Wednesday, October 29, 2014

রিপার মর্মান্তিক মৃত্যু : ধরা পড়েনি দুর্বৃত্তরা

রাজধানীর সোবাহানবাগে ছিনতাইকারীর হাতে রিকশারোহী নারীর মৃত্যুর দুই দিনেও পুলিশ দুর্বৃত্তদের সনাক্ত করতে পারেনি। পুলিশের দাবি দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারে সবরকম চেষ্টা চলছে। এদিকে আয়শা আক্তার রিপার মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা। শিশু সন্তান রাইসা বারবার তার মাকে খুঁজছে। ধানমন্ডি থানার ওসি নূরে আলম সিদ্দিক জানান, দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারে সব রকম চেষ্টা চলছে। এঘটনায় নিহতের ভাই মো: রবি বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। তিনি জানান, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নিহত রিপার বন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। নিহতের পরিবারের ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকায় তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।  দুর্বৃত্তদের তিনি চিনতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পোষ্টমর্টেম শেষে মঙ্গলবার রাতে রিপার লাশ দাফন করেছে পরিবার। এসময় নিহত রিপার মেয়ে রাইসা ও স্বামী মোহাম্মদ আউয়াল হোসেন শিমুলসহ পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
পুলিশ জানিয়েছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইব্রাহীম জানায়, গত ২৪ অক্টোবর রিপা ও ইব্রাহীম পান্থপথ থেকে শ্যমলী পরিবহনে করে রাত ১০ টায় বান্দরবন উদ্দেশ্যে রওনা হন। এরপর ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্নস্থানে ঘোরাফেরা করে সেদিনই রাতে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। মঙ্গলবার সকালে ঢাকার পান্থপথে গাড়ী থেকে নেমে রিকশায় করে রিপার বড় বোনের লালমাটিয়ায় ‘এ’ ব্লকের ৫/৬ নম্বর  বাসায় যাওয়ার পথে সোবাহানবাগ মসজিদের সামনে ছিনতাইকারীদের কবলে পরে প্রান হারান রিপা। ইব্রাহীম থানায় আটক থাকার সময় পুলিশকে জানায়, তার দুই ছেলে ও স্ত্রী রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ী মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদীখানে। বর্তমানে মোহাম্মদপুরে ২৩/ডি জাকির হোসেন রোডে স্ত্রী সন্তান নিয়ে বসবাস করেন ইব্রাহীম। তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পনীতে চাকরি করেন।
এদিকে রিপার বড় ভাই ও মামলার বাদী রবি জানান, ইব্রাহীমকে তারা চেনেন না। তবে ইব্রাহীম তার বোন রিপাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, রিপা বড় বোনের বাসায় থাকত। বান্দরবন যাওয়ার সময় বোনকে বলে গেছে, সে তার এক বান্ধবীর বিয়েতে গেছে। গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সোবাহানবাগ মসজিদের কাছে রাপা প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে মর্মান্তিকভাবে মারা যান আয়শা আক্তার রিপা। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বান্দরবন থেকে ঢাকা পৌঁছে পান্থপথের শ্যামলী বাস কাউন্টারে নামেন। সেখান থেকে বন্ধু ইব্রাহিমের সাথে রিকশায় করে লালমাটিয়ার বাসার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। রিকশাটি ধানমন্ডির সোবাহান মসজিদ সংলগ্ন রাপা প্লাজার সামনে পৌঁছামাত্র সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাস এসে রিকশার পাশে থামে। ওই গাড়ির ভেতর থেকে দুর্বৃত্তরা তার ব্যাগটি হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। রিপা নিজের ব্যাগটি রক্ষা করতে শক্ত করে তা ধরে রাখায় রিকশা থেকে নিচে পড়ে যান। এসময় দুর্বৃত্তদের চলন্ত গাড়ি তাকে কিছুদূর ঁেহচড়ে নিয়ে যায়। এক পর্যায় ব্যাগটি ছেড়ে দিয়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন রিপা। রিকশায় থাকা বন্ধু তাকে অচেতন অবস্থায় বাংলাদেশ মেডিকেলে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মায়ের কাছে রিহানির শেষ বার্তা- মাটির নিচে পচে শেষ হতে চাই না

‘আমি মাটির নিচে পচে শেষ হয়ে যেতে চাই না। চাই না আমার চোখ, হৃৎপিণ্ড ধূলিতে মিশে যাক। অনুনয় করছি, ফাঁসি হওয়ার পর যেন আমার চোখ, কিডনি, হৃৎপিণ্ড, হাড় বা অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যাদের শরীরে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন, তাদের উপহার হিসেবে দেওয়া হয়।’

এ শেষ ইচ্ছা খুনের দায়ে গত শনিবার ফাঁসি হওয়া ইরানি নারী ২৬ বছর বয়সী রিহানি জাবেরির। সাত বছর কারাগারে থাকার পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে রিহানি তাঁর মায়ের কাছে রেকর্ড করে শেষ বার্তা পাঠান। সেখানেই আছে মানবসেবায় তাঁর অঙ্গদানের ইচ্ছার কথা। ইরানের অধিকারকর্মীরা এই বার্তা বিভিন্নভাবে বিলি করছেন।
ইরানের গোয়েন্দাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক একজন কর্মকর্তাকে হত্যার দায়ে রিহানির ফাঁসি দেওয়া হয়। রিহানি বলেছেন, ধর্ষণের চেষ্টা করায় ওই ব্যক্তিকে ছুরি মেরেছিলেন তিনি। অন্য কেউ তাঁকে হত্যা করেছে। কিন্তু তদন্তে সেই ব্যক্তির প্রতি কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে সম্প্রতি প্রকাশিত মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়েছে, ছুরির আঘাত ছিল নিহত কর্মকর্তার পিঠে, যা রিহানির দাবির ওপর সংশয়ের ছায়া ফেলেছে।
শেষ বার্তায় রিহানি মাকে বলেছেন, ‘রাতের পর রাত ভেবেছি, আমাকে হত্যা করে শহরের এক কোনায় ফেলে দেওয়া হবে। কয়েক দিন পর পুলিশ লাশ ‘উদ্ধার’ করে মর্গে পাঠাবে। তোমাকে ডেকে পাঠাবে লাশ শনাক্ত করতে। সেখানে তুমি জানতে পারবে, তোমার মেয়ে ধর্ষণের শিকারও হয়েছে। কিন্তু পুলিশ অপরাধীদের খুঁজে পাবে না। কয়েক বছর সেই যন্ত্রণা বয়ে বেড়িয়ে তুমি একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।’
মায়ের উদ্দেশে রিহানি বলেন, ‘কিন্তু গল্পটা তেমন হয়নি। তারা আমাকে শহরের কোনো কোণে ফেলে দেয়নি। এভিন কারাগারে কবরের মতো নিঃসঙ্গ ওয়ার্ডে পাঠিয়েছে। সবকিছু তুমি ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দাও, কোথাও অভিযোগ কোরো না। তুমি তো জানো মৃত্যুই সবকিছুর শেষ নয়।’
বিচার নিয়েও অসন্তুষ্টির কথা মাকে জানিয়েছেন রিহানি। বলেছেন, তাঁর প্রতি যে অবিচার করা হয়েছে, তার বিচার একদিন হবে। সেটা হবে ‘সৃষ্টিকর্তার আদালতে’।
মায়ের উদ্দেশে সবশেষে বলেছেন রিহানি, ‘পরপারে শুধু তুমি আর আমি হব অভিযোগকারী। বাকিরা অভিযুক্ত। দেখি, সৃষ্টিকর্তা কী চান। মা, আমি তোমাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জড়িয়ে ধরে থাকতে চাই। তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ সূত্র: টেলিগ্রাফ।

লতিফ উপাখ্যান ও মন্ত্রী হওয়ার শর্ত by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

সম্প্রতি সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর কিছু লাগামহীন মন্তব্য সরকারকে কীভাবে বেকায়দায় ফেলেছে এবং দেশবাসীকে কীভাবে বিক্ষুব্ধ করেছে, তা পাঠকের অজানা নয়। লাগামহীন মন্তব্যের জন্য লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা ও দল থেকে বরখাস্ত করাই কি যথেষ্ট? গত কয়েক বছর দুই মেয়াদে মন্ত্রী থাকার সুবাদে সিদ্দিকী দুই মন্ত্রণালয়ে কী পরিমাণ দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তা-ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হতেন, তাহলে লতিফ সিদ্দিকী সম্পর্কে বিভিন্ন দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশের সূত্র ধরে তাঁর বিরুদ্ধে আগেই তদন্ত করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি বিভিন্ন সংবাদপত্রের করা প্রতিবেদন আমলে আনেননি। কিন্তু হজ ও তাবলিগ সম্পর্কে লতিফ সিদ্দিকীর মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, লতিফ সিদ্দিকীর দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সরকারের কাছে কোনো বড় অপরাধ ছিল না। মন্ত্রীরা তো এ রকম করতেই পারেন! দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো বড় মাপের অপরাধ নয়। অনেকে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিদেশে চলে যাওয়ার সুযোগ নিচ্ছেন। বিদেশে ‘সেকেন্ড হোম’ বা ‘বেগমগঞ্জ’ হওয়ার পর দুই বড় দলের মন্ত্রী-সাংসদেরা দুর্নীতি নিয়ে তেমন ভয় পান না।
সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংবাদপত্রে তাঁর দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার (দুই মেয়াদে) সম্পর্কে যে প্রতিবেদনগুলো প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তদন্তে যে ৪৫টি অভিযোগ পাওয়া গেছে (সূত্র: প্রথম আলো), এগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কী ভাবছেন, তা আমরা জানি না। প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে অন্তত তিনটি আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। এর আলোকে তিনি শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছেন। কিন্তু লতিফ সিদ্দিকীর দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর মুখে কিছু শুনিনি। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্তের ব্যবস্থা করবেন। এ ব্যাপারে দুদকও যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে সবাই প্রত্যাশা করে। লতিফ সিদ্দিকী যদি তদন্তে ও আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাহলে ভিন্ন কথা। কারও কিছু বলার থাকতে পারে না।
এ ধরনের সমস্যার সমাধান করতে হলে আরও গভীরে যেতে হবে। আমাদের সংবিধানের অনেক ধারা ত্রুটিপূর্ণ। ১৯৭২ সালের বাস্তবতায় এই সংবিধান প্রণীত হয়েছিল। এখন ২০১৪ সাল। এখন সংবিধানের অনেক ধারা কার্যকর নয়, বাস্তবসম্মতও নয়। কাজেই এই সংবিধান আগাগোড়া পর্যালোচনার জন্য একটা ‘কমিশন’ গঠন করা দরকার। এভাবে কাজ না করলে আমরা বর্তমান সংবিধানের নানা দুর্বল ধারার জন্য বারবার পিছিয়ে যাব। কারণ নির্বাচন, সরকার গঠন, সরকার পরিচালনা ও অন্যান্য প্রধান সব সরকারি কাজ এই সংবিধানের আলোকেই পরিচালিত হচ্ছে। এই সংবিধানের জন্যই ভোটারবিহীন নির্বাচনে ‘জয়ী’ হয়ে সরকার গঠন করা যায়। প্রধানমন্ত্রী পদটি মোগল সম্রাটের চেয়েও শক্তিধর বলে মন্তব্য করেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরই একজন সাবেক উপদেষ্টা। এ রকম বহু দুর্বলতায় আক্রান্ত আমাদের পবিত্র সংবিধান।
সংবিধানের একটা দুর্বলতা নিয়েই আলোচনা করব। সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে এককভাবে মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষমতা দেওয়া ঠিক হয়নি। এই একটি ধারা দিয়েই ‘প্রধানমন্ত্রী’ অতি ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছেন। (সব আমলে) তিনি, তাঁর দল ও অন্যান্য নেতা থেকেও বড় হয়ে উঠেছেন। তিনি যাঁকে-তাঁকে মন্ত্রী করতে পারেন। মন্ত্রিত্ব দেশের খুব গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা শুধু একজন নির্বাচিত ব্যক্তিকে দেওয়া ঠিক হয়নি। যাঁকে-তাঁকে মন্ত্রী করলে কী হয়, তার পরিণাম কি আমরা এখন দেখছি না? সংবিধানের ধারাটি যদি এমন হতো, ‘সংসদনেতা তাঁর সংসদীয় দল ও দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও সম্মতির মাধ্যমে মন্ত্রিসভা গঠন করবেন।’ তাহলে মন্ত্রিসভা গঠনের পদ্ধতি অনেক গণতান্ত্রিক হতো। এক ব্যক্তির ইচ্ছায় হতো না। দলের গঠনতন্ত্রেও মন্ত্রিসভা গঠনের কিছু দিকনির্দেশনা থাকতে পারে। প্রধানমন্ত্রীকে তা মানতে হতো।
দ্বিতীয় দুর্বলতা, মন্ত্রিসভার প্রধান অংশ সাংসদদের মধ্য থেকে নিতে হবে। এটাও ঠিক নয়। তাঁরা নির্বাচনে জয়লাভ করে সাংসদ হয়েছেন আইন প্রণয়নের জন্য, কোনো মন্ত্রণালয় পরিচালনার জন্য নয়। মন্ত্রণালয় পরিচালনা সার্বক্ষণিক কাজ এবং অনেক বড় কাজ। এবং বিশেষজ্ঞের কাজ। সরকারি দলের সাংসদদের মধ্যে মন্ত্রী হওয়ার মতো কিছু যোগ্য লোক থাকতেও পারেন। প্রধানমন্ত্রী ও দল নিশ্চয় তাঁদের মন্ত্রী করবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যেন সাংসদদের মন্ত্রী করতে বাধ্য না হন। পরিবার, বংশ, জনপ্রিয়তা, উত্তরাধিকার, দলের প্রতীক, ধনী লোক ইত্যাদি কারণে মানুষ সাংসদ নির্বাচিত হন। শিক্ষা, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, ব্যক্তিগত গুণাবলি ও দক্ষতার জন্য খুব কম ব্যক্তিই নির্বাচিত হন। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য বহু ফ্যাক্টর কাজ করে। নির্বাচনী প্রতীকের জোরে কলাগাছও নির্বাচিত হতে পারে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। দলের মধ্যে শিক্ষা, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, সততা ও অভিজ্ঞতায় যাঁরা শ্রেষ্ঠ, তাঁদেরই মন্ত্রী করা উচিত। দলের অন্য নেতাদের নানাভাবে পুরস্কৃত করা যেতে পারে। ‘মন্ত্রিত্ব’ যেন পুরস্কারের বিষয় না হয়। মন্ত্রিত্ব অনেক বড় কাজ। আমাদের বড় দুটি দল ‘মন্ত্রিত্বকে’ দুধ-ভাত করে ফেলেছে। এটা ঠিক নয়।
বিভিন্ন জেলা থেকে ‘মন্ত্রী’ নিতে হবে, এই ধারণাও ঠিক নয়। নির্বাচিত দল তাদের দলের প্রতি, আদর্শের প্রতি অনুগত সমাজের শিক্ষিত, সৎ, বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও মন্ত্রণালয়ে নেতৃত্বদানে সক্ষম ব্যক্তিদেরই মন্ত্রী করা উচিত। তাঁদের কেউ কেউ ঘটনাচক্রে সাংসদও হতে পারেন। কিন্তু সাংসদ বলেই তিনি মন্ত্রী হবেন, এমন যেন না হয়। যোগ্য, দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের মন্ত্রী করতে না পারলে কোনো সরকারই সুশাসন ও উন্নয়নের নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের আমলারা তাঁদের হীন স্বার্থে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে পারেন। মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তাঁর দল ও সংসদীয় দলের সঙ্গে অবশ্যই প্রকাশ্যে মিটিং করবেন। শুধু আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে নেপথ্যে আলোচনা করে মন্ত্রিসভা গঠন করলে তার ফল কী হয়, তা তো আমরা দেখেছি।
অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের ও সংসদীয় গণতন্ত্রের উদাহরণ টেনে এই প্রস্তাব খারিজ করা যাবে না। কারণ, আমাদের দূষিত রাজনীতি, প্রশাসনে দলীয়করণ, পরিবারতন্ত্র, দুর্বল নির্বাচন কমিশন, ভোটের দুর্নীতি, টাকার খেলা, ভোটে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, ভোটে মাস্তানি, ভোট জালিয়াতি ইত্যাদি অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে তেমন দেখা যায় না। অন্তত বাংলাদেশের মতো দেখা যায় না। আমাদের দেশের বাস্তবতায় আমাদের সংবিধান হতে হবে। যুক্তরাজ্য বা ভারতের বাস্তবতায় আমাদের সংবিধান হলে প্রকৃত ফল আমরা পাব না।

মন্ত্রিসভায় এমন একটা সিদ্ধান্ত থাকা উচিত: কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বড় মাপের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একটি তদন্ত করবে। তদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সেই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। সেই মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। যদি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে ক্ষমতাসীন দল বা মন্ত্রী প্রেস কাউন্সিলে মামলা দেবেন। প্রেস কাউন্সিলের রায়ে সেই পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে এবং মন্ত্রীকে কোটি টাকার অঙ্কে মানহানির ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এভাবে কাজ করলে গণমাধ্যমে অসত্য প্রতিবেদন প্রকাশ বন্ধ হবে। আর সত্য প্রতিবেদনের জন্য মন্ত্রীর সাজা হবে এবং তিনি মন্ত্রিত্ব হারাবেন। তবে সব রকম তদন্তই তিন থেকে চার মাসের মধ্যে বাধ্যতামূলক সম্পন্ন করতে হবে।
লতিফ সিদ্দিকীর মতো একজন মন্ত্রী বরখাস্ত হওয়ায় শাসন পরিস্থিতির তেমন বড় পরিবর্তন হবে না। দেশে দুর্নীতি হ্রাসে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা পরিবর্তন, সরকারের কতগুলো সিদ্ধান্ত ও নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে এই নীতি ও সিদ্ধান্তের জাঁতাকলে সব দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী ও সাংসদ আটকে যান। এ রকম কিছু নীতি গ্রহণ করলে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতাও প্রমাণিত হবে। একজন দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীকে বরখাস্ত করা তেমন বড় ঘটনা নয়। যদিও সরকার এ ঘটনাকে বড় করে প্রচার করতে চাইবে। আশা করি পাঠক এতে বিভ্রান্ত হবেন না।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

সামষ্টিক অর্থনীতির নতুন কৌশল by জেফরি ডি. স্যাকস

আমি একজন সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ধারার দুটি ঘরানা থেকেই আমি বিচ্ছিন্ন: এক দল হচ্ছে নব্য কেইনসীয়পন্থী, যারা সমন্বিত চাহিদা বাড়ানোয় গুরুত্বারোপ করে; আরেক দল হচ্ছে সরবরাহপন্থী, যারা কর হ্রাসের ওপর জোর দেয়। কিন্তু এ দুই ঘরানার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও উচ্চ আয়ের অর্থনীতির গত কয়েক বছরের দুর্বল পারফরম্যান্স কাটানো সম্ভব হয়নি। সময় এসেছে, নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যার ভিত্তি হবে টেকসই ও বিনিয়োগসৃষ্ট প্রবৃদ্ধি। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সমাজের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। যে শ্রমিকেরা কাজ খুঁজছেন, তাঁদের অবশ্যই তা পেতে হবে, কারখানার পুঁজি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। আর পুঁজির যে অংশটা ভোগ না হয়ে বেঁচে গেছে, সেটা মানুষের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের লক্ষ্যে বিনিয়োগ হতে হবে।
এই তৃতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়েই নব্য কেইনসীয়পন্থী ও সরবরাহপন্থীরা রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের উচ্চ আয়ের দেশগুলো ভবিষ্যতের সর্বোত্তম ব্যবহারের লক্ষ্যে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারছে না। বিনিয়োগ করার মাধ্যম দুটি: অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে। দুনিয়া এ দুই ক্ষেত্রেই কমজোর হয়ে পড়েছে।
অভ্যন্তীরণ বিনিয়োগ নানাভাবেই হতে পারে: যন্ত্রপাতি ও ভবন, গৃহস্থালি কাজে বিনিয়োগ ও জনগণের জন্য সরকারি বিনিয়োগ (শিক্ষা, দক্ষতা), জ্ঞান (গবেষণা ও উন্নয়ন) ও অবকাঠামো (যাতায়াত, শক্তি, পানি ও জলবায়ু সহিষ্ণুতা)।
নব্য কেইনসীয় পন্থা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কোনোভাবেই বাড়াতে পারেনি। হ্যাঁ, এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, খরচ তো খরচই। নব্য কেইনসীয়পন্থীরা এভাবে গৃহায়ণে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে, তার জন্য সুদের হার অনেক কমানো হয়েছে। সুনিশ্চিত ভোক্তা ঋণের মাধ্যমে মোটরগাড়ি বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে তারা। আর স্বল্পমেয়াদি উদ্দীপনা কর্মসূচির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নযোগ্য অবকাঠামো প্রকল্পও তারা হাতে নিয়েছে। আর বিনিয়োগ ব্যয়ের কোনো নড়চড় না হলে তারা সুপারিশ করেছে, ‘অতিরিক্ত’ সঞ্চয় যেন ভোগে ব্যয় করা হয়।
অন্যদিকে, সরবরাহপন্থীরা ব্যক্তিগত (সরকারি নয়) বিনিয়োগ বাড়ানোর পক্ষপাতী, এর জন্য তারা কর হ্রাস ও নিয়ম শিথিল করার পক্ষে। তারা বিভিন্ন সময়েই এ কাজ করার চেষ্টা করেছে, সর্বশেষ জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের সময় তারা এ কাজ করার চেষ্টা করেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই শিথিলকরণের ফলে স্বল্প সময়ের জন্য গৃহায়ণে বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়েছিল। সেটা ব্যক্তিগত বিনিয়োগে কোনো টেকসই তেজিভাব আনতে পারেনি।
যদিও সরবরাহপন্থী ও নব্য কেইনসীয়পন্থীদের নীতি সাধারণত এক হয় না, তাদের উভয়ের নীতির ফলে এক অভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে: অধিকাংশ উচ্চ আয়ের দেশে জাতীয় আয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগ কমেছে। আইএমএফের তথ্য অনুসারে, এসব দেশের মোট বিনিয়োগ ১৯৯০ সালে ছিল জিডিপির ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ, আর ২০১৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ সালে বিনিয়োগ ব্যয় ছিল জিডিপির ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০১৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে। নিট হিসাব করলে দেখা যায়, এ হ্রাস আরও অনেক বেশি (পুঁজির অবমূল্যায়ন বাদ দিয়ে মোট বিনিয়োগ)।
কিন্তু এরা কেউই সমস্যার মূলে যায় না। আমাদের সমাজের জরুরি ভিত্তিতে আরও বিনিয়োগ দরকার। বিশেষত অতি মাত্রায় দূষণশীল, শক্তিঘন ও উচ্চ কার্বন সৃষ্টিকারী উৎপাদন ব্যবস্থাটির রূপান্তর দরকার, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করতে পারবে ও নিম্ন কার্বন নিঃসরণ করে এমন একটি উৎপাদনব্যবস্থা আমাদের প্রয়োজন। এরূপ বিনিয়োগ হতে গেলে সরকারি ও বেসরকারি খাত উভয়কেই এগিয়ে আসতে হবে।
এই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে সৌর ও বায়ুশক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যোগাযোগব্যবস্থায় বৈদ্যুতিক শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, সেটা বাস, ট্রেন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত গাড়ি পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই করতে হবে। শক্তিবান্ধব ভবন, নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বহনের জন্য গ্রিড বানাতে হবে।
কিন্তু যখন এই বিনিয়োগ করার সময়, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সরকারি খাতে একধরনের বিনিয়োগ স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। বাজেট ভারসাম্যের নামে সরকার বিনিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিকল্প বিদ্যুতে অধিক হারে বিনিয়োগ করতে পারে না। সরকারি নীতি অস্পষ্ট হলে তারা এ ঝুঁকি নিতে পারে না।
এই বিনিয়োগ পক্ষাঘাতগ্রস্ততার ব্যাপারটি বুঝতে সরবরাহপন্থী ও নব্য কেইনসীয়পন্থী উভয়ই ভুল করেছে। নব্য কেইনসীয়পন্থীদের কাছে বিনিয়োগ হচ্ছে সমন্বিত চাহিদার আরেকটি রূপ মাত্র, সরকারি ও বেসরকারি। শক্তিব্যবস্থা ও অবকাঠামোবিষয়ক সরকারি নীতির প্রতি তাদের একধরনের অবহেলা আছে। অথচ পরিবেশের জন্য সহনীয় ও স্মার্ট প্রযুক্তি নির্মাণে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য যেটা খুবই দরকার। ফলে তারা শুধু সুদের হার কমানোর কথা বলে। বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, এমন তেজিজাতীয় নীতির কথা তারা বলে না।
অন্যদিকে, সরবরাহপন্থীরা এটা একেবারেই ভুলে যায় যে বেসরকারি বিনিয়োগ আসলে সরকারি বিনিয়োগ ও সুস্পষ্ট নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল। তারা সরকারি বিনিয়োগ কমানোর কথা বলে, তারা কেমন শিক্ষানবিশের মতো বিশ্বাস করে, বেসরকারি খাত কোনো না কোনোভাবে এ শূন্যতা পূরণ করবে। কিন্তু আসলে সরকারি বিনিয়োগ কমানোর কথা বলে তারা বেসরকারি বিনিয়োগের পথ রুদ্ধ করছে। সরকার যদি দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন তৈরি না করে তাহলে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা ব্যাপক পরিমাণ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহী হবে না। কিন্তু মুক্তবাজারের প্রবক্তারা কখনোই এরূপ বিশৃঙ্খল নীতি নিয়ে মাথা ঘামাননি।
অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় কাজে লাগিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করারও সুযোগ রয়েছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র নিম্ন আয়ের আফ্রিকার দেশগুলোকে টাকা ধার দিয়ে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ করে দিতে পারে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বৈদেশিক দারিদ্র্য মোকাবিলার মতো ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করা যায়।
তদুপরি, এই দুই ঘরানার কেউই উন্নয়ন ফিন্যান্স প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে তেমন একটা মাথা ঘামায়নি। জাপান ও চীনকে ভোগ ব্যয় বাড়ানোর উপদেশ না দিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিবিদদের উচিত হবে, দেশ দুটিকে উদ্বুদ্ধ করা, যাতে তারা তাদের সঞ্চয় শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও বিনিয়োগ করে।
যাঁরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশদূষণও রোধ করতে চান, তাঁদের কাছে এরূপ বিবেচনার উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার। আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, দুনিয়ার নোংরা ও কার্বনভিত্তিক শক্তি ব্যবস্থাটির রূপান্তর করে একুশ শতকের জন্য একটি স্মার্ট, পরিষ্কার ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। টেকসই উন্নয়নে বিনিয়োগ করলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে, আর আমাদের ‘অতিরিক্ত সঞ্চয়’ সঠিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এটা আপনাআপনি হবে না। আমাদের দীর্ঘ মেয়াদে সরকারি বিনিয়োগ কৌশল, পরিবেশগত পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি রোডম্যাপ লাগবে। নতুন ও টেকসই প্রযুক্তির জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্রয়োজন। আরও বড় পরিসরে বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। এসব হাতিয়ার এক নতুন সামষ্টিক অর্থনীতি সৃষ্টি করবে, যার ওপর আমাদের স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি নির্ভর করছে।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জেফরি ডি. স্যাকস: কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকসই উন্নয়নের অধ্যাপক।

বঞ্চিত আনন্দময় শিক্ষা ও শৈশব by মুনির হাসান

চট্টগ্রামের একটি বিখ্যাত স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে লেখা চিঠি। তাদের স্কুলে পঞ্চম, অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ছুটির পর বাধ্যতামূলক কোচিং কিংবা অতিরিক্ত ক্লাস করতেই হয়। সে নিজে এতে আগ্রহী নয়। সে নিজের মতো করেই প্রস্তুতি নিতে চায় এবং বিকেলটা নষ্ট করতে চায় না। কিন্তু যেহেতু তার স্কুল তাকে বাধ্য করবে আগামী বছর, তাই সে আমাদের কাছে অনুরোধ করেছে এই বাধ্যতামূলক কোচিং বন্ধে যেন আমরা কোনো উদ্যোগ নিই। আগে কিছু স্কুলে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বাড়তি চাপ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন ১২ বছরের শিক্ষাজীবনে সব শিক্ষার্থীকে চারটি পাবলিক পরীক্ষা দিতে হয়। ফলে, তারা তাদের জীবনের সুন্দর সময়গুলো মুখস্থ করার পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। কেবল কি শিক্ষার্থী? এক অনুষ্ঠানে দেখা এক চিকিৎসকের সঙ্গে। জানলাম, গত কয়েক মাসে কোনো আন্তর্জাতিক সেমিনার, গুরুত্বপূর্ণ সভা, এমনকি অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানেও তিনি যোগ দিতে পারেননি। কেন? ‘আমার ছেলেটি এবার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দেবে। এই ছোট্ট শিশুটিকে একটি পাবলিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে আমি হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। তাই আর অন্য কিছু করা হচ্ছে না।’
এই এখন বাংলাদেশের শিক্ষাচিত্র। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির তথাকথিত মেধা যাচাইয়ের কবলে পড়ে শিক্ষার্থীদের শৈশব যেমন শেষ, তেমনি মায়েদেরও জীবন বরবাদ। শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষাগুলোর মূল লক্ষ্যই হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ ক্ষমতা যাচাই করা। ‘মিনি কী করে’—এই প্রশ্নের উত্তরে এক শিক্ষার্থী লিখেছে: মিনি মুখে করে বাবার জুতা ড্রয়িং রুম থেকে বারান্দায় নিয়ে যায়। এই উত্তরে শিক্ষার্থীর পর্যবেক্ষণ এবং তা প্রকাশের চমৎকার নিদর্শন পাওয়া গেলেও শিক্ষক তার খাতায় শূন্য দিয়ে লিখে দিয়েছেন: মিনি রান্নাঘরে মাছের কড়াইয়ে মুখ দিয়ে মাছ চুরি করে। বেচারা শিক্ষার্থী তাদের বাড়ির বিড়ালটিকে কখনো এই কাজটি করতে দেখেনি, যা দেখেছে তা লিখেছে কিন্তু তাতে তাকে ভর্ৎসনাই করা হলো। ঠিক এভাবে আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার বারোটা বাজাই। সমকোণী ত্রিভুজ-সংক্রান্ত পিথাগোরাসের বিখ্যাত জ্যামিতিক উপপাদ্যটি প্রায় শ দুয়েক পদ্ধতিতে প্রমাণ করা যায়। কিন্তু কী আশ্চর্য, আমাদের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে ‘পিথাগোরাসের উপপাদ্য ইউক্লিডের পদ্ধতিতেই প্রমাণ করতে হয়।’ বলাবাহুল্য ইউক্লিডের প্রমাণটা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি জটিল মনে হয়।
অথচ সামান্য চেষ্টা করলেই এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা যায়। বেশ কদিন আগে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে জগদীশ চন্দ্র বসু বিজ্ঞান ক্যাম্প। সারা দেশের নির্বাচিত জনা পঞ্চাশেক শিক্ষার্থী সেখানে ছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
‘বাচ্চারা পড়তে চায় না। তাদের ধরে বেঁধে পড়ার টেবিলে নিতে হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে হয় টিভি বা কম্পিউটারের সামনে তাদের পাওয়া যায়। অথচ এখানে তারা নিজেরাই হাজির হয়ে যাচ্ছে ক্লাসে! অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থেকে কী জানি সব কাজ করছে। অথচ ঠিক ভোর সাড়ে ছয়টায় উঠে হাজির হয়ে যাচ্ছে পতাকার সামনে। বাসায় কত কষ্ট করে না তাদের ঘুম থেকে তুলতে হয়!’ ঠিক এভাবে ক্যাম্পে দিনাজপুরের এক মা তাঁর অভিজ্ঞতা বললেন। তাঁর অবাক হওয়ার কারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ওই ক্যাম্পটা তো আসলে পড়ালেখারই। কিন্তু তারা কেউ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে না। গণিত ক্যাম্প শুরু করার সময় এটা আমরা জানতাম। আর বিজ্ঞান ক্যাম্পে তো বাড়তি মজা হলো প্রকৃতির সঙ্গে থাকা। নো ইন্টারনেট, নো ফেসবুক এবং নো টেলিভিশন। কিন্তু কী আশ্চর্য, আনন্দের কোনো কমতি নেই। বিষয়গুলো কিন্তু সহজ নয়, পর্যায় সারণি, জীবকোষ, বিজ্ঞানভিত্তিক পোস্টার বানানো, মাঠে মাঠে ঘুরে গাছের তালিকা তৈরি করা কিংবা দূর মহাকাশের খোঁজ নেওয়া। পুরো চারটা দিন তাদের কেটেছে আনন্দের সঙ্গে বিজ্ঞানচর্চা করে। সে কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। এ দেশে কিছু লোক শিক্ষাকে বানিয়ে ফেলেছে নিরানন্দ, সৃজনশীল মুখস্থ পদ্ধতি। ‘নিজের ভাষায় লেখো’—এমন প্রশ্নের উত্তর পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়। শিক্ষার্থী সেটা মুখস্থ করে উগের দিয়ে আসে পরীক্ষার খাতায়। বেচারা কখনো সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে দেখে না, সেটা ঘড়ির কাঁটার দিকে না উল্টা দিকে ঘোরে, গোধূলিবেলায় মেঘের ওপর মেঘ করে কি না, গুঁড়ির কাঁঠাল বেশি মিষ্টি নাকি কাণ্ডের, পিঁপড়া কি সাঁতার কাটতে পারে? সে এসব প্রশ্ন করলে তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, এসব কি তোমার পরীক্ষায় আসবে?
আমাদের স্কুলগুলো পরীক্ষা আর জিপিএ–৫–এর পেছনে দৌড়ানোর জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। কারণ, তাদের নিজেদের মূল্যায়নও সরকার ওই জিপিএ–৫ দিয়েই করে। সরকার কিংবা স্কুলের কথা শুনলে মনে হয় জিপিএ–৫–ই জীবনের সব। আইনস্টাইন যদি না বুঝে মুখস্থ করতেন, তাহলে কি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হতো? সে জন্যই দরকার পড়ালেখার মধ্যে আনন্দ খোঁজা, শিক্ষার্থীকে তার ছোঁয়া দেওয়া। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের স্কুলগুলো এই কাজটা করে না। স্কুলগুলো আনন্দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ দিতে পারত, যদি তাদের ওপর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী কিংবা জেএসসির মতো অহেতুক পাবলিক পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়া না হতো। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আনন্দের শৈশবও নষ্ট হতো না। স্কুলগুলো আনন্দের আয়োজন করে না বলে আমাদের এই কাজগুলো করতে হয়। আমাদের স্বপ্নগুলো বড়, কিন্তু সামর্থ্য তো কম। তাই আমরা আশায় থাকি একদিন আমাদের স্কুলগুলোও হয়ে উঠবে আনন্দময়। স্কুলে যেতে না পারলে বাচ্চারা কান্নাকাটি করবে আর তাদের হাতে তৈরি হবে এক আশ্চর্য পৃথিবী!
মুনির হাসান: যুব কর্মসূচি সমন্বয়ক, প্রথম আলো। সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

তিন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের শেষ পরিণতি by আবদুল মান্নান

বাংলাদেশের মানুষের এরিখ প্রিবকের নাম শোনার কথা না। না শুনলে ক্ষতি নেই। প্রিবকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের ঘাতক দল এসএস পুলিশ বাহিনীর সদস্য হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৪৪ সালের ২৪ মার্চ ইতালির রাজধানী রোমের কাছে নাৎসিবিরোধী ৭৫ জন ইহুদিসহ ৩৩৫ জন ইতালীয় যোদ্ধার হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। ইতালীয় ভাষায় পারদর্শী প্রিবকে ১৯৩৬ সালে হিটলারের গোয়েন্দা সংস্থা গেস্টাপোর হয়ে কাজ করতে ইতালিতে যান। সেখানে দ্রুতই তিনি ইতালির ফ্যাসিস্ট পুলিশের কমান্ডারের দায়িত্ব নেন। বাস্তবে তিনি হিটলারের হয়ে ইতালিতে কাজ করছিলেন।
যুদ্ধ শেষ হলে অনেক যুদ্ধাপরাধীর মতো প্রিবকে গোপনে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যান। সেখানে তিনি নির্ঝঞ্ঝাটে ৪০ বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টাইন পুলিশের কাছে ধরা পড়েন। পরে প্রিবকেকে ইতালিতে ফেরত আনা হয় এবং বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের পর তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত তাঁর বয়সের কথা চিন্তা করে তাঁকে প্রচলিত কারাগারে না রেখে বাকি জীবনের জন্য গৃহবন্দী করে রাখার আদেশ দেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ইতালিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রিবকে তাঁর অপরাধের জন্য আদালত বা অন্য কারও কাছে কখনো ক্ষমা চাননি।
সেই প্রিবকে ১০০ বছর বয়সে ইতালীয় কারাগারে মারা গেলেন গত বছরের (২০১৩) ১১ অক্টোবর। মৃত্যুর আগে প্রিবকে কারা কর্তৃপক্ষকে বলে যান, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে আর্জেন্টিনায় তাঁর স্ত্রীর পাশে অথবা তাঁর জন্মস্থান বার্লিনের কাছে হেনিংসডর্ফে সমাহিত করা হয়। ইতালীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রিবকের এই অন্তিম ইচ্ছার ব্যাপারে আর্জেন্টিনা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সাফ জানিয়ে দেয়, তাদের দেশে প্রিবকের মতো একজন ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীকে কবর দেওয়ার সুযোগ নেই। আর্জেন্টাইন সরকারের এই সিদ্ধান্তে সে দেশে বসবাসরত তিন লাখ ইহুদির সংগঠন ‘আর্জেন্টিনা জুইস অ্যাসোসিয়েশন’ এক বিবৃতিতে বলে, ‘এই ঘাতক যে দীর্ঘ ৪০ বছর আর্জেন্টিনায় সব সুযোগ-সুবিধাসহ বসবাস করেছে, সেটাই তো তার বড় পাওনা।’ তারা আরও বলে, ‘কখনো কেউ যেন নাৎসি গণহত্যা অথবা যেকোনো ধরনের গণহত্যাকে না ভোলেন এবং ক্ষমা না করেন।’ জার্মান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও প্রিবকের লাশ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
সিদ্ধান্ত হয়, রোমের বাইরে রক্ষণশীল ক্যাথলিক গির্জা সেন্ট পিউসের কবরস্থানে হবে প্রিবকের শেষ ঠিকানা। এরিখ প্রিবকের লাশ বহনকারী গাড়িটি গির্জার ফটকে পৌঁছাতেই সেটিকে ঘিরে ধরে কয়েক শ ক্ষুব্ধ নাগরিক। উত্তেজিত জনতা প্রিবকের লাশবাহী গাড়িটির সমানে লাথি মারতে থাকে আর থুতু ছিটাতে থাকে অনবরত। ‘আমাদের এই শহরে এই কসাইয়ের জায়গা হবে না,’ চিৎকার করে বলতে থাকে উত্তেজিত জনতা। লাশ বহনকারী গাড়িটির গায়ে একটি ব্যানার টানানো হয়, যাতে লেখা ছিল: ‘যুদ্ধাপরাধীদের কোনো ঠাঁই নেই’। পরে পুলিশের সহায়তায় লাশ বহনকারী গাড়িটি রোমের একটি সামরিক বিমানবন্দরের ছাউনিতে নেওয়া হয়। পরে অজ্ঞাত স্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
রুডলফ হেস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের ডেপুটি আর নাৎসি পার্টির নীতিনির্ধারকদের শীর্ষ পর্যায়ের একজন। পেশাদার সৈনিক। জন্ম মিসরে। হিটলারের কাজকর্মে বিরক্ত হয়ে ১৯৪১ সালে নিজে একটি যুদ্ধবিমান চালিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের কাছে প্রস্তাব নিয়ে সোজা উড়ে গেলেন স্কটল্যান্ডে। নামতেই বন্দী করা হলো হেসকে। নিশ্চয় ব্যাটা হিটলারের গুপ্তচর। চার্চিল অত বোকা নন যে বিশ্বাস করবেন হেসের প্রস্তাবে হিটলার যুদ্ধ বন্ধ করবেন। ১৯৪৫ সালে জার্মানির পরাজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে যুদ্ধ শেষ হয়। জার্মানির নুরেমবার্গ শহরে বসল হিটলারের নাৎসি পার্টির আর অন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল। বিশেষ ব্যবস্থায় একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে রুডলফ হেসকে সেই ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করা হলো। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দুই মাস হেসের মামলার শুনানি চলল। ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবরে আদালত হেসকে আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
হেস শান্তির জন্য চেষ্টা করেছিলেন, তা ট্রাইব্যুনাল আমলে নেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের রাশিয়ান সদস্য মেজর জেনারেল ইওনা সিকিতচেনকো মনে করেন, হেসের অপরাধ মৃত্যুদণ্ডতুল্য। তিনি ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। হেসকে ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই বার্লিনের নিকটবর্তী স্পান্ডু কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কারাগারটিতে প্রায় সব বন্দীই ছিলেন যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত। আর এটি ছিল যুদ্ধকালীন চারটি মিত্র শক্তির তত্ত্বাবধানে। ৬০০ কয়েদি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই কারাগারে ১৯৬৬ সালের পর একমাত্র বন্দী ছিলেন রুডলফ হেস। এরই মধ্যে অন্যান্য কয়েদির হয় মৃত্যু হয়েছে অথবা কারাবাসের সাজা শেষে ছাড়া পেয়েছেন। ১৯৮৭ সালের ১৭ আগস্ট হেস কারাগারে আত্মহত্যা করেন। রাতের অন্ধকারে হেসকে গোপনে কবর দেওয়া হয়েছিল। এরপর জার্মান কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ কারাগারটি বুলডোজার দিয়ে ধূলিসাৎ করে দেয়, যাতে পরবর্তীকালে নব্য নাৎসিরা এই কারাগারে হেসের স্মরণে কোনো ধরনের স্মারকস্তম্ভ বা তেমন কিছু নির্মাণ করতে না পারে।
এরিখ প্রিবকে অথবা রুডলফ হেসের প্রসঙ্গটা এই কারণেই উল্লেখ করতে হলো, কারণ সম্প্রতি বাংলাদেশেও গোলাম আযম নামের এক সাজাপ্রাপ্ত ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে তাঁর পরিবারের দু-একজন সদস্য উপস্থিত ছিল। প্রিবকে বা হেস তেমন সৌভাগ্যবান ছিলেন না। গোলাম আযম তাঁর একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ঠিক কিন্তু তিনি বিচারের সময় যত রকমের সুযোগ-সুবিধা ও আইনের আশ্রয় পেয়েছেন, তার কোনোটাই প্রিবকে অথবা হেসের ভাগ্যে জোটেনি।
এই তিনজন অপরাধীর মধ্যে এক জায়গায় মিল আছে আর তা হচ্ছে, তাঁরা কেউ কখনো তাঁদের কৃত অপকর্মের জন্য ক্ষমা চাননি। জামায়াতের এককালের নেতা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে পাঁচ ধরনের অপরাধের ৬১টি অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং সেগুলোর প্রতিটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাইবু্যনাল আরও বলেছেন, গোলাম আযমের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালের অপরাধ মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য কিন্তু বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। অথচ তাঁর জানাজার আগে তাঁর ছেলে সবার সামনে বলেন, তাঁর বাবাকে অন্যায়ভাবে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। বাবা যেমন তাঁর অপকর্মের জন্য কখনো দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাননি, তাঁর সন্তানও রেওয়াজ অনুযায়ী তাঁর বাবার পক্ষে ক্ষমা না চেয়ে বরং একধরনের ক্ষমার অযোগ্য ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছেন। অথচ একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গোলাম আযম ও তাঁর দল শুধু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তাই প্রদান করেনি বরং নিরপরাধ মানুষ মারার কাজে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত ছিলেন।

শুধু গোলাম আযমের ছেলে নন, তাঁর বিচার ও রায় নিয়ে তাঁর কৌঁসুলিরা কয়েক দিন ধরে জনগণকে অবিরাম অসত্য তথ্য দিয়ে যাচ্ছেন। প্রিবকের মরদেহ এখনো দাফনের অপেক্ষায়। হেসকে গোপনে কবর দিতে হয়েছিল। আর লাখ লাখ বাঙালির রক্তে হাত রঞ্জিত গোলাম আযমের শেষকৃত্য বেশ ঘটা করেই অনুষ্ঠিত হলো গত শনিবার বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। জানাজায় অংশ নিয়েছিল তাঁর কয়েক হাজার অনুসারী (জামায়াতের মতে লক্ষাধিক)। জাতীয় মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠানের প্রতিবাদে জড়ো হয়েছিলেন মাত্র কয়েকজন তরুণ, এই প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা। এই সবই জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করেছে।
অনেকের প্রশ্ন, কেমন করে ঘটল এমন অভাবিত ঘটনা? এর উত্তরে শুধু বলা যায়, ৪৩ বছরে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতায় আর প্রশ্রয়ে পাকিস্তানি ধ্যানধারণার মানুষ বাংলাদেশে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। আমার এক গুরুজন আছেন। তিনি প্রায়ই বলে থাকেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১০ কোটি। অবাক হয়ে তাঁর কাছে জানতে চাই, বাকিদের কী হলো? তার সহজ উত্তর, ‘আরে বোকা, ওই বাকিরা তো পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত।’ গোলাম আযমকাণ্ড থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কিছু শিখবে, তেমন একটা আশা করি না। সহকর্মী ড. মুনতাসীর মামুনের বক্তব্য দিয়েই শেষ করি। তিনি প্রায়ই বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা দিয়ে গিয়েছিলেন।’ তার বড় প্রমাণ বাংলাদেশের গোলাম আযমের শান্তিতে মরণ ও লাখো শহীদের রক্তবিধৌত এই বাংলার মাটিতে তাঁর শেষ কৃত্যানুষ্ঠান আর তাঁর দাফন। ৩০ লাখ শহীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা ছাড়া আর কী করতে পারি?
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ইবোলার পরবর্তী শিকার কে? by হৃষভ সন্দিলা ও ড্যানি শোহাম

পশ্চিম আফ্রিকার বাইরে আরও কিছু দেশ ইবোলা মহামারিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে? বিশেষজ্ঞরা অবশ্য উন্নত দেশগুলো নিয়ে তেমন একটা চিন্তিত নন। কারণ, সেসব দেশের রোগ নিরাময়ের উন্নত ব্যবস্থা আছে, এমনকি তারা কম জনসংখ্যার উন্নয়নশীল দেশগুলো নিয়েও তেমন একটা চিন্তিত নন। কিন্তু সাধারণভাবে রোগ নিরাময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেই, এমন ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলো এ রোগের ঝুঁকিতে আছে। যেমন, ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে এ রোগ ছড়িয়ে পড়লে একদম বিপর্যয় নেমে আসবে। সেখানে শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি, গণস্বাস্থ্য কাঠামোও খুব দুর্বল, ফলে ভারতে ইবোলা ছড়িয়ে পড়লে তার রাশ টেনে ধরা সম্ভব হবে না। ভারতের সঙ্গে পশ্চিম আফ্রিকার সম্পর্ক খুব নিবিড়, সে অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার ভারতীয় বসবাস করছে। যে সম্পর্কের সূত্রপাত গত শতকে। আফ্রিকার আক্রা, লাগোস, ফ্রি টাউন, মনরোভিয়া, আবিদজান প্রভৃতি শহরের সঙ্গে ভারতের নয়াদিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের সম্পর্ক যথেষ্ট ভালো। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ এসব শহরের একটি থেকে আরেকটিতে যাতায়াত করে। তারা মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপ হয়ে এসব শহরে যাতায়াত করে থাকে। যদিও আক্রান্ত অঞ্চলের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে যথেষ্ট সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে আট থেকে ২১ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। ফলে এ রোগের ভাইরাস শরীরে নিয়ে বহু মানুষ অনায়াসে ভারতে ঢুকে যেতে পারে। সম্প্রতি নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে দেখলাম, ইবোলা আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রবেশ ঠেকাতে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা খুবই ঢিলেঢালা। ফলে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে কেউ শরীরে এ রোগের ভাইরাস নিয়ে ভারতে ঢুকলে দেশটি তা ঠেকাতে পারবে না। ভারতের বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০ হাজার। এতে এসব শহর দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির শহরের পর্যায়ে চলে গেছে। গ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরে আবাস গড়ায় শহরের যত্রতত্র বস্তি গড়ে উঠেছে। স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল, শহরে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে তার তুলনায় সেটা খুবই কম। আর বড় শহরের বাইরে স্বাস্থ্যসেবার অর্থ প্রাথমিক চিকিৎসার বেশি কিছু নয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ভারতে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ৬ দশমিক ৫ জন চিকিৎসক, ১৩ জন নার্স ও হাসপাতালে নয়টি আসন রয়েছে। বৈশ্বিক মান অনুসারে এটা অর্ধেকেরও কম, আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের চেয়ে তা অনেক কম।

শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব, ঘুপচি বস্তি, দুর্বল স্যানিটেশন, ড্রেনেজ, সুয়ারেজ ও কমজোর স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থার কারণে ভারতে ইবোলা দেখা গেলে তা কীভাবে ছড়িয়ে পড়বে, সেটা আমাদের কল্পনারও বাইরে। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে একজন মানুষও শরীরে এ ভাইরাস নিয়ে এলে ভারতে তা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়বে। ভারতীয় সরকার বলছে, তারা এটা মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত। একবার ছড়িয়ে পড়লে বড় শহরের বাইরে সীমিত সম্পদ ও অর্ধপ্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবীরা যে সহজেই এতে আক্রান্ত হয়ে পড়বে, এটা সহজেই অনুমেয়। মাদ্রিদ ও ডালাসে যেটা ঘটেছে, পশ্চিম আফ্রিকার কথা না হয় না-ই বললাম। ইবোলার রোগলক্ষণ ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুজ্বরের মতো, ফলে স্বাস্থ্যসেবীরা না বুঝেই কোনো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নাও নিতে পারেন। আবার, তাঁরা রোগীদের খুবই খারাপ অবস্থায় বাড়ি পাঠিয়ে দিতে পারেন। ফলে বিপদের আর অন্ত থাকবে না। সরকারের হাতে সুযোগ খুবই সীমিত। স্বাস্থ্যসেবা–ব্যবস্থা গভীর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে, যেটা রাতারাতি কাটিয়ে ওঠা যাবে না বা শুধু ইবোলার ধাক্কায় তা ঠিক হবে না। সরকার যেটা করতে পারে তা হচ্ছে, পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা লোকজনকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের চোখে চোখে রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ঠিক যা করতে শুরু করেছে। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি পশ্চিম আফ্রিকা থেকে কোনো যাত্রী আসামাত্রই তাদের আলাদা করে ফেলা ও পরবর্তী আট দিন তাদের নজরদারিতে রাখা হয়। কিন্তু সেটা ঠিক ন্যায্য হবে না, আর দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমান ও সমুদ্রবন্দরে এ কর্মসূচি চালানোর সক্ষমতা ভারত সরকারের আছে কি না, সেটাও সন্দেহের ব্যাপার। এর বদলে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আগত ব্যক্তিদের এ রোগের লক্ষণ সম্পর্কে আগেভাগে সচেতন করা যায়। কীভাবে নিজেদের নজরদারিতে রাখা যায়, সে বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, আর এ রোগের প্রথম লক্ষণ দেখা দিলে যে চিকিৎসা নিতে হবে, সে বিষয়ে তাদের সচেতন করা যায়। তদুপরি, শহরাঞ্চলের সব জায়গায় স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের প্রশিক্ষিত করা উচিত। তাঁরা যেন রোগীদের রোগ ও ভ্রমণের রেকর্ড রাখেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। পশ্চিম আফ্রিকায় সম্প্রতি যে ইবোলা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে বোঝা যায়, বাস্তুতন্ত্রে একধরনের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। এ ভাইরাস বহনকারী বাদুড় কলায় কামড় দিলে আর সে কলা মানুষ খেলে ভাইরাসটি মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিম আফ্রিকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ঘনত্বের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ যে সুরক্ষা দিতে পারত, সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না। গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে এটা তেমন প্রযোজ্য নয়। ভারতে ইবোলা ছড়িয়ে পড়বে, এটা এখনো একটা সম্ভাবনার পর্যায়ে আছে। ফলে তারা যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে—নাইজেরিয়া ঠিক যা করেছে। লাগোস ভারতের বড় শহরগুলোর মতোই, সেখানে ইবোলা প্রতিরোধে নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে। ভারতের উচিত, সেটা অনুসরণ করা।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
হৃষভ সন্দিলা: চেক প্রজাতন্ত্রের চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির প্রভাষক।
ড্যানি শোহাম: ইসরায়েলের বেগিন সাদাত সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক।

রেলপথমন্ত্রীর গায়েহলুদ হলো, পরশু বিয়ে

‘নির্ধারিত বয়সে বিয়ে করলে যা হতো (যে উৎসাহ থাকত), আগে থেকে এখন দ্বিগুণ উৎসাহ পাচ্ছি। প্রতিদিন আমাকে ফোনে ভক্ত ও কর্মীরা উৎসাহ দিচ্ছে। দেশের মানুষ, দলীয় নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, সুধীসমাজ ও সাংবাদিকেরা এ বিয়ে নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রকাশ করছে। প্রতিদিন সকলের কাছ থেকে উৎসাহ পাই। সকলের ভালোবাসা ও স্নেহের নিদর্শনস্বরূপ এ গায়েহলুদ।’ নিজের গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে এভাবেই সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক। আজ বুধবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর ফার্মগেটে খামারবাড়ি কৃষি ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে রেলপথমন্ত্রীর গায়েহলুদের অনুষ্ঠান হয়। একই স্থানে কনে হনুফা আক্তার ওরফে রিক্তারও গায়েহলুদ হয়। অনুষ্ঠানে সরকারদলীয় সাংসদ, বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, দলীয় নেতা-কর্মী, মন্ত্রী ও কনের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও।

গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্তত ১০ জন রাজনীতিবিদ ও সরকারদলীয় কর্মী বলেন, আজ দুপুর ১২টায় গায়েহলুদ অনুষ্ঠান শুরু হয়। ওই অনুষ্ঠানের দেখভাল করেন সংরক্ষিত আসনের নারী সাংসদ ও অভিনেত্রী তারানা হালিমের নেতৃত্বে একদল নারী সাংসদ। এতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, কনের এলাকা কুমিল্লার চান্দিনা আসনের সাংসদ আলী আশরাফ, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ আবদুল মালেকসহ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন।
গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জসিম খান বলেন, ‘জমজমাট গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য মুরগি, পোলাও, খাসির মাংস, চটপটি ও মিষ্টির ব্যবস্থা ছিল। অনুষ্ঠানে রেলপথমন্ত্রী মহোদয় বেশ ফুরফুরে ছিলেন।’
রেলপথমন্ত্রী বিয়ের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি একজন মুসলমান। একজন মুসলমান হিসেবে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনেই আল্লাহর মেহেরবাণীতে আমি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছি। আমি গতকল্য (গত মঙ্গলবার) আমার নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে দোয়া নিয়ে এসেছি। তিনি আমাকে বলেছেন, “আমি আল্লাহর কাছে তোমার জন্য দোয়া করি। তোমার দাম্পত্য জীবন সুখের হোক।” প্রধানমন্ত্রী আমাকে স্নেহ করেন। আমি তাঁর কর্মী। তিনি আমার সুখের ও শান্তিময় জীবন প্রত্যাশা করেছেন।’
রেলপথমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করি। আমার দাম্পত্য জীবন যেন সুখের হয়।’
এদিকে আগামী শুক্রবার দুপুরে রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক ৫০০ জন বরযাত্রী নিয়ে ঢাকা থেকে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মীরাখলা গ্রামে যাবেন। সেখানে বিয়ে সম্পন্ন হবে। এ উপলক্ষে কনের বাড়ি সাজানো হচ্ছে। সেখানে নতুন করে সড়ক ও ঘর মেরামত করা হয়েছে। এ বিয়ে দেখার জন্য আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা মুখিয়ে আছেন।
রেলপথমন্ত্রীর বিয়ের আয়োজনের সমন্বয়ক চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মো. শাহজালাল মজুমদার বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় শুক্রবার বিয়ের পর নববধূকে নিয়ে ঢাকার বেইলি রোডের মন্ত্রীপাড়ার বাসভবনে যাবেন। আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকায় এবং ৬ ডিসেম্বর চৌদ্দগ্রামের গ্রামের বাড়িতে বৌভাত অনুষ্ঠান হবে। ইতিমধ্যে সব কয়টি অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণপত্র বিতরণ শেষ হয়েছে।’
১৯৪৭ সালের ৩১ মে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের বসুয়ারা গ্রামে মো. মুজিবুল হক জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে তিনি চৌদ্দগ্রাম থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি রেলপথমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে ১৯৮৫ সালের ২০ মে হনুফা আক্তার ওরফে রিক্তা জন্মগ্রহণ করেন। ২০০১ সালে গল্লাই আবেদা নূর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে রিক্তা এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে এলএলবি পাস করেন। বর্তমানে তিনি হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ) বাংলাদেশ লিমিটেডের আইন উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত আছেন।

রানা ও তাজরীনের দুর্ঘটনায় আরও আর্থিক সহায়তা প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রানা প্লাজা ভবনধস এবং তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে নিহত আরও ৩৪ জনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার চেক ও সঞ্চয়পত্র প্রদান করেছেন। আজ বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে তাঁর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে এই আর্থিক সহায়তা করা হয়। খবর বাসসের।

>>প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ তাঁর কার্যালয়ে সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধসে ও তাজরিন ফ্যাশনস গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। ছবি: ফোকাস বাংলা
প্রধানমন্ত্রী প্রথমে রানা প্লাজায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২২ জনের প্রত্যেকের পরিবারকে দুই থেকে ১০ লাখ টাকা করে চেক ও সঞ্চয়পত্র দেন। এরপর তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১২ জনের প্রত্যেকের পরিবারের হাতে সাত লাখ টাকা করে চেক ও সঞ্চয়পত্র তুলে দেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে এক দুর্ঘটনায় আহত একজনকে হুইলচেয়ার প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, শ্রম ও কর্মসংস্থার প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরী ও বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম অন্যান্যের মধ্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে দুর্ঘটনা দুটিতে গুরুতর আহত ৪০ জনের চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা এক হাজার ১৩৪ জন নিহত ও অনেকে আহত হন। এর আগে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১১১ জন নিহত হন।

ভাগ্যবিড়ম্বিত রোহিঙ্গা- বিশ্বসম্প্রদায়কে দায় নিতে হবে

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি এখনো নাগরিকসুলভ আচরণ করছে না। তাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও মিয়ানমারের নাগরিক হওয়ার দাবি বারবার অস্বীকার করা হচ্ছে। গত শতকের আশির দশক থেকে রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের জন্য একটি অসহনীয়, কিন্তু মানবিক সমস্যা হয়ে আছে। বিশ্বসম্প্রদায় এই ইস্যুতে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেও লাভবান হয়নি, উপরন্তু রোহিঙ্গারা আরো বেশি রোষানলে পড়েছে। ক্রমবর্ধমান হতাশা ও ভীতির কারণে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা গণহারে অন্যত্র পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। দুই বছর আগে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর রোহিঙ্গাদের নৌকা করে মিয়ানমার ত্যাগের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে গেছে। শীর্ষস্থানীয় একটি সংস্থা ‘রোহিঙ্গা অ্যাডভোকেসি গ্রুপ’ তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।

শুধু গত দুই সপ্তাহে আট হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী পশ্চিম মিয়ানমার ছেড়ে মালবাহী জাহাজে চড়ে থাইল্যান্ডের পথ ধরেছে। প্রতিদিন পলাতকদের দলে ভিড়ছে গড়ে ৯০০ করে মানুষ। মূলত ১৫ অক্টোবর থেকে এ যাত্রা শুরু হয়েছে। গত দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা দেশ ছেড়েছে। এটি এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেশ ত্যাগের ঘটনা। থাইল্যান্ডে পৌঁছার পর থাই প্রশাসনের কাছ থেকেও তাদের পেতে হচ্ছে বৈরী আচরণ। শরণার্থী হিসেবে বাধ্য হয়ে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের দলগুলোকে সীমান্তে ভিড়তে দেয়া হচ্ছে না। অনেককেই পুনরায় ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। যারা কোনোভাবে থাইল্যান্ডের মাটিতে পা রাখতে সমর্থ হচ্ছেন, তারা আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর হাতে পড়ছেন এবং থাইল্যান্ডের জঙ্গলে শিবিরে নিয়ে তাদের নির্যাতন করা হচ্ছে। বড় অঙ্কের চাঁদা না দেয়া পর্যন্ত এ নির্যাতন বেড়েই চলেছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী পলায়নপর রোহিঙ্গাদের বর্তমান আবাস রাখাইন ভূমির উত্তরাংশে। কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা এ স্থানে বসবাস করে আসছে স্বীকৃতিবিহীনভাবে। তাদের ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করা হয় এবং সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের মধ্য থেকে আক্রমণাত্মক ভিুরা নিয়মিতভাবে তাদের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ-অধ্যুষিত বিস্তীর্ণ জনপদ, যেখানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার বাস। সামাজিকভাবে এরা অত্যন্ত অসহায় ও দারিদ্র্যের আঘাতে জর্জরিত জীবনযাপন করছে। গত দুই বছরে অসংখ্য পরিসংখ্যানবিহীন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মরেছে অনেকেই। তা ছাড়া এক লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুশিবিরে মানবেতর অবস্থায় বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। রাষ্ট্রহীন নির্যাতনের শিকার মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, আরব জাহান ও অন্যান্য দেশে চলে যেতে চায়, কারণ তারা চরম সাম্প্রদায়িক বৌদ্ধ দেশ মিয়ানমারে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। রোহিঙ্গারা স্বদেশে যেমন নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার, তেমনি শরণার্থী শিবিরেও মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে তারা এক ধরনের সামাজিক সঙ্কট সৃষ্টির কারণ হয়ে আছে। আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের সমস্যা। জাতিগত সঙ্কট নিরসনে তাদেরই করণীয় রয়েছে। যেহেতু তারা মুসলমান তাই বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং আরব দেশগুলোরও মানবিক সাহায্য প্রত্যাশিত। একই সাথে আন্তর্জাতিক বিশ্বকেও এ ব্যাপারে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে এগিয়ে আসতে হবে।

নায়কের নামে ব্যাঘ্র শাবকের নাম

সারাভানানের বয়স আট মাস। না, তিনি ভারতের তামিল অভিনেতা সারাভানান নন। তবে এ অভিনেতার নামেই রাখা হয়েছে ব্যাঘ্র শাবকটির নাম। ওটার আরো একটি পরিচয় রয়েছে, ওর বাবার নাম বিজয়, আর মা গনেশান। বিজয় মানে সেই বিজয়, যে কি না কিছু দিন আগে দিল্লি চিড়িয়াখানায় এক স্কুলছাত্রের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হত্যা করেছিল। তামিল নায়কেরা তো এমনই করেন। শত্রু এলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারপর সব ছারখার করে ছাড়েন।

>>>দিল্লির এক চিড়িয়াখানায় বাঘের খাঁচার সামনে গিয়ে ছবি তলার চেষ্টা করছিল ওই ছাত্রটি l তবে এর উল্টোটাও হয়েছে বলে দাবি করেছেন অনেক দর্শক l তাদের কেউ বলেছেন, ২০ বছরের ওই ছাত্রটি লাফিয়ে বাঘের এনক্লোসারে ঢোকার চেষ্টা করছিল , কোনও আবার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অসাবধানতাবশত ওই ছাত্রটি পা পিছলে বাঘের এনক্লোসারের মধ্যে পড়ে যায় l এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আচমকা চিত্কারে চিড়িয়াখানার বহু দর্শক বাঘের খাঁচার দিকে ছুটে গিয়ে দেখেন একটি পূর্ণবয়স্ক সাদা বাঘ একটি ছেলের ঘাড় কামড়ে ধরে রয়েছে l    
প্রথমে বাঘটি শান্তই ছিল l কিন্তু ছাত্রটি আতঙ্কিত হয়ে বাঘের দিকে পাথর ছুড়ে মারতেই হিংস্র হয়ে ওঠে বাঘটি l তারপরই সে আক্রমণ করে বসে ছাত্রটিকে l বাঘের আক্রমনে সারা শরীর থেঁতলে গিয়েছে ছাত্রটির l তবে ঘটনার ২০ মিনিট পরেও ঘুমপাড়ানি গুলি এনে বাঘটিকে নিরস্ত করতে পারেনি l  ১০ মিনিট ধরে বাঘের সঙ্গে লড়াই করে মারা যায় ছেলেটি l >>ঘটনাটি ঘটেছে ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ দুপুর দেড়টা নাগাদ<<<
বিজয়ের আট মাস বয়সী সারাভানান এরই মধ্যে খাঁচার ভেতর দৌড়াদৌড়ি করছে। নতুন বাড়ি পেয়ে সে মহা খুশি। ওর ক্ষিপ্রতা দেখে মনে হয় সত্যি সত্যিই যেন ও তামিল নায়ক সারাভানানই।
আর এ কারণেই তার এই নামটি রেখেছেন ড. সেলভান। এ চিড়িয়াখানায় আশা পশুপাখিদের নাম তিনিই রাখেন। তার বাড়িও ভারতের তামিলনাড়ুতেই।
ড. সেলভান প্রথম দিকে নতুন প্রাণীদের দেখাশোনা করেন। পরে এদেরকে নাম দিয়ে পাঠিয়ে দেন খাঁচায়। বর্তমানে তার তত্ত্বাবধানে আরো ১০টি প্রাণী আছে। এদের একটি ভারতীয় হাতি। নাম দিয়েছেন রাজলক্ষ্মী। আফ্রিকান হাতিটির নাম রেখেছেন জেনেশান। গণ্ডারের নাম মহেশ্বরি এবং বুনো ভালুকটাকে তিনি সেনডিল বলেই ডাকেন। তবে তার সবচেয়ে প্রিয় পার্বতী নামের একটি লক্ষ্মী গণ্ডার।
তিনি বলেন, এসব প্রাণীকে আমি নিজের সন্তানের মতোই দেখাশুনা করি। একটু বড় হয়ে উঠতে থাকলে ওদের জন্য নামও খুঁজি। সাধারণত ভারতীয় সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করেই নামগুলো রাখা হয়। প্রতিটি নামের পেছনেই অর্থপূর্ণ গল্প থাকে।
তবে বিশ্বের অন্যান্য চিড়িয়াখানায় প্রাণীদের নামকরণ হয় সাধারণত ওটাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্য এবং পূর্ব পুরুষদের রেকর্ড সংরক্ষণে রাখার জন্য।
ড. সেলভান বলেন, আমাদের চিড়িয়াখানায় হঠাৎ বাইরে থেকে নতুন কোনো প্রাণী এলে ১০ থেকে ৪৫ দিন ওটাকে হাসপাতালে রাখি। হাসপাতালে ওদেরকে বোঝার চেষ্টা করা হয়। ওদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করা হয়। আর চিড়িয়াখানায় জন্ম হওয়া নতুন শাবকদের আমরা ছয় মাস পর্যবেক্ষণে রাখি। তখন অন্য পশুদের সাথেও মিশতে দেই। এ সময়ের মধ্যেই ওরা সবার সাথে বেশ মানিয়ে নিতে পারে। সূত্র : ওয়েবসাইট।

সেই সন্ত্রাসীরা এখনো থামেনি by এম এ জব্বার

২৮ অক্টোবরের নৃশংসতা বাংলাদেশের আকাশে একখণ্ড কালো মেঘের বজ্রাঘাত। সে জমাট মেঘ এখনো তাণ্ডব থামায়নি। সে নিকশ কালো মেঘ আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্প্রীতি-ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ সব দুমড়ে-মুচড়ে নিঃশেষ করে দিতে ব্যতিব্যস্ত। ঘটনার খলনায়কেরা এখন ইতিহাসের সংরক্ষক, দরাজকণ্ঠী মানবতাবাদী! এক একটি চলমান ঘটনাই নতুন নতুন ২৮ অক্টোবর। পূর্বের ২৮-এর চেয়ে পরের ২৮ যেন আরো নৃশংস, হৃদয়বিদারক, লোমহর্ষক ও মানবেতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের কোনো নাগরিক নিরাপদ নয়। প্রতিটি মুহূর্ত তাদের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে চরম উৎকণ্ঠায় কাটছে। স্বস্তিহীন, নিরাপত্তাবিহীন আর কতকাল এভাবে কাটাতে হবে? আমাদের আর কত দিন গুনে গুনে দেখতে হবে নতুন নতুন ভয়াল ২৮ অক্টোবর! ওরা কারা, যারা নতুন নতুন করে ২৮ অক্টোবর রচনা করছে? ওদের রুখে দিতে আর কত সময় দরকার? ওরা মানবতাবিরোধী অপরাধী। ওদের রুখে দিতে না পারলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা হবো ক্ষমার অযোগ্য।
ক্ষমতালিপ্সুদের হিংস্র থাবায় ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রক্তরঞ্জিত হলো রাজধানীর কালো পিচঢালা রাজপথ। লাঠি-বৈঠার আঘাতে ও লাশের ওপর নর্দন-কুর্তন করে সত্যের সেনানীদের চিরতরে নিঃশেষ করে দেয়াই ছিল তাদের টার্গেট। সে দিন নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা ও আনুগত্যের পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে জীবন উৎসর্গ করল সাহসী কর্মীরা। কেউ পিছু হটেনি। মিডিয়ার সুবাদে হায়েনাদের বীভৎসতা, নীচতা ও পাশবিকতা প্রত্যক্ষ করল বিশ্বমানবতা। শহীদ ও আহতদের রাজপথে রেখে এক মুহূর্তের জন্য পিছপা হলো না আন্দোলনের সাথীরা। এ যেন কারবালার আরেক নিষ্ঠুর প্রান্তর। ভাইয়ের সামনে ভাইয়ের লাশ। বছর ঘুরে ২৮ অক্টোবর আসে। আজ প্রতিবাদী কর্মীদের কাছে ২৮ অক্টোবর প্রেরণার সুউচ্চ মিনার। যদিও বা ক্ষমতালিপ্সুরা ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার লালসায় বাংলার জমিনে এখন ক্ষণে ক্ষণে ঘটিয়ে চলছে নতুন নতুন ২৮ অক্টোবর।
আওয়ামী লীগ নিজেদের গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা দাবি করে। অথচ তারা বলে এক রকম, করে অন্য রকম। নেতাদের নেতৃত্বে ক্যাডাররা সে দিন ভয়াল নগ্ন চেহারা প্রদর্শন করেছিল। শান্তিপূর্ণ সভায় লগি-বৈঠাবাহিনীর নেতৃত্বে বিনা উসকানিতে হামলা ও দখলের চেষ্টা চলে। তাদের গতিবিধি, আচরণে দেশবাসীর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছিল যে, এটা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। চোরাপথে ক্ষমতায় আসার ডিজিটাল নাটকের মঞ্চায়ন।
পাতানো নির্বাচনের মাধমে কুৎসিত ফ্যাসিবাদীদের চেহারা আবার প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। সারা দেশে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নানা অভিযোগে দমনের ভয়ঙ্কর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সত্যপন্থীদের জীবন দিয়ে হলেও আন্দোলনের সুরক্ষার জন্য মরিয়াভাব দেখে দিশেহারা হয়ে তারা আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করে।
২৮ অক্টোবরের শহীদ ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের স্বজনেরা খুনিদের বিচারের অপেক্ষায় আছেন। যাদের নির্দেশে একটা শান্ত জনপদ অশান্ত হয়ে গেল, সামাজিক সম্প্রীতি খানখান হয়ে গেল, দেশের অভ্যন্তরে ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদের কালো মেঘ হানা দিলো, কে না চায় তাদের বিচার? বিচারের প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ। প্রকৃত অপরাধীদের বিচার বাংলার জমিনে হবেই ইনশাআল্লাহ।
আজ দেশবাসী শঙ্কিত। তারা জানে না আরো কত ২৮ অক্টোবর দেখতে হবে। ৫ মে ২০১৩ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকায় মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ আহ্বান করে হেফাজত। সে দিন ৬ মে রাতের আঁধারে ফ্যাসিস্ট সরকার সত্যানুসন্ধানী মিডিয়াগুলোর সম্প্রচার বন্ধ ও লাইট বন্ধ করে দিয়ে ঘুমন্ত, ইবাদতরত কান্ত মুসাফির আলেম-ওলামাদের ওপর এক নারকীয় আক্রমণ পরিচালনা করে। সে গণহত্যার সঠিক পরিসংখ্যান এখনো সরকার জনগণের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি। এভাবে আরো অনেক ঘটনা ফ্যাসিস্ট সরকার একের পর এক ঘটিয়ে চলছে। প্রতিটি ঘটনাই যেন ২৮ অক্টোবরকে হার মানিয়ে নতুন ২৮ অক্টোবর রচনা করছে। ২৮ অক্টোবর আমাদের প্রেরণার সুউচ্চ মিনার। এখন এই অশান্ত জনপদকে বদলে দেয়ার চ্যালেঞ্জ সমাজের নরখাদকদের মুখে এক প্রচণ্ড চাপেটাঘাত। সেই আঘাত হেনেই কাক্সিত বিজয় ছিনিয়ে আনাই হোক আজকের শপথ।
লেখক : ছাত্রনেতা

ধর্ম ও সময়ের প্রত্যাশাগুলো by সৈয়দা নীলুফার

ধর্ম বলতে বুঝি উপাসনা বা ইবাদত পদ্ধতি। আচার-আচরণ, ইহকাল-পরকাল ইত্যাদি বিষয়ের নির্দেশ ও তত্ত্ব। ইংরেজিতে একইভাবে Religion বলতে বুঝানো হয়েছে The belief in the existence of God or Gods and the activities that are connected with the worship of them.. চিন্তাশীল মানুষ সৃষ্টির আদিকাল থেকে জানতে আগ্রহী হয়েছে সৃষ্টি সম্পর্কে, স্রষ্টা সম্পর্কে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন ও স্রষ্টার শক্তির প্রকাশ বিবেচনায় তারা বটবৃক্ষের পূজা করেছে। পর্বতের পূজা করেছে। চন্দ্র-সূর্য ও স্রোতস্বিনীর স্রোতধারার প্রখরতাকে পূজা করেছে। সমাজ বিবর্তনের ধারায় বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞান বিকাশের সাথে সাথে সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে গূঢ় তত্ত্ব জানতে মানুষ আরো বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে ধর্মের মূল ভিত্তি হলো বিবেক। এই চিন্তা-চেতনা, ভাবনা ও বিবেকের জিজ্ঞাসার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিষ্ট ধর্ম ও ইসলাম ধর্ম। প্রত্যেক ধর্মেই কিছু মূল নীতি রয়েছে, তা তার অনুসারীরা পালন করে থাকেন। প্রসঙ্গ সংস্কৃতি বইটিতে মোহাম্মদ সোলায়মান সুন্দরভাবে ধর্মের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি লিখেছেন ধ হলো ধারণ করা; কিন্তু ধর্ম শব্দের ধ কী ধারণ করে? ইহা ধারণ করে ম্ম অর্থাৎ মর্ম। মর্ম হলো সারবস্তু। মানুষের সমগ্র চিন্তাধারা ও কার্যাবলির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্তা হলো তার বিবেক। আর বিবেক হলো মানুষের মর্ম বা সারবস্তু। ধর্ম সম্বন্ধে টিএস ইলিয়ট মত প্রকাশ করেছেন এভাবে A religion as the whole way of life of people from birth to the grave from morning to night and even sleep, and that way of life is culture. ধর্ম হলো মানুষের একটি পূর্ণ জীবন পদ্ধতি। জন্ম থেকে সমাধি পর্যন্ত সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এমনকি ঘুমও এর অন্তর্ভুক্ত এবং এই ধরনের জীবন পদ্ধতি হলো সংস্কৃতি।
ধর্ম নিয়ে এ আলোচনার পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলাম ধর্মের বর্তমান অবস্থা কেমন? অধিকাংশ জনগণের কাছে খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয় বললে ভুল বলা হবে না। ধর্মনিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে গিয়ে আমরা অনেকেই ধর্মহীনতা রোগে ভুগছি। ব্রিটিশ আমলের মতো মুসলিম সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসন চালাতে সাহায্য করছেন অতি প্রগতিবাদী কিছু মুসলমান। বাঙালিত্বের নামে এ ধরনের প্রচেষ্টা সত্যিকারের মুসলমানদের কষ্ট দেয়। অতীতে পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে মুসলমানদের হিন্দু সংস্কৃতি কিভাবে প্রভাবান্বিত করেছিল তার সুন্দর চিত্র মীর মশাররফ হোসেন তার ‘জীবন কথায়’ তারুণ্যচিত্র আঁকতে গিয়ে লিখেছেন ‘ধূতি পরিতে শিখিলাম চাদর বা উড়ানী গায়ে দেওয়া অভ্যাস হইল। মাথার চুল ছাঁটিয়া ফ্যাশনেবল করিলাম। পিছনের দিকে কিছুই নাই। পাজামা চাপকান বাড়ী পাঠাইয়া দিলাম। টুপিটাও ক’দিন পর সহপাঠীরা আগুনে পোড়াইয়া দিলো।’ বর্তমানে আমাদের কিছু মানুষের ধারণা এ ধরনের পোশাক পরিচ্ছদ ধর্মের ওপর তেমন আঘাত হানে না। তবে মুসলিম সংস্কৃতি বলতে আলাদা কিছু আছে এখানে সেটা উপেক্ষিত হয়েছে, সেটাই লেখক প্রকাশ করতে চেয়েছেন; কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্মের ওপর সংস্কৃতির ওপর যেভাবে নগ্ন হস্তক্ষেপ চলছে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আমরা চাই যার যার ধর্ম যার যার সংস্কৃতি দুটো পরস্পর কাছাকাছি প্রবহমান সমুদ্রের মতো নির্বিঘেœ প্রবাহিত হোক। কোনো রকম চাপিয়ে দেয়া সংস্কৃতি বর্জন করা হোক। তবেই সবার সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকবে।
ইসলামী রীতিনীতির প্রতি অবজ্ঞা, অত্যন্ত জৌলুসপূর্ণ জীবনযাপন, ন্যায়-অন্যায়বোধের তোয়াক্কা না করা, মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজকে এক অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এরই ফলে দেখতে পাই ঐশীর মতো মেয়ে মা-বাবাকে খুন করতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করেনি। ধর্মহীন জীবন ধেয়ে চলেছে পাগলা ঘোড়ার মতো মৃত্যুর গহ্বরে। ধর্মের সাথে আধুনিকতার ও বিজ্ঞানের কোনো বৈরিতা নেই। তার দুটো উজ্জ্বল উদাহরণ এখানে তুলে ধরছি। সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী নিউটন যিনি পদার্থবিজ্ঞান, আলোবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা ও গতিবিজ্ঞানের এত উন্নতি সাধন করেছেন তিনিও ছিলেন এক বড় ধার্মিক ব্যক্তি। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন যার শৈশব কেটেছিল নবম দশম শতকে মুসলিম শাসন আমলে তার লেখা Out of my later years শেষ বছরগুলো বইটিতে বিজ্ঞান ও ধর্ম সম্বন্ধে সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনিও ছিলেন আস্তিকবাদী ধার্মিক ব্যক্তি।
ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণে আমরা আমাদের ৮০০ বছরের মুসলমান শাসনের গৌরবময় অধ্যায়কে মুছে ফেলতে চেষ্টা করছি। আমরা আমাদের সন্তানসন্ততিদের কৌশলে তাদের ধর্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। অতীতের জাতীয় বীরদের গৌরবগাথা, পূর্বপুরুষদের গৌরবময় কাজ, কীর্তিকথা থেকে তারা যেন অনুপ্রেরণা না পায় শিক্ষাক্ষেত্রে সে ব্যবস্থা করে রেখেছি। তরুণ সম্প্রদায় যাতে সাংস্কৃতিক উৎসমূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বতন্ত্র জাতীয় চেতনায় সমৃদ্ধি লাভ করতে না পারে তার জন্য চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছি, তাই এখন সময়ের দাবি নতুন প্রজন্মকে সব কিছু জানাতে উদ্যোগ নিতে হবে। কিভাবে স্যার সৈয়দ আহমদ, কবি আল্লামা ইকবাল, কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য কী নিরলস প্রচেষ্টাই চালিয়েছিলেন তা তাদের কাছে তুলে ধরা হবে। তারা জেনে অনুপ্রাণিত হবে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য মৌলানা মুহাম্মদ আলী, হাকিম আজমল, ড. এস এ আনসারী, ব্যারিস্টার আসিফ আলী, মৌলানা হযরত সোহানী যথেষ্ট অবদান রেখেছিলেন। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার জন্য ধর্মের ওপর আমাদের অবশ্যই গুরুত্বারোপ করতে হবে। কারণ গাছের গোড়া কেটে (ধর্মকে গুরুত্বহীন রেখে) মৃতগাছ থেকে কখনো কোনো ফল আশা করা যায় না। এই তো কিছু দিন আগে আজান নিয়ে, রাসূল সা:কে নিয়ে, ধর্ম নিয়ে কত অশ্রাব্য কথা বলা হলো। তাদের তো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হলো না, বরঞ্চ সত্য কথা বলার জন্য নিরপরাধ ব্যক্তিকে নির্দয়ভাবে কারাগারে আটকিয়ে রাখা হলো, যা হওয়ার হয়েছে বর্তমানে তাকে ছেড়ে দিয়ে মানবতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হোক এটা জনগণের দাবি। লতিফ সিদ্দিকী হজ, রাসূল সা: ও তাবলিগ নিয়ে যেভাবে ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মনে আঘাত দিয়েছেন তা নিন্দনীয় ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তার শাস্তি এখন অধিকাংশ জনগণের দাবি। কারণ তিনি বিশ্বের ২১৪ কোটি মুসলমানের মনে তীব্র আঘাত হেনেছেন। তার মন্ত্রিত্ব ও সদস্যপদ বাতিল করলে সরকারের সঠিক দায়িত্ব পালন করা হবে। তবে সাধারণ জনগণের তার মন্ত্রিত্ব ও সদস্যপদ বাতিল হলে তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। জনগণের দায়িত্ব ছিল তার বিরুদ্ধে মামলা করা, তারা তা করেছে। এখন বিচার বিভাগের দায়িত্ব প্রচলিত আইনে তার শাস্তির বিধান করা।
সময়ের আরো একটি আলোচিত ঘটনা হলো পিয়াস করিমের মৃতদেহ বা লাশ শহীদ মিনারে রাখতে না দেয়ার ষড়যন্ত্র। তরুণরা রাজনীতির বাইরে নয়। তবে ছোটখাটো জিনিস নিয়ে তারা হইচই করবে সেটা তাদের শোভা পায় না। শহীদ মিনার সব তরুণের, শিশুদের, বৃদ্ধদের, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের, এমনকি টোকাইদেরও। এটা সরকারেরও নয়, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েরও নয়Ñ এটা দেশের সম্পদ, সব জনগণের। পিয়াস করিম কখন কী বলেছেন তার জন্য মৃত ব্যক্তিকে এভাবে অসম্মান করা কি যুক্তিসঙ্গত হয়েছে? এ অন্যায় ও অযৌক্তিক আচরণে লজ্জায় দুঃখে অনেকের চোখে মেঘবৃষ্টি হয়ে ঝরতে দেখেছি। করুণাময় আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন। বস্তুবাদী ও ভোগবাদী জীবনের কারণে আজ অনেকেই আমরা হৃদয়হীন হয়ে পড়েছি। মৃত কি জীবিত, কারো জন্য আজ আমাদের দয়া নেই, মায়া নেই, ভালোবাসা নেই। এখানে এখন সব ধু ধু মরু প্রান্তর।
বহু প্রত্যাশিত নির্বাচন নিয়ে কিছু না বললেই নয়, প্রতিবেশী দেশ ভারতের অনেক কিছুই আমাদের আলোড়িত করে। যদিও ভারত একটি বৃহৎ শক্তি তারপরও একটি নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানবোধ আমেরিকার জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রকাশ করেছেন তা ২০ হাজার আমেরিকান প্রবাসী ভারতীয়র মতো আমাদেরও মোহিত করেছে। তিনি বলেছেন তার ৮০০ সংসদ সদস্যকে তিনটি করে গ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দিয়ে আদর্শ গ্রাম যোজনা প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন। ২০১৯-এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার গ্রামকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী এতটাই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তিনি নিজের সত্যিকার পরিচয় দিতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করেন না বরঞ্চ সম্মান বোধ করেন, তাই তো তিনি ‘হিন্দু’ কথা লেখা ব্যান্ডটি হাতে সার্বক্ষণিক পরে ছিলেন। ওবামা নিজে ট্যুরিস্ট গাইড হয়ে মোদিকে মার্টিন লুথার কিং মেমোরিয়াল ঘুরে দেখিয়েছেন। তারা যৌথভাবে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। এগুলো ভারতীয়দের জন্য কতটুকু গৌরবের, কতটুকু আনন্দদায়ক ও প্রেরণাদায়ক তা কি কল্পনা করা যায়? আজ যদি আমাদের প্রিয় দেশনেত্রী গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে আসতেন তবে তার সম্মান স্বদেশে ও বিদেশে কি আরো বেশি গ্রহণযোগ্য হতো না। এ অপ্রাপ্তি কি আমাদের ভাবায় না, আমাদের দুঃখ দেয় না? তার সম্মান যে আমাদের সম্মান, দেশের সম্মান, তাই বলছিলাম আমরা সাধারণ মানুষ, বান কি মুন নই, আমরা আমেরিকা নই, চীন, জাপান নই (অর্থাৎ সেসব দেশের বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তি নই) আমরা প্রধানমন্ত্রীর ‘ুদ্র প্রজাবৃন্দ’, সংবিধানে এই প্রজাদের (জনগণ) সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বলা হয়েছে যদিও বাস্তবে এর প্রতিফলন তেমন একটা দেখা যায় না, বর্তমানে রাজা ও প্রজাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করার জন্য গণতন্ত্র নামক এক বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা সম্ভব হবে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে মনের মতন রাজা নির্বাচন করে। নির্বাচনে অধিকারবঞ্চিত জনগণ অবৈধ শব্দটির বোঝাটিও এখন আর বইতে নারাজ। তা ছাড়া বিদেশীদের অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন কথাটিও জনগণের মর্মপীড়ার কারণ। তারা বলেন, দশম সংসদ নির্বাচন ও চতুর্থ উপজেলা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণে ইউএসআইডি, ইউকে আইডি ও ইউরোপীয় কমিশন ইসির অর্থের অনুদান কমিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনের দুর্বলতার কারণে আমাদের নানাভাবে হেয় করা হচ্ছে ও দেশকে খেসারত দিতে হচ্ছে। জনগণকে ভুল না বুঝে সব দলের প্রধানকে নিয়ে ন্যায়নিষ্ঠ আলোচনার মাধ্যমে ও পরমতসহিষ্ণুতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করে রাষ্ট্রনায়কোচিত এক মহান অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন এটি বর্তমান বাংলাদেশের জনগণের এ সময়ের সর্বোচ্চ চাওয়া। আমাদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দৃঢ়চিত্তে প্রার্থনা করি ‘হে সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী জ্ঞানী আল্লাহ এ পৃথিবীর সব রাজত্বের তুমিই অধিপতি, তুমি আমাদের সঠিক পথ দেখাও তা না হলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্গত হবো।’
লেখক : অধ্যাপিকা

মোনাফেকি যখন অস্ত্র কিংবা অলঙ্কার by গোলাম মাওলা রনি

মোনাফেকির বাংলা কি? আগে জানতাম বিশ্বাসঘাতকতা। কথা দিয়ে কথা না রাখা বা একজনের কথা অন্যজনের কাছে অসদুদ্দেশ্যে বলে দেয়া অথবা চোগলখুরিকেও মোনাফেকি বলা যেতে পারে; কিন্তু আজ উপরিউক্ত শিরোনাম লিখতে বসে যখন ডিকশনারিতে মোনাফেক শব্দের অর্থ খুঁজতে গেলাম, তখন ভারি বিপদে পড়ে গেলাম। বাংলা-ইংরেজির অনেক ডিকশনারি খুঁজে মোনাফেক শব্দের কোনো সন্ধানই পেলাম নাÑ অর্থ তো দূরের কথা। ফলে শব্দটির ভাবার্থ নিয়ে আমাকে কুরআন-হাদিসের দ্বারস্থ হতে হলো। কথায় কথায় আমরা অহরহ শব্দটির ব্যবহার করিÑ অথচ এর প্রকৃত অর্থ জানি না কিংবা বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় শব্দটির কোনো প্রতিশব্দ নেই, এ কথা এত দিন পরে জানার পর জ্ঞানের রাজ্যে নিজেকে এক নিঃস্ব দরিদ্র ফকির বলে প্রতীয়মান হলো।
আজকের লেখার প্রতিপাদ্যÑ রাজনীতিতে মোনাফেকি। রাজনীতির অঙ্গনে কিভাবে মোনাফেকি চলছে এবং কিভাবে সংশ্লিষ্টরা মোনাফেকিকে তাদের গলার মালা, নাকের ফুল কিংবা কানের দুল বানিয়ে নিজেদের অলঙ্কৃত করছে, সেসব বৃত্তান্ত লিখব; কিন্তু তার আগে মোনাফেকি ও মোনাফেক সম্পর্কে একটু ধারণা নেয়া দরকার। এটি একটি আরবি শব্দ। কুরআনে একাধিকবার শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। একাধিক হাদিসও রয়েছে মোনাফেকি সম্পর্কে। মোনাফেক এবং মোনাফেকি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেয়ার সুবিধার্থে কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যাকারকেরা সব সময় উদাহরণ হিসেবে একটি লোককে সামনে নিয়ে আসেন। এই লোকটির নাম হলোÑ আবদ-আল্লাহ ইবনে উবাই। সচরাচর তাকে ডাকা হয়Ñ আবদুল্লাহ বিন উবাই নামে। রাসূল সা:-এর মদিনার জমানার লোক ছিলেন তিনি। তার চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের মধ্যেই রয়েছে মোনাফেকির সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো।
আল্লাহর রাসূল সা: যখন মদিনায় হিজরত করলেন, তখন আবদুল্লাহ বিন উবাই ছিলেন সেখানকার সবচেয়ে বড় এবং প্রভাবশালী নেতা। তার ডাক নাম ছিল ইবনে সালুল। তৎকালীন আরবে ছেলেমেয়েদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাবার নামের পরিচয় বহন করতে হতো। অনেকের আবার পিতৃ পরিচয়ে সঙ্কট দেখা দিলে মায়ের পরিচয় বহন করতে হতো। নিজেদের নাম তারপর ইবনে বা বিনতে শব্দটি বসিয়ে বাবা অথবা মায়ের নাম জুড়ে দেয়া হতো। আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মায়ের নাম ছিল সালুল। লোকজন তাকে কখনো ডাকত ইবনে উবাই, আবার কখনো বা ডাকত ইবনে সালুল বলে। মদিনা কিংবা মক্কার কোনো গোত্রপতিকে তার মা-বাবার দ্বৈত নাম বহন করতে হতো না। নিজের জন্মসংক্রান্ত এহেন সন্দেহ ও অবিশ্বাস ধারণ করা সত্ত্বেও তিনি মদিনাতুল মনওয়ারা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে বসবাসরত সবচেয়ে বড় গোত্র বনু খারাজের গোত্রপতির পদটি ধরে রেখেছিলেন প্রচণ্ড শক্তিমত্তা এবং প্রভাবসহকারে। তার ছিল অনেক সঙ্গী-সাথী এবং অনুসারী। এসব লোক নামে মুসলমান হলেও আল্লাহ-রাসূল সা:কে বাদ দিয়ে ইবনে উবাই বা ইবনে সালুলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করত।
এবার আমরা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কর্ম এবং বৈশিষ্ট্য বর্ণনার মাধ্যমে মোনাফেকির ধরন-ধারণ বুঝতে চেষ্টা করব। তিনি ছিলেন গোত্রপতি এবং একজন ধনবান প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সার পথে প্রধান বাধা ছিলেন আল্লাহর রাসূল সা:। তিনি প্রকাশ্য যুদ্ধ কিংবা দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের মাধ্যমে রাসূল সা:-এর সাথে পেরে ওঠার কোনো সম্ভাবনা দেখতে না পেয়ে নামমাত্র মুসলিম হলেন; কিন্তু অন্তরে কুফরি ধারণ করে রইলেন। মদিনার সবচেয়ে প্রভাবশালী সরদার হিসেবে তিনি রাসূল সা:-এর দরবারে নিয়মিত হাজির থাকতেন এবং নিজের উপস্থিতির সুবাদে সাধারণ মুসলিম ও তার অনুসারীদের বিভ্রান্ত করতেন। তিনি মুসলমানদের গোপন সংবাদগুলো মক্কা এবং হেজাজ অঞ্চলের অপরাপর কাফেরদের কাছে পাচার করতেন। বিচার-সালিস, মদিনা রাষ্ট্র পরিচালনা, যুদ্ধ, সন্ধি প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি ছলে-বলে-কৌশলে নিজের দুরভিসন্ধি, চক্রান্ত এবং বিভ্রান্ত মতবাদ মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দিতেন। মুসলমানদের দুর্দিনে শয়তানি চাল এবং প্রতারণামূলক অভিপ্রায় নিয়ে এগিয়ে আসতেন এবং বিপদগ্রস্ত অবস্থায় সাহায্য দেয়ার আশ্বাস দিতেন। মুসলমানেরা তার প্রতি আস্থা রেখে বিকল্প সাহায্যের বাকি সব পন্থা অবলম্বন না করে যখন বিপদ-আপদের প্রান্তসীমায় পৌঁছাত, তখন ইবনে উবাই কোনো সাহায্য না করেই বিপদগ্রস্তদের দুর্দশা বহু গুণে বাড়িয়ে দিতেন। তার চক্রান্ত ছিল অতিশয় সূক্ষ্ম এবং বুদ্ধিদীপ্ত। তার বাহ্যিক আচরণ ছিল বন্ধুর মতো। ফলে মুসলমানেরা বারবার প্রতারিত হতেন। তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ রাসূল সা:কে সতর্ক করে দিতেন।
এবার আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলেই মোনাফেকি সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তিনি রাজনীতি করতেন। ছিলেন একটি গোত্র বা দলের প্রধান। সমগ্র মদিনা বা ইয়াসরিব অঞ্চলের বাদশাহ হওয়ার জন্য দল, সাংগঠনিক শক্তি, দলীয় লোকজনের অর্থবিত্ত ও সামরিক শক্তি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেছিলেন। সোজা পথে তার প্রতিপক্ষের সাথে পেরে উঠছিলেন না। নানামুখী চক্রান্ত ও প্রতারণার মাধ্যমে সে প্রথম প্রথম বিরোধী দলের সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমে ব্যর্থ হন। এর পর নিজের ধর্ম ও চরিত্র গোপন রেখে প্রতিপক্ষের ধর্ম ও চরিত্রের মধ্যে একাকার হয়ে যান। ছিলেন চমৎকার একজন অভিনেতা। তার ব্যক্তিত্ব, কথা বলার ধরন এবং মজলিসকে নিয়ন্ত্রণ করার জাদুকরী ও সম্মোহনী ক্ষমতার কারণে অনায়াসে যেকোনো বৈঠকে উপস্থিত লোকজনকে বিভ্রান্ত করে তাদের ওপর নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে পারতেন।
তিনি ছিলেন যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং যার পুরোটাই ব্যবহার করত কূটকৌশলে। শুধু মদিনা নয়, সমগ্র আরব উপদ্বীপের পরস্পরবিরোধী প্রায় সব প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের সাথে তার ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। এসব যোগাযোগকে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন। তার অন্তর ছিল ঈর্ষায় পরিপূর্ণ। তিনি ক্ষমা করতে জানতেন না। সময় ও সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষের ওপর অত্যাচার, অনাচার এবং অবিচার করতেন। আবার অবস্থা পাল্টে গেলে অত্যাচারিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সাথে কী করে যেন সম্পর্ক স্বাভাবিক করে ফেলতেন। তার ছিল অসাধারণ বাগ্মিতা। অনবরত কথার দ্বারা প্রতিপক্ষের মনোবল দুর্বল করে দিতেন এবং প্রতিপক্ষের মনে সন্দেহ ও অবিশ্বাস ঢুকিয়ে দিতেন। কোনো কাজ না করেও হতেন সব কাজের কাজী।
ছিলেন ভণ্ড ধার্মিক। মসজিদে যেতেন অনেকের পরে; কিন্তু অন্য সবাইকে অতিক্রম করে সে চলে যেতেন জামাতের প্রথম সারিতে। দাঁড়াতেন প্রতিপক্ষের প্রধান ব্যক্তিদের কাতারে। সবাই যখন রুকু বা সিজদায় ব্যস্ত থাকতেন তখন তিনি ঘাড় বাঁকিয়ে বা মাথা উঁচু করে তার প্রতিপক্ষের একাগ্রতা যাচাই করার চেষ্টা করতেন। নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় চার পাশে, ওপরে এবং নিচে অবলীলায় তাকিয়ে দেখতেনÑ কে কী করে! মূলত ধর্মকে মানতেন না; তবে ধার্মিক হওয়ার ভান করে মানুষজনকে বিভ্রান্ত করতেন।
দলের সরদার হিসেবে কেবল নিজের ও তার পরিবারের স্বার্থই দেখতেন। দলের দরিদ্র লোকদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থটুকু ষোলআনাই আদায় করে নিতেন। তিনি যাদের ব্যবহার করে বিরোধী দলের কাছ থেকে ফায়দা হাসিল করতেন, সেই লোকদের কল্যাণের জন্য কিছুই করতেন না। কেবল নিজের ভণ্ডামি, প্রতারণা ও কথামালার জাদুতে দলীয় লোকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন দিনের পর দিন। মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যুদ্ধে তার মোনাফেকির কারণে ভয়ানক বিপর্যয় নেমে আসে। ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে বনু কায়নুকার যুদ্ধ, ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে ওহুদের যুদ্ধ, বনু নাজির গোত্রের সঙ্ঘাত ও ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত বনু মোস্তালিফের ঘটনায় আবদুল্লাহ বিন উবাই মুসলমানদের নানামুখী বিপর্যয়ে ফেলেছিলেন। বিশেষ করে বনু মোস্তালিফের ঘটনায় তার কূটকৌশলে মুসলমানদের মধ্যে শুরু হয় অবিশ্বাস, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আত্মকলহ। এমনকি হজরত ওমর রা: পর্যন্ত আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের দ্বারা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়লে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আল কুরআনের ৬৩ নম্বর সূরা নাজিল করেন, যার নাম সূরা মুনাফিক্কুন। এই সূরার আট নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তারা এরূপই বলে যে, মদিনায় ফিরে আমরা দুর্বলদের অবশ্যই সেখান থেকে বের করে দেবো; কিন্তু প্রকৃত মর্যাদা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং মুমিনদের জন্য; কিন্তু মোনাফিকরা তা অবগত নয়।’
ওই আয়াতের ব্যাখ্যা বা তফসিরে গেলে বহু সময় লেগে যাবে। তাই আমরা আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের অন্যসব কুকীর্তির মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখি। তিনি দশমুখে প্রতিপক্ষের নামে কুৎসা রটনা করতেন। মা আয়েশা সিদ্দিকা রা: সম্পর্কে কুৎসা ভয়াবহরূপে মদিনায় ছড়িয়ে পড়েছিল কেবল তারই কারণে। ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে সম্পাদিত হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন। অত্যন্ত সফলভাবে মুসলমান ও কাফের উভয় সম্প্রদায়কেই চুক্তিটির নেতিবাচক দিক বর্ণনা করার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তার অন্যতম চক্রান্ত ছিল ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে, যখন আল্লাহর রাসূল সা: সিরিয়ার বাইজান্টাইন সম্রাটের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন।
মারা যাওয়ার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত এই মোনাফিক সরদার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন মুসলমানদের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সব শক্তি বিনষ্ট করার। দলের মধ্যে উপদল সৃষ্টি, বিরোধী দলে ভাঙন, লোভী ব্যক্তিদের একত্র করা, দুর্নীতিবাজদের সংগঠিত করা এবং অন্যায়কারী, জুলুমবাজ ও অপরাধীদের ভালো মানুষদের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়ার দক্ষতার কারণে সমাজের সবাই তাকে যমের মতো ভয় পেত। ৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত আবদুল্লাহ বিন উবাই তার কুকর্ম চালিয়ে যেতে থাকেন বিপুল বিক্রমে।
এখন বাংলাদেশের রাজনীতি প্রসঙ্গে আসা যাক। আমাদের সমাজে কে বা কারা আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের চরিত্রের অধিকারী, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলাপের দরকার নেই। সম্মানিত পাঠক-পাঠিকারা তাদের আপন মেধা ও মননশীলতা দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনের মোনাফেকদের চিহ্নিত করে তাদের হয় প্রতিরোধ, নয়তো ঘৃণা বর্ষণ করবেনÑ এই আশা ব্যক্ত করে শিরোনাম প্রসঙ্গে চলে যাই। শিরোনামে বলা হয়েছে, মোনাফেকি যখন অস্ত্র কিংবা অলঙ্কার হয়! অর্থাৎ সমাজ পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সমাজপতিরা যদি মোনাফেকিকে প্রধান অস্ত্র বা হাতিয়ার কিংবা অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন পরিণতি কেমন হয়? আবার সমাজের গণ্যমান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিরা তাদের সব মানবিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কাজে মোনাফেকি করতে করতে পদবিকে তাদের অলঙ্কার বানিয়ে ফেলেন, তখন তাদের দেখতে কেমন মনে হয় এবং পরিণতিই বা কী হয়? এসব বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করে আজকের বিষয়ের ইতি টানব।
আমাদের সমাজের গোত্রপতিদের সাথে আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের পার্থক্য হলোÑ তিনি জানতেন নিজে অপরাধ করছেন। কাজেই তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হলেও প্রকাশ্যে নিজের কর্ম নিয়ে গর্ব করতে সাহস পেতেন না; কিন্তু বর্তমান জমানার বেশির ভাগ রাজনীতিক ইবনে উবাইকে অনেক আগেই অতিক্রম করে ফেলেছেন আপন আপন কুকীর্তির বিস্ময়কর মহিমায়। এখনকার নেতারা তাদের মোনাফেকি নিয়ে রীতিমতো গর্ব করেন। তারা দম্ভ করেন। তাদের দ্বারা অত্যাচারিত লোকদের নয়Ñ বরং তাদের মতো অন্য মোনাফেকদের আহ্বান করে বলেনÑ আমার কাছে আসো! আমার কাছে আসো! আমার সাথে মোনাফেকির প্রতিযোগিতা করো, যদি তোমরা পারো! তাদের আসল কথা হলো, দেখো, আমাদের পোশাক পরিচ্ছদ, দেখো আমাদের অন্তর্বাস কিংবা প্রসাধনসামগ্রী। আমরা সব কিছুই মোনাফেকি নামক নিয়ামক দিয়ে তৈরি করেছি। তার পর পরিধান করে নিজেদের মনুষ্যত্বকে হত্যা করে আজব এক প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছি। আমরা আল্লাহ, রাসূল, ন্যায়নীতি, বেহেশত-দোজখ, দুনিয়া-আখিরাত-কিয়ামতÑ কিছু মানি না। তোমরা যদি পারোÑ তবে আমাদের কিছু করো। আর না পারলে আমাদের আনুগত্য করোÑ না হয় অত্যাচারিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও!
এখন প্রশ্ন হলোÑ মোনাফেকি যদি অস্ত্র ও অলঙ্কার হয়, তবে সমাজের কী পরিণতি হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের আবারো আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের কাছে ফিরে যেতে হবে। তিনি ছিলেন মোনাফেক সরদার। তা সত্ত্বেও মোনাফেকি তার একমাত্র বা প্রধান অস্ত্র কিংবা অলঙ্কার ছিল না। ফলে তিনি অনায়াসে ভালো মানুষ সেজে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মুমিন মুসলমানদের সাথে মেলামেশা করতে পারতেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক অটুট রাখতে পেরেছিলেন। প্রতিপক্ষের সম্মানিত ব্যক্তিদের সমীহ করতে এবং শত অপরাধ সত্ত্বেও প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে নিজের মর্যাদা ও অবস্থান সমুন্নত রাখতে পেরেছিল। এখানে উল্লেখ্য, আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের মৃত্যু হলে আল্লাহর রাসূল সা: তার মৃতদেহ দেখতে আসেন, শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেন এবং নিজে মৃতব্যক্তির জানাজা পড়ান। অন্য দিকে, মোনাফেকি যখন প্রধান অস্ত্র ও অলঙ্কার হয়, তখন মানুষ তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে অপমান, অবিশ্বাস ও নির্যাতন করে মজা পায়।
তাদের চেহারাসুরত থেকে মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পবিত্রতা উধাও হয়ে যায়। সব কিছু কেমন যেন বিকৃত মনে হয়। এক পক্ষ আরেক পক্ষের মৃত্যু কামনা করে। অপর পক্ষের মৃত্যুতে উল্লাস প্রকাশ করে এবং জানাজায় অংশগ্রহণ করে না। তারা একজন অন্যজনের চেহারা পর্যন্ত দেখতে পারে নাÑ এক সাথে বসে না, কথা বলে না এবং কায়মনোবাক্যে একে অপরকে অভিসম্পাত করে। ফলে আসমানের রহমতের দরজা বন্ধ হয়ে যায়Ñ সন্ধি ও সমঝোতার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায় এবং নেমে আসে আসমানি ফয়সালা।

ইতিহাসের পাতায় ২৮ অক্টোবর by এরশাদ মজুমদার

আল্লাহ পাকই মানবজাতির জন্য দিনণ, মাস, বছর ও রাত-দিন তৈরি করেছেন। মানুষকে দিন-রাত্রির জ্ঞান দান করেছেন। এই জ্ঞান দিয়েই মানুষ দিনণ গণনা শিখেছে। ইতিহাস রচনা করা শিখেছে। মুসলমান জ্ঞানীগুণী ও ইতিহাসবিদেরা মানবজাতিকে ইতিহাসবিজ্ঞানের জ্ঞান দিয়েছেন। ভারতে ইতিহাসবিজ্ঞানের জ্ঞান ও চর্চা নিয়ে এসেছেন মুসলমানেরা। বিশেষ করে মোগল যুগে বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস রচনা শুরু হয়েছে। জওয়াহেরলাল নেহরু নিজে এ কথা বলেছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ উদ্বোধন করার সময় প্রিন্স চার্লস বলেছিলেন, মুসলমানেরাই ব্রিটেনসহ ইউরোপে জ্ঞানের আলো নিয়ে গেছে। দিন বা তারিখের নিজস্ব কোনো গুণ নেই। ঘটনাপ্রবাহ দিন বা রাত্রিকে স্মরণীয় করে রাখে। তাই এসব দিন ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়। পবিত্র কুরআন নাজিলের দিনণ স্মরণীয় হয়ে আছে কুরআনের কারণে। আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্ম ও মৃত্যুদিবস পালন করি। কারণ এরা নিজেদের জাতিকে গৌরবান্বিত করেছেন। একসময় মুসলমানদের মুক্তির জন্য মুসলিম লীগ সংগ্রাম করেছে। তাই ইতিহাসে মুসলিম লীগ স্থান করে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশেষ অবদান রাখার কারণে ইতিহাসে দলটি দৃঢ় অবস্থান করে নিয়েছে। তাই বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও মৃত্যুদিবস পালন করা হয়। একইভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বা পাঠ করে শহীদ জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে নিজেকে অমর করে রেখেছেন। একইভাবে জিন্নাহ ও গান্ধীজী ভারতের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। ইতিহাসে নিন্দিত ব্যক্তিও আছেন, যেমন জেনারেল মীর জাফর আলী খান ও লর্ড কাইভ। কাইভ নবাবের কোষাগার লুণ্ঠন করে দোষী সাব্যস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন। কারবালার যুদ্ধের কারণে খলিফা ইয়াজিদ একজন মহা নিন্দিত ব্যক্তি হিসেবে স্থান পেয়েছে।
ইতিহাসের এই দিনে ১৯৪০ সালে হিটলার ও মুসোলিনি ফোরেন্সে এক সভায় মিলিত হয়েছিলেন। এই দু’জনই ছিলেন জগদ্বিখ্যাত স্বেচ্ছাচারী শাসক। ১৯৪৮ সালের এই দিনে ইসরাইল তার রাষ্ট্রীয় পতাকার নকশা অনুমোদন দেয়। এই তারিখেই ১৯৪৯ সালে ইহুদিবাদী নেতা নেতানিয়াহুর জন্ম হয়েছে। ১৯৪৫ সালের এই দিনে ফরাসি দেশের নারীরা ভোটাধিকার লাভ করেছেন। ইতিহাসের কারণেই আমরা অতীতের কথা জানতে পারি। তবে আমরা যে ইতিহাস জানি, তা হলো, বিজয়ীর ইতিহাস। রাজার ধর্মই জনগণের ধর্মে পরিণত হয়েছে। রাজারাই কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদদের রাজার পে ইতিহাস রচনা করতে বাধ্য করে থাকে। যেমন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব নাকি হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন বলে একশ্রেণীর ঐতিহাসিক লিখে গেছেন। অথচ তিনি ছিলেন একজন দরবেশ সম্রাট। সেলাই করে আর হাতে লিখে কুরআনের কপি করতেন এবং তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি সারা ভারতে বহু মন্দির প্রতিষ্ঠা করার জন্য টাকা বরাদ্দ করেছেন। অপর দিকে বাদশাহ আকবর দ্বীনে ইলাহি চালু করে সনাতনধর্মীদের কাছে প্রিয় হয়েছেন আর মুসলমানদের কাছে নিন্দিত হয়েছেন। ইসলামের ইতিহাসে আবু জেহেল ও আবু লাহাব দু’জন মহা নিন্দিত ব্যক্তি। অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে, ইতিহাস কখনোই নিরপে হয় না। ত্যাগী ইতিহাসবিদ, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকেরা নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বিদেশে অবস্থান করে সত্য ইতিহাস তৈরি করে রেখে যান আগামী দিনের সত্যান্বেষীদের জন্য। আবার অনেকেই বলেন, সমকালে নিরপে ইতিহাস রচনা করা যায় না। যেমন, নবাব সিরাজ উদদৌলার ইতিহাস। বেশ কয়েকজন সনাতনধর্মী ইতিহাসবিদ ও ইংরেজ সিরাজকে কলঙ্কিত করে ইতিহাস রচনা করেছেন। অনেক কবি-সাহিত্যিকও নবাবের বিরুদ্ধে কবিতা ও সাহিত্য রচনা করেছেন। কিন্তু সত্য ইতিহাস চাপা পড়েনি। মুসলমান খলিফাদের (কার্যত বাদশাহ) আমলে বহু ইসলামিক পণ্ডিত, আলেম ও স্কলারদের নির্যাতন সহ্য করে শহীদ হতে হয়েছে। এমনকি প্রতিপরে আক্রোশ থেকে রা করার জন্য জ্ঞানের দুয়ার হজরত আলী রা:-এর কবর বা মকবরাকে ৯০ বছর লুকিয়ে রাখতে হয়েছে। আপনারা আসাদুল্লাহ হজরত আলী রা:-এর ভাষণগ্রন্থ নাহজুল বালাগা পড়তে পারেন তাঁর জ্ঞানের গভীরতা জানার জন্য। আমাদের হানাফি মাজহাবের ইমামে আজম হজরত আবু হানিফার জীবনী পড়ুন। তখনকার মুসলমান খলিফা তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করেছেন। ইতিহাসের প্রথম মরমি কবি মনসুর হাল্লাজকেও হত্যা করেছেন তখনকার খলিফা। যদিও খলিফার মা হাল্লাজের প হয়ে মা প্রার্থনা করেছিলেন। বলা হয়, শুধু শরিয়ত রা করার জন্য তাকে হত্যা করা হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে ইংল্যান্ডের রাজা অনেক ধর্মযাজককে হত্যা করেছেন। একই কারণে মহাজ্ঞানী সক্রেটিসকেও হত্যা করা হয়েছে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে কোটি কোটি মানুষকে জগতের মতাবানেরা। মানবজাতির ইতিহাস এভাবেই কলঙ্কিত হয়ে আছে।
যে ভারত মুসলমান শাসকেরা শাসন করেছেন এক হাজার বছরের মতো, সেই ভারতকে মুসলমান নেতারা কখনোই খণ্ডিত করতে চাননি। চেয়েছেন গান্ধীজী, গোখলে, প্যাটেল ও নেহরুজী। আর তাদের সহযোগিতা করেছেন ইংরেজ শাসকেরা। মুসলমান নেতারা বাধ্য হয়ে পাকিস্তান নামে একটি আলাদা রাষ্ট্রের দাবি করেছেন। কংগ্রেস নেতারা যদি একটু সহনশীল হতেন তাহলে ভারত বিভক্ত হতো না। কিন্তু বিভক্ত ভারতের জন্য দায়ী করা হলো মুসলমানদের। এমনকি বাংলাদেশে এখনো মুসলমান স্বার্থবিরোধী কিছু আরবি নামধারী রাজনীতিক ও দলদাস বুদ্ধিজীবী আছেন, যারা ভারত ও বঙ্গদেশ বিভক্তির জন্য মুসলমানদের দায়ী করে থাকেন। বাংলাদেশে মুসলমান মেজরিটি বাস্তবতায় যারা বিশ্বাস করেন না, তারা মনে করেন বাংলাদেশ বাঙালিদের দেশ। এ দেশে ধর্মীয় মেজরিটির স্বার্থ রাকে এরা সাম্প্রদায়িকতা মনে করেন। এরা বলেন, বাঙালিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ফলে তাদের কাছে বাংলাদেশ মুসলমানের দেশ নয়, ভারতের দর্শনই তাদের দর্শন। ভারত বাংলাদেশকে শুধু বাঙালির দেশ হিসেবে দেখতে চায়। এর অর্থ মেজরিটি হিসেবে মুসলমানদের কোনো গুরুত্ব থাকবে না। আমাদের বাপ-দাদারা মুসলমানদের এগিয়ে নেয়ার জন্য রাজনীতি করেছেন আর এখন তাদের নাতিপুতিরা ধর্মমুক্ত বা ধর্মবিরোধী অবস্থানে থাকতে পছন্দ করেন। মেজরিটি মানুষের স্বার্থ ত্যাগ করে মাইনরিটির স্বার্থ রার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। চলমান সরকার রাষ্ট্রকে ধর্মমুক্ত রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সংবিধানকে আল্লাহ-মুক্ত করেছেন। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সা:কে গালি দিলে সরকারের তেমন শক্তিশালী কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। মতাবান ব্যক্তিদের সমালোচনা বা ব্যঙ্গ করলে শাস্তি হয়। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল সা:-এর বিরুদ্ধে ব্লগ লিখে রাজীব নামে এক যুবক নিহত হলে সরকারের মন্ত্রী বলেছেন, দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রথম শহীদ। মন্ত্রীর কাছে শহীদ মানে হলো রাজনৈতিক গুণ্ডাপাণ্ডা ও দলদাস হলেই শহীদ হবে। ইসলামে শহীদ মানে ধর্ম রায়, আল্লাহর নির্ধারিত পথে চলতে গিয়ে জীবন দিলে শহীদ হওয়া যায়। রাজনীতিতে ধর্মদ্রোহীদেরও মর্যাদা থাকতে পারে। জগতে ৭০০ কোটি মানুষ থাকলে তার ৯৯ শতাংশ মানুষই ধর্মে বিশ্বাস করেন। হয়তো অনেকেই পূর্ণাঙ্গ চর্চা করেন না। কিন্তু খোদা বা তাঁর নবী-রাসূলদের অমান্য বা অস্বীকার করেন না। তবে মোনাফেক থাকতে পারেন। আমি সব সময় বলে আসছি, বাংলাদেশে ইংরেজি শিতি ও অর্ধশিতি কিছু মানুষ ধর্ম নিয়ে বিতর্ক করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বেশির ভাগই সুবিধাবাদী। তাদের আদর্শ দর্শন হলো, যেভাবেই হোক ভোট আদায় করে মতায় যাওয়া। ফলে বাংলাদেশ একটি আদর্শবিহীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রথম জীবনে রাজনীতি শুরু করেছিলেন একজন মুসলমান হিসেবে। সনাতনধর্মীদের অত্যাচার তিনি ও তার পরিবার প্রত্য করেছেন। রমাপদর মিথ্যা মামলায় তিনি জীবনে প্রথম জেলে যান। পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি দেখলেন, সাধারণ মুসলমানের স্বার্থ রা হচ্ছে না, তখন তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম গঠন করেন। জীবনে শেষ দিন পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের স্বার্থ রার সংগ্রাম করে গেছেন। ফলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতায় পরিণত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, আদবকায়দা, চলন-বলন, ইতিহাস আজ খোলাখুলিভাবেই দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ ধর্মমুক্ত রাষ্ট্রের পক্ষে অপর ভাগ ধর্মযুক্ত রাষ্ট্র ও রাজনীতির পক্ষে এক ভাগ সংবিধানকে ধর্ম ও আল্লাহ-মুক্ত রাখতে চায়, যারা নিজেকে শুধুই বাঙালি মনে করেন। এরা মনে করেন ধর্ম ব্যক্তিগত, রাষ্ট্র সবার। আরেক ভাগ নিজেদের বাঙালি মুসলমান মনে করেন। তারা ভৌগোলিক ও ধর্মীয় কারণে নিজেদের বাংলাদেশী মনে করেন। ধর্মীয় কারণে নয়, শোষিত ও নির্যাতিত মাইনরিটির (মুসলমান) স্বার্থ রার জন্য পাকিস্তান সৃষ্টি। আর ’৭১ সালে অর্থনৈতিক শোষণের কারণে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও দৃশ্যত মনে হয় ভারত খণ্ডিত হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে। এখানে ইসলাম বা মুসলমানের কোনো বিষয় ছিল না। ইসলাম বা মুসলমানিত্ব কাউকে বা দুর্বলকে শোষণের অধিকার দেয় না। রাষ্ট্রের মতা ব্যবহার করে যখন মতাবানেরা মানুষের অধিকার হরণ করে ও অত্যাচার করে তখন জনসাধারণ কী করে? ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এখনো শোষণ ও অত্যাচার অব্যাহত আছে। কখনো ধর্মের নামে, আর কখনো গণতন্ত্র রার নামে। মতাসীন জোট বা দল নিজেদের ভাষাভিত্তিক জাতি ও নাগরিক মনে করেন। এরা আরবি নামের নাগরিক। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা ধর্মীয় মেজরিটির রাজনীতিতে এরা বিশ্বাস করেন না। ধর্মমুক্ত রাজনীতিতে বিশ্বাস না করলেই আপনি জিহাদি, সন্ত্রাসী, মৌলবাদী, গোঁড়া বলে চিহ্নিত হবেন আর সরকার (বৈধ বা অবৈধ) যা-ই হোক, রাষ্ট্রের স্বার্থ রার নামে আপনার ওপর অত্যাচার চালাবে। আপনাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করবে। ধর্মচর্চার স্বাধীনতা ও অধিকার বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তবুও ইসলাম আজ বিশ্বব্যাপী আক্রান্ত। মুসলমানেরাই টেরোরিস্ট। ধর্মমুক্তরা রাজনীতির কারণে আল্লাহু আকবার না বলে আল্লাহ সর্বশক্তিমান বলে থাকেন। এরা আল্লাহর সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস না করে মানুষের সার্বভৌমত্ব বিশ্বাস করেন। যাদের কুরআন ও রাসূল সা:-এ বিশ্বাস তেমন দৃঢ় নয় তারাই আল্লাহর সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করেন না। এসব মৌলিক বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য না থাকায় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। মতাসীন সরকার ও নেতারা ব্যক্তিগত জীবনে ও পারিবারিক জীবনে ধর্ম চর্চা করেন বলে বহুল প্রচারিত, কিন্তু সরকার ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তারা ধর্মমুক্ত। মতাসীনেরা তাদের রাজনৈতিক দর্শনকে স্থায়ী রূপদান করার জন্যই মতায় থাকতে চান। তাও আবার গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে দিয়ে। তাদের এই দর্শনকে শক্তিশালী সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে দিল্লি সরকার। ধর্মীয় রাজনৈতিক দল বিজেপি তাদের রাষ্ট্রীয় দর্শনের কারণেই মতাসীনদের জোর করে, ব্ল্যাকমেইল করে মতায় রাখতে চায়। মতাসীনেরা ওদের সেবাদাসের ভূমিকা পালন করছে।
ধর্মমুক্ত রাজনীতিতে বিশ্বাসীরা ১৯৯৬ সালে কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে, চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ করেছে, বিমান অফিস ধ্বংস করেছে, চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে আগুন দিয়েছে, নির্বাচনের দিন কারফিউ ঘোষণা দিয়েছে, তারা আজ সাধু হয়ে গেছে। সেই একই গ্রুপ বা দল ও গোষ্ঠী ২০০৬ সালে খুন-খারাবি করে অন্যায়ভাবে শক্তি প্রয়োগ করে বাংলাদেশে নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরে ধর্মমুক্ত রাজনীতির নেতা ও গুরুদের আহ্বানে তার দলীয় কর্মীরা বেলা ১১টায় লগি-বৈঠা নিয়ে প্রতিপ দলের রাজনৈতিক কর্মীদের সশস্ত্র হামলা চালিয়ে অনেক কর্মীকে হত্যা করে ও বহু মানুষকে জখম করে পঙ্গু করে দেয়। তার বিচার আজো হয়নি। কেন হয়নি বা হচ্ছে না দেশবাসী ভালো করেই জানেন। সারা বিশ্ব এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য টিভির মাধ্যমে দেখতে পেয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপ দল বা মতকে হত্যা করার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে ২৮ অক্টোবর। ধর্মহীন আরবি নামধারী আর সনাতনিরা মনে করেন, শক্তিই আসল মতার উৎস। শক্তি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মেজরিটিকে দমন করে রাখা যায়। ষড়যন্ত্রের কারণেই কাইভ নবাবের ৫০ হাজার সৈন্যকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন। কারণ, কাইভ অখণ্ড জাতিকে হিন্দু মুসলমানে বিভক্ত করতে পেরেছিল।
মতাসীন দল বা জোটের সৃষ্ট সেই নৈরাজ্যকর অবস্থার অদৃশ্য ও পেছনের শক্তিরা পরে ভারতের সহযোগিতায় রাষ্ট্রমতা দখল করে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ধ্বংস করে। আজ এরা পরবাসী। তখন দিল্লির খাস প্রতিনিধি পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় দেখাশোনা করতেন। জেনারেল মইন তখন নানা ধরনের নাটক করে শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে তথাকথিত নির্বাচন করেন আওয়ামী লীগকে মতায় বসানোর জন্য। যেমন লর্ড কাইভ দৃশ্যত কিছু বেইমান মুসলমান ও সনাতনধর্মীদের হাত করে পলাশী যুদ্ধের নাটক বানিয়েছিল। সেই নাটকে জেনারেল মীরজাফর আলী খানকে গদিতে বসানো হয়। লর্ড কাইভ কোম্পানির সদর দফতরের অনুমতি ছাড়া রাজনৈতিক খেলা খেলেছিলেন। ফলে কাইভের শাস্তি হয়েছিল। তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। বাংলাদেশের েেত্র জেনারেল মইন দিল্লির পরামর্শ ও সহযোগিতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মতা দখল করেছিলেন। জেনারেল মইনকে স্থানীয়ভাবে সমর্থন করেছিলেন দিল্লির অনুগত ও সেবাদাস কিছু দল ও গোষ্ঠী। ভারতের সেবাদাস জেনারেল মইনের মূল ল্য ছিল জিয়াপরিবারকে ধ্বংস করে ভারতের অনুগত রাজনৈতিক দল ও নেতাদের চিরস্থায়ীভাবে মতায় বাসানো। সে সময়ে মইন নিজেই তার অবৈধ অধিকৃত মতা বলে নিজেকে প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে দিল্লিতে লাল গালিচার সংবর্ধনা ও ছয়টি ঘোড়া উপহার পেয়েছিলেন। জেনারেল আইউবও নিজেকে ফিল্ডমার্শাল প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছিলেন। ’৮২ সালে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে উচ্ছেদ করে মতায় এসে জেনারেল এরশাদ বলেছিলেন, তিনি দিল্লির সাথে কথা বলেই মতা দখল করেছিলেন। আওয়ামী লীগ বলেছিল তারা অসন্তুষ্ট নন। ভারতের কাগজ লিখেছিল ‘বন্দুকের নলে প্রজাপতি’। ২০০৮ সালে দিল্লির সেবাদাসরা মতা দখল করে জেনারেল মইনকে মা করে দিয়েছিলেন।
আবার ভারতের পরামর্শেই সেবাদাসরা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বশংবদ নির্বাচন কমিশন দিয়ে ভোটারবিহীন নির্বাচন করেন। সে সময়ে সরকারি হিসাব মোতাবেক ৮০ শতাংশ ভোটার নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ১৫৪ জন বিনা ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ধর্মমুক্ত দল ও জোট এখন মতায় আছে, সেই ভোটারবিহীন নির্বাচনের জোরে। আমাদের মহা পবিত্র ধর্মমুক্ত সংবিধান বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার তাদের সে অধিকার দিয়েছে। ভোট লাগবে না, শুধু গণতন্ত্রের নামাবলি থাকলেই চলবে। যেকোনো উপায়েই হোক, প্রধানমন্ত্রীর পদটা পেলেই তো সাংবিধানিকভাবেই একজন মোগল/ রোমান/পারস্য বা রাশিয়ার জার সম্রাট। গত বছর গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনের নামে রাষ্ট্র কয়েক শ’ নাগরিককে হত্যা করেছে। এখন বলা হচ্ছে রাষ্ট্র ও জনগণকে রা করার জন্যই তা করা হয়েছে। বাংলাদেশের ধর্মমুক্ত/ধর্মহীন দল ও জোট নেতারা হলেন বৈদিক যুগের আর্যঋষিদের মতো। তারাই ভূমিপুত্র দেশপ্রেমিকদের রাস বানিয়েছেন। তাদের বিপ শক্তিকে শূদ্র বা অর্ধমানবে পরিণত করেছে। আর্য ত্রিয় নেতা রাজা দশরথের পুত্র রামকে রাজা ও দেবতায় পরিণত করেছে। বাংলাদেশে এখন সেই রাজনীতির ধারা চালু হয়েছে।
লেখক : কবি ও ঐতিহ্য গবেষক

স্মরণ- বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ হামিদুর রহমান

বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি মোহাম্মদ হামিদুর রহমানের জন্ম ১৯৪৫ সালে ডুমুরিয়া গ্রাম, চাপড়া, চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গে। স্থায়ী নিবাস গ্রাম খোর্দ্দ খালিশপুর, উপজেলা মহেশপুর, জেলা ঝিনাইদহ। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পরে নাইট স্কুলে সামান্য লেখাপড়া করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেয়ার পরই চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে যান। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে চাকরিস্থল থেকে নিজ গ্রামে ফিরে বাড়িতে থাকেন মাত্র এক দিন। পরদিনই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে যান সুদূর সিলেট জেলার ধলই চা বাগানের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত বর্ডার আউট-পোস্টে। সামরিক দিক থেকে এই ফাঁড়িটি দখল করা ছিল মুক্তিবাহিনীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘাঁটি দখলের দায়িত্ব দেয়া হয় প্রথম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানিকে। এই দলে ছিলেন হামিদুর রহমান। এ জন্য ২৮ অক্টোবর ভোরে আক্রমণের দিন ঠিক করা হয়। আগের রাত ১০টায় যাত্রা শুরু মুক্তিযোদ্ধাদের। ভোর ৪টায় লক্ষ্যস্থলের কাছে পৌঁছে তারা চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নেন। সামনে দুই প্লাটুন ও তার পেছনে আর এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা। শেষের প্লাটুনটি প্রথম দুই প্লাটুনের অনুসরণকারী হিসেবে অগ্রসর হতে থাকে। টার্গেট ঘাঁটির কাছাকাছি এলে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের সাথে সাথে শুরু হয় শত্রুর অবিরাম গোলাবর্ষণ। বাধ্য হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা মাটিতে শুয়ে পড়েন। আর  এগোনো তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় শত্রুর এলএমজি অবস্থানের ফলে আর গাছপালার জন্য মেশিনগান দিয়ে গুলি করেও কোনো ফল হচ্ছিল না। অথচ শত্রুর এলএমজি স্তব্ধ করতে না পারলে ধলই ঘাঁটি দখল অসম্ভব। এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে এগিয়ে এলেন দুঃসাহসী সিপাহি হামিদুর রহমান। সঙ্গোপনে হামাগুড়ি দিয়ে শত্রুর অগোচরে এগিয়ে গেলেন এলএমজি পোস্টের দিকে। ঝাঁপিয়ে পড়লেন শত্রুপক্ষের ওপর। নিহত হলো এলএমজি চালকদ্বয়।
সাথে সাথে স্তব্ধ হলো এই মারণাস্ত্র এবং গুলির আঘাতে নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন হামিদুর রহমান নিজেও। কিন্তু তার প্রাণের বিনিময়ে স্পন্দন জাগল সি কোম্পানির সৈনিকদের মধ্যে। ফলে দুর্বার গতিতে তারা দখল করে নিতে সক্ষম হলেন সেই দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। সাথে সাথে যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হয়ে গেল। নিজের জীবন উৎসর্গ করে হামিদুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে আরো নিশ্চিত করে দিলেন। দেশ তাকে বীরশ্রেষ্ঠের সম্মানে ভূষিত করেছে। জাতি তার সর্বোচ্চ ত্যাগ ও অতুলনীয় অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে।

সরকার কাউকেই এমএলএম ব্যবসার লাইসেন্স দিচ্ছে না by ফখরুল ইসলাম

বহুস্তর বিপণন (এমএলএম) পদ্ধতিতে ব্যবসা করার জন্য কাউকেই আর লাইসেন্স দিচ্ছে না সরকার। গত দেড় মাসে চার দফায় প্রস্তাবিত সব এমএলএম কোম্পানির আবেদনই চূড়ান্তভাবে নাকচ করে দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নাকচের কথা প্রস্তাবিত কোম্পানিগুলোর চেয়ারম্যানদের চিঠি পাঠিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গতকাল মঙ্গলবার এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমএলএম কোম্পানিগুলোর প্রতারণার কথা সবাই জানেন। লাইসেন্সের জন্য যারা আবেদন করেছিল, যাচাই করে দেখা হয়েছে তাদের কাউকেই লাইসেন্স দেওয়া যায় না। এর আগে যে চারটিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল সেগুলোর ব্যাপারেও তদন্ত করছি।’
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসা করার লাইসেন্স চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে মোট ১৯টি আবেদন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে প্রথম দফায় পাঁচটি, দ্বিতীয় দফায় ছয়টি ও তৃতীয় দফায় চারটি ও চতুর্থ দফায় চারটি প্রস্তাবিত এমএলএম কোম্পানির আবেদন নাকচ করা হয়। নাকচ হওয়া কোম্পানিগুলো হচ্ছে: ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড, পিনাকল সোর্সিং, সানুস লাইফ বিডি, এবি নিউট্রিক ইন্টারন্যাশনাল, এমওয়ে ইন্টারন্যাশনাল বিডি, ভিশন ইন্ডাস্ট্রিজ বিডি, লাইফওয়ে বিডি, ম্যাকনাম ইন্টারন্যাশনাল, লাক্সার গ্লোবাল নেটওয়ার্কিং, ডি-ক্লাসিক লাইফ বিডি, অ্যাডভান্স বাংলা, ড্রিম টুগেদার, দেশান বিডি, একসিলেন্ট ফিউচার মার্কেটিং, ফরেভার লিভিং প্রডাক্টস বিডি, টিয়ানসি (বিডি), মিশন-১০, এসএমএন গ্লোবাল এবং ইনফিনিটি। এদের মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসা করার কোনো আইন ছিল না দেশে। তা সত্ত্বেও যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের (রেজসকো) কার্যালয় থেকে কোম্পানির নিবন্ধন নিয়ে শতাধিক এমএলএম কোম্পানি গড়ে উঠেছিল। ২০১২ সালে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের অনিয়ম-দুর্নীতি ফাঁস হওয়ার পর ২০১৩ সালের অক্টোবরে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন করে সরকার। এই আইনের অধীনে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে করা হয় বিধিমালা, যা আবার সংশোধন করা হয় গত ২২ জুলাই।
আইনে এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা করা হয় রেজসকোকে। এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসা করার জন্য এ যাবৎ রেজসকোতে লাইসেন্স নেওয়ার জন্য আবেদন পড়ে ২৩টি। এর মধ্যে গত মার্চে রেজসকো চারটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়। এগুলো হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ভিশন ২১, স্বাধীন অনলাইন পাবলিক লিমিটেড, রিচ বিজনেস সিস্টেম ও এমএক্সএন মডার্ন হারবাল ফুড।
আইনে রেজসকো থেকে লাইসেন্স না পেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আপিল করার সুযোগ রাখা হয়। সে অনুযায়ী রেজসকো থেকে লাইসেন্স না পাওয়া কোম্পানিগুলো পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আপিল করে। কয়েক মাস ধরেই আবেদনকারীদের দফায় দফায় শুনানি গ্রহণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মূর্তজা রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি। কিন্তু লাইসেন্স পাওয়ার প্রয়োজনীয় শর্ত ও যোগ্যতা কেউই পূরণ করতে পারেনি বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
বাণিজ্যসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, প্রস্তাবিত কোম্পানিগুলোর আবেদনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করা হয়েছে। আবেদনকারীদের শুনানিও গ্রহণ করা হয়েছে। দেখা গেছে যে কেউই লাইসেন্স পেতে পারে না। শর্ত পূরণের বিষয়ে জানতে চাইলে ডেসটিনি গ্রুপের কোম্পানি সচিব মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সব শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও মন্ত্রণালয় অন্যায়ভাবে আমাদের লাইসেন্স দেয়নি। আমরা এখন আদালতে যাব।’
লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসা নিষিদ্ধ হলেও রাজধানীসহ দেশের আনাচে-কানাচে এখনো এই ব্যবসা চলছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে। রাজধানীর হাতিরপুল ও পল্টন এলাকাতেই রয়েছে অন্তত ৫০টি প্রতিষ্ঠান। ব্যবসা করতে চাইলে আইন অনুযায়ী এদের লাইসেন্স নেওয়ার কথা। কিন্তু লাইসেন্স নেওয়ার জন্য কেউ আবেদনই করেনি। মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইনের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে লাইসেন্স নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করতে হবে। নইলে এমএলএম কার্যক্রম করা যাবে না। এই ধারা লঙ্ঘনকারীদের ১০ বছরের জেল ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
এদিকে রেজসকো থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে লাইসেন্স পেল—গত রোববার তা নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। লাইসেন্স পেলেও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের ঘাটতি থাকলে এখনো এদের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান। লাইসেন্স ছাড়াই যেসব প্রতিষ্ঠান এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনার দরকার রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো প্রতারণামূলক ব্যবসা চলতে দেওয়া হবে না।’

নির্বাচনের পর গোলযোগের আশঙ্কা থাকলেও তা ঘটেনি -গালফ নিউজকে সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের সৃষ্ট গোলযোগ নির্বাচনের পরেও অব্যাহত থাকবে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। জনগণ এ ধরনের সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মেনে নেয়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফরকালে গত শনিবার উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী পত্রিকা গাল্ফ নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। বিগত নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশগ্রহণ না করায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গাল্ফ নিউজ–এর সাংবাদিকের এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েকটি দল নির্বাচন বর্জন করলেও এতে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। নির্বাচনের পর দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে এবং বিশ্বনেতারা তাঁর সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) নির্বাহী চেয়ারপারসন এবং অপর এক সংসদ সদস্য ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটি আমার সরকার ও পার্লামেন্টের প্রতি বিশ্বের সমর্থন প্রমাণ করে।’
ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীদের মধ্যে বর্তমান বিরোধের প্রধান কারণ হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাই দায়ী বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। এর জবাবে কী বলবেন—জানতে চাইলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বলে উল্লেখ করেছে। আর এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিএনপি সরকারের আমলেই দেশের একজন নাগরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন। সর্বোচ্চ আদালতের এই আদেশ সকলকে মেনে চলতে হবে।’
ভারতে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক এখন কেমন—এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতের ক্ষমতায় যে–ই থাকুক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সব সময় চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কিছু সমস্যা থাকেই। এ বিষয়ে আমার নীতি হচ্ছে কোনো মধ্যস্থতা ছাড়াই দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করা।’
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরে প্রধানমন্ত্রী কতটা আশাবাদী—এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমরা জানি, তিনি কী করেছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং অন্যান্য দল খুবই সহায়ক মনোভাবের। একমাত্র তিনিই সহায়তা মনোভাবের নয়। তবে আমি নিশ্চিত, একসময় তিনি ঠিকই বুঝতে পারবেন এবং সহযোগিতা করবেন।’
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা–সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই অঞ্চলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহযোগিতা, যোগাযোগ ও বাণিজ্যের অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ব্যবস্থা সম্ভব হবে না। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নেতারা দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য সরবরাহ, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসুবিধা, স্যানিটেশন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জনগণের ক্ষমতায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ঐক্যবদ্ধ থাকলে দেশের অভ্যন্তরে অথবা বাইরের কোনো শক্তি আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’
বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর গঠনের একটি ধারণা সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক বেইজিং সফরকালে চীনা নেতাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন। আসিয়ান ও সার্ক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিজের ও দুটি অর্থনৈতিক ব্লকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বাণিজ্য, পর্যটন, বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারত্বে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চাই।’
অন্যদিকে সোমবার খালিজ টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত অপর এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ইউএইর সঙ্গে বাণিজ্য–সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী এবং বন্দর, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, আবাসন, বেসামরিক বিমান পরিবহন, পর্যটন ও টেলিযোগাযোগের মতো নতুন খাতে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা যথেষ্ট বলিষ্ঠ। কেউ বিনিয়োগে আগ্রহী হলে আসুন এবং আমাদের অবস্থা দেখুন। আমাদের পক্ষ থেকে অবশিষ্ট সুযোগ-সুবিধাগুলোও দেব। আমরা পরিবেশ তদারকি সহজ করেছি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও সহায়ক করব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে বর্তমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত¯চমৎকার। অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য ব্যাপকভিত্তিক কাঠামো তৈরিতে একটি যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন বর্তমানে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।’

মহাসড়কে একের পর এক ডাকাতি- হাইওয়ে পুলিশ প্রশ্নবিদ্ধ by গোলাম মর্তুজা

মহাসড়কের নিরাপত্তা দিতে পারছে না হাইওয়ে পুলিশ। পরিবহনব্যবসা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চাঁদা তোলা ছাড়া হাইওয়ে পুলিশের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। মহাসড়কে ডাকাতি-ছিনতাই ঘটনার প্রতিকারও মেলে না। তবে হাইওয়ে পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আছাদুজ্জামান মিয়া মনে করেন, পর্যাপ্ত জনবল ও যানবাহনের অভাব এবং মামলা গ্রহণ ও তদন্তের এখতিয়ার না থাকায় হাইওয়ে পুলিশের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। ৮০ শতাংশ কাজের ক্ষেত্রে হাইওয়ে পুলিশকে জেলা পুলিশের সহায়তা নিতে হয়। গত রোববার ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে ডাকাতির বীভৎসতা নিয়ে প্রথম আলোতে সরেজমিন প্রতিবেদন ছাপা হয়। এ ঘটনায়ও হাইওয়ে পুলিশের কোনো ভূমিকা ছিল না।

>>বনপাড়া–হাটিকুমরুল মহাসড়কের নাটোর অংশে স্পিডগান দিয়ে যানবাহনের গতি পরিমাপ করছে হাইওয়ে পুলিশ। গতকাল তোলা ছবি l প্রথম আলো
বাসমালিকেরা জানান, গত সাত দিনে শুধু ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ফরিদপুর ও রাজবাড়ী অংশে ছয়টি ডাকাতি হয়েছে। বাস-ট্রাক মালিক সমিতির একজন নেতা গতকাল বলেন, গতকাল সমিতির নেতারা হাইওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে এসব বিষয়ে অভিযোগ করার আগ পর্যন্ত ওই কর্মকর্তারা কিছুই জানতেন না। পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন। তাঁরা বলছেন, মহাসড়কে চাঁদা নেওয়ার সময়ই কেবল হাইওয়ে পুলিশের দেখা মেলে। মহাসড়কগুলোতে তাদের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ নেই।
মহাসড়কে মধ্যরাতে বিভীষিকা
সর্বশেষ গতকাল সন্ধ্যায় হাইওয়ে পুলিশের হয়রানির প্রতিবাদে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক আটকে রাখেন মাগুরার পরিবহনশ্রমিকেরা। তাঁদের অভিযোগ, চাঁদা না পেয়ে হাইওয়ে পুলিশ একটি পাটকাঠিবোঝাই ট্রাকের চালককে মারধর করেছে। বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক তালুকদার গতকাল বলেন, ‘আপনারা (প্রথম আলো) একটা ঘটনার ওপর সরেজমিন প্রতিবেদন করে দেখিয়েছেন, ডাকাতির ঘটনাগুলো কী ভয়াবহ! গত সাত দিনে ওই পথে এ রকম ছয়টি ডাকাতি হয়েছে, যার খবর কেউ জানে না। সাত দিনে শুধু সোহাগ পরিবহনেরই দুটি বাসে ডাকাতি হয়েছে। ফরিদপুর ও রাজবাড়ী এলাকায় প্রায় প্রতি রাতেই ডাকাতি হচ্ছে। আমি জানি না, পুলিশ আসলে কী করছে!’
ফারুক তালুকদার বলেন, রোববার রাতে ওই আলোচিত বাস ডাকাতির পরে সোমবার একই পথের মধুখালী থানা এলাকায় আবারও গাছ ফেলে গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করেছিল ডাকাতেরা। তবে কয়েকটি গাড়ি ওই গাছের ওপর দিয়েই চলে যেতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকা ডাকাতিপ্রবণ। ডাকাতির পর দু-চারজন ধরা পড়ে। কিছুদিন পর জামিনে বের হয়ে আবার ডাকাতি শুরু করে।
মধুখালীর ডাকাতির বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি বলেন, প্রথম আলোর প্রতিবেদনেই উল্লেখ রয়েছে যে রোববারের ডাকাতির ঘটনাস্থল মধুখালী থানা থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে। থানার সঙ্গে সমন্বয় করে ওই এলাকার ৫৪ কিলোমিটার মহাসড়কে টহল দেয় হাইওয়ে পুলিশ। কিন্তু রোববার ডাকাতির ঘটনাটি ঘটেছে মধুখালী থানার টহল এলাকায়।
সোহাগ পরিবহনের একজন কর্মকর্তা বলেন, মধুখালীতে ডাকাতির পরদিন ফরিদপুরের পুলিশ সুপারের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেন। পুলিশ সুপার বলেন, ওটা তাঁদের নয়, হাইওয়ে পুলিশের বিষয়। আর হাইওয়ে পুলিশ বলছে, ঘটনাটি মধুখালী থানা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে। তাই দায়ভার থানার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার জামিল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, এ রকম কোনো কথা সোহাগ পরিহনের কোনো কর্মকর্তাকে তিনি বলেননি। ওই ডাকাতির জন্য তিনি হাইওয়ে পুলিশকে দায়ী করে বলেন, হাইওয়েতে (মহাসড়ক) ঘটে যাওয়া ঘটনার দায় হাইওয়ে পুলিশ এড়াতে পারে না। তবে হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে কোনো সমন্বয়হীনতা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, থানা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, ডিবি পুলিশ মহাসড়কে প্রায়ই চেকপোস্ট বসায়। তল্লাশির নামে হয়রানি করে। পরিবহনশ্রমিকেরা বলছেন ঢাকার চারটি প্রবেশমুখে চেকপোস্ট বসাতে। আর প্রতিটি গাড়ি তল্লাশির পর একটা স্লিপ দিতে, যাতে পরে কোথাও সেটি দেখিয়ে সময় বাঁচানো যায়।
মহাসড়কের নিরাপত্তা নিয়ে অসন্তুষ্ট এই শ্রমিকনেতা বলেন, হাইওয়ে পুলিশ একেবারেই কম। নির্দিষ্ট এলাকায় তারা থাকে। এর বাইরে ডাকাতির ঘটনাগুলো ঘটে। আর ডাকাতির পরে শ্রমিকেরা, বিশেষ করে ট্রাকচালক ও সহকারীরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করে না। অনেক ক্ষেত্রেই ডাকাতির সময় ট্রাকচালক ও সহকারীকে মেরে ফেলে ডাকাতেরা। আর ডাকাতির পরে তাঁরা বেঁচে থাকলে পুলিশের হাত থেকে নিস্তার পায় না। তারা জড়িত থাকুক বা না থাকুক, পুলিশ আগে তাঁদের গ্রেপ্তার করে হয়রানি করে।
নেই আর নেই: হাইওয়ে পুলিশের ব্যর্থতার জন্য নয় বছর ধরেই লোকবল, যন্ত্রপাতি আর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে যাচ্ছেন এর কর্মকর্তারা। গতকাল হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজির কাছে গেলে তিনিও একই সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। ডিআইজি বলেন, সারা দেশে ১০ হাজার কিলোমিটার মহাসড়ক পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব হাইওয়ে পুলিশের। এ জন্য মোট লোকবল দুই হাজার। অভিযানে ব্যবহারের জন্য গাড়ি আছে মাত্র ৭২টি। আবার হাইওয়ে পুলিশের মামলা গ্রহণ ও তদন্তের এখতিয়ারও নেই। মহাসড়কের বাইরে হাইওয়ে পুলিশের গ্রেপ্তার করারও এখতিয়ার নেই। মহাসড়কের পাশের গ্রাম থেকে আসামি ধরতে হলেও জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। এ কারণে অনেক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর হাইওয়ে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে উদ্যোগ নিতে পারে না।
তবে ডিআইজির দাবি, হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতার কারণে মহাসড়কে ডাকাতি নেই বললেই চলে। মহাসড়কে যানজটও অনেকে কমেছে, ঈদের সময় যানজট সহনীয় হয়েছে। তবে অতি সম্প্রতি ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাগুলোকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু হয়ে গেছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে ডিআইজি বলেন, ‘হাইওয়েতে চাঁদাবাজি হয় না, আমি তা বলব না। তবে এটা নিয়ন্ত্রিত। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে গত কোরবানি ঈদের সময় পশুবাহী ট্রাক থামানো পর্যন্ত নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। ঈদের সময় সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া ঢালাও তল্লাশিও নিষেধ ছিল।’