Saturday, January 27, 2024
ভারতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিরোধীদের চাপের মুখে মুইজ্জু
চীনের একটি যুদ্ধজাহাজকে মালদ্বীপে নোঙর করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালদ্বীপ সরকার। সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুই দিনের মাথায় দুই বিরোধী দলের এই হুঁশিয়ারি দ্বীপরাষ্ট্রের রাজনীতিকে চনমনে করে তুলেছে। নিজের দেশেই বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুকে। ওই দুই দলের নেতারা বলেছেন, প্রেসিডেন্টের এই মনোভাবের ফলে আখেরে মালদ্বীপেরই ক্ষতি হবে।
মুইজ্জুর সমালোচনাকারী দুই বিরোধী দলের একটি ‘মালদ্বীপ ডেমোক্রেটিক পার্টি (এমডিপি), অন্যটি ‘দ্য ডেমোক্র্যাট’। ৮০ সদস্যবিশিষ্ট (আগে মোট আসন ছিল ৮৭) মালদ্বীপের পার্লামেন্ট বা আইনসভায়, যাকে সে দেশে ‘মজলিশ’ বলা হয়—দুই দলের সদস্যসংখ্যা ৫৫। রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ‘পিপলস ন্যাশনাল কংগ্রেস’ (পিএনসি) দলের মোহাম্মদ মুইজ্জু। এই পদে তিনি নির্বাচনে লড়েন প্রবল ভারতবিরোধিতাকে হাতিয়ার করে। জয়ী হয়েই তিনি ভারতবিরোধী ভূমিকায় নামেন। তা করতে গিয়ে খোলাখুলিভাবে চীনপন্থী হিসেবেও পরিচিতি পান।
চীনের যুদ্ধজাহাজ ‘শিয়াং ইয়াং হং–৩’–কে মালে বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মুইজ্জু। তারপরই এই দুই দল সরাসরি তাঁর সিদ্ধান্তদের বিরোধিতা করে। শুধু ওই দুই দলই নয়, মালদ্বীপের জনগণের এক বড় অংশও মনে করছে, অত্যধিক ভারতবিরোধিতা সে দেশের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। দেশকে বিপদের মুখে দাঁড় করাবে।
‘শিয়াং ইয়াং হং–৩’ যুদ্ধজাহাজটি দক্ষিণ চীন সাগর পেরিয়ে আপাতত ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ও জাভার মধ্যবর্তী সুন্দা প্রণালিতে রয়েছে। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে তার মালে পৌঁছানোর কথা। আগে ঠিক ছিল, কলম্বোতে সেটা নোঙর করবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আপত্তির কারণে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহে তা নাকচ করে দিয়েছেন। আগামী এক বছর চীনের কোনো যুদ্ধজাহাজ শ্রীলঙ্কায় নোঙর করতে পারবে না।
এরপরই মুইজ্জু ওই যুদ্ধজাহাজকে মালেতে আসার অনুমতি দেন। যদিও তাঁর সরকার জানিয়েছে, ওই জাহাজ সামরিক কোনো গবেষণার কাজে যুক্ত নয়। তারা নোঙর করবে লোকবল বদলাতে ও রসদসহ প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য। জাহাজটি শান্তিপূর্ণ সমুদ্র গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।
এমডিপির চেয়ারম্যান ফৈয়াজ ইসমাইল, মজলিশের ডেপুটি স্পিকার আহমেদ সালিম, ডেমোক্র্যাট দলের সভাপতি হাসান লতিফ ও সংসদীয় দলের নেতা আলি আজিম রাজধানী মালেতে একযোগে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, দুই দলই বিশ্বাস করে, উন্নয়নের সহযোগী বন্ধুকে উপেক্ষা করা, দূরে সরিয়ে রাখা দেশের জন্য ক্ষতিকর। আরও ক্ষতিকর এই কারণে যে সেই বন্ধুদেশের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষিত। দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পক্ষেও এই সিদ্ধান্ত ক্ষতিকর।
বিরোধী নেতারা এ কথাও বলেন, এতকাল ধরে দেশের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি হলো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে এমন বন্ধু দেশকে সঙ্গে রাখা। একযোগে পথচলা। দুই দলই ভারতকে ‘সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুদেশ’ বলে মনে করে। সংবাদ সম্মেলনে দুই দলের নেতারাই বলেছেন, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা মালদ্বীপের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।
মুইজ্জু ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রথমেই তিনি জানিয়ে দেন, মালদ্বীপে অবস্থানকারী ৮৮ ভারতীয় সেনাকে দেশে ফিরে যেতে হবে। সে জন্য তাঁর সরকার ১৫ মার্চ সময়সীমাও নির্ধারণ করে দিয়েছে। মালদ্বীপকে ভারত দুটি হেলিকপ্টার ও একটি ছোট বিমান উপহার দিয়েছিল। সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে ওই সেনাদের থাকা। সেনা সরে গেলে ওই বিমান ও হেলিকপ্টারের হাল কী হবে, তা এখনো অজানা। ওই সিদ্ধান্তের পরেই চীনা যুদ্ধজাহাজকে নোঙরের অনুমতি।
সেনা অপসারণ নিয়ে ভারত এখনো সরাসরি কিছু বলেনি। শুধু এটুকু জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। যুদ্ধজাহাজ নোঙর করা নিয়ে ভারত চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের কথা মালদ্বীপকে নানাভাবে বুঝিয়েও দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দুই বিরোধী দলের ভূমিকা ভারতের কাছে স্বস্তিদায়ক। ভারত দেখতে চাইছে, অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে সে দেশের জনগণ সরকারের ভারতবিরোধিতার বিরুদ্ধে কতটা সরব হয়।
![]() |
| মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুফাইল ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Monday, January 15, 2024
গল্প- সন্দেহ by শাহ্নাজ মুন্নী

আজাদের প্রশংসায় চোখে পানি এসে যাওয়ার উপক্রম হলো আমার। কতদিন পর এত আদর করে, আন্তরিক ভঙ্গিতে কথা বলছে ও। তবে কি ওই বিষাক্ত নারীর কবল থেকে মুক্ত হয়েছে আজাদ, ওই ডাইনি, রাক্ষুসী, অসভ্য মাগিটা আমার স্বামীর ওপর থেকে তার লোভী হিংস্র চোখ কি সরিয়ে নিয়েছে? আহ্ কী আনন্দ লাগছে আমার, আজ আমার সুখের দিন; আজাদকে আবার ফিরে পেতে যাচ্ছি আমি।
সাদা ভাতের সঙ্গে মাছের ভর্তা, ছোট মাছের তরকারি, লাল টমেটোর ঝোল মিশিয়ে কী তৃপ্তির সঙ্গে খাচ্ছে আজাদ; দেখতেও মনটা ভরে উঠছে খুশিতে, ভালো লাগায়, সুখে।
‘এই সালমা, কী যে টেস্ট হইছে না, তোমার হাতটা সোনা দিয়া বান্ধায়া রাখতে হবে। আসো, তুমিও বসো, খাওয়া শুরু করো।’ আজাদ খেতে খেতে বলে।
ইন্টারকমে সেই অভিশপ্ত রিং বেজে ওঠে তখন। নিচের রিসিপশন থেকে ফোন করেছে কেয়ারটেকার, অচেনা কেউ এলে ফোন করার জন্য সুপারভাইজারকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। এই অসময়ে আবার কেউ বেড়াতে এলো নাকি? কে হতে পারে? আজাদের কোনো বন্ধু, গ্রামের কোনো আত্মীয়স্বজন – কে, ভাবতে ভাবতে আমি ড্রইংরুমে গিয়ে ফোনটা ধরি।
‘ম্যাডাম তিনজন ভদ্রলোক আসছে, আপনেদের বাসায় আসতে চায়।’
‘কারা ওনারা? নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করো। কার কাছে আসছে? আজাদ সাহেবের কাছে? তারা অফিসের লোক নাকি?’
‘ম্যাডাম, তারা আপনের নাম বলছে, আপনের কাছেই নাকি আসছে।’
‘আমার কাছে?’ আমি খুবই অবাক হই। আমি তো নিতান্তই এক গৃহবধূ, আমার কাছে কে আসবে?
‘জি ম্যাডাম, তারা লিফটে উঠে গেছে, নিজেদের পরিচয় দেয় নাই। শুধু বলল, জরুরি প্রয়োজন।’
ততক্ষণে আজাদের খাওয়া শেষ, ড্রইংরুমে এসে আমার হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে সে জানতে চাইল, ‘কী ব্যাপার? কেউ এসেছে নাকি? কী বলল ওরা?’
আমি কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই পাখির কলকাকলির মতো মধুর সুরে আমার শখের কলিংবেল বেজে উঠল। তারা এসে গেছেন। আজাদকে কোনো কথা বলারই সুযোগ দিলো না লোকগুলো। কঠিন চেহারার একজন জানতে চাইল, ‘সালমা কে?’
আমি সামনে এগিয়ে এলে পাশের বেঁটে লোকটা বলে, ‘ম্যাডাম, আপনাকে আমাদের সঙ্গে একটু যেতে হবে। এখনই। কিছু জিজ্ঞাসাবাদের পর ফিরে আসবেন, চলুন।’
‘আপনারা কারা? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ওকে?’ আজাদ উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কেন নিয়ে যাচ্ছেন? কী সমস্যা? আরে দাঁড়ান, আমি ওর হাজব্যান্ড …’
‘পরে সবই জানতে পারবেন, এখন আমাদের সহযোগিতা করেন। চলেন, ম্যাডাম।’
লম্বা লোকটা বরফশীতল কণ্ঠে বলে। আজাদ অনুনয় করে আমার সঙ্গে আসতে চাইলে ওরা হিমঠান্ডা গলায় বলে, ‘না, সেটার দরকার নাই।’
মাইক্রোবাসে উঠিয়েই কালো কাপড় দিয়ে আমার চোখ বেঁধে ফেলে ওরা, তারপর আমাকে নিক্ষেপ করে এই কৃষ্ণগহবরে। এই কালো আঁধার আমার সব আলো শুষে নিয়েছে, আমি কালো কয়লার মতো নির্জীব, নিষ্প্রাণ একটা বস্ত্ততে পরিণত হয়েছি। কখনো কি আলো আসবে না? আমি আমার ঘরে ফিরে যাব না? আমার কি আর কোনো আশা নেই? এই চোখে আর কখনো কি ভোরের নরম আলো, গোধূলির ছায়াঘন আলো দেখব না আমি? কোথাও কি কেউ নেই? আমি কান পেতে থাকি, হ্যাঁ, অনেক দূরে মানুষের ব্যস্ত পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে, খুক করে কারো কাশির শব্দ শুনলাম যেন, ‘কে কোথায় আছো? আমাকে বাঁচাও, আমি বাড়ি যাবো …’
আমি গলার সব শক্তি একসঙ্গে করে চিৎকার করলাম। অন্ধকারে ধাক্কা খেয়ে আমার চিৎকার টেনিস বলের মতো আমার কানেই ফিরে এলো। তবু আমি চিৎকার করতেই থাকলাম, যতক্ষণ না আমার গলা চিরে গলগল করে কালো রক্ত বেরিয়ে এলো। তবু এক মুঠো আলো নিয়ে কেউ আমাকে বাঁচাতে এলো না। হতাশা, ক্লান্তি আর অবসাদে ডুবে যেতে যেতে আমি ভাগ্যকে মেনে নিলাম, বুঝলাম এই আমার নিয়তি, এই পাষাণপুরিতেই আমার মৃত্যু সুনিশ্চিত, বৃথাই হাত-পা ছোড়া, এই অন্ধকূপ থেকে মুক্তির আশা দুরাশা মাত্র, যা-ই ঘটুক আমি সবকিছুর জন্য প্রস্ত্তত। এই অন্ধকারে চোখ খোলা রাখা বা বন্ধ করা আলাদা কোনো অর্থ বহন করে না। তবু আমি চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম ভয়ংকর কোনো সর্বনাশের অপেক্ষায়।
হঠাৎ বাইরে থেকে খুট করে একটা শব্দ হলো, আর কী আশ্চর্য! কৃষ্ণগহবর উজ্জ্বল সাদা আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল, সে কী আলো! আলোর বন্যা যেন, আমি চোখ খুলতে না পেরে দুই হাতে চোখ ঢেকে রাখলাম, আলোর তীক্ষন কণা চোখের মণি ভেদ করে আমার মস্তিষ্কে গিয়ে বর্শার খোঁচার মতো আঘাত করতে থাকল, আর তীব্র অসহনীয় বেদনায় আমি কুঁকড়ে গেলাম।
‘চোখ খুলুন, এই যে শুনছেন চোখ খুলুন …’ আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে কেউ বলছে। কিন্তু আমি কীভাবে চোখ মেলব? চোখের দুই পাতা যেন আঠালো অন্ধকার আলকাতরা দিয়ে জোড়া লেগে গেছে, বহু কষ্টে একটু একটু করে চোখ খুললাম আমি, আবার বন্ধ করলাম, আবার খুললাম, চোখ পিটপিট করলাম কিছুক্ষণ, এতক্ষণে আলো কিছুটা সয়ে এলো। একজন শক্ত চেহারার নারীকে দেখলাম, সঙ্গে দুজন অপরিচিত লোক।
‘উঠুন, খেয়ে নিন।’ নারীটি যেন আদেশ করল। আমার বোধবুদ্ধি, ক্ষুধা-তৃষ্ণা সবই যেন লোপ পেয়েছে, উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও পাচ্ছি না। তীব্র আলোয় আমার চোখ, ত্বক ঝলসে যাচ্ছে। অচেনা নারীটির বাড়ানো হাত ধরে কোনোভাবে উঠে বসলাম আমি। টেবিলে ভাত, ভাজি, মাছের তরকারি, ডালের বাটি। হাত চলে না, মুখ চলে না, গলা ব্যথা, ঢোক গিলতে গেলে মনে হয় গলায় কাঁটা ফুটে আছে। কোনোমতে আমি শক্ত হয়ে যাওয়া ঠান্ডা ভাত মুখে দিলাম, ঢকঢক করে একজগ পানি গিললাম। এরপরই গা জুড়ে নামল রাজ্যের অবসাদ, চোখ জুড়ে নির্লজ্জ ঘুম।
‘খবরদার ঘুমাবেন না, স্যাররা যা প্রশ্ন করে ঠিক ঠিক উত্তর দিন।’
নিষ্ঠুর সেই নারী আমাকে ধরে মুখোমুখি বসিয়ে দেয় দুজন মানুষের সামনে। আমাদের মাঝখানে একটা টেবিল। টেবিলে এক হাতের ওপর অন্য হাত রেখে বহু কষ্টে ঢুলুঢুলু চোখদুটো আধখোলা রেখে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকি আমি। কিন্তু কিছুই দেখি না। ঘুমে বিভোর হয়ে বুকের ওপর ঢলে পড়ি।
‘এই নেন, চা খান।’
কেউ একজন টেবিলের ওপর একটা চা-ভরা লালচে কাপ রাখলে আমি সেই কাপের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা বাচ্চাদের পড়তে বসানোর আগে আমি নিজ হাতে এক মগ ঘন দুধের চা বানিয়ে চুকচুক করে অনেকক্ষণ লাগিয়ে খেতাম, সেই অসামান্য বিলাসিতার কথা মনে পড়ায় আমার বুকটা হঠাৎ হুহু করে উঠল। এদের দেওয়া জঘন্য স্বাদের লালরঙা চাও তৃষ্ণার্তের মতো এক চুমুকে শেষ করে আমি একটু সোজা হয়ে বসি। ঘুম-তাড়ানো চোখ মেলে লোকদুটোর পাথরে খোদাই করা মুখের দিকে তাকাই। অসহায়ের মতো বলি,
‘আপনারা কেন আমাকে এখানে এনেছেন?’
‘সাজেদুল আপনার কী হয়?’ পালটা প্রশ্ন করে পাথরে খোদাই মুখ।
সাজেদুল কে? কোন সাজেদুল? হঠাৎ করে আমি ধরতে পারি না, কার কথা বলছে ওরা। আজাদের অফিসের সেই পিয়নের কথা বলছে নাকি? অল্পবয়সী হালকা-পাতলা ছেলেটা, সাতক্ষীরা বাড়ি, মা-বাবা নেই বলে আজাদ যাকে খুব আদর করে। কিন্তু এখানে সাজেদুলের প্রসঙ্গ আসছে কেন? ওরা জানতে চাইছে – সাজেদুল কী হয় আমার? আমার তো কিছু হয় না।
‘বলেন, প্রেম করেন নাকি ওর সঙ্গে? স্বামীর অফিসের পিয়নের সঙ্গে পরকীয়া?’
লোকটার কণ্ঠে ব্যঙ্গ, ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য, তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি শব্দ যেন একেকটা পাথর, যা আমার গায়ে ছুড়ে মারা হচ্ছে, ব্যথা পাচ্ছি আমি, আহত হচ্ছি, আমার হৃদয় থেকে বিন্দু বিন্দু রক্ত ঝরছে। আমার আত্মা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।
‘বলেন, কী সম্পর্ক সাজেদুলের সঙ্গে? স্বামীর সঙ্গে তৃপ্তি পান না বুঝি? তাই অন্য পুরুষ লাগে? গোপন প্রেম!’
লোকটা চিবিয়ে চিবিয়ে বলে। আমি কি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব? আমি কি সীতার মতো পাতালে প্রবেশ করব? এইসব নোংরা বাক্য আমাকে কেন বলছে ওরা? আমার ভেতরের আমিটা এবার প্রচ- রাগে ক্ষক্ষাভে জেগে ওঠে,
‘সাবধান, মুখ সামলে কথা বলেন, কী সব বাজে কথা বলছেন আপনারা?’
‘আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাজেদুলের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে পারেন, দিনের মধ্যে চৌদ্দোবার ওকে ফোন করতে পারেন আর আমরা এই কথা জিজ্ঞেস করতে পারি না? আমাদের সামনে সতী-সাধ্বী সাজতে চান? আপনি তো একটা নষ্ট মেয়েলোক!’
‘খবরদার, কথা ঠিক করে বলেন …’ আমি রাগে থরথর করে কাঁপতে থাকি, সটান দাঁড়িয়ে ওদের মুখের সামনে আঙুল উঁচিয়ে বলি, ‘আমার সঙ্গে এইভাবে কথা বলার কোনো অধিকার নাই আপনেদের …’
এবার লোকগুলোর গলা একটু নরম হয়ে আসে।
‘রাখেন আপনের অধিকার! অস্বীকার করতে পারেন, সাজেদুলের সঙ্গে দিনে আপনি অন্তত তিন-চারবার কথা বলেন নাই?’
‘না, অস্বীকার করছি না তো।’
‘হাহ্ হাহ্, স্বীকার না করে যাবেন কোথায়? আমাদের কাছে তো সব প্রমাণ আছে, সাজেদুল ধরা পড়েছে, ওর কল লিস্ট চেক করেছি আমরা।’
সাজেদুল ধরা পড়েছে – মানে কী? সাজেদুল কি চুরি করেছে? ডাকাতি করেছে, না মানুষ খুন করেছে? আমার সঙ্গে কথা বলাটা কি ওর অপরাধ? একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের কথা বলা কি অন্যায়? এসবের পেছনে কি তবে আজাদের হাত আছে? নাকি ওর তথাকথিত কলিগ জেনি সুলতানা আড়ালে বসে কলকাঠি নেড়েছে? সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যায় আমার।
‘মনে হচ্ছে কিছুই জানেন না? এত খাতির, এত পিরিত, তারপরেও সাজেদুল আপনাকে বলে নাই যে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে তার। আপনেও তো ওকে মাঝে মাঝে অনলাইনে টাকা পাঠাইছেন, পাঠান নাই, বলেন? আপনিও কি তাইলে ওদের চক্রের কেউ, বলেন …’
‘না, আমি এসব কিছুই জানি না, আমি টাকা দিয়েছি অন্য কারণে …’
‘এই তো লাইনে এসেছেন, অন্য কারণটাই তো শুনতে চাই আমরা, আপনার মতো একজন ভদ্রমহিলাকে কীভাবে পটাল ওই ছোটলোকটা? অথবা আপনি কী ভেবে ওর সঙ্গে জড়ালেন?’
লোকগুলি, বুঝতে পারি, একটা রসালো গল্প শোনার আশায় নড়েচড়ে বসে।
কিন্তু কী শোনাব ওদের? আমার বোকামির গল্প? আমার দুর্ভাগ্যের গল্প? আমার মূর্খতার গল্প? নাকি আমার অনিঃশেষ ভয়ের গল্প? ভালোবাসা হারানোর ভয়, নিরাপত্তাহীনতার ভয়, আত্মবিশ্বাসহীনতার ভয়? অথচ কী সুন্দর ছন্দময় জীবন ছিল আমার। দেবদূতের মতো দুইটা ফুটফুটে সন্তান, প্রেমময় স্বামী, সাজানো গৃহকোণ। সব ঠিক ছিল। অশান্তি তৈরি হলো সেদিন থেকে, যেদিন জেনি সুলতানা আজাদের অফিসে অ্যাডমিন চিফ হিসেবে জয়েন করল। যে-আজাদ অফিস শেষ করেই বাড়ি ফিরে আসত, সে এখন সময়মতো ঘরে ফেরে না। জিজ্ঞেস করলে অফিসের কাজের দোহাই দেয়। যার চোখে শুধু আমার ছায়া পড়ত, এখন দেখি সেই চোখে উদাসীনতা, দেখি অবহেলা, অবজ্ঞা, ছুটির দিনেও নাকি তার অনেক কাজ থাকে। আমাদের ফেলে বাইরে চলে যায়। আমার তখন দিশাহারা অবস্থা, পাগল পাগল লাগে, রাগে-দুঃখে আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগে মনে। আমি মানতেই পারি না, আজাদ আমার সঙ্গে প্রতারণা করছে। ইচ্ছা করে চিৎকার করে কাঁদি। নিজের মাথার চুল নিজেই ছিঁড়ি। কোনো কাজেই মন বসে না। কী করব তাও ভেবে পাই না।
এই যখন অবস্থা, তখন একদিন ভুল করে বাসায় ফেলে যাওয়া একটা জরুরি কাগজ নেওয়ার জন্য আজাদ সাজেদুলকে পাঠায় আমার বাসায়। ছেলেটাকে দেখেই কেমন মায়া হয় আমার। ওকে আদর করে খাওয়াই, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার বাড়িঘরের খোঁজ নিই, সবশেষে তার ফোন নম্বরটা নিই।
‘সাজেদুল, একটা কাজ করতে পারবা ভাই, সহজ কাজ, তুমি আমাকে জানাবা, তোমার স্যার কোথায় যায়, কী করে? আমি তোমাকে টাকা দেবো। তুমি শুধু জানাবা জেনি সুলতানা কী করে, তোমার স্যারের সঙ্গে হাসাহাসি করে কি না, একসঙ্গে বাইরে যায় কি না, পারবা না সাজেদুল? তুমি আমার ছোটভাই, তুমি আমার সংসারটা বাঁচাও ভাই!’
সেই আমার সাজেদুলকে ফোন করা শুরু। গত তিনটা মাস সাজেদুল একনিষ্ঠভাবে আমাকে আজাদের গতিবিধির পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট দিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা আজাদ আর জেনির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছি।
‘আপা, জেনি ম্যাডাম এই মাত্র স্যারের রুমে ঢুকল!’
‘আচ্ছা, কতক্ষণ থাকে খেয়াল রাখো …’
‘দশ মিনিট পরে হাসতে হাসতে বের হইছে আপা …’
‘হুম, নজর রাখো, অফিসের পর কী করে? কোথায় যায় …’
‘সাজেদুল, জেনি সুলতানার বাড়িঘরের খোঁজ নেও তো …’
‘নিছি আপা, একটা বাচ্চা আছে, ছেলে, স্বামী মনে হয় বিদেশে থাকে, বাসা মোহাম্মদপুরে …’
‘আপা, জানেন, জেনি ম্যাডাম আজকে একটা লাল শাড়ি পইরা আসছে, যদি দেখতেন, পাতলা ফিনফিনা শাড়ি, অফিসের অন্য ম্যাডামরা হাসাহাসি করতেছে, ঠোঁটে এমন টুকটুকা লাল লিপিস্টিক দিছে, মনে হইতেছে যেন মানুষের রক্ত খাইছে …’
আমি জেনি সুলতানার রক্তখেকো চেহারা কল্পনা করে হি-হি করে হাসি।
আমার যেন একটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল আজাদ আর জেনির খোঁজ নেওয়াটা। জেনি কখন অফিসে এলো, কোনোদিন এলো না, আজাদের রুমে কতক্ষণ থাকল, অফিসশেষে দুইজন একসঙ্গে বের হলো কিনা, একসঙ্গে ক্যান্টিনে চা খেতে গেল কি না, কত তথ্য! এইসব তথ্য আমার আর আজাদের নাজুক সম্পর্ক পাকা করতে কোনো ভূমিকা না রাখলেও একধরনের বিকৃত আনন্দের ঘোলাটে অনুভবে আমি বুঁদ হয়ে থাকতাম।
সাজেদুল হয়তো কোনোদিন বলত, ‘আপা, বড়ভাইয়ের ছেলের পরীক্ষার ফিস দিতে হবে …’
আমি সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠাতাম। কখনো বলত, তার একটা জিন্সের প্যান্ট ভালো লাগছে। আমি উদারহসেত্ম টাকা পাঠিয়ে আরো দুটো শার্ট কিনে নিতে বলতাম। সাজেদুল আর আমি জেনি সুলতানাকে নিরাপদে খুন করার নানা রকম পরিকল্পনা করতাম। রাস্তায় কোনো অ্যাক্সিডেন্টে কিংবা বিষ খাইয়ে অথবা ভাড়াটে খুনি দিয়ে …
‘আপনার স্বামী জানত এসব?’
‘নাহ্, ও কীভাবে জানবে?’
লোকটা হিংস্র সাপের মতো হিসহিস করে ওঠে,
‘আপনি মিথ্যা গল্প বলছেন সালমা বেগম। সত্যি হচ্ছে আপনি আর সাজেদুল মিলে উগ্রপন্থীদের সাহায্য করেছেন, এখনো সময় আছে স্বীকার করুন। তা না হলে কীভাবে স্বীকার করাতে হয় তা আমাদের জানা আছে …’
‘বিশ্বাস করুন, এটাই সত্য। আমি শুধু আমার স্বামীকে সন্দেহ করতাম। আর কিছু জানি না।’
আমি আবার কান্নায় অবসাদে অবলম্বনহীন লতার মতো নেতিয়ে পড়ি।
‘স্যার, মুখোমুখি করেন দুইজনকে। তাইলেই সত্য বাইর হবে।’
পাশ থেকে একজন কর্কশ কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলে। আমি সম্ভবত অজ্ঞানই হয়ে গিয়েছিলাম। জেগে দেখি, ঘরের ভেতর গাড়ির হেডলাইটের মতো দুইটা তীব্র উজ্জ্বল বাতি জ্বলছে, বিরতিহীন, যেন দুইটা গনগনে সূর্য আমার মাথার ওপরে অবিরাম আলোক বর্ষণ করে চলেছে। আলোর এত ক্ষমতা যে, আমি চোখ বন্ধ করলেও সেই অবিনাশী আলো চোখের পাতা চুইয়ে চোখের ভেতর ঢুকে পড়ছে, মাথার খুলি ফুটো করে মগজের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। দিন-রাতের ভেদাভেদ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে আমার। আলোর শত্রুতায় আমার চোখ অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঘরের দেয়ালগুলো হাতড়ে দেখছি, কোথাও এই আলো নেভানোর সুইচ নেই। আমি এখন এক আলোকিত কারাগারে আটক। উফ্ আলোও যে এত অসহ্য হতে পারে, আগে কখনো বুঝি নাই। আমার জীবনের অন্ধকার অধ্যায় শেষ হয়ে এবার এক অসহনীয় আলোকোজ্জবল অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। আলোর এই উৎপীড়ন থেকে কে মুক্ত করবে আমায়? আমার গা গুলাচ্ছে, বমি আসছে, কে কোথায় আছো, লাইটদুটো নিভাও, বাঁচাও আমাকে। আজাদকে সন্দেহ করে ভুল করেছি আমি, নিজের ভেতর তুষের আগুন জ্বালিয়েছি। সেই আগুন সর্বগ্রাসী হয়ে আমাকেই পুড়িয়েছে। আমার ঘর, সংসার, প্রেম, ভালোবাসা সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। আমাকে মাফ করো আজাদ, এদের হাত থেকে আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাও। এই যন্ত্রণা থেকে আমাকে মুক্তি দাও। আবার আমার সময়ের হিসাব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য নিয়ে বসে আছি। হাত, পা, আঙুল, চোখ, মগজ সব পুড়ে-গলে একাকার হয়ে গেল আমার। এই নরকপুরিতে আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমি মারা যাচ্ছি …
… তবে সব আগুনই তো কোনো একসময় নেভে। কত সময় পরে জানি না, আমার জতুগৃহের দরজাও কোনো একসময় খুলল, ওই লোকগুলো আবার এসেছে। তবে একা আসেনি, সঙ্গে করে কাউকে নিয়ে এসেছে। হায়! কে এটা? ভালো করে দাঁড়াতে পারছে না। কুঁজো হয়ে আছে। ঠোঁট কেটে রক্ত বের হয়ে শুকিয়ে আছে ঠোঁটেই। সারামুখে, কপালে, গালে কালশিটে দাগ, মার খাওয়ার ভয়ংকর চিহ্ন, বাঁ চোখ ফুলে বন্ধ হয়ে আছে, ডান চোখটাও আধবোজা, লাল টকটকে, একটা বীভৎস বিকৃত ফুলে-ওঠা চেহারা, এটা কি সাজেদুল? হায়, হায়, আমার সামান্য কৌতূহল মেটাতে গিয়ে এ কী অবস্থা হয়েছে ওর?
‘এই দেখ হারামজাদা, ভালো করে তাকিয়ে দেখ – তাকে চিনিস?’
‘বল, তিনি কি তোর সহযোগী? তোকে টাকা-পয়সা দিত? বল শালা বল।’
সাজেদুল যদি আমি সঠিক চিনে থাকি, মার খেয়ে বদলে যাওয়া চেহারার সাজেদুল ওদের চিৎকার করে করা প্রশ্নের উত্তরে কোনো রকমে ওপরে-নিচে মাথা ঝাঁকায়।
‘কথা বল বাস্টার্ড ! মুখ খোল! বল এই মহিলা তোর দলের লোক কি না?’
আহত অর্ধমৃত ছেলেটি আধবোজা লাল চোখে আমার
দিকে তাকিয়ে তার কেটে যাওয়া রক্তাক্ত ঠোঁট ফাঁক করে অস্ফুট উচ্চারণে বলে, ‘হ্যাঁ। তাকে চিনি। তিনি আমার দলের। আমাদের সহযোগী।’
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Monday, January 1, 2024
রম্যকথন: কিছুটা বিলিতিয়ানা, কিছুটা বাঙালিয়ানা by সারফুদ্দিন আহমেদ
আদতে বাঙাল-ঘরের খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদ্যাপনে বাঙালিয়ানার মিশেল আছে। তাই এই উদ্যাপন এখনো ঠিক ‘সায়েবি’ হয়ে ওঠেনি।
নিউ ইয়ারে মাই ডিয়ার টাইপের বন্ধু-ইয়ার নিয়ে বিয়ারে বুঁদ হওয়া পশ্চিমের পুরোনো রেওয়াজ। সেই ব্রিটিশ আমলে আমাদের এই অঞ্চলে সাদা সাহেবরা একত্রিংশ রজনী ওরফে থার্টি ফাস্ট নাইটে নাচগানের পার্টিতে মিলিত হতেন। তাঁদের সঙ্গে বাঙালি ‘এলিট’ নরনারীও জুড়তেন।
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর ‘ইংরাজি নববর্ষ’ কবিতায় সেই রকমের একটি থার্টি ফার্স্ট নাইট পার্টির বর্ণনা দিয়েছেন: ‘নববর্ষ মহাহর্ষ ইংরাজটোলায়/ দেখে আসি ওরে মন, আয় আয় আয়/ সাহেবের ঘরে ঘরে কারিগুরি নানা।/ ধরিয়াছে টেবিলেতে অপরূপ খানা/ বেরিবেষ্ট সেরিটেষ্ট মেরিরেষ্ট যাতে/ আগে ভাগে দেন গিয়া শ্রীমতীর হাতে।’
সেই পার্টিতে বাঙালি পুরুষদের পাশাপাশি বাঙালি নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি ফুট কেটেছেন: ‘শাড়ী পরা এলোচুল আমাদের মেম/ বেলাক নেটিভ লেডি সেম্, সেম্, সেম্.../ হিপ হিপ হুররে ডাকে হোল ক্লাস/ ডিয়ার ম্যাডাম ইউ টেক দিস গ্লাস/ সুখের সখে খানা হলে সমাধান/ তারা রারা রারা সুমধুর গান।...শেরি চেরি বীর ব্রান্ডি ওই দেখ ভরা/ এক বিন্দু পেটে গেলে ধরা দেখি সরা।’
রবীন্দ্রনাথ ঋষি মানুষ। তিনি পয়লা বৈশাখের সুবহে সাদিকে লিখেছিলেন, ‘নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন বর্ষ হয় গত!.../ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বরষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’
খ্রিষ্টীয় নববর্ষকেও রবি ঠাকুর ঋষিসুলভ চোখে দেখেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মতো মৌজমাস্তির বর্ণনায় তিনি যাননি। ইংরেজিতে লেখা ‘দ্য নিউ ইয়ার’ কবিতায় নতুন বছরকে উতল হাওয়ার ঝাপটায় বৃন্তচ্যুত ফলের সঙ্গে তুলনা করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘লাইক ফ্রুট, শেকন ফ্রি বাই অ্যান ইমপেশেন্ট উইন্ড/ ফ্রম দ্য ভেল অব ইটস মাদার ফ্লাওয়ার,/ দাউ কামস্ট, নিউ ইয়ার।’
দিন বদলেছে। এই সময়ের নাগরিক পরিসরে, বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় বড় শহরে খ্রিষ্টীয় নববর্ষের ব্যবহারিক সংজ্ঞা ভিন্ন। হাসপাতাল চত্বরে পর্যন্ত বাজি-পটকার ঠুসঠাস, মহল্লার মোড়ে মোড়ে ধুমধাড়াক্কা মিউজিক, বাইক নিয়ে ভোঁ ভোঁ শব্দে এক শ কিলোমিটার গতিতে দশ-বারোজনের উদ্দাম রেস, ছাদে ছাদে ‘ধুম্মা চালে ধুম্মা চালে ধুম’—এসবই এখানকার নিউ ইয়ারের পিয়ারের অনুষঙ্গ।
এখানে ফি বছর পটকা-বাজি ফুটানোয় পুলিশের যত মানা আসে, তত বেশি বাজি-বোমাবাজির শব্দে নতুন বছরকে ‘বুকে আয় ভাই’ বলে স্বাগত জানায়। এখানে খ্রিষ্টীয় বর্ষের একত্রিংশ রজনীর বাস্তবিক ব্যবহারিক সংজ্ঞা হলো: ‘যে দিবাগত মধ্য রজনীতে বোমাসদৃশ কালীপটকার ব্রহ্মাণ্ডবিদারী নিনাদ ও অযুত আতশবাজির উল্লাসমুখর আলোকোজ্জ্বল আয়োজনে সদ্যাগত খ্রিষ্টীয় বর্ষকে “হ্যাপি নিউ ইয়ার” ওঙ্কারধ্বনি সহযোগে স্বাগত জানানো হয়, উহাকে থার্টি ফার্স্ট নাইট বলা হইয়া থাকে।’
এসব দেখে এখানকার খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদ্যাপনকে না ‘সাহেবি উৎসব’ বলার জো আছে, না তাকে বাঙালির উৎসব বলা যায়। কিছুটা বিলিতিয়ানা আর কিছুটা বাঙালিয়ানার মিশেলে আমাদের একটি নিজস্ব ঘরানার দো-আঁশলা কায়দায় আমরা নতুন বছরকে বরণ করি।
প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের তরুণ বয়সীদের অনেকে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ কথাটার আক্ষরিক বাংলা মানে না জানলেও জিনিসটা যে কী, তা ভালোই বোঝে।
রাত ১২টা ১ মিনিট হলেই পরস্পরের মধ্যে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলাবলি শুরু হয়। ফেসবুকের পাতা কিংবা টুইটার হ্যান্ডেলে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’খচিত ডিজিটাল স্টিকার সেঁটে দেওয়া হয়। টাইপ করে ভুলভাল বানানে লেখার ঝক্কি এড়াতে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ সংলাপধারী ভার্চ্যুয়াল কার্ড চালাচালি হয়।
তার মানে, এত হইহুল্লোড় ও পটকাবাজির বাইরেও নতুন বছর হাসিখুশিতে কাটানোর একটা প্রত্যাশা ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর মধ্যে গাঢ়ভাবেই মেশানো থাকে। একটা সর্বজনীন শুভ-ইচ্ছার দ্যোতনা তাতে মেশানো থাকে।
সামনের বছর কেমন যাবে, আমরা জানি না। ভোটপরবর্তী জোটনিরপেক্ষ বাংলাদেশ কত দূর এগোবে; মরিচের কেজি আগের বছরের মতো এক হাজার টাকায় উঠবে কি না; ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির মতো স্কুল-কলেজের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কালোবাজারে বিক্রি হবে কি না; আগের বছরের মতো টাকা পাচার হবে কি না—আমরা জানি না। এসব শঙ্কা আছে। ভালো কিছুর সম্ভাবনাও আছে।
নতুন বছরে আমরা সেই শঙ্কা আর সম্ভাবনার দোলাচলে। এর মধ্যেই বলছি, ‘পরানের দোস্ত ইয়ার, হ্যাপি নিউ ইয়ার’।
সারফুদ্দিন আহমেদ: প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
![]() |
| অলংকরণ: আরাফাত করিম |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1406)
- ► 2025 (3281)
- ▼ 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

