Saturday, March 26, 2016
চাই সবার জন্য স্বাধীনতা by আবুল মোমেন
বাঙালির পক্ষে এর মধ্যে বিকশিত হওয়া সম্ভব ছিল না, যেমন পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। বাঙালির ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতি শক্তিশালী। ব্রিটিশ আমল থেকে এ ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হওয়ায় এর ভিত্তি ছিল দৃঢ়, বিস্তার ঘটেছে ব্যাপক। তার ওপর বাংলা ভাষায় দ্রুত অত্যন্ত উন্নতমানের সাহিত্য রচিত হওয়ায় এবং সেই সাহিত্য মাতৃভূমির বন্দনায়, স্বাধীনতার উদ্দীপনায় বরাবর অত্যন্ত মানসম্পন্ন ও কার্যকর রসদ জুগিয়ে গেছে, যার আবেদন আজও সমানভাবে বজায় রয়েছে। ফলে বাঙালির ওপর পাকিস্তানের উর্দু ভাষা কিংবা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা চাপিয়ে দেওয়া এবং একতরফা অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসন মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। আর তারই ফলে মুক্তিযুদ্ধ যেমন, তেমনি স্বাধীনতাও হয়ে পড়েছিল অনিবার্য।
২.
পাকিস্তানে পাঞ্জাবি মুসলমানদের একাধিপত্য বজায় ছিল। আজ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে মূল্যায়ন করতে বসে মনে হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশে যেন তারই অনুকরণে বাঙালি মুসলমানের একাধিপত্য তৈরি হয়েছে। এখানে আমাদের পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আদর্শে পরাভব ঘটে। ১৯৪৭-এ যখন দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়, তখন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় তা ছিল ২২ শতাংশের মতো। আর বাংলাদেশের বিগত ৪৫ বছরের ইতিহাসে দেশের হিন্দু জনসংখ্যা কমে মাত্র ৯ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। কেন হিন্দুরা দেশ ছাড়ছে, তা নিয়ে প্রতিবেশী মুসলমান যথেষ্ট সচেতন নয়, বরং অধিকাংশের ধারণা বিভ্রান্তিকর। এদের অনেকেই এর মধ্যে একধরনের ভারতপ্রীতির হিন্দু মানসিকতাকেই কেবল দেখতে পায়। তার অস্তিত্ব হয়তো আছে, কিন্তু পারিপার্শ্বিকতাই এই মনোভাব তৈরিতে ও তা জিইয়ে রাখতে সাহায্য করে। ১৯৬৫ সালের শত্রুসম্পত্তি আইনের অভিশাপ কেন স্বাধীন দেশেও বয়ে বেড়াতে হবে, এর জবাব স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি দেয়নি। আমরা সংখ্যালঘুর সম্পত্তির জবরদখলের নানা চিত্র উত্তরোত্তর বাড়তে দেখছি। সংখ্যালঘু এ দেশে স্বস্তিতে বসবাস করতে পারছে কি না, সেটা যতক্ষণ না সংখ্যাগুরুর বিবেচ্য বিষয় হবে, ততক্ষণ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। আর তা ঘটেনি বলে বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য একাত্তরের স্বাধীনতা যে সুফল এনেছে, তা দেশের সব ধরনের সংখ্যালঘুর জন্য সেই মানে আনেনি। এটি আমাদের ব্যর্থতা, যা দ্রুত শোধরানো দরকার।
দেশে যেসব আদিবাসী সংখ্যালঘু আছেন—প্রায় ৪৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, তাদের পক্ষে ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষা তো কঠিন বটেই; ভিটেমাটি, জমি ও স্থাবর সম্পত্তি রক্ষা করাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তাদের এমন মনে হওয়ার উপলক্ষ বারবার তৈরি হয়েছে যে তারা জাতি পরিচয়ের কারণে এ দেশে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় নিত্যদিন খবর বেরোচ্ছে।
আমরা বিশ্বাস করি উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে আরও উন্নতি হবে, আয় ও আয়ু বাড়বে, শিক্ষিতের হার বাড়বে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কী হবে?
এই বাস্তবতা আমরা অস্বীকার করতে পারব না। একই সঙ্গে আমরা অস্বীকার করব না, সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, দারিদ্র্যবিমোচন ইত্যাদিতে উন্নয়ন বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি বাড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী ভূমিকাও প্রশংসনীয়। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতগুলো, বিশেষত অভিবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাক খাতের আয় টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। কেবল কৃষির ভিত্তিটা মজবুত হয়েছে। তৈরি পোশাক ও অভিবাসী এই খাতের শ্রমিকদের অধিকাংশের জীবন এখনো আয় ও অধিকারের দিক থেকে মানবেতরই রয়ে গেছে। তাদের দক্ষতা, আয় বৃদ্ধি ও জীবনমান বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ আমরা নিতে পারিনি।
৩.
জাতিসংঘ আগামী ২০৩০ সালে অর্জনের জন্য যে ১৭টি খাতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে, তা অর্জন আমাদের জন্য সত্যিই কঠিন হবে। কেননা, এটি আর পরিমাণগত উন্নয়নের বিষয় থাকছে না। এবার গুণগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিতে হবে। গুণ ও মান সাধারণত সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অবস্থার, কাজের ও ফলাফলের বিচারে তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, বোঝা যায়।
আমরা সব সময় দ্রুত সাফল্য চেয়েছি। জাতিগতভাবে আমরা লম্বা দৌড়ের জন্য মানসিক-শারীরিক কোনোভাবেই তৈরি নই। বাস্তবতা বলে, মুক্তিযুদ্ধ নয় মাসের বেশি স্থায়ী হলে, ধরা যাক যদি তা কয়েক বছর গড়াত, তাহলে স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতির ঐক্য ধরে রাখা যেত না। কেননা, আমাদের সেই প্রস্তুতি ছিল না। স্বাধীনতা কীভাবে কখন হতো, বলা মুশকিল।
গণতন্ত্র সব নাগরিকের জন্য মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করে। আর তা বাস্তবায়ন করতে হলে চাই দুটি ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন—সর্বস্তরে যথার্থ মানসম্পন্ন শিক্ষায় উন্নত নাগরিক এবং দক্ষ দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় যে বিষয়টি প্রয়োজন, তা সরকারের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতার ব্যবস্থা করা। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে আমরা কোনো কাজই শুরু করিনি। আমজনতার এতে কোনো আপত্তি নেই, বস্তুত এ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। তবে এর ফলাফল পেলে এতে তাদের নিশ্চয় আগ্রহ থাকবে। কিন্তু যাঁরা ক্ষমতাসীন এবং যাঁরা ক্ষমতাকে ঘিরে শাসকশ্রেণির অংশে পরিণত হয়েছেন, তাঁরা এমন ব্যবস্থা সম্পর্কে আন্তরিক নন। বড় দুই দলে এ বিষয়ে মতভিন্নতা আছে বলে মনে হয় না।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার জন্য স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পরেও নাগরিক সমাজ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার মতো যথেষ্ট শক্তি অর্জন করেনি। তাদের নৈতিক দুর্বলতাই এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে। তার ওপর আরেক দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের উপযোগী দল হয়ে উঠতে পারছে না বিএনপি। তারা যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতকে ছাড়বে কি না, তা অস্পষ্ট। খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনও ধোঁয়াশাপূর্ণ। তাঁদের আওয়ামী লীগবিরোধিতা যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার মূলধারার বিপরীতে অবস্থান নেয়, উল্টো বহুলাংশে পাকিস্তানের সঙ্গেই মেলে, তাহলে সাধারণ মানুষ, বিশেষত তরুণ সমাজ তো বিভ্রান্ত হবেই। আর এর ফলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে একধরনের একচ্ছত্র ভূমিকা গ্রহণের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। আখেরে ক্ষতি হচ্ছে গণতন্ত্রের। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন তো অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ—সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
আমাদের শেষ ভরসা মানুষ। কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবে সামনেই এগোতে চায়, তরুণ সমাজ সব বাধা ঠেলে এগিয়েই যাবে। আমরা বিশ্বাস করি উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে আরও উন্নতি হবে, আয় ও আয়ু বাড়বে, শিক্ষিতের হার বাড়বে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কী হবে? ধর্ম-বর্ণবৈষম্যহীন আইনের শাসনের? গণতন্ত্রের? এসবও যে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন থেকে যাচ্ছে? এটাই আমাদের আজ বড় দুর্বলতা, দুর্ভাবনার বিষয়।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ভোটারদের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দিন by মিজানুর রহমান খান
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড শব্দটি জবরদস্তি মুছে ফেলা গেলে কেবল সরকারি দলেরই লাভ হবে, কোনো গোলযোগ নৈরাজ্য থাকবে না, শান্তি থাকবে, তাদের ভ্রান্তি ঘুচবে কি। সহিংসতায় অন্তত ২১ জন নিহত হওয়া ও বিদ্রোহী প্রার্থীর হিড়িক পড়ার ঘটনায় নির্বাচন কমিশন কি বিচলিত ? সে কি এখনও বলবে, তার নাম সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তার কাজ হবে পোস্টবক্সের মতো। তার ডাকবাক্সে চিঠি জমা পড়বে। সেটা তিনি প্রাপককে পৌঁছে দেবেন। প্রেরক বা প্রাপক কারও নাম-পরিচয় তাঁর জানার দরকার নেই। কিন্তু এবারে কার্যত বিএনপি-জামায়াত বা তাদের কর্মী-সমর্থক যেখানে এতটাই কোণঠাসা, যা ক্ষমতাসীন দল অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে গলা ফাটিয়ে দাবি করতে পারছে যে, বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পেট্রলবোমা ও জঙ্গি রাজনীতির কারণে তাদের ওপর থেকে আমজনতা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। দৃশ্যত তেমন একটা পরিবেশেও প্রত্যাশিত শান্তি মিলল না। বিএনপি সমাজে থেকেও নেই। মিছিলের জবাবে মিছিল, স্লোগানের জবাবে স্লোগান, সংঘাতের জবাবে সংঘাত করতে তাদের সামর্থ্য লাটে উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তা হলেও আমরা অহিংস ভোট পাচ্ছি না কেন। দলে শৃঙ্খলা থাকলে শতাধিক বিদ্রোহী কী করে জয়ী হলেন?
যখন ব্রিটেন ও ভারতকে দেখিয়ে স্থানীয় সরকারে দলীয় টিকিটে নির্বাচনের আইন করা হলো, তখনই আমরা আশঙ্কা করেছি যে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক নেই। বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে লাইসেন্স প্রথা চালু করা হয়েছে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, এটা সুফল দেয়নি। বরং সমাজ ও নির্বাচনী ব্যবস্থার পবিত্রতা বলতে যেখানে যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা আরও দুর্বলতর হচ্ছে, কোথাও কোথাও মুখ থুবড়ে পড়ছে। মঠবাড়িয়ায় পাঁচজন ও টেকনাফে তিনজন নিহত ও মহেশখালীতে অন্তত ৩০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে যে বিবরণ পাচ্ছি, তাতে তিনটি স্থানেই গুলি এড়ানো সম্ভব ছিল। ইসির কাছে আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট না পেতে পারি। কিন্তু ভোটারদের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দাবি করতে পারি। বিজিবির মহাপরিচালক জাতিকে জানিয়েছেন, তাঁর সৈন্যরা ম্যাজিস্ট্রেটের লিখিত আদেশে গুলি চালিয়েছে। যেহেতু আইন মেনে হয়েছে, তাই এই গুলি বৈধ। কিন্তু আইন মান্য করা কাকে বলে। ম্যাজিস্ট্রেটকে কতগুলো শর্তসাপেক্ষ এই আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি মোটেই এমন নয় যে, পদাধিকারবলে যেকোনো পরিস্থিতিতে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতি তাঁকে বাধ্য করতে হবে। কারণ, ম্যাজিস্ট্রেট বলেই মর্জিমাফিক সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর এখতিয়ার নেই।
এখন ইসি কি বলবে, সহিংসতা তাদের দেখার বিষয় নয়। কারণ এর সঙ্গে ভোট গ্রহণ, গণনা ও তা প্রকাশের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু মঠবাড়িয়া ও টেকনাফে একটি করে কেন্দ্রের ফল প্রকাশ করা নিয়েই কিন্তু গুলির ঘটনা ঘটল।
মঠবাড়িয়ায় গোলযোগ হওয়া ইউনিয়নটির একটি কেন্দ্রে যেখানে ১ হাজার ৫৫৪ ভোট, সেটিই কেবল স্থগিত আছে, কিন্তু যে কেন্দ্রের ফল ঘোষণা নিয়ে এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে গেল, সেই কেন্দ্রের প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফল ঘোষণা করা হলই। যে বিবরণ আমি দিচ্ছি, সেটা সঠিক হলে ওই কেন্দ্রের ফলাফল অবশ্যই বাতিল করতে হবে। বিএনপি এখানকার দৃশ্যপটে নেই। মঠবাড়িয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর। স্বতন্ত্র প্রার্থী বিরোধপূর্ণ কেন্দ্র সাফা মহাবিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক। সুতরাং সেখানে তিনি আর যা-ই হোন, কোনো আগন্তুক নন। উপরন্তু তাঁর স্বজনদের মধ্যে একজন অতিরিক্ত সচিব ও একজন টাকাওয়ালা ব্যক্তি আছেন। তাঁরা কী প্রভাব ফেলেছেন, সেটা আমরা নিশ্চিত নই। তবে ম্যাজিস্ট্রেট কী পরিস্থিতিতে বিজিবিকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন, সেটা মূল বিবেচ্য।
সাফা কলেজ কেন্দ্রে মোট ভোট ২ হাজার ৫৭৮। এর মধ্যে ১ হাজার ৬০৯টি ভোট পড়েছে। দেখার বিষয় হলো, প্রিসাইডিং অফিসার নৌকা মার্কায় সিল মারা ৭৪৬টি ভোট বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর যুক্তি আইনগতভাবে সিদ্ধ। কারণ, ওই ব্যালট পেপারের মুড়িতে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের সই নেই। এই বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণই আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ক্ষুব্ধ করে। কিন্তু বড় করে দেখার বিষয় হলো, যে কেন্দ্রে সারা দিনে প্রায় অর্ধেক অবৈধ ভোট পড়েছে, সেটা প্রিসাইডিং অফিসারের গণনা করতে বসে নজরে আসার বিষয় ছিল না। এই কেন্দ্রের ফল যদি বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হতো, তা হলে তা উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হত কি না, সেটাও বিবেচ্য ছিল। বাস্তবে পাঁচজন মানুষের প্রাণহানির পরও কিন্তু ওই কেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করা হয়নি; বরং ওই ৭৪৬ ভোট বাতিল করা হয়েছে।
রূঢ় বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগের পাঁচ সমর্থক নিহত হলেন। অথচ প্রমাণ হলো না যে প্রশাসন নিরপেক্ষ বা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। যদিও এখানে বিএনপি নেই। বিএনপির প্রার্থী মাত্র ১ হাজার ৮২ ভোট পেয়ে নিরব আছেন। মঠবাড়িয়ায় বরং বলা যায়, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীই তাঁদের দলের প্রার্থীর বড় ক্ষতির কারণ হয়েছেন। কারণ, বিদ্রোহী প্রার্থী পেয়েছেন ১ হাজার ২৬ ভোট। এটা একটা অবাক করা বিষয় যে, যে কেন্দ্রে অর্ধেক ব্যালট ছিনতাই হওয়ার সন্দেহ দালিলিকভাবে প্রমাণিত, সেই কেন্দ্রে যথাসময়ে ফল ঘোষণা নিয়ে প্রিসাইডিং অফিসারকে অবরুদ্ধ হতে হয়েছে। তিনি যদি ওই কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে অবরুদ্ধ হতেন, তা হলেও একটা সান্ত্বনা ছিল। কিন্তু তিনি একটি অগ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিয়ে অবরুদ্ধ হন।
এরপর কথা হলো গুলির বিকল্প ছিল কি না?
পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের পরে এলাকায় কোনো বিক্ষোভ হয়নি, কোনো জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা ঘটেনি। আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ করেনি, এসব কী নির্দেশ করে? সন্ধ্যা সাতটা ২০ মিনিট থেকে রাত সাড়ে আটটা—মাঝখানে মাত্র ৭০ মিনিট সময়, এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা কী এমন করেছিলেন, যাতে গুলির কোনো বিকল্প ছিল না? মাইকে তাঁদের সতর্ক করা হয়নি।
মহেশখালীতে বিক্ষুব্ধ কর্মী, যাঁরা সেখানে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে কমপক্ষে ১০০টি ফাঁকা গুলি চালানো হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, বৃষ্টির মতো গুলি হয়েছে। ৫০০টির কম হবে না। বড় মহেশখালীতে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন না। সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় হামলা হয়েছে; তাঁরা নিজেরাও গুলিবিনিময় করেছেন। উভয় পক্ষের ৩০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু কেউ নিহত হননি।
মঠবাড়িয়ায় একজন ভোটার বিবিসিকে বলেছেন, বিক্ষুব্ধ লোকজন লগি-বৈঠা ব্যবহার করেছেন। তাঁরা আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার করেননি। মঠবাড়িয়ার গুলি চালানোর সপক্ষে দেখাতে হবে যে, অবরুদ্ধ কর্মকর্তাদের জীবন সত্যিই সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। অনেক সময় ৭০ মিনিট কেন, ১০ মিনিটের এদিক-সেদিকেও কারও জীবন বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু খতিয়ে দেখার বিষয় হলো, সেখানে কাঁদানে গ্যাস বা রাবার বুলেট ব্যবহারের কোনো চেষ্টা ছিল কি না। দু-চারটি ফাঁকা গুলি না চালিয়ে কয়েক হাজার গুলি খরচ করেও যদি ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে ছত্রভঙ্গ’ করা যায়, পাঁচ-পাঁচটি অমূল্য প্রাণের একটিকেও যদি কম ঝরানো যেত, তা হলে তো আমাদের সেই বিকল্পটাই বেছে নিতে হতো। সেই প্রচেষ্টা ছিল কি না, জাতির সেটা জানার অধিকার আছে। নাকি কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেটের মতো তুচ্ছ অস্ত্রের সরবরাহ ছিল না! নির্বাচন কমিশনের ফরমাশপত্রে নির্বাচনী উপকরণ হিসেবে ব্যালট বাক্স ও অমোচনীয় কালির সঙ্গে পর্যাপ্ত রাবার বুলেট আর কাঁদানে গ্যাসের উল্লেখ ছিল কি না? যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ কোনো বাহিনী লাগবে কি লাগবে না, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তারা কেন রাবার বুলেট বা কাঁদানে গ্যাসের জোগানে ঘাটতি থাকলে তার কৈফিয়ত চাইবে না।
আমরা এখন ইসির মাধ্যমে জানতে চাই যে, মঠবাড়িয়ায় সত্যিই কি ‘ট্রিগ্যার হ্যাপি’ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না? ওই গ্রামের মানুষেরা যদি এতটাই দুর্দান্ত-প্রকৃতির হবে, তা হলে তারা টুঁ-শব্দটি পর্যন্ত করল না কেন? ১৯৫০ সালের এনকোয়ারি অ্যাক্টের আওতায় মঠবাড়িয়ায় গুলিবর্ষণের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করি।
এ ঘটনা কেবল বিজিবিপ্রধান এবং ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব স্বীকার বা ‘আইনসম্মত’ দাবি করার মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া উচিত নয়। নির্বাচনকালে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ সব কর্মকর্তার চাকরি নির্বাচন কমিশনের কাছে ন্যস্ত থাকে; যাতে জবাবদিহিটা দ্রুত কার্যকর করা যায়। সংবিধানের এই রক্ষাকবচের সুফল আমরা পেতে চাই। অন্যথায় ভবিষ্যতে নির্বাচনে গোলাগুলি একটি সাংঘাতিক উপদ্রব হিসেবে দেখা দিতে পারে। বহু জায়গায় পেশিশক্তি একতরফা বলে সংঘাত কম হয়েছে। যেমন মহেশখালীর কুতুবজুমে বিএনপির প্রার্থী মাঝপথে ভোট বর্জন করেছেন। আবার টেকনাফে সামান্য দুই মেম্বার প্রার্থীর মধ্যকার সংঘাতেও পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন।
আবার প্রশাসন ও প্রার্থীরা মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন থাকলে রোল মডেল নির্বাচনও হতে পারে। শুরুতেই বলেছি, মাতারবাড়ীতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলো। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ৮ হাজার ৩৪৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম আওয়ামী লীগ প্রার্থী ৬ হাজার ৩৭২ এবং তাঁর থেকে মাত্র ৪০ ভোট কম পেয়ে বিএনপির প্রার্থী তৃতীয় হয়েছেন। একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ নির্বচন হয়েছে। সেখানকার জনগণ ও কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাই।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
অধ্যাপক মোজাফফর, বামপন্থা ও স্বাধীনতা by সোহরাব হাসান
![]() |
| মোজাফফর আহমদ |
তিনি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ; প্রায় নিষ্ক্রিয় এবং বিভক্ত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) একাংশের সভাপতি; যিনি নিজেকে কুঁড়েঘরের মোজাফফর বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। সরকার ২০১৫ সালে অন্যদের সঙ্গে তাঁকেও স্বাধীনতা পদক দেওয়ার ঘোষণা দিলে তিনি সবিনয়ে তা নিতে অস্বীকার করেন। তাঁর মত হলো, রাজনীতির অর্থ দেশসেবা, মানুষের সেবা। পদ বা পদবির জন্য কখনো রাজনীতি করিনি। পদক দিলে বা নিলেই সম্মানিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি বিশ্বাসী নই।
১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার ছয় সদস্যের যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল, তাঁদের মধ্যে একমাত্র মোজাফফর আহমদই বেঁচে আছেন। উপদেষ্টা কমিটির অন্যান্য সদস্য ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মণি সিংহ, মনোরঞ্জন ধর ও খোন্দকার মোশতাক আহমদ। আহ্বায়ক ছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। শেষোক্ত দুজন ছাড়া বাকি সবাই আওয়ামী লীগের বাইরের মানুষ এবং তিনজনই বামপন্থী। মাওলানা ভাসানী ও মোজাফফর আহমদ ছিলেন ন্যাপের নিজ নিজ অংশের সভাপতি; মণি সিংহ কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান এবং মনোরঞ্জন ধর ন্যাশনাল কংগ্রেসের সভাপতি। তাজউদ্দীন আহমদ সবাইকে নিয়ে চলতে চেয়েছিলেন।
মোজাফফর আহমদের বয়স এখন ৯৪ বছর। থাকেন বারিধারায় মেয়ে-জামাতার বাড়িতে। তাঁরাই তাঁর দেখাশোনা করেন। কয়েক দিন আগে অসুস্থতার কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। এখন বাড়িতেই আছেন। চলাফেরা করতে পারেন না। বারিধারার এই পরিবেশ তিনি মানিয়ে নিতে পারছেন না, সে কথা অনেকবার বলেছেন। সেখানে নিজেকে মনে হয়েছে ‘সোনার খাঁচায় বন্দী’। তাঁর স্ত্রী আমেনা আহমদ ন্যাপের সহসভাপতি ও সংরক্ষিত আসনে নবম ও দশম সংসদের সাংসদ।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারে বর্তমানে বেশ কয়েকজন অ-আওয়ামী লীগ সদস্য আছেন। আওয়ামী লীগ একসময় এটিকে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার বলে অভিহিত করত। কিন্তু স্বাধীনতার অব্যবহিত পর মোজাফফর আহমদই প্রথম জাতীয় সরকারের দাবি তুলেছিলেন।
বছর কয়েক আগেও তাঁকে দেখা যেত কাকরাইলের কোনো পত্রিকা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়ছেন কিংবা বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। যখন দলের দাপট নেই, কর্মী নেই, তখন সাধারণ মানুষই ভরসা। রাজনীতিক হয়েও রাজনীতির বাইরের মানুষ, বিশেষ করে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করতে তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন। কারও লেখা ভালো লাগলে টেলিফোন নম্বর জোগাড় করে তাঁকে ফোন করতেন। রিসিভার তুললেই ওপার থেকে শোনা যেত সেই পরিচিত কণ্ঠ, ‘ চিনতে পারছ, আমি কুঁড়েঘরের মোজাফফর।’
মোজাফফর আহমদের জন্ম ১৯২২ সােলর ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বারের এলাহাবাদ গ্রামে। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। তার আগে ছিলেন একাধিক কলেজে। চুয়ান্নতে মাত্র ২২ বছর বয়সে মুসলিম লীগের এক মন্ত্রীকে পরাজিত করে প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক সভায় মোজাফফর আহমদ বলেছিলেন, ‘আজ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের যে প্রস্তাব আনা হয়েছে, সেটি আমাদের নেতা মাওলানা ভাসানীর একক কিংবা কোনো একটি দলের দাবি নয়। এটি হলো পূর্ব পাকিস্তানের ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের দাবি। এটি আবেগের কিংবা ভোট লাভের স্লোগান নয়। এটি হলো প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত অভ্যন্তরীণ সব ব্যাপারে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত এ অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা।’
পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফায় সে স্বায়ত্তশাসন পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছে এবং রণাঙ্গেন উপিস্থত না থাকলেও এর নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই যুদ্ধে অন্যান্য দলের কোনো ভূমিকা ছিল না। দল কেন; সেনা, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, ছাত্র-তরুণ, নারী, বাঙালি-অবাঙালিসহ সর্বস্তরের মানুষেরই ভূমিকা ছিল। আর যুদ্ধটাও একাত্তরের ২৬ মার্চ শুরু হয়নি। শুরুরও আগের শুরু ছিল। বামপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। এটাই ইতিহাসের সত্য।
স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতিতে বামপন্থীদের বিচ্যুতি বা দুর্বলতা যত প্রকটই হোক না কেন, স্বাধীনতা-পূর্ব রাজনীতি তথা মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের ভূমিকা খাটো করে দেখার উপায় নেই। ষাটের দশকের মাঝামাঝি বামপন্থীরা মস্কো ও বেইজিং—দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মণি সিংহ, মোজাফফর আহমদ, খোকা রায়, মোহাম্মদ ফরহাদ, মতিয়া চৌধুরী, পঙ্কজ ভট্টাচার্য প্রমুখ ছিলেন মস্কো শিবিরে। আর বেইজিং শিবিরে ছিলেন মাওলানা ভাসানী, কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো প্রমুখ। এ বিভাজন সত্ত্বেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তবে বেইজিংপন্থীদের যে অংশটি ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তারা স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি।
ভারতে মস্কোপন্থী বামপন্থীরা সিপিআইেয়র সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছিল। তখন ইন্দিরা গান্ধী ও কংগ্রেসের ওপর দারুণ প্রভাব ছিল সিপিআইয়ের। অন্যদিকে বেইজিংপন্থী অংশ সিপিআইএমের সমর্থন পেলেও কংগ্রেসের নীতিনির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। একাত্তরে ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে আলাদা গেরিলা বাহিনী গঠিত হয়েছিল। ছয় হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তারা দেশের ভেতরে পাঠিয়েছে। বেইজিংপন্থীদের নিয়ে গঠিত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি দেশের ভেতরে ঘাঁটি স্থাপন করে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। অনেকে ভারতে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। কিন্তু বামপন্থীরা শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের উগ্রবাদী অংশের বিরোধিতার মুখে পড়েন। এ কারণে অনেক নেতা–কর্মী যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিলে ভারত রণকৌশল হিসেবে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি সই করে। এর আগেই অবশ্য বিচক্ষণ তাজউদ্দীন মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় রূপ দিতে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন এবং বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধিদলেও বামপন্থীদের যুক্ত করেন।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে যে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন ছিল, সেটি অনেকটাই অনুপস্থিত ছিল। এর জন্য আওয়ামী লীগের একদেশদর্শী নীতি বেশি দায়ী, না বামপন্থীদের হঠকারিতা—তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। সেই সময়ে প্রধান বিরোধী দল ন্যাপ কিংবা সিপিবির কাছ থেকেও মানুষ ভিন্ন ভূমিকা আশা করেছিল। আগ বাড়িয়ে সব বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতার নীতি না নিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নিতে পারলে হয়তো তারাই সত্যিকার বিরোধী দল হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু সেটি তারা করতে পারেনি বলেই শূন্যস্থানটি পূরণ করে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আসা জাসদ। রুশ-ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়ে দলটি রাজনীতি শুরু করলেও তাদের আসল খুঁটি কোথায় ছিল তা এখনো রহস্যাবৃত। বাহাত্তরে তারা যাকে ‘চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক’ বলে অভিহিত করেছিল, ২০০৮ সালে তাদের সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধে দলের একাংশ।
পঁচাত্তরের আগের ও পরের রাজনীতিতে একটি বড় ফারাক আছে। পঁচাত্তর–পূর্ববর্তী রাজনীতিতে বিরোধী দলগুলোর নালিশ ছিল: আওয়ামী লীগ চার মূল নীতি, বিশেষ করে সমাজতন্ত্র কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। অতএব প্রকৃত সমাজতন্ত্র ও খাঁটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র করতে হলে ক্ষমতার পরিবর্তন জরুরি। আর পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীরা পাল্লা দিয়ে ডানেই হাঁটছেন। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের ফারাকটাও কমে যাচ্ছে। সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী বহাল রেখে যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়া যায় না তা রাজনীতির অ আ ক খ পড়া বালকটিও বোঝে। তবে এর দায় বামপন্থীরাও এড়াতে পারেন না। বামেরা শক্তিশালী হলে এবং ক্ষমতার সঙ্গে লীন না হয়ে গেলে আওয়ামী লীগ যেকোনো নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তাদের কথা ভাবত। এখন ভাবে, ডান দিক থেকে চাপ আসবে কি না। এটি আওয়ামী লীগের জন্য যেমন, তেমনি দেশের জন্যও বিপজ্জনক।
তবে বামপন্থীদের বর্তমানের ভগ্নদশা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা বিচার করা ভুল হবে। আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার আগে যে সমাজতন্ত্রমুখী কর্মসূচি নিয়েছিল কিংবা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ যে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল, তাতে বামপন্থীদের প্রভাবও অনস্বীকার্য। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ষাটের দশকে বামপন্থীরা মস্কো-বেইজিং বিরোধে দ্বিখণ্ডিত না হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ভিন্নও হতে পারত।
যদি এবং কিন্তু দিয়ে ইতিহাস হয় না। তাই ইতিহাসে যার যা ভূমিকা, সেটুকু স্বীকার করতে হবে। তাতে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির কৃতিত্ব খর্ব হবে না, বরং ঔদার্য প্রকাশ পাবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনাই ছিল সবাইকে নিয়ে পথচলা। স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুক্তির জন্য কাজ করা। কিন্তু বাম-মধ্য সবাই সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ডানের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। উপেক্ষিত হয়েছে আমজনতার স্বার্থ।
অসুস্থ হওয়ার আগে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে টেলিফোনে কথা হতো। দেশ, সাধারণ মানুষের সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতি–প্রকৃতি নিয়েই তিনি বেশি কথা বলতেন। তাঁর মতে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হেলও সমাজতন্ত্রের আবেদন শেষ হয়নি। নতুন আঙ্গিকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। পৃথিবী বদলাচ্ছে, বাংলাদেশও বদলাবে। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রাজনীতির দুরবস্থা কেন? তিনি বলেছিলেন, রাজনীতি পেশাও নয়, ব্যবসাও নয়। রাজনীতি হলো একটি অঙ্গীকার, যার মূল লক্ষ্য জনসেবা। রাজনীতির ভিত্তি হবে নিজের দেশকে ভালোবাসা, গরিব মানুষের স্বার্থরক্ষা করা।
মোজাফফর আহমদের এই উপলব্ধি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাবে কি না, সে প্রশ্নের জবাব ভবিষ্যৎই দেবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
তনুর ভাইয়েরা by রোকেয়া রহমান
আজ প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে এক বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধনের ছবি ছাপা হয়েছে। ছবিতে বিক্ষোভকারীদের হাতে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘আমরা সবাই তনুর ভাই, তনু হত্যার বিচার চাই’। তনুর ভাইয়েরা আজ তাঁর বিচারের দাবিতে সরব হয়েছেন। এটা আশার কথা। কিন্তু যে বা যারা তনুকে হত্যা করেছে, সে বা তারা কারও না কারও ভাই। তাদের হাত একটুও কাঁপেনি তনুকে হত্যা করতে। এই ভাইয়েরা জানে না নারীদের সম্মান করতে, এই ভাইদের কাছে নারীরা ভোগের বস্তু, নারীদের সঙ্গে যা খুশি তা করা যায়। এই ভাইদের কাছে কোনো নারীই নিরাপদ নয়।
এই যেমন গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামে এমনই এক ‘ভাই’ একজন নারী চিকিৎসকের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। এই ভাইটি একজন অটোরিকশাচালক। আজ প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠার খবরে প্রকাশ, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ওই নারী চিকিৎসক চট্টগ্রামের পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকা থেকে অটোরিকশা করে কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকার বাসায় ফিরছিলেন। ষোলোশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় পৌঁছানোর পর সেখানে যানজট থাকায় চালক ভাইটি বিকল্প পথে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন। এরপর একটি নির্জন স্থানে অটোরিকশা থামিয়ে চিকিৎসকের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। কিন্তু চিকিৎসকের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে চালক ‘ভাইটির’ অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ হতে পারেনি। এই অটোরিকশাচালক ‘ভাইয়ের’ কাছে ওই চিকিৎসক কেবলই একজন রক্তমাংসের নারী। যাঁকে উত্ত্যক্ত করা যায়, ভোগ করা যায়। নারীর পদমর্যাদা, তাঁর পেশা, তাঁর সামাজিক অবস্থান এগুলো তার কাছে বিবেচ্য নয়। এসব ভাইদের কাছে নারীরা কী করে নিরাপদ থাকবেন? এই চিকিৎসক চিৎকার দিয়ে বেঁচেছেন। তনুও হয়তো বাঁচার জন্য চিৎকার দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই চিৎকার কেউ শুনতে পায়নি। মানুষরূপী হায়েনা বা হায়েনারা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
সমাজে এখন এমন ‘ভাইয়ের’ কোনো অভাব নেই। প্রায় দিনই আমরা তাদের অপকর্মের খবর শুনতে পাই। দেশে আইন রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে। সবার নাকের ডগায় আমাদের মহান ভাইয়েরা সোল্লাসে ভয়ংকর সব অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কেউ যেন এদের প্রতিরোধ করতে পারছে না। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু গত ৩১ জানুয়ারি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক ভালো। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি মন্ত্রীর এই কথাকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না।
এই লেখাটা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত তনুর হত্যাকারীদের কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। এমন তো কতই ঘটেছে যে ভয়ংকর সব অপরাধ করেও অপরাধীরা পার পেয়ে গেছে। তাই ভয় হয়, তনুর হত্যাকারীরা ধরা পড়বে তো! আজ যে ভাইয়েরা তনু হত্যার বিচার দাবিতে সরব হয়েছেন, তাঁদের শতকোটি স্যালুট জানাই। এই ভাইয়েরা বিক্ষোভ মিছিল করছেন, মানববন্ধন করছেন, সড়কে শুয়ে পড়ছেন, মোমবাতি প্রজ্বালন করছেন। তাঁদের আজ একটাই দাবি, তনুর হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। তনুর ভাইদের এ দাবি পূরণ হোক-এই আমাদের একান্ত চাওয়া।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
জাতীয় মহিলা দাবা
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হোক by জেফরি ডি স্যাকস ও হানা স্যাকস
৫৭ বছর আগে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবার বিপ্লব ছিল মার্কিন মনস্তত্ত্বের প্রতি বড় ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই এর নেতারা দাবি করছেন, এই দেশটি ব্যতিক্রম। আর মার্কিন মডেল এতই ভালো যে পৃথিবীর প্রতিটি শিষ্টাচারসম্পন্ন দেশ তার নজির অনুসরণ করবে। কোনো বিদেশি রাষ্ট্র যদি তাকে অনুসরণ না করার মতো বোকামি করে, তাহলে মার্কিন স্বার্থের হানি করার জন্য তাকে উচিত শাস্তি পেতে হবে, যার কারণে মার্কিন নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়তে পারে।
হাভানা যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে, ফলে কিউবার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই মাথা ঘামিয়ে আসছে। সেই ১৮২০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘প্রথম সুযোগেই কিউবা অধিগ্রহণ করতে হবে’। শেষ পর্যন্ত ১৮৯৮ সালে তারা সেটা করেও ফেলে। সেবার তারা স্পেনের বিরুদ্ধে কিউবার বিদ্রোহে হস্তক্ষেপ করে, সেখানে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে।
এর ফলে যে যুদ্ধ লাগে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র গুয়ানতানামো দখল করে নৌঘাঁটি স্থাপন করে। ফলে তারা ভবিষ্যতেও কিউবার ব্যাপারে নাক গলানোর অধিকারের ভিত স্থাপন করে। এরপর মার্কিন মেরিন সেনারা বারবার কিউবা দখল করে সেখানকার লাভজনক চিনিশিল্পের মালিকানা নিয়ে নেয়, আসলে এটাই ছিল মার্কিন দখলদারির উদ্দেশ্য। এরপর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নিপীড়ক ও তাঁবেদার সরকার বসায়, যার সর্বশেষ প্রতিনিধি ছিলেন বাতিস্তা, ফিদেল কাস্ত্রো যাঁকে উৎখাত করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে নিজের করতলে রেখেছিল। আর মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে দেশটির রপ্তানি শিল্প স্রেফ চিনি ও তামাকের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে। ২০ শতকের শুরুর দিকে ব্যাপারটা এমনই ছিল। বাতিস্তাকে উৎখাত করে কাস্ত্রো যে বিপ্লব করলেন, তার লক্ষ্য ছিল একটি আধুনিক ও বহুমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা। কিন্তু তাঁদের পরিষ্কার কৌশল না থাকায় এই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
কাস্ত্রোর কৃষি সংস্কার ও জাতীয়করণ শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক হয়ে যায়। চিনির ব্যবসা হুমকির মধ্যে পড়তে পারে, সে কারণে তারা নতুন বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে কিউবার চিনি রপ্তানির পরিমাণ কমে যায়, আর কিউবাতে মার্কিন তেল ও খাদ্য রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়। তখন কাস্ত্রো সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বারস্থ হলে আইজেনহাওয়ার সিআইএকে এক গোপন নির্দেশ দেন, কিউবার নতুন সরকারকে উৎখাত করতে হবে। ফলে ১৯৬১ সালে জন এফ কেনেডির প্রশাসনের শুরুর দিকে বে অব পিগস হামলা হয়, যার পরিণতি হয়েছিল বিপর্যয়কর।
পরবর্তীকালে কাস্ত্রোকে হত্যা করার জন্য সিআইএকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। ১৯৬২ সালে রুশ নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ আরেকটি মার্কিন অভিযান বন্ধ করে তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য গোপনে কিউবায় একটি পরমাণু অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করেন, ফলে সেই ক্ষেপণাস্ত্র সংকট সৃষ্টি হয়। যার কারণে পারমাণবিক যুদ্ধে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
তবে কেনেডি ও ক্রুশ্চেভের অসাধারণ সংযমের কারণে মানবতা বেঁচে যায়।
সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়, আর যুক্তরাষ্ট্রও প্রতিশ্রুতি দেয়, তারা আর আক্রমণ করবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এর বদলে কিউবার ওপর বাণিজ্য অবরোধ দ্বিগুণ করে দেয়, আর কিউবাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের কোলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে। কিউবার চিনি চাষ বহাল থাকল, কিন্তু তার গন্তব্য হলো সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র নয়।
আধা শতক ধরে সোভিয়েত স্টাইলের অর্থনীতি ও মার্কিন বাণিজ্য অবরোধের কারণে কিউবাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ক্রয়ক্ষমতার বিচারে কিউবার মাথাপিছু আয় দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এক-পঞ্চমাংশ। তারপরও শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যে কিউবা যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে। কিউবার মানুষের গড় আয়ু যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের গড় আয়ুর সমান, যা লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেকটাই বেশি। অন্যদিকে কিউবার চিকিৎসকেরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকার রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার মাধ্যমে মার্কিন-কিউবা সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র তার সেই পুরোনো বাজে পন্থায় ফেরত গেল, তারা অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিনিময়ে চাইছে কিউবা যেন কঠোর নীতি গ্রহণ করে। যেমন বলা যায়, কংগ্রেস হয়তো দাবি করবে, মানুষকে সম্পত্তির মালিকানা ফেরত দিতে হবে, বিপ্লবের সময় যা জাতীয়করণ করা হয়েছিল। এমনকি তারা হয়তো বলবে, মার্কিনদের কিউবার জমি ও সম্পত্তি কেনার অবাধ অধিকার দিতে হবে, পানির দামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিতে হবে এবং জনস্বাস্থ্যের মতো প্রগতিশীল সামাজিক নীতির অবসান ঘটাতে হবে। ব্যাপারটা খুবই কদর্য হতে পারে।
দ্বিতীয় চিত্রটি এমন হতে পারে যাতে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের ব্যত্যয় ঘটাবে, তারা হয়তো আত্মসংযমী হবে। কংগ্রেস হয়তো কিউবার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করবে, কিন্তু তার জন্য শর্ত দেবে না যে তাকে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কিউবাকে হয়তো রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্য খাতকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হবে না, এই খাতকে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য ছেড়ে দিতে বলা হবে না। কিউবার নাগরিকেরা এমন একটা শ্রদ্ধাশীল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আবার নতুন অধীনতার আশঙ্কায় ক্রোধান্বিতও হচ্ছে।
এটা বলছি না যে কিউবা ধীরে ধীরে সংস্কার প্রক্রিয়া জারি রাখুক। কিউবাকে দ্রুত তার মুদ্রা বাণিজ্যের জন্য রূপান্তরযোগ্য করতে হবে, সম্পত্তির অধিকার সম্প্রসারিত করতে হবে, আর কিছু প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি (যথেষ্ট স্বচ্ছতা ও যত্নের সঙ্গে) করতে হবে।
এ ধরনের বাজারভিত্তিক সংস্কারের সঙ্গে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ হলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, অর্থনীতি বহুমুখী হবে, যা একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবায় কিউবার অর্জন ধরে রাখবে। কিউবার উচিত হবে, কোস্টারিকার আদলে সামাজিক গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের মতো এ রকম স্থূল পুঁজিবাদের দিকে নয় (প্রথম লেখক মনে করেন, ২৫ বছর আগে পোল্যান্ডেরও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ধাঁচের সামাজিক-গণতন্ত্রের দিকে যাওয়া উচিত ছিল, রোনাল্ড রিগ্যান ও মার্গারেট থ্যাচারের ঘরানার নব্য উদার নীতিবাদের দিকে নয়)।
ফলে এই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ব্যাপারটা দুই দেশের জন্যই পরীক্ষা। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে কিউবাকে যথেষ্ট সংস্কার করতে হবে, তবে সেটা তার মহান সামাজিক অর্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই। যুক্তরাষ্ট্রকে অভূতপূর্ব সংযম দেখাতে হবে, যেটা হয়তো ঠিক তার সঙ্গে যায় না। কিউবাকে তার যথেষ্ট সময় ও সুযোগ দিতে হবে, যাতে সে একটি আধুনিক ও বহুমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে, যার মালিকানা থাকতে হবে কিউবার জনগণের হাতেই, তাদের উত্তরের প্রতিবেশীদের হাতে নয়।
![]() |
| জেফরি ডি স্যাকস ও হানা স্যাকস |
জেফরি ডি স্যাকস: কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইনস্টিটিউটের পরিচালক।
হানা স্যাকস: ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে কিউবার ইতিহাস অধ্যয়নরত।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন মেহবুবা
![]() |
| মেহবুবা মুফতি |
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
তুরস্কে দুই সাংবাদিকের বিচার হবে রুদ্ধদ্বারে
![]() |
| কান দুন্দার |
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1331)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
-
▼
2016
(3416)
-
▼
March
(214)
-
▼
Mar 26
(8)
- চাই সবার জন্য স্বাধীনতা by আবুল মোমেন
- ভোটারদের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দিন by মিজা...
- অধ্যাপক মোজাফফর, বামপন্থা ও স্বাধীনতা by সোহরাব ...
- তনুর ভাইয়েরা by রোকেয়া রহমান
- জাতীয় মহিলা দাবা
- যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত ...
- জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন মেহ...
- তুরস্কে দুই সাংবাদিকের বিচার হবে রুদ্ধদ্বারে
-
▼
Mar 26
(8)
-
▼
March
(214)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







