Sunday, May 31, 2026

২০২৪ সালে যক্ষ্মায় মারা গেছে ১২ লাখের বেশি মানুষ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে যক্ষ্মায় (টিবি) ১২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ কম। বুধবার প্রকাশিত সংস্থাটির বার্ষিক যক্ষ্মা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর টিবি রোগীর সংখ্যাও প্রায় ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এতে বলা হয়, এটি কোভিড-১৯ মহামারির পর প্রথমবারের মতো যক্ষ্মা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমার ঘটনা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে  ৮৩ লাখ মানুষ নতুনভাবে শনাক্ত হওয়ার পর যক্ষ্মার চিকিৎসা পেয়েছেন। যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। চিকিৎসা সফলতার হারও বেড়ে ৬৮ শতাংশ থেকে ৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

তবে ডব্লিউএইচও সতর্ক করেছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এই অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়তে পারে। সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রস আধানম গেব্রেইসুস বলেন, এই ঘাটতি আমাদের অর্জিত কঠিন সাফল্যগুলোকে উল্টে দিতে পারে।
২০২৪ সালে যক্ষ্মা প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছিল ৫.৯ বিলিয়ন ডলার। যা ২০২৭ সালের মধ্যে নির্ধারিত বার্ষিক ২২ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম। টেড্রস বলেন, যক্ষ্মা প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সাম্প্রতিক অগ্রগতি অবশ্যই ইতিবাচক, তবে এটিকে বিজয় বলা যায় না। এখনও প্রতিবছর এক মিলিয়নের বেশি মানুষ এই প্রতিরোধযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য রোগে মারা যাচ্ছেন। এটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে যক্ষ্মাজনিত মৃত্যু ২৯ শতাংশ কম হলেও ডব্লিউএইচও-এর লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে তা ৭৫ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ কমানো।

ডব্লিউএইচও-এর টিবি, এইচআইভি ও সংশ্লিষ্ট সংক্রমণবিষয়ক বিভাগের পরিচালক তেরেজা কাসায়েভা সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ২০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে এবং আরও ১ কোটি মানুষ নতুনভাবে টিবিতে আক্রান্ত হতে পারে। সংস্থাটি বড় ধাক্কা খায় যখন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউএইচও থেকে সরে যায়। ফলে এর প্রস্তাবিত বাজেটে ২১ শতাংশ কাটছাঁট করতে হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশি সহায়তা বিশেষ করে ইউএসএইডের অর্থায়ন কমানোর সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক টিবি চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, গত বছর আন্তর্জাতিক সহায়তার কারণে ৩৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষের জীবন যক্ষ্মা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল।

mzamin

পৃথিবীকে বাঁচাতে এই ১০ সবুজ উদ্ভাবন ভূমিকা রাখতে পারে

বিশ্বে মানুষের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে দূষণ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বৈশ্বিক উষ্ণতাকে ত্বরান্বিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাটা এখন জরুরি অগ্রাধিকারের বিষয়। আর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ক্ষেত্রে সবুজ বা পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনগুলো বড় পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করছে। এগুলো পৃথিবীকে বাঁচাতে সহায়ক হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মেধাস্বত্ব–বিষয়ক আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শেইজার ওলসেন বিশ্বে উল্লেখযোগ্য ১০টি সবুজ উদ্ভাবনের তালিকা করেছে। ওই তালিকা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

সৌর প্যানেল

সূর্যের আলোকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সৌর প্যানেল যুগান্তকারী এক উদ্ভাবন। এটি কয়লা বা তেলের মতো অনবায়নযোগ্য শক্তির ওপর নির্ভরতা কমায়। মার্কিন প্রকৌশলী রাসেল ওহল ১৯৪১ সালে প্রথম সৌরকোষ উদ্ভাবন করেন। এটিকে আধুনিক সৌর ফটোভোলটাইক প্রযুক্তির ভিত্তি বলে বিবেচনা করা হয়।

উইন্ড টারবাইন বা বায়ুবিদ্যুৎ

এ ক্ষেত্রে বায়ুশক্তি ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এটি সবচেয়ে কার্যকর নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসগুলোর একটি। ১৮৮৭ সালে চার্লস এফ. ব্রাশ প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী উইন্ড টারবাইন নির্মাণ করেন।

বৈদ্যুতিক গাড়ি

বিদ্যুৎ–চালিত হওয়ায় এসব গাড়িতে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হয় না। এ ধরনের গাড়ির ব্যবহার পরিবেশে কার্বন নিঃসরণ কমায়।

১৮৩০-এর দশকে প্রথম পরীক্ষামূলক বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করেন স্কটল্যান্ডের উদ্ভাবক রবার্ট অ্যান্ডারসন। এরপর অনেকেই বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে কাজ করেছেন। আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ি জনপ্রিয়তা পেয়েছে টেসলা ও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্কের হাত ধরে।

ভার্টিক্যাল ফার্মিং

ভার্টিক্যাল ফার্মিং হলো এমন এক আধুনিক চাষপদ্ধতি, যেখানে কোনো উঁচু স্থাপনা বা কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উল্লম্বভাবে বা স্তরে স্তরে চাষ করা হয়। এ পদ্ধতিতে চাষ করতে সাধারণত মাটি লাগে না। পানি ও জমিও কম লাগে।

সাধারণত শহরের কাছাকাছি এলাকায় এ ধরনের চাষপদ্ধতি ব্যবহার করতে দেখা যায়। সেখানে পরিবহনের প্রয়োজন কম পড়ে এবং কার্বন নিঃসরণ কম হয়। মার্কিন অণুজীববিজ্ঞানী ডিকসন ডেসপোমিয়ার ২০০০-এর দশকের শুরুতে আধুনিক ভার্টিক্যাল ফার্মিংয়ের ধারণা প্রবর্তন করেন।

বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক

এ ধরনের প্লাস্টিক প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয় হয়। এগুলো পচনশীল হওয়ায় ভাগাড়ে বর্জ্যের পরিমাণ কমিয়ে আনে। বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক মাটির সঙ্গে মিশে যায় বলে পরিবেশকে দূষিত করে না।

জার্মানিভিত্তিক বহুজাতিক রাসায়নিক কোম্পানি বিএএসএফের একটি দল প্রথম পূর্ণাঙ্গ বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকগুলোর একটির উদ্ভাবক।

হাইড্রোপাওয়ার ড্যাম বা জলবিদ্যুৎ বাঁধ

জলবিদ্যুৎ বাঁধ পদ্ধতিতে প্রবহমান পানির গতিশক্তিকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে রূপান্তরিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে জলবিদ্যুৎ বাঁধ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাঁধ দিয়ে নদীর পানি সংরক্ষণ করতে হয়। সে পানি একটি জলাধারে জমা রাখা হয়। ওই জলাধার থেকে পানি ছাড়া হলে তা একটি টারবাইনের (পাখাযুক্ত চাকা) মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় ও টারবাইন ঘুরতে থাকে। এ সময় ঘূর্ণনরত টারবাইন একটি জেনারেটরকে সক্রিয় করে তোলে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।

সৌরচালিত পানি পরিশোধন

এ ব্যবস্থায় সৌরশক্তি ব্যবহার করে পানি পরিশোধন করা হয়। বিশুদ্ধ পানির ঘাটতি পূরণের ক্ষেত্রে এটি একটি পরিবেশবান্ধব সমাধান। যেসব জায়গায় পানি শোধনের সরঞ্জাম সীমিত, সেখানে সৌর তাপ ব্যবহার করে পানির পরিশোধনের এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন অশোক গাদগিল। তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন পদার্থবিদ।

স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট

স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট হলো এমন একটি যন্ত্র, যা বাড়ির ভেতরকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। নেস্টের মতো থার্মোস্ট্যাটগুলো ব্যবহারকারী কেমন অভ্যস্ত, সেটি শিখে ফেলে এবং সে অনুযায়ী ঘর কতটুকু ঠান্ডা থাকবে বা কতটুকু গরম থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণ করে। এতে শক্তির অপচয় কম হয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হোম অটোমেশন কোম্পানি নেস্ট ল্যাবস ২০১১ সালে প্রথম বাণিজ্যিক স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট চালু করে।

অ্যালগি বায়োফুয়েল

শৈবাল থেকে বিকল্প এ জ্বালানি উৎপাদন করা হয়। এ জ্বালানি প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় পরিচ্ছন্ন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে অ্যালগি বায়োফুয়েল প্রক্রিয়া সম্পর্কে লেখা হয়েছে, শৈবালকোষ সূর্যের আলো ব্যবহার করে ফটোসিনথেসিসের মাধ্যমে সরাসরি শক্তি তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় সূর্যের আলো, পানি ও কার্বন ডাই–অক্সাইড কার্যকরভাবে অক্সিজেন ও শৈবাল জীবাশ্মে রূপান্তরিত হয়।

অনেক শৈবাল প্রজাতির দেহে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শক্তিসমৃদ্ধ চর্বি থাকে। আর তা বের করে বায়োফুয়েল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, যা তেলের বিকল্প। বাকি শৈবালকে সহজেই পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কারণ, এতে প্রচুর প্রোটিন থাকে।
১০
প্লাস্টিকখেকো অণুজীব

এ ধরনের প্লাস্টিকখেকো অণুজীব বা মাইক্রোব প্লাস্টিককে ভেঙে ফেলে। এগুলো প্লাস্টিককে এমন উপাদানে পরিণত করে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক নয়। প্লাস্টিক বর্জ্যজনিত দূষণ মোকাবিলায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন।

জাপানি বিজ্ঞানী শোসুকে ইয়োশিদার নেতৃত্বাধীন একটি দল ২০১৬ সালে এমন একটি ব্যাকটেরিয়া প্রজাতি আবিষ্কার করেন, যা পেট প্লাস্টিক ভাঙতে সক্ষম।
https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-12%2Fxl1c956f%2F1.jpg?w=620&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Saturday, May 30, 2026

পুকুরের মাছকে প্রতিদিন খাওয়ানো হয় ৫০০০ কেজি মরিচ

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টঃ চীনের দক্ষিণাঞ্চলে মাছের একটি পুকুর এখন অনলাইনে ভাইরাল। পুকুরের মালিক জানিয়েছেন, তিনি প্রতিদিন তাঁর পুকুরের মাছগুলোকে নানা ধরনের ৫ হাজার কেজি মরিচ খাওয়ান। তাঁর দাবি, এতে মাছগুলো দেখতে আরও চকচকে হয় এবং স্বাদেও ভালো লাগে।

এই পুকুরটি চীনের হুনান প্রদেশের চাংশায় অবস্থিত। এই এলাকা চীনের ঝাল খাবারের জন্য বিখ্যাত। সম্প্রতি এই পুকুরের মাছকে মরিচ খাওয়ানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে এটি ভাইরাল হয়ে যায়।

পুকুরটি দেখভাল করেন ৪০ বছর বয়সী মাছচাষি জিয়াং শেং ও তাঁর স্কুলজীবনের বন্ধু কুয়াং কে।

কুয়াং বলেন, পুকুরটির আয়তন প্রায় ১০ একর। আর এখানে ২ হাজারের বেশি মাছ আছে। এসব মাছকে নিয়মিত নানা ধরনের মরিচ খাওয়ানো হয়।

পুকুরের মালিক বলেন, ‘আমরা দিনে প্রায় ৫ হাজার কেজি মরিচ খাওয়াই। মানুষের খাওয়ার মতো একই মরিচই মাছকে খাওয়ানো যায়। এই মরিচের মধ্যে লম্বা ও ছোট দানাদার মরিচ রয়েছে। এই মরিচ খাওয়ার পর মাছের শরীরের গঠন আরও সুন্দর হয়, স্বাদ উন্নত হয়। আর আঁশগুলো ঝকঝকে সোনালি রঙের মতো দেখায়।’

কুয়াং আরও বলেন, ‘শুরুর দিকে মাছ মরিচ খেতে চাইত না। কিন্তু যখন ঘাস আর মরিচ একসঙ্গে দিই, তারা ঘাস না খেয়ে মরিচই খেতে পছন্দ করছে। আমরা ঝাল খেলে পানি খাই। তারা তো পানিতেই থাকে, তাই ঝাল লাগলে বেশি পানি খেয়ে নেয়।’

জিয়াং ব্যাখ্যা করে বলেন, মানুষের মতো মাছের স্বাদ গ্রহণের ক্ষমতা নেই। তারা মূলত ঘ্রাণের মাধ্যমে খাবার চেনে। তাই মরিচের ঝালে তাদের সমস্যা হয় না।

জিয়াং বলেন, মরিচে অনেক ভিটামিন থাকে, যেমনটা থাকে জলজ উদ্ভিদে। আর মাছ এগুলো খুব পছন্দ করে। মরিচ খাওয়ালে মাছের অন্ত্র সুস্থ থাকে এবং মানসিক চাপও কমে। মরিচে থাকা ক্যাপসাইসিন মাছের অন্ত্রের নড়াচড়া বৃদ্ধি করে। ফলে হজম ও পুষ্টি শোষণ ভালো হয় এবং মাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে।

জিয়াং বলেন, তা ছাড়া মরিচ মাছের শরীরে পরজীবী লাগা থেকেও রক্ষা করে। সাধারণ খাবারের তুলনায় মরিচ খাওয়া মাছের মাংস অনেক নরম ও সুস্বাদু হয়।

কুয়াং বলেন, বিক্রি হয়নি বা নষ্ট হতে চলেছে, এমন মরিচ তাঁরা স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে বিনা মূল্যে পান। এতে খরচ কমে ও ঘাস চাষের ঝামেলাও করতে হয় না।

পুকুরটি এখন মাছ ধরেন এমন স্থানীয় শৌখিন মানুষের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি শহর থেকেও অনেকে মাছ ধরতে যাচ্ছেন সেখানে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একজন ব্যবহারকারী মজা করে লিখেছেন, ‘ঝালের জন্য বিখ্যাত হুনান প্রদেশে এমন ঘটনা ঘটছে বলে যখন শুনলাম, তখন সব বুঝে গেলাম—স্থানীয় পানি, স্থানীয় মাছ।’

আরেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, মাছ এখন মানুষের মতো হয়ে যাচ্ছে। কিছু জায়গায় মানুষই এত মরিচ খেতে পারে না।

তৃতীয় আরেক ব্যক্তি রসিকতা করে লিখেছেন, ‘এ যেন আগে থেকেই মসলা মাখানো মাছ। শুধু সামান্য সিচুয়ান মরিচ, আদা, রসুন আর পেঁয়াজকুচি দিলেই দেখতে যেমন সুন্দর হবে, খেতেও তেমন স্বাদ হবে।’

মরিচ
মরিচ। ফাইল ছবি

গোপনে শিল্পপতি জয়কে বিয়ে করেছিলেন জুহি by সুমন মাহমুদ

বলিউড অভিনেত্রী জুহি চাওলা তখন তাঁর ক্যারিয়ারের শীর্ষে। ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তাক’, ‘ডর’, ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’, ‘ইশক’-এর মতো সুপারহিট সিনেমায় অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে ফেলেছেন। ঠিক তখনই জুহি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি গোপনে বিয়ে করবেন। পাত্র কে, তা তো বুঝতেই পারছেন। ব্যবসায়ী জয় মেহতা। এরপর জুহি ও জয়ের একই ছাদের নিচে বসবাসের ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে।

জয় মেহতা সব সময়ই মিডিয়াবিমুখ মানুষ। বলিউডের এক জনপ্রিয় তারকাকে বিয়ে করেও তিনি কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে চাননি; কিন্তু জুহির সঙ্গে বিয়ের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকে জয়ের বিপুল সম্পদ ও ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে জনমনে যেন কৌতূহলের শেষ নেই। আজ ৫৭ পেরিয়ে ৫৮ বছরে পা রাখলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী জুহি চাওলা। জন্মদিনে চলুন জেনে নিই জুহি আর জয়ের প্রেমের গল্প:

জুহি ও জয়ের প্রেমকাহিনি
বিয়েতে রাজি হওয়ার আগে জয়কে নাকি এক বছর অপেক্ষা করিয়েছিলেন, এক সাক্ষাৎকারে জুহি এমনটাই জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিয়ের আগে জয় প্রতিদিন আমাকে চিঠি লিখত। বিয়ের পর সেই অভ্যাস বন্ধ হয়ে যায় (হাসি)। তখন চিঠি আর কার্ডের যুগ ছিল, এখন সব ই–মেইল আর হোয়াটসঅ্যাপে চলে এসেছে। আমরা এক ডিনারে দেখা করেছিলাম। তার পর থেকেই সে আমার আশপাশে ঘুরঘুর করত। একবার আমার জন্মদিনে সে এক ট্রাক ভর্তি লাল গোলাপ পাঠিয়েছিল। আর আমি তাকে “হ্যাঁ” বলতে এক বছর সময় নিয়েছিলাম।’

এই জুটি ১৯৯৫ সালে বিয়ে করেন; কিন্তু সম্পর্কটি গোপন রাখেন। ২০০১ সালে প্রথম সন্তান জাহ্নবী মেহতা যখন জুহির গর্ভে, তখনই তাঁদের বিয়ের খবর প্রকাশ পায়।
বিয়ের খবর গোপন রাখার কারণ জানাতে গিয়ে চলচ্চিত্র সমালোচক ও সাংবাদিক রাজীব মাসান্দকে জুহি বলেন, ‘আমি তখন ঠিকমতো প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিলাম, ক্যারিয়ার ভালোই চলছিল। তখনই জয় আমাকে প্রপোজ করে। আমি তো ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম, আমার ক্যারিয়ার না হারিয়ে যায়! তাই ভেবেছিলাম, চুপচাপ বিয়ে করি আর কাজ চালিয়ে যাই।’

জয়ের মর্মান্তিক অতীত
জুহিকে বিয়ে করার আগে জয় বিয়ে করেন শিল্পপতি যশ বিড়লার বোন সুজাতা বিড়লাকে। কিন্তু ১৯৯০ সালে ভারতীয় এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৬০৫ দুর্ঘটনায় সুজাতা মারা যান। প্রথম স্ত্রীর এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পর গভীর দুঃখে ভেঙে পড়েছিলেন জয়। সেই কঠিন সময়ে জুহি তাঁর পাশে দাঁড়ান এবং ধীরে ধীরে তাঁদের বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হয়।

জয়ের বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য
জয় মেহতা মুম্বাইভিত্তিক বহুজাতিক দ্য মেহতা গ্রুপের চেয়ারম্যান। এর সদর দপ্তর গান্ধীনগরে। যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকায় এই কোম্পানির একাধিক শাখা রয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে জয় তাঁর বাবা মহেন্দ্র এবং মা সুনয়না মেহতার কাছ থেকে এই ব্যবসা পেয়েছেন। তাঁর দাদা নানজি কালিদাস মেহতা ২০ শতকের গোড়ায় এই ব্যবসার সূচনা করেন। দ্য মেহতা গ্রুপ চিনিশিল্প, সিমেন্ট, প্যাকেজিং, ফুল চাষ, ইঞ্জিনিয়ারিং, বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনসহ বহু খাতে ব্যবসা করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মূল্য ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৭ হাজার ৫৫৫ কোটি রুপি)।

জয় আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের সহমালিক। ২০০৭ সালে শাহরুখ খানের সঙ্গে মিলে তিনি প্রায় ৬২৩ কোটি টাকায় দলটি কিনেছিলেন। ২০২৫ সালে এসে এর মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ হাজার ১৩৯ কোটি রুপি।

জয় ও জুহির বিলাসবহুল সংগ্রহ
জয় ও জুহির গাড়ির বিশাল সংগ্রহ ছাড়াও রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল সম্পত্তি। তাঁদের মুম্বাইয়ের বাসভবনটি একটি দৃষ্টিনন্দন দোতলা ডুপ্লেক্স, যা শ্রীলঙ্কার স্থপতি চান্না দাসওয়াত্তে ডিজাইন করেছেন। ২ হাজার ২০০ বর্গফুটের বাসভবনটির বারান্দা থেকে আরব সাগরের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। এ ছাড়া তাঁদের গুজরাটের পোর বন্দরে একটি ঐতিহ্যবাহী পৈতৃক বাড়িও রয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

জয় মেহতা ও জুহি চাওলা। আইএমডিবি
জয় মেহতা ও জুহি চাওলা। আইএমডিবি

Friday, May 29, 2026

টিভি সিরিয়ালে স্বামী–স্ত্রীর আলিঙ্গনের দৃশ্য নিয়ে বিতর্ক

আলোচিত পাকিস্তানি টিভি ধারাবাহিক ‘পামাল’-এর একটি দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এতে মালিকা নামের এক লেখিকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন তারকা অভিনেত্রী সাবা কামার, মালিকার স্বামী রাজার চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেতা উসমান মুখতার।

ধারাবাহিকের ১২তম পর্বে একটি দৃশ্যে দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি আছেন রাজা, তাঁকে দেখতে যান মালিকা—সেখানে আবেগতাড়িত হয়ে স্বামীকে জড়িয়ে ধরেন মালিকা।

স্বামী ও স্ত্রীর আলিঙ্গনের দৃশ্যটি নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে, কেউ কেউ দৃশ্যটির প্রশংসা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এটি একটি রোমান্টিক দৃশ্য, এতে দুজনের রসায়ন পর্দায় ফুটে উঠেছে। গৎবাঁধা গল্পের বাইরে ধারাবাহিকটির গল্পে বৈচিত্র রয়েছে।

তবে কেউ কেউ বিষয়টি মানতে নারাজ, বলেন, গ্রিন টেলিভিশনে প্রচারিত ধারাবাহিকটি মা–বাবা, ভাই-বোনসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দেখেন দর্শকেরা। দৃশ্যটি ‘অস্বস্তি’ তৈরি করেছে।

ধারাবাহিকটি লিখেছেন জানজাবিল আসিম শাহ, পরিচালনা করেছেন খিজার ইদ্রিস এবং প্রযোজনা করেছেন তাহরিম চৌধুরী।

দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন লিখেছেন, ‘এত ঘনিষ্ঠ দৃশ্য দেখানোর জন্য পরিচালকের লজ্জা পাওয়া উচিত। এখন তো ভারতীয় চ্যানেল বা হলিউডের মতো অশ্লীলতা শুরু হয়েছে।’

অনেক দর্শকের অভিযোগ, হালের পাকিস্তানি টিভি ধারাবাহিকে ‘অপ্রয়োজনীয় সাহসী দৃশ্য’ রাখা হচ্ছে। একজন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এখন কি পরিবারের সঙ্গে বসে এসব নাটক দেখা যায়?’ আরেকজন লিখেছেন, ‘দৃশ্যটির সময় বাবা পাশে বসে ছিলেন না, নয়তো দেখা বেশ বিব্রতকর হতো।’

কেউ কেউ লিখছেন, আগামী দিনে হয়তো টিভি ধারাবাহিকে স্বামী-স্ত্রীর শয্যাদৃশ্যও দেখানো শুরু হবে। একজন লিখেছেন, ‘উসমান মুখতারের কাছ থেকে আমরা এটা আশা করিনি। সাবা কামার তো এমন সাহসী সব সময়ই। সাবা কামার প্রায়ই ভুলে যান, তিনি পাকিস্তানি নাটকে অভিনয় করছেন, কোনো বলিউড ছবিতে নয়।’

গত ৮ ২০২৫ অক্টোবর গ্রিন টেলিভিশনে প্রচারে আসে ‘পামাল’।

তথ্যসূত্র: ডেইলি পাকিস্তান, এনএমনিউজ

‘পামাল’ সিরিয়ালের দৃশ্যটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকর্কের ঝড় উঠেছে
‘পামাল’ সিরিয়ালের দৃশ্যটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকর্কের ঝড় উঠেছে। ইনস্টাগ্রাম থেকে

ডোপামিন ডিটক্সের সময় ফোন হাতে না নিলে করবেনটা কী?

এখন ডোপামিন রাশের সবচেয়ে বড় কারণ ‘মাইন্ডলেস স্ক্রলিং’। আর ঠিক এ কারণেই অনলাইন দুনিয়ায় ডুবে থাকা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আসক্তিগুলোর অন্যতম। ডিজিটাল ডিটক্স বা ডোপামিন ডিটক্স হলো সেই আসক্তি থেকে বিরতি নিয়ে স্বাস্থ্যকর, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রচেষ্টা।

ডোপামিন ডিটক্স বলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইন্টারনেট গেমিং বা জাঙ্ক ফুডের মতো তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয়, এমন কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকাকে বোঝায়।

এর উদ্দেশ্য মনোযোগ বাড়ানো, অতিরিক্ত উত্তেজনা কমানো এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা। এই পদ্ধতিতে কিছু নির্দিষ্ট আনন্দদায়ক অথচ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কার্যকলাপ থেকে নিজেকে সাময়িকভাবে বিরত রেখে ডোপামিন রিসেপ্টরগুলোকে পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।

প্রশ্ন হলো, সারা দিনে আপনি যদি প্রয়োজনের বাইরে ফোন ব্যবহার না করেন, স্ক্রিন টাইমের লাগাম ধরেন, তাহলে করবেনটা কী? আর হ্যাপি হরমোন ডোপামিনই-বা কীভাবে নিঃসরিত হবে? চলুন, চট করে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক এমন ৩০টি বিষয়ে, যাতে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ডোপামিন হরমোনের নিঃসরণ হয়।

১. ভোরে ঘুম থেকে উঠুন। পানি বা ডিটক্স পানীয়ের গ্লাস হাতে সূর্যোদয় দেখুন।

২. ‘ভিশন বোর্ড’ তৈরি করুন। সেটি হতে পারে ১ সপ্তাহ, ১ মাস বা ৫ বছরের। শর্ট টার্ম ও লং টার্ম গোল নির্ধারণ করুন।

৩. কাছাকাছি কোনো বইয়ের দোকান বা পাঠাগারে ঢুঁ মারুন।

৪. ঘরবাড়ি গুছিয়ে রাখুন।

৫. একটা গাছ লাগান। জায়গা না থাকলে ইনডোর প্ল্যান্ট কিনুন, যত্ন নিন।

৬. লিফটের বদলে সিঁড়ি দিয়ে উঠুন।

৭. একটা কবিতা লিখুন, চেষ্টা করেই দেখুন না!

৮. বনে, জঙ্গলে বা নিদেনপক্ষে প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁটুন।

৯. সাঁতার কাটুন।

১০. প্রতিদিন সূর্যোদয় দেখার পাশাপাশি সূর্যাস্তও দেখুন।

১১. একটা গান গান। সেটা না হলে অন্তত গান শুনুন।

১২. প্রোটিন বা আমিষ খান।

১৩. খালি পায়ে ঘাসের ওপর হাঁটুন।

১৪. যেকোনো ধরনের পাজল মেলান।

১৫. দিনে ১০ মিনিট সময় রাখুন কিছুই না করার জন্য। এ সময় আপনি কিছুই করবেন না।

১৬. ওয়েট লিফটিং করুন, মানে ভারী কিছু তুলুন।

১৭. ‘টু ডু’ লিস্ট লিখুন।

১৮. বই পড়ুন। বই পড়ার অভ্যাস করুন।

১৯. আপনি কেন কৃতজ্ঞ—প্রতিদিন নোটবুকে একটা করে কারণ লিখুন।

২০. গাছে উঠুন।

২১. নিরিবিলি বসে থাকুন।

২২. খেলাধুলা করুন। দাবা খেলতে পারেন।

২৩. শৈল্পিক বা সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে নিয়োজিত করুন।

২৪. শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান।

২৫. অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, জামাকাপড় বিক্রি করে দিন। ঘর হালকা করুন।

২৬. রান্না শিখুন, নতুন কোনো রেসিপি চেষ্টা করুন।

২৭. ঘুরে বেড়ান। পাহাড়ে চড়ুন।

২৮. পডকাস্ট শুনুন।

২৯. একটা ছোট গল্প লিখুন।

৩০. ছোটবেলার বন্ধুকে ফোন করে মন খুলে গল্প করুন।

সূত্র: কি ফর সাকসেস

ডোপামিন ডিটক্সের জন্য নিরিবিলি বসে থাকুন, মেডিটেশন বা ধ্যান করুন
ডোপামিন ডিটক্সের জন্য নিরিবিলি বসে থাকুন, মেডিটেশন বা ধ্যান করুন। মডেল: সারাকা। ছবি: সুমন ইউসুফ

Thursday, May 28, 2026

কিশোরদের যৌন সম্পর্ক কি অপরাধ, কী চাচ্ছেন ভারতের শিশু অধিকারকর্মীরা

ভারতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য যৌন সম্পর্ক বেআইনি। প্রচলিত আইনে এটিকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এ বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন দেশটির আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং। এ–সংক্রান্ত আইনকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ভারতে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

জয়সিং যুক্তি দেন, পারস্পরিক সম্মতিতে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক শোষণমূলক নয় কিংবা নিপীড়নমূলকও নয়। এ ধরনের সম্পর্ককে ফৌজদারি অপরাধের আওতার বাইরে রাখতে আদালতের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।

আদালতে জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক নথিতে জয়সিং বলেন, আইনের মাধ্যমে যৌন সম্পর্কের বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো নিপীড়ন রোধ করা, ওই সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা নয়।

তবে কেন্দ্রীয় সরকার জয়সিংয়ের এই দাবির বিরোধিতা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সীদের যৌন সম্পর্কের বৈধতা দিলে শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা হুমকির মুখে পড়বে। এতে তারা নিপীড়ন ও শোষণের শিকার হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টে জয়সিংয়ের এই চ্যালেঞ্জের কারণে ভারতে আবারও যৌন সম্পর্কে সম্মতি এবং শিশুদের যৌন সুরক্ষা আইন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। শিশুদের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভারতের প্রধান আইন পসকো অ্যাক্ট-২০১২।

এ আইন অনুযায়ী, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেও ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা যৌন সম্পর্কে জড়ালে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিষয়টি পসকো আইন থেকে বাদ দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে ভারতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, কিশোর-কিশোরীদের এই আইনের আওতামুক্ত রাখলে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে। অন্যদিকে এই মতের বিরোধীরা বলছেন, এতে মানব পাচার ও বাল্যবিবাহের মতো অপরাধ আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, নিপীড়নের শিকার হলে কিশোর-কিশোরীরা কি আদৌ প্রমাণের দায়ভার বহন করতে সক্ষম? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স নির্ধারণ করে দেয় কে। আর এই আইন আদতে কার স্বার্থ রক্ষা করে?

অনেক দেশের মতো ভারতেও যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স নির্ধারণ নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যভেদে এই বয়স ভিন্ন হতে পারে। তবে ভারতজুড়ে একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া আছে।

ইউরোপের অধিকাংশ দেশ কিংবা যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশে যৌন সম্পর্কের বৈধ বয়স ১৬। কিন্তু ভারতে যৌন সম্পর্কের বয়সসীমা এর চেয়ে বেশি।

১৮৬০ সালে যখন ভারতে ফৌজদারি বিধি চালু হয়, তখন যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির ন্যূনতম বয়স ছিল ১০ বছর। ১৯৪০ সালে এই বিধি সংশোধনের মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ১৬ বছর করা হয়।

পরে ২০১২ সালে পসকো আইনের মধ্য দিয়ে বড় পরিবর্তন আসে। এতে যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স ১৮ বছরে উন্নীত করা হয়। এক বছর পর ভারতের ফৌজদারি আইন এই পরিবর্তন অনুযায়ী সংশোধিত হয়। ২০২৪ সালে প্রণীত নতুন দণ্ডবিধিতেও এই বয়সসীমা বহাল রাখা হয়েছে।

ভারতে কিশোর-কিশোরীদের সম্মতিমূলক যৌন সম্পর্ক কেন অপরাধ

কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে অনেক শিশু অধিকারকর্মী এবং এমনকি আদালতও যৌন সম্পর্কের বৈধ বয়সসীমার সমালোচনা করেছেন এবং এই বয়সসীমা ১৬ বছরে নামিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, পসকো আইন কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং প্রায়ই প্রাপ্তবয়স্করা এ ধরনের সম্পর্কে বাধা দিতে এই আইনের অপব্যবহার করেন। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি বেশি ঘটে।

ভারতে এখনো যৌনতা একটি নিষিদ্ধ ও অস্বস্তিকর বিষয়। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কোটি কোটি ভারতীয় কিশোর-কিশোরী যৌন সম্পর্কে সক্রিয়।

শিশুদের যৌন নিপীড়ন রোধে কাজ করা সংস্থা ফাউন্ডেশন ফর চাইল্ড প্রোটেকশন-মুসকানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা শর্মিলা রাজ বলেন, ‘আমাদের সমাজ জাত, শ্রেণি ও ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত। ফলে সহজেই এ আইনের অপব্যবহার করা যায়।’

২০২২ সালে কর্ণাটক হাইকোর্ট ভারতের আইন সংস্কার সংস্থা ল’ কমিশনকে নির্দেশ দেন, যেন তারা পসকো আইনের আওতায় যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স পুনর্বিবেচনা করে। এ ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে বলা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, বহু ক্ষেত্রে ১৬ বছর পেরোনো কিশোরীরা প্রেমে পড়ে পালিয়ে যায় এবং যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলে। কিন্তু পরে শুধু ছেলেটির বিরুদ্ধে পসকো আইন ও দণ্ডবিধির আওতায় অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।

পরের বছর ২০২৩ সালে ল’ কমিশনের প্রতিবেদনে বয়সসীমা কমানোর প্রস্তাব নাকচ করা হয়। তবে কমিশন সুপারিশ করেছে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীর মধ্যে যদি পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সে ক্ষেত্রে সাজা দেওয়ার সময় বিচারকদের জন্য ‘নির্দেশিত বিচারিক বিবেচনার’ সুযোগ রাখা উচিত। এর অর্থ হলো বিচারক যাতে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকে সাজা কমাতে বা মওকুফ করতে পারেন।

এটি এখনো কার্যকর না হলেও মামলার তথ্য ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে ইতিমধ্যে ভারতের বিভিন্ন আদালত এই নীতির ভিত্তিতে জামিন, খালাস বা মামলা বাতিলের সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন।

শর্মিলা রাজসহ অনেক শিশু অধিকারকর্মী চান, এই বিধানটি যাতে আইনে পরিণত হয়। শুধু প্রস্তাব আকারে থাকলে আদালত তা উপেক্ষা করতে পারেন।

ইন্দিরা জয়সিং মনে করেন, শুধু বিচারকের বিবেচনা যথেষ্ট নয়। কারণ, অভিযুক্তকে পুলিশের জেরা, আদালতের দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও সামাজিক লজ্জার মুখোমুখি হতে হয়। ভারতের বিচারব্যবস্থা এতটাই ধীর যে বহু মানুষ এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই শাস্তি পেয়ে যান।

ইন্দিরা জয়সিং আরও বলেন, প্রতিটি মামলা বিচারকের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া সেরা সমাধান নয়। কারণ, এতে ফলাফল অসম হতে পারে এবং পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কাও থেকে যায়।

ভারতে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পসকো আইনের আওতায় বিশেষ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই লাখ।

জয়সিংয়ের দাবি, বয়সের ব্যবধান যদি খুব সামান্য হয় এবং উভয়েই সম্পর্কের জন্য সম্মত থাকে, তবে সে যৌন সম্পর্ককে যাতে ধর্ষণ বা শোষণের মতো অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করা হয়।

প্রতীকী ছবি: রয়টার্স  
প্রতীকী ছবি: রয়টার্স

নারীর ক্ষমতায়নের দায় কেবল কি নারীর by মানজুর–আল–মতিন

২৮ জুলাই, ২০২৪, রাত ২.৩০। উকুলেলে হাতে পারশা মাহজাবীন গাইলেন, ‘চল ভুলে যাই’। ভুলে যেতে বললেন আবু সঈদ, মুগ্ধদের কথা। বললেন, মনে রাখতে কেবল মেট্রোরেলের ক্ষত। মায়োপিক চোখে পৃথিবী দেখার বুলি আমাদের শেখানো হয়েছে ১৫ বছর ধরে; হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে, হয়তো ‘হাজার বছর ধরে’।

পুরুষের চোখে নারীকে পৃথিবী দেখানোর প্রয়াস বুঝি এর চেয়েও ঢের পুরোনো। নারীর জীবন নির্ধারিত হবে পুরুষের ইচ্ছা অনুসারে। ফরাসি বিপ্লবের পর নেপোলিয়ন বোনাপার্টের খুব বেশি সময় লাগেনি এই আইন ফ্রান্সের নারীদের ওপর চাপিয়ে দিতে। তিনি সেদিন খুব সহজেই ভুলে গিয়েছিলেন ১৭৮৯ সালের ৫ অক্টোবর, ভার্সাই প্রাসাদের ক্ষমতা টলিয়ে দেওয়ার লড়াইের সম্মুখসারিতে ছিলেন নারীরা।

আমাদের দেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পথপরিক্রমাও তার চেয়ে খুব ভিন্ন হয়নি। এই মরণপণ লড়াই একবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক সামিনা লুৎফাকে বিজয়ের দুই মাস না পেরোতেই বিভৎস আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে সাইবার দুনিয়ায়। তখন কর্তাব্যক্তিরা প্রাণপণে চোখ বুঁজে থেকেছেন। অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের অনেকেই সে সময় তাঁর পাশে দাঁড়াননি।

অধ্যাপক সামিনা অভ্যুত্থানের পর নানাভাবে নিগৃহের শিকার হওয়া নারীদের দীর্ঘ তালিকায় একটিমাত্র নাম। সে তালিকায় আন্দোলনের অন্যতম মুখ উমামা ফাতেমা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক প্রাপ্তি তাপসী যেমন আছেন, তেমনি আছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির তাসনিম জারা আর তাজনূভা জাবীনরাও। এই আক্রমণ যে কেবল বাইরে থেকে এসেছে তা–ই নয়, কথিথ সহযোদ্ধারাও কখনো কখনো নিপীড়ক হয়েছেন আর অনেক সময়ই হয়েছেন নীরব দর্শক।

কিন্তু অধ্যাপক সামিনা, প্রাপ্তি, উমামা, জারা কিংবা তাজনূভারা দমে যাননি। দমে যাবেন না। জুলাই এ দেশের নারীদের শিখিয়েছে তাঁদের আপন শক্তিতে এগিয়ে যাওয়া। এখনো দেয়ালে দেয়ালে নজরুলের ‘জাগো নারী জাগো বহ্নি–শিখা’ গানটির উৎকলন খুঁজে পাওয়া যাবে:

‘ধূ ধূ জ্ব’লে ওঠ ধূমায়িত অগ্নি,

জাগো মাতা, কন্যা, বধূ, জায়া, ভগ্নী!

পতিতোদ্ধারিণী স্বর্গ-স্খলিতা

জাহ্নবী সম বেগে জাগো পদ-দলিতা,

মেঘে আনো বালা বজ্রের জ্বালা

চির-বিজয়িনী জাগো জয়ন্তিকা।’

চির-বিজয়িনীরা হারিয়ে যান না। তাঁরা ফিরে ফিরে আসেন, নিশ্চিত বিজয়ের দিকে এগিয়ে চলেন। প্রশ্ন হলো, এ দেশের পুরুষেরা তাঁদের সঙ্গী হতে পারবেন কি না, নাকি কেবল পেছনে টেনে রাখতে চাইবেন?

দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের বেশির ভাগ এখনো পুরুষ। মুখে তাঁদের প্রায়ই শোনা যায়, নারী নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসার কথা। কিন্তু যখন ঐকমত্য কমিশনে প্রশ্ন এল, নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটের কিংবা অন্তত ৩৩ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার, তখন বাদ সাধলেন অনেকেই। বাধা আসায় আপাতত ৫ শতাংশ আর এরপর ১০ শতাংশ মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে বাহাসের ইতি টানল কমিশন।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, তবে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপরিশ কি একেবারেই মূল্যহীন? দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী, মোট ভোটারের অর্ধেকও তাঁরা। নারীরা কী চান, সেটা জানার বা বোঝার চেষ্টা কোথায়?

কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ অবশ্য ভোট না দেওয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন! এর অর্থ কি দাঁড়ায় এরকম: পারলে নারীরা নারীদের দাবি আদায় করুক। তাহলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কি ঐকমত্য কমিশনের কাজের পরিধির বাইরে?

এই অন্তর্বর্তী সরকার জুলাইয়ের ঐতিহাসিক সমরে অংশ নেওয়া সবার ত্যাগের ফসল। তাই দেশের অর্ধেক মানুষকে, তাঁদের রজনৈতিক স্বীকৃতির অধিকারকে পেছনে ফেলে নির্বাচনী ট্রেনে উঠে পড়া হবে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিদারুণ প্রতারণা।

এ দেশের নারীরা তাঁদের অধিকার আদায় করে ছাড়বেন। চাইলেই তাঁদের আর পুরুষতান্ত্রিকতার নিগড়ে আটকে রাখা যাবে না। তাঁদের বিজয় সময়ের ব্যাপারমাত্র। এখানে প্রশ্ন একটাই, এই অন্তর্বর্তী সরকার কি ইতিহাসে নারীর অধিকার আদায়ে অন্তরায় অথবা ‘অক্ষম’ হিসেবে নাম লেখাবে, নাকি সে অগ্রযাত্রায় সহায়ক শক্তি হিসেবে? একই একই প্রশ্ন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও। পরিবারের পুরুষ কর্তার ইচ্ছায় নারীরা দল বেঁধে ভোট দিয়ে আসবেন বলে যদি কেউ ভেবে থাকেন, তবে তিনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন।

যে নারীরা শেখ হাসিনার মতো নিষ্ঠুর স্বৈরশাসককে টেনে মসনদ থেকে নামাতে পারেন, তাঁরা নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে পারবেন না, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আর কত অস্থিরতা আর কত সংঘাত আর কত রক্তপাত দেখতে হবে আমাদের এই সহজ দাবিগুলো আদায় করে নিতে?

জুলাই যতবার ফিরে আসবে, ততবার তা বহু মায়ের কোল খালি করে ফিরে যাবে, চোখের জ্যোতি কেড়ে নেবে অনেকের। তাই আলাপের দরজা এত তাড়াতাড়ি বন্ধ করবেন না। নারীকে পেছনে ফেলে রেখে বাংলাদেশ কিছুতেই এগোতে পারবে না। তাই নারীর ক্ষমতায়নের দায় কেবল নারীর নয়, এ দেশের প্রত্যকটি মানুষের।

‘সেদিন সুদূর নয়—

যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।’

* মানজুর-আল-মতিন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

নারীর ক্ষমতায়নের দায় কেবল কি নারীর

Wednesday, May 27, 2026

বার্লিনের মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখেন শহরের মাঝখানে উঁচু প্রাচীর by মেহেদি হাসান

১৯৬১ সালের ১৩ আগস্ট। পূর্ব জার্মানির মানুষ গভীর ঘুমে। কিন্তু একদল মানুষ নির্ঘুম। তাঁরা কাঁটাতার দিয়ে প্রাচীর নির্মাণের কাজে ব্যস্ত, যে প্রাচীর পূর্ব জার্মানিকে পশ্চিম জার্মানি থেকে আলাদা করে দেয়। অসংখ্য পরিবারের সদস্যদের মুখ–দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। প্রাণের বন্ধুকে চিরতরে হারাতে হয়। প্রায় ২৮ বছর পর ভাঙা হয় বার্লিন প্রাচীর। আবারও একত্র হন দুই জার্মানির মানুষ।

বার্লিন প্রাচীর কেন নির্মাণ করা হয়েছিল

১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে জার্মানি। মিত্রশক্তির মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়ন।

যুদ্ধ শেষে মিত্রশক্তির দেশগুলো জার্মানিকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিটি দেশ জার্মানির একটি করে অঞ্চলের দায়িত্ব নেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স নেয় পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ, আর পূর্বাঞ্চল দখলে রাখে সোভিয়েত ইউনিয়ন।

জার্মানির রাজধানী বার্লিনের অংশ পড়ে পূর্বাঞ্চলে। তাই শহরটিকে চারটি অংশে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি দেশ বার্লিনের একটি করে অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পশ্চিম বার্লিন চলে যায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের হাতে আর পূর্ব বার্লিনের নিয়ন্ত্রণ নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।

১৯৪৯ সালের মধ্যে জার্মানি দুটি আলাদা দেশে ভাগ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের দখলে থাকা অংশের নামকরণ করা হয় ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি (পশ্চিম জার্মানি)। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে থাকা অংশের নাম হয় জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (পূর্ব জার্মানি)।

জার্মানি ভাগ হওয়ার পরপরই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ধারণা ছিল সমাজতন্ত্র, যা মিত্রশক্তি বা পশ্চিমা দেশগুলোর ধারণা থেকে একদমই আলাদা।

পশ্চিম জার্মানির শাসনব্যবস্থা ছিল অনেকটা এখনকার যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো। সেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারতেন, নিজের পছন্দমতো গান শুনতেন এবং স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারতেন।

অন্যদিকে পূর্ব জার্মানি কঠোরভাবে শাসন করা হতো। মানুষ কীভাবে আচরণ করবেন, তা নিয়ে ছিল কঠিন নিয়মকানুন। প্রতিটি কাজের ওপর পুলিশের কড়া নজরদারি ছিল।

জার্মানি ভাগের পর প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিমে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে শেষমেষ পশ্চিম বার্লিন ঘিরে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। নাম দেওয়া হয় বার্লিন প্রাচীর।

বার্লিন প্রাচীর যেভাবে তৈরি হলো

তৎকালীন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ ১৯৬১ সালে পূর্ব জার্মানি থেকে মানুষের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মাঝখানে একটি প্রাচীর নির্মাণের আদেশ দেন। তাঁর আদেশ অনুযায়ী ১৯৬১ সালের ১৩ আগস্ট রাতের আঁধারে তৈরি করা হয় প্রাচীর।

প্রাচীরটি এত অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল যে সাধারণ মানুষ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। অনেকে ঘুম থেকে উঠে দেখেন তাঁরা এক পাশে আটকা পড়েছেন। পশ্চিমে থাকা বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। প্রথমে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বার্লিন শহরকে ভাগ করা হয়েছিল।

এরপর ধীরে ধীরে অসংখ্য শক্তিশালী প্রাচীর তৈরি করা হয়। সঙ্গে বসানো হয় কড়া পাহারা ও টহল, যাতে কেউ এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে না পারে।

বার্লিন প্রাচীর কত বড় ছিল

বার্লিন প্রাচীরের দৈর্ঘ্য ছিল ১৫৫ কিলোমিটার (৯৬ মাইল)। উচ্চতা ৪ মিটার বা ১৩ ফুট। ১৯৮৯ সালে ভেঙে ফেলা পর্যন্ত প্রাচীরে ৩০২টি ওয়াচ টাওয়ার (নজরদারি টাওয়ার) ছিল।

দুটি সমান্তরাল দেয়ালের সমন্বয়ে প্রাচীরটি তৈরি করা হয়। দুটি দেয়ালের মাঝখানে একটি ফাঁকা অংশ রাখা হয়। এই অংশে সৈন্য মোতায়েন করা হতো। শুধু তা–ই নয়, কেউ যাতে লুকিয়ে সীমান্ত পার না হতে পারেন, সে জন্য মাইন পুঁতে রাখা হতো।

দ্রুতই এই প্রাচীর ইউরোপের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের বিভেদের প্রতীক হয়ে ওঠে। ‘আয়রন কার্টেন’ বা লোহার পর্দা নামে পরিচিতি পায়।

সোভিয়েত নেতারা বার্লিন প্রাচীরকে বলতেন সুরক্ষার আবরণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কাছে এটি ছিল একধরনের কারাগার, যে কারাগার থেকে পূর্ব জার্মানির মানুষকে বের হতে বাধা দেওয়া হতো।

বার্লিন প্রাচীর থাকার সময় জীবন যেমন ছিল

পূর্ব জার্মানি থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ বার্লিন প্রাচীর টপকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রাচীর টপকানো ছিল অত্যন্ত কঠিন ও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৬১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ২৮ বছরে এই পথে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে শতাধিক মানুষ নিহত হন।

পূর্ব বার্লিনে মানুষের জীবনযাত্রা ছিল কঠিন। কর্তৃপক্ষ তাঁদের প্রতিটি কাজ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। জীবনযাপনের নিয়মও ছিল অত্যন্ত কঠোর। এ ধরনের নানা কারণে যাঁরা আগে পশ্চিম বার্লিনে কাজ করতেন, তাঁরা চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন।

কড়াকড়ি ও কঠোর বিধিনিষেধের কারণে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানিতে থাকা পরিবারগুলো বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ১৯৮৯ সালে প্রাচীর ভাঙার আগপর্যন্ত অনেকের মধ্যে আর দেখা করার সুযোগ হয়নি।

বার্লিন প্রাচীরের পরিণতি

১৯৮০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপের অনেকে দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। পূর্ব ইউরোপের মানুষেরা আরও বেশি স্বাধীনতা চাইছিলেন। তাঁরা যেখানে খুশি সেখানে যাওয়ার অধিকার চান। এ ছাড়া নিজের পছন্দের গান শোনা এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার চান, যা সোভিয়েত শাসনে সম্ভব ছিল না। একপর্যায়ে দেশ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতির দাবি জোরালো হতে থাকে।

পূর্ব জার্মানি থেকে শত শত মানুষ হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভাকিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশের মাধ্যমে পালিয়ে যেতে থাকেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে পূর্ব বার্লিন সরকারের পক্ষে পশ্চিম জার্মানিতে প্রবেশের দাবি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।

অবশেষে ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদিন পূর্ব জার্মানির নেতা টেলিভিশনে একটি ভাষণ দেন। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সীমান্ত খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর পূর্ব জার্মানি থেকে হাজার হাজার মানুষ বার্লিন প্রাচীরের কাছে জড়ো হন। তাঁরা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের ফটক খুলে দিতে বলেন।

বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে পিছু হটেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। এরপর হাজার হাজার মানুষ পশ্চিম জার্মানিতে প্রবেশ করেন।

বার্লিন প্রাচীর পতন

সেদিন বার্লিন প্রাচীরের পশ্চিম পাশের মানুষ পূর্ব জার্মানির মানুষের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এত বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে সঙ্গে সঙ্গেই উৎসব শুরু হয়ে যায়। কেউ কেউ প্রাচীরের ওপর ওঠে নাচতে থাকেন।

বার্লিন প্রাচীরের পতন হয় ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর। তবে ওই দিন পুরো প্রাচীর একবারে ধ্বংস করা হয়নি।

এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে অসংখ্য হাতুড়ি দিয়ে প্রাচীর ভাঙতে থাকেন মানুষ। তাঁরা প্রাচীরের টুকরাগুলো রেখে দেন। কারণ, প্রাচীরের টুকরাগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। জার্মান সরকার শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালে প্রাচীরটি ধ্বংস করে। তবে দর্শনার্থীদের পরিদর্শনের জন্য প্রাচীরের অনেক অংশ এখনো অবশিষ্ট হয়েছে।

এরপর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বার্লিন প্রাচীর পতনের ১১ মাস পর ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে মিলিত হয়ে আজকের পরিচিত জার্মানি রাষ্ট্র গড়ে তোলে।

তথ্যসূত্র;
১. বার্লিন ওয়াল ফাউন্ডেশন,
২. বিবিসি,
৩. ডয়চে ভেলে,

বার্লিন প্রাচীর তৈরির কাজে ব্যস্ত একজন শ্রমিক
বার্লিন প্রাচীর তৈরির কাজে ব্যস্ত একজন শ্রমিক। ফাইল ছবি: এপি

৭২ বছর পর প্রেরকের ঠিকানায় পৌঁছাল চিঠি

আজকের ডিজিটাল যুগে চিঠি, খাম বা পোস্টকার্ডকে কিছুটা অপরিচিত মনে হয়। তাই বলে ডাক যোগাযোগ যে একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে, তা কিন্তু নয়। এখনো কখনো কখনো চিঠিপত্র আমাদের কাছে আসে। কিন্তু তা যদি হয় কয়েক দশকের পুরোনো, নিঃসন্দেহে তা বিস্ময়কর। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে এমনই এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে।

১৯৫৩ সালে অ্যালান বল নামের এক তরুণ নিউইয়র্ক থেকে তাঁর মা-বাবা এলিজাবেথ ও ফ্রেডরিক বলকে একটি পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিলেন। তাতে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের ছবি ছিল।

অ্যালান বল ছুটি কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন ক্যারিবীয় সাগরের দ্বীপাঞ্চল পুয়ের্তো রিকোয় যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে নিউইয়র্কে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে কিছুদিন সময় কাটান। নিউইয়র্কের স্মৃতি নিয়েই ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে থাকা মা-বাবার কাছে পোস্টকার্ডটি পাঠিয়েছিলেন অ্যালান। কিন্তু চিঠিটি গন্তব্যে পৌঁছায়নি। হারিয়ে যায় ডাক বিভাগের অজানা কোনো অফিসে।

এরই মধ্যে কেটে যায় সাত দশকের বেশি সময়। ৭২ বছর পর সেই পোস্টকার্ড হঠাৎ করে ইলিনয়ের অটোয়া ডাক অফিসের কর্মকর্তাদের নজরে আসে। পোস্টমাস্টার মার্ক থম্পসন এত পুরোনো পোস্টকার্ড দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান।

মার্ক থম্পসনের ধারণা, চিঠিটি জাতিসংঘ ভবনের ভেতরের ডাকঘরের কোথাও কোনো কারণে বা ভুলবশত আটকা পড়ে ছিল। এভাবে সবার অগোচরে এত বছর পড়ে ছিল।

পোস্টকার্ডটি হাতে আসার পর থম্পসন নড়েচড়ে বসেন। পণ করেন, যেভাবেই হোক চিঠির প্রাপককে খুঁজে বের করতে হবে। এ কাজের জন্য তিনি স্থানীয় বংশতত্ত্ব গবেষকদের সহায়তা নেন। ৮৮ বছর বয়সী অ্যালান বলকে খুঁজে বের করেন। ৭২ বছর আগে তিনিই এই চিঠি নিউইয়র্ক থেকে তাঁর মা-বাবার ঠিকানায় পাঠিয়েছিলেন।

অ্যালান বল বর্তমানে আইডাহো অঙ্গরাজ্যের স্যান্ডপয়েন্ট শহরে বসবাস করছেন। পোস্টকার্ডটি হাতে আসার পর ডিজিটাল ছবিতে নিজের হাতের লেখা দেখে অ্যালানের পুরোনো নিউইয়র্ক সফরের কথা মনে পড়ে যায়। তবে পোস্টকার্ড পাঠানোর ঘটনাটি তাঁর স্পষ্ট মনে নেই।

অ্যালান বলের পোস্টকার্ডের এই দীর্ঘ যাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগের ইতিহাসে নতুন। কিন্তু এটিই সবচেয়ে দেরিতে পৌঁছানো পোস্টকার্ড বা চিঠি নয়। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলসের সোয়ানসি শহরে ১২১ বছর আগের একটি পোস্টকার্ড পাওয়া গেছে।

হারানো চিঠি বা পোস্টকার্ড এভাবে ফিরে আসা শুধু বিস্ময়ের নয়, বরং সময়ের স্রোত পেরিয়ে মানবিক যোগাযোগের টিকে থাকারও এক মায়াময় সাক্ষ্য।

৭২ বছর পর প্রেরকের ঠিকানায় পৌঁছাল চিঠি

Tuesday, May 26, 2026

চতুর্থ স্টেজের ক্যানসার ধরা পড়ার আট বছর পরও লড়ে যাচ্ছেন মঞ্জুশ্রী by রাফিয়া আলম

‘ক্যানসার’ শব্দটার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে একটা চাপা আতঙ্ক। তার ওপর তা যদি হয় চতুর্থ স্টেজের ক্যানসার, মনোবল হারিয়ে ফেলাটা অস্বাভাবিক নয়। নভেম্বর মাস ফুসফুস ক্যানসার সচেতনতা মাস। চতুর্থ স্টেজে ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়ার পরও আট বছর ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া মঞ্জুশ্রী কুন্তলা দত্তর জীবনের গল্প জানুন। লিখেছেন রাফিয়া আলম।

২০১৭ সাল। বরিশালের মঞ্জুশ্রী কুন্তলা দত্ত দিব্যি ঘরকন্না করছেন। জানুয়ারি মাসে হঠাৎ কাশি হলো ৪৮ বছর বয়সী এই নারীর। খুব স্বাভাবিকভাবেই ওই মৌসুমে এমন উপসর্গকে সাধারণ বিষয় ধরে নিয়েছিলেন স্থানীয় চিকিৎসক।

তাঁর নির্দেশনামাফিক কিছু ওষুধ সেবনের পর সেরেও উঠলেন মঞ্জুশ্রী। পরে আরও দুয়েকবার কাশি হলো। সঙ্গে বুকে ব্যথা। বুকটা একটু ভারও মনে হতো তখন। আবারও সেখানকার চিকিৎসায় সেরে উঠলেন।

বিপত্তি বাধল নভেম্বর মাসে, যখন কাশির সঙ্গে রক্ত উঠে এল। মঞ্জুশ্রীর একমাত্র সন্তান তিলোত্তমা দত্ত তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ঢাকায় নিয়ে আসা হলো মঞ্জুশ্রীকে। ভর্তি করা হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বুকের সিটি স্ক্যানে ধরা পড়ল টিউমার। ব্রঙ্কোস্কপির মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করা হলো। রিপোর্টে ধরা পড়ল ক্যানসার।

চতুর্থ স্টেজে ক্যানসার

ক্যানসার ধরা পড়ার পর মাকে নিয়ে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডে এলেন তিলোত্তমা। সেখানকার ক্লিনিক্যাল অনকোলজি অ্যান্ড রেডিওথেরাপি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেনের অধীন শুরু হলো চিকিৎসা। ক্যানসারটা চতুর্থ স্টেজের।

মঞ্জুশ্রীর বুকে তখন পানি জমে গেছে। সেই পানি বের করার ব্যবস্থা করা হলো। ফুসফুসের পর্দার দুটি স্তরকে আটকে দেওয়া হলো বিশেষ প্রক্রিয়ায়। টিউমারের মলিকুলার স্টাডির (আণবিক পরীক্ষা) জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছিল ভারতের বেঙ্গালুরুতে। রিপোর্টের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হলো টার্গেটেড থেরাপি।

চিকিৎসা হলো যেভাবে

সহজভাবে বলতে গেলে টার্গেটেড থেরাপি হলো এমন চিকিৎসাপদ্ধতি, যা কেবল নির্দিষ্ট কোষের ওপরেই কাজ করে। অর্থাৎ দেহের বাকি কোষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না এই চিকিৎসায়।

তবে এই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ খুঁজে পেতে বেশ ভুগতে হয়েছে মঞ্জুশ্রীর পরিবারকে। ২০১৯ সাল থেকে এভারেস্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর মা হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে মঞ্জুশ্রীকে নানাভাবে সহায়তা করতে শুরু করে।

মাঝে ২০১৮ সালে মঞ্জুশ্রীর পেট সিটি স্ক্যানে ধরা পড়েছিল, ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে মেরুদণ্ডের তিনটি হাড়ে। তাই দিতে হলো রেডিওথেরাপিও। অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেনের পরামর্শেই মাঝে মুম্বাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মঞ্জুশ্রীকে।

তবে স্কয়ারেই চিকিৎসা চালিয়ে যায় মঞ্জুশ্রীর পরিবার। অবশ্য ভর্তি থাকতে হয়নি একবারও। ২০১৯ সালের বোন স্ক্যান রিপোর্টে আর কোনো অস্বাভাবিকতাও ছিল না।

সুস্থ জীবনে মঞ্জুশ্রী

ধীরে ধীরে শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন মঞ্জুশ্রী। তবে টার্গেটেড থেরাপি চালিয়ে যেতে হয়েছে সব সময়ই। আজীবনই চালিয়ে যেতে হবে এই চিকিৎসা। ঠিকঠাক চিকিৎসা নেওয়ায় মারাত্মক পরিস্থিতি থেকেও মঞ্জুশ্রী ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে।

মঞ্জুশ্রীর মেয়ে তিলোত্তমা বলছিলেন, ‘অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন স্যার এমনভাবে চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে নির্ধারণ করেছেন, যাতে আমার মায়ের ভয়াবহ শারীরিক কষ্টের উপশম হয়। চতুর্থ স্টেজ ক্যানসার থেকে সুস্থ জীবনে ফেরাটা সত্যিই বিশাল ব্যাপার। এখনো তাঁর তত্ত্বাবধানেই আছেন মা।’

মায়ের লড়াইয়ের সঙ্গী তো তিলোত্তমা নিজেই। মেডিকেল কলেজের পড়ালেখা আর পরীক্ষার চাপ সামলে মাকে নিয়ে তিলোত্তমা লড়েছেন প্রতিটা দিন। ২০২২ সালে চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর ইন্টার্নশিপ শেষ করে প্রবেশ করেন পেশাগত জীবনে।

নতুন লড়াইয়ে

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভালোই চলছিল সব। তবে এরপর মঞ্জুশ্রীর আচরণে কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। পরে পরীক্ষা–নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, মস্তিষ্কে ছড়িয়েছে টিউমার। আবারও রেডিওথেরাপি দেওয়া হয় তাঁকে।

আর টার্গেটেড থেরাপি তো চলছেই। আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো আছেন মঞ্জুশ্রী। বাসার ভেতর দিব্যি হাঁটাচলা করেন। আচরণে এখন কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।

তিলোত্তমার জীবনে আজও আছেন তাঁর পরম মমতাময়ী মা। মায়ের ক্যানসার ধরা পড়ার সময় থেকে স্বাভাবিকভাবেই জীবনের বহু রঙিন মুহূর্ত আর দশজন মানুষের মতো করে উপভোগ করার সুযোগ হয়নি তিলোত্তমার।

মায়ের জন্য জীবনের সব চ্যালেঞ্জ হাসিমুখে সামলাচ্ছেন এই চিকিৎসক। মায়ের আদরের কোমলতম স্পর্শটুকু থাকুক তাঁর সঙ্গে, কেবল এটুকুই তাঁর প্রত্যাশা।

চতুর্থ স্টেজের ক্যানসার ধরা পড়ার আট বছর পরও লড়ে যাচ্ছেন মঞ্জুশ্রী
চতুর্থ স্টেজের ক্যানসার ধরা পড়ার আট বছর পরও লড়ে যাচ্ছেন মঞ্জুশ্রী। ছবি: মঞ্জুশ্রী কুন্তলা দত্তের পরিবারের সৌজন্যে। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

শীতে মধু খেলে যেসব উপকার পাবেন by রাফিয়া আলম

কদিন ধরেই বাতাসে শীতের আমেজ। পৌষ আসতে আর দেরি নেই। আর শীতকালই মধু খাওয়ার সেরা সময়। কারণ, মধু আমাদের দেহের তাপ ধরে রাখতে সহায়তা করে। মধু স্বাস্থ্যকর। তবে কতটা মধু কার জন্য ভালো, তা জানা থাকা প্রয়োজন। মধুর নানা দিক সম্পর্কে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম।

* মধু থেকে আপনি যে কেবল উষ্ণতা পাবেন তা নয়, মধু আরও নানাভাবে সুস্থতার সহায়ক।

* মধুতে আছে অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট জাতীয় উপাদান। তাতে বাড়ে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা।

* শরীরকে ভেতর থেকে তরুণ রাখতেও চাই অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। ত্বকের স্বাভাবিক কোমলতা ধরে রাখতেও সাহায্য করে এ ধরনের উপাদান।

* ঠান্ডা-কাশির সমস্যা উপশমেও সাহায্য করে মধু।

* মধু খেলে দ্রুত শক্তি মেলে। কারণ, মধু খাওয়ার পর দ্রুত তা হজম হয় এবং তাতে থাকা শর্করা দ্রুত পৌঁছে যায় রক্তে।

* ১ চা-চামচ মধু থেকে প্রায় ২১ ক্যালরি পাওয়া যায়। তা ছাড়া এতে আছে পটাশিয়াম, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

যেভাবে খেতে পারেন মধু

নানাভাবেই খেতে পারেন মধু। কেউ কেউ চিতই পিঠা, ম্যাড়া পিঠা, রুটি বা পাউরুটির সঙ্গে মধু মিশিয়ে খান। তাতে স্বাদ বাড়লেও ক্যালরির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। তাই এ ধরনের শর্করা–জাতীয় খাবারের সঙ্গে মধু যোগ না করাই ভালো।

* টক ফল বা এসবের রস মধু দিয়ে খেতে পারেন। নানা রকম সালাদের ড্রেসিং তৈরির কাজেও মধু ব্যবহার করতে পারেন।

* লেবুর রস আর মধু দিয়ে পানীয় তৈরি করতে পারেন। কিংবা কমলার কোয়া হাত দিয়ে চটকে তাতে আদার রস আর মধু মিশিয়ে পানীয় তৈরি করতে পারেন। এ ধরনের পানীয় ঠান্ডা-কাশিতে উপকারী।

* রং চা, লেবু–চা বা গ্রিন টিতেও যোগ করতে পারেন সামান্য মধু। তবে দুধ–চায়ে মধু মেশাবেন না।

* ওটসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেতে পারেন।

* মাছ বা মুরগির যেসব পদ একটু মিষ্টি স্বাদের হয়, সেগুলো রান্নার সময় চিনির বিকল্প হিসেবে মধু দিতে পারেন। দেশি ধারার রান্নায় অবশ্য এমন সুযোগ কম।

কখন খাবেন, কতটা খাবেন

রাতে নয়, সকালের দিকে মধু খাওয়া ভালো। তবে সারা দিনে আধা চা-চামচ থেকে এক চা-চামচ মধু খাওয়াই যথেষ্ট।

অতিরিক্ত মধু খেলে রক্তে শর্করা ও ট্রাইগ্লিসারাইড নামের চর্বির মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কখনোই একবারে খুব বেশি পরিমাণে মধু খেতে নেই। এতে হজমের গন্ডগোল হতে পারে। হতে পারে অ্যাসিডিটির সমস্যা।

সারা দিনে কতটা মধু খাচ্ছেন, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখুন। সারা দিনে একজন ব্যক্তির প্রয়োজনীয় ক্যালরির অধিকাংশই গ্রহণ করা উচিত এমন খাবার থেকে, যা হজম হতে একটু বেশি সময় লাগে।

আরও খেয়াল রাখতে হবে, রোজকার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালরি যাতে গ্রহণ করা না হয়।

শিশুদেরও খুব বেশি মধু দিতে নেই। অতিরিক্ত মধু বা চিনি খেলে ওরা সাময়িকভাবে অতিচঞ্চল হয়ে উঠতে পারে।

মধুতে কারও অ্যালার্জি থাকলে অল্প পরিমাণেও খাওয়া উচিত নয়। সাধারণত অর্গানিক মধুতে অ্যালার্জিজনিত সমস্যার ঝুঁকি বেশি থাকে।

ডায়াবেটিস বা ফ্যাটিলিভারে আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা যাঁদের রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে মধুর ব্যাপারে সতর্কতা প্রয়োজন।

মধুতে আছে অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট জাতীয় উপাদান
মধুতে আছে অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট জাতীয় উপাদান। মডেল: হৃদি, ছবি: নকশা

Monday, May 25, 2026

নিউমোনিয়া ঠেকাতে যা করবেন by ডা. সাইফ হোসেন খান

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর ২৫ লাখের বেশি মানুষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, যার অর্ধেকের বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বাংলাদেশে এখনো শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া।

নিউমোনিয়া ফুসফুসের প্রদাহজনিত একটি সংক্রমণ। এটি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাকের মাধ্যমে হয়। সংক্রমণের ফলে ফুসফুসের ছোট বায়ুথলিগুলো তরল বা পুঁজে ভরে যায়, ফলে অক্সিজেন গ্রহণে বাধার সৃষ্টি হয়। নিউমোনিয়া শুধু একটি রোগ নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিফলন। টিকাদান, সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও সচেতনতা—এই তিনটি উপায়ে রয়েছে প্রতিরোধের চাবিকাঠি।

কীভাবে ছড়ায়, কারা ঝুঁকিতে

বাতাসে থাকা জীবাণু নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করলে এর সংক্রমণ ছড়ায়। সংক্রমিত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। আর দূষিত বস্তু বা হাতের মাধ্যমে মুখ-নাক স্পর্শ করলেও হয়।

পাঁচ বছরের কম বয়সী ও ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে প্রবীণেরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। এ ছাড়া দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ব্যক্তি, ধূমপায়ী ও অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি, দূষিত পরিবেশে বসবাসকারী মানুষদেরও নিউমোনিয়া বেশি হতে পারে।

উপসর্গ ও চিকিৎসা

নিউমোনিয়ার উপসর্গ বয়স ও সংক্রমণের ধরনভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত হঠাৎ জ্বর ও কাঁপুনি, কাশি, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা বা শিশুদের ক্ষেত্রে খাওয়ায় অনীহা, বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি বা মানসিক অস্থিরতা পর্যন্ত হতে পারে।

নিউমোনিয়ায় গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়, বিশেষত শিশু ও প্রবীণদের। চিকিৎসা নির্ভর করে সংক্রমণের কারণের ওপর। ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়।

রোগের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে সেটি মুখে খাওয়ার বা ইনজেকশন হতে পারে। ভাইরাল নিউমোনিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। বিশ্রাম, তরল খাবার ও উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা করলে এটি ভালো হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত পানীয় গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে পানিশূন্যতা থাকলে শিরায় স্যালাইন দিতে হতে পারে।

প্রতিরোধের উপায়

নিউমোনিয়া প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। এটি প্রতিরোধে কিছু কার্যকর পদক্ষেপের একটি টিকা গ্রহণ। নিউমোকোক্কাল টিকা ও ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা নিউমোনিয়া প্রতিরোধে কার্যকর। বিশেষত, যাঁরা ঝুঁকিতে আছেন, তাঁদের অবশ্যই নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সুষম খাদ্য গ্রহণে নিউমোনিয়াসহ সব রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ে। হাত নিয়মিত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে, যেসব স্থানে জনসমাগম বেশি, সেখানে মাস্ক পরে যেতে হবে। করতে হবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকার অভ্যাস। ধূমপান পরিহার করতে হবে।

শীত এলেই নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ে
শীত এলেই নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ে। ছবি: পেক্সেলস

ল্যাবএইডে জটিল অস্ত্রোপচার শেষে হাঁটতে পারছেন জান্নাতুল

গাজীপুরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের বয়স তখন ২২ বছর। এক সন্তানের মা। সন্তানের বয়স সবে দুই বছর পেরিয়েছে, সে সময়ই হঠাৎ তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে। নন-হজকিন লিম্ফোমা। দেশেই চিকিৎসা নিয়েছিলেন। কেমোথেরাপির অসহ্য যন্ত্রণা পার হয়ে শেষ পর্যন্ত জিতলেনও সেই লড়াই।

কিন্তু দুই বছর পর ২০১২ সালে আবার নতুন এক যুদ্ধে নামতে হলো। দুপাশের হিপ জয়েন্টেই প্রচণ্ড ব্যথা। ব্যথা এতটাই তীব্র যে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হতো। ক্যানসারের বিরুদ্ধে অত বড় লড়াইটা শেষ করেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারলেন না জান্নাতুল।

নতুন যুদ্ধ

অসহ্য যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে দ্রুতই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন জান্নাতুল। তবে অবস্থার উন্নতি হলো না। চিকিৎসার জন্য নানা জায়গায় গেলেন। তবে ফলাফল আশানুরূপ হলো না। পরে দেশের একটি স্বনামধন্য হাসপাতালে বড় ধরনের শল্যচিকিৎসা করা হলো। তাতেও ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলল না। চিকিৎসার পরও হিপ জয়েন্টের (ঊরুসন্ধি) ব্যথা রয়ে গেল। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারছিলেন না। সেই শল্যচিকিৎসার পর যন্ত্রণার মধ্যেই পেরিয়ে গেল দেড় বছর।

কষ্টের দিন পেরিয়ে

২০১৪ সালে এক চিকিৎসক বন্ধুর কাছে অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেনের খোঁজ পান জান্নাতুল। তিনি ল্যাবএইড হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারির প্রধান। তিনিই নতুনভাবে জান্নাতুলের শল্যচিকিৎসা করলেন। একই দিনে দুপাশের হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করা হলো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই শল্যচিকিৎসার নাম টোটাল হিপ রিপ্লেসমেন্ট। তারপর? জান্নাতুলের মুখেই শুনুন, ‘এক মাস পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হয়েছিল। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করি। ধীরে ধীরে একদম স্বাভাবিক হয়ে যায় আমার হাঁটাচলা।’

ল্যাবএইডে শল্যচিকিৎসার পরের বছরই আবার মা হন জান্নাতুল। সে–ও আজ ১০ বছর। সংসার আর দুই সন্তান নিয়ে এখন দারুণ ব্যস্ত জান্নাতুল। বড় সন্তান এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোটটিরও পড়ালেখা চলছে। জান্নাতুল এখনো মাঝেমধ্যে ফলোআপে যান অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেনের কাছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-06%2Fp5kqkemg%2F8feb503f-e37e-4662-96dd-6fc822347365-1.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজীপুরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস এখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটছেন। ছবি: জান্নাতুল ফেরদৌসের সৌজন্যে

Sunday, May 24, 2026

রাশিয়ায় দেখা গেল আগামী বছরের বিশ্ব ফ্যাশনের একঝলক by সুমন ইউসুফ

একটা ফ্যাশন শো, যেখানে নানা পোশাক আর অনুষঙ্গ ধারণ করে হেঁটে চলেছেন মডেলরা। আলোঝলমল পরিবেশ, তাক করা ক্যামেরার সারি, দর্শকের উচ্ছ্বাস, করতালি...। এ–ই কি শেষ? ডিজাইনার তাঁর সৃষ্টিশীলতা কি কেবলই এই একটি শোর জন্যই করেছেন? তা তো নয়। কখনো ফ্যাশন শো আগামী দিনের বার্তা দেয়, কখনো মনে করিয়ে দেয় ঐতিহ্যের কথা, কখনোবা চোখ ধাঁধায় প্রযুক্তির ব্যবহারে। তেমনই ফ্যাশন শো দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল কিছুদিন আগে।

মস্কো ফ্যাশন উইক ২০২৫-এর আসর বসেছিল রাশিয়ার মস্কোর জারইয়াদিয়া পার্কে। ২৮ আগস্ট ২০২৫ থেকে ২ সেপ্টেম্বর ৬ দিনের এই আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোয়ে রাশিয়ার মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ, কাজান, ইয়াকুতস্ক থেকে শুরু করে আর্মেনিয়া, নিকারাগুয়া, ব্রাজিল, চীন ও ভারতের ডিজাইনাররা মিলে যেন এক নতুন বিশ্বভাষা তৈরি করলেন, যার নাম ফ্যাশন।

ছয় দিনের এই ফ্যাশন মিলনমেলায় শহরটি রূপ নিয়েছিল নন্দননগরীতে। পার্কিং গ্যালারির আর্ট স্পেস, ভাসমান সেতুর ওপর স্বচ্ছ আকাশ, ঐতিহাসিক কিতাইগারোদস্কাম, পুশকিন স্টেট মিউজিয়াম, লিও তলস্তয় স্টেট মিউজিয়াম, বলোতনাইয়া স্কয়ার—এসব স্থান ফ্যাশনের ছন্দে হয়ে উঠেছিল একেকটি কবিতা।

যেখানে ঐতিহ্য, প্রযুক্তি ও সৃষ্টিশীলতা মিলেমিশে তৈরি করেছে পোশাকের নতুন নকশা আর ভাবনা। একই সঙ্গে ২৮ থেকে ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্রিকস‍+ ফ্যাশন সামিট। যেখানে বিশ্বের উদ্ভাবনী ডিজাইনার, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকেরা মিলিত হয়েছিলেন। আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ভবিষ্যৎ ফ্যাশনের পথরেখা।

এ বছরের ফ্যাশন উইকের একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল ওয়াইল্ডবেরিজ প্রদর্শনী, যেটা রাশিয়ার সমৃদ্ধ আঞ্চলিক ঐতিহ্য উদ্‌যাপন করে। এই কিউরেটেড প্রদর্শনীতে ছয়জন রুশ ডিজাইনার অংশ নেন, যাঁরা তাঁদের আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পোশাক বানান।

এর বাইরে যে কজন ডিজাইনার প্রশংসা পেয়েছেন মস্কো ফ্যাশন উইকে, তার মধ্যে অন্যতম মান্দ্রাগর এআইয়ের সংগ্রহ। ভাসমান সেতুর ওপর যেন গড়ে উঠেছিল এক মায়াবী বন, যেখানে পাইয়োটা ইলিভ চাইকোভস্কির অসমাপ্ত অপেরা মিশে গিয়েছিল ডিজিটাল জাদুর ছোঁয়ায়।

সেন্ট পিটার্সবার্গের লস্ট জিনোম, মস্কোর ক্যাটিস কিডস, গুয়াতেমালার মারিয়ান্দ্রে গাইটান লস্ট, দ্য নয়ার কোলেকটিভ ফ্যাশনের র‍্যাম্পে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছরও তাঁদের পোশাকের নকশা অনুসরণ করবেন অনেকেই। পিটার্সবার্গের জিনোম লিলি ফুলের পবিত্রতায় খুঁজেছে শক্তি ও জ্ঞান। যুক্তরাষ্ট্রের পিয়া লিন্ডসে স্টুডিও উপস্থাপন করেছে নারীর আত্মবিশ্বাসের নিখাদ বন্দনা।

মস্কোর সোরোকা অন কোর্স সংগ্রহ উপস্থাপন করেছে পুশকিন স্টেট মিউজিয়ামের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে। স্থানটির প্রতীকী অর্থ ছিল গভীর, কস্টিউম ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এই সংগ্রহের পোশাকগুলো অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের একটি সংলাপ তুলে ধরেছিল।

পোশাকের প্রতিটি স্তর, প্রতিটি ড্রেপ যেন বলছিল রুশ শিল্প–ঐতিহ্যের নীরব কাব্য। লিও তলস্তয় স্টেট মিউজিয়ামের শান্ত পরিবেশে মস্কোর রুবান ব্র্যান্ড উপস্থাপন করল তাদের স্প্রিং-সামার ২০২৬ সংগ্রহ। তলস্তয়ের দর্শন, প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেম এবং মানবিক সরলতার অনুপ্রেরণায় এই সংগ্রহ ছিল আত্মমগ্ন, অথচ সমসাময়িক। মস্কো ফ্যাশন উইক ২০২৫ প্রমাণ করল, ফ্যাশন এখন কেবল পোশাক নয়, এখানে ঐতিহ্য মিশে যায় প্রযুক্তির সঙ্গে আর ভবিষ্যতের ছায়া পড়ে রেশমের ভাঁজে। এভাবেই মস্কো ফ্যাশন উইক সমাপ্ত হলো আলো, ইতিহাস আর কল্পনার এক বৃত্ত সম্পূর্ণ করে। ফ্যাশন এখানে শুধু ট্রেন্ড নয়; এটি উত্তরাধিকার, এটি যেন সময়ের সঙ্গে এক অনন্ত আলাপ।

মস্কো ফ্যাশন উইকে ঐতিহ্য, প্রযুক্তি ও সৃষ্টিশীলতা মিলেমিশে তৈরি করেছে পোশাকের নতুন নকশা আর ভাবনা
মস্কো ফ্যাশন উইকে ঐতিহ্য, প্রযুক্তি ও সৃষ্টিশীলতা মিলেমিশে তৈরি করেছে পোশাকের নতুন নকশা আর ভাবনা। ছবি: স্ট্রাজিন ইগোর, মস্কো

গাইলেন মুজা ও সানজানা, নাচলেনও

‘মাইয়ার কথা আমার এত ভালো লাগিল/ পোলা আমার কথা শুইনা প্রেম জাগিল’—এমন কথায় ‘মাইয়া’ শিরোনামে নতুন গান নিয়ে এলেন সংগীতশিল্পী মুজা ও সানজানা।

গাওয়ার পাশাপাশি গানের ভিডিও চিত্রে নেচেছেনও তাঁরা। ৮ নভেম্বর নিজের ইউটিউব চ্যানেলে গানের ভিডিও চিত্রটি প্রকাশ করেছেন মুজা। তিন দিনে ভিডিওটি ৭৫ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে।

মুজা জানান, গানটিতে একজন নারীর সৌন্দর্যের চেয়ে ব্যক্তিত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণত কারও সৌন্দর্যে আবিষ্ট হই। কথা বলার পর সেই ভালো লাগা আরও বেড়ে যেতে পারে ব্যক্তিত্বের কারণে। সেটাই গানের কথায় রাখতে চেয়েছি আমরা।’

মুজা বলেন, ‘বিয়ের মৌসুমের কথা চিন্তা করেই গানটি করা। গানটি আমার কাছে খুবই স্পেশাল (বিশেষ)। গানটি পপ জনরার, সঙ্গে কাওয়ালির ভাবটা আছে।’

‘মাইয়া’ নিয়ে সানজানা বলেন, ‘গানটি তৈরি শুরুর গল্পটা সিনেমার দৃশ্যের মতো। হঠাৎ কেউ অন্ধকার স্টুডিওর দরজা খুলে বের হলেন, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শুভেচ্ছা বিনিময় হলো, তারপরই দেখলাম আমরা গানটি নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছি। রাতে ড্যান্স প্র্যাকটিস, সকালে রেকর্ডিং—ঘুম ছিল না। সব স্বপ্নের মতো মনে হয়েছে।’

খানিকটা রসিকতার ছলে মুজা বলেন, ‘আমি সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ নৃত্যশিল্পী। আমি কখনো এভাবে ড্যান্স করিনি, কিন্তু গানে এটা দরকার ছিল, তাই করেছি। আমি বাধা অতিক্রম করতে পছন্দ করি।’

গানটির কথা লিখেছেন মুজা ও বাঁধন। সংগীত প্রযোজনা করেছেন মুজা ও ডেডবানি, সংগীতায়োজন করেছেন মুজা। গানের ভিডিও চিত্র নির্মাণ করেছেন পার্থ শেখ। কোরিওগ্রাফি হৃদি শেখ।

‘নয়া দামান’, ‘ঝুমকা’, ‘বেণি খুলে’র মতো জনপ্রিয় গান দিয়ে পরিচিতি পেয়েছেন মুজা। তরুণ সংগীতশিল্পী সানজানা মডেল হিসেবেও পরিচিত। ছয় বছর বয়স থেকে গান শিখছেন সানজানা। এখন ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকলেও সুযোগ পেলেই গান করেন।

গাওয়ার পাশাপাশি গানের ভিডিও চিত্রে নেচেছেন মুজা ও সানজানা
গাওয়ার পাশাপাশি গানের ভিডিও চিত্রে নেচেছেন মুজা ও সানজানা। শিল্পীর সৌজন্যে

Saturday, May 23, 2026

‘এ আনন্দ যেন বাবা–মায়ের জন‍্য অকল্পনীয় শান্তি’, ফেসবুকে চঞ্চল চৌধুরী

‘উৎকণ্ঠার ব‍্যাপারটা হলো, এবার শীতে আমার এসব প্রিয় এবং পছন্দের দামি জিনিসগুলোর মালিকানা বোধ হয় আর আমার থাকবে না।’ মজা করেই কথাগুলো ফেসবুকে লিখেছেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। কারণ, এই অভিনেতার ছেলে এখন আর ছোট নয়, দিন দিন বেড়ে উঠছে, হয়ে উঠছে বাবার মতো। চঞ্চলের পছন্দের পোশাকগুলো এখন ছেলের গায়ে একদম জুতসই।

এই অভিনেতার ছেলের নাম শৈশব রোদ্দুর শুদ্ধ। তার গায়ে একটি ব্লেজার। সেই ছবি পোস্ট করে চঞ্চল চৌধুরী মজা করে লিখেছেন, ‘যত দূর মনে পড়ে, গত শীতেও এই ব্লেজারখানার মালিকানা আমার হাতেই ছিল। বেশ কয়েক বছর আগে আমার খালাতো ভাই প্রবীর নিজের শরীর থেকে খুলে আমাকে পরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “দাদা, তোকে খুব সুন্দর মানিয়েছে। এটা তুই নিয়ে যা। আমার খুব পছন্দের ব্লেজার ছিল এটা।” এ রকম আরও কিছু কালেকশন আমার কাছে আছে। কোনোটা নিজের টাকায় কেনা, আবার কোনোটা প্রীতি উপহার।’

শুধু ব্লেজার নয়, এই অভিনেতার পছন্দের সব পোশাকই এখন ছেলের শরীরে মানানসই হয়। যে কারণে ছেলের দখলে যাচ্ছে তাঁর পোশাকগুলো। চঞ্চল লিখেছেন, ‘ছেলেটা বড় হতে হতে আমার সমস্ত পোশাকই এখন তার শরীরে খাপে খাপ সেট হয়ে যাচ্ছে। একটা সময় বাবা–মায়ের সমস্ত কিছুই সন্তানের দখলে চলে যায়। এটাই মনে হয় প্রকৃতির নিয়ম।’

এভাবে পোশাক ছেলের দখলে যাওয়াটা যেকোনো মা-বাবার জন্যই শান্তির। এ ঘটনা চঞ্চল চৌধুরীকে আনন্দ দিয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘এ আনন্দ যেন বাবা–মায়ের জন‍্য অকল্পনীয় শান্তি। শুধুই কি সন্তানের হাতে বাবা–মায়ের বৈষয়িক অর্জনগুলো হাতবদল হলেই বাবা–মা খুশি হন, নাকি সন্তানের প্রতি আরেকটু বেশি কিছু প্রত‍্যাশা করেন, স্বপ্ন দেখেন! সবাই চায় বাবা–মায়ের আদর্শ, যোগ্যতা বা সকল ভালো অর্জনগুলোও যেন সন্তানেরা ভেতরে ধারণ করে, আগলে রাখে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।’

তবে চঞ্চল মনেপ্রাণে চান, তাঁর ছেলে যেন বিলাসী না হয়। যে কারণে নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলের কাছে অনুরোধ করে লিখেছেন, ‘আর আমার ছেলে শুদ্ধর কাছে অনুরোধ, অতি বিলাসিতা আমার কখনোই পছন্দ নয়। তাই আমার সমস্ত পোশাক…বাপ–বেটা দুজনই ভাগাভাগি করেই পরি চল। আমার প্রতিটি পোশাকে আমার শরীরের যে পরিশ্রম আর সাধনার ঘাম–গন্ধ লেগে আছে, সেটাকে কখনো অবজ্ঞা করিস না, বাপ। অনেক বড় মানুষ হ।’ আরও লিখেছেন, ‘বাবা–মায়ের সকল ভালো অর্জনগুলোও নিজের জীবনে বয়ে নিয়ে সফল হও। সকল সন্তানের জন্য আশীর্বাদ ও শুভকামনা।’

ছেলের জন্মদিন চঞ্চলেরা। ছবি: ফেসবুক
ছেলের জন্মদিন চঞ্চলেরা। ছবি: ফেসবুক

পলিথিন ও বিভিন্ন পণ্যের প্লাস্টিক মোড়ক

কাঁচাবাজার থেকে আধুনিক শপিং মল—সব জায়গায়ই এখন পলিথিনের রাজত্ব চলছে। লন্ড্রি থেকে কাপড় নিলে, আধা কেজি সবজি কিনলেও হাতে আসে দুটি করে পলিথিন ব্যাগ। কারণ, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পলিথিন উৎপাদনে খরচ খুবই কম। অথচ এই অপচনশীল পলিথিনের আয়ু নাকি ৫০০ বছর পর্যন্ত! কিছুদিন আগে খবরে দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ ড্রেজিং করা যাচ্ছে না, কারণ সেখানে দুই থেকে সাত মিটার পর্যন্ত পলিথিনের স্তর জমে গেছে। ফলে অত্যাধুনিক ড্রেজিং মেশিনও কাজ করতে পারছে না। শুধু কর্ণফুলী নয়, দেশের প্রায় সব নদ-নদীরই এই মরণদশা এখন বাস্তবতা।

পলিথিন ব্যাগের পাশাপাশি চিপসের মোড়ক, বিভিন্ন প্লাস্টিক বোতল, ই-বর্জ্য—সব মিলিয়ে এখন দেশের পরিবেশ গভীর সংকটে। যদিও অন্যান্য বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ কঠিন, কিন্তু পলিথিন নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট আইন রয়েছে, যার অধীনে এর উৎপাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ।

কিছুদিন আগে এক দেশীয় বিজ্ঞানী পাট থেকে পলিথিনের বিকল্প উপাদান উদ্ভাবন করে প্রশংসিত হয়েছেন। বাণিজ্যিকভাবে তা উৎপাদন ও বাজারজাত করার দাবি উঠলেও অজানা কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো নীরব। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য। তাই বলা যায়, অন্তত পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।

নূরুল আমিন, ঢাকা

https://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2016%2F11%2F14%2F59e134ee9e94c13fcc9435db3c14ef8f-18.jpg?rect=25%2C0%2C750%2C500&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পলিথিন ব্যাগের পাশাপাশি চিপসের মোড়ক, বিভিন্ন প্লাস্টিক বোতল, ই-বর্জ্য—সব মিলিয়ে এখন দেশের পরিবেশ গভীর সংকটে। ফাইল ছবি

Friday, May 22, 2026

নাসার শব্দহীন সুপারসনিক বিমান পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করেছে

আকাশে কোনো ফাইটার জেট উড়লে নিচে প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পাই আমরা। দ্রুত চলাচলের কারণে কানে তালা লেগে যায়। বিমানের এমন শব্দ আগে এড়ানো যেত না। দ্রুত চলাচল করা বিমানগুলো প্রচণ্ড শব্দ করত। এই শব্দকে বলে সনিক বুম। বাতাসে শব্দের গতি সাধারণত প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ২৩৫ কিলোমিটার বা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৪৩ মিটার। এর চেয়ে দ্রুত যদি কোনো বিমান চলে, তাকে বলে সুপারসনিক বিমান। যখন কোনো বিমান, রকেট বা বস্তু এই গতির চেয়ে দ্রুত চলে, তখন তাকে বলা হয় সুপারসনিক।

শব্দের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে আবাসিক এলাকায় এই বিমান চালানো নিষিদ্ধ। আবার এই বিমানে যাত্রী পরিবহন করাও নিষেধ। এই সমস্যা দূর করতে একটি প্রায় শব্দহীন বিমান তৈরি করেছে নাসা ও লকহিড মার্টিন কোম্পানি। বিমানটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সফলভাবে শেষ করেছে।

বিশেষ এই বিমানের নাম এক্স-৫৯। প্রথমবারের মতো এটি আকাশে উড়ল। বিমানটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যেন এটি শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে উড়লেও জোরালো সনিক বুম তৈরি না করে। প্রচলিত সনিক বুমের বদলে এটি খুব হালকা ‘থাম্প’ ধরনের শব্দ করে।

এই সফল উড্ডয়ন বিমান পরিষেবাকে এগিয়ে নেবে বলে মনে করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সুপারসনিক যাত্রীবিমান চালুর পথে বড় অগ্রগতি। ১৯৭৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সুপারসনিক যাত্রীবিমান চালানো নিষিদ্ধ।

প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন

এক্স-৫৯-এর পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল প্রায় এক ঘণ্টার জন্য। বিমানটি গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পামডেলে লকহিড মার্টিনের স্কাঙ্ক ওয়ার্কস ফ্যাসিলিটি থেকে আকাশে ওড়ে। ওড়া শেষে নাসার আর্মস্ট্রং ফ্লাইট রিসার্চ সেন্টারে অবতরণ করে।

এই পরীক্ষায় বিমানটির গতি ছিল সর্বোচ্চ ঘণ্টায় প্রায় ৩৮৬ কিলোমিটার। এটি ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়েছে। তবে এই উড্ডয়নে সুপারসনিক গতি তোলা হয়নি। কারণ, এই উড্ডয়নের লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করা।

কতটা শক্তিশালী এই বিমান

লকহিড মার্টিনের তথ্য অনুযায়ী, এক্স-৫৯ সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪৮৯ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারবে। যা যাত্রীবাহী বোয়িং ৭৪৭-এর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিমানটি ওড়ার জন্য উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ হাজার ফুট (১৬ হাজার ৭৬৪ মিটার)। এটির ডানার প্রস্থ ৩০ ফুট, উচ্চতা ১৪ ফুট এবং দৈর্ঘ্য ১০০ ফুট। লম্বা নাকের কারণে অনেকেই এটিকে সোর্ডফিশের সঙ্গে তুলনা করেন।

এক্স-৫৯-এর সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য হলো অবিশ্বাস্য লম্বা নাক। পাশ থেকে দেখলে এটি খুব সরু হয়ে শেষ হয়েছে মনে হয়। এমন নকশার কারণ, শকওয়েভের আকার বদলে দেয় এই আকৃতি। ফলে সুপারসনিক গতিতে উড়লেও জোরালো সনিক বুম তৈরি করে না।

সনিক বুম কেন হয়

যখন কোনো বিমান শব্দের গতির চেয়ে দ্রুত ওড়ে, তখন এর সামনে জমে থাকা বাতাস দ্রুত সরে যেতে পারে না। চাপের ফলে শব্দতরঙ্গগুলো একসঙ্গে মিলে একটি বড় শকওয়েভ তৈরি করে। এটিই সনিক বুম। এই শব্দ বজ্রপাতের শব্দের মতো শোনায়। সনিক বুম ভবন ও জানালার ক্ষতি করতে পারে।

১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা সিটিতে ছয় মাসের একটি গবেষণায় দেখা যায়, বারবার সনিক বুম মানুষকে ভয় পাইয়ে দিতে পারে। জানালা ভেঙে ফেলতে এবং ভবনের ক্ষতি করতে পারে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি চারজনের একজন তখন জানিয়েছিলেন, এ ধরনের শব্দে তাঁরা কখনো অভ্যস্ত হতে পারবেন না।

কীভাবে শব্দ কমায় এই বিমান


এই বিমানের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যেন এটি বড় একটি শকওয়েভকে ভেঙে অনেকগুলো ছোট শকওয়েভে ভাগ করে ফেলে। এ কারণে বিমানটি উড়লে বড় বুমের বদলে শোনা যাবে মাত্র একটি হালকা ‘থাম্প’ ধরনের শব্দ। গাড়ির দরজা জোরে বন্ধ করলে যেমন শব্দ হয়।

১৮৬৪ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী অগাস্ট টোপলার শকওয়েভ ভাগ করার কৌশল আবিষ্কার করেন। দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি বায়ুচাপের পরিবর্তনে আলোর বেঁকে যাওয়ার নীতি ব্যবহার করে। বিমানের এই তথ্য থেকে প্রকৌশলীরা জানতে পারেন, বিমানটির বাস্তব উড্ডয়ন আগে করা হিসাবের সঙ্গে মিলছে কি না।

আগামী পরীক্ষাগুলোয় এক্স-৫৯ সুপারসনিক গতিতে উড়বে। সবকিছু ঠিকঠাক চললে মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে বিমানটিকে ব্যবহার করা হবে। মানুষ নতুন ধরনের এই নিঃশব্দ সুপারসনিক বিমানকে কীভাবে গ্রহণ করে যাচাই করে দেখা হবে। এটি সফল হলে যুক্তরাষ্ট্রে আবারও সুপারসনিক যাত্রীবিমান চালুর পথ খুলে যেতে পারে। তবে আগের মতো কানে তালা লাগিয়ে না, অনেকটা নিঃশব্দে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-11%2F6yywlvew%2FgonwZ5Z2zZMHUQwtVEmwnQ-970-80.jpg.webp?rect=76%2C0%2C819%2C546&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

নিউইয়র্কের ‘লম্বু’দের কাহিনী

অনেকে মনে করেন সাত ফুটের বেশি লম্বা হওয়া মানেই ঈর্ষণীয় সুবিধা। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টা মোটেই তেমন নয়। নিউইয়র্কের এক ‘টল ট্যুর’ অনুষ্ঠানে ৭ ফুট ৪ ইঞ্চি লম্বা মার্ক জ্যাকসন জানান, তার উচ্চতা তাকে যতটা আলাদা করেছে, ততটাই বিপাকে ফেলেছে। শনিবার ২৩০ ফিফথ রুফটপে অনুষ্ঠিত ডেইলি মেইলের সঙ্গে আড্ডায় মার্ক বলেন, বিমান ভ্রমণে সব সময় এক্সিট রো সিট নিতে হয়। আর পোশাক খুঁজে পাওয়া দুঃস্বপ্নের মতো। আমি এখন থ্রিফট স্টোরে যাই, আর ইন্টারনেট সাহায্য করে আমাকে। তিনি জানান, তার ক্যালিফোর্নিয়া কিং সাইজ বিছানাতেও সোজা হয়ে শুতে পারেন না, আড়াআড়ি হয়ে শুতে হয়। অফিস চেয়ার খোঁজা ছিল আরও বড় যুদ্ধ। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, তার উচ্চতার কারণে প্রায়ই মাথা লেগে যায় ছাদে, দরজার ফ্রেমে, এমনকি সিঁড়িতেও।

মার্ক বলেন, আমি অসংখ্যবার মাথা ঠুকেছি। একবার ফ্রান্সে সিঁড়িতে মাথা লেগে সেলাই পর্যন্ত করতে হয়েছে। তবে কিছু মজার দিকও আছে। তিনি বলেন, আমি সবসময় সবার উপরে থাকি। তাই ‘ফ্রেশ এয়ার’ পাই প্রচুর। আর হ্যাঁ, নারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ সবসময়ই পাই। তবে ডেটিংয়ের ক্ষেত্রেও সমস্যা কম নয়। বারে গেলে কথাই শুনতে পাই না। কারণ উচ্চতার কারণে আমার কানে আওয়াজ পৌঁছায় না। নিচু হয়ে থাকতে হয়।

ফ্র্যাঙ্কি’র উচ্চতা ৬ ফুট ১১ ইঞ্চি। তিনিও একই অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। বলেন, বিছানা, ডেস্ক, বাস, বিমান, পোশাক- সব জায়গাতেই বিপদ। মেট্রোরেলে আমি সোজা দাঁড়াতে পারি না। এমনকি বিমানবন্দরে হাঁটতে গিয়ে স্যুটকেস পায়ে লাগে।

আরেকজন লিয়াম ম্যাকমোরো’র উচ্চতা ৭ ফুট ২ ইঞ্চি। তিনি বলেন, তার সবচেয়ে বড় কষ্ট পোশাকের অভাব। তার ভাষায়, এত লম্বা হওয়ায় আমি আর শপিং মলে যেতে চাই না। আমার মাপের কিছুই মেলে না। ফ্যাশনের আগ্রহটাই হারিয়ে যায়। কিন্তু এখন টল ট্যুর কমিউনিটি তৈরি হওয়ায়, সবাই একে অপরকে ভালো দোকানের তথ্য দেয়। এখন বুঝতে পারছি- আমরাও স্টাইলিশ হতে পারি। টল ট্যুরস-এর প্রতিষ্ঠাতা টাইলার বারগানটিনো নিজেও ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি লম্বা। তিনি বলেন, আমি চাই লম্বা মানুষরা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হোক। অভিজ্ঞতা শেয়ার করুক। কোথা থেকে পোশাক কেনে সেটা জানাক। ছোটবেলায় আমি রোলারকোস্টারে উঠতে পারতাম না, বাউন্সি ক্যাসেলেও ঢুকতে দিত না। আমি চাই না আর কেউ সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাক। এই দলটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে মিটআপ আয়োজন করে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/188976_Abul-9-1.webp

Thursday, May 21, 2026

’৭০–এর সাইক্লোনের ভয়াবহতা কেন আমরা ভুলে গেলাম by এম আমিরুল হক পারভেজ চৌধুরী

‘মেঘ থম থম করে কেউ নেই নেই; জল থই থই তীরে কিছু নেই নেই; ভাঙনের যে নেই পারাপার; তুমি আমি সব একাকার; মেঘ থম থম করে কেউ নেই নেই।’

১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সীমানা পেরিয়ে’ নামক বাংলাদেশি একটি চলচ্চিত্রে গাওয়া ভূপেন হাজারিকার গানের অংশবিশেষ। চলচ্চিত্রটি একই বছরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতাসহ মোট চারটি বিভাগে এবং দুটি বিভাগে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেছিল। এ ছাড়া ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থানও লাভ করেছিল ছবিটি।

১৯৭০-এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের ধ্বংসলীলার প্রায় তিন মাস পর একজোড়া মানব-মানবীকে বরিশালের দক্ষিণের একটি সামুদ্রিক চরে আদিম পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকতে দেখা গিয়েছিল; তৎকালীন ঢাকার সংবাদপত্রে এমন খবর প্রকাশিত হয়।

চরে একজোড়া নারী-পুরুষের বেঁচে থাকা ও বসবাসের বিষয়টি পরিচালক আলমগীর কবিরের দৃষ্টিতে সবার থেকে আলাদা মনে হয়। সেই থেকে তিনি এ ঘটনাটি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করার কথা ভাবেন এবং ১৯৭৫ সালে তিনি এটির নির্মাণকাজ শুরু করেন।

আজ চলচ্চিত্রটি একটি ইতিহাস। এই ইতিহাসের পেছনে রয়েছে নির্মম আরেক ইতিহাস। সেটি ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর, শুক্রবার। উপকূলের জীবন ইতিহাসের এক ভয়াবহ কালরাত। এদিন প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সাগর, নদী, খাল-বিলে ভেসে ছিল অসংখ্য লাশ আর এক কোটি মৃত গবাদিপশু। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখো মানুষ। উপকূলীয় দ্বীপচরসহ বহু এলাকার ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে বিরান জনপদে পরিণত হয়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়বিধ্বস্ত মনপুরা ঘুরে ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাবকে ২৮ ফুট লম্বা ‘মনপুরা ৭০’ নামে একটি শিল্পকর্ম চিত্রিত করেন। জয়নুল আবেদিন বলেন, ‘মনপুরায় আমরা যখন থার্ড ডেতে নামলাম, সি-প্লেনে আমি আর আমার বন্ধু একা ঘুরতাছি সারা দিন। কয়টা লোক বাঁইচা আছে দেখলাম। দৌড়ায় আসল। দেখলাম জখমওয়ালা। তারা কানতে আরম্ভ করল। আমরাও কানতে আরম্ভ করলাম। আপনারা বিশ্বাস করেন, আমার পেছনে...সমুদ্র...ঠিক সমুদ্র না সমুদ্রের খাঁড়ি, যেখানে যান, খালি গরু-মানুষ শুইয়া রইছে।’

সাগর-নদী-খাল-বিলে ভেসে ছিল অসংখ্য মৃতদেহ। এসব মৃতদেহের সৎকার করাও সম্ভব হয়নি। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখো মানুষ। এই ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতার কথা শুনলে আজও অনেকে শিউরে ওঠেন। প্রবীণেরা বর্ণনা দিতে গিয়ে জয়নুল আবেদিনের মতো হু হু করে কেঁদে ওঠেন। এ রকম হাজারো মর্মস্পর্শী ইতিহাস রয়েছে উপকূলের এ প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ঘিরে। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এই ঘূর্ণিঝড়কে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

উপকূলে যে ভয়াবহতা হয়েছে, তা এই প্রজন্মের মানুষ জানে না। এই দিন দিবস হিসেবে পালন করলে হয়তো এ প্রজন্মের মানুষ মনে রাখত। প্রাথমিকভাবে উপকূল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’-এর দাবি ওঠে। আমরা চাই একটি দিবস, যার নাম হবে ‘উপকূল দিবস’। বাংলাদেশে ‘উপকূল দিবস’ শুরু হলে বিশ্বে প্রথমবারের মতো এ ধরনের একটি দিবস পালন করা হবে। বর্তমান সময়; আগামী দিনের ইতিহাস। আর বিশেষ কোনো ‘দিবস’ মানেই যার মাধ্যমে প্রতিবছর আগের ইতিহাসকে স্মরণ করা। তেমনি একটি দিবস হোক ‘উপকূল দিবস’।

উপকূল দিবসের প্রাসঙ্গিকতাই–বা কেন? দেশের ৭১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঝড়ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক জনপদের নামই ‘উপকূল’। উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯টি জেলা ও ১৪৭টি উপজেলায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ বৈরী প্রতিকূলতা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে ফেরে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বাস করে উপকূলীয় অঞ্চলে। তাদের জীবন-জীবিকা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে মাছ, কৃষি, বন, স্থানীয় পরিবহন, লবণ ইত্যাদির ওপর। বন্যা, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা) আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। খাদ্যচাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশই বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে দেশে; যার সিংহভাগই উপকূলে। জাতীয় অর্থনীতিতে উপকূল জিডিপির কমবেশি প্রায় ২৫ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সমুদ্রের মৎস্য সেক্টর পুরোপুরি উপকূলকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের কলকারখানার পাশাপাশি উপকূলের মৎস্য সেক্টর এবং উপকূলের জনশক্তি দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে।

গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে উপকূলীয় অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষদের ভূমিকাও কম নয়। আর এসব খেটে খাওয়া মানুষদের কথা বিবেচনা করে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত। সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা, এনজিও, গণমাধ্যমসহ সবাই উপকূলের জন্য একটি দিবস প্রত্যাশা করবেন নিশ্চয়ই। উপকূলের সংকট, সমস্যা, সম্ভাবনা ও জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা উপকূলের মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি আদায়ে উপকূলের জন্য একটি বিশেষ দিন অপরিহার্য। ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’ ও ‘বিশ্ব উপকূল দিবস’ দাবি প্রতিষ্ঠিত হলে আরও একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হব আমরা। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ’৭০-এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

ভূপেন হাজারিকার ‘দূরের আর্তনাদের নদীর, ক্রন্দন কোনো ঘাটের, ভ্রুক্ষেপ নেই, পেয়েছি আমি, আলিঙ্গনের সাগর। সেই সাগরের স্রোতেই আছে, নিশ্বাসেরই ছোঁয়া, আছে ভালোবাসা, আদর।’ উপকূলের অবস্থা ঠিক তা–ই। সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। ’৭০-এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় স্রোতের নিশ্বাসের ছোঁয়া, ভালোবাসা ও আদর যুগ যুগ ধরে অবহেলিত। গত ২০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই প্রভাব মোকাবিলা না করা হলে, জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ুর ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে। ৫৬ বছর পর এই দিনটিকেই ‘উপকূল দিবস’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন সূচনা হোক।

* এম আমিরুল হক পারভেজ চৌধুরী, উপকূল গবেষক এবং চেয়ারম্যান, উপকূল ফাউন্ডেশন। ই-মেইল: ahcparvezdu@gmail.com

ভোলা সাইক্লোন, ১৯৭০
ভোলা সাইক্লোন, ১৯৭০ ফাইল ছবি

এই পাঁচ পানীয় কি রাতে খাচ্ছেন

রাতে এক গ্লাস দুধ খেয়ে ঘুমানোর অভ্যাস অনেকের। কেউ আবার ঘুমের আগে কেবল পানিই খান। আদতে কোন ধরনের তরল গ্রহণ করা উচিত রাতে? কোনগুলোই–বা এড়িয়ে চলা উচিত সন্ধ্যা থেকে? টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রধান শম্পা শারমিন খান–এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম।

পানি

রাতে ঘুমের পুরোটা সময় আমরা কোনো কাজ না করলেও দেহের ভেতর চলতে থাকে নানা ক্রিয়া–বিক্রিয়া। সেসব ক্রিয়া–বিক্রিয়ার জন্য পানি অপরিহার্য। তাই রাতে ঘুমের আগে এক গ্লাস পানি খাওয়া ভালো অভ্যাস।
তাতে সারা রাতে আপনার পানিশূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমে। তবে আপনি চাইলে পানির পরিবর্তে এমন পানীয়ও খেতে পারেন, যা পানির এই চাহিদা পূরণ করবে।

ডিটক্স পানি

রাতে পানির পরিবর্তে আপনি ডিটক্স পানি খেতে পারেন অনায়াসেই। ডিটক্স পানি ঘুমের জন্য ভালো। এ ছাড়া এসব পানীয় দেহের বিপাক হার কিছুটা বাড়ায়। অর্থাৎ বাড়তি মেদ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে এসব পানীয়।
ডিটক্স পানি ১৫-২০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। এসব পানীয় ছাঁকা উচিত নয়। কুসুম গরম পানি দিয়ে তৈরি করতে পারেন ডিটক্স পানি।
রাতে যেসব উপকরণ দিয়ে ডিটক্স পানি তৈরি করতে পারেন—
· আদা ও লেবু
· দারুচিনি (সঙ্গে মধুও দেওয়া যেতে পারে)
· হলুদ ও গোলমরিচ
· শসা ও লেটুসপাতা
· মেথি, জৈন ও গুয়ামৌরি (অ্যাসিডিটি কমাতে এই পানীয় দারুণ)

দুধ

রাতে শোয়ার আগে দুধ খেলে ঘুম ভালো হবে কি না, ব্যাপারটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। তবে অনেকেই শোয়ার আগে দুধ খান। এটি তাঁদের ঘুমের জন্য মানসিক প্রস্তুতির একটা অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অনভ্যস্ত ব্যক্তির জন্য হঠাৎ রাতে দুধ খেতে শুরু করাটা অস্বস্তিকর হতে পারে।
কারও জন্য গরম দুধ ভালো, কারও জন্য ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করা দুধ ভালো। কেউ আবার স্বাভাবিক তাপমাত্রার দুধ খান। এ বিষয়টি ব্যক্তিভেদে আলাদা। দুধ খেলে পানির চাহিদা তো মিটবেই, মিলবে পুষ্টিও। তবে আপনি দুধ রাতে খাবেন নাকি দিনের অন্য কোনো সময়ে, ঠিক করে নিন আপনার স্বাচ্ছন্দ্যের ভিত্তিতেই।

রাতে যেসব পানীয় খাবেন না

চিনি মেশানো পানীয়
চিনি মেশানো পানীয় স্বাস্থ্যের জন্য কখনোই ভালো নয়। বিশেষত রাতে আপনি যদি এ ধরনের পানীয় খান, তাহলে এই বাড়তি ক্যালরি আপনি পোড়ানোর সুযোগও পাচ্ছেন না। তার ওপর রাতে চিনি মেশানো পানীয় খাওয়া হলে তাতে অ্যাসিডিটির ঝুঁকি বাড়ে।
বাদামি চিনি, কৃত্রিম চিনি, মধু বা গুড় কোনোটিকেই চিনির স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ কোমল পানীয়, সোডা, চিনি মেশানো ফলের রস বা শরবত—কোনো কিছুই খাওয়া উচিত নয় রাতে। রাতের পানির চাহিদা মেটাতে উপযোগী পানীয় নয় এসব।

চা, কফি ও চকলেট মেশানো পানীয়
বিকেলের পর চা, কফি কিংবা চকলেট মেশানো পানীয় না খাওয়াই ভালো। এসব পানীয়তে থাকা ক্যাফেইনের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। এ ধরনের পানীয় খেলে রাতে প্রস্রাবও বেশি হতে পারে। তবে কিছু ভেষজ চা ঘুমের জন্য সহায়ক হতে পারে। যেমন ক্যামোমিল চা, অশ্বগন্ধা চা প্রভৃতি খাওয়া যেতে পারে সন্ধ্যায়।

যেকোনো তরলের বেলায় খেয়াল রাখুন
শোয়ার ঠিক আগমুহূর্তে পানি খেতে নেই। বরং শোয়ার অন্তত এক-দেড় ঘণ্টা আগে পানি খাওয়া উচিত। রাতের খাবার খাওয়ার এক-আধ ঘণ্টা পর পানি খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।
রাতে খুব বেশি পরিমাণে পানি না খাওয়াই ভালো। তাতে ঘুমের মাঝে বারবার প্রস্রাবের চাপ হতে পারে। এসব নিয়ম অন্যান্য তরল খাবারের জন্যও প্রযোজ্য।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-11%2F25k4gt2x%2FIMG6981.jpg?rect=79%2C0%2C3266%2C2177&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সন্ধ্যার পর থেকে কিছু পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, May 20, 2026

সাইবার বুলিং কাদের ওপর সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব ফেলে by কুমকুম হাবিবা জাহান

প্রযুক্তির বিপ্লব আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ ও উন্নত করার পাশাপাশি কিছু সংকটও তৈরি করেছে। ক্রমশ বাড়তে থাকা সাইবার বুলিং যার মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ভয়ানকভাবে প্রভাবিত করছে। আজ ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। বিশেষ এই দিনে জেনে নেওয়া যাক কাদের ওপর সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে সাইবার বুলিং। আর আমাদের করণীয়ই–বা কী।

বেড়েই চলেছে সাইবার বুলিং

বিনোদন থেকে শুরু করে পড়াশোনার জন্যও শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনকার সময়ের একটা বড় অংশ কাটে ইন্টারনেটে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ইন্টারনেটের পরিসরও এখন অনেক বড়। কৌতুক করার নামে ট্রল, আক্রমণাত্মক মিম, বডিশেমিং, মিথ্যাচার, অনলাইনের দুনিয়ায় দল বেঁধে চেহারা ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কটু কথা বলা—এমন সব ঘটনা বেড়েই চলেছে।

‘বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ট্রেন্ড ২০২৩’–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে রিপোর্ট করা সাইবার অপরাধের মধ্যে ৫২ শতাংশই ছিল সাইবার বুলিং। আর এর বড় একটা অংশের শিকার হলো স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থী। সাইবার বুলিং এমন ব্যাপক আকার ধারণ করার পেছনে রয়েছে সামাজিক আর মনস্তাত্ত্বিক কারণ। যেমন ধর্মের অপব্যাখ্যা, অতিরিক্ত রক্ষণশীলতা, সংবেদনশীলতা ও শিক্ষার অভাব ইত্যাদি। এ ধরনের হয়রানির সবচেয়ে ভয়ানক ফল হলো মানসিক বিপর্যয়। হতাশা, মানসিক চাপ, হীনম্মন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও একাকিত্বসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভোগেন ভুক্তভোগীরা। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসও কমে যায়। যে কারণে তাঁদের সামাজিক আচরণও বদলে যায়।

বুলিংয়ের শিকার শিশু-কিশোরদের মানসিক এই অবস্থা সব সময় বাইরে থেকে বোঝাও যায় না। অথচ মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ, আত্মসম্মানের অভাব ও একাকিত্বের মতো সমস্যা তাঁদের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলে যায়। একজন কিশোর বা কিশোরীর জন্য এ ধরনের মানসিক চাপ অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা এগুলোর সঙ্গে ‘বোঝাপড়া’ বা পাত্তা না দেওয়ার মতো মানসিক পরিপক্বতা এই বয়সে তাঁদের ভেতর থাকে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর স্বাভাবিক বিকাশ। এগুলো কখনো কখনো তাদের মধ্যে প্রতিহিংসার মনোভাব তৈরি করে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হলো, সাইবার বুলিংয়ের কারণে আত্মহননের পথও বেছে নেন কেউ কেউ।

এখন তবে কী করণীয়?

দেশের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাইবার অপরাধ রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কাজ করছে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট। কিছু আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে শুধু এ পদক্ষেপ গ্রহণই যথেষ্ট নয়। সমাজের বড় একটি অংশ এখনো এই সমস্যার প্রকৃত গভীরতা বুঝতে পারেনি। এই সংকট প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। স্কুল থেকেই শিশুদের ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। ডিজিটাল শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশের কিছু স্কুলে ইতিমধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। যেমন শিক্ষার্থীদের মানসিক ও আবেগীয় স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সোশ্যাল ইমোশনাল লার্নিং (এসইএল) ক্লাস চালু করেছে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশু ও তরুণ শিক্ষার্থীদের মানবিক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এমন পাঠ্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

* কুমকুম হাবিবা জাহান, হেড অব জুনিয়র স্কুল, গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা। 

সাইবার বুলিংয়ের ভুক্তভোগীরা হতাশা, মানসিক চাপ, হীনম্মন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও একাকিত্বসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভোগেন
সাইবার বুলিংয়ের ভুক্তভোগীরা হতাশা, মানসিক চাপ, হীনম্মন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও একাকিত্বসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভোগেন। ছবি: প্রথম আলো

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখবে যে ছয় ‘সুপারস্টার ফুড’ by রাফিয়া আলম

প্রথম আলোঃ ‘সুপারফুড’ শব্দটা দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কিন্তু কোনো খাবারকে সুপারফুড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তারপরও সুপারফুড নিয়ে হইচইয়ের শেষ নেই। কিন্তু আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন এমন কিছু খাবারের তালিকা দিয়েছে, যেসবকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ‘মহাতারকা’ বা ‘সুপারস্টার’ বলা যায়। ডায়াবেটিস নেই, এমন ব্যক্তির ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ডায়াবেটিস প্রতিরোধেও কাজে আসবে এসব খাবার।

ডায়াবেটিস এমন এক রোগ, যা জীবনধারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। চিকিৎসক একজন ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রয়োজনমাফিক ওষুধ তো দেবেনই, তবে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরচর্চারও বিকল্প নেই।

সুস্থ থাকতে প্রত্যেক ব্যক্তিরই এমন খাবার বেছে নেওয়া প্রয়োজন, যা হুট করে রক্তের সুগার বাড়িয়ে দেবে না, বরং তা হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগবে। তাই সবারই বেছে নেওয়া উচিত আঁশসমৃদ্ধ খাবার। এমন ছয় ধরনের খাবার সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

গাঢ় সবুজ শাক

* ভিটামিন এ, ভিটামিন কে, আয়রন, ফোলেট আর পটাশিয়ামে ভরপুর গাঢ় সবুজ শাকে আছে পর্যাপ্ত আঁশ।
* শাকে ক্যালরির পরিমাণ খুব কম। খাবারের প্লেট অর্ধেকটাই আপনি ভরাতে পারেন এ ধরনের খাবারে।
* তা ছাড়া স্যুপ ও সালাদও হতে পারে গাঢ় সবুজ শাক দিয়ে। তাতে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আসে।

শিম, মসুর, মটরজাতীয় খাবার

* শিম, মসুর, মটর, রাজমা, ছোলা, চানা—এ ধরনের খাবার থেকে আমিষ পাবেন।
* এ ধরনের খাবার আধা কাপ পরিমাণে খেলে ততটাই আমিষ পাবেন, যতটা পেতেন এক আউন্স (২৮.৩৫ গ্রাম) চর্বিছাড়া মাংস থেকে। এসব খাবারে আঁশ থাকে পর্যাপ্ত।
* আয়রন, জিঙ্ক, ফোলেট আর পটাশিয়ামও পাবেন এ ধরনের খাবারে। মজাদার নানান পদে রসনার তৃপ্তিও মিটবে।

টক ফল

* টক ফলে কেবল ভিটামিন সি নয়, থাকে ফোলেট আর পটাশিয়ামও।
* গোটা খেলে বা কেটে খেলে ফলের আঁশও পাবেন।
* যেসব ফল খোসাসহ খাওয়া যায়, সেসবের খোসা না ফেলাই ভালো।
* খোসায় প্রচুর আঁশ থাকে। রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে এটি জরুরি উপাদান।

দুধ ও টক দই

* ডায়াবেটিস হলেই যে শর্করা একেবারে বাদ দিতে হবে, তা নয়। বরং এমন শর্করা বেছে নেওয়া উচিত, যা স্বাস্থ্যকর।
* দুধ ও টক দইয়ে পাবেন ক্যালসিয়াম, আমিষ, শর্করা ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান।
* লো ফ্যাট দুধ বা লো ফ্যাট টক দই এই রোগীদের জন্য ভালো। তবে এসবে বাড়তি চিনি থাকা চলবে না।
* টক দইয়ের সঙ্গে কিছুটা ফল এবং আখরোট যোগ করতে পারেন।

গোটা শস্য

* গোটা শস্য, অর্থাৎ যা পরিশোধিত নয়, তা স্বাস্থ্যকর। তাই গোটা ওট, কিনোয়া, বার্লি, গোটা গম বেছে নেওয়া ভালো।
* লাল চালের ভাতও খেতে পারেন।
* গোটা শস্যে ভিটামিন বি, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন আর ম্যাঙ্গানিজও পাবেন।

বাদাম ও বীজ

* বিভিন্ন রকম বাদাম আর বীজ খেতে পারেন রোজ।
* এক আউন্স (২৮.৩৫ গ্রাম) বাদাম থেকেই পাবেন বেশ খানিকটা আঁশ, ম্যাগনেশিয়াম এবং স্বাস্থ্যকর তেল। তাতে ক্ষুধাও মিটবে।
* আখরোট, তিসি প্রভৃতিও যোগ করতে পারেন খাদ্যতালিকায়।
* তবে বাদাম বা বীজের সঙ্গে লবণ যোগ করবেন না। বাড়তি লবণ স্বাস্থ্যকর নয়।

সূত্র: আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন

https://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2018%2F05%2F09%2Ff83a714e38345edb9f808f51581040a3-5af30d7348424.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
করমচার মতো টক ফলে কেবল ভিটামিন সি নয়, থাকে ফোলেট আর পটাশিয়ামও। ছবি: এমদাদুল হক

Tuesday, May 19, 2026

২০০ বছর ধরে প্রভাবশালী দেশগুলো আকাশপথে কীভাবে নজরদারি চালাচ্ছে by ফাহমিদা আক্তার

সম্প্রতি বেলজিয়ামের একটি বিমানঘাঁটি এলাকায় কয়েকটি সন্দেহজনক ড্রোন শনাক্ত হয়। ২ নভেম্বর দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, বেলজিয়ামের ‘সামরিক যুদ্ধবিমানের ওপর নজরদারি করতে’ ড্রোনগুলো সেখানে পাঠিয়েছে কেউ। এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো একে অপরের ওপর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় মত্ত। আর তা করতে গিয়ে দেশগুলো অনেক সময় একে অপরের কর্মকাণ্ডের দিকে গোপনে নজর রাখে। এসব নজরদারির ঘটনা যখন সামনে আসে তখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা। একসঙ্গে বিস্তৃত এলাকাকে নজরদারির আওতায় রাখতে অনেক বছর আগে থেকেই আকাশপথকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে আকাশপথে নজরদারির মাধ্যমগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

২০২৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় শনাক্ত হয় একটি চীনা বেলুন। প্রায় ২০০ ফুট উঁচুতে ভেসে ছিল সেটি। এর নিচে ঝুলে ছিল অন্তত ৩০ ফুট চওড়া একটি ফ্রেম। দক্ষিণ ক্যারোলাইনা উপকূলে এফ-২২ যুদ্ধবিমানের সাহায্যে বেলুনটি ভূপাতিত করে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় বেশ হইচই শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্র তখন অভিযোগ করেছিল, এটি চীনের নজরদারি বেলুন। এর সঙ্গে নজরদারির সামগ্রী যুক্ত ছিল বলে দাবি করে তারা। তবে চীন দাবি করে, এটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী বেলুন ছিল এবং বেসামরিক গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রবল বাতাসের কারণে বেলুনটি পথভ্রষ্ট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছিল।

বেলুন হলো আকাশপথে নজরদারির প্রাচীনতম মাধ্যমগুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনারা যুক্তরাষ্ট্রে অগ্নিসংযোগকারী বোমা ফেলার জন্য এ ধরনের বেলুন ব্যবহার করতেন। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালেও যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যাপকভাবে বেলুনের ব্যবহার করেছিল। তবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এ সময়ে এসেও ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে নজরদারির কাজে বেলুনের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে।

এক দেশ আরেক দেশের ওপর নজরদারি চালাতে আজকাল নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ঠিকই, তবে এ ক্ষেত্রে ওপর থেকে (আকাশ থেকে) নজরদারিকে সবচেয়ে কার্যকর বলে বিবেচনা করা হয়।

আকাশ থেকে নজরদারির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের ইমেরিটাস কিউরেটর টম ডি ক্রাউচ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শত্রুরেখার পেছনের অংশে কী আছে, তা যতটা বেশি সম্ভব নজরে রাখার জন্য উঁচুতে উঠে পর্যবেক্ষণ করাটাই সব সময় কার্যকর।

২০০ বছরের বেশি সময় ধরে আকাশপথে বিভিন্ন মাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক দেশ আরেক দেশের ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছে। ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত বেলুন থেকে শুরু করে ঘুড়ি, ক্যামেরাবাহী কবুতর, গোয়েন্দা উড়োজাহাজ, ড্রোন, স্যাটেলাইটসহ নানা মাধ্যমের ব্যবহার দেখা গেছে।

গোয়েন্দা বেলুন

১৭৯০-এর দশকের শুরুর দিকে ফরাসিরা যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি চালাতে সর্বপ্রথম গোয়েন্দা বেলুনের ব্যবহার শুরু করেন। বেলুনগুলো হাইড্রোজেন গ্যাসে ভরা থাকত। এগুলো যে শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় গিয়ে ওড়াউড়ি করত, এমন নয়। এগুলোকে নিজেদের সীমান্ত এলাকায় একধরনের তারের সাহায্যে আটকে রাখা হতো।

বেলুনের সঙ্গে যুক্ত ঝুড়িতে দুজন সেনা বসতে পারতেন। তাঁদের একজন দুরবিন দিয়ে শত্রুপক্ষের অবস্থান দেখতেন। আর অন্যজন পতাকা ব্যবহার করে ভূমিতে থাকা কর্মকর্তাদের কাছে সংকেত পাঠাতেন।

ইতিহাসবিদ এবং ইন্টারন্যাশনাল স্পাই মিউজিয়ামের কিউরেটর অ্যান্ড্রু হ্যামন্ড বলেন, আকাশ পরিষ্কার থাকলে ওই ধরনের বেলুনে চড়ে ৫০ মাইল দূর পর্যন্ত দেখা যেত।

যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ চলার সময় উদ্ভাবক থ্যাডেউস লোও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সামনে একটি গোয়েন্দা বেলুন প্রদর্শন করেন। লিংকন তখন ওই বেলুনের কার্যকারিতা দেখে মুগ্ধ হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন আর্মি গোয়েন্দা বেলুনের ব্যবহার শুরু করে। সবচেয়ে বড় বেলুনটির নাম ছিল ইনট্রেপিড। এটিতে একজন টেলিগ্রাফ অপারেটরসহ পাঁচজন বসতে পারতেন।

ঘুড়ি ব্যবহার করে আকাশ থেকে ছবি তোলা

১৮৮০-এর দশকে ব্রিটিশ আবহাওয়াবিদ ডগলাস আর্চিবল্ড বড় ক্যানভাস ঘুড়ি দিয়ে বাতাসের গতিবেগ পরিমাপ করতেন। তিনি ঘুড়িতে ক্যামেরা লাগিয়ে রাখতেন আর দূর থেকে একটি কেব্‌লের সাহায্যে ক্যামেরার শাটারটি চালাতেন।

আর্চিবল্ডের তোলা ছবিগুলো ওই সময় বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল। ছবিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সেনা করপোরাল উইলিয়াম এড্ডির নজরে আসে। ১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র-স্পেন যুদ্ধ চলাকালে এড্ডি নিজেই ঘুড়িতে ক্যামেরা লাগিয়ে শত্রুর অবস্থানের ছবি তুলেছিলেন।

গৃহযুদ্ধের সময় সাধারণ ফটোগ্রাফি চালু ছিল ঠিকই, তবে এড্ডির ঘুড়ি দিয়ে তোলা ছবিকেই সামরিক উড়োজাহাজ থেকে তোলা প্রথম নজরদারির ছবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

ক্যামেরা বহনকারী কবুতর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কবুতর যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। কবুতরগুলো আটকে পড়া নাবিকদের সাহায্য চেয়ে পাঠানো বার্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দিত। গুপ্তচরদের পাঠানো সাংকেতিক বার্তাগুলোও যথাযথ জায়গায় পৌঁছে দিত। কবুতরের মাধ্যমে আকাশ থেকে ছবি তোলারও চেষ্টা করা হতো।

১৯০৭ সালে জার্মান ফার্মাসিস্ট জুলিয়াস নিউব্রোনার কবুতরের গায়ে লাগিয়ে ব্যবহার উপযোগী একটি ক্যামেরা উদ্ভাবন করেন এবং এটির পেটেন্ট পান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনারা এভাবে কবুতর দিয়ে ছবি তোলা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদ হ্যামন্ড বলেন, তাঁরা আসলেই কবুতরের সঙ্গে ক্যামেরা বেঁধে ফ্রান্সের পরিখাগুলোতে পাঠাতেন; কিন্তু ছবি অস্পষ্ট হতো এবং বোঝা কঠিন হতো।

সিআইএও হালকা ওজনের কবুতরের ক্যামেরার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিল। তবে কবুতরগুলো নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।

প্রথম নজরদারি উড়োজাহাজ এবং কোডাক ক্যামেরা

সর্বপ্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে উড়োজাহাজের ব্যবহার শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে। তবে শুরুতে এগুলোকে যুদ্ধবিমান বা বোমারু বিমান হিসেবে ব্যবহার করা হতো না। তখন উড়োজাহাজের কাজ ছিল কেবল নজরদারি চালানো। দুই আসনের উড়োজাহাজে একজন পাইলট এবং একজন পর্যবেক্ষক থাকতেন। ওই পর্যবেক্ষক দুরবিন ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করতেন।

এরপর উড়োজাহাজে ক্যামেরা বসানো শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোডাক কোম্পানি এ ধরনের ক্যামেরা তৈরি করে। কোডাকের রচেস্টার সদর দপ্তরে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু ছিল। সেখানে সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারির জন্য সহায়ক ছবি তোলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ নজরদারি বিমানগুলোতে অস্থায়ী ডার্করুম বসানো হয়। সেখানে যথাযথ সময়ে ছবিগুলো প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণ করা যেত। স্নায়ুযুদ্ধের সময় রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি স্থলভাগে গুপ্তচরবৃত্তি প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল। তাই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা তখন আকাশের দিকে মনোযোগ দিয়েছিল।

প্রথম গোয়েন্দা স্যাটেলাইট

যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যে শুধু কার আগে কে চাঁদে পৌঁছাবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা করত, তা নয়। কে প্রথম কক্ষপথে গোয়েন্দা স্যাটেলাইট পাঠাবে, তা নিয়েও প্রতিযোগিতায় মেতেছিল তারা।

১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ডিসকোভারার নামের একটি কর্মসূচি চালু করে। আদতে এটি ছিল প্রজেক্ট করোনা নামের একটি গোপন গোয়েন্দা কর্মসূচি। এর মধ্য দিয়ে গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হতো।

১৯৬০ সালে প্রথমবারের মতো গোয়েন্দা স্যাটেলাইটগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নে নজরদারির ছবি পাঠানো শুরু করে। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিকে হেক্সাগন কেএইচ-৯ নামের স্যাটেলাইটের ব্যবহার শুরু হয়। এ স্যাটেলাইট ১০০ মাইল উঁচু থেকে ২ ফুট আকারের ছোট বস্তুরও ছবি নিতে পারত।

সিআইএর ড্রাগনফ্লাই ড্রোন

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর জাদুঘরে থাকা সবচেয়ে আলোচিত যন্ত্রগুলোর একটি হলো ইনসেক্টোথোপটার। এটি একধরনের গোপন শোনার যন্ত্র, যা দেখতে একদমই ফড়িংয়ের মতো ছিল। সে জন্য এটিকে ড্রাগনফ্লাই ড্রোন বলা হতো। সিআইএ ১৯৭০-এর দশকে এটি তৈরি করে।

ইনসেক্টোথোপটারের স্বচ্ছ ডানায় ছোট একটি গ্যাসোলিন ইঞ্জিন লাগানো ছিল। ৬০ সেকেন্ডে দুটি ফুটবল মাঠের দূরত্ব অতিক্রম করার সক্ষমতা ছিল এটির।

ইনসেক্টোথোপটার এমনভাবে তৈরি হয়েছিল, যেন একজন অপারেটর লেজার বিম ব্যবহার করে এটির ওড়াউড়িকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং মাইক্রোফোনে ধারণ করা অডিও শুনতে পাওয়া যায়। তবে ইনসেক্টোথোপটার যন্ত্রটিকে কার্যকরভাবে চালানো যায়নি। কারণ, বাতাসের গতি ঘণ্টায় পাঁচ মাইলের বেশি হলেই এটি ভেঙে যেত।

প্রথম চালকবিহীন উড়োজাহাজ বা ড্রোন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ এরিয়াল টার্গেট নামের একটি রেডিও–কন্ট্রোলড উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয়। ওই সময় ব্রিটিশ সেনাদের আকাশে নিশানা করার প্রশিক্ষণ দিতে এ ধরনের উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনী চালকবিহীন এ উড়োজাহাজের নাম দেন কুইন বি। এটি ছিল পুনর্ব্যবহারযোগ্য। যুদ্ধবিমানের চালকেরা এটিকে নিশানা করার মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ চালাতেন। ব্রিটিশ উড়োজাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ডি হাভিল্যান্ড এই কুইন বি উড়োজাহাজ তৈরি করেছিল।

উড়োজাহাজটির রাডার ও এলিভেটর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোম্পানিটি একটি রেডিও-নিয়ন্ত্রিত সার্ভো ব্যবহার করেছিল। ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, এই মৌমাছি থিমযুক্ত চালকবিহীন বিমান থেকেই ‘ড্রোন’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নজরদারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে সর্বপ্রথম ভিয়েতনাম যুদ্ধে জেটচালিত নজরদারি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। এটির নাম ছিল একিউএম-৩৪ রায়ান ফায়ারবি।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে ৩৪ হাজারের বেশি নজরদারি মিশনে এ ড্রোন ব্যবহার করা হয়। রাডারকে ফাঁকি দিয়ে চলাচলের উপযোগী করে এটির রং করা হয়েছিল। এটি যেমন শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করত, পাশাপাশি শত্রুপক্ষের সীমানায় প্রচারপত্র ছড়াতেও এটিকে ব্যবহার করা হতো।

এ তো গেল পুরোনো ধাঁচের সব নজরদারি মাধ্যমের কথা। তবে প্রযুক্তিতে পুরোনো হলেও এগুলো নতুনরূপে এখনো ফিরে আসছে এবং এগুলোতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করে পরীক্ষা–নিরীক্ষা চলছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ফিল্ড মার্শাল জোহানেস আরভিন রোমেল একবার বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে স্থলযুদ্ধের শুরুটা আকাশ থেকেই হবে। এর মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয়ে যাবে, কোন পক্ষ অভিযান পরিচালনায় ও কৌশলগতভাবে দুর্বল হবে এবং যুদ্ধ চলাকালে বারবার সমঝোতার পথে যেতে বাধ্য হবে।’

রোমেলের এ কথাটি আজকের দিনে আগের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রগুলো এখনো অন্য দেশে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য স্যাটেলাইট, ড্রোনসহ নানা অত্যাধুনিক মাধ্যম ব্যবহার করছে। হয়তো এটি যুদ্ধবিমানের মুখোমুখি লড়াইয়ের বিষয় নয়। তবু এটি আকাশে আধিপত্য বজায় রাখার এক লড়াই হিসেবে থেকে গেছে। নজরদারির মাধ্যমগুলোতে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিও যুক্ত করা হচ্ছে।

এখন কথা হলো, আকাশপথে অন্য দেশের ওপর নজরদারির বিষয়টি কতটা হুমকির। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশকারী ওয়েবসাইট মডার্ন ডিপ্লোমেসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, নজরদারি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য হুমকি তৈরি করে, নাগরিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে। প্রতিপক্ষের সামরিক ও নাগরিক স্থাপনা তাদের অনুমতি ছাড়া পর্যবেক্ষণ করাটা নৈতিকভাবে অনুচিত।

একইভাবে নজরদারি তথ্যের ভুল বিশ্লেষণের কারণে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভুল–বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া নজরদারি তথ্যের অপব্যবহার বা ডিভাইস হ্যাক হলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে স্পর্শকাতর তথ্য চলে যেতে পারে। এতে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এ ধরনের নজরদারির কাজগুলো নিয়মিত নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের উচিত যুদ্ধবিধি এবং মানবাধিকার আইন মেনে নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা।

সূত্র: হিস্ট্রি ডট কম, এনপিআর, বিবিসি, রয়টার্স

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-10%2Fam535c8z%2FThumn-04.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif