Wednesday, March 12, 2014

সময়চিত্র- ক্রসফায়ারে খুশি হচ্ছে কারা by আসিফ নজরুল

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, ক্রসফায়ার মানুষ গ্রহণ করেছে। মানুষ বলতে তিনি কাদের বুঝিয়েছেন, তা আমি জানি না। তবে আমার ধারণা, যাঁরা ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন বা এর আশঙ্কায় আছেন, তাঁরা বা তাঁদের বন্ধু-বান্ধব-স্বজন ক্রসফায়ারে খুশি হতে পারেন না। বিগত কয়েক মাসে, বিশেষ করে গত ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন, গুম হয়েছেন বা নিখোঁজ আছেন। তাঁদের প্রায় সবাই বিএনপি বা এর মিত্র সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মী। এসব ক্রসফায়ার ও গুমের ঘটনা বিরোধী দলগুলোর নেতা, সংগঠক, কর্মী ও সমর্থকদের প্রাণভয়ে আতঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট। এমন আতঙ্ক কারোর খুশিমনে গ্রহণ করার কথা নয়। ক্রসফায়ার বা গুম যদি কারও স্বার্থসিদ্ধি বা প্রতিশোধস্পৃহা পূরণ করার জন্য করা হয়, তিনি যদি অসুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ হন, তাহলে তাঁরই একমাত্র এতে খুশি হওয়ার কথা।

ক্রিকেট ও জাতীয়তাবাদ- খেলায় পাকিস্তানকে সমর্থন কেন? by ফারুক ওয়াসিফ

রাজনীতি যদি রাজনীতির ময়দানে দাঁড়িয়ে খোলাখুলি করা না যায়, তখন বেজায়গায় তা প্রকাশ পাবেই। খেলার মাঠ নাকি সে রকম এক বেজায়গা। প্রশ্নটা তাই এখন দাঁড়িয়েছে, খেলার সঙ্গে রাজনীতি যদি মেশেই, তাহলে কোন ধরনের রাজনীতি মেশানো শ্রেয়? এশিয়া কাপে ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটযুদ্ধে পাকিস্তানের নামে জয়ধ্বনি দেওয়ায় মীরাটে পড়তে আসা কাশ্মীরের ৬৭ জন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাতৃভূমি কাশ্মীরে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাঁদের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা সমালোচনার মুখে সরানো হয়েছে বটে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে সংশয় কাটেনি। পাকিস্তানি ক্রিকেট তারকা আফ্রিদির ভক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে ভারতে কোনো আইন না থাকায় এ যাত্রা তাঁদের অপরাধী সাব্যস্ত করা গেল না। কিন্তু সনাতন ভারতীয় মন আহত হয়েছে। হিন্দু-মুসলমানের দূরত্বও বেড়েছে।

রুশ-ইউক্রেন বিরোধ- ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস by মুশফিকুর রহমান

ইউক্রেন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার মধ্যে ইউরোপজুড়ে অন্যতম আশঙ্কা, রাশিয়ার জ্বালানি গ্যাসের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকবে কি না। মনে রাখা দরকার, ইউরোপের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি গ্যাসের সরবরাহ পাইপলাইন দিয়ে আসে রাশিয়া থেকে। পূর্ব ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশের প্রায় শতভাগ জ্বালানি গ্যাসের সরবরাহ আসে গাজপ্রমের কাছ থেকে।

গোধূলির ছায়াপথে- ফুল ও বাতাসে মনীষীর স্পর্শ by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

সকালবেলায় শিল্পী গেয়ে গেলেন: ‘তোমার আসন পাতব কোথায় হে অতিথি/ ছেয়ে গেছে শুকনো পাতায় কানন বীথি’। গান শেষ হয়েছে, স্পর্শটুকু বাতাসে। আরেকটিবার শোনার জন্য মনের হাহাকার। ওটি তো চিরদিনের জন্য ভেসে গেল।

দক্ষিণ এশিয়া- ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক ভূত by কুলদীপ নায়ার

ভারত সম্পর্কে ব্রিটিশদের সাম্প্রতিকতম খোঁচাটি এসেছে এক ইতিহাসবিদের কাছ থেকে, যিনি ভগৎ সিং ও চন্দ্রশেখর আজাদকে চিত্রিত করেছেন ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে। দুজনকেই ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার দায়ে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। সন্ত্রাসবাদী ও বিপ্লবীর পার্থক্য বুঝতে ব্রিটিশরা স্পষ্টই অক্ষম। আসলে ব্রিটিশরাই সন্ত্রাসবাদীদের শ্রেণীভুক্ত। কারণ, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করেছে এমন হাজার হাজার মানুষকে তারা হত্যা করেছে। অথচ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, আর ব্রিটিশরা দাবি করে যে গণতন্ত্র তাদের খুব পছন্দ।

কিশোর-অপরাধ ও পুনর্বাসন ‘শিশু জেলখানায় যাইবেন, স্যার?’ শেখ হাফিজুর রহমান

১০-১১ বছর আগে কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের জন্য ‘অলটারনেটিভ মেজারস’ বা ‘বিকল্প ব্যবস্থা’বিষয়ক একটি গবেষণাকাজের জন্য আমাকে যশোরে যেতে হয়েছিল। দড়াটানা মোড়ের পাশের একটি আবাসিক হোটেলে রাত কাটিয়ে সকালবেলা যশোরের তৎকালীন ডিসির সঙ্গে দেখা করলাম। ডিসি অফিস থেকে বেরিয়ে এক রিকশাচালককে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি পুলেরহাট কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে যাবেন কি না। তিনি বুঝতে পারলেন না। তাঁকে যখন বুঝিয়ে বললাম যে আমি কিশোর অপরাধী ও অবাধ্য কিশোরদের যেখানে রাখা হয় সেখানে যেতে চাই, তখন তিনি বুঝলেন। রিকশাচালক মাথা নেড়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শিশু জেলখানায় যাইবেন, স্যার?’

রাজনীতি- পরাজয়ে দলীয় কোন্দলতত্ত্ব by মলয় ভৌমিক

পরাজিত প্রার্থীরা নির্বাচনে পরাজয়ের প্রকৃত কারণ আড়াল করার জন্য একটা কার্যকর আবরণ পেয়ে গেছেন। বাহ্যিক এই আবরণটির নাম ‘দলীয় কোন্দল’। পত্রপত্রিকায়ও ম্যাড়মেড়ে এই শব্দ দুটির বহুল ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। সাধারণের বা দলের শীর্ষ মহলের চোখে ঠুলি পরানোর জন্য এ ধরনের ‘মিথ্যা আবরণ’ (‘ফলস ফ্ল্যাগ’) বেশ কার্যকরও বটে।

প্রথম আলো’র বিরুদ্ধে অভিযোগ- রায় কাল

দৈনিক প্রথম আলো’র বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে। আগামীকাল এ ব্যাপারে রায় ঘোষণা করবে হাইকোর্ট। বিচারপতি নাঈমা হায়দার এবং বিচারপতি জাফর আহমেদের হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়ের এ দিন ধার্য করেন। গতকাল হাইকোর্টে  উপস্থিত হয়ে প্রথম আলো’র সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, আমরা সব সময় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে।

এরশাদের অনুষ্ঠানে জুতা নিয়ে ধাওয়া হট্টগোল by নিয়াজ মাহমুদ

নির্দেশ মেনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো প্রার্থীদের সান্ত্বনা দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এরশাদ। ক্ষুব্ধ নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একে অন্যের প্রতি। তৃণমূলের নেতারা প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝাড়েন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের ওপর। এ সময় জুতা নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ঘটে। এ ঘটনার জের ধরে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমানত হোসেনকে বহিষ্কার করা হয়েছে দল থেকে।

স্বাধীন হতে চায় ক্রিমিয়া

ই উ ক্রে ন স ং ক ট
গণভোটের আগেই ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়া অঞ্চলের স্বাধীনতার পক্ষে গতকাল মঙ্গলবার ভোট দিয়েছেন ক্রিমিয়ার পার্লামেন্টের মস্কোপন্থী সদস্যরা। ইউক্রেন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং শত্রুর অবস্থান জানতে ন্যাটো পোল্যান্ড ও রোমানিয়ায় বিমান মোতায়েন করতে যাচ্ছে। এদিকে ইউক্রেন-সংকট সমাধানে মার্কিন প্রস্তাবে মস্কো সম্পৃক্ত না হওয়া পর্যন্ত রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ফ্রান্স সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেছে, রাশিয়া পশ্চিমা প্রস্তাবে রাজি না হলে আগামী সপ্তাহেই রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করা হতে পারে। স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র ক্রিমিয়ার স্থানীয় পার্লামেন্টের সদস্য ৮১ জন। এর মধ্যে ৭৮ জন স্বাধীনতা ঘোষণার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। পার্লামেন্টের এই পদক্ষেপ ক্রিমিয়াকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আইনি কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্রিমিয়ার পার্লামেন্টের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ক্রিমিয়াকে রাশিয়া ফেডারেশনের অংশ হওয়ার পক্ষে গণভোটের ফল গেলে তার পরই স্বাধীনতার বিষয়টি কার্যকর হবে। গণভোট রাশিয়ার পক্ষে গেলে ‘ক্রিমিয়া প্রজাতন্ত্র একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে রুশ ফেডারেশনে যোগ দেওয়ার আবেদন জানাবে। আগামী রোববার এ গণভোট হওয়ার কথা। কেরির প্রত্যাখ্যান: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই লাভরভকে বলেছেন, ক্রিমিয়ায় রুশ সামরিক হস্তক্ষেপ ইউক্রেন-সংকট নিয়ে আলোচনার বিষয়টিকে কঠিন করে দিয়েছে। ক্রিমিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে গণভোট হলে ইউক্রেন-সংকট নিয়ে আলোচনার দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে।
ইউক্রেন-সংকট সমাধানে কেরি চলতি সপ্তাহে লাভরভকে একটি প্রস্তাব দেন, যেখানে বিশেষ করে কিয়েভের নতুন সরকারের সঙ্গে মস্কো বৈঠকে রাজি কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। রাশিয়ার পাল্টা প্রস্তাব: রাশিয়া সোমবার বলেছে, তারা সংকট নিরসনে মার্কিন প্রস্তাবের একটি পাল্টা প্রস্তাব তৈরি করছে। পাশাপাশি ইউক্রেনের নতুন সরকারকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়েছে মস্কো। পক্ষান্তরে ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী আরসেনিয়ে ইয়াৎসেনিউক ক্রিমিয়ার কর্তৃপক্ষকে রাশিয়ার মদদপুষ্ট ‘সংঘবদ্ধ অপরাধী দল’ আখ্যা দিয়েছেন। এদিকে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরা ফ্যাবিয়াস গতকাল বলেছেন, রাশিয়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির প্রস্তাবে রাজি হলে তিনি (জন কেরি) মস্কো যাবেন। সে ক্ষেত্রে এখনই অবরোধ আরোপ করা হবে। আর রাশিয়া যদি পশ্চিমা প্রস্তাবে রাজি না হয় অথবা নেতিবাচক মনোভাব দেখায়, তাহলে আগামী সপ্তাহেই দফায় দফায় রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করা হবে। অন্যদিকে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার স্টেইনমিয়ার গতকাল এস্তোনিয়া সফরকালে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘রাশিয়ার আচরণে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন ছাড়াই আগামী সপ্তাহ পার হয়ে গেলে, পরদিন সোমবার ইউরোপীয় (পররাষ্ট্রবিষয়ক) কাউন্সিল তাদের পদক্ষেপের পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা করবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সংঘাতে জড়াতে চাই না, তবে রুশ কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ড দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের তেমন কিছুর জন্য প্রস্তুতি নিতে বাধ্য করছে।’ ন্যাটোর মুখপাত্র বলেছেন, শত্রুপক্ষের অবস্থান চিহ্নিত করতে অ্যাওয়াক্স (এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম) বিমান মোতায়েন করা হচ্ছে। মিত্র দেশের ভূখণ্ড থেকে এসব বিমান কাজ করবে। গত সোমবারই পোল্যান্ড ও রোমানিয়ায় ওই বিমান মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ন্যাটো জানায়, পর্যবেক্ষণ বিমান ‘পরিস্থিতি সম্পর্কে মিত্রদের সচেতনতা’ বাড়াবে। রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসি।

সিরিয়া যুদ্ধের শিকার ৫৫ লাখ শিশু

সিরিয়া যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা গত বছর প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫৫ লাখে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এক প্রতিবেদনে গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধপীড়িত ওই শিশুদের অনেকে অবরুদ্ধ এলাকায় আটকে আছে।
তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই। সেখানকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ইউনিসেফ জানায়, থাকা-খাওয়ার নিদারুণ কষ্টে সিরিয়ার অনেক শিশু এখন সুরক্ষা, চিকিৎসাসেবা বা মানসিক সমর্থন ছাড়াই বসবাস করছে। তাদের শিক্ষার সুযোগ খুবই কম। কখনো কখনো শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর ইচ্ছাকৃত হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। সিরিয়ায় ১০ লাখ শিশু অবরুদ্ধ অবস্থায় করুণ জীবন যাপন করছে। তাদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো যাচ্ছে না। আর মানসিক সাহায্যের অভাবে ভুগছে প্রায় ২০ লাখ শিশু। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেক বলেন, সিরিয়ার শিশুদের জন্য গত তিন বছর যেন তাদের জীবনের দীর্ঘতম সময় ছিল। তাদের কি আরও এক বছর যন্ত্রণা সইতে হবে?
তিন বছর ধরে চলা সিরিয়ার যুদ্ধ শিশুদের ওপর কতটা গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তার ওপরই প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, সিরিয়ার অভ্যন্তরে ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে বসবাসরত ৫৫ লাখ শিশুর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ধস, মানসিক চাপ ও পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থার ক্রমেই অবনতিতে সার্বিকভাবে একটি প্রজন্ম বিপর্যস্ত হতে চলেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রিত ১২ লাখ সিরীয় শিশু বর্তমানে বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে রয়েছে। তারা বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০টি শরণার্থী শিশুর মধ্যে একজন এখন শ্রম দিচ্ছে এবং জর্ডানে অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সী প্রতি পাঁচ মেয়ের একজন বিয়ে করছে। অ্যান্থনি লেক বলেন, শিশুরা যাতে নিজেদের বাড়িতে ফিরে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে পারে, সে জন্যই এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। এএফপি।

প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে চ্যালেঞ্জে দুই দল

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি (সিইসি) আজ বুধবার আবার বৈঠকে বসছে। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার কংগ্রেস জানিয়ে দিল, এবার তামিলনাড়ুতে কোনো জোট নয়, তারা একাই লড়বে। কংগ্রেসের এই ঘোষণার ঠিক আগে দ্রাবিড় মুনাত্রা কাজাঘাম (ডিএমকে) নেতা এম করুণানিধি ঘোষণা দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাহুল গান্ধী বা নরেন্দ্র মোদি—কাউকেই তাঁরা সমর্থন করবেন না। করুণানিধি গত সোমবার রাতে দলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেন। তালিকায় তাঁর মেয়ে কানিমোলি, স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারিতে কারাভোগকারী সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এ রাজা এবং দয়ানিধি মারান স্থান পেয়েছেন। ডিএমকের সঙ্গে জোট না হওয়ায় তামিলনাড়ুতে কংগ্রেসের অবস্থান আরও খারাপ হলো। সিইসির বৈঠকে এসব বিষয় মাথায় রেখেই প্রার্থী ঠিক করতে হবে। রেল কেলেঙ্কারি, মুম্বাইয়ের আদর্শ হাউজিং কেলেঙ্কারি ও কমনওয়েলথ গেমস কেলেঙ্কারির তিন নায়ক যথাক্রমে পবন বনসল, অশোক চৌহান ও সুরেশ কালমাডির স্ত্রীদের টিকিট দেওয়া উচিত হবে কি না, সেই বিতর্কের মীমাংসাও এই বৈঠকেই করতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার রেল কেলেঙ্কারির মামলায় বনসলের ভাগনে বিজয় সিংলার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এই মামলায় বনসলকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হতে পারে। সিবিআই বনসলকে অভিযুক্ত না করায় তাঁকে টিকিট দিতে কোনো অসুবিধা না থাকলেও কংগ্রেস নেতৃত্ব এই তিনজনের ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত।
এদিকে কাল বৃহস্পতিবার বিজেপির তৃতীয় তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা। নরেন্দ্র মোদি ও রাজনাথ সিংয়ের নির্বাচনী কেন্দ্র ঠিক করতে বিজেপিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ওই দিনই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটি কঠিন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মেজো ছেলে অনিল শাস্ত্রীকে কংগ্রেস উত্তর প্রদেশ থেকে টিকিট দিতে পারে বলে তাঁর মেজো ছেলে সুনীল শাস্ত্রী বিজেপির টিকিট চাইছেন। টিকিটের দাবি জানিয়েছেন লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মেয়ের ছেলে সিদ্ধার্থনাথ সিংও। দিল্লি থেকে হঠাৎই টিকিট চাইছেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামীও। তিনি তাঁর জনতা দলকে বিজেপির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। আন্না হাজারের সঙ্গী সাবেক আইপিএস কর্মকর্তা কিরণ বেদী প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদিকে সমর্থন জানিয়ে এখন বিজেপির টিকিটে দিল্লি থেকে দাঁড়াতে চাইছেন। দুদিনের মধ্যে এসবের মীমাংসা করে বিজেপিকেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরই মধ্যে বিজেপি-শিবসেনা সম্পর্কে একটু টাল খায় মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার (এমএনএস) নেতা রাজ ঠাকরের জন্য। ঠাকরে রাজ্যে শিবসেনার বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়ে মোদিকে প্রধানমন্ত্রী পদে সমর্থন জানিয়েছেন। শিবসেনা এতে ক্ষিপ্ত। বিজেপি-এমএনএস নতুন জোটের সম্ভাবনা নিয়ে দলের মধ্যে কানাকানি শুরু হয়। সামাল দিতে রাজীব প্রতাপ রুডিকে মুম্বাই পাঠানো হয়। শিবসেনা বলেছে, বিজেপির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অটুটই থাকবে। তবে মুখে বললেও সম্পর্কে একটু সন্দেহ ঢুকেই গেছে। এই রাজনৈতিক আবহে গতকাল সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছান তৃণমূল কংগ্রেসনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ বুধবার দুপুরে রামলীলা ময়দানে প্রবীণ গান্ধীবাদী আন্না হাজারের সঙ্গে তাঁর যৌথ জনসভা। তৃণমূলের প্রার্থীদের আন্না হাজারে সরাসরি সমর্থন করছেন।

যেকোনো মূল্যে বিজেপিকে হারাব : রাহুল

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে হারাতে সবকিছু করবেন এবং যে কোনো মূল্যেই তাদের হারাবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী। সোমবার রাজস্থানের টংক জেলার এক নির্বাচনী র‌্যালিতে তিনি এসব কথা বলেন। রাজস্থানে নির্বাচনী র‌্যালি শুরু করার মধ্য দিয়ে তিনি আরও বলেন, আমরা তাদের জন্যই রাজনীতি করি এবং সরকার চালাই, যারা দৈনিক কাজ করার মাধ্যমে দেশ চালাচ্ছে। যেমন- চৌকিদার, ট্যাক্সিচালক, ড্রাইভারসহ আরও অন্যরা। এদিন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপিকে আক্রমণ করে রাহুল বলেন, তারা ক্ষমতায় এলে শুধু ধনিক শ্রেণীর লাভের জন্যই কাজ করে। কিন্তু আমরা কাজ করি গরিবের জন্য। আমরা রাজস্থানে বিজেপিকে মোকাবেলা করবই। তরুণদের উৎসাহিত করার উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা লোকসভা নির্বাচন ও বিধানসভায় নতুন এবং তরুণদের দেখতে চাই।
উল্লেখ্য, কংগ্রেস গত বছর ডিসেম্বরে রাজস্থানের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে পরাজিত হয়। এবার তাই রাজস্থানে ভালো ফল লাভের চেষ্টায় কংগ্রেস আগেভাগেই মাঠে নেমেছে।

কঠিন ঠিকই, তবে ফেলে রাখার নয়

খবরে প্রকাশ, তিস্তার বাংলাদেশ অংশে পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিক কমে গেছে। এতে বৃহত্তর রংপুরের তিস্তার সেচনির্ভর কৃষিব্যবস্থা হুমকির মুখে। জানা যায়, বিষয়টি স্থায়ী সমাধান প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমারের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। পত্রিকান্তরের খবর থেকে এটাও জানা যায়, সে বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে তিস্তা চুক্তি খুব কঠিন। আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি।’ সে বৈঠকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে আরও ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে ভারত। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের এ উদারতা প্রশংসার দাবি রাখে। ভারতে ইতিমধ্যে লোকসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। এটা সামনে রেখে তিস্তা চুক্তিটি এখনই হওয়ার কথা নয়। আর এ-জাতীয় একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন সহজও নয়। কঠিন বটে। তবে কঠিন বলেই ফেলে রাখার নয়। এর সমাধান করতে হবে ন্যায় ও বাস্তবতার নিরিখে। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন।
সে সময়েই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। উভয় পক্ষের মধ্যে আগাম আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির একটি ভিত্তিও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির মুখে ভারত সরকার তখনকার মতো চুক্তিটি স্বাক্ষরে অপারগ হয়। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক উন্নতি লক্ষণীয় হচ্ছে না। কিন্তু দুটি বন্ধুপ্রতিম দেশের সম্পর্ককে ক্রমবর্ধমানভাবে জোরদার করতে এটার আবশ্যকতা রয়েছে। আর তা দরকার যত দ্রুত সম্ভব। উল্লেখ্য, তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। ভারত ও বাংলাদেশের মাঝে এ ধরনের নদী রয়েছে ৫৪টি। ভারতের সিকিম রাজ্যে হিমালয় পর্বতের পাদদেশে এর উৎস। ভারতের অংশে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশ অংশের নীলফামারী জেলার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করেছে। ৩০৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ নদীটি বাংলাদেশ অংশে রয়েছে ১১৫ কিলোমিটার। বৃহত্তর রংপুরের পাঁচটি জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটা চিলমারী বন্দরের কাছে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে। এ পাঁচটি জেলার অনেক আবাদি জমিসহ বহু জনপদ তিস্তার ওপর নির্ভরশীল। ঠিক তেমনিভাবে নির্ভরশীল পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল ও সিকিমের কিছু অংশ। তাই এর ওপর একক অধিকার কারও নেই। ভাটির দেশের সম্মতি ব্যতিরেকে উজানে এর গতিপথ থেকে পানি ভিন্ন পথে সরিয়ে নেওয়াও যথার্থ নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় বাঁধ দিয়ে তা করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ন্যূনতম চাহিদা আর ন্যায়নীতির নিরিখে একটি চুক্তি সম্পাদন জরুরি।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরের সময়ে তিস্তা চুক্তি না হলেও স্বাক্ষরিত হয়েছিল স্থলসীমান্ত চুক্তি। এ চুক্তিটি মূলত ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি বাস্তবায়নসংক্রান্ত রূপরেখা। এটা বাস্তবায়িত হলে দুটি দেশের বেশ কিছু মানুষের নিত্য ভোগান্তির অবসান ঘটত। এতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমারেখার মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার একরের ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বাংলাদেশ পাওয়ার কথা রয়েছে। ঠিক তেমনি ভারতীয় ভৌগোলিক সীমায় সাত হাজার একরের ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল পাবে ভারত। বস্তুতপক্ষে এটা বর্তমান বাস্তব অবস্থার আইনানুগ স্বীকৃতি। এখন এসব ছিটমহলে বসবাসকারী ব্যক্তিরা কার্যত একরূপ বন্দী জীবন যাপন করছে। ‘নিজ দেশের’ পরিসেবাসহ প্রায় সবকিছু থেকে তারা বঞ্চিত। ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে ‘ভিনদেশের’ সুবিধাদি তাদের নিতে হয়। মনমোহন সিং সরকার এ চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সংবিধান সংশোধনে একটি বিল গত ডিসেম্বরে রাজ্যসভায় উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। ভারতের আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল অনিশ্চিত। ঠিক তেমনিভাবে অনিশ্চিত এ চুক্তি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা। তা-ও আমরা আশাবাদী থাকতে চাই। সমস্যাগুলোর সমাধান সহজসাধ্য নয়, এটা বলাবাহুল্য। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও দল সময়ে সময়ে স্থানীয় স্বার্থে এসব বিষয়ে অনড় অবস্থান নিয়ে থাকে। আর জোটনির্ভর কেন্দ্রীয় সরকার সে ক্ষেত্রে সবল কার্যক্রম নিতে পারে না। তবে ব্যতিক্রমও আছে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করেন। তখন দিল্লিতে ক্ষমতাসীন ছিল দেবগৌড়ার নেতৃত্বাধীন একটি সংখ্যালঘু জোট সরকার। গঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নদী। তা সত্ত্বেও সে চুক্তি সম্পাদনের জন্য ভারত সরকারকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়েছিল ওই রাজ্য। তেমনি দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহল বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করতে প্রয়োজন ছিল তিন বিঘা আয়তনের একটি করিডর।
সেটার বিধান ১৯৭৪ সালের চুক্তিতে থাকলেও অনেক পরে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর ওপর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত না হলেও ছিটমহলবাসী ও বাংলাদেশের প্রয়োজন অনেকটাই মিটছে। এটা নিয়েও সীমান্তের ওপারে বাধাবিঘ্ন অনেক ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দৃঢ়তার সঙ্গে সেগুলো অতিক্রম করে তথাকার সরকার। যৌথ অংশীদারির যেকোনো কিছুতে স্থানীয় জনগণ পুরোটাই চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়নীতি অনুসরণে যার যা প্রাপ্য, তা নিশ্চিত করতে হবে উভয় দেশের সরকারকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু ক্ষেত্রে তা ঘটছে না। ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামোর দেশ ভারতকে তার রাজ্যগুলোর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হয়। তবে আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সে মতামত যৌক্তিক হওয়া দরকার। এমনটা করা না হলে উদীয়মান পরাশক্তি ভারতের মর্যাদা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরদার হবে না। কথাটা বলেছেন ভারতের রাজ্যসভার সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মনিশঙ্কর আইয়ার গেল বছরের অক্টোবরে। তাঁর মতে, স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারতের কোনো ক্ষতিই হবে না। ভারত সরকারের এটা দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার বলেও তিনি মত ব্যক্ত করেন। অন্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো সম্পর্কেও তিনি এ ধরনের উদার মত ব্যক্ত করেন। প্রকৃতপক্ষে দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করতে উভয় পক্ষের উদারতার প্রয়োজন রয়েছে। ভারত আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে সর্বতোভাবে সহায়তা করেছে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটি ভারতবিরোধী মহল আমাদের দেশে বরাবর আছে। যেমনটা ভারতেও এ ধরনের একটি মহল রয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের পর এরা জোরদার হয়। পরিস্থিতি যায় তাদের নিয়ন্ত্রণে। আমাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে থাকে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী কয়েকটি গোষ্ঠী। এগুলো সে দেশটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে শীতল করেছে সন্দেহ নেই।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে মহাজোট সরকার অত্যন্ত সফলভাবে এর প্রতিকার করে। বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আশ্রয়স্থল কিংবা অস্ত্র সরবরাহের রুট হিসেবে যাতে এ দেশের ভূমি ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে মালামাল আনা-নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের স্থল, রেল ও নৌপথ ব্যবহার করতে দেওয়ার নীতি নিয়েছে এ সরকার। এটা পরিপূর্ণ রূপ না পেলেও সীমিত আকারে চলছে। পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওভার ডাইমেনশনাল মালামাল আশুগঞ্জ নদীবন্দর থেকে আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ত্রিপুরায় নেওয়া হয়েছে। সাময়িকভাবে হলেও তখন তিতাস নদে বাঁধ দিতে হয়েছিল। এগুলো সবই কঠিন সিদ্ধান্ত। তবে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টিতে আবশ্যক ছিল। আমরা যৌক্তিক মূল্যে ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি। এখন আরও ১০০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা হলো। ২০০৯ সালে বাংলাদেশে ক্ষমতায় এসে মহাজোট সরকার ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করতে যে ভূমিকা নিয়েছে, ভারতের পক্ষ থেকে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, স্থলসীমান্ত চুক্তিসহ মৌলিক কিছু বিষয়ে গঙ্গা চুক্তির ন্যায় উদারতা আশা করা অমূলক হবে না। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ভারতের কিছু কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আশাহত করে। এগুলো বাংলাদেশে ভারতবিরোধী অংশটিকেই চাঙা হতে সহায়তা করার কথা। তবে ভারত সরকার ও ভারতীয় সিভিল সমাজের উদার দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আশাবাদকে জোরদার করে। তিস্তা চুক্তি করা আর স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের কাজগুলো সহজ না হলেও এগুলোর আবশ্যকতা উপেক্ষা করার মতো নয়। আমাদের ক্ষেত্রবিশেষে কঠিন কাজও করতে হয়। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। ভারত অতীতে আমাদের জন্য অনেক কঠিন কাজ করেছে। এখনো কঠিন বলেই সামনে আসা সমস্যাগুলো ফেলে রাখবে না—এমন আশাবাদী আমরা হতে চাই।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক ভূত

ভারত সম্পর্কে ব্রিটিশদের সাম্প্রতিকতম খোঁচাটি এসেছে এক ইতিহাসবিদের কাছ থেকে, যিনি ভগৎ সিং ও চন্দ্রশেখর আজাদকে চিত্রিত করেছেন ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে। দুজনকেই ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার দায়ে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। সন্ত্রাসবাদী ও বিপ্লবীর পার্থক্য বুঝতে ব্রিটিশরা স্পষ্টই অক্ষম। আসলে ব্রিটিশরাই সন্ত্রাসবাদীদের শ্রেণীভুক্ত। কারণ, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করেছে এমন হাজার হাজার মানুষকে তারা হত্যা করেছে। অথচ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, আর ব্রিটিশরা দাবি করে যে গণতন্ত্র তাদের খুব পছন্দ। ব্রিটিশদের ১৫০ বছর দুঃশাসনের জন্য ভারতবর্ষের মানুষ আজ আর তাদের দুর্নাম করে না। ভারতীয়রা তিক্ত অতীতকে মেনে নিয়েছে, এমনকি ব্রিটেনের রানিকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে মেনে কমনওয়েলথেও যোগ দিয়েছে। তবু ব্রিটিশরা কখনো অতীত না ঘাঁটার জন্য ভারতের উদারতা স্বীকার করে একটি কথা বলেনি বা লেখেনি। কিন্তু তারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও সে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের হেয় করা অব্যাহত রেখেছে। এটা আনন্দিত হওয়ার মতোই খবর যে ভগৎ সিং তরুণ বয়সে যে বাড়িতে বাস করতেন, পাকিস্তান সরকার সেটি সংরক্ষণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছে। দেশবিভাগের আগে ব্রিটিশদের দুঃশাসনের শিকার ব্যক্তিরা সবাই পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতে নায়কের মর্যাদায় আসীন। আমার আকাঙ্ক্ষা, তাঁরা নিজেদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে নিজ নিজ দেশের জনগণকে বলবেন যে তাঁরা একই ইতিহাস-ঐতিহ্য আর ব্রিটিশদের হাতে একই দুর্ভোগের অংশীদার। ব্রিটিশ নির্মমতার এক জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিলের জালিয়ানওয়ালাবাগের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। এটি স্বাধীনতার পথে অগ্রযাত্রায় জাতীয়তাবাদীদের জন্য এক মাইলফলক। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারকে অমৃতসরের নিয়ন্ত্রণ দিয়েছিলেন পাঞ্জাবের লে. গভর্নর মাইকেল ও’ ডোইয়ের। ডায়ার ফসল কাটার উৎসব বৈশাখীর দিনটি বেছে নিয়েছিলেন প্রতিশোধের জন্য।
রাওলেট অ্যাক্ট নামে এক কালাকানুনের প্রতিবাদ করতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগ নামের উদ্যানে। শিকারিরা যেভাবে তাদের হিংস্র কুকুরের পালকে শিকারের পেছনে লেলিয়ে দেয়, ব্রিগেডিয়ার ডায়ার পুলিশকে সেভাবেই ওই সমাবেশের ওপর লেলিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ যাতে পালাতে না পারে, সে জন্য তিনি পরিকল্পিতভাবে উদ্যানের একমাত্র ফটকটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। গুলির মুখে অসহায় নারী-পুরুষ ও শিশুরা পালানোর কোনো পথ পায়নি। পুলিশ গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যায়। সেদিন এক হাজার ৬৫০টি গুলি করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে বহু লোক উদ্যানের একমাত্র কূপটিতে লাফিয়ে পড়েছিল, যা ছিল ওই বর্বর হত্যাযজ্ঞের নির্বাক সাক্ষী। সেদিন ঘটনাস্থলেই ৪০০-এর মতো লোক প্রাণ হারায় আর এক হাজার ৫০০-এর বেশি আহত হয়। ব্রিটিশ শাসনের কেন্দ্র লন্ডনও এতে আঁতকে উঠেছিল। ব্রিটিশ সরকার ব্রিগেডিয়ার ডায়ারকে ডেকে পাঠায়। তদন্ত কমিটির সামনে ডায়ারের ব্যাখ্যা ছিল, তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। ডায়ার কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। সরকারের পক্ষ থেকেও তাঁকে তিরস্কার করা হয়নি। ব্রিটিশ রাজনৈতিক মহলের কেউ কেউ তাঁর পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, ডায়ার পাঞ্জাবকে ‘অরাজকতা’ থেকে রক্ষা করেছেন। তার কয়েক বছর পর ব্রিটিশ সরকার ইউপি ও বিহার সীমান্তে অবস্থিত শহর বালিয়াতে কয়েক শ মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। স্বাধীনতা ঘোষণা করাই ছিল তাঁদের অপরাধ। মুক্তিসংগ্রামীদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য লাশ বেশ কয়েক দিন গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। কিন্তু ভারতীয় বিপ্লবীরা এতে দমে যাননি। মহাত্মা গান্ধীকে ‘নৈরাজ্যবাদী’ আখ্যা দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসকেরা, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে কলঙ্কিত করার জন্য তারা যেকোনো কিছু করতে তৈরি ছিল। অন্যদিকে ভারতবর্ষের বিপ্লবীরা নিজেদের তুলনা করতেন প্রদীপের শিখাটি জ্বালিয়ে রাখতে নিজেদের প্রাণ দেওয়া পতঙ্গের সঙ্গে। তাঁরা যদি শহীদ না হতেন, তাহলে কারাবরণ করা বা জীবন দেওয়া হাজারো স্বাধীনতাকামী অনুপ্রেরণা পেতেন না। এসব শহীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় তাঁদের প্রশংসা করেছেন মহাত্মা গান্ধী, যিনি নীতিগতভাবে বিপ্লবীদের সহিংস পন্থার বিরোধী ছিলেন।
তিনি বলেছেন, ‘ভগৎ সিং ও তাঁর সঙ্গীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁরা শহীদ হয়েছেন। তাঁদের মৃত্যু দৃশ্যত অনেকের কাছেই ব্যক্তিগত ক্ষতির মতো। আমিও সবার সঙ্গে মিলে এসব তরুণের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।’ মহাত্মা গান্ধী যেকোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে ছিলেন। ১৯২০ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে কারারুদ্ধ করা হয়। একপর্যায়ে যখন মনে হচ্ছিল ব্রিটিশ সরকার পিছু হটছে, তখনই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন গান্ধী। বাস্তবিকই অসহযোগ আন্দোলন ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের পরিচালিত সবচেয়ে বড় অহিংস আন্দোলন। তিনি আন্দোলন প্রত্যাহার করায় সবাই প্রতারিত বোধ করেন। হঠাৎ করে আন্দোলন প্রত্যাহার করার পেছনে ছিল উত্তর প্রদেশের চৌরিচৌরা গ্রামের বাসিন্দাদের সহিংস হয়ে ওঠার ঘটনা। গান্ধীজি এটা মেনে নিতে পারেননি। ১৯২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গোরখপুরের কাছের ওই গ্রামের কিছুসংখ্যক বাসিন্দা স্থানীয় থানার পাশ দিয়ে ব্রিটিশবিরোধী মিছিল বের করে। একপর্যায়ে পুলিশ মিছিলকারীদের ব্যঙ্গবিদ্রূপ করলে তারা খেপে গিয়ে চড়াও হয়। ক্ষুব্ধ পুলিশ জবাবে মিছিলকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। গোলাবারুদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গুলি চালিয়ে যায় পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজন নিহত ও অনেকে আহত হয়। গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন, কিন্তু পুলিশের নিন্দা করে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। ব্রিটিশদের উচিত নয় আমাদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়া। ভগৎ সিং ও চন্দ্রশেখর আজাদের মতো বীরদের কালিমালিপ্ত করে তারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। এ থেকে বিরত থাকলেই তারা ভালো করবে।