Wednesday, August 6, 2014

গাজায় যুদ্ধবিরতি শান্তির পথ সুগম করবে কি? by আলী রীয়াজ

গাজায় সীমিত সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েল ও হামাস সম্মত হয়েছে—এই খবরে ইতিবাচক দিক অন্তত এইটুকু যে গাজার নিরীহ মানুষ কিছু সময়ের জন্য হলেও নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে। জাতিসংঘের উদ্যোগে করা এই ‘মানবিক যুদ্ধবিরতি’র সুযোগে গাজার মানুষেরা নিহত ব্যক্তিদের কবর দিতে পারবে বলে গণমাধ্যমের জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তার মন্তব্য থেকে মনে হতে পারে যেন গাজার মানুষ তাদের প্রিয়জনদের চিরনিদ্রায় শয়নের অধিকারও হারিয়েছে। এই যুদ্ধবিরতিতে দুই পক্ষের সম্মতির কারণে আমরা অনুমান করতে পারি যে আগের দফায় মিসরের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি কাজে না দিলেও এবার তা বাস্তবায়িত হবে। শুধু তা-ই নয়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই আলোচনার বিষয়েও দুই পক্ষের মতৈক্য রয়েছে।

মিসরে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় ফিলিস্তিনিদের মূল ও চূড়ান্ত দাবির সমাধান হবে—এমন কেউই আশা করেন না। কেননা, আলোচনার এজেন্ডাতেই তা নেই; এখনকার লক্ষ্য হলো চলমান যুদ্ধের সাময়িক অবসান। ২০১২ সালেও আমরা তা-ই দেখেছি। কিন্তু অন্য যেকোনোবারের সঙ্গে এবারের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো এই যে এবার হামাসকে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। কেননা, আগে এই ধরনের পরিস্থিতিতে মিসরের ক্ষমতাসীনেরা কেবল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাই পালন করেননি, হামাসের প্রতি সহানুভূতিশীলও ছিলেন; ২০১২ সালের যুদ্ধের সময় ক্ষমতাসীন মুসলিম ব্রাদারহুড ও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি চেয়েছিলেন যে এই আলোচনার মধ্য দিয়ে তাঁর সরকারের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হোক এবং হামাসের প্রতি বিশ্বের সহানুভূতি বৃদ্ধি পাক। কিন্তু এবার মিসরের ক্ষমতাসীন আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসির সরকারের অবস্থান মোটেই তা নয়। এবারের গাজা হামলার সূচনা হাওয়ার পর যদিও মিসরের সরকার প্রত্যক্ষভাবে হামাসের বিরুদ্ধে কথা বলেনি; কিন্তু তাদের করা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের মূল বক্তব্য ইসরায়েলের প্রস্তাবের চেয়ে ভিন্ন ছিল না, যা থেকে এমন অনুমান করা ভুল হবে না যে তারা আলোচনায় মোটেই হামাসের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকবে না।
তবে আলোচনায় ফিলিস্তিনিদের কে প্রতিনিধিত্ব করবে, সেটা হামাস একা নির্ধারণ করবে না। সেটা নির্ধারণ করবেন ঐক্য সরকারের প্রধান হিসেবে মাহমুদ আব্বাস। এই আলোচনায় মিসরের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও থাকবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র হামাসের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় যাবে না; ইসরায়েলিরাও হামাসের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করবে না। এসব কারণে হামাসের জন্য এই আলোচনা যে খুব বেশি অনুকূলে যাবে না, তা বোঝা যায়। ২৬ দিনের এই ইসরায়েলি অভিযানের ফলে সারা বিশ্বের জনমত যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গেছে, তা বলাই বাহুল্য। বিমান হামলায় শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা সবাইকে যেভাবে নাড়া দিয়েছে, তা দীর্ঘ মেয়াদে ইসরায়েলের জন্য যে ক্ষতি হয়েছে, ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকেরা তা না বুঝলে বা না বুঝতে চাইলেও অন্যরা বুঝতে পারছেন। ফলে, হামাস যেমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আলোচনায় উপস্থিত হবে; তেমনি ইসরায়েলের জন্যও এই আলোচনা খুব অনুকূল পরিবেশে হচ্ছে তা নয়।
তবে প্রায় এক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির একটা নতুন বিষয় স্পষ্ট হয়ে পড়েছে, আর তা হলো, এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সমর্থন না দিলেও এই অঞ্চলের অনেক দেশই পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের এ অভিযানের বিষয়ে খুব বেশি অখুশি হয়নি। এই অঞ্চলের অনেক দেশ যে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় কম সরব হয়েছে, তাতেই এটা স্পষ্ট। আরব লীগ বা ওআইসি যে একটা কঠোর বিবৃতি পর্যন্ত দিতে এগিয়ে আসেনি, সেটা দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়। সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশের অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে তারা হামাসের পক্ষে দাঁড়াতে অনিচ্ছুক; এমনকি যদি তার ফলে ইসরায়েল লাভবান হয়, তাতেও তাদের আপত্তি নেই। ইসরায়েল এই আঞ্চলিক অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে, না তার সুযোগ গ্রহণ করেছে, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে; কিন্তু যা বিতর্কের ঊর্ধ্বে, তা হলো গাজার যুদ্ধের একটা সাময়িক বিরতি যদি অর্জনও করা যায়, তাহলেও এই পরিস্থিতি বদলে যাবে তা নয়।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, মধ্যপ্রাচ্যে একদিকে ইরানকেন্দ্রিক বা ইরান-প্রভাবিত একটি বলয়—হামাস, হেজবুল্লাহ, ইরাক, সিরিয়াকে আমরা সেই বলয়ের সদস্য হিসেবে দেখতে পাই, যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়া এবং প্রয়োজনে সংঘাত বহাল রাখাকে যথাযথ বলে মনে করে। সৌদি আরব, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে এবং যতক্ষণ না পর্যন্ত গাজা ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ফাতাহ গোষ্ঠী ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব স্থাপিত হচ্ছে, ততক্ষণ এই সংকট সমাধানে তারা অংশ নেবে না বলেই মনে হচ্ছে। এই দেশগুলোর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে মনে হয় না যে তার প্রভাববলয় বৃদ্ধি করতে চায়। তবে সৌদি আরবের শাসকেরা আশা করেন যে ইরানের শিয়া নেতৃত্বের বিপরীতে সুন্নিদের নেতৃত্ব তাঁদের হাতেই থাকবে। তাঁরা আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হচ্ছে।
এই দুই অবস্থানের বাইরে কাতার ও তুরস্ক একধরনের অবস্থান নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কাতারের যে হামাসের প্রতি পক্ষপাত রয়েছে, সেটা সবার জানা। হামাসের নেতা খালিদ মিশাল কাতারে বাস করেন এবং মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় থাকার সময়ে কাতার আট বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। হামাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সত্ত্বেও কাতার যে ইরানের প্রভাববলয় বৃদ্ধিকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেবে না, সেটা অনুমেয়। কাতারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের কারণেই সেটা সম্ভব নয়। লক্ষণীয় যে কয়েক দিন ধরেই কাতারে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে হামাসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে পরোক্ষ যোগাযোগ হচ্ছিল, তার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেয় কাতার। কাতারের সঙ্গে ছিল তুরস্ক। তুরস্ক লক্ষণীয়ভাবে গাজায় ইসরায়েলের হামলার নিন্দা করেছে এবং হামাসের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। কাতার ও তুরস্কের এই ভূমিকা মিসরের পছন্দ নয় এবং মিসরের সরকার মনে করে যে এই দুই দেশের ভূমিকা ইতিবাচক নয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে গত কয়েক দিনের আলোচনা এবং একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি কেবল এই দুই দেশের মধ্যস্থতায় সম্ভব হয়েছে।
গাজার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান শক্তি ভারসাম্যের প্রতিযোগিতা কেবল আরও স্পষ্টই হয়েছে তা নয়, তাতে নতুন উপাদানও যুক্ত হয়েছে। ফলে, ৭২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি এবং তার পরে ২০১২ সালের আদলে আরেকটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি অর্জিত হলেও এই যে নতুন শক্তি ভারসাম্যের প্রতিযোগিতা, তা অপসৃত হয়ে যাবে না।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

ইসরায়েল আরব যুদ্ধ- গাজার ফাঁদ by শ্লোমো বেন-অ্যামি

ইসরায়েল গাজায় হামলা চালিয়ে হামাসের বিরুদ্ধে সুবিধাজনক অবস্থান নিয়েছে—এটা একরকম অসম যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে বিগত কয়েক বছরে যেসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখা যাচ্ছে, সেগুলোও এ তরিকার অন্তর্ভুক্ত। এসব যুদ্ধে জয় যেন সোনার হরিণ।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী যতই সফল হোক বা তার ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী যন্ত্রের ক্ষমতা যতই সুচারু হোক না কেন, ইসরায়েল চাইলেই হামাস থাকবে আর না চাইলে থাকবে না— গাজা ধ্বংস হয়ে গেলেও এ সমীকরণের কোনো ব্যত্যয় হবে না। এর বিকল্প হতে পারে এ রকম: জিহাদি নৈরাজ্যের খপ্পরে পড়ে গাজা ফিলিস্তিনের সোমালিয়ায় পরিণত হতে পারে। এরূপ আশঙ্কার কথা ভাবাও পীড়াদায়ক।
হামাসের নেতা খালেদ মেশাল যতই আস্ফালন করুন না কেন, এবারের হামলায় হামাস যে বড় রকম একটা ধাক্কা খেয়েছে, সেটা লুকানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ইসরায়েল যতক্ষণ আন্তর্জাতিক মতামত উপেক্ষা করে গাজা দখল না করছে বা হামাসের কোমর ভেঙে দিচ্ছে, ততক্ষণ কিন্তু হামাস এই চলমান যুদ্ধে নিজেদের বিজয় দাবি করতেই পারে—হাজার হোক, ইসরায়েলের এই বিশাল সেনাবাহিনীর মুখে টিকে থাকাও একরকম জয়।
এরূপ অসম যুদ্ধে অধিক শক্তিশালী দেশগুলো কিছুটা বিপাকেই পড়ে যায়, তাদের আসলে লক্ষ্য কী, সেটাই তারা লোককে বুঝিয়ে উঠতে পারে না। এ ক্ষেত্রে ইসরায়েল কিছু বেসামরিক ফিলিস্তিনির জীবনের বিনিময়ে ‘শান্তি’ অর্জন করতে চায়। তারা ভাবছে, এতে হয়তো আন্তর্জাতিক সমালোচনার রাশ টেনে ধরা যাবে। তার পরও এই ‘শান্তি’ কোনো কৌশলগত লক্ষ্য নয়, ইসরায়েল যেভাবে এর পেছনে ছুটছে, সেটাও সমর্থনযোগ্য নয়—প্রতি দুই বা তিন বছর পর পর যুদ্ধ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইসরায়েল যে শান্তি চায়, সেটা তারা অর্জন করে ফেললে ভবিষ্যতে গাজাবিষয়ক তাদের কী অবস্থান হবে। আর ফিলিস্তিনের সমস্যা নিয়েই বা তারা কী করতে চায়, যেখানে গাজা হচ্ছে এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ফলে, এসব অসম যুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক শক্তি হীনবল হয়ে পড়ছে। এগুলো হচ্ছে মূলত রাজনৈতিক যুদ্ধ, সামরিক পন্থায় এসব যুদ্ধ জয় করা যাবে না। আসলে হুমকির মাত্রা ও তার প্রতি ইসরায়েলের অসম (অধিক) প্রতিক্রিয়ার কারণে ইসরায়েলের সামরিক শক্তি কৌশলগতভাবে মার খেয়ে যায়। এদিকে পশ্চিম তীরেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসও হামাসের লক্ষ্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। ফলে, ইসরায়েলের পক্ষে এখন আর এ দ্বন্দ্বের রাজনৈতিক তাৎপর্য এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আব্বাসের কূটনীতিতে হামাস এত দিন প্রতিপক্ষ হলেও তারা অনেকটা ব্রাত্যই ছিল। আর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাসংগ্রামে হামাসই এখন প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভাবছেন, পারমাণবিক শক্তিধর ইরানই হচ্ছে দেশটির প্রধান হুমকি, কিন্তু এটা ঠিক নয়। মূল সমস্যা রয়েছে দেশের ভেতরেই: ফিলিস্তিন সমস্যার কারণে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি হ্রাস। সময় সময় ইসরায়েল ফিলিস্তিনের সঙ্গে যে অসম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে বা যেভাবে সে দেশটির ভূমি দখল করছে, তাতে ইসরায়েল রাষ্ট্রটির ন্যায্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, নিরীহ কর্মসূচি যেমন বর্জন, পরিহার ও অবরোধের নীতির প্রতি জনসমর্থন বাড়ছে—এগুলো অহিংস আন্দোলনের একধরনের স্বীকৃত পন্থায় পরিণত হচ্ছে। বিডিএসের (ক্যাম্পেইন ফর বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশন) বিরোধীরা এই আন্দোলনকে একপ্রকার রাজনৈতিক ছল হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন, যে কারণে নাকি ইসরায়েল রাষ্ট্র ভেতর থেকে ধসে পড়বে।
ফিলিস্তিনের মূল ধারার নেতা মাহমুদ আব্বাস ১৯৬৭ সালের সীমান্তরেখা গ্রহণ করার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর উত্তরে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া হবে স্বভাবতই এ রকম: ইহুদি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে ইহুদিরাই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু এই অশেষ শান্তি–প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যদি দুই রাষ্ট্র তত্ত্বের মীমাংসা না হয়, তাহলে ইসরায়েল কীভাবে চিরদিনের তরে এই গৃহযুদ্ধাবস্থা থেকে রেহাই পাবে?
এই গাজা ট্র্যাজেডি থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথই আছে, যা বহু ভুক্তভোগীর জন্য হয়তো ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে পারে। বিবদমান পক্ষ ও মধ্যস্থতাকারীদের চেষ্টা করতে হবে এই চলমান মহা ডামাডোলকে শান্তি আলোচনায় পরিণত করার।
এর মানে হচ্ছে, একটি মহাপরিকল্পনা করে গাজার অবকাঠামো ও সামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর তা করতে গিয়ে গাজার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং গাজার সঙ্গে দুনিয়ার যোগাযোগ উন্মুক্ত করতে হবে। এর জন্য হামাসের অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের উপস্থিতিতে গাজার বেসামরিকীকরণ ঘটাতে হবে, আর আব্বাসের পৌরহিত্যে গাজার সঙ্গে ইসরায়েল ও মিসরের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে দুই রাষ্ট্র তত্ত্বের মীমাংসার লক্ষ্যে আলোচনা আবারও শুরু করতে হবে। সে লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্ব্যর্থহীন সমর্থন লাগবে। তথাকথিত মধ্যপ্রাচ্য চতুষ্টয়ের দেশগুলোরও সমর্থন লাগবে। তাদের কাজ হবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে যেকোনো উপায়ে এ লক্ষ্যে কাজ করতে বাধ্য করা।
ইসরায়েলের হাতে কোনো বিশ্বাসযোগ্য কৌশল নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধার্যকৃত ভূমির ওপরই তাকে বসবাস করতে হবে, সে লক্ষ্যেই দেশটিকে কিছু প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখাতে হবে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এই প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব কোনো কাজে আসে না। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েল যেসব আরব রাষ্ট্রের দ্বারে দ্বারে গেছে, তারা ফিলিস্তিনি ইস্যুটাকে কৌশলীভাবে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় ব্যাপারে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইসরায়েল সৌদি আরব ও মিসরের সঙ্গে কোনো মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হলে সেটা হবে ক্ষণস্থায়ী ও দৈবাৎ একটি ব্যাপার।
ইসরায়েলের সামনে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, তার সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশল সুস্পষ্টভাবে রাজনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। ফিলিস্তিনি সংকট সমাধানহীন থাকলে তা ইসরায়েলের নৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে, ইসরায়েল যদি একটি বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করতে চায়, তাহলে তাকে এ বিষয়টি ধর্তব্যের মধ্যে আনতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
শ্লোমো বেন-অ্যামি: ইসরায়েলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

গাজার সত্য খুব কঠিন by রবার্ট ফিস্ক

একসময় মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদ পরিবেশন ও মন্তব্য করতে সংবাদমাধ্যম ও রাজনীতিবিদদের একধরনের ভীতি ছিল, পাছে লোকে তাঁদের সেমিটীয় বিরোধী বলে না বসে।

ইসরায়েলের একজন সৎ সমালোচকের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ বিদ্বেষপ্রসূত। ব্যাপারটা এমন যে ইসরায়েল-আরব যুদ্ধে উভয় শিবিরের হতাহতের সংখ্যা যে অসম, এ কথা উচ্চারণ করামাত্র আপনাকে নাৎসি অভিধা দেওয়া হবে অথবা ‘ফিলিস্তিনপন্থী’ বা ‘সন্ত্রাসবাদের সমর্থক’ হিসেবে আপনার উপনামকরণ হয়ে যাবে।
গাজার সাম্প্রতিক এই রক্তস্নানের আগ পর্যন্ত ব্যাপারটা এমনই ছিল। এবারের পর্বের এত প্রচার হয়েছে যে আমাদের কর্তা ও সংবাদমাধ্যম এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে—না, এবার আর সেমিটীয় বিরোধী হিসেবে আখ্যা পাওয়ার ভয় নয়, এবার দর্শক ও পাঠকেরই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। গাজার নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতা দেখে তারা এতটাই ক্ষুব্ধ যে তারা জানতে চায়, টেলিভিশন মোগল ও রাজনীতিবিদেরা কেন জনগণের নৈতিকতা, ভদ্রতা ও বুদ্ধি নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন।
তারপরও টিভির পর্দায় রক্তস্নাত একেকটি শিশুর ছবি ভেসে উঠছে আর উপস্থাপক ইসরায়েল ও হামাসের পারস্পরিক দোষারোপের খবর পরিবেশন করছেন। এখনো সেটা চলছে। তাঁরা কী মনে করেন, এটা কি কোনো ফুটবল খেলা? অথবা রক্তস্নাত বিয়োগান্ত নাটক? ব্যাপারটা এভাবেই চলছে। বেসামরিক লোকদের হত্যা করা হচ্ছে। প্রতিবেদকেরা বলছেন, ‘ট্যাংকের গোলাগুলি’ (হামাসের কোনো ট্যাংক নেই)। ইসরায়েল বলছে, এটা হামাসের লক্ষ্যভ্রষ্ট গোলা। হামাস বলছে, এটা ইসরায়েলের কাজ। মানে পুরো ব্যাপারটাই একটা দোষারোপের খেলা। আসলে কাউকেই দোষ দেওয়া যায় না, এ কথা বলে আমরা আমাদের দায় সারতে পারি।
আমাদের ভুলে যাওয়া চলবে না যে ত্রিপোলিতে ১৯৮৬ সালে মার্কিন বোমার আঘাতে বেসামরিক মানুষ নিহত হলে আমরা একই কথা বলেছিলাম (আমার মনে আছে, একটি ‘লিবীয় লক্ষ্যভ্রষ্ট বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের’ ওপর দোষ চাপানো হয়েছিল)। বাগদাদের শুয়ালায় ন্যাটোর আক্রমণে বেসামরিক মানুষ নিহত হলেও একই কাজ করা হয়েছিল (অবশ্যই ‘ইরাকি লক্ষ্যভ্রষ্ট বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের’ ওপর দোষ চাপানো হয়েছিল)। অনেক মার্কিনই আমাকে এ বিষয়টি মাথায় রাখার জন্য বলে মন্তব্য করেন, মার্কিন সিনেটে ইসরায়েলের পক্ষে শতভাগ ভোট পড়া আর আরব স্বৈরশাসকদের ৯৮ শতাংশ ভোট পাওয়ার মধ্যে কোনো ভেদ নেই। তবে আরবদের পরিসংখ্যানটা সত্য, মার্কিনরা জানে না তারা কাকে নির্বাচিত করে।
হ্যাঁ, সন্দেহ নেই যে হামাস একটি দুর্নীতিগ্রস্ত, নৈরাশ্যবাদী ও নির্দয় সংগঠন। সংগঠনটির অধিকাংশ মুখপাত্র নির্বোধ, তাদের কথার মধ্যেও কোনো মিল থাকে না। তারা উঁচু গলায় এমনভাবে চেঁচায় যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র হামাসের বিরুদ্ধে কথা বলে দুনিয়ায় সংগঠনটিকে যতটুকু অজনপ্রিয় করে তুলেছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি এরা নিজেরাই নিজেদের করেছে। কিন্তু দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মন্ত্রীরা যেমনটা বলছেন (যদিও খুব মৃদুস্বরে)। দুনিয়া রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যমের কর্তাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে, জনগণের সঙ্গে এদের আচরণ অবজ্ঞাপূর্ণ।
গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমস একটি দুর্বল সম্পাদকীয় ছেপেছে। পত্রিকাটি আর কত দিন প্রত্যাশা করে তার পাঠকেরা এসব সহ্য করবে? পাঠকদের বলা হচ্ছে, গাজায় ‘মারাত্মক আক্রমণ’ হচ্ছে। তার পরই লেখা হচ্ছে, ইসরায়েল ও হামাস পরস্পরের প্রতি দোষারোপ করছে, এখন ‘এমন একটা উপায় বের করতে হবে, যাতে এই ধ্বংসলীলা বন্ধ হয়– বা বেশ বেশ, প্রথমে দোষারোপের বহর, তারপর কারও কোনো দোষই নেই।
ফরাসি সরকার গাজায় ইসরায়েলের স্থল সেনা অভিযানের ব্যাপারে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তার প্রতি জনগণ বিদ্রূপ করেছে। ফ্রাঙ্কইস হল্যান্ড চান, ইসরায়েল তার লক্ষ্যে ‘সামান্য’ কিছু ‘সংশোধন’ আনুক। তিনি হামাসের আগ্রাসন ও ইসরায়েলের প্রতিশোধের বিরোধিতা করেছেন। তার পরই ক্রোধান্বিত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আগমন ঘটে আর সবার সুরও পাল্টে যায়। হল্যান্ড তার চিরাচরিত মন্ত্র পাঠ করে, ‘ইসরায়েল তার জনগণকে রক্ষা করার জন্য সব রকম পদক্ষেপই নিতে পারে।’ অতঃপর ফ্রান্সের এমপিরা ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপানো ইসরায়েলের ‘সামষ্টিক শাস্তি’র বিষয়ে এতটা দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠেন যে হল্যান্ড তখন দোয়া করার ঢঙে বলে, এ ‘সহিংসতা’ যেন আর না বাড়ে। লক্ষণীয়, তিনি এ সহিংসতা বন্ধের দোয়া করেননি।
আয়ারল্যান্ডের দ্য আইরিশ টাইমস প্রথাগতভাবে ফিলিস্তিনপন্থী হলেও তারা নিউইয়র্ক টাইমস-এর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছে। ইসরায়েল যেদিন জাতিসংঘের বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ১৯ জন বেসামরিক লোককে হত্যা করল, তার পরের দিন পত্রিকাটি প্রথম পাতায় একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। এটা শুরু হয়েছে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়ে, এরপর এ-সংক্রান্ত কিছু বিবরণ দেওয়া হয় এবং হামাস এতে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, সেটাও বলা হয়। আর শেষ হয় ১৯ জনের মৃত্যুর সংবাদ দিয়ে। একজন পাঠক এই ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়াসের তীব্র বিরোধিতা করে বলেছেন, প্রতিবেদকেরা ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের একই কাতারে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। ‘এ রকম নৈর্ব্যক্তিকতা একপ্রকার নৈতিক অনীহা’—কথাটা তিনি ভালোই বলেছেন। গাজায় অবস্থানরত সাংবাদিকদের দুনিয়াবাসী ধন্যবাদ দিতেই পারেন, যদিও তাঁদের কর্তারা দৌড়ের ওপর আছেন।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাংবাদিক

গাজা আগ্রাসন- সুড়ঙ্গে দেখা হলে by ইউরি আভনেরি

ইংল্যান্ডের একটি গ্রাম তিরন্দাজদের জন্য খ্যাত ছিল। সেই গ্রামের প্রতি বর্গফুটে তিরবিদ্ধ বড় বড় বোর্ড ছিল, এগুলো সেখানকার তিরন্দাজদের দক্ষতার নিদর্শন হিসেবে দেখা হতো। দেখা গেছে, প্রতিটি তিরই একদম লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। একজন উৎসাহী পরিদর্শক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এটা কীভাবে সম্ভব হলো? উত্তরটা ছিল খুব সোজাসাপটা, ‘প্রথমে আমরা তির মারি, তারপর চারদিকে বৃত্ত এঁকে দিই।’
গাজায় চলমান আগ্রাসনের ক্ষেত্রেও ইসরায়েল সরকার এ নীতি গ্রহণ করেছে। প্রতি মুহূর্তেই ইসরায়েলের লক্ষ্য পরিবর্তিত হচ্ছে। আগ্রাসন যখন শুরু হয়, তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল শুধু ‘সন্ত্রাসীদের ডেরা ধ্বংস করা’। হামাস যখন প্রথমে রকেট হামলা শুরু করে, তখন লক্ষ্য ছিল এই রকেট ধ্বংস করা। ইসরায়েলের সেনারা গাজার সীমান্ত অতিক্রম করার পর সেখানে তাঁরা বিস্তৃত জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বহু সুড়ঙ্গ আবিষ্কার করেন। তারপর সেগুলোই হয়ে যায় যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য। হামাস ইসরায়েলের সীমানাপাঁচিলের নিচ দিয়ে গিয়ে ইসরায়েলে আঘাত করার লক্ষ্যে এই সুড়ঙ্গ খুঁড়েছিল। গাজায় যে এই সুড়ঙ্গ আছে, সেটা সবাই জানত। কিন্তু এর সংখ্যা ও কার্যকারিতা দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে যায়। এই সুড়ঙ্গের অনেকগুলোই আবার আন্তসম্পর্কিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সুড়ঙ্গগুলোই এই আগ্রাসনের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
আবার রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হলে এই আগ্রাসনের লক্ষ্য আগামীকালই বদলে যেতে পারে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলোও একেবারে নতজানু হয়ে গেছে। ‘সামরিক প্রতিনিধিদের’ গাজায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। সেখানে এখন কোনো স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ নেই। তাঁরা নিজেরাও সেনাবাহিনীর শেখানো বুলি আওড়েই খুশি। অনেক সাবেক জেনারেলকে দিয়ে বিবৃতি দেওয়ানো হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, তাঁরা ঘুরেফিরে একই শব্দ ব্যবহার করছেন। জনগণও ধর্মগ্রন্থের মতো এসব গিলছে। হারেৎস পত্রিকার মৃদু সমালোচনা এবং গিডিওন, লেভি ও আমিরা হাসের মতো যাঁরা ভিন্নমত দেওয়ার চেষ্টা করছেন, সবকিছুই এ ডামাডোলের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। এসব মগজধোলাই থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আমি একটি পন্থা অবলম্বন করেছি: সব সময়ই আমি ইসরায়েলি টিভি ও আল-জাজিরা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখি। এতে মনে হচ্ছে, দুটি ভিন্ন দুনিয়ায় দুটি ভিন্ন যুদ্ধ চলছে।
ইসরায়েলের গণমাধ্যমের দর্শকদের কাছে হামাস যেন সাক্ষাৎ শয়তান। সে জন্য ইসরায়েল ‘সন্ত্রাসীদের’ সঙ্গে লড়ছে, হামাসের যোদ্ধারা কখনো নিজেদের ‘প্রত্যাহার’ করেন না, তাঁরা পালান। তাঁদের নেতারা মাটির নিচের পরিচালনাকেন্দ্র থেকে এ যুদ্ধ পরিচালনা করছেন না, তাঁরা ‘লুকিয়ে’ আছেন। হামাস নৈরাশ্যবাদীদের ঢঙে বেসামরিক লোকদের ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে (উইনস্টন চার্চিল যেভাবে লন্ডনের অধিবাসীদের ব্যবহার করেছেন), ইত্যাদি ইত্যাদি।
আবার আরবের চোখ দিয়ে দেখলে এই যুদ্ধের আরেকটি ভাষ্য পাওয়া যায়। হামাস একটি দেশপ্রেমিক সংগঠন, তারা অমিত সাহস নিয়ে বিপুল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ছে। তারা কোনো বিদেশি শক্তি নয়, বরং এ মাটিরই সন্তান তারা। ফলে স্থানীয় জনগণের সমস্যা সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল। এদের আত্মীয়স্বজন বিপুল হারে মারা পড়ছে, বাড়িঘর ধ্বংস হচ্ছে। তাদের মা-বোনেরা জাতিসংঘের শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে, তাঁরা না পাচ্ছে পানি, না পাচ্ছে বিদ্যুৎ। শরীরটুকু ঢাকার কাপড় ছাড়া তাদের আর কিছুই নেই বললে চলে।
শত্রুকে দানব বানানোর মধ্যে আমি কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না। কলুষিত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার মধ্যে কোনো মর্যাদা নেই। আসুন স্বীকার করি, ইসরায়েলের শত্রু হামাস প্রচণ্ড সাহসের সঙ্গে কার্যকর যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব এখনো ভালোই কাজ করে যাচ্ছে, এটা এক দৈবাৎ ঘটনাই বটে। বেসামরিক মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠলেও তাদের প্রায় সবাই হামাসকে সমর্থন করছে। দুনিয়ার অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তারা চার সপ্তাহ ধরে লড়েও টিকে আছে, এটাই বা কম কী। এটা স্বীকার করে নিলে মুদ্রার অন্য পিঠ দেখতে সুবিধা হয়। যুদ্ধ করা, শান্তি স্থাপন করা ও এমনকি যুদ্ধবিরতি করার জন্যও এটা প্রয়োজন। শত্রু বা নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে যুদ্ধবিরতিও কঠিন হয়ে ওঠে।
যেমন, মাহমুদ আব্বাসের কাছ থেকে আমরা কী চাই? বহু বছর ধরে ইসরায়েল প্রকাশ্যেই তাঁর সমালোচনা করে আসছে। তাঁর সম্পর্কে অ্যারিয়েল শ্যারোনের মন্তব্য বিশেষভাবে খ্যাত৷ তিনি বলেছিলেন, আব্বাস হচ্ছে ‘পালকহীন মুরগি’। ইসরায়েলের ডানপন্থীরা তাঁকে ‘হামাসের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক’ মনে করে। নেতানিয়াহু তাঁর সহজাত চটকদার ভঙ্গিতে বলেছেন, ‘হয় আমাদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করো, অথবা হামাসের সঙ্গে।’
কিন্তু এই সপ্তাহে আমাদের নেতারা ব্যাকুলভাবে আব্বাসের দ্বারে ছুটছেন। ইসরায়েলি নেতারা তাঁকে ফিলিস্তিনের জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, যিনি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে পারেন। ইসরায়েলের সব ধারাভাষ্যকার জোর গলায় বলছেন, এ যুদ্ধের একটি বড় অর্জন হচ্ছে এর মাধ্যমে ইসরায়েল, মিসর, সৌদি আরব, দ্য গালফ এমিরেটস ও আব্বাসের মধ্যে একটি রাজনৈতিক জোট গড়ে ওঠা। গতকাল যে সহযোগী ছিল না, আজ সে একনিষ্ঠ ‘মিত্র’। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অনেক ফিলিস্তিনিই এখন আব্বাসকে ঘৃণার চোখে দেখছেন, কিন্তু হামাসের প্রশংসা করছেন—তাঁরাই এখন আরব মর্যাদার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইউরোপের চেয়ে আরব সংস্কৃতিতে মর্যাদার মূল্য অনেক বেশি।
এদিকে পশ্চিম তীরেও মানুষ গাজা আগ্রাসনের বিরোধিতা করছেন। তরুণেরাসহ সব বয়সের মানুষই তৃতীয় ইন্তিফাদার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইসরায়েলি সেনাও কালান্দিয়া, জেরুজালেম, বেথলেহেম ও অন্যান্য স্থানে গুলিবর্ষণ করছে। ফলে সেখানেও হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। সে কারণেই আমাদের জেনারেলরা গাজার যুদ্ধবিরতি চান। ইসরায়েলের লক্ষ্য পরিবর্তনশীল হলেও হামাসের তা নয়, তারা চায় গাজা উপত্যকার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে বহু কিছুই হতে পারে। তবে আমার একটি আশা আছে, এটাকে পাঠক অলীক কল্পনা বলতে পারেন: ইসরায়েলি সেনারা শত্রু তাড়ানোর ইচ্ছায় একটি সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকেছে। অন্য প্রান্ত দিয়ে হামাসের সেনারা ঢুকেছে। মৃদু আলোয় একে অন্যের মুখোমুখি হলে, তাঁরা গোলাগুলি না করে করমর্দন করলেন। আমি কি পাগল?

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
ইউরি আভনেরি: ইসরায়েলি লেখক।

দ্বিতীয় তিস্তা সেতুতে রেলপথ by নাহিদ হাসান

আসাম ও পূর্ববঙ্গের, কখনো কামরূপ ও বরেন্দ্র অঞ্চলের গেট হিসেবে যে জেলাটি হাজার হাজার বছর ধরে ভূমিকা পালন করছে, সেই জেলাটি কীভাবে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হলো, তার দায় ইতিহাসের। যে অঞ্চলে চিলমারী নদীবন্দর, ভূরুঙ্গামারী হয়ে লালমনিরহাট-ধুবড়ী রেলপথ থাকে, তা প্রমাণ করে অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত বিমানবন্দর, চিলমারীর যুদ্ধ, মুক্তাঞ্চল রৌমারী সাক্ষ্য দেয় সামরিক গুরুত্বের আর ভারতের নৌবন্দরসমূহের ইতিহাস গ্রন্থ হাজির করে চিলমারীতে জাহাজ কারখানার ইতিহাস। যে ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে পৃথিবীর প্রাচীনতম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথ বলা হচ্ছে, যে অববাহিকা দিয়ে চীন ও ভারতবর্ষ থেকে রোমান ও আরবরা পণ্য নিয়ে যেত; তখন তো বিস্মিত হতে হয় কী করে এই অঞ্চলটি মঙ্গা আক্রান্ত এলাকায় পরিণত হলো! সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রতিটি সমাজের বিকাশের বীজ তার গর্ভেই থাকে। তাহলে কুড়িগ্রাম তথা উত্তরের মঙ্গাপ্রবণ এই অঞ্চলের বিকাশের চিহ্নগুলো কোথায় বর্তমান? কোন সেই গিঁট, যা না খুললে উন্নয়নের সম্ভাবনার আসুরিক শক্তি দৃশ্যমান হবে না?
এই অঞ্চল এখন একদিকে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, গঙ্গাধর নানা নদ-নদীর ভাঙনকবলিত কৃষিনির্ভর এলাকা। কৃষিক্ষেত্র ছাড়া আর কোথাও শ্রম বেচার সুযোগ না থাকায় জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে এই জেলা থেকেই সর্বাধিকসংখ্যক শ্রমিক দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজের সন্ধানে ছুটে বেড়ায়। ফলে আগুনে পুড়ে, ভবনধসে ও সড়ক দুর্ঘটনায় এরাই বেশি নিহত হয়। শত শত ধরনের বেসরকারি-সরকারি কার্যক্রম ও গবেষণায় সয়লাব, তবু জনগণের দারিদ্র্য কমল না! তার মানে কি এই অঞ্চলের দারিদ্র্যসচেতনতার ফল? তার মানে এই পথে এই অঞ্চলের ক্রমমুক্তি যেমন হবে না, তেমনি অপেক্ষমাণ বধূর ঘাড়ের গামছা আঁকড়ে ধরেও কান্না থামবে না!
বিপ্লবী মার্ক্স রেলপথকে ভারতে আধুনিকতার যাত্রাবিন্দু বলে মনে করেছেন। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় পৃথিবীতে এক স্বতন্ত্র স্লোগান হাজির করা হয়—তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। অর্থাৎ রেলপথ যেখানে ভারতবর্ষের আধুনিক ইতিহাসের নির্ধারক আর নদী যে দেশের লড়াইয়ের ঠিকানা, সেই দেশের নীতিনির্ধারকেরা যেন এই চিহ্নসমূহকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে মাঠে নেমেছেন। মুনাফা থাকলে যেন বাপকেও বেচে দিতে রাজি। এসকাপ ও ইউএনডিপির যৌথ গবেষণায় দেখানো হয়েছে, টন-কিলোমিটারে তেল খরচের ক্ষেত্রে সড়কপথে যেখানে লাগে ২১৭ টাকা, রেলপথে সেখানে মাত্র ৮৫ টাকা, নৌপথে ২৫ টাকা। সে জন্য সারা পৃথিবীতে রেল যোগাযোগ দিনের পর দিন উন্নত হচ্ছে। চীন রেলযাত্রায় আমাদের চেয়ে এক শ বছরের বেশি সময় পরে যোগ দিয়ে বিমানগতির ট্রেন আবিষ্কার করেছে। আমরা সৈয়দপুর ও পাহাড়তলী ওয়ার্কশপ দুটিকে ফেলে রেখে সহযাত্রী ভারত থেকে ট্রেন আমদানি করি। জাহাজশিল্পের দেশ হয়েও দ্রুত জাহাজ আমদানি করি। সড়কপথের মোহে নদ-নদীর ওপর এমনভাবে সেতু নির্মাণ করেছি, যেখানে জলযান চলতে পারে না। আর অন্যদিকে নদ-নদীকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলছি সেতু দিয়েই। বাংলাদেশের নৌপথে কেউ যদি দেশ ভ্রমণে বের হন, তিনি দেখতে পাবেন বাংলাদেশ যেন সেই প্রাচীন যুগেই রয়ে গেছে। আর যিনি রেলপথে বের হন তিনি টাইম মেশিনে ব্রিটিশ আমলে চলে যাবেন। এবং সড়কপথে বের হলে বুঝবেন নরকযাত্রী বাংলাদেশকে। অথচ প্রমথনাথ বিশীর ভাষায়, নদ-নদী এখানকার রাজপথ।
সম্প্রতি সরকার কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী ও গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ পয়েন্টে ৬৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এক হাজার ৪৯০ মিটার দীর্ঘ দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর বাজেট একনেকে পাস করেছে, যা গাইবান্ধা অংশে পলাশবাড়ীতে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে যুক্ত হবে। এতে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকার দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার ও সময় এক ঘণ্টা সাশ্রয় হবে। অর্থাৎ এটিও সেই পুরোনো চিন্তাকাঠামোরই বহিঃপ্রকাশ। অথচ সরকার ইতিমধ্যে গাইবান্ধার ফুলছড়ি থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পয়েন্টে যমুনা সেতুর তলদেশ দিয়ে বহুমুখী টানেলের ঘোষণা দিয়েছে। যা নদী, প্রকৃতি ও ভূ-সামরিক কৌশলবান্ধব, দ্বিতীয় তিস্তা সেতুতে রেলপথ যুক্ত করে যদি ফুলছড়ি-দেওয়ানগঞ্জ টানেলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে ঢাকা থেকে চিলমারীর দূরত্ব ৪২৮ কিলোমিটার থেকে ২৩০ কিলোমিটারে ও রেলপথের দূরত্ব ৩৭৭ থেকে ২২৫ কিলোমিটারে নেমে আসবে এবং চিলমারী অংশে সংযোগ সড়কটি চিলমারীর মাটিকাটার উত্তর অংশের বদলে রমনা স্টেশনসংলগ্ন কেসি রোড থেকে শুরু হওয়ায় সংযোগ সড়কের দূরত্ব কমে আসবে তিন কিলোমিটার। সর্বোপরি লালমনিরহাট/পার্বতীপুর-কুড়িগ্রাম-গাইবান্ধা-জামালপুর-ঢাকা নামে একটি নতুন রুট তৈরি হবে। ফলে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুতে চাপ অর্ধেকে নেমে আসবে। ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধু সেতু সংস্কার বা অন্য কোনো কারণে বন্ধ থাকলে এই নতুন রুটটি ব্যবহার করা যাবে। আর এটি হলে কুড়িগ্রাম জেলায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিলমারী নদীবন্দর আন্তমহাদেশীয় বন্দরে উন্নীত হবে। সোনাহাট স্থলবন্দর সাবালকত্ব অর্জন করবে। আর কুড়িগ্রাম জেলা হয়ে উঠবে নতুন শিল্পাঞ্চল। কর্মসংস্থানের ফলে কেটে যাবে মঙ্গার পৌনে শতবর্ষ। ইতিহাস ও বিজ্ঞানমনস্কতাই আমাদের মুক্তি দেবে।
প্রধান সমন্বয়ক, রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি, কুড়িগ্রাম।
nahiduttar@yahoo.com

‘আমি ঢিল ছুড়ছি এক দিকে’ -এরশাদ

জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ দাবি করেছেন, চতুর্দিকে নয়, জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় নেওয়ার জন্য তিনি এক দিকেই ঢিল ছুড়ছেন।

আজ বুধবার প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় ‘চতুর্মুখী ঢিল ছুড়ছেন এরশাদ’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলে এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে প্রবন্ধের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে এরশাদ এসব কথা বলেন।
এরশাদ বলেন, ‘একটি কথা বলি, প্রথম আলো আমাদের বিরুদ্ধে লেখে। এক ভদ্রলোক লিখেছেন, এরশাদ সাহেব নানা দিকে ঢিল ছুড়ছেন। আমি ঢিল ছুড়ছি এক দিকে, জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় নেওয়ার জন্য। জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় যাব। সেই ঢিল ছুড়ছি।’
এরশাদ তাঁর শাসনামলের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের নয় বছর ছিল স্বর্ণযুগ। মানুষ সেই স্বর্ণযুগ আবার ফিরে পেতে চায়।’
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিবাদে জাতীয় পার্টি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বর পর্যন্ত মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে। মানববন্ধন চলাকালে প্রেসক্লাবের সামনে ও মতিঝিলে একটি খোলা ট্রাকে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন এরশাদ।
বক্তব্যে গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদে সোচ্চার না হওয়ার জন্য বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দল, মানবাধিকার সংগঠন ও পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনা করেন এরশাদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক ইসলামি দল আছে, ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী অনেক দল রয়েছে। কিন্তু তাদের রাস্তায় দেখি না। তাদের ইসলাম শুধু মুখে মুখে। আমরা বিশ্বাস করি, এ সময়ে রাজপথে নামা, জিহাদ করা প্রত্যেক মুসলমানদের দায়িত্ব। জাতীয় পার্টি আজ প্রমাণ করেছে, আমরা ইসলামকে ভালোবাসি, মানুষকে ভালোবাসি।’
সরকারকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত বলেন, ‘আপনাদের রাস্তায় দেখতে চাই। এই বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন, আওয়াজ তুলুন। নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ান।’
এ সময় এরশাদের সঙ্গে জাপার সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু, আবদুস সবুর আসাদ, যুগ্ম মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়াসহ কেন্দ্রীয় উপস্থিত নেতারা ছিলেন।

নিজের রক্তগঙ্গায় ডুবে মরবে ইসরাইল -ইস্তাম্বুলে জনসমুদ্রে এরদোগান

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েব এরদোগান বলেছেন, অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইল যে রক্তগঙ্গা তৈরি করছে তাতেই ডুবে মরবে ইহুদিবাদী দেশটি।
এরদোগান বলেন, ‘সমস্ত অপরাধ মাথায় নিয়ে হিটলার যেমন একটি বর্ণমুক্ত (ইহুদিমুক্ত) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, ইসরাইলও এখন সেই লক্ষ্যে ধাবিত হচ্ছে। তারা নারীদের হত্যা করছে যাতে তারা ফিলিস্তিনি শিশুর জন্ম দিতে না পারে; তারা শিশুদের হত্যা করছে যাতে তারা বড় হতে না পারে; তারা পুরুষদের হত্যা করছে যাতে তারা নিজের দেশ রক্ষা করতে না পারে…তারা যে রক্তগঙ্গা সৃষ্টি করছে তাতেই তারা ডুবে মরবে।’
রবিবার ইস্তাম্বুলে এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। এ জনসভাকে ‘জনতার সমুদ্র’ বলে মন্তব্য করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
আগামী ১০ আগস্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরদোগানের জন্মভূমি ইস্তাম্বুলে এ জনসভার আয়োজন করা হয়। এটি ছিল তার সবচেয়ে বড় নির্বাচনী জনসভা।

তুরস্কের ৪০ লাইন বিশিষ্ট জাতীয় সংগীতের পুরোটা আবৃত্তি করে এরদোগান তার বক্তব্য শুরু করেন। তীব্র গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকা জনতা এ সময় স্লোগানে স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ৪,৬০০ বাস ও ৭৫টি জাহাজে করে ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন শহর থেকে তার সমর্থকরা সমাবেশে যোগ দেন।
ডজন খানেক টিভি চ্যানেলে তার বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
এরগোদানের বেসবল ক্যাপ পরা এবং তার নির্বাচনী স্লোগান ‘জাতীয় আশা, জাতীয় ক্ষমতা’ লেখা পতাকা নিয়ে সমবেত হন তার সমর্থকরা।
এ সময় গাজা ইস্যুতে এরদোগানের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হাজার হাজার লোক ফিলিস্তিনি পতাকা বহন করেন।
ইস্তাম্বুলের সাবেক মেয়র এরদোগান এ সময় বলেন, ‘ইস্তাম্বুলে এটাই হয়তো আমাদের শেষ জনসভা। তবে আমি আপনাদেরকে, ইস্তাম্বুলকে বিদায় জানাচ্ছি না।’
‘আল্লাহর ইচ্ছায় এই শহরেই আমি কবর নিতে চাই। আমি এখানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আসিনি, প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবেও আসিনি, আমি এসেছি কাসিমপাসার (তার জন্মস্থান) এরদোগান হিসেবে’, বলেন এরদোগান।
এরদোগান বলেন, ‘আমরা এখানে জাতির প্রভু হতে আসিনি, এসেছি ভৃত্য হতে।’
‘এই রাজনৈতিক সংগ্রামে আমরা কখনো ‘আমি’ শব্দ ব্যবহার করিনি, বলেছি ‘আমরা’। এই জাতির ভালোবাসায় আমার হৃদয় গলে গেছে।’

খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া এক বালকের গল্প by মনজুরুল হক

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা হামলার ৭০তম বার্ষিকী পালিত হবে আগামী বছর। এর ঠিক এক বছর আগে, এ বছর ৬ আগস্ট মর্মান্তিক সেই ঘটনার নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করার পাশাপাশি যুদ্ধ পরিহার করার জন্য শান্তিকামী মানুষের দৃঢ় প্রত্যয়ই আবার প্রতিফলিত হবে। জাপানের জনগণের এই শান্তি উদ্যোগে এখন অবশ্য পরোক্ষভাবে জড়িত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নাগাসাকি শান্তি উদ্যানে শান্তির একটি ভাস্কর্য তৈরি করে দেওয়ার যে ঘোষণা কিছুদিন আগে জাপান সফরে এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, আশা করা যায় ৭০তম বার্ষিকীর আগেই সেই শান্তি ভাস্কর্য বাংলাদেশ সেখানে তৈরি করে দিতে সক্ষম হবে।
হিরোশিমা আর নাগাসাকির ওপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে আণবিক বোমা হামলার মর্মান্তিকতাকে প্রতিবছর স্মরণ করা হয় যুদ্ধের প্রতি সাধারণ মানুষজনের সামগ্রিক ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ তুলে ধরার একটি উপায় হিসেবে। তার পরও বিশ্বব্যাপী কমতি নেই হানাহানি আর যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার, কমতি নেই যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে যাওয়ার প্রয়াসে লিপ্ত হওয়ার সুপ্ত মানব আকাঙ্ক্ষার। এমনকি হিরোশিমা-নাগাসাকির মতো চরম মর্মান্তিকতার শিকার হতে হওয়া দেশ জাপানও এর বাইরে নয়। তবে তা সত্ত্বেও শান্তির প্রতি অবিচল আস্থা রেখে যাওয়া মানুষের ঘাটতি জাপানে হিরোশিমা-নাগাসাকির ঘটনার পর একেবারেই ছিল না এবং এখনো নেই।
তার পরও শান্তির ট্রেনকে লাইনচ্যুত করতে পারার নানা রকম প্রয়াস অশান্তির বার্তাবাহকেরা বারবার করে এসেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। হিরোশিমার বোমা হামলার অসহায় এক শিকার, ছয় বছর বয়সী বালক গেনের জীবনের মর্মান্তিকতাকে কেন্দ্র করে লেখা কমিকস কাহিনিকে ঘিরে জাপানের শিমানে জেলার শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক কিছু পাঁয়তারা এবং অবশেষে পিছু হাঁটার ঘটনা শান্তিবাদীদের শক্তিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেই মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বালক গেন আর তার বেঁচে থাকার সংগ্রামের দিকে আলোকপাত করা যুক্তিসংগত।
জাপানের কার্টুন গল্প বা কমিকস কাহিনির সঙ্গে বাংলাদেশের পাঠকদের পরিচয় না থাকাই স্বাভাবিক। আগে যে বালক গেনের কথা বলা হয়েছে, সে-ও হচ্ছে কার্টুন কাহিনিরই এক চরিত্র। শুধু তা-ই নয়, গল্পের নায়কও হচ্ছে বোমা বিধ্বস্ত হিরোশিমা শহরজুড়ে খালি পায়ে দৌড়ে বাবা-মা আর ভাইবোনকে খুঁজে বেড়ানো সেই বালক গেন। জাপানি ভাষায় ‘হাদাশি গেন’, আক্ষরিক অনুবাদে যেটা হবে ‘খালি পায়ের গেন’—এই নামে কমিকস উপন্যাসটি প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে ১৯৭২ সালে জনপ্রিয় কমিকস সাপ্তাহিক শুকান শোনেন জাম্প-এ। সেই সাময়িকীর গ্রাহকসংখ্যা তখন ছিল কুড়ি লাখের বেশি। লেখক কেইজি নাকাজাওয়া বালক গেনের মধ্যে দিয়ে বস্তুত নিজের অভিজ্ঞতার কথাই সেখানে তুলে ধরেছেন।
১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে নাকাজাওয়ার বয়স ছিল সাত বছর এবং পরিবারের সঙ্গে হিরোশিমা শহরে তিনি বসবাস করছিলেন। সময়টা ছিল গ্রীষ্মের ছুটির সময়। সহৃদয় পাঠক, একবার চিন্তা করে দেখুন, গ্রীষ্মের দীর্ঘ ছুটিতে সাত বছরের স্কুলগামী এক বালক ঠিক কী করতে পারে। খেলার মাঠজুড়ে দাবড়ে বেড়ানো, ফড়িং আর প্রজাপতির পেছনে ছুটে যাওয়া, প্রচণ্ড গরমের দিনে দল বেঁধে নদীতে ঝাঁপ দেওয়া—দেশভেদে এসবের কোনো রকম তারতম্য আদৌ লক্ষ করা যায় না। বালক নাকাজাওয়ার দিনও সেভাবেই কাটছিল, ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল আটটার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। এর অল্প পরেই মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যায় তার পুরো জীবন, যার গভীর মর্মান্তিক বর্ণনা আমরা খুঁজে পাই হাদাশি গেন-এর কাহিনি আর ছবির মধ্যে। এই গল্প হচ্ছে হিরোশিমার ওপর বোমা হামলা হওয়ার ঠিক আগে ও এর পরে কী ঘটেছিল, তারই এক হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা, ছবি আর গল্পের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরা যে কাহিনি আমাদের আবেগকেই কেবল জাগিয়ে তোলে না, সেই সঙ্গে বালক গেনের দুর্ভাগ্যের জন্য যারা দায়ী, তাদের প্রতি গভীর এক ঘৃণার বোধও আমাদের মনে তা ছড়িয়ে দেয়।
১৯৭২ সালে প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে হিরোশিমার সেই অসহায় বালকের কাহিনি। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ১৫ বছর ধরে নাকাজাওয়া ছবি আর লেখার মধ্যে দিয়ে বর্ণনা করে গেছেন নিজের দুর্ভাগ্যের কাহিনি, পরবর্তী সময়ে বইয়ের আকারে মোট ১০ খণ্ডে যেটা প্রকাশিত হয়েছে এবং সেই কাহিনি নিয়ে জনপ্রিয় একটি কার্টুন ছবিও একসময় তৈরি করা হয়। তবে বালক গেনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কাহিনি জাপানে এবং বিদেশে সবাইকে অবশ্যই সন্তুষ্ট করতে পারছে না। বিশেষ করে কাহিনির সবটা জুড়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা ফুটে ওঠার মধ্যে দিয়ে শান্তির প্রয়োজনীয়তা পাঠকদের সামনে তা তুলে ধরায় শান্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর যাঁরা আস্থা রাখতে পারছেন না, তাঁরা এতে মোটেও সন্তুষ্ট নন। তবে সরাসরি সে-কথা তাঁরা আবার বলতেও পারছেন না। ফলে হাদাশি গেনকে কোণঠাসা করে রাখার নানা রকম পরোক্ষ প্রয়াস তাঁদের চালাতে হচ্ছে। ঠিক সে রকম একটি প্রয়াস ছিল শিমানে জেলার শিক্ষা বিভাগের গত বছরের এক উদ্যোগ, ব্যাপক প্রতিবাদ আর ধিক্কারের মুখে শেষ পর্যন্ত যা থেকে শিক্ষা বোর্ডকে সরে আসতে হয়েছে।
প্রাথমিক ও জুনিয়র হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীরা যেন গেনের কাহিনি পাঠ করা থেকে বিরত থাকে, শিমানে জেলার শিক্ষা বোর্ড সে জন্য স্কুলের পাঠাগার থেকে বইটি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ তাদের আওতাধীন স্কুলগুলোকে গত বছর দিয়েছিল। যে কারণ শিক্ষা বোর্ড দেখায় তা হলো, এ রকম সব দৃশ্য ও ভাষার বর্ণনা এতে রয়েছে, তরুণ পাঠকদের জন্য যা যথাযথ নয়।
তবে তৃপ্তিকর দিকটি হলো, বালক গেনের মর্মান্তিকতার কাহিনিকে বাঁচিয়ে রেখে শান্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার প্রয়াসও জাপানজুড়ে সব সময় লক্ষ করা যায়। হিরোশিমার বার্ষিকী এগিয়ে আসার মুখে টোকিওর পার্শ্ববর্তী সাইতামা জেলার একটি জাদুঘর যেমন আয়োজন করেছে হাদাশি গেন-এর ২৪টি মূল রঙিন ছবির বিশেষ এক প্রদর্শনীর। সেই সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে ৭৩ বছর বয়সে লোকান্তরিত হওয়া, বালক গেনের কাহিনি আমাদের সামনে তুলে ধরা লেখক-শিল্পী কেইজি নাকাজাওয়াকে।
(টোকিও, ৪ আগস্ট ২০১৪)
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷

লেজ এখন কুকুরকে নাড়াচ্ছে by মশিউল আলম

বিশ্বমোড়লেরা এটাকে যুদ্ধবিরতি বলছে কেন? ৭ জুলাই থেকে গাজায় যা চলছে, তা কি যুদ্ধ? যুদ্ধে তো মানুষ হতাহত হয় দুই পক্ষেই। উভয় পক্ষেই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। গাজায় গত শনিবার পর্যন্ত নিহত হয়েছে এক হাজার ৬৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি, এর বিপরীতে কজন ইসরায়েলি মারা গেছে? ইসরায়েলের নিজের দাবি অনুযায়ী মাত্র তিনজন বেসামরিক নাগরিক আর ৬৩ জন সৈন্য। ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর, স্কুল, কলেজ, হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে শত শত; ইসরায়েলিদের একটি ঘরও কি ভেঙেছে? তাহলে এটাকে যুদ্ধ বলা হচ্ছে কেন? কেন ‘মানবিক যুদ্ধবিরতি’র জন্য ইসরায়েলের হাতে-পায়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করছে তথাকথিত আন্তর্জাতিক মহল?

গাজায় যা চলছে, তা যুদ্ধ নয়। এটা একতরফা গণহত্যা। শুধু গণহত্যাই নয়, কেবল মানুষ মারতে এমন শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপের দরকার হয় না, যেসব বোমায় কংক্রিটের তৈরি শত শত ভবন ভেঙে চুরমার হয়ে মাটিতে বিশাল বিশাল গর্ত তৈরি হয়। নৃশংস হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তাদের জমি দখল করার উদ্দেশ্যে। ইসরায়েলিরা গাজার ভূমি পুরোটা চায়; শুধু গাজার নয়, ফিলিস্তিনের সমস্ত ভূখণ্ড নিজেদের দখলে নেওয়াই ইসরায়েলিদের চূড়ান্ত মতলব। কারণ, তারা দাবি করে, এই ভূমি তাদেরকে দান করেছে তাদের ঈশ্বর!
ইসরায়েল এবার নেমেছে সর্বোচ্চসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার মতলব নিয়ে, পারলে তারা গাজার ১৭ লাখ ফিলিস্তিনির সবাইকেই হত্যা করে। ফিলিস্তিনিদের ঝাড়েবংশে নিশ্চিহ্ন করার ‘ম্যাক্সিমাম টার্গেট’ নিয়ে তারা এই গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছে। কিন্তু পশ্চিমা মোড়লেরা এটাকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলছে না। বস্তুত, ইসরায়েলকে থামাতে তারা কার্যকর কিছুই করছে না।
অথচ আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্রদের পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে অজস্রবার সামরিক হস্তক্ষেপ করতে দেখা গেছে। আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটোর যৌথ বাহিনী ১৯৯০–এর দশকে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় হাজার হাজার টন বোমা ফেলেছে, প্রায় আড়াই হাজার মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। কসোভো থেকে তারা দুই লাখ সার্বকে বিতাড়িত করেছে ক্লাস্টার বোমা আর ইউরেনিয়াম ডিপ্লিটেড বোমা মেরে। ১৯৯৯ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত কসভোতে তারা দুই হাজার নিরীহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে, তাদের মধ্যে ৮৮ জন ছিল শিশু। ন্যাটোর বিমান হামলায় ধ্বংস হয়েছে তিন শতাধিক বিদ্যালয় ও পাঠাগার, ২০টি হাসপাতাল। ৪০ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে ৯০টি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা।
আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সে সময় এসব করেছিল মানবতার দোহাই দিয়ে। মিলেসোভিচ সরকার ও উগ্র জাত্যাভিমানী সার্বীয় বাহিনীর বর্বরতা থেকে বসনীয় ও কসোভোর মুসলমানদের রক্ষা করার নামে তারা এসব বর্বরতা চালিয়েছিল।

এখন তারা লেগেছে রাশিয়ার পেছনে। ইউক্রেনের উগ্র জাতীয়তাবাদীদের মদদ দিয়ে তারা দেশটিতে যে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, তার ফলে ইউক্রেনের রুশভাষী নাগরিকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। ইউক্রেনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদ আর রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদের মধ্যকার বিরোধে ইন্ধন জুগিয়ে আমেরিকার ও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের যে দুরভিসন্ধি নিয়ে অগ্রসর হয়েছে, তারই পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নিয়েছে। কারণ, ওই অঞ্চলে রাশিয়া তার আধিপত্য অটুট রাখতে সামরিক শক্তি প্রয়োগে মোটেও দ্বিধান্বিত নয়। এসব তৎপরতার মধ্যে ইউক্রেনের আকাশসীমায় মালয়েশীয় এয়ারলাইনসের যাত্রীবাহী বিমান মিসাইলের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যে বিরাট ট্র্যাজেডি ঘটে, সেটার সুযোগ নিয়ে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক নানা ধরনের অবরোধ আরোপ করে চলেছে। এখন বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, মালয়েশীয় বিমানটিতে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা মিসাইল নিক্ষেপ করেনি; এটা করেছে ইউক্রেনেরই সামরিক বাহিনী। কেউ কেউ বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নৃশংসতা থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়ার মতলবে এবং এই সুযোগে রাশিয়াকে চূড়ান্তভাবে অপদস্থ ও কোণঠাসা করতে আমেরিকা ও তার মিত্ররা ইউক্রেনকে দিয়ে এই ট্র্যাজেডি ঘটিয়েছে।

অথচ ইসরায়েলের সীমাহীন বর্বরতার বিরুদ্ধে তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। প্রায় এক মাস ধরে ইসরায়েল গাজায় যে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, তার ভগ্নাংশও যদি অন্য কোনো দেশ করত, তাহলে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে বসত। অথচ ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ তারা চেয়ে চেয়ে দেখছে আর শুধু মুখে মুখে মাঝেমধ্যে উহু-আহা করছে।
ইসরায়েল নামের আগ্রাসী রাষ্ট্রটির পয়দাকারী হলো ব্রিটেন। আর আমেরিকা সেই রাষ্ট্রটিকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা-সমর্থন দিয়ে পরিণত করেছে এক দানবে। এই দানব যেন নেমে এসেছে সোজাসুজি নরক থেকে। পৃথিবীর সব শয়তান রাষ্ট্র এই নারকীয় দানবকে পূজা করে, তাকে অর্ঘ্য দেয়।
পৃথিবীর আত্মস্বীকৃত পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রগুলো আর কাউকেই পারমাণবিক অস্ত্রধারী হতে দিতে চায় না। তারা পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) করেছে।যেসব দেশের পারমাণবিক অস্ত্র নেই, কিন্তু যাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য বেসামরিক প্রয়োজনে পারমাণিক প্রকল্প আছে, তাদের এনপিটিতে স্বাক্ষর করার জন্য পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্রগুলো চাপ দেয়। সেসব রাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রকল্পের ওপর তারা প্রকাশ্যে নিয়মিত নজরদারি করে, আর গোপনে গোয়েন্দাগিরি করে। তাদের পরমাণু বিজ্ঞানীদের তারা ভাড়াটে খুনি লাগিয়ে হত্যাও করে।
একটা উদাহরণ ইরান। আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্রদের সন্দেহ যে দেশটি গোপনে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। কিন্তু ইরান ক্রমাগত বলে আসছে তারা তা করছে না, তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের জন্য তাদের পরমাণু প্রকল্পগুলো চালাচ্ছে। কিন্তু আমেরিকা ও তার মিত্ররা তা বিশ্বাস করে না। এ জন্য তারা তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের বিরুদ্ধে প্রায়-সর্বাত্মক অবরোধ চালিয়ে এসেছে। দেশটিকে বলতে গেলে একঘরে করে রেখেছে। এমনকি তাদের তেল রপ্তানিতে বাধা দেওয়া থেকে শুরু করে বিদেশ থেকে ওষুধপত্র এমনকি শিশুখাদ্য আমদানি করার ক্ষেত্রেও বাধা দিয়ে এসেছে। শুধু তা-ই নয়, অবরোধ আরোপের আগে ইরান যেসব দেশের কাছে তেল বিক্রি করেছে, তাদের কাছ থেকে পাওনা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও তারা পরিশোধ করতে দেয়নি।
অথচ ইসরায়েল জন্মের পর থেকেই ফিলিস্তিনিদের ভূমি জবরদখল চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামরিক শক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে। তারা সেই পঞ্চাশের দশক থেকে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির তৎপরতা শুরু করে। আমেরিকা ও ব্রিটেন তখন থেকেই তা জানে। তারা ইসরায়েলকে বাধা দেওয়ার বদলে সহযোগিতা করেছে। ষাটের দশকের শেষ দিকে আমেরিকান গোয়েন্দারা জেনে ফেলে যে ইসরায়েল গোপনে গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির সামর্থ্য অর্জন করেছে। তারা প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে সেটা জানায়। তখন নিক্সন তাদের বলেন, তাতে কোনো অসুবিধা নেই। ‘পারমাণবিক বোমার অধিকারী ইসরায়েলের সঙ্গে বাস করতে আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না।’
ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের দুই বিশেষজ্ঞ হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন ও রবার্ট নরিসের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েল ২০০৪ সালের মধ্যেই ৮০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করে ফেলেছে। তারা ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের মালিক। এ ক্ষেত্রে ইসরায়েল ভারত ও পাকিস্তানের প্রায়-সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তারা এটা গোপন রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই একমাত্র রাষ্ট্র, যেটি অঘোষিতভাবে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের মালিক। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা কোনো তথ্য প্রকাশ করে না। তাদের পারমাণবিক অস্ত্র আছে, এটা তারা স্বীকারও করে না আবার অস্বীকারও করে না। কিন্তু এটা একটা ‘ওপেন সিক্রেট’ যে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র আছে।
আমেরিকা ও ব্রিটেনের কোনো সরকারও এ ব্যাপারে কিছু বলে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে এক আমেরিকান সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল কি না। ওবামা জবাবে বলেছিলেন, তিনি এ বিষয়ে কোনো কিছু ‘স্পেকুলেট’ করতে চান না, অর্থাৎ কোনো জল্পনা-কল্পনা করতে চান না। ব্রিটেন ও অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের সরকারগুলোও ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যাপারে একই ধরনের ‘অনচ্ছতা’র নীতি অনুসরণ করে আসছে।
আমেরিকাসহ তথাকথিত বিশ্বমোড়লদের নৈতিকতার স্তর বিবেচনা করে যদি তাদের কুকুর বলে অভিহিত করি, তাহলে ইসরায়েলকে বলতে হয় সেই কুকুরের লেজ। কুকুরই সাধারণত লেজ নাড়ায়। কিন্তু এখন এই লেজই কুকুরকে নাড়াচ্ছে। এই লেজ ছেঁটে ফেলার জন্য একটা ক্ষুরধার অস্ত্র দরকার। কুকুরটি নিজে তা করবে না। পৃথিবীতে আরও কোনো শক্তি কি আছে?
এখন কি ইরানের অ্যাটম বোমা বানানো জায়েজ হয়নি?
মশিউল আলম: সাংবাদিক
mashiul.alam@prothom-alo.info

চতুর্মুখী ঢিল ছুড়ছেন এরশাদ by সেলিম জাহিদ

নিজ দলে এখনো কোণঠাসা। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়েও আস্থার সংকটের কারণে সরকারের কাছে উপেক্ষিত। মাথার ওপর মামলার খড়্গ৷ এ কারণে সরকারকে চটাতেও পারছেন না, এড়াতেও পারছেন না। সরকারকে তুষ্ট করার চেষ্টা করেও সফল হচ্ছেন না। সব মিলিয়ে ঘরে-বাইরে সংকটে আছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ।

এই সংকট কাটিয়ে উঠতে এরশাদের কোনো কৌশলই কাজে আসছে না। তার পরও তিনি চতুর্মুখী ঢিল ছুড়ছেন। কখনো নিজ দল, কখনো সরকার আবার কখনো বিএনপি ও জামায়াতের প্রতি ঢিল ছুড়ছেন। নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সাংসদ হয়েছেন। এখন একবার সে নির্বাচনের পক্ষে, আবার বিপক্ষেও কথা বলছেন। শপথ নেওয়ার পর বলেছিলেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নেননি। ইদানীং বলছেন, জাতীয় পার্টি অংশ নিয়েছে বলেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
সর্বশেষ ২ আগস্ট এরশাদ সুর পাল্টে বলেছেন, যে সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই। মানুষের নিরাপত্তা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলনে নামতে হবে।
এ ভোল পাল্টানো স্বভাবের জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল এরশাদকে দ্বিচারী বলেছিলেন। ২ আগস্ট সরকারে থেকে আন্দোলনে নামার হুমকি দেওয়ার পর আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও তাঁকে দ্বিচারী বলে মন্তব্য করেছেন।
এ সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব ও জাপার নেতা গোলাম মসীহ্ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আসলে উনি (এরশাদ) কখন কী বলেন, আমাদের মাথায় ধরে না।’
তবে জাপার সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, এরশাদ যা-ই করুন না কেন, সবই তাঁর নিজের ব্যক্তিস্বার্থে।
জাপার চারজন দায়িত্বশীল নেতা জানান, এরশাদ জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীকে সর্বাত্মক সহযোগতিার আশ্বাস দিয়েও তুষ্ট করতে না পেরে সম্প্রতি একটি বাংলা দৈনিকে স্বনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। তাতে বিএনপি-জামায়াতের প্রতিও ঢিল ছুড়েছেন।
এরশাদ এ লেখায় মূলত দুটি বিষয়ে বলতে চেয়েছেন। এক. আওয়ামী লীগের জন্য এতকিছু করার পরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে সামরিক স্বৈরশাসক বলেন, কখনো কখনো তীর্যক টিপ্পনী কেটে কথাবার্তা বলেন। এসব তাঁর গায়ে লাগে। তাই তিনি ‘প্রধানমন্ত্রীর সমীপে’ লিখেছেন, ‘আমরা আপনাদের কীভাবে সহযোগিতা করেছি, তা একটু স্মরণে রাখবেন। ইতিহাসের আলোকে কথা বলবেন।’
দুই. প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এরশাদের অনুরাগ বা অভিমানের প্রকাশ। তাই লেখায় হিসাব কষে তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ যে তিনবার ক্ষমতায় এসেছে, তাতে জাতীয় পার্টির সহযোগিতা ছিল। অবশ্য জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু এ প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, ওই নিবন্ধ হচ্ছে ইতিহাসের সত্য তুলে ধরা এবং সরকারকে তা বুঝিয়ে দেওয়া।
এখন সরকারকে তুষ্ট রাখার চেষ্টার পাশাপাশি এরশাদ বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক খোঁচাখুঁচিতে জড়িয়ে আলোচনায় থাকতে চাইছেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি সংসদে বাজেট বক্তৃতায় এবং সর্বশেষ তাঁর লেখায় জামায়াত-বিএনপিকে ‘বিষবৃক্ষ’ বলে অভিহিত করেন। এমনকি দল দুটির উত্থানের জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করেন তিনি। তাই নিবন্ধে এরশাদ বিএনপিকে খোঁচাতে গিয়ে বলেন, বিএনপি জামায়াতের গহ্বরে বিলীন হতে যাচ্ছে। এখান থেকে বের হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
এই এরশাদেরই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের বক্তব্য ছিল সরকারের ব্যর্থতার কঠোর সমলোচনাপূর্ণ। অবশ্য, তখন রাজনৈতিক অঙনে এমন আলোচনাও ছিল যে এরশাদের সরকারবিরোধী বক্তব্য ছিল সরকারের সঙ্গে সমঝোতা সাপেক্ষে ও লোক দেখানো। এখন তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের বিরোিধতা।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরপরও এরশাদের বক্তব্য ছিল এখনকার চেয়ে ভিন্ন। নির্বাচন দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হয়নি দাবি করে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন; এমনকি দলের সংরক্ষিত আসনে নারী সাংসদদের মনোনয়নের জন্য সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে এরশাদ ‘শিগগিরই আরেকটি নির্বাচন হবে’ বলেও মন্তব্য করেন। সম্প্রতি বলেছেন, সরকার পাঁচ বছরই ক্ষমতায় থাকবে। বিএনপি কিছুই করতে পারবে না।
সম্প্রতি আলাপকালে এই লেখকের কাছে জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুও স্বীকার করেছেন, ‘নির্বাচন নিয়ে জাপার চেয়ারম্যান এখন আগের মতো কথা বলছেন না।’
এরশাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা জানান, মূলত সরকারের শক্তিশালী অবস্থান দেখে এরশাদ ভোল পাল্টেছেন। এখন তিনি মনে করছেন, বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে বিতর্কে জড়ালেই সুবিধা। একদিকে জাপা আলোচনায় থাকবে, অপর দিকে সরকারও খুশি হবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ও জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুর পাল্টাপাল্টি বিবৃতিযুদ্ধ ছিল সে কৌশলেরই বর্ধিত রূপ।
জিয়াউদ্দিন বাবলু বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রকৃত বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির জায়গায় যেতে চাই। রাজনীতিতে আলোচনায় থাকতে চাই। এটা সত্য।’
৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দ্বিমুখী ভূমিকা রাখতে গিয়ে স্ত্রী রওশনের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েন এরশাদ। অন্যদিকে এরশাদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন জেনারেল মঞ্জুর হত্যা ও রাডার ক্রয় মামলা দুটিও নতুন আঙ্গিকে সক্রিয় হয়েছে। তাই আপাতত এরশাদ চাইলেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হতে পারছেন না।

সেলিম জাহিদ: সাংবাদিক।

বিধ্বস্ত গাজায় ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা

এলাকাভিত্তিক ফিলিস্তিনির মৃত্যু
ইসরায়েলের টানা প্রায় এক মাস ধরে চলা নৃশংস অভিযানে ব্যাপক রক্তপাত আর ধ্বংসযজ্ঞের পর অবশেষে গতকাল মঙ্গলবার শান্ত হয়ে আসে ফিলিস্তিনশাসিত গাজা। চারদিকে ধ্বংসস্তূপের মাঝে ছিল শুধুই নীরবতা। মিসরের মধ্যস্থতায় গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ৭২ ঘণ্টার এক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে গতকাল সকাল আটটা থেকে। মৃত্যুপুরীতে পরিণত গাজা থেকে সেনা সরিয়ে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে মোতায়েন করেছে ইসরায়েল। বিশ্ববাসীর অব্যাহত নিন্দা ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এর আগের দিন সোমবারও সাত ঘণ্টার জন্য মানবিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিল ইসরায়েল।কিন্তু ওই ঘোষণার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আশ্রয়শিবিরে হামলার মধ্য দিয়ে তা নিজেরাই ভেঙে ফেলে দেশটি।
এরও আগে দুই পক্ষ আরও কয়েক দফা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও প্রতিবারই তা ভেস্তে যায়। তাই সাম্প্রতিকতম এই যুদ্ধবিরতি টেকসই হওয়ার বিষয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে।খবর এএফপি ও বিবিসির। গতকাল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক মিনিট আগেও ইসরায়েলি বাহিনী ও হামাসের যোদ্ধাদের মধ্যে চলেছে তুমুল লড়াই। তবে ইসরায়েলি হামলার ২৯তম এই দিনটিতে বিবদমান দুই পক্ষই যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যাপারে আপাতদৃষ্টিতে প্রত্যয়ী ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদদাতারা জানান, যুদ্ধবিরতি শুরুর কিছু আগেও গাজায় ইসরায়েলি বিমান থেকে অন্তত পাঁচবার বোমাবর্ষণ করা হয়। হামাসও ইসরায়েল সীমান্তের ভেতর ১৬টি রকেট ছোড়ে। এসব রকেটে ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউ হতাহত হননি। ইসরায়েল বলেছে, তারা সীমান্ত অঞ্চলে হামাসের অত্যাধুনিক সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়ার মিশন শেষে গাজা থেকে তাদের সব সেনাসদস্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তারা এই উপত্যকায় স্থল অভিযান গুটিয়ে আনছে। হামাসের রকেট হামলা বন্ধের অজুহাতে গত ৮ জুলাই গাজার অধিবাসীদের ওপর নির্বিচারে বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এরপর ১৭ জুলাই থেকে শুরু হয় স্থল অভিযান। ইসরায়েল বলেছে, তারা তাদের অভিযানের মূল লক্ষ্য অর্জন করেছে। এ কদিনে হামাসের ৩২টি সুড়ঙ্গপথ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থল অভিযানে অংশগ্রহণকারী সেনাদের প্রত্যাহার করে নেওয়া প্রসঙ্গে ইসরায়েলের সেনা কর্মকর্তা জেনারেল মটি আলমজ দেশটির সেনা রেডিওকে বলেন, ‘তাদের সবাইকে সরিয়ে আনা হয়েছে।’ আরেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল পিটার লার্নার বলেন, প্রত্যাহার করে নেওয়া সেনাদের গাজার বাইরে ‘আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে মোতায়েন’ করা হবে এবং তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনার পাল্টা জবাব দেবে। হুঁশিয়ার করে তিনি বলেন,
‘আক্রান্ত হলে আইডিএফ (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী) তার সমুচিত জবাব দেবে।’ কেবলই ধ্বংসস্তূপ আর নীরবতা: নতুন দফা যুদ্ধবিরতি শুরুর সঙ্গে সঙ্গে গাজার চারদিকে মিলছে কেবলই ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। যে দিকেই চোখ যায়, শুধুই ধ্বংসস্তূপ। সেই সঙ্গে নেমে এসেছে এক অস্বাভাবিক নীরবতা। ঘটনাস্থল থেকে এএফপির একজন সংবাদদাতা বলেন, যুদ্ধবিরতি শুরুর আগের রাতটি ছিল ভয়াবহ ইসরায়েলি অভিযান শুরুর পর সবচেয়ে নীরব-নিস্তব্ধ একটি রাত। চিকিৎসকেরা জানান, সোমবার মধ্যরাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত কারও প্রাণহানি বা আহত হওয়ার ঘটনা জানা যায়নি। তবে ইতিপূর্বে হামলায় আহত দুই ব্যক্তি এদিন মারা গেছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই বিভিন্ন আশ্রয়শিবির থেকে গাজার বাসিন্দারা অপরিহার্য সামগ্রী ও তাঁদের স্বজনদের লাশের সন্ধানে নিজ নিজ বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপে ছুটে যান। খাদ্য ও পানির সন্ধানেও ছোটেন তাঁরা। পাশাপাশি হাসপাতালগুলো থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ছোটেন চিকিৎসাকর্মীরা। গতকাল এসব চিকিৎসাকর্মী এমন সব স্থানে যান, যেখানে সহিংসতার কারণে আগে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণ গাজার রাফার নিকটবর্তী এলাকায় গতকাল পাঁচটি লাশ পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে দুটি লাশ হামাস যোদ্ধার এবং তিনটি ইসলামিক জিহাদ গোষ্ঠী সদস্যের। প্রতি হাজারে একজনের মৃত্যু: যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত ২৯ দিনের ইসরায়েলি অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার ৮৬৭ জন। তাঁদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই ৪০০। গাজার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ। সে অনুযায়ী প্রতি এক হাজার ফিলিস্তিনির মধ্যে একজন করে নিহত হয়েছেন এই অভিযানে। প্রভাবশালী ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়। জাতিসংঘের অভিনন্দন: যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটির মহাসচিব বান কি মুন এক বার্তায় এই পদক্ষেপকে অভিনন্দন জানিয়ে যত শিগগির সম্ভব, মিসরে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে হামাস ও ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানান।
এলাকাভিত্তিক ফিলিস্তিনির মৃত্যু
মোট ফিলিস্তিনি নিহতের সংখ্যা ১৮০০
৩ জুলাই পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাব এলাকা শনাক্ত করা যায়নি ৩৭৪
উত্তর গাজা ২৫২, গাজা সিটি ৩৯১
দেইর আল-বালাহ ২০৩ খান ইউনিস ৪৩৪
রাফা ১৪৬ ইসরায়েলি নিহতের সংখ্যা ৬৭
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী (আইডিএফ) ৬৪
বেসামিরক* ৩
*একজন থাই নাগরিকসহ
সূত্র: ওসিএইচএ, আইডিএফ, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়/বিবিসি

কথা হয়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় না

গাজার আল-শাতি আশ্রয়শিবিরে গতকাল ইসরায়েলি হামলায়
গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে জীবন- মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে
বাবা। বাবার এই দুর্দশা দেখে কান্না ছাড়া আর
কীই-বা আছে এই ফিলিস্তিনি শিশুর। এএফপি
গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত থাকলেও যুদ্ধবিরতির কোনো উদ্যোগ সেভাবে চোখে পড়ছে না। শুরু থেকেই মিসর চেষ্টা চালিয়ে গেলেও তাতে বলার মতো সাফল্য আসেনি। কয়েকবার সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি হয়েছে বটে, কিন্তু প্রতিবারই ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির মধ্যেই নানা অজুহাত তুলে আরও বেপরোয়া ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এর মধ্যেও থেমে নেই মিসরের চেষ্টা। যদিও সেই প্রক্রিয়ার সফলতা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। ওই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে ফিলিস্তিনি আলোচকেরা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে কিছু শর্তের বিষয়ে একমত হয়েছেন।
শিগগিরই ওই শর্তগুলো মিসরের মধ্যস্থতাকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা। খবর আল-জাজিরার, এএফপি। ফিলিস্তিনের আলোচক দলটি মিসরের রাজধানী কায়রোয় অবস্থান করছে। ওই দলের সদস্য ও ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনের (ডিএফএলপি) প্রতিনিধি কায়েস আবদুল করিম আল-জাজিরা টেলিভিশনকে বলেন, ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ নেতা ও হামাস মধ্যস্থতাকারীদের কাছে গাজায় সামরিক অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি তুলে ধরবেন। এ দাবির মধ্যে সীমান্ত-ক্রসিংয়ে ফিলিস্তিনিদের চলাচল ও পণ্য আনা-নেওয়ার ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার বিষয়টিও থাকবে। আবদুল করিম আরও বলেন, ‘ইসরায়েলের হাতে ৬০ জন ফিলিস্তিনি বন্দীর মুক্তির বিষয়টিও তোলা হবে। ইসরায়েলি সেনা গিলাদ শালিতের মুক্তির বিনিময়ে ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ওই ৬০ ফিলিস্তিনিও ছিলেন। সম্প্রতি তাঁদের আবারও গ্রেপ্তার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।’ এ ছাড়া ফিলিস্তিনিদের দাবির মধ্যে রয়েছে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার, সেখানে পুনর্গঠন-প্রক্রিয়া শুরু ও গাজা উপকূলে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ফিলিস্তিনি জেলেদের মাছ ধরার নিশ্চয়তা দেওয়া। কায়রোতে থাকা ফিলিস্তিনি আলোচকদের মধ্যে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও), হামাস ও ইসলামিক জিহাদের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরভিত্তিক এই আলোচক দলটি গত শনিবার কায়রো পৌঁছায়। গত রোববার ইজ্জাত আল-রিসেকের নেতৃত্বে হামাসের একটি দলও কায়রো গেছে। ইসলামিক জিহাদের প্রতিনিধি হিসেবে জিয়াদ আল-নাখালা কায়রোর উদ্দেশে লেবাননের রাজধানী বৈরুত ছেড়েছেন। তবে মিসরের মধ্যস্থতায় চলমান যুদ্ধবিরতির এই প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিনিধি পাঠানো হয়নি। মধ্যস্থতাকারীরা ফিলিস্তিনি আলোচকদের সঙ্গে বৈঠক করার পর ইসরায়েলের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানা গেছে। কিন্তু ফিলিস্তিনি আলোচকেরা​ যে শর্তগুলো দিতে যাচ্ছেন, তা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিতে হবে জাতিসংঘ বা তৃতীয় কোনো পক্ষকে।
তার আগে ইসরায়েলকে এই শর্তগুলো মানার অঙ্গীকার করতে হবে। কিন্তু ইসরায়েল এখনো অনমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছে। রোববার ইসরায়েলি বিচারমন্ত্রী টিজিপি লিভনি বলেন, ‘গাজা থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে হামাসের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যাবে না ইসরায়েল। এই অবস্থান থেকে ইসরায়েল কখনোই সরে আসবে না।’ তবে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক চুক্তির ভিত্তিতে সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।’ ইসরায়েলকে অনেকটা আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে এ কারণে যে ইসরায়েলি নেতারা ভাবছেন, মিসরের সেনাসমর্থিত সরকার তাদের অবস্থানের পক্ষে রয়েছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট সাবেক সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি শনিবার বলেন, মিসর যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেই প্রস্তাবের বাইরে যুদ্ধবিরতির ‘কার্যকর কোনো বিকল্প’ প্রস্তাব নেই। হামাস ও ফিলিস্তিনি কয়েকটি সংগঠন মিসরের ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এতে গাজার ওপর থেকে অবরোধ শিথিলের সুনির্দিষ্ট কিছুর উল্লেখ নেই। গত সপ্তাহে মিসরের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ভেস্তে যাওয়ার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি নতুন কোনো প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রেখেছেন। এর মধ্যেই আবার নতুন প্রক্রিয়া শুরু করে মিসর। কিন্তু সেটা কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসরায়েল অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিলেই ​কি সংকটের সমাধান হয়ে যাবে? বিষয়টি তো এত সহজ নয়। একপর্যায়ে ইসরায়েল একতরফাভাবেই সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেবে, কিন্তু এতে তো আর গাজার ওপর থেকে আট বছর ধরে আরোপিত ইসরায়েলি সামরিক অবরোধের অবসান হবে না।’
ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধ করেছে: এইচআরডব্লিউ
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজার সংঘাতবিক্ষুব্ধ এলাকা ছেড়ে পলায়নরত বেসামরিক লোকজনকে হত্যার অভিযোগ এনেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনটির মতে, যা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গতকাল সোমবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস শহরের নিকটবর্তী খুজা নগর থেকে পালিয়ে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর জুলাইয়ের শেষ দিকে হামলা চালানো হয়। নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠনটি বলেছে, ‘ইসরায়েলি সেনারা ২৩ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় নগর খুজায় গোলাবর্ষণ করে বেসামরিক লোকজনকে হত্যা করেছে, যা স্পষ্টত যুদ্ধ আইনের লঙ্ঘন।’

ঘরের কথা অপরের মুখে by আলী ইমাম মজুমদার

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন গত ৫ জানুয়ারি হয়ে গেছে। গঠিত হয়েছে সরকার। বসেছে সংসদের একাধিক অধিবেশন। তবু এ সংসদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। মাঝেমধ্যেই তা জোরালো হয়ে ওঠে। দেশে তো আছেই, এ বিষয়ে হামেশাই কথাবার্তা বলেন বিদেশি দূত, এমনকি সময়ে সময়ে রাষ্ট্রনায়কেরাও। স্বাভাবিক নিয়মে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে অন্য কোনো দেশের নাক গলানোর কথা নয়। তা সত্ত্বেও বরাবরই হয়। বরং বলা চলে, আমরাই ডেকে আনি। আর তা করে সব পক্ষই। যাঁরা বিরোধী দলে থাকেন, তাঁরা কোনো একটি বিষয়ে সরকারের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পারলে বিদেশিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকেন। তাঁরা আন্তরিকভাবে চান বিদেশি রাষ্ট্র এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্যের সমর্থনে জোরালো সমর্থন দিক। অন্যদিকে সরকারে যাঁরা থাকেন, তাঁরাও তাঁদের কার্যক্রমের বৈধতার জন্য সেসব দেশের সমর্থনপ্রত্যাশী থাকেন। গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর বক্তব্য অনুকূলে রাখতে উভয় পক্ষের ব্যাপক প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে দীর্ঘকাল। শুধু বক্তব্যটি নিজদের বিপক্ষে গেলেই নাখোশ হন। তাও বলেন না আমাদের ঘরের বিষয়, আমরাই মেটাব। আর সে সদিচ্ছা কোনো পক্ষের রয়েছে, এমনটাও বলা যাবে না।

বিগত নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর একটি নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। সে মনোভাব অনেকটা প্রকাশ্যেই তারা ব্যক্ত করেছে। উল্লেখ্য, ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। মূলত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট আর এরশাদের নেতৃত্ব থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ছিটকে বেরিয়ে আসা জাতীয় পার্টিই (জেপি) সেই নির্বাচনী মাঠে ছিল। নির্বাচনে জনগণের উৎসাহ ও অংশগ্রহণের মাত্রা ছিল খুবই কম। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে একজন করে প্রার্থী থাকায় ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ যেগুলোতে হয়েছে, সেগুলোও অনেকটা লোক দেখানো। ভোটারের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। কেউ বিষয়টিকে অস্বীকার করলেও এটাই বাস্তব। সংবিধান ও আইনে কত ভোটারের অংশগ্রহণ নির্বাচনকে সিদ্ধ করবে, এমন বিধান নেই। তাই এটা আইনত অসিদ্ধ বলা যাবে না। তবে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে গেছে। যেমনটা ছিল ১৯৮৬, ১৯৮৮ আর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচিত সংসদ। তাই আলোচিত নির্বাচনটি ঘিরে সময়ে সময়ে পুরোনো কথাই নতুনভাবে বলা হয় বিভিন্ন পক্ষ থেকে।
অতি সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন ব্রিটেনে। মূলত গার্ল সামিট নামের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়াই ছিল এ সফরের লক্ষ্য। পাশাপাশি সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনসহ বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ নেতার সঙ্গে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সামাজিক খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেছেন। পাশাপাশি হতাশা ব্যক্ত করেছেন আলোচ্য নির্বাচন নিয়ে। এগুলো ব্রিটিশ সরকারি সূত্র থেকেই জানা গেছে।
আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ব্রিটেন বিষয়টি নিয়ে পেছনে তাকাতে চায় না। এর সহজ অর্থ, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন সবাই মিলেমিশে নতুন একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুসারে ব্রিটেন বর্তমান সরকারকে মেনে নিয়েছে।ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্যদৃষ্টে এর ভিন্নতা লক্ষণীয় হয় না। তবে তারা দৃঢ়তার সঙ্গে চায় দ্রুত একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা, এমনটা মনে করলে ভুল করা হবে না। তাদের মতামত নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ চলছে। কিন্তু কেউ বলছে না এসব বিষয়ে অন্য রাষ্ট্রের কথা বলার আবশ্যকতা থাকবে কেন? বরং নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করতে সরকার স্পষ্ট অনীহা ব্যক্ত করছে। তাদের বক্তব্য, গত নির্বাচনের আগে ‘সর্বাত্মক চেষ্টা’ করেও বিএনপিকে সংলাপ বা নির্বাচনে আনা যায়নি। বক্তব্যটি অংশত সত্য। সংলাপের জন্য প্রধানমন্ত্রী ফোন করেছিলেন বিএনপির প্রধানকে। সে ফোনালাপ নিষ্ফল হয়েছে। এর জন্য অনেকটাই দায়ী বিএনপি। নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তেও তারা অবিচল থেকেছে। এর দায় তাদেরই নিতে হবে। তবে এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে সংলাপ বা নির্বাচনে বিএনপিকে আনার জন্য আওয়ামী লীগের কথিত ‘সর্বাত্মক চেষ্টা’ ছিল না। বরং তাদের বাদ রেখেই যেনতেন একটি নির্বাচনের প্রস্তুতি ছিল সে দলটির। অবস্থাদৃষ্টে এমনটাই মনে হয়েছে। পাশাপাশি সেই ফাঁদে পা দিয়ে বিএনপি নিজেরা পর্যুদস্ত হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক অবস্থানকে করেছে দুর্বল।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের আগেও পাশ্চাত্যের বেশ কিছু দেশের অনুরূপ প্রতিক্রিয়া আমরা প্রকাশ্যেই জানতে পেরেছি। আর এ ধরনের প্রতিক্রিয়া তারা সুযোগ পেলেই ব্যক্ত করছে। এমনটাই অতি সম্প্রতি করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্তির চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় থাকা মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাট। নিয়োগ অনুমোদন-সংক্রান্ত সিনেট কমিটিতে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের গত নির্বাচন ছিল ‘অনস্বীকার্যভাবে ত্রুটিপূর্ণ’। এ দেশে অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল একটি সরকার গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ শুরুর বিষয়ে তিনি জোর দিয়েছেন। এ বক্তব্যের ওপরও আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া, এটা মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়। বক্তব্যটি নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রাষ্ট্রদূতের নিজের। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আমরা কিছুটা বিস্মিত। গত নির্বাচন সম্পর্কে বিভিন্ন মার্কিন মুখপাত্রের বক্তব্যের সঙ্গে বার্নিকাটের বক্তব্যের কোনো বড় ফারাক লক্ষণীয় হয় না। এ ক্ষেত্রেও কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে অন্য একটি দেশের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি কোনো পক্ষ। বরং একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী তাঁকে এ ধরনের বক্তব্য না দিয়ে খালেদা জিয়াকে জামায়াত-শিবিরের সংস্রব ত্যাগ করার পরামর্শ দিতে অনুরোধ করেছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন অনেকটাই অন্য সবার বিষয় হয়ে গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে মনে হয়, আমরা নিজেরাই এখানে গৌণ।
নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক হানাহানি আর তা সালিস করতে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ আমাদের দেশে কোনো নতুন বিষয় নয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনকালেও তা ঘটতে দেখেছি আমরা। এক-এগারোর আগে একটি অস্বস্তিকর পরিবেশে বেশ কয়েকজন বিদেশি রাষ্ট্রদূত উভয় পক্ষের কাছে ক্রমাগত ছোটাছুটি করেছেন। তাঁদের একই বক্তব্য, একটি অংশগ্রহণমূলক শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি। দুই পক্ষই তাদের যুক্তিতে রয়ে গেছে অনড়। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।
আলোচিত নির্বাচনের আগেও পাশ্চাত্য বিশ্ব প্রায় এক সুরে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কংগ্রেস সরকার এখানে আওয়ামী লীগের সরকারের নির্বাচনসংক্রান্ত অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছে অনেকটা স্পষ্টতই। এ সমর্থনের বিষয়ে কতিপয় ভারতীয় গণমাধ্যমের বেশ কিছু বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। হিন্দুস্তান টাইমস এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে তির্যক সমালোচনা করেছে সরকারের। দ্য হিন্দু বলেছে, একটি অনিশ্চিত পথে দেশটির যাত্রায় সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। প্রতিকার হিসেবে অতি দ্রুত অংশগ্রহণমূলক একটি নতুন নির্বাচন এ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে পারে বলে পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে। পতিত শাসক এরশাদ দাবি করেছেন, ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনে অংশ নিতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এটা স্মরণে থাকার কথা যে এরশাদ শেষ পর্যায়ে নির্বাচনে অংশ নিতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েছিলেন। পরিণতিতে দলটিই তাঁর হাতছাড়া হয়।
ডেভিড ক্যামেরন আর মার্শিয়া বার্নিকাট যে কথাগুলো বলেছেন, তা বলার সুযোগ আমরাই করে দিয়েছি। এ সমস্যাগুলো আমরা নিজেরা সমাধান করে ফেললে তাঁরা তা বলতেন না। আর কথাগুলো অপ্রিয় হতে পারে। তবে সত্য। স্বাধীনতা আমরা ভালোবাসি। অনেক রক্তের বিনিময়ে তা অর্জনও করেছি। কিন্তু একটি স্বাধীন জাতির মর্যাদা ধরে রাখার জন্য আমরা সচেষ্ট এমন দাবি করার কোনো সুযোগ নেই।এ বিষয়ে প্রয়াত খ্যাতনামা লেখক নীরদ চৌধুরীর একটি উদ্ধৃতি খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘আমরা বাঙ্গালী বলিয়া গর্ব অনুভব করিলেও রবীন্দ্রনাথ কেন বঙ্গজননীকে দোষী করিয়াছেন, তাহা বুঝিতে আমাদের কোনো কষ্ট হইত না, কেননা বঙ্কিমচন্দ্র অল্প বয়সেই বাঙ্গালীর “মানুষ” না হইবার একটি লক্ষণের কথা উল্লেখ করিয়াছিলেন। তিনি কপালকুণ্ডলাতে লিখিয়াছেন, “বাঙ্গালী অবস্থার বশীভূত, অবস্থা বাঙ্গালীর বশীভূত হয় না”।’ হয়তো বা এ জন্যই আমাদের ঘরের কথা অপরের মুখেই বেশি শোনা যায়।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

সম্প্রচারনীতি যেভাবে কণ্ঠরোধের হাতিয়ার হয় by কামাল আহমেদ

গত বছরের জুন মাসে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি এইট-এর শীর্ষ সম্মেলনের আগে জুন মাসের গোড়ার দিকে ব্রিটেনের গার্ডিয়ান এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমস আরও কয়েকটি প্রভাবশালী পত্রিকার সঙ্গে একযোগে সামরিক ও বেসামরিক গুপ্তচরবৃত্তির ভুবনজোড়া ইঙ্গ-মার্কিন কার্যক্রমের বিবরণ প্রকাশ করে দিলে সারা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অতীব গোপনীয় গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (এনএসএ) একজন চুক্তিভিত্তিক পরামর্শক বা ঠিকাদার এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যভান্ডারের ওপর ভিত্তি করে এসব কাগজ ধারাবাহিকভাবে বেআইনি গোয়েন্দা কার্যক্রমের বিশদ বিবরণ প্রকাশ করে দেয়।

জি এইট শীর্ষ বৈঠকের প্রাক্কালে যখন খবর বেরোল যে যুক্তরাষ্ট্র তার নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর মিত্র নেতাদের টেলিফোন এবং কারও কারও অফিসে আড়ি পেতে নজরদারি করছিল, তখন ওবামা প্রশাসন কী ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা হয়তো তাঁর ভবিষ্যৎ আত্মজীবনীতে জানা যাবে। তবে তাঁর দপ্তর তখন জানিয়েছিল যে বিষয়টি সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁকে কিছু জানায়নি। যার মানে দাঁড়ায়, যুক্তরাষ্ট্রের অতি ক্ষমতাধর সামরিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় নিরাপত্তার নামে দেশ-বিদেশে নানা ধরনের বেআইনি কাজে জড়িত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের টেলিফোনে বেআইনিভাবে আড়ি পাতার অভিযোগগুলো তদন্তে তাই দেশটির সিনেট কমিটি তদন্তও শুরু করে।
জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে কথিত এবং স্পর্শকাতর তথ্য, যা চুরি হয়ে সংবাদমাধ্যমের হাতে গেছে, তা ছাপানোর জন্য কোথাও কোনো সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার কোনো নজির এখনো তৈরি হয়নি। বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অজুহাতে গণমাধ্যমের ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার মতো কোনো আইন প্রয়োগের কথা কারও কল্পনাতেও আসেনি। তার কারণ, এসব তথ্য কথিত নিরাপত্তার জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান হচ্ছে নাগরিকদের স্বার্থ।
২০১৩ সালের জুন থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এসব অবৈধ কার্যক্রমের খবর প্রকাশ পেয়েছে ওই সব পত্রিকায়, যেগুলোর মধ্যে আছে দুনিয়াব্যাপী টেলিফোনে আড়ি পাতা, ইন্টারনেটে নজরদারি, গুগল, ফেসবুক ও টুইটারের মতো মাধ্যমগুলোর কাছ থেকে ব্যবহারকারীদের বিষয়ে ব্যক্তিগত তথ্য বেআইনিভাবে হস্তগত করা, দেশে দেশে সরকার ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠনের ওপর নানা ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের এখনো দেশে দেশে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। গত শনিবার নয়াদিল্লি সফরের সময় প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনেই জন কেরিকে ভারতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন শিবসেনার ওপর নজরদারির বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে তাঁদের অসন্তোষের কথা খোলামেলাই জানিয়ে দেন।
বছর কয়েক আগে ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকা পার্লামেন্টের হিসাব বিভাগ থেকে চুরি করা তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ করে বহুসংখ্যক এমপির বিভিন্ন ধরনের ভাতা আদায়ে অসাধুতা ও জালিয়াতির বিবরণ প্রকাশ করে দেয়। ওই সব হিসাবের প্রকাশ বন্ধে দু-চারজন রাজনীতিকের আদালতের আশ্রয় গ্রহণের চেষ্টাও ভেস্তে যায়। প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনসহ পরিচিত রাজনীতিকদের অনেকে অতিরিক্ত ভাতা গ্রহণের ভুল স্বীকার করে অর্থ ফেরত দিয়ে পার পেয়ে যান। তবে একাধিক সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও এমপিকে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছে। বেআইনি পন্থায় হাতে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা মর্যাদা রক্ষার মতো কোনো ঠুনকো অজুহাত সেখানে গণমাধ্যমকে তার ‘জনস্বার্থমূলক তথ্য’ প্রকাশ থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি ব্যবহার করে বিবিসি সাবেক মন্ত্রী স্টিফেন বায়ার্সসহ কয়েকজন রাজনীতিকের তদবিরের জন্য ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রচার করেছিল, সেটাও ওই ‘জনস্বার্থে’। টেলিগ্রাফ-এর এ রকম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কারণে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হয়েছে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিয়াম ফক্সকে।
বাংলাদেশে কিছুদিন আগে সংঘটিত নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলায় সেখানকার সাংসদের সঙ্গে প্রধান আসামির টেলিসংলাপের যে রেকর্ড প্রথম আলো ও বিভিন্ন টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে, সেটির ক্ষেত্রেও ওই জনস্বার্থই হচ্ছে একমাত্র যৌক্তিকতা। ওই হত্যাকাণ্ডে সশস্ত্র বাহিনীর তিন কর্মকর্তার জড়িত থাকার যে অভিযোগ নিহত ব্যক্তিদের আত্মীয়রা করেছিলেন, তা যদি দেশবাসীকে জানানোর অধিকার না থাকে, তাহলে সাংবাদিকতা পেশার যে অপমৃত্যু ঘটবে, আমাদের সর্ববিষয়ে বিশেষজ্ঞ রাজনীতিকেরা যে সেটা বোঝেন না, তা বিশ্বাস করা কঠিন। মন্ত্রিসভার বৈঠকে যে সম্প্রচার নীতিমালা অনুমোদিত হয়েছে, তা কার্যকর হলে বনের রাজা ওসমান গণির বাসায় তোশকভর্তি টাকার চিত্র কি দেশবাসী কোনো দিন দেখতে পাবেন? বিশ্বব্যাংকের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করলে বিদেশি প্রচারমাধ্যমে তা প্রচারিত হলেও দেশি সম্প্রচারমাধ্যমে শুধু সেই মন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ‘দেশপ্রেমিক’ উপাধির কথা প্রচার করতে হবে। সাংবাদিকদের সরকারের তথ্য কর্মকর্তার ভূমিকায় অধিষ্ঠিত করার এই প্রকল্পে অবশ্য আমি খুব একটা বিস্মিত নই। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট আইনের খসড়ার মধ্যেও এই আনুগত্য ক্রয়ের উদ্যোগ সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
মন্ত্রিসভায় সম্প্রচার নীতিমালা অনুমোদিত হওয়ার পর তথ্যমন্ত্রীকে সরকার–সমর্থক একটি টেলিভিশন চ্যানেলে যে বিষয়টিতে সোচ্চার হতে দেখেছি, তা হলো, ‘সরকার গোপনে কোনো কিছু করছে না।’ তিনি বলেছেন যে এই নীতির খসড়া প্রায় ছয় মাস ধরে ওয়েবসাইটে ছিল, যাতে আগ্রহীরা এ বিষয়ে মতামত দিতে পারেন। মন্ত্রীর সত্য ভাষণে সবার বিমোহিত হওয়ার কথা হলেও যাঁরা এ বিষয়ে মতামত দিয়েছেন, তাঁরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের পরামর্শ বা সুপারিশগুলো সরকার উপেক্ষা করেছে। স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত স্থাপনের এই সুযোগ মন্ত্রী কেন হাতছাড়া করলেন, তা অবশ্য বোধগম্য নয়। তিনি যদি জমা পড়া মতামতগুলোও তাঁর মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতেন, তাহলে সম্ভবত বোঝা যেত যে ওই শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কি খামোখাই রাজনীতি করছেন, নাকি সত্যিই তাঁদের পরামর্শগুলো উপেক্ষিত হয়েছে?
সরকার-সমর্থকদের কেউ কেউ এমন কথাও বলেছেন যে চ্যানেল-মালিকেরা এই নীতির বিষয়ে যতটা না মাথা ঘামাচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি সোচ্চার সংবাদপত্রগুলো। তাঁদের এই পর্যবেক্ষণ হয়তো কিছুটা ঠিক। তবে এই সত্যও ভোলা যায় না যে দেশে যতগুলো চ্যানেল এখন চালু আছে, তার সংখ্যাগরিষ্ঠগুলোর লাইসেন্স দিয়েছে বর্তমান সরকার এবং তা দেওয়া হয়েছে কেবল দলীয় আনুগত্যের বিবেচনায়। তার পরও পুঁজি ও সাংবাদিকতার যোগ্যতার অভাব মেটাতে লাইসেন্সধারীরা অনেকেই যেসব অংশীদারদের শরণাপন্ন হয়েছেন, তাঁদের জন্য সম্পাদকীয় নীতিমালার প্রশ্নে হয়তো কিছুটা ছাড় দিতে হয়েছে। যে কারণে নানা সময়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে হতাশার সুর শোনা গেছে যে ‘লাইসেন্স দিলাম আমরা আর আমাদের সমালোচনাই তাদের একমাত্র কাজ।’ প্রধানমন্ত্রীর এই মনোভাবের মধ্যেই ইঙ্গিত মেলে যে তিনি নিয়ন্ত্রণের পথটিকেই তাঁর রাজনীতির জন্য সহায়ক বিবেচনা করছেন। সম্প্রচারমাধ্যমের ওপর এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সফল হলে সংবাদপত্রগুলোই যে পরবর্তী লক্ষ্য হবে, সেই আশঙ্কা মোটেও অমূলক নয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক আনুগত্যের দূষণে প্রশাসনিক আমলাদের (প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স আইন সংশোধনে জেলা প্রশাসকদের সুপারিশমালা তৈরি) উদ্যোগ যখন দৃশ্যমান।
সরকারের পক্ষ থেকে এমন দাবিও করা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সম্প্রচার আইন ও নীতিমালার আলোকে বাংলাদেশের এই সম্প্রচারনীতি তৈরি করা হয়েছে। আবার এমন কথাও বলা হয়েছে যে বিবিসির সম্পাদকীয় নীতিও নাকি এতে অনুসৃত হয়েছে। বিটিভি ও বেতারের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে বিবিসিকে অনুসরণের শেখ হাসিনা সরকারের ছিয়ানব্বইয়ের অঙ্গীকারের অভিজ্ঞতা আমাদের যে সুখকর নয়, সে কথা নিশ্চয়ই সবাই বিস্মৃত হননি। রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরির জন্য এগুলো বেশ ভালো যুক্তি। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের নীতিতে যেমন ফারাক আছে, তেমনি গণতান্ত্রিক ওই সব দেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার রয়েছে বিরাট পার্থক্য। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ব্যক্তির মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবাধ, তাই সে দেশে জাতীয় পতাকা পোড়ানোর দৃশ্য সম্প্রচার করা হলেও তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে না। আমরা যে ততটা উদার হতে প্রস্তুত নই, তা আমাদের রাজনীতিকেরা ভালোই বুঝিয়ে দিয়েছেন।
ব্রিটেনের সম্প্রচার কার্যক্রমের তদারকি করে যে সংস্থা, তার সঙ্গে সরকারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। অফকম নামের ওই প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে টেলিভিশনের লাইসেন্স দেয়, তাদের বিধিমালা তৈরি করে এবং বিধি লঙ্ঘিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং শাস্তি দেয়। ইরাক যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিবিসির ওপর অফকমের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, বিবিসি পরিচালিত হতো তার পরিচালকমণ্ডলী বা গভর্নরদের তদারকিতে। কিছুদিন হলো এখন বিবিসিও অফকমের আওতাধীন। ভারতের সম্প্রচার জগৎও কিছুটা আলাদা। টেলিভিশনে বেসরকারি খাতের নাটকীয় বিকাশ হলেও সবচেয়ে শক্তিশালী সম্প্রচারমাধ্যম রেডিওতে বেসরকারি খাতের সংবাদ প্রচারের অধিকার এখনো নেই। আর টেলিভিশনের লাইসেন্স দেওয়ার এখতিয়ারও সরকারের। যে কারণে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ায় এখন শোর উঠেছে গণমাধ্যমের গেরুয়াকরণের। তবে মালয়েশিয়াকে দৃষ্টান্ত হিসেবে অনুসরণ করলে ভিন্ন কথা। কেননা, নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ওই মডেল মুক্ত বিশ্বের সঙ্গে তুলনীয় নয়। জনশ্রুতি আছে, আওয়ামী লীগের রূপকল্প ২০৪১-এর অনুপ্রেরণা নাকি মালয়েশিয়া। গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের শৃঙ্খল আরোপের চেষ্টা কি তারই আলামত?

কামাল আহমেদ: সাংবাদিক৷

চলমান লড়াইয়ে বিজয়ী হবে ফিলিস্তিনিরাই

খালেদ মেশাল
ইসরায়েলের শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকলেও চলমান লড়াইয়ে ফিলিস্তিনিরাই বিজয়ী হবে।সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ফিলিস্তিনের গাজাভিত্তিক ইসলামপন্থী সংগঠন হামাসের রাজনৈতিক নেতা খালেদ মেশাল এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।খবর সিএনএনের। সিএনএন গতকাল সোমবার মেশালের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করেছে। সাক্ষাৎকারে মেশাল বলেন, ‘আমরা এই ভূমির বৈধ মালিক, আর তারা ভূমি চোর। আমরা ভুক্তভোগী, তারা খুনি। আমরা হয়তো একটি বা দুটি যুদ্ধে সম্পূর্ণভাবে জিততে পারব না, তবে শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে আমরাই জিতব। তারা যখন আমাদের বেসামরিক লোকদের হত্যা করে, আমরা তখন তাদের সেনাদের হত্যা করি। ফিলিস্তিন ও হামাসের জন্য এটিও একটা বিজয়।’ ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে কয়েক দফা যুদ্ধবিরতি হলেও তাকে যুদ্ধবিরতি বলে মানতে নারাজ মেশাল। তিনি বলেন, ‘গাজার অভ্যন্তরে ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি এবং সুড়ঙ্গ ধ্বংস অব্যাহত থাকলে যুদ্ধবিরতি হয় কীভাবে। এটা একটা আগ্রাসন।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিরোধ যুদ্ধের মাধ্যমে আত্মরক্ষার অধিকার ফিলিস্তিনিদের রয়েছে।’ ইসরায়েলি ‘মিথ্যাচার’ বিনাবাক্যে মেনে নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে মেশাল বলেন, ‘মার্কিন প্রশাসন ও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইসরায়েল যা বলছে, তা-ই গ্রহণ করছে, অথচ সেগুলো মিথ্যা। হামাস জনগণের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছে। হামাস নিজেদের যোদ্ধাদের রক্ষায় কখনো জনগণকে মানববর্ম বানায় না।’ সাক্ষাৎকারে মেশাল বলেন, ‘আমরা মিসরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। ফিলিস্তিনের একটি প্রতিনিধিদল কায়রোতে আমাদের ও ইসরায়েলিদের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। এর মাধ্যমে আমরা একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারি।’ মেশাল বলেন, ‘ফিলিস্তিনি জনগণ ১৯৪৮ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের কথা ও আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে চলছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলি দখলদারত্বের অবসান ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা আমাদের জনগণকে স্বশাসন ও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিতে সহায়তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

গাজায় মারা গেছেন সিলেটের হামিদুর -‘আব্বু যুদ্ধে যাচ্ছি বেঁচে থাকলে দেখা হবে’ by ওয়েছ খছরু

‘আব্বু যুদ্ধে যাচ্ছি, বেঁচে থাকলে দেখা হবে, নতুবা তোমাদের সঙ্গে বেহেশতে দেখা হবে।’- এ কথা চিরকুটে লিখে ঘর থেকে বের হয়ে গাজা যুদ্ধে গিয়েছিলেন বিশ্বনাথের হামিদুর রহমান। গাজা উপত্যকায় সশস্ত্রযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। কিন্তু মায়ের কোলে ফিরে আসা হলো না তার। তার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন হামিদুর রহমান। যুদ্ধের ময়দান থেকে টেলিফোনে হামিদুর মারা যাওয়ার খবর জানিয়েছেন তার সহযোদ্ধারা। এ খবরে মাতম চলছে হামিদুরের পরিবারে। হামিদুর রহমানের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথের মীরের চক গ্রামে। তার পিতা আবদুল হান্নান। দীর্ঘদিন ধরে আবদুল হান্নান বসবাস করছেন যুক্তরাজ্যে। তার দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে হামিদুর রহমান তৃতীয়। তিনি ছোটকাল থেকে ধর্মভীরু ছিলেন। তাবলিগ জামাতে শরিক হতেন। সব সময় নামাজ-রোজা পালন করতেন। লন্ডনে তার সহযোদ্ধারা সবাই তাবলিগ জামাতের লোক। পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, এবার গাজা উপত্যকায় যখন ইসরাইল হামলার প্রস্তুতি শুরু করেছিল তখনই বন্ধুদের সঙ্গে গাজা যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে হামিদুর রহমান। যুক্তরাজ্য থেকে ১০ জনের একটি টিম গাজা যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। আর ওই দলে নাম লেখান হামিদুর রহমান। রমজানের আগেই তিনি বন্ধুদের সঙ্গে গাজার পথে রওনা হন। যাওয়ার আগে পরিবারের অনুমতি পাওয়া যাবে না- এমন আশঙ্কায় তিনি পরিবারকে সরাসরি জানান নি। যাওয়ার আগে তার পিতা আবদুল হান্নানকে চিরকুট লিখে গিয়েছিলেন। আর ওই চিরকুট পাওয়ার পর থেকে ছেলের প্রতীক্ষায় ছিলেন আবদুল হান্নান। হামিদুর রহমানের চাচা সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার মীরের চক গ্রামের বাসিন্দা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল মনাফ গতকাল মানবজমিনকে জানিয়েছেন, হামিদুর রহমান গাজা উপত্যকায় যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের হয়ে অংশ নেন। আর সশস্ত্রযুদ্ধে তিনি বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। একটি সম্মুখযুদ্ধে ইসরাইলি সৈন্যদের তোপের মুখে ছিলেন তারা। আর ঈদের আগের দিন ওই যুদ্ধে মারা যান হামিদুর রহমান। তার মারা যাওয়ার খবর সহযোদ্ধারা যুদ্ধের ময়দান থেকে লন্ডনের বাসায় জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তার মৃত্যুর খবর শুনে লন্ডনে শোকের মাতম চলছে। বিশ্বনাথের বাড়িতেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এদিকে, গত শনিবার মীরের চক গ্রামে নিহত হামিদুর রহমানের কুলখানি হয়েছে। আর ওই কুলখানিতে গ্রামের লোকজন অংশ নেন। আবদুল মনাফ জানান, হামিদুর রহমান খুবই শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। প্রায় ৪ বছর আগে তার ভাই হান্নান পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেশে এসেছিল। তখন হামিদুর রহমানও তাদের সঙ্গে দেশে আসে।

সংগঠন নয়, ব্যক্তির বিচারের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র

ঢাকায় সফররত যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক মার্কিন দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ জানিয়েছেন, কোন রাজনৈতিক সংগঠন নয়, যুদ্ধাপরাধের দায়ে যে কোন ব্যক্তির বিচারের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র। ওই বিচারের প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার তাগিদ দেন তিনি। সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল বিকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি এ অভিমত দেন। মার্কিন দূত বলেন, বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের যে বিচার চলছে তার সঙ্গে রাজনৈতিক দলকে টানা ঠিক হবে না। এটি করা হলে শান্তি ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে না। রাজধানীর বারিধারাস্থ আমেরিকান সেন্টারে মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে আছে, বাংলাদেশেও আছে। কিন্তু ইউরোপসহ পৃথিবীর অনেক দেশই ওই বিধান তুলে দিয়েছে। তাই ওই দণ্ড দেয়ার ব্যাপারে অভিযুক্তের সঙ্গে অপরাধের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। যে কোন অপরাধে কারও সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার আগে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার তাগিদ দেন তিনি। কাদের মোল্লার ফাঁসির বিষয়ে মার্কিন দূত বলেন, প্রথম আদালতে কাদের মোল্লার ফাঁসি দেয়া হয়নি। কিন্তু পরে আইন পরিবর্তন করা হয়েছে এবং ওই আইনেই সর্বোচ্চ আদালত থেকে তার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ জানিয়েছিল উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, বিচারিক আদালত যাবজ্জীবনের যে রায় দিয়েছিল দ্বিতীয় কোন আদালত থাকলে সেখানে এটি আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করা যেতো। বিচারিক আদালত আর উচ্চ আদালতের মধ্যে আরেকটি আদালত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। তবে চলমান ডিফেন্স টিম তৃতীয় কোন দেশে বিচারের যে দাবি তুলেছে তাকে আনরিয়েলিস্টিক বলে মত দেন মার্কিন ওই বিশেষ দূত। ঢাকায় তার এবারের সফরকে পঞ্চম সফর উল্লেখ করে স্টিফেন জে র‌্যাপ বলেন, এর আগে আমি যখন এসেছি, তখন চলমান যুদ্ধাপরাধের বিচারকে আন্তর্জাতিক মানের করতে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছি। অনেকটা বাস্তবায়ন হয়েছে। এটি ভাল। তবে ওই বিচারকে আন্তর্জাতিক মানের করতে এখনও অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বিচার প্রক্রিয়া যেভাবে এগোচ্ছে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি প্রশ্নে সরাসরি কোন মন্তব্য করেননি তিনি। তবে এবারও বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বৈঠক হয়েছে বলে জানান র‌্যাপ। গাজায় ইসরাইলি হামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইসরাইল মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেখানে যুদ্ধাবস্থা রয়েছে, তাই যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারটি আসতে পারে। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি আরও বিচার-বিবেচনা করতে হবে।
যুদ্ধাপরাধের বিচারে জনগণের সমর্থন রয়েছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাংলাদেশের জনগণের সমর্থন আছে। গত দু’টি সাধারণ নির্বাচনে এর প্রতিফলন ঘটেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নুরেমবার্গ বিচারের উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি অভ্যন্তরীণ আদালত হলেও বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেছে। স্টিফেন জে র‌্যাপ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ বিচারে সমর্থন দেয়ায় মার্কিন সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে এ ক্ষেত্রে এ সমর্থন অব্যাহত রাখার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানান। র‌্যাপ ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সহযোগিতা করতে তার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেন। যাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি একটি মডেল হতে পারে। ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে এই জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।