Thursday, April 24, 2025

কাশ্মীরে পর্যটকদের রক্ষায় শহীদ মুসলিম যুবক

কাশ্মীরের দক্ষিণে অনন্তনাগ জেলার পহেলগামের বৈসারণ উপত্যকায় এক ভয়ংকর দিনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, যখন একাধিক বন্দুকধারী পর্যটকদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি ছোড়ে। তখন সেই গোলাগুলির মাঝে দাঁড়িয়ে, নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে, কয়েকজন অমুসলিম পর্যটকের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসেন এক সাহসী মুসলিম যুবক—সৈয়দ আদিল হুসেন শাহ।

মাত্র ২৮ বছর বয়সী আদিল ছিলেন স্থানীয় একজন ঘোড়ার চালক। বৈসারণ উপত্যকায় পর্যটকদের ঘোড়ায় করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করাতে করাতেই চলত তার জীবিকা। সেই দিনে তিনি এক পর্যটক পরিবারকে উপত্যকার সৌন্দর্য ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই ভেসে আসে গুলির শব্দ। হামলাকারী সন্ত্রাসীরা পর্যটকদের ধর্ম জানতে চায় এবং তারপর বেছে বেছে গুলি চালাতে শুরু করে।

এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অন্যরা যখন প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালাচ্ছিলেন, তখন আদিল থেমে যাননি। বরং সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি এক বন্দুকধারীর দিকে দৌড়ে যান এবং তার অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অনেক পর্যটক পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হন এবং সন্ত্রাসীরা আদিলকে গুলি করে হত্যা করে।

এই সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন পর্যটকসহ মোট ২৬ জন, যা সাম্প্রতিক সময়ের কাশ্মীর অঞ্চলের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা। তবে আদিলের আত্মত্যাগ যেন এক আলোর রেখা, যা কাশ্মীরের মানুষকে নতুন করে মানবতার পাঠ পড়িয়েছে। তিনি শুধু সাহসিকতার পরিচয় দেননি, বরং প্রমাণ করেছেন, সন্ত্রাস ও ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালোবাসা ও সহানুভূতি আজও বেঁচে আছে।

আদিলের এক সহকর্মী গুলাম নবি বলেন, সে এক মুহূর্তও ভাবেনি। সে দেখল গুলি পর্যটকদের দিকে তাক করা, আর সঙ্গে সঙ্গেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। জীবন দিল, কিন্তু অপরিচিত কিছু মানুষকে বাঁচিয়ে দিল।

আদিলের মৃত্যুতে তার পরিবার শোকে ভেঙে পড়েছে। তার মা দরজায় বসে অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, সে ছিল আমাদের প্রাণ। ঘরের সব খরচ চালাতো, আমাদের দেখভাল করতো। সম্মানের সঙ্গে বেঁচে ছিল। এখন ও নেই, আমরা দিশেহারা। কিন্তু ও যেটা করেছে, তার জন্য আমি গর্বিত।

তার মা আরও বলেন, সে আমাদের একমাত্র ভরসা ছিল। ঘোড়া চালিয়ে যা আয় করত, তাই দিয়ে সংসার চলতো। এখন আমাদের দেখার মতো কেউ আর নেই। আমরা জানি না কীভাবে বাঁচবো।

স্থানীয় দোকানদার ইমতিয়াজ লোন বলেন, সে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মারা যায়নি। সে মারা গেছে এমন একটি উদ্দেশ্যে, যা মানুষের হৃদয়ে লেখা থাকে। যখন সন্ত্রাসীরা আমাদের ধর্মের নামে ভাগ করতে চেয়েছিল, তখন একজন মুসলিম নিজের জীবন দিয়ে অমুসলিমদের রক্ষা করেছিল। এটাই কাশ্মীর, এটাই আমাদের সত্যিকারের পরিচয়।

তিনি আরও বলেন, যখন সন্ত্রাসীরা বিভাজনের বুলেট নিয়ে এসেছিল, তখন আদিল ভালোবাসা নিয়ে সামনে দাঁড়িয়েছিল। সে শুধু জীবন বাঁচায়নি, আমাদের বিবেকও রক্ষা করেছে।

এই করুণ ঘটনার মধ্যেও আদিল একটি চিরন্তন সত্য মনে করিয়ে দিলেন—মানবতা ঘৃণার চেয়ে শক্তিশালী, আর ভালোবাসা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

সৈয়দ আদিল হুসেন শাহ এখন শুধুই একজন শহীদ নন—তিনি কাশ্মীরি সাহসিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার এক অনন্য প্রতীক।

সূত্র: দ্য ওয়ার 

আদিলের আত্মত্যাগ স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের একইসঙ্গে শোকাহত ও গর্বিত করেছে। ছবি : সংগৃহীত
আদিলের আত্মত্যাগ স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের একইসঙ্গে শোকাহত ও গর্বিত করেছে। ছবি : সংগৃহীত

কাশ্মীর নিয়ে টানটান উত্তেজনা, যুদ্ধের পথে ভারত ও পাকিস্তান?

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের পর্যটননগরী পাহেলগামে ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনায় ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে উপমহাদেশে।

মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) স্থানীয় সময় তিনটার দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও অনেকে। হামলায় নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন ভ্রমণকারী পর্যটক, যাদের মধ্যে একজন বিদেশিও রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এই হামলাকে ২০১৯ সালের পর কাশ্মীরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা পাহেলগামের জনপ্রিয় এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালায়।

হামলার দায় স্বীকার করেছে ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ নামের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী। তাদের দাবি, কাশ্মীরে ৮৫ হাজার বহিরাগতের ‘অবৈধ বসতি’ প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

ভারতের পুলিশ এ ঘটনার জন্য ‘ভারতীয় শাসন-বিরোধী সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করছে। দেশটির সাবেক সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সরাসরি পাকিস্তানের দিকে আঙুল তুলেছেন। তাদের দাবি, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মদদেই এই হামলা সংগঠিত হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিক্রিয়া জরুরি।

এ ধরনের উত্তেজনা নতুন নয়। ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলায় ৪০ জন ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তানে বিমান হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে পাকিস্তানও বিমান হামলা করে এবং একটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। সেই সময়কার উত্তেজনাও সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

কাশ্মীরে স্বায়ত্তশাসন বাতিলের পর কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আনা হয় অঞ্চলটিকে। এতে করে বহিরাগতদের জমি কেনা ও চাকরি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়, পর্যটন খাতে আসে নতুন গতি। তবে এতে চরমভাবে খারাপ হয় ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনীরের কাশ্মীর নিয়ে দেওয়া বক্তব্য এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিদেশ সফরের সময় হামলা চালানো—এ সবই ‘আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়ার কৌশল’ হতে পারে।

ভারতের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। জনমনে ক্ষোভ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কিছুদিনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া হিন্দু তীর্থযাত্রাকে সামনে রেখে কাশ্মীরে আরও হামলার শঙ্কা করা হচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্ট এর মতে, কাশ্মীরকে ঘিরে আবারও সংঘাতের ছায়া ঘনাচ্ছে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ বাড়তে থাকায় দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শান্তি আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি যুদ্ধের দিকেও মোড় নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।

সাম্প্রতিক হামলা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এক বিস্ফোরক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ—যার পেছনে আছে ইতিহাস, ভূরাজনীতি, এবং দুই দেশের জাতীয়তাবাদী আবেগ।

ভারত-পাকিস্তানের শান্তি আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি যুদ্ধের দিকেও মোড় নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। ছবি : সংগৃহীত
ভারত-পাকিস্তানের শান্তি আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি যুদ্ধের দিকেও মোড় নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। ছবি : সংগৃহীত



পারভেজ হত্যা : দুই তরুণীকে খুঁজে বের করতে বললেন বিচারক

রাজধানীর বনানীতে প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম পারভেজকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত দুই তরুণীকে খুঁজে বের করতে বলেছেন আদালত। বুধবার (২৩ এপ্রিল) এ মামলায় গ্রেপ্তার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বনানী থানার যুগ্ম সদস্য সচিব হৃদয় মিয়াজীর রিমান্ড শুনানির সময় এ আদেশ দেন ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো. ছানাউল্যাহ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এ এস এম মাঈন উদ্দিন আদালতে হৃদয়কে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চান। আদালত তার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিন রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগরের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি বলেন, ‘জাহিদুল ইসলাম পারভেজ হত্যা মামলায় এর আগে এজাহারনামীয় তিনজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ আসামি এজাহারনামীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিডিও ফুটেজ ও সিসি ক্যামেরা দেখেই এ মামলার সঙ্গে আসামির সংশ্লিষ্টতার কথা জানা যায়। পরে তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ নৃশংস হত্যার পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে বা অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেটা জানার জন্য আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।’

তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী তাসলিমা মিনু রিমান্ডের বিরোধিতা করে শুনানিতে বলেন, ‘হৃদয় ফার্মাসি ডিপার্টমেন্টের, এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা অন্য ডিপার্টমেন্টের। এ হত্যার সঙ্গে আমার মক্কেলের কোনো সম্পর্ক নেই। পারভেজ তার ডিপার্টমেন্টের কেউ না। মেয়েদেরও তিনি চেনেন না।'

পরে বিচারক মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাস করেন, ‘মেয়েরা কোথায়? তাদের ধরেননি কেন?’

জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এ মামলায় মেয়েদের সন্দেহ করার মতো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাইনি। সিসি ক্যামেরায় তাদের দেখা যায়নি। আবু জর পিয়াস নামে একটা ছেলে সবকিছু অর্গানাইজ করেছে। আমরা তাকে খুঁজছি।’

এরপর বিচারক বলেন, ‘মামলার সঙ্গে মেয়েদের সংশ্লিষ্টতা আছে। তারা স্পটে ছিল, মেয়েগুলোর ভূমিকা ছিল। তাদের খুঁজে বের করুন।’

এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, ‘এ মামলার আসামি কে কে, সেটা এজাহারে স্পষ্ট বলা আছে। এক, দুই ও তিন নম্বর আসামি কে, তারা কী ভূমিকা রেখেছে, সেটাও দেওয়া হয়েছে। তাদের ধরা হয়েছে। রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত সিসি ক্যামেরায় তার (হৃদয় মিয়াজীর) কোনো ভূমিকার কথা বলা নেই। রাজনৈতিকভাবে তাকে এ মামলায় জড়িত করা হয়েছে। তাকে রিমান্ড না দিয়ে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিন।’

শুনানি শেষে আদালত সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে হৃদয় মিয়াজীকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।

এর আগে গত ১৯ এপ্রিল বিকালে রাজধানীর বনানীতে প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে বিবাদের জেরে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২২৩ ব্যাচের ছাত্র জাহিদুল ইসলাম পারভেজকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসের পাশে একটি দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে সিঙাড়া খাচ্ছিলেন পারভেজ। তাদের পাশে সদ্য ভর্তি হওয়া ইংরেজি ও ইন্টারন্যাশনাল হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের বন্ধু ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্সের দুই ছাত্রী ছিলেন। একপর্যায়ে দুই ছাত্রী অভিযোগ করেন পারভেজ তাদের উত্ত্যক্ত করেছেন। তারা বিষয়টি প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির প্রক্টরকে জানান।

এরপর প্রক্টর পারভেজকে ডেকে নেন তার অফিসে। সেখানে পারভেজ দাবি করেন, তিনি বন্ধুদের সঙ্গে নিজেদের আলাপের বিষয় নিয়ে হাসাহাসি করছিলেন, কাউকে উত্ত্যক্ত করেননি। একপর্যায়ে ওই দুই ছাত্রীর কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হলে পারভেজ ক্ষমাও চান।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, সেখানেই ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা পারভেজকে হুমকি দেন। প্রক্টরের অফিস থেকে বেরিয়ে আসার পর কিছু বহিরাগত এসে আক্রমণ করেন। একপর্যায়ে ধারালো কিছু দিয়ে পারভেজের বুকে আঘাত করে তারা পালিয়ে যান।

পরে আহত ও রক্তাক্ত পারভেজকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে পারভেজের আগেই মৃত্যু হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক।

এ ঘটনায় নিহতের মামাতো ভাই হুমায়ুন কবীরের করা মামলায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের দুই নেতাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া নাম না দিয়ে আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়।

নিহত শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম পারভেজ। ছবি : সংগৃহীত

কাশ্মীর: যে হামলা অনেক কিছু বদলে দিতে পারে -আল–জাজিরার বিশ্লেষণ

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নয়নাভিরাম পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র পেহেলগামে মঙ্গলবার সন্দেহভাজন বিদ্রোহীরা অন্তত ২৬ জন পর্যটককে হত্যা করেছেন।

গত ২৫ বছরে এটি কাশ্মীরে ঘটা সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা, যা কিনা ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও খারাপ দিকে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

হামলাটি ঘটেছে কাশ্মীরের দক্ষিণ অনন্তনাগ জেলায়। হামলার সময় পুরো অঞ্চলটি পর্যটকে ভরপুর ছিল।

যদিও গত তিন দশক ধরে কাশ্মীর বিদ্রোহ ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবু প্রতিবছরের মতো এবারও লাখ লাখ পর্যটক এখানে ছুটি কাটাতে এসেছেন।

হামলার পরপরই পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে এবং হামলাকারীদের ধরতে অভিযান শুরু করে।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সেখানে উড়ে যান।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সৌদি আরব সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন এবং আজ বুধবার সকালে এই হামলার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, তা ঠিক করতে জরুরি বৈঠক করেন।

ঘটনাটি এমন সময়েই ঘটেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারতে সফরে আছেন। তিনি সোমবার এসেছেন এবং বৃহস্পতিবার (আগামীকাল) তাঁর ফিরে যাওয়ার কথা।

এই হামলায় কী কী ঘটেছে, কারা হতাহত হয়েছেন, কারা এর পেছনে আছে, কেন এই হামলা হলো, এর পটভূমি কী এবং এর ফলে কাশ্মীর ও গোটা অঞ্চলের জন্য কী বার্তা বহন করছে—সব বিষয় নিয়েই এখন বিশ্লেষণ চলছে।

ভারত কীভাবে এই ঘটনার জবাব দেবে, তা নিয়েও অনেক আলোচনা চলছে।

ঘটনা যেভাবে ঘটল

কাশ্মীরি ভাষায় ‘পেহেলগাম’-এর অর্থ ‘মেষপালকদের উপত্যকা’। এটি কাশ্মীরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন এলাকাগুলোর একটি। এলাকাটি রাজধানী শ্রীনগর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আল–জাজিরাকে জানান, মঙ্গলবার দুপুরে ওই এলাকায় অনেক পর্যটক ভিড় করেছিলেন।

বেলা পৌনের তিনটার দিকে একটি জঙ্গল থেকে ছদ্মবেশী পোশাক পরা কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি বেরিয়ে আসে।

নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, হামলাকারীরা বাইসারান নামের একটি পাহাড়ি খোলা এলাকায় হঠাৎ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।

এই জায়গায় পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ায় চড়ে যাওয়া যায়। তিনি বলেন, এ সময় অনেক পর্যটক গুলির শব্দে হতভম্ব হয়ে পড়েন।

মহারাষ্ট্রের নাগপুর থেকে আসা পর্যটক সিমরন চাঁদনি বলেন, তিনি যে বেঁচে ফিরতে পারবেন, তা ভাবতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা সবে চা আর নুডলস খেয়ে রওনা হচ্ছিলাম, ঠিক তখনই হামলা শুরু হয়।’ পেহেলগামকে তিনি ‘ছোট সুইজারল্যান্ড’ বলেও উল্লেখ করেন।

সিমরন চাঁদনি বলেন, ‘এরপর সবকিছু বদলে যায়। দেখি, অনেক মানুষ নিচে নেমে আসছেন। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো গ্যাসবেলুন ফেটেছে। সবাই একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিচ্ছিলেন। এরপর কেউ একজন জানান, হামলা হয়েছে।’

তিনি জানান, হামলাকারীরা মূলত পুরুষদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছিল। চাঁদানি বলেন, ‘আমি তখন ভগবানের নাম নিয়ে দৌড়াচ্ছিলাম।’

হতাহত সম্পর্কে কী জানা গেছে

এই হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকেই আহত হয়েছেন।
নিহত ব্যক্তিদের সবাই ওই এলাকায় বেড়াতে যাওয়া সাধারণ নাগরিক।

তাঁদের মধ্যে নববিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে হানিমুনে যাওয়া হরিয়ানার একজন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাও আছেন।

এ ছাড়া মারা গেছেন অন্ধ্র প্রদেশের পাণ্ডুরঙ্গপুরম এলাকার ৬৮ বছর বয়সী এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছিলেন।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আরও আছেন কর্ণাটকের এক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, ওডিশার এক হিসাবরক্ষক, উত্তর প্রদেশের একজন সিমেন্ট ব্যবসায়ী এবং কেরালার এক বিদেশফেরত নাগরিক। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন বিদেশিও ছিলেন। তিনি নেপালের নাগরিক।

এই হামলার দায় কি কেউ স্বীকার করেছে?

‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) নামের একটি গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। ধারণা করা হয়, গোষ্ঠীটি পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবার শাখা।

টিআরএফ এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, কাশ্মীরে ভারত সরকার বাইরের রাজ্যের হাজার হাজার বাসিন্দাকে যে পারমিট দিচ্ছে, তার প্রতিবাদে এই হামলা চালানো হয়েছে।

এসব পারমিট ভারতীয় নাগরিকদের কাশ্মীরে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি দেয়। তবে আল–জাজিরা স্বাধীনভাবে এই বিবৃতির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

ভারত সরকার ২০১৯ সালে কাশ্মীরের আধা স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করে এবং অঞ্চলটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে দেয়।

এই সিদ্ধান্তের ফলে কাশ্মীরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে যায় এবং সরকারের পক্ষ থেকে অ-কাশ্মীরিদের বসবাসের অনুমতি দেওয়ার পথ খুলে যায়, যা কিনা আগে নিষিদ্ধ ছিল।

ভারতীয় কর্মকর্তারা আল–জাজিরাকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁরা সন্দেহ করছেন, হামলায় চারজন অংশ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন পাকিস্তান থেকে এসেছেন এবং বাকি দুজন ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বাসিন্দা।

এর আগে কি কখনো পর্যটকদের ওপর এমন হামলা হয়েছিল?

কাশ্মীরে বহু বছর ধরে সংঘাত চললেও সরাসরি পর্যটকদের ওপর হামলা খুব কমই হয়েছে।

১৯৯৫ সালে পেহেলগামে আল-ফারান নামের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ছয়জন বিদেশি পর্যটককে অপহরণ করেছিল।

তাঁদের মধ্যে একজনকে হত্যা করা হয়, একজন পালিয়ে যান এবং বাকি চারজনের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

২০০০ সালে পেহেলগামের নুনওয়ান এলাকায় এক হামলায় ৩২ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ২১ জন ছিলেন হিন্দু তীর্থযাত্রী।

এর এক বছর পর, একই এলাকায় শেশনাগ হ্রদের কাছে আরেক হামলায় ১৩ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন ছিলেন তীর্থযাত্রী, বাকি দুজন স্থানীয় বাসিন্দা।

২০১৭ সালে অনন্তনাগ জেলায় এক গুলির ঘটনায় ৮ জন হিন্দু তীর্থযাত্রী নিহত হন।

গত বছরের জুন মাসে জম্মুর দক্ষিণাংশের কাঠুয়ায় এক তীর্থযাত্রীবাহী বাসে হামলা হলে সেটি খাদে পড়ে যায় এবং ৮ জন তীর্থযাত্রী নিহত হন।

কিন্তু এবারের, অর্থাৎ মঙ্গলবারের হামলাটি সম্ভবত ২০০০ সালের নুনওয়ানের হামলার পর থেকে পর্যটকদের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।

সামগ্রিকভাবে কাশ্মীরে ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য পরিষদের বাইরে বোমা হামলায় ৩৫ জন নিহত হওয়ার পর এমন ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা আর দেখা যায়নি।

এই হামলার ধরন ও ভয়াবহতা বেঁচে যাওয়া মানুষ ও স্থানীয় রাজনীতিকদের হতবাক করে দিয়েছে।

গুজরাটের ৬৫ বছর বয়সী পর্যটক বিনু বাই গুলিবিদ্ধ হয়ে অনন্তনাগ জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা পেহেলগামে গিয়েছিলাম, আমি তখন মাঠে চেয়ার বসে ছিলাম।

হঠাৎ তিনটা গুলির শব্দ শুনলাম। মুহূর্তেই চারদিকে হুড়োহুড়ি লেগে যায়। সবাই দৌড়াতে শুরু করে। তখনই একটি গুলি আমার হাতে এসে লাগে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, কাশ্মীর এখন শান্তিপূর্ণ। ভাবতেই পারিনি এমন কিছু হবে।’

স্থানীয় বিরোধী দলের সঙ্গে যুক্ত তরুণ রাজনীতিক ইলতিজা মুফতি বলেন, পেহেলগামে সাধারণত ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী টহল দেয়।

এমন একটি জায়গায়, বিশেষ করে বাইসারানে এ ধরনের হামলা হওয়া খুবই অবাক করার মতো। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সমাজে এ ধরনের হামলার কোনো জায়গা নেই।’

ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?

কাশ্মীরের এই ভয়াবহ হামলার পর দেশের পক্ষ থেকে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, তা ঠিক করতে বুধবার ভারতের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সৌদি আরব সফরে জেদ্দায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে নৈশভোজের কথা ছিল। কিন্তু তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত ভারতে ফিরে আসেন।

মোদি এক টুইটে লেখেন, ‘জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা করছি। যাঁরা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার সমবেদনা। আহত ব্যক্তিরা যেন দ্রুত সুস্থ হন, সেই প্রার্থনা করছি। ক্ষতিগ্রস্তদের সব ধরনের সাহায্য দেওয়া হচ্ছে। যারা এই নৃশংস হামলার পেছনে আছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে…কাউকে ছাড়া হবে না!’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও দ্রুত শ্রীনগরে পৌঁছান এবং সেখানকার শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এদিকে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, কাশ্মীর থেকে ২০১৯ সালে বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর যে ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’র দাবি করা হচ্ছে, তা বাস্তবে ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছু নয়।

রাহুল গান্ধী বলেন, ‘গোটা দেশ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু কাশ্মীরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক—এমন খালি দাবি না করে সরকারকে এখন দায়িত্ব নিতে হবে এবং এমন নৃশংস ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সেই জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে নিরীহ ভারতীয়দের আর প্রাণ হারাতে না হয়।’

ভারত কি পাকিস্তানে হামলা চালাবে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নৃশংস হামলার জবাবে ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা থাকতে পারে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর ল্যান্ড ওয়ারফেয়ার স্টাডিজ’-এর (ক্লস) পরিচালক তারা কার্থা বলেন, ‘এটি একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা। আমরা একে সেভাবেই দেখছি। এটা এমন এক সময় ঘটল, যখন কিছুদিন আগেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান একটি বিতর্কিত ভাষণ দিয়েছিলেন।’

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সচিবালয়ে একসময় দায়িত্ব পালন করে আসা তারা কার্থা পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ১৬ এপ্রিল দেওয়া এক বক্তব্যের কথা বলছিলেন।

তিনি উল্লেখ করেন, ওই বক্তব্যে আসিম মুনির ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের অনুঘটক দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি আবারও সমর্থন জানিয়েছেন এবং মুসলমানদের ‘হিন্দুদের থেকে আলাদা পরিচয়’–এর কথা জোর দিয়ে বলেন।

তারা কার্থার মতে, পেহেলগামে যা ঘটেছে, তা মুনিরের ওই বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের ধারার সঙ্গে মিলে যায়। তিনি বলেন, ‘শুধু পাকিস্তান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই হামলার কঠোর নিন্দা করে এবং জঙ্গিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলেই একটি বড় ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব হতে পারে।’

পাকিস্তান সরকার বুধবার ভোরে এই বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে।

তাতে বলা হয়, ‘ভারত অধিকৃত অবৈধ জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলায় পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের প্রতি আমরা সমবেদনা জানাই এবং আহত ব্যক্তিদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।’

ভারত ও পাকিস্তান—উভয়েই পুরো কাশ্মীরকে নিজেদের দাবি করে এবং উভয় দেশ কাশ্মীরের একটি করে অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

পাকিস্তানের এই বিবৃতি ভারতের জনমনে সৃষ্ট ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, সরকার এখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দেশবাসীর চাপের মুখে রয়েছে।

কেউ কেউ হঠাৎ করে উত্তেজিত প্রতিক্রিয়ার দেখানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছেন।

দিল্লিভিত্তিক অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাবা নকভি বলেন, ভারতের তুলনায় পাকিস্তান অনেক বেশি অস্থিতিশীল। তাই ভারতের প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ভাবনাচিন্তাপূর্ণ ও স্থির।

সাবা নকভি বলেন, ‘ভারতের ক্ষেত্রে অনেকেই ভাবেন, বিজেপি সরকার হয়তো বিমান থেকে বোমা ফেলবে, আর তাহলেই সব প্রতিশোধ নেওয়া হয়ে যাবে। কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়।’

কাশ্মীরের জন্য এই হামলার অর্থ কী?

কাশ্মীরের রাজনীতিক ও নাগরিক সমাজের নেতারা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এমন ধরনের হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কাশ্মীরের সাধারণ মানুষেরই।

বিরোধী দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) তরুণ বিধায়ক ওহিদ উর রহমান পাড়া আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এটি সন্ত্রাসী হামলা। আমি এটাকে অন্যভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারছি না। যারা এই কাজ করেছে, তারা কাশ্মীরিদের, আমাদের অর্থনীতিকে এবং গত কয়েক মাসে ফিরে আসা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করতে চায়।’

কাশ্মীরের অর্থনীতিতে পর্যটনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি অঞ্চলটির মোট জিডিপির প্রায় ৭ শতাংশ যোগ করে।

এ ছাড়া পর্যটকের ভিড়কে ভারতের শাসকদল বিজেপি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও ব্যবহার করে—তারা বলে, কাশ্মীরে শান্তি ফিরে এসেছে।

বাস্তবতা হলো, পেহেলগামে হামলার আগেও কাশ্মীরের পরিস্থিতি একেবারে স্বাভাবিক ছিল না।

২০১৯ সালে ভারতের সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পর থেকে রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে।

হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এমন কিছু আইন দিয়ে, যেগুলোর আওতায় কাউকে বিচারের আগেই দীর্ঘদিন আটক রাখা যায়।

গত বছরের অক্টোবরে প্রায় এক দশক পর কাশ্মীরে আবার স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত এক প্রশাসক নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়। সেই নির্বাচনে স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয় প্রাদেশিক রাজনীতিক ওমর আবদুল্লাহ বড় জয় পান।

তবে তিনি প্রকৃতপক্ষে খুব সীমিত ক্ষমতা পান। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার মনোনীত লেফটেন্যান্ট গভর্নর অনেক বড় বড় সিদ্ধান্তের ক্ষমতা নিজের হাতে রেখেছেন।

তবুও পেহেলগামে হামলার পর কাশ্মীরের হোটেল ব্যবসায়ী ও ট্যুর অপারেটররা পর্যটকদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন এবং হামলাকারীদের নিন্দা করেছেন।

পেহেলগামের হোটেল ব্যবসায়ী ও হোটেলমালিকদের সংগঠনের সাবেক সভাপতি আবদুল ওয়াহিদ মালিক বলেন, ‘এই হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এই মুহূর্তে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মানুষের প্রাণহানি। এখন আমাদের মূল চিন্তা পর্যটন নয়।’

মঙ্গলবারের হামলার পর রামবান এলাকায় ভূমিধসের কারণে কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে জম্মুর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে আতঙ্কগ্রস্ত পর্যটকেরা এলাকায় আটকে পড়েছেন, বিমান ভাড়াও অনেক বেড়ে গেছে।

এই অবস্থায় ওয়াহিদ মালিক জানতে পারেন, একটি পর্যটক পরিবার আটকে পড়েছে। তিনি তাঁদের জন্য নিজের হোটেলে চারটি কক্ষের ব্যবস্থা করেন।

ওয়াহিদ মালিক বলেন, ‘তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। এই হামলা আমাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে।’

কাশ্মীরের পর্যটন ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বুধবার বিক্ষোভ ও স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালন করে। অনেক সাধারণ বাসিন্দাও হামলার ঘটনায় গভীরভাবে শোকাহত।

শ্রীনগরের ৩১ বছর বয়সী বাসিন্দা নাদিয়া ফারুক বলেন, ‘কাশ্মীর মানুষ সাধারণত অতিথিপরায়ণ ও আন্তরিক—এই পরিচয়েই পরিচিত। এত প্রাণহানির ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। আমরা শান্তি চাই, রক্তপাতের শেষ চাই। আমরা শোকাচ্ছন্ন।’

আল জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

সন্ত্রাসী হামলায় নিহত আদিল হুসাইন শাহের জানাজার নামাজ পড়ানো হচ্ছে। ২৩ এপ্রিল দক্ষিণ কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার হাপতনার গ্রামে এই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
সন্ত্রাসী হামলায় নিহত আদিল হুসাইন শাহের জানাজার নামাজ পড়ানো হচ্ছে। ২৩ এপ্রিল দক্ষিণ কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার হাপতনার গ্রামে এই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: রয়টার্স

রম্যকথন: আওয়াম থেকে আম, আ–আমের দলবাজি by সারফুদ্দিন আহমেদ

নামে কী যায় আসে—সব জায়গায় এই কথা চলে না। রাজনীতিতে তো চলেই না। রাজনীতিতে নামে যায় আসে। কারণ ‘নামের আমি নামের তুমি নাম দিয়ে যায় চেনা’। রাজনীতিতে নামের যে কত দাম, তা আমের মৌসুম শুরুর আগেই ‘আম’ নিয়ে ‘আমজনতার দল’ আর ‘আ-আমজনতা পার্টি’র ঝগড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে।

নুরুল হকের ‘গণ অধিকার পরিষদ’ থেকে বেরিয়ে মিয়া মশিউজ্জামান আর মো. তারেক রহমান যে নতুন পার্টি খুলেছেন, তার নাম ‘আমজনতার দল’। এর মধ্যে টাকা পাচার আর ট্রি প্লান্টেশন দুর্নীতি মামলায় জেলে খেটে বের হওয়া ডেসটিনি গ্রুপের এমডি মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ‘আমজনতা’র আগে ‘আ’ জুড়ে দিয়ে ‘বাংলাদেশ আ-আম জনতা পার্টি’ খুলেছেন।

এতে ‘অরিজিনাল’ আমজনতা পার্টি ডার্টি পলিটিকসের গন্ধ পেয়ে নির্বাচন কমিশনের সালিসে নালিশ করেছে। তারা বলছে, ‘আম’ আর ‘আ-আম’ লিখলে আলাদা দেখায়, কিন্তু বললে শোনায় একই রকম। সুতরাং রফিকুল আমীনের দলকে যেন এই নামে নিবন্ধন দেওয়া না হয়। তাদের দাবি, যেহেতু তারা ‘আমজনতার দল’ নামটি আগেই ছালাবন্দী করেছে, সেহেতু আম এবং ছালা দুটোই তাদের।

৫ আগস্টের ঝড়ে যেহেতু বহু বক পড়েছে, সেহেতু কিছু ফকিরের কেরামতি বাড়ারই কথা। অভ্যুত্থানের ঝড়ের তোড়ে আদি ও আসল ‘আম’ ওরফে ‘আওয়াম’ ওরফে ‘আওয়ামী’ বৃক্ষ উড়ে গেছে। সেই বৃক্ষের ছায়াপুষ্ট গাছপালারও ডালপালা ভেঙেছে। কিন্তু মাটির সাথে ঘাপটি মারা ঘাসপাতার কিছু হয়নি।

৫ আগস্টের ঝড়ে শুধু বাতাস ছিল না; বৃষ্টিও ছিল। সেই বৃষ্টিতে দেড় যুগের খরাপীড়িত রাজনীতির খটখটে মাঠে জো এসেছে। ভেজা মাঠে এখন রাজনৈতিক দলরূপী নতুন নতুন ঘাসপাতা ও গাছগাছড়া গজাতে শুরু করেছে।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন শর্ত সহজ করার সুপারিশ করেছে। ইসি হয়তো ‘শত ফুল ফুটতে দাও’ নীতির পথে হাঁটতে চায়। আর তাই দেখে নতুন নতুন ফুল গাছের চারা মাথা উঁচু করছে। তবে চারাগুলোর নামের মধ্যেই যে ভাব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, এসব ফুলের মধ্যে ধুতরা-আকন্দের বাড়বাড়ন্ত বেশি। চামেলি, গোলাপের আলাপ প্রলাপের মতো মনে হচ্ছে।

এখন ইসিতে নিবন্ধিত দল আছে ৫০টি। ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ৬৫টি দল নিবন্ধন পাওয়ার আরজি জানিয়েছে। এর বাইরে আরও ৪৬টি দল নিবন্ধনের আবেদন জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। মানে, দেড় শতাধিক দল আমজনতার সেবায় দাঁড়িয়েছে। আর এই দলগুলোর ৯৯ শতাংশের মোটের ওপর যা আছে, তা হলো একটি নাম। নামসর্বস্ব এই দলগুলোর নেতা কারা, কেন তঁারা রাজনীতিতে আসতে চান, সে এক বিরাট প্রশ্ন।

নিবন্ধিত হতে চাওয়া একটি দলের নাম দেখা যাচ্ছে ‘বাংলাদেশ সংসারবন্দি পার্টি’। রাজনীতির সংসারে এই ধরনের ‘সঙ’-সারসম্পন্ন পলিটিক্যাল পার্টির নাম শুনতে হবে, তা কে কবে ভেবেছে? একইভাবে নিবন্ধন চেয়েছে ‘বাংলাদেশ শান্তির দল’, ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন’, ‘জাতীয় ভূমিহীন পার্টি’, ‘বাংলাদেশ বেকার সমাজ’, ‘বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি’, ‘জনতার কথা বলে’।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার দাবি যখন কোনো কোনো মহল থেকে তোলা হচ্ছে, সেই সময়ে ‘আওয়ামী লিগ’ নামে নিবন্ধন চেয়ে উজ্জ্বল রায় নামের এক লোক আবেদন করে বসেছেন। তবে সে নামটি শেষ পর্যন্ত তালিকায় রাখা হয়নি। এর বাইরে বাংলাদেশ সংরক্ষণশীল দল (বিসিপি), জনতা কংগ্রেস দল, বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণময় পার্টি, বাংলাদেশ মুক্তি ঐক্যদল, বাংলাদেশ জনশক্তি পার্টি—এ ধরনের বহু বাহারি নামের দল আছে।

নিবন্ধন চাওয়া কোনো কোনো দলের নেতা সম্ভবত পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে যাত্রা পার্টির মিল পেয়েছেন। তাঁরা হয়তো ভেবেছেন, একটা পলিটিক্যাল পার্টি মানে একটা দল; একটা যাত্রা পার্টি মানেও একটা দল। দুই কিসিমের দলেই নানান কিসিমের জনবল থাকে।

যাত্রা পার্টিতে একজন অধিকারী থাকেন। তিনিই কলাকৌশল করে দল চালান। যাত্রা পার্টির কুশীলবদের অভিনয় করতে হয়। পলিটিক্যাল পার্টিতেও একজন বড় নেতা থাকেন। তঁার নিচে মেজ-সেজ-নেতা থাকেন। তাঁদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিনয় করে পাবলিকের মন জয় করতে হয়। অ্যাকটিংয়ের পাশাপাশি পিকেটিং করতে হয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, যে পার্টিতে নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, সে পার্টির সঙ্গে কি যাত্রা পার্টির তুলনা চলে?  

ডেসটিনির রফিকুল সাহেব বিবিসি বাংলাকে সরল সোজা মনে বলেছেন, তিনি জেলখানায় ছিলেন। ৫ আগস্টের পর দেখলেন, জেলখানা থেকে অনেক রাজনীতিককে বিনা জামিনে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জেলারকে বললেন, ‘আমি তো বহুদিন জেলে, আমাকে ছাড়েন না কেন?’ জেলার তখন তাঁকে বললেন, ‘আপনি তো রাজনীতিক না, আপনি যদি রাজনীতিক হতেন, তাহলে ছেড়ে দিতাম। আপনি যদি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের লোক হতেন, তাহলেও ছেড়ে দিতাম।’

জেলারের এই বাণীই কি রফিকুল আমীন সাহেবকে রাজনৈতিক দল খুলতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে? রফিকুলের মতো অনেকেই জানেন, একটি রাজনৈতিক দল মানে একটি ঢাল। সে নামসর্বস্ব হোক আর কামসর্বস্ব হোক।

নিবন্ধন দেওয়ার সময় ইসিকে এই সত্য বুঝতে হবে।

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক

sarfuddin2003@gmail.com

আওয়াম থেকে আম, আ–আমের দলবাজি

২০ বছর ধরে অচেতন সৌদি আরবের এই যুবরাজ, ৩৬তম জন্মদিনও কাটল হাসপাতালের বিছানায় by সুরাইয়া সরওয়ার

দুষ্টু পরি ম্যালিফিসেন্টের অভিশাপে ১০০ বছর ঘুমিয়েছিল রূপকথার রাজকুমারী অরোরা। তবে শুধু ‘স্লিপিং প্রিন্সেস’–এর মতো রূপকথায় নয়, বাস্তবেও প্রায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ঘুমিয়ে আছেন এক রাজকুমার। সৌদি আরবের এই রাজকুমার তাই পরিচিত ‘স্লিপিং প্রিন্স’ বা ঘুমন্ত রাজকুমার নামে।

২০০৫ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন সৌদি আরবের যুবরাজ আল-ওয়ালিদ বিন খালেদ বিন তালাল। সে সময় লন্ডনের একটি সামরিক কলেজে পড়তেন তিনি। ওই দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে যুবরাজ কোমায় চলে যান। তখন থেকে আছেন কোমায়। যুবরাজকে নিয়ে তাঁর পরিবারের এই নিঃশব্দ যুদ্ধ চলছে টানা ২০ বছর ধরে। ১৮ এপ্রিল উদ্‌যাপিত হলো স্লিপিং প্রিন্সের ৩৬তম জন্মদিন। তখনো তিনি হাসপাতালের বিছানায় অসাড় হয়ে আছেন দেহে শুধু প্রাণ নিয়ে।  

যুবরাজ আল-ওয়ালিদের ফুপু প্রিন্সেস রিমা বিনতে তালাল। এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি শেয়ার করেছেন ভাতিজার ছোটবেলা ও বর্তমান সময়ের বেশ কিছু ছবি। ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘আমার প্রিয় আল-ওয়ালিদ, ২১ বছর ধরে তুমি আমাদের হৃদয়ে আছ। আল্লাহ তোমার আরোগ্য দিন, তিনিই জানেন তোমার দুর্বলতা। তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মালিক।’  
বিগত বছরগুলোয় যুবরাজের চিকিৎসায় যুক্ত হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনের খ্যাতনামা চিকিৎসকেরা। কিন্তু সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এখনো তাঁর জ্ঞান ফেরানো যায়নি। যুবরাজের বাবা প্রিন্স খালেদ বিন তালাল এখনো তাঁর আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘যদি আল্লাহ চাইতেন তার মৃত্যু হোক, তবে দুর্ঘটনার সময়ই সে মারা যেত। যে আল্লাহ তার প্রাণকে এত বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তিনিই তাকে সুস্থ করে তুলতে পারেন।’

২০১৯ সালে যুবরাজের সামান্য কিছু নড়াচড়া দেখা গিয়েছিল। তবে সেটুকু তিনি করেছিলেন অচেতন অবস্থাতেই। বর্তমানে আল–ওয়ালিদ চিকিৎসাধীন আছেন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং আবদুল আজিজ মেডিকেল সিটিতে। সেখানে একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা দল তাঁর সেবাযত্নে নিয়োজিত। চিকিৎসকেরা মনে করছেন, এত দীর্ঘ সময় কোমায় থাকার পর সেরে ওঠার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এরপরও অনেকে আশা করেন, ভবিষ্যতের কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি হয়তো যুবরাজের এই ঘুম ভাঙাতে পারবে।

সূত্র: দ্য সিয়াসাত ডেইলি

হাসপাতালে ‘স্লিপিং প্রিন্স’ হিসেবে পরিচিত যুবরাজ ও তাঁর বাবা
হাসপাতালে ‘স্লিপিং প্রিন্স’ হিসেবে পরিচিত যুবরাজ ও তাঁর বাবা। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

বিভিন্ন সময়ে যুবরাজ
বিভিন্ন সময়ে যুবরাজ। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর হামলা: সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতসহ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৫ পদক্ষেপ নিল ভারত

কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচটি পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত। আজ বুধবার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। পরে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি সিদ্ধান্তগুলো সাংবাদিকদের জানান।

বিক্রম মিশ্রি জানান, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি আপাতত স্থগিত করা হচ্ছে। এ ব্যবস্থা অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বহাল থাকবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে যে পরিমাণ পানি পাকিস্তানের পাওয়ার কথা, চুক্তি স্থগিত করায় আপাতত তা ব্যাহত হবে। অর্থাৎ চুক্তি অনুযায়ী পানি পাকিস্তান পাবে না।

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিতে সই করেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। এ চুক্তির আওতায় সিন্ধু, চন্দ্রভাগা, শতদ্রু, ঝিলাম, ইরাবতী ও বিপাশা নদীর পানি পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়। এই গ্রীষ্মকালে চুক্তিটি স্থগিত করার অর্থ চুক্তি অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পাকিস্তান পাবে না।

নয়াদিল্লির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো আটারি-ওয়াঘা সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া। বুধবার থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থলসীমান্ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ওই সীমান্ত দিয়ে যাঁরা ভারতে এসেছেন, তাঁদের সবাইকে ১ মের মধ্যে ফিরে যেতে হবে।

তৃতীয় সিদ্ধান্ত হলো দিল্লিতে পাকিস্তানের হাইকমিশনে নিযুক্ত সব সামরিক উপদেষ্টাকে বহিষ্কার। তাঁদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামাবাদে ভারতের হাই কমিশনে নিযুক্ত ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনছে নয়াদিল্লি।

চতুর্থ সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, দুই দেশের হাইকমিশনগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তাদের সংখ্যা ৫৫ থেকে কমিয়ে ৩০ করা হবে।

পঞ্চম সিদ্ধান্ত হলো সীমান্তচৌকি বন্ধ ও দূতাবাসে কর্মীর সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি পাকিস্তানিদের ভারতে আসাও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সে কারণে সব পাকিস্তানির জন্য সার্ক ভিসা বাতিল করার কথা জানানো হয়েছে। এই ভিসায় যাঁরা ভারতে রয়েছেন, তাঁদের ফেরত যাওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির বৈঠকে পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনার দায় পুরোপুরি পাকিস্তানের ওপর চাপানো হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে পেহেলগাম শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে বৈসরণ উপত্যকায় পর্যটকদের ওপর ওই হামলা হয়। পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় এ উপত্যকাকে ‘ভারতের সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ভারত বলছে, গতকালের এ ঘটনা ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পর কাশ্মীরে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিতে সম্ভাব্য সবকিছু করার ঘোষণা দিয়েছে ভারত সরকার।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির বৈঠক হয়। আজ বুধবার নয়াদিল্লিতে
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির বৈঠক হয়। বুধবার নয়াদিল্লিতে ছবি: এএনআই

‘শান্তি অসম্ভব, যত দিন অস্ত্রের ঝনঝনানি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে’ by পোপ ফ্রান্সিস

পোপ ফ্রান্সিস দীর্ঘ অসুস্থতা শেষে গত ২১ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর এক দিন আগে এটি ছিল ইস্টার উপলক্ষে রোমের সেন্ট পিটার চত্বরে তাঁর দেওয়া শেষ বার্তা।

ভাই ও বোনেরা, বিশেষত যাঁরা ব্যথায় আর দুঃখে যাপন করছেন, তাঁদের নিঃশব্দ ক্রন্দন ঈশ্বরের কানে পৌঁছে গেছে, তাঁদের প্রতিটি অশ্রুর বিচার নেবেন তিনি। ঈশ্বরের তাদের একটিকেও ভুলে যাবেন না! যিশুর সেই দীর্ঘ পথ, রক্তমাখা, কণ্টকিত সেই মৃত্যু, সেই পথ ধরে ঈশ্বর তাঁর কাঁধে তুলে নিয়েছেন সব মন্দের ভার, আর নিজের দয়ার ভেতর দিয়ে তাকে পরাস্ত করেছেন। হেরে গেছে সেই অহংকার, যা মানুষের হৃদয়কে বিষাক্ত করে তোলে, যা ডানে–বাঁয়ে ছড়িয়ে দেয় বৈরিতা আর পঙ্কিলতা। সেই অহংকার হেরে গেছে, খোদার মেষশাবক (যিশু) জয়ী হয়েছেন! তাই আজ আমরা কণ্ঠ ছেড়ে বলি: ‘আমার আশার খ্রিষ্ট জেগে উঠেছেন!’ (ভিক্তিমে পাসকালি লাউদেস)

যিশুর এই পুনরুত্থান, এটাই আমাদের আশার ভিত্তি। এর আলোকে, আশা আর সামান্য ভেলকি থাকে না। যিশুর রহমে, ক্রুশবিদ্ধ যিশু, পুনরুত্থিত যিশুর রহমে, আশা আর আশাহত করে না! স্পেস নন কনফুন্দিত! (রোম ৫: ৫)। আশা আর পালানোর রাস্তা নয়, আশাই চ্যালেঞ্জ; আশা কোনো ধোঁয়াশা নয়, আশাবাদই আমাদের শক্তি।

যাঁরা ঈশ্বরের ওপর ভরসা রাখেন, তাঁরা তাঁদের নরম হাত নিশ্চিন্তে রেখেছেন এক মহাশক্তিশালী দৃঢ় হাতে। তাঁরা উঠে দাঁড়াবেন, তাঁরা আবার হাঁটবেন। পুনরুত্থিত যিশুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও হয়ে ওঠেন আশার তীর্থযাত্রী, ভালোবাসার আর জীবনের নিরস্ত্র শক্তির বিজয়গাথার সাক্ষী।

খ্রিষ্ট জেগে উঠেছেন! এই শব্দেই লুকানো আমাদের অস্তিত্বের মানে, কারণ আমরা মৃত্যুর জন্য গড়া নই, জীবন আমাদের অভীষ্ট। ইস্টার, এটা তো জীবনের উৎসব! ঈশ্বর আমাদের তৈরি করেছেন জীবনকে লক্ষ্য রেখে, তিনি চান যেন এই কোটি মানুষের পরিবার আবার উঠে দাঁড়ায়! তাঁর চোখে প্রতিটি জীবন মূল্যবান! গর্ভের শিশুটি যেমন, তেমনি মূল্যবান বৃদ্ধেরা বা অসুস্থরাও, যাদের আজ দেশে দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ উচ্ছিষ্ট মানুষ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মৃত্যু আর খুনের কত পিপাসা চারদিকে! প্রতিদিন যুদ্ধ আর লড়াইয়ের নামে পৃথিবীর দিকে দিকে আমরা প্রতিদিন শুধু খুনই প্রত্যক্ষ করি! পরিবারের ভেতরে পর্যন্ত, কত জিঘাংসা, নারী আর শিশু যার স্বীকার। যারা দুর্বল, যাদের চলন বা ভাষা আমাদের মতো নয়, আর যারা অভিবাসী, তাদের দিকে অবিরত ছুড়ে দেওয়া হয় তাচ্ছিল্য আর ঘৃণা।
এই দিনে, আমি চাই আমরা সবাই আবার আশা করতে শিখি, ফিরিয়ে আনি বিশ্বাস, অন্যের ওপর বিশ্বাস, নিজেদের ওপর বিশ্বাস, তাদের ওপর বিশ্বাস যারা আমাদের মতো নয়, বা যারা অন্য দেশ থেকে এসেছে, যারা সঙ্গে নিয়ে এসেছে ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন যাপন, আর ভিন্ন চিন্তা ধারণ ধরা! কারণ, সব ভিন্নতার ঊর্ধ্বে, আমরা সবাই এক স্রষ্টার সন্তান!

আমি চাই আমরা সবাই বিশ্বাস করি, শান্তি সম্ভব!
পবিত্র সমাধি থেকে, পুনরুত্থানের গির্জা থেকে, যেখানে এবার একই দিনে ক্যাথলিক আর অর্থোডক্সরা একত্রে ইস্টার পালন করছে, যেন আলো ছড়িয়ে পড়ে পুণ্যভূমি হয়ে গোটা পৃথিবীতে। আমি জানাতে চাই, আমিও ভাগীদার ফিলিস্তিন আর ইসরায়েলের খ্রিষ্টানদের কষ্টের এবং শুধু খ্রিষ্টান নয়, ফিলিস্তিন আর ইসরায়েলের সব মানুষেরও। এ সময়ে বাড়তে থাকা ইহুদিবিদ্বেষের হওয়া আমাকে ভাবায়। কিন্তু সেই সঙ্গে আমি ভাবি গাজার মানুষের কথা, বিশেষত সেখানকার খ্রিষ্টানদের কথা, যাঁদের চারদিকে তীব্র সংঘাত শুধু মৃত্যু আর ধ্বংস উৎপাদন করে চলেছে, জিইয়ে রেখেছে এক নাটকীয় আর নারকীয় অমানবিক পরিস্থিতি। আমি হাত জোড় করে বলি যুদ্ধংদেহী পক্ষদের কাছে, আপনারা যুদ্ধ থামান, বন্দীদের ফিরিয়ে দিন, আর এগিয়ে আসুন সেই ক্ষুধার্তদের পাশে, যারা শুধু একফোঁটা শান্তির স্বপ্ন দেখে।

আসুন, আমরা প্রার্থনা করি, লেবানন আর সিরিয়ার খ্রিষ্টান সম্প্রদায়দের জন্য, এ মুহূর্তে যাঁরা ইতিহাসের এক নাজুক মুহূর্তে বাস করছেন। তাঁরা চান একটু স্থিরতা, তাঁরা চান নিজেদের জাতির আর দেশের ভাগ্যে নিজেদের অংশগ্রহণ। আমি গির্জার প্রতিটি হিস্যাদারকে বলি, আপনার চিন্তা থেকে, আপনার প্রার্থনা থেকে, প্রিয় মধ্যপ্রাচ্যের খ্রিষ্টানরা কখনো যেন বাদ না পড়ে।

আমার মন পড়ে থাকে ইয়েমেনেও, যুদ্ধ যাদের জীবনকে পরিণত করেছে পৃথিবীর অন্যতম নিদারুণ ও প্রলম্বিত এক মানবেতর দুঃখের গল্পে। আমি আহ্বান জানাই, আসুন, আমরা কথা বলি, আমরা গঠনমূলক সংলাপের ভেতর দিয়ে এর সমাধান খুঁজি।
পুনরুত্থিত যিশু যেন ইউক্রেনকে, যে ইউক্রেন আজও যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সটান দাঁড়িয়ে, তাঁর ইস্টারের শান্তির উপহার দেন। যারা দীর্ঘস্থায়ী আর সুবিচারস্নাত শান্তির লক্ষ্যে কাজ করছে, তাদের প্রতি থাকুক যিশুর পক্ষ থেকে উৎসাহ আর অবিচল সমর্থন।

এই উৎসবের দিনে, আমাদের মনে সজাগ থাকুক দক্ষিণ ককেশাস। আমরা প্রার্থনা করি, আর্মেনিয়া আর আজারবাইজানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ একটি শান্তিচুক্তি শিগগিরই চিরকালের জন্য বাস্তবায়িত হোক, কাগজে স্বাক্ষরিত হোক, জীবনে জাগরূক হোক, আর দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে পূর্ণতা পাক মেলবন্ধনের বহুপ্রতীক্ষিত স্বপ্ন।

ইস্টারের আলো ছড়িয়ে পড়ুক পশ্চিম বলকানে, যাতে সৌহার্দ্য প্রাধান্য পায়, যাতে রাজনীতিকেরা কাঁধে কাঁধ রেখে কাজ করে যেতে পারেন, ভয় আর সংকটের পথে নয়, বরং স্থিতিশীল সহাবস্থানের পথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে সঙ্গে নিয়ে।

পুনরুত্থিত যিশু, যিনি আমাদের ভরসাস্থল, যেন শান্তি ও সান্ত্বনা নিয়ে আসেন আফ্রিকার মানুষদের জন্য, যারা নির্যাতনের আর সংঘাতের বলি হয়েই চলেছে, বিশেষ করে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, সুদান ও দক্ষিণ সুদানে। সে সঙ্গে তিনি যেন সাহেল (নাইজার, চাদ, মালি প্রভৃতি—অনুবাদক), হর্ন অব আফ্রিকা (সোমালিয়া, সোমালিল্যান্ড, ইথিওপিয়া প্রভৃতি—অনুবাদক) আর গ্রেট লেক (রুয়ান্ডা, উগান্ডা, কেনিয়া, তানজানিয়া প্রভৃতি—অনুবাদক) অঞ্চলে বেদনাবিধুর মানুষদের যন্ত্রণা লাঘব করেন, আর শান্তি এনে দেন বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা সেই খ্রিষ্টানদের, যাঁরা প্রভু যিশুর ওপর তাঁদের বিশ্বাস লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হন।

শান্তি অসম্ভব, যদি না থাকে ধর্মীয় স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, বাক্‌স্বাধীনতা আর ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা।

শান্তি অসম্ভব, যত দিন অস্ত্রের ঝনঝনানি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে! প্রতিটা মানুষ আর প্রতিটা জনপদ আত্মরক্ষার দায় নিজেই বহন করবে, এই অসম্ভব শর্ত যেন পৃথিবীর প্রতিটা জাতিকে ক্যান্টনমেন্টে পরিণত না করে। ইস্টারের আলো আমাদের ঠেলে দেয়, ভেঙে ফেলো দেয়াল, যেই দেয়াল মানুষকে দল থেকে উপদলে ভাগ করে, রাজনীতি আর অর্থনীতির হিসাবের খাতায় আনে ঋণ আর বিপদ। ইস্টারের আলো আমাদের প্রেরণা দেয়, একে অন্যের দিকে হাত বাড়াও, দূরে ঠেলে দিয়ো না, এক হও, ভালোবাসো। ভ্রাতৃত্ব যেন কাউকে বাদ দিয়ে না হয়, উন্নয়ন যেন আসে প্রতিটি মানুষের জন্য, আমরা যেন কাজ করে যাই এক পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নের জন্য।

এ সময়ে আমরা যেন ভুলে না যাই মিয়ানমারের মানুষদের, দীর্ঘ যুদ্ধ যাদের বছরের পর বছর কাবু করে রেখেছে। এর মধ্যেও সাহস আর ধৈর্যে ভর দিয়ে ওরা বেঁচে আছে, সাগাইং অঞ্চলের ভূমিকম্পে তারা ঘর হারিয়েছে, মারা গেছে হাজারো মানুষ, ভুগছে বেঁচে যাওয়া লাখো পরিবার, এতিম শিশুরা, বয়োজ্যেষ্ঠরাও। আমরা প্রার্থনা করি, তাদের জন্যও, তাদের ভালোবাসার মানুষদের জন্যও। আর ধন্যবাদ জানাই তাঁদের, যাঁরা রিলিফকজে সাহায্য করছেন নিঃস্বার্থভাবে। মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা পুরো দেশটির জন্যই এক আশা জাগানো খবর। যারা অস্ত্র নামিয়ে রাখছে, তারা যেন ইস্টারের পুনরুত্থানের আলো হয়ে ওঠে বাকিদের চোখে।

আমি মুক্তকণ্ঠে অনুরোধ করি, যারা আজ রাজনীতির গুরুদায়িত্বে, ভয়ের যুক্তিতে নিজেদের বন্দী করে রাখবেন না, এতে শুধু দূরত্বই বাড়বে। বরং আপনার সম্পদ ব্যবহার করুন অসহায়কে সাহায্য করতে, ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, উন্নয়ন প্রসারিত হয় এমন সব উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে। এটাই তো আসল ‘অস্ত্র’, শান্তির ‘অস্ত্র’: ভবিষ্যৎ গড়ার অস্ত্র, মৃত্যুর বীজ বপনের মারণাস্ত্র নয়।

‘মানবতা’—এই মূলমন্ত্রটি যেন আমাদের প্রতিদিনের আচরণে থাকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা যখন আত্মরক্ষার সামর্থ্যহীন সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করে, আর স্কুল, হাসপাতাল আর ত্রাণকর্মীদের আক্রমণ করে, আমরা যেন ভুলে না বসি, আক্রমণের এই লক্ষ্যবস্তুরা কোনো টার্গেট নয়, জলজ্যান্ত রক্তমাংসের মানুষ। আর এই প্রতিটি মানুষের আছে একটা প্রাণ, একটা আত্মা, একটা মানুষের সমান মর্যাদা।

এই জুবিলি বর্ষে (চার্চের ভাষায়, প্রতি ২৫ বছর পরপর জুবিলি বর্ষ পালিত হয়), ইস্টার হয়ে উঠুক যুদ্ধবন্দী আর রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির এক মোক্ষম উপলক্ষ।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
প্রভুর পাসকাল রহস্যে (অর্থাৎ ক্রুশবিদ্ধ হওয়া ও পুনরুত্থানের পুরো ঘটনাপ্রবাহে), মৃত্যু আর জীবন একে অপরের সঙ্গে এক ভয়ংকর পাঞ্জায় লিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু যিনি উঠে এসেছেন মৃত্যু ছিঁড়ে, সেই প্রভু এখন চিরঞ্জীব (ভিক্তিমে পাসকালি লাউদেস)। তিনি আমাদের নিশ্চয়তা দেন, আমরাও তার সঙ্গে সঙ্গে ডাক পেয়েছি এমন এক অন্তহীন জীবনের, যেখানে আর কোনো অস্ত্রের দাপট থাকবে না, থাকবে না মৃত্যুর কর্কশ উদ্‌যাপন। তাঁর হাতে আমরা নিজেদের সঁপে দিই, কারণ কেবল তিনিই তো পারেন সবকিছু নতুন করে গড়তে (প্রকাশিত বাক্য ২১:৫)।
সবাইকে ইস্টারের শুভেচ্ছা!

* ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষ্য অবলম্বনে অনুবাদ করেছেন মিম আরাফাত মানব

পোপ ফ্রান্সিস
পোপ ফ্রান্সিস। রয়টার্স

৫০ দিন ধরে ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ, ভয়াবহ মানবিক সংকটে গাজাবাসী

ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ থাকায় মানবিক সংকট তীব্র হয়েছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায়। মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক কার্যালয় (ওসিএইচএ) সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপত্যকাটিতে মানবিক সংকট সবচেয়ে জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আনাদোলু।

এতে বলা হয়, গাজায় টানা ৫০ দিন ধরে ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ আছে। ওসিএইচএ’র মুখপাত্র জেন্স লার্কে বলেছেন, গাজা বর্তমানে সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। জেনেভায় জাতিসংঘের ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি।

গাজার বেসামরিক নাগরিকদের ভয়াবহ পরিস্থিতির ওপর জোর  দিয়েছেন জেন্স লার্কে। বলেছেন,পরিস্থিতি যে বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২ মার্চ থেকে গাজার ক্রসিংগুলো বন্ধ করে দিয়েছে দখলদার ইসরাইল। এছাড়া ত্রাণ ও সকল প্রকার সহায়তা উপকরণও পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে তারা। উপত্যকাটিতে মানবিক বিপর্যয় চলছে জেনেও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে তেল আবিব।

উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ১৮ মার্চ থেকে গাজায় পুনরায় হামলা শুরু করে ইসরাইল। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে তারা। এর মধ্যে বেশির ভাগই নারী ও শিশু।

গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নভেম্বরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।

mzamin

কাশ্মীরে হামলা নিয়ে মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণের শিকার সিপিআইএমের মহম্মদ সেলিম by শুভজিৎ বাগচী

কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভারতজুড়ে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতারা আরও জাতীয়তাবাদী ও শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থার দাবি তুলেছেন। এর মধ্যে খানিকটা স্রোতের বিপরীতে হাঁটলেন পশ্চিমবঙ্গ সিপিআইএমের (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্ক্সবাদী) সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তিনি সাধারণ মানুষকে সাবধান করেছেন, যাতে এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে কোনো পক্ষ সাম্প্রদায়িক উসকানি ও বিভাজন বাড়াতে না পারে। কাশ্মীরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতে অনেকটা জাতীয়তাবাদের সুনামি তৈরির মধ্যে তাঁর এই মন্তব্যকে ভালোভাবে দেখেননি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। মহম্মদ সেলিমের তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষত ফেসবুকে।

বুধবার দুপুরে সিপিআইএমের প্রচার বিভাগ ফেসবুকে রাজ্য সম্পাদকের একটি ছবি দিয়ে তাঁর একটি মন্তব্য প্রকাশ করে। সেখানে মহম্মদ সেলিম বলছেন, ‘কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল করে বিজেপি সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, তাতে সন্ত্রাসবাদকে আরও উসকে দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যটকদের ওপর এই হামলা ঘিরে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানো ও বিভাজনের চেষ্টা হবে। অমরনাথ যাত্রার প্রাক্কালে হামলা বলে দেখিয়ে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপরে হামলা বলে প্রচার করা হবে। আমরা কাশ্মীরের ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি এবং কোনোরকম সাম্প্রদায়িক উসকানিতে সাড়া না দেওয়ার আবেদন করছি।’

সিপিআইএমের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ পলিটব্যুরোও একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে, কিন্তু এখানেও তারা এই ধরনের ‘সাহসী’ মন্তব্য করেনি বলে মনে করছেন সিপিআইএম দলের সদস্যদের একাংশ। বিবৃতিতে ভুক্তভোগীদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে পলিটব্যুরো বলেছে, ‘এই জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে। এই নৃশংস হামলার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে কেন্দ্রীয় সরকারকে সর্বতোভাবে চেষ্টা করতে হবে। অপরাধকারীরা জাতির ও কাশ্মীরের জনগণের শত্রু। জনাকীর্ণ পর্যটন স্থানগুলোতে নিরাপত্তার অভাবসহ হামলার সমস্ত বিষয় নিয়ে তদন্ত চালানো কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব। চরমপন্থী মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এই ট্র্যাজেডির মুহূর্তে সিপিআই-মার্ক্সবাদী ভারতের জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ।’

অর্থাৎ যে কথা মহম্মদ সেলিম বলেছেন, এই ঘটনার জেরে ভারতে আগামী দিনে সাম্প্রদায়িকতা ও বিভাজনের রাজনীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেই ধরনের কোনো মন্তব্য করেনি দলের শীর্ষ পর্ষদ।

মহম্মদ সেলিমের মন্তব্যের জন্য তাঁকে প্রবল আক্রমণ করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। একজন লিখেছেন, ‘সিপিআইএমের আজ এই অবস্থা আপনাদের এই মতামতের জন্যই।’ সিপিআইএমের প্রচার বিভাগের ওই ফেসবকু পোস্টে রাত পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মন্তব্য করা হয়েছে এবং এর প্রায় প্রতিটিই মহম্মদ সেলিমকে আক্রমণ করে। আরেক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘সেলিম বিষয়টিকে নিয়ে রাজনীতি করছেন, যা কাম্য নয়।’ ফেসবুকে সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদককে ব্যক্তিগত আক্রমণও করেছেন অনেকে।

তবে সিপিআইএম দলের সদস্যদের একাংশ মনে করছেন, এই মন্তব্যের প্রয়োজন ছিল। দক্ষিণ কলকাতার কসবায় সিপিআইএমের স্থানীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও বর্তমানে পার্টির সাধারণ সদস্য কৌশিক রায় এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে আমি যেটা মনে করি সেটা হলো “পপুলিস্ট” চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে গিয়ে পাল্টা ন্যারেটিভ (আখ্যান) আমরা দিতে পারছি না। মানুষ বাম রাজনীতি থেকে সব সময় অন্য কিছু শুনতে চান। অন্য একটা ন্যারেটিভ চান। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা মূলস্রোতের ন্যারেটিভই অনুমোদন করি এবং সেটাই বলি। এই যে রাজ্য সম্পাদক কথাটা বললেন যে, এই ঘটনাকে ব্যবহার করে কিছু সংগঠন সম্প্রদায়িক রাজনীতি করার চেষ্টা করবে, এটা একটা বিকল্প ন্যারেটিভ। কাশ্মীরের ঘটনার ফলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং মেরুকরণের রাজনীতি বাড়তে পারে, এটা একটা বাস্তব সত্য এবং বিকল্প ন্যারেটিভও, যেটা এই মুহূর্তে অন্য রাজনৈতিক দল বলছে না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অনেক মানুষই সেটা মনে করেন। মূলস্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদের কথা বলাটা এই সময় খুব জরুরি।’

রাজ্য সম্পাদকের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে আগামী শুক্রবার (এপ্রিল ২৫) কাশ্মীরের সহিংসতা এবং সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতায় পথে নামবে পশ্চিমবঙ্গ সিপিআইএম।

মোহাম্মদ সেলিম
মোহাম্মদ সেলিম। ফাইল ছবি

আল জাজিরার বিশ্লেষণ: কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলায় ফের তুঙ্গে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা

মঙ্গলবার ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে মনোরম পর্যটন কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে সন্দেহভাজন বিদ্রোহীরা। এতে কমপক্ষে ২৮ জন পর্যটক নিহত হয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার পারদ যোগান দেবে। কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা অনন্তনাগে এই হামলার ঘটনায় ভারত জুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটন মৌসুমকে টার্গেট করে এই হামলা চালানো হয়েছে। ভারতের এই অঞ্চলটিতে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক ছুটি কাটাতে যান। যদিও ওই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। হামলার পরপরই পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর একটি দল আহত পর্যটকদের সরিয়ে নিয়ে আসে এবং সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে। পুরো বিষয়টি খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে ঘটনাস্থলে গিয়েছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তার সঙ্গে দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও রয়েছেন। অন্যদিকে সৌদি সফর সংক্ষিপ্ত করে নয়াদিল্লিতে ফিরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দিল্লিতে ফিরেই বুধবার সকালে জরুরি বৈঠক করেছেন তিনি। এ ছাড়া এমন এক সময়ে এই হামলা চালানো হয়েছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট তার পরিবার নিয়ে ভারত সফরে রয়েছেন। তিনি সোমবার দিল্লিতে পা রাখেন। বৃহস্পতিবার তিনি ভারত ছাড়বেন বলে কথা রয়েছে। এই হামলা কাশ্মীর ও ওই অঞ্চলের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে এবং ভারত কীভাবে এর প্রতিক্রিয়া জানাবে তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা।

ঘটনার বিবরণ: কাশ্মীরের ভাষায় পহেলগাঁও অর্থ হচ্ছে ‘মেষপালকের উপত্যকা’। পর্যটকদের জন্য এই স্থানটি বেশ আকর্ষণীয়। কাশ্মীরের প্রধান শহর শ্রীনগর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। মঙ্গলবার প্রত্যক্ষদর্শীরা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ওই স্থানটিতে ছিল পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে কাছের একটি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে মুখোশধারী একটি সশস্ত্র দল। এরপর বাইসারান তৃণভূমিতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে তারা। হামলার ওই স্থানটিতে পায়ে হেঁটে অথবা ঘোড়ায় করে যাওয়া যায়। ওই কর্মকর্তা বলেন, হঠাৎ গুলির শব্দ শুনে বহু পর্যটক জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের নাগপুর থেকে আসা সিমরান চন্দনি নামের এক পর্যটক জানিয়েছেন, তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে, হামলার পরও তার প্রাণ থাকবে কিনা। এই পর্যটক বলেছেন, আমরা চা ও নুডুলস খাওয়া শেষ করে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঠিক তখনই অতর্কিতভাবে হামলা শুরু হয়। যাতে ২৮ পর্যটক নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে দুইজন বিদেশি পর্যটক রয়েছেন। এ ছাড়া কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের প্রায় প্রত্যেকেই বেসামরিক। তবে এতে ভারতীয় নৌবাহিনীর একজন সদস্যও ছিলেন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে হানিমুনে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশের পান্ডুরঙ্গাপুরমের একজন সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তাও নিহত হয়েছেন। তার বয়স ৬৮ বছর। তিনিও তার স্ত্রীকে নিয়ে পহেলগাঁওয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন। নিহতদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীও ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ওড়িশার একজন হিসাবরক্ষক, উত্তরাঞ্চলীয় একটি প্রদেশের একজন সিমেন্ট ব্যবসায়ী এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার একজন বাসিন্দা। যিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করতেন।

হামলার দায় স্বীকার: এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে  রেসিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ) নামের একটি সশস্ত্র গ্রুপ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। ধারণা করা হচ্ছে এটি পাকিস্তানের নিষিদ্ধঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই- তৈয়বার একটি শাখা। ২০১৯ সালে কাশ্মীরের আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা কেড়ে নেয় ভারত সরকার। এর মাধ্যমে অঞ্চলটিতে কেন্দ্র তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করে। তারা রাজ্যটিকে কেন্দ্রশাসিত দুটি অঞ্চলে ভাগ করেছে। মোদি সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে অঞ্চলটির রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া মোদি সরকার এই আইনের মাধ্যমে কাশ্মীরের বাইরের মানুষকে সেখানে বসবাস করার অনুমতি দেয়ার পথ প্রশস্ত করেছে, যা এর আগ পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, তারা সন্দেহ করছেন যে, এই হামলায় মোট চারজন সন্ত্রাসী অংশ নিয়েছিলেন। যাদের মধ্যে দুজন পাকিস্তানের এবং দুজন ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের।

অতীতে কি পর্যটকদের লক্ষ্য করে এমন হামলার ঘটনা আছে:
যদিও কাশ্মীরের অস্থিরতার মধ্যে পর্যটকদের লক্ষ্য করে সরাসরি হামলার ঘটনা বিরল। তবে ১৯৯৫ সালে পহেলগাঁওয়ে একটি অপহরণের ঘটনা ঘটে। সেসময় আল ফারান নামের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ছয় বিদেশি পর্যটককে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এর মধ্যে একজনকে হত্যা করা হয় আর আরেকজন পালিয়ে যায়। বাকি চারজনের হদিস এখনো পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ২০০০ সালের দিকে একটি অতর্কিত হামলায় ৩২ জন নিহত হয়েছিলেন। যাদের মধ্যে ২১ জন হিন্দু তীর্থযাত্রীও ছিলেন। এর এক বছর পর একই এলাকার শেষনাগ হ্রদের কাছে ১১ জন তীর্থযাত্রী এবং দুই স্থানীয় বাসিন্দাকে হত্যা করা হয়। ২০১৭ সালে অনন্তনাগ জেলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আটজন তীর্থযাত্রী নিহত হন। গত বছরের জুন মাসে জম্মুর কাঠুয়ার দক্ষিণ অংশে আটজন হিন্দু তীর্থযাত্রী নিহত হন। যদিও বলা হয় যে, বাসের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মঙ্গলবারের হামলাটি সম্ভবত ২০০০ সালের পর পর্যটকদের উপর সবচেয়ে মারাত্মক হামলা। সবদিক বিবেচনায় ২০০১ সালের অক্টোবরে জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্য আইনসভার বাইরে বোমা হামলার পর এর বাইরে কোনো হামলায় এত প্রাণহানি দেখেনি কাশ্মীরের বাসিন্দারা। ওই হামলায় প্রায় ৩৫ জন নিহত হয়েছিলেন।

ভারতের প্রতিক্রিয়া: অতর্কিত এই হামলার প্রতিক্রিয়া কী হবে তা ঠিক করতে বুধবার বৈঠক করেছেন সরকারি পক্ষের নেতারা। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নিজে তার সৌদি আরবের সফর সংক্ষিপ্ত করে দিল্লিতে ফিরে এসেছেন। সেখানে সৌদির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। তবে হামলার পর তা বাদ রেখেই সফর শেষ করেছেন মোদি। সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক্সে পোস্ট করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেছেন, যারা তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন তাদের প্রতি সমবেদনা জানাই। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের সম্ভাব্য সকল সহায়তা করা হচ্ছে বলেও জানান মোদি। যারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত তাদের বিচারের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন, হামলাকারীদের রেহাই দেয়া হবে না। ঘটনার পরপরই শ্রীনগর ছুটে গিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি ওই অঞ্চলের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে  বৈঠক করেছেন। এদিকে ২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের তীব্র সমালোচনা করেছেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি বলেছেন, সন্ত্রাস দমনে গোটা দেশ ঐক্যবদ্ধ। জম্মু-কাশ্মীরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার ফাঁকা বুলি আওড়ানো বাদ দিয়ে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গান্ধী বলেছেন, এমন বর্বর ঘটনা যেন আর না ঘটে এবং নিরীহ ভারতীয়রা যেন আর প্রাণ না হারান সে বিষয়ে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ফের তুঙ্গে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা: বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নৃশংস হামলায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক প্রতিক্রিয়া দিতে পারে ভারত। পাকিস্তানের  সেনাপ্রধান অসীম মুনিরের ভাষণের কথা উল্লেখ করেছেন নয়াদিল্লি-ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর ল্যান্ড ওয়ারফেয়ার স্টাডিজ (সিএলএডব্লিউএস) এর পরিচালক তারা কার্থা। যেখানে বলা হয়েছিল, এটা যুদ্ধের একটা পদক্ষেপ। আমরা এ বিষয়টিকে এভাবেই দেখছি। পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের এই বক্তৃতার কয়েকদিন পরেই এমন হামলার ঘটনা ঘটলো। কার্থা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক একজন কর্মকর্তা। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের বিষয়টি উল্লেখ করে ওই ভাষণ দিয়েছিলেন পাকিস্তানের  সেনাপ্রধান। কার্থা বলেছেন, পহেলগাঁওয়ের হামলা ১৬ই এপ্রিল মুনিরের দেয়া ভাষণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এক্ষেত্রে পাকিস্তান যদি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানায় এবং আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় তাহলেই কেবল এই সংকট এড়ানো সম্ভব।

বুধবার ভোরে হামলার প্রতিক্রিয়া দিয়েছে পাকিস্তান।  দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতের অবৈধভাবে দখলকৃত জম্মু-কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলায় এক হামলায় পর্যটকদের প্রাণহানি হয়েছে। এতে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা নিহতদের নিকটাত্মীয়দের প্রতি সমবেদনা জানাই এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। এখানে বলে রাখা ভালো, ভারত ও পাকিস্তান- উভয় দেশই গোটা কাশ্মীর নিজেদের বলে দাবি করে। তবে বর্তমানে কাশ্মীরের দুটি অংশ এ দুই দেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যদিও এই বিবৃতিতে ভারতে উত্তেজনা কমানোর সম্ভাবনা কম। কেননা,  মোদি সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে চাপের সম্মুখীন হবে। তবে এক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া জানানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। 

mzamin

রক্তাক্ত কাশ্মীর

এক বছরের ব্যবধানে ফের রক্তাক্ত কাশ্মীর। সামপ্রতিক সময়ে এটিই সবচেয়ে মারাত্মক হত্যাকাণ্ড। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার পহেলগাঁওয়ের বৈসরণ উপত্যকায় মঙ্গলবারের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় অন্তত ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একজন বাদে সবাই পর্যটক। নিহতদের মধ্যে দুইজন বিদেশিও রয়েছেন বলে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সদ্য বিবাহিত।    সবুজ বাগান ও পাহাড়ে ঘেরা উপত্যকায় এই মৌসুমে গমগম করে পর্যটকের ভিড়ে। এলাকাটি পর্যটকদের কাছে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে জনপ্রিয়। মঙ্গলবারেও সেই চেনা ছবিই দেখা গিয়েছিল পহেলগাঁওয়ের উপত্যকা জুড়ে। মঙ্গলবার দুপুরের পর রক্তাক্ত হয়ে ওঠে বৈসরণ উপত্যকা। বুধবার গোটা কাশ্মীর জুড়ে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে রয়েছে। পর্যটকরা দ্রুত কাশ্মীর ছেড়ে চলে আসতে শুরু করেছেন। বুধবার কাশ্মীরের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল পহেলগাঁওয়ের সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানাতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সংহতি প্রকাশের জন্য কাশ্মীর বন্‌ধ পালন করেছে। সেনাকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, বৈসরণ উপত্যকায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের একটি দলকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা পর্যটকদের ওপর গুলি চালায়। হামলাকারীরা সংখ্যায় ছিল পাঁচ-ছয়জন। নিহতরা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বাসিন্দা। পশ্চিমবঙ্গের তিন বাসিন্দাও নিহতদের মধ্যে রয়েছেন। রাজ্যে রাজ্যে শোকের আবহ বিরাজ করছে।

সেনাবাহিনীর তরফে জানানো হয়েছে, সন্ত্রাসীদের সন্ধানে সেনাবাহিনী বিশেষ অভিযানে নেমেছে। ব্যবহার করা হচ্ছে হেলিকপ্টারও। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভূস্বর্গে সন্ত্রাসবাদী হামলায় পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র  মোদির  সঙ্গে টেলিফোনে কথাও বলেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভারত ও আমেরিকা যৌথ ভাবে জঙ্গিহানার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বুধবার একথা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে লস্কর-ই-তৈয়বার ছায়া সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বার্তায় তারা অসন্তোষ প্রকাশ করে লিখেছে, ৮৫ হাজারের বেশি ‘বহিরাগত’ এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে, যা জনসংখ্যাগত উপাত্তে পরিবর্তন আনছে। তবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ পহেলগাঁওয়ের হত্যাকাণ্ড থেকে ইসলামাবাদকে দূরে সরিয়ে রেখে এই সহিংসতাকে ভারতের ‘স্বদেশে জন্মানো’ এবং ভারতের বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিদ্রোহের অংশ বলে বর্ণনা করেছেন।

সমাজমাধ্যমে এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় তিনি লিখেছেন, এর সঙ্গে আমাদের একেবারেই কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা সকল ধরনের এবং সর্বত্র সন্ত্রাসবাদকে প্রত্যাখ্যান করি। ভারত বুধবার দুপুর পর্যন্ত এ ব্যাপারে কারও বিরুদ্ধে দোষারোপ না করলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগেই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের রেয়াত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বুধবারই তিনি সৌদি আরব সফর সংক্ষিপ্ত করে ভারতে ফিরে এসেছেন। বিমানবন্দরে অবতরণের পরই তিনি সেখানে জাতীয় উপদেষ্টা অজিত দোভাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ও অন্যান্য আধিকারিকদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। এদিকে, হামলার ঠিক আগের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সমাজমাধ্যমে। সেই ভিডিওতে ধরা পড়েছে এলোপাতাড়ি গুলির শব্দ। ভাইরাল হয়েছে ভিডিওটি। ভিডিওর শুরুতে দেখা গিয়েছে এক ব্যক্তি গাছের আড়াল থেকে ক্যামেরার দিকে হাত নাড়তে নাড়তে এগিয়ে আসছেন।  পেছনে সবুজ নৈসর্গিক দৃশ্য। হঠাৎ করেই শোনা যায় মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। সঙ্গে ভেসে আসতে থাকে আর্তচিৎকার। সরকারি সূত্রে সংবাদ সংস্থাকে জানানো হয়েছে, গোটা এলাকা জুড়ে সন্ত্রাসীদের খোঁজে সেনা অভিযান চলছে।

মঙ্গলবার রাতেই ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শ্রীনগরে এসে নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বুধবার তিনি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানিয়েছেন। ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রশ্ন তুলেছেন, এমন হামলা হতে পারে সেই গোয়েন্দা তথ্য কেন ছিল না রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। বিরোধীদের মতে, কাশ্মীর শান্ত হয়ে পড়েছে বলে যে দাবি করা হয়েছিল তা যে ঠিক নয়, তা ফের স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। হামলার নিন্দা করে গোটা দেশকে এক থাকার বার্তা দিয়েও কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, জম্মু-কাশ্মীরে সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে, এই ধাঁচের ফাঁকা দাবি না করে সরকারের উচিত ওই ঘটনার দায় নিয়ে পদক্ষেপ করা যাতে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে না ঘটে। তিনি বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর সঙ্গে কথাও বলেন। মঙ্গলবারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে নিন্দা জানানো হচ্ছে। বলিউড ও টলিউডের সকলে নিন্দা জানিয়েছেন। পিছিয়ে নেই ক্রীড়া অঙ্গনও।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সন্ত্রাসী হামলার নিন্দার পাশাপাশি আইপিএল ম্যাচে মাঠে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে বলে জানিয়েছে। আরও জানা গেছে, এদিনের ম্যাচে মুম্বই ও হায়দরাবাদের ক্রিকেটাররা কালো আর্মব্যান্ড পরে খেলবেন। আর্মব্যান্ড পরে থাকবেন আম্পায়াররাও। এদিনের খেলায় কোনো চিয়ারলিডার থাকবে না। আইপিএলে সাধারণত প্রতিটি ম্যাচে বাজি ও আলোর প্রদর্শনী হয়। দুই ইনিংসের বিরতিতে হয় আলো ও লেজারের প্রদর্শনী। খেলা শেষে হয় বাজির প্রদর্শনী। কিন্তু বুধবারের ম্যাচে সে সবও বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে। পহেলগাঁওয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত চার জঙ্গিকে শনাক্ত করেছে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। ইতিমধ্যে চার জনের ছবিও প্রকাশ করে পরিচয় জানানো হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, চার জঙ্গি হলো- আদিল, আসিফ ফুজি, সুলেমান শাহ এবং আবু তালহা!

এদিকে এই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা নাকচ করেছে পাকিস্তান। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জম্মু ও কাশ্মীরে সহিংসতার জন্য ‘বিপ্লব’ এবং ‘দেশীয় সন্ত্রাসী বাহিনীকেই’ দায়ী করেছেন। আসিফের দাবি, হামলার সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো যোগসূত্র নেই। এগুলো সবই দেশীয়, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে বিপ্লব চলছে, একটি নয়, দুটি নয়, বরং কয়েক ডজন। নাগাল্যান্ড থেকে কাশ্মীর, দক্ষিণের রাজ্য, ছত্তিশগড়ে, মণিপুরে সর্বত্র। তিনি আরও বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা কোনো পরিস্থিতিতেই সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করি না এবং স্থানীয় কোনো সংঘর্ষে নিরীহ মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কথায়, আমাদের জাতীয় নীতিতে বেসামরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অনুমতি নেই। কিন্তু যদি সেনাবাহিনী বা পুলিশ ভারতের কোথাও তাদের অধিকার দাবি করা মানুষদের ওপর নৃশংসতা চালায় এবং তার পরিবর্তে যদি তারা বিদ্রোহ করে, অস্ত্র তুলে নেয়- তাহলে পাকিস্তানের ঘাড়ে দোষ  চাপিয়ে দেয়া বোধহয় সহজ। আসিফ আরও বলেন যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টিতে ভারতের জড়িত থাকার অভিযোগের প্রমাণ ইসলামাবাদ অনেকবার দিয়েছে। আসিফের কথায়, আমরা আগেও প্রমাণ দিয়েছি- একবার নয় বরং বহুবার যে, ভারত বেলুচিস্তান এবং পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টিতে মদত দিচ্ছে। তারা আফগানিস্তানে বসে থাকুক বা অন্য কোথাও, পাকিস্তানে অস্থিরতা তৈরিতে মদত দেয়ার ভারতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

mzamin

বিশ্বের সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক

ভারতে সড়কে বেড়েছে মৃত্যুর মিছিল। দেশটিতে প্রতি তিন মিনিটে একজন সড়কে প্রাণ হারান। বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক সড়কগুলোর মধ্যে ভারত অন্যতম। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ভারতের সংবাদপত্রগুলোতে প্রতিদিন পাহাড়ি খাদে বাস পড়ে যাওয়া, মাতাল চালকের পথচারীকে পিষে দেয়া, দাঁড়িয়ে আছে এমন কোনো ট্রাকে গাড়ির ধাক্কা ও বড় যানবাহনের ধাক্কায় ছোট গাড়ি ভেঙে যাওয়ার মতো খবর লক্ষ্য করা যায়। ২০২৩ সালে ভারতে সড়কে প্রাণ হারান কমপক্ষে ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষ। প্রতিদিনের হিসাবে ওই সংখ্যা ৪৭৪। অর্থাৎ প্রতি তিন মিনিটে ১ জন করে মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়। এদিকে ডিসেম্বরে মৃতের সংখ্যা উদ্বৃত করে ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিষয়ক মন্ত্রী নিতিন গড়করি। ২০২৩ সালে মৃতের মধ্যে শিশু ছিল ১০ হাজার। স্কুল ও কলেজের কাছে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ১০ হাজার প্রাণহানি ঘটে। প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ হাজার পথচারী। দুই চাকার গাড়ির আরোহীদেরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অতি দ্রুত গাড়ি চালানোকে এসব সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অসাবধানতার জন্য প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে। এর মধ্যে হেলমেট না পরার কারণে প্রাণ হারান ৫৪ হাজার মানুষ। ১৬ হাজার প্রাণ হারান সিটবেল্ট না পরার কারণে। এ ছাড়া অতিমাত্রায় পণ্য পরিবহনও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

এতে নিহত হন ১২ হাজার মানুষ। বৈধ লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোয় ৩৪ হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভুল দিকে গাড়ি চালিয়েও প্রাণ খুইয়েছেন অনেকে। ২০২১ সালের ১৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে বৈধ লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর কারণে। সড়কে চলা বেশির ভাগ যানবাহনই অতি পুরনো। বেশির ভাগ গাড়িতেই সিট বেল্ট নেই। এয়ার ব্যাগের কথা ভাবা তো বিলাসিতা। এ ছাড়া ভারতের সড়কের পরিস্থিতি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে সেখানকার ট্রাফিক সিস্টেম। বাইসাইকেল, সাইকেল ও রিকশার মতো যানবাহনের সঙ্গে রাস্তায় জায়গা করে নেয়ার জন্য যানজট সৃষ্টি করে বাস, মোটরসাইকেল, কারের মতো মোটরচালিত যানবাহনগুলো। নিজেদের জিনিস বিক্রয়ের জন্য পথচারীদের পথ আটকে দেন হকাররা। এতে সড়কে আরও যানজট সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য চেষ্টা ও বিনিয়োগ করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে তা সত্ত্বেও সড়কে থেমে নেই  বিশৃঙ্খলা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো না বরং মানুষের ব্যবহারও সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী। এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার মতো ঘটনা ভারতের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা বার্ষিক জিডিপির ৩ শতাংশ ক্ষতি হয়। উল্লেখ্য, ভারতে আছে বিশ্বের দ্বিতীয় সড়ক নেটওয়ার্ক। যা ৬৬ লাখ কিলোমিটার বিস্তৃত।

এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারতের অবস্থান। গড়করি বলেন, জনগণের অসচেতনতা ও আইনের প্রতি উদাসীনতা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তবে গত মাসে তিনি সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশার জন্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের ওপর দোষ চাপান। এ ছাড়া নিম্নমানের নির্মাণ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, সবচেয়ে বড় অপরাধী হলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা। এ দেশে রাস্তার সাইনবোর্ড ও মার্কিং সিস্টেমও অতি দুর্বল। ২০১৯ সালে তার মন্ত্রণালয় মহাসড়কে ৫৯টি বড় ধরনের ত্রুটির কথা জানায়। ১৩ হাজার ৭৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনা কালো তালিকাভুক্ত করা হলেও মাত্র ৫ হাজার ৩৬টি দীর্ঘমেয়াদি সংশোধনের মধ্যদিয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে ভারতের ট্রান্সপোর্টেশন রিসার্চ অ্যান্ড ইনজুরি প্রেভেনশন সেন্টার (টিআরআইপিপি)  সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা সড়ক অবকাঠামোতে বড় ধরনের ত্রুটি উন্মোচিত করেছে। সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে ক্রাশ ব্যারিয়ার ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়। বলা হয়, ক্রাশ ব্যারিয়ার সড়কে দেয়া হয় যাতে এর সাহায্যে গাড়িগুলো সহজে থামানো যায়। তবে বেশির ভাগ জায়গাতেই এর উল্টোচিত্র চোখে পড়ে। উচ্চতা, ব্যবধান ও স্থাপনের জন্য স্পষ্ট মান থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন গল্প বলে। ভুল উচ্চতায় ধাতব বাধা, কংক্রিটের ওপর ভিত্তি স্থাপনের মতো কাজের ফলে বাস, ট্রাকের মতো গাড়ি থামার বদলে উল্টে যেতে পারে। এ বিষয়ে দিল্লির আইআইটি’র ইমেরিটাস অধ্যাপক গীতাম তিওয়ারি বলেন, ক্রাশ ব্যারিয়ারগুলো যদি ঠিকমতো স্থাপন না করা হয় তাহলে তা ভালো করার চেয়ে বরং খারাপ করতে পারে। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম মূল কারণ হলো- নিরাপত্তা মান না মানলে সেক্ষেত্রে ন্যূনতম জরিমানা নির্ধারণ। এ বিষয়ে গড়করি সম্প্রতি বলেছেন, তিনি ২৫ হাজার কিলোমিটারের দুই লেনের সড়কগুলোকে চার লেনের সড়কে পরিণত করবেন। এতে সড়কে প্রাণহানি কমবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

mzamin

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে

গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মতো জঘন্য অপরাধ কোনোভাবেই বিচার ও শাস্তিহীন থাকা উচিত নয়- মন্তব্য করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, মিয়ানমারকে এই অপরাধের জন্য দায়ী করা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। গতকাল কাতারের দোহায় আর্থনা শীর্ষ সম্মেলনের দ্বিতীয়দিনে ‘বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তুচ্যুত জনগণের সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ-রোহিঙ্গা ইস্যু’- শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে এ কথা বলেন তিনি। প্রফেসর ইউনূস বলেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে), আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং মিয়ানমারের জন্য গঠিত স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়া (আইআইএমএম)-এর আওতায় রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নৃশংসতার বিচার ও জবাবদিহিতার চলমান উদ্যোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, জাতিসংঘ ও রোম সংবিধির সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ কোনোভাবেই শাস্তির বাইরে থাকা উচিত নয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মিয়ানমার বা এর কর্মকর্তাদের ওপর এই অপরাধগুলোর দায় চাপানো রোহিঙ্গাদের রাখাইনে প্রত্যাবাসনের জন্য আত্মবিশ্বাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ এই তিনটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বিচার প্রক্রিয়াকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে। আইসিজে-তে গাম্বিয়া ২৩শে অক্টোবর ২০২০ তারিখে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য প্রমাণসহ তার অভিযোগপত্র (মেমোরিয়াল) জমা দেয় এবং মিয়ানমার তার পাল্টা জবাব (কাউন্টার-মেমোরিয়াল) জমা দেয় ২৪শে অক্টোবর-২০২৩ এ।

২৩শে মে ২০২৪-এ গাম্বিয়া তাদের উত্তর জমা দেয় এবং মিয়ানমার তার পাল্টা উত্তর (রিজয়ান্ডার) জমা দেয় ৩০শে ডিসেম্বর ২০২৪-এ। প্রফেসর ইউনূস বলেন, এই মামলাটি ২০২৫ সালের শুরুর দিকে মূল (মেরিট) পর্বে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইন সংস্থা ফোলে হোয়াগ জানিয়েছে, তিনটি ধাপ (অস্থায়ী, আপত্তি ও মূল) সফলভাবে সম্পন্ন হলে, তারা মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যার শিকারদের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবিতে আইসিজেতে আবেদন করবে। প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, গাম্বিয়া সরকার ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহে একযোগে কাজ করছে। এ পর্যন্ত ওআইসি ২.৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশের অবদান সবচেয়ে বেশি- ৭ লাখ ডলার। ড. ইউনূস বলেন, আইসিজেতে চলমান বিচার প্রক্রিয়ার ব্যয় নির্বাহে যে তীব্র বাজেট ঘাটতি দেখা দিয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে ওআইসি’র শক্তিশালী সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে কাতার ‘রোহিঙ্গা ফান্ড’-এ আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য ওআইসিকে অনুরোধ করতে পারে, যা মামলার খরচ মেটাতে এবং এ কাজে গতি বজায় রাখতে সহায়ক হবে। এ সময় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন শুরু করার জন্য ওআইসিকে সক্রিয় করতে কাতারকে জোরালো ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন শুরু করতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য কাতার তাদের কূটনৈতিক প্রভাব কাজে লাগাতে পারে।

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে, কাতার জোরালোভাবে তাদের সংহতি প্রকাশ করে এই সংকট সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া ওআইসি দেশগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তহবিল সংগ্রহ জোরদার ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে মত প্রকাশের জন্য আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি মানবতা, স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করতে বিশ্ববাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। বলেন, আসুন আমরা নিশ্চিত করি, আজকের আলোচনা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে একটি অর্থবহ অংশীদারিত্বের সূচনা করে যা রোহিঙ্গা সংকটকে আমাদের যৌথ মানবিক অগ্রাধিকারগুলোর শীর্ষে রাখে এবং একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে একযোগে কাজ করে। ড. ইউনূস বলেন, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে এবং রোহিঙ্গাদের হতাশ করে তুলছে। ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বৃদ্ধি এবং অবৈধ অভিবাসনের চেষ্টা তাদের হতাশার স্পষ্ট চিহ্ন। এই সমস্যা যদি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এটি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলোও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দুর্ভাগ্যবশত, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে উদ্ভূত নানা সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধীরে ধীরে রোহিঙ্গা সংকট থেকে সরে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের ১৯শে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের দাখিলকৃত ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জনের তালিকার মধ্যে মিয়ানমার সরকার ২ লাখ ৩৯ হাজার ৫৬ জনকে যাচাই করেছে এবং এর মধ্যে ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৯৮ জনকে ‘মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন ড. ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ‘রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন’ আয়োজন করবে। এই সম্মেলনে কাতারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। তিনি কাতার ফাউন্ডেশনকে এই বৈঠকের আয়োজন এবং নীতিগত বিবৃতির বাইরে গিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান, জবাবদিহিতা ও সংহতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা) আশ্রয় নিয়েছে, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ৩২ হাজার নবজাতক যুক্ত হচ্ছে। প্রফেসর ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ কেবল মানবিক বিবেচনায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মনে করে, টেকসই প্রত্যাবাসনই হলো বর্তমান সংকটের একমাত্র সমাধান। ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রফেসর ইউনূস বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে), আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং মিয়ানমারের জন্য গঠিত স্বাধীন তদন্ত সংস্থার (আইআইএমএম) চলমান উদ্যোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, জাতিসংঘ এবং রোম সংবিধির সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মতো অপরাধের কোনোভাবেই শাস্তি এড়ানো উচিত নয়।

রোহিঙ্গাদের আস্থা ফেরাতে এবং রাখাইন রাজ্যে তাদের প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করতে মিয়ানমার ও এর কর্মকর্তাদের অপরাধের জন্য দায়ী করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেন তিনি। আইসিজে’তে দায়ের করা মামলাটি চলতি বছরের প্রথমার্ধে মেরিট পর্বে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইনি ফার্ম ফোলি হোয়াগ জানিয়েছে, প্রাথমিক, আপত্তি ও মূলপর্ব শেষ হওয়ার পর তারা আইসিজে’তে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যার শিকারদের ক্ষতিপূরণের আবেদন করবে। গাম্বিয়া সরকার ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ওআইসি ২৭ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে, যেখানে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে, যার পরিমাণ সাত লাখ ডলার। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমান সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে টেকসই প্রত্যাবাসনকেই বিবেচনা করে। এই গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ।

mzamin

সৌদির ‘গোলাপ শহর’, যেন সুগন্ধির স্মারক

মরুভূমির গোলাপের সুগন্ধি বোতলে ধারণ করার শিল্পে নিখুঁত দক্ষতা অর্জন করেছেন সৌদি আরবের বাসিন্দা খালাফুল্লাহ আল-তালহি। গোলাপ বড়ই পছন্দ করেন তিনি। নিজের বাচ্চাদের চেয়েও গোলাপের যত্ন নেন বেশি। এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। সেখানে বলা হয়েছে, গোলাপের শহর নামে পরিচিত সৌদির তাইফ শহর। সেখানে ৮০০ খামারে প্রায় ৩০ কোটি গোলাপ উৎপাদন করা হয়। আল-তালহির ধারণা অনুযায়ী এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ লাখ গোলাপের ফলন তিনি নিজেই করেন। বসন্তের মৃদু আবহাওয়ার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে তাইফে গোলাপ ফুঁটতে দেখা যায়। যা বিশাল মরুভূমির দৃশ্যকে গোলাপী রঙের প্রাণবন্ত ছায়ায় সজ্জিত করে। একদল শ্রমিক ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুলগুলো তোলেন। এরপর গোলাপের পাঁপড়িগুলো পানিতে ভিজিয়ে রাখেন। পরে তা সেদ্ধ করা হয়। মানুষের কাছে অতি পরিচিত এই ফুলটির সুগন্ধ প্রক্রিয়াজাত করা একটি জটিল বিষয়। বাষ্প করে তা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে তা থেকে তৈরি হয় সুগন্ধি তেলে।

দীর্ঘদিন ধরে পবিত্র কাবা শরীফের দেয়াল ধোয়ার কাজে গোলাপ জল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ওই গোলাপ জল তৈরি করা হয় গোলাপ থেকে। এছাড়া তাইফের গোলাপ থেকে তৈরি সুগন্ধি সৌদি আরবে আসা হজ্জযাত্রীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। স্থানীয়ভাবে এর ব্যাপক চাহিদার কারণে সীমিত পরিমাণে গোলাপ রপ্তানি করা হয়। তালহি বলেন, এখানে অনেক গোলাপ প্রেমি আছেন যারা শুধু গোলাপেরই সুগন্ধি পছন্দ করেন। ট্রেন্ডইকোনোমির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সৌদি আরব ১৪১ মিলিয়ন ডলারের সুগন্ধি পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে গোলাপ জলও আছে। ফুল কাটার মৌসুমে তালহির খামার থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ফুল তোলা হয়। তালহি বলেন, আমরা খামারেই জন্মেছি এবং এগুলো নিয়েই আছি। তবে গ্রীষ্মের তীব্র তাপ, অতি শীত ও অপ্রত্যাশিত বন্যা তাইফের গোলাপ বাগানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জলবায়ুু বিজ্ঞানীরা সতর্কতা জারি করেছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে তাপপ্রবাহ, ভারী বৃষ্টিপাত ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাবে।  শুষ্ক জলবায়ু ও বিশাল মরুভূমির কারণে সৌদি আরব বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আটল্যান্টিক কাউন্সিল ধারণা করছে, উচ্চ তাপমাত্রা ও পর্যাপ্ত সেচের পানির অভাবে ২০৫০ সাল নাগাদ গমের উৎপাদন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাবে। এছাড়া খেজুর ও অন্য ফসলের উৎপাদনও হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে গোলাপ উৎপাদনও কমে যেতে পারে।

mzamin

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হলে বিকল্প কী, সে পরিকল্পনা নেই বাংলাদেশের

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক নানা বাস্তবতায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এর আগের ঐতিহাসিক সংকটগুলোর আলোকে বাংলাদেশ কোনো রোহিঙ্গা নীতি বা শরণার্থী নীতি তৈরি করেনি। প্রত্যাবাসন চেষ্টা ব্যর্থ হলে বিকল্প রোডম্যাপ কী হবে, সে পরিকল্পনা বাংলাদেশের নেই।

বুধবার রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (ঢায়রা) আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জেস: বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক কৌশলের সন্ধানে’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথাগুলো বলেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিক বলেন, ‘প্রত্যাবাসনে জটিলতার একটা বড় জায়গা হচ্ছে আমরা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত না আমাদের রোডম্যাপটা কী। রাষ্ট্র হিসেবে আমরা বিগত সময়ের সংকটগুলো থেকে শিক্ষা নেইনি।’

রোহিঙ্গাদের কোন ‘লেন্সে’ আমরা দেখব সে বিষয়ক একটা নীতি দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা বিষয়টা আছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীন। এটা তো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না, এটি একটি হিউম্যানিটারিয়ান ক্রাইসিস (মানবিক সংকট)। আর একটা জায়গা থেকে তাদের আমরা দেখি। সেটি হলো সিকিউরিটির (নিরাপত্তা) জায়গা থেকে।’

ঐতিহাসিক সমস্যাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে রোহিঙ্গাবিষয়ক একটা রূপরেখা থাকা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন বুলবুল সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘প্রত্যাবাসন না হওয়াতে রোহিঙ্গাদের কর্মসংস্থান, শিক্ষাসহ তাদের জীবনমানে আমরা খুব বেশি নজর দিচ্ছি না। প্রত্যাবাসন যদি না হয় তাহলে আমাদের বিকল্প রোডম্যাপটা কী সে বিষয়েও আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই।’

চীন বা ভারত তাদের যে স্বার্থ, সেটির বাইরে যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের একটা নীতি প্রণয়ন করা দরকার। প্রত্যাবাসন যদি না হয় তাহলে হোস্ট ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।’

বিমসটেক সম্মেলনে মিয়ানমার সরকারের ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক চাল হতে পারে কি না, এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আরাকান আর্মির সাথে আলোচনা না করে এমন ঘোষণা দিলে সেটি কখনো ফলপ্রসূ হবে না।

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব স্যোশাল সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমদ বলেন, বার্মিজ সরকারের যে একটা হোমোজেনাস রাষ্ট্র (এক জাতিগোষ্ঠীর রাষ্ট্র) গঠন করার আকাঙক্ষা সেটি অনেক পুরোনো। ১৯৬০–এর দশক থেকে এটি তাদের আলোচনায় ছিল। ১৯৭০–এর দশকের শেষে এসে চেষ্টা করা হয়েছে। ’৮০–এর দশকে চেষ্টা হয়েছে। ’৯০–তে এসে তারা কিছুটা সফল হয় কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পাঠাতে।

বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের সাথে ভারতের যে গভীর সম্পর্ক দেখা গেছে, তার ছিটেফোঁটা প্রতিফলন রোহিঙ্গা সংকটে দেখা যায়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘কোনো ফোরামে ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমর্থন দেয়নি। এ কারণে ভূরাজনীতি ও কূটনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেটুকু কূটনৈতিক সফলতা আমরা ১৯৭০, ১৯৮০ ও ১৯৯০–এ দেখেছি, ২০১৭ সালের পর সেটি দেখা যায়নি।’

রোহিঙ্গা সংকট ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক কিছু ভুল ছিল বলে মনে করেন অধ্যাপক বখতিয়ার আহমদ। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য ভূরাজনীতির বিষয় থেকে রোহিঙ্গা সংকটকে আলাদা করে দেখার একটা প্রবণতা আছে। আমাদের প্রথম স্বীকার করতে হবে যে রোহিঙ্গা সংকট একটা আত্মপরিচয়ের সংকট। এটি একটি ভূখণ্ডগত পরিচয়।’

আরাকান রাজ্যে রোহাং বা রোয়াং বলে যে অঞ্চলটি আছে সে অঞ্চলের ওপর রোহিঙ্গাদের যে টেরিটোরিয়াল ক্লেইম, সেটিই রোহিঙ্গাদের আত্মপরিচয় উল্লেখ করে তিনি সে পরিচয়কে স্বীকার করে গ্লোবাল ফোরামে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অধ্যাপক বখতিয়ার আহমদ বলেন, ‘আমাদের তখনকার সরকার রোহিঙ্গাদের অদ্ভুত একটা নামকরণ করেছে এফডিএমএন (জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক) নামে। এটাতে একটা বড় কূটনৈতিক ও কৌশলগত ভুল হয়েছে। শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা পাওয়ার যে আলোচনা, সেটাতে আমরা সুবিধা করতে পারছি না। এটা রোহিঙ্গাদের যে টেরিটোরিয়াল ক্লেইম, সেটিতেও হেল্প করছে না। কারণ, আমরা তাদের রোহিঙ্গা বলতে কার্পণ্য করছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়লের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স ও সোশিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইশরাত জাকিয়া সুলতানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সায়মা আহমদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব লর সহকারী অধ্যাপক মোস্তফা হোসেন।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকসের উদ্যোগে সংলাপে বক্তারা। বুধবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকসের উদ্যোগে সংলাপে বক্তারা। বুধবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা। ছবি: জাহিদুল করিম

চীন গোপনে প্রশান্ত মহাসাগরে একটি সামরিক নেটওয়ার্ক তৈরি করছে

একটি বাণিজ্যিক বিমান থেকে জরুরি রেডিও সম্প্রচার ছিল প্রথম সতর্কবার্তা। যেখানে বলা হয়েছিল, চীনা সরকার অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মধ্যে তাদের বিমান পথে লাইভ-ফায়ার মহড়া শুরু করতে চলেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ান কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয় এবং বিমান পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারীরা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে ৪৯টি বাণিজ্যিক ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করে যাতে তাদের কোনো ক্ষতি না হয়। চীনের পর্যবেক্ষক এবং সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুসারে, ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনা- যা ক্যানবেরা এবং ওয়েলিংটনের কর্মকর্তাদের বিচলিত করেছিল। এটি প্রশান্ত মহাসাগরে বেইজিংয়ের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার একটি ঝলক মাত্র। প্রাগভিত্তিক গবেষণা গোষ্ঠী সিনোপসিসের এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) কমপক্ষে ১০টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের দেশে ‘দ্বৈত-ব্যবহারের’ সমুদ্রবন্দর, বিমানঘাঁটি এবং টেলিকম নেটওয়ার্ক নীরবে গড়ে তুলছে, যা প্রায় ৩,০০০ মাইল জুড়ে বিস্তৃত। সেইসঙ্গে হাওয়াই থেকে মাত্র ২,৫০০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে পলিনেশিয়ার আমেরিকান সামোয়া অঞ্চল এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে কৌশলগত নেটওয়ার্ক তৈরি করছে।

সিনোপসিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়ন সহায়তা প্রদানের উদ্দেশে  তৈরি, দ্বৈত-ব্যবহারের এই অবকাঠামোগুলো ‘এক মুহূর্তের নোটিশে’ সামরিক ব্যবহারের জন্য উল্টে দেয়া যেতে পারে। এটি  পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)-কে তাদের দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে একটি প্রস্তুত লজিস্টিক চেইন প্রদান করে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, চীনের গোপনে এই নেটওয়ার্ক তৈরি ওয়াশিংটন, ক্যানবেরা এবং টোকিওতে সতর্কতা জোরদার করবে এবং দ্বীপ সরকারগুলোকে সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা বিবেচনা করতে বাধ্য করবে।

মার্কিন কমান্ডাররা প্রশান্ত মহাসাগরীয় শক্তি পরিমাপ করেন তিনটি প্রতিরক্ষামূলক আর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে, যা বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রথম দ্বীপ শৃঙ্খল-জাপান তাইওয়ান এবং ফিলিপাইনের মধ্য দিয়ে চীনের উপকূলের কাছে তার বাহিনীকে ঘিরে রেখেছে। দ্বিতীয় দ্বীপ শৃঙ্খলটি রয়েছে গুয়ামে, যেখানে মার্কিন যুদ্ধাস্ত্র মজুত করা হয়। হাওয়াই থেকে আমেরিকান সামোয়া এবং ফিজি পর্যন্ত দক্ষিণে বিস্তৃত, তৃতীয় শৃঙ্খলটি এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকাকে সংযুক্ত করে এমন সমুদ্র পথগুলোকে রক্ষা করে।পশ্চিমা পরিকল্পনাকারীদের মতে, বেইজিংয়ের কৌশল হলো প্রথম শৃঙ্খলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার অস্বীকার করা, দ্বিতীয় শৃঙ্খলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং তৃতীয় শৃঙ্খলে অবাধে কাজ করা। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ‘বেসামরিক’ সুযোগ-সুবিধা স্থাপনের ফলে পিএলএ প্রথম দুটি দ্বীপপুঞ্জ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে, কোনও বিমানবাহী জাহাজ ছাড়াই। Exhibit A হল ভানুয়াতুর লুগানভিল ওয়ার্ফ, যা তৃতীয় শৃঙ্খলের পাশে অবস্থিত একটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ। অস্ট্রেলিয়া থেকে ১,০০০ মাইলের কিছুটা  উত্তর-পূর্বে অবস্থিত, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনীর একটি প্রধান ঘাঁটি ছিল। ২০১৪ সালে ৯৭ মিলিয়ন ডলারের চীনা ঋণের ফলে এই ঘাঁটিটি এখন ৩৬১ মিটার (০.২২ মাইল) পর্যন্ত লম্বা , যা ক্রুজ লাইনার চলাচলের  জন্য যথেষ্ট বড়। তবে গুরুত্বপূর্ণভাবে, সরবরাহকারী ও ডেস্ট্রয়ার  জাহাজও অনায়াসেই যাতায়াত করতে পারে। সিনোপসিস অনুসারে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, স্থানীয়রা পিএলএ নৌবাহিনীর মতো পোশাক পরা লোকদের লুগানভিলের বিমানবন্দরের পেছনে জমি পরিষ্কার করতে দেখেন। গবেষক দলটি সতর্ক করে দিয়েছে যে লুগানভিলে গড়ে ওঠা  চীনা ফাঁড়ি পিএলএকে কাছাকাছি জলসীমায় যৌথ সামরিক মহড়া পর্যবেক্ষণ করার সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে বিমান ও সমুদ্র পরিবহনকে ব্যহত করতে পারে।

সূত্র : theepochtimes

mzamin

অবিশ্বাস্য! মানুষের খুলির তৈরি কাপে মদ পান করতেন অক্সফোর্ডের কিছু শিক্ষক

অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য বিশ্ববিখ্যাত বৃটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক কয়েক দশক ধরে মানুষের মাথার খুলির তৈরি কাপে পান করতেন মদ। যে তথ্য লুট হওয়া মানব দেহাবশেষের সহিংস ঔপনিবেশিক ইতহাস সম্বলিত একটি বইয়ে উঠে এসেছে। অক্সফোর্ডের পিট রিভার্স মিউজিয়ামের বিশ্ব প্রত্নত্তত্ব বিভাগের কিউরেটর অধ্যাপক ড্যান হিকসের মতে, ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওরচেস্টার কলেজের আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে পানপাত্রটি নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত হতো। যেগুলো মানুষের মাথার খুলি দিয়ে তৈরি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান।

এতে বলা হয়, ‘এভরি মনুমেন্ট উইল ফল’ নামের একটি বই লিখেছেন ড্যান হিকস। যেখানে তিনি মাথার খুলির লজ্জাজনক ইতিহাস তুলে ধরেছেন। হিকস বলেছেন, কাপ ফুটো হয়ে মদ বেরোতে শুরু করলে তাতে চকলেট পরিবেশন করা হতো।

অক্সফোর্ডের এই প্রত্নতত্ত্ববিদ বলেছেন, শিক্ষক এবং অতিথিদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ কমনরুমের আচার-অনুষ্ঠানের ইতি ঘটে। পরে ২০১৯ সালে খুলি কীভাবে ‘অস্বাভাকি ধরণের পানপাত্রে পরিণত’ হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে হিকসকে আমন্ত্রণ জানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ।

হিকস বলেন, ঔপনিবেশিকাতার উত্তরাধিকার সম্পর্কে বিতর্কই মূলত এ বিষয়ের ওপর মনযোগ আকর্ষণ করেছে। যেখানে সিসিল রোডস অথবা এডওয়ার্ড কলস্টনের মতো প্রসিদ্ধ বৃটিশরা এ থেকে লাভবান হয়েছেন। তারা কীভাবে তাদের নাম ধারণকারী মূর্তি, বস্তু বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

তবে হিকস দেখাতে চেয়েছেন, ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা মানুষদের পরিচয় প্রায়শই ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। কারণ বর্ণবাদী বৃটিশ সংস্কৃতি ও শ্বেত আধিপত্যবাদী ধারণার ফলে তাদের (ঔপনিবেশিক শাসনে ভুক্তভোগী মানুষ) উল্লেখযোগ্য বলে গণ্য করা হতো না। এ সব মানুষদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ ও তাদের পরিচয় ধ্বংস করার প্রচেষ্টা সহিংসতার অংশ বলে মন্তব্য করেছেন এই প্রত্নতত্ত্ববিদ।

হিকস সেই ব্যক্তির কোনো রেকর্ড খুঁজে পাননি যার দেহাবশেষ থেকে পানপাত্র তৈরি করা হয়েছিল। যদিও কার্বন ডেটিংয়ে দেখা গেছে খুলিটি প্রায় ২৫৫ বছর পুরোনো। খুলির আকার ও গঠন থেকে বুঝা যায় এটি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের। যা দাসত্বের শিকার কোনো নারীর বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পানপাত্রটির বৃটিশ মালিকদের সম্পর্কে সুপরিচিত তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৪৬ সালে জর্জ পিট-রিভার্স নামে সাবেক এক শিক্ষার্থী ওরচেস্টার কলেজে পানপাত্রটি দান করেছিলেন। যার নাম পানপাত্রের রূপার অংশে খোদাই করা আছে। যাকে বৃটিশ ফ্যাসিবাদী নেতা অসওয়াল্ড মোসলেকে সমর্থন করার অভিযোগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়  অন্তরীণ করে বৃটিশ সরকার।

কাপটি পিট-রিভার্সের দাদা ভিক্টোরিয়ান বৃটিশ সৈনিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক অগাস্টাস হেনরি লেন ফক্সের ব্যক্তিগত সংগ্রহের অংশ ছিল। ১৮৮৪ সালে পিট রিভার্স একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একই বছরে সথবি’র নিলাম থেকে কাপটি কিনেছেলেন তার বড় ভাই।

নথি থেকে জানা গেছে তখন কাপটিতে একটি কাঠের স্ট্যান্ড ছিল যার নীচে রানী ভিক্টোরিয়ার একটি শিলিং বসানো ছিল। কাপটির রূপালী অংশ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, এটি ১৮৩৮ সালে তৈরি করা হয়েছিল। সেই বছরই রানী ভিক্টোরিয়ার অভিষেক হয়েছিল।

কাপটির বিক্রেতা ছিলেন আইনজীবী ও অক্সফোর্ডের ওরিয়েল কলেজের স্নাতক বার্নার্ড স্মিথ। তিনি মূলত প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্র ও বর্ম সংগ্রহ করতেন। অধ্যাপক হিকসের ধারণা, তিনি তার বাবার কাছ থেকে কাপটি উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন। তার বাবা ক্যারিবীয় অঞ্চলে বৃটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীতে কাজ করতেন।

mzamin

আরব দেশগুলোর সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলন করবেন পুতিন

আরব লীগের দেশগুলোর সঙ্গে একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মঙ্গলবার ওই ঘোষণা দেন তিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।

এতে বলা হয়, ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে রাশিয়া। একে একে সব ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে দেশটির। এমন পরিস্থিতিতে নতুন মিত্র সন্ধান করছে মস্কো। মূলত এ কারণেই এবার এশিয়া, আফ্রিকা ও আরব দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন দৃঢ় করার পরিকল্পনা করছেন পুতিন। ইতিমধ্যেই মস্কোয় সফররত ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিককে অবগত করেছেন এ বিষয়টি তিনি। বলে রাখা ভালো, ওমানের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের এটাই প্রথম রাশিয়া সফর।

পুতিন বলেছেন, আমাদের অনেক আরব মিত্র ওই পরিকল্পনা সমর্থন করেন। সম্মেলনে তিনি হাইথাম বিন তারিককেও আমন্ত্রণ জানান। তবে সম্মেলনের তারিখ ও স্থান সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।

গাজা ও সিরিয়ার বিষয়ে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির সঙ্গে মস্কোতে বৈঠক করেন পুতিন। এর কিছুদিন পরই রাশিয়া সফর করলেন ওমানের সুলতান। এ থেকে স্পষ্ট যে, আরব  রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সক্ষ্যতা বাড়াতে তৎপর রুশ প্রেসিডেন্ট।

ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী দেশ হচ্ছে কাতার। বেশ কয়েকবার দেশটি ইসরাইল-হামাস সংঘাত বন্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।

এদিকে ইউক্রেনে গাজার মতো প্রতিদিই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এসব সংঘাতের সমাধানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে। এছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাব অর্জন করছে।

mzamin

সিলেট সীমান্তে ফের সক্রিয় হলো চোরাই সিন্ডিকেট by ওয়েছ খছরু

সিলেটে চোরাচালানকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে চাইছে প্রশাসন। সেজন্য চতুর্মুখী অভিযান চলছে। কিন্তু এসব অভিযানের ফাঁক গলিয়ে ফের সক্রিয় হয়েছে চোরাই সিন্ডিকেট। সীমান্ত দিয়ে আসছে বানের পানির মতো পণ্য। রুটও বদল করা হয়েছে। এ কারণে প্রশাসনের অনেককেই ‘ম্যানেজ’ করে চোরাচালান করা হচ্ছে। সিলেটের চোরাই রাজ্য বলে খ্যাত হরিপুর। ঈদের আগে সেনাবাহিনীর অভিযানে এই রাজ্য এখন অস্তিত্ব সংকটে। চিহ্নিত চোরাকারবারিরা পালিয়েছে এলাকা ছেড়ে। কেউ কেউ দেশ ছেড়েও পালিয়ে গেছে। এই অবস্থায় রুট পরিবর্তন করে ফের সক্রিয় হয়েছে হরিপুরের চোরাকারবারিরা। তাদের অনেকেই এখন জৈন্তাপুরের পার্শ্ববর্তী গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটে অবস্থান নিয়েছেন।  সেখান থেকে তারা চোরাচালান করছে। গোয়াইনঘাটের সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজন জানিয়েছেন- উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে চোরাই মালামাল। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঢাকার ব্যবসায়ীদের কসমেটিক্স সহ নানা পণ্য। এসব পণ্য দীর্ঘদিন ধরে হরিপুরের ব্যবসায়ীরা ক্যারিয়ার হিসেবে পৌঁছে দিচ্ছে। এতে মাঝখানে তারা লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। হরিপুরে সেনা অভিযানের পর মালামাল আটক হওয়ায় কিছু দিন চোরাচালান বন্ধ ছিল। ওই সময় প্রাণ ভয়ে হরিপুরের ব্যবসায়ীরা সিলেট থেকে পালিয়ে যান। সম্প্রতি তারা সিলেটে ফিরেছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই অবস্থান নিয়েছেন গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি, হাদারপাড়, মাতুর তল, হাজীপুর, জাফলং সহ কয়েকটি এলাকায়। সেখান থেকে তারা চোরাই পণ্য রিসিভ করে ট্রাকযোগে ঢাকায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। স্থানীয় লোকজন জানান- হরিপুর ছিল সবচেয়ে বড় পশুর হাট। সেটি এখন আর নেই। বর্তমানে গোয়াইনঘাটের তোয়াকুল বাজারে সবচেয়ে বড় চোরাই পশুর হাট বসে। বিছনাকান্দি এলাকা দিয়ে প্রতিদিন শত শত পশু সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ঢুকে।

স্থানীয় চোরাকারবারি কামাল সহ কয়েকজন সিন্ডিকেট করে এসব পশু বিজিবি ও পুলিশের সঙ্গে আঁতাত করে নিয়ে আসেন। এই পশুগুলো তোয়াক্কুল বাজারে এনে সিট দিয়ে বৈধ করা হয়। এরপর সেগুলো কোম্পানীগঞ্জ, সালুটিকর দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দেয়া হয়। প্রতিদিন ওই হাটে কোটি টাকার পশু বেচাবিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন এলাকার মানুষ। বিছনাকান্দি এলাকা দিয়ে আসে ঢাকার ব্যবসায়ীদের কসমেটিক্স সহ অন্যান্য মালামাল। এই মালগুলো হাদারপাড় এলাকায় এসে ট্রাকে করে সালুটিকর আসে। এরপর বাদাঘাট সড়ক ও এয়ারপোর্টের বাইপাস সড়ক দিয়ে সুনামগঞ্জ রুট ধরে চলে যায়। নতুন করে রুট হওয়ায় এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে পড়েনি পাচার হওয়া এসব চালান। সালুটিকর এলাকার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন প্রতিদিন চোরাচালানের শত শত ট্রাক ওই এলাকা দিয়ে চলে যায়। বেশির ভাগ চালান যায় ঢাকায়। হরিপুরের ব্যবসায়ীরা হাদারপাড় ও বিছনাকান্দি এলাকায় অবস্থান নিয়ে তাদের পুরাতন ব্যবসা চালাচ্ছেন। দ্বিতীয় স্পট হচ্ছে গোয়াইনঘাটের মাতুরতল, সোনারহাট সহ কয়েকটি এলাকা। এসব এলাকা দিয়ে পশু নামে। এগুলো রাধানগর বাজারে এসে বৈধ হয়ে যায়। হরিপুরের  চোরাকারবারিরা ওই এলাকার চোরাকারবারিদের পার্টনার। গ্রেপ্তার এড়াতে তারা সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাতে অবস্থান নিয়েছেন। প্রথমে তারা নীরব থাকলেও এখন পুরাতন ব্যবসা চালাচ্ছেন। গোয়াইনঘাট থানার সম্মুখ দিয়ে তারা চোরাই মালামাল নিয়ে এসে হাতিরপাড়া রুট দিয়ে ধোপাগুল হয়ে ঢাকায় চলে যায়। ওই রুট দিয়ে প্রতিদিনই পণ্যবাহী শতাধিক মিনি ট্রাক প্রবেশ করে বলে জানিয়েছেন গোয়াইনঘাট সদরের বাসিন্দারা।

তারা জানিয়েছেন, অনেক চাঁদাবাজ চক্র পথে পথে ট্যাক্স বসিয়ে এসব গাড়ি থেকে চাঁদাবাজি করে। গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ ‘ম্যানেজ’ থাকায় চোরাই পণ্যের মালামাল কখনোই আটক হয় না। হরিপুর চোরাই রাজ্যের পতন হওয়ার কারণে কানাইঘাটে বেড়েছে চোরাচালান। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার এড়াতে হরিপুরের অনেক ব্যবসায়ী কানাইঘাটে অবস্থান নিয়েছে। তারা লালাখাল সীমান্ত, কালীবাড়ী-বাদশাবাজার সীমান্ত ও লোভা সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে কসমেটিক্স সহ নানা পণ্য নিয়ে আসে। এসব পণ্য কানাইঘাট বাজার দিয়ে শাহবাগ হয়ে ঢাকায় যায়। আবার কেউ কেউ বোরহানউদ্দিন রুট ধরে পণ্য নিয়ে আসেন সিলেট নগরের টুলটিকর সহ কয়েকটি এলাকায়। সেখান থেকে বড় ট্রাকে করে পণ্য ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। রাত হলেই কানাইঘাটের সড়কগুলো সরব হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন এলাকার মানুষ। জৈন্তাপুর বাজারে বৈধ হয় চোরাচালানের পশু: সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা সদর বাজারে বৈধ হয় ভারতীয় পশু। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ শতাধিক পশু সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করে জৈন্তাপুর বাজারে। বাজার থেকে বৈধ চালান নিয়ে যাচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন বাজার সহ সিলেট ও বিভিন্ন জেলায়। কিছুদিন পূর্বে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর বাজারে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার পর  থেকে ধীরে ধীরে জৈন্তাপুর বাজার হয়ে উঠে চেরাচালানের বৈধ হাট। আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর অভিযানে ইতিমধ্যে জৈন্তাপুরের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদকদ্রব্য আটক করা হলেও দেদারছে বাজারে প্রবেশ করছে ভারতীয় গরু-মহিষ-ছাগল।

বাজার থেকে এসব গরু-মহিষ বৈধ কাগজ নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন বাজার সহ সিলেট ও জেলার বাইরে  প্রেরণ করা হচ্ছে। এলাকাবাসী জানান, বিজিবি’র লাইনম্যান ও নিজে চোরাচালান ব্যবসায়ী হওয়াতে জৈন্তাপুর গরুর বাজার ইজারাদার নিযুক্ত হওয়ায় একক আধিপত্য বিস্তার করে বাজারে গরু-মহিষ প্রবেশ করছে। আব্দুল করিম ওরফে ব্যান্ডিজ করিম নিজে ইজারাদার ও বিজিবি’র লাইনম্যান হওয়ার কারণে এখন উল্লিখিত চোরাকারবারিদের নিয়ে জৈন্তাপুর বাজার থেকে বৈধ চালান নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন বাজার সহ সারা দেশে প্রেরণ করা হয়। হরিপুর বাজারে অভিযানের পর থেকে সীমান্তের জৈন্তাপুর বাজার এখন চোরাকারবারিদের নিয়ন্ত্রণে ব্যবসা পরিচালনা করছে। জৈন্তাপুর উপজেলায় গরু-মহিষ বাজারজাত করণে কোনো খামার নেই। তবুও জৈন্তাপুর বাজারে প্রতিদিন শত শত ভারতীয় গরু- মহিষ বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রয় হচ্ছে। জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি আবুল বাশার মো. বদরুজ্জামান জানিয়েছেন- সীমান্তের অতি নিকটে বাজার হওয়ার পরে পুলিশ অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে। তবে সীমান্তের বিষয়টি অন্যান্য বাহিনী দেখভাল করছে বলে জানান। 

mzamin