Thursday, March 21, 2019

২৭ বছরেও ক্ষতিপূরণ পায়নি সাংবাদিক মন্টুর পরিবার by শাহনেওয়াজ বাবলু

সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান। মন্টুর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী রওশন আখতার  বাদী হয়ে মামলা করেন। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২৭ বছর পর রায় দেয় আদালত। ২০১৬ সালে নিহতের পরিবারকে এক কোটি ৭১ লাখ ৪৭ হাজার ৮ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ দেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। কিন্তু রায় ঘোষণার দুই বছর কেটে গেলেও ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না নিহত মন্টুর পরিবার। রওশন আখতারের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণের টাকা না পাওয়ার পেছনে প্রভাবশালীরা জড়িত।
অর্থ আদায়ে ডিক্রি জারি মামলা হলে বিচারিক আদালত বিবাদীপক্ষের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন। ওই কোম্পানির পাঁচ বিঘা জমি নিলামে বিক্রি করে মন্টুর পরিবারকে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেন আদালত।
কয়েক দফা নিলাম ডাকা হলেও রহস্যজনক কারণে ওই জমি বিক্রি করা যাচ্ছে না। খবর নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের তেজগাঁও এলাকার জমিটি একটি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ রয়েছে। তাই এই জমি কেউ কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আবার যদিও কেউ কেনার আগ্রহ দেখায়, তাহলে একটি প্রভাবশালী পক্ষ থেকে তাদের বাধা দেয়া হয়। আদালতের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ৬ বার নিলামের আয়োজন করা হয়েছে। আগামী নিলামের তারিখ ২৫শে মার্চ।
১৯৮৯ সালের ৩রা ডিসেম্বর রাজধানীর শান্তিনগরের আনন্দ ভবনের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পানীয়বোঝাই একটি মিনিট্রাক মোজাম্মেলকে ধাক্কা দেয়। তিনি মাথা ও মুখমণ্ডলে আঘাত পেলে স্থানীয় লোকজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। ১৩ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৬ই ডিসেম্বর মারা যান তিনি। ১৯৯১ সালের ১লা জানুয়ারি মোজাম্মেল হোসেনের স্ত্রী রওশন আখতার ৩ কোটি ৫২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২০শে মার্চ ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালত এক রায়ে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ৩ কোটি ৫২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন। ৩০ দিনের মধ্যে ওই অর্থ দিতে বলা হয়। চালকের ভুলে মালিকের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কোনো বিধান নেই উল্লেখ করে ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ বেভারেজ হাইকোর্টে আপিল করে। ২০১০ সালের ১১ই মে হাইকোর্ট ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ কোটি ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮ টাকা দেয়ার ডিক্রি দেন।
আইনজীবী সূত্র বলেছে, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরই লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করে বাংলাদেশ বেভারেজ। শুনানি নিয়ে ২০১৪ সালের ২০শে জুলাই আপিল বিভাগের রায়ে ক্ষতিপূরণের অর্থ পুনর্মূল্যায়ন করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। তবে ওই রায় পূর্ণাঙ্গ আকারে স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকাশিত না হওয়ায় ২০১৬ সালের এপ্রিলে পুনঃশুনানি হয়। এরপর ২০১৬ সালের ১৩ই এপ্রিল আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণসহ লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে রায় দেন।
এ নিয়ে আইনজীবী খলিলুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের দুই বছর পরেও বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড সেই টাকা এখনো দেয়নি। সর্বোচ্চ আদালত থেকে রায়ের পর ক্ষতিপূরণের অর্থ না দেয়ায় বাধ্য হয়ে আমরা তা আদায়ের জন্য ডিক্রি জারির মামলা করি। ওই আদালত বিবাদীপক্ষের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন। এরপর ওই কোম্পানির তেজগাঁওয়ের পাঁচ বিঘা জমি নিলামে বিক্রির নির্দেশ দিয়ে ওই অর্থ পরিশোধের সিদ্ধান্ত দেন আদালত। তবে কয়েক দফা নিলাম ডাকা হলেও রহস্যজনক কারণে ওই জমি বিক্রি করা যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, আমি যতদূর জানি বাদীপক্ষ কিছু কম ক্ষতিপূরণ হলেও মেনে নিতে রাজি আছে। কিন্তু তারপরও বিবাদীপক্ষ থেকে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
মামলার বাদী রওশন আখতার মানবজমিনকে বলেন, ক্ষতিপূরণের টাকা এখনো আদায় হয়নি। মামলা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আদালত তাদের জমি নিলাম করে টাকা দেয়ার নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। কারণ এর পেছনে প্রভাবশালীরা জড়িত। নিলামে জমির দাম ওঠে না। বারবার নিলাম বাতিল হয়। জমিটি একটি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ থাকার কারণে অনেকেই কিনতে চাইছে না। আমি নিজ উদ্যোগে এটা বিক্রির জন্য দুইবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছি। এতে আমার প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আর আদালতে প্রত্যেকবার বিভিন্নভাবে আমার অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। আমি এই ক্ষতিপূরণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে মুন্সীগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মোজাম্মেল হোসেন মন্টু। ১৯৬৮ সালে তিনি দৈনিক সংবাদে সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে তিনি বার্তা সম্পাদক হন। লেখক ও নাট্যকার হিসেবে পরিচিত এই সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেন।

চীনে নিপীড়নে মুসলিম বিশ্ব নীরব কেন? by গোয়ানে ডিয়ার

মুসলিম সংখ্যালঘু হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে যখন হত্যা করেছে মিয়ানমার, দেশ ছেড়ে কমপক্ষে ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করেছে, তখন বিশ্বের মুসলিম সরকারগুলো নীরব ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন ইসরাইলে তাদের দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করেন তখনও তারা সর্বসম্মতভাবে এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়েছে। কিন্তুপশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ সিনজিয়াংয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে নিপীড়ন চালাচ্ছে চীন সে বিষয়ে তারা পুরোপুরিই যেন নীরব।
আধুনিক ইতিহাসে এটা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণ।
১০ লাখের মতো চীনা নাগরিককে সিনজিয়াংয়ের বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর কারণ, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ নয়, অভিযোগ তারা মুসলিম। এ জন্যই এমনটা করা হয়েছে। তাদের আরো অপরাধ তারা এক কোটি মানুষের শক্তিশালী একটি সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বা।
তাদের বেশির ভাগই উইঘুর। এ ছাড়া আছেন লক্ষাধিক কাজাখ। এখানে কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের স্থান হলো মুসলিম ও তাদের ধর্ম।
এই নিপীড়ন যখন চলছে তখন বিশ্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ৪৯ টি দেশ প্রায় কোনোই কথা বলছে না। গত বছর এক ডজন উইঘুর শরণার্থীকে চীনে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায় মালয়েশিয়া। জানুয়ারিতে কুয়েত পার্লামেন্টের চারজন সদস্য প্রকাশ্যে এসব মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গত মাসে চীনের এমন আচরণের জোরালো নিন্দা জানিয়েছে তুরস্ক। কিন্তু বাকি ৪৬টি মুসলিম দেশ এ ইস্যুটিকে এড়িয়ে গেছে। এটা ভীষণ উদ্ভট এক ঘটনা।
তুরস্ক যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এলো, তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হামি আকসোয় বললেন, চীনের বিভিন্ন কারাগারে ১০ লাখেরও বেশি উইঘুরকে খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হচ্ছে। তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে ব্রেনওয়াশ করা হয়েছে। এ সব এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়। চীন কর্তৃপক্ষ একবিংশ শতাব্দীতে এসে নতুন করে বন্দিনির্যাতন শিবির চালু করেছে এবং উইঘুর তুর্কদের বিরুদ্ধে চীনা কর্তৃপক্ষ পর্যায়ক্রমিকভাবে নির্যাতন করছে। এটা মানবতার জন্য একটি বিরাট বিব্রতকর অবস্থা। হতাশার কথা।
কিন্তু তারপর থেকে অন্য মুসলিম দেশগুলো একেবারে নীরব। আল জাজিরায় সম্মানের সঙ্গে এ ইস্যুটি তুলে ধরা হলেও অন্য আরব মিডিয়ায় এ বিষয়টি উল্লেখই করা হয় নি বলা চলে। ইরান, পাকিস্তান বা ইন্দোনেশিয়ার মতো বিশাল সব মুসলিম দেশগুলোতে এ বিষয়ে যেন নজরই দেয়া হয় নি। কিন্তু কেন?
এটা সত্য যে, চীনে উইঘুর সম্প্রদায় ও অন্যান্য মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে গণনিপীড়ন চালানোর খবরটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে গত বছর, যদিও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে দু’বছর আগে এমন নীতি গ্রহণ করেছে চীন।
এ কথাও সত্য যে, এ বিষয়ে প্রচুর তথ্যপ্রমাণ আছে। প্রথমে যখন উইঘুরদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার প্রচুর রিপোর্ট আসতে থাকে, যেমন তখন কি পরিমাণ বন্দি আসলে রয়েছেন তা নিয়ে, তখন বলা হলো বন্দির সংখ্যা ১০ লাখ। এ সংখ্যাটি সিনজিয়াং প্রদেশের মোট মুসলিমের সংখ্যার এটা হলো এক দশমাংশ। এ থেকে আন্দাজ করা হয় আসলেই ওইসব বন্দিশিবিরে কি পরিমাণ মানুষ থাকতে পারেন।
তবে এসব নির্যাতন বা নিপীড়নের ভয়াবহতার মাত্রা ও এ বিষয়ক অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। তাদের বক্তব্য, এসব বন্দিশিবির হলো ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এর মধ্য দিয়ে তারা উগ্রবাদকে মোকাবিলা করছে। উগ্রবাদীদের চিন্তাভাবনাকে পরিবর্তন করছে। এটাকেই বলা হচ্ছে ব্রেনওয়াশ হিসেবে।
বন্দিদের আটকে রাখা হয়েছে অনির্দিষ্টকাল। তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ বা শাস্তি ঘোষণা করা হয় নি। বলা হচ্ছে, তারা ওই বন্দিশিবিরগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক। সিনজিয়াংয়ে চীনের শীর্ষ কর্মকর্তা শোহরাত জাকির গত অক্টোবরে বলেছেন, এসব মানুষ প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তারা তাদের ভুল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এ প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছে।
১৯৪৯ সালে যখন নতুন কমিউনিস্ট শাসকগোষ্ঠী চীনকে নতুন করে তাদের দখলে নেয় তখন সিনজিয়াংয়ের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগের বেশি ছিলেন মুসলিম ও টার্কিশ ভাষী। বেইজিংয়ের মূল উদ্ধেশ্য হলো হ্যান চাইনিজদের সংখ্যা বাড়ানো। ফলে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার শতকরা মাত্র ৪৫ ভাগ হলেন মুসলিম।
যখন অপরিহার্যভাবে পুশব্যাক ফেরত এলো তখন চীনা কর্তৃপক্ষ তাদের নজরদারি কড়া করে এবং বাড়ে স্থানীয় জনগণের নিপীড়ন। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামিক পর্যবেক্ষণকে খর্ব করা। একই সঙ্গে তারা টার্কিশ ভাষী স্থানীয়দের ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু তাতেও যখন কাজ হলো না তখন চীন ‘রি-এডুকেশন সেন্টার’-এর বিস্তার করা শুরু করলো। যেখানে এখন মোট মুসলিমের এক দশমাংশ ধারণ করছে।
এসব ঘটনা বিস্ময়ের কিছু নয়। হ্যান চাইনিজদের আদর্শের সঙ্গে মিল রেখে সব চীনা সরকার নীতি গ্রহণ করে। এমন কি কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার আগেও। কিন্তু এক্ষেত্রে বিস্ময়ের বিষয় যেটা তা হলো, মুসলিম বিশ্বের সরকারগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়ার ঘাতটি ।
তারা নীরব কেন? এর প্রধান কারণ হলো, চীন বড় অংকের ঋণ দিচ্ছে। আরব দেশগুলোকে ঋণ দিচ্ছে ২০০০ কোটি ডলার। পাকিস্তানকে ৬০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার কথা শোনা যায়। মধ্য এশিয়ার নিকটবর্তী মুসলিম দেশগুলোকে আরো ঋণ দেয়ার কথা শোনা যায়। শুধু কাজাখস্তানেই যৌথভাবে শিল্প বিষয়ক প্রকল্পে ঋণ দেয়া হয়েছে ২৭০০ কোটি ডলার। তাই মুসলিম বিশ্বের এসব দেশের প্রয়োজন হলো অর্থ। তাই তারা মুখে কুলুপ এঁটেছে। একই কাজ করছে তাদের অনুগত মিডিয়াগুলো।
সম্প্রতি চীন সফর করেন সৌদি আরবের ক্ষমতার নেপথ্যের নেতা ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। সিনজিয়াং প্রদেশে সন্ত্রাস বিরোধী, উগ্রবাদ বিরোধী যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, চীনের এমন অধিকার আছে বলে তিনি চীনকে অনুমোদন দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যায় নির্দেশ দেয়ার অভিযোগ আছে। এ অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে তার প্রয়োজন চীনের সমর্থন। তা ছাড়া তার আরো অর্থের প্রয়োজন আছে।
সিনজিয়াংয়ের মুসলিমদেরকে পরিত্যাগ করেছে মুসলিম বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের মুসলিম উম্মা। তাই তারা একা। তারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
গোয়ানে ডিয়ার-এর লেখা এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে থাইল্যান্ডের অনলাইন ব্যাংকক পোস্টে। সেখান থেকে অনুবাদ প্রকাশিত হলো। গোয়ানে ডিয়ার নতুন একটি বই লিখেছেন। এর নাম ‘গ্রোয়িং পেইনস: দ্য ফিউচার অব ডেমোক্রেসি (অ্যান্ড ওয়ার্ক)

তরুণদের বিনোদনহীন নগর ঢাকা

সবাই জানি,একটি দেশের প্রধান শক্তি তরুণ প্রজন্ম৷ তাদের সঠিক বিকাশের জন্যে বিনোদন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়৷ অথচ রাজধানী ঢাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির বিষ্ময়কর রকমের অনুপস্থিতি৷ সে বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা৷
১. মেধা বিকাশের সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা বা সুস্থতার সঙ্গে বেড়ে ওঠা অপরিহার্য৷ তরুণরা কতটা খেলাধুলার সুযোগ পান, তার উপর নির্ভরকরে শারীরিক-মানসিক সুস্থতা৷ ঢাকা শহরের তরুণদের খেলার মাঠ নেই৷ এক সময় যেগুলো খেলার মাঠ ছিল, সেগুলো দখল হয়ে গেছে৷ কোনো কোনো মাঠে উঠেছে বড় বড় ভবন৷
বিশ পঁচিশ বছর আগেও ঢাকা শহরে অনেকগুলো পুকুর ছিল৷ বিশেষ করে পুরনো ঢাকায় অত্যন্ত মানসম্পন্ন পুকুর ছিল৷ সেগুলোতে গোসল-সাঁতার কাটা যেত৷ কিশোর-তরুণদের সাঁতারে মুখরিত হয়ে থাকতো পুকুরগুলো৷ পুকুরগুলো ভরাট করে ভবন তৈরি করা হয়েছে৷ সাঁতারও যে বিনোদন, তা আমাদের ‘উন্নয়নবিদদের' বোধের মধ্যেই নেই৷
বুড়িগঙ্গার তীরের ঢাকার চারপাশেই নদী৷ অথচ একটি নদীতেও গোসল বা সাঁতার কাটা যায় না৷ পানি এতটাই বিষাক্ত হয়ে গেছে যে নদীগুলোর কাছাকাছি গেলেও দুর্গন্ধে দম আটকে আসার উপক্রম হয়৷ নদীতে ঘুরতে যাওয়ার মত পরিবেশ নেই৷
২. ঢাকা শহরের ভেতরে রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান, বোটানিক্যাল গার্ডেনের মত বেশ কয়েকটি পার্ক এখনো আছে৷ রমনা পার্কে সকাল-বিকেল যাওয়া যায়৷ সন্ধ্যা-রাতের রমনা পার্ক সন্ত্রাস- অপকর্মের স্বর্গ৷ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা চন্দ্রিমা উদ্যানের পরিবেশও তরুণ-তরুণীদের সময় কাটানোর মত নয়৷ সন্ধ্যার পরেতো নয়ই৷ বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়া মানেই বিপদে পড়া৷ কথাগুলো বলছি একারণে যে, তরুণ-তরুণীরা একটি পার্কে গিয়ে বসে কথা বলবে, এমন কোনো পার্ক রাজধানী ঢাকায় নেই৷
৩. শুধু বাইরে নয়, ঘরোয়া বিনোদনেরও বড় আকাল ঢাকা শহরে৷ একসময় পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি ছিল৷ পড়াশোনা ছাড়াও লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করে নানা রকমের সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল৷ এখন লাইব্রেরি নেই৷ নেই কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড৷ এলাকায় এলাকায় কমিউনিটি সেন্টার আগের চেয়ে বেড়েছে৷ কিন্তু সেখানে তরুণ-তরুণীদের সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি৷ কমিউনিটি সেন্টারগুলো হয়ে গেছে মানুষের বিরক্তির কারণ৷ বিয়ে বা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান উপলক্ষে সারা রাত বিকট আওয়াজে হিন্দি গান বাজে কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে৷
৪. ঢাকা নগরের তরুণ-তরুণীরা এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে উঠছে৷ তারা ফুটবল-ক্রিকেট খেলে স্ক্রিনে৷ চোখ সরায় না স্মার্টফোন থেকে৷ তরুণদের একটা অংশ সারারাত জেগে ফোনে কথা বলে৷ সারাদিন বা দিনের অর্ধেকটা সময় ঘুমায়৷ তরুণ-তরুণীদের বাইরে বের হয়ে কোথাও যাওয়া মানে রেস্টুরেন্টে যাওয়া৷ রেস্টুরেন্টে গিয়ে আলো-আঁধারীতে বসে খাওয়াটাই প্রধান, সঙ্গে দু'একটি কথা৷ ঢাকা শহরের মত এত বিনোদনের অভাবহীন কোনো রাজধানী পৃথিবীতে আছে কিনা সন্দেহ৷ বসবাসের জন্যে নিকৃষ্টতম শহরের তালিকায় ঢাকা দ্বিতীয়৷ তরণ-তরণীদের বিনোদনহীন শহর হিসেবে তালিকা করা হলে, ঢাকার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে৷
৫. বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকার ভয়ঙ্কর কুফলের শিকার হচ্ছে ঢাকার তরুণ-তরুণীরা৷ একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এককোটির বেশি তরুণ জীবন সম্পর্কে হতাশ৷ এদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে৷ বাংলাদেশের তরুণরা যে মাদকের প্রতি আসক্ত হচ্ছে, তা সম্ভবত বিরল নজির তৈরি করছে৷ সব মাদকের কম-বেশি ক্ষতি হয়৷ কিন্তু ফেনসিডিল বা ইয়াবার মত ক্ষতিকর মাদকে পৃথিবীর খুব কম দেশের তরুণ-তরুণীরাই আসক্ত৷ বাংলাদেশে এই মাদক চোরাকারবারিরা রাষ্ট্রীয় আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়৷ তরুণদের কথা ভাবার মত কোনো মানুষই যেন সমাজে নেই৷
৬. পৃথিবীর প্রায় সব দেশে একটি সেন্টার থাকে, বিকেল-সন্ধ্যা-রাতে তরুণরা সেখানে সময় কাটাতে পারে৷ ঢাকা নগরে এমন কোনো সেন্টার নেই৷ ছোট আকারে হলেও টিএসসি ছিল তেমন একটি জায়গা৷ বিশ ত্রিশটি সাংস্কৃতিক সংগঠন সেখানে সক্রিয় থাকতো৷ কিন্তু পর্যায়ক্রমে সেই কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷
দেশে ভালো সিনেমা তৈরি হয় না বললেই চলে৷ সিনেমা হলগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে৷ কয়েকটি সিনেপ্লেক্স তৈরি হয়েছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম৷ সবকিছু মিলিয়ে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, নগর ঢাকায় তরুণদের বিনোদনের সুবিধা অত্যন্ত অপ্রতুল৷ সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়, তরুণদের বিনোদনের এই বিষয়টি দেশ পরিচালনাকারীদের এজেন্ডার মধ্যেই নেই৷
সূত্র- ডি ডব্লিউ বাংলা

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিজয় এনে দিয়েছে by মরিয়ম চম্পা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সংসদ নির্বাচনে সুফিয়া কামাল হলে স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন তানজিনা আক্তার সুমা। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন যৌক্তিক আন্দোলনে তিনি অংশ নিয়েছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরাই তাকে ভোট দিয়ে ভিপি নির্বাচিত করেছেন বলে মনে করেন সুমা। মানবজমিন এর সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, শুরুর দিকে বলতে গেলে ডাকসু’র বিষয়টি ওভাবে মাথায় ছিল না। ডাকসু নির্বাচন হবে কি হবে না এটা নিয়ে একটি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলাম। আমাদের বন্ধুদের অনলাইনে আলাদা একটি গ্রুপ ছিল। সেখানে হলের বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি ডাকসু’র বিষয়ে প্রথম দিকে কম-বেশি আলোচনা হতো।
আমাদের হলে ক্যান্টিন ও আবাসন সমস্যাসহ অনেক সমস্যা রয়েছে। এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে আমাদের প্যানেলের কাছে মনে হয়েছে যে ডাকসুটাই একটি প্ল্যাটফর্ম। যেখানে সবার সমস্যাকে নিজের করে দেখার সুযোগ আছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা মানেই আমরা। এখানে আলাদা করে কিছু দেখার নেই। এই চিন্তাধারা থেকেই নির্বাচনে আসা। আমাদের প্যানেলটির নাম ছিল সুমা-মনিরা স্বতন্ত্র প্যানেল। যেখানে সদস্য সংখ্যা ছিল ৯ জন।
প্রথমদিকে নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে আমাদের কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমরা সবাই নতুন। তার ওপর একা। যেহেতু আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের না। এক্ষেত্রে আমাদের একটু চিন্তা-ভাবনা করেই এগোতে হয়েছে। প্যানেলের সদস্যরা মিলে নিজেরাই নিজেদের কাজগুলো করতাম। নিজেদের ল্যাপটপ নিয়ে নিজেরাই লিফলেট বানাতে বসে যেতাম। টিউশনি ও হাত খরচের টাকা থেকে সঞ্চয়কৃত অর্থ দিয়ে নির্বাচনের খরচ চালানো হতো। দৈনিক অন্তত তিনবার করে হলেও প্রত্যেক মেয়ের রুমে গিয়ে কথা বলেছি। কারণ মুখ না চিনলে তারা আমাদের কেন ভোট দেবেন। কাজেই শিক্ষার্থীদের মনে আস্থা তৈরি করতে তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করে জানানোর চেষ্টা করেছি আমাদের উদ্দেশ্য কি। এবং কোন বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে চাই। আমরা মূলত পুরো প্যানেলটিকেই পরিচিত করাতে চেয়েছি। বোঝাতে চেয়েছি যে, আমরা আপনাদের মতোই সাধারণ শিক্ষার্থী। আমাদের ইশতেহার সর্বপ্রথম অনলাইনে দিয়ে মেয়েদের মতামত নেয়ার চেষ্টা করেছি। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলেছে। তাদের মতো করে ইশতেহার তৈরি করেছি। সত্যি বলতে তো ‘তারাই আমরা’।
সুমা বলেন, নির্বাচনের আগের দিন রাত থেকেই আমরা হলের চারপাশে নজর রাখছিলাম। কখন কি হয় এই চিন্তা থেকে। রাত জেগে আমরা পালাক্রমে পাহারা দেয়ার চেষ্টা করেছি। সকাল থেকে নির্বাচন ভালোই চলছিল। এরপর যখন অন্য হলগুলোতে ঝামেলা শুরু হয় তখন আমাদের মনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়। এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ম্যামদের সহায়তার ব্যালট বাক্স চেক করতে চাইলে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পরবর্তীতে পুনরায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয় এটাই আমাদের প্রধান দাবি ছিল। যদিও পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। তবে আমাদের হলের নির্বাচনে আমরা একা ছিলাম না। আমাদের সঙ্গে হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা একত্মতা প্রকাশ করেছে এবং ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার পুরো বিষয়টিই সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে রেখেই করা হয়। বলতে গেলে শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে থেকে নিজ দায়িত্বে আমাদের জন্য একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর ফলাফল বয়ে এনেছে। নির্বাচনে আমাদের হল থেকে ভিপি পদে ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। আমার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ৮শ’ থেকে কিছুটা বেশি। ব্যালট নং-২।  
নির্বাচিত হল সংসদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নির্বাচিত প্রার্থী এবং হল প্রশাসনের মধ্যে একটি জবাবদিহিতার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। কারণ আমি যে কাজটি করবো সেটা নিয়ে যদি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জবাবদিহিতার একটি নির্দিষ্ট জায়গা না থাকে তাহলে প্রকৃতপক্ষে মনে হয় কাজটি হয় না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেন বলতে পারে আপনারা এটা করলেন না কিংবা করেছেন এই বিষয়টির একটি প্ল্যাটফর্ম থাকা দরকার। আমাদের ইশতেহারের মূল বিষয় ছিল হলের একটি মাত্র ক্যান্টিন দিয়ে শিক্ষার্থীদের খাবারের চাহিদা মেটানো সম্ভব না। পুরো দুই হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আমার মনে হয় না একটি ক্যান্টিন পর্যাপ্ত। এর খাবারের মান নিয়েও সংশয় রয়েছে। তাই খাবারের মানটা যেন আরেকটু উন্নত করা যায়। এবং অবশ্যই সেটা যেন স্বাস্থ্যসম্মত হয়। পাশাপাশি আবাসন সংকটের বিষয়টি সমাধানে জোর দিতে চাই।
আমি মনে করি হলে আবাসন ব্যবস্থা মেধায় নয় প্রয়োজন অনুযায়ী হওয়া উচিত। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীই মেধাবী। এক্ষেত্রে আমরা যেটা করবো- আগামী জুন মাস নাগাদ যাদের আইডি কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে তাদের স্থানে নতুনদের আবাসনের ব্যবস্থা করা। এছাড়া ডাবলিং এর বিষয়টি নিয়েও কাজ করতে চাই। ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার ইচ্ছা নেই। তবে ডাকসু পুনঃনির্বাচনের বিষয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যদি চায় তাহলে আমি তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করবো।  
ফার্মেসি বিভাগের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমার গ্রামের বাড়ি রংপুরে। বাবা মো. শাহজাহান আলী সরকারি চাকরি করেন। চার বোনের মধ্যে সুমা তৃতীয়। মা শামসুননাহার চম্পা। রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি।

মৈত্রী হলে ‘ওরা ১১ জন’-এর ভিপি সুস্মিতা by মরিয়ম চম্পা

যশোরের কেশবপুরের মেয়ে সুস্মিতা দে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হল সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনের দিন হলে বস্তাভর্তি সিল মারা ব্যালট পাওয়ার অভিযোগ উঠে। এসব ব্যালটে ছাত্রলীগের হল সংসদের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দেয়া ছিল। এরপর এই হলের ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়। পুনরায় ভোটগ্রহণের মধ্যে দিয়ে তিনটি স্বতন্ত্র প্যানেলের মধ্যে তিনি ভিপি নির্বাচিত হন। দীর্ঘ আলাপচারিতায় মানবজমিনকে এসব কথা জানান তিনি।
সুষ্মিতা দে বলেন, শুরুর দিকে নির্বাচন করবো- এমনটা আসলে ভাবিনি।
মূলত ছাত্রলীগ মনোনীত যে প্যানেলটি দেয়া হয়েছে সেখানে সবাই জুনিয়র প্রার্থী ছিল। ওখান থেকেই আমার মনে হয়েছে নির্বাচনে দাঁড়াই। যদিও আমি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবৃত্তি, অভিনয়, সরস্বতী পূজার আয়োজক, হলের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন, ভলিবলসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছি। সবকিছু মিলিয়ে হলে সবার সঙ্গে একটা পরিচিতি আছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে ১৩ জনের একটি প্যানেল তৈরি করি। পরে অবশ্য দু’জনকে বাদ দিয়ে আমরা ১১ জনের প্যানেল ছিলাম। নির্বাচনী প্যানেলে আমরা ১১ জনের মধ্যে ৮ জন নির্বাচিত হয়েছি এককভাবে। বাকি ৩ জন আরেকটি স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগের দিন রাতে স্বতন্ত্র তিন প্যানেলের মনে হচ্ছিল যে নির্বাচন নিয়ে আমরা খুব একটা সুখকর আভাস পাচ্ছিলাম না। সব সময় মনে হচ্ছিল কিছু একটা হবে। কিছু একটা হতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন নাও হতে পারে। মনে হচ্ছিল কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে। এ সময় আমরা নিচে নেমে আসি। রাত সাড়ে ১০টার পরে সাধারণত ম্যামদের রুমের লাইট বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু ওইদিন রাতে হাউস টিউটর ও অফিসের লাইট বন্ধ থাকলেও প্রভোস্টের রুমের লাইট জ্বালিয়ে রেখে বাহির থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়। এটা দেখে আমাদের প্রথম থেকেই সন্দেহ হয়- কেন লাইট বন্ধ করা হয়নি। ভেতরে কি আছে। দায়িত্বে থাকা হলের দাদুকে আমরা প্রভোস্ট ম্যামের রুম চেক করে দেখার বিষয়টি জানাই। এ বিষয়ে প্রভোস্ট ম্যামের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি হলে এসে আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। রিডিং রুম এবং ভোটকেন্দ্র অর্থাৎ অডিটরিয়ামের সঙ্গে মাঝে একটি সংযোগ দরজা আছে। আমাদের দাবি ছিল নির্বাচনের দিন মাঝের ওই দরজাটি বন্ধ রাখতে হবে। একইসঙ্গে রিডিংরুমে আমাদের যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। দুটি বিষয়েই ম্যাম অস্বীকৃতি জানায়। রিডিংরুমের একদম পেছনে একটি ক্যাচি গেট আছে। যেটা সব সময় তালাবদ্ধ থাকে। কিন্তু আমরা গেটটি খোলা দেখতে পাই।
ফলে পরবর্তীতে ম্যামের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে আমরা রিডিং রুম ও অডিটোরিয়ামের মাঝে যে দরজা সেখানে তালা লাগিয়ে দেই। প্রভোস্টের রুমে তখনো আলো জ্বলছিল। এরপর রাত সাড়ে ১২টায় তাকে ফোন দিলে ম্যাম এসে ১০ থেকে ১৫ মিনিট একা একা কিছু একটা করছিলেন। অতঃপর আমাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দিলেও ট্রাংক খুলে দেখা নিয়ে টালবাহানা করা হয়। আমাদের পরিকল্পনা ছিল সারারাত জেগে পালাক্রমে রুম দুটি পাহারা দেয়া। কিন্তু রাতে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় আমরা চলে আসি।
পরদিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিট থেকে মেয়েদের ভোটের লাইন শুরু হয়। তখন আমরা ভোটকেন্দ্রে ছিলাম। এ সময় ম্যামকে ব্যালটবাক্স খালি আছে কি না দেখতে চাইলে অনেক নাটকীয়তার পর প্রোক্টর স্যারকে ডাকা হয়। স্যার এলে অডিটোরিয়ামের মূল দরজাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর আমরা ধাক্কাধাক্কি করতে থাকলে একটা পর্যায়ে একটি কপাট খুলে যায়। তখন আমরা দেখতে পাই রাতের তালাবদ্ধ দরজাটির তালা কোনো কারণে কেটে ফেলা হয়েছে। এবং ওই দরজা দিয়ে কেউ একজন একটি বস্তা টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছে। এটা দেখার পরে আমরা ধাক্কাধাক্কি করে পুরো অডিটোরিয়ামের ভেতরে চলে যাই। তখন রিডিং রুমের ভেতর থেকে সিটকিনি লাগিয়ে দেয়া হয়। এরপর দরজা ধাক্কাধাক্কি করে আমি এবং বর্তমান জিএস মিশমা দু’জনে দৌড়ে অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে আসি। বেরিয়ে এসে রিডিং রুমের মূল দরজা দিয়ে দাদুদের পাহারা ভেদ করে অনেকটা জোর করে নিচু হয়ে রুমের ভেতরে ঢুকে যাই। ওখানে তখন প্রভোস্ট ম্যাম ও আরেকজন ছিলেন। তাদের কিছু না বলেই আমরা ভেতরে প্রবেশ করি। ওখানে একটি কিচেন, নামাজরুম ও ওয়াশরুম ছিল। আমরা প্রথমে কিচেন ও ওয়াশরুম দেখার পরে চলে যাই নামাজরুমে। নামাজরুমেই মূলত ব্যালটের বস্তাটি ছিল। নামাজরুমে যে বস্তাটি রাখা হয়েছে প্রথমে সেটার ওপর নির্দিষ্ট কোনো একটি ধর্মগ্রন্থ রাখা হয়। এরপর কিছু পুরাতন বই। বইয়ের ওপরে ব্যালটগুলো উল্টো করে রাখা হয়। যাতে দেখে মনে হয় যে সাদা পৃষ্ঠা।
এ সময় জিএস মিশমা প্রথমে ব্যালটগুলো ধরে টান দিয়ে বলে, আপু ব্যালট। সঙ্গে সঙ্গে আমি দৌড়ে গিয়ে বের করে দেখি আসলেই অনেক ব্যালট। পুরাতন বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে রাখা হয়েছে কিছু ব্যালট। সবগুলোই ক্ষমতাসীন দলের সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে সিল দেয়া। এ সময় দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। এরপরই মূলত আমাদের আন্দোলনটা শুরু হয়।
অতঃপর প্রভোস্ট ম্যামের পদত্যাগ এবং ওই দিনেই নির্বাচন সম্পন্ন করতে আমরা দাবি জানাই। আমাদের প্রবল আন্দোলনের মুখে প্রশাসন প্রভোস্ট ম্যামকে পদত্যাগ করাতে বাধ্য হন। এ সময় ছাত্রলীগের পুরো প্যানেলকে প্রত্যাহার করে স্বতন্ত্র প্যানেলের নির্বাচন হয়। ছাত্রলীগের হল শাখার বর্তমান সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও কেন স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যাদের ছাত্রলীগ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তাদের যোগ্য প্রার্থী মনে হয়নি। মুখ পরিচিতি, জনপ্রিয়তা সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়েছে যে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমি হয়তো নির্বাচন করার অধিকার রাখি। রাজনৈতিক একটি দলের প্রতি আমার পছন্দ থাকতেই পারে। কিন্তু দিন শেষে আমি একটি স্বতন্ত্র মানুষ। এবং সবার সঙ্গে আলাদা সম্পর্ক। তাই একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে নির্বাচনে আসা।     
নির্বাচনের খরচ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সত্যি কথা বলতে নির্বাচনের কোনো খরচ জোগাতে আমরা ঠিক ওভাবে কারো কাছ থেকে এক টাকাও সাহায্য নেইনি। আমরা যে ১১ জন প্রার্থী ছিলাম সবাই মিলে চাঁদা তুলে নির্বাচন করি। আমাদের লিফলেট অতবেশি অ্যাভেলঅ্যাবল ছিল না। যখন আমাদের ব্যালট নাম্বার আসেনি তখন প্রচারণায় রুমপ্রতি ১টি করে লিফলেট দিয়েছি। যেখানে পুরো প্যানেলের ১১ জনের ছবি ছিল। আমাদের কোনো আলাদা ছবি সংবলিত লিফলেট প্রচারণা ছিল না। যখন ব্যালট নং আসে তখন নতুন করে আরো কিছু লিফলেট ছাপাই। ওরকম ব্যানারও ছিল না। আমরা শুধুমাত্র দুটি ব্যানার করেছিলাম। যেগুলো নিজেদের কষ্টার্জিত চাঁদা থেকে খরচ করেছি। এমনও হয়েছে যে প্যানেলের প্রার্থীরা বিকালের নাস্তার টাকা, রিকশা ভাড়ার টাকা, টিউশনির জমানো টাকা দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার তহবিল সরবরাহ করেছে। আমাদের প্যানেলটিকে আমরা ‘ওরা ১১ জন’ বলে ডাকতাম। আমার নির্বাচনী ব্যালট নং ছিল-৪। এবং প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ৩০৫টি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ২৯০ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়।
দুই ভাই-বোনের মধ্যে সুষ্মিতা ছোট। গ্রামের বাড়ি যশোরের কেশবপুরে। গ্রামের স্কুল-কলেজ থেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। বাবা মনীন্দ্র নাথ দে একজন পশুচিকিৎসক। মা গীতা রাণী দত্ত গৃহিণী।

আবেগাপ্লুত জাসিন্দা আর্ডেন

পার্লামেন্টের বিশেষ বৈঠকে সালাম দিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আর্ডেন। তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আসসালামু আলাইকুম। বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়লেন তিনি। ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা চালানো ব্রেনটন টেরেন্টের প্রতি ক্ষোভ, ঘৃণা যেন ঝরে পড়লো তার কণ্ঠ থেকে। হামলাকারীর নামটিও তিনি মুখে আনতে চান না। বলেছেন, কখনোই ওই হামলাকারীর নাম মুখে উচ্চারণ করবেন না। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
পার্লামেন্টে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাসিন্দা আর্ডেন বলেন, সে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর সময় অনেক কিছুই বলেছে।
তার মধ্যে একটি বিষয় ছিল খুবই কুখ্যাত। এ জন্য আমি কখনোই তার নাম মুখে উচ্চারণ করবো না।
গত শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে গুলি করে বাংলাদেশিসহ হত্যা করা হয় কমপক্ষে ৫০ মুসলিমকে। আহত হন বেশ কিছু মানুষ। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এই হামলায় সামান্যর জন্য রক্ষা পান বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সদস্যরা। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী অস্ট্রেলিয়ান ব্রেনটন টেরেন্ট (২৮) ওই হামলা চালায়। তাকে গ্রেপ্তার করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে পার্লামেন্টের বক্তব্যে জাসিন্দা আর্ডেন বলেন, আমি আপনাদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ রাখছি দয়া করে যাদেরকে হারিয়েছি আমরা, তাদের নাম উচ্চারণ করুন। তার নাম উচ্চারণ করবেন না, যে তাদের জীবনকে কেড়ে নিয়েছে। সে একজন সন্ত্রাসী। সে একজন অপরাধী। সে উগ্রপন্থি। যখনই তার বিষয়ে আমি কথা বলবো কখনোই তার নাম উচ্চারণ করবো না।
মঙ্গলবার তিনি পার্লামেন্টে এক বিশেষ বৈঠক করেন। সেখানে তিনি সন্ত্রাস মোকাবিলায় আরো অনেক কিছু করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা শুধু চুপ করে বসে থাকতে পারি না এবং এটা মেনে নিতে পারি না যে, এসব (সামাজিক যোগাযোগ বিষয়ক) প্লাটফরমগুলো থাকবে আর তারা কোনো দায়দায়িত্ব নেবে না। তিনি বলেন, তারা প্রকাশক। তারা শুধু একটি পোস্টকে পোস্টই করার অনুমতি দিচ্ছে তা নয়। কোনো দায়দায়িত্ব ছাড়া আপনি লাভবান হবেন এমন কোনো ঘটনা ঘটতে পারে না।
ব্রেনটন টেরেন্টের ওই ভিডিও ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করার ফলে তা ২০০ বারেরও কম দেখা হয়েছে বলে মঙ্গলবার দাবি করেছে ফেসবুক। আর ওই ভিডিও প্রত্যাহার করে নেয়ার আগে তা দেখা হয়েছে প্রায় ৪০০০ বার। তারা আরো দাবি করেছে, ঘটনার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই ভিডিওর কমপক্ষে ১৫ লাখ কপি তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আপলোড করার সময় ১২ লাখ ভিডিও ব্লক করে দেয়া হয়েছে।

নিউজিল্যান্ড হামলা: ৩ বাংলাদেশির লাশ আসতে সময় লাগবে

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ৫ বাংলাদেশির মধ্যে দু’জনের লাশ দাফনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুস সামাদ ও সিলেটের ফরিদ আহমেদের স্ত্রী হোসনে আরা আহমেদ নিউজিল্যান্ডেই সমাহিত হচ্ছেন। বাকি ৩ জনের লাশ দেশে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে ওই পরিবারগুলোর উপযুক্ত প্রতিনিধি নির্বাচনে বিলম্ব হওয়া এবং পরিবার প্রতি একজনকে নিউজিল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় তাদের লাশ দেশে পৌঁছাতে সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা। সেগুনবাগিচা এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নরসিংদীর বাসিন্দা জাকারিয়া ভূঁইয়ার স্ত্রী এরইমধ্যে স্বউদ্যোগে নিউজিল্যান্ডের পথে রওনা হয়ে গেছেন। তিনি এখন পথে আছেন। আজ তার ক্রাইস্টচার্চে পৌঁছার কথা রয়েছে। যেটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তাতে এটা নিশ্চিত যে, বেগম জাকারিয়া ক্রাইস্টচার্চে তার এক আত্মীয়ের বাসায় উঠছেন।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনিই স্বামীর লাশ গ্রহণ করবেন। নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার বাসিন্দা মো. ওমর ফারুক ও চাঁদপুরের মোজাম্মেল হকের পরিবারের প্রতিনিধি কে হচ্ছেন চূড়ান্ত হয়নি। বন্দর থানার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিন্টু ব্যাপারী জানিয়েছেন তারা চেষ্টা করছেন যত দ্রুত প্রতিনিধি নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে। উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে নিহত ফারুকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তার স্ত্রী ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ অবস্থায় তিনি ট্রাভেল করতে পারবেন কি-না? তা এখনও নিশ্চিত হয়। তবে আজ-কালের মধ্যে তারা তার স্ত্রী অথবা নিহতের ভাই যে কোনো একজনের নাম চূড়ান্ত করার চেষ্টা করবেন বলে জানান। এদিকে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীদুল ইসলাম মানবজমিনকে জানিয়েছেন, মোজাম্মেলের পরিবার তার ভাই শাহাদাৎ হোসেন মিয়াজিকে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে লাশ গ্রহণের জন্য মানোনীত করেছে। শাহাদাৎ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হাজির হয়ে তার কাগজপত্র জমা দিতে গেছেন। তার পরিবারের তরফে ক্ষতিপূরণের আবেদন করা হয়েছে। তিনি এটি ডিসি অফিসে ফরওয়ার্ড করেছেন। কেবিনেট ডিভিশনে এটি যাওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা নিউজিল্যান্ড সরকারের কাছে পাঠানো হবে। উল্লেখ্য, নিহত ব্যক্তিদের স্ত্রী, সন্তান, পিতা বা মাতা অথবা ঘনিষ্ঠ কাউকে (যার প্রতি নিহতের পরিবারের আস্থা আছে) নিউজিল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। পরিবার প্রতি একজনকে দেশটিতে নিয়ে যাওয়া, লাশ দেশে পৌঁছানো এবং দাফন-কাফন সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যয় নিউজিল্যান্ড সরকারই বহন করবে। কোনো নিহতের পরিবার যদি ক্ষতিপূরণ চায় তা-ও দেয়ার কথা জানিয়েছে নিউজিল্যান্ড সরকার। ওদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ক্যানবেরা মিশন এবং নিউজিল্যান্ডের (অনারারি) কনস্যুলেটের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় আহতদের মধ্যে লিপির অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন। তার আরেকটি অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি চলছে। কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা লিপির চিকিৎসার বিষয়টি তদারকি করছেন খোদ নিউজিল্যন্ডের প্রধানমন্ত্রী। তিনি তাকে দেখতে হাসপাতালেও গেছেন। পায়ে গুলিবিদ্ধ গাজীপুরের মুতাসসিম ও শেখ হাসান রুবেলের অবস্থা বিপদমুক্ত হলেও তারা এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন বলে জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার জুমার নামাজের সময় নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ক্রাইস্টচার্চের দু’টি মসজিদে নৃশংস হামলায় ওই বাংলাদেশিসহ ৫০ জন নিহত ও ৪৮ জন আহত হন।

এখনো চলছে সেই জাবালে নূর পরিবহন

ঢাকার রাস্তায় রুট পারমিট ও গাড়ির নিবন্ধন নিয়ে ফের চলছে জাবালে নূর পরিবহনের বাস। তাও আবার একই রুটে। চালক ও হেল্পারদের দাবি, তাদের বাসের কোনো সমস্যা না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চলতে দিচ্ছে। তারাও  চালাচ্ছে। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় দেখা যায়, জাবালে নূরের অনেক গাড়ি সারি সারি দিয়ে রাখা হয়েছে। উত্তর বাড্ডা, নতুনবাজার ও উত্তরা এলাকায়ও বাসগুলো চলাচল করতে দেখা যায়। যাত্রীরা বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই মিরপুর-উত্তর বাড্ডা রুটে জাবালে নূরের বাসগুলো চলাচল করছে। জাবালে নূর পরিবহন দুটি রুটে চলাচল করতো।
এর একটি মিরপুর ১ নম্বর থেকে উত্তর বাড্ডা পর্যন্ত, অন্যটি হলো মিরপুর ১ নম্বর থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত। বাসগুলো শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় সাময়িকভাবে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আন্দোলন থেমে গেলে আস্তে আস্তে স্বনামে চলাচল করতে শুরু করে। জাবালে নূরের এক চালক মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাগোর বাসে কোনো সমস্যা নাই। তাই গত নভেম্বর মাস থেকে চলছে।’ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের পর কিছুদিন বন্ধ ছিল। তার কিছুদিন পর আন্দোলন থামলে মালিকরা আবার নামিয়েছে গাড়ি।
গত বছরের ২৯শে জুলাই বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূরের বেপরোয়া দুই বাসের প্রতিযোগিতায় চাপা পড়ে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দিয়া খানম মীম ও আবদুল করিম রাজিক নামের দুই শিক্ষার্থী নিহত ও ৯ জন আহত হন। ওই ঘটনার পর ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে এসে রাস্তা আটকে বিক্ষোভ ?শুরু করে। পরে সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজধানীতে। একপর্যায়ে ওই দুর্ঘটনার জন্য জাবালে নূরকে দায়ী করে এবং সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভে নামে স্কুলশিক্ষার্থীরা। এই বিক্ষোভের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা যানবাহন ও এর চালকের কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স তল্লাশি করেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সর্বস্তরের জনগণ সমর্থন দেয়। সরকারও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা সংস্কারে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়।
আন্দোলনের একপর্যায় রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে এমইএস বাসস্ট্যান্ডে জাবালে নূর পরিবহনের বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ওই পরিবহনের কোনো গাড়ি চলবে না বলে জানায় মালিকপক্ষ।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, প্রতিবাদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন অবৈধ চালকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি-বিআরটিএ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপিকে নির্দেশ দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ ছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’র খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।
ওই দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী মীমের বাবা মো. জাহাঙ্গীর বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা করেন। গুরুত্ব বিবেচনায় পরে মামলাটির তদন্তভার গোয়েন্দা উত্তর বিভাগকে দেয়া হয়। পরে বাসটির মালিক মো. শাহাদাৎ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১। উল্লেখ্য, এর কিছুদিন পর গত বছরের ৭ই নভেম্বর জাবালে নূরের মালিক শাহাদাতকে তিন মাসের জামিন দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে তার মামলার কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়। 
বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী জাবালে নূর পরিবহনকে দুইটি রুটে মাত্র ৭৯টি বাস চলাচলের অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় বৈধ অবৈধ মিলিয়ে রাজধানীতে প্রায় দেড় শতাধিক গাড়ি চালাচল করতো। পরে ঘাতক জাবালে নূর পরিবহনের মালিক শাহাদাৎ হোসেনকে গ্রেপ্তার ও দুইটি রুটেরই রুট পারমিট ও নিবন্ধন বাতিল করে কর্তৃপক্ষ।
বিআরটিএ’র ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক মো. মাসুদ আলম বলেন, জাবালে নূরের রুট পারমিট বাতিল হয়নি। যে দুটি বাস দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সেই দুটি বাসের রুট পারমিট ও রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়েছে। তাই জাবালে নূর সড়কে চলছে।

আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা: অ্যাকশন দেখতে চান শিক্ষার্থীরা

নিরাপদ সড়কের দাবিতে দ্বিতীয় দিনেও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে রাজধানীতে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে প্রধান প্রধান সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। দিনভর বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পর বিকালে ঢাকার উত্তর সিটি মেয়র ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে একটি প্রতিনিধি দল আন্দোলন স্থগিতে রাজি হলেও তা মানতে রাজি হননি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
তারা জানিয়েছেন, সড়ক নিরাপদ করতে উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তবে বৈঠকে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীসহ কিছু শিক্ষার্থী আন্দোল স্থগিতের অবস্থানে থেকে সেখান থেকে চলে যান। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস এর শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী বাস চাপায় নিহত হন। ঘটনার পর থেকেই নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামেন বিইউপি’র শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল থেকে আন্দোলনে যোগ দেন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
সড়ক বন্ধ করে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। কোথাও কোথাও সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতেও দেখা যায়।
গতকাল সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করলে পুরো ঢাকায় এর তীব্র প্রভাব পড়ে। শিক্ষার্থীদের সড়ক থেকে সরাতে চেষ্টা করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, সংশ্লিষ্ট কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দসহ পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। কিন্তু শিক্ষার্থীরা অতীতের উদাহরণ দিয়ে জানিয়ে দেন তারা আশ্বাসে বিশ্বাসী না। তাদের দাবির বাস্তবায়ন চান। এদিকে ঘটনায় জড়িত সুপ্রভাত বাসের চালককে সাতদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
গতকাল সকাল সাড়ে ন’টা থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রবেশ পথে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন বিইউপি’র শিক্ষার্থীরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই যমুনা ফিউচার পার্কের ফটক থেকে বসুন্ধরার ফটক পর্যন্ত পুরো সড়কটি দখলে নিয়ে নেন বিইউপিসহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ফুট ওভারব্রিজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করতে আসেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। মেয়র ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় নিহত আবরার আহমেদ চৌধুরীর নামে ফুট ওভারব্রিজ। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর মেয়র ও ডিএমপি কমিশনার যান আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের কাছে। এ সময় তারা দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিলেও তা শুনতে নারাজ ছিলেন শিক্ষার্থীরা।
ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রভাত বাসের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। আগামীকাল থেকে এই বাস আর চলাচল করবে না। অন্যদিকে জাবালে নূর পরিবহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়া হবে। এ সময় বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। কমিশনারকে বক্তব্য থামাতে বলেন। তারা বলেন, আপনারা এর আগেও কথা দিয়েছিলেন। সেই কথা রাখেননি। যার কারণে আবারও আমাদের প্রাণ দিতে হলো, আবারও মাঠে নামতে হলো। এ সময় কমিশনার বলেন, আপনারা আমাদের দমাতে পারবেন, গালিও দিতে পারবেন, কিন্তু আজ যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তার শেষ হবে না। আসুন আমরা সবাই মিলে, সমস্যার সমাধান করি। একই সময় বিইউপি’র ভিসি মেজর জেনারেল এমদাদুল বারীও শিক্ষার্থীদের অবরোধ তুলে নিতে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও সাড়া দেয়নি তারা। পরে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, আমি তোমাদের ভাই, তোমাদের নগরপিতা, তোমাদেরই একজন। আমি তোমাদের সঙ্গেই আছি। বলেন, তোমরা যে সমস্যায় পড়েছো, সেই সমস্যার সমাধানে আমরাও একমত। কাজেই জনগণের দুর্ভোগ না করে আমরা সড়ক ছেড়ে দিই। আর সমস্যা সমাধানে মন দিই। এ সময় শিক্ষার্থীরা মাইক ছেড়ে দিয়ে মেয়রকে নেমে যেতে আহ্বান জানান। এরপরও তিনি কথা বলতে চাইলে পারেননি। পরে ডিএমপি কমিশনার ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।   
এরপর দুপুরে বিইউপি’র শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে মেয়র ও ডিএমপি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। টানা তিনঘণ্টারও বেশি সময় ধরে রুদ্ধদ্বার ওই বৈঠকের সাতদিনের জন্য বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিতের সিদ্ধান্ত হয়।
এ সময় বৈঠকে অংশ নেয়া বিইউপি’র শিক্ষার্থীরা বলছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের দাবিগুলো মেনে নেয়া হবে মেয়রের এমন আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতেই তারা আন্দোলন স্থগিত করেন। বৈঠকের পর প্রতিনিধি দলে থাকা বিইউপি শিক্ষার্থী ফয়সাল এনায়েত সাংবাদিকদের বলেন, আমরা শিক্ষার্থী, ভিসিসহ ডিএমপি কমিশনার ও মেয়রের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেছি। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আটটি দাবির মধ্যে তিনটি দাবির কথা পুনরায় তুলে ধরছি। ফয়সাল বলেন, এর মধ্যে যে মামলা হয়েছে, সেই মামলার চার্জশিট যত দ্রুতসম্ভব দিতে হবে, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে এ চার্জশিট দিতে হবে।
জবাবে কমিশনার বলেছেন, তার আগেই যদি সম্ভব হয়, তাহলে আগেই দেয়া হবে। চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিইউপি’র এই শিক্ষার্থী প্রতিনিধি আরো বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনের সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টরা কী পরিকল্পনা নিলেন, তা আগামী সাত দিনের মধ্যে ঠিক করতে হবে। সুপ্রভাত পরিবহনের যে বাসটির রুট পারমিট বাতিল করা হয়েছে, তা স্থায়ী কার্যকর করতে হবে। বৈঠকে এক সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া মানার আশ্বাস দেয়া হয়েছে জানিয়ে ফয়সাল এনায়েত বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার (২৮শে মার্চ) সকাল ১১টায় আমরা সবাই আবারও মেয়রের সঙ্গে বৈঠকে বসবো। গৃহীত দাবিগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, সেটা নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হবে। সেখানে গৃহীত পদক্ষেপগুলো শুনে আমরা সন্তুষ্ট না হলে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা আবারো রাজপথে নামব।
এর মধ্যে আন্দোলনে না নেমে ২৮শে মার্চের বৈঠকের পর করণীয় ঠিক করা হবে বলে জানান তিনি। বিউইপি’র শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে বৈঠকে উপস্থিত ফয়সাল আরো বলেন, একটি স্টুডেন্ট কাউন্সিল গঠন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এই কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা কত হবে, সেটা শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হলো, স্টুডেন্ট কাউন্সিল তা পর্যবেক্ষণ করবে।
বৈঠকের পর ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, একজন চালকের হাতে একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হবে এটা কারও কাম্য নয়। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সেখানে (বসুন্ধরা গেট) একটি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা সেই অনুযায়ী এরই মধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছি। সুপ্রভাত ও জাবালে নূর বাস যেন ঢাকায় চলতে না পারে, সেজন্য ডিএমপি, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। মেয়র বলেন, শিক্ষার্থীদের সবগুলো দাবিই যৌক্তিক। সেই দাবি অনুযায়ী, উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত এলাকায় যেসব জায়গায় জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ নেই, আগামী সাতদিনের মধ্যে সেগুলো চিহ্নিত করে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হবে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এসব জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে। 
এদিকে বৈঠকের পর বিকালে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি দলের পক্ষে ফয়সাল এনায়েত বসুন্ধরায় বিক্ষোভ স্থলে এসে আলোচনা বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং বিক্ষোভ স্থগিতের ঘোষণা দেন। তবে এ সময় বিইউপির শিক্ষার্থী ও সেখানে থাকা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিষয়টি মেনে নেননি। বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। বলেন, দাবি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে অনড় অবস্থানে থাকার কথা। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আরেক প্রতিনিধি কাওসার হাবিব সন্ধ্যায় বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে আবার তারা আন্দোলন শুরু করবেন।
এদিকে সকাল থেকেই বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে রামপুরা ব্রিজ, বাড্ডা এলাকার সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল শিক্ষার্থী সেখানে অবস্থান নেন। তাদের হাতে ছিলো বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড ও জাতীয় পতাকা। ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে  ‘লেগেছেরে লেগেছে রক্তে আগুন লেগেছে, জেগেছেরে জেগেছেরে ছাত্রসমাজ জেগেছে,’ ‘আবরার স্মরণে ভয় করি না মরণে,’ ‘আমার ভাই মরবে কেন, জবাব চাই, জবাব চাই’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ প্রভৃতি স্লোগান দিচ্ছিলো তারা। এ সময় আশপাশে পুলিশ মোতায়েন ছিলো। বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অবরোধ চলাকালে অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি কাজে নিয়োজিত গাড়ি ছাড়া অন্যান্য যানবাহন চলাচল করতে দেয়নি শিক্ষার্থীরা। অ্যাম্বুলন্সেগুলোকে বিশেষ দায়িত্বে যেতে দিতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের। এ সময় পথচারীদের ফুটপাথ ব্যবহার করতে অনুরোধ করে শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলন চলাকালে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর এম এম শহিদুল হাসানসহ শিক্ষকবৃন্দ সেখানে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের অবরোধ প্রত্যাহার করতে আহ্বান জানান। এ সময় শিক্ষার্থীরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে কথা বলতে চায়। তারা জানায়, গত বছর ২৯শে জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম নিহত হয়। তখন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি বাস্তবায়নে আশ্বাস দিলেও তা পূরণ হয়নি। তাই এবার আশ্বাস না, বাস্তবায়ন চান তারা।
একপর্যায়ে ভিসি নিরাশ হয়ে ফিরে যান। ওই এলাকায় আন্দোলনে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইম্পেরিয়াল কলেজ, আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ এবং ফয়জুর রহমান আইডিয়াল ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। আন্দোলনের কর্মী হিমাদ্রি শেখর নন্দী বলেন, দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। আমরা কেউ বাসের নিচের পড়ে জীবন দিতে চাই না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে এই আন্দোলন। এই আন্দোলনে সকল শ্রেণির মানুষের সমর্থন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
সকাল সাড়ে দশটা। ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বন্ধ করে জড়ো হতে থাকে কলেজের সামনে।  প্রথমে কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী আন্দোলন শুরু করলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। উই ওয়ান্ট জাস্টিজ, নিরাপদ সড়ক চাইসহ বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান লিখে রাস্তায় নামেন তারা।
গতকাল পুরো রাজধানীর অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে ধানমণ্ডি তিন নাম্বার মিরপুর রোডে অবস্থান কর্মসূচি নেয় কলেজের শিক্ষার্থীরা। সিটি কলেজের শিক্ষার্থী আবির হাসান বলেন, আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো যতদিন না আমাদের দাবিগুলো মানা না হবে। সরজমিনে দেখা যায়, রাস্তায় অবস্থানের শুরু থেকেই অ্যাম্বুলেন্সসহ গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন চলাচলে কোনো বাধা ছিল না। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই এসব যানবাহন চলতে সহযোগিতা করেছেন।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা পুরো রাস্তাজুড়ে অবস্থান নেন। তখন মিরপুর রোডে কোনো ধরনের যানবাহন চলতে পারেনি। এ সময় বিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষার্থীরা নানা স্লোগানে মিছিল বের করেন। মিছিলগুলো কলেজ থেকে বের হয়ে সাইন্সল্যাব হয়ে ল্যাবএইডের সামনে এসে অবস্থান করে। পরে শিক্ষার্থীরা রাস্তার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেও কাজ করেন। এ সময় বিভিন্ন বাস, মোটরসাইকেলসহ সকল ধরনের যানবাহনের লাইসেন্স পরীক্ষা করেন তারা। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের এমন আন্দোলনে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষদের। মিরপুরের যাত্রী ব্যাংক কর্মকর্তা শাওন হাসনাত বলেন, বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অফিসে যেতে পারিনি। থেমে থেমে বাস চলছে। অনেক কষ্টে বাসে, হেঁটে অফিসে যেতে হয়েছে তাকে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থী শান্তা ইসলাম বলেন, মানুষের সাময়িক কষ্ট হচ্ছে সেটা আমরাও বুঝতে পেরেছি। কিন্তু এ ছাড়া আমাদের উপায় নেই। রাস্তায় যে হারে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে সেই তুলনায় এ কষ্ট কিছুই না। এভাবে আন্দোলন না করলে সরকারের টনক নড়বে না।
শাহবাগে ঢাবি শিক্ষার্থীদের অবস্থান: বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে বিইউপি’র ছাত্র নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শাহবাগে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সকাল ১১টা থেকে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে তারা। সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আমাদের দাবি একটাই, নিরাপদ সড়ক চাই’, ‘প্রশাসন, ভুয়া’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকে। পরে শতাধিক শিক্ষার্থীর একটি মিছিল শাহবাগে গিয়ে অবরোধ করে। এতে ব্যস্ততম এ মোড়ের আশপাশে যানজট শুরু হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শাহবাগে এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেন ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর।
এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতিটি দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। নুরুল হক নুর বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী এই যৌক্তিক আন্দোলনের সঙ্গে রয়েছে। শহীদ রমিজ উদ্দীন ক্যান্টনমেন্টের দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা এ রাষ্ট্রের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। তখন প্রথম দিকে শিক্ষার্থীদের প্রশংসা করা হলেও এ আন্দোলন দমনের জন্য রাষ্ট্র হাতুড়ি-হেলমেট বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিল। তিনি শিক্ষার্থীদের ৮ দফা দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম বিশৃঙ্খলা রয়েছে, এগুলোর প্রত্যেকটি সমাধান করতে হবে। যদি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ব্যর্থ হন, তাহলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসে সমস্যার সমাধান করবে। এদিকে বিকাল ৪টার দিকে শাহবাগে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানান ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন।

সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে খ্রিষ্টধর্মকে জড়াতে চান না এরদোগান

সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে খ্রিষ্টধর্মকে জড়াতে চান না তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। তার মতে, ক্রাইস্টচার্চে হামলাকারী সন্ত্রাসী ব্রেনটন টেরেন্ট ইসলামপন্থি জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের মতোই। দু’টিই একই রকম সন্ত্রাসী। ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা এক কলামে তিনি এসব কথা বলেন। এতে তিনি লেখেন, বিশ্বের ইতিহাস ও খ্রিষ্টধর্মীয় বিশ্বাসকে বিকৃত করে ক্রাইস্টচার্চের হামলাকারী তার হত্যাযজ্ঞকে যৌক্তিক করার চেষ্টা করেছে। সে মানুষের মধ্যে বিদ্বেষের বীজ বপন করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে খ্রিষ্ট ধর্মের শিক্ষা ও নীতির সঙ্গে গত সপ্তাহের হামলার সম্পৃক্ততা সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এরদোগান।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই কলামে এরদোগান আরো লেখেন, নিউজিল্যান্ডে যা ঘটেছে, সেটা হলো অজ্ঞতা ও বিদ্বেষের বিষাক্ত ফল। তিনি জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, শুক্রবারের হামলায় টেরেন্টও ঠিক একই কাজ করেছে।
সে তার মেনিফেস্টোতে শহরে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে। একইভাবে সিরিয়ায় তুর্কী সেনাদের অভিযান চালানোর কারণে তুরস্ককে ধ্বংস করার অঙ্গীকার করেছিল আইএস। তারা ইস্তাম্বুল পুনর্বিজয়ের ডাক দেয়।
তবে পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন এরদোগান। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের অন্য অংশগুলো ইসলামভীতি ও বিদেশি-ভীতির বিষয়ে নীরব। ক্রাইস্টচার্চ হত্যাযজ্ঞের পরে পশ্চিমা বিশ্বের কিছু কর্তব্য ছিল। ইসলামভীতি ও বর্ণবাদকে সাধারণ বিষয়ে পরিণত করার যে প্রক্রিয়া চলছে, পশ্চিমা সমাজ ও সরকারগুলোকে অবশ্যই তা বন্ধ করতে হবে। আমাদেরকে সব বিষয়ের ওপর নজরদারি করতে হবে। একজন সন্ত্রাসী কীভাবে উগ্রপন্থায় ঝুঁকছে তা বুঝতে হবে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগসূত্র কী, ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে সেটাও খুঁজে বের করতে হবে। ক্রাইস্টচার্চ হামলায় নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আরডেনের দৃষ্টান্তমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেন এরদোগান।

হুইলচেয়ারে বসে আন্দোলনের নেতৃত্বে উজ্জ্বল

পিচঢালা সড়ক। মাথার ওপর তপ্ত সূর্য। তীব্র রোদ। এরই মাঝে আন্দোলনে শামিল শিক্ষার্থীরা। ওয়েদার ডট কম’র হিসাব অনুযায়ী গতকাল বুধবার সারাদিন তাপমাত্রা ছিল ৩৩ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই গরমেও হার মানেননি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। উজ্জ্বল বৈদ্য। শক্তি নেই হাঁটার।
হুইলচেয়ার তার সঙ্গী। তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। অধ্যয়নরত আছেন মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি ডিপার্টমেন্টের পঞ্চম সেমিস্টারে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবি ও মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীর হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেন। গতকাল বুধবার ধানমণ্ডি ২৭ থেকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করেন। এই অবরোধ ও আন্দোলনের মধ্যমণি হয়ে ছিলেন হুইলচেয়ারকে সঙ্গী করে চলা উজ্জ্বল বৈদ্য।
‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’ এই ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকে ধানমণ্ডির সড়কটি। এ ছাড়াও শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে থাকেন ‘রাস্তায় এমন মানুষ মরে, প্রশাসন কি করে?’, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’, ‘আমার ভাইয়ের হত্যাকারীর ফাঁসি চাই দিতে হবে’, ‘আমার ভাই মরলো কেন? বিচার চাই বিচার চাই’, ‘আমার বাবার কান্না কেন? বিচার চাই বিচার চাই’, ‘আমার মায়ের কান্না কেন? বিচার চাই বিচার চাই’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেবো না’ ইত্যাদি। এই পুরো সময়ে শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আর উজ্জ্বল বৈদ্য পুরো সময়টিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে দিতে থাকেন স্লোগান। গতকাল বুধবার সকাল ১০টা থেকেই উপস্থিত হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
ক্যাম্পাসের সামনে সারিবদ্ধভাবে স্লোগান দিতে থাকেন তারা। এরপর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী দুপুর ১১টার দিকে ধানমণ্ডি ৩২ থেকে একটি মিছিল ধানমণ্ডি ২৭-এ আসে। করে সড়ক অবরোধ। তারা ধানমণ্ডি ২৭ থেকে ধানমণ্ডি ৩২মুখী অংশটি অবরোধ করে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে এই সড়কমুখী যানবাহনগুলো ঝিগাতলা সড়ক দিয়ে চলাচল করে। ধানমণ্ডি ২৭ থেকে ধানমণ্ডি ৩২মুখী অংশটি ছিল খোলা। এসময় শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকটি বাসের চালকের লাইসেন্স যাচাই করেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন বাসে থাকা ‘হাফ পাশ নাই’ লেখা স্টিকার ছিঁড়ে ফেলেন। সেই সঙ্গে বাসে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে অর্ধেক ভাড়া নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চান। বেশ কিছু বাসে অর্ধেক ভাড়া না নেয়ায় অভিযোগ মেলে। তখন তারা সুপারভাইজারের কাছে সেই অর্থ ফেরত নিয়ে সেইসব শিক্ষার্থীদের দিয়ে দেন।
আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা বেশ সজাগ ছিলেন এম্বুলেন্স, শিক্ষার্থীদের পরিবহনসহ জরুরি পরিবহনের বিষয়ে। এসব পরিবহনের জন্য তারা সড়ক ছেড়ে দেন। আবার খোলা সড়কের অংশটিতে করেন ইমারজেন্সি লেন। এই লেনে চলাচল করে জরুরি পরিবহন। এ ছাড়াও বাকি অংশ দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে গাড়ি চলাচলে বাধ্য করা হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হাতে শোভা পায় নানা ধরনের প্ল্যাকার্ড। যাতে লেখা ছিল ‘আর কত?’, ‘হয়তো হবো দীর্ঘশ্বাস, নয়তো ইতিহাস’, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’, ‘একটা জীবন ২০ লাখ, আর কত প্রাণ ঝরলে তোমাদের টাকা ফুরাবে?’ ‘হ্যালো হানি বানি, চলো আইন মানি’, ওস্তাদ সামনে স্টুডেন্ট, জোরে চলেন’, ‘এখন জেব্রা ক্রসিংয়ে মরতে হবে স্টুডেন্টদের?’ ইত্যাদি।
শিক্ষার্থীরা সাত দফা দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। এগুলো হচ্ছে- আবরারের হত্যাকারীর ফাঁসি প্রদান। জাবালে নুর পরিবহন বাতিলকরণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে বাস স্টপেজ করা। শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া নিশ্চিত করা। রাস্তায় চেকিং সিস্টেম বন্ধ করা। বাসে চালকের ছবি ও লাইসেন্স প্রদর্শন করা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ওভারব্রিজ নির্মাণ। আন্দোলনরত দ্বিতীয় সেমিস্টারের সফটওয়্যার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী হাসিবুল হাসান বলেন, জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারের পরেও কেন মরতে হলো আবরার ভাইকে? আমাদের জীবনের কি কোনো মূল্য নেই? আরেকজন শিক্ষার্থী মৃন্ময় চাকমা বলেন, আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।
প্রশাসনের টনক না নড়া পর্যন্ত চালিয়ে যাবো আমাদের আন্দোলন। ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অষ্টম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী তুবা জাহান বলেন, আর কত লাশ চাই তাদের? প্রতিদিন লাশের মিছিল। এই মিছিলে যুক্ত হতে দেবো না আর কোনো নতুন নাম। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এই আন্দোলন দুপুর ৩টায় শেষ করার কথা ছিল। দুপুর ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ধানমণ্ডি ২৭ সড়ক ছেড়ে দেয় তারা। এরপর শিক্ষার্থীরা একটি মিছিল নিয়ে উজ্জ্বলের নেতৃত্বে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে আসে। সেখানে আন্দোলন গতকালের মতো শেষ বলে জানানো হয়। এসময় উজ্জ্বল বৈদ্য ঘোষণা দেন, আগামীকাল (আজ) ফের আমরা আন্দোলনে নামবো। সকাল ১০টায়। আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত আমরা সড়ক ছাড়বো না। এই আন্দোলন আমাদের জীবনের আন্দোলন। এই আন্দোলন নিরাপদ সড়কের আন্দোলন। এই আন্দোলন নিরাপদে বাড়ি ফেরার আন্দোলন।