Sunday, August 24, 2025
মাহবুব তালুকদারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ: বেঁচে থাকলে তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখতে পেতে
তুমি নতুন বাংলাদেশ দেখতে পেতে। নিবিড় তিমির অমানিশা ভেদ করে নতুন সূর্য ছিনিয়ে এনেছে বাংলার ছাত্র-জনতা। আমরা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হলাম! এখন আর রাতের ভোট নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নাই।
যে নির্বাচন নিয়ে হুদা এবং তার দলের সঙ্গে পাঁচটা বছর তুমি একা লড়াই করেছ, সেই নির্বাচন কলুষমুক্ত হবে আশা করি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সমস্ত হিসাব বদলে দিয়েছে। তোমার ভাষায় ‘মূক’ জনতার মুখে ভাষা ফুটেছে। জনগণ সবই দেখে, সবই বোঝে, শুধু একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠির জ্বলে ওঠার অপেক্ষা। তারা অধিকার আদায় করতে রাস্তায় নেমেছে। প্রবল শক্তিধর সিইসি নুরুল হুদাকে প্রকাশ্যে অপমান করেছে। নুরুল হুদা পাঁচটা বছর তোমাকে কী পরিমাণ অপমান করেছে! তুমি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলে, সেটা নিয়েও কতো কটূক্তি করেছে। কিন্তু তোমার শক্তি ছিল দেশের মানুষের ভালোবাসা। তারা তোমাকে গ্রহণ করেছিল।
তুমি তোমার কাজে অটল ছিলে। তুমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলে, তাই একাই লড়াই চালিয়ে গিয়েছ। পাঁচটা বছর নির্বাচন ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে যেভাবে দেখেছ, তাকেই কাগজে কলমে রূপ দিয়েছ। লিখেছ ‘নির্বাচননামা’। এটি একটি দলিল। এতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিক নানা অসঙ্গতি নিয়ে লিখেছ। তুমি আশা করেছ, একদিন এই অমানিশা কেটে যাবে, নতুন সূর্য উঠবে। কবিরা স্বপ্নদ্রষ্টা, তারা ভবিষ্যৎ দেখতে পায়!
বিয়ের পর তুমি একদিন বলেছিলে, ছোটবেলায় তুমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলে, তোমার মরদেহের উপর ফুল দিয়ে ঢাকা। কী আশ্চর্য! তোমার কফিন বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা দিয়ে ঢাকা হলো আর সেই পতাকার উপর ছিল পুষ্পস্তবক! তোমাকে গার্ড অব অনার দেয়া হলো। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, তোমার নির্বাচন কমিশনে কার্যকালের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। ‘নির্বাচননামা’ বইটি লিখতেও তোমার লাগলো পাঁচ বছর, আর ক্যান্সারে আক্রান্ত তোমার জীবন প্রদীপও নিভে গেল পাঁচ বছরেই!
তোমার কবি মন কেমন করে বুঝতে পেরেছিল যে, সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে! তাই তো তুমি লিখেছ, ‘মৃত্যুর পরেও আমার দু’চোখ উন্মীলিত থাকবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। মানুষ নির্বাচনের সাঁকো বেয়ে গণতন্ত্রের আবাসভূমিতে যথাযথভাবে পৌঁছাতে পারছে কিনা, সেটা দেখার জন্য। কেউ তখন আমার চোখের পাতা বন্ধ করে দেবেন না, এই প্রত্যাশা পরিবার-পরিজনের কাছে।’
* নীলুফার বেগম
- সহধর্মিণী এবং মুক্তিযোদ্ধা

Thursday, June 20, 2019
কর্তৃত্ববাদী শাসনের অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশ: মাহবুব তালুকদার

উপজেলা ও জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে মাহবুব তালুকদারের আজকের বক্তব্য হচ্ছে, ‘এসব (উপজেলা) নির্বাচন কতটা অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে, সে বিষয়ে জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে আমি পূর্বে যা বলেছিলাম, এখনও তাই বলব, আপনারা নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞাসা করলে এর উত্তর পেয়ে যাবেন।’ পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট হয় ১০ মার্চ। এরপর দ্বিতীয় ধাপের ভোট ১৮ মার্চ, তৃতীয় ধাপের ২৪ মার্চ এবং চতুর্থ ধাপের ভোটগ্রহণ হয় ৩১ মার্চ।
১৮ জুন পঞ্চম ধাপের ভোটের মধ্য দিয়ে শেষ হলো পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটাভুটি। এই পঞ্চমধাপে বড় একটা অংশ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পর্কে মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য, ‘বিরোধীদলগুলো অংশগ্রহণ না করায় এবারের পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ছিল একতরফা।’ তিনি আরও বলেন, ‘একতরফা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠের কোনো অভিব্যক্তি প্রতিফলিত হয় না বলে এর কোনো ঔজ্জ্বল্য থাকে না। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র তৈরিতে উপযুক্ত পরিবেশ অপরিহার্য। কিন্তু আমরা ক্রমাগত একতরফা নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, যা গণতন্ত্রের জন্য অনভিপ্রেত।’ কারও আজ্ঞাবহ হয়ে দায়িত্বপালন করলে এবং উপজেলা পরিষদের গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য বিসর্জিত হলে উপজেলা পরিষদ জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হবে বলেও মন্তব্য করেন এই নির্বাচন কমিশনার।
মাহবুব তালুকদার জানান, কোনো কোনো সংসদ সদস্য আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বা সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে চিঠি পাঠিয়ে তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচন সাংসদদের আওতামুক্ত না হলে তা কখনও অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাদের উপদেষ্টার ভুমিকা উপজেলা পরিষদের কৌলিন্য বিনষ্ট করেছে।’ অনেক সাংসদ কেন আচরবিধি লঙ্ঘন করে পছন্দের প্রার্থীকে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে বসাতে চান, কখনও বা নিজদলের মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নেন, এ প্রশ্নের সমাধান না পেলে উপজেলা নির্বাচন তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের কবলে পড়বেই বলেও মনে করেন মাহবুব তালুদকার।
Friday, April 19, 2019
স্বাধীন দেশে অস্বচ্ছ নির্বাচন ও কুয়াশাচ্ছন্ন গণতন্ত্র কখনও কাম্য নয়: মাহবুব তালুকদার

বুধবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইলেকট্রোরাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনে ভোটারতালিকা হালনাগাদ-২০১৯ উপলক্ষে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন,‘ভোট’ দুই অক্ষরের একটি ছোট শব্দ। ছোট শব্দ হলেও এর ব্যাপ্তি অত্যন্ত বিস্তৃত ও ব্যাপক। ভোটের সঙ্গে আরও দুটি শব্দ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি হলো নির্বাচন, অন্যটি গণতন্ত্র।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচন হলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র অবলম্বন। যারা গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন না, তারা ভোটের উৎসবকে কলুষিত করতে চান, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান। আমরা যে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও আইনানুগ নির্বাচনের কথা বলি, ভোটের পবিত্রতা বিনষ্ট করে তা সম্ভব নয়। ভোট সুষ্ঠু না হলে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের কোনো ঔজ্জ্বল্য থাকে না। স্বাধীন দেশে অস্বচ্ছ নির্বাচন তথা কুয়াশাচ্ছন্ন গণতন্ত্র কখনও কাম্য নয়।
মাহবুব তালুকদার তার ব্যাখ্যায় বলেন, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও নির্বাচন এ তিনটি বিষয় স্বাধীন বাংলাদেশে ‘ভোট’-এর পটভূমি রচনা করেছে। এটি জনগণের রক্ষাকবচ। ভোট হচ্ছে স্বাধীন দেশে জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীক একটি পবিত্র আমানত। ভোটের মাধ্যমেই ভোটাররা তাদের প্রতিনিধি বেছে নেয়ার সুযোগ পান এবং এতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়। ভোটের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশগ্রহণ করে থাকে।
তিনি উল্লেখ করেন, বলেন, এ বছর ১ মার্চ প্রথমবারের মতো আমরা জাতীয় ভোটার দিবস পালন করেছি। এর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘ভোটার হব, ভোট দেব’। কথাটা খুব সাদামাটা মনে হলেও এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ১৮ বছর হলেই একজন নাগরিক ভোটার হওয়ার উপযুক্ততা অর্জন করেন। কিন্তু ‘ভোট দেব’ কথাটার সঙ্গে রাজনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। সামান্য ভোট দেয়ার জন্যই তো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের অসামান্য আয়োজন। একজন ভোটার নিবিঘ্নে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দ অনুযায়ী প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন, এইটুকু চাওয়া অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে পূরণ করা সম্ভব হয় না। ভোট প্রদানের নেতিবাচক ঘটনাক্রম অনেক সময় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদের শিরোনাম পর্যন্ত হয়।
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ভোট সুষ্ঠু ও শুদ্ধ হওয়ার পূর্বশর্ত হলো শুদ্ধ ভোটারতালিকা। ভুয়া ভোটারদের কাগুজে উপস্থিতি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রহসনে পরিণত করে। এছাড়া ভোটার তালিকায় মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটারদের উপস্থিতি সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়। এ জন্যই নির্বাচন কমিশন ভোটারতালিকা সম্পর্কে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছে।
প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সঠিক ও স্বচ্ছ ভোটারতালিকা তৈরির মাধ্যমে আপনারা একটি জাতীয় দায়িত্ব পালন করবেন বলে আশা করি।
Sunday, March 31, 2019
সংসদ নির্বাচনে এ তৎপরতা কেন দেখা যায়নি? -মাহবুব তালুকদারের প্রশ্ন

আজ শনিবার উপজেলা নির্বাচনের চতুর্থ পর্বের ভোট গ্রহণ শেষে কমিশনার মাহবুব তালুকদার এই কথা বলেন।
নির্বাচন ভবনে নিজ কক্ষে সাংবাদিকদের মাহবুব তালুকদার আরও বলেন, উপজেলা নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। যেসব কারণে আমরা ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছি, তার কারণ খুঁজে বের করা আবশ্যক। এ অবস্থায় ভোটারদের ওপর দায় চাপানো ঠিক নয়। গত দুই বছরে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, তা নিয়ে ইসির আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। ওই সব নির্বাচনে যেসব ভুলভ্রান্তি হয়েছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করা দরকার।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপজেলা পরিষদের স্বায়ত্তশাসন নেই উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, সাংসদদের হাত থেকে উপজেলা পরিষদকে মুক্ত করা না হলে এর নির্বাচন কখনোই সুষ্ঠু ও ত্রুটিমুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। তবে এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই নির্বাচন। কিন্তু ভোটদানে ভোটারদের অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিষয়টি গণতন্ত্রের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নামান্তর। কিন্তু আমরা গণতন্ত্রের শোকযাত্রায় শামিল হতে চাই না। রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখতে হবে।’
মাহবুব তালুকদারের মতে, সংসদ ও স্থানীয় নির্বাচনের দায়িত্ব পুরোপুরি ইসির হাতে ন্যস্ত করা উচিত। তিনি বলেন, রিমোটের মাধ্যমে নির্বাচনকে কন্ট্রোল করা হলে নির্বাচনব্যবস্থা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে, যা গণতন্ত্রের জন্য কাম্য নয়। এ জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অপরিহার্য। নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ রাখা হলে রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের অনীহা অবশ্যই দূর হবে।
Wednesday, March 27, 2019
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে কাঁদলেন মাহবুব তালুকদার

‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০১৯’ উপলক্ষে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) উদ্যোগে এ আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বক্তব্যের একপর্যায়ে মাহবুব তালুকদার বলেন, আজ আমার কার কথা মনে পড়ছে আপনারা জানেন? আমার মনে পড়ছে বঙ্গবন্ধুর কথা। আমার পরম সৌভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সরকারিভাবে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। অনেক স্মৃতি। আজ মাত্র দুটি কথা বলবো।
১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই দিনই তিনি আমায় ডেকে বলেন- মাহবুব তুমি আমার সঙ্গে থাকবা।
আমাকে রাষ্ট্রপতির সহকারী প্রেস সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। পদবি বড় কথা নয়, দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার পর স্বভাবতই আমি খুব খুশি হই। আমার দায়িত্ব পড়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর ডিকটেশন নেয়ার। সিদ্ধান্ত হয়- দুপুরে খাওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর বিশ্রামের সময়টুকুতে আমি তার রুমে ঢুকে যাবো। তিনি আমাকে বলেন যদি কোনো অজুহাতে ডিকটেশন দেয়ার জন্য তিনি সময় না দিতে পারেন, তাহলে আমি যেন জোর করে ডিকটেশন নিই। সেই মতে, আমি পরপর তিনদিন বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর ডিকটেশন নিই। তার ডিকটেশন রেকর্ডও করি। চতুর্থ দিন এসে তিনি বেঁকে বসেন। বলেন, তোমার জন্য তো আমি বিশ্রামটুকুও নিতে পারছি না। আমি তাকে বলি, আইয়ুবের শাসন, আপনার ছয় দফা, পাকিস্তানের জেলে বন্দির দিনগুলো, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা- এরকম গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায়ের বিষয়গুলো নিয়ে তো আপনাকে ডিকটেশন দিতে হবে। আপনার বিশ্রামের সময় আপনাকে বিরক্ত করা আমারও ভালো লাগে না। তাই আপনি আমাকে অন্য একটা সময় বের করে দিন। তখন বঙ্গবন্ধু বলেন- আমি সমস্ত কাজ গুছিয়ে আনছি, পরিবারের (সদস্যদের) বিয়ে শাদি শেষ করছি। সামনেই ডিকটেশন নেয়ার সময় বের করে দেবো। কোনো কিছুই আটকে থাকবে না। এরপরই ঘটে সেই ঘৃণ্য আগস্টের ঘটনা।
মাহবুব তালুকদার বলেন, দ্বিতীয় ঘটনাটি ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসের। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান যেদিন মারা যান, সেদিন আমি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সারাদিন ছিলাম। চল্লিশার দিনে ঠিক হয়, বঙ্গবন্ধু টুঙ্গিপাড়ায় যাবেন। সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ, তিন বাহিনীর প্রধান ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা থাকবেন। গাজী জাহাজে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়। আমার জাহাজ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা না থাকায়, কাপড়-চোপড় সঙ্গে নেয়ার কথা মনে হয়নি। রাতে জাহাজ ছাড়লে দেখি, আমার শোবার কোনো জায়গা নাই। একপাশে একটি খালি সোফা পেয়ে শুয়ে পড়ি। পাশেই তখনকার এডিসি রাব্বানী সাহেব ছিলেন। মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। দেখি, রাব্বানী জেগে আছেন। আমার মাথার নিচে বালিশ। আমি অবাক হয়ে রাব্বানীকে জিজ্ঞেস করি- এই বালিশ আমার মাথার নিচে কে দিলেন? রাব্বানী বলেন রাতে বঙ্গবন্ধু রাউন্ডে এসেছিলেন। তিনি দেখেন- আপনি মাথার নিচে হাত দিয়ে সোফায় শুয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধু তার রুমে গিয়ে বালিশ নিয়ে এসে আপনার মাথার নিচে রেখে গেছেন। এই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মাহবুব তালুকদার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি জানতাম বঙ্গবন্ধুর দুটি বালিশ ছাড়া ঘুম হয় না। তখন আমি বালিশ ফিরিয়ে দিতে বঙ্গবন্ধুর রুমের দিকে যাওয়ার কথা বলি। কিন্তু রাব্বানী জানান, গিয়ে লাভ নেই। বঙ্গবন্ধু দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
ভোর পাঁচটা। জাহাজ চলছে। সুনসান নীরবতা চারদিকে। জাহাজের সামনের দিকে এগিয়ে দেখি, একটি ইজি চেয়ারে বসে বঙ্গবন্ধু কবিতা আবৃত্তি করছেন। ‘নমো নমো নম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি/গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ-সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি।’ আর কবিতা আবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে তিনি পা দুলাচ্ছেন। আবৃত্তি শেষে বঙ্গবন্ধু আমাকে খেয়াল করেন। বলেন, মাহবুব, রাতে ভালো ঘুম হয়েছে তো? আমি বললাম না। কেন? আমি তো তোমার মাথার নিচে বালিশ দিয়ে আসলাম। উত্তরে বঙ্গবন্ধুকে বলি, আপনি আমার মাথার নিচে বালিশ দিয়ে এলেন। আপনিই বলুন, আপনি কারো মাথার নিচে বালিশ দিয়ে এলে তার পক্ষে কি আর ঘুমানো সম্ভব? মাঝে বক্তব্য দেয়ার সময় অশ্রুসজল চোখ মুছতেও দেখা যায় মাহবুব তালুকদারকে। এই অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদাসহ অন্য নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশন সচিবসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
Friday, February 15, 2019
একাদশ সংসদ নির্বাচন কৌলিন্য হারিয়েছে -নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার

এ দুটি শব্দের পরিমাপক জনগণ, যারা নির্বাচন করেন তারা নয়। এমন প্রেক্ষাপট মনে রেখে আগামী উপজেলা নির্বাচনে যাতে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার প্রতি জনগণকে অধিকতর আস্থাশীল করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শুদ্ধ নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে কমিশনার বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, নির্বাচন হতে হবে সুষ্ঠু ও শুদ্ধ। বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, নির্বাচন কমিশনের পক্ষে কখনো কাম্য নয়। তিনি বলেন, আমরা সবাই বলি নির্বাচন আইনানুগ হতে হবে। কথাটার কিছু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। নির্বাচন আইনানুগ হওয়ার অর্থ সবার সমঅধিকার ও সবার প্রতি সমআচরণ নিশ্চিত করা। এ জন্য আপনাদের কঠোর নিরপেক্ষতা অবলম্বন করতে হবে।
কোনো প্রকার ভয়-ভীতি চাপ, লোভ বা প্রলোভনের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে সাহসিকতার সঙ্গে আপনারা দায়িত্ব পালন করবেন। অনেক অপ্রত্যাশিত সমস্যা আপনাদের সামনে উপস্থিত হতে পারে। আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকেই আপনাদের তা মোকাবিলা করতে হবে। আইন কখনো সমস্যা সৃষ্টি করে না, সমাধান দেয়। আইনের ব্যত্যয়ই সকল সমস্যার মূল কারণ। যারা নির্বাচনের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন, তারা প্রতি পদক্ষেপে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, এটাই প্রত্যাশা। মাহবুব তালুকদার আরো বলেন, বর্তমান কমিশনের মেয়াদে অনেকগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সদ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়াও সাতটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব নির্বাচনে কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেছেন।
এসব নির্বাচনের সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে আপনারা সম্যক অবহিত। নির্বাচন কমিশনে এখন পর্যন্ত নির্বাচনগুলোর সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে আত্মবিশ্লেষণমূলক আলোচনা হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আপনারা সাফল্য ও ব্যর্থতার যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, তা থেকে পরবর্তী পর্যায়ের নির্বাচনগুলোর ভুলগুলো শুধরে নেয়ার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন।’ রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা উপজেলা নির্বাচনের মূল শক্তি। আপনাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা আছেন। সবার সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়ার মূল দায়িত্ব কর্মকর্তাদের।
Thursday, January 31, 2019
ইসি দাবি করলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এমন কোনও কথা নেই

মাহবুব তালুকদার বলেন, বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তথ্য উপাত্ত নিয়ে আমি কিছুটা পড়াশুনা করার চেষ্টা করেছি। এর অভিজ্ঞতা কিঞ্চিত আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি। যা আপনাদের সহায়ক হতে পারে। আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে মূলত দুই প্রধান শক্তির উপর নির্ভরশীল। একদিকে নির্বাচন কর্মকর্তা বা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমি এখন পর্যন্ত যেসব কাগজপত্র দেখেছি।
তাতে রিটার্নিং অফিসার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষক পর্যন্ত সকলের প্রতিবেদনে দুটি শব্দ অতিমাত্রায় ব্যবহৃত হয়েছে। একটি শব্দ হচ্ছে সন্তোষজনক এবং অন্য শব্দটি হচ্ছে আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মূলত দুই প্রধান শক্তির উপর নির্ভরশীল। একদিকে নির্বাচন কর্মকর্তা বা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি বলেন, আমি এখন পর্যন্ত যেসব কাগজপত্র দেখেছি। তাতে রিটার্নিং অফিসার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষক পর্যন্ত সকলের প্রতিবেদনে দুটি শব্দ অতিমাত্রায় ব্যবহৃত হয়েছে। একটি শব্দ হচ্ছে সন্তোষজনক এবং অন্য শব্দটি হচ্ছে স্বাভাবিক। তার মানে কি আমাদের নির্বাচন খুবই সন্তোষজনক হয়েছে? এই ক্ষেত্রে পাবলিক পারসেপশন কি, তা নিজেদের কাছেই জিজ্ঞেস করতে হবে। তিনি আরো বলেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ করার বিষয়ে আমি সবসময় গুরুত্বারোপ করেছি। এই গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অবশ্যই দৃশ্যমান হতে হবে। নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি করলেই যে তা সুষ্ঠু হয়ে যাবে এমন কোনো কথা নেই। জনতার চোখ বলে একটা কথা আছে। আমাদের ও আপনাদের সকলের কর্মকান্ড জনতার চোখে পরীক্ষিত হবে। সুতরাং যথার্থ একটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করার জন্য আমাদের সবাইকে অঙ্গিকারাবদ্ধ হতে হবে।
নিজের ভারত সফরের বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকদিন পূর্বে আমি ভারতে ছিলাম। সেখানে একটি পত্রিকায় নির্বাচনি ব্যবস্থাপনা নিয়ে লেখা একটি আর্টিকেল পড়ি। তাতে দুয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা ছিল। এতে লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচনি দায়িত্বে যারা নিয়োজিত সেই নির্বাচনি কর্মকর্তাগণ নির্বাচন সুষ্ঠু করার বিষয়ে অনড় ছিলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনিয়ম সম্পর্কে তারা কঠোর অবস্থান গ্রহন করতে পিছপা হননি। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারত যে অনেক বৈপরিত্য সত্ত্বেও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা সমুন্নত রেখেছে। তার পেছনে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের অবদান কম নয়।
নিজের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনে আমার দুই বছরের অভিজ্ঞতা বলে, বিভিন œ প্রতিবেদনে বিশেষত, নিজস্ব পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে সাধারণত কোনো নেতিবাচক বিষয় লিপিবদ্ধ করার বিষয়ে আমরা দ্বিধান্বিত। সবাই যেনো কাগজে পত্রে গা বাঁচিয়ে চলতে চান। যদি কেউ তথ্য উপাত্ত দিয়ে আমার কথার বিরোধীতা করতে পারেন। তাহলে আমি খুশি হবো। আমি মনে করি, নির্বাচনে প্রকৃত চিত্রটি সকল প্রতিবেদনে উঠে আসা উচিত।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সম্মান ও মর্যাদা এর কার্যক্রমের উপরে নির্ভর করে। এর সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়সহ মাঠপর্যায়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সকল প্রার্থীর প্রতি সমআচরণের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সম্মান, মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। আসন্ন সিটি নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাকে আমি নাতিশীতষ্ণ নির্বাচন বলবো। কারণ এই নির্বাচনের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা ছিল। যে উত্তাপ ও উষ্ণতা থাকার কথা ছিল এখন পর্যন্ত অবস্থার দৃষ্টি মনে হয় তা হবে না। কেবল কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কিছুটা উষ্ণতা আশা করা যায়। আসন্ন নির্বাচনের শৈত প্রবাহ তাতে কেটে যাবে বলে আমরা মনে করতে পারি।
তিনি বলেন, গত উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় প্রধান বিরোধী প্রার্থী সমান সুযোগ না থাকার কথা বলে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন। যদিও সত্যিকার অর্থে এবারের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রধান বিরোধী দলের কোনো প্রার্থী নেই। তবুও নির্বাচনে অনিয়মের কথা বলে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের ঘটনা যে ঘটবে না তা বলা যায় না। এক্ষেত্রে আমাদের উচিত হবে একটি শুদ্ধ, আইনানুগ নির্বাচন করা। যাতে নির্বাচনকে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ না পান। তিনি আরো বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর ঢাকার এই নির্বাচনের দিকে দেশবাসি এমনকি উন্নয়ন সহযোগিরা তাকিয়ে আছেন। আমরা কি ধরনের নির্বাচন উপহার দেই তা দেখার জন্য। নির্বাচনকালে আমরা কোনো চাপ, কোনো ভয়ভীতি বা প্রলোভনের কাছে নতি স্বীকার করবো না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেনো তৃণ সমদহে। এ উক্তি উল্লেখ করে রাজধানীবাসীকে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে হবে বলে জানান তিনি। ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম, বেগম কবিতা খানম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এতে উপস্থিত ছিলেন।
Wednesday, January 9, 2019
আমার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি -মাহবুব তালুকদার

সুষ্ঠু নির্বাচনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই।
নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়া একটা প্রাথমিক প্রাপ্তি। আসল কথা হচ্ছে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হচ্ছে কি না এবং বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে কি না? নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য না হলে অংশগ্রহণমূলক হলেও কোনো লাভ নেই।’ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন অনুষ্ঠানে কোনো কথা বলেননি বলেও দাবি করেন মাহবুব তালুকদার। তিনি আরো বলেন, কেমন নির্বাচন হয়েছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আমি পূর্বে বলেছি, ‘নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞাসা করুন, তাহলে এ প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন।’ এখনও আমি সে কথাই বলি। আমার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিগত ৩রা জানুয়ারির অনুষ্ঠানটিকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন অনুষ্ঠান উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, কাউকে প্রশংসাসূচক কথা বলে ধন্যবাদ জানাতে হয় এবং সেটাই সৌজন্যের প্রকাশ। তাঁর ধন্যবাদ জ্ঞাপন বক্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা ঠিক হবে না।
Friday, November 23, 2018
সিটি নির্বাচন: মাহবুব তালুকদারের মূল্যায়ন, আলোর মুখ দেখেনি রিপোর্ট

এসময় এই নির্বাচন কমিশনার প্রশ্ন তোলেন, শিডিউল ঘোষণার আগে যে পুলিশ গায়েবি মামলা করেছে, শিডিউল ঘোষণার পরে তাদের রাতারাতি পালটে গিয়ে নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা কী সম্ভব? তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি।
তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে নিজের করা তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে জমা দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি। বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনিয়মের কারণে বন্ধ করে দিতে কমিশনাররা একমত হলেও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তা করা হয়নি বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি বিগত নির্বাচনগুলোয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা সামনে এনে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে বিষয়ে যত্মবান হতে কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেন তিনি।
মাহবুব তালুকদারের পুরো বক্তব্য: আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক বিশেষ সভায় লিখিত বক্তব্য রাখার খুব একটা রেওয়াজ নেই। কিন্তু আজ আমি আপনাদের সামনে ব্যতিক্রম হিসেবে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করছি।
১৯৭০ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকাকালে তৎকালীন জাতীয় নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছিলাম। নির্বাচন বিষয়ে সেটাই ছিল আমার একমাত্র অভিজ্ঞতা। নির্বাচন কমিশনে যোগদানের পর সেই অভিজ্ঞতা দিনে দিনে ফুলে-পল্লবে পল্লবিত হয়েছে। একই সঙ্গে তাতে আছে কিছু কাঁটার আঘাত। আজ আপনাদের সঙ্গে তা শেয়ার করতে চাই।
বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আমরা দুটো উল্লেখযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করেছিলাম। একটি কুমিল্লা সিটি নির্বাচন এবং অপরটি রংপুর সিটি করপোরশেন নির্বাচন। এই দুটি নির্বাচনে আমরা সুনামের সঙ্গে উতরে গেছি বলে অনুমান করতে পারি। কারণ, এ দুটি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে অভিযোগ শোনা যায়নি। বলতে দ্বিধা নেই, এই দুটি নির্বাচনে বর্তমান নির্বাচন কমিশন জনমানসে একটা আস্থার স্থান তৈরি করে নিতে পেরেছে।
পরবর্তী সময়ে খুলনা, গাজীপুর, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট যে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। আমি খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট নির্বাচন সর্ম্পকে কোনো কথা বলব না। তবে যেহেতু আমি বরিশাল সিটি করপোরশন নির্বাচনে একক দায়িত্বে ছিলাম, সেহেতু এই নির্বাচনের অভিজ্ঞতা আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার আমাকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে অনুরোধ জানান। ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের স্বরূপ সন্ধান’ শিরোনামে আমি একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তাকে সমর্পণ করি। অজ্ঞাত কারণে সেটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
বিগত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে আত্মবিশ্লেষণের তাগিদেই আমি গাজীপুর ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন দুটির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। প্রথমেই বলে রাখা প্রয়োজন যে, কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নয়, কারো দায়িত্ব পালন অবমূল্যায়ন করার জন্য জন্য নয়, বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে হচ্ছে, আগের সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে পেতে এবং আগামী একদল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনুরূপ সমস্যা যাতে সৃষ্টি না হয়, সেই পথ সুগম করতেই এই আলোচনা।
গাজীপুর নির্বাচনের বিষয়ে আমি তিনটি ঘটনার উল্লেখ করব। প্রথম ঘটনা হচ্ছে- গাজীপুর জেলা প্রশাসক ১৭৯ জনের একটি স্বাক্ষরবিহীন তালিকা রিটার্নিং অফিসারের নিকট প্রেরণ করলে রিটার্নিং অফিসার তার গ্রহণে অসম্মতি জানান। পরে জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে নিম্নোক্ত ফরোয়ার্ডিংসহ তালিকা পাঠানো হলেও তালিকায় কারো স্বাক্ষর নেই। ফরোয়ার্ডিং নিম্নরূপ:
‘বিষয় প্রিজাইডিং অফিসারগণের নামের তালিকা প্রেরণ।
উপযুক্ত বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থা থেকে এ কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন পাওয়া গিয়েছে। প্রতিবেদন পর্যালোচনায় প্রতিবেদনটি গাজীপুর সিটি নির্বাচনের প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ সংক্রান্ত। প্রিজাইডিং নিয়োগ সংক্রান্ত কার্যক্রম যেহেতু রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক সম্পাদিত হয়ে থাকে, বিধায় প্রতিবেদনটি পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে এতদসঙ্গে প্রেরণ করা হলো।
সংযুক্ত: ০৮ (আট) ফর্দ।’
উল্লেখ্য যে, স্বাক্ষরবিহীন তালিকাটিতে কোনো শিরোনাম নেই। ফরোয়ার্ডিংয়ে জেলা প্রশাসক অফিসের নিম্ন পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার নাম ও স্বাক্ষর রয়েছে।
দ্বিতীয় বিষয়টি পুলিশের কার্যক্রম সম্পর্কিত। রিটার্নিং অফিসার মৌখিকভাবে বলেছেন, বিরোধী দলের মেয়রপ্রার্থীর কোনো অভিযোগপত্র প্রেরণ করা হলে পুলিশ অফিস থেকে তা তা গ্রহণের স্বীকৃতিপত্র দেয়া হতো না। অনেক অনুরোধের পর চিঠি গ্রহণ করা হতো। বিরোধী দলের মেয়র প্রার্থী পুলিশি হয়রানি গণগ্রেপ্তার ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করেছে। এসব অভিযোগ সম্বলিতপত্রের কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। রিটার্নিং অফিসার প্রেরিত এগারোটি অভিযোগপত্রের মাত্র চারটির উত্তর পাওয়া গেছে। যা অনেকটা দায়সারা গোছের। পুলিশ বাকি সাতটি অভিযোগের কোনো উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।
তৃতীয় বিষয়টিও পুলিশকে নিয়েই। গাজীপুরে নির্বাচনকালে ইউনিফরমধারী পুলিশ ও সাদা পোশাকের পুলিশ অনেক ব্যক্তিকে বাসা থেকে ও রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ আছে। অনেককে অন্য জেলায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের একজন ছাড়া পুলিশ অন্যদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে কোনো স্বীকারোক্তি করেনি। নির্বাচনের পরে দেখা যায় তাদের অনেকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে আছে। গ্রেপ্তার না করলে তারা কারাগারে কীভাবে গেলেন। এ প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এবার বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আসি। এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দায়িত্বে এককভাবে আমি ছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল বরিশালের। সকালে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম বেশ ভালো ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানে বিভিন্নমুখী অনিয়ম শুরু হয়। বেলা এগারোটার মধ্যে আমার কাছে প্রতীয়মান হয় যে, এভাবে ভোটগ্রহণ চলতে পারে না। সিইসিসহ মাননীয় কমিশনারদের আমি জানাই, বরিশালের ভোট কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া প্রয়োজন। একপর্যায়ে মাননীয় কমিশনারবৃন্দ সবাই ভোট বন্ধ করার বিষয়ে একমত হলেও নির্বাচন বন্ধ করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হবে কি না- ভেবে নির্বাচন বন্ধ করা থেকে আমরা বিরত থাকি। ইতিমধ্যে ৬জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৫জন তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয় এবং একজন প্রার্থী প্রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে বিজয়ী হন।
বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে পরে নির্বাচন কমিশনের যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয় তার সম্মুখে রিটার্নিং অফিসার যে বক্তব্য দেন তার কিয়দংশ তুলে ধরছি। ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরোধী প্রার্থীদের পুলিশ কর্তৃক অযাচিতভাবে হয়রানি করা হয়েছে। আবার সরকারি প্রার্থীর আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে। শুধু তাই নয়, উল্টো বিরোধী প্রার্থীর প্রচারণায় পুলিশের অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে।’ অন্যদিকে নির্বাচনের সার্বিক পর্যালোচনায় তদন্ত কমিটির বক্তব্য: ‘বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিন অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না এবং ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার এ বিষয়ে আন্তরিক ছিলেন না। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের নিরাপত্তায় কোনো পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেননি। ভোটকেন্দ্রসহ নির্বাচনী এলাকায় অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল নাজুক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণ অনেক ক্ষেত্রেই রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশনা অনুসরণ করেননি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্র ও ভোটকেন্দ্রের বাইরে প্রচুর বহিরাগতদের অবস্থান ছিল।’
প্রায় ৫ হাজার পৃষ্ঠার সংযুক্ত ডকুমেন্টসসহ টাইপ করা ৭১ পৃষ্টার মূল তদন্ত রিপোর্টটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি দুটি স্থান মাত্র উদ্ধৃতি করলাম।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এসব নির্বাচনে কোনো প্রাণহানী ঘটেনি। বিভিন্ন স্থানে অনিয়ম সত্ত্বেও ভোটকেন্দ্রগুলোতে মোটামুটি শান্তি বজায় ছিল, শৃঙ্খলা কতটুকু বজায় ছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ। একই সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় নির্বাচনে ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। সেসব বিবেচনায় সিটি করপোরেশনের ইতিবাচক বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না।
বর্তমানে বহুল প্রচলিত গায়েবি মামলা এখন আর গায়েবি আওয়াজ নয়। মাননীয় হাইকোর্ট পর্যন্ত এ ধরনের মামলাতে পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় বলে উল্লেখ করেছেন। ঢাকার পুলিশ কমিশনার মহোদয় পুলিশ বাহিনীকে গায়েবি মামলা না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তার পরও অনেক ক্ষেত্রে এরূপ মামলা চালু রয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো, শিডিউল ঘোষণার পর যে পুলিশ গায়েবি মামলা করেছে, শিডিউল ঘোষণার পরে তার পক্ষে রাতারাতি পাল্টে গিয়ে নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা কি সম্ভব? পুলিশ বাহিনী নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সহায়ক মুক্তি। তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করণে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
কিছুসংখ্যক গায়েবি মামলার আসামিদের তালিকা বিরোধী দল থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। যদিও অধিকাংশই পুরনো মামলা। এসব মামলার অজ্ঞাত আসামিদের অনেকের আদালত থেকে জামিন নেয়া হয়তো সম্ভব হবে না। কোন কোন সম্ভাব্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা থাকার কারণে তারা নির্বাচনী প্রচারকাজ চালাতে ভয় পাচ্ছেন। এহেন ভীতি সর্বক্ষেত্রে অমূলক নয়। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে নির্বাচন পূর্ব সময়ে প্রার্থীরা যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্য ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন থেকে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তা যথাযথভাবে পরিপালন করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি কথা বলতে চাই। ২০১৬ সালের ২৪শে মে বাংলাদেশ সরকার বনাম ব্লাস্ট-এর মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় আপিল বিভাগ ‘গাইড লাইনস ফর ল’ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিস’ শিরোনামে গ্রেপ্তার সম্পর্কিত যে নির্দেশনাটি প্রদান করেছেন, তা কোথাও যথাযথভাবে পরিপালন করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আপিল বিভাগের নির্দেশনাটিতে মানবিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা সমুন্নত রাখার যে অভিব্যক্তি রয়েছে, তা পরিপালিত হলে পুলিশের আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রবণতা অনেক কমে যেতে পারত।
‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বলে একটা বিষয় নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রায়ই দাবি করা হয়ে থাকে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের আশ্বাস দিলেও সত্যিকার অর্থে এর তেমন কোনো কার্যকারিতা ছিল না। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ একটি আপেক্ষিক কথা। এর কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপক নেই। তবে নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন বিধি-বিধানকে সামনে রেখে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরিতে বদ্ধপরিকর ছিল, এ কথা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু নির্বাচনী এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের জন্য অনুকূল ছিল না। আমার মনে হয়, সরকার যদি সরকারি দলের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকে তাহলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি সম্ভব। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এককভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা সম্ভব নয়। তবু আমি মনে করি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে পুলিশের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। পুলিশ যদি সবার প্রতি সমান আচরণ করে তাহলে সেটা সম্ভব হতে পারে।
আমি জানি, সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন এক কথা নয়। আগেই বলেছি, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিষয়গুলো উল্লেখ করেছি নির্বাচনকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার জন্য। এটা কখনোই পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমকে অবমূল্যায়ন করার জন্য নয়। আমার বক্তব্য আত্মবিশ্লেষণ হিসেবেই গ্রহণযোগ্য।
আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রতি মিডিয়ায় যে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে তা হলো নির্বাচন কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহে পুলিশ দুই মাস পূর্ব থেকে মাঠে নেমেছে। তারা প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং কর্মকর্তাদের বিষয়ে নানারূপ তথ্য সংগ্রহ করছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করছে। পত্রিকামতে, এই তথ্যানুসন্ধানের বিষয়ে পুলিশকে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। কমিশন নির্বাচন কর্মকর্তাদের তথ্যসংগ্রহের কোনো নির্দেশনা দেয়নি। সুতরাং এসব কর্মকাণ্ড কে কী উদ্দেশ্যে করছে, তা রহস্যজনক। বলা বাহুল্য, অতি উৎসাহী কিছু পুলিশ সদস্যের এই কর্মকাণ্ডে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও ভীতির সৃষ্টি হয়েছে, যার দায় নির্বাচন কমিশনের ওপর এসে পড়ে।
প্রিয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দ, আমি আগেও আপনাদের বলেছি সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের নিমিত্ত আমরা যে শপথ গ্রহণ করেছি, আপনারা সেই শপথের অংশীদার। কারণ, নির্বাচন আমরা করি না, নির্বাচন আপনারাই করে থাকেন। আপনারা আমাদের সবচেয়ে সহায়ক শক্তি। অতীতে যে সব জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে আপনারা তাতে দক্ষতা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আমি আশা করি অতীতের মতো আপনাদের সার্বিক সহযোগিতায় এবারও নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। তবু আমার বক্তব্য আত্মবিশ্লেষণমূলক কথা বলতে হলো অধিকতর সচেতনতা সৃষ্টির জন্য।
এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দেশবাসী নয়, বিশ্ববাসী আমাদের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। সত্যি বলতে কী, একাদশ জাতীয় নির্বাচন আমাদের আত্মসম্মান সমুন্নত রাখার নির্বাচন। আমরা কোনোভাবেই এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে দিতে পারি না। আর এ কথা সত্য যে আমরা প্রশ্নবিদ্ধ হলে তার দায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বর্তাবে এবং আপনারা প্রশ্নবিদ্ধ হলে আমরা দায় এড়াতে পারব না। সুতরাং আশা করি জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারব।
Saturday, September 19, 2015
আত্মঘাতী by মাহবুব তালুকদার
আমার কথা শুনে চাচা হেসে বললেন, জরিপে যা-ই বলা হোক না কেন, পৃথিবীর অনেক শহরের চেয়ে আমরা ভালো আছি। ঢাকা একটা ঐতিহাসিক শহর। এককালে বায়ান্ন বাজার আর তেপ্পান্ন গলির শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। মসজিদের শহর হিসেবে এর খ্যাতিও ছিল এক সময়ে।
আর এখন?
এখন এটাকে বিলবোর্ডের শহর বলতে পারো। সারা শহর ছোট-বড় হাজার হাজার বিলবোর্ডে ছেয়ে আছে।
ভেবেছিলাম, এ বিষয়ে কথা বলবো না। কিন্তু কথাটা আপনি যখন তুলেছেন, তখন কি নির্ভয়ে বলতে পারি?
অবশ্যই নির্ভয়ে বলবে। দেশে এখন বাকস্বাধীনতা বিদ্যমান।
চাচা! ১৫ই আগস্ট আমাদের জাতীয় শোক দিবস। এ দিনটি পালিত হয় পবিত্রতা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই মহান দিনটিতে সারা শহর জুড়ে অসংখ্য বিলবোর্ড ও প্ল্যাকার্ডে যে ধরনের আত্মপ্রচারের উৎসব লক্ষ্য করা গেছে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিলবোর্ডগুলোতে জাতির পিতার ক্ষুদ্রাকৃতির ছবি এক কোণায় রেখে অন্যদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছোট আকারের ছবি দিয়ে নিজেদের ছবি বিশাল আকারে ছেপে যেভাবে আত্মপ্রচার চালানো হয়েছে, তা যুগপৎ দুঃখ ও বেদনার উদ্রেক করে।
কিন্তু এসব বিলবোর্ডের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার প্রতি ভালোবাসাই প্রকাশিত হয়েছে।
ভালোবাসার প্রকাশ বুঝতাম, যদি তাতে নিজেদের ছবি আর আত্মপরিচয় তুলে না ধরা হতো। আরও একটি কথা আছে।
কী কথা, বলো।
জাতীয় শোক দিবস হিসেবে রাস্তার মোড়ে মোড়ে তোরণ বানানো হয়েছে। তোরণের সঙ্গে শোকের সম্পর্ক কি, আমি বুঝতে পারি না। আমার মতে তোরণ হচ্ছে উৎসবের প্রতীক। কিন্তু জাতীয় শোক দিবসের সঙ্গে উৎসবের সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না।
তোরণ উৎসবের প্রতীক?
আমি তা-ই মনে করি। আগের দিনে সৈন্যরা যুদ্ধ জয় করে ফিরলে তোরণ তৈরি করে তাদের স্বাগত জানাতে হতো। এখনও কোন অতিথিকে স্বাগত জানাতে বা সংবর্ধনা জানাতে তোরণ তৈরি করা হয়ে থাকে। আমি মনে করি, জাতীয় শোক দিবসের শোকাবহ অনুভূতির সঙ্গে তোরণ নির্মাণ খাপ খায় না।
তোমার কথাটা একেবারে ফেলে দিতে পারছি না। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখি তারা কি বলেন? চাচা আরও বললেন, এব্যাপারে আমাদের মেয়র দুজন ব্যবস্থা নিতে পারেন।
মেয়ররা নিজেরাই এখন বিলবোর্ডের মাঝখানে ঠাঁই পেয়েছেন। তারা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, নগরীর অবৈধ বিলবোর্ড তারা সরিয়ে দেবেন। কিন্তু তাদের পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়।
কেন সম্ভব নয়?
অবৈধ বিলবোর্ড সরানো একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তাছাড়া, রাজনৈতিক বিলবোর্ড অবৈধ বলার ধৃষ্টতা দেখানোও ঠিক হবে না। আমি কেবল বলতে চাই, যে কোন উপলক্ষ করে আত্মপ্রচারের বিলবোর্ড জাতির পিতা বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুদ্রাকৃতির ছবি সংবলিত হওয়া উচিত নয়।
সবাই তো আত্মপ্রচার করতে চায়। এটা বাস্তব সত্য।
আমার মনে হয়, নগরীর জনসভার স্থানে মাঠের একপাশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আত্মপ্রচারের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। তবে সেখানে জাতির পিতার ছবি ব্যবহার করা যাবে না। জাতির পিতার ছবি সংবলিত কোন বিলবোর্ডে আর কারও ছবি থাকা সমীচীন হবে না।
হুঁ। এ কথা থাক। অন্য কথা বলো। ঢাকা মহানগরীর এখনকার পরিচয় কী হিসেবে? বায়ান্ন বাজার, তেপ্পান্ন গলি, মসজিদের শহর, না অন্য কিছু?
ঢাকা হচ্ছে যানজটের শহর।
দেড় কোটির ওপর লোক এই শহরে বসবাস করে। যানজট তো হবেই।
এটা মেনে নিয়েই আমি বলতে চাই অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার কারণে যানজট এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পথচারী, যাত্রী ও যানবাহনে চলাচলকারীদের এখন দুর্গতি ও দুর্ভোগের শেষ নেই। যাতায়াত ব্যবস্থাও একরকম ভেঙে পড়েছে বলা যায়।
এর জন্য কে দায়ী? পুলিশ, যাতায়াতকারী, যানবাহনের চালক, না অন্য কেউ? চাচার জিজ্ঞাসা।
দায়ী আমরা সবাই। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এখন আর কোন শৃঙ্খলা নেই। রাজপথে উল্টো দিক দিয়ে প্রভাবশালীরা গাড়ি চালাচ্ছেন। রিকশাচালকরা একমুখী রাস্তায় উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি চালাতে বেশি পছন্দ করেন, মোটরসাইকেল আরোহীরা হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে ফুটপাথ ধরে গাড়ি চালালেও তাদের রোখার কেউ নেই। অন্যদিকে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের অবস্থা খুবই শোচনীয়।
পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যাপারে অবশ্য অনেক অভিযোগ।
হ্যাঁ। বেসরকারি বাসগুলোর অধিকাংশের কোন ফিটনেস নেই। অনেক চালকের লাইসেন্স নেই। এসব যাচাই করতে গেলে পরিবহন মালিকরা গাড়ি বন্ধ করে রাখেন। সরকার সর্বদাই পরিবহন মালিকদের সমঝে চলে। তার কারণ পরিবহন মালিকদের গোড়া ভারি শক্ত। ভাড়া বৃদ্ধিসহ তাদের অনেক অন্যায় আবদারকে সরকারের মেনে নিতে হয়। এবার একটা মজার ঘটনা ঘটছে।
কী মজার ঘটনা?
সরকারিভাবে অটোরিকশার ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এটাকে মজার ঘটনা বলছো কেন? চাচা জানতে চাইলেন।
মজার ঘটনা বলছি এ কারণে যে, অটোরিকশার ভাড়া কি নির্দিষ্ট আছে?
কেন থাকবে না? ভাড়ার একটা চার্ট তো অবশ্যই আছে।
সেই ভাড়ার চার্ট মেনে নিয়ে কি অটোরিকশা চালানো হয়?
তা অবশ্য হয় না।
ওই চার্ট হওয়ার আগে পরে কি যাত্রীরা মিটার অনুযায়ী চলাচল করতে পেরেছে?
তা হয়তো পারেনি।
আমি বললাম, গত কয়েক বছরে কেউ মিটারের ভাড়ায় অটোরিকশায় চেপেছে, এমন খবর জানা যায়নি। তা যদি হতো, তাহলে সেটা পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হতো। পত্রিকায় নিশ্চয়ই অটোরিকশার চালকের ছবিও ছাপা হতো। তেমন ঘটনা অবশ্য এ দেশে ঘটেনি।
তাহলে? কী বলতে চাও তুমি?
এখন বিআরটিএ যদি অটোরিকশার ভাড়া বাড়াতে চায়, তার আদৌ কোন প্রয়োজন আছে কি? অটোরিকশা কি মিটার মেনে রাস্তায় চলবে?
তারা তো সে রকমই বলছে।
আগের বারও তারা সে কথাই বলেছিল। কিন্তু ভাড়া নির্ধারণের পর থেকে কেউ মিটারের নির্ধারিত ভাড়ায় চলাচল করেছে, এমন কোন সৌভাগ্যবানের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তাহলে বিআরটিএ ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব করছে কেন?
অটোরিকশার মালিক ও চালকদের মনস্তাত্ত্বিক সুখ দেয়ার জন্য তারা এমনটা করছে বলে ধারণা করি। এতে চালক ও মালিকরা আরেক দফা ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ পাবে। আসলে অটোরিকশার ভাড়া ডবল করলেও কেউ মিটার অনুযায়ী চলতে পারবে- এমন দুরাশা কোন আহাম্মকেও করবে না। আমি অটোরিকশা সম্পর্কে কোন অবাস্তব বিভ্রান্তিতে থাকতে চাই না। অটোরিকশাকে মুক্ত করে দেয়া উচিত।
মুক্ত করে দেয়া উচিত মানে?
মানে অটোরিকশা থেকে মিটার তুলে দেয়া উচিত।
তাহলে ভাড়া নির্ধারিত হবে কিভাবে?
চালকরা যে ভাড়া চাইবে, যাত্রী তাই দিতে বাধ্য থাকবে।
সেটা কী কথা!
সেটাই বাস্তব কথা। এখনও তো তাই হচ্ছে। আমি বললাম, আজকাল চালকরা যাত্রীকে বলে দেয়, পুলিশ জিজ্ঞাসা করলে যাত্রী যে মিটারে চলছে, তা পুলিশকে জানায়।
হ্যাঁ। আমি নিজেও এমন অবস্থায় পড়েছি। মিটার ঠিক আছে, কিন্তু সিএনজি অটোরিকশা মিটারে চলছে না। পুলিশ রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে দেখলো মিটার ঠিক আছে। পুলিশও খুশি, চালকও খুশি।
আপনিও কি খুশি হননি?
না হয়ে উপায় কী? অসংখ্য অটোরিকশাকে আমার গন্তব্য জানালে তারা প্রত্যেকেই প্রত্যাখ্যান করলো। একজনকে অনুনয় বিনয় করে রাজি করানো হলো প্রায় ডবল টাকার বিনিময়ে।
ওরা গন্তব্যে যেতে রাজি হয় না কেন?
ওদের এক কথা। ওদিকে খুব জ্যাম। চাচা বিরক্তির ভঙ্গি করে বললেন, ঢাকা শহরে তো যানজট আছেই। অটোরিকশার চালকদের কথা শুনে মনে হয় ওরা আমেরিকা থেকে এসেছে।
আমি বললাম, শুধু যানজটের ব্যাপার নয়। এ শহরকে ক্ষমতাসীনরা যার যার মতো ভোগদখলের উপকরণ বানিয়ে ফেলেছে।
নতুন আবার কিছু হলো নাকি? চাচার কণ্ঠে উদ্বিগ্নতার আভাস।
পত্রিকায় দেখলাম, ওয়ারীর একটা রাস্তা দখল করে ‘ওয়ারী সিটি কাঁচাবাজার’ নাম দিয়ে আওয়ামী লীগের লোকজনকে ইজারা দেয়া হয়েছে। তারা সেখানে দোকানপাট সাজিয়ে বসেছেন।
সিটি করপোরেশনের লোকেরা তাহলে কী করে?
সিটি করপোরেশনের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা এতে সহযোগিতা করেছে। তবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, রাস্তা ইজারা দেয়ার অধিকার কারো নেই।
তাহলে আর চিন্তা কি?
চিন্তা তো আছেই। তিনি ওই ইজারা বাতিল করা সম্পর্কে উচ্চবাচ্য করেননি। ইতিমধ্যে অনেকগুলো দোকান মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে হস্তান্তর হয়েছে। সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হবে কীভাবে?
চাচা বেজার মুখে বললেন, ঢাকা শহরে রাস্তাঘাট এমনিতে খুব কম। এভাবে যদি রাস্তাগুলো দখল হতে থাকে, তাহলে সমস্যা আরও বাড়বে।
সে কথাটা কেউ ভাবছে না। অন্তত মেয়রদের তা ভাবা উচিত বলে মনে করি।
একটু চুপ থেকে চাচা বললেন, আমারও তো মনটা খারাপ হয়ে গেল।
কেন? আপনার মন খারাপের কারণ কি?
ওই যে তুমি বললে পৃথিবীর সবচাইতে অ-বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকার স্থান দ্বিতীয়। প্রথম হয়েছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক? আচ্ছা, দামেস্ক কি ঢাকার চেয়েও খারাপ শহর? সেটা কিভাবে সম্ভব হলো?
চাচা! দামেস্ক হচ্ছে একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত শহর। সেখানে জীবন ও জীবনযাপন, সবকিছুই অনিশ্চিত। নিতান্ত বাধ্য না হলে সেখানে কেউ থাকতে চায় না। ঢাকার পক্ষে দামেস্কের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন।
আমি প্রতিযোগিতার কথা বলছি না। চাচা বিষণ্নমুখে বললেন, আমি বলছি ওই তালিকায় ঢাকাকে নিচের দিকে নামিয়ে আনা যাবে কি? যাই কিছু বলি না কেন, ঢাকা যে আমাদের প্রাণের শহর।
আমি নিজেও আপনার সঙ্গে একমত। আমি বললাম, ঢাকা মহানগরীকে অবাসযোগ্য করার জন্য যা কিছু করা হচ্ছে, তা সবই আত্মঘাতী। এই প্রাণের শহরকে যারা প্রতিনিয়ত খুন করছে, তাদের প্রতিরোধ করতে না পারলে এ শহর প্রাণে বাঁচবে না।
Thursday, August 13, 2015
কভি খুশি কভি গম by মাহবুব তালুকদার
একটা মুভি দেখছি। আমি বললাম, ‘কভি খুশি কভি গম’।
তোমরা গম নিয়ে আর কত রাজনীতি করবে?
বুঝলাম চাচা আমার কথা বুঝতে পারেননি। বললাম, এই গম সেই গম নয়। এটা হিন্দি গম-এর অর্থ বেদনা। আপনি সম্ভবত গম কেলেঙ্কারির কথা বলতে চাচ্ছেন।
তুমি কত সহজে কেলেঙ্কারি শব্দটা জুড়ে দিলে। অথচ গম নিয়ে কোন কেলেঙ্কারিই হয়নি। খাদ্য অধিদপ্তর হাইকোর্টের নির্দেশে যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে, তাতে বলা হয়েছে ব্রাজিল থেকে আনা গম খাওয়ার উপযোগী।
এটা স্বস্তিকর কথা। তবে হাইকোর্ট এ বিষয়ে কী নির্দেশ দেন, এখন তা-ই দেখার বিষয়।
গম নিয়ে তো কম তোলপাড় হলো না। মিডিয়ায় ব্রাজিলের গমের যে ছবি ছাপা হয়েছে, তাতে গমগুলো নষ্ট মনে হয়েছে। সেদিন কুমারখালীর সংসদ সদস্য নিজে গম পরীক্ষা করে তার এলাকার সরকারি খাদ্য গুদামে ওই গম তুলতে দেননি। খুলনার আটাকল মালিকরা বলেছেন, ব্রাজিলের গম দুর্গন্ধযুক্ত এবং এতে আটা তৈরি করে বাজারে বিক্রি করলে লোকসান হবে।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই গমে কুঁচকানো ও ভাঙা দানার পরিমাণ সরকার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। পুলিশও এই গম নিতে চাইছে না। এরকম আরও কতো কী? এখন দেখা যাক, হাইকোর্টের নির্দেশ শেষপর্যন্ত কী দাঁড়ায়?
চাচার আমন্ত্রণে বিকালে তার বাসায় গেলাম। দেখি চাচাও তখন টেলিভিশন দেখায় ব্যস্ত। এরকম দৃশ্য কমই দেখা যায়। কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকলে চাচা টিভিতে মেতে থাকেন। আমাকে দেখে বললেন, দেশে কত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল। বাংলাদেশকে এখন বিশ্ববাসী সমীহের চোখে দেখছে। এটা কত বড় অর্জন, কল্পনা করতে পারো?
বললাম, বাংলাদেশের অর্জন দিকে দিকে। ক্রিকেট খেলায় অর্জন, সীমানা বিজয়ে অর্জন, সমুদ্র বিজয়ে অর্জন, আপনি কোন অর্জনের কথা বলছেন?
চাচা আর ভণিতা করলেন না। জানালেন, বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হয়েছে। এটা আমরা দাবি করছি না, বিশ্বব্যাংক ঘোষণা দিয়েছে।
চাচা! নিঃসন্দেহে খবরটা আনন্দের। আমিও খবরটা আগেই জেনেছি। তবে এই খবরে রবীন্দ্রনাথের ‘পুরসকার’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে গেল। কবি রাজসভা থেকে রাজার গলার পুষ্পমালা উপহার নিয়ে বাসায় ফিরছেন। কবির স্ত্রী দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হলেও শেষে রাজমাল্যটিকে গলায় পরে নেন। এটা ছিল রাজার কাছে আর স্ত্রীর কাছে কবির স্বীকৃতি।
তোমার এসব কথার কোন অর্থই বুঝলাম না।
আমি বলতে চাইছি, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হলাম, রাজার কাছ থেকে পুরস্কারও পেলাম। এর ফলাফল কী?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে যাবো। বুঝতেই পারছো, আমাদের অর্থনীতির এখন শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি হচ্ছে।
আমার সেই হিন্দি ছবিটার নাম আবার মনে হচ্ছে: ‘কভি খুশি কভি গম’। অর্থ হচ্ছে: কখনো খুশি কখনো বেদনা। আমাদের অর্থনীতির খুশির চেয়ে বেদনার দিকটি বেশি ভারি।
অর্থনীতি নিয়ে নৈরাশ্য যাতনায় কেন ভুগছো?
সংসদে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনের বেদনা বেড়েছে। অবশ্য অর্থমন্ত্রী যে সত্য কথাটি প্রকাশ করেছেন এবং যেহেতু তা প্রকাশ করতে পেরেছেন, সে জন্য তিনি সবার ধন্যবাদার্হ।
মুহিত স্যারের কোন কথা?
সংসদে তিনি বলেছেন, ‘নিজের দলীয় লোকদের সমর্থনের কারণে সোনালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।’ তিনি এ কথাও বলেছেন, ‘এটা নিয়ে আমি খুব ক্ষুব্ধ।’
তাহলে তো হয়েই গেল। মুহিত স্যার ঠিক কথাই বলেছেন।
বললাম, অর্থমন্ত্রীর ‘আমি খুব ক্ষুব্ধ’ বললেই কথাটা শেষ হয়ে যায় না। বিএনপি বলেছে, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যাংক লুটপাটকারীদের নাম প্রকাশ করুন’।
এদিকে সোনালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকসহ অন্যান্য সরকারি ব্যাংকগুলোতে ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থ লোপাটের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কিন্তু এর আর পর নেই। প্রত্যেকের ক্ষুব্ধ হওয়ার মধ্যে দুঃখ ও বেদনা আছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার কোন পদক্ষেপ নেই। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির তদন্ত সম্পর্কে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর ঐতিহাসিক বক্তব্যটি মনে পড়ে যায়- শেয়ারের ব্যাপারে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নয়, কারণ তারা খুবই প্রভাবশালী। প্রভাবশালীরাই এদেশের মালিক ও এদেশের রাজা, আমরা আমজনতা শুধু তাদের প্রজা।
আমি অর্থনীতিবিদ নই বা ব্যাংকারও নই। কিন্তু ব্যাংকিং খাতে যেসব অনাচার ও ভ্রষ্টাচার চলছে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্রথম আমি বুঝতে অক্ষম রাজনৈতিক কারণে কাউকে ব্যাংক উপহার দেয়া হয় কেন? কাউকে যদি দয়াদাক্ষিণ্য দেখাতে হয় তাহলে তাকে রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত করা যেতে পারে। আর্থিক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কেন? দ্বিতীয়ত, লোন দেয়ার কথা ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টের, বোর্ড কেন লোন দেবে? লোন দেয়ার সময় প্রকল্পের বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেয়া হয় না। বোর্ডের তদবিরে লোন দেয়া হয়। মনে হয় বোর্ডের কাজ কেবল লুটপাটে সহযোগী হওয়া। তৃতীয়ত. বোর্ডে আত্মীয় থাকার কথা নয়, কিন্তু যেখানে তা মানা হয় না, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কি কিছু করণীয় নেই। চতুর্থত. বাংলাদেশ ব্যাংক অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে কখনও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয় না। যাদের ধরা হয়, তাদের শাস্তির দীর্ঘসূত্রতায় অপকর্ম উৎসাহিত হয়।
আরও মজার ব্যাপার আছে। বড় বড় ঋণ খেলাপিদের সুদ মাফ করার প্রবণতা দেখে বিস্মিত হতে হয়। সম্প্রতি ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে রি-সিডিউল করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কী মহৎ উদ্যোগ। এরপর এখন থেকে ৫০০ কোটি টাকার খেলাপির সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা জানেন ব্যাংকে যেহেতু জনগণের টাকা আমানত থাকে, সেহেতু ঋণ খেলাপি হলে কোন অসুবিধা নেই। সর্বোচ্চ কতবার রি-সিডিউল করা যাবে, তার কোন নীতিমালা আছে কি? বড় ঋণগ্রহীতারা জানেন, তারা ‘টু পাওয়ার ফুল টু কন্ট্রোল’। ফলে সরকার যেন তাদের কাছে বাঁধা।
এসব কথা চাচাকে বলবো কিনা ভাবছিলাম। চাচা বললেন, দেশের আর্থিক অবস্থা এখন কত ভালো, তার দিকে তোমার কোন দৃষ্টি নেই।
আর্থিক অবস্থা ভালো মানে?
গত অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয় বা রেমিট্যান্স দেড় হাজার কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। ভাবতে পারো, এটা কত বড় অর্জন?
চাচা! এটা অবশ্যই অর্থনীতির জন্য একটা বিরাট সুখবর। কিন্তু এর পাশাপাশি বাংলাদেশীদের কত হাজার কোটি টাকা সুইস ব্যাংকে পাচার করা হয়েছে, সেই খবরটি এ ধরনের অর্জনকে ম্লান করে দেয়। সেজন্যই আমি বলছিলাম, অর্থনীতিতে আমাদের অবস্থা ‘কভি খুশি, কভি গম’।
তোমার মতো নেতিবাচক চিন্তা আমার নেই। চাচা বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করবেন। অর্থনীতির ফাঁক-ফোকরগুলো নিশ্চয়ই তিনি সামলে নেবেন। তার ওপর আস্থা আছে আমার।
আস্থা আমারও আছে। সেদিন তিনি সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদী ও চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের আরও সোচ্চার হতে বলেছেন। আমি মনে করি, একই সঙ্গে অর্থ লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বললে ভালো হতো।
সেটা কী সম্ভব?
কেন সম্ভব নয়?
সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদী চোরাকারবারিরা সরকারের বাইরে থেকে বিচ্ছিন্নভাবে অপকর্ম করে। কিন্তু যাদের তুমি অর্থ লুটপাটকারী বলছো, তারা কাজ করে সরকারের ভেতরে বসে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে আইন অনুযায়ী হতে হবে।
সব বিষয়েই আইন অনুযায়ী চলতে হবে। আমি জানালাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন, আইন অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে, তা সে যে দলেরই হোক।
প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন।
তাহলে মাননীয় অর্থমন্ত্রী ব্যবস্থা নিতে পারছেন না কেন? প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের সঙ্গে তার বক্তব্য খাপ খায় না। দু’জনের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
চাচা সহসা কথার মোড় পরিবর্তন করে বললেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা বলে একটা কথা আছে।
সেটাই বলুন। রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে নৈতিক বাস্তবতা মার খেয়ে যাচ্ছে।
আমার কণ্ঠস্বর উচ্চগ্রামে ওঠায় চাচা তার কণ্ঠস্বর নামিয়ে আনলেন। শান্তকণ্ঠে বললেন, তোমার উদ্বেগ কিছুটা বুঝতে পারছি। তবে চিন্তা করো না। খুব শিগগিরই আর্থিক খাতের সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
আর্থিক খাত তো একটা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু আর্থিক খাত ধরে অগ্রসর হলে হবে না। দেশে সামগ্রিকভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
ঠিক আছে। তোমার কথাই মেনে নিলাম। চাচা বললেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কী করতে হবে?
দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বেশ। তারপর? রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অবাধ নিরপেক্ষ সর্বজনগ্রহণযোগ্য নির্বাচন দরকার।
সর্বজনগ্রহণযোগ্য বলে কোন কথা নেই। অধিকাংশ লোক যা মেনে নেয়, তাই-ই সর্বজনগ্রহণযোগ্য। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন সবাই মেনে না নিলেও অধিকাংশ মানুষ তা মেনে নিয়েছে। দু’একটি দেশ ছাড়া বিদেশীরাও আর কোন কথা বলছে না।
আপনার তথ্য ঠিক নয়।
তোমার তথ্যটা কি?
চাচা: ক’দিন আগে জাতিসংঘ এক চিঠি দিয়ে ‘নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ বন্ধ করে দিয়েছে।
ভারি অন্যায়! জাতিসংঘের এটা করা উচিত হয়নি। কি কারণে তারা এটা করলো?
তারা কোন কারণ দর্শায়নি। তবে যেসব দেশ এই প্রকল্পের অর্থ যোগানদাতা ছিল, তারা হাত গুটিয়ে নিয়েছে। তারা অর্থ দিতে আর আগ্রহী নয়।
চাচা সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন, এসব দেশ কি চায় না বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা শক্তিশালী হোক?
তারা মুখ না খুললেও বোঝা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তারা খুব হতাশ। এ জন্যই তারা প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
যাকগে। আমরা এখন আর বিদেশীদের দিকে তাকিয়ে নেই। আমরা এখন আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছি। দেখলে না নিজেদের অর্থায়নে আমরা পদ্মা সেতু পর্যন্ত তৈরি করতে পারছি। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে যাবো আমরা। তারপর উচ্চ আয়ের দেশ।
এসব কথা শুনতে বেশ ভালো লাগে। আমিও আশাবাদী হতে চাই। আমি বললাম, কিন্তু আমাদের অবস্থা সেই হিন্দি গানের মতো: ‘কভি খুশি কভি গম’।
Wednesday, July 22, 2015
আশরাফ ও আতরাফ by মাহবুব তালুকদার
চাচার বাসায় বসে দৈনিক পত্রিকার পাতা উল্টাতে উল্টাতে আশরাফ ও ফখরুলের গুরুত্বপূর্ণ খবর দুটি পড়ছিলাম। আশরাফকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ফখরুলকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে জেলখাটা থেকে। আশরাফের মতো সৎ ও অনুগত রাজনীতিবিদকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার কারণ কী হতে পারে? তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তিনি মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম যথাযথভাবে দেখভাল করেন না, একনেকের গুরুত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত থাকেননি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকরূপে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার দূরত্ব রয়েছে, ইত্যাদি। তবে মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হলেও তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকই থাকলেন। আর ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাস্থ্যগত কারণে জামিনে মুক্তি লাভ করলেও চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে যেতে হবে। তার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের মতোই তার দলের স্বাস্থ্যও ভালো নয়। এই সময়ে অসংখ্য মামলার জালে জড়িয়ে আছে বিএনপির অগণিত নেতাকর্মী। হাজার হাজার নেতাকর্মী আন্দোলনের ফসল হিসেবে পলাতক এবং পারিবারিক ও ব্যবসা ক্ষেত্রে বিপর্যস্ত। এমতাবস্থায় ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে বিএনপি ও ফখরুল কবে কিভাবে রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরে আসবেন, তা এক জিজ্ঞাসা।
আমাকে পত্রিকার পাতায় নিবিষ্ট দেখে চাচা বললেন, কী ব্যাপার? এত মনোযোগ দিয়ে কি পড়ছো?
আশরাফ ও আতরাফের ঘটনা।
আতরাফ কী? চাচা জিজ্ঞাসা করলেন।
আমি বর্তমান রাজনীতিতে আতরাফ কথাটার তাৎপর্য তুলে ধরলাম।
চাচা কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি আশরাফ ও ফখরুলকে এক পাল্লায় মাপছো? একজন পার্টির পূর্ণ সাধারণ সম্পাদক, আরেকজন দলের ভারপ্রাপ্ত। দু’জনের প্রটোকল আলাদা।
আমি বললাম, পাল্লা তো একটাই হতে হবে। আলাদা আলাদা পাল্লায় মেপে তুলনামূলক বিচার করা যাবে না।
চাচা ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, আশরাফ সাহেবের সঙ্গে ফখরুলের তুলনা? তোমার কী মাথা খারাপ হয়েছে?
চাচা! আমি আপনার দৃষ্টি দিয়ে দেখছি না। সাধারণ মানুষের দৃষ্টি দিয়ে দেখছি। তারা দেশরত্ন শেখ হাসিনা ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ারও তুলনামূলক বিচার করতে পারে। কথার শেষে আমি চাচার প্রতি একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম, মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া আশরাফের পরিণতিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
চাচা বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুবই দূরদর্শী। তিনি কেবল রাষ্ট্রনায়ক নন, রাষ্ট্রচিন্তকও বটে। তার ডিসিশন অবশ্যই কারেক্ট।
কিন্তু তাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করা হলো কেন? এটা এইচ এম এরশাদের বিশেষ দূতের মতো অবস্থা হয়ে গেল না?
তুমি তো রাজনীতি বোঝো না। তাই এসব বিষয়ের মাজেজা বুঝতে পারো না। আশরাফ সাহেবকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী না করা হলে যারা তাকে ঘিরে আছে, তারা কোথায় যাবে? আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই বা তাকে মানবে কেন? আর এরশাদ স্যারের কথা বলছো? তিনি যে নির্বাচন না করতে চেয়ে নিজের মাথায় পিস্তল ধরে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিলেন, তাকেও তো কিছু একটা দিতে হবে?
চাচা! নির্বাচনের সময় এরশাদ সাহেব নমিনেশন পেপার লিখিতভাবে তুলে নিলেও তিনি বাধ্যতামূলকভাবে এমপি হয়ে যান। হতে না চেয়েও তিনি এমপি ও মন্ত্রীর পদমর্যাদায় আসীন হয়েছেন।
হ্যাঁ। এরই নাম রাজনীতি। চাচা বললেন, ভবিষ্যতে নমিনেশন পেপার সাবমিট না করেও কেউ কেউ এমপি হতে পারেন। প্রেমে, যুদ্ধে ও রাজনীতিতে সবই সম্ভব। এ বিষয়টা তুমি বুঝতে পারবে না।
রাজনীতি আমি ঠিকই ভালো বুঝতে পারি না। শুধু এটুকু বুঝতে পারলাম, পর্দার অন্তরালে আশরাফকে নিয়ে মান-অভিমানের খেলা চলছে। আশরাফ লন্ডনে চলে যাওয়ার ‘হুমকি’ দিচ্ছেন, ঘন ঘন শেখ রেহানার সঙ্গে তার ফোনালাপ হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কয়েকবার দেখাও হয়ে গেল। আমার কাছে মনে হলো, অন্তরালে কিছু একটা নাটক চলছে। এরপর জানা গেল, আশরাফ সাহেব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী হয়েছেন। খবরটি পেয়ে আমি চাচাকে ফোন করলাম। বললাম, আশরাফ সাহেব তো আবার মন্ত্রী হয়েছেন। আপনার প্রতিক্রিয়া কি?
চাচা বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুবই দূরদর্শী। তিনি কেবল রাষ্ট্রনায়ক নন, রাষ্ট্রচিন্তকও বটে। তার ডিসিশন অবশ্যই কারেক্ট।
বললাম, আগের ডিসিশন আর এখনকার ডিসিশন তো অনেকটা পরস্পরবিরোধী।
তুমি যদি এসব বিষয় বুঝতে পারতে, তাহলে তুমিই তো রাজনীতিবিদ হয়ে যেতে। আগের পরিস্থিতিতে মন্ত্রিত্ব থেকে তার অব্যাহতি দান ঠিকই ছিল। আবার এখনকার পরিস্থিতিতে নতুন মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদের মন্ত্রিত্ব প্রদান ঠিকই আছে। আগেই বলেছি, এসব তুমি বুঝবে না।
আসলেই আমি এসব বুঝতে পারি না। আমার মনে হয়েছে, আশরাফের অভিমানের কাছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে হার মেনেছেন। দু’জনেই পরস্পরের প্রতি গভীর অনুরাগের বন্ধনে আবদ্ধ। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠতম সহযোগী ছিলেন। এ জন্যই তাকে জেল হত্যাকাণ্ডের সময় প্রাণ দিতে হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় এসব বিষয় নিশ্চয়ই কাজ করেছে।
বাংলাদেশ এক অদ্ভুত দেশ। বিশেষত্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারা মন্ত্রিত্বের ইঁদুর দৌড়ে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু মন্ত্রিত্ব জোর করে চাপিয়ে দেয়ার পরও কেউ কেউ ক্ষমতা থেকে দূরে সরে থাকতে চান। সোহেল তাজের ঘটনাটা মনে পড়লো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে কেন মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল, সে রহস্য আজও আমার কাছে অজ্ঞাত। সম্ভবত সেই ঘটনার প্রভাবেই সোহেল তাজকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়। তবে তিনি এক পর্যায়ে একরকম জোর করেই মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি চান। অবশেষে তাজউদ্দীন কন্যা ও সোহেল তাজের বোন সিমিন হোসেন রিমিকে এমপি বানিয়ে, তাজউদ্দীন পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়। রাজনীতির অন্তরালে কত কৌতূহলপূর্ণ ঘটনা অনবরত ঘটে চলেছে, যা আমরা জানি না।
আবার আতরাফের কথায় আসা যাক। এক্ষণে ফখরুল ব্যক্তিগতভাবে হয়তো আতরাফ নন, কিন্তু তার দলকে আতরাফ বললে অত্যুক্তি হয় না। জাতীয়তাবাদী দলের প্রধান খালেদা জিয়া সম্ভবত তার রাজনৈতিক জীবনের কঠিনতম সময় পার করছেন। সরকার তার দলকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে তার বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা ঝুলছে। এর কোন একটিতে সাজা হলেও তাকে জেলে যেতে হবে এবং জেলে থাকতে হবে বলে মাননীয় তথ্যমন্ত্রী আগাম বলে দিয়েছেন। আদালতের রায় কি হবে তা কেউ জানে না। কিন্তু আমাদের মন্ত্রীদের কেউ কেউ রাজনৈতিক জ্যোতিষীও বটে। তারা অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকেন।
আতরাফ বিএনপিকে নিয়ে নতুন একটি খেলা শুরু হয়েছে। এমনিতে বিএনপিকে টুকরো করার প্রচেষ্টা এক-এগারোর সময় থেকেই চলে আসছিল। আসল বিএনপি’র ব্যানারে দলে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করা হয়। এক কালের বিএনপি নেতা আবু হেনা ও সংস্কারপন্থি নেতা এখন আওয়ামী ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু বর্তমান খেলাটা বেশ চমকপ্রদ। বিএনপি’র অসংখ্য নেতাকর্মীকে আওয়ামী লীগ কোলে তুলে বরণ করে নেয়ার চমৎকার ছবি পত্রিকাতে দেখা যাচ্ছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে বিগত আন্দোলনকালে সহিংসতা, মানুষ পুড়িয়ে মারার অভিযোগ রয়েছে, মামলাও রয়েছে। হামলা- মামলার ভয়ে বিপর্যস্ত বিএনপি’র অনেক আতরাফ নেতাকর্মী আত্মরক্ষার তাগিদে আওয়ামী লীগে যোগদানের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিচ্ছেন। জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়েছেন। কিন্তু আখেরে এসব ঘটনা রাজনীতিকে কোথায় নিয়ে যাবে কে জানে!
আমি চাচাকে জিজ্ঞাসা করলাম, দেশের ভবিষ্যৎ কি?
দেশের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। রাজনীতির খেলায় আওয়ামী লীগ চ্যাম্পিয়ন। আগামীতে জাতীয় নির্বাচন কিভাবে হবে?
মানে? চাচা চোখ কপালে তুলে বললেন, সিটি করপোরেশনের এবারের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত সাফল্যমণ্ডিত। জাতীয় নির্বাচনের জন্য এটা ছিল একটা মহড়া। এভাবে বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নেয় এবং নির্বাচনের দিন দুপুর বেলা উইথড্র করে, তাহলে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কি আছে?
কিন্তু বিএনপি, মানে আতরাফের দল যদি নির্বাচনে না আসে?
তাতে অসুবিধা কি? জাতীয় পার্টি আছে, ... পার্টি আছে। আর আগামীতে ইনশাআল্লাহ আওয়ামী লীগ থেকে মাত্র ১৫৩টি পদে নয়, সংসদের বিরোধী দলের সঙ্গে ভাগাভাগি করে প্রায় পৌনে তিনশ’ পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হবে।
কিন্তু আতরাফকে বাদ দিয়ে আশরাফের নির্বাচন কি সম্ভব?
কেন? চাচা সবিস্ময়ে আমার দিকে তাকালেন।
বললাম, আতরাফ পাশাপাশি না থাকলে আশরাফ তার মর্যাদার স্বীকৃতি পাবে কিভাবে?
Thursday, July 9, 2015
রাজনীতি by মাহবুব তালুকদার
প্রশ্নটা শুনে আমি হকচকিয়ে গেলাম। চাচার কাছ থেকে এ ধরনের প্রশ্ন আমি কখনো আশা করি না। আমাকে নিয়ে তার মনে দুটো ধারণা বদ্ধমূল রয়েছে। প্রথমত, আমি রাজনীতি বুঝি না। দ্বিতীয়ত, আমি কারণে বা অকারণে সরকারের সমালোচনা করি। এমতাবস্থায়, চাচার উপরোক্ত প্রশ্ন আমাকে স্বাভাবিকভাবে বিব্রত করল।
কি হলো? তুমি আমার কথার জবাব দিচ্ছ না কেন? চাচা ঈষৎ হেসে বললেন, যেহেতু দেশের সার্বিক অবস্থা এখন খুব ভাল, সেজন্য সত্য কথাটা তোমার মুখে আটকে যাচ্ছে।
বললাম, আপনি নিজেই তো আপনার প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিলেন। তাহলে আমাকে জিজ্ঞাসা করে লাভ কি?
আমি তোমার মতামতটা জানতে চাচ্ছি।
আমার মতামত কি খুব গুরুত্বপূর্ণ?
অবশ্যই। তুমি সাধারণ মানুষের একটা অংশের প্রতিনিধি। তাই তোমার কাছ থেকে মতামত যাচাই এ মুহূর্তে বিশেষ প্রয়োজন।
এ মুহূর্তে কেন?
ব্যাপারটা তাহলে তোমাকে খুলেই বলি। সরকার এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবছে।
তাই নাকি? হঠাৎ এ সময়ে এমন অশুভ চিন্তা কেন?
এমন একটা মহৎ চিন্তাকে তুমি অশুভ বলছ কোন যুক্তিতে?
চাচা! আপনার কথা অনুযায়ী দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এখন ভাল। তাহলে এভাবেই চলুক না দেশটা। অযথা নির্বাচনের কথা তুলে ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কি?
ঝামেলা হবে কেন? সিটি করপোরেশন নির্বাচন তো চমৎকার হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ পর্যন্ত প্রশংসা করে বলেছেন, কোথাও কোন রক্তক্ষয় হয়নি। সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুসরণ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি রক্তপাতহীন হয়, তাহলে নির্বাচনের ইতিহাসে তা একটা মডেল হয়ে থাকবে।
৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের মডেল বাদ দিয়ে এখন কি সিটি করপোরেশনের মতো জাতীয় নির্বাচন করার কথা ভাবা হচ্ছে?
অসুবিধা কি? জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি আসেনি, কিন্তু সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে তারা তো এসেছিল। পরে তারা নিজেরাই কেটে পড়েছে, সেটা তাদের ব্যাপার। জাতীয় নির্বাচনে তারা যদি আসে, পরে কেটে পড়লেই বা কি আসে যায়?
আমার তো মনে হয় না, বিএনপি কেবল বৈধতা দিতে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে?
চাচা বললেন, ৫ই জানুয়ারি বিএনপি নির্বাচনে না আসায় ক্ষতিটা কার হয়েছে? বিএনপি এখন সংসদের বাইরে। তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা ঝুলছে। তাদের বড় বড় নেতারা সবাই কারাগারে। নির্বাচনে না এসে বিএনপি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে। সত্যি বলতে কি, খালেদা জিয়া এখন মনে মনে পস্তাচ্ছেন।
এরপরও আমি মনে করি না খালেদা জিয়া ৫ই জানুয়ারি মার্কা কোনো নির্বাচনে আসবেন।
কেন? তার অসুবিধা কি? নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা হলেই তো হলো।
আমার মনে হয়, জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে কিছু সাংবিধানিক সংকট রয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা না হলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না। আর নির্বাচন কমিশনের কথা বলছেন? একটা অনুগত নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার অর্থ অধিকতর অনুগত করা।
আজকাল তুমি বড় কঠিন কথা বলতে শুরু করেছ।
কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছি না, দেশের এমন চমৎকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবা হচ্ছে কেন?
সরকার যখন ভাল অবস্থায় থাকে তখনই তো মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবা হয়। দল হিসেবে বিএনপির অস্তিত্ব প্রায় শূন্যের কোঠায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করে জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা হচ্ছে। খালেদা জিয়াও তার ব্যক্তিগত মামলায় ফেঁসে যেতে পারেন। তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ারই সম্ভাবনা। বিএনপিতে ভাঙন ধরাতে সবরকম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সংস্কারপন্থিরা তো আছেনই, মামলার ভারে জর্জরিত অন্য নেতারা বিএনপির নামে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। জামায়াতকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করারও ব্যবস্থা হয়েছে। তাছাড়া দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এখন অনেক উন্নতি হয়েছে।
চাচা! বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু উন্নতিটা নড়বড়ে’।
বিদেশীরা কি বলল না বলল, তাতে কি আসে যায়?
কিছু তো নিশ্চয়ই আসে যায়। সম্প্রতি বৃটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় তাতে বাংলাদেশ বিষয়ক সর্বদলীয় কমিটি সভাপতি কনজারভেটিভ দলীয় এমপি অ্যান মেইন রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতাকে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা বলে উল্লেখ করেছেন। অন্য এক এমপি কেরি ম্যাকার্থি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতি আছে। কিন্তু যে কথা বলা প্রয়োজন, তা হচ্ছে দেশটিতে গণতন্ত্র প্রয়োজন। প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে ক্ষমতার পালাবদলের ব্যবস্থা। এর কোনো বিকল্প নেই।’
বৃটিশ পার্লামেন্টের এমপিদের গায়ে পড়ে এসব কথা বলার উদ্দেশ্যটা কি?
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তারা খুবই উদ্বিগ্ন।
আমরা তো তাদের রাজনীতির ব্যাপারে গায়ে পড়ে কোনো পরামর্শ দিতে যাই না।
চাচা! বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বিবদমান দুটি দলের রাজনৈতিক উত্তেজনা যখন বৃটিশ পার্লামেন্টের সামনে উত্তাপ ছড়ায় তখন তারা নীরব থাকবেন কি করে? পৃথিবীতে বাংলাদেশ সম্ভবত একমাত্র দেশ যার রাজনৈতিক দলের বৈদেশিক শাখা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বৃটিশ কনজারভেটিভ পার্টি বা লেবারপার্টির সমর্থকদের কোন সংগঠন বা অফিস নেই। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈদেশিক শাখা আছে, বাংলাদেশে তেমন ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির কোন শাখা সংগঠন নেই।
এতে তুমি কি বোঝাতে চাও? এতে কি প্রমাণিত হয় না যে, বাংলাদেশের রাজনীতি চর্চা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে?
আমি বাংলাদেশের রাজনীতির নষ্ট চরিত্রের বিষয়টা মাননীয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর উক্তি দিয়ে বোঝাতে চাই।
তিনি কি রাজনীতি সম্পর্কে কোন নেতিবাচক উক্তি করেছেন?
না। তা করেননি। তবে তিনি সম্প্রতি একটি সত্য কথা বলেছেন।
কি সেই সত্য কথা?
ওবায়দুল কাদের সাহেব বলেছেন, ‘রাজনৈতিক কারণেই রাস্তা ও ফুটপাথ দখলমুক্ত করা যায় না।’
এতো খুবই সত্য কথা। চাচা বললেন।
কথাটা চিন্তা করে দেখার মতো। সম্প্রতি দেশের একটি প্রধান পত্রিকা এর সম্পাদকীয়তে বলেছে: ‘কথা সত্য। কিন্তু তিনি কোন রাজনীতির কথা বলেছেন? যে রাজনীতির তিনি একজন নেতা এবং যে রাজনীতি তাকে মন্ত্রী করেছে, সেই রাজনীতির কাছে তিনি এত অসহায় হলে চলবে কেন?’ পত্রিকাটি আরো লিখেছে: ‘সঠিকভাবেই সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেছেন, রাস্তা দখলমুক্ত করতে না পারলে ষোল লেন করেও যানজট দূর করা যাবে না। দখলদারেরা ক্ষমতাবান। কিন্তু তারা কি মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবান?’
এসব কথা বলে তুমি কি বোঝাতে চাচ্ছ?
চাচা! আমরা এক অর্থে রাজনীতির রাহুগ্রাসে পতিত হয়েছি। দেশের স্বাধীনতাসহ আমাদের রাজনীতিবিদদের বিশাল অর্জন রয়েছে, একথা যেমন সত্য, তেমনি রাজনীতির দোহাই দিয়ে আমাদের জনগণকে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
তুমি কি বুঝতে পারছ, তুমি কি বলছ?
আমি না বুঝে কোন কথা বলছি না। মাননীয় অর্থমন্ত্রী যখন বলেন, শেয়ার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয়া যাবে না, কারণ তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, এরও অলক্ষ্যে রয়েছে রাজনীতি। ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে যখন কোন ব্যবস্থা নেয়া যায় না, তখনও বোঝা যায় এর পেছনে রাজনীতির স্বার্থ জড়িত। এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধে হামলাকারী আওয়ামী ক্যাডারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে গেলে সেখানেও রাজনৈতিক স্বার্থ এসে বিচারের পথ রোধ করে দাঁড়ায়। ঢাকার দুজন মেয়রই ভেবেছিলেন, তারা নগরবাসীকে একটা জঞ্জালমুক্ত আধুনিক ঢাকা শহর উপহার দেবেন। কিন্তু তাদের নির্দেশে বিলবোর্ড সরানোই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি জমি দখল করে নিচ্ছে, সেখানেও দখলকারীর পরিচয় তিনি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিক। সুতরাং দখলদারিত্ব তার অধিকার।
এসব বলে তুমি কি বোঝাতে চাইছ?
রাজনীতির নামে এসব অপকর্ম যারা করে, আমরা তাদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
তোমার কথাবার্তা কি বিরাজনীতিকরণের হোতাদের উসকে দেবে না?
আমি কখনও বিরাজনীতিকরণের পক্ষে নই, তা আপনিও জানেন। আমি মনে করি, রাজনীতি সর্বদা সুস্থধারায় প্রবাহিত হওয়া উচিত। আমি বললাম।
আমাদের আলোচনার এই পর্যায়ে চাচি ঘরে ঢুকলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, খুব সরগরম মনে হচ্ছে। আজকের আলোচনা কি নিয়ে?
রাজনীতি। আমি বললাম, রাজনীতি আমাদের দিয়েছে অনেক, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে কম নয়।
এজন্য রাজনীতি দায়ী নয়, দায়ী রাজনীতিকের আবরণে যারা অপকর্ম করছে, তারা। চাচি বললেন।
চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন, তোমরা রাজনীতির অর্জনগুলো দেখছ না।
কি অর্জন? চাচির প্রশ্ন।
বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত চুক্তি কি একটা অর্জন নয়?
সেটা অবশ্যই অর্জন। আমি তা খাটো করে দেখছি না। কিন্তু ট্রানজিট? চাচি আবার প্রশ্ন করলেন।
সেটাও একটা বড় অর্জন।
চাচি ঘরের তাক থেকে একটা পত্রিকা হাতে তুলে নিয়ে বললেন, তুমি কি পত্রিকা পড়া বাদ দিয়েছ?
কেন?
পত্রিকার পাতা মেলে ধরে চাচি জানালেন, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘প্রকৃতপক্ষে ট্রানজিটের কারণে বাংলাদেশের কোন লাভ হবে না। ট্রানজিটের মাশুল বা অবকাঠামো উন্নয়নে ভারত কি দেবে সে বিষয়ে কোন চুক্তি বা নীতিমালা হয়নি। পুরো বিষয়টি নিয়ে সরকারের কোন পরিকল্পনা ছিল না। যে কারণে ইতিমধ্যেই ভারত মাশুল ছাড়াই চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার শুরু করেছে।’
এসবই হচ্ছে ভারতবিরোধী কথা।
তা হবে কেন? এসব হচ্ছে বাংলাদেশের স্বার্থের কথা। আমি জানালাম।
তোমরা দেখছি নরেন্দ্র মোদির সফরের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের সাফল্য খাটো করতে চাও। চাচার বক্তব্য।
আমরা একজন ভারতীয় সাংবাদিকের মতামতের ভিত্তিতে নরেন্দ্র মোদির সফরের তাৎপর্য তুলে ধরতে চাই। বলে চাচি আরেকটা পত্রিকার পাতা মেলে ধরলেন।
কে তিনি? চাচার জিজ্ঞাসা।
কুলদীপ নায়ার। তিনি বলেছেন, ‘ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরটি হয়েছে অসময়ে। দেখে মনে হয়েছিল তিনি যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পড়তি ইমেজ ঠেকাতে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে কেবল ভারতবিরোধী অনুভূতিকেই আরও তীব্রতর করে তুলেছেন। কেননা, নয়াদিল্লিকে নিরপেক্ষ হিসাবে মনে হয়নি। আমি জানিনা কেন এবং কতদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ন শাসনকে সমর্থন দিয়ে যেতে হবে আমাদের’।
কি আশ্চর্য! চাচা সবিস্ময়ে উচ্চারণ করলেন।
আশ্চর্যের কিছু নেই। চাচি জানালেন, ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কূটনীতিক কুলদীপ নায়ার আরও অনেক কঠোর ও কঠিন কথা বলেছেন। সেটা পড়ে নিও। বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত মনোভাবই তার লেখায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের মানুষ কখনোই ভারত বিদ্বেষী নয়। চাচা উচ্চকণ্ঠে জানালেন।
বাংলাদেশের মানুষ খালেদা জিয়াও নয় যে, অবস্থান পরিবর্তন করে ভারত প্রেমের কথা ঘোষণা করবে। তবে আমরা সমতা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে আগ্রহী।
তাহলে বাংলাদেশের মানুষের রাজনীতিটা কি?
আমরা বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশপ্রেমী। দলীয় রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বেরিয়ে আমরা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বুঝে নিতে চাই। এটাই বাংলাদেশীদের রাজনীতি। চাচি মৃদুকণ্ঠে বললেন।
Saturday, June 20, 2015
হাঁ-বাজেট না-বাজেট by মাহবুব তালুকদার
বললাম, আমি অর্থনীতিবিদ নই যে, বাজেট সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মতো মতামত দিতে পারবো। তবে বাজেট সম্পর্কে আমার নিজস্ব কিছু প্রতিক্রিয়া আছে।
কী রকম? চাচা জানতে চাইলেন।
চাচা! এবারের বাজেট হচ্ছে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী বাজেট। মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিজেই একজন ব্যতিক্রমী মানুষ।
কী কারণে তাকে ব্যতিক্রমী বলছো?

তিনি একজন নমস্য ব্যক্তি। তার হাসিটি বড়ই প্রাণখোলা। ‘রাবিশ’, ‘স্টুপিড’ ইত্যাদি শব্দের সহজাত ব্যবহারের জন্য তিনি আলোচিত। তবে আমার মনে ও মননে তিনি আসন পেতেছেন সৃজনশীল চিন্তাভাবনার কারণে।
কি সেই সৃজনশীলতা?
ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে একবার তিনি বলেছিলেন, একদিন জোড় সংখ্যার গাড়ি এবং একদিন বেজোড় সংখ্যার গাড়ি চালালে সমস্যার সমাধান হবে। আরও একটা প্রস্তাব ছিল তার।

কি প্রস্তাব?
গাড়ি রাস্তায় চলতে হলে চারজনের কম যাত্রী থাকলে হবে না। একজন বা দুজন যাত্রী থাকলে গাড়ি চলবে না। তবে এ প্রস্তাবগুলো কার্যকর করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
কথাগুলো তার পক্ষে গেল, না বিপক্ষে গেল?
পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে আমি ভাবি না। তবে কথাগুলো খুবই মৌলিক চিন্তা বলে আমার মনে হয়েছে। এরকম ব্যতিক্রমী চিন্তার মানুষকে শ্রদ্ধা না করে পারা যায় না।

চাচা গম্ভীরমুখে বললেন, মুহিত স্যারের কথা থাক। তার প্রণীত বাজেটকে তুমি ব্যতিক্রমী বলছো কেন?
আমি জানালাম, সেই আদিকাল থেকে দেখে আসছি বাজেট পেশের আগের দিন সরকারি দল ব্যানার-প্ল্যাকার্ড তৈরি করে বাজেটের স্বপক্ষে অভিনন্দন জানিয়ে রাজপথে মিছিল করে। অন্যদিকে বিরোধী দল গণবিরোধী বাজেট পেশের নিন্দা জানিয়ে পাল্টা শোভাযাত্রা করে। এবারের বাজেট পেশের পর তেমন পক্ষে-বিপক্ষে শো-ডাউনের আয়োজন দেখা যায়নি। এ জন্য এটা ব্যতিক্রম।

এটাও আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর হলো না।
তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটা চমক। সেদিক থেকে এটা ব্যতিক্রম। এ ধরনের বাজেট তারাই দিতে পারেন, যারা মনে মনে কবি।
মুহিত স্যার মনে মনে কবি?
অবশ্যই। আমি তাকে মনেপ্রাণে কবি বলিনি। মনে মনে কবি বলেছি।
বাজেটের সঙ্গে কবির সম্পর্ক কি?

চাচা! কেবল কবিদের পক্ষেই কল্পনাবিলাসিতা সম্ভব। সে জন্যই অর্থমন্ত্রীদের কবি হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কল্পনাবিলাসী না হলে তারা দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখাবেন কি করে? তাছাড়া, নিজে স্বপ্ন না দেখলে দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখানো সম্ভব নয়। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এ গুণটি রয়েছে।
তোমার আজকের কথার মাথামুণ্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি অর্থমন্ত্রীর কথা বাদ দিয়ে বাজেট সম্পর্কে সরাসরি কথা বলো।
ঠিক আছে। আমি তাই-ই বলছি। আমার মতে কোন বাজেট প্রণয়নের আগে পূর্ববর্তী বছরের বাজেটের সাফল্য ও ব্যর্থতার পর্যালোচনা করা উচিত। এডিপি’র বাস্তবায়ন কতখানি সম্ভব হয়েছে, কতখানি হয়নি, কেন হয়নি, তার মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ছিল।

হুঁ। এটা একটা কথা হতে পারে।
এই মূল্যায়ন কেবল যে সরকার করবে, তা নয়। বিশেষভাবে বিরোধী দলের উচিত এ ব্যাপারে হোমওয়ার্ক করে দেশের মানুষের কাছে বাজেটের সমালোচনার দিকগুলো তুলে ধরা।
শুধু সমালোচনার কথা বলছো কেন? সাফল্যের কথা বলছো না কেন?
বিরোধী দল যদি সরকারের সাফল্যের গীত গাইতে চায়, তাহলে তা তারা করতে পারে। অবশ্য আমাদের দেশের সংসদের বিরোধী দল তো সরকারেরই অংশ।

কেন? আমাদের সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ তো বাজেটের সমালোচনাও করেছেন।
কিছু সমালোচনা না করলে বিরোধী দলের তকমাটা থাকে না, সম্ভবত সে কারণেই করেছেন।
তুমি বাজেটের আলোচনা করতে গিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছো।
বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু করদাতাদের সেই অর্থের কত অংশ দুর্নীতি ও অপচয়ে খরচ হবে, তা বলা হচ্ছে না।
এ কথার অর্থ কি?

দুর্নীতি থেকে রক্ষা পেতে বাজেটে কিছু অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল।
সে তো আছেই। দুদককে সরকার যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে।
আমি দুদকের কথা বলছি না। তাদের দুর্নীতিমুক্তির সার্টিফিকেট জারি নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলছি না।
তাহলে?
আমি ন্যায়পালের কথা বলতে চাই। আমাদের সংবিধানে ন্যায়পালের কথা আছে। কিন্তু মন্ত্রী-এমপিসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দুর্নীতির সুরক্ষা দিতে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
আশ্চর্য! মন্ত্রী-এমপি বা প্রভাবশালীদের সমালোচনা করা ছাড়া তোমার কি আর কোন কাজ নেই?
আছে। তবে চোখের সামনে যা দেখা যাচ্ছে, তার চিত্রটি প্রথমে তুলে ধরা উচিত।
ঠিক আছে। বলে যাও।

চাচা! সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ১৬ জন এমপি’র কর্মকাণ্ডে সরকার বিব্রত বলে খবর ছাপা হয়েছে। এরা খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, জমি দখলসহ নানা অপকর্মে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে পত্রিকাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পত্রিকায় তাদের নামও উল্লিখিত আছে। কিন্তু কেউ তা অস্বীকার বা প্রতিবাদ করেছেন বলে জানা যায়নি। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে উপর থেকে সবুজ সংকেত না মিললে কর্তৃপক্ষ নাকি এদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে না।
তুমি বাজেটের আলোচনা করতে গিয়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছো।
চাচা! বাজেটের আলোচনা তো কেবল কর আদায় আর খাতওয়ারি অর্থ বরাদ্দের বিষয় নয়। যারা রাজস্ব যোগাচ্ছেন, তাদের অর্থ লুটপাট হচ্ছে কিনা, কারা কিভাবে তা লুটপাট করছে, সে বিষয়টিও সারফেসে উঠে আসা দরকার। আমার মতে সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার মধ্যেই লুটপাটের প্রশ্রয় রয়েছে।
তুমি বড় কঠোর কথা বলছো।

হতে পারে। চোখের সামনে যা দেখছি, তাই বলছি। আমি জানালাম, একটা উদাহরণ দিতে চাই। অন্য একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান খবরে বলা হয়েছে: ‘টেন্ডারবাজি রোধে সরকার ই-টেন্ডারের ঘোষণা দিলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সারা দেশের টেন্ডার এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সরকারি দলের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হানাহানি।’ আরও বলা হয়েছে ‘এমপিদের রামরাজত্ব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি দলে অব্যাহত সংঘাত-সংঘর্ষ’ চলছে। ই-টেন্ডার চালু হলে টেন্ডারবাজি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তা করা সম্ভব হচ্ছে না।

তুমি বাজেট সম্পর্কে কথা বলো।
সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা তো বাজেটেরই অংশ। যে দেশে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেলে কারও টনক নড়ে না। ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না, সেখানে করদাতাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে রাজস্ব আদায়ের নৈতিক শক্তি থাকে কিনা, তা বিবেচনাযোগ্য।
তোমার আজ কি হয়েছে বলো তো? কিসব কথাবার্তা বলছো?
চাচা! দেশের আইন যেন কেবল সাধারণ মানুষের জন্য, প্রভাবশালীদের জন্য কোন আইন নেই। দুর্নীতির পেটেই যদি সিংহভাগ কর ঢুকে যায়, তাহলে বাজেটের আকার বাড়ানোর অর্থ দুর্নীতিরও আকার বাড়ানো। ক’দিন আগে ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ অর্থাৎ টিআইবি দাবি করেছে প্রধানমন্ত্রী, কেবিনেট মন্ত্রী, উপদেষ্টা, আইনপ্রণেতা, বিচারক, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করে তা নিয়মিতভাবে আপডেট করা হোক। এটা করতে অসুবিধা কি?

এর সঙ্গে বাজেটের সম্পর্ক কি?
আছে। টিআইবি উল্লিখিত মাননীয় ব্যক্তিবর্গ নিয়মিত কর দেন কিনা, কতটা কর দেন, তাদের সম্পদ কি হারে বাড়ে, তা দেশবাসীর জানা প্রয়োজন। কিছুদিন আগে একজন এমপি বলেছেন, ‘ক্ষমতায় থাকলে সম্পদ তো বাড়বেই।’
টিআইবি’র কথা আর বলো না। ওরা সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
বিএনপি আমলেও টিআইবি’র বিরুদ্ধে একই অভিযোগ ছিল। ঐ সময়ে এ জন্য ডক্টর মোজাফ্ফর আহমদকে কম নিগ্রহ পোহাতে হয়নি। তার মানে টিআইবি এখন ঠিক লাইনেই আছে।

তুমি বাজেটের বিষয়ে বলো। বাজেটের ব্যাপারে তোমার কোন সুপারিশ আছে কি?
হ্যাঁ। আমার কমপক্ষে দুটি সুপারিশ আছে।
কী, কী, বলো।
প্রথমটি হলো, বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতিমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থাপনা। এটি না করা গেলে ব্যাপক রাজস্ব আদায় করা হবে কোন মুখে? মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টেও বলা হয়েছে: ‘রাজস্ব আদায়ে ন্যূনতম শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ’।
চাচা সরোষে বললেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় নিয়ে কথা বলার তারা কে? যুক্তরাষ্ট্রকে এই অধিকার কে দিয়েছে?

এই অধিকার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। আমি বললাম, যেসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সাহায্য দিয়ে থাকে, তাদের ব্যাপারে মার্কিনিরা জানতে চায় তাদের ট্যাক্সের টাকা কোথায় কিভাবে খরচ হচ্ছে। যথাযথভাবে তাদের ট্যাক্সের টাকা ব্যয় হচ্ছে কিনা। এ সম্পর্কিত রিপোর্টে রাজস্ব খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ মার্কিন সাহায্য না নিলে তারা এই খবরদারি করতে পারতো না।
চাচা চিন্তিতমুখে বললেন, হুঁ। বুঝলাম। তোমার আরেকটি সুপারিশ কি?
গণতন্ত্রের সংকট নিরসন করা। এটা করা হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া জিডিপির টার্গেট সাত শতাংশ বা যা-কিছুই ধরা হোক না কেন, তাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। আমি জানালাম।
Monday, June 1, 2015
মা বনাম জা by মাহবুব তালুকদার
জাফর ইকবালকে মাননীয় সংসদ সদস্যের চাবুক দিয়ে পেটাতে চাওয়ার কারণ আপাতদৃষ্টিতে খুবই যৌক্তিক। পত্রিকায় লেখা হয়েছে- ‘জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে মাহমুদ-উস সামাদের অসন্তোষ তার ‘সিলেট বিদ্বেষী’ মনোভাবের কারণে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, জাফর ইকবালের কারণেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলেটের শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারে না। তাদের আটকাতে নানা আইনকানুন তৈরি করে নেন জাফর ইকবাল।’ এহেন অভিযোগ যে অত্যন্ত গুরুতর তাতে সন্দেহ নেই। আমার মনে হয়, সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল সিলেটের শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারবে- এমন বিধিবিধান করে নিলে ল্যাঠা চুকে যায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়ে জাফর ইকবালের আইনকানুন তৈরির জারিজুরি বা তার কোনো অপকৌশল আর খাটবে না।
দ্বিতীয়ত, জাফর ইকবাল কে- এই প্রশ্নের জবাব দান খুবই সহজ। তিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং তার একটি ডক্টরেট ডিগ্রি আছে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং অর্ধশতাধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য শিক্ষকের ডক্টরেট ডিগ্রি আছে। সে হিসেবে তিনি বিশেষ কেউ নন। অবশ্য তিনি একজন লেখক। লেখকদের পদাধিকার বলতে কিছু নেই। তারা কোনো প্রটোকলের মধ্যে পড়েন না। এমতাবস্থায় একজন প্রটোকলবিহীন শিক্ষককে সঙ্গত কারণ ব্যতিরেকে অভিযুক্ত করা হয়নি। তিনি যদি তেমন কেউ হতেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে অ্যাকশনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হতো কি না জানি না।
জাফর ইকবাল আসলে একজন ছদ্ম-সিলেটপ্রেমী। ছদ্ম-সিলেটপ্রেমী ও সিলেট বিদ্বেষীর মধ্যে মূলত কোনো পার্থক্য নেই। ছদ্ম-সিলেটপ্রেমীরা সিলেটের প্রেমের ভান করেন কিন্তু সিলেটের স্বার্থ রক্ষায় তারা আগুয়ান হন না। জাফর ইকবাল সম্পর্কে পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘তার জন্ম এই সিলেটেই। এখানকার সিলেট নগরীর ব্যস্ততম এলাকা মিরাবাজারে তার শৈশব কেটেছে। বাল্যশিক্ষাও এখানে। তার স্ত্রী ড. ইয়াসমীন হকের রক্তেও রয়েছে সিলেটের উত্তরাধিকার। ইয়াসমীন হকের জন্ম সিলেটে না হলেও তার নানাবাড়ি এখানেই। সব মিলিয়ে জাফর ইকবালের ঘরজুড়ে সিলেটের মাটির ঘ্রাণ। আর তাই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বিলাসী জীবনের মোহমায়া ছেড়ে তিনি শিক্ষক হিসেবে ফিরে এসেছেন তার জন্মের শহর সিলেটেই।’ পত্রিকায় যাই লেখা হোক না কেন, জাফর ইকবাল যে সিলেটে জন্মেও সিলেট-বিদ্বেষী হয়েছেন, এটাই সত্য কথা। এক্ষেত্রে তার দুটো অপশন ছিল। এক. সিলেটে না জন্মানো। দুই. সিলেটে জন্মগ্রহণ যেহেতু তার ইচ্ছাধীন ছিল না সেহেতু তার উচিত ছিল সিলেটপ্রেমী হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ না করে সত্যিকার সিলেটপ্রেমিক হয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়টিকে মাহমদু-উস সামাদের চিন্তা ও আদর্শের আদলে গড়ে তোলায় হাত সম্প্রসারিত করা।
উপরোক্ত ‘আদর্শ’ কথাটার উল্লেখ করে আমি আরেকটা বিপদ ডেকে আনলাম। ৯ই মে’র বক্তৃতায় মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী স্পষ্ট করেছেন জাফর ইকবালের আদর্শও তার পছন্দ নয়। সেদিন জাফর ইকবাল প্রসঙ্গে বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘এই লেফটিস্টরা আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে।’ মাননীয় সংসদ সদস্যদের এই উক্তি প্রণিধানযোগ্য। আমরা লক্ষ্য করেছি, আওয়ামী লীগের মূলধারার রাজনীতিবিদরা প্রায়ই এহেন আক্ষেপ করে থাকেন। এই আক্ষেপের সঙ্গত কারণও আছে। মধ্যপন্থি মূল আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে বাম ঘরানা থেকে আসা অনেককে মন্ত্রিত্ব দেয়া হচ্ছে, মূল্যায়ন করা হচ্ছে, এটা মেনে নেয়া খুবই কষ্টকর। অন্যদিকে অনেকে বলে থাকেন, বর্তমান সরকার মার্কিনিদের পরিহার করে রাশিয়ার দিকে দিনে দিনে ঝুঁকে পড়ছে, এটাও তাদের দুঃখের কারণ। তাই লেফটিস্টদের সম্পর্কে এই আক্ষেপ চিরন্তন। জাফর ইকবালের সঙ্গে আমার পরিচয় থাকলে তাকে বলতাম, বামপথ পরিত্যাগ করে আপনি ডান দিকে মোচড় দিন। আখেরে যদি আপনি বেত্রাঘাত বা চাবুকের আঘাত এড়াতে চান।
মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরীকে আমি সাধারণ একজন সংসদ সদস্য মনে করি না। তিনি আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ দলের জনপ্রতিনিধি। জাতীয় সংসদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারবিল উত্থাপন করে তিনি দেশজুড়ে আলোচিত হন। অন্যদিকে জাফর ইকবালকে কোনক্রমেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ব্যক্তি বলে আখ্যা প্রদান করা সম্ভব নয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের কিশোর উপন্যাস ‘আমার বন্ধু রাশেদ’-এর লেখক। বইটি দেশব্যাপী স্কুলগুলোতে পড়ানো হয়। এমতাবস্থায় মাননীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরীর সামনে দুটো অপশন আছে। এক. বেত্রাঘাতযোগ্য একজন লেখকের বই স্কুলে পড়ানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বইটিকে বাতিল করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো। দুই. তিনি নিজেই ওই ধরনের একটি বই লিখে পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।
মাননীয় সংসদ সদস্যের আরেকটি বিষয় জানা আছে কি না জানি না। মুক্তিযুদ্ধের সময় জাফর ইকবালের পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদ পিরোজপুরের তৎকালীন এসডিপিও থাকাকালে শহীদ হন। পিতার মৃত্যুর পর এই পরিবারটিকে নানারূপ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। এ জন্য আমার মনে হয়, জাফর ইকবালকে বেত্রাঘাতের সিদ্ধান্ত প্রকাশের ক্ষেত্রে মাননীয় সংসদ সদস্যের আরও চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন ছিল।
এবার তৃতীয় বিষয় প্রসঙ্গে আসি। ক্ষমতা থাকলে তিনি জাফর ইকবালকে চাবুক দিয়ে পেটাতেন বলেছেন। ‘ক্ষমতা থাকলে’ কথাটার মধ্যে কিছুটা আক্ষেপ ও হতাশা পরিলক্ষিত হয়েছে। আমার মতে, মাননীয় সংসদ সদস্যগণের ক্ষমতা অবারিত হওয়া উচিত। তাদের ক্ষমতার যদি কিছু ঘাটতি থাকে, তাহলে অন্যত্র যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সংসদই সদস্যদের ক্ষমতা বর্ধিতকরণ সম্পর্কে ব্যবস্থা নিতে পারে। সংসদ সদস্যগণ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে আফসোস করবেন, এটা কারও কাম্য নয়। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। এক সময়ে শিক্ষকদের বেত দ্বারা ছাত্র পেটানোর অধিকার ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক আদেশবলে ওই অধিকার, এমনকি ছাত্রদের মারধর করার অধিকারও খর্ব করে। কিন্তু শিক্ষকদের পেটানোর ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো মানা নেই। তাছাড়া, চাবুক দিয়ে শিক্ষক পেটানোর ব্যাপারে কোনো নিষেধজ্ঞা তো নেইই। চাবুক জিনিসটা সাধারণত ফিল্মে দেখা যায়, জমিদার বা মালিকদের হাতে থাকে। আজকাল বাস্তবে চাবুক খুঁজে পাওয়া ভার।
চতুর্থ বিষয় হচ্ছে, মানুষ পেটানোর অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হরহামেশাই নির্বিচারে জনগণের ওপর এই অধিকার প্রয়োগ করে থাকে। এটা হচ্ছে তাদের নিম্নতম অধিকার। আজকাল তারা পায়ে গুলি করা ও ক্রসফায়ার পর্যন্ত তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়ে নিয়েছে। বিস্ময়ের বিষয় এই, একজন সংসদ সদস্যের এই সামান্য অধিকারটুকু পর্যন্ত নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কাউকে পেটানোর জন্য ইউনিফরম পরতে হবে কেন? যদিও আজকাল অনেক জনপ্রতিনিধি জনগণকে কিংবা ব্যক্তি বিশেষকে মারধর করার অধিকার প্রয়োগ করে থাকেন। সেটা হচ্ছে তাদের ইনফরমাল অ্যাকশন। এ কাজটির ফরমাল রূপদান করা এবং বিধিবদ্ধভাবে তা প্রয়োগ করার ব্যবস্থা থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ইউনিফরম না পরেও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সাদা পোশাকে কাউকে চাবুক দিয়ে পেটানোর অধিকার আইন দ্বারা সংরক্ষিত রাখা উচিত।
সর্বশেষ বিষয়টি হচ্ছে, একজন আইনপ্রণেতা কেন প্রয়োজনের ক্ষেত্রে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারবেন না? যিনি আইন তৈরি করেন, কেন সেই আইন ক্ষেত্রবিশেষে নিজে প্রয়োগ করতে পারবেন না? এর মধ্যে এক ধরনের পরস্পর বিরোধিতা আছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়। আমি যে আইন বানাই, সেটা অন্যে ব্যবহার করতে পারবে, আমি পারবো না কেন? ময়রা মিষ্টি প্রস্তুত করে, কিন্তু সেই মিষ্টি সে নিজে সদ্ব্যবহার করলে অসুবিধা কোথায়? তাছাড়া ‘ডকট্রিন অব নেসিসিটি’ বলে একটা কথা আছে। সেই প্রয়োজন পরিপূণের জন্য একজন আইনপ্রণেতাকে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার অধিকার দিতে হবে।
তবে মাহমুদ-উস সামাদর বক্তব্যের যে প্রতিবাদ হয়নি, এমন নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন। দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ তার জীবনের সর্বশেষ স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘মেধা-গুণ-বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কোনো দিক দিয়ে যে অধ্যাপকের হাঁটুর কাছে বসার যোগ্যতা নেই তারাই আবার ওই অধ্যাপককে চাবুক মারার কথা বলে। কলিকালের শিক্ষা একেই বলে।’ নিহত ব্লগার অনন্ত কলিকালের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাখ্যা করার অবকাশ পাননি। তিনিও যে কলিকালের শিক্ষার যূপকাষ্ঠে বলি হয়েছেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বেঁচে থাকলে এসব অর্বাচীনসুলভ স্ট্যাটাস দেয়ার জন্য তার কি পরিণতি হতো কে জানে?
পরিশেষে জাফর ইকবালকে বলি, আপনি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেও মনেপ্রাণে সিলেটি হতে পারেননি। মনেপ্রাণে সিলেটি হতে না পারলে সিলেটি ছাত্র ভর্তিসহ অন্যান্য বিষয়ে সিলেটিদের স্বার্থে আঘাত করলে, আপনাকে বেত্রাঘাত বা চাবুক দ্বারা পেটানো থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। মাননীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী ‘ক্ষমতা থাকলে’ বিষয়টি অনুধাবন করে আপনাকে ছাড় দিয়েছেন। এটা তার মহানুভবতা। কিন্তু ভবিষ্যতে এমন কারও পাল্লায় পড়ে যাবেন, যিনি ক্ষমতা আছে কি নেই, সে বিষয়ে চিন্তা করবেন না। তাই বলি, আপনি সুস্থ ও নিরাপদ থাকুন ডক্টর মুহম্মদ জাফর ইকবাল।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2388)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...





