Monday, August 5, 2013

মাটির টানে ফিরে চলা by ড. হারুন রশীদ

বাংলাদেশের মানুষ ভাগ্যের সন্ধানে যেমন শহরে পাড়ি জমায়, তেমনি আবার উৎসবে-আনন্দে গ্রামে যায়। বিশেষ করে দুই ঈদে মানুষের প্রিয়জনের সান্নিধ্যে যাওয়ার সে কী প্রাণান্তকর চেষ্টা। বাসের ভাড়া বৃদ্ধি, রেলের টিকিটের জন্য রাতভর অপেক্ষা, সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট ইত্যাকার নানা সমস্যা কাটিয়ে ঘরে ফেরার আনন্দই যেন হয়ে ওঠে মুখ্য। ঠাঁই নেই, তবুও যেতে হবে। বাসে, ট্রেনের কামরার ভেতরে দাঁড়িয়ে, সেখানে ঠাঁই না হলে ছাদে। লঞ্চেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফ্লোরে বসে, ডেকে দাঁড়িয়ে এমনকি ছাদের ওপর বিছানা পেতে সেখানেই বসে পড়া। ঈদ সামনে রেখে প্রতিবছর একই অবস্থা সৃষ্টি হয়। যেভাবেই হোক বাড়িতে পৌঁছতেই হবে। এ টান যে বড় বেশি প্রাণের। এ টান নাড়ির। দুনিয়ার কোথাও কি মানুষ এভাবে ছুটে প্রাণের টানে, শেকড়ের সন্ধানে? কীসের এত মায়া? কীসের জন্য মানুষের এই ঘরে ফেরার আকুতি? সে কি কেবলই প্রিয়জনের সান্নিধ্য? নাকি তারও অতিরিক্ত কিছু?
কী শোভা কী ছায়া গো, কী স্নেহ হয় কী মায়া গো, কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে নদীর কূলে কূলে। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামকে দেখার জন্য আকুতি? ইট-কাঠ-পাথরের এই শহর ছেড়ে মুক্তভাবে শ্বাস নেয়ার জন্য? নাকি জীবনানন্দের বনলতা সেনের মুখোমুখি বসার মতো ‘দুদণ্ড শান্তির’ জন্য এ যাত্রা? যারা গ্রাম থেকে শহরে আসেন, তাদের প্রাণটা আসলে পড়ে থাকে গ্রামেই। বিশেষ করে যারা গ্রামে বড় হয়েছেন। এই নাগরিক জীবন হয়তো অনেক কিছু দেয়। শিক্ষা-দীক্ষা, ভাত-কাপড়, রুটি-রোজগারের নিশ্চয়তা। অনেক উত্তেজনা। ভোগ-বিলাস-আনন্দ। কিন্তু জীবনের সব পাওয়া, সব তৃষ্ণা কি মেটে তাতে? কিছুই কি বাকি থাকে না?
এ শহরে তো দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ নেই, জোয়ার-ভাটায় দুলে ওঠা নদী নেই, বৃক্ষের শ্যামল ছায়া নেই, ধানের ক্ষেতে রোদ ও ছায়ার লুকোচুরি খেলা নেই, ঘাসের ডগায় শিশির নেই, রাখালের বাঁশের বাঁশি নেই, গোধূলির আলো নেই, বাউকুড়ানির ডগায় ঝরাপাতার নৃত্য নেই, পাখির কলকাকলি নেই, পিঠেপুলি পাটিসাপটার আয়োজন নেই, আউল, বাউল জারিসারি, ভাটিয়ালির হƒদয় উদাস করা সুর নেই, বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ নেই, নেই এক চিলতে উঠোন। সে জন্যই কি আমাদের ছুটে চলা? গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গা মাটির পথে পায়ে ধুলো মাখিয়ে হাঁটার জন্য? নাকি আদিখ্যেতা হয়ে যাচ্ছে এসব কথা? মানুষ কি আর এত হিসাব-নিকাশ করে চলে। কয়েকটা দিন ছুটি পেলাম আর কোথাও ঘুরে এলাম- এমনই তো। আটপৌরে বাঙালি। কোথায় আর যাবে। বেড়ানোর কি ফুরসত আছে? যে মাইনে আর রোজগার তাতে সংসারের হাঁড়ি টানতেই তো সব যায়। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে সামাল দিতেই হিমশিম খেতে হয়। সে জন্য বিদেশ-বিভুঁই নয়, ‘ঘর হতেই আঙিনা বিদেশের মতো’ দেশের বাড়িতেই (নিজ গ্রাম) ঈদ করা। কিন্তু সেই গ্রামও কি আর আগের মতো আছে?
নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেকখানিই পাওয়া যায় এখন গ্রামে বসেই। বিদ্যুৎ পৌঁছেছে বেশির ভাগ গ্রামেই। সে জন্য বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন। এমনকি ডিশ লাইন থাকায় মুম্বাই-কলকাতা ঢাকার চেয়েও কাছের। সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন। কম্পিউটার, সঙ্গে ওয়্যারলেস ইন্টারনেট সংযোগ। মফস্বলে দৈনিক পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধিরা এখন হাতে লিখে, ফ্যাক্স করে সংবাদ পাঠান না। কম্পিউটারে কম্পোজ করে ইন্টারনেটে ই-মেইলের মাধ্যমে অতি দ্রুত তারা পাঠিয়ে দেন খবরাখবর। ব্যবসা-বাণিজ্যের খবরও চলে মোবাইলে। মৎস্যচাষী, পোলট্রি ফার্মের মালিক কিংবা সবজিচাষী মোবাইলে জেনে নেন কেমন বাজার যাচ্ছে ঢাকায়। এভাবে ভার্চুয়াল একটা যোগাযোগ তো আছেই গ্রামের সঙ্গে শহরের। শহরের সঙ্গে গ্রামের। কিন্তু তাতেও তো সব হয় না। দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে? এর জন্য আসল দুধই চাই। আর সেটি পেতে হলে তো ‘গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরু’র দেশে যেতে হবেই। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, গ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাটা এখনও আশানুরূপ নয়। এজন্য ঘরমুখো মানুষজনকে কম দুর্ভোগ পোহাতে হয় না। কিন্তু তাতে কী? যেতে তো হবেই।
শিশির ভেজা সবুজ ঘাস, ছোট্টবেলার স্কুলে যাওয়ার মেঠোপথের স্মৃতি, হা-ডু-ডু আর ফুটবল খেলার মাঠ কিংবা টাকার অভাবে পড়তে না পারা স্কুলজীবনের সেই সহপাঠীর প্রিয়মুখ ফিরে দেখার আনন্দ কোথায় পাওয়া যাবে এই শহরে? পাশের বাড়ির সাপের ফণার মতো বেণী দুলানো দুরন্ত সেই কিশোরীর হাসি কোথায় মিলবে এই শহরে?
এই শহরে নির্ভেজাল জীবনানন্দ কোথায়? এখানে যেন মানুষ নয়, শোষক আর শোষিত, আমলা আর কামলা (মজুর), মালিক-শ্রমিক, পুঁজিপতি আর নিঃস্ব, হাইরাইজ বিল্ডিং বনাম রেললাইনের পাশের বস্তির বিস্তর ব্যবধানের মধ্যে সরকার কিংবা বিরোধী দলের শিলপাটার ঘষাঘষির রাজনীতির মধ্যে বসবাস। জীবন কোথায় এখানে? চারদিকে ঠগ, প্রবঞ্চক, প্রতারক, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি (রাজনৈতিক দলগুলোও কি পার্টি না!)। কী নির্মম, কী পাশবিক এই জীবনধারা। যানজট আর জনজটে রাস্তায় চলাই দায়। ঘুষখোর কর্মকর্তা ইলিশ কেনে ১০-১৫ হাজার টাকা হালি, আর সাধারণের পুঁটি কিনতেই নাভিশ্বাস। নব্য গজিয়ে ওঠা গার্মেন্ট মালিকের ড্রয়িংরুমে শোভা পায় হরিণ কিংবা ডোরাকাটা বাঘের চামড়া, লাখ লাখ টাকার শোপিস ইত্যাদি। অথচ গার্মেন্ট কর্মীদের তিন হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি ঠিকমতো দিতে তারা গলদঘর্ম হয়ে যান।
ওই সব খেটে খাওয়া মানুষের জীবনেও ঈদ আসে। তারাও ঘরে ফেরে। শরীরের প্রায় শেষ শ্রমটুকু নিংড়ে দিয়ে তাদের যখন ছুটি মেলে, তখন ফেরার নিশ্চয়তাটুকুও নেই। মধ্যরাত পর্যন্ত বাক্স-পেটরা হাতে রাস্তার পাশে অপেক্ষা আর অপেক্ষা। অথচ এদের ঘাম-শ্রমের বিনিময়েই আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। রেমিটেন্স প্রবাহ জিডিপির হার বাড়ায়, যা এ দেশকে গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে স্বাধীন করেছেন আর এখন এসব জীবনযোদ্ধা দেশ গড়ছেন।
আসলে এই যে এত সব ঝক্কি-ঝামেলা সহ্য করে ঘরে ফেরা, এটাও তো দেশপ্রেমেরই অংশ। আমরা তো আমাদের মায়ের কাছেই ফিরি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘ফিরে চল মাটির টানে যে মাটি/যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে...’। দেশও তো মায়ের সমতুল্যই। মা ছাড়া আর কারও জন্য কি এভাবে জীবন বাজি রাখা যায়? এবারের ঈদ এসেছে এমন এক সময়ে যখন একাত্তরের ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম অনেকটাই এগিয়ে গেছে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা অনেকেই কারান্তরীণ। অনেকের বিচারের রায় হয়ে গেছে। এ আরেক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জিততে না পারলে আমাদের স্বাধীনতা পূর্ণতা পাবে না। যে মাটির টানে ফিরে চলা আমাদের, সেই মাটিতে মিশে আছে লাখ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার রক্ত। তাদের আত্মা শান্তি পাবে না। এবারের ঈদ হোক দেশকে যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে কলংকমুক্ত করার শপথ নেয়ার দিন। মনে রাখা প্রয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ উন্নত একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল সবার সম-অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সে জন্যই আমাদের মাটির টানে ফিরে যেতে হবে। মূলে, দেশের জন্মসূত্র একাত্তরে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আর জ্ঞানের আধার হচ্ছে পাঠাগার। গ্রন্থাগার হচ্ছে লেখক, পুস্তক ও পাঠকের সম্মিলনস্থল। সভ্যতার দর্পণ। একটি দেশ তথা সমাজের সার্বিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির চর্চাকেন্দ্র ও এই পাঠাগার। সমাজে বিত্তবান অনেকেই আছেন, যারা তাদের অর্জিত অর্থের একটা অংশ বিভিন্ন সমাজ উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করেন। পাঠাগার হতে পারে এর জন্য উত্তম জায়গা। সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে, তার থেকে অন্ধকার দূর করতে হলে পাঠাগার হতে পারে অন্যতম আলোকবর্তিকা। এ জন্য ঈদে যারা গ্রামে ফিরবেন, বিশেষ করে বিত্তবান মানুষরা প্রচেষ্টা চালাতে পারেন নিজ নিজ এলাকায় একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার জন্য। আজকের তরুণ-তরুণী যেন বইয়ের সান্নিধ্যে বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সমাজের সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার জন্য সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে পাঠাগার। কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে আমরা আমাদের সমাজটাকে যতই জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধাররূপে গড়ে তুলতে পারব, ততই সমাজ এগিয়ে যাবে। আর একটি উন্নত সমাজ ব্যবস্থায় উৎসব হবে আরও আনন্দময় ও অর্থপূর্ণ। শেকড়ের টানে ঘরে ফেরাও তখন সার্থক হবে। আমাদের লক্ষ্য হোক সেই দিকে। সবার ঘরে ফেরা নিশ্চিত ও নির্বিঘœ হোক।
ড. হারুন রশীদ : সাংবাদিক, কলাম লেখক

উদ্বেগ উৎকণ্ঠার অবসান হোক by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক

আজকের সূর্যাস্তের পর লাইলাতুল কদরের মহিমান্বিত রজনী। এ রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ রজনীতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে ইবাদত করতে গেলে মানুষের মনে শান্তি প্রয়োজন, পরিবেশ প্রয়োজন। নিরবচ্ছিন্নভাবে একাগ্রচিত্তে শান্তিপূর্ণভাবে ইবাদত করার সে পরিবেশ রয়েছে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে না। কেননা রোজা শুরু হওয়ার আগে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ বলেছিলেন, পবিত্র রমজান মাসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবে জনগণ। ঢাকা মহানগরীতে রোজার মাসে বিদ্যুতের ঘাটতি কম ছিল এ কথা সত্য। কিন্তু রোজার মাসের অর্ধেক সময় চট্টগ্রাম মহানগরীতে বসবাস করে দেখেছি সেখানে লোডশেডিং নামক যন্ত্রণা কাকে বলে। সেখানে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইফতারে, তারাবি নামাজে এমনকি সেহরিতেও বিদ্যুতের অভাবে কষ্ট পেয়েছে এবং পেয়ে যাচ্ছে। সুতরাং শান্তিপূর্ণভাবে ইবাদত করার ইচ্ছা থাকলেও মানুষ সেটা পারছে না। আরও অনেক কারণেই মানুষের মনে শান্তি নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতায় মানুষ অতিষ্ঠ। সেই সঙ্গে গুম, মানুষ হত্যা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সব কিছু মিলিয়েই মানুষের মন থেকে শান্তি উঠে গেছে। এর থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না মানুষ। সব কিছুই নীরবে মুখ বুজে জনগণ সহ্য করে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ উত্তপ্ত। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে জয় লাভের জন্য সরকার বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সরকার এমন একটি পরিবেশ চাচ্ছে- যে পরিবেশে ১৮ দলীয় জোট দুর্বল হয়ে যাবে, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে, সরকারের রাজনৈতিক ক্যাডাররা একটি শক্ত অবস্থান নেবে ইত্যাদি। সরকার অবশ্য জনগণকে নির্বাচনমুখী করতে চাচ্ছে- সেই নির্বাচন যার অধীনেই হোক না কেন। সরকার বিশ্বকে বোঝাতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ ৫ বছর ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন দিয়ে আবার নির্বাচিত হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অনেকগুলো পদক্ষেপের মধ্যে ১টি হচ্ছে ১৮ দলীয় জোটের মধ্যে বৃহৎ শরিক দল জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে টানাহেঁচড়া। পত্রিকার কলামে টিভির টক-শোয়ের বিভিন্ন আলোচনায় এসেছে, সরকার এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে একটি আলোচনা হয়েছে এই মর্মে যে, সরকার জামায়াতের ওপর থেকে আক্রমণের খক্ষ উঠিয়ে নেবে, এর বিনিময়ে জামায়াত কোনো ধরনের সরকারবিরোধী এবং ধ্বংসাÍক আক্রমণাÍক কাজ করবে না, সেই সঙ্গে সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাবে। সুতরাং এর বিনিময়ে উভয়পক্ষই কিছু না কিছু পাবে। ওই একই রকম কথাবার্তা হেফাজতে ইসলাম নিয়েও হয়েছে। কথা উঠেছে আওয়ামী লীগ হেফাজতে ইসলামের জন্য ৫০টি আসন ছেড়ে দেবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আনীত সব মামলা তুলে নেবে। বিনিময়ে তারা সরকারের কোনো ধরনের বিরুদ্ধাচরণ না করে সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাবে। এরকম পেক্ষাপটে গত ৪-৫ দিন আগে সংবাদ শিরোনাম হল ‘জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।’ আইনের যুদ্ধ আইনের অঙ্গনে চলবে এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য, জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক দল এবং তাদেরও জনসমর্থন রয়েছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অধিকার রয়েছে। নিবন্ধনবিহীন রাজনৈতিক দল যে বাংলাদেশে নেই এটি সঠিক নয়। কিন্তু একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল করে বিচার বিভাগে একটি ইতিহাস সৃষ্টি করা হয়েছে (আমার কথা নয়, মানুষের অনুভূতি)। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে অন্য দলগুলোর ওপরও যে চালানো হবে না- এর নিশ্চয়তা কী? কেননা সরকারের প্রায় প্রতিটি কর্মকাণ্ডই ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলে। একুশে টিভি বন্ধ হয়েছে, তাই চ্যানেল ওয়ানও বন্ধ হল। আমার দেশ বন্ধ হয়েছে, হয়তো আগামীতে অন্য আরেকটি বন্ধ হবে যদি বিকল্প সরকার আসে। তাহলে এ দ্বন্দ্ব কি চলতেই থাকবে? এ দ্বন্দ্ব দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কতটুকু প্রভাব ফেলছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকেই বলছেন, যেহেতু আদালতের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়, তাই আদালত সরকারি প্রভাব বৃত্তের বাইরে নয়। হাইকোর্ট বিভাগে যত সংখ্যক বিচারক আছেন তার তিন ভাগের দুই ভাগই বর্তমান সরকারের অনুগত। কেননা সরকারই তাদের বাছাই করে নিয়োগ দিয়েছে। সুতরাং তাদের কর্মকাণ্ড সরকারপন্থী না হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। অতএব জামায়াতের নিবন্ধন প্রক্রিয়া বাতিলের যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো কাজ বিচার বিভাগের মাধ্যমে হোক আমরা সেটি চাই না। বিচার বিভাগ সম্মানিত এবং পবিত্র একটি ক্ষেত্র। আমরা একে কলুষিত হতে দিতে চাই না। আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের কাজও আদলতের মাধ্যমে করানো হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশন বলছেন, নিবন্ধন বাতিলের কাজ সেটি বাস্তবায়নের ক্ষমতা তার নেই। তাই তিনি এ ক্ষমতাটি ছেড়ে দিয়েছেন। বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা যদি তার না থাকে তাহলে তিনি সে ক্ষমতা চেয়ে নিতে পারেন। কিন্তু তিনি অভিমান করে যেটুকু ক্ষমতা আছে সেটুকুও ছেড়ে দেবেন কার স্বার্থে? তাহলে কি তিনি কাজের চাপ কমানোর জন্য নাকি দায়িত্ব এড়ানোর জন্য এসব করছেন? যাই হোক তিনি হয়তো জানেন না, রাজনৈতিক সরকারের হাতে একটি বড় অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন। দলকে নিবন্ধন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নিবন্ধন বাতিল করেছে হাইকোর্ট। তাই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল এটিই হাইকোর্টের মন্তব্য। তাহলে নির্বাচন কমিশন কেনই বা ওই ভুল সিদ্ধান্ত নিলেন। কেনই বা হাইকোর্ট সেটি বাতিল করলেন? তাহলে ওই দলটিকে কি ইচ্ছা করেই হেয় করা হল?
যাই হোক বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক অঙ্গন নিয়ে জনগণ উৎকণ্ঠিত। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় সেদিন বলেছেন ‘আগামীতেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে, আমার নিকট তথ্য আছে।’ সেদিন থেকে এই উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেছে। এ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমার কোনো পথ আমরা দেখছি না। কারণ অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বর্তমান সরকারি দল মরিয়া হয়ে উঠে পড়ে লেগে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য। প্রধানমন্ত্রী জাতিকে ভয় দেখাচ্ছে এই মর্মে, যদি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে তাহলে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান হতে দু’বছরও লাগতে পারে, আবার ১০ বছরও লাগতে পারে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক অনেক নেতাকর্মী জেলে যাবেন। এ ধরনের অযাচিত সতর্ক বাণী প্রচার করে তিনি কি কোনো ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন? তিনি কি এ ব্যাপারে জনগণকে প্রস্তুত হতে বলছেন? অনেকেই বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে সরকার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যে পরিস্থিতি তখন আর স্বাভাবিক আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। তখন রাষ্ট্রপতি ব্যতিক্রমী কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন। আমরা কোনোভাবেই এমনটি চাই না। আমরা আশা করব, সরকারদলীয় রাজনৈতিক মহলে শুভবুদ্ধির যেন উদয় হয়। রক্তপাত, সংঘাত আর সহিংসতার আবর্তে দেশকে যেন একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে না দেন। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ দরকার। সে পরিবেশ রক্ষায় সবাকেই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ মুহূর্তে যদি রেফারেন্ডাম বা গণভোট দেয়া হয় এ ব্যাপারে যে, বাংলাদেশের মানুষ নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় কি চায় না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস প্রায় ৯০ ভাগেরও ওপরে দেশের জনগণ বলবেন, তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়।
আজকের এ রাজনৈতিক অসহিষ্ণু পরিস্থিতির উৎপত্তি এখন থেকে আনুমানিক দু’বছর এক মাস আগে প্রধানমন্ত্রীর একটি হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে। সেই সিদ্ধান্তটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধান থেকে বাতিল করা। কিন্তু এ মুহূর্তে এর সমাধান প্রধানমন্ত্রীর একার ওপর আর নেই। সুতরাং এখন উচিত সর্বদলীয় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান করা।
মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক : কলাম লেখক; সভাপতি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

শান্তি ও অগ্রগতির স্বার্থে সুষ্ঠু নির্বাচন জরুরি by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

এশিয়ার দেশগুলোতে বর্তমানে অর্থনৈতিক উত্থান ঘটছে। এর মধ্যে চীন ও ভারতের অর্থনীতি সুপারসনিক গতিতে এগোচ্ছে। এভাবে এগোতে থাকলে আগামী এক দশকে বিশ্ব অর্থনীতির মূল কেন্দ্রস্থল হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। এর সঙ্গে রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিরও পরিবর্তন ঘটবে। বিশ্ব নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে এ অঞ্চলে। এর একটা আলামত এরই মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনীতি দিন দিন নিচের দিকে নামছে। তারা তাদের আধিপত্য ও আভিজাত্য নিয়ে শংকা প্রকাশ করছে। তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ চালাতে গিয়ে আমেরিকা তথা পশ্চিমা বিশ্ব ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। ফলে তাদের ব্যাংক-বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং খ্যাতনামা বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। দফায় দফায় বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্য দিয়ে এবং হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করেও এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বেকারত্ব ভয়াবহ আবার ধারণ করেছে। আমেরিকার বড় বড় শহরে জমি ও ফ্ল্যাটের দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে এক বক্তৃতায় বলেছেন, নীতি- কৌশলে পরিবর্তন না আনলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমেরিকাকে তৃতীয় বিশ্বের ভাগ্যবরণ করতে হতে পারে, চুরমার হয়ে যেতে পারে আমেরিকানদের অহংকার ও আভিজাত্য।
প্রেসিডেন্ট ওবামার এ বক্তৃতা বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, পশ্চিমা বিশ্ব দুনিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সামর্থ্য হারাচ্ছে। ফলে ইউরোপ-আমেরিকার খ্যাতনামা কোম্পানিগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিনিয়োগে অধিক আগ্রহী হয়ে পড়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ব্যবসা শূন্য হয়ে পড়বে ইউরোপ-আমেরিকা তথা পশ্চিমা বিশ্ব। সবদিক দিয়ে এগিয়ে যাবে এশিয়া। এটি আঁচ করতে পেরে গত বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে একটি বিল অনুমোদন করা হয়। ডেমোক্রাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যেও মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয় এই বিলে। এই বিলের লক্ষ্য দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক উত্থানকে ঘিরেই। বিশেষ করে চীনকে ঘিরে। কারণ চীনকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণকে যুক্তরাষ্ট্র দেখছে নেতিবাচক দৃষ্টিতে। এর ফলে দুনিয়ায় আমেরিকার প্রভাব কমে আসবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব জটিল রাজনৈতিক বিষয় মাথায় রেখে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে অশান্ত করার একটা প্রক্রিয়া চলমান আছে দীর্ঘদিন ধরে। এর অংশ হিসেবে মিয়ানমারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা চলছে জোরেশোরে। চেষ্টা চলছে বাংলাদেশে একটা গৃহযুদ্ধ বাধানোরও। এর সব লক্ষণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিলক্ষিত হচ্ছে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে অশান্ত করতে পারলে চীন ও ভারতকে সহজেই কাবু করা সম্ভব হবে, যেভাবে আফগানিস্তানকে দিয়ে রাশিয়াকে কাবু করা হয়েছিল।
চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের রয়েছে বিশাল সীমান্ত। আর বাংলাদেশের তিনদিক জুড়ে রয়েছে ভারতের সীমান্ত। এই দুটি দেশই এখন আছে পশ্চিমাদের বিশেষ নজরে এবং দুটি দেশই বর্তমানে গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ বাধলে চীনের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে। চীনকে রুখতে এর চেয়ে সহজ আর কোনো পথ নেই। আর বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ বাধলে ভারত ভীষণভাবে আক্রান্ত হবে। ধাবমান মানুষ তিনদিক দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়বে, যেমন কয়েক কোটি মানুষ ঢুকে পড়েছিল ১৯৭১ সালে। তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি আর এখন ১৬ কোটি। কাজেই ১৯৭১ সালের চেয়ে আরও কয়েকগুণ বেশি মানুষ ভারতে ঢুকে পড়বে। এ চিন্তা মাথায় রেখেই কয়েকশ’ কোটি ডলার ব্যয়ে সীমান্তজুড়ে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া বসিয়েছে ভারত। কিন্তু তাতে কি মানুষের স্রোত আটকে রাখা যাবে? ইতিহাস বলে, চীনের গ্রেটওয়াল মোঙ্গলদের ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। মানুষের স্রোতে ভেঙে পড়েছে জার্মানির বার্লিন প্রাচীর। সুতারাং ভারত ও চীনের উচিত দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় এক সঙ্গে কাজ করা; বিশেষ করে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের চলমান সহিংসতা বন্ধে বন্ধুর মতো এগিয়ে আসা এবং যা যা করা দরকার তা করা। তাতে চীনও লাভবান হবে, ভারতও লাভবান হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগের অনেক বিতর্কের অবসান হয়েছিল। মোটামুটি সব মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে দুটি বড় ধরনের বিভেদ রেখা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। দুটি বিভেদই অত্যন্ত ভয়াবহ। একটি যুদ্ধাপরাধের বিচার, অন্যটি নির্দলীয় কেয়ারটেকার সরকার বাতিল। এ দুটি বিষয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন টালমাটাল। রক্ত ঝরছে প্রতিনিয়ত, মরছে সাধারণ মানুষ ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। ধ্বংস হচ্ছে সম্পদ। সমাজে বিভেদ-বিভক্তি প্রকট আকার ধারণ করছে। ঘরে ঘরে, ভাইয়ে ভাইয়ের মধ্যে তৈরি হচ্ছে হিংসা-প্রতিহিংসা, যা একটা গৃহযুদ্ধ বাধার পূর্বাভাস।
বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। যুদ্ধাপরাধের বিচারও টেনে নির্বাচন পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়েছে, যা পরিকল্পিতই বলা যায়। এ দুটি বিষয় মুখোমুখি অবস্থানের কারণে আগামী জাতীয় নির্বাচন বানচাল হওয়ার সমূহ আশংকা রয়েছে। একদিকে নির্বাচন না হলে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের রায় কার্যকর শুরু হলে একটি ক্যাডারভিত্তিক বিপজ্জনক শক্তি সংক্ষুব্ধ হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃংখলা শুরু করবে। সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বাংলাদেশে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে গৃহযুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
অত্যন্ত ঘনবসতির এ দেশে এমনটি ঘটলে প্রাণহানিসহ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাতে যে আগুন বাংলাদেশে লাগবে, সে আগুনে শুধু বাংলাদেশই পুড়বে না; পার্শ্ববর্তী দেশকেও পোড়াবে, সর্বোপরি এ আগুন সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। কাজেই সামনে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনই যাতে প্রধান বিষয় হয় এবং ওই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হাতবদল হয়, সেদিকে সুদৃষ্টি দিতে হবে ভারত, চীনসহ দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে। এতে বাংলাদেশেও যেমন শান্তি ফিরে আসবে, অব্যাহত থাকবে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের গতি; তেমনি অব্যাহত থাকবে এ অঞ্চলের শান্তি ও অগ্রগতি।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

নাগরিক ও মানবিক অধিকারের রাজনীতি by ফরহাদ মজহার

আজকাল কোনো সভা-সমিতিতে যেতে ইচ্ছা করে না। এটা পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার নয়। প্রায় সব সময়ই দেখি, যে কথা বলি কোনো সময়ই সেটা ঠিকভাবে গণমাধ্যমে আসে না। প্রতিটি পত্রিকা তাদের নিজেদের মতো করেই তাদের যে-বাক্য পছন্দের সেটাই সারকথা হিসেবে হাজির করে। এতে অসুবিধা নেই। যদি উদ্ধৃতি সঠিক হয়। যে প্রসঙ্গে বাক্যটি বলা বা যুক্তির যে ধারাবাহিকতায় কথাটি উঠেছিল তা না হয় উহ্যই থাকল। কিন্তু বিপদ হয়ে দাঁড়ায় যা বলেছি ঠিক তার উল্টা যদি পত্রিকায় ছাপা হয়। এর ফলে বন্ধু ও শুভার্থী মহলে জবাবদিহি করতে করতে জান বেরিয়ে যাওয়ার হাল হয়। ভাগ্য ভালো যে আমি লেখালিখি করি। ফলে অন্য লেখালিখির মধ্যে বিভ্রান্তি কাটিয়ে ওঠা কিছুটা সম্ভব হয়। ক্ষতি যা হওয়ার তা তো হয়ই। তিন তারিখে নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির একটি সভা হয়েছে বহুদিন পর। সম্প্রতি আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আবার গত ২৭ জুলাই রিমান্ডে আনা হয়েছিল। রিমান্ডে আনার উদ্দেশ্য কোনো জিজ্ঞাসাবাদ নয়, স্রেফ তাকে নির্যাতন করা। তার প্রতিবাদ করার জন্য সভা। সেই সভায় যে কথা বলেছি তা ভুলভাবে কোথাও উদ্ধৃত হয় কিনা সেটা আগাম ভেবে কয়েকটি কথা এখানে বলে রাখতে চাই।
এই প্রথম মাহমুদুর রহমান শেখ হাসিনার সরকারের অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তা নয়। এর আগেও আদালত অবমাননার দায়ে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং পুলিশি হেফাজতে তার প্রাণনাশেরও চেষ্টা করা হয়েছে। তখন গ্রেফতারের সময় আমি দৈনিক আমার দেশে হাজির ছিলাম। যে বিপুল পরিমাণ সশস্ত্র পুলিশকে একটি পত্রিকা অফিসে ঢুকে একজন সম্পাদককে গ্রেফতার করতে দেখেছি তাতে মনে হচ্ছিল আমি একটি যুদ্ধক্ষেত্রে আছি। দমন-নিপীড়নের পুরা পুলিশি যন্ত্র মহাজোটের সরকার তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল। একদিক থেকে মাহমুদুর রহমানের জন্য আমার ঈর্ষাই হচ্ছিল। একটি সরকারের গোড়ায় তিনি কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তার লেখার দ্বারা যেমন, তেমনি দৈনিক আমার দেশের ভূমিকার দ্বারাও বটে। পত্রিকা অফিস থেকে তাকে যেভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তা নিন্দিত হয়েছে দেশ-বিদেশে। দেশের চেয়েও বিদেশে বেশি। অনেক সাংবাদিক তাকে গ্রেফতার করার সেই কুখ্যাত অপারেশন প্রত্যক্ষ করেছেন। তাদের কারণে সেই গ্রেফতারের ঘটনা একটা কাহিনী হয়ে ওঠে।
এবার মাহমুদুর রহমানকে পাকড়াও করার বীররসাত্মক দৃশ্য কোনো সাংবাদিকের প্রত্যক্ষ করার সুযোগ দেয়া হয়নি। আগেই জানাজানি ছিল সরকার তাকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ ছোট দেশ, কোনোকিছুই বিশেষ গোপন থাকে না। মাহমুদুর রহমান সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যদি গ্রেফতার হতে হয় তবে তিনি তার পত্রিকার অফিস থেকেই গ্রেফতার হবেন। যারা তার শুভার্থী ছিলেন, তাদের ভয় ছিল ভিন্ন। নানান সত্য-মিথ্যা তথ্যসূত্র এবং কিছুটা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের অনেকেই অনুমান করছিলেন, মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করার চেয়ে কোনো দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো সাজানো নাটকের মধ্য দিয়ে ক্ষতি করাই শ্রেয়। হত্যার পরিকল্পনাও কোনো মহলে থাকতেই পারে। থাকা বিচিত্র নয় মোটেও। তারা তাকে তার পত্রিকা অফিসে থাকাই অনুমোদন করেছিলেন। তাকে তার নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে বিশেষভাবে সচেতন হওয়ার পরামর্শও দিচ্ছিলেন তার বন্ধুরা। মাহমুদুর রহমান সেটাই করলেন। আমার ধারণা সেটা ছিল সাবধানী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।
এবার যখন তাকে ১১ এপ্রিল গ্রেফতার করা হল সরকার দৈনিক আমার দেশকে দৃশ্যমান যুদ্ধক্ষেত্র বানায়নি। তবে গুপ্ত কমান্ডো অপারেশনের ক্ষেত্র বানিয়ে ফেলেছিল। গণমাধ্যমগুলোও ওঁত পেতে ছিল। তাদের চোখ ফাঁকি দেয়ার জন্য মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হল গেরিলা কায়দায়। সাদা পোশাকে আইন-শৃংখলা বাহিনীর লোকজন ভোরে ঢুকে গেল দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায়। তিনি নাস্তা খেয়ে চা খাচ্ছিলেন, অস্ত্রের মুখে তারা তাকে তুলে নিয়ে গেল। এরপর তেরো দিনের রিমান্ড, নির্যাতন, মাহমুদুর রহমানের অনশন ও তা ভাঙা এবং তাকে হাসপাতালে স্থানান্তর ইত্যাদি অনেক ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমে খবরগুলো এসেছে।
এবার যখন তাকে রিমান্ডে আনা হল তখন কাশিমপুর কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময়টা বেছে নেয়া হয়েছিল এমনভাবে যাতে ইফতারের সময়টা পথেই পড়ে। মাহমুদ ধর্মপ্রাণ মানুষ। বলাবাহুল্য, তিনি যে কোনো পরিস্থিতিতে রোজা থাকেন। তিনি প্রিজন ভ্যানে রোজা ভাঙার জন্য মুখে দেয়ার কিছু পাননি। সেটা নির্যাতন। শুধু কিছু না দেয়ার কারণে নয়। এই আচরণের মধ্য দিয়ে তার ধর্মবিশ্বাসকে হেয় করার চেষ্টাও ছিল। মানবাধিকার কর্মীরা সম্ভবত এটাও দাবি করবেন যে সময়মতো রোজা ভেঙে ইফতার করতে না দিয়ে তার ধর্মাচরণ বা ধর্মপালনের অধিকারও ক্ষুণœ করা হয়েছে।
প্রিজন ভ্যানে শুধু পানি পান করে মাহমুদুর রহমান ইফতার করেন। তাকে নেয়া হয় মিন্টো রোডের ডিবি অফিসে। সেখানে ১২/১৫ ফুটের একটি সেলে ৩৫ জন বন্দির সঙ্গে গাদাগাদি করে দমবন্ধ পরিবেশে তাকে রাখা হয়। তিন দিন তিন রাত তাকে সেখানে থাকতে হয়েছে। নিদ্রাহীন, খাওয়া ছাড়া, গোসল করতে পারেননি, টয়লেটও সেই ঘরে ছিল না। রিমান্ড শেষে নিু আদালতে তিনি তার আইনজীবীর কাছে নির্যাতনের বীভৎস বর্ণনা দেন। সেহরি ও ইফতারে তিনি পানি ছাড়া কিছুই খাননি। পায়খানা-প্রস্রাবের উৎকট দুর্গন্ধে একাকার এক নারকীয় পরিবেশের মধ্যে তাকে স্রেফ নির্যাতন করার জন্যই রাখা হয়েছে। জেলে অকথ্য নির্যাতনের ফলে তার শরীর ভেঙে পড়েছে। তার ওজন ৭১ কেজি থেকে কমে ৬০ কেজি হয়েছে। প্রেসার কমে গেছে। শরীরে নানান শারীরিক সমস্যাও দেখা দিয়েছে।
এই ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্যই নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির সভা। মাহমুদুর রহমান এই ক্ষেত্রে ব্যক্তিমাত্র নন। পুলিশি হেফাজতে যেভাবে নির্যাতন চালানো হয় ক্স যেই হোক ক্স তার প্রতিবাদ করা মানবাধিকারের দিক থেকে কর্তব্য অবশ্যই। কিন্তু এই কর্তব্যের দুটো দিক আছে। এক. সুনির্দিষ্টভাবে মাহমুদুর রহমানের মুক্তি ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনার বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার জোর দাবি তোলা। দুই. একই সঙ্গে মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যে নৈতিক ও কাঠামোগত সংকট সুস্পষ্ট হয়ে গেছে মাহমুদুর রহমানকে নজির হিসাবে ধরে রাষ্ট্রের সেই ক্ষয়ের দিকটা স্পষ্ট করে তোলা। প্রথম দিকটি নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির অনেকেরই দায়, কারণ মাহমুদুর রহমান কমিটির অনেকেরই বন্ধু। কিন্তু দ্বিতীয়টিই তাদের প্রধান নাগরিক দায়িত্ব। এই দুটো কর্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট না থাকলে যদি শুধু বলা হয় শেখ হাসিনার সরকার ফ্যাসিস্ট তখন কথাগুলো গালাগালির মতো শোনায়। কোনো কাজে আসে না। বুঝতে হবে, আসলে আমাদের খোদ রাষ্ট্রব্যবস্থাই ফ্যাসিবাদী। রাষ্ট্রের এই রূপান্তর একদিনে ঘটেনি, কিংবা শেখ হাসিনার একার কারণে এটা হয়নি। অনেকে বলে থাকে তারা বাকশালী আমলেরই পুনরার্বিভাব দেখছেন। আসলে ২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে বাকশাল আসেনি। বরং বলা যায় আমরা বাকশাল হয়েই ছিলাম। নির্বাচন করে তাকে সরকারের রূপ দিয়েছি মাত্র। ধীরে ধীরে আমরা এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছি। সেই ক্ষেত্রে বিরোধী দলের ভূমিকাও কম নয়। তাদের নেতিবাচক ভূমিকা স্পষ্ট করে বলাও নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির কাজ।
আমরা ভুলে যাই, ফ্যাসিবাদ আমাদের সমাজে ও সংস্কৃতির মধ্যেই আছে, নিবিড়ভাবে। শুধু সরকারে নেই। রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী রূপান্তরের শর্ত সমাজের মধ্যেই সদা তৎপর। আমরা তো নাগরিক হয়ে উঠিনি। অথচ নাগরিকতার বিকাশের সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের লড়াই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ফলে একেকজন খুদে হিটলার হয়ে সমাজে বিরাট বিরাট বুলি আউড়িয়ে যেতে আমাদের বিশেষ অসুবিধা হয় না। যেমন- বাংলাদেশে যারা নিজেদের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল মনে করেন তাদের অধিকাংশই মনে করেন মাহমুদুর রহমানকে সমর্থন করার কোনো নৈতিক বা আদর্শগত কারণ নেই। রাজনৈতিক আদর্শ বলতে তারা ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস এবং ধর্মকে ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে মনে করেন। গণতন্ত্র কিংবা নাগরিক ও মানবিক অধিকার তাদের মুখ্য আদর্শ নয়। বলছি এ কারণে যে তাদের আদর্শের সঙ্গে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের সম্পর্ক কোথায় সেটা তাহলে তারা স্পষ্ট করতেন। সেটা স্পষ্ট নয়। সে কারণে ভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসী কোনো নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার ক্ষুণœ হলে তার বিরোধিতা করা তারা জরুরি মনে করেন না। করতে দেখিনি। এই না করাটা তাদের আদর্শের পরিপন্থী কিনা সেটা তারা বিবেচনায় নিতেও সক্ষম নন। তারপরও তারা নিজেদের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দাবি করেন।
এই না নেয়ার সঙ্গেই গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামের প্রশ্ন জড়িত, কারণ ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপান্তরই যে এখনকার প্রধান ও একমাত্র রাজনৈতিক কর্তব্য অনেকের এটা মনে না করার কারণ এখানেই নিহিত। যারা ইসলামপন্থী তাদের কোনো নাগরিক ও মানবিক অধিকার নেই। এই ফ্যাসিস্ট চিন্তা আমাদের সমাজে বদ্ধমূল। তাদের কথা থাক। মাহমুদুর রহমানের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করে এই সমাজ সম্পর্কে অনেক কিছুরই পাঠ আমরা নিতে পারি। মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে যারা তাদের আদর্শ মেলাতে পারেন না, তখন তারা সরাসরি মাহমুদুর রহমানের বিরোধিতা করেন। তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু এই বিরোধিতাই বাংলাদেশের জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ কিংবা মতাদর্শ নির্বিশেষে যে কোনো নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকারেরও বিরোধিতা হয়ে দাঁড়ায়। মানবাধিকারের কথা মুখে বললেও তার সঙ্গে নিজ নিজ আদর্শ ও আদর্শ চর্চার সম্পর্ক কোথায় সেটা বোঝার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা নাগরিক সচেতনতা আমরা এখনও তৈরি করতে পারিনি। আসলে বাংলাদেশের সংকট শুধু সরকারের নয়, এটা রাষ্ট্রীয় সংকট। আর এই রাষ্ট্রীয় সংকটের বীজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অর্থাৎ সমাজের মধ্যেই ফ্যাসিবাদের বীজ রয়েছে। যার ফলে ব্যক্তির বিরোধিতা করি বলে গণতান্ত্রিক নীতিনৈতিকতার জায়গাগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা গুয়েগোবরে করে ফেলি।
শুরুতে বলা দরকার, নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি যদি কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই নির্দলীয় হতে হবে। এটা কথার কথা হলে হবে না। এটা সত্যি কথা যে শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ফলে নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য তাদের লড়াইয়ের একটা তাগিদ সমাজে থাকবে এবং এই ধরনের কমিটির সঙ্গে তারাই এখন সবার আগে দলীয় স্বার্থ রক্ষার কারণে যুক্ত হবেন। কিন্তু কমিটিকে স্পষ্ট করতে হবে এই সংগঠন তাদের দলের প্রচারের যন্ত্র হবে না। বর্তমান সরকারের দমন-পীড়ন বিরোধিতার কথা বলতে গেলে আগের সরকারের ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী দলের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। আগামী দিনে ভালো হবে তারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ঠিক এ কারণেই ব্যক্তি মাহমুদুর রহমানের ওপর দমন-পীড়ন নির্যাতনের বিরোধিতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সাধারণভাবে নীতি হিসেবে নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন তোলা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকারের আগে যেসব সরকার নাগরিকদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার ক্ষুণœ করেছে তারাও সমানভাবে নিন্দনীয়। এই নীতিগত দিকটি স্পষ্ট না হলে বর্তমান সরকারের বিরোধিতা এর আগের সরকারগুলোর পক্ষে সাফাই সঙ্গীত হয়ে ওঠে। বিশেষত যখন বিরোধী দলের এখনকার বক্তব্যে তাদের নিজেদের অতীত সম্পর্কে কোনো আÍসমালোচনা বা পর্যালোচনার কোনো লক্ষণ আমরা দেখি না। কিংবা নাগরিক ও মানবিক অধিকারের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক তারা কিভাবে দেখে সেই বিষয়ে তারা নিশ্চুপ থাকে। এর অর্থ দাঁড়ায় শেখ হাসিনার আমলে রাষ্ট্রের সংবিধানে যে বদল ঘটেছে এবং রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী রূপান্তর ঘটেছে, সেই রাষ্ট্রকে বহাল রেখেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচন করতে চায়। শেখ হাসিনার সরকারকে তখন ফ্যাসিবাদী বলাটা প্রহসন হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপির নেতারা যা হামেশাই করছেন। এতে বিএনপির পক্ষে জনসমর্থন বাড়ছে কিনা সন্দেহ। এই হিসাব ভুল যে সাধারণ মানুষ বর্তমান সরকারকে অপছন্দ করে বলে আগামী দিনে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। বিএনপির উচিত ক্ষমতায় এসে বিএনপি কী করবে সেটা বলা। দশ টাকা দরে চাল খাওয়াবো সেসব মিথ্যা প্রতিশ্র“তি নয়। কিংবা তারেক রহমান সম্প্রতি বিলাতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যেসব কথাবার্তা বলেছেন সেসবও নয়। অতি সাধারণ জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্ন আগে। যেমন- বিএনপি কি ঘাতক বাহিনী হিসেবে পরিচিত র‌্যাব বহাল রাখবে, নাকি বিলুপ্ত করবে? রিমান্ড বন্ধ হবে, নাকি হবে না? বিচার বিভাগ কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে নাকি পারবে না ইত্যাদি।
নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির কাজ হচ্ছে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটকে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে বাধ্য করা। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তারাও কি ক্ষমতায় এসে শেখ মুজিবের বক্তৃতার মতো জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা সংবিধানে ঢুকিয়ে দেবেন? কে জানে। তাদের আমলেও কি তারা বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক দলের অধীন সংস্থার মতো ব্যবহার করবেন? কী গ্যারান্টি দেবেন তারা যাতে নাগরিকরা সুবিচার পাবে? দিল্লির সঙ্গে বাংলাদেশের যেসব সমঝোতা ও চুক্তি হয়েছে সেসব কি অক্ষুণœ থাকবে? এই রকম বেশ কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে বিরোধী দলের কাছে তার উত্তর জনগণ প্রত্যাশা করে।
অনেকে এই বলে সমালোচনা করেন যে নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটিতে যারা আছেন তাদের অধিকাংশই বিএনপির সঙ্গে সক্রিয়। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশে অনেক সামাজিক সংগঠন রয়েছে যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত বা আদর্শিকভাবে আওয়ামী রাজনীতিই বাস্তবায়ন করে। নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটিকে সেভাবে দলীয় হলে চলবে না। বিভিন্ন অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আদর্শগত ঝোঁক থাকতেই পারে। সে আদর্শকে যদি ফলপ্রসূ করতে হয় তার জন্যও দলীয় কাঠামোর বাইরে নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নকে সুস্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে হাজির করতে হবে। নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটিকে দেখাতে হবে তারা মাহমুদুর রহমানের ওপর দমন-নির্যাতনের বিরোধিতা করছেন এ কারণে নয় তিনি একসময় বিএনপি সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ছিলেন। বরং এ কারণে যে মাহমুদুর রহমানকে নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার যে চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য আমরা দেখছি তারা তা উন্মোচন করছেন। একে বহাল রেখে বাংলাদেশের জনগণের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষা অসম্ভব। এর খোলনলচে বদলে দেয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। যদি বিএনপি রাষ্ট্রের এই চরিত্র ও কাঠামো বহাল রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে চায়, তাহলে সেটা স্রেফ ক্ষমতার অভিলাষ ছাড়া কিছু নয়। তাহলে বিএনপির কঠোর সমালোচনাই এখনকার প্রধান নাগরিক কর্তব্য। সত্যি কথা হচ্ছে বাংলাদেশের আগামী রাজনীতির জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন বড় সমস্যা নয়। কারণ তার চেহারা স্পষ্ট এবং আওয়ামী লীগ গত সাড়ে চার বছরে যা হারিয়েছে তা উদ্ধার করতে পারবে কিনা সন্দেহ। এখন মূল সমস্যা বিএনপি।
যদি নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষা করা এই নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির প্রধান কাজ হয় তাহলে বিএনপির সঙ্গে এক্ষেত্রে আদর্শগত বিরোধ থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। মাহমুদুর রহমানকে নিয়ে নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির এই সভাটির গুরুত্ব হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত থাকা। একদিকে সেটা মুশকিলের, অন্যদিকে সেটা সুবিধার। মুশকিলের কারণ সাধারণ মানুষের কাছে নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি এতে নিজেকে বিএনপিঘেঁষা সংগঠন হিসেবে হাজির করল। এতে কমিটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ল নাকি কমল সেই উত্তর আমার জানা নেই। আগামী দিনগুলোতে সেটা আমরা দেখব। কিন্তু সুবিধাটুকু হচ্ছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে সভায় বসিয়ে তাকে কথাগুলো শুনিয়ে দেয়া। এই সুবিধাটুকু সভার সভাপতি হিসেবে সেখানে আমি গ্রহণ করেছিলাম। সেখানে যে কথাগুলো বলেছি গণমাধ্যমে সেসব আসেনি বলে নিজের কথা এখন নিজেই এখানে বলছি। শুরুতে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অনুযোগ করেছি নিজের কথা বলার উসিলা হিসেবে।
নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি তাদের নিয়েই বিশেষভাবে গঠিত হয়েছে যারা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সেই দিক থেকে এর একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি আছে। কিন্তু এখানেও বোঝা দরকার নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলন কোনো বিশেষ পেশার বা পেশাজীবীদের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন নয়। বরং পেশাজীবীদের এটাই প্রমাণ করতে হবে তারা তাদের নিজ নিজ পেশার বাইরে একজন সচেতন নাগরিকও বটে। তাদের নিজেদের কাছেও স্পষ্ট থাকতে হবে নাগরিক অধিকার রক্ষার সঙ্গে পেশাজীবীর স্বার্থ সব সময় ও সব অবস্থায় সুসঙ্গত না-ও থাকতে পারে। অবস্থা বিশেষে সেটা সাংঘর্ষিকও হতে পারে। এই ধরনের নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি গঠনের ন্যায্যতা একটিমাত্র জায়গায়। সেটা হল কোনো নাগরিকের নাগরিক অধিকার হরণ করার কোনো এখতিয়ার রাষ্ট্রের নেই। এই নীতির জায়গায় শক্তভাবে দাঁড়িয়ে নাগরিকদের পক্ষে দাঁড়ানো এবং তাদের সচেতন করে তোলা। একইভাবে কোনো নাগরিকেরও অন্যের অধিকার অস্বীকার বা তার বাস্তবায়নে বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিরও অধিকার নেই। এই ধরনের কোনো সংঘাত যেন সৃষ্টি না হয় তার জন্য রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য বিধিবিধান প্রণয়ন করতে পারে। কিন্তু কোনো নাগরিকের অধিকার হরণ করতে পারে না।
ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলে শেখ হাসিনা আমাদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করেছেন, গালভরা উন্নয়নের কথা বলে বিএনপি আমাদের হাতে পায়ের সেই শৃংখলকে আরও রক্তাক্ত করুক আমরা তা চাই না। তাহলে কিভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের ভিত্তিতে আমরা নতুনভাবে বাংলাদেশ গড়তে পারি সেই দিকনির্দেশনাই নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটিকে দিতে হবে।
সেটা যেন আমরা সবাই বুঝি, এটাই মিনতি।