Tuesday, January 28, 2025

‘আমার বাড়িটা আর নেই’: উত্তর গাজায় ফিরে যা দেখছেন ফিলিস্তিনিরা

গাজার উত্তরাঞ্চলে একসময়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এলাকায় নিজ বাড়িতে ফেরার পর ৪৪ বছর বয়সী সাবরাইন জানুনের আবেগ–অনুভূতি ছিল মিশ্র প্রকৃতির।

এই নারী বিবিসিকে বলছিলেন, ‘আমরা আবার আমাদের পরিবার ও স্বজনদের দেখতে পেয়ে খুশি...(কিন্তু) সেই সঙ্গে কান্না আসছে বিধ্বস্ত বাড়িঘর, ধ্বংসস্তূপ দেখে।’
সাবরাইন আরও বলছিলেন, ‘নৈসর্গিক দৃশ্যের টানে লোকজন এখানে হাঁটতে আসতেন। এখন এর অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।’

গতকাল সোমবার উত্তর গাজায় নিজেদের বাড়িঘর তথা ধ্বংসস্তূপের মাঝে ফেরা লাখো ফিলিস্তিনিরই একজন সাবরাইন। সম্প্রতি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গাজার বিভিন্ন অংশে আশ্রয় নিয়ে থাকা দুর্দশাগ্রস্ত এ মানুষেরা নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন।

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে ১৫ মাসের বেশি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলার পর গাজা উপত্যকায় এ যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর গাজার অন্যান্য বাসিন্দাদের মতো সাবরাইনও কয়েকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সর্বশেষ বাস্তুচ্যুত হন মধ্যাঞ্চলীয় গাজার দেইর আল–বালাহ এলাকা থেকে।

যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার পর গতকাল সকালে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের উত্তর গাজায় ফিরতে উপত্যকার উপকূলীয় সড়ক ‘আল–রশিদ স্ট্রিট’ খুলে দেয় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। এ সময় বাড়িমুখী মানুষের ঢলে শামিল হন সাবরাইন।

গাজার একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, দুই ঘণ্টায় দুই লাখের বেশি ফিলিস্তিনি এ সড়ক ধরে উত্তরাঞ্চলে ফিরেছেন।

এ যাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে বিবিসিকে অনেক ফিলিস্তিনি তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা জানান। এমন ফিলিস্তিনিদের একজন ২৪ বছর বয়সী ইসরা শাহিন। গাজা সিটিতে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর তিনি বলছিলেন, ‘এটা অনেক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর এক যাত্রা।’

ইসরা বলছিলেন, ‘মাঝপথ পর্যন্ত লোকজন আনন্দেই ছিল, তারা গাইছিল ও সে রকমই কিছু করছিল। কিন্তু বাড়ি পৌঁছাতে যত সময় লাগছিল, ততই তারা হতাশ হচ্ছিল। শেষমেশ, আমরা যখন “গাজায় স্বাগতম” লেখা এক প্রতীকের কাছে পৌঁছালাম, তখন ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে বহু মানুষ আবার আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে।’

অনেকে আবার ভিন্নপথে গাড়িতে করে গাজার উত্তরে রওনা করেন।

৪২ বছর বয়সী আরেক ফিলিস্তিনি ওয়াফা হাসুনা বলছিলেন, ‘উত্তর গাজা অভিমুখী সড়কটিতে তখন হাজার হাজার মানুষ। গোটা সড়কজুড়ে শুধু তাঁরা...আমরা খুব আনন্দে ছিলাম। তবে মনে মনে আমি কষ্ট পাচ্ছিলাম। কারণ, আমি জানি, আমি গাজা সিটিতে পৌঁছাব ঠিকই, কিন্তু আমার বাড়িটা সেখানে আর নেই।’

এই ফিলিস্তিনিরা যখন গন্তব্যে পৌঁছালেন, তখন বিধ্বস্ত বাড়িঘর আর ধ্বংসস্তূপ দেখে নিজেদের মধ্যে কষ্টের কথা বলাবলি করতে লাগলেন।

মোহাম্মদ ইমাদ আল–দীন ক্ষৌরকারের কাজ করতেন। সড়কে থাকা তল্লাশিচৌকি পেরিয়ে তিনি যখন গন্তব্যে পৌঁছলেন, দেখলেন তাঁর বাড়িটা মাটিতে মিশে আছে। স্যালুনটাও লুট করা হয়েছে। কাছাকাছি স্থানে ইসরায়েলি হামলায় সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্বামীর সঙ্গে আবার সাক্ষাতের আশায় দুই কন্যা ও ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষায় ছিলেন লুবানা নাসের। উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় স্বামী বেঁচে গেছেন, কিন্তু তাঁদের বাড়িটা আর নেই।

লুবানা বলছিলেন, ‘আনন্দঘন পুনর্মিলন তিক্ত–কঠিন বাস্তবতায় ঢাকা পড়ে গেল। আমাদের বাড়িটা নেই। তাই দক্ষিণ গাজায় তাঁবুতে কাটিয়ে এসে উত্তরেও সেই তাঁবুতেই উঠলাম।’

উত্তরে নিজ বাড়িঘরে ফিরতে বা পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দক্ষিণ গাজায় এখনো অপেক্ষায় আছেন বহু মানুষ।

এমনই একজন ফিলিস্তিনি বলেন, তাঁর সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও ছোট মেয়েটা না থাকলে তিনি উত্তরে এমনভাবে যেতেন, দেখে মনে হতো দৌঁড়াচ্ছেন। এ অবস্থায় সড়কে লোকজনের ভিড় কমা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ও বাড়ির পথে ধীরে পা বাড়ানোর চিন্তা করছেন। তাঁর ধারণা, সেখানে গিয়ে দেখবেন বাড়ির আশপাশের সব মাটির সঙ্গে মিশে আছে।

তবু এই ফিলিস্তিনির আশা, এ যুদ্ধ একদিন শেষ হবে ও যা ধ্বংস হয়ে গেছে তার সব আবারও নির্মাণ করতে পারবেন।

আরেক ফিলিস্তিনি জানান, তাঁর ভাই এখনই ফিরতে তাঁকে মানা করেছেন। ভাই তাঁকে ফোন করে বলেছেন, ‘বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়িফেরা লোকজন রাস্তায় ঘুমাচ্ছেন। তাঁদের সাহায্য করার কেউ নেই।’

উত্তর গাজায় ফেরার অপেক্ষায় এক শিশু  
উত্তর গাজায় ফেরার অপেক্ষায় এক শিশু। ছবি: রয়টার্স

কম দামে হাতে বানানো চামড়ার জুতা পাওয়া যাবে যেখানে by এম এ হান্নান

অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি, পাচ্ছি না। ভাবলাম, নেমে যাই। এরপর দেখি আশপাশে জিজ্ঞেস করে। জিগাতলায় জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের গলির মুখে এসে ভাড়া চুকিয়ে রিকশা থেকে যেই নামতে যাব, আমাদের কথা বুঝতে পেরে রিকশাওয়ালা মামা বললেন, ‘চলেন, আপনাগো এক্কেবারে জুতার কারখানার সামনেই দিয়া আহি।’ সামনের আরও দুটি গলি পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম হাতে বানানো জুতার রাজ্যে। ঠিকানা মূলত ধানমন্ডি ৮/এ, কিন্তু লোকে এখনো ধানমন্ডি পুরোনো ১৫ নম্বর রোড বলেই অভ্যস্ত। পরপর বেশ কটি দোকান—দ্য নিউ সঞ্জীব শুজ, জোনাকি শুজ, নিউ বাবুল শু অ্যান্ড লেদার ক্র্যাফট, গোলাপ শুজ, অপর্ণা শুজ, নিউ রোড স্টার শুজ, আবদুল্লাহ ফুট ওয়্যারসহ আরও কত কি নামের জুতার দোকান। রাস্তার পাশেই দোকান। দোকানে স্তরে স্তরে সাজানো জুতা। কোনো দোকানে ক্রেতার অর্ডার নেওয়া হচ্ছে, কোনো দোকানে অর্ডারের জুতা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কোনোটায় আবার নকশা অনুযায়ী জুতা বানানো নিয়ে ক্রেতা–বিক্রেতায় চলছে আলাপ।

নিউ বাবুল শু অ্যান্ড লেদার ক্র্যাফটে আসল চামড়ায় পছন্দসই জুতা বানাতে উত্তরা থেকে ছুটে এসেছেন তাহসিন আহমেদ খান। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী ঘোড়া চালাতে পারদর্শী। ঘোড়ায় চড়ার সময় গায়ে থাকে বিশেষ পোশাক আর পায়ে বিশেষ জুতা, নাম ‘কাউবয় বুট’। উঁচু হিলের এই কাউবয় বুট উঠে যায় একেবারে হাঁটু পর্যন্ত। এক হাতে সঙ্গে আনা কাউবয় বুট, অন্য হাতে মুঠোফোনে থাকা পছন্দের নকশা দেখিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন কেমন ধরনের কাউবয় বুট চান।

বাবুল শুজের বর্তমান ব্যবস্থাপক গণেশ রবিদাস জানালেন, এমন এক জোড়া কাউবয় বুট তৈরি করতে তাহসিনকে গুনতে হবে ১৫ হাজার টাকা। তবে আজকে দোকানের প্রথম ক্রেতা বলে দুই হাজার টাকা ছাড় পেলেন তাহসিন। ফলে ১৩ হাজার টাকায় পেয়ে যাচ্ছেন পছন্দসই টেকসই নতুন এক জোড়া কাউবয় বুট।

তাহসিনের মতো শুধু উত্তরা থেকেই নয়, টঙ্গী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, সিলেটসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে পশ্চিম ধানমন্ডির এই পুরোনো ১৫ নম্বর রোডে ফরমাশ নিয়ে আসে লোকজন।

জুতার কারিগরদের আস্তানা

রাস্তার সারি সারি জুতার দোকানের ঠিক পেছনেই কারখানা, বন্ধ ঘরে নিপুণ হাতে সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে চলেছেন কারিগরেরা। নিউ সঞ্জীব শুজের কারখানার ছোট্ট ঘরের তিন প্রান্তে তিনজন কাজ করছেন। পাকা ঘরটার মেঝে থেকে ছয় ফুট কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠলে মেলে আরেকটি মেঝে, সেখানেও কাজ চলছে।

বাবু রবিদাসের সঙ্গে কথা হলো। ১৯৫৪ সাল থেকে জুতা বানানোর কাজ করছেন ৯০ বছর বয়সী এই কারিগর। রবি দাস জানান, কয়েকটি ধাপে জুতা বানানোর কাজ চলে।

প্রথম ধাপে, ওপরের মেঝেতে নির্দিষ্ট মাপের চামড়া কেটে তৈরি করা হয় একেক জোড়া জুতার মাপ। চামড়ার এই অংশকে বলে ‘আপার অংশ’। শংকর, প্রদীপ আর হীরা নামের তিন কারিগর এই কাজ করেন।

দ্বিতীয় ধাপে বাবু রবিদাস ও স্বপন রবিদাস বাবলা কাঠের ছাঁচে (ডাইস) আপার অংশ বসিয়ে হাতুড়ি, পেরেক সহযোগে জুতার মূল কাঠামো গড়ে দেন। একেক নকশার জুতার জন্য একেক রকমের ছাঁচ। স্বপন রবিদাস জানান, কিছুদিন আগেই বংশাল থেকে ২৬ জোড়া নতুন ছাঁচ বানিয়ে এনেছেন। প্রতি জোড়া ১ হাজার ৫০০ টাকা করে। এখনো অনেক ছাঁচ ঘরের দেয়ালজোড়া তাকে তুলে রাখা আছে। নির্দিষ্ট নকশা ও গড়নের জুতার চাহিদা ফুরিয়ে গেলে সেসব ছাঁচও অচল হয়ে পড়ে। এ মাসের শুরুতেই অকেজো হয়ে পড়া দুই ট্রাক ছাঁচ ফেলে দিতে হয়েছে।

তৃতীয় ধাপে জুতার গায়ে রং ও ফিনিশিংয়ের কাজ করেন দিলীপ রবিদাস।

ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার আগে কমপক্ষে তিন দিন ধরে শুকানো হয় জুতার রং।

যে ধরনের জুতা বানানো যাবে

বানানো যাবে ফরমাল শু, হাফ শু, ক্যাজুয়াল শু, লোফার, চেলসি বুট, কাউবয় বুট, নাগরা, স্নিকার, কেডসসহ রং ও নকশা অনুযায়ী যেকোনো রকমের চামড়ার জুতা। স্যান্ডেল সাধারণত বানানো হয় না। ১২ জোড়া বা তার বেশি ফরমাশ এলে স্যান্ডেল জুতা বানানোর অর্ডার নেয় এখানকার সব কটি দোকান। এসব দোকানে নারী ও ১০ বছরের নিচের বয়সী শিশুদের জুতা বানানোর চল নেই।

বাজারে নামকরা সব ব্র্যান্ড থাকতেও কেন কারিগরের হাতে বানানো দোকানে ফরমাশ আসে? এমন প্রশ্নের উত্তরে গণেশ রবিদাস জানান, প্রথমত, আসল চামড়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। বাজারে নির্দিষ্ট কিছু আকারের বাইরের জুতা পাওয়া মুশকিল। এখানে আছে পায়ের মাপ অনুযায়ী জুতা বানানোর সুযোগ। আবার দেখা গেল আকার মিললেও জুতার রং নকশা পছন্দ হচ্ছে না। এখানে পাচ্ছেন পছন্দের রং ও নকশায় জুতা বানিয়ে নেওয়ার সুযোগ।

জন্মগতভাবে কারও কারও পায়ের সমস্যা থাকতে পারে, এক পা ছোট তো অন্য পা বড়, কোনো পায়ে পাঁচ তো কোনো পায়ে ছয় আঙুল। আবার কারও পায়ের পাতা থাকতে পারে বাঁকা। কেউ বা আবার অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পায়ের সমস্যায় ভোগেন। এসব ক্ষেত্রে বাজারে ঘুরে জুতা না মিললেও এখানে মিলবে সেসব জুতা বানিয়ে নেওয়ার সুযোগ। আসল চামড়ায় বানানো জুতার সঙ্গে আছে ওয়ারেন্টি সুবিধা। সব রকম জুতাতেই ছয় মাস থেকে এক বছরের ওয়ারেন্টি–সুবিধা পাবেন। এই সময়ের মধ্যে জুতার সোল ক্ষয়ে যাওয়া ছাড়া সব রকমের সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে।

যেমন খরচ

সাধারণত ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে পছন্দসই জুতা বানানো যায়। কিছু কিছু জুতার ক্ষেত্রে জুতার গঠন, নকশা ও হাতের কাজের বাড়তি সংযোজনের জন্য দাম ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজারেও গিয়ে ঠেকে।

যেখানে যেখানে মিলবে এমন দোকান

হাজারীবাগের পরে হাতে বানানো জুতার দোকান সবচেয়ে বেশি আছে পুরান ঢাকার দিকে। পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজার, আলু বাজার, বংশাল, মালিটোলা, মোগলটুলীসহ ধানমন্ডির পুরোনো ১৫ নম্বর রোড, মিরপুর ১০, ১১, ১২, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, পান্থপথ, মৌচাক মার্কেটের নিকটবর্তী সিদ্ধেশ্বরী রোড, টিকাটুলি কালীমন্দিরের পাশেসহ ঢাকার অনেক জায়গাতেই পেয়ে যাবেন কারিগরের হাতে বানানো চামড়ার জুতা।

সাধারণত ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে পছন্দসই জুতা বানানো যায়
সাধারণত ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে পছন্দসই জুতা বানানো যায় ছবি: কবির হোসেন

রেলওয়ে কর্মীরা কী চান, কর্তৃপক্ষ কী ভাবছে by আনোয়ার হোসেন

ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত কর্মচারীরা বাড়তি সময় কাজ করেন। তাই তাঁদের এক মাসের দায়িত্ব দুই মাস কিংবা এর চেয়ে বেশি সময় কাজ করেছেন ধরে বেতন হিসাব করার রীতি ব্রিটিশ আমল থেকেই। এসব কর্মচারী অবসরের পর পেতেন বাড়তি সুবিধা। বিশেষ এই সুবিধা পুরোপুরি দেওয়া না-দেওয়া নিয়ে অচল হয়ে পড়েছে সরকারের গণপরিবহন রেলওয়ে।

গতকাল সোমবার মধ্যরাত থেকে ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত কর্মচারীরা কর্মবিরতি শুরু করেছেন। রেলের ভাষায়, এসব কর্মচারী রানিং স্টাফ । ফলে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই জটিলতার শুরু ২০২২ সালে। তখন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়ে দেয় যে, রেলের রানিং স্টাফরা যে বাড়তি সুবিধা পান তা আর দেওয়া হবে না। অবশ্য পরে রানিং স্টাফ, রেল কর্তৃপক্ষ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দর-কষাকষির মাধ্যমে কিছু সুবিধা ফিরে পান রানিং স্টাফরা। কিন্তু এখন ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা সুবিধা পুরোপুরি পুনর্বহাল চান রানিং স্টাফরা। এ দাবিতেই কর্মবিরতি চলছে। রেল কর্তৃপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত কোনো সুরাহা আসেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রানিং স্টাফরা ট্রেন পরিচালনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চালকেরা কাজ না করলে ট্রেন চালানোর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে রেল কর্তৃপক্ষ রানিং স্টাফদের বিষয়ে কঠোর হতে পারছে না। বরং তাঁদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল রেল কর্তৃপক্ষ, এমনকি রেলপথ মন্ত্রণালয়ও।

কিন্তু রানিং স্টাফদের অভিযোগ, অর্থ মন্ত্রণালয়কে রাজি করিয়ে দাবি বাস্তবায়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে না রেলপথ মন্ত্রণালয়। রেল কর্তৃপক্ষের এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে চাইছেন রানিং স্টাফরা।  

রানিং স্টাফদের দাবি কী

রানিং স্টাফরা হলেন, ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত পরিচালক (গার্ড), ট্রেনচালক (লোকোমাস্টার), সহকারী চালক ও টিকিট পরিদর্শক (টিটিই)। এরা ট্রেন চালানোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এ ধরনের কর্মী রয়েছেন প্রায় দুই হাজার। তাঁরা সাধারণত দীর্ঘসময় ট্রেনে দায়িত্বপালন করে থাকেন। ট্রেন চালক ও সহকারী চালকের সংখ্যা এক হাজারের কিছু বেশি। পরিচালক ও টিটিই মিলিয়ে রানিং স্টাফের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৯০০ জনের মতো।

দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করলে বেসিকের (মূল বেতন) হিসেবে বাড়তি অর্থ পেতেন তাঁরা। যাকে রেলওয়ের ভাষায় বলা হয় মাইলেজ। মাইলেজ রানিং স্টাফদের বেতনেরই অংশ মনে করা হয়। প্রতি ১০০ কিলোমিটার ট্রেন চালালে রানিং স্টাফরা মূল বেতনের এক দিনের বেসিকের সমপরিমাণ টাকা অতিরিক্ত পেতেন। ৮ ঘণ্টায় এক দিনের কর্মদিবস ধরলে রানিং স্টাফদের প্রতি মাসে কাজ দাঁড়ায় আড়াই বা তিন মাসের সমপরিমাণ।

এ ছাড়া অবসরের পর বেসিকের সঙ্গে এর ৭৫ শতাংশ অর্থ যোগ করে অবসরকালীন অর্থের হিসাব হতো। তবে ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর এই সুবিধা সীমিত করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই সময়ের পর নতুন করে নিয়োগ পাওয়া কর্মীরা পুরোনোদের চেয়ে আরও কম সুবিধা পাবেন বলেও সরকার সিদ্ধান্ত নেয়।

২০২২ সালের পর নিয়োগপত্রে দুটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীরা চলন্ত ট্রেনে দায়িত্বপালনের জন্য রানিং অ্যালাউন্স ছাড়া অন্য কোনো ভাতা পাবেন না এবং মাসিক রানিং অ্যালাউন্সের পরিমাণ মূল বেতনের চেয়ে বেশি হবে না। এ ছাড়া অবসরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বশেষ আহরিত মূল বেতনের ভিত্তিতে পেনশন ও আনুতোষিক পাবেন।

শুরুতে পুরোনো রানিং স্টাফরা সুযোগ-সুবিধা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। একপর্যায়ে নতুন নিয়োগ পাওয়া রানিং স্টাফদেরও আন্দোলনে ভিড়িয়ে নেয় পুরোনোরা। প্রথমে বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের মাধ্যমে আন্দোলন করে। পরে বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ঐক্য পরিষদের নামে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করছেন তারা।

গত ২২ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে মাইলেজের ভিত্তিতে পেনশন ও আনুতোষিক প্রদান এবং নিয়োগপত্রের দুই শর্ত প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি জানান রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। তা না হলে ২৮ জানুয়ারি থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধের হুঁশিয়ারি দেন। এর ধারাবাহিকতায় গত সোমবার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম রানিং স্টাফদের বৈঠকে ডাকেন। কিন্তু তাঁরা শর্ত দেয় যে, আগে দাবি মানতে হবে। নতুবা বৈঠকে বসবেন না। পরে বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রানিং স্টাফদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। কিন্তু কর্মবিরতির বিষয়ে অনড় থাকেন রানিং স্টাফের নেতারা।

এর আগে ২০২২ সালে ১৩ এপ্রিল কর্মবিরতি পালন করলে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়েছিল। পরে রেল কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল। এরপর কয়েক দফা দাবি উপস্থাপন করেছেন রানিং স্টাফরা। রেল কর্তৃপক্ষও অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে এবং বৈঠক করেছে। কিন্তু কোনো সুরাহা সম্ভব হয়নি।

রানিং স্টাফ ঐক্য পরিষদের ঢাকা বিভাগের আহ্বায়ক সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব মিলে যদি সিদ্ধান্ত জানায় যে, আগামী সাত দিনের মধ্যে বিষয়টির সুরাহা করা হবে তাহলেই তারা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করবেন। তিনি জানান, দাবি-দাওয়া নিয়ে তারা রেলপথ মন্ত্রণালয়কে বিভিন্ন সময় ৯৪টি চিঠি দিয়েছেন। ১৭ বার বৈঠক করেছেন। কিন্তু সংকট নিরসনে আন্তরিক নয় তারা। প্রতিবারই কর্মবিরতি ডাকার পর শেষ মুহূর্তে বৈঠক ডাকা হয়।

রেল কর্তৃপক্ষের অবস্থান

রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রথমে অর্থ মন্ত্রণালয় রানিং স্টাফদের বিশেষ সুবিধার পুরোটাই বাতিল করে দিয়েছিল। তাদের বক্তব্য হচ্ছে—সরকারের আর অন্য কোনো কর্মচারীরা এই সুবিধা পায় না। সুতরাং রেলের জন্য বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা যাবে না।

কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানায় যে, রেল ২৪ ঘণ্টা সেবা দেয়। রানিং স্টাফদের কাজও ২৪ ঘণ্টা। তাদের সাপ্তাহিক ছুটিও বাতিল করা হয়। এ ছাড়া সামরিক বাহিনীসহ অন্য কিছু বিশেষায়িত দপ্তরের কর্মচারীরা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। তাই বহাল রাখা হোক। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয় প্রথমে মাইলেজ সুবিধা পুনর্বহাল করে। কিন্তু পেনশনের পর বাড়তি সুবিধা বাতিল এবং নতুনদের জন্য সুবিধা কিছুটা কমানোর সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

রেলওয়ে সূত্র বলছে, রানিং স্টাফদের দাবির বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষ আন্তরিক। রেলপথ মন্ত্রণালয়কে তারা বিষয়টি নানাভাবে বুঝিয়েছে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়কে রাজি করানো যাচ্ছে না।

আগামী শুক্রবার টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা শুরু হচ্ছে। প্রতিবার বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে বাড়তি ট্রেন পরিচালনা করে থাকে রেলওয়ে। এবার ঠিক ইজতেমার আগে কর্মবিরতিতে গিয়ে সরকারের গণপরিবহন সেবাকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও রানিং স্টাফদের সূত্র বলছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আন্দোলনের মাধ্যমে চাপ দিয়ে অনেকেই দাবি আদায় করছে। রেলের রানিং স্টাফদের কর্মবিরতির পেছনে এই চিন্তা থাকতে পারে। এটাও সত্য যে, অর্থ মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন ধরেই বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে। ফলে ইজতেমাকে সামনে রেখে রানিং স্টাফেরা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এবার আলোচনার জন্য বৈঠকে ডাকা হলেও এড়িয়ে যাচ্ছেন রানিং স্টাফ আন্দোলনের নেতারা। এ অবস্থায় জটিলতা আরও বাড়ছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আজ সকালে কমলাপুর রেল স্টেশনে পরিদর্শনে যান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দাবি-দাওয়া পূরণ রেল বিভাগের হাতে নেই। এটা অর্থ বিভাগের হাতে। আমরা অর্থ বিভাগের কাছে এটা তুলেছি। অর্থ বিভাগ এটা অনেকাংশে এটা পূরণ করে দিয়েছে। দরকার হলে আমরা বাকিটা নিয়েও তাদের সঙ্গে আলোচনা করব। তিনি কর্মবিরতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে কিন্তু রেল বন্ধ করতে পারে না। এতে সাধারণ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে।

দাবি পূরণে কর্মবিরতিতে রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। ফলে গতকাল সোমবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ। কমলাপুর স্টেশন, ঢাকা, ২৮ জানুয়ারি
দাবি পূরণে কর্মবিরতিতে রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। ফলে গতকাল সোমবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ। কমলাপুর স্টেশন, ঢাকা, ২৮ জানুয়ারি ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

ইসরাইলের মতো আমেরিকার আকাশে নিজস্ব 'আয়রন ডোম' চান ট্রাম্প

ইসরাইলের মতো এবার আমেরিকার আকাশেও নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তার লক্ষ্য ‘আয়রন ডোম’ তৈরি করা।  ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই ‘আয়রন ডোম’ তৈরির জন্য শী‌ঘ্রই তিনি একটি সরকারি নির্দেশিকা জারি করবেন।  প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় তিনি এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আয়রন ডোম হলো একটি মোবাইল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম যা ইসরাইলের জন্য রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস এবং ইসরাইল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।

জনবহুল এলাকার দিকে ধেয়ে আসা স্বল্প-পাল্লার রকেট এবং আর্টিলারি শেলগুলিকে আটকাতে এবং ধ্বংস করতে সক্ষম এই আয়রন ডোম। অল্প এবং মাঝারি দূরত্বের ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশেই অকেজো করে দিতে পারে এই ব্যবস্থা। ইসরাইলের বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একেবারে উপরের স্তর হিসাবে এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে।  

২০২৩ সালের ৭অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইল-হামাস সংঘর্ষে এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরাইলের উপর ইরানের হামলাসহ একাধিক ক্ষেত্রে আয়রন ডোম তার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।  

মায়ামিতে রিপাবলিকান শিবিরের এক কর্মসূচিতে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের অবিলম্বে ক্ষেপণাস্ত্র আটকানোর জন্য অত্যাধুনিক আয়রন ডোম তৈরির কাজ শুরু করতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনে সাংবাদিকদের বলেছেন যে, দায়িত্ব নিয়েই তার প্রথম কাজ হবে পেন্টাগনের অভ্যন্তরে DEI অপসারণ করা, কোভিড ম্যান্ডেটের কারণে বাইরে থাকা সৈন্যদের পুনর্বহাল করা, আমেরিকার জন্য আয়রন ডোম তৈরি করা।'

আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি থেকে বেসামরিক এলাকা রক্ষা করার জন্য ডিজাইন করেছে ইসরাইল, বিশেষ করে সীমিত সতর্কতার মধ্যে যাতে অঞ্চলগুলিকে রক্ষা করা যায়। সিস্টেমটি ইনকামিং প্রজেক্টাইলগুলি শনাক্ত করে, তাদের গতিপথ ট্র্যাক করে এবং তারা একটি জনবহুল এলাকা বা সংবেদনশীল অবকাঠামোতে আঘাত করবে কিনা তা গণনা করে সেইমতো কাজ করে। যদি রকেটটি একটি হুমকি হিসাবে নির্ধারিত হয়, আয়রন ডোম একটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র চালু করে যাতে এটি তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই  মধ্য-আকাশে ধ্বংস হয়ে যায়।

অত্যন্ত কার্যকরী ব্যবস্থাটিকে অনেক জীবন বাঁচানোর কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে স্থাপনের পর থেকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে এই আয়রন ডোম।

সূত্র :  হিন্দুস্থান টাইমস

mzamin

মার্কিন চাপ সত্ত্বেও আফগানিস্তানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আফগানিস্তান সফরে গেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ উপেক্ষা করে। আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করতে এ সফরটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর এটি প্রথমবারের মতো ইরানের কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা আফগানিস্তান সফর করছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার (২৬ জানুয়ারি) তালেবানের মুখ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান আখন্দের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের উন্নতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বৈঠকটি ইরান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই জানিয়েছেন, এই একদিনের সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করা এবং পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার প্রচেষ্টা বাড়ানো হবে।

সফরে, আরাগচি আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে জানানো হয়েছে, তিনি আফগানিস্তানের অর্থনৈতিকবিষয়ক উপ-প্রধানমন্ত্রী আবদুল গনি বারাদারের সঙ্গে বসবেন।

এই সফরটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নতির পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে, এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখছে।

এর আগে নতুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আফগানিস্তানের তালেবান নেতাদের মাথার ওপর পুরস্কার ঘোষণার হুমকি দিয়েছেন, দাবি করেছেন যে আফগান প্রশাসন বেশ কিছু মার্কিন নাগরিককে আটকে রেখেছে এবং তাদের মুক্তি না দিলে বড় মাপের অর্থের পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।

বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান, আফগানিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান কূটনৈতিক এবং সামরিক কার্যক্রম নতুন ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে ভবিষ্যতে একটি নতুন মোড় নিতে পারে।

তালেবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকীর সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। ছবি : রয়টার্স
তালেবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকীর সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। ছবি : রয়টার্স

ভয়ংকর ড্রোন বানাল ইরান, ঘুম হারাম ইসরায়েলের

কোনো কিছুই থামাতে পারছে না ইরানকে। নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দিন দিন সামরিক শক্তি বাড়িয়েই চলছে তেহরান। নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা চাপাবেন, এমন শঙ্কাকেও পাত্তা দিল খামেনির দেশ। উল্টো ভয়ংকর একটি ড্রোন উন্মোচন করে ঘুম হারাম করে দিল পশ্চিমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের।

ইরানের প্রভাবশালী মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডে দীর্ঘ ১৫ মাস ধরে চলা যুদ্ধকে সম্মান জানিয়ে ‘গাজা’ নামের ড্রোন উন্মোচন করেছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র অব ইরান। ড্রোনটি সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য পরিচালিত অভিযানে ব্যবহার হবে বলে জানিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস-আইআরজিসি। রোববার (২৬ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

আইআরজিসির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১ হাজার কিলোমিটার পাল্লার এবং কমপক্ষে ৫০০ কিলোগ্রাম পে-লোড বহন করতে সক্ষম এই চালকবিহীন ড্রোনটি স্থানীয় সময় রোববার ৮টি পরীক্ষামূলক লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে।

তথ্য বলছে, ৩ হাজার ১০০ কিলোগ্রাম ওজনের এই ড্রোনটি ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে। ‘গাজা’ ড্রোনটির ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে গিয়েও হামলা চালাতে সক্ষম। যা নাগালের মধ্যে থাকা ইসরায়েলের জন্য ভীতির কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ড্রোনটি একসঙ্গে ১২টি বোমা বহনে সক্ষম।

গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল ও হামাস সংঘাতে ৪৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তবে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি উপত্যকাটিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। যুদ্ধের শুরু থেকেই গাজার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে আসছে ইরান। 

ইরানের তৈরি ড্রোন। ছবি : সংগৃহীত
ইরানের তৈরি ড্রোন। ছবি : সংগৃহীত

পরীমনির জামিনদার কে এই তরুণ by মনজুর কাদের ও আসাদুজ্জামান

ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল পৌনে দশটা। পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারের যানজট পেরিয়ে একটি সাদা রঙের গাড়ি এসে থামে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রধান ফটকে। তখন হাসিমুখে গাড়ি থেকে বের হন চিত্রনায়িকা পরীমনি। হেঁটে যান লিফটের সামনে। উৎসুক জনতার ভিড় ঠেলে লিফটে পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হয় তাঁকে। এরপর লিফটে করে সাততলায় ওঠার পর আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে এজলাসকক্ষে ঢোকেন পরীমনি। তখনো পরীমনিকে একনজর দেখতে প্রচণ্ড ভিড়। এরপর বিচারক এজলাসে এলেন। পরীমনির আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত আদালতকে বলেন, পরীমনি এ মামলায় জামিনে ছিলেন। কখনো তিনি জামিনের অপব্যবহার করেননি। গতকাল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় আদালতে আসতে পারেননি। তিনি সব সময় আইন ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাঁকে জামিন দেওয়ার আবেদন করছি। এ সময় পরীমনি দাঁড়িয়ে ছিলেন আসামির কাঠগড়ায়। আদালত এক হাজার টাকা মুচলেকায় পরীমনির জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। জামিন মঞ্জুরের আদেশের পর পরীমনির মুখে ছিল হাসি। বিচারক এজলাস কক্ষ ত্যাগ করার পর পরীমনি তাঁর আইনজীবী ও তাঁর সঙ্গে যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে হাসিমুখে গল্প করতে থাকেন। আদালতকক্ষে দেখা যায়, ভক্তদের সঙ্গেও হাসিমুখে কথা বলছেন।

এরপর ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১০টা ২৭ মিনিট। চিত্রনায়িকা পরীমনি এজলাসের ঠিক পেছনের বেঞ্চে বসা ছিলেন। তখন পরীমনির আইনজীবীরা জামিননামা লেখায় ব্যস্ত। পাঁচ মিনিটের মধ্যে জামিননামার প্রয়োজনীয় তথ্য লেখার পর জামিনদারের স্বাক্ষরের জন্য কাগজটি তরুণ গায়ক শেখ সাদীর হাতে যায়। তখন পরীমনি ঠিক তাঁর ডান পাশেই বসা ছিলেন। এ সময় শেখ সাদী জামিননামায় নিজের নাম ও পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা লেখেন।

পরীমনির আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আদালতে পরীমনি আসতে না পারায় আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে পরীমনিকে খবরটি জানান। পরীমনি সিদ্ধান্ত নেন, কালই (আজ সোমবার) তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইবেন। আজ তিনি আদালত থেকে জামিনও পেয়ে যান।’

নীলাঞ্জনা রিফাত বলেন, ‘আদালতের জামিন আদেশের পর পরীমনির জামিননামা লেখা হয়। আমি জামিনদার হয়েছি। আরেকজন জামিনদার হয়েছেন শেখ সাদী। জামিননামাটি আদালতে জমাও দিয়েছি।’

জামিননামা জমা দেওয়ার পর আরও ১০ মিনিট পরীমনি ও শেখ সাদী পাশাপাশি বসা ছিলেন। তখন পরীমনিকে ঘিরে একদল আইনজীবী ও উৎসুক জনতা ছবি তুলতে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় আদালতের ওই এজলাস কক্ষের সামনে পরীমনিকে দেখার জন্য লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। তখন ঢাকা জেলা পুলিশের আদালত পরিদর্শক আখতার হোসেন উৎসুক জনতাকে আদালতের সামনে থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তখন পরীমনি আদালতকক্ষের ভেতরে তাঁর আইনজীবীদের সঙ্গে হাসিমুখে গল্প করতে থাকেন। কোনো কোনো আইনজীবী তাঁর ছবিও তোলেন। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সাততলার এজলাস কক্ষ থেকে তাঁকে কড়া নিরাপত্তা দিয়ে লিফটের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। সাততলা থেকে লিফট নামতে সময় নেয় প্রায় ১০ মিনিট। পরীমনি যখন আদালত ভবনের নিচতলায় আসেন, তখন সেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রচণ্ড ভিড় ছিল। এই ভিড় ঠেলে ঢাকার সিজেএম আদালতের প্রধান ফটকের সামনে রাখা ডায়াসের কাছে যান। তখন পরীমনি হাসিমুখে কথা বলতে শুরু করেন। কিন্তু উৎসুক জনতার চিৎকার–চেঁচামেচিতে পরীমনির কথা গণমাধ্যমকর্মীরা ঠিকমতো শুনতে পারছিল না। একপর্যায়ে পরীমনি বিরক্ত হন। তিনি বলতে শুরু করেন, যদি চিৎকার–চেঁচামেচি করেন, তাহলে আমি কথা বলব না। তখন পরীমনি হাসিমুখে বলতে থাকেন, আমি আপনাদের এত ভালোবাসা পেয়েছি...। পরীমনি গণমাধ্যমকর্মীদের কথা বলা শেষ করে, সাদা রঙের একটি প্রাইভেট কারে চড়ে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন।

ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদের দায়ের করা মারধর ও হত্যাচেষ্টার মামলায় ঢাকার সিজেএম আদালত গতকাল পরীমনির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। এদিকে ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদের বিরুদ্ধে পরীমনির দায়ের করা ধর্ষণচেষ্টা মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৯–এ বিচারাধীন। এই মামলায় পরীমনির সাক্ষ্য গ্রহণ চলমান।

জামিনদার শেখ সাদী

তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় গায়ক শেখ সাদী। আদালতে শুরু থেকে পরীমনির সঙ্গে ছিলেন তিনি। পরীমনির জামিনদার হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শেখ সাদী প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরীমনি আমার সহকর্মী। যখন তিনি গণমাধ্যমে পরীমনির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবর শুনলেন, তখন বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তখন পরীমনির সঙ্গে কথা হয়। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, আজ আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। এ জন্য আমিও আজ আদালতে আসি। জামিন হওয়ার পর তাঁর আইনজীবী একজন জামিনদার হন। আমিও আরেকজন জামিনদার হলাম।’

শেখ সাদী জানান, একই অঙ্গনে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে পরীমনির সঙ্গে বেশ আগেই পরিচয় হয়েছিল। তখন থেকে পেশাগত বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে নিয়মিত কথাবার্তা হয়। তরুণ গায়ক শেখ সাদীর বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান রয়েছে। ইউটিউবে এসব গানের ভিউ কোটি পার হয়েছে।

শেখ সাদীর জামিনদার হওয়া প্রসঙ্গে চিত্রনায়িকা পরীমনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘হঠাৎ করে আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম বলে গতকাল আদালতে যেতে পারিনি। যখন শুনলাম, আমার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। খবরটি যখন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, তখন আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ও শুভানুধ্যায়ীরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এমন পরিস্থিতিতে আমার বন্ধুবান্ধবেরা আমাকে সাহস জুগিয়েছে। শেখ সাদীও আমার সহকর্মী। তার সঙ্গেও গতকাল কথা হয়। আজ আদালতে শুনানির সময় সে ছিল। জামিন পাওয়ার পর আইনজীবী জামিনদারের পাশাপাশি স্থানীয় একজন জামিনদারের প্রয়োজন হয়। শেখ সাদী তখন জামিননামায় স্বাক্ষর করে।’

তিন বছর আগে ‘গুণিন’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে নায়ক শরিফুল রাজের পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে প্রণয়। এরপর এই দম্পতির একটি ছেলেসন্তান হয়। পরে তাঁদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। প্রায় দেড় বছর আগে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। পরীমনি তাঁর সন্তান ও কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত আছেন। অন্যদিকে রাজও তাঁর মতো করে ছবির কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। লম্বা সময় আলাদা থাকার বিষয় পরীমনি ও রাজের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

পরীমনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা চড়াই–উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে আমার জীবন চলছে। বিপদের সময় যে পাশে থাকেন, সে জীবনের জন্য আশীর্বাদ। আমি এই জীবনে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী পেয়েছি, এখনো আমার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছে। আমার সুখ-দুঃখের গল্পগুলো তাঁদের সঙ্গে শেয়ার করি। এতে আমি মানসিকভাবে ভালো থাকি।’

আর শেখ সাদী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমিও ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছি অনেক দিন হলো। পরীমনি অনেক ইতিবাচক গুণ রয়েছে। বিপদ–আপদে মানুষের পাশে থাকেন। আমি তাঁর মঙ্গল কামনা করি সব সময়।’

পরীমনির ফেসবুক পেজে দেখা যায়, চার দিন আগে শেখ সাদীর একটি ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে। তাতে পরীমনি লিখেছেন, ‘...পৃথিবীকে জানতে দিয়ো, তুমি এই পৃথিবীর আলো...।’ এ ছাড়া ১৩ জানুয়ারি পরীমনির ফেসবুক পেজে শেখ সাদীর আরও ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে। একই দিন শেখ সাদীর আরও একটি ভিডিও পরীমনির ফেসবুক পেজে প্রকাশ পায়।

পরীমনি
পরীমনি। ছবি : পরীমনির ফেসবুক থেকে

পরীমনির জামিনদার হয়েছেন তরুণ গায়ক শেখ সাদী, এই তরুণের বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান রয়েছে।
পরীমনির জামিনদার হয়েছেন তরুণ গায়ক শেখ সাদী, এই তরুণের বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান রয়েছে। ছবি : সাদীর ফেসবুক থেকে

৭ কলেজ: অবশেষে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত

সংঘাত-সংঘর্ষের পর অবশেষে আসলো ‘সম্মানজনক পৃথক্‌করণ’র সিদ্ধান্ত। প্রায় ৮ বছর অধিভুক্ত থাকা রাজধানীর ৭ সরকারি কলেজের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নতুন শিক্ষাবর্ষে আর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি নেবে না দেশের শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। তার আগে পদ্মার জল গড়িয়েছে অনেক দূর। দীর্ঘ এ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের অধিভুক্তি ও শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে আপত্তি। রাজপথে নেমে এসে জনদুর্ভোগ তৈরি করা। শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) হামলা। এরই ধারাবাহিকতায় সবশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) প্রফেসর ড. মামুন আহমেদের কার্যালয়ে গিয়ে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের হট্টগোল। ৫ই জানুয়ারি দেয়া পাঁচ দফা দাবি আদায়ে তাৎক্ষণিক চাপ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের ‘মব’ তৈরি না করতে কড়া ভাষায় প্রো-ভিসির সতর্ক করা। রোববার সন্ধ্যার এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রো-ভিসির বিরুদ্ধে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের ‘অসম্মান’ করার অভিযোগ আনা হয়। দাবি করা হয় প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার। এ নিয়ে রাতে অবরোধ করা হয় রাজধানীর পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। দীর্ঘ চার ঘণ্টা অবরোধের পর সড়ক ছেড়ে শিক্ষার্থীরা প্রো-ভিসির বাসা ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেন। রওয়ানা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে। এমন খবরে মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণে পাল্টা অবস্থান নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। যেটি এক পর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। রাতে প্রো-ভিসির দুঃখ প্রকাশেও সমাধান মেলেনি। গতকাল দুপুর অবধি চলতে থাকে উত্তেজনা। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী দুপুর সাড়ে ১২টায় সাত কলেজ ইস্যুতে বৈঠকে বসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. নিয়াজ আহমেদ খান। ভিসির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্রো-ভিসি (প্রশাসন) প্রফেসর ড. সায়মা হক বিদিশা, প্রো-ভিসি (শিক্ষা) প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ, ট্রেজারার প্রফেসর ড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন উপস্থিত ছিলেন। সাত কলেজের পক্ষ থেকে অংশ নেন কলেজগুলোর অধ্যক্ষরা। বৈঠক শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. নিয়াজ আহমেদ খান বৈঠকের সিদ্ধান্তের কথা জানান। বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অধিভুক্ত সাত কলেজের সম্মানজনক পৃথক্‌করণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ ছাড়াও অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এক বছর এগিয়ে এনে এ বছর থেকেই অর্থাৎ ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভর্তি না নেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়; শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৯শে ডিসেম্বর থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য সভায় জোর সুপারিশ করা হয়; ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী আসন সংখ্যা ও ভর্তি ফি নির্ধারণসহ যাবতীয় বিষয়ে মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে; যেসব শিক্ষার্থী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান শিক্ষা কার্যক্রমের অধীনে রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দায়িত্বশীল থাকবেন, যাতে তাদের শিক্ষাজীবন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তবে এমন সিদ্ধান্তে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের পক্ষে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী মইনুল ইসলাম বলেন, আমাদের এক নম্বর দাবি অধিভুক্তি বাতিল হয়েছে। এ জন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু আমাদের আরও পাঁচটি দাবি আছে। প্রো-ভিসির পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মেনে নিতে হবে। অন্যথায় আমরা নিউ মার্কেট থানা ঘেরাও করবো।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাপ কমানোর লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগে রাজধানীর সরকারি সাত কলেজকে অধিভুক্ত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। যেখানে এ দু’টি বিষয় ছাড়াও গুরুত্ব পেয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশীদের কোন্দল। কোনো রকম পর্যালোচনা ছাড়াই এক বিকালে হুট করে ঘোষণা করা হয়- ‘রাজধানীর সরকারি সাত কলেজ আজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।’ এরপর কেটেছে প্রায় ৮ বছর। কিন্তু সাত কলেজের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন হয়নি। বরং কিছুদিন পর পর রাজপথে নেমে আসতে হয়েছে এসব কলেজের শিক্ষার্থীদের। অন্যদিকে সাত কলেজের এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়ে নিজের ঘরেই আলো দিতে ব্যর্থ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক সময় দাবি তুলেছিল- সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের। যে দাবি করতে গিয়ে তৎকালীন সরকারের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) হামলার শিকারও হতে হয়েছে তাদের। নিপীড়নের শিকার হয়েছেন নারী শিক্ষার্থীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ৫ই জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. নিয়াজ আহমেদ খানকে পাঁচ দফা দাবি জানায় সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা।

দাবিগুলো হলো- ২০২৪-২৫ সেশন থেকেই সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় অযৌক্তিক কোটা পদ্ধতি বাতিল করা; শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি না করানো; শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো; নেগেটিভ মার্ক যুক্ত করা; সাত কলেজের ভর্তি ফি’র স্বচ্ছতা নিশ্চিতে, মন্ত্রণালয় গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে ঢাবি ব্যতীত নতুন অ্যাকাউন্টে ভর্তি ফি’র টাকা জমা রাখা। এরই ধারাবাহিকতায় গত রোববার সন্ধ্যায় অফিস সময়ের পরে সাত কলেজের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) প্রফেসর ড. মামুন আহমেদের কার্যালয়ে যান। সেখানে এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা প্রো-ভিসির সঙ্গে হট্টগোল শুরু করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় মব তৈরি না করতে প্রো-ভিসি শিক্ষার্থীদের কড়া ভাষায় সতর্ক করেন। যে ঘটনাকে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের অপমান বলে দাবি করেন তারা। এরপর সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব, শাহবাগ, মিরপুর, তাঁতীবাজার, নিউমার্কেট সড়কে অবরোধ করেন। দাবি করা হয় প্রো-ভিসির ক্ষমা চাওয়ার। চার ঘণ্টায়ও দাবি মানা না হলে অবরোধ তুলে নিয়ে প্রো-ভিসির বাসা ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেন তারা। রওয়ানা হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেত মোড়ে গেলে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণের নিচে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে এমন খবরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ক্ষুব্ধ হন। তারা ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের ঠেকাতে পাল্টা অবস্থান নেয় স্যার এ এফ রহমান হলের সামনে। মুহূর্তের মধ্যে হলগুলো থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সেখানে অবস্থান নেয়। উত্তেজনা বাড়তে থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একযোগে সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেয়। তাড়া খেয়ে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা যখন ঢাকা কলেজের সামনে চলে যায় তখন পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এ সময় দুই পক্ষের সংঘর্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। যাদের পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা দেয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে রাতে প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ এক ভিডিও বার্তায় উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে চলতে থাকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। ঢাবি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আবার এগিয়ে গেলে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়। রাত ২টার দিকে মোতায়েন করা হয় বিজিবি। এরই মধ্যে ইডেন কলেজের মেয়েরা রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ দেখান। রাত ৩টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়। দুই পক্ষ স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসেন। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. নিয়াজ আহমেদ উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। আর সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা পরদিন সকাল ৯টা থেকে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কিন্তু মিটিংয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থেকে তারা এক পর্যায়ে ৪ ঘণ্টার জন্য সে কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেন। সবশেষ সন্ধ্যায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পাঁচ দফা দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে এদিনের মতো কর্মসূচি শেষ করেন।

এদিকে সাত কলেজ ইস্যুতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের দুই গ্রুপ। পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে সাত কলেজ বাতিলকরণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। অন্যদিকে বিকালে আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে জগন্নাথ হল ও স্যার এ এফ রহমান হল পরিদর্শন করেন ভিসি ড. নিয়াজ আহমদ খান। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ, জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট দেবাশীষ পালসহ সংশ্লিষ্ট হলের আবাসিক শিক্ষকগণ উপস্থিত ছিলেন।

এখন কী হবে সাত কলেজের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তের পর এখন সরকারি সাত কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চলবে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও অন্ধকারে। আপাতত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও শিক্ষার্থীদের মাঝে শঙ্কা কাজ করছে ভবিষ্যৎ নিয়ে। নতুন কোনো জটিলতা যাতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। টানা ১৮ ঘণ্টার উদ্বেগ শেষে গতকাল সিনেট সভার পর ঢাবি ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান। এই ঘোষণার পর প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান প্রক্রিয়া কী হবে? এ বিষয়ে ঢাবি ভিসি বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল আগামী বছর অর্থাৎ, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে সাত কলেজের ভর্তি কার্যক্রম ঢাবি পরিচালনা করবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা সেই সিদ্ধান্ত এক বছর এগিয়ে এনেছি। তিনি আরও বলেন, যেসব শিক্ষার্থী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান শিক্ষা কার্যক্রমের অধীনে রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দায়িত্বশীল থাকবে। যাতে তাদের শিক্ষাজীবন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রানিং শিক্ষার্থীদের ঢাবি প্রশাসন দেখভাল করবে নাকি আলাদা কোনো ফরমেটে হবে- সেটি মিটিংয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। শিক্ষার্থীরা ঢাবি থেকে বেরিয়ে খুশি হলেও শঙ্কাও আছে তাদের মাঝে। ভবিষ্যতে কোনভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো চলবে- তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাদের দাবি অনুযায়ী স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাও জটিল বিষয়। 

তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী মো. সাগর আহমেদ বলেন, আমরা খুশি আমাদের দাবির একটা অংশ আদায় হয়েছে। তবে এখন পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে চিন্তিত। ঢাবি আমাদের পরীক্ষা নেবে, তারা চাইবে আমাদের দ্রুত বের করে দিতে। কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হলে সে বিষয়ে তাদের মনোভাব কেমন হবে এসব নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও তারা নতুন করে শিফটের মাধ্যমে পরীক্ষা নিলেও আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হবো। এখন আমাদের জন্য শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণের দাবি জানাই। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল বলেন, ঢাবি থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের কলেজগুলো নিয়ে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করার জোর দাবি জানাই। এখনো ভিসি’র দেয়া সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে আমরা পরিষ্কার হতে পারিনি কোন প্রক্রিয়ায় আগামী দিনের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা হবে। আগামী দিনে কীভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চলবে সেটিও দ্রুত জানানো হবে। 
সাত কলেজের বিষয়ে নেয়া সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে সরকারি তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শিপ্রা রাণী মণ্ডল বলেন, মিটিংয়ে যে সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে তা ঢাকা বিশ্ববদ্যালয় নিয়েছে। আমরা তা অবহিত হয়েছি মাত্র। দাবিগুলো ছিল শিক্ষার্থীদের। সেই দাবি পূরণ করেছে ঢাবি। এই সিদ্ধান্ত কীভাবে কার্যকর করা হবে- সেটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন জানে। একটা বিশেষজ্ঞ কমিটি করা আছে। সেই কমিটি যেভাবে নির্দেশনা দিবে সেভাবে হয়তো চলবে। সাত কলেজ নিয়ে কি করা হবে তার জন্য মন্ত্রণালয় আর ইউজিসি’র কাজ তো চলমান আগে থেকেই। তাদের থেকে যে নির্দেশনা আসবে আমরা সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন করবো।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক একেএম ইলিয়াস বলেন, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজের নেতৃত্বে যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়েছে তারাই একটা রূপরেখা দেবেন। তাদের এই পরিকল্পনার আলোকে সাত কলেজ নিয়ে একটা কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটির তত্ত্বাবধানেই চলতি বছরের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এই কমিটির আওতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চলতি দায়িত্ব নেয়ার মাধ্যমে অধিভুক্তি বাতিল প্রক্রিয়া শুরু হবে। চলমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা আলোচনার মাধ্যমে চলতি সেশনগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবো। এ ছাড়া চলমান পরীক্ষাগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলেও তিনি জনান।

গতকাল সাত কলেজের বিষয়ে জরুরি সভায় নেয়া সিদ্ধান্তে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৯শে ডিসেম্বর থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য সভায় জোর সুপারিশ করা হয়। এছাড়া ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী আসন সংখ্যা ও ভর্তি ফি নির্ধারণসহ যাবতীয় বিষয়ে মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলেও জানানো হয়। তবে এই প্রসঙ্গে ইউজিসি ও বিশেষজ্ঞ কমিটি সদস্য অধ্যাপক তানজিমউদ্দিন খান বলেন, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিষয়। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাও হয়নি। আমরা আমাদের মতো করে কাজ করছি। আমাদেরকে বলা হয়েছিল, সাত কলেজের সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যায় তার একটা রূপরেখা দিতে। আমরা সেটা দেয়ার চেষ্টা করছি। 

শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী আসন সংখ্যা ও ভর্তি ফি নির্ধারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা যখন ২০২৪-২৫ এর ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে তখন কি আমাদের সঙ্গে আলাপ করেছেন? তারা আমাদের সঙ্গে কোনো আলাপ করেনি। তারা তাদের মতো স্বাভাবিকভাবে করেছে। আর বিশেষজ্ঞ কমিটি তো ডিফারেন্ট টার্মস অফ রেফারেন্স। এটার সঙ্গে আমাদের কেন জড়াচ্ছে তাই তো বুঝলাম না। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একান্ত এখতিয়ার। কলেজের উপর আমাদের কোনো এখতিয়ার নাই। ইউজিসি দায়িত্বও নেয় নাই এটা অফিসিয়ালি। আমরা কীভাবে এই সিদ্ধান্ত দেবো। 

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এসএম এ ফায়েজ বলেন, নিয়মমাফিক সাত কলেজ স্বতন্ত্র কাঠামোতে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। অধিভুক্তি বাতিলে সাত কলেজের ভর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়বে। তিনি বলেন, ঢাবি আমাদের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা কী চায় তা বিবেচনা করে সরল ও যৌক্তিক পথে হাঁটতে হবে।

mzamin
৭ কলেজের শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলন ছবি: নিজস্ব

আওয়ামী লীগে বিভক্তি চ্যালেঞ্জের মুখে হাসিনা -আল জাজিরা’র রিপোর্ট

জুলাই বিপ্লবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৬ বছরের নেতৃত্বের যবনিকাপাত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্মের আগে থেকে রাজনীতিতে একটি বড় শক্তি হিসেবে তার দল এখন টুকরো টুকরো জোড়া লাগানোর লড়াই করছে। ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা নেই দলের এমন হোমরাচোমরা, মধ্যম পর্যায়ের নেতা এবং কর্মীদের মধ্যে তীব্র বিভক্তি প্রকাশ পাচ্ছে। এসব নেতাকর্মী বিশ্বাস করেন,  কোথায় ভুল হয়েছে তা পেছন ফিরে দেখা দরকার আওয়ামী লীগের। তারা আরও মনে করেন- এটাই একমাত্র পথ। ৭৫ বছর বয়সী এই রাজনৈতিক দলটি তাদের সমস্যার সমাধান করে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। এ বিষয়ে অনেক নেতাকর্মী কথা বলেছেন। অনলাইন আল জাজিরায় প্রকাশিত ‘আফটার দ্য ব্লাডশেড: ক্যান বাংলাদেশ’জ আওয়ামী লীগ রিসারেক্ট ইটসেল্ফ?’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, যখন ২০২৪ সালের ১৬ই জুলাই ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে রংপুরে নিহত হন আবু সাঈদ, তখনো আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ঠাণ্ডা মেজাজে আরাম করছিলেন। তাদের কাউকে কাউকে তার অফিসে কোনো স্থানীয় কবি কবিতা পাঠ করে শোনাচ্ছিলেন। আবৃত্তি শেষে তিনি বলে ওঠেন- ‘ওয়ান্ডারফুল’। এর কিছু সময় পরে আবু সাঈদ হত্যার তথ্য কোনো এক সহযোগী একজন নেতাকে জানান। কিন্তু তিনি তা উড়িয়ে দেন। বলেন- ওহ, কিছুই হবে না। নেতা (হাসিনা) সব কিছু ঠিক করে ফেলবেন। এর মধ্যদিয়েই প্রকাশ পেয়ে যায় ওই সময় আওয়ামী লীগের উপরিমহলের মনোভাব। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ে কি হচ্ছে, তা তারা মোটেও আমলে নেননি। এর তিন সপ্তাহেরও কম সময় পরে কর্তৃত্ববাদ ও নৃশংসতা চালানোর অভিযোগে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণ-অভ্যুত্থান। আইনপ্রয়োগকারীদের হামলায় বিক্ষোভকারী এবং পথচারীদের কমপক্ষে ৮৩৪ জন প্রাণ হারান। এই বিক্ষোভ শুরু হয় ১লা জুলাই। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে যাওয়ার মধ্যদিয়ে তার ইতি ঘটে। তবে হামলায় আহত হন কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ। তার মধ্যে আছেন শিশু ও নারী। দলটির এই পরিণতির জন্য দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। অজ্ঞাত স্থান থেকে ১৬ই জানুয়ারি আল জাজিরাকে ফোনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার। এটা শিগগিরই প্রমাণ হবে। তবে তিনি কাকে বা কোন দেশকে দায়ী করছেন সুনির্দিষ্টভাবে তা বলেননি। তার এমন মন্তব্যের পর বিশ্লেষকরা বলছেন, তাদের দলের নেতৃত্বের যে ব্যর্থতা এবং জনগণের অভিযোগগুলো সমাধানে তাদের যে অক্ষমতা- তা ফুটে ওঠে এমন প্রত্যাখ্যানের মধ্যদিয়ে। পক্ষান্তরে তাদের এমন মন্তব্যে দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এসব নেতাকর্মীর অনেকেই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার ভয়ে হয়তো আত্মগোপনে আছেন না হয় আতঙ্কিত। তারা একটি সুসংগঠিত দল থেকে ‘টপ-ডাউন’ কাঠামোতে রূপান্তরের কারণে সমালোচনা করছেন। তারা বলছেন, এ কারণে দল জনগণের সেন্টিমেন্ট হারিয়েছে। ৫ই আগস্ট যখন জনতার বিশাল ঢেউ শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বোন শেখ রেহানার সঙ্গে গণভবন থেকে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে উড়াল দেন। খুলনায় আওয়ামী লীগের ছাত্র বিষয়ক শাখা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের স্থানীয় সিনিয়র একজন নেতা বলেন- ‘যখন টেলিভিশনে নাটকীয় ওই পলায়নের দৃশ্য সম্প্রচার হচ্ছিল, তখনো কিছু নেতাকর্মীকে নিয়ে আমি খুলনার রাজপথে অবস্থান করছিলাম। আমি আমাদের একজন সিনিয়র নেতা, স্থানীয় এমপিকে ফোন করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তার ফোন ছিল বন্ধ।’ তিনি বলেন- ‘ঠিক ওই মুহূর্তে আমার মনে হলো আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে’।

২০২৪ সালের ২৩শে অক্টোবর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিষিদ্ধ করে ছাত্রলীগকে। এরপর খুলনার এক সময়ের ছাত্রলীগের প্রভাবশালী একজন নেতা নিরাপদে আশ্রয় নেয়ার ভয়ার্ত সফরের বর্ণনা করেন। ভুয়া একটি পরিচয়ে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। তার আগে তিনি পালিয়ে চলে আসেন গোপালগঞ্জে। তিনি বলেন- ‘আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ফোন নম্বর সহ সবকিছু পাল্টে ফেলেছি। বেঁচে থাকার জন্য একটি ছোট্ট ব্যবসা শুরু করেছি। দল আমাদেরকে পরিত্যগ করেছে। আর কখনো রাজনীতিতে ফিরবো না’।
সারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে তাদেরকে পরিত্যাগ করার একই রকম অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। বহু নেতাকর্মী রয়েছেন নীরব। তবে আওয়ামী লীগপন্থি সংগঠন বাংলাদেশ কৃষক লীগের সহকারী সম্পাদক সামিউল বশির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে রয়েছেন সরব। তিনি আল জাজিরাকে বলেন- প্রতিশ্রুতিবদ্ধ (কমিটেড) নেতাকর্মীকে বছরের পর বছর একপেশে করে রাখা হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে সুযোগ সন্ধানীরা এবং স্থানীয় এমপিদের পরিবারের সদস্যরা তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কাঠামোতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এর ফলে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। একই রকম হতাশার কথা তুলে ধরেন আওয়ামী লীগপন্থি চিকিৎসকদের একটি সংগঠনের এক নেতা। তিনি নাম প্রকাশ করতে চান না। তিনি বলেন, যারা দলীয় মুখপত্র হয়ে উঠেছেন তাদের কর্মকাণ্ড এবং ব্যবহৃত শব্দগুলো বিপর্যয়কর ছিল দলের জন্য, বিশেষ করে গত কয়েক বছর। দলের ব্যর্থতার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা ছিল নির্মম বাস্তবতা। সেটা হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের দল প্রচণ্ডভাবে নির্ভর করেছে গোয়েন্দা রিপোর্টের ওপর। কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে অথবা কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সে বিষয়ে শীর্ষ নেতাদেরকে দেখেছি তারা অবহিত নন।

ওদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, দলে গণতান্ত্রিক রীতির চর্চার অভাব দলকে বিশৃঙ্খল অবস্থায় ফেলেছে। গত এক দশক ধরে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় আওয়ামী লীগের সব তৃণমূল পর্যায়ের ইউনিট ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সংগঠনগুলো পরিচালিত হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে। এক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন না করে একই পুরনো সদস্যদের ওপর নির্ভর করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের বিষয়ে আওয়ামী লীগ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি অথবা আন্দোলন চলাকালে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর হস্তে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা স্বীকার করে কোনো বিবৃতি দেয়নি। এর পরিবর্তে দলটি বার বার এই আন্দোলনকে অস্বীকার করছে। তারা বিবৃতিতে এসব আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসীদের অভ্যুত্থান’ হিসেবে বর্ণনা করছে। ১০ই জানুয়ারি যুবলীগের এক বিবৃতিতে এমনটাই বলা হয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে, এই আন্দোলনে এমন সব শক্তি আছে, যারা দেশকে পাকিস্তানি আদর্শের দিকে নিয়ে যেতে চায়। প্রায় এক ঘণ্টা আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম। বার বার তিনি অভিযোগ করেন কোটা বিরোধী আন্দোলনের নামে ছাত্রদেরকে ‘বিভ্রান্ত’ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র বিষয়ক সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলকভাবে কোটা ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্ররা শুরু করেন কোটা বিরোধী আন্দোলন। কিন্তু তাদের ওপর সরকারের ক্রমবর্ধমান নিষ্পেষণ এবং ব্যাপক রক্তপাতের পর শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতকে নিয়ে বিতর্ক আছে। তারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে জামায়াতে ইসলামীর ৫ জন এবং বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র একজন সিনিয়র নেতাকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসি দিয়েছে। হাসিনা সরকারের সময়ে বিএনপি এবং জামায়াত- উভয়েই ভয়াবহ দমনপীড়নের শিকারে পরিণত হয়। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাপকভাবে জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। নাসিম স্বীকার করেন, তার দল কৌশলগত ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে তিনি ব্যর্থতার জন্য প্রথমেই দায়ী করেন গোয়েন্দাদের ব্যর্থতাকে। ওদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে সম্প্রতি দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ১১ বছর ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘ইসলামপন্থি সন্ত্রাসী এবং সেনাবাহিনী’র ‘যৌথ অভ্যুত্থানে’র শিকারে পরিণত হয়েছে আওয়ামী লীগ।

তবে দলের ভেতর জবাবদিহিতার অভাব থাকাকে কড়া সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের ছেলে ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। তিনি বলেন, অবিচার, নিষ্পেষণ, দুর্নীতি, কোটি কোটি টাকা লুট ও পাচারের কারণে বাংলাদেশের জনগণের কাছে অবশ্যই ক্ষমা চাইতে হবে আওয়ামী লীগকে। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, এখনো আমি তাদেরকে দেখিনি আত্মোপলব্ধি, আত্মসমালোচনা অথবা দোষ স্বীকার করতে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ও বিশ্লেষক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান যুক্তি দেন যে, দলটির কঠোর অবস্থান এবং সিদ্ধান্ত জনগণকে ক্ষুব্ধ হতে উৎসাহিত করেছে। এর মধ্যদিয়ে গণ-অভ্যুত্থানকে সফল হওয়ার পথ করে দেয়া হয়েছে। ধর্মীয় পদক্ষেপগুলো শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তায় আঘাত করেছে, যার ফলে একক দাবিতে পরিণত হয় তার পদত্যাগ।

নির্বাসনে থাকা বা সেখান থেকে ফিরে আসার মতো পরিস্থিতির সঙ্গে অপরিচিত নন হাসিনা। তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ও পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট হত্যা করা হয়। এরপর বেশ কয়েক বছর তিনি ভারতে অবস্থান করেন। তারপর ১৯৮১ সালে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। দলকে পুনর্গঠন করে ক্ষমতায় আসতে তার সময় লেগেছে ২১ বছর। হাসানুজ্জামান বলেন, এবার ছিল ভিন্ন পরিস্থিতি। ছাত্রদের নেতৃত্বে রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ। এতে নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি যুক্তি দেন- মারাত্মক ইমেজ ও নেতৃত্ব সংকটের মুখে আওয়ামী লীগ। তার ভাষায়- শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে দলটি পুনর্গঠিত করা হবে চ্যালেঞ্জিং। দলের ভেতরে বিভক্তি দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশে বড় দু’টি রাজনৈতিক শক্তি হলো বিএনপি ও জামায়াত। তারা উভয়েই বলেছে- জুলাই ও আগস্টে নাগরিকদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীরা বিচারের মুখোমুখি হোন- এটা তারা চায়। তার ওপর তারা আরও যুক্তি দিয়েছে যে, আওয়ামী লীগের ভাগ্য কি হবে সে সিদ্ধান্ত নেবেন দেশবাসী। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন যেসব ছাত্ররা তারা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। ২৫শে জানুয়ারি এক র‌্যালিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা এবং ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মাহফুজ আলম বলেছেন, আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবে না আওয়ামী লীগকে। তিনি আরও বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য হলো হত্যাকাণ্ড, গুম ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত সবার বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আমরা সংস্কার বাস্তবায়ন করবো; নিশ্চিত করবো বাংলাদেশপন্থি সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন।

আওয়ামী লীগের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচন হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, যদি আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে, তাহলে দলটির পা রাখার জন্য একটি জায়গা সৃষ্টি হবে। তবু নেতৃত্ব, সংগঠন ও তৃণমূল পর্যায়ে গণসংযোগের মাধ্যমে জনআস্থা পুনর্গঠন ছাড়া আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতিতে পুনরুজ্জীবন লাভ করা হবে অত্যন্ত জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও প্রফেসর আলী রীয়াজ আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগের জন্য চারটি শর্ত উদ্‌ঘাটন করেছেন। তা হলো- ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার সময়ে যেসব অপরাধ করেছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময়, তার জন্য দ্ব্যর্থহীনভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। তাদেরকে বর্তমান আদর্শ পরিত্যাগ করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে যে, শেখ হাসিনার পরিবারের কোনো সদস্য এই দলে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সহ যেসব জঘন্য অপরাধ করেছে তারা- তার জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, শেখ হাসিনা সহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নৃশংসতার জন্য সরাসরি দায়ীদেরকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। যখন এসব শর্ত পূরণ হবে, শুধু তখনই তাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয় আলোচনা করা যেতে পারে।  

শেখ হাসিনার পরিবারের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে গোপনে মাঝেমধ্যে নেতাকর্মীরা সমালোচনা করলেও এখনো শেখ হাসিনার ওপর আস্থা আছে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর। বিদেশে অবস্থানরত সিনিয়র নেতারা ব্যবহার করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং টকশো। তার মধ্যদিয়ে তারা নেতাকর্মীদের পুনর্গঠিত করার চেষ্টা করছেন। তাদেরকে বলছেন, ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার ব্যর্থ হতে যাচ্ছে। কিন্তু দলীয় নেতাকর্মীদেরকে তা খাওয়ানো কঠিন বিষয়। তারা কমেন্ট সেকশনে এসব দলীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নেতারা এবং দলের জুনিয়র নেতারা এ বক্তব্যকে  পেছনে ঠেলে দিচ্ছেন। তারা বলছেন, বিদেশে অভয়ারণ্যে থেকে নির্বাসিত নেতাদের পক্ষে এসব কথা বলা সহজ।  নেতারা এসব কথা বলছেন, যখন সারা বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ের নেতারা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন অথবা আত্মগোপনে আছেন। খুলনার ওই সাবেক ছাত্রনেতার মতো বহু নেতাকর্মী প্রকাশ্যে তাদের পরিচয় প্রকাশ করতে খুব বেশি ভয় পায়। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন অনেক দূরের পথ।

mzamin