Saturday, October 26, 2019

অভিমানী এক মুক্তিযোদ্ধার অন্যরকম প্রতিবাদ

অভিমানী এক মুক্তিযোদ্ধা এখন দেশজুড়ে আলোচনায়। তার মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া চিঠি নিয়ে সর্বত্র চলছে আলোচনা। চিঠি অনুযায়ী, তার শেষ ইচ্ছা পূরণও করা হয়েছে। গার্ড অব অনার ছাড়াই দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শেষ বিদায়ের সময় বাজেনি বিউগলের সুর। অভিমানী মুক্তিযোদ্ধার ব্যতিক্রমী এ প্রতিবাদ এখন মানুষের মুখে মুখে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ অ্যাসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম-স্যালুট।
আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাই না। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করিও। জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি বরারর এ চিঠি লেখার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন। তার এই চিঠিতে লিখে যাওয়া অছিয়ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
অবশ্য ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের চৌকসদল গার্ড অব অনার জানাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন পিতৃস্নেহে চিঠিতে যা লিখে গেছেন তার মূলকথা হচ্ছে- জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সুপারিশে ছেলে নুর ইসলামের ‘নো-ওয়ার্ক, নো-পে’ ভিত্তিতে গাড়িচালক হিসেবে চাকরি হয়। সেই সুবাদে নুর ইসলাম সদর অ্যাসিল্যান্ডের গাড়ি চালাতেন। কর্মস্থলে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এ সময় তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে সেখানে উপস্থিত এডিসি রাজস্বকে বিষয়টি দেখতে বলেন। হুইপকে বিষয়টি অবগত করায় প্রশাসন থেকে প্রথমে নুর ইসলামকে তার বসবাসরত খাস পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অ্যাসিল্যান্ড-এর স্ত্রী নুর ইসলামকে বাথরুম পরিষ্কার ও মাংস রান্না করতে বলেন। মাংস রান্না ঠিক না হওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকারিয়াকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জেলা প্রশাসকও ক্ষিপ্ত হন। এ ছাড়াও নুর ইসলাম তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাফ চাওয়ার জন্য অ্যাসিল্যান্ডের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দেখা করতে পারেনি।  চাকরি চলে যাওয়ায় উপায় না পেয়ে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু প্রশাসন সেটি চরম নেগেটিভ ভাবে নেয়। বর্তমানে তার ছেলেটি চাকরিচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত হয়ে স্ত্রী-পুত্র পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
তিনি লিখেছেন, ‘জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে নিয়ে করা স্বাধীন দেশে আমার ছেলের রুজি রোজগারটুকুও অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া হলো। গত ২১.১০.২০১৯ইং তারিখ থেকে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দিনাজপুরের কার্ডিওলজি বিভাগে, ওয়ার্ড নং-২, বেড নং-৪৪ এ ভর্তি অবস্থায় আছি, এই পত্রটি তোমার কাছে লিখছি। তোমার কাছে আমার আকুল আবেদন- তুমি ন্যায় বিচার কর। ঠুনকো অজুহাতে আমার ছেলেটিকে চাকরিচ্যুত করায় তাকে চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা কর। আমার বয়স প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি। ছেলেটি হঠাৎ করে চাকরিচ্যুত হওয়ায় একেই তো আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ তারপর মানসিকভাবেও ভেঙ্গে পড়েছি। জীবণ মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ অ্যাসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম-স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাইনা।’ পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২২শে অক্টোবর চিঠিতে তিনি স্বাক্ষর করে ডাকযোগে ঢাকায় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির বরাবরে প্রেরণ করেন। পরের দিন ২৩শে অক্টোবর সকাল ১১টার সময় হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন আবস্থায় মারা যান।
বৃহস্পতিবার ২৪শে অক্টোবর সকাল ১১টায় সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ী গ্রামে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের জানাজার পূর্ব মুহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করার জন্য যান। এ সময় স্ত্রী ছেলে-মেয়েরা তাদের পিতার লিখে যাওয়া চিঠি অনুয়ায়ী তারা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন বা গার্ড অব অনার প্রদান করতে দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। তাদের ভাষায় এটাই হবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মরহুম ইসমাইল হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। জানাজার আগে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের পরিবার পরিজন দায়িত্ব দিলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল জানাজা নামাজে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলেন, অন্যায়ভাবে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি এই চিঠি লিখে গেছেন। আমরা তার লিখে যাওয়া চিঠির অছিয়ত অনুয়ায়ী দাফন করতে চাই। চিকিৎসার জন্য তিনি অনেকের কাছে ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন। গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেটকে ছেলেরা বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় জেলা প্রশাসক বেতন পান। তিনি জেলার পিতা। তার সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধা দেখা করতে গিয়ে দেখা পান না। এর চেয়ে লজ্জার কি হতে পারে। এই কারণেই তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রশাসন থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়ার পর বিষয়টি অবগত হই। তিনি বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার  প্রদান করতে না দেয়ায় তা প্রদান করা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের মুক্তিবার্তা নং-০৩০৮০১১০০২, ভাতা বই নং-৮১৯।

ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না কেন? :-আনিসুজ্জামানের প্রশ্ন

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের প্রশ্ন- ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না কেন? ত্বকীকে আমরা প্রতিবছর স্মরণ করে আসছি। তার বিচার চেয়ে আসছি অথচ ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না। এর কারণ খুঁজে বের করে কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।
গতকাল রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর ২৪ তম জন্মবর্ষ উপলক্ষে ‘জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা’ পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এ প্রশ্ন রাখেন।
ড. আনিসুজ্জামান বলেন ,ত্বকী হত্যার পর আমরা প্রতিবছর ১ থেকে ২ বার সভা সমিতির আয়োজন করে বিচার দাবি করেছি। এত দিনেও দাবি পূরণ হয়নি, এটা গভীর আক্ষেপের কথা। ত্বকীর মত প্রতিভাবান ছেলেকে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হতে হলো, আর আমরা কিছুই করতে পারছি না। তবু আমরা হাল ছেড়ে দেব না।
আমরা ত্বকী হত্যার বিচারের দাবি সবসময় করবো। আশা করি একদিন না একদিন ত্বকী হত্যার বিচার হবে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না একমাত্র একটি গোষ্ঠীর জন্য। যে দেশে নুসরাত হত্যার বিচার সাত মাসের মধ্যে হতে পারে সেই দেশে ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না কেনো? নারায়গঞ্জে সেভেন মার্ডার থেকে শুরু করে সব কিছুই হয় ওই গোষ্ঠীর মাধ্যমে। প্রশাসন থেকে শুরু করে সবই সবার জানা তারপরও কিছু হচ্ছে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে ৩৫ বছর পর। অথচ এই বিচার বন্ধ করতে আইন করা হয়েছিলো। এতো বছর পর কিন্তু বিচার হয়েছে। আমরাও আশা রাখি একদিন না একদিন ত্বকী হত্যার বিচার হবে নারায়গঞ্জের মাটিতে। ত্বকী হত্যায় পুরো নারায়ণগঞ্জবাসী মর্মাহত। তাকে হত্যার উদ্দেশ্য নারায়ণগঞ্জকে স্তব্ধ করা, পরিবার ও নারায়ণগঞ্জবাসীকে থামিয়ে দেয়া। ছয় বছর ধরে বলছি, বিচার চাচ্ছি। কিন্তু বিচার হচ্ছে না। বিচার হবে না প্রায় ৯৯ ভাগ মানুষেরই ধারণা। নারায়ণগঞ্জবাসীও সেটাই মনে করে।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না কেনো এটা সবারই জানা। কারো হস্তক্ষেপে এই বিচারটি হচ্ছে না। এটা খুব দুঃখজনক। যে ব্যাক্তিটির হস্তক্ষেপে এ্‌ বিচারটি হচ্ছে না। তিনি দেখলাম ওই দিন আবরার হত্যারকারীদের জন্য আফসোস করছেন। তাদের পরিবারের জন্য সমাবেদনা জানাচ্ছেন। তাহলে এই লোকটির বিবেকবোধ কেমন হবে সেটা অনুমান করা যায়। ত্বকী যদি বড় হতো, ধরা যাক সে বুয়েটে পড়তে আসতো, সে যদি একটা রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে মন্তব্য করতো, তাহলেও তাকে নিহত হতে হতো, যেমনটা বুয়েটের আবরারের সঙ্গে হয়েছে। ত্বকীকে আমরা প্রতীকী হিসেবে দেখতে পাই। দেশের কৈশোরের সম্ভাবনা ও তাদের নিরাপত্তাহীনতার প্রতীকী হিসেবে ত্বকী হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে চলে আসে। তিনি আরও বলেন, যে রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা চলছি সেখানে কৈশোরের সম্ভাবনা ও নিরাপত্তা খুব সংকুচিত ও সংকটের মধ্যে আছে। এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা বদলাতে একটি কিশোর আন্দোলন দরকার।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, একটি ঘটনার যদি বিচার না হয় তাহলে হাজারো ঘটনার জন্ম হয়। দেশে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠছে। এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে সামনের দিকে আরো অন্ধকার দেখবে ভবিষৎ। শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক হায়াৎ মাহমুদ বলেন, ত্বকীকে জীবন দিতে হলো তার বাবার জন্য। একটি গোষ্ঠী তার বাবা’কে সারাজীবনের জন্য শেষ করে দিতেই তাকে হত্যা করেছে। কি ভয়ংকর ব্যাপার। অথচ তার বিচার হচ্ছে না এতো বছর পরও। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্যসচিব হালিম আজাদ, জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা পরিষদের আহ্বায়ক জাহিদুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি। এ প্রতিযোগিতায় সারা দেশ থেকে চিত্রাঙ্কনে ৭৫০ এবং রচনায় ৩০০ প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেছে। চিত্রাঙ্কন ও রচনার প্রতিটি বিষয়ে তিনটি বিভাগে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটির প্রথম স্থান অধিকারীদের ‘ত্বকী পদক’ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের বিশেষ ক্রেস্ট, বই ও সনদ দেয়া হয়েছে। আর সেরা ১০ প্রতিযোগীকে  ক্রেস্ট, বই ও সনদ দেয়া হয়েছে। উভয় বিষয়ের প্রতিটি বিভাগের সেরা ১০ জনের ছবি ও লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে সুশোভিত স্মারক ‘ত্বকী’। অনুষ্ঠানের শুরুতে ত্বকীকে নিয়ে ‘মানুষ হয়ে মরবো’ নামে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

ন্যাম সম্মেলনে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

ফোরামের চেতনা সমুন্নত রাখার এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারকরণের আহ্বানের মধ্য দিয়ে গতকাল আজারবাইজানের বাকুতে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) ১৮তম সম্মেলন শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাকু কংগ্রেস সেন্টারে ১২০টি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ফোরাম ন্যাম’র দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম এলিয়েভ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্র প্রধান এবং সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাকু কংগ্রেস সেন্টারের প্ল্যানারি হলে সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ১০টায় সম্মেলনে স্থলে পৌঁছলে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট তাকে স্বাগত জানান।
অন্যান্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মধ্যে সম্মেলনে আরো যোগ দেন- ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহনী, কিউবা’র প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ-ক্যানেল, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড.মাহাথির মোহাম্মদ, জিবুতি প্রেসিডেন্ট ইসমাইল ওমর, ঘানার প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আড্ডো, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শার্মা ওলী, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভী, ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট এম. ভেনকাইয়া নাইডু, তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট গুরবাংগুলি বেরদিমুহামেদো, চেয়ারম্যান অব দি প্রেসিডেন্সি অব বসনিয়া এন্ড হার্জগোবিনা বাকীর ইজতেবেগোভিচ, আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি এবং লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ মুস্তাফা আল-সারাজ। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট এবং ন্যামের বর্তমান চেয়ারপারসন নিকোলাস মাদুরো সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত ভাষণ দেন। তার ভাষণের পরই আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম এলিয়েভ সর্বসম্মতিক্রমে আগামী তিন বছরের জন্য ন্যাম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরই প্রদত্ত ভাষণে তিনি ন্যাম’কে বাংডুং আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনের সভাপতি তিজানি মুহাম্মাদ-বান্দে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। পূর্ব ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ার সংযোগ স্থলে এই সম্মেলনের আয়োজক দেশ আজারবাইজানের ভৌগলিক অবস্থান এবং এর জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি। বহু জাতিগত এবং এবং ধর্মাবলম্বীদের এই দেশের শতকরা ৯৬ জন নাগরিকই ইসলাম ধর্মের অনুসারী। সম্মেলনের শুরুতেই ২০১৬ সালে ভেনিজুয়েলায় অনুষ্ঠিত ১৭ তম ন্যাম সম্মেলনের পর থেকে এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণকারী ন্যাম নেতৃবৃন্দের সম্মানে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। এবারকার ১৮ তম ন্যাম সম্মেলনের সাধারণ বিতর্কের বিষয়বস্তু হচ্ছে-সকলের সম্মিলিত এবং পর্যাপ্ত সাড়া প্রদানের মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে বাংডং নীতিমালা সমুন্নত করা।
রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দলের প্রধানদের সম্মানে সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত ওয়ার্কিং লাঞ্চিয়ন এবং প্লানারী সেশনেও যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। বিকেলে হায়দার এলিয়েভ সেন্টারে অনুষ্ঠেয় আজারাইজানের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনাতেও তিনি যোগদান কবেন। সম্মেলনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী গতকাল বিকেলেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথীর মোহাম্মদের সঙ্গে সৌজন্য স্বাক্ষাৎ করেন। ন্যাম বিশ্বের ১২০টি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত একটি ফোরাম, যা বড় কোনো পাওয়ার ব্লকের সঙ্গে বা বিপক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত নয়। জাতিসংঘের পর এটি বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রগুলোর বৃহত্তম গ্রুপিং। এতে ১৭টি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র এবং ১০টি পর্যবেক্ষণ সংস্থা রয়েছে। এটি জাতিসংঘের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগঠন, বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৫৫ শতাংশ জনগণ এই ন্যামের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অধিবাসী। এই দেশগুলোতে বিশ্বের তেলের ৭৫ শতাংশেরও বেশি মজুদ এবং ৫০ শতাংশেরও বেশি গ্যাস মজুদ রয়েছে, পাশাপাশি বৃহত্তম মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসিপ ব্রোজ টিটোর উদ্যোগে ১৯৫৫ সালে বাংডং সম্মেলনে সম্মত নীতিমালা প্রণয়নের পর ১৯৬১ সালে যুগোস্লাভিয়া বেলগ্রেড ন্যাম প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভেনেজুয়েলার মারগারিটা দ্বীপে ২০১৬ সালে ১৭তম ন্যাম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার পতন এবং আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পরাশক্তির মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে ন্যাম প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর ক্রিয়াগুলি ডিক্লোনাইজেশন প্রক্রিয়ার মূল কারণ ছিল, যা পরে অনেক দেশ এবং জনগণের দ্বারা স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা অর্জন এবং বহু নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে পরিচালিত করে। ঐতিহাসিকভাবেই ন্যাম বিশ্বশান্তি এবং নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

যৌনপল্লীতে শিশুদের দুর্বিষহ জীবন by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

শ্যামলা মায়াবী চেহারার কলি ও শিউলি। এক যুগ আগে কিশোরী বয়সে পায়ে নূপুর আর মুখে প্রসাধনী মেখে দু’বোন পা রেখেছিল মা-নানীর পেশায়। জন্ম সূত্রেই তারা যৌন দাসত্বের অন্ধকার বৃত্তে ঘুরছে। তাদের মা কল্পনা বেগম। ছোটবেলায় স্কুলে ভর্তি করাতে চেয়েছিল দু’জনকেই। দুইজন নাকি স্কুলেও গিয়েছিল দু’দিন। এ পর্যন্তই। মানুষের বাঁকা চাহনি, স্কুলের সহপাঠী আর শিক্ষকদের তাচ্ছিল্যে দুইদিনেই ইতি টানতে হয় স্কুল জীবনের।
এর পরের গল্পটা মা নানীর মতোই।
টাঙ্গাইল শহরের কান্দাপাড়ার প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো  যৌনপল্লীতে জন্ম নেয়া প্রতিটি  শিশুই বেড়ে ওঠছে এভাবেই। কথা হয় কলি ও শিউলের সঙ্গে। তারা বলেন, এখানে জন্ম নেয়া যে কত বড় পাপ সেটা একমাত্র আমরা ছাড়া অন্য কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। আমরা যখন স্কুলে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম, দুইদিন ক্লাস করেছিলাম। তখন আমাদের দিকে মানুষ এভাবে তাকাচ্ছিলো কেন? বলতে পারবেন? আমাদের সঙ্গে টেবিলে পর্যন্ত কেউ বসেনি, বলে আমরা খারাপ মানুষ। পরে রাগে ক্ষোভে দু’বোন আর স্কুলে যাইনি। সেই দিন যদি আমাদেরকে সবাই ভালোভাবে নিতো আজ আমাদের এ জায়গায় থাকতে হতো না। এ পল্লীতে জন্ম নিয়েছি। এ জন্মে কি আমাদের কোনো হাত আছে?
যৌন পল্লীর শিশুদের সঙ্গে মিশতে মানা, খেতে মানা, কথা বলতে মানা। এসব মানা নিয়েই বেড়ে ওঠছে তারা। শুধু তাই নয় নিজেদের পল্লীর মধ্যেও টেনেহিঁচড়ে চলছে তাদের জীবন। ছোট একটি রুম। দিনে ভাড়া তিন’শ থেকে চার’শ টাকা। সেখানেই থাকা, খাওয়া, সন্তানদের পরিচর্যা। সঙ্গে মায়েদের যৌন ব্যবসা। এখানে শিশুদের পড়ার পরিবেশ নেই। অলি-গলিতে মদের দোকান, নাচানাচি ও চিৎকার চেঁচামেচি। ঘরে জায়গা না পাওয়ায় রাস্তায়, ফুটপাতে কিংবা মাসির ঘরে দিনাতিপাত করে যৌনকর্মী মায়ের অবুঝ শিশুরা। ?এতো গেলো পল্লীর ভিতরের অবস্থা। পল্লী থেকে বের হয়ে সন্তানদের বাবা মায়ের পরিচয়সহ নানান বিষয় নিয়ে প্রতি পদে পদে সঙ্কটে পড়তে হয় তাদের। বিয়ের ক্ষেত্রে, চাকরি পেতে, বিদেশ গমনে, সম্পত্তি রক্ষাসহ সর্বত্র তারা হয়রানির শিকার হয়। সবার জন্ম যে এখানে এমনটি নয়। অনেকে আছে যাদের জন্মের অনেক পরে মা যৌনকর্মী হয়েছেন। এসব মায়ের সন্তানরাও পরিচয় সঙ্কটে ভুগছে।
কথা হয় যৌন পল্লীর এক কিশোরী শিক্ষার্থীর সঙ্গে। পড়ছেন টাঙ্গাইলের একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেনীতে। ওই কিশোরী বলেন, মা পল্লীতে থাকলেও আমি থাকি না। আমি আমার বোনের সঙ্গে আলাদা বাসা নিয়ে থাকি। তারপরও কত কথা শুনতে হয়। সবাই জানে আমি এই পল্লীর মেয়ে। মানুষ আমাদের দেখলেই ঘেন্নার চোখে তাকায়। ক্লাসে নানান ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলে। তখন খুব কষ্ট হয়। নিরবে কাঁদি।
যৌনকর্মী হাজেরা বেগম দুই সন্তানের মা। তিনি বলেন, ঘর ভাড়া, খাওয়া দাওয়া,  বৃদ্ধ মায়ের দেখাশুনা, সাজসজ্জায় অনেক রকম ব্যয়। কাস্টমার না ধরলে একদিনও চলে না। ঘরে কাস্টমার নিলে বাচ্চার পড়ার জায়গা দিতে পারি না। কিন্তু বাচ্চা তো মানুষ করতে হবে। আমি চাই না মায়ের মতো,আমার মতো বাচ্চা দু্‌ইটা এ পথে আসুক। কষ্ট করে হলেও আমি তাদের মানুষ করবো। কেউ আমাদের ভালো চোখে নেয় না। আর আমাদের বাচ্চাদের তো দেখতেই পারে না।
হাজেরা বলেন, সবাই শুধু বাচ্চার বাবার পরিচয় চায়। স্কুলে বা কোনো জায়গায় কিছু করতে গেলে এই সমস্যায় ভুগি। আর আমার আসল পরিচয় পেলে তো কথায় বলতে চায় না কেউ।
আরেক যৌনকর্মী বৃষ্টি রানী বলেন, সরকার আমাদের কোনো সুযোগ সুবিধা না দিক আমাদের সন্তানদের তো পড়াশোনার ব্যবস্থাটা করে দিতে পারে। বাচ্চাদের জন্য একটা জন্মসনদ আনতে গেলেও আমাদের নানা হয়রানির মুখে পড়তে হয় ।
প্রতিদিন একটু একটু করে অন্ধকার জগতের হিমশীতল গলিতে হারিয়ে যাচ্ছে এ শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ। পল্লীর শিশুরা সবাইকে আপন করে নিতে পারলেও সাধারণ মানুষ তাদের আপন করে নিতে পারে না।  যার জন্য তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা ব্যহত হয়। ফলে কন্যা শিশুরা তাদের মায়েদের পথে হাটে আর ছেলে শিশুরা বখাটে হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে।
এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা.ঝুনু শামসুন নাহার বলেন, একটা শিশু যখন দিনে দিনে এমন তাচ্ছিলো বড় হবে, তখন তার মানসিক অবস্থা খুব ভয়ঙ্কর হয়ে দাড়াবে। সে মানুষ হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করবে না। তাদেরকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এসব শিশুদের মানসিকভাবে হেয় করা যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং সামজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, যৌন পল্লীর শিশুদের মূলশ্রোতে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তারাও এ দেশের নাগরিক। বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ না নিলে তাদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। তাদের শিক্ষা, বস্ত্র, খাদ্য, বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের নদীগুলোর জরুরি পুনর্বাসন প্রয়োজন by অমিত রাজন

১৯৭১ সালে তৎকালিন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে দেশটিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ ৪৮ বছরে অলৌকিকভাবে বদলে গেছে। বহু বছর ধরে এই দেশটি ৬-৭% প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে এবং ২০১৮ সালে বহু দেশকে পেছনে ফেলে ৭.৩% প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তবে, প্রবৃদ্ধির সুবিধা অবশ্য সবাই পাচ্ছে না, এবং কয়েক দশক ধরে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সাথে সাথে অপুষ্টিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও দেশটিতে বেড়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় দেশে অপুষ্টিতে আক্রান্তের সংখ্যা ২০০৪-০৬ সালে ছিল ২৩.৮৫ মিলিয়ন, যেটা ২০১৮ সালে বেড়ে ২৪.২ মিলিয়নে এসে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশানের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে।

তাছাড়া, দেশের নদীগুলোর স্বাস্থ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আজাদ মজুমদারের মতে, বাংলাদেশের প্রায় ২৩০টি ছোট ও বড় নদী রয়েছে, যেগুলোর উপর প্রায় ১৪০ মিলিয়ন মানুষ তাদের জীবিকা ও পরিবহনের জন্য নির্ভর করে। কিন্তু নদীগুলোর অধিকাংশই অতিমাত্রায় দুষিত এবং নদীর পাড়গুলো শক্তিধর লোকেরা দখল করে নিয়েছে।

দেশের নদীগুলো দুষিত হওয়ার একটা বড় কারণ হলো গার্মেন্টস কারখানা থেকে নির্গত দূষিত পদার্থ। এই খাত থেকে দেশের রফতানি পণ্যের ৮২% আসছে। মাইকো সাকামোতো ও তার সহকারীরা এক গবেষণায় দেখেছেন যে, এই গার্মেন্টস কারখানাগুলো যদি গতানুগতিক উপায়ে কাজ চালিয়ে যায়, তাহলে ২০২১ সাল নাগাদ তাদের উৎপাদিত বিষাক্ত বজ্যের পরিমাণ হবে ৩৪৯ মিলিয়ন ঘনমিটার। এগুলো বাংলাদেশের নদীগুলোর অবস্থা আরও খারাপ করে দেবে।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী বুড়িগঙ্গা দুষণ ও দখলের কবলে পড়ে ধ্বংসের পর্যায়ে চলে গেছে। ফটোসাংবাদিক অ্যালিসন জয়েসের ২০১৫ সালে এই নদীর দুর্দশার চিত্র ধরা পড়ে। এই নদী এতটাই দুষিত যে, এর পানি কালো থকথকে জেলের মতো হয়ে গেছে। ঢাকার হাজারিবাগের চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা, তাদের বর্জ্য নদীতে ফেলছে। নদীর পানি দুষণের এটাই প্রধান কারণ।

নগরীর অধিবাসীরা আরও বহু ধরনের বর্জ্য নদীতে ফেলছে। ঢাকার কাছের অন্যান্য নদীগুলো হলো শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু। এগুলোর অবস্থাও কম বেশি একই রকম। বিশ্ব ব্যাংকের এক জরিপে দেখা গেছে, এই সবগুলো নদীতে প্রতিদিন ১.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার বর্জ্য মিশছে।

বেশ কিছু পরিবেশ সচেতন মানুষ এই নদীগুলো পরিস্কার করার দাবি তুলেছেন এবং এজন্য আদালতে আবেদন করেছেন। এমনকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ২০১৯ সালের এপ্রিলে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যাতে তারা নদীতে বর্জ্য না ফেলে। তিনি আরও বলেছেন যে, “প্রতিটি শিল্প ইউনিটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম থাকতে হবে যাতে এর কারণে নদী দুষিত না হয়”। দুর্ভাগ্যজনকভাবে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

২০১৯ সালের মে মাসে ঢাকা হাই কোর্ট দেখতে পেয়েছে যে, বেশ কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও এমনকি সরকারী কর্মকর্তারা নদী দখলের সাথে যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশী ও ভারতীয় মিডিয়ায় যেমনটা প্রকাশিত হয়েছে যে, আদালতের পর্যবেক্ষণের কয়েক মাস আগে, বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথরিটি ঢাকার চারপাশের নদীতীরগুলোতে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। ওই অভিযানে প্রায় ৪০০০ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয় এবং ৭৭ হেক্টর জমি উদ্ধার করা হয়।

২০১৯ সালের ২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ একটি রায় দেয়, যেখানে তুরাগ নদীকে ‘বৈধ ব্যক্তি’ বা ‘জীবন্ত সত্ত্বার’ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। রায়ে আদালত বলেছে যে, “নদী হত্যার অর্থ হলো সম্মিলিতভাবে আত্মহত্যা করা”।

রায়ে ন্যাশনাল রিভার কনজার্ভেশান কমিশনকে দেশের পানীয় সম্পদের বৈধ অভিভাবকত্ব দেয়া হয়েছে। আদালত নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে যে, কেউ নদী দখল এবং দুষণের জন্য দোষি সাব্যস্ত হলে তাকে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, মিউনিসিপ্যালিটি, সিটি কর্পোরেশান এবং সংসদ নির্বাচনের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।

রায়ে আরও বলা হয়েছে যে, নদী দখলদার এবং দুষণ সৃষ্টিকারীদের ব্যাংক ঋণও দেয়া যাবে না। নদীর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য আদালত বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে যাতে প্রতি দুই মাস পর পর সকল সরকারী ও বেসরকারী স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘন্টাব্যাপী ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়।

আগামী বছরগুলোতে যদি সবকিছু গতানুগতিক গতিতেই চলতে থাকে, তাহলে বর্ধিত জনসংখ্যার কারণে আরও বেশি বর্জ্য তৈরি হবে এবং সেগুলো নদীতে মিশবে। এই বর্জ্য পরিশোধিত না হলে নদীগুলো আরও দুষিত হবে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাবে।

একই সাথে দখলে ও দুষণে নদীর মৃত্যু হলে দেশের প্রবৃদ্ধি কমে আসবে। তাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখার জন্য নদীগুলো সংরক্ষণের কোন বিকল্প নেই।

>>>অমিত রঞ্জন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইন্সটিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো
ঢাকার পাশে একটি নদী থেকে প্লাস্টিকের জিনিস সং করছে এক লোক, ছবি: রয়টার্স