলনের সময় স্থগিত করা হয় ৪৪তম বিসিএস’র মৌখিক পরীক্ষা। পরবর্তীতে ৪৬তম বিসিএস’র লিখিত পরীক্ষা। ১৪ই সেপ্টেম্বর ক্যাডারভুক্ত ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের অর্ধবার্ষিক বিভাগীয় পরীক্ষা স্থগিত হয়। আর দীর্ঘদিন ধরে ৪৫তম বিসিএস’র লিখিত পরীক্ষার ফলও আটকে আছে।

আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী প্রশাসন দিয়েই চলছে পিএসসি। পিএসসি’র চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এসএম গোলাম ফারুক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ফয়েজ আহম্মদ। অন্য সদস্যরা হলেন, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) জাহিদুর রশিদ, ঢাবি’র আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুবিনা খোন্দকার, কেএম আলী আজম ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, মো. খলিলুর রহমান ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাবেক সচিব, মো. মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী সাবেক ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক সচিব হেলালুদ্দিন আহমদ, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করা ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম, আরেক সদস্য অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক পিএসসি’র এক সদস্য বলেন, আমাদের এখন বার্তা প্রয়োজন। আমরা যে নতুন পরিকল্পনা নেবো কিসের ভিত্তিতে। আমরা যে এই অবস্থায় থাকবো নাকি সামনে চলে যেতে হবে সেটার একটা বার্তা প্রয়োজন। পিএসসি স্থবির হওয়ায় দেশেরসহ চাকরিপ্রত্যাশীদের ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে একটি বার্তা দেয়া হোক।

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি। এতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সরকার যেভাবে চাইবে সেভাবেই আমরা কাজ করবো। সংস্কার বা অপসারণ যেটাই চাক সেটাইতেই আমরা রাজি আছি।

এদিকে বিসিএস’র প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ অভিযুক্তরা স্বীকার করার পরও পিএসসি বারংবার না করে আসছে। এখনও স্বপদে বহাল আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসরদের সরানোর জন্য সোচ্চার হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম। গত শনিবার ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লেখেন- এই সপ্তাহের মধ্যে পিএসসি সংস্কার করে চাকরিপ্রত্যাশীদের জব এক্সামগুলো শুরু করতে হবে। যে তরুণ প্রজন্ম এই অভ্যুত্থানের অগ্রনায়ক তাদের প্রায়োরিটির কথা ভুলে গেলে চলবে না।
গতকালও বিপাকে পড়েছিলেন পিএসসি সদস্যরা। জুুনিয়র ইন্সট্রাক্টর নিয়োগের ফল প্রত্যাশীরা দ্রুত ফল প্রকাশের দাবিতে আন্দোলন করেন এবং আলোচনায় বসেন। কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তেমন কোনো আশ্বাস না মেলায় বাইরে অবস্থান অব্যাহত রাখেন চাকরিপ্রার্থীরা। এরপর তারা কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রেখে আন্দোলন করতে থাকেন।

আওয়ামী লীগের আমলে ইউজিসি হয়ে উঠেছিল নেতার স্বজন ও পরিচিতদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে। চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার কাজী জাফরুল্লাহর ভাই অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ। আবার সদস্য হিসেবে ছিলেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ছেলে অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র  চন্দ। এ ছাড়াও বাকি সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর, অধ্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন, অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র চন্দ, অধ্যাপক ড. হাসিনা খান ও অধ্যাপক ড. মো. জাকির হোসেন। তারা সবাই আওয়ামী ঘনিষ্ঠ লোক। তাদের অপসারণ করা হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। ইউজিসিতে চেয়ারম্যান ও পাঁচ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ইউজিসি চেয়ারম্যানের। এ ছাড়াও সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনকে। ইউজিসি’র শীর্ষ পদে রদবদল হলেও পুরনো ধাচেই আছে প্রতিষ্ঠানটি। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ভীত অবস্থায়। তাই তারা চলমান কাজগুলোতে নতুন করে এগুচ্ছে না। দু’মাস কেটে গেলেও নিয়োগ দেয়া হয়নি বাকি তিন সদস্যকে। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ সম্প্রতি মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমাদের সদস্যরা পূর্ণাঙ্গভাবে যোগদান না করায় কাজে গতি আসছে না। তারা যোগ দিলেই ইউজিসি জোরদারভাবে কাজ শুরু করবে।

এদিকে ১০০ দিনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বন্ধ শিক্ষা কার্যক্রম। আন্দোলনের তোড়ে জুলাইয়ের শুরু থেকেই বন্ধ হয়ে যায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরও শুরু করা যায়নি ক্লাস ও পরীক্ষা। একের পর এক ভিসি পদত্যাগের কারণে অস্থির হয়ে ওঠে পরিবেশ। এরপর বিপুল পরিমাণ ভিসি নিয়োগ দেয়া হলেও পুরোপুরি শিক্ষার পরিবেশ এখনো ফুটে ওঠেনি।
অন্যদিকে আগামী বছরের জন্য পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর কাজ চলার কথা থাকলেও তা থেমে আছে। সংশোধন ও পরিমার্জনে গঠিত কমিটি ৩০শে সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সমালোচনার প্রেক্ষিতে বাতিল হয় সেই কমিটি। নতুন সদস্য সংযুক্ত না করে কমিটি বাতিল করে দেয়ায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম নেয়। এরপর পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পরিমার্জন সমন্বয় কমিটি বাতিলের নিন্দা জানান ১২২ বিশিষ্ট নাগরিক। তারা অবিলম্বে কমিটি পুনর্বহাল করার দাবি করেন।
এদিকে প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কারে গঠিত কমিটি নিয়েও আছে নানা সমালোচনা। এই কমিটিতে দু’জন শিক্ষাবিদ, তিনজন সরকারি কর্মকর্তা (আমলা), তিনজন এনজিও প্রতিনিধি এবং একজন শিক্ষক রয়েছেন। বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক ও এই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে এখানে আরও শিক্ষকের উপস্থিতি প্রয়োজন। মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে এই কমিটির পূর্ণতা পাওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যন্ত এলাকার এক প্রাথমিক শিক্ষক বলেন, শিক্ষার সংস্কারের জন্য প্রথমত প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করা এবং উপলব্ধি করা। শিক্ষকের যুক্তকরণের পাশাপাশি একজন অভিভাবক, প্রত্যন্ত এলাকায় মাঠ পর্যায়ে শিক্ষা বিস্তারে কাজ করা একজন প্রতিনিধি, দুর্গম এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়ে আসা কোনো একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই কমিশনের কার্যক্রম শুধু ‘কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ না হয়ে যায়।

আবার শিক্ষার মেরুদণ্ড বাঁকা করে ফেলা হয়েছে বিগত ১৫ বছরে। ব্যাপকভাবে হয়েছে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় লোকজনকে পদায়ন। শিক্ষা প্রশাসনের মাথা থেকে অনেক কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেয়া হলেও স্বপদেই আছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, সকল শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম)সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে সচিব পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে গত নভেম্বরে নিয়োগ পাওয়া কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব পালন করছেন এখনো। আবার অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ ও সুবিধা পেলেও এখন গাইছেন বিএনপি’র গুণগান। বহাল তবিয়তেই দায়িত্ব পালন করছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ফরিদ আহাম্মদ। তিনি আওয়ামী শাসনামলে ডিসি থেকে শুরু করে সামরিক ভূমি ও ক্যান্টনমেন্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সিইও এবং পরবর্তীতে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়েছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর নেহাল আহমেদ পদত্যাগ করার পর আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী পরিচালক (প্রশাসন) প্রফেসর এবিএম রেজাউল করীম দায়িত্ব পান। তিনি এখন বিএনপি’র এক কেন্দ্রীয় নেতার বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন। দীর্ঘ ১৫ বছর তিনি ঢাকাতেই পদায়ন রয়েছেন। রাজধানীর ইডেন কলেজ, বিজ্ঞান কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে সর্বশেষ মাউশিতে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর মাধ্যমে পদায়ন হন। ইডেন কলেজে থাকাকালীন বাসে থাকা সাবেক ‘প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপহারের বাস’ এই স্টিকারগুলো খুলে ফেলেন। একইভাবে পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর সৈয়দ জাফর আলী, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রফেসর একিউএম শফিউল আজমসহ অনেক কর্মকর্তা এখনো মাউশিতে বহাল রয়েছেন। ৪ঠা আগস্ট নওফেলের পক্ষে মাউশিতে মিছিল এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিয়ে মিছিল দেয়া হয়। এর প্রধান উদ্যোক্তা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ। এতে যোগ দিয়েছিলেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা- মোহাম্মদ হাসানাত, স্বরূপ কুমার, আলমগীর হোসেন, মো. মুকিব মিয়া, শাহিনুর ইসলাম, রিপন মিয়া, মঞ্জুরুল আলম, কামরুন নাহার, শফিকুল ইসলাম, শফিউল্লাহ দিদার, সাদিয়া সুলতানা, ওয়ায়েছ আলকারনী মুন্সী, প্রলয় দাস, মাউশির- কাওছার আহমেদ, তরিকুল ইসলাম, রিয়াদ আরাফাত, হাফিজুর রহমান প্রমুখ। এদের মধ্যে ইতিমধ্যে সরিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষা পরির্দশক মো. রিপন মিয়া, মো. মুকিব মিয়াকে। বাকিরা রয়েছেন স্বপদে। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) পরিচালক পদে প্রফেসর ড. উম্মে আসমাসহ উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালকরা রয়েছেন আগের মতোই। আবার শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এখনো দায়িত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া সকল চেয়ারম্যানই। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনিয়মের পাহাড়সম প্রতিষ্ঠান। এখানে চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলন ছাড়া হয় না গতি। প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ চেয়ারম্যান ও সচিবের পরিবর্তন আসলেও পূর্বের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা পুরনো দায়িত্বেই। এদিকে এনটিআরসিএ’র পূর্বের দায়িত্বরতরা এমনভাবে প্রক্রিয়া সাজিয়েছে যে চাইলেও সুরাহা করতে পারছে না। দীর্ঘদিনের বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির দাবি শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সম্মতি জানালেও নিয়মের বেড়াজালে আটকে আছে। এখনো এনটিআরসিএ’র জালে আটকে আছে লাখো চাকরিপ্রত্যাশী।

শিক্ষার সার্বিক বিষয়ে গত শনিবার শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন, শিক্ষার মানের থেকে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যস্ত ছিল পূর্বের সরকার। এমনি অবস্থা যে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি করে বড় বড় সুপারিশ আসছে। আমরা তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারছি না। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়ন করে তারা অপরাজনীতি, নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় তিনি ইচ্ছাকৃত শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছেন উল্লেখ করে শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।