Showing posts with label ছিনতাই. Show all posts
Showing posts with label ছিনতাই. Show all posts

Saturday, October 18, 2025

ছিনতাই ও মাদক মামলায় জামিন: আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি

ঢাকা মহানগরীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কোনোভাবেই কাটছে না। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাকে এই উদ্বেগ না কাটার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মধ্যে একটি ছিনতাইসংক্রান্ত এবং অন্যটি মাদকসংক্রান্ত।

প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ছিনতাইয়ের অভিযোগে যাঁরা আটক হয়েছিলেন, গত তিন মাসে তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ১০৮ জন আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন মাদক পাচারকারীকে আটকের পর মাত্র ৩১ ঘণ্টার মধ্যে তিনি জামিন পেয়েছেন। এ দুটি ঘটনাই আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

ছিনতাই রাজধানীবাসীর জন্য একটি অব্যাহত ভয়ের নাম। বাসে, রাস্তায়, এমনকি বাড়ির আশপাশেও মানুষ এখন নিরাপদ বোধ করে না। পুলিশ প্রায় প্রতিদিনই এসব অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের খবর দেয়।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আদালতের দরজা পেরোতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা খুব সহজে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। ফলে গ্রেপ্তার হওয়া ও দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়ার এক অদ্ভুত চক্র তৈরি হয়েছে। এই চক্র আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

অপর দিকে মাদক দেশের সামাজিক কাঠামোকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সমাজের তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এই অভিশাপে। অথচ একজন মাদক পাচারকারী গ্রেপ্তারের মাত্র ৩১ ঘণ্টার মাথায় জামিন পেলেন—এ খবর জনমনে নানা রকম প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মাদক মামলায় জামিন এত দ্রুত মঞ্জুর হওয়া কি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি এর পেছনে কোনো বিশেষ মহলের প্রভাব রয়েছে—এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না।

বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনি অধিকার রক্ষা করা নিশ্চয়ই জরুরি বিষয়। তবে একই সঙ্গে জননিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারপ্রক্রিয়ায় যদি অপরাধীদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করা হয়, তবে তাঁরা আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াবেন—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

এ রকম বহু উদাহরণ আছে, যেখানে জামিনে মুক্ত আসামিরা আবারও একই অপরাধে ধরা পড়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থা যদি অপরাধীদের প্রতি এমন নমনীয়তা প্রদর্শন করে, তবে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হবেন। এর মানে জনগণকে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে আর অপরাধীরা পাচ্ছেন পুনরায় অপরাধ করার সুযোগ।

এই পরিস্থিতিতে সরকার, আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জামিন প্রক্রিয়ায় আরও কড়াকড়ি আরোপ করা জরুরি, বিশেষ করে ছিনতাই ও মাদক মামলার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং, জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের কার্যকলাপের ওপর নজরদারি এবং প্রয়োজনে জামিন বাতিলের প্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকর করতে হবে।

এ ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে হবে, যাতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের কোনো রকম সুবিধা না দেয়। মামলার তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা হলে বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং আদালতের সিদ্ধান্তে আস্থা তৈরি হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া জরুরি।

ঢাকার মতো জনবহুল শহরে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কিন্তু অপরাধীরা যদি গ্রেপ্তারের পরপরই মুক্তি পেতে থাকেন, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। এসব ঘটনা শুধু রাজধানীর নিরাপত্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং সমগ্র বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকে নষ্ট করছে।

এখন সময় এসেছে বিচারব্যবস্থার ফাঁকফোকর চিহ্নিত করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। তা না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা ভয়াবহ সংকটে রূপ নেবে। এ সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আদালত ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

Tuesday, May 27, 2025

দুই ছিনতাইয়ের ভিডিও ভাইরাল: ভুক্তভোগী তরুণের মুখে ভয়াবহ বর্ণনা by ফাহিমা আক্তার সুমি

হঠাৎ তিন ব্যক্তি আমাকে ঘিরে ধরে। তারমধ্যে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেল থেকে নেমে কোনো কথা না বলে আমাকে মারধর ও চাপাতি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। আমার কাছে থাকা ব্যাগ, মোবাইল-নগদ টাকা কেড়ে নেয়। চাপাতি দিয়ে চার-পাঁচটা কোপ দেয়। আমার পেট, কব্জি, পাসহ শরীরের আরও কয়েকটি জায়গায় আঘাত লাগে। ওদের অনেক আকুতি-মিনতি করেছিলাম কিন্তু ওরা আমার কোনো কিছু ফিরিয়ে দেয়নি। ভয়-আতঙ্ক নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন আবদুল্লাহ নামে এক তরুণ। তিনি পল্টনের একটি রেস্তরাঁয় কাজ করেন। ১৯শে মে সকালে রাজধানীর মগবাজারের গ্রিনওয়ে গলিতে ছিনতাইয়ের শিকার হন তিনি। এদিন আবদুল্লাহ গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা করেন তিনি।

ভুক্তভোগী এই তরুণ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মানবজমিনকে বলেন, ঘটনার দিন আমি সকাল পাঁচটায় বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে নয়াটোলা ভাড়া বাসা থেকে বের হই। বাসের জন্য হেঁটে মগবাজার পর্যন্ত গিয়েছিলাম। মগবাজার গ্রিনওয়ে গলিতে আসা মাত্রই মোটরসাইকেলযোগে তিন ব্যক্তি এসে আমাকে ঘিরে ধরে। দু’জন নেমে আমার ব্যাগ টানতে থাকে এবং মারধর করে। ওই দুই ব্যক্তির হাতে থাকা ধারালো চাপাতি দিয়ে চার-পাঁচটা কোপ দেয়। পরে আমার কাছে থাকা নগদ টাকা-মোবাইল কেড়ে নেয়। আমি জিনিসগুলো দেয়ার জন্য ওদের কাছে আকুতি-মিনতি করেছিলাম কিন্তু ওরা দেয়নি উল্টা আরও আঘাত করে চাপাতি দিয়ে। হাতের কব্জির মধ্যে, পেটে, ডান পায়েসহ শরীরের আরও কয়েকটি জায়গায় আঘাত লাগে। খুব বেশি কেটে যায়নি কিন্তু বেশ ব্যথা শরীর জুড়ে। সে সময় যতটা পেরেছি নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।

তিনি আরও বলেন, ঘটনাটি ঘটে ভোর ৫টা ২১ মিনিটের দিকে। প্রায় নগদ ১৪ হাজার টাকা ছিল আমার কাছে। চাপাতি দিয়ে অনেক জোরেই কোপ দিয়েছিল। সে সময় যেমন ভয় পেয়েছি তেমন খুব চিন্তা হচ্ছিলো পরিবারের কথা ভেবে। এখনো আমার ভেতর থেকে ভয় আর আতঙ্ক কাটছে না। শুধু ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভাসছে। আবদুল্লাহ বলেন, ঘটনার সময় আশপাশে কয়েকজন ব্যক্তি ছিলেন কিন্তু ভয়ে সবাই দৌড়ে চলে যায়, কেউ আমাকে সাহায্য করতে আসেনি। আবার তখন বেশি চিৎকারও করিনি; কারণ চিৎকার করলে আমার উপরে আরও বেশি আক্রমণ করবে সেজন্য। আমার জীবনে এই প্রথম এইরকম ভয়াবহ ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। এমন ঘটনা ঘটবে কখনো বুঝতে পারিনি। অনেক বড় বিপদের মুখ থেকে সৃষ্টিকর্তা আমাকে বাঁচিয়েছেন।

এ ঘটনার একটি ভিডিও রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আবদুল্লাহ। মোটরসাইকেলে চালকসহ তিনজন আরোহী ছিলেন। দুইজন আরোহী অবদুল্লাহর পথ আটকায়। তাদের একজনের মাথায় হেলমেট ও আরেকজনের মুখে মাস্ক পরা ছিল। দুজনের হাতে থাকা চাপাতি দিয়ে এই তরুণকে আঘাত করে কাছে থাকা জিনিসপত্র কেড়ে নেয়।

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাজু মানবজমিনকে বলেন, এ ঘটনায় রোববার রাতে একটি মামলা করেন ভুক্তভোগী আবদুল্লাহ। তিনি ঘটনার দিন গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন। এ ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

এদিকে ঢাকার পল্লবী মেট্রো স্টেশনের নিচে ফুটপাথে আরেকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ধস্তাধস্তি করে অস্ত্রের মুখে এক তরুণের ফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। ভিডিওতে দেখা যায়, পল্লবী মেট্রো স্টেশনের নিচে ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। তার কাঁধে ব্যাগ ছিল। তার পেছনে আসছিলেন তিনজন। এরমধ্যে একজন সামনের দিকে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনজন তার গতি রোধ করে। পরবর্তীতে ছিনতাইকারীরা ধস্তাধস্তি করে ভুক্তভোগী তরুণের কাছে থাকা মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এসময় ছিনতাইকারীদের মধ্যে একজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। জানা যায়, ভুক্তভোগী ব্যক্তির নাম আল-আমিন রানা। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। রাজধানীর পল্লবী এলাকায় থাকেন। ঘটনাটি ২৪শে মে রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ঘটে।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিউল আলম মানবজমিনকে বলেন, ঘটনাটি সত্য। এ ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি এখনো। ঘটনাটি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি।

Thursday, May 8, 2025

চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে শিক্ষার্থীকে ফেলে দিলো ছিনতাইকারীরা

রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে আফতাব আহমেদ (২০) নামে এক তরুণকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে ছিনতাইকারীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি ঢামেকের নিউরো সার্জারি বিভাগের ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহত এই তরুণ উত্তরা ইউনাইটেড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মঙ্গলবার রাতে ঘটনাটি ঘটে।

আফতাবের বাবা আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, গতকাল বিকালে আফতাব দক্ষিণখান আশকোনার বাসা থেকে গোপীবাগে এক আত্মীয়ের বাসায় যান। রাতে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনের ছাদে উঠে বিমানবন্দর রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। রাত ৯টার দিকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ট্রেনের ছাদে অবস্থানকারী তিন-চার ছিনতাইকারী আফতাবকে ঘিরে ধরে মারধর করে এবং সঙ্গে থাকা ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এরপর তারা আফতাবকে ট্রেনের ছাদ থেকে নিচে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। তিনি বলেন, আহত অবস্থায় আফতাবকে পথচারীরা প্রথমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আফতাবের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। তিনি বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে দক্ষিণখান আশকোনা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক বলেন, আফতাবের মাথায় আঘাত লেগেছে। তার শরীরের কয়েকটি স্থানেও জখম ছিল।

mzamin

Tuesday, April 29, 2025

বাইক-গাড়িতে ভয়ঙ্কর ছিনতাইকারী by শুভ্র দেব ও ফাহিমা আক্তার সুমি

ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া তৎপরতায় ঢাকার সড়কে চলাচল দিন দিন আরও বেশি আতঙ্কের হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ে নগরবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যে এখন সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বের হতে ভয় পান অনেকে। আর মধ্যরাত ও ভোরবেলা খুব বেশি জরুরি কাজ না থাকলে কেউ বের হন না। ঢাকায় ছিনতাই এতটাই বেড়েছে যা বিগত দিনের তুলনায় বেশি। যদিও ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই মামলা করতে চান না। ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে ছুরিকাঘাতে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত হওয়ার সংখ্যাও অহরহ। বেপরোয়া ছিনতাইকারীরা এখন অনেকটা ভিআইপি স্টাইলে ছিনতাই করছে। তারা প্রাইভেট ও মোটরসাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে ছিনতাই করে। চাপাতি, ছুরি ও আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি প্রাইভেটকারের জানালা থেকে টান দিয়েও ছিনতাই করে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।

শনিবার ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকার গ্রিনল্যান্ড টাওয়ারের সামনে প্রাইভেটকারের জানালা খুলে এক নারীর ভ্যানিটি ব্যাগসহ ওই নারীকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রাস্তার পাশে শাড়ি পরা ওই নারী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার হাতে ছিল একটি ভ্যানিটি ব্যাগ, পাশে একটি ট্রলি ব্যাগ। গাজীপুরে একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। হঠাৎ সাদা রঙের একটি প্রাইভেটকার এসে থামে তার সামনে। ঠিক তখনি সাদা প্রাইভেটকারের জানালা খুলে এক ব্যক্তি ঝাঁপিয়ে পড়ে নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে। কিন্তু ব্যাগ না ছাড়ায় মুহূর্তেই রাস্তায় পড়ে যান ওই নারী। ব্যাগের সঙ্গে সঙ্গে তাকেও টেনে নিয়ে যেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। একপর্যায়ে ছিনতাইকারীদের গাড়ি চলে যায়।

রাস্তায় পড়ে আর্ত চিৎকার করছিলেন ওই নারী। তার চিৎকারে আশপাশে থাকা লোকজন ওই নারীকে উদ্ধারে ছুটে আসেন। ব্যস্ত সড়কে এই ছিনতাইয়ের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ওই নারী গুরুতর শারীরিক আঘাত  পেয়েছেন। তার অবস্থা সংকটমুক্ত হলেও মানসিকভাবে চরম আঘাত পেয়েছেন। রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় ইস্ট-ওয়েস্ট স্কুলের পাশের গলিতে ১৮ই এপ্রিল ভোররাতে চাপাতি ঠেকিয়ে এক তরুণীর কাছ থেকে রুপার চেইন ও ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা।  মোটরসাইকেলে করে ওই ছিনতাইকারী ছিনতাই করে চলে যায়। এ ঘটনার ভিডিওচিত্র ছড়ানোর পর পুলিশ তৎপর হয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৫১টি, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেশি। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ১লা জানুয়ারি থেকে ৮ই মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে ছিনতাইয়ের (দস্যুতা) ৩২০টি মামলায় ৮৫২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চ পর্যন্ত আড়াই মাসে রাজধানীতে ছিনতাই, ডাকাতি ও দস্যুতার মামলায় গ্রেপ্তার অন্তত ১৫০ জন জামিন পেয়েছেন।

গত ২১শে এপ্রিল রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ‘ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে’ মো. আরমান হোসেন (২২) নামের এক তরুণ নিহত হন। পরিবারের দাবি, ছিনতাইয়ে বাধা দেয়ায় তাকে হত্যা করা হয়। আদালত সূত্র জানায়, এর আগে গত আগস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে ছিনতাইকারীর হাতে সাতজন খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার মাতুয়াইল বাজার এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে কাউসার (২৫) নামে এক যুবক নিহত হন। তিনি একটি মশার কয়েল স্ট্যান্ডের কারখানায় কাজ করতেন।

ছিনতাইয়ের ৪৩২ হটস্পট: একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় ছিনতাইয়ের হটস্পটের সংখ্যা ৩৪২টি। এগুলোর মধ্যে তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় আছে ১০৮টি স্পট। শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও, শিল্পাঞ্চল এবং হাতিরঝিল থানা এলাকায় ২৫ স্পট। বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় রয়েছে ৯৫টি হটস্পট। গুলশান ও উত্তরা বিভাগে আছে ৯৪টি এবং মতিঝিল বিভাগে-৩০, ওয়ারীতে-৩৫, রমনা ও লালবাগ বিভাগে ৪৫টি হটস্পট। এসব স্পটে ছিনতাইয়ে সক্রিয় রয়েছে প্রায় ১২শ’ অপরাধী। এর মধ্যে মতিঝিল বিভাগ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২১২ জন, মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে সক্রিয় ৩৮৬, রমনা ও লালবাগ বিভাগে ২১৭, উত্তরা এবং গুলশান বিভাগে ১৫৪, মোহাম্মদপুর থানার আওতাধীন এলাকায় ২০৫ জন ছিনতাইকারী সক্রিয়ভাবে জড়িত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এসএন মো. নজরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনা খুবই কম। একটা-দু’টা ঘটছে সেগুলো আসামি ধরা পড়ছে। শেওড়াপাড়ার ঘটনায় আসামি গ্রেপ্তার ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। সিদ্ধেশ্বরীর ঘটনায় গাড়ি পাওয়া গেছে। মালিকানা কার নামে সেটি বের করার কাজ চলছে।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঘটনা বাড়লেও র‌্যাব আগে থেকেই সতর্ক। র‌্যাব’র ঢাকার ৫টি ব্যাটালিয়নের টহল টিম সার্বক্ষণিক রাস্তায় থাকে। প্রত্যেকটা ব্যাটালিয়নের অধীনে ৪টা করে টহল টিম শিডিউল করে দায়িত্ব পালন করে। মোহাম্মদপুর, বছিলা, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইকারীদের হাতেনাতে ধরেছি। তিনি বলেন, আমরা সবসময় ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রতিহত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। তবুও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। সিদ্ধেশ্বরীর ঘটনায়ও আমরা ছায়া তদন্ত করছি।

সিদ্ধেশ্বরীর ঘটনার সময় ওই ভবনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, আমি ঘটনার সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখি এমন ঘটনা। তখন রাস্তাঘাটে তেমন মানুষ ছিল না। তার শুধুমাত্র একটা চিৎকার শুনতে পাই- এসময় আমিও  পেছন পেছন ছুটতে থাকি। বেশ কিছুদূরে এভাবে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। পরে আমরা সবাই এগিয়ে যাই। এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। এদের ঠেকাবে কে? কিছুদিন আগে আমার নিজেরই ক্যামেরা নিয়ে গেছে ছিনতাইকারীরা।

ঘটনাস্থলে থাকা সিদ্ধেশ্বরী কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ঘটনাটি যেভাবে ঘটতে দেখেছি ওই নারী তো মারাও যেতে পারতেন। আমরা কেউ রাস্তায় নিরাপদ না। ভিডিওটি দেখে এখনো ভয় কাটছে না, যেকোনো সময় আমাদের সঙ্গেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে। 

mzamin

Monday, April 28, 2025

চলন্ত কারে ছিনতাইকারী ছোঁ মেরে টান দিলো ব্যাগ: নারীর আর্তচিৎকারে কাঁপলো সিদ্ধেশ্বরী

শনিবার ভোর পৌনে পাঁচটা। ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকার গ্রিনল্যান্ড টাওয়ারের সামনের সবকিছু তখনো ঠিকঠাক ছিল। মানুষের চলাফেরা, যানবাহন চলাচল সবকিছু স্বাভাবিক। রাস্তার পাশে শাড়ি পরা একজন নারী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার হাতে ছিল একটি ভ্যানিটি ব্যাগ, পাশে একটি ট্রলি ব্যাগ। গাজীপুরে একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। হঠাৎ সাদা রঙের একটি প্রাইভেটকার এসে থামে তার সামনে। মুহূর্তেই ঘটে যায় ভয়ঙ্কর এক দৃশ্য।  যা ধরা পড়ে পাশের এক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে।

সাদা প্রাইভেট কারের জানালা খুলে এক ব্যক্তি ঝাঁপিয়ে পড়ে নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে। কিন্তু ব্যাগ না ছাড়ায় মুহূর্তেই রাস্তায় পড়ে যান ওই নারী। ব্যাগের সঙ্গে সঙ্গে তাকেও টেনে নিয়ে যেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। একপর্যায়ে ছিনতাইকারীদের গাড়ি চলে যায়। রাস্তায় পড়ে আর্তচিৎকার করছিলেন ওই নারী। তার চিৎকারে আশপাশে থাকা লোকজন ওই নারীকে উদ্ধারে ছুটে আসেন। ব্যস্ত সড়কে এই ছিনতাইয়ের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ভিডিওতে দেখা যায়, ছিনতাইয়ের মুহূর্তেই রাস্তায় পড়ে যান ওই নারী। টেনে-হিঁচড়ে তাকে নিয়ে চলে ছিনতাইকারীদের প্রাইভেটকারটি। পাশে থাকা ট্রলি ব্যাগটি যেখানে ছিল সেখানেই পড়ে থাকে। চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন দৌড়ে ছুটে আসেন। একজন ট্রলি ব্যাগের সামনে দাঁড়িয়ে যান, আর বাকি দু’জন এগিয়ে যান আহত নারীর দিকে। ৫০ সেকেন্ডের মাথায় আবারো ক্যামেরায় দেখা যায়, ওই নারী ফিরে এসে দাঁড়িয়ে আছেন, ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখে সহায়তার আশায় কথা বলছেন উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে। নিজের কনুইয়ের আঘাতের চিহ্ন দেখাচ্ছেন।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ওই নারী গুরুতর শারীরিক আঘাত পেয়েছেন। তবে, প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন তিনি। তার অবস্থা সংকটমুক্ত হলেও মানসিকভাবে চরম আঘাত পেয়েছেন। এরই মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে, তবে ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার তথ্য জানার পর তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার শিকার নারী গাজীপুরের একটি কলেজের শিক্ষক। তিনি সিদ্ধেশ্বরীর একটি বাসায় থাকেন। গাজীপুরের উদ্দেশ্যে তিনি বের হয়েছিলেন একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে। ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা  নেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পুলিশের নজরে এসেছে এবং তারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছেন। ইতিমধ্যে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। মামলা হয়নি, কারণ ভুক্তভোগী নারী এখনো পুলিশ স্টেশনে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দাখিল করেননি। তবে প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তিনি জানান, ঘটনার শিকার নারী আহত হওয়ার পর চিকিৎসা নিয়ে পরে প্রশিক্ষণে অংশ নেন।

এদিকে, এই ঘটনার পর থেকে রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিকরা। বিশেষত, নারীদের জন্য নিরাপত্তার বিষয়টি এখন বড় এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি শুধু ঘটনার তীব্রতা বাড়ায়নি, বরং সাধারণ মানুষের মনে ভয়ও সৃষ্টি করেছে। অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর একা পথে চলাচলকারী নারীরা।

ডিএমপি রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদ আলম বলেন, ঘটনাটি শনিবার ভোর পৌনে পাঁচটায় ঘটে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসার আগে আমরা বিষয়টি জানতে পারিনি। ভুক্তভোগী ওই নারী একজন শিক্ষিকা। হয়তো গাজীপুরের একটি ট্রেনিং সেন্টারে চার-পাঁচ মাস মেয়াদি একটি কোর্সে প্রশিক্ষণ করছেন। তিনি ঘটনাটি এখনো পর্যন্ত আমাদের জানাননি। আমরা ভুক্তভোগী ওই নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। তিনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমাদের কাজ করতে আরও সুবিধা হবে, তার ব্যাগে থাকা মোবাইল ও ব্যাংকের এটিএম কার্ডের মাধ্যমে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

mzamin

Saturday, April 19, 2025

চাপাতি ঠেকিয়ে রাজধানী জুড়ে ছিনতাই করতো চক্রটি

রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় ইস্ট ওয়েস্ট স্কুলের পাশের গলিতে ভোররাতে চাপাতি ঠেকিয়ে এক তরুণীর কাছ থেকে সোনার চেইন ও ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একজন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত আসামির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, চক্রটি শুধু মিরপুর এলাকায় নয়, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই করতো। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম ইমরান খান শাকিল ওরফে শাকিল। তার কাছ থেকে ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল মিরপুর মডেল থানায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর জোনের ডিসি মোহাম্মদ মাকছুদুর রহমান বলেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চাপাতির মুখে গলার চেইন ও ব্যাগসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনতাই করে নিয়ে যায় একটি চক্র। ভিডিওটির সূত্র ধরে আমরা ভুক্তভোগীকে খুঁজে বের করি। তার কাছ থেকে একটা অভিযোগ নিয়ে আমরা মামলাটি রুজু করি। বৃহস্পতিবার মামলাটি হওয়ার পর একটা টিম গঠন করে দেই। শুক্রবার ভোরে ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং মূল আসামি ইমরান খান শাকিল ওরফে শাকিলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে সঙ্গে থাকা অন্য দু’জন কারা ছিল তাদের নামও আমরা পেয়েছি। তাদের যত দ্রুত গ্রেপ্তার করা যায় সে বিষয়ে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। এ সময় শাকিলের কাছ থেকে ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, চাপাতি এবং ছিনিয়ে নেয়া ২ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা শুধু মিরপুর এলাকায় নয়, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই করে। মিরপুর এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা জানিয়ে তিনি বলেন, এই এলাকায় একসময় চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির প্রবণতা বেশি ছিল। ৫ই আগস্ট একটা পরিবর্তিত অবস্থার পর এসে আমরা এখানে যোগদান করি। আমরা যোগদানের পর আমাদের একটা থিম ছিল এ ধরনের অপরাধ যেন না হতে পারে। পূর্বে যারা এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করেছে তাদের একটা প্রোফাইল রেডি করি। সেই প্রোফাইল অনুযায়ী আমরা বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করি। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এটা আমাদের চলমান প্রক্রিয়া। আমরা চেষ্টা করছি পল্লবী এলাকায় মানুষ যেন শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে সেজন্য আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। মিরপুর এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো নজরদারি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থানে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন নামে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালাচ্ছি।

mzamin

Tuesday, October 29, 2024

মোহাম্মদপুরে অভিশপ্ত কালচার

ধারালো অস্ত্রের মুখে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে নারীসহ আরও ৩৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। গতকাল সকালে তাদের আদালতে চালান করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজন দেশীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারক রয়েছেন। যাদের কাছ থেকে ৪০টি ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হাসান বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে যে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসন করে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য মোহাম্মদপুর ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ পুলিশ বদ্ধ পরিকর। এরই প্রেক্ষিতে গত দুইদিন মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আমরা ৮১ জনকে আটক করেছি। এরমধ্যে রোববার ৪৭ জনকে আর সোমবার আরও ৩৪ জনকে আদালতে চালান করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মোহাম্মদপুরের শীর্ষ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আদম ব্যাপারি সেলিম, দুর্ধর্ষ রুহুল গ্যাংয়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইব্রাহিম, সাগরসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা রয়েছে। সেই তালিকায় একজন নারীও রয়েছেন। ওসি বলেন, যতদিন এই ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে নির্মূল না হবে ততদিন আমাদের অভিযান চলমান থাকবে।

রোববার মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে দেখা যায়, আগের দিন রাতভর চলা যৌথবাহিনীর অভিযানে  ৩৪ জনকে আটক করে নিয়ে আসা হয়েছে। তার মধ্যে নবোদয় হাউজিং এলাকার স্বামী-স্ত্রী আল আমিন ও রিয়াও রয়েছেন। রোববার সকালে আদালতে পাঠানোর জন্য ৩৩ জন পুরুষকে প্রিজনভ্যানে ওঠানো হলেও রিয়াকে নেয়া হয় আলাদা গাড়িতে। এ সময় রিয়া বলেন, নবোদয় হাউজিং এলাকায় আমাদের বাসা। স্বামীর সঙ্গে যৌথবাহিনীর সদস্যরা আমাকেও আটক করেছে। তিনি বলেন, আমি বা আমার স্বামী কিছুই করিনি। আমরা রাতে খাবার খেতে বের হয়েছিলাম। সেখান থেকেই আমাদের আটক করে নিয়ে আসা হয়। এ সময় প্রিজনভ্যানের মধ্য থেকে রিয়ার স্বামী চিল্লাইয়ে বলছিল- আমার স্ত্রী কিছু করেনি। আমাদের কাছ থেকে কিছুই পাইনি।

মোহাম্মদপুরের ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে গতকাল মোহাম্মদপুর থানায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) রুহুল কবির খান। ডিসি বলেন,  মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাং একটি অভিশপ্ত কালচার। ৫ই আগস্টের আগে থেকে এ কালচার বহুদিন ধরে চলমান ছিল। তবে কিশোর গ্যাং এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তারপরেও তাদের অস্তিত্ব ফেরাতে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা রাজনৈতিক মদতদাতাদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মোহাম্মদপুরে পুলিশ, র?্যাব ও সেনাবাহিনী জনগণের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে দিন-রাত কাজ করছে। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরের শের শাহ্‌ শুরি রোড থেকে দু’জন অস্ত্র বানানো কারিগরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে আমরা ৪০টি সামুরাই এবং বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করেছি। এ ছাড়া বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। তাদের কাছ থেকে ডাকাতির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়াও সম্প্রতি মোহাম্মদপুর হাউজিং লিমিটেড এলাকায় নেসলে কোম্পানির গাড়ি থামিয়ে ডাকাতির ঘটনায় জড়িত চারজনের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের একজন ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেছেন। মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় অপরাধ প্রতিরোধে এবং মোহাম্মদপুরবাসীর শান্তি-স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ বৃদ্ধি করার জন্য বিভিন্ন পেট্রোলিং, স্পেশাল অপারেশন ও ব্লক রেড দেয়া হচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

অপরদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে- গত ২ দিনের বিশেষ অভিযানে বেশ কিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ গ্রেপ্তার হওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মোহাম্মদপুরবাসীর মনে স্বস্তি ফিরে আসছে। সন্ত্রাস দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।

mzamin
মোহাম্মদপুরে অভিযানকালে গ্রেপ্তারকৃত ছিনতাইকারী চক্র -ছবি নিজস্ব

Sunday, October 27, 2024

মোহাম্মদপুরে সিরিজ ছিনতাই, আতঙ্ক by সুদীপ অধিকারী

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই অস্থির রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা। রাতে গণছিনতাইয়ের পাশাপাশি দিনের আলোতেও ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পথচারীদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়া হচ্ছে। ছাড় পাচ্ছেন না নারীরাও। চলন্ত গাড়ি ঠেকিয়ে অস্ত্রের মুখে লুটে নেয়া হয়েছে কোম্পানির লাখ লাখ টাকা। স্থানীয় মুদি দোকানের ভিতর ঢুকেও টাকা লুটে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। দিনে-রাতের এসব কর্মকাণ্ডে বসিলা, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান, বসিলা গার্ডেন সিটি, ৪০ ফিট, নবোদয় হাউজিংসহ এক আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে পুরো মোহাম্মদপুর এলাকা।

সম্প্রতি এমনই ছিনতাইয়ের কবলে পড়া নারীর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ৩৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটিতে  দেখা যায়,  কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। কালো রঙের হাফ প্যান্ট ও কালো শার্ট পড়া এক কিশোর দৌড়াতে দৌড়াতে তার মাজা থেকে ধারালো ছুরি বের করে ওই নারীর পথরোধ করে। পেছন থেকে আরও ৪ কিশোর নারীকে ঘিরে ধরে। তাদের মধ্যে কালো হাফ প্যান্ট-কালো গেঞ্জি পরা এক কিশোর হাতে বিশাল ছ্যান দাঁ নিয়ে মেয়েটির ব্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করে। চার-পাঁচ জন মিলে অস্ত্র নিয়ে ঘিরে ধরার পরও নারীটি তার  ব্যাগ বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে কালো শার্ট পরা ছেলেটি নারীর ওড়না ও ব্যাগ ধরে সজোরে টান দেয়। আরেকজন কোপ দেয়ার ভয় দেখায়। ইজ্জত ঢাকার ওড়না ও ব্যাগ নিয়ে নেয়ার পর নিজের জীবন বাঁচাতে একপর্যায়ে দৌড়ে স্থান ত্যাগ করেন ওই নারী।

ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিও’র ঘটনাটি গত ২১শে অক্টোবর সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মোহাম্মদপুর থানার নবোদয় হাউজিং এলাকার ডি ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের রোজ গার্ডেন নামের একটি ভবনের সামনে ঘটেছে। নিজের বাসার পাশেই সেদিন ভয়ঙ্কর ছিনতাইয়ের কবলে পড়েন ওই নারী। নাম প্রকাশে অনিচ্চুক ওই নারী ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী। গ্রামের বাড়ি দোহারে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের সুবিধার জন্য মোহাম্মদপুরে খালার বাসায় থাকেন। তিনি বলেন, ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য সেদিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বাসা থেকে বের হই। বাসার গেটের বাইরে বের হতেই কয়েকজন হাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে পেছন দিক থেকে এসে আমাকে ঘিরে ধরে। একপর্যায়ে ব্যাগ ধরে টানাহেঁচড়া শুরু করে। ব্যাগ দিতে না চাইলে তারা বড় বড় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমাকে কোপ দিতে যায়। আমি তখন ভীষণ ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু কোনোভাবেই আমার ব্যাগ ছাড়িনি। তারা বার বার বলছিল-ব্যাগ দিয়ে দে না হলে কোপ দেবো। এর মধ্যে একজন আমার গায়ের ওড়না ধরে টান দেয়। তখন ওড়নার সঙ্গে ব্যাগও রাস্তায় পড়ে যায়। আমি জীবন বাঁচাতে তখন বাসার দিকে দৌড় দেই। ওইদিনের ঘটনা আমি কখনো ভুলবো না। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর বড় বোন জান্নাতুল সুরভী বলেন, আমার বোন সেদিন অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। ছিনতাইকারীরা যেভাবে হামলা করেছে তাতে তার বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারতো। ওর ব্যাগে মোবাইল, টাকা, আইডিকার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাগজপত্র ছিল সব নিয়ে গেছে। ওর বুকের ওড়নাটা পর্যন্ত টান দিয়ে খুলে ফেলা হয়েছে। ওই ঘটনায় আমার বোন প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। সেদিনের পর থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। আমরা এর সঠিক বিচার চাই। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে সেদিন ওই শিক্ষার্থীকে অস্ত্র হাতে প্রথম গতিরোধ করে রতন। এরপর তার সঙ্গে যোগ দেয় নবোদয় হাউজিং বাজারের পাশের বস্তির শাওন, লিটকি, ইব্রাহিম (ইবু) ও শেখেরটেকের ফয়সাল। শুধু ওই নারীর কাছ থেকে ছিনতাই নয় মোহাম্মদপুর এলাকার আরও বেশ কয়েকটি ছিনতাই ও কুপিয়ে জখমের ঘটনায়ও তারা জড়িত।

এর আগের দিন ২০শে অক্টোবর সকাল পৌনে ১০টার দিকে মোহাম্মদপুর হাউজিং লিমিটেড এলাকায় দিনে-দুপুরে ফিল্মি স্টাইলে নেসলে কোম্পানির গাড়ি আটকিয়ে অস্ত্রের মুখে ১১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায় ৬ দুর্বৃত্ত। সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নেসলে’র মোহাম্মদপুরের এরিয়া অ্যাকাউন্ট্যান্ট মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সেদিন সকাল ৯টার দিকে কোম্পানির টাকা ব্যাংকে জমা দেয়ার জন্য গাড়িতে করে অফিস থেকে বের হই। যখন আমরা মোহাম্মদপুর হাউজিং লিমিটেড এলাকায় পৌঁছাই তখন রাস্তা ভাঙার কারণে আমাদের গাড়িটি কিছুটা ধীরগতিতে চলছিল। এরমধ্যে পেছন থেকে দু’টি মোটরসাইকেলে করে মোট ৬ জন ছিনতাইকারী এসে আমাদের গাড়ির লুকিং গ্লাস ভাঙচুর করে। এরপর তারা মোটরসাইকেল নিয়ে আমাদের গাড়ির সামনে চলে আসে। আমরা গাড়ি থামালে তারা চাপাতিসহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে গাড়ির সামনের গ্লাস ভাঙচুর শুরু করে এবং আমাদের কোপ দিতে যায়। তাদের কোপে আমি পড়ে গেলে তারা টাকার ব্যাগ নিয়ে নেয়। যাওয়ার সময় আমার পকেটে টাকা, মোবাইল যা ছিল তাও নিয়ে যায়। সাইফুল ইসলাম বলেন, সেদিন আমাদের কাছে থাকা ওই ব্যাগে অফিসের ১১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ও ১৭ হাজার টাকার একটি চেক ছিল। সম্পূর্ণ টাকা ও চেক নিয়ে চলে যায় ছিনতাইকারীরা।

১৯শে অক্টোবর বেলা সাড়ে ৩টায় বসিলা ৪০ ফিট সড়কে ছিনতাইয়ের শিকার হন খন্দকার রাফি ও তার সঙ্গে একই বাসায় থাকা আরও দুইজন। রাফি বলেন, সেদিন আমরা তিনজন রেস্টুরেন্ট থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে হেঁটে বাসায় আসছিলাম। হঠাৎ করে পেছন থেকে ৯/১০ জন অল্প বয়সী ছেলে আমাদেরকে ঘিরে ধরে। তাদের সকলের হাতেই বড় বড় ধারালো অস্ত্র ছিল। তারা আমাদের কাছে থাকা মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা সব কেড়ে নিয়ে চলে যায়। অস্ত্রের ভয়ে কিছুই বলার সাহস পাইনি তখন। মোহাম্মদপুরে একের পর এক খুন, ছিনতাইয়ের ঘটনা যেন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে গেছে।

মোহাম্মদপুরের ছিনতাইয়ের আরেকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কিছু লোক একটি মুদি দোকানে ঢুকে ধারালো অস্ত্রের মুখে দোকানিকে জিম্মি করে ক্যাশ বাক্সের সব টাকা নিয়ে যাচ্ছে। ঘটনাটি গত ২৪শে অক্টোবর মোহাম্মদপুর বসিলা ৪০ ফিট এলাকার। দোকানি জানান, আমি দোকানে বসে একজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম। এর মধ্যে আমার একটি ফোন কল আসে। ওই কল রিসিভ করতেই কয়েকজন যুবক মুখে মাস্ক পরে ধারালো অস্ত্র হাতে নিয়ে দোকানের ভেতর ঢুকে পড়ে। আমাকে মারধর করে দোকানের ক্যাশ বাক্স থেকে সব টাকা নিয়ে চলে যায়। জীবন বাঁচানোর ভয়ে সেদিন কিছুই বলতে পারিনি। অপরদিকে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত মোহাম্মদপুর এলাকায় অন্তত ৭ জনকে খুন করা হয়েছে। এর মধ্যে গুলিতে, ছুরিকাঘাতে ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আছে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, এলাকায় প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি চোর ধরতে গিয়েও ছুরিকাঘাতে রবিউল ইসলাম নামের ঢাকা উদ্যানের এক নৈশপ্রহরীকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিকার চেয়ে গতকাল বিকালে থানায় গিয়েছেন এলাকাটির সাধারণ ছাত্র-জনতা।

এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হাসান বলেন, গত কয়েকদিন মোহাম্মদপুরে বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ভিডিওগুলো দেখে আমি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও করেছি। কিন্তু তারা কোনো অভিযোগ বা মামলা দিতে চান না। তারপরও আমরা জড়িতদের শনাক্তে কাজ করছি। তিনি বলেন, আমার লোকবল কম। আমি দিনে ৪-৫ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারি না। বাকি সময়ের বেশিরভাগটা রাস্তাতেই কেটে যায়। আমাদের প্রত্যেকের ওয়ার্কিং আওয়ার বাড়িয়ে দিতে হয়েছে। আমরা প্রতিরোধমূলক সব রকম ব্যবস্থাই নিচ্ছি। টহল জোরদার করা হচ্ছে।

mzamin

Wednesday, October 23, 2024

ছিনতাই আতঙ্ক নগর জুড়ে by শুভ্র দেব

ছিনতাইকারীর রাজ্যে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি সন্ধ্যায়, রাতে ও ভোরেও ছিনতাই হচ্ছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির টাকা ছিনতাই, পথচারী, রিকশা আরোহী যাত্রীদের থামিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া গণপরিবহনে বসে থাকা যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল, ব্যাগ, ল্যাপটপসহ অন্যান্য মূল্যবান জিনিসও ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইকারীরা দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করছে। প্রকাশ্যে অটোরিকশা ছিনতাই, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের টাকা বহনকারী গাড়িতে অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রাণঘাতী ছিনতাইয়ের ঘটনাও রয়েছে অহরহ। এছাড়া ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে আহত হচ্ছেন শত শত মানুষ। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টসূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুলিশ বাহিনীতে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অবাধে গুলি করে মানুষ হত্যাসহ নানা কারণে পুলিশের উপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা চলে যায়। এতে করে জনগণের সঙ্গে পুলিশের একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ জনগণ থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, মালামাল লুট করাসহ পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। অনেক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে পুলিশের মনোবল ভেঙে যায়। স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড থেকে তারা দূরে চলে যায়। থানায় অগ্নিসংযোগ করার কারণে পুলিশের যানবাহন পুড়ে যায়। ওই সময় পুলিশের আইজিপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের পদবিতে পরিবর্তন আসে। ঢাকায় যারা দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ছিলেন তাদের ঢাকার বাইরে বিভিন্ন ইউনিটে বদলি করে দেয়া হয়। আর ঢাকায় যারা নতুন করে বদলি হয়ে এসেছেন তারা ডিএমপি’র কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বুঝে উঠতে সময় নিচ্ছেন। বদলির মধ্যে থাকার কারণে বিভিন্ন থানা পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিও কম। যানবাহন না থাকার কারণে পুলিশের টহল কার্যক্রম হচ্ছে না। এতে চোর- ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়েছে। টহল না থাকায় দেদারছে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে। পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, দেশে ১০ হাজারের বেশি ছিনতাইকারী ও ডাকাত রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে এদের সংখ্যা বেশি। ঢাকার ছিনতাইকারীদের নিয়ে গত বছর একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এতে বলা হয়, ডিএমপি’র সাসপেক্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেমের (এসআইভিএস) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ছয় হাজার ১৯৮ জন ছিনতাই ও ডাকাতিতে জড়িত। এর মধ্যে ছিনতাইকারী এক হাজার ৭৩৭ জন। ঢাকায় ছিনতাই ও ডাকাতি নিয়ন্ত্রণে এসআইভিএস’র তথ্য কাজে লাগিয়ে এই অপরাধীদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে। সূত্রগুলো বলছে, ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য বেশি গুলিস্তান, চানখাঁরপুল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকা, মালিবাগ রেলগেট, বাড্ডা, মগবাজার, শাহবাগ, জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, নিউ মার্কেট, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায়। পুলিশ মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছে, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ছিনতাইকারী ও ডাকাত রয়েছে তেজগাঁও এলাকায়। সবচেয়ে কম মিরপুর এলাকায়। সবচেয়ে বেশি ছিনতাইকারি ও ডাকাত রয়েছে শাহবাগ, ভাটারা ও শেরেবাংলানগর থানা এলাকায়। সবচেয়ে কম ছিনতাইকারী ও ডাকাতের নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে দক্ষিণখান, উত্তরখান ও উত্তরা-পূর্ব থানা এলাকায়।

ডিএমপি’র বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে কাজ করেন এমন কমকর্তারা বলছেন, ঢাকায় বেশির ভাগ ছিনতাই মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত। বিশেষ করে ভোরবেলা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনালে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা যাত্রীদের টার্গেট করে ছিনতাইকারীরা। যাত্রীরা যখন বাস ও ট্রেন থেকে নেমে রিকশা, সিএনজি ও পায়ে হেঁটে বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে চায় তখনই অন্ধকার বা আবছা অন্ধকারে যাত্রীদের টার্গেট করে ছিনতাইকারীরা। এছাড়া দিনের বেলা বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকের গ্রাহকদেরও টার্গেট করে তারা।

পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশে ছিনতাই রোধে রেঞ্জ পুলিশ, পুলিশ কমিশনার, র‌্যাবসহ সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছিনতাই প্রবণতা ঢাকায় বেশি হওয়াতে ঢাকার ৫০ থানা, ডিবিকে এ নিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছে ডিএমপি র‌্যাব সদরদপ্তর। পাশাপাশি র‌্যাব সদরদপ্তরও এ নিয়ে গুরুত্বসহকারে কাজ করছে। র‌্যাব’র যেসব ব্যাটালিয়ন ঢাকায় কাজ করছে তারা ঢাকার কোন কোন স্থানে বেশি ছিনতাই এবং অন্যান্য অপরাধ বেশি হয় তার একটি ম্যাপ তৈরি করছেন। সে অনুযায়ী তারা ছিনতাইকারী ধরতে পরবর্তী ব্যবস্থা নিবেন। ডিএমপি জানিয়েছে, ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে। ঢাকার প্রতিটি থানার ওসিদের এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। ছিনতাই-ডাকাতি প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুুযায়ী ডিএমপি’র আটটি অপরাধ বিভাগের (ক্রাইম) প্রতিটি এলাকায় প্রতিদিন রাত ৮টার পর থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত এই বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। ডিএমপি’র উপ-কমিশনাররা (ডিসি) অভিযান তদারকি করছেন। যে এলাকায় ছিনতাই-ডাকাতি হবে সেই এলাকার ওসিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শুধু যে ছিনতাই হচ্ছে তা নয়; পুলিশ বিভিন্ন ছিনতাইয়ের ঘটনায় ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারও করছে। বৃহস্পতিবার ভোরে ধানমণ্ডির রাপা প্লাজার সামনে অভিযান চালিয়ে তিন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে দু’টি চাপাতি, একটি লোহার রড ও ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত একটি হলুদ রঙের পিকআপ ভ্যান জব্দ করা হয়। ধানমণ্ডি থানা সূত্রে জানা গেছে, জেহাদুল ইসলাম মনি ও তার স্ত্রী মির্জা ফাতিমা জাহান দম্পতি ১৬ই অক্টোবর ভোরে বরগুনা থেকে এসে রাসেল স্কয়ার বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি থেকে নামেন। বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশাযোগে রওনা হয়ে ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে ধানমণ্ডির রোড নম্বর-১৩/এ, বাসা নম্বর-২৩ এর সামনে পৌঁছান। রিকশা থেকে নামার মুহূর্তে অজ্ঞাতনামা তিনজন ছিনতাইকারী একটি হলুদ রঙের পিকআপ দিয়ে তাদের গতিরোধ করে। তারা ধারালো চাপাতি ও লোহার রড দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও মারধর করে ভুক্তভোগীর স্ত্রীর ব্যবহার করা একটি মোবাইল ফোন, একটি ভ্যানিটি ব্যাগ, একটি ইবিএল ব্যাংকের এটিএম কার্ড ও এনআইডি কার্ড ছিনিয়ে নেয়। তাদের মারধরে জেহাদুল ইসলাম মনির স্ত্রী শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। ধানমণ্ডি সোসাইটি ঘটনাটি পুলিশকে জানালে ধানমণ্ডি থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং গোয়েন্দা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেপ্তার সবাই একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। এ চক্রটি দীর্ঘদিন যাবৎ ধানমণ্ডি, শেরেবাংলা নগর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় পিকআপযোগে ছিনতাই করে আসছিল। গত সোমবার রাত ১০টার দিকে বাড্ডা থেকে পেশাদার সশস্ত্র ছিনতাইকারী চক্রের অন্যতম সদস্য পারভেজকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উত্তর বাড্ডার হাজীপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার হেফাজত থেকে ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত একটি সুইচ গিয়ার চাকু, একটি ছুরি ও ৬টি মোবাইল উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার পারভেজ পেশাদার সশস্ত্র ছিনতাইকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বাড্ডা এলাকাসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় চুরি ও ছিনতাই করে আসছিল।

ডিএমপি আইন ও গণমাধ্যম শাখার উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান গতকাল মানবজমিনকে বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে আমাদের টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। চিহ্নিত ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। পেশাদার ছিনতাইকারী অনেকে আটক হয়েছে। এলিটফোর্স র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল মুনীম ফেরদৌস মানবজমিনকে বলেন, আমাদের ব্যাটালিয়নগুলো তাদের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় একটা অপরাধ মানচিত্র তৈরি করছে। আমরা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি কোন কোন এলাকায় ছিনতাই বেশি হচ্ছে। সে অনুযায়ী র‌্যাবের টহল টিম যে স্পটে বেশি ছিনতাই হয় সেটিকে নজরদারির মধ্যে রেখেছে। এ ছাড়াও আমরা স্থানীয়দের সহযোগিতা নিচ্ছি। তাদের কাছে যদি কোনো তথ্য উপাত্ত থাকে সেটিও সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি। এর বাইরে থানা ও বিভিন্ন সংস্থার চিহ্নিত ছিনতাইকারীদের নজরদারিতে রেখেছি। কেউ জামিনে বের হয়ে আসছে কিনা সেটিও নোট করছি। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা অভিযান চালিয়ে ২০ জনের মতো ছিনতাইকারী ও ৩৩ জন ডাকাতকে গ্রেপ্তার করেছি। তিনি বলেন, হেডকোয়ার্টার্স থেকে ব্যাটালিয়নগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। জনজীবনে স্বস্তি আনার জন্য ডাকাতি ও ছিনতাই নিয়ে কাজ করার কথা বলা হয়েছে।

Monday, September 9, 2019

ঢাকায় যেভাবে ছিনতাই হয় গাড়ি

সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও ভাড়ায় চালিত গাড়ির জন্য ঢাকার সড়কগুলো অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। ঢাকার বিভিন্ন সড়কে এখন অনেকটা বেপরোয়া গাড়ি ছিনতাইকারী চক্র। প্রতিদিনই ঢাকায় এখন ১৫ থেকে ২০টি গাড়ি ছিনতাই হচ্ছে। ছিনতাইকারীরা প্রকাশ্য দিবালোকে চালকের কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশলে গাড়ি ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে। পরে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আদায় করছে মোটা অংকের টাকা। তাদের কৌশলের কাছে হার মেনে অনেক চালক নিহত হচ্ছেন। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অনেক সময় ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসেন। কিন্তু চক্রের মুলহোতারা থাকেন অধরা।
হোতারাই পরে আইনজীবীদের মাধ্যমে জামিনে মুক্ত করে ফের একই কাজে লাগিয়ে দেন চক্রের সদস্যদের। এ কারণে এখন আতঙ্কে আছেন ভাড়ায় চালিত গাড়ির মালিক ও চালকরা।
বিভিন্ন সময় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আটক হওয়া গাড়ি ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা গাড়ি ছিনতাইয়ের বর্ণনা দিয়েছেন। এসব বর্ণনা থেকে জানাগেছে, ছিনতাইকারীরা সাধারণত চারটি ধাপে তাদের কাজ করে। মাঠ পর্যায়ে যারা ছিনতাই করে তারামূলত চালকদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশল যেমন কখনও নির্জন স্থানে নিয়ে মারধর করে আবার কখনও চালককে চেতনানাশক কিছু খাইয়ে অচেতন করে গাড়ি নিয়ে তাদের নির্ধারিত গ্যারেজে রেখে দেয়। এর উপরে যারা থাকেন তাদেরকে বলা হয় মধ্যস্থকারী। তারা ছিনতাই করা গাড়ি থেকে কাগজপত্র সংগ্রহ করে গাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে মধ্যস্থতা করে। মধ্যস্থতাকারীর উপরে আরো দুটি ধাপে কাজ হয়। একটি ধাপে চুরি হওয়া গাড়িগুলোকে ঢাকাসহ আশেপাশের এলাকায় হেফাজতে রাখে। তারা মূলত বিভিন্ন গ্যারেজ মালিক। আর সবার উপরে থাকে ছিনতাইকারীদের সর্দার। সর্দাররা মূলত আয়ের টাকা ভাগবাটোয়ারা, এলাকা নিয়ন্ত্রণ, গ্যারেজ ভাড়া, চক্রে নতুন সদস্য নিয়োগ, জামিনে মুক্ত করা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও দায়িত্ব বন্টণের কাজ করে থাকে।
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন গত সোমবার ঢাকার দারুসসালাম, ডেমরা ও দক্ষিণখান এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে গাড়ি ছিনতাই চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো, মো. হারুন অর রশিদ (২৮), মো. রুহুল আমিন (৩৬), মো.জামাল হোসেন (৬০), মো. সোহেল খাঁ (৪০), ওয়ালী উল্লাহ (২১) ও মো.রশিদ খান (৪৫)। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে এই ছয় ছিনতাইকারীর কাছে গাড়ির নানা তথ্য উঠে এসেছে। র‌্যাব-৪ অধিনায়ক চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, গাড়ি ছিনতাইকারী চক্রের কয়েকজন সদস্য যাত্রী সেজে রাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকে। তারপর তাদের সুবিধামত স্থানের কথা বলে একটি গাড়ি ভাড়া করে রওয়ানা দেয়। যাওয়ার সময় নির্জন কোন স্থানে গিয়ে চালককে মারধর শুরু করে। চালককে বেধড়ক মারধর দিয়ে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে সিএনজি নিয়ে তাদের নির্ধারিত গ্যারেজে রেখে দেয়। এছাড়া আরেকটি চক্র আছে যারা শহরের বিভিন্ন চা ও শরবতের দোকানে দাড়িয়ে থাকে।
ভাড়ায় চালিত কোন গাড়ির চালক যখন পিপাসা মেটাতে শরবত অথবা চায়ের দোকানে যায় তারা এদেরকে টার্গেট করে। এসব দোকানের মালিকের সঙ্গেও তাদের একটা যোগসাজোশ থাকে। কৌশলে তারা চা বা শরবতের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে দেয়। পরে ছিনতাইকারী চক্রের অন্য সদস্যরা এসে ওই চালককে ভাড়া করে নিয়ে যায়। কিছুদুর যাওয়ার পর যখন চালক অজ্ঞান হয়ে যায় তখন চালককে রাস্তার পাশে ফেলে সিএনজি ও তার পাশে থাকা মোবাইল, টাকা ও গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে যায়। পরবর্তীতে কাগজপত্র দেখে সিএনজির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার বিনিময়ে সিএনজি ফিরিয়ে দেয়।
র‌্যাব আরও জানিয়েছে, এসব চক্রের বাইরে কিছু কিছু গাড়ির চালকরা গাড়ি ছিনতাইকারীদের সঙ্গে যোগসাজোশ করে ছিনতাই করে। অসুসস্থতার ভান করে ওই চালক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে মালিককে ফোনে জানায় ছিনতাইকারীরা সিএনজি নিয়ে গেছে। পরবর্তীতে চক্রের অন্য সদস্যরা মালিকের কাছে ফোন দিয়ে বলে তাদের কাছে সিএনজি আছে। টাকা দিয়ে যেন সিএনজি নিয়ে যায়। র‌্যাব-৪ অধিনায়ক মঞ্জুরুল কবির আরও জানিয়েছেন, ঢাকার সড়কগুলোতে সিএনজি অটো রিকশা এখন নিরাপদ নয়। ছিনতাইকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি ছিনতাই করে আসছে। একটি গাড়ি ছিনতাই করে তারা মালিকের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ৬৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ এক অথবা দেড় লাখ টাকা আদায় করে। চাহিদামত টাকা পরিশোধ করা হলে নির্জন কোন স্থানে সিএনজি রেখে মালিককে ঠিকানা জানিয়ে দেয়। তবে টাকা নেয়া ও সিএনজি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য ছিনতাইকারীরা নানা কৌশল অবলম্বন করে।
গোয়েন্দারা বলছেন, গাড়ি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত এমন ২০ থেকে ২৫ টি চক্রের মূলহোতাদের তারা খোঁজছেন। বিভিন্ন সময় চালক ও মালিকদের অভিযোগে তারা অভিযান চালিয়ে অনেক গাড়ি ছিনতাইকারীদের তারা গ্রেপ্তার করছেন। কিন্তু তারা একেবারেই চক্রের মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন। তাদের উপরে আরও অনেক ধাপে লোক থাকে। তাই মূলহোতাদের আটক করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া ভুক্তভোগী চালক ও মালিকরা থানায় অভিযোগ করছেন না। যদি তারা থানায় অভিযোগ করতেন তবে তদন্ত করে চক্রের হোতাদের শনাক্ত করা যেত। মাঠ পর্যায়ে যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয় তারা নিজেরাই জানেনা তাদের মূলহোতা কে। গাড়ি ছিনতাই চক্র ও গাড়ি চোর নিয়ে কাজ করেন ঢাকার এমন গোয়েন্দারা বলেছেন, তারা একটি তালিকা ধরে কাজ করছেন। বেশ কিছু চক্র ও চক্রের হোতাদের তারা নজরদারিতে রেখেছেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি ছিনতাই করছেন। গাড়ি ছিনতাই করে তারা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
গোয়েন্দাদের কাছ থেকে ঢাকা শহরের বেশ কিছু গাড়ি ছিনতাইকারী চক্রের মুলহোতাদের নাম পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে, মজিবুর, আকতার মোল্লা, কানা শহীদ, মাসুম, গিয়াস, লোকমান, শাহীন, ফারুক, স্বপন, আসলাম, সবুজ, জনি, হোসেন, আবুল, মিন্টু, শিপন, ইয়াকুব, শাহাজাহান, আলমগীর, সেন্টু, লাল মিয়া, কামাল, ফেরদৌস, আলী, আলম, ফরিদ, রনি, জাহিদ, ইদ্রিস, মামুন, রিয়াজ, আজমত, মোস্তফা, রফিক, লিংকন, মুন্না, সালাম, হাশেম, মনোয়ার, রইছ, নুর হোসেন, জলিল, হাফিজ, রহমত, কাশেম অন্যতম। তারা প্রত্যেকেই এক একটি চক্রের সর্দার হিসাবেই পরিচিত। এসব চক্র ছাড়াও আরো নামে বেনামে আরো একাধিক হোতা রয়েছে। প্রতি সর্দারের অধীনে ২০ থেকে ২৫ জন করে সদস্য থাকে। তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা কাজ থাকে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) বলছে, গাড়ি ছিনতাইকারী খুব ভোরে তাদের মিশনে বের হয়। প্রতিটি চক্রের মাঠ পর্যায়ে ৫/৭ জন সদস্য কাজ করে। সর্দাররা সুবিধাজনক বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই গ্যারেজ ভাড়া করে রাখেন। ধরা পড়ার ভয়ে তারা একাধিক এলাকায় গ্যারেজ ভাড়া করেন। শুধু ঢাকার ভেতরে নয় গাজীপুর, নরসিংদি, নারায়নগঞ্জ এলাকায় গ্যারেজ ভাড়া করেন সর্দাররা। চুরি করা গাড়ি সরাসরি এসব গ্যারেজে নেয়া হয়। কিছু কিছু গ্যারেজের মালিকের সঙ্গে সর্দারদের চুক্তি থাকে। মধ্যস্থতাকারীরা সিএনজিতে থাকা কাগজপত্র থেকে তথ্য নিয়ে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এক্ষেত্রে মালিককে থানা পুলিশের ঝামেলা যাতে না করে সেজন্য সতর্ক করে দেয়। আর গাড়ীর কন্ডিশন বুঝে মালিকের কাছে টাকার পরিমান বলা হয়। এরপর শুরু হয় দর কষাকষি। বিকাশে অথবা রকেটে টাকা পাওয়ার পর ফিরিয়ে দেয়া হয় গাড়ি। আবার অনেক সময় এসব গাড়ির নম্বর প্লেট পরিবর্তন করে ভুয়া নম্বর প্লেট ও কাগজপত্র তৈরি করে বিক্রি করে দেয়া হয় মফস্বল এলাকায়। চুরি করা গাড়ি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে অথবা বিক্রি করে যে আয় হয় তার ভাগ সবাইকে দেয়া হয়। এছাড়া ওই টাকা থেকে একটি অংশ সর্দাররা রেখে দেন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যদি কোন চোর ধরা পড়ে তবে সেই টাকা দিয়ে তাদের জামিনের ব্যবস্থা করা হয়। ডিবি আরো বলছে, গাড়ি ছিনতাইকারীদের সঙ্গে অনেক সময় নকল চাবি থাকে। কিছু কিছু চাবি দিয়ে একাধিক গাড়ির লক খোলা যায়। ফলে কোন না কোন চাবি দিয়ে তারা লক খুলতে সক্ষম হন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রো চুরির ক্ষেত্রে তারা এসব নকল চাবি ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে তারা আগে থেকেই গাড়ি টার্গেট করে রাখে।
ভুক্তভোগী সিএনজি মালিক খিলগাঁর আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার তিনটি সিএনজি কয়েক বছর ধরে ঢাকায় চলাচল করে। তিনটি সিএনজির মধ্যে দুটি সিএনজি চারবার ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছে। এই চারে বারে আমার প্রায় দুই লাখ টাকা দিতে হয়েছে। ভেবেছিলাম থানায় অভিযোগ করব। কিন্তু বাড়তি ঝামেলা দেখে আর অভিযোগ করি নাই। ছিনতাইকারীরা মোবাইল ফোনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল পরে তাদের কথামত স্থানে টাকা রেখেছি। সিএনজি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তারা বেশ কয়েকটি স্থানের ঠিকানা দিয়েছিল। পরে উত্তরার একটি স্থান থেকে সিএনজি উদ্ধার করে এনেছি। আরেক ভুক্তভোগী মুগদা এলাকার শাহীন বেপারী বলেন, ছিনতাইকারী যোগাযোগ করে বলে থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সিএনজির পার্টস আলাদা আলাদা করে বিক্রি করে দেবে। আর তাদের কথামত কাজ করলে অক্ষত অবস্থায় সিএনজি পাওয়া যাবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, ঢাকায় নম্বর প্লেটসহ সিএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় ছিনতাইকারীরা সিএনজি ছিনতাই করে। মালিকরাও মনে করেন কিছু টাকা খরচ করে যদি সিএনজি ফিরে পাওয়া যায়। এছাড়া কিছু কিছু মালিক ডিজিটাল নম্বর প্লেট ব্যবহার করছেন না। তাই এ সুযোগটাও ছিনতাইকারীরা নিচ্ছে।

Thursday, July 18, 2019

ট্রেনে-স্টেশনে কিশোর অপরাধীরা বেপরোয়া: ঘটছে ছিনতাই, ধর্ষণ ও নৃশংস খুন by রেজোয়ান বিশ্বাস

কালের কণ্ঠ অনলাইন, ১৪ জুলাই, ২০১৯:
কমলাপুরসহ সারা দেশে রেলস্টেশনকেন্দ্রিক কয়েক শ ভাসমান কিশোর অপরাধীর তালিকা করেও তাদের ধরতে পারছে না পুলিশ। ট্রেনে এক এলাকায় অপরাধ করে আরেক এলাকায় গাঢাকা দেওয়ার কারণেই তাদের ধরতে বেগ পেতে হচ্ছে বলে পুলিশ দাবি করছে। এর ফলে চলন্ত ট্রেনে ছিনতাই, ছুরিকাঘাত ও ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে খুন-জখম, এমনকি ট্রেনে ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িয়ে গেছে কিশোর অপরাধীরা। তাদের দিয়ে অস্ত্র ও মাদক এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে বহন করানো হচ্ছে বলে পুলিশের একাধিক প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে। তবে কিশোর অপরাধ দমনে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষেরও দায় আছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ অবস্থায় পুলিশের পক্ষ থেকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এতে টিকিটে ট্রেনযাত্রীদের নাম থাকা এবং স্টেশনকেন্দ্রিক ভাসমান লোকজনের ওপর নজরদারি ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রেনযাত্রীদের অভিযোগ, রেল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি জিআরপি পুলিশের দায়িত্বহীনতার কারণেও অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অন্যদিকে পুলিশ ট্রেনকেন্দ্রিক কিশোর অপরাধীদের তালিকা করলেও তাদের সংখ্যা  জানাতে পারেনি রেলওয়ে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রেলওয়ে পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. সামসুদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ট্রেনকেন্দ্রিক অপরাধীদের বেশির ভাগই কিশোর। সামাজিক নানা কারণে এরা অপরাধ জগতে পা বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যারাই ট্রেনে যাত্রীদের ছিনতাইয়ের পর হত্যা ও ধর্ষণ করেছে তাদের বেশির ভাগকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ভাসমান কিশোররাই ট্রেনের ভেতরে ও স্টেশনকেন্দ্রিক সব অপরাধের কেন্দ্রে রয়েছে। এসব অপরাধীর তালিকার পাশাপাশি তাদের কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তার চিন্তাভাবনা চলছে। এ ক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা একটি পরামর্শমূলক প্রস্তাব বা সুপারিশ করেছি। সেটা যাচাই-বাছাই চলছে। এটা বাস্তবায়িত হলে তার সুফল প্রতিটি যাত্রীই পাবে। তিনি জানান, এই সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—স্টেশনকেন্দ্রিক ভাসমান লোকজনের ওপর নাজরদারি রাখা ও ট্রেনের টিকিটে যাত্রীদের নাম লেখা থাকতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জিআরপি বা রেলওয়ে পুলিশের কারণেও অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পুলিশ থাকতেও অপরাধীরা কিভাবে ছাদে উঠে ছিনতাই করছে জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, অনেক সময় লুকিয়ে এসব অপরাধী ট্রেনে ওঠে।
আরমান শেখ নামে এক ট্রেনযাত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যবসার কাজে তিনি নিয়মিত রাতে ও দিনে ট্রেনে যাওয়া-আসা করেন। এতে ট্রেনকেন্দ্রিক জিআরপি পুলিশের অনেক দায়িত্বহীনতা তার চোখে পড়ে। ট্রেনে মাদক কারবারি, কালোবাজারিদের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের দেখেও না দেখার ভান করে অর্থের বিনিময়ে পুলিশ তাদের সুযোগ করে দেয়। মূলত জিআরপি পুলিশের ব্যর্থতার কারণেই ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে।
ট্রেন ও স্টেশনকেন্দ্রিক অপরাধের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে ঘৃণ্য ঘটনা ঘটেছে গত বুধবার কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রেনে। সম্রাট নামে এক বখাটে এক শিশুকে ট্রেনে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনার কিছুদিন আগে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী সিল্ক সিটি এক্সপ্রেস ট্রেনের টয়লেটে মুখ চেপে ধরে এক কিশোরীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এরও আগে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় কিছু মালপত্র কিনতে আসা চার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমেদ, আবুল কালাম, হোসেন ও আলামিনের কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে তাদের মধ্যে তিনজনকে চলন্ত ট্রেন থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। এতে মোস্তফা নামে একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। বাকিরা এখন পঙ্গু হয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। রেলওয়ে পুলিশ বলছে, তারা গত এক বছরে অর্ধশতাধিক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে।
রেলওয়ে পুলিশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কিশোর অপরাধীর বেশির ভাগ ছিন্নমূল শিশু। তাদের বেশির ভাগ বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে না। বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। অবহেলা আর ঠিকমতো পারিবারিক বন্ধনে না থাকার কারণে এরা অপরাধ জগতে পা বাড়াচ্ছে। এরা ট্রেনেই থাকে, ট্রেনেই ঘুমায় আবার স্ট্রেশনেই ঘর তৈরি করে। তাদের অনেকেই মা-বাবার নামও জানে না। এরা এক এলাকায় অপরাধ করে অন্য এলাকায় চলে যায়। ঢাকায় অপরাধ করে ওরা যায় রংপুরে। আবার রংপুরে যে অপরাধ করে চলে আসে ঢাকায়। অথবা চট্টগ্রামে চলে যায়। সেখান থেকে আবার সিলেট না হয় রাজশাহী না হয় অন্য এলাকায় চলে যায়।
ঢাকা জেলা রেলওয়ে পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম বলেন, গত প্রায় এক বছরে ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে হত্যা, দুটি ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের বেশির ভাগ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কিশোর সংশোধনাগার কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

Wednesday, May 15, 2019

ছিনতাইকারীরা নিয়ে গেল সাত তরুণের ‘স্বপ্ন’ by জিয়া চৌধুরী

সাত তরুণের প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানড্রয়েড টোটো কোম্পানি: এটিসি’। বাজারে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক যেকোনো নতুন পণ্য এলে তার ভিডিও রিভিউ বানায় আশিকুর রহমান তুষারের এই প্রতিষ্ঠান। মুঠোফোন, গ্যাজেট, ল্যাপটপ, ডিএসএলআর ক্যামেরা অথবা গেমিং সফ্‌টওয়্যারের মতো প্রযুক্তি পণ্যের ভালো-মন্দ তথ্য তুলে ধরে ইউটিউব-ফেসবুকে ছাড়েন এটিসির  সদস্যরা। এসব রিভিউ থেকে নিজের পছন্দের পণ্য বেছে নেয়া সহজ হয় গ্রাহকদের। অনেকটা শখের বসে শুরু করলেও ‘এটিসি’ এখন প্রায় ৩৫ তরুণের স্বপ্নের কারখানাও। পড়াশোনার চালিয়ে যাবার পাশাপাশি নিজেদের আগ্রহ আর অভিজ্ঞতায় কিছুটা আর্থিক লাভের মুখও দেখতে শুরু করেছে এটিসির সদস্যরা। তবে, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুরে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে ম্লান হতে বসেছে এসব তরুণদের স্বপ্ন। কৌশলে নম্বরপ্লেট ছাড়া মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাই মিশনে যোগ দেয় দু’জন। প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে মিরপুর মডেল থানার পাশে এমন ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তবে ঘটনাটিকে ছিনতাই মানতে নারাজ মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তার মতে এটি ছিনতাই নয় চুরির ঘটনা। এটিসি’র উদ্যোক্তা আশিকুর রহমান তুষার গতকাল মানবজমিনকে জানান, বাজারে আসা নতুন একটি মুঠোফোনের ভিডিও রিভিউ বানাতে মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় যাচ্ছিল তার দলের দুইজন সদস্য। এদের একজনের সঙ্গে কালোব্যাগে ছিল দুইটি ক্যামেরা, দুটি লেন্স একটি নতুন স্মার্টফোন ও কিছু তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য। মিরপুর ৬০ ফিট সড়ক দিয়ে রিকশায় করে মিরপুর দুই নম্বর এলাকায় যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেল ছোঁ মেরে ব্যাগটি নিয়ে যায়। ব্যাগে প্রায় আড়াই লাখ টাকা দামের জিনিসপত্র ছিল বলেও জানান আশিকুর রহমান তুষার। তিনি মানবজমিনকে বলেন, কয়েক বছর ধরে তিলে তিলে ছোট্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। আমাদের টিমের প্রত্যেক সদস্যই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অথচ ছিনতাইকারীদের এক মুহূর্তের ছোবলে আমাদের অন্তত ৩৫জন তরুণের স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বসেছে। ছিনতাইয়ের ঘটনার পরে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন তারা। তবে, মিরপুর মডেল থানা পুলিশ আন্তরিক হলে ছিনতাইকারীদের ধরা সম্ভব বলেও জানান আশিকুর রহমান তুষার। ছিনতাইয়ের ঘটনার সময় রিকশায় থাকা এটিসি’র সদস্য জুলফিকার রহমান রিফাত হতাশার সুরে জানান, কি আর বলবো? হাসিখুশি সকালটা এক নিমিষেই দুঃখে পরিণত হলো। দুপুর আড়াইটার দিকে মিরপুর ৬০ ফিট থেকে রিকশায় করে পিজ্জাবার্গে একটি মুঠোফোনের ভিডিও রিভিউ বানাতে যাচ্ছিলাম আমরা দু’জন। ক্যামেরা-লেন্স, মোবাইল সব একটা ক্যালো ব্যাগে আমার কাছে ছিল। মনিপুরের একটু আগে ইফা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে থেকে হঠাৎ একটা মোটরবাইক এসে আমাদের ক্রস করে যাবার সময় হাত থেকে ছোঁ মেরে ব্যাগটা নিয়ে দ্রুত চলে যায়। ব্যাগ টান দেয়ায় আমিও রিকশা থেকে পড়ে যাই। সামনে তাকালে দেখতে পাই মোটরসাইকেলটিতে কোন নম্বরপ্লেট নেই। পরে আরেকজন মোটরসাইকেল আরোহীর সাহায্য নিয়ে ছিনতাইকারী মোটরসাইকেলটির পেছন পেছন যেতে থাকি। কিন্তু তারা দ্রুত গলির ভিতরে ঢুকে যাওয়ায় ছিনতাইকারীদের শেষ পর্যন্ত ধরতে পারিনি। রিফাত জানান, ব্যাগে সনি আলফা এ৬৩০০, সনি আলফা এ৬৫০০ মডেলের দুটি ক্যামেরা, কিট ও সিগমা লেন্স, পাওয়ার ব্যাংক, আইটেল স্কাইপি মডেলের মুঠোফোন এবং আরো কিছু প্রযুক্তিপণ্য ছিল ব্যাগটিতে। ছিনতাইকারীদের দুজনের মাথায় কালো রংয়ের হেলমেট ছিল, পেছনে থাকা ছিনতাইকারীর পরণে ছিল কালো শার্ট ও কমলা রংয়ের প্যান্ট। পরে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানিয়ে মিরপুর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন এটিসির’র উদ্যোক্তা আশিকুর রহমান তুষার। ছিনতাইকারীরা আগ থেকে তাদের ফলো করছিল বলেও ধারণা করছেন এটিসির সদস্যরা। তবে, ছিনতাইকারীদের মোটরসাইকেলে নেমপ্লেট না থাকায় বিপাকে পড়তে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। একটি সূত্রে জানা গেছে, চক্রটি বহুদিন ধরে মিরপুর এলাকায় ছিনতাই করে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার এড়াতে নম্বরপ্লেট ছাড়া মোটরসাইকেলে করে ছিনতাই করে চক্রের সদস্যরা। একই সঙ্গে দুজনে হেলমেট পরা থাকায় তাদের চিহ্নিত করাও কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের একজন সদস্য। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাদন ফকির গতকাল রাতে মানবজমিনকে বলেন, আইনের ভাষায় এটা ছিনতাইয়ের মধ্যে পড়ে না। কোন ব্যক্তিকে জোর করে কোন কিছু কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে কোন কিছু নিয়ে গেলে সেটাকে আমরা ছিনতাইয়ের মধ্যে ধরবো। তবে, গতকাল মনিপুর এলকায় যেটা ঘটেছে সেটা ছিনতাই নয় চুরি। চলন্ত অবস্থায় কোন কিছ টান দিয়ে নিয়ে গেলে এটা চুরির মধ্যেই পড়ে। তারপরও আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেবো। এদিকে, ছিনতাইয়ের ঘটনার আশপাশে থাকা সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান আশিকুর রহমান তুষার। আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি অনুরোধ করে বলেন, আমাদের ঈদটাকে মাটি করবেন না। এত বছর ধরে পরিশ্রম করে দাঁড় করানো এই ভিত্তিটাকে ভেঙে দিবেন না। দয়া করে আমাদের জিনিসগুলো ফিরে পাবার ব্যবস্থা করুন।

Saturday, July 28, 2018

ভিন্ন কৌশল নির্বিঘ্নে ছিনতাই by রুদ্র মিজান

পান্থকুঞ্জ। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা। পাঁচটি রাস্তা মিলিত হয়েছে এখানে। পান্থকুঞ্জ এক নীরব, প্রাকৃতিক স্থান। সন্ধ্যার পরপর  এখানে আড্ডায় মেতে উঠেন এক শ্রেণির নারী-পুরুষ। পাশে সিটি করপোরেশনের একটি পার্ক। পান্থকুঞ্জের আড্ডা ঘিরে ঘটে অন্য কাহিনী। গতকাল রাতে পান্থকুঞ্জে গিয়ে দেখা গেছে এক পাশে বসে আছেন পাঁচ নারী। তাদের আশপাশে কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অন্তত ১৫ তরুণ। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তরুণদের কড়া দৃষ্টি ওই পাঁচ নারীকে ঘিরে। শান্তা, শিল্পী, রোমা, রিনা ও স্মৃতি নামে পরিচিত তারা।
রাত প্রায় সাড়ে ১২ টা। শান্তা নামের ওই নারীর সঙ্গে কথা বলছিলো এক মধ্য বয়সী ব্যক্তি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পান্থকুঞ্জ পার্কের ভেতরে ঢুকে। দেখা গেছে, মাটিতে পাটি  বিছানো রয়েছে। রাতের আঁধারে সেখানেই অন্তরঙ্গ সময় কাটান তারা। এছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি পাকা বেঞ্চ। শান্তা ও ওই ব্যক্তি পার্কের ভেতরে ঢুকার দুই মিনিটের মধ্যেই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণরা পার্কে ঢুকে। শোনা যায় চিৎকার। কিছু বুঝে উঠার আগেই মধ্য বয়সী ব্যক্তি পার্ক থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হন। তাকে মারধর করে সর্বস্ব লুটে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা। সঙ্গী নারীর ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, শান্তা নামের ওই নারী তাৎক্ষণিকভাবে পার্ক থেকে বের হয়ে যায়।
আশপাশের লোকজন জানান, প্রায় প্রতি রাতে দফায় দফায় এখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। আশপাশেই থাকে পুলিশের টহল টিম। বাঁশি বাজিয়ে পুলিশ যখন পার্কের দিকে পা বাড়ায় বাঁশির আওয়াজ শুনে ছিনতাইকারীরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। তবে ওই পাঁচ নারীকে পুলিশের উপস্থিতিতেই পান্থকুঞ্জে বসে থাকতে দেখা গেছে।
সূত্রমতে, ওই নারীদের সঙ্গে ছিনতাইকারীদের রয়েছে যোগসূত্র। ছিনতাইয়ের টাকা ভাগাভাগি হয় তাদের মধ্যে। একটি অংশ পান পুলিশের অসাধু সদস্যরা। ছিনতাইকারীরা নিজেদের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের স্থানীয় স্থানীয় নেতাকর্মী পরিচয় দেয়। ছিনতাইকারীদের মধ্যে অন্যতম আজিজ ওরফে আজিজুর রহমান। এই স্পটের নারীরা জানান, ছিনতাইকারীদের কথামতো কাজ না করলে তাদের এখানে বসতে দেয়া হয় না। পুলিশসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে ছিনতাইকারীরা। শান্তাসহ পাঁচ নারী প্রতিদিনি এখানে জড়ো হন  টঙ্গী ও যাত্রবাড়ী এলাকা থেকে। রাতভর এখানে থেকে ভোরে বাড়ি ফিরেন তারা।
পুরুষদের পাশাপাশি এখানে ছিনতাইয়ে জড়িত রয়েছে নারীরাও। এমনকি শিশুদেরও ব্যবহার করা হয় ছিনতাইয়ে। প্রত্যক্ষদর্শী সাব্বির জানান, অফিসের কাজ শেষে সন্ধ্যার পর পান্থকুঞ্জে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন তারা তিন জন। এরমধ্যেই ঘটে ঘটনাটি।
নাইজেরিয়ার দুই তরুণ নাগরিক হেঁটে যাচ্ছিলেন ফার্মগেটের দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই ছোঁ মেরে তাদের একজনের মোবাইলফোন সেট লুটে নেয় ছিনতাইকারী। তার পেছনে ১০ বছর বয়সী শিশুকন্যা ও এক নারী। মোবাইলফোনটি শিশুটির হাতে দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ছিনতাইকারী নিজেই ‘ছিনতাইকারী ছিনতাইকারী’ বলে চিৎকার করতে করতে সিগন্যালে থেমে থাকা গাড়ির মধ্য দিয়ে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো। এরমধ্যেই সিগন্যাল ছেড়ে দিলে একটি বাসের মধ্যে লেগে মাথা ফেটে যায়। ছিনতাইয়ের শিকার দু’জন ধাওয়া করলে মোবাইলফোনটি আবার নিজের হাতে নেয়। দুই যুবক ছিনতাইকারীকে ধাওয়া করে। পেছন থেকে দুই যুবককে বাধা দিয়ে ছিনতাইকারীকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করছিলেন নারী। শেষপর্যন্ত মোবাইলফোন উদ্ধার করেই দুই যুবক ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। জানা গেছে, ওই ছিনতাইকারী কাল্লু নামে পরিচিত। সঙ্গে ছিলো তার স্ত্রী ও সন্তান।
এখানে রয়েছে টানা পার্টির সদস্যরাও। সিগন্যালের গাড়ি থামলে ফোন, ব্যাগ টেনে দ্রুত পালিয়ে যায় তারা। অন্তত অর্ধশত ছিনতাইকারী রয়েছে এই স্পটে।
এ রকম আরও একটি স্পষ্ট সংসদ ভবন সংলগ্ন খেজুর বাগান এলাকায়। সন্ধ্যার পর পর সেখানে ভিড় করে এক শ্রেণির ভাসমান নারী। পুরুষদের আকৃষ্ট করে নিয়ে যায় ফার্মগেট ও শ্যামলীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে, বাসায়। সেখানে জিম্মি করে সর্বস্ব রেখে ছেড়ে দেয় তাদের। এমনকি ওই এলাকায় রয়েছে ছিনতাইকারীদের একটি সিন্ডিকেট। তারা মোটরসাইকেলযোগে ওই এলাকায় অবস্থান নেয়। পথচারী ও রিকশাযাত্রীদের টার্গেট করে চক্রের সদস্যরা। দ্রুত ব্যাগ, ফোন টেনে পালিয়ে যায়। কখনও কখনও ছুরিকাঘাত করে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়। এমনকি ভাসমান নারীদের মাধ্যমে পুরুষকে আকৃষ্ট করে হোটেলে, বাসায় নিয়ে গেলে ছিনতাইকারীরা তাদের জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেয়। এই চক্রে সাদিয়া, রত্না, মনিসহ অন্তত ৩০ নারী রয়েছে।
একইভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে ফার্মগেট ও বিজয় সরণি এলাকায়। বিজয় সরণি এলাকায় রয়েছে হিজড়াদের একটি সিন্ডিকেট। একই কৌশলে পুরুষদের নির্জনস্থানে নিয়ে ছিনতাই করে তারা। এ রকম একটি চক্র রয়েছে মোহাম্মদপুরের বসিলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। রাত ১২টার পরে ওই এলাকায় অবস্থান নেয় তারা। আরও একটি চক্র রয়েছে এফডিসি সংলগ্ন হাতিরঝিল এলাকায়। ওই এলাকায় বিপ্লব নামে এক যুবক রয়েছে তাদের নেতৃত্বে। বিপ্লব নিজে যেমন ছিনতাই করে তেমনি ওই এলাকায় নিয়মিত মাদক বিক্রি করে। রাত ৮টার পরপরই ইস্কাটন সংলগ্ন হাতিরঝিল এলাকায় ও এফডিসি সংলগ্ন হাতিরঝিল এলাকায় বিপ্লবসহ এই চক্রের ছিনতাইকারীদের দেখা যায়। গোয়েন্দা সূত্রমতে, ঢাকায় এ রকম শতাধিক চক্র রয়েছে। তারা নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে বিভিন্ন কৌশলে ছিনতাই করে থাকে। পুলিশের অভিযানে প্রায়ই আটক হয় তারা। জামিনে বের হয়ে আবার একই অপকর্মে লিপ্ত হয়।
তবে এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানা-পুলিশমুখো বলতে গেলে হতেই চান না। গত জুন মাসে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই’র অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ৫২০টি, ঢাকায় মামলা হয়েছে ১০৩টি।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশ তৎপর রয়েছে। প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

Friday, July 6, 2018

ভিন্ন পেশার লোক হলেও তারা সংঘবদ্ধ ডাকাত দল

পেশায় তারা কেউ গার্মেন্ট শ্রমিক, কেউ দর্জি, কেউ বাসচালক কেউ বা জমির দালাল। এই কাজের বাইরেও তারা অর্থ উপার্জন করে। দিনের আলো ম্লান হয়ে রাতের অন্ধকার নেমে এলে তারা ছিনতাইয়ে নামে। বিভিন্ন ব্যাংকসহ আর্থিক  প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে টাকা ছিনতাই করতো এই চক্র। গত বুধবার চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তারা হলো- স্বপন মাহমুদ (৪৯), রুবেল (৩৫), সাগর বাড়ৈ (৩৫), মো. বাবুল (৩৬), মো. আনোয়ার হোসেন (৩৫), ইউসুফ আলী (২৮) ও আনোয়ার হোসেন (২৮)।
তাদের কাছ থেকে তিনটি বিদেশি অস্ত্র ও ১৬ রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর কাওরানবাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. রাকিবুজ্জামান জানান, গত ১৩ই মে গাজীপুর জেলার চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার উনিশে টাওয়ারের নিচে রবি ও বিকাশের এজেন্টের ১৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এরপর র‌্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে গত বুধবার রাত ১২টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উত্তরা এলাকা থেকে এই সাত জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। 
তিনি আরো জানান, গত ১৩ই মে গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার উনিশে টাওয়ারের নিচে একদল ছিনতাইকারীরা রবি ও বিকাশের এজেন্ট মো. আসাদুর রহমান আসাদ ও ইকবাল হোসেনের ১৫ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় একই প্রতিষ্ঠানের সুমন মল্লিক নামের একজন কর্মী আহত হন। গ্রেটওয়াল হাউজিং সোসাইটির নিজ প্রতিষ্ঠান জমাদ্দার এন্টারপ্রাইজ নামক প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক পদে মো. আসাদুর রহমান আসাদ ও সহকারী হিসাব রক্ষক পদে ইকবাল হোসেন এবং স্টোর ম্যানেজার পদে সুমন মল্লিক নিয়োজিত। জমাদ্দার এন্টারপ্রাইজ একটি রবি ও বিকাশ এজেন্টভিত্তিক প্রতিষ্ঠান।
তিনি আরো জানান,  র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ছিনতাইকারী চক্রটির প্রধান সাগর ও তার অন্যান্য সহযোগী গত ১৩ই মে গাজীপুর জেলার চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার উনিশে টাওয়ারের নিচে রবি ও বিকাশের দুই জন এজেন্টকে গুলি করে ১৫ লাখ টাকা ছিনতাই কাজের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। সাগর জানায় যে, তারা বিগত এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই করার জন্য প্রস্তুতি নিলেও বিভিন্ন কারণে সফল হতে পারেনি। র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, রুবেল (৩৫) পেশায় একজন দর্জি। রাজধানীর নিউমার্কেটের গাউছিয়া মার্কেটে দর্জির কাজ করে। ২০১৭ সালে আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে গুলিবিনিময়ে নিহত ছিনতাই চক্রের সদস্য আনোয়ারের মাধ্যমে রুবেল এ চক্রে যোগ দেয়। সাগর ও রুবেল পরস্পর যোগসাজশে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি ক্রয় করে ছিনতাই কাজে ব্যবহার করে বলে স্বীকার করে। এক্ষেত্রে অস্ত্র সরবরাহকারী ছিনতাই করা অর্থের দ্বিগুণ টাকা নেয়। এছাড়াও, সাগর পেশায় একজন মুহুরি। সে ২০০০ সাল হতে এই পেশায় নিয়োজিত আছে। ২০১৭ সালে আনোয়ার আশুলিয়ায় পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে সাগর ছিনতাই চক্রটির নেতৃত্ব দেয়।
তিনি আরো জানান, বাবুল পেশায় একজন সেলসম্যান। সে নিউমার্কেটের চাঁদনী চক মার্কেটে একটি দোকানে কাজ করে। কাজের সূত্র ধরে একই মার্কেটে কর্মরত রুবেলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বাবুলের বিরুদ্ধে আশুলিয়া ও সাভারে একাধিক ছিনতাই ও ডাকাতির মামলা থাকায় হাইকোর্টের মুহুরি সাগরের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। সাগর ও রুবেলের মাধ্যমেই সে ছিনতাই চক্রে যোগ দেয়। রাকিবুজ্জামান আরো জানান, আনোয়ার হোসেন পেশায় একজন গাড়িচালক। সে ২০০৫ সালে ঢাকায় আসে। সে বিমানবন্দর এলাকায় ভাড়ায় ট্যাক্সিক্যাব চালায়। মাদক ব্যবসার দায়ে একবার জেলে যায় এবং সেখানে তার সাগরের সঙ্গে পরিচয় হয়। দুই মাস পর জেল থেকে বের হয়ে আনোয়ার ও সাগরের সঙ্গে ওই ছিনতাইচক্রে যোগ দেয় এবং নিয়মিত ছিনতাই কাজে অংশ নেয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, স্বপন মাহমুদ পেশায় একজন জমির দালাল। ১৯৮৮ সালে আসামি স্বপন ঢাকায় আসে এবং একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকুরি নেয়। পরবর্তীতে সে সৌদি আরব যায় এবং প্রতারণার শিকার হয়ে চার মাস পর দেশে ফিরে আসে। সে ২০১৬ সালে সাগর, বাবু ও রুবেলের সঙ্গে ডাকাতি ও ছিনতাই মামলায় গ্রেপ্তার হয়। অন্যদিকে ইউসুফ আলী পেশায় একজন পোশাককর্মী। ২০০৮ সালে সে ঢাকায় আসে এবং সাভারে একটি সোয়েটার গার্মেন্টসে দীর্ঘদিন শ্রমিকের কাজ করে। কাজের সূত্র ধরে ২০১৭ সালে আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে গুলি বিনিময়ে নিহত আনোয়ারের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং তার মাধ্যমে বেশি উপার্জনের লোভে এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তিনি আরো জানান, এদের পেশা ভিন্ন হলেও তারা ঢাকার বিভিন্নস্থানে ছিনতাই করতো। এদের অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। র‌্যাব-১ এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Saturday, May 12, 2018

সিলেটের ‘জাপটা সিন্ডিকেট’ by ওয়েছ খছরু

ওরা ৫ জন। চিহ্নিত ছিনতাইকারী। কয়েকদিন ধরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল সিলেট নগর। প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিনটি ছিনতাই করে ওরা। সঙ্গে কালো পালসার মোটরসাইকেল। যেদিকে যায় জাপটে ধরে যাত্রীদের। ছিনিয়ে নেয় সর্বস্ব। ছিনতাইয়ের বেশ কয়েকটি অভিযোগ আসে সিলেট মহানগর পুলিশের কাছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা অভিযান শুরু করে। কিন্তু ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। অপরদিকে ওই সিন্ডিকেটের ঝাপটাও বন্ধ হচ্ছে না। তাদের নিয়ে পুলিশের ঘুম হারাম। অবশেষে সিলেট মহানগর পুলিশের একটি টিম প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা অনুসন্ধান শুরু করে। এর মধ্যে তারা নির্ণয় করে ৫ ছিনতাইকারীকে। তারা নতুন একটি গ্রুপ। এই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে কয়েকজন চিহ্নিত ছিনতাইকারী। পুলিশ তাদের শনাক্ত করার পর কয়েকটি গ্রুপ এক সঙ্গে অভিযান শুরু করে। বৃহস্পতিবার ভোররাত পর্যন্ত তারা অভিযান চালিয়ে ওই ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। আর গ্রেপ্তার হওয়া ওই ছিনতাইকারীরা সাম্প্রতিক কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। এদিকে- ৫ জনের ওই ছিনতাইকারী দল গ্রেপ্তার হওয়ার পর সিলেট নগরীতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। গত দুইদিন নগরের কোথাও কোনো ছিনতাইয়ের খবর পাওয়া যায়নি। সিলেট মহানগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) আবদুল ওয়াহাব জানিয়েছেন- ওই ছিনতাই সিন্ডিকেটের সঙ্গে কারা কারা জড়িত সেটি পেয়েছি। জবানবন্দিতেও তাদের সহযোগীদের নাম বলেছে। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। তিনি বলেন- সিলেটে ছিনতাই রোধে পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে সব কর্মকর্তারা জিরো টলারেন্সে রয়েছে। আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে যাতে ছিনতাই না বাড়ে পুলিশ সে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানান তিনি। ৭ই মে বিকাল পৌনে ৪টায় সিলেট-কানাইঘাট সড়কের মুরাদপুর পয়েন্টের কাছাকাছি একটি ছিনতাই হয়। নগরীর লালাদিঘীরপাড়স্থ একটি ব্যাংকের শাখা থেকে এক লাখ ৯০ হাজার টাকা তুলে সিএনজি অটোরিকশাযোগে যাচ্ছিলেন ল্যান্স কর্পোরাল মো. ময়নুল ইসলাম (৩২)। ওই পয়েন্টের কাছে দুটি মোটরসাইকেলযোগে পাঁচ ছিনতাইকারী এসে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর ল্যান্স কর্পোরাল ময়নুল ইসলাম শাহপরান থানায় দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের করেন। এরপর মাঠে নামে পুলিশ। শুরু হয় ছিনতাইকারীদের অবস্থান শনাক্ত করার মিশন। টানা দুইদিন চেষ্টার পর বৃহস্পতিবার ভোররাত পর্যন্ত পৃথক স্থান থেকে পাঁচ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে একটি কালো রঙের পালসার মোটরসাইকেল, একটি অ্যাপাচি ছাই কালারের মোটরসাইকেল, একটি ছোরা ও নগদ ২৭ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানার চরশিহারী শাইল গ্রামের মৃত মো. আলীর ছেলে নাসির উদ্দিন (৩৫), তিনি কোম্পানিগঞ্জ থানার পূর্ব ইসলামপুরের নতুন জীবনপুরের রিয়াজ উদ্দিন ওরফে খোকার ছেলে শফিকুল ইসলাম ওরফে কালা শফিক ওরফে শফিক খন্দকার (৩৩), মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থানার মনরাজ মাহমুদপুরের মৃত আজমান আহমদের ছেলে রাহেল আহমদ (২৭), সিলেট শাহপরান থানার খাদিমপাড়ার কল্লগ্রামের আবদুর রশীদের ছেলে মুক্তার হোসেন (৩৫) ও মেজরটিলা পশ্চিম ভাটপাড়ার হাবিবুর রহমান কালা মিয়ার ছেলে দিলোয়ার হোসেন আলম (৩৫)। নাসির উদ্দিনকে সিলেট শাহপরান থানাধীন খাদিমপাড়ার মাহমুদপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানা ও দক্ষিণ সুরমা থানায় দুটি মামলা রয়েছে। গোলাপগঞ্জ থানার মামলায় তিনি ১০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত ও ৫ হাজার টাকা জরিমানায় দণ্ডিত। শফিকুল ইসলামকে সিলেট নগরীর বন্দরবাজার ফয়েজ বোর্ডিং থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি ও শাহপরান থানায় দুটি মামলা রয়েছে। রাহেল আহমদকে সিলেট বিমানবন্দর থানার লাখাউড়া থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে নগরীর কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা রয়েছে। মুক্তার হোসেনকেও ফয়েজ বোর্ডিং থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে শাহপরান থানা ও কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলা রয়েছে। দিলোয়ার হোসেন আলমকে খাদিমপাড়া মাহমুদপুর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে শাহপরান থানায় একটি মামলা রয়েছে। ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার অভিযানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (অপরাধ, দক্ষিণ) জ্যোতির্ময় সরকার। সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছেন- ‘গোয়েন্দা তথ্যকে কাজে লাগিয়ে এই পাঁচ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবার তাদের আদালতে হাজির করা হলে তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে তারা সঙ্গীদের নামও প্রকাশ করেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশ ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করছে না। তাদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে।’

Wednesday, April 18, 2018

ছিনতাইয়ে ‘সালাম পার্টি’ by আল-আমিন

পোশাকে-আশাকে ভদ্রলোক। চলাফেরায় আভিজাত্যের ছাপ। কথা বলবে শুদ্ধ ভাষায়। পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণে বেশ দক্ষ। রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময় সুন্দর করে সালাম দেবে। সালামের উত্তর দিয়ে দাঁড়ালে কুশল বিনিময় হবে। হ্যান্ডশেক করবে। এর মাঝেই আরো কিছু লোক এসে অস্ত্র ঠেকিয়ে টাকা-পয়সা, মোবাইল হাতিয়ে নেবে। রাজধানীতে এমন অভিনব কায়দায় ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বেশ কিছু চক্র। যারা পরিচিত ‘সালাম পার্টি’ নামে। এসব প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খুঁইয়েছেন অনেক সাধারণ মানুষ। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে সালাম পার্টির বেশ কিছু সদস্য। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টার্গেট করে যে কোনো সড়ক দিয়ে রিকশা বা হেঁটে যাওয়ার সময় এই চক্রের সদস্যরা সামনে এসে দাঁড়াবে। প্রথমেই বিনয়ের সঙ্গে ‘সালাম দিবে’। এরপর জিজ্ঞাসা করবে, ‘কেমন আছেন ভাইয়া অথবা আপি, আমি ওমুক। আরে, চিনতে পারছেন না আমাকে’? যে কেউ তার কথা শুনে ভাবনায় পড়ে যাবেন? মনে হবে হয়তো তিনি আমাকে চিনেন। আমি হয়তো তাকে মনে করতে পারছি না। তখন তিনিও হাসি মুখে হাত বাড়িয়ে দেন। হাত ধরার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ আরো কয়েকজন যুবক এসে সেখানে হাজির। এ সময় তারা শরীরে ধারালো অস্ত্র অথবা রিভলবার ঠেকিয়ে বলবে, যা আছে দ্রুত বের করে দে’। নইলে জীবন দে? তখন ভিকটিমের মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে। কোনো কিছু চিন্তা করে নির্বিগ্নে যা আছে তাদেরকে বের করে দেয়। তখন সেখান থেকে দ্রুত কেটে পড়ে ‘সালাম পার্টির’ প্রতারক চক্রের দল। ছিনতাইয়ে জড়িত ‘সালাম পার্টির’ ৮ থেকে ১০টি চক্র ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। ছিনতাইয়ে জড়িত এই চক্রটিকে দমন করার জন্য কাজ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের বিভিন্ন শাখা। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পূর্ব বিভাগের ডিসি খন্দকার নূরনবী মানবজমিনকে জানান, ‘সালাম দিয়ে এমন একটি চক্র ঢাকার বিভিন্নস্থানে ছিনতাই করছে। তাদের দেখলে বোঝা যাবে না যে, তারা ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ এই চক্রটি দমন করার জন্য মাঠে কাজ করছে।’ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ‘গত ২০শে মার্চ মতিঝিল  ব্যাংক কলোনি এলাকায় এক ব্যবসায়ী এমন ঘটনার শিকার হন। পরে তিনি মতিঝিল থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন। বিষয়টি ছায়া তদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর পুলিশের পূর্ব বিভাগ। এরপর গত ২৮শে মার্চ পল্টনের  আইডিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে থেকে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলো: মো. জিতু (৪৯), মো. মিজান (৩৫), মো. আকতার হোসেন (৪৫), মো. রিপন (২৮) ও পিন্টু মিয়া (৩১)। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুইটি মোটরসাইকেল ও ছিনতাইকৃত ১ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। মামলায় পুলিশ তাদের রিমান্ডে নেয়। রিমান্ডে এ চক্রের আদ্যপ্রান্ত জানার চেষ্টা করে পুলিশ। তাদের তথ্য অনুযায়ী ঢাকাসহ আশপাশের জেলায় অভিযান চালাচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশ।
ডিবি জানায়, ‘সালাম পার্টির’ সদস্যদের দেখে কোনোভাবেই মনে হবে না যে, তারা ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। ভদ্র এবং উচ্চবিত্তের পরিবারের লোকজনের মতো এ চক্রের সদস্যরা তারা ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার জন্য বিকাল বেলায় ঢাকার কোনো একটি এলাকায় রিকশা ভাড়া করে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে। কেউবা প্রাইভেটকার নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। কিন্তু, তারা একদিন একাধিক কোনো স্থানে ঘুরে না। ভাগ করে ঘুরে বেড়াই। ভ্যানিটি ব্যাগ বা ব্রিফকেসধারী নারী অথবা পুরুষ হয় তাদের প্রধান টার্গেট। ওই এলাকায় ব্যাংক অথবা এটিএম বুথের পাশে একজন ঘোরাঘুরি করে। কেউ বা গ্রাহক সেজে ব্যাংকের মধ্যে গিয়ে টাকা তোলে। লক্ষ্য রাখে কে কত টাকা নিয়ে বের হচ্ছে। নিজেদের টার্গেট পেয়ে গেলে ওই পুরুষ ও নারীর পিছু নেয় তারা। পথের মধ্যে মোবাইলে তাদের অপর সহযোগীদের জানিয়ে দেয়। শরীরের বিভিন্নস্থানে তারা রিভলবার ও অস্ত্র গোপনস্থানে রাখে। যাতে করে কেউ বুঝতে না পারে। একপর্যায়ে এ চক্রের সদস্যরা ওই টার্গেটকৃত ব্যক্তির সামনে এসে দাঁড়ায়। সালাম দিয়ে প্রাথমিক কথা বলার সময়ের কিছুক্ষণের মধ্যে গ্রুপের অন্য সদস্যরা সেখানে এসে হাজির হয়। তখন অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তারা ভিকটিমের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ব্যাগ ও মোবাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়ে চলে যায়। এ সময় ভিকটিমের চিৎকার ও কান্না করা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। কোনো উপায় না পেয়ে ভিকটিম তখন থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করেন।
সূত্র জানায়, এ চক্রের সদস্যরা, পল্টন, কাকরাইল, মতিঝিল, ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা, রমনা মহাখালী, কমলাপুর এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। ঢাকায় ৮ থেকে ১০টি গ্রুপ রয়েছে। প্রত্যেকটি গ্রুপে ৫ থেকে ৬ জন সদস্য রয়েছে। সূত্র জানায়, এ চক্রের অধিকাংশ সদস্য মাদক সেবনে আসক্ত এবং বকে যাওয়া তরুণ। অনেকেই কাজ না পেয়ে বেকার হয়ে হতাশা থেকে এই ছিনতাইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গত ২৮শে মার্চ গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে ডিবি পুলিশ জানতে পেরেছে, এই সালাম পার্টির সদস্যরা ঢাকায় বসবাস করে না। নিরীহ লোকজনের কাছ থেকে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়ে তারা ঢাকার বাইরে তাদের আবাসস্থল নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ এবং গাজীপুর এলাকায় চলে যায়। বিকাল বেলা হলে তারা সেখান থেকে আবার ঢাকায় চলে এসে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ঘোরাঘুরি শুরু করে।

Monday, April 16, 2018

চট্টগ্রামে সক্রিয় ৩০ ছিনতাইকারী গ্রুপ

রাতের অন্ধকারে, ভোরের ফঁকা রাস্তায়, দুপুরের ব্যস্ত সময়, এমনকি সন্ধ্যার নির্জনেও সক্রিয় চট্টগ্রামের ৩০ ছিনতাইকারী গ্রুপের সদস্যরা। এদের নিয়ে জনমনে যেমন আতঙ্ক রয়েছে। তেমনি পুলিশও চিন্তিত ব্যাপকভাবে।
এমন কথাই বললেন চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-মিশনার মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, নগরে একের পর এক ধরা পড়ছে ছিনতাইকারী। তবুও থামছে না ছিনতাই। একের পর এক ঘটেই চলেছে ছিনতাইয়ের ঘটনা।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার নগরীর পৃথক দু’টি স্থানে ব্যবসায়ীর ১২ লাখ টাকা ছিনতাই। আগের দিন সোমবার নগরীর পাহাড়তলী থানার আবুল খায়ের গ্রুপের পরিবেশকের অফিসের সামনে থেকে ৮ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় ছিনতাইকারীদের হদিস পর্যন্ত মেলেনি এখনো।
এর আগে নগরে প্রতিমাসে ১৫ বা তারও বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বহু ছিনতাইকারীকে আটকও করা হয়েছে। এ কারণে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভবিষ্যতে এর ব্যাপক বিস্তৃতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, গত তিন মাসে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৫৭ জনের মতো ছিনতাইকারীকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এরপরও এত ছিনতাইয়ের ঘটনা কিভাবে ঘটে; এত ছিনতাইকারী কোথা থেকে আসে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত আমরা।
চট্টগ্রাম মহানগর বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ডিবি উত্তর ও বন্দর জোন গত দুই মাসে ৩০ থেকে ৪০ জন ছিনতাইকারী আটক করেছি। তাদের দুই-একজন জামিনে বের হয়ে আবারও টিম তৈরি করে দ্রুত ছিনতাই করে আড়ালে চলে যাচ্ছে। কৌশল বদল করে ছিনতাইকারীরা ছিনতাই করছে।
তিনি বলেন, ছিনতাইকারীদের সময় ভাগ করা আছে। কৌশলেও আছে ভিন্নতা। ছিনতাই কাজে কখনো রিকশা, কখনো সিএনজি টেক্সি, মোটরসাইকেল কিংবা মাইক্রোবাস ব্যবহার করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কোনো ছিনতাইকারী ধরা পড়লে অন্যটিম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এভাবে নগরজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অন্তত ৩০টি ছিনতাইকারী গ্রুপ। তাদের নামেও আছে ভিন্নতা। কোনো গ্রুপের নাম টানা পার্টি, কোনটা মামু পার্টি, কোন গ্রুপ পরিচিত সালাম পার্টি নামে, আছে সিএনজি পার্টি থেকে ভুয়া পুলিশ ডিবি পর্যন্ত।
তিনি বলেন, ছিনতাইকারীরা কয়েকটি ধাপে তাদের অপারেশন সমপন্ন করে। তাদের মূল টার্গেট হলো ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা উত্তোলনকারী ব্যক্তি এবং বিকাশসহ মোবাইল ব্যাংক কর্মীরা। এছাড়া বিদেশ ফেরত যাত্রীরাও রয়েছে তাদের টার্গেটে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক, আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ছিনতাইকারীদের কাছে গোপনে অর্থ পরিবহনের তথ্য আগাম জানিয়ে দেয়া হয়। এরপর ভুয়া নম্বর প্লেটের গাড়ি নিয়ে ছিনতাইকারীরা পরিকল্পনা সাজায়।
ছিনতাইকারী চক্রের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও রেসকিউ টিম রয়েছে। অপারেশন সফল হলে জড়িত সবার মধ্যে টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে দেয়া হয়। অনেক সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নকল পোশাক পরে ছিনতাই করা হয়। ভাড়া করা অটোরিকশায় খাঁচা লাগানোর পরে এখন ছাউনি কেটে নেয়া হচ্ছে মুঠোফোন বা ব্যাগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীতে সিএনজি টেক্সি নিয়ে ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত ছিনতাই করে এক গ্রুপ। আরেকটি গ্রুপ কাজ করে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। তারা সিএনজিতেও আসে, আবার মোটরসাইকেলেও আসে। মূলত: রিকশারোহী নারীদের টার্গেট করে তারা। রিকশার পাশ দিয়ে চলে যেতে যেতে মোটর সাইকেলের পেছনের আরোহী ছোঁ মেরে কেড়ে নেয় ব্যাগ।
জামালখান মোড়ে এ ধরনের একটি চক্রের শিকার হয়ে রিকশা থেকে পড়ে মারা যান শিরীন নামে এক তরুণী। কখনও কখনও পরিচিত ব্যক্তির ভাব করে লোকজনকে থামিয়েও ছিনতাই হচ্ছে। উচ্চস্বরে সালাম দিয়ে হঠাৎ মাঝপথে গতিরোধ করে রিকশা যাত্রীর দু’পাশে দাঁড়িয়ে দুই যুবক মুহূর্তে পিস্তল বের করে ঠেকায় যাত্রীর বুকে। কি আছে বের করে দাও না হলে গুলি ছুঁড়ব। প্রাণ বাঁচাতে টাকা-পয়সা মোবাইল ফোন নীরবেই তাদের হাতে তুলে দিতে হচ্ছে।
হাঁটার পথে আকস্মিক কয়েকজন যুবক মামু কেমন আছেন বলে ঘিরে ধরছে পথচারীকে। এরপর অস্ত্র কিংবা ছুরি দেখিয়ে সবকিছু কেড়ে নিচ্ছে। কখনও আবার রিকশা থামিয়ে চালককে মারধর শুরু করছে কয়েকজন যুবক। নিরপরাধ রিকশাচালকের উপর নির্যাতনে বাধা দিতে গেলে বন্দুক তাক করা হচ্ছে যাত্রীর দিকে। মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নেয়া হচ্ছে যাত্রীর টাকা-পয়সা।
সমপ্রতি ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক ছিনতাইকারীদের একটি গ্রুপ সক্রিয়, যারা মূলত মাদকাসক্ত। মাদকের টাকা জোগাড় করতে তারা মরিয়া। বিশেষ করে রাত ৮ টার পর থেকে নগরীর কদমতলী ফ্লাইওভার ও মুরাদপুর ফ্লাইওভারে চলন্ত গাড়ির গতিরোধ করে তিন চারজন। চেহারা উস্কো খুস্কো, ছুরি হাতে উদ্যত। বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেই ছুরিকাঘাত করে কেড়ে নেয় টাকা-পয়সা, মোবাইলসহ সবকিছু। কাজ হাসিল করেই ছুটতে থাকে মাদক আস্তানায়। এদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত সন্তানও জড়িয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ছিনতাই ঘটনায় মামলা নিতে বরাবরই থানা পুলিশ দারুণ উদাসীন। মামলা না নিয়ে জিডি নিয়ে দায় সারছে পুলিশ।
অন্যদিকে পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগীরাই অভিযোগ করতে চান না। থানায় অভিযোগ না নিলে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাহায্য চাইতে পারেন তারা। তা না করে একচেটিয়া পুলিশের উপর দায় চাপানোর অভ্যাসটা পুরনো।
সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, ছিনতাইয়ের ঘটনার ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা। এ পরিস্থিতির উত্তরণ এখনই ঘটানো না গেলে ভবিষ্যতে সমাজে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে। পুলিশের গড়িমসির বিষয়টি নতুন কিছুই নয়। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে তা সমাজের জন্য খারাপ ফল বয়ে আনবে।

Sunday, April 15, 2018

হত্যা রহস্যের কিনারা: সাদা রঙের স্মার্টফোনটিই কাল হয়েছিল মাহিদের by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

স্যামসাং ডুওস মডেলের সাদা রঙের স্মার্ট ফোন। এ ফোনটিই কাল হয়েছিলো শাহ্‌জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) অর্থনীতি বিভাগের ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী মাহিদ আল সালামের। মোবাইল আর টাকার জন্য ছিনতাইকারীরা ছুরির আঘাতে তার প্রাণ কেড়ে নেয়। তবে সে মোবাইল ফোনটি নিজেদের কবজায় রাখতে পারেনি ছিনতাইকারীরা। পুলিশ ঠিকই সেটি উদ্ধার করেছে। আর এর মধ্য দিয়ে বলতে গেলে পুরোই উন্মোচিত হয়েছে মাহিদ হত্যা রহস্য। তদন্তও অনেকটা শেষই হয়ে গেছে। এ মামলার সকল আসামিই এখন পুলিশের খাঁচায়। অপেক্ষা শুধু চার্জশিট জমা দেওয়ার। সবশেষে আটক হওয়া মোবাইল ব্যবসায়ী শুক্রবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন।
মাহিদ হত্যা মামলায় আসামী ছিলো ৪ জন। ৩ জনকে আগেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিলো। পলাতক থাকা অপর আসামি শাকিল গত সোমবার আদালতে আত্মসমর্পণ করে। আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে ওইদিনই পুলিশ তাকে রিমান্ডে নেয়। অপরদিকে আগে থেকে গ্রেপ্তার হওয়া মির্জা আতিককে এয়ারপোর্ট থানার অন্য একটি ছিনতাই মামলার আসামি হিসেবে বুধবার রিমান্ডে  নেয় পুলিশ। ওইদিনই দুই পেশাদার ছিনতাইকারী আতিক এবং শাকিলকে মুখোমুখি করা হয়। চতুর শাকিল প্রথমে পুরো ঘটনা অস্বীকার করে। কিন্তু পুলিশের জেরার মুখে বেশিক্ষণ টিকতে পারে না। এক পর্যায়ে ঘটনার বর্ননা দিতে থাকে। রহস্যের গেরো খুলতে শুরু করে এক এক করে। সেই জানায় কার কাছে রয়েছে ছিনতাইকৃত মোবাইলটি। জনৈক জসিমের কাছে মোবাইল ফোনটি রয়েছে জানালেও শাকিল কৌশলে জসিমের ঠিকানা জানি না বলে এড়িয়ে যায়। তবে পুলিশ বসে থাকার পাত্র নয়। তারা ঠিকই সন্ধান পায় জসিমের। মো. জসিম উদ্দিন একজন মোবাইল ব্যবসায় ী। সিলেট নগরীর বন্দরবাজারস্থ করিমউল্লাহ মার্কেটের ৩য় তলায় জসিম টেলিকম নামে তার মোবাইলের দোকানও রয়েছে। সে নগরীর শেখঘাট খুলিয়াটুলা নিলিমা-২২ নম্বর বাসার ইব্রাহীম আলীর ছেলে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) সহকারী উপ-কমিশনার (দক্ষিণ, অপরাধ) জ্যোতির্ময় সরকারের নেতৃত্বে জসিমের খোঁজে বের হয় পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে খুলিয়াপাড়া থেকে জসিমকে মোবাইলসহ আটক করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে জসিম উদ্দিন জানায়, ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে মির্জা আতিকের মাধ্যমে শাকিল তার কাছে  মোবাইলটি বিক্রি করে। ২৫শে মার্চ গভীর রাতে সুরমা নদীর উপরে কিন ব্রিজের দক্ষিণ পাশের অন্ধকার এক কোনে খুন হয়েছিলেন মাহিদ আল সালাম। পুলিশের সামনে তখন কোনো ক্লুই ছিলো না। তবে মাহিদকে যে রিকশার যাত্রী ছিলেন মাহিদ সে রিকশার পেছন দিকের একটি ছবিই পুলিশের সামনে রহস্য সন্ধানের দ্বার খুলে দিয়েছিল। সে ছবির সূত্র ধরে ওই রাতেই পুলিশ নগরীর আখালিয়া থেকে রিকশাচালক জয়নাল আবেদীন ভাণ্ডারীর সন্ধান পায়। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ছিনতাইকারীদের সম্পর্কে একটি ধারণা পায়। সে ধারণা থেকেই ২৬শে মার্চ ভোররাতে পুলিশ ঘেরাও দেয় পুরো সুরমার দক্ষিণ পারের ভার্থখলা এলাকা। দুপুরের দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে ওই এলাকায় আসে ভার্থখলা এলাকার সোয়াব মীর্জার ছেলে মীর্জা আতিক। মীর্জা আতিক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তায়েফ মুহাম্মদ রিপন। ঘাতক হিসেবে পুলিশ এদেরই সন্দেহ করছিলো। পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে মোটরসাইকেল ফেলে দৌড় দেয় আতিক ও রিপন। ঢুকে যায় ভার্থখলা কবরস্থানে। পুলিশ কবরস্থান ঘেরাও করে তাদের আটক করে। ২৮শে মার্চ রাত ১টার দিকে গ্রেপ্তার করা হয় আরো এক ছিনতাইকারী- দক্ষিণ সুরমার বারোখলার বাসিন্দা রাসেলকে। বেশ কিছুদিন লুকোচুরির পর ৯ই এপ্রিল আদালতে আত্মসমর্পণ করে ভার্থখলার বাসিন্দা শাকিল আহমদ। এ শাকিলই মাহিদের শরীরের ছুরির আঘাত করেছিল। মাহিদ হত্যা রহস্য উন্মোচনে শুরু থেকেই নেতৃত্ব দেন এসএমপি’র এডিসি দক্ষিণ (অপরাধ) জ্যোতির্ময় সরকার। মানবজমিন-এর কথা হয় তার সঙ্গে। মাত্র ১৬/১৭ দিনের মধ্যে রহস্যের কিনার করতে পারায় তাকে বেশ সন্তুষ্টই মনে হলো। জানালেন, ক্লু-লেস এ মামলার সকল আসামিকেই ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জানান, ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত দু’টি মোটরসাইকেল, ছুরি এবং ছিনতাইকৃত মোবাইলও উদ্ধার করা হয়েছে। মোটরসাইকেল দু’টির মালিক শাকিল ও রিপন। পুলিশের এ কর্মকর্তা বললেন, এখন দ্রুততম সময়ে চার্জশিট জমা দেয়া হবে।

Monday, April 9, 2018

অনিরাপদ ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ ট্রেনের ছাদে ১ বছরে ৪২ খুন by মতিউল আলম

ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেনে ছিনতাইকারীদের দাপট বেড়েছে। একের পর এক নিরীহ যাত্রীদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে তারা। নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হচ্ছে ট্রেন যাত্রীদের। ট্রেনের ছাদে গত ২০১৭ সালে ছিনতাইকারীর হাতে ৪২ জন খুন হয়েছে। এসব নির্মম হত্যাকাণ্ডে ট্রেনের যাত্রীরা অসহায় ও আতঙ্কিত।
ব্যবসায়ী খোকন খান (৩৮)। নেভী সিগারেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। দুই মাস আগে চাকরি ছেড়ে সিগারেট বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। ২৩শে মার্চ দিনভর গাজীপুরের টঙ্গী চেরাগআলী মার্কেট এলাকায় সিগারেট সাল্পাই দেন। পরে বাড়ির আকুলতায় রাতের ট্রেনে চেপেই রওনা হন। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কি বুঝতে পেরেছিলেন, জীবনের শেষ ট্রেনে চেপে বসেছেন তিনি। ট্রেনটি গফরগাঁওয়ের চারিপাড়া রেলসেতু সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছলে সর্বস্ব লুটে নিয়ে তাকে ট্রেন থেকে ফেলে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। নিহত খোকন গফরগাঁওয়ের পাঁচবাগ ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামের আবদুস ছালামের ছেলে।
১লা এপ্রিল ঢাকাগামী আন্তঃনগর তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে ছিনতাইকারীরা গণছিনতাই শেষে ১৬ বছর বয়সের এক কিশোরকে হত্যা করে। ট্রেনটি গফরগাঁও-ময়মনসিংহের মধ্যবর্তী আউলিয়া নগর রেলস্টেশন অতিক্রমকালে ট্রেনের ছাদ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়তে দেখে যাত্রীরা হৈ চৈ শুরু করে। পরে দায়িত্বরত জিআরপি পুলিশ ছাদে উঠে অজ্ঞাত এক কিশোরের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে গফরগাঁও জিআরপি পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেয়। এ সময় জিআরপি পুলিশ ছাদে ভ্রমণরত সন্দেহ জনক ফুলপুর গোদারিয়া গ্রামের লালমিয়ার ছেলে বাবুল (১৮), গৌরীপুর থানার নয়াপাড়া গ্রামের আমিনুল ইসলামের ছেলে ফরিদুল ইসলাম (২৫), শেরপুর সদরের রামকৃষ্ণপুর এলাকার আব্দুল করিমের ছেলে ফারুক মিয়া (২৫) ও নেত্রকোনা জেলার বাহাম গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে কাইজুল মিয়াকে (২০) আটক করে। এ রেলপথে এর আগেও অসংখ্য যাত্রীর প্রাণ গেছে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের হাতে। সামান্য কিছু টাকা আর মুঠোফোনের জন্য যাত্রীদের হত্যা করছে ছিনতাইকারীরা। ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথটি ছিনতাইকারীদের নিরাপদ জোনে পরিণত হয়েছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে মাত্র তিন মাসে এ পথে ৩৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। গত বছরের ২৯শে ডিসেম্বর ধলা ও বালিপাড়া এলাকায় দুই জনকে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। একই বছরের ১০ই আগস্ট গফরগাঁওয়ের রৌহা নামক স্থানে ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে অজ্ঞাত যুবককে ট্রেন থেকে ফেলে দিলে যুবক মারা যান। একই বছরের ১১ই সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা জামালপুর, বাহাদুরাবাদ ঘাটগামী সেভেন আপ ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবককে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। এ ছাড়াও ট্রেনের ছাদে ছিনতাই শেষে অনেক যাত্রী ফেলে দেয়ার ঘটনায় কেউ নিহত হচ্ছেন কেউবা আবার চিরতরে পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আর নিহত হওয়া অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের জামাকাপড় রেলওয়ে ডোম ঘরের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। তবে, বছর দুয়েকের মধ্যে স্বজনদের সন্ধান না পাওয়া গেলে ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবেই থেকে যায়। চলন্ত ট্রেনে আওয়াজ থাকায় কেউ কিছুই টের পাবে না-এ সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে পেশাদার চক্রটি। এভাবেই প্রাণ হারাচ্ছেন রাতে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণকারী যাত্রীরা। তবু কোনো প্রতিকার খুঁজে পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। আবার দুয়েকটা ঘটনায় হাতেনাতে ধরাও পড়ে ছিনতাইকারীরা। কিন্তু পর্যাপ্ত সাক্ষী আর আলামতের অভাবে সহজেই জামিন পেয়ে যায় অপরাধীরা।
শুক্রবার বিকালে গফরগাঁওয়ে কমিউটার ট্রেনে চলন্ত অবস্থায় গণ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এ সময় যাত্রীরা রায়হান নামে এক ছিনতাইকারীকে আটক করে জিআরপি পুলিশে সোর্পদ করে। আটক ছিনতাইকারীকে ছিনিয়ে নিতে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী দল গফরগাঁও জিআরপি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালায়। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে চলে এ তাণ্ডব। কিন্তু জিআপরপি পুলিশ ভেতর থেকে দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়ায় আটক ছিনতাইকারীকে ছিনিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। ৬ই এপ্রিল বিকাল সোয়া ৫টার দিকে গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে এ ঘটনা ঘটে।
গফরগাঁও জিআরপি ফাঁড়ির ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম খান দাবি করে বলেন, স্থানীয় কিছু ছেলে-পেলে আটক ছিনতাকারীকে ছাড়িয়ে নিতে ফাঁড়ির দরজার ধাক্কাধাক্কি করেছে। তবে, ছিনতাইকারীকে ময়মনসিংহ জিআরপি থানায় পাঠানো হয়েছে। ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ইব্রাহীম (৩২) ও গাজীপুর শহরের দক্ষিণ চত্বর এলাকার নূরুল হক (৩৫) জানায়, বালিপাড়া স্টেশন অতিক্রমকালে ছিনতাইকারীদল ছিনতাই শুরু করে। এ সময় বাধা দেয়ায় চেষ্টা করলে ছিনতাইকারীরা যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে মারধর করে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিতে চায়। সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা, মোবাইলসহ জিনিসপত্রসহ সর্বস্ব ছিনতাইকারীদের হাতে তুলে দিয়ে যাত্রীরা রক্ষা পায়। গত সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে চলাচলকারী বলাকা ট্রেনটি ময়মনসিংহ স্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ট্রেনটি ফাতেমানগর পার হওয়ার সময় ছাদে ভ্রমণরত যাত্রী গফরগাঁওয়ের রৌহা গ্রামের বাসিন্দা হানু মিয়া ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। এ সময় বাধা দেয়ায় ছিনতাইকারীরা তাকে মারধর করে। পরে ট্রেনটি গফরগাঁও স্টেশনে দাঁড়ালে ছিনতাইকারীরা দৌড়ে পালানোর সময় আক্রান্ত হানু মিয়া চিৎকারে জিআরপি ফাঁড়ি পুলিশ জনি মিয়া, অনন্ত ও আনারুল নামের তিন ছিনতাইকারীকে আটক করে। এ নিয়ে গত ১৫ দিনে এ রেলপথে অন্তত পাঁচটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুল মান্নান বলেন, ট্রেন যাত্রীদের হত্যার ঘটনায় তদন্ত করছে রেলওয়ে পুলিশ। পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারে কাজ চলছে।

Saturday, March 31, 2018

সিলেটে বেপরোয়া ছিনতাই সিন্ডিকেট by ওয়েছ খছরু

সিলেটে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীরা। প্রতিদিনই সিলেটের কোথাও না কোথাও ছিনতাই হচ্ছে। আবার ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ যাচ্ছে মানুষেরও। বিশেষ করে রাতের বেলা ছিনতাইয়ের ঘটনা আশংকাজনক হারে বেড়ে গেছে। এতে করে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেমে এসেছে। তবে পুলিশ বলছে- সিলেটে যাতে রাতের বেলা ছিনতাই না বাড়ে সে কারণে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। আর শাবির সাবেক ছাত্র মাহিদ খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। খুব শিগগিরই প্রকৃত আসামিরা গ্রেপ্তার হবে। ছিনতাইয়ের চিহ্নিত আস্তানা সিলেটের দক্ষিণ সুরমা। পাশাপাশি উত্তর এলাকার বেশ কয়েকটি স্পটও ছিনতাই জোনে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ সুরমায় ছিনতাইয়ের দৌরাত্ম্য বাড়ে ভোরবেলা। সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন সহ নগরীর প্রবেশ মুখ দক্ষিণ সুরমা। যারা বাইরে থেকে সিলেটে আসেন তাদের বেশির ভাগ যাত্রীই ভোরবেলা এসে গাড়িযোগে সিলেটের কদমতলী ও রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় নামেন। সেখান থেকে রিকশা কিংবা সিএনজি অটোরিকশাযোগে গন্তব্যে যান। কিন্তু দক্ষিণ সুরমায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছে যাত্রীরা। দক্ষিণ সুরমা কদমতলী। নতুন ব্রিজের মুখ। গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ ও ঢাকা বাইপাস সড়কের জংশন এটি। কদমতলী এলাকায় ছিনতাইয়ের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। ২০ জনের ছিনতাই গ্রুপ। ওই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে স্থানীয় মাদকসেবীরা ও এক পুলিশের সোর্স। গাড়ি থেকে যাত্রী নেমে নতুন ব্রিজ হয়ে একটু দূরে গেলেই তাদের জাপটে ধরা হয়। ফাঁকা রাস্তা থাকায় নির্বিঘ্নে যাত্রীদের সর্বস্ব কেড়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এরপর তারা ব্রিজের নিচ দিয়ে কলোনিতে চলে যায়। নতুন ব্রিজের উত্তর অংশে মেন্দিবাগ ও উপ-শহরের গলির মুখে রয়েছে আরেকটি ছিনতাই চক্র। ওদের হাতে বিশেষ করে বাস টার্মিনাল এলাকায় আগত যাত্রীরা ছিনতাইয়ের শিকার হন। দক্ষিণ সুরমার কদমতলী পয়েন্টে রয়েছে আরো একটি চক্র। ওই চক্র পাম্প ও বিভিন্ন মার্কেটের কর্ণারে অবস্থান করে। পাশে পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও তারা নির্বিঘ্নে ছিনতাই করে চলে যায়। তেমন ঘটনা ঘটেছে গত সোমবার ভোররাতে। রাতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মাহিদ ঢাকা যাওয়ার পথে কদমতলীতে ছিনতাইয়ের শিকার হয়। ওখানে মাহিদের ঊরুতে ছুরিকাঘাত করে সর্বস্ব ছিনতাই করা হয়। আর গুরুতর অবস্থায় মাহিদকে হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ এখন সিলেট। মাহিদের খুনিদের গ্রেপ্তারে সিলেট পুলিশের ঘুম হারাম। কিন্তু গতকাল বিকাল পর্যন্ত এই খুনের ঘটনায় জড়িত কাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি। কদমতলী বাস টার্মিনাল এলাকা হচ্ছে ছিনতাইকারীদের বড় আস্তানা। ওই টার্মিনাল এলাকার পেছনের কয়েকটি কলোনিতেই ছিনতাইকারীদের আস্তানা। এসব আস্তানা থেকে তারা ছিনতাই পরিচালনা করে। আর ছিনতাই করার পর তারা ওইসব কলোনিতে আশ্রয় নেয়। ভোরবেলা যাত্রীরা দূর-দূরান্ত থেকে নামলে তাদের ব্যাগ টেনে নেয়া সহ নানা ঘটনা ঘটে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে। গাড়ির চালকরা জানিয়েছেন প্রায় প্রতিদিনই ২-৩টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে টার্মিনাল এলাকায়। পুলিশের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো লাভ হয় না। কখনো কখনো পুলিশের সামনেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের গলির সামনে রয়েছে ঝাপটাপার্টির দৌরাত্ম্য। ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে রেলের যাত্রীরা ভোরে এসে সিলেটে নামেন। রিকশা কিংবা সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে বের হওয়ার সময় গাড়ি থেকে ঝাপটা দিয়ে ব্যাগ, মোবাইল ছিনতাই করা হয়। আর ছিনতাই করে তারা রেলওয়ে স্টেশনের পেছনে থাকা কলোনির দিকে চলে যায়। এর বাইরে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে কীন ব্রিজের মুখ পর্যন্ত মাদকসেবীদের একটি ছিনতাই সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা বিভিন্ন টং দোকানের আড়ালে কিংবা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। নিরিবিলি অবস্থায় যাত্রী পেলেই ঝাপটে সবকিছু নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করলে যাত্রীদের ওপর ছুরিকাঘাত করা হয়। দক্ষিণ সুরমার এসব ছিনতাইকারীদের বাস বিভিন্ন কলোনিতে। ওই কলোনিতে মাদক ও অসামাজিক কাজের আখড়া। নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয়রা। তারা নিয়মিত ফাঁড়ি পুলিশকে বখরা দেয় বলে পুলিশ ছিনতাই রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। সিলেটের কীন ব্রিজের সুরমা মার্কেট এলাকায় ছিনতাই পার্টি। পাশাপাশি ঝাপটা পার্টির দৌরাত্ম্যও বেশি। রাত নামলেই ছিনতাইকারীরা নেমে পড়ে রাস্তায়। আর দিনে ওরা ঝাপটা পার্টি হয়ে কাজ করে। ছিনতাই করে কখনো কখনো তারা কীন ব্রিজের নিচ দিয়ে পালিয়ে যায়। একটি গ্রুপের প্রধান আস্তানা সুরমা মার্কেটের ভেতরেই। ওই মার্কেটের ভেতরে তাদের আস্তানা রয়েছে। ছিনতাই করার মালামাল নিয়ে রাখা হয় ওখানে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, পুলিশ সহ তাদের সম্পর্কে অবগত থাকলেও কখনোই ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা হয় না। এর বাইরে নগরীর কোর্ট পয়েন্ট, আম্বরখানা, জিন্দাবাজার গার্লস স্কুলের সামন, ধোপাদিঘীরপাড়, সুবহানীঘাট, উপশহর, শিবগঞ্জ, টিলাগড়, শাহী ঈদগাহ, চৌহাট্টা, মেডিকেল, রিকাবীবাজার, সুবিদবাজার, মদিনা মার্কেট ও বিশ্ববিদ্যালয় ফটক এলাকায় রয়েছে ছিনতাই পার্টি। সিলেটে ছিনতাইকারীদের হাতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন প্রতিদিনই বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের কেউ না কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জালালাবাদ থানার পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এমনকি শহরের চিহ্নিত এলাকাগুলোতে ছিনতাই বন্ধে তারা কয়েক মাস আগে পুলিশের কাছে আবেদনও জানিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সিলেট পুলিশের সোর্সদের শেল্টারে ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে মহানগর পুলিশ থেকে কয়েক মাস আগে একটি ছিনতাইয়ের তালিকা করা হয়েছিল। ওই তালিকা ছিল দুর্ধর্ষ থেকে ছিঁচকে ছিনতাইকারীরাও। রয়েছে মোটরসাইকেল ছিনতাই চক্রও। তালিকা পুলিশের কাছে থাকলেও ছিনতাই বন্ধে থানা ও ফাঁড়ি পুলিশের তেমন গরজ নেই। খোদ ফাঁড়ি পুলিশের অনেক সদস্যই ছিনতাইকারীদের শেল্টারে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠে প্রায় সময়। এদিকে মাহিদ খুনের ঘটনায় পুলিশ সক্রিয় থাকলেও এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ওই দিন রাতে নগরীর ধোপাদিঘীর পাড়ে এক ছিনতাইকারীকে হাতেনাতে আটক করে স্থানীয়রা গণধোলাই দেয়। গণধোলাইয়ের এক পর্যায়ে ওই ছিনতাইকারী পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই বেনু চন্দ চন্দ্র। তিনি গতকাল মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ওই ছিনতাইকারী আহত অবস্থায় পালিয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশ বিভিন্ন হাসপাতালে অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে জানান তিনি। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) আব্দুল ওয়াহাব জানিয়েছেন, ছিনতাই রোধে সিলেটে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুলিশ। মাহিদ খুনের ঘটনায় জড়িত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। খুব শিগগিরই এ ব্যাপারে সুখবর মিলবে বলে জানান তিনি।